Tuesday, January 13, 2015

রিয়াজ রহমান গুলিবিদ্ধ- নগ্ন হামলা চালিয়ে শেষ রক্ষা হবে না: খালেদা জিয়া

বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর নগ্ন হামলা চালিয়ে সরকারের শেষ রক্ষা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতরাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, খ্যাতনামা প্রবীন কূটনীতিক, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা রিয়াজ রহমানের উপর রাতে গুলি বর্ষন ও তার গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় আমি যুগপৎভাবে ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন। আমাকে অবরুদ্ধ অবস্থায় দেখে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশবেষ্টনীর অদুরে তার ওপর এ কাপুরোষিত সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। আমি তার আশু সুস্থতা কামনা করি। খালেদা জিয়া বলেন, বিরোধী দলের ওপর এভাবে নগ্ন হামরা চালিয়ে শেষ রক্ষা হবে বলে আমি মনে করি না। এই সন্ত্রাসী হামলা ও প্রাণনাশের অপচেষ্টার নিন্দা ও প্রতিবাদের কোন ভাষা নেই। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকারি উচ্চ মহল থেকে উস্কানিমুলক বক্তব্যের পরই রিয়াজ রহমান এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হলেন। অনতি বিলম্বে হামলাকারি সন্ত্রাসীদের ধরে আইনামলে এনে কঠোর শাস্তির দাবি করছি। দেশে সুপরিকল্পিতভাবে এ ধরনের ভীতি প্রদর্শণ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পরিণাম শুভ হবে না বলে আমি ক্ষমতাসীনদের সতর্ক করে দিচ্ছি। তিনি বলেন, সন্ত্রাস, গুপ্ত হামলা, গুম, খুনের মাধ্যমে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির যে অপচেষ্টা চলছে তার পুরো দায় শাসক মহলকেই বহন করতে হবে।
রিয়াজ রহমান গুলিবিদ্ধ
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানকে গুলি করেছে দৃবৃত্তরা। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকায় ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার অবস্থা গুরুতর বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। হাসপাতালটির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রিয়াজ রহমানকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে বের হওয়ার কিছুক্ষণ পর রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে গুলশান-২ এ হোটেল ওয়েস্টিনের সামনে হামলার শিকার হন রিয়াজ রহমান। দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। এরপর তার গাড়িতে আগুন দেয়। ইউনাইটেড হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ফাওয়াজ শুভ জানিয়েছেন, রিয়াজ রহমানের পায়ে দুটি এবং কোমরে দুটি গুলি লেগেছে। তার প্রচ- রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

ভাড়া না নিয়েই শিশু একাডেমীতে পিঠা উৎসব! by মানুসরা হোসাইন

রাজধানীর দোয়েল চত্বরের বিপরীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রাঙ্গণে কাল বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে জাতীয় পিঠা উৎসব। আজ মঙ্গলবার সে উপলক্ষে একাডেমীর সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে জাতীয় পিঠা উৎসব উদযাপন পরিষদ।
অভিযোগ উঠেছে, যথাযথভাবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং ভাড়া নেওয়া ছাড়াই এ ধরনের আয়োজন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ অভিযোগ করেছেন শিশু একাডেমীতে কর্মরত বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই।
জাতীয় পিঠা উৎসব উদযাপন পরিষদের সদস্যসচিব হলেন মোশাররফ হোসেন। তিনি শিশু একাডেমীর পরিচালক। অন্যদিকে আজ সংবাদ সম্মেলন শেষে উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তির নিচে ঠিকানা হিসেবে টিএসসি (তৃতীয় তলা), দৃষ্টির মহড়াকক্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; উল্লেখ করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সংগঠনটি মোশাররফ হোসেনের। সংগঠনটি এবার ২১তম জাতীয় পিঠা উৎসব পালন করতে যাচ্ছে।
শিশু একাডেমীতে কর্মরত একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী একাডেমীর সম্মেলনকক্ষটি একাডেমী এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের (একাডেমী মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থা) বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়। এটি বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দেওয়া হয় না। অন্য কোনো সংগঠন এটি ব্যবহার করতে পারে না। কিন্তু সেই সম্মেলনকক্ষেই আজ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শিশু একাডেমীতে কোনো অনুষ্ঠান করতে হলের ভাড়া দিতে হয়। যে সংগঠন অনুষ্ঠান করবে তাদের সঙ্গে একাডেমীর চুক্তিও করতে হয়। আজ বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত এ ধরনের কোনো চুক্তি হয়েছে বা ভাড়া নিয়েছে, সে ধরনের কোনো তথ্য দিতে পারেননি শিশু একাডেমীর সংশ্লিষ্টরা। তবে একাডেমীর হিসাব বিভাগ, প্রশাসন বিভাগে কথা বলতে গেলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এক ব্যক্তি প্রতিবেদককে অনুরোধ করে বলেন, ‘আপনারা তো সবই বুঝেন। আপনি পরিচালক স্যারের সঙ্গে কথা বলুন। ভাড়া নিয়ে থাকলে সে সংক্রান্ত কাগজপত্র পরিচালক স্যারকে দিতে পারে। আমাদের কাছ পর্যন্ত তা আসেনি।’
তবে শিশু একাডেমীর পরিচালক মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন,‘সব ধরনের শর্ত পূরণ করে বৈধভাবেই এ উৎসব করা হবে। ভাড়াও নেওয়া হয়েছে।’ একাডেমী তার সম্মেলনকক্ষ ভাড়া দেয় বলেও জানালেন পরিচালক। চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে মোট কত টাকা ভাড়া, তা জানতে চাইলে সে সম্পর্কে তিনি কিছু বলেননি। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এক বেলা অনুষ্ঠানের জন্য একাডেমীকে দুই হাজার টাকা দিতে হয়।
জাতীয় পিঠা উৎসব উদযাপন পরিষদের মিডিয়া ও প্রচার উপ-কমিটির আহ্বায়ক মিনহাজুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, প্রত্যেকবার এ পিঠা উৎসব রমনা বটমূলে অনুষ্ঠিত হয়। এবার সেখানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রেরও একটি অনুষ্ঠান থাকায় তাঁরা নিজেরাই সে জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন।
শিশু একাডেমীতে অনুষ্ঠান করার জন্য ভাড়া নিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে মিনহাজুর রহমানও মোশাররফ হোসেনসহ দাপ্তরিক পদে যাঁরা আছেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুনেছি সেখানে নাকি উৎসব হবে। একাডেমীর প্রাঙ্গণ ভাড়া দেওয়ার সিস্টেম আছে। ভাড়া নিয়ে থাকলে পিঠা উৎসব তো হতেই পারে।’ তবে সংগঠনটি ভাড়া নিয়েছে কি না, তা পরে খোঁজ নিয়ে জানাবেন বলে জানান সচিব।
পিঠা উৎসব পরিষদের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কাল বিকেল চারটায় উৎসবের উদ্বোধন হবে। চার দিনব্যাপী এ উৎসব বেলা আড়াইটায় শুরু হয়ে চলবে রাত আটটা পর্যন্ত। তবে শুক্রবার সকাল ১০টা থেকেই উৎসব শুরু হবে। জাতীয় পিঠা উৎসব উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক হচ্ছেন ওসমান গণি।

ভুট্টোদের তিন প্রজন্মের রাজনীতি

(জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে (পিপিপি) পুনরুজ্জীবিত করতে এই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম প্রয়াত বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টোকে কাজে লাগানোর নানা চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত তা খুব একটা কাজে দিচ্ছে না।) পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভুট্টো পরিবারের তিন প্রজন্ম দেখার সুযোগ পেয়েছে দেশটির মানুষ। দেশটির উত্থান-পতনের রাজনীতিতে ভুট্টো পরিবারের দল বলে পরিচিত পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু তৃতীয় প্রজন্মের ভুট্টোর নেতৃত্বাধীন পিপিপি এখন অনেকটাই মলিন। পাকিস্তানের ঘাত-প্রতিঘাতের রাজনীতিতে বর্তমানে পিপিপির অবস্থান মূল্যায়ন করতে গিয়ে খ্যাতিমান কলাম লেখক আয়াজ আমির বলেন, ‘এই পিপিপি আর সেই পিপিপি নেই। দলটিকে কেউ পরাজিত করেনি, তারা নিজেরাই নিজেদের পরাজিত করেছে।’
ষাট ও সত্তরের দশকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে আলোচিত ও সমালোচিত মুখ জুলফিকার আলী ভুট্টো। তাঁর হাত ধরে ১৯৬৭ সালে গঠিত হয় পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। ১৯৭১-৭৩ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। ১৯৭৩-১৯৭৭ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী।
১৯৭৭ সালের নির্বাচনে পিপিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ওই নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তোলে বিরোধী দল। মওকা পেয়ে যান তৎকালীন সেনাপ্রধান মোহাম্মদ জিয়া-উল-হক। সেনা-অভ্যুত্থানে সরকার উৎখাত হয়। জুলফিকার আলীকে বন্দী করা হয়। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মামলায় ১৯৭৯ সালে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।
বাবার মৃত্যুর পর দলের হাল ধরেন বড় মেয়ে বেনজির ভুট্টো। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। ১৯৮৮-১৯৯০ এবং ১৯৯৩-১৯৯৬ এই দুই দফায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাঁকে বলা হতো ‘ডটার অব দ্য ইস্ট’। ২০০৭ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন বেনজির।
বেনজির নিহত হওয়ার পর কার্যত দলের কর্তৃত্ব নেন তাঁর স্বামী বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ আসিফ আলী জারদারি। নিজে নেন দলের কো-চেয়ারম্যানের পদ। চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয় ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টোর নাম। ব্যাপক দুর্নীতির জন্য পাকিস্তানে জারদারির ‘মিস্টার টেন পারসেন্ট’ বলে কুখ্যাতি রয়েছে।
২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জোট সরকার গঠন করে পিপিপি। জারদারি নির্বাচিত হন দেশের প্রেসিডেন্ট। ২০০৮-২০১৩ সাল পর্যন্ত এ পদে ছিলেন তিনি।
২০১৩ সালের নির্বাচনে তরুণ বিলাওয়ালকে সামনে রেখে বৈতরণী পার হতে চেয়েছিল পিপিপি। কিন্তু দলের ভরাডুবি ঠেকানো যায়নি।
দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে ভুট্টো পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম বিলাওয়ালকে কাজে লাগানোর নানা চেষ্টাই করছে পিপিপি। কিন্তু সেই চেষ্টা খুব একটা হালে পানি পাচ্ছে বলে মনে করছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
বিলাওয়ালের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাঁর বাবা জারদারির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা। ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ তা কতটা করতে সক্ষম হবেন, সেটি দেখার বিষয়।
দলটির নেতা-কর্মীরা বিশ্বাস করেন, বিলাওয়াল এখনো বয়সে তরুণ। তিনি রাতারাতিই দলকে পরিবর্তন করে দিতে পারবেন না। রাজনৈতিক পরিবারে তাঁর জন্ম। দল ও দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা তাঁর আছে। কিন্তু সে জন্য তাঁকে সময় দিতে হবে।
কলাম লেখক আয়াজ আমিরের মতে, বয়স কম ও অভিজ্ঞতার অভাব সত্ত্বেও দলের পুনরুজ্জীবনে বিলাওয়ালকে আশার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কারণ দলের সমর্থকেরা তাঁকে তাঁর বাবা জারদারির তুলনায় ভালো বিকল্প মনে করেন।-নিউজলাইন সাময়িকী অবলম্বনে

রাজধানীতে ৪ গাড়িতে আগুন, বিস্ফোরণ- নোয়াখালীতে ২০ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুর, কাল হরতাল

বিরোধী জোটের টানা অবরোধের অষ্টম দিনে রাজধানীতে যান চলাচল প্রায় স্বাভাবিক রয়েছে। তবে বাস স্ট্যান্ডগুলো থেকে দূরপাল্লার বাস ছাড়ছে না। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সব ট্রেনই নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে ছাড়ছে। রাজধানীর বিভিন্নস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন সহিংতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সকালে ধানমন্ডিতে অবরোধের সমর্থনে মিছিল বের হয়। এ মিছিল থেকে একটি লেগুনায় আগুন দেয়া হয়। এদিকে, খিলগাঁও কমিউিনিটি সেন্টারের সামনে একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মতিঝিলে জনতা ব্যাংকের সামনে ২৮টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। আগুন দেয়া হয়েছে একটি বিআরটিসি বাস ও একটি লেগুনায়। তবে এতে কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। অবরোধের সমর্থনে লালবাগ ও বনশ্রী এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেছেন শিবির কর্মীরা। এসময় ককটেল বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় শিবির কর্মীরা ৭ থেকে ৮টি গাড়ি ভাঙচুর করে। ১৫ থেকে ২০ জন শিবির কর্মী এ ভাঙচুর চালায়।  প্রায় একই সময়ে লালবাগে অবরোধের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল করে শিবির কর্মীরা। এ সময় তারা রাস্তায় পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখা শিবিরের প্রচার সম্পাদক আবদুল কাদেরের নেতৃত্বে মিছিলটি বের হয়।
নোয়াখালীতে ২০ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুর, কাল হরতাল
বুধবার সকাল থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ফেনীতে হরতালের ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় ছাত্রদল। কেন্দ্রীয় বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা বিএনপি’র সভাপতি মো. শাহজাহানকে আটক এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদে তারা এ হরতালের ডাক দেয়। এদিকে, বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শাহজাহানকে আটকের প্রতিবাদে ডাকা হরতালে নোয়াখালীতে যানবাহনে ব্যাপক নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। এসময় পিকেটাররা জেলার বিভিন্ন স্থানে ট্রাক, পিকআপভ্যান, অটোরিকসাসহ ২০টি গাড়ি ভাঙচুর ও একটি অটোরিকসায় আগুন দিয়েছে। এসব ঘটনায় পিকেটারদের ছোঁড়া ইটের আঘাতে ২ অটোরিকসা চালক আহত হয়েছেন। পিকেটার সন্দেহে পুলিশ এক যুবককে আটক করেছে। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে এসব ঘটনা ঘটে। বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আইনুল হক জানান, বিকাল থেকে পুলিশি পাহারায় লক্ষ্মীপুর থেকে বেশ কয়েকটি গাড়ি ছেড়ে এসেছে। তবে সন্ধ্যার পরে পুলিশি পাহারা ছাড়া লক্ষ্মীপুর থেকে ছেড়ে আসা কয়েকটি গাড়ি উপজেলার কেন্দুরবাগ এলাকায় আসলে পিকেটাররা ভাঙচুর চালায়। পরে পুলিশ ওই এলাকা থেকে সন্দেহভাজন একজনকে আটক করেছে। সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন জানান, সন্ধ্যার পরে শহরের দত্তেরহাট এলাকায় পিকেটাররা কয়েকটি ককটেলের বিষ্ফোরণ ঘটায়। অন্যদিকে, নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরপারবর্তী ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর কাজী হানিফকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মঙ্গলবার দুপুরে জেলা শহর মাইজদী সাব-রেজিস্ট্রার অফিস এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাহে নেওয়াজ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জামায়াত নেতা কাজী হানিফকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সংকটের সমাধান কোন পথে?

বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের বর্ষপূর্তির দিন থেকেই রাজনৈতিক অবস্থা উত্তপ্ত হয়ে রয়েছে। চলছে বিএনপির লাগাতার অবরোধ।
কিন্তু সরকার সংকট নিরসনে কোন ধরণের সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন দু পক্ষের কঠোর অবস্থানে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিএনপি বলছে ৩রা জানুয়ারি থেকে দলটির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া তার গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন।
যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন খালেদা জিয়া চাইলে তার বাসায় যেতে পারেন।ওদিকে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা একের পর এক গ্রেফতার হচ্ছেন।
পাশাপাশি চলছে বিএনপি অবরোধ এবং বিভিন্ন জেলায় নানা ঘটনায় দেয়া হচ্ছে হরতাল।
এরিমধ্যে সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় এক সমাবেশে বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করেছে, সেই মূল্য বিএনপিকেই দিতে হবে, জনগণকে নয়।
তাহলে এই অবস্থায় চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কোন পথে?
এ নিয়ে বিবিসির সকালের অধিবেশনে স্টুডিওতে এসে আলোচনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।তিনি বলেন, “সরকারের অবস্থান কঠোর বলেই মনে হচ্ছে। কাল যারা সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন তাদের কথা শুনে মনে হয়েছে যে তারা দল, দেশ ও সরকারকে একটা হার্ডলাইনে নিয়ে যেতে যান। এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও তাদের কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে”।
তিনি বলেন সরকার একেবারেই কঠোর অবস্থানে চলে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ ছাড় দেয়ার মানসিকতাতে নেই। প্রধানমন্ত্রীও বলে দিয়েছেন ২০১৯ সালের আগে সংলাপের সম্ভাবনা নেই।
“যেটুকু সংলাপের সম্ভাবনা ছিল সেটুকু তিরোহিত হয়ে গেছে। ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন হবেনা, নির্বাচন না হলে সংলাপ হবেনা এবং সংলাপ কার সঙ্গে এমন কথাও বলা হয়েছে আওয়ামী লীগের সমাবেশ থেকে”।
বিএনপির ছাড় দেয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মিস্টার ইসলাম বলেন বিএনপিরও ছাড় দেয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই তিন মনে করেন।
“প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় তারা যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তাতেও মনে হচ্ছে তারাও হার্ডলাইনে যাচ্ছে”।তিনি বলেন, “অবরোধ কোন সমাধান নয়। জনসম্পৃক্ততা সেখানে নেই। ১৮/১৯ জন মারা গেছে অকারণে। বিএনপির পক্ষ থেকেও বড় অবস্থানে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই”।
মিস্টার ইসলাম মনে করেন সংলাপের শুরু হলে একটা সমাধান আসতো।
“সামনের চিত্র ভয়াবহ। মানুষ উদ্বেগের মধ্যে আছে। যেভাবে চোরাগোপ্তা হামলা সে কারণে মানুষের মধ্যে স্বস্তি নেই। এভাবে দেশ চলতে পারেনা”।

ট্রেন তো আসেই না, ছাড়বে কীভাবে? by কমল জোহা খান

(ছবি:১- অবরোধের কারণে রেললাইন উপড়ে ফেলা, ফিশপ্লেট তুলে ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে দূরপাল্লার ট্রেনের শিডিউল অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। ফলে স্টেশনে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কখন আসবে তারও সঠিক জবাব দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। ছবিটি আজ কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে তোলা। ছবি: মনিরুল আলম ছবি:২- অবরোধের কারণে রেললাইন উপড়ে ফেলা, ফিশপ্লেট তুলে ফেলাসহ বিভিন্ন কারণে দূরপাল্লার ট্রেনের শিডিউল অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। ফলে স্টেশনে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কখন আসবে তারও সঠিক জবাব দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। ছবিটি আজ কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে তোলা। ছবি: মনিরুল আলম) ‘ট্রেন তো আসেই না, ছাড়বে কীভাবে?’ রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে টানা ১৩ ঘণ্টা অপেক্ষার পর আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে এ কথা বলেন উত্তরাঞ্চলগামী লালমনি এক্সপ্রেসের যাত্রী মনতাজুল ইসলাম। রংপুর যাওয়ার জন্য মনতাজুল গতকাল সোমবার রাত নয়টায় প্ল্যাটফরমে এসেছেন। ট্রেনটি গতকাল রাতেই ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ দুপুর ১২টা পর্যন্তও সেই ট্রেনের দেখা মেলেনি। কখন আসবে, বা আদৌ আসবে কি না, তাও জানেন না।
মনতাজুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাসে উঠতে ভয় পাচ্ছি। বাসে কখন পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেবে তার ঠিক নেই। তা ছাড়া বাস চলাচলও তো অনিয়মিত। তাই ট্রেনই ভরসা। রংপুর থেকে কুড়িগ্রামে যাব নিজ বাড়িতে। তাই সঙ্গে থাকা ব্যাগ, পুঁটলাপাটলি নিয়ে বসেই আছি।’
মনতাজুল ইসলামের মতো একই অবস্থা প্রায় প্রত্যেক যাত্রীর। সরেজমিনে দেখা গেছে, আজ সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে ভিড় দেখে মনে হচ্ছিল সামনে হয়তো ঈদ। ঘরমুখী মানুষের ভিড়। আসল কারণ হলো, অবরোধে ট্রেনের গতি কমে যাওয়ার কারণে দূরপাল্লার ট্রেনগুলো স্টেশনে পৌঁছাতেই দেরি করে। কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কোনো কোনোটা ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় পরে আসছে। আগে রেলের গতি ছিল ব্রডগেজে সর্বোচ্চ ৯০ কিলোমিটার, অঅর মিটার গ্রেজে ৭২ কিলোমিটার। এখন সেটি ৪০ কিলোমিটার গতিতে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। কোনো কোনো ট্রেন আদৌ আসবে কি না, তাও যাত্রীরা জানেন না। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও যাত্রীদের তেমন কোনো সন্তোষজনক উত্তর জানাতে পারছেন না।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, রংপুর এক্সপ্রেস ছাড়ার কথা ছিল সকাল নয়টায়। এখন সম্ভাব্য ট্রেন ছাড়ার সময় আজ রাত নয়টা। ধূমকেতু এক্সপ্রেস ভোর ছয়টায় ছাড়ার কথা ছিল। এখন বেলা পৌনে দুইটার দিকে ছাড়তে পারে। রাজশাহী এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতী, পারাবতসহ সব ট্রেনেই চলছে শিডিউল বিপর্যয়। তবে ঢাকার আশপাশে চলাচলকারী ট্রেন আসতে বা যেতে খুব বেশি দেরি হচ্ছে না।
মাহবুবুল আলম মেয়ে ও নাতনিদের নিয়ে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় যাবেন। আজ ভোর ছয়টায় ট্রেন ছাড়ার কথা। কিন্তু ট্রেন নেই। একই অবস্থা খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেসের যাত্রী নাজমুস সাকিবের। ভোর থেকে তিনি প্ল্যাটফরমে বসে আছেন। ট্রেন যে কোথায় আছে তাও জানেন না। নাজমুস সাকিব শুধু বললেন, ‘জরুরি কাজ আছে। বাড়ি যেতেই হবে।’
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ট্রেন চলাচল বন্ধ নেই। সব ট্রেনই চলছে। তবে অবরোধের কারণে দূরপাল্লার ট্রেনের শিডিউলে বিঘ্ন ঘটেছে। অবরোধের কারণে রেললাইন উপড়ে ফেলা, ফিশপ্লেট তুলে ফেলাসহ বিভিন্ন কারণেই বিঘ্ন ঘটছে। উত্তরাঞ্চলের ট্রেনগুলোর ক্ষেত্রে অবরোধ, কুয়াশা এবং ট্রেনে যাত্রীর চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় গতি কমাতেই হচ্ছে।’
ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে অনেক যাত্রী টিকিট ফেরত দিচ্ছেন। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, এখন টিকিট ফেরত দিলেও যাত্রীকে পুরো টাকাই ফেরত দেওয়া হচ্ছে। টাকা কেটে রাখা হচ্ছে না।
রেলপথ ও যাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যথাসাধ্য চেষ্টা এবং সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে জানালেন ঢাকা রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মজিদ। তিনি জানালেন, রেলওয়ের নিজস্ব জনবলের পাশাপাশি নিরাপত্তা রক্ষায় সশস্ত্র এবং সাদা পোশাকে ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। আজ থেকে আট হাজার আনসারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রেললাইনে কোনো ধরনের নাশকতা হচ্ছে কি না—তা তদারকের জন্য শুধু ইঞ্জিন চালিয়েও টহল দেওয়া হচ্ছে।

মোদির উন্নয়নমন্ত্রে মুগ্ধ জন কেরি

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও তাঁর দেশের বিনিয়োগকারীরা। সপ্তম ‘স্পন্দমান গুজরাট’ শীর্ষ সম্মেলনে (ভাইব্র্যান্ট গুজরাট সামিট) এ অনুভূতি প্রকাশ করেন তাঁরা। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি ও জি নিউজের। বিনিয়োগবিষয়ক সম্মেলনে অংশ নিতে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিসহ বিশ্বের শীর্ষ ৩০ কূটনীতিক ও ৫০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এখন ভারতে। গুজরাটে গতকাল রোববার শুরু হয় দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন। দুই বছর অন্তর ‘ভাইব্র্যান্ট গুজরাট’ বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে গুজরাট রাজ্য সরকার। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ২০০৩ সাল থেকে সেখানে এ ধরনের সম্মেলন হয়ে আসছে। নরেন্দ্র মোদি এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় এই উদ্যোগ নেন। গান্ধীনগরে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মোদির সুষম উন্নয়নের মন্ত্র ‘সবার সঙ্গে, সবার বিকাশ’ (সব কা সাথ, সব কা বিকাশ) তাঁকে খুব নাড়া দিয়েছে। মোদি গুজরাট নামটিকে এরই মধ্যে সম্ভাবনা ও সুযোগের সঙ্গে সমার্থক করে তুলেছেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে সম্মেলনের সহযোগী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী কেরি আরও বলেন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রকে অভাবনীয় সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে হবে। আর সেটা করার জন্য উপযুক্ত সময় এখনই। সন্ত্রাসবাদ রুখতে এবং স্বাধীনতা রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারত এশিয়াজুড়ে শান্তি ও প্রবৃদ্ধির যুগ গড়ে তোলায় নেতৃত্ব দিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আসন্ন ভারত সফর সামনে রেখে কেরির এসব মন্তব্যকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওবামা চলতি মাসের শেষের দিকে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে নয়াদিল্লিতে আসছেন। সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেন, গুজরাটকে বিশ্বের উন্নয়নের চৌরাস্তা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি নেতৃত্ব খুঁজে বের করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ভাষণের বেশির ভাগই ইংরেজিতে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী মোদির নজর ছিল বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার দিকে। ভারতকে বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভারত আপনাদের সামনে হাজির করেছে তিনটি ডি: চাহিদা, গণতন্ত্র ও জনগোষ্ঠী (ডিমান্ড, ডেমোক্রেসি ও ডেমোগ্রাফি)। বিশ্বের আর কোথাও এমনটা খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

মুসলিমবিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে মিছিল

ড্রেসডেনের মিছিলে সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির
আহ্বান জানিয়ে অংশ নেয় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। এএফপি
জার্মানিতে উগ্রপন্থীদের চলমান মুসলিমবিরোধী সমাবেশের বিরুদ্ধে গত শনিবার প্রায় ৩৫ হাজার লোক মিছিল করেছেন। গত সোমবার মুসলিমবিরোধী যে জমায়েত হয়েছিল, ড্রেসডেন শহরে শনিবারের এই মিছিলে তার প্রায় দ্বিগুণ লোক যোগ দেন। খবর বিবিসির। জার্মানির পূর্বাঞ্চলের শহর ড্রেসডেনে গত বছরের অক্টোবর থেকেই প্রতি সোমবার সন্ধ্যায় ‘পাশ্চাত্যের ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমী ইউরোপীয়রা’ (সংক্ষেপে ‘পেগিডা’) আন্দোলনের সমর্থকেরা সমাবেশ করছেন। ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিদের তৎপরতার প্রতিক্রিয়ায় তাঁদের তৎপরতা চাঙা হয়েছে। ড্রেসডেন শহরে শনিবারের বিক্ষোভ মিছিলের একপর্যায়ে ফ্রান্সের সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। স্যাক্সোনি রাজ্য সরকার এবং ড্রেসডেন নগর সরকার যৌথভাবে এর আয়োজন করে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী স্টানেচলাফ টিলিচ এতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এখানে সমবেত ৩৫ হাজার লোক এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যে তাঁরা এই নগরকে ভালোবাসেন।
এই সহিষ্ণু নগরের মানুষ হিসেবে তাঁরা গর্বিত। এটি একটি বিশ্বজনীন নগর।’ ড্রেসডেনের মেয়র হেলমা ওরোজ পেগিডা আন্দোলনের সমর্থকদের তাঁদের মত পরিবর্তন করে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সমবেত হতে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের সমাজ যে এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে, আজকের সমাবেশ তারই প্রমাণ। সোমবার পেগিডায় যাঁরা যাবেন, আমরা তাঁদের কথাও ভুলে যাইনি। আমরা তাঁদের পরিত্যাগও করছি না। আমাদের সমাবেশে আসার জন্য তাঁদের আহ্বান জানাই।’ এদিকে আজ সোমবার আবার পেগিডার সমাবেশ হবে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, ফ্রান্সের ঘটনার পর এবারের সমাবেশে আগের চেয়ে বেশি লোকের সমাগম হবে। গত সোমবার তাঁদের জমায়েতে ১৮ হাজার মানুষ যোগ দেন। পাশাপাশি আজ সন্ধ্যায় জার্মানির অনেক শহরে পেগিডা আন্দোলনের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। নতুন বছরের শুরুতে দেওয়া শুভেচ্ছা বক্তব্যে জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল জার্মানিতে ইসলামবিরোধী আন্দোলনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি জনগণকে এই আন্দোলন থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। আইএস ‘সমর্থক’ গ্রেপ্তার: এদিকে জার্মানির পুলিশ নর্থ রাইন ওয়েস্টফেলিয়া রাজ্য থেকে আইএসের এক সন্দেহভাজন সমর্থককে গ্রেপ্তার করেছে। ২৪ বছর বয়সী ওই যুবক সম্প্রতি সিরিয়া গিয়েছিলেন। তবে নিলস ডি. নামে সংক্ষিপ্ত পরিচয় প্রকাশ করা ওই যুবকের কোনো হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল, এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

ছাত্ররাজনীতি এখন ব্যক্তি-গোষ্ঠীনির্ভর হয়ে পড়ছে -সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি

(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৯ তম সমাবর্তনা অনুষ্ঠানে শিক্ষাথীদের উল্লাস। । উত্তীর্ণ শিক্ষাথীদের হাতে আজ তুলে দেওয়া হয়েছে সনদ। ছবিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভার্স্কয়ের সামনে থেকে তোলা হয়েছে। ছবি: মনিরুল আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৯তম সমাবর্তনে রাজু ভাস্কর্যের সামনে সমাবর্তন পোশাকে কয়েকজন শিক্ষার্থী। ছবি: সংগৃহীত) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, ছাত্ররাজনীতি এখন কিছু কিছু ক্ষেত্রে আদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থনির্ভর হয়ে পড়ছে। এ থেকে বেরিয়ে এসে ছাত্ররাজনীতিকে জাতির বৃহত্তর কল্যাণে আদর্শিক ও গণমুখী করে তুলতে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান। আজ মঙ্গলবার বেলা পৌনে দুইটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৯তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে অনেক বরেণ্য রাজনীতিবিদের। মূলত ছাত্ররাজনীতির পথ বেয়েই তাঁদের উত্থান ঘটেছে। নেতৃত্ব সৃষ্টিতে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন রয়েছে। তবে তা হতে হবে আদর্শিক ও জনকল্যাণমুখী। নিজেদের সময়ের ছাত্ররাজনীতির কথা বলতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘ষাটের দশকে আমরা যারা ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম, তাদের সবারই আদর্শ ছিল। সেই আদর্শ হলো দেশ ও জনগণের কল্যাণ সাধন। সেখানে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থের কোনো স্থান ছিল না।’ তিনি সমাবর্তনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে ও মননে দেশের গৌরবময় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করতে বলেন। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি বই পড়া, নিজ এলাকায় পাঠাগার তৈরি, দরিদ্র শিশুদের সহায়তা, রক্তদান ও বস্ত্রদানসহ মানবিক, সামজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এর আগে বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে আচার্য কার্জন হলের সামনে থেকে শোভাযাত্রা করে সমাবর্তনস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে যান। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এ সমাবর্তন অনুষ্ঠান বেলা একটা ৫১ মিনিটে আবার জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জেনেভাভিত্তিক মেধাস্বত্ব সংগঠন ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের (ডব্লিওআইপিও) মহাপরিচালক ফ্রান্সিস গ্যারিকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লজ’ ডিগ্রি দেওয়া হয়। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘আমরা এখনো একুশ শতকের সব পর্যায়ের শিক্ষাকে বিজ্ঞানমুখী করে তুলতে পারিনি। আগামী ৫০ বছরে না হোক, অন্তত আগামী ২০ বছরে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কী জাতীয় এবং কী পরিমাণ বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন, সে রূপরেখা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনায় এখনো প্রাধিকার লাভ করেনি। শিক্ষার্থীদের উপদেশ দিয়ে উপাচার্য বলেন, ‘তোমরা কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিনিধিত্ব করো না, তোমাদের জাগ্রত সত্তায় এ বোধ যেন সব সময় সজাগ থাকে যে, তোমরা এ দেশের সম্পদ। জাতীয় গৌরব বৃদ্ধি তোমাদের প্রতিজ্ঞা।’
সমাবর্তনে ৩৫ জনকে স্বর্ণপদক, ৪২ জনকে পিএইডি, ২০ জনকে এমফিল, ৫৬৫ জনকে স্নাতকোত্তর এবং তিন হাজার ১৬০ জনকে স্নাতকসহ মোট ছয় হাজার ১৫৭ জনকে বিভিন্ন ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

২১তম সংশোধনী পার্লামেন্টের জন্য আত্মঘাতী হামলা

আসমা জাহাঙ্গীর
পাকিস্তানের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার নেত্রী আসমা জাহাঙ্গীর তাঁর দেশের সংবিধানের ২১তম সংশোধনীকে পার্লামেন্টের ওপর আত্মঘাতী হামলার শামিল বলে আখ্যা দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে এর একটি বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। খবর ডনের। গত শনিবার লাহোরের বিচার বিভাগীয় কমপ্লেক্সে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলোচনার সময় ওই মন্তব্য করেন আসমা জাহাঙ্গীর। পাকিস্তানের পেশোয়ারের স্কুলে গত ১৬ ডিসেম্বরের ভয়াবহ জঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবাদীদের বিচারে সামরিক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এর জন্যই সংবিধানে ২১তম সংশোধনী আনা হয়। প্রথম দিকে সর্বদলীয় বৈঠকে রাজনৈতিক মতৈক্য হয়েছে বলে জানানো হলেও পরে এই সংশোধনী নিয়ে দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক দেখা দেয়।
আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, এই সামরিক আদালতের বিষয়ে পার্লামেন্টের সদস্যদের চাপ দিয়ে বাধ্য করা হয়েছে। পার্লামেন্ট সদস্যরা এই সন্ত্রাসের নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে একটি যৌক্তিক পথের সন্ধান দিতেও ব্যর্থ হয়েছেন তাঁরা। আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, সাবেক সামরিক একনায়ক পারভেজ মোশাররফও সামরিক আদালত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে সুশীল সমাজের বিরোধিতায় শেষতক সফল হননি। একটি গণতান্ত্রিক সরকার নিজে থেকে পার্লামেন্টের ক্ষমতা সামরিক আদালতের হাতে ছেড়ে দেওয়ায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। এ-সংক্রান্ত নতুন আইনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আসমা জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আইনের ওপর আক্রমণ করা পার্লামেন্টকে অবজ্ঞার শামিল হবে।’

জনগণকে বিপদে ফেলে এমন রাজনৈতিক কর্মসূচি কাম্য নয় by আর কে চৌধুরী

সন্ত্রাস-সংঘাত কিংবা হরতাল-অবরোধ সভ্য সমাজের রাজনীতির অনুষঙ্গ বলে বিবেচিত হতে পারে না। কিন্তু এর একটির সূত্র ধরে আরেকটি জাতির ঘাড়ে যেভাবে চেপে বসছে, তা জনপ্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। নেতিবাচক রাজনীতির কুপ্রভাব থেকে জাতিকে রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতাও জনগণকে আহত করছে।
দেশবাসী চায় সুস্থ পরিবেশ। রাজপথে স্বচ্ছন্দে চলাফেরার অধিকার। জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা থাকবে না এমনটিও তাদের কাম্য। সভ্য সমাজের প্রতিটি সরকার জনগণকে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হয়।
সরকারি ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের মানুষ। সরকারি দল ৫ জানুয়ারি দিনটিকে পালন করেছে গণতন্ত্র রক্ষা দিবস হিসেবে। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সংসদবহির্ভূত বিরোধী দলগুলো এটিকে পালন করেছে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে। সরকারি দল তাদের কর্মসূচি পালনে রাজধানীর ১৬টি পয়েন্টে সমাবেশ করার কর্মসূচি ঘোষণা করে। সরকারি ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির পরিণতিতে সহিংসতার ঘটনা এবং জনদুর্ভোগ দেশের রাজনীতি সম্পর্কে জনমনে বিরাজমান সংশয় ঘনীভূত করছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনগণই হল রাজনীতির প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। রাজনীতির কাছে গণমানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা কিংবা আশা-আকাক্সক্ষার কোনো মূল্য আছে কি-না সে সন্দেহই জোরদার হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় রাজনীতি সম্পর্কে জনমনে বিরূপ ধারণা সৃষ্টি করছে। এর অবসান হওয়া উচিত।
এটা মেনে নেয়া কঠিন হলেও সত্য- নিজেদের সভ্য দুনিয়ার অংশ হিসেবে ভাবার ক্ষেত্রে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের কার্পণ্য রয়েছে। এ কার্পণ্যের বিষয়টি জাজ্বল্যমান হয়ে উঠেছে সংঘাতপ্রবণ রাজনৈতিক কর্মসূচি এড়ানোর ক্ষেত্রে। ৫ জানুয়ারি সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির পর বিরোধী দলের লাগাতার অবরোধের ডাক দেশবাসীকে আতংকিত করে তুলেছে। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির পরিণতিতে চারজনের প্রাণহানি ও ৩০০ জন আহত হওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বহীনতাকেই দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট করেছে।
গত বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় আড়াই হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। স্বাভাবিক মৃত্যু মানুষের একটি সহজাত অধিকার। রাজনৈতিক হানাহানি ও সংঘাতে এ অধিকার হাতছাড়া হতে চলেছিল। নতুন বছরের শুরুতেই একের পর এক সহিংসতায় একদিকে যেমন হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বিপর্যস্ত হচ্ছে অর্থনীতি। জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধি সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে অভ্যুদয়ের যে আশা সৃষ্টি করেছিল, রাজনৈতিক সহিংসতা তা অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে রাজনীতিকদেরই আত্মত্যাগে। দেশের স্বাধীনতার জন্য তাদের অবদান প্রাতঃস্মরণীয়। কিন্তু গত বছর নির্বাচন নিয়ে তারা যে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন তা দুর্ভাগ্যজনক। নিজেদের নাক কেটে অপরের যাত্রাভঙ্গের অবিমৃষ্যকারিতা কখনোই কাম্য হওয়া উচিত ছিল না। সরকার ও বিরোধী দল দুপক্ষই যে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পক্ষে, তা তাদের বক্তব্যে স্পষ্ট। এ নির্বাচন কীভাবে হবে তা নিয়ে একমত হতে পারেননি তারা নিছক জেদের কারণে। সরকার ও বিরোধী দলের আস্থার সংকট অতীতে রাজনীতিকদের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, কেউই তা থেকে শিক্ষা নেননি। বলা হয়, ইতিহাসের শিক্ষা হল ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়া। আমরা মনে করি, দেশবাসীকে তারা মৃত্যু উপত্যকার দিকে ঠেলে দেয়ার যে বোকামি করছেন, তা কারও জন্যই মঙ্গল ডেকে আনবে না। নিজেদের স্বার্থেই সংঘাতের বদলে সমঝোতার পথে তাদের এগিয়ে আসা উচিত।
রাজনৈতিক দলগুলোর হরতাল পালনের অধিকার আছে। কিন্তু জনগণকে বিপদে ফেলে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিই কাম্য নয়। সরকারকেও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে হবে। আমরা চাই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটুক, মানুষ শান্তিতে, নির্বিঘ্নে তাদের কাজ করুক। হরতালে যদি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে, তাহলে সেটাকে সফল বলা যায়। কিন্তু যদি অযৌক্তিকভাবে হরতাল ডেকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়, নিছক দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য হরতাল ডাকা হয়, তাহলে সেটা মানুষ সমর্থন করবে না। দমনপীড়ন নয়, সহনশীলতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আর কে চৌধুরী : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩ নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

আমরাও শার্লি? হায় ইউরোপ! by ফরহাদ মজহার

ফ্রান্সে বেড়ে ওঠা ফরাসি নাগরিক দুই ভাই শরিফ কুয়াচি (Cherif Kouachi) ও সায়িদ কুয়াচি (Said Kouachi) অতর্কিতে শার্লি হেবদো পত্রিকা অফিসে হামলা চালিয়ে চারজন নামকরা কার্টুনিস্টসহ প্রায় বারোজন মানুষকে হত্যা করেছে। বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করলে এটা, বলাবাহুল্য, একটি হত্যাকাণ্ড। প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে পাশ্চাত্যের পত্রিকাগুলোর খবর হচ্ছে, হামলাকারীদের মুখে ‘আল্লাহু আকবর’ স্লোগান শোনা গিয়েছে এবং এটাও শোনা গিয়েছে যে তারা বলেছে ‘নবীর অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছি’। হত্যাকারীদের ধরার জন্য ফ্রান্সে রীতিমতো যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিন দিনব্যাপী পরিচালিত এই অসম ও অস্বাভাবিক পুলিশি অপারেশনে শরিফ কুয়াচি ও সৈয়দ কুয়াচিকে প্রায় ৮০ হাজার ফরাসি পুলিশ সংঘবদ্ধভাবে ঘেরাও করে হত্যা করেছে। তারা একটি ছাপাখানার ভবনে লুকিয়ে ছিল। তাদের হত্যা এতই জরুরি হয়ে পড়েছিল যে, কালো কাপড় পরা কমান্ডোরা হেলিকপ্টারে চড়ে বিল্ডিংয়ের ছাদে নেমে পড়ে। তারপর ভবনের ভেতরে তারা ফ্লাশ গ্রেনেড ছুড়ে মারে। শরিফ আর সৈয়দ পুলিশের ভাষ্যানুযায়ী বিল্ডিং থেকে তাদের কালাশনিকভ নিয়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়, আর তাদের এ সশস্ত্র বেরিয়ে আসা তৎক্ষণাৎ হত্যার জন্য ভালো একটি যুক্তি হয়ে ওঠে। তাদের সহযোগী ১৮ বছর বয়সী হামিদ মুরাদ নিজেকে নির্দোষ বলে স্বেচ্ছায় পুলিশের কাছে আগেই ধরা দিয়েছিল। এখন বলা হচ্ছে, পত্রিকাটির অফিস পাহারা দিতে গিয়ে একজন পুলিশও প্রাণ দিয়েছেন, যিনি নিজেও ইসলাম ধর্মাবলম্বী। পুলিশ হামলাকারীদের পরিচয় জানতে পেরেছে। শরিফ কুয়াচি (৩২) এবং সাইদ কুয়াচি (৩৪)।
ওদিকে প্যারিস শহরের ২৫ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের ইহুদি লোকালয়ে একটি ‘কোশার’ সুপার মার্কেটে আমেদি কুলেবালি (Amedz Coulibaly) ও হায়াত বুমেদিয়েন (Hayet Boumddiene) কিছু মানুষকে জিম্মি করে দুই ভাইকে বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়েছিল। সেখানেও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে জিম্মি উদ্ধার করতে গিয়ে আমেদিকে হত্যা করে এবং ১৫ জন জিম্মিকে উদ্ধার করে। তবে এতে চারজন জিম্মিও নিহত হয়। তবে হায়াত বুমেদিয়েন ঠিক কোথায় তা এখন অবধি সঠিক জানা যায়নি।
ইসলামের নবীর কুৎসিত কার্টুন এঁকে ধর্মপ্রাণ মানুষের মর্যাদাবোধকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করবার ক্ষেত্রে শার্লি হেবদো কুখ্যাতি অর্জন করেছে অনেক আগেই। আল কায়দার চোখে শার্লি হেবদো এবং তার কার্টুনিস্টরা দুশমন। এটা তারা ঘোষণা দিয়েই রেখেছে। এরকম হামলা হতে পারে সে আশংকা সবসময়ই ছিল। পুলিশ পত্রিকাটির অফিস পাহারা দিত। অবশেষে যে আশংকা সবাই করছিল, সেটাই সত্য প্রমাণিত হল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা সহনশীলতার সীমা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু শার্লি হেবদো সব ধর্মকেই অপমানিত করে, এটা সত্য নয় মোটেও। অন্যকে অপমানিত করার ক্ষেত্রে তারা উদার অথবা সবার বিরুদ্ধেই কার্টুন এঁকে অপমান ও লাঞ্ছনা সমভাবে বিতরণ করেন, এটা একটা মিথ মাত্র। ইউরোপ এক্ষেত্রে নিজেদের সহনশীল দাবি করলেও ইহুদি ধর্মের প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ইউরোপ সহ্য করে না। তাদের ভাষায় এটা ‘অ্যান্টি- সেমিটিক’। ইহুদি ধর্মের কোনো অপমান করা যাবে না। শার্লি হেবদো ব্যতিক্রম নয়। মরিস সন (Maurice Sinet) নামের ৮০ বছর বয়সী এক কার্টুনিস্ট ইহুদি ধর্মকে অবমাননার পর তাকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। কিন্তু তিনি মাফ চাননি, তাকে শার্লি হেবদো থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ইহুদি বা ইহুদি ধর্মকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করা না গেলেও ইসলাম ও মুসলমানদের অনায়াসেই অপমান ও লাঞ্ছিত করা যায়। এই ডবল স্ট্যান্ডার্ড ইউরোপে চালু, শার্লি হেবদোর কার্টুনিস্টরাও এই অসম আচরণে অভ্যস্ত। ইসলামের নবীকে নিয়ে যা খুশি কার্টুন আঁকা যায়, কিন্তু ইহুদি বা ইহুদি ধর্ম নিয়ে নয়।
আগেই বলেছি, বিচ্ছিন্নভাবে বিচার করলে শার্লি হেবদোর ঘটনা নিঃসন্দেহে একটি হত্যাকাণ্ড এবং প্রথাগত নীতি-নৈতিকতা ও আইনি বিচারে নিন্দনীয় ও বিচারযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এর জন্য ফরাসি প্রশাসনের দায় কতটুকু সেটাও ভেবে দেখা দরকার। শরিফ তথাকথিত জিহাদি কর্মকাণ্ডে জড়িত, এটা প্রশাসনের জানা ছিল। ২০০৫ সালে ফরাসি টেলিভিশনে একটি ডকুমেন্টারি প্রচারিত হয়। সেখানে উগ্র ইসলামপন্থায় জড়িয়ে পড়ার আগে যে তরুণ ফরাসি নাগরিকদের মধ্যে পরামর্শ ও সহায়তা দরকার হয়, ডকুমেন্টারিটি ছিল সেটা নিয়েই। সেখানে শরিফকে ডকুমেন্টারির শুরুতেই দেখা যায়। এখন বলা হচ্ছে, শরিফ কিছুকাল আগে সিরিয়ার যুদ্ধ শেষে ফিরেছে এবং তার অপারেশন ইয়েমেনে আল কায়দার নির্দেশে ঘটেছে। শার্লি হেবদোর হত্যাকাণ্ডের পর পত্রপত্রিকায় এ যাবৎ যত তথ্য আমরা পাচ্ছি তাতে পরিষ্কার যে, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ফরাসি পুলিশ তাদের গ্রেফতার করার চেষ্টা করেনি; যে বিল্ডিংয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছিল সেই ভবন আত্মসমর্পণে বাধ্য না হওয়া অবধি ঘিরে রাখার ধৈর্য তারা দেখায়নি। আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করার কোনো ভিন্ন কৌশলও তারা গ্রহণ করেনি। বরং হেলিকপ্টার দিয়ে ছাদে নেমে সেখান থেকে তারা ভেতরে ফ্লাশ গ্রেনেড ছোড়ে। এটা ছিল শরিফ ও সৈয়দকে উদভ্রান্ত করার কৌশল যাতে তারা তাদের অস্ত্রসহ বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয় এবং তাদের সহজে হত্যা করা যায়। বাংলাদেশে আমরা ‘ক্রসফায়ার’ নামে যে ঘটনার সঙ্গে পরিচিত, এক্ষেত্রেও পুলিশি হত্যাকাণ্ডের ধরন একই। ফরাসি পুলিশের তৎপরতা বাংলাদেশের র‌্যাব বা পুলিশের চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। পার্থক্য হচ্ছে, পুরা ঘটনাই ঘটেছে মিডিয়ার সামনে। দুই ভাইকে আইনের অধীনে এনে বিচার করার পরিবর্তে ‘ক্রসফায়ারে আইনবহির্ভূতভাবে হত্যা’ করা হয়েছে। কালাশনিকভ হাতে বেরিয়ে আসা এবং এরপর আত্মরক্ষার জন্য তাদের হত্যা করা বাংলাদেশী পুলিশের মতোই গল্প। আইনি কায়দায় সাজানো হয়েছে। পত্রিকায় পুলিশের বরাতে প্রচার করা হয়েছে, তারা নাকি শহীদ হতে রাজি, ধরা দেবে না। সেটা সত্য কী মিথ্যা জানার আর উপায় নেই। কারণ শরিফ ও সৈয়দ তাদের ইমান বা বিশ্বাস অনুযায়ী শহীদ। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তারা বলতে পারবে না তারা কেন শার্লি হেবদো পত্রিকা অফিসে হামলা করে কার্টুনিস্টদের হত্যা করেছে। কিংবা এটা যে ইসলামের নীতি-নৈতিকতার দিক থেকেও ভুল- সেই উপলব্ধি তাদের মধ্যে সঞ্চার করার মধ্য দিয়ে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে কেউ যেন আর উদ্বুদ্ধ না হয় সেই সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করাও আর সম্ভব নয়। এর একটা নিট ফল হবে এই যে, শরিফ ও সৈয়দ বহু মুসলিম তরুণকে তাদের নবী-রাসূলের অপমান ও অমর্যাদার জন্য ‘প্রতিশোধ’ নিতে অনুপ্রাণিত করবে। মুসলিম তরুণ-তরুণীর জীবনে নবী-রাসূলদের জন্য যে সম্মান ও মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত, তার মূল্য তাদের নিজের জীবনের সঙ্গে অভিন্ন। ফলে নবীর মর্যাদা রক্ষার জন্য জীবন বিসর্জনের মধ্য দিয়েই অনেকে নিজের জীবনের মর্যাদা ও মূল্য রক্ষাকে শ্রেয় মনে করবে।
দুই
তাহলে আমরা মেনে নিতে পারি, উদ্দেশ্য যাই হোক, শার্লি হেবদোর হত্যাকাণ্ড একটি অপরাধমূলক ঘটনা; কিন্তু অপরাধের বিচার পাল্টা আইনবহির্ভূত পুলিশি হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। এ অধ্যায় আমরা আপাতত ভবিষ্যতের পর্যালোচনার জন্য তুলে রাখতে পারি। শার্ল হেবদোর কার্টুনিস্টদের দেবতা বানানোর যেমন কোনো কারণ ঘটেনি, ঠিক তেমনি তাদের হত্যাকারীদের দানব জ্ঞান করারও কোনো যুক্তি নেই। ফরাসি সমাজ আন্তর্জাতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত তারা ফরাসি নাগরিক। কিন্তু এ হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ফরাসি সমাজ ‘আমরা’ আর ‘ওরা’ হয়ে গিয়েছে। এক্ষেত্রে ‘ওরা’ হচ্ছে মুসলমানরা। বলা হচ্ছে, শার্লি হেবদো যেভাবে কদর্য ও কুৎসিতভাবে ইসলামের নবীর কার্টুন এঁকেছে, তাতে মুসলমানদের এত ক্ষিপ্ত হওয়ার কী আছে? এটাই ইউরোপের প্রশ্ন। শার্লি হেবদো তো অন্য ধর্ম এবং ব্যক্তিকে নিয়েও তামাশা করে। কই তারা তো এসে কালাশনিকভ দিয়ে গুলি করে মানুষ হত্যা করে না? এ যুক্তি থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, যেহেতু ইসলাম একটি অসহনশীল ও নিষ্ঠুর ধর্ম, অতএব মুসলমান মাত্রই এ ধরনের ভয়ংকর কাজ করে। ইসলাম ধর্মের কারণেই প্রতিটি মুসলমানেরই সন্ত্রাসী ও সহিংস হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে। শরিফ, সৈয়দ কিংবা আমেদি ফ্রান্সে জন্ম নিয়ে সেখানে বেড়ে উঠলেও তারা ‘ফরাসি’ নয়, শেষ বিচারে তারা ‘মুসলমান’। ফলে খুনের দায়ে অভিযুক্ত হলেও এটা ইসলামেরই দায়। ফরাসি সমাজ তাদের অপরাধপ্রবণতা বদলাতে পারল না কেন, সেটা ফরাসি সমাজের সমস্যা নয়, সেটা ইসলামের সমস্যা।
আইনবহির্ভূতভাবে অপরাধীদের হত্যাকাণ্ড সাঙ্গ করে পাশ্চাত্য এখন ইসলামকে কাঠগড়ায় তুলতে চায়। দ্বিতীয়ত, তারা বলতে চায়, এটা ‘ফ্রি স্পিচ’ বা যা খুশি তাই বলা, লেখা ও কার্টুন আঁকার স্বাধীনতা। অন্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা কিংবা অন্যকে অপমানিত করা এতই পবিত্র অধিকার যে, এর সঙ্গে নাকি ঠাট্টা-তামাশা, ব্যঙ্গ বা ইয়ার্কির কোনো পার্থক্য নেই। পাশ্চাত্য যদি এ পার্থক্য করতে অক্ষম হয় তাহলে সেটা তাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি বা সমাজের সমস্যা নয়, সেটা ইসলামেরই সমস্যা! ফ্রিডম অব স্পিচ বা যা খুশি তাই বলা, লেখা বা কার্টুন আঁকার অধিকার একটি ‘পবিত্র’ অধিকার। কোনোভাবেই এ ‘পবিত্র’ অধিকার লংঘন করা যাবে না। সীমাহীন ও অলংঘনীয় অধিকারের এ পবিত্রতা ফ্রিডম অব স্পিচকে স্রেফ ধর্ম ও ধর্মতত্ত্বে পরিণত করে ফেলে। সেদিকে অধিকারবাদীদের বিশেষ হুঁশ নেই। অথচ এ ধার্মিকতাকেই সেক্যুলার দাবি করে ধর্মের বিরুদ্ধে, বিশেষত ইসলামের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় পাশ্চাত্য। বেশ কৌতুকের ব্যাপার বটে। শার্লি হেবদোর অফিসে বন্দুকধারীর হামলায় নিহতদের প্রতি শোক জানাতে গিয়ে শোকার্তরা বলছেন, ‘আমরাও শার্লি’। সেটা ঠিক, কারণ তারা সবাই যে নীতিতে বিশ্বাস করেন সেটা হচ্ছে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’, পাশ্চাত্য লিবারেল চিন্তা ও সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে যার ভূমিকা নির্ণায়ক। সারকথা হচ্ছে, কেউ মুখের কথায়, কিংবা লেখালেখিতে কারও ধর্ম, সংস্কৃতি, পরিচয় কিংবা ব্যক্তির আত্মমর্যাদার সঙ্গে যুক্ত কোনো কিছুকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করলেও সেটা মেনে নিতে হবে। নবী-রাসূলদের নিয়ে কুৎসিত ঠাট্টা, মশকরা, কার্টুন কিংবা লেখালেখি এ নিয়মের বাইরে নয়। কারণ সেটা লাঞ্ছনাকারীর মত প্রকাশের স্বাধীনতা। তারা ধর্ম বা নবী-রাসূলদের নিয়ে যা খুশি বলতেই পারে। অতএব যাকে আহত করা হয়েছে তাকে সেটা মেনে নিতে হবে। এর নাম সহনশীলতা। টলারেন্স। উদার সমাজে বাস করতে হলে সহনশীল হতে হবে। কথা বা কার্টুন দিয়ে প্রতিপক্ষকে পাল্টা আঘাত করা যাবে; কিন্তু সেটা শারীরিক হতে পারবে না। আহত হওয়াটা মানসিক। যিনি আঘাত পেয়েছেন, অলংঘনীয় পবিত্র ব্যক্তি অধিকারের সুবাদে তাকে সেটা মেনে নিতে হবে।
ব্যক্তিতান্ত্রিক অধিকারের এ ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা সেক্যুলারিজমের সমসাময়িক বৈশিষ্ট্য। পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্কে যে রূপান্তর ঘটায়, তার বিচার ছাড়া ব্যক্তিতন্ত্রের এ আধ্যাত্মিক পরিণতি ভালোভাবে বোঝা যাবে না। এখানে সেই ব্যাখ্যার সুযোগ সীমিত। যে সমাজে ব্যক্তির চেয়ে সমাজ ছোট, কিংবা সমাজের ঊর্ধ্বে ব্যক্তি অধিষ্ঠিত সেই সমাজের পক্ষে কেন নবী-রাসূলদের অমর্যাদাকে পুরো সমাজের অমর্যাদা হিসেবে গণ্য করা হয় সেটা অনুধাবন করা মুশকিল। ফলে ফ্রান্স শার্লি হেবদোর হত্যাকাণ্ডের স্মরণে মোমবাতি জ্বালিয়ে ‘Je Sui Charlie’ বা ‘আমরাও শার্লি’ প্লাকার্ড হাতে নিয়ে শোক মিছিল করতে পারে সহজে। কারণ তারা তাদের ধর্ম বিশ্বাসেরই প্রতিনিধিত্ব করছে- যা খুশি তাই বলা, লেখা এবং কুৎসিত ও কদর্য কার্টুন আঁকার গোঁয়ার্তুমি। আর তাদের এ অন্ধবিশ্বাসকে লিবারেলিজম আখ্যা দিয়ে তাকে প্রতিস্থাপন করছে ইসলামের বিরুদ্ধে। বিশেষত তাদের বিরুদ্ধে, যারা তাদের সমাজে সংখ্যালঘু ও দুর্বল। তাদের ধারণা, ‘মর্যাদাবোধ’ যার যার ব্যক্তিগত সংবেদনার ব্যাপার। মর্যাদা আহত হওয়ার মানদণ্ড দিয়ে ব্যক্তির অধিকার সংকুচিত করা যাবে না। বলা যাবে না, এ হচ্ছে ঠাট্টা-তামাশা-ব্যঙ্গ-রসিকতা করার সীমা- এ সীমা লংঘন করার অর্থ শুধু অপর কোনো ব্যক্তিকে নয়, পুরো একটি কমিউনিটি বা সমাজকেও অমর্যাদা ও অপমানিত করা। ব্যতিক্রম থাকলেও ফরাসি সমাজ সাধারণভাবে এতই সংবেদনহীন হয়ে পড়েছে যে, ‘আমিও শার্লি’ বলার মধ্য দিয়ে তারা নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করার চেয়ে বিশ্বব্যাপী সেই রটনাকেই প্রবল করছে যে, শার্লি হেবদোর মতো ইসলামের নবী-রাসূলদের অপমান করা তাদের আদপ বা সংস্কৃতির মধ্যেই পড়ে। তারা নিজেরাও শার্লি হেবদোর মতো অন্যদের অপমান ও অবমাননা করতে প্রস্তুত। কারণ ‘আমরাও শার্লি’! বেশ!
আমরাও শার্লি প্রমাণ করার জন্য ইউরোপ ও আমেরিকার পত্রপত্রিকায় শার্লি হেবদোর কার্টুনগুলো আবার ছাপানোর হিড়িক পড়েছে। তারা প্রমাণ করতে চায়, এ ধরনের হামলায় ভীত হয়ে মুখে, কথায়, কিংবা কার্টুনে যা খুশি তাই বলতে, লিখতে ও আঁকতে পারার অন্ধবিশ্বাস তারা ত্যাগ করবে না। ইউরোপ ফ্রিডম অব স্পিচ রক্ষা করার নামে মূলত যেভাবে নগ্নভাবে তাদের বর্ণবাদী চেহারা দেখিয়ে ইসলামের প্রতি আতংক প্রকাশ করছে, তা এক দর্শনীয় ব্যাপার বটে।
সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে দুনিয়াব্যাপী তারা যে যুদ্ধ করছে, ইউরোপের এ দৃশ্যমান বর্ণবাদ যুদ্ধেরই সম্প্রসারণ মাত্র। তারা নিজেরাই দাবি করছে যে, শরিফ আল কায়দার ইয়েমেনি শাখার নির্দেশ পালন করছে। জানি না এটা সত্য কিনা। যদি তাই হয়, তাহলে যে যুদ্ধ ইউরোপ অন্যের ভূখণ্ডে করছিল তা ক্রমে তার নিজ দেশের সীমানার মধ্যে ঢুকে পড়ছে।
যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে নিজেদের পক্ষে ইউরোপে রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটানোর কৌশলের দিক থেকে আল কায়দা খুবই সফল বলতে হবে। যে গর্ত ইউরোপ অন্যদের জন্য খুঁড়েছিল, সেই গর্তে তারা নিজেরাই পা দিচ্ছে।
ইউরোপের বিবেক ফিরে আসুক। এছাড়া দূর থেকে আমরা আর কীইবা বলতে পারি।

সমাবর্তন মনে করিয়ে দিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরগৌরবের দিনগুলো by ড. সুকোমল বড়ুয়া

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৯তম সমাবর্তন। ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯২৩ সালে প্রথম সমাবর্তন হয়। ওই সমাবর্তনে প্রথম চ্যান্সেলর বক্তৃতা দেন এজে আর বুলওয়ার লিটন। আজকের সমাবর্তনের বক্তা হলেন ওয়ার্ল্ড ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. ফ্রান্সিস গ্যারি।
মূলত পূর্ব বাংলার পশ্চাৎপদ মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের লক্ষ্যেই এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ নয় দশক পার করে এ বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছে এ উপমহাদেশ ও পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে। শিক্ষার্থীদের জন্য সনদও বিতরণ করেছে অনেক। মেধা, গবেষণা ও কৃতিত্বের কারণে বহু পদকও পেয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এবারের সমাবর্তনে মোট ৬ হাজার ১০৪ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করবে। তাদের মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী ৪২, এমফিল ২০, স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ২৯, এমডি ও এমএস ৪৯, অনার্স (স্নাতক) ৩ হাজার ১৬০ এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ৫৬৫ জন।
সমাবর্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্ট ও একাডেমিক শিক্ষা কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় সচল থাকে। বিদ্যা ও জ্ঞানমুখী সাধনায় নিবিষ্ট থাকার জন্য শিক্ষার্থীরা প্রেরণা পায় এবং পাঠের প্রতি উৎসাহ জোগায়। সমাবর্তনের দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের পদচারণায় মুখরিত হয়। পরিবেশও হয় বর্ণাঢ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষণার পাশাপাশি এদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা অসামান্য অবদান রেখেছেন। নেতৃত্বও দিয়েছে অসাধারণ। এ কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এত নামডাক। অর্জনও অনেক। গবেষণার পাশাপাশি মুক্তবুদ্ধির চর্চা, নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে।
বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট নামে প্রথমে পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের দাবি ওঠে। ১৯১২ সালের ২৭ মে বেঙ্গল গভর্নমেন্ট কর্তৃক গঠিত রবার্ট নাথান কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি তৈরি হয়। এর প্রস্তাবক ছিলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ও শেরেবাংলা একে ফজলুল হক।
ঢাকার রমনা সিভিল স্টেশন এলাকার প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ ২৭৫.০৮৩ একর। সুখের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে উইল করা প্রখ্যাত দার্শনিক গোবিন্দ চন্দ্র দেবের (জিসি দেব) জমিটিও সম্প্রতি কোর্টের রায়ে উদ্ধার করা হয়েছে। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। দীর্ঘদিন পরে হলেও এটিকে একটি ভালো কাজ বলা যায়। এরকম আরও নানা জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি রয়েছে। এগুলো উদ্ধার করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর আরও বিস্তৃত করা যাবে। যেহেতু যুগের চাহিদায় নতুন নতুন বিভাগ, ফ্যাকাল্টি ও গবেষণা সেন্টার খোলা হচ্ছে, সেহেতু এ নিয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে। সেজন্য চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে আণবিক শক্তি কমিশনের পূর্বদিক পর্যন্ত অর্থাৎ টিএসসির পূর্ব পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কিছু অংশ এখন থেকে নিতে না পারলে আগামী দেড়শ-দুশ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণের জন্য আর কোনো জায়গা পাওয়া যাবে না। এমনকি বর্তমান আণবিক শক্তি কমিশনের জায়গাটিও আমাদের নিয়ে নিতে হবে।
স্মর্তব্য, এ উপমহাদেশের প্রাচীনতম ও খ্যাতিমান নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটাকে গড়ে তোলা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, ছাত্র-শিক্ষক কাছাকাছি থেকে বিদ্যা ও পাঠ গ্রহণ এবং পারস্পরিক জ্ঞানের আদান-প্রদান
করবে। এমনকি শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলে থেকে জ্ঞানার্জনের নানা প্রয়োজনে লাইব্রেরিসহ শিক্ষকের সাহচর্য লাভ করবে। প্রাচীন ভারতবর্ষের বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানার্জনের ধরনও ছিল সে রকম। এ কারণে বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানদানে নালন্দার এত গৌরব ও এত খ্যাতি ছিল।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান ও বিদ্যাচর্চার নিরিখে এ উপমহাদেশে একটি শ্রেষ্ঠ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত লাভ করে। অক্সফোর্ডের আদলে এর পঠন-পাঠন ও শিক্ষাদান কার্যক্রম পদ্ধতি পরিচালিত হয়েছিল বলেই এটাকে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। এছাড়াও ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের গর্বিত অংশীদার হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম উপাচার্য ছিলেন স্যার পিজে হার্টজ। প্রথম চ্যান্সেলর ছিলেন লরেন্স জন লামলে ডানডাস (১৯২১-১৯২২)। প্রথম রেজিস্ট্রার ছিলেন খান বাহাদুর নাজির উদ্দিন আহমদ (১০.০৪.২১ থেকে ৩০.০৬.৪৪)। মনোগ্রাম পরিবর্তন হয় চারবার। প্রথম ১৯২১-১৯৫২, দ্বিতীয় ১৯৫২-৭২, তৃতীয় ১৯৭২-১৯৭৩, চতুর্থ ১৯৭৩ থেকে চলমান।
প্রথমে কলা, বিজ্ঞান ও আইন এ তিনটি অনুষদ নিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে কলা অনুষদে ছিল সংস্কৃত, বাংলা, উর্দু, ফার্সি, আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ ইত্যাদি বিষয়। ইতিহাস, ইংরেজি, দর্শন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও শিক্ষা বিভাগও ছিল। বিজ্ঞান অনুষদে ছিল গণিত, পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন। আইন অনুষদে ছিল শুধু আইন বিভাগ। সর্বমোট বিভাগ ছিল ১২টি। প্রথমে বিএ, বিএসসি অনার্স এবং এমএ ও এমএসসি সব মিলিয়ে ৮৫০ ছাত্রছাত্রী ভর্তি করা হয়েছিল। আবাসিক হল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা হল, জগন্নাথ হল ও মুসলিম হল।
সে সময় কোনো ছাত্রী হল ছিল না। সব বিভাগে পড়ানোর জন্য শিক্ষক ছিলেন মাত্র ৬০ জন। কলা অনুষদে ২৮, বিজ্ঞানে ১৭, আর আইনে ১৫ জন। প্রথম দিকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পাঠদান করতেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, সত্যেন বসু, হরিদাস ভট্টাচার্য, জিএইচ ল্যাংলি, রাধা গোবিন্দ বসাক, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, বিএম সেনগুপ্ত, গণেশচরণ বসু, রাজেন্দ্র চন্দ্র হাজরা, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ খ্যাতিমান পণ্ডিত।
বর্তমানে অনুষদের সংখ্যা ১৩, বিভাগ ৭৬, ইন্সটিটিউট ১৩, গবেষণা ব্যুরো ও কেন্দ্র ৪৬, আবাসিক হল ২০; তন্মধ্যে ৫টি ছাত্রী হল। ছাত্রীদের জন্য একটি বর্ধিত হল। হোস্টেল সংখ্যা ৪। বর্তমানে শিক্ষক সংখ্যা ১ হাজার ৮৮৫, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৪২ হাজার ৬৪, সান্ধ্যকালীন শিক্ষার্থী ৫ হাজার ৩০৮। প্রশাসনিক কর্মকর্তা ৯৭৩, তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ১ হাজার ৯৫, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ২ হাজার ১৮৪। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ ও ইন্সটিটিউট রয়েছে ৮৮টি।
শিক্ষার্থীদের অধিক বিদ্যা ও জ্ঞানমুখী করার লক্ষ্যে এবং নৈতিক আদর্শে গড়ে তোলার জন্য নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। কারণ শিক্ষা মানুষের চেতনাকে শানিত, অনুভূতিকে গভীর ও আত্মোপলব্ধিকে সমৃদ্ধ করে। প্রকৃত শিক্ষা ব্যক্তিকে অন্ধবিশ্বাস ও পশ্চাৎমুখিনতা থেকে মুক্ত করে, ভ্রান্ত দর্শন বা আদর্শ থেকে তাকে রক্ষা করে বিশুদ্ধ চিন্তায় আলোকিত করে। বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেষ্ঠ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের পণ্য-বিজ্ঞাপন থাকা উচিত নয়। সব ধরনের অনৈতিক, অনাদর্শ ও অসামাজিক কাজকর্ম থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত রাখতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে কোথাও কোনো দৃশ্যমান গেট নেই। শাহবাগ, ঢাকা মেডিকেল, পলাশী মোড়, হাইকোর্ট ও নীলক্ষেতের প্রধান প্রধান প্রবেশদ্বারে গেট থাকা উচিত। তবে নীলক্ষেতে একটি তৈরি হচ্ছে অনেক বলার পর। এটা সাধুবাদযোগ্য। বাইরের দর্শনার্থীরা যেন বাইরে থেকে দেখে অথবা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে বুঝতে পারে সত্যিকার অর্থে এটি দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ, সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশে, বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা এবং প্রধান স্থাপনা ও ফটকগুলোতে, এমনকি চারুকলার মতো নিজ নিজ ফ্যাকাল্টির সামনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতী শিক্ষক, দেশের বরেণ্য কিংবা বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিন্তাবিদদের ছবি ও বাণী থাকলে ভালো হয়। বাংলার প্রখ্যাত পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও কিছু করা গেল না, এটা দুঃখের বিষয়। তার নামে কিছু একটা করা উচিত।
পরিশেষে বলি, এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর আগের গৌরব নেই। বিদ্যাচর্চা, গবেষণা ও পঠন-পাঠনের গতিধারায় বেশ ভাটা পড়েছে। নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা আজ অনেক কমে গেছে। সর্বত্রই যেন অনৈতিকতা ও শৃংখলার অভাব। ছাত্র-শিক্ষকের একটি বড় অংশ জ্ঞানচর্চা ভুলে গিয়ে অর্থ, পদমর্যাদা ও বিত্ত-বৈভবের দিকে বেশি মনোযোগী হয়েছে। এজন্যই আগের তুলনায় মেধার বিকাশ কম হচ্ছে। শিক্ষার মান নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে।
তারপরও বলতে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এদেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় পঠন-পাঠন, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় অনেক অগ্রসরমান।
প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন-বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

সাংঘর্ষিক রাজনীতি পরিহারে সংলাপের বিকল্প নেই by ড. মাহবুব উল্লাহ্

বাংলাদেশে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান কোন পথে আসবে সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এ ব্যাপারে সুধীজনদের বড় অংশের অভিমত হল সংলাপ বা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট নিরসন করা সম্ভব। এ সংকটের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে সেই সম্পর্কে বড় দুটি দলের ভিন্নমুখী বক্তব্য থাকলেও সাধারণ মানুষ এবং আন্তর্জাতিক মহলে প্রতিষ্ঠিত মতটি ৫ জানুয়ারি ২০১৪ যে নির্বাচন হয়েছে, সেটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এটা উপলব্ধি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এটি হল নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য এ নির্বাচন করতে হয়েছে। প্রয়োজনে আরও একটি নির্বাচন হতে পারে।’ এরপর এক বছর কেটে গেছে। নির্বাচনের প্রশ্নে শাসক দল তাদের অবস্থান ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন করে ফেলেছে। তারা এখন বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। নির্বাচনের জন্য বিএনপিকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কী কারণে তারা তাদের অবস্থানে এ পরিবর্তন ঘটালেন, তার কোনো যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা তারা দেননি। তারা তাদের পরিবর্তিত অবস্থানের পক্ষে কিছু শিশুসুলভ যুক্তি দিচ্ছেন, যেগুলো মেনে নেয়া কঠিন।
গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চা হয় প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের মাধ্যমে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রের সব শর্ত পূরণ করে না। সাচ্চা গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন হয় জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা। একটি সরকার নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার পর তার কর্মকাণ্ডের জন্য প্রতিদিন কীভাবে জনগণের মুখোমুখি হবে, সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ কারণেই এখন অনেকে বলতে শুরু করেছেন, নির্বাচনী গণতন্ত্রে থেমে থাকলে চলবে না। গণতন্ত্রকে হতে সব দিক থেকে অর্থপূর্ণ। নির্বাচনী ম্যান্ডেট কোনো সরকারকে স্বেচ্ছাচারী হওয়ার স্বাধীনতা দেয় না। সাচ্চা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। গণতন্ত্র একটি প্রক্রিয়া আর প্রক্রিয়া মানেই হল আদর্শ স্থানে পৌঁছানোর জন্য নিরন্তর প্রয়াস। পশ্চিমা দেশগুলো যে ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে এখন দাঁড়িয়ে আছে, সেই অবস্থায় পৌঁছাতেও তাদের বহু চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করতে হয়েছে। এরপরও পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবীরা অনেকেই তাদের নিজ নিজ দেশের গণতন্ত্র সম্পর্কে সমালোচনায়মুখর। আসলে গণতন্ত্রের আদর্শ রূপ সম্পর্কে শেষ কথা বলার সময় এখনও হয়নি। বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচনের মাধ্যমে আমাদের হোঁচট খাওয়া গণতন্ত্র আবার খাড়া হয়ে দাঁড়াতে পারে। নির্যাতন, নিপীড়ন, জেল, জুলুম ও মামলা-হামলার পথে বিদ্যমান সংকটের কোনো সমাধান হবে না। তাই ৫ জানুয়ারি ২০১৪-এর নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে অবস্থানে ছিলেন, সে অবস্থানে ফিরে যাওয়াই আমাদের সবার জন্য মঙ্গলজনক হবে। জেদাজেদির চর্চা কারোর জন্যই মঙ্গলজনক নয়। কারণ বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিকভাবে প্রধান দুটি অংশে বিভক্ত। এ বিভক্তি এতই প্রকট যে, অনেকে এ বিভক্তিকে পারস্পরিক হননের রাজনীতি বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল এক পক্ষ অন্য পক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারবে না। এর জন্য সহঅবস্থানের পথ বেছে নেয়াই সঙ্গত। গত ৪৩ বছরে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেগুলোকে বড় করে দেখিয়ে সমাধানের পথ পাশ কাটিয়ে যাওয়া কোনোক্রমেই যুক্তিসঙ্গত নয়। ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে দুটি পরাশক্তি ছিল। সমর সম্ভারের দিক থেকে কেউ অন্যের তুলনায় কম ছিল না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়ে ছিল, তারা তাদের মারণাস্ত্র প্রয়োগ করে একে অপরকে মুহূর্তের মধ্যেই নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারত। কিন্তু সে পথে তারা হাঁটেনি। তারা পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাস দূর করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপও নিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ধ্বংস পরিস্থিতি এড়ানো গেছে। দুটি পক্ষ যদি সমান শক্তির অধিকারী হয়, তাহলে মারাত্মক ধরনের সংঘাত এড়ানো সম্ভব। বাংলাদেশে রাজনৈতিক শক্তির দিক থেকে দুটি পক্ষ কেউ কারোর তুলনায় দুর্বল নয়। ক্ষমতাসীনরা মনে করতে পারে তাদের হাতে যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্র রয়েছে সেহেতু তারা তাদের প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে ফেলতে পারবে। এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা অবাস্তব। কারণ শেষ বিচারে জনগণই ইতিহাসের গতি নির্ধারণ করে। জনগণের প্রতি আস্থা থাকলে সব পক্ষেরই উচিত জনগণের কাছে ফিরে যাওয়া। এ ফিরে যাওয়া কেবল একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্ভব। কীভাবে এবং কী প্রক্রিয়ায় একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করা যায় সেটাই হওয়া উচিত আলোচনা বা সংলাপের মূল বিষয়বস্তু। এ পথে না গিয়ে তরবারি শানানোর পথ মানুষ পছন্দ করে না। বক্তৃতা, বিবৃতি দিয়ে কিংবা অশালীন উক্তি করে জয়লাভ করা সম্ভব নয়।
আলোচনা একবার শুরু হলে টেবিলে বসে এক পক্ষ আরেক পক্ষের অবস্থান সম্পর্কে সম্যক অবগত হতে পারবে। প্রয়োজনে এ আলোচনা বেশ ক’দিন ধরে চলতে পারে। আলোচনাকে ফলপ্রসূ করতে হলে এমন একটি বিন্দুতে এসে উপনীত হতে হবে যাতে প্রতীয়মান হয়, কোনো একটি পক্ষ জয়ী কিংবা পরাজিত হয়নি। একেই বলে সমঝোতা। এরকম ফলাফল অর্জন সম্ভব হলে শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে জনগণ। আমরা বিশ্বাস করতে চাই শত বিরোধ সত্ত্বেও উভয় পক্ষ জনগণকেই বিজয়ী দেখতে চায়।
এ ধরনের একটি আলোচনা শুরু করার জন্য সরকার পক্ষকেই উদ্যোগ নিতে হবে। এ কথা মনে করারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, সব পক্ষেই কিছু অপরিণামদর্শী লোকজন থাকে, যারা বলতে চাইবে আলোচনার প্রস্তাব দেয়াই পরাজয় স্বীকার করার শামিল। কিন্তু এ ধরনের অপরিণামদর্শী ব্যক্তিরা বুঝতে চান না, গণতন্ত্র একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
এ প্রক্রিয়া কাউকে চিরদিনের জন্য জয়ী কিংবা পরাজিত করে না। যে কোনোভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকাকেই জয় বলে গণ্য করা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর জনগণ কোনো দলকেই একাদিক্রমে দু’দফা দেশ পরিচালনার সুযোগ দেয়নি। কারণ যারাই ক্ষমতাসীন হয়েছে তারাই বেশ কিছু অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ড করেছে। এজন্য জনগণ তাদের প্রদত্ত ম্যান্ডেটের মাধ্যমে বিচ্যুতি ও ভুল-ভ্রান্তি ধরিয়ে দেয়ার জন্য নির্বাচনী সুযোগটিকে ব্যবহার করেছে। কিন্তু মানুষকে বাধাহীনভাবে সেই সুযোগ ব্যবহার করতে না দিলে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটতে পারে। আপস-সমঝোতায় উপনীত হওয়ার ব্যর্থতা যে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, সেই পরিস্থিতিতে চরমপন্থীরাই সুযোগ পায়। এটা কারোর জন্য বিশেষ করে গণতন্ত্রের জন্য সুখকর নয়। তাই সবাইকে ধীরস্থিরভাবে ভাবতে হবে সংঘাত-সংঘর্ষের পথ এড়িয়ে কীভাবে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়। দেশ পরিচালনায় অংশগ্রহণ না থাকলে অংশগ্রহণবঞ্চিত পক্ষ বিচ্ছিন্নবোধে আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারে। এ বোধ থেকেই চরমপন্থার ভিত্তি রচিত হয়। এখন দায়িত্বশীল মহলকে ভাবতে হবে তারা চরমপন্থার উত্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবেন কিনা। শুধু আবেগ কিংবা প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এ ধরনের অবস্থার সৃষ্টি কোনোক্রমেই কাম্য নয়। গত কয়েক বছর ধরে লক্ষ করা গেছে, কেউ কেউ খুব জোরালো কণ্ঠে বলতে চাচ্ছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে সেটা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির সঙ্গে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্বে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তিকে চূড়ান্তভাবে নির্মূল করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এটাকে এরা শেষ এবং চূড়ান্ত লড়াই হিসেবে গণ্য করছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তিকে এরকম প্রবল ভাবা আসলে আমাদের স্বাধীনতাকেই দুর্বল বলে প্রতিপন্ন করে। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের ৯৯ শতাংশ কিংবা আরও বেশি মানুষের সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল। ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী এর বিরোধিতা করেছিল সত্য। আজ এত বছর পর কেন ওই শক্তিটিকে পরাক্রমশালী ভাবতে হবে। আসলে এ ধরনের ভাবনা আমাদের স্বাধীনতাকে ম্লান করে দেয়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশের বয়স ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের বয়সের প্রায় দ্বিগুণ সময় ইতোমধ্যেই অতিক্রম করেছে। সুতরাং বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অত ঠুনকো মনে করার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশ তার জনগণের অসীম সৃজনশীলতার শক্তিতে অনন্তকাল টিকে থাকবে। জনগণের সৃজনশীলতার এ ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন সমঝোতার রাজনীতি, সংঘাতের রাজনীতি নয়। যারা একথা-ওকথা বলে সংঘাতকে জিইয়ে রাখতে চায় তারা কেউই বাংলাদেশের হিতাকাক্সক্ষী হতে পারে না। যে কারণে এ মুহূর্তে আমরা সংঘাত-সংঘর্ষমূলক রাজনীতি প্রত্যক্ষ করছি, তার মূলের দিকেই দৃষ্টি নিবন্ধ করতে হবে। যদি মূল কারণটি চিহ্নিত করার প্রশ্নে একমত হওয়া যায় তাহলেই আমরা দেখব দেশ থেকে মুহূর্তের মধ্যেই সব সংঘাত-সংঘর্ষের অবসান ঘটেছে। সেই মুহূর্তে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমাদের দায়িত্ব হবে গণতন্ত্রকে অর্থপূর্ণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে সহায়তা করা। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়া এবং দেশের উন্নয়নের জন্য সঠিক কর্মপন্থা নির্ধারণের দাবি তোলা এবং চাপ প্রয়োগ করা। এরকম অঙ্গীকার প্রদানে রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করার জন্য প্রবল গণচাপ সৃষ্টি করতে পারলে বাংলাদেশে একটি জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হবে।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

মোদি খুবই সাধারণ মানুষ

বিনিয়োগ বাড়ানোর ভাইব্রান্ট গুজরাট সম্মেলনে এসে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। জন কেরি বলেন, ‘নরেন্দ্র মোদির মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া খুবই প্রশংসনীয় ঘটনা। মোদি খুবই সাধারণ মানুষ। তিনি গুজরাটকে সম্ভাবনাময় রাজ্যে পরিণত করেছেন।’ জন কেরি বলেন, ‘আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভারত সফরের জন্য অধীর অপেক্ষায় রয়েছেন। আসন্ন প্রজাতন্ত্র দিবসে অংশগ্রহণ করার জন্য তিনি বিশেষ উৎসাহী হয়ে আছেন।’
জন কেরি বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিজ শহরে আসতে পেরে ভীষণ ভালো লাগছে। মোদি একটি ছোট রাজ্য থেকে বেরিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, এতেই বোঝা যাচ্ছে, ভারত পরিবর্তন হচ্ছে। মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ একটা বড় সুযোগ। আমরা ভারতের সঙ্গে মজবুত সম্পর্ক চাই।’ জন কেরি মোদির ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগানের অনুকরণে বলেন, ‘আমরা সবার সঙ্গে, সবার উন্নয়ন চাই।’ নয়াদিল্লির সঙ্গে বাণিজ্য পরিধি প্রসারে ইচ্ছুক ওয়াশিংটন। গত এক বছরে এখানে অর্থনৈতিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

পাকিস্তানে বাস-ট্যাংকার সংঘর্ষ

পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে রোববার ভোরে একটি যাত্রীবাহী বাস একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে সজোরে ধাক্কা দিলে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৬২ জনের প্রাণহানি ঘটে। সংঘর্ষের পর যান দুটোতে আগুন ধরে যায়। সিন্ধু প্রদেশে তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় দুর্ঘটনা এটি। দুটি ঘটনায় বেশ কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে আশংকা করে কর্তৃপক্ষ জানায়, কয়েকটি মৃতদেহ এমনভাবে পুড়ে গেছে যে তাদের চেনাই যাচ্ছে না। লাশগুলো একটার আরেকটি লেপ্টে ছিল।
তাদের শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। করাচির জিন্নাহ হাসপাতালের চিকিৎসক সিমি জামালি এএফপিকে বলেন, ‘আমরা ৬২টির বেশি মৃতদেহ পেয়েছি। কিন্তু আহতদের অধিকাংশেরই শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঝলসে যাওয়ায় মৃতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।’ তিনি জানান, ছয় শিশু মহিলাদের জড়িয়ে ধরে ছিল। তাতে মনে করা হচ্ছে ওই মহিলারা হয়তো বা তাদের মা। ওই নারী চিকিৎসক আরও বলেন, ‘তারা এমনভাবে পুড়ে গেছে যে তাদের চেনাই যাচ্ছে না। তাদের কেবল ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমেই শনাক্ত করা সম্ভব।’ অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই বাসটি দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর নগরী করাচি থেকে শিকারপুর যাওয়ার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বাসটিতে ৬০ জনের বেশি যাত্রী ছিল।

জার্মানির পত্রিকা অফিসে হামলা

প্যারিসের এক পত্রিকা অফিসে জঙ্গি হামলার চার দিন যেতে না যেতেই জার্মানির হামবুর্গ শহরের একটি পত্রিকার অফিসে হামলা চালানো হয়েছে। সন্ত্রাসী হামলার শিকার প্যারিসের রম্য সাপ্তাহিক পত্রিকা শার্লি হেবদোয় ছাপা মহানবী (সা.)-এর কটূক্তিমূলক কার্টুন ফের ‘হামবুর্গের মর্গেন পোস্ট’ প্রকাশ করায় ওই হামলা চলানো হয় বলে জানা গেছে। পুলিশের এক মুখপাত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘ওই পত্রিকা অফিসের জানালা লক্ষ্য করে প্রথমে ইট ও পাথর পরে দাহ্য পদার্থ ছোড়ে দুষ্কৃতকারীরা। এ সময় তারা অফিসটিতে আগুন লাগিয়ে দেয়ারও চেষ্টা চালায়। নিচ তলার দুটি রুমে ভাংচুর চালায় তারা। আগুনে অফিসের দুটি কক্ষ এবং মেঝে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ হতাহত হয়নি। পুলিশ দ্রুতই ঘটনাস্থলে পৌঁছে। এ সময় সেখান থেকে দু’জনকে আটক করা হয়।’ তথ্যসূত্র : আলজাজিরা। শার্লি হেবদো দফতরে ন্যক্কারজনক জঙ্গি নাশকতার পর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সরব হয় হামবুর্গের মর্গান পোস্ট সংবাদপত্রটি। ফ্রান্সের ওই ব্যঙ্গাÍক সপ্তাহিকীতে প্রকাশিত ৩টি কার্টুন ওই সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় পুনর্মুদ্রিত করা হয়েছিল। হেডলাইন ছিল, ‘ঞযরং সঁপয ভৎববফড়স সঁংঃ নব ঢ়ড়ংংরনষব!’ এদিকে রোববারের ওই হামলার ঘটনায় দু’জনক আটক করেছে স্থানীয় পুলিশ। হামবুর্গের এক পুলিশ জানিয়েছেন, প্যারিসের ঘটনার সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কিনা এখনও এটা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এছাড়া আটককৃতদের পরিচয় সম্পর্কেও বিস্তারিত জানায়নি পুলিশ।

উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক অবজ্ঞা

ফ্রান্সে তিন দিনের সন্ত্রাসী হামলায় ১৭ জন নিহত হওয়ার পর সংহতি প্রকাশে প্যারিসে এক ঐতিহাসিক র‌্যালিতে যোগ দিয়েছেন বিশ্বনেতারা। বার্তা সংস্থা এএফপি’র খবরে বলা হয়েছে, প্রায় ৪০টি দেশের নেতারা সমাবেশে যোগ দেন। উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক অবজ্ঞার অংশ হিসেবে এদিনের সমাবেশে উপস্থিতির সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে খবরে বলা হয়েছে। সমাবেশের আগে ফ্রান্সের প্রসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ বলেন, ‘আজ বিশ্বের রাজধানী প্যারিস। সমগ্র দেশ আজ জেগে উঠেছে। সমাবেশ উপলক্ষে রাজধানী প্যারিসে নিরাপত্তা ব্যাপক জোরদার করা হয়। মোতায়েন করা হয় ২ হাজার পুলিশ ও এক হাজার ৩৫০ সেনা সদস্য। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নাদ কাজেনুভা বলেন, ‘সামনের সপ্তাহগুলোতেও ফ্রান্স সতর্ক থাকবে।’ সমাবেশের আগে তিনি ইউরোপের দেশগুলোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে জঙ্গিদের হুমকি নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি বলেন, প্যারিসে রোববারের সমাবেশকে সামনে রেখে ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
উঁচু স্থাগুলোতে স্নাইপার রাখা হয়েছে। রোববারের সমাবেশে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল, ফিলিস্তিন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা উপস্থিত হন। সমাবেশে আগতরা স্থানীয় সময় বেলা ৩টায় মিছিল সহকারে প্যালেস দ্য লা রিপাবলিক ত্যাগ করেন। গত সপ্তাহে হামলায় নিহতদের আত্মীয়স্বজনরা মিছিলের নেতৃত্ব দেন। সমাবেশের আগে ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ। প্যারিসের পূর্বাঞ্চলে ইহুদিদের একটি সুপার মার্কেটে এক সন্ত্রাসীর হামলায় চারজন নিহত হয়। এর একদিন আগে বন্দুকধারী আমেদি কাউলিবালির গুলিতে এক নারী পুলিশ সদস্য নিহত হন। এছাড়া গত বুধবার শার্লি হেবদো পত্রিকার সদর দফতরে কালাশনিকভ রাইফেল ও রকেট লঞ্চার নিয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। এতে পত্রিকাটির অন্যতম প্রধান সম্পাদক স্তেফান শার্বনেয়ার, তিন ব্যঙ্গচিত্রশিল্পী উয়োলিন্স্কি, তিনু ও কাবু এবং পুলিশ সদস্যসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। হামলাকারী সন্দেহভাজন দুই ভাই পরে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠেয় সমাবেশে যোগ দেননি। মার্কিন কর্মকর্তারা এ কথা জানান। ফ্রান্সে ইসলামপন্থীদের হামলায় নিহত ১৭ জনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রোববার এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের প্রায় ৪০ জন নেতা এতে অংশ নেন। সমাবেশে প্রায় ১০ লাখেরও বেশি লোক অংশ নেন।
ইসরাইল তোমাদের নিজের বাড়ি-নেতানিয়াহু : ইসরাইলকে ফ্রান্সের ইহুদিদের নিজেদের বাড়ি বলে অভিহিত করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। সব ইহুদিকে ইসরাইলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ‘ইসরাইল তোমাদের নিজের বাড়ি।’ ফ্রান্সের প্যারিসে একটি শপিং সেন্টারে সন্ত্রাসী হামলায় চার ইহুদি নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় শনিবার তিনি এ আহ্বান জানান। নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরাইল আসতে চায় এমন প্রতিটি ইহুদিকেই আমরা খোলা হৃদয়ে স্বাগত জানাই। তাদের আমাদের খোলা অস্ত্র দিয়ে নিরাপত্তা দেব।’ তিনি বলেন, ‘ফ্রান্সসহ ইউরোপের সব দেশের ইহুদিদের জন্য অভিবাসী সুবিধা বাড়াবে ইসরাইল।’ ফ্রান্সের সব ইহুদি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য প্রেসিডেন্ট ওলান্দকে আহ্বান জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। হাফিংটন পোস্ট। প্যারিসের মুসলিম হিরো : ফ্রান্সের প্যারিসে তিন দিনের মধ্যে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যখন মুসলিমদের দিকে তীর তাক করা হচ্ছে তখন প্যারিসবাসীর কাছে হিরো হয়ে উঠলেন এক মুসলিম যুবক। ওই যুবকের বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহসী আচরণেই শুক্রবার রক্ষা পেয়েছে কয়েক বন্দির জীবন। অন্তত ছয়জনকে নিরাপদ অবস্থানে রেখে পণ্য পরিবহনকারী লিফট দিয়ে মার্কেট থেকে বেরিয়ে আসেন বাথিলি।
বাইরে এসেই দ্রুত পুলিশকে ভেতরের পরিস্থিতি জানান তিনি। মূলত তার কর্মতৎপরতায় ওই বন্দিদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার প্যারিসের পোর্তে দে ভিনসেনেসে ইহুদিদের খাদ্যপণ্য বিক্রয়কারী হাইপার ক্যাচার সুপার মার্কেটে হামলা চালায় এক ইসলামপন্থী বন্দুকধারী। ওই সময় সুপার মার্কেটটির ভেতরে কর্মরত ছিলেন মালি থেকে আসা ২৪ বছর বয়সী লাসানা বাথিলি। বন্দুকধারী মার্কেটের ভেতরে ঢুকে ক্রেতাদের বন্দি করে ফেলে। এ সময় কয়েক বন্দিকে দৌড়ে আসতে দেখে যে কক্ষে কাজ করছিলেন তার দরজা খুলে দেন বাথিলি। সঙ্গে সঙ্গে কক্ষের বাতি ও খাদ্যপণ্য রাখা ফ্রিজের সুইচ অফ করে দেন তিনি। ফ্রিজের ভেতর ঠাণ্ডা কমে এলে সেখানে ক্রেতাদের অবস্থান করতে বলেন বাথিলি। এ ঘটনায় চার বন্দি ও হামলাকারীসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়। জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৫ জনকে। এ ঘটনার পর ফ্রান্সের বিএফএমটিভি’তে সাক্ষাৎকার দেন বাথিলি। ওই সাক্ষাৎকার এবং ফেসবুক ও টুইটারে বার্তা পোস্টের পর পরই প্যারিসবাসীর কাছে হিরোতে পরিণত হন তিনি। এএফপি।

রাত নামলেই আতঙ্ক

রাত নামলেই বিরাজ করছে আতঙ্ক। সাধারণ মানুষের চোখে-মুখে তাড়া করে ফিরছে ভয়। দশটা বাজতে না বাজতেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে রাজধানীসহ আশেপাশের সব ব্যস্ত এলাকা। জীবিকার টানে বাধ্য হয়ে যারা ঘরের বাইরে বের হয়েছিলেন, ঘরে ফেরা নিয়ে তাদের মনে উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ। নিরাপদে বাড়িতে ফেরা নিয়ে সংশয়ে সবাই। কারণ বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধে গত কয়েকদিন ধরেই রাজধানীতে সন্ধ্যা নামলেই যানবাহনে আগুন দিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। বিক্ষিপ্তভাবে বিস্ফোরিত হচ্ছে ককটেল। গত রাতেও রাজধানী ও আশেপাশের এলাকার চিত্র ছিল এমনই। ঘণ্টা খানেকের ব্যবধানে অন্তত ৫টি যানবাহনে আগুন লাগার খবর দিয়েছে খোদ ফায়ার কর্তৃপক্ষ। সন্ধ্যার পর থেকে রাজধানীসহ আশেপাশের এলাকায় অন্তত এক ডজন গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। রাতে ঢাকার বাইরেও একাধিক গাড়িতে আগুন দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ককটেল বিস্ফোরণ যেন নৈমত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। খোদ রাজধানীতেই গতকাল ককটেল বিস্ফোরণে অন্তত ১০-১২ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তাদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে বিরোধী জোটের টানা অবরোধের মধ্যে ২২ জেলায় বিজিবি মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব জেলায় ৫৯ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করতে নির্দেশনার পাশাপাশি আরও ৫ জেলায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিজিবি সদস্য মোতায়েন করতে বলা হয়েছে। অপরদিকে গতকাল রাতে বিএনপির তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিবকে তেজগাঁওয়ে তেজগাঁও চ্যানেল টুয়েন্টিফোর কার্যালয়ের সমানে থেকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ।
গ্রেপ্তারে বিএনপির প্রতিবাদ: এদিকে বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব ও নোয়াখালী জেলা সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, সহ-দপ্তর সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলাল আহমেদকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএনপি। গতকাল দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানান। সারাদেশে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদেরকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, জোর জবরদখলকৃত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য অবৈধ সরকারের জুলুম নির্যাতনের মাত্রা এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তিনি অবিলম্বে নেতাদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নি:শর্ত মুক্তি দাবি করেন।
রাজধানীতে ১১ গাড়িতে আগুন: প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সূত্র জানায়, গতকাল রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে এক ঘণ্টায় রাজধানী ও এর পাশ্ববর্তী এলাকায় অন্তত ৫টি গাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। রাত সাড়ে ৯টায় কাওরানবাজার তিতাস ভবনের সামনে ইটিসি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে (ঢাকা মেট্টো-জ-১৭০৭) আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে বাসটির ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসময় আশপাশের এলাকার লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় একই সময়ে পান্থপথের বসুন্ধরাসিটি শপিং কমপ্লেক্সের সামনে একটি ট্যাক্সিতে (ঢাকা মেট্টো প-১৪-৫৩২৪) অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। তবে কারা আগুন দিয়েছে তা কেউ বলতে পারেননি। ঘটনাস্থল থেকে তেজগাঁও থানা পুলিশ ওই ট্যাক্সির চালককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। প্রায় একই সময়ে শান্তিনগরেও একটি প্রাইভেটকারে আগুন দেয়া হয়। সোমবার সন্ধ্যার একটু পরেই রাজধানীর মিরপুর ১১ নম্বর বাংলা স্কুলের সামনে সেফটি পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এছাড়া পুরনো ঢাকার নবাবপুর রোডে একটি গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। সন্ধ্যার পর তেজগাঁও তিব্বত মোড়ে অপর একটি গাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। সন্ধ্যায় আগুন দেয়া হয় যাত্রাবাড়ীর দয়াগঞ্জে মেঘনা পরিবহনের একটি বাসে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে লালবাগের বাগানবাড়ি এলাকায় একটি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ধানমন্ডিতে একটি প্রাইভেটকারে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এর আগে গতকাল সকাল পৌনে ১০টার দিকে গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের কাছে গাজীপুর পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এছাড়া, বেলা পৌনে ১২টার দিকে নর্দ্দা প্রগতি সরণিতে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেটের সামনে তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কোন কোন স্থানে স্থানীয় ও পথচারীরা নিজেদের উদ্যোগেই আগুন নিভিয়ে ফেলেন। তবে আগুনে কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
ঢাকার বাইরে: রাতে রাজধানী ঢাকার মতো ঢাকার বাইরেও একাধিক যানবাহনে আগুন দেয়অর ঘটনা ঘটেছে। সন্ধ্যার পর ঢাকার অদুরে নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সড়কে দুটি বাসা ও দুটি ট্রাকে আগুন দেয়া দুর্বৃত্তরা। প্রায় একই সময়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের গেন্ডা এলাকায় ঝুটভর্তি দুটি ট্রাকে আগুন দেয়া হয়। রাজশাহীতে একটি গাড়িতে, বরিশালে একটি অটোরিকশায় ও যশোর-বেনাপোল সড়কে একটি যানবাহনে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে অন্যান্য দিনের মতো গতকালও রাজধানীতে বিক্ষিপ্তভাবে ককটেল বিস্ফোরিত হয়েছে। গতকাল  বিকাল সাড়ে ৩টায় শহীদ মিনারের রাস্তার পাশে দুর্বৃত্তরা দুইটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে আসলাম, মিলন, জাবেদ এবং লতিফ নামে চার যুবক আহত হন। রক্তাক্ত অবস্থায় পথচারীরা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। বিকাল সাড়ে ৩টায় লালবাগ থানাধীন আজিমপুরের ভিকারুননেসা নূন স্কুলের সামনের রাস্তায় দুর্বৃত্তরা ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে রিকশাচালক সামিউল ইসলাম আহত হন। পথচারীরা তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। বিকাল পৌনে ৪টায় বংশাল থানাধীন সুরিটোলায় দুর্বৃত্তদের ককটেল বিস্ফোরণে রিকশা দিয়ে যাওয়ার সময় গৃহবধূ নিপা আক্তার আহত হন। পথচারীরা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। বিকাল ৪টায় বংশাল থানাধীন নাজিরা বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটালে রিকশাচালক রেজাউল আহত হন। পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদে ও শীর্ষ নেতাদের মুক্তির দাবিতে রাজধানীর মালিবাগে মিছিল করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। দুপুর ১২টার দিকে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মফিজুর রহমান আশিকের নেতৃত্বে মালিবাগ রেলক্রসিং এলাকায় এ মিছিল করে ছাত্রদল। এ সময় বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আহ্বায়ক লায়ন আসলাম চৌধুরীর মুক্তি দাবি করে সেøাগান দেয়া হয়।
সুনসান নয়াপল্টন: টানা অবরোধে তালাবদ্ধ নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়। ৫ই জানুয়ারি রাজধানীতে ২০দল ঘোষিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে ৩রা জানুয়ারি রাতে দলের দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদকে কার্যালয় থেকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করায় পুলিশ। একই রাতে কার্যালয়ের কর্মচারীদের বের করে দিয়ে মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দেয় পুলিশ। এরপর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়। কাকরাইল মোড় থেকে শুরু করে কার্যালয়ের ফটক পর্যন্ত কয়েক প্লাটুন পুলিশসহ সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা রয়েছে সতর্কাবস্থায়। তালাবদ্ধ কার্যালয়ের সামনে মোতায়েন রয়েছে জলকামান, প্রিজন ভ্যান ও পুলিশের কয়েকটি গাড়ি। বিএনপি কার্যালয় এলাকায় একসঙ্গে তিন-চারজন মানুষের জটলা দেখলেই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সরিয়ে দিচ্ছে পুলিশ। ফলে গ্রেপ্তার আতঙ্কে নয়াপল্টনমুখী হতে পারছেন না নেতাকর্মীরা। দেশব্যাপী অবরোধ অব্যাহত থাকার পাশাপাশি ঢাকার আশেপাশের জেলাগুলোতে ছাত্রদলের হরতাল থাকলেও তার আঁচ পড়েনি নয়াপল্টনে।
২২ জেলায় বিজিবি মোতায়েনের নির্দেশ: বিরোধী জোটের টানা অবরোধের মধ্যে ২২ জেলায় বিজিবি মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব জেলায় ৫৯ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করতে নির্দেশনার পাশাপাশি আরও ৫ জেলায় প্রয়োজন অনুযায়ি বিজিবি সদস্য মোতায়েন করতে বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার উপসচিব হাবীবুর রহমান এ-সংক্রান্ত চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। টানা অবরোধ ও বিভিন্ন জেলায় হরতালের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বিজিবি চেয়ে বিভিন্ন জেলা প্রশাসক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠান। এর প্রেক্ষিতে বিজিবি মোতায়েনের নির্দেশনা দেয়া হয়। এবিষয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রাতে বিবিসিকে বলেন, জেলা প্রশাসকদের চাহিদা অনুযায়ী যেখানে প্রয়োজন হবে, সেখানেই বিজিবি, আনসারসহ প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাঠ প্রশাসনে যেখানেই নিরাপত্তা চাওয়া হবে, সেখানেই নিরাপত্তা দেয়া হবে।
অবরোধে বাড়ছে দুর্ভোগ: টানা অবরোধে বাড়ছে সংঘাত-সহিংসতা, দুর্ভোগ। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের গুলি আর চোরাগোপ্তা হামলার আতঙ্ক দেশজুড়ে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে ২০ দলের নেতাকর্মীরা বাড়িছাড়া হলেও থেমে নেই আন্দোলন। প্রতিদিনই পুড়ছে গাড়ি, ভাঙচুর অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। আর বিরোধী জোটের মিছিলেও পুলিশের গুলি হচ্ছে যখন তখন। মামলার অধিকাংশ আসামি অজ্ঞাত হওয়ায় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি আতঙ্কে রয়েছেন সাধারণ মানুষও। গ্রেপ্তার এড়াতে পারছেন না তারাও। ৭ই জানুয়ারিতে নোয়াখালীর চৌমুহনীতে সহিংসতায় আঘাতপ্রাপ্ত ট্রাক হেলপার আতিকুর রহমান গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে যৌথবাহিনীর অভিযানের সময় তাদের উপস্থিতিতেই বিরোধী পক্ষের বাড়িঘরে লুটপাট চালিয়েছে মুখোশধারীরা। বগুড়ায় দুর্বৃত্তদের ছোঁড়া পেট্রলবোমায় আহত হয়েছেন ৭ পুলিশ কনস্টেবল। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আদালত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে অবিস্ফোরিত ৪টি ককটেল। সাভারে মহিলা দল ও গাজীপুরে ছাত্রদলের মিছিলে গুলি চালিয়েছে পুলিশ। এছাড়া অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ-মিছিলের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, যশোর, ফেনী, ঝিনাইদহ, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, বগুড়াসহ বেশ কয়েকটি জেলায় যানবাহনে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপক ধরপাকড় চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। এতে আটক হয়েছেন শত শত নেতাকর্মী। রোববার রাতে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে কুমিল্লার লাকসাম ও দেবিদ্বার, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, হবিগঞ্জ, ধামরাই, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল ও সিলেটে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের হাজারো নেতাকর্মীকে আসামি করে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। অবরোধের পাশাপাশি খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদে গতকাল রাজধানীর চারপাশে চার জেলাসহ সারা দেশে ১৬ জেলায় হরতাল কর্মসূচি পালন করেছে ২০-দল ও ছাত্রদল। আজ নতুন করে ১০টি জেলায় হরতাল ডেকেছে ২০দল। রাজধানীতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে অব্যাহত রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া ট্রাকের ব্যারিকেড।
সারা দেশে ব্যাপক ধরপাকড়
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ব্যাপক ধরপাকড় করেছে পুলিশ। রাজধানীর গুলশান-১ থেকে গতকাল সকালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নোয়াখালী জেলা সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলাল আহমেদকে আটক করে র?্যাপিড অ্যাকশন ব্যটালিয়ান (র‌্যাব)। বিকালে রাজধানীর শঙ্কর থেকে বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক শামীমুল রহমান শামীম, ধানম-ি মাঠের পাশ থেকে ২০-দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টি (জাফর) প্রেসিডিয়াম সদস্য আহসান হাবিব লিংকন ও রামপুরা থেকে জাসাস ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক খালেদ এনামকে আটক করা হয়। এছাড়া সিলেটে মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব বদরুজ্জামান সেলিম, বগুড়ায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি মেহেদী হাসান হিমু, ঝিনাইদহ জেলা শ্রমিকদলের সভাপতি আবু বক্কার ও পৌর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী কাজল, বেলকুচি পৌর যুবদল সভাপতি আশরাফুল আলম ও সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম পৌর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাইনুদ্দিন, ফেনী জেলা জামায়াত আমির একেএম সামসুদ্দিন, গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জাহাঙ্গীর কবির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবদুল মতিন, সিরাজদি খান থানা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী কামরুজ্জামান লিপু ও যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদ ও জেলা ছাত্রদল নেতা সালাম, চট্টগ্রাম পটিয়া উপজেলার আহ্বায়ক কামাল উদ্দিন, চুয়াডাঙ্গা জেলা ছাত্রদলের সদস্য আহসান হাবিব মামুন, ফরিদপুর জেলা ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক রাকিবুল হাছান রাকিবসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জে আটক ১০৫, চট্টগ্রামে ৪২ জন, যশোরে ৪১ জন, রংপুরে ৩২ জন, বগুড়া ৫১ জন, কক্সবাজারে ২০জন, নেত্রকোনায় ১১ জন, সাতক্ষীরার তালায় ৯ জন, ফেনীতে ১৫ জন, মৌলভীবাজারে ১৬ জন, সিরাজগঞ্জে ১৮ জন, নেত্রকোনা ১১ জন, সাভারে ১০ জনসহ ২০-দলীয় জোটের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রোববার রাতে মিরপুর থেকে গ্রেপ্তারের পর বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান দুদুকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
১০ জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আজ
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা, নেতাকর্মীদের ওপর মামলার-হামলার প্রতিবাদ ও মুক্তির দাবিতে সারা দেশে ১০ জেলায় হরতাল ডেকেছে ২০ দল। জেলাগুলো হচ্ছে সুনামগঞ্জ, মাগুরা, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, চাপাইনবাবগঞ্জ, ফেনী, গাজীপুর, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল ও বগুড়া। গতকাল সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি ও ২০-দলীয় জোটের আহ্বায়ক নাছির উদ্দিন চৌধুরী, নোয়াখালী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ আজাদ, ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ, মাগুরা জেলা বিএনপির সভাপতি কবির মুরাদ, ফেনী জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবু তাহের ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক আবু ইউসুফ, গাজীপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোনায়েম খন্দকারসহ সংশ্লিষ্ট জেলা বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতারা আলাদা ব্রিফিং ও বিবৃবিতে এ হরতালের ঘোষণা দেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদের পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদুকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় চুয়াডাঙ্গা, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা সভাপতি মো. শাহজাহানকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আজ নোয়াখালীতে, সহ-দপ্তর সম্পাদক শামীমুর রহমানকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় বাগেরহাটে, গাজীপুরে ছাত্রদল নেতা নাজমুল খন্দকার সুমনকে কেন্দ্র গ্রেপ্তারের ঘটনায় গাজীপুরে, ফেনী জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা শামসুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় ফেনীতে ২০-দল ও শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং শিবগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম হায়দারীর বাসভবনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হামলা-ভাঙচুরের প্রতিবাদে আজ পুরো জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে যুবদল। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদ ও নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে গতকাল ঢাকা জেলাসহ ১৬ জেলায় হরতাল পালন করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। একই ঘটনায় রাজধানীর চারপাশের ৪ জেলাসহ ৬ জেলায় হরতাল পালন করেছে ২০-দল। হরতালে পিকেটিং করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
স্টাফ রিপোর্টার, মুন্সীগঞ্জ থেকে জানান, মুন্সীগঞ্জে বিএনপি দলীয় ৭ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার রাতে তাদের আটক করে। সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক কামরুজ্জামান লিপু, ইছাপুরা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আবদুল হালিম ও  কেবি ডিগ্রি কলেজের ছাত্রদলের সাবেক ভিপি মাকসুদুর রশীদকে নিজ বাড়ি থেকে। মুন্সীগঞ্জ শহরের দক্ষিণ ইসলামপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে  আটক করা হয় স্বপন বেপারী (২৬), আবুল হোসেন (৩০), আবু কালাম (২৯) ও চরকিশোরগঞ্জ এলাকা থেকে নাজিম উদ্দিনকে (২৮)।
স্টাফ রিপোর্টার, হবিগঞ্জ থেকে জানান, হবিগঞ্জে গাড়ি ভাঙচুর এর ঘটনায় জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল হক সেলিমসহ ৩৪ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে সদর মডেল থানা পুলিশ। রোববার গভীর রাতে হবিগঞ্জ সদর থানার এসআই ইব্রাহিম বাদী হয়ে এই মামলা দায়ের করেন। রোববার দুপুরে হবিগঞ্জ শহরের ২নং পুল বাইপাস সড়কে অবরোধকালে গাড়ি ভাঙচুর সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ বিএনপি’র ৩৪ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৩০/৪০ জনকে আসামি করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করেছে।
ফেনী প্রতিনিধি জানান, ফেনীতে ম্যাজিস্ট্রেটের ওপর ককটেল হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর একেএম সামছুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার দুপুরে আদালত চত্বর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া বিজিবি-র‌্যাব-পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ১৫ জনকে আটক করেছে। শনিবার দুপুরে ম্যাজিস্ট্রেটের বহনকারী গাড়িটির চালক রিয়াদ হাসান বাদী হয়ে জেলা বিএনপি’র সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীরসহ ৩৫ জনের নাম উল্লেখ করে ফেনী মডেল থানায় মামলা দায়ের করে।
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজার মডেল থানা পুলিশ বিশেষ অভিযান চালিয়ে  রোববার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র শিবিরের এক নেতাসহ ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এরা হচ্ছেনÑ ছাত্রশিবিরের সদর উপজেলা (দক্ষিণ) সেক্রেটারি শাহনূর আহমদ, আশরাফুল হক (২৪), সমীরণ ঘোষ (৩৫), রিপণ চন্দ্র শর্মা (৩০), মোশাহিদ মিয়া (৩১), কামরুল ইসলাম (২৭), কামাল হোসেন (২৪), নির্মল মল্লিক (২৮), মুমিত আলী (৩০), রিপন মিয়া (২৪), হারিছ মিয়া (৪৫), রন্টু ধর (৩২), কাদির মিয়া (২৮), রেণু মিয়া (৩২), রায়হান (৩২), রাসেল (২৫), পল্টু মালাকার (২৮)। আটককৃতদের মধ্যে ১০ জন বিএনপি-জামায়াতকর্মী বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি জানান, ফুলবাড়ী-বালারহাট সড়কের বিভিন্ন স্থানে টায়ারে আগুন জালিয়ে পিকেটিং করে মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে অবরোধকারীরা। এ সময় নারু গোপাল নামের স্বাস্থ্য বিভাগের এক সরকারি কর্মচারীর ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে এবং তাকে মারপিট করে। বর্তমানে তিনি ফুলবাড়ী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যদিকে রোশন শিমুলবাড়ীতে অভিযান চালিয়ে জামায়াতকর্মী জয়নাল আবেদীন (৪৫)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধামরাইয়ের সুতিপাড়ায় অবরোধ চলাকালে যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় গতকাল সকালে ধামরাই উপজেলা চেয়ারম্যান বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য তমিজ উদ্দিন,  কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ও ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন ফেরদৌস মুরাদ, সুতিপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা রমিজুর রহমান চৌধুরী রোমাসহ বিএনপি-ছাত্রদলের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক এসআই জাহিদুর রহমান মামলা করেছেন। মামলার আসামি ৩ বিএনপি কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান, রোববার উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক একেএম রেজাউল করিমসহ বিএনপি’র ৮৯ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গাড়ী ভাঙচুরের মামলা করেছে পুলিশ। এসআই রজব আলী বাদী হয়ে সোমবার এ মামলা দায়ের করেন। রোবাবর অবরোধের সময় ঘাটাইল কলেজ মোড়সহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবরোধ সৃষ্টি করে গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় এ মামলা করা হয়। মামলায় উপজেলা বিএনপি’র সাংগাঠনিক সম্পাদক শামীম খান, প্রচার সম্পাদক আবুবকর সিদ্দিকী, পৌর বিএনপি’র সাংগাঠনিক শামীম সরকার, উপজেলা যুবদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম দুলাল, সাধারণ সম্পাদক আরিফ সিদ্দিকী, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক খুররম মাসুদ সিদ্দিকী, কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক আফজাল হোসেনসহ বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ এর অঙ্গ সংগঠনের ৮৯ জন নেতাকর্মীর নাম রয়েছে। বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ৯ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর থেকে জানান, রোবাবর গভীর রাতে যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের মালঞ্চি ধোপাখোলায় বেনাপোল থেকে ছেড়ে আসা ঢাকামুখী পিয়াজবাহী একটি ট্রাকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। পরে যশোর  থেকে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।  ট্রাকচালক ও হেলপারের সন্ধান পায়নি পুলিশ।
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহ জেলা শ্রমিকদলের সভাপতি আবু বক্কার ও পৌর শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ আলী কাজলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। গতকাল ভোরে তাদেরকে নিজ নিজ বাড়ি থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। এদিকে রাববার রাতে শৈলকুপায় একটি যাত্রীবাহী বাসে কে বা কারা পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করেছে।
স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ থেকে জানান, রোববার রাতে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে শহরের একরামপুর এলএসডি গুদামের কাছে পার্কিং করা একটি ট্রাক পুড়ে গেছে। পরে দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ট্রাকের চালক রতন মিয়া জানান, ট্রাকটির মালিক সাবেক পৌর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন মধু। অবরোধের কারণে খালি ট্রাকটি এলএসডি গুদামের কাছে পার্কিং করে রাখা ছিল। এ ঘটনায় ইসমাইল হোসেন মধু বাদী হয়ে গাজী মাসুদ, ফারুক ও কাজল নামে তিন ছাত্রদলকর্মীর নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাত ১০/১৫ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছেন। এদিকে হরতাল চলাকালে গতকাল সকালে শহরের সতাল এলাকায় জেলা পরিষদের সামনের কিশোরগঞ্জ-করিমগঞ্জ সড়কে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাঙচুর করে পিকেটাররা।
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া থেকে জানান, বগুড়ায় পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ ও ককটেল বিস্ফোরণ এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় ৭ পুলিশ কনস্টেবল আহত হয়েছে। পুলিশ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্বেচ্ছাসেবকদলের জেলা সভাপতিসহ বিএনপি এবং জামায়াত-শিবিরের ২০ নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া বিভিন্ন মামলায় আরও ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার রাত ৯টার দিকে শাজাহানপুর থানা পুলিশ মহাসড়কের টহল দেয়ার সময় শহরতলীর বনানী এলাকায় ফুলদীঘি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে রাস্তার পাশে লুকিয়ে থাকা হরতাল অবরোধকারী পিকেটাররা পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারে। এদিকে রাত ১১টায় বিশ্ব ইজতেমায় ডিউটি শেষে বাসযোগে রংপুরে ফেরার পথে  বগুড়া সদরের গোকুলে একটি বাসের চাকা পাঙচার হয়ে যায়। দাঁড়িয়ে থাকা বাস দেখে স্থানীয় পিকেটাররা ঢিল ছুড়ে মারলে গ্লাস ভেঙে ৫/৬ পুলিশ আহত হয়। অন্যদিকে শহরের পিটিআই মোড়ে পুলিশ সুপারের গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এদিকে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের আরও ১৪জন সহ ৫১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গত রোববার জেলা বিএনপি’র সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলামের বাসায় তাকে গ্রেপ্তারের জন্য তল্লাশি চালায়।
ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভালুকায় বড়টিলা নামক স্থানে সোমবার ভোরে বিএনপিকর্মীরা রাস্তায় টায়ার জ¦ালিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে। পরে পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে অভিযান চালিয়ে ছাত্রদলের সেলিম হোসেন বাপ্পী (২৭), ইমতিয়াজ আহমেদ ইলিয়াস (২৫), রাজু (২৫), মামুন (২০), আল-আমীন (১৮) ও নাজমুল (১৯)কে আটক করেছে।
দুদুর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে চুয়াডাঙ্গায় হরতাল
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামসুজ্জামান দুদুকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে আগামীকাল মঙ্গলবার চুয়াডাঙ্গায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা কৃষক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, যুবদল ও ছাত্রদলের যৌথভাবে এ হরতাল আহ্বান করা হয়। সোমবার দুপুর একটা ৩০ মিনিটে জেলা আইনজীবী সমিতির লাইব্রেরি ভবনের তৃতীয় তলায় হরতালের ঘোষণা দেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি অ্যাডভোকেট শামীম রেজা ডালিম। এসময় কৃষকদল, যুবদল ও ছাত্রদলের জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সুনামগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ, মির্জা ফখরুল ও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তারসহ স্থানীয় জেলা বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুলিশের ২টি পৃথক মামলা দায়ের ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিতে ১৩ই জানুয়ারি আজ সুনামগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ঘোষণা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে ২০-দলীয় জোট। সোমবার সকালে বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয় ে বিলপাড়স্থ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ ষোলঘর করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী। লিখিত বক্তব্যে বলা হয় সুনামগঞ্জে ৫ই জানুয়ারি বিনা উস্কানিতে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ পরে পুলিশ মিছিলে হামলা করে। এতে ২০ দলীয় জোটের ২৫-৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়। পর দিন উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হচ্ছে। ৯ই জানুয়ারি আবার আরেকটি মামলা করে এর এর প্রতিবাদেই মঙ্গবারের এ হরতাল। এর পরপরই শহরে হরতালের সমর্থনে মিছিল করে জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির ১ম সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন মিলন, উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন, জামায়াতের সেক্রেটারি মমতাজুল হাসান আবেদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে যুবদল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি: আজ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ঘোষণা দিয়েছে জেলা যুবদল। গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে পাঠানো জেলা যুবদলের সভাপতি ওবায়েদ পাঠান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শিবগঞ্জ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদুল ইসলাম হায়দারীর কানসাটের বাসভবনে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পুলিশের তল্লাশির নামে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। একই সময়ে বিএনপি কর্মী জিএম মিয়া, আ. মঈন, আ. ওদুদ, বেলাল হোসেন, মামুন মিয়া, পারভেজসহ প্রায় ১০-১৫টি বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয় এর প্রতিবাদে হরতালের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে কখন এই হামলা চালানো হয়েছে তা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি। এ ব্যাপারে জেলা যুবদলের সভাপতি ওবায়েদ পাঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি হরতালের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে শিবগঞ্জ থানার ওসি ময়নুল ইসলাম ভাঙ্গচুর ও অগ্নিসংযোগের কথা অস্বীকার করে জানান, শিবগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বেশ কয়েকটি মামলার আসামি শহীদুল ইসলাম হায়দারীর বাড়িতে রোববার রাতে যৌথবাহিনী অভিযান চালায়। সেখানে ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের কোন ঘটনা ঘটেনি।
ফেনীতে নাশকতার মামলা, হরতাল
ফেনী প্রতিনিধি: ফেনীতে অবরোধের পাশাপাশি ২০-দলীয় জোটের ডাকা হরতাল অনেকটা ঢিলেঢালাভাবে পালিত হচ্ছে। খালেদা জিয়ার গ্রামের বাড়ি ফুলগাজী উপজেলা ব্যাপক ককটেল ও পটকার বিস্ফোরণ হয়েছে। এসময় পিকেটাররা ৬-৭টি গাড়ি ভাঙচুর করেছে। সন্ধ্যার পর ছাত্রশিবির নেতাকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় অন্তত ১০টি গাড়ি ভাঙচুর করেছে শিবির কর্মীরা। এছাড়া হরতালে পুলিশ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ৬ জনকে আটক করেছে। ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল হক জানান, অবরোধ-হরতালে নাশকতা এড়াতে পুলিশ-র‌্যাবের পাশাপাশি বিজিবির সদস্যরা টহলে রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানচলাচলে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেয়া হচ্ছে। ফুলগাজী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হারুন-অর-রশিদ জানান, হারতালকরীরা থেমে থেমে পটকার বিস্ফোরণ ও কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুর করেছে। দাগনভূঞা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল ফয়সাল জানান, গত রোববার হরতালে ককটেল বিস্ফোরণসহ ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। উপজেলা যুবদলের সভাপতি হাসানুজ্জামান শাহাদাত ও সাধারণ সম্পাদক কবির আহম্মদ ডিপলুসহ ২১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত অনেককে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। এই মামলায় ৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ। প্রসঙ্গত, বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালদো জিয়াকে অন্যায়ভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা, দেশব্যাপী বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করার প্রতিবাদে রোববার দাগনভূঞা উপজেলা যুবদলর সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করে। তারা ফেনী-নোয়াখালী সড়কের দাগনভূঞার সিলোনিয়া এলাকার সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ও গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে ককটেল বিস্ফোরণ করে ৮-১০টি গাড়ি ভাঙচুর করে।
নোয়াখালীতে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল
স্টাফ রিপোর্টার, নোয়াখালী থেকে: বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নোয়াখালী জেলা সভাপতি মো. শাহজাহানকে আটকের প্রতিবাদে আজ জেলায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে নোয়াখালী জেলা বিএনপি। জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হারুন-উর-রশিদ আজাদ আজ জেলায় সকাল-সন্ধ্যা শান্তিপূর্ণ হরতালের আহ্বান করেছেন। এদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা অনির্দিষ্টকালের অবরোধের সপ্তম দিন নোয়াখালীতে ঝটিকা মিছিল, গাড়ি ভাঙচুরসহ বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে চলছে। এর আগে জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিএনপির ১৯ কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। মাইজদীর বড় মসজিদ এলাকায় একটি ঝটিকা মিছিল বের করে জেলা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এছাড়া সকাল ৮টার দিকে জেলা শহরের প্রধান সড়কের মোহাম্মদিয়া হোটেলের সামনে দুটি সিএনজি চালিত অটোরিক্সা ও একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে অবরোধ সমর্থকরা। এসময় কয়েকটি ককটেল বিস্ফেরণও করে তারা। দুপুর ১টায় আইনজীবীরা বার লাইব্রেরি থেকে মিছিল শুরু করে আদালত পাড়া প্রদক্ষিণ শেষে নোয়াখালী প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। নোয়াখালী আইনজীবী ফোরামের সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুর রহমানের সভাপতিত্বে অ্যাডভোকেট সারোয়ার উদ্দিন দিদারের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন জেলা বারের সভাপতি ও বেগমগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবদুর রহিম, সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাফসীর হোসেন, সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট বিইউএম কামরুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য দেন। ওদিকে জেলা পুলিশ সুপার মো. ইলিয়াছ শরীফ জানান, অবরোধে সকল ধরনের নাশকতা এড়াতে জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ মোতায়েন এবং বিভিন্ন সড়কে পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি টহলে রয়েছে।
বগুড়ায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া থেকে: বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় উপজেলা বিএনপি ৩৬ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করেছে। গাবতলী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদ মিল্টন জানান, গাবতলীর বিএনপি ২২ নেতা-কর্মীর জামিন না মঞ্জুর করে জেলে প্রেরণের প্রতিবাদে আজ সকাল ৬টা থেকে বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৩৬ ঘণ্টা হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ১০ই ডিসেম্বর বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা বগুড়া শহরে আসার সময় গাড়ীর বহরে হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী ৩৩ জনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় ৮ জন জামিনে আছেন। বাকি আসামিদের মধ্যে ২২ জন আজ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করলে বিচারক তাদের জামিন না মঞ্জুর করে।
কালিয়াকৈরে হরতাল, মিছিলে পুলিশের গুলি
কালিয়াকৈর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: অবরোধ চলাকালীন গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হরতালে ছাত্রদলের একটি মিছিল ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এসময় পরিবেশ নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ ৪-৫ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অপরদিকে রোববার রাতে কালিয়াকৈর বাইপাস এলাকায় বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটায় দুর্বৃত্তরা। দলীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য হুমায়ুন কবীর খান ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও কালিয়াকৈর পৌর মেয়র মজিবর রহমান এবং কালিয়াকৈর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক পারভেজ আহমেদের নেতৃত্বে তিনটি মিছিল করে বিএনপি নেতাকর্মীরা।
গাজীপুরে আইনজীবীদের বিক্ষোভ
স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর থেকে: গাজীপুরে বিএনপি ও ছাত্রদলের ডাকা হরতালের সমর্থনে বিক্ষোভ মিছিল ও সভা করেছে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। সকালে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের উদ্যোগে আইনজীবী সমিতি ভবনের প্রাঙ্গন থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের করা হয়। মিছিলটি জেলা প্রশাসক কার্যালয় এলাকা ঘুরে আবারও আইনজীবী সমিতি ভবনের সামনে গিয়ে শেষ করা হয়। সেখানে আয়োজিত বিক্ষোভ সভায় জেলা বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট ড. মো. সহিদুজ্জামানের সভাপতিত্বে জেলা ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সিদ্দিকুর রহমানসহ আইনজীবী নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
মুন্সীগঞ্জ বিএনপির সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত

স্টাফ রিপোর্টার, মুন্সীগঞ্জ থেকে: খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা, জোট নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে মুন্সীগঞ্জে ২০-দলীয় জোটের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়েছে। গতকাল সকাল ১০টার দিকে মুক্তারপুর সেতুর কাছ থেকে জেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ আবদুল হাইয়ের নেতৃত্বে হরতালের সর্মথনে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি কিছু দূর যাওয়ার পরে পুলিশের বাধার মুখে প- হয়ে যায়। পরে মুক্তারপুর এলাকায় পথ সভা করেন। শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত মুক্তারপুর ও শহরের উত্তরাংশের দোকানপাট বন্ধ ছিল। অন্যদিক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়া উপজেলার জামালদি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সকাল ৬টার দিকে কুমিল্লাগামী একটি মাইক্রোবাসে আগুন দিয়েছে হরতাল সমর্থকরা। এতে গাড়িতে থাকা চালক ইব্রাহিম ও খলিল নামের দু’জন আহত হয়। হরতালে জেলা শহরের মুন্সীগঞ্জ-ঢাকা সড়কে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কেও দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। শহরের মধ্যে লোকাল যানবাহন সীমিত আকারে চলাচল করে। মুন্সীগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ অভ্যন্তরীণ রুটে লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক ছিল। সকাল থেকেই জেলা বিনপির কার্যালয়ের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এছাড়াও শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। মুন্সীগঞ্জে বিএনপি দলীয় ৭ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আটক করা হয় উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুজ্জামান লিপু, ইছাপুরা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আবদুল হালিম ও  কেবি ডিগ্রি কলেজের ছাত্রদলের সাবেক ভিপি মাকসুদুর রশীদকে নিজ বাড়ি থেকে।
নরসিংদীতে রেললাইনের ব্রিজে আগুন
নরসিংদী প্রতিনিধি: বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে অবরোধ ও মহাসচিবসহ সারা দেশে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করার প্রতিবাদে ২০-দলের ডাকা আজ সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলছে। গতকাল সোমবার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করে হরতাল সমর্থনকারীরা। এসময় একটি ট্রাক ও একটি প্রাইভেট কার ভাঙচুর করা হয়। এছাড়া নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জে রেল লাইনের ব্রিজে আগুন লাগিয়ে দেয় পিকেটাররা। পরে জেলা ছাত্রদল হরতাল সমর্থনে একটি মিছিল বের করে। শহরের দোকানপাটসহ ভারি যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়নি।