Friday, January 29, 2016

গ্যাস গেল কোথায়? by ডক্টর তুহিন মালিক

ইদানীং কাউকে নিমন্ত্রণ করেন না আমার মা। কারণ রাত ১১টার আগে চুলা জ্বলে না আমাদের পুরান ঢাকার চকবাজারের বাসায়। আগের রাতের খাবারটা পর্যন্ত পরদিন দুপুরে গরম করে খাবারও কোনোরকম সুযোগ নাই চরম গ্যাস সংকটের কারণে। কয়লার তন্দুরে বানানো বাখরখানিটাই আপাতত বাঁচিয়ে রেখেছে সকালের নাস্তাটাকে। ঐতিহ্যের বাখরখানি এখন অনেকটা যেন নিত্যদিনের অনুরোধে ঢেঁকি গেলারই মতো। রান্না করে খাবার  খেতে পারার এখন আর কোনো সুযোগই নাই ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মানুষের কাছে। রান্নার জন্য চাই গ্যাস। অথচ চরম গ্যাস সংকটে ভুগছে রাজধানীসহ আশেপাশের সব এলাকা। তবে মধ্যরাতে দেখা মেলে গ্যাসের। সারাদিন সংসারের কাজকর্ম সেরে রাত জেগে গৃহিণীদের রান্নাবান্না করতে হচ্ছে। দিনে গ্যাসের চুলায় যে আগুন পাওয়া যায় তাতে ভাত রান্না করতে তিন দিন সময়ের প্রয়োজন। গত মঙ্গলবার গ্যাসের দাবিতে ফতুল্লা ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রুটে ঝাড়ু হাতে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী। রাত ১২টার পর যখন গার্মেন্টস বন্ধ হয় তখন এলাকার চুলা জ্বলে বলে অভিযোগ করে তারা। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কমপ্রেসারের সাহায্যে গ্যাস লাইনের পুরো গ্যাসটাই টেনে নিয়ে যাবার কারণেই নাকি চুলায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে সরকার গ্যাস সংকট সমাধান না করে জনগণকে পরামর্শ দিয়েই চলেছে। গত বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী স্পষ্টতই জানিয়ে দেন, আবাসিক খাতে গ্যাসের এই সমস্যা থাকবেই। তিনি জনগণকে এলপিজি গ্যাস ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে নিজের দায়িত্ব সম্পন্ন করলেন। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান ‘আমাদের মূল লক্ষ্য হলো শিল্প এলাকায় প্রথমে গ্যাস সরবরাহ করা। আমরা সেদিকেই ধাবিত হচ্ছি।’ তবে শিল্পখাতকে সুবিধা দেয়ার জন্য আবাসিকে গ্যাসের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে কিনা- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। আসলে দেশের মোট উৎপাদিত গ্যাসের মাত্র ১২ শতাংশ গৃহস্থালিতে ব্যবহার হচ্ছে। অথচ শিল্পখাতের মাত্র ২ ভাগ কমিয়ে আবাসিক খাতে গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি করে দিলেই তো এই সমস্যা মিটে যায়। অথচ এর বদলে মন্ত্রীরা আবাসিক গ্যাস সংযোগ বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন।  এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সম্পর্কীয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও সুপারিশ করে চলেছে বাসাবাড়িতে গ্যাসের ব্যবহার বন্ধের।
দুই... মন্ত্রীদের প্রেসক্রিপশন মতে গ্যাসের আবাসিক সংযোগ বন্ধ হলে একটা পরিবারে কমপক্ষে সিলিন্ডারপ্রতি মাসে ৩৫০০ টাকা থেকে ৪০০০ টাকা গুনতে হবে। নিম্নবিত্ত পরিবারের কথা বাদই দিলাম, এর ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারে চুলা জ্বালানোর খরচ নির্বাহ করাটাই দুর্বিষহ হয়ে পড়বে। পরিবারের রান্নাটা একটু বেশি হলেই রান্নার খরচ ৮/১০ হাজার টাকায় গিয়ে পৌঁছাবে। অথচ পুরো ঢাকা শহর এখন যেন সিএনজিময়। প্রাইভেট কার আর অটোরিকশা তো বটেই, বাস-ট্রাক পর্যন্ত এখন গ্যাসে চলে। পারলে যেখানে আমরা মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে রিকশা পর্যন্ত সিএনজি দিয়ে চালাতে প্রস্তুত, সেখানে আবাসিক গ্যাস বন্ধের এহেন হুঁশিয়ারিতে রাজধানীবাসী সত্যিই আতঙ্কিত। খাবারের জন্য রান্না আগে, না গাড়ির গ্যাস আগে- এটা ভাববার সময় এখন এসেছে। সরকার বলছে, গ্যাসের উপর ভাসছে দেশ, অথচ রান্নার জন্য গ্যাস নেই কেন? এ কথার জবাব দিবে কে? খুবই দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সরকার যেখানে বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছে নামমাত্র দামে আমাদের গ্যাসসহ প্রাকৃতিক সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছে, তা আবার চড়ামূল্যে তাদের কাছ থেকেই কিনে নিচ্ছে। আর সেখানে রান্নার জন্য দেশের মানুষকে রাত জেগে সেই গ্যাসের জন্যই অপেক্ষা করতে হচ্ছে তীর্থের কাকের মতো! এতে কর্তাব্যক্তিদের পকেট ভারী হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এর কঠিন মূল্য দিতে হচ্ছে এদেশের দরিদ্র মানুষকে। ভাত রান্নার গ্যাস বন্ধের হুঁশিয়ারি হজম করা ছাড়া তো অন্য কোনো উপায়ও নেই জনগণের।
তিন... যতই দিন যাচ্ছে রাজধানীতে গ্যাস সংকট ততই প্রকট হয়ে উঠছে। কোনো কোনো এলাকায় রাতে তির তির করে গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও দিন-রাত গ্যাস সরবরাহ পাওয়াটাই একেবারে কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে রাজধানীতে বসবাসকারী নাগরিকদের একটি বড় অংশের রান্না-খাওয়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কর্মজীবী মানুষকে রাত জেগে বসে থাকতে হচ্ছে গ্যাস এলে রান্না করতে হবে। নগরের গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাসের কাছে রয়েছে অযুহাতের লম্বা ফিরিস্তি। যথারীতি সরকারি বুলি আওড়ানো হয়- অমুক জায়গায় অত মেগাওয়াট প্ল্যান্ট বন্ধ, গ্যাসের চাপ কম, শীতের কারণে প্রেসার নাই, উৎপাদনের চাইতে চাহিদা বেশি, উন্নয়ন বাড়ছে তাই চাহিদা বাড়ছে ইত্যাদি সব গৎবাঁধা বুলি। পুরান ঢাকার চকবাজার, উর্দু রোড, ইসলামবাগ, বংশাল, হাজারীবাগ, লালবাগ, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর থেকে শুরু করে ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর অথবা খিলগাঁও, সিপাহীবাগ, মিরপুর, মনিপুর কিংবা রামপুরা, বাড্ডা, মালিবাগ, বনশ্রী, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী,  শনির আখড়া, পোস্তগোলা, উত্তরা, এমনকি গুলশান-বনানীতেও সর্বত্রই একই অবস্থা। ঢাকার আশেপাশের অঞ্চল নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মানুষেরও এই একই ভোগান্তি।
চার... এদিকে গত বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী জানালেন, ‘শীতকালে গ্যাস সংকট হয়। গ্যাসের চাপও কমে যায়। এই সমস্যা প্রতি শীতেই হয়।’ আসলে বাংলাদেশে শীতকাল কি এই সরকারের আমলেই এসেছে? আগে কখনও কি দেশে শীতকাল আসেনি? অথচ রাজধানীতে গ্যাস সংকট চলছে গত ছয় সাত বছর ধরেই। দুটি কারণে এ সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। রাজধানীর বহু এলাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সংকীর্ণ ব্যাসার্ধের পাইপলাইনে সরবরাহকৃত গ্যাস চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। জাতীয় গ্রিডলাইনে যখন গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকে না তখনও কোনো কোনো এলাকায় রান্নার উপযোগী গ্যাস পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। চাহিদার তুলনায় যখন গ্যাস সরবরাহ কম থাকে তখন পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। ফলে রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকায় দেখা দেয় গ্যাস সংকট। গ্যাস সংকটের আরেকটি কারণ হলো, পাইপলাইনে গ্যাসের সঙ্গে থাকা তরল জ্বালানি কনডেনসেট জমে যাওয়া। এ মুহূর্তে গৃহস্থালি পর্যায়েই শুধু নয়, শিল্প কলকারখানায়ও গ্যাস চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে দেশে যে গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে এর মধ্যে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে ৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। মোট উৎপাদিত গ্যাসের ৪২ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে; ১৭ শতাংশ শিল্পে; ১৬ শতাংশ ক্যাপটিভ পাওয়ারে; ১২ শতাংশ গৃহস্থালিতে; ৭ শতাংশ সার-কারখানায়; ৫ শতাংশ সিএনজিতে; ১ শতাংশ বাণিজ্যিক এবং দশমিক ১ শতাংশ চা-বাগানে ব্যবহূত হচ্ছে। সার কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে গড়ে ২৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু পাচ্ছে গড়ে ৬৬ থেকে ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট।  বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে গড়ে সাড়ে ১৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। পাচ্ছে গড়ে সাড়ে ৭শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। প্রায় ৯শ’টি ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টে গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ ৩৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। এছাড়াও আবাসিক ও অন্যান্য গ্রাহকদের ১ হাজার ১শ’ ৬৪ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। যা মোট উৎপাদিত গ্যাসের ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ। বর্তমানে দেশের  বিতরণ কোম্পানির অধীনে বৈধ আবাসিক গ্যাস গ্রাহকের সংখ্যা ২৩ লাখের ঊর্ধ্বে। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, বৈধ আবাসিক সংযোগে দৈনিক গ্যাস ব্যবহার হয় ২৫ কোটি ঘনফুটের মতো। যা মোট উৎপাদিত গ্যাসের ১২ শতাংশ। আর বর্তমানে আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে সাড়ে ২৭ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ মাত্র ২ কোটি ঘনফুট আবাসিক খাতে বৃদ্ধি করা হলেই এই সংকট আর থাকে না।
পাঁচ... আশংকার বিষয় হচ্ছে, দেশে বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ১২ বছরের ব্যবহারের মতো গ্যাস মজুত রয়েছে। অথচ অচিরেই যখন দেশ গ্যাসশূন্য হয়ে পড়বে এটা মোকাবিলার কোনো বাস্তবিক পরিকল্পনা সরকারের হাতে নেই। অন্যদিকে সাগরের ১০, ১১, ১২, ১৬, ১৮, ১৯ নম্বর ব্লকে কোনোরকম দরপত্র ছাড়াই একটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেয়ার কাজ এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। যার মধ্যে মাত্র দুটি ব্লকেই রয়েছে ৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এই গ্যাস তুলতে হলে কূপ খনন ও পাইপলাইন তৈরিতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। সেদিকে কার্যকর কোনোরকম গুরুত্ব না দিয়ে সরকার কেন এভাবে সাধারণ মানুষের চুলার গ্যাসের উপর হামলা চালাচ্ছে তা বোধগম্য নয়। অথচ গ্যাসের সঠিক ব্যবহারের জন্য কোনো জাতীয় নীতিমালা এখন পর্যন্ত করতে পারেনি সরকার। সরকার ক্ষমতায় এসে নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও আজ অবধি কার্যত কিছুই করা হয়নি। তবে এই নীতিমালার খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে বহুবার। খসড়া নীতিমালায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ এবং সার-কারখানায় গ্যাস বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়। আবাসিক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়। গ্যাসের একক নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জ্বালানির সংস্থানের কথা বলা হয়েছে এতে। কিন্তু খাতওয়ারি গ্যাসের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করাসহ সংকটকালীন গ্যাস ব্যবস্থাপনার কোনো কথা এই খসড়া নীতিমালায় নেই। যেখানে দেশে উৎপাদিত গ্যাসের মাত্র ১২ শতাংশ দিয়ে জ্বলছে আমাদের রান্নার চুলাগুলো সেখানে দরিদ্র জনগণের চুলার উপর এত বিরাগের কারণ কি?
ছয়... সরকারের দাবিকৃত ‘গ্যাসে ভাসা দেশে’ ভাত রান্নার জন্য গৃহস্থালি কাজে প্রাকৃতিক গ্যাস পাওয়ার অধিকার এদেশের জনগণের রয়েছে। জনগণের বেঁচে থাকার এই আবশ্যকীয় অধিকারটুকু নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্বও বটে। কেননা, আমাদের সংবিধানে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারটুকুই যে শুধু মৌলিক অধিকার তা কিন্তু নয়। মানুষের জীবনধারণের জন্য মৌলিক সেবা পাওয়ার অধিকারও মানবাধিকার। তাই দরিদ্র জনগণের ভাত রান্নার জন্য মাসে তিন থেকে দশ হাজার টাকা খরচে বাধ্য করা হলে তা হবে চরম মানবাধিকারের লঙ্ঘন। ভাবতে কষ্ট হয়, যেখানে মন্ত্রী-এমপিদের নির্দেশনা দেখিয়ে নগদ অর্থের স্পীডমানির সুবাদে নতুন সংযোগ দেয়া হয় বলে খোদ সংসদীয় কমিটি অভিযোগ করে। হাজার হাজার কোটি টাকার গ্যাস সংযোগ বাণিজ্য হয় তিতাসে। সেখানে গরিব জনগণের রান্নার গ্যাস বন্ধের রক্তচক্ষুর আতঙ্কে ভুগতে হচ্ছে এদেশের সাধারণ মানুষকে। তাই গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে আবাসিক কাজে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেই হবে। এ সরবরাহ কোনোক্রমেই ব্যাহত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে জনগণকে আর ভয় না দেখিয়ে বা নতুন কোনো আতঙ্কে না ফেলে সরকারের উচিত অবিলম্বে জনদুর্ভোগ লাঘব করে রান্নার গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। জনগণের পেটের ক্ষুধার আগুন মেটাতে চুলায় আগুনের দরকার। আর মানুষ চুলায় আগুন জ্বালাতে না পারলে প্রতিবাদের আগুন ধরাবার জন্য অপেক্ষায় বসে থাকবে না।
লেখক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
e-mail: drtuhinmalik@hotmail.com

সরকারকে অ্যামনেস্টির জবাব

গত বছর ২৭শে অক্টোবর লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দেয়া এক বিবৃতির বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের নোটের জবাব দিয়েছে সংস্থাটি । এ সংক্রান্ত একটি বিবৃতি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘গত বছরের ৬ই নভেম্বর লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার খোন্দকার এম. তালহার মারফতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সরকারের একটি আনুষ্ঠানিক নোট হাতে পায়। দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর প্রত্যাসন্ন ফাঁসির বিষয়ে ২৭শে অক্টোবর আমাদের দেয়া বিবৃতির জবাবে বাংলাদেশ সরকার ওই নোট দেয়।’ এই নোটের জবাবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গণমাধ্যমে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক উত্থাপিত মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি, আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে লেখা একটি চিঠিতে ওই নোটে উল্লিখিত অভিযোগসমূহের জবাব দিয়েছি। এ ছাড়া নীচের বিষয়গুলোর ওপর জোর দিয়েছি।’ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ বিবৃতিতে মোট ৫টি অংশে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছে।
বিবৃতির প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটি স্বাধীন ও পক্ষপাতহীন সংগঠন। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার ও অপরাধীদের দায় নিশ্চিতের জন্য এটি প্রচারণা চালিয়ে থাকে। অপরাধীরা কারা বা তাদের কোনো রাজনৈতিক সমপৃক্ততা আছে কি না, সেগুলো এক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয় না। আমরা বাংলাদেশ বা কোথাও কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন বা বিরোধিতা করি না। বাংলাদেশ নিয়ে আমরা কয়েক দশক ধরে কাজ করেছি। আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ জাতীয় পার্টি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেও মানবাধিকার পরিস্থিতি নথিভুক্ত করেছি। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, সামপ্রদায়িক সহিংসতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের শিকার ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পূর্ববর্তী সরকারসমূহের প্রতি আমরা সুপারিশ জানিয়েছি। নিজেদের নোটে বাংলাদেশ সরকার উপসংহার টেনেছে যে, বিবৃতিতে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ‘বিরোধীদলীয় নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করায় তাদের বিচারের ক্ষেত্রে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল পক্ষপাতদুষ্ট পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নিয়েছে। আমাদের ২৭শে অক্টোবরের বিবৃতি ও পূর্বের আরও দুইটি বিবৃতিতে এ দুই দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীর যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আমরা উল্লেখ করেছি, তা ছিল তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ্য বিবরণ এবং বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাদের যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে।’
বিবৃতির দ্বিতীয় অংশ অ্যামনেস্টি বলেছে, ‘সরকারের নোটে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে বিচারের পক্ষপাতদুষ্টতা সমপর্কে মাত্রাজ্ঞানহীন মন্তব্য করার অভিযোগ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এতে কেবল অপরাধী ও তাদের সমর্থকদের স্বার্থ হাসিল হয়েছে। আমরা বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষকে বহু বছর ধরে ১৯৭১ সালে সংঘটিত গণ-সহিংসতার বিচারহীনতার দিকে নজর দেয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছি। এ বিচারহীনতা পূর্ববর্তী সরকারসমূহের অসক্রিয়তার দরুন প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। আমরা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দিই। ২০০৮ সালে যুদ্ধাপরাধের ক্ষেত্রে মানবাধিকার বিষয়ক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও অন্যান্য মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাবলী তদন্তে একটি স্বাধীন আনুষ্ঠানিক কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে আমরা সুপারিশ করেছিলাম। এ ছাড়াও, ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে সরকারি প্রতিনিধি ও আদালতের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি-বিডি) প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানিয়েছিল। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড এ বিচার প্রক্রিয়ায় অনুসরণ করার প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করেছি। বলেছি, মৃত্যুদণ্ড এক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত অপরাধ ও মানবাধিকারের অন্যান্য মারাত্মক লঙ্ঘনে  সংশ্লিষ্টতার জোরালো সন্দেহ রয়েছে যাদের বিরুদ্ধে, তাদের সকলের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত করার আহ্বান জানায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, ‘বাংলাদেশের সংঘাতে’ উভয় পক্ষের দ্বারা আন্তর্জাতিক আইনানুসারে স্বীকৃত অপরাধ সংঘটন ও অন্যান্য মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে ইঙ্গিত দেয়ার পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে। শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান সংঘাতের মতো এখানেও আমরা উভয় পক্ষের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের আহ্বান জানাই।’
বিবৃতির তৃতীয় অংশে মানবাধিকার সংগঠনটি বলেছে, ‘আইসিটি-বিডি’তে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর পর থেকেই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গবেষণা পরিচালনা করেছে। এতে আইনগতভাবে ও বাস্তবে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের আইনগত মানদণ্ডের মারাত্মক লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে সরকারের কাছে এ উদ্বেগের বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। এরপর থেকেই পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় ত্রুটির দৃষ্টান্ত সরকারের সঙ্গে ভাগাভাগি করা হয়েছে। প্রকাশ্যে লভ্য নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে যে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টসসহ বৃহৎ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনসমূহ, বিদেশি সরকারের কর্মকর্তারা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও বিচার ও আপিল প্রক্রিয়া নিয়ে মারাত্মক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এসব উদ্বেগ নিরসনে সরকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেয়নি।’
বিবৃতির চতুর্থ অংশে সংস্থাটি লিখেছে, ‘কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই সকল ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এক্ষেত্রে অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি; ব্যক্তিবিশেষের দোষ, নিষ্কলুষতা বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্য এবং মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকরে রাষ্ট্রভেদে ব্যবহৃত পৃথক পদ্ধতি বিবেচনায় নেয়া হয় না। মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তির আহ্বান জানানোর মানে এই নয় যে, কোনো অপরাধ শাস্তি ব্যতিরেকে পার পেয়ে যাক। বরং, এর অর্থ মৃত্যুদণ্ড ব্যতীত পক্ষপাতহীন বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। আমাদের নজরে আসা সকল ক্ষেত্রে, বাংলাদেশে কারও প্রত্যাসন্ন ফাঁসির বিষয়ে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। এক্ষেত্রে কে বা কারা এ ফাঁসির মুখোমুখি হচ্ছে, তা বিবেচনা করা হয়নি। বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিলুপ্তির জন্য আমরা প্রচারাভিযান অব্যাহত রাখবো।’
বিবৃতির পঞ্চম ও শেষ অংশে বলা হয়েছে, ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সরকারের সদস্যদের সঙ্গে এসব ইস্যু নিয়ে আরও আলোচনা করতে অধীরভাবে আগ্রহী। দেশটিতে গিয়ে সংলাপে বসার জন্য ও বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও মূল্যায়নের জন্য আমাদের প্রতিনিধিদের ভিসা দিতে হবে।’

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় দেশ-বিদেশে মুসলিমদের ভাবাবেগে আঘাত দিয়েছিল -প্রণব মুখার্জির আত্মজীবনী by পরিতোষ পাল

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি তার আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ডে আশি ও নব্বইয়ের দশকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তুলে ধরেছেন। এর আগে প্রথম খণ্ডে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঘটনা তুলে ধরেছিলেন। ‘দ্য টারবুলেন্ট ইয়ার্স : ১৯৮০-৯৬’ গ্রন্থে প্রণব মুখার্জি বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও স্বর্ণমন্দিরে ব্লু স্টার অপারেশনের মতো বিতর্কিত বিষয়ে তার পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাকে প্রতিরোধ না করতে পারাকে দেশের প্রধান হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলে অভিহিত করেছেন প্রণব মুখার্জি। সেই সঙ্গে তিনি আরও বলেছেন, এ ঘটনায় দেশ ও বিদেশে মুসলমানদের ভাবাবেগে প্রবল আঘাত লেগেছিল। সেদিনের ঘটনার কথা জানাতে গিয়ে প্রণব মুখার্জি লিখেছেন, ১৯৯২ সালের ৬ই ডিসেম্বর আমি মুম্বইয়ে ছিলাম। পরিকল্পনা কমিশনে আমার অফিসার অন স্পেশাল ডিউটিতে ছিলেন জয়রাম রমেশ। তিনিই আমাকে ফোনে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কথা জানান। আমি ফোনে যা শুনছিলাম তা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আর তাই আমি বারবার জয়রামকে জিজ্ঞেস করি বিরাট কাঠামোটা ধ্বংস করা হলো কীভাবে? তখন জয়রাম শান্তভাবে আমাকে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ শোনান। সেদিন বিকালেই আমার দিল্লি ফিরে আসার কথা। কিন্তু জানতে পারলাম, মুম্বইতে ইতিমধ্যেই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মহারাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র সচিব আমাকে ফোন করে জানালেন, আমার বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে অনেক স্পর্শকাতর এলাকা থাকায় আমার জন্য একটি এসকর্ট ও একটি পাইলট কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমি বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দিলাম। আমার সামনে পুলিশের জিপ। আর পেছনে একটি অ্যাম্বাসাডরে ভর্তি সাদা পোশাকে পুলিশ। আর আমার গাড়িতে বসে একজন নিরাপত্তা অফিসার। যাওয়ার পথে হঠাৎ দেখতে পাই আইনজীবী রাম জেঠমালিনি তার গাড়ি থেকে আপ্রাণভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। আমি গাড়ি থামিয়ে তার গাড়িটিকেও আমার কনভয়ের নিরাপত্তার মধ্যে নিয়ে এলাম। আসার পথে রাস্তার মোড়ে মোড়ে মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাস্তায় ইটপাথর পড়ে থাকা দেখে বোঝা গেছে কিছুক্ষণ আগেই ভালো রকম সংঘর্ষ হয়েছে। পরের দিনের সংবাদপত্রে সেসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পড়েছিলাম।
এর পরেই তিনি লিখেছেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার কাজ, যা সব ভারতীয়দের মাথা লজ্জায় হেট করে দিয়েছিল। সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক স্বার্থে একটি ধর্মীয় কাঠামোকে মাত্রাজ্ঞান বিবর্জিত হয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল। এ ঘটনায় দেশ-বিদেশে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভাবাবেগে প্রচণ্ড আঘাত দিয়েছিল। এ ঘটনা সহিষ্ণু ও বহুত্ববাদী দেশ হিসেবে যেখানে সব ধর্মের মানুষ শান্তি ও সম্প্রীতির মধ্যে একসঙ্গে থেকেছে, সেই ভারতের ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করেছিল। পরে একটি আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছিলেন, এ ধরনের মসজিদ বিনষ্ট করার ঘটনা জেরুজালেমের শহরে যেখানে শতাব্দীকাল ধরে ধর্মীয় বিরোধ চলে আসছে, সেখানেও কখনও ঘটেনি। সে সময় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওকে অনেকেই দায়ী করেছেন। আমি সে সময় মন্ত্রিসভায় ছিলাম না। তাই বাবরি ইস্যুতে কোনো সরকারি নীতিনির্ধারণের শরিক ছিলাম না। তবে আমার বিশ্বাস, ভারত সরকার সে সময় ‘হবসনস’ চয়েসের মুখোমুখি হয়েছিল। সরকারের সামনে অনেক পথ খোলা ছিল না। বাবরি মসজিদকে নিরাপদ রাখার ব্যাপারে রাজ্য সরকার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হবে- এ আশঙ্কায় কোনো রাজ্য সরকারকে কেন্দ্রীয় সরকার বরখাস্ত করতে পারে না। উত্তর প্রদেশ সরকার জাতীয় সংহতি কাউন্সিলের বৈঠকেই শুধু নয়, সুপ্রিম কোর্টে এফিডেভিট করে বাবরি মসজিদের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছিল। অনেকেই অবশ্য যুক্তি দেখিয়েছে, সংবিধানের ৩৫৬ ধারা জারি করে কেন্দ্রীয সরকার রাজ্য সরকারকে বরখাস্ত করতে পারতো। কিন্তু সংসদের রাজ্যসভায় যেখানে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না, সেখানে কীভাবে তা পাস করানো হতো?
প্রণব মুখার্জি অবশ্য বাবরি মসজিদ ধ্বংস প্রতিহত করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাওয়ের অক্ষমতাকে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বলে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, নরসিমা রাও উত্তর প্রদেশের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এনডি তিওয়ারির মতো প্রবীণ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কঠিন আলোচনার দায়িত্ব দিতে পারতেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসবি চ্যাবন একজন ভালো আলোচনাকারী হলেও তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতির আবেগটিকে ধরতে পারেননি। রঙ্গরাজন কুমারমঙ্গলম আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছিলেন, তবে তিনি ছিলেন খুবই তরুণ এবং তার অভিজ্ঞতাও কম। সেই সময় প্রথম প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি।
পরে নরসিমা রাওয়ের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত বৈঠকে আমি মোলায়েমভাবে না বলে বরং ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলাম, এর বিপদের দিকটি সম্পর্কে আপনাকে পরামর্শ দেয়ার কেউ কি ছিলেন না? বাবরি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে সেটা কি আপনি বুঝতে পারেননি? এখন আপনি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা প্রশমনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিন। সদর্থক কাজের মাধ্যমে মুসলমানদের আবেগকে আশ্বস্ত করুন। প্রণব মুখার্জি জানিয়েছেন, এ কথা বলার সময় পিভি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তবে তার চারিত্রিক স্টাইন অনুযায়ীই মুখমণ্ডলে আবেগের কোনো রেখাপাত হতে দেননি। কিন্তু আমি তার সঙ্গে কয়েক শতাব্দী একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে তাকে জানতাম। তাই তার মুখমণ্ডল পড়ার দরকার হয়নি। আমি তার মধ্যে হতাশা ও বিষণ্নতা অনুভব করতে পেরেছিলাম। এর পরে আমি অনেক সময় ভেবেছি, আমার এ বিস্ফোরণের ফলেই কি ১৯৯৩ সালের ১৭ই জানুয়ারি আমাকে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। প্রসঙ্গত, গতকাল বইটি রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রকাশিত হয়েছে। প্রণব মুখার্জি এ নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত টুইটার অ্যাকাউন্টে মন্তব্যও করেছেন।

শাহজালালের নিরাপত্তায় যৌথবাহিনী by দীন ইসলাম ও মিজানুর রহমান

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়াতে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরামর্শ অনুযায়ী নয়া উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিমানবন্দরের কার্গো এরিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হচ্ছে। নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রথম ধাপে যৌথ বাহিনী গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে এ বাহিনীতে আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত ১০০ জন সদস্যকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ জন পুলিশ, ৪০ জন বিমান বাহিনী ও ২০ জন আনসার বাহিনীর সদস্য রয়েছেন। এ সদস্য সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। এ ছাড়া লাগেজ স্ক্যানিং মেশিন, মেটাল ডিটেক্টর ও আর্চওয়ে মেশিন চালাতে দক্ষ কর্মী নিয়োগ করার প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া অচল সিসি ক্যামেরা চালু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য নতুন স্থান নির্ধারণ করা হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, এয়ারপোর্টের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয় সতর্ক রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নতুন করে নিয়োগকৃত যৌথ বাহিনী শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (নিরাপত্তা)-এর নির্দেশে কাজ করবে। পাশাপাশি লাগেজ স্ক্যানিং মেশিন, মেটাল ডিটেক্টর ও আর্চওয়ে মেশিন সচল রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও করবেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইউরোপে সরাসরি পণ্য রপ্তানি করতে এয়ার কার্গো সিকিউরিটি-৩ (এসিসি-৩) ও রেগুলেশন এজেন্ট-৩ (আরএ-৩) সনদ নবায়ন করেছে বাংলাদেশ বিমান। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ইইউর শর্তানুযায়ী বিমানকে সনদ  দেয়া হয়। শর্তে বলা হয়েছে, শাহজালালে কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে কার্গো শাখায় উন্নতমানের স্ক্যানিং মেশিন ও আর্চওয়ে স্থাপন করতে হবে। বিমানবন্দরে আসা লোকজনকে এসব মেশিনের ভেতর দিয়ে চলাচল করতে হবে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে কোনো দেশের ফ্লাইট চালাতে হলে সে দেশের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাসোসিয়েশনের (এফএএ) ক্যাটাগরি-১ ছাড়পত্র দরকার হয়। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এই ছাড়পত্র না থাকায় এখানকার কোনো বিমান সে দেশে যেতে পারছে না।
এদিকে স্ক্যানিং মেশিন ও আর্চওয়ে ব্যবহার নিয়ে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিপত্তি দেখা দিয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, কাস্টমস কর্মকর্তারা ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস চালানোর নিয়ম কানুন মানছেন না। এ নিয়ে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। এ ব্যাপারে কাস্টমস কমিশনার ও শাহজালালের নিরাপত্তা পরিচালকের কাছে লিখিত নালিশ জানানো হয়েছে। বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার নির্দেশ দিয়েছে, আর্চওয়ে ও স্ক্যানিং  মেশিন সবাইকে ব্যবহার করতে হবে। আমাদের সঙ্গে কোন সংস্থার বিরোধ থাকলে চলবে না। সবাইকে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। দেশের স্বার্থেই শাহজালালে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। এদিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপের পর কূটনৈতিক কার্যক্রমে সহায়তাকারী প্রটোকল এসিস্ট্যান্টদের চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সমপ্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক আদেশে বলা হয়েছে, কূটনীতিক বা কর্মকর্তাকে বিমানবন্দরে স্বাগত কিংবা বিদায় জানাতে সহায়তাকারী অনুমোদিত প্রটোকল এসিসট্যান্টরা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন গেট পর্যন্ত যেতে পারবেন। তাদের গেটের ভেতরে প্রবেশ করতে বারন করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জরুরি ওই সার্কুলার ইস্যুর বিষয়টি মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছে। সূত্র মতে, আদেশের অনুলিপি মন্ত্রণালয়ের সর্বস্তরের কর্মকর্তা, ফরেন সার্ভিস একাডেমির কর্মকর্তা এবং বিদেশস্থ বাংলাদেশের সব মিশনে পাঠানো হয়েছে। উল্লেখ্য, আগে প্রটোকল এসিস্ট্যান্টরা ইমিগ্রেশন পর্যন্ত যেতে পারবেন। এতে কর্মকর্তা-বিশেষ করে তাদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের স্বাগত কিংবা বিদায় জানানোর প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে পারতেন। নয়া ওই আদেশ ইস্যুর পর বিষয়টি নিয়ে দেশীয় কূটনীতিকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, দেশের প্রধান বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে বার বার অসন্তুষ্টির কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে তারা নিরাপত্তা বাড়ানোরও তাগিদ দেয়। সম্প্রতি সারা বিশ্বে কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়াতে তাগিদ দেয় এসব দেশ।
বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ঘাটতির বিষয়ে বুধবার এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা যদি এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি এখনই না বাড়াই, শুধু বাড়ানো না, এটাকে একেবারে ভিজিবল করতে হবে। সেটা যদি না করি তাহলে আমাদের বিমান কিন্তু লন্ডনে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘আমেরিকায় কিন্তু আমরা এখনও (ফ্লাইট) পাঠাতে পারছি না। একটাই কারণে। এখনও কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে এ গ্রেডে নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়নি।’