Showing posts with label সাজেদুল হক. Show all posts
Showing posts with label সাজেদুল হক. Show all posts

Friday, March 21, 2025

কাওরান বাজারের চিঠি: আছিয়া, আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছি by সাজেদুল হক

২০ বছর পেশায় আছি। লিখেছি বিচিত্র সব বিষয়ে। আনন্দ-বেদনার এক মহাকাব্য। কখনো কখনো খুব ক্লান্তি লাগে। সব ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছা করে। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে বের হওয়া লাশের পা এখনো তাড়িয়ে বেড়ায়। এই তো সেদিন জুলাই-আগস্টে আমাদের সন্তানদের, ভাই-বোনদের খুন হতে দেখেছি। অনেক দিন ঠিকঠাক ঘুমাতে পারিনি। এখনো মাঝে মাঝে আঁতকে উঠি।

স্থিতিশীলতা বলতে যা বুঝায় দেশে আজও তা ফেরেনি। প্রতিবেশী দেশের মিডিয়া প্রতি মুহূর্তে গুজব উৎপাদন করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা। এরই মধ্যে আছিয়ার ভয়ঙ্কর খবর নজরে আসে। পুরো খবরটা পড়ি না। হৃদয় থেকে প্রার্থনা করি মেয়েটা অন্তত বেঁচে যাক। কিন্তু আঁচ করতে পারি, খুব একটা আশা নেই।

বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে সে ভয়ঙ্কর খবর পাওয়া যায়। আছিয়া নেই। নেই মানে আর নেই। সেনা হেলিকপ্টারে শেষবারের মতো তার নিথর দেহ বাড়ি ফেরে। আমি পালিয়ে থাকি। এ নিয়ে কিছু লিখতে, বলতে ইচ্ছা করে না। মানুষ কী করে এত বর্বর হয়? প্রশ্নটা অনেকবারই মনে আসে। কল্পনাতেও উত্তর পাই না। কোনো সমাধানও পাই না। আট বছরের এক ছোট্ট শিশু। তার ওপর কী করে এমন বর্বর, অমানবিক নির্যাতন চালাতে পারলো। এরা কি সেই মানুষ যারা পশুর চেয়েও নিষ্ঠুর।

মানবজমিনের জন্য হেডলাইন ভাবতে থাকি। সাংবাদিকতায় নিষ্ঠুর কাজ। শেষ পর্যন্ত একটা স্থির করি, ‘দুঃখ ভারাক্রান্ত বাংলাদেশ।’ সন্ধ্যায় মতি ভাইর (মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রধান সম্পাদক, মানবজমিন) সঙ্গে আলাপ করি। মতি ভাই জানতে চান, ‘এটা নিয়ে কি আপনি লিখছেন?’ আমি তেমন কিছু বলি না। আসলে লিখতে ইচ্ছা করে না। কিছুক্ষণ পর কাজল দা (কাজল ঘোষ, নির্বাহী সম্পাদক জনতার চোখ, বার্তা সম্পাদক মানবজমিন) জনতার চোখ-এর জন্য আছিয়াকে নিয়ে লিখতে বলেন। আমি আবার আঁতকে উঠি। রাতের একটা বড় অংশ ভাবি কী লিখা যায়।
নজরে আসে কবি ফারুক ওয়াসিফের লেখা। তিনি লিখেছেন-   

আছিয়ার আজান শোনো
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা  দেখি, পাখি দেখি, প্লেন দেখি।
আছিয়াকে দেখি না। কেবল ভালুকের  খোলস পরা রোমশ রাজনীতি দেখি। আমি আর আকাশের আশ্বাসে বিশ্বাস রাখি না।
আমি বিশ্বাস করি না, শিশুরা তারা বা পাখি হয়ে যায়। সামরিক হেলিকপ্টারের শব্দ কি তাদের ভালো লাগে? এভাবে কি কেউ বাড়ি ফেরে?
আমার বুকটা খুব ফাঁকা লাগছে। সর সর করে বালি সরে যাচ্ছে পায়ের তলে। আমি আমার মেয়েটাকে বুকে জড়াই, তবু ভয় কাটে না।
তোমার জরায়ুতে একটা শোকের পাথর বসে যাচ্ছে দেখে, আমি তাকাতে পারি না। যদি আমার দৃষ্টি পড়া মাত্রই সব নারীর চোখ পাথর হয়ে যায়!
আমিও পিতা, আমার বুকেও জমে  বেদনার নিকষিত দুধ। কালো দুধের অশ্রু উঠে আসে আমার চোখে। আমার  চোখ আজ তিস্তা নদীর মতো পাহাড়ি রাগ হয়ে বাজছে। আজ আর কথা হবে না। আজ আমরা আছিয়ার আজানে শামিল জানাজায়।

আজ মা আছিয়া একটু ঘুমাবে। কেবল মাটি, কেবল মাটি ছাড়া আমার  মেয়েটার কোনো মা নাই আজ।  
ফেসবুকেই ইসলামী বক্তা মাওলানা আবদুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ লিখেছেন, ‘আম্মু, আছিয়া, তুমি এমনভাবে ‘বেঁচে গেলে আজ’ যে আমরা হাজারবার মরেও তার দায়  শোধ করতে পারবো না। আমি তোমার জন্য অঝোরে কাঁদছি, মা’রে! জানি, পুরো দুনিয়ার সবার চোখের সব পানিও  তোমার এ দুঃখের ভারের কাছে এক  ফোঁটারও সমান হতে পারে না। ওহহ! ভুলে গেছি বলতে আমরা কিন্তু সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার করবো, হুঁ! কত্ত বিচার আগেও আমরা করেছি!’
এই সব লেখা পড়ি আর ভাবি কী লেখা যায়! আছিয়া আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বাংলাদেশকে সে তাড়িয়ে বেড়ায়। এমনকি কেন যেন মনে হয় পুরো মানব সভ্যতাকে সে তাড়িয়ে বেড়ায়।
আবার বলি? আট বছরের একটি শিশু। তার সঙ্গে যখন এ বর্বরতা চলছিল কী ভাবছিল সে! অবিশ্বাস্য, অমানবিক। কোনো শব্দ দিয়েই তো এর ব্যাখ্যা করা যায় না। পৃথিবীতে সেই শব্দ আজও আবিষ্কার হয়নি।

কেন কিছু মানুষ নামধারী লোক এতটা অমানুষ হয়ে গেল? আইনের শাসন এখানে একটি বড় প্রশ্ন। সমাজে যখন দেখা যায় অপরাধীরা অর্থের জোরে, প্রতিপত্তির জোরে আইনকে অবজ্ঞা করতে পারে, অপরাধ আড়াল করতে পারে তখন এ ধরনের ঘটনা বেড়ে যায়। বাংলাদেশে আইনের শাসনের ক্ষেত্রে একটি বিরাট বিপর্যয় ঘটে গেছে। আমরা এখানে দেখছি বড় বড় অভিযুক্তরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। আছিয়ার মর্মান্তিক ধর্ষণ, হত্যার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম আইনের সঠিক এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগ করতে হবে। অপরাধীকে সর্বোচ্চ সাজা দিতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত দ্রুত এ মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে। বড় কোনো ঘটনা ঘটলে আমাদের রাষ্ট্র নানা রকম উদ্যোগ নেয়, বাৎচিত করে। আবার সোশ্যাল মিডিয়া যখন চুপ হয়ে যায়, রাষ্ট্রও চুপ হয়ে যায়। যে কারণে অপরাধীরা সবসময় বিচারের মুখোমুখি হয় না। সবক্ষেত্রেই অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

সমাজে নৈতিকতার স্খলন হয়েছে ভয়ঙ্কর। শুধু আইন দিয়ে এসব অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। এক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যক্তিদের আরও সোচ্চার হতে হবে।
আছিয়াকে নিয়ে লেখা সত্যি কঠিন। সান্ত্বনা জান্নাতে সে ভালো থাকবে। আর ধর্ষক আর খুনিদের জন্য নিশ্চয় অপেক্ষা করছে কঠিন শাস্তি।
পবিত্র গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘আমার কথাই সত্যে পরিণত হবে যে, নিশ্চয় আমি জাহান্নাম পূর্ণ করবো মানুষ ও জীন উভয় দ্বারা।’ সূরা আস সাজদাহ।

সূত্র- জনতার চোখ

mzamin


Friday, February 28, 2025

নাহিদরা নতুন বাসা খুঁজে পাবেন? by সাজেদুল হক

বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের অন্যতম চরিত্র তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তার নামে এভিনিউ। পাশেই সংসদ ভবন। গণতন্ত্রের তীর্থস্থান। এখানে গণতন্ত্রের চর্চা কতোটা হয়েছে সে প্রশ্ন আলাদা। এই সংসদ ভবনকে সামনে রেখেই আজ আত্মপ্রকাশ ঘটতে চলেছে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির। এদেশের অলিতে-গলিতে রাজনৈতিক দল। গেল ক’মাসেই জন্ম হয়েছে অন্তত ১৬টি নতুন দলের। তবুও নাহিদ ইসলামদের নেতৃত্বে অভিষিক্ত দলটি নিশ্চিতভাবেই আলাদা। কেবল এ ভূমিতে কেন, এতগুলো তরুণ কবে, কোথায় কোন দলের জন্ম দিয়েছে কে জানে!

শহীদ মিনার থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ। গেল কয়েক মাসে কতো ঘটনাই না ঘটে গেল। ওলটপালট হয়ে গেল সব। কখনো কখনো এমন হয়। সময়ের চাকা ঘোরে খুবই দ্রুত। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে স্বৈরশাসকের পতন। দুনিয়ায় এমন ঘটনা খুব বেশি ঘটেনি। আপাত মনে হবে আকস্মিক, অকস্মাৎ এক ঝড়। আদতে এ তরুণদের একটি অংশ নিজেদের তৈরি করেছে অনেকদিন ধরেই। রাজনীতি আর সমাজ নিয়ে নতুন করে ভেবেছে তারা। পড়েছে, পরামর্শ করেছে। অপেক্ষায় ছিল একটি মোক্ষম সময়ের। ইতিহাস তাদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে।

তবে ৩রা আগস্টের শহীদ মিনার আর ২৮শে ফেব্রুয়ারির মানিক মিয়া এভিনিউ এক নয়। শুধু স্থান আর সময় নয়। সেটা যে আলাদা বুঝতেই পারছেন। ভিন্নতা আসলে তার চেয়েও বেশি। নাহিদ ইসলাম। ২৬ বছরের এক তরুণ। গোয়েন্দা সংস্থার গোপন সেল ঘুরে এসেছেন। শরীরে নির্যাতনের দাগ। এসবও শেষ পর্যন্ত দমাতে পারেনি তাকে। শহীদ মিনার থেকে ডাক দেন একদফার। ঘোষণা দেন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের। সেই সমাবেশে শামিল ছিল হাসিনাবিরোধী পুরো বাংলাদেশ। বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল, শিবির, ডান, বাম, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়-এর সাধারন শিক্ষার্থী সবাই শামিল ছিলেন শহীদ মিনারে। কট্টর আওয়ামী লীগ ছাড়া রাজনীতির আর সব রং মুছে গিয়েছিল। কিন্তু ২৮শে ফেব্রুয়ারি মানিক মিয়া এভিনিউতে নাহিদ ইসলাম যখন নতুন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন- পরিস্থিতি এরইমধ্যে অনেকটা পাল্টে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সদ্য সাবেক এই উপদেষ্টা এটা বুঝতে শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগ তাদের শত্রু গণ্য করে তা স্পষ্ট। অনেক ইস্যুতে বিএনপি’র সঙ্গেও তাদের বাহাস-বিতর্ক হচ্ছে। জামায়াতের সঙ্গে তুলনামূলক কম। কিন্তু বিএনপি বা জামায়াত কেউই তো আজ আর মানিক মিয়া এভিনিউতে থাকছে না।

জুলাই আন্দোলনের নেতাদের নেতৃত্বে ইতিমধ্যে একটি ছাত্র সংগঠনের অভিষেক হয়েছে। যাত্রা শুরুর দিনই ঘটেছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। হাতাহাতি আর বিশৃঙ্খলায় জড়িয়েছেন নতুন সংগঠনের সমর্থকরা। নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দল স্পষ্ট। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করা হয়েছে এ অভিযোগ উঠেছে জোরেশোরে। কিন্তু জুলাই আন্দোলনে তাদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। পুরো বাংলাদেশে আন্দোলনের রেখাটাই পাল্টে দিয়েছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নেতারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন এটাও বলা হচ্ছে। নতুন রাজনৈতিক দল অভিষেকের আগেও নানা টানাপড়েন চলছে। বেগ পেতে হয়েছে নেতা নির্বাচনে। শিবিরের সাবেক দুই আলোচিত নেতা এরইমধ্যে নিজেদের নতুন দল থেকে সরিয়ে নিয়েছেন। একটি রিপোর্ট বলছে, সামনের দিনে নতুন দলে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হতে পারে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে ‘বাংলাদেশমুখী, মধ্যপন্থি, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক’ রাজনৈতিক দল হিসেবে। আগেই বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল অনেক। সকাল-বিকাল পার্টিরও কোনো অভাব নেই। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে এর নেতাকর্মীরা বরাবরই সমালোচিত। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ক্ষমতার দাপট দেখানোসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে যান তারা। বহিষ্কার-আবিষ্কারের খেলা চলতে থাকে। নতুন রাজনৈতিক দলের জন্যও এটি একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে। নাহিদ ইসলাম এরইমধ্যে তার একধরনের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করেছেন। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা নতুন নজির। পুরো দলের ক্ষেত্রেও আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা রাখতে হবে। দল চালাতে অর্থ প্রয়োজন হয়। সেটা কে না জানে। স্বচ্ছতাই এখানে মুখ্য বিষয়।

এই তরুণরা আর পাঁচ-দশটা তরুণের মতো নয়। দুনিয়ার সবচেয়ে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকদের অন্যতম শেখ হাসিনাকে উৎখাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা। ৫ই আগস্টের আগেও যেটাকে অসম্ভব মনে হচ্ছিলো। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন প্রয়োজন, প্রয়োজন নতুন রাজনীতি। এই তরুণদের হাত ধরে যদি সেটা আসে তা হবে জাতির জীবনে এক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। কিন্তু রাজনীতির পথ বরাবরই পিচ্ছিল। এখানে সফলতার সহজ-সরল কোনো পন্থা নেই। বিপ্লব বা অভ্যুত্থান এক ধরনের অস্থিরতাও তৈরি করে। পুরনো সব নিয়ম ভেঙে দেয়া কেবল মুখের কথা নয়।

ভারতীয় সাংবাদিক অর্ক দেব ফেসবুকে এক লেখায় ঢাকায় নাহিদ ইসলামের সঙ্গে তার সাক্ষাতের বিবরণ দিয়েছেন। নাহিদের রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নেয়া প্রসঙ্গে তিনি লিখেন, ‘নাহিদ, এই  যে বিরুদ্ধবাদীর চোখ বেঁধে ফেলা, আসলে এর উল্টোপথে হাঁটা শুরু আজ থেকে। মনে পড়ছে আপনার কালশিটে। মনে পড়ছে ব্যাডমিন্টন  কোর্টে দাঁড়িয়ে আপনার স্বগতোক্তি, ভাই নতুন একটা বাসা খুঁজতে হবে। আমরা সবাই নতুন বাসা খুঁজছি, যে বাসা সবার, পক্ষের-বিপক্ষের-প্রান্তিকের, বিশ্ব জুড়ে যাদের গায়ে মনে কালশিটে আজও, তাদের সবার।’

এখন প্রশ্ন হলো নাহিদরা কি সেই বাসা খুঁজে পাবেন। যে বাসা হবে বাংলাদেশপন্থিদের, মধ্যপন্থিদের। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব বাংলাদেশির জন্য যেখানে ইনসাফ পাওয়া যাবে। পুরনো শৃঙ্খল ভেঙে মিলবে মুক্তি। নাহিদরা একা নন। এমন বাসা, এমন দেশ তো আসলে আমরা সবাই খুঁজছি। যদিও জানি, পথটা বড্ড কঠিন।

mzamin

Saturday, February 1, 2025

টেনশন বাড়ছে by সাজেদুল হক

ইতিহাসে এমন সময় আসে। মনে হয় খুব একটা কিছু ঘটছে না। তারপরও চোখ-কান খোলা রাখতে হয়। কখন কী ঘটে? ‘৫ই আগস্টের’ পর বাংলাদেশ তেমন একটা সময়ই অতিক্রম  করছে। এর আগের দিনগুলো ছিল অভাবনীয় ও অকল্পনীয়। রক্তাক্ত, বেদনার এবং গৌরবের।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কীভাবে দায়িত্ব নিয়েছে তা সবারই জানা। ছয় মাসে সরকারকে নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়েছে। সমালোচনাও কম হয়নি। তবে আওয়ামী লীগ ছাড়া সব শক্তিরই একধরনের নিরঙ্কুশ সমর্থন পেয়ে এসেছে সরকার। এ দৃশ্যপটে কি বড় কোনো পরিবর্তন হতে চলেছে?  

খুব সম্ভবত নতুন একটি পর্বে প্রবেশ করতে যাচ্ছে রাজনীতি। ফেব্রুয়ারিতে ছাত্রদের দলের আত্মপ্রকাশ ঘটতে চলছে। এ দলের প্রধান কে হবেন তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট এক ছাত্রনেতা জানিয়েছেন, মূলত চার ক্যাটাগরি থেকে সমন্বয় করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, নাগরিক কমিটি, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠিত হবে। উপদেষ্টা পরিষদে থাকা ছাত্রনেতারা নবগঠিত দলে যোগ দেয়ার আগে সরকার থেকে পদত্যাগ করবেন। সবার আগে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করতে পারেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্য দুই উপদেষ্টা আরও কিছুটা সময় নিয়ে পদত্যাগ করবেন। ২০শে ফেব্রুয়ারি কিংবা তারপর এই নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে। ছাত্রদের নতুন দলের বিষয়টি এরইমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও নিশ্চিত করেছেন। বৃটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে হয়তো তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এটাও একটা বিপদ। কারণ, রাজনীতি শুরু করলে সব ধরনের রাজনীতিবিদ তাদের সঙ্গে মিশে যাবে। তাই আমরা জানি না তারা আমাদের দেশে যে রাজনীতি, তা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারবে কি-না। তবে ছাত্ররা প্রস্তুত। তারা প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা দেশ জুড়ে  লোকজনকে সংগঠিত করছে।’

ছাত্রদের নতুন দলের এই উদ্যোগ এরইমধ্যে বিএনপি’র সঙ্গে তাদের একধরনের দূরত্ব তৈরি করেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের তীব্র প্রতিক্রিয়া আমরা দেখেছি। এ বাহাস আগামীদিনে আরও বাড়তে পারে। এটিই রাজনীতির রীতি। কারণ লড়াইটা মূলত ক্ষমতার। বিএনপি’র পক্ষ থেকে এরইমধ্যে সম্ভাব্য নতুন দলের প্রতি রাষ্ট্রীয় কোনো ইন্ধন থাকে কি-না সে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে নাহিদ ইসলাম ওয়ান-ইলেভেনের উল্লেখ করে যে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকার একজন পরিচিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী তা নাকচ করেননি।

দৃশ্যত জামায়াত নতুন দলের বিরোধিতা করছে না। বলাবলি আছে, নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রতি জামায়াত-শিবিরের সমর্থন রয়েছে। তবে যদি কখনো এমনটা ঘটে, নতুন দলের সঙ্গে বিএনপি’র নির্বাচনী ঐক্য হয়ে গেল সেক্ষেত্রে জামায়াত আরও একা হয়ে যাবে। রাজনীতিতে বিস্ময়কর কতো ঘটনাই তো ঘটে! উপদেষ্টা আসিফ নজরুল কিন্তু বিএনপি’র সঙ্গে ছাত্রদের বৃহত্তর নির্বাচনী সমঝোতার সম্ভাবনা নাকচ করেন নি।    

আওয়ামী লীগ এরইমধ্যে ফেব্রুয়ারি মাসে বেশ কিছু কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এরমধ্যে হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচিও রয়েছে। যদিও দলটির নেতারা হয় পলাতক নয়তো বা কারাবন্দি। মূলত পলাতক নেতারাই কর্মসূচির পক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিবিসি বাংলার রিপোর্ট বলছে, দেশে থাকা তৃণমূল নেতাকর্মীরা এসব কর্মসূচিতে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তাদের কারও কারও ধারণা এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বিপদ আরও বাড়বে। দেখার বিষয় আওয়ামী লীগ মাঠে নামতে পারে কি-না। যদিও সরকার যে, এ ব্যাপারে হার্ডলাইনে থাকবে তা সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে। পুলিশও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছে।

ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি’র আন্দোলনে নামার সম্ভাবনা পুরো বিষয়টিতে কৌতূহল তৈরি করেছে। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ইতিমধ্যে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদও এক বক্তব্যে আন্দোলনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে একাধিক সূত্র বলছে, বিএনপি পুরো বিষয়টি সতর্কভাবে হ্যান্ডেল করতে চায়। বিএনপি নির্বাচন নিয়ে কোনো বিলম্ব চায় না। যদিও সরকার এবং নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, চলতি বছর ডিসেম্বর কিংবা পরের বছর জানুয়ারিতে নির্বাচন হতে পারে। বিএনপি কোনোভাবেই এরপর আর যেতে চায় না। দলটি সম্ভব হলে এর আগেই নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। ছাত্র নেতৃত্বাধীন দল নিয়েও বিএনপি’র মধ্যে একধরনের সংশয় রয়েছে। এ দল কতোটা রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পায় সেদিকে দৃষ্টি রাখছেন বিএনপি’র নীতিনির্ধারকরা। বিএনপি নেতৃত্ব বিশ্বাস করে অবাধ নির্বাচন হলে তারা বড় জয় পাবেন। এক্ষেত্রে বিরোধী দল কারা হবে সেদিকেও তাদের দৃষ্টি রয়েছে।

জামায়াত ৫ই আগস্টের পর অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু দলটি ভোটের রাজনীতিতে কতোটা প্রভাব রাখতে পারবে তা আদৌ নিশ্চিত নয়। তাছাড়া, জামায়াতের সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করেন, বিএনপি তাদের বিরোধী দল হিসেবে চায় না। একাত্তর প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা নিয়েও জামায়াতে আলোচনা চলছে। দু’টি আইনি ইস্যুর সুরাহার পর মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য জামায়াত দুঃখপ্রকাশ করতে পারে।    

বাংলাদেশের রাজনীতির একধরনের চিত্র পাওয়া যায় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমার ও বাংলাদেশ-বিষয়ক সিনিয়র কনসালট্যান্ট থমাস কিয়ান-এর মন্তব্যে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের মধুচন্দ্রিমা এখন পুরোপুরি শেষ। রাজনৈতিক দলগুলো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ সংস্কার নিয়ে দরকষাকষি করায় এবং নির্বাচনী সুবিধার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠায় এই বছর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো বাড়তে পারে। জিনিসপত্রের ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির কারণেও সরকার চাপের মধ্যে রয়েছে যা সাবেক প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনার অব্যবস্থাপনার উত্তরাধিকার হিসেবে তারা  পেয়েছে। আর অর্থনীতিকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চলমান প্রচেষ্টার সুফল বাংলাদেশের জনগণের বাস্তবে পেতে আরও সময় লাগবে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে এখনো টানাপড়েন রয়েছে আর  রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধবিধ্বস্ত  মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এরপরও আগামী বছর বাংলাদেশের সামনে দেশটির জাতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং এটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক করার একটি বিরল সুযোগ রয়েছে।’

শেষ কথা: সব মিলিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। হাসিনাবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে দূরত্ব ও ফাটল বাড়ছে। চিরচেনা শত্রু-মিত্র’র সমীকরণও সম্ভবত পাল্টে যাচ্ছে। পাকিস্তানে কী হয়েছিল? ইমরানের বিরুদ্ধে পুরনো শত্রুরা কি এক হয়নি। বাংলাদেশের হিসাব অবশ্য আলাদা। একটি রক্তাক্ত অধ্যায় এখানে অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে তো কিছু নেই।

mzamin

Saturday, January 4, 2025

রাজনীতিতে নয়া শক্তির আওয়াজ, নানা গুঞ্জন by সাজেদুল হক ও মনির হোসেন

হঠাৎই যেন গোলপোস্ট বদলে গেছে। চিরচেনা বন্ধুরা জড়াচ্ছেন বিরোধে। শত্রুদের কাছে টানার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ক্ষমতার লড়াই অবশ্য চিরকাল এমনই। কঠিন এবং নিষ্ঠুর। এ ভূমের রাজনীতি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত পার করছে। শেখ হাসিনার পলায়নের  পর দৃশ্যপটে নানা পরিবর্তন আসছে। বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন মূলত দু’টি-এক. আগামী নির্বাচন কবে হবে? দুই. নির্বাচনে কারা জয় পাবেন।

এই প্রশ্নের প্রেক্ষাপট সামনে রেখেই আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে নতুন রাজনৈতিক দলের। বলে রাখা ভালো, এদেশে রাজনৈতিক দল নিয়ে  ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম হয়নি। গবেষকদের শ্রম ও মেধারও হয়তো ঘাটতি ছিল না। সামরিক-বেসামরিক, তন্ত্র-তত্ত্ব। বৈচিত্র্য ছিল নানা রকম। কিন্তু সফলতার হার একেবারেই নগণ্য। দল আসে, দল যায়। এটাই যেন এখানে নিয়ম।

তবে এবারের দৃশ্যপট কিছুটা হলেও ভিন্ন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই নতুন রাজনৈতিক দলকে নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। বিএনপি নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। নেতাদের কেউ কেউ তীব্র ভাষায় জামায়াত-শিবিরের সমালোচনা করছেন। নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের নেতাদের নিয়েও নানা বক্তব্য দিচ্ছেন। ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণা’ নিয়েও একদফা নাটক হয়ে গেছে। মুখোশে যাই থাকুক এটাও আসলে রাজনীতিরই লড়াই। যেকারণে বিএনপি এতটা রিঅ্যাক্ট করেছে। বিএনপি’র প্রভাবশালী নেতা রুহুল কবির রিজভী কারও নাম উল্লেখ না করে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা একটি দল গঠনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।’ সোশ্যাল মিডিয়ায় বিএনপি নেতাকর্মীরা নতুন এই রাজনৈতিক উদ্যোগকে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে অভিহিত করছেন। নাগরিক কমিটির সমর্থকরাও অবশ্য এর জবাব দিচ্ছেন। সংগঠনটির এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, বাংলাদেশের প্রথম কিংস পার্টি হচ্ছে বিএনপি।
বিএনপি সংশ্লিষ্ট কোনো কোনো সূত্র মনে করে, নতুন এই রাজনৈতিক উদ্যোগের নেপথ্যে জামায়াতের সমর্থন রয়েছে। এটা বিএনপি’র মধ্যে একধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। নির্বাচন কবে হবে এ নিয়েও দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে নানা জিজ্ঞাসা রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা এ নিয়ে একধরনের ডেটলাইন দিলেও তা বিএনপিকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপি কি সরকারের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে যাবে? বিএনপি’র একজন নেতা বলেন, এখনো তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এ প্রশ্ন বিএনপি’র জন্য বেশ কঠিন। কিছু কিছু সূত্র দাবি করছে, আওয়ামী লীগ দৃশ্যপটে ফেরার চেষ্টা করবে। বিএনপি নেতাদের সঙ্গেও যদি তারা যোগাযোগ করার চেষ্টা করে তা বিস্ময়কর হবে না।

এই অবস্থায় জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের নেতাদের নেতৃত্বে দল গঠনের জোরদার চেষ্টা চলছে। আগামী দুই মাসের মধ্যেই নতুন দল দেখা যেতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এরইমধ্যে জাতীয় নাগরিক কমিটির ব্যানারে সারা দেশে কমিটি দেয়া হচ্ছে। ৩৬ সদস্যবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে। ছাত্র সমন্বয়করাও বিভিন্ন পর্যায়ে কমিটি দিচ্ছেন। তবে শীর্ষ সমন্বয়কদের কারও কারও মধ্যে মতবিরোধের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

ট্র্যাক রেকর্ডে যেখানে নতুন রাজনৈতিক দলের সফলতার হার নেই বললেই চলে; তবুও কেন নতুন দল? এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একজন সরলভাবে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, ছাত্ররা জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়ে সরকারের পতন ঘটিয়েছেন। তারা বিশ্বাস করেন রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তনেও তাদের আহ্বানে জনগণ সাড়া দিবে। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে ভারত বিরোধিতা ছিল প্রবল। এ আন্দোলনের নেতারাও প্রায়শ’ই ভারতের নানা ভূমিকার বিরোধিতা করেন। এটাও স্পষ্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন সহজভাবে নেয়নি নয়াদিল্লি। এই ছাত্রনেতাদেরও যে প্রতিবেশীরা উষ্ণভাবে গ্রহণ করছে না তারও ইঙ্গিত মিলছে। নতুন দল গঠনের পেছনে এ বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। আরেকটি প্রধান কারণ হচ্ছে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের ভূমিকা। অতিসম্প্রতি আওয়ামী লীগের বিবৃতিতেও ছাত্রনেতাদের সন্ত্রাসী বলা হচ্ছে। ভবিষ্যতে সমন্বয়কদের প্রতি তাদের মনোভাব কী হবে তা সহজেই বুঝা যায়।

নেতারা আশাবাদী: নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আকতার হোসেন মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর একটি নির্দিষ্ট জনসমর্থন থাকলেও এ দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের নতুন রাজনৈতিক দল নিয়ে প্রত্যাশা রয়েছে। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার নেতৃত্বের প্রতি তাদের অনেক ভরসা রয়েছে। তারা মনে করে এদের মাধ্যমে দেশের জন্য ভালো কিছু করা সম্ভব। তাই পুরাতন বন্দোবস্তের বাইরে নতুন একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। যেটি বিভিন্ন জরিপ এবং বিভিন্ন এলাকার সভা-সমাবেশের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ফুটে উঠেছে। মানুষ  তরুণদের ওপর আস্থা ও ভরসা রাখছে। তারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চায়। সেই দিক বিবেচনা করেই আমাদের নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ। নির্বাচনে অংশ নেয়ার কৌশল প্রসঙ্গে আকতার হোসেন বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় জোট হতে পারে আবার নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে আমরা তখনকার পরিস্থিতি ও দলগুলোর আদর্শিক দিক বিবেচনা করেই জোট করবো। তবে এ মুহূর্তে আমরা জোট নিয়ে ভাবছি না। সময় হলে সেটি দেখা যাবে। এখন আমরা দল গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, জাতীয় নাগরিক কমিটি ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে তরুণদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক দল করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেটি তারা নিতেই পারে। যে কারও রাজনৈতিক দল গঠন করার বা রাজনীতি করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানের একটি প্ল্যাটফরম। আমরা এটিকে কোনো রাজনৈতিক দলে রূপ দিতে চাই না। কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত হতে চান তাহলে তাকে আমাদের প্ল্যাটফরম থেকে অব্যাহতি নিতে হবে। কারণ এটি অভ্যুত্থানের সম্পদ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত।

তিনি বলেন, যারা রাজনৈতিক দল করতে চাচ্ছেন জুলাই অভ্যুত্থানে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তারা মনে করছেন রাজনীতিতে তরুণদের অংশীদারিত্ব থাকা দরকার। তাই তারা দল গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। গত ১৫ বছর এদেশের মানুষ নিয়মতান্ত্রিকভাবে রাজনীতি করতে পারেনি। এটাকে আমি বলবো সময়ের ব্যর্থতা বা সিস্টেমের ব্যর্থতা।      

অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারির মত: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নুরুল আমিন বেপারি নতুন রাজনৈতিক দলের ব্যাপারে নিজের মতামত তুলে ধরেন মানবজমিনের কাছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল করার অধিকার সবার আছে। তার কিছু প্রেক্ষাপটও আছে। প্রশ্ন হচ্ছে- যারা করতে চাচ্ছেন তারা কতোটুকু সফল হবেন।

ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করেছে। তারা আওয়ামী লীগের গুম- খুনের বিরুদ্ধে যে সেন্টিমেন্ট সেটির দখল নিজেদের পক্ষে নিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়া ভারতবিরোধী পক্ষকেও তারা তাদের পক্ষে টানতে পেরেছে। এখন কথা হচ্ছে ছাত্ররা কি কিংস পার্টি হবে না ধীরে ধীরে নিজেদের গুছিয়ে  নেবে। কিংস পার্টি না হয়ে তারা যদি আসলেই দল হিসেবে গড়ে উঠতে চায় তাহলে তাদের সেভাবে কাজ করা উচিত। এটা ঠিক যে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা  দেবে। কারণ এরা ক্ষমতায় আসলে তাদের লাভ। বৈষম্যবিরোধীরা আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী কর্মসূচি নিয়ে এসেছে। সেখানে বিএনপি পরোক্ষভাবে তাদের সমালোচনা করছে।

বিএনপি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করতে চাইলে ভুল করবে: নির্বাচন যত দেরি হবে তত ছাত্ররা ভালো করবে। নির্বাচন হলে হয়তো ক্ষমতায় যাবে না তবে ভালো করতে পারে যদি তারা জামায়াতসহ অন্যান্য দলকে জোটে নিয়ে নিতে পারে। এমন হলে পাশার দান উল্টেও যেতে পারে। এতে যে জামায়াতের প্রত্যক্ষ সমর্থন রয়েছে বুঝাই যায়। আন্দোলনের সমন্বয়কদের অধিকাংশ শিবিরের। শিবিরের প্রোগ্রামে গিয়ে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা অভ্যুত্থানের  ক্রেডিট তাদের দিয়ে দিচ্ছে। অথচ এ আন্দোলনে তারেক রহমান ও তার দলের নেতাকর্মীদের অনেক ত্যাগ রয়েছে। জামায়াত তাদের ছাত্রসংগঠন দিয়ে বৈষম্যবিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন ডাকসু নির্বাচনের বিষয় সামনে আসছে। এটা যদি হয় তাহলেও শিবির ও  বৈষম্যবিরোধীরা ভালো করবে। আর ডাকসুতে যারা ভালো করবে তাদের জাতীয় রাজনীতি ভালো হবে- এটাই স্বাভাবিক।

mzamin

Saturday, December 28, 2024

ড্রাইভিং সিটে বসেও বিএনপি’র উদ্বেগের নেপথ্যে কী? by সাজেদুল হক ও কিরণ শেখ

ফুটবল অথবা ক্রিকেট। ছন্দময় ব্রাজিল কিংবা আক্রমণাত্মক অস্ট্রেলিয়া। প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়া। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমনটা কখনোই বিএনপি’র বৈশিষ্ট্য ছিল না। যদিও প্রতিপক্ষকে নির্মূলের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে দলটির বিরুদ্ধে। কিন্তু শুরু থেকেই বিএনপি মনোযোগী ছিল টেবিল পলিটিক্সে। প্রয়াত জিয়াউর রহমানকে ঘিরে ছিলেন একদল মেধাবী মানুষ। খালেদা জিয়া বিএনপিকে রাজপথে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করান। এরশাদের পতনের পর ভোটে জয়ী হয়ে চমক তৈরি করেন। এরপর কখনো মসনদে, কখনো বিরোধী দলে আসন ছিল বিএনপি’র। তবে ওয়ান ইলেভেন সবকিছু একেবারে তছনছ করে দেয়। এরপর টানা ১৮ বছর ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। তবে আরেকটি বিখ্যাত তারিখ বিএনপিকে প্রত্যাশিত কিন্তু নাটকীয়ভাবে ড্রাইভিং সিটে নিয়ে এসেছে।

৫ই আগস্ট হাসিনার পলায়নের পর বিএনপি তার দুঃসময় অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। রাজপথ থেকে প্রশাসন সর্বত্র দলটির কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। তারপরও বিএনপি’র বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের কথায় একধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশিত হচ্ছে। অন্তত বক্তৃতা-বিবৃতিতে তারা দ্রুত নির্বাচনের জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের একধরনের রোডম্যাপ দিলেও বিএনপি তাতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। দলটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট রোডম্যাপের দাবি জানানো হয়েছে। এমনকি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ভোটের অধিকারের দাবিতে রাজপথে নামার কথাও বলছেন। বিএনপিতে কেন এ ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। দলটির ভেতরে-বাইরে কথা বলে একটা ধারণা পাওয়া যায়।

বেশির ভাগ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, এখন দেশে নির্বাচন হলে বিএনপি জয়লাভ করবে। স্বাভাবিকভাবেই এ কারণে বিএনপি দ্রুত নির্বাচন চাচ্ছে। এটি রাজনীতির সবচেয়ে সহজ হিসাব।
বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ মনে করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর ক্রমশ চাপ বাড়বে। ভারত বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও তারা এসব বিষয়ে বুঝানোর চেষ্টা করছে। পণ্য সরবরাহসহ নানা ইস্যুতে পতিত সরকারের সহযোগীরা অন্তর্বর্তী সরকারকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করবে। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। অন্য কোনো শক্তি যার সুযোগ নিতে পারে।

এমন একটি ধারণাও বিএনপি’র কারও মধ্যে রয়েছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি অংশ যতটা সম্ভব নির্বাচন বিলম্ব করতে চায়। তারা দ্রুত নির্বাচন দিতে চায় না। এক্ষেত্রে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হলে তাদের জন্য সুবিধাজনক সময়ে নির্বাচন হতে পারে এমন আলোচনাও রয়েছে। বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা একটি রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।’ তবে একাধিক গোয়েন্দা সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

১৮ বছর ধরে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। দলটির নেতাকর্মীরা গুম, খুন, মামলা, কারাভোগসহ নানা ধরনের নির্যাতন সহ্য করেছেন। ঘরছাড়া ছিলেন হাজার হাজার নেতাকর্র্মী। পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তারা এলাকায় ফিরেছেন। অনেকে তাদের দখল হওয়া জমি, সম্পদ উদ্ধার করেছেন। আবার অনেকে জড়িয়েছেন দখল ও চাঁদাবাজিতে। এ রিপোর্টারের কাছেও দখলের এমন কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অনেক জায়গাতেই হাতবদল হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এসব অভিযোগ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিএনপি’র বিরুদ্ধেও জনগণ ক্ষুব্ধ হতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান অবশ্য এবার শুরু থেকেই শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অভিযুক্তদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তারেক রহমান দলের নেতাকর্মীদের বারবার সতর্ক করছেন।     

কী বলছেন বিএনপি নেতারা?
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বুঝতে হবে, কেন ছাত্রদের গণআন্দোলন হয়েছে? বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য এই আন্দোলন হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এবিষয়টি সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য আমরা  নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি। আর আমরা উদ্বিগ্ন না। আমরা চিন্তা-ভাবনা করছি, জনগণ নির্বাচনমুখী হলে যে ছোটখাটো সমস্যা তৈরি হচ্ছে তা তারা নিজেরাই মোকাবিলা করবে। যেটা এই সরকারের জন্য প্রয়োজন।

বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু মানবজমিনকে বলেন, বিএনপি ১৭ বছর ধরে আন্দোলন, সংগ্রাম করছে। জুলুম নির্যাতন সহ্য করছে। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে ১ লাখ ৬০ হাজার মামলা হয়েছে। ৬২ লাখ নেতাকর্মী আসামি হয়েছেন। আমরা এই আন্দোলন কেন করেছি? এ আন্দোলন আমরা করেছি জনগণের ভোটের অধিকারের জন্য। জনগণ তো এখনো সে অধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। গণতান্ত্রিক সরকার মানে হচ্ছে জনগণের নির্বাচিত সরকার। জনগণের নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠার জন্যই দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন। দ্রুত নির্বাচন মানে এই নয় যে, আমরা দুই মাসের মধ্যেই নির্বাচন চাচ্ছি। প্রধান উপদেষ্টা একটা টাইমলাইন বলেছেন। আগামী বছর ডিসেম্বর অথবা পরের বছর শুরুর দিকে। এখন আলোচনা করে একটি ডেট দিলেই হয়। বর্তমান সরকারের প্রতি বিএনপি’র সমর্থন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো দেশের সত্যিকারের উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি কেবল নির্বাচিত সরকারের দ্বারাই সম্ভব। জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে গঠিত কোনো দলকে হুমকি বলে মনে করেন না বলে জানান তিনি। বলেন, দল করার অধিকার সবারই রয়েছে। জনগণ যাদের ভোট দেয় তারাই সরকার গঠন করবে।
বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, আমরা ১৬ বছর ধরে ভালো নির্বাচনের কথা বলছি। হাসিনার আমলে তামাশা, ভোট চুরি ও ডাকাতির নির্বাচন হয়েছে। আর এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচন বন্ধ করতে চায়। তাদের গায়ে জ্বালা করছে। তারা বলছেন, ‘৫৩ বছরে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কী করেছেন! আমরা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে নির্বাচন চাচ্ছি। আমরা আতঙ্কিত হচ্ছি একারণে যে, নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রে উত্তোরণের পথ নাই।’ বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দেয়া উচিত। কেননা, অনির্বাচিত সরকার বহু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তিনি ঢাকা এবং অন্যান্য শহরে ক্রমবর্ধমান সংঘর্ষ এবং বিক্ষোভের দিকে ইঙ্গিত করেন। যেসব বিক্ষোভের মধ্যে অটোরিকশা চালকদের আন্দোলনও ছিল।

বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গণমাধ্যমকে বলছেন, সুনির্দিষ্ট  রোডম্যাপ না দিয়ে নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য আসছে বলেই জনমনে বিভ্রান্তি কিংবা অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, মানুষ কখন ভোট দিয়ে তাদের পছন্দনীয় সরকার গঠন করতে পারবে সেটা স্পষ্ট করা দরকার দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে। সরকার অন্য যাই বলুক, এই ভোটের সময়টা না পাওয়াতেই জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিএনপি  সেটিই তুলে ধরছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলছেন, নির্বাচন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা  মোটামুটি একটি সময়ের কথা বললেও সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণায় যে সরকারের প্রবল অনীহা- তা কিন্তু দৃশ্যমান। বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা একদিকে একটি সময় বলেছেন, আবার অন্যদিকে বলেছেন তার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এসব বিষয় চূড়ান্ত করবে। আবার উপদেষ্টারা  কেউ কেউ বলছেন সংস্কারের পর নির্বাচন। ফলে নির্বাচনের তারিখ বলার ক্ষেত্রে একটি অনিশ্চয়তা  তো জনমনে আছে। সে কারণেই বিএনপি’র মধ্যেও শঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং এ পরিস্থিতিতে  সেটাই স্বাভাবিক।

শেষ কথা: একধরনের বৈপরীত্য নিয়ে এগুচ্ছে বিএনপি’র রাজনীতি। একদিকে ক্ষমতার একেবারে কাছাকাছি অবস্থান। অন্যদিকে অনিশ্চয়তা। রাজনীতিতে যদিও এটা কোনো অভিনব দৃশ্যপট নয়। ঢাকার একজন বিশ্লেষক বলেন, ‘হাজার হাজার বছর ধরেই এটা চলে আসছে। মসনদে বসা কোনো সহজ খেলা নয়।’ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতাদের সঙ্গে একধরনের দ্বান্দ্বিক অবস্থান তৈরি হয়েছে বিএনপি’র। এটাকেও সব বিশ্লেষক নেতিবাচক মনে করেন না। তারা স্মরণ করেন, বন্ধুত্ব ক্ষণকালের। দ্বন্দ্ব চিরদিনের। তবে শত্রুতা না এলেই হলো।  

mzamin

Sunday, December 1, 2024

সামনের দৃশ্যপট কেমন হবে? by সাজেদুল হক

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সবে দায়িত্ব নিয়েছে। চারদিকে তখনও বিশৃঙ্খলা। দাবির খাতা খোলা শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে একজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা সরকারকে পরামর্শ দিলেন, একটি দাবিও যেন মানা না হয়। যুক্তি ছিল, কারও দাবি মানলে গেট খুলে দেয়া হবে। তখন অন্যরাও ফর্দ নিয়ে হাজির হবেন। আদতে হয়েছেও তাই। সরকারের বয়স আজ ১১৫ দিন। এরমধ্যে সুস্থির দিন কমই কেটেছে। একের পর এক আন্দোলন, বিক্ষোভ। এক হিসাবে এ সময়ে শ’ খানেক আন্দোলন হয়েছে। সরকার অবশ্য হার্ডলাইনে যায়নি। শুরু থেকেই চেষ্টা করেছে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের। প্রশ্ন উঠেছে এর শেষ কোথায়?

কেন এই অস্থিরতা?
সরকার তখনও দায়িত্ব নেয়নি। এরইমধ্যে শাহবাগে একটি জনগোষ্ঠীর বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। আন্দোলনের ট্রেন এখনো চলছে। এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সচিবালয়ে ঢুকে পড়া ছিল ব্যাপক আলোচিত। তারা অবশ্য দাবি আদায়ে সক্ষম হয়। অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, এটি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। পরে আনসার সদস্যদের একটি গ্রুপ বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করে। সেটা অবশ্য শক্ত হাতে মোকাবিলা করা হয়। পোশাক খাতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখনো থামেনি। কিছু কারখানায় বেতন বকেয়া থাকাই এ খাতে অস্থিরতা প্রধান কারণ। জুট ব্যবসার হাত বদল নিয়েও শুরুতে কিছু সংঘাত হয়েছে। ভিনদেশি উস্কানির অভিযোগও করে থাকেন কেউ কেউ। শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা অবশ্য অনেককেই হতবাক করেছে। সর্বশেষ সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের গ্রেপ্তার এবং আদালত এলাকায় আইনজীবীকে হত্যার ঘটনায় বড় ধরনের সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তবে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত সতর্কতায় আপাত তা এড়ানো গেছে। এই অস্থিরতা কেন- বিশ্লেষকরা শুরু থেকেই সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এমনিতে দুনিয়ার যে কোনো দেশেই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অস্থির পরিস্থিতির তৈরি হয়। বাংলাদেশে ১৫ বছরের প্রবল পরাক্রমশালী শাসকের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তিনদিন দেশ সরকারবিহীন অবস্থায় ছিল। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির এটিও একটি কারণ। ৫ই আগস্ট সম্ভবত আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পুলিশের সব সদস্য থানা ছেড়ে চলে যান। তাদের কর্মক্ষেত্রে ফেরাতেও সময় লাগে। তবে পুলিশকে এখনো শতভাগ সক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ বাড়ার এটি প্রধান কারণ। প্রশাসনও পুরোমাত্রায় সরকারকে সহযোগিতা করছে না। পনেরো বছর এতো ধাপে দলীয়করণ করা হয়েছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চাইলেও তা থেকে বের হতে পারেনি। কিছু ক্ষেত্রে কয়েকজন উপদেষ্টার দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে দেশি-বিদেশি নানা পক্ষের ইন্ধনের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। পলাতক স্বৈরাচারের অর্থও এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

বড় প্রশ্ন
সরকার এরইমধ্যে বিভিন্নখাতে সংস্কারের জন্য কয়েকটি কমিশন গঠন করেছে। বেশির ভাগ কমিশনের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ রিপোর্ট দেয়ার কথা। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে সেটি বিলম্বিত হতে পারে এমন ইঙ্গিত মিলছে। আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের পক্ষ থেকে যেটা বলা হয়েছে, কমিশনের রিপোর্ট পাওয়ার পর সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবে। সেখানেই সংস্কারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কী কী সংস্কার হবে তার ওপরই নির্ভর করবে নির্বাচন কবে হবে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যত কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে এটাও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি বলে সংস্কার লাগবে না, এখনই নির্বাচন দিয়ে দিন। তাহলে আমরা নির্বাচন দিয়ে দেবো। সংবিধান সংস্কারও একটি প্রধান প্রশ্ন। যদিও বিএনপি’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এটি নির্বাচিত সরকারের কাজ। তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ কত দিন? নির্বাচনই বা কবে হবে। বিএনপি’র পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে, নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করার। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্ট করে এ ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। একজন উপদেষ্টা একবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ২০২৫ সালের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে। পরে অবশ্য এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তিনি একটি ব্যাখ্যা দেন। আরেকটি প্রধান প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ কি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পাবে? ছাত্র নেতৃত্বের একাংশ এবং কোনো কোনো মহল থেকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে। তবে বিএনপি বা জামায়াতের মতো প্রধান দলগুলো এ ব্যাপারে সায় দেয়নি। সরকারও রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

সামনের দৃশ্যপট কেমন হবে?
নানা গুজবে ভাসছে দেশ। ভারত থেকে চলছে বিরামহীন অপপ্রচার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এসব প্রচারণার কিছু প্রভাব এরইমধ্যে দেখা যাচ্ছে। দ্রব্যমূল্য এখনও নিয়ন্ত্রণহীন। সাধারণ মানুষের কাছে এটিই প্রধান ইস্যু। সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপের কথা বলা হলেও বাজারে তার তেমন কোনো প্রভাব নেই। সাম্প্রতিক ইস্যুগুলো নিয়ে সরকার এরইমধ্যে বিএনপি এবং জামায়াতের সঙ্গে আলোচনা করেছে। এসব আলোচনায় জাতীয় ঐকমত্যের কথা বলা হয়েছে। যদিও সে ঐকমত্য কেমন হবে তা স্পষ্ট নয়। বিএনপি যতো সম্ভব দ্রুত একটি নির্বাচন চায়। বর্তমানে নির্বাচন হলে দলটির বড় জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। নির্বাচনে বিলম্ব হলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এ নিয়ে বিএনপি’র মধ্যে একধরনের শঙ্কা রয়েছে। দলটির বিবেচনায় ওয়ান-ইলেভেনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। বিএনপি’র পক্ষ থেকে দ্রুত নির্বাচনের জন্য সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করা হচ্ছে। জামায়াত অবশ্য নির্বাচন নিয়ে তাড়াহুড়া করছে না। অন্যদিকে, ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া নেতারা সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন। তারা নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করেন কি-না সে আলোচনাও রয়েছে। এরমধ্যে ছাত্রদের সমর্থিত নাগরিক কমিটি বিভিন্ন অঞ্চলে কমিটি দিচ্ছে। সমন্বয়ক কমিটিও পুনর্গঠন হচ্ছে জেলায় জেলায়। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের দল হলেও তা বড় কোনো প্রভাব রাখতে পারবে কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার শুরু হলে দৃশ্যপটে বড় পরিবর্তন আসতে পারে কেউ কেউ এমনটা ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে আগামীদিনে আওয়ামী লীগের ভূমিকা কী হবে তাও হবে দেখার বিষয়। ভয়েস অব আমেরিকার একটি জরিপে ৫৭ ভাগ লোক আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সলিমুল্লাহ খান মনে করেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা নেই। এক আলোচনায় তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ তার নৈতিক বৈধতা হারিয়েছে। মুসলিম লীগ যেমন বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তেমনি আওয়ামী লীগও বিলুপ্তির পথে রয়েছে। এটা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’

শেষ কথা বলে কিছু নেই
এটা প্রায়ই বলা হয়, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। ৫ই আগস্টের অভাবনীয় অভ্যুত্থানের পরও বাংলাদেশ এক অস্থির সময় পার করছে। এটি কবে স্থির হবে সেটি বলা মুশকিল। সংশ্লিষ্ট কিছু সূত্র আভাস দিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই বাংলাদেশে একটি নির্বাচন হতে পারে। যদিও এটি নানা যদি, কিন্তুর ওপর নির্ভর করে। এটা ঠিক, সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো কখনও কখনও সরকারকে চাপে রাখলেও নিজ নিজ স্বার্থেই আবার তারা সরকারকে সমর্থন দেয়। তবে ছাত্র নেতৃত্ব যদি প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন কোনো দল গঠন করে তাহলে অঙ্ক জটিল হতে পারে। সীমান্ত পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখছেন সবাই।

mzamin

Saturday, November 30, 2024

এটাই বাংলাদেশ! by সাজেদুল হক

এটাই বাংলাদেশ। সম্প্রীতির-বন্ধনের। ছাত্র-জনতার ঐক্যের। ষড়যন্ত্র রুখে দেয়ার। মঙ্গলবার বিকাল। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে রক্ত হিম করা একটি খবর। চট্টগ্রাম আদালতের অদূরে হত্যা করা হয়েছে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের সমর্থকরা কুপিয়ে হত্যা করেছে তাকে। মুহূর্তের মধ্যে উত্তেজনা-উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। আশঙ্কা দেখা দেয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের। কিন্তু রাজনীতিবিদ থেকে আলেম, ছাত্রনেতা থেকে সাধারণ মানুষ সবার কণ্ঠেই উচ্চারিত হয় একটি আহ্বান-‘ধৈর্য ধারণ করুন, সম্প্রীতি বজায় রাখুন।’ এতে মিলে অভূতপূর্ব সাড়া। একটি জাতি ফিরে যায় তার মিলনের স্থলে। মিছিল হয়েছে, প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু সংঘাত এড়িয়ে চলে জনতা। লাশ কাঁধে নিয়েও পরম ধৈর্যের পরিচয় দেয়। আলিফের জানাজায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হলেও ঘটেনি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। সবার উপরে বাংলাদেশ- এটাই যেন প্রতিষ্ঠিত হয় আরেকবার। মানুষের ঐক্য আপাত হলেও নস্যাৎ করে দেয় ষড়যন্ত্র।

একটি জানাজা, জাতীয় ঐক্যের প্রতীক
সাইফুল ইসলাম আলিফ ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টেও। তার সামনে ছিল অনেক পথ পাড়ি দেয়ার হাতছানি। কিন্তু ঘাতকরা দুঃসাহস দেখিয়ে হত্যা করেছে তাকে। শহীদ আলিফের অবুঝ সন্তান জানেও না তার বাবা আর কোনো দিন ফিরবে না। সন্তানের জন্য আহাজারি করতে করতে আলিফের বাবা বার্তা দিয়েছিলেন, সম্প্রীতি রক্ষার। কার সাধ্য আছে তার মাকে সান্ত্বনা দেয়! তবে বাংলাদেশ তার এক শ্রেষ্ঠ সন্তানকে বিদায়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সম্মানই দেখিয়েছে। আমাদের ইতিহাসে অল্প কিছু জানাজাই বারবার আলোচনায় আসে। নিশ্চিতভাবেই সে তালিকায় যোগ হলো সাইফুল ইসলাম আলিফের নাম। চট্টগ্রামে তার জানাজায় যোগ দিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। তারা চোখের পানিতে বিদায় জানিয়েছেন আলিফকে। কিন্তু কোথাও সামান্য বিশৃঙ্খলাও করেননি। জানাজায় শরিক হয়েছিলেন ৫ই আগস্টের পটভূমিতে বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা সব পক্ষের প্রতিনিধি। ছিলেন উপদেষ্টা, ছাত্র আন্দোলনের নেতা, বিএনপি ও জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং পক্ষের প্রতিনিধিরা।

ভারতীয় মিডিয়ার বিরামহীন অপপ্রচার
৫ই আগস্টের পর থেকে বিরামহীনভাবে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় মিডিয়ার একটি অংশ। ডনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের দিন এমনকি এ খবরও দেয়া হয়েছিল যে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফ্রান্স চলে গেছেন। পাশের বাড়ির মিডিয়ার এ ধরনের প্রচারণা থেমে নেই। সাংবাদিকতার রীতিনীতির বাইরে গিয়ে প্রতিনিয়ত তারা ছড়াচ্ছে নানা গুজব, দিচ্ছে উস্কানি। তবে বাংলাদেশের জনগণ এসব উস্কানির ফাঁদে পা দেয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ পরম ধৈর্যের সঙ্গে তার প্রতিবেশীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করে গেছেন। তবে কিছু বিচ্যুতি যে ঘটেনি তা নয়। যদিও এর প্রায় সবই রাজনীতি সংশ্লিষ্ট। ধর্মীয় কারণে কারও ওপর কিংবা কারও বাড়িঘরে হামলা এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না।  

জাতীয় ঐক্যের বার্তা রাজনৈতিক দলের
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এরইমধ্যে সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা। আলাদা দিনে বৈঠক করেছেন তারা। বৈঠকে উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্যও উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি এবং জামায়াত দু’টি দলের পক্ষ থেকেই জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। যদিও বিশেষত বিএনপি নির্বাচনের রোডম্যাপের দাবিও জানিয়ে আসছে।

ছাত্র-জনতাকে অভিবাদন
বর্তমান পরিস্থিতির ভূমিকার জন্য জনগণকে অভিবাদন জানিয়েছেন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম। মাহফুজ আলম এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, দায়িত্ব ও দরদের নজির দেখিয়ে আপনারা বাংলাদেশকে গর্বিত করেছেন। বাংলাদেশ আর কারও ষড়যন্ত্রের সামনে পরাস্ত হবে না। ইনশাআল্লাহ। তিনি আরও লিখেছেন, আমাদের ব্যক্তি ও সমষ্টির ‘শক্তি’ সাধনায় দরদি ও দায়িত্ববান হয়ে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হয়ে ওঠা মোক্ষ। আমাদের এ অভ্যন্তরীণ শক্তি যেকোনো বহিঃশত্রুকে পর্যুদস্ত করবে। আমরা আর Colonizable হবো না।

বিশেষ ধন্যবাদ প্রাজ্ঞ আলেম ও মুসলিম  নেতৃবৃন্দের প্রাপ্য। আপনারা এ গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে বাঙালি মুসলমানকে দায়িত্বশীল আচরণে অনুপ্রাণিত করেছেন। ধর্ম, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে আপনাদের আজ ও আগামীর প্রাজ্ঞ উদ্যোগ বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আপনাদের ইজ্জত ও শরিকানা নিশ্চিত করবে। পোস্টে আরও বলা হয়, হঠকারিতা, নেতিবাচকতা ও ভাঙনের মানসিকতা থেকে বের হয়ে আমাদের সৃজনশীল ও ইতিবাচক মানসিকতায় এ রাষ্ট্রকে গড়তে হবে। এ রাষ্ট্র  পরিগঠন করলেই কেবল জুলাই শহীদানসহ শহীদ আলিফের শাহাদাত অর্থবহ হয়ে উঠবে।

অন্যদিকে, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম লিখেছেন, মঙ্গলবার দেশের মানুষ; রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় ও বিদেশে অবস্থানরত প্রভাবশালী বাংলাদেশিরা অভূতপূর্ব রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি আরও লিখেছেন, ‘এখনো কিছু বিষয়ে উত্তেজনা থাকলেও আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আমরা মাথা উঁচু করে কঠিন এই পরীক্ষায়ও উতরে যাবো। স্বার্থান্বেষী কিছু গোষ্ঠী ও ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসকের পাতা ফাঁদে বাংলাদেশের মানুষ কখনো পা দেবে না।  দেশের মানুষের বৈপ্লবিক চেতনা যে দারুণভাবে জ্বলজ্বল করছে, সেটা বেশ স্পষ্ট। এটা কয়েক দশক ও শতক ধরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।

সংখ্যালঘু সমপ্রদায় আগের তুলনায়  বেশি নিরাপত্তা পাচ্ছে
ভয়েস অফ আমেরিকা (ভিওএ) বাংলার এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে বেশি নিরাপত্তা দিতে পারছে। জরিপের ফলাফলে নিরাপত্তা নিয়ে ধারণায় মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে।

গত অক্টোবর মাসের শেষের দিকে পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, ৬৪ দশমিক ১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের তুলনায় অন্তর্বর্তী সরকার ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে বেশি নিরাপত্তা দিচ্ছে। মাত্র ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, বর্তমান সরকার সংখ্যালঘুদের জন্য আগের চেয়ে খারাপ নিরাপত্তা দিচ্ছে। ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, পরিস্থিতি আগের মতোই আছে।

জরিপে এক হাজার উত্তরদাতাকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনের তুলনা করতে বলা হয়। বাংলাদেশের জনতত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য  রেখে জরিপের জন্য এক হাজার উত্তরদাতা বাছাই করা হয়। উত্তরদাতাদের মধ্যে সমানসংখ্যার নারী ও পুরুষ ছিলেন, যাদের মধ্যে ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ মুসলিম। উত্তরদাতাদের মধ্যে অর্ধেকের একটু  বেশির বয়স ৩৪ বছর বয়সের নিচে। উত্তরদাতাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ শহুরে মানুষ।

শেষ কথা: যুগের পর যুগ ধরে হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি বাস করেছে এ ভূমিতে। মর্মান্তিক ঘটনা যে কখনও ঘটেনি তা নয়। তবে শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে সৌহার্দ্য আর ভালোবাসারই। আরও একবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। মানুষ আগলে রেখেছে মানুষকে। পরাভূত করেছে চক্রান্ত আর প্রচারণাকে। তবে এ লড়াই এখানেই শেষ হবে না। সামনে দীর্ঘ কঠিন পথ।

mzamin


Friday, November 22, 2024

দৃশ্যপট পাল্টায় এভাবেই! by সাজেদুল হক

কারাগার, বাসা, হাসপাতাল। গেল অনেকগুলো বছর এটাই ছিল খালেদা জিয়ার জীবন। দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রীয় মঞ্চে দেখা গেল তাকে। এক যুগ পর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে সেনাকুঞ্জে অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও যোগ দেন এই অনুষ্ঠানে। তারা দু’জন কুশল বিনিময় করেন। পাশাপাশি বসে কথা বলেন। ছাত্র আন্দোলনের নেতা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নাহিদ ইসলাম, মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদও খালেদা জিয়ার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। রাজনীতিবিদ, সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, নানা পেশার মানুষ আলোকিত করেন সেনাকুঞ্জ।

সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং খালেদা জিয়া যখন আলাপ করছিলেন সে মুহূর্তে গণবিক্ষোভের মুখে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা ভারতে কী করছিলেন তা জানার উপায় নেই। তবে নিয়তির পরিহাস যে কতোটা নির্মম হতে পারে তা হয়তো আওয়ামী লীগ সভানেত্রী অনুভব করতে পারেন। শেখ হাসিনা বনাম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের রাজনীতির ময়দানে এই বৈরিতা দীর্ঘদিনের। তবে ‘যুদ্ধের’ মধ্যেও এক ধরনের শান্তির নীতি তারা অনুসরণ করে আসছিলেন। তাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হতো কম। সৌহার্দ্যও হয়তো ছিল না। কিন্তু একে- অপরকে দীর্ঘদিন জেলের বাইরে সহ্য করেছেন। যদিও শেখ হাসিনা তার ওপর গ্রেনেড হামলার জন্য বিএনপি সরকারকে দায়ী করেছেন। তবে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হতে থাকে। এক পর্যায়ে খালেদা জিয়াকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। পরে তিনি নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেলেও কার্যত ছিলেন বন্দি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপরও শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলের কোপ পড়ে। তাকে প্রথমে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অপসারণ করা হয়। সুদখোরসহ নানা উপাধি দিয়ে তার ওপর আক্রমণ শানান শেখ হাসিনা। একপর্যায়ে  তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হতে থাকে। আদালতের ‘খাঁচায় বন্দি’ নোবেল জয়ীকে দেখে সারা দুনিয়া। ৫ই আগস্ট দৃশ্যপটে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর দ্রুতই মুক্তি মেলে খালেদা জিয়ার। ফ্রান্সে অবস্থানরত ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভাবছিলেন দেশে ফিরে তাকে কারাগারে যেতে হয় কি-না? কিন্তু মাতৃভূমি থেকে তার ডাক আসে সরকার প্রধান হওয়ার।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং খালেদা জিয়া যখন গতকাল কুশল বিনিময় করছিলেন তখন অনেকে ভাবছিলেন বছর দুয়েক আগে তাদের নিয়ে শেখ হাসিনার করা একটি মন্তব্যের কথা।  ২০২২ সালের ১৮ই মে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ কার্যালয়ে  শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল আওয়ামী লীগ। গণভবন থেকে ভার্চ্যুয়ালি সে আলোচনায় যোগ দেন শেখ হাসিনা।  সেদিনের বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “একটি এমডি পদের জন্য পদ্মা সেতুর মতো সেতুর টাকা বন্ধ করেছে, তাকে পদ্মা নদীতে দুইটা চুবানি দিয়ে তোলা উচিত। মরে যাতে না যায়, পদ্মা নদীতে একটু চুবানি দিয়ে  সেতুতে তুলে দেয়া উচিত। তাহলে যদি শিক্ষা হয়। পদ্মা সেতুর অর্থ বন্ধ করালো ড. ইউনূস। কেন? গ্রামীণ ব্যাংকের একটি এমডি পদে তাকে থাকতে হবে।” ওইদিনের বক্তব্যে শেখ হাসিনা আরও বলেন, “খালেদা জিয়া বলেছিল যে, জোড়াতালি দিয়ে পদ্মা  সেতু বানাচ্ছে, কারণ বিভিন্ন স্প্যানগুলো যে বসাচ্ছে, ওটা ছিল তার কাছে জোড়াতালি দেয়া। তো বলছিল,  জোড়াতালি দিয়ে পদ্মা সেতু বানাচ্ছে, ওখানে চড়া যাবে না। চড়লে ভেঙে পড়বে। আবার তার সঙ্গে তার কিছু  দোসররাও। তাদেরকে কি করা উচিত? পদ্মা সেতুতে নিয়ে যেয়ে, ওখান থেকে পদ্মা নদীতে টুস করে ফেলে দেয়া উচিত।”

ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং খালেদা জিয়াকে পদ্মা নদীতে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু রাজনীতির মঞ্চ কখনো কখনো রোমাঞ্চকর এবং নিষ্ঠুর। সেই মঞ্চ কাল পাশাপাশি কুশল বিনিময়ের সুযোগ করে দিলো বাংলাদেশের ইতিহাসের দুই আলোচিত ব্যক্তিকে। যখন দিল্লির কোথাও বসে শেখ হাসিনা হয়তো হিসাব মেলাচ্ছেন! কোথা থেকে কি হয়ে গেল! যদিও রাজনীতির পণ্ডিতরা তাকে বার বারই হুঁশিয়ার করছিলেন বহুদিন ধরেই। বলেছিলেন, সব দরজা-জানালা বন্ধ করতে নেই। সমঝোতার কিছু পথ খোলা রাখতে হয়। না হয় শেষ পর্যন্ত কোনো হিসাবই মেলে না। আওয়ামী লীগ নেতারাই এখন বলছেন, বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন আয়োজন ভুল ছিল! কিন্তু শেখ হাসিনা যখন মসনদে ছিলেন তখন কেউ হয়তো তাকে সেটা বলার সাহস পাননি। অনুগত মিডিয়াও কেবল তোষামোদ করে গেছে। মনে করিয়ে দেয়নি রাজনীতিতে এক সময় থামতে হয়।

শেখ হাসিনা এখন কোথায়? ক’দিন আগেই ভারতীয় মিডিয়া খবর দিয়েছিল, নয়াদিল্লির লোধি গার্ডেন এলাকায় বাংলোতে আছেন শেখ হাসিনা। সর্বশেষ বিবিসিতে সাংবাদিক শুভজ্যোতি ঘোষ লিখেছেন, ‘আসলে আজ থেকে ঠিক একশ’ দিন আগে আগস্টের ৫ তারিখে চরম নাটকীয় পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা যখন ভারতে পা রাখেন, দিল্লির বিশ্বাস ছিল তার এই আসাটা একেবারেই সাময়িক- ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে যাওয়ার আগে এটা একটা সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির  বেশি কিছু নয়! যেকোনো মুহূর্তে তৃতীয়  কোনো দেশের উদ্দেশ্যে তিনি রওনা হয়ে যাবেন, এই ধারণা থেকেই প্রথম দু-চারদিন তাকে (সঙ্গে বোন শেখ  রেহানাকে) রাখা হয়েছিল দিল্লির উপকণ্ঠে গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটির টার্মিনাল বিল্ডিংয়েই,  যেটির নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার ভার  দেশের বিমান বাহিনীর। কিন্তু চট করে শেখ হাসিনার তৃতীয় কোনো  দেশে পাড়ি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর ভারত সরকার তাকে হিন্ডন থেকে সরিয়ে আনে দিল্লির  কোনো গোপন ঠিকানায়। পরে তাকে হয়তো দিল্লির কাছাকাছি অন্য কোনো সুরক্ষিত ডেরাতে সরিয়েও নেয়া হয়েছে- কিন্তু এ ব্যাপারে ভারত সরকার আজ পর্যন্ত কোনো তথ্যই প্রকাশ করেনি।’

এমন রাষ্ট্র গড়তে চাই যেখানে জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক হবে: প্রধান উপদেষ্টা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধারা বৈষম্যহীন, শোষণহীন, কল্যাণময় এবং মুক্ত বাতাসের যে স্বপ্ন নিয়ে রাষ্ট্রকে স্বাধীন করেছিলেন, আমি তাদের সেই স্বপ্ন পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা এখন থেকে বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়তে চাই যেখানে সত্যিকার অর্থে জনগণই হবে সকল ক্ষমতার মালিক। গতকাল সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। প্রফেসর ড. ইউনূস বলেন, জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে আমরা নতুন বাংলাদেশের সূচনা করেছি। এ নতুন দেশে আমাদের দায়িত্ব সকল মানুষকে এক বৃহত্তর পরিবারের বন্ধনে আবদ্ধ করা। কেউ কারও উপরে না, আবার কেউ কারও নিচেও না; এই ধারণা আমরা আমাদের জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। বিশ্ব দরবারে মানবিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে সমাদৃত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমরা সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখবো। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হবে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা, বিশ্বাস ও সহযোগিতা। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এবং বৈশ্বিক শান্তি ও অর্থনীতি সুসংহতকরণে আমাদের একত্রে কাজ করতে হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ফলে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও পরিচিতি লাভ করেছে। দেশ স্বাধীন করার মহান ব্রত নিয়ে ’৭১- এর ২৫শে মার্চ কালরাত থেকে বাঙালি সেনারা সেনানিবাস ত্যাগ করে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। একই সঙ্গে এই দেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতা সাধারণ মানুষ সকলেই যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরবর্তীতে যা একটি জনযুদ্ধে রূপ নেয়। আমাদের মা-বোনেরা মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ বিভিন্নভাবে যুদ্ধে সহযোগিতা করেছেন। সরকারপ্রধান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া সকল বাহিনীকে ‘বাংলাদেশ ফোর্সেস’ নামে সাংগঠনিক রূপ দেয়া হয়। সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালিত হয়। মাত্র ২টি গান বোট ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ্থ’ নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী জলপথে যুদ্ধ শুরু করে। এ ছাড়াও পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কর্মরত বাংলাদেশি সাবমেরিনার এবং নাবিকদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা অকুতোভয় নৌ-কমান্ডো দল ‘অপারেশন জ্যাকপট’ নামক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন নদী বন্দরে খাদ্য ও রসদ বোঝাই শত্রু জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিমান বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ‘কিলো ফ্লাইট’ চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের জ্বালানি ডিপোসহ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সফল অভিযান পরিচালনা করে। মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর এই অবদানকে সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের সঙ্গে একীভূত করার উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ২১শে নভেম্বর পালিত হয় সশস্ত্র বাহিনী দিবস। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের এই দিনে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর অকুতোভয় সদস্য এবং বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ সম্মিলিতভাবে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ সূচনা করে। সেই আক্রমণের ফলে আমাদের বিজয় ত্বরান্বিত হয় এবং ফলশ্রুতিতে আমরা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করি।

স্বাধীনতা যুদ্ধে শাহাদতবরণকারী বীর শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমি আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি স্বাধীনতা যুদ্ধে শাহাদতবরণকারী সকল বীর শহীদদের এবং মহান আল্লাহর দরবারে আমি তাদের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। আমি সকল শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য এবং সম্মানিত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাগণের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের এই আয়োজনে আর্মি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সে যে সকল খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারীগণ উপস্থিত আছেন তাদের জন্যও রইলো আমার বিনীত শ্রদ্ধা। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা চলমান রয়েছে। সময়ের আবর্তে অধিকাংশ বীর মুক্তিযোদ্ধা আজ বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। সশস্ত্র বাহিনী দিবস উদ্‌যাপনকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী যে উদ্যোগ প্রতিবছর নিচ্ছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এ জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। ড. ইউনূস বলেন, খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারীদের সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পেয়ে আমি গর্বিত ও অনুপ্রাণিত। নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে সুযোগ ছাত্র-জনতার সাহস ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে সমপ্রতি আমরা অর্জন করেছি, সেটাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী ভবিষ্যৎ গড়তে হবে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, আহত এবং জীবিত ছাত্র-জনতার কাছে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকতে চাই। যে সুযোগ তারা আমাদেরকে দিয়েছে তার মাধ্যমে আমাদের দেশকে পৃথিবীর সামনে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী দেশে পরিণত করতে আমরা শপথ নিয়েছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের উত্তরাধিকারীদের কল্যাণার্থে যা কিছু প্রয়োজন তা করার জন্য আমরা দৃঢ়প্রত্যয়ী এবং এ ধারা অব্যাহত থাকবে।

এর আগে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী সকল বীর শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা সেনানিবাসে শিখা অনির্বাণের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। এ সময় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর একটি চৌকস দল প্রধান উপদেষ্টাকে সালাম জানান। এ সময়  বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। প্রধান উপদেষ্টা সেখানে রাখা দর্শনার্থীদের বইয়েও স্বাক্ষর করেন। এর আগে শিখা অনির্বাণে পৌঁছলে সেখানে তিন বাহিনীর প্রধানগণ এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ড. ইউনূসকে স্বাগত জানান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বয়ে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী গঠিত হয় এবং তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর সর্বাত্মক হামলা চালায়। স্বাধীনতার পর থেকে এই ঐতিহাসিক দিনটিকে প্রতিবছর যথাযোগ্য মর্যাদায় সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

হাস্যোজ্জ্বল খালেদা জিয়া, ড. ইউনূসের সঙ্গে কুশল বিনিময়: সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। প্রধান উপদেষ্টার দেয়া বৈকালিক এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অতিথিদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তার পাশেই বসেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। অতিথিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে প্রধান উপদেষ্টা তার আসনে বসে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এসময় হাস্যোজ্জ্বল খালেদা জিয়াকে কথা বলতে দেখা যায়। দীর্ঘ এক যুগ পর সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৮ সালের পর এই প্রথম প্রকাশ্যে কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিলেন তিনি। 

mzamin

Saturday, November 2, 2024

‘এক ভোটে’ প্রেসিডেন্ট, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস, ঢাকায় উত্তেজনা by সাজেদুল হক

“মনে হচ্ছিল এটি যেন এক শবযাত্রা। সবাই যেন পাথর হয়ে গেছে। আড়াইটার সময় আল গোর একা তার স্যুইটের বেডরুমে গিয়ে বুশকে ফোন করলেন এবং পরাজয় স্বীকার করলেন। বুশকে অভিনন্দন জানালেন।’’ আল গোর যখন হার স্বীকার করে বক্তৃতা দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন তার টিমের কাছে একটি বার্তা আসলো। “তার দলের একজন কর্মীর কাছে একটা  টেক্সট  মেসেজ আসলো ক্যাম্পেইন ম্যানেজারের কাছ থেকে। বলা হলো, আল গোরকে যেন অনুষ্ঠান মঞ্চে যেতে দেয়া না হয়। কারণ ভোটের লড়াই এখনো শেষ হয়নি।” কিন্তু আল গোর চাচ্ছিলেন, তিনি মঞ্চে গিয়ে বক্তৃতা দেবেন। তার কথা ছিল, “লোকজন বহু ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছে। আমি সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই।’’ তখন একটা লোক সবার সামনে গিয়ে বললো, মাইক রেডি নয়। কাজেই সবাই আবার বাইরের রুমে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। এরপর লোকটা আল গোরকে গিয়ে বললো, “ফ্লোরিডার ব্যাপারটা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’’

এ বয়ান ক্যালি শেলের। যিনি ২০০০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট প্রার্থী আল গোরের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার ছিলেন। পরে কাজ করেছেন বারাক ওবামার সঙ্গেও। কীভাবে মাত্র একটি ইলেক্টোরাল ভোটের ব্যবধানে জর্জ ডাব্লিউ বুশ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন তার রোমাঞ্চকর, উত্তেজনাপূর্ণ বর্ণনা দেন ক্যালি শেল, বিবিসিতে যা তুলে এনেছিলেন রেবেকা কেসবি। শুধু যুক্তরাষ্ট্র কেন, পৃথিবীতেই সম্ভবত এমন নির্বাচন আর হয়নি। একবার বলা হচ্ছিল আল গোর জিতেছেন। পরে খবর পাওয়া যায় বুশ জিতেছেন। ব্যালট গণনা নিয়ে লড়াই গড়ায় আদালতে। ফ্লোরিডার আদালতের রায় পাল্টে যায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে। তাও সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে। এক মাসের আইনি লড়াই শেষে মাত্র একটি ইলেক্টোরাল ভোট প্রেসিডেন্টের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়।

আরেকটি মার্কিন নির্বাচন একেবারেই দোরগোড়ায়। দুইদিন বাদেই ভোট। ২০০০ সনের জনমত জরিপ যেমন লড়াইয়ের আভাস দিয়েছিল এবারো একই রকম খবর পাওয়া যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে ডনাল্ড ট্রাম্প এবং কমালা হ্যারিসের মধ্যে। প্রায় সব জরিপই বলছে তাদের ভোটের ব্যবধান হবে একেবারে সামান্য। কোথাও ট্রাম্প এগিয়ে, কোথাও কমালা। ডেমোক্রেট এবং রিপাবলিকান শিবিরের ঘুম হারাম। যদিও ভোটের আগেই উত্তেজনা তৈরি করেছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। সিএনএনে একজন ভাষ্যকার বলছিলেন, ট্রাম্প এমন একটি আবহ তৈরি করতে চাচ্ছেন যেন তার জয়ই সত্য, আর সব মিথ্যা। ট্রাম্প এরইমধ্যে দাবি করেছেন, ‘গড যদি ভোট গনণাকারী হন তবে তিনি ভূমিধস জয় পাবেন।’ পুরো দুনিয়ার চোখ এখন মার্কিন মুল্লুকে। পরিবর্তিত পৃথিবীতেও আমেরিকা বিশ্ব নেতা। সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ইউরোপ এবং ইউক্রেন। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে ইউক্রেনের পাশে আছে যুক্তরাষ্ট্র। ডনাল্ড ট্রাম্প যদি ক্ষমতায় আসেন তাতে পরিবর্তন আসবে এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে। মার্কিন নির্বাচনের পর সে অঞ্চলে কী হবে? যুদ্ধ বিস্তৃত হবে? শান্তি ফিরবে? বিশ্ব ব্যবস্থায় কি কোনো পরিবর্তন আসবে? পুতিন যে ট্রাম্পের জয় চাইছেন তা কারও অজানা নয়। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেই হোন চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বড় কোনো হেরফের হবে না।

মার্কিন নির্বাচনের দিকে সবসময় দৃষ্টি থাকে বাংলাদেশেরও। তবে এবার মনে হয় এ ভূমে হাজার হাজার মাইল দূরের নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনা কিছুটা বেশিই। শুক্রবার রাতে এক্সে দেয়া ডনাল্ড ট্রাম্পের একটি বার্তা যাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-বিশ্লেষণ। কিছুটা দীর্ঘ বার্তার শুরুতে ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ প্রসঙ্গ। লিখেছেন, ‘আমি বাংলাদেশে হিন্দু, খ্রিস্টান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বরোচিত সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। দেশটিতে দলবদ্ধভাবে তাদের ওপর হামলা ও লুটপাট চালানো হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন পুরোপুরিভাবে একটি বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে রয়েছে।’ বার্তায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন হিন্দু ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করেছেন তিনি। তবে তার এই বার্তা ঢাকায় কম চাঞ্চল্য তৈরি করেনি। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গেল বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিবেচনায় এ বার্তা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও কেউ কেউ এর পেছনে গুজব, লবিস্ট ফার্মের ভূমিকা এবং হিন্দুত্ববাদী প্রচারণার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করে আসছে। বিশেষত রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা ও পিটার হাস্‌ এ নিয়ে অনেক চেষ্টা করেছিলেন। বাইডেন প্রশাসন বাংলাদেশের জন্য ভিসা নীতিও ঘোষণা করেছিল। অবশ্য কাজের কাজ এতে হয়নি। শেখ হাসিনা একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন। তবে গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যান। নতুন এক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যাকে ওয়াশিংটনের পুরনো মিত্র মনে করা হয়। তবে ট্রাম্প শিবিরের ক্ষেত্রে সে মিত্রতার চিত্র কেমন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এরইমধ্যে ভারতের সঙ্গে শীতল সম্পর্ক যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। আমেরিকার ক্ষমতার অন্দরমহলে দিল্লির প্রভাবের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় রয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন বেশকিছু প্রশ্ন রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো কবে, আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো সে ব্যাপারে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। তবে কিছু ইঙ্গিত মিলছে ২০২৫ সালে নির্বাচন হতে পারে। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এ ব্যাপারে রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছে। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো আওয়ামী লীগ রাজনীতি করার বা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পাবে কি-না? এ দু’টি ক্ষেত্রেই আমেরিকার নির্বাচনের ফল প্রভাব রাখতে পারে। ড. ইউনূস সরকার এক্ষেত্রে কী কৌশল অবলম্বন করে তা হবে দেখার বিষয়। সম্ভবত, ড. ইউনূসের সরকারের চেয়েও বেশি দৃষ্টি নিয়ে মার্কিন নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ। তারা কেমন ফল চান তা ধারণা করা কঠিন কিছু নয়। একইরকম ভাবে সে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে বিএনপি, জামায়াত, ছাত্র নেতৃত্বসহ বিভিন্ন দল ও গ্রুপ।

আমেরিকার কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব কম-বেশি যাই হোক না কেন পুরো বিশ্ব ব্যবস্থার জন্যই এ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। একের পর এক জরিপ হচ্ছে। কোথাও কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে না। একেবারেই কাছাকাছি দুই প্রার্থী। একে অন্যের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন। দুই শিবিরই কি কিছুটা নার্ভাস? প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ তার ‘মে ফ্লাওয়ার’ বইতে লিখেছিলেন, ‘আমরা আমাদের দেশে একজন মহিলা রাষ্ট্র প্রধানের কথা চিন্তা করতে পারি। ভাবতে পারি। ওরা (আমেরিকান) তা পারে না। আসছে একশ’ বছরেও এই আমেরিকায় কোনো মহিলা প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট হবে না। অতি সুসভ্য এই দেশ তা হতে দিবে না।’ হিলারি ক্লিনটনের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তিনি তা হতে পারেননি। কিন্তু কমালা হ্যারিস ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। এবার কি তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন? তিনি কি নতুন ইতিহাস তৈরি করবেন। নাকি ডনাল্ড ট্রাম্প, যিনি সম্ভবত পুরো আমেরিকার রাজনীতির খোলনলচে বদলে দিয়েছেন তিনি আবার হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হবেন। যেই জয় পান না কেন, লড়াইটা যে খুব কঠিন হবে তা একেবারেই স্পষ্ট।

আবার ২০০০ সনে ফিরে যাই। বিবিসি’র বরাতে ক্যালি শেলের বয়ানে। ফ্লোরিডার আদালত প্রতিটি ভোট গণনার পক্ষে রায় দিলেও সুপ্রিম কোর্ট তা পাল্টে দেয়। ৯ জন বিচারকের ৫ জন ভোট পুনঃগণনা বন্ধ করার পক্ষে, ৪ জন বিপক্ষে মত দেন। আদালতের রায় অনুযায়ী জর্জ বুশই ফ্লোরিডায় জয় পান। তার মোট ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট দাঁড়ায় ২৭১। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল ২৭০ ভোট। সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার সময় আল গোরের কাছাকাছিই ছিলেন ক্যালি শেল। ‘আইনজীবীরা সবাই তখন ফোনে কথা বলছে। আমার মনে পড়ছে, আল গোর তখন বললেন, সব শেষ হয়ে গেছে, ঠিক? আমরা কি আর কিছু করতে পারি?’ আইনজীবীরা বললো, ‘না, সব শেষ, আর কিছু করার নেই। তখন আল গোর বললেন, তাহলে আর কিছু করার নেই, আমাদের সবার এখন ঘুমাতে যাওয়া উচিত। আমার মনে হচ্ছিল, তিনি বেশ দমে গিয়েছিলেন। আল গোর বেশ নিরাশ হয়েছিলেন, যে সিস্টেমের ওপর তিনি এতটা আস্থা রেখেছিলেন, সেটি শেষ পর্যন্ত কাজ করেনি।’ প্রশ্ন হলো এবারের ভোটও কি এমনই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে?

mzamin


Thursday, September 5, 2024

আমরা তোমাদের ভুলবো না by সাজেদুল হক

ছেলেটি হাসপাতালের বেডে বসে আছে। মুখে হাসি। এক ফোঁটা দুঃখও নেই কোথাও। কে বলবে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তার একটি হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে তার কথা, ‘আঙ্কেল লাগলে আবার যামু, দরকার হলে আরেকটা হাত দিমু।’ মুহূর্তে মনে হানা দেয় হুমায়ূন আহমেদের একটি গল্প। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা। যুদ্ধে পা হারায় ছেলেটি। ক্র্যাচে ভর দিয়ে বাড়ি ফিরে এসে দেখে প্রেমিকার বিয়ে হয়ে গেছে। এটা তার জীবনে তেমন কোনো ছাপ ফেলে না। সে ভাবে ‘একটি স্বাধীনতার কাছে এ ক্ষতি সামান্য।’ যদিও মা রহিমা তেমনটা ভাবতে পারেন না। জীবন তার সুবিশাল বাহু তার দিকে প্রসারিত করেনি। রাতে তার ঘুম হয় না।

জিহাদ হাসান মাহিম। আমাদের কলিগ পিন্টু আনোয়ারের আত্মীয়। ১৯শে জুলাই একবার গুলিবিদ্ধ হয়েছিল। বাবা-মা সতর্ক করেছিল তাকে। বাবা আর যাইস না। সে বলেছিল, আমরা না গেলে দেশ পরিষ্কার হবে কীভাবে! ৫ই আগস্ট সকাল থেকেই উত্তেজনা। মাকে ফাঁকি দেয়ার জন্য মাহিম বলেছিল, ডিম সিদ্ধ বসাও। মা যেন বুঝতে না পারে মোবাইলটাও বাসায় রেখে বের হয়ে যায়। সেই ডিম নিয়ে মায়ের অপেক্ষা শেষ হয়নি। মাহিম তার ঘরে ফিরতে পারেনি। কোনোদিন পারবেও না।

আবু সাঈদ, মুগ্ধদের নাম আমরা জানি। অসংখ্য শহীদের নাম আমরা কেউ জানি না। বাংলা মায়ের মাটিতে কোথাও কি তাদের কবর হয়েছে? নাকি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাদের? ভ্যানগাড়িতে ময়লার মতো লাশ ফেলা হচ্ছে। এমন একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে ক’দিন আগে। আরও ভিডিও সামনে আসছে। আসছে লোমহর্ষক সব ছবি।

৫ই আগস্ট থেকে ৫ই সেপ্টেম্বর। একদা অসম্ভব মনে হওয়া হাসিনার পতনের এক মাস হলো। রাষ্ট্র এখনো পুরোপুরি স্থির হয়নি। একের পর এক চ্যালেঞ্জ আসছে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সামনে। কেউ কেউ বলছেন, ষড়যন্ত্র। ভিনদেশি শেয়ারহোল্ডাররা চেষ্টা করছেন সবকিছু অচল করার। রাজনৈতিক দলগুলোও যথাযথ ভূমিকা রাখছে কি-না সে প্রশ্নও উঠছে।

রক্ত নদী পেরিয়ে আসা বিজয়ের পর প্রধান কর্তব্য কী? আমরা মনে করি এ নিয়ে কোনো দ্বিধা-সংশয় থাকা উচিত নয়। শহীদদের সর্বোচ্চ সম্মান দিতে হবে। সরকার, সমন্বয়ক, রাজনীতিবিদ, মিডিয়া সবাইকেই এটা করতে হবে। যারা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য তাদের বর্তমানকে বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের যেন আমরা কোনোদিনও ভুলে না যাই। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, দিনমজুর যারাই নিহত হয়েছেন তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে হবে। অনতিবিলম্বে তাদের পরিবারকে একটি প্রাথমিক অর্থ সম্মানী দিতে হবে। গুরুতর আহত, পঙ্গু হওয়াদের পাশেও রাষ্ট্র, সমাজকে সর্বশক্তি নিয়ে দাঁড়াতে হবে। ভিডিওগুলো পুরোটা দেখতে পারি না। কারও হাত কেটে ফেলতে হয়েছে, কারও পা। চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছেন অনেকে। সরকার তাদের চিকিৎসায় পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে গুরুতর আহতদেরও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিতে হবে। নিহতদের পরিবার এবং আহতদের পাশে রাষ্ট্রকে সারা জীবন থাকতে হবে। এ ব্যাপারে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ফাউন্ডেশন সম্ভাব্য সবকিছু করবে বলেই প্রত্যাশা আমাদের। শহীদদের বিশেষ মর্যাদা দিতে হবে।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গড়ে উঠেছে মূলত জুলাই ‘গণহত্যার’ বিচারের দাবিতে। এরইমধ্যে জাতিসংঘকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এ ঘটনার তদন্তে। যেটি নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক পদক্ষেপ। সারা দেশে নিহতের ঘটনায় বেশ কিছু মামলাও করা হয়েছে। অনেকে বলছেন, এসব মামলা বিশৃঙ্খল। আইন উপদেষ্টা এরইমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। আইনবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য এ আইনে কিছু সংশোধনী আনতে হবে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।

জুলাই-আগস্টের শহীদদের প্রতি সমাজ, মিডিয়া, সাহিত্য, সংস্কৃতি সবক্ষেত্র থেকেই যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে।  ঢাকার মিডিয়ায় এখন পর্যন্ত শহীদদের পূর্ণাঙ্গ চিত্র উঠে আসেনি। এটা অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামর্থ্যেরও ঘাটতি। গান, সিনেমা, নাটকে, পাঠ্যপুস্তকে শহীদদের অবদান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাদের আন্দোলনের যে মূল চেতনা বৈষম্যমুক্ত সমাজ এবং মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

কী করে শেখ হাসিনার পতন সম্ভব হলো তা নিয়ে এখনো নানা গবেষণা চলছে। চারদিকে এখনো বিস্ময়! মানুষ তো দূরের কথা অনেক রাষ্ট্রই এখনো এটা বিশ্বাস করতে পারছে না। যার গায়ে গুলি লাগে শুধু সেই সরে আর কেউ কেন সরে না- এটা আসলে বুঝা কঠিন, দুঃসাধ্য। সাদা চোখে যা বুঝা যায় আওয়ামী লীগ ও কিছু সহযোগী ছাড়া বাংলাদেশের সব মানুষকে এ আন্দোলন একই ছাতার নিচে আনতে সক্ষম হয়েছে। এ আন্দোলনে অংশ নেয়া নারী শিক্ষার্থীদের পোশাকের বৈচিত্র্য প্রমাণ করে তা কতো বিস্তৃত ছিল। আন্দোলনে নিহতদের তালিকায় রয়েছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।  এ ভূমির মানুষ ইতিহাস তৈরি করেছে। যার নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্ররা। যারা জীবন দিয়েছে তাদের চেয়ে বড় ত্যাগ আর কারোরই নেই। তোমাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না। ‘আমরা তোমাদের ভুলবো না’। 

Saturday, August 31, 2024

কী হচ্ছে, কী হবে? by সাজেদুল হক

এই শিরোনাম মানবজমিন-এ আগেও ছাপা হয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। এমনকি ইতিহাসেও এমন সময় আগে কখনো আসেনি। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বয়স ২৪ দিন। চারদিকে এখনো অস্থিরতা। একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে। কিছু বড় পদক্ষেপ এরইমধ্যে নেয়া হয়েছে। অর্থনীতিতে  শৃঙ্খলা ফেরাতে ও গুম-খুনের তদন্তে বেশকিছু কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এখন পর্যন্ত খুব একটা উন্নতি হয়নি। পুলিশকে পুরোদমে কাজে ফেরানো যায়নি। দাবি-দাওয়া পার্টির অপতৎপরতা অবশ্য কিছুটা কমেছে। সামনের দিনগুলো কেমন হবে তা নিয়ে পর্দার আড়ালে নানা কথা চালাচালি হচ্ছে। বিএনপি’র পক্ষ থেকে নির্বাচনী রোডম্যাপের কথা বলা হয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব নিয়েও কিছু আলোচনার কথা শোনা যাচ্ছে। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করতে পারেন এমন গুঞ্জনও রয়েছে। এরইমধ্যে তার কিছু ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।

৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে বেশকিছু নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। দেশে কার্যত কয়েক দিন পুলিশই ছিল না। এ অবস্থায় হামলা, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের বাড়িতেও কিছু হামলা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগ আবার আওয়ামী লীগের নেতা। এই পরিস্থিতিতে নানা গুজব ছড়িয়ে হিন্দু-সম্প্রদায়ের লোকজনকে রাস্তায় নামিয়ে বড় বিক্ষোভের চেষ্টা ছিল একটি মহলের। তবে রাজপথে ছাত্র-জনতার কঠোর অবস্থানের কারণে তা সফল হয়নি। রাষ্ট্রের এমন জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই বিভিন্ন সেক্টরে দাবি-দাওয়া পার্টি সক্রিয় হয়ে ওঠে। যদিও এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেয়ার জন্য শুরু থেকেই সরকারকে বিভিন্ন মহল থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল। আনসার সদস্যরা সচিবালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করে। গত কয়েকদিনে দাবি-দাওয়া পার্টির তৎপরতা কমেছে। তবে তা এখনো পুরো মেটেনি। এসবের মধ্যেই ফেনী-কুমিল্লা অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হানা দেয়। এ পরিস্থিতিতে সরকার, সশস্ত্র বাহিনী, শিক্ষার্থী-জনতা বন্যা উপদ্রুত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বেশকিছু শক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষত ব্যাকিং খাত এস আলম মুক্ত করতে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। গুমের ঘটনা তদন্তে গঠন করা হয়েছে কমিশন।  বেশকিছু ক্ষেত্রে অবশ্য এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশন বহাল তবিয়তে রয়েছে। ভোট চুরির কারিগর প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতিকে সংবিধান শেখাচ্ছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনে এখনো পুরনো মুখ। প্রশাসনে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে সাবেক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা বসে আছেন। সরকারের একটি সূত্র অবশ্য বলছে, পনেরো বছরে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে তা থেকে বের হতে সময় লাগবে। তবে সরকার সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে আছে পুলিশ নিয়ে। কারণ পুলিশ পুরো সক্রিয় না হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন। ঢাকার একজন বিশ্লেষক বলেন, ‘সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে অ্যাকশন নেয়া। কারণ জনগণের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি না হলে অন্য সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যাবে।’ মামলাগুলো কেন্দ্র করেও এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের পরামর্শ এসেছে। সংশোধিত আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের স্বচ্ছ বিচার সম্ভব বলে আইনবিদরা মনে করেন।

সরকার যখন একের পর এক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে তখন রাজনীতির পর্দার আড়ালেও চাপান উতোর তৈরি হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের বাহাস চলছে। জোটে না থাকলেও দল দু’টির মধ্যে দীর্ঘদিন সহমর্মিতা ছিল। নতুন সরকার গঠনের পর বেশ কিছু ইস্যুতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের মধ্যে মতভেদের খবর পাওয়া যায়। দল দু’টির সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কেমন হয় সেদিকে গভীর দৃষ্টি রাখছেন রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা। বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কিছু কিছু নেতার বিরুদ্ধে দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্ব এসব ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যদিও আগামী নির্বাচন ঘিরে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের কৌশল কী হবে তা নিয়ে বিপুল কৌতুহল তৈরি হয়েছে। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, দিন যত গড়াবে রাজনীতির হিসাব তত কঠিন ও জটিল হবে। বিএনপি’র নেতৃত্ব নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ার কিছু দেশসহ কিছু কিছু মহলের ভিন্ন অবস্থানের গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। সেসব মহল শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয় অথবা বিএনপি নেতৃত্ব বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করে আগামী দিনে সে ব্যাপারে দৃষ্টি থাকবে সবার। এসবের মধ্যে ছাত্র নেতৃত্ব নতুন কোনো দল তৈরি করে কি-না সেটিও এক বড় প্রশ্ন। যদিও বাংলাদেশে নতুন দলের সাফল্যের রেকর্ড কম। কিন্তু এবারের নেতৃত্ব ইতিমধ্যে সবাইকে বিস্মিত করেছে। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা তারা খোলাখুলিই বলছেন। ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আব্দুল্লাহ গতকালও যেমন লিখেছেন, ‘এখন সময় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান করার! জনগণই আমাদের মাস্টারপ্ল্যানার!’ বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়েছে এমন ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায় না। পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা কী? সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমা কূটনীতিকদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা এক রাজনীতিবিদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম এ ব্যাপারে। তিনি বলেন, ‘তারা মনে করেন ৫ই আগস্টের পর এটা এক নতুন বাংলাদেশ।’

Wednesday, August 28, 2024

মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে: গ্রহণযোগ্য বিচারের জন্য আইসিটি আইনের সংশোধন প্রয়োজন by সাজেদুল হক

জুলাই ‘গণহত্যার’ বিচার কোন আইনে? এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। এসব ঘটনায় সারা দেশে বেশ কিছু মামলাও দায়ের হয়েছে। গ্রেপ্তারও করা হয়েছে  কয়েকজনকে। তবে এসব মামলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল এরইমধ্যে জানিয়েছেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে (আইসিটি) এসব ঘটনার বিচার হবে। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বিস্তারিত কিছু এখনো জানানো হয়নি। তবে আইনবিদরা বলছেন, ১৯৭৩ সালের আইনটি নিয়ে দেশ-বিদেশে বিতর্ক রয়েছে। অতীতে এ আইন সংশোধনের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান আইনজীবীরা কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন। তাই গ্রহণযোগ্য বিচারের জন্য এ আইনে কিছু সংশোধন প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক মামলা পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির।

ফৌজদারি মামলায় বিশেষজ্ঞ এ আইনজীবী মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালের আইনে এসব অপরাধের বিচার সম্ভব। শুধুমাত্র কিছু হত্যা মামলা দিয়ে এসব জঘন্য ঘটনার ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। এসব অপরাধের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে বিচারই যথাযথ। কারণ এ আইনে নির্দেশদাতা, সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি যাদের তাদের বিচারের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। তবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে আইনে কিছু সংশোধন আনতে হবে। কী ধরনের সংশোধন করতে হবে সে ব্যাপারে একাধিক পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, বিদেশি আইনজীবী আনার সুযোগ দিতে হবে। বিচার কার্যক্রম লাইভ সম্প্রচার করতে হবে। যাতে সারা দুনিয়া দেখতে পায় কী ধরনের বিচার হচ্ছে।

শিশির মনির বলেন, আমাদের ফৌজদারি আইনের মূল আইন হচ্ছে দণ্ডবিধি। দণ্ডবিধিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো কনসেপ্ট নেই। বাকি আইনগুলোতেও এ ধরনের অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা নেই। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে যেসব অপরাধের বিচারের বিধান রয়েছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধ। প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালগুলোর রায়ে একটি বিষয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধ হতে হলে অপরাধ ব্যাপক বিস্তৃত এবং পদ্ধতিগতভাবে হয়েছে এটা দেখাতে হবে। এরপর যদি দেখানো যায় এখানে মার্ডার হয়েছে কিংবা টর্চার হয়েছে, কিংবা এখানে অপহরণ হয়েছে, ডিজাইন করে হয়েছে, একটা ঘটনা নয় শত শত ঘটনা হয়েছে, শত শত হত্যা হয়েছে, রাষ্ট্রের বাহিনী করেছে, রাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, কোন দলের লোক করেছে তাহলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী সেটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। বাংলাদেশে যেটা হয়েছে পুলিশ গুলি করেছে, হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়েছে, বিভিন্ন রিপোর্টে আমরা দেখছি যারা নিহত হয়েছেন তারা গুলিতে নিহত হয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে গুম, খুন সংঘটিত হয়েছে এসবকে আমি মানবতাবিরোধী অপরাধ মনে করি। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্টের ৩ ধারার ২ এর ১ উপধারায় এসব অপরাধের বিচার করা সম্ভব। এ আইনে বলা আছে, আইন কার্যকর হওয়ার আগের এবং পরের অপরাধের বিচার করা যাবে। সে হিসেবেও জুলাই এবং আগস্টে সংঘটিত অপরাধের বিচার এ আইনে করা সম্ভব।

এ আইনের আওতায় কারা কারা আসবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যিনি সরাসরি গুলি করেননি, নির্দেশ দিয়েছেন কিংবা দূর থেকে বসে মনিটরিং করেছেন কিংবা কমান্ড দিয়েছেন তাকেও এ আইনের অধীনে আনা যাবে। ফিল্ডে যদি কেউ অংশ নেন তার সাজার কথা আইনে আছে। পাশাপাশি যিনি আদেশ দিয়েছেন, সুপিরিয়র অফিসার ছিলেন, সুপিরিয়র অফিসারের পদে থেকে অর্ডার দিয়েছেন, অথবা পারমিট করেছেন কিংবা মৌন সম্মতি দিয়েছেন তারাও এ আইনের অধীনে সংজ্ঞার মধ্যে পড়বেন। ফিল্ড লেভেলে যে পুলিশ সদস্য গুলি করেছেন তাকে আদেশ দিলো কে? এটা যদি লিংক খোঁজা হয় তাহলে যেতে যেতে ডিএমপি কমিশনার, তার উপরে আইজিপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তখন কমান্ড, কন্ট্রোল, সুপিরিয়র অফিসার, সুপিরিয়র কমান্ড এগুলো হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবেই সঠিক বিচার হবে। এটা না করে যদি একেক জায়গায় একেকটা মামলা হয় তাহলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধের বিচার হবে না। শুধু খুনের বিচার হবে।

সরকার প্রধানকে কি এ আইনের অধীনে বিচারের আওতায় আনা যাবে- এ প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির বলেন, হাইয়েস্ট কমান্ডের সোর্স কি? একজন রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের কমান্ড দেয়ার কতোগুলো মেকানিজম আছে। তার এ মেকানিজমগুলো কোর্টে যদি এভিডেন্স আকারে আসে তাহলে সর্বোচ্চ কমান্ডে যিনি ছিলেন তাকেও বিচারের আওতায় আনা যাবে, তিনিও অপরাধে দায়ী থাকবেন। আন্তর্জাতিকভাবে এমনও ডিসিশন আছে যে, তিনি করতে বলেননি কিন্তু তার অধীনস্থদের বিরত রাখেননি। এই যে বিরত রাখেননি সেটিও অপরাধ।

তবে আইনটি বর্তমানে যেভাবে আছে সেভাবে বিচার হলে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে বলে মনে করেন এই আইনজীবী। তিনি বলেন, বর্তমানে আইনটি যেভাবে আছে এভাবে বিচার করা হলে যার বিচারই করা হোক না কেন সেটি দেশে এবং আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়বে। কারণ এ আইনের মধ্যে কয়েকটি মৌলিক গলদ রয়েছে। এ গলদগুলো সংশোধন প্রয়োজন। আপনি যারই বিচার করেন না কেন আসামির যে অধিকার সে অধিকার তাকে দিতে হবে। আসামির অধিকার নিশ্চিত না করে আপনি হাত-পা  বেঁধে কারও বিচার করলে সে বিচার গ্রহণযোগ্য হবে না। এটা দেশেও গ্রহণযোগ্য হবে না, বিদেশেও গ্রহণযোগ্য হবে না।

তিনি বলেন, এ আইনে একটি বিধান আছে যে, সাক্ষ্য আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে না। সাক্ষ্য আইন যদি প্রযোজ্য না হয় তাহলে সাক্ষ্য-প্রমাণ কীভাবে হবে, জেরা কী করে হবে, যে সাক্ষীকে রাষ্ট্রপক্ষ হাজির করবে তাকে ক্রস এক্সামিনেশন কী করে হবে। সাক্ষ্য আইনকে বাদ দিয়ে কেউ যদি নিজেদের মতো করে সাক্ষ্যের রুলস করে বিচার করে, যেটা আগে করা হয়েছে সেটা তো গ্রহণযোগ্য হবে না। যেমন এ আইনে বলা আছে, একজন ব্যক্তি যদি পুলিশের কাছে একটি স্টেটমেন্ট দেয়, পরে যদি কোর্টে হাজির না হয়, তারপরও তার সেই জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হবে। এটা পৃথিবীর কোন স্ট্যান্ডার্ডেই গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রহণযোগ্য ম্যাকানিজম হলো যেটা সে পুলিশের কাছে বলবে তাই আদালতে এসে বলবে, তাকে ক্রস এক্সামিনেশন করা হবে, তারপরই কেবল তা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হবে। কিন্তু অতীতে কী হয়েছে, মাওলানা সাঈদীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, সাক্ষীরা পুলিশের কাছে স্টেটমেন্ট দিয়েছে কিন্তু আদালতে আসেনি তা আদালত জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে এটা হাস্যকর বিচার হয়ে গেছে। কারণ সাক্ষী তো আসেনি, তাকে তো ক্রসচেক করা যায়নি। সুতরাং এ বিধান পরিবর্তন করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের কিছু রুলস অফ এভিডেন্সেস আছে। এ রুলস অফ এভিডেন্সের যতগুলো সুযোগ আছে তার সবগুলো এখানে প্রযোজ্য করে দেয়া উচিত। যাতে স্বাধীনভাবে একজন ব্যক্তির এভিডেন্স উপস্থাপনের সবধরনের সুযোগ থাকে। এখানে আরেকটা বিধান আছে পত্রিকার রিপোর্ট, ফটোগ্রাফস, ম্যাগাজিন, ফিল্ম এভিডেন্স হবে। কিন্তু এটি এভিডেন্সের সর্বজনীন বিধান নয়। আন্তর্জাতিকভাবে বর্তমানে ডিজিটাল এভিডেন্সের বিধান চালু হয়েছে যেটায় বলা হচ্ছে ভিডিওর সোর্স প্রকাশ করতে হবে, কনটেন্ট সম্পর্কে ক্রস এক্সামিনেশন করতে হবে, বিশেষজ্ঞ মতামত নিতে হবে।

বিদেশি আইনজীবী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদেশি আইনজীবী আনতে গেলে এখন বার কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হয়। এটি উচিত নয়। কেউ যদি বিদেশি আইনজীবী আনতে চান তাকে তার সুযোগ দিতে হবে। অতীতে আমরা দেখেছি বিদেশি আইনজীবী আনার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের অনুমোদন দেয়া হয়নি। এটা সারা দুনিয়াতেই সমালোচনা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রসঙ্গে শিশির মনির বলেন, আমাদের অন্য আইনে ডেথ পেনাল্টি আছে। সুতরাং এ আইনেও ডেথ পেনাল্টি থাকতে পারে।
তিনি বলেন, এসব সংশোধন আনার পর যথাযথ তদন্তে সক্ষম তদন্ত সংস্থা নিয়োগ দিতে হবে। যোগ্য আইনজীবী নিয়োগ দিতে হবে। যারা আইনের যথাযথ আলোচনা করতে পারেন। একইসঙ্গে এই বিচারের লাইভ সম্প্রচার করা উচিত। যেন সারা পৃথিবীর মানুষ এ বিচার দেখতে পায়। অতীতে আমরা এ ব্যাপারে বলেছি কিন্তু ভ্রূক্ষেপ করা হয়নি। আইসিসিতে যে বিচার হয় আমরা দেখছি লাইভ সম্প্রচার করা হয়।

শিশির মনির বলেন, সব জড়তার ঊর্ধ্বে উঠে সত্যিকারের বিচার হলে মানবতার বিরুদ্ধে যে অপরাধ হয়েছে তার প্রতি জাস্টিস হবে। সবাই দেখেছেন হাজার হাজার লোককে হত্যা করা হয়েছে, হাজার হাজার লোক আহত হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন। এই অপরাধের বিচার কি সাধারণ আদালতে সম্ভব? সম্ভব নয়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট এখন যেভাবে আছে সেভাবে সম্ভব? সম্ভব নয়। এ আইনের মান ঠিক করে যদি বিচার করা হয় তাহলে এ বিচার দেশে এবং বিদেশে শত বছর দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।  কিন্তু তাড়াহুড়া করে আইন সংশোধন না করে যদি বিচার শুরু হয় বা চলে একসময় তা নিয়ে মারাত্মক সমালোচনা হবে। তিনি বলেন, অপরাধী যেন পার না পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে আসামির অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। এটাই আইন ও ধর্মের কথা।

Friday, August 23, 2024

দাবি-দাওয়া পার্টির অপতৎপরতা by সাজেদুল হক

মধ্য জুলাইয়ে শুরু। এখনো ঠিকমতো ঘুম হয় না। এমন সময় তো আসলে আগে কখনো যায়নি। এরইমধ্যে হানা দিয়েছে ভয়াবহ বন্যা। কুমিল্লায় আমার স্বজনরাও কঠিন পরিস্থিতিতে। অন্য অনেক এলাকার অবস্থাও তাই। ফেনীর পরিস্থিতি তো রীতিমতো ভয়ঙ্কর। কিছু খবর পাচ্ছি, কিছু পাচ্ছি না। একধরনের হিমশীতল আতঙ্কের মধ্যে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছি। এসময়ও একদল সুযোগ সন্ধানী তৎপর। গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের পতনের পর থেকে তারা সামনে আসতে থাকে।

দাবি-দাওয়া পার্টির আবদারের যেন শেষ নেই। প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন, সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর স্থানে তারা প্রতিদিনই হাজির হচ্ছে। ধরনা দিচ্ছে, রাস্তাঘাট বন্ধ করছে। এমনকি প্রধান উপদেষ্টার চলাচলেও বিঘ্ন তৈরি করছে। উদার-গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সুযোগ নিয়ে এরা যেন রাষ্ট্রকেই অচল করার চেষ্টা করছে। গতকাল বন্যার এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতেও এদের বিভিন্ন গ্রুপের তৎপরতা থামেনি। তারা এদিনও সচিবালয়ের সামনেসহ বিভিন্ন স্থানে অংশ নেয়। সড়কে যান চলাচল ব্যাহত করে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের একটি অতিক্রম করছে। এ সময়ে ভয়াবহ বন্যা তৈরি করেছে নাজুক পরিস্থিতি। এই অবস্থায় যেসব সুযোগ সন্ধানী গ্রুপ অপতৎপরতা চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আগেও এক কলামে লিখেছি, রাষ্ট্রকে কখনো কখনো কঠিন হতে হয়।

নতুন বাংলাদেশ কেমন হবে? এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে তৈরি হয়েছে আশাবাদ। আরেক দিকে হতাশাও রয়েছে। দখল-পুনর্দখলের পুরনো খেলা চলছে কোথাও কোথাও। পরিবহন খাতে হাতবদলের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এরইমধ্যে প্রশাসন এবং পুলিশের একটি অংশে এখনো একধরনের শৈথিল্য দেখা যায়। তাদের নাম দেয়া যায় ‘মন খারাপ পার্টি’। কেউ কেউ হয়তো চিন্তা করছে, উপরি আয় যদি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়, তবে তারা কীভাবে চলবেন?

এ দুই পার্টির বাইরে আরেকটি পার্টি তৎপর। তাদের বলা যায়-‘আগেই ভালো ছিল পার্টি।’ এরইমধ্যে দৈনিক প্রথম আলো’তে হাসান আল মাহমুদ একটি ইন্টারেস্টিং নিবন্ধ লিখেছেন। সেখান থেকে ধার করে নিজের মতো করে বলি। এটা বিশেষত গল্প কিংবা সিনেমায় দেখা যায়। এক নারীকে কেউ অপহরণ করলেন। দীর্ঘদিন আটকে রেখে নানা নির্যাতন করলেন। একসময় ওই নারী অপহরণকারীর প্রেমে পড়ে যায়। স্বৈরশাসকদের বেলাতেও কখনো কখনো এমন ঘটে। যেমন হাসান আল মাহমুদ সে নিবন্ধে লিখেছেন, ‘স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় প্রকৃতার্থে নাগরিকদের অবস্থা পণবন্দির মতোই হয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে স্বৈরশাসকের প্রতি নাগরিকদের একটা অংশের মধ্যে অন্ধ  মোহ তৈরি হয় এবং যত খারাপ পদক্ষেপই  স্বৈরশাসক নিক না কেন, অনেকে সেটিকে কল্যাণকর মনে করেন। একনায়কের পতনের পর এই উপসর্গে আক্রান্ত ব্যক্তিরা একধরনের হাহাকার ও কাতরতা অনুভব করেন।’ এই মানুষরা হয়তো মুক্তির আনন্দ কী তা বুঝেন না। মুক্তির আনন্দ বুঝাতে সাংবাদিক আকবর হোসেনের একটি লেখা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকার রাস্তায় আমি হাঁটি আর মুগ্ধ হই। বড় রাস্তার পাশে, অলিগলিতে- এত সুন্দর গ্রাফিতি। ছোট  ছোট ছেলেমেয়েরা এত সৃজনশীল সেটা জানা ছিল না। দেশ ও সমাজ নিয়ে তাদের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ। কথা বলতে গেলে আরও মুগ্ধ হই। আসলে মানুষের জীবনে মুক্তি না আসলে সৃজনশীলতাও আসে না। বাবা-মা বাধা দিচ্ছে না, কেউ তাদের কিছু বলছে না। আমার জীবনে এই প্রথম দেখলাম বাংলাদেশকে ওউন করছে অনেকে। সবাই বলছে, বাংলাদেশ আমার। ‘মুক্তি’ কী জিনিস সেটা ‘মুক্ত’ না হলে বোঝা যায় না।’

Wednesday, August 21, 2024

আহনাফদের রক্তে নবযাত্রা, ব্যর্থতার সুযোগ নেই by সাজেদুল হক

পুরনো মানচিত্র। নতুন ছবি। দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি। বহুত্ববাদ আর সাম্যের গান। মুক্তির আনন্দ, হারানোর হাহাকার। নতুন শুরুর স্বপ্ন। যেন ঠিক মুক্তিযুদ্ধের পরের দিনগুলোর গল্প। আমার মতো অনেকের ট্রমা অবশ্য এখনো কাটেনি। ক’দিন ধরেই লেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না।

রোববারের কথাই যেমন বলি। মাথায় পুরো লেখা গুছিয়ে এনেছি। এমন সময় হানা দিলো একটি ছবি। বিএএফ শাহীন কলেজের কক্ষ। পরীক্ষা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। একটি টেবিলে কিছু ফুল। কাগজে লেখা- শাফিক উদ্দিন আহমেদ আহনাফ। এখানে ১৭ বছরের এই তরুণের থাকার কথা ছিল। কিন্তু থাকতে পারেনি। ৪ঠা আগস্ট মিরপুর-১০ নাম্বারে গুলিতে নিহত হয় আহনাফ। তার মতো এমন অনেকেই আর শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি। তারা আর কোনো দিন পারবেনও না। তাদের সংখ্যা কতো আমরা নিশ্চিত করে জানি না। এই শহীদদের ছবি দেখে, এদের গল্প পড়ে ঠিক থাকা যায় না। কিংবা সে ছবিটার কথা। একটি ছেলের গুলিবিদ্ধ হাত কেটে ফেলতে হয়েছে। কিন্তু তার চোখে-মুখে হাসি। বলছে, ‘লাগলে আবার যামু। দরকার হলে আরেকটা হাত হারামু।’ চোখের পানিতে লেখা এগোতে চায় না।

১৫ই জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট। অপরিসীম আত্মত্যাগের এক ইতিহাস তৈরি করেছে বাংলার তরুণেরা। মুক্তিযুদ্ধের পর যা আগে কখনো ঘটেনি। ছাত্র-জনতার বলিদান একদিকে তৈরি করেছে বেদনার পাহাড়। অন্যদিকে, নতুন এক দেশের স্বপ্ন। এমনই এক পটভূমিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুরুতে তিনি রাজি ছিলেন না। শিক্ষার্থীদের বারবার অনুরোধে সায় দেন। শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্যও তৈরি হয়েছে। কোনো দল বা ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ব্যাপারে আপত্তি জানানো হয়নি।

এটা সারা দুনিয়াতেই ঘটেছে। বিপ্লবের পর এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি আর অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধান উপদেষ্টা ভিনদেশি কূটনীতিকদের কাছে দেয়া বক্তব্যে তার সরকারের অবস্থান পুরোপুরি স্পষ্ট করেছেন। শেখ হাসিনার স্বৈরশাসন যে সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছে সেটা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, সংস্কারের পর একটি অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কিছু সুপারিশ রাখতে চাই সব মহলের প্রতি।

আগেই বলেছি, অপরিসীম ত্যাগ আর তিতিক্ষার বিনিময়ে নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন তৈরি হয়েছে। কতো ছাত্র-জনতা এ সংগ্রামে নিহত হয়েছেন তার সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। সদ্য সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। শহীদদের একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রণয়নে সরকারকে কাজ করতে হবে। তাদের পরিবারকে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ আন্দোলনে অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। বহু মানুষ চোখ হারিয়েছেন। আহতদের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে। অবশ্য  এরইমধ্যে এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

রাষ্ট্র পরিচালনায় কখনো কখনো হয়তো কিছুটা কঠোরতারও প্রয়োজন হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পটভূমিতে কেউ কেউ সুযোগ নেয়ার চেষ্টাও করছেন, বিশেষত সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা। কারিগরি ত্রুটি না থাকলেও কর্মচারীদের ধর্মঘটের কারণে মেট্রোরেল এ লেখার সময় পর্যন্ত চালু করা যায়নি। এমন অনেকেই দাবি-দাওয়া নিয়ে হাজির হচ্ছেন। এসব ক্ষেত্রে যৌক্তিক হলে মেনে নেয়া এবং অযৌক্তিক হলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

সরকারের এখন প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরানো। অর্থ, পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে দেশসেরা মানুষরা কাজ শুরু করেছেন। যদিও তারা অর্থনীতিকে খুবই বাজে অবস্থায় পেয়েছেন। ব্যাংকগুলো ভেঙে পড়েছে। এস আলম গ্রুপ একাই প্রায় পুরো ব্যাংক খাত খেয়ে ফেলেছে। এ গ্রুপ তাদের নিয়ন্ত্রিত ছয়টি ব্যাংক থেকেই ৯৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এরসঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এটিও খেয়াল রাখতে হবে নতুন কোনো এস আলমের যেন জন্ম না হয়। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এরইমধ্যে কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর  পদক্ষেপ নিতে হবে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ফেরাতে হবে। পুলিশে দুর্নীতি যেন কিছুতেই না ফেরে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমান সরকারের প্রধানতম ম্যান্ডেট হচ্ছে জুলাই-আগস্ট হত্যাসহ গুম-খুনে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা। সরকারকে সে কাজ করতে হবে আইনের যথাযথ অনুসরণে। জুলাইয়ে কী হয়েছে তা একেবারেই স্পষ্ট। ভিডিও প্রমাণ করে কীভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সমালোচিত বা বিতর্কিত আইনে বিচারের ক্ষেত্রে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন করাই উত্তম। যেন কেউ বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে। গণহারে মামলা না করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা হওয়া উচিত। জুলাই-আগস্ট হত্যা, গুমে যারা স্ট্রাকচারে জড়িত ছিলেন তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবে বন্দিদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। গল্প না সাজিয়ে সত্য তথ্য প্রচার করতে হবে। অভিযুক্তরা যেন আইনজীবী নিয়োগসহ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান তা নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যে তার কিছু ব্যত্যয় ঘটেছে।

প্রধান উপদেষ্টা নিজেও বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। স্বৈরশাসন কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। বিশেষত নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার করতে হবে। এক্ষেত্রে সৎ ও দক্ষ বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে। এমন ব্যবস্থা উদ্ভাবন করতে হবে যাতে অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের পথ কেউ বন্ধ না করতে পারে। বিচারবিভাগে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের স্থান দিতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকর করতে হবে।

ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। শুধু অতীতের দুর্নীতির বিচার করলেই চলবে না। এখনো কারও বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে বিশেষ ব্যবস্থায় দ্রুত বিচার করতে হবে। আশার কথা হচ্ছে, রাস্তায় কাউকে ঘুষ নিতে দেখা যাচ্ছে না। প্রধান উপদেষ্টা মিডিয়াতেও সংস্কারের কথা বলেছেন। এটি কীভাবে সম্ভব সে ব্যাপারে তিনি নিরপেক্ষ, সৎ সাংবাদিকদের পরামর্শ নিতে পারেন। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। এতে বাধা দেয়া কালাকানুন বাতিল করতে হবে। মুক্ত সাংবাদিকতার বিকল্প কিছু নেই। সাংবাদিকরা যেন নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন তার গ্যারান্টি দিতে হবে।

আন্দোলনে সব শ্রেণি-পেশার মানুষই যোগ দিয়েছে। কিন্তু এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সমন্বয়করা এ আন্দোলনের মুখ। ইতিমধ্যে তারা ইতিহাস তৈরি করেছেন। তবে বিপ্লব শেষ হয়ে যায়নি। বিপ্লব পূর্ণ করার জন্য তাদের সামনে আরও অনেক পথ রয়ে গেছে। তাদের বিরুদ্ধেও যদি কোনো অভিযোগ আসে তাদের তা শুনতে হবে। অভিযোগের সুরাহা করতে হবে দ্রুত।

এমন কিছু ঘটনা ঘটছে যা ঘটা উচিত হয়নি।  যেমন: সমন্বয়করাই এটা নিশ্চিত করেছেন যে, কারও মোবাইল চেক করা, ব্যাগ চেক করার অধিকার অন্যদের নেই। আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন, বই পোড়ানোর মাঝে, ভাঙচুরের মাঝে কল্যাণ নেই। প্রয়োজন নতুন সৃষ্টির।
রাজনীতিবিদের বুঝতে হবে, তরুণরা কী চায়। নিজ নিজ দলে সংস্কার আনতে হবে তাদের। দলের নামে যারা অপরাধে জড়িয়েছে, জড়াচ্ছে তাদের বাদ দিতে হবে।

শেষ কথা: এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর নবযাত্রা শুরু করেছে দেশ। এই যাত্রায় ব্যর্থতার কোনো সুযোগ নেই। নতুন দেশ, নতুন রাষ্ট্রের বিনির্মাণ চান সবাই। বিপ্লব যেন আর কোনো দিন বেহাত না হয়। শহীদের রক্ত যেন বৃথা না যায়। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার হোক নয়া বাংলাদেশের ভিত্তি।

Friday, August 16, 2024

সংকটের অন্যতম স্থপতি by সাজেদুল হক

কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক। কথা বলেন সুন্দর। চলাফেরা স্মার্ট।  কিন্তু অভিযোগের আঙ্গুল তার দিকে। বলা হয়, গত এক দশকে বাংলাদেশে যে সংকট তার অন্যতম প্রধান স্থপতি প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। তার একটি রায়ের কারণেই ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা। অবশ্য এর

পুরস্কারও পেয়েছেন। দীর্ঘদিন ছিলেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে। আগস্ট ঝড়ে সে পদ অবশ্য হারিয়েছেন। পদত্যাগ করেছেন তিনি। তবে খায়রুল হককে নিয়ে আলোচনা থামছে না। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবসরে যাওয়ার ১৬ মাস পর রায় পরিবর্তন শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ।
ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার শুনানি চলছে। বিভক্ত বাংলাদেশি সমাজের শীর্ষ সব আইনজীবী একটি প্রশ্নে একমত পোষণ করলেন। এমনকি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিশেষ ব্যবস্থা বহাল রাখার পরামর্শ দিলেন তারা। এমনকি শুনানির সময় প্রয়াত সিনিয়র আইনজীবী টিএইচ খান চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন। বললেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলে দেশে বিপর্যয় তৈরি হবে, গৃহযুদ্ধ লেগে যাবে। কিন্তু তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল তাতে রা করলেন না। বিভক্ত রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে গেল। যেখানে তিনি মুখ্য ভূমিকা রাখলেন। তবে এখানেই থেমে থাকলেন না খায়রুল হক। ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলায় প্রকাশ্যে আদালতে ঘোষিত রায়ে সুপ্রিম কোর্ট দুই মেয়াদ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পথ খোলা রেখেছিল। কিন্তু প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ১৬ মাস পর যে রায় প্রকাশ করলেন সেখানে তিনি এ অংশটি রাখেননি। আপিল বিভাগের দুই জন বিচারপতি এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। দৃশ্যত আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তই অনুসরণ করেছিলেন খায়রুল হক।
বিচারপতি খায়রুল হকের এ রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে এক আলোচনা সভায় এ নিয়ে কথা বলেন তিনি। যদিও বিচারপতি খায়রুল হকের নাম মুখে নেননি। বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বলেছিলেন, আমি মনে করি না অবসরের পর রায়  লেখা বেআইনি। পদ্ধতিগত কারণে আপিল বিভাগের রায়ে দেরি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে সেটা  যৌক্তিক সময়, যেমন এক মাসের মধ্যে হতে পারে। কিছুতেই এক-দেড় বছর হতে পারে না। আর অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদেশের অংশ কোনোভাবেই পরিবর্তন করা যাবে না। সেটা করতে  গেলে পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন ও শুনানি হতে হবে। কিন্তু তা না করেই যদি রাতের অন্ধকারে, এক-দেড় বছর পর রায় পরিবর্তন করে ফেলেন, তাহলে  সেটা  ফৌজদারি অপরাধ।

মাহমুদুল আমীন চৌধুরীর এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী। গতকাল তিনি মানবজমিনকে বলেন, রায়ে এ ধরনের পরিবর্তন ফৌজদারি অপরাধ।  অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির এ প্রসঙ্গে বলেন, বিচারকদের ওপর অর্পিত দায়িত্বের মূল হলো আস্থা ও বিশ্বাস। ঘোষিত রায় পরিবর্তন করা ফৌজদারি অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ। এটা দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একইসঙ্গে এটি বিচারকদের আচরণবিধিরও লঙ্ঘন।

বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের এ রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দেয়া হয়। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা গেছে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর প্রথম নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। সেসময় সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি হয় এবং সম্পদ বিনষ্ট হয়। একতরফা নির্বাচনের পরও আওয়ামী লীগ পাঁচ বছর ক্ষমতায় থেকে যায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ নিয়েছিল। তবে সে নির্বাচন রাতের ভোট নামে পরিচিতি পায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনও বিরোধী দলগুলো বর্জন করে।

ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায় ছাড়াও একাধিক রায়, বক্তব্য, বিবৃতিতে বিচারপতি খায়রুল হকের রাজনৈতিক মতাদর্শ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে যা কখনো দেখা যায়নি। প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পরও অবশ্য তাকে পুরস্কৃত করা হয়। তাকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বানানো হয়। সেখানেও তিনি পুরোদমে সরকারের প্রতি আনুগত্য বহাল রাখেন।

মাহবুব তালুকদারের বইয়ে খায়রুল হক সম্পর্কে যা বলা হয়েছে: প্রয়াত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তার ‘নির্বাচননামা: নির্বাচন কমিশনে আমার দিনগুলো’ বইতে বিচারপতি খায়রুল হক সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি লিখেন, বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাজনীতির স্থপতি একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তি- সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। আমি তাকে অরাজনৈতিক ব্যক্তি বললেও মূলত তিনি পর্দার অন্তরাল থেকে দলীয় রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে দাবার চাল দিয়েছেন। প্রধান বিচারপতির আসনে থেকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য যে ঘটনাটি ঘটান, তার নাম সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত রায়। এই রায়ের ফলে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাদ দেয়া হয়। তিনি আরও লিখেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বিচার বিভাগ। গণতান্ত্রিক  দেশে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে অনেক যৌক্তিকতা প্রদর্শন করা যেতে পারে। কিন্তু এই ব্যবস্থার স্থলাভিষিক্ত করার জন্য যে নতুন আইনি কাঠামোর প্রয়োজন ছিল, বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ে তা অনুপস্থিত।

Saturday, August 10, 2024

হাসিনা হাতের রেখা পড়তে পারেননি by সাজেদুল হক

১৪ই জুলাই, ২০২৪। বিকালে গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন শেখ হাসিনা। অবশ্য নামেই সংবাদ সম্মেলন। এটা ছিল এক নতুন ট্রেন্ড। শাড়ি থেকে কবিতা কোনোকিছুই বাদ যেতো না। সাংবাদিকের নামে হাজির থাকতেন স্তাবকেরা। প্রশ্নের নামে চলতো দীর্ঘ বক্তৃতা। এমনই এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কটাক্ষ করেন শেখ হাসিনা। বলেন, ‘মানে কি? মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা মেধাবী না, যত রাজাকারের বাচ্চা, নাতিপুতিরা মেধাবী।’ তার এ মন্তব্যের প্রতিবাদে রাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৫ বছরের শাসনামলে প্রথম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন তিনি। ১৪ই জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট। কীভাবে সবকিছু তছনছ হয়ে গেল। ইতিহাসে কখনো কখনো এমন হয়। কয়েকটি দিনে এমন সব ঘটনা ঘটে যা একশ’ বছরেও ঘটে না।

শুরুতে অনুসরণ করা হলো পুরনো রীতি। ছাত্রলীগ নামিয়ে দাও। ঠেঙ্গাও। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রকাশ্যেই শাসালেন। ঢাকা শহরের সব মাস্তান জড়ো করা হলো ক্যাম্পাসে। ছাত্রীদেরও পেটালেন তারা। এরপর নামানো হলো পুলিশ-বিজিবি-র‌্যাব। রক্তে রঞ্জিত রাজপথ। আবু সাঈদের ঝাঁঝরা বুক যেন বাংলাদেশের হৃদয়। কী অসীম সাহসের সঙ্গে বুক পেতে দিয়েছিল এক তরুণ। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। অনেকে অবশ্য বলেন, আবু সাঈদের বিশ্বাস হচ্ছিল না! স্বাধীন দেশের পুলিশ নিরস্ত্র কোনো যুবকের বুকে এভাবে গুলি চালাতে পারে। তারপর প্রতিটি দিনই ছিল রক্তাক্ত। লাশের কাউন্ট ডাউন করতে গিয়ে নিউজরুমে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ি। বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনো এমন ঘটনা ঘটেনি। কবরে অজ্ঞাত লাশের সারি। কতো মানুষ মারা গেলেন তার সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। কয়েকশ’ মানুষ নিহত হয়েছেন এই নৃশংসতায়। যার বড় অংশই তরুণ। অন্তত ৩২ শিশু নিহতের খবর দিয়েছে ইউনিসেফ। এই নির্মম, নিষ্ঠুরতা অবশ্য মানুষ মেনে নেয়নি। তারা গুলির মুখেও রাস্তায় নেমেছে। এটা অনেককেই বিস্মিত, হতবাক করেছে। এই সাহসের উৎস কোথায় তা অজানা! এই লেখক খেয়াল করেছেন, রোববার দুপুরে তার অফিসের পাশের রাস্তাতেই কয়েক ঘণ্টা সংঘর্ষ চলে। যেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগ নির্বিচারে গুলি চালায় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে। তারা মারা যায়। কিন্তু পিছু হটে না। পরবর্তী কয়েকঘণ্টা ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের নেতারা সবাইকে ঢাকায় চলে আসার ডাক দেন। পরদিন মূল কর্মসূচি ছিল গণভবন ঘেরাও। তবে এরইমধ্যে পর্দার আড়ালে বেশকিছু ঘটনা ঘটে। আন্দোলনকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নেয় সেনাবাহিনী। অন্যদিকে, খবর বেরিয়েছে সার্বিক পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন দিল্লিকে জানিয়ে দেয়, শেখ হাসিনার সময় শেষ হয়ে গেছে। এরপর কী ঘটেছে তা সবারই জানা। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। আমেরিকা তার ভিসা বাতিল করেছে। বৃটেন তাকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় শুরুতে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা আর রাজনীতি করবেন না। এখন অবশ্য বলছেন, নির্বাচনের ঘোষণা দিলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী পালিয়ে যাওয়ার পর দলটি তার ইতিহাসে সবচেয়ে বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। সাবেক মন্ত্রী, শীর্ষ নেতারা কেউ বিদেশ চলে গেছেন, বাকিরা আত্মগোপনে আছেন। কেন এই পরিণতি? এর প্রধান কারণ জনগণের ক্ষমতাকে তুচ্ছ করা, গণতন্ত্রকে বিদায় করা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একটি বিয়োগান্তক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন শেখ হাসিনা। গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করেন তিনি। ভোট ও ভাতের অধিকারের জন্য তার নেতৃত্বে লড়াই করে আওয়ামী লীগ। এরশাদের পতনের পর অনেকেই তাকে ক্ষমতায় দেখছিলেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে বিএনপি সে নির্বাচনে জয়ী হয়। এরপরও রাজনীতির মাঠে লড়ে যান তিনি। একটি সহিংসতাপূর্ণ আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তার শাসনামলের অনেকেই প্রশংসা করেন। নানা ঘটনা পেরিয়ে ২০০৯ সালে তিনি বিপুল সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেন। বিশেষত তরুণ সমাজ তার প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন জানায়। তবে মানুষের আশা ভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগেনি। সময় যত গড়িয়েছে দলের ভেতরে এবং দেশে তিনি নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। দলের সিনিয়র নেতাদের করেছেন কোণঠাসা। ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনের পথে হেঁটেছেন। বিরোধী নেতাকর্মীদের দিয়ে পূর্ণ করেন জেল। হত্যা, গুম, খুনের শিকার হন বহু মানুষ। প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ নিজের কব্জায় নেন। ভোটারবিহীন নির্বাচনের পরও টিকে যাওয়া তাকে আরও একনায়কতন্ত্রের পথে নিয়ে যায়। বিরোধীদের সব আন্দোলনই তিনি কঠোরভাবে দমন করেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতামতকে অগ্রাহ্য করেন। ২০১৮ সালে বিরোধীরা নির্বাচনে অংশ নিলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভোট হয়ে যায় রাতেই। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো বারবারই আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু দমনপীড়নের মুখে শেষ পর্যন্ত তারা টিকতে পারেনি। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা এসব আন্দোলন নিয়ে উপহাসও করতেন প্রায়ই। ২০২৪ সালেও আওয়ামী লীগ আরেকটি একতরফা নির্বাচন করে ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের নির্বাচনের বিরোধিতা করে আসছিল। তবে নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। অনেকেই ধারণা করতে থাকেন, আবারো হয়তো পাঁচ বছরের জন্য টিকে গেল সরকার।

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশে বেশকিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। পদ্মা সেতু এবং মেট্রোরেল এরমধ্যে অন্যতম প্রধান। এগুলো দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিরও একধরনের স্মারক। তবে একইসঙ্গে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে বহুগুণ। যা ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তার। অন্যদিকে, এ সময়ে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। নির্বাচনের নামে হয়েছে তামাশা। মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো ইস্যুতে বাংলাদেশের উল্টোযাত্রা দেখেছে সবাই। পবিত্র গ্রন্থে বারবার বলা হয়েছে, ‘তোমরা সীমা লঙ্ঘন করো না।’ বাংলাদেশে আমরা এর পরিণতি দেখতে পাচ্ছি। মধ্য জুলাইয়ে কবি ইমতিয়াজ মাহমুদ লিখেছিলেন, ‘লেখা আছে হাতের রেখায়। জাহাজ ডুববে অহমিকায়।’ বলা হচ্ছে, দেশ একটা নতুন যাত্রা শুরু করেছে। সামনের দিনগুলোতে কী হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনা কী আর কখনো বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন?

Thursday, November 21, 2019

জনগণ কেন শাস্তি পাবে? by সাজেদুল হক ও মোহাম্মদ ওমর ফারুক

উনাদের ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। কখনও কখনও বলা হয়েছে, তারা সরকারের ভেতর আরেক সরকার। কথা হয়েছে অনেক। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সেই পুরনো ভূমিকাতেই আবার দেখা  যাচ্ছে তাদের। শাজাহান খান। সরকারি দলের নেতা। সাবেক মন্ত্রী।
পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষ নেতা। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে গঠিত কমিটিরও প্রধান করা হয়েছিল তাকে। আরেকজন মশিউর রহমান রাঙ্গা। জাতীয় পার্টির মহাসচিব। বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ। কিন্তু তারও সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি পরিবহন মালিকদের সংগঠনের শীর্ষ নেতা।
সড়কে মৃত্যুর মিছিল চলছে অনেকদিন হলো। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। নেয়া হয়েছে নানা উদ্যেগ। কিন্তু এসব উদ্যোগ কার্যকরে সবসময়ই বাধা এসেছে শ্রমিক-মালিকদের পক্ষ থেকে। আর এক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন এই সংগঠন দুটির শীর্ষ নেতারা। বিশেষকরে শাজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গা সবসময়ই ছিলেন আলোচনায়। গত বছর দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে স্কুল শিক্ষার্থীরা। সেসময় শাজাহান খানের একটি হাসিখুশি ছবি ভাইরাল হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। যা শিক্ষার্থীদের আরও বিক্ষুদ্ধ করে তোলে। আন্দোলনের মুখেই সড়ক আইনে সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়। নতুন আইন সবেমাত্র কার্যকর শুরু হয়েছে। এ আইনে শাস্তির মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ নিয়ে সুযোগ রয়েছে আলোচনার। চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে আদালতেও।
সরকার সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী নেতা হিসেবে শাজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গার সুযোগ রয়েছে সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনার। কিন্তু সে পথে তারা হাটেননি। নেয়া হয়েছে সে পুরনো কৌশলই। অঘোষিত ধর্মঘটে জিম্মি করা হয়েছে জনগণকে। নিজেরা গাড়ি পরিচালনা না করেই শ্রমিকরা ক্ষ্যান্ত হননি। যারা রাস্তায় নেমেছেন তাদের নাজেহাল করা হয়েছে। মারধর আর লাঞ্চনার শিকার হয়েছেন গাড়ি নিয়ে বের হওয়া চালকরা। এতো রীতিমতো নৈরাজ্য। আর এ নৈরাজ্যের পেছনে ইন্দনদাতা হিসেবে দুই শীর্ষ শ্রমিক ও মালিক নেতার দিকেই আঙ্গুল তুলছেন সবাই। শাজাহান খান ও মশিউর রহমান রাঙ্গা স্পষ্টতই ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। বিবিসি বাংলাকে তারা জানিয়েছেন, তাদের দুটি সংগঠনের পক্ষ থেকে ধর্মঘট বা কর্মবিরতির কোন কর্মসূচি নেয়া হয়নি। কিন্তু তারা একইসঙ্গে এটাও জানিয়েছেন যে, শ্রমিকদের দাবিকে তারা সমর্থন করেন। সরকারের পক্ষ থেকে শুরুতে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও গতকাল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জনগণকে দুর্ভোগে না ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আপনারা জনগণকে শাস্তি দেবেন না। শাস্তির ভয়ে জনগণকে শাস্তি দেবেন না। জনগণকে দুর্ভোগে ফেলবেন না প্লিজ।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এবারই প্রথম নয়, প্রভাবশালী নেতাদের ইন্ধনে বারবার জনগণকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। যারা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত তারা থেকে যাচ্ছেন আইনের উর্ধ্বে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণ আর কতবার এ ধরনের শাস্তি পাবেন?
এটাতো ধর্মঘট না: শাজাহান খান
ধর্মঘট তো ডাকে নাই। ধর্মঘট হচ্ছে নোটিশ দিয়ে, টাইম দিয়ে আলোচনার দাবি জানিয়ে যেটা করে সেটাই হচ্ছে ধর্মঘট। আর এটা হচ্ছে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ সমাবেশ, বিক্ষিপ্তভাবে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমেছে। প্রচারের অভাব, অপপ্রচার প্রপাগান্ডাসহ এসমস্ত কারণেই এটা হয়েছে। মানবজমিনকে এসব কথা বলেন শাজাহান খান। ধর্মঘটে জনগণের ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ থেকে আমরা আরো বেশি ভোগান্তির শিকার। শাস্তি দিবে আমাদের লোকজনদের। তবে আমাদের ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে সমর্থনও করিনি, বিরোধিতাও করিনি। সমর্থন জানাইনি এই জন্য, ফেডারেশনের মিটিং ছাড়া তো আমি সমর্থন করতে পারি না। আমরা ফেডারেশনের পক্ষ থেকে মিটিং করে তারপর জানাবো। তবে বিরোধিতা না করারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কিছু ভুল ভ্রান্তি, ভুল ধারণাসহ আইনের কিছু অসঙ্গতি আছে এসব কারণে তাদের আমরা বিরোধিতাও করিনি।
তিনি পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন ,তাদের প্রচারণারওও কিছু ঘাটতি রয়েছে। তাদের লিফলেটগুলোতে দেখা যায়, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে যত কঠিন সাজাগুলো আছে সেগুলো তারা উপস্থাপন করেছে। এই আইনে ভালো দিকও তো আছে। সেগুলো কিন্তু  কোনো জায়গায় বলা হয়নি। পথচারীদের নিয়ে আইনে যে শাস্তির বিধান রয়েছে সেগুলোও কিন্তু বলা হয়নি। এটা শ্রমিকদের অস্তিত্বের প্রশ্ন, কোন আইনে তাদের যাবজ্জীবন হবে, কোন আইনে তাদের আরও বড় শাস্তি হবে সেটা নিয়ে তো তারা উদ্বিগ্ন হবেই। তাছাড়া এখনো শ্রমিকরা এসব বিষয় নিয়ে পরিষ্কার না। এ জন্যই তারা বিক্ষোভ করেছে। রাস্তায় তো তাদেরও চলতে হবে, এটা তাদের রুটিরুজির ব্যপার। আমাদের দুই দিন মিটিং হবে কাল (আজ) এবং পরশুদিন। মিটিংয়ে বসে তারপর সিদ্ধান্ত হবে এবং আমরা গণমাধ্যমে জানাবো। মিটিং চলাকালীন দুইদিন কি ধর্মঘট থাকবে এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন , বিষয়টি কালকে ( আজ) ঠিক হবে।
মানুষকে জিম্মি করে ধর্মঘট করবে এটা হতে পারে না: নাসিম
ওদিকে ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, দেশের মানুষেকে জিম্মি করে যারা পরিবহন ধর্মঘট করছে তাদের শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, দেশের জনগণকে যারা জিম্মি করছে, শক্ত হাতে তাদের মোকাবিলা করা হবে। ক্যাসিনোকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের যেমন কোনো ছাড় দেয়া হয়নি, তেমনি এদেরকেও ছাড় দেয়া হবে না। গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। পরিবহন শ্রমিক নেতা ও মালিকদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর এ সদস্য বলেন, কোনো ঘাতক চালক নিজের ইচ্ছেমতো কাউকে হত্যা করবে, এটা দেশের জনগণ মেনে নেবে না। তারা এখন সুযোগ বুঝে ধর্মঘট করছে। যারা দেশ ও দেশের মানুষকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলছে, তাদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সড়ক পরিবহন আইন হওয়ার আগে শ্রমিক ও মালিকের স্বার্থ রক্ষার জন্য অনেক আলোচনা করা হয়েছে। এরপর এক বছর পর্যালোচনায় রেখে এই আইন পাস করা হয়েছে। এখন জনগণকে জিম্মি করে ধর্মঘট করবে,এটা হতে পারে না। সংগঠনের কার্যনির্বাহী সভাপতি ফালগুনী হামিদের সভাপতিত্বে তথ্যপ্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।