Thursday, March 27, 2025

‘পুতিন শীঘ্রই মারা যাবেন’

দীর্ঘ সময় ধরেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অসুস্থতা নিয়ে গুজব রয়েছে। কখনও খবর হয়েছে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। আবার কখনও শোনা গেছে তার খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটার সংবাদ। এর কোনোটিই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হলেও এসব খবরে পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস রাখেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। নতুন করে পুতিনের অসুস্থতার গুজব ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক উদ্ভট মন্তব্য করলেন কিয়েভের প্রেসিডেন্ট। বলেছেন, পুতিন শীঘ্রই মারা যাবেন। 

বুধবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রনের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্যারিসে এক সংবাদ সম্মেলনে পুতিনের স্বাস্থ্য নিয়ে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নের জবাবে ওমন উদ্ভট মন্তব্য করলেন জেলেনস্কি। এ খবর দিয়েছে ডেইলি মেইল। এতে বলা হয়, জেলেনস্কি বলেছেন, পুতিন শীঘ্রই মারা যাবেন এবং এটা কঠিন সত্য। এটা (যুদ্ধ) শেষ হয়ে যাবে।

পুতিনের অতি পৌরুষ ভাবমূর্তি ধরে রাখার প্রচেষ্টা থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য ভগ্নের গুজবের মুখোমুখি হচ্ছেন। বর্তমানে পুতিনের বয়স ৭২ বছর। সম্প্রতি তার মুখাবয়ব ফুলে উঠেছে। দাঁড়ানোর সময় পা কাঁপতে থাকে। আর চোখগুলো সবসময় রক্তাভ থাকায় পুতিনের অসুস্থতার জল্পনা আরও জোরদার হয়েছে।

২০২২ সালের একটি ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হয়। রাশিয়ার তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগুরের সঙ্গে বৈঠকের সময় হঠাৎ চেয়ারে ঝুঁকে পড়েন প্রেসিডেন্ট পুতিন। পরে টেবিল ধরে কথা বলতে থাকেন। এছাড়া তার ক্রমাগত কাশি এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে ঝাঁকুনির খবরও শোনা গেছে। বেশ কয়েকবার তাকে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটতে দেখা গেছে। এমনও দাবি করা হচ্ছে যে, পুতিন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জেলেনস্কি দাবি করেছেন, পুতিন রাশিয়ার মিত্র দেশগুলোর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ভেতর থেকে আঘাত করার চেষ্টা করছেন, যা তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের শঙ্কা তৈরি করেছে।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে চুক্তি সম্পন্ন হলে ইউরোপ কিয়েভকে কেমন নিরাপত্তা দেবে সে বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হলে জেলেনস্কির সঙ্গে ইউরোপীয় নেতাদের স্বাগত জানাবেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।

প্যারিসে জেলেনস্কির সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ম্যাক্রন বলেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসন থামানোর এখনই চূড়ান্ত সময়। কেননা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র একটি চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এছাড়া ইউক্রেনের জন্য দুই বিলিয়ন ইউরোর সামরিক সহায়তা ঘোষণা করেছে ফ্রান্স।

৩০ দিনের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতিতে অবশ্যই রাশিয়াকে সম্মত হতে হবে বলে জোর দিয়েছেন ম্যাক্রন। অবশ্যই এটা কোনো ধরনের শর্ত ছাড়াই হবে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। ফরাসি প্রেসিডেন্ট মস্কোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেছেন, রাশিয়া এখনও যুদ্ধের মনোভাব পোষণ করছে। যার ফলে কিয়েভের জন্য শান্তি চুক্তি গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

mzamin

ফিলিস্তিনি শিশুদের ‘মৃত্যুদণ্ড’র পরামর্শ, ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ‘বন্দুক’ বা ‘গ্রেনেড’ হাত দিয়ে ধরার জন্য ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরামর্শ দিয়েছেন অস্ট্রিয়ায় নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ডেভিড রোয়েট।

এই বিতর্কিত পরামর্শ তিনি ইউরোপের দেশ ইনসব্রুকে ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে উত্থাপন করেন। বৈঠকটি ছিল একটি বন্ধ পরিবেশে, যেখানে রোয়েটের বক্তব্য গোপনে রেকর্ড করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা ফাঁস হয়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

ভিডিও বার্তায় ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত দাবি করেন, গাজার শিশুদের হাতে অস্ত্র বা গ্রেনেড বহনের কোনো প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করতে পারেননি, কিন্তু তবুও তিনি এমন একটি পরামর্শ দিয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে চরম বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

রোববার (২৩ মার্চ) মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটর এই ভিডিও প্রকাশ করে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ মার্চ ভোরে, ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ভয়াবহ হামলার দুই দিন পর এই ভিডিওটি রেকর্ড করা হয়।

ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত এই সময় বেসামরিক হতাহতের বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে অগ্রাহ্য করে, সাফ জানিয়ে দেন, ‘আপনি বিশ্বাস করছেন যে ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করছে, যা সঠিক নয়।’

প্রসঙ্গত, জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিল (ইউনিসেফ) এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গণহত্যা শুরুর পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী গাজায় সাড়ে ১৪ হাজারেরও বেশি শিশুকে হত্যা করেছে। বর্তমানে এই সংখ্যাটি বেড়ে ১৫ হাজার ৬১৩ জনে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদমাধ্যমটির রেকর্ডিংটি ফাঁসকারী অজ্ঞাতনামা কর্মীকে উদ্ধৃত করে জানায়, ‘রোয়েট যখন এই বক্তব্য দিয়েছিলেন, তার কণ্ঠস্বর ছিল শান্ত। তিনি যখন শিশুদের মৃত্যুদণ্ডের পরামর্শ দেন, তখন উপস্থিত অন্যরা কোনো প্রতিবাদ করেনি। এটি আমাকে গভীরভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে যে, যখন কিছু মানুষ যুদ্ধাপরাধের পরামর্শ দেন, তখন বিষয়টি কতটা কলুষিত হতে পারে।’

রোয়েটের বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষোভের ঝড় ওঠে এবং এই মন্তব্যের জন্য তাকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের বক্তব্য কেবল একে অপরের প্রতি ঘৃণা এবং সহিংসতার মন্ত্রই প্রচার করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

গাজায় ইসরায়েলের হামলার মুখে শিশু সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছেন এক ফিলিস্তিনি পরিবার। ছবি : সংগৃহীত
গাজায় ইসরায়েলের হামলার মুখে শিশু সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছেন এক ফিলিস্তিনি পরিবার। ছবি : সংগৃহীত



যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফিলিস্তিনিদের নিয়ে ইসরায়েলের নতুন সিদ্ধান্ত

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের ভয়ানক হামলা অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে গাজা নিয়ে একটি নতুন এবং বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে ইসরায়েল।

এই পরিকল্পনা মূলত গাজাকে পুনরায় দখল ও শাসন করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি সরকার দ্বারা পর্যালোচিত হচ্ছে। এমনকি, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনও এই পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে।

মঙ্গলবার (২৫ মার্চ) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে গাজা নিয়ে ইসরায়েলের নতুন পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।

এছাড়াও দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর ইসরায়েলি সেনারা গাজা পুনর্দখল ও শাসনের পদক্ষেপগুলো এখন একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরায়েলি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগের (জো বাইডেন) প্রশাসন চেয়েছিল আমরা যুদ্ধ শেষ করি, তবে ট্রাম্প চান আমরা যুদ্ধে জয়ী হই। এর মাধ্যমে ইসরায়েলের শাসকগোষ্ঠীর দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশিত হয় যে, তারা গাজার উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজার ২৩ লাখ বাসিন্দাকে আল মাওয়াসি নামে একটি ছোট উপকূলীয় অঞ্চলে স্থানান্তর করার কথা বলা হচ্ছে। এই অঞ্চলটি বর্তমানে ইসরায়েলি প্রশাসন ‘মানবিক অঞ্চল’ হিসেবে বর্ণনা করছে, তবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, এই পরিকল্পনা কার্যকর করতে প্রায় ৪০ হাজার সেনা মোতায়েন করা হতে পারে, যা ৪টি সেনা ডিভিশনের সমান। এই সেনাবাহিনী গাজার স্থায়ী শাসন পরিচালনা করবে।

তবে এই পরিকল্পনার কার্যকারিতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেক সামরিক বিশ্লেষক। তারা মনে করছেন, এত বড় একটি এলাকা পুনর্দখল ও শাসন করা অনেক জটিল হতে পারে, বিশেষ করে যখন গাজার বাসিন্দাদের প্রতি অত্যাচার এবং দমনপীড়ন শঙ্কা রয়েছে।

এদিকে, টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে যে, ইসরায়েলের কৌশলগত বিষয়াদি সম্পর্কিত মন্ত্রী রন ডেরমার চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র সফর করবেন। এই সফরের সময় তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে গাজা উপত্যকার দখল নেয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন। এক্ষেত্রে ইসরায়েলি মন্ত্রীদের লক্ষ্য হচ্ছে মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন অর্জন করা, যাতে গাজার বাসিন্দাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ হয়।

নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে যেভাবে ত্রাণ গাজার জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটি আর সরবরাহ করা হবে না। পরিবর্তে, গাজার ফিলিস্তিনিদের ত্রাণ সরবরাহ করবে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী আইডিএফ। এর ফলে, গাজার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হতে পারে, কারণ তারা ইসরায়েলি বাহিনীর নীতি অনুযায়ী ত্রাণ পাওয়ার জন্য নির্ভরশীল হতে হবে।

এছাড়া, সিএনএন জানিয়েছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় একটি বিতর্কিত প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে, যা গাজার সব ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করার পক্ষে। এই প্রস্তাবের মধ্যে গাজার বাসিন্দাদের অন্য দেশে স্থানান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের বাস্তুচ্যুতি জাতিগত নিধনের শামিল হতে পারে।

রোববার (২৩ মার্চ) ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী ও কট্টরপন্থি নেতা বেজালাল স্মোট্রিচ বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজের উত্থাপিত প্রস্তাবটি নিরাপত্তা কাউন্সিলে অনুমোদন পেয়েছে। তিনি জানান, গাজার বাসিন্দাদের ‘স্বেচ্ছায়’ অন্য দেশে স্থানান্তরের কথাও বলা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ও একই ধরনের প্রস্তাব ছিল, যা আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, গণবাস্তুচ্যুতি বা ব্যাপক স্থানান্তর মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এসব প্রস্তাবকে তাদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় হিসেবে উপস্থাপন করছে।

এদিকে, গাজায় ইসরায়েলের নৃশংসতা অব্যাহত রয়েছে। ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন হামলা শুরু করার পর গাজায় ৭৩০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে কমপক্ষে ৪০০ জন নারী ও শিশু। এই হামলাগুলোর মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলা, আর্টিলারি শেলিং ও গুলি চালানো অন্তর্ভুক্ত। বিশ্ব সম্প্রদায় এই সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, এবং মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপ বাড়ছে।

নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে ইসরায়েলের গাজার ওপর পুনরায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ছবি : সংগৃহীত

আওরঙ্গজেবের কবর ভাঙার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি by জাওয়েদ নকভি

মোগলরা ১৫২৬ থেকে ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর আগপর্যন্ত ভারত শাসন করেছিলেন। সেই সময়ে দুনিয়ায় আর কী ঘটছিল? এই প্রশ্ন ওঠে আরও অদ্ভুত এক দাবির কারণে। হিন্দুত্ববাদীরা চাইছেন, মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গবাদে থাকা আওরঙ্গজেবের সাধারণ কবর গুঁড়িয়ে দিতে।

আওরঙ্গজেব কি এতটাই ভয়ংকর ছিলেন? যদি তা–ই হয়, তবে কি ব্রিটিশদেরও প্রচারণা চালানো উচিত হেনরি অষ্টমের সমাধি উড়িয়ে দেওয়ার জন্য? কারণ, তিনি তাঁর স্ত্রীদের প্রতি ভয়ংকর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিলেন। এই রাজা ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর ও তাঁর পুত্র হুমায়ুনের সমসাময়িক। বাবর ছিলেন এক কাব্যপ্রেমী, তাঁর আত্মজীবনীতে যার ছাপ স্পষ্ট, আর হুমায়ুন ছিলেন এক রহস্যময় সাধক।

ভারতে মুসলিম শাসকদের প্রতি হিন্দুত্ববাদীদের ঘৃণা নতুন কিছু নয়। এই ঘৃণা হিটলারের ইহুদি বা আজকের নেতানিয়াহুর ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালানো ঘৃণার মতো। কিন্তু বিজেপি যদি সত্যিই ন্যায়বিচার চায়, তাহলে শুধু দেশীয় শাসকদের নয়, ইতিহাসের আরও কিছু নিষ্ঠুর শাসকের দিকেও দৃষ্টি দেওয়া উচিত।

বাবরের রাজত্ব শুরু হওয়ার তিন দশক আগেই ইউরোপীয়রা আমেরিকায় উপনিবেশ স্থাপন শুরু করেছিলেন। এরপর ইউরোপীয় শাসকেরা প্রায় ১ হাজার ৫০০ যুদ্ধ, হামলা ও গণহত্যা চালিয়েছেন আমেরিকার আদিবাসীদের ওপর। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৪৯২ সালে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের সময় যেখানে প্রায় এক কোটি আদিবাসী বাস করত। ঊনবিংশ শতকের শেষে ‘ইন্ডিয়ান ওয়ার্স’ শেষ হওয়ার পর মাত্র আড়াই লাখ আদিবাসী টিকে ছিল।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর বছর, ১৭০৭ সালে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল—ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড একীভূত হয়ে গঠন করেছিল গ্রেট ব্রিটেন। এই রাজনৈতিক জোট পশ্চিমা দুনিয়ায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল এবং ব্রিটিশদের আমেরিকায় আধিপত্য বিস্তারে সহায়তা করেছিল। তবে এই জোট শুরুর পর থেকেই বারবার বাধার মুখে পড়েছে। স্কটিশ জাতীয়তাবাদীরা এখনো স্বাধীনতার জন্য লড়ছে। তারা ইতিহাসের অন্যায় সংশোধন করতে চায়। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা ৩০০ বছর পুরোনো এক সমাধি নিয়ে এত আগ্রহী কেন?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দৃষ্টিতে আওরঙ্গজেব ছিলেন হিন্দুবিদ্বেষী, যিনি অমুসলিমদের ওপর ‘জিজিয়া’ কর আরোপ করেছিলেন। ইতিহাসবিদেরাও স্বীকার করেন, তিনি বহুজাতিক, বহুধর্মীয় ভারত শাসনকারী মোগলদের মধ্যে সবচেয়ে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির শাসক ছিলেন। তবে ইতিহাসের আরেক দিকও আছে। আওরঙ্গজেব যেমন কিছু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন, তেমনি অনেক হিন্দু মন্দিরকে অনুদানও দিয়েছিলেন।

সত্যি বলতে, বিজেপি তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে বিষয়টি উসকে না দিলে কেউই আওরঙ্গজেব বা তাঁর সমাধি নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। হিন্দুত্ববাদী প্রচারণাকে আরও উসকে দিয়েছে, যা মোদি সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থন পাওয়া একটি হিন্দি চলচ্চিত্র। সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে আওরঙ্গজেব নির্মমভাবে মারাঠা শাসক সাম্ভাজিকে হত্যা করেছিলেন। তবে এতে ধর্মীয় মেরুকরণের জন্য ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি হিন্দুত্ববাদীদের বহু পুরোনো এক কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি।

চলুন, একমুহূর্তের জন্য আওরঙ্গজেবের কঠোর সমালোচকদের সান্ত্বনার জন্য ধরে নিই যে আওরঙ্গজেব ছিলেন ভয়ংকর এক শাসক। সিংহাসনের জন্য তিনি তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার বড় ভাই দারা শিকোকে হত্যা করেছিলেন। তিনি শিখ, মারাঠা ও জাঠ কৃষক বিদ্রোহের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় উগ্রতার মধ্যেও কিছু অসংগতি ছিল। তাঁর সেনাবাহিনীতে উচ্চপদস্থ সেনাপতিরা ছিলেন হিন্দু। তিনি বিজাপুর ও গোলকোন্ডার মুসলিম শাসকদের আক্রমণ করেছিলেন। এ ছাড়া তিনি যেমন শিখদের পবিত্র গুরু তেগ বাহাদুরকে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করেছিলেন, তেমনই তিনি সুফি সাধক শাহ সরমদকেও একই নির্মমতায় হত্যা করেছিলেন।

এই হত্যাকাণ্ডগুলো ব্রিটিশ কবি টি এস এলিয়টের নাটক মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল-এ বর্ণিত ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় হেনরি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আর্চ বিশপ থমাস বেকেটকে হত্যা করিয়েছিলেন। সরমদ ছিলেন ফারসিভাষী এক আর্মেনীয় সুফি। যদিও পরবর্তী সময়ে কট্টর ইসলামি পণ্ডিতেরা তাঁকে ধর্মদ্রোহী হিসেবে ঘোষণা করেন। দিল্লির জামে মসজিদের পাশেই সরমদের কবর, যা এখনো বহু ধর্মের মানুষের জন্য তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।

প্রশ্ন হলো, আদর্শ শাসক কে ছিলেন? আওরঙ্গজেব নন, এটা অনেকেই মানেন। কেউ কেউ আকবরকে বলেন আদর্শ শাসক। কিন্তু হিন্দুত্ববাদীরা তাঁকেও ঘৃণা করেন। হয়তো আওরঙ্গজেবের চেয়ে বেশি। মুসলিম কট্টরপন্থীরাও আকবরকে পছন্দ করেন না। কারণ, তিনি অন্যান্য ধর্মের প্রতি উদার ছিলেন।

তাহলে কি এমন কোনো হিন্দু শাসক ছিলেন, যিনি হিন্দু শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি? নাকি শুধু মুসলিম শাসকেরাই এমন কাজ করেছেন? চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর উপদেষ্টা চাণক্য, কৌশল ও প্রতারণার মাধ্যমে মগধের নন্দ শাসকদের পরাজিত করেছিলেন। চাণক্য কি হিন্দু ও অহিন্দুর মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন? না। ঠিক যেমন ভারতবর্ষের মুসলিম শাসকেরা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কখনো পিছপা হননি।

তাহলে আজ মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গবাদে তাঁর সমাধি ধ্বংসের জন্য এত হইচই কেন? যদি এই হিন্দুত্ববাদীরা উসকে না দিতেন, তাহলে কি তা খবরের শিরোনামে আসত? ভারতের অর্থনীতি এখন কঠিন সময় পার করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। এ বছরের শেষের দিকে বিহার রাজ্যে নির্বাচন রয়েছে। এসব বাস্তব সমস্যার চেয়ে কি ৩০০ বছর পুরোনো এক কবরে হাত দেওয়াটাই বেশি জরুরি?

আওরঙ্গজেবের সঙ্গে এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। আর বিজেপি রাজনৈতিক মেরুকরণ থেকে সুবিধা নিতে চায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে মহারাষ্ট্রে ব্রাহ্মণ-মারাঠা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির একজন ব্রাহ্মণ। তিনি এক মারাঠা মিত্রকে সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। শোনা যাচ্ছে, ক্ষমতাচ্যুত মারাঠা নেতা ক্ষোভে ফুঁসছেন।

বিতর্কিত সিনেমাটিতে দেখানো হয়েছে, মারাঠা শাসক সাম্ভাজির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাঁকে আওরঙ্গজেবের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মারাঠা প্রতিদ্বন্দ্বীরা। কিন্তু পেশাদার ইতিহাসবিদেরা বলছেন, এই ষড়যন্ত্রকারীরা আসলে ব্রাহ্মণ ছিলেন। ছবির সহিংসতা এই অস্বস্তিকর সত্য আড়াল করছে। সিনেমাটি দারুণ ব্যবসা করছে, আর আওরঙ্গজেবের পক্ষে তাঁর গল্প পাল্টানো তো দূরের কথা, নিজের কবরও রক্ষা করা সম্ভব নয়।

* জাওয়েদ নকভি দিল্লিতে ডন পত্রিকার প্রতিনিধি

ডন থেকে নেওয়া ইংরেজির অনুবাদ

নাগপুরে আওরঙ্গজেবসমাধি ভাঙা নিয়ে সংঘাত, ১৭ মার্চ ২০২৫
নাগপুরে আওরঙ্গজেবসমাধি ভাঙা নিয়ে সংঘাত, ১৭ মার্চ ২০২৫ ছবি: এএফপি


ভাতিজাকে আলিঙ্গন করতে বাদশাহ দুই হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুলি by শেখ নিয়ামত উল্লাহ

সৌদি আরবের তৃতীয় বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ বেশ জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। আজকের সৌদি আরবের রূপকার বলা যায় তাঁকে। স্বাধীন ফিলিস্তিনের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ আপন ভাতিজা তাঁকে হত্যা করেন। সৌদি বাদশাহকে নিয়ে আজকের আয়োজন।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। গভর্নরের প্রাসাদের সামনে হাজির হয়েছেন হাজার দশেক মানুষ। সেখানে আনা হলো সৌদি রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স ফয়সাল বিন মুসাইদকে। পরনে সাদা পোশাক। হাঁটু গেড়ে বসলেন তিনি। কিছুক্ষণ বাদেই নেমে এল জল্লাদের তলোয়ার। হাজারো জনতার সামনে শিরশ্ছেদ করা হলো যুবরাজকে। তারিখটা ১৯৭৫ সালের ১৮ জুন।

এবার কয়েক মাস পেছনে ফেরা যাক। সেদিন ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ, আজ থেকে ঠিক ৫০ বছর আগে। সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ নিজ কার্যালয়ে কুয়েতের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তখনই তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন প্রিন্স ফয়সাল বিন মুসাইদ। সম্পর্কে তিনি বাদশাহ ফয়সালের ভাইপো। ওই হত্যাকাণ্ডের জন্যই তাঁর শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল।

বাদশাহ ফয়সাল ছিলেন সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ বিন আল সৌদের ছেলে। সৌদি আরবের তৃতীয় বাদশাহ তিনি। তাঁর মৃত্যু সে সময় দুনিয়াজুড়ে সাড়া ফেলেছিল। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টসহ নামীদামি সব সংবাদপত্র এ নিয়ে ফলাও করে খবর ছেপেছিল। শোক জানিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডসহ বিশ্বনেতারা। তবে কী কারণে চাচাকে হত্যা করতে প্রিন্স ফয়সাল অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন, সে রহস্যের আর সমাধান হয়নি।

যেভাবে হত্যা করা হয় ফয়সালকে

বাদশাহ ফয়সালকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তাঁর জ্বালানি তেলমন্ত্রী ছিলেন শেখ আহমেদ জাকি ইয়ামানি। তাঁর মেয়ের নাম মেই ইয়ামানি। পেশায় তিনি লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাদশাহ ফয়সালকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর। এখন বয়স ৬৮। হত্যাকাণ্ডের সময় কী ঘটেছিল, তা বিবিসির সঙ্গে আলাপচারিতায় জানিয়েছিলেন তিনি।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মেই ইয়ামানি বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন তেলমন্ত্রী। তাই তিনি সেদিন বাদশাহ ফয়সালকে এ বিষয়ে আগে থেকে ব্যাখ্যা করতে গিয়েছিলেন। আর যে যুবরাজ এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, তিনি বাদশাহর ভাইপো ছিলেন। ভাগ্যের পরিহাস হচ্ছে, তাঁর নামও ছিল ফয়সাল।

মেই ইয়ামানি আরও বলেন, ‘কুয়েতের তেলমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে প্রতিনিধিদল বাদশাহর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, তাদের ভেতরে ঢুকে পড়েন ফয়সাল। বাদশাহ ফয়সাল তাঁর ভাইপোকে আলিঙ্গন করতে দুই হাত বাড়িয়ে দেন। তখনই তাঁর ভাইপো পকেট থেকে একটা ছোট্ট পিস্তল বের করেন। এরপর গুলি করেন বাদশাহ ফয়সালকে। মাথা লক্ষ্য করে পরপর তিনটি গুলি। আমার বাবা তখন বাদশাহ ফয়সালের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন।’

এরপর বাদশাহ ফয়সালকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা জানান, তিনি মারা গেছেন। মেই ইয়ামানির বাবা শেখ ইয়ামানি বাদশাহ ফয়সালের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মন্ত্রীদের একজন। বিবিসিকে মেই ইয়ামিন বলেন, ‘আমি সেদিনের কথা কখনোই ভুলব না। সে কষ্ট আমাকে সইতে হয়েছে। আমি এখনো তা মনে করতে পারি। আমার বাবার যে বেদনা, সেটা বোঝার চেষ্টা করুন। তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন বাদশাহ ফয়সালের পাশে, যিনি ছিলেন তাঁর সব কিছু—গুরু, বন্ধু, পথপ্রদর্শক। অথচ তাঁকে এত কাছে থেকে গুলি করে মারা হলো।’

হত্যাকারী যুবরাজ কি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন

যুবরাজ ফয়সালের চালানো প্রথম গুলিটি লাগে বাদশাহর চিবুকে। দ্বিতীয় গুলিটি তাঁর কান ঘেঁষে চলে যায়। একজন রক্ষী অকস্মাৎ এগিয়ে এসে যুবরাজকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেন। তখন তেলমন্ত্রী জাকি চিৎকার করে ওঠেন, যুবরাজকে হত্যা করা যাবে না। এরপর প্রিন্স ফয়সালকে গ্রেপ্তার করে কারাবন্দী করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর সৌদি রাজপরিবার থেকে দাবি করা হয়েছিল, যুবরাজ ফয়সাল মানসিকভাবে অসুস্থ। তবে তাঁর শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য গঠন করা বিশেষজ্ঞদের বরাতে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছিল সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস। ওই বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, হত্যার দিন যখন নিরাপত্তারক্ষীদের পেরিয়ে যুবরাজ ফয়সাল বাদশাহের কাছে গিয়েছিলেন, তখন তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন।

যুবরাজ ফয়সাল যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করেছিলেন। সে সময় তাঁর মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা জানতে দেশটিতে বিশদ খোঁজখবর নেন তদন্তকারীরা। জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে এলএসডি নামের একধরনের মাদক বিক্রির জন্য একবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল যুবরাজ ফয়সালকে। সৌদি আরবে ফেরার পর রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তখন তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন বলে খবর বের হয়। লেবাননের রাজধানী বৈরুতেও মানসিক চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত চাচাকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পান ২৭ বছর বয়সী যুবরাজ ফয়সাল। ১৯৭৫ সালের ১৮ জুন তাঁকে শিরশ্ছেদের আগে বিকেল সাড়ে চারটায় আদালতের রায় গভর্নরের প্রাসাদের সামনে উপস্থিত জনতাকে জানায় সৌদি সরকার। এরপর শিরশ্ছেদ কার্যকর করা হয়। সাজা দেওয়ার পর কিছুক্ষণ জনসাধারণের সামনে রাখা হয় যুবরাজের খণ্ডিত মাথা। এরপর কবর দেওয়ার জন্য পুরো শরীর অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাওয়া হয়।

হত্যার পেছনে রহস্য কী

বাদশাহ ফয়সালকে হত্যার পর কারণ খুঁজতে ১৬ সপ্তাহ ধরে অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন তদন্তকারীরা। শেষ পর্যন্ত তাঁরা জানান, এ হত্যার পেছনে কোনো চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র নেই। যদিও বাদশাহ ফয়সালকে হত্যার পেছনে কী কারণ কাজ করেছিল, তা নিয়ে গুঞ্জন কম ছড়ায়নি।

চাচাকে হত্যার পর যুবরাজ ফয়সালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। যেমন বলা হয়েছিল, রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে নিজের বার্ষিক বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন যুবরাজ। এ ছাড়া তাঁর দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর গ্রেপ্তার-সংক্রান্ত কারণে ওই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যুবরাজ ফয়সাল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদস্য, এমন অভিযোগও আনা হয়েছিল।

বাদশাহ ফয়সালের মৃত্যুর পর তাঁর স্থলে আসেন বাদশাহ খালিদ। তখন সৌদি আরবের গোয়েন্দাপ্রধান ছিলেন যুবরাজ তুর্কি আল ফয়সাল। তাঁকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেন বাদশাহ খালিদ। ২০২০ সালের এপ্রিলে সৌদি রোতানা খালিজিয়া চ্যানেলে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাদশাহ ফয়সালের হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত ছিল না। হত্যার পেছনে কাজ করেছিল যুবরাজ ফয়সালের ‘ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা ও বাদশাহর কিছু নীতি’।

বাদশাহ ফয়সালের মৃত্যুর কারণ নিয়ে বিবিসিকে মেই ইয়ামানি বলেছিলেন, ‘বাদশাহ ফয়সালকে কেন হত্যা করা হয়েছিল, তার আসল কারণ আমরা জানি না। শুধু এটা জানি, বাদশাহকে যিনি হত্যা করেছিলেন, সেই ভাইপো ছিলেন মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত।’

‘ফিলিস্তিনের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত’

আরব উপদ্বীপকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য লড়াই করেছিলেন বাদশাহ আবদুল আজিজ আল সৌদ। ১৯৩২ সালে বাদশাহ হন তিনি। ১৯৫৩ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। এরপর ক্ষমতায় বসেন আবদুল আজিজের বড় ছেলে সৌদ বিন আবদুল আজিজ। তিনি দায়িত্ব পালন করেন ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত। বড় ভাইয়ের শাসনামলে সৌদি আরবের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ।

১৯৬৪ সালে বাদশাহ হন ফয়সাল। সৌদি আরব তখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ এক দেশ, যদিও আকারে প্রায় ইউরোপের সমান। ফলে ক্ষমতায় বসে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার বিরাট এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন ফয়সাল। সেই চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে দেশের আধুনিকায়নের জন্য সৌদি আরবের সদ্য পাওয়া বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলসম্পদ ব্যবহারের উদ্যোগ নেন তিনি।

বাদশাহ ফয়সাল একজন বিচক্ষণ রাজনীতিক ও ধার্মিক মানুষ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আধুনিক বিচারব্যবস্থা প্রবর্তনের কাজে হাত লাগান তিনি। তাঁর আমলে ষাটের দশকে সৌদি আরবে প্রথম টেলিভিশন স্টেশন চালু করা হয়। মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর উদ্যোগও নেন। সে সময় সৌদি আরবে বহুবিবাহের প্রচলন থাকলেও ফয়সালের একসঙ্গে একটির বেশি স্ত্রী ছিল না।

বিবিসিকে দেওয়া মেই ইয়ামানির সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে বাদশাহ ফয়সালের শিক্ষা সংস্কারের কথা। ফয়সালের স্ত্রী রানি এরফাদ মেয়েদের জন্য স্কুলশিক্ষা চালু করেন। বাদশাহ সৌদি আরবের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষকে রাজি করাতে পেরেছিলেন যে শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের ভালো মায়ে পরিণত করতে হবে। রানি এরফাদের স্কুলের প্রথম ৯ মেয়েশিক্ষার্থীর একজন ছিলেন মেই ইয়ামানি।

বাদশাহ ফয়সালের গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ ছিল সৌদি আরবের জ্বালানি তেল নীতি। এ নীতির মাধ্যমে নিজেদের তেলসম্পদের ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ পায় সৌদি আরব। ফলে আরব বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায় দেশটি।

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় এই তেলসম্পদকে প্রথম রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে সৌদি আরব। ইসরায়েলের সমর্থনকারী পশ্চিমা দেশগুলোতে তেল রপ্তানি বন্ধের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় দেশটি। ফলে বিশ্বে রাতারাতি তেলের দাম বহুগুণ বেড়ে যায়।

বাদশাহ ফয়সালের তেলমন্ত্রী শেখ ইয়ামানি তখন পশ্চিমা গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ইসরায়েল সব আরব এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার না করলে তেলের সরবরাহ বাড়ানো হবে না। এ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে দারুণ শোরগোল পড়েছিল। ওই ঘটনার পর প্রভাবশালী টাইম সাময়িকী ১৯৭৪ সালে বাদশাহ ফয়সালকে বছরের আলোচিত ব্যক্তিত্ব ঘোষণা করে।

বাদশাহ ফয়সালের পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পেয়েছিল ফিলিস্তিন। তিনি ছিলেন ফিলিস্তিনের দুর্দশাপীড়িত মানুষের পক্ষে। ইসরায়েলের দখলদারির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। ১৯৬৫ সালে এক রেডিও সম্প্রচারে বাদশাহ ফয়সাল বলেছিলেন, ‘ফিলিস্তিন আমাদের কাছে তেলের চেয়ে দামি। প্রয়োজন পড়লে যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসেবে তেলকে ব্যবহার করা যাবে। ফিলিস্তিনিদের অবশ্যই তাদের জন্মভূমিতে ফিরিয়ে নিতে হবে, এ জন্য আমাদের সবার জীবন দিতে হলেও।’

তথ্যসূত্র: বিবিসি, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, মিডল ইস্ট মনিটর, আনাদুলু এজেন্সি

বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ। ফাইল
বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ। ফাইল ছবি: বাদশাহ ফয়সাল ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

কমিউনিস্টরা বাংলাদেশকে জানতেন না: বিশেষ সাক্ষাৎকারে বদরুদ্দীন উমর

স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলো। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন বামপন্থী গবেষক ও তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমরসাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনোজ দে

প্রথম আলো: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীরা নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখতে পারলেন না কেন?

বদরুদ্দীন উমর: এর প্রধান কারণ, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে বামপন্থী ছিলেন না। অনেক সম্মান করে এখানকার দক্ষিণপন্থী লোকেরা তাঁদের বামপন্থী বলতেন।
প্রথম আলো: কিন্তু বায়ান্ন, চুয়ান্ন আর উনসত্তরে তো তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

বদরুদ্দীন উমর: তখন পর্যন্ত তাঁদের একটা বামপন্থী চরিত্র ছিল। একটা আদর্শগত অঙ্গীকার ছিল। নতুন পাকিস্তান হয়েছে। সেখানে সরকারবিরোধিতা করতে গিয়ে তাঁরা একটা ভূমিকা রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁদের চরিত্র ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গেল। যে জায়গায় তাঁরা পৌঁছে গেলেন, তাতে বামপন্থী বলে চেনার কোনো উপায় থাকল না। প্রথমত, যাঁদের বামপন্থী বলা হয়, তাঁদের মধ্যে আমি অন্তত কমিউনিস্ট চরিত্র দেখিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলাম ১৯৬৯ সালে। তার আগে থেকেই কমিউনিস্টদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল। ১৯৬৯ সালে যুক্ত হওয়ার পর সত্তর ও একাত্তর সালে তাঁদের সঙ্গে কাজ করলাম। অন্য কমিউনিস্টদেরও দেখলাম। আমার মনে হলো, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের বাস্তব কোনো ধারণা নেই। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট, কিন্তু বাংলাদেশকে জানেন না। একাত্তর সালে মস্কোপন্থীরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে কলকাতায় চলে গেলেন। তাঁদের কোনো আলাদা নীতিগত বা সাংগঠনিক অবস্থান বলে কিছুই থাকল না। পরে তো তাঁরা দল বিলীন করে বাকশালে মিশে গেলেন।
প্রথম আলো: একাত্তরে আপনি যে বাম দলে ছিলেন, সেই ইপিসিএমএল মুক্তিযুদ্ধকে কীভাবে মূল্যায়ন করেছিল? আপনি কেন দল থেকে বেরিয়ে এলেন?

বদরুদ্দীন উমর: এ দেশে যে কী হচ্ছে, পিকিংপন্থীরা সেটা বুঝতেই পারলেন না। অবশ্য প্রথম দিকটাতে তাঁরা বুঝেছিলেন। ২৫ মার্চের পরে প্রথমে যে দু-একটি বৈঠক তাঁরা করেছিলেন, সেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা তাঁরা বলেছিলেন। আমি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে না থাকলেও গণশক্তির সম্পাদক হিসেবে বৈঠকে ছিলাম। ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও প্রথম দিকে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে যারা যুদ্ধ করেছিল, তারা ছিল পিকিংপন্থী বলে পরিচিত কোনো না কোনো পার্টি ও গ্রুপ। কিন্তু সেটা ছিল অল্প কিছু জায়গায় সীমাবদ্ধ। ১৪ এপ্রিল চৌ এনলাইয়ের ভাষণের আগে পিকিংপন্থীদের অবস্থান ছিল এমন যে দেশের মাটিতে থেকেই তাঁরা লড়াই করবেন, সংগ্রাম করবেন। চীনে যেমন একটা ঐক্যফ্রন্ট হয়েছিল, তেমন করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট করে তাঁরা একসঙ্গে লড়াই করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যেই চৌ এনলাইয়ের ঘোষণা এল, চীনপন্থীদের অবস্থান পুরোপুরি পাল্টে গেল। মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই বলা শুরু করলেন।
প্রথম আলো: তাঁদের এই নীতি নেওয়ার পেছনে কী রাজনীতি ছিল?

বদরুদ্দীন উমর: চারু মজুমদারের লাইন আমাদের কমিউনিস্টদের সর্বনাশ করেছে। চারু মজুমদারের কথায় তাঁরা এখানে যে বড় ছাত্রসংগঠন ছিল, সেটা ভেঙে দিলেন। কৃষকসংগঠন, শ্রমিকসংগঠন ভেঙে দিলেন। এর ফলে একাত্তর সালের ঠিক আগে পার্টি ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে গেল। একাত্তরে সালে যুদ্ধ যখন শুরু হলো, জনগণের কাছে পৌঁছানোর মতো কোনো সাংগঠনিক কাঠামো থাকল না। যাঁরা এসব গণসংগঠনে ছিলেন, তাঁরা ছড়িয়ে গিয়ে এদিক-সেদিক চলে গেলেন। অন্য সংগঠনগুলোতেও অনেকে চলে গেলেন। নেতৃত্ব অকেজো হয়ে গেল। ইপিসিপিএমএলএর তিনজন কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন সুখেন্দু দস্তিদার, আবদুল হক আর মোহাম্মদ তোয়াহা। আবদুল হক থাকলেন যশোরে, তোয়াহা কিছুদিন নোয়াখালীতে গিয়ে থাকলেন। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে আসা হলো। ঢাকায় থাকলেন সুখেন্দু দস্তিদার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সে সময় সুখেন্দু দস্তিদার ঠুঁটো জগন্নাথ। কোথায় কী হচ্ছে, এর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই ছিল না। সুখেন্দু দস্তিদারের সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখা হতো। অনেক সময় সারা দিন একসঙ্গে থাকতাম। একসময় তিনি কোনো সাংগঠনিক যোগাযোগ ছাড়াই কুমিল্লায় চলে গেলেন। একদিন গিয়ে ঘুরে চলে এলেন। আরেকবার গিয়েছিলেন খুলনায়। ডুমুরিয়া অঞ্চলে পার্টি যে লড়াই করছিল, সেখানে কয়েক দিন ছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি কিছুই করেননি, ক্যাম্পে গিয়ে বসে ছিলেন। খালি কাগজপত্র তৈরি করা ছাড়া তাঁর কোনো ভূমিকাই ছিল না।
প্রথম আলো: আপনি কেন দল ছাড়লেন?

বদরুদ্দীন উমর: আবদুল হক একদিকে, অন্যদিকে তোয়াহা ও সুখেন্দু দস্তিদার। তাঁরা দুই পক্ষে ভাগ হয়ে গেলেন। তার পেছনে লড়াইয়ের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাঁরা দুই পক্ষই দুটো দলিল তৈরি করলেন। এরপর আমি প্রথমে ১৮ পৃষ্ঠার দলিল, পরে ৬৪ পৃষ্ঠার দলিল লিখেছিলাম। পুরো বিষয়টা বিশ্লেষণ করেছিলাম। দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য ছিল না। পরিস্থিতির কোনো বিশ্লেষণ তাঁদের ছিল না। দেশের লোকজন কী ভাবছে, সেটা বোঝার দরকার তাঁদের ছিল না। তাঁরা কতগুলো ভুল তত্ত্বগত ধারণার ওপর বসে ছিলেন। আর যেহেতু সেই ধারণার সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক ছিল না, সে জন্য তাঁদের কোনো কর্মকাণ্ডও ছিল না, কোনো কার্যকারিতাও ছিল না। এ অবস্থায় তাঁদের সঙ্গে অনেক রকম তর্কবিতর্ক করতে করতে ডিসেম্বর মাসে এসে যখন বাংলাদেশ হয়ে গেল, তখন আমি পদত্যাগ করলাম। তখন আমি দেখলাম, আমার কিছু কাজ করা দরকার, কিছু বক্তব্য জনগণের কাছে দেওয়া দরকার। আমি বরাবরই একজন খুব শৃঙ্খলাপূর্ণ লোক হিসেবে কাজ করেছি। আমি দেখলাম, ওই পার্টিতে থাকলে আমি শৃঙ্খলা রক্ষা করে কিছু করতে পারব না। কিন্তু আমাকে তো কিছু কথা বলতে হবে। পার্টিতে থেকে সেসব কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই পার্টি থেকে ইস্তফা দিলাম।
প্রথম আলো: ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি বামদের মধ্যে মস্কো-পিকিং প্রশ্নে যে বিভাজন দেখা দিল, সেটা কি সঠিক ছিল?

বদরুদ্দীন উমর: বামপন্থীদের মধ্যে যে বিভাজন দেখা দিল, তার সঠিক-বেঠিকের কোনো প্রশ্নই নেই। বিভাজন অনেক সময় হলো ব্যক্তির দ্বন্দ্বের কারণে। মস্কোপন্থী-পিকিংপন্থী ভাগাভাগির সময়ও অনেক ক্ষেত্রেই পছন্দের ভিত্তিতে বিভাজন হয়েছিল। কমিউনিস্টদের সঙ্গে আলোচনা করে মার্ক্সবাদের কোনো শিক্ষা আমি পাইনি। মার্ক্সবাদের মৌলিক বিষয়গুলোর সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ছিল না।
প্রথম আলো: অনেক রাজনীতিক ও গবেষকের মতে, একাত্তরে বামপন্থীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বাধা সৃষ্টি করেছে। এ কারণে তাঁরা কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারেননি।

বদরুদ্দীন উমর: এটা ঠিক যে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন জায়গায় কমিউনিস্টদের মার দিয়েছে। কিন্তু সেটা তো বামপন্থীদের মূল ব্যাপার ছিল না। আওয়ামী লীগের বাধার কারণে বামপন্থীরা লড়াই না করে থাকলে তো সেটা আরও খারাপ। তাঁরা লড়াই করেননি নিজেদের সিদ্ধান্তে। লোকে বলে, চিন্তা আর সঠিক চিন্তা। বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছিলেন, সঠিক চিন্তা বলে কিছু নেই। আসল জিনিস হলো চিন্তা করার ক্ষমতা। কমিউনিস্টদের নিজেদের চিন্তা করার ক্ষমতা ছিল না। আমার জন্য এটা ট্র্যাজিক ব্যাপার ছিল। কারণ, আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবকিছু ছেড়েছুড়ে অনেক আশা নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলাম। এখানে একটা কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যে থাকব, এ দেশে একটা বিপ্লবী কাজ করব। আমি সবকিছু ছেড়েছুড়ে এসেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি যখন ছেড়েছিলাম, তখন তো চিন্তাও করিনি, কী করব? আমার কোনো সঞ্চয় ছিল না, টাকাপয়সা ছিল না। অন্য কোনো কাজের মধ্যেও যাইনি। এভাবেই আমি এসেছিলাম রাজনীতিতে। কাজেই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়া, এরপর বেরিয়ে আসা আমার জন্য মস্ত ট্র্যাজিক ব্যাপার ছিল। এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমাকে দাঁড়াতে হয়েছিল। লড়াই করতে গিয়ে দেখেছি, আমি দক্ষিণপন্থীদের দিক থেকে বিরোধিতা পাইনি, সব বিরোধিতা পেয়েছি বামপন্থীদের কাছ থেকে। আমার নামে কেউ কেউ সিআইয়ের এজেন্ট বলেও রটনা করেছিল।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

বদরুদ্দীন উমর: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বদরুদ্দীন উমর
বদরুদ্দীন উমর

তুরস্কে বিরোধী নেতাকে গ্রেপ্তার: রাজপথ থেকে সরকার পতনের ডাক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের

ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুর মুক্তির দাবিতে গতকাল বুধবারও বিক্ষোভ করেন তুরস্কের হাজার হাজার মানুষ। এ নিয়ে বিক্ষোভ অষ্টম দিনে গড়াল। এ কয় দিনে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ দেড় হাজার মানুষকে আটক করেছে এরদোয়ান সরকার। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করে বলেছেন, দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের কোথাও জায়গা হবে না। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের বলপ্রয়োগ ও ব্যাপক ধরপাকড়ের নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ ও অধিকার সংগঠনগুলো।

এ ছাড়া বিক্ষোভের সংবাদ কভারেজ করায় এএফপির সাংবাদিকসহ সাতজন সাংবাদিককে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) গত মঙ্গলবার ইস্তাম্বুলে সিটি হলের সামনে বিক্ষোভ করেছে। এ ছাড়া আগামী শনিবার শহরে বড় বিক্ষোভ মিছিল করার পরিকল্পনা করেছে দলটি।

এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের কোথাও জায়গা হবে না। বিক্ষোভের সূচনা হয় গত সপ্তাহে বুধবার। ওই দিন ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে গ্রেপ্তার করা হলে তাঁর সমর্থকেরা রাজপথে নেমে এসে আন্দোলন শুরু করেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইমামোগলুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। জাতিসংঘ ও অধিকার সংগঠনগুলো বিক্ষোভ দমনে পুলিশের শক্তিপ্রয়োগ ও ব্যাপক ধড়পাকড়ের নিন্দা জানিয়েছে।

মেয়র একরেম ইমামোগলু দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। মঙ্গলবার রাজধানী আঙ্কারায় তরুণদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নিয়ে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেন, দেশ খুবই নাজুক সময় পার করছে। তিনি সবাইকে ধৈর্য আর কাণ্ডজ্ঞান বিবেচনা করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আহ্বান জানান। এরদোয়ান বলেন, যাঁরা দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তাঁদের কোথাও জায়গা হবে না। বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা করুণ পরিণতির পথ বেছে নিয়েছেন।

মঙ্গলবার ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে মিছিলে শামিল হন। তাঁরা সরকার পতনের দাবিতে স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারী ব্যক্তিদের হাতে থাকা ব্যানার ও পতাকায় এরদোয়ান সরকারের পতনসংক্রান্ত দাবির কথা লেখা ছিল।

শিক্ষার্থীদের মিছিল যাতে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে না ওঠে, সে জন্য ইস্তাম্বুলে বিপুল পরিমাণ দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শহর কর্তৃপক্ষ সেখানে যেকোনো বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে। মূলত উসকানি প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রক্ষার স্বার্থে বিক্ষোভ প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বেশ কিছু সড়ক। এ পরিস্থিতিতে পুলিশের কাছে পরিচয় আড়াল রাখতে মুখে মাস্ক পরে বহু শিক্ষার্থী মিছিলে অংশ নেন।

এদিকের সপ্তাহজুড়ে রাজধানী আঙ্কারা, বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুলসহ তুরস্কের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ চলছে। তুরস্কের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলী ইয়ারলিকায়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, ১৯ মার্চের পর থেকে ‘বেআইনি’ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।

ইস্তাম্বুলের সাবেক মেয়র ও বিরোধী নেতা একরেম ইমামোগলুর মুক্তির দাবিতে ছাত্র–জনতার বিক্ষোভ। গত মঙ্গলবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে
ইস্তাম্বুলের সাবেক মেয়র ও বিরোধী নেতা একরেম ইমামোগলুর মুক্তির দাবিতে ছাত্র–জনতার বিক্ষোভ। গত মঙ্গলবার তুরস্কের ইস্তাম্বুলে। ছবি: রয়টার্স

নতুন প্রত্যয়ে দেশ গড়ার শপথ

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জাতীয় স্মৃতিসৌধে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণ করেছে জাতি। ভোর থেকেই দলে দলে ফুল, ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে শ্রদ্ধা জানাতে স্মৃতিসৌধে আসেন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশার  মানুষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি। এ সময় অনেককে লাল-সবুজের পোশাক পরে আসতে দেখা গেছে। স্বাধীনতা দিবসে শ্রদ্ধা জানাতে আসা অধিকাংশই জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যে জোর দিয়েছেন। বলেছেন, আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও আমরা যেন জাতীয় স্বার্থে ২০২৪-এর মতো ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি সেটাই প্রত্যাশা। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনে ডাক পড়লে সবাই আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে এক কাতারে দাঁড়াবো। গতকাল ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে প্রথমে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সকাল ৬টা ১১ মিনিটে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর শহীদদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি চৌকস দল তাকে রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানায়। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। এরপর শ্রদ্ধা জানান বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা। শ্রদ্ধা জানান উপদেষ্টামণ্ডলী ও বিদেশি কূটনীতিকরাও।

সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিগণ। শ্রদ্ধা জানাতে আসেন সরকারের উপদেষ্টারাও। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জাতীয় স্বার্থে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা ঐকমত্য পোষণ করবো। কিন্তু একেকজন মানুষের চিন্তাভাবনা এবং দৃষ্টিভঙ্গি একেক রকম। সেসব দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়গুলো কমিয়ে আনতে কিছুটা সময় তো লাগবেই। একটা সরকারের জন্য গতানুগতিক কিছু চ্যালেঞ্জ তো থাকেই। তবে এখন একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বিভিন্ন সংস্কার বিষয়ে ঐকমত্য গড়া। সেটা অবশ্যই একটা প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যেতে হবে। এটাকে চ্যালেঞ্জ বলেন আর না বলেন, একটা প্রক্রিয়া তো বটেই। আমাদের জন্য ওটাতে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াকে একটা বড় বিষয় বলে আমি মনে করি। আরেকটা হচ্ছে- নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে করে দেয়া, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। রাজনৈতিক দলগুলো সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমাদের অনেকের চেয়ে তারা তো আরও অনেক বেশি অভিজ্ঞ। ফলে আমি মনে করি জনগণকে আস্থায় যদি আনতে হয়, তাহলে যে সংস্কারগুলোর দাবি জনগণের ক্ষেত্রে ওঠে, সেগুলোর বিষয়ে ঐকমত্যে না পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই।

 সব সময় জনগণের মতামতের সঙ্গেই আছি। আমরা তাদের জন্যই কাজ করছি। এ সময় স্বাধীন ভূখণ্ডে এ দেশের মানুষ আর পরাধীন বোধ করবে না বলে মন্তব্য করেছেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ’৭১-এ দেশকে জন্ম দিয়েছেন, আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা। কিন্তু বিগত ১৬ বছরে স্বাধীনতার যে কনসেপ্ট সেটাকে নষ্ট করে দিয়ে গেছে। আমরা মনে করি, দেশের প্রত্যেকটা নাগরিক যতক্ষণ না মনে করবে সে স্বাধীন, তার বাকস্বাধীনতা আছে, তার ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভূখণ্ড স্বাধীন হয়ে কোনো লাভ নেই। আমরা মনে করি, ’২৪ সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে। এই স্বাধীনতা সামনের দিনগুলোতেও থাকবে। আর কখনোই একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে এ দেশের মানুষ আর পরাধীনতা বোধ করবে না। সকাল ৮টার দিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বিএনপি’র নেতারা। এ সময় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে বাংলাদেশে কিছু নেই’ মন্তব্য করে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, যারা আজকের স্বাধীনতা দিবসকে খাটো করতে চান, একাত্তরের স্বাধীনতায় তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। সুতরাং এই দিনটাকে তারা খাটো করতে চান। আমি বলবো, তারা যেন এখানেই বিরত থাকেন। এই স্বাধীনতা দিবসকে যেন সম্মান জানান এবং সম্মান করেন।

জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন করে স্বৈরাচারকে তাড়িয়ে স্বাধীনতার নতুন স্বাদ পেয়েছি। অনেকে বলেন- দ্বিতীয় স্বাধীনতা। আসলে আজকের স্বাধীনতা দিবস প্রমাণ করে, দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে বাংলাদেশে কিছু নেই। তিনি বলেন, প্রত্যেকটা দলের নিজস্ব আদর্শিক জায়গা ও মতাদর্শ আছে। সবাই যার যার মতাদর্শ থেকে কথা বলে। এটাকে আমি অনৈক্য বলবো না। তবে দলগুলোর মধ্যে স্বার্থের সংঘাত আছে। যদি কখনো এমন সময় আসে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। তখন কিন্তু আমরা সবাই এক হয়ে যাবো। এখানে কোনো ভুল নাই। এখন দলীয় আদর্শিক স্বার্থে হয়তো আলাদা কথা বলছি। কিন্তু যখন জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হবে, তখন বাংলাদেশের জনগণ এক হয়ে যাবে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। এ সময় এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা মনে করি, ’৭১ এবং ’২৪ আলাদা কিছু নয়, বরং ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়েই ’৭১-এর যে স্পিরিট সেটা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সেটা ৫৪ বছরে অর্জিত হতে পারেনি বিধায় একটা ফ্যাসিজম ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশে চেপে বসেছিল। ফলে ’৭১-এ যে সাম্যের কথা বলা হয়েছিল ’২৪-এ কিন্তু আমরা সেই বৈষম্যহীন সমাজের কথাই বলছি। ফলে যারা এটাকে পরস্পরবিরোধী বা মুখোমুখি করে দাঁড় করাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য অসৎ এবং আমরা মনে করি ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানকে, ছাত্র-জনতার বিজয়কে প্রকৃতভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। তিনি বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, পুরনো সংবিধান আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আমরা মনে করি ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং আমাদের যে ’৭১-এর সংগ্রাম, ’৪৭-এর আজাদীর লড়াই-সব কিছুর ভেতর দিয়েই আমরা যে স্বাধীন সার্বভৌম মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র পেতে চেয়েছিলাম তার একটি সুযোগ এবং সম্ভাবনা কেবল আমাদের গণ-অভ্যুত্থানের পরেই তৈরি হয়েছে। আমরা কেবল ক্ষমতার লোভে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই যাতে সেই সকল সম্ভাবনাকে নষ্ট না করে দেই। সংস্কার ও বিচার ছাড়া নির্বাচন দিলে মেনে নেয়া হবে না জানিয়ে এনসিপি’র আহ্বায়ক বলেন, বর্তমানে আমাদের জাতীয় নাগরিক পার্টির যে দাবি বিচার ও সংস্কার এবং গণপরিষদ নির্বাচন। আমরা মনে করি সেই পথে গেলেই জাতির একটি উত্তরণ ঘটবে গণতন্ত্রের পথে। সংস্কার এবং বিচারবিহীন যদি নির্বাচন দেয়া হয় এবং কোনো একটি দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্যই নির্বাচন চাপিয়ে দেয়া হয় সংস্কার ছাড়া তাহলে তা অবশ্যই মেনে নেয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, এদেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, ন্যায়বিচারের জন্য। এরই ধারাবাহিকতা ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান। আমরা মনে করি যে, আমাদের একটি স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং বারবার এটা বেহাত হয়েছে এবং বারবার রক্ত দিতে হয়েছে জনগণকে। আমাদের যাতে সামনের দিনগুলোতে আর রক্ত না দিতে হয় জনগণের এই প্রত্যাশা আমাদের আজকের দিনে। আমাদের যে গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করেছি যুগ যুগ ধরে এবং ২০২৪ সালেও আমাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করতে হয়েছে।

mzamin

সংখ্যালঘুদের দমিয়ে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা: যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রতিবেদন

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০২৪ সালে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার অবনতি ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ এবং গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার সুপারিশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম। ২০২৪ সালে ভারতে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার ওপর বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম-২০২৫’ প্রকাশ করা হয়েছে মঙ্গলবার। ৯৬ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্টে ২৮ ও ২৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ভারতের ওই বছরের বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুনে জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্যরা ঘৃণামূলক প্রপাগান্ডা বা বক্তব্য ও ভুয়া তথ্য প্রচার করেছেন মুসলিম ও অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে।

এর মধ্য দিয়ে তারা রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চেয়েছেন। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতে গোষ্ঠীগত নীতি চাপিয়ে দিয়ে ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা করেছেন তারা। এতে বলা হয়, ওইসব ঘটনার ফলে ব্যক্তিবিশেষ ও এনটিটিজ- যেমন বিকাশ যাদব ও গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’- এর বিরুদ্ধে তাদের  টার্গেটেড নিষেধাজ্ঞা  দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে মার্কিন সরকারের প্রতি। এসব অপরাধে জড়িত থাকার কারণে ওইসব ব্যক্তি বা সংস্থার যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ জব্দ অথবা তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনে অবদান রাখতে পারে বা তা আরও খারাপ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় ভারতের কাছে আর্মস এক্সপোর্ট কন্ট্রোল অ্যাক্টের অধীনে এমকিউ-৯বি ড্রোন বিক্রি করার বিষয় পুনর্মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়েছে সরকারের কাছে। একইসঙ্গে ভারতে কংগ্রেসনাল প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং  ধর্মীয় বিশ্বাসভিত্তিক নাগরিক সমাজের বিষয়ে আলোচনার জন্য অনুরোধ করা এবং অগ্রাধিকার দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এ রিপোর্ট দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্যানেলকে ‘এনটিটি অব কনসার্ন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ রিপোর্ট পক্ষপাতী, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজেপি’র উস্কানিমূলক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকে উৎসাহিত করেছে। নির্বাচনের পরেও তা অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে আছে ভিজিল্যান্ট ভায়োলেন্স, টার্গেটেড এবং খেয়ালখুশি মতো হত্যাকাণ্ড, সম্পদ ও উপসনালয় গুঁড়িয়ে দেয়া। কর্তৃপক্ষ অব্যাহতভাবে সন্ত্রাসবিরোধী ও অর্থায়ন বিষয়ক আইনের সুবিধা নিয়ে নাগরিক সমাজের সংগঠনের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন চালিয়েছে। এসব আইনের মধ্যে আছে ‘আনলফুল একটিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট’ (ইউএপিএ), ‘ফরেন কন্ট্রিবিউশন রেজুলেশন অ্যাক্ট’ (এফসিআরএ)। এসব ব্যবহার করে আটক করেছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের, ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের। নতুন আইন প্রণয়ন করে ফৌজদারি অপরাধের ধারা প্রতিস্থাপন করেছে সরকার। এর ফলে যদি মনে করা হয় সংখ্যালঘুরা দেশের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও ভারতের অখণ্ডতাকে বিপন্ন করছেন, তাহলে সন্দেহজনকভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের টার্গেট করা যাবে।  মার্চে ২০১৯ সালের সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) বাস্তবায়নের নিয়ম সচল করে বিজেপি। এর মধ্যদিয়ে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা পালিয়ে ভারতে গিয়েছেন তাদেরকে নাগরিকত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ২০১৯ সালে সিএএ’র বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করার জন্য ইউএপিএ’র অধীনে বেশ কিছু ব্যক্তিকে আটক রাখা হয়েছে। এর মধ্যে আছেন উমর খালিদ, মিরন হায়দার ও সারজিল ইমাম। জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে (এনআরসি) সব নাগরিককে তার নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলা হয়। এতে মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয় যে, তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হতে পারে। জুলাই মাসে আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল ২৮ জন মুসলিমকে ‘নন-সিটিজেন’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বন্দিশিবিরে পাঠায়। সারা বছরে দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ডিডিএ)সহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ উপাসনালয়গুলোকে উচ্ছেদ ও ধ্বংসের সুযোগ করে দেয়। এর মধ্যে আছে মসজিদ ধ্বংস করে দেয়ার স্থানে মন্দির নির্মাণের অনুমতি। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, জানুয়ারিতে অযোধ্যায় রাম মন্দির পবিত্রকরণে নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। ধ্বংস করে দেয়া বাবরি মসজিদের স্থানে দাঁড়িয়ে আছে এই মন্দির।

এর আগে ১৯৯২ সালে ওই মসজিদটি ভেঙে দেয় হিন্দু দাঙ্গাবাজরা। এই পবিত্রকরণের পরপরই ৬টি রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হামলা শুরু হয়। ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৫ ধারা কর্র্তৃপক্ষ বার বার লঙ্ঘন করেছে। এই ধারায় কোনো উপাসনালয় ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত করাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মসজিদসহ মুসলিম মালিকানাধীন সম্পত্তি গুঁড়িয়ে দেয়া বেআইনি। কর্তৃপক্ষ রাজ্যপর্যায়ে ধর্মান্তরবিরোধী আইন করে বৈষম্য করেছে এবং গরু জবাইবিরোধী আইন করে মুসলিমদের টার্গেট করেছে। জুন ও জুলাইয়ে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ২০ জন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ব্যক্তিকে আটক করে। এর মধ্যে চারজন পাদ্রি। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা রাজ্যের ধর্মান্তরকরণ বিরোধী আইন লঙ্ঘন করেছেন। জুলাইয়ে উত্তর প্রদেশ রাজ্য সরকার একটি বিল আনে। এটা দিয়ে ওই আইনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা হয়েছে, যাতে ধর্মান্তর করার শাস্তি হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এর ফলে সন্দেহজনকভাবে আইন লঙ্ঘন করা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর করার অনুমোদন থাকে। এই আইনে ধর্মান্তরকরণকে জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।  এরপর উত্তর প্রদেশের হাইকোর্ট মুসলিম ধর্মীয় নেতা কলিম সিদ্দিকী এবং অন্য ১১ জনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণে অংশ নেয়ার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

উপরন্তু উত্তরাখণ্ড পাস করে ইউনিফরম সিভিল কোড (ইউসিসি) বিল। এতে আন্তঃধর্মীয় যুগলদের ক্ষেত্রে নিবন্ধন ও বৃহত্তর পুলিশি অনুমোদন দেয়ার কথা বলা হয়।  ভারত সরকার দেশের বাইরেও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে নিষ্পেষণমূলক কৌশল অব্যাহতভাবে ব্যবহার করে। বিশেষ করে শিখ সম্প্রদায় ও তাদের বিভিন্ন পরামর্শকের বিরুদ্ধে। সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো ভারতের কন্সুল্যার সার্ভিস প্রত্যাখ্যানের রিপোর্ট করেন। আন্তর্জাতিক রিপোর্ট এবং কানাডা সরকারের গোয়েন্দা রিপোর্টকে একত্রিত করে অভিযোগ করা হয়, ভারতের রিসার্স অ্যান্ড এনালাইসিস উইংয়ের (র) একজন কর্মকর্তা এবং ৬ জন কূটনীতিক ২০২৩ সালে নিউ ইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্রের একজন শিখ নেতাকে হত্যার চেষ্টা করেন। ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ ভারত। এর জনসংখ্যা ১৪০ কোটির মতো। বেশির ভাগই হিন্দু (শতকরা ৭৯.৮ ভাগ)। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে আছেন মুসলিম (শতকরা ১৪.২ ভাগ), খ্রিস্টান (শতকরা ২.৩ ভাগ), শিখ (শতকরা ১.৭ ভাগ)। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্মীয় সংখ্যালঘুর মধ্যে আছেন বৌদ্ধ, জৈন, বাহাই, পারসি এবং ইহুদি। ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে সব মানুষের ধর্ম চর্চা, ধর্মীয় উপদেশ দেয়ার স্বাধীনতা দেয়া আছে। ২০১৪ সাল থেকে ভারতে সরকার চালাচ্ছে বিজেপি। তারা ২০২৪ সালের জুনে পুনর্নির্বাচিত হয়েছে। ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় থেকে তারা ক্রমবর্ধমান হারে গোষ্ঠীগত পলিসি জোরপূর্বক চাপিয়ে দিচ্ছে। এর মধ্যদিয়ে তারা ভারতকে আপাদমস্তক একটি হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে চায়।

পক্ষান্তরে সংবিধানের মূলমন্ত্র হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। জুনের নির্বাচনের আগে সরকারি কর্মকর্তারা মুসলিম ও অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণামূলক ও বৈষম্যমূলক বক্তব্য বিবৃতি দিতে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বার বার দাবি করতে থাকেন যে, বিরোধী দল (নির্বাচনে জিতলে) দেশ থেকে হিন্দুত্ববাদকে সমূলে উৎখাত করবে। একইসঙ্গে তিনি মুসলিমদেরকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ওদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও একইভাবে বিরোধীদলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, যদি তারা বিজয়ী হন তাহলে দেশে শরীয়া আইন জারি করবেন। ওদিকে বিরোধীদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে এমন কোনো কথার উল্লেখই ছিল না। সরকারি পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ ধরনের ঘন ঘন মিথ্যা তথ্য ও উস্কানি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম হামলায় উদ্বুদ্ধ করেছে। উদাহরণ হিসেবে মিরা রোডে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হামলার কথা তুলে ধরা হয়। বলা হয়, দু’জন এমএলএ নীতেশ রানা এবং গীতা জৈনের মধ্যে জ্বালাময়ী বক্তব্যের ফলে ওই ঘটনার উদ্ভব ঘটে।  

mzamin

আনোয়ারুজ্জামানের দেশত্যাগ নিয়ে সিলেটের রাজনীতিতে নিঃশব্দ উত্তেজনা by মিজানুর রহমান

সিলেটের মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী কীভাবে দেশ ছাড়লেন তা নিয়ে অন্তহীন গুজব সিলেট জুড়েই। যদিও আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী নিজেই এক ভিডিও বার্তায় কীভাবে লন্ডন পৌঁছেছেন তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। এরপরও সিলেটের রাজনীতিতে এ নিয়ে মুখরোচক নানা কথা চাউর হয়ে আছে। বলা হচ্ছে- সাবেক সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী তাকে পালাতে সহায়তা করেছেন। এ নিয়ে আরিফুল হক চৌধুরীর মুখোমুখি হয়েছিল মানবজমিন। তিনি বলেছেন, এসব কথা সত্য নয়, স্রেফ প্রপাগান্ডা। 

এর আগে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী লন্ডনে মানবজমিনকে জানিয়েছিলেন, ৫ই আগস্ট সরকার পতনের দিনেই তিনি সিলেট সেনানিবাসে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে ১৪ই আগস্ট বের হন। ১৭ই আগস্ট লন্ডনে পৌঁছান।

আনোয়ারুজ্জামান নিজেই বিষয়টি পরিষ্কার করলেও তার দেশত্যাগ নিয়ে নিঃশব্দ উত্তেজনা আছে সিলেটে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তার পালানোর সঙ্গে নেতাদের নাম ছড়িয়ে মুখরোচক আলোচনাও ছড়ানো হয় রাজনীতির মাঠে। এই আলোচনার মধ্যে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নামও আসে।

এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে আরিফুল হক চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, বাস্তবতা হলো আনোয়ারুজ্জামান নিজেই ফেসবুকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত পোস্ট করেছেন। তিনি কীভাবে দেশ ছেড়েছেন? তা সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিজের মুখে  বলেছেন কীভাবে সেনাবাহিনীর সহায়তায় চট্টগ্রামে গেছেন। সেখান থেকে কীভাবে নির্বিঘ্নে ফ্লাইটে উঠলেন। সবই বলেছেন।
শুধু তাই নয়, এজন্য তিনি সেনাবাহিনীর সংশ্লিষ্ট অফিসারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাকে সহায়তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তার নিজের বয়ানেই সব অস্পষ্টতা দূর হয়ে গেছে। তারপরও তারা আমাকে দোষারোপ করে। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, যারা মেয়র বানানোর জন্য আনোয়ারুজ্জামানকে লন্ডন থেকে নিয়ে এসেছে, তার পক্ষে সভা করেছেন। তার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করেছেন। জয়ের জন্য ক্যাম্পেইন করেছেন তারা আজ বিএনপি নেতাদের আশ্রয়ে। তারা আমাদের দল করে না, ভিন্ন দলের। কিন্তু তারা যখন লন্ডন থেকে আসেন তখন আমাদের নেতাদের বাসায় উঠেন। সেই কর্নার থেকেই আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা। আমাকে কীভাবে  ধ্বংস করতে চায়। এ জন্যই এসব প্রচার প্রপাগান্ডা। যারা আনোয়ারুজ্জামানকে মেয়র বানানোর জন্য দিনরাত খাটলো, সভা-সমাবেশ সফল করতে পরিশ্রম করলো তারাই এখন প্রপাগান্ডা করে আমি নাকি তাকে সীমান্ত পার করে দিয়েছি!

৫ই আগস্টের পর থেকে পলাতক কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল এবং কানাডা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সরওয়ার হোসেনের সহায়-সম্পত্তি এবং ব্যবসা বিএনপি নেতাদের দখলে যাওয়া প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি যথাযথভাবে বিষয়গুলো খোঁজ নেইনি এখনো। তবে এমনটা সত্য হলে তা খুবই দুঃখজনক। কারণ আমাদের বুঝতে হবে তারা জাতির ওপর কতোটা নির্যাতন নিষ্পেষণ চালিয়েছে। তাদের অত্যাচারের শিকার আমরাও। আরিফুল হক চৌধুরী স্বীকার করেন যে, সিলেটে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা তাদের বিশাল সম্পত্তি রক্ষার জন্য বিএনপি নেতাদের কাছে তাদের ব্যবসা ট্রান্সফার করেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু কিছু ঘটনার জ্বলন্ত প্রমাণ আছে। একদম পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে আছে।

সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিএনপি’র দায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৭ বছর পর নতুন এক পরিস্থিতি। ৫ই আগস্টের পর পুলিশের মনোবল খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তারা অগোছালো ছিল এবং দায়িত্ব পালন করছিল ঢিমেতালে। সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে কিছু দুষ্কৃতকারী। এ সময় (রাতারাতি) কিছু হাত পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে, এটা সত্য।  আগে যারা খেয়েছে তারা পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য গ্রুপ সেটা দখলে নিয়েছে। এদেরকে তো রাজনীতিবিদ বলা যায় না।  এরা কোনো না কোনোভাবে রাজনীতির নাম ব্যবহার করে কাজটি করেছে।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার কথা স্মরণ করে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এসব বন্ধে সেন্ট্রালি আমাদের ব্রিফ করা হয়েছে। সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রফেসর ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এ নিয়ে কথা বলেছেন।

আরিফ বলেন, সিলেট বিভাগের সব দায়িত্বশীলকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি বলেন, আজকে আপনি যেসব বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করলেন তা নিরসনে আমরা কাজ করছি দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনা মতে। মানুষের মাঝে যেন আমাদের সংগঠন জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নিয়ে কোনো আতঙ্ক না থাকে সেটি নিশ্চিত করতে আমাদের দু’দিন আগেই ব্রিফ করে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যারা এসব অপকর্ম করছে তারা যত শক্তিশালীই হোক তাদের ছাড়া হবে না। আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রথমে আমাদের বলা হয়েছে দলের হাইকমান্ডের বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে। আমাদের দলের সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান স্পষ্ট। কোনোভাবেই দল এদের (দুষ্কৃতকারী, ডেভিল) দায়ভার নিবে না। আমাদের এই অনুরোধ, আহ্বানে তারা যদি কর্ণপাত না করে তবে অবশ্যই দলের হাইকমান্ড তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিবে। শুধু দল থেকে বহিষ্কারই নয়, প্রয়োজনে আমরা তাদের ধরে আইনের হাতে সোপর্দ করবো। প্রশাসনকেও এ বিষয়ে কঠিন পদক্ষেপ নিতে আমরা অনুরোধ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, যার অপরাধ যতটুকু তাকে ততটুকু শাস্তি পেতে হবে। কেউ তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করলে তিনিও সমান অপরাধী, আশ্রয়দাতা। আরিফ বলেন, আমি যদি কাউকে রক্ষা করি আমাকে দল শাস্তি দিক। এতে কোনো ধরনের রাখঢাক বা বিচলিত হওয়ার দরকার নাই।

তিনি বলেন, এই সেই সিলেট। আত্মাধ্যিক নগরী। এখানে রাজনীতি-সমাজনীতি সব কিছুতেই এক ধরনের সহনশীলতা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য। আওয়ামী জমানার শেষ সময়ে এসে সিলেটের সেই ঐতিহ্যকে নষ্ট করা হলো। এটা পরিকল্পিত। এর নেপথ্যে কোন কোন আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন তা সিলেটবাসী জানেন। সেই নেতাদের অনুসারীদের অনেকে এখন চট করে আমাদের দলে ভিড়তে শুরু করেছে! আমরা যাদের চিহ্নিত করতে পারছি, তাদের বের করে দিচ্ছি। আমাদের সকলকেই সজাগ থাকতে হবে নাগরিকদের শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে। এতে রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিদের ভূমিকা রাখতে হবে। দেশ এবং দলের মঙ্গল চাইলে অবশ্যই আমাদের ক্ষুদ্র মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। বিএনপি চেয়ারম্যানের আদেশ-নির্দেশ পালনের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, মানুষকে আমাদের আস্থায় নিতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনগণ যেন স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে আমাদের ভূমিকা রাখতে হবে। অতীতে কি হয়েছে তা বাদ। পাড়া-মহল্লায় গ্রুপ করে আড্ডার দৃশ্য আমরা আর সিলেটে দেখতে চাই না।

mzamin

এরদোগান গণবিক্ষোভ সামাল দেবেন কীভাবে?

তুরস্কে ২০১৬ সালে সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থান চেষ্টা সফলতার সঙ্গে ব্যর্থ করে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। কিন্তু ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে গ্রেপ্তার করার প্রতিবাদে যে গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে, তাকে কি তিনি দমিয়ে রাখতে পারবেন! এ নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন বিদেশি মিডিয়া মন্তব্য করা শুরু করেছে। ইকোনমিস্ট তো জানিয়ে দিয়েছে, তুরস্কের গণতন্ত্র বিপন্ন হচ্ছে। সেখানে গণতান্ত্রিক ধারা নেই। প্রেসিডেন্ট এরদোগান যা বলছেন, তাই যেন নিয়ম। তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় অন্যচোখে দেখা যেতে পারে। তা হলো, গাজা সহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার তিনি। বলা যায়, মুসলিমদের সাহস হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু নিজের দেশের ভেতরে যে পরিস্থিতি তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। মেয়র একরেম ইমামোগলুকে গ্রেপ্তার করার পর মঙ্গলবার সপ্তম রাতের মতো প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ ইমামোগলুর মুক্তির দাবিতে নেমে আসেন রাজপথে। বিক্ষোভে অংশ নেয়ায় এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। তারপরও বিক্ষোভ অব্যাহত আছে। কিন্তু তাদেরকে মঙ্গলবার সতর্ক করেছেন এরদোগান। তিনি বলেছেন, দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের কোথাও জায়গা হবে না। বিক্ষোভের সূচনা হয় গত সপ্তাহের বুধবার। ওই দিন ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে গ্রেপ্তার করা হলে তার সমর্থকরা রাজপথে আন্দোলন শুরু করেন। 

প্রেসিডেন্ট এরদোগানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইমামোগলুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। জাতিসংঘ ও অধিকার সংগঠনগুলো বিক্ষোভ দমনে পুলিশের শক্তি প্রয়োগ ও ব্যাপক ধড়পাকড়ের নিন্দা জানিয়েছে। একরেম ইমামোগলু দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। মঙ্গলবার রাজধানী আঙ্কারায় তরুণদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নিয়ে প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেন, দেশ খুবই নাজুক সময় পার করছে। তিনি সবাইকে ধৈর্য আর কাণ্ডজ্ঞান বিবেচনা করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আহ্বান জানান। এরদোগান বলেন, যারা দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, তাদের  কোথাও জায়গা হবে না। বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা করুণ পরিণতির পথ বেছে নিয়েছেন। মঙ্গলবার ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে মিছিলে শামিল হন। তারা সরকার পতনের দাবিতে  স্লোগান দেন। বিক্ষোভকারী ব্যক্তিদের হাতে থাকা ব্যানার ও পতাকায় এরদোগান সরকারের পতনসংক্রান্ত দাবির কথা লেখা ছিল।

 শিক্ষার্থীদের মিছিল যাতে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে না ওঠে, সে জন্য ইস্তাম্বুলে বিপুল পরিমাণ দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শহর কর্তৃপক্ষ সেখানে যেকোনো বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে। মূলত উস্কানি প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার স্বার্থে বিক্ষোভ প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় বেশ কিছু সড়ক। এ পরিস্থিতিতে পুলিশের কাছে পরিচয় আড়াল রাখতে মুখে মাস্ক পরে বহু শিক্ষার্থী মিছিলে অংশ নেন। প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) মঙ্গলবার ইস্তাম্বুলে সিটি হলের সামনে বিক্ষোভ করেছে। আগামী শনিবার শহরে বড়সড় বিক্ষোভ মিছিল করার পরিকল্পনা করেছে দলটি। সপ্তাহ জুড়ে রাজধানী আঙ্কারা, বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুলসহ তুরস্কের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলি ইয়ারলিকায়া সামাজিক  যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে জানান, গত বুধবারের পর থেকে ‘বেআইনি’ বিক্ষোভে অংশ নেয়ায় ১ হাজার ৪১৮ জনকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, যারা রাজপথে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করার চেষ্টা করবেন, তাদের ছাড় দেয়া হবে না। আমাদের জাতীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত হানা যাবে না। পুলিশ সদস্যদের ওপরও আঘাত মেনে নেয়া হবে না। ২০২৮ সালে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একরেম ইমামোগলু ইতিমধ্যে  প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নিজ দলসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকের সমর্থন আদায় করেছেন। মুক্ত হলে তিনি যে এরদোগানের বিপক্ষে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হচ্ছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

mzamin

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ভিক্ষুক এই ভারতীয়, সম্পদের পরিমাণ ৭.৫ কোটি

ভারত জৈনকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ভিক্ষুক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কারণ তার সম্পদের পরিমাণ ৭.৫ কোটি রুপি। তার কাহিনী ভারতে ভিক্ষাবৃত্তির রমরমাকে  তুলে ধরে, যেখানে বহু মানুষ উপার্জনের পথ হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নেন। তার কারণ এটি আরও ভালো আর্থিক আয় প্রদান করে। ভারত জৈন ছত্রপতি মহারাষ্ট্রের শিবাজি মহারাজ টার্মিনাস এবং আজাদ ময়দানের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ভিক্ষাবৃত্তি  করেন। এমনকি বহুবছর ধরে এই কাজ করে এখন তিনি ফ্ল্যাট এবং দোকানসহ মুম্বইতে একাধিক সম্পত্তির মালিক। দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করা জৈনের স্কুলে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না। ক্রমাগত ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করে দিন কাটছিলো তার।

বাধ্য হয়ে তিনি ভিক্ষা করতে শুরু করেন এবং এখন তার পরিবারের অবস্থা সম্পূর্ণরূপে বদলে গেছে। তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে ভিক্ষা করছেন। প্রতিদিন দু হাজার থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত আয় করেন।প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘন্টা একটানা ভিক্ষা করে  প্রতি মাসে ঘরে তোলেন ৬০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার রুপি। ১.৪ কোটি রুপি দিয়ে  দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন ভারত জৈন। যেখানে তার  স্ত্রী, দুই ছেলে, বাবা এবং ভাইসহ গোটা পরিবার থাকে।এছাড়াও থানে-তে তিনি দুটি দোকানের মালিক। যারা তাকে ৩০ হাজার রুপি মাসিক ভাড়া দেয় করে। তার ছেলেরা বিখ্যাত কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা করছে এবং তার পরিবারের  একটি নিজস্ব স্টেশনারি দোকান রয়েছে। আর্থিক স্থিতিশীলতা সত্ত্বেও, জৈন তার ভিক্ষাবৃত্তির পেশা ছাড়তে পারেননি।  ইকোনমিক টাইমসের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে জৈন বলেছেন, ‘আমি ভিক্ষাবৃত্তি উপভোগ করি এবং আমি এটি ছেড়ে দিতে চাই না। আমি লোভী নই। আমি উদার।’

শুধু ফ্ল্যাট বা দোকান কেনাই নয়। কীভাবে মন্দির এবং দাতব্য সংস্থায় দান করেন তাও জানিয়েছেন এই ভিক্ষুক। জৈনের কাছে ভিক্ষা করা বেঁচে থাকার জন্য নয়, বরং এটি একটি ‘পেশা’। যার জন্য তিনি নির্ধারিত কাজের সময় বেছে নিয়েছেন।

দ্য এন্টারপ্রাইজ ওয়ার্ল্ডের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, অন্যান্য ধনী ভারতীয় ভিক্ষুকরা হলেন কলকাতার বাসিন্দা লক্ষ্মী দাস, যার মোট সম্পত্তির মূল্য ১ কোটি রুপি এবং কৃষ্ণ কুমার গীত, যিনি নালা সোপারায় তার ভাইয়ের সাথে একটি ঘরে থাকেন যার দাম প্রায় ৭ লক্ষ রুপি। ভারতে ৪ লক্ষেরও বেশি ভিক্ষুক রয়েছেন। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। সেখানে ভিক্ষুকের সংখ্যা ৮১ হাজার। তারপরে উত্তরপ্রদেশ এবং অন্ধ্রপ্রদেশ।  যদিও এই ভিক্ষুকদের মধ্যে অনেকেই বেঁচে থাকার জন্য ভিক্ষা করে চলেছেন। তবে ভারত জৈনের মতো অনেকের কাছেই এটি টেকসই এবং লাভজনক আয়ের উৎস।

সূত্র : টাইমস অফ ইন্ডিয়া

mzamin

চীনের আগে ভারত সফরে যেতে চেয়েছিলেন ড. ইউনূস -দ্য হিন্দুকে প্রেস সচিব

বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীনের আগে ভারত সফর করতে চেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তবে ঢাকার অনুরোধে সাড়া দেয়নি দিল্লি। মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে শফিকুল আলমকে উদ্ধৃত করে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু। সংবাদমাধ্যমটিকে প্রেস সচিব বলেছেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফরের আগে ভারত সফর করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ঢাকার অনুরোধে ভারতের পক্ষ থেকে ‘ইতিবাচক’ সাড়া পাওয়া যায়নি।

আজ ২৬শে মার্চ চীন সফরে যাবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। এই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন তিনি। উৎপাদন খাতে চীনা বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশকে তুলে ধরবেন প্রধান উপদেষ্টা।

ড. ইউনূস ভারতের সঙ্গে উষ্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চান উল্লেখ করে শফিকুল আলম বলেন, আমরা আসলে আমাদের আগ্রহ দেখিয়েছি এবং গত বছরের ডিসেম্বরের প্রথম দিকেই ভারতীয় পক্ষকে প্রধান উপদেষ্টার ভারত সফরের জন্য ভারতকে অনুরোধ করেছি। চীন সফর চূড়ান্ত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে দিল্লিকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়। দুর্ভাগ্যবশত এতে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
ড. ইউনূস দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় নেতা যিনি চার মাসের মধ্যে চীন সফরের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চার দিনের সফরে চীন ভ্রমণ করেছিলেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানান, ড. ইউনূস চীন সফর শেষে দেশে ফিরে আসবেন। পরে ৩ থেকে ৪ এপ্রিল ব্যাংককে বিমসটেক এর শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন। এই সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকের জন্যও অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন শফিকুল আলম। যদিও এ বিষয়ে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি দিল্লি। ২৬ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত মোট তিন দিন চীন সফরে থাকবেন ড. ইউনূস। এসময় তিনি চীনের বিশিষ্ট বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। কেননা তিনি বাংলাদেশকে একটি ব্যবসা-বান্ধব গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে আগ্রহী। এতে চীনের উৎপাদন ইউনিটগুলোকে ব্যবসায়িক পরিবেশ প্রদান করবে।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চীনা বিনিয়োগকে নেতিবাচকভাবে দেখায় বাংলাদেশকে বেসরকারি চীনা বিনিয়োগকে স্বাগত জানানোর সুযোগ করে দিয়েছে উল্লেখ করে শফিকুল আলম জানিয়েছেন, ২৮ মার্চ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক ছাড়াও ড. ইউনূসকে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হবে। এর আগের দিন ২৭ মার্চ বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার (বিএফএ) বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেবেন অধ্যাপক ইউনূস।

দ্য হিন্দু বলছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধান উপদেষ্টা। সেখানে ড. ইউনূসকে চীনা জনগণের পুরনো বন্ধু হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন ওয়াং। পরে ড. ইউনূস চীনকে বাংলাদেশের সৌর প্যানেল তৈরির আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের দিন প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর বেশ আকর্ষণ তৈরি করেছে। কেননা সফরটি এমন সময় হচ্ছে যখন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বব্যাপী সম্পর্ক পুনর্গঠন করছেন এবং বিভিন্ন দেশে পালটাপালটি শুল্ক আরোপের কথা জানিয়েছেন। যা ২ এপ্রিল থেকে কার্যকর করা হবে বলে কথা রয়েছে।

মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে ড. ইউনূস দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বাংলাদেশকে প্রবৃদ্ধির প্রধান ইঞ্জিনে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য, ভুটান এবং নেপাল উপকৃত হবে। ভাষণে তিনি চীন সফরের ঘোষণা দিয়ে বলেন, মালয়েশিয়াও তাকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে যা তিনি গ্রহণ করেছেন।

ভারত, নেপাল, ভুটান এবং চীনের জন্য বাংলাদেশকে ব্যবসা-বান্ধব অর্থনৈতিক হাব হিসেবে তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কুমিরা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত আমাদের একটি দীর্ঘ উপকূলরেখা রয়েছে, যেখানে বেশ কয়েকটি শিল্পাঞ্চল এবং বন্দর হতে পারে। যা ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে পরিবর্তন আনতে পারে।

mzamin