Showing posts with label ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ. Show all posts
Showing posts with label ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ. Show all posts

Friday, March 13, 2015

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৭৫ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

চট্টগ্রামে সরকারি অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ছিল বিপ্লবীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযান। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল এই সফল আক্রমণের মধ্য দিয়ে বিপ্লবীরা প্রচুর অস্ত্র সংগ্রহ করেন। এই আক্রমণের নেতা ছিলেন সূর্যসেন। স্থানীয় ন্যাশনাল ইন্সটিটিউটের শিক্ষক ছিলেন বলে সূর্যসেন মাস্টারদা নামে সুপরিচিত। এর পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণ পরিচালিত হয় ১৯৩২ সালে। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে ক্লাবে বিপ্লবী কর্মী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে আক্রমণ পরিচালিত হয়। চট্টগ্রামের পুলিশ ইন্সপেক্টর খান বাহাদুর আহসানউল্লাহকেও হত্যা করে বিপ্লবীরা। চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশ বিপ্লবী পরে ধরা পড়েছিলেন। বিচারে সূর্যসেনের ফাঁসি হয়। প্রচণ্ড দমন অভিযানের মধ্য দিয়ে ১৯৩০ সালে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অবসান ঘটে।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার কারণগুলো পরীক্ষা করা যেতে পারে। আত্মগোপন করে আন্দোলন চালানো হতো বলে বিপ্লবী আন্দোলন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। বিপ্লবের ব্যাপারে ধারণা স্বচ্ছ না থাকায় সাধারণ মানুষের সার্বিক সহযোগিতা লাভ করতে পারেননি বিপ্লবীরা। বাংলার বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে এ আন্দোলন গণআন্দোলন না হয়ে হিন্দুর আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত হতে থাকে। বিপ্লবীদের বাধ্যতামূলকভাবে অনেক হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান করতে হতো। ফলে এতে মুসলমানদের যোগ দেয়া খুব সহজ ছিল না। বিচ্ছিন্নভাবে নানা জেলায় গোপন সমিতি গঠিত হলেও এগুলোর মধ্যে সমন্বয় ছিল না। তাই তারা সুসংগঠিত তৎপরতা চালাতে পারেননি। এছাড়াও বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতাদের মধ্যে আদর্শগত ধারণা ও মতপার্থক্য ছিল। এ বিষয়গুলো আন্দোলনকে দুর্বল করে দেয়।
বিপ্লবীদের ওপর সরকারের কঠোর দমননীতি ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। এতে বিপ্লবীরা ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এ সময়ে বাংলায় নতুন রাজনৈতিক মতবাদ সাম্যবাদ বা কম্যুনিজম প্রবেশ করে। অনেক বিপ্লবী নেতা বিকল্প হিসেবে এই নতুন মতাদর্শে নিজেদের জড়িয়ে ফেলতে থাকেন। এভাবেই ব্যর্থ হয়ে যায় সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন।
স্বরাজ ও বেঙ্গল প্যাক্ট : অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর কংগ্রেস নেতা চিত্তরঞ্জন দাস ও পণ্ডিত মতিলাল নেহেরুর নেতৃত্বে ভারতীয় কংগ্রেসের একাংশ আইনসভায় যোগদানের চিন্তাভাবনা করেন। ১৯২২ সালের ডিসেম্বরে গয়ায় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনের পর চিত্তরঞ্জন দাস কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং কিছুসংখ্যক অনুসারী নিয়ে স্বরাজ্য পার্টি নামে একটি দল গঠন করেন। এ দলের উদ্যোগে পরবর্তী সময়ে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য জোরদার করার জন্য বাংলায় একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়, যা বেঙ্গল প্যাক্ট নামে সুপরিচিত।
স্বরাজ্য পার্টি ও স্বরাজ : সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা নয়, দলীয় কর্মসূচির মধ্য দিয়ে একটি পরিবর্তন আনার লক্ষ্যেই স্বরাজ্য পার্টি গঠিত হয়েছিল। এ দলের লক্ষ্য ছিল বাঙালির স্বশাসন প্রতিষ্ঠা। তাই স্বরাজ্য পার্টির উদ্দেশ্য বিবেচনায় এর কর্মভূমিকা স্বরাজ নামে পরিচিত।
দল গঠিত হওয়ার পর ১৯২৩ সালের বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচনে স্বরাজ্য পার্টি অংশগ্রহণ করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য লাভ করেছিল। এ নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের ১৩৯টি আসনের মধ্যে ৪৬টি আসন লাভ করে স্বরাজ্য দল। বাংলার গভর্নর লর্ড লিটন স্বরাজ্য পার্টিকে মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান জানালে সিআর দাস তা প্রত্যাখ্যান করেন।
স্বরাজ্য পার্টি কতগুলো কর্মসূচি সামনে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করে। এগুলো হচ্ছে- ১. আইনসভায় সরকারি কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করা এবং ১৯১৯ সালের সরকারি সংস্কার কার্যকর করতে না দেয়া; ২. দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তিতে বাজেট প্রত্যাখ্যান করা এবং মন্ত্রিসভার পতন ঘটানো; ৩. জাতীয়তাবাদী চেতনা স্পষ্ট করার লক্ষ্যে আইনসভায় বিভিন্ন প্রস্তাব ও বিল উত্থাপন করা; ৪. ইংরেজ শাসকদের জন্য এ দেশ শাসন করার পথ জটিল করে তোলা। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে স্বরাজ্য দল ১৯১৯ সালের সংস্কার কর্মসূচি অকার্যকর করে স্বায়ত্তশাসনের পথ প্রশস্ত করতে চেয়েছিল।

Friday, March 6, 2015

পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করতে হবে by এ কে এম শাহনাওয়াজ

ছোটবেলায় যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, তখন দারুণ পুলিশভীতি ছিল। আমার ভয়ের প্রধান কারণ ছিল পুলিশের খাকি পোশাক, হাতে লাঠি, কাঁধে রাইফেল। আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে একটি পুলিশ ফাঁড়ি ছিল। এখনও আছে। সে সময় রিকশায় করে স্কুলে পাঠানোর বিলাসিতা অনেক পরিবারেরই ছিল না। আমাদেরও তাই। হেঁটেই যেতে হতো। মনে পড়ে আসা-যাওয়ার পথে পুলিশ ফাঁড়িটি নজরে আসতেই বুক ধক করে উঠত। চোখ প্রায় বন্ধ করে কোনোভাবে ফাঁড়ি এলাকা পার হতাম। একই কারণে সম্ভবত খাকি পোশাক পরা পাটকলের দারোয়ানকেও পুলিশ ভেবে ভয় পেতাম। পরে শৈশবেই ধীরাজ ভট্টাচার্যের ‘যখন পুলিশ ছিলাম’ বইটি পড়ি। ওই সময় থেকেই সম্ভবত পুলিশের প্রতি ভয় কাটতে থাকে। পুলিশকে মানবিক হিসেবেই দেখতে থাকি। অনেক দিন থেকেই আমাদের সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে, নাটকে পুলিশকে খল চরিত্রে দেখানো হয়। উপস্থাপন করা হয় দুর্নীতিপরায়ণ হিসেবে। সাহিত্যে জীবনের ছবিই প্রতিফলিত হয়। হয়তো ক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ আছে বলেই কোনো কোনো পুলিশ সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকতে পারেন।
অনেক বছর আগের কথা। বিশেষ প্রয়োজনে সাভার থানায় যেতে হয়েছিল। এর আগে থানায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না। আমার প্রয়োজন ওসি সাহেবের সঙ্গে কথা বলার। তিনি বিশেষ কাজে বাইরে ছিলেন। চলে আসবেন। পরিচয় জেনে এসআই পদমর্যাদার একজন সমাদর করে বসালেন। চা খেতে খেতে কথা বলছিলাম। গরমের দিন। ঘরে একটি বৈদ্যুতিক পাখা ছিল। নষ্ট থাকায় থেমে আছে। আসবাবপত্রের অবস্থা ভালো না। জোড়াতালি দেয়া। দীনহীন অবস্থা। জানলাম সরকারি বরাদ্দের অপ্রতুলতার কথা। বুঝলাম অপরাধীদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে প্রয়োজন মেটাতে হয়। তা ছাড়া দায়িত্ব অনুযায়ী পুলিশের বেতন ও আনুষঙ্গিক সুযোগ সম্মানজনক নয়। এসব কারণেই সম্ভবত কোনো কোনো পুলিশ সদস্য দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তবে সামগ্রিকভাবে পুলিশকে নেতিবাচক চরিত্রে উপস্থাপন করা খুব বাস্তবসম্মত হবে না।
পুলিশের প্রতি বড় শ্রদ্ধা তৈরি হল মুক্তিযুদ্ধের সময়। রাজারবাগে পুলিশের যে বীরোচিত ভূমিকা রাখার কথা জেনেছি, তাতে তাদের দেশপ্রেম আমাকে মুগ্ধ করেছে। পুলিশের প্রতি আমার মনে শ্রদ্ধার আসন অনেক বেড়ে গিয়েছিল তখন। তাই যখন পুলিশ সদস্যদের কোনো বড় স্খলনের কথা সামনে আসে, তখন খুব কষ্ট পাই। মুক্তিযুদ্ধে আত্মাহুতি দেয়া বীর পুলিশ সদস্যদের কথা ভেবে ভীষণ বিব্রত হই।
কয়েক বছর আগের কথা। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়ে একজন অসাধারণ মেধাবী ছাত্রকে পাই। মাশরুর ওর নাম। ছ’ ফুটের ওপর লম্বা, সুদর্শন ছেলে। ও প্রায় দিনই ক্লাসের পর সুযোগ পেলে আমার কাছে আসত। নানা বিষয়ে কথা হতো। প্রচুর পড়াশোনা করত মাশরুর। আমার কাছ থেকে অনেক বইয়ের খোঁজ নিত। ওর কাছ থেকেও অনেক বইয়ের সন্ধান পেতাম। কথায় বুঝতাম দেশের প্রতি ভীষণ ভালোবাসা ওর। মাশরুরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষের দিকে তখন। ও জানাল বিসিএস পরীক্ষা দেবে। আমার পরামর্শ ও পরিচর্যা চায়। আমাকে বিস্মিত করে জানাল ওর একমাত্র লক্ষ্য পুলিশ ক্যাডারে চাকরি করা। কারণ জানতে চাইলাম। বলল, স্যার মুক্তিযুদ্ধে রাজারবাগে পুলিশের বীরত্বগাথা শুনে আমি গর্ববোধ করি। যখন নানা কারণে পুলিশের প্রতি মানুষ নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে, আমার তখন খুব খারাপ লাগে। আমি চাই পুলিশে যোগ দিয়ে পুলিশের সম্মান ফিরিয়ে আনায় ভূমিকা রাখতে। ওর কথায় আমি আপ্লুত হয়েছিলাম। মাশরুরের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এএসপি হিসেবে রাজধানীর এক মডেল থানায় দায়িত্বরত ছিল। আমি জেনেছি বেশ কিছু অসাধারণ সাফল্যে ও পুলিশ বিভাগে অনেকের নজর কেড়েছে। জানলাম এখন উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে রয়েছে।
এ দেশে রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কোনো সরকারই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ছে প্রশাসনের সর্বত্র। ক্ষমতার রাজনীতি কলুষিত করছে চারপাশের সব প্রতিষ্ঠানকে। সব ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরা পুলিশ প্রশাসনকে তাদের রাজনীতির হাতিয়ার বানাতে চেয়েছে। ভেতরে ভেতরে রাজনীতিকরণও সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশের উচ্চতর পদে পদ-পদায়ন, পদোন্নতিতে নাকি রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে। এতে বৃদ্ধি পাচ্ছে পারস্পরিক ক্ষোভ ও হতাশা। অন্যান্য দিক ছাড়াও পুলিশের নিয়োগ বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। এ অবস্থা পুলিশের ভেতরকার শক্তিকে অনেক বেশি দুর্বল করে দেয়। রাজনীতিকরণের কুফল চারিত্রিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে পুলিশকে। এর দীর্ঘ কুপ্রভাব বয়ে বেড়াতে হবে এই প্রতিষ্ঠানকে। ‘ক্রস ফায়ার’ নামের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নির্দেশনাতেই হয়।
পুলিশকে অনেককাল ধরেই ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলনের হাতিয়ার হিসেবে। এর পথ ধরে গ্রেফতার বাণিজ্য, ঘুষ বাণিজ্যের কথা আজকাল অনেক বেশি শোনা যাচ্ছে। সৎ পুলিশ অফিসার ও সদস্যরা এসব কারণে মানসিক পীড়নে ভুগছেন।
অনেক স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড ঘটেছে নিকট অতীতে, যার কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। এর পেছনে তিনটি কারণের কথা অনেকেই বলে থাকেন। এক. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব, দুই. পুলিশের দুর্নীতিপরায়ণতা এবং তিন. পুলিশের সঠিক প্রশিক্ষণের অভাব। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় নানা দিক থেকে পুলিশের সক্ষমতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ব্লগার অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের পর প্রশ্নটি অনেক বেশি সামনে চলে এসেছে। পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা এ ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দেননি। পেট্রলবোমা মারা আর ককটেল ফোটানোর মাঝখানেই এবার বইমেলা হয়ে গেল। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চয়তা দিয়েছিল তারা নিñিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। উপরন্তু অভিজিৎ রায়কে হত্যার হুমকির ব্যাপারটি পুলিশকে অবহিত করা হয়েছিল আগেই। সেই প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা বলয়ের ভেতর লোকারণ্যে ক’জন খুনি আড়াল থেকে গুলি নয়- অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করল, তার স্ত্রীকে আহত করা হল, তারপর খুনিরা বিনা চ্যালেঞ্জে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল! কাছেপিঠে নিরাপত্তা বলয়ে নিয়োজিত পুলিশ থাকলেও কেউ এগিয়ে এলো না। এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে পুলিশের নিরাপত্তার আশ্বাসে মানুষ আশ্বস্ত হবে কীভাবে! আরও দু-একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসছে। বুঝলাম বোমাবাজদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সারা দেশে পুলিশ নজরদারি করতে পারবে না। কিন্তু বলতেই হয়, হরতাল-অবরোধের প্রথম থেকেই বারবার নীলক্ষেত-নিউমার্কেট এলাকায় ককটেল মারা হচ্ছে, মানুষ আহত হচ্ছে, সেখানে পুলিশি তৎপরতা নেই কেন? ধরা পড়ছে না কেন হত্যাকারী? একইভাবে লক্ষ্মীবাজার-বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় উপর্যুপরি কয়েকবার বোমা হামলা হল, আগুনে পোড়ানো হল গাড়ি। একাধিক মানুষ আহত হল। পুলিশি কার্যকর নজরদারি থাকলে একই জায়গায় অপরাধীদের বারবার অপরাধ সংঘটনের সাহস থাকত না। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, এই চিহ্নিত বিশেষ এলাকাটি পুলিশি নজরদারির বাইরে রয়ে গেল কেমন করে? আমাদের দুর্ভাগ্য, কেতাবি ভাষায় পুলিশ জনগণের সেবক হলেও এসবের কোনো ব্যাখ্যা পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া যায় না।
এসব কারণে আমাদের সামনে পুলিশি নিরাপত্তার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সত্যিই কি আমাদের দেশের পুলিশ বাহিনী এতটা দুর্বল? পুলিশের উল্লেখ করার মতো অনেক সাফল্য আছে। তাহলে কি পুলিশ বাধ্য হচ্ছে ব্যর্থতার কলংক তিলক কপালে পরতে? পূর্বসূরিদের গৌরবময় ঐতিহ্য ধারণ না করে নিজেদের নিষ্প্রভ করে তুলছে?
আমাদের ধারণা পুলিশি শক্তিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে গিয়ে পুলিশের ভেতরের নৈতিক ও আদর্শিক জায়গাটিকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার আমাদের দেশে নতুন নয়। বিএনপির শাসনামলে আমি একটি হলের প্রভোস্টের দায়িত্ব পালন করেছি। সহিংস ছাত্র সংঘাতের সময় সশস্ত্র সরকারদলীয় ছাত্রদের কখনও স্পর্শ করতে পারেনি পুলিশ। আওয়ামী লীগের শাসনযুগে ছাত্রলীগের দাপটও একই রকম। এখানেও পুলিশকে নীরব থাকতে হয়েছে। অনেক পুলিশ অফিসার একান্ত আলাপে তাদের অসহায়ত্বের কথা বলে থাকেন।
এভাবে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রয়োজনে ব্যবহার করতে গিয়ে বিনিময়ে এদের নৈতিক স্খলনকে প্রশ্রয় দিতে হচ্ছে শাসক দলকে। ফলে শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে পুলিশকে দুর্বল করে ফেলা হচ্ছে। দুর্নীতিপরায়ণ করে ফেলা হচ্ছে। এর ফল কখনও ভালো হতে পারে না।
হরতাল-অবরোধ ও সহিংসতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখা, পরীক্ষা সচল রাখার জন্য আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে হলে পুলিশকে দৃঢ় ভূমিকা রাখতে হবে। এই দৃঢ়তা বাস্তবক্ষেত্রে নেই বলে সরকার আদালতের নির্দেশ পালন করতে পারছে না।
আমরা মনে করি বিশেষ সংকটে বিজিবি, র‌্যাব ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হলেও আইনশৃংখলা রক্ষায় সাংবাৎসরিক যারা ভূমিকা রাখেন, তারা হচ্ছেন আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্য। এই বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ না হলে দৃঢ় ও আদর্শিক পুলিশ আমরা পাব না। রাজনীতিকদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কোন পথে হাঁটব।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬৭ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইনের কতগুলো বৈশিষ্ট্য ছিল। যেমন- ১. কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভা গঠন। কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য সংখ্যা নির্ধারিত হয় ১৬-৬০। এর মধ্যে অনধিক ২৮ জনকে সরকার মনোনীত করতে পারবে, ২. গভর্নর জেনারেলের নির্বাহী পরিষদে (ক) পদাধিকার বলে সদস্য, (খ) মনোনীত সরকারি সদস্য, (গ) মনোনীত বেসরকারি সদস্য, (ঘ) নির্বাচিত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়, ৩. এই সংস্কারে আইনে পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়, ৪. মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা স্বীকৃত হয় এবং ৫. এ আইনে সর্বপ্রথম ব্রিটিশ ভারতে প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থার ধারণা স্বীকৃত হয়। আইনের ফলে মুসলমানদের দাবি অনেকাংশ স্বীকৃত হলে মুসলমান নেতৃবৃন্দ সন্তুষ্ট হন। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের মনে হতাশা সৃষ্টি হয়। ফলে এ আইন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কিছুটা ব্যবধানও গড়ে তুলেছিল।
বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) : কংগ্রেস ও বাঙালি হিন্দুদের বিরোধিতা এবং সন্ত্রাসবাদীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে অবশেষে বঙ্গভঙ্গ প্রসঙ্গে নতুনভাবে ভাবতে হয় ইংরেজ শাসকদের। লর্ড হার্ডিঞ্জ বড়লাট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ১৯১১ সালের ২৫ আগস্ট গোপনীয়ভাবে ভারত সরকারকে প্রকৃত অবস্থা জানিয়ে প্রশাসনিক পরিবর্তনের সুপারিশ করেন। এক্ষেত্রে নতুন একটি পরিকল্পনাও করা হয়। পরিকল্পনা অনুসারে প্রেসিডেন্সি, বর্ধমান, ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পাঁচটি বাংলা ভাষাভাষী বিভাগ নিয়ে বাংলা প্রদেশ গঠনের সুপারিশ করা হয়। নতুন বাংলা প্রদেশের রাজধানী করা হয় কলকাতাকে।
১৯১১ সালের ডিসেম্বরে রাজা পঞ্চম জর্জ দিল্লিতে তার রাজ্যাভিষেক অনুষ্ঠানে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করে উপরে উল্লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ১৯১২ সালের ১ এপ্রিল দুই বাংলা আবার একত্রিত হবে। বঙ্গভঙ্গ রদ করে গৃহীত নতুন ব্যবস্থাটি ১৯১২ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়। স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তারা একে সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা বলে আখ্যা দেন। পাশাপাশি বর্ণ হিন্দু ও কংগ্রেস নেতারা বিজয়োল্লাস প্রকাশ করতে থাকেন। প্রচণ্ড কষ্ট ও হতাশায় নবাব সলিমুল্লাহ রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ পূর্ব বাংলার মুসলমানদের শান্ত করার জন্য আশ্বাস দেন, ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনার জন্য একটি সংস্থাও গঠন করা হয়। বাংলার অনেক হিন্দু এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের নিপীড়িত বাংলার মুসলমানরা যেভাবে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল, ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা ঠিক সেভাবেই তাদের হতাশার অন্ধকারে টেনে নেয়। মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজ ও কংগ্রেসবিরোধী মনোভাব বাড়তে থাকে। ফলে হিন্দু-মুসলমান দুই গোষ্ঠীর মধ্যেই কিছুটা দূরত্ব বেড়ে যায়। এ অবস্থায় হিন্দু ও মুসলমান নেতৃবর্গ খুব স্বস্তিতে ছিলেন না। তারা অনুভব করেন, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার দূরত্ব ইংরেজ সরকারকে লাভবান করবে। এ কারণে উভয় সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ এ সময়ের রাজনীতিতে নতুন কিছু পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তা করেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা স্থাপনের জন্য ১৯১৬ সালে লক্ষ্মৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর পরে সে সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতে খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এ আন্দোলন এদেশীয়দের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী ঐক্য গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল। এভাবে এক পর্যায়ে শুরু হয় ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন। হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সামনে রেখে ১৯২৩ সালে স্বাক্ষরিত হয় বেঙ্গল প্যাক্ট। বঙ্গভঙ্গের পরবর্তী সময়ের এই রাজনীতি ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত একই ধারা বজায় রাখে। পরে আবার রাজনীতিতে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

Wednesday, March 4, 2015

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬৬ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিলেতি পণ্য বর্জন এবং স্বদেশী পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ আন্দোলন স্বদেশী আন্দোলন নামেও পরিচিতি পায়। কংগ্রেসের নেতৃত্বে পরিচালিত এ আন্দোলনে শহর ও গ্রামগঞ্জে প্রকাশ্যে বিলেতি দ্রব্য পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং স্বদেশী পণ্য ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা হয়। স্বদেশী আন্দোলনের ফলে বিদেশী পণ্যের চাহিদা অনেক হ্রাস পায়। ১৯০৬ সালে সরকারি বিবরণ থেকে জানা যায়, বিলেতি সাবান, লবণ, সুতি কাপড় ও সিগারেটের আমদানি অনেক কমে গিয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে স্বদেশী তাঁত বস্ত্র, সাবান, লবণ, চিনি ও চামড়ার দ্রব্য।
উপরের আন্দোলনগুলো পরিচালিত হওয়ার পরও সরকারের সিদ্ধান্তে পরিবর্তন না আসায় কংগ্রেসের চরমপন্থী দল বৈপ্লবিক আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকা ও কলকাতাকে কেন্দ্র করে ঢাকার অনুশীলন সমিতি ও কলকাতার যুগান্তর পার্টি ছিল বৈপ্লবিক আন্দোলনের দুই প্রধান শক্তিশালী সংগঠন। এই বৈপ্লবিক সংগঠনের যুবকেরা অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ এবং ইংরেজ সমর্থকদের হত্যা করে একটি তীব্র সংকট সৃষ্টি করার পদক্ষেপ নেয়। ১৯০৮ সালে বাংলার গভর্নর এন্ড্রু ফ্রেজার এবং পূর্ববঙ্গ ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলারকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। বিপ্লবীরা প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংস ফোর্ডের গাড়িতে হামলা চালালে তার স্ত্রী ও কন্যা নিহত হন। বিপ্লবী ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী ধরা পড়লে প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করেন এবং ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়। ১৯০৮ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে বিপ্লবীদের গুলিতে বহুসংখ্যক ইংরেজ, পুলিশ কর্মকর্তা এবং তাদের দেশীয় সহযোগী নিহত হয়।
মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন (১৯০৯) : বাংলা তথা ভারতের রাজনীতি যখন এভাবে উত্তপ্ত হচ্ছিল, তখন মুসলমানদের দাবি ব্রিটিশ সরকার নতুনভাবে বিবেচনা করার চিন্তা করে। এরই ফল হিসেবে ১৯০৯ সালে মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন বাস্তবায়ন করা হয়। উনিশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত ভারতের হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায় স্বাধিকার লাভের জন্য যে আন্দোলন পরিচালনা করে আসছিল তা ব্রিটিশ শাসকদের প্রবলভাবে ভাবিয়ে তোলে। এ কারণেই তারা শাসনতন্ত্রে নানা ধরনের সংস্কার এনে ভারতীয় জনসাধারণ ও নেতাদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে, যার মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের ধারণা প্রকাশ পেয়েছিল। ভারতবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সাংবিধানিক সংস্কারের। মুসলমান নেতৃত্বের কাছে স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম বড় কারণ প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থা। এ পরিস্থিতিতে ১৯০৬ সালের অক্টোবরে আগা খানের নেতৃত্বে মুসলিম প্রতিনিধিদের একটি দল লর্ড মিন্টোর কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করে। ওই স্মারকপত্রে দাবি করা হয়, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে এবং মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতের বদলে রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুসারে তাদের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে জন মর্লি ও লর্ড মিন্টো একটি সংস্কার চিন্তার রূপরেখা প্রণয়ন করেন। ১৯০৯ সালে এই রূপরেখা ইন্ডিয়া অ্যাক্ট হিসেবে বাস্তবায়িত হয়। মর্লি ও মিন্টোর নামানুসারে তা পরিচিত হয় ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কার আইন নামে। এ আইনের কতগুলো শর্ত ছিল। এগুলো হচ্ছে- ক. জনস্বার্থে ভারতীয় নেতৃবর্গ সরকারকে সহযোগিতা করবে, খ. গভর্নর জেনারেল বা বড়লাটের কার্যনির্বাহী পরিষদে একজন ভারতীয় প্রতিনিধি রাখা হবে, গ. বাংলার গভর্নরের একটি কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন করা হবে এবং ঘ. এই পরিষদে কিশোরী লাল গোস্বামীকে নিযুক্ত করা হবে।

Tuesday, March 3, 2015

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬৫ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল হিসেবে মুসলিম লীগের জন্ম হয়। তবে এই সংগঠন গড়ে তোলার একটি তাৎক্ষণিক কারণ ছিল। ভারতের মুসলমান নেতারা মুসলমান সম্প্রদায়ের শিক্ষাসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য এবং সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে বছরে একবার আলোচনা অনুষ্ঠানে মিলিত হতেন। কংগ্রেসের প্রেরণায় বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে ‘সর্বভারতীয় শিক্ষা সম্মেলন’ নামে এমন এক সভা ১৯০৬ সালে ঢাকার শাহবাগে অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে মুসলমানদের নেতা খাজা সলিমুল্লাহ কংগ্রেস সমর্থকদের বঙ্গভঙ্গবিরোধী বিক্ষোভ মোকাবেলা করার জন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। শাহবাগে অনুষ্ঠিত সভায় তিনি তার এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সভার সভাপতি নওয়াব ভিখার-উল-মুল্ক প্রস্তাবটি সমর্থন করেন। ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে ৩৫ জন মুসলিম প্রতিনিধি বড়লাট মিন্টোর সঙ্গে একটি দাবিনামা নিয়ে সাক্ষাৎ করেন। সিমলায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল বলে তা ‘সিমলা ডেপুটেশন’ নামে পরিচিত। দাবিতে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনের অধিকারসহ নানা বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সময়েই মুসলিম নেতারা তাদের দাবি আদায়ের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন।
মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার পেছনে তিনটি উদ্দেশ্য শনাক্ত করা যায়। এগুলো হচ্ছে- ক. ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতের মুসলমানদের আনুগত্যবোধ গড়ে তোলা; খ. ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা এবং সরকারের কাছে তাদের দাবি উত্থাপন করা; গ. এসব উদ্দেশ্য ক্ষুন্ন না করে ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ, নওয়াব ভিখার-উল-মুল্ক, নওয়াব মহসীন-উল-মুল্ক প্রমুখের নেতৃত্বে ‘নিখিল ভারত মুসলিম লীগ’ নামে এ সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। মুসলিম লীগের প্রথম সভাপতি হন আগা খান এবং যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন নওয়াব ভিখার-উল-মুল্ক ও নওয়াব মহসীন-উল-মুল্ক। মুসলিম লীগের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, জাফর আলী খান, হাকিম আজমল খান, মুহম্মদ আলী প্রমুখ।
বঙ্গভঙ্গবিরোধীরা যে আন্দোলন গড়ে তোলে, সাধারণভাবে তা স্বদেশী আন্দোলন নামে পরিচিত। এ আন্দোলন চারটি পর্যায়ে বিভক্ত ছিল। প্রথমেই প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দান ও প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জ্ঞাপন করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ছিল আÍশক্তি গঠন ও জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলা। তৃতীয় পর্যায়ে ‘বয়কট’ অর্থাৎ বিলাতি পণ্য বর্জন এবং স্বদেশী পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহার। চতুর্থ পর্যায়ে সশস্ত্র বিপ্লব বা সন্ত্রাসের পথ গ্রহণ করা। মূলত বয়কট বা স্বদেশী আন্দোলন থেকেই বৈপ্লবিক বা সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল। ফলে এ দুই আন্দোলন বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে বিশেষ তাৎপর্যের দাবি রাখে।
বিভিন্ন সভায় বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্য দিয়ে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা হতে থাকে। পাশাপাশি চাপ সৃষ্টি করা হয় ইংরেজ সরকারের ওপর। এ সময় পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত ইংরেজি পত্রিকা ইংলিশম্যান, স্টেটসম্যান, পাইওনিয়ার এবং বাংলা পত্রিকা যুগান্তর, সন্ধ্যা, সঞ্জীবনী, নবশক্তি, হিতবাদী ইত্যাদি বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে।
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের অপরাধে সরকারি স্কুল-কলেজ থেকে বহু ছাত্রকে বহিষ্কার করা হয়। এ কারণে আন্দোলনকারী নেতাদের জন্য জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়ে। জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের ফলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কয়েকটি জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপিত হয় এবং কয়েকটি কারিগরি শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের রংপুর, দিনাজপুর, ময়মনসিংহ ও বরিশালে জাতীয় বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। কিন্তু জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬৪ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

কলকাতার শিক্ষিত বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা পূর্ব বাংলার অনুন্নত ও অবহেলিত মুসলমানদের উন্নতির বিষয়টি সুনজরে দেখেননি। তারা জানতেন বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে নবগঠিত প্রদেশের রাজধানী হবে ঢাকা। এ অবস্থা কলকাতাবাসী ব্যবসায়ী, উকিল ও শিক্ষিত সমাজের স্বার্থবিরোধী হবে বলে মনে করা হয়। কলকাতায় অবস্থানকারী পূর্ব বাংলার জমিদাররাও বিলাসিতা ছেড়ে পূর্ব বাংলায় ফিরে যেতে উৎসাহী ছিলেন না। এসব কারণে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। হিন্দু নেতৃবৃন্দ তথা কংগ্রেসের বঙ্গভঙ্গবিরোধী কার্যক্রম মুসলমান নেতৃত্বকে চিন্তিত করে তোলে। তারা অনেকেই ভাবতে থাকেন, কংগ্রেস মুসলমানদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করছে না। এ কারণে তারা মুসলমানদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক সংগঠন গড়ার পদক্ষেপ নেন। এরই ফল ছিল মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা।
আলীগড় আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসা মুসলমান নেতৃত্বের অনেকেই মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। যদিও পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে ইংরেজদের সঙ্গে মুসলমানদের দূরত্ব বেড়ে গিয়েছিল। মুসলমানদের দীর্ঘদিনের রাজত্ব কেড়ে নেয়ায় তারা ইংরেজদের প্রধান শত্র“ বিবেচনা করে। যে কারণে ইংরেজ শাসন যুগে তারা ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চা থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখে। উনিশ শতকের কয়েকজন শিক্ষিত মুসলমান নেতা বুঝেছিলেন মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত না করে তুললে তারা জাতি হিসেবে অনেকটা পিছিয়ে পড়বে। এদিকে দৃষ্টি রেখে নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখ শিক্ষিত মুসলিম নেতা প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে মুসলমানদের এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। মুসলমানরা ইতিমধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করেছিল বলে ১৮৮৫ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেস গঠিত হলেও অনেক মুসলমান নেতাই এতে যোগ দেননি। অতঃপর ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে প্রেরণা দেয়।
১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই মুসলিম লীগ গঠনের পটভূমি রচিত হয়েছিল। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত হিন্দু নেতৃবৃন্দই কংগ্রেস গঠন করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল এ সংগঠনের মধ্য দিয়ে তারা যেন সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নিতে পারে এবং ভারতে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে সহযোগিতা করতে পারে। এ সময় মুসলমান সমাজের কোনো কোনো শিক্ষিত নেতা বুঝেছিলেন, কংগ্রেসের মাধ্যমে মুসলমানের কোনো উপকার হবে না। তাই সর্বজন মান্য মুসলিম নেতা স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থে ভারতীয় মুসলমানদের কংগ্রেসে যোগ দিতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি আলীগড়ে একটি কলেজ স্থাপন করে একে কেন্দ্র করে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন শুরু করেন, যা আলীগড় আন্দোলন নামে পরিচিত। আলীগড় আন্দোলন মুসলমান সম্প্রদায়ের স্বার্থ সংরক্ষণের প্রশ্নে যে ভূমিকা রেখেছিল, তার মধ্যেই মুসলিম লীগ গড়ার একটি প্রেরণা খুঁজে পাওয়া যায়।
বাংলার মুসলমানদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক ছিল ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা। বাংলার অধিকাংশ মুসলমান পূর্ব বাংলায় বাস করে। কিন্তু শাসনকেন্দ্র কলকাতায় থাকায় নানা ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলা ছিল অবহেলিত। তাই বঙ্গভঙ্গের সূত্রে ঢাকা পূর্ব বাংলার রাজধানী হলে এ অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবে। এ কারণে পূর্ব বাংলার মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা শুনে উল্লাস প্রকাশ করে। কিন্তু অচিরেই এই উল্লাসের বেলুন চুপসে যায়। কলকাতা কেন্দ্রিক কংগ্রেস ও অন্য হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গ বাতিলের দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করে। এবার মুসলমান নেতৃত্ব বুঝতে পারেন, তাদের সম্প্রদায়ের অধিকারের দাবি সরকারের কাছে উত্থাপনের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। এ পটভূমিতেই গঠিত হয়েছিল মুসলিম লীগ।

Monday, March 2, 2015

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬৩ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

ইংরেজ শাসকরা কেন বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা করেছিল, তা নিয়ে নানা ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সরকারি সরল বক্তব্যে বলা হয়, বাংলা, বিহার উড়িষ্যা ও আসাম নিয়ে গঠিত বিরাট বাংলা প্রেসিডেন্সিকে একটি কেন্দ্র হতে একজন প্রশাসকের দ্বারা সুষ্ঠুভাবে শাসন করা কঠিন কাজ ছিল। এ অসুবিধার কথা চিন্তা করে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেন।
একটি অর্থনৈতিক কারণের প্রতিও ইঙ্গিত রয়েছে। ইংরেজ শাসনের শুরু থেকে কলকাতা বাংলাদেশের রাজধানী থাকায় পূর্ব বাংলা বরাবরই অবহেলিত থেকেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা- প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ অঞ্চলের মানুষ পিছিয়ে পড়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়সহ বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলকাতাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকে। ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে পূর্ববঙ্গ অবহেলিত থেকে যায়। কৃষিপ্রধান অঞ্চল হলেও প্রশাসন কেন্দ্র থেকে দূরে থাকায় পূর্ব বাংলার কৃষির উন্নতিও তেমন হয়নি। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পূর্ব বাংলা পিছিয়ে পড়ে।
বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাবের পেছনে সরকারের একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও ছিল। প্রায় ১০০ বছর ধরে সামাজিক, শিক্ষা ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন এদেশের মানুষকে অধিকার সচেতন করে তুলেছিল। বাংলা তথা ভারতের নেতৃবর্গের রাজনীতি চর্চা এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ অর্থাৎ ভারতীয়রাও যে একটি ভিন্ন জাতি সে প্রশ্নে তারা সচেতন হয়ে ওঠে। লর্ড কার্জন বিষয়টির প্রতি নজর রেখেছিলেন। কারণ ইতিমধ্যে ভারতীয়দের রাজনৈতিক সংগঠন কংগ্রেস বিভিন্ন আন্দোলন পরিচালনা করছিল। লর্ড কার্জন ভারতীয়দের ঐক্য ভেঙে দিয়ে তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইলেন। তিনি বুঝেছিলেন, এদেশের হিন্দু ও মুসলমান এ দুই সম্প্রদায়ের জনগণকে যারা পরস্পরের শত্র“তে পরিণত করতে পারবে, তাদের পক্ষে শাসন করা সহজ হবে। এ ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বঙ্গভঙ্গ চিন্তার পেছনে কাজ করেছে।
ব্রিটিশ শাসক চক্রের প্ররোচনায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে পারস্পরিক ঘৃণা ও বিদ্বেষ তীব্র আকার ধারণ করে। এর প্রতিক্রিয়ায় শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। পূর্ববঙ্গের উন্নয়নের প্রশ্ন এবং সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণেই মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে সোচ্চার হয়।
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন এক ঘোষণার মধ্য দিয়ে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করেন। মুসলমানদের জন্য এ সিদ্ধান্ত খুব দ্রুতই ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছিল। ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানী হওয়ায় নানা দিক থেকে পূর্ববঙ্গের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। ঢাকায় একে একে স্থাপিত হয় স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কলকাতার মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন কমে যায়। বঙ্গভঙ্গের সুফল হিসেবে রাজধানী শহর ঢাকায় বড় বড় ইমারত নির্মিত হতে থাকে। হাইকোর্ট, সেক্রেটারিয়েট, কার্জন হল ইত্যাদি নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এভাবেই পূর্ব বাংলার মানুষ নতুনভাবে আশাবাদী হয়ে ওঠে।
বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষিত হলে বাংলার মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। একটি অংশ মনে করে, ইংরেজরা নিশ্চিন্তে দেশ শাসন করার জন্য এ অঞ্চলের অধিবাসীদের দুর্বল করে ফেলতে চাইছে। এ কারণে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার দিন কংগ্রেস দেশব্যাপী শোক দিবস পালন করে। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে হরতাল পালিত হয়। প্রথম দিকে মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে সমর্থন জানায়নি। মৌলভী আবদুল রসুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কলকাতার রাজাবাজারের জনসভায় মুসলিম নেতৃবৃন্দ বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। অবশ্য পরে মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানাতে থাকে। কংগ্রেস সমর্থক ও উচ্চবিত্তের হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা তাদের বক্তব্যে বলেন, এ বিভক্তি বাঙালির ঐক্যকে নষ্ট করে দেবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর হানবে চরম আঘাত। পশ্চিমবঙ্গের বড় বড় পত্রিকায় বঙ্গভঙ্গবিরোধী নিবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে। পত্রিকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইংরেজি পত্রিকা স্টেটসম্যান ও পাইওনিয়ার এবং বাংলা পত্রিকা যুগান্তর, সন্ধ্যা, হিতবাদী, সঞ্জীবনী, নবশক্তি ইত্যাদি।

Saturday, February 28, 2015

ষড়যন্ত্রের রাজনীতি বনাম তারুণ্যের মানবতা by এ কে এম শাহনাওয়াজ

রাজতন্ত্রের যুগে জনগণ পরিচিত ছিল প্রজা বলে। সে সময় অধিকার নিয়ে প্রজার নিরর্থক কোনো মাথাব্যথা ছিল না। রাজ্য বা সাম্রাজ্যের মালিক ছিলেন রাজা বা সম্রাট। রাজার ইচ্ছায় রাজ্য চলত। ভালো রাজা সুশাসন পরিচালনা করতেন। প্রজাদরদি হতেন। প্রজাদেরও অমন রাজার রাজত্বে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব ছিল না। আবার অত্যাচারী রাজাও ছিলেন। অমন রাজার অধীনে জীবন দুঃসহ হয়ে উঠত প্রজা সাধারণের। তবে অকারণে সিংহাসনের দিকে কারও নজর ছিল না। বংশপরম্পরায় রাজপরিবার শাসন করত। মাঝে মধ্যে অন্য রাজ্যের আক্রমণে পরাস্ত হলে সিংহাসন চলে যেত বিদেশী শাসকদের হাতে। তবে বংশ আর মর্যাদাক্রমে রাজরাজড়াদের মধ্যেই সিংহাসন আবর্তিত হতো। সিংহাসন নিয়ে সেখানেও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ঘটনা ঘটত। রক্ত ঝরত। এসব ঝড়-ঝাপটা পোহাতেন সিংহাসনের সুবিধাভোগীরাই। প্রজার গায়ে এসবের আঁচ তেমন লাগত না। একইভাবে ভালো-মন্দে প্রজারা জীবন নির্বাহ করত।
আধুনিক যুগে রাজতন্ত্র কার্যকরভাবে বহাল নেই। প্রজাতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, সাম্যবাদী নানা নামে রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন প্রতিষ্ঠিত। বলা হয়, এখন আর কেউ প্রজা নয়। সবাই রাষ্ট্রের নাগরিক। জনগণই সব শক্তির উৎস। তারাই রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল ঘটানোর মূল চালিকাশক্তি। আসলে এসব কেতাবি কথা। বাস্তবে স্বার্থপর হিংস্র রাজনীতির বলয়ে জনগণ এখন প্রজারও অধম। এখনও রাষ্ট্রক্ষমতার জন্য রাজনীতিকরা ষড়যন্ত্র করেন। তবে রক্তারক্তি তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। নিজেদের ক্ষমতা লাভের সিঁড়ি বানায় জনসাধারণকে। জনগণকেই জিম্মি করে। নির্বাচন নামের বস্তু দিয়ে সাধারণ মানুষকে করে প্রতারণা।
২০১৩ সালে বিএনপি জোট মনে করেছিল, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তারা নির্বাচন করলে ফলাফল অনুকূলে আনতে পারবে না। তাই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তোলে। আওয়ামী লীগ অনড় ছিল। সাংবিধানিক ও আইনগত শক্তি তার রয়েছে। তাই ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ব্যাপারে অটল থাকে। দাবি মানানোর জন্য এখন আর প্রাসাদের ভেতর বিবদমান দলগুলো নিজেদের রক্ত ঝরায় না। জিম্মি করে ফেলে সাধারণ মানুষকে। দস্যুর মতো ছুরি ধরে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের বুকে। এভাবেই দুর্বল করতে চায় প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে। ২০১৪-এর নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি জোট। শুধু বর্জন নয়, ঘোষণা দিয়েছিল ‘নির্বাচন হতে দেয়া হবে না’। এ লক্ষ্যে ২০১৩-এর ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছিল নাশকতা। বিএনপি-জামায়াতের পরিচালনায় পেট্রলবোমায় মানুষ আর যানবাহন পোড়ানোর সংস্কৃতি প্রবলভাবে চলে আসছে সে সময় থেকে। নির্বাচনে মনোনয়ন না নিয়ে একটি শূন্যতা তৈরির চেষ্টা করে বিরোধী জোট। যে কারণে সরকারদলীয় জোটের ১৫৪ প্রার্র্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হয়ে যান। বর্জন ও প্রতিহতকারীরা নির্বাচন কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারিত অনেক স্কুলে আগুন দেয়। বোমা ছুড়ে আতংক সৃষ্টি করে। যার ফল হিসেবে আতংকগ্রস্ত অনেক ভোটারই ভোট দিতে আসেননি। এভাবে এ যুগে সিংহাসন দখলের লড়াইয়ে বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। একই ধারাবাহিকতায় সিংহাসন প্রত্যাশীরা বিগত প্রায় দুই মাস ধরে সাধারণ মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি, শিক্ষা সব
কিছুকে জিম্মি করে হরতাল-অবরোধের ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে। এসব কর্মসূচি কার্যকর না থাকলেও চোরাগোপ্তা বোমা হামলায় জীবন বিপন্ন হচ্ছে সাধারণ মানুষের। মানুষ পথে বেরুচ্ছে ঠিকই। তবে আতংকমুক্ত জীবনযাপন করতে পারছে না।
আমাদের ক্ষমতার রাজনীতির ভয়ংকর মানুষগুলো যখন নিরপরাধ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে দ্বিধা করছে না, ঠিক তখনই একদল তরুণ তাদের বন্ধুর জীবন রক্ষায় ছুটছে দ্বারে দ্বারে। এজন্যই বুঝি হাজার হতাশায় আমরা আলোর শিখা এখনও দেখতে পাই। আবার নতুন করে বেঁচে থাকার আশ্বাস খুঁজে পাই। পাঠকের কাছে নিবেদন করতে চাই সে কথাটিই।
দিন কয়েক আগে আমার এক ছাত্রী টেলিফোন করে জানাল, ওদের এক বন্ধু ভয়ংকর অসুস্থ। ওরা বন্ধুর জন্য কিছু করতে চায়। এজন্য পরামর্শ করতে আমার কাছে আসবে। আমার কক্ষে বিভিন্ন বিভাগের চারজন ছাত্রী এলো। ওদের চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা। জানাল, ওদের বন্ধু ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির ছাত্রী নুসরাত জেরিন জিনিয়ার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি আছে। ডাক্তার বলেছেন, রোগীর অবস্থা অনেকটা জটিল। বাঁচাতে হলে দ্রুত বিদেশে নিয়ে জিনিয়ার বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করতে হবে। জিনিয়া স্নাতক চূড়ান্ত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে। এখন স্নাতকোত্তরের ছাত্রী। পিতৃহারা মেয়েটির পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি নেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করার। ডাক্তাররা ধারণা দিয়েছেন, বিদেশে এ চিকিৎসা করাতে কমপক্ষে ৭৫ লাখ টাকা প্রয়োজন।
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক আবুল হোসেন স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন কোনো আর্থিক খাত নেই যেখান থেকে সহায়তা করতে পারেন। তবে জিনিয়ার বিভাগে ছাত্রকল্যাণের একটি ফান্ড আছে। সেখান থেকে ৪-৫ লাখ টাকা ঋণ দেয়ার একটি অনুমোদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিতে পারে। আমি ছাত্রীদের কাছে জানতে চাইলাম ওরা কী করতে চায়। এ তরুণীদের কাছে তো অত রাস্তা খোলা নেই। তবে হতাশার ভেতরেও একটা দৃঢ়তা আছে ওদের কণ্ঠে। ওরা যে করেই হোক বন্ধুকে বাঁচানোর জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করবে। ওরা জানাল, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে যাবে। ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষকদের কাছে সাহায্যের আবেদন করবে। পথে পথে মানুষের কাছে সাহায্য চাইবে। আমি ওদের দৃঢ় প্রত্যয়ী কণ্ঠ শুনে বিস্মিত হলাম। কী বৈপরীত্য! রাষ্ট্রক্ষমতা পাওয়ার জন্য লোভী রাজনীতিকরা যখন সাধারণ সুস্থ নিরপরাধ মানুষকে বোমা মেরে পুড়িয়ে মারছে, তখন একদল তরুণ জীবনবাজি রেখে ছুটছে অসুস্থ বন্ধুর জীবন রক্ষার জন্য।
আমি বললাম, তোমরা যে উদ্যোগের কথা ভাবছ তা তো প্রয়োজনের বালিতে বারি বিন্দু হবে। যে মেয়েটিকে বিদেশে পাঠিয়ে দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে তার দরকার বড় মাপের প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যক্তিক ও সরকারি সহায়তা। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের পথঘাট আমার চেনা নেই। আমি আমার দুই বন্ধুকে ফোন করলাম। ওরা অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার সরকারি কর্মকর্তা। ওদের পরামর্শ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মহোদয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা তার অফিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আবেদন জানালে একটি উপায় হতে পারে। আইআইটি বিভাগের স্নেহভাজন সভাপতিকে এ পরামর্শ দিলাম। আমি ওদের বললাম, তোমরা তোমাদের মতো চেষ্টা করতে থাক।
পরদিন আমি একুশের বইমেলায় গেছি। হঠাৎ একটি মেয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে কতগুলো হ্যান্ডবিল। আমার সামনে একটি এগিয়ে দিল। বলল, ওদের অসুস্থ বন্ধুর জন্য সাহায্য চায়। দেখলাম জিনিয়ার জন্য ও পথে দাঁড়িয়েছে। আমাকে চিনত না। পরিচয় দিলাম। জানাল, ওরা কয়েকটি মেয়ে হরতাল উপেক্ষা করে বাসে চড়ে জাহাঙ্গীরনগর থেকে বইমেলায় এসেছে। এক-একজন এক একদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এভাবে মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়ার অভিজ্ঞতা ওদের নেই। তাই খুব দ্বিধা হচ্ছে। আজ বন্ধুর জীবন রক্ষার জন্য সব দ্বিধা অতিক্রম করে পথে নেমেছে। নগদ অর্থ নয়। লিফলেটে ঠিকানা রয়েছে। হৃদয়বানরা যাতে যোগাযোগ করেন।
আমি একটু আড়ালে সরে গিয়ে ওকে লক্ষ করছিলাম। খুব দ্বিধায় ও কম্পিত হাতে মেলায় আসা মানুষদের কাছে লিফলেট তুলে দিতে চাইছে। দেখলাম, ব্যস্ত ও সন্দিগ্ধ মানুষের অনেকেই বাঁকা চোখে দেখছে এবং লিফলেট না নিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। বন্ধুর জন্য পথে নামা মেয়েটির মুখ কালশিটে হয়ে যাচ্ছে। ওকে খুব অসহায় মনে হতে লাগল আমার। আবার ভেসে উঠল আমাদের লোভী ও ভয়ংকর অমানবিক রাজনীতিকদের মুখ। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া ফোনালাপ আমি শুনেছি। প্রিন্ট মিডিয়ায় পড়েছি। যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য গণরায়ের বদলে শর্টকাট পথ খুঁজছেন আমাদের রাজনীতিকরা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি দাবিদার মাহমুদুর রহমান মান্না আর প্রবাসে থাকা বিএনপি নেতা সাদেক হোসেন খোকা সরকারকে দুর্বল করে দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল করে দু’-তিনটি ছাত্রের লাশ ফেলে দেয়ার কথা বলেন, তখন অসুস্থ বন্ধুকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর অসাধ্য সাধনের জন্য পথে নেমেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরা। ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি পেতে এ মহৎপ্রাণ প্রজন্মের জীবন কেড়ে নিতে চায় কুৎসিত রাজনৈতিক অঙ্গনের মানুষরা। আমরা বুঝতে পারি এ অমানবিক, স্বার্থপর ভয়ংকর রক্তবীজ একটি-দুটি নয়, অনেক ছড়িয়ে আছে। গণমানুষের প্রতিরোধ ছাড়া এদের হাত থেকে দেশ ও জাতির মুক্তি নেই।
দুদিন আগে ইন্টারনেটে একটি মেইল পেয়ে চমৎকৃত হয়েছি। আমার বরাবরই সুন্দরের প্রত্যাশা তরুণ প্রজন্মের কাছে। প্রত্যাশাটা আরও বেড়ে গেল। একই চিঠি প্রকাশিত হয়েছে গতকালের (২৫ ফেব্র“য়ারি) যুগান্তরে। এ দুর্বিনীত পরিবেশে মানবিক চেতনার তরুণীটির নাম তাসনুভা তাবাসসুম। চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। যখন রাজনীতিকরা তাদের লোভের আগুনে সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে বার্ন ইউনিটে পাঠাচ্ছে, তখন মন কেঁদে উঠছে তাসনুভার। সে অগ্নিদগ্ধদের সহায়তার একটি পথ খুঁজে পেয়েছে। বলছে, আমাদের দেশের ৫ কোটি মুঠোফোন ব্যবহারকারীর প্রত্যেকে যদি মাত্র ১০ টাকা করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পাঠায় তবে ৫০ কোটি টাকা সংগ্রহ সম্ভব। তাসনুভা এ দুঃসময়ে আমাদের জিনিয়ার জন্যও নতুন একটি পথ খুঁজে দিল। মাত্র ৭ লাখ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী যদি জিনিয়ার জন্য ১০ টাকা করে পাঠায় তবে দুদিনের মধ্যেই জিনিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। হিংসার রাজনীতি আমাদের জীবন কাড়তে জানে; কিন্তু তরুণ প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষ মানবিক আবেদনে কিভাবে সাড়া দিতে পারে তার প্রমাণ কি আমরা রাখতে পারি না? এই সুযোগে আমি জিনিয়ার চিকিৎসায় অর্থ সাহায্যের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দেশের দানশীল মানুষ ও সাধারণ সব মানুষের কাছে আবেদন জানাই। ওদের বিতরণ করা হ্যান্ডবিলে আর্থিক সাহায্য পাঠানোর ঠিকানাটি হল : বিকাশ নং-০১৭৩৮২৭৫১২৭, অথবা মো. জসিম উদ্দিন, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নং- ১৮১১৭১০৫৯০১।
আমরা বিশ্বাস করি অসুন্দরের শেষ পরিণতি অন্ধকার। সুন্দরের জয় হবেই। আমি আমার প্রত্যয়ী ছাত্রীদের মুখে সেই আলো দেখতে পেয়েছি।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬০ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

হাজী শরীয়তউল্লাহ
ফরায়েজী আন্দোলনের জনক হাজী শরীয়তউল্লাহ ও দুদুমিয়ার বাড়ী
হাজী শরীয়তউল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) : বর্তমান শরীয়তপুর জেলার শ্যামাইল গ্রামে ১৭৮১ সালে শরীয়তউল্লাহর জন্ম। ছেলেবেলায় তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে যান কলকাতায়। হুগলী জেলার ফুরফুরায় দু’বছর আরবি ও ফারসি শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৭৯৯ সালে তিনি তার ওস্তাদ মওলানা বাশারত আলীর সঙ্গে মক্কায় যান এবং হজ সম্পন্ন করেন। তিনি ওয়াহাবি ভাবধারায় প্রভাবিত হয়েছিলেন। এ কারণে ১৮১৮ সালে দেশে ফিরে তিনি ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করেন, যা ইতিহাসে ফরায়েজি আন্দোলন নামে পরিচিত।
হিন্দু সমাজে যখন সংস্কার চলছিল, তখন বাংলার মুসলমানদের, বিশেষ করে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসেন হাজী শরীয়তউল্লাহ। শরীয়তউল্লাহ লক্ষ্য করেছিলেন ইংরেজ শাসিত এদেশে মুসলমানরা নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। স্থানীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির আচার-আচরণ নিজেদের জীবনে প্রবেশ করায় ইসলামের মূল শিক্ষার প্রতি তারা উদাসীন হয়ে পড়েছে। এ কারণে ফরায়েজি আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি মনোযোগী করে তাদের শক্তি জাগিয়ে তোলা। একই উদ্দেশ্যে এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও অনুশাসন পালনে উদ্বুদ্ধ করা এবং সব ধরনের কুসংস্কার থেকে মুক্ত করারও প্রচেষ্টা নেয়া হয়। ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি জমিদার, নীলকর, মহাজন ও স্থানীয় প্রশাসনের শোষণ ও অত্যাচার থেকে কৃষকদের মুক্ত করাও ছিল এ আন্দোলনের লক্ষ্য।
হাজী শরীয়তউল্লাহ তার আন্দোলনের প্রধান বক্তব্য হিসেবে ইসলামের পাঁচটি মৌলিক আদর্শের ভেতর মুসলমানদের নিষ্ঠাবান থাকার নির্দেশ দেন। এই মূল আদর্শগুলোর ব্যতিক্রম কাজকে তিনি শিরক ও বিদাত বলে ঘোষণা দেন। ফরায়েজিরা জন্মদিন, বিয়ে, মৃত্যু ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত আচার অনুষ্ঠান, পীরপূজা, পীরের প্রতি অতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, তাজিয়া নির্মাণ ও মহররম মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
হাজী শরীয়তউল্লাহর জীবদ্দশায় ফরায়েজি আন্দোলন ফরিদপুর ছাড়াও ঢাকা, বরিশাল ও কুমিল্লা জেলায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শরীয়তউল্লাহ বুঝেছিলেন মুসলমানদের প্রতি ইংরেজদের নীতি ছিল শত্র“তামূলক। এ কারণে মুসলমানরা শিক্ষা-দীক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছিল। তিনি মুসলমানদের বোঝাতে চেয়েছিলেন, রাজনৈতিকভাবে তারা আর স্বাধীন নয়। তাদের দেশ এখন ‘দারুল হারব’ অর্থাৎ যুদ্ধরত বা অমুসলিমের দেশ। এমন দেশকে হয় শক্তি প্রয়োগ করে মুসলমান শাসিত দেশ অর্থাৎ ‘দারুল ইসলাম’ বানাতে হবে অথবা দারুল হারব ছেড়ে অন্য কোনো মুসলমানের দেশে চলে যেতে হবে। এর কোনোটি করা সম্ভব না হলে মুসলমানদের কয়েকটি নিয়ম মেনে এ দেশে থাকতে হবে। এ কারণেই শরীয়তউল্লাহ ঘোষণা দেন, দারুল হারবে মুসলমানদের শুধু ফরজ ইবাদতটুকু করলেই চলবে। তাই আন্দোলনটির নাম হয় ফরায়েজি আন্দোলন। শরীয়তউল্লাহ এমন প্রতীকী নিয়ম পালনের মধ্য দিয়ে বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।
ইংরেজ সিভিলিয়ান জেমস ওয়াইজ হাজী শরীয়তউল্লাহকে মুসলমান কৃষকদের উজ্জীবিত করার কাজে একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা বলে উল্লেখ করেছেন। লক্ষ্য করা গেছে, যেসব অঞ্চলে ফরায়েজি আন্দোলন জনপ্রিয় হয়েছে সেখানে হিন্দু জমিদার ও নীলকররা শক্তিশালী ছিল এবং এদের দ্বারা কৃষকরা অত্যাচারিত হতো। কঠোরভাবে ধর্ম সংস্কার করায় একশ্রেণীর মুসলমান নেতা শরীয়তউল্লাহর আন্দোলনকে সমর্থন করেননি। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী। এই মতবিরোধের সুযোগ গ্রহণ করেছিলেন হিন্দু জমিদাররা। তারা কৌশলে রক্ষণশীল মুসলমান কৃষকসহ নীলকরদের ফরায়েজিদের বিরুদ্ধে একত্রিত করেন। এভাবে ১৮৮০ সালের দিকে ফরায়েজিরা একটি সংঘাতময় অবস্থার মুখোমুখি হয়। এমন একটি পরিস্থিতি যখন বিরাজমান, তখনই হাজী শরীয়তউল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬১ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

দুদু মিয়া (১৮১৯-১৮৬২) : দুদু মিয়া ছিলেন হাজী শরিয়তউল্লাহর একমাত্র ছেলে। ১৮১৯ সালে পৈত্রিক গ্রামেই তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৮৪০ সালে বাবার মৃত্যুর পর দুদু মিয়া ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
শিক্ষা গ্রহণের জন্য বাবার জীবদ্দশাতেই দুদু মিয়া মক্কা যান। সেখানে পাঁচ বছর কাটান তিনি। বাবার অসুস্থতার সংবাদে ১৯ বছর বয়সে দেশে ফিরে আসেন দুদু মিয়া। এ সময় হিন্দু জমিদার, নীলকর এবং কোনো কোনো রক্ষণশীল মুসলিম নেতা ফরায়েজিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। তারা প্রায়ই ফরায়েজিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করতেন। দুদু মিয়া ছিলেন বিপ্লবী মনোভাবাপন্ন ও কূটনৈতিক জ্ঞানে দক্ষ। তিনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। তার মধ্যে ছিল সংগঠকের গুণাবলী। তিনি বুঝেছিলেন, সব প্রতিরোধের মুখে টিকে থাকতে হলে ফরায়েজিদের সংগঠিত হতে হবে। তিনি জমিদারদের কর্তত্ব থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। এ লক্ষ্যে তিনি সরকার বা জমিদারদের পরোয়া না করে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন করেন। গ্রামাঞ্চলের মানুষের বিভিন্ন বিরোধের মীমাংসা পঞ্চায়েতেই করা হতো।
এ ব্যবস্থা কার্যকর রাখার জন্য তিনি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। দুদু মিয়া বুঝেছিলেন সশস্ত্র প্রতিরোধ ছাড়া টিকে থাকা যাবে না। এ উদ্দেশ্যে তিনি লাঠিয়াল বাহিনী গঠন করেন। এই বাহিনী নিয়ে তিনি জমিদার ও নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। দুদু মিয়ার শক্ত নেতৃত্বে ১৮৩৮ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ফরায়েজি এলাকায় শান্তি বিরাজ করে। ফরায়েজিদের বাড়ি ও মহল্লা নিয়ে তিনি এক একটি এলাকা গঠন করেন। এসব এলাকায় ৫০ থেকে ৫০০ সদস্যের অন্তর্ভুক্তি ছিল। গ্রামবাসী ও তার মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার জন্য এক একজন প্রতিনিধি নিয়োগ দেয়া হতো। এদের বলা হতো গ্রাম খলিফা। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি বড় ইউনিট গঠন করা হতো। একে বলা হতো গির্ধ। এর কর্তৃত্ব পালন করতেন একজন তত্ত্বাবধায়ক খলিফা। গির্ধের নেতৃত্বে খলিফাদের একটি পরিষদ গঠন করা হতো। এভাবে গঠিত হতো সালিশি আদালত। দুদু মিয়ার প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয় বাহাদুরপুরে।
দুদু মিয়া ঘোষণা করেন, জমির মালিক হবে কৃষকরা। তার এ ঘোষণা নির্যাতিত কৃষকদের মনে আশার সঞ্চার করে। কৃষকরা দলে দলে এসে তার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে ফরায়েজি আন্দোলন পায় নতুন গতি। দুদু মিয়া অবশ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অস্বীকার করেননি। ইংরেজ অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে রেখেছিলেন। এক ধরনের সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুদু মিয়া প্রজার অধিকার রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর দুদু মিয়াকে সরকার বন্দি করে। তাকে কলকাতার আলীপুর কারাগারে আটক রাখা হয়। ১৮৬১ সালে মুক্তি পান তিনি। দুদু মিয়া ১৮৬২ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
জমিদার, নীলকর ও ইংরেজ প্রশাসনের সম্মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে ফরায়েজি আন্দোলন বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। দুদু মিয়ার মৃত্যুর পর ক্রমশ এ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। তবে বাঙালির জাগরণে এ আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ফরায়েজি আন্দোলনের ভেতর ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি থাকায় সাধারণ হিন্দু-মুসলমানকে শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে তোলা সহজ ছিল।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৬২ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষের মধ্যে অধিকার সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও বাংলার নেতৃবৃন্দ গভীরভাবে ভাবতে থাকেন। ইংরেজ শাসকরাও বাংলা তথা ভারতবাসীর ঐক্যবদ্ধ ব্রিটিশবিরোধী সচেতনতাকে কিছুটা ভয়ের চোখে দেখতে থাকে। এসব কারণে শাসক ইংরেজ, এদেশের সমাজ সংস্কারক, রাজনীতিক সবাই এগোতে থাকেন যার যার অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। এভাবে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি হয়, উনিশ শতকের প্রথম দিক থেকেই তার প্রকাশ ঘটতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত বাংলার রাজনীতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তীকালের রাজনৈতিক আন্দোলন ও কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯০৫ সালে সরকারের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং এর প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এর পথ ধরে হিন্দু, মুসলমান দুই পরিচয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে বাংলার মানুষ। কংগ্রেসের প্রতিপক্ষ হিসেবে মুসলমানদের রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম লীগের জন্ম হয়।
বঙ্গভঙ্গ মুসলমানদের স্বস্তি দিলেও তা কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু নেতৃবৃন্দকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। সরকারের বিরুদ্ধে স্বদেশী ও অসহযোগ আন্দোলনের মতো বড় বড় কর্মসূচি গৃহীত হতে থাকে। এর প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করতে হয় ইংরেজ সরকারকে।
বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) : ভারতের রাজনৈতিক ও স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বড়লাট লর্ড কার্জন সুষ্ঠুভাবে প্রশাসন পরিচালনার স্বার্থে ১৯০৫ সালে বৃহৎ বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। অবশ্য এর পেছনে ইংরেজ সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উত্তর ও পূর্ব বাংলাকে আসামের সঙ্গে যুক্ত করে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম’ নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠনের প্রস্তাব করা হয়। সিদ্ধান্ত হয় এ প্রদেশের রাজধানী হবে ঢাকা।
বাংলা প্রদেশের আয়তন ছিল বিশাল। ফলে অনেককাল আগে থেকেই ইংরেজ শাসকরা প্রশাসনিক কাজ গতিশীল করার জন্য বাংলাকে প্রশাসনিকভাবে বিভক্ত করার চিন্তা করছিলেন। এদিক থেকে বলা যায়, বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত একটি দীর্ঘ পটভূমির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। ১৮৫৩ সালে চার্লস গ্রান্ট সরকারের কাছে একটি সুপারিশ পেশ করেছিলেন। এতে শাসনকার্যের সুবিধার জন্য বাংলা প্রদেশের আয়তন কমানোর প্রস্তাব ছিল। ১৮৬৬ সালে উড়িষ্যায় নেমে এসেছিল দুর্ভিক্ষ। ব্রিটিশ সরকারের কাছে স্পষ্ট হয়, প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণেই এই দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানকারী তদন্ত কমিটি বাংলার সীমানা পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করে। স্পষ্ট হয় যে, বিপুল জনসংখ্যা ও বিশাল ভৌগোলিক এলাকার এ অঞ্চলটি একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করা সহজ নয়। এর মধ্যে ১৮২৬-১৮৭৪ সাল পর্যন্ত আসাম অঞ্চলও বাংলা প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকারি নীতির অংশ হিসেবে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ১৮৭৪ সালে আসামকে একজন চিফ কমিশনারের শাসনাধীনে নেয়া হয়। এ ব্যবস্থায় নিকটবর্তী অঞ্চল বাংলাদেশের সিলেট জেলাকে আসামের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই চিন্তার ফল হিসেবে ১৯০১ সালে উড়িষ্যাকে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে পৃথক করে মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হয়। এ প্রস্তাব দেন মধ্যপ্রদেশের লেফটেন্যান্ট গভর্নর এন্ড্রু ফ্রেজার। এর পরপরই এন্ড্রু ফ্রেজার বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর হয়ে এলে বাংলাকে বিভক্ত করা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড কার্জনের কাছে পেশ করেন।
এসব প্রস্তুতি শেষে ১৯০৩ সালে বঙ্গভঙ্গের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব সরকারিভাবে উত্থাপিত হয়। এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন ভারত সরকারের স্বরাষ্ট্র সচিব হার্বার্ট রিজলি। তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগ আসামের সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করেন।

Friday, February 27, 2015

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৫৩ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

রাজা রামমোহন রায়
রামমোহন রায় আরবি ও ফারসি ভাষায় কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার প্রথম পাণ্ডুলিপির নাম ‘মনযারাতুল আধিয়ান’। এতে তিনি বিভিন্ন ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করেন। এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি। মুর্শিদাবাদে থাকাকালীন ছোট কলেবরে তার লেখা একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটির নাম ‘তুহফাত উল মুওয়াহিদ্দীন’। গ্রন্থটি ফারসি ভাষায় লেখা হলেও এর শিরোনাম ও মুখবন্ধ ছিল আরবিতে।
রামমোহন রায় লক্ষ্য করেন আধুনিক বিশেষত ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বাংলার হিন্দুদের অনীহা। গোঁড়া হিন্দুরা মনে করে, ইংরেজদের সংস্পর্শে এলে এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করলে ধর্মহানি ঘটবে। এই বাস্তবতাটি রামমোহন রায়কে ব্যথিত করে। তিনি মনে করেন, বহু দেবতাবাদ ও মূর্তিপূজায় আচ্ছন্ন থাকায় হিন্দু সমাজের মানুষ মুক্তচিন্তা নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না। এসব কারণে তিনি মূর্তিপূজাবিরোধী তার মনোভাব প্রকাশ করতে থাকেন।
রামমোহন রায় ১৮১৫ সালে মুর্শিদাবাদ ছেড়ে কলকাতায় আসেন। এ সময় থেকে তিনি সমাজ সংস্কারে নিবেদিত হন। সেখানে তিনি সমমনা বন্ধুদের একত্রিত করে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এর নাম হয় ‘আত্মীয়সভা’। ধর্মীয় ও সামাজিক নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হতো সেখানে। এই সভায় দ্বারকানাথ ঠাকুর ও প্রসন্নকুমার ঠাকুরের মতো বরেণ্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকতেন।
সাধারণ হিন্দুদের ভেতর মুক্তচিন্তা ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে রামমোহন রায় সংবাদপত্র প্রকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে ১৮২১ সালে প্রকাশ করেন ‘সংবাদ কৌমুদী’ নামে একটি বাংলা সংবাদপত্র। পরের বছর ফারসি ভাষায় আরেকটি সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। এর নাম ছিল ‘মিরাত উল আখবার’।
উপনিষদে বহু দেবদেবির পরিবর্তে নিরাকার ব্রহ্মার উপাসনার কথা রয়েছে। এ সূত্রেই রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে ‘ব্রাহ্মসভা’ নামে একটি সংগঠনের জন্ম দেন। এখানে নিরাকার ব্রহ্মার স্মরণে ধর্মসঙ্গীত গেয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু করা হয়। পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে ব্রাহ্মসভা ‘ব্রাহ্মসমাজ’ নামে আত্মপ্রকাশ করে।
বহুকাল আগে থেকেই হিন্দু সমাজে অনেক কুপ্রথা প্রচলিত ছিল। এর অন্যতম সতীদাহ প্রথা। এ প্রথা অনুসারে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে স্বামীর চিতায় জীবন্ত পেড়ানো হতো। গোঁড়া হিন্দুদের প্রবল প্রতিরোধের মধ্যেও রামমোহন রায় সতীদাহের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে থাকেন। তিনি প্রভাবিত করতে থাকেন কোম্পানির শাসকদের। এই সূত্রে ১৮২৯ সালে গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিংয়ের অনুমোদনে সতীদাহ প্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করে আইন পাস হয়।
রামমোহন রায় ও তার সমমনা বন্ধুরা ইংরেজ শাসকদের সহযোগিতা প্রদানে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ভারতবাসী ইংরেজ শাসকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সুবিধা লাভ করতে পারবে। পাশাপাশি তিনি ভারতীয়দের প্রতি সরকারের কোনো কোনো বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেন।
১৮২৩ সালে গভর্নর জেনারেল জন এডাম ভারতীয় সংবাদপত্রের ওপর কয়েকটি বিধিনিষেধ আরোপ করেন। রামমোহন রায় ও সমমনা বন্ধুরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলে স্মারকলিপি প্রদান করেন। ভারতে তখন রাজনৈতিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা না থাকায় এ স্মারকলিপি গৃহীত হয়নি। পরবর্তী সময়ে রামমোহন রায় ও তার বন্ধু দ্বারকানাথ ঠাকুর ‘ইন্ডিয়ান জুরি অ্যাক্ট ১৮২৬’-এর ভেতরকার কয়েকটি বৈষম্যমূলক ধারা বাতিলের দাবিতে প্রতিবাদলিপি পেশ করেন। এই পত্রে কলকাতার হিন্দু-মুসলমান নাগরিকদের স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়েছিল।
রামমোহন রায় ও তার বন্ধুরা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার জমিদারদের পক্ষ থেকে ১৮২৯ সালে আরেকটি আবেদনপত্র জমা দেন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংয়ের কাছে। এতে জমিদারদের জন্য ক্ষতিকর সরকারের রাজস্ব নীতি পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়।

Wednesday, February 25, 2015

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৫৮ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি গঠন : নওয়াব আবদুল লতিফ ১৮৬৩ সালে ‘মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটি’ নামে মুসলমানদের একটি সাহিত্য সমিতি গঠন করেন। এ সমিতি গঠনের উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে উৎসাহ প্রদান করা। সমিতির উদ্দেশ্য সম্পর্কে আবদুল লতিফ নিজে যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তা অনেকটা এ রকম- ‘মুসলমানদের ইংরেজি ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে পাশ্চাত্য শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করানো এবং সামাজিক আচার-আচরণে তাদের শিক্ষিত হিন্দু ও ইংরেজদের সমকক্ষ করে গড়ে তোলা।’ এ উদ্দেশ্যে সভায় নিয়মিত আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এখানে বিজ্ঞান, কলা ও সমকালীন নানা সমস্যা নিয়ে মুক্ত আলোচনার ব্যবস্থা ছিল। এভাবে মুসলমানদের সঙ্গে ইংরেজ শাসকদের মধ্যে একটি সম্পর্ক তৈরিরও চেষ্টা করেন তিনি। এই সমিতির বিভিন্ন কার্যক্রমে বিভিন্ন ধর্মের প্রথিতযশা গুণী ব্যক্তিরাও অংশগ্রহণ করতেন। আবদুল লতিফ ‘মোহামেডান লিটারেরি সোসাইটির’ মাধ্যমে মুসলমানদের মৌলিক সমস্যার প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন।
আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নওয়াব আবদুল লতিফ একজন উদারপন্থী ব্যক্তি ছিলেন। নিজ ধর্মের পিছিয়ে পড়া মানুষদের উন্নতির জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করলেও তার মধ্যে সাম্প্রদায়িক মনোভাব ছিল না। শিক্ষার প্রসারতা ঘটিয়ে তিনি শুধু মুসলমানদের অগ্রগতির পথই দেখাননি, বরং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতি ও ইংরেজ শাসকদের সুদৃষ্টি লাভের চেষ্টা করেছেন। তার প্রচেষ্টায় মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজ বিদ্বেষ অনেকটা কমে আসে। বাংলার গণমানুষের জন্য তিনি যেসব সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারমূলক কাজ করেন সেজন্য তাকে বাংলার ‘সৈয়দ আহমদ’ বলা হয়। বাংলার এই মহান মনীষী ১৮৯৩ সালের ১০ জুলাই ইন্তেকাল করেন।
নওয়াব আবদুল লতিফ নিজ মেধার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। ১৮৭৭ সালে লর্ড লিটন তাকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধি প্রদান করেন। এছাড়াও তাকে ‘রানীর মেডেল’ (Empress Medal) দেয়া হয়। লর্ড লিটন ১৮৮০ সালে আবদুল লতিফকে সর্বোচ্চ খেতাব ‘নওয়াব’ উপাধীতে ভূষিত করেন। লর্ড ডাফরিন এই খেতাবকে আরও উন্নীত করে ‘নওয়াব বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮) : বলা হয় সৈয়দ আমীর আলী ছিলেন হযরত মোহাম্মদের (সা.) পরবর্তী অষ্টম ইমামের বংশধর। তার পূর্বপুরুষ পারস্যের সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আব্বাসের অধীনে চাকরি করতেন। নাদির শাহের আক্রমণের সময় তারা ভারত আসেন। তাদের এক পূর্বপুরুষ তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধে মারাঠাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিলেন। আমীর আলীর পিতা সাদত আলী খান বিদ্বান ব্যক্তি ছিলেন। ১৮৪৯ সালের ৬ এপ্রিল উড়িষ্যার কটকে আমীর আলী জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা এরপর পরিবার নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন এবং চিনসুরাতে পাকাপাকিভাবে বসতি স্থাপন করেন।
মুসলিম সম্প্রদায়ের জাগরণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন সৈয়দ আমীর আলী। রাজনীতিক, আইনবিদ ও ইসলামের ইতিহাস রচয়িতা হিসেবে উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি বিশিষ্ট স্থান করে নিয়েছিলেন সৈয়দ আমীর আলী। তিনি ১৮৬৯ থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত লন্ডনে আইনশাস্ত্রের ওপর পড়ালেখা করেন। ১৮৭৩ সালে দেশে ফিরে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। পরের বছর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো হিসেবে মনোনীত হন। একই সঙ্গে তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ইসলামী আইনের বিভাগে লেকচারার পদে নিয়োগ পান। ১৮৭৮ সালে আমীর আলী বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৮৮৩ সালে তিনি গভর্নর জেনারেল কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত হন। এর আগে ১৮৮১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ব্যক্তিগত যোগ্যতা তাকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যায়। আমীর আলী ১৮৯০ সালে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভ করেন।

Tuesday, February 24, 2015

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৫৭ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

নওয়াব আবদুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩) : ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লব অবদমিত হলে ভারতের অন্যান্য অংশের মতো বাংলার মুসলমানরা হতাশাগ্রস্ত ও অসংগঠিত হয়ে পড়ে। এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় মুসলমান সমাজে নবজাগরণ সৃষ্টিতে যেসব মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছিল, নওয়াব আবদুল লতিফ তাদের অন্যতম। ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে আবদুল লতিফ ইংরেজ শাসকদের কাছাকাছি আসতে পেরেছিলেন।
আবদুল লতিফের জন্ম বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার রাজাপুর গ্রামে। এই শিক্ষাব্রতী সমাজ সংস্কারককে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮০ সালে নওয়াব উপাধিতে ভূষিত করে। নওয়াব আবদুল লতিফ উনিশ শতকের ভারতের অন্যতম মুসলমান, যিনি মুসলিম সম্প্রদায়কে আধুনিকতার পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন।
আবদুল লতিফ ১৮৪৬ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে নিজের পেশাজীবন শুরু করেন। ১৮৪৭ সালে তরুণ বয়সেই তিনি সিন্ধুর এক আমীরের সহকারী হিসেবে সরকার কর্তৃক নিয়োগ লাভ করেন। সেখানে এক বছর কাটানোর পর পুনরায় ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দেন। এর অল্পদিন পর তিনি কলকাতায় যান। তার প্রচেষ্টায় কলকাতা মাদ্রাসায় অ্যাংলো-পার্সিয়ান বিভাগ খোলা হয়। এ বিভাগে পাঠদানের জন্য তিনি অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। ১৮৪৯ সালে আবদুল লতিফ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট পদে উন্নীত হন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সাতক্ষীরায় দায়িত্ব পালনকালে নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের পক্ষে সাক্ষ্য দেন। আবদুল লতিফের বিশেষ ভূমিকার কারণে সরকার ১৮৬০ সালে নীল কমিশন গঠন করে। এভাবে কৃষক অধিকার অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত হয়। আবদুল লতিফ ১৮৬২ সালে লর্ড ক্যানিংয়ের শাসনকালে গঠিত বেঙ্গল ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৬৮৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো হিসেবে মনোনয়ন লাভ করেন এবং একই বছর বেসরকারি ও সামরিক সার্ভিসের পরীক্ষা বোর্ডের সদস্য হন। ১৮৬৫ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের জাস্টিস অব পিস পদে মনোনয়ন লাভ করেন।
নওয়াব আবদুল লতিফের নেতৃত্বে ১৮৭২ সালে সরকারি সাহায্যে গ্রামাঞ্চলে কয়েকটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সেখানে আধুনিক শিক্ষাও দেয়া হতো। এ সময় কলকাতায় হিন্দু কলেজের কার্যকলাপে কিছুটা সাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রকাশ পেত। একে ভালো চোখে দেখেনি শিক্ষা কাউন্সিল। কাউন্সিলের সভাপতি বেথুন সাহেব তাই হিন্দু কলেজকে প্রেসিডেন্সি কলেজ নামে রূপান্তরের চিন্তা করেন। এ কাজে তিনি নওয়াব আদুল লতিফের সমর্থন পেয়েছিলেন। এভাবে কলেজটি সব ধর্মের ছাত্রদের পড়ার জন্য উন্মুক্ত হয়।
অভিযোগ ছিল মুহসীন ফান্ডের টাকা মুসলমান ছাত্রদের কল্যাণে খুব বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে না। আবদুল লতিফ এ সংকট উত্তরণে সচেষ্ট হন। তার প্রচেষ্টায় মুসলমান ছাত্রদের কল্যাণে এই ফান্ডের টাকার যথাযথ ব্যয় নিশ্চিত হয়। মুহসীন ফান্ডের টাকায় বাংলার অবহেলিত জনপদের মুসলমান ছাত্রদের, বিশেষ করে মেধাবী দরিদ্র ছাত্রদের বৃত্তি প্রদানসহ শিক্ষার ব্যয় বহন করা হতো। এভাবে নওয়াব আবদুল লতিফ মুসলমানদের দুর্যোগকালে তাদের পাশে যোগ্য নেতৃত্ব নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন। মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষার প্রতি অনুরাগী করে তুলে তাদের অগ্রগতির ধারার সঙ্গে যুক্ত করে একটি বড় রকমের সামাজিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

Monday, February 23, 2015

ভ্রান্তিবিলাসে আর কতকাল? by একেএম শাহনাওয়াজ

লিখতে ভালো লাগছে না, বলতে ভালো লাগছে না, ভাবতেও ভালো লাগছে না; তবুও সত্য এড়িয়ে যাওয়ার উপায় কী! বিবেক বলছে, কথা বলতেই হবে। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদ দূর অতীতের বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে লিখতে গিয়ে একুশ শতকের বাংলাদেশের কলুষিত রাজনীতি ও কলংকিত রাজনীতিকদের কথা লিখবেন। তাতে বাংলাদেশের সুদূর অতীতের ঔজ্জ্বল্য অনেকটাই ঢাকা পড়ে যাবে। দেশটি লাঞ্ছিত হবে কিছুসংখ্যক অমানবিক, অসংস্কৃতবান, স্বার্থপর, লোভী রাজনীতিক আর তাদের পদলেহী কিছুসংখ্যক পেশাজীবীর কারণে। ইতিহাসের কাঠগড়ায় যদিও তারাই দাঁড়াবেন। তারপরও বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত অহমিকা কি ভূলুণ্ঠিত হবে না?
আমাদের ক্ষমতার রাজনীতিকদের বারবারই মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে। গণতন্ত্রের বুলি শুনেছে; কিন্তু এর প্রায়োগিক ভূমিকা দেখেনি। সব পক্ষের শাসনকালেই সুশাসন সুদূরপরাহত হয়েছে। সাধারণ মানুষকে আগ বাড়িয়ে বলার দরকার হয়নি- বিবদমান পক্ষগুলোই একে অন্যকে চোর, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী, খুনি বলেছে- বলে যাচ্ছে। দেশপ্রেমের বদলে দলপ্রেম এবং নেতৃত্বের একনায়কতান্ত্রিক আচরণ প্রত্যক্ষ করেছে মানুষ। নির্লোভ, দেশপ্রেমিক, প্রকৃত গণতান্ত্রিক চেতনা আশ্রয়ী কোনো নেতৃত্বের সংঘশক্তি দৃশ্যমান না থাকায় সুন্দরের পক্ষে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। ফলে একই বৃত্তে দাপটের সঙ্গে
ক্ষমতাপ্রিয় দলগুলোই আবর্তিত হচ্ছে বারবার। তবুও মানুষ অগত্যা মন্দের ভালো নিয়ে তুষ্ট থাকতে চেয়েছে। একপক্ষ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকলে অন্যপক্ষ দাপটের সঙ্গে বিরোধী পক্ষে থাকবে এটিই স্বাভাবিক রীতি। এতে বজায় থাকবে শক্তির ভারসাম্য।
সরকার পক্ষ স্বৈরাচারী মনোভাব বজায় রাখতে পারবে না।
এবার আন্দোলনের নামে টানা অবরোধ-হরতাল কর্মসূচি ও সহিংসতার কারণে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে যে ক্ষতিগ্রস্ত হল তাতে এখন সে সম্ভাবনাও তিরোহিত হয়ে যাচ্ছে। বিএনপি একটি বড় জনপ্রিয় দল। এ দলের কর্মী, সমর্থক এবং তৃণমূলের অনেক নেতাও- যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় ভাগ বসান না, নিজ দলকে গণতান্ত্রিক অবয়বেই দেখতে চান- তারা জামায়াতি চেহারায় সন্ত্রাসী দল হিসেবে আপন দলকে দেখতে চাননি। ব্যক্তি ও পরিবারের স্বার্থ রক্ষার জন্য দল কলংকতিলক কপালে পড়ুক, তা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিএনপি নেতাকর্মীর কাম্য নয়। তাই এবার বিএনপি জোটের দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির কারণে অনেক কর্মী-সমর্থক দিন দিন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। এর প্রমাণ দেখা গেল ১৪ ফেব্রুয়ারিতে।
ভুল রাজনীতির কারণে বিএনপি নেতৃত্ব যখন ব্যর্থ হচ্ছিল, তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পরবর্তী কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে কর্মী-সমর্থকদের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো বাস্তব অবস্থা যাচাই করার। এ কারণেই টেস্ট কেস হিসেবে দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। পাঁচ-দশটি এলাকায় ঝটিকা মিছিল ছাড়া এবারও কর্মীদের মাঠে নামাতে ব্যর্থ হয়েছে বিএনপি জোট। আশা করেছিলাম, এদিন অন্তত খালেদা জিয়া তার অনুসারীদের নিয়ে পথে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করবেন। কিন্তু তারা সে উদাহরণ রাখেননি। ভাবখানা এমন, ঝড়-ঝাপটা যা যাওয়ার তা সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের ওপর দিয়ে যাক। অতি জ্ঞানীরা বলে থাকেন, এমন পুলিশি অত্যাচার থাকলে কেমন করে পথে নামবেন নেতা-নেত্রীরা! মুক্তচিন্তার মানুষ উত্তরে বলবেন, আমাদের এ ধারার বুর্জোয়া রাজনীতিতে কবেইবা বিরোধী দলের রাজনীতির পথে ফুল
বিছানো ছিল? যারা আন্দোলন করেছে, তারা কণ্টক বিছানো পথে পা ক্ষতবিক্ষত হবে জেনেই নেমেছে। আর এ বাস্তবতা পেতে চাইলে দলের কর্মসূচির বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি সমর্থকদের আস্থা থাকতে হবে।
কিন্তু সেই আস্থার জায়গাটি নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা মনে করি, ১৪ ফেব্রুয়ারির পরীক্ষায় ফলাফল ইতিবাচক না হওয়ায় পরিণতি নিয়ে বিএনপির নতুন করে উদ্বেগ বেড়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি আমি ক্যাম্পাসের ব্যাংকে গিয়েছিলাম। ম্যানেজার সাহেব সজ্জন মানুষ। বললেন, স্যার আপনি তো কাগজে লেখেন। এ অবস্থা আর কতকাল চলবে? আমি আমার বিবেচনা মতো বললাম, কেরোসিনের কুপিতে ততক্ষণই আলো জ্বলে যতক্ষণ তেল থাকে। তেল ফুরিয়ে গেলে ধপ করে নিভে যায়। আমার ধারণা, তেল ফুরিয়ে যাওয়ার সময় এসে যাচ্ছে। তবে ধপ করে নিভে যাওয়াটা বিএনপির জন্য মঙ্গলের হবে না। দলীয় স্বার্থেই জেতা-হারার লড়াইয়ে না থেকে সমাধানের পথে বিএনপিকে নেমে আসতে হবে। সুবিধাজনক আসনে বসে যদি সরকার পক্ষের হাতে স্টিয়ারিং থাকে, তবে আমাদের রাজনীতির
বাস্তবতায় সরকার পক্ষ নেমে আসবে না। তাছাড়া কর্মসূচির নামে মানবতাবিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে বিএনপি নেতারাই তো সরকার পক্ষকে শক্ত হয়ে থাকতে রসদ জুগিয়েছেন।
দলীয় প্রস্তুতির অনেক আগেই সংবাদকর্মীদের পীড়াপীড়িতে খালেদা জিয়ার হঠাৎ লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণায় আমরা অনেকেই চমকে গিয়েছিলাম। এ নিয়ে বিশ্লেষণ সে সময় কাগজে আমরা অনেকেই করেছি। আমাদের বারবার মনে হয়েছে, এমন অপরিণামদর্শিতার ফল বিএনপির জন্য শুভ হবে না। নেতাকর্মী ও গণমানুষকে আন্দোলনের পক্ষে মাঠে না নামাতে পারলে সে আন্দোলন কখনও সফল হয় না। ভেবেছিলাম, ভুল সংশোধন করে এ অসময়ের অপরিপক্ব আন্দোলন থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ খুঁজবে বিএনপি। দু’বার সুযোগ এসেছিল। প্রথমবার ছিল বিশ্ব ইজতেমা সামনে রেখে সরকারকে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের অগ্রিম হুমকি দিয়ে প্যাভেলিয়নে ফিরে আসা। দ্বিতীয়বারের সুযোগটি ছিল এসএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার সময়। অনেকটা পানি ঘোলা করার পরও বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে এসএসসি পরীক্ষাকে উসিলা ধরে ফিরে আসতে পারত
তারা। এ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে বিএনপির আন্দোলন মুলতবি করার সুযোগ ছিল। এভাবে এক্সপ্রেস ট্রেন ও লোকাল ট্রেন দুটোই মিস করল বিএনপি।
সবচেয়ে দুর্ভাগ্য, কাঠামোগত দিক থেকে এবং প্রচারিত আদর্শের বিচারে বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। জঙ্গিবাদী জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক বন্ধুত্ব থাকলেও লাখ লাখ বিএনপি নেতাকর্মী-সমর্থক তাদের দলকে জঙ্গি দল মনে করে না। ৫ জানুয়ারি ২০১৪-এর নির্বাচন ঠেকাতে জামায়াতের হাতে জঙ্গি আচরণের দায়িত্ব দিয়ে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে নিজের অনেক ক্ষতি করেছিল। সচেতন মানুষ মনে করেছিল, এ শিক্ষাটি বিএনপি মনে রাখবে। তা ছাড়া এদেশের দীর্ঘ ইতিহাস বিচার করলেও বিএনপি নেতৃত্বের বোঝা উচিত ছিল গণমানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া সন্ত্রাসী তৎপরতায় সরকারের পতন সম্ভব নয়। আর আওয়ামী লীগের মতো প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে হলে প্রকৃত গণআন্দোলনের শক্তিই ছড়িয়ে দিতে হবে।
বিএনপি নেতৃত্বের ভ্রান্তিবিলাসে এসব শিক্ষা কাজে এলো না। আমাদের ধারণা নিকট অতীতে জামায়াত সুচতুরভাবে নিজেদের ওপর বিএনপিকে নির্ভরশীল করে তুলেছিল। বলা যায়, নিজ লভ্যাংশ ঘরে তোলার জন্য জামায়াত সুনিপুণভাবে বিএনপিকে ব্যবহার করল। অবশ্য আমরা বিশ্বাস করি, এক্ষেত্রে বিএনপির প্রভাবশালী কোনো কোনো নেতা-নেত্রীর সমর্থন পেয়েছে জামায়াত।
বিএনপির দেশজুড়ে যে জনসমর্থন, আমরা বারবার সে শক্তিকে ব্যবহার করে দলটিকে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথে হাঁটতে অনুরোধ করেছিলাম। বিএনপি নেতৃত্ব সে পথে হাঁটেননি। এবার জামায়াতি ফর্মুলা গণতান্ত্রিক দলকে জঙ্গিবাদী দর্শনে ঠেলে দিল। আমাদের ধারণা, বিএনপি ভেবেছিল এভাবে পেট্রলবোমা আর ককটেল ছুড়ে সরকারকে অসহায় করে তুলবে। এতে নাশকতা দমনে সরকার ব্যর্থ বলে সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগ সরকারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। অন্যদিকে চাপে পড়ে সরকার বিএনপির সঙ্গে একটি আপসরফায় আসবে। মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে কথা বলবে।
আমাদের ধারণাগুলো যদি সত্যি হয় তাহলে বলতে হবে, বিএনপি নেতৃত্ব প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষমতাকে ঠিকমতো মাপতে পারেনি। অন্যদিকে অবরোধের মাঝখানে প্রায় বিরতিহীন হরতাল ডেকে মানুষের জীবন-জীবিকাকে যখন হুমকির মুখে নিয়ে এলো, তখনই সরকারের দিকে ছোড়া তীর বিএনপির দিকে বুমেরাং হয়ে ফিরতে লাগল। এর সঙ্গে যুক্ত হল পেট্রলবোমার বীভৎসতা। বার্ন ইউনিটে অসহায় মানুষের আর্তচিৎকার। কৃষক আর শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা ছিনতাই করা। রেললাইন উপড়ে ফেলা। অর্থনীতির ধস নামানো। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ছুড়ে ফেলা। বিএনপি নেতারা যত কথাই বলুন,
সাধারণ মানুষের চোখে এসবের দায় জামায়াত-বিএনপির ওপরই বর্তেছে। এভাবে মানুষের
সহানুভূতি লাভ করতে গিয়ে বিএনপি গণআস্থা
থেকে অনেক দূর সরে গেছে। রাজনৈতিক সুবিধা
লাভ করতে গিয়ে রাজনীতির হিংসাত্মক পথটি বেছে নিয়ে নিজের যাত্রাপথ নিজেই কণ্টকাকীর্ণ করে ফেলেছে।
নিজ রাজনৈতিক পথে হাঁটতে গিয়ে বিএনপি বারবার চোরাবালিতে পা রেখেছে আর পরিত্রাণ পেতে চেয়েছে বিদেশী রাষ্ট্র ও কূটনীতিকদের করুণা নিয়ে। কিন্তু এবার তাতেও সংকট তৈরি হয়েছে। পেট্রলবোমাসহ নানা নাশকতা করতে গিয়ে এ মহলের সহানুভূতি পাওয়ার সম্ভাবনাটুকুও হারাতে বসেছে। প্রতি সপ্তাহে ঠুনকো কারণ দেখিয়ে হরতাল ডাকাটা সাধারণ মানুষ এখন ভীষণ বাড়াবাড়ি হিসেবে দেখছে। সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক দল এভাবে দাঁড়াতে পারে, এটি কেউ ভাবতে পারেনি।
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় ব্যবসায়ী সংগঠনসহ সাধারণ মানুষ এখন আইন করে হরতাল-অবরোধ বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে ১৫ ফেব্র“য়ারি হাইকোর্ট হরতাল-অবরোধের নামে নৈরাজ্য রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি নির্দেশ জারি করেছেন। একই সঙ্গে এমন নৃশংস অবরোধ কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে একটি রুলও জারি করা হয়েছে। আসলে জল ঘোলা করলে এমনটিই হয়। আন্দোলনের নামে বিএনপির নৈরাজ্য দমনে এবার সরকার একটি আইনগত ভিত্তিও পেয়ে গেল। নাগরিক সমাজের কোনো কোনো জ্ঞানী মানুষের আপত্তি থাকলেও বিপন্ন মানুষ হরতাল-অবরোধ আহ্বানকারীদের সন্ত্রাসী তৎপরতা থেকে মুক্তি পেতে সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন। সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের চাওয়া জীবনের নিরাপত্তা, শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, অর্থনীতির চাকা গতিশীল রাখা। এজন্য সরকারের গৃহীত সব পদক্ষেপে মানুষের সমর্থন থাকবে।
আর বেশি না হারিয়ে বিএনপির উচিত বাস্তবতার আলোয় এসে দাঁড়ানো। তারা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে যত তাড়াতাড়ি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে হাঁটবে, তত দেশ ও জাতির মঙ্গল এবং দল হিসেবে বিএনপিরও মঙ্গল। অসংখ্য দলপ্রেমিক সমর্থক থাকার পরও বিএনপি নেতৃত্ব কেন নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে হাঁটতে চাইছে না, সে এক রহস্য।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৫৬ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলার মুসলমানরা দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এর পেছনে কারণ ছিল। দীর্ঘ ছয়শ বছর ভারতবর্ষ ছিল মুসলমানদের শাসনাধীনে। মুসলমানদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয় ইংরেজরা। তাই ক্ষোভ ও অভিমানে মুসলমানরা ইংরেজদের সংস্রব থেকে দূরে সরে থাকে। কৃষিজীবী ও শ্রমজীবী মুসলমানরা অর্থনৈতিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। ইংরেজি শিক্ষা থেকে শুরু করে নানা আধুনিক ধ্যান-ধারণা থেকে ছিটকে পড়ে। মুসলিম সমাজের এই ভঙ্গুর অবস্থা যখন বিরাজ করছিল তখন সৌভাগ্যক্রমে সমাজের কয়েকজন শিক্ষিত বাঙালি বেরিয়ে এলেন। তারা বুঝতে পারলেন, এ অন্ধত্ব থেকে মুসলমানদের মুক্ত করতে হবে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে না পারলে এই সমাজ অন্ধকারে নিপতিত হবে। মুসলিম সমাজের এই সংস্কারকদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন হাজী মুহম্মদ মুহসীন, নওয়াব আবদুল লতিফ ও সৈয়দ আমীর আলী। অপরদিকে মুসলমান সমাজকে ইসলামী চেতনায় জাগিয়ে তোলার জন্য সমাজ সংস্কারে ভূমিকা রাখেন হাজী শরিয়তুলাহ এবং দুদু মিয়া।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন (১৭৩২-১৮১২) : এই জনহিতৈষী দানবীরের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায়। তার বাবার নাম হাজী ফয়জুল্লাহ ও মায়ের নাম জয়নব খানম। বাড়িতেই তিনি লেখাপড়া করেছিলেন। কোরআন, হাদিস ও ফিকাহশাস্ত্রে বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি ইরান, ইরাক, তুরস্ক এবং আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করেছিলেন। মক্কায় হজ পালন করতে গিয়ে তিনি মদিনা, কুফা ও কারবালাসহ অন্যান্য ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে দেখেন।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন ছিলেন মানব কল্যাণে আত্মনিবেদিত। সমাজ উন্নয়নে ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান। অনগ্রসর মুসলমান সমাজে শিক্ষা বিস্তারে মুহসীন বিশেষ ভূমিকা রাখেন। নিজের জীবদ্দশায় তিনি হুগলীতে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, যশোর ইত্যাদি অঞ্চলের মাদ্রাসাগুলোর উন্নয়নে প্রচুর অর্থ দান করেন।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন ১৮০৬ সালে মুহসীন ট্রাস্ট ফান্ড নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করেন। ট্রাস্ট পরিচালনার জন্য দুজন মুতওয়ালি নিয়োগ করা হয়। তিনি তার সম্পত্তিকে নয়টি শেয়ারে ভাগ করেন। তিনটি শেয়ার ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য, চারটি পেনশন, বৃত্তি ও দাতব্য কাজে ব্যয়ের জন্য, এবং দুটি শেয়ার রাখা হয় মুতওয়ালির বেতন নির্বাহের জন্য। হাজী মুহম্মদ মুহসীনের মৃত্যুর পর এক পর্যায়ে মুতওয়ালি দুজনের বিরুদ্ধে তহবিল তছরুফের অভিযোগ ওঠে। ফলে ১৮১৮ সালে মুহসীন ট্রাস্ট ফান্ডের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব সরকার নিয়ে নেয়। এ ট্রাস্টের টাকায় ১৮৩৬ সালে মুহসীন কলেজ এবং পরে হুগলী দাতব্য চিকিৎসালয় ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।
হাজী মুহম্মদ মুহসীন ধর্মনির্বিশেষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। মুহসীনের সম্পত্তির আয় থেকে এখনও বহু দরিদ্র ছাত্র এবং মুসলমান পরিবার অর্থ সাহায্য পেয়ে থাকে। হাজী মুহম্মদ মুহসীনের দানের পরিমাণ কত তা নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করা যায় না। প্রকাশ্য দানের বাইরেও তিনি গোপনে অনেক দান করতেন বলে জনশ্র“তি রয়েছে। এই দানবীর ও শিক্ষা প্রসারের অগ্রদূত ১৮১২ সালে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে হুগলীর ইমামবাড়ায় সমাধিস্থ করা হয়।

Saturday, February 21, 2015

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৫৫ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

বিদ্যাসাগর কোনো কুসংস্কার মানতেন না। তিনি সংস্কৃত কলেজের দরজা নিম্নবর্ণের ছাত্রদের জন্যও খুলে দিয়েছিলেন। কলেরা আক্রান্ত রোগীর সেবায় ছুটে যেতেও দ্বিধা করতেন না তিনি। মাইলের পর মাইল হেঁটে অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। তিনি নিজ খরচে বেওয়ারিশ মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করতেন। উনিশ শতকের খ্যাতিমান কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ফ্রান্সের ভার্সাইতে অবস্থানকালে যখন অর্থাভাবে বিপন্ন দশায়, তখন ঈশ্বরচন্দ্রের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে কবিকে টাকা পাঠিয়েছিলেন।
দীর্ঘদিন থেকে প্রচলিত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে এ সময় ভারতীয় নারীরা দুর্দশাগ্রস্ত ছিলেন। এ অবস্থা ব্যথিত করেছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে। বিশেষ করে হিন্দু মেয়েদের বাল্যবিয়ে ও বিধবা বিয়ে নিষিদ্ধ থাকাকে তিনি অন্যায় ও অমানবিক মনে করেছিলেন। সামাজিক প্রথামতো কোনো মেয়ের ১২ বছরের মধ্যে বিয়ে না হলে তা সামাজিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। এমন পরিবারকে নানাভাবে নিগৃহীত হতে হতো। কখনও কখনও পুরো পরিবারকে গ্রামছাড়া করা হতো। আবার ব্রাহ্মণ কন্যাকে কুলীন ব্রাহ্মণ ছাড়া বিয়ে দেয়া যাবে না বলে সমাজে বিধান ছিল। ফলে এক ধরনের কুলীন ব্রাহ্মণের বিয়ে করা পেশা হয়ে দাঁড়ায়। সামাজিক চাপে পড়ে সাত বছরের কন্যার সঙ্গে সত্তর বছরের কুলীন ব্রাহ্মণ বৃদ্ধের বিয়ে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। স্বাভাবিক নিয়মেই এ বৃদ্ধদের বা অন্য বয়সী বরদের মৃত্যু হলে বালিকা বধূ বিধবা হয়ে যেত। কিন্তু এদের আর পুনরায় বিয়ে করার অনুমতি ছিল না। উপরন্তু এই বাল্য বিধবাদের সারা জীবন নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করে চলতে হতো। এর বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় অনেক সামাজিক অনাচারও তৈরি হতে থাকে। বাল্যবিয়ের কুফল এবং বিধবাদের করুণ জীবন ঈশ্বরচন্দ্রকে ব্যথিত করে।
ঈশ্বরচন্দ্রের ঐকান্তিকতায় ও চেষ্টায় সরকার এগিয়ে আসে। অবশেষে ১৮৫৬ সালে বিধবা পুনর্বিবাহ আইন পাস হয়। সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য বিদ্যাসাগর নিজের পুত্রকেও একজন বিধবার সঙ্গে বিয়ে দেন। বিধবা বিয়ে কার্যকর করা, দ্বি-বিবাহ ও বাল্যবিয়ে রহিতকরণ এং বিধবা বিয়েকে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে ১৮৭২ সালে সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্ট পাস করা হয়। এই আইন পাসেও বিদ্যাসাগরের যথেষ্ট অনুপ্রেরণা ছিল।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে বিদ্যাসাগর : স্যার উইলিয়াম কেরি বাংলা ব্যাকরণ লেখার যে যাত্রা শুরু করেছিলেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর পূর্ণতা দেন। তার হাতে বাংলা ব্যাকরণ পরিপূর্ণতা লাভ করে। বাংলা হরফেরও তিনি সংস্কার করেছিলেন। ব্যঞ্জনবর্ণ ও স্বরবর্ণের বিভাজনও করেন সাফল্যের সঙ্গে। বিদ্যাসাগর নিজে একজন লেখক ছিলেন। তিনি বাংলা ও সংস্কৃত সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখা উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হচ্ছে- বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭), বাংলার ইতিহাস (১৮৪৮), জীবনচরিত (১৮৫০), বোধদয় (১৮৫১), উপক্রমণিকা (১৮৫১). শকুন্তলা (১৮৫৫), বিধবা বিবাহ বিষয়ক প্রস্তাব (১৮৯০), বর্ণ পরিচয় (১৮৫৪), কথামালা (১৮৫৬), সিতার বনবাস (১৮৬০) ইত্যাদি।
বিদ্যাসাগর বিশেষ স্কুল পরিদর্শক থাকায় শিক্ষা বিস্তার ও নারী শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে তার সুবিধা হয়েছিল। জমিদার ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বিদ্যালয় গড়ায় উৎসাহ দিতেন। তিনি অনেক বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজ অর্থ ব্যয়ে ১৮৬৪ সালে কলিকাতা মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশন প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষা বিস্তারে এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষ ভূমিকা ছিল।
১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই এই মহৎপ্রাণ সমাজ সংস্কারক ও পণ্ডিত ব্যক্তির জীবনাবসান ঘটে।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য -১৫৪ by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

রামমোহন রায়কে সাধারণভাবে রাজা রামমোহন রায় বলা হয়। তিনি রাজা উপাধিটি পেয়েছিলেন সে সময়ের নামমাত্র মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের (১৮০৬-১৮৩৭) কাছ থেকে। এর পেছনে কারণ ছিল। এ সময় সম্রাট তার জন্য বরাদ্দ বার্ষিক ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য কোম্পানি শাসকদের কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেই আবেদন গৃহীত হয়নি। তাই সম্রাট স্থির করলেন তিনি আবেদন জানাবেন ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে। তার পক্ষে ওকালতি করার জন্য সে সময়ের সুশিক্ষিত ভারতীয় হিসেবে রামমোহন রায়কেই বাছাই করলেন। রামমোহন রায়ও এ ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করেন। এ সময় সম্রাটের আভিজাত্যকে ধারণ করার জন্য সম্রাট তার প্রতিনিধি হিসেবে রামমোহন রায়কে ‘রাজা’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। রামমোহন রায় অর্পিত দায়িত্ব সম্পন্ন করে ১৮৩২ সালে ফ্রান্স ভ্রমণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তিনি ইংল্যান্ড থেকে আর দেশে ফিরতে পারেননি। ১৮৩৩ সালে ব্রিস্টলে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০- ১৮৯১ খ্রি.) : বিদ্যাসাগর উপাধিতে সমধিক পরিচিত হলেও এই ক্ষণজন্মা পুরুষের প্রকৃত নাম ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন বাঙালি নবজাগরণের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। বিদ্যাসাগর ছিলেন একাধারে দার্শনিক, শিক্ষানুরাগী, শিক্ষক, লেখক, অনুবাদক, মুদ্রাকর, প্রকাশক, সমাজ সংস্কারক ও ব্যাকরণবিদ। তিনি সহজবোধ্য আধুনিক বাংলা গদ্য রচনার পথপ্রদর্শক ছিলেন। মুদ্রণ শিল্পে বিদ্যাসাগর বাংলা অক্ষরকে অনেক সহজীকরণ করেছিলেন। উনিশ শতকের ভারতে একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। জ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি একজন সংস্কৃত পণ্ডিত হিসেবেই বিশেষভাবে পরিচিত। কলকাতার সংস্কৃত কলেজ পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বিদ্যাসাগর উপাধিতে ভূষিত করে।
ছেলেবেলা থেকেই ঈশ্বরচন্দ্রের লেখাপড়ার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। তিনি ঘরের প্রদীপের খরচ বাঁচাতে রাতে সড়ক বাতির নিচে দাঁড়িয়ে বই পড়তেন। স্কুলে সব বিষয়ে তিনি অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন। ফলে বেশ কয়েকটি বৃত্তি লাভ করেন। নিজের খরচ মেটানো এবং পরিবারকে সাহায্য করার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র জোড়াসাঁকোতে ছাত্র পড়ানোর কাজ নেন। এরপর তিনি ভর্তি হন সংস্কৃত কলেজে। দীর্ঘ ১২ বছর সেখানে লেখাপড়া করেন। ১৮৪১ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলংকারশাস্ত্র, বেদান্ত, স্মৃতি ও জ্যোতির্বিদ্যায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। ১৮৩৯ সালে ঈশ্বরচন্দ্র আইনশাস্ত্র চর্চাও সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেন। ১৮৪১ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে ঈশ্বরচন্দ্র ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে সংস্কৃত বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন।
পাঁচ বছর পর ১৮৪৬ সালে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ছেড়ে সংস্কৃত কলেজে সহকারী সেক্রেটারি পদে যোগদান করেন। ঈশ্বরচন্দ্র শিক্ষাব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেন। ১৮৪৯ সালে তিনি সংস্কৃত কলেজে সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পান। একই কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব লাভ করেন ১৮৫১ সালে। ১৮৫৫ সালে তিনি বিশেষ স্কুল পরিদর্শকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা সংস্কার নিয়ে কলেজ সেক্রেটারি রসময় দত্তের সঙ্গে তার মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃত কলেজ থেকে পদত্যাগ করে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান করণিক হিসেবে যোগদান করেন।
দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণ ভাবনা ছিল ঈশ্বরচন্দ্রের সহজাত বৈশিষ্ট্য। তার লেখায় ও বক্তব্যে এদের অর্থনৈতিক মুক্তির কথা থাকত। সাধারণ মানুষ ঈশ্বরচন্দ্রকে ‘দয়ার সাগর’ বা ‘করুণার সাগর’ বলে ডাকত। তিনি অসুস্থ-পীড়িতদের পাশে ছুটে যেতেন। তাদের প্রতি যে কোনো অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতেন। সংস্কৃত কলেজের ছাত্র থাকাকালে ঈশ্বরচন্দ্র তার বৃত্তির টাকা দিয়ে দরিদ্রদের খাবার কিনে দিতেন। অসুস্থদের কিনে দিতেন ওষুধ। গ্রামের অসহায় প্রতিবেশীদেরও সাধ্যমতো দান করতেন।

Wednesday, February 18, 2015

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

১৫২
উনিশ শতকে অর্থনৈতিকভাবে মুসলমান সমাজ দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। হিন্দু-মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের এমন মানসিক গড়ন দেখে আতংকিত হয়ে পড়েছিলেন দুই সম্প্রদায়ের কয়েকজন শিক্ষিত আধুনিক মানুষ। তারা বুঝেছিলেন, স্ব-স্ব সম্প্রদায়ের মানুষদের রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপ থেকে বের করে আনতে হবে। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। কিন্তু এ পথে হাঁটা অত সহজ হবে না। সমাজ সংস্কারের মধ্য দিয়ে মানুষকে মুক্ত করতে হবে চিন্তার বন্দিত্ব থেকে।
এই প্রেক্ষাপটে দুই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে বেশ কয়েকজন সংস্কারক বেরিয়ে এলেন। হিন্দু সমাজ সংস্কারে যারা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। আর মুসলিম সংস্কারকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সৈয়দ আমীর আলী, নওয়াব আবদুল লতিফ, হাজী মোহাম্মদ মহসীন, হাজী শরিয়তুল্লাহ প্রমুখ।
হিন্দু সমাজ সংস্কার : উনিশ শতকে ভারতে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ধর্মসংস্কার ও শিক্ষা উন্নয়নের একটি সম্পর্ক ছিল। বাংলার হিন্দু সমাজ সংস্কারে অভিন্ন বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করা যায়।
রাজা রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩) : বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রামমোহন রায় উনিশ শতকের একজন ধর্ম ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে এক হিন্দু পরিবারে তার জন্ম হয়েছিল। রামমোহন রায়ের পারিবারিক ধর্মীয় ঐতিহ্য সে যুগের বিচারে ব্যতিক্রমী ছিল। রামমোহন রায়ের পরিবার রাঢ়ী ব্রাহ্মণ। পারিবারিক উপাধি বন্দ্যোপাধ্যায়। তার ঠাকুরদা কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘রায়’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। রামমোহনের পিতা রামকান্ত রায় বৈষ্ণব মতবাদ গ্রহণ করেন। অন্যদিকে তার মা তারিণী দেবী শৈব পরিবারের মেয়ে ছিলেন। এসব কারণেই সম্ভবত একটি উদার ও মিশ্র ধর্মীয় অবয়বের ভেতর অনেকটা মুক্ত মানসিকতায় বেড়ে উঠেছিলেন রামমোহন রায়। তাই তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা তার ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত ছিল।
রাজা রামমোহন রায় একজন ধর্ম সংস্কারক ও শিক্ষা সংস্কারক হিসেবে পরিচিত হলেও সমাজ সংস্কারক হিসেবেই তার ভূমিকা ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল। তার ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছিল।
রামমোহন রায়ের শিক্ষা জীবনের উজ্জ্বল সময়টি কাটে আঠারো শতকের শেষদিকে। বাংলা ও হিন্দি ভাষা চর্চার মধ্য দিয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করলেও ধীরে ধীরে সংস্কৃত, ইংরেজি, আরবি ও ফারসি ভাষায় বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে যেমন হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করেন, তেমনি ইসলামী ধর্মতত্ত্ব ও আইনশাস্ত্রের একজন নিষ্ঠাবান পাঠক ছিলেন।
উনিশ শতকে হিন্দু সমাজ সংস্কারে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন রামমোহন রায়। উনিশ শতকের ইউরোপীয়দের চোখে রামমোহন রায় ছিলেন ভারতের একজন আধুনিক মানুষ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন রামমোহন রায়। রামমোহন বেন্থাম, মন্টেস্কু প্রমুখ পাশ্চাত্য চিন্তাবিদের জ্ঞানচর্চায় প্রভাবিত হয়েছিলেন।
১৮৩৭ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনস্থ বাংলার সরকারি ভাষা ছিল ফারসি। তাই রাজস্ব আদায় ও বিচারকাজ পরিচালনার জন্য ইংরেজি, আরবি ও ফারসি ভাষা জানা ভারতীয়দের জন্য সরকারি চাকরির সুযোগ ছিল। সাধারণত এই পদাধিকারীরা মুন্সি নামে পরিচিত ছিলেন। এই সূত্রে রামমোহন রায় মুর্শিদাবাদের আপিল আদালতের রেজিস্ট্রার টমাস উডফোর্ডের অধীনে মুন্সি পদে চাকরি গ্রহণ করেন। ১৮০৩ থেকে ১৮১৫ পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য by ড. একেএম শাহনাওয়াজ

১৫১
ব্যাপ্টিস্টরা বরিশাল অঞ্চলে অনেক নমশূদ্রকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে পেরেছিলেন। উনিশ শতকে হিন্দু ও মুসলিম সমাজের প্রতিরোধের মুখে মিশনারি তৎপরতা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। তবে কোনো কোনো মিশনারি গ্রামের দরিদ্র মানুষের সংকটে পাশে দাঁড়িয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে চার্চ মিশনারি সোসাইটির জেমস লংয়ের নাম করা যেতে পারে। তিনি নীলকরদের অত্যাচার থেকে গরিব চাষীদের মুক্ত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। লং সাহেব দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ নাটকটি ১৮৬১ সালে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। সে সময় নীলকররা তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছিল।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে খ্রিস্টান মিশনারিরা হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহজ সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছিলেন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি বাংলায় রোমান ক্যাথলিক চার্চ শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। বেলজিয়ামের যাজকরা কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এ কলেজ শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। খ্রিস্টান মিশনগুলো থেকে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হতো। ভারত বিভাগের পর অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পর ঢাকায় রোমান ক্যাথলিক আর্চ বিশপ ও অ্যাঙ্গলিকান বিশপের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি হয়।
উনিশ শতকের সমাজ সংস্কার : ১৫ শতকের মধ্যভাগে আধুনিক যুগে পদার্পণ করেছিল ইউরোপ। বিশেষত ১৪৫৩ সালে অটোমান তুর্কিদের হাতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের পর থেকে এই সময়কাল নির্ধারণ করা হয়। মধ্যযুগের ইউরোপে কনস্টান্টিনোপল রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। গ্রেকো-রোমান সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র ভূমি হিসেবে পরিচিতি পায় কনস্টান্টিনোপল। পরবর্তীকালে মুসলিম শক্তির হাতে কনস্টান্টিনোপলের পতনের পর এ স্থান থেকে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি ইউরোপের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। তাদের সিংহভাগ গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন ইতালিতে। এই জ্ঞানী ব্যক্তিরা দেশান্তরী হওয়ার সময় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন অনেক মূল্যবান গ্রন্থ। তারা ইতালিতে বসে যে জ্ঞানচর্চা করার সুযোগ পান, মূলত তার ফলেই সেখানে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ ঘটে। এই রেনেসাঁ ছিল মধ্যযুগ অতিক্রম করে আধুনিক যুগে প্রবেশের অন্যতম চালিকাশক্তি।
এদিক থেকে বাংলায় মধ্যযুগ প্রলম্বিত ছিল ১৮ শতকের মাঝপর্ব পর্যন্ত। ইউরোপীয়দের আগমন ও রাজক্ষমতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার রূপান্তর না ঘটলে হয়তো মধ্যযুগের চরিত্র আরও প্রলম্বিত হতো। ইংরেজদের আগমন ও ক্ষমতাসীন হওয়া বাংলার সাধারণ হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।
ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ও সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে শাসক ইংরেজদের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছিল উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ অনুমোদন দেয়নি ইংরেজদের সংস্পর্শে আসার। ইংরেজ সান্নিধ্যকে তারা ধর্মীয় অনাচার হিসেবে মনে করতে থাকে। এ কারণে আধুনিক ইউরোপীয় জ্ঞানের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে পারেনি। ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণকে পাপ বিবেচনা করতে থাকে। এদিক থেকে অনেক বেশি পিছিয়ে পড়েছিল মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। রাজনৈতিক দিক থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের হারানোর কিছু ছিল না। তাদের শুধু প্রভু বদল হয়েছে। প্রায় ছয়শ’ বছর তারা মুসলমান শাসনের অধীনে ছিল। এবার ক্ষমতায় এসেছে ইংরেজ শাসক। অন্যদিকে মুসলমানদের মানসিক কষ্ট ও হতাশা ছিল বেশি। কারণ ইংরেজরা তাদের ছয়শ’ বছরের শাসনক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। রাজ্যহারা মুসলমানদের তাই অভিমান ছিল ইংরেজ শাসকদের প্রতি। তাই তারা ইংরেজদের ছায়া না মাড়ানোর কারণে অনেকটা পিছিয়ে গেল।