Friday, August 7, 2015

তুলা রাশি ও সম্মুখবর্তী কাঁসা by রাসেল আহমেদ

প্রচণ্ড গরম পড়েছে এ বছর। উঠোনে ভিড় করে দাঁড়ানো মানুষগুলো তিরতির করে ঘামছে, যার ফলে তাদের থমথমে মুখ আরও স্পষ্ট এবং প্রকটভাবে চোখে পড়ছে। একেকজনের মুখের অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছে তারা কতটা কৌতূহলী ও আগ্রহী। কিছু নিস্পৃহ এবং ভাবলেশহীন মুখও দেখা যাচ্ছে। আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু বিশু কবিরাজ। আজ তাঁর মাথায় শক্ত করে জড়ানো লাল কাপড়—ময়লা জমে জমে কালচে রং ধারণ করেছে। অর্থাৎ আজ এ বাড়িতে তিনি এসেছেন ওঝা হিসেবে। গ্রামের সবাই জানে, ঝাড়ফুঁক, তন্ত্র-মন্ত্রের কাজ হলেই তিনি মাথায় পট্টি বেঁধে আসেন। এই মুহূর্তে তাঁর চোখ গাঢ় লাল কেন—সে রহস্য ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। বিশু কবিরাজের সামনে তোফাজ্জল মাস্টারের বাড়ি থেকে আনা একটা কাঁসার বাটি। আগে প্রতি বাড়িতে এমন বাটি পাওয়া যেত। আজকাল দু-একটি বনেদি বাড়ি ছাড়া আর কাঁসার বাটি খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশু কবিরাজ কাঁসার বাটিটা সযত্নে নেড়েচেড়ে সামনে রাখলেন। উদ্যত ছুরির মতো সূর্যের আলোয় ঝিকঝিক করতে লাগল কাঁসা। মনে হচ্ছে যেন আহত কোনো বয়স্ক মোগল সম্রাটের ঢাল উল্টে পড়ে আছে। বিশু কবিরাজকে ডাব কেটে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছেন তিনি। অভিব্যক্তিতে তৃপ্তির একটা ছায়া। তাঁর চোখ কাঁসার বাটির দিকে। আশপাশে তীব্র নীরবতা প্রথমে ভাঙলেন তিনিই, ‘এই বাটিতে হইব না। পুরাতন বাটি লাগব। আর কোনো পুরাতন কাঁসার বাটি নাই? পুরাতন থাল হইলেও চলব।’ তোফাজ্জল মাস্টার বললেন, ‘আছে, আছে। পুরাতন কাঁসার বাটিই আছে। আনতেছি, খাড়ান।’ কাছেই কামাল দাঁড়িয়ে ছিল। সে এই মাস্টারবাড়ির ফাই-ফরমাশ খাটে। তাকে মায়ের ব্যবহার করা কাঁসার বাটিটা নিয়ে আসতে বললেন তোফাজ্জল মাস্টার। বাটি আনতে ছুটল কামাল।
সপ্তাহ খানেক পরে তোফাজ্জল মাস্টারের ছোট মেয়ের বিয়ে। ছেলেপক্ষের সবাই বিদেশে থাকে। বিয়েতে এখনো আসেনি, কিন্তু গয়না কেনার টাকা আগেই পাঠিয়েছে। কাল-পরশুর মধ্যে সবাই এসেও যাবে। এর মধ্যে ঘটল অঘটন। ছোট মেয়ে তিতলির তিন ভরি ওজনের সোনার নেকলেস চুরি গেল। বিয়ে উপলক্ষে অনেকেই আসছে-যাচ্ছে। আত্মীয়স্বজন আছে, তিতলির বান্ধবীরা আছে, তোফাজ্জলের দুই ছেলের বন্ধুরাও এসেছে কয়েকজন। হয়তো স্রেফ হারিয়েই গেছে, কিংবা এদের মধ্যে কেউ একজন সত্যিই নিয়েছে। কিন্তু কাকে ধরবেন তিনি? আলাদা করে কার ওপরেই বা সন্দেহ করা যায়? সবাই কাছের মানুষ। প্রায় সবাইকেই তিনি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করেন, গুটি কয়েককে বিশ্বাস করার ভান করতে হয়। শেষমেশ বিশু কবিরাজকে ডাকা হলো। পরিবার-প্রতিবেশী সবাই এই বুদ্ধি দিয়েছে। বিশেষ করে বৃদ্ধা মায়েরই চাপ বেশি। মা থানা-পুলিশ করতে রাজি নন। তোফাজ্জল মাস্টার নিজে ঝাড়ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাস করেন না। মায়ের চাপাচাপিতেই ওঝা আনায় মত দিয়েছেন তিনি। বিশু কবিরাজ বাটি চালান দেবেন। বাটি দৌড়ে গিয়ে উঠবে চোরের গায়ে। কিংবা চোরের ঘরে গিয়ে উঠবে। সোজা বের করে দেবে চুরি করা জিনিস। কবিরাজ পরিচয়ে খ্যাত হলেও বিশু বিশ্বাস এ গ্রামের প্রসিদ্ধ ওঝা। এমনকি গ্রামের আশপাশেও মাঝেমধ্যে তাঁর ডাক পড়ে। তন্ত্রমন্ত্রে মাস্টারসাহেবের পুরোপুরি অবিশ্বাস থাকলেও বিশুকে তিনি যে কারণে বিশ্বাস করেন তা হলো ওঝাগিরিতে বিশু কোনো ধরনের অর্থ নেয় না। গুরুর নাকি নিষেধ আছে। অবশ্য এটা তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধিও হতে পারে—ওঝা খ্যাতির কারণেই সম্ভবত তাঁর কবিরাজি ব্যবসা রমরমা। কামাল এক দৌড়ে কাঁসার বাটি নিয়ে এল। এসেই সরাসরি কবিরাজের হাতে তুলে না দিয়ে বাটিটাকে প্রথমে গলায় জড়ানো গামছা দিয়ে মুছল ভালোভাবে। তারপর সেটিকে যে ভঙ্গিতে সে বিশু কবিরাজের হাতে তুলে দিল, সেই ভঙ্গিই বলে দেয় কবিরাজকে কতটা সমীহ করে সে।
হাত বাড়িয়ে বাটির দিকে অল্পক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন কবিরাজ। তারপর যত্ন নিয়ে সেটিকে রাখলেন মাটিতে। এবার নিজের চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে আনলেন একবার। নারী-পুরুষ সবাই কেমন যেন ভয় পেয়ে জড়সড় হলো আরেকটু। লালচে চোখ মেলে বিশু কবিরাজ হাঁক দিলেন, ‘আপনেগো মইধ্যে তুলা রাশির জাতক কে আছেন? তুলা রাশি! কে আছেন? আমার কাছে আসেন। আছেন কেউ?...সিংহ রাশি হইলেও চলব। কে আছেন?’
কেউ সাহস করে এগিয়ে আসছে না।
আবার বিশু কবিরাজ হাঁক দিলেন, ‘কেউ নাই আপনেগো ভেতরে তুলা রাশির জাতক?...জাতিকাও নাই কেউ?’
হঠাৎ ভিড় ঠেলে যে যুবক বিশু কবিরাজের সামনে এসে দাঁড়াল, সে সুলতান। তাকে সামনে বসতে বললেন বিশু কবিরাজ। সুলতান বসল। কবিরাজ চোখ বন্ধ করে বাম হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী এক করে সুলতানের কপালে রাখল। আধমিনিট চোখ বন্ধ রেখে যখন তার দিকে তাকালেন, তখন তাঁর চোখ টকটকে লাল। প্রশ্নের ভঙ্গিতে প্রায় গর্জন করলেন, ‘তুলা রাশি?’
মাথা ঝাঁকাল সুলতান। কবিরাজ বললেন, ‘আপনে বাটির সামনে গিয়া বসেন। তারপর দুই হাতের মুঠা দিয়া বাটিটা শক্ত কইরা ধরবেন। চোউখ বন্ধ কইরা থাকবেন। বাটি নিজে নিজে নড়ার আগে চোউখ খুলবেন না।’ সুলতান হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়িয়ে কাঁসার বাটির সামনে বসল। তারপর দুহাতে শক্ত করে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার কপালে ঘাম জমে আছে বড় বড় ফোঁটায়।
২. জাহিদ এ গ্রামে এসেছে বছর দুয়েক হবে। সে এখানকার একমাত্র সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। ছাত্রদের প্রিয়। গ্রামবাসীও তাকে পছন্দ করে। তবুও তার বন্ধুসংখ্যা সীমিত। ঘনিষ্ঠ বলতে গেলে একমাত্র সুলতান। প্রয়োজনের খাতিরেই মানুষ এমন দু-একজন বন্ধুবান্ধব বানিয়ে নেয়, যাদের কাছে অকপটে সবকিছু বলা যায়—সুলতান তেমন বন্ধু। গল্প-কবিতাসহ বিচিত্র ধরনের বই পড়ার অভ্যাস জাহিদের। সুলতানেরও তা-ই। সম্ভবত দুজনের বন্ধুত্ব জমে ওঠার এটাই একমাত্র কারণ। শামুকভাঙা নদীর পাশে বড় বাজারটিতে সবচেয়ে চালু কাপড়ের দোকান সুলতানের। তার দুজন কর্মচারী আছে—তারাই দোকান চালায়। সুলতান মাঝেমধ্যে গিয়ে হিসাবপত্র দেখে। শহর থেকে বিএ পাস করে আবার গ্রামে ফিরে এসে এই ব্যবসা ধরেছে সে। কেবল মায়ের চাপাচাপিতে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামে আসা। মা তাকে ছাড়া থাকতে পারেন না, আবার স্বামীর ভিটে ছেড়ে শহরেও তিনি যাবেন না। শুধু কান্নাকাটি করেন। শেষমেশ বাধ্য হয়েই মানিয়ে নিয়েছে সে। ব্যবসাও জমিয়ে তুলেছে দারুণভাবে। যেখানেই থাকুক, প্রতিদিন বিকেলে দুজনের আড্ডা হয় শামুকভাঙার তীরে। পুরোনো স্মৃতিচারণা করে। শেয়ার করে নিজেদের সারা দিনের জমানো বিষাদ, বেদনা ও আনন্দের গল্প। এভাবেই কথায় কথায় জাহিদ একদিন হুট করে বলে বসে ফাহিমার কথা। ফাহিমাকে নিয়ে তার স্বপ্নের কথা, প্রেমের কথা, ‘বেতনটা আরেকটু বাড়ুক। সামান্য কিছু টাকা জমলেই দেখিস, একদিন আমরা বিয়ে করে ফেলব। ফাহিমার বাড়ি থেকে খুব চাপ দিচ্ছে।’ সব শুনে সুলতান খেপে যাওয়ার ভান করল। কপট রাগে চোখ কুঁচকাল। এবং অবশেষে নিখাদ আনন্দে অভিনন্দন জানাল বন্ধুকে। কিন্তু রাতে বাড়ি ফিরে সে অবাক হয়ে টের পেল, সত্যি সত্যি আনন্দ নয়, বরং তার শরীরে একধরনের জ্বলুনি হচ্ছে—ঈর্ষার জ্বলুনি। অহেতুক ঈর্ষায় সারা শরীর কাঁপতে লাগল তার। ফাহিমার সৌন্দর্য সাদামাটা ধরনের। আফসোস করার মতো শিক্ষিতও সে নয়। আর গ্রামে ফাহিমার বাবার প্রভাবও তেমন নয়। কিন্তু অকস্মাৎ এ কেমন অনুভূতি হলো তার? ফাহিমার প্রতি সামান্যতর দুর্বলতাও সুলতান এর আগে অনুভব করেনি। তবে জাহিদের ওপর হঠাৎ ঈর্ষা কেন জেগে উঠল? একধরনের অপরাধবোধে ভুগতে লাগল সে, কিন্তু ঈর্ষার তীব্র টানে সে অপরাধবোধ ভেসেই উঠতে পারল না; বরং গভীরে তলিয়ে যেতে লাগল। উল্টো ক্রমাগত আরও তীব্র হতে লাগল ঈর্ষা, বাড়তে লাগল জ্বলুনি। যেন তীব্র আক্রোশ নিয়ে শামুকভাঙা নদী তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল বেশির চেয়ে বেশি—অধিকতর অন্ধকার তলানিতে।
৩. ভিড়টা একটু বিস্তৃত হয়ে গেল আচমকা। সবাইই দেখেছে যে বাটিটা নড়ে উঠল। সুলতান চোখ খুলতেই কাঁসার বাটি তাকে নিয়ে রওনা দিল উত্তরে। ভিড়ের উত্তর দিক ফাঁকা হয়ে তাকে জায়গা করে দিতে লাগল। সবার চোখে তীব্র ভয় এবং বিস্ময়। দু-পায়েই চলছে সুলতান। তার ভঙ্গি অনেকটা ছোটখাটো গরিলার মতো—নুয়ে দু-হাতে বাটি ধরে আছে। বাটি এখন দক্ষিণ দিকে চলছে—মন্থর গতি। সুলতানের পেছনে পেছনে হাঁটছে বিশু কবিরাজ, তার পেছনে তোফাজ্জল মাস্টার, পেছনে অন্যরা। ধীরে ধীরে গতি বাড়ছে বাটির। দুমড়ে যাওয়া সবুজ ঘাস ধরে রাখছে একদল কৌতূহলী মানুষের স্মৃতিচিহ্ন। দক্ষিণে যেতে যেতে পুকুরের পাশ ঘেঁষে শামুকভাঙার দিকের রাস্তায় উঠল সুলতান। এবার পুবদিকে যে রাস্তাটি বাঁক নিয়েছে সেই রাস্তা ধরে ছুটতে লাগল...
একটা কুৎসিত প্ল্যান করেছে সুলতান। হ্যাঁ, জাহিদের বাড়িতে গিয়ে উঠবে সে। জাহিদকেই চোর সাব্যস্ত করবে। এতেই হয়তো তার তৃপ্তি মিলবে। হয়তো এটিই এই অসহ্য জ্বলুনির নিরাময়। এই মুহূর্তে এই যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া তার কাছে জরুরি। গতি বাড়িয়ে দিল সুলতান। পুবের রাস্তা ছেড়ে এবার বাগানের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সরু পথটা ধরল সে। মৃধাবাড়ির সাদামাটা ঘোয়ো কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করতে করতে ছুটে আসছিল তার দিকে, অন্যরা তাড়িয়ে দিল। দু-চারজন বড় বড় মাটির ঢেলা ছুড়ে মারল কুকুরের গায়ে। ফলে কেঁউ কেঁউ করতে করতে আবার মৃধাবাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল সে। ওই বাড়ি থেকে অনেকগুলো মুখ তখন তাকিয়ে আছে সুলতানের দিকে। মৃধাবাড়ি ছাড়িয়ে এসেছে অনেকক্ষণ। টপটপ করে ঘাম ঝরছে সুলতানের গা বেয়ে। সারা মুখের ঘাম নাক হয়ে পড়ছে বাটিতে। কপাল বেয়ে সামান্য ঘাম চোখে যেতেই ছ্যাঁৎ করে উঠল চোখ। জ্বলছে। বাটিতে ঘাম পড়ার সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না কে জানে, আচমকা যেন নিজেকে অদ্ভুতদর্শন একটি প্রাণী হিসেবে দেখতে পেল সুলতান—প্রাণীটি অন্য আরেকটি কুকুরের মতোই চার পায়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। অপরাধবোধ এবার যেন-বা বাতাস পেল; তলানি থেকে আবার ভেসে উঠল জলের ওপরে। ঈর্ষা পাতলা হয়ে আসছে। এবং তৎক্ষণাৎ নিজের প্রতি একধরনের ঘৃণা বোধ হতে লাগল সুলতানের। এ কী করছে সে? নিজের বন্ধুকে চোর সাজাচ্ছে! তা-ও এমন ভিত্তিহীনভাবে? জাহিদকে ঈর্ষা করার যৌক্তিক কারণই বা কী? ফাহিমার সঙ্গে তার মাখো-মাখো প্রেম কোনো দিন ছিল না, যেখানে অবাঞ্ছিত আগন্তুকের মতো ঢুকে পড়েছে জাহিদ। সামান্যতমও দুর্বলতা ছিল না ফাহিমার প্রতি। সম্পূর্ণ নিরপরাধ একটা মানুষের প্রতি অমূলক ঈর্ষায় এতখানি নিচে নেমে এল সে!
হঠাৎ জেগে ওঠা অপরাধবোধ সুলতানের পায়ে মাটির ঢেলা হয়ে পড়তে লাগল। নিজেকে তার মনে হতে লাগল মৃধাবাড়ির হাড়সর্বস্ব কুকুর। জাহিদের বাড়ি আর বেশি দূরে নয়। পেছনের ভিড় থেকে দু-চারজন জাহিদকে সন্দেহ করা শুরু করেছে। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, জাহিদ চোর। সে তোফাজ্জল মাস্টারের নাতি মামুনকে বাড়িতে গিয়ে পড়ায়। তার পক্ষে তো নেকলেস চুরি করা আসলেই সহজ। ছিঃ ছিঃ মাস্টারসাব চোর! সে কই এখন? স্কুলে? এই টাইমে স্কুলেই থাকার কথা। ছিঃ ছিঃ!
আচমকা সুলতান থমকে দাঁড়াল। সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ শোনা গেল শোরগোল। সুলতান ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অন্যদিকে মুখ ঘুরে গেছে তার। অন্য পথ নিচ্ছে। আর এ সময়ই অলৌকিক ব্যাপারটা ঘটল। জারুলগাছের দিকে মুখ ঘুরিয়েই সুলতান টের পেল, বাটি ঘুরছে না। থামছেও না। সে জাহিদের বাড়ির দিকেই যেতে চাইছে। শক্তি দিয়ে টান দিল সুলতান। বাটি নড়ছে না; বরং তার তুমুল আগ্রহ ও আকর্ষণ যেন জাহিদের বাড়ির দিকে। বাটিটা সুলতান শক্ত করে ধরল। বাটির ভেতর থেকেও অদৃশ্য কেউ যেন তাকে টানছে জাহিদের একলা দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটির দিকে। ওই তো, তাকালেই দেখা যাচ্ছে রোদে চকমক সার্কাসের তাঁবুর মতো বাড়ি। সুলতান বাটি ছেড়ে দিতে চাইল। নাহ, সে বাটি ছেড়েও দিতে পারছে না। অদৃশ্য জগতের কেউ যেন শক্ত করে চেপে ধরে আছে তার হাত। হ্যাঁচকা এক টানে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো তার, কোনোমতে ঠিক রাখল ভারসাম্য। টান বাড়ছে। দু-পা এগোতে বাধ্য হলো সে। রাবারের চটি জুতো খুলে গেল এক পাটি। অন্য পাটিও খুলে ফেলল সুলতান। যেভাবেই হোক, বাটি আটকাতে হবে তাকে। যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। কিন্তু জাহিদকে চোর প্রমাণ হতে দেবে না সে। ভাঙা শামুকে পা কেটে গেল তার। কাটুক। ফালি ফালি হয়ে যাক। তবু সামনে এগোবে না আর এক পা-ও। অন্য কোথাও ঘুরিয়ে নিতে হবে বাটি। কিন্তু নেবেই বা কোথায়! আটকে রাখতেই বা পারবে কি? সুলতান বাটিটার সঙ্গে যুদ্ধ করছে। তার কান বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল অদ্ভুত এ দৃশ্য।

ভারত–বিরোধিতা বনাম দেশপ্রেম by আসিফ নজরুল

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ভারত–বিরোধিতা’র ইতিহাস বহু পুরোনো। বাংলাদেশের জন্মের আগে ভারত–বিরোধিতার রাজনীতিতে কোনো না কোনো সময় সক্রিয় ছিলেন অনেক বরেণ্য নেতা। স্বাধীনতার পর ফারাক্কা মার্চের নায়ক মাওলানা ভাসানী এবং কিছু মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগের দলছুট একটি অংশের নেতৃত্বে গঠিত জাসদের রাজনীতির একটি বড় পরিচয় ছিল ভারত–বিরোধিতা। অনেকের মতে, এই ভারত–বিরোধিতা ছিল মূলত দেশের স্বার্থে, দেশের সম্পদ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার পক্ষে। তুলনায় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু ধর্মাশ্রয়ী দলের ভারত-বিরোধিতা ছিল সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত-বিরোধিতার এই দুটো ধারা আগেও ছিল, এখনো আছে। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির উত্থানের একটি বড় কারণ ছিল জাতীয়তাবাদী ও জাতীয় স্বার্থের চেতনায় বিভিন্ন ইস্যুতে ভারতের সমালোচনা করা। তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দলটির বাড়াবাড়ি ঘনিষ্ঠতা এবং সর্বশেষ ক্ষমতায় থাকাকালীন ভারতের অখণ্ডতা-বিরোধী কিছু অপতৎপরতার কারণে বিএনপির ‘ভারতবিরোধী’ রাজনীতি একসময় প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করে।
এ ধরনের বেপরোয়া ভারত-বিরোধিতার কঠিন মূল্যও দিতে হয় বিএনপিকে একসময়। জনগণের ব্যাপক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন রুখতে পারেনি তার একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হয় সেই নির্বাচনের পক্ষে ভারতের সক্রিয় সমর্থনকে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন এবং এর পক্ষে ভারতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বহু মানুষের কাছে এই বার্তা দেয় যে জনগণের সম্মতি শুধু নয়, ভারতের সম্মতিও এ দেশে ক্ষমতায় আরোহেণর বড় একটি শর্ত।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক সফরে ভারত-বিরোধিতার ‘কলঙ্ক’ মোচনে তড়িঘড়ি করে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিএনপি। অন্যদিকে ভারত সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতার কারণেই হয়তো দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলিতে সর্বোচ্চ উদারতা দেখাতে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের আগে রাজনীতির এই চিত্রটি নিজ জনগণের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দর-কষাকষির ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে হ্রাস করে।
২...
এমন এক সময়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আসেন অতু্যজ্জ্বল এক ইমেজ নিয়ে। এই সফরের মাত্র কয়েক দিন আগে ভারতের পার্লামেন্টে স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদিত হয়েছিল। এটির অনুমোদন নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা ছিল বাংলাদেশের। কারণ, ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিটি বাংলাদেশ তখনই অনুসমর্থন করে। ২০১১ সালে একটি প্রটোকলে (সংযুক্ত চুক্তি) অনিষ্পন্ন সীমান্ত, ছিটমহল ও অপদখলীয় জমিসংক্রান্ত আরও কিছু বিষয়ের মীমাংসার পর ভারত তা অনুমোদন করে চুক্তি স্বাক্ষরের দীর্ঘ ৪১ বছর পরে। এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক অর্জন আখ্যায়িত করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়।
বহু বিলম্বে অনুমোদিত হলেও স্থলসীমান্ত চুক্তির জন্য ভারত সরকারের প্রশংসা প্রাপ্য ছিল। মোদি সরকারকে অভিনন্দন জানানো তাই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল বিএনপির। কিন্তু বড় দল হিসেবে বিএনপির উচিত ছিল মোদির সফরের আগে বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের যৌক্তিক অবস্থান কী হওয়া উচিত তা–ও জনগণের কাছে তুলে ধরা। কিন্তু স্থলসীমান্ত চুক্তির উচ্ছ্বাসে প্রভাবিত হয়েই হয়তো বিএনপি তা না করে হাস্যকরভাবে ঘোষণা দেয় যে তারা কখনোই ভারতবিরোধী ছিল না, ভবিষ্যতেও তা হবে না। ভারতবিরোধী লেবেল না লাগাতে হঠাৎ করেই অতিসতর্ক হয়ে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনার কথা বলতে বিরত থাকে। একমাত্র বাম মোর্চা এসব ইস্যুতে একটি অবস্থান কর্মসূচি দিলে পুলিশ তা পণ্ড করে দেয়।
মোদির বাংলাদেশ সফর শেষ হয় প্রবল উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনার মধ্যে। কোনো বিশদ আলোচনা এমনকি আভাস-ইঙ্গিত ছাড়াই তাঁর এই দুই দিনের ঝটিকা সফরে বহু চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।।
৩...
ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ এই নিবন্ধে সম্ভব নয়। তবে শুধু দুই দেশের যৌথ নদীর পানি ব্যবহার প্রশ্নে কিছু আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের অপ্রাপ্তির বিষয়টি আঁচ করা সম্ভব। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি যৌথ নদীর মধ্যে একমাত্র গঙ্গা নদীর পানি ব্যবহারে দুই দেশ চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছিল ১৯৯৬ সালে।
ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান ও নেপালের যৌথ নদীর বিষয়ে চুক্তি আরও অনেক ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী। এই দুটো দেশের তুলনায় বাংলাদেশ নিম্ন অববাহিকার দেশ। চুক্তি ছাড়াই উচ্চ অববাহিকার দেশ ভারত একতরফাভাবে পানি ব্যবহার করতে থাকায় স্বাভাবিকভাবে এর অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ওপর। পানি প্রাপ্তির পরিমাণে অনিশ্চয়তার কারণে এমনকি বাংলাদেশের পক্ষে বাস্তবভিত্তিক পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাও অসম্ভব হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তাই যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে বাংলাদেশ বারবার ন্যূনতম পানি প্রাপ্তির নিশ্চয়তা চাইতে থাকে ভারতের কাছে।
তিস্তা নদী নিয়ে স্বাধীনতার পরপর আলোচনা শুরু হলেও ১৯৮৩ সালে প্রথম একটি সমঝোতা হয়। এই সমঝোতা অনুসারে তিস্তার পানির ৩৯ শতাংশ ভারত ও ৩৬ শতাংশ বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল। বাকি ২৫ শতাংশের কতটুকু বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত তিস্তার গতিপথকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন এবং এটি কীভাবে ভাগাভাগি হবে তা নিয়ে পরে আরও আলোচনার কথা ছিল। এই আলোচনা কখনো আর সুসম্পন্ন হয়নি। বারবার বাংলাদেশকে ক্রমান্বয়ে আরও কম পানি নিতে রাজি হতে বলা হয়েছে, বারবার সমঝোতার শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। অন্য নদীর পানি দূরের কথা, এক তিস্তার ক্ষেত্রেও এই চুক্তি এখনো হয়নি, যদিও ইতিমধ্যে তিস্তার আরও উজানে একতরফাভাবে ভারত নির্মাণ করে চলেছে একের পর এক পানি ব্যবহার প্রকল্প।
মনমোহন সিং-হাসিনার আমলে তিস্তার পানি দেওয়া হবে এমন আশাবাদের মধ্যে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের বহু প্রত্যাশা পূরণ করে দেওয়া হয়। ভারতের পণ্য আর চাকরিজীবীদের জন্য প্রায় একতরফাভাবে খুলে দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশের দুয়ার। চরম ঝুঁকি নিয়ে শেখ হাসিনার সরকার ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশের মাটিতে গ্রেপ্তার ও দমন করার অসাধারণ বন্ধুত্বের নিদর্শন দেখিয়েছিল।
ভারতকে প্রায় সর্বস্ব দিয়ে তখন কী পেয়েছিল বাংলাদেশ? পুরোনো কিছু দায়দায়িত্ব কিয়দংশে পালন (তিনবিঘা করিডর) কিংবা তা পুনরায় পালনে রাজি (নেপালে রেল ট্রানজিট) হয়েছিল ভারত। আর বাংলাদেশ দিয়েছিল যা দেওয়ার ছিল তার প্রায় সবই। বাকি ছিল এক ট্রানজিট। বলা হয়েছিল সেটি নাকি দেওয়া হবে না তিস্তা নদীর পানি ভাগাভাগি চুক্তি না হলে। তিস্তার পানি আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আমাদের অধিকার। ট্রানজিট পাওয়া ভারতের অধিকার নয়, প্রত্যাশা। তবু তিস্তার পানির অধিকার না পেয়েই কখনো কখনো ভারতকে সীমিতভাবে সড়ক ও নৌ ট্রানজিট দেওয়া হয়। সেও বিনা মাশুল এবং রুলস অব বিজনেস লঙ্ঘন করে।
মোদির এবারের সফরে তাই বাংলাদেশের বহুল প্রতীক্ষিত ন্যায্য কিছু প্রত্যাশা পূরণ করা হলে দুই দেশের সম্পর্ক ভারসাম্যমূলক হতো। কিন্তু এবারও তা হয়নি। তিস্তার পানি বণ্টনের কোনো সুরাহা না করে এবার ভারতকে তার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক চলাচল করিডর দেওয়া হয়েছে, মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়।
ভারতকে এই সফরে আরও বহু একতরফা সুবিধা দেওয়া হয়েছে অভিযোগ রয়েছে। যেমন: কোনো টেন্ডার ছাড়াই ভারতের রিলায়েন্স ও আদানিকে বিশাল মাপের বিদ্যুৎ প্রকল্প দেওয়ার জন্য সমঝোতা হয়েছে বিদ্যুৎ খাতের বিশেষ আইনের অপব্যাখ্যা করে। আমার কথা শুধু ট্রানজিট নিয়েই। আমরা জানি, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারত বাংলাদেশের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে সবচেয়ে বড় যে কারণে তা হচ্ছে ট্রানজিট। ফলে ভারতের কাছে বহু পাওনা ও প্রত্যাশা আদায়ে এটি আমাদের সবচেয়ে বড় দর-কষাকষির শক্তি। এসব পাওনা ও প্রত্যাশার প্রায় কোনো কিছু আদায় না করে ভারতকে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট, করিডর সুবিধা দেওয়ায় তাই দেশের স্বার্থ রক্ষা হয়নি।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে যাতায়াতের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকি রয়েছে বলেও বহু বিশেষজ্ঞ বলে থাকেন। বন্ধুত্বের খাতিরে এই ঝুঁকি নেওয়াও হয়তো অযৌক্তিক নয়। কিন্তু দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই বন্ধুত্ব অবশ্যই হতে হয় পারস্পরিক। শুধু একটি দেশ ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাসুবিধা গ্রহণ করলে আর অন্য দেশ বন্ধুত্বের আশ্বাস পেয়েই খুশি থাকলে তা কখনোই সত্যিকারের বন্ধুত্ব হতে পারে না।
৪...
নিজ দেশের স্বার্থের কথা বলা ভারত-বিরোধিতা নয়। ভারতের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার পাশাপাশি নিজ দেশের স্বার্থ রক্ষা করাও সত্যিকারের দেশপ্রেম। ক্ষমতায় থাকার নিশ্চয়তা পেয়ে বা অদূর ভবিষ্যতে এর আশা করে আমাদের বড় দুটো দল তা ভুলতে বসেছে বোধ হয়। দেশের বাম দলগুলোর একটি বড় অংশও ভারত-বিরোধিতা ফোবিয়ায় ভুগে নিজেদের দায়িত্ব ভুলতে বসেছে মনে হয়।
মোদির সফরে আমরা শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানিয়েছি, স্থলসীমান্ত চুক্তির জন্য তাঁকে অভিনন্দিত করেছি, ঠিক আছে। কিন্তু কেন আমাদের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বলতে ব্যর্থ হলো যে আমরা সীমান্তে বাংলাদেশের মানুষের হত্যাকাণ্ড বন্ধ চাই, পরিবেশবিনাশী রামপাল বা নদী সংযোগ প্রকল্পের অবসান চাই, যৌথ নদীর পানির ওপর আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই, ভারতের মানুষ যেমন সহজে এখানে ব্যবসা আর চাকরি করেন, বাংলাদেশের মানুষের জন্যও তেমন সুযোগ চাই, ভিসার নামে বিড়ম্বনা বন্ধ চাই, ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট দেওয়া হলে তার জন্য ন্যায্য অর্থনৈতিক সুবিধা চাই, ভারতের ভেতর দিয়েও অবাধে নেপাল, ভুটানসহ অন্যান্য দেশে যেতে চাই।
এসব বলা ভারত-বিরোধিতা নয়। বরং এসব না বলা হচ্ছে বাংলাদেশ-বিরোধিতা।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ক্ষত কাটিয়ে উঠেছে হিরোশিমা

হিরোশিমা : ‘লিটল বয়’ আর ‘ফ্যাট ম্যান’ দুটো বিস্ফোরণ। শেষ হয়ে গিয়েছিল কয়েক লাখ জীবন। ৭০ বছরের আগের সেই দিনটিকে স্মরণ করল জাপান। উদযাপিত হল ৭০তম হিরোশিমা দিবস। প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে পরমাণু বোমামুক্ত একটি বিশ্ব গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ সব বিশ্বনেতাকে পরমাণু অস্ত্রবিহীন পৃথিবী তৈরি করতে। সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে হিরোশিমা ‘পিস পার্ক’-এ দাঁড়িয়ে এক মিনিটের নীরবতা পালন করলেন জাপানবাসী। ১৯৪৫ সালের এ দিনটাতে ঠিক এই সময়ে, এই জায়গাতেই বোমাটি ফেলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকার তৈরি পরমাণু বোমা ‘লিটল বয়’ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম পরমাণু বোমা। বিস্ফোরণে মৃত্যু হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের। তিনদিন পর নাগাসাকিতে বিস্ফোরণ ঘটানো হয় আরও একটি পরমাণু বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’-এর। মৃত্যু ৭০ হাজার মানুষের।
এর পরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করে জাপান। ওই ঘটনার পরেও এই দুই বিস্ফোরণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবে জাপানে মৃত্যু হয় আরও ৪ লাখ মানুষের। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১০ মিনিটে হিরোশিমার আকাশে উড়ে এসে আমেরিকার বোমারু বিমান এনোলা গে হামলা চালায়। বোমাটি মাটি থেকে প্রায় ৬০০ মিটার উঁচুতে বিস্ফোরিত হয়। সেই অ্যাটম বোমার বিস্ফোরণের ক্ষত আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে হিরোশিমাবাসীকে। পরমাণু বোমার তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব কয়েক প্রজন্মজুড়ে দেখা যায়, যখন এ কারণে জন্ম নেয় বিকলাঙ্গ শিশু। এদিন আবে বলেন, ‘পরমাণু বোমার আঘাতে শুধু হাজারো মানুষের মৃত্যুই হয়নি, অবর্ণনীয় কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে লাখো মানুষকে। তবে হিরোশিমা আজ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই ক্ষত কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। আবারও জেগে উঠেছে হিরোশিমা। এটি এখন সংস্কৃতি ও সমৃদ্ধির শহরে পরিণত হয়েছে। তবে পরমাণু বোমা হামলার ৭০ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আমি বিশ্বশান্তির গুরুত্ব আবারও উল্লেখ করছি।’ তিনি আরও বলেন, পরমাণু অস্ত্রমুক্ত একটি বিশ্ব গড়তে আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাব। আনবিক বোমার শিকার একমাত্র দেশ হিসেবে পরমাণু অস্ত্র দূরীকরণের ক্ষেত্রে জাপান অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। এদিন তারা শান্তি কামনায় শান্তির বার্তা লেখা কাগজ উড়িয়ে দেন।

‘ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল অতীত ফেরাতে চেষ্টা করবো’ -জাকির হোসাইন by ফররুখ মাহমুদ

ছাত্রসমাজের অধিকার রক্ষায় কাজ করার প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছেন ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসাইন। তিনি বলেছেন, ছাত্রসমাজের কল্যাণ ও অধিকার রক্ষাই অতীতে ছাত্ররাজনীতির প্রধান ব্রত ছিল। ক্ষেত্রবিশেষে এর ব্যত্যয় হলেও ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্ব ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল অতীত ফিরে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। তিনি জানিয়েছেন, শিক্ষাই একটি জাতির এগিয়ে যাওয়ার বড় শক্তি। শিক্ষার উৎকর্ষ সাধন ও জ্ঞানমুখী ছাত্ররাজনীতির প্রতি ছাত্রসমাজকে প্রলুব্ধ করাই হবে নতুন নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ। মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এমন প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছেন জাকির হোসাইন
জাকির হোসাইনের গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের গোয়ালবাড়ী গ্রামে। ছাত্রলীগের ২৮তম কেন্দ্রীয় সম্মেলনে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে সর্বোচ্চ ২৬৭৫ ভোট পেয়ে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। বাবা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ আবদুল জলিল ও মা আমেনা বেগমের ৫ ছেলে ও ৪ মেয়ের মধ্যে জাকির অষ্টম। স্থানীয় গোয়ালবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া শেষ করে হাজী ইমজাদ আলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৭ম শ্রেণী পাস করেন তিনি। পরে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে ভর্তি হন রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে। উচ্চ মাধ্যমিকেও জিপিএ-৫ পেয়ে দেশসেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ২০০৭-২০০৮ সেশনে ভর্তি হন। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে ছাত্রলীগের ভূমিকা কি হবে- জানতে চাইলে ছাত্রলীগ সম্পাদক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে বই-খাতা তুলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, নিয়মিত ছাত্ররাই ছাত্ররাজনীতি করবে। তারই ধারাবাহিকতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে ছাত্রলীগ অতীতের মতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলে জানান তিনি। বলেন, গত এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দেশব্যাপী ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি পালন করেছিলেন। তখনও ছাত্রলীগ পরীক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছিল এবং শিক্ষার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করেছিল। এই সরকারের আমলে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ছাত্রলীগ নামধারী কিছু অনুপ্রবেশকারী এসব ঘটনা ঘটিয়ে থাকে। ছাত্রলীগ থেকে এসব অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়ে ওঠা এই ছাত্রনেতা বলেন, মাধ্যমিকে থাকাবস্থায়ই ছাত্রলীগের মাধ্যমেই ছাত্ররাজনীতিতে নাম লেখাই। ৯ম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় তৎকালীন থানা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক সেলিম উদ্দিনের কাছে সদস্য ফরম পূরণ করি। সেখান থেকেই শুরু। কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধের কারণে সক্রিয় হতে না পারলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেই বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেই। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় ১/১১ সরকারের দুঃশাসন থেকে মুক্তির জন্য আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ ঘোষিত সকল কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূত অংশগ্রহণ করি। সেই সময় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার মুক্তি, তৎকালীন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের মুক্তির আন্দোলন এবং ৯ম সংসদ নির্বাচনে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলাম। সর্বশেষ ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সাঈদ খোকনের পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য কয়েকটি ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করি। ২০০৯ সালে ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী থাকাবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল কমিটিতে সদস্য পদ পাই। যা ছিল আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। সেসময় হল কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বর্তমান কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ। পরবর্তীকালে ২০১২ সালে সদ্য বিদায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক হই। পারিবারিকভাবে রাজনীতিতে আসার প্রেরণা পান বলে জানান সিলেট অঞ্চল থেকে উঠে আসা এই ছাত্রনেতা।
বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে ছাত্রলীগের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া যায়, সে অবস্থা থেকে ছাত্রলীগকে বের করে আনতে হলে তার ভূমিকা কি হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছাত্রলীগ দেশের সর্ববৃহৎ ছাত্রসংগঠন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া এই সংগঠন কোন চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে বিশ্বাস করে না। তাই এ সংগঠনে কোন চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজের স্থান হতে পারে না। এরকম কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ পেলে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এসময় তিনি ছাত্রলীগসহ প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়ার অনুরোধ করেন।  একটি ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) এর নির্বাচনের বিষয়ে ছাত্রলীগ সম্পাদক জাকির হোসাইন বলেন, ছাত্রলীগ সবসময় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং ছাত্রদের ন্যায্য অধিকারের কথা বলে। তাই আমরাও ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে অবিলম্বে ডাকসু নির্বাচন চাই।
মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান জাকির হোসাইনের দুই চাচাও ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। বড় চাচা হাজী উস্তার আলী ও ছোট চাচা আবদুল কাইয়ুম। বড় চাচার স্ত্রীর ভাইয়ের ছেলে শাহবুদ্দিন লেমন গোঁয়ালবাড়ী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যান। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন জাকির। এরপর দেশব্যাপী হেফাজতে ইসলামের তাণ্ডবলীলা, বিএনপির ডাকা টানা অবরোধ-হরতালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন তিনি।

এক ভয়ার্ত সাঁওতালপল্লি থেকে বলছি... by ফারুক ওয়াসিফ

অনি​শ্চয়তার মুখে এ রকমই থতমত সমতলের আদিবাসীরা
মেয়েটির নাম অনীতা—অনীতা হেমব্রম। বাড়ির দাওয়ার মাটির থামের আড়াল থেকে লজ্জায় মুখ বের করতেই পারছিল না। তাদের উঠানের গাছের ডালিম সবুজাভ হলুদ, দেয়ালে আলপনা আঁকা; কেমন এক শান্তি শান্তি পরিবেশ। অনীতার প্রিয় তৃষ্ণার্ত কাকের গল্প, প্রিয় কবিতার নাম ‘শোভা’, প্রিয় গান ‘আমার সোনার বাংলা’। অথচ সোনার বাংলার বাঙালিরাই তাদের বিপদের সর্বনাম।
সবার চোখের জলই সমান নোনা, সবার রক্তই সমান লাল। কিন্তু তা হয়তো নয়। উত্তরবঙ্গের পার্বতীপুরের গহিন মেঠোপথের মাথায় যে গ্রামটির নাম চিড়াকুটা, সেখানকার মানুষের সবই কম। তাদের জমি কম, রক্ত কম লাল, চোখের পানি কম নোনা, অত্যাচার-নির্যাতনও যেন তাদের গা-সওয়া। কমই যদি না হবে, তাহলে এত সহ্য করে কীভাবে? বাঙালির পক্ষে বাঙালি, মুসলমানের ডাক আরেক মুসলমানে শোনে, হিন্দু ও খ্রিষ্টানদেরও সহায়-শক্তি আছে এ দেশে—কিন্তু আদিবাসী সাঁওতালদের কিছুই নেই। চিড়াকুটার সাঁওতাল উচ্ছেদ হলে শিমুলজুড়ির সাঁওতালেরা তাদের আশ্রয় দিতে ভয় পায়। এত ‘নেই’-এর মধ্যেও খুব করে ‘আছে’ তাদের গায়ের রং, চেহারার ধাঁচ আর সাঁওতালি ভাষার বুলি। এই থাকাতেই মস্ত বিপদ। হোটেল-রেস্তোরাঁয় তাদের পাতে কেউ খায় না। তাদের কোনো যুবকের স্বজাতির বাইরের কাউকে ভালোবাসা মানে মৃত্যু ডেকে আনা। তাদের মর্যাদা ও সম্পত্তি দুটোই যেন লুটপাটের বিষয়।
এ বছরের ২৪ জানুয়ারির ঘটনা। সকালবেলা চিড়াকুটার কৃষকেরা তাঁদের জমিতে গিয়ে দেখেন, পাশের গ্রামের জনৈক জিয়ারুল-জহুরুল ভ্রাতৃদ্বয় লোকজন নিয়ে হাল চষা শুরু করেছেন। বাধা দিলে তাঁদের একজন পিস্তল বের করেন। সাঁওতালি রক্তে সুপ্ত হুলের স্মৃতি জেগে ওঠে। সাঁওতালি তিরে এক বাঙালির প্রাণ যায়। যথারীতি পুলিশ এসে ২৩ সাঁওতালকে আটক করে। পুলিশ যাওয়ামাত্রই চারপাশের হাজার হাজার বাঙালি মুসলমান নামধারী হামলাকারী ‘পিঁপড়ার মতো আসি’ ঘরদোর লুট করে, বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, ছিনিয়ে নেয় গবাদিপশুসহ অস্থাবর সব সম্পদ। তারপরও অটুট তাদের অপার্থিব সরলতা, সাঁওতালি ঐক্য আর আধুনিক হাহাকার।
এর প্রায় পাঁচ মাস পর ১ জুলাই চিড়াকুটায় গিয়ে পেলাম মধ্যবয়সী চ্যালচিউস হেমব্রমকে। কথা বলতে বলতে উত্তেজনায় তড়পাচ্ছিলেন। বলছিলেন ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের বীর নেতা সিধো-কানো-চাঁদ-ভৈরব ভাই ও তাঁদের ফুলমণি বোনের কথা। কিন্তু যেই বললাম, ‘আপনারা তো সংখ্যায় কম, পারবেন কী করে?’ বাতাস–হারা পতাকা যেমন মিইয়ে পড়ে, লোকটার গলার স্বরও তেমনি নেমে যায়: ‘ওদিকে ভারত এদিকে বাংলাদেশ, কী করব, কোথায় যাব? সংখ্যায় তো আমরা কম! আমারও মারবা ইচ্ছা করে, কিন্তু পারি না!’
পার্বতীপুর থেকে রওনা দিলে মোটরসাইকেলে দুই ঘণ্টার পথ চিড়াকুটা। পথের মধ্যে অবিরত সবুজের সমারোহ, বৃষ্টিভেজা খেতগুলো ধান রোপার জন্য প্রস্তুত। মাটির বা পাকা রাস্তার ওপর ধানের খড় আর ভুট্টা শুকাতে দেওয়া। বৃষ্টিজমা খেতে বা খালে বাচ্চা-বুড়ো মাছ ধরছে। কোথাও কোনো বিপর্যয়ের চিহ্ন নেই। শুধু চিড়াকুটা গ্রামের জমিগুলো ফাঁকা, চাষবাস বন্ধ। পুরো গ্রামে সরকারি স্কুলঘরে পুলিশ ক্যাম্প। আরও এগোলে সাঁওতালপল্লির মাটির ঘরবাড়ি। পাঁচ মাস আগের আগুনের দাগ এখনো এদিকে-ওদিকে। কয়েকটি অঙ্গার হওয়া গাছ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভাঙাচোরা টিনের বেড়া, চালহীন কিছু ঘর সাক্ষ্য দিচ্ছে, পাঁচ মাসেও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। সেদিনের পর এলিজাবেথ টুডুর রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে সেদিনের হামলার স্মৃতি।
মধ্যবয়সী বিমলা মুর্মুর চোখে এখনো ভাসে সেই সব দৃশ্য: ‘হিসাব ছাড়া লোক আসছে সেদিন আমার ঘরে। আমার দুই ড্রাম চাল, টিভি, সাইকেল, সেলাই মেশিন, হাঁড়িকুড়ি, জামা-কাপড়—সব নিয়ে গেছে।’ গ্রামের মধ্যে এটিই সবচেয়ে অবস্থাপন্ন বাড়ি। গ্রামের একমাত্র টেলিভিশনটাও তাদেরই ছিল। বিমলার দুঃখ, ‘সেলাই মেশিন আমার জান, সেটাও নিয়ে গেল! তারা আমার পায়ে বাড়ি দিল, গলায় টিপে ধরে কোমরে হাত দিয়ে মোবাইল নিতে গেল। আমি দৌড় দিলাম—এত পুরুষ আমার পেছনে। কেউ বলতেছে ম্যারা ফেল। তখন লালমাটি গ্রামের মোস্তফা চৌকিদার আমারে বাঁচাইল! কিন্তু মোবাইল আর পাইলাম না।’
৬৫ বছরের বৃদ্ধ লক্ষণ টুডুর হাহাকার লুট হওয়া পোয়াতি গরুটার জন্য। ‘এত দিনে গরুটা মনে হয় বিয়াইছে’ বলে হাতের লাঠি দিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি করতে থাকেন। মেসেস টুডুর বিমারি স্বামী জেলখানায়, বাড়িটা মাটির সঙ্গে মেশানো, ওর মধ্যেই ছিল তাঁর খাসি বিক্রির ১০ হাজার টাকা—তা–ও পুড়েছে। ওদের ধারণা, এখন যারা গ্রাম পাহারা দিচ্ছে তারা তাদের পুলিশ, আর যারা গ্রামবাসীদের ধরে নিয়ে গেছে তারা ‘ওদের পুলিশ’। ওদের ধারণা, ‘বঙ্গবন্ধু দেশের ব্যাপার আর সিধো-কানো সংস্কৃতির ব্যাপার।’ ওদের ধারণা, ‘যা বলব সত্যই বলব, মিথ্যা বলব কেন?’ ওদের ধারণা, বউ পেটানো ছাড়া আর কোনো অপরাধ তারা করে না। ওরা মনে করে, সাঁওতালদের মধ্যে কানা-খোঁড়া, চোর-ডাকাত-ভিখারি কিছু নাই। ওদের ধারণা, মারামারি-লুটপাট করলে ‘নিজের জাতের ওপরই ঘিন্না লাগবে!’ ওদের বিশ্বাস, ‘আমরা জয় পাব, কারণ সরেজমিনে লড়াই করছি, আর ওরা তো ভূমিদস্যু।’
অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঁওতালেরা পাকিস্তানি মিলিটারি হটিয়ে রংপুরকে অল্প সময়ের জন্য স্বাধীন করেছিল। কিছুদিন আগেও গ্রামে ফুটবল খেলা হলে সাঁওতাল-বাঙালি মিলেমিশে ‘লাফাত’। জাত নিয়ে ছি ছি করত না! কিন্তু মাঝখানে চলে এসেছে ভূমি। সেই ইংরেজ আমল থেকে জমির অধিকার, অরণ্যের অধিকার, মর্যাদার অধিকার বাঁচাতে সাঁওতালেরা লড়ে যাচ্ছে।
দুই...
আগের দিন ছিল ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬০তম বছরপূর্তি। এ উপলক্ষে দিনাজপুর শহরে জমায়েত হয়েছিল কয়েক হাজার সাঁওতাল নারী-পুরুষ-শিশু। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে বাসে করে, ভটভটিতে চড়ে তারা এসেছে রোদে পুড়তে পুড়তে। এর আয়োজন করে আদিবাসী পরিষদ ও দিনাজপুরের নাগরিক সমাজ। তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। সবার দাবি, সমতলের আদিবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন হোক। সেখানে যতজনের সঙ্গে কথা বলেছি, অধিকাংশেরই জমি নিয়ে হয় সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, নয়তো এলাকার প্রভাবশালী বাঙালিদের সঙ্গে বিরোধ চলছে। কোথাও সরকারের বন বিভাগ তাদের জমিকে বনাঞ্চল ঘোষণা করে দখলে নিচ্ছে। দিনাজপুরের হাজী দানেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পাটকলসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই সাঁওতালদের জমির ওপর নির্মিত।
এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী তাঁদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দাবি করলেন, ৮০ শতাংশ সাঁওতালি জমি নিয়েই গন্ডগোল চলছে। চিড়াকুটার যে ৪৩ একর ৩৩ শতক জমি নিয়ে বিবাদ, তার ১৯ একর ১৭ শতক জমিতে অনাদিকাল থেকে সাঁওতালেরাই চাষবাস করছিল। কিন্তু বিষয়বুদ্ধি নেই বলে, আর শিক্ষা-দীক্ষার অভাবে এসব জমির দলিল-রেকর্ড তারা করে উঠতে পারেনি। আর পারলেই-বা কী, ভূমি দপ্তর, সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে নকল দলিলের ভিত্তিতে সেই সব জমি কেড়ে নেওয়া খুবই সহজ। আমেরিকায় একসময় স্বর্ণ শিকারিরা গোল্ড রাশের জন্ম দিয়েছিল, বাংলাদেশে এখন চলছে ভূমিদস্যুদের ল্যান্ড রাশ তথা ভূমিগ্রাসের ছিনিমিনি খেলা। এই খেলায় সাঁওতাল-আদিবাসীসহ প্রান্তিক হিন্দু-মুসলমান বাঙালির জেতার সম্ভাবনা খুবই কম।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা নিরসনে একটা ভূমি কমিশন সরকার গঠন করেছে। অনুরূপ কমিশন সাঁওতালদেরও দাবি। এর জন্য আইন লাগবে, লাগবে ভূমি প্রশাসনের দুর্নীতি বন্ধ করা। কিন্তু কে করবে?
তিন...
দিনাজপুর থেকে পার্বতীপুরে যাওয়ার পথে এক স্কুলের মাঠে দুজন মানুষকে ঘুরে ঘুরে ঢোল আর মাদল বাজাতে দেখে থামি। মাঠের প্রান্তে সাদা কাপড়ের প্যান্ডেলে প্রমাণ আকারের দুই যোদ্ধামূর্তি। হাতে তির-ধনুক আর পুরু গোঁফ দেখে চিনতে পারি, সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের পথপ্রদর্শক সিধো ও কানোর মূর্তি। পাশেই আদিবাসী কমিউনিটি সেন্টার। সেখানকার মণ্ডপে প্রতি সন্ধ্যায় বাতি দেওয়া হয়, ঢোল-মাদলের নাচে আর পুষ্পে সাঁওতালদের জাতীয় বীরদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। মাঠের দুই পাশে বালক ও বালিকাদের জন্য আলাদা দুটি বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় ও কমিউনিটি সেন্টারের এত জমি কোথা থেকে এল? জটলার ভেতর থেকে জবাব দিলেন হাড্ডিসার প্রৌঢ় একজন। হাসতে হাসতে বুকে হাত দিয়ে বললেন, ‘আমি দিসি।’
অবাক চোখে লুঙ্গি-শার্ট পরা ছোটখাটো মানুষটার ফোকলা মুখটায় তাকিয়ে থাকি।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, ঢোল-মাদল নিয়ে ওরা উঠে দাঁড়াল। কোথায় যায়? বলে, নসিপুরে এক বাড়িতে বিয়া। সেখানে বাজনা বাজাব, নাচব। আর কী করব?
হারিয়ে ফেলার আগেই এই আদিবাসী দাতা হাতেম তাইয়ের নাম জানতে চাইলাম। আকাশি রঙের শার্টের বুক পকেটের কাছটায় আবারও হাত দিয়ে মানুষটা উত্তর করে, ‘আমার দাদা ডুলু মুর্মু, বাবা মঙ্গল মুর্মু আর আমি নরেশ মুর্মু। এই সব জমি আমাদের দান।’
এখন কত জমি আছে আপনার?
চলে যাওয়ার আগে অবলীলায় হা হা হা হেসে লোকটা বলে, ‘কিসসু নাই।’
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

স্বপ্ন দেখতে হবে বড়, নিজের জন্য নয়, সবার জন্য -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: কৈলাস সত্যার্থী by কামাল আহমেদ

আজ আন্তর্জাতিক শিশুশ্রমবিরোধী দিবস। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলওর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে শিশু শ্রমিক রয়েছে প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ, যার প্রায় অর্ধেকই রয়েছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায়। সম্প্রতি ঢাকায় এসেছিলেন ২০১৪ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী কৈলাস সত্যার্থী। পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি এ পুরস্কার পান। ভারতে দাসত্বমূলক শিশুশ্রমের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে সংগ্রাম পরিচালনার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি এ পুরস্কার পান। ঢাকায় অবস্থানকালে তাঁর মুখোমুখি হয় প্রথম আলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর পরামর্শক সম্পাদক কামাল আহমেদ
প্রথম আলো : আপনি ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুশ্রম পুরোপুরিভাবে দূর করার লক্ষ্য ঠিক করার জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে, ২০০০ সালে বিশ্বনেতারা যখন সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজি ঠিক করেছিলেন, তখন শিশুদের উন্নয়নে বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের পরও দেখা গেছে যে গত ১৫ বছরে মাত্র ৩৩ শতাংশ শিশুকে শ্রমনির্ভরতা থেকে মুক্ত করা গেছে। তাহলে আগামী ১৫ বছরে কীভাবে এত বড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে?
কৈলাস সত্যার্থী : দেখুন, আমি বারবারই বলে আসছি যে শিশুকে প্রথমে শিশু হিসেবে বেড়ে ওঠার অধিকারটি দিতে হবে। এটা ঠিক যে আমরা তা দিতে পারিনি। প্রতিটি শিশুর শিশুর মতো বাঁচার অধিকার রয়েছে, তার হাসার অধিকার, খেলার অধিকার। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে শিক্ষার অধিকার। কোটি কোটি শিশুকে আমরা সেটা দিতে পারিনি। এক দিক দিয়ে এটা একটা অগ্রগতি যে এখন আমরা সামনে এগোনোর কথা বলছি—টেকসই উন্নয়নের কর্মসূচি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস— এসডিজি) চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে শিশুশ্রমের অবসান ঘটিয়ে শতভাগ শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলছি। এটা অবশ্যই সম্ভব। কেন এটাকে আমি সম্ভব বলছি? তার কারণ হলো ১৯৮৯ সালে যখন আমি দাসত্বমূলক শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করি, তখন কিন্তু কেউ বিশ্বাস করতে চাননি যে এটা সম্ভব। তখন বিষয়টি কোনো ইস্যু ছিল না। সেই কাজটি শুরুর সময়ে যতটা অসাধ্য মনে হয়েছিল পরে কিন্তু ততটা থাকেনি। অনেকটাই এগোনো গেছে। কুড়ি বছর আগে বিশ্বে ২৬ কোটি শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করত, যা এখন কমেছে ৩৩ শতাংশের বেশি। আবার স্কুলে যেতে পারত না এমন শিশুর সংখ্যা ছিল ২৩ কোটি, এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
প্রথম আলো : শিশুশ্রম অবসানে অগ্রগতি হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আমাদের অঞ্চল—ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল তথা দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো কোটি কোটি শিশুকে কাজ করতে হচ্ছে অর্থনৈতিক কারণে।
কৈলাস সত্যার্থী : আমি এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নই। অগ্রগতি হয়েছে, যদিও অনেকে (মিলিয়নস) এখনো শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে। শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কমছে, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশুর সংখ্যা কমছে। অবস্থা বদলাচ্ছে। ভোক্তারা সচেতন হচ্ছে এবং তারা দেখতে চায় যে তারা যে পণ্য কিনছে তা তৈরিতে শিশুশ্রম ব্যবহৃত হয়নি। তবে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা বা পণ্য বয়কটের মতো পদক্ষেপের বদলে আমি এমন একটি সমাধানের চেষ্টা করছি, যা হবে অংশীদারিমূলক। আমরা যদি শুধু বলি যে শিশুশ্রম খারাপ, শিশুশ্রমের পণ্য বয়কট করুন, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না। শিশুর পরিবার বা তার বাবা-মায়ের জন্য এ ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। শিশুর বদলে সেখানে তাদের বাবা-মায়ের বা অভিভাবকের চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। কর্মক্ষম বাবা-মাকে কাজ না দিয়ে তাঁদের বাচ্চাদের দিয়ে কাজ করানো কোনো নীতি হতে পারে না। সে জন্য যেসব শিল্পে তাদের নিয়োগ করা হয়, সেখানে বিষয়টি বদলানো প্রয়োজন।
প্রথম আলো : শিশুশ্রম অবসানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? ভোটের হিসাব-নিকাশে শিশু অধিকারের বিষয়টি কি সব সময় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে না?
কৈলাস সত্যার্থী : রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অবশ্যই এ ক্ষেত্রে ভূমিকা নিতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাধারণত বর্তমান নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকেন। কিন্তু এখানে ভবিষ্যতের প্রশ্ন জড়িত। সুতরাং, তাঁদের এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্বে এখনো ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত। এদের মধ্যে সাড়ে আট কোটি আছে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে, যেটাকে আমরা বলি সবচেয়ে খারাপ শিশুশ্রম। আমরা আমাদের নিজেদের বাচ্চাদের কথা ভাবার সময় ভাবি যে তারা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু গরিব মানুষের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ভাবি ওরা কষ্ট করতে করতে ঠিক হয়ে যাবে। এই দ্বৈত মানসিকতা বদলাতে হবে।
প্রথম আলো : শিশু অধিকারের পক্ষে ভূমিকা রাখার জন্য আপনার নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তি কি রাজনীতিকদের ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলেছে?
কৈলাস সত্যার্থী : অবশ্যই। এখন অনেক ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সরকারগুলো—বিশ্বের নানা প্রান্তে সরকারগুলোর মধ্যে বেশ আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। আমার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি মাত্র কয়েক মাসের ঘটনা। কিন্তু ইতিমধ্যেই অনেক সরকারপ্রধানের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ অনেক দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী টেকসই উন্নয়নসূচিতে শিশু অধিকারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছেন।
প্রথম আলো : এই উপমহাদেশে ভারত এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কি শিশু অধিকারের প্রসার ঘটানোর পথে কিছুটা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
কৈলাস সত্যার্থী : আমি রাজনৈতিকভাবে কখনোই কোনো উদ্যোগ নিইনি এবং কখনো রাজনৈতিকভাবে চেষ্টা করব না। তবে আমি বিশ্বাস করি মানুষে-মানুষে সৌহার্দ্য থাকলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। ভারতে আমি শুরু করেছিলাম ১৯৮১-তে এবং তার পরে আমি পাকিস্তানেও গিয়েছি, যেখানে কাজ করাটা ছিল কঠিন। তারপর আমি বাংলাদেশেও কাজ করেছি। আমি কুড়ি বছর ধরেই বাংলাদেশে আসছি এবং মূলত প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কাজ করছি। বাংলাদেশে তো অনেক অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলে-মেয়ের সংখ্যাসাম্য এসেছে ২০০৫ সালে। এখন মাধ্যমিকেও এসেছে। শতভাগ শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ছাড়া টেকসই উন্নয়নের কথা ভাবা যায় না। এখন সেদিকেই এগোতে হবে।
প্রথম আলো : শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে আপনাকে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমদাসত্ব থেকে মুক্ত করার চেষ্টায় আপনি শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত হয়েছেন। এ রকম কঠিন কোনো অভিজ্ঞতার কথা কি আমাদের পাঠকদের জন্য বলতে পারেন?
কৈলাস সত্যার্থী : বেশ কয়েকবারই এ রকম ঝুঁকির মুখে পড়েছি। এর মধ্যে দিল্লিতে সার্কাস থেকে কয়েকজনকে উদ্ধারের একটি ঘটনা ছিল খুবই গুরুতর। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের কিছু মেয়ের অভিভাবকেরা এসেছিলেন তাঁদের বাচ্চাদের উদ্ধার করা যায় কি না, সে জন্য আমাদের সাহায্য চাইতে। সেখানে নেপালের কিছু মেয়েশিশুও ছিল। আমরা যখন সেই সার্কাস থেকে ওই সব বাচ্চাকে উদ্ধারের জন্য গিয়েছিলাম, তখন সেখানে পুলিশও উপস্থিত ছিল। ছিলেন একজন ক্যামেরাম্যানও। যখন আমরা কথা বলছিলাম, তখন তিনি ছবি তুলছিলেন। সার্কাসের মালিক ও তাঁর লোকজন প্রথমে সেই ক্যামেরাম্যানের ওপর চড়াও হয়। এরপর তারা আমাদের ওপর হামলা চালায়।
প্রথম আলো : পুলিশ কিছু করল না?
কৈলাস সত্যার্থী : পুলিশ তো তাদের সাহায্য করছিল। তারা যখন আমার ওপর চড়াও হয়, তখন আমার ছেলে আমাকে রক্ষার চেষ্টা করলে তারা তাকেও পিটিয়ে রক্তাক্ত করে ফেলে। আমাদের আহত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে পথচারীরা আমাদের হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওই দিন আমরা ওই সব বাচ্চাকে উদ্ধার করতে পারিনি। সেদিন আমরা একটি মেয়েকে কোনোমতে গাড়িতে তুলে নিতে পেরেছিলাম। সেই মেয়েটির মা পরে আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত ওই সার্কাস কোম্পানিতে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন এবং সেখানে ২৫টি মেয়েকে পাওয়া যায়। পরে আরও ১২ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
প্রথম আলো : বাংলাদেশের শিশুদের জন্য আপনার প্রধান বার্তাটি কী হবে?
কৈলাস সত্যার্থী : আমার বার্তা হচ্ছে থ্রি ডি—ড্রিম, ডিসকভার অ্যান্ড ডু (স্বপ্ন দেখা, জ্ঞান অন্বেষণ বা জানা এবং করা)। আমি বলব স্বপ্ন দেখতে হবে বড়। শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, দেশের জন্য, সারা বিশ্বের জন্য। শুধু নিজের জন্য স্বপ্ন দেখলে নিজের সমৃদ্ধি হতে পারে কিন্তু সমাজের সমৃদ্ধি না-ও হতে পারে। তাই সবার জন্য স্বপ্ন দেখতে হবে। জানতে হবে এবং জানার জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর নিজে কাজ না করে অন্যের কাছ থেকে ভালো কিছু পাওয়ার প্রত্যাশার মানে হচ্ছে অন্যের মুখাপেক্ষী থাকা। নিজের স্বপ্ন নিজে বাস্তবায়ন করতে পারার চেয়ে আনন্দ আর তৃপ্তির কিছু হতে পারে না। তবে আমাদেরও মনে রাখতে হবে যে শিশুদের শিশুর মতো ভাবতে দিতে হবে।
প্রথম আলো : এত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
কৈলাস সত্যার্থী : আপনাদেরও ধন্যবাদ।

দায়ী রাজনীতিকরাই by উৎপল রায়

রাজনৈতিক কারণেই দেশের সিভিল সোসাইটি ভাগ হয়ে গেছে বলে মনে করেন সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, জনগণ নিরপেক্ষ ভূমিকা আশা করলেও বিভক্তির কারণে তারা সিভিল সোসাইটি সে ভূমিকা পালন করতে পারছে না। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, বাংলাদেশের সুশীল সমাজ আজ পরিপূর্ণভাবে বিভক্ত। এর কারণ, মূলত নিষ্কলুষভাবে তারা সম্পূর্ণরূপে নির্দলীয় নয়। সুশীল সমাজ বলতে আমি শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, এবং আইনজ্ঞদের মনে করি। এরা জ্ঞাত ও অজ্ঞাতে মনের গভীরে দেশের দুই শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে হয় বন্দি, না হয় অসহায়। এ বন্দিত্ব ও অসহায়ত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে যে সাহস ও প্রাপ্তি প্রত্যাশা বিবর্জিত মননশীলতা প্রয়োজন তা অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় না। আর সুশীল সমাজের মধ্যে যারা সাহসের সঙ্গে অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলতেন তাদের অনেকেই নিষিদ্ধ হয়ে গেছেন অথবা পূর্বের সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। আমার মতে নির্যাতন নিগ্রহকে ভয় পেলে সাহসের অভাব হলে দোটানা নাগরদোলায় দোল খাওয়া যায়, মানুষের আস্থার গভীরে আসন পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, গণতন্ত্রের অস্তিত্ব বিলুপতার পরিবারতন্ত্র এবং রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এই দুর্বিষহ পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় দুই শীর্ষ নেত্রীর উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর দুটি সংগঠনের ভেতরে অথবা সমাজের অভ্যন্তরে কোথাও কোন বিকল্প শক্তি বা সাহসী সুশীল সমাজকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। কি সংগঠন, কি সংসদ কি সমাজের অভ্যন্তরে কোথাও গণতন্ত্রের চর্চার অনুশীলন বর্তমানে নেই। এমনকি দুটি জোটে বিপরীতমুখী নানা দল সংগঠিত হলেও তারা তাদের দলীয় চেতনা ও মননশীলতাকে শুধু জলাঞ্জলিই দেন নাই, তারা এখন নিতান্ত আজ্ঞাবহ ভূমিকা পালন করছে। সুশীল সমাজের একাংশের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, দুই নেত্রীর করুণা ভিক্ষার জন্য যে স্তুতি, বন্দনা, অর্চনা হয় তা রাজনীতিকেই শুধু দূষিত করেনি, এই বাংলার যে জাগ্রত জনতা যারা একসময় ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলে উঠতো তাদেরকে সম্পূর্ণরুপে নিষ্পৃহ ও নির্বিকার করে দিয়েছে। প্রক্রিয়াটি শুরু হয় ২০০১ এর পর থেকে। ক্রমে ক্রমে তা এমন পরিপূর্ণতা লাভ করে যে, সমস্ত বিচারিক ব্যবস্থা, প্রশাসন থেকে শুরু করে সংসদ এবং শাসনতন্ত্রকে বিকলাঙ্গ এবং দলকানা করেনি বরং সমস্ত জায়গায় একটি বিশৃঙ্খল আবহের ভয়াবহ উদগ্র রূপ প্রতিভাত হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে সুশীল সমাজের বিরাট একটি অংশ বিভাজিত ও বরাবরই দলকানা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে লাল দল, নীল দল, সাংবাদিকদের মধ্যে প্রচণ্ড দল নির্ভরতা, আইনজ্ঞদের মধ্যে শুধু বিভাজনই নয়, দলের প্ররোচনায় প্রধান বিচারপতির কার্যালয়ের দরজায় লাথি মারা, হাতাহাতি, মারামারি দলের প্রতি আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশই শুধু হয়নি বিচার ব্যবস্থাকেও তা বাধাগ্রস্ত করেছে এবং জাতির কাছেও আমাদের মাথা হেট করেছে।
তিনি বলেন, আজকে রাজনীতির নিয়মই হলো অর্চনা, বন্দনা, স্তুতি ও স্তাবকতা। আমি বরাবরই মন্তব্য করি, গণতন্ত্র অর্থই হলো অনুশীলন ও চর্চা এবং তার জীবনীশক্তি হলো সহনশীলতা। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক সংগঠনেরতো বটেই শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, আইনজ্ঞ সকলেই আজ দলকানা। অগণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী এ পরিবেশে মানুষ শুধু প্রচণ্ডভাবে অসহায়ই নয়, নির্বিকার ও নিস্পৃহ।  অকুতোভয় সুশীল সমাজ নিঃস্বার্থ প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার ঊর্ধ্বে উঠে একটা তৃতীয় ঐক্য সুসংগঠিত থাকলে একটা গণবিক্ষোভ ঘটাতে না পারলেও জনগণের প্রত্যয়কে কিছুটা হলেও জাগ্রত করতে সাহায্য করতো। কিন্তু ব্যতিক্রমধর্মী কিছু প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব যারা জ্ঞানে প্রদীপ্ত কিন্তু সাহসের প্রশ্নে দরিদ্র। কেউ কেউ কিছুটা নিরপেক্ষতা অবলম্বন করলেও যে সাহস ও মানসিকতা জনগণকে উজ্জীবিত করতে পারতো তার এখন ভীষণ অভাব। নূরে আলম সিদ্দিকী আরও বলেন, রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বের স্বৈরাচারী মনোভাব তো বটেই বিভাজিত সুশীল সমাজে অনৈক্য ও সাহসের দারিদ্রের কারণে স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করলেও জনগণ ব্যথিত চিত্তে তা অবলোকন করে। কিন্তু প্রতিহত করতে কেউ এগিয়ে আসে না। এর দায়ভার আমাদের সকলকেই নিতে হবে। তিনি বলেন, সুশীল সমাজের অনেকেই আমাকে বলেন, আমাদের সময়ের রাজনীতিতে মতপার্থক্য ছিল, কিন্তু গুম খুন ছিল না। আর গ্রেপ্তার হলেও আমরা রাজবন্দির মর্যাদা পেয়েছি। কিন্তু এখন গ্রেপ্তার হলে থানা থেকেই যে পাশবিক নির্যাতন করা হয় তা বর্ণনাতীত। সুশীল সমাজও এখন সেই আতঙ্কে অস্থির। তবুও আমি এটুকু বলবো আমাদের আমলে রাজনীতির মধ্যে প্রত্যাশা, প্রাপ্তি লোভ লালসা ছিল না। রাজনীতি আমাদের জন্য ছিল আদর্শ, প্রত্যয়ের বিষয়। যেখানে আমাদের শক্তির উৎস ছিল জনগণের হৃদয় উৎসারিত সমর্থন। আর বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বে সেই জনগণকে আমরা ঐক্যবদ্ধ করেছিলাম। সাবেক এই ছাত্রনেতা বলেন, অধিকার, অনুদানের বিষয় নয়, নয় সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে আমার অভিব্যক্তি অর্জনের বিষয়। নিজেদের নির্মোহ হতে হয়। তবেই জনগণের আস্থা ও সমর্থন মিলে। নেতৃত্বের সততা, সাহস, প্রত্যয় জনগণকে উজ্জীবিত করে। সুশীল সমাজকে সেটিই অনুধাবন করতে হবে।
অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বলা যায়, আমরা যাদের সুশীল সমাজ বা সিভিল সোসাইটি বলি তাদের অনেকেই শাসক দলের পদলেহনকারী। শাসক দলের প্রতি তারা অনুরক্ত থাকে। কেন তারা এমন করে তা সহজেই অনুমেয়। সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী চরিত্রের কারণেই তারা এমন করে। আবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে মিশে যায়। এরাই সুবিধাবাদী এবং সুবিধাভোগী। এদের বেশিরভাগ দালাল। এদের মধ্যে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবী কমবেশি সবাই আছেন। তিনি বলেন, বিখ্যাত দার্শনিক কালমার্কসের উদ্ধৃতি দিয়ে যদি বলি তাহলে এটা বলা যায়, সিভিল সোসাইটির মানুষদের শ্রেণী চরিত্র হলো এরা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার আশায় বিশেষ সময়ে শাসক ও শোষক শ্রেণীর সঙ্গে মিশে যায়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে গুনগান গাওয়ার জন্য শাসক শ্রেণীরও চাটুকারের প্রয়োজন হয়। তখন সুশীল সমাজের একশ্রেণীর মানুষকে তারা কাছে টানে। তবে, কিছুসংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের মানুষ আছে যারা এ ধরনের পদ্ধতিতে বিশ্বাস করে না। কিন্তু এ সংখ্যা খুবই কম। আবার কেউ কেউ আছে শাসকদলের সমর্থন করে কিন্তু তাদের পদলেহন করে না। যদি এ থেকে দূরে থাকা না যায় তাহলে সুশীল সমাজের মধ্যে দলবাজি, বিভক্তি, বিভাজন চলতেই থাকবে। যা দেশ ও জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।
মোবাশ্বের হোসেন
স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সুশীল সমাজ যে ধাপে উঠার কথা ছিল সে ধাপে উঠেনি। মাত্র নয় মাসের যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হয়েছে। যদি তা না হয়ে নয় বছরে হতো তাহলে বহু বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা পাকিস্তানের হয়ে যেত। কারণ বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজ বলে যাদের আমরা চিনি তারা এত ধৈর্যশীল নয়। এরা এক ধাপে এক ধরনের আচরণ করে আবার আরেক ধাপে গিয়েই নিজেকে পরিবর্তন করে অন্য দিকে চলে যায়। কেউ কেউ স্রোতের বিপরীতেও চলে। আসলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে সুশীল সমাজ যে প্রক্রিয়ায় আসার কথা ছিল সে প্রক্রিয়ায় এখনও আসেনি। এখন যাদের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বলা হয়, তারা আসলে সুশীল সমাজ নয়। সুশীল সমাজের ছদ্মবেশে তারা মূলত দেশ ও জাতির ক্ষতি করছে। তিনি বলেন, এখন সরকারে আছে আওয়ামী লীগ। স্বভাবতই সুশীল সমাজের অনেকেই এখন আওয়ামী লীগার হয়ে গেছে। আমার প্রশ্ন হলো পঁচাত্তরে যখন বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো তখন এই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা কোথায় ছিল? এখন যারা আওয়ামী লীগের নামে গলা ফাটায় সেই নেতারাই বা ছিল কোথায়? অথচ এই সুশীল সমাজ নামধারীরা বঙ্গবন্ধুর আমলে তৎকালীন সরকারের সুবিধা যেমন নিয়েছে। তেমনি এই শেখ হাসিনার আমলেও নিচ্ছে। মোবাশ্বের হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু  বলেছিলেন, আমার পাশে সব চাটার দল। তিনি (বঙ্গবন্ধু) তখনকার সুবিধাবাদী সুশীল সমাজের উদ্দেশেই তা বলেছিলেন। কত দুঃখে তিনি একথা বলেছিলেন তা সহজেই অনুমেয়। তার কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, তাকে ছাড়া আর সবাইকে কেনা যায়। তিনিও সেই সুবিধাবাদীদের উদ্দেশেই একথা বলেছেন। তিনিও কত দুঃখে একথা বলেছেন। আসলে সুশীল সমাজ এখন চাটতে চাটতে গেলার দল আর গিলতে গিলতে রাক্ষসে পরিণত হয়েছে। সরকার ও দলের ভেতরেই তারা ফ্রাঙ্কেস্টাইনে পরিণত হয়েছে। মোবাশ্বের হোসেন আরও বলেন, শিশু সন্তান অপরিষ্কার হলেও মা বাবা যেমন তাকে ডাস্টবিনে ফেলে না, তেমনি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা হচ্ছে একটি শিশুর মতো। যা দুর্বল হলেও কখনো ফেলা যায় না, সযত্নে রাখতে হয়। তাই, নাই গণতন্ত্রের চাইতে দুর্বল গণতন্ত্রও ভাল। দুর্বল হলেও আমাদের তা ধরে রাখতে হবে। আর সঠিক গণতান্ত্রিক চর্চা যদি আমরা করতে পারি তাহলে সঠিক সুশীল সমাজ গড়ে উঠবে। সেজন্য আমি আশাহত নই। বর্তমান তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যতে গ্রহণযোগ্য সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব করবে বলে আমার আশা।
ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ   
নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা-জানিপপের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে যে বিদ্যমান সুশীল সমাজ ব্যবস্থা ছিল তা এনজিওগুলোর দাপটের কারণে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এনজিওগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন আছে। সেহেতু সিভিল সোসাইটিও বিভাজিত ও বিভক্ত হয়ে গেছে। তাই দেশে চলমান এনজিওগুলোর অর্গানিক ভিত্তি থাকতে হবে। তিনি বলেন, কোন কিছুই রাজনীতি বিযুক্ত নয়। কিন্তু এখন যেভাবে সিভিল সোসাইটিকে রাজনীতি প্রভাবিত করছে তাতে সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজ আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে সিভিল সোসাইটির যতটুকু ভূমিকা রাখার দরকার তা আর হালে পানি পাচ্ছে না। তিনি বলেন, যারা রাজনীতির টুপুর মাথায় দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে তাদের বিষয়ে কথা বলা অতিশয়োক্তি হবে। তবে, নিকট অতীতে বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা বিভিন্নভাবে সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন।
ড. দিলারা চৌধুরী
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী সুশীল সমাজের বিভক্তির জন্য সরাসরি দায়ী করেছেন রাজনীতিকে। তার মতে, আমাদের দেশের সিভিল সোসাইটি বিভক্ত হওয়ার একমাত্র কারণ রাজনীতি। এ জন্য দেশের বর্তমান সিভিল সোসাইটি কোন সংজ্ঞার মধেই পড়ে না। কেননা, রাজনৈতিকভাবে সুবিধা নেয়ার জন্য কিন্তু সিভিল সোসাইটি গড়ে উঠেনি। তিনি আরও বলেন, সিভিল সোসাইটির প্রথম শর্তই হলো তারা হবে অরাজনৈতিক। তারা সরকারের ভুলত্রুটি নিরসনে জাতীয় জনমত গঠন করবে, যাতে সরকার সঠিকভাবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু আমাদের দেশে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান যেমন সঠিকভাবে গড়ে উঠেনি, তেমনি সিভিল সোসাইটিও সঠিকভাবে গড়ে উঠেনি। ফলে যারাই সরকারের মন্দ কাজের সমালোচনা করবে বা ভুল ধরিয়ে দেবে তাদেরকেই অপদস্থ করা হবে। এজন্য দেশে সুশীল সমাজ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী
বিডিনিউজ  টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজ তার পূর্ব সম্মান হারিয়েছে। কেন হারিয়েছে সেটা সহজেই অনুমেয়। দেশের সুশীল সমাজ ভাব করে যেন তারা নিরপেক্ষ। তারা আসলে নিরপেক্ষ নন, বিভাজিত। নিজেদের সুবিধার জন্য যে কোন সরকারের সময় এরা সুবিধালাভের আশায় তৎপর হয়ে উঠে। কোন না কোন দল বা সরকারের পদলেহন করে। কিছুদিন আগে শত নাগরিক কমিটি ও সহস্র নাগরিক কমিটি নামে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা আওয়ামী ও বিএনপি নামে দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেল। এটা নির্লজ্জ দলবাজির উদাহরণ ছাড়া আর কিছুই নয়। সুশীল সমাজের এখন যারা সক্রিয় তাদের মধ্যে সুবিধাবাদিতার বিষয়টি অত্যন্ত ষ্পষ্ট। তারা মূলত কাজ করে ব্যক্তিস্বার্থে। তিনি বলেন, আমরা যদি অতীতের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো, সুশীল সমাজের অনেকেই অতীতেও বিভিন্ন সরকারের সময় অনেক ধরনের সুবিধা নিয়েছেন। নিকট অতীতে ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থার সময়ও অনেকে নির্লজ্জভাবে বিশেষ সুবিধা নিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতা এখনও বজায় আছে। দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর গত ২৪ বছরে যে সরকারই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে তখনই সুশীল সমাজ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে। এদের অনেকে মন্ত্রী হওয়ার আশায় ছিলেন। অনেকে সেই সুযোগ পেয়েছেনও। রাজনৈতিকভাবেও অনেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিয়েছেন, পেয়েছেন। আর সিভিল সোসাইটির বিভাজন ও বিভক্তিটাও এ কারণেই।

পদ্মাপারের তিন লড়াকু by আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

লেখাপড়ার খরচ জোগাতে পেট্রলপাম্পে
কাজ করছে আতিকুল ইসলাম l প্রথম আলো
বর্ষার বাবা নেই। ভাই ছিল, তা-ও কারাগারে। একমাত্র ভরসা মা। তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। আতিকুলের বাবা থেকেও নেই। সংসার দেখেন না। আতিক পেট্রলপাম্পে কাজ নিয়েছে। রীতার বাবা রিকশা চালান, কিন্তু এখন চোখে কম দেখেন। তাই আগের মতো রিকশা চালাতে পারছেন না। সংসারে টান।
বর্ষা, রীতা ও আতিকুল—তিনজনই ইউসেপ-রাজশাহী টেকনিক্যাল স্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। ভর্তি হয়েছে রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে। শিক্ষকদের বিবেচনায় তারা তিনজনই তুখোড় মেধাবী। তবে ভয়—তারা আদৌ আর পড়াশোনা চালাতে পারবে কি না। অভাব-অনটন আর সাংসারিক জটিলতায় পেন্ডুলামের মতো ঝুলছে তাদের ভবিষ্যৎ।
বর্ষা খাতুনের বাড়ি রাজশাহী নগরের কেশবপুর বস্তিতে। বাবার নাম আবদুল আজিজ। মারা গেছেন। মা নাজমা বেগম অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। একমাত্র ভাই রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। ভাইয়ের স্ত্রী বিষপানে আত্মহত্যা করেছেন। শ্বশুরবাড়ির মামলায় ভাই এখন হাজতে। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বাড়িতে মেজো বোন রাশিদা খাতুন ও মায়ের সঙ্গে থাকে বর্ষা। কয়েক দিন আগে বর্ষাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘর থেকে বড়জোর এক পা ফেলার জায়গা। দুই পা ফেলতে গেলেই পদ্মা নদী। কোনো জানালা নেই। ঘরের চালাও মাথায় বাধে। মাথা নিচু না করে ভেতরে ঢোকার উপায় নেই। বর্ষা জানায়, তার বোনও খুব মেধাবী। কিন্তু এসএসসি পাসের পর আর পড়াশোনা হয়নি। একটি ক্লিনিকে কাজ নিয়েছিলেন। সে কাজও কিছুদিন থেকে বন্ধ। বর্ষা রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে জেনারেল মেকানিক্যাল ট্রেডে ভর্তি হয়েছে। তার ভয়, তার পরিণতিও বোনের মতো হতে পারে। বর্ষার মা নাজমা বেগম বলেন, মেজো মেয়েটার মেধা থাকা সত্ত্বেও পড়াতে পারেননি। ছোট মেয়েটা আরও মেধাবী। তাকে পড়ানোর খুব ইচ্ছা। কিন্তু কীভাবে পড়াবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না।
আতিকুল ইসলামের বাড়ি নগরের কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায়। নিজেদের বাড়িঘর নেই। নানার বাড়ির একটি খুপরি ঘরে থাকে তারা। বাবা মামুনুর রশিদ মাঝেমধ্যে একটি হোটেলে কাজ করেন। আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যান। সংসার দেখাশোনা করেন না। তাই মাকে ঝিয়ের কাজ করতে হয়। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে আতিক সবার বড়।
বর্ষা খাতুন ও রীতা খাতুন
পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডে ভর্তি হয়েছে আতিক। তার পড়াশোনার খরচ চালানোর কোনো উপায় নেই। তাই পেট্রলপাম্পে কাজ নিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নগরের কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায় মেসার্স আমিন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে তাকে কাজ করতে দেখা যায়। সে জানায়, পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্য পাম্পে কাজ নিয়েছে। বুঝতে পারছে না এই কাজ করে আদৌ পড়াশোনা চালাতে পারবে কি না।
রীতা খাতুনের বাড়ি নগরের গুড়িপাড়া বস্তিতে। বাবা শরিফুল ইসলাম রিকশা চালান। রীতা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার ট্রেডে ভর্তি হয়েছে। তার মা সাদেরা বেগম জানান, সম্প্রতি রিতার বাবা চোখে ঠিকমতো দেখছেন না। মাথায়ও সমস্যা। আগের মতো রিকশা নিয়ে বের হতে পারেন না। এ অবস্থায় সংসারের হাল ধরতে ছোট ছেলে নাইম একটা হোটেলে কাজ নিয়েছে। সে ওই কাজ করেই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। রীতা পড়াশোনায় খুবই ভালো। কিন্তু এখন পড়াশোনা কীভাবে চলবে, সেটা নিয়েই যত চিন্তা।
ইউসেপ-রাজশাহী টেকনিক্যাল স্কুলের শিক্ষক মাসুদ রানা বলেন, সীমাহীন দারিদ্র্যের মধ্যে এই তিন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছে। খেয়ে না খেয়ে স্কুলে আসত। কোনো দিন পড়ায় ফাঁকি দেয়নি। তিনজনই জিপিএ-৫ পেয়েছে। একটু সহযোগিতা পেলে ওরা যেকোনো পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করবে।

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের অর্থ পাচার by জব্বার আল নাঈম

জব্বার আল নাঈম
সম্প্রতি দেশ ও বিদেশের আলোচিত ব্যবসায়ী প্রিন্স মুসা বিন শমসের রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি দমন সংস্থার কাছে নিজেই সুইস ব্যাংকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে এই ৫ বিলিয়ন ডলার থাকার কথা স্বীকার করেছেন। ৭ বিলিয়ন ডলার অর্থের অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরো ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সন্ধান পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদককে জনাব মুসা জানিয়েছেন, সুইস ব্যাংকে তার কেবল একটিমাত্র অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তবে এ অ্যাকাউন্টে সাত বিলিয়ন নয়, বর্তমানে মোট জমা ১২ বিলিয়ন ডলার। যা বাংলাদেশি টাকায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার (প্রতি ডলার ৭৮ টাকা হিসেবে) সমপরিমাণ।
সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচারের এরকম অনেক গল্প আছে, অভিযোগ আছে। কেবলমাত্র দুর্নীতবাজরাই সুইস ব্যাংকে টাকা পাচার করে, এমন একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে জনমনে স্পষ্ট। দেশে অসংখ্য ব্যাংক থাকার পরও সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালেশিয়া মতো দেশে অর্থ পাচার কেন হয়? আর কারা সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচার করে?
তবে সুইস ব্যাংকে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশী নাগরিকরা সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে ব্যাপকভাবে অর্থ পাচার করছে। তবে, এদের অধিকাংশই রাজনৈতিক ব্যক্তি। এ পাচার রোধে সরকার চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যর্থ হচ্ছে কেন? এখানে তো রাষ্ট্র আছে, রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট নীতি আছে। সরকার আছে। আছে প্রশাসন। এতকিছুর পরও আমাদের চূড়ান্ত ব্যর্থতার কারণগুলো সনাক্তকরণ সম্ভব হয় না কেন? সম্ভাবনার একটা সীমা নিয়ে গত এক বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক সামান্য উদ্যোগ নিয়েছিল, যদিও সে উদ্যোগ ঝুলে আছে উদ্যোগের খাতায়। সময়ের টেবিলে সেই হিসাব চিৎকার করছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ তথা সুইস ব্যাংকে টাকা পাচার হওয়া কমার বদলে মাল্টিকালার ঢঙে বাংলাদেশী টাকায় সুইস ব্যাংকের পেট মোটা হচ্ছে।
অর্থ পাচারের কারণগুলো নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন ভিন্ন কথা, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকা, রাজনীতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা এবং নিরাপত্তাহীনতা অর্থ পাচারের বড় কারণ। ১৯ জুন বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি) প্রকাশিত ‘ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড ২০১৪’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশী নাগরিকদের ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ অর্থ বেশি জমা হয়েছে। পাঁচ বছরের হিসাবে এ পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। যে খতিয়ান দেখে আমরা বারবার বিস্মিত হওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না। বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, সরকার নির্বাচনের বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা এই পাচারের জন্য দেশে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ না থাকাকে দায়ী করছেন বারবার। আমরা দেখছি, বিগত কয়েক বছর ধরে, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় বিনিয়োগের যে হার রয়েছে, তার চাইতে সঞ্চয়ের হার বেশি। এই প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ কাজি খলীকুজ্জামান জানান, ‘দেশে বিনিয়োগের তুলনায় সঞ্চয়ের হার ২-৩ শতাংশ বেশি। টাকাতো আর মানুষ বালিশের তলায় রাখে না। তাই পাচার করা।’ আর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম মনে করেন, প্রত্যাশামাফিক বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকাই অর্থ পাচারের বড় কারণ। জনাব আজিজুল ইসলামের কথা অযৌক্তিক নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বাণিজ্যিক ভাবে সমান সুযোগ না দিলে বিনিয়োগে ভয় পেয়ে নিরাপদ অবস্থানে হাঁটতে চায়। সমীক্ষায় দেখা যায়, সুইস একাউন্টে জমা টাকার মালিকগণ সরকারের প্রতিপক্ষের তুলনায় সরকার পক্ষের লোক বেশি। তাতে বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকে না। বিভিন্ন জায়গায় আমি বলে থাকি, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পকেট ভারী করে অবৈধ মালিকানায় বা নামে বেনামে ব্যাংক ব্যালেন্স ও বাড়ি- গাড়ি করা। ক্রাইসিস মোমেন্টে বিদেশে পাড়ি দিয়ে বিলাশ বহুল লাইফ লিড করা এবং ছেলেমেয়েদের সেখানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো। এত ছোট দেশের সমীকরণ সরকারের পক্ষে অসম্ভব কিছু বলে মনে হয় না। সরকারের আন্তরিকতায় বিদেশ থেকে অনেকের টাকা দেশে এসেছে। এটাও জানি, নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত টাকা পাচার বন্ধ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা। 
পাচার হওয়া অর্থ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ জানান ভিন্ন কথা, সুইস ব্যাংকের এ রিপোর্ট সম্পূর্ণ নয়। এভাবে গোপন তথ্য প্রকাশের বিধান নেই। তবুও এন্টি মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার খতিয়ে দেখতে পারে। যেন ভবিষ্যতে এমনটি না হয়। এ ধরনের অপরাধে কি ধরনের শাস্তি হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পৃথিবীর কোথাও এমন রিপোর্ট প্রকাশ কিংবা শাস্তির নজির নেই। দেশের অর্থ এভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়ার তৎপরতা আমাদের অর্থনীতির জন্য এক অশনি সংকেত নয়? এ ক্ষেত্রে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু তেমন ভূমিকা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এই প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য বলেন, অর্থ পাচার রোধে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেই। সরকার সত্যি সত্যিই অর্থ পাচার রোধ করতে চায় কিনা, সে ব্যাপারেও সন্দেহ রয়েছে। সন্দেহের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘অর্থ পাচার রোধ শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের একার চাওয়ার ব্যাপার নয়। বিষয়টি রাজনৈতিক।’ সাধারণ মানুষের সাথে সুর মিলিয়ে ড. দেব প্রিয়র প্রশ্ন, অর্থ পাচার কারা করে? অবশ্যই রাজনৈতিক ভাবে শক্তিশালী লোকেরা। দেখার বিষয় যে সরকার তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে চায় কিনা। তিনি আরও বলেন, ‘দেশে যখন নির্বাচন আসে তখনই অর্থ পাচার অনেক বেড়ে যায়। রাজনীতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা এ পাচারের বড় কারণ।’ প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ্য যে, যেসব দেশের সাথে সুইস ব্যাংকের এমওইউ রয়েছে, সেসব দেশ সুইস ব্যাংক থেকে তথ্য আনতে পারে। এই সুযোগটি বিশ্বের অন্যান্য দেশ কাজে লাগায়। সম্প্রতি কাজে লাগিয়েছে ভারত। যে কারণে ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে সুইস ব্যাংকে ভারতের অর্থ পাচার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমেছে। তাহলে বাংলাদেশ কেন নয়? ভারত এগিয়ে যাচ্ছে উন্নতির গ্রাফ আঁকতে আঁকতে। কিন্তু বাংলাদেশ সুইস ব্যাংকের সাথে এমওইউ করতে পারেনি। এই যে না পারার ভেতরে সরকারের দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাব প্রতীয়মান হয়।
খতিয়ানের দিকে চোখ নিলে সুইস ব্যাংকে ১২ বছরের মধ্যে ২০১৩ সালেই বাংলাদেশীদের সবচেয়ে বেশি আমানত জমা। যার পরিমাণ ৩৭ কোটি ২০ লাখ ফ্রাঁ, স্থানীয় মুদ্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। ২০১২ সালে ২২ কোটি ৯০ লাখ ফ্রাঁ বা ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বাংলাদেশীদের আমানত বেড়েছে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। ২০১১ সালে ছিল ১৫ কোটি ২০ ফ্রাঁ বা ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। তবে কোনো বাংলাদেশী তার নাগরিকত্ব গোপন রেখে আমানত রেখেছে তা এই প্রতিবেদনে আসেনি। একইভাবে স্বর্ণালঙ্কার, শিল্পকর্ম এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র জমা রাখলে তার আর্থিক মূল্যমান হিসাব করে আমানতে যোগ হয় না। প্রতিবেদন দেখা গেছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশীদের আমানত ২০০২ সালে ছিল ৩ কোটি ১০ লাখ ফ্রাঁ। ২০০৪ সালে ৪ কোটি ১০ লাখ, ২০০৫ সালে ৯ কোটি ৭০ লাখ, ২০০৬ সালে ১২ কোটি ৪০ লাখ, ২০০৭ সালে ২৪ কোটি ৩০ লাখ, ২০০৮ সালে ১০ কোটি ৭০ লাখ, ২০০৯ সালে ১৪ কোটি ৯০ লাখ এবং ২০১০ সালে ২৩ কোটি ৬০ লাখ ফ্রাঁ। এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে ভারতের ১৯৫ কোটি ফ্রাঁ, পাকিস্তান ১০১ কোটি, শ্রীলঙ্কা ৮ কোটি ২০ লাখ, নেপাল ৮ কোটি ৪৮ লাখ, মিয়ানমার ১ কোটি, মালদ্বীপ ১ কোটি ৩০ লাখ. আফগানিস্তান ১ কোটি ২১ লাখ এবং ভুটান ৫৬ হাজার ফ্রাঁ’র আমানত জমা আছে। প্রতিবেদন হিসাব অনুসারে ২০১৩ সালে বিশ্বের অন্যান্য দেশের আমানত কমলেও বাংলাদেশের বেড়েছে। ২০১৩ সালে সুইস ব্যাংকে বিদেশীদের মোট আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি ফ্রাঁ। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২৯ হাজার কোটি ফ্রাঁ। এ হিসাবে ব্যাংকগুলোর মোট আমানত কমেছে ৬ হাজার কোটি ফ্রাঁ। ২০০৯ সালে ছিল ১ হাজার ৩৩ হাজার কোটি ফ্রাঁ, ২০১০ সালে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি এবং ২০১১ সালে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি।
আমরা মনে করি বিদেশে অর্থ পাচার রোধে এর চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- দেশে বিনিয়োগের কাঙ্খিত পরিবেশ সৃষ্টি, রাজনীতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা দূর করা, এ ছাড়া নিরাপত্তা শঙ্কা দূর করাও বিশেষভাবে প্রয়োজন। তবে এই বিষয়গুলো অর্জন করতে হলে সরকারকে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিক ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের রয়েছে অনেক সংকট। এই সংকট দূরীকরণে সরকার সঙ্গত ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসে কি না সেটাই এখন দেখার বিষয়। আমাদের প্রধান প্রধান ঘাটতি গুলোর দিকে নজর দিয়ে কর্মসূচী সফলভাবে সম্পূর্ন করা। সরকার সকল ধরনের পাচার (যদিও এখন মানব পাচার সরকারের সামনে বড় একটা ইস্যু) রোধ করতে পারলে দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করা সম্ভব। সরকারকে বিভিন্ন সেক্টরে বারবার সফলতায় উত্তরণ ঘটিয়ে জনগণের কাছে পৌঁছতে হবে। যাতে পাঁচ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে সরকার মুছতে পারে। এখানে ব্যর্থ হওয়া চলবে না।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক

চ্যালেঞ্জে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ by কাজী সোহাগ

হাতে সময় রয়েছে তিন বছর। কাজ এখনও অনেক বাকি। সরকার চায় আগামী ২ বছরের মধ্যেই দেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণ করতে। তাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে এ কার্যক্রম। বড় ধরনের চার ধাপ পেরিয়ে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা যাবে স্যাটেলাইট। এরমধ্যে মহাকাশে স্লট কেনা শেষ হয়েছে। স্যাটেলাইট তৈরির টেন্ডার জমা দেয়া হয়েছে। এখন চলছে মূল্যায়নের কাজ। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, কানাডা ও ফ্রান্সের চারটি কোম্পানি ওই টেন্ডারে অংশ নিয়েছে। গাজীপুর ও চট্টগ্রামে দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণের কাজও এগিয়েছে। এরপরই রয়েছে স্যাটেলাইটের উদ্বোধন। এটাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধরণত রকেটের মাধ্যমে স্যাটেলাইট পাঠানো হয় মহাকাশে। অনেক সময় রকেট উৎক্ষেপণের আগে-পরে কিংবা অন্য যে কোন কারণে বিগড়ে যেতে পারে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে কোন ঝুঁকি নিতে চায় না বাংলাদেশ। বিকল্প হিসেবে আরও একটি অতিরিক্ত রকেট মজুত রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি ব্যর্থ হলে আরেকটি উৎক্ষেপণ করা হবে। এ জন্য ওই প্রকল্পে ব্যয় কিছুটা বাড়ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান (বিটিআরসি) সুনীল কান্তি বোস সম্প্রতি টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, একটি রকেট ব্যর্থ হলে সাধারণত আরও ৬ মাস সময় লাগে পরবর্তী রকেটের জন্য। আমাদের হাতে সময় খুব কম। তাই খরচ বাড়লেও বিকল্প হিসেবে বাড়তি একটি রকেট হাতে রাখা হচ্ছে। স্যাটেলাইটসহ একটি রকেট উৎক্ষেপণের জন্য সাধারণত ব্যয় হয় চারশ’ থেকে সাড়ে চারশ’ কোটি টাকা। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে আমাদের স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে হবে। তা না হলে কোন লাভ নেই। যদিও আমাদের লক্ষ্য ২০১৭ সালের শেষদিকে উৎক্ষেপণ করা। বিটিআরসি চেয়ারম্যান জানান, সফলভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে। বিটিআরসি জানিয়েছে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হলে বাংলাদেশসহ আশেপাশের বেশ কয়েকটি দেশ টেলিযোগাযোগ ও সমপ্রচার সেবা দিতে জিয়োসিক্রোনাস স্যাটেলাইট সিস্টেম (৪০টি ট্যান্সপন্ডার, ২৬ কেইউ ব্যান্ড, ১৪ সি ব্যান্ড)-এর গ্রাউন্ড সিস্টেমসহ সব ধরনের সেবা দেবে। দরপত্রের আওতায় স্পেস সিগমেন্ট, লঞ্চ সার্ভিস, গ্রাউন্ড সিগমেন্ট ও উৎক্ষেপণের এক বছর পর্যন্ত বীমা সুবিধা রাখা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুনীল কান্তি বোস বলেন, বিশাল এ প্রজেক্ট কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারের যেন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি না হয় সেদিকটি বিবেচনা করে ইন্স্যুরেন্স করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মহাকাশের বিভিন্ন রেখায় স্থাপন করা ৬৯টি দেশের শতাধিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ ও সমপ্রচার এবং গোয়েন্দাগিরির কাজ করে যাচ্ছে। নিজেদের স্যাটেলাইট না থাকায় বাংলাদেশের ওপর বিদেশী ৫টি স্যাটেলাইট ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিশ্বের ৪৫টি দেশের মহাকাশে নিজস্ব স্পেস রয়েছে। তাদের আকাশে অন্য কোন দেশের স্যাটেলাইট নেই। ৫০টি দেশ অন্য দেশের সহযোগিতায় স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে। ১১টি দেশ নিজস্ব ব্যয়ে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে। এসব দেশের শতাধিক স্যাটেলাইট বিষুবরেখা, মেরুবিন্দু বা ক্রান্তীয় অঞ্চল অথবা বিভিন্ন কৌণিক পথে পরিভ্রমণ করছে। যোগাযোগ মাধ্যমের স্যাটেলাইটগুলো সাধারণত বিষুবরেখার ওপর স্থাপন করা হয়। কক্ষপথের এই স্থানে স্যাটেলাইট স্থাপন করলে পরিচালন ব্যয় অনেক কম হয়। তাই উন্নত দেশগুলো এই কক্ষে একটার পর একটা যোগাযোগ স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে। এর আগে বিটিআরসি বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের জন্য অরবিটাল স্লট ইজারা নিতে চুক্তি করে। চুক্তির আওতায় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপনে ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্লটের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারস্পটনিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব স্পেস কমিউনিকেশনসকে কয়েক কিস্তিতে দুই কোটি ৮০ লাখ ডলার দেবে বিটিআরসি। এরইমধ্যে প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি অনুমোদন করে। এর মধ্যে এক হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা সরকারের তহবিল থেকে যোগান দেয়া হবে। দাতা সংস্থা দেবে এক হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। বিডার্স ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে এই প্রকল্পের অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণের জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)-এর নিজস্ব জমিতে দুটি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ করা হবে।

বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে বিস্ময় by শরিফুজ্জামান

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও কথিত বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে এত দিন একধরনের রাখঢাক থাকলেও পুলিশ এর যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করায় বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে। তাঁদের কেউ বিষয়টিকে অনভিপ্রেত, কেউ দুঃখজনক, কেউবা অবিশ্বাস্য বলে মন্তব্য করেছেন।
আত্মরক্ষার কারণ দেখিয়ে এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তদন্তকে ঢাল হিসেবে নিয়ে পুলিশ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করে না, এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। ২ আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে অধিকার ও বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের বিচারবহির্ভূত হত্যার তথ্য এবং এ-সংক্রান্ত বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করে। পুলিশের দাবি, ওই সংগঠন দুটির বক্তব্য দেশের বিদ্যমান আইনের পরিপন্থী, যা আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল।
‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড পুলিশ করেনি’—এমন আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়ায় পর এ নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের একজন সহকারী মহাপরিদর্শকের সই করা ওই বক্তব্যে বলা হয়, যারা পুলিশ বা সাধারণ মানুষের প্রাণ হরণ করবে তাদের প্রতিহত করতে গিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটানোর আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত রয়েছে বাংলাদেশের আইনে।
তবে আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন করলেও বন্ধুকযুদ্ধের ঘটনাগুলো প্রকৃতপক্ষে আত্মরক্ষার কারণে ঘটছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। প্রতিটি বন্দুকযুদ্ধের পর একই ধরনের গল্প তুলে ধরায় এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও অবিশ্বাস রয়েছে।
দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো নিয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করে আইন ও সালিস কেন্দ্র, অধিকার, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনসহ কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠন।
গত ৩০ জুন আইন ও সালিস কেন্দ্রের ষাণ্মাসিক পরিসংখ্যান (জানুয়ারি-জুন ১৫) বলছে, এই সময়ে র্যা ব ও পুলিশ বাহিনীর হাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন ৭২ জন। এদের মধ্যে ৪০ জন পুলিশের সঙ্গে, ২২ জন র্যা বের সঙ্গে, বাকিরা অন্য বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন।
অন্যদিকে অধিকারের ষাণ্মাসিক প্রতিবেদন (জানুয়ারি-জুন ১৫) বলেছে, গত ছয় মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হওয়া ১০৮ জনের মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছে ৬৬ জন। এদের মধ্যে ৩৯ জন পুলিশের হাতে, ১৪ জন র্যা বের হাতে, বাকিরা অন্য বাহিনীর হাতে মারা গেছে বলে ওই সংগঠনের অভিযোগ।
৩১ জুলাই অধিকারের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুলাই মাসে দেশে ১৫ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে পুলিশের হাতে ১১, র্যা ব ও আনসারের হাতে চারজন মারা যাওয়ার অভিযোগ তুলেছে সংগঠনটি।
পুলিশের বিবৃতিতে অধিকারের ওই প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বলা হয়, গত জুলাই মাসে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের কোনো ঘটনাকে ম্যাজিস্ট্রেট এবং আদালত বিচারবহির্ভূত বলেননি। এ প্রসঙ্গে প্রশাসনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে আরও বলা হয়, আত্মরক্ষার অধিকার সঠিকভাবে পুলিশ প্রয়োগ করছে কি না বা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে কি না, তা অনুসন্ধান করেন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বাধীন নির্বাহী কমিটি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করছে না, এমন দাবি অবিশ্বাস্য বলে মত দেন আইন ও সালিস কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল। তিনি বলেন, ‘আমরা তো পুলিশের কাছে জবাবদিহি চাই। কিন্তু তারা এর বদলে যে বক্তব্য দিয়েছে, তা অনভিপ্রেত।’
সুলতানা কামাল বলেন, মানবাধিকার সংগঠনগুলো পুলিশকে দায়ী করছে না, অভিযুক্ত করছে। কিন্তু এই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ করার দায়িত্ব পুলিশেরই। তাঁর মতে, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তদন্তে যদি প্রমাণ হয়েও থাকে যে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়নি, তাহলে সেই তথ্য জানার অধিকার নাগরিকের রয়েছে। কিন্তু এতগুলো ঘটনা ঘটল, একটি তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না।
বিচারবহির্ভূত হত্যা সম্পর্কে মানবাধিকার সংগঠনের কথা বলার যৌক্তিকতা সম্পর্কে সুলতানা কামাল আরও বলেন, আইনের শাসনের ব্যত্যয় হলে মানবাধিকার সংগঠন কেন, যেকোনো নাগরিককেই কথা বলতে হবে; বরং কথা না বলাটাই নৈতিকতাবিরোধী।
অধিকারের ষাণ্মাসিক প্রতিবেদনে সরকারকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিচারের সম্মুখীন করার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া তাদের দায়মুক্তি রোধে সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়।
এই সুপারিশের জবাবে অধিকার ও বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের এ-সংক্রান্ত বক্তব্যকে বেআইনি ও নিছক নাশকতামূলক প্রচারণা বলে উল্লেখ করেছে পুলিশ। সংস্থা দুটির বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হত্যাকাণ্ডের দায়ভার চাপানোর অভিযোগ তুলে বলা হয়েছে, এর ফলে পুলিশের কাজ বিতর্কিত হচ্ছে এবং পুলিশের ভাবমূর্তি জনসমক্ষে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, এটা মানহানিকর এবং তা ফৌজদারি অপরাধের শামিল।
পুলিশ আরও জানায়, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে এ দেশের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থাকে বিতর্কিতভাবে পৃথিবীর মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়। এতে বিদেশের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা নাশকতামূলক কাজ হিসেবে বিবেচ্য বলে পুলিশ মনে করে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া এসব বক্তব্য ও যুক্তি হাস্যকর। রাষ্ট্র অস্ত্র দিয়েছে বলে অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করা সমর্থনযোগ্য নয়। তাঁর মতে, পুলিশের ঝুঁকির বিষয়টি মেনে নেওয়া হলেও প্রায় সব ঘটনায় ক্ষমতার প্রয়োগ বেশি করা হচ্ছে। তা ছাড়া প্রতিটি ঘটনার ধরন, বিবরণ বা গল্প একই, যা অবিশ্বাস্য।
ড. ইফতেখারের মতে, ম্যাজিস্ট্রেট যে তদন্ত করেন, তা পুলিশের একধরনের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই হয়; বরং অস্ত্র উদ্ধার বা আসামি ধরতে যাওয়ার আগে পুলিশই ম্যাজিস্ট্রেট বা তৃতীয় পক্ষের কাউকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। নইলে একমাত্র পুলিশ ও অভিযুক্তের উপস্থিতিতে যে কথিত বন্দুকযুদ্ধ হয়, তার বিবরণ কেউ সত্য বলে মেনে নেবে না।
এদিকে পুলিশের ব্যাখ্যা সম্পর্কে উপজেলা পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেসি করেছেন, সচিবালয়ে এমন তিন কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা গত সোমবার জানতে চাওয়া হয়। ওই সব কর্মকর্তা জানান, এ ধরনের ঘটনায় সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। বন্দুকযুদ্ধের পর সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি হওয়ায় সেখানে র্যা ব-পুলিশের বাইরে কারও কিছু বলার থাকে না। তা ছাড়া তদন্তের নামে যা কিছু হয়, সবকিছুতেই পুলিশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ থাকে। এর ফলে একজন ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনার যথার্থতা প্রমাণ করতে সক্ষম হন না।
জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তদন্ত হওয়ার কথা বলা হলেও আসলে তা সুষ্ঠু হওয়ার সুযোগ নেই। ত্রুটিপূর্ণ বিচারব্যবস্থায় এ ধরনের ঘটনার তদন্ত ও বিচার করা কঠিন। তাঁর মতে, অপরাধীরা ক্ষেত্রবিশেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা করে থাকে, এটা সত্য। কিন্তু প্রায় সব ঘটনায় এক পক্ষ মারা যাচ্ছে, আরেক পক্ষ অক্ষত থাকছে—এর বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু?
তবে পুলিশের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছে, দেশে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় এতগুলো মানুষ মারা গেল কিন্তু পুলিশ বেঠিক বা বেআইনি কাজ করেছে বা বাড়াবাড়ি করেছে, এমন কথা কেউ বলেনি।
‘ক্রসফায়ারে মৃত্যু’র ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্তে প্রতিটি ক্ষেত্রে গুলিবর্ষনের ঘটনা সঠিক রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ প্রবিধান (পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গল-পিআরবি) অনুযায়ী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের তদন্তের বাধ্যবাধকতা থাকায় ক্রসফায়ার মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত একটি ঘটনার ক্ষেত্রে ঘটনাটি যথার্থ নয় বলে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিবেদন দেননি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, তদন্তকারীরা কি এ থেকে নিজেদের দায় এড়াতে পারেন?
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিতর্কিত ও সমালোচিত বিচারবহির্ভূত হত্যা শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদে ‘এলিট ফোর্স’ হিসেবে র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যা ব প্রতিষ্ঠার পর। সে সময় প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এসব বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছিল। সে সময় তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় এলে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড চালাতে দেবে না।
কিন্তু ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত ঠিক একই পদ্ধতিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে। প্রথম কয়েক বছর র্যা বের বিরুদ্ধে প্রায় এককভাবে ক্রসফায়ারের অভিযোগ ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে র্যা বের চেয়ে পুলিশের বিরুদ্ধেই এ ধরনের অভিযোগ বেশি উঠছে।
অধিকারের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে এসে বিচারবহির্ভূতভাবে সন্দেহভাজনদের হত্যা করাকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। আর এ ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের দায়মুক্তিমূলক বক্তব্য তাদের এ কাজে আরও উৎসাহিত করছে।
২০১৪ সালে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া র্যা ব নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেন, যাঁর শাসনামলেই র্যা ব সৃষ্টি ও বিচারবহির্ভূত হত্যা শুরু হয়। তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এর কঠোর সমালোচনা করেছিলেন এবং এ ধরনের হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশে ক্ষমতায় যাঁরা থাকেন তাঁরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চান। এমনকি পুলিশের বৈধ ক্ষমতাও অবৈধভাবে ব্যবহার করতে চান। আবার বিরোধী দলে গেলে তাদেরই টনক নড়ে। জনস্বার্থের বদলে ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দলীয় ও ক্ষুদ্রস্বার্থে ক্ষমতার এই অপব্যবহার বন্ধ হওয়া উচিত।
এদিকে, দ্য অবজারভেটরি নামে জেনেভা ও প্যারিসভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন পুলিশের এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে মঙ্গলবার বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়, পুলিশের এই বক্তব্য বাংলাদেশের নিরপেক্ষ সুশীল সমাজের ওপর নতুন আঘাত, যা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। ওই সংগঠনের মতে, বেসরকারি সংগঠন কর্তৃক সরকারের কর্মকাণ্ডের যাচাই-বাছাই আইনের শাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ নয়।
পুলিশ যেভাবেই বলুক, কোনো যুক্তিতেই বিচারবহির্ভূত হত্যা সমর্থনযোগ্য নয়, এমনকি চোর বা ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে কাউকে হত্যা করাও গর্হিত অন্যায়। সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব অপরাধের শাস্তি বিচারের মাধ্যমেই নিশ্চিত করতে হবে। আইন হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দরজা ভাঙা নোংরা দুর্গন্ধময় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল by আরিফুল হক

উচিত ছিল রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু
কর্তৃপক্ষের অবহেলায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছে রংপুর
মেডিকেলের গোসলখানা ও শৌচাগারগুলোতে। -প্রথম আলো
পানি জমে মেঝে পিচ্ছিল। দরজাগুলো ভাঙা। কোনোটির আবার কপাটই নেই। দেয়াল স্যাঁতসেঁতে। ময়লা নোংরা দুর্গন্ধ পরিবেশ।
এই দশা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগীদের জন্য তৈরি গোসলখানা ও শৌচাগারগুলোর। অবস্থা এতটাই বেগতিক যে ঝুঁকি নিয়ে প্রয়োজন সারতে হয় রোগী ও তাঁদের স্বজনদের।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এক হাজার শয্যার হাসপাতালটিতে ৪০টি ওয়ার্ড। এসব ওয়ার্ডে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকেন শয্যাসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। সেই সঙ্গে রোগীদের স্বজন মিলে হাসপাতালে মোট লোকের সংখ্যা দাঁড়ায় দিনে প্রায় পাঁচ হাজার। রংপুর বিভাগের আট জেলার মানুষ এখানে উন্নত চিকিৎসার জন্য ছুটে আসেন।
৪০টি ওয়ার্ডে ১১০টি গোসলখানা ও শৌচাগার রয়েছে। সংস্কারের অভাবে ও নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এগুলো এখন পূতিগন্ধময় স্থানে পরিণত হয়েছে। দিনে দুবার করে এগুলো পরিষ্কার করার কথা থাকলেও অনেক সময় একবারও করা হয় না বলে রোগী ও তাঁদের স্বজনদের অভিযোগ।
গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, অধিকাংশ গোসলখানা ও শৌচাগার বেহাল। পানি পড়তে পড়তে সেগুলো স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। মেঝেগুলো নোংরা-অপরিষ্কার। সেখানে হাঁটাচলাই কষ্টকর। পা টিপে টিপে সাবধানে রোগী ও স্বজনেরা চলাফেরা করেন।
হৃদ্রোগ ওয়ার্ডে পুরুষদের জন্য ব্যবহৃত দুটি শৌচাগারে দরজা নেই। গোসলখানার দরজার নিচের অংশ ভাঙা। মেঝেতে ময়লার কারণে দুর্গন্ধে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাই দায়। তবে এই ওয়ার্ডের মহিলাদের জন্য ব্যবহৃত গোসলখানা ও শৌচাগার কিছুটা ভালো রয়েছে। তবে এই ওয়ার্ডে কোনো বেসিন দেখা যায়নি।
পুরুষ ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া একজন রোগীর স্বজন তৈয়বুর রহমান বলেন, শৌচাগারে গেলে দরজায় আরেকজনকে পাহারা দিতে হয়।
হৃদ্রোগ ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন আমিরুল ইসলাম বলেন, গোসলখানার এমন দুরবস্থা যে রোগী নিয়া যাওয়াই মুশকিল।
মেডিসিন পুরুষ ওয়ার্ডের দুই পাশের গোসলখানা ও শৌচাগারই নোংরা। বিধ্বস্ত অবস্থা দরজাগুলোর। দেয়ালে শেওলা জমে গেছে। পুরুষ ওয়ার্ডের একজন রোগীকে স্যালাইন লাগানো অবস্থায় সাবধানে শৌচাগারে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁর দুজন স্বজন। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থেকে আসা ওই রোগীর এক স্বজন বলরাম রায় বললেন, ‘খুব কষ্টে বাথরুম যাওয়া-আসা করা লাগে। ভয় লাগে কখন যে পিছলে পড়ে যাই।’
কয়েকজন রোগী ও তাঁদের স্বজনের অভিযোগ, ওয়ার্ডগুলোর শৌচাগার ব্যবস্থাপনা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তেমন নজর নেই। এর একটাই কারণ, চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে আলাদা শৌচাগার রয়েছে। সেগুলোর অবস্থা ভালো।
মেডিসিন মহিলা ওয়ার্ডের গোসলখানা ও শৌচাগারে ঢোকার মুখে এলোমেলোভাবে পড়ে ছিল রোগীদের নোংরা কাপড়। পানি জমে মেঝে পিচ্ছিল সেখানে। ওয়ার্ডের দর্শনার্থী আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, ‘হাসপাতালোত চিকিৎসা কইরবার আসিয়া এমন অবস্থা যে বাথরুমোত ঢোকায় যায় না। এত গন্ধ যে বমি আইসে।’
এভাবে সার্জিক্যাল, গাইনি ও শিশু ওয়ার্ডসহ ১১টি ওয়ার্ডের গোসলখানা ও শৌচাগারে একই চিত্র দেখা যায়। এই ১১ ওয়ার্ডে কোনো বেসিন দেখা যায়নি।
হাসপাতালে ১০৬ জন সুইপারের মধ্যে ২৮ জন সুইপারের পদ শূন্য রয়েছে। বাকি ৭৮ জন সুইপার দিয়েও গোসলখানা ও শৌচাগারগুলো নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যাচ্ছে না বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি।
হাসপাতালের পরিচালকের দায়িত্বে থাকা সহকারী পরিচালক বিমল কুমার বর্মণ বলেন, এগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে তাঁদের পক্ষ থেকে তদারক করা হয়। তবে রোগী ও স্বজনদের চাপে এগুলো পরিষ্কার রাখা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপরও জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে নিয়মিত তদারকের মাধ্যমে এগুলো ব্যবহারের উপযোগী করে রাখতে। গোসলখানা ও শৌচাগার ব্যবহারে সবার সচেতন হওয়াও প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আবদুল হাই বাচ্চুকে ধরার সাধ্য কার? সংবাদ বিশ্লেষণ: বেসিক ব্যাংকে অনিয়ম by শওকত হোসেন

আবদুল হাই বাচ্চু
বেসিক ব্যাংকের বহুল আলোচিত সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে দায়মুক্তি দেওয়ার সব আয়োজনই সম্পন্ন করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গতকাল মঙ্গলবার দুদকের অনুসন্ধানী দল যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তাতে আবদুল হাই বাচ্চুর নাম নেই। অনুসন্ধানী দলটি বেসিক ব্যাংক জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ৫৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করলেও আবদুল হাই বাচ্চুর কোনো দায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনেই তাঁর নামটি রাখার সাহস পেল না দুদক। এতটাই ক্ষমতাশালী আবদুল হাই বাচ্চু!
এখন তাহলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কী বলবেন? কারণ, অর্থমন্ত্রী গত ৮ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে আইনের আওতায় আনা হবে’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘ব্যাংকটিতে হরিলুট হয়েছে। আর এর পেছনে ছিলেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। তাঁর ব্যাংক-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের কারণেই বেসিক ব্যাংক সমস্যায় জর্জরিত হয়েছে। তাঁর ব্যাংক-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অনেক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কোনো সমস্যা হবে না।’
স্মরণ করা যেতে পারে, এর আগে গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী ‘হল-মার্ক কেলেঙ্কারি ও বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি নিয়ে বলেছিলেন, ‘জালিয়াতদের ধরতে বাধা নিজের দলের লোক।’ অর্থমন্ত্রী কি এবার ওই সব দলের লোকদের নাম বলবেন?
আবদুল হাই বাচ্চুর ক্ষমতার উৎস এতটাই শক্ত যে কেউই তাঁকে স্পর্শ করতে পারছেন না। বেসিক ব্যাংকের জালিয়াতি নিয়ে আলোচনা ও লেখালেখি শুরু হয়েছে ২০১২ সাল থেকেই। অর্থমন্ত্রী নিজেও গত ৮ জুলাইয়ের আগে কখনোই আবদুল হাই বাচ্চুর নাম উচ্চারণ করে সরাসরি তাঁকে দায়ী করেননি। তবে ইদানীং ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও দুদক অর্থমন্ত্রীর কথা আমলেই নিল না। বরং বলা যায়, দুদক প্রভাবশালীদের দায়মুক্তির যে কমিশনে পরিণত হয়েছে, তার আরেকটি উদাহরণ এই ঘটনা।
এর আগে হল-মার্ক কেলেঙ্কারির জন্য সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে দায়মুক্তি দিয়েছিল দুদক। যুক্তি ছিল, হল-মার্ককে যে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছিল, তা পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদিত ছিল না। ফলে পর্ষদ সদস্যদের দায় পায়নি দুদক। কিন্তু বেসিক ব্যাংকের পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে সবকিছুই করা হয়েছে পর্ষদের মাধ্যমে। আর এর সব ধরনের প্রমাণ বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৪ সালেই দিয়েছিল দুদককে।
খুব সরাসরিই বলা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ দেওয়া পরিচালনা পর্ষদই ডুবিয়েছে বেসিক ব্যাংককে। ১৯৮৯ সালে ব্যংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিল্পসচিবই পদাধিকারবলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হতেন। পরিচালকও হতেন বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা। এই ধারা চলেছে ২০০৮ সাল পর্যন্ত। সরকার মালিক থাকলেও একটি ব্যাংক যে ভালোভাবে চলতে পারে, তার উদাহরণ ছিল বেসিক ব্যাংক।
প্রতিষ্ঠার ২৮ বছর পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার ঠিক পরপরই বেসিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় প্রথম বড় পরিবর্তন আনা হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের বদলে নিয়োগ দেওয়া হয় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের। আর তারপর থেকেই শুরু হয় বেসিক ব্যাংকের ভরাডুবি। এখন তাহলে প্রমাণ হচ্ছে যে ব্যাংকের অর্থ লুটপাটের জন্যই নীতির পরিবর্তন করা হয়েছিল।
বেসিক ব্যাংকের ভরাডুবির কারণ তিনটি। কাছের লোকদের ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানানোর নীতি নেয় সরকার এবং সে অনুযায়ী নিয়োগ পান আবদুল হাই বাচ্চু। আবার দিনের পর দিন বেসিক ব্যাংক নিয়ে লেখালেখি হলেও অর্থমন্ত্রী তা আমলেই নেননি। যখন নিয়েছেন তখন আর বেসিক ব্যাংক বাঁচানোর পথ ছিল না। আর সর্বশেষ হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকও লুটপাট ঠেকাতে পারেনি।
সুতরাং বলা যায়, আবদুল হাই বাচ্চুর যেমন শাস্তি হওয়া দরকার, তেমনি দায় নিতে হবে সরকার, অর্থমন্ত্রীর ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। দায় তো কেউই নিচ্ছেই না, বরং প্রভাবশালী আবদুল হাই বাচ্চুর দায়মুক্তির সব আয়োজন করে দিচ্ছে সরকারেরই একটি সংস্থা দুদক। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর শক্তির উৎস কী?
আবদুল হাই বাচ্চু এরশাদ আমলে বাগেরহাট-মোল্লারহাট থেকে একবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর আওয়ামী লীগ সরকার গত মেয়াদে আসার পর তিনি প্রথম মেয়াদে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে তিন বছরের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। ২০১২ সালে তাঁকে আবার দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
চেয়ারম্যান আবদুল হাইয়ের সময় বেসিক ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন সরকারেরই সাবেক একজন যুগ্ম সচিব এ কে এম রেজাউর রহমান। তিনি ২০১৩ সালের ১১ জুলাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলমের কাছে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। তাতে আবদুল হাই বাচ্চুর নানা অনিয়মের বিবরণ দেওয়া ছিল। আবদুল হাই সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কাউকে পরোয়া করেন না তিনি। কার্যত ব্যাংকটি চলে এই চেয়ারম্যানের নির্দেশে। তিনি লোকবল নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতি, সব ক্ষেত্রেই একচ্ছত্র প্রভাব রাখেন।’
সেই প্রভাবের নমুনাও আছে অনেক। যেমন, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদকে সরাসরি দায়ী করে একাধিকবার চিঠি দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়কে। বেসিক ব্যাংকের অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম চিঠিটি দেয় ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে। চিঠিতে বলা ছিল, ‘এর সব দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের। ব্যাংকের ঋণ শৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। প্রধান কার্যালয়ের ঋণ যাচাই কমিটি বিরোধিতা করলেও বেসিক ব্যাংকের পর্ষদ ঋণ অনুমোদন করে দেয়। ৪০টি দেশীয় তফসিলি ব্যাংকের কোনোটির ক্ষেত্রেই পর্ষদ কর্তৃক এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় না।’
এরপরও অর্থ মন্ত্রণালয় বেসিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে ব্যাংকটির অবস্থা আরও খারাপ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে ২০১৪ সালের ২৯ মে সরকারের কাছে সুপারিশ করে। এর আগে ২৬ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী ফখরুল ইসলামকে দুই বছরের জন্য অপসারণ করে। আর এর পরদিন ঢাকার গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখার নতুন ঋণ অনুমোদন বন্ধের নির্দেশ দেয়।
এরপরও বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভাঙেননি অর্থমন্ত্রী। বরং সে সময়ে অর্থমন্ত্রী পাল্টা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘পর্ষদ ভাঙা হলে দায়িত্ব (ব্যাংকটির) নেবে কে?’
এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ২০১৪ সালের ৬ জুলাই পদত্যাগ করেন আবদুল হাই বাচ্চু। তিনি অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে পদত্যাগপত্র দিয়ে আসেন। এর দুই দিন পর সরকার ব্যাংকের গোটা পর্ষদও অবশ্য বাতিল করে দেয়। অর্থাৎ তাঁকে সম্মানজনক পদত্যাগেরই সুযোগ করে দেয় সরকার। কারণ পর্ষদ বাতিল হলে আবদুল হাই এমনিতেই চেয়ারম্যান থাকতে পারতেন না। সুতরাং তাঁকে অপসারণ করা হয়েছে—এ কথাটাও বলার সুযোগ রাখেনি সরকার।
২০০৮ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৫ শতাংশেরও কম। আর এখন খেলাপি ঋণ প্রায় ৫৭ শতাংশ। কেবল তা-ই নয়, ব্যাংকটি চালাতে এখন দুই হাজার কোটি টাকার মূলধন দিতে হবে সরকারকে। এই অর্থ দেওয়া হবে সাধারণ মানুষের করের টাকা থেকে। এসবই হচ্ছে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ফল।
প্রশ্ন হচ্ছে, এর দায় এখন কে কে নেবে?