Showing posts with label জামালপুর. Show all posts
Showing posts with label জামালপুর. Show all posts

Friday, February 13, 2026

জামালপুরের দুই পাঠাগার: ঝকঝকে ভবন, তাকে তাকে সাজানো বই, নেই শুধু পাঠক by আবদুল আজিজ

প্রকাশ ২০ অক্টোবর ২০২৫ঃ ঝকঝকে টাইলসের মেঝে আর সাদা রঙের দেয়াল। কাঠের তৈরি চেয়ার-টেবিলগুলো এখনো নতুন। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত বিশাল পাঠাগার দুটির তাকে তাকে সাজানো দেশ-বিদেশের হাজারো বই। কিন্তু যাঁদের জন্য এই আয়োজন, সেই পাঠকই নেই। ভেতরে সুনসান নীরবতা। পাঠক–খরায় বই, চেয়ার–টেবিলগুলো পড়ে থাকছে ফাঁকা।

এ অবস্থা দেখা গেছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারে। ২০১৫ সালে পাঠাগার দুটির উদ্বোধন হয়। প্রথমদিকে সেখানে কিছু পাঠক ছিলেন। এখন মাঝেমধ্যে স্কুলের কিছু শিক্ষার্থী এলেও ক্রমে পাঠকশূন্য হয়ে যাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন পাঠাগার দুটি। পাঠক ফেরাতেও নেই তেমন কোনো উদ্যোগ।

৫ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, দেওয়ানগঞ্জ শহর থেকে অল্প দূরেই এ কে মেমোরিয়াল কলেজ। কলেজের প্রধান ফটক পেরোতেই চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন একটি ভবন। আর কলেজ ক্যাম্পাসের পূর্ব পাশে দাঁড়িয়ে আছে দেওয়ানগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারের দোতলা ভবনটি। ভবনের নিচতলায় প্রায় ২০০ মানুষের ধারণক্ষমতাসংবলিত একটি বিশাল মিলনায়তন। ওপরে দোতলায় মূল পাঠাগার। কিন্তু পাঠাগারে কোনো পাঠক নেই। পাঠাগার বিষয়ে কথা বলার মতো লোকজনও খুঁজে পাওয়া গেল না।

১২ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণের দক্ষিণ পাশে সরকারি গণগ্রন্থাগারের দোতলা ভবন। দেওয়ানগঞ্জের মতোই পুরো পাঠাগার চকচকে-তকতকে। ওপরে দোতলায় মূল পাঠাগার। সেখানে গিয়ে কিছু শিক্ষার্থীকে পাওয়া গেল। কয়েকজন পাঠাগারে বসে গল্প করছে। কয়েকজন বই পড়ছেন।

শিক্ষার্থীদের কয়েকজন বললেন, তাঁরা মাঝেমধ্যে এখানে আসেন। সব ধরনের বই এখানে আছে। গ্রন্থাগারটা অনেক সুন্দর করে বানানো হয়েছে। তবে তেমন কেউ যান না বই পড়তে। এখন সবাই মোবাইলেই সময় কাটান।

গণগ্রন্থাগার সূত্রে জানা গেছে, এ কে মেমোরিয়াল কলেজ ক্যাম্পাসে ও বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে গণপূর্ত অধিদপ্তর ২০১৩ সালে পাঠাগার দুটির নির্মাণকাজ শেষ করে। সব কাজ শেষ হওয়ার পর ২০১৫ সালে এই দুটি পাঠাগার জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পাঠাগার দুটিতে প্রায় ২০ হাজার বই আছে। প্রতিদিনের সংবাদপত্রও থাকে।

জামালপুর শহরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যাপক মো. আবদুল হাই আলহাদী প্রথম আলোকে বলেন, ‘পড়িলে বই আলোকিত হই’—জ্ঞানে, প্রজ্ঞায়, আচরণে এই আলোকিত হওয়ার প্রবণতা এখন উদ্বেগজনকভাবে কমে এসেছে। পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার গড়ে তোলার যে আন্দোলন একসময় ছিল, তা আর দেখা যায় না। কারণ, জেলা, উপজেলা বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় শহরের গ্রন্থাগারগুলোতেও এখন চলছে পাঠকের আকাল। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গ্রন্থাগারেও পাঠক নেই।

সব আয়োজন থাকার পরও পাঠক না থাকার প্রসঙ্গে মো. আবদুল হাই আলহাদী বলেন, কেন পাঠক নেই বা পাঠক তৈরি হচ্ছে না—সেটা নিয়ে গবেষণা করা দরকার। পরীক্ষায় ভালো করার প্রতিযোগিতা, ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা, অনলাইনে তথ্যপ্রাপ্তির অবাধ সুযোগ; এ যুগের শিক্ষার্থীদের গ্রন্থাগারবিমুখ করার অন্যতম কারণ। তরুণ প্রজন্ম বই পড়ার বদলে সময় দিচ্ছে ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

জাতীয় কবিতা পরিষদ জামালপুর জেলা শাখার উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, মানুষকে পাঠাগারে ফেরাতে সামাজিক বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হবে। অফিস সময়ের পর গ্রন্থাগার বন্ধ থাকে। ফলে সান্ধ্য অবসরে পাঠক গ্রন্থাগারে যাওয়ার সুবিধাটা পান না। বিনোদনের নানা কিছু এসে পাঠাভ্যাসকে বদলে দিয়েছে। পাঠক আকৃষ্ট করতে নানা প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের আয়োজন করা দরকার।

গ্রন্থাগারে পাঠক নেই, এ এক দুঃখজনক বাস্তবতা—এমন মন্তব্য করে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকী বলেন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তথ্য পাওয়া সহজ হওয়ায় মানুষ এখন গ্রন্থাগারে যেতে চান না। বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারগুলোও এখন চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই দেশে জ্ঞানীরা সম্মানের অধিকারী নন, যেকোনো উপায়ে বিত্তবান ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সমাজের নিয়ন্ত্রক বলে মানুষ জ্ঞানলাভে উৎসাহী নয়। জ্ঞানভিত্তিক সমাজগঠনে রাষ্ট্র এগিয়ে এলে, চাকরিপ্রার্থীদের বাছাইপ্রক্রিয়া মুখস্থ তথ্যভিত্তিক না হয়ে মননধর্মী হলে, জ্ঞানীদের সম্মান দেওয়া শুরু হলে গ্রন্থাগারে আবারও পাঠক যাবেন বলে তিনি আশা করেন।

বকশীগঞ্জ উপজেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. মোখলেছুর রহমান দেওয়ানগঞ্জের গণগ্রন্থাগারের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। তিনি বলেন, গ্রন্থাগার দুটির বড় সমস্যা জনবল। বকশীগঞ্জে তাঁরা তিনজন এবং দেওয়ানগঞ্জে মাত্র দুজন আছেন। পাঠক না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, বকশীগঞ্জে শিক্ষার্থীসহ কিছু পাঠক আছেন। তবে দেওয়ানগঞ্জেরটা কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যে হওয়ায় অনেকেই মনে করেন, সেটা কলেজের গ্রন্থাগার। ফলে সেখানে পাঠক একদমই কম। পাঠকদের ফেরাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচার চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

পাঠাগারের তাকে তাকে সাজানো নানা ধরনের বই। আছে নতুন টেবিল–চেয়ার, নেই শুধু পাঠক। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারে
পাঠাগারের তাকে তাকে সাজানো নানা ধরনের বই। আছে নতুন টেবিল–চেয়ার, নেই শুধু পাঠক। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারে। ছবি: প্রথম আলো

Sunday, January 11, 2026

জামালপুরে দৃষ্টিনন্দন ‘মসজিদে নূর’ দেখতে মানুষের ভিড়

চারদিকে ফসলের মাঠ। এর আশপাশে মিতালি গড়েছে গাছগাছালি। এমন মনোরম আবহের মাঝখানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘মসজিদে নূর’ জামে মসজিদ। তিন দরজাবিশিষ্ট দুই তলা মসজিদটি মার্বেল পাথরের অবকাঠামোর তৈরি। ছাদের চারপাশে পিলারের ওপর সাতটি গম্বুজসহ চারটি বড় মিনার। জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা শহরের প্রবেশপথে চোখে পড়বে মসজিদটি।

তুরস্কের আদলে কারুকার্যমণ্ডিত এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। জামালপুর-বকশীগঞ্জ সড়ক–সংলগ্ন বকশীগঞ্জ শহরের দড়িপাড়া এলাকায় আধুনিক স্থাপত্যে গড়ে তোলা হয়েছে এই মসজিদ। মসজিদের স্থাপত্যশৈলী দেখতে সেখানে প্রতিদিনই ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী।

প্রকৃতির সঙ্গে মিশে একাকার ও নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী মসজিদে নূর জামে মসজিদ দেখতে প্রতিদিন ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী। সম্প্রতি জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা শহরের দড়িপাড়া এলাকায়
প্রকৃতির সঙ্গে মিশে একাকার ও নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী মসজিদে নূর জামে মসজিদ দেখতে প্রতিদিন ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী। সম্প্রতি জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা শহরের দড়িপাড়া এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

সম্প্রতি মসজিদে নূর–সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা শহরগামী প্রধান সড়কের ডান পাশে আরেকটি পাকা সড়ক চলে গেছে। সেটি ধরে ৫০০ মিটার এগোলেই চোখে পড়ে নয়নাভিরাম মসজিদটি। এর চারপাশে সবুজ সমারোহ। আঙিনায় সারিবদ্ধ ঝাউগাছসহ মসজিদের চারপাশে আছে হরেক ফুলের বাগান। ডান পাশে একটি দৃষ্টিনন্দন অজুখানা আছে। এর ঠিক সামনেই বিশাল একটি মাঠ। সেখানে নিয়মিত খেলাধুলা করে স্থানীয় কিশোর, তরুণ ও যুবকেরা।

মসজিদের ভেতরে ঢুকতেই নজর কাড়ে কারুকাজ। মেঝেতে ব্যবহৃত হয়েছে মার্বেল পাথর। সম্পূর্ণ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দ্বিতল মসজিদের সিলিংয়ে ঝুলছে দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি। এ ছাড়া মসজিদের মূল চত্বরের পবিত্রতা রক্ষার্থে চারপাশে নির্মিত হয়েছে দেয়াল।

নির্মাতা ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১১ মে জুমার নামাজের মাধ্যমে মসজিদটি মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পাঁচ একর জায়গাজুড়ে এটি নির্মিত হয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাহবুবুল হক নামের এক ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেন।

তুরস্কের আদলে কারুকার্যমণ্ডিত এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন
তুরস্কের আদলে কারুকার্যমণ্ডিত এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। ছবি: প্রথম আলো

জামালপুর শহরের জিগাতলা এলাকা থেকে মসজিদটি দেখতে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ কালাম নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘অনেকের কাছেই এ মসজিদের সৌন্দর্যের কথা শুনেছি। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগল মসজিদের মিনারগুলো।’

মসজিদের প্রাঙ্গণে কথা হয় বকশীগঞ্জ উপজেলা শহরের রমজান আলীর সঙ্গে। তিনি তাঁর সন্তানদের নিয়ে এটি দেখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এত বড় জায়গা নিয়ে সুন্দর মসজিদটি জামালপুরের আর কোথাও নাই। মূলত এর স্থাপত্যশৈলী দেখতেই প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ ভিড় করেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহে এর মতো সুন্দর মসজিদ আর নেই।’

মসজিদের ইমাম মো.বেলাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, মসজিদের ভেতরে, নিচে ও দোতলায় প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। ফুলের বাগানে ঘেরা এই মসজিদের পাশে বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা ও মাদ্রাসা আছে। এখন মুসল্লিদের মুখে মুখে মসজিদটির নাম ছড়িয়ে পড়েছে।

আঙিনায় সারিবদ্ধ ঝাউগাছসহ মসজিদের চারপাশে আছে হরেক ফুলের বাগান। ডান পাশে একটি দৃষ্টিনন্দন অজুখানা আছে। এর ঠিক সামনেই বিশাল একটি মাঠ
আঙিনায় সারিবদ্ধ ঝাউগাছসহ মসজিদের চারপাশে আছে হরেক ফুলের বাগান। ডান পাশে একটি দৃষ্টিনন্দন অজুখানা আছে। এর ঠিক সামনেই বিশাল একটি মাঠ। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, June 11, 2025

মাথায় কাটা চিহ্নের সূত্র ধরে যেভাবে গ্রেপ্তার হলেন খুনি by নজরুল ইসলাম

জামালপুরের বকশীগঞ্জের বান্দেপাড়া এলাকার পাটখেত থেকে গত ১৬ মে এক নারীর পোড়া লাশ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। মুখমণ্ডল পুড়ে যাওয়ায় ওই নারীর নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। ওই ঘটনায় জড়িতদেরও শনাক্ত করতে পারছিল না পুলিশ। শেষ পর্যন্ত ওই নারীর মাথায় আগের কাটা চিহ্নের সূত্র ধরে তাঁর নাম-ঠিকানা নিশ্চিত হয়ে হত্যায় জড়িত অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ওই নারীর নাম নবিরন খাতুন (৫২)। বাড়ি জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের চেংটিমারী পূর্ব এলাকায়। পেশায় পোশাকশ্রমিক এই নারী থাকতেন রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায়।

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত জামালপুরের পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার দুই সন্ত্রাসীকে ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া করে নবিরনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন তাঁর জামাতা আবু তালেব মণ্ডল (৪৭)। লাশ যাতে চেনা না যায়, সে জন্য পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় লাশটি পাওয়া যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবস্থান নিশ্চিত হয়ে ৪ জুন রাতে ঢাকার সাভারের একটি এলাকা থেকে আবু তালেবকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি জামালপুরের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে পুলিশ জানায়।

কাটা চিহ্নের সূত্র ধরে যেভাবে পরিচয় শনাক্ত

পাটখেত থেকে উদ্ধার নবিরনের লাশটির মুখ, গলা ও বুক পোড়া ছিল। ওই ঘটনায় বকশীগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আনিছুর রহমান বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় বলা হয়, ১৫ মে দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারীরা পূর্বশত্রুতার জের ধরে ওই নারীকে হত্যা করে লাশ গুম করার চেষ্টা করেছেন।

মামলার তদন্ত তদারকের সঙ্গে যুক্ত জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আঙুলের ছাপ মিলিয়েও নিহত নারীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। হত্যাকাণ্ডের তেমন কোনো সূত্র ছিল না পুলিশের কাছে।

তদন্তের এক পর্যায়ে স্থানীয় এক স্কুলশিক্ষক পুলিশকে জানান, গত মে দিবসের দিন এক নারীর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিলেন আবু তালেব। আর পুলিশের করা সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, নিহত নারীর মাথায় ছয় ইঞ্চি গভীর কাটা চিহ্ন রয়েছে। এ নিয়ে পুলিশের সন্দেহের সৃষ্টি হয়। পুলিশ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ওই নারী বকশীগঞ্জের একটি ওষুধের দোকান থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু আবু তালেবকে এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁর ছেলের কাছ থেকে আবু তালেবের মুঠোফোন নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

পুলিশ অনুসন্ধান করে জানতে পারে, নবিরনের একমাত্র মেয়ে বিলকিস বেগম রাজধানীর খিলগাঁওয়ে থাকেন। তাঁর মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে যোগাযোগ করে পুলিশ জানতে পারে, অনেক দিন ধরে তাঁর মা নিখোঁজ রয়েছেন। এর আগে তাঁর মায়ের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছিলেন আবু তালেব। তখন পুলিশের কাছে বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কার হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, তখন বিলকিসের কাছ থেকে আবু তালেবের মুঠোফোন নম্বর নিয়ে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যায় অংশ নেওয়া অপর দুজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে যাওয়ায় হত্যার পরিকল্পনা

জিজ্ঞাসাবাদে নবিরনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার কথা স্বীকার করে আবু তালেব পুলিশকে বলেন, এ জন্য তিনি ঢাকা থেকে দুজন সন্ত্রাসী ভাড়া করেন। ভাড়া করা দুজনসহ মিলে তাঁরা নবিরনকে ছুরিকাঘাত হত্যা করেন। লাশ যাতে শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার পর তিনি সাভারে গিয়ে অটোরিকশা চালানো শুরু করেন। কিন্তু সেটি কাউকে জানাতেন না।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আবু তালেব বলেন, ‘আমার স্ত্রী বিলকিসকে নিয়ে যাতে সংসার করতে না পারি, সে জন্য যা যা করার দরকার, সবই শাশুড়ি (নবিরন) করতেন। আর আমার স্ত্রীও তাঁর মায়ের কথা শুনতেন। আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। পরে আমার সন্তানদেরও আমার শাশুড়ি ঢাকায় নিয়ে যান। এতে আমি ক্ষুব্ধ হয়ে অমার শাশুড়িকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিই। আমার শাশুড়িকে মেরে ফেলার জন্য ঢাকায় দু্ই সন্ত্রাসীকে ৩০ হাজার টাকায় ভাড়া করি।’

আবু তালেব আদালতকে বলেন, ‘গত ১৫ মে আমার শাশুড়ি ঢাকা থেকে জামালপুর আসেন। এই খবর পেয়ে ভাড়া করা দুই সন্ত্রাসীও জামালপুরে আসেন। ওই দিন সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমার শাশুড়ি স্থানীয় বাজারে মুঠোফোন কিনতে যাচ্ছিলেন। তখন আমি তাঁকে বলি, চলেন আমি আপনাকে সোজা পথে নিয়ে যাব। এ কথা বলে ভাড়া করা দুই সন্ত্রাসীসহ আমি এবং আমার শাশুড়ি একটি রিকশায় (রিকশাভ্যান) উঠি। কিছু দূর যাওয়ার পর ভ্যান থেকে নেমে পড়ি এবং চালককে ভ্যান নিয়ে চলে যেতে বলি।’

আবু তালেব জবানবন্দিতে আরও বলেন, ‘এরপর তাঁকে (শাশুড়ি) একটি প্লটে নিয়ে যাই। তখন আমরা তাঁকে ঘিরে ধরি। তখন শাশুড়ি বলেন, তাঁর কাছে টাকা ও চেক আছে। এগুলো নিয়ে যেতে অনুরোধ করে বলা হয়, তাঁকে যেন মেরে না ফেলা হয়। তখন দুই সন্ত্রাসী আমার শাশুড়ির গলায় ওড়না লাগিয়ে পেঁচিয়ে ধরেন। এঁদের একজন মাথা, হাত ও পায়ে ছুরিকাঘাত করেন। তাঁরা টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেন। তখন আমার শাশুড়ির মুখ চেপে ধরি আমি।’

আবু তালেব আরও বলেন, ‘এ সময় আমি দুজনকে ১ হাজার ৩০০ টাকা দিই। বাকি টাকা পরে দিতে চাই। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশ পাটখেতে নিয়ে আগুন ধরিয়ে আমরা চলে যাই।’

তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, নবিরনকে ধর্ষণের আলামতও পাওয়া গেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বকশীগঞ্জের কামালের বাত্তি তদন্তকেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, নবিরনকে হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে তৈরি