Monday, January 20, 2014

৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে আসল বিজয়ী বিএনপি by আনিসুর রহমান @সুইডেন থেকে

শিরোনামটা দেখে অনেকেই দেখে চমকে উঠবেন কিংবা ভ্র-কুঁচকাবেন। এটাই স্বাভাবিক। আওয়ামী খোলসে বাকশালী জোট ৫ই জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনের নাম ভাঙ্গিয়ে ক্ষমতা দখল করে যেখানে সরকার পর্যন্ত গঠন করে ফেলেছে সেখানে বিএনপি এতে বিজয়ী হয়েছে বললে কারও কারও কাছে তা হাস্যকরও মনে হতে পারে।

রূপসী রহস্যময়ী রমণী by সাযযাদ কাদির

তাঁর রূপের যেমন তুলনা নেই, তেমন নেই রহস্যের অন্ত। কি তাঁর আসল নামধাম পরিচয়- কিছুই বলা যায় না নিশ্চিত করে। নিজেকে নিজেই বদলে, আড়াল করে চলেছেন জীবনভর। আর কি বিচিত্র সে জীবন!
কত ঘটনায়, কত কীর্তিতে যে ধাঁধানো সে বিস্ময়। কেউ বলেন, এই রূপসী রহস্যময়ীর নাম এডিথ অথবা ইথেল মড শিরান। পরে কোন কারণে এ নাম বদলে রাখেন এলিসা-মারিয়া। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে কখনও বলেছেন তাঁর জন্ম ১৯০৪ সালে বালটিক অঞ্চলে, কখনও বলেছেন বেলজিয়ামে, আবার বলেছেন স্কটল্যান্ডে। ফিনল্যান্ডের জেনারেল মানারহাইম-এর অবৈধ কন্যা বলেও পরিচয় দিয়েছেন তিনি। উত্তরসূরি দাবিদার দু’জন জানিয়েছেন, তাঁর জন্ম স্কটল্যান্ডের পার্থশায়ারের ডুনুন-এ। তবে তিনি বড় হয়েছেন এডিনবার্গে। সেখানকার স্কেরি’স সিভিল সারভিস কলেজ থেকে স্নাতক হয়েছেন ১৯২২ সালে। ইথেল দাবি করেছিলেন, এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন তিনি; তবে তাঁর বংশধরেরা সেখানে খুঁজে কোন প্রমাণ পান নি এ দাবির পক্ষে। দুই মহাদেশের বিচিত্র সব অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন ইথেল। প্যারিস থেকে আঙ্কারা, কলকাতা থেকে ইয়াঙ্গুন... আরও কত সব শহরে-জনপদে। এলিসা-মারিয়া নাম ধারণ করে সাংবাদিকতা করেছেন ফরাসি পত্রিকায়, ওই সূত্রে পরিচিত হয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক (১৮৮১-১৯৩৮)-এর সঙ্গে, থেকেছেন রাজধানী আঙ্কারায় তাঁর প্রাসাদে। গিয়েছেন মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনে, নিকটবর্তী ইনসেইন-এ বাস করেছেন ইংরেজ ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েল (এরিক আরথার ব্লেয়ার, ১৯০৩-১৯৫০)-এর সঙ্গে। সম্ভবত ছদ্মনাম ধারণে অভ্যস্ত ইথেলের প্রভাবেই ছদ্ম লেখক-নাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন এরিক। অনেক পরিক্রমার এক পর্যায়ে ইথেল পৌঁছেছেন কলকাতায়, পুলিশ কর্মকর্তা বারট্রাম ল্যাংফোর্ড-রি’র পত্নী হিসেবে। দু’বার হয়েছে তাঁদের বিয়ে। একবার এডিনবার্গে ১৯২৩ সালে, আরেকবার মিয়ানমারের মান্দালয়ে ১৯২৪ সালে। পরে থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন এলিসা-মারিয়া ল্যাংফোর্ড-রি। দীক্ষা নেন ত্রিরত্ন বুড্ডিস্ট কমিউনিটি’র প্রতিষ্ঠাতা সংঘরক্ষিত (ডেনিস ফিলিপ এডওয়ার্ড লিংউড)-এর কাছে। ইথেল বা এলিসা’র তৃতীয় বিয়ে সিকিমের রাজনীতিক কাজি লেনদুপ দোরজি খাংসর্প (১৯০৪-২০০৭)-এর সঙ্গে। বিয়ের পর তিনি পরিচিতি পান ‘কাজিনি সাহিবা’ নামে। তাঁর পুরো নাম হয় ‘কাজিনি এলিসা-মারিয়া ল্যাংফোর্ড-রি দোরজি খাংসর্প অভ চাকুং’। বিয়ের পর স্বামীকে তিনি সহজেই নিয়েছিলেন হাতের মুঠোয়। তাঁর বুদ্ধি পরামর্শ উপদেশ মেনেই চলতে হতো দোরজিকে। সিকিমের লোক দোরজিকে জানতো ধূর্ত রাজনীতিক হিসেবে, কিন্তু কাজিনি ছিলেন তাঁর চেয়ে শত গুণ ধূর্ত। কিছু দিন আগে বেগম খালেদা জিয়া এই লেনদুপ দোরজির নামই উল্লেখ করেছিলেন এক বক্তৃতায়। স্বাধীন রাজ্য সিকিমের সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ভারতের অঙ্গীভূত হওয়ার কলকাঠি নেড়েছিলেন এই দোরজি দম্পতিই। এই ঘটনা ‘সিকিমাইজেশন’ নামে পরিচিত রাজনৈতিক ইতিহাসে। বর্তমানে নেপালের রাজনীতিতে কথাটি বহুল উচ্চারিত। ১৯৪৭ সালে ভারতে যোগ দেয়ার পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট হয় সিকিমে। তখন বেশি ভোট পড়ে যোগ দেয়ার বিপক্ষে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু সম্মত হন সিকিমকে আশ্রিত রাজ্যের মর্যাদা দিতে। এ অবস্থায় সিকিম আসে ভারতের অধিরাজত্বের নিয়ন্ত্রণে। সিকিমের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন বজায় থাকলেও বৈদেশিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা, কূটনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা যায় ভারতের অধীনে। ১৯৫৩ সালে সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে গঠিত হয় রাজ্য পর্ষদ। কিন্তু সিকিম জাতীয় কংগ্রেস দল দাবি করে নতুন নির্বাচন, সেই সঙ্গে সিকিমে নেপালি জনগোষ্ঠীর অধিকতর প্রতিনিধিত্ব। ১৯৭৩ সালে সিকিমের চোগিয়াল (রাজা) পালদেন থোনদুপ নামগিয়াল (১৯২৩-১৯৮২)-এর প্রাসাদের সামনেই শুরু হয় ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গা। তখন আনুষ্ঠানিক ভাবে চোগিয়াল সাহায্য প্রার্থনা করেন ভারতের। ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী কাজি লেনদুপ দোরজি খাংসর্প ভারতীয় পারলিয়ামেন্টে আবেদন জানান, সিকিমকে ভারতের রাজ্য করা হোক। ওই বছরের এপ্রিল মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ নেয় রাজধানী গ্যাংটকের, নিরস্ত্র করে চোগিয়ালের প্রাসাদরক্ষীদের। এরপর গণভোটের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটানো হয় সিকিমে, আর অনুমোদিত হয় ভারতে যোগদান। ভারত সরকার এ যোগদানকে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে তুলে ধরলেও দেশে-বিদেশে এর বিরূপ সমালোচনা হয়েছে ব্যাপকভাবে। অভিযোগ করা হয়েছে, সিকিমে জাতিগত বিভাজনের সুযোগ নিয়েছে ভারত, গণভোটেও করেছে ব্যাপক জালিয়াতি। সিকিমাইজেশনের প্রত্যক্ষ বিবরণ রয়েছে প্রখ্যাত সাংবাদিক সুনন্দ কে. দত্ত-রায়ের ‘স্ম্যাশ অ্যান্ড গ্র্যাব: দি এনেক্সেশন অভ সিকিম’ (বিকাশ, নয়া দিল্লি, ১৯৮৪) বইটিতে। সেখানে রয়েছে রূপসী রহস্যময়ী রমণী কাজিনি সাহিবারও অন্তরঙ্গ বৃত্তান্ত। বইটির নতুন ট্রাঙ্কিউবার সংস্করণ প্রকাশের পথে বলে জানা গেছে।

বিএনপি ছেড়ে দিলেও জামায়াতের আপত্তি নেই by আহমেদ জামাল

বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব বাড়ছে। সামপ্রতিক কিছু ঘটনায় জামায়াত নেতারা মনে করছেন বিএনপির সঙ্গে তাদের মিত্রতা ভেঙে যেতে পারে। তবে নিজ থেকে জামায়াত জোট ভাঙবে না।
জামায়াত নেতারা মনে করছেন রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তন কিংবা  সুবিধা লাভের জন্য বিএনপি যে কোন উদ্যোগ নেয়ার এখতিয়ার রাখে। সে ক্ষেত্রে জামায়াতকে বাদ দিয়ে চলতে চাইলে চলবে। বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্বকে ইতিমধ্যে এমন ইঙ্গিত দেয়াও হয়েছে। উভয় দল স্থায়ী কোন চুক্তিতে আবদ্ধ নয় বলেও মনে করেন জামায়াতের নীতি-নির্ধারকরা। বিএনপি-জামায়াতের মিত্রতা নিয়ে সামপ্রতিক বিতর্কের প্রেক্ষাপটে দলটির সর্বস্তরে এমন মনোভাব তৈরি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট কৌশলগত’ ১০ই জানুয়ারি বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার এমন মন্তব্যের পর নড়েচড়ে বসে জামায়াত। তারা মনে করছেন বিএনপি যে কোন সময় জোট থেকে জামায়াতকে বাদ দিতে পারে। জামায়াত নেতারা বলেন, সত্যিকার অর্থে বিএনপি’র সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক কোন আদর্শিক নয়। রাজনৈতিক। এ ধরনের রাজনৈতিক সম্পর্ক নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের সঙ্গেও ছিল। তবে পরে  আওয়ামী লীগের দেশ পরিচালনা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড  আচরণসহ নানা কারণে সে সম্পর্ক ভেঙে যায়। নতুন ঐক্য গড়ে ওঠে বিএনপি’র সঙ্গে। শিবিরের রাজনীতি ছেড়ে জামায়াতে যোগ দেয়া এক নেতা বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এ সরকারের পতন। তবে গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে নির্যাতিত নিপীড়িত জামায়াত-শিবির সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি আছে কি নেই তা না দেখে নিজের প্রয়োজনে যে কোন কৌশলে সক্রিয় থাকবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির সামপ্রতি সৃষ্ট দূরত্ব ও মান অভিমানের প্রভাব ইতিমধ্যে পড়তে শুরু করেছে রাজনীতির মাঠে। বিশেষ করে জামায়াত-বিএনপি’র মধ্যে দূরত্ব বাড়ার বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায় ২৯শে ডিসেম্বরের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। ওই দিন রাজধানীর টিকাটুলি ও মালিবাগে মিছিল করে শিবির। মালিবাগে শিবিরের মিছিলে পুলিশের গুলিতে শিবির নেতা মনসুর নিহত হন। ১৮ দল ঘোষিত এই কর্মসূচিকে পরে আরও একদিন বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু শরিক দলের তৎপরতা না দেখে শেষ দিন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় জামায়াত-শিবির। ১২ই জানুয়ারি নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর পর শীতবস্ত্র বিতরণসহ নানামুখী কাজে মনোযোগী হয় তারা। বিষয়টি স্বীকার করে দলের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এই মুহূর্তে আত্মরক্ষা এবং সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত হওয়া ছাড়া জামায়াতের সামনে কোন পথ খোলা নেই। সংশ্লিষ্টরা জানায়, মার্চ ফর ডেমোক্রেসি বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর কারাবন্দি শীর্ষ নেতাদের নির্দেশে হঠাৎ থমকে যায় জামায়াত-শিবির। চলমান আন্দোলনে দেশব্যাপী জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন দলটির শীর্ষ নেতারা। এই ক্ষয়ক্ষতি রোধে জরুরি বার্তা পাঠান দায়িত্বশীলদের কাছে। নির্দেশ দেন কৌশলী কর্মসূচি দিতে- যাতে নেতাকর্মীদের প্রাণহানির সংখ্যা আর না বাড়ে। সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতিও যেন আর না হয়। ইতিমধ্যে এই বার্তা পৌঁছে যায় দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে। সূত্র মতে, জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়ে জামায়াত। এই দুই ঘটনার পর ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় প্রায় দু’শ’ শিবিরকর্মীর প্রাণহানি ঘটে। তবে এসব সহিংসতার সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুসহ চলমান আন্দোলনও যুক্ত ছিল। তবু নেতাকর্মীদের লাশের সারি আর বাড়তে দিতে চান না জামায়াতের শীর্ষ নেতারা। তারা আইনজীবী এবং কারাগারে সাক্ষাতে যাওয়া নিকটজনের মাধ্যমে বার্তা দিয়েছেন নেতাকর্মীদের উদ্দেশে। বলেছেন, যুদ্ধাপরাধের মামলায় আটক নেতাদের যা হওয়ার হোক। এ ক্ষেত্রে কেবল আইনি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। সংঘাত-সহিংসতা নয়। নয় আর কোন প্রাণহানি। সংশ্লিষ্টদের মতে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের এই বার্তার দ্রুত প্রতিফলন দেখা যায় রাজনৈতিক অঙ্গনে। মার্চ ফর ডেমোক্রেসি কর্মসূচি পালনের প্রথম দিন ২৯শে ডিসেম্বর রাজধানীর মালিবাগে পুলিশের গুলিতে এক শিবির নেতা নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকে কৌশলী ভূমিকায় মাঠে থাকছে জামায়াত-শিবির। তারা যতটা সম্ভব ঝুঁকিমুক্ত থেকে বিক্ষিপ্ত মিছিল করছে। তবে যৌথ বাহিনীর অভিযানের কারণে হতাহতের ঘটনা এড়াতে পারছে না। অন্যদিকে রাজনৈতিক মিত্র বিএনপি’র সঙ্গে শুরু হয় টানাপড়েন, মান অভিমান। বিষয়টি স্বীকার করে শিবিরের দায়িত্বশীল এক নেতা বলেন, চলমান আন্দোলনে আমরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছি। সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারও করেছি। কিন্তু সহযোগী ছাত্র সংগঠনের জোরালো ভূমিকা না থাকায় তেমন সুফল পাওয়া যায়নি। তবু আমাদের নেতাকর্মীরা হতোদ্যম নয়। তারা শেষ পর্যন্ত অর্পিত দায়িত্বপালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শিবিরের এই কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা কিছু পাওয়ার জন্য আন্দোলন করে না। তাদের সংগ্রাম ত্যাগ আল্লাহর রাস্তায়। এদিকে চলমান প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে এ মুহূর্তে রক্ষণাত্মক কৌশলে মাঠে থাকতে চায় জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে এমন কৌশল নিচ্ছে বিপর্যস্ত দলটি। কারাবন্দি শীর্ষ নেতারাও এমনটি চান বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানায়। যুদ্ধাপরাধ সন্ত্রাসবাদসহ নানা ইস্যুতে একেবারে খাদের কিনারে ১৮ দলের শরিক দলটি। যে কোন সময় রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ হয়ে যেতে পারে এ দলের কার্যক্রম। সামপ্রতিক আন্দোলনে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেও লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি তারা। এ অবস্থায় আত্মরক্ষামূলক কর্মসূচির দিকে ঝুঁকছে জামায়াত।

অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় থাকা যাবে না: খালেদা জিয়া

বর্তমান সরকার জনগণের সরকার নয় দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, তারা জনগণের সরকার নয় বলেই দেশের মানুষের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে।
এই সরকার একটি দুর্নীতিবাজ সরকার। গত পাঁচ বছরে তারা জনগণের সম্পদ লুট করেছে। তিনি বলেন, সরকারের ক্ষমতার মেয়াদ অতি অল্প দিনের। অল্প দিনেই তাদের বিদায় নিতে হবে। অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় থাকা যাবে না। বিকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি আয়োজিত গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

খালেদা জিয়া বলেন, এই দুর্নীতিবাজ সরকার দেশের কল্যাণ করতে পারবে না। তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় দেশের জনগণকে। ২৯শে ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমোক্রেসি আহবান করেছিলাম। জাতীয় পতাকা নিয়ে মানুষ আসবে। কিন্তু দুই দিন আগে আমাকে গৃহবন্দি করেছে। সারা দেশে তারা অবরোধ করেছে। এই হল সরকার। যদি জনগণের সরকার হতো তাহলে তারা তা করতে পারতো না। আমরা ক্ষমতায় ছিলাম। আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম তখন কোন দিন এভাবে কর্মসূচিতে বাধা দেইনি। তিনি বলেন, জনগণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়েছে। তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। তারা সম্পূর্ণ অবৈধ সরকার। খালেদা জিয়া বলেন, অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় থাকা যায় না। বেশি দিন থাকা যাবে না।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কথা উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, কারা হামলা করছে সরকার তা বের করতে পারছে না। কিন্তু দায় চাপাচ্ছে বিরোধী দলের ওপর। সরকার মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।
সাতক্ষীরায় সরকারি বাহিনী সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, সেখানে এমন অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে যে মানুষের বিশ্বাস হচ্ছে না দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এতো নির্মম কাজ করছে। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ আছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। স্বাধীনতার ৪২বছর পর আবার আমরা স্বাধীনতা হারাতে যাচ্ছি। তাই আবার আমাদের দেশ রক্ষার জন্য যুদ্ধ করতে হবে। খালেদা জিয়া বলেন, মানুষ নির্বাচনে সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মানুষ ভোট দিতে যায়নি। এটি কোন নির্বাচন নয়। অবিলম্বে নির্বাচন দিন। জনপ্রিয়তা যাচাই করুন।
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, মনে করে থাকেন গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকবেন এটা হবে না। অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা চাই না। শান্তি চাই। অবিলম্বে নির্বাচনের জন্য আলোচনার পরিবেশ তৈরি করুন। আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি সারা দেশে চালিয়ে যেতে চাই।
পেশাজীবীদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন হচ্ছে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, আইনজীবীদের ওপর হামলা হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের ওপর হত্যা নির্যাতন চালানো হচ্ছে। জেলে নেয়া হচ্ছে। এভাবে গুন্ডা বাহিনী দিয়ে শেষ রক্ষা হবে না। এই সরকার সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি একটি পত্রিকার কপি তুলে ধরে বলেন, এই সরকার সন্ত্রাসীদের সরকার।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন আজ্ঞাবহ ও মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন। এই কমিশন দিয়ে কোন নির্বাচন স্ষ্টুুভাবে করা যাবে না। সরকারের বাইরে তারা যেতে পারে না। কথা বলার কোন সাহস রাখে না। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট পড়েনি। কিন্তু ফল ঘোষণার জন্য তিন দিন সময় নিয়ে নির্লজ্জভাবে ৪০ ভাগ ভোট দেখিয়েছে।
বেলা দুইটা থেকে শুরু হওয়া সমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি ও ১৮ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।

রূপসী রহস্যময়ী রমণী by সাযযাদ কাদির

তাঁর রূপের যেমন তুলনা নেই, তেমন নেই রহস্যের অন্ত। কি তাঁর আসল নামধাম পরিচয়- কিছুই বলা যায় না নিশ্চিত করে। নিজেকে নিজেই বদলে, আড়াল করে চলেছেন জীবনভর। আর কি বিচিত্র সে জীবন!

বিএনপি ছেড়ে দিলেও জামায়াতের আপত্তি নেই by আহমেদ জামাল

বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব বাড়ছে। সামপ্রতিক কিছু ঘটনায় জামায়াত নেতারা মনে করছেন বিএনপির সঙ্গে তাদের মিত্রতা ভেঙে যেতে পারে। তবে নিজ থেকে জামায়াত জোট ভাঙবে না।

অস্ত্রের জোরে ক্ষমতায় থাকা যাবে না: খালেদা জিয়া

বর্তমান সরকার জনগণের সরকার নয় দাবি করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, তারা জনগণের সরকার নয় বলেই দেশের মানুষের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে।

আজ-কাল-পরশু- বিএনপি এখন কী করবে by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ, তিনি তাঁর আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তন করেছেন। আন্দোলনের পাশাপাশি সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সেটাও প্রশংসাযোগ্য।

বিশ্বায়নের কাল- বিতর্কের বিষয় যখন বাংলাদেশ by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশ সম্পর্কে ভিনদেশের পার্লামেন্টে বিতর্কের ঘটনা সচরাচর ঘটে না বললে কমই বলা হবে; বরং বিরল শব্দটিই এ ক্ষেত্রে যথার্থ হতে পারে। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, ওয়েস্টমিনস্টারের উভয় কক্ষ—হাউস অব কমন্স এবং হাউস অব লর্ডসে প্রশ্ন উত্থাপন বা মন্ত্রীর বিবৃতির দৃষ্টান্ত আছে।
কিন্তু গত কয়েক দশকে শুধু বাংলাদেশ বিষয়ে বিশেষ বিতর্ক অনুষ্ঠানের কথা ইউরোপ বা আমেরিকার কোথাও হওয়ার তথ্য খুঁজে পাচ্ছি না। গত বছর প্রথম এ ধরনের একটি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় ইউরোপীয় পার্লামেন্টে—রানা প্লাজার প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর। সেই বিতর্কের উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের অধিকার, কাজের নিরাপত্তা এবং ন্যূনতম মজুরির মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। এরপর পাকিস্তানের পার্লামেন্টে গত ডিসেম্বরে যুদ্ধাপরাধের বিচারে কাদের মোল্লার ফাঁসির বিষয়ে নিন্দা জানিয়ে আলোচনা এবং প্রস্তাবের কথা জানা গেল। তারপর, এ বছরের শুরুতেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পার্লামেন্টের তিনটি উদ্যোগ এবং প্রতিটিই বাংলাদেশের প্রধান দুই দলের রাজনৈতিক কলহের আপসহীনতায় সৃষ্ট অচলাবস্থা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে তেমন একটা বিতর্ক ছাড়াই গৃহীত হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক বাস্তবতার বিষয়ে সমঝোতার আহ্বান জানানোর প্রস্তাব। আর গত বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) একই দিনে মাত্র ঘণ্টা চারেকের ব্যবধানে লন্ডন এবং স্ট্রাসবুর্গে দুটি বিতর্ক।

পাকিস্তানের পার্লামেন্টের বিতর্ক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আবেগকে আহত করে বলে তার প্রতিবাদ জানানো যুক্তিসংগত হলেও অন্যগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া অচিন্তনীয় বলেই ধারণা করি। যদিও দলকানা বুদ্ধিজীবীদের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ‘নির্বাচনী প্রহসনে’র সমালোচনায় সোচ্চার বিদেশিদের অন্যদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সরকার এসব স্বার্থান্ধ বুদ্ধিজীবীর মন্ত্রণায় কান দেবে না বলেই আশা করি।
ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দুটি বিতর্কই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। হাউস অব কমন্সে সেদিনকার উপস্থিতির চিত্রটি তেমন একটা আশাপ্রদ না হলেও বিতর্কের গুণগত মান ছিল খুবই সমৃদ্ধ এবং ধারালো। ওই একই দিনে একই সময়ে পার্লামেন্টের অন্য আরেকটি কক্ষে সে সময় চলছিল একজন অভিজ্ঞ এমপির স্মরণসভা, যে কারণে উপস্থিতি ছিল কম। এই বিতর্কে কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব (মোশন) ছিল না। কোনো কোনো খবরে বিভিন্ন প্রস্তাব গ্রহণের কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো প্রস্তাব পাসের বিষয় ছিল না। হাউস অব কমন্সের কার্যবিবরণী (হ্যানসার্ড) দেখলেই তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।
প্রতিমন্ত্রীসহ যে ১৩ জন আলোচনা করেছেন এবং অন্য যাঁরা নানা প্রশ্ন বা মন্তব্য করেছেন, তাঁদের কোনো সময় বাঁধা ছিল না। ফলে, তাঁরা মন খুলে বলেছেন। বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, নিজেদের নির্বাচনী এলাকার বাংলাদেশিদের কথা বলেছেন, কেন বাংলাদেশ তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেটাও তাঁরা ব্যাখ্যা করেছেন। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সেনাসমর্থিত সরকারের নির্বাচনী সংস্কারের প্রশংসা যেমন ছিল তাঁদের বক্তৃতায়, তেমনি ছিল দুই নেত্রীকে মাইনাস করার রাজনীতির বিপত্তি এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের সমালোচনা। তবে, তাঁদের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি ছিল হতাশা এ কারণে যে ওই রাজনৈতিক সংকট থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকেরা কোনো শিক্ষা নেননি। তাঁদের আরেকটি হতাশার বিষয় ছিল যে রাজনীতিকদের বিবাদের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ক্রসফায়ারে মৃত্যুর কথাটি তাঁরা যেমন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সংঘাতে বেঘোরে প্রাণ হারানো নিরীহ মানুষের ক্ষেত্রেও তা উচ্চারণ করেছেন।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিতর্কটি ছিল মাত্র ৩০ মিনিটের এবং তাতে প্রায় তিন ডজন ্রএমইপি অংশ নেন। ফলে আলোচনার সূচনাকারী ছাড়া আর কেউই মিনিট খানেকের বেশি বলার সুযোগ পাননি। তবে অধিবেশনকক্ষে উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিতর্কের জন্য ১৪ জানুয়ারি প্রস্তাব (মোশন) জমা পড়ে ছয়টি। ছয়টি রাজনৈতিক গোষ্ঠী—দ্য গ্রিনস ইউরোপিয়ান অ্যালায়েন্স, ইউরোপিয়ান কনজারভেটিভস অ্যান্ড রিফর্মিস্টস গ্রুপ, সোশ্যালিস্টস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস, অ্যালায়েন্স অব লিবারেলস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস ফর ইউরোপ (এএলডিই), ইউরোপিয়ান ইউনাইটেড লেফট অ্যান্ড নরডিক গ্রিন লেফট এবং ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি। এই ছয়টি মোশনই আমি পড়েছি। অনেক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে মিল থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্যও ছিল। বিএনপিকে জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গ ছাড়ার আহ্বানটি ছিল শুধু এএলডিইর প্রস্তাবে। পরে ১৫ জানুয়ারি এসব রাজনৈতিক গোষ্ঠী একটি সম্মত প্রস্তাবের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায় এবং সেই অভিন্ন প্রস্তাবে জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গ ছাড়ার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়। জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গ ত্যাগের এই আহ্বানে আওয়ামী জোটের খুশি হওয়ার কারণ থাকলেও তাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে পুরো প্রস্তাবের মূল বার্তা হচ্ছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেউই প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন হিসেবে মানছেন না।
ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্ট—উভয় স্থানের বিতর্কেই কতগুলো অভিন্ন বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অস্থিরতায় হতাশা ও নিন্দা। দ্বিতীয়ত, আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সমঝোতা। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বিরোধীদের গ্রেপ্তার, হয়রানি, নিপীড়ন বন্ধ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সহিংসতা বন্ধে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতায় উদ্বেগ এবং বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দেখার প্রত্যাশা। এ ক্ষেত্রে প্রধান দুই দলের একে অন্যকে দায়ী করার প্রবণতার বিষয়ে সচেতন ইউরোপীয় জনপ্রতিনিধিরা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। পঞ্চমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ এবং জবাবদিহি না থাকায় উদ্বেগ। ষষ্ঠত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগকে যথাযথ হিসেবে অভিহিত করে তার প্রতি সমর্থন জানালেও তাঁদের সবাই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ব্রিটিশ এমপিদের উদ্বেগ হচ্ছে বিচার-প্রক্রিয়ার মান সম্পর্কে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাক্ষী এবং আইনজীবীদের নিরাপত্তার বিষয়।
ব্রিটিশ এমপিদের সমালোচনার একটা বড় অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাবের ভূমিকা। র‌্যাবকে ঘাতক বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করে তাঁরা বিভিন্ন গুম ও খুনের ঘটনার জন্য র‌্যাবকে দায়ী করে তাদের জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারার জন্য সরকারের সমালোচনা করেন। এমনকি, র‌্যাব ভেঙে দেওয়ার দাবি জানানোর আহ্বানও এই বিতর্কে শোনা গেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিতর্কে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, প্রধান তিনটি দলের এমপিরাই তাঁদের নিজস্ব মতামত দিয়েছেন। ফলে, কনজারভেটিভ পার্টির অ্যান মেইন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আবশ্যকতা স্বীকার না করলেও তাঁর দলেরই রিচার্ড ফুলার ও রেহমান চিশতি বলেছেন যে, ওই ব্যবস্থা ছাড়া অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। আর এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন বিতর্কের সহ-উদ্যোক্তা লেবারের সায়মন ড্যানচুক।
উভয় বিতর্কেই জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজত প্রসঙ্গ আলোচিত হলেও কেউই সরাসরি নাম উল্লেখ করে কোনো দলকে নিষিদ্ধের কথা বলেননি। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত দলগুলোকে নিষিদ্ধের আহ্বান জানানো হলেও সেখানে কোনো দলের নাম কেউ উল্লেখ করেননি। জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গ ত্যাগ করার আহ্বান অবশ্য এসেছে উভয় পার্লামেন্ট থেকেই। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আহ্বানটি ছিল সরাসরি বিএনপির প্রতি। কিন্তু, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিস্তারিত আলোচনায় জামায়াতের প্রসঙ্গটি এলে অন্যান্য দেশের উদাহরণ দিয়ে রেহমান চিশতি এমপি প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হলে তা দেশটিতে গোপন উগ্রপন্থার উত্থান ঘটবে কি না। এর জবাবে বাংলাদেশি-অধ্যুষিত পপলার এলাকার এমপি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত জিম ফিটজপ্যাট্রিক বলেন যে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, সব দলের উচিত হবে জামায়াতকে সঙ্গে না রাখা। তবে অন্যদের জামায়াতকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
যে তিনটি পার্লামেন্টে বাংলাদেশের সমসাময়িক সংঘাতের রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক এবং প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, সেগুলো বিশ্বের সমৃদ্ধ অর্থনীতিগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানির বাজারগুলোও ওই ইউরোপ এবং আমেরিকায়। বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা (বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে) দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই দুই মহাদেশের দেশগুলোর ভূমিকা ব্যাপকভাবে পরিব্যাপ্ত। আধুনিক প্রযুক্তির উৎস হিসেবেও তাদের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা কম নয়। তারপর প্রবাসী আয়ের উৎস
বিবেচনায় নিলে এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বই আলাদা। তাদের জনপ্রতিনিধিদের সমালোচনা কর্কশ শোনাতে পারে, পরামর্শগুলো মধুর না হয়ে তেতো মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলো উপেক্ষা করা নিজেদের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। বেলারুশের স্বৈরশাসক আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, রাশিয়ার নব্য জার পুতিন অথবা উত্তর কোরিয়ার অভিনন্দনে পুলকিত হওয়ার স্বাধীনতা আমাদের নিশ্চয়ই আছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের অভিনন্দনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু সেটুকু অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল থেকে বাকি বিশ্বকে ‘কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না’ কথাটা শোনানো কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এসব বিতর্ককে অনেকটা সিনক্রোনাইজড (তাল মেলানো) নাচ মনে হতে পারে। এটা কারও পক্ষেই নিশ্চিত করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি তা নাকচ করাও অসম্ভব। কারণ, পাশ্চাত্যের রাজনীতিকদের মধ্যে সমন্বয় ঘটাটা অস্বাভাবিক নয়, তবে বাংলাদেশকে নিয়ে তেমনটি হয়ে থাকলে তা যথেষ্ট ভাবনার বিষয়।
এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখা ভালো, বিশ্বরাজনীতিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সুনির্দিষ্ট বিতর্ক বিশেষ ধরনের ভূমিকা রেখে থাকে। পাঠকদের এ ক্ষেত্রে মনে করিয়ে দেব সিরিয়াবিষয়ক বিতর্কের কথা। সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সীমিত আকারে সামরিক অভিযান পরিচালনার কথা প্রেসিডেন্ট ওবামা ঘোষণা করার পর ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে ব্রিটেনসহ নেটো জোট সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। ওই অভিযানের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে হাউস অব কমন্সে বিরোধী নেতা এড মিলিব্যান্ড বিতর্কের সূচনা করলে সেই বিতর্কের পর সরকার ভোটে হেরে যায়। ফলে, ব্রিটেন পরিকল্পিত সামরিক অভিযান থেকে সরে আসে। আর তারই সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও ফরাসি পার্লামেন্টেও বিতর্ক হয় এবং পাশ্চাত্য জোট আরেকটি সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

বিশ্বায়নের কাল- বিতর্কের বিষয় যখন বাংলাদেশ by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশ সম্পর্কে ভিনদেশের পার্লামেন্টে বিতর্কের ঘটনা সচরাচর ঘটে না বললে কমই বলা হবে; বরং বিরল শব্দটিই এ ক্ষেত্রে যথার্থ হতে পারে। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, ওয়েস্টমিনস্টারের উভয় কক্ষ—হাউস অব কমন্স এবং হাউস অব লর্ডসে প্রশ্ন উত্থাপন বা মন্ত্রীর বিবৃতির দৃষ্টান্ত আছে।

অনেক হয়েছে, এবার বন্ধ করতে আইন চাই- রাজনৈতিক কাজে শিশুদের ব্যবহার

একজনের নির্বাচন বিজয়, তা-ও আবার প্রতিদ্বন্দ্বীহীন; কেবল আনুগত্যের যোগ্যতায়। দলের কাছে, জয়ী ব্যক্তিদের কাছে এসব অবশ্যই উদ্যাপনের মতো বিষয়। কিন্তু তাতে স্কুলের শিশুদের ব্যবহার করা কেন?
বহু বছর ধরে এ রকম উৎকট দেখানোপনা চলছে, যা কেবল অনৈতিক নয়, বেআইনিও।
সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে সাংসদ হয়েছেন আওয়ামী লীগের হাসিবুর রহমান। এদিকে ধর্মমন্ত্রীকে সরকারি দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা যে সংবর্ধনা দিয়েছেন, তা দিগ্বিজয়ী আকবর বা আলেকজান্ডারদেরই মানায়। তাঁরা এলাকায় আসবেন বলে দলের পক্ষ থেকে উচ্ছ্বসিত সংবর্ধনা হতেই পারে। কিন্তু যে শিশুরা রাজনীতি বোঝে না, কারও বিজয়ের শোভাবর্ধনের চাকরি করে না; তাদের কেন রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা? একদলের ককটেলে শিশুরা আহত হবে, অন্য দল রাজনৈতিক আয়োজনে শিশুদের ব্যবহার করবে, এটা কেমন ধরনের রাজনীতি?
উন্নত সংস্কৃতিতে শিশুদের পূর্ণ ব্যক্তিমানুষের মর্যাদা দেওয়া হয়। তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে সম্মান দেখানো হয়। তাদের প্রহার বা ব্যবহার দুটোই সেসব দেশে নিষিদ্ধ। এবং এর জন্য সব ক্ষেত্রে আইনও করা লাগে না, সংস্কৃতির ভেতর থেকেই মানুষ এটা শেখে এবং পালন করে। অথচ আমাদের দেশে যাঁরা নাকি হবেন পথপ্রদর্শক, তাঁরাই শিশুদের জয়-পরাজয়ের লড়াইয়ে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেন। কখনো তাদের বাসভর্তি করে জনসভায় নেওয়া হয়, কখনো তাদের রাস্তার দুই পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বিশেষ কাউকে হাত নাড়িয়ে সংবর্ধনা দিতে হবে বলে। যারা রাজনীতির কিছুই বোঝে না, তাদের এমন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনের নির্দেশনা থাকা উচিত।
বছরের পর বছর ধরে এ ধরনের ‘রাজকীয়’ তথা জমিদারসুলভ চর্চা চলছে। অনেক নেতা ও সাংসদ আছেন যাঁরা নিজেদের নির্বাচনী এলাকার জনপ্রতিনিধি ভাবেন না, জনগণের সেবক মনে করেন না, মনে করেন ‘রাজা’। বাকিরা কি তাহলে তাঁদের প্রজা? এই মানসিকতা কেবল অগণতান্ত্রিকই নয়, স্বেচ্ছাচারীও। আর কোনো সংবর্ধনায় যেন শিশুদের ব্যবহার করা না হয়। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ চাই।

অনেক হয়েছে, এবার বন্ধ করতে আইন চাই- রাজনৈতিক কাজে শিশুদের ব্যবহার

একজনের নির্বাচন বিজয়, তা-ও আবার প্রতিদ্বন্দ্বীহীন; কেবল আনুগত্যের যোগ্যতায়। দলের কাছে, জয়ী ব্যক্তিদের কাছে এসব অবশ্যই উদ্যাপনের মতো বিষয়। কিন্তু তাতে স্কুলের শিশুদের ব্যবহার করা কেন?

সরেজমিন- ভোটের দিন সাতক্ষীরায় by ইফতেখার মাহমুদ

যশোর সদর থেকে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার দূরত্ব ৯০ কিলোমিটারের মতো। কিন্তু যখন তালায় পৌঁছলাম, তখন মোটরসাইকেলের মিটার যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে দেখাল।
প্রধান সড়ক দিয়ে যাওয়া যায়নি। অবরোধকারীদের হাতে তিন দফা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে অগত্যা ঘুর পথে গ্রামের ভেতর দিয়ে তালায় পৌঁছতে হয়েছে। তাই বাড়তি এই পথ পেরোনো। তালায় রওনা হওয়ার আগে বন্ধু ও সহকর্মীদের বারবার সাবধানবাণী শুনতে শুনতে আমার ভেতরেও যে ভয় ধরেনি, তা নয়। কিছুটা আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা নিয়েই তালার মাটিতে পা রাখলাম।
কিন্তু তালায় পৌঁছার পর ভয় কিছুটা হলেও ভাঙল। মহাসড়ক ও গ্রামীণ সড়কগুলোতে সুনসান নীরবতা। কোথাও অবরোধকারীদের দেখা মিলল না। পথে পথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল চোখে পড়ল। বিকেলে তালা উপজেলা সদরে পৌঁছার পর দেখা গেল, বাজারের বেশির ভাগ দোকান বন্ধ। মোটরসাইকেলের চালক বারবার সাবধান করে দিয়ে মনের ভেতর পেট্রলবোমা ছোড়ার ভয় জাগিয়ে দিচ্ছিলেন। কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই নির্বাচনের আগের দিনটি পার হলো।
নির্বাচনের দিন সকালে ভোট দেখতে বের হলাম। তিন-চারটি কেন্দ্রে ভোট দেখার পর দুপুর ১২টার দিকে তালার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মহাবিদ্যালয় কেন্দ্রে গেলাম। সেখানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে এসেছেন তাঁরা। ওই কেন্দ্রে প্রবেশ করার ঠিক আগ মুহূর্তে মুঠোফোনে খবর এল, জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ইসলামকাঠি ইউনিয়নের বেশির ভাগ কেন্দ্রের পাশে জড়ো হচ্ছেন। তাঁরা চারটি কেন্দ্রে যাওয়ার সড়ক বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছ ফেলে আটকে অবরোধ সৃষ্টি করেছেন। ডাঙ্গা আলিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্র দখল করে সেখানে ধারালো অস্ত্র নিয়ে অবস্থান নিয়েছেন জামায়াতের কর্মীরা।
এই খবর শোনার পর বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জানালাম। তাঁরা ইসলামকাঠি ইউনিয়নের বিভিন্ন কেন্দ্রে অবরোধ সৃষ্টির সংবাদটি সঠিক নয় বলে উড়িয়ে দিলেন। আরেকটু আগ বাড়িয়ে বললেন, ছোটখাটো কিছু অবরোধ ছিল, তা পুলিশ-বিজিবি কিছুক্ষণ আগে সরিয়ে ফেলেছে। এখন কোথাও কোনো সমস্যা নেই। সবাই শান্তিমতো ভোট দিচ্ছেন। নির্বাচনী কর্মকর্তারা যখন এসব কথা বলছেন, তখন আবারও মুঠোফোনে ডাঙ্গা কেন্দ্র থেকে খবর এল, ভোট দিতে আসা একজন বৃদ্ধাকে জামায়াতের কর্মীরা তুলে নিয়ে গেছেন। ভোটকেন্দ্রে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন তাঁরা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে আরেকজন স্থানীয় সাংবাদিককে সঙ্গে নিয়ে ইসলামকাঠি ইউনিয়নের পথে রওনা হলাম। বেলা তখন একটা। সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে চারটি কেন্দ্র অতিক্রম করলাম। বেশির ভাগ কেন্দ্র ফাঁকা। রাস্তায়ও কোনো লোকজন চোখে পড়ল না। যে দু-একজন পথচারী চোখে পড়ল, তাদের চোখে-মুখে আতঙ্ক। ডাঙ্গা কেন্দ্রে যাওয়ার পথে দেখলাম, সত্যি সত্যি বাঁশ, গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে রাখা হয়েছে। দূর থেকে নির্বাচনী কেন্দ্র দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন প্রতিরোধকারীরা সেখানে মিছিল করছে। আমাদের দেখে সেখান থেকে কয়েকজন তেড়ে এল।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমরা পিছু হটলাম। সঙ্গে থাকা স্থানীয় সাংবাদিকেরা তালা থানার যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে খবর দিলেন। ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করার পর বিজিবি ও পুলিশের দুটি গাড়ি এসে উপস্থিত হলো। তারা প্রায় ২০টি ফাঁকা গুলি ছুড়ল। অবরোধকারীদের সঙ্গে তাদের কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটল। শেষ পর্যন্ত অবরোধকারীরা পিছু হটল।
এ ঘটনা যখন চলছিল তখন স্থানীয় অন্য সাংবাদিকেরা কিছুক্ষণ পর পর ফোন দিচ্ছিলেন। ইসলামকাঠি ইউনিয়ন এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছিলেন তাঁরা। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাই বিজিবির গাড়ির পেছন পেছন ইসলামকাঠি ইউনিয়ন এলাকা ত্যাগ করলাম। সন্ধ্যায় নির্বাচনের
ফলাফল ঘোষণার সময় দেখা গেল, তালা থানার পুলিশের দুজন কর্মকর্তা কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে গুলি ছোড়ার অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর নিচ্ছেন।
নির্বাচনের দিন বিকেল পর্যন্ত তালা উপজেলার কমপক্ষে ১৫টি কেন্দ্র ঘুরে দেখা হলো। তিনটি কেন্দ্রে সারি ধরে ভোটারদের ভোট দিতে দেখা গেল। বাকিগুলোতে নির্বাচনসংক্রান্ত কর্মকর্তা ও প্রার্থীদের পক্ষের লোকদের তুলনায় ভোটারের সংখ্যা কম দেখা গেল।
পরদিনের প্রথম আলোতে ডাঙ্গা ইউনিয়নের অবরোধ ও সংঘাতের সংবাদসহ নির্বাচন বিষয়ে প্রতিবেদন ছাপা হলো। সকালে সাতক্ষীরা সদরে প্রথম আলো কার্যালয়ে পৌঁছালাম। পৌঁছার পরপরই প্রথম আলোর সাতক্ষীরার নিজস্ব প্রতিবেদক কল্যাণ ব্যানার্জির কাছে ফোন এল। সাতক্ষীরার জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে বলা হলো, ‘এ ধরনের কোনো অবরোধ ইসলামকাঠিতে হয়নি। সবকিছু শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। সবাই ঠিকমতো ভোট দিয়েছেন। আপনার পত্রিকায় সঠিক সংবাদ আসেনি।’
কল্যাণ ব্যানার্জি মুঠোফোনেই ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘আমাদের প্রতিবেদক ঘটনাস্থলে ছিলেন। তিনি যা দেখেছেন, তা-ই লিখেছেন।’ অপর প্রান্ত থেকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলা হলো, ‘না, এমন কোনো কিছু ঘটেনি।’
ইফতেখার মাহমুদ: সাংবাদিক।

সরেজমিন- ভোটের দিন সাতক্ষীরায় by ইফতেখার মাহমুদ

যশোর সদর থেকে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার দূরত্ব ৯০ কিলোমিটারের মতো। কিন্তু যখন তালায় পৌঁছলাম, তখন মোটরসাইকেলের মিটার যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে দেখাল।

শ্রদ্ধাঞ্জলি- একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তা by ফারুক চৌধুরী

এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা স্বল্প পরিচয়েই মনে দাগ কাটেন। এম মুজিবুল হক—বাংলাদেশের সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারি, যিনি ১২ জানুয়ারি, ২০১৪ সালে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন—ছিলেন তাঁদের একজন।

শ্রদ্ধাঞ্জলি- একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তা by ফারুক চৌধুরী

এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা স্বল্প পরিচয়েই মনে দাগ কাটেন। এম মুজিবুল হক—বাংলাদেশের সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারি, যিনি ১২ জানুয়ারি, ২০১৪ সালে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন—ছিলেন তাঁদের একজন।
তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ১৯৫২ সালে, যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল ছাত্র ইউনিয়নের ভিপি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন নামকরা ছাত্র। তিনি হলের ভিপি হয়েছেন, হল নির্বাচনে, পরবর্তীকালের প্রখ্যাত আওয়ামী লীগের নেতা আবদুস সামাদ আজাদকে পরাজিত করে। ১৯৫২ সালেরই কোনো একসময়ে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সলিমুল্লাহ্ হলের চায়ের দোকানে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত হিসেবে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হলাম এবং আমার এখনো মনে আছে, সুদর্শন এই মানুষটির গভীর গলার আওয়াজ, স্পষ্ট বাচনভঙ্গি আর ব্যবহারের উষ্ণতা আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। পরের বছরগুলোতে, তাঁর সঙ্গে জীবনের চলার পথে, বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা হয়েছে এবং যতই তাঁকে জেনেছি, ততই তিনি মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছেন।

১৯৩০ সালে বরিশালের বানারীপাড়ায় জন্ম নেওয়া মুজিবুল হক ছিলেন আমার চেয়ে মাত্র চার বছরের বড়; কিন্তু তবু কিছুদিনের জন্য হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন আমার সরাসরি শিক্ষক। তাঁর প্রয়াণে কি স্কুল কি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সরাসরি আর কোনো শিক্ষক বেঁচে নেই। ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে (সিএসপি) যোগদানের আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। আমার মনে পড়ে, ক্লাসে আমরা ইংরেজিতে কথা বলে যেন ইংরেজি বলার জড়তা কাটিয়ে উঠি, সেটাই ছিল তাঁর প্রচেষ্টা। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক, কারাবাসেও ছিলেন কিছু সময়ের জন্য এবং ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে বহু বছর পরে হলেও সোহ্রাওয়ার্দী পুরস্কারে পুরস্কৃত করে স্বীকৃতি জানানো হয়েছিল।
মুজিবুল হক ছিলেন একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তা, যিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন স্থানে, এসডিও এবং ডিসির পদ অলংকৃত করেছিলেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর এতই সুনাম ছিল যে তখন অনেক কনিষ্ঠ কর্মকর্তাই তাঁর সঙ্গে কাজ করতে চাইতেন। আমার ছোট ভাই ইনাম আহমদ চৌধুরী ছিল তাঁদের একজন, যে ১৯৬১ সালে শিক্ষানবিশ সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে অনেক চেষ্টা করে রাজশাহীতে পোস্টিং নিয়েছিল। কারণ, মুজিবুল হক রাজশাহীর ডিসি ছিলেন। তার চাকরিজীবনের প্রথমেই মুজিবুল হকের সান্নিধ্য ছিল এক প্রীতিদায়ক অভিজ্ঞতা, এই কথাটি ইনাম প্রায়ই বলে থাকে।
আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় মুজিবুল হক ছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রসচিব। সেই সময়ে তাঁর ভূমিকার জন্য তিনি টিক্কা খানের রোষানলে পড়েন। কথিত যে টিক্কা খান তাঁকে বলেছিলেন, বাঙালি কর্মকর্তাদের ‘শুদ্ধি’ অভিযান কি তিনি স্বরাষ্ট্রসচিব মুজিবুল হককে দিয়েই শুরু করবেন। যা-ই হোক একাত্তরের মার্চ/এপ্রিল মাসেই তাঁকে ইসলামাবাদে বদলি করে দেওয়া হয়। নামকাওয়াস্তে তাঁকে কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও কোনো অর্থপূর্ণ দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়নি। সেই সময়ে পাকিস্তান সরকার দ্য বিট্রেয়েল অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতা শীর্ষক একটি প্রোপাগান্ডা ছবি তৈরি করে, যাতে উল্লেখ ছিল, পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে কিছু বাঙালি সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তার ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ নজির। এই ছবিটি দেখতে বাঙালি কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা হতো। ছবিটি দেখতে গিয়েছিলেন মুজিবুল হক। তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েরই তদানীন্তন উপসচিব নুরুল হোসেন খান। ছবিটি দেখার পর বেরিয়ে এসে মুজিবুল হক একটি বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন, ‘বাপ কা বেটা’! ‘কে তিনি’, তাঁকে প্রশ্ন নুরুল হোসেন খানের। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’, দৃপ্তকণ্ঠে ছিল মুজিবুল হকের উত্তর।
পাকিস্তান থেকে ১৯৭৩ সালে আফগানিস্তান আর দিল্লি হয়ে গোপনে বাংলাদেশে পাড়ি জমালেন মুজিবুল হক। বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাসচিব হিসেবে নিযুক্তি দিলেন। তার পর থেকে একজন আদর্শ এবং দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে মুজিবুল হক অধিষ্ঠিত ছিলেন বিভিন্ন পদে। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশের কেবিনেট সেক্রেটারি হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। প্রশাসনিক বিষয়াদিতে তাঁর ছিল গভীর অভিজ্ঞতা। যখন বাংলাদেশে মাত্র ১৬টি জেলা ছিল, তখনো তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নগরায়ণ ত্বরান্বিত করে সেগুলোকে ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ভাবনা পোষণ করতেন। দেশের সব মহকুমাকে জেলা হিসেবে পরিণত করার আদি ভাবনাটি বোধ করি তাতেই নিহিত ছিল।
মুজিবুল হকের একটি বিশেষ গুণ ছিল তাঁর স্পষ্টবাদিতা এবং তিনি যা বলতে অথবা বোঝাতে চাইতেন তা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায়, বাংলা অথবা ইংরেজিতে প্রকাশ করার ক্ষমতা তাঁর ছিল।
১৯৮৯ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বসে থাকেননি মুজিবুল হক। স্বাস্থ্য উন্নয়ন ক্ষেত্রে তাঁর ছিল বিপুল আগ্রহ এবং ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ছিলেন। সম্পৃক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সঙ্গে।
জনপ্রশাসন ট্রেনিং কেন্দ্র, বাংলাদেশ জাতীয় পে-কমিশন এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে সরকারি কর্মকাণ্ডে সহায়ক ভূমিকা পালনের জন্য তিনি সচেষ্ট ছিলেন। ইউনিসেফের ঢাকা অফিসের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্বন্ধে তাঁর আগ্রহ আমি প্রত্যক্ষ করেছি, যখন আমি ব্র্যাকের উপদেষ্টা ছিলাম। তিনি ২০০৫ সালে বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতা পদক’ লাভ করেন।
তাঁর জীবনের শেষ দু-তিনটি বছর তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে নিজেকে সক্রিয় কর্মকাণ্ড থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেছেন। কিছুটা লোকচক্ষুর অন্তরালে।
তাঁর তিরোধানে বাংলাদেশ একজন মূল্যবান নাগরিককে হারাল আর আমরা যারা তাঁর নৈকট্য লাভে ভাগ্যবান ছিলাম, হারিয়েছি একজন উদার, উষ্ণ হূদয় মানুষকে, যাঁর অনুপস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে অনুভব করি।
ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব।

নগর দর্পণ: চট্টগ্রাম- আওয়ামী লীগে এলে তিন খুন মাফ? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

একসঙ্গে একই পরিবারের তিনজনকে হত্যার ঘটনা তখন তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল চট্টগ্রামে। সেটা ২০০৪ সাল। সে বছর ২৯ জুন রাতে ব্রাশফায়ারে নির্মমভাবে খুন হন শিবির ক্যাডার সাইফুল আলম,
তাঁর বড় ভাই মো. আলমগীর ও বোন মনোয়ারা বেগম। এই হত্যার জন্য অভিযোগের আঙুল ওঠে শিবিরেরই ক্যাডার আবুল কাশেম, মোহাম্মদ ইউসুফ, নাছির উদ্দিন (গিট্টু নাছির নামে পরিচিত) ও ফয়েজ মুন্নার দিকে। ঘটনার পরদিনই নিহত সাইফুলের স্ত্রী আয়েশা আক্তার বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন এই চারজনের বিরুদ্ধে। ২০০৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি এজাহারভুক্ত চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন বায়েজিদ বোস্তামী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। এর মধ্যে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান দুই আসামি নাছির উদ্দিন ও ফয়েজ মুন্না।

২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগে যোগ দেন আবুল কাশেম ও মোহাম্মদ ইউসুফ। এই যোগদানের ঘটনা সরকারি দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের কতটা উদ্বুদ্ধ করেছিল জানি না, কিন্তু এক বছরের মধ্যেই শিবির ক্যাডার ও হত্যা মামলার আসামি আবুল কাশেম ‘অলংকৃত’ করেছেন জালালাবাদ ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতির পদ।
জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও নাশকতার বিরুদ্ধে অবিরাম গলা ফাটাচ্ছেন যে দলের নেতা-কর্মীরা, সেই দলে যোগ দিয়েই যেন ‘পরশ পাথরের’ ছোঁয়া পেলেন শিবিরের এসব ক্যাডার। সব গরল রূপান্তরিত হলো অমৃতে। আবুল কাশেম তাঁর ও সহকর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সেই আবেদনে সুপারিশ করেন তৎকালীন নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত কাজী ইনামুল হক। এখন ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ মামলাটি প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা থেকে আসা এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি আদালতে দেওয়া হয়েছে।
মামলার সরকারি কৌঁসুলি অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অশোক কুমার দাশ কয়েক দিন আগে পত্রিকান্তরে জানিয়েছেন, শিবির ক্যাডার কর্তৃক তিনজনকে খুনের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পর গত ২৫ অক্টোবর আদালতে আবেদন করা হয়। গত ৫ নভেম্বর আবেদনের ওপর শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শুনানি হয়নি। পরবর্তী শুনানির জন্য ধার্য তারিখে আদালত মামলাটি প্রত্যাহারের আদেশ দিতে পারেন।
মামলা প্রত্যাহারসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির ৩১তম বৈঠকে শিবিরের তিন খুনের মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে একই কমিটির ১৭তম বৈঠকেও একবার মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমে বিষয়টি সমালোচিত হলে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে জাতীয় কমিটি।
দলীয় কোন্দলে খুন হয়েছিলেন সাইফুল ও তাঁর ভাইবোনেরা। এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম রব্বানী হত্যা মামলায় শিবির ক্যাডার নাছির ও তাঁর ভাই মনছুরকে আসামি করা হলে শিবিরের একটি পক্ষ সন্দেহ করেছিল সাইফুলকে। ধারণা করা হয়, সাইফুল তাঁদের ফাঁসিয়েছেন—এমন সন্দেহের কারণেই ভাইবোনসহ প্রাণ দিতে হয়েছে তাঁকে।
রাজনীতির ক্ষেত্রে ভোল পাল্টানোর নজির এ দেশে কম নেই। ‘আল্লাহর আইন’ প্রতিষ্ঠার জন্য ‘শহীদ’ হওয়ার অঙ্গীকার করা নেতা-কর্মীর ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকে’ রূপান্তরিত হওয়ার নজিরও কম নয়। কিন্তু নতুন দলীয় পরিচয়ের সুবাদে এই আসামিরা অব্যাহতি পেলে মামলার বাদী আয়েশা আক্তার ও তাঁর দুই সন্তানের জীবন কতটা সংশয়মুক্ত থাকবে, কিংবা ২০০৭ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ২২ জন সাক্ষীর মধ্যে যে ১৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, তাঁদের জীবনের নিরাপত্তাই বা নিশ্চিত করবে কে? এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কেউ নেই।
একই ধরনের ঘটনা ঘটতে চলেছে ফটিকছড়িতেও। এই উপজেলার বহুল আলোচিত ‘ভুজপুর ট্র্যাজেডি’র মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত জামায়াতের তিন নেতাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। এই ঘটনায় ভুজপুর থানায় যে পাঁচটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল, তার কোনোটিতে ২ নম্বর, কোনোটিতে ৩ নম্বর আসামি হিসেবে অভিযুক্ত এই তিন নেতা।
২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল ফটিকছড়ির ভুজপুর এলাকায় যে ভয়াবহ রক্তাক্ত তাণ্ডবটি ঘটেছিল, যাদের স্মৃতিতে নেই, তাদের জন্য ঘটনাটি পূর্বাপর উল্লেখ করা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। গত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুদকের মামলা থাকার কারণে ফটিকছড়ি আসনে প্রার্থী হতে পারেননি আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ রফিকুল আনোয়ার। তাঁর অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের অন্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন বিএনপির নেতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। ওই নির্বাচনের পর থেকে সাকা চৌধুরীর ক্যাডারদের সন্ত্রাসের মুখে দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ে হতোদ্যম স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অনেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। এর মধ্যে রফিকুল আনোয়ারের আকস্মিক মৃত্যুতে আরও অগোছালো হয়ে পড়ে দল।
নির্বাচনের প্রস্তুতি ও দলকে পুনর্গঠিত করার জন্য ২০১৩ সালের ১১ এপ্রিল বড় ধরনের শোডাউনের আয়োজন করেন এখানকার নেতা-কর্মীরা। উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নেতা পেয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে সেদিন দু-তিন হাজার নেতা-কর্মী এক মিছিলে অংশ নেন। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা সেদিন মসজিদের মাইকে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে এই মিছিলে হামলা চালালে এক নারকীয় তাণ্ডবের সাক্ষী হয় ভুজপুর এলাকাবাসী। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ফটিকছড়ির এই সংবাদ পড়ে ও দেখে শিউরে ওঠে দেশের মানুষ। যুবলীগ-ছাত্রলীগের কর্মী বিপুল, রুবেল ও ফেরকানকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। আজীবন পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এ ঘটনায় আহত অনেক নেতা-কর্মী। পুড়িয়ে দেওয়া হয় মাইক্রোবাস, জিপ, ব্যক্তিগত মোটরযান ও দুই শতাধিক মোটরসাইকেল। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফায়ার সার্ভিসের গাড়িসহ সরকারের কোটি টাকার সম্পদ।
সেই রক্তাক্ত স্মৃতি, কর্মী-সমর্থকদের ওপর নেমে আসা সেই বীভৎসতা আজ ভুলে যেতে চান আওয়ামী লীগের কিছু নেতা। অভিযোগপত্র থেকে তাঁরা বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছেন জামায়াতের নেতা নূর মোহাম্মদ আল কাদেরী, ইকবাল চৌধুরী ও শহীদুল আজমকে। তাঁরা তিনজনই ফটিকছড়ির তিনটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার, তৃণমূলের এই জনপ্রতিনিধিদের দলে টানতে পারলে ভবিষ্যতে নির্বাচন বা অন্যান্য দলীয় কর্মকাণ্ডে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু দলের নেতা-কর্মীদের রক্তে যে এলাকাটি এখনো সিক্ত, এখনো মানবেতর জীবন যাপন করছেন দলের যে পঙ্গু নেতা-কর্মীরা, তাঁরা কীভাবে মেনে নেবেন আইনের নিজস্ব গতিকে রুদ্ধ করার এই উদ্যোগ!
এই মামলার অন্যতম বাদী জামাল পাশা শওকতের মুখে আমরা শুনি সেই ক্ষোভ। তিনি বলেন, অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করার আগে যাতে কোনো নিরীহ লোকের নাম এতে অন্তর্ভুক্ত না হয়, তা যাচাই-বাছাই করার জন্য দলীয়ভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। অথচ অন্যতম বাদী হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সেই কমিটিতেও রাখা হয়নি। অভিযোগপত্র থেকে জামায়াতের নেতাদের বাদ দেওয়ার খবর শুনে তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিকে আবারও ভুজপুরের মতো ঘটনা ঘটাতে উৎসাহিত করবে।
ভুজপুর থানার কর্মকর্তারাও এই অযৌক্তিক উদ্যোগের বিরোধিতা করে বলেছেন, পুরো তদন্ত যেখানে শেষ হয়নি, সেখানে অভিযোগপত্র থেকে কারও নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ কোথায়, কারণই বা কী?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা না জানলেও আমরা কিছুটা আঁচ করতে পারি। হত্যা, সন্ত্রাস ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত জামায়াতের নেতা-কর্মীরা এখন চাইবেন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সমঝোতা করে আইনের হাত থেকে বাঁচতে। আওয়ামী লীগের স্বার্থান্বেষী নেতারা সেই সমঝোতার পথে নিজের স্বার্থ হাসিলের স্বপ্ন দেখছেন। এতে আইনের হাত অকেজো হয়ে পড়বে আর নিহত ব্যক্তিদের পরিবার বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও দেখবেন, কীভাবে ‘বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে’!
যশোর-৫ (মনিরামপুর) আসনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে বিজয়ী করতে বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা এককাট্টা হয়েছেন—এমন সংবাদ আমরা দেখেছি পত্রপত্রিকায়। সেখানে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা অভিযোগ করেছেন, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী নাকি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সহিংসতার অভিযোগে জামায়াত-বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলাগুলো তিনি প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করবেন। এই অভিযোগ কতটা সত্য জানি না, তবে এটা তো এখন সহজেই অনুমেয়, সারা দেশে এ রকম অভিযুক্ত নেতা-কর্মীদের আওয়ামী লীগে যোগদানের হিড়িক পড়বে। তাতে মামলার দায় থেকে হয়তো রক্ষাও পাবেন অনেকে। কিন্তু আইনের ওপর ক্ষমতাসীনদের এই হস্তক্ষেপ খারাপ নজির হয়ে থাকবে।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

নগর দর্পণ: চট্টগ্রাম- আওয়ামী লীগে এলে তিন খুন মাফ? by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

একসঙ্গে একই পরিবারের তিনজনকে হত্যার ঘটনা তখন তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল চট্টগ্রামে। সেটা ২০০৪ সাল। সে বছর ২৯ জুন রাতে ব্রাশফায়ারে নির্মমভাবে খুন হন শিবির ক্যাডার সাইফুল আলম,

আজ-কাল-পরশু- বিএনপি এখন কী করবে by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ, তিনি তাঁর আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তন করেছেন। আন্দোলনের পাশাপাশি সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সেটাও প্রশংসাযোগ্য।
দেখা যাক নতুন কৌশল নিয়ে তিনি কত দূর এগোতে পারেন। আশা করি খালেদা জিয়া, বিএনপি বা ১৮-দলীয় জোট এখন উপলব্ধি করতে পারছে যে ৫ জানুয়ারি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করা আরও কঠিন কাজ হবে। নির্বাচন যতই প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রহসনের হোক না কেন, বাস্তব সত্য হলো: একটা নির্বাচন হয়েছে। ১৪-দলীয় জোট নতুন সরকার গঠন করেছে। এটা বাস্তব। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই বিএনপিকে নতুন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান সরকারকে অবৈধ বলা যাবে না, জনসমর্থিতও বলা যাবে না। এটা নিয়ম রক্ষার প্রশ্নবিদ্ধ সরকার।

বিএনপি বাংলাদেশের একটি বড় দল। তবে গত এক বছরে প্রমাণিত হয়েছে বিএনপি লড়াকু দল নয়। বিএনপির সামনে এখন বড় সংকট। জানি না বিএনপি এই সংকট কীভাবে মোকাবিলা করবে। লেখার শুরুতেই বিএনপির কিছু সাফল্যের কথা তুলে ধরতে চাই। সাম্প্র্রতিককালে টিভি টক শো ও সংবাদপত্রে বিএনপির নানা সমালোচনা হচ্ছে, যা সব সময় পুরোপুরি ন্যায্য নয়। সমালোচকেরা আংশিক বর্ণনা করেন, যা অনুচিত। যেসব কথা মিডিয়ায় সে রকমভাবে আসেনি। তা হলো—১. ঢাকায় ব্যর্থ হলেও বিভিন্ন জেলা শহরে বিএনপি ও ১৮-দলীয় জোট ভালোভাবেই আন্দোলন করেছে। হরতাল ও অবরোধ প্রায় সব জেলায়ই সফল হয়েছে। ২. আওয়ামী লীগের সরকার নানা চেষ্টা করার পরও ৩০০ আসনের একটিতেও বিএনপির কাউকে দিয়ে নির্বাচন করাতে পারেনি। সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীরা দলের সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। এটা একটা দলের জন্য কম কৃতিত্ব নয়। ৩. নির্বাচন কমিশন চক্রান্ত করে ‘বিএনএফ’ নামে একটি ভুয়া দল সৃষ্টি করলেও বিএনপির একজন নেতাও ওই দলে যোগ দেননি। সরকারের ‘বিএনএফ’ পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়েছে। ৪. ১৮-দলীয় জোটের আন্দোলনের ফলেই সরকার একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করতে পারেনি। সরকার যদি আগামী পাঁচ বছরও ক্ষমতায় থাকে, তবু এক দিনের জন্যও এই কলঙ্ক মোচন হবে না। ৫. সরকার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে এবার ভালোভাবে প্রমাণ করেছে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন বাংলাদেশে সম্ভব নয়। এটাও বিএনপির বিজয়।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কে আন্দোলনের একটা অধ্যায় বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে যাওয়ার আগে বিএনপির প্রথম কাজ হবে আত্মসমালোচনা করা (যা কেউ করতে চায় না)। আত্মসমালোচনা না করলে বিএনপি তার ভুলগুলো চিহ্নিত করতে পারবে না। বলাবাহুল্য, বিএনপি গত আন্দোলনে প্রচুর ভুল করেছে। প্রথমে ভুলগুলো স্বীকার করতে হবে। ভুল স্বীকার করলেই পরবর্তী পদক্ষেপগুলো মোটামুটি ঠিকভাবে নিতে পারবে। ভুলগুলো প্রচারের জন্য নয়। নিজেদের অবস্থান বোঝার জন্য খুব জরুরি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমরা বিএনপির কী কী ভুল দেখেছি? ১. বিএনপি ঢাকা শহরে তার শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিল না। ঢাকায় বিএনপির অন্তত পাঁচ হাজার লড়াকু কর্মী নেই। ২. দলের শীর্ষস্থানীয় ১০ জন নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর দলটি কাবু হয়ে গেছে। ৩. কারারুদ্ধ সাদেক হোসেন খোকা ছাড়া ঢাকায় আন্দোলন সংগঠিত করার মতো আর যোগ্য নেতা নেই। ৪. কেন্দ্রের বেশির ভাগ নেতাই আন্দোলনমুখী নন, মিডিয়ামুখী। বেশির ভাগই বুদ্ধিজীবী টাইপের নেতা। একটি বড় দলে অন্তত ৫০ জন আন্দোলনমুখী নেতা ও পাঁচ হাজার আন্দোলনমুখী কর্মী থাকতে হয়, যাঁরা জান বাজি রেখে দলের কর্মসূচি রাজপথে বাস্তবায়ন করতে পারেন। গত তিন মাসের আন্দোলনে দেখা গেছে বিএনপিতে সেই রকম নেতা ও কর্মী খুব কম। নয়াপল্টনের জনসভায় যোগ দেওয়া, মিছিল করা, সেমিনার করা আর জান বাজি রেখে রাজপথে আন্দোলন করা এক কথা নয়। ৫. বিএনপি একটি পেটিবুর্জোয়া সনাতন রাজনৈতিক দল। বিপ্লবী দল নয়। কাজেই বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াবেন, তা সমর্থনযোগ্য নয়। দলের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের হাতে গ্রেপ্তার হবেন, এটাই স্বাভাবিক। গ্রেপ্তার হলে তো বড় নেতা হওয়া যায়। রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হওয়া রাজনৈতিক নেতার একটা শর্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তান আমলে বারবার গ্রেপ্তার না হলে এত বড় নেতা হতে পারতেন কি? ৬. নির্বাচন একবার করে ফেলতে পারলে আওয়ামী লীগকে টলানো কঠিন হবে। নির্বাচন প্রতিহত (বানচাল) করার মতো শক্তি বিএনপির নেই। নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য ঢাকায় ও অন্যত্র আইনানুগভাবে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ থাকবে। তাদের পরাস্ত করে নির্বাচন প্রতিহত করতে হবে। এটা কত বড় লড়াই তা বিএনপির হাইকমান্ড অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ৭. গত তিন মাসের আন্দোলনে বিএনপি তার নেতা ও কর্মীর বাইরে (সব নেতা ও কর্মীও রাজপথে ছিলেন না) সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। কোথায় ছিল তাদের যুবদল ও ছাত্রদল? (কয়েকজন অবশ্য গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আগেই) বেশির ভাগ নেতাই স্লোগান, মিছিল ও জনসভার লোক। আন্দোলনের লোক খুব কম। অনেক নেতাই সুবিধাবাদী। সুসময়ের বন্ধু। এটা এবার প্রমাণিত হয়েছে। তবে একটা কথা সবার বুঝতে হবে, আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা এখন খুব সহজ কাজ নয়। ’৬৮-৬৯-এর গণ-আন্দোলন, ’৭১-এর স্বাধীনতার আন্দোলন বা ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মতো ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা এখন প্রায় অসম্ভব। তবু এখনো কিছুটা সম্ভব হতে পারে মুক্তিযুদ্ধের কোনো ইস্যু হলে বা ধর্মবিষয়ক কোনো ইস্যু হলে। ৮. ১৮-দলীয় জোটের আন্দোলনে যে ব্যাপক সন্ত্রাস ও সহিংসতা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষ সমর্থন করেননি। এসব হিংসাত্মক ঘটনায় ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানিতে অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এতে লাভ হয়েছে আওয়ামী লীগের। জনগণের ক্ষোভ ও সমালোচনাকে তারা ক্যাশ করেছে। ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে। খালেদা জিয়া যতই বলুন, ‘সহিংসতা বিএনপি করেনি’, তা বাস্তবতার ধোপে টেকেনি। সন্ত্রাস ও সহিংসতা দিয়ে নির্বাচন প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি, উল্টো বিএনপির বদনাম হয়েছে। আন্দোলনে সন্ত্রাস ও সহিংসতা পুরো আন্দোলন সম্পর্কেই দেশে-বিদেশে একটা নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করবে, তা বিএনপি আগে বুঝতে পারেনি।
এগুলো আমাদের প্রধান পর্যবেক্ষণ। এর বাইরে হয়তো আরও অনেক বিষয় থাকতে পারে। বিএনপির নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাও থাকতে পারে। নিঃসন্দেহে তা হবে খুব মূল্যবান।
আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বে বিএনপি কী করবে, কী কৌশল নেবে, তা আমরা বিস্তারিত জানি না। তবে সরকার তথা আওয়ামী লীগ এখন অনেক শক্তিশালী। প্রহসনের নির্বাচনের কলঙ্ককে তারা গায়ে মাখছে না। আমাদের ধারণা, সরকার সংলাপের নাটক করবে কিন্তু অর্থবহ সংলাপ করবে না। সংলাপ করলেও আওয়ামী লীগ ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ মানবে না। আওয়ামী লীগ এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যার মাধ্যমে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে ও জয়লাভ করার সুযোগ পাবে। নির্বাচন থেকে যেকোনোভাবে বিএনপিকে দূরে রাখাই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য। আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলে আমরা খুশি হব। তবে এই ধারণাগুলো বিএনপিকে মনে রাখতে অনুরোধ জানাই।
২০১৪ সালটা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরেই যা কিছু করার বিএনপিকে করতে হবে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, দেশি-বিদেশি চাপ সৃষ্টি করে সরকারকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা। এই বছরটি যদি সরকার নানা টালবাহানায় পার করে দিতে পারে, আমাদের ধারণা, পরিস্থিতি আর বিএনপির অনুকূলে না-ও থাকতে পারে।
বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। এমনও শোনা যাচ্ছে, আইনি প্রক্রিয়ায় জামায়াত নিষিদ্ধও হয়ে যেতে পারে। ভোটের কিছু শেয়ার ছাড়া বিএনপির জন্য জামায়াত তেমন প্রয়োজনীয় দল নয়। তা ছাড়া জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার, সন্ত্রাসী দল ইত্যাদি অভিযোগও রয়েছে। এ রকম বিতর্কিত একটি দলকে সঙ্গে না রাখলে বিএনপির কি খুব বড় রকম ক্ষতি হবে? আমাদের ধারণা, না, তেমন বড় কোনো ক্ষতি হবে না। জামায়াতকে ছাড়লেও জামায়াতের ভোট বিএনপিই পাবে। জামায়াতকে বাদ দিলে বিএনপি আরও অন্তত তিন-চারটি দলকে আন্দোলনে পাশে পাবে, যারা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকাও রাখতে পারবে। নতুন কয়েকটি দল ছাড়াও ব্যাপকসংখ্যক প্রগতিশীল মানুষও বিএনপিকে সমর্থন দিতে পারে, এমনকি ভোটের অধিকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে রাজপথেও নামতে পারে। জামায়াতমুক্ত বিএনপি নতুন তিন-চারটি দলের সহায়তায় ‘তত্ত্বাবধায়ক’ ইস্যুতে একটা বড় গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে। বিএনপিকে বুঝতে হবে, জামায়াতের সহায়তায় যে সহিংস আন্দোলন সমপ্রতি হয়েছে, তাতে দলের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং বিএনপি ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে জিয়াউর রহমানের বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে পাথেয় করে একটা বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্দোলন শুরু করার আগে বিএনপিকে তার মিত্র, জোট, কৌশল, আন্দোলনের চরিত্র, কর্মসূচি ইত্যাদি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যদি বিএনপি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিএনপির জন্য করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছে। বিএনপি ও খালেদা জিয়া নিশ্চয়ই সেটি চান না।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

ভবিষ্যতেও গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রেখে  গত ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
গতকাল বিকালে গণভবনে সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশে বলেন, সবাইকে মনোনয়ন দিতে পারবো না। তবে শীতের পিঠা খাওয়াতে পারবো। তিনি ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, নির্বাচন যাতে না হয় সেজন্য নানা বাধা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু শত বাধা উপেক্ষা করে দেশবাসী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ভাগে ৩৬টি সিট। আবেদন পেয়েছি ৮২২টি। আমি খুব আনন্দিত। এত উৎসাহ উদ্দীপনা এটাই বড় কথা। নারী জাগরণ বলতে যা বোঝায় এখানে তাই ঘটে গেছে। গণভবনের মাঠ সত্যিই ধন্য হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে বলেন, পার্লামেন্টে অংশ নেয়ার জন্য আপনারা এগিয়ে এসেছেন এটাই বড় অর্জন। রাজনীতি একদিনে শেষ হয়ে যায় না। যার যার এলাকায় কাজ করবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। বর্তমানে স্পিকার, সংসদ নেতা, বিরোধী দলের নেতা, সংসদ উপনেতা সবাই মহিলা। এটা বিশ্বে কোথাও নেই। ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর মেয়েদের অবস্থান ছিল না বললেই চলে। ডিসি, এসপি, সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর, সহকারী জজ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাম্বাসেডর, ওসি, ইউএনও প্রত্যেকটি পদে যেন মহিলারা পদ করে নিতে পারে তা আমরা করে দিয়েছিলাম। মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করে দিই। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেছি। প্রথম মহিলা স্পিকার নারী করেছি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, একে একে সব জায়গায় যেন আমাদের বোনদের জন্য স্থান থাকে সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছি।
অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সবাই যোগ্য ও অভিজ্ঞ। তবে প্রার্থী অনেক, তাই সবাই সুযোগ পাবেন না। তিনি বলেন, হতাশ হওয়ার কোন কারণ নেই। সামনে উপজেলা নির্বাচন। এছাড়া পৌরসভা, সিটি করপোরেশনেও আপনারা সুযোগ পাবেন। প্রার্থী নির্বাচন করার ক্ষেত্রে আবেগের বশবর্তী হয়ে অথবা যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত প্রিফারেন্স দিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করবো না। যোগ্যতা অনুসারেই প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হবে।
অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ড. গওহর বিজভী, এইচ টি ইমাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য সাজেদা চৌধুরী, ওবায়দুল কাদের, কাজী জাফরউল্লাহ, নূহ-উল আলম লেলিন ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ৩৬টি আসনের জন্য আওয়ামী লীগের ৮২২জন প্রার্থী দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।
হাসিনাকে অভিনন্দন ইংলাকের
তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার অনুবিভাগ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। কূটনৈতিক চ্যানেলে পাঠানো অভিনন্দন বার্তায় ইংলাক সিনাওয়াত্রা আশা করেন, বর্তমান সরকার দুই দেশের সম্পর্ক আরও প্রসার ও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করতে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে জানান।

ভবিষ্যতেও গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রেখে  গত ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

দাম্পত্যের তুষের অনলে জ্বলছিলেন সুনন্দা পুষ্কর

দাম্পত্যের তুষের অনলে জ্বলছিলেন সুনন্দা পুষ্কর। স্বামী ভারতের কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ মন্ত্রী শশী ঠারুর পরকীয়ায় জড়িয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে চলছিল তিক্ত সম্পর্ক।
এর এক পর্যায়ে রাজধানী নয়া দিল্লির এক অভিজাত হোটেল থেকে উদ্ধার করা হয় তার মৃতদেহ। এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। তার মৃতদেহ উদ্ধার করার পর হাসপাতালে নেয়া হয় পোস্টমর্টেমের জন্য। এরপর বলা হয়েছে, সুনন্দা পুষ্করের বড় ধরনের কোন স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছিল না। যে পুরুষকে ভালবেসে বিয়ে করে তিনি সুখের সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কিছুদিন আগে আবিষ্কার করেন তিনি অন্য নারীর প্রেমে মজেছেন। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এ নিয়ে টুইটারে তিনি ফাঁস করে দেন নানা গোপন বিষয়। নয়া দিল্লির হোটেলে ৫২ বছর বয়সী সুনন্দা পুষ্কর ১৫ই জানুয়ারি একা অবস্থান করেন। পরের দিন তার সঙ্গে যোগ দেন মন্ত্রী শশী। সুনন্দা তার স্বামীর পরকীয়া সম্পর্কে তথ্য ফাঁস করে দেয়ার পরদিনই তার রহস্যময় মৃত্যু হয়। হোটেল থেকে সুনন্দার মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেরালা ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসকরা ভালমতো পরীক্ষা করে বলেন, সুনন্দার বড় কোন অসুখই ছিল না। সোমবার এ বিষয়ে মন্ত্রী শশীকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা রয়েছে পুলিশের। এ জন্য আগে থেকেই তাকে প্রস্তুতি নিতে দু’ দিন সময় দেয়া হয়। চিকিৎসকরা বলছেন, সুনন্দার মৃত্যু আকস্মিক ও অস্বাভাবিক। তার শরীরে রয়েছে ক্ষতের চিহ্ন। শনিবার লোদি রোডে সুনন্দার মৃতদেহ দাহ করা হয়। ওদিকে এর আগের এক রিপোর্টে বলা হয়, টুইটারে পাকিস্তানি সাংবাদিক মেহের তারারের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছেন শশী ঠারুর। বুধবার শশী ঠারুরের টুইটার একাউন্টে ইঙ্গিত দেয়া হয়, লাহোর ভিত্তিক সাংবাদিক মেহের তারারের সঙ্গে প্রণয় চলছে ৫৭ বছর বয়সী শশীর। এরপরই তিনি টুইটারে লেখেন, তার একাউন্ট হ্যাক হয়ে গেছে। মেহেরের সঙ্গে তার কোন প্রেম নেই। এর আগে একবার সুনন্দা পুষ্কর দ্য ইকোনমিক টাইমস পত্রিকাকে বলেন, শশী বা তার একাউন্ট কেউ হ্যাক করেনি, তারাই এসব বার্তা দিচ্ছেন টুইটারে। তিনি বলেছেন, লাহোর ভিত্তিক মেহের তারার যেসব ব্যক্তিগত বার্তা শশী ঠারুরকে পাঠিয়েছেন সেগুলোই তিনি পোস্ট করেছেন। টুইটারে মেহের তারার বলেছেন, টুইটারে তিনি সব সময় প্রকাশ্যে শশী ঠারুরের প্রশংসা করেছেন। তার বইয়ের পর্যালোচনা করেছেন। এ নিয়ে লুকোচুরির কিছুই নেই। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সুনন্দা পুষ্করকে উদ্ধৃত করে বলেছে, তার স্বামী শশী ঠারুরের সঙ্গে মেহের তারারের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে। এ জন্য তিনি বিচ্ছেদ চাইবেন। এনডিটিভি চ্যানেলকে সুনন্দা পুষ্কর বলেছেন, মেহের তারার তার স্বামীকে বাগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন। তবে বিতর্ক যখন তুঙ্গে তখন শশী-সুনন্দা দম্পতি বললেন, তারা বিবাহিত, সুখী এবং এভাবেই বাকিটা সময় থাকতে চান। কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়! এখন দু’জন দু’ ভুবনের বাসিন্দা।

ওদিকে সুনন্দা পুস্কর ও শশী ঠারুরের জীবনে ঝড় তোলার অভিযোগ পাকিস্তানি যে নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তিনি বলেছেন, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। মেহের তারার বলেছেন, শশী ঠারুর ও তার স্ত্রী সুনন্দা পুস্করের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টিতে তার কোন ভূমিকা নেই। সুনন্দা পুস্করের লাশ দিল্লির একটি অভিজাত হোটেল থেকে উদ্ধার করার পর এ বিতর্ক ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। ঠিক এমন সময় পাকিস্তানের একটি টিভি চ্যানেলকে মেহের তারার বলেছেন, তিনি এ ঘটনায় ষড়যন্ত্রের শিকার। লাহোরভিত্তিক এই সাংবাদিকের বয়স ৪৫ বছর। এরই মধ্যে তিনি টুইটার একাউন্টে পাল্টে ফেলেছেন প্রোফাইল ছবি। তিনি বলেছেন, শশী ঠারুরের সঙ্গে তার দু’বার সাক্ষাত হয়েছে। একবার গত এপ্রিলে ভারতে। দ্বিতীয়বার গত জুনে দুবাইতে। তখন সেখানে অনেক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। মেহের বলেন, যখন আমি তাকে নিয়ে একটি লেখা লিখেছি, তখন অন্য মেয়ে হয়তো তা পছন্দ করবে না। সুনন্দা তার স্বামীকে অন্য জন এভাবে প্রশংসা করছে তা হয়তো সহ্য করতে পারেন নি। তাই তিনি শশীকে আমার সঙ্গে কথা বলতে বারণ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও শশী টুইটারে আমাকে ফলো করতে থাকেন। আমি বুঝতে পারি না তার স্বামীর সঙ্গে ফোনে কথা বললে বা ই মেইলে যোগাযোগ করলে তাতে তার সমস্যা আছে।

দাম্পত্যের তুষের অনলে জ্বলছিলেন সুনন্দা পুষ্কর

দাম্পত্যের তুষের অনলে জ্বলছিলেন সুনন্দা পুষ্কর। স্বামী ভারতের কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ মন্ত্রী শশী ঠারুর পরকীয়ায় জড়িয়ে যাওয়ায় তাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে চলছিল তিক্ত সম্পর্ক।

অন্তরালে দুই কিংবদন্তি- গ্রেটা গারবো থেকে সুচিত্রা সেন

গ্রেটা গারবো ও সুচিত্রা সেন। দু’জনেই অভিনেত্রী। একজন বাংলার মেয়ে। অন্যজন সুদূর সুইজারল্যান্ডের। তারপরও তাদের মধ্যে রয়েছে অদভুত মিল। তারা দু’জনেই চোখের চাহনিতে লিখে দিয়েছেন অমর কবিতা।

অন্তরালে দুই কিংবদন্তি- গ্রেটা গারবো থেকে সুচিত্রা সেন

গ্রেটা গারবো ও সুচিত্রা সেন। দু’জনেই অভিনেত্রী। একজন বাংলার মেয়ে। অন্যজন সুদূর সুইজারল্যান্ডের। তারপরও তাদের মধ্যে রয়েছে অদভুত মিল। তারা দু’জনেই চোখের চাহনিতে লিখে দিয়েছেন অমর কবিতা।
প্রেমের জয়গান তাতে ফুটে উঠেছে এক অকৃত্রিমতায়। সিনেমায় অভিনয় করতে গিয়ে দু’জনেই হারিয়ে গিয়েছিলেন প্রেমের এক গোপন ভুবনে। সেখান থেকে তাদের মুক্তি মেলে নি কোনদিন। নিজেরাই নিজেদের করেছেন লোকচক্ষুর আড়াল। সেভাবেই কেটে গেছে তাদের জীবনের বড় অংশ। বলা যায়, এ সময়টা তাদের জীবনের অন্ধকার সময়। নিজেরাই নিজেদের কষ্ট দিয়েছেন। ঘরের চার দেয়ালে বন্দি হয়েছেন স্বেচ্ছায়। তারপর আর কোনদিন পৃথিবীর কারও সামনে মুখ দেখান নি। শত চেষ্টা করেও তাদের একান্ত আপনজন বাদে কাউকে দেখান নি মুখ। এমন কি মৃত্যুর পরেও কাউকে দেখতে দেন নি ‘স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা’কে। দেখতে দেন নি মৃত্যুর পরেও সেই অজস্র কবিতার চোখ এখনও উত্তম কুমারের জন্য পথ চেয়ে আছে কিনা। গ্রেটা গারবো কি জীবনের শেষ সময়টাতে তার প্রিয়তম জন গিলবার্টের ডাক শুনতে পেয়েছিলেন! ১৯০৫ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বরে সুইডেনের স্টকহোমে জন্ম গ্রেটা গারবোর। তিনি প্রথমে অভিনয়ে কাজ শুরু করেন ইউরোপে। এরপর ১৯ বসন্তের যুবতী গ্রেটা গারবো যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এমজিএম-এর ব্যানারে কাজ করার জন্য। রমা দাস গুপ্তা যেমন কলকাতা গিয়ে সুচিত্রা সেন হয়ে ওঠেন, গ্রেটা গারবোর ক্ষেত্রে তেমন হয় নি। তিনি নাম পাল্টান নি। তার মতোই অসাধারণ, অবর্ণনীয় সৌন্দর্য্যের অধিকারী ছিলেন সুচিত্রা। শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তার আগে গ্রেটা গারবো কাজ করেন নির্বাক ও পরে সবাক চলচ্চিত্রে। তাকে বলা হয় হলিউডের সবচেয়ে খেয়ালি তারকা। তবে তার সঙ্গে সুচিত্রা সেনের রয়েছে কিছু পার্থক্য। গ্রেটা গারবো কখনও বিয়ে করেন নি। তার কোন সন্তান নেই। সারা জীবনই তিনি বেছে নেন নিঃসঙ্গ জীবন। কিন্তু সুচিত্রা সেন বিয়ে করার পরই এসেছেন চিত্রজগতে। তার কন্যা মুনমুন সেন, নাতনি রিয়া ও রাইমা সেন অভিনেত্রী। ১৮ বছর বয়সে কলকাতার বিশিষ্ট শিল্পপতি প্রিয়নাথ সেনের ছেলে দিবানাথ সেনের সঙ্গে বিয়ে হয় সুচিত্রার। গ্রেটা গারবো যাদের সঙ্গে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ প্রেম গড়ে উঠেছিল জন গিলবার্টের সঙ্গে। ১৯২৬ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন সময়ে তিনি অবস্থান করেন গিলবার্টের সঙ্গে। তাদের মধ্যে এমন গাঢ় প্রেমকে পুুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে এমজিএম। এ সংস্থা তৈরি করে ‘ফ্লেশ অ্যান্ড দ্য ডেভিল’। নির্মিত হয় ‘লাভ’ এবং ‘এ ওম্যান অব অ্যাফেয়ার্স’। এগুলো ব্যবসাসফল হয়। বহুবার তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন গিলবার্ট। ১৯২৬ সালে একবার তাকে ইলেন বোর্ডম্যান ও কিং ভিদোরের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন করা হয়। কিন্তু বিয়ের আসরে উপস্থিত হন নি গ্রেটা গারবো। ১৯৩৭ সালে লিওপোল্ড স্টকোস্কি নামে এক কনডাক্টরের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। তার সঙ্গে তিনি পরের বছরগুলো চুটিয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। শুধু বন্ধুত্ব নয়, গাঢ় প্রেম। এই প্রেমের উন্মাতাল হাওয়ায় তারা মাঝে মাঝেই হারিয়ে যেতে থাকেন ইউরোপে। এছাড়াও গ্রেটা গারবোর প্রেম গড়ে উঠেছিল সিসিল বিটন, রাশিয়ার ধনকুবের দিলীপ কুমার, সঞ্জীব কুমার, ধর্মেন্দ্র, দেব আনন্দ, ভারত ভূষণ, শেখর, জর্জ শলির সঙ্গে। অন্যদিকে, সুচিত্রা সেন অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, বিকাশ রায়, বসন্ত চৌধুরী, কমল চিত্র, প্রশান্ত কুমার, রঞ্জিত মল্লিক প্রমুখের সঙ্গে। এর মধ্যে উত্তম-সুচিত্রা জুটি যেন জীবন্ত হয়ে কথা বলতো। তাদের অভিনয়কে কখনও মনে হয় নি অভিনয়। একান্তে, মনের গভীরে, চোখে চোখে তারা যে অভিনয় করে গেছেন তা তাদেরকে চিরজীবন দিয়েছে। তাদের মধ্যে গড়ে উঠেছিল সত্যিকার প্রেম। তারই ধারাবাহিকতায় সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্র থেকে অবসর নেয়ার পর ৩৫টি বছর ঘরের ভিতর নিজেকে বন্দি করে রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন ভীষণ জেদি। ১৯৭৮ সালে তার ‘প্রণয় পাশা’ ভাল ব্যবসা করে নি। অভিমানে তিনি চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যান বাকিটা জীবন। ওদিকে গ্রেটা গারবোও চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। তিনিও নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। এ থেকেই বলাবলি আছে যে, তাকে দেখেই সুচিত্রা সেন লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যেতে উদ্বুদ্ধ হন। এ জন্যই সুচিত্রাকে কাব্য করে বলা হয় ‘বাংলার গ্রেটা গারবো’। তবে গ্রেটা গারবো বিয়ে না করলেও তার ছিল উদ্দাম, উন্মুক্ত প্রেমময় জীবন। তিনি একাধারে পুরুষ ও মেয়েদের সঙ্গে সমকামিতায় লিপ্ত হয়েছেন। ১৯২৭ সালে মঞ্চ ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী লিলিয়েন তাশমানের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। এরপরেই তারা প্রেমে পড়ে যান। এছাড়া সমকামিতা গড়ে ওঠে তার মারসিডিস ডি একোস্তার সঙ্গে। এ সময়ে তাদের মধ্যে বিনিময় হয় ১৮১টি প্রেমপত্র, কার্ড, টেলিগ্রাম। এর বেশির ভাগই এখন সংরক্ষিত আছে ফিলাডেলফিয়ার রোদেনবাক মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরিতে। শুরুর দিকে গ্রেটা গারবো চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলতেন। তিনি একা একা থাকতে ভালবাসতেন। কোন বন্ধুর সঙ্গে অযথা আড্ডা দেয়া পছন্দ করতেন না। তেমনি সুচিত্রা সেন প্রথম দিকে চলচ্চিত্রে আসতেই চান নি। তাকে বলা যায় অনেকটা জোর করে এ জগতে প্রবেশ ঘটিয়েছেন তার স্বামী। গ্রেটা গারবো কখনও অটোগ্রাফ দেননি। ভক্তদের চিঠির কোন জবাব দেন নি। সাক্ষাৎকার দিয়েছেন হাতেগোনা। কখনও তিনি অস্কার উৎসবে যোগ দেননি। তাকে অস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কারে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রচার বিমুখ গ্রেটা গারবো সেই পুরস্কার আনতে যান নি। লোকচক্ষুর অন্তরালে যখন তিনি নিজেকে নিয়ে যান তখন শত চেষ্টা করেও বাইরের কেউ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারেন নি। এ সময় ভীষণ বিষণ্নতা তাকে ঘিরে ধরে। এক পর্যায়ে তার স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ে। ১৯৮৪ সালে এর জন্য তাকে সফল চিকিৎসা দেয়া হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে শুধুমাত্র তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা জানতে পারেন সপ্তাহের তিন দিন- সোমবার, বুধবার ও শুক্রবার নিউ ইয়র্ক হাসপাতালের দ্য রোগোসিন ইনস্টিটিউটে ৬ ঘণ্টা করে তিনি ডায়ালাইসিস করান। ১৯৯০ সালের ১৫ই এপ্রিল ৮৪ বছর বয়সে ওই হাসপাতালেই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। পরে শোনা যায় তিনি গ্যাস্ট্রিকেও আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার মৃতদেহ সমাহিত করা হয়েছে মানহাটনে। অন্যদিকে সূচিত্রা সেন ফিরিয়ে দিয়েছেন রাজ কাপুরের অফার, গ্রহণ করেন নি দাদা সাহেব ফালকে পুরস্কার। স্বেচ্ছা অন্তরালে যাওয়ার আগে অভ্যস্ত ছিলেন তুমুল বৈভবের বিলাসী জীবনে। রঙ্গ-কৌতুকেও ছিলেন অভ্যস্ত। এক অনুষ্ঠানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের গেঞ্জি টেনে ছিঁড়ে দেখিয়েছিলেন কিভাবে এ দৃশ্যটি তিনি রূপায়িত করেছেন ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবিতে।

দীর্ঘকাল পরে বাংলাদেশ আবার আন্তর্জাতিক ফোকাসে

বাংলাদেশ একদা ডায়রিয়া, ঘূর্ণিঝড় ও হরতালের দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ফোকাসে ছিল। দীর্ঘকাল পরে বাংলাদেশ আবার আন্তর্জাতিক ফোকাসে। আর সেটা কেবল ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের কারণে।
১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরও যা ঘটেনি বাংলাদেশ প্রশ্নে বিশ্ব এবার তাই করে দেখিয়েছে। তবে এর বিপরীতে এটা দেখার মতো যে, বিতর্কিত নির্বাচন প্রশ্নে বিশ্বের শক্তিশালী পার্লামেন্ট যখন একযোগে অনাস্থা প্রকাশ করেছে তখন বাংলাদেশের জাতীয় গণমাধ্যম তা ফোকাসে আনতে অপারগতার পরিচয় দিচ্ছে। এর একটি জ্বলন্ত উদাহরণ, গত ১৬ই জানুয়ারি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত প্রস্তাবের সংবাদ পরিবেশন করা। অনেক সংস্থা এমনভাবে খবর দিয়েছে যে, মনে হতে পারে সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে বিএনপিকে দূরত্ব বজায় রাখতে বলা কিংবা জামায়াত নিষিদ্ধ করার ব্যাপারেই ইইউ তার মাথাব্যথার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। এটা অর্ধসত্য। প্রকৃত ঘটনা হলো ১৬ই জানুয়ারির ইইউ রেজুলেশনের শিরোনামই হলো বাংলাদেশের নির্বাচন। এর বেশির ভাগ জায়গা জুড়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংসদ নির্বাচন করতে ‘আগাম নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের পক্ষে মত ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু অনেক মিডিয়া তা বেমালুম চেপে যায়। গৃহীত প্রস্তাবে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘ঐতিহ্যবাহী তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাতিল করেছেন’ বলা আছে। আরও বলা আছে, নির্বাচন কমিশন ৪০ ভাগ ভোটের দাবি করলেও ঢাকাভিত্তিক কূটনীতিকরা ২০ ভাগ ভোটের কথা বলেছেন। সরকারকে নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে ও পরে সংঘটিত সহিংসতায় নিহতদের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত করতে। আর এটা বলতে গিয়ে ওই প্রস্তাবে ‘নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ সকল দুষ্কৃত অপরাধের বিষয়ে’ তদন্ত করার কথাটিও ব্যবহার করেছে। ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য এসব অস্বস্তিকর অংশ একেবারেই ঝেড়ে ফেলে সরকারি মহলে কেবল জামায়াত বিরোধী অংশটির প্রচার-প্রচারণা নিয়ে উৎসাহ দেখাচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ১৪ই জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টের ১২ জন সংসদ সদস্য ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বিষয়ে কঠোরতম মনোভাব ব্যক্ত করেছিলেন। তারা নির্দিষ্টভাবে যত শিগগির সম্ভব নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন ক্রান্তিকালীন সরকার গঠন করে নির্বাচন অনুষ্ঠান অন্যথায় বাংলাদেশকে দেয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল করার বিষয়ে ইঙ্গিত দেয়া হয়। বছরে এর ফলে ইইউর ২৮টি দেশে ১০ বিলিয়নেরও বেশি ডলারের পণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হয়, তা কাটছাঁট করার ব্যাপারেও ইঙ্গিত দেয়া হয়। গত ১৬ই জানুয়ারি গৃহীত সিদ্ধান্তে যদিও ওই প্রস্তাব সরাসরি গৃহীত হয়নি।
তবে এটাও দেখার বিষয় যে, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পরে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার হাউস অব কমন্স এবং গণতন্ত্রের আদি নিবাস ইউরোপের পার্লামেন্ট থেকেই বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের জন্য সরাসরি একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওয়াজ উঠলো।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে যদিও বিষয়টিকে কাকতালীয় মনে করেন কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সাড়ে ছয় শ’ সদস্যের হাউস অব কমন্স এবং সাড়ে সাত শ’ সদস্যের ইইউ’র পার্লামেন্ট একই দিনে অত্যন্ত প্রাণবন্ত বিতর্ক করেছে। টেমস নদীর তীর থেকে ফ্রান্সের স্ট্রামবুর্গ পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয়েছে যে, বাংলাদেশে নির্বাচন বিতর্কিত। এতে বাঙালি জনগোষ্ঠীর মতামত প্রতিফলিত হয়নি।
আলোচনার অভিন্ন বিষয়: বাংলাদেশের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন
একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন এবং উন্নত বিশ্ব হিসেবে স্বীকৃত ২৮টি দেশের নির্বাচিত রাজনীতিকরা একযোগে বলেছেন ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন তাদের মনঃপূত হয়নি। এর নেতৃত্বে মার্কিন আইনসভা নির্বাচন প্রশ্নে শুনানি তারা আগেই করে রেখেছিল। তাই মার্কিন সিনেটর দ্রুত দুই নেত্রীর কাছে চিঠি লেখেন। প্রধানমন্ত্রীকে সাফ জানিয়ে দেন এই নির্বাচনে তাদের আস্থা নেই। নতুন নির্বাচন লাগবে।
এটা অত্যন্ত লক্ষণীয় যে, নির্বাচিতের বড়াই করে ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছে। অথচ ১৯৯৬ ও ১৯৮৮ নির্বাচনের পরে বিভিন্ন ক্ষমতাসীন বিদেশী সরকার প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসে এই প্রথম গোটা উন্নত বিশ্বের নির্বাচিত জ্ঞানীগুণী রাজনীতিকরা সমস্বরে বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচিতদের মুখের ওপর না বলে দিয়েছে। এত বড় কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিধস পরাজয়ের গ্লানি বাংলাদেশ এই প্রথম আস্বাদন করলো।
সর্বত্র প্রশ্ন, এই সরকার বৈধ কিনা। বিবিসি ও সিএনএনসহ সকল প্রভাবশালী মিডিয়া একযোগে নির্বাচনকে বিতর্কিত বলেছে। প্রতিবেশী ভারতের মিডিয়াও উন্নত বিশ্বের পার্লামেন্টগুলোর কণ্ঠস্বরের সঙ্গে গলা মিলিয়েছে। ভারতে নতুন সাধারণ নির্বাচনের সানাই বাজছে। তাই বলা যায়, এই নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের বিদায়ী ক্ষমতাসীন দল যারা পরাস্ত হতে পারে তারাই কেবল স্বাগত জানিয়েছে। সেখানেও দিল্লি কিন্তু অসতর্ক নয়। তারা কোনমতে বলেছে, সাংবিধানিক প্রয়োজনের কারণে, এর অর্থ তারাও মনে করে নির্বাচন বিতর্কিত। চীনের অবস্থানও কৌশলগত। কিন্তু নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, চীন তার আগের মনোভাব পাল্টে সরকারকে সমর্থন দিয়েছে। অথচ চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া বাংলাদেশ নির্বাচনকে বিতর্কিতই বলছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকেও কোন ঐতিহ্যবাহী বন্ধু রাষ্ট্র নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নে অন্তত প্রকাশ্যে বাংলাদেশ সরকারের পাশে দাঁড়ায়নি। উল্লেখ্য, ইইউ’র গৃহীত সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে নিরাপত্তাবাহিনীর নিপীড়নমূলক পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে বলে উল্লেখ আছে। তারা বলেছে, নির্বিচারে গুলিবর্ষণ বন্ধ এবং নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন বন্ধ করা বিরোধীদলীয় রাজনীতিকদের মুক্তি দেয়া দরকার। কারণ, তারা নিয়মবহির্ভূত গ্রেপ্তারের স্বীকার হয়েছেন। নির্বাচন আগে ও পরের সহিংস মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখতে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানানো হয়। এর সঙ্গে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যসহ জড়িত দুর্বৃত্তদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতেও আহ্বান জানানো হয়।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বাণিজ্য সুবিধা পর্যালোচনার মধ্যে এলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ইঙ্গিত আছে। তাই এই ধরনের প্রস্তাব পাস হওয়ার মতো পরিস্থিতি যাতে যা না হয় সেজন্য উভয় পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সমঝোতার পথে আসতে হবে। কারণ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মতো বিষয় গৃহীত সিদ্ধান্তে না থাকলেও সেখানে প্রচ্ছন্নভাবে তাদের কঠোর মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে। তাই কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এক অর্থে বিদেশী সংসদগুলোয় বাংলাদেশ জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটেছে, সরকারও বলেছিল নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। এ ধরনের ফোকাস বিব্রতকর এজন্য যে নিজেদের যা করণীয় এবং যা নিজেদেরও জানা সেটার জন্য আজ বিদেশীদের পরামর্শে শুনতে হচ্ছে। সন্ত্রাসী দলকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইইউ’র পার্লামেন্টে এ ঘটনা এই প্রথম।

দীর্ঘকাল পরে বাংলাদেশ আবার আন্তর্জাতিক ফোকাসে

বাংলাদেশ একদা ডায়রিয়া, ঘূর্ণিঝড় ও হরতালের দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ফোকাসে ছিল। দীর্ঘকাল পরে বাংলাদেশ আবার আন্তর্জাতিক ফোকাসে। আর সেটা কেবল ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের কারণে।

বিতর্কের বিষয় যখন বাংলাদেশ

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ভবন
বাংলাদেশ সম্পর্কে ভিনদেশের পার্লামেন্টে বিতর্কের ঘটনা সচরাচর ঘটে না বললে কমই বলা হবে; বরং বিরল শব্দটিই এ ক্ষেত্রে যথার্থ হতে পারে। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, ওয়েস্টমিনস্টারের উভয় কক্ষ—হাউস অব কমন্স এবং হাউস অব লর্ডসে প্রশ্ন উত্থাপন বা মন্ত্রীর বিবৃতির দৃষ্টান্ত আছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে শুধু বাংলাদেশ বিষয়ে বিশেষ বিতর্ক অনুষ্ঠানের কথা ইউরোপ বা আমেরিকার কোথাও হওয়ার তথ্য খুঁজে পাচ্ছি না। গত বছর প্রথম এ ধরনের একটি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় ইউরোপীয় পার্লামেন্টে—রানা প্লাজার প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার পর। সেই বিতর্কের উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের অধিকার, কাজের নিরাপত্তা এবং ন্যূনতম মজুরির মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা। এরপর পাকিস্তানের পার্লামেন্টে গত ডিসেম্বরে যুদ্ধাপরাধের বিচারে কাদের মোল্লার ফাঁসির বিষয়ে নিন্দা জানিয়ে আলোচনা এবং প্রস্তাবের কথা জানা গেল। তারপর, এ বছরের শুরুতেই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পার্লামেন্টের তিনটি উদ্যোগ এবং প্রতিটিই বাংলাদেশের প্রধান দুই দলের রাজনৈতিক কলহের আপসহীনতায় সৃষ্ট অচলাবস্থা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে তেমন একটা বিতর্ক ছাড়াই গৃহীত হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের নির্বাচন-পূর্ব রাজনৈতিক বাস্তবতার বিষয়ে সমঝোতার আহ্বান জানানোর প্রস্তাব।
আর গত বৃহস্পতিবার (১৬ জানুয়ারি) একই দিনে মাত্র ঘণ্টা চারেকের ব্যবধানে লন্ডন এবং স্ট্রাসবুর্গে দুটি বিতর্ক। পাকিস্তানের পার্লামেন্টের বিতর্ক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আবেগকে আহত করে বলে তার প্রতিবাদ জানানো যুক্তিসংগত হলেও অন্যগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া অচিন্তনীয় বলেই ধারণা করি। যদিও দলকানা বুদ্ধিজীবীদের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ‘নির্বাচনী প্রহসনে’র সমালোচনায় সোচ্চার বিদেশিদের অন্যদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সরকার এসব স্বার্থান্ধ বুদ্ধিজীবীর মন্ত্রণায় কান দেবে না বলেই আশা করি। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের দুটি বিতর্কই বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। হাউস অব কমন্সে সেদিনকার উপস্থিতির চিত্রটি তেমন একটা আশাপ্রদ না হলেও বিতর্কের গুণগত মান ছিল খুবই সমৃদ্ধ এবং ধারালো। ওই একই দিনে একই সময়ে পার্লামেন্টের অন্য আরেকটি কক্ষে সে সময় চলছিল একজন অভিজ্ঞ এমপির স্মরণসভা, যে কারণে উপস্থিতি ছিল কম। এই বিতর্কে কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব (মোশন) ছিল না। কোনো কোনো খবরে বিভিন্ন প্রস্তাব গ্রহণের কথা বলা হলেও বাস্তবে কোনো প্রস্তাব পাসের বিষয় ছিল না। হাউস অব কমন্সের কার্যবিবরণী (হ্যানসার্ড) দেখলেই তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। প্রতিমন্ত্রীসহ যে ১৩ জন আলোচনা করেছেন এবং অন্য যাঁরা নানা প্রশ্ন বা মন্তব্য করেছেন, তাঁদের কোনো সময় বাঁধা ছিল না। ফলে, তাঁরা মন খুলে বলেছেন। বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, নিজেদের নির্বাচনী এলাকার বাংলাদেশিদের কথা বলেছেন, কেন বাংলাদেশ তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেটাও তাঁরা ব্যাখ্যা করেছেন।
২০০৬ সালের রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সেনাসমর্থিত সরকারের নির্বাচনী সংস্কারের প্রশংসা যেমন ছিল তাঁদের বক্তৃতায়, তেমনি ছিল দুই নেত্রীকে মাইনাস করার রাজনীতির বিপত্তি এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের সমালোচনা। তবে, তাঁদের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি ছিল হতাশা এ কারণে যে ওই রাজনৈতিক সংকট থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকেরা কোনো শিক্ষা নেননি। তাঁদের আরেকটি হতাশার বিষয় ছিল যে রাজনীতিকদের বিবাদের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ক্রসফায়ারে মৃত্যুর কথাটি তাঁরা যেমন নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছেন, তেমনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সংঘাতে বেঘোরে প্রাণ হারানো নিরীহ মানুষের ক্ষেত্রেও তা উচ্চারণ করেছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিতর্কটি ছিল মাত্র ৩০ মিনিটের এবং তাতে প্রায় তিন ডজন ্রএমইপি অংশ নেন। ফলে আলোচনার সূচনাকারী ছাড়া আর কেউই মিনিট খানেকের বেশি বলার সুযোগ পাননি। তবে অধিবেশনকক্ষে উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিতর্কের জন্য ১৪ জানুয়ারি প্রস্তাব (মোশন) জমা পড়ে ছয়টি। ছয়টি রাজনৈতিক গোষ্ঠী—দ্য গ্রিনস ইউরোপিয়ান অ্যালায়েন্স, ইউরোপিয়ান কনজারভেটিভস অ্যান্ড রিফর্মিস্টস গ্রুপ, সোশ্যালিস্টস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস, অ্যালায়েন্স অব লিবারেলস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাটস ফর ইউরোপ (এএলডিই), ইউরোপিয়ান ইউনাইটেড লেফট অ্যান্ড নরডিক গ্রিন লেফট এবং ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি। এই ছয়টি মোশনই আমি পড়েছি।
অনেক ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে মিল থাকলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্যও ছিল। বিএনপিকে জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গ ছাড়ার আহ্বানটি ছিল শুধু এএলডিইর প্রস্তাবে। পরে ১৫ জানুয়ারি এসব রাজনৈতিক গোষ্ঠী একটি সম্মত প্রস্তাবের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায় এবং সেই অভিন্ন প্রস্তাবে জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গ ছাড়ার জন্য বিএনপির প্রতি আহ্বানের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়। জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গ ত্যাগের এই আহ্বানে আওয়ামী জোটের খুশি হওয়ার কারণ থাকলেও তাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে পুরো প্রস্তাবের মূল বার্তা হচ্ছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেউই প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন হিসেবে মানছেন না। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্ট—উভয় স্থানের বিতর্কেই কতগুলো অভিন্ন বিষয় লক্ষণীয়। প্রথমত, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অস্থিরতায় হতাশা ও নিন্দা। দ্বিতীয়ত, আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সমঝোতা। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বিরোধীদের গ্রেপ্তার, হয়রানি, নিপীড়ন বন্ধ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। চতুর্থত, সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সহিংসতা বন্ধে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতায় উদ্বেগ এবং বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দেখার প্রত্যাশা।
এ ক্ষেত্রে প্রধান দুই দলের একে অন্যকে দায়ী করার প্রবণতার বিষয়ে সচেতন ইউরোপীয় জনপ্রতিনিধিরা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচার নিশ্চিত করার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। পঞ্চমত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ এবং জবাবদিহি না থাকায় উদ্বেগ। ষষ্ঠত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগকে যথাযথ হিসেবে অভিহিত করে তার প্রতি সমর্থন জানালেও তাঁদের সবাই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ব্রিটিশ এমপিদের উদ্বেগ হচ্ছে বিচার-প্রক্রিয়ার মান সম্পর্কে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাক্ষী এবং আইনজীবীদের নিরাপত্তার বিষয়। ব্রিটিশ এমপিদের সমালোচনার একটা বড় অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাবের ভূমিকা। র‌্যাবকে ঘাতক বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করে তাঁরা বিভিন্ন গুম ও খুনের ঘটনার জন্য র‌্যাবকে দায়ী করে তাদের জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারার জন্য সরকারের সমালোচনা করেন। এমনকি, র‌্যাব ভেঙে দেওয়ার দাবি জানানোর আহ্বানও এই বিতর্কে শোনা গেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বিতর্কে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, প্রধান তিনটি দলের এমপিরাই তাঁদের নিজস্ব মতামত দিয়েছেন। ফলে, কনজারভেটিভ পার্টির অ্যান মেইন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আবশ্যকতা স্বীকার না করলেও তাঁর দলেরই রিচার্ড ফুলার ও রেহমান চিশতি বলেছেন যে, ওই ব্যবস্থা ছাড়া অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। আর এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সরব ছিলেন বিতর্কের সহ-উদ্যোক্তা লেবারের সায়মন ড্যানচুক। উভয় বিতর্কেই জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজত প্রসঙ্গ আলোচিত হলেও কেউই সরাসরি নাম উল্লেখ করে কোনো দলকে নিষিদ্ধের কথা বলেননি। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রস্তাবে সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত দলগুলোকে নিষিদ্ধের আহ্বান জানানো হলেও সেখানে কোনো দলের নাম কেউ উল্লেখ করেননি। জামায়াত ও হেফাজতের সঙ্গ ত্যাগ করার আহ্বান অবশ্য এসেছে উভয় পার্লামেন্ট থেকেই।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আহ্বানটি ছিল সরাসরি বিএনপির প্রতি। কিন্তু, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিস্তারিত আলোচনায় জামায়াতের প্রসঙ্গটি এলে অন্যান্য দেশের উদাহরণ দিয়ে রেহমান চিশতি এমপি প্রশ্ন করেন, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হলে তা দেশটিতে গোপন উগ্রপন্থার উত্থান ঘটবে কি না। এর জবাবে বাংলাদেশি-অধ্যুষিত পপলার এলাকার এমপি এবং বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত জিম ফিটজপ্যাট্রিক বলেন যে সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তিনি বলেন, সব দলের উচিত হবে জামায়াতকে সঙ্গে না রাখা। তবে অন্যদের জামায়াতকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন। যে তিনটি পার্লামেন্টে বাংলাদেশের সমসাময়িক সংঘাতের রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক এবং প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, সেগুলো বিশ্বের সমৃদ্ধ অর্থনীতিগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানির বাজারগুলোও ওই ইউরোপ এবং আমেরিকায়। বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা (বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে) দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই দুই মহাদেশের দেশগুলোর ভূমিকা ব্যাপকভাবে পরিব্যাপ্ত। আধুনিক প্রযুক্তির উৎস হিসেবেও তাদের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতা কম নয়। তারপর প্রবাসী আয়ের উৎস বিবেচনায় নিলে এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বই আলাদা। তাদের জনপ্রতিনিধিদের সমালোচনা কর্কশ শোনাতে পারে, পরামর্শগুলো মধুর না হয়ে তেতো মনে হতে পারে, কিন্তু এগুলো উপেক্ষা করা নিজেদের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। বেলারুশের স্বৈরশাসক আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো, রাশিয়ার নব্য জার পুতিন অথবা উত্তর কোরিয়ার অভিনন্দনে পুলকিত হওয়ার স্বাধীনতা আমাদের নিশ্চয়ই আছে। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের অভিনন্দনও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু সেটুকু অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল থেকে বাকি বিশ্বকে ‘কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার করব না’
কথাটা শোনানো কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এসব বিতর্ককে অনেকটা সিনক্রোনাইজড (তাল মেলানো) নাচ মনে হতে পারে। এটা কারও পক্ষেই নিশ্চিত করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি তা নাকচ করাও অসম্ভব। কারণ, পাশ্চাত্যের রাজনীতিকদের মধ্যে সমন্বয় ঘটাটা অস্বাভাবিক নয়, তবে বাংলাদেশকে নিয়ে তেমনটি হয়ে থাকলে তা যথেষ্ট ভাবনার বিষয়।এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখা ভালো, বিশ্বরাজনীতিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সুনির্দিষ্ট বিতর্ক বিশেষ ধরনের ভূমিকা রেখে থাকে। পাঠকদের এ ক্ষেত্রে মনে করিয়ে দেব সিরিয়াবিষয়ক বিতর্কের কথা। সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সীমিত আকারে সামরিক অভিযান পরিচালনার কথা প্রেসিডেন্ট ওবামা ঘোষণা করার পর ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে ব্রিটেনসহ নেটো জোট সামরিক অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। ওই অভিযানের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে হাউস অব কমন্সে বিরোধী নেতা এড মিলিব্যান্ড বিতর্কের সূচনা করলে সেই বিতর্কের পর সরকার ভোটে হেরে যায়। ফলে, ব্রিটেন পরিকল্পিত সামরিক অভিযান থেকে সরে আসে। আর তারই সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও ফরাসি পার্লামেন্টেও বিতর্ক হয় এবং পাশ্চাত্য জোট আরেকটি সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

শীতের তিন মিঠা

আকাশের হিম গলে গলে নামতেই দেশের শহর গ্রাম ভেসে যায় পৌষের ঘন কুয়াশায়। সেই কুয়াশায় মাঠ খায়, আকাশ খায়, নিঃশব্দে গিলে খায় নদীর ফেরিঘাট। বিশাল বাঁশঝাড় গ্রাস করেও খিদে মেটে না দানবটার। সঙ্গে কনকনে উত্তুরে বাতাস থেকে থেকে যেন শিং মাছের বিষমাখা কাঁটা বিঁধিয়ে দেয় শরীরে। বেলা বাড়লে পিছু হটে কুয়াশা; একে একে মাঠ নদী আকাশ সব উগরে দেয় জঠর থেকে। একটু পরে কুয়াশার চাদর সরিয়ে আকাশে উঁকি দেয় ম্লান-মনমরা ভোরের সূর্য। ‘পান-পানি-পিঠে: শীতে তিন মিঠে’—কথাটা নির্ভেজাল সত্য। তাই বলে শীত শুধু বিলাসব্যসন আর উৎসবেরই ঋতু নয়, আমাদের শীত পশ্চিমা রোমান্টিকতার আদলে কেবলই বসন্তের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে থাকে না। এই ঋতু শ্রমের ঋতু, কর্মের ঋতু—কর্মসংস্থানের ঋতু। কে না জানেন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি সবচেয়ে বেগবান হয় এ সময়েই। চিরাচরিত কৃষি ভিত্তিতে জীবিকায়নের গণ্ডির বাইরে বেকার যুবকদের নানা অপ্রচলিত পেশার পথ খুলে দেয় শীতকাল। সমুদ্রসৈকত ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ঘিরে শীতের দেশি-বিদেশি পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন জীবিকার উন্মেষ ঘটেছে এই ঋতুটির দাক্ষিণ্যে। যাঁরা এসব পেশায় যুক্ত,
তাঁদের অনেকের সংসারের চাকা বছরভর সচল রাখে শীতের কয় মাসের উপার্জন। অথচ এবার দেশজুড়ে সহিংসতায় শীতের শুরু থেকেই পর্যটনকেন্দ্রগুলো শূন্য—খাঁ খাঁ। স্পিডবোটগুলো সাগরে ভাসার বদলে বেলাভূমির বালুতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। অন্যান্য যানবাহনও ঝিমায় যাত্রীর অভাবে। বাংলাদেশের গোটা উপকূলজুড়ে এখন মাছ ধরার মৌসুম। ঝড়বাদলা না থাকায় সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ এখন শান্ত। তাই বহু মাঝি, জেলে আর নৌকার মহাজন মাছ ধরতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সাগরে কাটান। তাঁদের কষ্ট, পরিশ্রম আর নিঃসঙ্গতার পুরস্কার দিতে সাগরও কার্পণ্য করে না। নানা জাতের মাছে তাঁদের নৌকার খোল ভরে ওঠে; সেই মাছের কেনাবেচায় গমগম করে উপকূলের দ্বীপ। শত শত মানুষের আনাগোনায় সমুদ্রের কূলে যেন হাট বসেছে। বিভিন্ন শহরে, বন্দরে, আড়তে এখানকার মাছ চালান যায়; বালুর চরায় মাছের একটা বড় অংশ রোদে শুকিয়ে তৈরি হয় শুঁটকি। দেশের চাহিদা মিটিয়েও এই শুঁটকি রপ্তানি হয় বিদেশে। এখানে শীতের তিন মাস অস্থায়ী দরমার ঘর বেঁধে ব্যবসা করেন নানা জায়গা থেকে জমায়েত হওয়া মাছ ব্যবসায়ীরা। শীতে ঠান্ডা যত কড়া হয়, তত বেশি রস নামে খেজুরগাছে। সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের গুড়—পাটালি, নলেন, বালি, লালি আর মেলা গুড়—কত নাম গুড়ের। ‘জিরান কাটের’ রস জ্বাল দিয়ে তৈরি পাটালি গুড় স্বাদে-গন্ধে অদ্বিতীয়, তা সমঝদারমাত্রই জানেন। শীতজুড়ে বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায়, বিশেষ করে ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনায় খেজুরগাছ চাঁছা হয় রসের জন্য। মোরগ ডাকা ভোরে শীতে কাঁপতে কাঁপতে খেজুরগাছ বেয়ে রস নামায় ‘গাছি’।
রসভরা কলসগুলো বাঁকে বেঁধে সকালেই গাছি পৌঁছে যায় রস জ্বাল দেওয়ার ‘বাইনে’। গুড় তৈরির পর কলসি ভরে মহাজনের ঘরে দিয়ে আসতে হবে। সারা বছর এ গুড় খাওয়া ও বিক্রি হয়। রসের পর শীতের আরেক উপহার সরষে ফুলের মধু। পেশাদার মধু সংগ্রহকারীরা হলুদ ফুলে ভরা বিস্তীর্ণ সরষেখেতের পাশে সারি সারি পোষা মৌমাছির বাক্স পেতে রাখে। কয়েক দিন পর পর সেই বাক্সের মধু তোলা হয়। এই ভ্রাম্যমাণ মধু সংগ্রহকারীরা এক জায়গায় ফুল ঝরে গেলে অন্য জায়গায় হাজির হন। সবে সরষে ফুল ধরেছে এমন খেতে বাক্স পেতে অস্থায়ী ডেরা বাঁধেন। খেতের মালিকও আপত্তি করেন না, বরং খুশিই হন। কারণ, মৌমাছি তাঁর খেতে পরাগায়নে সাহায্য করে সরষের ফলন বাড়াবে। সেকালে শীতের ঢাকার আকাশে উৎসবের মেজাজে ভেসে বেড়াত শত শত রংবেরঙের ঘুড়ি। ১২৮৭-এর অগ্রহায়ণের বঙ্গদর্শন বলছে, ‘শীতকালে ঢাকায় প্রত্যেক দিন পাঁচ শ/ সাত শ ঘুড়ি উড়ে। সরস্বতী পূজার দিন শহরের উত্তরের মাঠে (সম্ভবত রেসকোর্সের মাঠ) যে কত ঘুড়ি উড়িয়া থাকে তাহার সংখ্যা বলা যায়নি। ঘুড়ি কাটিয়া গেলে তাহা ধরিবার জন্য শত শত লোক বাঁশ হাতে দৌড়িয়ে থাকে। ইহা দেখিয়ে বড় চমৎকার।’ এখনো ঢাকায় কিছু ঘুড়ি উড়তে দেখা যায়; ঘুড়ি উৎসবও হয়। আমাদের চোখের সামনে দেখতে দেখতে শীতের ঢাকার চেনা অনুষঙ্গগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
সত্তরের দশকের শেষের দিকেও বনানী-গুলশানে জোনাকি জ্বলত ঝোপে-ঝাড়ে। কবরস্থানের পাশের ফাঁকা জায়গায় শিয়াল ডাকত রাতে দু-তিনবার; একটি-দুটি নয়, একাধিক এবং সম্মিলিত কণ্ঠে। তখনো দু-চারটি শিমুলগাছকে দেখা গেছে লাল ফুল ফুটিয়ে অহংকারী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে। গাছপালা বেশি থাকায় শীতের দুপুরে দু-চারটি অলস বকের ওড়াউড়ি চোখে পড়েছে বিনা প্রয়াসে। কামাল আতাতুর্কের পাশের একদা ফাঁকা প্রান্তটি এখন ঐতিহাসিকের গবেষণার বিষয়। সেদিনের ফাঁকা কুয়াশাঘেরা মাঠে এখন হাট-বাজার, সুপার মার্কেট, আর আকাশ আছড়ানো ভবনের ভিড়। তাদের কারও কারও মাথায় উঁচু উঁচু সেলফোনের টাওয়ার। শুনেছি, ঘনবসতি আবাসিক এলাকায় এ ধরনের উচ্চক্ষমতাবিশিষ্ট তরঙ্গের বিকিরণ মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর। জানি, প্রযুক্তিকে পিছু হটানো যায় না, কিন্তু তাকে নির্বিচারে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আকাশছোঁয়া বহুতল ভবন লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে, অথচ রাজধানীর স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করার কথা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছে বলে মনে হয় না।
মাহবুব আলম: সাবেক রাষ্ট্রদূত।

রূপের মোহেই নির্বাসন সুচিত্রার, মত মনোবিদদের

স্বেচ্ছা নির্বাসনের নেপথ্যে কি লুকিয়ে ছিল কোন গভীর মানসিক আঘাত? নাকি বিগতযৌবনা হওয়ার জ্বালা সহ্য করে উঠতে না পেরেই নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন প্রয়াত সুচিত্রা সেন।
নায়িকা বুড়িয়ে যাচ্ছেন, সে বাস্তব সত্যিটাই কি মেনে নিতে না পেরে এমন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। সে রহস্য জানার উপায় আর নেই। কিন্তু মনোবিদরা বলছেন, অভিনয় জীবনে আচমকা দাঁড়ি টেনে দিয়ে সাড়ে তিন দশক নিজেকে চার দেয়ালে বন্দি করে নেয়ার নজির একেবারেই স্বাভাবিক নয়। বরং আমৃত্যু এমন জীবনযাত্রা বেছে নেয়ার মূলে নির্ঘাত কোন গভীর অবসাদ কিংবা অন্য কোন জটিল ও বিরল মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা থাকাই যুক্তিসঙ্গত। এই খবর জানিয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত এই সময়। কি সেই সমস্যা। ডাক্তারি পরিভাষায় একে বলে নার্সিসিস্টিক অ্যাটিটিউড। নিজের রূপ-যৌবনের প্রতি অতি-ভালবাসা থেকে কখনও কখনও এমন নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেন মানুষ। চুল পাকছে, ত্বক কুঁচকে যাচ্ছে, এমন রূপে নায়িকাকে কেউ দেখুক, এমনটা হয়তো চাননি তিনি- মন্তব্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কেদাররঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তিনি মনে করেন, এমন অস্বাভাবিক আচরণ আদতে বাস্তবকে মেনে নিতে না পারা। হয়তো তিনি চাইতেন, তার রিনা ব্রাউন, সাগরিকার সৌন্দর্যটাই লোকের মনে থেকে যাক। তার আক্ষেপ, ‘ঠিক সময়ে এ নিয়ে তার কাউন্সিলিং হলে হয়তো বাঙালির কাছে এতো বছর অধরা থেকে যেতেন না সুচিত্রা সেন।’ মনোবিদ সুবর্ণা সেনের কথায়, ‘যে সুচিত্রা সেন স্বপ্নসুন্দরী ছিলেন, তিনি বেশি বয়সে মানুষের সামনে এলে মানুষ সেই চেহারাটা কেমনভাবে নেবে, সে বিষয়ে হয়তো তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। নার্সিসিজমে এমনটা হয়।’ যে হাসপাতালে জীবনের শেষ ২৬ দিন ভর্তি ছিলেন সুচিত্রা, সেখানকার চিকিৎসকরাও মনে করছেন, নিজের যৌবনের রূপ নিয়ে নায়িকা এতোটাই মোহগ্রস্ত ছিলেন যে, প্রৌঢ়ত্বে কিংবা বৃদ্ধাবস্থায় তাকে কেউ চিনে ফেলুক, এমনটা কখনও চাইতেন না তিনি। এক চিকিৎসক বলেন, ‘টিভিতে উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা দেখে তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, ওটা তো আমি নই, সুচিত্রা সেন। এই মনোভাবটাই তাকে আটকে রেখেছিল বাড়ির মধ্যে।’ যদিও স্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় এমন আচরণ স্বাভাবিক নয় বলেই মত চিকিৎসকদের। ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পার্থসারথী বিশ্বাসও এ বিষয়ে একমত। তার বক্তব্য, একই রকম আচরণ দেখা গিয়েছিল হলিউড সুন্দরী গ্রেটা গার্বোর ক্ষেত্রে। সম্ভবত গার্বোকে নিয়ে মার্কিন মনোবিদরা গবেষণা করেছেন। তার জীবনে ঠিক কি ঘটেছিল তা সবারই অজানা। তবু মনে হয়, এদেশেও সুচিত্রার স্বেচ্ছা নির্বাসন রীতিমতো ডাক্তারি গবেষণার বিষয়বস্তু- মূল্যায়ন পার্থসারথীর। তিনি মনে করেন, নার্সিসিজমের জেরে কোন মানসিক আঘাতের (নার্সিসিস্টিক ইনজুরি) প্রভাবেই তার মধ্যে ‘পজিটিভ বডি ইমেজ’-এর উপসর্গ তৈরি হয়েছিল। নিজের রূপলাবণ্যের মোহে আচ্ছন্ন হয়েই নিজেকে ঘরবন্দি করে ফেলেছিলেন সুচিত্রা।

রূপের মোহেই নির্বাসন সুচিত্রার, মত মনোবিদদের

স্বেচ্ছা নির্বাসনের নেপথ্যে কি লুকিয়ে ছিল কোন গভীর মানসিক আঘাত? নাকি বিগতযৌবনা হওয়ার জ্বালা সহ্য করে উঠতে না পেরেই নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন প্রয়াত সুচিত্রা সেন।

দুধ দিয়ে অনেক ভাত by মন্‌জুরুল ইসলাম

‘এত ভাত দুধ দিয়া খায় না’- কথাটি গ্রামেগঞ্জে অনেক বেশি প্রচলিত হলেও রাজনীতির মাঠে কথাটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তিনি যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখন তিনি এটা অত্যন্ত মজা করে বলতেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কখনও কোথাও বলেছেন কিনা তা শোনার বা জানার সুযোগ হয়নি। আন্দোলন বেগবান করতে ও তৎকালীন সরকারকে উদ্দেশ্য করেই তিনি এ কথাটি বলতেন। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল ২৯শে ডিসেম্বর ২০০৮। বলা হয়ে থাকে সেনাসমর্থিত সরকারের অধীনে হয়েছিল সেই নির্বাচনটি। সে সময়ের সরকারকে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সরকার বলা হতো। তখনকার  বিরোধীদলীয় নেতা আজকের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলছিলেন, ওই সরকার তারই আন্দোলনের ফসল। যদিও ওই সরকারই তাকে কারারুদ্ধ করেছিল। যা হোক, আপনজনেরা অন্যায় করলেও শেষ পর্যন্ত আপন বিবেচনায় মার্জনা করা হয়। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তিনি আন্দোলন শুরু করেছিলেন ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর নির্বাচনের পর থেকেই। প্রথমে শপথ না নেয়ার চিন্তা, পরে শপথ নিলেও সংসদে না যাওয়া, পরে ৩০শে এপ্রিলের ট্রাম্পকার্ডসহ অনেক কিছুই হয়েছিল। একের পর এক আন্দোলনের কর্মসূচি ধারাবাহিকভাবে চলছিল। একজন রাজনৈতিক রিপোর্টার হিসেবে সে সব আন্দোলনের প্রতিটি ঘটনার সাক্ষী থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই আন্দোলনে রাজপথে, পল্টন ময়দানে, দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সমাবেশের খবর সংগ্রহ করেছি। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডি ৩/এ সড়কের বাড়ির কার্যালয় ও ধানমন্ডি ৫ নম্বর সড়কের বাস ভবনে অনুষ্ঠিত অনেক আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্য শোনার এবং রিপোর্টিং করার সুযোগ আমার হয়েছিল। তাঁর অনেক বক্তব্যই আমার মনে আছে। অনেকদিন আওয়ামী লীগ বিট কভার করার কারণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, দলের অনেক সিনিয়র-জুনিয়র নেতার সঙ্গে অনেক স্মৃতিও আছে। অনেক কিছু জানার ও দেখার সুযোগও আমার হয়েছে। ইদানীং সে সময়ের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য বার বার আমার মনে কড়া নাড়ছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ও সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, হাওয়া ভবনকে উদ্দেশ্য করে প্রায়ই তিনি বলতেন, ‘এত ভাত দুধ দিয়া খায় না।’ এই বক্তব্যটি নিয়ে আমরা যারা আওয়ামী লীগ বিট করতাম তাদের মধ্যে অনেক আলোচনাও হতো।  তবে অনুষ্ঠান শেষে বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক প্রদীপ কুমার সিংহ রায় (সে সময় ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন) যখন বলতেন, ‘এত ভাত দুধ দিয়া খায় না’- এর ইংরেজি কি লিখবো, তখন আমরা সবাই হাসতাম। ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর থেকে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনেক সময়। বাংলাদেশে অনেক ঘটনা ঘটেছে। এক ঘাটের পানি অনেক ঘাটে গড়িয়েছে। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যাত্রা শুরু করেছেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। যারা এক সময় বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বানাতে চেয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করতে গণবাহিনী গঠন করেছিলেন, তাদের হাতে জপমালা ধরিয়ে দিয়েছেন। তারা এখন সারাক্ষণ শুধু বঙ্গবন্ধুর নাম জপছে। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে দলকে তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছেন। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে সরকার চালিয়েছেন এবং সবার পরামর্শ নিয়ে রাজনীতিও করেছেন। ২০০৮-এর নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে একটি চমক মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং রাজনীতিটা এককভাবে করেন। দলের সিনিয়র নেতাদের রাখেন বাউন্ডারির বাইরে। অন্য সময়ের তুলনায় এবার তিনি অনেক বেশি দক্ষ, অভিজ্ঞ, সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী। কারণ, টার্গেট ২০২১। তাই রাজনীতির খেলাটা খেলেছেনও অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে। শক্ত প্রতিপক্ষকে রাজনীতির খেলার মাঠের বাইরে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা অবশ্যই প্রশংসনীয়।  কল্পনাবিলাসীদের মতো ভবিষ্যতে কি হবে বা হতে পারে তা ভেবে সময় নষ্ট না করে বর্তমানকে নিয়েই তিনি ভেবেছেন। আর সে কারণেই নিজের পছন্দমতো প্রতিপক্ষ তৈরি করে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে ২৩১ আসন জিতে নিলেন। তিন শ’ আসনের মধ্যে বাকি যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারাও শেখ হাসিনারই কৃপাধন্য। আস্থার ছাই দিয়ে যাকে ধরা যায়নি তাকে তিনি করেছেন বিশেষ দূত। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে সরকার গঠনের সুন্দর সমাপ্তি তিনি টেনেছেন।  আর নতুন টার্গেট ২০৪১ ঘোষণা দিলেন। সে কারণেই আমার বার বার মনে হচ্ছে শেখ হাসিনা এবার অনেক ভাত দুধ দিয়ে খেয়েছেন।

দুধ দিয়ে অনেক ভাত by মন্‌জুরুল ইসলাম

‘এত ভাত দুধ দিয়া খায় না’- কথাটি গ্রামেগঞ্জে অনেক বেশি প্রচলিত হলেও রাজনীতির মাঠে কথাটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তিনি যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখন তিনি এটা অত্যন্ত মজা করে বলতেন।

মিত্রদের ওপর নজরদারি নিষিদ্ধ করলেন ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর নেতাদের ওপর নজরদারি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গত শুক্রবার মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ ঘোষণা করেন ওবামা। এতে ওই সব পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন তিনি। তবে নজরদারি নিয়ন্ত্রণে ওবামার ঘোষিত সংস্কারের পদক্ষেপগুলো যথেষ্ট নয় বলে দাবি করেছে নাগরিক সংগঠনগুলো। বিশ্লেষকেরাও প্রায় একই কথা বলছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামা শুক্রবার মার্কিন বিচার বিভাগে দেওয়া বক্তৃতায় নজরদারি নিয়ন্ত্রণে তাঁর প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। তবে তিনি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নজরদারির মাধ্যমে যা কিছু করেছে, তাতে তিনি অনুতপ্ত নন। নজরদারি চালাতে দিয়ে সংস্থাগুলোর আইন লঙ্ঘনের মতো কোনো কিছু চোখে পড়েনি বলেও দাবি করেন ওবামা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, বড় আকারে তথ্য সংগ্রহ করার প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, বড় আকারে তথ্য সংগ্রহ করলে এই সুযোগের ‘অপব্যবহারেরও আশঙ্কা’ থাকবে। ওবামা বলেন, ‘সংস্কারের যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তাতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় সরকারের ওপর মার্কিন জনগণের আস্থা ফিরে আসবে।
এসব পদক্ষেপের পাশাপাশি আমাদের গোপনীয়তা রক্ষায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নজরদারির ক্ষেত্রে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করবে।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মিত্র দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের ওপর ওয়াশিংটন আর নজরদারি চালাবে না। অন্য দেশের নাগরিকদের উদ্দেশে ওবামা বলেন, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের এটা জানা উচিত যে মার্কিন জাতীয় স্বার্থের জন্য হুমকি না হলে বিদেশি কোনো নাগরিকের ওপর নজরদারি করে না ওয়াশিংটন। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) নজরদারির শিকার হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেল। গত শুক্রবার ম্যার্কেলের একজন মুখপাত্র বলেন, মার্কিন নজরদারি নিয়ে জার্মানির জনগণ উদ্বিগ্ন। বিদেশি নাগরিকদের অধিকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান জানানো উচিত। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন কয়েক মাস আগে মার্কিন নজরদারির খবর ফাঁস করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। আল-জাজিরা ও বিবিসি।
কিয়েভে আজ নতুন করে বিরোধীদের সমাবেশ
ইউক্রেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নপন্থী (ইইউ) সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা আজ রোববার আবার নতুন করে রাজধানী কিয়েভে বড় ধরনের সমাবেশ করতে যাচ্ছে। গতকাল শনিবার থেকেই স্বাধীনতা চত্বরে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ গত শুক্রবারই দেশটিতে সমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে এক আইনে স্বাক্ষর করেন। পশ্চিমা বিশ্ব এ আইনের নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ একে ‘গণতন্ত্রের পরিপন্থী’ বলে আখ্যায়িত করেছে। বিক্ষোভকারীরা বলছে, এর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ‘স্বৈরতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। সমালোচনাকারীরা বলছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন ইয়ানুকোভিচ। ২০১২ সালে বড় ধরনের বিক্ষোভের মুখেও তৃতীয় দফায় ক্রেমলিনে ফেরার পর এ ধরনের আইন প্রণয়ন করেছিলেন পুতিন। ইয়ানুকোভিচের পদত্যাগের দাবিতে প্রায় দুই মাস ধরে আন্দোলন চলছে। এর মধ্যেই সরকারি ভবন ঘেরাও কিংবা ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা অপবাদ’ ছড়ানোর অপরাধে কারাদণ্ডসহ কঠোর সাজার বিধান রেখে শুক্রবার নতুন আইনে সই করেন প্রেসিডেন্ট। লিওনিদ তেরতিচনি নামের একজন বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা স্তালিন যুগে ফিরে যাচ্ছি। ইউক্রেনে নতুন আইনটি বাস্তবায়ন শুরু হলে পরিস্থিতি রাশিয়া কিংবা বেলারুশের চেয়েও খারাপ হবে। কিন্তু আমাদের বিক্ষোভ চলবেই।’ নতুন কঠোর আইন হলেও বিরোধীরা দমেনি। বরং আজকের সমাবেশ সফল করার উদ্দেশে কিয়েভের স্বাধীনতা চত্বরে দলে দলে জড়ো হচ্ছে। গত মাসে রাশিয়ার চাপের মুখে ইইউর সঙ্গে একটি রাজনৈতিক ও বাণিজ্যসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই করা থেকে বিরত থাকেন প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ। এর প্রতিবাদে তখন ইইউপন্থী হাজারো মানুষ কিয়েভের রাস্তায় বিক্ষোভ করেছিলেন। এএফপি।