Showing posts with label শিল্প. Show all posts
Showing posts with label শিল্প. Show all posts

Monday, August 24, 2026

ফিলিস্তিনের মানুষের গল্প বাঁচিয়ে রাখতে ‘গাজা পাবলিকেশনস’ by রবিউল কমল

গাজায় যুদ্ধ ও ধ্বংসের মধ্যেও মানুষের গল্প, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ধরে রাখতে ‘গাজা পাবলিকেশনস’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন লেখক হুসাম মারুফ।

১৪ আগস্ট প্রকাশিত এক লেখায় নিজের এই উদ্যোগের কথা জানান তিনি।

যুদ্ধের শুরুর দিকে মারুফ পরিবারের সঙ্গে রাফাহ শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। চারপাশে তখন গোলাবর্ষণ চলছিল। প্রতিদিনই তাঁর মনে হতো, যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে।

তবে শুধু মৃত্যুর ভয়ই তাঁকে ভাবিয়ে তুলছিল না। তাঁর ভয় ছিল, নিজের লেখা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই যদি তিনি মারা যান, তাহলে তাঁর গল্প, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাগুলোও হয়তো হারিয়ে যাবে।

মারুফ মনে করেন, একজন মানুষের মৃত্যু আর তাঁর স্মৃতি মুছে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন মানুষ মারা যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর জীবন, ভালোবাসা, ভয়, স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতার চিহ্নগুলোও যদি হারিয়ে যায়, তাহলে সেটি আরও বড় ক্ষতি।

গাজায় তখন অনেক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগার ধ্বংস হচ্ছিল। লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও থেমে যাচ্ছিল। তখনই মারুফের মনে প্রশ্ন আসে, এই সময়ের মানুষের গল্পগুলো কে সংরক্ষণ করবে?

এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘গাজা পাবলিকেশনস’।

গাজার ভেতরে তখন বই ছাপার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই মারুফ সিদ্ধান্ত নেন, বই গাজার বাইরে ছাপা হবে। তবে সম্পাদনা, নকশা ও অন্যান্য কাজ গাজা থেকেই শুরু করা হবে।

তিনি একজন সম্পাদক, প্রুফ রিডার, ডিজাইনার, বিপণনকর্মী এবং মুদ্রণ ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা কয়েকজনকে নিয়ে একটি ছোট দল তৈরি করেন। তাঁদের কয়েকজনকে তিনি আগে চিনতেন না। কিন্তু সবাই উদ্যোগটির গুরুত্ব বুঝে স্বেচ্ছায় যুক্ত হন।

শুরুতে খুব অল্প সামর্থ্য নিয়েই কাজ শুরু হয়। তৈরি করা হয় একটি সাধারণ লোগো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ। এরপর এমন বই খোঁজা শুরু হয়, যেগুলোতে যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের জীবন ও অভিজ্ঞতার কথা আছে।

‘গাজা পাবলিকেশনস’-এর লোগোতে রয়েছে একটি বালুঘড়ি। তবে সেখানে বালু নিচে পড়ে না। মাঝখানে একটি বাধা থাকায় বালু আটকে থাকে। মারুফের কাছে এই বালুঘড়ি গাজার যুদ্ধকালীন জীবনের প্রতীক।

তাঁর মতে, গাজায় তখন সময় যেন থেমে গিয়েছিল। কাজ, পড়ালেখা, সামাজিক জীবন এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা অনেক কিছুই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ কেবল বর্তমান মুহূর্তটি পার করার চেষ্টা করছিল।

প্রকাশনাটির প্রথম বই ছিল আমের আল-মাসরির ‘দ্য ম্যান হু লুকড ব্যাক’। বইটিতে কেবল বোমা হামলার কথা নেই। যুদ্ধের মধ্যে মানুষের ভয়, পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং নিজের পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টার কথাও রয়েছে।

বইটি প্রকাশের দিনই মারুফ জানতে পারেন, তাঁর এক কাজিনের মেয়ে ও সন্তানেরা বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। একই দিনে তাঁকে দুটি বিপরীত অনুভূতি সামলাতে হয়। একদিকে আনন্দ—গাজা থেকে একটি বই বের হয়ে পৃথিবীর পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। অন্যদিকে গভীর শোক—একটি পুরো পরিবার হারিয়ে গেছে।

সেদিনই তাঁর কাছে আরও পরিষ্কার হয়ে যায়, বই প্রকাশের কাজটি শুধু সাহিত্য প্রকাশের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন ও স্মৃতি ধরে রাখারও একটি চেষ্টা।

দ্বিতীয় বই ছিল রেহাম আল-সাবির উপন্যাস ‘আই অ্যাম অ্যাট ইউর ডোর’। এতে যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনি নারীদের জীবনের কথা বলা হয়েছে। বাস্তুচ্যুতি ও ভয় ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট সমস্যাগুলোও উঠে এসেছে।

যেমন স্যানিটারি প্যাড, সাবান, ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পুর মতো প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব। স্বাভাবিক সময়ে এসব সাধারণ জিনিস হলেও যুদ্ধের সময় এগুলোর অভাব নারীদের ব্যক্তিগত জীবন, গোপনীয়তা ও মর্যাদায় বড় প্রভাব ফেলে।

তৃতীয় বই ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য সি শু’ লিখেছেন ফিলিস্তিনি লেখক বিসান নাতিল। শিশুদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা এই বইয়ে শরণার্থীশিবিরের শিশুদের জীবন উঠে এসেছে। বাড়ি হারানো, বোমা হামলার ভয়, ক্ষুধা, পানির সংকট, খেলতে না পারা—সবকিছুর পাশাপাশি বইটিতে শিশুদের ছোট ছোট অনুভূতির কথাও বলা হয়েছে।

‘গাজা পাবলিকেশনস’-এর কাজ চালাতে গিয়ে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যেত, দলের সদস্যদের সঙ্গে দিনের পর দিন যোগাযোগ করা যেত না। একবার দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর তাঁরা ভেবেছিলেন, মারুফ হয়তো মারা গেছেন। পরে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়, কাজও আবার শুরু হয়।

বইগুলো পোল্যান্ডে ছাপা হয়েছে। এরপর জার্মানি, জর্ডান ও কায়রোর বিভিন্ন বিতরণকেন্দ্রের মাধ্যমে সেগুলো পাঠকদের কাছে পৌঁছেছে। বইগুলো নিয়ে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি আগ্রহ দেখা গেছে বলে জানান মারুফ।

পরে নিজের পুরোনো বাড়ির জায়গায় ফিরে তিনি দেখেন, পুরো বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের সামনে একটি গাছ এবং তার পাশে ছোট আরেকটি গাছ তখনো দাঁড়িয়ে আছে।

সেই ছোট গাছটির দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়, লেখাও অনেকটা এমন। লেখা যুদ্ধ থামাতে পারে না। হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। কিন্তু চারপাশের সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও মানুষের গল্প, স্মৃতি ও পরিচয় ধরে রাখতে পারে।

মারুফের কাছে ‘গাজা পাবলিকেশনস’ সেই কাজটিই করছে—যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও যেন মানুষ কেবল সংখ্যা হয়ে হারিয়ে না যায়, বরং তার গল্প পৃথিবীর কাছে থেকে যায়।

(লিটারেরি হাবে প্রকাশিত হুসাম মারুফের কলাম অবলম্বনে)

গাজার প্রকাশনা সংস্থা ‘গাজা পাবলিকেশনস’ থেকে প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ ও হুসাম মারুফের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গাজার প্রকাশনা সংস্থা ‘গাজা পাবলিকেশনস’ থেকে প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ ও হুসাম মারুফের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

Saturday, July 4, 2026

চা–শিল্প বিকাশের পথে চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় by মামুন রশীদ

চা–শিল্পের সঙ্গে অনেক দিনের সম্পৃক্ততার কারণে প্রায়ই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, যদি চা–বাগান খুব লাভজনক না-ই হয়, তাহলে এত এত ব্যবসায়ী কেন চা–বাগানের মালিক হতে আগ্রহী? আর যদি চা বিক্রির বাজার এত বড় হয়, তাহলে এই মূল্যশৃঙ্খলে প্রকৃত লাভের অংশটি কার হাতে যাচ্ছে?

বাংলাদেশে প্রায় দেড় শ বছরেরও বেশি সময় ধরে চা চাষ হচ্ছে। বর্তমানে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, পঞ্চগড় ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৬৮টি বাণিজ্যিক চা–বাগান প্রায় আড়াই লাখ একরের বেশি জমিতে বিস্তৃত। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২৯ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের নবম বৃহত্তম চা উৎপাদক এবং বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ আসে আমাদের দেশ থেকে।

কিন্তু এত বড় উৎপাদন সত্ত্বেও বাংলাদেশের চা–শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে আজও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। দেশে উৎপাদিত চায়ের প্রায় পুরোটাই অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবহৃত হয়। বছরে প্রায় ৯ থেকে ৯.৫ কোটি কেজি চা দেশেই ভোগ করা হয়। অন্যদিকে বিশেষ মানের ব্লেন্ড তৈরির জন্য কিছু চা আমদানিও করতে হয়। অথচ ২০০২ সালে যেখানে ১ কোটি ৩৬ লাখ কেজির বেশি চা রপ্তানি হয়েছিল, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২২ লাখ কেজিতে। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়লেও রপ্তানিতে আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই এ জন্য অপরাপর দেশের তুলনায় আমাদের চায়ের বেশি দামকে দায়ী করেন।

বাংলাদেশের চা–শিল্প মূলত বেসরকারি উদ্যোক্তা ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের একটি মিশ্র কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইস্পাহানি, জেমস ফিনলে, আবুল খায়ের গ্রুপ, কাজী অ্যান্ড কাজী, ডানকান ব্রাদার্স, ট্রান্সকম, হালদা ভ্যালি ও ওরিয়নের মতো প্রতিষ্ঠান বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অন্যদিকে অধিকাংশ সরকারি মালিকানায় রয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত- ন্যাশনাল টি কোম্পানি। বাংলাদেশ চা বোর্ড নিলাম ব্যবস্থা, কারখানার লাইসেন্সিং ও রপ্তানি তদারকির দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু এই কাঠামো এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খুব একটা তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।

চা–শিল্পের অন্যতম বড় সমস্যা এর বিপণনকাঠামো। অধিকাংশ চা এখনো চট্টগ্রামের নিলাম ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্রি হয়। ফলে উৎপাদকেরা বিদেশি ক্রেতা কিংবা বড় আন্তর্জাতিক বিপণন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পান না। একই সঙ্গে ব্র্যান্ডিং, আধুনিক প্যাকেজিং এবং মূল্য সংযোজনের অভাবে বাংলাদেশের চা এখনো মূলত বাল্ক পণ্য হিসেবেই বিক্রি হয়।

অর্থায়নও একটি বড় বাধা। চা–শিল্পকে এখনো শিল্প খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে উদ্যোক্তাদের ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হয়। এটিকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে। এতে পুনঃ রোপণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ সহজ হবে। সবুজ হলেও চা–শিল্প সবুজ অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত।

বাংলাদেশে প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ৯০০ কেজি চা উৎপাদিত হয়। অথচ কেনিয়ায় এই হার প্রায় ২ হাজার কেজি এবং মালাউইয়ে আড়াই হাজার কেজিরও বেশি। একইভাবে শ্রীলঙ্কার রপ্তানিকারকেরা প্রতি কেজি চায়ের জন্য যে মূল্য পান, বাংলাদেশের উৎপাদকেরা তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম আয় করেন। অর্থাৎ উৎপাদনের চেয়ে মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রেই আমাদের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। বাগানের অতিরিক্ত জমিতে নতুন করে চাষ, উন্নত মানের ফলের চাষসহ সোলার এনার্জি প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শ্রমব্যবস্থা। বহু চা–বাগানে এখনো কয়েক দশক আগের জনবলকাঠামো বহাল রয়েছে। শ্রমিকদের মৌলিক মজুরি সীমিত হলেও অনেকেই উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনার মাধ্যমে অতিরিক্ত আয় করেন। বাগানগুলোয় আবাসন, রেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধায় এখনো ঘাটতি রয়েছে। প্রশ্ন রয়েছে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা নিয়ে। তাই শ্রমিক কল্যাণ ও উৎপাদনশীলতাকে একসঙ্গে বিবেচনায় এনে নতুন কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের সময় এসেছে।

চা–শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নীতিগত সংস্কারের ওপর। প্রথমত, কৃষি খাতের মতো স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিলাম ব্যবস্থার পাশাপাশি উৎপাদকদের সরাসরি রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে হবে। পাকিস্তান, মিসর, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের চায়ের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জৈব ও বিশেষায়িত চায়ের বাজার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে ব্র্যান্ডভিত্তিক রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগও কাজে লাগাতে হবে। চা–শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও কাজ করতে হবে।

সুশাসন ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্পও নেই। ডিজিটাল পে রোল বা বেতন প্রদান, জিপিএস-নির্ভর সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ব্যবস্থা চা–শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন (ইএসজি) মানদণ্ড অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর-সুবিধা ও সহজ অর্থায়নের আওতায় আনলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে।

বাংলাদেশের চা–শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি এর দীর্ঘ ঐতিহ্য, অনুকূল জলবায়ু এবং ঐতিহ্যবাহী শ্রমশক্তি। দুর্বলতা মূলত নীতিমালা, অর্থায়ন, বাজারব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনায়। তাই এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন সংস্কার নয়; প্রয়োজন একটি সমন্বিত রূপান্তর পরিকল্পনা। স্বল্প সুদে অর্থায়ন, বাজার উদারীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং মূল্য সংযোজনভিত্তিক রপ্তানি কৌশল বাস্তবায়ন করা গেলে চা–শিল্প আবারও দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের চা–শিল্পের শিকড় যেমন গভীরে প্রোথিত, তেমনি সঠিক নীতি ও সংস্কারের মাধ্যমে এর সম্ভাবনার ডালপালাও আরও অনেক দূর বিস্তৃত হতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের অপরাপর অংশ এ পথে ভাবছে বলে ভালো লাগছে। নীতিমালা গ্রহণ করে সেগুলোর ত্বরিত বাস্তবায়ন হলে আরও ভালো লাগবে।

* মামুন রশীদ, অর্থনীতি বিশ্লেষক

চা বাগানে কাজ করছেন এক শ্রমিক
চা বাগানে কাজ করছেন এক শ্রমিক। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, June 10, 2026

ক্যানভাসে সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করা এক ইরানি শিল্পী by আশরাফুর রহমান

যখন পুরো শহরজুড়ে সাইরেনের আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হয় এবং সংবাদমাধ্যমের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে বারুদের গন্ধ, তখন প্রতিটি বিবেকবান মানুষ নিজের মতো করে অস্ত্র তুলে নেয়। কেউ কাঁধে তুলে নেন রাইফেল, কেউ আবার তাক করেন ক্যামেরার লেন্স।

আর বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের এই আগ্রাসী রূপের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এমন এক শিল্পী, যার অস্ত্র কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নয়—তার অস্ত্র হলো নিখুঁত কিছু রেখা, রং এবং বিশ্বরাজনীতিকে কাঁপিয়ে দেওয়া অত্যন্ত অর্থপূর্ণ ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গচিত্র।

ইরানের প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট সাইয়্যেদ মাসুদ শোজায়ি তাবাতাবায়ি ‘৪০ দিনের যুদ্ধ’ শুরুর প্রথম ভোরেই একটি নীরব প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যে প্রতিজ্ঞার ভিত্তি ছিল শিল্প ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা।
তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যতদিন এই সংঘাতের আগুন জ্বলবে, ততদিন তিনি প্রতিদিন অন্তত একটি করে ক্যারিকেচার (ব্যঙ্গচিত্র) তৈরি করবেন। এই ছবিগুলো যুদ্ধক্ষেত্রের পেছনের আসল সত্য, পশ্চিমা মিডিয়ার একপেশে প্রচারণার জবাব এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের এক সৎ ও আপসহীন দলিল হিসেবে কাজ করবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ছোট ফ্রেমে বন্দি থাকা সেই উত্তাল দিনগুলোর গল্পই উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে। বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের মূল হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করা থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মকে দিনরাত কার্টুন আঁকার প্রশিক্ষণ দেওয়া—সবই জড়িয়ে আছে এই শিল্পীর লড়াকু জীবনের সাথে।
এটি এমন এক স্রষ্টার দুনিয়ায় ঘুরে আসার গল্প, যিনি বিশ্বাস করেন যে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে সত্যকে টেনে বের করতে হলে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপকে কখনো কখনো তীরের মতো তীক্ষ্ণ ও ধারালো হতে হয়।

ক্যানভাসের নীরব বৈপ্লবিক ঝড়
ডিজিটাল স্ক্রিনের ওপর দিয়ে স্টাইলাস (ডিজিটাল কলম) আলতো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবকিছু শুরু হয় একটিমাত্র কালো বিন্দু দিয়ে। সেই বিন্দুটি ধীরে ধীরে প্রাণ পেয়ে রেখায় রূপ নেয় এবং ফুটিয়ে তোলে একটি চেনা মুখের অবয়ব। ভেতরের চরিত্র আর উপাদানগুলো সব যার যার জায়গায় ঠিকঠাক বসে যায়; মনে হয় যেন ক্যানভাসে এখনই রঙ আর ব্যঙ্গের একটা বিস্ফোরণ ঘটতে যাচ্ছে। এই দৃশ্যের পরিচালক পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের কোনো জোরালো আওয়াজ বা প্রোপাগান্ডা নয়, বরং একজন শিল্পীর মন, যিনি তার কর্মশালার নীরবতার মাঝেই একটা বৈপ্লবিক ঝড় তুলে দিচ্ছেন।

হঠাৎ করেই রেখাগুলো একে অপরের সাথে জড়িয়ে যায় এবং স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ভাঙা শিংওয়ালা একটি ষাঁড়। এটি কোনো ফ্যান্টাসি দৃশ্য নয়, এটি বর্তমান ভূরাজনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ও চাক্ষুষ রূপ। এই ৪০ দিনের মিডিয়া যুদ্ধের আসল চেহারা কী ছিল, তা যদি কেউ জানতে চায়, তবে তাকে এই শিল্পীর প্রতিদিনের কার্টুনগুলো দেখানোই যথেষ্ট। ইতিহাস যেন তাকে এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সাক্ষী হতে এবং তা স্মৃতির পাতায় ধরে রাখার জন্যই নির্বাচন করেছে। বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধের পরিধি সাধারণ খবরের চেনা ফ্রেমে তুলে ধরা যায় না; এই লড়াইকে দেখতে হবে তার কার্টুনের অতিরঞ্জিত রেখা, তেতো ব্যঙ্গ আর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সাহসী রঙের মধ্য দিয়ে।

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের আগুন জ্বলে ওঠার প্রথম দিন থেকেই এই পরিশ্রমী ও সচেতন কার্টুনিস্ট হাত গুটিয়ে বসে না থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কেবল একজন দর্শক বা সংবাদের নিস্পৃহ ভোক্তা হয়ে থাকতে চাননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞার মুহূর্তটি তুলে ধরে বলেন: ‘যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতেই আমি একটি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম: যদি আল্লাহ চান এবং কোনো বাধা না আসে, তবে আমি এই পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন অন্তত একটি করে ব্যঙ্গচিত্র তৈরি ও প্রকাশ করব। আল্লাহর রহমতে, আজ পর্যন্ত আমি প্রায় প্রতিদিনই এটি করতে পেরেছি, এমনকি কোনো কোনো দিন একাধিক ছবিও এঁকেছি। এখন পর্যন্ত এই কাজের সংখ্যা ৮০টি ছাড়িয়ে গেছে।’

তবে এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে, যেখানে খবরের গতি আলোর চেয়েও দ্রুত, সেখানে প্রতিটি ঘটনার সাথে তাল মিলিয়ে চলা মোটেও সহজ কাজ নয়। তিনি বলেন, ‘এত এত ঘটনা আর একের পর এক সংবাদের জোয়ারে কখনো কখনো সত্যিই কিছুটা পিছিয়ে পড়তে হয়। খবরের গতি অত্যন্ত তীব্র, তবে আমি চেষ্টা করি প্রতিদিনের এই পরিবর্তনের অন্তত একটি ভিজ্যুয়াল বর্ণনা তুলে ধরতে।’

ছবি দিয়ে সত্য উন্মোচন
কার্টুনের দুনিয়ায় রেখাগুলো কেবল মানুষকে হাসানোর জন্য আঁকা হয় না। কখনো কখনো একটি সাধারণ খসড়া ছবিও একটি বিশ্বসাম্রাজ্যের মিডিয়া একাধিপত্যকে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারে। শোজায়ি তাবাতাবায়ি তার এই কার্টুনগুলোকে ‘মুখোশ উন্মোচনের ভাষা’ হিসেবে দেখেন। পর্দার আড়ালে কী ঘটছে তা প্রকাশ করার প্রয়োজনীয়তায় তিনি বিশ্বাস করেন: ‘আমাদের কাজ হলো এটা দেখানো যে বাস্তবে কী ধরনের অপরাধ ঘটছে, এর পেছনে কারা রয়েছে এবং সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক খবরের আড়ালে কোন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।’

যখন তার কার্টুনের নিয়মিত চরিত্রগুলো সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়, তখন দুটি নাম সবচেয়ে বেশি সামনে আসে: ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি এই দুজনকে ‘আগ্রাসী ও যুদ্ধবাজ নীতির প্রতীক’ মনে করেন। তাবাতাবায়ি বলেন, ‘আজ নেতানিয়াহুকে কার্যত একজন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চেনে সবাই। অন্যদিকে ট্রাম্পও একজন জটিল ব্যক্তিত্ব—যার বিরুদ্ধে অসংখ্য আইনি মামলা রয়েছে। এই চরিত্রগুলো ব্যঙ্গচিত্রের জন্য খুবই উপযোগী, কারণ তারা একদিকে যেমন বিশ্বজুড়ে পরিচিত, অন্যদিকে তেমনি একবিংশ শতাব্দীর কুৎসিত রাজনৈতিক আচরণের প্রতীক।’

ভাঙা শিংয়ের ষাঁড় এবং ‘মেড ইন চায়না’ পতাকা
একজন সাধারণ মানুষ যেভাবে পৃথিবীকে দেখে, এই শিল্পী দেখেন তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে। নিজের সাম্প্রতিক একটি বহুল প্রচারিত (ভাইরাল) কাজের কথা উল্লেখ করে শোজায়ি তাবাতাবায়ি বলেন: ‘আমি একটি ছবি এঁকেছিলাম যেখানে ট্রাম্পকে একটি আহত ষাঁড় হিসেবে দেখানো হয়েছে—যার একটি শিং ভাঙা এবং ব্যান্ডেজ করা। ষাঁড়ের শরীরের দাগগুলোকে আমি পৃথিবীর মানচিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছি। সাধারণত বলা হয় গরুর প্রতিটি অংশই উপকারী, কিন্তু এখানে এটিকে একটি ক্ষতিগ্রস্ত ও পরাজিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই কাজটি ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার শিল্পীদের কাছ থেকে প্রচুর সাড়া পায়।’

ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্রে তার ব্যঙ্গাত্মক রূপটি মাঝেমধ্যে বেশ নিষ্ঠুর ও রূপক হয়ে ওঠে। আরেকটি কাজে তিনি উদীয়মান পরাশক্তি চীনের সামনে মার্কিন নেতৃত্বকে ক্ষুদ্র ও অসহায় হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছেন: “এক সময় তারা চীনের সাথে হুমকির ভাষায় কথা বলত, কিন্তু আজ তারা এমন এক অবস্থানে আছে যেখানে তাকে অন্যের কাছে এক ধরনের মরিয়া ভাব নিয়ে যেতে হয়। ছবিতে দেখা যায়, ট্রাম্পের হাতে একটি বিশাল চীনা পতাকার সামনে আমেরিকার একটি ছোট্ট পতাকা রয়েছে। আর সবচেয়ে মজার ব্যঙ্গাত্মক বিষয় হলো, ট্রাম্পের হাতের ওই ছোট্ট পতাকাটিতেও লেখা ‘মেড ইন চায়না’!”

ব্রাজিল থেকে তেহরান: বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী নেটওয়ার্ক
শোজায়ি তাবাতাবায়ির এই ব্যঙ্গচিত্রগুলোর বার্তা কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকেনি। তিনি আন্তর্জাতিক শিল্পীদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত, যারা কার্টুনকে কেবল বিনোদন হিসেবে নয়, বরং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখেন।

বিদেশি কার্টুনিস্টদের সাথে তার সুগভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি ব্রাজিলের একজন শিল্পীকে নিয়ে একটি চমৎকার স্মৃতি চারণ করেন: “ব্রাজিলের একজন বিখ্যাত কার্টুনিস্ট ছিলেন যিনি আমাদের একটি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে বিচারক হিসেবে ইরানে এসেছিলেন। তিনি তেহরানের ১০ লাখ মানুষের সেই বিশাল সমাবেশে অংশ নেন এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সেই গণজাগরণ খুব কাছ থেকে দেখেন। পরে তিনি ব্রাজিলে ইরানি সংস্কৃতির একজন প্রকৃত দূত হয়ে ওঠেন! তিনি বলতেন, ‘যারা নিপীড়কদের হয়ে কাজ করে, তাদের আমরা কার্টুনিস্ট বলেই গণ্য করি না; যার বাস্তবতার সঠিক বোধ ও পর্যাপ্ত সচেতনতা নেই, সে পেশাদার কার্টুনিস্টদের দলের মধ্যেই পড়ে না’।”

শোজায়ি এবং তার সমমনা বন্ধুদের কাছে ভার্চুয়াল জগৎ—বিশেষ করে ফেসবুক—একটি ‘নরম যুদ্ধ’ বা ‘সফট ওয়ার’ রুমে পরিণত হয়েছে। যখন বিশ্বখ্যাত কোনো ব্যক্তিত্ব এই ছবিগুলো শেয়ার করেন, তখন সেটি হাজার হাজার বার ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি মনস্তাত্ত্বিক দলিল হয়ে ওঠে।

ক্যানভাসে অশ্রু: মিনাবের শহীদদের গল্প
সব ব্যঙ্গচিত্র মানুষকে হাসানোর জন্য নয়; কখনো কখনো এটি এমন এক আয়না হিসেবে কাজ করে যা সত্যকে প্রতিফলিত করে বুকের ভেতর এক গভীর বেদনা তৈরি করে। বেসামরিক ভুক্তভোগী ও শিশুদের নিয়ে তৈরি করা ছবির প্রসঙ্গে আসতেই শোজায়ি তাবাতাবায়ির কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে ওঠে। সাম্রাজ্যবাদের এই নিষ্ঠুর আগ্রাসনের চিত্রকর নিজেও এর মানসিক আঘাত থেকে রেহাই পাননি। অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন:
“মিনাবের শহীদদের জন্য আমি যে ছবিটি এঁকেছিলাম, তা গভীর ভালোবাসা আর তীব্র বেদনা থেকে তৈরি হয়েছিল। কাজটা করার সময় আমি সত্যিই কাঁদছিলাম। আপনি যখন এমন শিশুদের ছবি আঁকেন যারা যুদ্ধের শিকার হয়েছে, অথচ একই সাথে ছবিতে তাদের মর্যাদা ও নির্দোষ ভাবটা ফুটিয়ে তোলেন, তখন সেই কাজটা আর কেবল কার্টুন থাকে না; তা একটি আবেগঘন দলিলে পরিণত হয়। আমি বিশ্বাস করি, কোনো কাজ যখন হৃদয় থেকে আসে, তখন তা অন্যের হৃদয়েও জায়গা করে নেয়।”

কোমে মধ্যরাতের ক্লাস: পেন্সিল ও কাগজের এক নতুন বাহিনী
তবে এই লড়াই কেবল একজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের পবিত্র কোম শহরে শোজায়ি তাবাতাবায়ি রাত প্রায় দেড়টা পর্যন্ত জেগে তরুণ প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যারা আগামী দিনে এই দেশের ও সময়ের সত্যগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবে। সেখানে এক দারুণ সৃজনশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে; শিশু, কিশোর ও তরুণরা এসে তাদের চারপাশের বেদনা ভাগ করে নেয় এবং এই গভীর কথোপকথন থেকেই নতুন নতুন কার্টুনের আইডিয়া জন্ম হয়।

গর্বের সঙ্গে তিনি বলেন, “আমার কিছু শিক্ষার্থী এখন এত ভালো কাজ করছে যে আমি তাদের বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিই। আজকের যুগে যখন রাজনীতিবিদরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ঝকঝকে প্রচারণার ওপর নির্ভর করছেন, তখন ব্যঙ্গচিত্র কোনো সীমান্ত না মেনেই মানুষের মনে পৌঁছে যাচ্ছে খুব সহজেই।”

এ প্রসঙ্গে শোজায়ি তাবাতাবায়ি বলেন, “আমি এই দিনগুলোতে আমার সব শক্তি ব্যয় করছি, যেন প্রতিদিন অন্তত একটি কাজ তৈরি হয়, যা একই সঙ্গে গল্প, সচেতনতা এবং শিক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। আশা করি, এই কার্টুনগুলো সত্য তুলে ধরতে এবং শোকাহত মানুষের হৃদয়ে সামান্য হলেও সান্ত্বনা দিতে পারবে।”

যতদিন অন্যায় ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য থাকবে, ততদিন এই শিল্পীদের ক্যানভাসে আঁকা রেখাগুলো কখনো বিশ্রাম পাবে না। তারা তাদের তুলি ও কলমকে তীক্ষ্ণ করেছেন যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস কেবল অস্ত্রধারী বিজয়ীদের মুখ থেকেই না শোনে, বরং সত্যের আসল রূপটি দেখতে পায়।

ক্যানভাসে সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করা এক ইরানি শিল্পী
সাইয়্যেদ মাসুদ শোজায়ি তাবাতাবায়ির ব্যঙ্গচিত্র ‘বৈশ্বিক সংকট: একটি গরু, হাজার সমস্যা!

Wednesday, March 25, 2026

৬ বছরের সাধনা, হাতে লেখা বিশাল কোরআন

প্রকাশ ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ভোর থেকে সন্ধ্যা—টানা ছয়টি বছর এভাবেই কেটেছে তাঁর। তুরস্কের ইস্তাম্বুলের মিহরিমাহ সুলতান মসজিদের একটি ছোট কামরায় নিবিষ্ট মনে তুলি চালিয়েছেন তিনি।

লক্ষ্য ছিল পবিত্র কোরআনের এক অনন্য পাণ্ডুলিপি তৈরি করা। দীর্ঘ শ্রম ও শৈল্পিক নৈপুণ্যের পর অবশেষে সেই মহৎ কাজ শেষ করেছেন ইরাকি ক্যালিগ্রাফার আলী জামান।

৫৪ বছর বয়সী এই শিল্পীর তৈরি করা কোরআনের পাণ্ডুলিপিটি এখন ইস্তাম্বুলের ওই মসজিদেই সংরক্ষিত আছে। পাণ্ডুলিপিটির বিশালত্ব যে কাউকেই চমকে দেবে। এতে রয়েছে ৩০২টি দ্বিমুখী স্ক্রল বা পাতা, যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৪ মিটার (১৩ ফুট) এবং প্রস্থ ১ দশমিক ৫ মিটার (৫ ফুট)।

আলী জামান বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘যখনই আমি এই কোরআনটির কথা ভাবি, আমার এক অদ্ভুত প্রশান্তি লাগে। মহান আল্লাহ আমাকে এটি শেষ করার তৌফিক দিয়েছেন, এ জন্য আমি গর্বিত।’

অদম্য স্পৃহা

এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য সাধারণ কাগজ ব্যবহার করেননি জামান। ডিমের সাদা অংশ, কর্ন স্টার্চ (ভুট্টার আটা) এবং ফিটকিরির বিশেষ মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছিল টেকসই বিশেষ কাগজ।

১২ বছর বয়স থেকে ক্যালিগ্রাফির প্রেমে পড়া জামান মূলত ইরাকের সোলাইমানিয়া প্রদেশের বাসিন্দা। তবে ক্যালিগ্রাফি বা হস্তশিল্পের কদর তুরস্কে বেশি হওয়ায় ২০১৭ সালে সপরিবারে ইস্তাম্বুলে চলে আসেন তিনি।

আলী জামানের এই দীর্ঘ সাধনায় বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে তাঁর পরিবারকেও।

তাঁর ছেলে রেকার জামান স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘বাবার এই প্রকল্পের কাজ চলাকালীন আমরা তাঁকে খুব কমই কাছে পেয়েছি। শুধু তাঁর খাবার পৌঁছে দেওয়ার সময় অথবা রাতে যখন তিনি ঘুমাতে আসতেন, তখনই তাঁর দেখা মিলত। আলহামদুলিল্লাহ, কাজ শেষ হওয়ার পর এখন আমরা তাঁকে বেশি সময় পাচ্ছি।’

বিশ্ব রেকর্ডের হাতছানি

আলী জামানের দাবি, এটি বিশ্বের বৃহত্তম হাতে লেখা কোরআন। যদিও গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ এখনো এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।

রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের মক্কার ‘হলি কোরআন মিউজিয়ামে’ সংরক্ষিত একটি কোরআনকে বিশ্বের বৃহত্তম ছাপানো কোরআন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে জামানের শিল্পকর্মটি হাতে লেখা হওয়ার কারণে এর গুরুত্ব আলাদা।

শিল্প বিশেষজ্ঞ উমিত কোসকুনসু বলেন, ‘ইসলামি ক্যালিগ্রাফি কেবল সাধারণ কোনো লেখা নয়, এটি একধরনের ইবাদত। আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি মাধ্যম।’

বর্তমানে এই বিশাল পাণ্ডুলিপিটি ধুলাবালি ও আর্দ্রতা থেকে বাঁচাতে বিশেষ আবরণে ঢেকে রাখা হয়েছে।

আলী জামানের শেষ ইচ্ছা, কোনো বিশেষ জাদুঘর বা শিল্পসংগ্রাহক যেন এটি সংগ্রহ করেন, যেখানে সাধারণ মানুষ এই অনন্য শিল্পকর্মটি দেখার ও মূল্যায়ন করার সুযোগ পাবে।

সূত্র: এপি

নিবিষ্ট মনে কোরআনের ক্যালিগ্রাফি আঁকছেন আলী জামান
নিবিষ্ট মনে কোরআনের ক্যালিগ্রাফি আঁকছেন আলী জামান। ছবি: এপি

Saturday, March 22, 2025

সেই সময়টা ছিল রূপকথার গল্পের মতো by ইব্রাহীম ইশান

বরেণ্য প্রযোজক, চলচ্চিত্র অভিনেতা এবং রাজনীতিবিদ চিত্রনায়ক আশরাফ উদ্দিন আহমেদ উজ্জ্বল। জানা-অজানা অনেক বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন মানবজমিনের সঙ্গে। আপনি এক সময়ে অভিনয় নিয়ে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করতেন? এখন ব্যস্ততাটা কী নিয়ে? বরেণ্য এ নায়ক বলেন, এখন আমাদের ব্যবহারের মতো সেই ধরনের পরিচালক নেই, কাহিনী নেই। সেই ধরনের সুযোগ-সুবিধাও নেই। এ ছাড়া চলচ্চিত্র শিল্প এখন অস্তিত্বহীন অবস্থায় আছে। সুতরাং প্রথমে চলচ্চিত্র শিল্পটাকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে আনতে হবে। এরপর আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করবো। তাই এখন আমার চলচ্চিত্রে ব্যস্ততা নেই। আমার আরেকটি পরিচয় আছে। আমি একজন রাজনীতিবিদ। সেই পরিচয়েই এখন ব্যস্ত। এফডিসি’র বর্তমান এমডি মাসুমা রহমান তানিকে নিয়ে একাধিক অভিযোগ করেছেন। তাকে অপসারণের দাবিতে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই। উজ্জ্বল বলেন, তরুণ ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে রক্ত ঝরিয়েছে, যারা আহত-নিহত হয়েছেন তাদের পরিবার সন্তানদের বিপ্লবের মাসে বিলিয়ে দিয়েছেন। সেই তাদের সঙ্গে বেঈমানি করে এমন একজন অভিভাবককে এখানে আনা হয়েছে। যার সঙ্গে স্বৈরাচারের সকল ভূমিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তার একটি ডকুমেন্টেশন আমাদের এবং জনগণের কাছে আছে। উনি ২০১৮ সালে যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন তার ফাইন্যান্সার যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জড়িত। শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণকে নানা রকমভাবে এই স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। সেই প্রতিষ্ঠা করার জন্য সহযোগী হিসেবে একটি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার ভূমিকা ছিল। সেই ভূমিকাকে আমি তীব্র নিন্দা জানাই। সেই লক্ষ্যেই আমরা যারা চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, আমরা তার পরিবর্তন চাই। আমরা তাকে এখান থেকে বিদায় করে দিতে চাই। চলচ্চিত্রে এখন যারা কাজ করছে, তাদের কেমন মনে হচ্ছে? তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী থাকবে? উত্তরে এ বরেণ্য নায়ক বলেন, এক সময় সংস্কৃতি তার আপন গতিতে আপন পরিবেশনায় চলতো। এর কোনো বাউন্ডারি ছিল না। এখন তো আরও নেই প্রযুক্তির কারণে। সেই লক্ষ্যে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে সাজিয়ে বর্তমান সময়ের উপযোগী করে নিতে হবে। সেজন্য প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হবে। এই চলচ্চিত্রকে তার নিজের পায়ে আবার দাঁড় করাতে হবে। চলচ্চিত্র শিল্পের শিক্ষা গ্রহণের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। সেজন্য ফিল্ম একাডেমি করা যেতে পারে। দেশে যদি শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমি থাকে তো চলচ্চিত্র একাডেমি থাকবে না কেন? আগামী ঈদে বেশ কয়েকটি সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। আপনার সময়ে ঈদের আমেজ কী রকম থাকতো? উজ্জ্বল হেসে বলেন, সেই সময়টা ছিল রূপকথার গল্পের মতো। যেটা আমরা কল্পনায় দেখি। আমাদের চলচ্চিত্রে প্রতি সপ্তাহেই উৎসব হতো। গুলিস্তান এবং কাকরাইলে চলচ্চিত্রের মূল ব্যবসাকেন্দ্র ছিল। প্রতি বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ছবি রিলিজ হতো। সারা দিন সেখানে মানুষের আনাগোনা, পাশাপাশি এফডিসি সারা রাত খোলা থাকতো। অ্যাকাউন্টসের টাকা রিসিভ হতো, প্রিন্ট হতো। মনে হতো উৎসব হচ্ছে। আর ঈদে মহা উৎসব হতো। একই সময়ে অনেক ছবি, প্রত্যেকে সেই ছবির অপেক্ষায় থাকতো। ঈদে সিনেমা দেখার আলাদা একটা বাজেট থাকতো দর্শকদের। সেই দিনগুলো এখন শুধুই স্বপ্নের দিন। আমার বেশির ভাগ সিনেমাই ঈদের সময়ে মুক্তি পেয়েছিল।

mzamin

Tuesday, March 18, 2025

সিএমএসএমই ঋণ নীতিমালা: ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া সহজ হলো

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া আরও সহজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) না থাকলেও ছোট উদ্যোক্তাদের পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ জন্য কোনো জামানতও লাগবে না। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তারা যাতে আরও বেশি ঋণ পান, সে জন্যও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কারা নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বিবেচিত হবেন, সেটিও পরিষ্কার করা হয়েছে। যেসব ব্যাংকের দেশজুড়ে শাখা–উপশাখা নেই, তারা এ ধরনের ঋণ অন্য ব্যাংকের মাধ্যমেও বিতরণ করতে পারবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করা হয়েছে।

নতুন এসব বিধান যুক্ত করে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে (সিএমএসএমই) অর্থায়নের নতুন নীতিমালা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে সিএমএসএমই ঋণ বিতরণ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই নীতিমালা মেনে চলতে হবে। আগামী পাঁচ বছর এই নীতিমালা কার্যকর থাকবে।

নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের মধ্যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করতে হবে। পাশাপাশি এই খাতে প্রতিবছর দশমিক ৫ শতাংশ হারে ঋণ বাড়াতে হবে। ২০২৯ সালের মধ্যে ঋণের ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে দিতে হবে। এর মধ্যে ক্লাস্টার খাতে ঋণের লক্ষ্য ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তা খাতে ঋণ আগের মতোই ১৫ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে। সেবা খাতের ঋণ ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ ও ব্যবসা খাতে ঋণ ৩৫ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে।

জানা গেছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা সিএমএসএমই খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। ব্যাংকগুলোতে এখন এসএমই ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। তবে পুনঃ অর্থায়ন সুবিধার ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার ৭ থেকে ৮ শতাংশ।

* কুটিরশিল্প খাতের উদ্যোক্তারা পাবেন সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা
* মাইক্রো শিল্প উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা
* ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তারা পাবেন সর্বোচ্চ ২৫ কোটি টাকা
* মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা

টিআইএন না থাকলেও মিলবে ঋণ

বর্তমানে সব ধরনের ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড নিতে টিআইএন বাধ্যতামূলক। তবে সিএমএসএমই নীতিমালায় বলা হয়েছে, টিআইএন না থাকলেও ঋণ পাবেন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা। ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন তাঁরা। নীতিমালা অনুযায়ী, উৎপাদন, সেবা ও ব্যবসা—এই তিন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা, যাঁদের জনবল পারিবারিক সদস্যসহ ১০ জনের বেশি নয়, তাঁরা ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। ঋণের ক্ষেত্রে এই শ্রেণির উদ্যোক্তাদের টার্নওভারের কোনো শর্ত রাখা হয়নি। তবে তাঁদের জমি ও কারখানা ভবন ব্যতীত প্রতিস্থাপন ব্যয়সহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সম্পদের মূল্য পাঁচ লাখ টাকার কম হতে হবে।

কারা কত ঋণ পাবেন

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। ১২১ থেকে ৩০০ কর্মী আছেন, এমন তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান অথবা এক হাজার কর্মী আছেন, এমন শ্রমঘন শিল্পে এই ঋণ দেওয়া যাবে। এ ছাড়া মাঝারি শিল্পের মধ্যে সেবা খাতে সর্বোচ্চ ৭৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া যাবে, যেখানে কর্মীর সংখ্যা ৫১ থেকে ১২০ জন। উৎপাদন খাতের ক্ষেত্রে মাইক্রো শিল্প সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা ও ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তারা ২৫ কোটি টাকা ঋণ পাবেন। ট্রেডিং খাতের মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা ১০ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র শিল্পের ট্রেডিং ও সেবা খাতের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৮ কোটি টাকা ঋণ পাবেন। অন্যদিকে ট্রেডিং খাতের মাইক্রো শিল্পের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা এবং কুটিরশিল্প খাতের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা ঋণ পাবেন।

৩০ দিনে ঋণ

নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি ডিজিটাল পদ্ধতিতেও ঋণের আবেদন করতে পারবেন সিএমএসএমই উদ্যোক্তারা। ঋণ আবেদন জমার পর গ্রাহককে তা মোবাইলে খুদে বার্তার মাধ্যমে জানাতে হবে। ৩০ দিনের মধ্যে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। ঋণ অনুমোদন হলে তা যেমন গ্রাহককে অবহিত করতে হবে, তেমনি অনুমোদন না হলে প্রকৃত কারণসহ গ্রাহককে তা জানাতে হবে। আবেদন অনুমোদন না হলে নতুন করে আবার আবেদন করতে পারবেন গ্রাহকেরা। সিএমএসএমই ঋণের সব তথ্য ওয়েবসাইটে প্রদর্শনের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার (লাইভ চ্যাটবট) সুবিধা চালু করতে বলা হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।

নারী উদ্যোক্তা কারা

নীতিমালায় নারী উদ্যোক্তা ও উদ্যোগের সংজ্ঞায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। বলা হয়েছে, সিএমএসএমই খাতের কোনো একটি উদ্যোগ নারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে, যদি অংশীদারি প্রতিষ্ঠান বা জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধিত প্রাইভেট কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারের ন্যূনতম ২০ শতাংশের মালিক নারী হন। যদি ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অথবা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অথবা সমপর্যায়ের পদে একজন নারী দায়িত্বরত থাকেন বা অংশীদারি প্রতিষ্ঠান বা জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধিত প্রাইভেট কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারের ন্যূনতম ২০ শতাংশের মালিক হন। উক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্থায়ী জনবলের ন্যূনতম ৫১ শতাংশ নারী কর্মরত থাকেন।

একজন ছোট ব্যবসায়ী পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন
একজন ছোট ব্যবসায়ী পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন। ফাইল ছবি

Friday, November 8, 2024

জাহাজ নির্মাণ শিল্প সম্ভাবনাময় ও প্রতিশ্রুতিশীল : নৌপরিবহন উপদেষ্টা

নৌপরিবহন এবং বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও প্রতিশ্রুতিশীল। বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে উন্নতি করছে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় বেসরকারি খাতেও জাহাজ নির্মাণ শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে । আগামীতে জাহাজ নির্মাণ জাতি হিসেবে আমরা গড়ে উঠছি। বর্তমান সরকার জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়নে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটিতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেরিন এন্ড অফশোর এক্সপো- (বিমক্স ২০২৪)’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশের মেরিনটাইম সেক্টর তথা জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বিদেশিদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের তিনটি সমুদ্রবন্দর আছে- চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর ও পায়রা বন্দর। আপনাদের সবাইকে এই তিন বন্দরে আমি স্বাগত জানাচ্ছি। আপনারা আসুন ঘুরে দেখে যান। মাতারবাড়িসহ সকল বন্দরগুলোতে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ বিরাজ করছে। চট্টগ্রাম বন্দরকে সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। বে টার্মিনাল নির্মাণ ও লালদিয়ার চরে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

কোনো প্রকল্পে কোনোরূপ অনিয়ম বা অবহেলা হবে না মর্মে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেন, সবকিছুই অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সঠিকভাবে পরিচালিত হবে। কোনোরূপ অন্যায়, দুর্নীতি অনিয়ম আমি বরদাশত করব না। সবকিছুই থাকবে উন্মুক্ত। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। ছোট বড় মিলিয়ে আমাদের ৯০৭টি নদ-নদী আছে। এর মধ্যে ৩৬৬টি নদীতে নৌযান চলাচল করে। যেখানে অনেক দেশের সমুদ্রবন্দরই নেই, সেখানে আমাদের সমুদ্র বন্দরের পাশাপাশি অসংখ্য নদীবন্দর আছে। দুর্ভাগ্যবশত আমরা নৌ-যোগাযোগ বাড়াতে পারিনি। নৌযোগাযোগ বাড়াতে সম্প্রতি সরকার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জনসাধারণের দুর্ভোগ লাঘবে দেশের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ বা জেলাগুলোতে নৌযোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত এবং নেদারল্যান্ডস ও সুইডিশ দূতাবাসের প্রতিনিধিগণ বাংলাদেশের মেরিটাইম সেক্টরের উন্নয়নে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেন, তাদের দেশ সবসময় বাংলাদেশের পাশে আছে। তাদের দেশের সরকার এবং বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের মেরিটাইম সেক্টরের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

সেভর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের আয়োজনে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরাতে (আইসিসিবি) তিন দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী আগামী শনিবার শেষ হবে। এতে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে মেরিটাইম ইঞ্জিনিয়ারিং, অফশোর ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি শিপ রিসাইকেলিং শিপ-ব্রেকি ইকুইপমেন্ট, বন্দর ও এর সম্পর্কিত বিভিন্ন লজিস্টিক ও টেকনোলজির বিষয়বস্তু প্রর্দশনীতে স্থান পেয়েছে। প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত। বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাজার তৈরির লক্ষ্যে সেভর ষষ্ঠবারের মতো এই প্রর্দশনীর আয়োজন করছে। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে মেরিটাইম ও অফশোর শিল্পে বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তাদের জন্য এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হল। প্রর্দশনীতে ১৫টি দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মোট ১৮০টিরও বেশি স্টলে তাদের পণ্য প্রর্দশন করছে।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আরও বক্তৃতা করেন, সহকারী নৌবাহিনী প্রধান (ম্যাটেরিয়েল) রিয়ার অ্যাডমিরাল খন্দকার আখতার হুসাইন, ঢাকার ড্যানিশ রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের মিশন প্রধান আন্দ্রে কারস্টেন্স, সুইডেন দূতাবাসের রাজনৈতিক, বাণিজ্য ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধান লোভিসা হফম্যান এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রমুখ। 

‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেরিন এন্ড অফশোর এক্সপো- (বিমক্স ২০২৪)’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। ছবি : কালবেলা
‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেরিন এন্ড অফশোর এক্সপো- (বিমক্স ২০২৪)’ শীর্ষক অনুষ্ঠান। ছবি : কালবেলা

Tuesday, August 20, 2024

সারা দেশে দেড় হাজার ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙচুর

প্রথম আলো: ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় দেড় হাজার ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলা হয়েছে। এসব ভাস্কর্য ও ম্যুরালের বেশির ভাগই ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক। ধ্বংস করা হয়েছে ময়মনসিংহের শশীলজের ভেনাসের মূর্তি, সুপ্রিম কোর্টের থেমিস ও শিশু একাডেমির দুরন্ত ভাস্কর্যটিও।

প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়ে ৫ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে ৫৯টি জেলায় ১ হাজার ৪৯৪টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য (সিরামিক বা টেরাকোটা দিয়ে দেয়ালে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা অবয়ব), ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলার তথ্য পেয়েছেন। বেশির ভাগ ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট।

ঢাকা মহানগর এলাকার ১৫টি স্থানে ১২২টির বেশি ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও রিলিফ ভাস্কর্য ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের পরিপূর্ণ অবয়ব কাঠামোর ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয়েছে ৭টি। ঢাকা বিভাগে ২৭৩টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০৪, রাজশাহীতে ১৬৬, খুলনায় ৪৭৯, বরিশালে ১০০, রংপুরে ১২৯, সিলেটে ৪৯ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৯২টিসহ মোট ১ হাজার ৪৯২টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে, উপড়ে ফেলে এবং আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভাস্কর্য, ম্যুরাল ভাঙচুর প্রসঙ্গে দেশের প্রথিতযশা ভাস্কর্যশিল্পী হামিদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি খুবই দুঃখিত, ভারাক্রান্ত। এমন না হওয়াই উচিত ছিল। আর যেন এমন ঘটনা না ঘটে। প্রত্যাশা করি দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু হবে।’

ঢাকার যত ভাস্কর্য

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা–ভাঙ্চুরের সময় ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে দুটি বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল। রাজধানীতে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত পাঁচটি ভাস্কর্যের স্থান ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও হাতুড়ি-শাবল দিয়ে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে, কোথাও উপড়ে ফেলা হয়েছে, কোনো কোনো ভাস্কর্য পোড়ানো হয়েছে আগুনে।

মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী শামীম শিকদারের ‘স্বাধীনতাসংগ্রাম’ ভাস্কর্যটি রাজধানীর পলাশীর মোড়ে অবস্থিত। সেখানে ছোট-বড় শতাধিক পৃথক ভাস্কর্য রয়েছে। এর মধ্যে অক্ষত আছে মাত্র পাঁচটি। বাকিগুলো উপড়ে ফেলা হয়েছে। ১১ আগস্ট দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, মাটিতে লুটাচ্ছে দেশ-বিদেশের কবি, সাহিত্যিক, বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানীদের আবক্ষ ভাস্কর্য। এর মধ্যে আছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে ইয়াসির আরাফাত, জগদীশচন্দ্র বসু থেকে লালন।

শিশু একাডেমি চত্বরের ‘দুরন্ত’ পুড়ে যাওয়ার খবর জানা গেছে ৮ আগস্ট। সেদিন বিকেলে শিশু একাডেমিতে গিয়ে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে আছে দুরন্তর অঙ্গার শরীর। অক্ষত ছিল শুধু শিশু মুখটুকু। কাঠি দিয়ে চাকা নিয়ে ছুটে চলা কিশোরের দুরন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। পাশে থাকা শেখ রাসেলের ম্যুরালটিও পুড়ে ছাই।

বিজয় সরণিতে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘মৃত্যুঞ্জয়’ ভাস্কর্য স্থাপিত হয় সাম্প্রতিক সময়ে। গত বছরের ১০ নভেম্বর ‘মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাঙ্গণ’ উদ্বোধন করা হয়। ৫ আগস্ট বিকেলে দেখা যায়, বিজয় সরণিতে বিশাল অবয়বের ভাস্কর্যটি ভাঙার চেষ্টা চলছে। দড়ি বেঁধে টেনে, আগুন দিয়ে, শাবল চালিয়ে একপর্যায়ে ধ্বংস করা হয় মৃত্যুঞ্জয়।

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে স্থাপিত থেমিসের ভাস্কর্যটি উপড়ে ফেলা হয়েছে দুই পর্বে। এই ভাস্কর্য নিয়ে ২০১৬ সাল থেকেই ছিল নানা মতবিরোধ। গ্রিক দেবী থেমিসের আদলে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা এই ভাস্কর্যের হাতে ছিল ন্যায়দণ্ডের প্রতীক। ৭ আগস্ট উপড়ে ফেলা হয় এটি।

জেলায় জেলায় ক্ষতি

মেহেরপুরের ‘মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স’কে একক ভাস্কর্য হিসেবে ধরা হলেও সেখানে পাঁচ শতাধিক পৃথক ভাস্কর্য ছিল। কমপ্লেক্সের অন্তত ৩০৩টি ছোট–বড় ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে। সবার আগে ভাঙা হয় বঙ্গবন্ধুর বিশাল ভাস্কর্যটি। ৫ আগস্ট বিকেল পাঁচটার দিকে শতাধিক যুবক রড, বাঁশ ও হাতুড়ি নিয়ে স্মৃতি কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটির মাথা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। একই সময় এলোপাতাড়িভাবে আঘাত করে ‘১৭ এপ্রিলের গার্ড অব অনার’ ভাস্কর্যটিতে।

ময়মনসিংহের শশীলজে থাকা ভেনাসের ভাস্কর্যটি ভাঙা হয়েছে, চুরি হয়েছে মাথাটি। শশীলজের জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘শত শত লোক দলবেঁধে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। ভাস্কর্যের মাথার অংশ পাওয়া যায়নি। এটি অমূল্য সম্পদ ছিল।’ এ শহরে জয়নুল সংগ্রহশালার সামনে থাকা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ মূর্তিটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবশ্য স্থানীয় শিল্পীরা মিলে পরে সেটি সংস্কার করেছেন।

খুলনায় শেখ মুজিবুর রহমানের দুটি ভাস্কর্য পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়েছে। জেলা শহর মাদারীপুরে নির্মাণাধীন মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মৃতিকেন্দ্রের নাম ছিল ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’। শহরের প্রাণকেন্দ্র শকুনির লেকপাড়ে অবস্থিত এই স্মারকের ভেতরের সবকিছু নষ্ট করা হয়েছে ৭ আগস্ট বিকেলে।

৫ আগস্টের পর গাজীপুরে তিনটি স্থানে ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাত বীরশ্রেষ্ঠের রিলিফ ভাস্কর্য। এটি ছিল জয়দেবপুরের ভেতরের দিকে। সিলেটে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থাকা ১২টির বেশি ম্যুরাল ভাঙা হয়েছে। এর সব কটিই শেখ মুজিবুর রহমানের। নরসংদীতে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘তর্জনী’ নামে পরিচিত ভাস্কর্যটি। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ ভাষণের একটি আঙুল তুলে রাখা সেই দৃশ্যের অনুকরণে তর্জনী বানানো হয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান নাসিমুল খবির প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্যের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সংস্কারের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভাস্কর্য নির্বাচনে। কোনটি কোন প্রক্রিয়ায় সংস্কার হবে তা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। তবে সবগুলোই সংস্কার করা সম্ভব নয়।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]

Wednesday, March 23, 2022

দ্য ড্যান্সিং গার্ল! by শাঈখ আল মাহমুদ বনি

নৃত্যরতা মেয়েটি, বা দ্য ড্যান্সিং গার্ল – আমাদের ভারতবর্ষের পুরাকীর্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নিদর্শন। বইয়ে অনেক পড়েছি এই ভাস্কর্যের কথা, সামনাসামনি এই পাঁচ হাজার বছরের পুরনো নিদর্শন দেখে নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম।
সিন্ধু সভ্যতার শিল্পসৌকর্যের অনুপম এই নিদর্শনটির বয়স প্রায় পাঁচ হাজার বছর! (২০০০-২৭০০ খ্রিঃপূঃ)। জন ম্যাকে নামে একজন প্রথিতযশা পুরাতাত্ত্বিক ১৯২৬ সালে এই নিদর্শনটি আবিষ্কার করেন মোহেনজোদারো এলাকাতে, প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের পরে পাওয়া এক বাড়ির উনুনের কাছে।
এই ভাস্কর্যটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? একটু সময় নিয়ে তাকাই এই ভাস্কর্যের দিকে, দেখতে পাবো এর চমৎকার বৈশিষ্ট্যগুলো। দুই হাত ভরা বালা পরে সম্পূর্ণ নিরাবরণ একজন নারী খুবই আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন কোমরে হাত দিয়ে। এই ভাস্কর্য থেকে সিন্ধু সভ্যতার নারীদের পরিধেয় অলঙ্কার প্রসঙ্গে কিছুটা ধারণা করা যায়। এই যে একহাত ভর্তি চুড়ি, এইরকম কিন্তু এখনো দেখা যায় রাজস্থানে, বাঞ্জারা নামের যাযাবর গোষ্ঠীর নারীদের মাঝে। দাঁড়ানোর ভঙ্গিমার মাঝে যে আত্মবিশ্বাস আছে, এ থেকে সেই সময়ের সামাজিক পরিমণ্ডলে নারীদের উঁচু অবস্থান সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা যায় কি? এর ইন্টারপ্রিটিশান নিয়ে একেক বিশেষজ্ঞ একেক মন্তব্য করেছেন। ধারণা করে নেয়া হলো, এই ভাস্কর্যের নারীটি পেশায় একজন নৃত্যশিল্পী, তার চারুময় ভঙ্গিমা দেখে এবং এ থেকেই এর নাম হয়ে গেল ড্যান্সিং গার্ল।
প্রত্নতাত্ত্বিক শিরিন রত্নাগর বলছেন,
  • *“তার ঘন দীর্ঘ চুল নান্দনিক ভঙ্গিমায় গুটিয়ে ঘাড়ের কাছে খোঁপার মতো নিবদ্ধ। মূর্তিটি নগ্ন, কিন্তু কামোদ্দীপক নয় বরং অত্যন্ত সারল্যমাখা।“
এই ভাস্কর্যটি সিন্ধু সভ্যতার মানুষজনের কারিগরি দক্ষতা নিয়েও একটি ধারণা দেয়। এটি ব্রোঞ্জে তৈরি। এই ভাস্কর্য থেকেই আমরা প্রথম জানতে পারি যে সিন্ধু সভ্যতার অধিবাসীরা মেটাল কাস্টিং সম্পর্কে খুব ভালোমতোই ওয়াবকিবহাল ছিল। এ ভাস্কর্যটি বানানোর জন্যে প্রথমে একটি কাদামাটির নমুনা তৈরি করা হয়েছিল। এরপর সেই নমুনার গায়ে মোমের একটি পাতলা আস্তরণ দিয়ে দেয়া হলো। এরপর তার উপর কাদামাটির আরেকটি স্তর চাপিয়ে দেয়া হলো। এখন কাদামাটির দুইস্তরের মাঝামাঝি মোমের যে পাতলা স্তর আছে, সেখানে গলিত উত্তপ্ত ব্রোঞ্জকে ঢালা হলো। মোম সহজেই বাষ্পীভূত হয়ে গেল এবং ব্রোঞ্জের একটি চমৎকার পাতলা আস্তরণের অসাধারণ ভাস্কর্য আমরা পেয়ে গেলাম।
প্রত্নতত্ত্ববিদ শিরিন রত্নাগর অবশ্য বলছেন,
*“এই ভাস্কর্যটি আদতে আরো বড় কোন ভাস্কর্যের অংশবিশেষ, যেটা তার হাতের দিকে তাকালে বোঝা যায়, যেনবা সেখানে কোন খুঁটির মতো কিছু ধরে রাখার জায়গা ছিল।”
এই ভাস্কর্যটি আরো সাক্ষ্য বহন করে যে, সিন্ধু সভ্যতায় নৃত্যকলার কদর ছিল, বিনোদন ছিল তাদের জীবনধারার অংশ।
এর সমসাময়িক আরেকটি নিদর্শন পাওয়া গেছে মোহেনজোদারোতেই। আরেকটি মেয়ের ভাস্কর্য কিন্তু সে যেন এই ড্যান্সিং গার্লের সৌন্দর্যপ্রভার কাছে অনেকটাই ম্লান হয়ে আছে। সেটি এখন আছে পাকিস্তানের করাচির জাদুঘরে। মোহেনজোদারো এখন পড়েছে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে। পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে এই ড্যান্সিং গার্লকে নিয়ে বেশ বিবাদ আছে, পাকিস্তান দাবি করে যে এই ড্যান্সিং গার্ল এর উত্তরাধিকারী তারা। তাকে যেন এই অমূল্য নিদর্শন ফিরিয়ে দেয়া হোক। ২০১৬ সালে এই নিয়ে বেশ কোর্টকাচারিও হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে ইতালির কাছে মোনালিসা যেমন, পাকিস্তানের কাছেও এই ড্যান্সিং গার্ল তেমনই।
পাঁচ হাজার বছরে আমাদের কি বিপুল পরিবর্তন! সিন্ধু সভ্যতার খুবই উন্নতমানের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল, পানির বিতরণ নিয়ে তারা রীতিমতো অবসেসড ছিল। জলপ্রকৌশলের আদিমতম কিছু নিদর্শন পাওয়া গেছে সেখানে। অথচ আমরা এক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে মিরপুরকে পানির নীচ থেকে তুলতে পারি না। এই নৃত্যরতা রমণী যে নির্ভয়ে যে আত্মবিশ্বাসে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সময়ে আমাদের আধুনিক শহরে কি কোন নারী এতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়াতে পারে?
দ্যা ডান্সিং গার্ল

Thursday, August 20, 2020

শ্রীলংকার টি মিউজিয়াম, ঐতিহ্য বেঁচে আছে যেখানে by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা

ঔপনিবেশিক অতীত আর বর্তমান এক সাথে মিশে গেছে শ্রীলংকার যাদুঘরে, যেখানে দেশের চায়ের ঐতিহ্য সংরক্ষিত রয়েছে। ঐতিহাসিক ক্যান্ডি শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে নয়নাভিরাম হানতানা পাহাড়ি এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে এই যাদুঘর। ১৯২৫ সালে হানতান টি ফ্যাক্টরিটিই এখন যাদুঘরে রূপ নিয়েছে। দানবাকৃতির চা প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি আর শত বছরের পুরনো সরঞ্জামাদি রয়েছে এখানে। চা পাতা শুকানো এবং বিশ্বের দূর-দূরান্তের বাজারে পাঠানোর উপযোগী করে তুলতে একসময় এই সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হতো।
যাদুঘরের দেয়ালে এক-দেড়শ বছর আগের ছবি ঝুলছে। কিভাবে বন বাদার কেটে চা চাষের জমি তৈরি হলো, মাটির রাস্তা যেগুলো দিয়ে গরুর গাড়িতে চা নিয়ে যাওয়া হতো কলম্বো বা গালে বন্দরে। রেললাইন তৈরির আগে ওই মাটির রাস্তাতেই চা পরিবহন করতে হতো।
সেই শুরুর দিকের ব্রিটিশদের তৎপরতাও জীবন্ত উঠে উঠেছে যাদুঘরে। যেমন স্কটিস ভদ্রলোক জেমস টেইলর। চা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার নেশা ছিল তার। বলা যায় তার কারণেই শ্রীলংকায় চা চাষের শুরু। ১৮৬০-এর দশক পর্যন্ত সিলনে ব্রিটিশ চাষীদের প্রধান কৃষিপণ্য ছিল কফি। দারুণ মুনাফা হতো কফি চাষে। কিন্তু ১৮৬৯ সালে ভয়াবহ পাতার রোগ ছড়িয়ে পড়ে, পুরো তছনছ হয়ে যায় কফি শিল্প।
বলা যায় টেইলরের একক প্রচেষ্টাতেই কফির শূন্য জায়গা দখল করে চা। ভারত থেকে চা গাছ এনেছিলেন টেইলর। সেগুলো নিয়ে তার আগ্রহের অন্ত ছিল না। আদতে এই গাছগুলো আনা হয়েছিল চীন থেকে। এরপর কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনে উষ্ণ ও আদ্র ভারতীয় আবহাওয়ায় প্রথম লাগানো হয় গাছগুলো। এরপর আসামেও লাগানো হয় গাছগুলো এবং শেষ পর্যন্ত শ্রীলংকার ক্যান্ডি পাহাড়ে শেষ ঠিকানা হয় এগুলোর। আজকের যে টি মিউজিয়াম, এর কাছেই লুলেকোন্দেরা ইস্টেটে ১৯ একর জায়গা জুড়ে প্রথম চা বাগান গড়ে তুলেছিলেন টেইলর। টেইলরের ব্যাপারটা অনন্য ছিল সত্যিই কারণ শুধু বিপুল পরিমাণ চা চাষের দিকেই তার আগ্রহ ছিল না, চা প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রেই সবার সেরা হতে চেয়েছিলেন তিনি।
টি মিউজিয়াম এই সব আবিষ্কারের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে বিশেষ করে টেইলর যে সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছিলেন। অতিকায় বা মাঝারি আকারের এই সব যন্ত্রপাতির মধ্যের চা রোলিং মেশিনও রয়েছে একটি, চা পাতা গুড়া করার জন্য যেটি উদ্ভাবন করেছিলেন টেইলর। বাকি যন্ত্রপাতিগুলো চা চাষ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণে ব্যবহার করা হতো।

টি মিউজিয়ামে দর্শনার্থীরা টেইলর, তার যন্ত্রপাতি এবং শ্রীলংকার চা চাষের ইতিহাসের সাথে সাথে চা শিল্পের আরও সব বড় বড় ব্যক্তিদের অতীতটাও জীবন্ত দেখতে পাবেন। প্রচুর তথ্যের সাথে এখানে লিফলেট, পোস্টার এমনকি ভিডিও-ও রয়েছে। মিউজিয়ামের মধ্যেই তৈরি রেস্তোরাঁয় বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে এই সব ভিডিও দেখতে পারবেন আপনি।
চা ‘টেস্ট’ করার সুক্ষ্ম ব্যাপারটার সাথেও পরিচিত হতে পারবেন দর্শনার্থীরা। শ্রীলংকার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন আবহাওয়ায় চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করা চা দেয়া হবে আপনার সামনে। ছোট দেশ হলেও শ্রীলংকায় বিচিত্র স্বাদের চায়ের দেখা মিলবে। পাহাড়ি এলাকার কত উচ্চতায় চা উৎপাদিত হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করে স্বাদও বদলে যায় চায়ের। আবার ক্যান্ডিতে যে চা তৈরি হচ্ছে, সেটা নুয়ারা এলিয়ান্দের মতো শীতল উঁচু এলাকায় খেতে একরকম লাগবে, আবার নিচু গালে বা মাতারা এলাকায় তার স্বাদ হবে ভিন্ন। বাতাসে জলীয় বাস্পের তারতম্যের কারণে বদলে যায় এই স্বাদ।
সব মিলিয়ে চারটি তলা জুড়ে ছড়ানো যাদুঘরটি। নিচ তলা আর তৃতীয় তলায় রয়েছে পুরনো যন্ত্রপাতিগুলো। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে লাইব্রেরি। চা নিয়ে যাবতীয় তথ্য রয়েছে এখানে। সাথে রয়েছে অডিটোরিয়াম আর অডিও ভিডিওর কালেকশান। চতুর্থ তলায় রয়েছে কেনাবেচার দোকান। শ্রীলংকার সবচেয়ে ভাল চা’টা এখান থেকে কিনতে পারবেন আপনি। চা সম্পর্কিত বই পুস্তক, পোস্টার, অডিও ভিডিও-ও পাবেন এখানকার দোকানগুলোতে।
যাদুঘরের চতুর্থ তলার সাথেই রয়েছে চমৎকার চা ক্যাফে। চা তো খেতে পারবেনই, এখানে রয়েছে আরও চমৎকার আকর্ষণ। টেলিস্কোপ বসানো রয়েছে এই ক্যাফেতে, যেগুলো দিয়ে অসাধারণ দৃষ্টিনন্দন হুনাসগিরিয়া, নাকলস রেঞ্জ এবং মাতালে রেঞ্জের পাহাড়গুলোতে ঘনিষ্ঠ নজর বুলাতে পারবেন আপনি। সন্দেহ নেই টেলিস্কোপে দেখার পর ওই জায়গাগুলোতে যেতে ইচ্ছে করবে আপনার। আরও যদি চায়ের স্বাদ নিতে চান আপনি, যাদুঘরের চারদিকে ঘিরে বহু রকমের চা পাবেন আপনি।
যাদুঘরে এবং এর চারপাশে আসলে কি আছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ধারণা দেয়ার জন্য যাদুঘরের পক্ষ থেকে গাইডের ব্যবস্থাও রয়েছে। যাদুঘরের স্টাফরা আপনাকে বুঝিয়ে দেবে কোন মেশিন দিয়ে কি করা হতো। চায়ের কি স্বাস্থ্যগুণ, সেগুলো নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট তথ্য ও লিফলেট। এই যাদুঘরে একবার ঘুরে গেলে নিশ্চিত চায়ের ভক্ত হয়ে যাবেন আপনি। শুধু এর স্বাদের কারণে নয়, বরং এর স্বাস্থ্যগুণের কারণে বিশেষ করে ক্যান্সার প্রতিরোধে এর ভূমিকার কারণে।
এই্ প্রতিবেদনটি শ্রীলংকার চা ও এর ঐতিহ্য নিয়ে সাউথ এশিয়ান মনিটরের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের অংশ।

Monday, August 3, 2020

চা-চিত্র: লঙ্কা চায়ের মানবীয় ভূগোল by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা

শ্রীলংকা ২০১৮ সালের জুলাই মাসে চা প্রবর্তনের ১৫১তম বার্ষিকী উদযাপন করবে। পাতা-মরা রোগে প্রথম অর্থকরী ফসল হিসেবে কফির পরীক্ষা ব্যর্থ হওয়ার পর ব্রিটিশ নাগরিক জেমস টেলর চা নিয়ে মাঠে নামেন। ১৮৬৭ সালে ক্যান্ডির লুকান্দুরা প্লান্টেশনে প্রথম চা চাষ করা হয়। ভারতের আসাম থেকে চারা নিয়ে লাগানো হয়েছিল সেখানে।
শ্রীলংকা চায়ের গল্প আসলে মানুষেরই গল্প। এর আনসাঙ হিরোরা হলো শ্রীলংকার ভারতীয় বংশোদ্ভূত বাগান-কর্মীরা। এসব নারী-পুরুষকে ১৮৩০-১৮৮০ সময়কালে তালাইমানারের নর্থ ওয়েস্টারমসি বন্দরে জাহাজযোগে আনা হয়েছিল। সেখান থেকে তারা ঘন জঙ্গল দিয়ে পায়ে হেঁটে সদ্য বন কেটে ক্যান্ডি, নওয়ারা ইলিয়া ও তালাওয়াকেলের মতো স্থানে তৈরি করা বাগানে পৌঁছেছিল। অনেক শ্রমিক পথেই মারা পড়েছিল। অন্যরা প্রাণ হারিয়েছিল ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ রোগে।
বর্তমানে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সব বাগান-কর্মীকে শ্রীলংকার নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে, তারা দ্বীপদেশটির বহুমুখী সামাজিক আবরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সংগ্রহ করা চায়ের পাতা জমা দিচ্ছে শ্রমিকরা
শ্রীলংকার চা শিল্পের ইতিহাসের সাথে দ্বীপটির উপনিবেশ আমলের ইতিহাসও ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তা ভালো বা মন্দ যাই হোক না কেন।
চা-বাগান ১৯৯০-এর দশক থেকে পুরোপুরি স্থানীয় মালিকানায় চলে এলেও বাগানের সাথে জড়িত দাস-শ্রমিকদের উপনিবেশ সম্পৃক্ততা এখনো রয়ে গেছে। আবার চা তোলার কাজ প্রায় পুরোপুরি নারীদের হাতে থাকায় এটি নারীদের সংগ্রামের কাহিনীও।
স্বাদে ও গন্ধে শ্রীলংকার চা অতুলনীয়। এ চা ভারতীয় ও কেনিয়ান চায়ের সাথে পাল্লা দেয়। অবশ্য বর্তমানে শ্রমিক সঙ্কট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় শ্রীলংকার চায়ের সেই সুনাম হুমকির মুখে পড়েছে।
তাদের না-বলা কাহিনী ভাসে চাপের কাপে
চল্লিশ বছরের রানি। ক্ষিপ্র পায়ে চা-বাগান দিয়ে হাঁটছেন। দূর থেকে মনে হবে, তিনি সবুজ কার্পেটের উপর দিয়ে চলছেন। সকালের রোদে চা-পাতা ভিন্ন ধরনের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই পাতাই তার জীবিকা ছিল। কেবল তার নয়, তার পূর্বপুরুষদেরও রুটি-রুজির উৎস ছিল এই চা পাতা। এখন অবশ্য আয়া হিসেবে কাজ করেন।
বয়স যখন ছিল ১৮, তখন থেকেই তিনি চা-বাগানে কাজ করেন। কোনো রকমে নাম লিখতে পারেন তিনি। আসলে তাদের পড়াশোনা করার মতো কোনো ব্যবস্থাও তার শৈশবে ছিল না। ফলে পড়াশোনা অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন ব্যাপারেও পরিণত হয়েছিল।
তবে নিজে পড়াশোনা করতে না পারলেও তিনি তার সন্তানদের পড়াচ্ছেন। তিনি চান তার সন্তানরা যেন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হন। এখন অবশ্য তার আয় বাড়ায় তিনি সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে পারছেন। তার সময়ে তেমনটি করা সম্ভব ছিল না।
তবে তা কেবল তার একার আয় দিয়ে হচ্ছে না। তার স্বামী কাজ করেন কলম্বোতে একটি দোকান সহকারী হিসেবে। এতেই তার পক্ষে অনেক কাজ সহজ হয়ে গিয়েছে।
নতুন একটি সড়কে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছেন রানি
তিনি অবশ্য অনেক কিছু থেকে এখনো বঞ্চিত। তিনি জানান, ‘আমার চাকরি খণ্ডকালীন। মুখের কথাতেই হয়তো একদিন চাকরিটি চলে যাবে। তখন আবার তাকে হয়তো চা-বাগানে ফিরে যেতে হবে।
তিনি জানান, আয়ার কাজে তিনি মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা আয় করেন। পরিশ্রমও খুব নয়। চা-শ্রমিক হিসেবেও তার আয় প্রায় একই ছিল। তবে তা ছিল অনেক বেশি পরিশ্রমের। তখন তাকে পোকামাকড়ের কামড় খেতে হতো, জোঁক ধরত, ঠাণ্ডায় ভুগতে হতো। ছুটিছাটাও তেমন পাওয়া যেত না। তাছাড়া থাকতে হতো ঘিঞ্চি মেসে। মালিকদের সাথে চা-শ্রমিকদের সম্পর্কও সবসময় মধুর থাকে না।
দুনিয়া যে ছোট নয়, সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি চা-বাগান থেকে সরে গেছেন। তার মেয়ে পড়াশোনা করছে কাছের একটি চার্চে। ইংরেজিতেই হয় পড়াশোনা। এ নিয়ে তার গর্বও কম নয়।
এই রানিই বলে দিচ্ছে, চা-শ্রমিকদের জীবনযাত্রা বদলে যাচ্ছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা চা শিল্পে নিয়োজিত থাকলেও পরবর্তী প্রজন্ম সম্ভবত এই পেশায় থাকবে না। তাহলে চা-শিল্পের কী হবে? শ্রমিক না থাকলেও তো চা-বাগানও থাকবে না। এ নিয়ে চা-শ্রমিকরা কী ভাবছে?
রানিই জানালেন, চা-পাতা কে তুলবে, তা আমার কাজ নয়। আমাদের সবার দিন-রাতের ভাবনা হলো, আমাদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত নিশ্চিত করা। বাগানে বন্দি থাকার নিয়তি আমরা মেনে নিতে পারি না। তারা আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না, আমরা কেন তাদের দিকে তাকাব।
তার প্রকাশভঙ্গি ও স্বরই বলে দিচ্ছে, তারা এখন নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে ভাবছেন।
চা-বাগানটির কাছাকাছি থাকা ছোট একটি গির্জায় দুই তরুণ নানকে দেখা গেল। তারাও এখন পড়াশোনার কথাই ভাবছে। তাদের মাথায় ভর করে আছে বিজ্ঞান, গণিত আর ইংরেজি।
সবুজ দিগন্ত
তবে চা বাগানের মালিকদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। ক্যান্ডি জেলার গালাসার একটি চা-বাগানের কথাই ধরা যাক। সেখানকার বেশির ভাগ শ্রমিকের বয়স ৫০ বছরের বেশি। নতুন শ্রমিক পাওয়া কঠিন। এমনকি স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাগানে কাজ করবে এমন কাউকেও পাওয়া যায় না।
বাগান-মালিক জানান, ১০ বছর পর চা তুলবে কে? তবে তিনি যতটা হতাশ, তার সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী তার মেয়ে ততটা নন। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করলে ব্যাপক পরিবর্তন আনবেন বলে পরিকল্পনা করছেন। তিনি একদিকে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবেন বলে জানিয়েছেন। তাছাড়া শ্রমিকদের জুতার মতো সামগ্রীও দেওয়ার কথা ভাবছেন। ফলে কম শ্রমিকেও বেশি উৎপাদন হবে।
কিন্তু তাতে তো খরচ বেড়ে যাবে অনেক। এখনই দামের কারণে চা-শিল্প বেশ সঙ্কটে পড়েছে। দাম আরো বেড়ে গেলে বাজার পাওয়া কঠিন হবে বৈকি।
তবে তারা পরিবর্তন আনুন বা না আনুন, শ্রীলংকার চা-শিল্পে ইতোমধ্যেই পরিবর্তনের ঢেউ লেগে গেছে। অবশ্য তা হচ্ছে ধীরে ধীরে।

চা-বাগানেও একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। বাগানের আকার ও মালিকানায় নতুনত্ব আসছে। অনেক চা-শ্রমিক পর্যন্ত এখন যৌথভাবে বাগান কিনছে। অবশ্য এসবের আয়তন বেশ ছোট। এমন একটি উদাহরণ হলো ৩৫ বছরের রাতনাভেলি। তিনি পূর্বসুরীদের থেকে পাওয়া তার বিশাল বাগানের একটি অংশ বেশ কম দামে শ্রমিদের কাছে বিক্রি করেছেন। তারা এখন যৌথভাবে এটি পরিচালনা করছে। নিজের জমিতে কাজ করতে হওয়ায় এসব শ্রমিক পারিশ্রমিক নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামান না।
ছোট চা-বাগান মালিক-শ্রমিকদের বিষয়টি তদারকির জন্য গড়ে ওঠেছে টি স্মল হোল্ডার্স অথোরিটি। এসব বাগান যাতে লাভজনক হয়, তা-ই দেখা এই সংগঠনের অন্যতম দায়িত্ব। রাতনাভেলি একসময় শিক্ষকতা করতেন কাছের একটি স্কুলে। এখন তিনি চা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, যে ফসলটিকে একসময় দাসত্বের প্রতীক বিবেচনা করা হতো, তা এখন মুক্তির বার্তা বয়ে আনছে।

Thursday, November 21, 2019

দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ঘাসের মাদুর by ড. রেঅপামুদ্রা মৈত্র বাজপাই

সম্প্রতি অবসরে যাওয়া প্রখ্যাত আমলা সিলেটি-বংশোদ্ভূত গুরুসাদে দত্ত বাংলার লোককলা ও শিল্প রক্ষায় ভূমিকা রাখার জন্য সুপরিচিত।
বাংলার হস্তশিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি লিখেছেন যে এই অঞ্চলের লোকজ শিল্প সাধারণ কৃষকদের আনাড়ি হাতের শিল্প নয়, বরং তা প্রতিটি ব্যক্তির সামাজিক মাত্রার মধ্যে তার শিক্ষা ও অবস্থানের মাত্রার বহিঃপ্রকাশ। আর কারিগর ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা ভিন্ন কেউ নন, বরং একই সাংস্কৃতিক ধারার অংশবিশেষ।
হস্তশিল্পের সাথে জড়িতরা কোনো ভৌগোলিক আয়তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাদের উপস্থিতি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। আর এই শিল্প বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগসূত্র সৃষ্টি করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মও শিল্পীদের মধ্যে সংযোগ সাধনের কাজ করে। এ ধরনের একটি প্লাটফর্ম হলো ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ প্লাটফর্ম।

গত ৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু আইল্যান্ডে এর দ্বাদশ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইন্টারগভার্নমেন্টাল কমিটি অব ইউনেস্কো বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটিকে ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ (আইসিএইচ) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। শিল্পপ্রেমীদের কাছে এটি একটি বিরাট মুহূর্ত।
শীতল পার্টির অন্তর্ভূক্তির ফলে তালিকায় বাংলাদেশের পণ্যসংখ্যা দাঁড়াল চারে। অন্যগুলো হলো পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা (২০১৬), জামদানি শাড়িতে ঐতিহ্যবাহী নক্সা (২০১৩) ও বাউল সঙ্গীত (২০০৮)।
শীতল পাটি বোনা হয় বেত-জাতীয় গাছের আঁশ থেকে। এই গাছটি মোস্তাক, পাটিপাতা, পাটিবেত ও পৈতারা। এই গাছটি সিলেট, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনি, চট্টগ্রামে জন্মায়।
শীতল পাটি সত্যিকার অর্থেই একটি বিরাট শিল্পকর্ম। এই কাজে নারীরা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই শিল্পের সাথে জড়িতরা তাদের অঞ্চলের নক্সা ও মটিফকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

আফগানিস্তান পরিচিত তার চমৎকার ছোট গালিচা ও কার্পেটের জন্য। বিশেষ করে দক্ষিণ আফগানিস্তানে উষ্ণ জলবায়ু এই শিল্পের জন্য বিশেষ ভূমিকা পালন করছে।
পার্বত্যপূর্ণ ভুটানে বাঁশ হস্তশিল্পের জন্য প্রধান কাঁচামাল। মধ্য ও পশ্চিম ভুটানে জন্ম নেয়া ছোট বাঁশ ব্যবহৃত হয় ম্যাট, বেড়া বা ছাদ দেয়ার কাছে।
ভারতে শুকনা ঘাস, বেত ও বাঁশের মাদুর-বোনা বেশ জনপ্রিয়। মেঘালয়ে বাঁশের স্লিপিং ম্যাটের বেশ কদর রয়েছে। ত্রিপুরার চাটাই পর্যটকদের মধ্যেও চাহিদা রয়েছে।
শীতল পাটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরাতেও পৌঁছে গেছে। কড়া/কড়াই নদীর তীরে জন্মানো ঘাস দিয়েও একই ধরনের পাটি বোনা হয় অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও কর্নাটকে। কেরালায় পাট দিয়ে বানানো কার্পেট বেশ জনপ্রিয়।
মালদ্বীপে একসময় থুনদুকুনা ম্যাট রাজকীয় উপহার হিসেবে পরিচিত ছিল। মালদ্বীপের সুলতানেরা ডাচ ও ব্রিটিশ গভর্নরদের এ ধরনের মূল্যবান উপহার দিতেন। নারীরাই এই ম্যাট তৈরির সাথে জড়িত ছিল। বর্তমানে দাধধু দ্বীপেই মূলত এসব ম্যাট তৈরি হয়। তবে যে নলখাগড়া দিয়ে এসব ম্যাট তৈরি হয় সেগুলো পাওয়া যায় ফিয়োরি দ্বীপে।

নেপালে খড় থেকে ম্যাট বানানো হয়। স্থানীয়রা একে বলে গুনদ্রি। একসময় নারীরাই জড়িত ছিল এই শিল্পে। এখন পুরুষেরাও হাত লাগিয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে ধান কাটা হয় সেখানে। তারপর খড় সংগ্রহ করে মাঘ ও ফাগুন মাসে বোনা হয় এসব ম্যাট। তাদের কাজ দেখে মনে হয় খুব সহজ। কিন্তু করতে গেলে টের পাওয়া যায়, কত দক্ষতার প্রয়োজন এতে।
পাকিস্তানের নদীগুলোর ধারে এক ধরনের নরম ঘাস জন্মায়। এগুলো জায়নামাজ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। নারী-পুরুষ সবাই ঘাসের জায়নামাজ তৈরির সাথে জড়িত।
শ্রীলঙ্কায় নলখাগড়া থেকে তৈরি করা হয় জটিল ম্যাট। এসব ম্যাট মেঝ ঢাকতে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়। নানা ফুল-পাখির নক্সা আঁকা থাকে এসব ম্যাটে।

Tuesday, November 12, 2019

জামদানি শাড়ি: বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এই শাড়ির আসল-নকল চিনবেন যেভাবে by সানজানা চৌধুরী

বাংলাদেশের যেসব নারী শাড়ি পছন্দ করেন, তাদের সংগ্রহে অন্তত একটি হলেও জামদানি শাড়ি থাকে।
নান্দনিক ডিজাইন এবং দামে বেশি হওয়ার কারণে জামদানির সঙ্গে আভিজাত্য এবং রুচিশীলতা - এই দুটি শব্দ জড়িয়ে আছে।
ঐতিহ্যবাহী নকশা ও বুননের কারণে ২০১৬ সালে জামদানিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে আজকাল বিভিন্ন মার্কেটে জামদানির নামে বিক্রি হচ্ছে নকল শাড়ি, ফলে ঐতিহ্যবাহী জামদানির আবেদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ক্রেতারা।
অনেক বিক্রেতা জামদানি বলে ভারতীয় কটন, টাঙ্গাইলের তাঁত, পাবনা ও রাজশাহীর সিল্ক শাড়ি ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
২০১৬ সালে জামদানিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো।
প্রশ্ন হল আসল জামদানি শাড়ি চেনার উপায় তাহলে কী?
এক্ষেত্রে শাড়ি কেনার আগে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে নজর দেয়ার কথা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন ফ্যাশন ডিজাইনার শারমিন শৈলী এবং নারায়ণগঞ্জের জামদানি বিসিক শিল্প নগরীর তাঁতি মোঃ মনির হোসেন।

আসল জামদানি শাড়ি চেনার উপায়:

জামদানি শাড়ি কেনার আগে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে - শাড়ির দাম, সূতার মান এবং কাজের সূক্ষ্মতা।
আসল জামদানি শাড়ি তাঁতিরা হাতে বুনন করেন বলে এগুলো তৈরি করা অনেক কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। তাই এগুলোর দামও অন্যান্য শাড়ির তুলনায় বেশি হয়ে থাকে।
একটি জামদানি শাড়ি তৈরি করতে দুইজন কারিগর যদি প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শ্রম দেন, তাহলে ডিজাইন ভেদে পুরো শাড়ি তৈরি হতে সাত দিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সাধারণত শাড়ি তৈরির সময়, সূতার মান ও কাজের সূক্ষ্মতা বিবেচনায় একটি জামদানির দাম ৩,০০০ টাকা থেকে এক লাখ ২০,০০০ টাকা কিংবা তারচেয়েও বেশি হতে পারে।
নারায়নগঞ্জে জামদানির পাইকারি বাজারে শাড়ি তুলে দাম হাকানো হয়
কিন্তু মেশিনে বোনা শাড়িতে তেমন সময় বা শ্রম দিতে হয় না। এজন্য দামও তুলনামূলক অনেক কম।
জামদানি শাড়ি হাতে বোনা হওয়ায়, শাড়ির ডিজাইন হয় খুব সূক্ষ্ম এবং নিখুঁত। ডিজাইনগুলো হয় মসৃণ।
কারিগর প্রতিটি সুতো হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বুনন করেন। সূতার কোন অংশ বের হয়ে থাকে না। এ কারণে জামদানি শাড়ির কোনটা সামনের অংশ আর কোনটা ভেতরের অংশ, তা পার্থক্য করা বেশ কঠিন।
মেশিনে বোনা শাড়িতে কেবল জামদানির অনুকরণে হুবহু নকশা সেঁটে দেয়া হয়। এই শাড়িগুলোর উল্টো পিঠের সূতাগুলো কাটা কাটা অবস্থায় বের হয়ে থাকে।
জামদানি শাড়ি চেনার আরেকটি উপায় হতে পারে এর সূতা ও মসৃণতা যাচাই করা। জামদানি শাড়ি বয়নে সুতি ও সিল্ক সূতা ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
সূতার ব্যবহারের দিক থেকে জামদানি সাধারণ তিন ধরণের হয়ে থাকে।
১. ফুল কটন জামদানি - যেটা তুলার সূতা দিয়ে তৈরি করা হয়।
২. হাফ-সিল্ক জামদানি - যেখানে আড়াআড়ি সুতাগুলো হয় রেশমের আর লম্বালম্বি সূতাগুলো হয় তুলার।
৩. ফুল-সিল্ক জামদানি - যেখানে দুই প্রান্তের সূতাই রেশমের হয়ে থাকে।
শাড়ি কেনার আগে এই সূতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি, কেননা নকল জামদানি শাড়ি সিল্কের পরিবর্তে পলেস্টার বা নাইলনের মতো কৃত্রিম সূতা ব্যবহার করে থাকে।
সূতার মান যাচাই করতে শাড়ির আঁচলের শেষ প্রান্তে যে কিছু সুতা বের হয়ে থাকে, সেগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে।
জামদানি শাড়ির কোনটা সামনের অংশ আর কোনটা ভেতরের অংশ সেটা পার্থক্য করা বেশ কঠিন।
নাইলনের সূতা মসৃণ হয়, আর জামদানির সিল্ক সূতায় মাড় দেয়া থাকায় সেটা হবে অপেক্ষাকৃত অমসৃণ। সাধারণ পিওর সিল্কের সূতা টানাটানি করলে ছিঁড়ে যায় এবং এই সূতা আগুনে পোড়ালে চুলের মতো পোড়া গন্ধ বেরোয়।
আঁচলের শেষ প্রান্তের সূতাগুলো আঙ্গুল দিয়ে মোড়ানোর পর যদি সুতাগুলো জড়িয়ে যায়, তবে সেটা সিল্ক সূতার তৈরি আর যদি সূতাগুলো যেকোনো অবস্থায় সমান থাকে, তবে তা নাইলন।
এছাড়া কাউন্ট দিয়ে সূতার মান বোঝানো হয়। যে সুতার কাউন্ট যত বেশি, সেই সুতা তত চিকন। আর সূতা যতো চিকন, কাজ ততই সূক্ষ্ম হবে - যা ভাল মানের জামদানি শাড়ির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
জামদানি শাড়ির সূতাগুলো সাধারণত ৩২-২৫০ কাউন্টের হয়ে থাকে।
জামদানির মান মূলত কাজের এই সূক্ষ্মতার উপর নির্ভর করে। আর শাড়ি কতোটা সূক্ষ্ম হবে, তা নির্ভর করে এই সূতা এবং তাঁতির দক্ষতার উপর।
সাধারণত যে শাড়িটা কাজ যতো সূক্ষ্ম, স্বাভাবিকভাবেই তার দামও ততো বেশি হয়ে থাকে। আবার সুতা যত চিকন, শাড়ি বুনতে সময়ও লাগে তত বেশি - কাজেই দামও বেশি পড়ে।
অন্যদিকে মেশিনে বোনা শাড়ির সুতা ২৪-৪০ কাউন্টের হয়ে থাকে।
তবে মেশিনে বোনা শাড়িগুলোর বুনন অনেক ঘন হয়। তাঁতে আর যাই হোক মেশিনের মতো ঘন বুনন দেয়া সম্ভব না।
জামদানির সূতায় মাড় দেয়া থাকে
জামদানি শাড়িতে যে অংশটুকু কোমরে গুঁজে রাখা হয়, ওই অংশটায় অর্থাৎ সাড়ে পাঁচ হাত পর্যন্ত কোন পাড় বোনা থাকে না। কিন্তু মেশিনে বোনা শাড়ির পুরো অংশ জুড়েই পাড় থাকে।
হাতে বোনা জামদানি ওজনে হালকা হয়ে থাকে এবং পরতেও আরামদায়ক।
তবে জামদানি খুব যত্ন করে রাখতে হয়, না হলে বেশিদিন টেকসই হয় না।
অন্যদিকে কোনও রকম হাতের ছোঁয়া ছাড়া, জামদানির ডিজাইন নকল করা, মেশিনে বোনা শাড়ি কৃত্রিম সুতোয় তৈরি হয় বলে এই শাড়িগুলো হয় ভারি এবং খসখসে।
তবে এই শাড়িগুলো বছর বছর ধরে পরা যায়।

জামদানির বৈশিষ্ট্য:

জামদানির প্রধান বৈশিষ্ট্য এর জ্যামিতিক নকশা। এই জ্যামিতিক নকশায় ফুটিয়ে তোলা হয় নানা ধরণের ফুল, লতাপাতা, কলকাসহ নানা ডিজাইন।
জামদানির ডিজাইন বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে। তারমধ্যে পান্না হাজার, তেরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খী, বটপাতা, করলা, জাল, বুটিদার, জলপাড়, দুবলি, ডুরিয়া, বলিহার, কটিহার, কলকাপাড় ইত্যাদি বেশি প্রচলিত।
জামদানিতে ছোট ছোট ফুল বা লতাপাতার ডিজাইন যদি তেরছা ভাবে সারিবদ্ধ থাকে, তাহলে তাকে তেরছা জামদানি বলে।
ফুল, লতার বুটি জাল বুননের মতো সমস্ত জমিনে থাকলে তাকে জালার নকশা বলা হয়।
পুরো জমিনে সারিবদ্ধ ফুলকাটা জামদানি ফুলওয়ার নামে পরিচিত। ডুরিয়া জামদানি ডোরাকাটা নকশায় সাজানো থাকে।
তেমনি পাড়ে কলকির নকশা থাকলে তা হবে কলকাপাড়।
দীর্ঘ সময় ও কঠোর শ্রমের কারণে জামদানির দাম তাই অন্যান্য শাড়ির তুলনায় বেশি পড়ে।

বাংলাদেশে অডিও সিডি-ভিসিডি বিক্রি বন্ধ, লাইক-সাবসক্রাইবার বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় প্রযোজকরা by শফিক রহমান

এক ধরনের ধসের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের অডিও সিডি-ভিসিডির মার্কেট। বন্ধ হয়ে গেছে দেশটির এক সময়ের ক্যাসেট এবং কিছু দিন আগের অডিও সিডি-ভিসিডির প্রযোজনা ও বিক্রয়ের একমাত্র হাব হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীর বিক্রয় কেন্দ্রগুলো। আগে পাটুয়াটুলীর নূরুল হক মার্কেট, সালাম ম্যানশন, হাজী নূর মার্কেট এবং আরেফিন প্লাজাসহ আশপাশের মার্কেট থেকে অখ্যাত-বিখ্যাত নানা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে প্রকাশ হতো বাউল, বিচ্ছেদ, জারি-সারি, পালাগান, ইসলামী গজল, হামদ-নাত, ওয়াজ, কোরআন তেলাওয়াতসহ আধুনিক ও ব্যান্ড সঙ্গীতের জনপ্রিয়সব ক্যাসেট। প্রায় দেড় দশক আগে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো জড়ো হয়েছিল ওই এলাকারই ঐতিহাসিক ও আলোচিত মুন সিনেমা হল ভেঙ্গে গড়ে ওঠা মুন কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায়।
সম্প্রতি ফেব্রুয়ারির এক সন্ধ্যায় নগরীর ব্যস্ততম ওই অংশের ঘড়ি, চশমা, কাপড় ও বোরকার দোকানের হাজার ওয়াটের লাইটের নিচে বসে বিক্রেতারা যখন পাইকারি ক্রেতাদের নিয়ে ব্যস্ত, যখন  সামনের ছোট-চাপা রাস্তায় রিকশা, ভ্যান আর ঠেলা গাড়ির ঠাসা-ঠাসি, তখন মুন কমপ্লেক্সের তৃতীয় তলায় অডিও সিডি-ভিসিডির মার্কেট জুড়ে অন্ধকার। সাটার নামানো দোকানগুলো ঘিরে তৈরি হয়েছে ভৌতিক এক নিরবতা। দুই একটি দোকানে আলো জ্বলছে। সেগুলোর সামনের অংশে সিডি-ভিসিডি বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড থাকলেও ভেতরে কাজ করছে পাঞ্জাবি, বোরকা ও টি শার্ট প্যাকেজিং এর শ্রমিকরা। এর মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গেল ‘মা সিডি ভিশন’।
প্রতিষ্ঠানটির মালিক শিবু কৌতুহলী হয়ে নড়েচড়ে বসে জানালেন, ‘বিক্রি নাই, ব্যবসা বন্ধ।’ সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পাল্টা প্রশ্ন রাখেন, ফেসবুক, ইউটিউবের যুগে এসবের কি আর চাহিদা থাকে?
শিবু জানান, তিনি মুলত বাউল, বিচ্ছেদ, জারি-সারি ও পালা গানের ক্যাসেট প্রযোজনা ও বিক্রি করতেন। ১৯৮৪ সালে জনি এন্টারপ্রাইজের ব্যানারে প্রথম প্রকাশ করেন মালেক সরকারের গাওয়া সুলায়মান পয়গম্বরের জারির ক্যাসেট। এর ধারাবাহিকতায় একে একে প্রকাশ করেন ঐতিহাসিক চরিত্র হানিফ পালোয়ান, সোহরাব-রুস্তুম, মা ফাতেমার শক্তি পরীক্ষাসহ নানা শিরোনামের জারি গানের ক্যাসেট।
শিবু আরও জানান, ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘মা সিডি ভিশন’ এবং ওই বছরই তিনি প্রথম প্রকাশ করেন লোক সঙ্গীত শিল্পী মমতাজের ‘মরার কোকিলে’ সিডিটি। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সিডিটির শিরোনামের গানটি পৌঁছে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। শিবুর দাবি, এই গানটির মাধ্যমেই মমতাজ যুক্ত হন সঙ্গীত জগতের ‘মূল ধারায়’। তিনি বলেন, মমতাজের খ্যাতি আগেও ছিল। কিন্তু তা পালা গানের শিল্পী হিসেবে। এই গানটিই তাকে এনে দেয় ভিন্ন পরিচয়।
পরবর্তীতে মমতাজ সমান তালে গেয়েছেন রেডিও, টেলিভিশন, দেশি-বিদেশি কনসার্টসহ নানা অনুষ্ঠানে। পরিচিতি পেয়েছেন বাংলাদেশের ফোক সম্রাজ্ঞী হিসেবে।
জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রথমে সংরক্ষিত মহিলা আসনে। বর্তমানে নির্বাচিত।
জানা গেছে, পাকিস্তান আমলেই পাটুয়াটুলিতে দেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির গোড়াপত্তন ঘটে। বিশেষ করে তখন দুই তিনটি ব্যবসায়ি প্রতিষ্ঠান গ্রামোফোন থেকে গান-মিউজিক কপি করে বিক্রি শুরু করে। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিস ওউনারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইবি) জানায়, এর ধারাবাহিকতায় ওই এলাকায় ১১২টি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যদিও সারা দেশে তখন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৭১টি।
ক্ষিণ আলোতে মোবাইলের ক্যামেরায় সারি সারি বন্ধ দোকানের ছবি তুলতে গেলে উদ্দেশ্য জানতে চান স্বপন দাস। নিজেকে ‘সুর সঙ্গীত’ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মালিক পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘ব্যবসায়ী হিসেবে আমরা বুদ্ধিমান না। এক সময় যখন ক্যাসেট বের করা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম ততোদিনে বাজার দখল করে নিয়েছে অডিও সিডি-ভিসিডি। ওই সময় আর্থিকভাবে বড় একটা ধরা খেয়েছি। পরে আবার যখন সিডি-ভিসিডি নিয়ে ব্যস্ত রয়েছি ততোদিনে ফেসবুক, ইউটিউবের যুগ চলে এসেছে। আবার আর্থিক ক্ষতি।’
তবে এবার ক্ষতির ধকল কাটিয়ে ওঠার চেষ্টার কথা জানালেন স্বপন দাস। তিনি বলেন, ‘ইউটিউবে সুরসঙ্গীত’ নামে একটি চ্যানেল খুলেছি। পুরোনো প্রযোজনাগুলো ওখানে ছাড়া হয়েছে। নতুনগুলোও ছাড়া হচ্ছে। তাতে খরচ কিছুটা উঠে আসা শুরু হয়েছে।’
স্বপন দাস জানান, তার বাবা সুবল চন্দ্র দাস ছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত ঢোল বাদক। ১৯৯৪ সালে তিনিই শুরু করেন ‘সুর সঙ্গীত’ এবং প্রতিষ্ঠানটির লোগো হিসেবে রাখেন ঢোলকে। তাদের প্রথম এবং বিখ্যাত প্রযোজনা মমতাজের ‘ভাব বৈঠকী’।
ইউটিউবে সার্চ দিয়ে দেখা গেল বাংলার ঢোলের ছবি দিয়ে তৈরি করা লোগো এবং ‘সুরসঙ্গীতে’র ব্যানারে ইতোমধ্যে ১৯৪টি ভিডিও আপ হয়েছে। শুরুতেই দেখা যায় মমতাজের ছবি সম্বলিত সেই অ্যালবামটি। যার শিরোনামে লেখা রয়েছে ‘মমতাজের শ্রেষ্ঠ অ্যালবাম-ভাববৈঠকী’। এক বছর আগে আপ হওয়া অ্যালবামটি ইতোমধ্যে ভিউয়ারের সংখ্যা পার করেছে ১২ লাখ ৩৪ হাজার।
এদিকে একই তথ্য জানালেন এমআইবি’র সেক্রেটারি জেনারেল এবং সেন্ট্রাল মিউজিক এন্ড ভিডিওস (সিএমভি)-এর কর্ণধার শাহেদ আলী পাপ্পু। তিনি বলেন, অডিও সিডি-ভিসিডি’র দোকান কেন্দ্রীক ব্যবসা বন্ধ। ব্যবসাটা এখন করপোরেট পর্যায়ে চলে গেছে। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো আমাদের কাছ থেকে কনটেন্ট নেয়। এছাড়া ফেসবুক গ্রুপ আছে, ইউটিউবে চ্যানেল আছে।
আয়ের হিসাব বিশেষ করে দোকান ভিত্তিক বিক্রির তুলনায় বর্তমান প্রক্রিয়ায় আয় বেশি না কম জানতে চাইলে শাহেদ আলী পাপ্পু বলেন, পুরনো একটি ধারা থেকে একেবারেই নতুন একটি পথে আমরা চলতে শুরু করেছি। এ পথে আয় আসছে কিন্তু পুরো মাত্রায় আসতে হয়তো একটু সময় লাগবে।
ইউটিউবে সার্চ দিয়ে দেখা গেল সিএমভি’র সাবসক্রাইবার ১.৫ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে।
এছাড়া সিডি চয়েসের ০.৫ মিলিয়ন, সিডি ভিশনের ০.২ মিলিয়ন, সুরঞ্জলীর ০.৬ মিলিয়ন, মিউজিক হেভেনের ০.৭ মিলিয়ন, বাউল মেলার ০.২ মিলিয়ন, চেনাসুরের ০.২ মিলিয়ন, লেজার ভিশনের ০.৭ মিলিয়ন, অনুপমের ০.১ মিলিয়ন, সাউন্ডটেকের ১.৪ মিলিয়ন, সঙ্গীতার ০.২ মিলিয়ন। তবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সাবসক্রাইবার জি সিরিজের থলিতে। তাদের মোট সংখ্যা ২.৪ মিলিয়ন ছাড়িয়েছে। আর সবচেয়ে কম সুরের মেলার। তাদের মাত্র ২৭টি।
এদের মধ্যে ‘সঙ্গীতা’ শুরু হয় আশির দশকের শুরুর দিকে। প্রতিষ্ঠানটির আদি নাম ছিল সামাদ ইলেক্ট্রনিকস। পরে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘সঙ্গীতা’। বাংলাদেশের বিখ্যাত শিল্পীদের অধিকাংশ গানই সঙ্গীতার ব্যানারে বাজারে এসেছে।
মুলত ওই আশির দশককেই বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির বিকাশের দশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর ধারাবাহিকতা চলে পরের দশক জুড়েও। ওই সময়ের মধ্যে বের হওয়া অধিকাংশ অ্যালবামই আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা পায়।
তবে শুধু প্রযোজনা ও বিক্রিই নয় ক্যাসেট প্রস্তুতেরও কেন্দ্র ছিল পাটুয়াটুলি। সাউন্ডটেক ও কেটি ছিল মূল প্রস্তুতকারক। যদিও প্রতিষ্ঠান দুটি স্থানীয়ভাবে শুধু ক্যাসেটের কেসিং তৈরি করতো এবং তার মধ্যে আমদানি করা টেপ বসিয়ে দিত। পরবর্তীতে সাউন্ডটেক প্রযোজনা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয় এবং বের করে জনপ্রিয়সব গানের অ্যালবাম।
ইউটিউবে সাউন্ডটেকের দুটি সেকশন দেখা যাচ্ছে। একটি সাউন্ডটেক মিউজিক, আরেকটি সাউন্ডটেক নাটক। অন্যান্য প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোরও এমন একাধিক সেকশন দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে লেজার ভিশনের সেকশনগুলোর মধ্যে বাড়তি দেখা যাচ্ছে ‘লেজার ভিশন বাউলিয়ানা’; ‘লেজার ভিশন মুভি’ ও ‘লেজার ভিশন ডকুমেন্টারি’।
তবে প্রতিষ্ঠিত সবকয়টি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানেরই কমন একটি সেকশন ‘ইসলামিক’। যেখানে রয়েছে ইসলামিক গান, কোরআন তেলাওয়াত ও ওয়াজ।
‘পরিবর্তন’ তা যে ধরনেরই হোক তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন মিউজিক শিল্প উদ্যোক্তারা। গ্রামোফোন থেকে ক্যাসেট, ক্যাসেট থেকে সিডি-ভিসিডি-ডিভিডি। এবার ডিজিটাল প্রযুক্তিতে লাইক-সাবসক্রাইবার বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। সঙ্গীত চলছেই।

Wednesday, October 30, 2019

কুঁড়ার তেলের বিদেশযাত্রা by ফখরুল ইসলাম

*১০ বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২টি কারখানা গড়ে উঠেছে।
*বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তেল।
*দাম সয়াবিন তেলের চেয়ে কিছুটা বেশি।
*২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশ থেকে রপ্তানি হয় কুঁড়ার ২০ হাজার টন তেল।
*দেশে বছরে উৎপাদিত হয় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টন তেল।
*সাড়ে ছয় কেজি কুঁড়া থেকে এক লিটার তেল হয়।

দেশে তো জনপ্রিয় হচ্ছেই, ধানের কুঁড়ার তেল (রাইস ব্র্যান অয়েল) এখন বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশ থেকে কুঁড়ার ২০ হাজার টন তেল রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানির প্রায় পুরোটাই হচ্ছে বগুড়া থেকে। বর্তমানে এই তেল প্রধানত রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। তবে শ্রীলঙ্কা, জাপান, চীন—এসব দেশেও রপ্তানির প্রক্রিয়া চলছে।
স্বাধীনতার পর এবং আশির দশকেও দেশে প্রধান ভোজ্যতেল ছিল সরিষার তেল। তবে নব্বইয়ের দশক থেকেই অপরিশোধিত পাম তেল ও সয়াবিন তেলের আমদানি বাড়তে থাকে। দেশে গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানাও। আর ভোজ্যতেল হিসেবে ঘরে ঘরে জায়গা করে নেয় পাম তেল ও সয়াবিন তেল। কেউ কেউ অবশ্য সূর্যমুখী বা জলপাই তেলও (অলিভ অয়েল) রান্নায় ব্যবহার করেন।
একসময় বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে আসে অন্য ভোজ্যতেলের তুলনায় ধানের কুঁড়ার তেলে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক মাত্রা কম। ধানের তুষ ছাড়ানোর পর চালের গায়ে বাদামি যে অংশ থাকে, সেখান থেকে এই তেল নিষ্কাশন করা হয়।
গত ১০ বছরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধানের কুঁড়ার তেলের ১২টি কারখানা গড়ে ওঠে। পাবনার ঈশ্বরদীতে ২০১১ সালে রশিদ অয়েল মিলস লিমিটেড ‘হোয়াইট গোল্ড ব্র্যান্ড’ নামে ধানের কুঁড়ার তেল উৎপাদন শুরু করে। প্রায় একই সময়ে গড়ে ওঠে ময়মনসিংহে ‘স্পন্দন’ ব্র্যান্ডের আরেকটি কারখানা।
তবে উৎপাদনের মাঠে ভালোভাবে আছে এখন বগুড়ার মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ও তামিম অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। মজুমদার গ্রুপের তেলের ব্র্যান্ড ‘স্বর্ণা’। মজুমদার গ্রুপের কারখানায় প্রতিদিন তেল উৎপাদন হয় ৯০ থেকে ১০০ টন। এ ছাড়া রংপুরের গ্রিন অ্যান্ড পোলট্রি ফিড ইন্ডাস্ট্রিজও কিছু তেল উৎপাদন করে।
মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিত্ত মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রপ্তানি করছি মূলত ভারতে। তবে বিশ্বব্যাপীই এই তেলের চাহিদা রয়েছে এবং বছর বছর চাহিদা বাড়ছে।’
কুঁড়ার তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন ২৫০–৩০০ টন এই তেল উৎপাদিত হয়। বছরে হয় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টন। সাড়ে ছয় কেজি কুঁড়া থেকে এক লিটার তেল হয়। ধান থেকে চাল তৈরি করলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ কুঁড়া পাওয়া যায়।
তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিদিনের কুঁড়ার চাহিদা ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টন। দেশের চালকল থেকে বছরে ৩৭ লাখ টনের বেশি কুঁড়া উৎপাদিত হয়। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ভোজ্যতেলের মধ্যে কুঁড়ার তেলের অবদান সোয়া দুই থেকে আড়াই শতাংশ। সয়াবিন ও পাম তেলের চাহিদা ১৪ লাখ টন।
তবে অন্যদের কাছ থেকে পরিশোধন করিয়ে নিয়েও এই তেল বাজারজাত করছে কয়েকটি বড় কোম্পানি। যেমন এসিআই। এসিআইয়ের রাইস ব্র্যান তেলের নাম ‘নিউট্রিলাইফ’। বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের ব্র্যান্ড ‘ফরচুন’। ‘নেচুরা’ নামের একটি ব্র্যান্ডও বাজারে রয়েছে।
এসিআই কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের বিজনেস ডিরেক্টর অনুপ কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এই পণ্যটির বিক্রির পরিমাণ যেহেতু বাড়ছে, অনুমান করা যায় যে সারা দেশে রাইস ব্র্যান তেল জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্বব্যাপীও এর জনপ্রিয়তা রয়েছে, তবে নানা কারণে রপ্তানি বাজার এখনো অত বড় হতে পারছে না।’
জনপ্রিয়তার কারণ জানতে চাইলে অনুপ কুমার বলেন, ডাক্তাররাই বলছেন এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অরাইজানল রয়েছে এবং এই তেল মানুষের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। অরাইজানল ইনসুলিন প্রতিরোধে সহায়তা করে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ধারণা বোতলে তেলের রংটা একটু হালকা হলে ভালো হয়। কিন্তু তা করতে গেলে তেল থেকে উপকারিতা কম পাওয়া যেতে পারে।
কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, বোতলজাত এক লিটার কুঁড়ার তেলের দাম পাম ও সয়াবিন তেলের দামের চেয়ে একটু বেশি। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম যেখানে ১০০ টাকার মতো, কুঁড়ার তেলের দাম সেখানে ১১৫ থেকে ১৩০ টাকা।
কুঁড়ার তেল উৎপাদনকারীরা বলছেন, এই তেল যেমন স্বাস্থ্যসম্মত, তেমনি সাশ্রয়ী। এক লিটার সয়াবিন তেলে যে খাবার রান্না করা যায়, তা পৌনে এক লিটার কুঁড়ার তেলেই করা সম্ভব। এদিকে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থার (বিসিএসআইআর) এক গবেষণাও বলছে, ভোজ্যতেলে যেসব খাদ্যগুণ থাকা উচিত, জলপাই তেলের পর সবচেয়ে বেশি তা কুঁড়ার তেলে রয়েছে।
মজুমদার গ্রুপের চিত্ত মজুমদার বলেন, ‘বড় সমস্যা কুঁড়ার সরবরাহ। যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, সেই পরিমাণ কুঁড়া সব সময় পাওয়া যায় না। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এ কারণেই। তবে সম্ভাবনা বিশাল। পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনের দিকে যেতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে দরকার নগদ সহায়তা। ভারতে আমরা রপ্তানি করি ঠিকই, কিন্তু ভারতই এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বড় প্রতিযোগী।’

Thursday, October 24, 2019

তিন দশকে বন্ধ অর্ধেক তাঁত by জাহাঙ্গীর শাহ

• দেশের হস্তচালিত শিল্পটি বেঁচে আছে পার্বত্য তিন জেলায়।
• নিরুপায় তাঁতিরা পেশা পরিবর্তন করছেন।

দেশের হস্তচালিত তাঁতিদের দুর্দিন চলছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানার ঐতিহ্যবাহী তাঁতগুলো। নিরুপায় তাঁতিরা পেশা পরিবর্তন করছেন। সরকারি এক হিসাবে উঠে এসেছে, গত তিন দশকে অর্ধেক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে এবং তাঁতির সংখ্যা ১০ লাখ থেকে ৩ লাখে নেমে এসেছে। এদিকে মাত্র ১৫ বছরে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের ৯৫ শতাংশ হস্তচালিত তাঁত কারখানা।
একসময় নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ তাঁতশিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ হলে এখন দেশের হস্তচালিত শিল্পটি বেঁচে আছে পার্বত্য তিন জেলায়। এই তিন জেলায় আছে দেশের অর্ধেকের বেশি তাঁত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হস্তচালিত তাঁতশুমারি ২০১৮–এর প্রাথমিক ফলাফলে এই চিত্র উঠে এসেছে। শিগগিরই প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশ করা হবে। তাঁত বন্ধ হয়ে যাওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে ওই শুমারিতে। অন্যতম কারণ হলো অন্য পেশায় বেশি আয়, তাই অনেক তাঁতি পেশা পরিবর্তন করেছেন। এ ছাড়া অনেকেই যন্ত্রচালিত তাঁতে নিজেদের ব্যবসা স্থানান্তর করেছেন। অন্যদিকে মূলধনের অভাবেও তাঁত বন্ধ হচ্ছে। এ ছাড়া তাঁতপণ্যের বিক্রির জন্য শক্তিশালী বাজারজাত ব্যবস্থা নেই।
এবারের তাঁতশুমারিতে গৃহস্থালির তাঁতে কমপক্ষে গড়ে ২ দশমিক ৩ সংখ্যায় এবং কারখানায় ৯ দশমিক ২ সংখ্যায় তাঁতযন্ত্র আছে, তাদের মধ্যে শুমারি করা হয়েছে। বিবিএসের এই শুমারির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাজারজাতকরণে সমস্যা এবং পেশা পরিবর্তনের কারণেই তাঁতের সংখ্যা কমেছে।
এ নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক রুশিদান ইসলাম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কিছু কিছু তাঁত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে চলে গেছে। ফলে হস্তচালিত তাঁত ও তাঁতির সংখ্যা কমেছে। এ ছাড়া তাঁতের কাপড়ের চাহিদাও কমেছে। মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা আরও মিহি বুননের কাপড়ের দিকে ঝুঁকছেন।
রুশিদান ইসলাম রহমান মনে করেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন করে সবকিছু করা সম্ভব, কিন্তু দেশের ঐতিহ্যও ধরে রাখতে হবে। তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হবে। সে জন্য হস্তচালিত তাঁতিদের জন্য নতুন নতুন নকশার পাশাপাশি পণ্যের বাজারজাতকরণের সহযোগিতা দিতে হবে।
বিবিএসের শুমারি অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে সারা দেশে ১০ লাখ ২৭ হাজার ৪০৭ জন তাঁতি ছিলেন। পরের ১৩ বছরে তাঁতির সংখ্যা কমেছে ১ লাখ ২৫ হাজার। কিন্তু এরপরের ১৫ বছরে সবচেয়ে বেশি প্রায় ছয় লাখ তাঁতি নিজেদের পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। ২০১৮ সাল শেষে দেখা গেছে, দেশে হস্তচালিত তাঁত পেশায় আছেন মাত্র ৩ লাখ ১ হাজার ৭৫৭ জন। আবার গত তিন দশকে তাঁত বন্ধ হয়েছে প্রায় ৯৬ হাজার। এখন সারা দেশে তাঁতের সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজার ৬টি।
সমতলে হারাচ্ছে, পাহাড়ে টিকে আছে
একসময় ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত তাঁতের জন্য বিখ্যাত ছিল নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইলের মতো জেলাগুলো। এই জেলাগুলো প্রসিদ্ধ ছিল তাঁতের জন্য। এসব জেলা সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে পারছে না। সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে পার্বত্য তিন জেলা। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে দেশের এখন ৫৫ শতাংশ তাঁত আছে। এসব জেলায় দেশের এক-তৃতীয়াংশ বা ৯৪ হাজার ১৯৭ জন হস্তচালিত তাঁতি আছেন।
শুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯২ শতাংশ বা ১ লাখ ৭ হাজারের মতো তাঁত আছে মাত্র ১৫টি জেলায়। এর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী জেলা হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জে আছে চার হাজার তাঁত। আর টাঙ্গাইলে ৩ হাজার ২৯০টি এবং নরসিংদীতে মাত্র ১ হাজার ১২৮টি তাঁত। এই তালিকায় ১৫ নম্বর স্থানে আছে নরসিংদী।
রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলায় বড় শিল্পের উত্থানের কারণে ঐতিহ্যবাহী ছোট শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশকে রাজধানীর পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে বড় ও মুনাফামুখী শিল্পের বিকাশ হতে থাকে। তখন তাঁতের মতো ছোট শিল্পগুলো দেশের আরও প্রান্তিক এলাকায় চলে যায়। নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে বড় শিল্পের বিকাশ ঘটায় শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। এতে তাঁতের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পের শ্রমিকেরা পেশা পরিবর্তন করেছেন। তিনি মনে করেন, এসব ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে ধরে রাখতে সরকারের নীতিগত সহায়তাও পর্যাপ্ত ছিল না।

Monday, October 14, 2019

ওদের কিছু নেই by প্রণব বল

প্রথম আলো, ২৭ জানুয়ারি ২০১৯: *বড় বড় মেশিন আছে, চলার শক্তি নেই। *মণ্ড তৈরির কারখানা আছে, চালু নেই। *রক্ষণাবেক্ষণ নেই। *উৎপাদন নেই।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ কর্ণফুলী পেপার মিলটির (কেপিএম) অবস্থা অনেকটা কবি অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তের ‘ছন্নছাড়া’ কবিতার কয়েকটি লাইনের মতো। কবিতাটিতে কবি ছন্নছাড়া বেকার যুবকদের বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, ‘ওরা বিরাট এক নৈরাজ্যের এক নেই রাজ্যের বাসিন্দে। ওদের কিছু নেই।’
কেপিএমের তেমনি বড় বড় মেশিন আছে। কিন্তু চলার শক্তি নেই। মণ্ড তৈরির কারখানা আছে, চালু নেই। রক্ষণাবেক্ষণ নেই, কাঁচামাল নেই, দক্ষ শ্রমিক নেই, ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় নেই, আয় নেই, রোজগার নেই, মূলধন নেই, সর্বোপরি উৎপাদন নেই।
দিনের পর দিন লোকসান গুনতে থাকা কেপিএমের পরিচালনা সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) দেওয়ার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একই ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি কাগজকল করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। সৌদি আরবের আল ফানা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এই সমঝোতা স্মারক সই হয়।
রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনা এলাকায় ১৯৫৩ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত কাগজকল কেপিএম প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন এ প্রতিষ্ঠানটি এখন রুগ্ণ থেকে রুগ্ণতর হচ্ছে। এরই মধ্যে শ্রমিক কমেছে ৮০ শতাংশ।
সিআইসির পরিচালক (উৎপাদন ও গবেষণা) শাহীন কামাল বলেন, কারখানাটি অনেক পুরোনো। লোকসান হচ্ছেই। তবে লোকসান অনেক কমেছে। এটির ব্যবস্থাপনার জন্য পিপিপির আওতায় সম্প্রতি সৌদি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এমওইউ সই হয়েছে। সমঝোতার আওতায় নতুন কাগজকল করার পরিকল্পনা রয়েছে।
মরণদশা
প্রায় ৩০ বছর ধরে কেপিএমের কোনো সংস্কার (ওভারহোলিং) হয়নি। ফলে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুই বছর আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মণ্ড তৈরির কারখানা বা প্লাপ সেকশন। মণ্ড তৈরির কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১০ কোটি টাকার কাঁচামাল নষ্ট হওয়ার পথে। বর্তমানে আমদানি করা মণ্ডের ওপর নির্ভর করে সীমিত আকারে উৎপাদন করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। দিনে ৩০ টন পর্যন্ত কাগজ উৎপাদন হয় মাত্র।
গত ১ জুন রাঙামাটির তখনকার সাংসদ ঊষাতন তালুকদার শিল্পমন্ত্রী বরাবর কারখানাটির দৈন্যদশা তুলে ধরে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন। কেপিএমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এম এম আবদুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, কাঁচামাল–সংকট, দক্ষ জনবল–সংকট, তারল্য–সংকট রয়েছে মিলে। বর্তমানে বন্ধ রয়েছে ২ নম্বর মেশিনটি। এটি মেরামতের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ৩ নম্বর মেশিনটিও আংশিক চালু।
উৎপাদন কমছে, লোকসান বাড়ছে
প্রতিষ্ঠাকালীন এই কারখানার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার টন। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ১৮২ টন কাগজ। একই সময়ে লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৭৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা লোকসান দেয় কেপিএম। ওই বছর উৎপাদন ছিল ১০ হাজার ৫৮১ টন। সর্বশেষ ২০০৮-০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৬৩৮ কোটি টাকা লাভ করেছিল। তখন উৎপাদন ছিল ২৯ হাজার ৭৩ টন। বর্তমানে লোকসান কমে প্রায় ২০ কোটি টাকার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। একসময় কেপিএমে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী ছিলেন। এখন স্থায়ী–অস্থায়ী মিলে লোকবল ১ হাজারের মতো।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
পার্বত্য চট্টগ্রাম–বিষয়ক সংসদীয় কমিটি গত অক্টোবরে কারখানাটি পরিদর্শন করে। তখন কমিটির কাছে এমডি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তাতে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে মিলের কিছু অংশের রক্ষণাবেক্ষণ এবং রিপ্লেসমেন্টের মাধ্যমে চার থেকে পাঁচ বছর উৎপাদন সচল রাখার প্রস্তাব করা হয়। সে জন্য ৫২ কোটি টাকা দরকার হবে বলে মিল কর্তৃপক্ষ সংসদীয় কমিটিকে জানায়।
এ ছাড়া মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে পিপিপির মাধ্যমে ১০০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি ইন্টিগ্রেটেড মণ্ড পেপার মিল স্থাপন করার কথা বলা হয়। তার জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানানো হয়। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দিনে ৩০০ টন উৎপাদন সক্ষম আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন ইন্টিগ্রেটেড মণ্ড পেপার মিল স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। এই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই সৌদি প্রতিষ্ঠান আল ফানার সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি হয়।
এদুই বছর ধরে যেসব শ্রমিক অবসরে কিংবা অন্যত্র বদলি হয়েছেন, তাঁরা তাঁদের পাওনা পুরোপুরি বুঝে পাননি।
দেনায় জর্জরিত
বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকা দেনায় রয়েছে কেপিএম। এর মধ্যে সরকারি ঋণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া রয়েছে শ্রমিকের গ্র্যাচুইটি, বকেয়া মজুরি, ডিবেঞ্চার ঋণ, বিভিন্ন পণ্য এবং রাসায়নিক সরবরাহকারীদের দেনা অন্যতম। কেপিএমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির মোট দেনা ৭৪৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা। বিসিআইসির পরিচালক মোহাম্মদ শাহীন কামাল বলেন, দেনা আগের চেয়ে কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে নতুন মজুরি কমিশনের কারণে লোকসান আবার বাড়তে পারে। কারণ শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাবে।
সরেজমিন
সম্প্রতি কেপিএম ঘুরে দেখা যায়, কারখানার যন্ত্রপাতি সব জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে একটি ইউনিটে চলছে উৎপাদন কাজ। মণ্ড ইউনিটে দেখা যায় বাঁশের চিপস পড়ে রয়েছে। এই ইউনিটটির স্থানে স্থানে শেওলা জমে গেছে। সরেজমিন পরিদর্শনকালে নুরুল আলম নামের এক শ্রমিক বলেন, কারখানার যন্ত্রপাতি পুরোনো হওয়ায় প্রতিদিন তা চালু করা যায় না। ফলে ২৪ ঘণ্টাও উৎপাদন চলে না।
দিনের পর দিন লোকসান গুনতে থাকা কর্ণফুলী পেপার মিলের (কেপিএম) অবস্থা এখন এমনই জরাজীর্ণ। এখানে বড় বড় যন্ত্রপাতি থাকলেও তা চালু নেই। মণ্ড তৈরির কারখানা আছে, চালু নেই। রক্ষণাবেক্ষণ নেই, কাঁচামাল নেই, দক্ষ শ্রমিক নেই। ছবি: সৌরভ দাশ