Friday, September 21, 2018

ধর্ষিতার সঙ্গে চিকিৎসকের কথোপকথন -ফেসবুক থেকে নেয়া

একজন ডাক্তার ধর্ষণ নিয়ে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা বললেন...
‘আপা কাগজে একটা আলতাসনো লিখ্যা দেন’- আউটডোরের খালার আবদারে বিরক্ত আমি।
‘রোগী না দেখে আমি কিছু লিখবো না। আগে রোগী আনেন।’ শীতল গলায় জানিয়ে দিলাম।
গুটিগুটি পায়ে অনুপ্রবেশ ঘটলো এক কিশোরীর। শ্যামলা গায়ের রং, মাথায় দুই বেনী। পরনে ঢিলাঢালা ফ্রক, বয়সের তুলনায় বেশ অপুষ্ট। দু’চোখে গভীর অবসাদ।
-কি সমস্যা তোমার?
...কিশোরী নীরব।
-‘আপা ওর প্যাটে বাইচ্চা। চাইর মাস। নষ্ট করতে আইছে।’
আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো !
হিস্ট্রি নিয়ে জানলাম ...
She was gang raped while returning from tutors home!
দুঃখিত আমি এই লাইনটা বাংলায় লিখতে পারলাম না! হাতে আর জোর পাচ্ছিলাম না...
কাঁপা কাঁপা হাতে লিখে দিলাম 'USG of pregnancy profile'
পরে আবার সেই কিশোরীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ফার্মেসির সামনে। আমাকে  দেখে বিব্রত।
মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে ইচ্ছে করেছিল-
তুমি কেন লজ্জা পাচ্ছো? লজ্জা পাবো তো আমরা। মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছি তাই। আমি এই দেশের, এই সমাজের একজন অক্ষম, নিষ্ক্রিয় সদস্য লজ্জা তো আমাদের প্রাপ্য।
ঘটনা : ২
সেদিন ছিল মঙ্গলবার। এডমিশন রুমে মধ্যবয়সী এক লোকের প্রবেশ।
-কি সমস্যা?
-আপা আমার মাইয়াডা ধর্ষণ হইছে। অবস্থা খুব খারাপ, আপা। মামলা করুম না। শুধু একটু চিকিৎসা দ্যান।
And it was another case of gang rape by neighbors...
রোগীকে আনতে বলা হলো ।
না না! সে কোনো উত্তেজক পোশাক পরা সুন্দরী নন। ৫ বছরের মেয়ে শিশু, মায়ের  কোলে চড়ে এসেছে। শিশুর! দু’চোখে পানি। আর আমার বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ ...!
পরিশিষ্ট :::
*** যদি আপনার পরিবারে ০ থেকে ৯০ বছরের কোনো নারী সদস্য থেকে থাকে, তবে লেখাটি আপনার জন্যই।
*** আপনার কন্যা শিশুটিকে প্রতিবেশী, গাড়ির ড্রাইভার, বাবার বন্ধু, মায়ের কলিগ, মামার ক্লাসমেট টাইপের কারো কাছে আপনার অনুপস্থিতিতে যেতে  দেবেন না।
*** আপনি যখন রাস্তায় কোনো  মেয়েকে দেখে চোখের ব্যায়ামটা সেরে নিচ্ছেন, আপনার পরিবারের কোনো নারী সদস্য হয়তো তখন হয়রানির শিকার হয়ে বাড়ি ফিরছে।
***আজ থেকে নতুন করে ভাবুন। আপনার আশেপাশের নারীদের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? এবং নিজ পরিবারের নারী সদস্যদের প্রতি অন্য পুরুষের কেমন আচরণ আপনি আশা করছেন?
লেখা: ডা. তাহসিনা হায়দার

ভেষজের কারিগর ডালেশ্বর গ্রাম by রায়হানুল ইসলাম আকন্দ

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের সাতখামাইর বাজার পেরিয়ে এক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকলে ডালেশ্বর গ্রাম। গ্রামে প্রবেশের পরই চোখে পড়বে খলা (উন্মুক্ত জায়গা)। এর পাশে নারী-পুরুষ একসঙ্গে বসে কাটছে ভেষজ উদ্ভিদ। এরপর সেগুলো রোদে শুকাতে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ ঘণ্টা পরপর রোদে শুকাতে সেগুলো উল্টে-পাল্টে দিচ্ছেন।
ডালেশ্বর গ্রামে বাসিন্দারা ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ করছে। ভাওয়াল বনের ভেতর থেকে তারা বনজ লতা-পাতা, গুল্ম সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করেন। পরে সেগুলো দেশের নামকরা বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানিতে সরবরাহ করেন। এ গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের জীবিকা নির্ভর করে বনজ তথা ভেষজ উদ্ভিদ প্রক্রিয়াকরণের ওপর।
দুপুরের পর থেকে খলার দৃশ্যপট পাল্টে যায়। লতা-গুল্ম নিয়ে খলায় ঢুকছে রিকশা ভ্যান। এ গ্রামের বিভিন্ন খলার চিত্রগুলো ঠিক একই রকম। কোনও কোনও খলা নিরাপত্তার জন্য প্রাচীরঘেরা।
খলায় শুকানো হচ্ছে ভেষজ গাছ, পাতা
খলায় শুকানো হচ্ছে ভেষজ গাছ, পাতা
ডালেশ্বর গ্রামের আব্দুল কাদির মিয়ার (৭০) বাবা ৬০ বছর আগে এ কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘৬০ বছর আগে আমার বাবা ওয়াহেদ আলী মিয়া এ এলাকায় সর্বপ্রথম ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহের কাজটি শুরু করেন। তখন ভাওয়ালের বন অনেক গভীর ছিল। তখন নানা প্রজাতির লতাপাতা, গাছপালার অভাবই ছিল না। বাবার সঙ্গে ভেষজ সংগ্রহের কাজ করতে গিয়ে নিজেই এ কাজে জড়িয়ে পড়ি। ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য। আমার ছেলেও একাজের সঙ্গে যুক্ত।’
কাদির মিয়ার প্রতিবেশী আব্দুল মান্নান বলেন, কমপক্ষে ৪০ বছর আগে ওয়াহেদ আলী মিয়ার দেখাদেখি তার বাবাও এ পেশায় যুক্ত হন। ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করে এখন জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। দিনে দিনে ভেষজ সংগ্রহের কাজটি ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামে। তার মতো অনেকেই যুক্ত হন ভেষজ সংগ্রহের কাজে। প্রত্যেকেই পরিবারের সব সদস্যদের এ কাজে নিয়োজিত করেন।
খলায় কাজ করছেন শ্রমিকরা
খলায় কাজ করছেন শ্রমিকরা
ভেষজ ব্যবসায়ী আবদুল মান্নান বলেন, ‘পৈত্রিক সূত্রে এ কাজে যুক্ত হয়েছি। গাজীপুরের ভাওয়াল বনাঞ্চল ছাড়াও ময়মনসিংহ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল জেলার বনাঞ্চল থেকে ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করা হয়। যারা বন থেকে এগুলো সংগ্রহ করেন তাদেরকে অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়। পরে সেগুলো সংগ্রহ করে খলায় জমা করেন। ওজন ও পরিমাপ করে কম হলে টাকা ফেরত পাই। আর বেশি হলে আরও টাকা দেই।’
ডালেশ্বর গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের শতাধিক মানুষ ভেষজ উদ্ভিদ সংগ্রহের কাজ করেন। প্রায় প্রতিদিন বন থেকে তারা এসব সংগ্রহ করেন।
দরগাহচালা গ্রামের আজম আলী বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে ভ্যানগাড়ি নিয়ে বিভিন্ন বনে, রাস্তার পাশে, বিল, পুকুর, নদীর পাড় থেকে লতপাতাগুলো সংগ্রহ করি। সারাদিনে  সর্বোচ্চ দুটি ভ্যানগাড়ি ভর্তি করা য়ায়। পরে এগুলো ব্যবসায়ীদের খলায় নিয়ে মণ হিসেবে বিক্রি করি।’
খলায় নিয়ে আসা হয়েছে ভেষজ গাছ, লতাপাতা
খলায় নিয়ে আসা হয়েছে ভেষজ গাছ, লতাপাতা
একই গ্রামের আব্দুস শহীদ বলেন, ‘যে উদ্ভিদ বেশি পাওয়া যায় তার দাম তুলনামূলক কম। যেটি দূর দূরান্ত থেকে সংগ্রহ করা হয় তার দাম একটু বেশি। যেমন নিমপাতা, বেলপাতা, শিশু পাতা ৫০০ টাকা মণ দরে ব্যবসায়ীদের সরবরাহ করি। আমলকি, বহেরা দুই বা আড়াই হাজার টাকা মণ, হরিতকি, নিশিন্দা, কালো মেঘ, অর্জুন ছাল, এরকম ভেষজ জিনিসগুলোর দাম একটু বেশি। ৪-৫ হাজার টাকা মণ দরে এগুলো সরবরাহ করে থাকি।’
ডালেশ্বর গ্রামের ভেষজ খলার মালিক রাশিদা বলেন, তার খলায় লতাপাতা প্রক্রিয়াকরণে ২০ জন লোক কাজ করে। কেউ কাটাকুটি, কেউ শুকানো, কেউ আবার বস্তাভর্তি করাসহ নানা প্রক্রিয়ার কাজে নিয়োজিত। তাদের মজুরি দেওয়া হয় মণ হিসেবে। সংগৃহীত একেক ভেষজের জন্য একেক হিসেবে মজুরি দেওয়া হয়।
আরেক খলার মালিক মনির হোসেন বলেন, খলায় ভেষজ শুকাতে গেলে নানা সমস্যা হয়। মানুষ, গরু, ছাগল খলায় ঢুকে ভেষজ উপাদান নষ্ট করে ফেলে। খলার মেঝে পাকা থাকলে প্রক্রিয়াকরণ সহজ ও সময় কম লাগে।

এক নারী দেহরক্ষীর গোপন জীবন

যুক্তরাজ্যের প্রথম নারী দেহরক্ষী হিসাবে কাজ শুরু করেন জ্যাকুইন ডেভিস, যিনি রাজপরিবারের সদস্য এবং অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের জন্য কাজ করেছেন। তার ৩০ বছরের পেশাজীবনে অনেক জিম্মি মুক্ত করেছেন এবং গোপন নজরদারি করেছেন।
কিন্তু কেমন ছিল তার সেই জীবন?
জ্যাকুইন বলছেন, ''যখন আমি প্রথম এই পেশায় আসি, তখন এটা ছিল পুরোপুরি পুরুষ কেন্দ্রিক একটি জায়গা। তারা সবসময়ে চাইতো আমি যেন শুধু নারী বা শিশুদের বিষয়গুলো দেখভাল করি-যা ছিল খুবই অদ্ভুত। যেন তারা সবাই আমার বাবা।''
১৯৮০ সালে পুলিশ বিভাগে চাকরিতে ঢোকার কিছুদিন পরেই জ্যাকুইন বেসরকারি নিরাপত্তা খাতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ এটা তাকে নানা ধরণের কাজের সুযোগ দেবে।
পেশার কারণে তিনি বিশ্বের নামীদামী পাঁচ বা ছয় তারকা হোটেলে থেকেছেন। তিনি বলছেন, ''কিন্তু প্রতিদিনই ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করার পর সেসব উপভোগের সময় থাকেনা। ''
এর বাইরে একজন দেহরক্ষীকে সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় তার ব্যক্তিগত জীবনের। ''আপনি হয়তো আট-দশ সপ্তাহ বাড়িতেই যেতে পারবেন না।''
যখন আগেভাগে পরিকল্পনা করে ক্লায়েন্টদের জীবনের ঝুঁকি দূর করতে হয়, তখন সেটি সিনেমা বা নাটকের চেয়েও নাটকীয় হয়ে ওঠে।
অপহরণের শিকার কয়েকজন তেল কর্মীকে উদ্ধার করতে গিয়ে নজরদারির অংশ হিসাবে জ্যাকুইনকে ইরাকের রাস্তায় বোরকা পড়ে ঘুরতে হয়েছে।
একটি উদ্ধার অভিযানের কাহিনী
''একবার আমাদের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধাওয়া করেছিল এবং আমরা কাশ্মীরে ঢুকে পড়ি। কাশ্মীরের বিদ্রোহীরা পাকিস্তানি সেনাদের দিকে গুলি ছুড়তে শুরু করলে আমরাও তার মধ্যে পড়ে যাই।'' বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের বিজনেস ডেইলির কাছে একটি ঘটনা বর্ণনা করছিলেন জ্যাকুইন।
সদ্য বিবাহিত স্বামীর সঙ্গে পাকিস্তানে যাওয়া ২৩ বছর বয়সী একজন ব্রিটিশ নারীকে উদ্ধার করতে নিজের দল নিয়ে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন জ্যাকুইন।
ব্রিটেনে থাকা তার মা জানতে পারে, যে পাকিস্তানে তাকে আটকে রাখা হয়েছে। তখন তিনি মেয়েকে উদ্ধারের জন্য জ্যাকুইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
যে ভিলায় তাকে আটকে রাখা হয়েছিল, একরাতে জ্যাকুইন সেখানে প্রবেশ করে তাকে বিছানার সঙ্গে হাতকড়া লাগানো অবস্থায় দেখতে পান।
''সে আমাদের জানায়, সে তিনমাসের অন্তঃসত্ত্বা। তাকে ধর্ষণ করা হচ্ছে, খেতে দেয়া হয়না এবং মারধর করা হচ্ছে। আমি তখন তাকে বললাম, আমি আবার আসবো এবং তোমাকে নিয়ে যাবো।''
কিন্তু হঠাৎ একটি ফোন কলে তারা জানতে পারেন যে, তাদের পরিচয় ফাঁস হয়ে গেছে।
''বেনজির ভুট্টোর জন্য আমি একসময় কাজ করেছি। তিনি আমাকে চিনতে পারেন এবং ধারণা করেন, নিশ্চয়ই আমি কাউকে উদ্ধার করার জন্য এখানে এসেছি।''
এর মানে, তাদের খুব দ্রুত কাজ করতে হবে।
''একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে ঘুষ দিয়ে আমরা বাড়িটির গেট ভেঙ্গে প্রবেশ করি'' তিনি বলছেন। এরপর সেই মেয়েটিকে উদ্ধার করে পাহাড়ি পথ ধরে একটি গাড়িতে করে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু পাকিস্তানি আর্মি তাদের ধাওয়া করে।
তারপর তারা ভারত হয়ে সেই মেয়েকে ব্রিটেনে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।
জ্যাকুইন বলছেন, গত ৩০ বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেক নারী এই পেশায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে, যদিও পুরো যুক্তরাজ্য জুড়ে নারী দেহরক্ষীর সংখ্যা এখনো মাত্র ১০জন।
জ্যাকুইন বলছেন, দেহরক্ষী হিসাবে যারা কাজ করবেন, তাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, তারা ক্লায়েন্টের বন্ধু নন। ''তাহলেই আপনার দৃষ্টি পরিষ্কার থাকবে আর যখন দরকার হবে, তখন আপনি ঠিক পদক্ষেপ নিতে পারবেন।''
দেহরক্ষী বলতে যেরকম কালো চশমা পড়া একজন কাউকে মানুষ বুঝে থাকে, বাস্তবে সেটা নাও হতে পারে, বলছেন জ্যাকুইন। বরং তার পোশাকের চেয়ে মস্তিষ্ক অনেক বেশি খাটাতে হয়।
হয়তো তাকে নামী রেস্তোরায় ক্লায়েন্টের সঙ্গে বসে খেতে হয়, বিখ্যাত ক্লাবে বিকালের নাস্তায় ঠিক পোশাকে এবং আদবকায়দার সঙ্গে চা খেতে হয়। বিশ্বের চলমান নানা বিষয়ে কথা বলার জন্য খোঁজখবর রাখতে হয়।
এই পেশার ঝুঁকির বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছেন না জ্যাকুইন। কিন্তু তিনি বলছেন, ''কোন চাকরি নিয়েই তো আর উদ্বেগে থাকা যায় না।''
জ্যাকুইন ডেভিসের এই জীবন নিয়ে একটি চলচ্চিত্র বানানোর পরিকল্পনা করছে নেটফ্লিক্স।
সূত্র: বিবিসি

মানবাধিকার ও নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে দুই সংস্থার উদ্বেগ

বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হওয়া এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের উপযোগী পরিবেশ না থাকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ফোরাম এশিয়া) ও এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন্স (এএনএফআরইএল) নামে দু’টি মানবাধিকার সংস্থা। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ঢাকায় ৭ থেকে ১০ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একটি  ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ পরিচালনা করা হয়। এ সময় যেসব সাক্ষ্য ও উপাত্ত পাওয়া গেছে, সেসবের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপযোগী পরিবেশ না থাকা নিয়ে সর্বোচ্চ উদ্বেগ প্রকাশ করে সংস্থা দু’টি।
বাংলাদেশে মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নজিরবিহীন আক্রমণের সম্মুখীন- এই যুক্তির স্বপক্ষে সংস্থা বেশকিছু যুক্তি তুলে ধরেছে। 
শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ আয়োজনের স্বাধীনতা লঙ্ঘন নিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার ও সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে আয়োজিত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অত্যধিক মাত্রায় বলপ্রয়োগ ছিল মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ আয়োজন ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারের লঙ্ঘন।
এতে বলা হয়, প্রায় শতাধিক ব্যক্তি, যাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী, ২৯শে জুলাই থেকে ১৫ই আগস্টের মধ্যে আটক হয়। বিভিন্ন পুলিশ স্টেশনে কমপক্ষে ৫২টি মামলা দায়ের করা হয়। ৫ হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে সহিংসতা সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়।
সংস্থা দু’টি লিখেছে, তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইন, বিশেষ করে আইনটির অস্পষ্ট ৫৭ ধারার মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পদ্ধতিগতভাবে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। ৫৭ ধারার অধীনে প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও সমাজকর্মী শহীদুল আলমের অবৈধ গ্রেপ্তার প্রমাণ করে বাংলাদেশে অনলাইন ও অফলাইনে মতামত প্রকাশ ও সরকারের সমালোচনা করার অধিকার বেশ সীমিত।
কেবল ২০১৮ সালের ৩১শে আগস্ট নাগাদ, মোট ১২৮ জনকে আইসিটি আইনে আটক করা হয়েছে। ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথিত মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করার অভিযোগে।
আইসিটি আইনকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে অতিরিক্ত ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। কারণ, এই আইনটির অনেক ধারার ব্যাপকতা অত্যন্ত বেশি এবং সাজার হারও আনুপাতিকভাবে বেশি।
মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার হরণ হয়েছে- এমন বক্তব্যও দিয়েছে  ফোরাম এশিয়া ও এএনএফআরইএল। বিবৃতিতে বলা হয়, এই বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট নাগাদ ৩৬৭টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নথিবদ্ধ হয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগই সংঘটিত হয়েছে পুলিশ ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)-এর হাতে। ২০০৯ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত মোট ১৮২২ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এই বছরের মে থেকে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী যুদ্ধে ২২৮ জন বিচারবহির্ভূতভাবে খুন হয়েছেন।
২০১৮ সালের ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত ২৭ জন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহ গুম করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৯ থেকে ৪৪২ জনের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। এদের মধ্যে সাবেক কূটনীতিক মারুফ জামান সহ উঁচুমাপের সাবেক কর্মকর্তারাও রয়েছেন।
‘ভিন্নমত ও সুশীল সমাজের ওপর দমনপীড়ন’ শীর্ষক অংশে বলা হয়েছে বিচারিক হয়রানি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম এই দেশে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে। ফলশ্রুতিতে সুশীল সমাজভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও বিরোধী দলের সদস্যরা বিশেষ হুমকির মুখে রয়েছেন।
বিভিন্ন সংস্থার দ্বারা আর্থিক সংস্থান বন্ধ করা, আইনি হেনস্তা, নজরদারি, ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে সুশীল সমাজের অবস্থান ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে। সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের বাসায় ৪ঠা আগস্ট আক্রমণ করা হয়। এ ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে বাংলাদেশে মানবাধিকার কর্মীরা কী ধরনের ভয়ের পরিবেশে কাজ করছেন।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে সংস্থা দু’টি লিখেছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাতন্ত্র্য ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক বিশ্বাসহীনতা আমরা নথিবদ্ধ করেছি। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, যিনি ২০১৭ সালের অক্টোবরে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন বলে খবর এসেছে, তার বিষয়টি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও দেশে গণতন্ত্রের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি করে।
এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনে সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের উপযোগী পরিবেশ থাকার প্রশ্নে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সংকট নিরসনে ফোরাম এশিয়া ও এএনএফআরইএল বাংলাদেশ সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বিভিন্ন আহ্বান জানিয়েছে। সরকারের প্রতি ৫৭ ধারা বিলোপ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করা, শহিদুল আলম সহ সকল আটককৃত প্রতিবাদকারীকে মুক্তি দেয়া, সকল ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে বাধা না দেয়া এবং ৯০ দিনের মধ্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করতে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানানো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার, নিরপেক্ষতা নিশ্চিত, সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা, সরকারকে সকল ধরনের মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের পরামর্শ দেয়া এবং দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সুশীল সমাজের প্রচারাভিযানে সমর্থন দিতে বলা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কাঠামো ব্যবহার করে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরা অব্যাহত রাখা, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো, মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির দিকে ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে ভারতের এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে বলেও মন্তব্য করা হয় বিবৃতিতে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে এই দেশগুলোকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে বলা হয়েছে।

সৌদি থেকে ফিরে আসা নারীদের মুখে লোমহর্ষক বর্ণনা by রোকনুজ্জামান পিয়াস

হাতে হলুদ রঙের একটি ছোট পলিথিন ব্যাগ।এরমধ্যে একসেট পুরোনো জামাকাপড়। ধীর পায়ে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে আসলেন। চেহারায় অসুস্থতার ছাপ। যেন নড়াচড়ার শক্তি হারিয়েছেন।কোথা থেকে আসছেন- জিজ্ঞেস করতেই, অনেকটা ভাবলেশহীনভাবে চেয়ে থাকলেন। এরপর অনেকটা বিরক্তি নিয়েই বললেন, সৌদি থেকে। কণ্ঠে ক্ষোভ আর চোখে-মুখে হতাশা। চোখ ছলছল করছে। আর কিছু জিজ্ঞেস করতেই হাঁটা দিলেন সামনের দিকে। তবে যাওয়ার সময় বললেন, পারলে সৌদিতে আর মেয়ে মানুষ পাঠাইয়েন না।
ওরা বহুত খারাপ। আমাদেরকে মানুষই মনে করে না। যা ইচ্ছা, তাই ব্যবহার করে। চল্লিশ পেরোনো এই নারীর বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায়। মাস ছয়েক আগে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরব গেছেন। বেতন পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো কপালে জুটেছে অমানসিক নির্যাতন। মঙ্গলবার রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একে-৫৮৪ নম্বর ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান এই নারী। এর আগে সৌদির গৃহকর্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন দেশটিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের রিয়াদস্থ সেইফ হোমে।
সৌদি আরব যাওয়ার সময় যে কাপড়ে গিয়েছিলেন, সেই কাপড়েই ফিরেছেন তিনি। তার সঙ্গে একই ফ্লাইটে দেশে ফিরেছেন আরো ৪২ নারীকর্মী। যারা প্রত্যেকেই একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন। এদের একজন লুৎফা খাতুন। তিনি বলেন, তাকে ১২ দিন ধরে একটি কক্ষে আটকে রেখেছিল গৃহকর্তার ছেলে। পরে মৃত্যুমুখে পতিত হলে তাকে রাস্তায় ফেলে আসা হয়। সেখান থেকে উদ্ধার করে সেইফ হোমে রেখে আসে পুলিশ। তিনি প্রায় একবছর কাজ করলেও গৃহকর্তা কোনো বেতন দেননি। ফেরত আসা নারীদের অভিযোগ, তারা নিয়মিত বেতন পাননি, ঠিকমতো খেতে দেয়া হয়নি। এ ছাড়া সবারই অভিযোগ, মালিকের হাতে মারধরসহ নানাধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার এই নারীদের দেশে ফেরার সময় বিমানবন্দরে তাদের সার্বিক সহযোগিতা দেয় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন, বোর্ডের সহকারী পারিচালক জাহিদ আনোয়ার, তানভীর আহমেদ, উপসহকারী পরিচালক আবদুল কাদেরসহ অন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এ ছাড়া ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে ফেরত আসা এ  নারীদের প্রত্যেককে খাবার সরবরাহ করা হয়। দূরের নারীকর্মীদের আশকোনাস্থ ব্র্যাকের লার্নি সেন্টারে থাকার ব্যবস্থা করা হয়।
বিএমইটির তথ্যমতে, গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে এ পর্যন্ত আড়াই লাখেরও বেশি বাংলাদেশি নারী সৌদি আরবে গেছেন। ১৯৯১ সাল থেকে দেশটিতে নারী কর্মীরা যাওয়া শুরু করে। তবে ব্যাপকভাবে শুরু হয় ২০১৫ সালের পর থেকে। ওই বছর ২০ হাজার ৫২ জন নারীকর্মী দেশটিতে যায়। এরপর থেকে প্রতিবছরই এ সংখ্যা বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে ৬৮ হাজার ২৮৬ জন, ২০১৭ সালে ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন নারীকর্মী সৌদি আরব যান। আর চলতি বছরের প্রথম ৮ মাসে দেশটিতে নারীকর্মী গেছেন ৪৯ হাজার ৬৪০ জন।
এদিকে নারীকর্মী যাওয়ার পর থেকেই অতিরিক্ত কাজ করানো, মারধর, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ আসতে থাকে। এসব কারণে দেশটিতে ফিলিপাইন, নেপাল এবং ইন্দোনেশিয়া তাদের নারীকর্মী পাঠানো বন্ধও করে দেয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশি নারীকর্মীদের চাহিদা বাড়ে দেশটিতে। কিন্তু নারীদের ওপর নির্যাতন হবে না- এমন শর্তে বাংলাদেশ কর্মী পাঠালেও বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং ফেরত আসা নারীদের ভাষ্যমতে, নির্যাতন থেমে নেই। সংশ্লিষ্ট গৃহকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই নির্যাতনের কারণ কেউ জানতে পারে না।
এমনকি বাংলাদেশ দূতাবাসেরও তেমন কিছু করার নেই এক্ষেত্রে। জানা গেছে, বিভিন্ন সময় গৃহকর্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা নারীরা দেশটির বাংলাদেশ দূতাবাসের রিয়াদ ও জেদ্দার দুটি সেইফ হোমে আশ্রয় নেন। ফিরে আসা নারীরা জানান, প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০-৬০ জন নারী সেখানে আশ্রয় নেন। বর্তমানে শুধু রিয়াদের সেইফ হোমেই রয়েছে দুই শতাধিক নারী গৃহকর্মী।  
মঙ্গলবার রাতে কথা হয় ফেরত আসা নারী নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার বাসিন্দা লুৎফা খাতুনের সঙ্গে। তিনি জানান, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তার গ্রামের দালাল জয়নালের মাধ্যমে সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে যান। কিন্তু যে বাসায় তাকে কাজ দেয়া হয় সেই বাসার মালিক, মালিকের স্ত্রী এবং ছেলে প্রায় প্রতিদিনই নানা কারণে মারধর করতো। খেতে দিত না। এতে করে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময়ে তাকে চিকিৎসাও করায় নি। বাড়ির সব কাজ তাকেই করতে হতো। অনেক সময় মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হতো। কিন্তু গত একবছরে এক মাসের বেতনও তাকে দেয়া হয়নি। বেতন চাইলে মাঝে মাঝে গৃহকর্তার স্ত্রী কাগজে তার সই নিতো। কিন্তু টাকা দিতো না।
তিনি বলেন, গৃহকর্তার ছেলে ছিল খুবই খারাপ। তাকে নানা কারণে প্রায়ই মারধর করতো। তাদের এই নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালিয়ে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারেননি। লুৎফা খাতুন জানান, ২ মাস আগে একদিন তাদের কাপড়চোপড় ইস্ত্রি করছিলাম। এ সময় গৃহকর্তার ছেলে মিথ্যা ও তুচ্ছ কারণে তাকে মারধর করে। তিনি বলেন, ওইদিন মাগরিবের সময় থেকে এশা পর্যন্ত তাকে একটানা মারধর করে। রড দিয়ে বেধড়ক পেটায়, উপর্যুপরি লাথি মারতে থাকে।
ওইদিনের বীভৎসতার কথা বলতে গিয়ে লুৎফা খাতুন কেঁদে ফেলেন। তার সারা শরীরে আঘাতের ক্ষত রয়েছে বলে জানান। এ সময় তিনি হাতের আঘাতের চিহ্ন দেখান। লুৎফা বলেন, ‘ওইদিন পালিয়ে যাওয়ার সময় গৃহকর্তার ছেলের খালাতো ভাই আমাকে দেখে ফেলে। পালাতে বাধা দেয়। পরে নির্যাতনের কথা জানিয়ে পা জড়িয়ে ধরি। তিনি আমাকে একটি বাসায় নিয়ে গিয়ে গৃহকর্তার ছেলেকে খবর দেন। সেখানেও তাকে মারধর করে। এ সময় গৃহকর্তার ছেলেকে তিরস্কার করে ওই আশ্রয়দাতা। তিনি বলেন, সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় গৃহকর্তার মায়ের বাড়িতে।
সেখানে দোতলার একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। সেই ঘরে একদিন কেটে যাওয়ার পরও তাকে কোনো খাবার দেয়া হয়নি। পরদিন ওই বাসায় এক কাজের মহিলা বিষয়টি টের পেয়ে গোপনে খাবার দেয়। এরপর ওই রুমে আরো ১২ দিন রাখা হয় তাকে। কিন্তু এর মধ্যে একদিনও তাকে খাবার দেয়া হয়নি। অবশেষে ১২ দিন খাবার না খাওয়ায় তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। তার নড়াচড়ার শক্তি ছিল না। পরে নিশ্চিত মৃত্যু হবে মনে করে তাকে রাস্তায় ফেলে আসে। সেখান থেকে দুই ব্যক্তি উদ্ধার করে পুলিশের কাছে নিয়ে যায়। থানায় তাকে খাবার দেয়া হয়। পুলিশ সব কথা শুনে তাকে সফর জেলে পাঠায়। সেখানে একমাস অবস্থানের পর মঙ্গলবার দেশে পাঠানো হয়।
একই ফ্লাইটে ফেরা নরসিংদীর শিল্পী রানী শাহা বলেন, তিনি রিয়াদের সেইফ হোমে ছিলেন। বলেন, তাদের সঙ্গে মানসিক ভারসাম্য এক নারী আসছিলেন। কিন্তু দুবাই বিমানবন্দর থেকে তাকে আর পাওয়া যায়নি। তার খবর কেউ বলতে পারছেন না। তিনি জানান, প্রতিদিনই সেইফ হোমে নির্যাতিত নারীরা আসছেন। তারা আসার আগেও প্রায় ৫০ জন নতুন করে এসেছে। এ ছাড়া আরো দুই শতাধিক নারীকর্মী রিয়াদের সেইফ হোমে অবস্থান করছেন।
এদিকে মঙ্গলবার রাতে বিমানবন্দরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট ওই ফ্লাইট ছাড়াও বিভিন্ন ফ্লাইটে অনেক নারীই ফেরত আসছেন। বিমানবন্দরে কর্মরত সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্য নারী ফেরত আসেন। কিন্তু সেসব খবর অনেকেই জানেন না।

সিনহার বই নিয়ে বাহাস

সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার লেখা বই নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। এ নিয়ে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।
এস কে সিনহার লেখা-‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল’, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ শীর্ষক বইটি এরই মধ্যে বিপুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী সাবেক এই প্রধান বিচারপতি  লিখেছেন, ক্ষমতাসীন সরকারই তাকে পদত্যাগে এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য  করেছে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তিনি (বিচারপতি সিনহা) সাবেক হয়ে গেছেন। সাবেক হওয়ার অন্তর্জ্বালা আছে।
কী পরিস্থিতিতে সাবেক হয়েছেন তা সবাই জানে। বই লিখে মনগড়া কথা বলবেন বিদেশে বসে, সেটা নিয়ে কথা বলার কোনো প্রয়োজন আছে? এখন বইতে যা লিখেছেন, তখন তা বলার সৎ সাহস একজন বিচারপতির কেন ছিল না? এখন বিদায় নিয়ে কেন পুরানো কথা নতুন করে বলছেন, যা খুশি তাই বলছেন। এখন বিদেশে বসে আপন মনে ভুতুড়ে কথা ছাপছেন। এটা আমাদের ও দেশের মানুষের বিশ্বাস করতে হবে? বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন।
অন্যদিকে, বিএনপি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ বলেছেন, এস কে সিনহার বক্তব্যে পরিষ্কার বন্দুকের নলের মুখে সরকার বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণে নিয়েই সাজানো মামলায় রায় দিয়ে খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করে এক নম্বর মিশন কার্যকর করেছে। এখন দুই নম্বর মিশন কার্যকর করতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ১০ই অক্টোবর দেয়া হবে। নির্বাচনের আগে এ মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণা সুপরিকল্পিত নীলনকশারই অংশ।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই শীর্ষ স্থানীয় নেতার মন্তব্য ছাড়াও এস কে সিনহার বইটি নিয়ে তোলপাড় তৈরি হয়েছে দেশে-বিদেশে। নানা সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকার দিয়েও খোলামেলা কথা বলেছেন বিচারপতি সিনহা। ৬১০ পৃষ্ঠার বইয়ে কী লিখেছেন তিনি? খোঁজ করছেন আগ্রহী পাঠক। আত্মজীবনীর ঢঙে লেখা বইটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পর্ব বিচার বিভাগ থেকে তার বিদায় পর্বটি। এ বইয়ের শুরুতে বিচারপতি সিনহা লিখেছেন, বিচার বিভাগ একটি রাষ্ট্রের অপরিহার্য এবং অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এবং এর স্বাধীনতা একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে আবির্ভূত বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে গণতন্ত্রকে সংবিধানে রাষ্ট্রীয় নীতির একটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। এবং সংবিধান নির্বাহী  বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। ১৯৭৪ সাল থেকে বিচার বিভাগের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার বয়ানের পর এস কে সিনহা ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর সৃষ্ট পরিস্থিতির ব্যাপারে আলোকপাত করেন।
তিনি লিখেছেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতিদের সর্বসম্মত রায়ে শাসন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রবণতা সম্পর্কে দেয়া পর্যবেক্ষণ সাধারণ নাগরিক এবং সুশীল সমাজের প্রশংসা পায়। দেশি এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ রায়। তবে ধারাবাহিকভাবে দুঃখজনক ও অভূতপূর্ব কিছু ঘটনা ঘটে যা বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে। রায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে সংসদ একটি প্রস্তাব পাস করে। প্রধানমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা সংসদে তার সমালোচনায় মুখর হন। এস কে সিনহা লিখেছেন, ২০১৭ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে ঐতিহাসিক এক রায় দেয়ার পর বর্তমান সরকার আমাকে পদত্যাগ করতে এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। ওই সময় তাকে বাসভবনে আটকে রাখা হয় এবং আইনজীবী ও বিচারপতিদেরকে তার সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন এস কে সিনহা। কীভাবে তাকে ছুটিতে যাওয়ার, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এবং বিদেশে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বইতে সে ব্যাপারেও বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন এস কে সিনহা।
তিনি একটি দিনের কথা তুলে ধরে লিখেছেন, অসম্পন্ন কাজ শেষ করার জন্য ২০১৭ সালের ২রা অক্টোবর আমি কোর্টে এলাম। সকাল সাড়ে ১১টায় আমার ব্যক্তিগত সচিব আনিসুর রহমান আমাকে জানালেন যে, দুপুর ১২টায় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান একটি গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তা। আমি তাকে আসার অনুমতি দিলাম। তিনি সময়মতো এলেন এবং আমার কাছে সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরে তার একজন অফিসারের সঙ্গে কেন খারাপ ব্যবহার করেছি তা জানতে চাইলেন। তার বডি ল্যাংগুয়েজ ও আমাকে সরাসরি যেভাবে চার্জ করছেন তাতে হতবাক হয়ে গেলাম।
তিনি এমনভাবে কথা বলছেন যে, আমি তার অধীনস্থ কোনো কর্মচারী। আমি ভাবলাম, এই অফিসার কীভাবে একজন প্রধান বিচারপতিকে চার্জ করার এমন সাহস পেলেন। তিনি আমাকে বললেন, আমার জানা উচিত যে, আমার দেয়া ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর বিএনপি এতটাই খুশি হয়েছে যে, তারা নিজেদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেছে। তারা টেক্সট  মেসেজ বিনিময় করেছে যে, তারা শিগগিরই ক্ষমতায় আসছে।
আমি জবাবে তাকে বললাম, কে ক্ষমতায় আসবে সেটা আমার কোনো বিবেচনার বিষয় নয়। এতে যদি কেউ আহত হন তাহলে সেটা তার দুর্বলতায় প্রকাশ পায়। এবং এই দুর্বলতা হলো সরকারের। তিনি আমাকে আরো বললেন, তিনি এবং প্রধানমন্ত্রীর মাঝখানে কেউ নেই। তিনি যা বলবেন তা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য হিসেবে আমার নেয়া উচিত। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসরণ করেছেন। এরপর তিনি বললেন, ‘স্যার, ২০১৮ সালের ৩১শে জানুয়ারি পর্যন্ত আপনি চার মাসের ছুটি নেন’। আমি তার এ প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালাম এবং তার কাছে জানতে চাইলাম, তিনি কোন্‌ ক্ষমতায় আমাকে নির্দেশনা দিচ্ছেন। তারপর বললাম, আমি ড. গওহর রিজভীর সঙ্গে কথা বলেছি এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা না বলে কিছু করবো না।
তিনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী আমার সঙ্গে কথা বলবেন না। আমি তাকে বললাম, ঈদুল আজহার দিনে প্রধানমন্ত্রী আমাকে বলেছেন যে, যা ঘটেছে তা নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলবেন। এ কথা শুনে গোয়েন্দা কর্মকর্তা একটু ঝাঁকুনি খেলেন বলে মনে হলো। তারপর তিনি আমাকে বললেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। এ কথা শুনে আমি চিৎকার করে বললাম ‘কী! আপনি আপনার সীমা অতিক্রম করছেন। এভাবে কথা বলার ক্ষমতা আপনাকে কে দিয়েছে?’ জবাবে তিনি বললেন, প্রমাণ ছাড়া তিনি কিছু বলেননি। আমি বললাম যে, তার দুঃসাহস দেখে আমি বিস্মিত। এরপর তিনি আমার অফিস থেকে বেরিয়ে গেলেন।
যদিও আমি আমার ধৈর্য ও সাহস দেখিয়েছি ঐ কর্মকর্তার প্রতি, একই সময়ে আমি এটাও অনুধাবন করি যে, এই ‘শক্তিধর মানুষটির’ সঙ্গে লড়াই করতে পারব না। তার কাছে আছে একটি অস্ত্র ও পার্স। আমার তো এর কিছুই নেই। আমার শক্তি সহকর্মী বিচারকরা। কিন্তু তারাও এখন আমার বিরুদ্ধে চলে গিয়েছেন।
আমাকে খবর জানানো হয়েছে যে, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা পুরো সুপ্রিম কোর্ট ভবন দখলে নিয়েছেন। আমার কর্মকর্তারা আতঙ্কে কাঁপছেন। পরের দিন, আমি জানতে পারলাম যে, আদালতের আইটি সেকশনের ভেতরে প্রবেশ করেছিলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তারা সিসিটিভিতে থাকা গোয়েন্দা কর্মকর্তার ভিডিও সরিয়ে ফেলেছেন। আমার সচিব আনিস আমাকে অনুরোধ করলেন যাতে আমি এমন কোনো সিদ্ধান্ত না নিই, যাতে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়।
আমি তার শরীরের ভাষা অনুধাবন করতে পারলাম যে, তারা বিপুল পরিমাণে সমস্যা মোকাবিলা করছে। কিন্তু তার সবটা আমাকে জানাচ্ছে না। আমি বুঝতে পেরেছি যে, সব বিচারক আমার বিরুদ্ধে চলে গেছেন এবং যদি প্রশাসন আমার প্রতি পুরোপুরি শত্রুতাপূর্ণ অবস্থানে চলে যায় তাহলে আমি কীভাবে টিকে থাকবো? কোনো বিকল্প খুঁজে না পেয়ে বিচার বিভাগের স্বার্থের কথা চিন্তা করে তিন মাসের পরিবর্তে আমি এক মাসের ছুটিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি জানতে পারলাম আমার ছুটির আবেদনপত্র প্রস্তুত করেছে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। সাধারণত আমার আবেদনপত্র তৈরি করে দেন আমার সচিব। কিন্তু এ সময় তিনি ছিলেন প্রচণ্ড কড়া পাহারায়। ওই আবেদনে স্বাক্ষর করে আমি দুপুরের দিকে বাসার উদ্দেশে অফিস ছাড়লাম।
বাসায় ফিরেই জানতে পারলাম, আমার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ সময় পুরো গৃহবন্দির মতো পরিবেশে আমাকে রাখা হয়। বাইরের কেউ আমার বাসায় প্রবেশ করতে পারেন না। পরের দিন আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্যরা। কিন্তু তাদের অনুমতি দেয়া হয়নি। আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেসব আত্মীয় এসেছিলেন তাদেরকে গেটে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের ছবি তোলা হয়েছে।
তারপরেই তাদের কেউ কেউ প্রবেশ করতে পেরেছেন। একদিন আমার বাড়ির একজন হেলপার তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ৩রা অক্টোবর। এদিন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফোন করে আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি হাসপাতালে ভর্তি হতে চাই কি-না। কিন্তু আমি হাসপাতালে যেতে চাইনি। তাকে বললাম, আমি অসুস্থ নই। ফলে হাসপাতালে যাবো না। আমি একজন অসুস্থ মানুষ হিসেবে নিজেকে দেখাতে চাই না। ওই মুহূর্তের পর থেকে বিএসএমএমইউয়ের একজন অর্থোপেডিক ও একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ গোয়েন্দাদের নির্দেশনামতো আমার বাসভবনে এলেন। তাদের মধ্যে আমি কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর সজল ব্যানার্জির নাম মনে করতে পারছি। আমি দেখলাম তারা খালি হাতে এসেছেন। এমন কি তারা স্টেথেটিস্কোপ পর্যন্ত আনেননি সঙ্গে। আমি তাদের সঙ্গে কৌতুক করলাম। বললাম, মৌলিক যন্ত্রপাতি ছাড়া কেন তারা একজন রোগী দেখতে এসেছেন। আমার দিকে তারা অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকলেন।
বাসায় আমার কোনো কাজ ছিল না। তাই আমি তাদের সঙ্গে একসঙ্গে চা ও কফি পান করতে করতে কয়েক ঘণ্টা আলাপ করলাম। তারা এসময় তাদের অসহায়ত্বের কথা জানালেন। আমি তাদের বললাম, প্রধান বিচারপতি যেখানে ভয় পাচ্ছেন না তখন তারা কেন এমন করছেন। সমস্যা তো প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে, তাদের নয়।
এ কথা শুনে তারা মাথা নিচু করলেন। কোনো কথা বললেন না। তাদের জন্য আমার মায়া হলো, কারণ তারা কোনো কারণ ছাড়াই তাদের মূল্যবান সময়ের অনেকটা আমার বাসায় বসে কাটালেন। একদিন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলেন। তার সাক্ষাতের কারণ জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছেন। আমি রেগে গেলাম এবং তাকে বললাম, ভণ্ড হবেন না। যা বলার সুস্পষ্ট করে বলুন।
এইভাবে বিচার বিভাগ চলতে পারে না। এই বার্তাটি পৌঁছে দেবেন প্রধানমন্ত্রীকে। জবাবে আইনমন্ত্রী বললেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বার্তাটি পৌঁছে দেবেন। যখন আমার ভাতিজা উত্তরা থেকে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলো তাকে গেটে আটক রাখা হলো তিন ঘণ্টা, আমার বাসভবনে তাকে প্রবেশ করতে দেয়া হলো না। আমার একজন স্টাফ তার মোবাইল ফোন নম্বর দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তাকে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। আমি আইনমন্ত্রীকে এসব বিষয় তুলে ধরে বললাম, তার লোকজন এসব কী করছে কাণ্ডজ্ঞানহীনের মতো। 
এস কে সিনহা আরো লিখেছেন, ২০১৭ সালের ৫ই অক্টোবর। সময় রাত প্রায় ১০টা। আমার সচিব আনিস আমাকে জানালেন যে, বাসভবনে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান গোয়েন্দা কর্মকর্তা। ওই সময় আমি শুতে যাচ্ছিলাম। এমন অসময়ে সাক্ষাতে আসা বন্ধ করলাম আমি। কিন্তু ওই অফিসার আমার সচিবকে অনুরোধ করেন যে, তিনি মাত্র অল্প কয়েক মিনিটের জন্য আসতে চান। শেষ পর্যন্ত তাকে আমি অনুমতি দিলাম। রাত সাড়ে ১০টার দিকে এলেন ওই অফিসার।
তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি যেহেতু বিদেশে যেতে চেয়েছি তাহলে কেন আমি যাইনি? আমি তাকে মনে করিয়ে দিলাম যে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে আমি কোথাও যাবো না। আমি জানতে পারলাম, প্রধানমন্ত্রী ফিরবেন ৭ই অক্টোবর। কিন্তু ওই অফিসার আমাকে বললেন, ২০১৭ সালের ৬ই অক্টোবরের মধ্যে আমাকে দেশ ত্যাগ করতেই হবে। তিনিই আমাকে টিকিটের ব্যবস্থা করে দেবেন। তার প্রস্তাব আমি মানলাম না। তিনি আমার বাসভবন ত্যাগ করলেন। তবে বলে গেলেন, অবশ্যই আমাকে ৭ই অক্টোবর বা ৮ই অক্টোবর দেশ ছাড়তেই হবে।
এই অসন্তোষজনক আলোচনার পর ড. গওহর রিজভী আমাকে ফোন করলেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তার আমার বাসায় আসার কথা তাকে জানালেন আমার স্ত্রী। আমি গওহর রিজভীর কাছে জানতে চাইলাম, অপ্রত্যাশিত এসব ঘটনা কেন ঘটছে। যেসব ঘটনা ঘটে গেছে তার সব শুনে তিনি বিস্মিত হলেন এবং আমাকে বললেন, তিনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ৬ই অক্টোবর। তিনি যথারীতি এলেন। তাকে আমি জানালাম, তিনি আমার ঘুম নষ্ট করেছেন।
কিন্তু গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন অন্যকথা। জবাবে তিনি (গওহর রিজভী) আমাকে বললেন, আমার কাছে পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন তা নিয়ে যোগাযোগ করছেন তিনি।  আমাকে দেশ ছাড়ার জন্য যে চাপ দেয়া হয়েছে তা শুনে তিনি বললেন, ওই অফিসার আমাকে যা বলেছেন তা মিথ্যা। আমি তাকে বললাম, বিচার বিভাগ এভাবে চলতে পারে না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি সাক্ষাতের আয়োজন করতে তাকে অনুরোধ করলাম। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করলেন। বললেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফিরে গিয়ে তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি বৈঠক আয়োজন করবেন। তারপর ড. গওহর রিজভী আমাকে আর কিছুই জানাননি।
ওবায়দুল কাদেরও আমাকে আশ্বস্ত করেছেন এমন একটি সাক্ষাতের বিষয়ে। কিন্তু পরে তারা দুজনই নীরব হয়ে গেছেন। তারা অসহায় এটা বুঝতে পারলাম। তাই তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করার ইচ্ছা করলো না। তাদেরকে বিব্রতকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিলাম।
এস কে সিনহা তার বইয়ে আরো লিখেছেন, আমি অনুধাবন করতে পারলাম গোয়েন্দা কর্মকর্তা যা বলেছেন তা যথার্থ এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনামতোই তিনি কাজ করছেন। আইনমন্ত্রীও আমাকে কিছু জানাননি। একপর্যায়ে আমি দেখলাম, আমার ফোন কেউই ধরছেন না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছি।
এমনকি কাউকে যখন আলোচনার জন্য পাঠাই, তারা আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কোনো সাহস দেখায় না। তারা তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। যদি কেউ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে, তাদেরকে গেটে এমন উপায়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় যে, তাতে তারা ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এমন সব পরিস্থিতিতে আমি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। প্রথমে আমি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
২০১৭ সালের ৫ই অক্টোবর সিঙ্গাপুর থেকে জি নিউজের একজন সাংবাদিক আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন ফোনে। জানতে চান আমার পরিস্থিতি। বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো বিরূপ মন্তব্য করিনি তার কাছে। কিন্তু তাকে বলেছি, আমাদের বিচার বিভাগ পুরোপুরি স্বাধীন নয়। সব সময়, এমন কি জটিল সময়গুলোতে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার চেষ্টা করেছি।

ধর্ষণের পর হত্যাই নেশা শফিকের by ওয়েছ খছরু

বিয়ে করেছে চারটি। চার বউই রয়েছে ঘরে। একটি ‘গ্যাং রেপ’ মামলার আসামিও। পরকীয়ায় মত্ত কর্মস্থলের আরেক নারীর সঙ্গে। এরপরও থেমে নেই শফিকের ধর্ষণের নেশা। টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে ১৬ বছরের এক তরুণীকে ফুসলিয়ে নিয়ে আসে সিলেটের বিশ্বনাথে। ওখানে ধর্ষণ করে রুমি আক্তার নামের ওই তরুণীকে হত্যার পর আবার ফিরে যায় কর্মস্থল মির্জাপুরে।
বিশ্বনাথের পাঠাইকন গ্রামের যে স্থানে রুমির লাশ পাওয়া গেছে সেই স্থানে এক বছর আগেও মিলেছিল আরেক তরুণীর লাশ। পরপর দুই বছরে দুটি লাশ। আবার তাও দুই তরুণীর। ঘটনার ধরন একই। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নেন সিলেটের পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান। ঘটনার অন্তরালে রহস্যর গন্ধ খুঁজে পান তিনি। চৌকস পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠন করেন একটি টিমও। অনুসন্ধানে নামে সিলেটের পুলিশ। ঘটনার ধরন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সবই বিশ্লেষণ করা হয়।
এরপর নেয়া হয় প্রযুক্তির সহায়তা। পাওয়া যায় ক্লু-ও। এই পথ ধরে পুলিশ রহস্যর কিনারা খুঁজে বের করতে কাজ শুরু করে। বেরিয়ে এসেছে সব ঘটনা। মূলহোতা শফিককেও মঙ্গলবার টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের নাছির গ্লাস ফ্যাক্টরি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনা স্বীকার করেছে শফিক। আর তার বয়ান শুনে চমকে উঠে পুলিশও। ধর্ষণ যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে শফিকের। ঘরে চারটি বউ থাকতেও অবাধ মেলামেশার অন্ত নেই তার। শুধু ধর্ষণেই ক্ষান্ত হচ্ছে না।
আলামত নষ্টে খুনের পথও বেছে নিয়েছে। শফিক মিয়া। বয়স প্রায় ৩২ বছর। বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথের রামচন্দ্র পুর গ্রামে। পিতা ওয়াব উল্লাহ। চার বউ ঘরে থাকার পরও ২০১৭ সালে নিজ এলাকায় ‘গ্যাং রেপ’ ঘটায় শফিক মিয়া। ওই সময় থানায় তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করা হয়। এ ঘটনার পর পরই এলাকা ছাড়ে শফিক। দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে থাকে। এরপর কাজ নেয় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের নাসির গ্লাস ফ্যাক্টরিতে। সেখানে কাজ নেয়ার পরপরই ওই ফ্যাক্টরিতে কর্মরত এক মহিলার সঙ্গে তার পরকীয়ার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সর্ম্পক প্রায় ফ্যাক্টরির সবাই জানেন।
পুলিশের অনুসন্ধানে পরকীয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। টাঙ্গাইলের কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন শফিকের অসুস্থ শাশুড়ি। নিহত তরুনী রুমি আক্তার ছিল থ্যালেসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। এ কারণে তার রক্ত পরিবর্তন করতে হতো। রুমিও ওই সময় শফিকের শাশুড়ির পাশের বেডে ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালে যাতায়াতের কারণে রুমির সঙ্গে পরিচয় হয় শফিকের। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে রুমির সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করে শফিক। এরপর শফিক প্রেমের অভিনয় করে রুমিকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে গত ৯ই সেপ্টেম্বর নিয়ে আসে বিশ্বনাথের নিজ এলাকায়।
সেখানে প্রথমে তার নিজ বাড়িতে রুমিকে রাখে। এরপর আশুগঞ্জ বাজারের ইমরান আহমদ রিয়াদ নামের আরো একজনের বাড়িতে নিয়ে রাখে। বিশ্বনাথে নিয়ে আসার পরদিনই রাত সাড়ে ৯টার দিকে পুলিশ রামপাশা ইউনিয়নের পাঠাকইন গ্রামের তোবারক আলীর বাড়ির রাস্তার মুখ থেকে ওই তরুণীর লাশ উদ্ধার করে। এলাকার কেউ তরুণীকে চিনেন না। এ কারণে পুলিশ অজ্ঞাত পরিচয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য পাঠায়। তরুণীর হাত পেছন থেকে বাঁধা ছিল। গলায় ওড়না পেঁচানো ছিল। এরপর পুলিশ সুপারের নির্দেশে পুলিশের বিশেষ একটি টিম গঠন করা হয়।
লাশের সঙ্গে দুটি মোবাইল নম্বর পাওয়া গিয়েছিল। এসব মোবাইল নম্বর অনুসন্ধান ও প্রযুক্তি সহায়তা নেয়া হয়। এরমধ্যে দেখা যায় শফিক নামের ওই ব্যক্তির ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ৯ই সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থেকে সিলেটের বিশ্বনাথে আসে। পরদিন আবার চলে যায়। ওই মোবাইল ফোনের সঙ্গে আশুগঞ্জ বাজারে থাকা একটি নম্বরের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ওই মোবাইল ফোন নম্বরটি হচ্ছে আশুগঞ্জ বাজারের ইমরান আহমদ রিয়াদের। পাশাপাশি আরো কয়েকটি মোবাইল ফোন নম্বরের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পায় পুলিশ। পুলিশ আটক করে রিয়াদকে।
রিয়াদের কাছ থেকে মিলে শফিকের ঠিকানা। শফিক মির্জাপুরের গ্লাস ফ্যাক্টরিতে রয়েছে বলে জানায়। পুলিশ অনুসন্ধান চালায় মির্জাপুরে। সেখানে গিয়ে তারা সন্ধান পায় নিহত রুমির পরিবারেরও। পরিবারের লোকজনও পুলিশকে জানান- রুমি ৯ই সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের দেয়া তথ্য-বিশ্লেষণ করে পুলিশ লাশটি রুমির বলে সনাক্ত করে। এরপর গত মঙ্গলবার তারা মির্জাপুরের নাসির গ্লাস ফ্যাক্টরি থেকে গ্রেপ্তার করে আলোচিত শফিক মিয়াকে।
রাতেই তাকে নিয়ে আসা হয়েছে সিলেটে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শফিক ঘটনা স্বীকার করেছে এবং রুমিকে সে প্রেমের অভিনয় করে সিলেটের বিশ্বনাথে নিয়ে আসে বলে জানায়। সেখানে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে লাশ ফেলে আবার মির্জাপুরে চলে যায়। গতকাল নিজ কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সিলেটের পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান- ঠিক এক বছর আগে ওই জায়গা থেকে আরেক অজ্ঞাত তরুণীর লাশ পাওয়া যায়।
এরপর এক বছর পরে আরেক তরুণীর লাশ ওই এলাকা থেকে পাওয়ায় সন্দেহ হয়। এরপর বিশেষ টিম গঠন করে তদন্ত শুরু করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে সত্য ঘটনা। প্রাথমিকভাবে গ্রেপ্তার হওয়া শফিক ঘটনা স্বীকার করেছে। রুমি হত্যার রহস্য উদঘাটন হলেও এখনো এক বছর আগের আরেক তরুণী হত্যার ঘটনার মোটিভ উদঘাটন হয়নি। এ ব্যাপারে শফিক এখনো মুখ খুলেনি বলে জানান তিনি।
এদিকে সিলেটের পুলিশ শুধু শফিককেই নয়, এ পর্যন্ত ঘটনার সম্পর্কের সূত্র ধরে ১৪ জনকে আটক করেছে। এর মধ্যে সোনালী আক্তার হীরা নামের এক মহিলাও রয়েছেন। তাদের পুলিশি হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। যারা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে না তাদের ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি জানান- শফিক তার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল রুমিকে। ওই সময় তার ভাবী সেটি দেখলেও খুনের ঘটনার পরবর্তী সময়ে তিনি কাউকে কিছু জানাননি। গ্রেপ্তারকৃত শফিকসহ যারা খুনের ঘটনায় জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জনগণের বিরুদ্ধে নয়, কল্যাণে আইন করতে হবে

সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান বলেছেন, যে আইন তৈরি হচ্ছে, সে আইন জনগণের কল্যাণে না বিরুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে। ডিজিটাল মিডিয়াকে সহায়তা করা, ডিজিটাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে জনগণ, ব্যক্তি যাতে সুবিধা নিতে পারে, সে নিরাপদ ও নিরাপত্তাবোধ করে সেটা নিশ্চিত করা। অথচ নিরাপত্তার পরিবর্তে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটার অপব্যবহার হচ্ছে। গতকাল রাজধানীর কাওরানবাজার ডেইলি স্টার সেন্টারে ইউএসএইড ও সমষ্টির যৌথ আয়োজনে শান্তি ও সহনশীলতা উন্নয়ন সাংবাদিকতা পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, আমরা এর আগে সাইবার নিরাপত্তা আইনের কীভাবে অপব্যবহার হয়েছে তা দেখেছি। বুধবার সংসদে যে আইন পাস হলো সেটা কীভাবে ব্যবহার হয় সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে। প্রযুক্তি ছাড়া আমরা এগুতে পারবো না।
এটাকে কীভাবে সহায়ক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় সেটাই করতে হবে। প্রযুক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে কোনো সমাজে আমাদের বেঁচে থাকার উপায় নেই। প্রযুক্তিকে সমাজে একটি স্থান করে দিতে হবে। আর তাই যদি করতে হয় তাহলে প্রযুক্তিবান্ধব আইন করে দিতে হবে। কিন্তু আমরা আইন তৈরি করতে গিয়ে সঠিকভাবে আইন করতে পারছি না।
গোলাম রহমান আরো বলেন, বর্তমান সমাজের জন্য গণমাধ্যমের অনেক ভূমিকা রয়েছে। সেটা পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন, অনলাইন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা নিউ মিডিয়ার সকলের। তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অনেক ভূমিকা রাখছে। কেউ কেউ এটার আবার অপব্যবহারও করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকী বলেন, সাংবাদিকতা যখন উচ্চারণ করি তখনই এর মধ্যে দায়িত্বশীলতার কথা চলে আসে। সব সাংবাদিকই অনুসন্ধান করে। প্রত্যেক সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে সত্যটা খুঁজে বের করা। একজন প্রকৃত সাংবাদিক কারো স্বার্থেই কাজ করেন না, একমাত্র সত্যের স্বার্থে কাজ করেন। সত্য অনুসন্ধান করা সত্যিই কঠিন কাজ। পুরস্কারপ্রাপ্ত নাগরিক সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনারা যারা মূল ধারার সাংবাদিক হতে চান তাদের সত্যটা খুঁজে বের করতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে হবে। শান্তির নীতি নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এটা আমাদের অন্তর থেকে শুরু করতে হবে।
গাজী টেলিভিশন ও অনলাইন পত্রিকা সারা বাংলার প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, আমাদেরকে সংঘাতের সময় মানবিক সাংবাদিকতা করতে হবে। সেটা যেভাবেই সম্ভব হোক। সারা পৃথিবীতেই সাংবাদিকতার সঙ্গে সংঘাতের একটা সম্পর্ক রয়েছে। সংঘাতের সময় সবাই বাড়ি ফিরেন আর সাংবাদিকরা সেদিকে এগিয়ে যান। একুশে টেলিভিশনের সিইও এবং প্রধান সম্পাদক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, সাহসী ও মেধাবী ছেলেমেয়েদের সাংবাদিকতায় আসতে হবে। তাদেরকে বেশি বেশি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে হবে। সাংবাদিকতায় চ্যালেঞ্জ সবসময়ই থাকবে। এটা সাংবাদিকতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেটা মূলধারার গণমাধ্যমে হোক আর মফস্বলে হোক। যেখানে যেভাবে করেন সবার জন্যই সমান।
দৈনিক সমকালের উপ-সম্পাদক অজয় দাসগুপ্ত বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম। তখন কোনো সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। তবুও অনেক পত্রিকায় সংবাদ পাঠাতাম। অনেক সময় ছাপা হয়ে যেত। এভাবেই সাংবাদিকতায় আসছি। তথ্যপ্রযুক্তির সৎ ব্যবহার হয় না এমনটা নয়, তবে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীরা এর অপব্যবহার করে এসেছে।
পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে চ্যানেল নিউজ টুয়েন্টিফোরের প্রধান বার্তা সম্পাদক শাহনাজ মুন্নি ও ইউএসএইড ও সমষ্টির কর্মকর্তারা, ঢাকা ও রাজশাহী অঞ্চলের ১৩ নাগরিক সাংবাদিকের হাতে সনদপত্র ও নগদ অর্থ পুরস্কার তুলে দেন।

সহপাঠী বন্ধুর মূল্যায়নঃমানবসেবার ব্রতই লোটে শেরিংকে তুলেছে এ পর্যায়ে by কাফি কামাল

ভুটানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্র ডা. লোটে শেরিং। দেশটির প্রথম দফা নির্বাচনে এগিয়ে রয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের পর চূড়ান্ত ফলাফল জানা যাবে মধ্য অক্টোবরে। 
তবে প্রথম দফা নির্বাচনের পরই দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ২৮তম ব্যাচের এ শিক্ষার্থীর নাম। শিক্ষাজীবন শেষে থিম্পুর জিগমে দর্জি ওয়াংচুক ন্যাশনাল রেফারেল হাসপাতালে ইউরোলজি কনসালটেন্ট হিসেবে যোগ দেন। ২০১৩ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি নবগঠিত রাজনৈতিক দল দ্রুক নিয়ামরূপ তসুগপা’য় (ডিএনটি) যোগ দেন। মাত্র ৫ বছরের মধ্যেই ডা. লোটে শেরিং চলে আসেন দলটির শীর্ষপর্যায়ে। ১৫ই সেপ্টেম্বর ভুটানের প্রথম দফা নির্বাচনে জয়লাভ করে চমক সৃষ্টি করে ডা. লোটের দল ডিএনটি। দ্বিতীয় দফা ভোটের পর আগামী ১৮ই অক্টোবর জানা যাবে চূড়ান্ত ফলাফল। তবে প্রথম দফা ভোটের পরই দেশটির সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে ডা. লোটে শেরিংয়ের নাম।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ডা. লোটের সহপাঠীদের মধ্যে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন খুলনার ছেলে ডা. মো. আহসান হাবীব সাকির। বর্তমানে তিনি রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন বিভাগের রেজিস্ট্রার। দেড় দশকের বন্ধুত্বের সুবাদে দৈনিক মানবজমিন-এর কাছে ডা. লোটে’র জীবনের নানাদিক তুলে ধরেছেন ডা. সাকির।
১৯৯১ সালের কথা। বাংলাদেশে তখন হাতেগোনা যে কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজ ছিল তার অন্যতম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ। ডা. সাকির বলেন, ১৯৯১ সালে আমরা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। চিকিৎসা শাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনে তখন বহু বিদেশি শিক্ষার্থী আসতেন বাংলাদেশে। নেপাল, ভুটান, ইরান, সুদান, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ থেকে স্কলারশিপ নিয়ে তারা এদেশে পড়তে আসতেন। সেবার ভুটান থেকে যে কয়েকজন এসেছিলেন তাদের একজন লোটে শেরিং, আমাদের লোটে। আমাদের দু’জনের হোস্টেল ছিল পাশাপাশি।
লোটে থাকতেন বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত হোস্টেলের ওয়েস্ট ব্লকের দোতলায়। মেডিকেলে ভর্তির মাধ্যমেই আমাদের পরিচয়। তবে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠার কারণ ছিল অন্য। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে আমাদের একাডেমিক ভবন ও হোস্টেলের দূরত্ব ছিল প্রায় আধা কিলোমিটার। আমরা হোস্টেল থেকে প্রায় একই সময়ে কলেজের উদ্দেশে রওনা দিতাম। ফিরতামও একই সময়ে। ফলে প্রায় দিনই আমরা একসঙ্গে আসা-যাওয়া করতাম। এই আসা-যাওয়ার পথে আমাদের মধ্যে অনেক গল্প হতো। সে তার দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে গল্প করতো। বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষের আচার-ব্যবহার, আতিথেয়তা নিয়েও প্রকাশ করতো তার অনুভূতি। এভাবেই লোটের সঙ্গে আমাদের বাংলাদেশের কয়েকজনের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
শিক্ষাজীবনে খুব কঠোরভাবে সময়জ্ঞান মেনে চলতেন লোটে শেরিং। ডা. সাকির বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে লোটে ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে যেতেন। পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজগুলো সম্পন্ন করতেন অত্যন্ত সুচারুভাবে। তার সময়জ্ঞান ছিল প্রখর। কঠোরভাবে সময়জ্ঞান মেনে চলতেন। এক মুহূর্তে অযথা ব্যয় করতেন না। অলসতা কিংবা কোনো ধরনের বদ্যভ্যাস ছিল না তার জীবনে। শিক্ষাজীবনে তার একটি শখ ছিল বাগান করার। তার দেশ যেমন সুন্দর, সে রকম চিন্তাভাবনা করতেন। প্রতিদিনের পড়াশোনার কাজ প্রতিদিন শেষ করতেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন খুবই বন্ধুবৎসল। তবে কথা বলতেন মেপে মেপে। পড়াশোনার পাশাপাশি টেবিল টেনিস ও ক্যারাম খেলতেন। ডা. সাকির বলেন, আমাদের  সহপাঠী একটি প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হচ্ছেন এটা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। গৌরবের বিষয়। বিশেষ করে আমাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের জন্য, ম-২৮ ব্যাচের সহপাঠীদের জন্য গৌরবের বিষয়। আমি বিশ্বাস করি, পরিশ্রম, সততা ও কর্মঠ হওয়ার কারণেই সৃষ্টিকর্তা তাকে আজ এই পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, লোটের মতো নিবেদিতপ্রাণ মানুষের হাত ধরে ভুটান তথা ভুটানের মানুষ সামগ্রিক উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবে।
পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে অনার্স পেয়েছিলেন ডা. লোটে শেরিং। ডা. সাকির বলেন, পড়াশোনায় তিনি খুবই ভালো ছিলেন। এছাড়া বিদেশ থেকে যেসব শিক্ষার্থী আসতেন তারা বেশিরভাগই প্রি-মেডিকেল স্কুল কোর্স করে আসতেন। কাজেই মেডিকেল সম্পর্কে তারা আমাদের চেয়ে একটু বেশি জানতেন। বিশেষ করে বেসিক সাবজেক্টগুলোতে তারা ছিলেন এগিয়ে। বেসিক ক্লাসগুলোতে তার পারফরর্মেন্স থাকতো ভালো। কিন্তু লোটে শেরিং ছিলেন ব্যতিক্রমী। মেডিকেলের যেকোনো বিষয়ে গভীর, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর চিন্তা করতেন তিনি। বাংলাদেশে পড়তে এসেছিলেন পূর্ণ স্কলারশিপ নিয়ে। ফলে পরীক্ষায় খুবই ভালো রেজাল্ট করতেন।
আমাদের মেডিকেল থেকে কয়েকজন অনার্স (৮০ ভাগের বেশি নম্বর) পেয়েছিলেন লোটে শেরিং তাদের একজন। শুধু মেধাবীই নন, লোটে ছিলেন খুবই নম্র-ভদ্র স্বভাবের। ১৯৯৯ সালে এমবিবিএস পাসের পর জেনারেল সার্জারিতে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০০৩ সালে এফসিপিএস কোর্স সম্পন্ন করেন। লোটে বাচ্চাদের ব্যাপারে খুব সচেতন ছিলেন। এমবিবিএস পড়ার সময় বলতেন, আমি একজন পেডিয়াট্রিশিয়ান হবো, বড় পেডিয়াট্রিশিয়ান। তবে এমবিবিএস কমপ্লিট করার পর লোটে সার্জারিতে ক্যারিয়ার গড়ার সিদ্ধান্ত নেন। যাই হোক, এফসিপিএস সম্পন্নের পরেও লোটে প্রাকটিস করতেন বাংলাদেশের সার্জারির পথিকৃৎ খ্যাত প্রফেসর ডা. খাদেমুল ইসলামের অধীনে। এরপর লোটে সিঙ্গাপুরে গিয়ে ইউরোলজিতে একটি কোর্স করেন। প্রায় ১৫ বছর তার বাংলাদেশে অবস্থানকালে সব সময়ই অব্যাহত ছিল যোগাযোগ। ডা. লোটে সর্বশেষ ২০০৬ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন।
মানবসেবার ব্রতই ডা. লোটে শেরিংকে নিয়ে গেছে রাজনীতির মাঠে। পড়াশোনা অবস্থাতেই লোটে সব সময় চিন্তা করতেন মানবসেবার। কীভাবে মানুষকে সেবা দেয়া যায় এ নিয়ে ভাবতেন, আলোচনা করতেন। মানবসেবাটাই তার কাছে অগ্রাধিকার পেতো। বিয়ে করলে মানবসেবা বা জনসেবায় ব্যত্যয় হবে কিনা এমন চিন্তাভাবনা থেকে বিয়ে সংক্রান্ত বিষয়েও আগ্রহ ছিল না তার। চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। থিম্পুর জিগমে দর্জি ওয়াংচুক ন্যাশনাল রেফারেল হাসপাতালে ইউরোলজি কনসালটেন্ট হিসেবে ২০০৬ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত চাকরি করেন। ২০১৩ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। আসলে মানবসেবার ব্রতই তাকে নিয়ে গেছে রাজনীতির মাঠে। একজন চিকিৎসক থেকে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে বেশি মানুষকে সেবা দিতে পারবেন এমন ভাবনা থেকেই রাজনীতিতে যোগ দেন লোটে শেরিং। ভুটানের প্রথম দফা নির্বাচনে ভালো করেছে লোটে’র দল ডিএনটি। আমরা আশা করি, দ্বিতীয় দফার চূড়ান্ত ফলাফলেও তার দল বিজয়ী হবে। আগামীতে তিনি ভুটানের একজন সফল প্রধানমন্ত্রী হবেন- এ প্রত্যাশা করি।
লোটে শেরিংয়ের মতো পরিচ্ছন্ন মানসিকতার মানুষদের রাজনীতিতে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন তার বন্ধু ডা. সাকির। তিনি বলেন, আমরা ১৫ বছরের বন্ধু। এ বন্ধুত্বের সুবাদে ব্যক্তি লোটের নানাদিক দেখেছি, জেনেছি। তার মতো একজন সৎ, কর্মঠ, শিক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন মানসিকতার মানুষ আমি কম দেখেছি। তার মতো মানুষদের দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করি। আমি বিশ্বাস করি, অদূর ভবিষ্যতে ডা. লোটের হাত ধরে আরো উন্নত হবে ভুটান। তার নেতৃত্বে ভুটানের জনসাধারণের আর্থসামাজিক উন্নতি ঘটবে।
লোটে শেরিংয়ের হৃদয়ে বাংলাদেশের একটি বিশেষ অবস্থান আছে বলে বিশ্বাস করেন ডা. সাকির। তিনি বলেন, লোটের জীবনের সর্বোচ্চ সুন্দর ও সবচেয়ে উর্বর সময়টা কাটিয়েছেন বাংলাদেশে। আমাদের সর্বোচ্চ আতিথেয়তা, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার পরিবেশে লোটের হৃদয় এবং চিন্তা-চেতনায় বাংলাদেশের একটি বিশেষ অবস্থান আছে।
আমরা আশা করি এবং বিশ্বাস করি অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ভুটানের সামগ্রিক অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক বন্ধন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। কারণ তার মনে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ জায়গা আছে। ডা. সাকির বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামোগত সুবিধা, বিশেষ করে সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে ভুটান উপকৃত হতে পারে। আবার হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি রপ্তানি করে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতিতেও ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি বাংলাদেশের সঙ্গে তার দেশের সব ধরনের সম্পর্ক, বিশেষ করে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোতে লোটে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে এটা সহপাঠী এবং বন্ধু হিসেবে আমি আশা ও বিশ্বাস করি।
উল্লেখ্য, ভুটানে দুই দফায় ভোট হয়। প্রথম দফায় ভোটাররা রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোট দেয়। যে দুই দল প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান পায় তারা পার্লামেন্টের ৪৭টি আসনে প্রার্থী দেয় এবং তখন দ্বিতীয় দফা ভোট হয়। এবারের প্রথম দফার ভোটে চারটি দল অংশ নেয় এবং প্রথম দফার মৌলিক নির্বাচনে বিস্ময়কর সাফল্য পায় ডা. লোটে শেরিংয়ের দল।

রোহিঙ্গা নিপীড়ন: মিয়ানমারের বিচারে সম্ভাব্য সব পথ বিবেচনায় রাখা উচিত: যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেছেন, মিয়ানমার যদি রোহিঙ্গা নিপীড়নে দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে না পারে তাহলে হেগে অবস্থিত আইসিসির মাধ্যমে তাদের বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্যোগী হতে হবে। যেহেতু সদস্য নয় এমন পক্ষের বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম চালাতে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের’ (আইসিসির)  নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে সেহেতু ভিন্ন পথেও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিতের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, যুক্তরাজ্য খুব সম্ভবত রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো জাতিগত নিপীড়ন, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে, ঠিক যেমন সিরিয়ায় যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করতে উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সন্ত্রাসবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে শুরু হয় নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। আগে থেকে উপস্থিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় দশ লাখে। এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছে।
মিয়ানমার সফরে থাকা অবস্থাতেই হান্ট তার টুইটার অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘বার্মায় যদি জবাবদিহিতা ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত না হয় তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টি বিচারের জন্য পাঠানো থেকে শুরু করে অন্যান্য সবগুলো পথ বিবেচনায় রাখা। আন্তর্জাতিক আদালতের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনের দরকার পড়বে, যা পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের অন্যান্য পথ কী কী হতে পারে সে বিষয়ে ভাবতে হবে।’
ইতোমধ্যেই জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি মিয়ানমারের দায়ী সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। রাখাইনে নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গাদের বিষয়ে গত সপ্তাহে প্রকাশিত তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং লাইং ও সংশ্লিষ্ট অপর পাঁচ জন জেনারেলকে গণহত্যা চালানো, যুদ্ধাপরাধ সংঘটন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিচারের আওতায় আনা উচিত।
তাছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর ফাতৌ বেনসুদা জানিয়েছেন, তিনি রোহিঙ্গাদের অপর মিয়ানমারের চালানো নিপীড়নের বিষয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক আদলাত তার এক আবেদনের রায়ে বলেছে, মিয়ানমারের সংঘটিত রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের বিষয়ে তদন্ত শুরু করা যেতে পারে। সে প্রেক্ষিতেই বেনসুদা এখন আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছেন। যেহেতু মিয়ানমার আইসিসির সদস্য নয় সেহেতু তারা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মিয়ানমারকে জড়িত করে এমন বিচার কার্যক্রম গ্রহণ করতে রাজি নয়। মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চি এবং দেশটির প্রেসিডেন্টের অফিস, দুই স্থান থেকেই মিয়ানমারের দায়ী সেনা কর্মকর্তাদের বিচারের উদ্যোগকে আইসিসির বিধিবহির্ভূত কার্যকলাপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন, ফাতৌ বেনসুদার উদ্যোগ ছাড়াও রয়েছে মার্কিন পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্র গত ১৭ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো জাতিগত নিধনযজ্ঞের দায়ে দেশটির তিনজন সেনা কর্মকর্তা, দুইটি সেনা ব্রিগেড ও বর্ডার পুলিশের এক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
বৃহস্পতিবার (২০ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন পাওয়ার বিষয়ে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আদালত সে সমর্থন নাও পেতে পারে।  দেশটির ধারণা, চীন নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নেওয়া প্রস্তাবে ভেটো দেবে। মিয়ানমারের বিচারের দাবি তোলা ব্রিটিশ আন্দোলনকারীরা মনে করেন, হান্টের উচিত অব্যাহতভাবে মিয়ানমারের বিচারের দাবির পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া। এতে করে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটাভুটির বিষয়টি গৌণ হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক সমর্থন রোহিঙ্গাদের পক্ষে চলে এলে মিয়ানমার বিশ্বসভায় কোণঠাসা হয়ে যাবে। তখন রোহিঙ্গাদের নিধনযজ্ঞের দায়ে দেশটির সেনাবাহিনীর দায়ী সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে।
জেরেমি হান্ট বলেছেন, ‘যুক্তরাজ্য একা পারবে না। আমাদেরকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে এক হয়ে কাজ করতে হবে। আমরা আইনের শাসনের ভিত্তিতে ন্যায় নিশ্চিত করতে চাই। দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
জেরেমি হান্ট আরও জানিয়েছেন, অং সান সু চির সঙ্গে বৈঠকে তিনি আটক রয়টার্স সানবাদিকদের মুক্তির দাবিও জানিয়েছেন। রয়টার্সের ওই দুই সাংবাদিক মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো রোহিঙ্গা নিধনের বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন। কিন্তু তাদেরকে কারাদণ্ড দিয়েছে মিয়ানমারের আদালত। অং সান সু চির ভাষ্য, রয়টার্সের ওই দুই সাংবাদিককে যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের দায়ে সাজা দেওয়া হয়নি, সরকারি নথির গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন ভঙ্গের দায়ে তাদেরকে সাজা দেওয়া হয়েছে।
গার্ডিয়ান লিখেছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সু চির নিয়ন্ত্রণে নেই, এমন কথা বলে জেরেমি হান্টও সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সু চিও রোহিঙ্গাদের এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। সংসদে তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তিনি চাইলে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে দিতে পারতেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের যে তথ্যগুলো জানা দরকার

বাংলাদেশের পার্লামেন্টে বুধবার পাস হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮, যে আইনের প্রস্তাবের পর থেকেই উদ্বেগ, বিতর্ক আর সমালোচনা চলছে।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তফা জব্বার বিলটি পাসের জন্য সংসদে উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে পাস হয়।
আইনটি প্রস্তাবের পর থেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের কর্মীরা। তাদের আশঙ্কা, আইনটির অনেক ধারায় হয়রানি ও অপব্যবহার হতে পারে।
তবে মি. জব্বার সংসদে দাবী করেছেন, সংবাদকর্মীরা যেসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, তা সংশোধন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কি রয়েছে?
ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জন শৃঙ্খলা ক্ষুণ্ণ করলে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তা ব্লক বা অপসারণের জন্য টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে। এক্ষেত্রে পুলিশ পরোয়ানা বা অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তার করতে পারবে।
আইনে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট যুক্ত করা হয়েছে। ফলে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, বা প্রকাশ করে বা কাউকে করতে সহায়তা করে ওই আইন ভঙ্গ করলে এই আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সাজা হতে পারে, ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থার অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত যদি কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করা হয়, তাহলে তা গুপ্তচরবৃত্তি বলে গণ্য হবে এবং এজন্য ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
আইন অনুযায়ী ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার নামে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালালে বা মদদ দিলে অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, ঘৃণা প্রকাশ, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, প্রকাশ বা ব্যবহার করলে জেল জরিমানার বিধান রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে তিন থেকে সাত সাত বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। দ্বিতীয়বার এরকম অপরাধ করলে ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণা করলে অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড, ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ড হতে পারে।
কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের বিষয়েও বিধান রয়েছে এই আইনে। সেখানে ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম. কম্পিউটার সিস্টেম বা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা ডিভাইস, ডিজিটাল সিস্টেম বা ডিজিটাল নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার ব্যাহত করে, এমন ডিজিটাল সন্ত্রাসী কাজের জন্য অপরাধী হবেন এবং এজন্য অনধিক ১৪ বছর কারাদণ্ড অথবা এনধিক এক কোটি অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
ছবি বিকৃতি বা অসৎ উদ্দেশ্যে ইচ্ছেকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে কারো ব্যক্তিগত ছবি তোলা, প্রকাশ করা বা বিকৃত করা বা ধারণ করার মতো অপরাধ করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। ইন্টারনেটে পর্নগ্রাফি ও শিশু পর্নগ্রাফির অপরাধে সাত বছর কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
কোন ব্যাংক, বীমা বা আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে কোন ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে আইনানুগ কর্তৃত্ব ছাড়া অনলাইন লেনদেন করলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
বাংলাদেশ বা বিশ্বের যেকোনো বসে বাংলাদেশের কোন নাগরিক যদি এই আইন লঙ্ঘন করেন, তাহলেই তার বিরুদ্ধে এই আইনে বিচার করা যাবে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিচার হবে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে। অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে এর মধ্যে করা সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবস পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।
সূত্র:  বিবিসি

একজন অনন্য চাচা ও ভাতিজার পারস্পরিক ভালবাসার অমর কাহিনী

ইমাম হুসাইন (আ) তাঁর জীবনের শেষ রাতে যখন সঙ্গীদের জানালেন, জালিম ও বলদর্পী খোদাদ্রোহী শত্রুরা শুধু তাঁকেই (ইমামকে) চায় হত্যা করতে। তাঁর কাছ থেকে জোর করে ইয়াজিদের জন্য আনুগত্য আদায় অথবা তাঁকে হত্যা করাই তাঁদের মূল টার্গেট। তাই অন্যরা চাইলে সবাই তাঁকে ত্যাগ করতে পারেন জীবন বাঁচানোর জন্য।
তাঁর একদল ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও সঙ্গী যাদের সংখ্যা ১০০’রও কিছু কম বা সামান্য বেশি ছিল- তাঁদের সবাই যখন সকলেই এক জায়গায় ও এক বাক্যে সুস্পষ্ট ভাষায় তাঁদের নিষ্ঠা ও আনুগত্যের ঘোষণা দিলেন এবং বললেন যে, আমরা কখনো আপনাকে ছেড়ে চলে যাবো না, তখন সহসাই পট পরিবর্তিত হয়ে গেলো।
ইমাম (আঃ) বললেন, ব্যাপার যখন এই, তখন সকলেই জেনে রাখো যে, আমরা নিহত হতে যাচ্ছি। তখন সকলে বললো, আলহামদুলিল্লাহ-আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করছি যে, তিনি আমাদেরকে এ ধরনের তাওফীক দান করেছেন। এটা আমাদের জন্য এক সুসংবাদ, একটি আনন্দের ব্যাপার।
ইমাম হুসাইনের (আ) মজলিসের এক কোণে একজন কিশোর বসে ছিলেন; বয়স বড় জোর তেরো বছর হবে। এ কিশোরের মনে সংশয়ের উদয় হলোঃ আমিও কি এ নিহতদের অন্তর্ভুক্ত হবো? যদিও ইমাম বলেছেন ‘তোমরা এখানে যারা আছা তাদের সকলে’,কিন্তু আমি যেহেতু কিশোর ও নাবালেগ, সেহেতু আমার কথা হয়তো বলা হয় নি। কিশোর ইমাম হুসাইনের দিকে ফিরে বললেন: অর্থাৎ,চাচাজান! আমিও কি নিহতদের অন্তর্ভুক্ত হবো? এ কিশোর ছিলেন হযরত ইমাম হাসানের (আ) পুত্র হযরত কাসেম।
ইতিহাস লিখেছে, এ সময় হযরত ইমাম হুসাইন (আ) স্নেহশীলতার পরিচয় দেন। তিনি প্রথমে জবাব দানে বিরত থাকেন, এরপর কিশোরকে জিজ্ঞেস করেন, ভাতিজা! প্রথমে তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও, এরপর আমি তোমার প্রশ্নের জবাব দেবো। তুমি বলো, তোমার কাছে মৃত্যু কেমন; মৃত্যুর স্বাদ কী রকম? কিশোর জবাব দিলেন,আমার কাছে মধুর চেয়েও অধিকতর সুমিষ্ট। আপনি যদি বলেন যে, আমি আগামী কাল শহীদ হবো তাহলে আপনি আমাকে সেই সুসংবাদই দিলেন। তখন ইমাম হুসাইন (আঃ) জবাব দিলেন, হ্যাঁ, ভাতিজা! কিন্তু তুমি অত্যন্ত কঠিন কষ্ট ভোগ করার পর শহীদ হবে। কাসেম বললেন: আল্লাহর শুকরিয়া, আল-হামদুলিল্লাহ-আল্লাহর প্রশংসা যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটবে।
এবার আপনারা ইমাম হুসাইন (আঃ) এর এ ভূমিকা নিয়ে চিন্তা করে দেখুন যে, পরদিন কী বিস্ময়কর এক বাস্তব কঠিন দৃশ্যের অবতারণা হওয়া সম্ভব! হযরত আলী আকবরের শাহাদাতের পর এই তেরো বছরের কিশোর হযরত ইমাম হাসানের পুত্র ইমাম হুসাইন (আঃ) এর নিকট এগিয়ে এলেন। যেহেতু তিনি ছিলেন নাবালেগ কিশোর, তার শরীরের বৃদ্ধি তখনো সম্পূর্ণ হয় নি, তাই তার শরীরে অস্ত্র ঠিকভাবে খাপ খাচ্ছিলো না;কোমরে ঝুলানো তলোয়ার ভূমি স্পর্শ করে কাত হয়ে ছিলো। আর বর্মও ছিলো বড়, কারণ বর্ম পূর্ণ বয়স্ক পুরুষদের জন্য তৈরি করা হয়েছিলো, কিশোরদের জন্য নয়। টুপি বড়দের মাথার উপযোগী, ছোট বাচ্চাদের উপযোগী নয়। কাসেম বললেন, চাচাজান! এবার আমার পালা। অনুমতি দিন আমি রণাঙ্গনে যাই।
এখানে উল্লেখ্য যে,আশুরার দিনে ইমাম হুসাইন (আঃ) এর সঙ্গী সাথীদের কেউই তার কাছ থেকে অনুমতি না নিয়ে রণাঙ্গনে যান নি। প্রত্যেকেই তাঁর কাছে এসে তাকে সালাম করেন এবং এরপর অনুমতি চান; বলেন: ‘‘আস-সালামু ‘আলাইকা ইয়া আবা আবদিল্লাহ। আমাকে অনুমতি দিন।’’
ইমাম হুসাইন (আঃ) সাথে সাথেই কাসেমকে অনুমতি দিলেন না। তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। কাসেম ও তাঁর চাচা পরস্পরকে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন। ইতিহাসে লেখা হয়েছে:  অর্থাৎ,অতঃপর তিনি (কাসেম) তাঁর (ইমাম হুসাইনের) হাত ও পা চুম্বন করতে শুরু করলেন। ‘‘মাক্বাতিল’’ গ্রন্থে এ সম্পর্কে লেখা হয়েছে: ‘‘তাকে যতক্ষণ না অনুমতি দেয়া হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কিশোর তার (ইমাম হোসেনের) হাত ও পা চুম্বন অব্যাহত রাখেন।’’ (মাকতালু খরাযমী,খণ্ড: ২,পৃষ্ঠা: ২৭)
এ ঘটনার অবতারণা কি এ উদ্দেশ্যে হয়নি যাতে ইতিহাস পুরো ঘটনাকে অধিকতর উত্তম রূপে বিচার করতে পারে? কাসেম অনুমতির জন্য পীড়াপীড়ি করেন আর ইমাম হুসাইন (আঃ) অনুমতি দানে বিরত থাকেন। ইমাম মনে মনে চাচ্ছিলেন কাসেমকে অনুমতি দেবন এবং বলবেন,যদি যেতে চাও তো যাও। কিন্তু মুখে সাথে সাথেই অনুমতি দিলেন না। বরং সহসাই তিনি তার বাহুদ্বয় প্রসারিত করে দিলেন এবং বললেন, এসো ভাতিজা! এসো, তোমার সাথে খোদা হাফেযী করি। কাসেম ইমাম হুসাইন (আঃ)-এর কাঁধের ওপর তাঁর হাত দুটো রাখলেন এবং ইমামও কাসেমের কাঁধের ওপর হাত দুটি রাখলেন। এরপর উভয়ে কাঁদলেন। ইমামের সঙ্গী সাথীরা ও তাঁর আহলে বাইতের সদস্যরা এ হৃদয় বিদারক বিদায়ের দৃশ্য দেখলেন। ইতিহাসে লেখা হয়েছে, উভয়ে এতই ক্রন্দন করলেন যে, উভয়ই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। এরপর এক সময় তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন এবং কিশোর কাসেম সহসাই তাঁর ঘোড়ায় আরোহণ করলেন।
ইয়াযীদী পক্ষের সেনাপতি ওমর ইবনে সা‘দের সেনাবাহিনীর মধ্যে অবস্থানকারী বর্ণনাকারী বলেন,সহসাই আমরা একটি বালককে দেখলাম ঘোড়ায় চড়ে আমাদের দিকে আসছে যে তার মাথায় ধাতব-টুপির পরিবর্তে একটি পাগড়ী বেধেছে। আর তার পায়ে যোদ্ধার বুট জুতার পরিবর্তে সাধারণ জুতা এবং তার এক পায়ের জুতার ফিতা খোলা ছিলো; আমার স্মৃতি থেকে এটা মুছে যাবে না যে,এটা ছিলো তার বাম পা। তারপর বর্ণনাকারী বলেন: সে যেন চাঁদের একটি টুকরা। (মানাকিবে ইবনে শাহরে আশুব,খণ্ড: ৪,পৃষ্ঠা: ১০৬,এ’লামুল ওয়ারা, পৃষ্ঠা: ২৪২,আল-লুহুফ, পৃষ্ঠা: ৪৮, ইরশাদ-শেখ মুফিদ, পৃষ্ঠা: ২৩৯,মাকতালু মুকাররাম, পৃষ্ঠা: ২৩১,তারীখে তাবারী, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৫) একই বর্ণনাকারী আরো বলেন,কাসেম যখন আসছিলো তখনো তার গণ্ড দেশে অশ্রুর ফোটা দেখা যাচ্ছিলো।
সবাই অনুপম সুন্দর এ কিশোর যোদ্ধাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো এবং ভেবে পাচ্ছিলো না যে, এ ছেলেটি কে! তৎকালে রীতি ছিলো এই যে, কোনো যোদ্ধা রণাঙ্গনে আসার পর প্রথমেই নিজের পরিচয় দিতো যে,আমি অমুক ব্যক্ত । উক্ত রীতি অনুযায়ী কাসেম প্রতিপক্ষের সামনে এসে পৌঁছার পর উচ্চস্বরে বললেন:
"যদি না চেনো আমাকে জেনো আমি হাসান তনয় সেই নবী মুস্তাফার নাতি যার ওপর ঈমান আনা হয় ঋণে আবদ্ধ বন্দী সম এই যে হুসাইন প্রিয়জনদের মাঝে,পানি দেয়া হয় নি যাদের উত্তম রীতি মেনে।’’
কাসেম রণাঙ্গনে চলে গেলেন, আর হযরত ইমাম হুসাইন (আঃ) তার ঘোড়াকে প্রস্তুত করলেন এবং ঘোড়ার লাগাম হাতে নিলেন। মনে হচ্ছিলো যে তিনি তার দায়িত্ব পালনের জন্য যথা সময়ের অপেক্ষা করছিলেন। জানি না তখন হযরত ইমামের মনের অবস্থা কেমন ছিলো। তিনি অপেক্ষমাণ; তিনি কাসেমের কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষমাণ। সহসাই কাশেমের কণ্ঠে ‘‘চাচাজান!’’ ধ্বনি উচ্চকিত হলো। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বুঝতে পারলাম না ইমাম হুসাইন কত দ্রুত গতিতে ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং রণাঙ্গনের দিকে ছুটে এলেন। তার এ কথা বলার তাৎপর্য এই যে,ইমাম হুসাইন (আঃ) এক শিকারি বায পাখীর মত রণাঙ্গনে পৌঁছে যান।
ইতিহাসে লিখিত আছে,কাসেম যখন ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যান তখন শত্রুপক্ষের প্রায় দুই শত যোদ্ধা তাঁকে ঘিরে ফেলে। তাদের একজন কাশেমের মাথা কেটে ফলেতে চাচ্ছিলো। কিন্তু তারা যখন দেখলো যে, ইমাম হুসাইন (আঃ) তীব্র গতিতে ঘোড়া চালিয়ে এগিয়ে আসছেন তখন তাদের সকলেই সেখান থেকে পালিয়ে গেলো। আর যে ব্যক্তি কাশেমের মাথা কাটতে চাচ্ছিলো সে তাদেরই ঘোড়ার পায়ের নীচে পিষ্ট হলো। যেহেতু তারা খুবই ভয় পেয়ে গিয়েছিলো সেহেতু তারা তাদের বন্ধুর ওপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক লোক একবারে ঘোড়া চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলো;কেউ কারো দিকে তাকাবার অবকাশ পাচ্ছিলো না। মহা কবি ফেরদৌসীর ভাষায়:
‘‘সেই বিশাল প্রান্তরে কঠিন ক্ষুরের ঘায়ে ধরণী যেন হলো ছয় ভাগ আর আসমান আট।’’ কেউ বুঝতে পারলো না যে, কী ঘটে গেলো। ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে সৃষ্ট ধুলার কুণ্ডলী যখন বসে গেলো এবং হাওয়া কিছুটা স্বচ্ছ হলো তখন সবাই দেখতে পেলো যে, ইমাম হুসাইন (আঃ) কাসেমকে কোলে নিয়ে আছেন। আর কাসেম তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছিলেন এবং যন্ত্রণার তীব্রতার কারণে মাটিতে পা আছড়াচ্ছিলেন। এ সময় শোনা গেলো,ইমাম হুসাইন (আঃ) বলছেন: ‘‘আল্লাহর শপথ, এটা তোমার চাচার জন্য কতই না কষ্টকর যে, তুমি তাকে ডাকলে কিন্তু তার জবাব তোমার কোনো কাজে এলো না।’’

দৃশ্যপটে বৃহত্তর জোট এক মঞ্চে উঠছেন বিরোধী নেতারা

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের অভিন্ন দাবি সামনে রেখে এক মঞ্চে উঠছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা। শনিবার জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সমাবেশে জামায়াত ছাড়া প্রায় সব বিরোধী রাজনৈতিক দলকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমন্ত্রণ পাওয়া দলগুলোও সমাবেশে অংশ নেয়ার  বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
রাজনৈতিক দল ছাড়াও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সংগঠনের প্রতিনিধিদেরও সমাবেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিএনপিসহ ২০দলীয় জোটের অন্য শরিকদের সমাবেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে জোটের শরিক জামায়াতকে আমন্ত্রণ জানায়নি ঐক্যপ্রক্রিয়া। সমাবেশের উদ্যোক্তা ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতারা জানিয়েছেন, যে পাঁচ দাবি ও ৯ লক্ষ্য নিয়ে ঐক্যপ্রক্রিয়া ও যুক্তফ্রন্ট বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছে শনিবারের সমাবেশে এর একটি আবহ ফুটে উঠবে।
সমাবেশ থেকে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা অভিন্ন দাবিতে বৃহৎ ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিতে পারেন। চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটের নেতৃত্ব বা মাঠের কর্মসূচিকে সামনে আনা হচ্ছে না। নিরপেক্ষ নির্বাচনের অভিন্ন দাবি সামনে রেখে দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হলে পরবর্তীতে মাঠের কর্মসূচি দেয়ার চিন্তা রয়েছে নেতাদের।
তিন দলের যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়া গত শনিবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন, তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দেয়াসহ ৫ দফা দাবি ও ৯ লক্ষ্য সামনে রেখে এ ঐক্যের আহ্বান জানান নেতারা। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় স্বাধীনতাবিরোধী দল ও ব্যক্তি ছাড়া সবাই এই ঐক্য প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবে।
এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নেতারা বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত দলগুলো আলাদা কর্মসূচি দিলেও প্রায় সব কর্মসূচিতেই ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতারা অংশ নিচ্ছেন। ঐক্যপ্রক্রিয়ার নেতারা জানিয়েছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হলেও পুলিশের পক্ষ থেকে মহানগর নাট্যমঞ্চে সমাবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে। বুধবার পুলিশের অনুমতিপত্র পাওয়া গেছে। বিকাল পাঁচটার মধ্যে সমাবেশ শেষ করাসহ বেশ কয়েকটি শর্তে ঢাকা মহানগর পুলিশ এ অনুমতি দিয়েছে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন বিকল্প ধারা বাংলাদেশের সভাপতি ও যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এতে জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বক্তব্য রাখবেন।
শনিবারের নাগরিক সমাবেশ উপলক্ষে গঠিত উপ-কমিটির সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক মানবজমিনকে বলেন, জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার নাগরিক সমাবেশের প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। সমাবেশে জামায়াত ছাড়া বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
অনেক বিশিষ্ট নাগরিককেও দাওয়াত দেয়া হয়েছে। সমাবেশ থেকে নতুন চমক আসবে বলেও জানান তিনি। এদিকে বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত আটটি দল বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী), গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকেও সমাবেশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। দলগুলোর পক্ষ থেকে অংশ নেয়ার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে বলে নেতারা জানিয়েছেন।
সমাবেশে যোগ দেবে বিএনপি: জাতীয় ঐক্যের সমাবেশে যোগ দেবে বিএনপি। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার তরফে বিএনপি মহাসচিবকে আমন্ত্রণ জানানোর পর বুধবার রাতে এ নিয়ে চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে একটি জরুরি বৈঠক করেন দলের নীতিনির্ধারক ফোরাম। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা ও স্থায়ী কমিটির মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যের সমাবেশে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আগামীকালের সমাবেশে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব করবেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপি স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, বুধবারের বৈঠকে জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার গতিপ্রকৃতিসহ সার্বিক বিষয়ে আলোচনা হয়। জাতীয় ঐক্যের তাগিদ দিয়ে দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি প্রথম আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সে আহ্বানের প্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে বিএনপির মনোভাব সবসময়ই ইতিবাচক।
এছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী বৈঠকে জাতীয় ঐক্যের অনুকূলে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয় সূত্র জানায়, সোমবার রাতে অনুষ্ঠিত দলের নীতিনির্ধারকদের বৈঠকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে ১৩ দফা ও উপ-দফা এবং নয়টি লক্ষ্যে খসড়া চূড়ান্ত করা হয়।
এই খসড়া নিয়ে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা। বিএনপির এই খসড়ার সঙ্গে প্রায় একমত পোষণ করেছেন ড. কামাল হোসেন। স্থায়ী কমিটির সূত্র জানায়, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব নিয়ে ড. কামাল হোসেনের ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই বিএনপির। কারণ বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দল ও জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার বাইরেও কিছু বাম রাজনৈতিক দলের একটি জোট রয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
এখন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল মৌলিক ইস্যুতে একমত হলে জাতীয় ঐক্যের গতিপ্রকৃতি ও কর্মপন্থা নির্ধারণে দ্বিমতের কোনো কারণ নেই বিএনপির। তবে দুইটি বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেনি বিএনপি। বিষয়গুলো হচ্ছে- জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত হলে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড ও নির্বাচন পরবর্তী কর্মকাণ্ডে কে নেতৃত্ব দেবেন।
যথোপযুক্ত সময়ে দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের মতামত ও নির্দেশনার আলোকে দলের নীতিনির্ধারক ফোরাম সে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন। ২০ দলীয় সূত্র জানায়, জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার তরফে জোটের বেশিরভাগ শরিক দল দুইটি চিঠি করে চিঠি পেয়েছে। একটি চিঠিতে দলের চেয়ারম্যান বা সভাপতি ও আরেকটি চিঠিতে দলকে সে সমাবেশে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। তবে জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো দাওয়াত পাননি। এ নিয়ে জটিলতা নিরসনে বুধবার ও বৃহস্পতিবার জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের দুইটি অংশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

চাপ, হুমকির মুখে দেশ ত্যাগ করেছি -টাইম টেলিভিশনকে এসকে সিনহা

একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা। আমি কিছুই বুঝলাম না। ওয়াহাব মিয়া বলছেন যে তিনি সারারাত ঘুমাননি। অভিযোগগুলো নিয়ে অনেক চিন্তা করেছেন। অভিযোগগুলো সিরিয়াস। আমি বললাম, এসব কি অভিযোগ যে আমি জানলাম না। আমাকে রাষ্ট্রপতি জানালেন না। তোমরা আমার বিচার করবা? সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছো? প্রধান বিচারপতিকে যদি এতো তাড়াতাড়ি সরানো যায়। এতো তাড়াতাড়ি যদি সরকারের ফর্মূলা হয়ে যায়। তাহলে বিচার বিভাগ থাকবে ? ওয়াহাব মিয়া কিছুই বলছেন না। সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা আমেরিকার নিউইয়র্ক থেকে সম্প্রচারিত টিভি চ্যানেল টাইম টেলিভিশনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। নিজের আতœজীবনীমূলক ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম’ বই প্রকাশের পর এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে দেশে বিদেশে। যেখানে তিনি দাবি করেছেন বর্তমান সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের চাপ ও হুমকির মুখে দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। এই ইস্যুতে টাইম টেলিভিশনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন কীভাবে এবং কেন তাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য হতে হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অব্যাহত চাপ, গৃহবন্দি, বিশেষ বাহিনীর চাপ, সুস্থ থাকার পরও কেন তাকে ক্যান্সারের রোগি বানিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে। সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা  বলেন, এর মধ্যে ১১টার সময় আমাকে আমার সেক্রেটারি এসে বলছে, স্যার ডিজিএফআই’র প্রধান এসেছেন আপনার সাথে কথা বলবে। তিনি এসে বললেন, স্যার আপনাকে লম্বা ছুটিতে যেতে হবে। হুয়াট? তিনি বললেন, হাই অথরিটি থেকে আমাকে অর্ডার দেয়া হয়েছে। দেখেন, আর্মি অফিসারকে দিয়ে অপদস্ত করা হয়েছে। এরপরে তো কিছুই করার থাকে না। এরমধ্যে আবার ডাক্তার আসলো। আমি বললাম আপনাদের তো ইনভাইটেশন দেই নাই। কেন এসেছেন? বললাম, কই আপনাদের কানে যে দেয়, ওইটা কোথায়? ব্লাড প্রেসার মাপে ওই যন্ত্র কোথায়? কিছুই আনেন নাই।  মুছকি হাসতেছে। বলল, স্যার আপনি বুঝেন তো। আপনি তো আমাদের চেয়েও সুস্থ। এভাবে মশকারা করলো। একদিন একজন আসে। আরেকদিন আরেকজন আসে। ৬ তারিখে রাত ১০টার সময় আবার ডিজিএফআইয়ের প্রধান আসলেন। আমাকে চার্জ করছে। স্যার আপনাকে ভর্তি হতে হবে। আপনি অসুস্থ। হোয়াট? আমি কেন ভর্তি হবো? একজন আর্মি অফিসারকে দিয়ে একজন প্রধান বিচারপতিকে একেবারে পা দিয়ে লাথি দেয়া হয়েছে। আমাকে চার্জ করেছে ডিজিএফআই চিফ। স্যার আপনাকে ভর্তি হতে হবে। স্যার আপনি অসুস্থ। তিনি বললেন, আমি যা বলছি তাই ফাইনাল। ওয়াহাব মিয়াসহ সবাইকে প্রধান বিচারপতি করার লোভ দেখানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি ষোড়শ সংশোধনীর রায় দেয়ার আগের দিন পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ছিল না।

আমি নারী, পিরিয়ড তো হবেই by প্রিয়াংকা চক্রবর্ত্তী

পিরিয়ড বা ঋতুস্রাব, একজন নারীর জীবনে খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু এই স্বাভাবিক নিয়মটিই সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে হয়ে ওঠে সংকোচের, লজ্জার। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে পিরিয়ড নিয়ে জনসম্মুখে কথা বলাটাও যেন মহাবিব্রতকর। এই স্বাভাবিক বিষয়টিকে সমাজে ট্যাবু করে রাখা হয়েছে যার ফলে তৈরি হয় নানান ভুল ধারণা।
পিরিয়ড চলাকালীন একজন নারী হরমোনজনিত কারণে একদিকে যেমন শারীরিক ও মানসিক ব্যাপক এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যান। আবার তেমনি বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় তাকে পোহাতে হয় নানান ঝক্কি-ঝামেলাও। রাস্তাঘাটে চলাফেরা থেকে শুরু করে বাড়িতে পর্যন্তও সতর্কতা অবলম্বন করতে হয় তাকে। ঘরে হোক বা বাইরে, কোনো পুরুষ যেন বুঝতে না পারে মেয়েটি তার জীবনের একটি খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্যে মাসের কয়েকটি দিন অতিবাহিত করছে। এসব নিয়ে এক মানসিক প্রেশার একইভাবে যেভাবে থেকে যায়, সঙ্গে থাকে শারীরিক কিছু সমস্যাও।
পিরিয়ডের দিনগুলোতে তীব্র পেট, পিঠ, কোমর ব্যথা আর সঙ্গে অনেকসময় থাকে বমি বমি ভাব। এভাবেই মেয়েদেরকে চালিয়ে যেতে হয় দৈনন্দিন সকল কাজকর্ম। শারীরিক এসব প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি এ সময় দেখা দেয় মানসিক নানান সমস্যা। হরমোনজনিত কারণে খুবই সংবেদনশীল মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এছাড়াও বিষণ্নতা, রাগ হওয়া, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকা, খিটখিটেভাব অনুভব করেন। এ সময়ে প্রয়োজন সঠিক যত্নের পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন থাকা, ভিজে যাওয়া স্যানিটারি ন্যাপকিন পড়ে না থাকা, আর ঠিকমতো পুষ্টিকর খাবার চালিয়ে যাওয়া। যত বেশি সম্ভব আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।
এবার আসা যাক সামাজিক কিছু বাস্তব উদাহরণে। ‘আচ্ছা তোদের প্রতি মাসে কি যেন হয়?’ ‘কিরে কোন দিক দিয়ে অসুস্থ তুই, চলে নাকি এখন?’ বন্ধুদের এসব বিব্রতকর কথাবার্তার সম্মুখীন হতে হয়েছে বেশির ভাগ মেয়েকেই। মেয়েদের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করা তো দূরের কথা, প্রকৃতির এই স্বাভাবিক নিয়মকে হাস্যরসাত্মক, ব্যঙ্গাত্মক বিষয় বানিয়ে দেয়া হয় অনেকসময়। এক্ষেত্রে সামাজিক অবস্থা যেমনভাবে দায়ী একইভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে পিরিয়ড সংক্রান্ত কোনো শিক্ষামূলক বিষয় বইয়ের অন্তর্ভুক্ত না করাও অনেকাংশেই দায়ী। মেয়েদের যেমন পিরিয়ড সংক্রান্ত শিক্ষার প্রয়োজন, একইভাবে একটি ছেলেরও সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত, নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং পিরিয়ডের বিষয়ে সঠিক ধারণা দেয়ার জন্য এ সংক্রান্ত শিক্ষার প্রয়োজন। প্রকৃতিক নিয়মে পিরিয়ড এলেও এ সময় নারীদের অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয় না কোনো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে। আর এসব বিষয়কে কেন্দ্র করেও অনেক সময় বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়।
স্যানিটারি ন্যাপকিন। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমাদের সমাজ ব্যবস্থা নারীদের এমন অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে যে, স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে যাওটাও নারীদের জন্য অত্যন্ত সংকোচের বিষয়। কোনো নারী স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে গেছেন আর তার দিকে দোকানে থাকা কেউ বা বিক্রেতা আড়চোখে তাকাননি, এমন ঘটনা খুব কমই পাওয়া যাবে। সেজন্য চক্ষুলজ্জার খাতিরে অনেকেই নিজে থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে দোকানে যেতে রাজি হন না। এক্ষেত্রেও সমাজের রক্ষণশীলতাই প্রধানত দায়ী। বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন অনেক নারী আছেন যারা স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করলেও, নিজেরা কখনও দোকান থেকে কেনেননি। আর গ্রামের বেশির ভাগ নারীই এ সময়টাতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের বদলে কাপড় ব্যবহার করেন। স্পর্শকাতর এই দিনগুলোতে পরিচ্ছন্ন না থাকলে কতখানি স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন সে বিষয়েও তাদের কোনো ধারণা নেই।
চিকিৎসকরা বলেন, পিরিয়ডের দিনগুলোতে অপরিচ্ছন্ন থাকলে বা কাপড় ব্যবহার করলে জরায়ুতে ও মুত্রাশয়ে ইনফেকশন, পিরিয়ড অনিয়মিত হওয়া এবং অতি মাত্রায় পেট ব্যথা হয়ে থাকে।
পিরিয়ড সংক্রান্ত অজ্ঞতা আমাদেরকে এমন অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে বেশির ভাগ নারীরই প্রজননস্বাস্থ্য সম্বন্ধে কোনো শিক্ষা নেই। আর এই অজ্ঞতা আসে খোলামেলা আলোচনার অভাবে। কিন্তু আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট আমাদেরকে পিরিয়ড নিয়ে মুক্ত আলোচনার কোনো সুযোগ দেয় না। মেয়েলি বিষয় বলে আগেই মুখ চেপে ধরা হয়। বাইরে আলোচনা তো অনেক দূরের কথা, নিজের বাড়িতে বাবা-ভাইয়ের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলার যেন অনুমতি নেই। এমন মেয়ে হাতে গোনা কয়েকজনই পাওয়া যাবে, যারা নিজে মুখে বাবাকে বা ভাইকে বলেছেন বাইরে থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে এনে দিতে।
চুপ থাকা সমাধান নয়। আসুন মুক্ত আলোচনা করি। কেননা আলোচনার মাধ্যমেই আসে সমাধান।