Monday, February 17, 2014

বলিউড জগতে সবচেয়ে কঠোর মনের অধিকারিণী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া

বলিউড জগতে প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে সবচেয়ে কঠোর মনের অধিকারিণী হিসেবে আখ্যা দিলেন সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘গুণ্ডে’ ছবির পরিচালক আলি আব্বাস জাফর। এই পরিচালক বলেন, প্রিয়াঙ্কা মনের দিক থেকে বেশ শক্ত এবং এ যাবৎ কালে আমার দেখা সব থেকে কঠোর মনের অধিকারিণী তিনিই। প্রিয়াঙ্কার বাবা মারা যাওয়ার দশ দিন পর সে ‘গুণ্ডে’ ছবিটির গানে ক্যাবেরে নাচ করেন। তার এরকম প্রফেশনালিজম আমাকে মুগ্ধ করেছে।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার বাবা অশোক চোপড়া পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন। ২০১৩ সালের ১০ জুন তিনি মারা যান। জাফর বলেন, ব্যক্তিগত সমস্যা কখনই প্রিয়াঙ্কার কাজে প্রভাব ফেলে না। গানটিতে তার পারফর্মেন্স দেখলে আপনি ঘুণাক্ষরেও তের পাবেন না যে কতটুকু কষ্টের মধ্যে দিয়ে গেছেন এই তারকা। কাজের ব্যাপারে অত্যন্ত প্রফেশনাল প্রিয়াঙ্কা।

সাত মাসেই ৩৬৪ বই পড়া শেষ শিশুটির!

নিজের পড়া কিছু বইয়ের সঙ্গে ফেইথ জ্যাকসন
নয় বছর বয়সী মেয়েটির নাম ফেইথ জ্যাকসন। সমবয়সী অন্যদের মতো সে টেলিভিশন বা কম্পিউটার গেমসে মোটেই আসক্ত নয়। বইয়ের পাতায় লুকানো স্বপ্নরাজ্যে মগ্ন থাকাই বেশি পছন্দ তার। পড়ার প্রতি ভালোবাসা রীতিমতো প্রমাণ করে দেখিয়েছে সে—মাত্র সাত মাসেই পড়ে ফেলেছে ৩৬৪টি বই। রোয়াল্ড ডালের যেকোনো লেখা বা হ্যারি পটার সিরিজের বইগুলো ভীষণ পছন্দ ফেইথের। জন্তু-জানোয়ার, জাদুকরি ঘটনাবলির সমাহার আর দুঃসাহসী অভিযাত্রার গল্প ভালোবাসে সে। বিপুল পরিমাণ বই পড়ে ফেলার স্বীকৃতির সনদ সে পেয়েছে হাউ টু ট্রেইন ইয়োর ড্রাগন বইয়ের লেখক ক্রেসিডা কাওয়েলের কাছ থেকে। যুক্তরাজ্যের চেশায়ারের অ্যাশলে এলাকার বাসিন্দা ফেইথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রেরণায় দুই বছর আগে বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়।
ফেইথের মা ৩৫ বছর বয়সী লরেন বলেন, তার সন্তানের কাছে বই পড়ার আকর্ষণ টেলিভিশন বা কম্পিউটারের মতোই উদ্দীপক। তবে পড়ার সময় কল্পনার রাজ্যে বিচরণের যে সুযোগ রয়েছে, সেটা শুধু যন্ত্রের পর্দায় চোখ আটকে থাকলে পাওয়া যায় না। যন্ত্রনির্ভর বিনোদনব্যবস্থার সমালোচনা করে ফেইথ বলে, বই পড়ার পরিবর্তে অনেক শিশু এসব মাধ্যমকে বেছে নিয়েছে। বিষয়টি লজ্জাজনক। তবে তার জীবন শুধু বইয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। সে প্রতি সপ্তাহে চার ঘণ্টা ব্যায়াম করে কাটায়, কারাতের ক্লাসে যায়, খেলাধুলা করে। আর এখন সে ড্রামস বাজানোও শিখছে। টেলিভিশনে উদ্ভট জিনিসপত্র দেখার চেয়ে গাছে চড়া ও সাইকেল চালাতেই বরং বেশি মজা পায় সে। লেখক ক্রেসিডা বলেন, আনন্দের জন্য পাঠাভ্যাস একটি শিশুর শিক্ষাজীবনে সাফল্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। সব শিশুই ফেইথের মতো পড়ার মধ্যে আনন্দ খুঁজে পেলে সেটা জাতির জন্য ইতিবাচক হবে। ডেইলি এক্সপ্রেস।

আস্থা কমে যাওয়া অশনিসংকেত

পিপিআরসি যে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ। তবে কোনো গবেষণাই পূর্ণাঙ্গ না। কোনো একটি গবেষণা থেকে সব প্রশ্নের উত্তরও আশা করা যায় না। সব গবেষণার কিছু শক্তিশালী দিক থাকে, কিছু সীমাবদ্ধতাও থাকে। এখানে সেই শক্তির দিক যেমন আছে, তেমনি কিছু দুর্বলতাও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। এ ধরনের গবেষণাকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটা প্রয়াস হিসেবে দেখা যায়। মানুষ কী মনে করে সেই তথ্যগুলো আমাদের জানা দরকার; সেটা জানানো হয়েছে। এটা শুরু, ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এ ধরনের কাজ আরও হবে। এই গবেষণা প্রতিবেদনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার অভাব জোরালোভাবে দেখা গেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি নতুন প্রজন্মের অনীহা জন্মানো একটা অশনিসংকেত। আমাদের কাজের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্যভাবে জানি যে এতে সত্যের প্রতিফলন ঘটেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন বা নৈরাজ্য বন্ধ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে মানুষের আস্থা ধাক্কা খাবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের অবস্থা বিরাজ করে অনেকের ধারণা। কিন্তু এ রকম অবস্থা দীর্ঘকাল ধরে চলতে পারে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দায়বদ্ধ, গণমুখী ও স্বচ্ছ ভূমিকা পালন করলে যেকোনো কিছু করে পার পেয়ে যাওয়া বা পার করে দেওয়ার সংস্কৃতির অবসান হবে।
এর জন্য যে অঙ্গীকার দরকার, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিক থেকেই আসতে হবে। আরেকটা বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, দেশের চেয়ে দল বড় হয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই তো শতকরা ৭০ ভাগের মতো মানুষের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয় রাজনীতি প্রবেশ করানো হয়েছে। বিচারব্যবস্থা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। যে রীতি ও ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্য থেকে বেশি কিছু বলা যায় না। কিন্তু এ ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণের প্রয়োজন, তা এই গবেষণা থেকে উপলব্ধি করা যায়। র‌্যাবের ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, তাকেও পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না। অনেক ঘটনার তো খবরই হয় না। মোট ঘটনার শতকরা ২০ ভাগ যেখানে খবর হয়, সেখানে সুশাসন নিশ্চিত করার দরকারে সম্পূর্ণ চিত্রটা জানতে ও জানাতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করায় এটা জরুরি। এই জবাবদিহি জনগণের কাছে, দলের কাছে না। তবে প্রতিবেদনে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ বিশেষ নেই। জবাবদিহি নিশ্চিত করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকা দরকার ছিল। অথচ প্রার্থীদের হলফনামা প্রকাশের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন নিজেই লুকোচুরি খেলছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী তথ্য জানার অধিকার আমাদের আছে। ইসি যখন সেই তথ্য দিচ্ছে না বা দিতে চাইছে না, তখন অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাজ করার ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে তথ্য অধিকার কমিশনেরও কোনো ভূমিকা আমরা দেখিনি। এ ব্যাপারে আরও আলোকপাত করা দরকার। পুলিশের বিষয়ে ক্রমাগতভাবে মানুষের আস্থা কমছে। এটা নতুন না, প্রতিটা দশকে এই আস্থা কমছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে, সরকারের চাপের কারণে দায়িত্ব পালনে বাধা পায়, সেই বিষয়টা গবেষণায় অনুপস্থিত। তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্যও তারা যথাযথভাবে কাজ করতে পারে না। এর বাইরে ঢালাওভাবে দলীয় নিয়োগের ব্যাপার তো রয়েছেই।
আমরা দেখেছি যে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে তারা দাগি আসামিকেও ছেড়ে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও দলীয়করণ গভীর হয়েছে। এসব বিষয় যখন জনগণের দৃষ্টির মধ্যে আসে, তখন তো তারা আস্থা হারাবেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকলাপ যেমন র‌্যাবের বিষয়ে, বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে আরও আলোকপাত করতে হবে। জনগণের অর্থেই তারা প্রতিপালিত হয়। তাদের দোষ-ত্রুটির কথা যদি আরও আসত তাহলে জনগণও সচেতন হতো এবং র‌্যাব-পুলিশও হয়তো তাদের জবাবদিহির ঘাটতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে পারত। এ কারণে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক গবেষণার কথা ভাবা যেতে পারে। ছাত্ররাজনীতির মধ্যে যে কলঙ্ক আমরা দেখতে পাই, সেটা নিরসনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাণী শুনি, কিন্তু সমাধানের কোনো ভূমিকায় তাঁরা নেই। সন্ত্রাসীদের বহিষ্কার করা হলেও আইনি শাস্তি হতে দেখছি না। বহিষ্কৃত ব্যক্তিরা কিছুদিন পরে আবার দলে ফিরে আসেন। ভবিষ্যতে যে নেতারা আসবেন, তাঁদের চরিত্র তো আমরা ছাত্ররাজনীতির দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। এদিকেও আশা করার সুযোগ কম। সব ক্ষেত্রেই এমন হচ্ছে। সুশীল সমাজের বিভিন্ন অংশ যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপের মধ্যে থাকে, সেটা উঠে না আসা এই গবেষণার আরেকটি সীমাবদ্ধতা। প্রত্যক্ষভাবে তো গণমাধ্যম বন্ধই করে দেওয়া হয়, পরোক্ষভাবে নানা রকম চাপের কারণে মিডিয়া যে জবাবদিহির চাপ তৈরি করবে, সেটাও করতে ব্যর্থ হয়। এ ধরনের গবেষণা মানুষের ধারণার ওপর ভিত্তি করে করা হয়। তারপরও এই প্রয়াসটা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের গবেষণা চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

আইসিটি আইনটি ঢেলে সাজানো দরকার

তানজীব উল আলম
ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী। তাঁর জন্ম চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে, ১৯৭৪ সালে। চট্টগ্রাম জামিয়া আহমাদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিম পাস করার পর তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৬ সালে আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৭ সালে লিংকনস ইন থেকে বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি লাভের পর তিনি ঢাকায় আইন পেশা শুরু করেন; ১৯৯৯ সালে তিনি হাইকোর্টের সনদ লাভ করেন এবং ২০০৫ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত হন। তিনি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি আইনের খসড়া প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। সম্প্রতি ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন আইনের খসড়া প্রণয়ন করেন। তিনি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও জ্বালানিবিষয়ক আইনের একজন বিশেষজ্ঞ।
প্রথম আলো  বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনকে (আইসিটি আইন) একটা কালাকানুন বলা হচ্ছে। আইনটা আসলে কী?
তানজীব উল আলম  আইসিটি আইনের ৫৭ থেকে ৫৯ পর্যন্ত যে ধারাগুলো রয়েছে, মূলত সেগুলোর জন্যই এ আইনের সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু এই ধারাগুলো পুরো আইনটির একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। আইসিটি আইনের মূল উদ্দেশ্য খুবই ভালো এবং আমি মনে করি যোগাযোগপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে একটা আইনগত শূন্যতা ছিল, এই আইন প্রণয়নের ফলে সেই শূন্যতা পূরণ হয়েছে। এ আইনের মাধ্যমে ডিজিটাল স্বাক্ষরের একটা স্বীকৃতি এসেছে, ইন্টারনেটভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর সবচেয়ে বড় সুফল আমরা দেখতে পাই ব্যাংকিং খাতে। এখন কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকই তাদের টাকার হিসাব লেজার বুকের মাধ্যমে করে না, ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সফটওয়্যারের মাধ্যমে করে। এই যে সফটওয়্যারের মাধ্যমে যে হিসাবটা রাখা হচ্ছে, এটার আইনগত স্বীকৃতি কিন্তু আইসিটি আইনের মাধ্যমে এসেছে। সুতরাং আইনটাকে সেই অর্থে খারাপ বলা যাবে না, বরং বাংলাদেশে এই ইলেকট্রনিক যুগে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের যুগে একটা বড় অবদান রেখেছে।
প্রথম আলো  তাহলে এ আইন নিয়ে আপত্তির কারণ কী? কেন এটির সমালোচনা করা হচ্ছে?
তানজীব উল আলম  আইনটি যখন প্রণয়ন করা হয়, তখন এর একটা অংশের উদ্দেশ্য ছিল একরকম, পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে অনেক বিষয় চলে এসেছে, যেগুলোতে আইনটির এই বিশেষ কয়েকটি বিধানের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রথম আলো  সেগুলো কী?
তানজীব উল আলম  যেটা নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে সেটা হলো, ইলেকট্রনিক বিন্যাসে মিথ্যা, উসকানিমূলক, মানহানিকর তথ্য, সংবাদ, ছবি ইত্যাদি প্রচারের দায়ে যে শাস্তির বিধান করা হয়েছে, সেটা। ২০০৬ সালে মূল যে আইনটা করা হয়েছে, সেটির কয়েকটি বিধানের ধারাবাহিকতায় এই বিধানগুলো এসেছে। যেমন, কেউ যদি ইলেকট্রনিক মাধ্যমে, বিশেষত কোনো ওয়েবসাইট হ্যাকিং করে, কিংবা কারও ওয়েবসাইটে ঢুকে কারও বদনাম করে, মানহানিকর কিছু প্রকাশ করে, তাহলে যে অপরাধ ঘটে, তা বন্ধ করার জন্য ওই আইনটা করা হয়েছিল। ২০০৬ সালে যখন মূল আইনটি করা হয়, তখন কিন্তু ফেসবুক বা এ ধরনের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বলে কিছু ছিল না। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে এই বিধানের অনেকটা সেকেলে হয়ে গেছে বেশ দ্রুতই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরাধের বিচারের জন্য আলাদা বিধান করে আলাদা আইন করা যেত। কিন্তু সেটা না করে এই আইনটাকে ঢালাওভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মানুষের মতপ্রকাশের অধিকারটাকে দমন করার জন্য। যদিও আইনটার আদি উদ্দেশ্য অনেক ভালো ছিল এবং বর্তমানেও আইনটা অনেকটুকুই আমাদের সাহায্য করছে। কিন্তু এই কয়েকটি বিধানের অপব্যবহারের ফলে লোকে মনে করছে যে পুরো আইনটাই আসলে কালাকানুন। প্রথম আলো  কিন্তু এই আইনের ৫৭ থেকে ৫৯ ধারা পর্যন্ত বিধানগুলোর কারণে তো নাগরিকদের কয়েকটি মৌলিক অধিকার খর্ব হচ্ছে। যেমন মতপ্রকাশের ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা... তানজীব উল আলম  বর্তমান প্রেক্ষাপটে বলা যায়, আইনটা যে অপব্যবহারের কয়েকটা দৃষ্টান্ত আমরা দেখেছি, তাতে সাধারণ মানুষের মনে হতে পারে যে এই পরিস্থিতিগুলোতে এই আইনের এমন ব্যবহার আসলে কাম্য ছিল না। বিশেষ করে ৫৭ ধারার কথা যদি ধরা যায়, সেখানে লেখা আছে, ইলেকট্রনিক বিন্যাসে মিথ্যা, অশ্লীল ও মানহানিকর তথ্য প্রকাশসংক্রান্ত অপরাধ। পুরো বিধানটা যদি আপনি পড়েন, তাহলে দেখবেন, যে পারস্পেক্টিভ থেকে এ বিধানটা করা হয়েছে, সেখানে কিন্তু পত্রিকাগুলোর সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এই আইনের অপব্যবহার হবে—এই বিষয়টা পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী আসে না। যে পরিপ্রেক্ষিত মনে রেখে বিধানটা করা হয়েছিল, সেটা হলো কেউ যদি ইলেকট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে কোনো অপরাধ বা কাউকে হেয়প্রতিপন্ন করার লক্ষ্যবস্তু করে কোনো পদক্ষেপ নেয়।
প্রথম আলো  আপনি কি সাইবার অপরাধের কথা বলছেন, যেটার সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের পেশাদারি কাজের সম্পর্ক নেই?
তানজীব উল আলম  ঠিক। জিনিসটা আসলে ছিল সাইবার অপরাধেরই অংশ হিসেবে। কিন্তু এখন সংবাদমাধ্যমের সংবাদ বা ছবি প্রকাশকে সাইবার অপরাধের আওতায় নিয়ে আসাকে আমি মনে করি আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। কারণ, এই অনুচ্ছেদে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলো  কিন্তু বাস্তবে অনেক সাইবার অপরাধ ঘটছে। যাঁরা এসব অপরাধের শিকার হচ্ছেন, তাঁরা এখনো আইনি প্রতিকারের বিষয়টা ভালোভাবে জানেন না বলে হয়তো মামলা-মোকদ্দমা হচ্ছে না। কিন্তু ফেসবুকসহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন ফোরামে ব্যক্তি মানুষের সম্মানহানি, গুজব ছড়িয়ে অস্থিরতা সৃষ্টি, সামাজিক-সাম্প্রদায়িক উসকানিসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক আচরণ করা হচ্ছে। রামু বৌদ্ধপল্লিতে আক্রমণের ঘটনা একটা উদাহরণ। এসব অপরাধের আইনি প্রতিকারের উপায়ও তো থাকা দরকার। তানজীব উল আলম  হ্যাঁ, এ ধরনের অপরাধ আসলেই সংঘটিত হচ্ছে। এখন বিষয় হচ্ছে, এসব অপরাধ দমনের জন্য আমরা কী ধরনের আইন করব। এমন আইন করা তো ঠিক হয় না যাতে করে এসব অপরাধ দমন করতে গিয়ে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্বিত হয়। এই ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখাটা খুবই চ্যালেঞ্জিং একটা বিষয়। যেহেতু মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটা মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃত, তাই আইনটা এমনভাবে প্রণয়ন করা উচিত, যাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চর্চার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া না হয়। আবার একই সঙ্গে কেউ যদি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চর্চা করতে গিয়ে সীমা লঙ্ঘন করে অপরাধ করে, তাহলে তার শাস্তিও অবশ্যই হওয়া উচিত।
প্রথম আলো  এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে কীভাবে?
তানজীব উল আলম  সেটাই তো প্রশ্ন। এই ভারসাম্য এভাবে রক্ষা করা যাবে যে এমন একটা আইন করা হলো, যাতে ন্যূনতম শাস্তি সাত বছর কারাদণ্ড, যেখানে অভিযুক্তের জামিন পাওয়ার বিধান থাকবে না, কোনো ধরনের সুরক্ষা ব্যতিরেকেই যেকোনো সময় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা যাবে? তো ২০০৬ সালের আইনটিতে তিন-চার ধরনের সংশোধনী এনে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করা হলো, যা খুবই বিপজ্জনক। যারা অপরাধী তারা কিন্তু এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে কোনোভাবেই নিবৃত্ত হবে না। কারণ, তারা তো অপরাধী। কিন্তু বিধানটা আপনি এমনভাবে করলেন যে সাধারণ নাগরিকদের জন্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হলো। তাহলে তো ভারসাম্যটা আসলে রক্ষা করা গেল না। ভারসাম্য হওয়া উচিত এ রকম যে যারা অপরাধী তারা তাদের অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি পাবে। ধরা যাক, আপনি ফেসবুকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে একটা মিথ্যা খবর শেয়ার করলেন, আপনি জানেন না যে খবরটা মিথ্যা। এখন এই অপরাধে আপনাকে জামিন অযোগ্য হিসেবে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা ঠিক?
প্রথম আলো  শুধু তা-ই নয়, অপরাধ প্রমাণিত হলে কমপক্ষে সাত বছর কারাদণ্ড হবে, এর চেয়ে কম শাস্তি দেওয়া যাবে না। এটা কী ধরনের আইন?
তানজীব উল আলম  হ্যাঁ, এটা হচ্ছে এই আইনের সবচেয়ে অসাংবিধানিক অংশ। এখানে আইন সুনির্দিষ্ট করে বলে দিচ্ছে ন্যূনতম শাস্তি কী হবে, অপরাধের মাত্রা বিবেচনা না করেই। কারণ, আইনটিতে অপরাধের সংজ্ঞা এমন বিস্তৃতভাবে দেওয়া হয়েছে যে ফেসবুকে আপনার যেকোনো স্ট্যাটাসও আপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, আপনার সাত বছরের কারাদণ্ড হয়ে যেতে পারে।
প্রথম আলো  তো এ ধরনের বিপজ্জনক কালাকানুন কী প্রক্রিয়ায় করা হলো?
তানজীব উল আলম  আমার জানামতে, ২০০৬ সালের আইনটির সংশোধনী আনা হয়েছে খুবই তড়িঘড়ি করে। সে সময় পার্লামেন্ট বসছিল না, তখন একটা অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রথমে এই সংশোধনীটা আনা হয়। দুই সপ্তাহ পরেই আবার সংসদে সংশোধনীটা পাস করা হয়। এ ধরনের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞসহ জনগণের ওয়াকিবহাল অংশের যে অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন, এ ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। এটা ঠিক হয়নি। ২০০৬ সালের আইনটিই যথেষ্ট কড়া আইন ছিল, সেটাকে এ রকম বিপজ্জনক কালাকানুনের রূপ দেওয়া হয়েছে। এটা একটা সভ্য সমাজে কখনোই কাম্য হতে পারে না।
প্রথম আলো  আপনি কি মনে করেন না, এই মুহূর্তে এই আইন সংশোধন করা উচিত?
তানজীব উল আলম  আমি মনে করি আইসিটি আইনের অষ্টম অধ্যায় সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন অংশের মতামত নেওয়া উচিত এবং সাইবার জগতের বিভিন্ন অপরাধ আলাদা আলাদা করে সংজ্ঞায়িত করা উচিত। তারপর অপরাধের স্বরূপ ও মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আলাদা আলাদা শাস্তি নির্ধারণ করা উচিত। অর্থাৎ পুরো আইনটি আগাগোড়া ঢেলে সাজানো প্রয়োজন এবং সেই প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রথম আলো  আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
তানজীব উল আলম  আপনাকেও ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মশিউল আলম

যারা লাশ আনতে যায়, সকালে বা সন্ধ্যায়

কোথাও যুদ্ধ হয়, বেশুমার মানুষ মরে। আমরা তার খবর পড়ি আর ভুলে যাই। বাড়ির পাশে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হয়, পরদিন খবরের কাগজ থেকে জানা যায়, আরও একটি লাশ পড়েছে। যুদ্ধে যে মারে তার জবাবদিহি হয় না। যাদের মারা যায়, তারাও জানে এসব হত্যার বিচার হবে না; হয় না কদাচিৎ। নিহত স্বজনের লাশ পাওয়ার আর আদরযত্নে আর শোকে তাকে দাফন করার সুযোগও থাকে না যুদ্ধের দিনে। যুদ্ধ থামলে হয়তো সুযোগ পেলে তারা স্বজনের শেষনিঃশ্বাস ছাড়ার জায়গাটা দেখে আসে। পারলে গণকবর খুঁজে বের করে ফুল দেয়। তারপর আবার ফিরে আসে যার যার জীবনে। জীবন এমন এক কঠিন কারাগার, যেখানে ফিরতেই হয়। বাংলাদেশে অপঘাতে মৃত্যুও এক নাছোড় দানব, যার লাশের ক্ষুধা মেটাতে হয় প্রতিদিন। এখানে এখন গড়ে প্রতিদিন একজন মানুষ মারা যাচ্ছে ‘যুদ্ধে’। যুদ্ধই বলছি, কারণ সরকারি বাহিনীগুলো এসব হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধের পরিভাষা দিয়েই চিনিয়েছে: ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি। কথাশিল্পী মাহমুদুল হকের একটি গল্পের নাম ছিল ‘প্রতিদিন একটি রুমাল’। এখন আমাদের খবরের কাগজের শিরোনাম হয় ‘প্রতিদিন গড়ে একটি হত্যা’। খুন করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার ‘ঐতিহ্য’ আছে বাংলাদেশে।
প্রায়ই নদীর ধারে নিয়ে গিয়ে খুন করে লাশ ডোবানোর ঘটনা সংবাদে আসে। লঞ্চডুবির পরও অজস্র লাশ ভাসে। একাত্তর সালে, পাকিস্তানি বাহিনী নদীর ধারে সারবেঁধে বাঙালিদের দাঁড় করিয়ে গুলি করত। দেহগুলো নদীতে পড়ে ভাসতে ভাসতে কাক-শকুন আর মাছের খোরাক হতো। পুরাকালে সাপে কাটা কিংবা বেওয়ারিশ লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার রীতিও ছিল। এখনকার রীতি হলো বন্দুকযুদ্ধ। সবাই জানে এসব আসলে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। এত মৃত্যুর জন্য পেশাদার বাহিনী লাগে, প্রয়োজন হয় ‘ডেথ স্কোয়াডের’। আমাদেরই চারপাশে তারা থাকে, খায়, ঘুমায়, আনন্দ করে, টহল দেয়। তারপর তালিকা ধরে ধরে মধ্যরাত থেকে ভোরের কোনো সময়ে নদীর বাঁধ বা খেতের কিনারে নিয়ে শিকারকে হত্যা করে। এ রকম করে প্রতিদিন একটি রুমাল এখন কার প্রয়োজন? এই মৃত্যুর চানমারি শুরু হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবিরের সহিংস প্রতিরোধের মাধ্যমে। যে সহিংসতা তারা শুরু করেছিল, আজ তা-ই বহুগুণে বড় হয়ে হয়ে তাদের বিনাশ করছে। সেই ককটেল, পেট্রলবোমা—যার শুদ্ধ নাম মলোটভ ককটেল খুবই গরিব-দরদি। বেছে বেছে মেহনতি মানুষকেই তারা হত্যা করত। সেটা এমন সময়, যখন সরকারি দলের সমর্থকদেরও কেউ কেউ বোমা-বারুদসহ জনতার হাতে ধৃত হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের লোকেরা তো আগুন নিয়ে খেলছিলই। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর হঠাৎ সেই সব বোমাবাজ গায়েব হয়ে গেল। কোথায় গেল?
এখন কেন আর তাদের প্রয়োজন হচ্ছে না? এসব ককটেল আর পেট্রলবোমা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে সাধারণ মানুষের, দ্বিতীয় ক্ষতিগ্রস্ত বিরোধীদের ভাবমূর্তি। এর জন্য তাদের জনপ্রিয়তা কমেছে। অন্যদিকে হিসাব করলে বোঝা যায়, লাভবান হয়েছে ‘সরকার’। সেই লাভ এমনই লাভ যে নির্বাচন, গণতন্ত্র, জনপ্রতিনিধিত্ব—সবকিছুই ওই ‘পেট্রলবোমার’ ভয়ে উবে গেল, তেমন কোনো আহাজারিও করল না কেউ। আগুন দিয়ে চলন্ত বাস-গাড়ি-ট্রাকে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংসতা কি একাত্তরের পরে দেখেছে বাংলাদেশ? হ্যাঁ, কি স্বৈরশাসক, কি নির্বাচিত শাসক—সব আমলেই গুলি চলেছে। কিন্তু মানুষ হত্যার এমন উৎসব আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০১৩ সালে এ রকম রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫০৭ জন নিহত হন। এখন শোনা যাচ্ছে, জামায়াতি সন্ত্রাসীদেরই নাকি খুঁজে খুঁজে হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন নেতা-নেত্রী পরোক্ষভাবে এসব হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করে বক্তব্য দিয়েছেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমরা যাঁরা পকেটমারকে পিটিয়ে মেরে ফেলে উচিত শিক্ষা দিই, তাঁদের অনেকেই এ রকম আইনবহির্ভূত হত্যাকে সমর্থন করছেন। এই সমর্থনের শুরু হয়েছিল বিএনপি আমলের অপারেশন ক্লিন হার্টের সময়। তারপর এল ক্রসফায়ার। অনেকেই এটাকেই সন্ত্রাস দমনের ধন্বন্তরি পথ বলে বাহবা দিলেন। কিন্তু তাতে কি জনগণের নিরাপত্তাহীনতা কমেছে?
রাজনীতি থেকে সহিংসতা দূর হয়েছে? নাকি তা আরও বহুগুণে বেড়েছে। এখন আর বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাস হয় না। এখন হয় বেআইনি ও আইনি বাহিনীর সংঘবদ্ধ হত্যাযজ্ঞ। পৌরাণিক কাহিনিতে পরশুরাম পাপের বিনাশে কুঠার হাতে নিজের বংশকেই নাশ করেছিলেন। নদীর তীর ধরে তিনি হত্যা করতে করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। পরিণামে সেই কুঠার তাঁর হাতের অংশ হয়ে যায়, কোনোভাবেই তাকে ছাড়ানো যায় না। অবশেষে করতোয়া নদীর জলে হাত ধুলে সেই ঘাতক কুঠার খসে। রাষ্ট্রের হাতে যাঁরা পরশুরামের কুঠার তুলে দিয়েছেন, আশা করছেন প্রতিপক্ষ বিনাশেই সেটা শেষ হবে, তাঁরা ভুল করছেন। র‌্যাবের জন্ম দিয়েছিল বিএনপি, অথচ আজ তারাই এই বাহিনীর বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে সোচ্চার। যে আওয়ামী লীগ ২০০৮-এর নির্বাচনী ইশতেহারে ক্রসফায়ার বন্ধের কথা বলেছিল, আজ তারাই হয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ প্রবর্তক। হত্যা আরও হত্যা ডেকে আনে; এই সত্য তারা ভুলে যেতে পারে, কিন্তু নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য এমন বিস্মরণ হবে আত্মঘাতী। যারা পেট্রলবোমায় মানুষ মেরেছে, তাদের বিচার করতে অসুবিধা কোথায়?
এত মৃত্যু যাদের হাতে ঘটেছে, তাদের নিশ্চয়ই একটা পরিকল্পনা ছিল, উদ্দেশ্য ছিল, সহায়-সরঞ্জাম ও তহবিল ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, তাদের ছিল ‘নিয়োগদাতা, হুকুমদাতা’। আটক করে বিচার করলে তাদের মুখ থেকে সম্পূর্ণ সত্যটা মানুষ জানতে পারত। যে রাজনীতি এ রকম হত্যার আয়োজন চালায়, তাদের মুখোশ খসে পড়ত। কিন্তু সরকার সেই জরুরি কাজটা কেন করছে না? সত্য উন্মোচনে তাদের কিসের ভয়? এ ধরনের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড শেষাবধি রাজনীতিকেই হত্যা করে। হত্যা করে আইন, যুক্তি ও ন্যায়কে। সত্য নেই, রয়েছে গুজব। ভূতের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি করে না আধুনিক কোনো সরকার; কিন্তু জগতে এমন সরকার কম যে গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই করে না। এ যেন হাওয়ায় তরবারি চালিয়ে গুজবের আগামাথা তরমুজের মতো ফালাফালা করার কারবার। যখন সত্য বিতর্কিত বা জানার অতীত, তেমন সময়ই গুজবের বসন্ত। সময়ের জ্বলন্ত প্রশ্নগুলোয় যে-ই হাত দিচ্ছে, তার হাতই পুড়ে যাচ্ছে। সরকারি প্রেসনোটের মধ্যিখানে ফোকর ধরা পড়লে জানবেন, সত্যটা ওই পথেই পগারপার। এমন দিনেই তারে বলা যায়: মতিঝিলে নাকি...রানা প্লাজার রেশমা নাকি...বিএনপি নাকি..., বন্দুকযুদ্ধ নাকি... ইত্যাদি। গুজবে উত্তর থাকে না, থাকে সময়ের সবচেয়ে জ্বলন্ত ও জরুরি প্রশ্ন। সবলের বিরুদ্ধে গুজব দুর্বলের অস্ত্র। যখন সত্যের কারবারিরা জনমনের আস্থা হারায়, তখন ‘নাকি’ শব্দটা আমাদের বাক্যের মধ্যে খিল গেড়ে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়াকে প্রশ্ন করে, ‘তোমরা নাকি...’।
আমাদের কালের দুর্ধর্ষ গুজব রাশি সেসব প্রশ্নেরই উত্তর প্রস্তাব করে, একচক্ষু সরকার যার ওপর ধামা হয়ে চেপে বসেছে; যার উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধ নিয়ে, প্রতিদিন একটি বা ততোধিক হত্যা নিয়েও গুজব ডানা মেলা শুরু করেছে। তাহলেও সরকার নড়বে না চড়বে না। সাগর-রুনির মতো ব্যাখ্যাতীত অনেক মৃত্যুর প্রতিকারে ব্যাখ্যাতীত দায়িত্বহীনতা দেখিয়েই যাবে। কেবল নদীমাতৃক বাংলাদেশের নদীগুলো মায়ের মতো অসীম মমতায় অপঘাতে নিহত সন্তানদের লাশ বুকে নিয়ে বইতে থাকবে। বইতেই থাকবে। যারা বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ার বা পেট্রলবোমায় নিহতদের লাশ আনতে যায়, সকালে বা সন্ধ্যায়, তাদের বোবা প্রতিবাদের ভাষা পড়ার ক্ষমতা জাতি হিসেবেই হয়তো আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তুর্কি চলচ্চিত্রকার ইলমাজ গুনের ছবি ইওল। ছবির একটি দৃশ্যে কুর্দিস্তানের বিদ্রোহীদের লাশ নিয়ে আসতে দেখা যায় সেনাদের। তাদের ট্রাকের পেছনটায় সার সার লাশ। ট্রাকটা একের পর এক কুর্দি গ্রামে ঢোকে, আর গ্রামবাসীদের বলা হয় লাশ শনাক্ত করতে। তারা বাধ্য হয় সারবেঁধে নির্বিকার মুখে একে একে লাশগুলো দেখে যেতে। একটি লাশের সামনে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াতে দেখা যায় এক বাবাকে। সেনারা এগিয়ে আসে, চোখে প্রশ্ন: আপনার? লোকটি নীরবে মাথা নাড়িয়ে সরে যায়। নিজের ছেলের লাশ শনাক্ত করাও যে বিপদ! বাংলাদেশে আমরা ধন্য, আমাদের বাবাদের নিহত ছেলের লাশ শনাক্ত করার সুযোগ আছে।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com