Thursday, June 25, 2026

ডেমোক্রেটিক দলের রাজনীতিতে যেভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন জোহরান মামদানি

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ডেমোক্রেটিক দলের প্রাথমিক বাছাই নির্বাচনের ফল ঘোষণার রাতে নিয়ন রঙের জমকালো পোশাক পরা চার ব্যক্তি রাস্তার পাশে উৎসবের আমেজ তৈরির চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলের পানশালাটি তখনো ঠিকমতো খোলা হয়নি। সেখান থেকে কিছুটা দূরে ডেমোক্রেটি দলের প্রাথমিক বাছাইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হেরে যাওয়া আদ্রিয়ানো এসপাইলাতের সমাবেশ চলছিল। কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক বাছাই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এসপাইলাত ওয়াশিংটনে যেতে ২০ বছর চেষ্টা করে গেছেন। কংগ্রেসে আরও ১০ বছর কাটিয়েছেন। তিনি নিজের পরাজয় স্বীকার করে বক্তব্য দিতে নিউইয়র্কে এসেছিলেন এবং ১০ মিনিটের কম সময়ের মধ্যে চলে যান।

আসল পার্টি চলছিল প্রায় তিন মাইল দূরে। সেখানেই জোহরান মামদানি তাঁর সমর্থিত জয়ী প্রার্থীদের নিয়ে তিনটি বিজয় উৎসবের শেষ পর্বটি সারছিলেন। এই প্রার্থীরা হয়তো মামদানির সমর্থন ছাড়া কংগ্রেসের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারতেন না। অথচ মাত্র এক বছর আগেই ডেমোক্রেটিক পার্টির মেয়রপ্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে (প্রাইমারি) অ্যান্ড্রু কুমোকে হারিয়ে জোহরান রাজনৈতিক বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন।

জোহরান মামদানি বলেন, ‘আমরা দেখিয়ে দিচ্ছি, গত জুনে অর্থাৎ আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে যা ঘটেছিল, তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। সেটা শেষ ছিল না, ছিল শুরু।’

এসব জয় প্রমাণ করে, নিউইয়র্কের রাজনীতি ও ডেমোক্রেটিক পার্টিতে এখন ক্ষমতার নতুন এক কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। ব্রুকলিনভিত্তিক হাউস ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস তাঁর দলের দুজন বর্তমান সদস্যকে হারিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি একদল উদীয়মান আন্দোলনকারীর মুখোমুখি হচ্ছেন। আর ডেমোক্রেটিক রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁরা এই সাফল্যে মোটেও খুশি নন।

এই নেতারা দাবি করছেন, তাঁরা নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন এবং এমন একজন মেয়র পেয়েছেন, যাঁকে তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছেন না। মামদানিবিরোধী সিটি কাউন্সিলের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিএনএনকে বলেন, মেয়রের চারপাশে থাকা তাঁর মিত্ররা এখন একটি কথাই বলাবলি করছেন—মামদানি শুধু নিজের শর্তেই বন্ধুত্ব করতে আগ্রহী।

বিরোধী কাউন্সিল সদস্যরা এখন মামদানিকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার উপায় খুঁজছেন। তা হতে পারে তাঁর কোনো উন্নয়নকাজের তহবিল আটকে দিয়ে বা অন্য কোনো ছোটখাটো উপায়ে তাঁকে খাটো করে।

তবে মামদানি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বলছেন, একটা বিপ্লব দেখতে এমনই হয়, যা তাঁর নিজের শর্তে চলছে। তিনি আভিলা শেভালিয়ার নামের এক সাবেক নির্বাচনী স্বেচ্ছাসেবককে বড় পদে নিয়ে এসেছেন, যাঁর অতীতের অনেক টুইট নিয়ে বিরোধীদের মধ্যে বিতর্ক আছে এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের পক্ষে সমাবেশে যোগ দেওয়ার রেকর্ড রয়েছে। হিস্প্যানিক ককাসের চেয়ারম্যানের মতো প্রভাবশালী নেতা থাকা সত্ত্বেও মামদানি শেভালিয়ারকে কংগ্রেসের দিকে এগিয়ে দিয়েছেন।

অথচ গত বছর অ্যান্ড্রু কুমোর বিরুদ্ধে মামদানির প্রাথমিক বাছাইয়ে জয়ের পর অন্য ডেমোক্র্যাটরা যখন পাশে ছিলেন না, তখন এসপাইলাত নিজেই মামদানিকে সমর্থন করেছিলেন। মেয়রের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানেন, এমন দুজন ব্যক্তি বলেন, মেয়র প্রথমে আভিলা শেভালিয়ারের জেতার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট এবং অন্য মিত্রদের নিয়ে সিটি হলে এক বৈঠকে তিনি শেভালিয়ারকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

মামদানির যোগাযোগ পরিচালক অ্যানা বার সিএনএনকে বলেন, মেয়র মামদানি এক ভিন্ন ধরনের রাজনীতির উদাহরণ তৈরি করছেন—যা কোনো কোটিপতির অর্থায়নে বা পরামর্শকদের বুদ্ধিতে চলে না; বরং খেটে খাওয়া মানুষের চাহিদাকে প্রাধান্য দেয়। নিউইয়র্কবাসী ঠিক এটাই চাচ্ছেন। তাঁর সমর্থিত প্রার্থীরাও এই আদর্শেরই প্রতীক এবং সে কারণেই আজ (মঙ্গলবার) রাতে এই পুরো প্যানেলটি জয়ী হয়েছে।

নির্বাচনে শেভালিয়ারের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর অ্যানা বারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, মেয়র কি এই নির্বাচনী লড়াইয়ের পর সবার সঙ্গে আবার সুসম্পর্ক গড়ে তুলবেন, নাকি এখন বাকিদেরই তাঁর কাছে আসতে হবে? জবাবে বার সংক্ষেপে একটি টেক্সট মেসেজ পাঠান, যাতে কেবল একটি ইমোজি ছিল।

নিউইয়র্ক নিক্স বাস্কেটবল দলের অন্ধ ভক্ত মামদানি দলটির সাম্প্রতিক চ্যাম্পিয়ন হওয়া উদ্‌যাপন করতে গিয়ে সুপারস্টার গার্ড জ্যালেন ব্রুনসনের দেওয়া বক্তব্যের একটি ভিডিও ক্লিপ পোস্ট করেন।

সেই ক্লিপে ব্রুনসনকে বলতে শোনা যায়, ‘অনেকে অনেক নেতিবাচক কথা বলেন। অনেকের অনেক মতামত থাকে। কিন্তু আপনি যখন তাঁদের ভুল প্রমাণ করে দেবেন, তখন তাঁদের মুখে কিছু বলার আর দরকার পড়ে না।’

বর্তমান ডেমোক্র্যাট দুই সদস্যকে মামদানির নিশানা

গত বছর মামদানি জেতার কিছুদিন পরই হাকিম জেফরিস মামদানির উপদেষ্টাদের কাছে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। এ বিষয়ে অবগত দুজন ব্যক্তি জানান, জেফরিস বলেছিলেন—তাঁরা যদি ডেমোক্রেটিক দলের বর্তমান কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে লড়তে চান, তবে যেন সরাসরি তাঁর (জেফরিসের) বিরুদ্ধে লড়েন।

শুরুতে মামদানি তেমন কিছু করেননি। তাঁর কিছু মিত্রের অস্বস্তি বাড়িয়ে তিনি সিটি কাউন্সিলর চি ওসের হাত থেকে জেফরিসকে বাঁচাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছিলেন। ওসে ছিলেন তাঁর বন্ধু ও সমর্থক। কিন্তু মামদানি তাঁর বিরুদ্ধে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার (ডিএসএ) স্থানীয় শাখাকে খেপিয়ে তোলেন।

এরপর মামদানি এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে গিয়ে পরিষ্কার বলেন, ডেমোক্র্যাটরা হাউসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে তিনি জেফরিসকেই স্পিকার হিসেবে দেখতে চান।

মঙ্গলবার সকালে ওসের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, মামদানি অন্যদের সমর্থন দিলেও তাঁর সম্ভাব্য নির্বাচনী লড়াইয়ে তাঁকে কেন সমর্থন দিলেন না? ওসে সিএনএনকে বলেন, ‘আমার কাছে এর কোনো উত্তর নেই।’

প্রতিনিধি পরিষদের ড্যান গোল্ডম্যান গত বছর মামদানির ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের কারণে তাঁকে সমর্থন করতে রাজি হননি। অবশ্য গোল্ডম্যানের এলাকার বেশির ভাগ মানুষই মামদানিকে ভোট দিয়েছিলেন। তাই গোল্ডম্যান আগে থেকেই মামদানির নজরে ছিলেন। মামদানি অন্য এক ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট সিটি কাউন্সিলরকে নির্বাচনে দাঁড়াতে নিষেধ করেন। কারণ, তিনি ব্র্যাড ল্যান্ডারকে সমর্থন করতে চেয়েছিলেন। ল্যান্ডারকে মামদানি প্রথমে তাঁর পছন্দের ফার্স্ট ডেপুটি মেয়রের পদ না দেওয়ায় তিনি কংগ্রেস নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ব্রুকলিনের এক ভোটকেন্দ্রের বাইরে গোল্ডম্যান সিএনএনকে বলেন, ‘আমার মনে হয়, ব্র্যাডকে আমার জন্য সমস্যা বানিয়ে দেওয়াটা তাঁর (মামদানি) জন্য বেশ সহজ কাজ ছিল।’

অতীতের সব তিক্ততা ভুলে মামদানি নিজেকে ল্যান্ডারের নির্বাচনী প্রচারে সঁপে দেন। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে তিনি ল্যান্ডারের সঙ্গে মঞ্চে ওঠেন। সেখানে তাঁরা এক বিশাল জয় উদ্‌যাপন করেন।

তবে প্রতিনিধি নিদিয়া ভেলাজকুয়েজের আসনের লড়াইটি ছিল অনেক বেশি জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ।

ভেলাজকুয়েজ মামদানির মেয়র নির্বাচনের শুরুর দিকে তাঁকে সমর্থন করেছিলেন। গত জুনে মামদানির জমকালো বিজয় পার্টিতে বক্তব্য দিয়ে সমর্থকদের করতালি পেয়েছিলেন। এখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি মামদানিকে সমর্থন করার জন্য অনুতপ্ত কি না। এই কংগ্রেস সদস্য জানান, তিনি কেবল মামদানির কর্মসূচিকে সমর্থন করেছিলেন। সে সময় তাঁকে তিনি তুলনামূলক ভালো বিকল্প মনে করেছিলেন।

ভেলাজকুয়েজ বলেন, সরকারের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব না বুঝে মামদানি একটি কৌশলগত ভুল করেছেন। যে নগর ফেডারেল ও রাজ্য সরকারের তহবিলের ওপর নির্ভর করে, সেখানে নিজের দল বা পরিধি বড় করার চেষ্টা করতে হয়, ছোট করা নয়। কারণ, সবার সাহায্যই কোনো না কোনো সময় প্রয়োজন হয়।

বিদায়ী এই কংগ্রেস সদস্য প্রথমে চেয়েছিলেন তাঁর জায়গায় কোনো নারী আসুক। বিশেষ করে তাঁর মতো পুয়ের্তো রিকান বংশোদ্ভূত কোনো নারী। ঘটনার বিষয়ে অবগত কয়েকজন ব্যক্তি জানান, ওই এলাকার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকা দুই নারী—সিটি কাউন্সিলর টিফানি কাবান এবং স্টেট সিনেটর জুলিয়া সালাজারকে মামদানি স্পষ্টভাবেই মেনে নেননি। কারণ, ডিএসএর সঙ্গে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও তাঁরা প্রথমে মামদানির মেয়র পদে দাঁড়ানো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

তাঁদের আশঙ্কা ছিল, মামদানি হেরে গেলে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন পিছিয়ে পড়বে। এবার মামদানি ক্লেয়ার ভালদেজের প্রতি ঝুঁকে পড়েন, যিনি মাত্র এক মেয়াদের অ্যাসেম্বলি সদস্য ছিলেন। তিনি শুরুর দিকেই মামদানির মেয়র নির্বাচনকে সমর্থন করে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মামদানি ততক্ষণে জেনে গিয়েছিলেন, ভেলাজকুয়েজ ব্রুকলিন বরো প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও রেনোসোকে সমর্থন করবেন।

মামদানি বারবার ভেলাজকুয়েজকে অনুরোধ করছিলেন, তিনি যেন রেনোসোর নাম এখনই সবার সামনে প্রকাশ না করেন। এমনকি মামদানির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশের আগের দিনও তিনি এ অনুরোধ করেন, যেখানে তিনি নিজেই ভালদেজকে সমর্থন দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। অথচ এই বিষয় তিনি ভেলাজকুয়েজকে জানাননি।

পরদিন সকালে ভেলাজকুয়েজ ওই সমর্থনের বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর তিনি মামদানির সঙ্গে সেদিন রাতের পূর্বনির্ধারিত নৈশভোজের আমন্ত্রণ বাতিল করে দেন।

বর্তমান কংগ্রেস সদস্য ড্যান গোল্ডম্যানকে পরাজিত করা প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডারের সঙ্গে জোহরান মামদানি
বর্তমান কংগ্রেস সদস্য ড্যান গোল্ডম্যানকে পরাজিত করা প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডারের সঙ্গে জোহরান মামদানি। ছবি: রয়টার্স

ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান সিনেটরের সঙ্গে ট্রাম্পের তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা

ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান সিনেটরদের সঙ্গে গতকাল বুধবার রুদ্ধদ্বার এক বৈঠকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই বৈঠকের কিছুক্ষণ পর ট্রাম্প প্রশাসন ইরান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে কংগ্রেসের কাছে কয়েক হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত বরাদ্দ চায়।

বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর বলেন, বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডির তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা হয়।

ক্যাসিডি বলেছেন, গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন, তা নিয়ে তাঁর প্রশাসনের আরও ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন।

প্রাথমিক ওই চুক্তিতে ইরানকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হলেও যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প যেসব লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন, সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।

ক্যাসিডি সাংবাদিকদের আরও বলেন, ‘আমাদের যা বলা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের তার চেয়ে বেশি জানা প্রয়োজন। যদিও আমি নিশ্চিতভাবে জানি না। তবে মনে হচ্ছে, বিষয়টি আমাদের যেভাবে বলা হয়েছে, সেভাবে এগোচ্ছে না।’

অবশ্য পরে সিনেটের রিপাবলিকান নেতারা ইরানের সঙ্গে সংঘাতের অবসান চেয়ে আনা একটি প্রস্তাব ঠেকাতে গভীর রাতে ভোটাভুটির সময়সূচি নির্ধারণ করেন। খুব সম্ভবত প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টার অংশ হিসেবে তাঁরা সেটা করেছেন।

সে রাতে সিনেটে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতার রাশ টেনে ধরতে পাস করা একটি প্রস্তাব ঠেকাতে ভোটাভুটি হয়। ৫০-৪৭ ভোটে রিপাবলিকানদের প্রস্তাবটি পাস করা হয়।

বুধবার গভীর রাতে সিনেটে হওয়া ওই ভোটাভুটির পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘এই ভোটের মাধ্যমে ইরানকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।’

যদিও এ ভোটের প্রভাব আগের ভোটের ওপর পড়বে না।

রিপাবলিকান শিবিরে চাপ বাড়ছে

চলতি বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। ইরান যুদ্ধ নিয়ে বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁরই দলের এক সদস্যের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় দেখিয়ে দিচ্ছে, এ যুদ্ধ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর দলের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করছে।

গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর বর্তমানে ট্রাম্পের জনসমর্থন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। রয়টার্স/ ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি চারজন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে মাত্র একজন মনে করেন, ইরান যুদ্ধ যথার্থ ছিল।

এ মাসে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া একটি প্রস্তাবের ওপর পৃথক ভোটে সিনেট ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানোর নির্দেশ দেওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। ওই ভোটের এক দিন পর বাগ্‌বিতণ্ডার ঘটনা ঘটল। বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যে চারজন রিপাবলিকান সিনেটর ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তাঁদের একজন ক্যাসিডি।

ট্রাম্প সিনেটর ক্যাসিডির সঙ্গে তাঁর বাগ্‌বিতণ্ডা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। এ বছর ট্রাম্প–সমর্থিত একজন প্রার্থীর কাছে রিপাবলিকান পার্টির প্রাথমিক বাছাই নির্বাচনে হেরে গেছেন ক্যাসিডি।

তবে ক্যাসিডির সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা নিয়ে কিছু না বললেও ট্রাম্প সিনেটের সমালোচনা করেছেন। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ইরান এটা দেখে ভাববে, “এসব কী হচ্ছে?”। এখন আপনারাই বলুন, এর তো কোনো অর্থই নেই, তাই না?’

সাংবাদিকদের এ কথা বলার কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে কংগ্রেসের কাছে ৭ হাজার কোটি ডলার চেয়েছে। এই অর্থ যুক্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট বেড়ে ৮৬ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকবে।

বুধবার গভীর রাতে অনুষ্ঠিত ভোটে ক্যাসিডি ‘না’ ভোট দেন। তিনি ইরান যুদ্ধক্ষমতা–সংক্রান্ত সাম্প্রতিক প্রস্তাবগুলোয় পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। অন্যদিকে কেন্টাকির রিপাবলিকান সিনেটর র‍্যান্ড পল, যিনি আগে ওই প্রস্তাবগুলোয় পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, তিনি ‘উপস্থিত’ ভোট দেন।

আরও দুই রিপাবলিকান মেইনের সিনেটর সুসান কলিন্স ও আলাস্কার সিনেটর লিসা মুরকাওস্কি এবং ডেমোক্র্যাটদের একজন বাদে বাকি সবাই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। পেনসিলভানিয়ার সিনেটর জন ফেটারম্যান ছিলেন একমাত্র ডেমোক্র্যাট, যিনি বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন।

কেন্টাকির রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককোনেল এবং কলোরাডোর সিনেটর মাইকেল বেনেট ভোট দেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা জন থুন ওয়াশিংটন ডিসির ইউএস ক্যাপিটলে সিনেট রিপাবলিকান স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে যাচ্ছেন। ২৪ জুন, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠের নেতা জন থুন ওয়াশিংটন ডিসির ইউএস ক্যাপিটলে সিনেট রিপাবলিকান স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে যাচ্ছেন। ২৪ জুন, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

দরজা খুলতে দেরি, বেডরুমে ঢুকে ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করে হত্যা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে অভিযান চালিয়ে এক নিরস্ত্র ফিলিস্তিনি যুবককে নিজ শোবার ঘরে গুলি করে হত্যা করেছে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী। মঙ্গলবার সালফিত শহরের পশ্চিমে সারতা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।

নিহতের চাচা ইয়াসিন আল-খাতিবের মতে, দখলদার বাহিনীর অভিযান চলাকালে মুস্তফা তাহা মুস্তফা আল-খাতিবের বুকে, মাথায় ও হাতে বেশ কয়েকবার গুলি করা হয়।

ইয়াসিন আল-খাতিব বলেন, ঘুমিয়ে থাকায় মুস্তাফা দরজা খুলতে কিছুটা দেরি করেছিলেন। তিনি বলেন, ঘুম থেকে উঠে পোশাক পরার চেষ্টা করছিলেন তিনি। এ সময় ইসরাইলি সেনারা বাড়ির প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তার শোবার ঘরে প্রবেশ করে এবং তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

তিনি জানান, গুলিবিদ্ধ মুস্তাফাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের এগিয়ে যেতে বাধা দেয় ইসরাইলি বাহিনী। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি মারা যান। সেনারা এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পর চিকিৎসাকর্মীরা সেখানে পৌঁছে তার মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে যান।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর এ ধরনের অভিযান প্রায়ই গভীর রাতে পরিচালিত হয় এবং এসব অভিযানে নিয়মিত প্রাণহানির পাশাপাশি বহু ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়।

ফিলিস্তিনি বন্দিদের অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরাইলের কারাগারে প্রায় ৯ হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন। তাদের প্রায় অর্ধেকই কোনো অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই আটক রয়েছেন।

দরজা খুলতে দেরি, বেডরুমে ঢুকে ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করে হত্যা
নিহত পশ্চিম তীরের অধিবাসী মুস্তাফা তাহা মুস্তাফা আল-খাতিব। ছবি: সংগৃহীত।

পৃথিবীর যে দুই জায়গায় গাড়ির কোনো গতিসীমা নেই by কাজী আকাশ

গাড়ির বিজ্ঞাপনে সব সময় বড় বড় করে লেখা থাকে—ঘণ্টায় ২০০ মাইল গতি! কিন্তু এ তথ্যের আসলে কোনো দাম আছে? বাংলাদেশে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে পারবে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে। শহরের রাস্তা বা সিটি করপোরেশনের ভেতরে তো মাত্র ৪০ কিলোমিটার ঘণ্টায়। তা ছাড়া বাংলাদেশ যেমন জনবহুল দেশ, তাতে প্রায় সব সময় রাস্তাঘাটে জ্যাম লেগে থাকে। টানা ৮০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালানোও প্রায় অসম্ভব। কিন্তু তোমার গাড়ি তো এর চেয়ে দ্বিগুণের বেশি গতিতে চলতে পারে।

একটু ভেবে দেখো, সত্যি সত্যি যদি তোমার গাড়ি পুরো গতিতে চালাতে পারতে? কোনো জরিমানার ভয় বা লাইসেন্স বাতিলের চিন্তা যদি না থাকত? এমন জায়গা পৃথিবীতে সত্যি আছে। তবে পুরো পৃথিবীতে এমন জায়গা মাত্র দুটি।

প্রথম জায়গাটির নাম আইল অব ম্যান। এটি যুক্তরাজ্য আর আয়ারল্যান্ডের মাঝখানের ছোট্ট একটি দ্বীপ। জায়গাটা তিনটি কারণে বিখ্যাত। এক, এখানে কর দিতে হয় খুব কম। দুই, মোটরস্পোর্টের জন্য এটা স্বর্গ। তিন, জায়গাটা ব্রিটেনের অংশ, আবার ঠিক অংশও না! ব্যাপারটা একটু জটিল।

২০১৫ সালে অ্যালান থমসন নামের এক পুলিশ অফিসার বলেছিলেন, ‘আমরা অনন্য। তুমি ফেরি থেকে নেমে ১৫ মিনিটের মধ্যে পাহাড়ি রাস্তায় উঠে ঘণ্টায় ১৮০ মাইল বেগে গাড়ি চালাতে পারবে। এতে আইন ভাঙার কোনো ভয় নেই।’

এর মানে এই না যে পুরো দ্বীপেই কোনো গতিসীমা নেই। আবাসিক এলাকায় আর শহরের ভেতরে সাধারণত ঘণ্টায় ৩০ মাইল বেগে গাড়ি চালাতে হয়। কিন্তু হাইওয়েতে যত ইচ্ছা গতি ওঠানো যায়।

দ্বীপটা মোটরগাড়ি দুর্ঘটনার জন্যও কুখ্যাত। বিশেষ করে মোটরবাইক দুর্ঘটনা। দ্বীপে মানুষ আছেন ৮৫ হাজারের কম। আর প্রতিবছর নিয়মিতভাবে মাত্র দুই সপ্তাহে অন্তত তিন-চারজন রাস্তায় প্রাণ হারান।

যেকোনো দুই সপ্তাহ না কিন্তু। মে আর জুন মাসে আইল অব ম্যান ট্যুরিস্ট ট্রফি বা টিটি রেস হয়। পুরো দ্বীপে চলে এই মোটরবাইক রেস। পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক রেস বলা হয় একে।

টিটি রেসের সপ্তাহ না হলেও রাস্তাগুলো সাধারণ মানুষের জন্য খোলাই থাকে। তবে এই ট্র্যাক নতুনদের জন্য নয়। এখানে আছে প্রচণ্ড বাঁক। আছে উঁচু-নিচু রাস্তা, শহরের বাধা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে ৪২২ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত ওঠানামা করে রাস্তা। সব মিলিয়ে বেশ চ্যালেঞ্জিং। তার ওপর জায়গাটা ব্রিটেন আর আয়ারল্যান্ডের মাঝামাঝি। মানে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির রাজধানী।

এসব কারণে এ দ্বীপে দুর্ঘটনার হার পাশের দেশগুলোর দ্বিগুণ। অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য যে এ সংখ্যা ৩০ বছর আগের চেয়ে অর্ধেক কমেছে।

দ্বিতীয় জায়গার নাম জার্মানির বিখ্যাত হাইওয়ে অটোবান। আইনকানুন না মানার কথা শুনলে সবার আগে তোমার মাথায় হয়তো জার্মানির কথা আসবে না! তাই হয়তো তোমার কাছে একটু অদ্ভুত শোনাচ্ছে। দেশটা নিয়ম আর শৃঙ্খলার জন্য বিখ্যাত হওয়া সত্ত্বেও গতিসীমার কেন কোনো লিমিট নেই?

এটা ঠিক যে অটোবানের প্রায় ৭০ শতাংশ জায়গায় তুমি যেমন ইচ্ছা গতিতে গাড়ি চালাতে পারো। ২০২৩ সালে ফ্র্যাঙ্কলিন মাও নামের এক গবেষক দেখিয়েছিলেন, অটোবানে গাড়ির গড় গতি ঘণ্টায় ১৪১ দশমিক ৮ কিলোমিটার। কোনো গতিসীমা না থাকলেও সাধারণ মানুষ এখানে বেশি জোরে গাড়ি চালান না। তা ছাড়া ট্রাফিক তো আছেই। বাণিজ্যিক গাড়িগুলোকে আবার গতিসীমা মানতে হয়। এতে রাস্তায় একটু জ্যাম হয়। তাই চাইলে ২০০ বা ২৫০ কিলোমিটার গতিতে এখানে সব সময় গাড়ি চালানো যায় না।

তবে জার্মানিতে গতিসীমা না থাকলে অন্যান্য দেশের তুলনায় মৃত্যুহার কিন্তু কম। ২০২১ সালে জার্মান হাইওয়ে রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটি প্রতিবদন অনুসারে, জার্মানিতে প্রতি এক বিলিয়ন কিলোমিটার গাড়ি চলাচলে ১ দশমিক ৪১ জন মারা যান। সেই তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে ৩ দশমিক ৪৫ জন, ফ্রান্সে ২ দশমিক ১৩ জন এবং ইতালিতে ৩ দশমিক ৬৬ জন মারা যান।

অর্থাৎ অন্য যেসব দেশে গতিসীমা আছে, সেই দেশের তুলনায়ও অটোবান নিরাপদ। আইল অব ম্যানের চেয়ে যে অনেক বেশি নিরাপদ, তা তো বুঝতেই পারছ! এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। জার্মান সরকার জাতীয় সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে প্রচুর টাকা ঢালে। তা ছাড়া ওখানকার গাড়িগুলোও তুলনামূলক ভালো। আর জার্মানির চালকেরাও বেশ দক্ষ। এখানে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া একটা যুদ্ধের মতো! বাধ্যতামূলক ৮ ঘণ্টার ফার্স্ট এইড কোর্স, কমপক্ষে ৩৭ ঘণ্টার ড্রাইভিং ক্লাস, আর কঠিন সব তাত্ত্বিক পরীক্ষায় পাস করতে হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্স করতেও প্রায় আড়াই লাখ টাকার বেশি খরচ করতে হয়!

যাহোক, পৃথিবীতে দুটি গতিসীমাহীন রাস্তার খোঁজ দিলাম, চাইলে একবার ঘুরে আসতেই পারো। তবে জার্মানির অটোবানে গিয়ে একটু গাড়ি চালানোর কথা ভাবলে ড্রাইভিং লাইসেন্সের কথা ভুলো না যেন! আর আইল অব ম্যানে গেলে একটু সাবধানে যেয়ো।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

পৃথিবীর যে দুই জায়গায় গাড়ির কোনো গতিসীমা নেই

বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্ত কোনটি by শিউলী সুলতানা

বিশ্বের দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থিত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ হাজার ৮৯১ কিলোমিটার। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, এটা বেশ সাধারণ একটা সীমান্ত। পরিষ্কার এবং একদম সোজা। কিন্তু একটু কাছে থেকে দেখলেই বুঝবে, এই আঞ্চলিক সীমানা আসলে অদ্ভুত রকমের জটিল। এর গভীরে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত সব ভুল আর মজার ইতিহাস।

আমেরিকা-কানাডা সীমান্তের দুটি প্রধান অংশ আছে। একটা হলো সেই লম্বা সীমান্ত, যার দক্ষিণে আছে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড। আরেকটা হলো উল্লম্ব সীমানা, যা আলাস্কা আর কানাডার মধ্যে মহাদেশের সুদূর উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত।

অনুভূমিক সীমান্তের একটা বড় অংশ বেশির ভাগ বিশ্বমানচিত্রে অবিশ্বাস্য রকম সোজা দেখায়। বিশেষ করে লেক অব দ্য উডস থেকে বাউন্ডারি বে পর্যন্ত ২ হাজার ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশটা মনে হয় একদম নিখুঁতভাবে ৪৯তম সমান্তরাল অক্ষ রেখা বরাবর চলে গেছে। উত্তর গোলার্ধে পৃথিবীকে ঘিরে যে অনেকগুলো কাল্পনিক বৃত্ত আঁকা থাকে, ৪৯তম সমান্তরাল রেখা সেগুলোর মধ্যে একটি। পৃথিবীর নিরক্ষরেখাকে ধরে ওপরের দিকে ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত ধরা হয়। নিরক্ষরেখা থেকে ৪৯ ডিগ্রি উত্তরে যে অক্ষাংশের রেখা আছে, তাকেই বলে ৪৯তম সমান্তরাল অক্ষ রেখা।

কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা একদমই আলাদা। মাটির ওপর দাঁড়িয়ে দেখলে দেখা যাবে, সীমানাটা আঁকাবাঁকা। এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে আমেরিকা-কানাডা সীমান্ত আসলে ৪৯তম সমান্তরাল অক্ষ রেখা থেকে কয়েক শ মিটার সরে গেছে। সাধারণত এতে কোনো সমস্যা হয় না, কিন্তু মাঝেমধ্যে জটিলতা তৈরি করে।

একটা মজার উদাহরণ দিই। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে জানা গেল, কানাডার আলবার্টার কাউটস শহরটা আমেরিকার সীমানার ভেতরে প্রায় ৩৬৩ মিটার ঢুকে আছে! এমন ছোটখাটো ভুল পুরো সীমান্তজুড়েই ছড়িয়ে আছে। হিসাব করে দেখা গেছে, ভুল করে কানাডা আসলে আমেরিকার অংশের প্রায় ৬৭ বর্গকিলোমিটার জায়গা দখল করে বসে আছে।

কিন্তু কেন এমন ভুল হলো? এর কারণ লুকিয়ে আছে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর ইতিহাসে। তখন স্যাটেলাইট বা জিপিএস ছিল না। ছিল না ওই এলাকার কোনো ভালো মানচিত্রও। ১৮০৩ সালে আমেরিকা যখন লুইজিয়ানা কিনে নিল, তখন ব্রিটিশ আর মার্কিনরা মিলে ঠিক করল, নদীর প্রবাহ দেখে সীমানা ঠিক করবে। কিন্তু বাস্তবে গিয়ে দেখা গেল, ওখানকার জমি এত সমতল যে নদীর পানি কোন দিকে গড়ায়, সেটাই বোঝা দায়!

ভেজাল এড়াতে তারা ঠিক করল, সোজা ৪৯তম প্যারালাল বরাবর দাগ টেনে সীমানা দেওয়া হবে। তারা জানতও না, ওই কাল্পনিক দাগের নিচে আসলে কী আছে? পাহাড়, নদী না জঙ্গল? লন্ডনে বসে ম্যাপ আঁকিয়েরা আন্দাজে দাগ টেনে দিয়েছিল এক অজানা দুনিয়ার ওপর।

পুরোনো আমলের সেই নড়বড়ে যন্ত্র আর আন্দাজে টানা দাগের খেসারত আজও মানুষকে দিতে হচ্ছে।

সেই ভুলের মাশুল দিতে তৈরি হলো অদ্ভুত সব দ্বীপ। ওয়াশিংটনের পয়েন্ট রবার্টসের কথাই ধরো। এটা আমেরিকার অংশ, কিন্তু আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে সেখানে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই! নিজের দেশে যেতে হলে আমেরিকানদের আগে কানাডায় ঢুকতে হবে, তারপর সেখান থেকে গাড়ি চালিয়ে যেতে হবে পয়েন্ট রবার্টসে।

একই অবস্থা মিনেসোটার নর্থওয়েস্ট অ্যাঙ্গেলে। লন্ডনের ম্যাপ আঁকিয়েদের সামান্য ভুলে এই জায়গাটা কানাডা দিয়ে পুরোপুরি ঘেরা হয়ে গেছে। তবে ভালো খবর হলো, আমেরিকা আর কানাডা ঐতিহাসিকভাবে বন্ধু দেশ। সীমানা নিয়ে তাদের এই অদ্ভুত জগাখিচুড়ি অবস্থা থাকলেও, এটা নিয়ে তারা যুদ্ধ বাধায় না। মানচিত্রের ওই আঁকাবাঁকা দাগ আর ভুলগুলো তাই ইতিহাসের এক মজার কৌতুক হয়েই টিকে আছে।

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স

বিশ্বের দীর্ঘতম সীমান্ত কোনটি