Thursday, February 20, 2014

আসলে যা হয়েছিল by হাসিব কামাল

আসলে কী হয়েছিল সোনালী ব্যাংকের আদমদীঘি ব্র্যাঞ্চে? গবেষণা করে দেখেছে রস+আলো
আসলে ওরা স্বেচ্ছাসেবক কর্মী হিসেবে ব্যাংকের নিচে অবস্থিত স্যুয়ারেজ লাইনের পাইপ পরিষ্কার করতে গিয়ে ভুলবশত ব্যাংকের ভল্টই পরিষ্কার করে ফেলে। তবে এটা পুরোটাই ভুল বোঝাবুঝি ছিল বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

প্রকাশ্যে ব্যাংকের টাকা লুট করতে গেলে কিছু নির্দিষ্ট মানুষকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে হবে। এটা ভেবেই মূলত তারা নিভৃতে, চুপিসারে চুরিটা করে। কারণ, চোরেরা এটা বিশ্বাস করে যে ঘুষ দেওয়া ও নেওয়া দুটোই আইনের চোখে সমান অপরাধ।
আসলে ওরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে এসেছিল। কিন্তু ব্যাংক তখন বন্ধ থাকায় সুড়ঙ্গপথেই তাদের ঋণ নেওয়ার রাস্তা তৈরি করতে হয়েছিল। এই ঋণের টাকা তারা শিগগিরই পরিশোধ করে দিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অযথাই মাঝখান দিয়ে একটা বাগড়া দিল।
ওরা হলিউডের ছবিগুলোতে চুরির অভিনব কায়দা-কানুন দেখে এতটাই অনুপ্রাণিত হয়েছিল যে নিজেরাই দেশের মাটিতে ঘরোয়া পরিবেশে সুড়ঙ্গপথে হলিউডি কায়দায় একটা শর্ট ফিল্ম বানানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে শর্ট ফিল্মটা রিলিজ হওয়ার আগেই সেন্সর বোর্ড আটকে দিল!

ব্রাজিলে কিশোরীদের অবাধ যৌনাচার, আয় ৫০০ কোটি ডলার!

ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নগরী ফরটালেজা। সমুদ্র উপকূলবেষ্টিত এ নগরীতে আছে সুন্দর ও নান্দনিক পরিবেশ। এ কারণে পৃথিবীর সব পর্যটকের আকর্ষণ এখন ফরটালেজা ঘিরে। তা ছাড়া এমন সুন্দর নগরীতে ‘হুর পরির’ অভাব নেই। তাই লালসা ও কামনায় কাতর মানুষ সারা পৃথিবী থেকে ছুটে আসছেন এই নগরীতে।

টনা রে উঠতি বয়সী সুন্দরী তরুণী। তরুণী বললেও ভুল বলা হবে, বরং কিশোরী বলা চলে তাকে। মাত্র ১৩ বছর বয়স। প্রতিদিন সন্ধ্যায় নগরীর বিভিন্ন পার্কে সেজেগুজে ঘুরে বেড়ায়। পুরুষের মনোরঞ্জনে নিজেকে সঁপে দেয়। এভাবেই ব্রাজিলে চলছে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের অবাধ যৌনাচার।

বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র চার মাস বাকি। সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ করে ফেলেছে ব্রাজিলীয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্বকাপের আগেই ব্রাজিলে শিশুদের নিয়ে যৌন ব্যাবসায়ে মেতে উঠেছে এক শ্রেণীর দালাল। তাদের মূল ব্যাবসায় পরিণত হয়েছে দেহব্যবসা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত চার মাসে ফরটালেজা নগরীতে দেশি-বিদেশি লক্ষাধিক পর্যটক এসেছেন। তারা কিশোরীদের সঙ্গে আনন্দ-ফুর্তিতে সময় কাটাচ্ছেন। অবাধ এ যৌন ব্যবসায়ে এ পর্যন্ত তাদের আয় হয়েছে ৫০০ কোটি ডলার।

নান্দনিক, আকর্ষণীয় বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসবে ১২ জুন। দিনক্ষণ হিসাবে একেবারে চার মাস বা ১২০ দিন বাকি রয়েছে। তার আগেই বিশ্বকাপ আর সুন্দরী তরুণী এক এবং অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। কনফেডারেশন কাপ চলাকালীন হাজার হাজার পর্যটক এসেছেন এখানে। তারা কিশোরী ও তরুণীদের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা করছেন। কিশোরী যৌনকর্মীদের নিয়ে রাত কাটাচ্ছেন।

ফরটালেজা নগরীর স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ছয়টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। সে কারণেই ইতিমধ্যে এ নগরীর প্রধান অকর্ষণ হয়ে উঠেছে সুন্দরী কিশোরী-তরুণীরা। ব্রাজিলের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শীর্ষ পর্যায়ের কেউই কিশোরী ও তরুণীদের অবাধ যৌন ব্যবসাকে কোনো অপরাধ বলে মনে করেন না । মানবাধিকার সংস্থার মহাপরিচালিকা লিনা রেজিয়া ফেবিয়া বলেন, কিশোরী ও তরুণীদের নিয়ে অবাধ যৌনাচার চলছে। তাদের প্রতারিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে, বিশ্বকাপের আগে পর্যটকদের মনোরঞ্জনে এ ব্যবসা চলছে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, কনফেডারেশন কাপ থেকেই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের নিয়ে চলছে অবাধ যৌন ব্যবসা। বলা হচ্ছে, ৫০০ কোটি ডলার আয় হয়েছে । বাস্তবে তা আরো বেশি। রাজস্ব ফাঁকি দিতেই আয় কমিয়ে দেখানো হচ্ছে।

বহু তরুণী সন্ধ্যার পর সেজেগুজে রাস্তায় দাঁড়িয়ে পুরুষের আকর্ষণের চেষ্টায় নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে। তারা দামদর মিটিয়ে অজানা পুরুষের মনোরঞ্জনে হোটেলে চলে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, যে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী ও তরুণী সারা রাত পুরুষকে আনন্দ দিল, সে খুব বেশি হলে ব্রাজিলের মুদ্রায় ৩০ রিল (১২ ডলার) পায়। বাকি অর্থ দালাল, মাস্তান আর ফড়িয়ারা লুটে নেয়।

শিশু, কিশোরী এবং তরুণীদের নিরাপত্তা রক্ষার্থে এবং তাদের সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার স্বার্থে জাতীয় শিশু-কিশোর অপরাধ দমন ফোরাম বলেছে, ব্রাজিলে ৫ লাখ শিশু যৌনকর্মী রয়েছে। ফরটালেজা নগরীতে ২০০৯ সালে শিশু যৌনকর্মী ছিল ১৯৩ জন। আশ্চর্যের বিষয়, পাঁচ বছরে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২২-এ।

এ নগরীতে এত শিশু যৌনকর্মী কেন? এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অবাধ যৌনাচারের জন্য নিয়মনীতির কোনো বালাই নেই। এতে কোনো সমস্যা নেই তাদের।

উপকূলীয় এ অঞ্চলটিতে আবহাওয়া ও পরিবেশ খুবই সুন্দর। তার চেয়েও বড় কথা, অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যপীড়িত।
অভাবের তাড়নায় এবং ক্ষুধার জ্বালা মেটাতে বহু অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরী পতিতাবৃত্তিতে নাম লেখায়। এতে পরিবারের পূর্ণ সমর্থনও রয়েছে। উপরন্তু ফরটালেজা দিনকে দিন যৌনকর্মীদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বেসরকারি সংস্থার পরিচালিকা জ্যাকিনা রডরিগেজ বলেন, তরুণী যৌনকর্মীতে ভরে গেছে পুরো শহর। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে পুরো নগরী যেন যৌনপল্লিতে পরিণত হতে চলেছে। বিশ্বকাপ যখন শুরু হবে তখন আরো দর্শক আসবেন, বিদেশি অতিথিতে ভরে যাবে। বিদেশি অতিথিরা যৌনকর্মীদের নিয়ে আনন্দে মেতে উঠবেন। কোনো সন্দেহ নেই প্রচুর অর্থ উপার্জিত হবে।

জ্যাকিনা রডরিগেজ বলেন, ‘জ্যাকুলিনো কুবেতসেক এলাকার নিষিদ্ধ পল্লিতে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, সেখানে ১৭ বছরের কম বয়সী তরুণীই যৌনকর্মে নিয়োজিত রয়েছে। তারা টাইট শার্ট এবং শর্টস পরে দাঁড়িয়ে থাকে এবং পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে।’

অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীদের যৌনকর্মে লিপ্ত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ । প্রশ্ন হচ্ছে, অপরাধীকে শাস্তি দেবে কে? রাষ্ট্র আইনগত কোনো পদক্ষেপ নেয় না। শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের যৌনকর্মে লিপ্ত করা বড় ধরনের অনৈতিকতার শামিল এবং তাদের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ অপকর্মটি যারা করে, তারা কিশোরীদের এমনভাবে পোশাক পরায় এবং প্রসাধনী দিয়ে সাজায়, তাতে দেখে মনে হয় তারা প্রাপ্তবয়স্ক। ফলে পুলিশও তাকে কিছু বলতে পারে না ।

বিশ্বকাপে অবাধ যৌনাচার, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরীদের দিয়ে যৌন অপরাধ যাতে না হয়, সেজন্য ফিফা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে- এমন প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, এ বিষয়ে ব্রাজিলীয় কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক তা নিশ্চিত নয় ফিফা। দেশটিতে বিশ্বকাপের সময় অবাধ যৌনাচার এবং বিদেশি পর্যটকের মনোযোগ আকর্ষণ করে ২ হাজার কোটি ডলার আয় করবে, এমন প্রত্যাশা করছে দেশটির সরকার।

ইউক্রেনে রক্তাক্ত সহিংসতা ২৬ জনের প্রাণহানি

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে গতকাল পুলিশের সঙ্গে সরকারবিরোধী
বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের তাঁবু, গাড়ি
ও আশপাশের ভবনে আগুন দেওয়া হয় ছবি: এএফপি
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে গতকাল বুধবারও ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। শহরটিতে গত মঙ্গলবার থেকে সহিংসতায় এ পর্যন্ত ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছে। সেখানে তিন মাস আগে বিক্ষোভ শুরুর পর এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দাঙ্গা পুলিশ কিয়েভের কেন্দ্রস্থলের ইনডিপেনডেন্স স্কয়ারে অবস্থানকারী বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে গতকাল ভোরে সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও ককটেল নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীরা। এর আগে রাতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে ইনডিপেনডেন্স স্কয়ার এলাকা থেকে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। এ সময় আন্দোলনকারীদের তাঁবুগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। রাতভর ওই সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়। এর মধ্যে ২৪১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে ইনডিপেনডেন্স স্কয়ার ছেড়ে যেতে কর্তৃপক্ষ সেখানে বিক্ষোভকারীদের প্রতি একাধিকবার আহ্বান জানানোর পরও তারা সেখানেই অবস্থানের ঘোষণা দেয়। বিরোধীদের নেতা ভিতালি ক্লিশকো বলেন, তাঁরা কোথাও যাবেন না। ইইউর অবরোধ আরোপের চিন্তাভাবনা: ইউক্রেনে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনায় দেশটির ওপর অবরোধ আরোপের পরিকল্পনা করছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতারা। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বলেন, আজ বৃহস্পতিবার একটি জরুরি সভায় ইউক্রেনের ওপর ‘অবরোধ আরোপ’ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সংলাপের আহ্বান: ইউক্রেনের সহিংস ঘটনায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন উদ্বেগ প্রকাশ করে সংযমী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষকে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। আলোচনায় আসার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রও। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন টেলিফোনে প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচের সঙ্গে আলাপ করে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একইভাবে ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান ক্যাথেরিন অ্যাশটনও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইউক্রেনে বিভক্তি: রাশিয়া নাকি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যত্ মৈত্রী স্থাপন—মূলত এ বিষয় নিয়ে ইউক্রেনে বিভক্তি দেখা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ এখনো রাশিয়ার প্রতি আস্থা রাখছেন। ইইউর সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাব ইয়ানুকোভিচ প্রত্যাখ্যান করায় গত নভেম্বরে দেশটিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত দেশ ইউক্রেন এখনো অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়ার ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। সেনাপ্রধানকে বরখাস্ত : প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল ভ্লাদিমির জামানাকে বরখাস্ত করেছেন। গতকাল রাতে প্রেসিডেন্টের ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানানো হয়। জামানার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ইউরি ইলিন। এএফপি ও বিবিসি।

সাজাপ্রাপ্ত সবাইকে মুক্তি দেওয়া হবে: জয়ললিতা

মুরুগান, নলিনী ও পেরারিভালান
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত সাত আসামিকে শিগগিরই মুক্তি দেবে তামিলনাড়ু রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জে জয়ললিতা রাজ্য বিধানসভায় গতকাল বুধবার এই ঘোষণা দেন। রাজীব হত্যার দায়ে তিন আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে সুপ্রিম কোর্ট গত মঙ্গলবার তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন। এরপর তামিলনাড়ুর মন্ত্রিসভা গতকাল ওই তিনজনসহ মামলার বাকি আসামিদের মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা করা হবে। জয়ললিতা বলেন, রাজীব গান্ধী হত্যা মামলায় বর্তমানে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত তিন আসামি পেরারিভালান, মুরুগান ও সন্থানকে একই মেয়াদে সাজাপ্রাপ্ত অন্য চার আসামির (নলিনী, রবার্ট পাইয়াস, জয়াকুমার ও রবিচন্দ্রন) সঙ্গে মুক্তি দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের মতামত তিন দিনের মধ্যে না পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ওই সাতজন মুক্তি পাবেন।
বিধানসভার কংগ্রেস দলীয় সাংসদেরা সরকারের ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ওয়াকআউট করেন। প্রধান বিচারপতি পি সদাশিবমের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ মঙ্গলবার তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করেন। তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করে দীর্ঘ ১১ বছর অপেক্ষা করার পরও কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আদালত এই রায় দেন। ১৪ বছর কারাভোগকারী কয়েদিদের সদাচরণ বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের মুক্তি দেওয়ার অধিকার রাজ্য সরকারের রয়েছে। রাজীব গান্ধীকে ১৯৯১ সালের মে মাসে হত্যা করা হয়। হত্যায় জড়িত আসামিরা সবাই শ্রীলঙ্কাভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন লিবারেশন টাইগার অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) সদস্য। শ্রীলঙ্কায় ১৯৮৭ সালে ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর ওপর ক্ষুব্ধ হয় তামিল গেরিলারা। অবশ্য, তাঁকে হত্যা করার ঘটনায় ২০০৬ সালে ‘দুঃখ প্রকাশ’ করে এলটিটিই। শ্রীলঙ্কান সেনাবাহিনী ২০০৯ সালে অভিযান চালিয়ে এলটিটিইকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। বিবিসি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া।

মমতার তৃণমূলকে সমর্থন দিচ্ছেন আন্না

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারতের লোকসভার আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন দিচ্ছেন প্রবীণ গান্ধীবাদী সমাজ সংস্কারক আন্না হাজারে। গতকাল বুধবার নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তৃণমূল নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাশে বসিয়ে আন্না জানালেন, তৃণমূলকে শুধু সমর্থন নয়, কয়েকটি রাজ্যে তৃণমূলের প্রার্থীদের হয়ে তিনি প্রচারও চালাবেন। রাজনীতি থেকে এত দিন দূরে থাকা আন্না কেন মমতাকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত এবং কেন তিনি নরেন্দ্র মোদি ও অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে সমর্থন দিতে রাজি নন, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। পাঁচ মাস আগে তিনি দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। তাতে তিনি দেশ ও জাতি গঠনে ১৭ দফা কর্মসূচি নিয়ে তাঁদের মতামত জানতে চেয়েছিলেন। আন্না বলেন, মমতা ছাড়া আর কেউই সেই চিঠির উত্তর পাঠাননি। এমনকি অরবিন্দ কেজরিওয়ালও নন। মমতার ‘সহজ-সরল জীবন যাপন’, তাঁর ‘নির্লোভ চরিত্র’ এবং ‘সততা’ তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তা ছাড়া মমতা তাঁকে জানিয়েছেন, ১৭ দফার অনেকগুলো তাঁর সরকার পশ্চিমবঙ্গে চালু করেছে।
আন্না হাজারে
এ কারণেই তিনি মমতার দলকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেন। আন্না বলেন, ‘আমি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করছি না, সমর্থন করছি একটা রাজনৈতিক বিচারধারাকে।’ আন্না জানান, তৃণমূল গরিব পার্টি। লোকসভার ৫৪৩ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। তাই তারা ঠিক করেছে, ১০০ আসনে প্রার্থী দেবে ও প্রচার চলবে। মঙ্গলবার রাতে মমতার সঙ্গে আন্না হাজারে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বৈঠক করেন। দুজনের মধ্যে এটাই ছিল প্রথম সাক্ষাৎ।

সুন্দরবন থেকে বঙ্গোপসাগর

সুন্দরবন
অন্য বহু দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অনেকগুলো বিশেষ শক্তির দিক আছে। উর্বর তিন ফসলি জমি, ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিস্থ বিশাল পানিসম্পদ, নদী-নালা, খাল-বিল, ঘন জনবসতি—সবই আমাদের সম্পদ, যা অনেকের নেই। এর বাইরেও আছে সুন্দরবনের মতো অসংখ্য প্রাণের সমষ্টি এক মহাপ্রাণ। অসাধারণ জীববৈচিত্র্য দিয়ে তা সারা দেশকে সমৃদ্ধ করে, যা লাখ লাখ মানুষের জীবিকার সংস্থান করে, আবার প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে লাখ লাখ মানুষকে বাঁচায়। আমাদের আরও আছে বঙ্গোপসাগর। স্থলভাগের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি আয়তনের এই সমুদ্র জানা-অজানা বিশাল সম্পদের আধার। এই বিশাল সাগর শুধু সম্পদের দিক থেকে নয়, বিশ্ব-যোগাযোগ ও সার্বভৌম নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এই বিবেচনায় বাংলাদেশ শুধু নদীমাতৃক দেশ নয়, সমুদ্রমাতৃক দেশও। এর পরও আমাদের বাড়তি আছে গ্যাস, কয়লাসহ খনিজ সম্পদ। এত সব সম্পদ থাকা সত্ত্বেও কি একটি দেশকে গরিব বলা যায়? না। কোনো কারণ নেই গরিব থাকার। কিন্তু উন্নয়নের ধরনই এমন, শুধু যে মানুষ গরিব তা-ই নয়; আবাদি জমি, নদী, পানি, সমুদ্র, সুন্দরবন, গ্যাস ও কয়লা—সবই একের পর এক আক্রমণের শিকার, বিপন্ন। যা আমাদের সমৃদ্ধ জীবন নিশ্চিত করতে সক্ষম, সেগুলোই দেশি-বিদেশি কতিপয় গোষ্ঠীর লোভের বলি হয়ে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে। ফুলবাড়ী প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কৃষিজমি নষ্ট করে, খাদ্যনিরাপত্তা নষ্ট করে উন্মুক্ত খনি করা হবে না। নতুন প্রযুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। খুবই সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু তাঁর কথা আর সরকারের নানা মহলের কাজে কোনো সংগতি নেই। লবিস্টদের তৎপরতা চলছেই। লন্ডনে ফুলবাড়ীর কয়লাখনি দেখিয়ে জালিয়াতি শেয়ার ব্যবসা চালাচ্ছে বিদেশি কোম্পানি। নতুন প্রযুক্তির জন্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশের জন্য জাতীয় সক্ষমতার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সেদিকে কোনো উদ্যোগ নেই। শেখ হাসিনা বলেছেন,
২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত দেশে পরিণত হবে। খুবই সম্ভব, এর আগেই সম্ভব। কিন্তু বিশ্বে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই, যেখানে নিজেদের খনিজ সম্পদের ওপর জাতীয় কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো দেশ উন্নতি করতে পেরেছে। জ্বালানি সার্বভৌমত্ব জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নের পূর্বশর্ত। নিজেদের সার্বভৌম ক্ষমতা বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিয়ে কোনো দেশ কি উন্নতি করেছে? এ রকম কোনো দৃষ্টান্ত কি আছে, নিজেদের জমি-পানিসহ নবায়নযোগ্য ও গ্যাস-কয়লাসহ অনবায়নযোগ্য সম্পদের সর্বনাশ করে কোনো দেশ বিষচক্র থেকে বের হতে পেরেছে? না, নেই। দায়মুক্তি আইন করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সরকার যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে দেশের কতিপয় গোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও রাশিয়ার শাসকেরা খুশি, কিন্তু বিপদাপন্ন বাংলাদেশ। দেশ ও জনস্বার্থ বিবেচনার কেন্দ্রে থাকলে কী করে রামপালে সুন্দরবনধ্বংসী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প হতে পারে? সরকারি পদের দায়িত্বে থাকা কতিপয় ব্যক্তি, সুন্দরবন এলাকায় ভূমি দখলে উদগ্রীব কতিপয় দস্যু ও হাতে গোনা কয়েক জন নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ ছাড়া কাউকে পাইনি, যাঁরা এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। এটি যে সুন্দরবন ধ্বংস করবে, সে ব্যাপারে তাঁরা সবাই নিশ্চিত। কর্মকর্তারা ‘বাঙালকে হাইকোর্ট দেখানো’র মতো সুপারক্রিটিক্যাল টেকনোলজির গল্প বলেন। আমি ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির কেন্দ্র সিংগ্রলিতে তাদের কার্যক্রম দেখে এসেছি। দেখেছি, উন্মুক্ত খনি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে কীভাবে এককালের ঘন বনজঙ্গলের এলাকা এখন বিরান, বিষাক্ত, পানি-বাতাসদূষিত। অ্যাশপন্ড বা ছাইয়ের পুকুর অঞ্চলের সব জলাধার এমনকি পানি পানের শেষ ভরসা কুয়ার পানি বিষাক্ত করেছে। খাদ্য উৎপাদনের উপযোগী জমি নেই। ঘরে ঘরে অসুস্থ শিশু। প্রতি তিন বাড়ির এক বাড়িতে এখন পাগল পাওয়া যাচ্ছে।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, তাহলে বিকল্প কী? সুন্দরবনের বিকল্প নেই, কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে। প্রথমত, যেহেতু ভারতের কোম্পানি এটি পরিচালনা করবে, যেহেতু ভারতের ব্যাংক এর জন্য ঋণ জোগান দেবে, যেহেতু ভারতের বিশেষজ্ঞরা এখানে কাজ করবেন, যেহেতু সম্ভবত ভারতের কয়লাই এখানে ব্যবহার হবে; সেহেতু ফ্রেন্ডশিপ কোম্পানির এই কেন্দ্র ভারতেই প্রতিষ্ঠিত হোক, আমরা না হয় বিদ্যুৎ কিনব। অথবা দ্বিতীয়ত, সব বিধি মেনে স্বচ্ছতার সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যত্র এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারে। অথবা তৃতীয়ত, যে পরিমাণ বিদ্যুৎ এই কেন্দ্র থেকে পাওয়া যাবে, তার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ, ২০ ভাগের এক ভাগ অর্থে, বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্র মেরামত ও নবায়ন করেই পাওয়া সম্ভব। অথবা চতুর্থত, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বৃহৎ উদ্যোগ। ভারতের রাজস্থানই তার একটি ভালো দৃষ্টান্ত। গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের জন্য বিশাল উৎস হবে বঙ্গোপসাগর। এটি বাংলাদেশের জন্য এক বিশেষ সুবিধা, যা বহু দেশে নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ভুল ও লোভী নীতি ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গোপসাগরে গ্যাস ব্লক নিয়ে আরেকটি সর্বনাশা চুক্তি করল সরকার। সংশোধিত ‘পিএসসি ২০১২’ অনুযায়ী সরকার ভারতের অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন (ওএনজিসি বিদেশ) এবং অয়েল ইন্ডিয়ার সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের এসএস ৪ ও এসএস ৯ নামে চিহ্নিত ১৪ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার দুটি গ্যাস ব্লকের চুক্তি সম্পাদন করেছে। এর আগে পিএসসি ২০০৮ ও তাতে রপ্তানির বিধান নিয়ে আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। জনপ্রতিরোধ ও জনমতের চাপে পিএসসি ২০১২ সালে রপ্তানির বিধান রাখা হয়নি। কিন্তু বর্তমান দলিলে অনেক চালাকি করা হয়েছে।
মার্কিন ও ভারতীয় কোম্পানিগুলোর দাবির কাছে নতি স্বীকার করে সরকার পিএসসি ২০১২ সংশোধন করেছে। তাদের কথামতো চুক্তির দলিল বা পিএসসি সাজানোর পর দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং আগে থেকে ঠিক করা কোম্পানিগুলো তাতে সাড়া দেয়। ভারতের ওএনজিসি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কনোকোফিলিপস তাদের অন্যতম। কনোকোফিলিপসের সঙ্গে ৭ নম্বর গ্যাস ব্লক নিয়ে সরকার আরও একটি চুক্তি করার অপেক্ষায়। কোম্পানিগুলোর উচ্চ মুনাফা ও কর্তৃত্ব নিশ্চিত করতে সংশোধিত পিএসসিতে যেসব বাড়তি সুবিধা নতুন করে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে আছে প্রথমত, গ্যাসের ক্রয়মূল্য, অর্থাৎ বাংলাদেশ যে দামে গ্যাস কিনবে তার দাম আগের চুক্তির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বাড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রতিবছর গ্যাসের দাম শতকরা পাঁচ ভাগ হারে বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, ব্যয় পরিশোধ পর্বে বিদেশি কোম্পানির অংশীদারি শতকরা ৫৫ ভাগ থেকে বৃদ্ধি করে শতকরা ৭০ ভাগ করা হয়েছে। চতুর্থত, ইচ্ছামতো দামে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই চুক্তির কারণে তাই নিজের গ্যাস সম্পদ কেনার ক্ষমতা বাংলাদেশের থাকবে না, কিনতে গেলে ভয়াবহ আর্থিক বোঝার সম্মুখীন হতে হবে। এ ছাড়া একাধিক ব্লকে গ্যাস পাওয়া গেলে জোগান এত বেশি হবে যে রপ্তানি তখন অনিবার্য হয়ে উঠবে, যা শুধু এই কোম্পানিগুলোকেই লাভবান করবে। সে জন্যই কি দলিলে গ্যাস রপ্তানির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়নি? চার বছর আগে সংসদে উত্থাপিত ‘খনিজ সম্পদ রপ্তানি নিষিদ্ধ আইন’ও পাস করা হয়নি, উল্টো রপ্তানিনীতিতে খনিজ সম্পদ রপ্তানির বিধান রাখা হয়েছে।
‘পুঁজির অভাব’-এর যুক্তি তুলেই স্থলভাগ ও সমুদ্রে একের পর এক গ্যাস ব্লক বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে নাকি ‘বিপুল পরিমাণ’ অর্থের প্রয়োজন, আর তা বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। কত সেই পরিমাণ? সর্বশেষ চুক্তি অনুযায়ী ওএনজিসি আট বছরে বিনিয়োগ করবে প্রায় ১৪ কোটি ডলার বা এক হাজার ১০০ কোটি টাকা, মানে বছরে গড়ে ১৩৮ কোটি টাকা। তার মানে প্রতিবছর মন্ত্রী-আমলাদের গাড়ি কেনার বা বিলাসিতার খরচ একটু কমালেই সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের টাকার জোগান হয়। তা ছাড়া ওএনজিসি আট বছরে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করবে, তার প্রায় দ্বিগুণ অর্থ গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে অলস পড়ে আছে। শত-হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি আর পাচারের হিসাব নাহয় না-ই দিলাম। ‘বাংলাদেশের সক্ষমতা নেই’—বারবার এই যুক্তি তোলা হয়। কবে এই সক্ষমতা আসবে, সে ব্যাপারে কি কোনো কথা আছে? জাতীয় সক্ষমতা বিকাশে সরকারের কি কোনো উদ্যোগ আছে? কোনো সরকারের ছিল? না। ভারতের সক্ষমতা অর্জনে কত বছর লেগেছিল? প্রতিষ্ঠার ১৩ বছর পরই ওএনজিসি সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ শুরু করেছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও, ‘আমরা পারব না’, এটাই সরকারগুলোর সার্বক্ষণিক কথা। অক্ষমতার প্রচার করে, একটি সমৃদ্ধ দেশের সম্পদ বিনাশের নানা চুক্তি হতে থাকে। দক্ষ কোম্পানি বলে যে ওএনজিসির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ ভারতেই আছে।
কনোকোফিলিপস তো দুর্ঘটনার রাজা হিসেবেই পরিচিত। অথচ পিএসসিতে দুর্ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণের ধারা দুর্বল করে রাখা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে যদি দুর্ঘটনা হয়, ক্ষতি কত দূর বিস্তৃত হবে, তা চিন্তা করাও কঠিন। মাগুরছড়া-টেংরাটিলার অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। কোনো সরকার এই ক্ষতির জন্য মার্কিন শেভরন ও কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকোর কাছ থেকে আমাদের প্রাপ্য পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আদায়ের উদ্যোগ নেয়নি। এতসবের পরও প্রশ্ন করা হবে, এর বিকল্প কী? আমাদের তো গ্যাস লাগবে! বিকল্প নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু তাতে কমিশনভোগীদের সুবিধা নেই। আমরা সরকারকে এ ধরনের আত্মঘাতী চুক্তি স্বাক্ষরের পরিবর্তে জাতীয় সংস্থার সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে, প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে, জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম গ্রহণের দাবি জানিয়েছি বারবার। শতভাগ জাতীয় মালিকানার অধীনে নির্দিষ্ট কাজে বিদেশি কোনো দক্ষ কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া, বিদেশি বা প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের এসব কাজে যুক্ত করায় তো কোনো অসুবিধা নেই। জাতীয় কমিটির সাত দফায় বিস্তারিত কর্মসূচির রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। কোনো সরকারের এতে আগ্রহ দেখা যায় না। জনস্বার্থ যদি উন্নয়নচিন্তার কেন্দ্রে থাকে, তাহলে ধ্বংসের বিকল্প ঠিকই পাওয়া সম্ভব। কিন্তু তার জন্য ঘাড়টা ঘোরাতে হবে। না ঘোরালে জনগণকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ এই দেশের মানুষের, আর কারও নয়।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

‘রাজনৈতিক’ বিবেচনায় মামলা ‘খুন’ আর কত?

প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি পড়ে হতবাক হওয়ারই কথা। একসঙ্গে ৯৮টি আলোচিত মামলা ও মামলা থেকে আসামির নাম প্রত্যাহারের সুপারিশ! তার মধ্যে ৪০টি আবার মৃত্যুদণ্ডযোগ্য খুনের মামলা। আছে ধর্ষণ, ঘুষ লেনদেন, অবৈধভাবে সরকারি টাকা আত্মসাৎ, ডাকাতি, অবৈধভাবে অস্ত্র দখলে রাখা, কালোবাজারি, অপহরণ, জালিয়াতি, বামা, চুরি, অস্ত্র মামলাসহ যত গুরুতর অপরাধের মামলা। তাতে রেহাই পেতে যাচ্ছে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মাছ কাদেরসহ অর্ধশতাধিকের বেশি আসামি। এ নিয়ে গত মহাজোট সরকারের আমলে সাত হাজার ১৯৮টি মামলা সম্পূর্ণ বা আংশিক প্রত্যাহারের সুপারিশের ঘটনা ঘটল (প্রথম আলো, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪)। তবে এই ‘প্রত্যাহার’ ‘প্রত্যাহার’ খেলাটা নতুন নয়। এক সরকারের আমলে যা ‘হত্যা মামলা’, অন্য সরকারের আমলে তা ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’ মামলা। ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনা’য় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তাদের ২০০১-০৬ মেয়াদে পাঁচ হাজার ৮৮৮টি মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও ৯৪৫টি মামলা থেকে কিছু আসামিকে অব্যাহতি দেয়।
এ প্রক্রিয়ায় তখন মোট ৭৩ হাজার ৫৪১ জন অভিযুক্ত খালাস পায়। (প্রথম আলো, ৭ অক্টোবর, ২০১৩)। এ রাজনৈতিক খেলার অস্ত্র ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৪ ধারা। ‘মামলা পরিচালনা প্রত্যাহারের ফল’ শিরোনামের ধারাটির মূল ভাষ্য হচ্ছে—রায় ঘোষণার আগে, আদালতের অনুমতি নিয়ে সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) কোনো মামলা সম্পূর্ণ কিংবা তাতে বর্ণিত এক বা একাধিক অপরাধের অভিযোগ প্রত্যাহার করতে পারেন। ওই প্রত্যাহার অভিযোগ বা চার্জ গঠনের আগে অনুমোদিত হলে অভিযুক্তকে ডিসচার্জ করতে হবে। আর চার্জ গঠনের পরে অনুমোদিত হলে বা আইনানুসারে চার্জ গঠনের দরকার না হলে অভিযুক্তকে খালাস দিতে হবে। মামলা প্রত্যাহারসংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশগুলো মূলত এই ধারাবলে পিপির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়।তবে বরাবরই প্রয়োগের চেয়ে ধারাটির অপপ্রয়োগ বেশি। আইনগত ব্যবহারের চেয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপব্যবহার বেশি। তার অন্যতম কারণ অবশ্যই ধারাটি নিজেই। ধারাটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্পষ্টতায় দুষ্ট:
১. ঠিক কোন কারণে বা কিসের ভিত্তিতে বা কী উদ্দেশ্য বা পরিস্থিতিতে একজন পিপি বা সরকারি কৌঁসুলি মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করতে পারেন, সে বিষয়ে ওই ধারায় সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
২. আদালত কখন, কী বিবেচনায়, কিসের ভিত্তিতে ওই প্রত্যাহার আবেদনে মঞ্জুর করবেন বা করবেন না, তা-ও ওই ধারায় বলা নেই। তবে ভারত, পাকিস্তানসহ আমাদের উচ্চ আদালতের রায়ে ওই অস্পষ্টতাগুলো অনেকটাই সুস্পষ্ট। ওই সব রায়ের ভিত্তিতেই বিষয়গুলো পরিষ্কার করছি। প্রত্যাহার আবেদনের উদ্দেশ্য ও ভিত্তি: একটি মামলার ভিত্তি সব সময় মজবুত হয় না। কখনো কখনো তা হয় খুবই দুর্বল, খেলো। অভিযোগ গঠনের পর কখনো দেখা যায়, আনীত অভিযোগ যুক্তিহীন এবং ভিত্তিহীন। কখনো আবার সাক্ষ্য এতই অপ্রতুল যে, তাতে অভিযুক্তের শাস্তি হওয়ার নয় বা মামলাটা প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত সাক্ষীই পাওয়া যাচ্ছে না, এককথায় যাকে বলে মামলাটা প্রমাণ-অযোগ্য। কিংবা কখনো দেখা যায় মামলাটি প্রাথমিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত নয় (prima facie case নেই)। ওই রকম পরিস্থিতিতেই সংশ্লিষ্ট সরকারি কৌঁসুলি আদালতের কাছে মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করবেন। মূলত তুচ্ছ, অযাচিত বা মিথ্যা মামলা পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সময় বাঁচাতে এবং নিরীহ-অসহায় মানুষকে হয়রানিমূলক মামলা থেকে মুক্তি দিতে ফৌজদারি কার্যবিধিতে মামলা প্রত্যাহারের বিধানসংবলিত ওই ৪৯৪ ধারা সংযোজিত হয়। সরকারি কৌঁসুলির বিবেচনা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশসংবলিত চিঠি হাতে পাওয়ার পর আমাদের দেশের সরকারি কৌঁসুলিরা সাধারণত এ সম্পর্কে নিজস্ব বিচার-বিবেচনা ছাড়াই সরাসরি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে তৎপর হয়। মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠিই যেন বাধ্যবাধকতার বাহক। অথচ ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলছেন ভিন্ন কথা, ‘সরকার সরকারি কৌঁসুলিকে মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ বা পরামর্শ দিতে পারে। কিন্তু তজ্জন্য কেউ তাকে বাধ্য করতে পারে না।
সরকারি কৌঁসুলিরা আদালতের কর্মকর্তা এবং আদালতের কাছেই দায়বদ্ধ’ (্সুবাস চন্দর বনাম রাষ্ট্র, এআইআর ১৯৮০ সুপ্রিম কোর্ট ৪২৩)। আদালতের সম্মতি: ৪৯৪ ধারাবলে আদালতের নিজ উদ্যোগে বা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ নেই। কিন্তু তাহলেও ওই প্রত্যাহারের পূর্বশর্ত হলো আদালতের সম্মতি। ওই সম্মতি হবে আবার অবাধ। কোনো রকম চাপ ছাড়াই আদালত তা প্রয়োগ করবেন (২৮ ডিএলআর ৩৮৬)। এ ক্ষেত্রে আদালত অবশ্যই তাঁর বিচারগত স্বেচ্ছাধিকার প্রয়োগ করবেন এবং আইনানুসারে কাজ করবেন (৩৮ ডিএলআর ২৮২)। আদালতের সম্মতি ছাড়া এই ধারাবলে মামলা প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই এবং তা প্রদানে আদালত কোনোভাবে বাধ্যও নন (এআইআর ১৯৪৯ পাট. ২২২, ২২৭)। মামলা প্রত্যাহারে আদালতের বিবেচনা: মামলা প্রত্যাহারের আদেশ একটি বিচার বিভাগীয় আদেশ। তাই সেটি ইচ্ছামাফিক হবে না এবং শক্তিশালী কোনো কারণ ছাড়া প্রদত্ত হবে না (২৮ ডিএলআর ৩৮৬)। কেবল পিপির আবেদনের ভিত্তিতে আদালত যান্ত্রিকভাবে কোনো প্রত্যাহারে অনুমোদন দেবেন না (১৯৯৯ এমএলআর ১৮)। এ ক্ষেত্রে মামলার বিষয়বস্তু, অবস্থা এবং অভিযোগের ভিত্তিগুলো সম্ভাব্য সব উপায়ে আদালত খতিয়ে দেখবেন। মামলার নথিপত্র পরীক্ষা করবেন (পিএলডি ১৯৮০ লাহোর ২০১)। তা ছাড়া দেখবেন, জনস্বার্থে ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে ওই প্রত্যাহারটা জরুরি কিনা। পাশাপাশি নিশ্চিত হবেন,
প্রত্যাহার আবেদনটি সদ্বিশ্বাসে জননীতির স্বার্থে করা হয়েছে এবং তাতে আইনের স্বাভাবিক পথকে বাধাগ্রস্ত বা ব্যাহত করার কোনো উদ্দেশ্য নেই (এআইআর ১৯৮৭ সুপ্রিম কোর্ট ৮৭৭)। তবে যে মামলা আপস-অযোগ্য নালিশি মামলা কিংবা অভিযুক্ত স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে বা যেখানে কারও বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারে অনুমতি দিলে, সে সহযোগী-অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে মর্মে আশঙ্কা থাকে; সেসব ক্ষেত্রে আদালত মামলা প্রত্যাহারে অনুমতি দেবেন না। মামলার বিষয় ও অবস্থা সম্পর্কে নিজস্ব মূল্যায়ন ব্যতিরেকে কেবল সরকারি কৌঁসুলির পরামর্শে মামলা প্রত্যাহার আইনবহির্ভূত (১২৬ ডিএলআর ১৩৩)। তদুপরি কারণ ব্যতিরেকে মামলার কার্যক্রম প্রত্যাহারের অনুমতি দেওয়া হলে তা একটি বিচারিক কার্যক্রমকে গলা টিপে হত্যা করার শামিল (পিএলডি ১৯৮২ বিজে৯)। এমনকি আদালতের আদেশেও ওই কারণ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে প্রয়োজনবোধে হাইকোর্ট ডিভিশন বুঝতে পারেন যে, মামলা প্রত্যাহারের আদেশটি আইনসম্মতভাবে দেওয়া হয়েছে (পিএলডি ১৯৫৯ পেশোয়ার ১৮৬)। উপরোক্ত আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কার, ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনার’ নামে যে উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়ায় হত্যা মামলাসহ ঢালাওভাবে বিচিত্র ফৌজদারি মামলা প্রত্যাহারের সংস্কৃতি আমাদের দেশে বহাল তবিয়তে চলছে, তা কোনোভাবে আইনসংগত নয়। রাষ্ট্রের এ খামখেয়ালিপনা কেবল মানবাধিকারের লঙ্ঘনই নয়, এ রাষ্ট্র প্রদত্ত মৌলিক অধিকার কিংবা গোটা বিচার-প্রক্রিয়ার প্রতি নির্মম উপহাস। এ অবস্থা নিরসনে ৪৯৪ ধারার সংশোধনীসহ প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
aftabragib@yahoo.com