Wednesday, July 21, 2010

ঘোড়ার গাড়ির কথা by কিঙ্কর আহ্সান

বকশীবাজার মোড়। নোংরা, স্যাঁতসেঁতে পথ। হাজারো রিকশার আনাগোনা এখানে। পথ ধরে একটু এগোলেই টংমতো দোকান। দিনমান এ জায়গায় চা, বিড়ি, পান দেদার বিক্রি হয়। পাশেই সার বেঁধে দাঁড় করানো রিকশার ওপর শুয়েবসে জিরিয়ে নিচ্ছেন রিকশাওয়ালারা।
বিকেলের শেষভাগ তবুও রোদ্দুর খুব। মস্ত সূর্যটা যেন গাছের মগডালে নেমে এসে থিতু হতে চায়। এর মাঝেই দেখতে পাই হাড় জিরজিরে কিছু ঘোড়া। ময়লার রাজত্ব চারপাশটায়। ভনভন করে উড়ছে মাছি। ঢুলুঢুলু চোখ ঘোড়াগুলোর। ধীরে ধীরে চিবিয়ে খাচ্ছে কী যেন। বোঝাই যায়, খুব অসুস্থ। এমন ঘোড়া দেখে হতাশ হই। কল্পনার সঙ্গে মেলে না কিছুই। কোথায় সেই রূপকথার বইয়ে ঠাঁই পাওয়া রাজসিক ঘোড়া, যুদ্ধের ময়দানে সেনাপতিকে পিঠে নিয়ে বাধাহীনভাবে ছুটে চলা তাদের, সেনাদের তলোয়ার তলোয়ারে ঠোকাঠুকি, ঝনাৎ ঝনাৎ আওয়াজ আর কোথায় এই ম্যাড়মেড়ে রোগা ঘোড়া! বীরত্বের লেশমাত্র নেই এই এদের মধ্যে। নেই কোনো তেজ। নিজেকে জানান দেওয়ার জন্য নেই অযথা ডাকাডাকি করার অভ্যাস।
রোগা ঘোড়াগুলো বড্ড শান্ত। সাত চড়েও রা নেই এদের। হুট করে ঘোড়ার মালিককে পেয়ে কথা বলা শুরু করি। মুখে পান তাঁর। লোকটা বুড়ো। তার পরও দাদু বলে সম্বোধন করায় কিছুটা বিরক্ত হন। শুরু হয় আলাপচারিতা।
—দাদু ঘোড়াগুলোর এই অবস্থা কেন?
—গরিব মানু আমরা। নিজেরই ঠিক নাই, ঘোড়ার দিকে নজর দিমু ক্যামনে।
—আস্তাবল নেই কোনো?
—না। ঘোড়া দিয়া আয় নাই অখন আর। ঘোড়ার গাড়িরও কদর নাই। রাস্তার লগে দেয়ালে সবগুলারে ঠেস দিয়া বাইন্ধা থুই। হাবিজাবি খাইতে দেই।
—আয় নেই কেন?
—ক্যামনে থাকব। মানু অখন ইঞ্জিন ছাড়া চলে না। চাইর চাক্কার গাড়িই ভরসা। পানের পিক ফেলতে ফেলতে বলে লোকটি।
—বাড়িতে বউ আর ছেলেপুলে নিয়ে চলতে পারেন ঠিকমতো?—ঘোড়ার প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে পরিবারের কথা তুলি।
—অই চলে আরকি। বড়লুকগো বিয়ায় দুই-একটা খ্যাপ পাই। ঘোড়ার গাড়িতে চইরা বউ-জামাই যায়। তহন আয় ভালো। বকশিশও আছে। তয় বারো মাইস তো আর বিয়া-শাদি হয় না। কথা শেষ করেই উঠে পড়ে লোকটি। কী নিয়ে যেন ব্যস্ত হয়ে ওঠে আরেকজনের সঙ্গে। বুঝতে পারি, আলাপ জমানোর ইচ্ছা নেই। আমি আর কথা বাড়াই না। ফুটপাত ঘেঁষে দাঁড়ানো ঘোড়াগুলো দেখতে থাকি এক এক করে।
গলায় দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা তাদের। জোরাজুরির কারণে দড়ির নিচের চামড়ায় পড়েছে দাগ। শরীরজুড়ে ক্ষতচিহ্ন। চর্মরোগের শিকার সবগুলো ঘোড়া। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এদের বাস। আগে এমনটা ছিল না। শৌখিন মানুষ ঘোড়ার গাড়ি পছন্দ করায় এর চাহিদা ছিল বেশ। যত্ন নেওয়া হতো ঘোড়াগুলোর। অনেকেই জড়িত ছিল ঘোড়ার গাড়ি চালানোর মতো আনন্দদায়ক পেশায়। এর পরিমাণটা কমে গিয়ে এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। পুরান ঢাকার কিছু কিছু মানুষ এখনো ছুটির দিনে পুরো পরিবার নিয়ে ঠেসেঠুসে চরে বসেন ঘোড়ার গাড়িতে। অনেক কম খরচে উসুল হয় ষোলআনা আনন্দ। বাস-গাড়ির পাশেই সমান ছন্দ নিয়ে চলতে দেখা যায় ঘোড়াগুলোকে। নবাবি হালে ঘুরে বেড়ায় তারা। চালক বেত ঘুড়িয়ে সপাং সপাং মারে এদের শরীরে। বেড়ে যায় গতি। এসব দৃশ্য পরিচিত হলেও এখন আর হরহামেশা চোখে পড়ে না। আয় কমার সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়ার গাড়ির চালকেরাও বদলান পেশা। কমে যায় ঘোড়ার সংখ্যা। তবুও নিজ নিজ ঘোড়া আর পুরোনো পেশার প্রতি ভালোবাসার টানে থেকে যান কেউ কেউ। টিঙটিঙে ঘোড়া নিয়ে নেমে পড়েন পথে।
ঘোড়া নিয়ে এলেবেলে ভাবনা ভাবতে ভাবতে কেটে যায় সময়। ওদের দুরবস্থা দেখে খারাপ হয় মন। জানা নেই কীভাবে ঘোড়াগুলোকে তরতাজা করে তোলা যায়। গাড়ির ভিড় সরিয়ে আবার নিয়ে আসা যায় পথে। বিকেল আর সন্ধ্যা শেষ হয়ে অবশেষে নামে রাত। সূর্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আকাশের দখল নিয়ে নেয় চাঁদ। ডজনখানেক তারাও উঠি উঠি করে। আমি ঘোড়াগুলোকে পেছনে ফেলে হাঁটতে শুরু করি। একটা সময় সবকিছু দৃষ্টির বাইরে চলে যেতেই পিছু নেয় চাঁদটা। মন খারাপ করা আস্ত একটা চাঁদ আসতে থাকে পেছন পেছন। শরীরভর্তি আলো নিয়ে। বড্ড আপন এ আলো...।

ছাত্রলীগ নেতা কি ‘সম্মানিত’ ব্যক্তি নন by এ কে এম জাকারিয়া

এক ট্রাফিক সার্জেন্টকে মারধর করেছিলেন আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ। এ নিয়ে থানায় মামলা করেছিলেন নাজেহাল হওয়া সার্জেন্ট। এরপর পুরো পুলিশ বিভাগেরই নাজেহাল হওয়ার দশা। কেন ট্রাফিক সার্জেন্ট মামলা করলেন, থানা কেন মামলা নিল—এসব প্রশ্নে জর্জরিত হলো পুলিশ বিভাগ। সার্জেন্টকে মারধরের ঘটনায় পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন থেকে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছিল তার জন্য ক্ষমাও চাইতে হয়েছে অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের। মার খেয়ে যে সার্জেন্ট মামলা করলেন, তিনি উল্টো শাস্তি পাবেন কি না বা যিনি মামলা নিয়েছেন, থানার সেই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কী হবে—এসব প্রশ্ন এখন সাংসদের হাতে পুলিশ লাঞ্ছিত হওয়ার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় কমিটির সভায়ও বিষয়টি উত্তাপ ছড়িয়েছে। সভা থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সাংসদদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে। ‘পুলিশ কর্মকর্তাদের এ ধরনের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, কাজ করতে গেলে যে কারও ভুলত্রুটি হতেই পারে। সাংসদদের ছোটখাটো ভুলের বিষয়ে মামলা করার আগে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবশ্যই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, অনুমতি নিতে হবে।’ (প্রথম আলো, ১৪ জুলাই)
সাংসদ কেন ট্রাফিক সার্জেন্টকে মারলেন সে বিষয়ে নয় বরং সাংসদের বিরুদ্ধে ট্রাফিক সার্জেন্ট কেন মামলা করলেন তা তদন্তে কমিটি গঠন করার জন্য সভা থেকে আইজিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দুজনের বক্তব্য ছিল প্রায় একই। দুজনেই বলেছেন, জনপ্রতিনিধি ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে একজন সাংসদের বিরুদ্ধে মামলা করার আগে চিন্তাভাবনা করার দরকার ছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর এসব বক্তব্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত; সাংসদদের বিরুদ্ধে মামলা করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে। কোনো সাংসদ ‘কাজ’ করতে গিয়ে যদি কোনো ‘ভুলত্রুটি’ করেন, তবে মামলা করা যাবে না। আগে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে ঘটনাটি ‘ছোটখাটো ভুল’ কি না। যদি ছোটখাটো ভুল হয়ে থাকে, তবে মামলা করা যাবে না। কোনটি ছোটখাটো ভুল তার অন্তত একটি উদাহরণ আমরা পেয়ে গেছি। সরকারদলীয় সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ গত ৩০ জুন যা করেছিলেন, তা ছোটখাটো ভুলের একটি দৃষ্টান্ত। কী করেছিলেন তিনি সেদিন? সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল থানায় তার এজাহারে বলা হয়েছে, সার্জেন্ট শরীফুল ইসলাম গত ৩০ জুন আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের আশুলিয়া থানার আশুলিয়া বাজারসংলগ্ন সেতুর পাশে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওই দিন দুপুর থেকেই সেতুর উভয় পাশে সড়কটিতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ গাড়িতে ওই সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় সেতুর কাছে যানজটে আটকা পড়েন। কিছুক্ষণ আটকা থাকার পর তিনি হেঁটে সেতুর ওপর যান। সেখান থেকে ইশারায় সার্জেন্ট শরীফুলকে সেতুর ওপর আসতে বলেন। সার্জেন্ট সেখানে যাওয়ামাত্র ইলিয়াস মোল্লাহ তাঁকে গালিগালাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁর জামার কলার ধরে টানাটানি করেন এবং তাঁকে মারধর করেন। (প্রথম আলো ১০ জুলাই)। ‘পুলিশের কাজে বাধা, পোশাক ধরে টানাহেঁচড়া ও মারধরের অভিযোগে’ এই মামলাটি হয়েছিল। এ থেকে আমরা যা শিখলাম, তা হচ্ছে ‘কাজ’ করতে গিয়ে কোনো সাংসদ যদি ট্রাফিক পুলিশকে মারধর করেন, তবে তাঁকে ‘ছোটখাটো ভুল’ হিসেবেই ধরে নিতে হবে।
তবে আমাদের ধারণা, ‘সাংসদ’ বলতে এ ক্ষেত্রে সরকারি দলের সাংসদদেরই বোঝাবে। বিরোধীদলীয় সাংসদদের এই সিদ্ধান্তে বগল বাজানোর কিছু আছে বলে মনে হয় না। কারণ, বিরোধী দলের কোনো সাংসদ ‘পুলিশের কাজে বাধা দিলে’ তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই মামলা ও প্রয়োজনে গ্রেপ্তারও করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগাম অনুমতি আছে—এমনটিই ধরে নিতে হবে।
জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাংসদেরা কী ধরনের ছাড় পেতে পারেন, তা আমাদের কাছে কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতাদের বেলায় কী হবে? তাঁরা যদি পুলিশকে মারধর করেন, তবে কি ছাড় পাবেন না? ‘এসআইকে ছাত্রলীগ নেতার মারধর’ এই খররের প্রথম প্যারাটি হচ্ছে, ‘তোর মতো দারোগা ১০টা আমার পকেটে থাকে। তুই আমার ফোনে গাড়ি ছাড়িসনি কেন?’ এ কথা বলেই তল্লাশি চৌকিতে দায়িত্বরত পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) গালে চড় মারেন কামরাঙ্গীরচর থানা ছাত্রলীগের নেতা জুম্মন মিয়া (প্রথম আলো ১৮ জুলাই)। এসআইয়ের অপরাধ, টেলিফোনে জুম্মন মিয়ার নির্দেশ পেয়েও আটক একটি মোটরসাইকেল ছেড়ে না দিয়ে মামলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এরপর পুলিশের টহল চৌকিতে এসে তিনি এসআইকে শুধু চড়ই মারেননি, আটক মোটরসাইকেলটিও ছিনিয়ে নিয়ে গেছেন তাঁর দলবল নিয়ে। এ ক্ষেত্রেও লাঞ্ছনার শিকার পুলিশের এসআই মামলা করেছেন। তবে পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন থেকে কোনো বিবৃতি দেওয়া হবে কি না সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই।
সাংসদ ‘সম্মানিত ব্যক্তি’ তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একজন ছাত্রলীগ নেতা সম্মানিত ব্যক্তি নন, তা আমরা কী করে বলব? এখন যিনি ছাত্রলীগে আছেন, দুই দিন পর আওয়ামী লীগে যাবেন, তারপর হয়তো সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়ে আইনপ্রণেতা হবেন, জনপ্রতিনিধি হবেন। জুম্মন মিয়াকে আমরা যদি ভবিষ্যতের একজন সম্ভাবনাময় নেতা হিসেবে বিবেচনা করি, তবে কিছু আগাম ছাড় তো তিনি পেতেই পারেন!
সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহর ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী যে দায়িত্ব ও ভূমিকা পালন করেছেন, একজন সম্ভাব্য আইনপ্রণেতা ও জনপ্রতিনিধির ক্ষেত্রেও তাঁরা একই কাজ করতে পারেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করতে পারে, ছাত্রনেতাদের যেহেতু ভবিষ্যতে জনপ্রতিনিধি ও আইনপ্রণেতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাই তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করতে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে। তবে বিষয়টি সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাদের মধ্যে সীমিত রাখাই যৌক্তিক হবে। সাধারণভাবে সব ছাত্র সংগঠনের ছাত্রনেতাদের ছাড় না দিয়ে শুধু ছাত্রলীগের নেতাদের ছাড় দেওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার করে দিলে বিভ্রান্তি দূর হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলতে পারেন, ‘কাজ করতে গিয়ে’ ছাত্রলীগ নেতাদের ‘ছোটখাটো ভুল’ হতেই পারে। এসব ছোটখাটো ভুলের কারণে মামলা করার আগে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে অবশ্যই অনুমতি নিতে হবে। ছাত্রলীগ নেতা জুম্মন মিয়ার বিরুদ্ধে কেন থানায় মামলা হলো তা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় কমিটির সভায় ভবিষ্যতে আলোচনা হতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করতে আইজিকে নির্দেশও দিতে পারেন! বর্তমান জনপ্রতিনিধি ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে পার্থক্য রাখার দরকার কী!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

সারমেয় সমাচার by শাহাদুজ্জামান

‘কুকুরের কাজ কুকুর করেছে...’ বিখ্যাত সেই কবিতাটি পড়েছিলাম ছোটবেলায়। মর্মার্থ এই যে, কুকুর ইতর প্রাণী, সে মানুষকে কামড়াতে পারে, তাই বলে কুকুরকে কামড়ানো মানুষের শোভা পায় না ইত্যাদি। নিজের করুণ জীবনের কথা বলতে গিয়ে বাস্তব এবং সাহিত্যের চরিত্রকে বলতে শুনেছি ‘কুকুরের মতো বেঁচে আছি’। বাঘ, ভালুক বলে কাউকে গালি দিলে ব্যাপারটা যতটা নয়, অপমানের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায় যদি তাকে ‘কুকুর’ বলে গালি দেওয়া হয়। মোট কথা, সাধারণভাবে কুকুরের জীবন নেহাতই অচ্ছুত, লজ্জাকর একটি জীবন হিসেবেই বিবেচিত। কুকুরবিষয়ক এ ধারণা আমূল পাল্টাতে হয়েছে ইউরোপের নানা শহরে ঘোরার সুবাদে। এখানে কুকুরকে নিয়ে যে আড়ম্বর, তার যে মর্যাদা আর বৈভব, তাতে কুকুরের মতো বেঁচে থাকাটাকে রীতিমতো সৌভাগ্য হিসেবেই বিবেচনা করা যায়।
বিমানে আমার সহযাত্রী এক আমেরিকান বৃদ্ধার সঙ্গে আলাপ জমে ওঠার একপর্যায়ে তিনি আমাকে তাঁর পারিবারিক অ্যালবামটি দেখান। অ্যালবামের শুরুর কয়েক পাতাজুড়ে শুধু তাঁর প্রিয় কুকুরটির ছবি। কুকুরের নাম ‘ভ্যান গঘ’। তাঁর প্রিয় চিত্রকরের নামে নাম রেখেছেন তিনি। বেশ অনেকক্ষণ ধরে তাঁর ভ্যান গঘ যে কেমন দুষ্টু, এ নিয়ে তিনি বিস্তর গল্প শোনান আমাকে। এর অনেক পর তিনি তাঁর দুই মেয়ে এবং স্বামীর ছবি দেখান। ব্যাপারটি অস্বাভাবিক নয়। কারণ, কুকুর এখন অধিকাংশ পশ্চিমা দেশে অন্যতম পারিবারিক সদস্য। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমেরিকায় প্রায় ৭০ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি কুকুর আছে। জীববিদদের মতে, কুকুরই হচ্ছে প্রথম বন্য প্রাণী, যা মানুষের পোষ মেনেছে। একসময় কুকুর ছিল মানুষের শিকারের সহযোগী। পরবর্তীকালে কুকুরকে মানুষ ব্যবহার করেছে তার ঘর পাহারার কাজে। আধুনিক পশ্চিমা দেশে মানুষ এখন কুকুরকে স্থান দিয়েছে তার নিজের শোবার ঘরে। গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিমা দেশে মানুষের সঙ্গে কুকুরের সম্পর্ক এখন শুধু এসব কেজো ব্যাপারে সীমাবদ্ধ নয় বরং এ সম্পর্ক এখন অনেক বেশি আবেগী, মানসিক। এখানে মানুষে মানুষে সম্পর্ক অনেকটা শিথিল হওয়ার কারণে যে বিচ্ছিন্নতা, নিঃসঙ্গতা দেখা দিয়েছে, তাতে কুকুরের আনুগত্য, বিশ্বস্ততা মানুষকে এনে দেয় স্বস্তি। অপূর্ণ ভালোবাসা আর বাৎসল্যের অনুভূতি তৃপ্ত হয় কুকুরের মধ্য দিয়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব দেশে যাদের সঙ্গী হিসেবে কুকুর আছে, তারা কুকুরবিহীন মানুষের চেয়ে দীর্ঘায়ু।
কুকুরের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য এখানে তাই দেখি সীমাহীন আয়োজন। সুপার মার্কেটগুলোতে কুকুরের জন্য বরাদ্দ এলাকায় দেখতে পাই সুদৃশ্য প্যাকেটে কুকুরের জন্য চর্ব, চোষ্য, লেহ্য ও পেয় বিচিত্র খাবার; তার জন্য সাবান, শ্যাম্পু, পারফিউমের বিপুল সমাহার। আমস্টারডামে যখন পড়াশোনা করতাম, এক শিক্ষিকা প্রতি বুধবার ক্লাসের পর আগে আগে ছুটতেন বাড়িতে। সেদিন ছিল তাঁর বাড়ির কুকুর দুটোকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়ার তারিখ। ঘরে খেতে খেতে কুকুরদেরও একঘেয়ে লাগে বলে ওদের জন্য রয়েছে বিশেষ রেস্টুরেন্ট। রেস্টুরেন্ট ছাড়াও শুধু কুকুরের জন্য আছে পার্ক, সমুদ্রসৈকত, স্পা। ব্রিটেনে কেবল কুকুরকে নিয়ে আছে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান, তাতে থাকে কুকুরের ঝলমলে ফ্যাশন শো, কুকুরের শারীরিক, মানসিক রোগ বিষয়ে পরামর্শ ইত্যাদি। এ বছর ‘ব্রিটেন গট ট্যালেন্ট’ নামের প্রতিভা অন্বেষণ প্রতিযোগিতায় বহু মানুষ প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছে গিয়েছিল এক নৃত্যপটীয়সী কুকুর।
চেনবাঁধা, চেনহীন কুকুরকে নিয়ে অসংখ্য পথচারীর নিয়মিত রাস্তায়, পার্কে হাঁটতে দেখি। বিড়াল আকারের কুকুর থেকে শুরু করে দেখতে পাই বাঘের সমান কুকুরও। শুনি কার কোন জাতের কুকুর, এর ওপর নির্ভর করে তার আভিজাত্যও। পথচারীরা পরস্পরের মধ্যে কথা না বললেও তাঁদের কুকুরেরা যদি পরস্পরকে শোঁকার আগ্রহ দেখায়, তাহলে তাঁরা ধৈর্যের সঙ্গে কুকুরগুলোকে সেই সামাজিকতার সুযোগ দেন। পাশে দাঁড়িয়ে পরস্পরের কুকুরের রূপের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। কুকুরের সঙ্গে সদয় ব্যবহার করা এখানে আইনগত কর্তব্য। কুকুরের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটলেও তার জরিমানার বিধান আছেন কোনো কোনো শহরে। দেখেছি নিজের শিশুর মতো প্যারামবুলেটারে তার কুকুরকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন মহিলা এবং মাঝেমধ্যে কুকুরের মুখে তুলে দিচ্ছেন বিষ্কুট। একদিন দেখলাম এক ভদ্রলোক তাঁর কুকুরটিকে সাইকেলের সামনের ঝুড়িতে বসিয়ে নিয়ে চলেছেন; কুকুরটির চোখে সানগ্লাস, গলায় টাই। প্রভুভক্ত, প্রাচীন বিশ্বস্ত এই প্রাণীটির কদরের কোনো কমতি নেই এখানে।
মোট কথা, বিদেশে এসে আমার অগাধ কুকুরজ্ঞান হয়েছে। অবশ্য কুকুরের এই বিপুল সমাদর দেখে বেশ হতচকিত থাকি, বুকের ভেতর একটা চাপা দীর্ঘশ্বাসও জমে থাকে সারাক্ষণ। ভাবি, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কত লাখ-কোটি মানুষ এমন একটা কুকুরের জীবন পেলেও কতই না বর্তে যেত। বহু দিন আগে পড়া সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘পাদটীকা’ নামের একটি গল্পের কথা মনে পড়ে। গল্পটি গ্রামের এক স্কুলশিক্ষকের বয়ানে বলা। স্কুলে এসেছেন বিলাতি স্কুল ইন্সপেক্টর। সঙ্গে তার প্রিয় কুকুর। ঘটনাচক্রে কুকুরটির একটি পা নেই। তিন পায়ে লেংচে চলা ওই কুকুরটিকে নিয়ে স্কুল পরিদর্শন করেন তিনি। সবাই ভয়ে কম্পমান। প্রসঙ্গক্রমে ওই কুকুরটির পেছনে মাসে ইন্সপেক্টরের কত খরচ হয়, আমরা তা জানতে পারি। ইন্সপেক্টর চলে গেলে শিক্ষক ছাত্রদের হিসাব করে দেখান ওই তিন ঠ্যাংয়ের কুকুরের প্রতিটি ঠ্যাংয়ের পেছনে যা খরচ, তা তাঁর মাসিক বেতনের চেয়েও বেশি। ছাত্রদের আর বুঝতে বাকি থাকে না যে তাদের প্রিয় শিক্ষকের দাম বস্তুত বিলাতি ওই ইন্সপেক্টরের কুকুরের একটি পায়ের চেয়েও কম।
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।
zaman567@yahoo.com

একদা একটা শহর ছিল ঢাকা নামে by আনিসুল হক

একদা একটা শহর ছিল ঢাকা নামে। সেই শহরে বাস করত দেড় কোটি মানুষ। সেই শহরটা এখন একটা পরিত্যক্ত মৃত নগর।
নগরটা কীভাবে পরিত্যক্ত হলো, পরিণত হলো পোড়ো এলাকায়, সেই কাহিনি পৃথিবীর মানুষের জানা। সারা পৃথিবীর স্কুল কলেজেই একটি শহরের মৃত্যুকাহিনি নামের প্রবন্ধ পড়ানো হয়ে থাকে।
শহরটা আগে খুবই সুন্দর ছিল। ছিল একটা উদ্যানগর।
বুদ্ধদেব বসু নামের একজন বাঙালি কবি-লেখক ঢাকা সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘কার্জন-কল্পিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হিসেবে তৈরি হয়েছিলো রমনা—অনেকের মুখে তখনও নাম ছিল “নিউ টাউন”।...ভিতরে বাইরে এক জমকালো ব্যাপার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। নিখিলবাংলার একমাত্র উদ্যান-নগরে পনেরো-কুড়িটি অট্টালিকা নিয়ে ছড়িয়ে আছে তার কলেজ-বাড়ি, ল্যাবরেটরি, ছাত্রাবাস: আছে ব্যায়ামাগার ও ক্রীড়াঙ্গন ও জলক্রীড়ার জন্য পুস্করণী—যেখানে সেখানে সবুজ মাঠ বিস্তীর্ণ।...স্থাপত্যে কোনো একঘেঁয়েমি নেই, সরণি ও উদ্যান রচনায় নয়াদিলির্ল জ্যামিতিক দুঃস্বপ্ন স্থান পায়নি।...সর্বত্র প্রচুর স্থান, ঘেঁষাঘেঁষি ঠেলাঠেলির কোনো কথাই ওঠে না।’
১৯০৮ সালে গভর্নর হেয়ার সাহেব তার বন্ধু বিশ্বখ্যাত কিউ গার্ডেনস-এর ইন্সট্রাকটর মি. প্রাউডলককে নিয়ে এসেছিলেন ঢাকাকে বৃক্ষশোভিত করার জন্যে। সবুজ শ্যামল ঢাকা দেখে মুগ্ধ প্রাউডলক ঘোষণা দেন, আমি রমনাকে গড়ে তুলব দ্বিতীয় পারি হিসেবে। ১৯০৮ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত প্রাউডলক ঢাকার পথতরু আর বাগান নিয়ে কাজ করেন। যে রমনা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বুদ্ধদেব বসু।
ঢাকা ছিল নদীর শহর। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, চারদিকে তার নদী। ছিল বাগান আর বাগান। গুলিস্তান, গুলবাগ, সেগুনবাগিচা, কাঁঠালবাগান, কলাবাগান, শান্তিবাগ শহরের এলাকার নামগুলোই বলে দিত কত ধরনের বাগান ছিল শহরে। আর ছিল খাল। মহাখালী, ধোলাইখাল, মতিঝিল—এমনই কত খাল বিল ঝিলের নামে জায়গার নাম ছিল সেই শহরে।
সেই শহরে ছিল শেরেবাংলা নগর নামের একটা পরিকল্পিত এলাকা। পৃথিবীবিখ্যাত স্থপতি লুই কান ওই এলাকাটার নকশা করেছিলেন। জাতীয় সংসদ ভবন ছিল তারই অংশ। লুই কানের করা ঢাকা শহরের সংসদ ভবনটা ছিল সারা পৃথিবীর মধ্যে একটা শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য নিদর্শন। পুরো শেরেবাংলা নগরের যতটা লুই কানের পরিকল্পনা মতো করা হয়েছিল, তা ছিল যেকোনো বিচারে একটা আদর্শ নগর এলাকা।
তারপর শহরটিতে এল বর্গিরা। তারা লুট করে নিতে লাগল সব বাগান, জলাশয় আর নদ-নদী, খাল। নিচু জমি, ফাঁকা মাঠ, উদ্যান। ফুলবনে মত্ত হস্তীর মতো তাদের তাণ্ডবে তছনছ হয়ে যেতে লাগল সবকিছু, আইনকানুন, নগর পরিকল্পনা, সরকারি উদ্যোগ। কতিপয় বর্গির সীমাহীন লোভ, আগ্রাসন, আস্ফাালনের কাছে পর্যুদস্ত হয়ে গেল নাগরিকদের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা, স্বাভাবিক শুভবোধ ও জীবনবোধ। সর্বভুক আগুনের মতো তাদের চকচকে জিহ্বার লেলিহান শিখা গ্রাস করে ফেলল পুরোটা শহরের টিকে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুও।
চারদিকে নদী ছিল, এখন নদী নেই। যাও আছে, তার পানি হয়ে উঠল শোধনের অযোগ্য। ফলে ক্রমাগতভাবে মাটির নিচের পানি ওঠানো হতে লাগল শহরবাসীর জলের প্রয়োজন মেটাতে। তখন পানির স্তর নিচে নেমে যেতে লাগল। কিন্তু শহরের সব খোলা জায়গা, মাঠ, খাল-বিল, জলাশয় ভরাট করার ফলে ওপরের পানি চুইয়ে মাটির নিচের জলাধারে পৌঁছানোর সব সুযোগ গেল বন্ধ হয়ে। শহরের মাটির নিচটা হয়ে গেল ফাঁপা।
আর বৃষ্টির পানি নামার সব রাস্তাও হয়ে গেল বন্ধ। বর্ষাকালে বৃষ্টি হলেই সব ঘরবাড়ি ডুবে যায়। রাস্তাঘাট অচল হয়ে পড়ে। প্রত্যেকের গ্যারেজে গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে দুটো করে নৌকাও স্থান পেল সগৌরবে।
আবার ভূগর্ভের পানির আধারগুলো ফাঁকা।
একসময় পরিস্থিতি এমন হলো, গভীর নলকূপ বসিয়েও পানি পাওয়া যায় না। ওই শহরের লোকজন খাওয়ার পানি আগে থেকেই কিনে খেত। এরপর গোসলের পানি, রান্নার পানি, কাপড় কাচার পানিও কেনা শুরু করল তারা। সিঙ্গাপুর থেকে, থাইল্যান্ড থেকে জাহাজে করে আসতে লাগল পানি।
তবুও শহরটা একেবারেই পরিত্যক্ত হয়ে যায়নি।
একবার একটা ভূমিকম্প হলো। জলাধার ভরাট করে বানানো আবাসিক এলাকাগুলোর ভবনগুলো সব হেলে পড়ল এদিক-ওদিক। মাটির নিচের পানিশূন্য আধারগুলো তৈরি করল সমূহ বিপদ। পুরো শহরটা দেবে গেল ২০-৩০-৪০ ফুট পর্যন্ত। বাড়িঘর সব ভেঙে পড়ল তাসের ঘরের মতো।
আর ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট থেকে বিভিন্ন জায়গায় আগুন উঠল জ্বলে। সেই আগুন যে নেভানো হবে, পানি কই। আর কে-ই বা নেভাবে।
শহরময় শুধু ধ্বংস আর মৃত্যুর চিহ্ন। দেখা দিল রোগশোক মহামারি। অবস্থা এমন হলো যে জীবিতরা ঈর্ষা করতে লাগল মৃতদের।
ওই শহর থেকে ভেসে আসত ধোঁয়া আর লাশের গন্ধ। মৃত্যুর দুর্বিষহ গন্ধে ওই দেশটা তো বটেই, আশপাশের দেশের মানুষও বহুদিন নাকে রুমাল বেঁধে রাখতে বাধ্য হয়েছিল।
ওই শহরটা থেকে খুব অল্পসংখ্যক লোকই পালিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। তারা আর কেউই ওই শহরে ফিরে যায়নি। একটা শহরের খোলা প্রান্তর, জলাশয়, উদ্যান, নদী মরে গেলে যে শহরটাও মরে যায়, তার উদাহরণ হয়ে রয়েছে ওই ঢাকা শহরের ইতিহাস।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

গণতন্ত্রের জন্য সংবাদপত্র, কোনো গোত্রের জন্য নয় by সৈয়দ আবুল মকসুদ

যাঁদের ধূমপানের নেশা আছে, তাঁরা সকালে ঘুম থেকে উঠেই হুক্কা বা সিগারেটে টান না দিলে অস্বস্তি বোধ করেন। ধূমপান না করলে অনেকের কোষ্ঠ পরিষ্কার হয় না। সিগারেট ধরিয়ে পায়খানায় ঢোকেন। এমন অনেক পাঠকও আছেন, যাঁরা সকালে খবরের কাগজে চোখ না বোলালে অস্বস্তি বোধ করেন। যাঁদের কোষ্ঠবদ্ধতা আছে, তাঁরা কেউ খবরের কাগজ হাতে নিয়ে নজরুল ইসলামের মতো লম্বা সময়ের জন্য বাথরুমে গিয়ে বসে থাকেন।
খবরের কাগজটি কীভাবে তৈরি হয়? কারা, কোথায় বসে লেখাগুলো লেখেন? সারা রাত কোথায় ছাপা হয়? সেসব বিষয় খুব অল্প পাঠকই জানেন, বা তাঁদের জানার প্রয়োজন আছে। ভোরবেলা পাঠক তাঁর হাতে কাগজটি পান অনেকটা অলৌকিকভাবে। রাস্তার পাঠক পত্রিকা কেনেন হকারের কাছ থেকে অথবা পত্রপত্রিকার স্ট্যান্ড থেকে। গ্রাহকদের যাঁরা একতলার বাড়িতে থাকেন, তাঁরা সকালে কাগজ পান জানালার নিচে। যাঁরা বহুতল ভবনে থাকেন, তাঁদের কাগজ আসে দরজার তলা দিয়ে। একালের অনেক আধুনিক পাঠক কাগজ স্পর্শ না করে নাশতার টেবিলে বসেন না। কারও থাকে এক হাতে চায়ের ধূমায়িত কাপ, আরেক হাতে খবরের কাগজ। আধুনিক জীবন ও খবরের কাগজ অবিচ্ছিন্ন। সংবাদপত্র ছাড়া আধুনিক রাজনীতিও অচল। গণতন্ত্রের জন্য সংবাদপত্র চাই-ই।
অনুমান করি, পৃথিবীতে এসে প্রথম চোখ মেলেই দেখে থাকব খবরের কাগজ। নিশ্চয়ই আমার আঁতুড়ঘরের বেড়ায় খবরের কাগজ সাঁটানো ছিল। কার্তিকের বিষণ্ন রাতে পদ্মার ঠান্ডা হাওয়া বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে আঁতুড়ঘরে না ঢুকতে পারে, সে জন্য পুরোনো খবরের কাগজ ব্যবহূত হয়ে থাকবে। আমার বাল্যশিক্ষা পড়া আর খবরের কাগজের শিরোনাম বানান করে পড়া একই সময় শুরু হয়। আমার বাবা ছিলেন খবরের কাগজের পোকা। পত্রিকা একটা হলেই হলো। আজাদ বা আনন্দবাজার পত্রিকা, মর্নিং নিউজ বা স্টেটসম্যান। সেকালে কাগজ সহজলভ্য ছিল না, গ্রামের পাঠক বা গ্রাহকদের জন্য তো নয়ই। গ্রামে কাগজ সকালবেলায় জানালার নিচে বা দরজার তলায় পাওয়া যেত না। কলকাতা ও ঢাকার কাগজ গ্রামে যেত তিন দিন পর। মঙ্গলবারের কাগজ পাওয়া যেত শুক্রবার সন্ধ্যায়। পোস্টাপিসের ডাকপিয়ন এসে দিয়ে যেতেন।
আমার অতি শৈশবে তিনটি ভাষার কাগজ আমি বাড়িতে দেখেছি। আমার মা বাংলা বলতে পারতেন না, বাংলা অক্ষরও চিনতেন না। তিনি পড়তেন উর্দু সাপ্তাহিক রোজানা-ই-হিন্দ্ বা কলকাতার অন্য কোনো কাগজ। খুব নিয়মিতও নয়। কাগজে লেখা হয় দুনিয়ার কোথায় কী ঘটছে। কে কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী, কে চিয়াং কাই-শেক, কে মাও সেতুং, কে দেশের রেলমন্ত্রী, চালের বাজারে আগুন লাগল কি না, আলু ও এলাচের দাম হঠাৎ কেন বাড়ল, কোন বেশরম মেয়েটি তার প্রাইভেট শিক্ষককে ভালোবেসে তার সঙ্গে পালিয়ে গেছে—এসব জানার আগ্রহ সব পাঠকের থাকে না।
শৈশবে যখন গ্রামে ছিলাম, বিশেষ করে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের আগে, ভরসা ছিল আজাদ ও ইত্তেফাক। তাও কয়েক দিনের বাসি কাগজ। সেটাই টাটকা মনে হতো। মাঝেমধ্যে কলকাতা থেকে আসত দৈনিক যুগান্তর। সেটার ছাপা ও লেখা আরও উন্নত। স্বাধীনতার পর প্রথম ১০ বছর, মোটের ওপর স্বাভাবিক সম্পর্ক ছিল, আইয়ুব ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের মাঝখানে বিরাট প্রাচীর উঠে যায়। কলকাতার কাগজ আসা বন্ধ হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে আমার ছোট চাচা, যিনি গ্রহণ করেছিলেন ভারতের নাগরিকত্ব, লোকের হাতে কলকাতার দৈনিক-সাপ্তাহিকের বান্ডিল পাঠাতেন।
সব মানুষের মতোই আমিও একদিন ছিলাম পাঠক, তারপর হয়ে গেলাম সংবাদপত্রের লেখক। তারপর পেশাদার সাংবাদিক। স্বাধীনতার আগে অনিয়মিতভাবে লিখলেও স্বাধীনতার পর দেশের প্রধান তিনটি কাগজ—ইত্তেফাক, সংবাদ ও দৈনিক বাংলার সাহিত্য সাময়িকীর প্রধান লেখকদের আমি ছিলাম একজন। বছরের পর বছর দৈনিক বাংলায় কবি আহসান হাবীব, ইত্তেফাক-এ রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই) এবং সংবাদ-এ আবুল হাসনাত আমার লেখাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রধান রচনা করেছেন। তাঁদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
তারপর শুরু হয় উপসম্পাদকীয় নিবন্ধ রচনা। ইংরেজি-বাংলা সব কাগজেই লিখতাম। নিয়মিত লেখা শুরু হয় আজকের কাগজ থেকে। তারপর ভোরের কাগজ, প্রথম পর্যায়ের বাংলাবাজার পত্রিকা, প্রথম আলো, যুগান্তর, সমকাল প্রভৃতি। ডেইলি স্টার পত্রিকায়ও বহুদিন লিখেছি। প্রধান কাগজের সম্পাদকদের অকৃপণ ভালোবাসা ও প্রীতি বর্ষিত হয়েছে আমার ওপর। মালিক-সম্পাদকদের মধ্যে সংবাদ-এর আহমদুল কবির, ইত্তেফাক-এর মইনুল হোসেন এবং আজকের কাগজ-এর কাজী শাহেদ আহমেদ আমাকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের যে সুযোগ দিয়েছেন, এর জন্য তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। যত দিন শামসুর রাহমান দৈনিক বাংলার সম্পাদক ছিলেন, তত দিন ওই কাগজ ছিল আমাদের নিজস্ব।
নব্বইয়ের দশক এবং এই শতকের প্রথম দশকে কয়েকজন সম্পাদক বাংলাদেশের সংবাদপত্রে নতুন যুগের সূচনা করেন। তোয়াব খানের নেতৃত্বে জনকণ্ঠ, মতিউর রহমানের ভোরের কাগজ ও প্রথম আলো, মতিউর রহমান চৌধুরীর প্রথমে বাংলাবাজার পত্রিকা এবং পরে মানবজমিন, গোলাম সারওয়ারের যুগান্তর ও সমকাল এবং আবেদ খানের সমকাল এবং এখন কালের কণ্ঠ বাংলাদেশের সংবাদপত্রের দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম নতুন এক বলিষ্ঠ ধারার সৃষ্টি করেছেন। এসব দক্ষ সম্পাদকের দ্বারা যে আধুনিক সাংবাদিকতার সূচনা হয়েছে, তার জন্য তাঁদের সহযোগী একদল যোগ্য তরুণ সাংবাদিকের অবদানও বিরাট। তাঁরা নতুন যুগের সাংবাদিক। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাষা নতুন ও আধুনিক। তৈরি হয়েছে গত পনেরো বছরে একদল দক্ষ ফটোসাংবাদিক। অর্থাৎ একটি উঁচু জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে আজ আমাদের সংবাদপত্র।
আমার চিন্তা প্রকাশে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজী শাহেদ আহমেদ, মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমান, গোলাম সারওয়ার, মতিউর রহমান চৌধুরী, আবেদ খান যে স্বাধীনতা দিয়েছেন, নিশ্চয়ই অন্য লেখকেরাও তেমনটি ভোগ করেছেন। পত্রিকায় সম্পাদকের পাতায় রচনা লিখলেও আমি তো একজন পাঠকও বটে। শৈশবে একটি কাগজের জন্য পোস্টাপিসের পিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। আজ সম্পাদক-প্রকাশকদের দয়ায় দরজার তলা ভরে যায় কাগজে। সবচেয়ে পুরোনো সৌজন্য কপিটি ইত্তেফাক। ৪১ বছর ধরে পাচ্ছি। সিরাজুদ্দীন হোসেন দিয়ে গিয়েছিলেন, আর বন্ধ হয়নি। ১০-১৫টি কাগজে প্রতিদিন চোখ বোলানোর সৌভাগ্য হয়। সংবাদপত্র পাঠ করে আজ সব সময় ভালো লাগে না। ভালো না লাগার কারণ অনেক রকম।
কয়েক দিন আগে ঢাকার বাইরে থেকে ফিরছিলাম। হাইওয়ের পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ড্রাইভার অদূরে ঝোপের আড়ালে গেল। আমি গাড়ি থেকে নেমে একটু হাঁটাহাঁটি করছিলাম। রাস্তার পাশের এক সবজির খেতে এক ভদ্রলোক কী যেন করছিলেন; তিনি উঠে এলেন সড়কের ওপর। কোনোভাবে তিনি আমাকে চিনলেন। ঝাড়া দিয়ে লুঙ্গির মাটি ফেলে তিনি ক্ষোভের সুরে বললেন, ‘কাগজে আপনারা সরকারের, বিরোধী দলের, প্রধানমন্ত্রীর, বিরোধীদলীয় নেত্রীর, মন্ত্রীদের দোষ, দুর্নীতি ও দুর্বলতার জন্য লেখালেখি করেন। পত্রিকার ভুলভ্রান্তি ও দোষের সমালোচনা করার উপায় কী?’
আমি তাঁকে বললাম, ‘সে সমালোচনা আপনারা করবেন। আপনাদের মতামতের মূল্য খুব বেশি।’ তখন তিনি কয়েকটি সংবাদের উল্লেখ করলেন উদাহরণ হিসেবে। তিনি জানতে চাইলেন, এসব সংবাদের উদ্দেশ্য কী, এসব সংবাদের ভিত্তি কী, এতে দেশের কোনো উপকার হবে কি না, এসব সংবাদে আদৌ কোনো সত্যতা আছে কি না।
ভদ্রলোকের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আমি কেউ নই। যেসব কাগজে ওই সব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, সেসব কাগজের সম্পাদক এবং যিনি বা যাঁরা ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছেন, তাঁরাই সঠিক উত্তর দিতে পারতেন। ওই ভদ্রলোকই প্রথম নন, তাঁর মতো প্রশ্ন আরও অনেকেই করেন। জবাব দিতে পারি না। ৩৫ বছরের বেশি আমি প্রত্যক্ষভাবে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। সহকারী সম্পাদক থেকে সম্পাদক পর্যন্ত হয়েছিলাম। পত্রপত্রিকার দোষ-গুণ আমার অজানা নয়। সমস্যাও আমার অজ্ঞাত নয়। বাঙালির গণতান্ত্রিক সংগ্রামে আমাদের সংবাদপত্র পাকিস্তানি আমলে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু তার পরও বলব, সব সময় কাগজের ভূমিকা ইতিবাচক ও নির্মল ছিল না। অনেক সময় সত্য ও ন্যায় থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে এবং তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গোটা জাতি। সেই ক্ষতির মাশুল গুনতে হয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে।
১৯৪৮ সালে এক ব্যক্তিগত চিরকুটে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছিলেন, ‘কী করছে আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, অমৃতবাজার পত্রিকা আর হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড এবং ওদিকে আজাদ পত্রিকা। এরা চাইছে, দাঙ্গা ভালোমতো লাগুক। যাচ্ছেতাই মিথ্যাচার করছে এই কাগজগুলো। এপার থেকে মুসলমানরা ওপার চলে যাক, আর পূর্ববাংলা থেকে হিন্দুরা ভয়ে বাড়িঘর ফেলে এদিকে চলে আসুক। এদের থামাতে পারো কি না দ্যাখো।’
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে কেউ কিছু করলে কে তাকে রুধিবে দিয়ে বালির বাঁধ। কোটি কোটি মানুষের সর্বনাশ হয়েছে, লাভবান হয়েছে কয়েকজন। পত্রিকা শুধু ঘটে যাওয়া খবর দেয় না, জনমত গঠন করে, বিশেষ পরিস্থিতির জন্য মানুষের মন তৈরি করে। তা ছাড়া একটি রাষ্ট্রে সরকার ছাড়াও বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী থাকে। তারাও সংবাদপত্রকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে।
স্বাধীন সংবাদপত্র ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। আবার গণতন্ত্রকে হত্যা করতেও একশ্রেণীর সংবাদপত্র খুব বড় ভূমিকা রাখে। হিটলার দানব হয়ে ওঠার আগে সংবাদপত্র ছিল তাঁর প্রধান সহায়। তাঁর কাজকে অনেক দিন অন্ধভাবে সমর্থন দিয়ে গেছে সংবাদপত্র। তাঁর নীলনকশাকে দিয়েছে সমর্থন। তা ছাড়া বিভিন্ন দেশ আক্রমণের আগে ওই সব দেশের সরকারগুলোও হিটলারের নিন্দা করেনি। সুতরাং সেখানকার কাগজগুলোও করেনি। বহুকাল স্পেনের কাগজগুলো রিপাবলিকপন্থীদের নয়, স্বৈরাচারী ফ্রানসিসকো ফ্রাঙ্কোকেই সমর্থন দিয়েছে। পর্তুগালে একনায়ক আন্তনিও সালাজারকে টিকিয়ে রাখে সংবাদপত্র। ফিলিপাইনে ফার্দিনান্দ মার্কোসের স্বৈরশাসনকে পাকাপোক্ত করতে সংবাদপত্রই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। পরিহাসের মতো মনে হয়, তাদের পতনের পরে হিটলার, ফ্রাঙ্কো, সালাজার, মার্কোসকে ওই সব কাগজই বেশি নিন্দা করেছে। ইঙ্গো-মার্কিনপন্থী ইরানের শাহকে পত্রিকাগুলো প্রশংসায় সিক্ত করেছে বহু বছর। তারপর যেদিন আয়াতুল্লাহ খোমেনি তাঁকে এক কাপড়ে দেশ থেকে বিতাড়ন করেন, বিমানবন্দর পর্যন্ত জনগণ তাঁকে তাড়া করে, সেদিন ঘুরে যায় কাগজের সুর। লেখা হতে থাকে শাহ কত খারাপ শাসক ছিলেন। পঁচাত্তরের আগে এবং পরে আমরা তা দেখেছি।
সরকারের বিভিন্ন বিভাগ থেকে, বিশেষ করে গোয়েন্দা বিভাগ থেকে খবর সংগ্রহ করা সাংবাদিকদের প্রচলিত রীতি। চিরকাল সব দেশেই তা করা হয়। নানা কারণে সূত্রের নাম গোপন রাখা হয়। ১২-১৩ বছর ধরে দেখছি, গোয়েন্দা বিভাগই আগ বাড়িয়ে সাংবাদিকদের দিয়ে সংবাদ করাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা তথ্য নিজে যাচাই না করে সাংবাদিক প্রকাশ করতে পারেন না। আমাদের তা করা হচ্ছে।
তিনোদ্দীনের বিশেষ সরকারের সময় থেকে শুরু হয়েছে আরেক ধারা: অপরাধী বা রাজনৈতিক নেতাদের আটক করে রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। তারপর সম্পূর্ণ অনৈতিকভাবে একতরফা বলা হচ্ছে: ওই ব্যক্তি এই বলেছেন, ওই করেছেন এবং তাঁর অমুক অমুক নাশকতামূলক কাজ করার পরিকল্পনা ছিল। সব কাগজে নয়, কোনো কোনো কাগজে সেসব বানোয়াট কাহিনি বিশাল শিরোনাম দিয়ে প্রকাশ করা হচ্ছে। রিমান্ডের গোপন ঘরে ভয়-ভীতির মধ্যে কে কী বলল, তা সংবাদ নয়। সাংবাদিকদের কাছে অপরাধী কী বলল, তাই সংবাদ। কয়েক দিন বাদ দিয়েই সম্ভাব্য নাশকতার সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। আজ কতভাবে বাংলাদেশের ক্ষতি করা হচ্ছে, তার কিছু কিছু হিসাব জনগণ ঠিকই রাখে। কয়েক মাস আগে আমি কলকাতায় যাব। টিকিট করার জন্য বিমান অফিসে গেছি। ঢুকছি, দেখি দলবেঁধে অনেক লোক বেরোচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে বিদেশি আছেন দুজন। ওই দিন একটি বা একাধিক কাগজে ‘ভারতের একটি গোয়েন্দা সংস্থার বরাত’ দিয়ে প্রতিবেদন করা হয়েছে ইসলামি জঙ্গিরা বাংলাদেশ বিমানে হামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ খবর জানার পর কে চড়বে বিমানে? বিমান অফিস থেকে লোকগুলো দৌড়ে চলে গেলেন অন্য এয়ারলাইনসের অফিসে। তাঁদের পিছে পিছে আমিও দিলাম দৌড়। অন্য এয়ারলাইনসের টিকিট কিনলাম। এক খবরেই আমার বন্ধু জি এম কাদেরের কয়েক কোটি টাকা লোকসান হয়ে গেল।
ঢাকার বিদেশি দূতাবাসে হামলার সংবাদ হামেশাই হচ্ছে। এ জাতীয় সংবাদ প্রকাশের সুবিধা অনেক রকম। যদি সত্যি কখনো হামলা হয়, তাহলে যে কাগজে রিপোর্ট হয়েছে, তাঁরা লাফিয়ে উঠবেন। বলবেন: এ তো আমরা জানতাম, তাই আগেই সাবধান করে দিয়েছিলাম। অন্যদিকে এই ভুয়া বা বায়বীয় সংবাদ প্রকাশের পর যখন কিছুই ঘটবে না, তখন ওই সাংবাদিক বলবেন: আমরা লিখেছিলাম বলেই হামলাটি হয়নি। তা না হলে বিমানের সব উড়োজাহাজ জঙ্গিরা উড়িয়ে দিত। গুঁড়িয়ে দিত দূতাবাস।
এ জাতীয় সংবাদে অট্টহাসি হাসে দুই পক্ষ: এক পক্ষ, যাদের সম্পর্কে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তারা হাসতে হাসতে বলে: কত বড় বেকুব দেখো। কিছুই জানে না। আর হাসে সেই পক্ষ, যারা সত্যি সত্যি অপরাধ ঘটাবে। কখন ঘটাবে, তা শুধু তারাই জানে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে বর্বরতার পর গত সপ্তাহে চ্যানেল আইয়ের এক আলোচনায় মাহমুদুর রহমান মান্না, রিজভী আহমেদ ও আমি ছিলাম। আলোচনার মধ্যে উপস্থাপক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর একটি প্রধান দৈনিকের একটি রিপোর্ট আমাদের দেখালেন। তাতে রিপোর্টার একটি গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে লিখেছেন: ছাত্রলীগের বর্তমান যে কমিটি, এটি হাওয়া ভবন থেকে মনোনীত হয়ে আসে ইত্যাদি ইত্যাদি। রিপোর্টটি পড়ে আমার মনে হলো, রিপোর্টার বলতে চান, হাওয়া ভবনের সাবেক সর্বাধিনায়ক তারেক রহমান কয়েক বছর আগেই জানতে পারেন, আগামী ২০০৮-এর নির্বাচনে তাঁর আম্মা জিততে পারবেন না। সরকার গঠন করবেন শেখ হাসিনা। তখন সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য প্রয়োজন হবে ছাত্রলীগের। সুতরাং আগেভাগে ছাত্রলীগে এমন নেতৃত্ব বসিয়ে যাবেন, যাঁরা চাপাতি ও রামদার সদ্ব্যবহারে সুদক্ষ এবং সহপাঠীদের খড়কুটোর মতো তিনতলা থেকে মাটিতে ছুড়ে ফেলবেন। মান্না ও রিজভী উভয়েই রিপোর্টটিকে বাজে ও রাবিশ বলে উড়িয়ে দিলেন। আমি বলেছিলাম, এ খবরটি গোয়েন্দারা সাত-আট বছর গোপন রাখলেন কেন? জাহাঙ্গীরনগরের ঘটনার আগের দিন তথ্যটি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে পৌঁছে দেননি কেন? অর্থাৎ এ খবরটি কোনো গোয়েন্দা সূত্র দেয়নি, রিপোর্টারের মাথা দিয়েছে।
আমি যা বলতে চাই তা হলো সংবাদপত্রের কাছে মানুষের প্রত্যাশা প্রচুর। সেই প্রত্যাশা নষ্ট হয়ে গেলে পাঠক হতাশায় ভোগে। আমার এ লেখার দীর্ঘ ভূমিকায় আমি যা বলেছি, তার অর্থ হলো সংবাদপত্রের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সারা জীবনের। সাংবাদিকতা ও লেখালেখি ছিল আমার জীবিকার একমাত্র উপায়। সংবাদপত্রকে যখন কেউ সমালোচনা করে এবং সংগত কারণেই করে, তখন আমার গায়ে লাগে। আমি আহত হই।
পৃথিবীতে মন্দ গণতন্ত্র যেমন আছে, তেমনই অপসাংবাদিকতাও আছে। ভালো গণতন্ত্রের জন্য ভালো সংবাদপত্র অপরিহার্য। ব্যক্তিস্বার্থের কারণে রাজনীতিকদের কেউ খারাপ হতে পারেন, নীতি বিসর্জন দিতে পারেন, কিন্তু সাংবাদিকের নীতিভ্রষ্ট হওয়ার উপায় নেই। কোনো গোষ্ঠীর বা শাসকের লাঠিয়াল হওয়া সাংবাদিকের কাজ নয়। দেশ, জাতি ও জনগণের স্বার্থ রক্ষাই তাঁর ব্রত। সত্যের পক্ষে অনড় থেকেই সেই ব্রত পালন করা সম্ভব। সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া তাঁর জন্য আত্মহত্যার শামিল।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

বিএম কলেজে শিক্ষক প্রহার - আর কত ঘটবে, সরকারের টনক আর কবে নড়বে

ছাত্রের হাতে শিক্ষক প্রহার অসভ্যতার এক চরম আচরণ। বরিশালের বিএম কলেজে সেই কাজটি যারা করেছে, অভিযোগ উঠেছে যে তারা ছাত্রলীগের সদস্য। তাদের সহিংসতায় বাধা দেওয়ায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তিন শিক্ষককে প্রহারের যত কায়দা আছে, তা প্রয়োগ করে তবেই শান্ত হয়েছে। এই হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র নামধারী সন্ত্রাসীদের অবদান (!)। সন্ত্রাসীরা পারে না এমন কোনো কাজ নেই; কিন্তু একের পর এক এমন ঘটনা সংঘটন কীভাবে সম্ভব হচ্ছে, যখন দেশে রয়েছে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার? শিক্ষক নিপীড়নের এইধারা আর কতদিন চলবে, কত অন্যায়ের পর জাতীয়ভাবে এসব বন্ধে জাতীয় আলোড়ন সৃষ্টি হবে?
বনভোজন আয়োজনের কমিটিতে কেন ছাত্রলীগের এক কর্মীর নাম রাখা হলো না, সে জন্য আরেক ছাত্রকে দলবল নিয়ে প্রহার করতে যাওয়াকে কেন্দ্র করেই ঘটনাটি দানা বাঁধে। আহত ওই তিন শিক্ষকের ‘অপরাধ’ হলো, তাঁরা তাঁদের কক্ষে আশ্রয় নেওয়া এক ছাত্রকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু যে সন্ত্রাসীদের ক্ষমতার পেছনে রাজনৈতিক মদদ আছে, তারা কি কাউকে পরোয়া করে? অতএব, প্রহূত হলেন ওই তিন শিক্ষক। এবং এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, প্রায়ই ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা এমনটি করে থাকেন। বছরের শুরুতেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে একাধিক শিক্ষককে প্রহূত হতে দেখা গেছে। বরিশালের বিএম কলেজে আবার সেই ন্যক্কারজনক ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হলো।
ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সঙ্গে জড়িত ছাত্রসংগঠনগুলোতে এ ধরনের সন্ত্রাসীর কোনো অভাব নেই। এবং প্রায়ই দেখা যায়, নিজ নিজ দলের কর্মীদের নিয়ে নেতারা তাঁদের গর্ব প্রকাশে লজ্জা পান না। সাধারণ মানুষের পক্ষে রাজনৈতিক দলের ছাত্রকর্মী আর ক্ষমতাবান দলের মদদ পাওয়া সন্ত্রাসীদের মধ্যে পার্থক্য করার কোনো উপায় থাকে না। সাংগঠনিক কমিটিতে, মিছিলে, মঞ্চে, সন্ত্রাসী কাজকর্মে সন্ত্রাসীরা কিংবা তাদের আশ্রয়দাতারাই থাকে সবার সামনে।
অভিযোগ উঠেছে, কলেজের অধ্যক্ষের প্রশ্রয় পেয়েই সন্ত্রাসীরা এমন বেপরোয়া হতে পেরেছে। যথারীতি তিনি ও কলেজের ছাত্রলীগের নেতারা শিক্ষক-প্রহারের হোতাদের সঙ্গে নিজেদের দূরত্ব প্রমাণ করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন। অথচ সরকার জানে, নেতারা জানেন, পুলিশ জানে, সাধারণ মানুষও জানে, কারা সন্ত্রাসী এবং কাদের জন্য শিক্ষাঙ্গনে মাঝেমধ্যেই বর্বরোচিত ঘটনা ঘটছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস নিকৃষ্ট প্রকৃতির সন্ত্রাস। অতীতে মানুষ এ রকম আচরণ ভালোভাবে নেয়নি, ভবিষ্যতেও নেবে না।

সচিবদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক -সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দিকেই নজর দিতে হবে

গত রোববার সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন, যা আলোচনার দাবি রাখে। তিনি যথার্থভাবেই জনপ্রশাসনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন এবং অনেক বিষয়ে কেন্দ্রের দিকে না তাকিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের বড় বাধা রাজনৈতিক, সন্দেহ নেই। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের গা বাঁচানোর মানসিকতাও কম দায়ী নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কেন্দ্র নীতি নির্ধারণ করবে; আর উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়োগ, বদলি, ছুটি, পেনশন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, ভূমি অধিগ্রহণসহ অনেক কাজ স্থানীয় পর্যায়ে সম্পন্ন করারও তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে কার্যবিধি সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিলে তাও করতে হবে।
সরকারের সদিচ্ছা থাকলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের বাধাগুলো অপসারণ করা অসম্ভব নয়। সংবিধানে চার স্তরের স্থানীয় সরকারের কথা বলা হলেও তা কার্যকর হয়নি। জেলা পরিষদ নির্বাচিত নয়। উপজেলা পরিষদে নির্বাচন হলেও দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের মীমাংসা হয়নি। সাংসদেরা স্থানীয় সরকারের কর্তৃত্বই মানতে চান না। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, স্থানীয় প্রশাসন যাতে নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেই নিশ্চয়তা সরকারকেই দিতে হবে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনকে আরও গতিশীল করার যে তাগিদ দিয়েছেন, তার সঙ্গে কেউ দ্বিমত করবেন না। সমস্যা হলো বাস্তবায়ন নিয়ে। সরকার অনেক ভালো সিদ্ধান্ত নিলেও সময়মতো তা বাস্তবায়িত হয় না, ফলে জনগণ তার সুফল পায় না। গত অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার বেড়েছে, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় তা কম। অতএব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হার আরও বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সরকার পুরস্কার ও শাস্তির বিধান রাখতে পারে।
বৈঠকে কয়েকজন সচিব খোলামেলা বক্তব্য দিয়েছেন। এটি ভালো লক্ষণ। এতে নীতিনির্ধারক ও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তার অবসান হয়, পারস্পরিক আস্থা বাড়ে। সে দিক থেকে বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সচিবেরা তাঁদের বক্তব্যে চাকরির বয়সসীমা বাড়ানো নিয়ে যতটা উৎসাহী ছিলেন, সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের বাধাগুলো চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে ততটাই ছিলেন নীরব। মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিশ্চয়ই তাঁরা মাঠপ্রশাসনের সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবহিত।
প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, সরকারের গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন, কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সচিবদের সহযোগিতা চেয়েছেন। আসন্ন রমজান মাস সামনে রেখে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য অযৌক্তিকভাবে না বাড়াতে পারে, সে ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রী তাঁদের সতর্ক থাকতে বলেছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্বেগের সঙ্গে আমরাও একমত। প্রশ্ন হলো, কথিত বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ভাঙা যাবে কী করে? এর সঙ্গে সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যুক্ত থাকলে প্রশাসনের পক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন বৈকি। সে ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটি আসতে হবে রাজনৈতিক পর্যায়েই। টিসিবির মাধ্যমে পণ্য আমদানি নিয়ে গত বছর যে হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সীমান্ত বাঁধ খুলে দ. কোরিয়ায় পানি ছাড়ছে উ. কোরিয়া

উত্তর কোরিয়া তাদের সীমান্তবর্তী একটি বাঁধ দিয়ে পানি ছেড়ে দেওয়া শুরু করেছে। এতে প্রতি সেকেন্ডে এক হাজার টন পানি দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহ্যাপ এ তথ্য জানায়।
ধারণা করা হচ্ছে, গত রোববার রাতে উত্তর কোরিয়ার সীমান্তবর্তী হোয়াংগ্যাং বাঁধের বন্যা নিয়ন্ত্রণ দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। ফলে ইমজিন নদী দিয়ে পানি দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশ করছে। গত কয়েক দিনের মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ফলে কোরীয় উপদ্বীপের কয়েকটি বড় নদীতে পানি বেড়ে যায়।
বন্যা প্রতিরোধে পিয়ংইয়ং শিগগিরই একটি বাঁধ দিয়ে পানি ছেড়ে দেবে বলে গত রোববার সিউলকে জানায়। গত সেপ্টেম্বরে উত্তর কোরিয়া আকস্মিক বন্যার পানি বাঁধ দিয়ে ছেড়ে দিলে দক্ষিণ কোরিয়ার ছয় পর্যটক নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকে পানি ছাড়ার আগে উত্তর কোরিয়া সিউলকে অবহিত করবে বলে অঙ্গীকার করে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ট্যাংক ও টর্পেডো কিনছে তাইওয়ান

প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে টর্পেডো ও ভারী ট্যাংক কিনতে যাচ্ছে তাইওয়ান। চীনের সঙ্গে তাইওয়ানের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করলেও তাইওয়ান এই পরিকল্পনা করছে। গতকাল সোমবার স্থানীয় লিবার্টি টাইমস পত্রিকায় এ খবর প্রকাশিত হয়।
পত্রিকার খবরে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট মা ইং-জিউ টর্পেডো ও অস্ত্রশস্ত্র কেনার জন্য একটি তালিকা তৈরি করতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। তাতে তিনি এমকে-৫৪ টর্পেডো, এমআইএ-২ ট্যাংক, উভচর যানসহ বেশ কিছু অস্ত্রের নাম অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। তবে তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য-সম্পর্ক উন্নয়নের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন মা ইং-জিউ। এর পর থেকে লক্ষণীয়ভাবে চীনের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে থাকে। প্রসঙ্গত, ১৯৪৯ সালে চীনের গৃহযুদ্ধের পর মূল ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া তাইওয়ানে স্বায়ত্তশাসন চলছে।

চীন আরও একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে

চীন আরও একটি নতুন পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গুয়াংজি এলাকায় এ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। দেশটির সরকারি গণমাধ্যম গতকাল সোমবার এ তথ্য জানিয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে পিপলস ডেইলি বলেছে, প্রস্তাবিত পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ধাপে ৩৫০ কোটি ডলার ব্যয়ে ১ দশমিক ৮ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি পরমাণু চুল্লি স্থাপন করা হবে।
গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমাতে চীনা সরকার পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। ২০১০ সাল নাগাদ মোট চাহিদার ১০ শতাংশ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশ পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পিপলস ডেইলি বলেছে, নতুন পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ২০১৫ সালের মধ্যে প্রথম চুল্লি এবং ২০১৬ সালের মধ্যে দ্বিতীয় চুল্লিটি চালু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পত্রিকাটি আরও বলেছে, নতুন পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট ছয়টি চুল্লি স্থাপন করা হবে। প্রতিটি চুল্লি হবে অন্তত এক গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন।

আক্রান্তদের প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসা দেওয়ার পরামর্শ

জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এইডস রোগীদের প্রাথমিক রোগের লক্ষণ ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে থেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। ভিয়েনায় চলমান আন্তর্জাতিক এইডস সম্মেলনে গতকাল সোমবার চিকিৎসায় গত চার বছরের অগ্রগতি তুলে ধরে ডব্লিউএইচও এ পরামর্শ দিয়েছে। সম্মেলনে বলা হয়েছে, এইডস থেরাপির মাধ্যমে বর্তমানে প্রায় ৫০ লাখ রোগীর জীবন রক্ষা পাচ্ছে। গত রোববার এ সম্মেলন শুরু হয়। চলবে ২৩ জুলাই পর্যন্ত। ১৮৫টি দেশের প্রায় ২০ হাজার প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে গত বছর প্রাথমিক পর্যায়েই রোগীদের এন্টি-রেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। গতকাল এইডস সম্মেলনে এক প্রতিবেদনের মাধ্যমে হু সেই সুপারিশের পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছে। ১৫৬ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে এইচআইভি ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম ‘ককটেল’খ্যাত ওষুধটির কার্যকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে এইডস রোগীদের চিকিৎসায় পাঁচমিশালি থেরাপির আবিষ্কার হয়। ওই সময় এ থেরাপি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে এ চিকিৎসাপদ্ধতির খরচ কমে আসে।
হুর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালে বিশ্বে মোট ৪০ লাখ লোক ককটেল থেরাপি নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। পরের বছর অর্থাৎ ২০০৯ সালে এই চিকিৎসাপ্রাপ্তদের সংখ্যা ৫২ লাখে দাঁড়ায়। ২০০৮ সালের একটি জরিপে বলা হয়েছে, দরিদ্র ও বেশি মাত্রায় আক্রান্ত প্রায় ৪৩ লাখ রোগী এখনো এ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।
২০০৬ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেসব রোগীর দেহের প্রতি মাইক্রোলিটার রক্তে সিডি৪ সেলের (এইচআইভি আক্রান্ত রোগ প্রতিরোধকারী কোষ) পরিমাণ ২০০ বা তার নিচে নেমে এসেছে, তাদের শরীরে ককটেলখ্যাত ওষুধ প্রয়োগ করার পরামর্শ দেয়। এ পর্যায়ের রোগীদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে যায়। তবে ২০০৯ সালে ওই ওষুধের কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে, ২০০ বা তার কম পরিমাণের নয়, বরং যেসব রোগীর প্রতি মাইক্রোলিটার রক্তে সিডি৪ সেলের পরিমাণ ৩৫০-এর নিচে নেমে এসেছে, তাদেরই এ থেরাপি দেওয়া উচিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্লিনিক্যাল রোগের লক্ষণ দৃশ্যমান হোক বা না হোক, এইচআইভি-আক্রান্ত অন্তসত্ত্বা নারীসহ সব শিশু-কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক এইডস রোগীদের (যাদের রক্তে সিডি৪ সেলের পরিমাণ ৩৫০-এর কম) ককটেল থেরাপি দেওয়া উচিত।

মেগরাহির মুক্তির সিদ্ধান্ত ভুল ছিল: ক্যামেরন

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, লকারবির আকাশে মার্কিন বিমানে হামলাকারী লিবীয় নাগরিক আবদেল বাসেত আল-মেগরাহিকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ভুল ছিল। গতকাল সোমবার বিবিসি টেলিভিশনকে তিনি এ কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রে সফরের প্রাক্কালে এই মন্তব্য করলেন ক্যামেরন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র সফর করছেন তিনি। আজ মঙ্গলবার তাঁর ওয়াশিংটন পৌঁছানোর কথা।
১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকারবি শহরের আকাশে একটি মার্কিন বিমানে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় অভিযুক্ত একমাত্র আসামি মেগরাহিকে ২০০১ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু সাজার মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই মানবিক দিক বিবেচনা করে গত বছর ক্যানসারে আক্রান্ত মেগরাহিকে মুক্তি দেয় স্কটল্যান্ডের বিচার মন্ত্রণালয়। এই সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় মার্কিন প্রশাসন। কারণ, ওই হামলায় নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগ ছিল মার্কিন নাগরিক।
ক্যামেরন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক খুবই দৃঢ়। আমরা অনেক বিষয়ে আলোচনা করব—আফগানিস্তান, বিপি (ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম); আমি নিশ্চিত, মেগরাহির বিষয়টিও আলোচনায় আসবে।’ অভিযোগ উঠেছে, মেগরাহির মুক্তির ব্যাপারে সুপারিশ করেছিল বিপি। সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রে বিপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ তীব্র হয়েছে। তেল কোম্পানিটি ইতিমধ্যে মেক্সিকো উপসাগরে তেলক্ষেত্র দুর্ঘটনা নিয়ে মার্কিন জনগণের রোষানলে রয়েছে।
তবে লন্ডন জানিয়েছে, মেগরাহিকে মুক্তি দেওয়া এবং লিবিয়ায় তেল অনুসন্ধানের ব্যাপারে বিপির চুক্তি করার মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে ক্যামেরন বলেন, ‘আমার কোনো ধারণা নেই বিপি কী করেছে। বিপির কোনো কর্মকাণ্ডের দায় আমার ওপর বর্তায় না। মেগরাহির মুক্তির ব্যাপারে আমি যা কিছু জানি, তা বিরোধী দলের নেতা হিসেবেই জানতে পেরেছি। আমি মনে করি, মেগরাহিকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ভুল ছিল।’

আফগান সরকারকে সহায়তাকারীদের হত্যা বা বন্দীর নির্দেশ

আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট গত রোববার বলেছে, তালেবানপ্রধান মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের লেখা একটি চিঠি তারা হাতে পেয়েছে। এতে তিনি আফগান সরকারকে সহায়তা করছে, বা বিদেশি সেনাদের হয়ে কাজ করছে এমন যে কাউকে বন্দী অথবা হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ন্যাটো জোটের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার যোসেফ ব্লোটজ জানান, তালেবান নেতা মোল্লা ওমর তাঁর অনুসারীদের এ হত্যার নির্দেশ দিয়ে গত জুনে চিঠিটি লিখেছেন। চিঠিতে তালেবান যোদ্ধাদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ন্যাটো জোটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব আফগান সে দেশের সরকারকে সহায়তা করছে, অথবা সরকারের পক্ষে কাজ করছে, মোল্লা ওমর তাদের বন্দী অথবা হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিদেশি সেনাদের সম্পর্কে তথ্য পেতে তিনি আফগান নাগরিকদের ন্যাটো জোট অথবা মার্কিন ঘাঁটিতে চাকরি নেওয়ার কথাও বলেছেন।
চিঠিটি যদি মোল্লা ওমরের লেখাই হয়ে থাকে, তবে তা তাঁর আগের লেখা এক চিঠির বক্তব্যের বিপরীত। ২০০৯ সালের আগস্টে লেখা ওই চিঠিতে মোল্লা ওমর অনুসারীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, আমেরিকার পুতুল সরকারের কোনো কর্মকর্তা, সেনাসদস্য, ঠিকাদার অথবা কর্মীকে বন্দী করা হলে তাঁকে যেন নির্যাতন অথবা অন্য কোনো ক্ষতি করা না হয়।
মোল্লা ওমর বর্তমানে পাকিস্তানে আছেন বলে পশ্চিমারা দাবি করছে। তবে ইসলামাবাদ এ দাবি নাকচ করে দিয়েছে।

আফগানিস্তানে শান্তি ও উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণ প্রধান উদ্দেশ্য

আফগানিস্তানে আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির শান্তি ও উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণের উদ্দেশেই এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ছাড়াও বিশ্বের অন্তত ৪০টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ সম্মেলনে অংশ নেবেন বলে জানা গেছে।
আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক প্রার্থী ও সম্মেলনের সংগঠক আশরাফ গনি বলেন, ‘এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য দুটি। একটি হলো আফগান রাজনৈতিক বিষয়গুলো প্রতিপাদন করে কার্যপ্রণালী নির্ধারণ করা। অপরটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক দেশের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো।
সম্মেলন উপলক্ষে রাজধানী কাবুলে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার কাবুলের প্রধান প্রধান সড়কে সেনা মোতায়েন করা হয়। সম্মেলনের নিরাপত্তায় কয়েক হাজার সেনা কাজ করছে বলে জানা গেছে।
সম্মেলনে আফগান কর্মকর্তারা দেশ পরিচালনা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা, বিদেশি সহায়তার আরও কার্যকর ব্যবহার এবং শান্তি প্রচেষ্টার পরিকল্পনার বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরবেন।

ইচ্ছার বিরুদ্ধে বন্ধ্যা করার অভিযোগ উজবেক নারীর

সাওদাত রাখিমবায়েভা আক্ষেপ করে বললেন, মৃত নবজাতক সন্তানের সঙ্গে মারা গেলেই খুশি হতেন তিনি। এই আক্ষেপের কারণ, আর কখনোই মা হতে পারবেন না সাওদাত।
গত মার্চে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়ার সময় চিকিৎসক তাঁর জরায়ুর একটি অংশ কেটে ফেলেন। চিকিৎসক যদিও বলেছেন, একটি সম্ভাব্য ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ অপসারণের জন্যই ওই অংশটি কেটে ফেলা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু সাওদাতের ধারণা, এটি পরিকল্পিত। সরকারের জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই বন্ধ্যাকরণের শিকার তিনি।
উজবেকিস্তানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর গুলিস্তানের একটি হাসপাতালে এ অস্ত্রোপচার করা হয়। উজবেক এই গৃহবধূ জানান, ওই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি অপরিণত সন্তানের জন্ম দেন তিনি। জন্মের তিন দিন পর সে মারা যায়। বন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আসে উপর্যুপরি আরেক আঘাত হিসেবে।
সাওদাত চিকিৎসকের ব্যাখ্যা মানতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘ওই চিকিৎসক একবারও এ ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞাসা করেননি। কোনো পরীক্ষাও করেননি। সরাসরি অস্ত্রোপচার করেছেন, যেন আমি কোনো বোবাকালা জন্তু।’ কাঁদতে কাঁদতে সাওদাত বলেন, ‘ইব্রাহিমের সঙ্গেই আমার মৃত্যু হওয়া উচিত ছিল।’
স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন, ভুক্তভোগী ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সাওদাতের মতো আরও অনেক নারীকে এভাবেই তাঁদের অজান্তে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানপ্রসবের সময় বন্ধ্যা করে ফেলা হয়েছে। সরকারের জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অংশ হিসেবেই এমনটি করা হয়েছে।
উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইসলাম করিমভ সম্প্রতি বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি জোরদার করেছেন। এ ব্যাপারে গত ফেব্রুয়ারি মাসে একটি ঘোষণা দেয় সরকার। এতে বলা হয়, কোনো নারী স্বেচ্ছায় বন্ধ্যাকরণের জন্য এলে চিকিৎসকেরা বিনামূল্যে তাঁর অস্ত্রোপচার করবেন।

আল-কায়েদার সাময়িকী ইন্সপায়ারের প্রধান লেখক একজন মার্কিন

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার নতুন অনলাইন সাময়িকী ইন্সপায়ার-এর (প্রেরণা) প্রধান লেখক সমির খান নামের একজন মার্কিন নাগরিক। ২০০৯ সালের অক্টোবরে তিনি ইয়েমেনে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে মার্কিন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত ৭০ পৃষ্ঠার সাময়িকী ইন্সপায়ার-এ ইয়েমেনের বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ও জঙ্গি নেতা আনোয়ার আল আওলাকির সাক্ষাৎকার রয়েছে। এতে বোমা তৈরির কলাকৌশলও প্রকাশ করা হয়। মার্কিন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই সাময়িকীর মাধ্যমে আল-কায়েদা তার অনুসারীদের কাছে সাংকেতিক বার্তাও পাঠাচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সৌদি আরবে জন্ম নেওয়া সমির খান সাত বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি পরিবারের সঙ্গে নিউইয়র্কের কুইন্স এলাকায় বসবাস শুরু করেন। একপর্যায়ে মার্কিন নাগরিকত্বও পান সমির। পরে নর্থ ক্যারলিনায় বসবাস শুরু করেন। মার্কিন কর্তৃপক্ষের মতে, নিউইয়র্কভিত্তিক ইসলামিক থিঙ্কার্স সোসাইটি নামের একটি সংগঠনে যাতায়াত ছিল তাঁর। তবে কোনো সময়ই ওই সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের কেউ ছিলেন না তিনি। পরে তিনি জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ ফেরত-টিকিট নিয়ে ইয়েমেন যান। কিন্তু আর ফিরে আসেননি।
অনলাইনে সমির খানের নাম ‘ইনশাল্লাহশহীদ’। তাঁর বেশ কয়েকটি ব্লগের মাধ্যমে ইংরেজিতে আল-কায়েদাসহ ইরাকভিত্তিক বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের প্রচারণা চালানো হয়। ২০০৭ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে সমিরকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে তাঁকে ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীর পশ্চিমা প্রচারকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমটিবি বুথ খুলেছে

ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি) লিমিটেড একটি বুথ খুলেছে।
ভারপ্রাপ্ত বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনসচিব শফিক আলম প্রধান অতিথি হিসেবে গতকাল সোমবার বুথটির উদ্বোধন করেন। এ সময় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার কমোডর মাহমুদ হোসেন, এমটিবির চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনিস এ খান, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল ইসলাম চৌধুরী, মো. হাসেম চৌধুরী ও মো. আহসান-উজ জামান এবং উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

নীতিনির্ধারণী গবেষণা-সহায়তার জন্য দেশের দুটি সংস্থা মনোনীত

থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনিশিয়েটিভ (টিটিআই) দক্ষিণ এশিয়ার ১৬টি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অথবা স্বাধীনভাবে পরিচালিত নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার জন্য নির্বাচিত করেছে। যাতে এসব প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
সহায়তা পাওয়ার জন্য মনোনীত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের দুটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স স্টাডিজও (আইজিএস) রয়েছে।
এ ব্যাপারে থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনিশিয়েটিভ (টিটিআই) দক্ষিণ এশিয়ার থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে জাতীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুর ওপর ১৫০টিরও বেশি ব্যাপকভিত্তিক প্রস্তাব পেয়েছে। যথাযথভাবে এসব প্রস্তাব পর্যালোচনার করে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার ১৬টি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা দেওয়ার জন্য মনোনীত করা হয়। এতে বাংলাদেশের দুটি প্রতিষ্ঠান স্থান পায়। গতকাল সোমবার সিপিডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ক্যাপাসিটি বিল্ডিং বা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দীর্ঘ মেয়াদে টিটিআইয়ের আওতায় সহায়তা পাবে।
ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (আইডিআরসি), দ্য উইলিয়াম অ্যান্ড ফ্লোরা হিউলেট ফাউন্ডেশন এবং দ্য বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন ২০০৮ সালে থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনিশিয়েটিভ (টিটিআই) প্রতিষ্ঠা করে। দক্ষিণ এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকার স্থানীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করার লক্ষ্যে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। যাতে এসব প্রতিষ্ঠান উচ্চমানসম্পন্ন গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে নীতিমালার উন্নয়নের মাধ্যমে ন্যায়বিচারভিত্তিক ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
টিটিআইয়ের প্রাথমিক তিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে তহবিলের জোগানদার তথা অর্থায়নকারী হিসেবে আরও দুটি দাতা সংস্থা যোগ দেয়। সংস্থা দুটি হলো, যুক্তরাজ্য সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ (ডিএফআইডি) ও নেদারল্যান্ডস ডিরেক্টোরেট জেনারেল ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (ডিজিআইএস)।

রমজান মাসে বাজারে চাই সত্যিকারের তদারকি

রমজান মাসের বাকি প্রায় তিন সপ্তাহ। মন্ত্রী, আমলা এমনকি ব্যবসায়ী-নেতারাও রমজান মাসের বাজার নিয়ে কথা বলা শুরু করেছেন। গত সপ্তাহে সিলেটে এক অনুুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান রমজান মাসের বাজারে অসাধুতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। এরপর ঢাকায় তিনি বলেছেন, রমজান মাসের জন্য পর্যাপ্ত পণ্য মজুদ করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই এরই মধ্যে রমজান মাসের বাজার তদারকির জন্য ৪৫ সদস্যের বাজার মনিটরিং কমিটি গঠন করেছে।
সবকিছুই বেশ শ্রুতিমধুর, তবে কতখানি আস্থাযোগ্য? সরকারের ‘শক্ত প্রস্তুতি’ প্রসঙ্গটি দিয়েই শুরু করা যাক। রমজান মাসের জন্য হাজার দশেক টন করে চিনি ও তেলের মজুদ, এর চেয়ে অনেক কম পেঁয়াজ ও ছোলার মজুদ দিয়ে সরকার রমজান মাসের বাজারে প্রভাব রাখতে চায়। বিনয় দেখালে এ প্রস্তুতির প্রশংসা করতে হবে। তবে একে মোটেই শক্তিশালী প্রস্তুতি বলা যাবে না।
কারণ আলোচনা করা যেতে পারে। গত অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ও স্থানীয় উৎপাদনের অনুমিত হিসাবে বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের মাসিক গড় চাহিদা কমপক্ষে সোয়া লাখ টন। পাইকার ও পাইকারি বাজার পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, রমজান মাসে দেশে ভোজ্যতেলের ভোগ কমপক্ষে শতকরা ৪০ ভাগ বাড়ে। এর অর্থচাহিদা দাঁড়ায় পৌনে দুই লাখ টন। মুক্তবাজার অর্থনীতির শুভার্থী এবং অনেক পশ্চিমা অর্থনীতিবিদ বলেছেন, পণ্যবাজারে সরবরাহ ও মূল্যে প্রভাব রাখতে হলে কোনো সরবরাহকারীকে ওই বাজারের চাহিদার কমপক্ষে ২০ ভাগ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রমজান মাসের বাজারের চাহিদার তুলনায় টিসিবির কাছে থাকা ডাল, পেঁয়াজ ও ছোলার মজুদ প্রায়শই চাহিদার শতকরা দশমিক বা শূন্য দশমিকের কোনো অঙ্কে থাকে। এমন মজুদ টিসিবিকে আক্ষরিক অর্থেই নিধিরামে পরিণত করে।
টিসিবি শক্তিশালীকরণ সম্ভবত বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত শব্দমালার একটি। অস্থির বাজার আর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে নাকাল সাধারণ ভোক্তার প্রত্যাশা আর হতাশা আলোচনায় ‘টিসিবির শক্তি বৃদ্ধি’ একটি জনপ্রিয় আলোচনা। কিন্তু এর মজুদশক্তি দেখে মনে হয়, সরকার পেনসিল ব্যাটারি দিয়ে সত্যিকারের একটি রেলগাড়ি চালাতে চায়।
এবার চালের দর প্রসঙ্গ। সংগ্রহমূল্য বাড়িয়ে চালের বাজার চড়িয়েছে সরকার। এরপর মিলারদের ডেকে কঠোর সমালোচনা এবং ওএমএস বা খোলাবাজারে চাল বিক্রির খবরে ইতিমধ্যেই মোকামে চালের দাম কমে গেছে মণপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা। বলা হচ্ছে, রমজান মাসের আগেই ওএমএস চালু হবে চালের দাম কমানোর জন্য। রমজান মাসের বাজার চালের জন্য এমনিতেই মন্দা। চাহিদা কমে যায়, ফলে পাইকারি বাজারে দাম কমতে থাকে রমজান মাসের আগেই। হয়তো ওএমএস চালুর আগেই পাইকারি বাজার আগের জায়গায় চলে আসবে। কিন্তু খুচরা বাজারে কেজিতে যে চালের দাম দু-চার টাকা বেড়ে গেছে, তা কমার লক্ষণ নেই। এখানেই সরকারের চ্যালেঞ্জ।
এবার রমজান মাসের অন্যান্য পণ্যের হাল। ভোজ্যতেলের বাজারটি বেশ চড়ে গেছে এরই মধ্যে। সেটি বিশ্ববাজারের মূল্যবৃদ্ধির জন্য হয়নি বরং অসুস্থ প্রতিযোগিতার কবল থেকে মূল্য সংশোধিত হয়েছে। বিশ্ববাজারের বর্তমান মজুদ, মূল্য পরিস্থিতি ও উৎপাদনের নিকট পূর্বাভাস বলছে, এবার রমজান মাসে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধির কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। খেসারিসহ কিছু ডালের বাজারেও দর বেড়ে গেছে এর মধ্যেই। ছোলার মজুদ ও আমদানি পরিস্থিতিও মন্দ নয়।
তবে ভোজ্যতেল ও চিনির সরবরাহ এখনো স্থিতিশীল নয়। প্রস্তুতপণ্য ও আর সরবরাহ আদেশের (ডিও) মধ্যে মূল্যপার্থক্য মণে ১০০-১৫০ টাকা। স্বাভাবিক বাজারে এটি ২০-৩০ টাকা। ডিও কিনে পণ্য পেতে দেড় মাসও লেগে যাচ্ছে। গতবারের মতো চড়া লাভের আশায় মফস্বলের দোকানিরা কিছু বাড়তি চিনি মজুদ করছেন বলেও মনে করা হচ্ছে। যদিও বিশ্ববাজার বলছে, চিনির দাম সামনের কয়েক সপ্তায় চড়ার কথা নয়।
দেশে এবার পেঁয়াজ উৎপন্ন হয়েছে প্রচুর। কৃষক দাম পেয়েছেন গত কয়েক মাস, ভোক্তাও সস্তায় খেয়েছে। তবে সপ্তাহ দুয়েক ধরে ভারতীয় পেঁয়াজের সরবরাহ বাজার ওঠানামা করিয়েছে। তাই রমজান মাসের আগেই সরকার ও বেসরকারি খাত মিলে একটি বিকল্প আমদানি সূত্র তৈরি রাখা নিরাপদ। পাকিস্তান, ইরান, তুরস্ক, মিয়ানমারসহ আরও কিছু আমদানিসূত্রে যোগাযোগ বাড়াতে হবে এখনই।
তবে মসলাই বোধহয় গোল বাধাবে। চিনি, আদা, রসুনের দাম বাড়ছে তো বাড়ছেই। তাই ঢাকায়ও বাজার গরম। গরম মসলায় আক্ষরিক অর্থেই আগুন লেগেছে। গতবার এক হাজার ৪০০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়ার পর এবার বড় সাদা এলাচি গত সপ্তাহে তিন হাজার টাকা ছুঁয়েছে।
এফবিসিসিআই এবারও মার্কেট মনিটরিং কমিটি করেছে, যার সমন্বয়ে আছেন প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক, সরকারি ভবন ও রাস্তাঘাটের নির্মাণ ঠিকাদারি এবং চশমার দোকানদারিতে সফল ব্যবসায়ীরা। টিভি ক্যামেরা দাওয়াত দিয়ে, দামি স্যুট-টাই পরে দলবেঁধে কাঁচাবাজার ভ্রমণ ছিল গতবারের মার্কেট মনিটরিং। টিভি ক্যামেরার ক্লোজআপে দোকানির কাছে কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজের দর জানতে চাওয়া ছিল মার্কেট মনিটরিং। এটিকে লোক দেখানো এক অনুষ্ঠানে পরিণত করেছিল সরকার ও ব্যবসায়ীরা। বাজারে প্রভাব রাখতে হলে বাজারের গভীরে যেতে হবে, বাজারের আচরণ বুঝতে হবে প্রতিটি ধাপে। উৎপাদন, আমদানি, মজুদ, সরবরাহ, চাহিদার সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত ও মার্কেট ট্রেন্ডের পেশাদারি বিশ্লেষণই হলো সত্যিকারের মার্কেট মনিটরিং।

ডন সিকিউরিটিজের কার্যক্রম স্থগিত

গ্রাহকদের শেয়ার ও টাকা নিয়ে প্রতারণার অভিযোগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সদস্য ব্রোকারেজ হাউস ডন সিকিউরিটিজের লেনদেন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে গ্রাহকদের টাকা ও শেয়ার ফেরত দিতে। তা না হলে পুঁজিবাজারের আইন অনুযায়ী সদস্যপদ বিক্রি করে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্বনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গতকাল সোমবার ব্রোকারেজ হাউসটিকে চিঠির মাধ্যমে এ নির্দেশ দিয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকেও এ পদক্ষেপের ব্যাপারে অবহিত করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি ডিএসইর উপমহাব্যবস্থাপক ও মনিটরিং দলের প্রধান খন্দকার আসাদ উল্লাহর নেতৃত্বে একটি দল ব্রোকারেজ হাউসটির অস্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর নজর রাখছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় দলটি দেখতে পায়, ব্রোকারেজ হাউসটিতে গ্রাহকদের না জানিয়েই তাঁদের শেয়ার সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এমনকি শেয়ার বিক্রি বা জমা টাকাও তহবিলে নেই।
মনিটরিং দলের তদন্তে বেরিয়ে আসে, সর্বশেষ গত ৬ জুলাই পর্যন্ত ব্রোকারেজ হাউসটির কাছে গ্রাহকদের মোট পাওনা ছিল দুই কোটি ২৫ লাখ ২৪ হাজার ৬৩৭ টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে হাউসের তহবিল ছিল মাত্র ৪০ লাখ ১৬ হাজার টাকার কিছু বেশি। অর্থাৎ, মোট ঘাটতি ছিল দুই কোটি ৬৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
এ ছাড়া একই দিন দুই কোটি ৯০ লাখ ৩৯ হাজার টাকার সমমূল্যের শেয়ারের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। নগদ টাকা ও শেয়ার মিলিয়ে ব্রোকারেজ হাউসটির মোট ঘাটতির পরিমাণ পাঁচ কোটি ৫৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
সূত্র আরও জানায়, বিভিন্ন সময় গ্রাহকেরা টাকা চাইলে ব্রোকারেজ হাউসটি তাদের হাতে চেক তুলে দিয়েছে। কিন্তু গ্রাহকেরা টাকা তুলতে গিয়ে দেখেন, হাউসের গ্রাহক হিসাবে কোনো টাকা নেই।
এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবে যে পরিমাণ শেয়ার থাকার কথা তাও পাওয়া যায়নি। এসব ক্ষেত্রে গ্রাহকদের ব্যাক অফিস থেকে কৃত্রিমভাবে শেয়ারের স্থিতিপত্র বানিয়ে দেখানো হতো। ফলে গ্রাহকেরা মনে করতেন, তাঁদের বিও হিসাবে শেয়ার ঠিকমতোই রয়েছে।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ব্রোকারেজ হাউসটি গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যেই এ কাজ করেছে। এখনই বিষয়টি ধরা না পড়লে হয়তো ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারত। তবে ডিএসইর মনিটরিং দলের চৌকস পদক্ষেপের কারণে সেটি শুরুতেই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ পদক্ষেপ অন্য ব্রোকারেজ হাউসগুলোকেও সতর্ক করবে বলে তাদের বিশ্বাস।
যোগাযোগ করা হলে এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডিএসইর সংশ্লিষ্ট বিভাগের মাধ্যমে বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এটি নিয়ে এসইসিতে আজ আলোচনা হবে। এ ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী যে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এসইসি তাই করবে।’
তবে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ডন সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল হামিদ ভূঁইয়ার প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি।

আর্সেনালে ফিরতে চান অঁরি

স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে নাম লিখিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারের দল নিউইয়র্ক রেড বুলসে। জীবিকার তাগিদে সাগর-মহাসাগর পাড়ি তিনি দিতেই পারেন। কিন্তু থিয়েরি অঁরির মন পড়ে আছে সেই আর্সেনালেই! যে ক্লাবের সঙ্গে তাঁর নাড়িপোঁতা সম্পর্ক, সেই আর্সেনালকে কি ভুলতে পারেন অঁরি?
ভুলতে পারেন না বলেই সুদূর মার্কিন মুলুকে বসেও অঁরি নির্দ্বিধায় বলে বেড়াচ্ছেন, আর্সেনাল তাঁর ভালোবাসা। আর ভালোবাসার টানেই আবার ফিরে আসবেন আর্সেনালে। তবে খেলোয়াড় হিসেবে যে আর কখনোই আর্সেনালের মতো ক্লাবে পা রাখা সম্ভব হয়ে উঠবে না, সেটা ভালো করেই জানেন অঁরি। বয়স ৩৩ হয়ে গেছে, ফুটবলার জীবনের শেষটা প্রায় দেখতেই পাচ্ছেন সাবেক ফরাসি স্ট্রাইকার। ফ্রান্স জাতীয় দলকে বিদায় বলে দেওয়া এবং ইউরোপের রমরমা ক্লাব ফুটবল ছেড়ে তারকাদের ‘নির্বাসনপল্লী’খ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে খেলতে যাওয়াটাও সেই বুঝ থেকেই।
অঁরির তাই স্বপ্ন, অবসরের পরে হলেও ভালোবাসার ঠিকানা আর্সেনালে ফিরবেন তিনি। বিবিসি রেডিও ফাইভকে সাবেক ফরাসি স্ট্রাইকার বলেছেন, ‘জানি না কখন অবসর নেব। তবে অবসরের পর আর্সেনালেই ফিরে যেতে চাইব আমি।’ ১৯৯৯-২০০৭, দীর্ঘ আট বছর খেলে গড়েছেন আর্সেনালের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড (২২৬টি)। বিশ্ববাসীর কাছে তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল আর্সেনালের অঁরি। সেই আর্সেনালে আসার সাধ অঁরির মনে থাকতেই পারে। কিন্তু অবসরের পর পুরোনো ক্লাবে ফিরলেও সেখানে তাঁর ভূমিকাটা কী হবে? অঁরি অবশ্য বলছেন, আর্সেনালে ফিরে পানির বোতল টানতেও রাজি তিনি! ‘আমি আর্সেনালে ফিরতে চাই—এটাই শেষ কথা। সেটা যদি খেলোয়াড়দের জন্য পানির বোতল নিয়ে যাওয়ার কাজও হয়, তবুও আমি রাজি। আমি ক্লাবটিকে প্রচণ্ড ভালোবাসি।’
তাই বলে ভাববেন না, সদ্য ঠিকানা বদল করা নিউইয়র্ক রেড বুলসকে নিয়ে তাঁর কোনো পরিকল্পনাই নেই। অঁরির প্রতিশ্রুতি শুনে বরং রেড বুলস কর্তারাও খুশিতে গদগদ হতে পারেন। অঁরি নিউইয়র্ক বুলসেও জিততে চান শিরোপা, ‘আমি নিউইয়র্কে স্রেফ খেলতেই এসেছি। এখানেও আমি আরেকটি শিরোপা জিততে চাই।’

ঘুরে দাঁড়ানোর আশা পাকিস্তানের

লর্ডস টেস্টে ১৫০ রানের পরাজয়, এরপর টেস্ট থেকে শহীদ আফ্রিদির বিদায়—ঘটনা দুটি পাকিস্তান ক্রিকেট দলের পারফরম্যান্সে কী রকম প্রভাব ফেলবে, সেটা সময়ই বলবে। তবে পাকিস্তানের ক্রিকেট কোচ ওয়াকার ইউনুস এই হইচইয়ের মধ্যেই বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাঁড়াবে পাকিস্তান। আগামীকাল হেডিংলিতে শুরু হবে দুই টেস্ট সিরিজের শেষ ম্যাচ।
লর্ডস টেস্টের পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়েই হেডিংলিতে ভালো করার প্রেরণা পাচ্ছেন ওয়াকার, ‘(লর্ডসে) জয়-পরাজয়ের মধ্যে খুব বেশি ব্যবধান ছিল না। একটু ভাগ্যের সহায়তা পেলে এবং সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারলে পরাজয় এড়ানো সম্ভব ছিল বলে বিশ্বাস করি আমি।’ পাকিস্তান দলের ওপর আস্থা রেখেই ওয়াকার বলছেন, ‘অস্ট্রেলিয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো খেলোয়াড় আমাদের আছে এবং যারা প্রথম টেস্টে ব্যর্থ, আশা করি, হেডিংলিতে তারা তাদের সেরাটা দিতে পারবে।’
হেডিংলি টেস্টের পাকিস্তান দলে পরিবর্তন আসছে। লেগ স্পিনার দানিশ কানেরিয়ার জায়গায় অফ স্পিনার সাঈদ আজমল খেলতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট। আজমলের পক্ষে তাঁদের যুক্তি, অস্ট্রেলিয়ার বেশির ভাগ ব্যাটসম্যানই বাঁহাতি। সাঈদের অফ স্পিন খেলতেই বেশি সমস্যা হবে অস্ট্রেলীয় ব্যাটসম্যানদের। নাম প্রকাশ না করে দলের এক কর্মকর্তা বলছেন, ‘সাঈদ আজমলের দুসরা দেওয়ার দিকে ঝোঁক একটু বেশি। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে এটা বেশ কার্যকর।’
সাঈদ আজমল ছাড়াও হেডিংলি টেস্টে পাকিস্তান দলে দেখা যাবে আরেকটি পরিবর্তন। প্রথম টেস্ট না খেলা শোয়েব মালিক খেলবেন হেডিংলিতে। চোটের কারণে দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে না পারা শহীদ আফ্রিদির জায়গা নেবেন তিনি। হেডিংলি টেস্টে মালিক খেলবেন, কাল এমনটাই জানিয়েছে পাকিস্তানের টিম ম্যানেজমেন্ট।

খ্যাপা রুনি থেকে সাবধান

ওয়েইন রুনি শিগগিরই স্বরূপে ফিরবেন—এ কথাটা গত কিছুদিনে অনেকবারই শুনেছেন। ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ-ব্যর্থতার পর পরই কথাটা বলেছেন তাঁর ক্লাব কোচ অ্যালেক্স ফার্গুসন। আরও অনেকেই পরে তাঁর সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন। এবার রুনির সাবেক ম্যানইউ-সতীর্থ জেরার্ড পিকেও বললেন, রুনি স্বরূপে ফিরবেন।
শুধু রুনি ফিরবেন বলেই চুপ থাকেননি বিশ্বজয়ী স্পেনের ডিফেন্ডার, ক্লাব ফুটবলে ম্যানইউর প্রতিপক্ষদেরও সতর্ক করে দিয়েছেন—খ্যাপা রুনি থেকে সাবধান! ম্যানইউতে একসঙ্গে খেলেছেন বলেই রুনিকে ভালোভাবে জানেন পিকে। ব্যর্থতা রুনিকে কতটা পোড়ায়, সেটা খুব কাছ থেকেই দেখেছেন। এই অন্তর্জ্বালাই রুনিকে জাগিয়ে তোলে।
দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকাকে এই কথাগুলোই বলেছেন পিকে, ‘পরাজয়ে রুনির চেয়ে বেশি হতাশ হতে আমি আর কাউকে দেখিনি। কেউ কেউ মনে করে, ফুটবলাররা টাকা পায় আর খেলে; জয়-পরাজয় তাদের স্পর্শ করে না। কোনো পরাজয়ের পর রুনিকে ড্রেসিংরুমে দেখা উচিত এদের। ওর অবস্থাটা এমন হয়, কেউ হয়তো কথাই বলতে চাইবে না রুনির সঙ্গে। মনে হবে, এই বুঝি ও কান্নায় ফেটে পড়ল।’
জার্মানির কাছে বিধ্বস্ত হয়ে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই ছিটকে পড়েছে ইংল্যান্ড। রুনির নিজের পারফরম্যান্সটাও ভালো হয়নি। সব মিলিয়ে ইংল্যান্ডের এই বিশ্বকাপটা রুনিকে অবশ্যই পোড়াচ্ছে বলে মনে করেন পিকে। আর এটাই নাকি তাঁর থেকে সেরাটা বের করে আনবে।
কেউ সাফল্যের আনন্দস্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে, কেউ ব্যর্থতা ভুলে নিজেদের সতেজ করতে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। রুনিও বেড়াতে গেছেন। তবে আগামী সোমবার থেকেই অনুশীলন শুরু করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন ইংলিশ স্ট্রাইকার। ছুটি কাটাতে গিয়েও রুনি শান্তি পাননি বলেই মনে করেন পিকে, ‘আমার তো মনে হয়, পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে গিয়েও স্বস্তিতে ছিল না ও, বিশ্বকাপ-ব্যর্থতার বেদনা তাকে কুরে কুরে খেয়েছে।’
সব মিলিয়ে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ-ব্যর্থতা ম্যানইউর জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে বলেই বিশ্বাস পিকের, ‘আমার মনে হয়, ইংল্যান্ডের এই বিশ্বকাপ-ব্যর্থতা ম্যানইউর জন্য সৌভাগ্য হয়ে এসেছে। রুনি ম্যানইউর হয়ে ভালো খেলতে চাইবে।’

আছেন মুরালির রক্ষাকর্তাও

মহানায়কের বিদায়কে স্মরণীয় করতে চেষ্টার কমতি রাখেনি ক্রিকেট শ্রীলঙ্কা। ‘মুরালি-বিদায় সংবর্ধনা’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা দেখভাল করছে সব আয়োজন। মুত্তিয়া মুরালিধরন নিজে বিদায়ী টেস্টে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধুকে। এই ভাগ্যবানদের একজন মানদ্বীপ সিং ধিলন। পেশায় অর্থোপেডিক সার্জন, এখন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব স্পোর্টস মেডিসিনের লিয়াজোঁ কমিটির চেয়ারম্যান। মুরালির জন্য তিনি বন্ধুর চেয়ে বেশি কিছু। মানদ্বীপ সিং না থাকলে হয়তো চাকিংয়ের কলঙ্ক মাথায় নিয়ে বছর ছয়েক আগেই ক্রিকেট ছাড়তে হতো মুরালিকে।
২০০৩ সালে অ্যাপোলো হাসপাতালের চাকরি নিয়ে কলম্বো গিয়েছিলেন ধিলন। এ সময় আড়াই বছর কাজ করেছেন শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের ‘স্পোর্টস ইনজুরি উপদেষ্টা’ হিসেবে। বল ছোড়া নিয়ে ওই সময়ই আইসিসির পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছিল মুরালিকে। ধিলনের তৈরি করে দেওয়া বিশেষ এক ধরনের বর্ম পড়েই আইসিসির পরীক্ষাগারে ‘পাস’ মার্ক পেয়ে যান মুরালি। ডেইলি মিররকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের সেই সময়ের স্মৃতিচারণা করেছেন চিকিৎসক মানদ্বীপ, ‘বোলিংয়ের সময় মুরালির বাহুর ওপরের দিকে এবং কবজিতে বাড়তি একটু ঝাঁকি লাগে। এই কারণেই খোলা চোখে মনে হয় সে বল ছুড়ছে। হতে পারে, এটা এক ধরনের দৃষ্টিবিভ্রম। আমি এটাকে (বাড়তি ঝাঁকি) সৌভাগ্য বা সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ কিংবা বিকলাঙ্গতা বলব না। এটা মুরালির জন্মগত, তাঁর বোলিং নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি এ জন্যই।’
ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে কাজের সময় মুরালির সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় মানদ্বীপকে। মুরালিকে খুব কাছ থেকে দেখে একটি বর্ম তৈরি করে দেন তিনি, যে বর্ম প্রমাণ করে, জন্মগত ওই সমস্যা বাড়তি কোনো সুবিধা দিচ্ছে না মুরালিকে। এরপরই আইসিসি চূড়ান্ত বৈধতা দেয় মুরালির অ্যাকশনকে। মানদ্বীপকে তাই বলা যায় মুরালির রক্ষাকর্তা। পেশাগত ব্যস্ততার জন্য গল টেস্টের প্রথম দিনটায় অবশ্য থাকতে পারেননি মানদ্বীপ। তবে উপস্থিত থাকার কথা বাকি চার দিনই।
শুধু মুরালির নয়, এই ভদ্রলোকের কাছে অনেক ঋণ তো ক্রিকেটেরও। তিনি না থাকলে ক্রিকেট নিশ্চিতভাবেই বঞ্চিত হতো স্পিন-জাদুকরের অবিশ্বাস্য সব কীর্তি থেকে!

টুকরো খবর

তবুও পাশে
গাড়ির মডেল নাকি প্রেমিকা—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কোনটি বেশি দ্রুত পাল্টান, এটা নিয়ে একটা কুইজ হতে পারে। এটাও যেমন কুইজের প্রশ্ন—ইরিনা শায়াক এই ফুটবল তারকার কততম প্রেমিকা? সে যা-ই হোক, বাজারে গুঞ্জন, রিয়াল মাদ্রিদের উইঙ্গার আবারও হূদয়ে ‘টু-লেট’ লাগাতে যাচ্ছেন। কারণ রোনালদোর সন্তান। যে সন্তানের মায়ের পরিচয় এখনো ধোঁয়াশায়। এ নিয়েই নাকি রোনালদোর সঙ্গে মনোমালিন্য এই রুশ মডেল-কন্যার। তবে নিন্দুকদের মুখে ছাই দিয়ে শায়াক ছুটে এসেছেন তাঁর প্রেমিকপ্রবরের কাছে। শায়াক ছিলেন মিয়ামিতে, সেখানকার ফ্যাশন উইক সুইম অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। সেখান থেকেই তিনি ছুটে যাচ্ছেন ইউরোপে, রোনালদোর কাছে। ওয়েবসাইট।
দাওয়াতেও দুয়ো
সমর্থকদের দুয়ো থেকে নিষ্কৃতি পেতে ইংলিশ ফুটবলাররা এখন একটা কাজই করতে পারেন, নিজেদের চারদেয়ালের মধ্যে বন্দী করে ফেলা! তা ছাড়া উপায় কী? বেড়াতে গিয়ে, বউ-ছেলেমেয়ে নিয়ে কেনাকাটা করতে গিয়েও না হয় দুয়ো হজম করা যায়! তাই বলে বিয়ের দাওয়াতে গিয়েও দুয়ো শোনা! হতভাগা ডিফেন্ডার অ্যাশলি কোলের ক্ষেত্রে তো ঘটল সেটাই। পাত্র সাবেক আর্সেনাল-সতীর্থ সল ক্যাম্পেবেল আর কনে ফিওনা বারাতের বিয়ের দাওয়াত খেতে কোল গিয়েছিলেন সেন্ট অ্যান্ড্রুস চার্চে। নবদম্পতির জন্য আনন্দ প্রকাশ করেছে সবাই। কিন্তু বিশ্বকাপ নিয়ে ইংল্যান্ড ও ইংলিশদের ব্যাপারে যে মন্তব্য করেছেন কোল, সে জন্য তাঁকে পড়তে হয় তীব্র ক্ষোভের মুখে। বিশ্বকাপের পর কোল নাকি বন্ধুদের খুদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, ‘আমি ইংল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের মানুষদের ঘৃণা করি!’ জবাবটা বিয়ের অনুষ্ঠানেই পেলেন কোল। ওয়েবসাইট।
কর দাও
আইপিএল নিয়ে অনেক অনিয়মের খবরই পাওয়া যাচ্ছে। সব অনিয়মের তদন্ত চলছে। এবার চোখ পড়েছে ক্রিকেটারদের ওপরও। আজকালের মধ্যে যুবরাজ সিংসহ আরও চার ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করবে চণ্ডীগড়ের কেন্দ্রীয় কর বিভাগ। অঙ্কটাও বিশাল—প্রায় সোয়া এক কোটি রুপি! আইপিএলের প্রথম আর দ্বিতীয় মৌসুমে খেলার সুবাদে যুবরাজ, ভিআরভি সিং, সানি সোহাল এবং উদয় কাউলের কাছ থেকে এই পরিমাণ কর বকেয়া পড়ে আছে বলে জানানো হয়েছে। এই ক্রিকেটারদের এর আগেও নোটিশ দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আইপিএলের প্রথম দুই মৌসুমে কোন খাত থেকে তাঁরা কী পরিমাণ আয় করেছেন। কারণ ম্যাচ ফি আর বিজ্ঞাপন বাবদ আয়ের কর সমান নয়। কিন্তু কর বিভাগের সেই নোটিশে সাড়া দেননি এঁরা। খোদ কর বিভাগই একটা কর ধার্য করেছে। ওয়েবসাইট।
গায়েন রোনালদিনহো
নাচতে-গাইতে তাঁকে আগেও দেখা গেছে। তবে সেসবই নৈশক্লাবের পার্টিতে। সাম্বার ছন্দে কত নেচেছেন রোনালদিনহো! এবার ব্রাজিলিয়ান তারকা মাতলেন র‌্যাপের ছন্দে। জনপ্রিয় মার্কিন র‌্যাপার ফিফটি সেন্ট ব্রাজিল সফর করছেন। গত শনিবার রিওতে একটা কনসার্টও ছিল। ওই কনসার্টে ফিফটি সেন্টের আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে মঞ্চে হাজির হন এসি মিলান তারকা। বেশভূষায় রোনালদিনহোকে দেখাচ্ছিল ঠিক যেন ফিফটি সেন্টের ছোট ভাই!

আদালতে ঊষা

গত এপ্রিল মাসে ক্লাব কাপ হকির ফাইনালটি ১৮ মিনিট বাকি থাকতে মোহামেডানকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে ‘দায়’ এড়িয়েছিল ফেডারেশন। কিন্তু ফেডারেশনের ওই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি রানার্সআপ ঊষা ক্রীড়াচক্র। প্রতিবাদে চলমান প্রিমিয়ার ডিভিশন হকি লিগেও অংশ নেয়নি তারা। ফেডারেশনের কাছে বারবার ওই ফাইনালের একটা সুষ্ঠু সমাধান চেয়ে হতাশ ঊষা শেষ পর্যন্ত আদালতে মামলা করে বসে গত ২১ জুন। সেই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে বাইলজ এবং আন্তর্জাতিক হকির আইন অনুসারে দ্রুত ওই ফাইনালের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ২২ জুলাই ফেডারেশনের সিদ্ধান্ত আদালতকে জানাতে হবে। এবং আগামী বছর ঊষা যাতে লিগে খেলতে পারে, সেটি বিবেচনা করতে বলেছেন আদালত। লিগে খেলতে না পারায় তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ঊষাকে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ আছে ফেডারেশনের প্রতি।

ক্যাপেলো দুঃখিত

ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সের কোনো নম্বর ক্যাপেলো দেননি। এসব নম্বর-টম্বর দেওয়ায় তিনি বিশ্বাসও করেন না। তাহলে ইন্টারনেটে ক্যাপেলো সূচক এল কোত্থেকে? ইংল্যান্ডের ইতালিয়ান কোচ আগেই বলেছেন, এটা তিনি জানেন না। ইন্টারনেটে ক্যাপেলো সূচক দেখে খেপেছেন, বিরক্তও হয়েছেন। তাঁর অজান্তেই নাকি করা হয়েছে এসব।
তবে যা ঘটেছে, তা নিয়ে ক্যাপেলো খুবই হতাশ এবং দুঃখিত—বলেছেন তাঁর ছেলে এবং এজেন্ট পিয়ারফিলেপ্পো। ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (এফএ) এরই মধ্যে পিয়ারফিলেপ্পো জানিয়ে দিয়েছে, ক্যাপেলো ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সের কোনো ধরনের মূল্যায়নই কোথাও করেননি। ইন্টারনেটের ওই মূল্যায়ন পাতা থেকে দ্রুতই ক্যাপেলোর নাম সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন ক্যাপেলো-তনয়।

শ্যাম না কুল রাখবেন ফ্যাব্রিগাস

আর্সেনাল না বার্সেলোনা, বার্সেলোনা না আর্সেনাল! শ্যাম রাখি না কুল রাখি! সেস ফ্যাব্রিগাস পড়ে গেছেন এমন মধুর সমস্যায়। শৈশবের ক্লাব বার্সেলোনা হাত বাড়িয়ে ডাকছে তাঁকে, এদিকে আর্সেনালের মায়ার বাঁধন এড়াতে পারছেন না।
ফ্যাব্রিগাসের জন্য আর্সেনালের কাছে ৩ কোটি পাউন্ডের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল বার্সেলোনা। আর্সেনাল এমন লোভনীয় প্রস্তাবেও নির্বিকার। বার্সার নতুন সভাপতি স্যান্দ্রো রোসেল ফ্যাব্রিগাসকে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছেন, ‘এ মৌসুমে আমরা আর সেসকে (ফ্যাব্রিগাস) পাচ্ছি না। ওকে বিক্রি করবে না বলে দিয়েছে আর্সেনাল।’
রোসেল হালছাড়া নাবিক হলেও বার্সেলোনা শিবির এখনো ফ্যাব্রিগাসকে পাওয়ার জন্য আকুল। স্পেনের বিশ্বকাপ ফাইনালের জয়সূচক গোলদাতা এবং বার্সার প্লে-মেকার আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা বলেছেন—বন্ধু ফ্যাব্রিগাসকে সতীর্থ হিসেবে পেলে খুব ভালো হয়। আর কোচ পেপ গার্দিওলা বলেছেন, ‘আমরা তো চাই, সে আসুক, কিন্তু আর্সেনাল যদি সমঝোতা করতে না চায়, তার আসা হবে না।’
তাহলে বার্সেলোনায় আসা হবে না ফ্যাব্রিগাসের? কিন্তু বার্সেলোনার জন্যও তো তাঁর মনের মধ্যে বড় একটা জায়গা আছে। বাড়ির পাশের ক্লাব মাতারো দিয়ে ১৯৯৭ সালে ফুটবলে হাতেখড়ি ফ্যাব্রিগাসের। একই বছরে বার্সেলোনার যুবদলে নাম লেখান। ৬ বছর কাটিয়েছেন বার্সার ‘খামারবাড়ি’খ্যাত এই যুব প্রকল্পে। সেখান থেকেই ২০০৩ সালে আর্সেনালের জার্সি গায়ে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক। এখন তো আর্সেনালের অধিনায়কই তিনি। আর্সেনাল তাদের অধিনায়ককে ছাড়তে চায় না। আর্সেনালের সঙ্গে প্রায় সাত বছরের বন্ধন ছিন্ন করতে চান না ফ্যাব্রিগাস। আবার বালক বেলার ক্লাবের হাতছানিও এড়াতে পারেন না।
ফ্যাব্রিগাসের মনের অবস্থাটা যেন ঠিক ঠিক বুঝতে পারছেন ফ্রান্স ও বার্সেলোনার সাবেক তারকা স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি। বলেছেন, ‘ফ্যাব্রিগাসের মতো অবস্থায় আমি কোনো দিনও পড়তে চাইতাম না। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না কী বলব। তবে আর্সেনালের ভক্ত হিসেবে আমি ফ্যাব্রিগাসকে আর্সেনালেই দেখতে চাইব।’
এদিকে এসি মিলান কর্তারা চাইছেন, এসি মিলানে থেকে যান ব্রাজিলিয়ান প্লে-মেকার রোনালদিনহো। ইতালি ছেড়ে নিজের দেশে পাড়ি জমানোর কথা ভাবছেন বার্সেলোনার সাবেক তারকা। কিন্তু মিলানও চায় না রোনালদিনহো ব্রাজিলে চলে যান।
তবে কোনো মায়ার বাঁধনে নিজেকে জড়াতে চান না রোনালদিনহো। ছুটি কাটিয়ে ব্রাজিল থেকে ফিরছেন তিনি দুটি প্রস্তাব পকেটে নিয়ে। ব্রাজিলের ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গো অনেক আগে থেকেই চাইছে তাঁকে। এর সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে মেজর লিগ সকারে (এমএলএস) ডেভিড বেকহামের ক্লাব লস অ্যাঞ্জেলেস গ্যালাক্সি (এলএ গ্যালাক্সি)।
সব প্রতিরোধ ভেঙে রোনালদিনহো বোধ হয় মিলান থেকে বেরিয়েই যাচ্ছেন। উপায় না দেখে রোনালদিনহোকে ঠেকাতে শেষ ‘ট্যাকল’টি মিলান করেছে এভাবে—যে দলই চায় না কেন, রোনালদিনহোকে পেতে টেবিলে রাখতে হবে ১০ মিলিয়ন ইউরো।
ইতালির আরেক ক্লাব জুভেন্টাস দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলজয়ী ডিয়েগো ফোরলানকে নিতে প্রস্তাব দিয়েছে ২০ মিলিয়ন ইউরোর। তবে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ ছাড়বেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন উরুগুয়ের স্ট্রাইকার, ‘আমার সঙ্গে আরও ৩ বছরের চুক্তি আছে অ্যাটলেটিকোর। আমি এখানে সুখে আছি। এই ক্লাবটিকে আমি খুব ভালোও বাসি এবং এখানেই থেকে যেতে চাই।’
থাকবেন না যাবেন—এই সিদ্ধান্ত ফার্নান্দো তোরেস আর স্টিভেন জেরার্ডের ওপরই ছেড়ে দিয়েছে লিভারপুল। স্পেনের স্ট্রাইকার তোরেসকে পেতে চাইছে চেলসি আর জেরার্ডের ব্যাপারে আগ্রহ আছে রিয়াল মাদ্রিদের। লিভারপুল থেকে দুজনকেই দুই সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।
দলবদলের বাজারে টাকা-পয়সা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এখন ইউরোপের প্রায় সব বড় দলগুলোই। বিশ্বকাপ শেষ, যাঁরা মাঠ মাতিয়েছেন তাঁদের নিয়েই টানাটানিটা প্রবল। এই যেমন বায়ার্ন মিউনিখের ফিলিপ লামের জন্য হাত বাড়িয়েছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানইউ নাকি চাইছে, আলো ছড়ানো জার্মানির আরেক খেলোয়াড় মেসুত ওজিলকেও। তবে ওজিলকে পাওয়ার দৌড়ে তাদের পেছনে ফেলে দিতে পারে রিয়াল মাদ্রিদ।

চাপ নিতেই রিয়ালে মরিনহো

রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হওয়া মানেই নিজেকে পরীক্ষার মধ্যে ঠেলে দেওয়া। কিন্তু হোসে মরিনহোর কাছে এসব কোনো বিষয়? মরিনহো নিজেই বলছেন, চাপকে জয় করতে জানেন বলেই রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি।
কোচ হিসেবে এই পর্তুগিজ কেমন, তা কারও অজানা নয়। তবে অন্যের জানার চেয়েও নিজের জানা থাকাটা জরুরি। কোচ হয়ে যেখানেই গেছেন, পেয়েছেন সাফল্য। দুটি চ্যাম্পিয়নস লিগ, ছয়টি ঘরোয়া লিগের শিরোপাসহ কোচিং ক্যারিয়ারে ট্রফি জিতেছেন ১৬টি। সদ্যই ইন্টার মিলানকে ‘ট্রেবল’ জিতিয়ে আসা মরিনহোও নিজের কাজে খুবই সন্তুষ্ট। আর এই সন্তুষ্টি থেকেই বলছেন, ‘আমি যদি এখন ফুটবল থেকে সরে দাঁড়াই, তা হলেও আমার যে অর্জন, তাতে আমি ইতিহাস হয়ে থাকব।’
কিন্তু রিয়াল তো তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে সাফল্যতৃষিত হয়েই! আট বছর ধরে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারছে না রিয়াল। দুই মৌসুম ধরে জিততে পারছে না লা লিগা শিরোপাও। এবার তাদের আশা, মরিনহোর কাঁধে চেপে করবে শিরোপা উৎসব। মরিনহোও সেটা জেনেই নিয়েছেন দায়িত্ব। আর জানেন বলেই বলছেন, ‘আমি সব সময় যে চাপটা নিতে পছন্দ করি, রিয়াল মাদ্রিদের চ্যালেঞ্জটাও ঠিক তাই।’
লা লিগা এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপাটাই যে টার্গেট, মরিনহোর হাবভাবও বলে দিচ্ছে সেটা। দায়িত্ব নিয়েই নজর দিয়েছেন দলের শক্তিবৃদ্ধির দিকে। আর্জেন্টিনার অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া এবং পেদ্রো লিয়নকে সই করিয়েছেন রিয়ালে। এবার তাঁর ইচ্ছে, রক্ষণের শক্তিবৃদ্ধিতে একজন স্টপার দলে ভেড়ানোর। মরিনহোর চাহিদার তালিকায় আছেন বেনফিকার ডেভিড লুইস, মিলানের থিয়াগো সিলভা, ইন্টার মিলানের মাইকন, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের নেমানিয়া ভিদিচ, পোর্তোর ব্রুনো আলভেসসহ একগাদা নাম।
সাফল্যপিপাসু মরিনহো কাকে দলে পান, সেটা সময়ই বলবে। তবে আর্জেন্টাইন তারকা অ্যাঙ্গেল ডি মারিয়া কোচ-সান্নিধ্য পেয়েই মরিনহোতে মুগ্ধ। বিশ্বখ্যাত কোচ মরিনহো তাঁকে পছন্দ করতে পারেন, এটা বিশ্বাসই হচ্ছিল না তাঁর।