Showing posts with label মোছাব্বের হোসেন. Show all posts
Showing posts with label মোছাব্বের হোসেন. Show all posts

Monday, December 23, 2019

মোটর মেকানিক ‘রাব্বি’ আপা by মোছাব্বের হোসেন

কাজে ব্যস্ত রাবেয়া সুলতানা রাব্বি
ছয়-সাত বছর আগের কথা। দিনাজপুরের বাহাদুর বাজার এলাকার অগ্রণী ব্যাংকে একটি কাজে গিয়েছিলেন রাবেয়া সুলতানা রাব্বি। তিনি গাড়ির মেকানিক—এ পরিচয় শুনে ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের চোখ কপালে উঠে গেল! কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইলেন না। বাধ্য হয়ে রাব্বি তাঁর পরিচয়পত্র দেখালেন। তারপরও বিস্ময় কাটে না, একজন নারী কীভাবে গাড়ির মেকানিক হন!
শুধু ব্যাংকের ব্যবস্থাপকই নন, অনেকেই রাব্বির পেশা শুনে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। যাঁকে নিয়ে কথা হচ্ছে, সেই রাবেয়া সুলতানা রাব্বি ২০০৬ সাল থেকে বেসরকারি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কেয়ারে গাড়ির মেকানিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজধানীর পান্থপথে কেয়ারের গ্যারেজে বসে রাব্বি জানালেন তাঁর জীবনযুদ্ধের কথা। ২০০৫ সালে টাকার অভাবে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হলো না। বাবা আবদুল আজিজ ফরাজী তরিতরকারির ব্যবসা করলেও প্রায়ই নানা অসুখ-বিসুখে বাড়িতেই বসে থাকতেন। ছয় ছেলেমেয়ের সংসার তাঁর।
একদিন কেয়ারের মাঠকর্মীরা রাব্বিদের বাড়িতে এসে কেয়ারের পক্ষ থেকে নারীদের গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণের কথা জানালেন। একেবারেই ভিন্ন
একটি পেশার কথা শুনে রাব্বি যোগ দিলেন সেই প্রশিক্ষণে।
রাব্বি বলছিলেন, ‘গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণে নাম লেখালাম। প্রশিক্ষণ শেষে কয়েকজন নারীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় কেয়ার থেকে। কিন্তু আমার চাকরি হলো না। কিছুদিন পর কেয়ার থেকে বলা হলো মেকানিক হিসেবে কাজ করার জন্য। সেই সুযোগ লুফে নিয়ে শুরু করলাম গাড়ি দেখভালের কাজ। সেই থেকে এখন পর্যন্ত করেই চলছি। কেয়ারের বিভিন্ন গাড়ি, মোটরসাইকেল সার্ভিসিংয়ের কাজ করি। সেখানে সবার কাছে আমার পরিচয় “মেকানিক রাব্বি আপা”। আমিও তাঁদের এই ডাকে সাড়া দিই।’
গাড়ির ব্রেক ঠিক করা, গাড়ির মবিল বদলানো, ফিল্টার পরিবর্তনসহ নানা কাজ করতে হয় রাব্বিকে। রাব্বি গর্বের সঙ্গেই বললেন, ‘গাড়ির চাকায় হাত দিলেই বুঝতে পারি কোন গাড়িতে কী সমস্যা হয়েছে।’
তিন বছর বয়সী ছেলের মা রাব্বি। স্বামী একরামুল হক একটি নিরাপত্তা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। সন্তানকে দেখভাল করার জন্য তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষ এখন রাব্বি। গ্রামে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খরচও চালান রাব্বি। বলছিলেন, ‘প্রতি মাসে বাবা-মায়ের জন্য পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। অন্য পাঁচ ভাইবোন থাকলেও বাবা-মায়ের মাসিক খরচ আমাকেই দিতে হয়।’
মূল বেতন আর ওভারটাইম মিলে ৪৪ থেকে ৪৫ হাজার টাকা বেতন পান রাব্বি। নিয়মিত ট্যাক্স দেন। রাব্বি বললেন, ‘আমার বেতনের কথা শুনে আরও নারীরা যাতে এই পেশায় আসে, সেই জন্য কত বেতন পাই তা বললাম।’ হাসতে হাসতে বললেন, ‘গ্রামে গেলে মানুষ আমার চারপাশে ভিড় করে। কী কী কাজ করি, কীভাবে করি, জানতে চায় আর অবাক হয়। ওদের প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার ভালো লাগে।’
কেয়ারের সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাব্বি জানালেন, কেয়ারে কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান, কোনো বৈষম্য নেই।
রাব্বির কাজের সম্পর্কে কেয়ারের পরিবহন ব্যবস্থাপক মো. সেলিম শেখ বললেন, রাব্বি শুধু মেকানিকের কাজই নিখুঁতভাবে করেন না, ফাইলিং থেকে শুরু অফিসের বেশ কিছু কাজেও সাহায্য করেন। কোনো কাজের কথা বললে ‘না’ করেন না। সব মিলে দারুণ এক কর্মী তিনি।
কাজে ব্যস্ত রাবেয়া সুলতানা রাব্বি। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

Wednesday, May 15, 2019

বিসিএসে প্রথম হলেন চিকিৎসক নীলিমা by মোছাব্বের হোসেন

নীলিমা ইয়াসমিন
সম্প্রতি প্রকাশিত চিকিৎসকদের জন্য ৩৯তম বিশেষ বিসিএসে দেশসেরা হয়েছেন নীলিমা ইয়াসমিন। এই বিসিএসে ৪ হাজার ৭৯২ জন চিকিৎসক নেওয়া হয়। নীলিমা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছেন।
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়ার সময় বিয়ে হয় নীলিমা ইয়াসমিনের। সংসার, সন্তান সবকিছু সামলে তিনি পড়াশোনায় করেই এ ফল করেছেন। ফলে সেরা হওয়ার পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না নীলিমার।
নীলিমা বলছিলেন, ‘তৃতীয় বর্ষে পড়ি তখন বিয়ে হয়। বিয়ের পর সংসারের চাপ তো আছেই। তবে নিজের পড়াশোনাটা করে গেছি ঠিকমতো। আর তার ফলও পেয়েছি হাতেনাতে। প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে স্বর্ণপদক নিয়েছিলাম সেরা ফলের জন্য।’
নীলিমার জীবনে প্রথম বিসিএস পরীক্ষা ছিল ৩৮তম বিসিএস। এই পরীক্ষার তিন দিন পর এফসিপিএস পরীক্ষা। সন্তানের বয়সও চার মাস। সব মিলে দারুণ এক চাপে ছিলেন তিনি। ৩৮তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় পাস করে লিখিত পরীক্ষা দিয়েছেন, সে ফলাফল এখনো হয়নি। এফসিপিএসের মতো কঠিন পরীক্ষাতেও পেয়েছেন সফলতা।
নীলিমার পড়াশোনায় ভালো করার অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ঢাকার মুন্সি আব্দুর রউফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০০৮ সালে এসএসসি আর ২০১০ সালে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করেন। বৃত্তি নিয়ে দুটোতেই গোল্ডেন জিপিএ ৫ পান। এরপর ভর্তি হন সিলেটের সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজে।
মেডিকেলে ভালো ফলাফলের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্বর্ণ পদক পেয়ে নিজের প্রত্যাশা বেড়ে গিয়েছিল নীলিমার। ছেলে নাহিয়ান হকের বয়স যখন ১ বছর তখন ৩৯তম বিসিএসে অংশ নেন তিনি। পরীক্ষা ভালোই দিয়েছিলেন। বললেন, ‘যখন ৩৯তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিয়ে বের হলাম, তখন মিলিয়ে দেখলাম যে ১৬৪/১৬৫ পাব। মৌখিক পরীক্ষাও দিলাম বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। ফলাফলের দিন নিজের ফলাফল দেখে কিছুটা অবাক হলেও আবেগে ভাসিনি। ভালো পরীক্ষা দিয়েই তো এ ফল পেয়েছি।’
নীলিমার স্বামী জিহাদুল হকও চিকিৎসক হিসেব কর্মরত। নীলিমা বললেন, ‘স্বামী চিকিৎসক হওয়াতে তিনি সবকিছুতে সহায়তা করেছেন। বিসিএসে আমার ভালো ফলাফলের কৃতিত্ব তাঁরও আছে।’
নীলিমার গ্রামের বাড়ি ফেনীতে হলেও বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই। বাবা মোহাম্মাদ হানিফ ছিলেন আমেরিকা প্রবাসী আর মা গৃহিণী। বাবা-মা সব সময় তাঁকে উৎসাহ দিয়েছেন। বাবা ২০১৩ সালে মারা যান। নীলিমার সন্তানের বয়স এখন ২ বছর।
নীলিমা ভালো চিকিৎসক হতে চান। চিকিৎসকদের সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক মনোভাব বদলে মানুষ আর চিকিৎসকের মধ্যে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে চান তিনি।

Sunday, November 8, 2015

নিরাপত্তা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন, সিসি ক্যামেরার বিক্রি দ্বিগুণ by মোছাব্বের হোসেন

একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মাজেদুল হক বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটে গত বৃহস্পতিবার সিসি ক্যামেরা কিনতে এসেছিলেন। মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডে থাকেন। সেখানে ফ্ল্যাটের অন্যান্য মালিক মিলে সিসি ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিপদ তো আর বলে আসবে না। তাই আগে থেকেই এই ক্যামেরা লাগিয়ে সতর্ক থাকছি।’ চুরি-ডাকাতি বা অন্য যেকোনো খারাপ ঘটনার পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে এখন সিসি ক্যামেরা জরুরি হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সহিংস ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা অনেকে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বা সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার দিকে জোর দিচ্ছেন। এতে রাজধানীসহ সারা দেশে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার চাহিদা বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, গত এক বছরে এই বিক্রির হার দ্বিগুণ হয়েছে। তবে গত দুই সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে।
রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও স্টেডিয়াম মার্কেটে দেশের সবচেয়ে বড় সিসি ক্যামেরার বাজার। এর বাইরে ধানমন্ডি, বনানী, কম্পিউটার সিটিসহ বড় বড় কয়েকটি শপিং সেন্টারে সিসি ক্যামেরার মার্কেট আছে।
গত বৃহস্পতিবার বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও স্টেডিয়াম মার্কেটের সিসি ক্যামেরার বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এখন অনেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও সিসি ক্যামেরা কিনছেন।
রাজধানীর সিসি ক্যামেরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্যামেরা মিউজিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ গাফফার মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরাকে এখন খুবই দরকারি মনে করা হচ্ছে। কোনো ঘটনা ঘটলে এর সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে। আমাদের বিক্রি এখন দ্বিগুণ বেড়েছে।’ তিনি বলেন, সারা দেশে বিশেষ করে বড় বড় শহরে সিসি ক্যামেরার চাহিদা বেড়েছে। তিনি বলেন, আগে বড় বড় শপিং মলে সিসি ক্যামেরার চাহিদা ছিল কিন্তু এখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তো বটেই, ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে অনেকে সিসি ক্যামেরা লাগাচ্ছেন। এই সিসি ক্যামেরাগুলোর বেশির ভাগই চীন ও তাইওয়ান থেকে আসছে বলে তিনি জানান।
বায়তুল মোকাররম মার্কেটে ক্যামেরা ফিউচার নামের একটি সিসি ক্যামেরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মালিক তানভীর হাসান বলেন, আগে বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে সিসি ক্যামেরা লাগানোর অর্ডার পেতেন। কিন্তু গত দুই সপ্তাহে তিনি চারটি বাড়িতে সিসি ক্যামেরা লাগানোর অর্ডার পেয়েছেন। তিনিও জানালেন, এই ক্যামেরার বিক্রি দ্বিগুণ বেড়েছে।
নারায়ণগঞ্জের একটি পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আয়নাল কবির এসেছিলেন বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের জন্য আটটি ক্যামেরা কিনেছেন। তিনি বললেন, ‘এমনিতেই আমাদের ক্যামেরা লাগানোর চিন্তা ছিল না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়তি নিরাপত্তার কথা ভেবে ক্যামেরা লাগাচ্ছি।’
হাতিরপুল এলাকায় এক সপ্তাহ আগে একটি ব্যক্তিগত বহুতল ভবনের মালিক সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছেন। সেখানকার বাসিন্দাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের পরিস্থিতি তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। দিনের আলোতে যেভাবে খুনখারাবি চলছে, তাতে সিসি ক্যামেরা না লাগিয়ে উপায় ছিল না। এটি না হলে ঘটনা ঘটার পর তা ধরার জন্য আর কোনো সূত্রই থাকে না। তিনি জানান, এটি হয়তো কিছুটা ব্যয়বহুল, কিন্তু প্রয়োজনের কথা চিন্তা করলে এটির বিকল্প হয় না।
বাজার ঘুরে দেখা গেল, ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে আড়াই লাখ টাকা দামের সিসি ক্যামেরা আছে। এ ছাড়া এই ক্যামেরার তথ্য সংরক্ষণ করতে নানান যন্ত্রপাতি কিনতে হয়। ক্যামেরা মিউজিয়ামের বাবুল খান বলেন, একটি মনিটরে চারটি সিসি ক্যামেরার কার্যক্রম দেখা যায়। ২ হাজার ৫০০ টাকার একটি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে সব যন্ত্রপাতিসহ ৩০ হাজার টাকা খরচ পড়ে।
সিসি ক্যামেরার চাহিদাই শুধু বাড়েনি, বেড়েছে এই কাজের সঙ্গে জড়িত মেকানিকদেরও চাহিদা। বসুন্ধরা সিটিতে কথা হয় এমনই একজন মেকানিক মো. জুয়েলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজের চাপ এখন বেশি। কাজ করে কূল পাচ্ছি না। আগে তিনি সপ্তাহে এক থেকে দুটি স্থানে সিসি ক্যামেরা লাগানোর কাজ করতেন, এখন রোজই কাজের অর্ডার পাচ্ছেন।’
আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে তারা অভিজাত এলাকায় যেসব বাড়ি নির্মাণ করছে, তার বেশির ভাগগুলোতেই সিসি ক্যামেরা লাগাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকেরাই উদ্যোগী হচ্ছেন। এ বিষয়ে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা তানভীরুল ইসলাম বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখন প্রায় সবাই সিসি ক্যামেরা লাগানোর বিষয়ে আমাদের বলছেন। এ ছাড়া ভিডিও ডোর কলের মাধ্যমে কোনো অপরিচিত ব্যক্তি বাসায় যাবে কি না, তা দেখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সাধারণত আমরা ছাদের রেলিং, পার্কিং ও বাসার প্রবেশমুখে বেশি করে সিসি ক্যামেরা লাগানোর অর্ডার পাচ্ছি।’ দিনে দিনে এভাবে ক্যামেরার ব্যবহার বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
সিসি ক্যামেরা লাগানোর বিষয়ে পুলিশের কোনো উদ্যোগ আছে কি না, জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মুনতাসিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের অপরাধ শাখার কর্মকর্তারা বিভিন্ন আবাসিক এলাকার ভবন মালিক, বড় বড় শপিং সেন্টারের মালিক, ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনের মালিকদের সিসি ক্যামেরা লাগানোর বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করছেন। কোনো এলাকায় সিসি ক্যামেরা লাগালে যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধী শনাক্ত করা সহজ হয়, এটি তাদের বোঝানো হচ্ছে।’ মুনতাসিরুল বলেন, কোনো ভবনে সিসি ক্যামেরা থাকলে এমনিতেই অপরাধীরা সচেতন থাকে। এতে ওই এলাকায় অপরাধ কমে আসে বা কোনো ঘটনা ঘটলেও পুলিশ ওই সিসি ক্যামেরার বিশ্লেষণ করে ঘটনার সূত্র খুঁজতে সুবিধা হয়। এ জন্য যত বেশি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে, অপরাধের মাত্রা তত কমতে থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে নিজের কর্মস্থলে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসাতে চান মাহবুব আলম নামের এই ব্যক্তি। গতকাল বিকেলে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মার্কেটে এই ক্যামেরা কিনতে যান তিনি l ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, October 21, 2015

নতুন ঢাকায় মিলনের সুরধ্বনি by মোছাব্বের হোসেন

বনানীর পূজা মন্ডপের বর্ণিল আয়োজন -প্রথম আলো
কয়েক বছর আগেও ঢাকায় শারদীয় দুর্গোৎসব বলতে মূলত পুরান ঢাকার ছবিই ভাসত। রাজধানীর অন্য এলাকার ভক্তের সমাগমও ওমুখীই ছিল। পূজার বর্ণছটা ‘নতুন ঢাকা’য় খুব একটা ছিল না।
পূজা এলেই নতুন ঢাক হিসেবে পরিচিত গুলশান-বনানী-ধানমণ্ডির হিন্দু সমাজের অনেকেই মন ভার হতো। অবশ্য এখন তাঁরা খুশি।
ধানমন্ডির সুরধ্বনি: ধানমন্ডি লেকের পাড়ে হাঁটা ও ব্যায়ামের পরিচয় থেকে হয় বন্ধুত্ব। আন্তরিক যোগাযোগে একদল মানুষ গড়ে তোলেন সুরধ্বনি নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। সুরধ্বনিরই বন্ধুরা, যাঁদের কেউ হিন্দু কেউবা মুসলমান; ধানমন্ডি এলাকায় দুর্গাপূজার আয়োজনের কথা ভাবলেন।
২০০৭ সালের কথা। দুর্গাপূজার মাত্র ১৮ দিন বাকি। কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের মাঠে পূজার আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। মাঠ কর্তৃপক্ষকে জানাতে তাঁরাও সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন। ব্যস, শুরু হয়ে গেল মিলনের আয়োজন।
এই ইতিহাসেরই একজন যতি দাস কুণ্ডু। তাঁর মুখেই শোনা যাক: আমাদের দলে হিন্দু-মুসলমান সবাই ছিলেন। হাতে হাত মিলিয়ে দুর্গাপূজার এই আয়োজন করেছিলাম।’ তিনিই জানালেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা খালেদা বেগমের উৎসাহের কথা।
খালেদার স্মৃতিতেও তো অনেক কথা জমা, ‘নতুন ঢাকায় বড় পরিসরে পূজার এটিই প্রথম উদ্যোগ। সেদিন হিন্দু-মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তড়িঘড়ি করে কাজে নেমে পড়লাম। বেশির ভাগ টাকা বিভিন্ন মুসলমান বন্ধুরাই দেন।’ এভাবেই শুরু কলাবাগান মাঠে দুর্গোৎসবের সূচনাপর্ব।
ধানমন্ডি পূজা কমিটি থেকে প্রকাশিত স্মরণিকার নামও দেওয়া হয় সম্প্রীতি।
কলাবাগান মাঠের পূজার হাত ধরেই কিন্তু বনানী মাঠে, উত্তরাতে বা আজিমপুর সরকারি কোয়ার্টারে পূজা শুরু হয়। ধানমন্ডি হয়েছে তাদের পথিকৃৎ।
ধানমন্ডির বাসিন্দা সম্রাট সরকার বললেন, ‘এই পূজা শুরু করার সময় মুসলমান বন্ধুরাই সাহস ও উৎসাহ জুগিয়েছেন। আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। সম্প্রদায়বোধ কোনো সমস্যা হয়নি।’
ধানমন্ডি মাঠে নিয়মিত পূজা দেখতে আসেন এলিফ্যান্ট রোডের বাসিন্দা শাহানা হোসেন। তাঁর কথা ‘যখন থেকে এই মাঠে পূজা শুরু হয়েছে, তখন থেকেই সন্তানদের এখানে পূজা দেখাতে নিয়ে আসি। ওদের ধর্ম ওরা পালন করবে, আমার ধর্ম আমার। কিন্তু উৎসব তো সবারই’।
কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি সফিকুল আলমেরও ভূমিকা আছে এ আয়োজনে। বললেন, ‘আমাদের দেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ। এই মাঠে হিন্দুদের পূজাতে সহায়তা করতে পেরে আমাদের ভালো লাগে। মনে হয় যেন এই উৎসব আমাদেরও।’
গুলশান-বনানীর আলোবাদ্য: ‘২০০৮ সালের আগে আমাদের এলাকার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কোনো স্থায়ী পূজা করার জায়গা ছিল না। দুর্গাপূজা এলেই মন ভার হয়ে থাকত। পুরান ঢাকার কোথাও গিয়ে পূজা করতে হতো। কিন্তু শান্তি মিলত না। ২০০৮ সালে আমাদের হিন্দু আর মুসলমান বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মিলে এই এলাকায় পূজা করার বিষয়ে কথা হয়। সিদ্ধান্ত নিই ২৮ সেপ্টেম্বর। আর পূজা শুরু ৪ অক্টোবরে।’ এভাবেই গল্পে গল্পে ইতিহাস বর্ণনা করছিলেন গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও নটর ডেম কলেজের সাবেক শিক্ষক পান্না লাল দত্ত: ‘অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই আদা-জল খেয়ে নেমে পড়ি। তখন বনানী খেলার মাঠ আজকের মতো এত সুন্দর আর পরিপাটি ছিল না। কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েক শ ট্রাক বালু ফেলে মাঠ পূজার উপযোগী করা হয়। শুরুতে নানা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হলেও এখন তৃপ্তি পাই। সেই যে শুরু, এখনো চলছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে মুসলমান বন্ধু, প্রিয়জন, এলাকার বাসিন্দাদের অকৃপণ সহায়তায়।’
পান্না লাল দত্তরা নতুন প্রজন্মের কাছে একটি অসাম্প্রদায়িক উৎসব উপহার দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘ঈদে যেমন আমরা আমাদের মুসলমান বন্ধুদের বাসায় যাই, তেমনি পূজাতেও মুসলমান বন্ধুরা পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে আসে। ধর্ম যার যার, উৎসব তো সবার।’ এখানে পূজা শুরুর সময় যুক্ত ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের। তিনিও মনে করেন, ‘আমাদের সবার ঐক্য প্রচেষ্টায় এটা সম্ভব হয়েছিল।’
এবারও বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের ওই মাঠটিতে অষ্টমবারের মতো সর্বজনীন দুর্গাপূজা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। মণ্ডপের রং শ্বেত মর্মরের মতো, যা শান্তির বার্তাও বহন করে। গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সুধাংশু কে দাসও জানালেন, দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মিলিত উদ্যোগের কথা।
উত্তরায় দুর্গা: ২০০৯ সাল থেকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টর পার্কের মাঠে এ আয়োজন হচ্ছে। উত্তরা থানা পূজা কমিটির সহসভাপতি সুদেব চন্দ্র পাল। তিনিও বলেন, ‘আমাদের আয়োজনে মুসলমানেরাও অংশ নেন। পার্কে অনুষ্ঠিত হয় পূজা। আমরা এখানে মুসলমানসহ সব ধর্মের মানুষদের নিমন্ত্রণ করি। মূলত মুসলমান প্রতিবেশীদের জন্যই এখানে পূজার আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে।’ প্রতিবেশিতা থেকে সহমর্মিতা। সম্প্রীতির সুরে মিলনের এই গান ছড়াতে থাকুক সবখানে।

Monday, August 17, 2015

পান্থপথ–ফার্মগেট সড়ক: রাস্তা–ফুটপাত দখল করে রিকশার অবৈধ গ্যারেজ by মোছাব্বের হোসেন

গ্রিন রোডের ফুটপাতটি দখল করে তৈরি হয়েছে
রিকশার গ্যারেজ। রিকশা মেরামতের জায়গা
হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছেl -মনিরুল আলম
রাজধানীর পান্থপথ থেকে ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলে যাওয়ার পথে হাতের ডান দিকের সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে রিকশার অবৈধ গ্যারেজ। এতে এই রাস্তায় তীব্র যানজট হচ্ছে। দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে পথচারীদের।
স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, জনগণের ভোগান্তিকে তোয়াক্কা না করে সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে রাস্তা-ফুটপাত দখল করে রিকশা গ্যারেজ তৈরি করে চাঁদা তোলা হয়।
সরেজমিনে গত বুধবার সকালে দেখা গেছে, পান্থপথ থেকে ফার্মগেটে যাওয়ার ডান দিকের এই সড়ক-ফুটপাত পুরোটাই দখল। প্রায় ৩০০ রিকশা নিয়মিত এখানে রাখা হচ্ছে। ফুটপাতে রিকশা রাখার পর আর অবশিষ্ট জায়গা না থাকায় সড়কের ওপরেও রিকশা সারি করে রাখা হয়েছে। রাস্তার ওপর কিছুদূর পরপর রিকশার মিস্ত্রি সরঞ্জাম নিয়ে বসে মেরামতের কাজ করছেন। এর ফাঁকে ফাঁকে ফুটপাতের ওপরেই বসেছে চায়ের দোকান। ফলে ওই ফুটপাত দিয়ে পথচারীদের চলার জায়গা নেই, এমনকি রাস্তারও অনেকটা অংশ দখলে। এর ফলে সড়ক সংকীর্ণ হয়ে গেছে, সারা দিন যানজট লেগেই আছে।
কিন্তু সন্ধ্যার পরের চিত্র আরও কিছুটা ভিন্ন। সরেজমিনে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পর রিকশাচালকেরা রিকশা জমা দিতে আসেন, রাত যত বাড়তে থাকে, রিকশার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। তখন আরও বেশি অংশজুড়ে এই দখল ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যার পর মাদকসেবীরা দাঁড় করিয়ে রাখা সেই সব খালি রিকশায় বসে গাঁজা সেবন ও মাদক গ্রহণ করে। এই রাস্তায় রাত গভীর হলে ছিনতাইয়ের অভিযোগও রয়েছে।
এই পথে নিয়মিত যাতায়াত করেন মো. আলম। তিনি বলেন, ‘ফুটপাত তো দখল হয়েছেই, রাস্তাও দখল। বাধ্য হয়ে বাঁ দিকের ফুটপাত দিয়ে চলি। এভাবে দখল করে রিকশার গ্যারেজ হয় কীভাবে? নিশ্চয় কারও ব্যাকআপ আছে ওদের।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এখানে রিকশার গ্যারেজে বিল্লাল হোসেন ওরফে কালাম, লিটন, এরশাদ, সুলতানসহ আরও কয়েকজনের প্রায় ৩০০ রিকশা আছে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে এঁদের চারজনের কথা হয়। এখানে রিকশার অবৈধ গ্যারেজ স্থাপনের কথা তাঁরা প্রত্যেকেই স্বীকার করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, তাঁদের কোনো গ্যারেজ না থাকায় তাঁরা এখানে গ্যারেজ বানিয়েছেন। রাস্তার ওপরই মেরামত করার কাজ সারেন তাঁরা। তবে তাঁরা জানিয়েছেন, প্রতিটি রিকশা রাখার জন্য দৈনিক ১২ টাকা দিতে হয়। এই হিসাবে ৩০০ রিকশার জন্য দৈনিক এখান থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা ওঠে। মাসে এই টাকা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। আবদুল্লাহ নামের একজন এই চাঁদা নেন। যিনি নিজেকে এই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছের লোক আর ক্ষমতাসীন দলীয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। চাঁদা তোলার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে আবদুল্লাহ এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
গ্যারেজের সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয়। সেখানের কর্মকর্তারাও এই গ্যারেজের কারণে বিরক্ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন কর্মকর্তা জানান, এখান দিয়ে আসতে উল্টো পথের রাস্তা ও ফুটপাত ব্যবহার করতে হয়। গাড়ি নিয়ে প্রবেশে সমস্যা হয়। এর নিয়ন্ত্রণে দলীয় লোক থাকায় প্রতিবাদ করা যায় না।
কয়েকজন রিকশাচালক নিয়মিত এখান থেকে রিকশা নেন। তাঁরা বলেন, প্রতিটি রিকশা সকাল ছয়টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নিলে জমা দিতে হয় ১০০ টাকা। ফার্মগেটের আশপাশের এলাকায় তাঁরা এই রিকশা চালান। তাঁরাও স্বীকার করেন, এখানে রিকশা থাকার কারণে তাঁদেরও বাড়তি যানজটে পড়তে হয়।
এই এলাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫ নম্বর জোন ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হলে ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ফোন ধরেননি।
দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে এই জোনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি এই জোনে কয়েক দিন আগে যোগ দিয়েছেন। তবে ফুটপাত দখলের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

Wednesday, August 5, 2015

‘স্বর্ণারে তো কবরটাও দিতে পারি নাই’ by মোছাব্বের হোসেন

তিনজনের এই ‘সেলফি’ এখন শুধুই স্মৃতি। বাম থেকে
জান্নাতুল নাঈম লাকি, ফতেমা তুজ জোহরা স্বর্ণা ও
নুসরাত জাহান হীরা। মাওয়ায় ডুবে যাওয়া লঞ্চ ‘পিনাক-৬’
-এর যাত্রী ছিলেন তাঁরা। হীরার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
বাকি দুজন এখনো নিখোঁজ। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত
‘বড় সাধ ছিল বড় মেয়েটারে ডাক্তার বানাব। মেডিকেল কলেজে ভর্তিও করেছিলাম। ওর সঙ্গে ঢাকায় যখনই দেখা করতে যেতাম, দেখতাম ও ক্লাস থেকে এপ্রোন পরে আমার সামনে আসত। কী যে ভালো লাগত! কিন্তু আজ হীরা...’ বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন বাবা নুরুল হক হাওলাদার।
এক বছর আগে আজকের এই দিনেই (৪ আগস্ট) মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মা নদীতে ‘পিনাক-৬’ লঞ্চডুবিতে দুই মেয়ে নুসরাত জাহান হীরা ও ফাতেমা তুজ জোহরা স্বর্ণাকে হারিয়েছেন নুরুল হক। ঢাকার শিকদার মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষে পড়তেন হীরা। আর স্বর্ণা পড়ত নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ওই দুর্ঘটনার পর হীরার লাশ পাওয়া গেলেও স্বর্ণার হদিস মেলেনি আজও। কাঁদো কাঁদো গলায় নুরুল হক বলেন, ‘তিন সন্তানের মধ্যে আমার মেয়ে দুইটা চলে গেল একসঙ্গে। ছোট ছেলেটা সবেমাত্র ফাইভে পড়ে। ঘরে ঢুকলেই মেয়েদের কথা মনে পড়ে। খেতে বসলে মনে পড়ে, রাস্তাঘাটে মনে পড়ে। মনের দুঃখে শুধুই কান্নাকাটি করি। হীরারে না হয় কবর দিছি, স্বর্ণারে তো তা-ও পারি নাই।’
‘দলিল লেখার কাজের মধ্যে যখনই অবসর পাই, তখনই দুই মেয়ের কথা মনে পড়ে’ জানিয়ে নুরুল হক বললেন, ‘কী আর কবর! নামাজ পড়ে ওদের জন্য দোয়া করি। আত্মীয়স্বজন যারা আছে, তারা নামাজ পড়ে দোয়া করে। আপনারাও ওদের জন্য দোয়া কইরেন।’
গত বছরের ঈদের পর মাদারীপুরের শিবচরের কাওরাকান্দি ঘাট থেকে যাত্রী বোঝাই করে মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার পথে মাওয়া ঘাটের কাছে ডুবে যায় পিনাক-৬ লঞ্চটি। এ দুর্ঘটনায় ৪৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ২৮টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় ২১টি। তবে, এ দুর্ঘটনায় ঠিক কত জন নিখোঁজ রয়েছে, তা আজও নিশ্চিত করা যায়নি।
সকালে মাওয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, পিনাক-৬ ডুবে যাওয়ার স্থানটিতে পুরোদমে চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। এ কারণে মাওয়ার পুরো ঘাটটি স্থানান্তর করা হয়েছে শিমুলিয়ায়।
পিনাক-৬ ডুবে যাওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী ও মাওয়া ঘাটের হোটেল ব্যবসায়ী তপন কুমার দাশ এই প্রতিনিধিকে বলেন, ‘ওই দিন খুবই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল। চোখের সামনেই লঞ্চটিকে ডুবে যেতে দেখেছিলাম।’
ঘটনার পর এখানে নিখোঁজ লোকজনের কেউ আসে কি না, জানতে চাইলে তপন কুমার বলেন, ‘লঞ্চ নাই, ঘাট নাই, মানুষ আসবে কোত্থেকে? ’
মাওয়া থেকে ঘাটটি সরিয়ে নেওয়ায় অনেকেই শিমুলিয়ায় ব্যবসা শুরু করেছেন। সেখানে শিমুলিয়া ঘাট স্পিডবোট সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিনু খানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘মাওয়া ঘাটের কাছে আমার দোকান ছিল। ওই দিন দোকানে বসে কাজ করছিলাম। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস ছিল। ভাবছিলাম, বৃষ্টি কমলেই বাইরে বেরুবো। এর মধ্যে লঞ্চ ডুবে যাচ্ছে বলে চিল্লাচিল্লি শুনে বাইরে গিয়ে দেখি, লঞ্চটির পেছন অংশ ডুবে গেছে। এরপর কাত হয়ে পুরোপুরি ডুবে যায়।’
বিনু খানের ভাষ্য, ডুবে যাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে স্পিডবোট চালকদের নিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করি। ১১২ জন যাত্রীকে তাঁরা জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করেছেন বলে জানান তিনি।
ঘটনার পরদিন লাশ ভেসে ওঠার দৃশ্য বর্ণনা করেন বিনু খান এভাবে—‘কচুরিপানার মতো লাশ ভাইস্যা উঠছিল। এর চাইতেও বেশি ঢেউয়ের মধ্যেই পদ্মায় লঞ্চ চলে। কিন্তু ধারণক্ষমতার চাইতে অধিক যাত্রী নেওয়ায় লঞ্চটা ডুবছে।’
ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘ওই দিন গ্যারেজে গাড়ি ঠিক করছিলাম। এমন সময় দেখি লোকজন ডাকাডাকি করছে। পরে সামনে গিয়া দেখি, আস্তে আস্তে লঞ্চটি ডুবে যাচ্ছে। বেশি যাত্রী না লইলে লঞ্চটি হয়তো ডুবত না।’
গত বছরের ৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জের মাওয়ার পদ্মা নদীর এই অংশ পিনাক-৬ লঞ্চটি ডুবে যায়। এখন সেখানে চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। ছবি: মোছাব্বের ​হোসেন

যানজট বাড়াচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীন রিকশা by মোছাব্বের হোসেন

রাজধা​নীজুড়ে রিকশাজট। রিকশার অনিয়ন্ত্রিত
চলাচল যানজট বাড়াচ্ছে। ছবি-সাজিদ হোসেন
রিকশার শহর হিসেবে ঢাকায় রিকশার পরিচিতি বেশ পুরোনো। কিন্তু দিনে দিনে আমজনতার এই বাহন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ছে। ব্যস্ত সড়কগুলোতে রিকশা ঢুকে পড়ায় যানজট বাড়ছে। এতে ভুগছে নগরবাসী। নগর বিশেষজ্ঞদের মত হচ্ছে, নিয়ন্ত্রণহীন ও অপরিকল্পিতভাবে চলাচল করার কারণে রাজধানীর যানজটের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে রিকশা।
ঢাকা সিটি করপোরেশনের সূত্র বলছে, ডিসিসির উত্তর-দক্ষিণে তালিকাভুক্ত রিকশার সংখ্যা সাড়ে ৭৯ হাজার। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুসারে ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। এ সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। এ রিকশার সংখ্যাও অর্ধ লক্ষাধিক বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। আবার ঈদের মৌসুমে এই সংখ্যা বেড়ে যায়। বেশি আয়ের আশায় অনেক মৌসুমি রিকশাচালক বিভিন্ন স্থান থেকে রিকশা এনে চালান।
রাজধানীর পাড়া-মহল্লার মানুষ এখানে-সেখানে যেতে মূলত রিকশাই ব্যবহার করে থাকেন। তবে অনেকেই মনে করেন, ঢাকায় সড়কে চলার পথে এই রিকশা ভোগান্তির কারণ হয়ে ওঠে। পথে রিকশার বিশৃঙ্খলভাবে চলাচল বাস বা ব্যক্তিগত গাড়িসহ অন্যান্য যান্ত্রিক যানবাহনের চলার গতি কমিয়ে দেয়। নগরে যানজট দিনে দিনে তীব্রতর হওয়ার অন্যতম একটি কারণ অপরিকল্পিতভাবে রিকশা চলাচল। চলার পথেও এ দৃশ্য হরহামেশা চোখে পড়ে।
সম্প্রতি এলিফ্যান্ট রোডে দেখা গেল দুই রিকশা একটি অপরটিকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় পরস্পরের সঙ্গে আটকে যায়। রিকশা দুটির চালকেরা এ নিয়ে তর্ক শুরু করেন। ওদিকে ততক্ষণে ছোটখাটো যানজট লেগে গেছে।
মতিঝিল-মোহাম্মদপুর রুটের সিটি বাসের চালক মো. ফারুক বলেন, ‘রিকশার লাইগ্যা আমাদের অনেক সমস্যা হয়। কথাই হোনে না। হ্যারা মেইন রোডে উইঠ্যা আহে। গাড়ির সামনে পইড়্যা যায়, কইসা ব্রেক করতে হয়। এমনে কইরা অনেক সময় লাইগ্যাও যায়। তখন মানুষ তো হেগোরে কিছু কয় না, গাড়ি ভাঙচুর করে। দোষটা কিন্তু কইলাম হেরই।’
মোহাম্মদপুরের ব্যক্তিগত গাড়ির চালক আলমগীর মিয়ার কাছে রিকশার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গাড়ি টানার সময় কথা নাই বার্তা নাই সামনে রিকশা আইসা পড়ে। ব্রেক করতে গিয়া ঝাঁকুনি খাইতে হয়। ডাইনেও যাইতে পারি না বামেও যাইতে পারি না। হেই সময় যারা গাড়ি চালায়, তারাই কইতে পারব রিকশা কি ডিসটার্ব করে।’
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাজেদুল হক নিজেই নিজের গাড়ি চালন। তিনি বলেন, প্রধান সড়কে রিকশা চলার কারণে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে আর যানজটের সৃষ্টি হয়।
রিকশা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এর ভালো-খারাপ দুই দিকই আছে। রিকশা পরিবেশবান্ধব যান। ঘর পর্যন্ত যেতে রিকশার বিকল্প নেই। যাঁরা গণপরিবহনে যাতায়াত করেন, তাঁদের বড় একটা অংশ প্রধান সড়কে আসতে রিকশা ব্যবহার করেন। এটি খুবই দরকারিও। আবার অনেক গন্তব্যে কোনো গণপরিবহন না থাকলে সেখানেও যেতে মানুষ রিকশা ব্যবহার করেন। তবে ঢাকায় যানজটের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রধান প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ওপর দিয়ে রিকশা চলাচল।’ তিনি মনে করেন, রিকশার সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি। আবার সমস্যা একদিনে সমাধানও করা যাবে না। রিকশা কোন পর্যন্ত চললে সমস্যা হবে না, এই বিষয়কে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই সমস্যার তৈরি হচ্ছে। রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হতে হবে। কিন্তু এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ দিনের পর দিন উদাসীন থেকেছে। তিনি বলেন, রিকশা রাতারাতি তুলেও দেওয়া যাবে না। কেননা, এর সঙ্গে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। রাজধানীতে গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত হলে মানুষের রিকশার প্রতি নির্ভরশীলতা কমত বলে মনে করেন এই নগর বিশেষজ্ঞ।
বসুন্ধরা সিটির সামনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্রাফিক সার্জেন্ট জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সড়কে যানজটের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে রিকশা। আমরা দিনের বেলা প্রধান সড়কে এটি চলতে দিই না। কেউ চালালে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়।’ তিনি আরও জানালেন, ঈদ সামনে রেখে রাজধানীতে অনেক মৌসুমি রিকশা আসে। এটি নতুন করে যানজট তৈরি করে। ট্রাফিক বিভাগ থেকে এ ধরনের অবৈধ রিকশা ধরতে অভিযান চালানো হয় বলে জানান তিনি।
অবৈধ রিকশার বিষয়ে সিটি করপোরেশনের করণীয় কী জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী আনসার আলী বলেন, ‘আমরা নতুন করে কোনো নিবন্ধন দিচ্ছি না। এ ছাড়া অবৈধ রিকশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের কোনো করণীয় নেই। এটি নিয়ন্ত্রণ করবে ট্রাফিক বিভাগ।’
রিকশার নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকায় অনেক রিকশা অবৈধ। কিন্তু কোনটি অবৈধ, তা সিটি করপোরেশন শনাক্ত করতে পারে। আমাদের জব্দ করা রিকশার জন্য আলাদা জায়গা না থাকায় আমরা অবৈধ রিকশা কম ধরছি। নিয়ম ভঙ্গ করলে অনেক সময় আমরা রিকশার চাকা ফুটো করে দিই বা গদি নিয়ে তাঁদের শাস্তি দিই। সিটি করপোরেশন আমাদের আলাদা জায়গা করে দিলে অবৈধ রিকশা ধরার অভিযান চালিয়ে জব্দ করে রাখতে পারব।’ এ জন্য তিনি সিটি করপোরেশনের সহায়তা চান।

ঘাটও নাই, লঞ্চও নাই by মোছাব্বের হোসেন

গত বছরের ৪ আগস্ট মুন্সিগঞ্জের মাওয়ার পদ্মা নদীর
এই অংশ পিনাক-৬ লঞ্চটি ডুবে যায়। এখন সেখানে
চলছে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। ছবি: মোছাব্বের ​হোসেন
মাওয়া চৌরাস্তার পাশে মধ্য দুপুরে রাস্তায় লোকজনের আনাগোনা ছিল কম। আজ মঙ্গলবার প্রখর রোদে কেউ কেউ ছায়ায় বসে জিরিয়ে নিচ্ছেন। ঘাটের সামনে যে অংশে গত বছরের এই দিনে পিনাক-৬ লঞ্চটি ডুবেছিল সেখানে এখন পুরোদমে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। এ কারণে মাওয়ার পুরোনো ঘাটটি স্থানান্তর করা হয়েছে শিমুলিয়ায়।
পিনাক-৬ ডুবে যাওয়ার সময় প্রত্যক্ষদর্শী এক রিকশা চালক সোলেমান মিয়া আঙুল উঁচিয়ে দেখালেন, ‘ওই যে সামনে দেখতেছেন কাজ চলতাছে, ওইখানে আইসা পড়ছিল লঞ্চডা। তীরে আইবো আইবো এমন সময় ডুইব্যা গেল। কারও গ্যাছে ভাই, কারও বইন, কারও পোলা-মাইয়্যা। হ্যারাই বুঝে ওগো কি কষ্ট।’ আজকে এখানে কাউকে দেখেছেন স্বজনদের খোঁজে আসতে? সোলেমান বলেন, ‘সেতুর কাজের লাইগা তো ঘাটটাও সইরা গেল এইখান থাইক্যা। লঞ্চটাও আর পাওয়া গেল না। ঘাটও নাই, লঞ্চও নাই।’
গত বছরের ঈদের পর মাদারীপুরের শিবচরের কাওরাকান্দি ঘাট থেকে যাত্রী বোঝাই করে মুন্সিগঞ্জ যাওয়ার পথে মাওয়া ঘাটের কাছে ডুবে যায় পিনাক-৬ লঞ্চটি। এ দুর্ঘটনায় ৪৯টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ২৮টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হলেও বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় ২১টি। তবে, এ দুর্ঘটনায় ঠিক কত জন নিখোঁজ রয়েছে, তা আজও নিশ্চিত করা যায়নি।
সোলেমানের কথা শেষ হতে পাশেই পুরোনো লঞ্চঘাটের এক দোকানদার পিনাক-৬ ডুবে যাওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী মাওয়া ঘাটের হোটেল ব্যবসায়ী তপন কুমার দাশ বললেন, ‘মানুষের কি ভাগ্য দেখেন, লঞ্চডা কিন্তু ঘাট থাইক্যা বেশি দূরে আছিল না, আয়া পড়ছে পড়ছে এমনি সময় তলায় গেল। আজকে পর্যন্ত কোথায় আছে খুঁইজ্যা পাইলো না।’
লঞ্চডুবি এলাকার পাশে সবচেয়ে বেশি ছিল তেলের দোকান। তেলের দোকানি শামিম মাতবর দেখেছেন ওই দিনের ঘটনা। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, লঞ্চটা আর পাওয়াই গেল না, ঘাটটাও রইল না।’
স্বজনরা কেউ এখানে লাশের খোঁজে এখনো আসেন? তপন বলেন, ‘ঘাটই তো উইঠা গেছে। ওইখানে এখন সেতুর কাম চলে। কাউকে তো আসতে দেখি নাই।
স্থানীয় এক হোটেল ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বললেন, এত বড় সেতুর কাজ শুরু করা গেল, আর একটা জ্বলজ্যান্ত লঞ্চ পানির নিচে ডুবে গেল তাকে উদ্ধার করা গেল না? এটা আমাদের অনেক বড় ব্যর্থতা।

Friday, July 31, 2015

চামড়ার বর্জ্য আর ময়লা পানিতে সয়লাব ঢাকা দক্ষিণের হাজারীবাগ এলাকা by মোছাব্বের হোসেন

চামড়ার বর্জ্য স্তূপ করে রাখা হয়েছে রাজধানীর হাজারীবাগের
ট্যানারি সড়কে। এর ভেতর জমেছে বৃষ্টির পানি। এই পথেই প্রচণ্ড
দুর্ভোগ সহ্য করে চলাচল করছে এলাকাবাসী। -সাহাদাত পারভেজ
রাস্তার দুই পাশে ট্যানারির বর্জ্যের স্তূপ। সুয়ারেজের ময়লা পানিতে সয়লাব। ডাস্টবিন থেকে উপচে পড়া ময়লার দুর্গন্ধ। রাস্তা দখল করে রাখা হয়েছে ট্রাক। এসব সামলেই পথ চলতে হচ্ছে পথচারীদের। দুর্ভোগের এই চিত্র রাজধানীর হাজারীবাগ এলাকার ঢাকা ট্যানারির সড়কের। শুধু এই এলাকা নয়, হাজারীবাগ এলাকার বেশির ভাগ সড়কের অবস্থাই এমন। চামড়াশিল্প এলাকা হিসেবে পরিচিত এই এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ট্যানারিগুলো দীর্ঘদিন ধরে সাভারে স্থানান্তরের কথা বলা হলেও তা হয়নি। ট্যানারির কারণে সৃষ্টি হচ্ছে নানা ধরনের ভোগান্তি। এই এলাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত। ওয়ার্ডের অন্য এলাকা হচ্ছে জিগাতলা, গজমহল, শিকারিটোলা, সোনাতনগড়, চরকঘাটা, মনেশ্বর, তল্লাবাগ, বাংলা সড়ক, সুলতানগঞ্জ ও মধুবাজারের কিছু অংশ। জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ।
সরেজমিনে গত সোমবার সকালে হাজারীবাগ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ঢাকা ট্যানারি মোড় সড়কের ওপর চারটি ডাস্টবিন। রাস্তার এক পাশে খোলা ডাস্টবিনের ময়লা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, অন্যদিকে সুয়ারেজের পানিতে সয়লাব। ময়লার গন্ধে নাক চেপে চলছে পথচারীরা। হাঁটার রাস্তা বলতে তেমন কোনো জায়গাও অবশিষ্ট নেই। আর পুরো রাস্তার পাশের ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট টং দোকান। এর ওপরেই রাস্তা দখল করে বড় বড় ট্রাক সারি করে রাখা হয়েছে। এক পাশে রাস্তা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ঠেলাগাড়ির স্ট্যান্ড, পাশেই ফুটপাতের ওপর হাজারীবাগ ঠেলাগাড়ি বহুমুখী সমবায় সমিতির কার্যালয় তৈরি করা হয়েছে। সাইনবোর্ডে বলা হচ্ছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অনুমোদিত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমিতির সভাপতি মজিবর রহমান দাবি করেন, তাঁদের কার্যালয় বৈধ। ডিএমপি অনুমোদিত। কিন্তু হাজারীবাগ থানার ডিউটি অফিসার আশরাফ আলী বলেন, এমন কোনো অনুমোদনের বিষয়ে তাঁর জানা নেই।
এলাকার ট্যানারি মোড় ও হাজারীবাগ থানা সড়ক, শেরেবাংলা রোডের ওপর ময়লা স্তূপ করে রাখা। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে ধুয়ে আবার সেই ময়লা সুয়ারেজে গিয়ে মিশছে।
এলাকার বাসিন্দা শাহজাহান কাজী বলেন, ময়লা পানিতে হাঁটতে হয়, আর ডাস্টবিনের ময়লার দুর্গন্ধে বমি আসার উপক্রম হয়। এখানে চামড়ার বর্জ্য আর ময়লা পানিতে টেকা দায়। আরেক বাসিন্দা লালন মিয়া অভিযোগ করেন, সিটি করপোরেশনের সুইপাররা সুয়ারেজের ময়লা তুলে রাস্তায়ই রাখে। সঠিক সময় তুলে না নেওয়ার কারণে আবার সেই ময়লা আগের জায়গায় চলে যায়। এ ছাড়া ময়লার দুর্গন্ধে ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
মিলন ট্যানারির সামনে কথা হয় চা দোকানদার মো. হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ওই গলিতে বৃষ্টি হলে তো পানি ওঠেই। এ ছাড়া সুয়ারেজের পানিতেও রাস্তা ডুবে যায়। তিনি জানান, দুপুরের দিকে সব ট্যানারির বর্জ্য একসঙ্গে ছেড়ে দেয়। তাই দুপুরে এখানের বেশির ভাগ রাস্তায় সুয়ারেজের ময়লা পানি রাস্তায় এসে পড়ে। তখন ওই পানি মাড়িয়েই পথচারীদের চলতে হয়। চর্মরোগসহ নানা ধরনের রোগে ভুগছে অনেকেই।
এই এলাকার আরও কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, হাজারীবাগের মূল সমস্যা হচ্ছে, ট্যানারির বর্জ্য আর জলাবদ্ধতা। তাঁরা অভিযোগ করেন, অনেক দিন ধরে তাঁরা এসব সমস্যার সম্মুখীন হলেও এসব সমাধানে সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এলাকার বাসিন্দা মো. মইনুল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ‘শুধু শুইনাই গেলাম ট্যানারি সরবো, বাস্তবে আর সরে না।’
ট্যানারি স্থানান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের বিষয়টি সরকারের হাতে। আমাদের কিছু দাবি এখনো পূরণ হয়নি। সে জন্য অনেক ট্যানারি স্থানান্তর হচ্ছে না।’
এলাকার সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়ার্ড কমিশনার মো. সেলিম বলেন, ‘শিল্প এলাকা, তাই ট্রাক বা ঠেলাগাড়ি আসে। তবে তিনি দাবি করলেন, এসব মালামাল আনা-নেওয়া করেই চলে যায়, থাকে না। রাস্তার ওপরে বর্জ্য থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিদিন রাতে ময়লা সিটি করপোরেশন থেকে পরিষ্কার করে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছু রাস্তায় সংস্কারের কাজ চলছে, তবে বৃষ্টির কারণে কাজ বন্ধ আছে। সিটি করপোরেশনে এলাকার সার্বিক উন্নয়নের জন্য কর্মপরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। সেগুলো পাস হলেই আর সমস্যা থাকবে না।

Wednesday, July 29, 2015

ঢাকা উত্তরের ওয়ার্ড ২৭ রাজাবাজার–ইন্দিরা রোডের বেহাল অবস্থা by মোছাব্বের হোসেন

পূর্ব রাজাবাজার ও পশ্চিম রাজাবাজারের সরু সড়কটি খুঁড়ে
নালার পাইপ বসানোর কাজ চলছে দুই মাসের বেশি সময় ধরে।
এতে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এলাকাবাসী l সাবিনা ​ইয়াসমিন
ইটের সুরকি বিছানো এবড়োখেবড়ো আর খানাখন্দে ভরা রাস্তা। কোথাও উঁচু-নিচু। বৃষ্টিতে কোথাও কোথাও কাদাপানি জমেছে। রাস্তার ওপরই আবার ফেলে রাখা হয়েছে সিমেন্টের বড় বড় পাইপ, ইট, পিচ ও মাটি। ফলে চলাচলের জায়গা আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশৃঙ্খল অবস্থা। পথচারীদের ভোগান্তি প্রচণ্ড। এই অবস্থা রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম রাজাবাজার এবং ইন্দিরা রোডের বড় একটি অংশজুড়ে। এই এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব এলাকায় গত দুই মাস আগে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ড্রেনেজ লাইনের পুরোনো পাইপলাইন সরিয়ে সেখানে নতুন বড় পাইপ বসানো ও সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হয়। এতে এক মাস এই রাস্তা বন্ধ ছিল। পাইপ বসানোর পরে কিছুদিন থেকে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করার জন্য ইট-সুরকি বিছিয়ে দেওয়া হলেও রাস্তা পুরোপুরি সংস্কার হয়নি।
সরেজমিনে গত রোববার সকালে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তাগুলোর বিভিন্ন স্থানে উঁচু-নিচু ও কোথাও গর্ত তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া রাস্তা খোঁড়ার পর মাটি, পিচ, ও ইট রাস্তার ওপরেই স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সিমেন্টের বড় বড় পাইপ রাখা হয়েছে। এতে রাস্তা আরও সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। দুই পাশে ঠিকমতো যান চলাচল না করতে পারায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন এখানকার মানুষ ও পথচারীরা। এলাকাবাসীরা জানান, মূল সড়কের যানজট এড়িয়ে এই পথটি ধরে অল্প সময়ে পূর্ব ও পশ্চিম রাজাবাজার, সোবহানবাগ, পান্থপথ, কলাবাগানসহ আরও কয়েকটি গন্তব্যে প্রতিদিন হাজারো লোক চলাচল করেন। রাস্তার সংস্কার না হওয়ায় তাঁদের প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে।
পূর্ব রাজাবাজারে একটি স্কুলের সামনে কথা হয় মাহবুবা নাসরিনের সঙ্গে। তিনি জানান, ছেলের স্কুলে আসতে প্রতিদিন কলাবাগান থেকে তিনি এই রাস্তায় যাওয়া-আসা করেন। পুরোটা রাস্তাই ঝাঁকুনি খেতে খেতে আসতে হয়। কখনো পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। অনেকটা বিরক্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘রাস্তা নিয়ে আর কী বলব? দেখতেই পাচ্ছেন কী অবস্থা!’
পূর্ব রাজাবাজারের পর পশ্চিম রাজাবাজার ও ইন্দিরা রোড ঘুরে দেখা গেল রাস্তার পাশাপাশি গলিতেও মাটি, পিচ, ও ইট রাস্তার ওপরেই স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারী ও বাসিন্দারা। এই এলাকায় নিয়মিত রিকশা চালান তারা মিয়া। তিনি বলেন, ‘রাস্তা ভালা না, ঝাঁকি লাগে। আমিও কষ্ট পাই, যাত্রীরাও দুঃখ পায়। বৃষ্টি হইলে পানি জইমা থাকে।’
পথচারী আমিন বলেন, ‘ এক মাস তো রাস্তা বন্ধই ছিল। সে সময় একদফা ভুগেছি। আর এখন তো নতুন উপদ্রব হচ্ছে ভাঙাচোরা রাস্তা। কী যে সমস্যা তা কি কর্তৃপক্ষ দেখে না?।’
এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান কাজটি দেখভাল করছেন। গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগেই যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটির দায়িত্ব পেয়েছে, সেটিতে তাঁর অংশীদারিও ছিল। তবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তা ছেড়ে দেন বলে জানান। তিনি বলেন, অংশীদারি ছেড়ে দিলেও এখন পর্যন্ত এক অর্থে তিনিই কাজটি দেখভাল করছেন।
রাস্তা সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আড়াই মাসের কাজ এক মাসে শেষ করেছি। আগে এই রাস্তায় পানি জমত। সেটি আমরা এমনভাবে ঠিক করছি, যাতে আর পানি না জমে।’ কাজের অগ্রগতি ও রাস্তার সংস্কারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পাইপলাইন বসানোর কাজ শেষ। এখন বর্ষা কমলে রাস্তা ঢালাই দেওয়ার কাজ শুরু হবে।’

Saturday, July 25, 2015

ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পারাপার, পথচারীদের পদচারী-সেতু ব্যবহারে আগ্রহ কম by মোছাব্বের হোসেন

বাংলামোটরে রাস্তা পারাপারের জন্য এপারে-ওপারে শতাধিক মানুষ। সবাই ট্রাফিক সংকেতের অপেক্ষায়। যেই সবুজ বাতি জ্বলল, অমনি পথচারীরা পারাপার হয়ে গেল। কিন্তু এর ওপরে থাকা পদচারী-সেতুটি প্রায় খালি। এই চিত্র রাজধানীর বেশির ভাগ পদচারী-সেতুর। প্রথম আলোর সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য সড়কের ওপর পদচারী-সেতু থাকলেও পথচারীরা তা ব্যবহার করছে না। ঝুঁকি নিয়ে সড়কের ওপর দিয়েই রাস্তা পারাপার হচ্ছে তারা। আর এতে নিয়মিত ছোট-বড় দুর্ঘটনা তো ঘটছেই, কখনো মানুষ গুরুতর দুর্ঘটনায় মারাও যাচ্ছে।
ট্রাফিক-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পথচারীদের পদচারী-সেতু ব্যবহারে আগ্রহ কম। এ ছাড়া রাজধানীর রাস্তায় যানজট বাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে এটি। যানজট ও দুর্ঘটনা কমাতে ট্রাফিক বিভাগ গত বছর পরীক্ষামূলকভাবে বাধ্যতামূলক পদচারী-সেতু ব্যবহারের নিয়ম করে। শুরুর কয়েক দিন পদচারী-সেতু ব্যবহার না করার কারণে কয়েকজনকে জরিমানাও করা হয়। কিন্তু বর্তমানে এ তৎপরতা আর দেখা যাচ্ছে না।
সরেজমিনে বাংলামোটর, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার আন্ডারপাস, শুক্রাবাদ, আসাদগেট, আজিমপুর, বুয়েট, খিলক্ষেত, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়াসহ মিরপুরের বিভিন্ন পদচারী-সেতু ঘুরে দেখা গেছে, পথচারীরা রাস্তার ওপর দিয়ে পার হচ্ছে বেশি আর পদচারী-সেতু ব্যবহার করছে কম।
সরেজমিনে ঈদের কয়েক দিন ধারাবাহিকভাবে বাংলামোটর পদচারী-সেতুতে গিয়ে দেখা গেছে, এতে তেমন লোকজনের যাতায়াত নেই। তবে এর নিচেই রাস্তা পারাপার করছে শত শত মানুষ। রাস্তা পারাপারের জন্য সংকেত বাতি জ্বললেই অপেক্ষমাণ মানুষ রাস্তা পারাপার হচ্ছে। অথচ সবুজ সংকেত বাতির জন্য পথচারীদের যে সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, এই সময়ে অনায়াসে পদচারী-সেতু দিয়ে পারাপার করা যেত। এভাবে রাস্তা পার হচ্ছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোস্তামিন বিল্লাহ। পদচারী-সেতু ব্যবহার না করে এভাবে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপারের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, পদচারী-সেতু ব্যবহারের অভ্যাস নেই তাঁর। এ ছাড়া তিনি দাবি করেন, রাস্তা দিয়ে পারাপারে কিছুটা ঝুঁকি থাকলেও এতে পদচারী-সেতু দিয়ে যাওয়ার থেকে সময় কম লাগে। একই স্থানে পদচারী-সেতু ব্যবহার না করে রাস্তা পার হচ্ছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন। তিনি বলেন, ‘আসলে পদচারী-সেতু দিয়েই পার হওয়া উচিত, হাতে সময় কম তো, তাই রাস্তা দিয়েই পার হলাম।’
এই স্থানে দায়িত্ব পালন করছিলেন ট্রাফিক সার্জেন্ট সারওয়ার ও শাহ আলম। সারওয়ার জানান, মানুষের পদচারী-সেতু ব্যবহারের আগ্রহ কম। পদচারী-সেতু ব্যবহার না করে রাস্তা দিয়েই পারাপারের প্রবণতা বেশি। যে সময় তারা সবুজ সংকেতের জন্য অপেক্ষা করছে, সেই সময়ই তারা অনায়াসে পদচারী-সেতু ব্যবহার করতে পারে। এতে দুর্ঘটনা এড়ানো যায় আর তাঁদের ওপর চাপ কম থাকে। এ ছাড়া পথচারী পারাপারের বিষয়টি আলাদা করে নজর দিতে হয় বলে তাঁদের অন্যান্য কাজেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বলে জানান তিনি।
শাহ আলম জোর দিলেন এই কারণে সৃষ্ট যানজটের কথায়। তিনি জানান, প্রতিবার সবুজ সংকেতের সময় মানুষ যেভাবে রাস্তা পারাপার হচ্ছে, তাতে বাড়তি ৩০ থেকে ৪০ সেকেন্ড অতিরিক্ত সময় লাগে। এতে আশপাশের অন্য পথের সংকেতের ওপর চাপ পড়ছে। আর এভাবেই সারা ঢাকা শহরের যানজট বাড়ছে। অথচ মানুষ যদি রাস্তা দিয়ে পারাপার না হয়ে পদচারী-সেতু ব্যবহার করত, তাহলে এই বাড়তি চাপ পড়ে না যানজটেও এর প্রভাব পড়বে না।
পদচারী-সেতু ব্যবহার না করার এমন চিত্র দেখা গেল শাহবাগেও। বিএসএমএমইউ হাসপাতালের সামনের পদচারী-সেতু থাকলেও সেখান দিয়ে যেসব মানুষ যাতায়াত করছে, তার থেকে তিন গুণ বেশি মানুষ রাস্তা দিয়ে পারাপার হচ্ছে। এখানের রাস্তা দিয়ে বারডেম হাসপাতাল থেকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের দিকে আসার সময় কথা হয় বেসরকারি চাকুরে মইনুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, পদচারী-সেতু দিয়ে পার হতে সময় বেশি লাগে। তাই এভাবেই রাস্তা পার হন। তিনি স্বীকার করেন, এভাবে রাস্তা পার হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। গত বছরের ২৬ নভেম্বর প্রথমবারের মতো পদচারী-সেতু ও পাতালপথ ব্যবহার না করে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করায় ৩৩১ জন পথচারীকে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ডিএমপির উদ্যোগে এই অভিযান চলে। ২০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানাও করা হয়।
ঢাকা মহানগর ট্রাফিক বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, পদচারী-সেতু ব্যবহার না করে পথচারীরা রাস্তা ব্যবহারের কারণে যানজট বাড়ে। তিনি জানান, ওভারব্রিজ ও পাতালপথ ব্যবহার না করলে জরিমানার ওই কার্যক্রম ছিল পরীক্ষামূলক ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য। এটি বন্ধ থাকলেও বর্তমানে ট্রাফিক বিভাগ নানাভাবে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে।
পদচারী–সেতুর নিচ দিয়ে এভাবেই পথচারীরা রাস্তা পার হয়ে থাকেন। ছবিটি শাহবাগ এলাকা থেকে তোলা l প্রথম আলো

Monday, July 20, 2015

ঢাকায় পাঁচ বছরে মোটরযান বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ by মোছাব্বের হোসেন

ঢাকায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন।
সৃষ্টি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট। ছবিটি হোটেল
রূপসী বাংলা মোড় থেকে তোলা l প্রথম আলো
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুসারে গত পাঁচ বছরে রাজধানীতে মোটরযান বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০০৯ পর্যন্ত রাজধানীতে মোটরযানের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখের বেশি আর চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এই সংখ্যা হয়েছে প্রায় নয় লাখ। বিআরটিএ সূত্র জানায়, নিবন্ধিত যানবাহনের বাইরে আরও কয়েক লাখ যানবাহন ঢাকায় চলাচল করছে। এর বেশির ভাগই মোটরসাইকেল ও স্থানীয়ভাবে নির্মিত হিউম্যানহলার বা লেগুনা।
বিআরটিএ ২০ ধরনের যানবাহনের হিসাব সংরক্ষণ করে। এর মধ্যে কার, স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল-এসইউভি (জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাসকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর বাস-ট্রাকসহ অন্য সব যানবাহন বাণিজ্যিক যানের আওতাভুক্ত।
বিআরটিএ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে শুধু তিন লাখ গাড়ি চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ গাড়ি পার্কিং ও চলাচলের পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় ঢাকার যানজট দিনে দিনে বাড়ছে।
বিআরটিএ সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ছিল, ৫ লাখ ১৬ হাজার ৯১২টি। ২০১০ সালে ৭৬ হাজার ১৬৫টি গাড়ি নিবন্ধিত হয়েছে। ২০১১ সালে নিবন্ধিত হয় ৭২ হাজার ৯৪৭, ২০১২ সালে ৫৯ হাজার ৫৭৩, ২০১৩ সালে ৫৪ হাজার ৪৯২, ২০১৪ সালে ৭৩ হাজার ৫১ এবং সর্বশেষ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছে ৪৩ হাজার ৫৩টি গাড়ি। সর্বমোট নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৯৬ হাজার ১৯৩টি।
বিআরটিএ সূত্র জানায়, রাজধানীতে মোটরসাইকেলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩২৪টি। এরপর বেশি নিবন্ধিত হয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি, যার সংখ্যা ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৮৯টি।
শহরের যানজট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক বলেন, রাজধানীতে বিআরটিএ যেভাবে গাড়ির নিবন্ধন দিয়েই যাচ্ছে তা অবৈজ্ঞানিক। ঢাকায় যত গাড়ি চলছে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এর মাধ্যমে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে কোনো সমন্বয় থাকছে না তাই যানজট বাড়ছেই। লোকজন ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে তখনই ছুটছেন, যখন তাঁরা গণপরিবহনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। গণপরিবহন উন্নত হলে ব্যক্তিগত গাড়ির এত চাহিদা থাকত না। এতে যানজট কিছুটা হলেও কমে যেত। এই পরিবহন বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, এমন পরিস্থিতি থেকে একদিনে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। এর জন্য কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে হবে। বছরে কী পরিমাণ জোগান আছে সে অনুসারে গাড়ির নিবন্ধন করাতে হবে। যানবাহনের ঢালাও নিবন্ধন করতে দেওয়া যাবে না। গণপরিবহনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। সড়কে চলতে লোকজন যখন বিকল্প গণপরিবহন বা অন্যান্য যানবাহন পাবেন, তখন গাড়ি কিনতে নিরুৎসাহিত হবেন।
এ সম্পর্কে বিআরটিএর প্রকৌশল বিভাগের উপপরিচালক সিতাংশু শেখর বিশ্বাস বলেন, একটি শহরে যেখানে যানবাহনের চলাচল ও ব্যবস্থাপনার জন্য ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সড়ক দরকার সেখানে ঢাকায় আছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। ফলে যানজট হবে এটাই স্বাভাবিক। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় লোকজন সড়কের ওপরই গাড়ি রাখছেন, যা যানজট বেড়ে যাওয়ার বড় একটি কারণ।

Saturday, July 18, 2015

‘এখন মইরাও শান্তি’- ঈদে ছিটমহলবাসীদের চোখে-মুখে আনন্দের দ্যুতি! by মোছাব্বের হোসেন

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় উত্তর গোতামারি ১৩৫ / ১ নম্বর ছিটমহলের বাসিন্দা মহির আলী (৪০)। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত চুক্তির পর প্রথমবারের মতো ঈদ করলেন আজ শনিবার। তাঁর চোখে-মুখে যেন আনন্দের দ্যুতি! বলছিলেন, ‘এত দিন মানুষ কইতো ছিটের লোক। ঈদ করছি ছিটে। এইবার নিজের দেশে নিজের মাটিতে ঈদ করলাম, এর চায়া আলন্দের (আনন্দের) আর কী হইতে পারে! কী যে শান্তি লাগতেছে তা খালি আমি বুজি’। মহির আলীর স্ত্রী আয়েশা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, আনন্দ আর কী করমো? এরপরও কলিজার মধ্যে শান্তি লাগতেছে যে, হামার দেশের মাটিতেই ঈদ করবার পাইলাম।’
পরিবারের সঙ্গে প্রবীণ ছকবর আলী (৮৭) ও তাঁর স্ত্রী আশরাফুনন্নেসা
উত্তর গোতামারি ছিটমহলটি ভারতের কোচবিহার জেলার শিতলকুচি থানার পাশাপাশি একটি গ্রাম। এখানের দুটি ছিটমহলে মোট প্রায় ১১১টি পরিবারের বসবাস। মহির আলীর পরিবারের মতো এখানকার অন্য পরিবারগুলোর মধ্যেও যেন একটু অন্য মাত্রায় ছড়িয়ে গেছে এবারের ঈদের আনন্দ। এবারই তাঁরা প্রথম পেলেন দেশের মাটিতে ঈদ উদ্‌যাপনের স্বাদ।
ছিটমহলের নানা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন প্রবীণ ছকবর আলী (৮৭)। তাঁর কাছেও এবারের ঈদ অন্যবারের চেয়ে আলাদা। অকপটে বললেন মনের মধ্যে জমে থাকা আনন্দের কথাগুলো। ‘আগে ঈদ আসতো, ঈদ যাইতো। মনের মধ্যে কষ্ট লাগতো পরের মাটিতে থাকি। এইবার ঈদ আইসার আগে কয়দিন থাকি মনে আলন্দ, দেশে পরথম ঈদ করব। দেশের মাটিতে ঈদ করবার পায়া আজকে অনেক ভালো লাগতেছে।’ তিনি বলেন, ‘অনেক আন্দোলন করছি, মনে হইছে বাপ-চাচার মতো আমাকেও পরের মাটিতে মরবার লাগবো। কিন্তু চুক্তি হওয়ার পর মনে অনেক শান্তি। এখন মরলেও শান্তি।’ ছকবর আলী বলেন, তাঁর অনেক আত্মীয়-স্বজন ভারতে থাকলেও তিনি এই দেশেই বড় হয়েছেন। আর এই ভিটে ছেড়ে যেতে চান না কখনো। বললেন, ‘সোনা দিয়া মোড়াইলেও এই দেশ থেকে যামো না, ভিক্ষা করি খামো তাও এটে মরবর চাই।’ ঈদে কেমন লাগছে জানতে চাইলে তাঁর স্ত্রী আশরাফুন্নেসা বলেন, ‘অনেক আলন্দ লাগছে, এমন আলন্দ আগে পাই নাই।’
পরিবারের সঙ্গে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার উত্তর গোতামারি ১৩৫ / ১ নম্বর ছিটমহলের বাসিন্দা মহির আলী।
এদিকে, এবারের ঈদের আনন্দ ও বেদনা দুটোই সমানভাবে ছুঁয়ে গেছে উত্তর গোতামারি ১৩৬ / ২ নম্বর ছিটমহলের বাসিন্দা কামাল হোসেনকে। ছয় মাস আগে তাঁর বাবা আবুল হোসেন মারা যান। তিনি ছিলেন ছিটমহল আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। তিনি দেখে যেতে পারলেন না তাঁদের আন্দোলনের ফল। আবুল হোসেনের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ছিটমহলে কবর না দিয়ে পরিবার তাঁর কবর দিয়েছে বাংলাদেশের মাটিতে স্থানীয় ঈদগাহ মাঠের পাশে। কামাল হোসেন বলেন, ছিটমহলে এটাই প্রথম ঈদ বলে ভালো লাগছে, আনন্দ লাগছে। কিন্তু বাবা এই ঈদটা দেখে যেতে পারলেন না বলে দুঃখও লাগছে।
আছর উদ্দিন নামের ৮০ বছরের এক বৃদ্ধা ঈদের আনন্দ অনুভূতি ব্যক্ত করলেন এভাবে, ‘নিজের দেশে, নিজের মাটিতে ঈদ করলাম। আজকে অনেক দিনের আশা পূরণ হইলো।’

Friday, July 17, 2015

ঘরমুখোরা ব্যাকুল, গাড়ি চলে না চলে না... by মোছাব্বের হোসেন

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গতকাল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটা থেকে আজ শুক্রবার সকাল নয়টা পর্যন্ত তীব্র যানজট ছিল। দুপুর ১২টার দিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সেখানে থেমে থেমে যানবাহন চলছে। মহাসড়কে গাজীপুরের কোনাবাড়ি থেকে চন্দ্রা হয়ে কালিয়াকৈর পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার এবং কালিয়াকৈর-নবীনগর সড়কে চন্দ্রা থেকে জিরানী পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় যানজট রয়েছে। এতে যাত্রীরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত চন্দ্রা থেকে মির্জাপুরের কুর্নি পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার এলাকায় চন্দ্রা, কালিয়াকৈর, গোড়াই, ধেরুয়া রেলক্রসিং, দেওহাটা, মির্জাপুর, শুভুল্যা, কদিম ধল্যা, পাকুল্যা, নাটিয়াপাড়া ও করটিয়া বাসস্টেশনে থেমে থেমে যানবাহন চলছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকা থেকে আজ শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে তোলা ছবি। ছবি: প্রথম আলো
যানজটে আটকা পড়া ঢাকা থেকে বগুড়াগামী বাসের চালক মহর আলী (৩৫) বলেন, ‘গতকাল রাত আটটার দিকে ঢাকার মিরপুর থেকে রওনা হন। সকাল আটটায় চন্দ্রা পৌঁছান। এত দীর্ঘসময় তাঁরা যানজটেই ছিলেন।’
ঠাকুরগাঁওগামী হানিফ পরিবহনের চালক আব্দুল মন্নাফ বলেন, গাবতলী থেকে বাস ছেড়েছিল গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টায়। গোটা রাস্তায় ছিল ছাড়া ছাড়া যানজট। রাত তিনটার দিকে গাড়িটি সাভারের নবীনগরের বড়াইবাড়ি এলাকায় এসে থেমে যায়। সেখানেই সকাল নয়টা পর্যন্ত তীব্র যানজট চলছে। তিনি বলেন, ‘গাড়ি আগায় না, পুরা রাস্তা জ্যাম।’
ঢাকা থেকে বুড়িমারীগামী বাস শুভ বসুন্ধরার চালক মোহাম্মদ সোলেমান বলেন, তিনিও গতকাল রাত পৌনে ১০টার দিকে গাবতলী থেকে বাস ছেড়েছিলেন। স্বাভাবিক নিয়মে বাস চললে আজ ভোর পাঁচটার মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছার কথা। যানজটের কারণে সকাল আটটা পর্যন্ত চন্দ্রায়ই বসে আছেন।
তীব্র যানজটের কারণে স্থবির হয়ে আছে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক। মাঝে-মধ্যে গাড়ি চললেও তা চলছে ধীর গতিতে। বৃষ্টি আর কাদাপানিতে যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। চালকেরা বলছেন, কাদাপানিতে সড়কের অবস্থা খারাপ হওয়ায় গাড়ি ধীর গতিতে চালাতে হচ্ছে।
বৃষ্টিতে রাস্তায় কাদা। তাতে যানজট আরও বেড়েছে। ছবিটি ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস থেকে আজ শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে তোলা। ছবি: প্রথম আলো
গরমে অতিষ্ঠ অনেক যাত্রী বাস থেকে নেমে এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে। পোশাকশ্রমিক আবু যাবেন গাইবান্ধায়। যানজটে হতাশ তিনি। সকাল নয়টার দিকে তিনি বলেন, ‘ঈদের পরদিন চইলা আসতে হইব। রাস্তায়ই যদি একদিন থাকা লাগে, তাইলে কখন যামু আর কখন আসমু।’
ঢাকা লালমনিরহাটে যাবেন সৌরভ। যানজটে ক্ষুব্ধ তিনি। তাঁর কথা, ‘ঈদের আগে যোগাযোগমন্ত্রী বলেছিলেন, মহাসড়কে যানজট থাকবে না। কই, তাঁর কথা তো সত্যি হলো না।’
মির্জাপুরের ট্রাফিক পরিদর্শক সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘পোশাক কারখানা ছুটির পর শ্রমিকেরা বাড়ির দিকে রওনা হওয়াতে যানবাহনের চাপ বাড়ে। এ ছাড়া কয়েকটি স্থানে যানবাহন বিকল হওয়ার পাশাপাশি চালকেরা এলোপাতাড়ি যানবাহন চালানোর কারণে যানজট লাগে। আজ সকাল থেকে যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল শুরু হয়েছে।’
গাজীপুরের কোনাবাড়ি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু দাউদের ভাষ্য, বৃষ্টির কারণে রাস্তা কর্দমাক্ত হওয়ায় যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছে না। এতে থেমে থেমে যানজট লাগছে।

Monday, July 13, 2015

নিয়ম না মানাটাই যেন নিয়ম by মোছাব্বের হোসেন

আইনের তোয়াক্কা না করে উল্টো পথেই চলছে গাড়ি।
রূপসী বাংলা হোটেলের মোড়ে ছবিটি তুলেছেন সাজিদ হোসেন
বাংলামোটর এলাকার ব্যস্ত সময়। রাস্তায় যানজট। এরই মধ্যে কয়েকটি মোটরসাইকেল ফুটপাতে উঠে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ছোট হয়ে আসা ফুটপাতের পথচারীরা এতে বিরক্ত হচ্ছেন। ফুটপাত দিয়ে মোটরসাইকেল চালানো বেআইনি—এটা তিনি জানেন কি না জিজ্ঞেস করতেই এক চালক খেঁকিয়ে বলে উঠলেন, ‘আমার আগে যেতে হবে, কাজ আছে। আপনার জ্ঞান শোনার সময় নাই।’ গত সোমবারের ঘটনা। এ রকম ঘটনা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাতেই নিয়মিত ঘটছে।
প্রচণ্ড যানজটে মানুষের যখন হাঁসফাঁস অবস্থা, তখন ‘বিশেষ ব্যক্তিরা’ উল্টো পথে চলে যান। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান, জ্বালানিসচিব আবু বকর সিদ্দিক নিয়ম লঙ্ঘন করে উল্টো পথে গাড়িতে চড়ে যাচ্ছেন।
বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে উল্টো পথে গাড়ি চালানো, ফুটপাতের ওপর মোটরসাইকেল চালানো, যত্রতত্র বাস থামানো, গাড়ি পার্কিং, প্রধান সড়কে রিকশা চালানোসহ নানাভাবে নিয়ম ভাঙা হচ্ছে। আর এসবের সঙ্গে আছে পথচারীদের যত্রতত্র রাস্তা পারাপার, চলন্ত গাড়ির সামনে হাত দেখিয়ে রাস্তা পার হওয়া, ফুটওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস ব্যবহার না করাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
গত রবি ও সোমবার মিরপুর, শ্যামলী, কল্যাণপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ গণপরিবহনই রাস্তার বিভিন্ন অনির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে লোক নিচ্ছে। যাত্রী না পেলে দাঁড়িয়েই আছে। এতে পেছনে যে যানজট তৈরি হচ্ছে, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। আবার বড় বড় একাধিক বাস রাস্তার মাঝে এমনভাবে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামার কাজ করছে যে পুরো রাস্তাটাই আটকে যাচ্ছে।
ঢাকার বিভিন্ন রাস্তা, অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে গাড়ি পার্ক করার নিয়ম না থাকলেও মানুষ এসব স্থানে তা করছেন। এর ফলে যানজট তৈরি হচ্ছে। মানুষের ভোগান্তি চরমে উঠছে।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বাংলামোটর এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক সার্জেন্ট শাহ আলম বলেন, ‘কিছু কিছু বিষয়ে আমাদের ছাড় দিতে হয়। এ জন্য অনেক সময় উল্টো পথে গাড়ি চলতে দিই।’ তবে ফুটপাতে মোটরসাইকেল যাতে না চলে, সে জন্য ট্রাফিক বিভাগ অভিযান চালাচ্ছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষের ভেতর এখনো আইন মানার সংস্কৃতিটাই পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি। সবার মধ্যেই আইন ভাঙার প্রবণতা।’
নিয়ম না মানার এ সংস্কৃতি প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বলেন, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা যখন আইন লঙ্ঘন করছেন, সেটাই সাধারণ মানুষের মধ্যে একধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং তাঁরা সেটাই অনুকরণ করার চেষ্টা করেন। এ ছাড়া আইনপ্রণেতারা যখন আইন ভঙ্গ করছেন, সেটা সাধারণ মানুষ অনুকরণ করেন।

Thursday, July 9, 2015

পানির সমস্যায় নাকাল উত্তর কাজীপাড়ার একাংশ by মোছাব্বের হোসেন

পানি সংগ্রহ করছেন উত্তর কাজীপাড়ার
কয়েকজন বাসিন্দা l ছবি: প্রথম আলো
‘দ্যাড় মাস ধইরা পানির সমস্যা। অন্যের বাড়ি গিয়া গোসল করি, কাপড় ধুই। খাইবার পানি ঠিকমতো পাই না। রোজার মইদ্যে কী যে কষ্ট হইতাছে, বইলা বুঝাইতে পারমু না। সব কষ্ট সহ্য করতে পারি, পানির কষ্ট সহ্য হয় না।’
দুই হাতে দুটি খালি বালতি নিয়ে এভাবে নিজেদের দুর্ভোগের কথা বলছিলেন রাজধানীর উত্তর কাজীপাড়ার প্যারিস ফার্নিচার গলির বাসিন্দা ইশরাত জাহান।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উত্তর কাজীপাড়ার চারটি গলি ঘুরে দেখা গেছে, মোড়ে মোড়ে আর বাড়ির সামনে অনেকেই খালি বালতি-কলস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁরা ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে করে ওয়াসা থেকে সরবরাহ করা পানির জন্য অপেক্ষা করছেন।
পানির সমস্যা নিয়ে কথা হয় উত্তর কাজীপাড়া বাড়ি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের সঙ্গে। তাঁর দাবি, ওয়াসা এই এলাকায় (জোন: ১০) নতুন করে পানির লাইনের কাজ শুরু করার সময় প্রায় ৫০০ বাড়ির পানির লাইনে ত্রুটি দেখা দেয়। এতে ব্যবহারের অযোগ্য নোংরা পানি আসা শুরু করে। কিন্তু নতুন করে লাইন সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সমস্যার সমাধান চেয়ে বিভিন্ন সময়ে মৌখিক অনুরোধের পাশাপাশি এলাকার সাংসদ কামাল আহমেদ মজুমদার ও ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেউ সমস্যা সমাধানের জন্য এগিয়ে আসেননি।
জাকির হোসেন আরও বলেন, এলাকাবাসীর চাপে পাঁচ দিন ধরে ওয়াসা পানির বড় গাড়িতে পানি সরবরাহ করছে। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ গাড়ি করে পাওয়া গেলেও তা চাহিদার তুলনায় কম।
এলাকাবাসী জানান, পানির সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁরা গত রোববার রাত একটার দিকে কাফরুল থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন। থানা কর্তৃপক্ষ ওয়াসার ওই জোনের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ডাকেন। পরে তিন দিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলে এলাকাবাসী ফিরে যান।
এই এলাকার বাসিন্দা মাহবুবুল আলম খান বলেন, ‘কী যে একটা মানবেতর জীবন যাপন করছি, বলে বোঝাতে পারব না।’ এই এলাকার বাড়ির মালিক গোলাম সারওয়ার বলেন, ‘পানির কষ্ট সহ্য করতে না পাইরা আমার ছয়টা ভাড়াটিয়া চইল্যা গেছে। আরও দুজন যাইব বইলা হুমকি দিছে। আমি তো আর ওদের আটকায়া রাখতে পারি না।’
এলাকার বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান জানালেন, তাঁদের বিক্ষোভের পর ওয়াসার ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে পানি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তা খুবই অল্প পরিমাণে। আর এই পানি সংগ্রহ করছেন বেশির ভাগই নিচতলার বাসিন্দারা। এ ছাড়া ওপরের তলার বাসিন্দারা পানি পাচ্ছেন না।
রওশন আক্তার (৫০) বলেন, ‘রোজার মাসে পানির যে কষ্টটা করতেছি, তা ওয়াসার লোকজন দেখতেও আসে নাই।’ তিনি জানান, ঠিকমতো পানি না পাওয়ার কারণে তাঁর পরিবারের প্রায় সবারই বিভিন্ন সময়ে পেটের অসুখে ভুগতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ওয়াসার জোন ১০-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল মোতালেব বলেন, সমস্যা সম্পর্কে তিনি অবগত। তবে তিনি দাবি করেন, সমস্যাগ্রস্ত বাড়ির সংখ্যা হাতে গোনা। এটি সমাধানের জন্য কাজ চলছে।
এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডভুক্ত। পানির সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করছেন বলে জানালেন এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হুমায়ুন রশিদ। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওয়াসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা এক দিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ শুরু করবে বলে জানিয়েছে।’

Sunday, June 21, 2015

সবজি থেকেই সব পেয়েছেন বাসার by মোছাব্বের হোসেন

গুলশানে নিজের দোকানে কাজে ব্যস্ত বাসার l প্রথম আলো
অন্যের সবজির দোকানে কাজ করতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের আবুল বাসার (৪৫)। আয় বলতে বেতনটাই সম্বল। সে অবস্থা থেকে বুদ্ধি আর পরিশ্রমের জোরে আজ তিনি কোটিপতি। বাসারের ভাগ্য বদলেছে সবজি দিয়েই। তবে দেশি নয়, বিদেশি জাতের। তাঁর মতো আরও অনেকেই সাফল্য পেয়েছেন স্থানীয় বাজারে ‘চায়না সবজি’ নামে পরিচিত এ রকম বিদেশি সবজি চাষ করে।
ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে বিদেশি সবজির বড় বাজার তৈরি হচ্ছে। চায়নিজ রেস্তোরাঁগুলো এর বাণিজ্যিক ক্রেতা। পাশাপাশি ভোজনরসিক সাধারণ মানুষের মধ্যেও আগ্রহ বেড়েছে এই ভিনদেশি সবজির প্রতি। সুপ, সালাদ ও চীনা বিভিন্ন পদের খাবার তৈরিতে এসব সবজির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
নবীনগরের লাউর ফতেহপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবুল বাসারের বাবা নূরুল ইসলাম ১৯৮৫ সালে মারা যান। বাসারের বয়স তখন মাত্র ১৫। বড় ছেলে হওয়ায় তাঁর কাঁধেই সংসারের বোঝা চাপল। সিদ্ধান্ত নিলেন পড়াশোনায় ইতি টেনে বিদেশে পাড়ি জমাবেন। কিন্তু রিক্রুটিং এজেন্সি টাকা নিয়ে অফিস গুটিয়ে কেটে পড়ে। বাসারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। কিন্তু দমলেন না। ঢাকায় এসে গুলশানের সিটি করপোরেশনের কাঁচা বাজারে এক সবজির দোকানে চাকরি নিলেন। ওই বাজারে অনেক বিদেশি ক্রেতা আসতেন বলে দোকানের মালিক দেশির পাশাপাশি কিছু বিদেশি সবজিও রাখতেন। এখানেই বিদেশি সবজি সম্পর্কে ধারণা পান বাসার। পাঁচ থেকে ছয় মাস কাজ করার পর তিনি ঠিক করলেন নিজেই ব্যবসা শুরু করবেন।
১৯৮৭ সালে সিটি করপোরেশনের কাঁচাবাজারেই ছোট্ট একটি দোকান নিলেন বাসার। শুরু করলেন নিজের ব্যবসা। এরপর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সাফল্যের পথ বেয়ে আজ গুলশানের বাসার এগ্রো ফুড প্রোডাক্টস নামের দোকানের মালিক তিনি। সম্প্রতি সেই দোকানে বসেই আজকের অবস্থানে আসার গল্প শোনালেন তিনি।
বাসার জানালেন, নিজে দোকান শুরুর পর ধীরে ধীরে সবজির চাহিদা বাড়তে থাকল। তখন গাজীপুরের কাশিমপুরের বিএডিসি এগ্রো সার্ভিস সেন্টারে ছোট পরিসরে চীনা সবজির চাষ হতো। তাঁর আগের দোকানের মালিক সেখান থেকেই সবজি কিনতেন। তিনি নিজেও সেখান থেকেই সবজি আনতেন। পরিবহন খরচ বেশি দেখে একসময় নিজেই চাষের উদ্যোগ নেন। ঢাকার আশপাশে সুবিধা না হওয়ায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গিয়ে ১২ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে সবজি চাষ শুরু করলেন। ঢাকায় থেকে তত্ত্বাবধান করতেন চাষ। প্রথমবারই ফলন বেশ ভালো হলো। আর তা বাড়তেই থাকল বছর বছর। সেখান থেকে সবজি চলে আসত ঢাকায়।
সফল এই উদ্যোক্তা জানান, ১৯৯০ সালের শুরুতে তিনি ঢাকার বড় চায়নিজ রেস্টুরেন্টগুলোতে সবজি সরবরাহ করতে থাকেন। বগুড়া শহরেও কিছু দোকানে সরবরাহ করতেন। দিনে দিনে ব্যবসার পরিধি বাড়ে। তাঁর ভাষায়, ‘শুরুর দিকের ওই সময়টা ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক বিদেশি আমার দোকান থেকে সবজি কিনতেন। সবজি যখন তাঁদের মনমতো হতে থাকে, তখন আমার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসাও বাড়তে থাকে।’
মাঝে গাইবান্ধা ছাড়াও দুই পর্যায়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে সবজি চাষ করেছেন বাসার। বর্তমানে সাভারের হেমায়েতপুরের দক্ষিণে মুসরিখোলা ও গাজীপুরের বাঘেরবাজারের জলপাইতলায় চীনা সবজির দুটি প্রকল্প আছে বলে জানালেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন ধরনের চীনা সবজি চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাপসিক্যাম, চায়নাপাতা, লিকপাতা, চাংচিং ওনিয়ন, লাল বাঁধাকপি, পার্সলি, বেবিকর্ন, সুইটকর্ন, বিট রুট, আইসবার্গ লেটুস, চেরি টমেটো, ব্রকোলি, লেমন গ্রাস, থাই জিনজার, থাই তুলসীপাতা, মাশরুম প্রভৃতি। এই দুই প্রকল্প ছাড়াও ঢাকা ও বগুড়ার দুজন চাষি তাঁর কাছে অর্থ ও বীজ নিয়ে বিদেশি সবজির চাষ করছেন।
বাসার জানালেন, তাঁর এই অবস্থানে আসতে একটি চেইনশপেরও ভূমিকা আছে। লোকমুখে শুনে ২০০১ সালে ওই চেইনশপ কর্তৃপক্ষ তাঁকে খুঁজে বের করে। তাঁর উৎপাদিত সবজির একটা বড় অংশ ওই চেইনশপ কিনে নিতে থাকে। পরে ওই প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে এই সবজি চাষ ও সংরক্ষণের বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেয়। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ থেকে তিনি নিজের উদ্যোগে সবজি জীবাণুমুক্ত করে বাজারজাত করার কৌশল শেখেন। বিদেশি সবজি চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞান তিনি অন্য চাষিদেরও শেখাচ্ছেন।
বাসারকে অনেক দিন ধরে চেনেন গুলশান সিটি করপোরেশন মার্কেটের চেয়ারম্যান শের মোহাম্মদ। তিনি বললেন, ‘২৫ বছর ধরে চিনি বাসারকে। কষ্ট করেই সে ভাগ্য বদলেছে।’ বাসারের দেওয়া বীজ দিয়ে চাষ করেই গত আট বছরে অবস্থা ফিরিয়েছেন ঢাকার খিলক্ষেতের গৌরনগরের চাষি আক্তার হোসেন। তিনি বলেন, ‘বাসারের সঙ্গে ব্যবসা করে আমার অভাব দূর হইছে।’
কথা হলো বাসারের গুলশানের দোকানে সবজি কিনতে আসা এক চীনা তরুণীর সঙ্গে। জেং নামের মেয়েটি জানালেন, চাকরির কারণে বেশ কয়েক বছর তিনি বাংলাদেশে আছেন। নিয়মিত এখান থেকে সবজি কেনেন। নিজের দেশের নানা ধরনের সবজি এখানে পাওয়া যায় বলে তিনি বেশ খুশি।
বাসার কখনো কোথাও থেকে ঋণ নেননি। তাঁর ভাষায়, পুঁজি বলতে ছিল কঠোর পরিশ্রম ও লেগে থাকার মানসিকতা, সততা আর কথা দিয়ে কথা রাখা। এই পুঁজি নিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়েছেন। এখন গুলশানে সিটি করপোরেশন মার্কেটে তাঁর নিজের দোকান দুটি। আরও দুটি ভাড়া নিয়েছেন। এগুলোতে দেশি সবজি, ফলও বিক্রি করেন। তাঁর প্রকল্পগুলোতে স্থায়ী কর্মী ৪০ জন।
বাসার বলেন, প্রতিদিন ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকার সবজির অর্ডার পান তিনি। সুপারশপ আগোরা, ল্যাভেন্ডার, ইউনিমার্ট তাঁর কাছে নিয়মিত বিদেশি সবজি নেয়। এ ছাড়া রাজশাহী, বগুড়া, সিলেটসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাঁর কাছ থেকে নিয়মিত এই সবজি কেনেন। ব্যবসার আয় থেকে জমি কিনেছেন। সন্তানদের ভর্তি করিয়েছেন ভালো স্কুলে। একটু আবেগপ্রবণ হয়েই বলেন, ‘নিজে তো বেশি দূর পড়তে পারি নাই, তাই ঠিক করছি সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ বানাব।’
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক এম এ রহিম বলেন, সাধারণত উঁচু জমিতে এ ধরনের সবজি ভালো হয়। এগুলো দ্রুত বর্ধনশীল। তিনি জানান শৌখিন মানুষের কাছে দিন দিন এই সবজি জনপ্রিয় হচ্ছে বলে বাজারে চাহিদাও বাড়ছে। এই সবজিগুলোর মধ্যে ক্যাপসিক্যাম, ব্রকোলি, লেটুসপাতা, বিট প্রভৃতির পুষ্টিগুণও ভালো।

Wednesday, May 27, 2015

‘লন লন, এক্কেরে মধুর মতো মিষ্টি...’ by মোছাব্বের হোসেন

লিচুর লালিমায় লোভনীয় হাতছানি। প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে রসে ভরা এই ফল নিয়ে হেঁকে যাচ্ছিলেন আমিনুল মিয়া, ‘লন লন, এক্কেরে মধুর মতো মিষ্টি! খাইয়া লন, মিষ্টি না হইলে টেকা ফিরত।’
গতকাল সোমবার রাজধানীর পুরানা পল্টনে এভাবেই ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে দেখা যায় আমিনুলকে (৪০)। জানালেন, এই লিচু পাবনার ঈশ্বরদী থেকে এসেছে। আকারে মাঝারি ও গায়ে লালটা একটু গাঢ়। প্রতি ১০০ লিচু বিক্রি করছেন ৩০০-৩৫০ টাকায়। তাঁর মতো আরও অনেকে এখানে রাস্তার পাশে লিচুর দোকান দিয়েছেন।
রাজধানীর স্থায়ী ফলের দোকান তো বটেই, রাস্তার পাশেও অনেকে বসে গেছেন লিচুর পসরা নিয়ে। সচিবালয়, বড় বড় বিপণিকেন্দ্র, ফুটপাত, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সামনে, সদরঘাট, রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনালগুলোতে এখন বিক্রি হচ্ছে নানান জাতের লিচু। দেখতে আকর্ষণীয় বলে এই ফল সহজে মানুষের নজর কাড়ে। আর স্বাদটাও এমন যে জিভের জল সামলানো দায়।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মৌসুমি ফলের মতো তাঁদের অনেকেই মৌসুমি বিক্রেতা। কয়েকজন লিচু বিক্রেতার তথ্যমতে, অন্যান্য বারের মতো এই মৌসুমে প্রথম লিচু আসে চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহের পর থেকে। শুরুতে লিচু আসছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে। কারণ সারা দেশের মধ্যে সেখানের লিচুই আগে পাকে। আকারে ছোট লাল রঙের এই লিচু প্রধানত রাজধানীর বাজারে বিক্রি হয় বেশি।
কারওয়ান বাজারের লিচু বিক্রেতা জাহাঙ্গীর মিয়া ঈশ্বরদীর ১০০টি লিচু ৩০০ ও দিনাজপুরের লিচু ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি করছিলেন। তাঁর তথ্যমতে, সোনারগাঁয়ের পরপর ঈশ্বরদী ও রাজশাহীর লিচু বাজারে আসতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে ময়মনসিংহ, মেহেরপুরের লিচুও চলে আসে। তবে সবার শেষে আসবে দিনাজপুরের লিচু। তিনি বলেন, ‘লিচু এমনই এক ফল, মানুষ দ্যাখলেই কেনে। নিজেরা খায়, আবার অন্য মানুষেরে খাওয়ায়, গিফট দেয়।’
লিচু দেখে লোভ সামলানো দায়। ছবিটি রাজধানীর পুরানা
পল্টন এলাকা থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা
মতিঝিলের দৈনিক বাংলা মোড়ের বিক্রেতা আলম মিয়ার ভাষ্য, ‘এইডা অল্প সময়ের ফল। লিচু দ্যাখতে দ্যাখতেই ফুরায় যায়। এই দ্যাখবেন আছে, এই নাই।’
বিক্রেতাদের ভাষ্য, দিনাজপুরের লিচুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আকারেও এই জেলার লিচু বড়। বীজ ছোট ও বড় আঁশের এই লিচুর নাম সারা দেশে। অনেকে দিনাজপুরের বেদানা লিচুর নাম করেন। রসিকতা করে বলেন, ‘টাকা দিয়েও যেখানে মন গলে না, সেখানে মানুষ এই জাতের লিচু উপহার বা উপঢৌকন নিয়ে যান। ব্যস, কাজ হয়ে যায়।’
লিচু কিনতে গিয়ে ক্রেতার হয়রানিতে পড়ার দৃশ্যও গতকাল চোখে পড়েছে। দুপুরে গুলিস্তানে এক তরুণী লিচুর দোকানের সামনে যেতেই বিক্রেতা লিচুর থোকা থেকে লিচু ছিঁড়ে দিলেন তাঁর হাতে। তিনি দাম জানতে চাইতে না চাইতেই আবার সেই লিচুর চামড়াও তুলে তাঁকে চেখে দেখতে বললেন। তরুণী সেটি না খেয়ে দাম শুনে চলে যেতে চাইলে বিক্রেতা কটু কথা বলতে শুরু করলেন। তরুণী রেগে গিয়ে বলেই ফেললেন, ‘আপনাকে লিচু ছিঁড়তে বলছিল কেউ?
হাতিরপুল থেকে লিচু কিনছিলেন ধানমন্ডির বাসিন্দা আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আত্মীয়দের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। খাবার শেষে ফল হিসেবে লিচু পরিবেশন করা হবে। এ ছাড়া আমাদের বাড়িতেও সবাই লিচু খুব পছন্দ করে।’
লিচু বিক্রেতারা জানান, আরও ১৫-২০ দিন লিচুর সরবরাহ থাকবে বেশি। এরপর আস্তে আস্তে কমতে থাকবে। সেই হিসেবে বলা যায়, আরও ২০-২৫ দিন লিচুর দেখা মিলবে রাজধানীর বাজারগুলোতে।
লিচুর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা আখতারুন নাহার বলেন, ‘লিচু খুব বেশি দিন থাকে না। অল্প দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। লিচুতে পানির পরিমাণ বেশি থাকে। প্রতি ১০০ গ্রাম লিচুর মধ্যে ৬১ ক্যালরি। এ ছাড়া শর্করা ১৩ দশমিক ৬ গ্রাম, ক্যালসিয়াম ১০ মিলিগ্রাম, ভিটামিন সি ৩১ মিলিগ্রাম থাকে। তিনি বেলন, লিচু একদম ছোট বাচ্চাকে খাওয়ানো ঠিক নয়। তিন বছর বয়স পর্যন্ত শিশু এটি না খেলেই ভালো। কেননা লিচু সহজে হজম হয় না। এটি বেশি খেলে বড়দেরও বদহজম হতে পারে।