Thursday, September 4, 2025

গাজা পরিস্থিতি: অপুষ্টিতে ১ মাসে মৃত্যু ১৮৫

ফিলিস্তিনের গাজায় গত মাসে অপুষ্টিতে ১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় অপুষ্টিতে আরও ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি শিশু। গাজায় ইসরায়েলের সৃষ্ট অবরোধের কারণে অপুষ্টিজনিত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। গতকাল মঙ্গলবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।

গতকাল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘের বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা দ্য ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি) গত মাসের শেষ সপ্তাহে গাজার কিছু অংশে পূর্ণমাত্রার দুর্ভিক্ষ চলছে বলে ঘোষণা দেয়। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত সেখানে ৮৩ জনেরও বেশি মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি শিশু।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, উপত্যকার পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪৩ হাজার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। ৫৫ হাজারেরও বেশি গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীও একই সমস্যায় আক্রান্ত। দুই-তৃতীয়াংশ গর্ভবতী নারী রক্তশূন্যতায় ভুগছেন।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েল সেখানে নৃশংস হামলা চালাচ্ছে। অবরুদ্ধ উপত্যকায় অপুষ্টিতে ৩৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৩০টি শিশু। এই যুদ্ধে ইসরায়েল অন্তত ৬৩ হাজার ৬৩৩ জনকে হত্যা করেছে।

অপুষ্টিতে ভোগা এক ফিলিস্তিনি শিশুর চিকিৎসা চলছে। গতকাল খান ইউনুসের নাসের হাসপাতালে
অপুষ্টিতে ভোগা এক ফিলিস্তিনি শিশুর চিকিৎসা চলছে। গতকাল খান ইউনুসের নাসের হাসপাতালে। ছবি: রয়টার্স

নতুন ও ক্রমবর্ধমান শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে এশিয়ায়, হতে পারে মার্কিন শৃংখলার বিকল্প

চীনের সামরিক শক্তি বুধবার বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কোয়ারে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশাল কুচকাওয়াজে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়। হাজার মাইল দূরে ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসে বসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তা গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন। তিনি বলেন, তারা (চীন) আশা করছিল আমি এটা দেখি, আর আমি দেখছিলামও। যদিও ট্রাম্প চীনের এই মহা-উদযাপন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি, কেবল একে ‘খুব, খুব চিত্তাকর্ষক’ বলে মন্তব্য করেন। তবে এই কুচকাওয়াজের বার্তাটি বেশ স্পষ্ট। তা হলো একটি নতুন ও ক্রমবর্ধমান শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে, যা বিগত শতাব্দীর মার্কিন সমর্থিত বৈশ্বিক শৃঙ্খলার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। বুধবার চীনের বিশাল ওই সামরিক কুচকাওয়াজ নিয়ে অনলাইন বিবিসিতে এভাবেই লিখেছেন সাংবাদিক অ্যান্থনি জারচার। উল্লেখ্য, ওই কুচকাওয়াজে চীন তার সর্বশেষ সামরিক অস্ত্রগুলো প্রদর্শন করেছে। মূলত এর মধ্য দিয়ে তারা বিশ্ববাসীর কাছে নিজেদের সামরিক শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের ওপর যখন অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে বাণিজ্যকে টালমাটাল করে দিয়েছেন, তখন চীন মাথাটাকে আরও উঁচু করে জানান দিচ্ছে তার শক্তি। বিবিসি লিখেছে, ওই দিনই পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোকির সাথে বৈঠকে ট্রাম্প চীনের অনুষ্ঠান নিয়ে খুব কমই আলোকপাত করেন। আগের দিন পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে তিনি কুচকাওয়াজকে তুচ্ছ করে বলেন, তিনি ‘চীনের শক্তি প্রদর্শনী নিয়ে উদ্বিগ্ন নন’- যেখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন এবং আরও দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত ছিলেন। তবে মঙ্গলবার রাতেই ট্রাম্প নিজের ট্রুথ সোশ্যালে অভিযোগ করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার ভূমিকার যথাযথ কৃতিত্ব দিচ্ছে না চীন। তিনি লিখেছেন, আমার উষ্ণ শুভেচ্ছা জানাও ভ্লাদিমির পুতিন আর কিম জং উনকে, যেহেতু তোমরা একসাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছ।

ট্রাম্প বরাবরই কুচকাওয়াজ ও সামরিক প্রদর্শনীতে আকৃষ্ট হন। তিনি গত মাসে আলাস্কায় পুতিনকে স্বাগত জানান স্টেলথ বোম্বার ফ্লাইওভার দিয়ে। তার প্রথম প্রেসিডেন্সির সময় ফ্রান্সের বাস্তিল দিবসের কুচকাওয়াজে অংশ  নেন এবং সম্প্রতি ওয়াশিংটনে মার্কিন সেনাবাহিনীর ২৫০তম বার্ষিকীতে নিজেও সামরিক কুচকাওয়াজ আয়োজন করেন। তবে বেইজিংয়ের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও নিখুঁত মার্চপাস্টের বিপরীতে ট্রাম্পের অনুষ্ঠান ছিল ইতিহাসনির্ভর- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ট্যাঙ্ক ও স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন পোশাকে সৈন্যরা হোয়াইট হাউসের কাছে কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউ দিয়ে হেঁটে যান। এই বৈপরীত্য ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানের সাথে মিলে যায়, যেখানে তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর বাণিজ্যনীতি (মার্কেন্টাইলিজম)-এ ফিরে যাওয়াকে আমেরিকার স্বর্ণযুগ বলে মনে করেন।
অ্যান্থনি জারচার আরও লিখেছেন, অন্যদিকে চীনের কুচকাওয়াজ ভবিষ্যতমুখী অস্ত্রশস্ত্রে ভরপুর হলেও এর মধ্যে ইতিহাসও ছিল- বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের বড় ভূমিকার দাবি তুলে ধরা। যদি সেই যুদ্ধ ‘আমেরিকান শতাব্দী’র সূচনা করে থাকে, তবে বেইজিং আশা করছে তাদের ভূমিকাকে সম্মান জানালে ‘চীনা ভবিষ্যৎ’ সহজ হবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক ভেটেরেনস অ্যাফেয়ার্স সেক্রেটারি রিচার্ড উইলকি বলেন, এটি মূলত ইতিহাস নতুনভাবে লেখার প্রচেষ্টা। আর আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন নতুনভাবে লেখার প্রথম ধাপই হলো ইতিহাসকে পুনর্লিখন। চীনের কুচকাওয়াজ ছাড়াও এ সপ্তাহে আরও এক দৃশ্য ওয়াশিংটনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সোমবার তিয়ানজিনে অর্থনৈতিক সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বৈঠক হয়। ট্রাম্পের শুল্কনীতির কারণে চীন ও ভারতের মধ্যে যে টানাপোড়েন ছিল তা অনেকটাই কমে আসছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্যনীতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যে নাড়া দিয়েছে। চীন-রাশিয়া-ভারতের নতুন ঘনিষ্ঠতা দেখাচ্ছে যে ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র নতুনভাবে আঁকা হচ্ছে। ট্রাম্পের মতে, শুল্ক আরোপ করা মার্কিন শিল্প রক্ষা ও সরকারকে নতুন রাজস্ব আনার উপায়। কিন্তু কূটনৈতিক মূল্য থাকলেও আপাতত সেটি দিতে তিনি প্রস্তুত।

তবে ঝুঁকি বড়। শুক্রবার এক মার্কিন আপিল আদালত রায় দিয়েছে, ট্রাম্পের বহু শুল্ক আসলে আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন তিনি সুপ্রিম কোর্টে যাবেন। যদিও আদালত প্রায়ই তার পক্ষে রায় দেয়, তারা কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া প্রেসিডেন্টের অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগে সতর্ক। তাই জয়ী হবেন তার নিশ্চয়তা নেই। সবশেষে বলা যায়- ট্রাম্প বাণিজ্যে নিজস্ব ছন্দে হাঁটছেন। তিনি আমেরিকাকে নাটকীয়ভাবে নতুন পথে নিয়ে যাচ্ছেন, নতুন আন্তর্জাতিক মিত্রও তৈরি করছেন। তার প্রতিশ্রুতি- এটি দ্বিতীয় এক আমেরিকান স্বর্ণযুগ আনবে। কিন্তু ঝুঁকিও বাস্তব, হোক তা তিয়ানআনমেন স্কোয়ারের কুচকাওয়াজে কিংবা মার্কিন আদালতের ভেতরে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-03%2Fysld3c6i%2FChina-2.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

বিপজ্জনক মধ্যপ্রাচ্য, যে কোনো সময় বৃহত্তর যুদ্ধ শুরু

সময়ের সবচেয়ে ‘সংবেদনশীল ও বিপজ্জনক’ অবস্থায় রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য। অঞ্চলটি ঘিরে আতঙ্কিত বিশ্লেষকরা। তাদের আশঙ্কা, নানা দিক থেকে বাড়তে থাকা সংঘাত ও উত্তেজনা যে কোনো সময় একটি বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। সেই যুদ্ধে মুখোমুখি হবে ইসরায়েল, ইরান ও তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

ইয়েমেন

ফিলিস্তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আশরাফ আকা মনে করেন, হুতিদের সাম্প্রতিক ঘোষণা নতুন সংঘাতের সূচনা হতে পারে। তাদের মতে, ইয়েমেন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। হামলা হলে এটি শুধু গাজার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলকেও ব্যাহত করতে পারে।

লেবানন

লেবানন ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হামলা, এমনকি মিসর ও জর্ডানের প্রতি উসকানিমূলক নীতি গোটা অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করছে। লেবানিজ লেখক মরতাদা সামাভি বলেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো গাজায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও লেবাননে প্রতিরোধ শক্তিকে নিরস্ত্র করা। এর ফলে দেশটি ‘উত্তপ্ত দিনগুলোর’ মুখোমুখি হতে চলেছে। তিনি মনে করেন, জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর ইরানও নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে।

ইরান

তেহরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ হাদি ইসা দালুল জানান, ইসরায়েল এখনো সরাসরি ইরানের ভেতরে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারেনি; বরং তারা সীমান্তবর্তী এলাকায় ড্রোন নেটওয়ার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার ওপর নির্ভর করেছে। তবে ইরান এরই মধ্যে এসব নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়েছে, ফলে ইসরায়েলের বিকল্প সীমিত। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ইসরায়েল একা ইরানের মুখোমুখি হতে পারবে না। গবেষক সালেহ আল-কাজউইনি মনে করেন, ইরানের সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়া ইসরায়েলের জন্য এক সতর্কবার্তা, তবে ইসরায়েলকে পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না। তাদের লক্ষ্যই হলো গোটা অঞ্চলের প্রতিরোধ শক্তি ভেঙে দেওয়া।

ইরাক

বাগদাদের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মুখলিদ আল-দার্ব মনে করেন, ইরাকই ইরানপন্থি ফ্রন্টের সবচেয়ে দুর্বল সংযোগ। যদি ইরাক সক্রিয়ভাবে ইরানকে সমর্থন করে, তবে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এর ফলে দেশটির ভেতরে নিরাপত্তা ভেঙে পড়বে এবং সুপ্ত জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

জেরুজালেম

গবেষক হোসেইন আল-দিক মনে করেন, আসন্ন সংঘাত অতীতের যে কোনো লড়াইয়ের চেয়ে ‘বেশি সহিংস ও নির্ধারক’ হতে পারে। তার দাবি, এ যুদ্ধে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বও টার্গেট হতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইসরায়েলকে ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছে। সব ফ্রন্টে একই অস্ত্রনীতির প্রয়োগ করাই এখন দুই দেশের কৌশল।

বিশেজ্ঞরা সবাই একমত যে মধ্যপ্রাচ্য সবচেয়ে বিপজ্জনক এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। তবে যুদ্ধ শুরুর সময় নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। ইসরায়েলের লক্ষ্য প্রতিরোধ শক্তিকে ভেঙে দেওয়া এবং ইরানের লক্ষ্য আঞ্চলিক মিত্রদের ধরে রাখা। এ অবস্থায় ইরাক, লেবানন বা সিরিয়ার মতো ভঙ্গুর রাষ্ট্রগুলো সহজেই বড় শক্তির সংঘাতের ময়দানে পরিণত হতে পারে। সামান্য ভুল পদক্ষেপই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে। তথ্যসূত্র : শাফাক নিউজ 

গাজায় উপত্যকায় ট্যাংক নিয়ে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা। ছবি: সংগৃহীত
গাজায় উপত্যকায় ট্যাংক নিয়ে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি সেনারা।
গাজায় দ্রুত সময়ের মধ্যে ইসরায়েলি গণহত্যা ঠেকাতে জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস।
গত বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) পুরো গাজায় ইসরায়েলি হামলায় একাধিক ত্রাণ সংগ্রহকারীসহ অন্তত ৭৩ জন নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে শুধু গাজা শহরেই নিহত হয়েছেন ৪৩ জন। খবর আল জাজিরা
গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ করে ইসরায়েল বাহিনী একটি পুরো পরিবারকে হত্যা করেছে। বাস্তুচ্যুত এক ফিলিস্তিনি সাবরেন আল মাবহু আল জাজিরাকে বলেন, আমার ভাইকে তার রুমেই হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া তার স্ত্রী-সন্তানকেও হত্যা করা হয়েছে। কেউ বাঁচতে পারেনি।
শেখ রাদওয়ানের বাসিন্দা জাকিয়া সামি রয়টার্সের সাংবাদিককে জানায়, বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো যে স্কুলগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে, সেখানে গ্রেড হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। পুরো এলাকা ওলটপালট করে দেওয়া হয়েছে। যদি এভাবে চলতে থাকে তাহলে আমরা মারা যাব। যারা এটি দেখে কিছুই করছে না আমরা তাদের ক্ষমা করব না।
গাজার গণমাধ্যম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে শুধু গাজা সিটিতে অন্তত ১০০ রোবট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরো আবাসিক ব্লক ও মহল্লা গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। ১৩ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া অভিযানে গাজা সিটিতেই মারা গেছেন প্রায় ১ হাজার ১০০ ফিলিস্তিনি।
আল জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, গাজায় পরিস্থিতি ‘প্রলয়ংকরী’ রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে এর কোনো শেষ নেই... একের পর এক পুরো মহল্লা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মানুষ কয়েক দশকে যা গড়ে তুলেছিল, সব হারাচ্ছে। এটা যেন এক দুঃস্বপ্ন।
বুধবার হামাস জানায়, তারা একটি সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতি ও ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিনিময়ে সব ইসরায়েলি বন্দিকে মুক্তি দিতে প্রস্তুত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পরই হামাস এই বিবৃতি দেয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, অবরোধের কারণে খাদ্য ও সহায়তা প্রবেশে কড়াকড়ি থাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় এক শিশুসহ আরও ছয়জন অপুষ্টি ও অনাহারে মারা গেছে। অবরোধ চলাকালে এখন পর্যন্ত ক্ষুধাজনিত কারণে ৩৬৭ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন, এর মধ্যে ১৩১ শিশু।
জাতিসংঘ বলছে, ইসরায়েলের গাজা সিটি দখল অভিযান প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করতে পারে। কেবল ১৪ থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে জোরপূর্বক নতুন করে ৮২ হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩০ হাজারকে উত্তর থেকে দক্ষিণে সরতে বাধ্য করা হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেলকে অপসারণ চেষ্টায় অচলাবস্থা, নেতানিয়াহুর সরকার বিপাকে: অস্ট্রেলিয়া-ইসরাইল সম্পর্ক তলানিতে

মানবজমিনঃ ইসরাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারাকে অপসারণের প্রক্রিয়া আইনি অচলাবস্থায় থেমে গেছে। ঠিক এমন সময়ে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার প্রকাশ্যে স্বীকার করছে- হুমকি দেয়া ছাড়া তাদের হাতে আর কার্যকর কোনো পথ নেই। এ খবর দিয়ে অনলাইন হারেৎজের রিপোর্ট জানাচ্ছে- সুপ্রিম কোর্ট সরকারের এই প্রচেষ্টাকে অবৈধ বলেছে। তারা বলেছে, অ্যাটর্নি জেনারেলকে অপসারণের প্রচেষ্টা এগিয়ে না নিতে। এর ফলে এক সরকারি সূত্র মন্তব্য করেন, বিচারপতিরা অন্তত আমাদের একদিনের অর্থহীন বিতর্ক থেকে রক্ষা করেছেন। এই অচলাবস্থা সরকারের অবস্থান নরম করেনি, তবে উন্মোচন করেছে ভেতরের বিভাজন ও তীব্র সমালোচনা।

বিশেষ করে ন্যায়বিচার বিষয়ক মন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিনের বিরুদ্ধে তা তীব্র হয়েছে। তিনি এ প্রচেষ্টার মূল কারিগর। শাসক জোটের এক জ্যেষ্ঠ সদস্য বলেন, লেভিন অ্যাটর্নি জেনারেলের বিরুদ্ধে হয় ‘সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ’, নয়তো ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ’ চালাতে পারতেন। সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধে বেতন বন্ধ করে দেয়া, তার নির্দেশ মানলে প্রসিকিউটর অফিস থেকে লোক বরখাস্ত করা, এমনকি হাইকোর্টকে উপেক্ষা করা হতো। কিন্তু সেই পথ নেয়া হয়নি। ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে ঢুকে পড়া হলো, আর তাও ঠিকভাবে পরিচালিত হয়নি। তার মতে, একের পর এক ভুল হয়েছে পদ্ধতি বেছে নেয়া থেকে শুরু করে সার্চ কমিটি না ডাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে, লেভিনের সমর্থকরা বলছেন, তিনি যা-ই করতেন না কেন, শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টই তা বাতিল করত। একজন সরকারি সূত্র বলেন, যদি লেভিন আইন পরিবর্তন করে অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা ভাগ করার চেষ্টা করতেন, তাও আদালতে বাতিল হয়ে যেত। তখন আবার বলা হতো, কেন বরখাস্তের চেষ্টা করলেন না? তবে তারা স্বীকার করেন, লেভিন নিখুঁত নন, ভুল করেছেন।

শাসক জোটের আশা- বাহারাভ-মিয়ারা দীর্ঘ স্নায়ুযুদ্ধের ক্লান্তিতে নিজেই অবসর নেবেন, যেমনটা করেছিলেন শিন বেত-এর সাবেক প্রধান রোনেন বার। তবে বাস্তবে সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। বাহারাভ-মিয়ারা ডেমোক্রেসিপন্থি শিবিরে এক প্রতীকী ব্যক্তিত্ব- আইনের শাসনের শেষ প্রহরী হিসেবে বিবেচিত। তাকে অপসারণের পুরো প্রক্রিয়া অনিয়ম আর আইনি লঙ্ঘনে ভরা ছিল। এমনকি সরকারের নীতির প্রতি সহানুভূতিশীল রক্ষণশীল বিচারকরাও এই প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে পারবেন না।

অস্ট্রেলিয়া-ইসরাইল সম্পর্ক তলানিতে, কিন্তু আড়ালে চলছে সব
২৪শে আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, ফিলিস্তিনিদের সমর্থন জানায় এবং নিজেদের সরকারকে আরও শক্ত অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানায়। এর আগে ৩রা আগস্ট সিডনি হারবার ব্রিজে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশ ছিল অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক বিক্ষোভ। সেই বিক্ষোভ সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। অস্ট্রেলিয়া-ইসরাইল সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ভিসা বাতিল, উভয়পক্ষের কঠোর বক্তব্য, এমনকি ইসরাইলের অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ পর্যন্ত ওঠে। অস্ট্রেলিয়া ও ইসরাইলের সম্পর্ক নিয়ে এক বিশ্লেষণে এসব কথা অনলাইন বিবিসিতে লিখেছেন সাংবাদিক গাভিন বাটলার। তিনি আরও লিখেছেন, এ সপ্তাহে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলার্স ঘোষণা দিয়েছে- জাতিসংঘ কনভেনশনের আইনি সংজ্ঞা অনুযায়ী ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। তারা স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ত্রাণ খাতে ব্যাপক হামলা এবং প্রায় ৫০ হাজার শিশু নিহত বা আহত হওয়ার তথ্য তুলে ধরে। ইসরাইল এসব অভিযোগকে ‘হামাসের মিথ্যা’ প্রচারণা বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে জাতিসংঘ সমর্থিত বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা নিশ্চিত করেছে গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে। অর্ধ মিলিয়নের বেশি মানুষ ‘ক্ষুধা, নিঃস্বতা ও মৃত্যু’ পরিস্থিতিতে রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, ইসরাইল খাদ্য প্রবেশ ‘পদ্ধতিগতভাবে বাধাগ্রস্ত’ করছে।

ক্রমবর্ধমান জনরোষ ও পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বৃটেন, ফ্রান্স ও কানাডার পথে হেঁটে ঘোষণা দেন- অস্ট্রেলিয়া শর্তসাপেক্ষে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে। তিনি পরে জানান, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপ তাকে স্পষ্ট করে দেয়, নেতানিয়াহু গাজার মানবিক সংকট নিয়ে ‘অস্বীকারের ভেতরেই’ আছেন। ১৮ই আগস্ট নেতানিয়াহু আলবানিজকে পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগ করেন, এই সিদ্ধান্ত ইহুদি বিরোধী আগুনে ঘি ঢালার সমান এবং হামাসকে তুষ্ট করার নীতি। এরপর থেকে তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কঠোর ভাষায় আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাকে দুর্বল নেতা আখ্যা দিয়ে দাবি করেছেন, অস্ট্রেলিয়ার ইহুদিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছেন, নেতানিয়াহু আসলে ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক ইয়ান পারমিটার বলেন, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কখনো ইসরাইলের এত খারাপ সম্পর্ক আমি দেখিনি। তার মতে, পরিবর্তনের পেছনে মূলত দুটি কারণ কাজ করেছে- নেতানিয়াহুর গাজার মানবিক সংকট অস্বীকার ও গোটা ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনা। আরেকটি বড় কারণ ছিল সিডনি হারবার ব্রিজের ঐতিহাসিক মিছিল, যা জনমতের শক্ত চাপ প্রকাশ করে। ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনের অনেকেই মনে করেন, সরকার আসলে প্রতীকী পদক্ষেপই নিয়েছে। আড়ালে সামরিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রায় অপরিবর্তিত। ইসরাইলের ব্যবহৃত এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের অংশ সরবরাহ করে অস্ট্রেলিয়া। বিশেষ করে বোমা বহনের দরজা খোলার যন্ত্র, যা অন্য কোথাও তৈরি হয় না। যদিও সরকার দাবি করে, এসব প্রাণঘাতী নয়, জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী এটিও অস্ত্র বাণিজ্যের অংশ। এ কারণে আন্দোলনকারীরা সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। সম্প্রতি ইরানের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছে অস্ট্রেলিয়া । যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো ঘটল। ইসরাইল এ সিদ্ধান্তকে নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য বলে দাবি করেছে। কূটনৈতিক বিবাদ যতই তীব্র মনে হোক, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি স্থায়ী প্রভাব ফেলবে না। মানবসম্পর্ক ও দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক বন্ধনই সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক করে তুলবে।mzamin

পারমাণবিক ‘ট্রায়াড’, সমুদ্র-ড্রোন, কুকুরসদৃশ রোবট—যত গোপন অস্ত্র দেখাল চীন

প্রথম আলোঃ চীন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক কুচকাওয়াজে নানা ধরনের আধুনিক অস্ত্র প্রদর্শন করেছে। পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম সর্বাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র (বিশ্বের প্রায় যেকোনো স্থানে হামলার উপযোগী) থেকে শুরু করে বিমান প্রতিরক্ষা লেজার, হাইপারসনিক অস্ত্র ও সামুদ্রিক ড্রোন—সব মিলিয়ে একধরনের ভয়ভীতি প্রদর্শনের বার্তাই দিয়েছে দেশটি।

সামরিক বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের মতে, প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বুধবারের এ কুচকাওয়াজকে কাজে লাগিয়েছেন বহুমুখী বার্তা পাঠানোর জন্য। একটি বার্তা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্দেশে, একটি বার্তা দুই প্রতিবেশী ভারত ও রাশিয়ার উদ্দেশে এবং অন্যটি সম্ভাব্য অস্ত্র ক্রেতাদের উদ্দেশে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলেকজান্ডার নিল বলেন, ‘এসব নতুন অস্ত্রের নানা কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও চীন আসলে দেখিয়েছে, তারা প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তির সব দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য এসব বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে।’

প্রথমবারের মতো চীন তাদের পূর্ণ পারমাণবিক ‘ট্রায়াড’ বা ত্রিমুখী অস্ত্রশক্তি প্রদর্শন করেছে। এটি স্থল, সমুদ্র ও আকাশ থেকে একযোগে হামলা চালাতে পারে। এর মধ্যে ছিল আধুনিকায়ন করা আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ডিএফ-৫সি, যার পাল্লা ২০ হাজার কিলোমিটার (১২,৪০০ মাইল) আর দীর্ঘপাল্লার নতুন ‘রোড–মোবাইল’ ক্ষেপণাস্ত্র ডিএফ-৬১।

শুধু কৌশলগত স্তরেই নয়, চীন স্পষ্ট করেছে যে তারা নিজস্ব সমুদ্র অঞ্চলেও প্রভাব বিস্তার করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সিঙ্গাপুরের এস রাজরত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জেমস চর বলেন, ‘এত বিস্তৃত নতুন অস্ত্রভান্ডার যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পূর্ব এশিয়ায় যেকোনো সংঘাতের পরিকল্পনা জটিল করে তুলতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘সমুদ্র–ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্র মিলে এমন এক ঘেরাটোপ তৈরি করতে পারে, যেখানে বাইরের নৌবাহিনী প্রবেশ করতেই পারবে না।’

জেমস চর ও অন্যান্য বিশ্লেষক বলেন, চীন হয়তো ছোট দেশগুলোকে দেখাতে চাইছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা নিয়ে সংশয়ের মধ্যে তারা এখন ‘শান্তির রক্ষক’ হিসেবে দাঁড়াতে সক্ষম।

বিশেষ করে নতুন টর্পেডো–আকৃতির ড্রোন ও হাইপারসনিক ট্রায়াড অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্রদের জন্য বড় ধরনের হুমকি। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় চীনের বাড়তে থাকা ডিএফ-২৬ মধ্যমপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, তবে হুমকি আরও বাড়বে। গাইডেড ওয়ারহেড বহনকারী এ ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন জাহাজ ও গুয়ামসহ অন্যান্য ঘাঁটি টার্গেট করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, তাইওয়ান নিয়ে কোনো সংঘাতে সফল হতে হলে চীনকে দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু এটি সহজ নয়। কারণ, পূর্ব এশিয়াজুড়ে বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় রয়েছে।

তবে সামরিক কুচকাওয়াজে শৃঙ্খলা ও নিখুঁত প্রদর্শনীর আড়ালেও প্রশ্ন থেকেই গেছে এসব নতুন অস্ত্রের পূর্ণ সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে।

তাইপেভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাসোসিয়েশন অব স্ট্র্যাটেজিক ফোরসাইট’–এর গবেষক চিয়েহ চুং বলেন, ‘চীন বলছে, এসব অস্ত্র কার্যকর অবস্থায় আছে। তবে তা কতটা সত্য, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক অস্ত্র হয়তো এখনো সীমিতভাবে সেনা ইউনিটে মোতায়েন, পরীক্ষামূলক ব্যবহারের স্তরে রয়েছে এবং স্বাভাবিক উৎপাদনের পর্যায়ে নেই।

চর, নিলসহ অন্য বিশ্লেষকেরা বলেন, চীন দেখিয়েছে যে বিমান প্রতিরক্ষা, যুদ্ধক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা ও ড্রোনের সমন্বয়ে তারা উন্নত প্রযুক্তি একত্রে কাজে লাগাতে চাইছে। উদাহরণস্বরূপ, সামরিক কুচকাওয়াজে নতুন যুদ্ধট্যাঙ্ক ‘টাইপ–১০০’ প্রদর্শন করা হয়; যেখানে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও গোয়েন্দা ড্রোনসহ নানা আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া নবগঠিত মহাকাশ, সাইবার ও তথ্য–সহায়তা ইউনিটও দেখানো হয়। এসব প্রমাণ করে, চীন উন্নত মহাকাশ যুদ্ধ ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধক্ষেত্রেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রস্তুত।

নিল বলেন, ‘পশ্চিমা সেনারা এখনো কার্যকারিতার দিক থেকে এগিয়ে থাকতে পারে। তবে চীন দ্রুত তাদের ধরে ফেলছে—এটা স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র সাধারণত উন্নয়নাধীন অস্ত্র নিয়ে এত খোলামেলা জানায় না।’

এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, চীনের এসব প্রযুক্তি অন্য দেশকে বিক্রি করার হয়তো একটা ইচ্ছা আছে। আসলে কিছুটা প্রদর্শনী ছিলও এখানে, যেমন দেখা গেছে কুকুরের মতো দেখতে এক রোবট।’ রয়টার্স, সিঙ্গাপুর

অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্‌

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-03%2Fbaexyea7%2FChina-1.jpg?rect=0%2C0%2C960%2C640&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চীনের বেইজিংয়ে আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে প্রদর্শন করা অত্যাধুনিক ড্রোন। ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে বেলজিয়াম, ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা

ফিলিস্তিনকে এ মাসের শেষের দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে বেলজিয়াম। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো এ ঘোষণা দিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়, মঙ্গলবার ভোরে এক্স প্ল্যাটফর্মে দেয়া বার্তায় প্রেভো লিখেছেন, জাতিসংঘ অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে বেলজিয়াম! আর ইসরাইলি সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।

উল্লেখ্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন ম্যাক্সিম প্রেভো। তার ঘোষণা অনুযায়ী ইসরাইলের বিরুদ্ধে বেলজিয়াম মোট ১২টি নিষেধাজ্ঞা দেবে। এর মধ্যে রয়েছে দখলকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসরাইলি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকারি ক্রয়নীতি পুনর্বিবেচনা। প্রেভো বেলজিয়ামের মধ্যপন্থি ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেট দলের সদস্য। তিনি বলেন, গাজা বিশেষ করে ফিলিস্তিনে চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সবশেষ বন্দি মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত এবং হামাস ফিলিস্তিন পরিচালনায় কোনো ভূমিকা না রাখা পর্যন্ত এই স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে না। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট দে ওয়েভার ফ্লেমিশ জাতীয়তাবাদী দলের। তিনি গত মাসে বলেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়া উচিত কঠোর শর্তসাপেক্ষে। জুলাইয়ের শেষ দিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন ঘোষণা করেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অধিবেশন চলাকালীন বিশ্বনেতারা যখন মিলিত হবেন, তখন ফ্রান্স ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে। ২২ সেপ্টেম্বরের ওই অধিবেশনে ফিলিস্তিন স্বীকৃতি নিয়ে বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করবে ফ্রান্স ও সৌদি আরব। এ মাসেই অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং বৃটেনও শর্তসাপেক্ষে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত জাতিসংঘের ৭৫ শতাংশ সদস্য রাষ্ট্র তথা ১৪৭টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র এসব উদ্যোগকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফ্রান্সের ঘোষণাকে অবিবেচক সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দেন। তার মতে এটা শুধু হামাসের প্রচারণাকেই শক্তিশালী করবে। তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জাতিসংঘ অধিবেশনের আগে নিউ ইয়র্কে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা বাতিল এবং অস্বীকার করবে। ইসরাইলের চরম ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ গত বছর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যে দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে, প্রতিবারই পশ্চিম তীরে নতুন একটি অবৈধ বসতি স্থাপন করা হবে। বর্তমানে স্মোত্রিচ অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে ও বৃৃটেনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দু’জন ইসরাইলি মন্ত্রীর একজন। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলের গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে। যার মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং অস্ত্র সরবরাহে অবরোধ। প্রেভোর ঘোষিত ১২টি নতুন নিষেধাজ্ঞা মূলত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতিগুলোকে কেন্দ্র করেই।

গত মাসে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাসপার ভেল্ডক্যাম্প মন্ত্রিসভায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আদায়ে সমর্থন না পাওয়ায় পদত্যাগ করেন। ২২ আগস্ট জাতিসংঘ সমর্থিত একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে উত্তর গাজায় দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে, যা সেপ্টেম্বরের শেষে মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেলজিয়ামের এই সিদ্ধান্ত এসেছে এমন সময়ে যখন ইসরাইলের গাজায় যুদ্ধে কমপক্ষে ৬৩,৪৫৯ জনকে হত্যা করেছে এবং আরও ১,৬০,২৫৬ জনকে আহত করেছে। গত জুলাইয়ে বেলজিয়ান প্রসিকিউটররা গাজায় নৃশংসতায় অংশ নেয়ার অভিযোগে দুই ইসরাইলি সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলার আবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠিয়েছেন।
https://mzamin.com/uploads/news/main/178281_Abul-4.webp