Tuesday, September 15, 2026

ইরান যুদ্ধে অস্ত্র সংকটের বিষয় স্বীকার করে নিজেদের দুর্দশার কথা জানাল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে সংকট তৈরি হয়েছিল বলে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছে পেন্টাগন।

নিজেদের দুর্দশার কথা জানিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের (ইন্সপেক্টর জেনারেল) বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির শত শত ভবন ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোলাবারুদের মজুতও প্রায় শেষ হয়ে গেছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের ওপর তৈরি প্রতিবেদনে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মজুত কমে যায়। এর আগে চালানো হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার রাডারসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামও ধ্বংস হয়েছিল।

ইরান ও তার মিত্রদের হামলার কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন বাহিনীর পরিচালন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হয়। হামলার পর সেন্টকমকে সেনা, সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র সংরক্ষণাগার সরিয়ে নিতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে ইরাক ও কুয়েত থেকে মার্কিন সেনাবাহিনীর চিকিৎসা-উদ্ধার হেলিকপ্টার প্রত্যাহার করা হয়। ফলে অধিকাংশ আহত সেনাকে আকাশপথের বদলে স্থলপথে স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে।

বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর আঞ্চলিক ঘাঁটি ধ্বংস হওয়ায় পর্যাপ্ত নৌঘাঁটি ও সহায়ক বন্দর তৈরি করতেও বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে।

পরিস্থিতির কারণে ভারত মহাসাগরের দুর্গম দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপকে সামুদ্রিক রসদ সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে মার্কিন বাহিনী। এতে নতুন করে রসদ সরবরাহের সময় বেড়ে ১৪ থেকে ১৮ দিন হয়েছে।

রসদ সরবরাহে অনিয়মিত ঘাটতির পাশাপাশি মার্কিন সামরিক বাহিনীর আঞ্চলিক ডাকব্যবস্থায়ও বিঘ্ন ঘটে। এতে পারস্য উপসাগরে মার্কিন সেনা মোতায়েন আরও জটিল হয়ে পড়ে।

ইরানে বিমান হামলা এবং পরবর্তী সময়ে ইরানি বন্দর অবরোধের প্রচেষ্টায় মার্কিন বাহিনীর অভিযান পরিচালনাতেও এসব সংকটের প্রভাব পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতির কিছু পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধের পর অঞ্চলটিতে দীর্ঘমেয়াদে সেনা ও সামরিক স্থাপনা কমিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার মহাপরিদর্শকের কার্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি প্রতিবেদনে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর ক্ষয়ক্ষতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলায় পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোতে প্রায় ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছে। তবে সামরিক ঘাঁটিগুলোর মোট ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেওয়া হয়নি।

মার্চের শুরুতে ইরানি দুটি ড্রোন রিয়াদে মার্কিন দূতাবাস কম্পাউন্ডে আঘাত হানে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার মধ্যে সেখানে থাকা একটি সিআইএ স্থাপনাও ছিল। একই সময়ে দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট লক্ষ্য করে চালানো ড্রোন হামলায় একটি ইউটিলিটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইরানি ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মার্চে কুয়েতে মার্কিন দূতাবাস পুরোপুরি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। জুনের শেষ দিকে মার্কিন নাগরিকদের জন্য জরুরি কার্যক্রম আবার চালু করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাকে মার্কিন স্থাপনাগুলোতে ৬০০টির বেশি হামলার খবর পাওয়া যায়। এতে প্রায় ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়, যা কূটনৈতিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে সবচেয়ে বেশি।

যুদ্ধের সময় ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুনের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মার্কিন কূটনৈতিক কর্মকর্তা অঞ্চলটির বাইরে অবস্থান করছিলেন। একই সময়ে পশ্চিম এশিয়ায় অধিকাংশ মার্কিন কূটনৈতিক মিশন সীমিত কার্যক্রমের মধ্যে ছিল।

যুদ্ধ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে জরুরি দায়িত্বে না থাকা কর্মকর্তা এবং সব পরিবারের সদস্যকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

প্রতিবেদন তৈরির সময়ও অঞ্চলটির অধিকাংশ মার্কিন কূটনৈতিক মিশনে সীমিত কার্যক্রম চলছিল। অর্থাৎ এসব মিশনে স্বাভাবিক সংখ্যায় কর্মী ফেরেননি।

প্রতিবেদনে যুদ্ধের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি ইরানের পাল্টা প্রতিরোধের প্রভাবও উঠে এসেছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে মার্কিন সামরিক তৎপরতা বাড়ে। পরে ইরান প্রণালিটি সব ধরনের নৌযান চলাচলের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক অভিযান, রসদ সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ক্ষেত্রে নতুন চাপ তৈরি হয়।

সূত্র : সিবিএস নিউজ

ইরানের হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: রয়টার্স
ইরানের হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: রয়টার্স

যেভাবে পাল্টে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের মুসলিমদের রাজনৈতিক ভূমিকা

দ্য গার্ডিয়ানঃ নাইন-ইলেভেনে হামলার ২৫ বছর পরও যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষের প্রবণতা শক্তিশালী রয়েছে। তবে একই সময়ে মুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ডের নতুন প্রজন্ম দেশটির সংস্কৃতি, বিনোদন ও রাজনীতিতে ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি।

নিউইয়র্কে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা—এসডব্লিউএএনএ—অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের নতুন প্রজন্ম নিজেদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠা করছে। একসময় যাদের পরিচয় মূলত অভিবাসী পাড়া, হালাল খাবারের দোকান বা স্থানীয় ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে দেখা হতো, তারা এখন টেলিভিশন, বিনোদন, রেস্তোরাঁ এবং রাজনীতির মূলধারায় জায়গা করে নিয়েছে। মামদানি এই প্রজন্মের প্রতীক এবং একই সঙ্গে তাদের দৃশ্যমানতা বাড়ানোর অন্যতম অনুঘটক।

তবে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি ইসলামোফোবিয়াও কমেনি। পিউ রিসার্চের তথ্য হচ্ছে, ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মনে করতেন ইসলাম অন্য ধর্মগুলোর তুলনায় সহিংসতাকে বেশি উৎসাহিত করে। ২০২৬ সালে সেই হার বেড়ে ৫১ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে মুসলিম পরিচয়ের রাজনীতিকদের এখনো সন্ত্রাসবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে।

৯/১১-পরবর্তী ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ মুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ডের নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বৈষম্য ও সন্দেহের অভিজ্ঞতা অনেক তরুণকে নিজেদের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্পর্কে আরো সচেতন করেছে। মার্কিন কৌতুকশিল্পী রামি ইউসুফকে ৯/১১-এর পর এমনভাবে দায়ী করা হয়েছিল যেন হামলার জন্য তারও দায় রয়েছে। এ ধরনের অভিজ্ঞতা অনেকের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত করেছে।

এই প্রজন্মের রাজনীতি শুধু মুসলিম স্বার্থকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে না। তারা স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, শিশুদের যত্ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বৃহত্তর ইস্যুকে সামনে আনছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা এবং গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতাও তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের অংশ হয়ে উঠেছে।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ এমন একটি রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধিত্ব করছেন, যেখানে মুসলিম পরিচয় থাকলেও রাজনীতির লক্ষ্য শুধু মুসলিম জনগোষ্ঠী নয়; বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উন্নতি।

অন্যদিকে, ইসলামোফোবিয়াকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়। মার্কিন রাজনীতিতে নির্বাচনের সময় মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী লরা লুমার, কংগ্রেস সদস্য ন্যান্সি মেস ও র‍্যান্ডি ফাইন এবং সিনেটর টমি টিউবারভিলের মুসলিমবিরোধী বক্তব্যকে এর উদাহরণ।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভয় ও সন্দেহ ছড়ানোর রাজনীতি শুধু মুসলিমদেরই ক্ষতি করে না; এর মাধ্যমে বৃহত্তর নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হতে পারে। মুসলিমদের ওপর নজরদারি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ বা রাজনৈতিক মতপ্রকাশ দমনের মতো ব্যবস্থাগুলো পরবর্তীতে অন্য জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও প্রয়োগ হতে পারে।

তবে দৃষ্টিতে বর্তমান বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—মুসলিম আমেরিকানরা আর নীরব বা প্রান্তিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে থাকছে না। সাম্প্রতিক এক গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নির্বাচিত পদে এখন ২৫৫ জন মুসলিম দায়িত্ব পালন করছেন; তাদের মধ্যে ১১ জন মেয়র, ১৮ জন বিচারক এবং চারজন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য।

৯/১১-এর স্মরণ অনুষ্ঠানে মামদানির অংশগ্রহণ এই পরিবর্তনের প্রতীক। সাবেক নিউইয়র্ক মেয়র রুডি জুলিয়ানির সঙ্গে মামদানির করমর্দনের ঘটনা অতীত ও ভবিষ্যতের প্রতীকী সাক্ষাৎ। জুলিয়ানি মামদানির অনুষ্ঠানে উপস্থিতির বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠানে মামদানি শান্ত ও সৌজন্যমূলক আচরণ করেন।

৯/১১-এর পরের এক প্রজন্ম ইসলামোফোবিয়ার মধ্যে বেড়ে উঠলেও সেই অভিজ্ঞতা তাদের রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করেনি। নতুন প্রজন্মের অনেক মুসলিম ব্যাকগ্রাউন্ডের আমেরিকান বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলছে এবং নিজেদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সবার জন্য উন্নততর সমাজের দাবি তুলছে। ইসলামোফোবিয়ার রাজনীতি এখনো শক্তিশালী হলেও মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দৃশ্যমান। 

 যেভাবে পাল্টে যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের মুসলিমদের রাজনৈতিক ভূমিকা

সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন কেন বৈশ্বিক তেলের বাজারে এত গুরুত্বপূর্ণ

আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরব থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনে বিশাল একটি পাইপলাইন রয়েছে। নাম ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন। গত বৃহস্পতিবার পাইপলাইনটিতে ড্রোন হামলা হয়। পরে সৌদি সরকার পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, হামলার জেরে পাইপলাইনটি বন্ধের ঘটনা জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজারের জন্য আরেকটি ধাক্কা।

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার বা ৭৪৬ মাইল। প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল এ পাইপলাইন দিয়ে পরিবহন করা হয়। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন করা তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়া হয় পাইপলাইনটি দিয়ে। পরে তেল ট্যাংকারে ভরে সমুদ্রপথে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হয়।

পাইপলাইনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

এ পথে জ্বালানি তেল রপ্তানিতে সৌদি আরবের একটি বড় লাভ হয়। সেটা হলো, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলা। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোয় মার্কিন সামরিক-বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। পুরো উপসাগরীয় এলাকায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল পরিবহনে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে হামলার ফলে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনার পর ‘সতর্কতামূলক’ পদক্ষেপ হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ রাখা হয়েছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিরা লোহিত সাগর এলাকায় হামলা জোরদার করেছে। সেখানেও বাব আল-মানদেব প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে হুতিরা। অতিগুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর সৌদি আরবের নির্ভরশীলতা বেড়েছে। যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের বাজারে যখন টালমাটাল অবস্থা, সে পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইনটির কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

ক্ষয়ক্ষতি কতটা, কবে চালু হবে

হামলায় ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কতটা ক্ষতি হয়েছে, এখনো জানা যায়নি। পাইপলাইনটির কার্যক্রম কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সেটা নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন কথা শোনা যাচ্ছে।

ঘটনাটি সম্পর্কে জানেন এমন কয়েকজন রয়টার্সকে জানান, মেরামতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ লাগতে পারে। তবে আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, এর আগেই পাইপলাইনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে।

সৌদি আরবের কর্মকর্তারা জানান, রিয়াদ ও পবিত্র মদিনার কাছে দুটি এলাকায় ড্রোন দিয়ে পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে।

এর আগে গত মার্চে ইয়ানবুতে সৌদি আরামকো-এক্সন মোবিলের তেল শোধনাগারের কাছে হামলা হয়েছিল। এতে লোহিত সাগরের বন্দরটি থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ট্যাংকারে তোলার কার্যক্রম সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।

ওই হামলার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে পড়েনি। কয়েক দিনের মধ্যেই তেল পরিবহন স্বাভাবিক হয়। তবে ওই হামলা দেখিয়ে দিয়েছিল, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের তেল অবকাঠামোগুলো হামলার ঝুঁকির বাইরে নয়।

কত তেল পরিবহন হচ্ছিল

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ‘পেট্রোলাইন’ নামেও পরিচিত। এটি ১৯৮১ সালে নির্মাণ করা হয়। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের ক্ষেত্রগুলো থেকে উত্তোলন হওয়া জ্বালানি তেল পুরো আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নেওয়ার জন্য এটি চালু করা হয়। হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন করা ছিল এটি চালুর উদ্দেশ্য।

পাইপলাইনটি দিয়ে দিনে সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা যায়। যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এ পাইপলাইন ব্যবহার করে জ্বালানি তেল পরিবহনের পরিমাণ অনেকটা কমেছে।

বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে এ পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়েছে। জানুয়ারির পর এটিই জ্বালানি তেল পরিবহনের সর্বনিম্ন মাসভিত্তিক হিসাব। হুতিদের একের পর এক হামলার কারণে লোহিত সাগরের এ পথে জ্বালানি তেল পরিবহন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর প্রথম পাঁচ মাসে সৌদি আরব পশ্চিমমুখী পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পাঠানোর পরিমাণ বাড়িয়েছিল। তখন প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এ পথে পরিবহন করা হতো। এটি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের চার থেকে পাঁচ শতাংশ।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ার পরও বিশ্বের দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব এ পাইপলাইনের কল্যাণে পণ্যটির রপ্তানি অব্যাহত রাখার সুযোগ পেয়েছিল।

বাজারে প্রভাব কতটা

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক বাজারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ে ঘটেছে।

ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের এক-পঞ্চমাংশের বেশি জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছিল। এর পরিমাণ ছিল দিনে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, এখন এ প্রণালি দিয়ে দিনে প্রায় ৬০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন হচ্ছে। অর্থাৎ জ্বালানি তেল পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

কাজেই এ পথের বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব বেছে নিয়েছিল লোহিত সাগরকে। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে লোহিত সাগরের দিকে বেশি পরিমাণে জ্বালানি তেল পাঠাচ্ছিল তারা। যদিও পুরো রপ্তানি প্রক্রিয়া নির্ভর করছে পাইপলাইন, মজুতাগার ও তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ওপর। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এসব অবকাঠামো ও পরিবহনব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়েছে।

সৌদির ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ইয়ানবুতে এরই মধ্যে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে, তা দিয়ে পণ্যটির রপ্তানি পাঁচ থেকে সাত দিন অব্যাহত রাখতে পারবে সৌদি আরব।

এ ছাড়া মিসরের আইন সোখনা ও সিদি কেরিরে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল মজুত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখান থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে আরও কয়েক দিন রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারবে সৌদি আরব। তাই বলা যায়, পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির সরকার কিছুটা সময় হাতে পাচ্ছে।

সরবরাহ ও দাম নিয়ে শঙ্কা


বিশ্বে জ্বালানি তেলের মজুত এরই মধ্যে অনেকটা কমে এসেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার জের ধরে গত মাসে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ৩০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।

আইইএ জানিয়েছে, এ বছর বিশ্বে জ্বালানি তেলের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। এ পরিমাণ বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ।

সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিতে কৌশলগত মজুত থেকে বেশি পরিমাণে জ্বালানি তেল সরবরাহ করেছে বিভিন্ন দেশ। এ কারণে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি পণ্যটির দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়েনি। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ছিল।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের সরবরাহ যত কমে আসবে, মজুতও তত কমবে। এটি শঙ্কার কারণ। কেননা, মজুত কমতে থাকলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করবে।

গত জুনে আইইএ সতর্ক করে বলেছিল, কৌশলগত মজুত থেকে এভাবে জ্বালানি তেল সরবরাহ চালু রাখা হলে তা সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, মজুত অস্বাভাবিক কমে গেলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে।

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে বড়সড় ক্ষয়ক্ষতি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। সেই সঙ্গে ইয়ানবু বন্দর ও সেখানকার তেল পরিবহন পথে হামলার হুমকি দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত থাকলে, সৌদি আরবের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কমে যাওয়া জ্বালানি তেল রপ্তানির ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াটাও কঠিন হতে পারে।

হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গাভেকাল রিসার্চ সতর্ক করে বলেছে, হুতিদের ড্রোন হামলার হুমকির কারণে যদি দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি জ্বালানি তেল প্রক্রিয়াজাতকারী ইয়ানবু কেন্দ্রটি অচল হয়ে পড়ে, তবে তা বিশ্বের জন্য ‘ভয়াবহ বিপর্যয়’ হবে।

সৌদি আরবের পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনে হামলার ক্ষত। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ স্যাটেলাইট থেকে তোলা
সৌদি আরবের পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনে হামলার ক্ষত। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ স্যাটেলাইট থেকে তোলা। ছবি: এএফপি

ওয়াশিংটন–বেইজিং উত্তেজনা: যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশযুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করতে বলল চীন

এএফপিঃ মহাকাশে যুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে চীন। আজ মঙ্গলবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন এ আহ্বান জানান। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র কক্ষপথে প্রথমবারের মতো অস্ত্র মোতায়েনের কথা নিশ্চিত করেছে।

এক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র জিয়াকুন বলেন, ‘মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা ও যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া বন্ধ করা উচিত।’ তিনি মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরুর বিষয়েও সতর্ক করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্ক গতকাল সোমবার মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি প্রকাশ করেন।

মেইঙ্ক বলেন, ‘শুধু আকাশেই নয়, মহাকাশেও আমরা আমাদের আধিপত্য বজায় রাখি, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

তবে প্রশ্নোত্তর পর্বে মেইঙ্ক অস্ত্রগুলোর ধরন বা সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তিনি শুধু বলেন, তাঁর বক্তব্যের শব্দচয়ন ‘খুব ভেবেচিন্তে করা হয়েছে’।

ওয়াশিংটন পোস্টকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, মেইঙ্ক যে প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে এমন সক্ষমতাও থাকতে পারে, যার মাধ্যমে কোনো শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট ধ্বংস করা সম্ভব।

মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনে আন্তর্জাতিকভাবে সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, সেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন করা নিষিদ্ধ।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে স্পেস ফোর্স প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় তিনি মহাকাশকে বিশ্বের নবীনতম যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

গত বছর ট্রাম্প ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পুরো ভূখণ্ড সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রস্তাবিত এ বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে মহাকাশভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন। ছবি: রয়টার্স

সৌদি আরবের তিন শহরে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ১৩ জন আহত

এএফপিঃ সৌদি আরবের তিন শহরে ইরান–সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় ১৩ বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট আজ মঙ্গলবার এ দাবি করেছে।

জোটের মুখপাত্র বলেন, গতকাল সোমবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফ শহরের বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায় হুতিরা।

মুখপাত্র এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে আরও বলেন, হুতিরা কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে এসব হামলা চালিয়েছে। এতে ১৩ বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। হামলায় সাতটি বাড়ি ও দুটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বলেছে, হুতিরা বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে এসব হামলা চালিয়েছে। তবে হামলায় আহত ব্যক্তিদের পরিচয় বা তাঁদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ এবং লোহিত সাগরের উপকূল ও বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করার পর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। তাদের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বে সামরিক জোট অভিযান শুরু করে। তবে ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বড় ধরনের লড়াই অনেকটা কমে আসে।

অতি সম্প্রতি ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রায় সেই যুদ্ধবিরতি নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে। হুতিরা লোহিত সাগর তীরের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখলের পর বাব আল-মানদেব প্রণালির মুখে অবস্থিত মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এতে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও বেড়েছে উদ্বেগ।

হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। জবাবে হুতিরা সৌদি আরবের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে বলে জোটের দাবি।

একই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির নৌপথ নিয়ে বিরোধ বেড়েছে। ফলে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রা শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য নয়, লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্যও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। সংঘর্ষে ইয়েমেনে নতুন করে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে।

হুতিদের সাম্প্রতিক হামলায় সৌদি আরবে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন
হুতিদের সাম্প্রতিক হামলায় সৌদি আরবে ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবন। ছবি: রয়টার্স

কিমের কি গোপন কোনো ছেলে আছে, খুঁজছেন দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দারা

দ্য ইনডিপেনডেন্টঃ উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের গোপন কোনো ছেলে আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখছেন দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দারা। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (এনআইএস) এ তথ্য জানিয়েছে।

২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর পর উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায় আসেন কিম। এনআইএসের সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, কিমের পর সম্ভবত দেশটির দায়িত্ব নেবেন তাঁর মেয়ে। ধারণা করা হয়, ওই মেয়ের বয়স বর্তমানে প্রায় ১৩ বছর। তাঁর নাম কিম জু এ।

বিবৃতিতে এনআইএস বলেছে, কিম জুর কোনো বড় ভাই আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে তারা। তবে কিমের কোনো ছেলেসন্তান থাকলেও, সে হয়তো তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার অবস্থায় নেই। এ ছাড়া কিমের আরেকটি ছোট সন্তান রয়েছে। তবে সে ছেলে নাকি মেয়ে, তা নিশ্চিত নয়।

এর আগে ২০২৩ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার এক আইনপ্রণেতা বলেছিলেন, সংসদীয় কমিটিকে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে এনআইএস জানিয়েছিল, কিম জু এর একজন বড় ভাই আছে। তবে সেবারও পরে গোয়েন্দা সংস্থাটি জানিয়ে দেয়, উত্তর কোরিয়ার নেতার ছেলে আছে—এমন প্রতিবেদন তারা এখনো যাচাই করে দেখছে।

কিমের কোনো ছেলে আছে কি না, তা উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিকতা। ১৯৪৮ সালে উত্তর কোরিয়া প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটির তিনজন নেতাই কিম পরিবারের পুরুষ সদস্য।

সে হিসেবে কিমের উত্তরসূরি তাঁর মেয়ে হতে যাচ্ছেন কি না, তা নিয়ে কিছু বিশেষজ্ঞের সন্দেহ রয়েছে। তাঁদের মতে, উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা একজন নারীর নেতৃত্ব মেনে না–ও নিতে পারেন। এ ছাড়া কিম জু এ যদি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাও পান, তাহলে দেশটির শাসনভার তাঁর পরিবারের হাত থেকে চলে যেতে পারে। কারণ, কিম জু এ যদি বিয়ে করেন এবং তাঁদের সন্তান যদি পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হন, তাহলে কিম পরিবারের বাইরে ক্ষমতা চলে যাবে।

মেয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন
মেয়ের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, এবার কি ‘স্টার ওয়ার্স’ শুরু করবে দেশটি

তথ্যসূত্র:- আরটিঃ রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করেছে, মহাকাশে তাদের অস্ত্র মোতায়েন করা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সেক্রেটারি (বাহিনীর শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তা) ট্রয় মেইঙ্ক গতকাল সোমবার মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে মেইঙ্ক বলেন,‘বরাবরের মতো আজও আমরা নিশ্চিত করে বলছি, নতুন কোনো হুমকি যেখানেই দেখা দিক না কেন, তা মোকাবিলার জন্য আমরা সদা প্রস্তুত থাকি।’

মেইঙ্ক আরও বলেন, ‘এ কারণেই এখন স্পেস ফোর্সের কাছে কক্ষপথে মোতায়েন করা এমন অস্ত্র রয়েছে, যেটি শত্রুপক্ষের হামলা থেকে যৌথ বাহিনীকে রক্ষা করতে সক্ষম। প্রতিরোধের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ।’

প্রশ্নোত্তর পর্বে মেইঙ্ক নিজের ওই বক্তব্য নিয়ে বিস্তারিত আর কিছু বলতে রাজি হননি। তিনি শুধু জোর দিয়ে বলেন, তাঁর বক্তব্যের শব্দচয়ন ‘খুব ভেবেচিন্তে করা হয়েছে’।

ট্রয় মেইঙ্কের বরাতে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে এসব কথা উঠে এসেছে।

মেইঙ্ক বলেন, ‘শুধু আকাশেই নয়, মহাকাশেও আমরা আমাদের আধিপত্য বজায় রাখি, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

ওয়াশিংটন পোস্টকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, মেইঙ্ক যে প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে এমন সক্ষমতাও থাকতে পারে, যার মাধ্যমে কোনো শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইটকেও ‘ধ্বংস করে দেওয়া’ সম্ভব।

মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে সেগুলো গণবিধ্বংসী অস্ত্র হতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে স্পেস ফোর্স প্রতিষ্ঠা করেন। তখন তিনি মহাকাশকে ‘বিশ্বের নবীনতম যুদ্ধক্ষেত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

গত বছর ট্রাম্প ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের পুরো ভূখণ্ড সুরক্ষিত রাখার জন্য তৈরি বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যার মধ্যে মহাকাশভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।

ট্রাম্পের এ পরিকল্পনা ১৯৮৩ সালে স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময় প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের চালু করা স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভের (এসডিআই) কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রকল্পটি ‘স্টার ওয়ার্স’ নামেও পরিচিত ছিল।

রিগ্যানের উচ্চাভিলাষী এ কর্মসূচি পরে সীমিত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা পরিত্যক্ত হয়। এ কর্মসূচির অধীন প্রস্তাবিত মহাকাশভিত্তিক অস্ত্রও আর মোতায়েন করা হয়নি।

গত মার্চে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ পরিকল্পনাকে ‘মহাকাশে সামরিকীকরণ’ বলে আখ্যায়িত করে এর নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ‘গোল্ডেন ডোম’ কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্য ‘গুরুতর হুমকি’।

২০০০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়া—এ চার দেশ স্যাটেলাইট–বিধ্বংসী অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে।

২০২১ সালের নভেম্বরে রুশ সামরিক বাহিনী সফলভাবে সোভিয়েত আমলের একটি অব্যবহৃত গোয়েন্দা স্যাটেলাইট ধ্বংস করে। সে সময় রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, আন্তর্জাতিক আইন কঠোরভাবে মেনে অভিযানটি পরিচালনা করা হয়েছে এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়নি।

স্টারশিপ রকেট
স্টারশিপ রকেট। ফাইল ছবি: রয়টার্স

হুতি–সৌদির সংঘাতে ট্রাম্প কি নতুন বিপদে পড়ছেন

ইরান-সমর্থিত হুতিরা কয়েক দিন ধরে সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে। গত শুক্রবার হুতিরা লোহিত সাগরে পুরো ইয়েমেন উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে। তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখার দখলও নেয়।

ইয়েমেনের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী বাব আল-মানদেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবিও করেছে এবং বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরু করার পর তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ববাজারে সরবরাহকৃত তেলের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর এর বিকল্প বাণিজ্যিক পথ হিসেবে সামনে চলে আসে বাব আল-মানদেব। বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য ইরান যুদ্ধের মধ্যে নিজেদের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে প্রণালিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ছে। ইরানের সমর্থনে হুতিরা সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে কাবু করতে ইরানও হরমুজ প্রণালির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশ্চিম দিকে হুতিদের অব্যাহত হামলার বিষয়টি ওয়াশিংটন হয়তো আর উপেক্ষা করতে পারবে না। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের দ্বিতীয় অস্থিতিশীল ফ্রন্টটি বন্ধ করতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আরও বিস্তৃত একটি জোটের প্রয়োজন হতে পারে।

হুতিরা সৌদি আরবে হামলা করছে কেন

হুতি বিদ্রোহীরা সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন চালিয়ে আসছে। ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বেশির ভাগ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে। লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা চালিয়ে তারা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানির বাজার বারবার উল্টেপাল্টে দিয়েছে।

ইয়েমেনে হুতিদের বড় ধরনের উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। সে বছর তারা রাজধানী সানা দখল করে। এর জেরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয়, যার জেরে ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়। ইয়েমেনে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গাজায় হামাসের সমর্থনে বাব আল-মানদেবে চলাচল করা জাহাজে হামলা চালিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গোষ্ঠীটি আবার আলোচনায় আসে।

জাহাজ–বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, অত্যাধুনিক ড্রোন ও বিস্ফোরকবোঝাই স্পিডবোটের সাহায্যে বড় আকারের নৌযানের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করার সক্ষমতা হুতিদের রয়েছে। তা ছাড়া সাগরের বুকে মাইন পেতে রেখে বাব আল-মানদেব প্রণালির স্বাভাবিক নৌ চলাচলকেও তারা প্রবলভাবে বিঘ্নিত করতে পারে।

২০২৫ সালে লোহিত সাগর যুক্তরাষ্ট্র ও হুতিদের মধ্যে একটা উত্তেজনাকর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষশক্তি’র অংশ হিসেবে সেবার হুতিরা আন্তর্জাতিক জাহাজে তাদের হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছিল।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় হুতিদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘অপারেশন রাফ রাইডার’ নামে বড় সামরিক অভিযান শুরু করেন। এতে খরচ হয় প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার।

এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত, ড্রোন ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয় ও আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহারের পরও এ অভিযান কৌশলগত লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। হুতিদের সামরিক সক্ষমতার ওপর এ অভিযানের তেমন কোনো প্রভাবই পড়েনি। অভিযানে ইয়েমেনে আট শতাধিক স্থানে হামলা চালানো হয়েছিল।

ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ও ইরানের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে হুতিরা যে সে সময়ে শুধু টিকে ছিল, তা নয়; বরং বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের ওপর হামলা আরও বাড়িয়ে দেয়। হুতিদের এ আক্রমণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক আধিপত্যের ওপর বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। হুতিরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে। এমনকি মার্কিন যুদ্ধজাহাজও বারবার হুতিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ওই অভিযান শুরুর দুই মাসের মাথায় ওই বছরের ৬ মে ট্রাম্প অপ্রত্যাশিতভাবে ইসরায়েলকে এড়িয়ে হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন। ওই এলাকা শান্ত হয়ে আসে।

কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে তেহরানের পক্ষে আবারও হুতিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে সৌদি আরবের তেলবাহী জাহাজে হুতিদের হামলা বেড়েছে। সংকীর্ণ এ প্রণালি সমুদ্রপথে, বিশেষ করে লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে মহাগুরুত্বপূর্ণ। আরব সাগর থেকে এডেন উপসাগর দিয়ে লোহিত সাগরে প্রবেশ করতে হলে সরু এ প্রণালিই একমাত্র পথ।

হুতিরা বলেছে, ইরানের সমর্থনে তারা এসব হামলা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোকে যুদ্ধে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইয়েমেনে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত এডমুন্ড ফিটন-ব্রাউন দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছেন, হুতিরা যে তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করেই কাজ করবে, এতে কোনো সন্দেহ কখনোই ছিল না।

ফিটন-ব্রাউন আরও বলেন, কয়েক মাস ধরে সমুদ্রে হামলা চালানোর পর হুতিরা হয়তো মনে করছে, সৌদি আরব তাদের যেসব হুমকি দিয়ে রেখেছে, বাস্তবে সেগুলো যাচাই করার সময় এসেছে। হয়তো তারা মনে করছে, সৌদি আরব লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তারা মনে করছে, ইরানিদের সামনে সৌদিরা নিজেদের দুর্বল ও ভীত হিসেবে তুলে ধরেছে।

হুতিরা এ সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিক ফিটন–ব্রাউন। তিনি বলেন, ‘হুতিরা মনে করছে, এটাই সেই সময়, যখন তারা নিজেদের দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে এবং সৌদি আরবের কাছ থেকে তাদের (হুতি) আগের দাবিদাওয়ার চেয়ে আরও বেশি সুবিধাজনক শর্ত আদায় এবং প্রতিপক্ষকে সেটা মেনে নিতে বাধ্য করতে পারবে।’

সৌদি আরব বহু বছর ধরে হুতিদের দমন করার চেষ্টা করে আসছে। ২০১৫ সাল থেকে গোষ্ঠীটিকে রাজধানী থেকে হটিয়ে ২০১৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।

তবে এখন পর্যন্ত তারা লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ভয় দেখিয়ে ওই পথে চলাচল বন্ধ করার চেষ্টা থেকে হুতিদের বিরত রাখতে পারেনি।

হামলাগুলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় কী প্রভাব ফেলছে

গত মঙ্গলবার হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো। কিন্তু এতে বহু মানুষ হতাহত হন। বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এটাই ছিল সৌদি আরবে সবচেয়ে বড় হামলা।

চ্যাথাম হাউসের সহযোগী ফেলো লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, এই হামলাগুলো নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান বৃহত্তর সংঘাতেরই অংশ।

দ্য ইনডিপেনডেন্টকে লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, বড় একটি প্রশ্ন হলো, পুরো অঞ্চলে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কতটা প্রতিরোধক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত করা গেছে। কিন্তু নানা চেষ্টা সত্ত্বেও হুতিদের সামরিক শাখাকে ঠেকানো ‘আরও বেশি কঠিন হয়ে উঠছে’।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তিতে হুতিদের বিষয়টির কোনো সমাধান হয়নি। ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই ওয়াশিংটন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থনের বিষয়টি আলোচনায় তুলতে চাপ দিয়ে আসছিল।

লিন্ডসে নিউম্যান বলেন, গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ইরানের আঞ্চলিক মিত্রগোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে একটি সমাধান বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত অবসানের যেকোনো উদ্যোগের অংশ হতে হবে। তা না হলে এসব গোষ্ঠী আবার অস্ত্র ও সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারবে এবং পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীল করে তুলতে সক্ষম হবে।

এরপর কী হতে পারে

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ হুতিদের হামলার নিন্দা করেছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ‘কূটনীতির পথ এখনো বন্ধ হয়নি।’

যদিও হুতিরা দাবি করেছে, সৌদি আরব তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা আল-জওফ, আল-বায়দা, মারিব ও তাইজ প্রদেশে হামলা চালিয়েছে।

এ নিয়ে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদি আরব সব সময় কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে থাকবে। তবে নিজেদের ও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এ রাষ্ট্র কখনোই পিছপা হবে না। নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে আমরা সব ধরনের উপায় ব্যবহার করব।’

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের জয়েন্ট ফোর্সেস কমান্ড হুতিদের ‘শত্রুতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা’ করার অঙ্গীকার করেছে।

সৌদি আরবের বিশ্লেষক আলী শিহাবি হুতিদের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি সিএনএনকে বলেন, ‘সৌদি আরব বুঝতে পেরেছে, হুতিরা যুক্তিসংগত আচরণ করছে না। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম।’

এ বিষয়ে ফিটন-ব্রাউন বলেন, সৌদি আরব পাল্টা লড়াই করতে প্রস্তুত বলেই তাঁর মনে হচ্ছে। হুতিদের আগ্রাসন ঠেকাতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় (মক্কা চুক্তি) তারা একটি নৌ জোট গঠন করেছে।

যদিও এখনো আঙ্কারা ও ইসলামাবাদ রিয়াদের সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। এদিকে ইয়েমেনে কারা শাসন করবে, তা নিয়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

সর্বশেষ এ উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ সালমান ওয়াশিংটনে ফোন করে হুতিদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চেয়েছেন বলে কয়েকটি মার্কিন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পেয়েছে।

ফিটন-ব্রাউন বলেন, এ অঞ্চলের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব চাইছে। তারা চায়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সংঘাত যে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, যুক্তরাষ্ট্র তা স্বীকার করুক এবং সেখানে হস্তক্ষেপ করুক। কারণ, সৌদি আরব সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি লোহিত সাগরকে উপেক্ষা করে, হুতিদের কাছ থেকে সৌদি আরবের ওপর তৈরি হওয়া এই হুমকিকে উপেক্ষা করে, তাহলে সেটি আসলে পুরো বিষয়কে নিজেদের জন্যই আরও কঠিন করে তোলা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘অবশ্যই, ইরানের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমর্থন না পাওয়ায় মার্কিন নাগরিকেরা ক্ষুব্ধ। তবে আমার মনে হয়েছে, সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর করতে একটি জোট গড়ে তোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র খুব সামান্যই চেষ্টা করেছে।’

ট্রাম্প যদি হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে কড়া পদক্ষেপ নেন বা পারস্য উপসাগরে আকাশ, নৌ ও স্থলপথে বড় ধরনের কোনো অভিযান চালান, তবে সেটি শুরুতেই নস্যাৎ করা হুতিদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হুতিরা তাদের নৌ সক্ষমতা ব্যবহার করে ইরান যুদ্ধে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ চলাচলের পথকে রীতিমতো কণ্টকাকীর্ণ ও সময়সাপেক্ষ করে তুলতে পারবে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো চাইলে অবশ্য সৌদি আরবের উপকূল ঘেঁষে লোহিত সাগরের উত্তরাঞ্চল থেকে নিজেদের অভিযান চালাতে পারে। তবে হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ওই এলাকা পর্যন্ত গিয়েও অনায়াস আঘাত হানতে সক্ষম। পাশাপাশি সৌদি উপকূল থেকে হরমুজ প্রণালির দূরত্ব এক হাজার কিলোমিটারের বেশি হওয়া মার্কিন বাহিনীর জন্য আরেক বড় বাধা।

সম্প্রতি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ঘটনা ও এর অন্তর্নিহিত সতর্কবার্তার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য, লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমাবেশ প্রতিহত করা। ইরানের ওপর কোনো বড় হামলার আগে অথবা কড়া পাহারায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মার্কিন চেষ্টাকে আটকে দিতেই মূলত এ কৌশল নিয়েছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র অতীতে বহুবার হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মাঝ আকাশেই ধ্বংস করে দিয়েছে এবং আগামী দিনেও সেই প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এরপরও ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলে হুতিদের এ অব্যাহত হামলা মার্কিন বাহিনীর সমরপ্রস্তুতি ও সেনাসমাবেশের গতি বেশ খানিকটা মন্থর করে দিতে পারবে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটের কাছে হুতিবিরোধী ইয়েমেনি একটি সূত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছে। সেই সূত্রের ভাষ্যমতে, সংঘাতের পেছনের অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে বয়ে যাওয়া তেলের বিশাল পাইপলাইন (ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন)।

ইরাক থেকে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী পাইপলাইনের একটি অংশে হামলা চালানোর পর লোহিত সাগর দিয়ে নিজেদের তেল পরিবহনের এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন শুক্রবার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। পাইপলাইনটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। ইউরোপে জ্বালানি তেলের জোগান স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রেও এ পাইপলাইনের ভূমিকা অনেক।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় হুতিদের কড়া জবাব দিতে এবং নিজেদের রণতরি ঝুঁকিমুক্ত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।

এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে হুতিদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করতে পারে ইসরায়েল। এর মধ্য দিয়ে পুরো যুদ্ধের মানচিত্রে খুলে যেতে পারে নতুন আরেকটি বিপজ্জনক রণাঙ্গন। কারণ, হুতি বিদ্রোহীদের শক্তিশালী করতে সম্প্রতি নিজেদের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার, সামরিক উপদেষ্টা, মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনসংক্রান্ত সরঞ্জাম ইয়েমেনে পাঠিয়েছে ইরান।

(দ্য ইনডিপেনডেন্ট, রয়টার্স, আল–জাজিরা থেকে অনুবাদ করেছেন শামিমা নাসরিন)

পতাকা হাতে দুই হুতি যোদ্ধা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
পতাকা হাতে দুই হুতি যোদ্ধা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: কোলাজ/রয়টার্স ফাইল ছবি

জানা–অজানা রকিব হাসান by অনীশ দাস অপু

১৯৮৫ সালে রকিব হাসান যখন কিশোরদের জন্য ‘তিন গোয়েন্দা’ লিখতে শুরু করেন, তখন আমি কিশোর নই, কলেজে পড়ি। তবে রকিব হাসানের লেখা সব বই তত দিনে পড়ে ফেলেছি এবং তাঁর ভক্ত হয়ে গেছি। বিশেষ করে তাঁর ড্রাকুলার অনুবাদ এবং শিকারকাহিনিগুলো আমার দারুণ লাগত। স্কুলজীবনে বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে তাঁর ড্রাকুলা পড়ে এতটাই ভয় পেয়েছিলাম, রাতে একা একা বাসায় ফিরতে ভীষণ ভয় লাগছিল। অনেকেই পরবর্তী সময়ে ড্রাকুলা অনুবাদ করেছেন; কিন্তু রকিব হাসানের অনুবাদের ধারেকাছে পৌঁছার ক্ষমতা কারও ছিল না। রকিব হাসানের তিমির প্রেম বইটিও আমাকে দারুণ টেনেছে। আর তাঁর অনূদিত টম সয়্যার পড়ে এতটাই মুগ্ধ হই, আমারও মনে ইচ্ছা জাগে ক্ল্যাসিক বই অনুবাদ করব। আমার প্রয়াত মেজ ভাই ছিল সেবা প্রকাশনীর বইয়ের বিরাট ভক্ত। মূলত সে-ই সেবার নতুন নতুন বই ভাড়া করে আনত এবং আমি সেই সুযোগে বইগুলো পড়ে ফেলতাম। স্কুল ও কলেজজীবনে থাকতেই সেবা প্রকাশনীর সব বই আমার পড়া সারা। ‘কুয়াশা’, ‘মাসুদ রানা’, রহস্য উপন্যাস, কিশোর ক্ল্যাসিক, ওয়েস্টার্ন, শিকারকাহিনি, জুলভার্ন এবং অবশ্যই ‘তিন গোয়েন্দা’ ও ‘টারজান’ সিরিজের বই। সেবার লেখকদের মানুষ মনে হতো না, মনে হতো দেবতা! ইচ্ছা জাগত তাঁদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করব। তাঁরা তাঁদের লেখনী দিয়ে এতটাই মুগ্ধ করে রেখেছিলেন আমাকে! অবশ্য তখন সুদূরতম কল্পনাতেও ছিল না একদিন আমি নিজেই সেবার লেখক হয়ে যাব এবং পূজনীয় লেখকদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ ও সৌভাগ্য হবে।

রকিব হাসানের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ১৯৯১ সালের শরতের এক ঝলমলে বিকেলে। সেদিন ছিল শনিবার। আমি দুটো লেখা নিয়ে গিয়েছিলাম শেখ আবদুল হাকিম ও নিয়াজ মোর্শেদের জন্য। একটি গল্প, অপরটি ফিচার। রকিব হাসানের পাশাপাশি এই দুই লেখকের প্রতিও আমার ছিল পরম শ্রদ্ধা। হাকিম ভাইয়ের কামিনী এবং গডফাদার-এর অনুবাদ পড়ে আমি তাঁর গুণমুগ্ধ ভক্ত। আর নিয়াজ ভাইয়ের ক্ল্যাসিক অনুবাদগুলো তো ছিল অনবদ্য। রহস্য পত্রিকার গল্প–উপন্যাস বিভাগের দায়িত্ব ছিল হাকিম ভাইয়ের। নিয়াজ ভাই এবং রকিব ভাই মিলে ফিচার বিভাগ সামলাতেন। আমি রকিব ভাইয়ের জন্য ওই সময় কোনো লেখা নিয়ে যাইনি, বাড়তি কোনো ফিচার অনুবাদ করা ছিল না বলে।

তিন সুপারস্টার লেখকের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন রহস্য পত্রিকার সমন্বয়কারী শেখ মহিউদ্দিন ভাই। রোগা, শ্যামলা হাকিম ভাই আমার লেখা গল্পটির এক পাতা পড়ে মন্তব্য করলেন, ‘দেখে তো মনে হচ্ছে ভালোই। রেখে যান। তিন মাস পরে খোঁজ নিয়েন লেখাটা ছাপা হলো কি না।’ স্বল্পভাষী নিয়াজ ভাই শুধু মাথা ঝাঁকালেন, যার অর্থ হতে পারে—রেখে যাও। পরে দেখব। তবে যাঁর সঙ্গে আমার কথা বলার সবচেয়ে বেশি ইচ্ছা হচ্ছিল, আমার কিশোরবেলার হিরো, সেই রকিব হাসান আমাকে পাত্তাই দিলেন না। আমার আদাবের জবাবে সামান্য মাথা দুলিয়ে লেখা সম্পাদনার কাজে ফিরে গেলেন। আমি তাঁর সামনে চুপচাপ বসে রইলাম। তিনি লেখাটি পড়া শেষ করলেন এবং ‘কিচ্ছু হয় নাই’ বলে ওটা ময়লা ফেলার ঝুড়িতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তাঁর পাশে বসা হাকিম ভাইয়ের সঙ্গে গপ্পো জুড়ে দিলেন।

টকটকে ফরসা গায়ের রঙের রকিব হাসান উচ্চ স্বরে কথা বলতেন। অন্যরা তাঁর কথা শুনছে কি না, সেদিকে খেয়ালও করতেন না। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে প্রথম দর্শনেই তাঁকে আমার অপছন্দ হয়ে গেল। মনে হলো অত্যন্ত অহংকারী একজন মানুষ, যিনি নিজের মতামতকেই একমাত্র প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তখন অবশ্য কল্পনাতেও ছিল না এই মানুষটি একদিন হয়ে উঠবেন আমার বন্ধুর মতো এবং আমরা একসঙ্গে চলব অনেকটা পথ।

আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে রকিব হাসান জনপ্রিয়তার স্বাদ পেতে শুরু করেন। নব্বইয়ের দশকে সেই জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়ে যায়। তাঁর ‘তিন গোয়েন্দা’ প্রতি মাসে সাত হাজার কপি ছাপা হতো। কোনো কোনো বইয়ের এডিশন তিন দিনেও শেষ হয়ে গেছে। কাজী আনোয়ার হোসেনের ‘মাসুদ রানা’র পর তাঁর বই-ই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হতো সেবা প্রকাশনীতে। তবে রকিব ভাইয়ের কাছ থেকে জেনেছি, ‘তিন গোয়েন্দা’র চেয়েও তাঁর সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বই ছিল ড্রাকুলা। ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের ধ্বংসপাহাড়-এর পর ড্রাকুলা ছিল সেবা প্রকাশনীর সর্বাধিক এডিশনের বই। নব্বই দশকের শুরুতে তিনি ত্রৈমাসিক রয়্যালটি পেতেন নব্বই হাজার টাকার বেশি। দুই হাতে লিখতেন। সঙ্গী ছিল টাইপরাইটার। পরে কম্পিউটার। তিনি আমাকে একদিন বলেছিলেন, ‘সারা জীবন টাইপরাইটার আর কম্পিউটারে লিখতে লিখতে হাতে লিখতে ভুলেই গেছি। এমনকি ব্যাংকের চেক বইতে সই করতে গেলেও আঁকাবাঁকা হয়ে যায় সই।’

রকিব ভাই ছোট-বড় মিলিয়ে মাসে ছয়টি বই লিখেছেন এমন রেকর্ডও আছে। আমি তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এত লেখার স্ট্যামিনা কোথায় পান?’ তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘এ জগতে টিকে থাকতে হলে নিয়মিত লিখতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। লেখায় ছাড় দিয়েছেন কি আপনি শেষ। একবার বিরতিতে গেলে আর কোনো দিনই আগের মতো করে ফিরে আসতে পারবেন না।’

রহস্য পত্রিকার অন্যতম সহকারী সম্পাদক ছিলেন রকিব হাসান। তাঁর এবং হাকিম ভাইয়ের কাছ থেকে লেখা সম্পাদনার অনেক কিছুই শিখেছি। রকিব ভাই শুরুতে আমাকে কোনো কাজ দেননি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত খুঁতখুঁতে স্বভাবের মানুষ। লেখা দিয়ে তাঁর মন জয় করা খুবই কঠিন ছিল। তিনি আমাকে লেখা অনুবাদ করতে দেওয়ার আগে হাকিম ভাই ও নিয়াজ ভাইয়ের কাছ থেকে জেনে নিয়েছেন, আমার ওপরে ভরসা করা চলে কি না। সবুজসংকেত পাওয়ার পর আমাকে রিডার্স ডাইজেস্ট পত্রিকা থেকে একটি ফিচার অনুবাদ করতে দিয়েছিলেন। পরে আমার ওই লেখা দিয়েই তিনি সেবারের রহস্য পত্রিকার কভার তৈরি করান। এরপরে আমাকে দিয়ে অসংখ্য লেখা লিখিয়েছেন রকিব ভাই। ধারাবাহিকভাবে দুটো বইও অনুবাদ করিয়েছিলেন। একটি ছিল জিম করবেটের বনের গল্প, অপরটি জেরাল্ড ডুরেলের মানবজন্তু। যে রকিব ভাই একদা আমাকে তেমন পাত্তা দেননি, একসময় সেই আমি হয়ে উঠেছিলাম তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অনুবাদক। রহস্য পত্রিকার সিংহভাগ ফিচার আমাকে দিয়ে অনুবাদ করাতেন তিনি। আমি তখন অর্ক দাসগুপ্ত, আনন্দ সিদ্ধার্থসহ অসংখ্য ছদ্মনাম ব্যবহার করতাম। কোনো কোনো সংখ্যায় ১৩-১৪টি লেখাও ছাপা হয়েছে আমার। একবার রকিব ভাই হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘এবারের রহস্য পত্রিকায় লিখে অনীশ আমাদের বেতনের চেয়েও বেশি বিল নিয়ে গেল!’ সেই সময় রহস্য পত্রিকার সহকারী সম্পাদকদের বেতন ছিল ২৭৫০ টাকা। তাঁরা সপ্তাহে তিন দিন অফিস করতেন। বিকেলে। তুমুল আড্ডা হতো। বেশির ভাগ সময় কথা বলতেন রকিব ভাই। আড্ডা জমিয়ে তুলতে পারতেন অবলীলায়। সবচেয়ে কম কথা বলতেন নিয়াজ মোর্শেদ। আপনমনে নিজের কাজ করে যেতেন। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্যি, আমি তাঁকে কোনো দিন হাসতে দেখিনি। এমন নয় যে তিনি ছিলেন গোমড়ামুখো। তবে খুব গম্ভীর থাকতেন। তরল স্বভাবের ছিলেন হাকিম ভাই। তবে আড্ডার মধ্যমণি হিসেবে সব সময়ই দেখেছি রকিব হাসানকে। ঘর ফাটিয়ে ঠা ঠা করে হাসতেন। একবার কক্সবাজার বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেই বাসযাত্রার বর্ণনা দিতে গিয়ে বললেন, ‘ঢাকা থেকে কক্সবাজার–যাত্রার এই ভ্রমণকাহিনি নিয়েই দুটো “তিন গোয়েন্দা” লিখে ফেলা যায়।’ লিখেওছিলেন।

রকিব ভাই সম্পর্কে অনেকেই হয়তো জানেন না তিনি গোস্টরাইটার হিসেবে প্রচুর বই লিখেছেন। সেবা থেকে তাঁর প্রথম বই ড্রাকুলা বের হলেও তিনি শুরু করেছিলেন ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের কুউউ! দিয়ে। কাজীদাকে আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, রকিব ভাইয়ের লেখা তাঁর কেমন লাগে। তিনি বলেছিলেন, ‘ও তো পুরোটাই আমার হাতে গড়া লেখক। শুরুতে রকিব অনেক ভুলভাল লিখত। দুই ভাইকে লিখত “দোনো ভাই”। আঞ্চলিকতার একটা ছাপ চলে আসত ওর লেখার মধ্যে। আমি ওকে বলতাম, “আপনি তো গল্প বলেন চমত্কার। এ রকম সাবলীলভাবে গল্প বলার ঢঙে লিখলেই হয়।” ও পেরেছে, তাই সেবার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হয়েছে। আসলে ন্যাক থাকা চাই। নইলে শত ধাক্কাধাক্কিতেও লাভ হবে না।’

কাজীদাকে রকিব হাসান গুরু মানতেন। তিনি কাজীদার ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের বেশ কয়েকটি বই লিখে দিয়েছিলেন ছায়ালেখক হিসেবে। কুউউ! ছাড়াও লেনিনগ্রাদ, বুশ পাইলট, অমানুষ ইত্যাদি তাঁর লেখা। (আমি তাঁকে জেমস হেডলি চেজের অনেকগুলো বই দিয়েছিলাম রহস্য উপন্যাস লেখার জন্য। তত দিনে তিনি সেবা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাবাজারে লেখার চেষ্টা করছেন) সেবা থেকে প্রকাশিত আমার অত্যন্ত প্রিয় রহস্য উপন্যাস দাঁড়াও, পথিক কাজীদার নামে বের হলেও ওটার মূল লেখক রকিব হাসান। আমি একদিন বইটির খুব প্রশংসা করছিলাম দেখে তিনি মিটিমিটি হাসছিলেন। তারপর বললেন, ‘ওটা আমার লেখা বই। জেমস হেডলি চেজের কাম ইজি, গো ইজি অবলম্বনে লেখা।’

রকিব হাসান কোনো এক অভিমানে সেবা প্রকাশনী ছেড়ে চলে যান সম্ভবত ২০০৩ বা ২০০৪-এ। তারপর তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগটা ছিল মূলত টেলিফোনে। মাঝেমধ্যে জরুরি প্রয়োজনে আমার সঙ্গে দেখাও করতেন। ২০০৭ সালে আমি সিলেটবাজার নামে একটি পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম। অফিসটা ছিল নয়াপল্টনে। ওখানে আসতেন রকিব ভাই। রকিব ভাইয়ের মতো লেখক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন দেখে আমার কলিগরা থ হয়ে যেত।

রকিব ভাই বাংলাবাজারে লেখার তোড়জোড় করছিলেন। প্রায়ই আমাকে ফোন করতেন বাংলাবাজারের প্রকাশকদের হালহকিকত জানার জন্য। ওখানকার প্রকাশকেরা সেবা প্রকাশনীর মতো নিয়মিত রয়্যালটি দেন না শুনে তিনি বেশ হতাশই হয়েছিলেন। তাঁকে পরামর্শ দিই এককালীন পেমেন্ট নিতে, যেটা আমি একদম শুরু থেকে করে আসছি। তাতে ঠকার চান্স থাকে কম। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, তা–ই করবেন।

সেবা থেকে চলে আসার পর রকিব হাসানের মতো জনপ্রিয় লেখকেরও নতুন পরিবেশে চলার পথটি খুব একটা মসৃণ ছিল না। আমি তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর হতাশা, রাগ, ক্ষোভ সব লক্ষ করেছি। তবে হাল ছাড়ার পাত্র তিনি ছিলেন না। অহংকারী মানুষ ছিলেন। তবে আত্মবিশ্বাসেরও কোনো ঘাটতি ছিল না। তিনি বলতেন, ‘এই খারাপ সময়টা আমি ঠিকই কাটিয়ে উঠব।’ তা তিনি পেরেছিলেন। কয়েক বছরের মধ্যে স্বমহিমায় আবার আবির্ভাব ঘটে রকিব হাসানের। নতুন পাণ্ডুলিপির জন্য বাংলাবাজারের প্রকাশকেরা লাইন দিয়ে যেতে শুরু করেন তাঁর বাসাবোর বাসায়। তাঁর ‘তিন গোয়েন্দা’ নিয়ে টিভিতে সিরিয়ালও হয়েছে। তবে সেই নাটক দেখে খুবই বিরক্ত হয়েছিলেন রকিব ভাই। বলেছিলেন, ‘আমার “তিন গোয়েন্দা”কে ওরা শেষ করে দিয়েছে। আর কোনো দিন কাউকে “তিন গোয়েন্দা” দিয়ে টিভি নাটক বানানোর অনুমতি দেব না।’

রকিব হাসান তাঁর জীবদ্দশায় লেখক হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। অর্থ-যশ-খ্যাতি লাভ করেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন ও হুমায়ূন আহমেদের মতোই। কিন্তু প্রচণ্ড অসুস্থতায় আর যখন লিখতে পারছিলেন না, তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল হাহাকার, ‘আমি আর লিখতে পারছি না, অনীশ। সারাক্ষণ আমার হাত কাঁপে। কি–বোর্ডে আঙুল স্থির থাকে না। অথচ এখনো কত লেখা বাকি রয়ে গেছে। আরও কত কিছু দেওয়ার ছিল আমার পাঠকদের!’

২০২২ বা ২০২৩ সালের দিকে টেলিফোনে রকিব ভাইয়ের সেই আকুতি আমি যেন এখনো শুনতে পাই। আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। তাঁর সঙ্গে আমার আর কথা হয়নি। ওনাকে কয়েকবার ফোন করেছিলাম। উনি ধরেননি। অথবা ধরতে পারেননি। দুটো কিডনিই বিকল হয়ে গিয়েছিল তাঁর। স্মৃতিশক্তিও লোপ পেয়ে যাচ্ছিল। নিজের স্মৃতিশক্তি নিয়ে গর্ব করতেন রকিব ভাই। বলতেন, কোনো কিছুই ভোলেন না তিনি। নানা আইডিয়া সারাক্ষণ গিজগিজ করত মাথায়। ১৯৮৪ সালে রহস্য পত্রিকা নতুন করে চালু করা কিংবা ১৯৮৫ সালে ওয়েস্টার্ন বই বের করার আইডিয়া তাঁরই ছিল। এই মানুষটি এখন আর নেই, তবে ‘তিন গোয়েন্দা’সহ অসাধারণ সব বইয়ের লেখক-অনুবাদক হিসেবে পাঠকমনে চিরজাগরূক হয়ে রইবেন রকিব হাসান!

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-30%2Fihpxln9p%2FCover.jpg?rect=150%2C0%2C1620%2C1080&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

গল্প- ডুমুরের ফুল এবং সাপের পাঁচ পা by নীহারুল ইসলাম

ডুমুরের ফুল আর সাপের পাঁচ পা দেখা নিয়ে অনেক কথা শোনা যায়। তবে ওই দুই জিনিসই কখনো চোখে দেখা যায় না। কেউ কখনো দেখেনি। আমি অন্তত এতদিন সেটাই জানতাম। কিন্তু হঠাৎ করে আন্দু আমাকে বলল, ডুমুরের ফুল দেখবি?

আন্দু আমাদের বন্ধু। তার কথায় আমি চমকে উঠলাম। বললাম, তুই একটা পাগল নাকি! ডুমুরের ফুল হয় নাকি যে তুই আমায় দেখাবি?

আন্দু বলল, হয় রে হয়! দেখার চোখ থাকলে দেখাও যায়। আমি আজকাল রোজ দেখি।

ছোঁড়া বলে কী? ডুমুরের ফুল হয়, সেই ফুল আবার সে দেখতে পায়! ছোঁড়া কি তবে সত্যিই পাগল হয়ে গেল?

আন্দুর কথা আমার বিশ্বাস হয় না। তাকে আমি বলি, চল – কোথায় ডুমুরের ফুল আছে আমি দেখব।

আন্দু বলল, আজ নয়, কাল দেখাব তোকে। ঠিক দশটার সময় রেডি থাকিস।

– ঠিক আছে রেডি থাকব। কথার খেলাপ করবি না কিন্তু।

– কথা খেলাপের কী আছে? আমি রোজ দেখি। তুই আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। না হয় তুইও একদিন দেখলি। তাছাড়া একা দেখে সুখ হয় না, সঙ্গে কেউ থাকলে বেশি সুখ পাওয়া যায়।

আন্দুর এমন কথায় আমার গর্ব হয়। সে যে আমাকে এত পাত্তা দেয়, বন্ধু ভাবে – এর আগে কখনো বুঝতে পারিনি। তাই হয়তো আন্দুর ডুমুরের ফুল দেখার গল্পটা আমি বিশ্বাস করে বসি।

আন্দু আমাদের গ্রামের ছেলে। আমার বয়সী। বলতে গেলে আমরা একসঙ্গে জন্মেছি – একসঙ্গেই বেড়ে উঠছি। তাই ওকে আমি যতটা জানি, আর কেউ জানে না। এমনকি ওর মা সখী বেওয়া পর্যন্ত জানে না। সখী বেওয়া জানবে কী করে, সে তো স্বামী-মরা, চাকরি করে বেড়ায়, শহরে যায় চাকরি করতে। সেই ফজরের নামাজের আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। ফিরে আসে মাগরিবের নামাজের আজানের পর।

আন্দু যখন খুব ছোট ছিল সেও মায়ের সঙ্গে যেত। শহরের ইংলিশ মিডিয়াম ইশকুলে পড়ত। কিন্তু যেই সে বিড়ি-সিগারেট টানতে শিখল, মায়ের সঙ্গ ছেড়ে দিলো। আজকাল সে আর স্কুলে যায় না। আমরা যখন গ্রামের ইশ্কুলে পড়তে যাই, সে তখন ডোমকুল-মাঠে তার রাখালবন্ধুদের সঙ্গে খেলে বেড়ায়। পাখপাখালি শিকার করে। কিংবা বিল-ডোমকুলের নহরে ছিপ ফেলে মাছ ধরে। সেইসব মাছ আবার ওই মাঠেই রাখালবন্ধুদের সঙ্গে পুড়িয়ে খায়। আরো অনেক ব্যাপারস্যাপার আছে তার।

শুধু বিকেলবেলা সে আমাদের সঙ্গী হয়, দরগার মাঠে যখন আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলি কিংবা গুলিডাণ্ডা। আমাদের সঙ্গে আরো অনেকেই খেলে। কিন্তু আন্দুর সঙ্গে আমরা কেউ কোনো খেলাতেই কখনো পেরে উঠি না। সবকিছুতে সে একাই একশ। সত্যি কথা বলতে আমরা প্রত্যেকেই তাকে রীতিমতো সমীহ করে চলি। সমীহ না করে আমাদের কোনো উপায় থাকে না। আমরা জানি, এই বয়সে সে যা যা করে বেড়ায় তার জন্য যে সাহস লাগে তা আমাদের কারোর নেই।

যেমন দরগার মাঠের সেই জঙ্গলে গোদানা আছে। এটা আমরা সকলেই জানি। তাই সন্ধ্যার আগে সেখান থেকে বাড়ি ফিরে আসি। আন্দু কিন্তু ফিরে আসে না। একা একা বসে থাকে। বিড়ি টানে। স্বভাবতই এই বয়সে আমাদের চোখে আন্দু রীতিমতো হিরো সালমান খান। না হলে পরদিন আমি হঠাৎ করে তার সঙ্গী হয়ে ডুমুরের ফুল দেখতে যেতে রাজি হবো কেন?

-----দুই-----

আমার স্কুল ছিল। বাড়ি থেকে স্কুলে যাচ্ছি বলে বেরিয়ে আমি দরগাতলায় এসে বসে আছি। আন্দু আমাকে এখানেই আসতে বলেছে; কিন্তু কোথায় সে? এখনো তার পাত্তা নেই কেন? আমার যে ভয় করছে! ঘুরেফিরে মনে পড়ছে আমি যেখানে বসে আন্দুর অপেক্ষা করছি, জায়গাটার নাম দরগাতলা। এখানে জিনের একরাত্রে তৈরি একটা ইঁদারা আর একটা মসজিদ আছে। যদিও এখন দুটোই পরিত্যক্ত। একটা বিশাল বটগাছ ঝুরি নামিয়ে দুটোকেই ঢেকে রেখেছে। আর এসবের দখল নিয়ে রেখেছে একটা শয়তান গোদানা। ভেতরে প্রবেশের কোনো পথ নেই। কেউ প্রবেশ করতে চাইলেও পারে না, ওই গোদানার ভয়ে। গোদানাটা নাকি পাহারা দেয় জায়গাটা। কেউ প্রবেশ করলে তার আর রক্ষে থাকে না। মুরব্বিরা গল্প করে, বহুদিন আগে ডিহিপাড়ার বাশেদ সেখ নামে একজনকে ঘাড় মটকে মেরে ফেলেছিল ওই গোদানাতেই।

আন্দুর অপেক্ষা করতে করতে গোদানার ভয় আমাকে ঘিরে ধরছে। আমাদের স্কুলটা এখন থেকে খুব বেশি দূরে নয়, শেষ পর্যন্ত স্কুলেই চলে যাব কি না ভাবছি। হঠাৎ দেখি আন্দুকে। কী একটা গান গুনগুন করতে করতে চামাবেড়ার ডিহির ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে।

বুঝতে পারি যেখানে আতঙ্ক, সেখানেই আন্দু। সাধারণত আমরা কেউ চামাবেড়ার ডিহি মাড়াই না। আমরা জানি, যত অপদেবতার আশ্রয় নাকি ওই ডিহিতেই। আমাদের গ্রাম, এমনকি আশপাশের গ্রামে যদি কারো ওপর অপদেবতা ভর করে, দুলহাবুড়ি কিংবা সায়েদ ওঝার তাড়া খেয়ে তারা আশ্রয় নেয় ওই ডিহিতেই। তাই নাকি সেখানে কোনো আবাদ হয় না, ফসল ফলে না। সারাবছর অনাবাদি পড়ে থাকে। বাড়ির গরু-ছাগল-কুকুর-হাঁস-মুরগি মরলে ফেলে আসা হয় সেখানে। অথচ আন্দু বলে, ওরকম ডিহি নাকি দুনিয়ায় আর একটিও নেই।

একদিন আন্দুকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, দুনিয়ায় কেন নেই ওরকম আর একটি ডিহি?

কোনো জবাব দেয়নি সে। বদলে একদিন সে আমাকে নিয়ে গেছিল ওই ডিহিতে। আমি দেখেছিলাম সেই ডিহি। অদ্ভুত জায়গা বটে। মাটি যা আছে তার চেয়ে বেশি আছে খোলামকুচি। সবুজের চিহ্ন নেই। গাছ বলতে যা আছে কাঁটাঝোপ আর দু-চারটে বাবলা গাছ। যেগুলোর ডালে সর্বক্ষণ কাক-শকুন বসে থাকে লোলুপদৃষ্টি মেলে। অথচ বৃষ্টি হলে নাকি ওই ডিহি ফুঁড়ে চাঁদির মোহর উঠে আসে। সেই গল্পও করছিল আন্দু। শুধু গল্পই করেনি, পকেট থেকে একটা চাঁদির মোহর বের করে আমাকে দেখিয়ে বলেছিল, জানিস – কালিপালের ডিহিতে পাওয়া এরকম মোহর আমার কাছে প্রচুর আছে।

শেষ পর্যন্ত আন্দু যখন আমার কাছে এলো, দেখলাম তার দুই হাতে আলতো করে ধরা একটা ফুটফুটে ফড়িং। আমি কিছু বলার আগেই সে বলতে শুরু করল, জানিস বন্ধু – এটা আমার একটা নতুন খেলা। এই খেলার নাম ফড়িংধরা খেলা। এর একটা একটা করে পাখনা ছিঁড়ে এর মৃত্যু দেখতে আজকাল আমার খুব ভালো লাগে। হয়তো জিজ্ঞেস করবি, এমন নিষ্ঠুর খেলার শখ আবার আমার হলো কী করে? তার উত্তরে বলি, খেলাটা নিষ্ঠুর বটে। তবে খুব মজার। আর এ-খেলার শখটা আমার এমনি এমনি হয়নি। তুই জানিস – একসময় আমার প্রিয় শখ ছিল পুকুরে ছিপ ফেলে মাছ ধরা। সেটাও একটা নিষ্ঠুর খেলা। যদিও মানুষ তা স্বীকার করবে না। মাছেভাতে বাঙালি একটা কথা আছে না! সেটা অন্য প্রসঙ্গ। যাই হোক, আমি ছিপ ফেলে ফাতনার দিকে চেয়ে থাকতাম আর অপেক্ষা করতাম, কখন মাছ বড়শির টোপে মুখ দেবে আর আমি আমার হাতে ধরা ছিপে মারব খাঁচ আর উঠে আসবে মাছ! কিন্তু তার আগেই কোথা থেকে ফড়িং উড়ে এসে বসল জলে ভাসা আমার ছিপের ফাতনার ওপর। ফাতনা নড়ে যেত। আমি ভাবতাম মাছ বড়শির টোপে মুখ দিয়েছে। ছিপে খাঁচ মারতাম। অথচ শূন্য বড়শি উঠে আসত আমার হাতে, আমার ভীষণ খারাপ লাগত। খুব রাগ হতো।

সেই রাগ থেকেই আমার ছিপে মাছ ধরার শখ কোথায় হারিয়ে গেছে। এখন আমি ফড়িংয়ের পেছনে পড়ে থাকি। যেখানেই ফড়িং দেখি, খুব ধৈর্য ধরে আগে সেটাকে ধরি। তারপর তার একটা একটা করে পাখনা ছিঁড়ি। সে ছটফট করতে থাকে, কিন্তু আমি তারিয়ে তারিয়ে তার মৃত্যু দেখি। আজ অবশ্য ধৈর্য ধরে শুধু ফড়িংটাকে ধরেছি মাত্র। তারপর ডুমুরের ফুল দেখাব বলে তোকে দাঁড় করিয়ে রেখেছি ব্যাপারটা মনে পড়তেই একে সঙ্গে করে নিয়ে সরাসরি তোর কাছে চলে এলাম। এই বিরান মাঠে একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে যদি তুই ভয় পাস! কে জানে, ওই জঙ্গলের গোদানা যদি জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে তোর ঘাড় মটকে দেয়।

আন্দু বলল, আর একটু দাঁড়া। আগে এটাকে সাপের পাঁচ পা দেখিয়ে নিয়ে আসি। তারপর তোকে ডুমুরের ফুল দেখাব। বলেই আন্দু ফড়িংটাকে সঙ্গে নিয়ে ভয়ংকর জঙ্গলটার ভেতর ঢুকে গেল।

----তিন----

আন্দুকে আমার কেমন লাগে! তার কথা যেন আমি ঠিক ঠিক বুঝতে পারছি না। তার কথায় ডুমুরের ফুল দেখতে এসে আমি কোনো ভুল করিনি তো? আমার পিঠে স্কুলব্যাগ। অথচ আমি স্কুলের বদলে ডুমুরের ফুল দেখব বলে বিরান মাঠের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে আছি। যার একদিকে দরগাতলার সেই ভয়ংকর জঙ্গল। আর একদিকে যতসব অপদেবতার আশ্রয় ওই চামাবেড়ার ডিহি।

নিজের অবস্থান টের পেতেই আমি ডুমুরের ফুল দেখার কথা ভুলে যাই। আর আমার মনে পড়ে সেই গোদানাটাকে, যে ওই জঙ্গলটা পাহারা দেয়। যার বিনা অনুমতিতে ওই জঙ্গলে কেউ প্রবেশ করতে পারে না, করলেই ঘাড় মটকে মেরে ফেলে। যেমন বহুদিন আগে বাশেদ সেখকে মেরে ফেলেছিল। তাহলে যে আন্দু ফড়িংকে সঙ্গে করে ওই জঙ্গলে গিয়েই প্রবেশ করল! যদি তার কিছু হয়ে যায়! যদি ছোঁড়া মরে যায়!

আন্দুর ভাবনা ভাবতে গিয়ে আমার ভীষণ ভয় করতে শুরু করল। দুপাশে দুই বিপদ নিয়ে আমি আর দরগার বিরান মাঠে একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না, প্রাণভয়ে দিগি¦দিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করলাম।

----চার----

যখন আমার জ্ঞান ফিরে এলো, দেখলাম আমি আমার বিছানায় শুয়ে আছি। আমাকে ঘিরে আছে আমার আত্মীয়স্বজন। তাদের সবার চোখেমুখে আতঙ্ক! আমার কী হয়েছে বুঝতে পারি না। সময়টা ভোর হতে পারে, আবার সন্ধ্যাও। তা বলে ফজরের কিংবা মাগরিবের নামাজের আজান শুনতে পাই না, তার বদলে আমার কানে আমাদের প্রতিবেশী কাদুখালার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। খুব করুণ স্বরে কাদুখালা কাঁদছে। কাদুখালা কাঁদছে কেন? আমি জিজ্ঞেস করি, কাদুখালার কী হলো যে এভাবে কাঁদছে?

আমার মা বসেছিলেন আমার মাথার কাছে। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বললেন, অর বিটি ফড়িংকে জি দরগার জঙ্গলে গোদানায় মেরে ফেলেছে বেটা।

এতক্ষণে বুঝতে পারি, আন্দু আমাকে শুধু ডুমুরের ফুল দেখায়নি, সাপের পাঁচ পা-ও দেখিয়েছে। কিন্তু সে-কথা আমি কাউকে বলতে পারি না।

হাজার মানুষের জীবন বাঁচানোই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল… by আসিফ বিন আলম সিয়াম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বিশ্ব দেখেছিল হিটলার বাহিনীর রূদ্রমূর্তি৷ যে যুদ্ধ জন্ম দিয়েছিল শত শত ঘটনার৷ আর সেই সাথে বিশ্ব দেখেছিল কিছু বীরের উত্থান৷ যাদের বীরত্বে রক্ষা পেয়েছে হাজার হাজার মানুষের জীবন৷ সওসা মেন্ডিস তাদেরই একজন। যার বদৌলতে প্রাণে বেঁচেছে ১৫,০০০(মতান্তরে ১২,০০০) এরও বেশি ইহুদী। যা তাঁরই মত আরেক মহাত্মন অস্কার সিন্ডলার থেকেও প্রায় ১০ গুন বেশি। অথচ হলিউড মুভি “সিন্ডলার’স লিস্ট” এর কল্যাণে অস্কার সিন্ডলার আজ জগদ্বিখ্যাত হলেও অনেকের কাছে সওসা মেন্ডিসের নামটাই অজানা৷
পুরো নাম অ্যারিস্টেডিস দে সওসা মেন্ডিস ডু অ্যামেরালে অ্যাবরান্চেস। জন্ম ১৯৮৫ সালের ১৯শে জুলাই ক্যাবানাস ডি ভিরিয়াটু, ভিসেউ, পর্তুগালে। তার বাবা হোসে ডি সওসা ছিলেন কয়িমব্রা কোর্টের বিচারক। তারা ছিলেন তিন ভাই৷ সওসা মেন্ডিস এবং সিজার ছিলেন জমজ (মেন্ডিস কয়েক মিনিটের বড়)। যমজ দুই ভাই ভর্তি হয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি ওফ কোয়িমব্রার আইন বিভাগে। আর ছোট ভাই হয়েছিলেন নাভাল অফিসার। আইন পাস করে তার যমজ ভাই বিদেশী দূত এবং তিনি তার ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে কেনিয়া, সান ফ্রান্সিসকো, অ্যান্টোয়ার্প, জর্জিয়া এবং ব্রাজিলে কূটনৈতিকের দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে অ্যান্টোয়ার্পেই ছিলেন প্রায় ১ দশক। শেষে পর্তুগীজ দূত হিসেবে বোর্দোঁ’র দায়িত্বে নিযুক্ত হন। তার স্ত্রীর নাম ছিল মারিয়া এন্জেলিনা দি সওসা মেন্ডিস, তার ছোটবেলার বন্ধু এবং তার ১৪ সন্তানের জননী।
তার পরিবারে শুরু থেকেই ছিল রাজকীয় রক্তধারা। তার মা ছিলেন দ্বিতীয় ভিস্কাউন্ট অফ মিডোরাসের নাজায়েজ সন্তান৷ এদিকে বাবাও ছিলেন বিচারপতি৷ ফলে সমাজে তার পরিবারের অবস্থান ছিল সম্মানজনকই ছিল। এছাড়া কোয়িমব্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার ফলে মেন্ডিস কিছুটা মুক্ত চিন্তাধারার ছিলেন। ফলে অনেক সময় তাকে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল৷ এমনকি ১৯১৯ সালে ব্রাজিলে থাকার সময় তাকে কিছু সময় নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হয়েছিল।
যুদ্ধ শুরুর সাথে শুরু হল নাৎসী বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ। নাৎসী বাহিনী অগ্রসর হচ্ছিল ফ্রান্সের দিকে। পথমধ্যে বোর্দোঁকে যেন ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ পালিয়ে বেঁচেছিল। ভঙ্গুর সরকার, রাজনৈতিক সমস্যা, শরনার্থী সমস্যা সব একসাথে যেন অন্যরকাম এক অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া বোমারু এবং মৃগীরোগের সমস্যা তো ছিলই। এদিকে পর্তুগালে ঘটল আরেক ঘটনা৷ হিটলারের তুষ্টির জন্য পর্তুগালের তৎকালীন ডিক্টেটর অ্যান্টোনিও দে অলিভাইরা সালজার তার ১৪ নম্বর বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষনা করেন যে, ইহুদী অথবা ঐ ধর্মের অনুগামী ব্যক্তির পর্তুগালে প্রবেশ নিষেধ।
সপরিবারে সওসা মেন্ডিস
সওসা মেন্ডিস চোখের সামনে হাজার হাজার ইহুদীকে মরতে দেখে হয়ত যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন যদি তাদের পর্তুগালে ঢোকানো যায়, তবে তারা হিটলারের হাত থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু একটি দেশের প্রতিনিধি হয়ে সে দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মুখের কথা নয়। বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার দুইদিনের মাথায় তিনি সিদ্ধান্ত নেন তাকে কিছু করতে হবে।
  • **“আমি তাদের সবাইকে মরতে দিতে পারি না। তোমাদের অনেকেই ইহুদী এবং আমাদের সংবিধানে বলা আছে যে ধর্ম বা রাজনৈতিক বিশ্বাস কোন বিদেশী ব্যক্তির পর্তুগালে প্রবেশে বাধা হবে না। আমি এই নীতিতে বিশ্বাস রাখব বলে ঠিক করেছি। তার মানে এই না যে আমি পদত্যাগ করব। আমি খ্রীষ্টান এবং এ ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখি। আর তাই এটিই একমাত্র পথ আমি বিবেকের দ্বারা কাজ করব।”
– এই কথাগুলোই সওসা মেন্ডিস তাঁর দূতাবাসের স্টাফদের বলেছিলেন। তারা সবাই তার এই ঐতিহাসিক বিবৃতি সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়৷
জুন ১৭। সওসা মেন্ডিস নিজের এক প্রোডাকশন লাইন তৈরী করেন যেখানে ৩০,০০০ ভিসা, পাসপোর্ট এবং ভ্রমনের যাবতীয় কাগজপত্র তৈরী করেন। তিনি কাগজগুলো ইস্যু করেন মোট তিন জায়গা থেকে- বোর্দোঁ, হান্ডায়ি ও বয়োন্নি। অথচ এগুলো তখনকার ডিক্টেটর সালাজার কড়া নির্দেশের বিরুদ্ধে। তিনি জানতেন তার সামনে কি হতে যাচ্ছে এমনকি তিনি তার পরিবারের কথাও ভাবেননি।
প্রায় ১২,০০০ (মতান্তরে ১৫,০০০) ইহুদিকে সওসা মেন্ডিস সে সময় সাহায্য করেছিলেন৷ যার মধ্যে ছিলো বেলজিয়ান কেবিনেটের সদস্যরা, হলিউড অভিনেতা মন্টগোমেরী এবং অষ্ট্রিয়ার প্রিন্স অটো ভন হ্যাবসবার্গ। মানুষ ২৪ ঘন্টা তার সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকত সোনার টিকিটের জন্য, যাতে তারা ফ্রান্সে নাৎসি দুঃস্বপ্ন থেকে বাঁচতে পারে।
তবে সওসা মেন্ডিস শুধু কাগজ দিয়েই মানুষদের সাহায্য করেন নি। বর্ডারে গিয়েও সাহায্য করেছিলেন। যেখানে গিয়ে তার দেখা হয় আরেক মহান ব্যক্তি জেনারেল চার্লস ডি গাউল্লির সাথে। যার সহযোগিতায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রেও ইহুদীদের পালাতে সাহায্য করেন। যখন সালাজার জানতে পারে তখন তিনি মেন্ডিসকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ ঘোষনা করেন। এরপরও মেন্ডিস বলেছিলেন,
  • **“আমি বিবেকের দ্বারা কাজ করি, যেটি আমি যে খ্রীষ্টান তার একমাত্র পরিচয়৷”
পদ থেকে অব্যাহতি তো হওয়ারই ছিল। তাকে তার কূটনৈতিক পদবী থেকে বিচ্যুত করা হয়েছিল৷ এমনকি তার পেনশন এবং আইনজীবীর উপাধিও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল৷ কেউ তাঁকে কিংবা তাঁর পরিবারকে সাহায্য করবে না -সরকার এমনটাই নির্দেশ দেয়। মানুষজন রাস্তা দিয়ে গেলে তাকে মূমুর্ষ অবস্থায় দেখতে পেত৷ তার সকল সন্তানরাও তাকে ছেড়ে দূরদেশে পাড়ি জমায় ভালো কিছুর আশায়।
ভাবুন, প্রায় ১৪ বছর যিনি ছিলেন সম্মানীয় রাষ্ট্রদূত, যার নিচে কাজ করত শত শত কর্মচারী! এখন তিনি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেন। তার সাহায্যের জন্যও কেউ ছিল না! তাও আবার নিজ শহরেই!
আর এভাবে ধুঁকে ধুঁকেই ১৯৫৪ সালে তার মৃত্যু হয়। একজন মহান হৃদয়ের মানুষ, যার জন্য রক্ষা পেয়েছে এত মানুষের জীবন, তার এমন করুণ পরিনতি সত্যিই অবিশ্বাস্য।
ইহুদি র‍্যাব্বাই খাইম ক্রুগেরের সাথে সওসা মেন্ডিস, ১৯৪০।
তবে পরবর্তীতে সওসা মেন্ডিস তার প্রাপ্য সম্মানটুকু পেয়েছিলেন৷ ১৯৬৬ সালে ইসরাইল তাকে “Righteous among the nations” উপাধিতে ভূষিত করে যা ছিল ইহূদী বহির্ভূতদের মধ্যে দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান। এই সম্মাননাটি দেওয়া হয়েছিল সে সময়ে যারা নাৎসী বাহিনীর হাত থেকে ইহুদীদের বাঁচিয়েছিল, তাদের। আর সওসা-ই ছিলেন প্রথম কূটনীতিবিদ যাকে এমন সম্মান দেওয়া হয়েছিল।
তবে তাঁর নিজ দেশের সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্য সম্মাননা পেতে লেগেছিল আরও ২০ টি বছর। যাদের জন্য আজীবন বিশ্বস্ততার সহীত কাজ করেছিলেন, তাদের থেকে সম্মাননা তো পাওয়ারই ছিল। ১৯৮৮ সালে পর্তুগীজ পার্লামেন্ট তার বিরুদ্ধে সকল চার্জ উঠিয়ে নেয় এবং কূটনৈতিক সম্মানও ফিরিয়ে দেয়৷  তাকে মরণোত্তর “The Cross of Merit” উপাধীতেও ভূষিত করা হয়।
যদিও তাঁর মৃত্যুর পর অনেক সময় চলে যায়। তবে গড়ে ওঠে সওসা মেন্ডিস ফাউন্ডেশন, যার একটি ব্রাঞ্চ যুক্তরাষ্ট্রেও ছিল। এই ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য ছিল সওসা মেন্ডিসের প্রাক্তন বাড়িকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং মানবাধিকারের স্মরণে মিউজিয়াম হিসেবে গড়ে তোলা।
সওসা মেন্ডিসের মত মানুষ পৃথিবীতে সচরাচর আসেন না, যারা মৃত্যু অনিবার্য জেনেও এগিয়ে যায়। তার বাঁচানো মানুষের সংখ্যা অস্কার সিন্ডলারের থেকেও প্রায় ১০গুন বেশি। এর চেয়েও বড় কথা হল, তিনি এমন মানুষগুলোর জন্য নিজের সারাজীবনের সব অর্জন, সব সম্মান উৎসর্গ করেছিলেন, যাদের তিনি চিনতেনই না!
শেষে প্রশ্ন থেকেই যায়, মেন্ডিস কি পারতেন না নিজে সুন্দরভাবে বেঁচে থেকে এসব বসে বসে দেখতে? হ্যাঁ সেখানেই রয়েছে উত্তরটি। আপনি কি সত্যিই মানুষ, নাকি রক্ত মাংসে গড়া বিবেকহীন খেলনা? উত্তর খুঁজে নিবেন।

ফ্যাটি লিভারের কারণে কি ইনসুলিন অকার্যকর হয়ে যায়? by ডা. শাহজাদা সেলিম

ফ্যাটি লিভার নামটি এখন সুপরিচিত। আশপাশের অনেককে বলতে শোনা যায়, আমার তো লিভারে চর্বি জমেছে বা ফ্যাটি লিভার ধরা পড়েছে। এ রোগের আসল নাম এমএএফএলডি বা মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যাটি লিভার ডিজিজ। ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য এটি বিশেষ স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। কেননা এ দুটি রোগের সৃষ্টি ও প্যাথোফিজিওলজিক্যাল মেকানিজম ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

দুই রোগের সংযোগ

* ফ্যাটি লিভার ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন অকার্যকারিতার সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স শরীরে ইনসুলিন কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ক্ষমতা ব্যাহত করে। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স যকৃতে চর্বি জমার প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। এভাবেই এটি এমএএফএলডিতে অবদান রাখে।

* শরীরের অতিরিক্ত ওজন উভয় রোগের জন্য উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির কারণ।

* উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে থাকা, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরলের মাত্রা ও কোমরের চারপাশে শরীরের অতিরিক্ত চর্বি এসব একসঙ্গে মিলে হয় মেটাবলিক সিনড্রোম। এমএএফএলডি এবং ডায়াবেটিস উভয়ের ঝুঁকি বাড়ায় এটি।

ব্যবস্থাপনা

* একটি স্বাস্থ্যকর ওজন অর্জন ও বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের বর্তমান ওজনের ৫-১০ শতাংশ হ্রাস করতে পারলে এটি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে ও লিভারের চর্বি কমাতে পারে।

* ফল, সবজি, গোটা শস্য ও চর্বিহীন প্রোটিনসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন। উচ্চ ক্যালরি, উচ্চ চর্বিযুক্ত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।

* সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক ব্যায়াম (যেমন দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার) ও সঙ্গে দুই বা তার বেশি দিন পেশি শক্তিশালী করার ক্রিয়াকলাপে যুক্ত থাকুন।

স্বাস্থ্যকর খাবার

* খাবারে কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ সীমিত করা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। ফ্যাটি লিভারও কমায়।

* খাদ্যতালিকায় ফাইবার বা আঁশসমৃদ্ধ খাবার যুক্ত করুন।

* রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি রোধে কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স আছে এমন খাবার বেছে নিন।

জীবনধারায় পরিবর্তন

* সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও কার্ডিওভাসকুলার জটিলতার ঝুঁকি কমাতে ধূমপান ত্যাগ করা অপরিহার্য।

* সাত-আট ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করুন।

চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা

* ফ্যাটি লিভার ও ডায়াবেটিস এ উভয় অবস্থার ব্যবস্থাপনা ও নিরীক্ষণে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সঙ্গে নিয়মিত ফলোআপে থাকা।

* সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ডায়েটিশিয়ান, এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট, হেপাটোলজিস্ট ও ফিজিক্যাল থেরাপিস্টদের সম্পৃক্ততা জরুরি।

* ডা. শাহজাদা সেলিম, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

ফ্যাটি লিভার ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন অকার্যকারিতার সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত
ফ্যাটি লিভার ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন অকার্যকারিতার সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত। ছবি: সংগৃহীত