Wednesday, September 16, 2026
পশ্চিমবঙ্গে ইসলামি অভিবাদন জানানোর জেরে বিতর্ক, নারী আইপিএস কর্মকর্তাকে বদলি
ভুক্তভোগী ওই কর্মকর্তার নাম বুশরা বানো। তিনি ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসের (আইপিএস) কর্মকর্তা। এর আগে তিনি সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। পরে সুবিধাজনক চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে এসে দুইবার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (ইউপিএসসি) পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন। সম্প্রতি তিনি খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট (এএসপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় একটি ভিডিও চিত্রকে কেন্দ্র করে। সেখানে বুশরা বানোর ইসলামি শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর হিন্দুত্ববাদী বিভিন্ন হ্যান্ডল থেকে তাঁর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ তোলা হয়, তিনি বন্দে মাতরম বা জয় হিন্দের মতো আনুষ্ঠানিক জাতীয় স্লোগান ব্যবহার করেননি। এরপর ভারতের বিতর্কিত সম্প্রচারমাধ্যম ‘সুদর্শন নিউজ’ পুরো ঘটনাকে ‘ইউপিএসসি জিহাদ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রচার শুরু করে। পাশাপাশি হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড নামের একটি সংগঠন পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করে। অভিযোগ জমা পড়ার পরদিনই সোমবার বুশরা বানোকে খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদ থেকে সরিয়ে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের (এসএপি) ডেপুটি কমান্ড্যান্ট হিসেবে বদলি করা হয়।
প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র কেন্দ্রীয় সরকারের সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলনের প্রসঙ্গ টেনে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, একদিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি তুলে ধরতে ব্রিকস সম্মেলনে প্রার্থনাকক্ষ তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ‘গোদি মিডিয়া’র ছড়ানো বিদ্বেষের শিকার হয়ে ‘আসসালামু আলাইকুম’ ও ‘জাজাকাল্লাহ’ বলার অপরাধে একজন মুসলিম নারী পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ইমরান প্রতাপগড়ি এ ঘটনায় ভারতের আইপিএস অ্যাসোসিয়েশনের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিদ্বেষ ছড়ানোর ইতিহাস থাকা একটি টেলিভিশন চ্যানেলের অনলাইন ট্রলিংয়ের শিকার হলেন একজন নারী কর্মকর্তা। অথচ রাজ্য সরকার ওই অফিসারের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো তাঁকে বদলি করে দিল। তিনি উত্তর প্রদেশের পুলিশ কর্মকর্তা অনুজ চৌধুরীর প্রসঙ্গ টেনে আনেন; যিনি ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় হাতে গদা নিয়ে রথযাত্রায় অংশ নেওয়ার পরেও শাস্তি না পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন।
ভারতের সাবেক আমলা আশিস জোশী বিষয়টিকে দেশটির ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের চেতনার’ পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, যিনি সৌদি আরবের চাকরি ছেড়ে এসে দু-দুবার ইউপিএসসি পাস করে দেশের সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন, তাঁর ব্যবহৃত শব্দগুলো কেবলই ব্যক্তিগত বিশ্বাসের অংশ। এটি কোনোভাবেই দেশকে রক্ষা করার মানসিকতাকে খাটো করে না। ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্র্যময় দেশে এই বহুত্ববাদ দুর্বলতা নয়; বরং গর্বের প্রতীক।
![]() |
| পশ্চিমবঙ্গের আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানো। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া |
Friday, September 11, 2026
ইসলামভীতি ছড়াতে নিজের পাতা ফাঁদেই আটকেছিল যুক্তরাষ্ট্র
ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা ৯/১১ হামলা সংঘটিত হওয়ার আগেই এ সম্পর্কে জানত। ইসরাইলের নেতৃত্ব কখনোই ৯/১১ হামলা নিয়ে তাদের মনোভাব লুকায়নি; বরং তাদের ধারণা ছিল, এ হামলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্ককে আরো গভীর করে তুলেছে। ব্রিটিশ সাংবাদিক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও লেখক পিয়ার্স মরগানের অনুষ্ঠান ‘আনসেন্সরড নিউজ’-এ মার্কিন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন একটি প্রামাণ্যচিত্র সিরিজে সম্প্রতি এসব দাবি করেছেন।
কার্লসন উল্লেখ করেন, হামলার পরপরই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্যামেরার সামনে বলেছিলেন, ‘এ ঘটনা আসলে ভালো। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ইসরাইল কয়েক দশক ধরে অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি ৯/১১ হামলার সঙ্গে পার্ল হারবারে জাপানি হামলার তুলনাও করেছিলেন। ট্রাম্পসহ বেশ কিছু পরিচিত মুখ ও গণমাধ্যম ভাষ্যকার মুসলিম এবং আরব মার্কিনদের নিয়ে ভয় উসকে দিয়ে নিজেদের সমর্থকগোষ্ঠীকে আরো উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন।
কার্লসন এ প্রসঙ্গে বহুল আলোচিত ‘ইসরাইলি আর্ট স্টুডেন্টস’ ইস্যুও সামনে আনেন। তার কথায়, যুক্তরাষ্ট্রে এ তথাকথিত শিল্পশিক্ষার্থীদের কেউ কেউ প্রকৃতপক্ষে শিল্পশিক্ষার্থী ছিলেন না, বরং ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাদের যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার করে কিছুদিন আটকে রাখা হলেও পরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়। এফবিআইয়ের নথি অনুযায়ী ওই শিক্ষার্থীদের কয়েকজন হামলার দৃশ্য ধারণ করেছিলেন এবং দৃশ্যত হামলার বিষয়ে আগে থেকেই তাদের ধারণা ছিল।
অথচ হামলার ঠিক পরপরই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিম ও আরব বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিকদের জীবনে নেমে আসে নতুন সংকট। বহু মসজিদে আগুন দেওয়া হয় বা ভাঙচুর করা হয়, মুসলিমদের ওপর নেমে আসে হত্যার হুমকি ও হয়রানি। ২০১১ সালে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টারের সাক্ষ্য অনুযায়ী, শুধু মুসলিম বলে মনে হওয়ার কারণেই অনেককে মারধর, আক্রমণ এমনকি বন্দুকের মুখে ফেলা হয়েছিল।
মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ৯/১১ ও এর পরবর্তী বৈষম্য নিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী হিসেবে তারাও (মুসলিমরা) সেদিন আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার ভাষায়, ‘এ দেশ, এ কমিউনিটি তাদেরও। হামলায় মুসলিম ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ বহু মুসলিম নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন।’
মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (এফবিআই) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাজনিত অপরাধ বেড়ে যায় প্রায় ১৬১৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ইসলামভীতি থেকে সৃষ্ট ঘৃণামূলক অপরাধের অন্যতম সর্বোচ্চ সংখ্যা এটি। এমন অপরাধের ঘটনা ২০০০ সালে ছিল ২৮টি। ২০০১ সালে তা একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮১টিতে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের আরব আমেরিকান স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক স্যালি হাওয়েল বলেন, ৯/১১ পরবর্তী সময়ে মুসলিম ও সন্ত্রাসবাদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এতটাই ভয় তৈরি হয়েছিল যে সন্ত্রাস মোকাবিলার নামে নাগরিকদের ওপর নজরদারি, হয়রানি ও ফাঁদে ফেলার মতো নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালের নির্বাচনী মৌসুমেও মুসলিমবিরোধী মনোভাব অব্যাহত ছিল। সে সময় ইসলামভীতিজনিত ঘৃণামূলক অপরাধ আবার বেড়ে যায়। এফবিআইয়ের হিসাবে ২০০১ সালে এমন ঘটনা ঘটেছিল ৪৮১টি, যা পরের বছরই কমে দাঁড়ায় ১৫৫টিতে। এরপর ২০১৫ সালে তা আবার বেড়ে হয় ২৫৭, আর ২০১৬ সালে ৩০৭। অবশ্য, এর পর থেকে এ সংখ্যা ক্রমশ কমেছে।
সূত্র: এবিসি নিউজ ও সিবিএস

Friday, September 4, 2026
কেমন ছিলেন সাহাবি যুগের নারীরা by মনযূরুল হক
এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে বড় বড় পুরুষ আলেম নারী শিক্ষক/শাইখাদের থেকে হাদিস, ফিকহ এবং অন্যান্য শরয়ী জ্ঞান অর্জন করেছেন।
ইসলামের প্রারম্ভে নারী
শাইখ ইউসুফ কারজাভি (রহ.) ইসলামের প্রথম যুগের নারীদের জ্ঞানান্বেষণের মানসিকতা সম্পর্কে বলেছেন, “নারীরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে আসতেন এবং ব্যক্তিগত বিষয়েও জিজ্ঞাসা করতেন। এমনকি আয়েশা (রা.) বলতেন, ‘আল্লাহ আনসার নারীদের প্রতি রহম করুন, লজ্জা তাদেরকে ধর্মীয় জ্ঞান শেখা থেকে বিরত রাখেনি।’”
তারা জীবনের গোপনতম বিষয়েও নবীজি (সা.)-কে প্রশ্ন করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি, কারণ দ্বীনের বিষয়ে কোনো লজ্জা নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩০)
নারীরা আল্লাহর আদেশ পালনে ছিলেন অতিশয় দ্রুত ও তৎপর। যখন পর্দার বিধান সম্পর্কিত আয়াত অবতীর্ণ হলো, “আর ইমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে; আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ব্যতীত তাদের অলংকারাদি প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের ওড়না দ্বারা আপন বক্ষদেশ আবৃত করে।” (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
আয়েশা (রা.) সেই সময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করে বলেন, আয়াতটি নাজিল হওয়ার পরই, “আনসার নারীরা তাদের কাছে যা কিছু চাদর ছিল, তাই নিয়ে খুঁজতে শুরু করলেন, অতঃপর তারা নামাজের জন্য এলেন, তাদের মাথায় সেই চাদর জড়ানো ছিল, মনে হচ্ছিল যেন তাদের মাথার ওপর কাক বসে আছে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪১০২)
তারা এক মুহূর্তের জন্যও অপেক্ষা করেননি, দ্রুত আল্লাহর আদেশ পালনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এভাবেই ছিল আল্লাহর আদেশ ও দ্বীনের বিধিবিধানের প্রতি সেই নারীদের অবিচল নিষ্ঠা।
স্বামীর জন্য সহযোগী
ইসলামের প্রথম যুগের নারীরা ছিলেন স্বামীর জন্য সর্বোত্তম সাহায্যকারী।
আসমা বিনতে আবি বকর (রা.): তিনি ছিলেন নবীজির ফুফাতো ভাই ও সহচর জুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.)-এর স্ত্রী এবং ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর কন্যা। তিনি তাঁর স্বামীকে সাহায্য করতেন। জুবাইরের এক খণ্ড জমি ছিল যা মদিনা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে।
আসমা পায়ে হেঁটে সেখানে যেতেন এবং কাজ করে আসতেন। জুবাইরের একটি ঘোড়াও ছিল, যাকে খাওয়াতে তিনি খেজুরের আঁটি পিষতেন। একবার ফেরার পথে নবীজি তাঁকে দেখে নিজের পিছনে সওয়ার করিয়ে আনেন। জুবাইর তা জানতে পারেন এবং তাঁর কষ্ট দেখে ব্যথিত হন। তবে আসমা (রা.) তার পরও নিয়মিত স্বামীকে সাহায্য করতেন এবং স্বামীর দুঃসময় ও সংকটের মুহূর্তে তাঁর পাশে থাকতেন।
ফাতিমা আয-যাহরা (রা.): নবীজির কন্যা ফাতিমা (রা.) নিজ হাতে ঘর ঝাড়ু দিতেন, আটা মাখতেন, রান্না করতেন এবং রুটি বানাতেন। তিনি এত বেশি যাতা ঘুরিয়েছিলেন যে তাঁর হাতে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। একদিন তিনি নবীজির কাছে গিয়ে একজন সাহায্যকারী (খাদেম) পেতে আরজি জানালেন। রাসুল (সা.) তাঁকে বলেন, “ফাতিমা আমার অংশ; যা তাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকেও কষ্ট দেয়।”
এরপর তিনি তাঁকে বললেন, “আমি কি তোমাকে এর চেয়েও উত্তম কিছু শিখিয়ে দেব না? যখন তুমি ঘুমাতে যাও, তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার পড়বে। আল্লাহর এই জিকির তোমার জন্য খাদেমের চেয়ে উত্তম।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭০৫)
নবীজি (সা.) বোঝালেন যে, আল্লাহর স্মরণ তাঁকে এমন আত্মিক শক্তি দেবে, যা জীবনের কঠিন দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে। আলী (রা.) সেই সময় তাঁর জন্য খাদেমের ব্যবস্থা করতে পারেননি, তাই ফাতিমা (রা.) জীবনের তিক্ততা ও কঠোরতা ভাগ করে নিতে প্রস্তুত ছিলেন।
স্বামীর প্রতি উপদেশ
সেই সময়ের নারীরা স্বামী কাজ বা ব্যবসার জন্য বের হওয়ার সময় বলতেন, “হে অমুকের পিতা, আপনি হারাম উপার্জন থেকে সাবধান থাকবেন। কারণ আমরা ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করতে পারি, কিন্তু জাহান্নামের আগুন এবং পরাক্রমশালী আল্লাহর ক্রোধ সহ্য করতে পারব না।”
যদি কোনো পুরুষের অসৎ পথে উপার্জনের প্রতি দুর্বলতা থাকত, তবে স্ত্রীর এই কথা তাকে সতর্ক করত এবং বিবেককে জাগ্রত করত।
নারীদের ত্যাগ
যদি স্বামী জিহাদের জন্য যেতেন, স্ত্রীর অবস্থান মোটেও নিরুৎসাহিত করার মতো ছিল না, বরং তাঁরা স্বামীকে জিহাদের জন্য উৎসাহিত করতেন। যদি স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হতো, ‘স্বামী ছাড়া তুমি তোমার সন্তানাদি নিয়ে কী করবে?’ তখন একজন নিশ্চিত ইমানদার নারীর উত্তর হতো, “আল্লাহ তো আছেন!”
তিনি সন্তানকে উত্তম চরিত্র, ইসলামি মূল্যবোধ এবং আল্লাহর ইবাদতের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তুলতেন এবং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে রাখতেন।
প্রাচীন জাহেলি যুগের কবি খানসা (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগে তাঁর ভাই সাখরের মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান ছিলেন এবং পুরো একটি কাব্যগ্রন্থ কেবল তাঁর ভাইয়ের জন্য বিলাপ করে রচনা করেছিলেন। কিন্তু ইসলামের আলো তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করার পর ইসলাম তাঁকে নতুন করে গড়ে তুলল, নতুন ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাচেতনা দিল।
উমর (রা.)-এর যুগে তাঁর চার পুত্র কাদিসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন। তিনি তাদের উপদেশ দিয়েছিলেন যে, তারা যেন আল্লাহর পথে শহীদ হতে এগিয়ে যান, পিছপা না হন এবং দ্বিধা না করেন।
চারজনই শহীদ হলেন। খবর শুনে তিনি কোনো আর্তনাদ করেননি বা জাহেলি যুগের মতো আচরণ করেননি। বরং অত্যন্ত দৃঢ় ইমানের সঙ্গে বলেছিলেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাকে তাঁর পথে তাদের শহীদ হওয়ার মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন এবং কেয়ামতের দিন তাদের আমার জন্য সুপারিশকারী বানিয়েছেন।” (ইবনে আব্দিল বার, আল-ইসতিআব ফী মা’রিফাতিল আসহাব, ৪/১৬৫৫, বৈরুত: দারুল জীল, ১৯৯২)
আসমা (রা.)-এর পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) খিলাফত নিয়ে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আত্মসমর্পণের আগে তিনি মায়ের কাছে যান। সেই দৃঢ়চেতা ধৈর্যশীল মা আসমা তাঁকে বলেন, “হে আমার পুত্র, যদি তুমি সত্যের ওপর থাকো, তবে এই জাতিকে তোমার মাথা নিয়ে খেলতে দিয়ো না।”
ইবনে জুবাইর (রা.) যখন বললেন, ‘আম্মা, আমি ভয় পাচ্ছি যে আমি নিহত হলে তারা আমার অঙ্গহানি করবে।’ জবাবে তিনি বলেছিলেন, “হে আমার পুত্র, জবাই করার পর চামড়া ছাড়ানোতে মেষের কোনো ক্ষতি হয় না!”
এই ছিল সেই মা, যিনি জীবন ও শাহাদাতের মূল্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতেন।
নারীদের জ্ঞানার্জন
নারীর জন্য জ্ঞানার্জন ফরজ। যারা কোনো কোনো সময় নারীকে মূর্খতার মধ্যে রাখতে চেয়েছেন, তারা নিজেরাই অজ্ঞ ছিলেন। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই জ্ঞানার্জনের নির্দেশ দেয়। মুসলিম নারীদের মধ্যে এমন বহুজন ছিলেন যারা পুরুষদেরকে ফতোয়া দিতেন।
নবীজির স্ত্রীদের জ্ঞান: পুরুষেরা আয়েশা (রা.) ও উম্মে সালামা (রা.)-এর কাছে যেতেন হাদিস বর্ণনা করতে এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে জানতে। এমনকি বড় বড় সাহাবি ও তাবেয়িগণ আয়েশা (রা.)-এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন, আর তিনি উত্তর দিতেন এবং প্রয়োজনে তাদের ত্রুটি সংশোধন করতেন। ইমাম জারকাশি (রহ.) এ নিয়ে একটি বই-ও লিখেছেন যার নাম আল-ইজাবাহ লিমা ইস্তাদরাকাতহু আয়েশা আলা আস-সাহাবাহ (সাহাবিদের বিষয়ে আয়েশা যা সংশোধন করেছেন তার উত্তর)।
শিষ্যত্ব ও শিক্ষকতা: পরবর্তী যুগগুলোতেও মুসলিম নারীদের জ্ঞানচর্চার মজলিস ছিল। সাকিনা বিনতে হুসাইন (রা.)-এর একটি জ্ঞান মজলিস ছিল, যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সফর করত। কথিত আছে, চার ইমামের একজন ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-ও তাঁর মজলিসে উপস্থিত হয়েছিলেন।
বিখ্যাত হাদিস বিশারদ ইবনে হাজার আল-আসক্বালানি (রহ.) তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে অনেক নারীর নাম উল্লেখ করেছেন। হানাফি মাজহাবের একজন প্রবীণ আলেমের এমন একজন কন্যা ছিলেন যিনি পিতার মতোই ফতোয়া দিতেন। ফতোয়ার নিচে পিতার সঙ্গে কন্যারও স্বাক্ষর থাকত।
এই ছিল ইসলামের প্রথম যুগের নারীর প্রতিচ্ছবি। মুসলিম নারীদেরকে অবশ্যই তাদের ঐতিহ্য, ব্যক্তিত্ব ও দাওয়াতি দায়িত্বের প্রতি আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার করতে হবে।
![]() |
| ছবি: ফ্রিপিক |
Thursday, August 27, 2026
ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ইসলামের ওপর আঘাত’
মঙ্গলবার এআইএমআইএমের দারুস সালাম কার্যালয়ে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আয়োজিত ‘জালসা-এ-রহমাতুল লিল আলামিন’ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় ওয়াইসি এ মন্তব্য করেন।
ওয়াইসি বলেন, স্কুলে কোনো ছাত্রী হিজাব পরতে পারবে না—আদালতের এমন সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত নন। তিনি প্রশ্ন করেন, সুপ্রিম কোর্টের নয় বিচারপতির বেঞ্চে সাবরিমালা-সংক্রান্ত বিষয়টি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় হাইকোর্ট কেন কোনো ধর্মীয় অনুশীলন ইসলামের জন্য অপরিহার্য কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিল।
তিনি বলেন, “আজকের রায় ভারতের সংবিধানের ২৫ ও ১৯ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। ইসলামের জন্য কোনটি অপরিহার্য, তা নির্ধারণ করার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে? মেয়েরা মাথায় হিজাব পরে, মনে নয়।”
এর আগে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বলেছিল, বৈষম্যহীন ও সৎ উদ্দেশ্যে নির্ধারিত ইউনিফর্ম নীতিমালা স্কুল কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারভুক্ত। ওই ছাত্রী আগের বছরগুলোতে কোনো আপত্তি ছাড়াই মাথায় স্কার্ফ পরলেও এবার পোশাকবিধির কারণ দেখিয়ে তাঁকে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি দেওয়া হয়নি।
এদিকে আসাম ও উত্তরাখণ্ডে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউসিসি প্রণয়নের উদ্যোগেরও সমালোচনা করেন ওয়াইসি। তার দাবি, ইউসিসির নামে হিন্দু ব্যক্তিগত আইন, যেমন হিন্দু বিবাহ আইন, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত আইন অনুসরণে মুসলমানদের বাধ্য করা হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মুসলমানদের কেন এসব আইন অনুসরণ করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, ধর্মীয় বিশ্বাসে অটল মুসলমানরা কোরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করেই চলবেন।
‘বন্দে মাতরম’ নিয়েও বক্তব্য দেন ওয়াইসি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষচন্দ্র বসু ও মহাত্মা গান্ধীর প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, গানটির প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়ার জন্য নির্ধারিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁদের চেয়ে নিজেকে বেশি জ্ঞানী মনে করেন কি না—এমন প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ওয়াইসি বলেন, ভারত সবার এবং পরিণতি যা-ই হোক, তিনি কালেমা ঘোষণা করে যাবেন।
এ সময় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও বিজেপিরও সমালোচনা করেন এআইএমআইএম সভাপতি। তার দাবি, ভারতের সংবিধান গৃহীত হওয়ার কয়েকদিন পরই আরএসএসের মুখপত্র সংবিধানের পরিবর্তে মনুস্মৃতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
তিনি আন্দামান কারাগারে বিনায়ক দামোদর সাভারকারের আচরণের সঙ্গে মুসলিম স্বাধীনতাসংগ্রামীদের ভূমিকার তুলনা করেন এবং দাবি করেন, মুসলিম স্বাধীনতাসংগ্রামীরা কখনো ব্রিটিশদের অনুগ্রহ চাননি। স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএস কোনো ত্যাগ স্বীকার করেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
সূত্র: এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, মুসলিম মিরর
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি তাদেরই দেশ
এর মাধ্যমে মূলত তিনি একটি সতর্কবাণী দিয়েছিলেন। কিন্তু এই সতর্কবার্তা ব্রিটেন শহর সম্পর্কে জানার চেয়ে বরং এই উক্তিটির পেছনের রাজনীতিকেই বের করে আনে।
মুসলিমদের দৃশ্যমানতা ও ‘ইসলামীকরণ’ বিতর্ক
ব্রিটেন একটি বৈচিত্র্যময় গণতন্ত্র, যেখানে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ছয় শতাংশ। রাজনীতি, সংস্কৃতি, পেশাগত ক্ষেত্র এবং জনজীবনে তাদের ক্রমবর্ধমান দৃশ্যমানতা হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসতি স্থাপন, নাগরিকত্ব এবং অংশগ্রহণের এক স্বাভাবিক পরিণতি।
কিন্তু মুসলিম-বিরোধী আতঙ্কের রাজনীতিতে, দৃশ্যমানতাকে আধিপত্য, বৈচিত্র্যকে ‘ইসলামীকরণ’ এবং অংশগ্রহণকে অনুপ্রবেশ হিসেবে নতুন রূপ দেওয়া হয়। এর অন্তর্নিহিত প্রস্তাবনাটি বেশ অদ্ভুত: যখন একটি গণতন্ত্রে মুসলমানরা যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র নিজেই কোনোভাবে মুসলিম হয়ে যায়।
ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাছাই করা আতঙ্ক
এই বাছাই প্রক্রিয়াটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটেনে সম্প্রতি ঋষি সুনাকের মতো একজন প্র্যাক্টিসিং হিন্দু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, নেতানিয়াহু এবং তার আদর্শগত মিত্ররা তখন ব্রিটেনের মধ্যে কেনো ‘হিন্দুকরণ’ আঁচ করতে পারেননি। এমনকি ওয়েস্টমিনস্টার যে একটি হিন্দু প্রজাতন্ত্রে পরিণত হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো সতর্কবার্তা ছিল না।
সুনাকের স্থলাভিষিক্ত হন কিয়ার স্টারমার, যার স্ত্রী ইহুদি এবং সন্তানরা ইহুদি ঐতিহ্য অনুসারে বেড়ে উঠেছে। এবারও ‘ব্রিটেনের ইহুদিকরণ’ নিয়ে কোনো কথা হয়নি, কিংবা টেমস নদীর তীরে একটি ইহুদি প্রজাতন্ত্র গড়ে ওঠার কোনো জল্পনাও শোনা যায়নি।
ব্রিটেনের বর্তমান নেতৃত্ব দিচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, যিনি একজন ক্যাথলিক। এখন পর্যন্ত, ‘ব্রিটেনের ক্যাথলিকীকরণ’ দৃশ্যত নেতানিয়াহুরও দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।
জাতিগত বৈচিত্র্য
কিন্তু মুসলিমরা রাজনীতি বা পেশাগত ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হলেই তাকে ‘ইসলামীকরণ’ বা ‘অনুপ্রবেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। মুসলিম মেয়র, এমপি, ডাক্তার, আইনজীবী এবং ভোটাররা কেবল অংশগ্রহণের প্রমাণ নয়, বরং ‘ইসলামীকরণের’ প্রমাণ হয়ে ওঠে। তাদের দৃশ্যমানতা হয়ে দাঁড়ায় জনসংখ্যাতাত্ত্বিক হুমকি; তাদের রাজনৈতিক প্রভাব হয়ে ওঠে অনুপ্রবেশ।
মনে হচ্ছে, ধর্মীয় বহুত্ববাদ বহুত্ববাদই থেকে যায়—যতক্ষণ না সেই ধর্মটি ইসলাম হয়।
ব্রিটেনে মুসলিমদের বাস্তব অবস্থান
বাস্তবতা ততটা চাঞ্চল্যকর নয়। ব্রিটেনে প্রায় চল্লিশ লাখ মুসলিম বসবাস করেন, যা একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু মাত্র। সেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য আন্দোলন নেই যা একটি ইসলামিক রাষ্ট্র বা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ব্রিটিশ রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং আইন সম্পূর্ণ ব্রিটিশই রয়েছে; সংসদ কোনো শুরা কাউন্সিল দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়নি এবং ব্রিটিশ আইনও ইসলামিক আইন দ্বারা উচ্ছেদ করা হয়নি।
পরিবর্তনটি মূলত দৃশ্যমানতার ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী ইংল্যান্ডে প্রায় ১৩,০০০ মুসলিম ডাক্তার কর্মরত ছিলেন, যা মোট চিকিৎসকদের প্রায় ১০% (জনসংখ্যার অনুপাতের প্রায় দ্বিগুণ)। তারা নির্বাচনে ভোট দেন এবং তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা ইংরেজিকে প্রথম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে ব্রিটেনকেই তাদের নিজের বাড়ি মনে করে।
এটিকে ইসলামী দখলের প্রমাণ হিসেবে চিত্রিত করা মানে নাগরিকত্বকে বিজয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা—এবং এই বিভ্রান্তির একটি ইতিহাস রয়েছে।
ইউরোপের ইতিহাসে ইসলামের দীর্ঘ উপস্থিতি
ইউরোপের ইতিহাসে ইসলাম কোনো নতুন বিষয় নয়। সহস্রাধিক বছর ধরে যুদ্ধ, বাণিজ্য, পাণ্ডিত্য, অভিবাসন, কূটনীতি এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।
আল-আন্দালুসে বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। খ্রিস্টান ইউরোপের রাজনৈতিক কল্পনায় আরব ও অটোমানরা বারবার আবির্ভূত হয়েছিল। পোয়াতিয়ে থেকে ভিয়েনা পর্যন্ত, এই মুসলিম ‘অন্য’ সত্তাটি ইউরোপকে তার আত্মপরিচয় নির্ধারণে সহায়তা করেছিল।
সুতরাং ইসলাম কখনোই ইউরোপীয় ইতিহাসের বাইরে ছিল না। এটি ছিল সেই শক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম, যার বিরুদ্ধে এবং যার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরোপ নিজেকে গড়ে তুলেছিল।
যুদ্ধোত্তর অভিবাসন ও ইউরোপ পুনর্গঠন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই সম্পর্কটি মৌলিকভাবে বদলে যায়। বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনকারী ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের উপনিবেশ ও সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে শ্রমিক নিয়ে আসে। ব্রিটেন দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য স্থান থেকে অভিবাসী গ্রহণ করে; ফ্রান্স উত্তর আফ্রিকা থেকে; এবং অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব ঔপনিবেশিক প্রভাবাধীন অঞ্চল বা শ্রম সংগ্রহের এলাকা থেকে শ্রমিক নেয়।
এইসব পুরুষ ও মহিলা কারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা, হাসপাতাল এবং সরকারি পরিষেবাগুলিতে কাজ করতেন। তাঁরা প্রায়শই সমাজের প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও ইউরোপ পুনর্গঠনে সহায়তা করেছিলেন।
কিন্তু সেটাও গল্পের শুরু ছিল না।
যুদ্ধ, আত্মত্যাগ ও ব্রিটিশ ইতিহাসে মুসলিমদের ভূমিকা
যুদ্ধোত্তর অভিবাসন ব্রিটেনকে বদলে দেওয়ার অনেক আগেই, মুসলমানরা ব্রিটিশ ও মিত্রশক্তির পাশাপাশি বিপুল সংখ্যায় যুদ্ধ করেছিল এবং প্রাণ দিয়েছিল। সংসদে উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাদের অবদান ছিল কমপক্ষে ২৫ লক্ষ সৈন্য ও শ্রমিক এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৫৫ লক্ষ, এবং ধারণা করা হয় যে এই দুই সংঘাত জুড়ে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল।
মুসলিম সৈন্যরা ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের পরিখায়, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এবং সুদূর প্রাচ্যের যুদ্ধাভিযানে লড়াই করেছিল। শুধুমাত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ই ব্রিটিশ ভারত থেকে চার লক্ষেরও বেশি মুসলিম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।
তাদের এই আত্মত্যাগ এমন এক সমসাময়িক রাজনীতির পাশে বেমানান মনে হয়, যা খুব সহজেই মুসলমানদের নবাগত, বহিরাগত অথবা এমন এক জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে যাদের অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ ক্রমাগত দিতে হয়। মুসলমানরা ব্রিটিশ ইতিহাসে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত কোনো ভিনগ্রহী সত্তা নয়। তারা এর যুদ্ধগুলোতে লড়তে, এর স্বাধীনতা রক্ষা করতে এবং এর ইতিহাস গঠনে সাহায্য করেছে।
অভিবাসী থেকে নাগরিক
তারা থিতু হলেন। তাদের সন্তান জন্মালো, তারপর নাতি-নাতনি। সেই ‘অভিবাসী’ নাগরিক হয়ে উঠলেন।
এই রূপান্তরটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আজকের অধিকাংশ কথাবার্তাই আগমনের পরিভাষায় আটকে আছে, যেন মুসলিম পটভূমির লক্ষ লক্ষ ইউরোপীয় এইমাত্র একটি নৌকা থেকে নেমেছেন এবং যেকোনো মুহূর্তে তাদের অন্য কোথাও ফিরে যেতে প্ররোচিত করা যেতে পারে।
কিন্তু চতুর্থ প্রজন্মের একজন লন্ডনবাসী ঠিক কোথায় “ফিরে” যাবে? ব্রিটেনই তো তার বাড়ি। এটাই সেই বাস্তবতা, যার সঙ্গে চিরস্থায়ী পরদেশীত্বের রাজনীতি লড়াই করতে হিমশিম খায়।
আধুনিক ব্রিটেন ও বহুত্ববাদ
আধুনিক ব্রিটেন কোনো অপরিবর্তনীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নয়, যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে অবিকৃতভাবে চলে আসে। এটি এমন একটি সমাজ যা এর অধিবাসীরাই ক্রমাগত রূপদান করে। খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলিম, হিন্দু, শিখ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং অধার্মিকদের জীবনযাত্রা এখন একই জাতীয় পরিসরে একে অপরের সাথে মিশে গেছে।
আর একীকরণ মানে কখনোই এই নয় যে সংখ্যালঘুরা অপরিবর্তিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির সাথে কেবল বিলীন হয়ে যাবে। এটি উভয় দিকেই কাজ করে।
নাগরিকত্ব, পরিচয় ও অন্তর্ভুক্তি
এই কারণেই “ইসলামিক রিপাবলিক অফ ব্রিটেন” কথাটি শুধু উপহাসের চেয়েও বেশি কিছু দাবি করে। এর অযৌক্তিকতার আড়ালে নাগরিকত্বের এক গভীর বর্জনমূলক ধারণা নিহিত রয়েছে: যে কিছু নাগরিক স্বাভাবিকভাবেই জাতির অন্তর্ভুক্ত, আর অন্যরা স্থায়ী অতিথি হয়ে থাকে, যাদের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতার জন্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়।
একজন মুসলমান আপাতদৃষ্টিতে ব্রিটিশ হতে পারেন—যদি তার ব্রিটিশ পরিচয় যথেষ্ট পরিমাণে অস্পষ্ট থাকে।
কিন্তু নাগরিকত্ব এভাবে কাজ করে না। সংসদে একজন ব্রিটিশ মুসলিম নির্বাচিত হওয়াটা এই প্রমাণ দেয় না যে মুসলিমরা ব্রিটেন দখল করে নিয়েছে। বরং এটি প্রমাণ করে যে ব্রিটিশ মুসলিমরা ভোট দেয় এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
জাতীয় স্বাস্থ্য সেবায় একজন মুসলিম ডাক্তার থাকা ইসলামীকরণের প্রমাণ নয়। গির্জা, সিনাগগ বা মন্দিরের পাশে একটি মসজিদ থাকাও বিজয়ের প্রমাণ নয়।
কোনো মুসলিম পরিবার, যাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানি পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, সোমালিয়া বা মরক্কো থেকে এসেছিলেন, তারা তাদের জাতীয় উত্তরাধিকারের পাশাপাশি একটি ধর্মীয় উত্তরাধিকার ধরে রাখার কারণে কম ব্রিটিশ হয়ে যান না।
আধুনিক ব্রিটেন
বহুত্ববাদ মানে ব্রিটেনের বিলুপ্তি নয়। এটিই সমসাময়িক ব্রিটেন – এবং মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উপস্থিতিকেও সেইভাবেই বোঝা উচিত। বিভিন্ন সম্প্রদায় যখন প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। গণতান্ত্রিক সমাজজুড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর ক্ষেত্রে এই একই প্রক্রিয়া বারবার ঘটেছে।
সূত্র:মিডল ইস্ট আই
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Tuesday, August 25, 2026
খলিফা ওমর (রা.)-এর বাজার ব্যবস্থাপনা by নাসরুল্লাহ ইবনে ইলিয়াস
বাজারের ভেতরে জনতার ভিড় ঠেলে হেঁটে যাচ্ছেন এক দীর্ঘদেহের প্রবীণ ব্যক্তি; হাতে তার চামড়ার চাবুক। তিনি অন্য কেউ নন, মুসলিম জাহানের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)। হাঁটতে হাঁটতে তিনি তীক্ষ্ণ চোখে লক্ষ করছেন পণ্যের মান, পরখ করছেন মাপের পাত্র এবং আড়চোখে খেয়াল করছেন কোনো ব্যবসায়ী গোপনে ভেজাল দিচ্ছে বা অতিরিক্ত মুনাফার লোভে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে কি না।
এই দৃশ্য-ইতিহাস কল্পনা করলে পাঠকের মতে একটা মৌলিক প্রশ্ন জাগবে, বাজার কি শুধু ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যকার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত লেনদেনের স্থান, নাকি সেখানে ন্যায়নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা এবং সততা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরও এক অনিবার্য দায়িত্ব?
প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.)-এর সংক্ষিপ্ত শাসনকালে রিদ্দা যুদ্ধ-পরবর্তী যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়েছিল, ওমর (রা.)-এর ১০ বছরের খেলাফতকালে (১৩-২৩ হিজরি/৬৩৪-৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) তা এক বিশাল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যেও রূপ নেয়। আজকের আলোচনা সেই রূপান্তর নিয়ে।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র
ওমর (রা.)-এর শাসনকালে খেলাফত রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা অভূতপূর্ব গতিতে সম্প্রসারিত হয়। রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধ এলাকা—সিরিয়া, ইরাক, ইরান ও মিসর মুসলিম রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তৎকালীন আরবের প্রথাগত মরু-অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র আঞ্চলিক বাজার ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটে।
সিরিয়ার কৃষিপণ্য, মিসরের খাদ্যশস্য এবং পারস্যের ধাতু ও পোশাকশিল্প এখন একক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছাতার নিচে চলে আসে। এর ফলে খোলাফায়ে রাশেদিনের অধীনে একটি বৃহৎ ‘একীভূত অর্থনীতি’ (Unified Economy) গড়ে ওঠে, যেখানে বাণিজ্য শুল্কের জটিলতা কমে যায় এবং সীমান্তহীন বাণিজ্য যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
নববিজিত অঞ্চলগুলোতে সামরিক ও বেসামরিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নগর অর্থনীতির দ্রুত বিকাশ ঘটে। সামরিক কেন্দ্র ও সেনানিবাস হিসেবে গড়ে ওঠা বসরা এবং কুফা অল্প সময়ের মধ্যেই অর্থনীতি ও বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। ওমর (রা.) এই নতুন নগরগুলোতে বাজার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিশেষ নকশা বাস্তবায়ন করেন। যেমন : কুফার বাজার পরিকল্পনা করার সময় তিনি নির্দেশ দেন যেন বাজারগুলো জামে মসজিদের কাছে এবং প্রশস্ত সড়কের পাশে উন্মুক্ত স্থানে গড়ে ওঠে, যাতে পণ্য পরিবহন ও তদারকি সহজ হয়।
একই সঙ্গে তিনি মুদ্রাব্যবস্থায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আনেন। প্রচলিত সাসনি ও বাইজেন্টাইন মুদ্রা সচল রেখে তিনি দিরহামের ওজন সুনির্দিষ্ট করেন, যেখানে ১০টি দিরহামের ওজন ৭টি স্বর্ণ-দিনারের (মিছকাল) সমান নির্ধারণ করা হয়। পারস্যের দিরহামে ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর মতো আরবি বাক্য খোদাই করে খেলাফত রাষ্ট্রের আর্থিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই মুদ্রানীতি বাণিজ্যিক লেনদেনে স্থিতিশীলতা আনে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দূরবর্তী বাজারগুলোকে একীভূত লেনদেন সূত্রে গ্রথিত করে।
শরিয়ত জেনে আসতে হবে
একটি অতিদ্রুত সম্প্রসারণশীল অর্থনীতিতে শুধু নৈতিক উপদেশ দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ওমর (রা.) গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, ব্যবসায়ী যদি বাণিজ্য-সংক্রান্ত শরিয়তের বিধিবিধান না জানে, তবে অজ্ঞতাবশতই সে বিভিন্ন অন্যায্য ও হারাম লেনদেনে জড়িয়ে পড়বে।
মুসলিম আইন শাস্ত্রে ‘ইবাদত’-এর মতোই ‘মুয়ামালাত’ (অর্থনৈতিক লেনদেন) ঈমানের বাস্তব প্রয়োগক্ষেত্র। বাজারে ব্যবসা করা শুধু মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক দায়িত্বও বটে। ওমর (রা.)-এর অর্থনৈতিক প্রশাসনে ব্যবসায়ীদের জন্য মোটাদাগে চার বিষয়ের জ্ঞান বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল—
রিবা (সুদ) ও তার সূক্ষ্ম রূপ : ‘রিবা আলফজল’ (সমজাতীয় পণ্য বিনিময়ে কমবেশি করা) এবং ‘রিবা আননাসিআহ’ (মেয়াদের কারণে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা) বাণিজ্যের এই জটিল নিয়মগুলো না জানলে সাধারণ ব্যবসায়ী সহজেই সুদের খপ্পরে পড়তে পারে।
গিশ ও তাদলিস (প্রতারণা ও ত্রুটি লুকানো) : ভালো পণ্যের নিচে নিম্নমানের পণ্য লুকিয়ে রাখা বা পণ্যের অভ্যন্তরীণ কোনো ত্রুটি গোপন করে বিক্রি করা শরিয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
তাতফিফ (ওজনে কারচুপি) : মাপে বা ওজনে ক্রেতাকে ঠকানো, যা কোরআনে সরাসরি অভিশাপযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত।
মিথ্যা তথ্য ও কৃত্রিম অসততা : পণ্যের কৃত্রিম গুণগান গাওয়া, মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি করা বা বাজারে কৃত্রিমভাবে পণ্যের চাহিদা বাড়াতে ক্রেতা সেজে দাম হাঁকানো (নজশ)।
ওমর (রা.)-এর সুনির্দিষ্ট শাসননীতি ছিল—আইন না জেনে বাজারে নামলে ব্যবসায়ী অজান্তেই সুদে লিপ্ত হবে এবং ক্রেতার অধিকার হরণ করবে। ফলে প্রতিটি পেশাদার ব্যবসায়ীর জন্য নির্দিষ্ট ব্যবসার আইনকানুন জানা ‘ফরজে আইন’ (বাধ্যতামূলক আইনি দায়িত্ব) হিসেবে গণ্য হতো।
আধুনিক অনেক আলোচনায় এই ঘটনাটিকে একটি ‘আমলাতান্ত্রিক বাণিজ্যিক লাইসেন্সিং ব্যবস্থা’ হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা দেখা যায়। বলা হয়, ওমর (রা.) নাকি বাজারে ঢোকার মুখে পরীক্ষা কেন্দ্র বসিয়েছিলেন এবং ফিকহ পরীক্ষায় পাস না করলে কাউকে ব্যবসা করতে দিতেন না। তবে প্রাথমিক ঐতিহাসিক গ্রন্থ অনুসন্ধান করলে এমন কোনো লিখিত সনদ প্রদান বা প্রশাসনিক প্রবেশ পরীক্ষার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
তিনি ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসার বিধিবিধান (ফিকহ) জানা বাধ্যতামূলক করেছিলেন, তবে তা বাস্তবায়ন হতো বাজারে সরেজমিনে তদারকি, শিক্ষা ও সংশোধনের মাধ্যমে। খলিফা নিজে এবং নিযুক্ত কর্মকর্তারা ভুল লেনদেন সংশোধন করতেন; আর বারবার প্রতারণা, সুদি বা অবৈধ লেনদেন করলে তাজিরস্বরূপ শাস্তি দিতেন এবং প্রয়োজনে বাজার থেকে বহিষ্কার করতেন। অর্থাৎ, এটি আধুনিক অর্থে কোনো লাইসেন্সিং ব্যবস্থা নয়; বরং জ্ঞানভিত্তিক বাজার তদারকি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর ব্যবস্থা ছিল।
বাজার মনিটরিং
পরবর্তীকালের সুসংগঠিত ‘মুহতাসিব’ (মার্কেট ইন্সপেক্টর) বা ‘হিসবাহ’ নামক যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক রূপ গড়ে উঠেছিল, তার প্রত্যক্ষ সূচনা ঘটেছিল ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালে। ওমর (রা.) নিজে ছিলেন রাষ্ট্রের প্রধান নীতি-তদারককারী। তিনি নিয়মিত মদিনার বাজার পরিদর্শন করতেন। তবে রাষ্ট্রের আকার বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি বিশেষ ব্যক্তিবর্গকে বাজার তদারকির জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন।
এই প্রক্রিয়ায় ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) নিজেই সমগ্র রাষ্ট্রের বাজার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। তিনি নিয়মিত বাজার পরিদর্শন, ব্যবসায়িক নীতিনির্ধারণ এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। পাশাপাশি মদিনার বাজার পরিচালনার জন্য তিনি আবদুল্লাহ ইবনে উতবা ও সায়িব ইবনে ইয়াজিদকে দায়িত্ব প্রদান করেন, যারা যৌথভাবে বাজারের শৃঙ্খলা ও লেনদেন তদারকি করতেন। শিফা বিনতে আবদুল্লাহও বাজার তদারকির দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি ব্যবসায়িক নৈতিকতা নিশ্চিত করা, প্রতারণা প্রতিরোধ এবং বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ভূমিকা পালন করেন। অন্যদিকে, সামরা বিনতে নুহাইক মক্কার বাজারে নিয়মিত পরিদর্শন করে অনিয়ম প্রতিরোধ, ওজন-পরিমাপ পরীক্ষা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সতর্ক করার দায়িত্ব পালন করতেন।
মনিটরিংয়ের প্রধান পয়েন্টগুলো
তদারককারীদের মূল প্রশাসনিক নজরদারির বিষয় ছিল তিনটি—
ক. মাপ ও ওজন : বাজারের বাটখারা ও মাপের পাত্রগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করা হতো, যাতে কোনো ব্যবসায়ী পরিমাপে কম দিতে না পারে।
খ. পণ্যের মান ও ভেজাল প্রতিরোধ : পচা, বাসি বা নিম্নমানের পণ্য ভালো পণ্যের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা রোধ করা হতো।
গ. মজুতদারি প্রতিরোধ : বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্য আটকে রাখা খলিফা ওমর কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত আছে, ওমর (রা.) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমাদের বাজারে কোনো মজুতদারি চলবে না।’ যে ব্যক্তি দূর থেকে বাজারে খাদ্যশস্য আমদানি করত, তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করা হতো আর যে ব্যক্তি কৃত্রিম সংকটের জন্য মজুত করত, তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
সংকটকালে ওমরের নীতি
হিজরি ১৮ সালে আরবে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ (আমুর রামাদাহ) দেখা দেয়, তখন ওমর (রা.) বাজার নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি ব্যবসায়ীদের ওপর জোরপূর্বক দাম চাপিয়ে না দিয়ে, মিসর ও ইরাক থেকে সরকারি তহবিলে শস্য আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি করেন। ফলে পণ্যের আকাশচুম্বী দাম স্বতঃস্ফূর্তভাবেই কমে আসে। এটি ছিল সরকারি মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল করার আধুনিক অর্থনৈতিক কৌশল।
ব্যবসায় উৎসাহ প্রদান
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাকে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের শক্তির অন্যতম ভিত্তি মনে করতেন। তাই তিনি মানুষকে শ্রম, পেশা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বৈধ উপার্জনে উৎসাহিত করতেন। ব্যবসায় সফল হওয়ার জন্য তিনি মানুষকে অধ্যবসায়, দক্ষতা ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণের শিক্ষা দিতেন। তিনি বলতেন, কোনো ব্যক্তি যদি একটি ব্যবসায় বারবার চেষ্টা করেও সফল না হয়, তবে তার উচিত অন্য কোনো ব্যবসা করা। একই সঙ্গে তিনি প্রত্যেককে অন্তত একটি পেশা বা কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পরামর্শ দিতেন এবং সতর্ক করতেন, একদিন এর প্রয়োজন হবেই। তার মতে, ব্যবসা ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান না থাকলে মানুষ অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ে। তাই তিনি বলতেন, মানুষের কাছে হাত পাতার চেয়ে পরিশ্রমের মাধ্যমে সামান্য উপার্জনও অধিক মর্যাদাপূর্ণ। দরিদ্রদের উদ্দেশে তার আহ্বান ছিল, ‘মাথা উঁচু করে ব্যবসা করো; মানুষের বোঝা হয়ে থেকো না।’
ওমর (রা.) শুধু ব্যক্তিগত জীবিকার জন্য নয়, বরং মুসলিম সমাজের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্যও ব্যবসাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। একদিন তিনি মদিনার বাজারে এসে লক্ষ করলেন, অধিকাংশ ব্যবসায়ী নাবাতি (বিদেশি) জনগোষ্ঠীর। এতে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। লোকরা যখন বলল যে, ইসলামি বিজয়ের ফলে প্রাপ্ত সম্পদ তাদের বাজারমুখী হওয়ার প্রয়োজন কমিয়ে দিয়েছে, তখন ওমর (রা.) দৃঢ়ভাবে সতর্ক করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম! যদি তোমরা এমন করো, তবে একদিন তোমাদের পুরুষরা তাদের পুরুষদের এবং তোমাদের নারীরা তাদের নারীদের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়বে।’
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, কোনো জাতি যদি উৎপাদন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে একসময় তাকে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়। ওমর (রা.)-এর দৃষ্টিতে ব্যবসা শুধু ব্যক্তিগত আয়ের মাধ্যম নয়; বরং মুসলিম সমাজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, মর্যাদা ও রাষ্ট্রশক্তি সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল।
ইসলামি বাজার ও আধুনিক বাজার
ওমর (রা.)-এর বাজার ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে উদ্দেশ্যগত মিল থাকলেও তাদের ভিত্তিগত দর্শনে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আধুনিক বাজার তদারকি প্রধানত রাষ্ট্রপ্রণীত আইন, প্রশাসনিক বিধান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া এর অসংখ্য ফাঁকফোকর নিয়ে আলোচনা তো আছেই; পক্ষান্তরে ওমর (রা.)-এর নীতি প্রতিষ্ঠিত ছিল ওহির নির্দেশনা, নৈতিক জবাবদিহি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সমন্বয়ে। খেলাফতের লক্ষ্য শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ ছিল না, বরং এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে ব্যবসায়ী আল্লাহভীরু হবে, ভোক্তা নিরাপদ থাকবে এবং বাজার হবে ন্যায় ও আমানতের প্রতীক। তাই খেলাফতের এই তদারকি শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ছিল চরিত্র গঠনও।
অকথ্য বাস্তবতা হলো, আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো প্রতারণা, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট, ভেজাল ও একচেটিয়া বাণিজ্যের ওপর টিকে আছে। জনগণ এবং জনগণের স্বার্থে কাজ করা কিছু সমাজচিন্তকরা এর প্রতিকার খুঁজে চলেছেন এর-ওর কাছে। অথচ চৌদ্দ শতাব্দী আগে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) যে নীতিমালা প্রয়োগ করেছিলেন, তা বাজারকে শুধু নিয়ন্ত্রিতই করেনি; বরং নৈতিকতা, জবাবদিহি ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে একটি টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। এ কারণেই তাঁর বাজারনীতি শুধু একটি ঐতিহাসিক প্রশাসনিক মডেল নয়; বরং ইসলামের অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা, ন্যায়ভিত্তিক শাসন এবং মানবকল্যাণমুখী রাষ্ট্রচিন্তার এক উজ্জ্বল ও কালজয়ী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
![]() |
| মসজিদে নববির কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘সুক সুয়াইকা’ বা ‘সুক আল-কামাশাহ’ |
নবীজীবনচর্চায় নতুন আলো by ড. ইসাম তালিমা
মুসলিম সভ্যতার প্রতিটি যুগেই মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা ও রচনাকর্ম হয়েছে। কখনো তার সমগ্র জীবনকে ধারাবাহিক ও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে; কখনো বিভিন্ন বর্ণনার সত্যতা যাচাই, সনদ পরীক্ষা এবং ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে; আবার কখনো তার জীবনের কোনো বিশেষ ঘটনা, বৈশিষ্ট্য বা দিককে কেন্দ্র করে আলোচনা করা হয়েছে। তার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিরা যেমন তার জীবনচরিত রচনা করেছেন, তেমনি বিদ্বেষী এবং বিরোধীরাও তাকে নিয়ে লিখেছে। এমনকি নিরপেক্ষ ও ন্যায়নিষ্ঠ গবেষকরাও তার জীবন এবং কর্মকে তাদের গবেষণার বিষয় করেছেন। ফলে মহানবী (সা.)-এর সিরাত যুগে যুগে ভালোবাসা, বিরোধিতা ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধান—তিন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষেরই আগ্রহের বিষয় হয়ে থেকেছে।
সিরাতচর্চার দুটি ধারা
মহানবী (সা.)-এর সিরাত নিয়ে প্রচলিত চর্চাকে মূলগতভাবে দুটি প্রধান ধারায় ভাগ করা যায়। প্রথম ধারা হলো ‘ঐতিহাসিক বর্ণনাভিত্তিক সিরাতচর্চা’। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জন্ম, জন্মের পূর্ববর্তী সময় ও তৎকালীন পরিবেশ থেকে শুরু করে তার ইন্তেকাল এবং ইন্তেকাল-পরবর্তী ঘটনাবলি ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়।
এই ধারার মধ্যেও রয়েছে একাধিক গবেষণাপদ্ধতি। সনদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন না করেই কেউ আলোচিত সব তথ্য একত্র করেছেন। আবার কেউ তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সনদ নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করেছেন; যেসব বর্ণনা বিশুদ্ধ, সেগুলো গ্রহণ করেছেন এবং যেগুলো প্রমাণিত নয় বা দুর্বল, সেগুলোর ব্যাপারেও পাঠককে সতর্ক করেছেন। এই ধারার আরেকটি প্রবণতা হলো, সিরাতের ঘটনাবলি আলোচনা করে সেখান থেকে শিক্ষা, উপদেশ ও জীবনের নানা দিকনির্দেশনা আহরণ করা। কারো আলোচনায় সাধারণ শিক্ষাগুলো গুরুত্ব পেয়েছে, আবার কেউ বিশেষ কোনো শিক্ষা বা তাৎপর্যের ওপর জোর দিয়েছেন।
সিরাতচর্চার দ্বিতীয় ধারাটিও প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। এ ধারায় মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো একটি বিশেষ দিককে বেছে নিয়ে সেটিকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা হয়। মুসলিম ঐতিহ্যে এর প্রাথমিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় মহানবী (সা.)-এর শামায়েল (বাহ্যিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য) এবং খাসায়েস (বিশেষ বৈশিষ্ট্য) নিয়ে রচিত গ্রন্থগুলোয়। কাজী ইয়াজ, মাকরিজি প্রমুখের রচনায় এ ধরনের চর্চার উদাহরণ রয়েছে।
আধুনিক যুগে মহানবী (সা.)-এর জীবনের বিশেষ কোনো দিক নিয়ে গবেষণার এই ধারা আরো বিকশিত হয়েছে। সিরাতের নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অনেক বইপত্র। আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ, খালিদ মুহাম্মদ খালিদ, ইউসুফ আল-কারজাবি, মাহমুদ শিত খাত্তাব ও অন্যরা এই ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছেন।
পাশাপাশি পাশ্চাত্য লেখকদের মধ্যেও মহানবী (সা.)-এর জীবন নিয়ে গবেষণা করেছেন। এসব রচনার মধ্যে যেমন ন্যায়নিষ্ঠ ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনি পক্ষপাতদুষ্ট ও বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থিতিরও প্রমাণ পাওয়া যায়।
সিরাতচর্চার তৃতীয় ও নতুন আরেকটি ধারা
সিরাতচর্চায় তৃতীয় একটি ধারা রয়েছে, যে ধারায় তেমন বিস্তৃত চর্চা হয়নি। বরং অল্প কয়েকজন লেখক এ পদ্ধতিতে কাজ করেছেন। এই ধারার বিষয় শুধু মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিত নয়; বরং যারা লেখক ও গ্রন্থকার হিসেবে নবীজির সিরাত নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের নানা দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সিরাতকে নতুন করে পাঠ করা।
এ পদ্ধতিকে আমরা বলতে পারি ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’—অর্থাৎ সিরাতের কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন লেখক কীভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা পাশাপাশি রেখে তুলনামূলক আলোচনা করা। কারণ প্রত্যেক লেখক তার নিজস্ব সংস্কৃতি, সাহিত্যিক পরিমণ্ডল, ভাষাশৈলী এবং মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার আলোকে সিরাতের ঘটনা বিশ্লেষণ করেন। ফলে একই ঘটনা নিয়ে তাদের লেখায় বৈচিত্র্যময় চিন্তা, সৃজনশীলতা ও অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ ঘটে।
ফিকহের ক্ষেত্রে যেমন তুলনামূলক ফিকহ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ফকিহের মতামত ও ফিকহি সিদ্ধান্তের তুলনা করা হয়; এসব মতের পেছনের প্রেরণা, কারণ ও যুক্তি বিশ্লেষণ করা হয়; কোনো একটি মতের পেছনে থাকা ফিকহি দর্শন এবং তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বিধানগুলোও পর্যালোচনা করা হয়। তাফসির শাস্ত্রেও এই পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়।
তাই সিরাতের ক্ষেত্রেও যদি এ ধরনের তুলনামূলক পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয়, তাহলে মহানবী (সা.)-এর সিরাতচর্চায় নতুন ও স্বতন্ত্র একটি ধারা সৃষ্টি হবে। এর মাধ্যমে সিরাতের অনেক দিক ও তাৎপর্য সামনে আসবে, বিচ্ছিন্নভাবে পাঠ করলে যা হয়তো আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়বে না। ফলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে বোঝার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি সিরাতচর্চাকে আরো সমৃদ্ধ এবং গভীর করে তুলতে পারে।
বিয়ুমির দৃষ্টান্ত
ড. মুহাম্মদ রজব আল-বায়ুমি ছাড়া এ ধরনের প্রচেষ্টা আর কারো মধ্যে আমার চোখে পড়েনি। তবে তিনি তুলনামূলক সিরাতচর্চার কোনো স্বতন্ত্র পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এই পদ্ধতিতে লেখেননি; বরং সিরাত রচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন মাত্র। তার প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল من روائع السيرة النبوية: الرسول يبكي ولده إبراهيم (সিরাতের অনুপম সৌন্দর্য : সন্তান ইব্রাহিমের জন্য রাসুলের কান্না)। প্রবন্ধটি ‘ফি মিজানিল ইসলাম’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এতে তিনি মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে জন্ম নেওয়া নবীজি (সা.)-এর ছেলে ইব্রাহিমের অল্প বয়সে ইন্তেকালের ঘটনা আলোচনা করেছেন।
বায়ুমি সমকালীন সাহিত্যিক ও চিন্তক আব্বাস আল-আক্কাদ, তাহা হুসাইন, আহমদ হাসান আল-জাইয়াত ও মুহাম্মদ হুসাইন হাইকলের সিরাতগ্রন্থে এ ঘটনাটির উপস্থাপন নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন।
সিরাতের গ্রন্থগুলোতে ঘটনাটি বড়জোর আধা থেকে এক পৃষ্ঠার হলেও, এই চার সাহিত্যিকের কলমে তা অসাধারণ মূল্যবান হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ভিন্ন। আক্কাদ প্রথমে যুক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে বিষয়টি দেখেছেন, এরপর আবেগের দিকে গেছেন; তাহা হুসাইন ঠিক বিপরীতভাবে আবেগ দিয়ে শুরু করে যুক্তিতে পৌঁছেছেন। যাইয়াত নিজের সন্তান হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে এ ঘটনায় সান্ত্বনা ও শিক্ষা খুঁজে পেয়েছেন। আর হাইকল ঘটনাটিকে প্রবহমান সাহিত্যিক ভাষায় বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করেছেন।
এই ধারণার পক্ষে আরো কিছু দৃষ্টান্ত
বায়ুমি যে আঙ্গিকে আলোচনা করেছেন, সেটি ছাড়াও এ ধারার গবেষণা পদ্ধতির পক্ষে অসংখ্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। দেখা যায়, প্রত্যেক ফকিহ বা সাহিত্যিক মহানবী (সা.)-এর জীবনের কোনো ঘটনা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেছেন। এসব দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশাপাশি রেখে তুলনা করলে নবুয়তের আরো পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট চিত্র আমাদের সামনে বিকশিত হবে।
এর একটি দৃষ্টান্ত ইউসুফ আল-কারজাবি ও খালিদ মুহাম্মদ খালিদের রচনায় পাওয়া যায়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রথম আঘাতে একটি কাকলাস (টিকটিকি জাতীয় একধরনের সরীসৃপ) হত্যা করবে, তার জন্য একশ নেকি লেখা হবে। দ্বিতীয় আঘাতে এর চেয়ে কম এবং তৃতীয় আঘাতেও এর চেয়ে কম (নেকি পাবে)।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর : ৫৭৪০)
প্রথম আঘাতের জন্য ১০০ নেকি এবং পরবর্তী আঘাতের জন্য ক্রমহ্রাসমান নেকি কেন, এর ব্যাখ্যায় ইউসুফ কারজাবি একজন আইনজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলেছেন, এটা মূলত সঠিকভাবে লক্ষ্যভেদ করার দক্ষতার পুরস্কার। শত্রুর মোকাবিলায় কাজে লাগাতে মুসলমানের এ ধরনের দক্ষতা থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে খালিদ মুহাম্মদ খালিদের ব্যাখ্যা ভিন্ন। তার মতে, এখানে নেকির পুরস্কারের মধ্য দিয়ে মূলত দয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যদি কাকলাসকে হত্যা করতেই হয়, তবে যেন দ্রুত হত্যা করা হয়; কারণ বারবার আঘাত করলে প্রাণীটি অযথা কষ্ট পাবে।
আমরা যে পদ্ধতিকে ‘তুলনামূলক সিরাতচর্চা’ নামে অভিহিত করছি, তা সিরাতের বিস্তৃত ভান্ডারে ছড়িয়ে থাকা অমূল্য রত্নগুলোকে পাঠকের সামনে তুলে আনার একটি কার্যকর পথ হতে পারে। বিশেষত সিরাতের এমন সব পার্শ্বঘটনা ও অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত বিষয় রয়েছে, যেগুলোর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা অনেক সময় বৃহৎ বর্ণনার আড়ালে পড়ে যায়।
সিরাতের লেখক ও কবিরা সাধারণত মহানবী (সা.)-এর জীবনের বড় ঘটনাগুলোর প্রতিই বেশি মনোযোগ দেন। নবীজির জন্ম, নবুয়তপ্রাপ্তি, হিজরত ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলো তাদের রচনায় প্রাধান্য পায়। অথচ তার জীবনের অনেক ছোট ও আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ঘটনার মধ্যেও নিহিত রয়েছে গভীর তাৎপর্য, মূল্যবান শিক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ঈমানি ও জাগতিক দিকনির্দেশনা। সেই বিস্মৃত বা আড়ালে থাকা রত্নগুলো খুঁজে বের করে বিভিন্ন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে একত্র করা গেলে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শকে আরো গভীর, পূর্ণাঙ্গ ও বহুমাত্রিকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।
আরবি থেকে বাংলা : আহমাদ ফাহমি

খলিফা ওমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থা ও সংস্কার by কাজী যুবাইদা তোহফা
মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেকোনো বড় সাম্রাজ্যের উত্থানের পেছনে থাকে সামরিক পরাক্রম। আর তার দীর্ঘস্থায়িত্বের আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে একটি সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর। সাত শতকে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনকাল ছিল বৈশ্বিক ইতিহাসে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অনন্য জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকাল। কোরআন ও সুন্নাহর মৌলিক দর্শন ও নীতির ওপর ভিত্তি করে তিনি যে অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন, তা সমকালীন রোমান বা পারস্য সাম্রাজ্য তো বটেই, আধুনিক অর্থনৈতিক চিন্তায়ও তার ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতিমালা গভীর গবেষণার বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল সম্পদকে শুধু ধনীদের মধ্যে আবর্তিত হতে না দিয়ে সমাজের প্রান্তিক স্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং রাষ্ট্রে কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
খলিফা উমর (রা.)-এর প্রবর্তিত এই বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল গভীরতা অনুধাবন করতে হলে তার পূর্ববর্তী শাসনকালের বাস্তব পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনার পেছনে কোনো স্থায়ী বা প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতন্ত্র গড়ে ওঠেনি। তখন পর্যন্ত রাষ্ট্রে সুনির্দিষ্ট কোনো কর কাঠামো, জাতীয় বাজেট কিংবা স্থায়ী অর্থনৈতিক নীতিমালার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কারণ, খেলাফতের ভৌগোলিক পরিধি তখন প্রধানত আরবের মরুভূমির মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং রাজস্বের আকারও ছিল তুলনামূলক ছোট। কিন্তু উমর (রা.) যখন খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, তখন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যের বিজয়ের মাধ্যমে খেলাফত রাষ্ট্রের সীমানা বিশাল রূপ ধারণ করে। কোটি কোটি দিরহামের রাজস্ব এবং লাখ লাখ নতুন অনারব নাগরিকের অন্তর্ভুক্তির ফলে আগের সেই অনানুষ্ঠানিক ও সাময়িক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দূরদর্শী খলিফা উমর (রা.) অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, একটি বিশাল আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রকে শুধু সামরিক পরাক্রমের জোরে টিকিয়ে রাখা যাবে না, যদি না তার পেছনে একটি সুশৃঙ্খল, স্থায়ী এবং সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো থাকে। ঠিক এই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই তিনি প্রথাগত আরবীয় সাময়িক রাজস্ব বণ্টন পদ্ধতি থেকে বের হয়ে এসে রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ আধুনিক ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
বাইতুল মালের প্রাতিষ্ঠানিক আধুনিকায়ন
ইসলামের শুরুর যুগে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা ‘বাইতুল মালে’র কোনো স্থায়ী অবয়ব ছিল না; রাজস্ব এলে তাৎক্ষণিকভাবে বণ্টন করে দেওয়া হতো। বাহরাইন থেকে আসা ৮ লাখ দিরহামের বিশাল রাজস্বও মহানবী (সা.) এক বৈঠকে সর্বসাধারণের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। কিন্তু খেলাফত রাষ্ট্রের পরিধি বৃহৎ পরিসরে বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা উমর স্থায়ী ও সুসংহত কেন্দ্রীয় বাইতুল মাল ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। মদিনায় কেন্দ্রীয় সুবৃহৎ কোষাগার ভবন নির্মাণের পাশাপাশি প্রতিটি বিজিত প্রদেশে এর শাখা বিস্তৃত করা হয় এবং সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক পাহারাদার নিযুক্ত করা হয়। কর আদায়ের প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক করতে তিনি ‘সাহেবুল খারাজ’ বা কর সংগ্রাহক এবং কোষাগার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘সাহিবে বাইতুল মাল’ বা কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের মতো সম্পূর্ণ নতুন প্রশাসনিক পদের সৃষ্টি করেন। বাহরাইন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসার পর উমর (রা.) সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভায় বসেন এবং ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরার প্রস্তাব অনুযায়ী পারস্য ও রোমানদের আদলে হিসাব সংরক্ষণের স্থায়ী দপ্তর চালু করেন। এই নতুন কেন্দ্রীয় কোষাগারের প্রধান কোষাধ্যক্ষ বা ‘সাহেবে বাইতুল মাল’ হিসেবে তিনি প্রখ্যাত আমানতদার সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম (রা.)-কে নিযুক্ত করেন।
দেওয়ান ব্যবস্থা ও নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারি
প্রশাসনিক দূরদর্শিতার আলোকেই খলিফা উমর (রা.) আরবে প্রথম সুশৃঙ্খল আমলাতান্ত্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনা হিসেবে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বিভাগ গঠন করেন। এই ব্যবস্থার নিখুঁত বাস্তবায়নে তিনি খেলাফত রাষ্ট্রে প্রথম নিয়মতান্ত্রিক আদমশুমারির ব্যবস্থা করেন। নাগরিকদের সংখ্যা ও প্রকৃত আর্থিক অবস্থা তালিকাভুক্ত করার পর তিনি বীরত্ব ও ইসলামের ত্যাগের তারতম্য অনুযায়ী ভাতার বৈজ্ঞানিক স্তরবিন্যাস করেন। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকের জন্য বার্ষিক ৫ হাজার দিরহাম, ওহুদ যুদ্ধের শহীদদের পরিবার ও হাবশায় হিজরতকারীদের জন্য ৪ হাজার দিরহাম এবং তরুণদের জন্য ২ হাজার দিরহাম করে নিয়মিত বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের আর্থিক অধিকার নিশ্চিত করা। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে সাদের ‘আত-তবাকাতুল কুবরা’ গ্রন্থের ৩৬০৫ নম্বর বর্ণনা অনুযায়ী, খলিফা উমর ঘোষণা করেছিলেন, ‘(আমি প্রদান করি কিংবা না-ই বা করি) পৃথিবীর সব স্বাধীন মুসলিমের রাষ্ট্রীয় সম্পদে অধিকার রয়েছে। আর আমি যদি বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই ইয়েমেনের মেষপালকের কাছেও তার প্রাপ্য অধিকার পৌঁছে যাবে তার মুখ লাল হওয়ার আগেই (নিজের হকের জন্য কষ্ট করে দাবি করার আগেই)।’ এই দেওয়ানব্যবস্থা ও ভাতা নির্ধারণের শুরুর সময়ে খলিফা উমর (রা.) আরবের বংশ তালিকা ও বীরত্ব অনুযায়ী নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত করার জন্য আকিল ইবনে আবু তালেব, মাখরামাহ ইবনে নাওফাল এবং জুবাইর ইবনে মুতইমকে দায়িত্ব দেন। তালিকা প্রস্তুতের পর ভাতা বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি নিজের পরিবার বা গোত্রকে নয়, বরং ইসলামের প্রথম যুগের ত্যাগকে অগ্রাধিকার দিয়ে সর্বপ্রথম মহানবী (সা.)-এর পরিবার এবং বদরি সাহাবিদের নাম রাষ্ট্রীয় খাতায় সবার ওপরে তালিকাভুক্ত করেন।
নিয়মিত সামরিক বাহিনী গঠন ও আর্থিক নিরাপত্তা
উমর (রা.)-এর আগে খেলাফতে নিয়মিত কোনো বেতনভুক্ত সামরিক বাহিনীর অস্তিত্ব ছিল না। তিনি খেলাফতের ইতিহাসে প্রথম নিয়মিত বেতনভুক্ত ও সুশৃঙ্খল সামরিক বাহিনী গঠন করেন। পদাতিক, অশ্বারোহী ও তীরন্দাজদের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে তাদের নাম রাষ্ট্রীয় রেজিস্ট্রি বা দেওয়ানে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং বাইতুল মাল থেকে নিয়মিত বেতন ও উন্নতমানের পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা হয়।
যুদ্ধের ময়দানে থাকা সেনাদের পরিবার-পরিজনের সার্বিক অর্থনৈতিক দায়িত্ব খলিফা নিজে তদারকি করতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বৈপ্লবিক ব্যবস্থা করেছিলেন। সৈন্যদের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে খলিফা উমরের এই নীতি শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল স্পর্শকাতর ঐতিহাসিক ঘটনা।
এক রাতে খলিফা উমর মদিনার অলিগলিতে সাধারণ প্রজাদের অবস্থা তদারকি করছিলেন। সে সময় একটি বাড়ি থেকে এক নারীর কণ্ঠে গভীর বিরহ ও আকুলতার কবিতা শুনতে পান, যার স্বামী দীর্ঘ সময় ধরে খিলাফতের সীমান্ত রক্ষায় যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োজিত ছিলেন। এ ঘটনা খলিফার মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। পরদিন সকালেই তিনি উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.)-এর কাছে গিয়ে জানতে চান, একজন বিবাহিত নারী তার স্বামী ছাড়া সর্বোচ্চ কতদিন ধৈর্য ধরে থাকতে পারে? উত্তরে তিনি জানান, এই সময়সীমা সর্বোচ্চ চার মাস।
এ ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করেন—কোনো বিবাহিত সৈনিককে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চার মাসের বেশি সময় পরিবার থেকে দূরে যুদ্ধক্ষেত্রে রাখা যাবে না। একই সঙ্গে তিনি আইন করেন, যুদ্ধকালীন এই চার মাস সৈন্যদের পরিবারের যাবতীয় ভরণপোষণ ও অর্থনৈতিক ব্যয়ভার রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মাল থেকে সুনিশ্চিত করা হবে।
খলিফা নিজে রাতের আঁধারে যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সৈন্যদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ পৌঁছে দিতেন এবং দূরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা সৈন্যদের চিঠিপত্র নিজে বহন করে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতেন।
এই নিয়মতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ফলেই খেলাফত রাষ্ট্রে সৈন্যদের বীরত্ব এবং তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অভূতপূর্ব এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
নবজাতকের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা
উমর (রা.)-এর অর্থব্যবস্থায় ‘শাসক’ পদের চেয়ে নিজেকে জনগণের ‘পাহারাদার’ ভাবা খলিফা মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ছিলেন আপসহীন। মদিনার এক অসহায় মায়ের কষ্ট দেখে তিনি নীতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের প্রতিটি নবজাতক শিশুর জন্যই মায়ের বুকের দুধপানের সময় থেকেই নিয়মিত রাষ্ট্রীয় ভাতার নিয়ম চালু করেন। এই মানবিক রাষ্ট্রদর্শনের পেছনে মদিনার উপকণ্ঠে ঘটে যাওয়া এক স্পর্শকাতর বাস্তব চিত্র বিদ্যমান। এক গভীর রাতে খলিফা উমর এবং আবদুর রহমান ইবনে আওফ যখন মদিনার বাইরে তাঁবু খাটিয়ে থাকা এক কাফেলার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন, তখন দূর থেকে একটি শিশুর কান্নার আওয়াজ খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ঘরের দরজায় গিয়ে মাকে সান্ত্বনা দিতে বললেও দীর্ঘক্ষণ পর আবার কান্নার তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় খলিফা নিজে গিয়ে এর কারণ অনুসন্ধান করেন। খলিফাকে চিনতে না পেরে সেই দুঃখী মা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান, খলিফা শুধু দুধ ছাড়ানো শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় ভাতার ঘোষণা দিয়েছেন; তাই পেটের দায়ে তিনি জোরপূর্বক তার এই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে মায়ের বুক থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করছেন, যাতে দ্রুত সরকারি সাহায্য পাওয়া যায়।
অসহায় মায়ের এই নিদারুণ স্বীকারোক্তি খলিফার বিবেককে প্রচণ্ড নাড়া দেয় এবং অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে তিনি ফজরের নামাজে এতটাই কান্না করছিলেন যে মুসল্লিদের পক্ষে তার কিরাত বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছিল। মোনাজাত শেষে তিনি বিলাপ করে বলতে থাকেন যে উমরের ভুলের কারণে আজ কত নিষ্পাপ শিশু কষ্টের শিকার হয়েছে। এ ঘটনার পরদিনই খেলাফতে জরুরি ফরমান জারি করা হয়, এখন থেকে কোনো শিশুকে জোর করে দুধ ছাড়াতে হবে না, বরং প্রতিটি নবজাতক পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই বাইতুল মালের নিবন্ধিত নাগরিক হিসেবে স্থায়ী ভাতার অধিকার লাভ করবে।
স্বজনপ্রীতি রোধ ও মিতব্যয়িতার আদর্শ
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি রোধে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। কোনো গভর্নর বা সরকারি কর্মকর্তা নিযুক্ত হওয়ার আগে সম্পদের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নেওয়া হতো এবং দায়িত্ব ছাড়ার সময় অতিরিক্ত বা অবৈধ কোনো সম্পদ পাওয়া গেলে বাজেয়াপ্ত করা হতো। আর এই জবাবদিহির সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলেন খলিফা নিজে, যিনি বাইতুল মাল থেকে সাধারণ একজন নাগরিকের সমপরিমাণ সর্বনিম্ন ভাতা গ্রহণ করতেন। অগণিত তালি দেওয়া সাধারণ পোশাক পরে বিশ্ব কাঁপানো এই রাষ্ট্রনায়ক প্রমাণ করেছিলেন, শাসকের ভোগবিলাস নয়, বরং মিতব্যয়িতাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি। এই কঠোর প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও মিতব্যয়িতার নীতিটি খলিফা শুধু মুখে বলেননি, বরং তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিজের পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের প্রভাবশালী সেনাপতিদের প্রতিও কোনো ছাড় দেননি। খেলাফতের অন্যতম সফল ও প্রভাবশালী গভর্নর আমর ইবনুল আস যখন মিসরের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন তার ব্যক্তিগত সম্পদে আকস্মিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ করে খলিফা উমর (রা.) তৎক্ষণাৎ হিসাব তলব করেন। গভর্নর তার এই অতিরিক্ত সম্পদকে বৈধ ব্যবসা ও ব্যক্তিগত উপার্জনের ফসল বলে দাবি করলেও, খলিফা তার নীতিতে অটল থাকেন এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত উপার্জনের আশঙ্কার কারণে গভর্নরের সেই বর্ধিত সম্পদের অর্ধেক অংশ রাষ্ট্রীয় ফরমান বলে বাইতুল মালে বাজেয়াপ্ত করেন। এমনকি নিজের প্রিয় পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) রাষ্ট্রীয় চারণভূমি ব্যবহার করে চড়া দামে উট বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করলে, খলিফা সরকারি চারণভূমির অনৈতিক সুবিধার কারণে পুত্রের সেই লভ্যাংশের পুরোটা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করে দেন। নিজের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রপ্রধানের এমন নজিরবিহীন ও আপসহীন অর্থনৈতিক জবাবদিহি সমগ্র খিলাফতে দুর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়েছিল।
![]() |
| মুসলিমদের বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের স্মৃতিবাহী ঐতিহাসিক ‘ওমর ইবনুল খাত্তাব ময়দান’ |
Thursday, August 20, 2026
টেক্সাসে বাড়ছে মুসলিমদের সংখ্যা, তীব্র হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষও
বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
জুনের শুরুর দিকে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম থেকে উঠেছিলেন গুলাম কেহার। টেক্সাসের আরভিংয়ে নিজের স্থানীয় মসজিদ ভ্যালি র্যাঞ্চ ইসলামিক সেন্টারে দিনের প্রথম নামাজ আদায় করে কয়েক মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডে দায়িত্ব পালনে যাওয়ার কথা ছিল তার।
এর আগেও তিনি দায়িত্ব পালনে গিয়েছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে টেক্সাসে রেখে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।
টেক্সাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মুসলিমবিরোধী বক্তব্য তখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং সেগুলোর প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছিল। বিভিন্ন মসজিদের মুসল্লি ও ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে নামাজ পড়ার সময় কিংবা পার্কে বসে থাকার সময় তাদের উদ্দেশে করা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছিলেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হিউস্টনের একটি বড় ইসলামিক সেন্টারে সন্ত্রাসী হুমকি দেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কনরো শহরে এক নারী মুসলিম ক্রেতাদের বলেন, তারা ‘এই অঙ্গরাজ্য বা এই দেশে স্বাগত নয়’। ওই মন্তব্যের ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর নারীটি চাকরি হারান। পরে সমর্থকদের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পান তিনি।
ডালাসের উপশহর ম্যাককিনিতেও একটি মসজিদ সম্প্রসারণ নিয়ে উত্তপ্ত সিটি কাউন্সিলের শুনানির সময় এক নারী সাবেক মেয়রের জামার ভেতরে ইসলামবিরোধী বার্তা লেখা কাগজ ঢুকিয়ে দেন।
‘এমন পরিবেশে তাদের একা রেখে যাওয়া কিছুটা উদ্বেগের বিষয় ছিল,’ নিজের পরিবারের প্রসঙ্গে বলেন কেহার। ‘বাইরে যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোই ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিল।’
পরে দায়িত্ব পালনের এলাকায় তার পরিবারকে যত দ্রুত সম্ভব তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি।
কেহারের মতো গত কয়েক দশকে টেক্সাসে বসতি গড়া মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে। ডালাসের দক্ষিণে ‘ডিসোটো হাউস অব পিস’-এর মতো প্রতিষ্ঠানও মুসলিম সম্প্রদায়ের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।
‘আমেরিকান মুসলিমদের জন্য এটাই থাকার সবচেয়ে ভালো জায়গা,’ বলেন তাম্মাম আলওয়ান। ডেট্রয়েট থেকে আরভিংয়ে চলে আসা এই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি প্রার্থনা করেছিলাম—হে আল্লাহ, আমাকে আরভিংয়ে পাঠান।’
কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায় যত বেড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভও তত বেড়েছে।
‘র্যাডিক্যাল ইসলাম’ মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকান রাজনীতির অংশ। জাতীয় পর্যায়েও এই বক্তব্য আরও তীব্র হয়েছে। মুসলিম রাজনীতিকদের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয় এবং মুসলিমদের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
তবে টেক্সাসের রাজনীতিকরা শুধু বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা কিছু মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতাও প্রয়োগ করেছেন।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। পূর্ব প্লানোর ইসলামিক সেন্টার বা এপিকের সদস্যরা ডালাসের পূর্বদিকে প্রায় ৪০০ একর জমিতে মসজিদকেন্দ্রিক একটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রকাশ করলে তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় এপিক সিটি । পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘দ্য মেডো’ রাখা হয়। প্রকল্পটিতে এক হাজারের বেশি বাড়ি, মসজিদ, স্কুল, দোকান, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদনমূলক স্থাপনা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটি নিয়ে ইসলামবিরোধী প্রভাবক অ্যামি মেকেলবার্গ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, টেক্সাসের বারবিকিউ রেস্তোরাঁগুলোকে একটি সমন্বিত ‘দখল’-এর অংশ হিসেবে ‘আরব শপিং প্লাজা’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এপিক সিটি নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘এভাবেই পশ্চিমা বিশ্বের পতন হয়।’
তার প্রচারণা টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর অ্যাবট প্রস্তাবিত প্রকল্প ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রাজ্যীয় তদন্ত শুরু করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনও প্রকল্পটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেন।
প্রকল্পটির সমালোচকেরা এটিকে ‘শরিয়াহ-নিয়ন্ত্রিত’ বা মুসলিমদের জন্য আলাদা এলাকা হিসেবে তুলে ধরলেও প্রকল্পের উদ্যোক্তারা বলেছেন, এটি সব ধর্ম ও পটভূমির মানুষের জন্য উন্মুক্ত।
রিপাবলিকান কনভেনশনে শরিয়াহবিরোধী প্রপাগাণ্ডা
মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের বিস্তার টেক্সাসের রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জুনে অনুষ্ঠিত টেক্সাস স্টেট রিপাবলিকান কনভেনশনে ‘Don’t Sharia Our Texas’ বা টেক্সাসকে শরিয়াহমুক্ত রাখার বার্তা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়। একাধিক প্যানেলে মুসলিম ‘আগ্রাসন’ নিয়ে সতর্ক করা হয় এবং শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করাকে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়। গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও সম্মেলনে শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান।
সম্মেলনস্থলে টেক্সাস হাউসের নতুন ‘শরিয়াহ-মুক্ত ককাস’-এর একটি বুথও ছিল। সেখানে অ্যামি মেকেলবার্গের সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রচারণা চালানো হয়।
এক নারীর হাতে থাকা একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমার টেক্সাসকে শরিয়াহ আইনে শাসিত করো না। স্বাধীনতা রক্ষা করো। টেক্সাস রক্ষা করো।’
এরই মধ্যে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রিপাবলিকান প্রার্থী বো ফ্রেঞ্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি থামব না।’
২০১৫ থেকেই শরিয়াহবিরোধী রাজনীতি
টেক্সাসে মুসলিমদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে আরভিংয়ের তৎকালীন মেয়র বেথ ভ্যান ডুইন শরিয়াহ আইনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসেন। তিনি বর্তমানে কংগ্রেসের সদস্য।
এর দুই বছর পর, ওয়াশিংটনভিত্তিক কট্টর ডানপন্থী থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসি-র উদ্যোগে আনা একাধিক বিলের অংশ হিসেবে টেক্সাসের রিপাবলিকানরা শরিয়াহবিরোধী আইন পাস করেন।
এরপর কিছু সময়ের জন্য কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিতে ইসলাম ইস্যুর গুরুত্ব কমে যায়। অভিবাসন, মহামারি ও লিঙ্গ রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পায়।
কিন্তু পরে কট্টর ডানপন্থীদের একটি অংশ নতুন করে এমন একটি বিতর্কিত ধারণা সামনে আনে—ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, বরং একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ।
এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এপিক সিটি নিয়ে নতুন করে প্রচারণা শুরু হয়।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ
রিপাবলিকান রাজনৈতিক পরামর্শক অ্যান্থনি হোমের মতে, ইসলাম নিয়ে রিপাবলিকান ভোটারদের উদ্বেগ মূলত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে তাদের ভীতিরই সম্প্রসারণ। গভর্নর অ্যাবটের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি যা কিছু করেন, তা জনমত জরিপ দ্বারা চালিত।’
এদিকে অ্যাবট মুসলিম যাত্রীদের ধর্মীয় অজুর জন্য ব্যবস্থা রাখা টেক্সাসের বিমানবন্দরগুলোর সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করার হুমকি দেন। মুসলিমদের একটি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত একটি ব্যক্তিগত ওয়াটার পার্ক অনুষ্ঠান বাতিলের নির্দেশও দেন তিনি।
একই সঙ্গে অ্যাবট জাতীয় নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেন। সংগঠনটি আদালতে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, সিএআইআর-কে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি অন্যান্য ইসলামি প্রতিষ্ঠানকেও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
মুসলিম নেতাদের অবস্থান
টেক্সাসের মুসলিম নেতারা কীভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ আন্তঃধর্মীয় যোগাযোগ ও জনসম্পৃক্ততার পক্ষে। আবার কেউ মনে করছেন, শুধু নিজেদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়।
ভ্যালি র্যাঞ্চ মসজিদে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট মুসলিম স্কলার ড. ওমর সুলেইমান বলেন, ‘আমরা সবসময় আমাদের কর্মকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে আশা করেছি, আমাদের কর্মকাণ্ডই স্বাভাবিকভাবে আমাদের পক্ষে কথা বলবে। আমরা সেটা চেষ্টা করেছি, কিন্তু এতে আমাদের কোনো লাভ হয়নি।’
তার মতে, এখন পরিস্থিতির জন্য ‘শক্ত অবস্থান’ প্রয়োজন এবং মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।
‘আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলাকে এসব মানুষের জন্য আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল করে তুলতে হবে,’ বলেন তিনি। ‘আমাদের তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।’
তিনি এমন প্রতিরোধের ভিত্তি হিসেবে মার্কিন সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষার কথা উল্লেখ করেন। তবে কট্টর রক্ষণশীলরা কীভাবে সেই সুরক্ষা সীমিত করা যায়, তার পথ খুঁজছেন।
টেক্সাসে এমন একটি উদ্যোগ হিসেবে কিছু ইসলামি সাংস্কৃতিক চর্চা—যেমন বিবাহ ও অন্যান্য বিষয়ে ধর্মীয় বিধানভিত্তিক সালিশি ব্যবস্থা—নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণে রাজ্য আইন ব্যবহারের কথা আলোচনা হচ্ছে।
সান অ্যান্টোনিওর রিপাবলিকান স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালান স্কুলক্রাফট বলেন, ‘আমরা প্রথম যে বিষয়গুলো করার চেষ্টা করব, তার একটি হলো—ধর্ম বলতে কী বোঝায়, সেটি সংজ্ঞায়িত করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়। এটি একটি ধর্মের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।’
মুসলিম অধিকারকর্মীদের মতে, পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক প্রচারণা, আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এবং সরকারি পদক্ষেপের মধ্য দিয়েও এর প্রকাশ ঘটছে।
সিএআইআর-এর অস্টিন শাখার শাইমা জায়ান বলেন, ‘আমরা ইসলামোফোবিয়ার ঢেউয়ের সম্মুখীন হচ্ছি। এটি সবচেয়ে ভয়াবহ ঢেউ।’
সব মিলিয়ে, টেক্সাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিস্তারের পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক প্রচারণাও নতুন মাত্রা পেয়েছে। মসজিদ ও মুসলিম অধ্যুষিত কমিউনিটি গড়ে ওঠা থেকে শুরু করে শরিয়াহ আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক—সবকিছু মিলিয়ে অঙ্গরাজ্যটির মুসলিমদের ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হচ্ছে।
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Wednesday, August 19, 2026
‘রহমতের ধর্মে তোমাকে স্বাগতম’—রবার্তো কার্লোসকে কাবার ইমামের অভিনন্দন
বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে রবার্তো কার্লোসের অতীত এবং বর্তমান ছবি শেয়ার করে তাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘রহমতের ধর্মে তোমাকে স্বাগতম।’
সাবেক এই ব্রাজিলিয়ান তারকার জন্য দোয়া করে শায়খ ইয়াসির আদ-দোসারি পোস্টে আরও লেখেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন, তার অন্তরে হেদায়েত দান করুন, তার ইসলাম গ্রহণে বরকত দিন এবং তাকে দৃঢ় ও হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’
রবার্তো কার্লোসের ইসলাম গ্রহণের খবরটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে মঙ্গলবার। তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির গাজিয়ানতেপের সংসদ সদস্য আলি শাহিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ দাবি করেন।
আলি শাহিন জানান, সম্প্রতি ব্রাজিল সফরের সময় দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সেখানেই ব্রাজিলের ইসলামী ব্যক্তিত্ব শায়খ জিহাদ হাম্মাদের কাছ থেকে রবার্তো কার্লোসের ইসলাম গ্রহণের খবর জানতে পারেন তিনি। পরে সাবেক এই ফুটবলারকে অভিনন্দনও জানান শাহিন।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রবার্তো কার্লোসের সঙ্গে শায়খ জিহাদ হাম্মাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। প্রায় চার সপ্তাহ আগে সাও পাওলোতে তাদের সাক্ষাৎ হয়। ওই সময় রবার্তো কার্লোস শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
![]() |
| মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. ইয়াসির আদ-দোসারি (বামে) তার ফেসবুক পোস্টে শেয়ার করা রবার্তো কার্লোসের ছবি (ডানে)। |
Sunday, August 16, 2026
‘আজান আমেরিকান সংস্কৃতির অংশ নয়’
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যের অলাভজনক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ানা সিটিজেন এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
নিজের ‘আস্ক মিকা এনিথিং’ ভিডিও সিরিজে এক দর্শকের প্রশ্নের জবাবে বেকউইথ বলেন, গির্জার ঘণ্টা বাজানো যদি অনুমোদিত হয়, তাহলে ইসলামের আজান কেন নীরব রাখতে হবে—এমন প্রশ্নের পর তিনি আজানের প্রকাশ্য সম্প্রচারের বিরোধিতা করেন।
বেকউইথ কোনো নির্দিষ্ট মসজিদ বা স্থানীয় বিরোধের কথা উল্লেখ করেননি এবং কোনো নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব করেননি। সাধারণত প্রকাশ্যে ধর্মীয় শব্দ সম্প্রচারের ক্ষেত্রে স্থানীয় আইন প্রযোজ্য হতে পারে। তবে আদালতের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে, এসব আইন ধর্মীয় বক্তব্যের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক হতে পারে না।
ইন্ডিয়ানা মুসলিম অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক মালিহা জাফর বলেন, তার জানা মতে ইন্ডিয়ানার কোনো মসজিদই লাউডস্পিকারে বাইরে আজান সম্প্রচার করে না।
জাফর আরো জানান যে যে, মুসলিম সম্প্রদায় বর্তমানে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষত জনসমক্ষে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কারণে মুসলিমরা নিজেদের অনিরাপদ মনে করছে।
তিনি বলেন, মসজিদগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে এবং সক্রিয় বন্দুকধারী মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে প্ল্যাকার্ড নিয়ে এসে ভাঙচুর ও অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, তিনি প্রতিটি মসজিদের সঙ্গে তার যোগাযোগে নেই এবং তাই এ ধরনের ঘটনার ব্যাপকতার সঠিক হিসাব তিনি দিতে পারবেন না।
জুন মাসে স্টেটহাউসে অনুষ্ঠিত ‘ফেইথ ওভার ফিয়ার’ অনুষ্ঠানে জাফর বলেন, ইন্ডিয়ানা জুড়ে মুসলিম পরিবারগুলো ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষপূর্ণ জনমত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জাফর বলেন, ‘যখন কুসংস্কার এবং অপতথ্যকে বিনা প্রতিবাদে চলতে দেওয়া হয়, তখন তা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে মানুষ নিজেদের অবাঞ্ছিত, বিচ্ছিন্ন এবং ভীত বোধ করে।’
বেকউইথ সোমবার যুক্তি দিয়েছেন যে, ইসলামি আযান আমেরিকান সংস্কৃতির জন্য একটি বহিরাগত বিষয়। তিনি একজন দর্শকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, যিনি জানতে চেয়েছিলেন যে গির্জার ঘণ্টা বাজানোর অনুমতি থাকলেও কেন ইসলামিক আজানকে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে।
বেকউইথ পরামর্শ দিয়েছেন যে, যারা ইসলামিক আজান শুনতে চান, তাদের এমন দেশে যাওয়া উচিত যেখানে এই প্রথাটি স্থানীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের অংশ। তিনি আরও পরামর্শ দিয়েছেন যে, মসজিদগুলো প্রকাশ্যে আজান সম্প্রচার করার পরিবর্তে নামাজের সময় হলে সদস্যদের কাছে টেক্সট মেসেজ পাঠাতে পারে।
বেকউইথ বলেছেন, ‘ইসরাইল এবং ইন্ডিয়ানার বাকি অংশের সম্প্রদায়গুলোতে উচ্চস্বরে ইসলামিক আজান বাজানোর কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই’।
মে মাস থেকে তীব্রতর হওয়া ইসলামের বিরুদ্ধে তার ব্যাপক সমালোচনা অব্যাহত অংশ হিসেবেই বেকউইথ এই মন্তব্যগুলো করেন।
খ্রিস্টান রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ফ্ল্যাশপয়েন্টে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বেকউইথ ইসলামের সমালোচনা করেন এবং বলেন যে আমেরিকানদের ‘আবার ঘৃণা করার অনুমতি’ থাকা উচিত। একই মন্তব্যে তিনি ইসলামকে একটি ‘শয়তানের উপাসক গোষ্ঠী’ হিসেবেও বর্ণনা করেন। পরে তিনি দাবি করেন যে এই ধর্মটি ‘নাৎসিবাদের চেয়েও খারাপ’, । পরে তিনি আজান নিষিদ্ধ করার জন্য প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস
তবে বেকউইথের দাবি করা ‘ইসলাম আমেরিকান সংস্কৃতি বা ইতিহাসের অংশ নয়’ এর সঙ্গে দেশটির ইতিহাসের বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখা যায়।
ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আফ্রিকান আমেরিকান হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার এবং লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয়দের বসতি স্থাপনের প্রাথমিক সময় থেকেই উত্তর আমেরিকায় মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল।
১৫০০-এর দশক থেকেই উত্তর আমেরিকায় ইসলামের উপস্থিতি রয়েছে এবং ক্রীতদাস হিসেবে আসা আফ্রিকান মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় চর্চা বজায় রেখেছিলেন
এমনকি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধেও মুসলমানরা উপনিবেশগুলোর পক্ষে লড়াই করেছিলেন। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ওয়াশিংটন ও থমাস জেফারসন ধর্মীয় স্বাধীনতার বিতর্কের সময় ইসলামকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিলেন।
থমাস জেফারসন লিখেছিলেন যে ভার্জিনিয়ার ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানসহ সবার সুরক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছিল।
আমেরিকান সংস্কৃতিতে প্রাথমিক আফ্রিকান মুসলিমদের প্রভাব ব্লুজ সঙ্গীতের সুরের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়।
ফলে ইন্ডিয়ানায় প্রকাশ্যে আজান প্রচার নিয়ে বেকউইথের মন্তব্য নতুন করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মিকা বেকউইথ। ছবি: সংগৃহীত। |
Sunday, June 21, 2026
ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন ‘ব্রেকিং ব্যাড’ খ্যাত মার্কিন অভিনেতা এস্পোসিতো
সৌদি আরবের জেনারেল এন্টারটেইনমেন্ট অথরিটির প্রধান তুর্কি আল-শেখ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এস্পোসিতো শাহাদাহ পাঠের মাধ্যমে ইসলামে দীক্ষিত হন। শুটিং চলাকালে তিনি একটি মসজিদে সহকর্মীদের সঙ্গে নামাজেও অংশ নেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে তাকে মুসল্লিদের সঙ্গে কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে।
তুর্কি আল-শেখ জানান, সৌদি আরবে অবস্থানকালে স্থানীয় মুসলিম সমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পরিচয়, তাদের জীবনযাপন ও ইতিবাচক আচরণ এস্পোসিতোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। দেশটির মানুষের আন্তরিকতা, অতিথিপরায়ণতা এবং সামাজিক সম্প্রীতিরও প্রশংসা করেছেন এই হলিউড অভিনেতা।
দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয়জীবনে জিয়ানকার্লো এস্পোসিতো টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছেন। ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এ তার অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে এবং তাকে একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারের মনোনয়ন এনে দিয়েছে। এছাড়া ‘বেটার কল সল’ ও ‘দ্য ম্যান্ডালোরিয়ান’-এর মতো জনপ্রিয় সিরিজেও তার অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের সমানভাবে মুগ্ধ করেছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এস্পোসিতো বর্তমানে ‘সেভেন ডগস’ নামের একটি উচ্চ বাজেটের চলচ্চিত্রের কাজ নিয়ে সৌদি আরবে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা ও তারকাদের আকৃষ্ট করে দেশটির বিনোদন খাতকে আরও বিকশিত করার যে পরিকল্পনা সৌদি আরব বাস্তবায়ন করছে, এই প্রকল্পকে তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
![]() |
| মার্কিন টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেতা জিয়ানকার্লো এস্পোসিতো। ছবি : সংগৃহীত |
Monday, June 15, 2026
খলিফা আবু বকরের যুগে পারস্য অভিযান: ইরাক অঞ্চলে অন্যান্য বিজয় by মাহমুদ আহমাদ
আনবার (জাতুল উয়ুন)
আনবার ছিল দজলা নদীর পূর্বতীরে, বর্তমান সাকলাওয়িয়া অঞ্চলের অন্তর্গত এলাকায় অবস্থিত ইরাকের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একটি নগর। প্রাচীনকাল থেকেই এটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পারসিক যুগে আনবার অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক ও সামরিক ঘাঁটি ছিল।
দুমাতুল জান্দালের উদ্দেশে রওনা হয়ে সেনাপতি খালেদ আনবারের প্রতিপক্ষের বাধার মুখোমুখি হলেন। তিনি চাইলে তাদের উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যেতে পারতেন; কিন্তু তাতে বাহিনীর পেছন দিকটা অনিরাপদ রয়ে যেত। এই ঝুঁকি তিনি নিতে চাইলেন না।
মুসলিম বাহিনীর অভিযানের জন্য আনবারবাসী আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। তারা দুর্গের চারপাশে পরিখা খনন করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সুরক্ষিত করল। এরপর দুর্গের ভেতরে ঢুকে বসে থাকল। মুসলিম বাহিনী আনবার দুর্গের চারপাশে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করলেন। মুসলিমরা সঙ্গে থাকা দুর্বল উটগুলো জবাই করে পরিখার সরু অংশ ভরাট করে ফেলল। এরপর দুর্গ নিজেদের দখলে নিয়ে নিলেন। সেনাপতি খালেদ এই দুর্গের দায়িত্বে জাবরকান ইবনে বদরকে নিযুক্ত করলেন।
আইনে তামর
আনবার বিজয়ের খালেদ ইবনে ওয়ালিদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র আইনে তামর। মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে আরব ও পারস্যের সম্মিলিত শক্তি সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়েছিল। তাদের নেতা ছিল উক্কাহ ইবনে আবি উক্কাহ। অন্যদের মতো তারাও খালেদের সামরিক দক্ষতাকে অবমূল্যায়ন করল। উক্কাহ অহংকারভরে ঘোষণা করেছিলে, আরবদের মোকাবিলায় আরবরাই যথেষ্ট; পারস্য বাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন তাদের নেই।
দুই বাহিনী মুখোমুখি হলে খালেদ একটি সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে, যখন উক্কাহ নিজের সৈন্যদের সারিবদ্ধ করতে ব্যস্ত, তখন খালেদ অল্পসংখ্যক অশ্বারোহী নিয়ে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তাকে বন্দি করে নিয়ে আসেন। নেতা বন্দি হওয়ায় আরব খ্রিষ্টান বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে এবং তারা আত্মসমর্পণ করে। এরপর খালেদ আইন তামরের দুর্গ অবরোধ করেন। দুর্গে আশ্রয় নেওয়া লোকদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন। এভাবে আইনে তামরে সম্পূর্ণভাবে মুসলিমদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। আইন তামরের প্রশাসক হিসেবে উয়াইমির ইবনে কাহিল আসলামীর নিযুক্ত করেন।
দুমাতুল জানদাল
আইনে তামর জয় করে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ দুমাতুল জানদালের দিকে এগিয়ে গেলেন। এখানে মুসলিম সেনাপতি ইয়াজ ইবনে গানাম অবরুদ্ধ হয়ে ছিলেন। খালেদের অগ্রযাত্রার সংবাদ পৌঁছাতেই দাউমাতুল-জানদালের শাসকরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল এবং বিভিন্ন গোত্রের সৈন্যদের সমবেত করল।
এদিকে দাউমাতুল-জানদালে পৌঁছে খালেদ দেখতে পেলেন, শত্রুবাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একদল তার মোকাবিলার জন্য এবং অন্যদল ইয়াজ ইবনে গানামের বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আক্রমণ শুরু হলে উভয় বাহিনী মুসলিমদের হাতে পরাজিত হয়। পরাজিত সৈন্যরা দুর্গে আশ্রয় নিতে ছুটে গেলেও ভিড়ের কারণে ভেতরে যেতে পারে না। ফলে তারা মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এরপর খালেদ দুর্গের প্রবেশদ্বার ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং দুমাতুল জানদালের পূর্ণ নিজের হাতে তুলে নেন।
এই বিজয় শুধু সামরিক সাফল্য নয়; কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও এর অনেক গুরুত্ব ছিল। দুমাতুল জানদাল ছিল আরব উপদ্বীপ, ইরাক এবং শামের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে শহরটির অধিকার মুসলিমদের জন্য উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তকে নিরাপদ করে এবং ইরাক ও শামের মধ্যকার যোগাযোগপথকে সুরক্ষিত করে।
হুসাইদ বিজয়
দুমাতুল জানদাল বিজয়ের পরও ইরাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ থেমে যায়নি। খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ অন্য অভিযানে ব্যস্ত থাকায় বহু অমুসলিম আরব ও পারসিক গোষ্ঠী মুসলিম শাসনকে দুর্বল মনে করে আবার সংগঠিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে, আইনুত তামরে নিহত উক্কাহর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা পারসিকদের সঙ্গে জোট করে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ সম্মিলিত বাহিনী প্রস্তুত করে।
এই উদ্দেশ্যে পারসিক সেনানায়করা তাদের বাহিনী নিয়ে বাগদাদ অঞ্চল থেকে হুসাইদ ও খানাফিতে অবস্থানরত আরব মিত্রদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তাদের তৎপরতা মুসলিম গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে যায়। হীরার শাসক কা’কা ইবনে আমর তাদের ওপর নজরদারির ব্যবস্থা করেন।
খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ জানতে পারেন, হুসাইদে বিভিন্ন গোত্রের সৈন্যরা পারসিক সেনাপতি রাওজাবার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। শত্রুকে আরো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ না দিয়ে তিনি কাকা ইবনে আমরের নেতৃত্বে একটি বাহিনী সেখানে পাঠান এবং হীরার দায়িত্ব ইয়াজ ইবনে গনমের হাতে অর্পণ করেন। এদিকে জারমাহারের সহায়তায় রাওজাবাও পারসিক ও আরব বাহিনীকে একত্র করেন। হুসাইদের যুদ্ধে কাকার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী শত্রুপক্ষকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। যুদ্ধে অনেক শত্রুসৈন্য নিহত হয়। এ বিজয়ের ফলে মুসলিমরা ইরাকে তাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা নতুন জোট ও সম্ভাব্য বিদ্রোহের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়।
মুসাইয়াখ বিজয়
হুসাইদে বিজয়ের পর খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ উপলব্ধি করেন, ইরাকের উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আরব ও পারসিক গোষ্ঠীগুলো দ্রুত দমন না করা গেলে তারা আবার একত্র হয়ে মুসলিমদের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে। তাই তিনি তার অধীনস্থ সব কমান্ডারকে মুসাইয়্যাখ নামক স্থানে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। হাওরাতের নিকটবর্তী এ অঞ্চলে নির্ধারিত সময়ে মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন একত্র হলে খালেদ তাদের সমন্বিত আক্রমণের পরিকল্পনা দেন। এরপর তিন দিক থেকে একযোগে অভিযান চালিয়ে তারা স্থানীয় প্রতিরোধশক্তিকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং শত্রুদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়।
ফিরাজের লড়াই
ইরাকে ধারাবাহিক বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিমরা যখন অধিকাংশ প্রতিরোধশক্তিকে দমন করতে সক্ষম হয়, তখন সেনাপতি খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ ফিরাজ অঞ্চলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। শাম, ইরাক ও আরব উপদ্বীপের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ফিরাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্তাঞ্চল। কৌশলগতভাবে এর নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য ছিল।
ফিরাজে মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতি রোমানদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। মুসলিমদের দ্রুত অগ্রযাত্রা থামানোর উদ্দেশ্যে তারা পারসিকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং উভয় পক্ষ তাদের অভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একযোগে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে প্রথমবারের মতো মুসলিম বাহিনী একই যুদ্ধে রোমান, পারসিক ও আরব—এই তিন শক্তির সম্মিলিত বাহিনীর মুখোমুখি হয়।
উভয় বাহিনী ফোরাত নদীর তীরে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। শত্রুপক্ষ মুসলিমদের নদী পার হয়ে আসার আহ্বান জানালে খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ নিজ অবস্থানে অটল থেকে তাদেরই নদী পার হতে দেন। যুদ্ধে রোমান, পারসিক ও আরবদের যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিমরা অসাধারণ সাহস ও শৃঙ্খলার পরিচয় দেয়। তীব্র যুদ্ধের পর শত্রুজোট সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয় এবং বিপুলসংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। বিজয়ের পর খালেদ কয়েক দিন ফিরাজে অবস্থান করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করেন।
হিজরি ১২ সালের জিলকদ মাসে সংঘটিত এই যুদ্ধ মুসলিমদের বিরুদ্ধে গঠিত বৃহত্তম জোটকে ভেঙে দেয় এবং ইরাকে মুসলিম কর্তৃত্বকে আরো সুদৃঢ় করে। ইতিহাসে এটি ইরাক অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। এটি ছিল ইরাকে খালেদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে পরিচালিত শেষ উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ।

Friday, June 12, 2026
মুসলিম গণিতবিদের নাম থেকে যেভাবে এলো ‘অ্যালগরিদম’
শব্দটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় ভ্যাটিকানের একটি পদক্ষেপে। পোপ লিও চতুর্দশ তার প্রথম বিশ্বপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে আলোচনা করেছেন, যেখানে ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটি এসেছে ১৯ বার।
কিন্তু বহুল ব্যবহৃত এই শব্দের উৎপত্তি কীভাবে? শব্দের উৎস ও ব্যবহার নিয়ে তৈরি জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেল ‘রবওয়ার্ডস’-এর সঞ্চালক ও সাংবাদিক রব ওয়াটস জানান, অ্যালগরিদম শব্দটির উৎপত্তি মূলত নবম শতকের একজন পার্সিয়ান (পারস্যের) গণিতবিদের নাম থেকে। তার নাম মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমি।
ওয়াটস বলেন, ‘আমরা যখন অ্যালগরিদম শব্দটি ব্যবহার করি, তখন মূলত আল-খাওয়ারিজমি নামের ল্যাটিন রূপটিকেই উচ্চারণ করি।’ তবে দ্বাদশ শতাব্দী পেরিয়ে শব্দটির আজকের রূপে পৌঁছানোর পথটি বেশ আঁকাবাঁকা ছিল। আধুনিক ‘অ্যালগরিজম’ শব্দটি ল্যাটিন ‘অ্যালগোরিজমাস’ থেকে ফরাসি অ্যালগরিজম (algorisme) ও ইংরেজি অ্যালগরিজম (algorism) হয়ে এসেছে। বর্তমান রূপে আসার আগে এটি ‘অ্যারিথমেটিক’ বা পাটিগণিত শব্দের সঙ্গেও কিছুটা মিশ্রিত হয়ে গিয়েছিল।
কে ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমি?
আল-খাওয়ারিজমি কেবল একজন গণিতবিদই ছিলেন না, একাধারে তিনি ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদ। বর্তমান উজবেকিস্তানের আরাল সাগরের দক্ষিণ অঞ্চলে তার জন্ম। সেই অঞ্চলের নাম ছিল খাওয়ারিজম, যা থেকে তার নামের এই অংশের উৎপত্তি।
তবে গণিতেই তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তার বিখ্যাত বই ‘দ্য কম্পেনডিয়াস বুক অন ক্যালকুলেশন বাই কমপ্লিশন অ্যান্ড ব্যালেন্সিং’-এর মাধ্যমে তিনি গাণিতিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি বা অ্যালগরিদমিক প্রক্রিয়া পরিচয় করিয়ে দেন। এছাড়া পশ্চিমে হিন্দু-আরবি সংখ্যা পদ্ধতির (শূন্যের ধারণাসহ) প্রসার এবং বীজগণিত বা ‘অ্যালজেব্রা’র ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তিনি।
পিটজার কলেজের বিজ্ঞান ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক জুডি গ্র্যাবাইনার বলেন, ‘দ্বাদশ শতকে ইউরোপে প্রাচীন জ্ঞানচর্চার পুনর্জাগরণ ঘটলে এই বইটি একাধিকবার ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়।’
অষ্টম শতকে ইসলামি বিজ্ঞান ও গণিতের সোনালী যুগে ‘আল’ (আরবিতে ‘নির্দিষ্টবাচক’ শব্দ) দিয়ে শুরু হওয়া আরো অনেক শব্দ ইংরেজিতে জায়গা করে নেয়। যেমন-অ্যালকোহল, অ্যালকালি, অ্যালকেমি এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের আলটায়ার, অলকায়েড ও আলদেবারানের মতো নক্ষত্রের নাম।
গাণিতিক রেসিপি
জ্যোতির্বিদ্যা ও রসায়নের পথ ধরে অ্যালগরিদম শব্দটির প্রবেশ ঘটে আধুনিক কম্পিউটিংয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানার সফটওয়্যার প্রকৌশলী বিল ওয়েস্ট্রিকের মতে, ‘অ্যালগরিদম আসলে কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা নিয়মের সেট।’
এটিকে কেক তৈরির রেসিপির সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘রেসিপিতে উপাদানগুলো নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে মেশাতে বা নির্দিষ্ট সময় ধরে নাড়তে বলা হয়। কেন তা করা হচ্ছে তা না বুঝলেও নির্দেশনা মানলে একটি ভালো কেক তৈরি সম্ভব।’
মিলওয়াকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সুসান ম্যাকরয় জানান, আধুনিক কম্পিউটারের অনেক আগেই ব্যবসা, জরিপ ও নৌ-যান চালনার মতো ক্ষেত্রে অ্যালগরিদম অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল। ১৭০০ শতকের শেষের দিকে সমুদ্রের বুকে সেক্সট্যান্ট (দিগন্ত ও নক্ষত্রের মধ্যকার কৌণিক দূরত্ব মাপার যন্ত্র) ব্যবহার করে অবস্থান নির্ণয়ে অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হতো। ১৯৫০-এর দশকে ডাচ কম্পিউটার বিজ্ঞানী এডসগার ডাইকস্ট্রা ‘ডাইকস্ট্রাস অ্যালগরিদম’ তৈরি করেন, যা দুটি স্থানের মধ্যকার সংক্ষিপ্ততম দূরত্ব খুঁজে বের করে এবং আজকের ডিজিটাল ম্যাপিং বা জিপিএস (জিপিএস স্যাটেলাইট) প্রযুক্তির মূল ভিত্তি। এমনকি চাঁদে মানুষ পাঠাতেও অ্যালগরিদম সাহায্য করেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে একক ও পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ঠেলে দেওয়া এই ‘অমানবিক’ অ্যালগরিদম নিয়ে পোপের উদ্বেগ হয়তো যথার্থ। তবে এটিও সত্য যে, শত শত বছর ধরে এই অ্যালগরিদমই মানুষকে পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করে আসছে।
সূত্র: এনপিআর
![]() |
| প্রতীকী ছবি |
Friday, May 1, 2026
কবরে মাটি দেওয়ার নিয়ম ও দোয়া
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছেন, কবর খনন করেছেন এবং মাটি দিয়েছেন। তাই মুসলিমদের জন্য এ বিষয়টি জানা ও সঠিকভাবে পালন করা জরুরি।
কবর দেওয়ার নিয়ম
দাফন প্রক্রিয়ার মূলনীতি হলো:
১. মৃতদেহকে গোসল করানো, কাফন দেওয়া ও জানাজা পড়ানো।
২. কবর যথেষ্ট গভীর করা যাতে মৃতদেহ নিরাপদ থাকে।
৩. মৃতদেহকে ডান দিকে কিবলামুখী করে রাখা।
৪. কবর ঢেকে দেওয়া ও মাটি চাপা দেওয়া।
নবীজি (সা.) বলেছেন: “তোমরা মৃতদেহকে সম্মানের সাথে দাফন করো।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩২২১)
কবরে মাটি দেওয়ার নিয়ম
কবর ঢাকতে গিয়ে প্রথমে সাধারণত ৩ মুঠো করে মাটি দেওয়া সুন্নাহ। প্রত্যেকে পালাক্রমে মৃতের দিকে মুখ করে কবরের ভেতর প্রথম তিন মুঠো মাটি দেন। প্রতিবার মুঠো খোলার সময় সুরা ত্বাহার ৫৫ নম্বর আয়াতের একটি করে অংশ পড়তে হয়।
* প্রথম মুঠোয় পড়তে হয়: “মিনহা খালাক্না–কুম।” অর্থ: “আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি।”
* দ্বিতীয় মুঠোয় পড়তে হয়: “ওয়া ফীহা নু‘ঈদুকুম।” অর্থ: “এবং আমি তোমাদেরকে তাতে ফিরিয়ে দেব।”
* তৃতীয় মুঠোয় পড়তে হয়: “ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখরা।” অর্থ: “এবং সেখান থেকে আবার তোমাদেরকে একবার বের করব।”
এটি রাসুল (সা.) ও সাহাবিদের আমল। (তাফসির ইবন কাসির, সুরা ত্বাহা. আয়াত ৫৫ এর ব্যাখ্যা)
দাফনের পর দোয়া
দাফন শেষে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা সুন্নাহ। নবীজি প্রতিবার দাফনের পর সাহাবিদের বলতেন: “তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং তার জন্য স্থিরতার দোয়া করো, কারণ এখন তাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩২২১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৫৩১)
এ সময় সাধারণত বলা হয়:
উচ্চারণ: “আল্লাহুম্মাগ্ফির লাহু, আল্লাহুম্মা সাব্বিতহু, আল্লাহুম্মাজ্‘আল কবরাহু রাওযাতান মিন রিয়াযিল জান্নাহ।”
অর্থ: “হে আল্লাহ, তাকে ক্ষমা করুন, তাকে স্থির রাখুন এবং তার কবরকে জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগানে পরিণত করুন।”
কবরের মাটি দেওয়ার নিয়ম ও দোয়া ইসলামি শিষ্টাচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে রয়েছে মৃতের প্রতি সম্মান, আখিরাতের স্মরণ এবং জীবিতদের জন্য শিক্ষা। আমাদের উচিত নবীজির (সা.) প্রদর্শিত এ সুন্নাহ যথাযথভাবে পালন করা।

Thursday, April 9, 2026
খলিফার পরিকল্পনা ও চার সেনাপতির অগ্রযাত্রা by নাসরুল্লাহ ইবনে ইলিয়াস
আবু বকর (রা.)
চারজন সুদক্ষ সেনাপতিকে নির্বাচন করেন এবং প্রত্যেককে শামের নির্দিষ্ট
অঞ্চলে অভিযানের দায়িত্ব দেন। এটি ছিল খলিফার অত্যন্ত সুচিন্তিত রণকৌশল। এর
মাধ্যমে তিনি বাইজেন্টাইন বাহিনীকে বিভক্ত করে ফেলেন, ফলে তারা সম্পূর্ণ
শক্তি নিয়ে মুসলিম বাহিনীর ওপর একযোগে আক্রমণ করতে অক্ষম হয়। খলিফা
সেনাপতিদের এইভাবে পাঠানÑআমর ইবনুল আসকে ফিলিস্তিনে, ইয়াজিদ বিন আবু
সুফিয়ানকে দামেস্কে, আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে হোমস ও মধ্য সিরিয়ায়,
শুরাহবিল বিন হাসানাহকে জর্ডানে।
বিজ্ঞাপন
যুদ্ধের নৈতিক নীতিমালা
মুসলিম
বাহিনী যখন মার্চ করে মদিনা থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল, খলিফা আবু বকর (রা.)
তখন চার ফ্রন্টের একটির সেনাপতি ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ানের ঘোড়ার পাশেপাশে
হাঁটছিলেন। এ সময় খলিফা ইয়াজিদকে কয়েকটি উপদেশ ও যুদ্ধের কিছু নীতিমালা
উল্লেখ করে দেন। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধের নৈতিক নীতিমালা হিসেবে যা এখনো
অমর হয়ে আছে।
ইয়াজিদকে দেওয়া খলিফার কয়েকটি অমর নির্দেশনা—
১. নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপত্তা : কোনো অবস্থাতেই বয়োবৃদ্ধ, নারী বা শিশুকে হত্যা করা যাবে না। এটি ছিল তৎকালীন অমানবিক যুদ্ধনীতিকে পরিশোধনের নতুন উদ্যোগ।
২. প্রকৃতির সুরক্ষা :
যুদ্ধের সময়ও প্রকৃতির প্রতি সংযম দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কোনো
ফলদার গাছ কাটা যাবে না এবং শস্যক্ষেত বা বাগান জ্বালিয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ
ছিল। যুদ্ধের ময়দানেও যেন পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে খলিফা আবু বকর
(রা.) বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
৩. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা : সন্ন্যাসী বা ধর্মগুরু, যারা উপাসনালয়ে নিভৃতে উপাসনা করে, তাদের বিরক্ত করা যাবে না এবং কোনো গির্জা ও মন্দির ধ্বংস করা যাবে না।
৪. নিষ্ঠুরতা বর্জন : শত্রুদের মৃতদেহ বিকৃত (Mutilation) করা যাবে না এবং কোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা বা বর্বরতা প্রদর্শন করা যাবে না।
৫. সম্পদের সুরক্ষা
: প্রয়োজনীয় খাদ্য ছাড়া কোনো গবাদি পশুÑযেমন উট, গরু বা ছাগল জবাই করা
যাবে না। মালে গনিমত খেয়ানত বা লুটপাট করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
বিজয়ের ঝান্ডাবাহিরা
খলিফা
আবু বকর (রা.)-এর এই সাহসী পদক্ষেপ শুধু আরবের জন্যই নয়, বরং পুরো পৃথিবীর
জন্য ছিল নতুন ভোরের সূচনা। চারটি সুশৃঙ্খল বাহিনী যখন ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে
উত্তরের দিকে যাত্রা শুরু করল, তখন মদিনার ধূলিধূসরিত আকাশে লেখা হতে থাকল
ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। একদিকে আমর ইবনুল আস (রা.) গাজার উপকূল ধরে
এগোচ্ছিলেন, অন্যদিকে আবু উবাইদাহ ও ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) তাবুক ও
জর্ডান উপত্যকার মধ্য দিয়ে শামের হৃৎপিণ্ডের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এটি
শুধু সামরিক সংঘাতের সূচনা ছিল না, ছিল এক জরাজীর্ণ ও শোষণমূলক ব্যবস্থার
বিরুদ্ধে এক নতুন ও ইনসাফভিত্তিক জীবন দর্শনের লড়াই।
শাম অভিযানের
প্রথম ধাপটি ছিল পরবর্তী বড় বিজয়গুলোর ভিত্তি। পরবর্তী আলোচনায় আমরা দেখব,
কীভাবে এই ক্ষুদ্র বাহিনীগুলো বিপুল শক্তিধর পরাশক্তি বাইজেন্টাইন
সাম্রাজ্যের প্রাচীরে ফাটল ধরিয়াছিল।
বাজে রণডঙ্কা
মদিনার
উত্তর প্রান্তে অবস্থিত ‘জুরফ’ নামক স্থানে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে।
আবু বকর (রা.)-এর জন্য এই অভিযান ছিল অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। একদিকে
অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনের পর ক্লান্ত এক সেনাবাহিনী, অন্যদিকে বিশ্বের
শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। কিন্তু মদিনার পরিবেশে তখন
ভয়ের চেয়েও বেশি ছিল খোদার প্রতি নিবেদন ও আত্মবিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাস
তৈরি হয়েছিল নবীজি (সা.)-এর সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যদ্বাণী এবং উসামা ইবনে জায়দ
(রা.)-এর সফল অভিযানের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে।
জুরফের সামরিক
ক্যাম্পে তাঁবু খাটিয়েছেন আরবের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধারা। আবু বকর (রা.) নিজে
তদারকি করছিলেন প্রতিটি বাহিনীর প্রস্তুতি। মদিনায় সবার মুখে মুখে এই
যুদ্ধের আলোচনা। বাইজেন্টাইন সীমান্ত অভিমুখে অভিযানের অর্থ ছিল ইসলামের
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্বপরাশক্তির মুখোমুখি হওয়া। এই সিদ্ধান্ত
বাস্তবায়নের মুহূর্তটি ছিল খেলাফত রাষ্ট্রের জন্য সন্ধিক্ষণ, যা পরবর্তী
শতাব্দীর বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ পাল্টে দিয়েছিল।
চার সেনাপতি নির্বাচন ও কৌশলগত পরিকল্পনা
আবু
বকর (রা.)-এর সামরিক প্রজ্ঞার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ছিল, শাম অভিযানের
জন্য একাধিক ফ্রন্ট উন্মুক্ত করে চারজন আলাদা ব্যক্তিকে সেনাপতি নির্বাচন
করা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শাম অঞ্চলটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে খুব
বৈচিত্র্যময়। এই বিশাল ভূখণ্ড জয় করতে হলে এমন নেতৃত্বের প্রয়োজন, যারা
রণকৌশলে দক্ষ হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতি ও ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কেও সম্যক
জ্ঞান রাখেন বা দ্রুত সময়ে তা অর্জন করতে পারবেন।
সেনাপতি নির্বাচনে খলিফার দৃষ্টিভঙ্গি
ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান
: ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) ছিলেন কুরাইশ বংশের প্রভাবশালী নেতা আবু
সুফিয়ানের জ্যেষ্ঠ পুত্র। মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করলেও তার একাগ্রতা ও
সামরিক নিষ্ঠা আবু বকর (রা.)-এর নজর কেড়েছিল। তাকে ইসলামের ইতিহাসে
‘ইয়াজিদ আলখায়র’ বা কল্যাণময় ইয়াজিদ বলা হয়। নবীজি (সা.)-এর যুগে তিনি
হুনাইনের যুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন এবং পুরস্কার হিসেবে ১০০ উট
পেয়েছিলেন।
শাম অভিযানের জন্য তাকে মনোনীত করার প্রধান কারণ ছিল,
তার পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতা। কুরাইশদের সঙ্গে
সিরিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে ইয়াজিদ সেখানকার ভূ-প্রকৃতি এবং গোত্রীয়
বিন্যাস সম্পর্কে জানতেন। তার ব্যক্তিত্ব ছিল গম্ভীর ও ধীরস্থির, যা
দামেশকের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত শহর দখলের অভিযানে অত্যন্ত প্রয়োজন
ছিল। আবু বকর (রা.) তাকে দামেস্ক ফ্রন্টের দায়িত্ব দেন।
শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ
: শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের সাহাবি।
তিনি হাবশায় দ্বিতীয় হিজরতের সময় দেশত্যাগ করেছিলেন এবং পরে নবীজি (সা.)-এর
ওহি লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্দাহ গোত্রের এই সন্তান ছিলেন
অত্যন্ত মেধাবী এবং সংযত। ধর্মদ্রোহ বিরোধী যুদ্ধে তিনি খালিদ (রা.)-এর
অধীনে ইয়ামামার যুদ্ধে অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন।
শুরাহবিলের
বিশেষত্ব ছিল, ধৈর্য, সংযত আচরণ ও সামরিক শৃঙ্খলাবোধ। জর্ডানের রুক্ষ ও
পাহাড়ি এলাকায় অভিযানের জন্য আবু বকর (রা.)-এর প্রথম পছন্দ ছিল দক্ষ
সেনাপতি।
আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ : আবু উবাইদা (রা.)-এর নাম
শুনলে মদিনার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে এক গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়। নবীজি
(সা.) তাকে ‘আমিনুল উম্মাহ’ উম্মতের বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত
করেছিলেন।
আবু উবাইদা ছিলেন খেলাফত রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ।
চারিত্রিক দৃঢ়তা, বিনয় এবং উচ্চ নৈতিকতা তাকে অন্য সেনাপতিদের চেয়ে আলাদা
মর্যাদা দিয়েছিল। আবু বকর (রা.) জানতেন, যদি কোনো কারণে চার বাহিনী সমবেত
হওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে আবু উবাইদার মতো একজন সর্বজনমান্য নেতাই হতে পারেন
তাদের প্রধান সমন্বয়ক। তাকে সিরিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চল হোমস অভিমুখে প্রেরণ
করা হয়।
আমর ইবনুল আস : আমর ইবনুল আস (রা.) ছিলেন সেই সময়ের
আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কূটনীতিবিদ। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি কুরাইশদের হয়ে
বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনে সফল হয়েছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর নবীজি (সা.) তাকে
‘জাতুস সালাসিল’ অভিযানে সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন, যেখানে আবু বকর
(রা.) এবং উমর (রা.)-এর মতো বড় বড় সাহাবি তার নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছিলেন।
আমরের
সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং প্রতিপক্ষের মনস্তত্ত্ব
বোঝার ক্ষমতা। ফিলিস্তিন মতো মাল্টিপল ফ্রন্ট ও অত্যন্ত কৌশলগত এবং
সংরক্ষিত এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য আমর ইবনুল আসের বিকল্প কেউ ছিল না।
শাম অভিযানে অংশ নেওয়া চার বাহিনীর সম্মিলিত সৈন্য সংখ্যা ছিল সাত থেকে আট হাজারের মধ্যে।

Friday, March 27, 2026
সিসিলি থেকে ইন্দোনেশিয়া: একই দিনে মুসলিম বিশ্বের নতুন মানচিত্র by মনযূরুল হক
এই দিনে একদিকে যেমন সিসিলির উপকূলে মুসলিম নৌবাহিনীর নোঙর ফেলার মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে এক নতুন যুগের সূচনা হয়, অন্যদিকে আধুনিক যুগে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম প্রধান দেশ ইন্দোনেশিয়া অর্জন করেছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা।
সিসিলি জয়ে এক ফকিহ্র নেতৃত্ব
২১২ হিজরির ৯ রমজান (৮২৭ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলামি সামরিক ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। এই দিনে উত্তর আফ্রিকার আগলাবি শাসনামলে সেনাপতি আসাদ ইবনে আল-ফুরাতের নেতৃত্বে মুসলিম নৌবাহিনী সিসিলি দ্বীপের ‘মাজারা’ উপকূলে অবতরণ করে। (ইবনে আসির, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৫/২০২, ১৯৮৭)
সেনাপতি আসাদ ইবনে আল-ফুরাত একই সঙ্গে ছিলেন একজন প্রখ্যাত ফকিহ্ ও বিচারক। ১০ হাজার পদাতিক এবং ৭০০ অশ্বারোহী নিয়ে পরিচালিত তার এই অভিযান প্রমাণ করে যে মুসলিম সভ্যতায় একজন আলেমও রণক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
এই বিজয়ের মাধ্যমে সিসিলিতে পরবর্তী আড়াইশ বছরের মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/২৬৫, ১৯৮৮)
মিসরের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও আইয়ুবিদের উত্থান
৫৫৯ হিজরির ৯ রমজান (১১৬৪ খ্রিষ্টাব্দ) কায়রোর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নাটকীয় মোড় পরিবর্তন ঘটে। ফাতেমি উজির শাওয়ার ও দিরগামের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই দিনে কায়রো শহর অবরোধ মুক্ত হয়। (ইমাম জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২০/৫২০, ১৯৮৫)
নুরুদ্দিন জেনকির নির্দেশে সেনাপতি শিরকুহ এই সংকটে হস্তক্ষেপ করেন। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই ঘটনাটিই মূলত মিসরে ফাতেমি শাসনের অবসান এবং সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবির উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল, যা পরবর্তীকালে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করতে প্রধান ভূমিকা পালন করে (সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃষ্ঠা: ৪২০, ২০০৪)
সুলতানি আজান ও কায়রোর স্থিতিশীলতা
৮২৫ হিজরির ৯ রমজান (১৪২২ খ্রিষ্টাব্দ) কায়রোর সুলতান হাসান মাদরাসায় এক দীর্ঘ বিরতির পর আবারও আজান ধ্বনিত হয়। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/১১০, ১৯৮৮)
মামলুক সুলতান ‘জহির তাতার’-এর শাসনামলে এই পদক্ষেপটি কেবল একটি ধর্মীয় ঘোষণা ছিল না, বরং এটি ছিল মামলুকদের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার পর মিশরের রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার একটি প্রতীকী ঘোষণা।
ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা
আধুনিক ইতিহাসের ৯ রমজান ১৩৬৪ হিজরি (১৭ আগস্ট ১৯৪৫) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এক নতুন ভোরের সূচনা হয়। এই দিনে নেতা সুকর্ন ও মোহাম্মদ হাতা ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
সাড়ে তিনশ বছরের ডাচ ঔপনিবেশিক শাসনের পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের সুযোগে ইন্দোনেশীয় নেতারা এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। রমজানের এক পবিত্র জুমাবারে এই স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশটিকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে দেয়।
ফিলিস্তিন ও আন্তর্জাতিক ব্যর্থতা
১৩৬৭ হিজরির ৯ রমজান (১৫ জুলাই ১৯৪৮) ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে এক বেদনাবিধুর স্মৃতির উদ্রেক করে। এই দিনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ফিলিস্তিনে যুদ্ধবিরতির জন্য ৫৪ নম্বর প্রস্তাব গ্রহণ করে।
প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবটি গৃহীত হলেও এটি ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও দখলদারিত্ব বন্ধে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই ব্যর্থতা ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী নাকবা বা বিপর্যয়ের পথ তৈরি করে দেয়।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2005)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...




-এর-বাজার-ব্যবস্থাপনা-2c4045.jpg)





