Monday, December 29, 2014

‘৭১ বাংলাদেশ’ ওয়েবসাইটের উদ্বোধন

বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলাদি নিয়ে ‘একাত্তর বাংলাদেশ’ নামের একটি ওয়েবপেজ চালু হয়েছে। www.71bangladesh.com ঠিকানায় ওয়েবপেজটি পাওয়া যাবে। আজ সোমবার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ওয়েবসাইটটির উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি একজন অর্থনীতিবিদ। সেই হিসেবেই বলছি, উন্নয়নেও ইতিহাস বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন মুক্তিযুদ্ধ। সেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এই আর্কাইভ হয়েছে। আমি আশা করছি, এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।’
আতিউর রহমান বলেন, ‘এই দেশের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষ, কৃষকের অনেক বেশি অবদান রয়েছে। আমি আশা করি, এই আর্কাইভে সেই ইতিহাস উঠে আসবে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে মানুষ এই ইতিহাস জানতে পারবে।’
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন একটি নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে এবং একের পর এক মামলার রায় হচ্ছে। এটি সম্ভব হয়েছে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার কারণে। নতুন ভোটাররা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ওই নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল।’
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এম এ হাসান বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে। এক কোটি লোক উদ্বাস্তু হয়েছে। সাড়ে চার লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি হয়েছে। সঠিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরলেই এই বিশাল আত্মত্যাগের মূল্য দেওয়া যাবে।
আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আশফাক হোসেন এবং একাত্তর বাংলাদেশের প্রধান সম্পাদক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আনোয়ার হোসেন।

সিলেটে আগামীকাল আধাবেলা হরতাল

(আজ সোমবার হরতালে পিকেটিং করার সময় বিএনপির নেতা শাহরিয়ারসহ ছাত্রদলের দুই কর্মীকে আটক করে পুলিশ। এর প্রতিবাদে দুপুরে ২০-দলীয় জোট সংবাদ সম্মেলন করে কাল হরতালের ঘোষণা দেয়। ছবি: আনিস মাহমুদ) সিলেট নগর ও জেলায় আগামীকাল মঙ্গলবার আধাবেলা হরতাল ডেকেছে ২০-দলীয় জোট। আজ সোমবার হরতালে পিকেটিং করার সময় বিএনপির নেতা শাহরিয়ারসহ ছাত্রদলের দুই কর্মীকে আটক করে পুলিশ। এর প্রতিবাদে দুপুরে ২০-দলীয় জোট সংবাদ সম্মেলন করে এ হরতালের ঘোষণা দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আজ সকাল নয়টার দিকে নগরের চৌহাট্টা মোড়ে বিএনপির নেতা শাহরিয়ার হোসেন ও নগর বিএনপির সদস্যসচিব বদরুজ্জামান সেলিমের নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা পিকেটিং করেন। এ সময় কোতোয়ালি থানার পুলিশ শাহরিয়ার এবং ছাত্রদলের দুই কর্মী সুমন চক্রবর্তী ও জুবের আহমদকে আটক করে। সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান বলেন, ‘হরতালে তারা গাড়ি ভাঙচুর করতে পারে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে শাহরিয়ারসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে।’
এদিকে আটক নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে দুপুরে তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলন করে ২০-দলীয় জোট। দুপুরে জেলা বার হলে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বিএনপির নেতা শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী ও গত রোববার কারাগারে পাঠানো মহানগর জামায়াতের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ নেতা-কর্মীদের মুক্তির দাবিতে হরতাল ঘোষণা করেন নেতারা। অন্যথায় কাল আবারও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুমকি দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ২০-দলীয় জোট সিলেট জেলার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক দিলদার হোসেন সেলিম। তিনি বলেন, ‘অবৈধ পন্থায় ক্ষমতার মোহে এখন অন্ধ হয়ে গেছে আওয়ামী বাকশালী সরকার। দেশপ্রেমিক জনতার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতে জোটের নেতাদের গ্রেপ্তার ও পুলিশি নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে। গ্রেপ্তার-নির্যাতন-পুলিশি হামলা-মামলা চালিয়ে জনতার আন্দোলন দমিয়ে রাখার স্বপ্ন কখনো সফল হবে না।’
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ও সিলেট জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাহের চৌধুরী শামীম, মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব বদরুজ্জামান সেলিম, জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল গফফার ও আলী আহমদ, মহানগর জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির ফখরুল ইসলাম, সেক্রেটারি সোহেল আহমদ, মহানগর খেলাফত মজলিসের সহসভাপতি আবদুল হান্নান তাপাদার, মহানগর জমিয়তের সভাপতি মনসুরুল হাসান রায়পুরী, জাগপা সিলেট জেলার সভাপতি মকসুদ হোসেন, মহানগর লেবার পার্টির সভাপতি মাহবুবুর রহমান খালেদ, জাতীয় পার্টির (বিজেপি-আন্দালিব পার্থ) জেলা আহ্বায়ক মোজাম্মেল হোসেন, এলডিপির জেলা সভাপতি সায়েদুর রহমান চৌধুরীসহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

‘ওর মুখের দিকে তাকাতে পারি না’ by মানসুরা হোসাইন

তানজিমুল হক (অয়ন)
বার্ন ইউনিটের যে বিছানায় ছোট ভাই শুয়ে, তার কাছ পর্যন্ত গিয়ে আবার ছুটে বেরিয়ে এলেন মানসুরুল হক। বিস্ময়ের ঘোর তিনি তখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। বিছানায় শোয়া মানুষটির যে তাঁর ভাই, তা যেন তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কয়েক মুহূর্ত পর তিনি যেন সংবিৎ​ ফিরে পেলেন। কান্নায় ভেঙে পড়লেন মানসুরুল হক। বললেন, ‘আমি তো ওর মুখের দিকে তাকাতে পারি না। আমাদের কী সুন্দর সংসার ছিল। সব শেষ হয়ে গেল।’ আজ সোমবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিত্র এটি। মানসুরুল পেট্রলবোমায় দগ্ধ তানজিমুল হকের (অয়ন) বড় ভাই। ভাইয়ের কাছে যেতে গিয়েও তিনি বারবার ফিরে আসছিলেন। অয়নের মুখ পুড়ে বিকৃত হয়ে গেছে। শুধু ভাই নয়, মায়ের মুখও দগ্ধ হয়েছে। সঙ্গে থাকা বোন সালমা আনিকার কান ও হাতের কিছু জায়গা দগ্ধ হয়েছে। এর ফলে পুরো পরিবার এখন দিশেহারা।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা হরতালের আগের দিন গত রোববার রাত আটটার দিকে রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়ায় দুর্বৃত্তরা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পেট্রলবোমা ছুড়ে মা​রলে সেটিতে আগুন ধরে যায়। এতে অয়ন, তাঁর মা শামসুন নাহার বেগম ও বোন সালমা আনিকা দগ্ধ হন। নোয়াখালী জেলার হাতিয়া থেকে আনিকাকে চিকিৎসক দেখানোর জন্যই ঢাকায় এসেছিলেন শামসুন নাহার।
হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, অয়নের পুরো মুখ দগ্ধ। চেহারা বীভৎস হয়ে গেছে। চোখ বন্ধ। শ্বাসনালি আক্রান্ত হওয়ায় কথা বলতে পারছেন না। শামসুন্নাহারের মুখ, হাত ও শরীরের বিভিন্ন জায়গাও দগ্ধ হয়েছে। তবে তিনি কথা বলতে পারছেন।
বড় ছেলেকে উদ্দেশ করে শামসুন নাহার বলছিলেন, ‘চোখ তো মেলতে পারি না। চোখে তো কিছু দেখি না। আমাদের তো জীবনটাই চলে যাচ্ছে।’
দুপুরে ৬০২ নম্বর কেবিনে যাওয়ার আগে ওয়ার্ডের বিছানায় শুয়ে শুয়েই শামসুন নাহার বলছিলেন, ‘আনিকা তো কিছু খায়নি।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের (বার্ন ইউনিট) অবৈতনিক উপদেষ্টা চিকিৎসক সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘অয়নের ৯ শতাংশ এবং তাঁর মায়ের সারা শরীরের বিভিন্ন জায়গাসহ ১০ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। মা ও ছেলের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এর বেশি এখন আর সেভাবে কিছুই বলা সম্ভব হচ্ছে না।’
শামসুন নাহার বেগম হাতিয়া ইউনিয়ন মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। অয়নের বাবা জাবের উদ্দিন ব্যবসায়ী। অয়ন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাঁর বড় ভাই মানসুরুল হক চট্টগ্রামে একটি ব্যাংকে কর্মরত। একমাত্র ছোট বোন আনিকা এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে।
মানসুরুল হক বলতে থাকেন, ‘আমার আদরের ভাইটির গায়ে কেউ কখনো হাত তোলেনি। সে অন্যায় করলেও বাবা আমাকেই বকত। ভাইয়ের ক্যামেরা কেনার শখ ছিল। আমি চাকরি পেয়েছি। মা চাকরি করছেন। আমরা একটু গুছিয়েই ওর জন্য একটি ক্যামেরা কেনার পরিকল্পনা করছিলাম। কিন্তু এখন ওর যে চেহারা, ক্যামেরা দিয়ে আর কী করবে? ও যাতে কোনো রাজনীতি বা বাজে কাজের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তার জন্য যা করা দরকার, আমরা তা-ই করতাম। দেশের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে সে যায়নি। ঘুরে বেড়াতে সে খুব পছন্দ করত।’
মানসুরুল হক জানালেন, তিনিই তাড়া দিয়ে মা ও ছোট বোনকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। ছোট বোনের মাইগ্রেনের ব্যথা। ব্যথার জন্য পড়তে পারছিল না। অন্যদিকে হরতাল শুরু হয়ে যাচ্ছে। তাই তাড়া দেওয়া হয়।
অয়নের চাচা জামসেদ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোববার ভাবি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মেয়েকে চিকিৎসক দেখানোর জন্য শান্তিনগরে যান। গিয়ে শোনেন চিকিৎসকের শরীর খারাপ, তাই তিনি আসবেন না। তখন তিনি মিরপুরে তাঁর ভাইয়ের বাসায় ফিরে যাচ্ছিলেন। তারপরই শুনি এ ঘটনা।’
আনিকা সেভাবে দগ্ধ না হলেও মা ও ভাইয়ের অবস্থা দেখে ভড়কে গেছে। সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল, তা বলতে পারবে একমাত্র আনিকাই। তবে সে কোনো কথাই বলতে চাচ্ছে না।
ঘটনার পরই হাসপাতালে অয়নের বন্ধু, বিভাগের বড় ভাই-বোনেরা ছুটে এসেছেন। বড় চুলের বাউল বাউল ভাবের তরতাজা যুবকের এখন যে পরিণতি, তা তাঁরা মানতে পারছেন না। তাঁরা বলছেন, এখন অয়নের নাটক করা তো দূরের কথা, সে বাঁচবে কি না, তাই নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। শুধু রাজনীতির কারণে এভাবে মানুষকে দগ্ধ করার বিষয়ে অয়নের বন্ধু ও অন্যান্যরা তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেন।
অয়নের পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তবে তার পরও তাঁদের বক্তব্য, দুবৃ‌র্ত্তরা শাস্তি পেলেও কী পরিবারটি কখনো আগের জায়গায় পৌঁছাতে পারবে? এর দায় কে নেবে?

সংঘাত চাই না, শান্তি চাই: প্রধানমন্ত্রী

দেশে শান্তির ধারা অব্যাহত থাকুক। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষ ভালো থাকুক বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সুন্দর বাংলাদেশ। সংঘাত চাই না আমরা, শান্তি চাই। বাঙালি জাতির একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চাই।’ আজ সোমবার বিকেলে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। খবর বাসসের। শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাঙালি সংস্কৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য অসাম্প্রদায়িকতা। ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে মানুষে মানুষে মিলন হবে, এটাই বাঙালি সংস্কৃতির মূল কথা। আজ মাঝেমধ্যে নিজের মনেই প্রশ্ন জাগে, বাঙালি জাতি কি তার সংস্কৃতির মূলধারা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে?’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জঙ্গিবাদ, ধর্মান্ধতা, অসহিষ্ণুতা, সহিংসতা এসব বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই নয়। মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য, অতিথিপরায়ণতা হচ্ছে বাঙালির আদর্শ। বাঙালির তো কখনোই সম্পদের প্রাচুর্য ছিল না। কিন্তু অল্পতে তুষ্ট বাঙালি জীবনকে উপভোগ করার কৌশল জানত। কিন্তু আজ জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। ধর্মের লেবাসধারীরা ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলা করছে। আমরা গত বছর দেখেছি কীভাবে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের চত্বরে পবিত্র কোরআন শরিফে আগুন দেওয়া হয়। জাতীয় মসজিদ তছনছ করা হয়। তার পরও তারা কীভাবে নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করে?’ তিনি বলেন, একমাত্র আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্যই এসব অমানবিক আচরণের পরিবর্তন আনতে পারে। শিল্পী-সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবীদের এ ব্যাপারে আমি আহ্বান জানাই তাঁরা যেন আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেন। নিচু ও সংকীর্ণ মানসিকতার বিরুদ্ধে মানুষের চেতনাকে আরও জাগ্রত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষের মূল্যবোধকে আরও জাগ্রত করতে হবে।’
জয়নুল আবেদিন ও জাতীয় কবি কাজী নজরুলের মিল তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একজন শব্দের কারুকার্যের মাধ্যমে অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদ করেছেন। অন্যজন রংতুলির আঁচড়ে সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বঞ্চনাকে তুলে ধরেছেন।’
জয়নুল আবেদিন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, বাংলাদেশের শিল্পসংস্কৃতির অঙ্গনে নানা ক্রান্তিকালে তিনি নেতৃত্বও দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শিল্পাচার্য ১৯৪৩ সালের দুভিক্ষ শীর্ষক চিত্রমালার জন্য সারা বিশ্বে খ্যাতি লাভ করেছেন। তাঁর নৌকা, সংগ্রাম, নবান্ন, মনপুরা-৭০, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রভৃতি শিল্পকর্ম একদিকে বাংলার নিসর্গ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে যেমন ফুটিয়ে তুলেছে, তেমনি বাঙালির জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি এসব শিল্পকর্মে মূর্ত হয়ে উঠেছে।’
বছরব্যাপী জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে আয়োজকদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শিল্পাচার্যের শিল্পকর্ম দেখার মাধ্যমে দেশি-বিদেশি দর্শক আমাদের বিশ্বমানের শিল্পকলা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবেন। নবীন শিল্পীরা উৎসাহিত হবেন। এ আয়োজন পরবর্তী প্রজন্মকেও আরও উজ্জীবিত করবে। আমাদের শিল্পাঙ্গন সমৃদ্ধ হবে।’ এরপর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।

‘দেশব্যাপী ব্যাপক দমননীতি চালিয়েছে সরকার’ -ফখরুল

২০ দলীয় জোটের হরতালকে কেন্দ্র করে সারা দেশে সরকার ব্যাপক দমননীতি চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। বলেছেন, হরতালে জনগণের ব্যাপক ও স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকবে ভেবেই দেশব্যাপী চালানো হয়েছে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর ওপর ব্যাপক দমননীতি। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপকভাবে হানা দিয়েছে। তল্লাশির নামে পরিবারের লোকজনদের সঙ্গে করা হয়েছে অসভ্য দুর্ব্যবহার। বিরোধী নেতাকর্মীদের যাকে যেখানে পাওয়া গেছে গ্রেপ্তার করা হয়েছে নির্বিচারে। হরতালের সার্বিক চিত্র তুলে ধরতে বিকালে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, হরতালকে কেন্দ্র করে রোববার রাত থেকে বিকাল পর্যন্ত সারা দেশে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪৪২ জন নেতাকর্মীকে। ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে তিনজনকে। গ্রেপ্তারকৃত কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে রয়েছেন- যুবদল কেন্দ্রীয় সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সিলেট মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহরিয়ার প্রমুখ। তিনি বলেন, রাজধানীর পল্লবী, মুগদা, লালবাগ, দক্ষিণখান, শাহআলী, সবুজবাগ, নিউমার্কেট এলাকায় মিছিলে হামলা করেছে পুলিশ। পল্লবীতে মিছিলে গুলি চালালে গুলিবিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা স্বপন গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় পুলিশ। মির্জা আলমগীর বলেন, একদলীয় বাকশালী স্বৈরতন্ত্র পাকাপাকি একটি ভিত্তি দেয়ার জন্য এই ভোটারবিহীন সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে তারা আরও বেশি নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী হয়ে উঠেছে। শাসক দল তার সাঙ্গপাঙ্গসহ সমস্ত হিংস্রতা দিয়ে বিরোধী দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। মির্জা আলমগীর বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রে অন্তর্নিহিত শক্তিই হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। দেশে দেশে নিষ্ঠুর জনপীড়ক একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগকারী স্বৈরাচারী শাসকরাই মুক্তচিন্তা, সমালোচনাকে ভয় পায়। সেইজন্য এ ধরনের শাসকরা মুক্তবুদ্ধির স্বাধীনচেতা মানুষদেরকে বর্বর আক্রমণে দমন করতে চায়। তিনি বলেন, গতকাল নিউএজ পত্রিকা অফিসে পুলিশ হানা দেয়। পুলিশি হানার মাধ্যমে গণমাধ্যমকে চাপ সৃষ্টি করা এই সরকারের একটি চিরচেনা কৌশল। নিউ এজ অফিসে পুলিশি হানার উদ্দেশ্যই হচ্ছে পত্রিকার নির্ভীক সম্পাদক নুরুল কবিরকে ভয় দেখানো। আমরা নিউএজ অফিসে পুলিশি হানার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। মির্জা আলমগীর বলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন থেকে জনদৃষ্টিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য সরকার নিখুঁত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। হরতালের প্রাক্কালে পুরনো কৌশলের পুনরাবৃত্তি করে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, পেট্রোল বোমা ছুড়ে জীবনহানির মতো মানবতাবিরোধী সহিংস কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। সরকারি এজেন্টদের দিয়ে তারা এই ধরনের অমানবিক কর্মকা- ৫ই জানুয়ারির তামাশার নির্বাচনের পূর্বাপর ঘটিয়েছিল। মির্জা আলমগীর বলেন, নোয়াখালীতে হরতালের প্রথম প্রহরে স্কুল শিক্ষিকা সামসুন্নাহানের জীবনহানি ঘটানো হয়। সরকার এজেন্টদের দিয়ে নানাভাবে বিরোধী দলের গণতান্ত্রিক কর্মসূচিগুলোকে স্যাবোটাজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালিয়ে, সহিংস ধ্বংযজ্ঞ সংঘটিত করে হরতালকারীদের ওপর দায় চাপানোর অপচেষ্টা করে। বিরোধী দলের হরতালের বিরুদ্ধে অপবাদ দেয়ার জন্য এই ভোটারবিহীন সরকারের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকা-ের জুড়ি মেলা ভার।  কিন্তু জনগণের দরবারে প্রকৃত ঘাতকরা চিহ্নিত হয়েই থাকে। তাদের নিষ্ঠুর অপকর্মের বিচার জনগণ একদিন যথাযথভাবেই করবে। তিনি বলেন, বেআইনি অস্ত্র দিয়ে বিরোধী দলের মিছিলকে পন্ড করার পুরস্কারস্বরূপ এই অবৈধ সরকারের স্নেহমাখা সন্ত্রাসী ছাত্র সংগঠনের নেতাদেরকে যখন মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন আওয়ামী নেতারা বাহবা দেন তখন দেশবাসী কারোরই জীবনের নিরাপত্তা নির্বিঘœ থাকে না। নোয়াখালীতে শিক্ষিকা হত্যার ঘটনায় শোকপ্রকাশ ও দায়ীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি। তিনি কমলাপুর রেল দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে নিহত ও আহতদের প্রতি শোক ও দুঃখ প্রকাশ এবং তাদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান। সরকারের সমালোচনা করে বলেন, জনস্বার্থকে সরকার তাচ্ছিল্য করে শুধুমাত্র বিরোধী দলকে দমানোর আয়োজনে ব্যস্ত থাকার জন্যই দেশজুড়ে চলছে নানা দুর্যোগ দুর্ঘটনা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীদের অবিলম্বে মুক্তি ও আহতদের সুচিকিৎসার দাবি করেন। সেই সঙ্গে হরতাল সফল করায় বিএনপি, অঙ্গসংগঠন ও জোটের শরিক দলের নেতাকর্মীদের বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।

সেই ব্যবসায়ীর মাথা, হাত–পা উদ্ধার

কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে নিখোঁজ হওয়া পরিবহন ব্যবসায়ী নবী হোসেনের (৪০) মাথা ও হাত-পা গতকাল রোববার উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল ভোরে পৌর শহরের চিজণ্ডবের দক্ষিণপাড়া মহল্লার শহীদ জিয়া তোরণ এলাকার একটি আস্তাকুঁড় থেকে মাথা ও পরে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সড়কসেতু এলাকা থেকে হাত ও পা উদ্ধার করা হয়। গত বৃহস্পতিবার পৌর শহরের মালাগুদাম এলাকা থেকে হাত-পা-মাথাবিহীন একটি খণ্ডিত দেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার ভৈরব শহর থেকে রাসেল মিয়া নামের নবীর এক পরিচিত ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে গতকাল ভোরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের বিজেশ্বর এলাকা থেকে নজরুল ইসলাম (৩৮) ও সুমনা বেগম (৩০) নামের নবীর আরও দুই পূর্বপরিচিত ব্যক্তিকে আটক করা হয়।
পরে তাঁদের দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশ খুন হওয়া ব্যবসায়ীর মাথা ও হাত-পা উদ্ধার করে। সহকারী পুলিশ সুপার (বাজিতপুর সার্কেল) মৃত্যুঞ্জয় দে ও ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বদরুল আলম তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন নজরুল ও সুমনা। নজরুল ও সুমনার ভাষ্য অনুযায়ী সহকারী পুলিশ সুপার জানান, দুজনেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা। দুজনের মধ্যে একসময় প্রেম ছিল। পরে সুমনার অন্যত্র বিয়ে হয়। এরপর স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে সুমনা তাঁর একটি কন্যাসন্তান নিয়ে ভৈরবে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। এর মধ্যে নবীর সঙ্গে সুমনার প্রেম হয়। তবে কিছুদিন ধরে নজরুল ও সুমনার মধ্যে আবার সম্পর্কের উন্নতি হয়। নবী তাঁদের সম্পর্কে বাধা দেওয়ায় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সুমনার বাসায় ২৩ ডিসেম্বর তাঁকে হত্যার পর লাশ কয়েক টুকরা করে বিভিন্ন স্থানে সেগুলো ফেলা হয়।
নবীর স্ত্রী বিলকিস বেগম বলেন, সুমনা নামের নবীর দূরসম্পর্কের এক বোন আছে বলে তিনি জানেন। তবে তাঁদের দুজনের মধ্যে আর কোনো সম্পর্কের কথা তাঁর জানা নেই। ওসি বলেন, সোমবার (আজ) ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে সুমনা ও নজরুলকে আদালতে নেওয়া হবে। সুমনা যে বাসায় থাকতেন, সেই বাড়ির মালিক রওশন আরা বেগম বলেন, সুমনা চার বছর ধরে ওই বাসায় থাকতেন। স্বামী পরিচয়ে নবী প্রায়ই এখানে আসতেন। ভাড়া ও সংসার খরচ তিনিই দিতেন। তবে ইদানীং নবী আর ঠিকমতো সংসারের খরচ দিচ্ছেন না বলে জানিয়ে গত বুধবার বাসা ছেড়ে চলে যান সুমনা।

পটুয়াখালীতে উপ মহাদেশের প্রথম পানি জাদুঘরের যাত্রা শুরু

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার পাখিমারা গ্রামে নির্মিত হলো উপ মহাদেশের প্রথম ‘পানি জাদুঘর’।  সোমবার সকালে এ জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধন করেন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। নদী দখল ও পানি দূষণ কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধিতে নির্মিত হয় এই পানি জাদুঘর।
উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, একশন এইড বাংলাদেশ’র কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির, শমসের আলী, উন্নয়ন সংস্থা আভাস’র নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল, কলাপাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান আ. মোতালেব তালুকদার, ইউপি চেয়ারম্যান আ. মালেক খান। আভাস’র প্রকল্প কর্মকর্তা মনিরুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন উনন্নয়ন কর্মী জয়নাল আবেদীন, হাওয়া বেগম, লাইলী বেগম প্রমুখ।
জাদুঘরে কাঁচের জারে সারিবদ্ধ করে রাখা দেশের প্রধান পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, কীর্তনখোলা, পায়রা, বুড়িগঙ্গা, গড়াই, হালদা, মেঘনা  নদী ও টিউবওয়েলের পানি সংগ্রহ ছাড়াও ছবির ফ্রেমে ফুঁটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড.ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দেশের বিভিন্ন বহমান নদীতে ড্যাম নির্মাণ ও দখলের কারণে নদীর ¯্রােত থেমে যাওয়ায় পলিমাটি নদীর পানির সঙ্গে যেতে না পেরে থেমে যাচ্ছে। এ কারণে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। তাই এই মৃত প্রায় নদীগুলোকে রক্ষার জন্যই এ পানি জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এ জাদুঘরে এক পলকে দেখা যাবে সারা বাংলাদেশের নদী। এছাড়া ছবির ফ্রেমে ফুঁটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি।
একশন এইড বাংলাদেশ’র কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, তাদের লক্ষ দেশের নদী ও নদী সম্পদকে রক্ষা করা। উপমহাদেশে এই প্রথম নদী নিয়ে গভেষনা করার জন্য কোন পানি জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। উদ্ধোধনী অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা জাদুঘর ঘুরে দেখেন।

দ্য ইন্টারভিউ অনলাইনে আয় করেছে দেড় কোটি ডলার

মাত্র চার দিনে সনি’র বহুল আলোচিত ছবি ‘দ্য ইন্টারভিউ’ অনলাইন থেকে আয় করেছে দেড় কোটি ডলার। এর ফলে সনি’র অনলাইনে সবচেয়ে বেশি আয় করা মুভির তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে এটি। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। অনলাইনে ছবিটি ২০ লাখেরও বেশিবার ডাউনলোড করা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে হত্যাপরিকল্পনা নিয়ে ছবিটি তৈরি করা হয়েছে। এ ছবিতে নিজেদের নেতার চরিত্র হরণ করা হয়েছে বলে তীব্র আপত্তি জানায় উত্তর কোরিয়া। ছবিটির মুক্তি বন্ধ করতে সনি ও যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর ভাষায় হূমকিও দেয় দেশটি। এমনকি সনির সার্ভার হ্যাক করে সনির অনেক গুরুত্বপূর্ন তথ্য প্রকাশ করে দেয় হ্যাকাররা। এর মধ্যে রয়েছে অভিনেতাদের পারিশ্রমিক, পরবর্তি চলচ্চিত্র স¤পর্কে বিস্তারিত তথ্য, নির্মিতব্য ছবির স্ক্রিপ্ট থেকে শুরু করে বেশ গুরুত্বপূর্ন অনেক তথ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও সনি এ হ্যকিং-এর জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করে প্রতিশোধ নেয়ার ঘোষণা দেয়। তবে উত্তর কোরিয়া এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। এর পরপরই সাইবার হামলার তোড়ে উত্তর কোরিয়ার ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ কয়েকবারের জন্য একেবারেই ভেঙ্গে পড়ে। এ ঘটনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত রয়েছে বলে দাবি করে উত্তর কোরিয়া। বেশ কয়েকদিন এ নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলে দুই দেশের কূটনীতিক পর্যায়ে। এক পর্যায়ে ছবিটির নির্ধারিত মুক্তির দিন পিছিয়ে দেয় সনি। ততদিনে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ছবিটি নিয়ে ব্যপক আলোচনা শুরু হয়। অবশেষে বড়দিনে ছবিটি অনলাইনে মুক্তি দেয় সনি। আর তাতেই বিশাল অংকের অর্থ ঘরে তুলেছে বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি।

মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ভয়াবহ বন্যায় নিহত ২৪

মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে বন্যায় নিহত হয়েছে ২৪ জন। এক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যায় মালয়েশিয়ায় নিহত হয়েছে অন্তত ১০ জন। সীমান্তের ঠিক ওপাশে অবস্থিত থাইল্যান্ডে ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে শুরু হওয়া বন্যায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে ১৪ জন। বন্যার ফলে বাস্তচ্যুত হয়েছে ২ লাখেরও বেশি মানুষ। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা। মালয়েশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায়ই বন্যা হয়। তবে এ বছর এর তীব্রতা একটু বেশিই ছিল। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের ফলে ঝড়ের তীব্রতা আরও মারাত্মক হবে, পূর্বাভাস দেয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। মালয়েশিয়ায় বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ প্রদেশ কেলান্টানে নিহত হয়েছে ৫ জন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অন্তত ৮০ হাজার মানুষ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক এ সপ্তাহে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কিছু অঞ্চল সফর করেছেন। কেলান্টানে পানির উচ্চতা কিছুটা কমে আসলেও, এখনও বিপদজনক মাত্রায় রয়েছে। এর আগে মালয়েশিয়ান সরকার বলেছে, কেলান্টান ও থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে অব্যাহত বৃষ্টিপাত আরও এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

পিতা-পুত্র দ্বন্দ্ব পিপিপি’র পরিণতি কি!

ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)’র শীর্ষ পদে আসীন পিতা সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও পুত্র দলীয় চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করেছে। ছেলের মান ভাঙাতে লন্ডনে ছুটে যান আসিফ আলী জারদারি। সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থান করেন। কিন্তু ক্ষুব্ধ বিলাওয়ালকে তিনি বাগে আনতে পারেন নি। তাই গতকাল শূন্য হাতে তার পাকিস্তান ফিরে আসার কথা। গতকাল ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো জারদারির মৃত্যুবার্ষিকী। এদিন তার স্মরণ সভায় যোগ দিতে ফিরছেন না বিলাওয়াল। এ নিয়ে পাকিস্তানের মিডিয়ায় বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে। গতকাল ঘড়ি খুদা বকশ-এ বেনজির ভুট্টো স্মরণ সভা হওয়ার কথা। গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দেশে ফেরার বিষয়ে বিলাওয়াল ছিলেন সিদ্ধান্তহীন। অনলাইন ডন লিখেছে, বিলাওয়াল দেশে না ফেরায় গতকালের অনুষ্ঠানে একা একা সভাপতিত্ব করতে পারেন তার পিতা। গত ৩০শে নভেম্বর থেকে পিতা-পুত্রের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূচনা প্রকাশ পায়। ওইদিন ছিল পিপিপি’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সেদিনও অনুপস্থিত ছিলেন বিলাওয়াল। তখন প্রকাশ পায় যে, দলীয় বিষয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। এখানে উল্লেখ্য, পিপিপি’র প্রেসিডেন্ট বিলাওয়াল। ভাইস প্রেসিডেন্ট তার পিতা আসিফ আলী জারদারি। জারদারির বিরুদ্ধে সুইস কোর্টে মামলা থাকায় বেনজির ভুট্টো মারা যাওয়ার পর ছেলেকে বানানো হয় দলীয় প্রধান। তারপর থেকে নানা চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে চলছে পিপিপি। সম্প্রতি কয়েক মাস ধরে লন্ডনে অবস্থান করছেন বিলাওয়াল। দলীয় সূত্র বলেছেন, দলের মূল নেতারা তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সর্বোতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কি নিয়ে তার বিরোধ তা দেশে এসে প্রকাশ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে দলীয় অন্যান্য বিষয়ে তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে বলা হচ্ছে, নিজের ইচ্ছামতো দল সাজাতে চেয়েছিলেন বিলাওয়াল। তা নিয়েই মূলত তার পিতার সঙ্গে বিরোধ। এর সঙ্গে দলের নারীবিষয়ক পার্লামেন্টারি শাখার সভানেত্রী ফারিয়া তালপুরের জন্য আসন অক্ষত রাখা নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। ফারিয়া তালপুর হলেন আসিফ আলী জারদারির বোন। তিনি বোনের জন্য ওই পদটি ধরে রাখার বিষয়ে অনড়। এই নিয়ে পুত্রের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব।  ওদিকে গতকালের অনুষ্ঠানে বিলাওয়াল যোগ দেবেন কিনা সে বিষয়ে তার প্রেস সেক্রেটারি বশির রিয়াজ বিস্তারিত কোন তথ্য দেন নি। তিনি বলেছেন, অপেক্ষা করুন। সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। ওদিকে পিতা-পুত্রের বিরোধ নিয়ে মিডিয়া যখন সরব হয়ে উঠেছে তখন আসিফ আলী জারদারি ও বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি যৌথ ছবি তুলে তা প্রকাশ করে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তাদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। ওদিকে দলের ভিতরে ও বাইরের নেতাদের মধ্যে যে ভাবধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দলের ভিতরে গ্রুপিং সৃষ্টি হচ্ছে- এমন এক সঙ্কট মোকাবিলা করছে পিপিপি। তারা বলছেন, দলীয় বিষয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে এটা দেখার পর পাঞ্জাবে বিলাওয়াল দল পুনর্গঠন আপাতত স্থগিত করেছেন। এ অবস্থায় পিপিপি’র ভবিষ্যৎ কি, দল কোন দিকে যাচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে দেশে ও বিদেশে।

বেঙ্গালুরুতে বোমা বিস্ফোরণ নিহত ১, আহত ৫

ভারতের বেঙ্গালুরুর এমজি রোডের চার্চ স্ট্রিটে এক বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন এক নারী। আহত হয়েছে পাঁচজন। গতকাল রাত আটটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত নারীর নাম ভবানি (৩৭) বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে টাইমস অফ ইন্ডিয়া। এ ঘটনাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু। পুলিশ জানিয়েছে, একটি ডিভাইস থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একটি রেস্টুরেন্টের দুইটি ফুল গাছের মাঝে ডিভাইসটি স্থাপন করা হয়। কর্ণাটক রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কেজে জর্জ বলেছেন, তদন্তের জন্য অপেক্ষা করা হবে। সব ধরণের সতর্কতা গ্রহণ করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং এ ঘটনা নিয়ে এনএসএস, আইবি প্রধান ও স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে আলোচনা করছেন। তিনি ইতোমধ্যেই কর্ণাটক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়াহ-এর সঙ্গে কথা বলে কেন্দ্রের সকল ধরণের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ নিয়ে চারবার দেশটির প্রযুক্তি শহর বলে পরিচিত বেঙ্গালুরুতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলো। এর আগে ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৩ সালেও বোমা বিস্ফোরিত হয়েছিল বেঙ্গালুরুতে। ২০০৮ সালে ৯টি পৃথক স্থানে সিরিজ বোমা হামলায় ২ ব্যক্তি নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছিল। ২০১০ সালে আইপিএল ম্যাচের আগে দুই বোমা বিস্ফোরণে ১৫ ব্যক্তি আহত হয়েছিল। ২০১৩ সালে নির্বাচনের কয়েকদিন আগে বিজেপি রাজ্য সদর দপ্তরের বাইরে এক বোমা বিস্ফোরণে আহত হয়েছিল ১৬ ব্যক্তি।

কাভার্ড ভ্যানে ট্রেনের ধাক্কা, নিহত ৫

(রাজধানীর কমলাপুর রেল স্টেশনের কাছে আজ নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ট্রেনের বগিতে প্রজণ্ড ধাক্কা দেয় একটি কাভার্ড ভ্যান। ছবি: মনিরুল আলম) রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনের কাছে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী একটি ট্রেন আজ সোমবার বেলা দেড়টার দিকে কাভার্ড ভ্যানকে ধাক্কা দিয়েছে। এই দুর্ঘটনায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাঁচজন নিহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে ১১ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বেলা পৌনে দুইটার দিকে কমলাপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মজিদ প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন। তবে তাঁদের নাম জানা যায়নি। আর বিকেল পৌনে চারটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এঁদের মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁর নাম মজিবুর রহমান। রেলওয়ে রেঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন জানান, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের আইসিডি টার্মিনাল থেকে কাভার্ড ভ্যানটি আরেকটি টার্মিনালে যাচ্ছিল। এই দুটি টার্মিনালের মধ্যে রেলপথ আছে। একটি টার্মিনাল থেকে অন্যটিতে যেতে হলে এই পথ পাড়ি দিতে হয়। ফারুক হোসেনের ভাষ্য, আজ বেলা দেড়টার দিকে কাভার্ড ভ্যানটি যখন একটি টার্মিনাল থেকে আরেকটি টার্মিনালে যেতে রেললাইন পার হচ্ছিল, তখন ওই রেলপথে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী একটি ট্রেন চলে আসে। ট্রেনটি কাভার্ড ভ্যানের সামনের অংশটিকে জোরে ধাক্কা দেয়। কাভার্ড ভ্যানের দুমড়ানো-মোচড়ানো অংশকে ছেঁচড়ে প্রায় ৫০ ফুট দূরে নিয়ে যায় ট্রেনটি। এ পথে থাকা গেট ও দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে ওই দুমড়ানো-মোচড়ানো অংশটি ভারী কিছুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে আবার রেললাইনে এসে পড়ে। রেললাইনের ভেতরে ওই অংশ ঢুকে পড়লে ট্রেনের শেষ দিকের বগি লাইনচ্যুত হয়ে কাত হয়ে পড়ে। এতে বগিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার ফলে ওই রেললাইনের পাশাপাশি আরেকটি রেললাইনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইসিডি পরিদর্শক ফজলুল হক চৌধুরী জানান, এখানে ট্রেন চলাচলের সময় ঘণ্টা বাজানো হয়। একটি লাল বাতিও জ্বলে। এর পাশাপাশি আনসারের দুজন সদস্য টার্মিনালের গেটে দায়িত্বে থেকে কাভার্ড ভ্যানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর দাবি, ঘটনার আগে হান্নান ও মিজান নামের আনসারের দুজন সদস্য কাভার্ড ভ্যানটির চালককে থামানোর সংকেত দেন। কিন্তু চালক তা অমান্য করেন এবং গাড়িটি থামাননি। দুর্ঘটনায় আনসারের দুই সদস্য আহত হয়েছেন বলেও তিনি দাবি করেন।

শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনাই যেন শেষ ঘটনা হয় : ড. মো. ইফতেখারুল আলম by মোকাম্মেল হোসেন

যুগান্তর : জিহাদের মৃত্যু পুরো জাতিকে স্পর্শ করেছে। এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু রোধ করতে হলে কোন কোন বিষয়ের ওপর আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে?
ড. মো. ইফতেখারুল আলম : জীবন এবং মৃত্যু- এ শব্দ দুটির সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়তই সম্পৃক্ত হচ্ছি। তবে কিছু কিছু মৃত্যু মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী কষ্টদায়ক চিত্র এঁকে দেয়, যা সহজে ভোলা যায় না। এ ধরনের মৃত্যু আমাদের মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয় এবং হৃদয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। জিহাদের মৃত্যুর কথা ভাবলেই চোখের সামনে যে চিত্রটি ভেসে ওঠে তা হল- একটি চার বছরের উজ্জ্বল, হাসিখুশি প্রাণবন্ত শিশু খেলতে খেলতে মৃত্যুকূপে পড়ে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা গভীর সরু পাইপের মধ্যে অসহায়ভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। এখানে প্রথম কথা হচ্ছে, ঘটনাটি যে একটি দুর্যোগ বা ঝুঁকির দিকে গড়াবে- এ বিষয়টিই আমাদের ভাবনায় ছিল না। দুর্যোগ বলতে সাধারণত আমরা মনে করি, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ইত্যাদিকে। এ জাতীয় ঘটনাও যে ঝুঁকি বা দুর্যোগ হয়ে উঠতে পারে- এটা আমাদের ভাবনা বা চিন্তায় আনতে হবে এবং এ ব্যাপারে মানুষের মধ্যে প্রয়োজনীয় সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সাধারণত যেসব স্থানে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়- সেখানে বড় আকারের সাইনবোর্ড দিয়ে গণবিজ্ঞপ্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা থাকা উচিত। তারপরও দুর্ভাগ্যবশত কোনো দুঃখজনক ঘটনা ঘটলে তা মোকাবেলার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ অন্যদের যথার্থ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা থাকতে হবে।
যুগান্তর : জিহাদের মৃত্যুর দায় কি রাষ্ট্রের? যদি তাই হয়, তাহলে এ ঘটনা থেকে রাষ্ট্রের জন্য শিক্ষণীয় কী আছে?
ই. আ. : কোটি কোটি মানুষের ইচ্ছা ও আগ্রহের বিষয়টি অনুধাবন করে রাষ্ট্র তাকে বাঁচানোর জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু ২০০ ফুট গভীর নলকূপের নিচের ৩৬০ ফুট শীতল পানিতে ভর্তি আর ওপরে ২৪০ ফুট বায়ুপূর্ণ অংশের নিচেরটুকু বিষাক্ত ঈড়২ পূর্ণ। শিশু জিহাদ কূপের ওপর থেকে ২১০ ফুট গভীরতায় প্রথম পানিকে স্পর্শ করে এবং কয়েক মিনিট বা ঘণ্টা পর ৩৬০ ফুট পানির গভীরে চলে যায়, আবার ধীরে ধীরে পানি থেকে ওপরে ভাসতে থাকে। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করে। উদ্ধারকর্মীরা এ ধরনের মানবসৃষ্ট দুর্যোগের সঙ্গে আগে কখনোই পরিচিত ছিল না। তাই কী করা উচিত, কী করব, কীভাবে করব- কিছুই তাদের জানা ছিল না। তবুও তাদের নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি, জ্ঞান-দক্ষতা দিয়ে উদ্ধার কার্য শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এখানে রাষ্ট্রকে সরাসরি দায়ী করা ঠিক হবে না। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি অবশ্যই ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের দায়িত্ব অবহেলাকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান- যে বা যারাই হোক, তারা যদি কারও মৃত্যুর কারণ হয়, তখন তাদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার ভার রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়।
যুগান্তর : জিহাদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমাদের দুর্যোগ বা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার করুণ চিত্র পরিস্ফুট হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনকারী সংস্থাকে কার্যকর ও যুগোপযোগী করতে হলে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন?
ই. আ. : গভীর নলকূপটি হয়তো ডিসচার্জ কম হওয়ার কারণে পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়। পাশেই অন্য একটি নলকূপ স্থাপন করা হয় এবং এটির মাথায় একটি পাথর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়, যাতে কেউ এর ভেতর পড়তে না পারে। পাথর দিয়ে ঢাকনা দেয়া কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নয়। এ চিত্র থেকে অনুমান করা যায়, পুরনো পরিত্যক্ত নলকূপের ভেতরে ৩৬০ ফুট গভীরতার একটি সাব-মার্সিবল পাম্প স্থাপন করে পানি উত্তোলন করে নতুন নলকূপটি স্থাপন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করতে হলে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়, যা ক্রয় করে ব্যবহার করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এজন্য নতুন নলকূপটি খননকালে পরিত্যক্ত নলকূপ থেকে পানি উত্তোলন করা হয়েছে। এ কাজে কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ লেগেছে। নতুন নলকূপটি খনন কাজ শেষ হওয়ার পর পরিত্যক্ত নলকূপটি সিল করা হয়নি। যে কারণে এটি একটি বিপজ্জনক মরণফাঁদে পরিণত হয়। বলা প্রয়োজন, গভীর নলকূপ খননের কয়েকটি ধাপ আছে। এগুলো হল- ১. প্রথমে ড্রিলিং করা এবং ড্রিলিংয়ের গভীরতা হবে পর্যাপ্ত পানি সমৃদ্ধ একুইফার পর্যন্ত ২. ওয়েল ডিজাইন ৩. ফিকচার লোয়ারিং, ৪. গ্রাভেল প্যাকিং ৫. টেস্টিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ও ৬. কমিশনিং। সম্ভবত নতুন নলকূপটি ৪ ধাপ পর্যন্ত সমাপ্ত হয়েছিল।
সাধারণত দুর্যোগ বলতে আমরা যা বুঝি, সেগুলো মোকাবেলায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে অনেক সামর্থ্য-সক্ষমতা ও সফলতা অর্জন করেছে। ’৭০-এর দশকে জলোচ্ছ্বাসে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। বর্তমানে এটাকে সফলভাবে আমরা মোকাবেলা করতে পারছি। একই মাত্রার দুর্যোগে মৃত্যুর সংখ্যা এখন সিঙ্গেল ডিজেটে নেমে এসেছে। এটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।
যুগান্তর : রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন সঙ্গত কারণেই প্রত্যাশিত ছিল। জিহাদ মরে প্রমাণ করল- প্রত্যাশার ন্যূনতম মাত্রাও পূরণ হয়নি। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই যে ব্যবধান- এটা ঘোচাতে হলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি?
ই. আ. আমাদের চারপাশে অদৃশ্যমান অনেক দুর্যোগ আছে, যেগুলোর ব্যাপারে আগেভাগে সতর্ক হওয়া সম্ভব নয়। রানা প্লাজা বা জিহাদের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর জন্য দায়ী যে ভবনধস বা পরিত্যক্ত ও অরক্ষিত গভীর নলকূপ- এসব হচ্ছে তারই দৃষ্টান্ত। এক্ষেত্রে আমাদের সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ঢাকাসহ গাজীপুর ও ভালুকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সমুদ্রের গড় উচ্চতার ৩০ থেকে ৫৫ মিটার নিচে নেমে যাওয়া, দক্ষিণের সাগরের লবণ পানি ভূগর্ভস্থ হয়ে ধীরগতিতে উত্তর দিকে প্রবাহিত হওয়াসহ অন্যান্য কারণে আমরা খুবই ঝুঁকির মধ্যে আছি। আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সেল আছে। এর সঙ্গে অপ্রচলিত দুর্যোগ ও ঝুঁকি মোকাবেলায় এ সেলের অধীনে আলাদা একটা ডিভিশন থাকা উচিত। তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান বা বিষয় সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা বা পূর্বাভাস প্রচারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
যুগান্তর : ওয়াসা-ডিসিসি-বাংলাদেশ রেলওয়ে- এ ত্রয়ীর দায়িত্বহীনতার বিষয়টিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ই. আ. : এখানে মূল দায়বদ্ধতার জায়গাটি হচ্ছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তাকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর। সড়কের ম্যানহোল, ড্রেন ও খালের ব্যাপারে ডিসিসির দায়-দায়িত্ব আছে। গভীর নলকূপের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের ওপর তাদের কোনো হাত নেই।
যুগান্তর : ওয়াসার অনুমতি ছাড়া তো ঢাকা শহরে কোনো নলকূপ স্থাপন সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে তাদেরও তো দায়িত্বের প্রশ্নটি এসে যায়?
ই. আ. : হ্যাঁ। ওয়াসা অনুমতি না দিলে ঢাকায় কোনো নলকূপ বা গভীর নলকূপ স্থাপন করা যায় না। কাজেই শাহজাহানপুরের পরিত্যক্ত ঘোষিত গভীর নলকূপের ক্ষেত্রে তাদেরও একটা দায়িত্ব আছে। বস্তুত কতটুকু দূরত্বে একেকটি নলকূপ স্থাপন করা যাবে- আমি জানি না, এ ধরনের কোনো নীতিমালা ওয়াসার আছে কিনা। না থাকলে দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত।
যুগান্তর : অগ্নিকাণ্ড, ভূমিধস, দুর্ঘটনা ইত্যাদি মানুষসৃষ্ট দুর্যোগ ছাড়াও আমাদের সামনে বহুবিদ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এ রকম একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে ভূমিকম্প। বিশ্বের ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম। ৬ রিখটার স্কেল বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঢাকায় আঘাত হানলে আমাদের পরিণতি কী হবে?
ই. আ. : ভূমিকম্প সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়ার মতো কোনো প্রযুক্তি এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে আবিষ্কার হয়নি। তবে মাটির গর্তে বাস করা কিছু কিছু অনুজীব ভূমিকম্পের আভাস পায় বলে জনশ্র“তি আছে। এ বিষয়ে গবেষণার পাশাপাশি ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কতটা সহনশীল অবস্থায় নিয়ে আসা যায়- সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। ’৮০ দশকে ঢাকায় ভূপৃষ্ঠ থেকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ১০ থেকে ২০ ফুটের মধ্যে ওঠানামা করত। এখন সেটা ২২০ থেকে ২৪০ ফুট নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে মাটির সহনক্ষমতা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। এ অবস্থায় ঢাকায় ভূমিকম্প হলে একটা অংশ দেবে যাবে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে ভূগর্ভস্থ পানির। মাটি থেকে ৭০ ফুট গভীরে আছে বুড়িগঙ্গাসহ আশপাশের নদী ও জলাশয়ের বিষাক্ত পানি। এ বিষাক্ত পানির নিচে কাদা ও পলিথিনের ১০ থেকে ১৮ ফুটের স্তর রয়েছে, যা বিষাক্ত পানিকে ঢাকার পানযোগ্য মিঠাপানি থেকে আলাদা করে রেখেছে। ভূমিকম্পে নদীর তলদেশ এবং কাদা ও পলিথিনের স্তর ফেটে গেলে পানীয় জলের পুরোটাই দূষিত হবে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ভূ-উপরিস্থ পানি দূষণমুক্ত করতে যে প্রযুক্তি, সময় ও অর্থ লাগবে, তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি প্রযুক্তি, সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হবে ভূগর্ভস্থ পানি দূষণমুক্ত করতে। ভূমিকম্পে অন্য ক্ষয়ক্ষতির কথা বাদ দিলেও পানির অভাবেই ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। ঢাকা জনশূন্য হয়ে পড়বে।
যুগান্তর : আগাম কোনো ঘোষণা ছাড়াই ভূমিকম্প পাল্টে দিতে পারে একটি দেশের পুরো মানচিত্র। এ ধরনের ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের কী ধরনের প্রস্তুতি থাকা দরকার।
ই. আ. : পানির স্তর নেমে যাওয়ার বিষয়টি অদৃশ্যমান। তাই বিপদের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা আঁচ করতে পারছি না। এটা জানতে ও বুঝতে হলে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট একটা সংস্থা বা বিভাগকে দায়িত্ব দেয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও কর্মী তৈরি করার পদক্ষেপ নিতে হবে।
যুগান্তর : নিজের সন্তান যখন গভীর অন্ধকার একটি পাইপে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে, তখন পুলিশ জিহাদের বাবাকে ধরে থানায় নিয়ে অমানবিক আচরণ করেছে। পুলিশের এ আচরণ কী প্রমাণ করে?
ই. আ. : নিষ্পাপ হাসিখুশি কোনো শিশু যখন গভীর কোনো নলকূপে পড়ে যায়, তখন যে বিপদগুলো তার সামনে আসে তা হল- একটি অন্ধকার জনমানবশূন্য ভুতুড়ে ভয়াবহ পরিবেশ, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে ২৫-২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার অন্ধকার গভীর পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকে। তার শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। বাতাসের পরিবর্তে ঈড়২ এবং পরে পানি তার নাক-মুখ দিয়ে পেটে চলে যায়। তার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যায়। সে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তবে তখনও সে যে জীবন্ত, বাঁচার একটি আকুতি, করুণ আবেদন তার মনের কোণে ভাসতে থাকে। তার আজন্ম চেনা মমতাময়ী মায়ের ছবি তার মনে জাগতে থাকে। বিশ্বাস করে- মা তাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করবে। পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মায়ের কোলে সে ফিরে যাবে। কিন্তু জিহাদের এ আকুতি তার মায়ের কাছে পৌঁছায়নি। পৃথিবীর আলো দেখার আর সুযোগ তার হয়নি। অনেক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাকে চলে যেতে হল না ফেরার দেশে। এই ছেলেটি যদি আমার বা আপনার বা ওই ঠিকাদারের হতো, তাহলে তার কেমন লাগত? জিহাদ সবার কাছে একটি প্রশ্ন রেখে গেল- আমার কী অপরাধ? যাদের জন্য আমার এই অকালমৃত্যু- তারা কি কেউ বিচারের সম্মুখীন হবে? জনগণের বন্ধু হিসেবে এ বিষয়গুলো পুলিশের মাথায় থাকা উচিত ছিল। পুলিশের অনেক সফলতার পাশাপাশি কিছু কিছু ব্যর্থতাও রয়েছে। ভুল তথ্য বা প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতার অভাবেই এমনটি ঘটে থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, আসল সত্যটা তারা জানতে পারে না। পুলিশেরও এ ধরনের দুর্ঘটনা, ঝুঁকি ও দুর্যোগ সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ থাকা দরকার।
যুগান্তর : কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা আমাদের ব্যর্থতাগুলোকে ধামাচাপা দিতে চাই। জিহাদের ঘটনায়ও তা লক্ষ্য করা গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তাদের কথাবার্তায় তা প্রমাণও হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এ জাতীয় আচরণ জাতিকে কী বার্তা দেয়?
ই. আ. : দেশের মানুষ এ ধরনের মৃত্যু দেখতে চায় না। আর এজন্যই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, অন্যান্য উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ শীতের রাতে ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং দীর্ঘসময় উদ্ধার কাজে বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করেন। টিভি চ্যানেলগুলো নিয়মিত সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে। উৎসুক কোটি কোটি মানুষ জিহাদের সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকলেও তাকে পাওয়া যায় না। তখন এক ধরনের ধূম্রজাল তৈরি হয়। এটা মূলত অজ্ঞতার কারণে ঘটেছে। বিষয়টি তাদের কাছে অস্পষ্ট ছিল। পুলিশ বা সংশ্লিষ্টদের কাছে যে কোনোভাবেই হোক, একটা ভুলবার্তা চলে গেছে। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। শিশু জিহাদের মৃত্যুর ঘটনাই যেন শেষ ঘটনা হয়।
যুগান্তর : জিহাদের উদ্ধার কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা লক্ষ্য করা গেছে। দেখা গেছে, পুলিশ পুলিশের মতো চিন্তা করছে, ফায়ার সার্ভিস তাদের মতো চিন্তা করছে। মন্ত্রী আরেক রকম। যে কোনো দুর্যোগে বিভিন্ন সংস্থা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সমন্বয় কতটা জরুরি।
ই. আ. : এটা একটা বড় জিনিস। কো-অপারেশন অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশনের দারুণ অভাব রয়েছে আমাদের মধ্যে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের ঝুঁকি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।
যুগান্তর : জাতি হিসেবে চরিত্রগতভাবেই কি আমরা বিশৃঙ্খল? জিহাদের ঘটনা কি তাই প্রমাণ করে?
ই. আ. : আমি বিশৃংখল বলব না। মনে রাখতে হবে, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী একটা সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুশৃঙ্খলভাবে যুদ্ধ করেই আমরা স্বাধীন হয়েছি। মূলত ব্রিটিশদের যে কলোনিয়াল সিস্টেম, তা থেকে আমরা এখনও পুরোপুরি মুক্ত হতে পারিনি। জিহাদের উদ্ধার তৎপরতার ক্ষেত্রে প্রথমে এর মধ্যে স্থাপিত সাব-মার্সিবল পাম্পটি উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ৩৬০ ফুট দীর্ঘ এ পাম্পটি তুলতে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়। আশা ছিল, এ পাম্পটির নিচে এমন কিছু আছে যার সঙ্গে আটকে জিহাদ উঠে আসবে আমাদের কাছে। কিন্তু সে প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হল। শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে এক যুবক এগিয়ে এলো নলকূপে নেমে জিহাদকে উঠানোর জন্য। কিন্তু ওই ১৪ ইঞ্চি ব্যাসের ৬০০ ফুট দৈর্ঘ্যরে পাইপের ভেতরে কোনো মানুষকে রশি বেঁধে নামানো হলে তার নিজের মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। এ বিষয়টি যখন টিভি চ্যানেল থেকে জানানো হল, তখন এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত হল সে। এটা একটি বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে। অন্যথায় অজ্ঞতার কারণে পুরো জাতি আর একজন জীবন্ত যুবককে মারার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেত না। এরপর শোনা গেল, বুয়েটের কিছু প্রকৌশলী ‘ক্যাচার’ নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন এবং এর দ্বারা ওই শিশুকে সহজে ওপরে তুলে আনা সম্ভব হবে। মানুষ আবার নতুন আশায় ভর করে অপেক্ষা করছিল। এ সময় ওয়াসা ও একটি বেসরকারি সংস্থা কূপের মধ্যে ক্যামেরা নামিয়ে ছবি সংগ্রহ করে এবং জানায়- কূপের ভেতর কোনো শিশুর অস্তিত্ব নেই। সবাই হতাশ হয়ে গেল। তখন সন্দেহ হল- জিহাদ আসলেই ওই কূপে পড়েছে কিনা। এর মধ্যে অন্যান্য টিভি চ্যানেলে প্রচারিত সংবাদে উদ্ধার কর্মীরাও সন্দিহান হয়ে গেল। ক্যামেরা সরিয়ে নেয়া হল, ক্যাচারের যন্ত্রাংশ খোলা হল এবং তারা ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল। এসব বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঘটেছে- এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
যুগান্তর : মৃত জিহাদকে উদ্ধারে স্থানীয় প্রযুক্তি সফলতা পেয়েছে। কিন্তু এ ধরনের প্রযুক্তি বড় মাপের কোনো দুর্যোগ বা ঝুঁকি মোকাবেলা করতে সক্ষম নয়। এ ক্ষেত্রে দুর্যোগ ও ঝুঁকি মোকাবেলায় জনআগ্রহকে কাজে লাগিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তুলে সুফল পাওয়া যাবে কি?
ই. আ. : যে কোনো মুহূর্তে উদ্ধার কাজ পরিত্যক্ত ঘোষণা হতে পারে- এমন একটা অবস্থায় একজন বিশেষজ্ঞের কথা প্রচার করা হল- যেহেতু দুজন শিশু একসঙ্গে মাঠে খেলা করছিল, তাদের একজন কূপের মধ্যে পড়ে যাওয়ার পর আরেকজন দৌড়ে গিয়ে জিহাদের মাকে খবর দিয়েছে, জিহাদ কূপে পড়ে গেছে। এ সংবাদ মিথ্যা হতে পারে না। নিষ্পাপ শিশুরা মিথ্যা বলতে পারে না। জিহাদের দেহ অবশ্যই ওই কূপে আছে এবং এটা তোলা সম্ভব। স্থানীয় জনতা আগ্রহী হয়ে উঠলেন তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি ব্যবহার করে জিহাদকে তোলার জন্য। দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেল, কিন্তু তাদের অনুমতি দেয়া হল না। অনেকের ধারণা, যারা এ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী, তারা প্রভাব খাটিয়ে জিহাদের মৃতদেহ নলকূপ থেকে না তুলে নলকূপে আদৌ কেউ পড়েনি, তা প্রমাণ করার জন্য নানাভাবে প্রচেষ্টা শুরু করে। ফলে এক সময় বলা হয়, কূপের মধ্যে জিহাদ নেই এবং উদ্ধার কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। উৎসুক জনতা বিষয়টি বুঝতে পেরে ক্ষোভে ফেটে পড়লে কয়েক মিনিট পর স্থানীয় লোকদের স্থানীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে অব্যাহত প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে ৬০০ ফুট গভীরতার ৩৮৫ ফুট গভীর থেকে তুলে আনা হল জিহাদকে। সবাই অবাক দৃষ্টিতে দেখল- বাঁ-হাতের বাহু দিয়ে চোখ ঢেকে সে ঘুমিয়ে আছে। সবাই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হল। কিন্তু পরক্ষণেই দেখা গেল, জিহাদের দেহে প্রাণ নেই। এটা অবশ্যই একটা শিক্ষণীয় ঘটনা। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্যোগ মোকাবেলায় স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করা যেতে পারে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার সময় এ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ সরকারি বাহিনীর পাশাপাশি উদ্ধার কাজে অংশ নিয়েছিল। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রযুক্তির সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে ফলপ্রসূ ব্যবস্থা উদ্ভাবন ও ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে।
যুগান্তর : যে কোনো দুর্ঘটনা রোধে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজ ও পরিবারের কী ভূমিকা হওয়া উচিত?
ই. আ. : ছেলেমেয়ে কোথায় যাচ্ছে, কোথায় আড্ডা বা খেলাধুলা করছে, কাদের সঙ্গে মিশছে- এটার দেখার দায়িত্ব মূলত পরিবারের। রাষ্ট্রের পক্ষে তো প্রতিটি মানুষের দেখভাল করা সম্ভব নয়। এ কাজ বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনদেরই করতে হবে। তবে রাষ্ট্র যেটা করতে পারে তা হল- একটা জ্ঞানভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, যত্নশীল হতে পারে।
যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
ই. আ. : আপনাকেও ধন্যবাদ।

ডিএমপি কমিশনারের জবাবদিহি চাই by মহিউদ্দিন আহমদ

ইটালির এক শিশুকে গভীর এক গর্ত থেকে উদ্ধার চেষ্টার স্মৃতিটা আজ ৪০ বছর পরও ভুলতে পারি না। ১৯৭৫ বা ৭৬-এর কোনো এক সময়। আমি তখন জেনেভায় বাংলাদেশের জাতিসংঘ মিশনে কর্মরত। তখন টিভির এমন ব্যাপক ব্যবহার ছিল না। তবু যে কটি চ্যানেল চালু ছিল- ইউরোপের প্রায় সব বয়স্ক মানুষকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল শিশুটির উদ্ধার প্রচেষ্টার সম্প্রচার দিয়ে।
শিশুটির বয়স তখন বোধ হয় তিন বা চার- আমাদের জিহাদের বয়সী। ইটালির সেই শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল কিনা, এখন মনে নেই। তবে মনে আছে ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে আসা ইটালির প্রেসিডেন্টের এক মন্তব্য : মানুষকে চাঁদে পাঠিয়ে সুস্থ অবস্থায় আবার ফেরতও আনতে পারছে মানুষ। কিন্তু গর্তে পড়ে যাওয়া একটা শিশুকে উদ্ধার করার প্রযুক্তি এখনও মানুষ আবিষ্কার করতে পারল না, কী লজ্জা! ইটালির প্রেসিডেন্টের ওই মন্তব্যের পর এক্ষেত্রে গত ৪০ বছরে প্রযুক্তির বেশ উন্নতি ঘটেছে; দুনিয়ার অনেক জায়গাতেই এমন উদ্ধার করা শিশুদের কিছু বর্ণনা গতকাল আমাদের এক টিভি চ্যানেলে দেখলাম। তবে শিশু জিহাদের ব্যর্থ সরকারি উদ্ধার প্রচেষ্টায় দেখলাম, আমাদের অবস্থা যেমন ছিল তেমনই আছে। যে কোনো দুর্ঘটনার পর আমাদের সরকারগুলোর ব্যর্থতা গত কয়েক বছরে কতবারই না দেখল এদেশের মানুষ। সাভারে কয়েক বছর আগে একটি ভবনের ধস দেখল মানুষ, তাজরিন গার্মেন্ট, রানা প্লাজা ট্রাজেডি, পিনাক লঞ্চডুবি, দেশের বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনা এবং এই সিরিজে শুক্র-শনিবার শাহজাহানপুরের উল্লেখিত দুর্ঘটনা। শাহজাহানপুরের দুর্ঘটনাটি সর্বসাম্প্র্রতিক, কিন্তু সর্বশেষ দুর্ঘটনা নয় মোটেও।
জীবনের শেষ কয়েক ঘণ্টা শিশু জিহাদ কিভাবে কাটিয়েছে ভাবতে গেলে আমার শরীর অবশ হয়ে আসে। শিশুটি নিশ্চয়ই তার বাবা-মাকে ডেকেছে, অন্ধকারে অঝোরে কেঁদেছে। তার বন্ধুদের কথাও তার মনে পড়েছে। কিন্তু কেউই তার কাছে যাচ্ছে না। তার গায়ে শীতের কাপড়ও নেই। আমরা ওই শিশু বয়সে যখন ভয় পেয়েছি, মায়ের বুকে ঢুকে পড়েছি, সেখানে আশ্রয়ও পেয়েছি। শাহজাহানপুরের সেই গর্তের আশপাশে যারা শিশুটির উদ্ধার তৎপরতা দেখেছে- তখন তারাও সাহায্য করতে পারছে না। তারা দেখতে পারছে, বুঝতে পারছে, একটি নিষ্পাপ নিরীহ অসহায় শিশু মারা যাচ্ছে। কিন্তু তারাও অসহায়, শিশু জিহাদের মৃত্যুটি পানিতে ডুবে কয়েক মিনিটের মৃত্যু না। মারা যাওয়ার আগে বোধহয় অচেতন হয়ে মৃত্যুও নয়। মৃত্যুর ভয়-বিভীষিকা-যন্ত্রণায় প্রতিটি সেকেন্ড তাকে সাফার করতে হয়েছে। সরকারের এ ব্যর্থতার পাশাপাশি পুলিশের নিষ্ঠুরতাও আবার ধরা পড়ল এ দুর্ঘটনায়।
জিহাদের বাবা নাসির ফকিরকে ১২ ঘণ্টা আটকে রাখল শাহজাহানপুর থানা পুলিশ। ছেলে বেঁচে আছে না মারা গেছে- তা জানেন না বাবা, শিশু জিহাদের মঙ্গল চিন্তায় অস্থির বাবা। কিন্তু পুলিশ তাকে র‌্যাবের ভয়ও দেখায়। প্রকৃত ঘটনা চাপা দেয়ার অপচেষ্টা করে আরেকটি অপরাধ করে খোদ পুলিশ। আওয়ামী লীগের এমপিদের হাতে আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মারধর খাওয়া এবং লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাসমূহের নিন্দা জানিয়ে আমি কয়েকবার আমার কলামে লিখেছি। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আমার এমন সমর্থনের প্রশংসায় তৎকালীন আইজিপি, বর্তমান ক্রীড়া সচিব নূর মোহাম্মদ আমাকে চিঠিও লিখেছেন।
জিহাদের বাবা নাসির ফকিরের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতার নির্দেশ নিশ্চয়ই ওপর মহল থেকে এসেছে। কিন্তু এই ওপর মহলের ব্যক্তি কে? দেশের কোনো গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশের আইজি, ঢাকার পুলিশ কমিশনার, নাকি খোদ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে এখন একজন জোকারই মনে হয়। ঢাকার পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ গত বছরের সেপ্টেম্বরে আদুরী নামে চরম নির্যাতিতা এক শিশু কাজের মেয়েকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়েছিলেন কিছু ফলমূল নিয়ে। তাকে তারিফ করে কলাম লিখেছিলাম। টেলিফোনেও তারিফ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ধরেননি। তাকে দয়াময় একজন মানুষ ভেবেছিলাম। কিন্তু এখন আর তা মনে করতে পারছি না। তারই সরাসরি অধীনস্থ শাহজাহানপুর থানার কিছু পুলিশ সদস্য জিহাদের বাবাকে তেলাপোকার মতোই গণ্য করল!
কমিশনার বেনজীর আহমেদকে এখন আর দয়ামায়ার মানুষ মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে একজন প্রাচীন আমলের পুলিশ। এখন আমার আশংকা, কোনো নেতা-মন্ত্রী জিহাদের বাবা-মাকে অফিসে ডেকে নিয়ে কিছু টাকা ধরিয়ে দেবে এবং আবার অপমান করবে; কিন্তু মাফ চাইবে না। চারপাশের এত ব্যর্থতা ও দুর্ঘটনার পরও কয়েকজন তরুণ শিশু জিহাদকে তুলে এনে, হোক না তা একটি লাশ, মানব প্রেমের যে উদাহরণ সৃষ্টি করল তাদের প্রতি শ্রদ্ধায় আমি মাথানত করছি। এদেশের কোটি মানুষ শিশু জিহাদকে কোনোদিন দেখেনি। কিন্তু তার জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া-দরুদ পড়েছে। তার বাবা-মার সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠেছে। সবশেষে আমার দুটি প্রশ্ন : ঢাকনা খোলা রাখার জন্য দায়ী সে কন্ট্রাক্টর এসআর কোম্পানির মালিকের নাম ঠিকানা কী? তিনি কোন দল করেন? এতসব নেতা-মন্ত্রী ঘটনাস্থলে গেলেন, কিন্তু শাহজাহানপুরের নির্বাচিত এমপি এ কয়দিন কোথায় থাকলেন? তার নাম এ দুদিনে একবারও কোথাও দেখলাম না কেন?
মহিউদ্দিন আহমদ : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব

শিশুটির মৃত্যু এড়ানো যেত by প্রফেসর এমআর কবির

ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য বসানো গভীর নলকূপের গর্তে শিশু জিহাদ অসতর্কতাবশত পড়ে যাওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশে এই প্রথম হলেও এ ধরনের দুর্ঘটনা বিভিন্ন দেশে বহুবার ঘটেছে। ওই সব তথ্য বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞ এবং কর্মীর কম বেশি অবগত থাকার কথা। আমাদের প্রত্যাশা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত কর্মী ও বিশেষজ্ঞরা জানা তথ্যের আলোকে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া যে কোনো দুর্যোগ-দুর্ঘটনা পরবর্তী পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবেন।
ইতিমধ্যে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়- বিভিন্ন দেশে শিশুরা যেসব গভীর খাদে বা গর্তে পড়েছে, সেগুলোর গভীরতা প্রায় ৫০, ১০০ বা ২০০ ফুট। ২০০ ফুটের বেশি গভীর খাদ বা গর্তে কোনো শিশু পড়েছে এমন তথ্য আমাদের জানা নেই। কাজেই এ কাজে নিয়োজিত সরকারি উদ্ধারকারী দলের প্রস্তুতি থাকে মোটামুটি ২০০ বা ২৫০ ফুট গভীরে পড়ে যাওয়া কাউকে উদ্ধার করার।
কোনো গভীর খাদ বা গর্তের গভীরতা যত বাড়তে থাকে অক্সিজেনের পরিমাণ ততো কমতে থাকে। কোনো শিশু বা এমনকি বয়স্ক কেউ গর্তে পড়ে গেলে গভীর খাদে অক্সিজেনের স্বল্পতার কারণে বেশি সময় বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। গভীর খাদে পড়ে যাওয়ার পর শারীরিক সমস্যা ছাড়াও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা বেড়ে যায়। সাধারণভাবে ওই অবস্থায় অলৌকিক কিছু না ঘটলে বা কৃত্রিম উপায়ে অক্সিজেন সরবরাহ না করা হলে একজন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে কয়েক ঘণ্টার বেশি বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। পরিত্যক্ত থাকার কারণে শাহজাহানপুরের নলকূপের গর্তটিতে কার্বনডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেশি থাকার আশংকা রয়েছে- যা মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ব্যাঘাত ঘটাবে। এছাড়া পরিত্যক্ত পাইপ বা গভীর গর্তে আরও অন্যান্য দূষিত পদার্থ থাকা স্বাভাবিক। উদ্ধারকারী দল শাহজাহানপুরে দুর্ঘটনাকবলিত শিশুটির অবস্থান দ্রুত নির্ণয় করতে পারেনি এবং একপর্যায়ে শিশুটিকে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়। উদ্ধারকারী দলের আধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বেশি থাকলে তারা অল্প সময়ে শিশুটির অবস্থান নির্ণয় করে অক্সিজেন ও আলোর ব্যবস্থাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারত। উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত আধুনিক যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল না থাকলে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও উদ্ধার কাজে কাক্সিক্ষত সুফল মিলবে না।
গভীর নলকূপে মোটা পাইপের ব্যবহার অপরিহার্য হলে ভূমি থেকে কয়েক ফুট নিচে গর্তের ভেতরে আড়াআড়িভাবে কয়েকটি প্লেট যুক্ত করে দিলে বড় মাপের কোনো বস্তু ওই প্লেটে আটকে থাকবে। আগামীতে যাতে জিহাদের মতো অন্য কোনো শিশুকে করুণ পরিণতি বরণ করতে না হয়, সে জন্য উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত হয় এমন পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করে বিশেষভাবে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। উদ্ধারকারী দল যাতে ঘটনাস্থলে স্বল্পতম সময়ে পৌঁছতে পারে তা-ও নিশ্চিত করা দরকার। যুক্তরাষ্ট্রে ৯১১ নম্বরে ডায়াল করলে উদ্ধারকারী দল স্বল্পতম সময়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে। আমাদের দেশেও এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ ধরনের প্রস্তুতি না থাকলে ভূমিকম্পসহ অন্য যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাবে।
যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরীক্ষা-নিরীক্ষাও অব্যাহত রাখলে কী সুফল মিলবে তা জিহাদের উদ্ধারে আমরা লক্ষ্য করলাম।
প্রফেসর এমআর কবির : প্রো-ভিসি, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়

ডায়াবেটিক ও সিজোফ্রেনিকের লড়াই by মাহবুব কামাল

ইমম্যাচিউরের কথায় ম্যাচুউরিটি থাকে না-এই বাক্যটি দিয়ে লেখাটা শুরু করলে বুদ্ধিমান পাঠক ধরে ফেলবেন আমাকে। কারণ, বাক্যটিতে চক্রাবৃত্ত অনুপপত্তি ঘটেছে- একই কথা দুবার বলা হয়েছে। অনির্ভরযোগ্যকে নির্ভর করা যায় না- এই বাক্যের মতো। অনির্ভরযোগ্যকে যে নির্ভর করা যায় না, তা যেমন আলাদাভাবে বলার দরকার হয় না, তেমন ইমম্যাচিউর যে ম্যাচিউরিটির পরিচয় দেবে না- এটাও স্বাভাবিক। কিন্তু যদি বলি, ম্যাচিউরও কখনও কখনও ইমম্যাচিউরিটি দেখায়, তাহলে ভুল হবে না। অবশ্য সেক্ষেত্রেও কেউ বলতে পারেন, যে মুহূর্তে ইমম্যাচিউরিটি দেখানো হল, সেই মুহূর্তে লোকটি আর ম্যাচিউর থাকল না, ইমম্যাচিউর হয়ে গেল।
তো একটি সাপ্তাহিকের এক অনুজপ্রতিম (আসল নামটা কেন দিলাম না, পাঠক পরে বুঝবেন নিশ্চয়ই। ধরা যাক তার নাম জামান) যথেষ্ট ম্যাচিউর। তাকে প্রায়ই বলতে শোনা যায়- আরে, এটা তো আমি ৮৫ সালেই বুঝে ফেলেছিলাম। হবে হয়তো, কারণ তিনি সাধারণত মিথ্যা বলেন না। তবে সত্যবাদী মানেই সত্যসন্ধানী নন। সত্যকে স্পর্শ করা বড় কঠিন কাজ, সত্যবাদীর পক্ষে তা সম্ভব না-ও হতে পারে। আর তাই হয়তো জামান এমন এক কথা বলে ফেলেছেন, যা ইমম্যাচিউরিটির নামান্তর। কথাটি নিছকই সুইপিং কমেন্ট হলে তা নেগলিজিবল বলে উড়িয়ে দিতাম। চায়ের আড্ডার কথার মতো। এরূপ আড্ডায় লোকে মুহূর্তে মুহূর্তে সুইপিং কমেন্ট করে। সেগুলো চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে মিলিয়েও যায়। আমরা যখন বলি- অল করাপ্ট, সেটা সুইপিং কমেন্ট, কারণ সমাজে দুর্নীতিমুক্ত মানুষও আছে। যাহোক, জামানের মন্তব্যটি সুইপিং নয়, তিনি জেনে-বুঝেই করেছেন তা। হয়তো তার মতো আরও অনেকেই এই ধারণা পোষণ করেন। জামান বলেছেন, এদেশের সব মন্দ কাজের সূত্রপাত করেছে আওয়ামী লীগ, এই দলটি যতদিন না ধ্বংস হচ্ছে, ততদিন এদেশে কিছু হওয়ার নেই!
এদেশের সব মন্দ কাজের সূত্রপাত আওয়ামী লীগ করেছে কি-না কিংবা দেশের অগ্রগতির জন্য আওয়ামী লীগের ধ্বংস অনিবার্য শর্ত কি-না, ভেবে দেখার ফুরসত পাইনি। কীভাবে পাবো? আওয়ামী লীগ ধ্বংস হয়ে যাবে- এটা ভেবেই তো অস্থির। জামান কি মনে করেন, আওয়ামী লীগ ধ্বংস হয়েও যেতে পারে? তা না হলে অমন কথা বলবেন কেন? আমাদের অনেকেই, এমনকি ভাষাবিদরাও আশংকা বলতে বা লিখতে হবে যেখানে, সেখানে সম্ভাবনা বলেন বা লেখেন। যেমন লেখেন- এবার বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আওয়ামী লীগ ধ্বংস হয়ে যাবে- জামানের কাছে হয়তো এটা সম্ভাবনা; তবে বাণীটি সম্ভাবনার, না আশংকার, সেটা আমাদের প্রতিপাদ্য নয়। আমরা শুধু যাচাই করব আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা আদৌ সম্ভব কি-না।
শুরুতেই উপসংহার টানার নিয়ম আছে কি? থাকলে নিয়মটা ভাঙলাম। না, আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। একমাত্র প্রকৃতিই যদি পারে তা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের রেকর্ডসহ এ অঞ্চলের সভ্যতা যদি কখনও হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর মতো তলিয়ে যায়, তাহলে এরপর নবউত্থিত সভ্যতায় আওয়ামী লীগ বলতে হয়তো কিছু থাকবে না। অন্যথায় নয়। তিনটি বড় কারণে।
প্রথমত, আওয়ামী লীগ এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দল। স্বাধীনতা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। সৈয়দ হক বলেছেন, সব অনুভূতি মানুষের মধ্যে বাস করে আর মানুষ বাস করে প্রেমানুভূতির ভেতর। রোমান্টিক তো, তাই এমন বলেছেন। আমি বলি, মানুষ বাস করে স্বাধীন সত্তার ভেতর। এই স্বাধীন সত্তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে দল, তাকে ধ্বংস করতে চাইলে এই সমাজে তাই সবসময়ই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ পাওয়া যাবে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্টের কারণে যারা তা প্রতিহত করতে এগিয়ে আসবে। ভারতের স্বাধীনতা-সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল কংগ্রেসকে যেমন ধ্বংস করা যায় না, দুর্বল করা যায় মাত্র; বাংলাদেশেও তেমন আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা যাবে না, বড়জোর দুর্বল করা যাবে। কেউ হয়তো বলবেন, এ অঞ্চলের স্বাধীনতার জন্য মুসলিম লীগও তো একসময় নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেটি ধ্বংস হল কীভাবে? এর সহজ উত্তর- এ অঞ্চলে মুসলিম লীগের ধ্বংসের জন্য পাকিস্তান ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। মুসলিম লীগ প্রাসঙ্গিক ছিল পাকিস্তানের ক্ষেত্রে, বাংলাদেশের নয়। যে হেতুর (cause) জন্য মুসলিম লীগ ফাইট করেছিল, সেটিই যখন আর থাকল না, তখন দলটির ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগের ধ্বংস দেখতে চাইলে আমাদের প্রবেশ করতে হবে আরেকটি স্বাধীন ভৌগোলিক রাজ্যে এবং সেই আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দলটিই কেবল পারবে আওয়ামী লীগকে প্রতিস্থাপিত করতে। ভাবুন কত অসম্ভব কল্পনা! জামান হয়তো বলবেন, ভৌগোলিক স্বাধীনতাই কি শেষ কথা? স্বাধীন দেশের মানুষ কি পরাধীন জীবনযাপন করে না? গণতন্ত্রহীন মানুষ কি প্রকৃত স্বাধীন? কোনো দল যদি নিজভূমে পরাধীন থাকা মানুষকে স্বাধীন করতে পারে, সেক্ষেত্রে? এর উত্তর হচ্ছে- নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা, নিরঙ্কুশ গণতন্ত্র বলতে কিছু নেই পৃথিবীতে, হ্যাঁ কোথাও নেই। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র দুটোই আপেক্ষিক প্রপঞ্চ (phenomenon)। এই আপেক্ষিকতা নিয়ে তর্ক চলে, সিদ্ধান্ত টানা যায় না। যখন-তখন, যেখানে-সেখানে সিদ্ধান্ত টানা একটা বদঅভ্যাসে পরিণত হয়েছে আমাদের।
দ্বিতীয় যে কারণে আওয়ামী লীগ ধ্বংস হবে না, সেটা জীববৈজ্ঞানিক। জীববিজ্ঞানে প্রাণীবর্গের প্রধান বিভাগ বা গোত্রকে বলে phylum- যেমন সরীসৃপ প্রাণীদের phylum হল রেপটাইলা, উভচরদের অ্যাম্ফিবিয়া। বাঙালি প্রাণিকুলের একটি প্রধান গোত্র বা ঢ়যুষঁস হল আওয়ামী লীগ। সে টিকে থাকবে প্রজনন ক্ষমতার জোরে। প্রশ্ন, তবে কি ডায়নোসর বিলুপ্ত হয়নি? হয়েছে এবং সেটা প্রতিকূল পরিবেশে অভিযোজিত হওয়ার ক্ষমতার অভাবে। আওয়ামী লীগের সেই ক্ষমতা আছে। প্রতিকূল পরিবেশে আওয়ামী লীগের অভিযোজিত হওয়ার ক্ষমতা আয়ুব-ইয়াহিয়াই টের পাননি শুধু, ৭৫-পরবর্তী সময়ে জিয়া, ২০০১ সালের নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া এবং এক-এগারোর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা (বুয়েট থেকে পাস করা হলে ঘটনা অন্যরকম হতো) টের পেয়েছেন ভালোভাবেই।
তৃতীয়ত, কর্মদোষে অর্থাৎ ভ্রান্ত রাজনীতির কারণে আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা-উত্তরকালে কখনও কখনও দুর্বল (জনসমর্থনহীনতাজনিত দুর্বলতা) হয়ে পড়েছে ঠিক; কিন্তু তাকে ধ্বংস করতে পারে এমন শক্তিধর সুঠাম দেহ কোথায়? আওয়ামী লীগ যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন নির্বাচনে হারে; কিন্তু তাকে ধ্বংস করার শক্তি ধারণ করে না কেউ। এক অর্থে দেশের সব রাজনৈতিক দলই কম-বেশি দুর্বল, কোনোটাই সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্নাতীত নয়। এক দুর্বল আরেক দুর্বলকে ধ্বংস করতে পারে না, অর্থাৎ দৌর্বল্যে দৌর্বল্যে কাটাকাটি হয়ে যায় এবং তাই সবগুলোই টিকে আছে। এমন কোনো সময় যদি আসে, যখন উন্নত সংস্কৃতি ও যথার্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ছাড়া রাজনীতি করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, অপরাজনীতিকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করতে প্রস্তুত হবে, তখন আওয়ামী লীগসহ সবাইকেই তাদের স্বভাব পরিবর্তন করতে হবে। সেক্ষেত্রে কাউকে ধ্বংস করার কিংবা কারও ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রশ্ন অবান্তর হয়ে পড়বে।
হ্যাঁ, ২০০৮ সালের নির্বাচনের অব্যবহিত আগ থেকে এ বছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত শত আন্দোলন ও নাশকতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল; কিন্তু এর পর দলটি দুর্বল হয়ে পড়ছে দিন দিন। নিজের দুর্বলতা ঢাকতে বিরোধী দলকে আঘাত করে তাকেও দুর্বল করতে চাইছে এখন ক্ষমতাসীন এই দল; তবে বুঝতে পারছে না এতে তার নিজের ফিজিওলজিক্যাল সিস্টেমগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এই মুহূর্তে মেডিকেল চেকআপ করালে দেখা যাবে, অলক্ষ্যেই দলটির শরীরে সুগারের মাত্রা বেড়ে গেছে অনেক, যা অ্যাফেক্ট করছে নানা সিস্টেম ও অরগ্যান। ইতিমধ্যেই তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে পড়েছে, যে কারণে দেখতে পারছে না অনেক কিছু। আওয়ামী লীগ কিছু কাজ কেন করল আর কিছু কেন করছে না, বিলাতের আবহাওয়া বুঝতে পারার চেয়েও বুঝি কঠিন সেটা বোঝা। এই দল তিনটি বড় গণতান্ত্রিক শুভশক্তি নিয়ন্ত্রণের ভার হাতে তুলে নিয়েছে- বিচারপতি, সম্প্র্রচার ও বিরোধী দল। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পর্যবেক্ষক যারা, তারা জানেন যে, যে সরকার যত কম শাসন করে, সেই সরকার ততো বেশি স্থায়ী হয়। অথচ বর্তমান সরকার অতিরিক্ত শাসন করে টিকে থাকতে চাইছে। শাসনটা যদি অপরাধ দমন কিংবা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট হতো তাহলে এক কথা ছিল। চারদিকে হত্যা, দুর্নীতির সূচক বাড়ছে, বাড়ছে তেল-গ্যাসের দাম, ওষুধের দামও, ফাঁস হচ্ছে প্রশ্নপত্র- কোথায় শাসন? শাসন মানে কি ক্ষমতার প্রতি হুমকি দমন?
প্রশ্ন উঠতে পারে, আওয়ামী লীগ তো বোঝা হল, বিএনপি কি সুস্থ? না, বিএনপিও অসুস্থ। তার রোগের নাম সিজোফ্রেনিয়া। সিজোফ্রেনিয়ার একটি টাইপ হল, আক্রান্ত ব্যক্তি বাস্তব জগৎ থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সে নিজের মতো করে জগৎ গড়ে তোলে, কারও কথা শুনতে চায় না। এ অবস্থায় কখনও সে হঠকারীও হয়ে উঠতে পারে। আমরা এখন যে লড়াইটা দেখছি, তা আসলে ডায়াবেটিক ও সিজোফ্রেনিকের লড়াই।
ওলবার্স নামের এক জ্যোতির্বিজ্ঞানী একটা কূটতর্ক তুলেছিলেন বহুকাল আগে। এটি 'lburs' paradox বা ওলবার্সের কূটাভাস নামে পরিচিত। তিনি বলেছিলেন- রাতের আকাশে সূর্য নেই ঠিক আছে; কিন্তু আলো বিকিরণকারী লক্ষ-কোটি নক্ষত্র তো আছে। তার তর্কটা- রাতের আকাশ তবু অন্ধকার কেন? ৭৫-এর ১৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সূর্য চিরকালের জন্য অস্তমিত হয়েছে সত্য; কিন্তু এই দলে ছিল অসংখ্য তারকা। এত তারকা-রাজনীতিক থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ একুশ বছর দলটির অন্ধকার কাটেনি। কেন?
হ্যাঁ, এটাও এক কূটাভাস। মর্মার্থটি খুঁজে বের করতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে। তা না হলে আওয়ামী লীগকে হয়তো আরেকবার প্রবেশ করতে হবে দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকারে।
পুনশ্চ : ছাত্রলীগ নিয়ে আমার লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পর সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের এক কর্মী অনেক কথা বলার ফাঁকে বলেছে- ছাত্র রাজনীতি নিয়ে গর্ব করার মতো কিছুই কি নেই?
এই ছাত্র সংগঠনটির কর্মীদের প্রতি আমি সহানুভূতিশীল। প্রায়ই ১০ টাকার বিনিময়ে তাদের লিটারেচার কিনে থাকি। এটা ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের মতো চাঁদাবাজি নয়। এই টাকা দিয়ে তারা সংগঠন চালায়, আদর্শকে সমুন্নত রাখে। একটি অধঃপতিত সমাজে তারা মেইনস্ট্রিমে আসতে পারবে না, এটাই স্বাভাবিক। যাহোক।
ছাত্রফ্রন্ট কর্মী প্রশ্ন করেছেন- ছাত্র রাজনীতির কোনো গৌরব আছে কি-না। কখনও কখনও এক প্রশ্নের দুই উত্তর থাকে। গল্পটি পড়ুন আগে।
স্কুল পরিদর্শনে এসেছেন ইন্সপেক্টর। পঞ্চম শ্রেণীতে ঢুকে তিনি ফার্স্ট বয়কে দাঁড়াতে বললেন। এরপর বললেন- বলো তো, বৃষ্টি কেন হয়?
ছেলেটি সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলল- স্যার, এখনকার বৃষ্টি, না এক ঘণ্টা পরের?
ইন্সপেক্টর সামান্য বিচলিত হয়ে বললেন- ধরো এখনকার বৃষ্টি।
সে বলতে থাকল- তাহলে স্যার, সমুদ্রের পানি সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে উপরে ওঠে, তারপর সেই বাষ্প ঠাণ্ডা হয়ে ধীরে ধীরে পানির আকারে নিচে নামে।
- আর এক ঘণ্টা পরের বৃষ্টি?
- সেই বৃষ্টি স্যার, হজরত মিকাইল আলায়সাল্লামের আদেশে হয়।
ইন্সপেক্টর কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। ছেলেটি ব্যাখ্যা দেয়, বুঝলেন না স্যার? এখন চলছে বিজ্ঞান ক্লাস আর এক ঘণ্টা পরে হবে ধর্ম ক্লাস।
ছাত্রফ্রন্টের কর্মী এবার দুপ্রকার উত্তর দেখুন। স্বাধীনতা-পূর্ব ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস গৌরবের। এমনকি স্বাধীনতার কুড়ি বছর পর পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে এই গৌরবের রেশ থেকেছে। কিন্তু ৯০-এর অভ্যুত্থানের পর যেদিন আমানউল্লাহ আমান শেখালেন ছাত্র রাজনীতি করে কোটিপতি হওয়া যায়, সেদিন থেকেই এই রাজনীতি কালিমালিপ্ত হওয়া শুরু করেছে। এই কালি এখন হাঁড়ির কালির চেয়ে কালো।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

রাজনৈতিক সহিংসতা- ক্ষমতায় থেকেও খুনোখুনি by শরিফুজ্জামান

গত ছয় বছরে (২০০৯-১৪) সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অন্তত ১৭২ জন নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও চরমপন্থীদের হাতে খুন হয়েছেন আরও ৭৪ জন। ২০০৯ থেকে এ বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকেও দলটি এই ২৪৬ নেতা-কর্মীকে রক্ষা করতে পারেনি। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য সংরক্ষণ ইউনিট, প্রথম আলোর ৬৪ জেলা প্রতিনিধির সংগৃহীত তথ্য, প্রথম আলোয় প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন এবং সার্চ ইঞ্জিন গুগলের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণ করে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের এ চিত্র পাওয়া গেছে। এসব হত্যার পাশাপাশি দলীয় কোন্দলে সৃষ্ট সংঘর্ষে ছয় বছরে আহত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৬৯১। এঁদের প্রায় সবাই সরকারি দলের নেতা-কর্মী। এই সময়ে নিজেদের মধ্যে সহিংস ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ১১১টি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে দলের এত বেশিসংখ্যক নেতা-কর্মী খুন হওয়ার বিষয়টি দলের নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুললেও খুনের এ মিছিল থামছে না। কয়েক দিন পর পর দেশের কোথাও না কোথাও দলীয় কোন্দলে নিহত হচ্ছেন সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। আর এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে ছাত্রলীগ। গত ছয় বছরে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ছাত্রলীগের ৪০ নেতা-কর্মী নিহত হলেও এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর প্রায় সব কটিই তদন্ত পর্যায়ে আটকে আছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের গত মেয়াদের (২০০৯-১৩) প্রথম বছরের তুলনায় বর্তমান মেয়াদের প্রথম বছরে দলীয় কোন্দল ও বিরোধ আরও বেড়েছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথম এক বছরে দলীয় কোন্দলে খুন হয়েছিলেন সংগঠনটির ২০ নেতা-কর্মী। আর ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১১ মাসে খুন হয়েছেন কমপক্ষে ৩২ নেতা-কর্মী। এ সময় নিজেদের মধ্যে ১৪৫ বার মারামারি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদে বিরোধী দলে থাকা আওয়ামী লীগের প্রায় ২০০ নেতা-কর্মী খুন হয়েছিলেন। এখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। কিন্তু নিজেদের কোন্দলে একদিকে খুন হচ্ছে, অন্যদিকে বিচারও হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও অন্তর্দলীয় গণতন্ত্রের যুগসন্ধিক্ষণ চলছে। রাজনৈতিক দল, সরকার, গণমাধ্যমসহ সর্বত্রই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা নিশ্চিত করতে হবে। এর অভাবে এবং অন্তর্দলীয় গণতন্ত্রে ঘাটতি থাকায় এ ধরনের সহিংসতা চলছে।
বিএনপির ঘাঁটিতে আ.লীগের কোন্দলে খুনোখুনি: বগুড়া জেলা বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এ জেলায় খুনোখুনি হচ্ছে সরকারদলীয় নেতাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। গত প্রায় ছয় বছরে সেখানে আওয়ামী লীগের ৩৬ নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ জনই দলীয় কোন্দলে। বাকি পাঁচজন প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের হাতে খুন হয়েছেন।
বগুড়ায় ৩৬ জন খুন হলেও সেখানকার আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের ভেতরে বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের নেতা শিমুল হক হত্যাকাণ্ড ছাড়া পুলিশ আর কোনো ঘটনাকেই রাজনৈতিক বলতে রাজি নয়।
বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী খুন হলেও বেশির ভাগ ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে আধিপত্য বিস্তার, জমি দখল, দরপত্র নিয়ে বিরোধ, মাদক ব্যবসা, অবৈধ বালু উত্তোলনসহ ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিরোধ।
বগুড়া পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রেজাউল করিম জানান, দলের নেতা-কর্মী খুন হলে বিচার না হওয়াটা দুঃখজনক। তবে রাজনৈতিক কারণে নয়, আধিপত্য বিস্তার ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে বেশির ভাগ নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন।
অস্থির জেলা: নারায়ণগঞ্জে কাগজে-কলমে দুটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড হলেও এগুলো ছিল চাঞ্চল্যকর। এর একটি হচ্ছে বাবার ওপর আক্রোশ মেটাতে শিশুপুত্র ও মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ড। অপরটি ছাত্রলীগ নেতা শহীদুল ইসলাম হত্যাকাণ্ড। দুটি হত্যাকাণ্ডেই সন্দেহের তির ওসমান পরিবারের দিকে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে ত্বকী হত্যার তদন্ত করছে র্যাব। আর মিঠু হত্যার অভিযোগপত্র দাখিল হলেও বিচার শুরু হয়নি। তবে আলোচিত সাত খুনের ঘটনা র্যাব ঘটালেও এর পেছনেও সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ রয়েছে।
এক জেলায় এক ডজন খুন: নরসিংদী জেলায় সরকারদলীয় কোন্দলে নিহতের সংখ্যা এক ডজন। নরসিংদী সদর আসনের সাংসদ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম বলেন, ক্ষমতাসীন দলের হয়েও হত্যার শিকার হওয়াটা দুঃখজনক। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগই রাজনৈতিক কারণে নয়, ব্যক্তিগত বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ঘটছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় খুনোখুনির সংখ্যা টাঙ্গাইলে কম। তবে সেখানে ‘খান পরিবার’ টাঙ্গাইল আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ফারুক আহমেদ হত্যার পরিকল্পনাকারী হিসেবে নাম আসায় খান পরিবারের বর্তমান সাংসদ আমানুর রহমান খানসহ তাঁরা চার ভাই পলাতক রয়েছেন।
মেহেরপুরে ছয় বছরে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুন হয়েছেন পাঁচ নেতা-কর্মী। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মিয়াজান আলী প্রথম আলোকে বলেন, প্রকৃত রাজনীতির চেয়ে ক্ষমতার স্বাদ খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেকেই। এ জন্য তাঁরা নিজ দলের নেতা-কর্মীদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে খুনের মতো জঘন্য কাজ করছেন।
শরীয়তপুরে নিহত ১২ জনের সবাই সরকারি দলের নেতা-কর্মী। সবাই খুন হয়েছেন দলীয় কোন্দলে। জেলা পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল মামুন বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মূলত এসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
শরীয়তপুর সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি লোকমান মাতবর দলীয় কোন্দলে খুন হলেও বিচার পাচ্ছেন না তাঁর স্ত্রী ফরিদা বেগম। তিনি বলেন, ‘স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে বিপদে আছি। হত্যাকারীরা আওয়ামী লীগের বড় নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর আমাদের হুমকি দিচ্ছেন।’
বিচার পাচ্ছে না নিহতের পরিবার: প্রথম আলোর ৬৪ জেলা প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিবেদন থেকে ধারণা পাওয়া যায়, ক্ষমতায় থাকলেও সরকারি দলের নিহত নেতাদের পরিবার দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বিচার পাওয়া দূরে থাক, উল্টো অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। এ ধরনের মামলার শেষ কোথায় কেউ জানে না। অধিকাংশ ঘটনার কথিত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র জমা দিতেই কেটে যাচ্ছে তিন থেকে পাঁচ বছর। এতে বিচারপ্রার্থীদের হতাশা, ক্ষোভ ও হাহাকার বাড়ছে।
গত কয়েক বছরে আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে একমাত্র বিশ্বজিতের পরিবার বিচার পেয়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে নিষ্ঠুর ও নৃশংসভাবে হত্যার পর এ নিয়ে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলের চাপে ঘটনাটি সরকারের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
তবে যুবলীগের কোন্দলে রাজধানীর আরেক আলোচিত হত্যাকাণ্ড রিয়াজুল হক (মিল্কি) হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকায় অভিযুক্ত যুবলীগের দুই প্রভাবশালী নেতার নাম বাদ দিয়ে র্যাব অভিযোগপত্র দেওয়ায় গত ৯ জুন নিহতের ভাই আদালতে নারাজি আবেদন করেন। মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের এই সাংগঠনিক সম্পাদককে গত বছরের ২৯ জুলাই গুলশানে একটি বিপণিবিতানের সামনে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার দৃশ্য সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিল।
আবার ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবুবকর খুন হলেও সেই হত্যার বিচার আজও হয়নি।
২০১১ সালের ১ নভেম্বর নরসিংদীর পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন দলীয় কোন্দলে নিহত হলেও মামলাটি হাইকোর্টে স্থগিত হয়ে আছে।
যুবলীগের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও খুলনার ওয়ার্ড কাউন্সিলর শহীদ ইকবাল বিথার ২০০৯ সালের ১১ জুলাই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হওয়ার পর সাড়ে পাঁচ বছর পার হয়েছে। কিন্তু বিচার হচ্ছে না।
এ ছাড়া পঞ্চগড়ে পুকুর ইজারাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ২০১০ সালের ৮ এপ্রিল পৌর ছাত্রলীগের নেতা ফারুক হোসেন নিহত হন। চার দফা তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের পর পঞ্চমবার সরকারি দলের ১৩ আসামির নাম বাদ দিয়ে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
২০১১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ-১০ আসনের সাংসদ গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদের ব্যক্তিগত সহকারী ও যুবলীগ নেতা মেহেদী হাছান ইলিয়াসকে সদ্য বিয়ে করা স্ত্রীর সামনে হত্যা করে মাথা নিয়ে চলে যায় সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় যুবলীগের একজন কর্মী র্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ মারা গেলেও তদন্ত এগোয়নি।
বান্দরবানে স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষে স্বেচ্ছাসেবক লীগের ছোটন মল্লিক নিহত হওয়ার পর ছাত্রলীগের ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও সবাই জামিনে আছেন।
গত ২৮ অক্টোবর মাগুরা সরকারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ক্যাম্পাসে পৌর ছাত্রলীগ নেতা রাজন খানকে হত্যার ঘটনায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।
দলীয় কোন্দলে নিহত ব্যক্তিদের বিচারের দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বুঝতে হবে, যোগ্যতার বদলে প্রভাব, চাপ বা তদবিরের মাধ্যমে দরপত্র পেলে এবং এ পাওয়ার কারণে সৃষ্ট বিরোধে তিনি যদি নিহত বা আহত হন, তাহলে তাঁর পরিবার বিচার পাবে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটে। এর ফলে নিহতের পরিবার বা স্বজনেরাই যে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন এমনটি নয়, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ঘাটতি প্রশাসনকেও গ্রাস করে। এই অবস্থায় প্রশাসনের ওপরও মানুষের আস্থা কমে যায়।
প্রথম আলো>>{তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আনোয়ার পারভেজ (বগুড়া), আকমল হোসেন (মৌলভীবাজার), আসাদুল্লাহ সরকার (দিনাজপুর), নেয়ামতউল্যাহ (ভোলা), হরি কিশোর চাকমা (রাঙামাটি), মীর মাহমুদুল হাসান (নীলফামারী), কামনাশীষ শেখর (টাঙ্গাইল), আসিফ হোসেন (নারায়ণগঞ্জ), তুহিন আরণ্য (মেহেরপুর), মনিরুজ্জামান (নরসিংদী), সুমন চক্রবর্তী (খুলনা), শহীদুল ইসলাম (পঞ্চগড়), কামরান পারভেজ (ময়মনসিংহ), বুদ্ধজ্যোতি চাকমা (বান্দরবান), সৈকত দেওয়ান (খাগড়াছড়ি), কবির হোসেন (মাগুরা), সত্যজিৎ ঘোষ (শরীয়তপুর) ও মুক্তার হোসেন (নাটোর)}

পম্পার প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়াল সীমানা

(কুষ্টিয়া কারাগার থেকে বের হওয়ার পর পম্পা মণ্ডলকে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়েছে। ছবি: তৌহিদী হাসান) প্রেমের টানে কাঁটাতারের বাধা পার হয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের তরুণী পম্পা মণ্ডল। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের আমজাদের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দুজনে ঘর বাঁধেন। কিন্তু কাঁটাতারের সীমানা বাধা হয়ে দাঁড়াল তাঁদের জীবনে। বিনা পাসপোর্টে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার দায়ে আদালত তাঁকে ১৫ দিনের সাজা দেন। কারাভোগ শেষে আজ সোমবার সকাল আটটার দিকে তিনি নিজ দেশ ভারতের পথে পাড়ি দিয়েছেন। কুষ্টিয়া কারাগার থেকে বের হওয়ার পর পম্পা মণ্ডলকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমা‌ন্তে নেওয়া হয়। সেখানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মাধ্যমে তাঁকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কারাগার থেকে বের হয়ে পম্পা মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইন্ডিয়া আমার কাছে ভালো লাগে। তার পরও আমজাদকে ভালো লেগেছিল। বিয়েও হয়েছিল। কিন্তু এখন ভাগ্যের লিখনে দেশে চলে যেতে হচ্ছে।’
কুষ্টিয়া কারাগারের কারা তত্ত্বাবধায়ক মকলেছুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, পম্পা মণ্ডলের ১৫ দিনের সাজা হয়েছিল। এরপর তাঁকে দেশে পাঠানোর ব্যাপারে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি আদান-প্রদান হয়। গত সপ্তাহে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন সরকারি সফরে ভারতে গিয়ে পম্পা মণ্ডলকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি জানান। এ সময় জানানো হয়, দর্শনা সীমান্তে পম্পার পরিবার তাঁকে নিতে আসবে।
সকালে কারাগারে গিয়ে দেখা গিয়েছে, কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশের নারী সদস্যসহ পাঁচ সদস্যের একটি দল পম্পাকে গাড়িতে করে কুষ্টিয়ার পোড়াদহ রেলস্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে ট্রেনে করে তাঁকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় নেওয়া হবে। এরপর তারা তাঁকে দর্শনা সীমা‌ন্তে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করবে।
পম্পা মণ্ডলকে ভারতে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে ভারতীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘সংলাপ’ ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) কাজ করেছে। ব্লাস্ট, পুলিশ ও কুষ্টিয়া কারাগার সূত্রে জানা গিয়েছে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ধর্মদহ গ্রামের আমজাদ আলীর সঙ্গে পম্পার কয়েক বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পম্পার বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার মুরুটিয়া থানার শিকারপুর গ্রামে। গত ১৪ মে তিনি বাড়ির পাশের হাঁটুপানির মাথাভাঙ্গা নদী পাড়ি দিয়ে আমজাদের কাছে আসেন। দুজনে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন।
পম্পা বাড়ি ছেড়ে চলে আসার পরপরই তাঁর বড় ভাই অনুপ মণ্ডল স্থানীয় মুরুটিয়া থানায় আমজাদের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন। একই সঙ্গে তিনি কলকাতায় সংলাপ নামে একটি মানবাধিকার সংগঠনকে বিষয়টি জানান। পরে সংলাপ কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতিকে জানিয়ে পম্পাকে উদ্ধারে সহায়তা কামনা করে। ২৪ দিন সংসার করার পর মানবাধিকারকর্মীদের সহায়তায় পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। তাঁকে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হওয়ার দায়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। বিনা পাসপোর্টে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার দায়ে আদালত তাঁকে ১৫ দিনের সাজা দেন। কারা তত্ত্বাবধায়ক মকলেছুর রহমানের ভাষ্য, সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল। গত ৯ নভেম্বর দর্শনা সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে তাঁর পরিবার না আসায় তাঁকে ফেরত না পাঠিয়ে আবার কারাগারে নেওয়া হয়েছিল।

চার শিশুকে থানায় জেরা by কাজী আনিছ

পরিত্যক্ত পানির পাইপ থেকে শিশু জিহাদ উদ্ধার হওয়ার আগে গত শনিবার চার শিশুকে থানায় কয়েক ঘণ্টা আটকে দফায় দফায় জেরা করেছে পুলিশ। পাইপের ভেতরে কোনো বাচ্চা নেই। তার পরও তারা কেন বলছে, কান্নার আওয়াজ শুনেছে—এ বিষয়ে নানা প্রশ্ন করে পুলিশ। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে তারা। তাদের পরিবার জানিয়েছে, এখনো তাদের ভয় কাটছে না। ওই চার শিশু হলো মো. নাহিদ (৫), মো. তৌশিদ (৪), জাহিদা ইয়াসমিন পুষ্পিতা (৮) ও মোছাম্মৎ ফাতেমা (১৪)। জাহিদা শাহজাহানপুরের একটি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। ফাতেমা একই স্কুলের দশম শ্রেণিতে পড়ে। এর আগে জিহাদের বাবা নাসির ফকিরকেও থানায় ১২ ঘণ্টা আটকে রেখে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
শিশু আইন অনুযায়ী, কোনো শিশুকে থানায় নিয়ে গেলে তার বাবা-মা কিংবা বৈধ অভিভাবককে জানাতে হবে। এরপর থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশবিষয়ক কর্মকর্তার হাতে তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। এরপর প্রবেশন কর্মকর্তাকে অবহিত করে তার উপস্থিতিতেই শিশুবান্ধব পরিবেশে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। মানসিক পরিষেবা ও শিশুর মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। জানা গেছে, এ ক্ষেত্রে আইনের কোনো তোয়াক্কা করেনি পুলিশ। তবে থানায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তিনজনের পরিবারকে জানানো হয়। কয়েক ঘণ্টা জেরা করা হলেও খাবার দেওয়া হয়নি।
গতকাল সন্ধ্যায় থানায় যোগাযোগ করে জানতে চাওয়া হয়, সেখানে দায়িত্বরত শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা কে। জবাবে শাহজাহানপুর থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ আলম বলেন, ‘আমিই থানার শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা। কিন্তু থানায় শিশুদের আনার ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না।’
এ বিষয়ে পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার আনোয়ার হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ডিএমপির গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ‘তথ্য যাচাইয়ের জন্য আমরা শিশুদের সঙ্গে কথা বলেছি, জিজ্ঞাসাবাদ নয়। এরা কোনো মামলার আসামি হলে শিশু আইন প্রযোজ্য হতো।’
শিশুদের এভাবে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, শিশু আইন অনুযায়ী, এ ধরনের আচরণ নিষিদ্ধ, বেআইনি। পুলিশ যে আইনকানুন না মানতে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে, ছোট ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে এ আচরণেও তা ফুটে উঠেছে। পুলিশ আইন রক্ষার বদলে আইন ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে।
গত শুক্রবার বিকেল চারটার দিকে শাহজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনি মাঠের কাছে রেলওয়ে পাম্পের একটি পানির পাইপে পড়ে যায় চার বছরের শিশু জিহাদ। ওই দিন রাতে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পাইপের ভেতরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা ফেলেন। এরপর ক্যামেরা উঠিয়ে বলেন, পাইপের ভেতরে শিশু জিহাদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, গুজব। ফলে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তির। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার রাতেই পুলিশ জিহাদের বাবা নাসিরকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। আর শনিবার বেলা ১১টার দিকে নেওয়া হয় চার শিশুকে।
জানা যায়, জাহিদা ও ফাতেমাকে টানা চার ঘণ্টা এবং নাহিদ ও তৌশিদকে দুই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। থানায় নাহিদ ও তৌশিদের মা এবং জাহিদার বাবাও যান। কিন্তু ফাতেমাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তার বাবা-মা কিংবা বৈধ অভিভাবককে পুলিশ কোনো কিছুই জানায়নি।
সরেজমিনে জানা গেছে, শুক্রবার বিকেলে রেলওয়ে পাম্পের কাছে ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়েছিল জাহিদা ও ফাতেমা। তখন তারা পাইপের ভেতর থেকে শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পায়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জিহাদের বাবা নাসির পুলিশকে জানিয়েছিলেন, জিহাদ পড়ে যাওয়ার কথা তিনি নাহিদ ও তৌশিদের কাছ থেকে শুনেছেন। এ কারণে মাসহ ওই দুই শিশুকেও থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। শেষমেশ জিহাদ উদ্ধার হওয়ার পর চার শিশুর বাসায় ফেরার সুযোগ মেলে।
গতকাল দুপুরে বাসায় গেলে ফাতেমা ও জাহিদার পরিবার প্রথমে কথা বলতে রাজি হয়নি। পরে অনুরোধ করার পর জাহিদার বাবা মো. জাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, দুজন পোশাকধারী পুলিশ সদস্য বাসায় এসে জানান, জিহাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জাহিদাকে থানায় নিয়ে যেতে এসেছেন তাঁরা। একজনের মাধ্যমে ফাতেমাকেও ডেকে পাঠানো হয়। পরে তাদের দুজনকেই থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সঙ্গে তিনিও থানায় যান।
ফাতেমার মা ফুলবানু বলেন, ‘আমার মেয়ে ফাতেমাকে পুলিশ কখন, কীভাবে থানায় নিয়ে গেল জানি না। পরে জানতে পাইরা দৌড়াইয়া থানায় যাই। সেখানে এক অফিসার জানায়, কাউকেই থানায় আনেননি তাঁরা। অথচ পরে জাহিদার বাবা জাহিদাকে ফোন করলে জানায়, ফাতেমাসহ তারা থানার ভেতরেই আছে। আমাকে বলল, কোনো দুশ্চিন্তা না করতে।’
ফাতেমা ও জাহিদা প্রথম আলোকে জানায়, থানায় নিয়ে যাওয়ার পর তাদের একটি কক্ষে বসানো হয়। সেখানে জিহাদের বাবাকেও দেখে তারা। সেখানে একের পর এক পুলিশ কর্মকর্তা তাদের পাইপের ভেতর থেকে শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পাওয়ার কথা জানতে চান। তারা বারবারই ‘শুনতে পেয়েছি’ বলে জানায়। একপর্যায়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা তাদের বলেন, ‘তোমরা আবার মিথ্যা বলতাছ নাকি? আমরা তো কোনো বাচ্চা দেখি নাই। বাচ্চার আওয়াজ তো তোমাদের চিৎকারের প্রতিধ্বনিও হতে পারে।’
ফাতেমা জানায়, এর মধ্যে বাচ্চা উদ্ধারের খবর এলে তড়িঘড়ি করে সব পুলিশ সদস্য বের হয়ে যান। তখন সে পুলিশকে বলে, ‘আমরা তো মিথ্যা বলছি। এখন বাচ্চা আইলো কোত্থেকে।’ ওই কর্মকর্তা কোনো জবাব না দিয়ে চলে যান। এরপর তারা বাসায় ফিরে আসে। তবে এই চার ঘণ্টা তাদের কোনো খাবার দেওয়া হয়নি।
শিশু নাহিদের মা খাদিজা বেগম ও তৌশিদের মা পারুল আক্তার জানান, এক পুলিশ সদস্য নাহিদ ও তৌশিদসহ তাদের হেঁটে থানায় নিয়ে যান। সেখানে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করেন, জিহাদকে পড়তে তারা দেখেছিল কি না। তখন বাচ্চারা দেখেনি বলে জানায়।

হরতালে নোয়াখালিতে স্কুল শিক্ষিকা নিহত, বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ গুলি ছুড়ছে: রিজভী

সারা দেশে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা সকাল-সন্ধ্যার হরতাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন জায়গায় সরকারের পেটোয়া বাহিনী ও পুলিশ গুলি ছুড়ছে। গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনে অবৈধভাবে বাধা দিচ্ছে। আজ সোমবার সকাল থেকে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এলাকায় বিপুল পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এই এলাকায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কোনো মিছিল বা পিকেটিং হয়নি। এ এলাকা থেকে পুলিশ ছয়জনকে আটক করেছে। পল্টন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সুশঙ্করের ভাষ্য, সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করায় তাঁদের আটক করা হয়। তাঁদের পল্টন থানায় রাখা হয়েছে। তাঁরা হলেন আলামিন, ওবায়দুল, কবির, রিয়াজ, ইব্রাহিম ও কালু। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কার্যালয়ে আছেন। সকাল থেকে দপ্তরের দায়িত্বে থাকা দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কার্যালয়ের নিচতলায় ফটকে চেয়ারে বসে ছিলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে কয়েকজন নেতা-কর্মী ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে তিনি ওপরে চলে যান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ কেন্দ্রীয় নেতাদের মুক্তি, শনিবারের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের বাধার প্রতিবাদ, গাজীপুরের জনসভা বানচাল ও ১৪৪ ধারার মধ্যেই ক্ষমতাসীনদের মিছিল, বিক্ষোভের দ্বৈত নীতির প্রতিবাদে ২০-দলীয় জোট এই হরতালের ডাক দিয়েছে।
হরতালে নোয়াখালিতে স্কুল শিক্ষিকা নিহত
সভা-সমাবেশে বাধা প্রদান ও গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে ২০ দলীয় জোটের ডাকা দেশব্যাপী হরতাল আজ সোমবার সকাল ৬ টায় শুরু হয়েছে। চলবে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত। এরইমধ্যে নোয়াখালী জেলা শহরে হরতাল সমর্থনকারী পিকেটারের ইটের আঘাতে এক স্কুল শিক্ষিকা নিহত হয়েছেন। এছাড়া সকালে রাজধানীর মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা। সকালে পল্লবী এলাকায় এ ঘটনায় পুলিশের ছররা গুলিতে আহত হয়েছেন অন্তত একজন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিএনপি-জামায়াতকর্মীরা হঠাৎ রাস্তায় নেমে এসে গাড়ি ভাংচুর শুরু করলে পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয়। এক পর্যায়ে সড়কে ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর পুলিশ লাঠিপেটা করে এবং রাবার বুলেট ও ছররা গুলি ছুঁড়ে তাদের সরিয়ে দেয়। এদিকে হরতালের সমর্থনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মিছিল করেছে বিএনপি-জামায়াত। হরতালকে কেন্দ্র করে রাজধানীর কয়েক জায়গায় গাড়ি ভাঙচুর, আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে। অপরদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। হরতালের সকালে সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ি খুব একটা দেখা না গেলেও গণপরিবহন, অটোরিকশা ও রিকশা চলাচল করছে। বাস মালিকরা নিরাপত্তার কারণে দূরপাল্লার বাস বন্ধ রেখেছেন, তবে ঢাকার আশেপাশের জেলাগুলোর পথে কিছু মিনিবাস ছেড়ে যাওয়ার খবর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গাজীপুরে ২০ দলের সমাবেশ করতে না দেওয়ার প্রতিবাদে ও গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে শনিবার সন্ধ্যায় ২০ দলীয় জোটের মহাসচিব পর্যায়ের এক বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ হরতালের ঘোষণা দেন।

ছয় বছরে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বিএনপির ৩৪ খুন

বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত ছয় বছরে অন্তত ৩৪ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলীয় কোন্দলে বিএনপির একজন কর্মী মারা যান। আর এ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর গত ১১ মাসে দলীয় কোন্দলে বিএনপির পাঁচজন মারা গেছেন। ছয় বছরে বিএনপি-সমর্থক পাঁচজন জনপ্রতিনিধি খুন হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের হাতে চারজন নিহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মারা যান একজন। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্ষমতার বাইরে থাকায় নিজেদের কোন্দল কম হলেও তা উপেক্ষা করার মতো নয়। বিরোধী দলে থেকেও নিজেরা এই ছয় বছরে ৩৪৪ বার অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে জড়িয়েছে। এসব সংঘর্ষে আহত ব্যক্তির সংখ্যা চার হাজার ৭৬২। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, গণতান্ত্রিক চর্চা যেভাবে হওয়া উচিত ছিল, সেভাবে হচ্ছে না। এ কারণে সংঘাত-সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। সরকারি দলের পাশাপাশি বিএনপির দলীয় কোন্দলে খুনোখুনির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সবাই এই সমাজের মানুষ। এই রাজনীতিতে অভ্যস্ত। তবে দলীয় কোন্দল বলা হলেও অনেক ঘটনার পেছনে সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার ইন্ধন থাকে।
নিহত জনপ্রতিনিধিরা: ২০১০ সালের ৮ অক্টোবর দলীয় মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপির নেতা সানাউল্লাহ নূরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চার বছর ধরে এই মামলার কথিত তদন্ত চলছে। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার নির্বাসখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপির নেতা শওকত আলী খুন হন ২০১০ সালের ১৬ নভেম্বর। অভিযোগপত্র থেকে আওয়ামী লীগের নেতাদের নাম বাদ দেওয়ায় বাদী নারাজি দেওয়ার পর আদালত পুনঃ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের তিনবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম ফারুককে শহরের বটতলা বাজারে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কয়েক নেতাসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে।
গত ২৮ অক্টোবর ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও দৌলতপুর ইউপির চেয়ারম্যান আবুল হোসেনকে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের সামনে দখলপুর বাজারে শত শত লোকের সামনে বোমা মেরে ও জবাই করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের। কুমারখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জগন্নাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুন্সী রশিদুর রহমান ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির দলীয় কোন্দলে খুন হন। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও হাজীপাড়া ইউপির চেয়ারম্যান ওমর ফারুককে এ বছরের শুরুতে অপহরণ করা হয়। তাঁর খোঁজ বা লাশ কোনোটাই পাওয়া যায়নি।
মামলা নিয়েও রাজনীতি: গত বছরের ২৫ অক্টোবর কক্সবাজারের চকরিয়ায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষে স্থানীয় বিএনপির দুই নেতা সাইফুল ইসলাম ও মিজানুর রহমান নিহত হন। এই দুটি ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে চকরিয়া থানায় দুটি মামলা করে। গত ২৩ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হওয়ার পর জানা যায়, স্থানীয় বিএনপির ৪৬ নেতা-কর্মী মামলার আসামি। এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে নিহত সাইফুলের বাবা মোকতার আহমদ বলেন, ‘এটা বিচারের নামে প্রহসন। পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা হত্যা করে মামলা দিয়েছে বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে। এর বিচার আল্লাহ করবে।’
নিহত মিজানের মা নূরজাহান বেগম বলেন, ‘আমি কারও বিরুদ্ধে মামলা করিনি। এখন শুনতে পেলাম, আসামিরা বিএনপির নেতা-কর্মী।’
একই জেলায় গত ২৯ নভেম্বর আওয়ামী লীগ, পুলিশ ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষে বিএনপির নেতা জাকের হোছাইনের হত্যা মামলায় স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়েছে।
বিএনপির নেতা ও পৌরসভার মেয়র নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপির নেতা-কর্মীদের হত্যা করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের আসামি করার মতো হাস্যকর ঘটনায় আমাদের উচ্চ আদালতে যেতে হচ্ছে।’
{প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন: একরামুল হক ও গাজী ফিরোজ (চট্টগ্রাম), আব্দুল কুদ্দুস, কক্সবাজার, উজ্জ্বল মেহেদী (সিলেট), আবুল কালাম আজাদ (রাজশাহী), মজিবর রহমান খান (ঠাকুরগাঁও), দেবাশীষ সাহা রায় (শেরপুর), আনোয়ার হোসেন (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), এনামুল হক (সিরাজগঞ্জ), আবদুল মোমিন (মানিকগঞ্জ), তৌহিদী হাসান (কুষ্টিয়া) ও মাসুদ রানা (গাজীপুর)।}

খুনের কথা স্বীকার করলো প্রেমিকা

কুড়িগ্রামের উলিপুরে প্রেমের দ্বন্দে খুন হয়েছে এক কিশোর। প্রেমিকার মোবাইল ফোনে ডেকে নিয়ে তাকে খুন করা হয় । এ ঘটনায় উলিপুর থানা পুলিশ প্রেমিকা মৌসুমি আক্তার(১৪), জিয়াউর রহমান (২২) ও সোহাগকে (২০) গ্রেপ্তার করেছে। লাশ ময়না তদন্ত শেষে দাফন করা হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে রাশেদের পরিবারসহ ওই গ্রামে শোকের মাতম চলছে। মামলার এজাহার ও এলাকাবাসী সূত্রে জানাযায়, উলিপুর উপজেলার তবকপুর ইউনিয়নের দক্ষিন উমানন্দ গ্রামের মজনু মিয়ার স্কুল পড়–য়া কন্যা মৌসুমি আক্তারের সাথে একই গ্রামের লুৎফর রহমানের কলেজ পড়–য়া ছেলে জিয়াউর রহমানের দীর্ঘদিন ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এর মধ্যে মৌসুমি মাঠিয়াল আর্দশবাজার গ্রামের আনিছুর রহমানের পুত্র  রাশেদুল ইসলামের (১৫) সাথে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে এতে ঈর্শ্বানিত হয়ে ঘটনার দিন শুক্রবার রাতে জিয়াউর রহমান মৌসুমির মাধ্যমে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জরুরী কথা আছে বলে রাশেদকে বাড়ীর বাইরে ডেকে নেয়। রাশেদ সেখানে এলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মৌসুমির উপস্থিতিতে জিয়াউর রহমান ও সোহাগ রাশেদকে ছুরিকাঘাত করে। এতে রাশেদ গুরুত্বর আহত হয় তাকে প্রথমে চিলমারী হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে রেফাড করেন। পরে হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। সোহাগ উমানন্দ আদর্শ বাজার গ্রামের বকুল মিয়ার পুত্র। এ ঘটনায় রাশেদের পিতা আনিছুর রহমান বাদী হয়ে উলিপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন, মামলা নং-৩১, তাং-২৭/১২/১৪ ইং।  মৌসুমি আক্তার, জিয়াউর রহমান, সোহাগসহ সিদ্দিকুল ইসলাম (২০), মাহফুজার রহমান (২৫) ও সিদ্দিক (২২) কে  ২৭ ডিসেম্বর শনিবার পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। পরে বাদী ্ওই তিন জনের নামে মামলা দায়ের করায় পুলিশ বাকী ৩ জনকে ছেড়ে দিয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উলিপুর থানার এস.আই হাবিবুর রহমান জানান, জিজ্ঞাসাবাদে মৌসুমি, জিয়াউর ও সোহাগ খুনের সাথে জড়িত থাকার কথা শিকার করেছেন। কুড়িগ্রাম জেলার অতিঃ পুলিশ সুপার মোঃ শাহাবুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। উলিপুর থানার ওসি জমির উদ্দিন জানান, বাদীর এজাহার নামীয় আসামীদের আটক করে অপর তিনজনকে ছেড়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

কুড়িল ফ্লাইওভার-পূর্বাচল রাস্তার দুপাশে খাল খননের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে পূর্বাচল রাস্তার দু’পাশে খাল খননের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ ব্যাপারে কারো সঙ্গে আপস ও আপত্তিতে কান না দিয়ে দ্রুত এ লেকের খনন কাজ শেষ করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, মূল প্ল্যানে আছে দুটো লেক হবে। কাজেই এটা খুব দ্রুত খনন করা দরকার। এ ব্যাপারে কারো আপত্তি মানার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি শহরগুলোকে মানুষের বসবাস উপযোগী রাখতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দেন। রোববার সচিবালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে এসে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন। এ সময় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সূচনা বক্তৃতার পর প্রধানমন্ত্রী এ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন।
তিনি বলেন, কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে পূর্বাচলে যাওয়ার পথে রাস্তার দু’পাশে দুটো লেক খনন করার কথা রয়েছে। আমি জানি এ লেক খনন করতে অনেক বাধা আছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ওই লেকের সঙ্গে সরাসরি নদীর যোগাযোগ থাকবে। বন্যা বা ভারি বৃষ্টির সময় ওই এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্যই ওই লেক খনন অত্যন্ত জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোথাও কোনো বক্স কালভার্ট হবে না। সব লেক হবে, ওপেন লেক হবে। যাদের দরকার হবে, তারা লেকের পাশ দিয়ে ব্রিজ করে নেবে। শেখ হাসিনা বলেন, কোনোমতেই এখানে ‘কম্প্রোমাইজ’ করা যাবে না। বিষয়টা আপনাদের দেখতে হবে এবং খুব তাড়াতাড়ি এটা শুরু করতে হবে।
বিভিন্ন সময়ে ঢাকার জলাধারগুলো নষ্ট করার তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, রাজধানীর মতিঝিলে এক সময় একটি ঝিল থাকলেও আইয়ুব খান সেটি বন্ধ করে দেন। পরে বিভিন্ন সরকারের সময় শান্তিনগর খাল, পান্থপথ খালসহ বিভিন্ন খাল বন্ধ করে দেয়া হয় অথবা বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। অথচ এ খালগুলো একটা শহরের শিরা-উপশিরার মতো। আপনারা আমাদের একটা অনুরোধ রক্ষা করবেন, বক্স কালভার্ট যেন শহরের ভেতর আর না করা হয়। সুযোগ থাকলে ঢাকার সব বক্স কালভার্ট তুলে দিয়ে খাল উদ্ধারের চেষ্টা করতেন বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি জানান, রক্ত সঞ্চালন যেভাবে হয়। ঠিক সেভাবে পানির সঞ্চালন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখার পাশাপাশি পরিবেশ ঠিক রাখে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ে শহরগুলোর উন্নতি করতে হবে। এ জন্য সুদূরপ্রসারী ‘মাস্টার প্ল্যান’ করতে হবে। বিভাগীয় ও উপজেলা শহরগুলোর জন্যও মাস্টার প্ল্যান করতে হবে। শহরে মানুষের উপযোগী করে ফ্ল্যাট বাড়িসহ সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানী ঢাকা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লোকসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু শহরটা ছোট ও ঘিঞ্জি হয়ে যাচ্ছে। সেখানেও আমরা যদি মানুষের নাগরিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে না পারি তবে এটি আর বসবাসের উপযোগী থাকবে না। প্রধানমন্ত্রী পরিকল্পিতভাবে বস্তির মানুষগুলোকে পুনর্বাসনের নির্দেশ দেন। তিনি বস্তিগুলোতে মানুষের মানবেতর জীবনযাপনের বর্ণনা দেন। সেই সঙ্গে ঢাকার উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
সব লাল দালান রক্ষার দরকার নেই : প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐতিহ্য রক্ষার নামে ব্রিটিশদের সব লাল দালান রক্ষার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, ঐতিহ্য রক্ষায় ব্রিটিশ আমলের অপ্রয়োজনীয় ভাঙ্গা দালান বা তাদের অনেক জিনিস ধরে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। এর কোনো প্রয়োজন নেই। শেখ হাসিনা বলেন, দৃষ্টিনন্দন থাকলে ব্রিটিশদের দুই-একটা জিনিস রাখা যেতে পারে। স্থাপত্য শিল্পের দিক থেকে যেগুলো প্রয়োজন আছে সেগুলোর কিছুটা রাখা যেতে পারে। সব দালান ধরে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, ‘লাল দালান যা আছে সবই রেখে দিতে হবে আমাদের হেরিটেজ হিসেবে? কিসের হেরিটেজ? ব্রিটিশদের গোলামি করেছি আমরা তাদের হেরিটেজ রক্ষার করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না অন্তত স্বাধীন দেশে। কারণ তাদের বিরুদ্ধেও আমাদের লড়াই করতে হয়েছে, সংগ্রাম করতে হয়েছে, রক্ত দিতে হয়েছে। এটাও মনে রাখতে হবে। তবে স্থাপত্য শিল্প যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী।
সংসদ ভবনের নির্মাণ কাজ এখনও কিছু বাকি আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, লুই আই কার্নের মূল নকশা দেখলে দেখা যাবে সংসদ ভবনের কিছু কাজ এখনও বাকি আছে। এ সচিবালয় সংসদ এলাকায় থাকার কথা ছিল। সেখানে চারপাশে বেড়া থাকার কথা ছিল।
আবাসিক এলাকায় হাসপাতাল অত্যন্ত ক্ষতিকর : প্রতিটি হাসপাতালের নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করতে বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় হাসপাতাল গড়ে ওঠা অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, হাসপাতালের বর্জ্যগুলো সব থেকে ক্ষতিকারক। তাতে রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে। এটার একটা ব্যবস্থা একান্তভাবে নেয়া দরকার এবং প্রত্যেকটা হাসপাতালের বর্জ্যরে জন্য নিজস্ব ব্যবস্থা থাকা উচিত।
ব্যাঙের ছাতার মতো ইউনিভার্সিটি : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ে সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের তো কোনো মাত্রাজ্ঞানই নেই। ইউনিভার্সিটি বলতে আগে যা বুঝতাম এখন আর তা নেই। ব্যাঙের ছাতার মতো ইউনিভার্সিটি। এক বিল্ডিংয়ে দেখা গেল অনেকগুলো সাইনবোর্ড। সব নাকি ইউনিভার্সিটি। কোনো একটা পরিকল্পনা নিয়ে কিচ্ছু করা হয়নি। যে যখন এসেছে, একেকটা পারমিশন দিয়ে গেছে।

আজ ২০ দলের হরতাল

বছরের শেষ সময়ে আজ সারা দেশে হরতাল কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। গাজীপুরে খালেদা জিয়াকে সমাবেশ করতে না দেয়া, বিএনপি নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে আজ সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলবে এ কর্মসূচি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দেশব্যাপী বিএনপির ডাকা দ্বিতীয় হরতাল এটা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে এ হরতাল ডাকা হয়েছে দাবি করে দেশবাসীকে সর্বাত্মক কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। হরতাল সফল করতে বিএনপি-জামায়াতসহ জোট শরিক ও সমমনা দলগুলো প্রস্তুতি নিয়েছে। মহানগর বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে হরতালে মাঠে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হরতালের সমর্থনে রোববার বিকাল থেকেই শুরু হয় যানবাহন ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ককটেল বিস্ফোরণে এক নারী আহত হন। মিরপুরের কাজীপাড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশায় পেট্রল বোমা বিস্ফোরণে একই পরিবারের তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অপরদিকে হরতাল প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। হরতালকে কেন্দ্র করে যে কোনো নাশকতা ঠেকাতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। রোববার রাত থেকেই ঢাকাসহ সারা দেশে মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। চলছে গ্রেফতার অভিযান। যুবদল সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ সারা দেশে অসংখ্য বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রোববার সকাল থেকে নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ও আশপাশে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ।
হরতালের সমর্থনে রোববার সচিবালয়ের একটি স্টাফ বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনার আগে নয়াপল্টনে জোনাকী সিনেমা হলের সামনে আধা ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এ সময় এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। রোববার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে পল্টন মোড়ে পার্কিং করা একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো স-১১-০১০১) আগুন দেয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শী পথচারীরা পুলিশকে জানান, কয়েকজন যুবক পার্কিং করা বাসটিতে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ওই এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। পল্টন থানার এসআই জুলহাস মিয়া জানান, এ ঘটনায় পল্টন এলাকায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কমিটি গঠনের পর এটি প্রথম হরতাল। এ হরতাল ছাত্রদল নেতাদের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। রোববার সন্ধ্যা ৬টায় শেরাটন হোটেল মোড়ে হরতালের পক্ষে মিছিল করেছে ছাত্রদল। এতে যুগ্ম সম্পাদক মিয়া মো. রাসেল, করিম সরকার, শফিক আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল নেতা আবুল বাশার সিদ্দিকী, মাইনুল ইসলাম, শ্রাবণ, রিপন প্রমুখ অংশ নেন। রামপুরায় স্বেচ্ছাসেবক দল একটি মিছিল করে।
রোববার দুপুরে মহাখালীতে ছাত্রশিবির ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ওই এলাকায় প্রায় ১ ঘণ্টা যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, দুপুর ২টার দিকে হরতালের সমর্থনে ছাত্রশিবির মহাখালী কলেরা হাসপাতালের গেট থেকে একটি ঝটিকা মিছিল বের করে। মিছিলটি নাবিস্কোর দিকে যাওয়ার পথে পুলিশ বাধা দেয়। তখন উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় শিবিরকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
এদিকে হরতালে যান চলাচলের ঘোষণা দিয়েছে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতি। আর ব্যবসায়ীরা হরতাল প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, হরতাল বন্ধের প্রয়োজনে তারা আবার মাঠে নামবেন।
হরতালের আওতামুক্ত : জনগণের প্রয়োজনে কয়েকটি জরুরি সার্ভিস হরতালের আওতামুক্ত থাকার কথা জানিয়েছে বিএনপি। রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সংবাদ মাধ্যম এবং এ সংশ্লিষ্ট যানবাহন, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসা সেবা, লাশবাহী গাড়ি, মিডিয়ার যানবাহন, ফায়ার সার্ভিস, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির জরুরি সার্ভিসগুলো হরতালের আওতামুক্ত থাকবে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গাউসুল আজম সম্মেলন উপলক্ষে ওই এলাকা হরতালের আওতামুক্ত থাকবে।
আন্দোলন দমাতে গণগ্রেফতার -বিএনপি : আন্দোলন দমাতে সরকার নিষ্ঠুর হয়ে ওঠছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলটির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সরকার নাকি কোনো কিছুতেই ভয় করছে না। খুব ‘স্বস্তিতে’ আছে বলে দম্ভোক্তি করছে। তাহলে দেশব্যাপী গ্রেফতার অভিযান চলছে কেন? উদ্দেশ্য বিএনপির আন্দোলন দমানো। গ্রেফতার করে আন্দোলন দমানো যাবে না বলেও হুশিয়ারি দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে রিজভী আরও বলেন, ‘হানিফ সাহেব (মাহবুবউল আলম হানিফ) বলেছেন, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। আমরা দৃঢ়কণ্ঠে বলতে চাই, বিএনপির সমাবেশে বাধা দিলে আওয়ামী লীগও দেশের কোথাও নির্বিঘ্নে সমাবেশ করতে পারবে না। জনগণের সম্মিলিত শক্তিতে তা প্রতিহত করা হবে।’
যুবদল সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলালকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানান রিজভী। এছাড়া খিলগাঁও বিএনপির সহ-সভাপতি ফরহাদ হোসেন, বরিশাল স্বেচ্ছাসেবক দলের হাবিবুর রহমান পিন্টু, পটুয়াখালীর শাহাবুদ্দিন, আহসান উল্লাহ পিন্টু, শাহজাহান হাওলাদারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি করেন তিনি।
সোমবারের হরতালে বিএনপির শীর্ষ নেতারা মাঠে থাকবেন কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, ‘বিএনপি কোনো ভুঁইফোঁড় সংগঠন নয়। বিএনপির নেতারা ঘরে বসে নেই। কালকে সবাই মাঠে থাকবেন। যা হওয়ার কাল হবে।’ সম্মেলনে দলের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল লতিফ জনি, আসাদুল করীম শাহিন, বেলাল আহমেদ, আবদুস সালাম আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।