Friday, December 27, 2024

মির্জা গালিবের যত বিপত্তি by জাভেদ হুসেন

আজ ২৭ ডিসেম্বর উর্দু কবি মির্জা গালিবের জন্মদিন। পেনশনের ঝামেলা, মামলা, দেনার দায়—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল বাধাবিপত্তিঘেরা...

২০০৬ সালের ঘটনা। ভারতের হাইকোর্টে একজন বিচারক উকিলের সওয়াল–জবাব শুনছেন সকাল থেকে। এর মধ্যে দুপুর হয়ে গেল। কিন্তু রায় দেওয়ার মতো কোনো জায়গায় আসা গেল না। বিচারক মুলতবি ঘোষণা করে জানালেন, মামলার পরবর্তী তারিখ এক মাস পর। উকিল সাহেব আবেদন করলেন যে তারিখ একটু এগিয়ে দেওয়া হোক। বিচারক জানালেন যে তালিকায় অনেক মামলা আছে। সম্ভব নয়।


বিচারক উঠে নিজের চেম্বারে রওনা হয়েছেন, মৃদুভাষী উকিল একটা কবিতার পঙ্​ক্তির দ্বিতীয় লাইন পড়লেন:

‘কওন জিতা হ্যাঁয় তেরে জুলফ কে সর হোতে তক’

(কে বাঁচে তোমার কেশগুচ্ছ সাজিয়ে নেওয়া পর্যন্ত?)

কবিতা শুনে বিচারক থেমে গেলেন। উকিল সাহেবকে বললেন, প্রথম লাইনটাও পড়ুন। উকিল পড়লেন:

‘আহ কো চাহিয়ে ইক উম্র আসর হোতে তক’

(একটা দীর্ঘশ্বাসের ফল ফলতে একটা জীবন দরকার)

বিচারক চলে যাওয়ার আগে আদালতের কর্মচারীকে বললেন, এই মামলার তারিখ আগামী সপ্তাহে রাখবেন। বিচারকের নাম তিরথ সিং ঠাকুর। উকিল ছিলেন নাজমি ওয়াজিরি। মামলা চলছিল দিল্লি হাইকোর্টে। আর শেরটা মির্জা গালিবের।

মির্জা গালিব এই মামলায় খোদ উকিলের পরিত্রাতা হলেন। কিন্তু নিজের জীবনে ঝুটঝামেলা তাঁর পিছু ছাড়েনি। অর্থাভাব, পাওনাদারের অপমান আর আদালতে নালিশ, কয়েদবাস—কী ছিল না তাঁর জীবনে?

পেনশনের ঝামেলা

আইন, মামলা আর আদালতের সঙ্গে মির্জা গালিবকে মোটামুটি সারা জীবনই কাটাতে হয়েছে। তাঁর সৈনিক বাবা মির্জা আবদুল্লাহ বেগ মারা যান ১৮০৩ সালে। গালিবের বয়স তখন ৫। পরিবারের দায়িত্ব তুলে নেন চাচা মির্জা নসরুল্লাহ বেগ।

১৮০৬ সালে চাচাও মারা গেলেন দুর্ঘটনায়। পরিবারের পেনশন ঠিক হলো বছরে ১০ হাজার টাকা। সে টাকা দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল ফিরোজপুর ঝিরকার জমিদারির ওপর। ইংরেজদের চাপিয়ে দেওয়া পেনশনের টাকা দিতে জমিদারদের খুব আগ্রহ থাকার কথাও নয়। পেনশনের টাকা নেমে এল বছরে তিন হাজার টাকায়। শেষে বিভিন্ন দাবিদারদের মধ্যে ভাগ হয়ে গালিবের ভাগে এল মাসে ৬২ টাকা ৫০ আনা।

গালিবের জীবনের অর্ধেক কেটেছে পেনশনের প্রাপ্য টাকা আদায় করতে দেনদরবার আর মামলা করে। প্রথমে প্রভাবশালী বন্ধুদের সহায়তা নিয়ে ব্যর্থ হয়ে মামলা করেছেন। সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।

দেনদরবারে কলকাতায়

গালিবের বয়স যখন ১৪ বছর, ১৮১১ সালে পারিবারিক বন্ধুদের পরামর্শে দিল্লির ব্রিটিশ রেসিডেন্ট স্যার চার্লস মেটকাফের কাছে দরবার করলেন। সেখান থেকে জানলেন, গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিল উইলিয়াম এমহার্স্ট ছাড়া এ সিদ্ধান্ত আর কেউ দিতে পারবেন না। এমহার্স্ট সাহেবের দপ্তর ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতায়।

গালিব যুবক বয়সে, ১৮২৬ সালে রওনা দিলেন কলকাতায়। পৌঁছালেন দেড় বছর পর। পথে বিভিন্ন জায়গায় থামলেন। বিভিন্ন দরবারে অতিথি হলেন। কাশি দেখে অভিভূত হয়ে লিখলেন ফারসি মসনভি, ‘চারাগে দ্যায়ের’, মানে মন্দিরের প্রদীপ। কলকাতায় গিয়ে পৌঁছালেন ১৮২৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। থাকলেন দেড় বছর।  

গালিব শিগগিরই ব্রিটিশ চিফ সেক্রেটারি এন্ড্রু স্টারলিং আর তাঁর সহযোগী সাইমন ফেজারের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে ফেললেন। বিষয় উত্থাপিত হলো গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিলের দরবারে। তিনি জানালেন, এ বিষয়ে তাঁর কিছু করার নেই। দিল্লির রেসিডেন্ট সাহেব যদি মামলার দায়িত্ব দেন, তাহলে তিনি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।

এর মধ্যে দিল্লির রেসিডেন্ট ম্যাটকাফ সাহেব বদলি হয়ে গেছেন। বদলিতে এসেছেন এডওয়ার্ড কোলব্রুক। এই সাহেবকে গালিব ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। গালিব দিল্লির বিখ্যাত উকিল পণ্ডিত হিরা নন্দকে দায়িত্ব দিলেন রেসিডেন্টের দরবারে বিষয় সুরাহা করার। ডাকযোগে কাগজপত্র পাঠালেন। মামলা চালানোর খরচ জোগাড় হলো কিছু দামি জিনিসপত্র বিক্রি করে। ওকালতনামা পাঠানো হলো। এর মধ্যে কোলব্রুক সাহেব বদলি হয়ে গেলেন। নতুন রেসিডেন্ট হলেন উইলিয়াম ফ্রেজার। আগের ওকালতনামা বাতিল হলো। সব চেষ্টা গেল জলে।

এ সময় গালিব কলকাতার সদর দিওয়ানি আদালতে আবেদন করলেন। এই আদালতও জানালেন যে মামলায় তাঁদের এখতিয়ার নেই। ব্যর্থ মনোরথ গালিব দিল্লিতে ফিরলেন ১৮২৯ সালের আগস্টে। তবে নতুন যুগের কলকাতা তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি লিখেছিলেন:

‘কলকাতার কথা মনে করিয়ে দিলে হে বন্ধু

যেন আমার বুকে তির মারলে, হায় হায়।’

এদিকে দিল্লিতে রেসিডেন্টের দরবারেও মামলা খারিজ হয়ে গেল। গালিব আপিল করলেন লন্ডনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিচালকদের আদালতে। ফলাফল শূন্য।

ফ্রেজার হত্যা মামলা

লন্ডন থেকে আবেদন খারিজ হওয়ার পর গালিবের স্ত্রী উমরাও বেগমের চাচাতো ভাই বললেন যে তিনি দিল্লির রেসিডেন্ট ফ্রেজার সাহেবকে পেনশনের জন্য রাজি করাতে পারবেন। তবে এর জন্য খরচাপাতি লাগবে। গালিব আবার টাকা ধার নিয়ে দিলেন।

এর কিছুদিন পরেই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটল। ১৮৩৫ সালের ২২ মার্চ ফ্রেজার সাহেব খুন হলেন। কিসনগড়ের রাজার বাড়িতে পার্টি শেষ করে ফিরছিলেন রাতে। পথে আততায়ী গুলি করে তাঁকে হত্যা করে। পুলিশ আততায়ীকে খুঁজে গ্রেপ্তার করে। নাম করিম উদ্দিন। জেরায় তিনি স্বীকার করেন যে হত্যার নির্দেশ পেয়েছেন নওয়াব শামসউদ্দিনের কাছ থেকে। উমরাও বেগমের যে ভাই গালিবের মামলা ফ্রেজার সাহেবের কাছে তদবির করছিলেন, শামসউদ্দিন তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই। শামসউদ্দিনদের জমিদারি থেকেই গালিবের পেনশনের টাকা আসত। তা নিয়ে শামসউদ্দিনের আপত্তি ছিল। বিবাদও ছিল সৎভাইয়ের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে। বিবাদে ফ্রেজার শামসউদ্দিনের পক্ষে ছিলেন না।

আরও সমস্যা ছিল। শামসউদ্দিন বিয়ে করেছিলেন ওয়াজির খানম নামের এক নারীকে। ওয়াজির ছিলেন একজন তাওয়ায়েফ। ফ্রেজারের তাঁর সঙ্গে আগে থেকে সখ্য ছিল। সব মিলিয়ে শামসউদ্দিন গ্রেপ্তার হলেন। রায়ে তাঁর হলো ফাঁসি। ফ্রেজার ছিলেন ভারতীয় সংস্কৃতি নিয়ে আগ্রহী লোক, গালিবের বন্ধুস্থানীয়। আর নওয়াব শামসউদ্দিন তাঁর বিরোধী। আবার পরিবারের আত্মীয়। হত্যা মামলায় গালিব জড়িয়ে পড়লেন। দিল্লির ম্যাজিস্ট্রেট মামলায় তাঁর জবানবন্দি নিয়েছিলেন।

শামসউদ্দিনের ফাঁসিতে দিল্লিতে প্রবল আলোড়ন শুরু হলো। অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস, তিনি নির্দোষ। ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের শিকার। ফাঁসির পর তিনি শহীদের মর্যাদা পেয়ে গেলেন প্রায়। আর গালিব পুলিশকে জবানবন্দি দিয়ে দিল্লিবাসীর কাছে তকমা পেয়ে গেলেন বিশ্বাসঘাতকের। এটা অবশ্য অন্যায্য ছিল। প্রথমত, জবানবন্দি তাঁকে দিতেই হতো। আর দ্বিতীয়ত, পুরো ঘটনায় তাঁর ক্ষতিই হয়েছিল। একদিকে ফ্রেজারের মতো প্রভাবশালী বন্ধুস্থানীয় লোক হারালেন। অপর দিকে ঝিরকার নবাবদের জমিদারি বাজেয়াপ্ত হলো। তিনি চিরকালের মতো পেনশন বাড়ানোর সুযোগ হারালেন।

বাকি জীবন গালিবের আর্থিক দৈন্যে কেটেছে। নিজের অবস্থা যেমন হোক না কেন, বাড়িতে সব মিলিয়ে পোষ্য ছিল ২০ জন। কেমন করে সংসার চালাতেন, কোত্থেকে আসত টাকা? বন্ধু সুরুরকে লেখা ১৮৬২ সালের এক চিঠিতে এর কিছু বয়ান পাওয়া যায়, ‘বেশ কিছুদিন পর দিল্লির বাদশাহ আমাকে মাসে ৫০ টাকায় নিয়োগ দিলেন। যুবরাজ বরাদ্দ করলেন বছরে ৪০০ টাকা। এর দুই বছর পরে যুবরাজ মারা গেলেন। আমার কাসিদা পড়ে আওধের বাদশাহ ওয়াজিদ আলী শাহ বছরে ৫০০ টাকা বরাদ্দ করলেন। তিনিও দুই বছরের বেশি টিকে থাকতে পারলেন না। মানে, বেঁচে তিনি এখনো আছেন, কিন্তু তাঁর রাজত্ব নেই। দিল্লির রাজত্বের প্রাণ একটু বেশি শক্ত ছিল। আমাকে সাত বছর খাবার জোগানোর ব্যবস্থা করে তারপর ধ্বংস হলো।’   

চৌসরের দায়, জুয়ার দায়

মোগল আমলে সামান্য টাকা বাজি রেখে চৌসর খেলা খুব একটা দোষের কিছু ছিল না। কিন্তু ইংরেজদের নতুন শাসনে তা হলো দণ্ডনীয় অপরাধ। গালিব পাশা ফেলে চৌসর খেলতেন নিজ ঘরে। কাছের কিছু বন্ধুর সঙ্গে। আগের কোতোয়াল ছিলেন গালিবের বন্ধু। ফলে কখনো সমস্যা হয়নি। সেই কোতোয়াল বদলি হলেন। নতুন কোতোয়াল এলেন ফয়জুল হাসান খান। তিনি মোগল ক্ষয়িষ্ণু অভিজাতদের মান-সম্মানের ধার ধারতেন না।  

জুয়া খেলার অভিযোগে গালিবের বাড়িতে পুলিশের অভিযান হয়েছিল। জরিমানা গুনতে হয়েছিল ১০০ টাকা। তাহলে এরপরও কেন তিনি ঘরে বসে টাকা বাজি রেখে পাশা খেলছিলেন? কারণ বোধ হয় এই যে তিনি ইংরেজ প্রশাসনে বেশ কিছু প্রভাবশালী বন্ধু পেয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, তেমন কিছু হলে তাঁরা রক্ষা করবেন। কিন্তু গালিবের ভুল ভাঙল। তিনি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হলেন। বিচার আর শাস্তিও হলো। ২০০ টাকা নগদ অর্থদণ্ড আর ছয় মাস সশ্রম জেল। ৫০ টাকা বাড়তি দিলে বিনাশ্রম কয়েদ।

পুরো ছয় মাস গালিবকে জেল খাটতে হয়নি। তিন মাস পর মুক্তি পেয়েছিলেন। কী কারণে এই রেয়াত, তা আজ আর জানা যায় না। তবে এ ঘটনায় গালিবের মন ভেঙে গিয়েছিল। অস্তমিত বংশগৌরব, তবু মনে গর্ব ছিল, বড় কবি তিনি। কিন্তু এই কয়েদ খাটার ঘটনায় কাছের মানুষদের ওপর আস্থাও যে কবির টলে গিয়েছিল, জেলে কাটানো সময় নিয়ে লেখা একটা ফারসি কবিতায় তা বোঝা যায়:

‘পুরোনো বন্ধুরা, বৃথা করো না কষ্ট

আমাকে দেখতে আসার

নেড়ো না কড়া আমার দরজার, কে খুলবে আর এই দ্বার

বন্দী তস্কর আমার বন্ধু এখন, তারাই আমার কদরদান

তাদের কোলাহল থামিয়ে বলি,

“বাইরে নেই বিশ্বস্ততা বলে কিছু”’

দেনার দায়

এদিকে বাজারে দেনা বেড়ে অবস্থা করুণ। কলকাতায় গিয়ে পেনশনের টাকা ফিরে পাবেন বলে আশা ছিল। সে আশার গুড়ে বালি পড়েছে। পাওনাদারেরা সব জেনে গেছেন সে কথা। তাঁরা টাকার জন্য অস্থির। বাড়ির সামনে এসে ভিড় করে থাকেন। হইহল্লা করেন। বিপদের এই ঘনঘটা দেখে গালিব নাকি বলেছিলেন, ‘খোদার পাঠানো সব বিপদ দুনিয়ায় নেমেই জিজ্ঞাসা করে, গালিবের বাড়িটা কোথায়?’  

তবে স্বভাবসিদ্ধ রসিকতা তিনি ভোলেননি। দেনাদারদের হাতে নাজেহাল হয়ে এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘মানুষ অন্যের কষ্ট দেখলে আনন্দ পায়। আমিও এক কায়দা শিখে নিয়েছি। নিজেকে আরেকজন ভেবে নিয়ে নিজের বিপদে নিজেই মজা পাই।’

মৃত্যুর আগপর্যন্ত এই দেনার টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন গালিব। বিভিন্ন জায়গায় অর্থসহায়তা চেয়ে চিঠি লিখেও কোনো সাড়া পাননি। আর চিন্তা ছিল স্ত্রী উমরাওকে নিয়েও। তাঁর মৃত্যুর পর নিকটজন বলতে এমন কেউ ছিল না যে এই নারীর সহায় হবে।

নিজের দেনা শোধ করতে না পারলেও মির্জা গালিব আমাদের ঋণী করে গেলেন। এখনো অনেক অজ্ঞাত উর্দু কবি নিজেদের কবিতা গালিবের বলে প্রচার করেন। তবে সেসব জাল কবিতা কোনোমতেই গালিবের নয়, পড়লেই বোঝা যায়।

হায় রে, মৃত্যুর পরও কবিতা লেখা থামল না গালিবের!

মির্জা গালিবের যত বিপত্তি

মা–বাবার বিষণ্নতা যেভাবে সন্তানের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে by রাউফুন নাহার

সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মায়ের আত্মহত্যা, সন্তানকে হত্যার পর বাবার আত্মহত্যা, বাংলাদেশেও এমন খবর এখন বিরল নয়। এসব ঘটনা আমাদের স্তব্ধ করে, গভীর শোক ও উদ্বেগের মুখে ঠেলে দেয়। স্বাভাবিক চিন্তার যেকোনো মানুষের কাছে এমন কর্মকাণ্ড শুধু হৃদয়বিদারকই নয়, অযৌক্তিক, নিষ্ঠুর ও দুর্বোধ্য। এমন ঘটনা কাম্য নয়, কোনোমতেই মেনে নেওয়ার নয়, কিন্তু ঘটছে। কেন ঘটছে, এর পেছনের আর্থসামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো জানা থাকলে উত্তরণ কিছুটা হলেও সহজ হতে পারে।

সম্ভাব্য কারণ

১. মানসিক অসুস্থতা: কিছু মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক ও যৌক্তিকভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, বাস্তবতাকে নেতিবাচক ও বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করে। তাদের মধ্যে আত্মহত্যা বা সন্তান থাকলে তাকে সঙ্গে নিয়ে আত্মহত্যার ঝুঁকি থাকতে পারে। এসব মানসিক রোগের মধ্যে উচ্চ মাত্রার বিষণ্নতা অন্যতম। এ ছাড়া রয়েছে বাইপোলার ডিজঅর্ডার বা সাইকোসিস, মাদকাসক্তি, মায়েদের মধ্যে প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা।

২. কষ্ট থেকে নিজেকে ও সন্তানকে বাঁচাতে হত্যা: মরে গিয়ে বেঁচে যাওয়ার চেষ্টা! কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য সন্তানসহ নিজেকে হত্যা! অদ্ভুত শোনালেও উচ্চ মাত্রার বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে এমন চিন্তা আসতে পারে। একদিকে শারীরিক ও মানসিক শক্তিহীনতা, আরেক দিকে মস্তিষ্কের সমস্যা সমাধানকারী অংশের নিষ্ক্রিয়তা আক্রান্ত ব্যক্তিকে তীব্র মনোযাতনায় ফেলে দেয়, যা ধীরে ধীরে জীবনবিধ্বংসী চিন্তা ও সিদ্ধান্তের দিকে মোড় নেয়।

৩. সামাজিক প্রতিকূলতা: কিছু প্রতিকূলতা যেমন আর্থিক সংকট, দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ, বেকারত্ব, বৈষম্য, নির্যাতন, দুর্ঘটনা ইত্যাদি মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির হতাশা ও বিষণ্ণতাকে বাড়িয়ে তোলে। এমন পরিস্থিতিতে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি অসহায় ও নিরুপায় বোধ করে, যা তাকে ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়।

৪. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা: সামাজিক সহযোগিতার অভাব মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির একাকিত্ব ও হতাশার অনুভূতিকে তীব্রতর করে। সামাজিক সহায়তা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন আর্থিক সহায়তা যা মূলত পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন বা দাতব্য সংস্থা থেকে আসতে পারে; মানসিক সহায়তা যেমন কঠিন পরিস্থিতিতে কাছের মানুষকে পাশে পাওয়া, যত্ন ও মমতা পাওয়া; ব্যবহারিক সহায়তা যেমন দৈনন্দিন কাজকর্মে সহযোগিতা, বাজার বা গৃহস্থালি কাজে সাহায্য এবং তথ্যসহায়তা যেমন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া। মানসিক রোগে আক্রান্ত বা ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি যখন পর্যাপ্ত সামাজিক সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত থাকেন, তখন তাঁর মধ্যে সন্তানসহ নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক চিন্তা আসতে পারে।

৫. মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব: কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আমাদের সমাজে বেশ কিছু মিথ বা ধারণা চালু আছে, যা মানুষকে সাহায্য নেওয়া থেকে পিছপা করে। চিকিৎসা নিতে দেখলে লোকে আমাকে পাগল বা মানসিক রোগী ভাববে, এমন ভীতি থেকে অনেকেই পেশাদার মনোবিদের শরণাপন্ন হন না, ফলে মানসিক সমস্যা বাড়তে থাকে। একসময় যা আত্মঘাতী বা হত্যাকাণ্ডের প্রবণতায় রূপ নিতে পারে।

লক্ষণ ও সতর্ক সংকেত

আত্মহত্যা বা হত্যাকাণ্ডের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এমন ব্যক্তির আচরণ ও কথাবার্তা থেকে বেশ কিছু সংকেত পাওয়া যায়। আমরা যদি সেসব সংকেত বা লক্ষণ সম্পর্কে সজাগ থাকি, তাহলে খুব সহজেই ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে সহযোগিতা দিতে বা চিকিৎসা নিতে উদ্যোগ নিতে পারি।

লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—

১. ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ: নিজেকে বোঝা হিসেবে দেখা। নিজেকে ও সন্তানদের অপ্রয়োজনীয় মনে করা।

২. সামাজিক সম্পর্ক ছিন্ন করা: বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।

৩. নিজের জিনিসপত্র বিলিয়ে দেওয়া: আর্থিক বিষয়াদি গুছিয়ে নেওয়া, জিনিসপত্র বিলিয়ে দেওয়া ইত্যাদি কাজ আত্মঘাতী ইচ্ছাকেই ইঙ্গিত করে।

৪. ঘন ঘন মৃত্যু নিয়ে কথা বলা: মরে গেলেই ভালো, এমন চিন্তাধারা ও কথাবার্তা বা মৃত্যুকে একমাত্র মুক্তি বা সমাধানের পথ মনে করা।

৫. আচরণগত পরিবর্তন: হঠাৎ শান্ত ও চুপ হয়ে যাওয়া, কাজকর্ম থামিয়ে দেওয়া বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হওয়া, ধীরগতিতে চলাফেরা ও কথাবার্তা বলা ইত্যাদি।

প্রতিরোধ ও পদক্ষেপ

এমন ট্র্যাজেডি প্রতিরোধে সচেতনতা, সময়মতো পদক্ষেপ এবং সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ হতে পারে—

১. মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো: মানসিক স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে বিভ্রান্তি দূর করতে সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যখন মানসিক স্বাস্থ্য প্রাধান্য পায়, নিষ্ঠুরতা, নিপীড়ন, বৈষম্যও তখন কমে আসে। পরস্পরের জন্য নিরাপদ ও আস্থাশীল হয়ে ওঠে মানুষ। এতে করে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তির জীবন যেমন সহজ হয়, তেমনি নতুন করে আর কেউ ঝুঁকির মুখে পড়ে না। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

২. মা-বাবা বা অভিভাবকদের জন্য সামাজিক সহায়তা: সন্তান লালন-পালনের বিষয়টি উপভোগ্য হলেও কঠিন একটি দায়িত্ব। মানসিক চাপ কমাতে এ সময় আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি সামাজিক সংযোগও বেশ প্রয়োজন হয়। সন্তান পালনের কঠিন এই যাত্রাপথে সামাজিক সহায়তাহীন ও একা বোধ করলে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। নিরাপদ কর্মস্থল, সামাজিক সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ মা-বাবা বা অভিভাবকের মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশেই কমাতে পারে।

৩. মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা: মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করার জন্য সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।

৪. জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা: বিভিন্ন হাসপাতালে যেমন জরুরি বিভাগ রয়েছে, যেখানে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পাওয়া যায়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এমন জরুরি সেবা প্রয়োজন হয়, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি তাৎক্ষণিক সেবা পেতে পারে।

সন্তানকে হত্যা করার পর আত্মহত্যা করা বিষণ্নতাজনিত মানসিক অসুস্থতার ভয়ংকরতম রূপগুলোর একটি। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন, পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মা–বাবার বিষণ্ণতা অনেক সময় সন্তানের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনতে পারে। যেটা একেবারেই কাম্য নয়
মা–বাবার বিষণ্ণতা অনেক সময় সন্তানের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনতে পারে। যেটা একেবারেই কাম্য নয়। ছবি: আরাফাত করিম

কুর্দিদের প্রতি এরদোয়ানের ক্ষোভের মূল কারণ

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সিরিয়ার কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কুর্দি যোদ্ধারা অস্ত্র জমা দেবে অথবা তাদের ‘পুঁতে ফেলা হবে।’ এরদোয়ানের এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, সামরিক এবং আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব। — খবর রয়টার্স।

সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সময় কুর্দি যোদ্ধারা, বিশেষ করে ওয়াইপিজি (ইউনিটস অব প্রোটেকশন), সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে। তুরস্ক এই গোষ্ঠীকে পিকেকে (কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি)-র শাখা হিসেবে বিবেচনা করে।

তুরস্কের মতে, ওয়াইপিজি তুরস্কের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। আঙ্কারা বারবার বলেছে, ভবিষ্যতের সিরিয়ায় এই গোষ্ঠীর কোনো জায়গা নেই।

পিকেকে ও সন্ত্রাসবাদ

তুরস্কের সরকার কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)-কে একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পিকেকে ১৯৮৪ সাল থেকে তুরস্কের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য তুরস্কের কুর্দি-অধ্যুষিত অঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এই সংঘাতের কারণে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং এরদোয়ান পিকেকেকে তুরস্কের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন।

রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা

তুরস্কের কুর্দি-সমর্থিত রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (এইচডিপি), এরদোয়ানের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এই দলটি কুর্দি জনগণের অধিকার নিয়ে সরব এবং সরকারের সমালোচনায় দৃঢ়। এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন একে পার্টি মনে করে, এইচডিপি পিকেকের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা তুরস্কের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।

কুর্দি স্বায়ত্তশাসনের দাবি

তুরস্কে বসবাসরত কুর্দিরা দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক, ভাষাগত এবং রাজনৈতিক অধিকারের দাবি করে আসছে। যদিও কুর্দিদের দাবি সাংবিধানিক স্বীকৃতির মধ্যে সীমিত, তুরস্কের সরকার এটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদের দিকে ধাবিত হওয়ার আশঙ্কা হিসেবে দেখে। এরদোয়ানের মতে, এই দাবি তুরস্কের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকিস্বরূপ।

জাতীয়তাবাদের উত্থান

এরদোয়ান তার রাজনৈতিক অবস্থান দৃঢ় করতে তুর্কি জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করার কৌশল গ্রহণ করেছেন। কুর্দিদের ওপর কঠোর অবস্থান নেওয়া এই জাতীয়তাবাদের অংশ হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে তিনি তার সমর্থকদের কাছে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতি

সম্প্রতি এরদোয়ান ঘোষণা করেছেন, তুরস্ক সিরিয়ার আলেপ্পোতে কনসুলেট খুলবে এবং শরণার্থীদের তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে কাজ করবে। একইসঙ্গে সিরিয়া ও ইরাকে সামরিক অভিযান চালিয়ে ২১ জন কুর্দি যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

কুর্দি ইস্যু তুরস্কের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। পিকেকে এবং ওয়াইপিজি-র কার্যক্রমকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে দেখলেও, কুর্দি জনগণ এটিকে তাদের অধিকারের সংগ্রাম বলে মনে করে। এরদোয়ানের কুর্দিদের প্রতি এই কঠোর অবস্থান তুরস্কের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশ।

এরদোয়ানের কুর্দিদের প্রতি এই কঠোর অবস্থান তুরস্কের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশ। ছবি : সংগৃহীত
এরদোয়ানের কুর্দিদের প্রতি এই কঠোর অবস্থান তুরস্কের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশ। ছবি : সংগৃহীত



ধনী দেশগুলোর মানবিক সহায়তা হ্রাসে বিশ্ব জুড়ে বাড়ছে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা

বিশ্বের ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ক্ষুধার্ত বা খাদ্যের জন্য সংগ্রাম করা মানুষের পরিসংখ্যান করা সহজ হলেও এর সমীকরণ মেলানো অনেক জটিল বলে মনে করছেন তারা। কেননা, এসব মানুষের কষ্ট লাঘবে যে পরিমাণ অর্থ সহায়তার প্রয়োজন ধনী দেশগুলোর পক্ষ থেকে তা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে বর্তমানে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা ৩০ কোটি ৭০ লাখ। এই সংখ্যার এখনো ৬০ শতাংশ মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এর অর্থ হচ্ছে ২০২৫ সালে কমপক্ষে ১০ কোটি ১৭ লাখ মানুষ খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, এ বছর বিশ্ব জুড়ে মানবিক সাহায্যের জন্য ৪৯.৬ বিলিয়ন অর্থ সহায়তার তহবিলের আবেদন জানায় জাতিসংঘ। বছর শেষে চাহিদার মাত্র ৪৬ শতাংশ অর্থ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো জাতিসংঘ চাহিদার তুলনায় অর্ধেকের কম তহবিল সংগ্রহ করেছে। যার ফলে তহবিলে অর্থ সংকট প্রকট হচ্ছে। এতে সকল ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে তারা। এই সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সিরিয়ার মতো জায়গাগুলোতে। কেননা, এসব অঞ্চলে বছরে প্রায় ৬০ লাখ মানুষকে খাদ্য সহায়তা পৌঁছায় জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। তবে অর্থ সংকটে এ বছরের শুরুতে সে সংখ্যা ১০ লাখে নামাতে বাধ্য হয়েছে তারা। রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন সংস্থাটির সম্পদ সংগ্রহ বিষয়ক সহকারী নির্বাহী পরিচালক রানিয়া দাগাশ কামার। এ বছরের মার্চে দাগাশ কামার সিরিয়ার খাদ্য সহায়তা পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। এক সাক্ষাৎকারে এই নারী বলেছেন, সেখানকার বিষয়টি হচ্ছে- আমরা ক্ষুধার্তদের খাবার অন্য ক্ষুধার্তদের মাঝে বিতরণ করছি। বিশ্ব জুড়ে সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিরূপ আবহাওয়ার ফলে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা। রয়টার্সকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক উপ-প্রধান এবং জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী টম ফ্লেচার বলেছেন, ‘চরম খাদ্য সংকটে থাকা মানুষদের সহায়তা কমাতে বাধ্য হয়েছি।

কারণ আর্থিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় বিশ্বের  বেশ কিছু ধনী দেশ তাদের সহায়তার পরিমাণ পুনর্গঠন করছে। জাতিসংঘের অন্যতম বৃহৎ দাতা দেশ জার্মানি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে দেশটি এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ কোটি ডলার তহবিল হ্রাস করেছে। এ ছাড়া আগামী বছরের জন্যও ১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা হ্রাসের আবেদন করেছে ইউরোপের ওই দেশটি। ফেব্রুয়ারিতে ফেডারেল নির্বাচনের পর নতুন সংসদ গঠনের পর আগামী বছরের ব্যয় নির্ধারণ করবে তারা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দিকেও তাকিয়ে আছে বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলো। কেননা, জানুয়ারিতে তিনি তার দ্বিতীয় টার্মের কাজ শুরু করবেন। মানবিক সহায়তার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন কী ভাবছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি তার প্রথম মেয়াদে মানবিক সহায়তা কমানোর চেষ্টা করেছিলেন। এবার তিনি এমন ব্যক্তিদের মনোনয়ন দিয়েছেন যারা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিদেশি সহায়তা কমানোর সুযোগ রয়েছে। বিশ্ব জুড়ে ক্ষুধা প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। গত পাঁচ বছরে দেশটি ৬৪.৫ বিলিয়ন ডলার মানবিক সহায়তা প্রদান করেছে। যা জাতিসংঘের প্রাপ্ত মোট অর্থের ৩৮ শতাংশ।

mzamin


একমাত্র অবলম্বন নয়নকে হারিয়ে অসহায় পরিবার

সোহানুর জামান নয়ন। চব্বিশ বছরের এই যুবক ২০২২ সালে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে যোগদান করেন। তিনি ঢাকার তেজগাঁও ফায়ার স্টেশনে কর্মরত ছিলেন। সচিবালয়ে আগুন নেভানোর কাজে গিয়ে ট্রাকচাপায় আহত হন। বুধবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। পরে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক ভোর পৌনে চারটার দিকে মৃত ঘোষণা করেন। নয়নের গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুরে। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। নিহত নয়নের বাবা আক্তারুজ্জামান কৃষিকাজ করেন। অভাবের সংসারে নয়ন ছিলেন একমাত্র অবলম্বন। নয়নকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে পরিবারটি। একমাত্র ছেলে সন্তানকে হারিয়ে দিশাহারা বাবা-মা।

নয়নকে হাসপাতালে নিয়ে আসা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আগুন লাগলে তেজগাঁও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা সচিবালয়ের মালামাল নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় জিরো পয়েন্টের দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের ধাক্কায় দুইজন ফায়ার সার্ভিস কর্মী আহত হন। পরে তাদের উদ্ধার করে ঢামেকে নেয়া হলে হলে সোহানুরকে চিকিৎসক মৃত  ঘোষণা করেন। আহত হাবিবুর রহমান (২৬) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। নিহতের চাচাতো ভাই মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, সোহানুর জামান নয়ন, পিএন: (৫০৭৬৭৫ ৬১তম ব্যাচ) ০২-১০-২০২২ সালে যোগদান করেন। পরে সেখান থেকে তেজগাঁও ফায়ার স্টেশনের ফায়ার ফাইটার হিসেবে যোগদান করেন। তিনি বলেন, আমাদের গ্রামের বাড়ি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানায়। আটপনিয়া গ্রামের আখতারুজ্জামান এর সন্তান। নয়ন বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান। তার বড় বোন রয়েছেন।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নয়নের ব্যবহৃত হেলমেটটি রাস্তায় পড়ে রয়েছে। পিচঢালা রাস্তাটিতে রক্তের চিহ্ন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ফায়ার সার্ভিসের একজন সদস্য বিকল্প পানির ব্যবস্থা করছিলেন। এ সময় তিনি পাইপ কাঁধে নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি দ্রুতগামী ট্রাক এসে তাকে ধাক্কা দিলে তিনি রাস্তায় পড়ে যান। মাথায় পরা হেলমেটটি সঙ্গে সঙ্গে খুলে যায়। রাস্তায় ছিটকে পড়ে রক্ত। ঘটনার পর গণপূর্ত ভবনের সামনে দিয়ে ট্রাকটি পালিয়ে যাওয়ার সময় এর চালককে আটক করেন শিক্ষার্থীরা।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, সচিবালয়ের অগ্নিদুর্ঘটনায় কর্মরত অবস্থায় ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে মারা যান ফায়ারফাইটার মো. সোহানুর জামান নয়ন। গতকাল দুপুর ২টার সময় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর প্রাঙ্গণে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.), প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মো. খোদা বখস চৌধুরী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল, এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসিসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ অংশগ্রহণ করেন। জানাজা অনুষ্ঠানের আগে শহীদ মো. সোহানুর জামান নয়ন এর কফিনে শ্রদ্ধা জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। এ সময় অগ্নিসেনাদের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাগণ  নয়নের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে তার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

জানাজা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, গতকাল আমাদের ফায়ার ফাইটার নয়ন দুর্ঘটনায় মারা যান। আমরা সবাই তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। নয়নের বয়স খুবই কম ছিল। তিনি মাত্র দুই বছর ধরে ফায়ার সার্ভিসে চাকরি করছিলেন। কর্তব্যরত অবস্থায় তিনি মারা যান, তার মা-বাবার যে কি অবস্থা সেটা আমরা সবাই বুঝতে পারছি। তিনি খুবই দক্ষ ফায়ার ফাইটার ছিলেন। তাই তাকে স্পেশাল টিমের জন্য ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছিল।

mzamin

মধ্যরাতে সচিবালয়ে ভয়াবহ আগুন: দুর্ঘটনা না নাশকতা?

আগুনে পুড়লো প্রশাসনের কেন্দ্র সচিবালয়ের একটি ভবন। বুধবার মধ্যরাতে রহস্যজনক আগুনে ৭ নম্বর ভবনের চারটি তলা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব তলায় অন্তত চারটি মন্ত্রণালয়ের দপ্তর আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। ছাই  হয়ে গেছে নথিপত্র-কম্পিউটার ও আসবাবপত্র। বড়দিনের ছুটির পর মধ্য রাতের এই অগ্নিকাণ্ড নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকে ধারণা করছেন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি নাশকতা হতে পারে। তবে ঠিক কীভাবে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত তা পরিষ্কার হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের কেউ কেউ এই ঘটনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। ঘটনা তদন্তে একাধিক উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিনদিনের মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে আগুন লাগার তথ্য পায় ফায়ার সার্ভিস। তাদের ১৯টি ইউনিটের দীর্ঘ চেষ্টায় বৃহস্পতিবার সকালে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নেভানোর সময় সচিবালয়ের পাশের রাস্তায় ট্রাকচাপায় ফায়ার ফাইটার সোহানুর জামান নয়নের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় আহত হয়েছেন আরও দুইজন ফায়ার ফাইটার। আগুনের ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে সরকারের প্রতি পরামর্শ দিয়েছে বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। আগুনের ধরন দেখে নাশকতার বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকে। বলা হচ্ছে- কোনো পক্ষ নথিপত্র ধ্বংস করে দেয়ার জন্য এই চেষ্টা চালাতে পারে। আগুন লাগার পর প্রথমে ভবনটির দুই পাশের ভিন্ন তলায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়। অনেকে বলছেন, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুন ধরলে সেটা একস্থান থেকে হতে পারে। কিন্তু ভবনের দুই পাশের ভিন্ন তলায় আগুন সন্দেহ তৈরি করেছে। কয়েকদিন ধরে প্রশাসন ও অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টির মধ্যে সচিবালয়ে আগুনের ঘটনা ঘটলো। বড়দিনের ছুটিতে বুধবার প্রশাসন ক্যাডারের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা সভা করে প্রশাসন সংস্কার কমিটির প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। গতকাল অন্যান্য ২৫ ক্যাডারের কর্মকর্তারাও সারা দেশে মানববন্ধন করেছেন। সচিবালয়ে আগুনের পর ক্যাডার কর্মকর্তাদের এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। আগুনের ঘটনায় ঘাপটি মেরে থাকা কোনো পক্ষের দোসররা জড়িত থাকতে পারে এমনটিও সন্দেহ করছেন অনেকে।

এ ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। তার ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে লেখেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের বিগত সময়ে হওয়া অর্থলোপাট, দুর্নীতি নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম। কয়েক হাজার কোটি টাকা লুটপাটের প্রমাণও পাওয়া গিয়েছিল। আগুনে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এখনো জানা যায়নি। আমাদেরকে ব্যর্থ করার এই ষড়যন্ত্রে যে বা যারাই জড়িত থাকবে তাদের বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেয়া হবে না।

আগুন পরিকল্পিতভাবে লাগানো হয়েছে বলে মনে করেন সচিবালয়ের কাছে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি মানবজমিনকে বলেন, সুনিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারেন এটা সুপরিকল্পিত। সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এক প্রত্যক্ষদর্শী। উষ্মা প্রকাশ করে তিনি মানবজমিনকে বলেন, সচিবালয়ের ভেতরে একশ’ থেকে দেড়শ’ সিকিউরিটি গার্ড থাকেন। আগুন লাগার পর কি একজনেরও চোখে পড়েনি। এটা কীভাবে সম্ভব। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর সকাল ৯টার দিকে সচিবালয়ে উপস্থিত হন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সেখানে এক ব্রিফিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভেতরে আমরা দেখবো। পুরো সার্চ করে কোনো কিছু পাওয়া যায় কি-না দেখা হবে। নাশকতা কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তদন্ত হওয়ার পর বিষয়টি জানা যাবে।

অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বলেন, বুধবার দিবাগত রাত ১টা ৫২ মিনিটে আমাদের কাছে খবর আসে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে আগুন লাগে। ১টা ৫৪ মিনিটের মধ্যে আমাদের ইউনিট পৌঁছে যায়। একে একে ২০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। তবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়িগুলো সচিবালয়ের গেটের মধ্যে ঢোকাতে অনেক বেগ পেতে হয়। পরে সচিবালয়ের গেট ভেঙে দু’টি বড় গাড়ি ভেতরে ঢোকানো হয়। ২১১ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় ৬ ঘণ্টা পর সকাল ৮টা ৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন পুরোপুরি নেভে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে। তিনি বলেন, আগুনটা মূলত লেগেছে ৭ নম্বর ভবনের ৬ষ্ঠ তলায়। আগুন নিচের দিকে না এসে উপরের দিকে উঠে যায়। তাই ভবনের নিচের অংশে তেমন ক্ষতি না হলেও উপরের ৬, ৭, ৮ ও ৯ এই চারটি ফ্লোর পুড়ে গেছে।  ষষ্ঠ ও সপ্তমতলা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ লাইন দিয়ে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই দুর্ঘটনা এড়াতে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা যায়, আগুনে পুড়ে গেছে সচিবালয়ের ৯তলাবিশিষ্ট সাত নম্বর ভবনের ৬ থেকে ৯তলা পর্যন্ত চারটি ফ্লোর। ভবনের ছয়তলায় রয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, সাত তলায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় (একাংশ), আট তলায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়  (একাংশ) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় (একাংশ) ছিল। এছাড়া নবম তলায় রয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একাংশ। আগুন লেগে পুড়ে যাওয়া ভবনটিতে থাকা সকল দপ্তরের কাজ আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। দপ্তরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের অফিসে প্রবেশের জন্য সকাল থেকে এসে অপেক্ষা করলেও সচিবালয়ের মূল গেট দিয়ে কাউকেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। ৫ নম্বর গেট দিয়ে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন। তবে ৪ নম্বর ভবন ছাড়া অন্য কোনো ভবনে বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় কার্যত সকল কাজ বন্ধ রয়েছে প্রশাসনিক এই সদর দপ্তরের। তাই  যারা ভেতরে প্রবেশ করেছেন তারাও কিছুক্ষণ পর বাইরে বের হয়ে আসেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেলেও কোনো কক্ষেই প্রবেশ করা যাচ্ছে না। পুরো সচিবালয় বিদ্যুৎহীন। কিছু স্থানে জেনারেটর চললেও অধিকাংশ স্থানে অন্ধকার পরিবেশ।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মচারী বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের একাংশ পুড়ে  গেছে। পুরো ভবন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে। আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বেরিয়ে এসেছি। ছয় নম্বর ভবনে থাকা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মী আফসানা আক্তার বলেন, অন্য ভবনে আগুন লাগলেও আমাদের ভবনে বিদ্যুৎ না থাকায় ঢুকতে পারছি না। সেজন্য বেরিয়ে এসেছি। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রাজীব আহমেদ বলেন, ভেতরে প্রবেশ করলেও বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের দপ্তরের সকল কাজ বন্ধ রয়েছে। সচিবালয়ের মধ্যে অন্ধকার পরিবেশ।

একটি কুকুরের মরদেহ উদ্ধার: সচিবালয়ে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবন পরিদর্শন করেছে পুলিশের ফরেনসিক বিভাগ। পুড়ে যাওয়া সাত নম্বর ভবনের অষ্টম তলা থেকে আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি কুকুরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণের পর বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সচিবালয়ে প্রবেশ করে পুলিশের ফরেনসিক বিভাগের দল।

তদন্ত কমিটি: সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বৃহস্পতিবার এই কমিটি গঠন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসন ও শৃঙ্খলা শাখার এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন) মোহাম্মদ খালেদ রহীমকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে কমিটি। কমিটির কার্যপরিধি সম্পর্কে ওই অফিস আদেশে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের উৎস ও কারণ উদ্‌ঘাটন, অগ্নিদুর্ঘটনার পেছনে কারও ব্যক্তিগত বা পেশাগত দায়দায়িত্ব আছে কি না, তা উদ্‌ঘাটন এবং এ জাতীয় দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ করা। কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন- জননিরাপত্তা বিভাগের প্রতিনিধি (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার নিচে নয়), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার নিচে নয়), স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিনিধি (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার নিচে নয়), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিনিধি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার নিচে নয়)। কমিটিকে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের উৎস ও কারণ উদ্‌ঘাটন, অগ্নি দুর্ঘটনার পেছনে কারও ব্যক্তিগত বা পেশাগত দায়-দায়িত্ব আছে কি না তা উদ্‌ঘাটন করতে বলা হয়েছে। এছাড়া এ জাতীয় দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশও দেবে তদন্ত কমিটি। কমিটি প্রয়োজনে এক বা একাধিক সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। এছাড়া সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে দু’টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে দু’টি কমিটিকেই প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ ঘটনায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে দু’টি কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেন। উপদেষ্টার নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত দু’টি অফিস আদেশ জারি করা হয়। মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড-সমূহের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও তালিকা প্রস্তুত করা এবং ভবিষ্যতে যেকোনো দুর্ঘটনার ফলে উদ্ভূত ক্ষয়ক্ষতি রোধকল্পে করণীয় বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের জন্য প্রশাসন অধিশাখার যুগ্মসচিব মোর্শেদা আক্তারকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন- শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন, সিনিয়র সহকারী সচিব পূরবী গোলদার, সহকারী সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং সদস্য সচিব হিসেবে আছেন সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ মাসুম।

এছাড়াও মন্ত্রণালয়ের সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের জন্য প্রশাসন অধিশাখার যুগ্মসচিব মো. আবদুছ সামাদ আল আজাদকে আহ্বায়ক করে অন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত এ কমিটিতে সদস্য হিসেবে আছেন উপ-সচিব মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, সিস্টেম এনালিস্ট সুকান্ত বসাক, সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার এএসএম মেহরাব হোসেন। সদস্যসচিব হিসেবে আছেন, উপ-সচিব মো. কামাল হোসেন। এই দু’টি কমিটিকে আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

mzamin


পুলিশ সংস্কারে কিছু প্রস্তাবনা by শহীদুল্লাহ ফরায়জী

বিগত সরকারের সময় পুলিশ দলীয় স্বার্থে বড় ধরনের অপরাধ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাহিনীপ্রধান বাহারুল আলম। পুলিশের মহাপরিদর্শক(আইজিপি) বলেছেন, ‘বর্তমানে পুলিশ মনভাঙা অবস্থায় আছে। ভয়-আতঙ্কে তাদের মন ভেঙে গেছে। গণ-অভ্যুত্থানে সিনিয়র পুলিশ সদস্যরা জুনিয়রদের হুকুম দিয়ে তাদেরকে অনিরাপদ রেখে পালিয়ে গেছে।’

পুলিশ ফোর্সকে জাগিয়ে তোলা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, ‘বিগত সময়ে পুলিশ দলীয় স্বার্থ উদ্ধারে বড় ধরনের অপরাধ করেছে, এ জন্য আমরা লজ্জিত।
এই ধরনের সাহসী ও নৈতিক স্বীকারোক্তি পুলিশ ব্যবস্থা সংস্কারের ন্যায়সংগত ভিত্তি হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা জনগণের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বা রাষ্ট্রের আইন-কানুনের ঊর্ধ্বে অবস্থান গ্রহণ করতে পারে কি না! কী করে পুলিশবাহিনীর মতো ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠানের ন্যায়নীতি বা কর্তব্যবোধ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো, তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। যারা জনগণের সার্বভৌমত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো এবং রাষ্ট্রকে ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গিয়েছিলো, আওয়ামী লীগের অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক শাসনকে যারা চিরস্থায়ী করতে চেয়েছিলো, আইনের অনুমোদনবিহীন শক্তি প্রয়োগ করে যারা হত্যার উৎসবে মেতেছিলো, তাদের দায় কীভাবে নির্ধারিত হবে তাও আমাদেরকে সুস্পষ্ট করতে হবে। বাহিনীর পক্ষে আইজিপি সাহেবের ক্ষমাপ্রার্থনা বা লজ্জিত হওয়াই সমগ্র পুলিশবাহিনীর অপরাধের স্খলন বা নৈতিক অবস্থান কিংবা চরিত্রের পরিবর্তন নিশ্চিত করে কি না তাও আমাদেরকে গভীর পর্যালোচনা করতে হবে। জনগণের ন্যায়সঙ্গত অধিকার অপহরণ করে ক্ষমা প্রার্থনা কোনো প্রতিকারের প্রতিফলন নয়। একজন মানুষ যখন অব্যাহত হত্যার কাজে যুক্ত থাকে তখন সে সংবেদনহীন হয়ে যায়,অভ্যাসগত পাপের বিরুদ্ধে সে আর প্রতিবাদ করে না। দীর্ঘকালীন পাপ বিবেকের নির্দেশকে অস্বীকার করে, কারণ তার বিবেক তখন নিকৃষ্টতর হয়ে পড়ে।
বাহিনী প্রধানের ব্যক্তিগত নৈতিকজগত বা নৈতিক উৎকর্ষতা প্রশংসনীয়, কিন্তু তা সমস্ত পুলিশবাহিনীর নৈতিকতার প্রতিনিধিত্ব করে কি না তাও আমাদের তলিয়ে দেখতে হবে।

বিগত অবৈধ সরকারের আমলে বিভিন্ন আন্দোলন ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশের ভূমিকা জনমনে প্রচণ্ড রোষের সৃষ্টি করেছে। ভয়াবহ, অমানবিক ও পরিমাণহীন রক্তপাতের দায় নিয়ে পুলিশ এখন নৈতিকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত। মানুষহত্যা, দুর্ব্যবহার, নির্যাতন, ক্ষমতা, ক্রোধান্নিত আচরণ এবং রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ গণ-শত্রুতে পরিণত হয়েছে।
একদিকে ঔপনিবেশিক আইন-কানুন-প্রথা এবং অন্যদিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়া— এই দু'টি প্রধান কারণে পুলিশ-প্রশাসন গণমুখী চরিত্র লাভ করতে পারেনি। ফলে পেশাদারিত্বের বাইরে গিয়ে মারমুখী আচরণ এবং বল প্রয়োগে অস্বাভাবিক হিংস্র কর্মকাণ্ড পুলিশের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আন্দোলন দমনের নামে নির্বিচারে মানুষ হত্যার পুলিশি কর্মকাণ্ড দেশবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। বিশেষ করে পুলিশের নির্বিচারে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, হত্যার নির্মম দৃশ্য এবং দুষ্কৃতিকারীদের সশস্ত্র আক্রমণে সক্রিয় সমর্থন দেয়া, সরকারবিরোধী মত-পথের লোকদের গুম ও ক্রসফায়ারের মতো ন্যাক্কারজনক কাজে জড়িত থাকায় পুলিশের ওপর জনগণ চরম ক্ষুব্ধ। বিরোধীদলের বৃহৎ সমাবেশকে বেআইনিভাবে কঠোর হস্তে দমন করে ক্রমাগত লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি করার ব্যাডপুলিশিং— জনগণ থেকে পুলিশকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আইন ও বিধিতে নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সরকারের অভিপ্রায় পূরণে লাঠিয়াল হওয়ার কারণে পুলিশের প্রতি জনগণের ক্ষোভ ক্রমাগত পুঞ্জিভূত হয়। পুলিশি হেফাজতে নির্মম নির্যাতন, অমর্যাদাকর নিষ্ঠুর আচরণ— পুলিশকে দানব করে তোলে। জীবন্ত-লাশ পোড়ানো, এপিসি থেকে গুলিবিদ্ধ আহত ছাত্রকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলার মতো লোমহর্ষক ঘটনা জাতির মননকে মারাত্মকভাবে আহত করে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ও সামাজিক নিরাপত্তায় পুলিশ-প্রশাসন খুবই অত্যাবশ্যকীয়। জনবান্ধব পুলিশ-প্রশাসন গড়ে তোলা এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
পুলিশ সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাবনার উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে:—
ক. পুলিশবাহিনীর কাঠামো পরিচালন পদ্ধতি, স্বাধীনতা এবং পেশাদারিত্ব
১. জনবান্ধব পুলিশবাহিনী গঠন
জনবান্ধব করার লক্ষ্যে পুলিশকে দ্রুততম সময়ে স্বতন্ত্র, বৈষম্যহীন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত এবং শতভাগ পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিমূলক ইউনিফর্মধারী বেসামারিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
২  শৃঙ্খলাবাহিনীর সংজ্ঞার আওতামুক্ত করা
পুলিশ একটি ইউনিফর্মধারী বেসামরিক সংস্থা, যা জনগণের কাছে একটি সহানুভূতিশীল ও সেবামূলকবাহিনী হিসেবে পরিচিত হওয়া উচিত। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শৃঙ্খলাবাহিনীর সংজ্ঞা থেকে পুলিশকে অব্যাহতি দেয়া আবশ্যক, যাতে এটি সামরিক বাহিনীর কঠোর শৃঙ্খলার পরিবর্তে সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য শৃঙ্খলা-বিধি অনুসরণ করতে পারে এবং প্রকৃত বেসামরিক সংগঠন হিসেবে জনগণের কাছাকাছি থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।  
৩. বেসামরিক পরিচালন ও শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা
পুলিশ যেহেতু একটি বেসামরিক সংস্থা, সেহেতু তার পরিচালন-বিধিবিধান ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বেসামারিক হওয়া ন্যায়সংগত।
৪. পুলিশের কাজের যৌক্তিক পরিধি নির্ধারণ
পুলিশকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং তদন্ত কাজে মনোনিবেশ করার সুযোগ দিতে— ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা যেতে পারে।
৫. স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন এবং পুলিশের বিরাজনীতিকরণ
পুলিশের নীতি-নির্ধারণ, পদায়ন, নিয়োগ ও পদোন্নতি এবং পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অনুসন্ধান-প্রতিকারের বিষয়টি পুলিশ সদর দপ্তর বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে না রেখে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশনের উপর ন্যস্ত করতে হবে (১১১)। এতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দূর হবে।
৬. পুলিশ অভিযোগ কর্তৃপক্ষ গঠন
পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ, তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বতন্ত্র পুলিশ অভিযোগ কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে।
খ. নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি
১. বৈষম্যহীন নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থা
নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ ও শান্তি মিশনে গমনসহ সকল ধরনের বৈষম্য দূর করতে হবে।
২. উচ্চতর শিক্ষা ও নৈতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি
পুলিশ সদস্যদের উচ্চতর শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। বাধ্যতামূলকভাবে নৈতিকতা ও মানবিক আচরণ বিষয়ক ধারাবাহিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৩. আধুনিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া
নিয়োগ হতে হবে আধুনিক ও অধিকতর স্বচ্ছ পদ্ধতিতে। দুই স্তরে নিয়োগ হবে— কনস্টেবল এবং এসপি পর্যায়ে। কনস্টেবলদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হবে এইচএসসি। মামলা তদন্তের জন্য বিভাগীয় প্রশিক্ষণ এবং স্নাতক ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৪. মানবাধিকার ও মব-সাইকোলজির প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা
পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ‘মানবাধিকার’ এবং ‘শক্তি প্রয়োগ’ বিষয়ে জোরালো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। উচ্ছৃঙ্খল জনতা নিয়ন্ত্রণের উপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এছাড়া মব-সাইকোলজি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।
৫. নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি
পুলিশ বাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করে তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
গ. পুলিশ বাহিনীর পুনর্গঠন এবং রাজনৈতিক প্রভাব দূরীকরণ
১. র্যা ব বিলুপ্তি এবং বিশেষ ইউনিট গঠন
র্যা বকে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত কালো কাপড় বেঁধে যুদ্ধংদেহি মনোভাবে চলাফেরায় ত্রাসের সৃষ্টি করে। জনগণ ইউনিফর্মধারী পুলিশ চায়, কিন্তু অস্ত্রসজ্জিত সৈনিক চায় না। র্যা ব বিলুপ্ত করা জরুরি। তবে সন্ত্রাস বা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী মোকাবেলায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইউনিট রাখা যেতে পারে।
২. বেআইনি আদেশ প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রীয় সম্মান নিশ্চিতকরণ
অধস্তনদের বেআইনি বা অবৈধ কিংবা জনস্বার্থবিরোধী আদেশ পালনে বাধ্য করা যাবে না। কর্তব্যরত অবস্থায় আহত বা নিহত হলে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে হবে।
৩. ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং পুলিশ সুপারের হাতে ফেরত
জেলা পুলিশের অনেক আর্থিক সম্পর্কিত ক্ষমতা সদর দপ্তরে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে, কিন্তু সুশাসনের স্বার্থে বিকেন্দ্রীকরণ করে পুলিশ সুপারের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
৪. থানার সংস্কার এবং সেবামুখী সংস্কৃতি তৈরি
থানায় সাধারণ সেবা পেতে জনগণের হয়রানির অভিযোগ রোধ করতে থানা সংস্কারের মাধ্যমে সেবামুখী সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে হবে। নিয়মিত নজরদারি, অবৈধ লেনদেন বন্ধ করা এবং সেবা প্রত্যাশীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
ঘ. পুলিশ জবাবদিহিতা এবং জনসম্পৃক্ততা
১. নাগরিক কমিটি গঠন ও জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি
থানা, তদন্তকেন্দ্র, পুলিশফাঁড়ি ও পুলিশক্যাম্পের নিত্যকার অপরাধদমন কাজে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানো এবং পুলিশকে অপরাধের স্থানীয় গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত করে পরামর্শদানের জন্য এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে নাগরিক কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
২. গ্রেপ্তারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ
ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, দায়ীদের শাস্তি ও ক্ষেত্রবিশেষে পুরস্কার প্রদানের নিমিত্তে পুলিশের প্রতিটি গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিশদ তথ্য সম্বলিত একটি গ্রেপ্তারের ফর্ম তৈরি করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রতিটি গ্রেপ্তারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
৩. কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণ
সমাজের সাথে পুলিশের সম্পর্ক আরো দৃঢ় করার জন্য কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণর নিশ্চিত করতে হবে।
ঙ. আইনগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
১. জনবান্ধব পুলিশের জন্য যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন
পুলিশ অ্যাক্ট ১৮৬১ সনের আইন পরিবর্তন করে স্বাধীন দেশের যুগোপযোগী জনবান্ধব পুলিশ-প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য নতুন আইন প্রতিস্থাপন করতে হবে।
২. ‘বাংলাদেশ পুলিশ অধ্যাদেশ ২০০৭’ কার্যকর করা
পুলিশের রিফর্ম প্রজেক্ট যা, ‘বাংলাদেশ পুলিশ অধ্যাদেশ ২০০৭’— নামে প্রণয়ন করা হয়, তা প্রয়োজনীয় সংযোজন, বিয়োজন ও যুগের চাহিদা পূরণ উপযোগী করে অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে।

৩. পুলিশ কমিশন গঠনের আইনি কাঠামো নির্ধারণ
আইন দ্বারা পুলিশ কমিশন গঠন প্রক্রিয়া সুনির্দিষ্ট করা।
এইচ জি ওয়েলস্ এর একটি বিখ্যাত গল্প আছে,নাম তার “অন্ধের দেশ”(The Country of the Blind), তাতে এক অন্ধ জনগোষ্ঠীকে একজন স্বাভাবিক দৃষ্টিসম্পন্ন -মানুষ বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, তার এমন এক ইন্দ্রিয়ানুভূতি আছে,যা থেকে তারা বঞ্চিত, এই কথা অন্ধ জনগোষ্ঠীকে বোঝাতে তিনি ব্যর্থ হন এবং পরিশেষে তাকে তার বিভ্রম থেকে আরোগ্য করার জন্য তার চক্ষু উৎপাটনের সিদ্ধান্ত হয়। নৈতিক স্বজ্ঞার অধিকারীদের বেলায়ও  এমন হতে পারে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ নৈতিকভাবে অন্ধ, সেখানে নৈতিক দৃষ্টির অধিকারীর ভাগ্য কী হয় তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: গীতিকবি
faraizees@gmail.com

mzamin

বেতন ১৩ হাজার বান্ধবীকে উপহার ২১ কোটি রুপির সম্পদ

হর্ষল কুমার ক্ষীরসাগর। পেশায় একজন কম্পিউটার অপারেটর। মাসিক বেতন মাত্র ১৩ হাজার রুপি। অথচ তিনি বান্ধবীকে উপহার দিয়েছেন ২১ কোটি রুপি। সেই অর্থ ব্যবহার করে কেনা হয়েছে বিলাসবহুল গাড়ী ও একটি ফ্লাট। ওই ফ্লাটে আছে ৪টি বেডরুম, একটি হলরুম এবং একটি কিচেন। এ জন্য সংক্ষেপে এ জাতীয় ফ্লাটকে ৪বিএইচকে নামে অভিহিত করা হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, রাষ্ট্র পরিচালিত একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্সে কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্ব পালন করেন হর্ষল কুমার ক্ষরসাগর। ছত্রাপতি সভাজিনগরে একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্সের একটি বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তাকে সমর্থন দেয়ার কারণে সহকর্মী যশোদা শেঠী এবং তার স্বামী বিকে জীবনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে কিভাবে ২৩ বছর বয়সী এই যুবক অর্থ সরিয়েছেন। বলা হয়েছে, স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পুরনো লেটারহেড ব্যবহার করে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। স্পোর্টস কমপ্লেক্সের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন ইমেইলের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধের অনুরোধ করেন। ওই স্পোর্টস কমপ্লেক্সের অ্যাকাউন্টের মতো একই রকম একাউন্ট ব্যবহার করে নতুন ইমেইল খোলেন তিনি। তাতে শুধু একটি বর্ণ পরিবর্তন করেছেন। ওই ইমেইল ব্যবহার করে হর্ষল ওটিপি সুবিধা পেতেন। একই সঙ্গে অন্যান্য লেনদেনের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতেন। বিভাগীয় স্পোর্টস কমপ্লেক্স কমিটির ব্যাংক একাউন্টে ইন্টারনেট ব্যাংকিং সচল করেন হর্ষল।

এ বছর ১লা জুলাই থেকে ৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ১৩টি ব্যাংক একাউন্ট থেকে ২১.৬ কোটি রুপি সরিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। পুলিশ বলেছে, এই অর্থ থেকে ১.২ কোটি রুপি ব্যয় করে কেনা হয়েছে একটি বিএমডব্লিউ, ১.৩ কোটি রুপি দিয়ে কেনা হয়েছে একটি এসইউভি, ৩২ লাখ রুপি দিয়ে কেনা হয়েছে একটি বিএমডব্লিউ বাইক। ছত্রাপতি বিমানবন্দরের কাছে একটি বিলাসী ৪বিএইটকে ফ্লাট কিনে তা উপহার দিয়েছেন গার্লফ্রেন্ডকে। এখানেই শেষ নয়। তদন্তে দেখা গেছে, তিনি বান্ধবীর জন্য ডায়মন্ড খচিত চশমারও অর্ডার দিয়েছেন।
পুলিশের সন্দেহ এতে আরও মানুষ জড়িত থাকতে পারে। ব্যাংক একাউন্ট ব্যবহার করে যেসব স্থানে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে কর্তৃপক্ষ এখন সেগুলোর অনুসন্ধান করছে। হর্ষলকে গ্রেপ্তারে তল্লাশি অভিযানে বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করেছে পুলিশ। তারা বলেছে, স্পোর্টস ডিপার্টমেন্টের এক কর্মকর্তা সম্প্রতি লক্ষ্য করেন তাদের আর্থিক অনিয়ম আছে। এ নিয়ে তিনি অভিযোগ দাখিল করেন। সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা প্রশান্ত কদম বলেছেন, এফআইআরে এ পর্যন্ত তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তার মধ্যে দু;জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একজন পলাতক।

mzamin

দেশে ফিরে ব্যারিস্টার রাজ্জাক: দেশে এখন জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন

দেশে এখন জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ও জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেশে ফিরে এয়ারপোর্টে তিনি একথা বলেন। বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানান জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মুহাম্মদ মনিরসহ শুভানুধ্যায়ীরা।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন,  এখন আমাদের যেটা প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে জাতীয় ঐক্য। হিটলার চলে যাওয়ার পরে জার্মানি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কিন্তু জার্মানি এখন এক হয়ে গেছে। তিনটি বিষয়ে জাতি যদি একমত হতে পারে তাহলে বাংলাদেশ একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী ও কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।  আর সেই তিনটি বিষয় হলো- ১. স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ২. গণতন্ত্র ৩. অর্থনৈতিক উন্নয়ন।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, দীর্ঘ ১১ বছর পর দেশে আসলাম। বাংলাদেশ আমার জন্মভূমি। আমি এ দেশকে ভালোবাসি। এই শহর আমার নিজের শহর। এখানকার আইনাঙ্গনেই আমার বিচরণ ছিলো। আজকে সুদীর্ঘ ১১ বছর পর দেশে আসতে  পেরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া আদায় করছি। বিমান যখন ঢাকার এয়ারপোর্টে এসে অবতরণ করছিলো তখন আমি স্মরণ করছিলাম সেই সমস্ত তরুণ যুবকদের কথা যারা সর্বোচ্চ সেক্রেফাইজ করে আজ দেশ ও জাতির জন্য একটি মুক্ত পরিবেশ করে দিয়েছে। জার্মানি থেকে ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করার জন্য একটি মহাযুদ্ধের প্রয়োজন হয়েছিলো। সেই মহাযুদ্ধে তদানীন্তন তিনটি বৃহৎ শক্তি আমেরিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বৃটেনকে ৫ বছর যুদ্ধ করতে হয়েছে। আমাদের এই যুবকরা তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আমাদের জন্য স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। আজকের এই দিনে আমি তাদের অবদানকে শ্রদ্ধা ভরে স্বীকার করছি। কিন্তু আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি। প্রতিটি বিপ্লবের পরেই সমস্যার সৃষ্টি হয়। ফ্রেঞ্চ বিপ্লবের পর হয়েছে, আমেরিকান রেভুলেশনের পরে হয়েছে। এখন আমাদের যেটা প্রয়োজন, সেটা হচ্ছে জাতীয় ঐক্য।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের শাসনামলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হলে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের প্রধান আইনজীবী ছিলেন। ২০১৩ সালে জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়। একই বছরের ১৭ই ডিসেম্বর ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক ইংল্যান্ডে চলে যান। এক পর্যায়ে তিনি জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তিনি এবি পার্টির প্রধান উপদেষ্টা হন। এরপর গত সেপ্টেম্বরে এবি পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির প্রধান উপদেষ্টা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। জানা গেছে, তিনি সুপ্রিম কোর্টে আইনপেশায় নিয়মিত হবেন। তার দুই ছেলে সুপ্রিম কোর্টে আইনপেশায় আছেন। 

mzamin

যুদ্ধবিরতিতে বিলম্ব, গাজায় ঠাণ্ডায় মরছে নবজাতক

গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইসরাইল ও হামাসের কালক্ষেপণের মধ্যে নবজাতকদের অবস্থা শোচনীয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় এখন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। এর ফলে তাদের মৃত্যু ঘটছে। একদিকে শিশুদের মৃত্যু, অন্যদিকে খাদ্যের জন্য হাহাকার। জাতিসংঘ এরই মধ্যে সতর্ক করেছে, গাজাবাসী দুর্ভিক্ষাবস্থার মুখোমুখি। তাদেরকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক মহল থেকে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। একইভাবে ইসরাইল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে গাজাবাসীর ওপর। প্রতিদিন ঝরছে মানুষের প্রাণ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শীতের তীব্রতা। প্রাপ্ত বয়স্করা কোনোমতে নিজেকে সামাল দিলেও নবজাতক ও শিশুদের অবস্থা নাজুক। ঠাণ্ডাজনিক বিভিন্ন রোগে ভুগছে তারা। তীব্র ঠাণ্ডায় জমে প্রাণ হারিয়েছে সদ্য জন্ম নেয়া এক  নবজাতক। অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় হাইপোথারমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায় ওই শিশু। খান ইউনিস হাসপাতালের শিশুবিভাগের প্রধান আহমেদ আল ফাররা জানান, ৪৮ ঘণ্টায় হাইপোথারমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও দুই শিশু।

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর ইসরাইলে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রাণ হারায় প্রায় ১১৬০ ইসরাইলি নাগরিক। হামাস জিম্মি করে ২৫০ জনকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গাজায় পাল্টা হামলা শুরু করে ইসরাইল। তারপর থেকে টানা ১৪ মাস ধরে গাজায় অব্যাহত আছে ইসরাইলি আগ্রাসন। এই ১৪ মাসের যুদ্ধে মানবিক বিপর্যয় চলছে গাজা উপত্যকায়। ইসরাইলি আগ্রাসনে প্রাণ হারিয়েছেন গাজার কমপক্ষে ৪৫ হাজার মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ২৩ লাখ  গাজাবাসী। দেখা দিয়েছে খাবার, পানি ও চিকিৎসা উপকরণের তীব্র সংকট। হাসপাতালগুলোতেও চলছে মানবিক সংকট। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চললেও তাতে কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না । হামাস ও ইসরাইলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে বার বার বিলম্বিত হচ্ছে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব। ইসরাইলের বিরুদ্ধে  একের পর এক শর্ত জুড়ে দেয়ার অভিযোগ এনেছে হামাস। যা অগ্রহণযোগ্য বলে দাবি তাদের। ফলে বিলম্বিত হচ্ছে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছা। আর ক্ষীণ থেকে ক্ষীণ হচ্ছে হামাসের হাতে আটক থাকা জিম্মিদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। এতেই ক্ষোভে ফুঁসছে জিম্মিদের পরিবারগুলো। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু’র পদত্যাগের দাবিতে করছেন বিক্ষোভ ও মানববন্ধন। তবে এবার হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ২০ই জানুয়ারি পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের আগে যদি আটক জিম্মিদের মুক্ত না করা হয় তাহলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে হামাস’কে। 

mzamin