Showing posts with label সিলেট. Show all posts
Showing posts with label সিলেট. Show all posts

Saturday, August 15, 2026

অন্তরালের রহস্যও খুঁজছে নগর পুলিশ

সিলেটে ট্রিপল মার্ডারঃ সিলেটের ট্রিপল মার্ডারের ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা- সেটি খতিয়ে দেখছে নগর পুলিশ। শুধুমাত্র বাবুল মিয়ার প্রেমের ঘটনাই নয়, যেসব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে সব বিষয়ই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এমনটি জানিয়েছেন, সিলেট নগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা। সেজন্য সিনিয়র কর্মকর্তারাও তদন্ত কাজ মনিটরিং করবেন। এদিকে, বাবুল মিয়ার বক্তব্যের বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সিসিটিভি ফুটেজে বাবুল মিয়ার উপস্থিতি, ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া, কথা মতো ছুরি উদ্ধার হওয়া, ড্রয়ার থেকে নেয়া টাকা ভাড়া হিসেবে পরিশোধ করা- সবই ঘটনার ধারাবাহিকতায় মিলে গেছে। সিলেট মেট্রোপলিন পুলিশের এডিসি (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, মামলার অনেক বিষয় রয়েছে। তার সঙ্গে জমি বিরোধে অনেকের মামলা চলমান ছিল বা হুমকি দেয়ার বিষয়টি আমাদের নলেজে রয়েছে। সেগুলো তদন্ত করে দেখবো।’ তিনি বলেন, ‘ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইলের সিডিআরসহ অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে দেখেছি, বাসায় কিন্তু ওই সময় অন্য কেউ প্রবেশ করেনি।

আর আলমারি তছনছ করার বিষয়টি হচ্ছে, বাবুল যখন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে হাত ধুয়ে ড্রয়ারগুলো খোলা দেখেছে, সেখান থেকে সে কিছু টাকা নিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, ওই টাকাগুলো সে দীর্ঘদিনের জমানো বাসা ভাড়া পরিশোধ করেছে।’ বুধবার সকালে সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলায় গলা কেটে খুন করা হয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও কাজের মেয়ে তাহমিনাকে। ঘটনার পর বিকালে পুলিশ এ ঘটনায় বাবুল মিয়া নামের এক রংমিস্ত্রিকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাকালীন সিসিটিভি ফুটেজে তার উপস্থিতি ছিল। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানায়, কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সূত্র ধরে সে ওই বাসায় যায়। এরপর একেক করে তিনজনকে ধারালো ছুরি দিয়ে খুন করে পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনায় ছুরিও উদ্ধার করেছে। আলোচিত এ ঘটনার লোমহর্ষক দৃশ্য উঠে এসেছে ময়নাতদন্তে। নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী ও কাজের মেয়েকে।

এর মধ্যে কাজের মেয়ে তাহমিনার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রায় ১৬-১৭টি ছুরিকাঘাত ছিল তার দেহে। আব্দুস সাত্তার ও তার স্ত্রী সুরাইয়ার শরীরেও ছিল আঘাতের পর আঘাত। এসব আঘাতে রক্তক্ষরণে তারা ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের আমেরিকান প্রবাসী ছেলে আসিফ ইফতেখারের কাছে লাশ বুঝিয়ে দেয়া হয়। পিতা-মাতার মৃত্যু সংবাদ শুনে আসিফ ইফতেহার বৃহস্পতিবার বিকালেই সিলেট এসে পৌঁছান। সঙ্গে তার বোনরাও আসেন। গতকাল বিকালে সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দানে জানাজা শেষে তাদের মরদেহ মানিকপীর (র.) গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। নামাজে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন- রাষ্ট্রদূত ও সিনিয়র সচিব মুশফিকুল ফজল আনসারী, সিলেট নগর প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, নগর বিএনপি’র সভাপতি নাসিম হোসাইনসহ সর্বস্তরের মানুষ। জানাজার নামাজের পূর্বে বক্তৃতায় সিটি প্রশাসক বলেন, এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে কিনা সেটি পুলিশ খতিয়ে দেখবে। এ ছাড়া তিনি মামলার দ্রুত বিচার কামনা করেন।

এর আগে গতকাল বাদ জুমা বৃহত্তর মিতালী, টিবি গেট এলাকাবাসীর উদ্যোগে টিবি গেট এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তব্যে মওদুদুল হক মওদুদ বলেন, বাবুলের প্রেমের ঘটনায় এ ঘটনা ঘটতে পারে- সেটি বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। সত্য উদ্‌ঘাটনে ভিন্নখাতে ডাইভার্ট করা হচ্ছে কিনা, তা দেখা দরকার। এলাকার মুরুব্বি আলিমুস সাদাত বলেন, ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা- সে প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। ভালো করে বিষয়টি তদন্ত প্রয়োজন। তাঁতীদলের জেলার সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বেলাল বলেন, এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবো। আরেকজনের উপস্থিতি: সিলেটের ওই বাসায় ঘটনার সময় আরও এক ব্যক্তির উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকার মানুষ। ২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা গেছে, খুনের ঘটনার সময় এক ব্যক্তি সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। তবে আদৌও ওই ভিডিওটি ঘটনার সময়ের কিনা, তা নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ। নগর পুলিশের ডিসি (উত্তর) সাইফুল ইসলাম গতকালও বলেছেন, ঘটনার সময় ওই বাসায় বাবুল ছাড়া আর কারও উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মোবাইল ট্র্যাকিং করে তারা এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।

ঘটনার পর বাগানে চলে যায় বাবুল: ঘটনার পর বাগানে চলে যায় বাবুল মিয়া। সেখানে গিয়ে মাদকসেবন করেন। তার বাসার কেয়ারটেকার রিয়াজ এ নিয়ে গণমাধ্যমকেও বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, বাবুলের কাছে টাকা পাবেন- এজন্য তাকে বার বার ফোন দেয়া হচ্ছে। প্রথমে জানায় শাহী ঈদগাহে যাবে। পরে বলে বাগানে। এরপর এসে টাকা দেয়। ওই সময় তার হাতের আঙ্গুলে ব্যান্ডেজ দেখেছেন বলে জানান তিনি। 

অন্তরালের রহস্যও খুঁজছে নগর পুলিশ

Thursday, March 19, 2026

পাথরের গ্রামে এখন মাঠভরা ফসল, পুকুরভরা মাছ, সব কৃতিত্ব মনিরের by সুমনকুমার দাশ

প্রকাশ ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ দিগন্তজোড়া হলুদ শর্ষে ফুল আর শাকসবজির বাগান। ডানে-বাঁয়ে বাতাসে দোল খাচ্ছে গম, ধান, ভুট্টা গাছের সবুজ পাতারা। খেতঘেঁষা এক ঘরে ওড়াওড়ি করছে কবুতর। পাশেই দুই পুকুরে লাফাচ্ছে মাছ। খামারে হাম্বা হাম্বা করছে গরু। কাছের এক ঘরে উৎপাদিত হচ্ছে জৈব সার।

সমন্বিত আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির এই দৃশ্য দেখা গেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে। দেশের বৃহত্তম পাথরকোয়ারি ভোলাগঞ্জ–সংলগ্ন এ গ্রামের মানুষ কয়েক বছর আগেও পাথরকেন্দ্রিক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁরা আমন ধান ছাড়া কিছুই চাষ করতেন না। এখন গ্রামটিতে রীতিমতো সবুজের বিপ্লব চলছে। এর নায়ক মো. মনিরুজ্জামান। তাঁর দেখানো পথেই গ্রামের প্রায় সবাই চাষাবাদে এগিয়ে এসেছেন।

৪০ ছুঁই ছুঁই মনিরুজ্জামানের বাড়ি উপজেলার পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়নের কালীবাড়ি গ্রামে। বাড়ির পাশেই পাথরকোয়ারি। আশপাশের অনেকের মতো তিনিও ছিলেন পাথর ব্যবসায়ী। স্থানীয় পাথর কেনার পাশাপাশি তিনি পাথর আমদানিকারকও ছিলেন। ২০১৮ সালে যখন সরকারি নির্দেশনায় কোয়ারির পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে পড়ে, তখন অনেকের মতো তিনিও বেকার হয়ে পড়েন। তাঁর বন্ধুবান্ধব আর পরিচিতজনেরা কাজের আশায় যেতে থাকেন ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে। মনিরুজ্জামান কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না।

ঘরে স্ত্রী আর ছোট তিন সন্তান। তাদের ফেলে রেখে প্রবাসী হওয়ার বিষয়টিও মনিরের মনে সায় দিচ্ছিল না। ওই সময়টাতে একদিন কালীবাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরের রাধানগর গ্রামে যান। সেখানে দেখেন, বিঘার পর বিঘা অনাবাদি জমি। এসব জমি চাষাবাদের আওতায় আনার পরিকল্পনা তাৎক্ষণিক তাঁর মাথায় আসে। যেই ভাবা, সেই কাজ। কয়েক দিনের মধ্যে কিছু জমি কিনে আর কিছু জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন চাষাবাদ।

শুরুর দিকটায় রাধানগর গ্রামের বাসিন্দারা মনিরের কাজকে ‘অসাধ্য ও পাগলামি’ বলে মনে করতেন; কিন্তু পরিশ্রম আর একাগ্রতায় অসাধ্য সাধন করেন তিনি। এখন ‘পাথরের পৃথিবী’খ্যাত সীমান্তবর্তী রাধানগর গ্রামে ফোটালেন ফুল, ঘটালেন সবুজের বিপ্লব। স্বপ্ন এখন তাঁর হাতের মুঠোয় বন্দী। স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ পেরিয়ে তিনি এখন চাইছেন, রাধানগর গ্রামটি কৃষিজ আর প্রাণিজ সম্পদের এক আধারে পরিণত করবেন।

শুরুর গল্প

শুরুটা ২০১৯ সালে। রাধানগর গ্রামে তিনি পরিত্যক্ত একটা দোতলা বাড়ি কম দামে কেনেন। আটটি কবুতর কিনে সে বাড়িতে তৈরি করেন খামার। কিছুদিন পর সিলেটের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে কম টাকায় কেনেন মিসরীয় ফাউমি মুরগি। ধীরে ধীরে তাঁর পসার বাড়ে। এরপর কেনেন গ্রামের কিছু অনাবাদি জমি। বর্গাও নেন কিছু পরিত্যক্ত পতিত জমি। সেসব জমিতে ধানের পাশাপাশি শুরু করেন শাকসবজির ফলন।

প্রথম বছরেই সাফল্য আসে। মনিরুজ্জামানের উৎপাদিত শাকসবজি কিনতে পাশের হাটবাজার থেকে পাইকারেরা আসেন। মুখে মুখে সে খবর রটে। চাহিদা বাড়ে তাঁর মুরগি আর সবজির। পরের বছর আরও অনাবাদি জমির ইজারা নেন। সেখানে শর্ষে, গম, ভুট্টা, লালশাক, ঝিঙা, মিষ্টিকুমড়া, লাউ, আলু, খিরা, শসা, সূর্যমুখী, রসুন, পেঁয়াজসহ নানা সবজি ফলান। বস্তার মধ্যে উৎপাদন করেন আদা। এ ছাড়া আমনের পাশাপাশি আউশ ও বোরো ধানের আবাদও করেন। তাঁর হাত ধরে যেন সোনা ফলে। সব চাষেই ধরা দেয় অভাবনীয় সাফল্য।

মনিরকে সাফল্যের নেশায় পেয়ে বসে। কৃষিতে সাফল্য পেয়ে তৈরি করেন গরুর খামার। সেখানেও পান সফলতা। এরপর প্রায় মরা দুটি পুকুর খনন করে মাছের পোনা ছাড়েন। কয়েক মাস যেতেই তাঁর পুকুরজুড়ে লাফালাফি করতে থাকে হাজারো কার্ফু, ব্রিগেড, রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, গ্রাস কার্প। মাছ যত লাফায়, মনিরের মুখের হাসি তত চওড়া হয়। এখন তো উপজেলা ছাড়িয়ে জেলায়ও তিনি এক আদর্শ চাষি হিসেবে সুপরিচিত। এরই স্বীকৃতি মেলে ২০২৫ সালে। সেবার তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাঁকে দিয়েছে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। সবাইকে ডিঙিয়ে তিনি হয়েছেন প্রথম।

পুকুর ভরা মাছ, গোয়াল ভরা গরু

যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সফলতা পেয়েছেন মনির। তিনি বলেন, এখন দুটি পুকুরে তিনি মাছের চাষ করছেন। এসব মাছ পাইকারি দরে ব্যবসায়ীরা এসে কিনে নিয়ে যান। মাছের ব্যবসায় লাভ বেশি। অল্প দামে পোনা কিনে পুকুরে ছেড়ে দিলে পরে বেশি দামে বেচা যায়। এ জন্য কয়েক দিন আগে আরেকটি পরিত্যক্ত পুকুর খনন করেছেন। কিছুদিনের মধ্যে সেখানেও মাছ চাষ শুরু করবেন।

মনির বলেন, তিনি কিছুদিন আগে পুকুরে ১৬ হাজার টাকার মাছের পোনা ছেড়েছিলেন। এরই মধ্যে ওই পোনা কেনার সমপরিমাণ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। পুকুরে আরও এক লাখ টাকার বেশি মাছ আছে। মাছের ব্যবসা লাভজনক হওয়ায় তিনি রেণু পোনা উৎপাদনও শুরু করবেন। এসব রেণু পোনা তাঁর পুকুরে ছাড়ার পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির পরিকল্পনাও তাঁর আছে।

বর্তমানে তাঁর খামারে ১০টি গরু আছে। এসব গরুর দুধ আশপাশের এলাকায় বিক্রি হয়। এ ছাড়া বড় পরিসরে ৮ শতাংশ জায়গার মধ্যে একটি খামার তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে আছে। দ্রুতই এখানে আরও গরুর পাশাপাশি ছাগল পালনও শুরু করবেন। এসব গরু, ছাগল পাইকারি দরে বেচবেন।

‘ক্ষেতে-ক্ষেতে ঝরিতেছে’ ফসল

এক বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেছে, রাধানগর গ্রামটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। ওপাশে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি। ওই চেরাপুঞ্জির আকাশ আর পাহাড়ের সম্মিলন পেরিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে নৈসর্গিক পরিমণ্ডলে রাধানগর গ্রামের অবস্থান। গ্রামের যেখানে শেষ, এর পরেই মনিরুজ্জামানের কৃষিজমি শুরু।

গ্রামের শেষ সীমানার মেঠো রাস্তায় দাঁড়িয়ে মনিরুজ্জামান দেখান তাঁর কৃষিজমি। জানান, প্রায় ৬০০ শতাংশ জায়গায় তিনি নানা ধরনের ফসল উৎপাদন করছেন। আমন, আউশ ও বোরো ধান চাষের পাশাপাশি অন্তত ২০ প্রজাতির সবজি ফলাচ্ছেন। এক দিনের জন্যও কোনো জমি অনাবাদি রাখছেন না। ধান কাটা শেষ হলেই পরদিন ওই জমিতে শাক কিংবা শসার বীজ ফেলছেন, আবার শর্ষে কাটার পরদিনই বুনছেন অন্য কোনো ফসল। যখন যে কৃষিপণ্য উৎপাদনের সময়, তখনই তিনি সেটিই ফলাচ্ছেন।

পানির তীব্র সংকটের কারণে শুরুর দিকটায় চাষাবাদ খুব মুশকিল ছিল বলে মনিরুজ্জামান জানান। তিনি বলেন, ‘পানি ছাড়া চাষাবাদ কঠিন। রাধানগর গ্রাম থেকে নদীও অনেক দূরে। ২০২৩ সালে সরকারি উদ্যোগে এখানে মাটির নিচ থেকে পানি উত্তোলনের একটি সংযোগ চালু করে। ওই সংযোগ থেকে আটটি সাব-সংযোগ আশপাশের জমিতে নেওয়া হয়। যেহেতু আমার দেখাদেখি এখন অনেকেই পতিত জমি আবাদের আওতায় নিয়ে আসছেন, ফলে এসব চাষিও এখন ওই পানি ব্যবহার করে ফলন ভালোভাবে করতে পারছেন।’

মনির একই জমিতে একসঙ্গে একাধিক ফসল ফলানোর চেষ্টা করছেন। ভুট্টার পাশাপাশি লালশাক করেছেন। এখন এক বিঘা জমিতে ধানের পাশাপাশি একই সঙ্গে কলা গাছও রোপণ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এ ছাড়া আগামীতে কুল ও পেয়ারাসহ নানা ধরনের ফলের আবাদের চিন্তা আছে তাঁর।

আরও যত সফলতা

সবজি, মাছের চাষ বা গরু, কবুতর ও মুরগির খামার ছাড়াও অনেক কাজে সফলতা পেয়েছেন মনির। তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কোম্পানীগঞ্জের সহায়তায় ৩ শতাংশ জায়গায় ভার্মি কম্পোস্ট (জৈব সার) উৎপাদন করছেন। মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এক বছর আগে এ উদ্যোগ নেন তিনি।

মনিরুজ্জামান বলেন, গত এক বছরে তিনি চারবার জৈব সার উৎপাদন করেছেন। জমিতে জৈব সার ব্যবহার করায় তাঁর ফলন বেড়েছে। বিষমুক্ত এ সার ব্যবহারের কারণে তাঁর উৎপাদিত শাকসবজি ও কৃষিপণ্যের চাহিদাও পাইকারি ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া নিজের জমিতে ব্যবহারের পর অতিরিক্ত সার তিনি গ্রামের অন্য চাষিদের কাছে বিক্রি করছেন। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে জৈব সার বিক্রির জন্য তিনি উৎপাদন আরও বাড়াবেন বলে ভাবছেন।

ছোট একটি অটো রাইসমিলও বসিয়েছেন মনির। এখানে ধান থেকে চাল করার পাশাপাশি ভুট্টা, গম, হলুদ, মরিচ ও জিরাগুঁড়া করেন। রাধানগর গ্রামসহ আশপাশের মানুষেরা অল্প টাকায় এ মিল ব্যবহার করেন। এ ছাড়া শর্ষে থেকে তেল করার জন্য ছোট একটি মেশিনও আছে তাঁর। এর বাইরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ভর্তুকি মূল্যে আধুনিক বেশকিছু কৃষি যন্ত্রপাতি কিনেছেন। কিছু যন্ত্রপাতি সরকারিভাবে বিনা মূল্যে পেয়েছেন। সেসব তিনি গ্রামবাসীকেও ব্যবহার করতে দিচ্ছেন।

আলোর দিশা পেলেন অন্যরাও

রাধানগর গ্রামের একাধিক বাসিন্দা বলেন, মনির এক ফসলি জমিকে একাধিক ফসলি জমিতে রূপ দিয়েছেন। সফলতা আসায় তাঁর দেখাদেখি এখন অন্যরাও চাষাবাদে উৎসাহী হচ্ছেন। বিশেষ করে চলতি বছর গ্রামের অনেকে শর্ষে চাষ করেছেন। শতাধিক চাষি অন্তত ১৫ হাজার শতাংশ জমিতে শর্ষে চাষ করেছেন।

রাধানগর গ্রামের কৃষক মো. ইয়াসিন বলেন, তিনি মনিরুজ্জামানকে দেখে উৎসাহিত হয়ে চলতি বছর পাঁচ বিঘা জমিতে শর্ষে আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। কিছুদিনের মধ্যে ফসল কাটবেন। লাভ হলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে শর্ষের পাশাপাশি অন্যান্য সবজি চাষের চিন্তা আছে তাঁর।

মো. এনামুল হক নামের আরেক কৃষক জানান, তিনি ৬০ শতাংশ জমিতে শর্ষে চাষ করেছেন। মনিরুজ্জামানের হাত ধরে কৃষিতে যে সফলতা এসেছে, সেটি এখন রাধানগরসহ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন অনেকেই পতিত জমিকে আবাদের আওতায় নিয়ে আসছেন।

রাধানগর গ্রামের মানুষ জানলেন, একজন আদর্শ কৃষকের পাশাপাশি মনির সমাজকর্মীও। তাঁদের কয়েকজনের অর্থায়নে স্থানীয়ভাবে একটি মসজিদ পরিচালিত হচ্ছে। বেশ কয়েকটা দুস্থ পরিবারের ভরণপোষণও করছেন তাঁরা কয়েকজন। মনিরুজ্জামান কোম্পানীগঞ্জ টুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি। এ ছাড়া সিলেট স্বপ্ন রক্তদান ও সমাজকল্যাণ সংস্থার একজন সদস্য হিসেবে এ পর্যন্ত রক্তদান করেছেন ৪২ বার।

তৈরি করতে চান অ্যাগ্রো রিসোর্ট

আগামী বর্ষার মধ্যে একটি অ্যাগ্রো রিসোর্ট (কৃষি খামার ও পর্যটনের সংমিশ্রণ) তৈরির পরিকল্পনা আছে বলে জানান মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমি নিজের গ্রাম কালীবাড়ি থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে প্রতিদিন সকালে রাধানগরে আসি। দুপুরে বাড়িতে খেতে যাই। পরে বিকেলে আবার আসি। ফিরি সন্ধ্যা সাতটা কিংবা রাত আটটার দিকে। আসলে সীমান্তলাগোয়া এ জায়গার মায়ায় পড়ে গেছি। কী সুন্দর জায়গা!’

মনির বলেন, ‘সামনে তাকালেই মেঘালয়ের সারি সারি সুউচ্চ পাহাড়। বর্ষায় সেই পাহাড়ের চূড়ায় মেঘ ভেসে বেড়ায়। তখন পুরো এলাকাটি অপরূপ সৌন্দর্যে রূপ নেয়। এটি মাথায় রেখেই অ্যাগ্রো রিসোর্ট তৈরি করতে চাই। মানুষ এখানে এসে প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগের পাশাপাশি নির্ভেজাল শাকসবজি, মাছ, মাংস খাবেন। বিশুদ্ধ বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নেবেন। এরই মধ্যে জায়গাও প্রস্তুত করেছি। দ্রুতই রিসোর্ট তৈরির কাজ শুরু করব।’

আক্ষেপহীন সুন্দর জীবন

মনির বলেন, ‘পাথরের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেকেই বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। কেন আমি গেলাম না, এ নিয়ে তখন সাময়িক সময়ের জন্য আক্ষেপ ছিল; কিন্তু এখন আর আক্ষেপ নেই। নির্ঝঞ্ঝাট সুন্দর জীবন আমার। প্রাকৃতিক পরিবেশে মনের আনন্দে নিজের কাজ করছি। বিদেশে গেলে অন্যের দোকানে কাজ করতে হতো, এখন আমার এখানে তিনজন শ্রমিক স্থায়ীভাবে কাজ করছেন। প্রতিদিন সাত থেকে আটজন শ্রমিক অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করছেন। অন্যের কর্মসংস্থানের উপলক্ষ আমি হতে পারছি, এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে?’

বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ভ্রমণ করেছেন জানিয়ে মনির বলেন, ‘দেশ ঘোরা আমার নেশা। প্রতিটি জেলা সফর করেছি। অন্তত ২১টি জেলায় নানা ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদনের বিষয়ে হাতে–কলমে পাঠ নিয়েছি। সেসব আমার চাষাবাদ-পরিকল্পনায় প্রয়োগও করছি। সফলতার এটিও একটি কারণ।’

মনিরুজ্জামানের সাফল্যের প্রশংসা করলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ আনিছুজ্জামান। তিনি বলেন, যে এলাকার সবাই কমবেশি পাথরের ব্যবসা কিংবা উত্তেলনের সঙ্গে জড়িত, সেখানে অনাবাদি জমিকে আবাদের আওতায় এনে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করেছেন মনিরুজ্জামান। পরিত্যক্ত জমিও তিনি চাষাবাদের আওতায় এনেছেন। তাঁর মতো কৃষকই আমাদের আদর্শ। তিনি এখন অনেকেরই অনুপ্রেরণা।

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে সারা বছর অনাবাদি জমিতে ফসল ফলান মো. মনিরুজ্জামান
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রাধানগর গ্রামে সারা বছর অনাবাদি জমিতে ফসল ফলান মো. মনিরুজ্জামান। ছবি: আনিস মাহমুদ

Saturday, January 17, 2026

আট মাস যেভাবে পালিয়ে ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন

গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশেই ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিলেট-১ আসনের এমপি ড. একে আব্দুল মোমেন। ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপিদের মতো তিনিও আত্মগোপনে চলে যান। এরপর দেশের ভেতরেই পালিয়ে ছিলেন ৮ মাস। ধরা পড়ার ভয়ে একাধিকবার বাসা বদল করেছেন। মোবাইল ফোনের সিম বদলিয়েছেন ৬ বার। চেহারায়ও এসেছে আমূল পরিবর্তন। রেখেছেন দাড়িও। এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। এক বছরের অধিক সময় তিনি অন্তরালে ছিলেন। খোঁজ-খবর কেউ জানতেন না। সম্প্রতি তিনি নিজেই মিডিয়ার সামনে হাজির হয়েছেন। স্বভাব ভঙ্গিতেই জানিয়েছেন দেশে পালিয়ে থাকার ঘটনা। তবে কীভাবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র্রে পৌঁছালেন সেটি বলেননি। নিজেই জানিয়েছেন; এখনো সে ঘটনা বলার সময় আসেনি। এ নিয়ে রহস্যও জিইয়ে রাখলেন। যুক্তরাষ্ট্র্রে থাকা এক বাংলাদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে তিনি ভার্চ্যুয়াল মিডিয়ায় কথা বলেন। ওই ইন্টারভিউতে ড. মোমেন বলেছেন; গণ-অভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী সময়ে তিনি আমেরিকাতেই ছিলেন। সেখান থেকে কয়েক দিন আগে দেশে ফিরেন। আর তিনি আসার পরপরই গণ-অভ্যুত্থান হয়। ফলে তাকেও অন্যদের মতো আত্মগোপনে যেতে হয়েছে। প্রশ্ন করা হয়েছিলো কীভাবে তিনি দেশ ছেড়েছেন। সে প্রশ্নের উত্তর তিনি দেননি। তার আগে দেশের ভেতরে পালিয়ে থাকার কিছুটা বর্ণনা দিয়েছেন। বলেন- ‘এটা একটা সিনেমা হতে পারে। সুন্দর মুভি হবে। আই ওয়াজ দ্য লাস্টম্যান টু লিভ দ্য কান্ট্রি। আমি কোনো অন্যায় করিনি। কাউকে কোনোদিন জেলে পাঠাইনি। কোনো চুরি-চামারি করিনি। সো আই ওয়াজ কনফিডেন্ট। আমি কেন পালাবো? কিন্তু যখন কর্নেল সাব আমাকে ফোন করে বললেন; স্যার উই উইল প্রটেক্ট ইউ। তখন আমার সবাই বললো- স্যার আপনার নাম্বার পেয়ে গেছে। এখান থেকে পালান।’ ড. একে মোমেন জানান- ‘আমি কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাইনি। আমার সব আত্মীয়-স্বজন পাবলিকলি নোন। আমি অন্যান্য লোকের যেমন রেন্ট হাউসের বাড়িতে ছিলাম। এইটা আমার খুব কাজ দিয়েছে। এক বাসার মালিকের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো। সেই মালিককে আমি জিজ্ঞেস করলাম; আপনার এগুলো তো সুন্দর। উনাকে আমি আগে চিনতাম। উনি এসে বললেন; আমরা গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। হোটেলে আমাদের বায়ারকে রাখি না। বাসায় রাখি। এজন্য বাসা সুন্দর করে রাখি। এখন যেহেতু দেশে কোনো বায়ার আসতেছে না, কেউ আসলে সিঙ্গাপুর কিংবা ব্যাংকক পর্যন্ত আসে। ঢাকায় ভয় পায় আসে না। সেজন্য সব খালি। তার জন্য আপনি ভাড়া পাচ্ছেন।’ পালিয়ে থাকা বিবরণ তুলে ধরে ড. মোমেন জানান- ‘আমি পালিয়ে পালিয়ে ছিলাম। যাতে বাইরে কেউ না চিনতে পারে মব’র জ্বালায় সেজন্য চেহারা-টেহারা সব পরিবর্তন করে ফেলেছি। যখন নাপিতের কাছে গেলাম। এক বাসায় গেলাম সার্টেন টাইমে। ওই বাসায় এক নাপিত এলো। সেটি আমার বাসা না। আরেকজনের বাড়িতে। যাতে ওই নাপিত কাউকে বলতে পারে না কোথায় আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে। এটা লং স্টোরি। বহুত কষ্ট করে বের হয়েছি। আমার বউয়ের প্রেসারে ও উনার বুদ্ধিতে বের হয়েছি। এই যে বের হইছি কিছু জানি না। কারণ আমি তো ফোনে কথা বলতে পারি না।  সি মেক দিস এরেঞ্জমেন্ট। দেশে অনেক ফড়িয়া আছে আপনাকে বিদেশ পাঠানোর জন্য। ওগুলো সবগুলোই মানি মেকিং। শুধু টাকা নেয়। আমি জীবিত আছি। আর মানুষের দোয়া। বহু লোক আমার জন্য দোয়া করেছে। ওমরাহ্‌ হজ করেছে। আমি তো অনেককেই চিনি না। বাট ডিড ইট।’ প্রশ্ন করা হয়েছিলো বাই এয়ারে সরাসরি শাহ্‌জালাল থেকে এসেছেন না অন্য কোনো বিমানবন্দর থেকে? জবাবে ড. মোমেন জানান- ‘না না বিমানবন্দর তো আপনি যেতেই পারবেন না। ধারে কাছেও না। এটা পালাইয়া আসছি। কীভাবে বিভিন্ন ভাবে পালিয়ে আসছি। বলা যাবে কোনো এক সময়। এখনো বলতে চাচ্ছি না। কারণ- সরকারি লোকরাই আমাকে সাহায্য করেছে।’ কথা শেষে ডক্টর মোমেন জানান- ‘আমরা সাদাসিধে মানুষ। দেশটাকে বাঁচাতে হবে। দেশটাকে জঙ্গি দেশ বানাতে চাই না। এ ব্যাপারে সবার উদ্যোগ নেয়া দরকার।’
mzamin

Saturday, January 10, 2026

কানাইঘাটে লোভাছড়ার পাথর লুটের মহোৎসব by মুফিজুর রহমান

সিলেটের কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী এলাকার লোভাছড়া কোয়ারিতে পাথর লুটের মহোৎসব চলছে। একটি চক্র দিনে ও রাতে লুট করে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকার পাথর। একইসঙ্গে যন্ত্রদানব ক্রাশার মিল দিয়ে ভেঙে পাথরগুলো বিক্রি করছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। লোভাছড়া কোয়ারির পাথর ইজারাদার অংশের লোকজন সম্প্রতি পাথর লুটের অভিযোগ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে করে প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন। ইজাদার পিয়াস ইন্টারপ্রাইজ গত বছর লোভাছড়া থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত প্রায় ৪৫ লাখ ঘনফুট পাথর নিলামে কিনে নেয়। সরকারের দপ্তরের হিসাব বলছে; নদীতে পানি শূন্যতাসহ নানা কারণে পিয়াস এন্টারপ্রাইজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ২০ লাখ ঘনফুট পাথর সরিয়ে নিতে পেরেছে। এখনো তাদের প্রায় ২৫ লাখ ঘনফুট পাথর লোভায় রয়ে গেছে। এ নিয়ে তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলে আদালত তাদের পাথর সরিয়ে দেয়ার অনুমতি দেন। পরবর্তীতে খনিজ ব্যুরো আপিল করলে এখনো সেটি শুনানি হয়নি। এই অবস্থায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা তমিজ উদ্দিনের নির্দেশে লোভায় পাথর লুটপাট করা হচ্ছে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। তারা জানিয়েছেন- তমিজের সঙ্গে কামাল হাজী, ময়নুল মেম্বার, সায়েক মেম্বার, আলমগীরসহ কয়েকজন এ লুটের সঙ্গে জড়িত। তারা পাথর লুট করে এনে নিজেদের ক্রাশার মিলে ভেঙে সেগুলো বিক্রিও করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন দপ্তরে দেয়া আবেদনে পিয়াস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কামরুল হাসান জানিয়েছেন- লোভাছড়া একটি দুর্গম ও নদী বেষ্টিত দুর্গম অঞ্চল। চাইলেই মালামাল অপসারণ করা যায় না। ইতিমধ্যে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো কর্তৃক আমাদের মাল অপসারণ বন্ধে আদেশ জারি করলে, আমরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হই এবং মহামান্য আদালত আমাদের ৩ মাস, ৯০ দিনের সময় দেন। তথাপি আপনাদের অফিসের রিভিউর কারণে মামলাটি এখনো বিচারাধীন পর্যায়ে আছে। কিন্তু বর্তমানে প্রশাসন ম্যানেজ করে ভাল্লুকমারা ও জকিগঞ্জের আটগ্রাম এবং চিন্তার বাজার বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার পাথর প্রতি রাতে চুরি হয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে মিডিয়ায় প্রভাবশালী মহলের কারণে তেমন একটা খবর প্রচার হতে পারছে না এবং একাধিকবার মৌখিকভাবে পুলিশ ও ইউএনও অফিসে জানিয়ে কোনো লাভ হচ্ছে না। ৩০ থেকে ৫০ গাড়ি প্রতিদিন ও মাঝে মাঝে বড় কন্ট্রাকের মাধ্যমে ১০০ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বার্কি নৌকা দিয়ে ও প্রশাসন ম্যানেজ করে মালামাল নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে কানাইঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন- তার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। বিষয়টি তার জানাও নেই। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান। কানাইঘাট থানার ওসি আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন- তিনিও অভিযোগ পাননি। যদি পাথর লুট হয়ে থাকে এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান।
mzamin

Monday, October 20, 2025

বিদায়ী ডিসি যেমন ছিলেন by ওয়েছ খছরু

তীব্র বিতর্কের মুখে সিলেট ছাড়ছেন বিদায়ী ডিসি মুহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ। তাকে নিয়ে জল্পনার অন্ত নেই সিলেটে। কেন তিনি রক্ষা করতে পারেননি সাদাপাথর?- এ প্রশ্ন সর্বত্র। তার আমলেই সিলেটে বালু ও পাথর লুটে রেকর্ড হয়েছে। চোখের সামনে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রাকৃতিক সম্পদ লুটে নিয়েছে খেকোরা। নির্বিচারে পরিবেশ ধ্বংস করা হয়েছে। এ নিয়ে জনগণের মধ্যে হা-হুতাশ দেখা দিলেও কার্যত প্রশাসন ছিল নির্বিকার। আর সব কিছুর জন্য দায়ী করা হচ্ছে মাহবুব মুরাদকে। তার আমলে সিলেটের বালু ও পাথর যেভাবে লুট হয়েছে অতীতে কখনোই তা হয়নি। এজন্য শুধু প্রত্যাহারই নয়, তদন্তের মাধ্যমে ডিসি মুরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি উঠেছে। এক বছর আগে ক্রান্তিকালে সিলেটের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন মুহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ। যোগদান করেই তিনি বালু ও পাথর লুটে কড়াকড়ি  দেখিয়েছিলেন। আর এই কড়াকড়ির কারণেই তার হাতের মুঠোয় চলে আসে সব সিন্ডিকেট। একে একে সবাই এসে ধরা দেন তার হাতের মুঠোয়।

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- ডিসি সিলেটে যোগদান করেই বালুমহালগুলো ইজারা দেয়া শুরু করেন। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি বালু ও পাথরখেকোদের সঙ্গে আঁতাত করেই ইজারা দেন। কমপক্ষে ৫-৬টি বালুমহাল তিনি ইজারা দেন।  শেষ পর্যায়ে তিনি ইজারা দেন কোম্পানীগঞ্জের বালুমহাল। এই মহালটি গত বছরও দেয়া হয়েছিল। প্রায় ১০ কোটি টাকার বিনিময়ে দেয়া এই বালুমহাল ইজারা নিয়ে স্থানীয় ভাবে আপত্তি ছিল। এ নিয়ে একাধিকবার স্থানীয়দের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে মৌখিক ও লিখিত ভাবে আপত্তি জানানো হয়। এই আপত্তি ডিসি মুরাদ অগ্রাহ্য করেন। সর্বশেষ  কোম্পানীগঞ্জের বালুমহালের ইজারার অংশ থেকে কালাসাদেক মৌজা বাদ দিতে অনুরোধ জানানো হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- কালাসাদেক মৌজার অবস্থান হচ্ছে সাদাপাথরের মুখ পর্যন্ত। ফলে কোয়ারি এলাকায় লুটপাট বন্ধ করতে হলে কালাসাদেক মৌজা ইজারার বাইরে রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু জেলা প্রশাসন থেকে যে লিজ দেয়া হয়েছে সেখানে কালাসাদেক মৌজাকে বাদ দেয়া হয়নি। ফলে শেষ মুহূর্তে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

গতকাল ভোলাগঞ্জ, গুচ্ছগ্রাম, কালাইরাগ, কালীবাড়ি সহ কয়েকটি এলাকার লোকজন জানিয়েছেন- ইজারার ভেতরে কালাসাদেক মৌজা থাকার কারণে বালুখেকোরা সাদাপাথর এলাকা পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। ইজারা থাকায় সাদাপাথরের গা ঘেঁষেই তারা বৈধভাবেই বালু উত্তোলন করে। জুলাই মাসের শেষদিকে টানা বৃষ্টিতে যখন ঢল নামে তখন সাদাপাথরে পানি বেড়ে যায়। বৃষ্টি থাকায় পর্যটকরাও কম যান। আর এই সুযোগে বালুর সঙ্গে পাথর লুট শুরু করে। টানা দুই সপ্তাহের লুটে শূন্য করা হয় সাদাপাথরকে। মিডিয়ায় আসায় লুটপাট নিয়ে দেশ জুড়ে তোলপাড় শুরু হলেও তখন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ নীরব থাকেন। হৈচৈ শুরু হওয়ার পর অ্যাকশনে নামে প্রশাসন। আর পাথর লুটের ঘটনার জন্য সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে সিলেটের প্রশাসনকে।

তবে জেলা প্রশাসক মাহবুব মুরাদ পাথর লুটের ঘটনায় নিজের ব্যর্থতার দায় নিতেও রাজি হননি। পাথর লুটের কয়েক দিন পর তিনি যখন সাদাপাথর পরিদর্শনে যান তখন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সেখানে তিনি জানিয়েছেন- প্রশাসন ব্যর্থ নয়। লুট বন্ধে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল সেগুলো কার্যকর হয়নি। এতে প্রশাসনের ভুল ছিল না বলে তিনি মন্তব্য করেন। শুধু সাদাপাথরই নয়, পাশেই রেলওয়ের সংরক্ষিত সম্পত্তি ‘বাঙ্কার’। স্বাধীনতার পর থেকে বাঙ্কার এলাকা নিরাপদ ছিল। কিন্তু এবার আর নিরাপদ থাকেনি বাঙ্কার। ওখান থেকে শতকোটি টাকার পাথর লুট করা হয়েছে। স্থাপনা ভাঙচুর করার কারণে রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ওই এলাকায় নির্ধারিত বাসস্থানে বসবাস করতে পারেননি। তারা দূরবর্তী একটি স্কুলে অবস্থান করেন। আর এই সুযোগে পাথরখেকোরা গোটা বাঙ্কার এলাকা লুট করেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- বাঙ্কার ছাড়াও কোয়ারি এলাকার কালাইরাগ, কালীবাড়ি, কলাবাড়ি সহ কয়েকটি এলাকায় রীতিমতো পাথর হরিলুট চলেছে। এসব পাথর লুট বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখা হয়নি।  লোকবলের দোহাই দিয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন গা ভাসিয়ে দিয়েছিল স্রোতের তালে। আর ইউএনও আজিজুন্নেছারও ছিল রহস্যময় নীরবতা। ফলে কোম্পানীগঞ্জের শারপিনটিলা, সাদাপাথর সহ কয়েকটি এলাকায় লুট ঠেকানো সম্ভব হয়নি। গত দুই মাস ধরে আলোচনায় ছিল সিলেটের গোয়াইনঘাটের রয়্যালিটি ঘাট। জৈন্তাপুরের সারি-১ বালুমহালের ইজারাদার কামরুল ইসলামের পক্ষে ঘাট বসিয়েছিল গোয়াইনঘাটের আলোচিত বালুখেকো স্ট্যালিং তারিয়াং, জাহিদ খান, জিয়ারত খান সহ কয়েকজন।  গোয়াইনঘাট সদরে ঘাট বসানোর কারণে বর্ষায় মৌসুম পুরোটাই জাফলংয়ে অবাধে লুটপাট চালিয়েছে বালুখেকোরা। এ নিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসককে একাধিক অভিযোগ দেয়া হলেও কোনো কাজ হয়নি। উল্টো লেঙ্গুরা গ্রামের প্রতিবাদকে পুঁজি করে বালুখেকোদের পক্ষ নিয়ে প্রশাসন সাধারণ মানুষকে নির্যাতন করে।

‘টাঙ্গাইল সিন্ডিকেট’ গোয়াইনঘাটের একটি আলোচিত সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে ডিসি মাহবুব মুরাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠে। বালুখেকো জাহিদ খান ও জিয়ারত খানের সঙ্গে ডিসি’র সরাসরি যোগাযোগ ছিল। তাদের দাপট এতটাই বেশি ছিল জাফলংয়ে সফরকালে দুই উপদেষ্টার গাড়িবহর জাহিদ খানের নেতৃত্বে পথরোধ সহ নানা ঘটনা ঘটানো হয়। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে বালুখেকোরা একের পর এক মামলা দিয়ে বিপর্যস্ত করে গোয়াইনঘাট বিএনপি’র ত্রাণ বিষয়ক সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন তালুকদারকে। রিয়াজ জানান, বালু লুটপাটের প্রতিবাদ করার কারণেই ওসি তোফায়েল ও বিট অফিসার এসআই উৎসবের ইন্ধনে একের পর এক তাকে মামলার আসামি করা হয়। গোয়াইনঘাট সদরে ইজারাঘাট বসানোর বিষয়ে সারি-১ এর ইজারাদার কামরুল ইসলাম মাসখানেক আগে মানবজমিনকে জানিয়েছিলেন- প্রশাসনের মৌখিক অনুমতির প্রেক্ষিতে তারা জৈন্তাপুরের পরিবর্তে গোয়াইনঘাটে ইজারাঘাট বসিয়েছেন। তবে জাফলং লুটের ঘটনা তিনি অস্বীকার করেন। এদিকে- গতকাল জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে প্রত্যাহারের ঘটনায় স্বস্তি ফিরেছে সিলেটে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কীম জানিয়েছেন- বালু ও পাথর লুট বন্ধে অযোগ্য ও অদক্ষতা দেখিয়েছেন বিদায়ী জেলা প্রশাসক। প্রাকৃতিক সম্পদের তিনি যে ক্ষতি করে গেছেন এর জন্য তার বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক বিভাগীয় ব্যবস্থা  নেয়া উচিত। দৃশ্যমান কিছু না হলে পাথরখেকোরা পিছু হটবে না বলে জানান তিনি। বেলা’র সিলেটের সমন্বয়ক এডভোকেট শাহ সাহেদা আক্তার জানিয়েছেন- বালু ও পাথর লুটে জেলা প্রশাসকের অঘোষিত বা অলিখিত সমর্থন ছিল। এজন্যই বালু ও পাথর লুটের ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন- আইনিভাবে কী করা যায় সেটি আমরা চিন্তাভাবনা করছি। তবে বর্তমানে প্রশাসন থেকে কাগজপত্র দিয়ে সহযোগিতা করা হয় না বলে অভিযোগ করেন তিনি। সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন- জেলা প্রশাসক সহ যারা ব্যর্থ হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। যদি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তাহলে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করতে সাহস পাবে না।

সিলেটের ডিসি পদে নিয়োগ পেলেন সারওয়ার আলম: সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন প্রশাসনের আলোচিত কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম। উপ-সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা সারওয়ার আলম বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল তাকে সিলেটের ডিসি নিয়োগ দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। সারওয়ার আলম র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আলোচিত ছিলেন।

mzamin

Monday, October 6, 2025

কঠোর অভিযানের মধ্যে কৌশলে পাথর ‘লুট’ by সুমনকুমার দাশ

নদীতে বড় বড় নৌযান সারিবদ্ধভাবে নোঙর করা, যা ‘বাল্কহেড’ নামে পরিচিত। শত শত শ্রমিক নদীর পাড়ে জমা করে রাখা পাথর টুকরিতে ভরে সেই সব নৌযানে ওঠাচ্ছেন। কাছেই নদীতে চলছে খননযন্ত্র (এক্সকাভেটর), যা দিয়ে পানির নিচ থেকে পাথর ওঠানো হচ্ছে।

সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় পাথর লুটকারীদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের মধ্যেও এই দৃশ্য দেখা গেল কানাইঘাট উপজেলার লোভা নদীতে। লোভা নদী সীমান্তের ওপার থেকে এসে সুরমায় মিশেছে। এই নদীতেও পানির স্রোতের সঙ্গে ওপার থেকে পাথর আসে।

লোভা নদীর বাংলাদেশ অংশের শুরুতে একটি পাথর কোয়ারি (যেখানে পাথর উত্তোলন করা হয়) রয়েছে। সেই কোয়ারিতে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাথর উত্তোলন করা যেত। তারপর সরকার আর কোয়ারি ইজারা দেয়নি, মানে হলো পাথর তোলা নিষিদ্ধ। তবে নিলামে বিক্রি করা পাথর স্থানান্তরের নামে এখন সেখানে লুট চলছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। তাঁরা বলছেন, পাথর লুটের সঙ্গে জড়িত বেশির ভাগ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা, যাঁরা বিএনপির কোনো কোনো নেতার সঙ্গে মিলে কাজটি করছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে নিলামে পাথর কেনা ঠিকাদারের যোগসাজশ রয়েছে।

লোভা নদী সিলেট শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। কানাইঘাট উপজেলা শহর থেকে এর দূরত্ব আট কিলোমিটারের মতো। গতকাল রোববার বেলা একটা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত নৌপথে সুরমা নদী হয়ে ভারতের সীমান্তবর্তী লোভা নদীর জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, সুরমা নদীর কানাইঘাট বাজারের বিপরীত অংশ স্টেশন এলাকায় একটি বাল্কহেডে অন্তত ১৫ জন শ্রমিক পাথর তুলছিলেন। আশপাশের অন্তত আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পাথরের এমন স্তূপ দেখা গেছে। পাশে ক্রাশার মেশিনে (পাথর ভাঙার কল) পাথর ভাঙার কাজও করছিলেন শ্রমিকেরা।

সুরমা নদী পেরিয়ে সংযুক্ত লোভা নদীতে ঢোকার পরপরই নদীর দুই পাড়ে কয়েক শ পাথরের স্তূপ চোখে পড়ে। নদীর দুই পাশের চিন্তারবাজার, মেছারচর, বাগিচাবাজার, নয়াবাজার, মুলাগুল, সাউদগ্রাম, বড়গ্রাম এবং লোভাছড়া ছাব্বিশের পিলারের পাশের ভালুকমারা ও ডাউকেরগুল গ্রামের পাশে অন্তত ১০০ বাল্কহেড ভেড়ানো আছে। সেসব বাল্কহেডে পাথর ওঠানো হচ্ছিল। সব মিলিয়ে অন্তত ৫০টি খননযন্ত্র দেখা যায়, যা দিয়ে পাথর নৌযানে ওঠানো হচ্ছিল। ৩০ থেকে ৩৫টি ক্রাশার মেশিনে পাথর ভেঙে টুকরা করতে দেখা যায়।

পাথর তুলতে দেখা গেছে তিনটি জায়গায়। সেখানেও খননযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছিল। কিছু মানুষকে নদীর নিচে থাকা পাথর হাত দিয়ে তুলে নৌকায় রাখতে দেখা যায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, লোভাছড়া এলাকাটি দুর্গম। এখানে প্রশাসনের লোকজন আসেন না। এ কারণে পাথর লুটে কোনো বাধা নেই। তিনি বলেন, রাতের বেলা পাথর সরানো হয়। তখন কেউ দেখে না।

যে কৌশলে সরানো হয় পাথর

স্থানীয় প্রশাসনের সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে কোয়ারি ইজারা বন্ধের পর ভ্রাম্যমাণ আদালত নদীর দুই পাড় এবং আশপাশে থাকা প্রায় এক কোটি ছয় লাখ ঘনফুট পাথর জব্দ করেন। এর মধ্যে ৪৪ লাখ ঘনফুট পাথর ওই বছরই নিলামে তোলা হয়। যদিও তখন মামলার কারণে বিক্রি সম্ভব হয়নি। পরে আইনি জটিলতা শেষে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো (বিএমডি) ৪৪ লাখ ঘনফুট পাথর নিলামে বিক্রি করে। মেসার্স পিয়াস এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান সাড়ে ২১ কোটি টাকায় পাথরগুলো কিনেছিল। শর্ত ছিল, কার্যাদেশে উল্লিখিত ৪৫ দিনের মধ্যে নিজ খরচ ও উদ্যোগে নিলামে কেনা পাথর কেবল দিনের বেলা অপসারণ করতে হবে। নতুন করে পাথর উত্তোলন ও সংরক্ষণ করে নিলামে কেনা পাথরের সঙ্গে মেশানো যাবে না।

সূত্র জানায়, ঠিকাদার গত ৭ মে পাথর অপসারণে কাজ শুরু করেন। ইতিমধ্যে নির্ধারিত ৪৫ দিন শেষ হয়ে যায়। তখন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে তাঁরা সময় আরও ৩০ দিন বাড়িয়ে নেন। বাড়তি সময়ও গত ২৩ জুলাই শেষ হয়েছে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিলামপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান পাথর অপসারণে সময় বাড়ানোর দাবিতে দ্বিতীয় দফায় আবেদন করেছিল। কিন্তু জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সময় বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে আবেদনটি নথিজাতপূর্বক নিষ্পত্তি করে।’

সময় শেষ হওয়ার পরও পাথর স্থানান্তর কেন করা হচ্ছে, জানতে চাইলে ঠিকাদার মেসার্স পিয়াস এন্টারপ্রাইজের মালিক কামরুল হাসান চৌধুরী দাবি করেন, তিনি অন্যায্যভাবে কোনো পাথর অপসারণ করছেন না। তাঁর ভাষ্য, তাঁকে বিপুলসংখ্যক পাথর সরানোর জন্য সময় দেওয়া হয় মাত্র ৪৫ দিন। এ সময়ে এত পাথর সরানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, নিলামে কেনা পাথরের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ স্থানান্তর সম্ভব হয়েছে। তাই আবার তিন মাস সময় চেয়ে আবেদন করেছেন। সময় বাড়ানো হয়নি। তিনি উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। আদালত তাঁকে তিন মাস সময় দিয়েছেন। তিনি শুনেছেন, সরকার পক্ষ এর বিরুদ্ধে আপিল করেছে। তবে স্থগিতাদেশ আসেনি। তাই পাথর স্থানান্তরে বাধা নেই।

রাতে পাথর কে সরায় জানতে চাইলে কামরুল হাসান চৌধুরী বলেন, সেটা তিনি জানেন না।

সিলেটের পরিবেশবাদীরা বলছেন, ৪৫ দিনের পর ঠিকাদার বাড়তি ৩০ দিন সময় পেয়েছেন। কিন্তু তারপরও সময় বাড়ানোর আবেদনের উদ্দেশ্য ভিন্ন।

সামনে বিএনপি নেতারা, নেপথ্যে আ.লীগ

স্থানীয় সূত্র বলছে, নিলামে পাথর কেনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক কামরুল হাসান চৌধুরী একসময় সিলেট মহানগর ছাত্রদলের সক্রিয় নেতা ছিলেন। তাঁকে সামনে রেখে ২০ থেকে ৩০ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী পাথর লুটে জড়িত। কয়েকজন বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত।

যাঁদের বিরুদ্ধে পাথর লুট ও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক তমিজ উদ্দিন, জ্যেষ্ঠ সদস্য কামাল উদ্দিন, আওয়ামী লীগ কর্মী মঈনুল (অন্য মামলায় ১২ আগস্ট গ্রেপ্তার), লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন, সহসভাপতি বিলাল আহমদ, কানাইঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক আলমাস উদ্দিন।

নাম আসা তিনজনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। তাঁরা হলেন তমিজ উদ্দিন, বিলাল আহমদ ও আলমাস উদ্দিন। তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তমিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি এসবে জড়িত নই। যিনি নিলাম পেয়েছেন, তিনি কি অভিযোগ করেছেন? যদি তিনি না করেন, তাহলে কেন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ? লোভাছড়ার দুই পাড়ে নিলামের বাইরে কোনো পাথর নেই।’

আলমাস উদ্দিন বলেন, ‘আমরার থুরাথুরি (সামান্য) মাল (পাথর) আছিল। সরকার নিয়া গেছে। এখন নিলাম যারা পাইছে, তারা নিতাছে। আমরা কিছুত জড়িত নাই।’

অবশ্য কানাইঘাট উপজেলার লক্ষ্মীপ্রসাদ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক নাজিম উদ্দিন বলেন, নিলাম পাওয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও বিএনপির দু-একজন কর্মী মিলে পাথর এখন সরাচ্ছেন। নিলামের পাথর অপসারণের সময় শেষ হলেও পাথর নেওয়া থামছে না। এ ছাড়া নতুন করে পাথর তোলায় এলাকার পরিবেশও বিনষ্ট হচ্ছে।

নিলামের কাগজ ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে

সিলেটের বিভিন্ন জায়গা থেকে এক বছর ধরে পাথর লুট করা হয়। সর্বশেষ লুট করা হয় ভোলাগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র থেকে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকার বৃহস্পতিবার থেকে জোরালো অভিযান শুরু করেছে।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, গতকাল পঞ্চম দিনের মতো লুট হওয়া পাথর উদ্ধারে যৌথ বাহিনী ও টাস্কফোর্সের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় টাস্কফোর্সের অভিযানে প্রায় ৩৯ হাজার ঘনফুট পাথর উদ্ধার করা হয়। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সদর উপজেলার সালুটিকর এলাকা থেকে দুজনকে আটক করা হয়।

অভিযানের মধ্যে যখন পাথর স্থানান্তর কঠিন হয়ে পড়েছে, তখন লোভা নদী থেকে নিলামের কাগজ ব্যবহার করে পাথর সরানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের বিভাগীয় সমন্বয়কারী শাহ সাহেদা আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিলামের বৈধ কাগজটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি চক্র কোয়ারি ও আশপাশের এলাকায় নির্বিচার লুটপাট চালাচ্ছে।’

পাথর লুট চলছেই। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া থেকে খননযন্ত্র দিয়ে অবাধে পাথর তোলা হচ্ছে। পাথর ভাঙার পর তোলা হচ্ছে নৌযানে। গতকাল দুপুরে
পাথর লুট চলছেই। সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া থেকে খননযন্ত্র দিয়ে অবাধে পাথর তোলা হচ্ছে। পাথর ভাঙার পর তোলা হচ্ছে নৌযানে। গত ১৮ আগস্ট ২০২৫, দুপুরে ছবি: আনিস মাহমুদ

Thursday, September 18, 2025

অনেক কাজ করেছি, যা দেশের ইতিহাসে হয়নি: আসিফ নজরুল

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অল্প সময়ে তিনি এমন অনেক কাজ করেছেন, যা দেশের ইতিহাসে হয়নি।

বুধবার বিকেলে সিলেটের একটি হোটেলের হলরুমে ‘জারিকৃত আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫: মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার বাধ্যতামূলক বিধান’ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘সবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রয়েছে, যার যা ইচ্ছা, লিখে দেওয়া যায়। আমি প্রায়ই শুনি, “আপনি কী করেছেন? শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে বসেছেন, আমরা আপনাকে বসিয়েছি, আপনি কী করেছেন?” আমি বুঝতে পারি না, আনসারটা কী হবে। আমি ফুটবল প্লেয়ার নই, কিংবা মঞ্চনাটকের অভিনেতাও নই, আমি যেটা করব, আপনি দেখতে পারবেন।’

আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘আজকে লিগ্যাল এইডের কথা বললাম। এর আগে অনেক কাজ করেছি, যা কোনো দিন বাংলাদেশের ইতিহাসে হয়নি। আমরা সিভিল আদালত, ক্রিমিনাল আদালত পৃথক করেছি, যাতে সিভিল আদালতের নিষ্পত্তি বাড়ে, যাতে মামলার নিষ্পত্তি দ্রুতগামী হয়। আগে কোনো দিন বাংলাদেশে এটা করা হয়নি। আমরা বিচারিক পদ সৃজনের ক্ষমতা সেটা আগে পলিটিক্যাল মন্ত্রীদের হাতে ছিল, এটা চিফ জাস্টিসের কাছে নিয়ে গেছি। যে ফাইল নিজের হাতে নিয়ে চিফ অ্যাডভাইজারের কাছে সাইন করিয়েছি। পিয়নের মতো করে গিয়ে ওনার হাত থেকে সাইন করে নিয়েছি। সে রকম প্রায় সোয়া দুই শ বিচারকের পদ এক দিনে সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এমন একটা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট করেছি, যার জন্য বাংলাদেশে সমালোচনা হয়নি। দেওয়ানি কার্যবিধি আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি আইনে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে, যেটা আগে হয় নাই।’

আসিফ নজরুল দাবি করেন, তাঁর মন্ত্রণালয়ে সারা বাংলাদেশ থেকে খুঁজে সবচেয়ে সৎ, সবচেয়ে যোগ্য অফিসারদের নিয়ে এসেছেন। তাঁরা দিনে–রাতে কাজ করছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, তাঁরা যে পরিবর্তনগুলো করে দিয়েছেন, যে সংস্কার এনেছেন, তা রাজনৈতিক সরকার ধরে রাখলে ন্যায়বিচার বৃদ্ধি পাবে। দরিদ্র, অসহায় মানুষের আইনগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ অবারিত হবে। বিনা খরচে দ্রুততম সময়ে আইনগত সহায়তা পাবেন তাঁরা।

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার আয়োজনে আইনগত সহায়তা প্রদান কার্যক্রমকে সম্প্রসারণ এবং অধিকতর গতিশীল, জনবাবন্ধব ও সহজলভ্য করতে গত ১ জুলাই আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এই অধ্যাদেশের তফসিলভুক্ত বিষয়গুলোতে (পারিবারিক বিরোধ, পিতা-মাতার ভরণপোষণ, বাড়িভাড়া, যৌতুক ইত্যাদি) সিলেটসহ ১২টি জেলায় মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার বাধ্যতামূলক বিধান বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আসিফ নজরুল বলেন, ‘লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে যে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়, সেটা প্রচলিত আদালতের বিরোধ নিষ্পত্তির চেয়ে ১০ ভাগের ১ ভাগ কম সময় লাগে। প্রচলিত আদালতে যদি পাঁচ বছর লাগে, লিগ্যাল এইডে সেটি নিষ্পত্তি করতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে, এত পার্থক্য। লিগ্যাল এইড অফিসে যে নিষ্পত্তিগুলো হয়, সেখানে ৯০ শতাংশ মানুষ সেটিসফায়েড থাকে। অর্থাৎ লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে যে সলিউশনটা পায়, পরে তারা কোর্টে যায় না। ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জন্যই আর কোর্টে যায় না। অথচ প্রচলিত আদালতে যে মামলা হয়, দেখবেন বিচারিক আদালতে রায় হওয়ার পরও কেউ উচ্চতর আদালতে যায় আপিল করার জন্য। কাজেই দেখলাম যে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সন্তুষ্ট লোকের সংখ্যাও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সন্তুষ্ট লোকের চাইতে অনেক বেশি। এটা এমন একটা বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা যেখানে কম সময় লাগে, অনেক কম টাকা লাগে, অনেক কম ভোগান্তি হয়, অনেক বেশি মানুষ সন্তুষ্ট থাকে।’

লিগ্যাল এইড আগে বাধ্যতামূলক ছিল না মন্তব্য করে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘এবার আমরা মামলার জট কমাতে বাধ্যতামূলক করেছি। আপনাকে প্রথমে লিগ্যাল এইডে যেতে হবে। সেখানে যাওয়ার পর অসন্তুষ্টি থাকলে আদালতে যেতে পারবেন। কিন্তু প্রথমে লিগ্যাল এইডে যেতে হবে। এটা আমরা করেছি ১ নম্বর পরিবর্তন। আমাদের একটা ইচ্ছা ও বিশ্বাস আছে, এটা ঠিকমতো করতে পারলে মামলার জট কমে যাবে। মানুষের হয়রানি কমে যাবে, বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য অপূর্ব অভাবনীয় সুযোগ তৈরি হয়েছে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য।’

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শেখ আশফাকুর রহমান, সিলেট জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হালিম উল্লাহ চৌধুরী এবং বন্ধুরাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষে দুজন প্রতিনিধি বক্তব্য দেন। এর আগে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা বিষয়ে নাটক প্রদর্শন করা হয়।

এদিকে সকালে সিলেটে পৌঁছে আইন উপদেষ্টা সিলেটের দক্ষিণ সুরমার আলমপুরে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (টিটিসি) প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। পরে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র রাতারগুল পরিদর্শনে যান তিনি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-17%2Fev3dh6ry%2FSylhetDH048620250917Sylhet-Pic-18.JPG?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার উদ্যোগে এবং সিলেট জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সহযোগিতায় জেলা পর্যায়ে আইনগত সহায়তা সম্পর্কিত সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বুধবার বিকেলে গ্র্যান্ড সিলেট হোটেলের মিলনায়তনে। ছবি: প্রথম আলো

Tuesday, June 10, 2025

জাফলংয়ে পর্যটকদের সঙ্গে স্থানীয়দের হাতাহাতি, উৎমাছড়া পর্যটনকেন্দ্রে যেতে বাধা

সিলেটের গোয়াইনঘাটের জাফলংয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে পর্যটকদের হাতাহাতি হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে জাফলং বিজিবি ক্যাম্প–সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

তবে ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। এ সম্পর্কে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী প্রথম আলোকে বলেন, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পর্যটকদের সঙ্গে ভুল–বোঝাবুঝি হয়েছিল। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গেই সমাধান হয়ে গেছে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকের ভুল ধারণা হয়েছে।

রতন কুমার অধিকারী আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে পর্যটকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। কোনো পক্ষই অভিযোগ করেনি। এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসন তৎপর রয়েছে।

জাফলংয়ে পর্যটকদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের হাতাহাতির ঘটনা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, জাফলং বিজিবি ক্যাম্প–সংলগ্ন একটি স্থানে পর্যটকদের পরিবহনে ব্যবহৃত একটি বাসের পাশে জটলা। সেখানে কথাবার্তা হচ্ছিল। তবে কী নিয়ে কথা বলছিলেন, সেটি শোনা যায়নি। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে চিৎকার ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গতকাল বিকেলে জাফলং বিজিবি ক্যাম্প এলাকায় কয়েকজন পর্যটকের সঙ্গে স্থানীয় কয়েক যুবকের কথা–কাটাকাটি হয়। এ সময় তাঁদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। এ সময় পর্যটকদের ধাওয়া দেন কয়েক যুবক। পরে স্থানীয় মুরব্বিরা বিষয়টি মীমাংসা করে দেন।

এদিকে গত রোববার কোম্পানীগঞ্জের উত্তর রনিখাই ইউনিয়নে উৎমাছড়া পর্যটনকেন্দ্রে যেতে পর্যটকদের বাধা দেওয়ার এক ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়েছে।
ভিডিওতে স্থানীয় পরিচয়ে কয়েকজন যাঁরা বেড়াতে এসেছেন, তাঁদের চলে যেতে অনুরোধ জানান। পর্যটকদের এলাকার পরিবেশ নষ্ট না করা ও অশ্লীলতা না করার কথা বলা হয়। বেড়াতে আসা অনেকেই ওই এলাকায় মদ্যপান ও অশ্লীল কার্যকলাপ করে এলাকার পরিবেশ নষ্ট করছেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পর্যটকদের উৎমাছড়ায় বেড়াতে যেতে যাঁরা নিষেধ করেছিলে, তাঁদের মধ্যে ছিলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা জমিয়তের সহসভাপতি মুফতি রুহুল আমিন সিরাজী। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘পর্যটনের কথা বলে নামে কিছু মানুষ ওই এলাকায় গিয়ে মদ্যপান ও অশ্লীল কার্যক্রম করছেন। এতে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এসব বিষয়ে স্থানীয় আলেম-ওলামা ও মুরব্বি–যুবকদের নিয়ে ঈদের আগে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত হয়েছে, পর্যটনকেন্দ্রটি নিয়ে যাতে নিরুৎসাহিত করা হয়। এর অংশ হিসেবে গত রোববার বিকেলে বেড়াতে আসা লোকজনকে বুঝিয়ে বলা হয়েছে।’

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং পাথর কোয়ারি
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং পাথর কোয়ারি। প্রথম আলোর ফাইল ছবি

Thursday, May 8, 2025

এমসি’র ছাত্রাবাসের ধর্ষণের বিচার সাড়ে ৪ বছর পর শুরু

মাঝখানে কেটে গেছে সাড়ে চার বছর। আসামি ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ফলে আইনের ফাঁকফোকরে নানা প্রতিবন্ধকতা। অথচ মামলার তদন্তকালে পাঁচ আসামির স্বীকারোক্তি। ছয় আসামির ডিএনএ টেস্টে মিল পাওয়া যায়। এটি সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসের আলোচিত ধর্ষণকাণ্ডের ঘটনা। আশার কথা হলো- দীর্ঘদিন পর সকল আইনি জটিলতা কাটিয়ে মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে আলোচিত এ ধর্ষণকাণ্ডের বিচার। উচ্চ আদালতের সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির ঘটনায় দায়ের করা দু’টি মামলার বিচার একসঙ্গে শুরু হলো। ২০২০ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর বিকালে দক্ষিণ সুরমার জৈনপুরের ২৪ বছর বয়সী এক যুবক তার ১৯ বছর বয়সী নববিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে প্রাইভেটকারযোগে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুরতে যান। এ সময় কয়েকজন যুবক ওই স্বামী ও তার স্ত্রীকে ঘিরে ধরে। একপর্যায়ে প্রাইভেটকারসহ তাদেরকে জোরপূর্বক জিম্মি করে কলেজের ছাত্রাবাসের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। এরপর স্বামীকে আটকে রেখে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের পঞ্চম তলা বিল্ডিংয়ের সামনে প্রাইভেটকারের মধ্যেই গৃহবধূকে জোরপূর্বক গণধর্ষণ করে। তারা দম্পতির সঙ্গে থাকা টাকা, স্বর্ণের চেইন ও কানের দুল ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আটকে রাখে তাদের প্রাইভেটকারও। ওই রাতেই নির্যাতিতার স্বামী মাইদুল ইসলাম বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকে আসামি করে শাহপরান থানায় মামলা করেন।

গণধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগ কুর্শী বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার পুত্র সাইফুর রহমান, হবিগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বাগুনীপাড়ার শাহ জাহাঙ্গীর মিয়ার পুত্র শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনি, সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার উমেদনগরের মৃত রফিকুল ইসলামের পুত্র তারেকুল ইসলাম তারেক, জকিগঞ্জের আটগ্রামের মৃত অমলেন্দু লস্কর ওরফে কানু লস্করের পুত্র অর্জুন লস্কর, দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুরের দেলোয়ার হোসেনের পুত্র রবিউল ইসলাম, কানাইঘাট উপজেলার লামা দলইকান্দির সালিক আহমদের পুত্র মাহফুজুর রহমান মাসুম, সিলেট নগরীর গোলাপবাগ আবাসিক এলাকার মৃত সোনা মিয়ার পুত্র আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ও বিয়ানীবাজার উপজেলার নটেশ্বর গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের পুত্র মিজবাউল ইসলাম রাজনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করে পুলিশ। এতে ৫২ জনকে সাক্ষী রাখা হয়। ঘটনার মাত্র ২ মাস ৮ দিন পর ১৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রটি আদালতে জমা দেয়া হয়। গণধর্ষণের পর পুলিশ ও র‌্যাব ৮ ধর্ষককে গ্রেপ্তার করে। তারা ছাত্রলীগের টিলাগড় গ্রুপের গডফাদার রনজিত সরকারের অনুসারী। গ্রেপ্তারের পর ৮ আসামির সকলেই অকপটে একেবারে সহজ-সরলভাবে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

আসামিদের মধ্যে সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর, মিজবাহুল ইসলাম রাজন ও আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল ১৯ বছর বয়সী ওই নববধূকে সরাসরি গণধর্ষণ করে। রবিউল ইসলাম ও মাহফুজুর রহমান মাসুম ধর্ষণে সহযোগিতা করে। ডিএনএ রিপোর্টে ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম তারেক, অর্জুন লস্কর ও মাহবুবুর রহমান রনির ডিএনএ মিল পাওয়া যায়। এদিকে, আইনুদ্দিন ও মিজবাউল ইসলাম রাজনের ডিএনএ মিল পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধেও ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হয়। ঘটনার পর থেকে আসামিরা সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছে। আদালত সূত্র জানায়, গত ১৭ই মার্চ সোমবার বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির আপিল বেঞ্চ অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস থেকে করা লিভ টু আপিল বাতিলের আদেশ দিয়ে মামলা দুটোর নথিপত্র ৩০ দিনের মধ্যে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রেরণের আদেশ দেন।

এর আগে বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস থেকে লিভ টু আপিল প্রত্যাহারের আবেদন করা হলে ওই দিন এ বিষয়ে শুনানি শেষে উচ্চ আদালত ওই আদেশ দেন। উচ্চ আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে বহুল আলোচিত এই ধর্ষণ মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাদী পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট শহীদুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, মামলার পরবর্তী তারিখ হচ্ছে ১৩ই মে। এদিন আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। আদালতে বিচার শুরু হলেও এখনো সশরীরে বাদী আদালতে আসেননি। পরবর্তী তারিখে তার উপস্থিত থাকার কথা। তিনি বলেন, দুটো মামলার বিচার কার্যক্রম একসঙ্গে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার জন্য প্রথম থেকেই বাদী পক্ষ বলে আসছে। কিন্তু ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত করতে পদে পদে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি উচ্চ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে আপিল দায়ের ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। শেষ পর্যন্ত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে একইসঙ্গে দুটো মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

mzamin

Tuesday, May 6, 2025

জুবাইদাকে ঘিরে সিলেটে উচ্ছ্বাস by ওয়েছ খছরু

সিলেটের বনেদি পরিবারের সন্তান ডা. জুবাইদা রহমান। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী। ১৭ বছর তিনি দেশে আসতে পারেননি। শাশুড়ি সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আজ তিনি দেশে ফিরছেন। তাকে ঘিরে সিলেটের বিএনপি ঘরানার নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বসিত। তাকে স্বাগত জানিয়ে গতকাল সোমবার সিলেটে আনন্দ মিছিল করেছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। সিলেট জুড়েও আলোচনায় জুবাইদা রহমান। সিলেট বিএনপিতে চলছে জাতীয় নেতৃত্ব সংকট। বিএনপি’র চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদে যে কয়েকজন নেতা রয়েছেন তাদের নেতৃত্বেই চলছে সিলেট বিএনপি। এতে অবশ্য কোনো বিতর্ক নেই। এরপরও বিএনপি’র অনেকেরই কাছে পছন্দের তালিকায় ডা. জুবাইদা রহমান। নির্বাচন এলে সিলেটে তার নাম আলোচিত হয়। জুবাইদা রহমান রাজনীতিতে নামবেন কিনা বিষয়টি পরিষ্কার না হলেও গতকালের উচ্ছ্বাসে সিলেটের রাজনীতিতে জুবাইদা রহমানের পদচারণা চান অনেকেই। বিএনপি’র অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ব্যানারে দুপুরে বিএনপি সহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বাগত মিছিল করেছেন।

ওই মিছিলে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম আহমদ। স্বাগত মিছিলের আয়োজন উপলক্ষে তিনি বলেছেন, দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে ১৭ বছর পর দেশে ফিরছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের স্ত্রী ও আমাদের এলাকার সন্তান ডা. জুবাইদা রহমান। তার এই আগমনকে ঘিরে আমরা উচ্ছ্বসিত। আমরা আশাবাদী জুবাইদা রহমান আগামীতে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে সিলেটে এসে নির্বাচনে অংশ নিন। প্রার্থী হলে আমরা তার পক্ষে মাঠে কাজ করে জয় সুনিশ্চিত করবো। সিলেটের কর্মসূচিতে সেই আকাঙ্ক্ষাও ব্যক্ত করেছেন বিএনপি’র নেতাকর্মীরা। কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন- জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি মাহবুবুর রব চৌধুরী ফয়সল। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন, সিলেটের রত্মগর্ভা সন্তান ডা. জুবাইদা রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরছেন। এটা আমাদের জন্য আনন্দের। এজন্য দলের চেয়ারপারসন সহ তাকে স্বাগত জানিয়ে সিলেটে মিছিল করা হয়েছে। আগামীতে সিলেটের মানুষের সুখে, দুঃখে তাকে পেলে শুধু আমরাই নই, মানুষও খুশি হবে। মিছিলে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে এবারই কেবল সিলেটের নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেননি, নির্বাচন এলে তাকে সিলেট থেকে প্রার্থী হওয়ার দাবি জানান বিএনপি’র নেতাকর্মীরা। এর কারণ শুধু রাজনীতিই নয়। বিগত ১৭ বছর ধরে উন্নয়ন বঞ্চিত সিলেট। দেশের অন্যান্য এলাকা আলোকিত হলেও সিলেট অবহেলিত রয়েছে। এ কারণে সিলেটের উন্নয়নের জন্য নেতাকর্মীরা জুবাইদা রহমানকে পাশে চান। তার দেশে আসার খবরে সিলেটের নেতাকর্মীরা সহ সাধারণ মানুষও উচ্ছ্বসিত।

এদিকে, গণতন্ত্রের মাতা বেগম খালেদা জিয়া যুক্তরাজ্যে উন্নত চিকিৎসা শেষে দেশে আগমন এবং দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহধর্মিণী, সিলেটের রত্নগর্ভা কৃতী সন্তান ডা. জুবাইদা রহমানের দেশে আগমন উপলক্ষে স্বাগত জানিয়ে সাবেক ছাত্রদল নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র‌্যালি পরবর্তী সমাবেশে সিলেট মহানগর বিএনপি’র সাবেক নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক, সিলেট-৪ আসন থেকে বিএনপি’র মনোনয়নপ্রত্যাশী বদরুজ্জামান সেলিমও উচ্ছ্বাস জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সিলেটের রত্নগর্ভা কৃতী সন্তান ডা. জুবাইদা রহমান বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে অপরিসীম ভূমিকা রেখে ছিলেন। পরবর্তীতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশের স্বাস্থ্যখাতকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি অতীতের মতো আগামীতেও ডা. জুবাইদা রহমান দেশের স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।’ র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করেন জেলা বিএনপি’র সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও বর্তমান মহানগর বিএনপি’র উপদেষ্টা বদরুদ্দোজা বদর, মদন মোহন কলেজের সহকারী অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন, নুরজাহান মেমোরিয়াল মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ নিজাম উদ্দিন তরফদার, সাইফুর রহমান ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ জিল্লুর রহমান শুয়েব, মহানগর কৃষক দলের আহ্বায়ক হুমায়ুন কবির শাহীন, মহানগর বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ সাফেক মাহবুব, বিমানবন্দর থানা বিএনপি’র আহ্বায়ক আব্দুল কাদির সমছু, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ খান জামাল, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মাহবুবুল হক চৌধুরী, সদস্য সচিব আফসর খান, অ্যাডিশনাল পিপি এডভোকেট আল আসলাম মুমিন, জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক দিলোয়ার হোসেন দিনার ও হাজী মিলাদসহ বিএনপি এবং অঙ্গসহযোগী সংগঠনের সকল স্তরের নেতাকর্মী।

mzamin

Sunday, May 4, 2025

সিলেটের শাপলা: নেশায় বুঁদ তরুণীদের নিয়ে নানা ভাই’র ফাঁদ by ওয়েছ খছরু

সিলেটে নেশায় বুঁদ থাকা তরুণীদের দিয়ে ফাঁদ পাততো নানা ভাই ফয়জুল খান আলম। অশ্লীল ছবি ও ভিডিও ধারণ করে করতো ব্ল্যাকমেইল। একবার তার ফাঁদে কেউ পা দিলে মাসে মাসে দিতে হতো বড় অঙ্কের চাঁদা। টাকা না দিলে ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হতো। সিলেটের শাপলা হলিডে হোমে এভাবেই ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদ পেতে রাখে আলম। সবাই তাকে নানা ভাই বলে চিনেন। আর এই নানা ভাই বলার কারণও আছে। শাপলায় যাওয়া তরুণীরাই তাকে নানা ভাই বলে ডাকেন। এজন্য অনেকের কাছে সে এখন নানা ভাই। পাওনা টাকা নিয়ে গোলাপগঞ্জের কায়স্থগ্রামের মুহিনুর রহমান ও তার বন্ধু ব্যবসায়ী আসাদের ওপর হামলার ঘটনায় শাপলার কুকীর্তির নানা ঘটনা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। হামলার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর থেকে পলাতক রয়েছে আলম। তার তরুণী সিন্ডিকেটরাও গা-ঢাকা দিয়েছে। শাপলার কুকীর্তি প্রকাশ হওয়ার পর পুলিশও সক্রিয় হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়েছে এ হলিডে হোমে। তবে আলম কিংবা তার সিন্ডিকেটের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ বলছে, আলম ও তার সহযোগীদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে। আলমের মূল বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার দত্তরাই গ্রামে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৫-৬ বছর আগে শাপলার মূল মালিক লন্ডন প্রবাসীর কাছ থেকে বিল্ডিং ভাড়া নেয়। প্রথম তিনতলাকে সে রিসোর্ট হিসেবে ব্যবহার করে। আর উপরের দুইতলায় ফ্ল্যাট বাড়ি ভাড়া দিয়েছে। আর দুইতলা পরিবার সহ ফ্ল্যাটবাড়ি ভাড়া দিয়ে সে নিচের তিনতলাকে অপকর্মের হেডকোয়ার্টার হিসেবে গড়ে তোলে। প্রথমে বিষয়টি বড়শালা এলাকার মানুষ বুঝতে পারেননি। পরে ধীরে ধীরে তাদের কাছে সব পরিষ্কার হয়। বড়শালা এলাকার কয়েকজন স্থায়ী বাসিন্দা জানিয়েছেন, শাপলায় নানা কীর্তি হয়। অনেক বড় বড় ভিআইপি রাত-বিরাতে সেখানে ছুটে আসায় বিষয়টি ধরা পড়ে। আসে সুন্দর সুন্দর রমণীরা। বিশেষ করে থার্টিফার্স্ট নাইট, পহেলা বৈশাখে শাপলায় জমকালো আয়োজন হয়েছে। রাতভর সেখানে নাচ-গানের আসর ছিল। এলাকার লোকজন সব বুঝলেও মুখ বুঝে সহে গেছেন। কী হতো শাপলায় এমন প্রশ্নের জবাবে আলমের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়া কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, শাপলা হচ্ছে অসামাজিক কাজের হেডকোয়ার্টার। যা চাইবেন সেখানে সব পাবেন। আলমই সব ব্যবস্থা করে দেয়। তার কাছে নগরের ১০ থেকে ১২ জন তরুণীর ফোন নম্বর রয়েছে। এসব তরুণীদের বেশির ভাগেরই বাড়ি সিলেটের বাইরে। তারা কলেজ ভার্সিটির পড়ার সুবাদে সিলেটে বসবাস করে। নানা ভাইয়ের ফোন পেলেই তারা ছুটে আসে। এরপর অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। আর চতুর আলম হোটেলে আসা লোকজন ও তরুণীদের ভিডিও ও ছবি ধারণ করে রাখে। পরে এসব ভিডিও ছবি দিয়ে ওই হোটেলে আসা লোকজনকে ব্ল্যাকমেইল করে। চায় টাকা। আলমের মোবাইল ফোনে এ ধরনের অনেক ভিডিও ও ছবি রয়েছে। গত ১৫ই এপ্রিল শাপলা হলিডে হোমে হামলার শিকার হওয়া মুহিনুর রহমান জানিয়েছেন, যখন তাকে রিসোর্টে একটি রুমে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছিল তখন ওই সব ছবি তাকে দেখায় আলম ও তার ভাই তাজুল। ওই সময় তারা জানিয়েছিল, সবাই তার কাছে জিম্মি। তাদের উপর লেবেলে হাত রয়েছে। তাকে কেউ ছুঁতে পারবে না। মুহিন জানান, আলম নিজেই নেশাগ্রস্ত। সে তার রিসোর্টে নিয়ে তরুণীদের ইয়াবা ও মদ সেবন করায়। এরপর তাদের নেশায় আসক্ত করে তাদের ছবি ধারণ করে রাখে। এ ছাড়া অশ্লীল ছবিও রাখে। পরে ওই ছবি দিয়ে তরুণীদেরও সে ব্ল্যাকমেইল করে। কয়েকজন তরুণী তার কাছে এভাবে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। আলমের ডাকে না গেলে তাদেরও দেয়া হয় হুমকি। এতে করে তরুণীরাও বিপর্যস্ত। তাদের নেশায় আসক্ত করে সে রিসোর্টে আসা লোকজনের কাছে তাদের পাঠায়। তিনি জানান, তরুণীদের নিয়ে আলমের নেশা করা, অসামাজিক কাজে ব্যবসা করার অনেক ভিডিও ও ছবি বিভিন্নজনের কাছে রয়েছে। লোকজনের মোবাইল ফোনে সে এসব পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে। ঘটনার পর বিভিন্ন তরফ থেকে আলমের আক্রোশের শিকার হওয়া অনেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ব্ল্যাকমেইলে শিকার হওয়া এক ব্যবসায়ী জানান, আলম তথা নানা ভাইয়ের ডেরায় মাদক ছিল ওপেন সিক্রেট। নগরের জান্নাত, বৃষ্টি, তানিয়া ও ইমা সহ বিভিন্ন নামের তরুণীরা নিয়মিত আসতো। এর বাইরে ঢাকা থেকে কলগার্ল আনা হতো। ঢাকার নাটক ও চলচ্চিত্র পাড়ার অনেক নায়িকাও তার ডাকে সাড়া দিয়ে আসতো। ফলে সিলেটের ভিআইপি অনেকেই তার কাছে ছুটে যেতেন। হাই অফিসিয়ালরা যেতেন। এ ছাড়া জাফলং, ভোলাগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বড় বড় ব্যবসায়ীরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তার ছোট ভাই ও স্বেচ্ছাসেবকলীগ ক্যাডার তাজুলকে দিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রাখে। তাজুল হচ্ছে সিলেটের আলোচিত ক্যাডার পীযূষের সহযোগী। এয়ারপোর্ট রুটের পর্যটন মোটেলে ঢোকার পথেই শাপলা হলিডে হোম। উল্টো দিকে পর্যটনের বার। ওই বারের নিচে তাজুল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিনে ও রাতে বসে আড্ডা দিতো। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মুহিনের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর থেকে নিয়মিত পুলিশ আসতো রিসোর্টে। তল্লাশি করছে। এ কারণে পালিয়ে বেড়াচ্ছে নানা ভাই আলম। ক’দিন ধরে এলাকা ছাড়া রয়েছে তাজুল ও সন্ত্রাসী বাহিনী। এতে করে এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। তারা জানান, শাপলা হলিডে হোমের নানা কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাওয়ার পর ফ্ল্যাট বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাসকারীরাও ছেড়ে যাচ্ছেন। আলমের কর্মকাণ্ডে তাদের মধ্যে ভয় ঢোকার কারণে তারা অন্যত্র চলে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
mzamin

Wednesday, April 30, 2025

লন্ডন সফরে গিয়ে ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য আরিফুল হকের by ওয়েছ খছরু

কয়েকদিনের সফরে হঠাৎ করে লন্ডন গেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তার এই সফরকে ঘিরে সিলেট ও লন্ডনে নানা জল্পনা চলছে। যাওয়ার আগে নগরে নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রক্রিয়াও চালিয়েছেন তিনি। তবে কোথায় নির্বাচন করবেন সেটি এখনো স্পষ্ট জানাননি। এজন্যই তাকে ঘিরে সিলেটে রহস্যের অন্ত নেই। তবে তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন, সার্বিক বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শ নিতে তিনি লন্ডনে গেছেন। তার পরামর্শ নিয়ে এসে সিলেটে দল ও নির্বাচনী মাঠে কাজ শুরু করবেন। তারা জানিয়েছেন; রোববার লন্ডনের উদ্দেশ্যে সিলেট ছাড়েন আরিফুল হক চৌধুরী। সোমবার গিয়ে সেখানে পৌঁছেন। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাকে এয়ারপোর্টে বরণ করেন। এয়ারপোর্টে উপস্থিত থাকা বিএনপি নেতা ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনাদের দেখতে আমি লন্ডনে এসেছি। ৪-৫টি দিন লন্ডনে থাকবো। তারপর সিলেটে ফিরে যাবো।’ সরকারের তরফ থেকে সিলেট সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র দেয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। এক্ষেত্রে পছন্দের তালিকায় এগিয়ে আছেন সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে সাবেক এই মেয়রকে নিয়ে সিলেটে নানা আলোচনা ডালপালা মেলেছে। আরিফুল হকের ঘনিষ্ঠ বিএনপি নেতারা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- দুটি মিশনকে সামনে রেখে আরিফুল হক চৌধুরী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পরামর্শ নিতে লন্ডনে গেছেন। এর মধ্যে একটি; প্রস্তাব পেলে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হবেন কিনা। অপরটি হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেবেন কিনা। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনার পর তিনি সিলেটে ফিরে পুরোদমে কাজ শুরু করবেন। তার এই সিদ্ধান্ত এখনই নেয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ওই নেতারা। তবে লন্ডনে সোমবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আরিফ বলেন, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত আমরা বলতে পারবো না নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচনের দাবি বিএনপি’র সব পর্যায় থেকে করা হচ্ছে। বিএনপি’র মূল টার্গেট হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এদিকে, সোমবার রাতে লন্ডনে আরিফুল হক চৌধুরী তার একান্ত ঘনিষ্ঠ শতাধিক নেতাকর্মীকে নিয়ে একটি রেস্টুরেন্টে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে তিনি বর্তমানে মাঠে থাকা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি মুখে ওই রাজনৈতিক দলের নাম বলেননি। নতুন রাজনৈতিক সংগঠনের কথা সরাসরি বলেছেন। তার বক্তব্যকে ঘিরে সিলেটে জামায়াত ঘরানার রাজনৈতিক নেতারা স্যোশাল মিডিয়ায় সরব হয়ে উঠেছেন। কেউ কেউ প্রশ্ন করেছেন, অন্য পার্টি বলতে সাবেক মেয়র আরিফ কি জামায়াতকে  বোঝাতে চেয়েছেন? ভার্চ্যুয়াল মিডিয়ায় প্রচারিত হওয়া ভিডিওতে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দু-একটা তুচ্ছ ঘটনাকে আমাদের কিছু রাজনৈতিক অন্য পার্টি, অন্য প্ল্যাটফরমে যা আপনারা ভালোভাবেই বুজতেছেন যারা এখনই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি, বিভিন্ন ইনস্টিটিউশন, বিভিন্ন হাই-অফিসিয়াল পোস্টে তারা কিন্তু তাদের মানুষগুলোদের সেটআপ করে ফেলছে। সেখানে আমাদের মানুষগুলো নেই। আমাদের দু-চার জন অ্যাটর্নি জেনারেল, আর দু-চারটা পোস্ট দেখলেই মনে করবেন না সব আমাদের। প্রশাসনের ‘কি’ পোস্টগুলোতে তারা বেছে বেছে ওই সংগঠনের মানুষ সেটআপ করে ফেলছে। তারা ভালো করে জানে ভোটে গেলে বিএনপি’র সঙ্গে কোনোভাবেই রিটার্ন করতে পারবে না। কাজেই তারা ওই ম্যাকানিজম শুরু করেছে সেখানে নির্বাচনকে একটু দূরে ঠেলে দিয়ে বিভিন্ন প্রশাসনে তাদের লোকগুলোকে সেটআপ করা।’ আরিফুল হক বলেন, ‘যেমন নতুন দল এবং আরেকটি দল সবাই বুঝতে পারতেছেন। তারা কখনো আমাদের সঙ্গে, কখনো ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে। কখন যে কার সঙ্গে হাত মেলায় তারাই জানে। এরা কিন্তু আমাদের তুচ্ছ ছোটো ঘটনাকে তারা স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সারা বিশ্বে আমাদের অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, আমাদের ছেলেরা এসব করছে। হয়তো দু’একজনে করছে, এদের বিরুদ্ধে কিন্তু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এদেরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আরও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এটাকে এমনভাবে প্রোপাগান্ডা করতেছে যেন বিএনপি সব করছে।’ বক্তৃতায় আরিফুল হক চৌধুরী প্রবাসী নেতৃবৃন্দকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের যেসব ছেলে-মেয়েরা দেশের বাইরে আছে কিংবা দেশে আছে। তাদেরকে স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিতে হবে। রিপ্লাই না দিলে বিএনপিকে তারা বিভিন্নভাবে নষ্ট করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে।’ সিলেটের রাজনীতিতে আরিফুল হক চৌধুরী এখন বলতে গেলে সিনিয়র নেতা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সময় প্রশাসনসহ মাঠে থাকা বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে নানা মন্তব্য করছেন। দলীয় নেতারা জানিয়েছেন- আরিফুল হক চৌধুরী বর্তমান সময়ের মন্তব্য খুবই যৌক্তিক। এই সময়ে ভয়ে অনেকেই সত্য উচ্চারণ করছেন না। কিন্তু আরিফ যখন যার প্রশংসা, আবার যখন যার সমালোচনা সবই করে যাচ্ছেন। 
mzamin

Monday, April 28, 2025

সারা দেশে পাথর কোয়ারি খুললো, সিলেটে বন্ধ, রহস্য কী? by মিজানুর রহমান

সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সিলেটকে বাদ দিয়ে সারা দেশের পাথর কোয়ারিগুলো খুলে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরিবেশ বিপর্যয়ের অজুহাতে প্রায় ৮ বছর পাথর উত্তোলন বন্ধ রেখে আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়েছে কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকার। ৫ই আগস্টের পর থেকে পাথর রাজ্য সিলেটসহ দেশের ৫১টি কোয়ারি খুলে দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছিল। তবে অতীতের ধারাবাহিকতায় তা বন্ধ রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছিলেন পরিবেশবাদীরা। মুখোমুখি বা পাল্টাপাল্টি ওই অবস্থায় উভয় দিক বিবেচনায় গতকাল একটি গ্রহণযোগ্য উপায় খুঁজতে বৈঠকে বসেছিল এ সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ। পাথর/সিলিকাবালু, নুড়ি পাথর/সাদা মাটি কোয়ারিসমূহের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উপদেষ্টামণ্ডলীর সভাটি হয় হাইব্রিড ফরমেটে। কেন্দ্র ছিল জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সভাকক্ষ ১২১। সভায় ফিজিক্যালি উপসি'ত থেকে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। এতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান উপসি'ত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, কোয়ারি থাকা জেলাগুলোর জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তরের প্রতিনিধিরা অনলাইনে যুক্ত ছিলেন। সভায় খোলাসা করে বলা হয়, হাসিনা সরকার পরিবেশ রক্ষার নামে ৮ বছর ধরে কোয়ারিগুলো বন্ধ করে রাখলেও এক সেকেন্ডের জন্য পাথর লুট বন্ধ হয়নি। এতে শাসক দলের মদদপুষ্ট অসাধু নেতাকর্মীরা উপকৃত হয়েছে, কিন্তু  সরকার বছরে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর কোয়ারিগুলোর নিয়ন্ত্রণে হাত বদল হয়েছে। আগে এটি আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের শেল্টারে পাথর লুট হতো। যার বখরা পেতো আওয়ামী প্রশাসন। ৫ই আগস্টের পর কিছু দিন বন্ধ থাকলেও এখন কোয়ারিগুলো থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন তথা লুটপাট অব্যাহত রয়েছে সমান গতিতে। এই লুটপাটে এখন ‘বহুদলীয়’ সিন্ডিকেট। যার মধ্যস্থতা করছে কোথাও বিএনপি নেতা, কোথাও সমন্বয়ক পরিচয়ধারী আবার কোথাও বা জামায়াত। পুনর্গঠিত সিন্ডিকেটে সামাজিক, ব্যবসায়িক এবং শ্রমিক পরিচয়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী যুক্ত রয়েছে। এ অবস্থায় মাঠ প্রশাসন তথা বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের বক্তব্য ছিল হাজার হাজার কোটি টাকার পাথর লুট বন্ধ করতে প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। যদিও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযান শেষে স্থানচ্যুত হওয়ার আগেই ফের লুট শুরু  হয় এমন মন্তব্য করে এক কর্মকর্তা বলেন, সীমিত পরিসরে কোয়ারি খুলে না দিলে লুট পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না। এ সময় বিজিবি’র টহল বাড়ানোর কথাও ওঠে। যার যৌক্তিকতা নিয়ে খোদ সভাতে প্রশ্ন ওঠে।

বলা হয়, বিজিবি’র কাজ সীমান্ত রক্ষা। পাথর লুট ঠেকানো নয়। পুলিশ লুট হওয়া পাথর পরিবহন বন্ধে উদ্যোগ নিতে পারে। কিন্তু  সেটি খুব একটি দৃশ্যমান নয়; বরং প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযানে গতকালও একজন পুলিশ সদস্যকে পাথর লুটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ক্লোজ করা হয়েছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সনাতন পদ্ধতিতে উত্তোলনের অনুমতি প্রদানের পক্ষে তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। বলেন, সিস্টেমেটিক ইজারা দিলে অন্তত ইজারাদারকে জবাবদিহির মধ্যে রেখে অর্থাৎ পরিবেশ রক্ষা করে তার মাধ্যমে পাথর উত্তোলন করানো সম্ভব। এতে লুট ঠেকানো এবং রাজস্ব দু’টিই মিলতো। তারা ইসিএভুক্ত এবং মামলার আওতায় না থাকা দেশের সব কোয়ারি খুলে দেয়ার অনুরোধ জানান। মাঠের কর্মকর্তারা বলেন, ইজারা দিলে নির্ধারিত ইজারাদার পাথর তুলবে। এখন যে যার শক্তিমত্তা প্রদর্শন করে দিনে রাতে পাথর তুলছে, লুট করছে। কোথাও কোনো শৃঙ্খলা নেই। এটি চলতে পারে না। কোয়ারি বন্ধ থাকায় এ খাতে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের মাঝে অসন্তোষ বাড়ছে। পাথর লুটকে কেন্দ্র করে নব্য সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ সংঘাত-রাহাজানি তথা অঞ্চল ভেদে অস্থিতিশীলতা চরম আকার ধারণের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু না, এ নিয়ে কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে হাঁটেনি উপদেষ্টা পরিষদ। মাঠ প্রশাসনের রিপোর্ট তথা বক্তব্যকে আমলে না নিয়ে তারা নিজেদের মতো করে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন! যা নিয়ে সভাতেই প্রশ্ন উঠে। বিশেষ করে পাথরের রাজ্য সিলেটের কোয়ারিগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত রহস্যের জন্ম দিয়েছে। সরকারের হাজার কোটি টাকার রাজস্বের ক্ষতি তো বটেই, এ নিয়ে শান্ত সিলেট উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সভায় এও বলা হয়, ২০২২-২৩ সালে সিলেট অঞ্চলের ভয়াবহ বন্যার অন্যতম কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন পাথর উত্তোলন বন্ধ রাখায় নদীগুলোর পানি প্রবাহ বিঘ্নিত হওয়াকে চিহ্নিত করা হয়।

সে সময় বলা হয়, নদীগুলোতে পাথর স্তূপের কারণে মৎস্য প্রজননও ঝুঁকিতে। সিলেট চেম্বার অব কমার্সের একাধিক সেমিনারে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের সুযোগ উন্মুক্তকরণের জোর দাবি জানানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে শেখ হাসিনার সরকারের পথ ধরে পাথর রাজ্য সিলেটকে বাদ দেয়ার বিষয় জানতে চাইলে সভায় উপসি'ত একজন কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশের গেজেটভুক্ত পাথর কোয়ারি, সিলিকাবালু কোয়ারি, নুড়িপাথর, সাদা মাটি উত্তোলনসহ অন্যান্য সকল কোয়ারির ইজারার পক্ষেই বলেছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কিন্তু  উপদেষ্টা পরিষদের ৩ সদস্যের মধ্যে এ নিয়ে বিভাজন দেখা দেয়। সিলেটের কোয়ারিগুলো উন্মুক্তকরণে কোনো অবস্থাতেই একজন উপদেষ্টা রাজি হননি। বরং তিনি পরিবেশ রক্ষায় আরও কঠোর হতে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। এক কর্মকর্তা বলেন, ২০১২ সালে জাফলংয়ের পিয়াইন নদীসহ ১৫ কিলোমিটার পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফলে ইসিএভুক্ত এলাকা জাফলং এবং মামলা থাকায় শারপিনটিলা থেকে পাথর উত্তোলনের সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সবাই অবগত। কিন্তু  সিলেটের বাকি কোয়ারিগুলো কেন এখনো বন্ধ? তা নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় প্রশ্ন ওঠে। তবে কোনো সদুত্তর মেলেনি। এ বিষয়ে সভার সভাপতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে দেখা করে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য চায় মানবজমিন। কিন্তু  তিনি কথা বলতে রাজি হননি। বরং রেফার করেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের কাছে। সচিবের দপ্তরে সন্ধ্যা অবধি অপেক্ষা, পিএস এর মাধ্যমে দফায় দফায় বার্তা পাঠানো বিশেষ করে উপদেষ্টার রেফারেন্স দেয়া হলেও সচিব কথা বলতে রাজি হননি। 

mzamin

Friday, April 25, 2025

সিলেটের ২ কিশোরীকে কক্সবাজারে পাচার, অনৈতিক কাজ করানোর অভিযোগ

পোশাক কারখানায় চাকরির কথা বলে সিলেটের দুই কিশোরীকে কক্সবাজারে পাচার করার অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশী এক নারীর বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী ওই দুই কিশোরী কক্সবাজার থেকে পালিয়ে সিলেটের শাহপরান থানায় এসে পুলিশের কাছে এ ঘটনা জানায়।

বর্তমানে দুই কিশোরীকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী কিশোরীরা কালবেলাকে বলেন, নাটক দেখার সুবাদে শাহনাজ বেগম নামে এক প্রতিবেশীর বাসায় প্রায়ই যাতায়াত ছিল তাদের। গত ৮ এপ্রিল শাহনাজ বেগম নামের ওই প্রতিবেশী নারী তাদের দুজনকে পোশাক কারখানায় চাকরির কথা বলে সিলেট থেকে কক্সবাজারে তার ছেলে কাছে পাঠায়। এরপর সে তাদেরকে কৌশলে চেতনানাশক দ্রব্য খাইয়ে অজ্ঞান করে।

তারা আরও বলেন, পরদিন জ্ঞান ফিরলে ওই দুই তরুণী নিজেদেরকে আবাসিক হোটেলে রুমে দেখতে পায়। এরপর কয়েকটি আবাসিক হোটেল নিয়ে অনৈতিক কাজ করাতো শাহনাজ বেগমের ছেলে ইমন আহমদ। গত ৯ এপ্রিল রাত থেকে শুরু করে ২৩ এপ্রিল রাত পর্যন্ত তাদের দুজনকে এসব কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে সিলেটের শাহপরান থানায় এসেছি।

ভুক্তভোগী এক কিশোরীর মা রোবেনা আক্তার কালবেলাকে জানান, শাহনাজ বেগম আমার প্রতিবেশী। স্বামী না থাকায় আমি কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে গেলে আমার মেয়ে রিয়া ও প্রতিবেশী সানা উল্লার মেয়ে মীম দুজনেই টিভি দেখতে পাশের বাসার শাহনাজ বেগমের বাসায় যেতো। ওই মহিলা তাদের দুজনকে খুব আদর-স্নেহ করতো, সেকারণে আমিও কখনো ওই বাসায় যেতে বারণ করিনি। কিন্তু দুই মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে শাহনাজ বেগমের আচার-ব্যবহারে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করি। সে প্রায়শই আমাদের মেয়েদের নিয়ে নানা রকম আজগুবি কথাবার্তা শোনাত। আমাদেরকে দোষারোপ ও গালিগালাজ করতো। এখন দীর্ঘ ১৫ দিন পর মেয়ে দুটো ফিরে এসে যে বর্ণনা দিচ্ছে তাতে তো ওই মহিলার ভয়ংকর রূপ আমাদের কাছে ফুটে উঠেছে।

তিনি আরও বলেন, আমার মেয়েসহ দুই কিশোরীর জীবন নষ্ট করে দিয়েছে শাহনাজ বেগম। প্রায় ১৪ দিন ছোট্ট দুটি মেয়ের শরীরের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। আমাদের মেয়েদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছে ওই নারী। বর্তমানে আমার মেয়ে ওসমানী হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব।

ভুক্তভোগী অপর কিশোরীর বাবা সানাউল্লা বলেন, আমাদের মেয়েদের সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে আমরা তার যথাযথ বিচার দাবি করছি। বিশেষ করে শাহনাজ বেগম ও তার ছেলে ইমন আহমদ। তারা দুজনে মিলে আমাদের মেয়েদের মান-মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিয়েছে। আমরা তাদের দুজনের সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করছি।

শাহপরাণ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোহেল চন্দ্র সরকার বলেন, দুই কিশোরীর মা-বাবা তাদেরকে নির্যাতন করতো, ঘরে আটকে রাখতো। তাই অভিমান করে পূর্ব পরিচিত ওই নারীর ফাঁদে পা দেয়। কাজের জন্য তাদেরকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল কিনা বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে সেখানে তাদেরকে আটকে পাশবিক নির্যাতনের ব্যাপারে বলেন, একটি বাসায় তাদেরকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকালে তারা সেখান থেকে মুক্ত হয়ে সিলেটে আসেন।

শাহপরাণ থানার ওসি মো. মনির হোসেন কালবেলাকে বলেন, পরিবারের লোকজনের সঙ্গে অভিমান করে দুই বান্ধবী কক্সবাজার পালিয়ে যায়। এরপর তারা দুজনে বৃহস্পতিবার সিলেটে ফিরে আসে। এ ঘটনায় দুজনের পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা মিসিং ডায়েরি পেয়েছিলাম। সে কারণে আমাদের তদন্ত কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে তাদেরকে বুঝিয়ে ফেরত আসতে বলে এবং তারা ফিরে আসে। দুজনকেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

হোটেলে নিয়ে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার বিষয়ে তিনি বলেন, এরকম কোনো কথা তারা আমাদের কাছে বলেনি। এ ছাড়া এমন ঘটনার কোনো অভিযোগও আমরা পাইনি। আমরা যতটুকু জানি, পরিবারের নির্যাতনের শিকার হয়ে দুই বান্ধবী পালিয়েছিল।

তাহলে দুই কিশোরী ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি কেন এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। 

প্রতীকী ছবি : সংগৃহীত

Thursday, April 24, 2025

সিলেট সীমান্তে ফের সক্রিয় হলো চোরাই সিন্ডিকেট by ওয়েছ খছরু

সিলেটে চোরাচালানকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে চাইছে প্রশাসন। সেজন্য চতুর্মুখী অভিযান চলছে। কিন্তু এসব অভিযানের ফাঁক গলিয়ে ফের সক্রিয় হয়েছে চোরাই সিন্ডিকেট। সীমান্ত দিয়ে আসছে বানের পানির মতো পণ্য। রুটও বদল করা হয়েছে। এ কারণে প্রশাসনের অনেককেই ‘ম্যানেজ’ করে চোরাচালান করা হচ্ছে। সিলেটের চোরাই রাজ্য বলে খ্যাত হরিপুর। ঈদের আগে সেনাবাহিনীর অভিযানে এই রাজ্য এখন অস্তিত্ব সংকটে। চিহ্নিত চোরাকারবারিরা পালিয়েছে এলাকা ছেড়ে। কেউ কেউ দেশ ছেড়েও পালিয়ে গেছে। এই অবস্থায় রুট পরিবর্তন করে ফের সক্রিয় হয়েছে হরিপুরের চোরাকারবারিরা। তাদের অনেকেই এখন জৈন্তাপুরের পার্শ্ববর্তী গোয়াইনঘাট ও কানাইঘাটে অবস্থান নিয়েছেন।  সেখান থেকে তারা চোরাচালান করছে। গোয়াইনঘাটের সীমান্তবর্তী এলাকার লোকজন জানিয়েছেন- উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা দিয়ে প্রবেশ করে চোরাই মালামাল। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঢাকার ব্যবসায়ীদের কসমেটিক্স সহ নানা পণ্য। এসব পণ্য দীর্ঘদিন ধরে হরিপুরের ব্যবসায়ীরা ক্যারিয়ার হিসেবে পৌঁছে দিচ্ছে। এতে মাঝখানে তারা লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। হরিপুরে সেনা অভিযানের পর মালামাল আটক হওয়ায় কিছু দিন চোরাচালান বন্ধ ছিল। ওই সময় প্রাণ ভয়ে হরিপুরের ব্যবসায়ীরা সিলেট থেকে পালিয়ে যান। সম্প্রতি তারা সিলেটে ফিরেছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই অবস্থান নিয়েছেন গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি, হাদারপাড়, মাতুর তল, হাজীপুর, জাফলং সহ কয়েকটি এলাকায়। সেখান থেকে তারা চোরাই পণ্য রিসিভ করে ট্রাকযোগে ঢাকায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। স্থানীয় লোকজন জানান- হরিপুর ছিল সবচেয়ে বড় পশুর হাট। সেটি এখন আর নেই। বর্তমানে গোয়াইনঘাটের তোয়াকুল বাজারে সবচেয়ে বড় চোরাই পশুর হাট বসে। বিছনাকান্দি এলাকা দিয়ে প্রতিদিন শত শত পশু সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ঢুকে।

স্থানীয় চোরাকারবারি কামাল সহ কয়েকজন সিন্ডিকেট করে এসব পশু বিজিবি ও পুলিশের সঙ্গে আঁতাত করে নিয়ে আসেন। এই পশুগুলো তোয়াক্কুল বাজারে এনে সিট দিয়ে বৈধ করা হয়। এরপর সেগুলো কোম্পানীগঞ্জ, সালুটিকর দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দেয়া হয়। প্রতিদিন ওই হাটে কোটি টাকার পশু বেচাবিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন এলাকার মানুষ। বিছনাকান্দি এলাকা দিয়ে আসে ঢাকার ব্যবসায়ীদের কসমেটিক্স সহ অন্যান্য মালামাল। এই মালগুলো হাদারপাড় এলাকায় এসে ট্রাকে করে সালুটিকর আসে। এরপর বাদাঘাট সড়ক ও এয়ারপোর্টের বাইপাস সড়ক দিয়ে সুনামগঞ্জ রুট ধরে চলে যায়। নতুন করে রুট হওয়ায় এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে পড়েনি পাচার হওয়া এসব চালান। সালুটিকর এলাকার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন প্রতিদিন চোরাচালানের শত শত ট্রাক ওই এলাকা দিয়ে চলে যায়। বেশির ভাগ চালান যায় ঢাকায়। হরিপুরের ব্যবসায়ীরা হাদারপাড় ও বিছনাকান্দি এলাকায় অবস্থান নিয়ে তাদের পুরাতন ব্যবসা চালাচ্ছেন। দ্বিতীয় স্পট হচ্ছে গোয়াইনঘাটের মাতুরতল, সোনারহাট সহ কয়েকটি এলাকা। এসব এলাকা দিয়ে পশু নামে। এগুলো রাধানগর বাজারে এসে বৈধ হয়ে যায়। হরিপুরের  চোরাকারবারিরা ওই এলাকার চোরাকারবারিদের পার্টনার। গ্রেপ্তার এড়াতে তারা সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাতে অবস্থান নিয়েছেন। প্রথমে তারা নীরব থাকলেও এখন পুরাতন ব্যবসা চালাচ্ছেন। গোয়াইনঘাট থানার সম্মুখ দিয়ে তারা চোরাই মালামাল নিয়ে এসে হাতিরপাড়া রুট দিয়ে ধোপাগুল হয়ে ঢাকায় চলে যায়। ওই রুট দিয়ে প্রতিদিনই পণ্যবাহী শতাধিক মিনি ট্রাক প্রবেশ করে বলে জানিয়েছেন গোয়াইনঘাট সদরের বাসিন্দারা।

তারা জানিয়েছেন, অনেক চাঁদাবাজ চক্র পথে পথে ট্যাক্স বসিয়ে এসব গাড়ি থেকে চাঁদাবাজি করে। গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ ‘ম্যানেজ’ থাকায় চোরাই পণ্যের মালামাল কখনোই আটক হয় না। হরিপুর চোরাই রাজ্যের পতন হওয়ার কারণে কানাইঘাটে বেড়েছে চোরাচালান। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার এড়াতে হরিপুরের অনেক ব্যবসায়ী কানাইঘাটে অবস্থান নিয়েছে। তারা লালাখাল সীমান্ত, কালীবাড়ী-বাদশাবাজার সীমান্ত ও লোভা সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে কসমেটিক্স সহ নানা পণ্য নিয়ে আসে। এসব পণ্য কানাইঘাট বাজার দিয়ে শাহবাগ হয়ে ঢাকায় যায়। আবার কেউ কেউ বোরহানউদ্দিন রুট ধরে পণ্য নিয়ে আসেন সিলেট নগরের টুলটিকর সহ কয়েকটি এলাকায়। সেখান থেকে বড় ট্রাকে করে পণ্য ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। রাত হলেই কানাইঘাটের সড়কগুলো সরব হয়ে যায় বলে জানিয়েছেন এলাকার মানুষ। জৈন্তাপুর বাজারে বৈধ হয় চোরাচালানের পশু: সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলা সদর বাজারে বৈধ হয় ভারতীয় পশু। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ শতাধিক পশু সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে প্রবেশ করে জৈন্তাপুর বাজারে। বাজার থেকে বৈধ চালান নিয়ে যাচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন বাজার সহ সিলেট ও বিভিন্ন জেলায়। কিছুদিন পূর্বে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর বাজারে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার পর  থেকে ধীরে ধীরে জৈন্তাপুর বাজার হয়ে উঠে চেরাচালানের বৈধ হাট। আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর অভিযানে ইতিমধ্যে জৈন্তাপুরের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদকদ্রব্য আটক করা হলেও দেদারছে বাজারে প্রবেশ করছে ভারতীয় গরু-মহিষ-ছাগল।

বাজার থেকে এসব গরু-মহিষ বৈধ কাগজ নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন বাজার সহ সিলেট ও জেলার বাইরে  প্রেরণ করা হচ্ছে। এলাকাবাসী জানান, বিজিবি’র লাইনম্যান ও নিজে চোরাচালান ব্যবসায়ী হওয়াতে জৈন্তাপুর গরুর বাজার ইজারাদার নিযুক্ত হওয়ায় একক আধিপত্য বিস্তার করে বাজারে গরু-মহিষ প্রবেশ করছে। আব্দুল করিম ওরফে ব্যান্ডিজ করিম নিজে ইজারাদার ও বিজিবি’র লাইনম্যান হওয়ার কারণে এখন উল্লিখিত চোরাকারবারিদের নিয়ে জৈন্তাপুর বাজার থেকে বৈধ চালান নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন বাজার সহ সারা দেশে প্রেরণ করা হয়। হরিপুর বাজারে অভিযানের পর থেকে সীমান্তের জৈন্তাপুর বাজার এখন চোরাকারবারিদের নিয়ন্ত্রণে ব্যবসা পরিচালনা করছে। জৈন্তাপুর উপজেলায় গরু-মহিষ বাজারজাত করণে কোনো খামার নেই। তবুও জৈন্তাপুর বাজারে প্রতিদিন শত শত ভারতীয় গরু- মহিষ বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রয় হচ্ছে। জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি আবুল বাশার মো. বদরুজ্জামান জানিয়েছেন- সীমান্তের অতি নিকটে বাজার হওয়ার পরে পুলিশ অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে। তবে সীমান্তের বিষয়টি অন্যান্য বাহিনী দেখভাল করছে বলে জানান। 

mzamin

Saturday, April 19, 2025

যে সম্পদ বিক্রি করছেন নাদেল by ওয়েছ খছরু

সিলেটে অবৈধ পথে অর্জিত সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। তিনি মৌলভীবাজার-২ আসনের এমপি ছিলেন। শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরপরই নাদেলও দেশ ছেড়ে পালান। এখন তার অবস্থান ভারতের কলকাতায়। সেখানে থেকে তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন। সিলেটে পলাতক থাকা নেতাদের একত্রিত রেখে দুর্দিনে দলকে চাঙ্গা করার মিশনে ব্যস্ত রয়েছেন বলে জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা। ঈদ পরবর্তী সময়ে সিলেটে ফের আঘাত হয়েছে নাদেলের পৈতৃক ভিটা নগরের হাউজিং এস্টেটের ফরিদবাগ বাসায়। সেখানে তিনি বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। এরমধ্যে দু’তলার ফ্ল্যাট রেখে তিনি বাসার অন্তত ১৮টি ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়েছেন। পৈতৃক সম্পত্তি বলতে এখন তার দু’তলার বড় পরিসরের ওই ফ্ল্যাট। ৫ই আগস্টের দিন নাদেলের বাসায় ব্যাপক ভাঙচুর করেছিল ছাত্র-জনতা। এতে বাসাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু ঈদ পরবর্তী সময়ে নাদেল বলয়ের নেতাকর্মীদের মিছিলের কারণে ওই ফ্ল্যাটটি পুনরায় ভাঙা হয়।

দাবি করা হচ্ছে; ফ্ল্যাটে লুট করা হয়েছে। যাই ঘটুক দ্বিতীয় দফায় ভাঙচুরের ক্ষেত্র নাদেল নিজেই তৈরি করে দিয়েছেন। মৌলভীবাজারের এমপি ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ক’বছর রাজনীতি করেছেন ঢাকায়। এখনো আছেন ময়মনসিংহ বিভাগ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক নেতা হিসেবে। কিন্তু সিলেটেই নাদেলের সব। সিলেট আওয়ামী লীগে তার একটি বলয় রয়েছে। যেটি ছাত্রলীগের নুর হোসেন ব্লক বা দর্শন দেউরী গ্রুপ নামে পরিচিত। ঈদের পরপরই নগরের ধোপাদীঘিরপাড়ে নাদেলের ছবি সম্বলিত একটি ব্যানার নিয়ে কয়েক মিনিটের মিছিল করে ছাত্রলীগ কর্মীরা। এতেই ক্ষোভ দেখা দেয়। বিকালে ছাত্র-জনতার ব্যানারে নগরের ৭-৮ জন নেতার বাসায় ভাঙচুর করা হয়। নগরে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বেশি ভাঙচুর হয়েছে সিলেটের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ও শফিউল আলম চৌধুরীর বাসায়। এ দুটি বাসায় ঘণ্টাব্যাপী ভাঙচুর করা হয়। এরপর থেকে সিলেটে শেকড় গেড়ে বসা নাদেল পিছুটান দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন দলীয় নেতারা। সিলেট নগরে নাদেলের সম্পত্তি ঢাকার তুলনায় খুবই কম। বিতর্ক এড়িয়ে বিগত দিনে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে তিনটি বাসার মালিক হয়েছেন। এ তিনটি বাসা তার নিজের নামে ছিল না। নিজের একান্ত অনুসারী ও আত্মীয়স্বজনের নামে এসব বাসা ক্রয় করেন। সিলেটে নাদেল অর্ধকোটি টাকার যে পাজেরো জিপ চালাতেন সেটিও তার নিজের নামে নয়। পরিবারের এক সদস্যের নামে ক্রয় করা। নাদেলের ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন- গাড়িটি সম্প্রতি তিনি বিক্রি করতে চাইছেন। এ গাড়িটি শোরুমে রয়েছে। ৫ই আগস্টের পর সেটি নিরাপদ স্থান হিসেবে শোরুমে রাখা হয়। অর্ধকোটি টাকার মূল্যের এই গাড়ির দাম ১৯ লাখ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এ ছাড়া- নগরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডসহ কয়েকটি এলাকায় থাকা তিনটি বাড়ি তিনি বিক্রির চেষ্টা করছেন। এই বাড়িগুলো যাদের নামে তারা সিলেটে রয়েছেন। সিলেটের সম্পত্তি বিক্রির কারণ কী- এ প্রশ্নের জবাবে তার এক ঘনিষ্ঠজন জানিয়েছেন- সিলেটে ছাত্র জনতার নামে দ্বিতীয় দফা বাড়িঘরে হামলার পর নাদেল পিছুটান দিয়েছেন। কারণ; দ্বিতীয় দফায় ঘটনার জন্য তাকে দায়ী করা হচ্ছে। এ ঘটনায় পুলিশ অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। মামলায় জর্জরিত হননি এ রকম অনেক নেতা বাড়িঘরে ফিরেছিলেন। এ ঘটনার পর তারা ফের বাড়িঘর ছাড়া রয়েছেন। ফলে সবকিছু মিলিয়ে নাদেল সিলেটে ব্যাকফুটে রয়েছেন। এ ছাড়া ৮ মাস ধরে নাদেল ভারতে পলাতক। ওখানে সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের নেতাদের দেখভালের দায়িত্ব অনেকটা তার ওপর। যাকে যেভাবে পারছেন সহযোগিতা করছেন। ৯ই ডিসেম্বর সিলেটের ৫ নেতা কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ডাউকিতে গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় তাদের গ্রেপ্তার করার পর তাদের ছাড়িয়ে নিতে নিজেই শিলং আদালত পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ করেন। তাদের মুক্ত করার প্রক্রিয়ার খরচের এক অংশ তিনি বহন করেছেন।

নেতারা জানিয়েছেন- ভারতে থাকা সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের নেতাদের এখন অভিভাবক নাদেল। সংকটকালীন সময় অতিবাহিত করতে টাকার প্রয়োজনে তিনি সিলেটের সম্পদ বিক্রি করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সময় নাদেল আওয়ামী লীগের নেতা থাকলেও স্থানীয় রাজনীতিতে তার আধিপত্য ছিল না। তবে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় তিনি পরবর্তীতে ধীরে ধীরে দাপটবাজ নেতা হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেন। ২০১৯ সালে নাদেল রাজনীতির মহা পরীক্ষায় পড়েছিলেন। ওই সময় নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে পড়া নালেদকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক পর্যন্ত নিয়ে পৌঁছান প্রয়াত মুহিত। এরপর থেকে নাদেলকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সিলেটে সবখানে তিনি আধিপত্য বজায় রেখে চলেন। দলের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন- নাদেলের হাত ধরেই সিলেট ইন্টারন্যশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়াম, বাদাঘাতে নতুন কারাগার নির্মাণ, আবুল মাল আব্দুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্স, সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ কয়েকটি বড় বড় উন্নয়ন হয়। আর এসব উন্নয়ন কাজে তার লোকজন এক তরফা প্রভাব খাটিয়েছেন। তারা সাব-ঠিকাদারিসহ নানা বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে কোটি কোটি টাকা লুটে নিয়েছে। এ ছাড়া নগরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হাওলাদারপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় নাদেলের লোকজন নামে-বেনামে জমি দখল করেছেন। বাসা দখল করেছিলেন তারা। তবে এসব সম্পত্তি নাদেল নিজের নামে না করে নিজের কাছের আত্মীয়স্বজন ও একান্ত সহযোগীদের নামে করেন। ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছে- সিলেটে নাদেলের পৈতৃক ভিটা সবাই চিনেন। এর বাইরে নাদেলের যেসব সম্পত্তি রয়েছে সেগুলো অনেকেই চিনেন না। হাউজিং এস্টেট এলাকার এক জনপ্রতিনিধি জানিয়েছেন- হাউজিং এস্টেটে নাদেলের পৈতৃক ভিটে ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। এই সম্পদটি ফ্ল্যাট আকারে তিনি বিক্রি করে দিয়েছেন। অন্য এলাকায় কেমন সম্পদ রয়েছে সেটি হাউজিং এস্টেট এলাকার মানুষ জানেন না।

mzamin

Friday, April 18, 2025

সিলেটে হাওয়া হয়ে গেল তুষারের চিহ্নিত ঘাতকরা

সিলেটের পূর্ব শাহী ঈদগাহ্‌ টিবি গেট এলাকা পরিচিত অপরাধ জোন হিসেবে। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতো ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও কাউন্সিলর হিরণ মাহমুদ নীপু। ভয়ঙ্কর সব অপরাধে কাঁপতো ওই এলাকা। সর্বশেষ দুই বছর আগে হিরণ মাহমুদ গ্রুপের কর্মীরা প্রকাশ্যে কুপিয়ে খুন করে ছাত্রলীগকর্মী আরিফকে। সেটি ঘটেছিল তুষার হত্যাকাণ্ডের স্থল থেকে অদূরে টিবি গেট এলাকায়। আরিফ হত্যার রেশ কাটতে না কাটতে ফের হত্যার শিকার হলো ছাত্রলীগকর্মী তুষার আহমদ চৌধুরী। তার খুনের মধ্য দিয়ে ফের ওই এলাকায় আতঙ্ক নেমে আসে। পাশেই সদর উপজেলা খেলার মাঠে চলছে বৈশাখী মেলা। মেলার পেছনেই দলদলি বাগানের মদের পাট্টার পাশে ঘটে তুষার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- যেখানে তুষারকে খুন করা হয় সেটি ক্রাইমজোন হিসেবে পরিচিত। দলদলি চা বাগানের প্রবেশমুখ। এর আগেও এখানে কয়েকটি আলোচিত হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তুষার খুন হয়েছিল নিরিবিলি স্থানে। প্রায় দেড়ঘণ্টা তুষারের মরদেহ পড়েছিল বাগানের প্রবেশমুখে। পরে তার লাশ উদ্ধার করে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু মোটিভ অজানা এ খুনের রহস্য খুব দ্রুতই খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। এক আসামিকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তবে মূল আসামি সহ কয়েকজন এখনো অধরা। তাদের অবস্থান নিশ্চিত হতে পারছে না পুলিশ। এয়ারপোর্ট থানা পুলিশের শেষ সীমানা। আবার কোতোয়ালি ও শাহ্‌পরাণ থানা পুলিশের শেষ সীমানা। ফলে এই স্থানকে ধরা হয় তিন থানার মধ্যস্থল। বাগান এলাকা হওয়ার কারণে এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যাতায়াত খুবই কম। তুষার হত্যার পরপরই এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ খুনিদের শনাক্ত করে। রাত ১১টার মধ্যে নগরের বড় বাজারের একটি বাসার খাটের নিচ থেকে গ্রেপ্তার করে জাবেদ নামের একজনকে। সে হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছেও স্বীকার করেছে। তবে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়নি। এ কারণে তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ জানিয়েছে- গ্রেপ্তার হওয়া জাবেদের কাছ থেকে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। তার বাসা আম্বরখানা বড় বাজার এলাকায়। ঘটনার পর সে নিজ এলাকায় চলে এসেছিল। পুলিশের অবস্থান টের পেয়ে লুকিয়েও ছিল। তার তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি পলাতক থাকা আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। নিহত তুষারের পিতা সাজেদ আহমদ চৌধুরী তিনজনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছেন। অজ্ঞাত রেখেছেন কয়েকটি নাম। স্থানীয়দের ভাষ্য থেকে পুলিশ খুনের মিশনে ৯-১০ জনের জড়িত থাকার তথ্য জেনেছে। পুলিশ জানায়- যারা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তারা তুষারের সহপাঠী। ওই এলাকায় তুষারের সঙ্গেই তারা আড্ডা দিতো। সে তথ্য স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া সে তথ্য যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। বর্তমানে তাদের গ্রুপের অনেকেই অন্য আরেকটি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। তবে সেই বিভক্তির রেশ তাদের বন্ধুত্বের মধ্যে পড়েনি। এদিকে- খুনের ঘটনায় জড়িতরা হঠাৎই হাওয়া হয়ে গেল। একমাত্র জাবেদ ছাড়া আর কাউকে গতকাল বিকাল পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে টিবি গেট এলাকায় অপরাধ রাজ্য ফের সরগরম। কেউ কেউ বলছেন; অপরাধীরাই হত্যায় জড়িতদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- শাহী ঈদগাহ্‌ থেকে টিবি গেট এলাকা পর্যন্ত বিএনপি কিংবা অঙ্গ সংগঠনের কারও কোনো গ্রুপ নেই। কেউ সেখানে গ্রুপভিত্তিক রাজনীতি করেন না। এ কারণে বালুচর, টিবি গেট ও পূর্ব শাহী ঈদগাহ্‌ এলাকার অপরাধীরা এ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমানে সেখানে খাসদবির এলাকার অপরাধ চক্রের নজর পড়েছে। বালুচর এলাকার অপরাধীরা টিবি গেট পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। নিহত তুষার ও তার খুনিরা খাসদবিরকেন্দ্রিক অপরাধ চক্রের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। রাজু ও রনি নামের দু’জন তাদের নিয়ন্ত্রক। তাদের অবস্থান খাসদবির এলাকায় হলেও তারা ওখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করে টিবি গেট এলাকা। গেল কয়েক মাস ধরে তাদের নিয়মিত আড্ডা বসে ওই এলাকায়। সন্ধ্যা হলে উঠতি যুবকরা সেখানে বসে। কেউ কেউ বাগান থেকে মাদক কিনে সেবনও করে। আবার অনেকেই ওই এলাকায় ছিনতাই করে বেড়ায়। গত ঈদ মৌসুমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খাসদবির এলাকার নেতাদের নামে খুনের ঘটনায় জড়িতদের পোস্টারিং করতে দেখা গেছে। তুষার খুনের ঘটনার পর এই পোস্টারিং নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ কারণে তুষার খুনের ঘটনার পর জড়িতকে কৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে ধারণা এলাকাবাসীর। তবে এয়ারপোর্ট থানার ওসি আনিসুর রহমান খান মানবজমিনকে জানিয়েছেন- খুনের ঘটনাটি ব্যক্তিগত বিরোধ বলে মনে করা হচ্ছে। পরবর্তীতে তদন্তে সবকিছু বেরিয়ে আসবে। তুষারের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। ভার্চ্যুয়ালি তদন্ত চালানো হচ্ছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
mzamin

Wednesday, April 16, 2025

বেসামাল ‘নেত্রী’ সিলেটের আরজু

চাল-চলনে ছিল বেপরোয়া ভাব। ভয়ে নারী রাজনীতিকরা তাকে এড়িয়ে চলতেন। সম্মান হারানোর ভয়ে পাশে জায়গা দিতেন না অনেকেই। কিন্তু সিলেটে পুরুষ রাজনীতিকদের কাছে তার কদর ছিল বেশি। আর কদরেই দিনে দিনে বেসামাল হয়ে ওঠে সিলেটের ‘নেত্রী’ আরজু। নামের পাশে আগে খান ব্যবহার করতো না। সাম্প্রতিক সময়ে খান শব্দটি জুড়ে দিয়েছে। সিলেটের ওই ‘নেত্রী’ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী। বিতর্কিত ওই নেত্রীকে আটক করেছে র‌্যাব। নগরের বালুচরের বাসা থেকে তাকে আটক করা হয় বলে র‌্যাব জানায়। পুরো নাম নাজমা আক্তার আরজু। পরে এই নাম পরিবর্তন করে হয় নাজমা খান আরজু। নগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। কয়েক বছর আগে মহিলা যুবলীগ করতেন। তখন থেকে অন্ধকার জগতে তার পথচলা শুরু। গ্রেপ্তারের পর গতকাল দলের কয়েকজন মহিলা নেত্রীর সঙ্গে আলাপ হয় মানবজমিনের। তার সম্পর্কে জানা গেছে অনেক তথ্য।

তারা জানিয়েছেন- যুব মহিলা লীগে থাকার সময় সিলেটের কয়েকজন অন্ধকার জগতের নারীদের সঙ্গে তার খ্যাতি গড়ে ওঠে। ওই নারীদের সঙ্গে তার রাজপথে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকতো। ফলে ওই সময় থেকে সে জড়িয়ে পড়ে অপরাধ কর্মে। নারীদের দিয়ে নগরে বাসা ভাড়া করে অসামাজিক কাজ, মাদক ব্যবসাসহ নানা কাজে জড়িয়ে পড়ে সে। এ কারণে পুরুষ রাজনীতিকদের কাছে সে ছিল পছন্দের। নিজেও নেতাদের মনোরঞ্জন দিতেন। রাতারাতি তার কদর বেড়ে যায়। এই অবস্থায় কয়েক বছর চলার পর নিজেকে মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী পরিচয় দিতে শুরু করে। মহিলা আওয়ামী লীগে নিজের পরিচয় দিলেও কোনো পদবিতে ছিল না। গ্রেপ্তারের পর সে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে নিজেকে নগরের ৭ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু ওই ওয়ার্ডের মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রীরা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- আরজু কখনোই ৭ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগে ছিল না। কিছুদিন তার বসবাসস্থল ছিল ওই ওয়ার্ডে। সে বনকলাপাড়া, ফাজিলচিস্তসহ কয়েকটি এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করেছে। ওই সময় আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আফতাব হোসেন খানের ঘনিষ্ঠ নেত্রী ছিলেন। নানা সময় তাদের শেল্টারে থাকায় রাজনীতিতে সে সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল বলে জানান তারা।

আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে আরজু সিলেট সদর উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য নির্বাচনী মাঠে ছিল। ওইসময় সে তার ঠিকানা ব্যবহার করে জালালাবাদ থানার জাহাঙ্গীরনগর এলাকায়। তবে মনোনয়ন দাখিলের আগে সে নির্বাচন থেকে সরে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন- ৫ই আগস্টের আগে সিলেটের রাজপথে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের সময় সে নেতাকর্মীদের সঙ্গে রাজপথে ছিল। সংঘর্ষের সময়ও মাঠে অ্যাক্টিভ থাকে। গণ-অভ্যুত্থানের পর সে সুবিদবাজার এলাকা ছেড়ে চলে যায়। তার বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়। পলাতক অবস্থায় আশ্রয় নেন নগরের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের বালুচর এলাকায়। ওখানে ঘাপটি মেরে থেকে ছিল। তবে সরব ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সমালোচনাসহ সাম্প্রতিক নানা বিষয় নিয়ে লাইভে এসে অশালীন আচরণ করেছে। একইসঙ্গে সরকারবিরোধী নানা অপপ্রচারে অ্যাক্টিভ ছিল। ফিলিস্তিনে ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে সিলেটে ব্যাপক ভাঙচুর ঘটনায়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজনের মুখে এসেছে পলাতক থাকা নাজমা খান আরজুর নাম। এরপর তাকে ধরতে অভিযান শুরু করে র‌্যাব।

গত সোমবার রাতে তাকে বালুচর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। নগরের উপশহরে ছিল আরজুর সবচেয়ে বেশি আড্ডাস্থল। ওই এলাকার এক আওয়ামী লীগ নেত্রী যিনি মৎসজীবী দলের কমিটিতে ছিলেন তার সঙ্গে ছিল সখ্যতা। ওই নেত্রীর নাম নাহার। তার সঙ্গে সখ্যতা থাকার কারণে ওর বাসাতেই তার অসামাজিক কাজের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। গত কয়েক বছর ধরে উপশহরে বসেই তারা অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। মহিলা আওয়ামী লীগের গত কমিটি গঠনের সময় পুরুষ রাজনীতিকদের দিয়ে মহিলা নেত্রীদের চাপে রেখে কমিটিতে আসার চেষ্টা করে। তবে মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রীদের প্রতিবাদের কারণে তাকে কোনো কমিটিতে জায়গা দেয়া হয়নি বলে জানান কয়েকজন নেত্রী। তারা জানিয়েছেন- শুধু অসামাজিক কাজই নয়, তাদের নেটওয়ার্কে ছিল মাদক বিক্রেতারা। মদ, গাঁজা ও ইয়াবা আরজু ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিক্রি করতো। উপশহরে অপরাধীদের একটি গ্রুপ লোকজনকে ধরে নিয়ে উলঙ্গ করে নারীদের দিয়ে ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইল করতো। ওদের নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য হিসেবে আরজু কাজ করেছে। নানা সময় পুলিশের রোষানলে পড়লেও সে ও তার সিন্ডিকেট রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা এডিসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ছাত্র আন্দোলনের সময়ের দুটি মামলার আসামি দেখিয়ে র‌্যাব সদস্যরা তাকে কোতোয়ালি থানায় হস্তান্তর করেছে। এ মামলা তাকে পুলিশ আদালতে সোপর্দ করেছে বলে জানান তিনি।  

mzamin

হেলেনের দাপটে বেপরোয়া ছিল সিলেটের কয়েস

সিলেটের আওয়ামী লীগ নেত্রী হেলেন আহমদ। বর্তমানে লন্ডনে পলাতক। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনের ঘনিষ্ঠ জননেত্রী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। সিলেটে দাপট দেখিয়েছেন এক তরফা। তার দাপটের কাছে অসহায় ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেই হেলেনের ব্যবসায়িক পার্টনার কয়েস পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে। আগে সাদাসিদেই ছিলেন আওয়ামী লীগ নেত্রী হেলেন আহমদ। পার্টনার কয়েসই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই থেকেই হেলেনের জীবন রহস্যঘেরা। হেলেন থেকে আরও চতুর মিসবাউল ইসলাম কয়েস। হেলেনের সব অপকর্মের মূল নিয়ন্ত্রক তিনি। তবু থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে দাপটের সঙ্গে চলেন সিলেটে। হেলেনের যেকোনো বিতর্কিত ঘটনায় কয়েসই ঢাল হিসেবে দাঁড়াতেন। সেই কয়েসের এবার আর শেষ রক্ষা হলো না। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে হেলেন পালিয়ে গেলেও তিনি প্রকাশ্যেই ছিলেন। হেলেনের যাবতীয় অপকর্মকে ঢাকার চেষ্টা করছিলেন। অবশেষে শনিবার রাত ১১টার দিকে জিন্দাবাজার হেলেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে পুলিশ কয়েসকে আটক করেছে। আটক নিয়েও নানা নাটকীয়তা। গ্রেপ্তারকালীন সময়ে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে, কোতোয়ালি থানা পুলিশের একটি দল কয়েসকে আটক করতে যায়। এ সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাইরে দাঁড়িয়ে কয়েস পুলিশকে নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করছিলেন। পুলিশ দাবি করে- তার বিরুদ্ধে মামলা আছে। কিন্তু কয়েস নিজেকে আইনজীবী পরিচয় দিয়ে বলেন, ঠিকানা দেখেন। আমি সেই ব্যক্তি কি না। পুলিশ ভোটার আইডি দেখে। পুলিশ সদস্যরা জানান, কয়েস আটকের সময় নিজেকে নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। প্রায় ১০ মিনিট বাদানুবাদের পর কয়েসকে পুলিশের ভ্যানে করে থানায় নিয়ে যায়। এ সময় সাংবাদিকরা ছবি ও ফুটেজ তুলতে গেলে তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করেন তিনি। থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ মামলার অনুসন্ধান করে। কোতোয়ালি থানা পুলিশ জানায়, কয়েসের বিরুদ্ধে মারামারি, হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার আইনে সাতটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা রয়েছে ৬টি এবং দক্ষিণ সুরমা থানায় ১টি। তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলাও ছিল বলে জানায় পুলিশ। কোতোয়ালি থানার ওসি মো. জিয়াউল হক জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত কয়েস আওয়ামী লীগ নেতা। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় সাতটি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার বিকালে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। কয়েসের মূল বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বসন্তপুরে। তার পিতার নাম নিমার আলী। সে বর্তমানে নগরের বিমানবন্দর এলাকার বড়শালা এলাকার বাসিন্দা। এই বড়শালায়ই অবস্থান হেলেনের। সেখানে রয়েছে হেলেনের মালিকানাধীন আহমদ হাউজিং। নামে-বেনামে অনেক সম্পদ। সেগুলোর পাহারাদার কয়েস। হেলেনের দখল করা সম্পদ দখলে রাখা, আইনি লড়াই করা, ক্ষমতার দাপট দেখানো- সবই করতেন কয়েস। ফলে হেলেনের পাশাপাশি কয়েসও ছিলেন বিগত দিনের আলোচিত চরিত্র। হেলেনের নাম আসলেই আসে কয়েসের নাম। আর নাম আসার কারণও রয়েছে। হেলেনের সঙ্গে সম্পর্ক কি- এ নিয়ে এন্তার প্রশ্ন। অনেকেই বলেন; সর্ম্পক স্বামী-স্ত্রীর। কিন্তু কয়েস সবসময়ই এ অভিযোগ উড়িয়ে দিতেন। ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে তাদের সর্ম্পক রয়েছে জানান দিতেন। হেলেনও এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ চুপ। তবে তাদের বেপরোয়া জীবন নিয়ে নানা কানাঘুষা চলছে। জিন্দাবাজারের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রায় ২৫ বছর আগে যখন হেলেনের স্বামী ব্যবসায়ী রুহেল আহমদ নগরের জল্লারপাড় রোডে হোটেল ব্যবসা শুরু করেন, তখন ওখানে চাকরি নিয়েছিলেন কয়েস। এরপর সে হেলেনের কাছাকাছি চলে আসে। হেলেনের স্বামী রুহেল সম্পদ নিয়েও ছিলেন সমস্যায়। নানা ধরনের চাপ কাবু করেছিল তাকে। হোটেল ব্যবসা চালু করার কিছুদিনের মধ্যে রুহেল মারা যান। আর তখনই হেলেন হাল ধরেন স্বামীর ব্যবসায়। সঙ্গে কয়েসও। হেলেনের পার্টনার হিসেবে পুরো সম্পত্তি দেখভালের দায়িত্ব পায় কয়েস। হেলেন নামে থাকলেও কয়েসই সব। ফলে হেলেনের সঙ্গে জমি সংক্রান্ত যত বিরোধ রয়েছে সবখানেই কয়েসের নাম জড়িয়ে আছে। আহমদ হাউজিং ও ওই এলাকায় জমি দখল নিয়ে এলাকাবাসী ও প্রবাসীদের দ্বন্দ্বের যাবতীয় নাটক মঞ্চস্থ করেন কয়েস। কয়েস গ্রেপ্তারের পর সরব হচ্ছে ভুক্তভোগীরা। তারা জানিয়েছেন, নানা সময় হেলেনের ক্ষমতার দাপটে প্রবাসীসহ অনেককেই হয়রানি করেছে কয়েস। এ নিয়ে সিলেটে একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন করেও প্রশাসনের সহযোগিতা চাইলে কোনো কাজ হয়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিজেকে আওয়ামী লীগ নেত্রী পরিচয় দিয়ে হেলেন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এই সময়ে কয়েক একর ভূমিও তারা জোরপূর্বক দখলে নিয়েছে। এয়ারপোর্ট এলাকায় দখল করা ভূমিতে মোমেন ফাউন্ডেশনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় যারাই প্রতিবাদী হয়েছেন তাদের হুমকি, ধমকি দিয়ে সরিয়ে রাখা হতো। তাদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে। গত ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি রূপ পাল্টে ফেলেন কয়েস। হেলেন পালিয়ে যায় দেশ ছেড়ে। কিন্তু কয়েস প্রথমেই নিজেকে ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা পরিচয় দিয়ে অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করে। নতুন করে সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত আমিরের ছবি পোস্ট করে শুভকামনা জানান। জামায়াতের নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করায় সে হালে পানি পায়নি। এর আগে তিনি নিয়মিত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের সকল অনুষ্ঠানের ছবি সংগ্রহ করে ফেসবুকে পোস্ট করতেন। সম্প্রতি প্রতারক মিসবাউল ইসলাম জেলা ও মহানগর বিএনপি’র দায়িত্বশীল পদে থাকা অনেকের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছিল। তবে, কোথাও সে আশ্রয় পায়নি। এদিকে, সিলেটে দাপট খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী হেলেন ও কয়েসের নাম উঠেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের তালিকায়। দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে হেলেন ও কয়েসের নানা দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। তারা অবৈধ সম্পদ অর্জনের নানা বিষয় খতিয়ে দেখছেন। এসব বিষয় নিয়ে দুদকের পক্ষ থেকে আইনি উদ্যোগ নেয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে ওই সূত্র।
mzamin

Saturday, April 12, 2025

সিলেটে চোরাই রাজ্যের নতুন নিয়ন্ত্রক করিম by ওয়েছ খছরু

সিলেটের চোরাই রাজ্য হরিপুর তছনছ হয়ে গেছে। সেনাসদস্যদের ওপর হামলার ঘটনার পর চিহ্নিত চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে অ্যাকশন শুরু হয়েছিল। আর এতেই হরিপুরের চোরাচালান এখন শূন্যের কোঠায়। গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছে চোরাকারবারিরা। সূত্র বলছে; শীর্ষ ৭-৮ জন চোরাকারবারি ভারত পালিয়েছে। দু’একজন ঢাকায় আত্মগোপনে থেকে রাজনৈতিক শেল্টারের চেষ্টা করছে। হরিপুরের চোরাই রাজ্য হাতবদল হয়ে এখন জৈন্তাপুরে। রমরমা বাণিজ্য চলছে। গোটা রাতই জেগে থাকে জৈন্তাপুর বাজার। নতুন এই চোরাই রাজ্য নতুন অধিপতি করিম আহমদ। অনেকেই তাকে ‘ব্যান্ডিজ’ করিম হিসেবে চিনেন। এক সময় জৈন্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান পলাতক লিয়াকত আলীর আস্থাভাজন লোক ছিলেন করিম। লিয়াকতকে উপজেলা নির্বাচনি বিজয়ী করতে দু’হাতে টাকা উড়িয়েছে করিম। পটপরিবর্তনের পর হয়ে উঠেছেন বিএনপি নেতা। শেল্টার পাচ্ছেন স্থানীয় নেতাদেরও। প্রশ্ন ছিল; জৈন্তাপুর বাজারে প্রতিদিন কতো টাকার চোরাই ব্যবসা হয়। উত্তরে বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী মানবজমিনকে জানিয়েছেন; ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার চোরাই ব্যবসা হয়। পাশেই ভারত সীমান্ত। জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট সীমান্ত গলিয়ে যেসব পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে তার বেশির ভাগই জৈন্তাপুর বাজারে এসে বৈধ হয়ে যায়। সীমান্ত জুড়ে তার রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। জৈন্তাপুরের করিমের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের শুরু থেকে অপরাধ জগতে তার পদচারণা। সীমান্তে বিজিবি ও পুলিশের লাইনম্যান রয়েছে। করিম বিজিবি’র প্রধান লাইনম্যান। সীমান্ত দিয়ে যেসব পশু ও চোরাচালানি পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করে সবকিছু থেকে বিজিবি’র নামে চাদা আদায় করে সে। সম্প্রতি বিজিবি’র সঙ্গে চোরাকারবারিদের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়েছে তার পেছনে ছিল করিমের হাত। জৈন্তাপুরের নিজপাটের ঘিলাতৈল গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা করিম আহমদ। একক নেতৃত্বে জৈন্তাপুর উপজেলার শ্রীপুর, মিনাটিলা, ডিবির হাওর, রাজবাড়ী, গোয়াবাড়ী ও লালাখাল এলাকায় বিজিবি’র লাইন নিয়ন্ত্রণ করে। বিজিবি’র লাইন পরিচালনা করে অঢেল সম্পদের মালিক। জৈন্তাপুর সদরে রয়েছে তার বিলাসবহুল বাসা। নামে বেনামে রয়েছে কয়েকটি বাড়ি। ছেলে, ভাই, ভাতিজা, ভাগিনা, বোনের জামাতা সবাই হয়েছেন তার শেল্টারে কোটিপতি। চলতি ১৪৩২ বাংলা বছরের জন্য নানা বির্তকের মাধ্যমে ১ কোটি ৫ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন জৈন্তাপুরের পশুর হাট। ভ্যাট, ট্যাক্স মিলিয়ে সেটি দঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকায়। এতে তার সঙ্গে সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি ও সেনা সদস্যের হামলার ঘটনায় বর্তমানে পলাতক থাকা আব্দুর রশিদ ও উপজলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক নিজপাট ইউপি’র বর্তমান চেয়ারম্যান মো. ইন্তাজ আলী। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- সরকারের প্রকৃত ইজারা মূল্য ফাঁকি দিতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পশুর হাট ইজারা নেন। এতে শতাধিক সিডিউল ক্রয় হলেও সিন্ডিকেট করে কেবল করিমের নামে বাজার ইজারা নেয়া হয়। এ নিয়ে জৈন্তাপুর তোলপাড় চলছে। সীমান্ত এলাকার লোকজন জানিয়েছেন- জৈন্তাপুর সীমান্তের খাঁসিয়া হাওর, শান্তিমাইর জুম করিমের নির্ধারিত লাইনম্যান মোকামবাড়ী গ্রামের রুবেল ও তার ভাই লিটনের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া মোকামপুঞ্জি ও শ্রীপুর তার নির্ধারিত লাইনম্যান মোকামপুঞ্জির বাসিন্দা মাঘাই পাত্র, ছাগল খাউরী, মিনাটিলা, কেন্দ্রী ও লম্বাটিলা কেন্দ্রী গ্রামের উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মিজান আহমদ রুবেল, ডিবির হাওর ফরিদের বাড়ি, রিভার্স পিলার (ডিবির হাওর আসামপাড়া), ঘিলাতৈল, তলাল, টিপরাখলা, কমলাবাড়ী, করিমটিলা, ভিতরগোল, গোয়াবাড়ী নিয়ন্ত্রণ করে করিম নিজেই। বাইরাখেল, হর্ণি নয়াগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করে তার ব্যবসায়িক পার্টনার বাইরাখেল গ্রামের আব্দুল মালেক ওরফে আব্দুল, জালিয়াখলা, সারীনদীর মুখ নিয়ন্ত্রণ করেন কালিঞ্জি গ্রামের রহিম উদ্দিন ও তার ভাই তাজউদ্দিন। ৫ই আগস্টের পূর্বে রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা সামাদ ও আরমানের মাধ্যমে করিম তার বাহিনীর মাধ্যমে জৈন্তাপুর সীমান্ত এলাকায় বিজিবি’র নামে কখনো সিও লাইন, কখনো ক্যাম্প লাইন ও কখনো টহল লাইনের মাধ্যমে পণ্য নিয়ে আসা হতো। বর্তমানে করিম নিজেই এ লাইন পরিচালনা করছেন। অভিযোগ রয়েছে; হরিপুরের চোরাকারবারিরা ভারত পালিয়ে যাওয়ার আগে জৈন্তাপুরের একাধিক খাঁসিয়া জুমে আত্মগোপনে ছিলেন। তাদের শেল্টার দিয়েছেন করিম।

যেসব পথ দিয়ে আসে চোরাই পণ্য: জৈন্তাপুর বাজারের চোরাচালানের গরু-মহিষসহ বিভিন্ন পণ্য আসে। সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় চোরাই পণ্য নিয়ে আসার ধুম। আর শেষ হয় ভোর রাতে। এ কারণে রাতে জেগে থাকে জৈন্তাপুর বাজার। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- খাঁসি হাওর, মোকামপুঞ্জি, শ্রীপুর, মিনাটিলা, আদর্শগ্রাম, কেন্দ্রী দিয়ে সীমান্ত দিয়ে নিয়ে আসা গরু মহিষ শেওলারটুক হয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলার মঞ্জিলতলা, কাকুনাখাই, পাঁচ সেউতী হাওর দিয়ে কুওর বাজার, কেন্দ্রী লম্বাটিলা, ডিবির হাওর, ঘিলাতৈল, টিপরাখলা, করিমটিলা, ভিরতগোল, বাইরাখেল, হর্ণি, মাঝেরবিল, সাইনবোর্ড হয়ে বিভিন্ন পথে আসা গরু-মহিষ আসে। লালাখাল হয়ে নিয়ে আসা গরু-মহিষ দরবস্ত ও চতুল বাজারে প্রবেশ করে। বিজিবি ও পুলিশ প্রশাসন থেকে এসব পণ্য নিরাপদ রাখতে করিমই মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

করিম আহমদের বক্তব্য: এ ব্যাপারে শুক্রবার বিকালে করিম আহমদের সঙ্গে কথা হয় মানবজমিনের। বাজার ইজারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন- বাজারে শরীকান শতাধিক ব্যক্তি। ইজারাদার হিসেবে আমার নাম দেয়া হয়েছে। আমার নামে বাজার এলেও এখনো নিয়ন্ত্রণ পাইনি। ফলে বাজারে পশু কোথায় থেকে আসে সে ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না বলে জানান। বলেন- আমি কখনো বিজিবি’র লাইনম্যান ছিলাম না। এখনো নেই। এসব বিষয়ে আমার ওপর সবসময় দোষ দেয়া হয়। কোনো সিন্ডিকেটও নেই বলে দাবি করেন। করিম বলেন- বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা টহল দেন। কোনো পণ্য নিয়ে আসা খুব কঠিন। এ কারণে ভারত থেকে কম পণ্য আসছে।

mzamin