Wednesday, May 21, 2014

আমার ভয় কি ভিত্তিহীন? by নন্দিতা দাস

ভারতে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার নির্বাচিত হওয়া একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া৷ এটা এক বিশাল গণতান্ত্রিক কর্মযজ্ঞ৷ ফলে জনগণের রায় নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত৷ আগেভাগে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকাও উচিত৷ অন্যদিকে এটাও সত্য যে, আমাদের অনেকের জন্য ভীত হওয়ার কারণও আছে৷

কার সম্পদ কার হাতে by আনু মুহাম্মদ

গত ৫ জানুয়ারির পর থেকে গত সরকারের নতুন মেয়াদ শুরু হয়েছে। গত আমলে এই সরকারের যেসব উদ্যোগ দেশকে আরও ঋণগ্রস্ত করেছে, সুন্দরবন থেকে বঙ্গোপসাগরকে হুমকির মুখে নিেক্ষপ করেছে, বিদ্যুৎ খাতকে কতিপয় দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর হাতে আরও বেশি করে আটকে দিয়েছে, তাদের মুনাফা নিশ্চিত করতে গিয়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে কয়েক দফা, দায়মুক্তি দিয়ে জ্বালানি খাতকে বানানো হয়েছে ‘তলাহীন ঝুড়ি’; সেসব কাজে এই মেয়াদে আরও দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে এই সরকার। প্রতিবাদ, যুক্তি, তথ্য—কোনো কিছুতেই তাদের পরোয়া নেই, পর্যালোচনা করার সাহস বা ইচ্ছা নেই। সরকারের বড় সুবিধা, দেশের বড় বিরোধী দল এসব চুক্তির বিরোধী নয়, বরং নিজেরা পাল্লা দিয়ে আরও চুক্তি করতে আগ্রহী। অপকর্মে তাদের ঐক্যের অভাব নেই।

কার সম্পদ কার হাতে

২০০৫ সালে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণ
গত ৫ জানুয়ারির পর থেকে গত সরকারের নতুন মেয়াদ শুরু হয়েছে। গত আমলে এই সরকারের যেসব উদ্যোগ দেশকে আরও ঋণগ্রস্ত করেছে, সুন্দরবন থেকে বঙ্গোপসাগরকে হুমকির মুখে নিেক্ষপ করেছে, বিদ্যুৎ খাতকে কতিপয় দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর হাতে আরও বেশি করে আটকে দিয়েছে, তাদের মুনাফা নিশ্চিত করতে গিয়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে কয়েক দফা, দায়মুক্তি দিয়ে জ্বালানি খাতকে বানানো হয়েছে ‘তলাহীন ঝুড়ি’; সেসব কাজে এই মেয়াদে আরও দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে এই সরকার। প্রতিবাদ, যুক্তি, তথ্য—কোনো কিছুতেই তাদের পরোয়া নেই, পর্যালোচনা করার সাহস বা ইচ্ছা নেই। সরকারের বড় সুবিধা, দেশের বড় বিরোধী দল এসব চুক্তির বিরোধী নয়, বরং নিজেরা পাল্লা দিয়ে আরও চুক্তি করতে আগ্রহী। অপকর্মে তাদের ঐক্যের অভাব নেই। সরকার খুব দ্রুততার সঙ্গে উন্নয়নের নামে একের পর এক যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যেভাবে চুক্তি করে সর্বজনের সম্পদ (পাবলিক প্রপার্টি) বিদেশি কোম্পানি ও দেশি কিছু গোষ্ঠীর ব্যক্তিমালিকানায় দিয়ে দিচ্ছে, তাকে কি উন্নয়ন বলা যায়? না। কেননা, উন্নয়ন তাকেই বলা যায়, যা সম্পদ সৃষ্টি করে, নতুন সম্পদ যোগ করে, দেশের মানুষের জীবন সহজ করে, উৎপাদনশীল খাতের সম্প্রসারণে সহায়ক হয়, দেশের সক্ষমতা বাড়ায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সৃষ্টি করে নিরাপদ ও সমৃদ্ধ জগৎ। সরকারের এসব সিদ্ধান্ত বরং এর উল্টোটাই করছে। নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস্য মাত্রায় নির্লিপ্ততা দেখিয়ে, পরিবেশ সমীক্ষা না করে, অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা না করে, দেশের বিশেষজ্ঞদের মতামত থোড়াই কেয়ার করে, নিজস্ব সক্ষমতা না বাড়িয়ে, রাশিয়ার কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে তাদের পূর্ণ কর্তৃত্বে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজে কয়েক দফা চুক্তি করেছে সরকার।
পরিবেশগত সমীক্ষা না করে চীনা কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে মহেশখালী। সুন্দরবন ধ্বংসের সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মতো ভারতীয় কোম্পানির কর্তৃত্বাধীন রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজে একগুঁয়েমি দেখিয়েই ক্ষান্ত হয়নি সরকার, সুন্দরবনের আরও কাছে আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের অরিয়ন কোম্পানিকে অনুমতি দিয়েছে। পিএসসি ২০১২ সংশোধন করে চাহিদামতো আরও সুবিধা বাড়িয়ে বঙ্গোপসাগরের গ্যাস সম্পদ বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে চুক্তি শুরু করেছে সরকার। ইতিমধ্যে বাড়তি সুবিধা দিয়ে ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। এখন আরও সুবিধা আদায়ের সম্ভাবনা দেখে মার্কিনসহ সব বিদেশি কোম্পানি তড়িঘড়ি নানা ব্যবস্থার লম্বা ফর্দ নিয়ে হাজির হয়েছে। এগুলো নিয়ে দর-কষাকষি তাদের তেমন করতে হয় না। অন্য পক্ষে নিজেদেরই বিশ্বস্ত লোক থাকলে তাদের চিন্তা কী? ৮ মে শেভরনের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নয় সদস্যের একটি দল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বেশ কিছু দাবি উত্থাপন করে। এর মধ্যে যেগুলো সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে একটি হলো, তাদের কাছ থেকে কেনা গ্যাসের দাম আরও বৃদ্ধি করা। উল্লেখ করা দরকার যে বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় সংস্থাগুলো যে দামে গ্যাস সরবরাহ করে লাভ করছে, বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে একই পরিমাণ গ্যাস কিনতে হয় তার ১০ গুণেরও বেশি দামে, বৈদেশিক মুদ্রায়। অর্থাৎ যদি জাতীয় সংস্থাগুলোকে কাজের সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের গ্যাস ও বিদ্যুৎ অনেক কম দামে পাওয়া সম্ভব হতো, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়ত না, ভর্তুকি দিতে হতো না। সর্বোপরি বিদেশি কোম্পানির হাতে জিম্মি হতো না দেশ, যে সুযোগে তারা কদিন পরপরই নতুন নতুন আবদার নিয়ে হাজির হয়। সে কারণেই তারা স্থলভাগে আরও ব্লক দেওয়ার দাবি উত্থাপন করতে পারছে। এ রকম আত্মঘাতী পথে সরকার যাচ্ছে এমন এক সময়, যখন বাপেক্স তার সম্পদের হাজারো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আন্তর্জাতিক মান প্রদর্শন করেছে, ত্রিমাত্রিক জরিপ সম্পন্ন করেছে সফলভাবে।
শেভরন এখন তাকে ভাড়া করে কাজ করাতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। মানে বাংলাদেশের তরুণ বিশেষজ্ঞরা অনেক কম সুবিধা পেয়েও নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করলেও তাঁরা কর্তৃত্ব পাবেন না, তাঁদের বড়জোর সাবকন্ট্রাক্টর পর্যন্ত যেতে দেওয়া হবে। শেভরন বর্তমানে বাংলাদেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের শতকরা প্রায় ৫৫ ভাগ সরবরাহ করে। যে ব্লকগুলো এই কোম্পানির হাতে, তার মধ্যে তিনটি গ্যাসফিল্ডে তারা কাজ করছে। এগুলো হলো মৌলভীবাজার, বিবিয়ানা ও জালালাবাদ। সামগ্রিক পরিপ্রেিক্ষত ও বিভিন্ন সরকারের ভূমিকা না জানলে এটা মনেই হতে পারে যে বাংলাদেশের অক্ষমতা থাকার কারণে শেভরন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং তাদের জন্যই আজ গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো। শেভরনের মতো বিদেশি কোম্পানিকে জায়গা দেওয়ার জন্যই বরং জাতীয় সংস্থার গলা-হাত-পায়ে ফাঁস পরানো হয়েছে, তার কর্মক্ষমতা শৃঙ্খল করা হয়েছে, কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। বরং অনেক বেশি সম্পদ ও সুযোগ দিয়ে উৎপাদন বণ্টন চুক্তির (পিএসসি) মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে সমৃদ্ধ গ্যাস ব্লকগুলো। আগে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র জালালাবাদও এর অন্তর্ভুক্ত। এসব চুক্তি করা হয়েছিল প্রধানত দুটো যুক্তি দেখিয়ে: বাংলাদেশে ‘পুঁজির অভাব’ এবং ‘দক্ষতা ও প্রযুক্তির অভাব’। যে পরিমাণ পুঁজি হলে জাতীয় সংস্থা এই গ্যাস উত্তোলন করতে পারত, পরে তার ৩০ গুণ বেশি খরচ করে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনতে হয়েছে, হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আর পুঁজির অভাবের কথা শোনা যায় না। আর বিদেশি কোম্পানির প্রযুক্তি ও দক্ষতার পরিচয় আমরা পেয়েছি মাগুরছড়া আর টেংরাটিলায়। শেভরনের ব্লকগুলো আদিতে পেয়েছিল মার্কিন আরেকটি প্রতিষ্ঠান অক্সিডেন্টাল। তাদের কর্তৃত্বাধীনেই ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন ঘটে মাগুরছড়া বিস্ফোরণ। তদন্তে দেখা যায়, অবহেলা ও কাজে গাফিলতিই এই দুর্ঘটনার কারণ।
তদন্ত কমিটি নিয়ে অনেক নাটকের পর যে রিপোর্ট হয়, সেখানে পাওয়া যায়, আমাদের প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্ট হয়েছে। গত দেড় বছরে সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহৃত হয়েছে, এটি তার সমান। এই বিপুল পরিমাণ গ্যাস সম্পদ ধ্বংস ও পরিবেশগত ক্ষতির জন্য যারা দায়ী, তাদের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি না করে বরং তাদের কীভাবে বাঁচানো যায়, সে চেষ্টাটাই আমরা বরাবর দেখেছি। যে পরিমাণ গ্যাস বাংলাদেশ অক্সিডেন্টালের কারণে হারিয়েছে, বর্তমানে এই পরিমাণ গ্যাস সংগ্রহের দাম বিবেচনা করলে শুধু গ্যাস বাবদ ক্ষতিপূরণই আমাদের দাবি করা উচিত কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা। অক্সিডেন্টাল তার ব্যবসা বিক্রি করে আরেকটি মার্কিন কোম্পানি ইউনোকলের কাছে এবং ক্ষতিপূরণ না দিয়ে দেশত্যাগ করে বিনা বাধায়। ইউনোকল দায়িত্ব নিয়ে বিবিয়ানার গ্যাস সম্পদ ভারতে রপ্তানি করার জন্য ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। সরকার পরিবর্তন হলো ২০০১ সালে, তৎপরতা আরও বাড়ল। যারা আজও বিদেশি কোম্পানির হাতে সমুদ্র ও ভূমির সব খনিজ সম্পদ তুলে দিতে সরকারের ভেতর ও বাইরে থেকে সক্রিয়, তাদের মধ্যেই সেই ব্যক্তিদের পাওয়া যাবে, যাঁরা সে সময়ে এই ভয়াবহ প্রস্তাবকে দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করেছিলেন। এঁরাই গলা ফুলিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে! তাঁদের চেষ্টা সফল হলে বাংলাদেশের বর্তমানে সর্বোচ্চ গ্যাস জোগানদার বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে কোনো গ্যাসই বাংলাদেশ পেত না, লোডশেডিং আরও ভয়াবহ হতো, রপ্তানি আয়ও চুক্তির কারণে প্রায় পুরোটাই পেত কোম্পানি। আর সমপরিমাণ জ্বালানি হিসেবে তেল আমদানি করতে গিয়ে বাংলাদেশকে প্রতিবছর খরচ করতে হতো প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পেয়েছিল একদিকে বুদ্ধিবৃত্তিক অন্যদিকে জনপ্রতিরোধের কারণে। জাতীয় কমিটি তখন একাধিক লংমার্চ ছাড়াও জাতীয় এই প্রতিরোধ সংগঠিত করেছিল। ব্যর্থ হয়ে ইউনোকল তার ব্যবসা বিক্রি করে শেভরনের কাছে। এবারও ক্ষতিপূরণ না দিয়ে ইউনোকল দেশ ত্যাগ করতে সক্ষম হয়।
এখন শেভরন সেই বিবিয়ানা থেকেই গ্যাস সরবরাহ করছে। কিন্তু যেহেতু দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ মুনাফা তাদের লক্ষ্য, সেহেতু নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন করে বিপদাপন্ন করছে পুরো ফিল্ড। পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে লাউয়াছড়া উদ্যানে জরিপ চালিয়েছে। বৃহত্তর সিলেট এলাকায় ‘করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ নামে প্রচারমূলক কাজ করছে, কিন্তু ক্ষতিপূরণের টাকা অনাদািয় রেখেছে। নতুন দাবিদাওয়া নিয়ে শেভরন-প্রধান যখন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন, তখন কি তিনি এসব অনিয়ম আর ক্ষতিপূরণের বিষয় তুললেন? না। বরং তাঁদের আরও কী করে বাড়তি সুবিধা দেওয়া যায়, তাঁদের দখলিস্বত্ব আরও বাড়ানো যায়, সেই পথই ধরলেন। সুতরাং দাবিদাওয়া পেশের ছয় দিনের মাথায় গত ১৪ মে এক সভা অনুষ্ঠিত হলো। এর কিছু খবর সংবাদপত্রে এসেছে। বলা হয়েছে, সভার একপর্যায়ে হঠাৎ করেই ‘পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মুহাম্মদ ইমামুদ্দীন সব ব্লক বিদেশি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব উত্থাপন করতে শুরু করেন। কিন্তু তা পেট্রোবাংলার পরিকল্পনায় না থাকায় এবং সংস্থার চেয়ারম্যান বিষয়টি সভায় উত্থাপনের বিষয়ে না জানায় তিনি পরিচালককে থামিয়ে দেন। এতে প্রতিমন্ত্রী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।’ (প্রথম আলো, ১৫ মে ২০১৪) মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের মুখে আমরা বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রসংশা ও তাদের আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কথাই বরাবর শুনি। বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে কথা বলার সুযোগ তাদের হয় না, তাদের যেন সেটা কাজও নয়! কেউ বলতে চাইলে বরং তার ‘উন্নতির পথ’ বন্ধ হয়ে যায়। বহুজাতিক কোম্পানির বৃহৎ ব্যবসা বাগানোর জন্য যারা পেশাদার মিশনে বিভিন্ন দেশে অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে আসে, প্রজেক্ট নামে উন্নয়নের ভুয়া গল্প তৈরি করে, নীতিনির্ধারকদের লোভের জালে আটকানোর কাজ করে, তাদের আরেক নাম ‘ইকোনমিক হিটম্যান’। এ রকম একজন জন পারকিনস, হয়তো নিজের অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে, নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন দুটো গ্রন্থ। জানিয়েছেন বাংলাদেশের মতো বিভিন্ন দেশে কীভাবে বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ রক্ষায় দুর্বৃত্তজাল তৈরি হয়, ঘুষ ও কমিশনে কেনা হয় মন্ত্রী-আমলা আর কনসালট্যান্টদের, উন্নয়নের গল্প সাজিয়ে মানুষকে ভয়ংকর প্রতারণায় আটকে তাদের খনিজ সম্পদ ও জীবন লুট করা হয়। বোঝা যাচ্ছে, এখন দেশ চালাচ্ছে এই ‘হিটম্যানরাই’!
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

মোদি পর্বের শুরু ও শেখ হাসিনার আগাম বার্তা

ভারতের ১৬তম লোকসভা নির্বাচন হয়ে গেল। নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সব জল্পনা-কল্পনা আর পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। দলটির অন্যতম প্রধান নেতা নরেন্দ্র মোদিই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন৷ ভারতের ১৬তম লোকসভা নানা দিক থেকেই রেকর্ড তৈরি করেছে। ৬১ জন নারী লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছেন, যা পূর্ববর্তী সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ভারতের ইতিহাসে এটাই আবার প্রবীণতম সদস্যদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে, যেখানে ৪৭ শতাংশ সদস্যের বয়স ৫৫ বছরের বেশি। মাধ্যমিক পাস করতে পারেননি—এমন সদস্য আছেন ১৩ শতাংশ; যা গত লোকসভার চেয়ে চার গুণেরও বেশি। অন্যদিকে পিএইচডি আছে—এমন সদস্য ৬ শতাংশ, যা গত লোকসভার দ্বিগুণ। পেশাগতভাবে যদিও একক সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য (২৭ শতাংশ) হচ্ছেন কৃষিজীবী; ব্যবসায়ী সদস্য আছেন ২০ শতাংশ, যা এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। প্রথম লোকসভায় (১৯৫২) আইনজীবীদের সংখ্যা যেখানে ছিল ৩৬ শতাংশ, কমতে কমতে তা এখন ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সাবেক সিভিল-মিলিটারি আমলা আছেন ২ শতাংশ। এসবই হচ্ছে পরিসংখ্যানের টুকিটাকি। ভারতীয়দের সামনে এখন পরিবর্তিত ভারত বা মোডিফায়েড ইন্ডিয়ার প্রবল বন্যা। প্রতিবেশী বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমার ভাবনা, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক মোদি সরকারের আমলে কেমন থাকবে?
নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে আমাদের দেশে অনেকেরই অনেক শঙ্কা। তাঁর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক উসকানি বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। মোদির সমালোচক ভারতেও আছেন অনেকেই। সেখানে একাডেমিক বিতর্ক হয় বিস্তর, বাংলাদেশে একাডেমিক বিতর্ক তেমন নেই। ২০০০-০১ সালে গুজরাটে দাঙ্গায় দুই হাজারের বেশি মুসলমান সংখ্যালঘু নিহত হয়েছেন। অভিযোগের তির মোদির দিকে। কেননা, তিনি তখন গুজরাটে ক্ষমতায় ছিলেন। দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে তখন তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। দাঙ্গার পরপর তিনি আরও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গুজরাটে সরকার গঠন করেন এবং তার পর থেকে গুজরাট রাজ্যে বিজেপির নিশান উড্ডীন রয়েছে।    আমাদের দেশে অবশ্য অনেকেই মনে করেন, কংগ্রেস একটি সেক্যুলার দল। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা আততায়ীর হাতে নিহত হলে দিল্লিতে শিখবিরোধী দাঙ্গা হয়েছিল। নিহত হয়েছিলেন আরও বেশি শিখ। সংখ্যাটা তিন হাজারের বেশি। দাঙ্গাকারীরা কংগ্রেসের লোক ছিলেন বলে ভারতের আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ অবশ্য ভারতে শিখদের মারলে মাথা ঘামান না। মুসলমান মরলে উত্তেজিত হন। সব ধরনের দাঙ্গাই অমানবিক, নৃশংস। কিন্তু যেহেতু আমরা একধরনের ‘আইডেন্টিটি পলিটিকস’ করি, আমরা কোনো কোনো ব্যাপারে সরব, আবার কোনো কোনো বিষয়ে নীরব।
এই অঞ্চলের নেতাদের মধ্যে নানা বিষয়ে অদ্ভুত মিল দেখা যায়। খালেদা জিয়া সচরাচর শাহজালালের মাজার জিয়ারত করে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। তিনি ঘোরতর ‘জাতীয়তাবাদী’। শেখ হাসিনা একই কাজ করেন অন্য কোনো মাজার জিয়ারত করে। তিনি আপাদমস্তক ‘সেক্যুলার’। নরেন্দ্র মোদি এবার হিন্দু সম্প্রদায়ের তীর্থক্ষেত্র বেনারস গিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি এসেছেন ‘মা গঙ্গার’ আহ্বানে। তাই তিনি হলেন ‘সাম্প্রদায়িক’। আমি তিনজনের কথা বললাম। তিনজনই সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের ধর্মীয় বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ভোট পেতে চান। ভারতের একদিকে পাকিস্তান একটি ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’। অমুসলমানরা যেখানে প্রায় বিলীয়মান প্রজাতি। তার পরও ইসলামি জোশ ও জজবা আসমান ছাড়িয়ে যায় নির্বাচনের সময়। বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে বাদ পড়েছিল ১৯৭৬ সালে একটি সামরিক ফরমানের বলে। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। সম্প্রতি ‘সেক্যুলার’ ভাবনা সংবিধানে পুনঃপ্রবেশ করলেও রাষ্ট্রধর্ম আছে বহাল তবিয়তে। দুই পাশে দুই সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রবল প্রতাপে বিরাজমান থাকা সত্ত্বেও ভারতের সংবিধান এখনো সেক্যুলার। আর আমরা যা-ই করি না কেন, ভারতীয়দের কেমন থাকতে হবে, এ ব্যাপারে আমাদের প্রেসক্রিপশন খুবই সরল। ওদের সেক্যুলার থাকতেই হবে। তবে ভোটের রাজনীতিতে তা নিতান্তই অবাস্তব, বিশেষত আমাদের অঞ্চলের বাস্তবতায়। সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারে এসে ‘বাংলাদেিশ অবৈধ অভিবাসী’ নিয়ে মাঠ গরম করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তৃণমূলের নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে একহাত নিয়েছেন। এখানেও সাম্প্রদায়িক বিভাজন। মোদির লক্ষ্য ‘হিন্দু’ ভোট আর মমতার লক্ষ্য ‘মুসলমান’ ভোট। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা প্রথমে কংগ্রেস, তারপর বামদের ভোট দিত। এখন দেয় তৃণমূলকে। বামদের হয়তো আর কিছুদিন পর খুঁজেও পাওয়া যাবে না৷
বাংলাদেশ থেকে ভারতে মানুষ যাচ্ছে কি যাচ্ছে না, এ নিয়ে চায়ের কাপে  ঝড় তোলার লোকের অভাব নেই। বাংলাদেশ থেকে দুই ধরনের মানুষ ভারতে যায়। ‘মুসলমানরা’ যায় রুটি-রুজির জন্য, আর ‘হিন্দুরা’ যায় নিরাপত্তার জন্য। আমরা এখানে বসে যতই হম্বিতম্বি করে বলি না কেন, এ দেশে চমৎকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছে, যারা দেশত্যাগ করছে, তাঁদের ভাষ্যটা জানা খুবই জরুরি। মোদির কথায় আমি অবাক হই না। অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের যদি সৌদি আরব, মালয়েশিয়া কিংবা ডেনমার্ক থেকে বের করে দেওয়া হয়, তাহলে এ দেশে কেউ তাদের গালি দেয় না। ভারতে কেউ এ কথা বললে আমাদের রক্ত মাথায় উঠে যায়। কেন? এখানেও সাম্প্রদায়িকতা। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, মানুষ এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাবে তার ইচ্ছ অনুযায়ী, যখন খুশি তখন। পঁুজি যদি এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবাধে যেতে পারে, তাহলে ‘শ্রম’ কেন পারবে না। বিশ্বব্যবস্থা তাই শ্রমিকের অনুকূল হওয়া উচিত। এ ধরনের একটি ক্লোজ দক্ষিণ এশীয় সোশ্যাল চার্টারে আছে, যা সার্ক কর্তৃক অনুমোদিত। আমরা এটার বাস্তবায়ন দেখতে চাই। তবে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কাউকে ভিটেমাটি থেকে তাড়ানো নিতান্তই বর্বরতা। নানা কথার মারপ্যাঁচ দিয়ে এই প্রবণতা আড়াল করার চেষ্টা নিন্দনীয়। আমরা এটা করে থাকি। নরেন্দ্র মোদি যখন বলেন, অবৈধ বাংলাদেশিদের বাক্স-পেটরাসমেত বিদায় করা হবে, তিনি আসলে তর্জনী তোলেন মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। আবার আমাদের আপসহীন নেত্রী যখন বলেন, নৌকায় ভোট দিলে মসজিদে উলুধ্বনি হবে, তখন তিনি হিন্দু সম্প্রদায়কে অপমান করেন। এই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে সৎ প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করতে হলে সবাইকে আরও বেশি সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল হতে হবে। শুধু জাতীয় পর্যায়ে এটা অর্জন করা সম্ভব নয়। এর মীমাংসা হতে হবে আঞ্চলিকভাবে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেকগুলো বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এগুলোর সুরাহা হওয়া দরকার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি সভায় বলেছেন, তিস্তা চুক্তি হতে পারেনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির জন্য। তিনি আরও বলেছেন, ভারতের সঙ্গে সব সমস্যার সমাধান হবে আলোচনার মাধ্যমে। এ কথা বলে তিনি নরেন্দ্র মোদিকে একটি আগাম বার্তা দিতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ ভবিষ্যতের মোদি সরকারের সঙ্গে খোলা মনে আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। একই সঙ্গে তিনি মমতার নাম উল্লেখ করে হয়তো বা মোদি-মমতা দ্বন্দ্বের সুযোগ নিতে চেয়েছেন। আমার কাছে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য সময়োপযোগী ও রাষ্ট্রনায়কোচিত বলে মনে হয়েছে। তবে এটাও সত্য, মমতার অবস্থান পশ্চিমবঙ্গে আরও শক্তিশালী হয়েছে। আস্থায় নিতে হবে তাঁকেও। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমস্যা শুধু তিস্তা নিয়ে নয়; আরও অনেক সমস্যা আছে। প্রধান সমস্যাটি হলো মনস্তাত্ত্বিক। আমরা এখনো ১৯৪৭ সালের বিভাজনের ঋণ বা লিগেসি বয়ে বেড়াচ্ছি। এই উপলব্ধি থেকেই আমাদের বসতে হবে খোলা মন নিয়ে। সে জন্য দরকার কুশলী কূটনীতিকের। এখন যাঁরা এ দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁদের ব্যর্থতার দায় বইতে হচ্ছে শেখ হাসিনাকে। ভারতের অবস্থাও একই রকম। সাউথ ব্লকের রক্ষণশীল আমলারা একের পর এক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে চলেছেন। যদি সামনের দিকে এগোতে হয়, নরেন্দ্র মোদিকেও এই অচলায়তন ভাঙতে হবে। আমি আশাবাদী।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক৷
mohi2005@gmail.com

থাইল্যান্ডে সেনা অভ্যুত্থান?

থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী গতকাল মঙ্গলবার দেশজুড়ে সামরিক আইন জারি করেছে৷ ছয় মাস ধরে চলমান সহিংস বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সেনাবাহিনী জানিয়েছে৷ খবর রয়টার্স, এএফপি ও বিবিসির৷ তবে থাইল্যান্ডের অন্তর্বর্তী সরকার সেনাবাহিনীর এই পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু জানেনা বলে জানিয়েছে৷ ফলে সেনাবাহিনীর এই পদক্ষেপ নিয়ে ধাঁধঁার সৃষ্টি হয়েছে৷ অবশ্য, এিটকে তারা ‘সামরিক অভ্যুত্থান’ বলতে নারাজ৷ সেনাবাহিনীর সদস্যরা রাজধানী ব্যাংককের রাস্তায় রাস্তায় টহল দেওয়া শুরু করেছেন৷ তাঁরা দেশটির টেলিভিশন ও বেতারকেন্দ্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংককে প্রবেশের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছেন৷ সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার দল-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারই এখনো দেশের দায়িত্বে রয়েছে বলে সেনা ও সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন৷ অবশ্য স্থানীয় সময় রাত তিনটায় (গ্রিনিচ মান সময় সোমবার রাত আটটা) টেলিভিশনে সামরিক বাহিনীর সামরিক আইন জারির আগে বিষয়টি মন্ত্রীরা জানতেন না বলে জানা গেছে৷ থাই সেনাপ্রধান প্রাইউথ শান-ওশা বলেন, সহিংস বিক্ষোভের কারণে মানুষের প্রাণহানি ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির কারণে সেনাবাহিনী জননিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে৷ গত বছরের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী ইংলাকের সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে দেশটিতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ সেনাপ্রধান বলেন, ‘চলমান সহিংসতা দেশের সার্বিক নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে৷
তাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই আমরা সামরিক আইন ঘোষণা করেছি৷ আমি সব পক্ষকে চলমান সংকট সমাধানে সহযোগিতা করতে আহ্বান জানাচ্ছি৷ সবাই আলোচনায় বসে সমাধানের একটি উপায় বের করুন৷’ থাইল্যান্ডের সরকার-সমর্থক ও বিরোধী শিবিরের লোকজন এখনো ব্যাংককের বিভিন্ন স্থানে শিবির গেড়ে রয়েছে৷ সংঘাত এড়াতে যারা যেখানে আছে, সেখানেই থাকতে এবং কোনো মিছিলে অংশ না নিতে সেনাবাহিনী আহ্বান জানিয়েছে৷ পাশাপাশি গণমাধ্যমকে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক আইনের বিষয়টি প্রচার না করতে এবং সরকারপন্থী ও সরকারবিরোধী ১০টি টেলিভিশন চ্যানেলকে সম্প্রচার বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷ সেনাবাহিনীর পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার৷ সরকার জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর পদক্ষেপ সম্পর্কে তাদের অবগত করা হয়নি৷ তবে তারা এখনো দেশ চালাচ্ছে৷ অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী নিওয়াত্থামরং বুনসংফাইসান দেশের সংবিধানের ভেতরে থেকে দায়িত্ব পালন করতে সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান৷ স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা থাকসিনের বোন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রাকে ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে ৭ মে আদালত অপসারণ করার পর থেকেই থাইল্যান্ড চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থায় পড়ে৷ মূলত ১৯৩২ সালে থাইল্যান্ডে একচ্ছত্র রাজতন্ত্রের অবসান ঘটার পর থেকেই এ রাজনৈতিক সংকট চলছে৷ তখন থেকে এ পর্যন্ত সেনাবাহিনী অন্তত ১১ বার দেশে অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে৷ সর্বশেষ ২০১০ সালে থাকসিনকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী৷ সামরিক আইন ঘোষণার পর থাকসিন এক টুইটার বার্তায় বলেছেন, থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক ঘটনা অনুসরণকারী যে কেউই সামরিক আইনের বিষয়টি প্রত্যাশা করতে পারেন৷ তবে এটা গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না বলে তাঁর বিশ্বাস৷

আমার ভয় কি ভিত্তিহীন?

ভারতে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার নির্বাচিত হওয়া একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া৷ এটা এক বিশাল গণতান্ত্রিক কর্মযজ্ঞ৷ ফলে জনগণের রায় নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত৷ আগেভাগে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকাও উচিত৷ অন্যদিকে এটাও সত্য যে, আমাদের অনেকের জন্য ভীত হওয়ার কারণও আছে৷ শুরু করা যাক বহুকথিত ও প্রতিশ্রুত ‘উন্নয়নের’ মডেল নিয়ে৷ অভিজাত ও মধ্যবিত্তদের মধ্যে ‘গুজরাট মডেল’ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে৷ বিষয়টি মাথায় রাখার জন্য বলছি, এই রাজ্যটি ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর তুলনায় উদ্যোগবান্ধব, সমৃদ্ধও বটে৷ বিগত দশকে অর্থনীতির সাধারণ সূচকেই মহারাষ্ট্র, বিহার ও তামিলনাড়ু গুজরাটের তুলনায় ভালো করেছে৷ যা-ই হোক, অর্থনৈতিক অগ্রগতিই সফলতার একমাত্র মাপকাঠি নয়৷ ভারতের বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশের মূল স্রোতের বাইরে অবস্থান করে৷ নানাভাবেই তারা দুর্গতি ভোগ করে৷ করপোরেট নীতি দ্বারা পরিচালিত অর্থনৈতিক মডেলে কি এই মানুষগুলোর স্বার্থ সংরক্ষণ হবে? সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য কি কোনো সামাজিক কর্মসূচি থাকবে? উন্নয়ন কি সবার কপালে জুটবে?
আমাদের ২০০২ সালের দাঙ্গার ভয়াল স্মৃতি ঝেড়ে ফেলতে বলা হলেও দেশভাগের বা তারও আগে বাবরের যুগের স্মৃতিচারণা করতে কোনো সমস্যা নেই৷ আমার ভয় হচ্ছে, ২০০২ সালের দাঙ্গার ব্যাপারে কোনো অনুশোচনা তো দেখা যাচ্ছে না, উপরন্তু এ-বিষয়ক একধরনের পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব এবং এমনকি এটাকে বৈধতা দেওয়ারও চেষ্টা চলছে৷ নির্বাচনে প্রচারাভিযানের সময় একধরনের উগ্র ধর্মীয় আবেগ জাগানোর চেষ্টা স্পষ্টতই লক্ষ করা গেছে৷ এই ‘উন্নয়নের’ গল্পের ভেতরে এক বিভাজনের রাজনীতি আছে৷ মুজাফফরনগরে অমিত শাহর বক্তব্য, মোদির কিস্তি টুপি (মুসলমানদের ব্যবহৃত টুপি) পরতে অস্বীকৃতি—যদিও তিনি আর অন্য সব টুপি–পাগড়ি পরতে দ্বিধা করেননি৷ প্রাভিন টোগাডিয়ার তো মুসলমানদের ‘হিন্দু এলাকা’ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে বিভাজনের রাজনীতিকে আরও উসকে দিয়েছে৷ এগুলো নমুনা মাত্র, আরও অনেক রয়েছে৷
কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক ভীতি হচ্ছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ হতে পারে৷ গণতন্ত্র ভিন্নমতকে প্রকাশের সুযোগ দেয়৷ এ কারণে জনগণ তাদের মত পরিবর্তন করতে পারে, সরকারও পরিবর্তন করতে পারে৷ গণতান্ত্রিক ও সভ্য পন্থায় তাঁদের অসন্তুষ্টির কথা বলতে পারে৷ বিজেপি ও তার সমর্থকেরা সব সময় সমালোচনা স্তব্ধ করে দিতে চায়৷ তা হোক সেন্সরশিপ আরোপ বা বল প্রয়োগ করে, যখন যেটা সুবিধাজনক৷ কিন্তু আমি কখনোই দেখিনি যে ধর্মনিরপেক্ষ দলকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানালেও মোদি সমর্থকদের আক্রোশের শিকার হতে হয়৷ আজ আমার ভিন্নমত ধারণকারী একটি টুইটবার্তার প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছে, ‘বাচ্চাদের নিয়ে পাকিস্তান চলে যান!’ এর ভেতরের অর্থ ভয়ংকর৷ ২০০৮ সালে আমি ফিরাক নামে একটি ছবি নির্মাণ করি৷ এর বিষয়বস্তু ছিল গুজরাট দাঙ্গার পর মানুষ কীভাবে এর পরিণাম ভোগ করে৷ ছবিতে কারও প্রতি অভিযোগের আঙুল তোলা হয়নি৷ 
তবে সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান ছিল পরিষ্কার৷ ছবিটি বেশ প্রশংসিত হয়৷ যাঁরা খোলা মন নিয়ে ছবিটি দেখতে পারেননি, তাঁরা এর সমালোচনাও করেন৷ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর খুব একটা ব্যবসা করতে পারেনি৷ নির্বাচন কাছাকাছি চলে আসার কারণে এমনটা হয়েছে বলে আমাকে জানানো হয়৷ কিন্তু আজ যদি ছবিটি মুক্তি দিতে হতো, তাহলে বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়তে হতো, এমনকি নির্বাচন ও এনডিএর বিজয় দেখানো হলেও৷ শিল্পী হিসেবে আমি বিপন্নবোধ করছি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায়৷ এই প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ কী জিনিস, আমি তা বুঝতে পারছি৷ নিজেকে বিপদমুক্ত রাখার জন্য গণমাধ্যম এ কাজ করছে৷ এ থেকে বোঝা যায়, সামনের দিনগুলোতে কী ঘটতে পারে৷ এই নীরবতা ভীষণ রকম কান ফাটানো৷ ভিন্নমতের মানুষের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যাবে৷ তাই আজ আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করি, আমার ভয়গুলো কি ভিত্তিহীন?
ভারতের দি আউটলুক ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
নিন্দতা দাস: ভারতীয় অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র পরিচালক৷

মমতার তিন

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন বছর পার করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ তিনি সরকারের তিন বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজ্যের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন৷ আর সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে আবার বিপুলভাবে সমর্থন দেওয়ায় তিনি জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান৷
ফেসবুকে মমতা লিখেছেন, ‘ইতিহাস নিজেকেই পুনরাবৃত্ত করে৷’ সরকারের তৃতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৩৩ জন ব্যক্তিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য রাজ্যের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার বঙ্গবিভূষণ ও বঙ্গভূষণ পুরস্কার দেওয়া হয়৷ দ্য হিন্দু৷

এ পি জে আবদুল কালাম সুস্থ

এ পি জে আবদুল কালাম
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম পুরোপুরি সুস্থ রয়েছেন৷ ৮২ বছর বয়সী সাবেক এই রাষ্ট্রপতির অসুস্থতা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন খবর নাকচ করে দিয়ে গত সোমবার তাঁর কার্যালয় থেকে এ দাবি করা হয়েছে৷ খবর জি নিউজের৷ আবদুল কালামের ব্যক্তিগত সচিবের বরাত দিয়ে ওই কার্যালয় থেকে বলা হয়, পরমাণুবিজ্ঞানীর অসুস্থতা নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে৷ কেউ হয়তো এর মাধ্যমে মজা লুটছেন৷ ইতিমধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদানের জন্য স্কটল্যান্ডের খ্যাতনামা ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরা আবদুল কালামকে সম্মানসূচক একটি ডিগ্রি দিয়েছে৷ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসাধারণ অবদান এবং ২০২০ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরের সহায়তার ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতির জন্য ড. কালামকে এ ডিগ্রি দেওয়া হয়৷’ ১৫ মে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তিনি এ ডিগ্রির সনদ গ্রহণ করেন৷