Friday, September 19, 2014

ফরিদুর রেজা সাগরের মানুষের মুখ

স্বজনের অভিমান কষ্ট বেদনা না বুঝলে আত্মীয়তা কি করে জন্মাবে। কনে দেখার আলো বলে একটা কথা আছে, মানুষ দেখার জন্য একটা আলো দরকার যার নাম মনের আলো। মনের আলো দিয়ে মানুষের মুখ দেখলে অনেক দুঃখ, হতাশা ও ঘৃণা দেখা যাবে অর্থ নয় বিত্ত নয় শুধু মানুষের মুখ দেখে আনন্দ পাওয়ার বিষয়টা কৌতূহলোদ্দীপক। তাও আবার ২৯ জন মানুষের মুখ। মানুষের মুখ ৩-এর লেখক ফরিদুর রেজা সাগর এভাবেই মানুষ দেখার আনন্দকে মহিমান্বিত করেছেন তার গ্রন্থে। সময় সবকিছু বদলে দেয় কিশোর তরুণ যুবা ও বৃদ্ধ একটা দীর্ঘপথ পরিক্রমা। আমরা কিছু স্মৃতি কাঁধে নিয়ে যাই- সঙ্গে কিছু আশ্চর্য মানুষের মুখ, মানুষের সঙ্গী আনন্দ। সফোক্লিসের চার হাজার বছর আগের উক্তি এখনও অম্লান- ‘হে স ষ্টা মানুষ দেখার আনন্দে যেন আমি কখনও ক্লান্ত না হই। ফরিদুর রেজা সাগর কার্যার্থে যে খানেই গেছেন সেখানেই মানুষের মুখের অনুসন্ধান করেছেন। কার মধ্যে কতটা সদগুণ আছে, সুযোগ পেলে একজন মানুষ নিজেকে কতটা প্রতিষ্ঠা দিতে পারে তারও একটা নিরীক্ষা করেছেন বাস্তব জীবনে। ফরিদুর রেজা সাগর দেখেছেন প্রতিটি মানুষ আলাদারকম এবং তাদের মুখাবয়ব, তাদের হাঁটার ভঙ্গি, কথা বলার ধরন ভিন্ন ভিন্ন। মানুষের মুখ দেখার এবং তা বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন শুধু চিত্রকরদের নয়, তা’ একজন খাঁটি লেখকেরও। লিও টলস্টয় তার ডধৎ ধহফ ঢ়বধপব গ্রন্থে চরিত্র চিত্রন করেছেন পাঁচশ’ মানুষের।
কিছুদূর পড়লে চরিত্রগুলো মিলিয়ে যায় আবার পেছনে পড়ে দেখে নিতে হয় কার নাম কি কে কোন ভূমিকায় আছেন। পাঠক ভুলে গেলেও লিও টলস্টয় কিন্তু কোথাও এক কর পরিমাণ খামতি রাখেননি- প্রত্যেকটি মানুষ তার কাজ করেছে সঠিক মাত্রায়। মাঝে মাঝে এই মহান শিল্পীর শ্রমনিবিড় কার্যক্ষমতা বিস্ময় জাগায়। আনা কারানিনা উপন্যাস লিখেছেন পুরোটা সাতবার। মানুষের মুখ দেখায় অদ্বিতীয় লিও টলস্টয় এখনও দুনিয়া কাঁপানো মানুষ অন্বেষক হিসেবে সমাদৃত। দস্তয়ভস্কি, ভিক্টর হুগো প্রমুখ লেখকরা মানুষ দেখার আনন্দে বিভোর থাকতেন। ফরিদুর রেজা সাগরের মানুষের মুখ নিয়ে লেখার ক্ষমতা আমাকে মোহিত করে। এ জন্য মানুষের মুখ-১ ও ২ পাঠ করেছি, আলোচনা করেছি। ৩-এর জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। হাতে পেয়েই গোগ্রাসে পড়ে দেখেছি। পড়ার সময় দু’-একটি প্রশ্ন জানতে আনন্দে মাঝে মাঝে ফোন করেছি। বিখ্যাত লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় পথে প্রবাসে গ্রন্থের এক জায়গায় লিখেছেন- তিনি এবং মনীন্দ্রলাল রায় ফ্রান্সে রমা রলার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। মনীন্দ্রলাল রায় একপর্যায়ে রমা রলাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন আর মানুষ কবিতা পড়ে না কেন? রমা রলা একটা চমৎকার উত্তর দিলেন, এখনকার কবিতায় মানুষের মুখ এবং সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার কথা থাকে না বলেই মানুষ কবিতা পড়ে না। যদি ভিক্টর হুগো থাকতেন তাহলে তিনি মানুষের জন্য কবিতা লিখত এবং মানুষ কবিতামুখী হতো। অর্থাৎ মানুষের জন্য শিল্প এই বিশ্বাসে অটল না থাকলে লেখকের সিদ্ধি লাভ হয় না।
ফরিদুর রেজা সাগর যখন খাবার-দাবার রেস্টুরেন্ট চালাতেন তখন বেশকিছু মানুষের সঙ্গে তার দেখা হতো। একজন মাঝে মাঝে খেতে আসতেন তখন খাবার-দাবার হোটেলে বেইলি রোডের নাটকের টিকিট বিক্রি হতো। অসামর্থ্যরে কথা বলে একজন ফরিদুর রেজা সাগরের কাছ থেকে টিকিট নিয়ে সেই টিকিট বেইলি রোডে বিক্রি করে দেয়। লোকটি একদিন খাবার-দাবার হোটেলে খেতে এসে ধরাও পড়ে। কিন্তু, তার কথা কেউ সহযোগিতা না করলে যাব কোথায়? এই খাবার-দাবার হোটেলে মমতাবশত: চাকরি পেল সোহরাব এবং রুস্তম। কিন্তু সোহরাব গেল অন্ধকার পথে আর রুস্তম বুদ্ধিদীপ্ত পরিশ্রমী সে এল সংসারে- জীবনের দিকে। রুস্তমের ছেলে এখন নটরড্যাম কলেজের ছাত্র। এভাবেই একটা স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে মানুষ এগোয়। কাঠমন্ডুতে বাংলাদেশের নিজামউদ্দিন কঠিন পরিশ্রমী, পাহাড়ি আঁকা-বাঁকা রাস্তায় পিঠে করে বাড়ি বাড়ি ফ্রিজ পৌঁছে দেয়ার কাজ করে, ক্লান্তি নেই। এখন অনেকের কাছে তিনি উদাহরণ। কিংবা যে বাংলাদেশী মালয়েশিয়ার স্কেটিং টিচার বনে গেছে আর মদিনার হাশেম মিয়া এখন শ্রমিক থেকে গাইড। বাহরাইনের বাংলাদেশী মনসুরার সততা ও নিষ্ঠা তাকে নিয়ে গেছে বহুদূর। আরও কত বাংলাদেশের সৎ মানুষ এ দেশে যাদের মূল্যায়ন নেই দুবাইয়ের ট্যাক্সিচালক আবদুল হালিম অনেক ডলার আর হীরা পেয়ে ফেরত দিলেন এবং সততার প্রতীক হয়ে উঠলেন। নিজেই বাংলাদেশ হয়ে উঠলেন। আরও কত মানুষ কানাডায় ভাইকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা দেয়ার জন্য কত কৌশল শ্রম কত ত্যাগ। কিন্তু কানাডায় যখন ছোট ভাই পৌঁছাল তখন আর বড় ভাইকে চিনল না। মানুষের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বহিঃপ্রকাশ কত বিচিত্র তা একটু পর্যাবেক্ষণ করলে জানা যায়। ঠিক একই ঘটনা বড় ভাই ভালো সঙ্গীতশিল্পী কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি- ছোট ভাই বড় ভাইয়ের পরিচিতজনদের কাছে ধর্ণা ধরে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠল আর সেই কিনা বড় ভাইকেই শুরু করল অবজ্ঞা করতে, ঘটনাটা মর্মান্তিক।
ফরিদুর রেজা সাগর দেশের বাইরে নানা কাজে যান আর আবিষ্কার করেন দেশপ্রেম। নিজের দেশের পোশাক পরার জন্য কতজন মরিয়া হয়ে থাকে। দেশের মায়ায় অর্থ উর্পাজন করে টাকা পাঠায় আবার যখন এয়ারপোর্টে আসে তখন নিরীহ মানুষগুলো পড়ে দুর্ভোগে আর চ্যানেল আই যারা স্বদেশীকতায় বিশ্বাসী তারা বিদেশী কাপড়ের প্রশংসা করলে কষ্ট পায় প্রবাসীরা। এক অমুসলিম ভদ্রলোক বাড়ি কুমিল্লায়। থাকে দীর্ঘদিন প্রবাসে নর্থ আমেরিকায় কিন্তু দেশ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশে ফিরতে নারাজ। কিন্তু তার কথা, আমার মৃত্যুর পর সৎকার হবে কুমিল্লায়। কেন এই প্রতিজ্ঞা জানতে চেয়েছিলেন ফরিদুর রেজা সাগর। তিনি বললেন, আমার কবর কুমিল্লায় হবে তাহলে আমার সন্তানেরা কখনও না কখনও বাংলাদেশে ফিরবে অন্তত তার পিতার অন্তিম আশ্রয়স্থল বাংলাদেশ দেখতে। এই সব মহৎ মানুষের মুখ দেখেছেন ফরিদুর রেজা সাগর। ঠিক রফিক আজাদের কবিতার মতো খুব খুটিয়ে মানুষ দেখি/ যেমন করে বরের বাবা/কনের চলাফেরা এবং চুল থেকে তার পা অব্দি/ দেখতে থাকে/ঠিক তেমনি মানুষ দেখি। মানুষ দেখার ক্ষেত্রে আমরা কেউ একান্ত মানুষকেও সঠিকভাবে নির্ভুলভাবে নির্ণয় করি না। স্বজনের অভিমান কষ্ট বেদনা না বুঝলে আত্মীয়তা কি করে জন্মাবে। কনে দেখার আলো বলে একটা কথা আছে, মানুষ দেখার জন্য একটা আলো দরকার যার নাম মনের আলো। মনের আলো দিয়ে মানুষের মুখ দেখলে অনেক দুঃখ, হতাশা ও ঘৃণা দেখা যাবে।
সিগমন্ড ফ্রয়েড একটা প্রশ্ন করেছিলেন মানবতার কাছে, মানুষের সহজাত আক্রমানাত্মক এবং আত্মবিধ্বংসী প্রবৃত্তি দ্বারা যে বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় মানব সংস্কৃতি সেটাকে কি এবং কতটা প্রতিহত করতে পারবে? আমার ধারণা, মানব সংস্কৃতিই প্রেমের দ্বারা প্রীতির দ্বারা হৃদয়ের স্পন্দনের দ্বারা এক অসীম মানবিক তরঙ্গ তৈরি করতে সক্ষম যা দৃশ্যমান হয় মানুষের মুখে। মানুষের এই ক্ষমতা অসাধারণ যাকে স্বর্গীয় ক্ষমতা বলেছেন গেটে। এই শিরোনামের কবিতাটি অনুবাদ করেছিলেন তার দুটো লাইনে এখানে প্রাসঙ্গিক- পৃথিবী তুমি এক ক্লান্ত পৃথিবী/ক্ষমা করে দিয়েছিলে মানবতার দোষ-ত্র“টি/ কতযুগ পেরিয়ে/ অনুতাপের দাহে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে/দেখালে/ একটি মুহূর্তের ভুলে যুগ যুগান্তর এত মর্মপীড়া। স্বর্গচুতির পর মানুষের যে মর্মপীড়া তা কিছুটা ঘুচানো যাবে মানুষকে আবিষ্কার করে, মনের আলোয় তার মুখ দেখে। মানুষের মুখ- তিন প্রকাশ করেছে অনন্যা অসাধারণ প্রচ্ছদ মাশুক হেলালের। মূল্য ৩৫০ টাকা। রেজাউদ্দিন স্টালিন

পৃথিবীর কবি প্রেমের কবি পাবলো নেরুদা by রবিউল হুসাইন

চিলির কবি, কূটনীতিক ও রাজনীতিক পাবলো নেরুদা ১২ জুলাই ১৯০৪ পারর‌্যাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬৯ বছর পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। তার মৃত্যু হয় ১৯৭৩-এর ২৩ সেপ্টেম্বর। আসল নাম ছিল নেফতালি রিকার্ডো রেয়েস বোসোয়াল্টো। তার লেখালেখি পিতার অপছন্দের জন্য চেকোস্লাভিয়ার কবি জাঁ নেরুদার অনুসারে পাবলো নেরুদা ছন্দনাম নিয়ে লেখা শুরু করেন ১৯২০ থেকে। এ নামেই সারা জীবন লিখে গেছেন এবং ১৯৭১ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন পাবলো নেরুদা এ ছদ্মনামে, যেটি ১৯৪৬-এ বৈধ করে নেন। সদ্য প্রয়াত কলোম্বিয়ার অমর উপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এ অসাধারণ কবিকে যে কোনো ভাষায় বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিশোরকাল থেকেই কবি হিসেবে পাবলো পরিচিতি পেতে শুরু করেন। বহু ধরনের কবিতা রচনা করেছিলেন-অতিবাস্তবতা থেকে নিয়ে ইতিহাস, লোককাহিনী, রাজনীতির ইস্তাহার, আত্মজীবনী ও যৌন উদ্দীপনানির্ভর এমন সব। ২০ বছর বয়সে ১৯২৪-এ ‘টয়েন্টি লাভ পোয়েমস্ অ্যান্ড এ সং অব ডেসপেয়ার ‘অর্থাৎ বিশটি কবিতা ভালোবাসার একটি গান হতাশার’ শীর্ষক দ্বিতীয় কবিতা সংকলন সান্তিয়াগোতে প্রকাশ পেলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
এ বইয়ের মোট একুশটি কবিতার ইংরেজি তরজমা করেছিলেন ডব্ল– এম মেরউইন ১৯৬৯ সালে যুক্তরাজ্যে। নেরুদার পাবলো নামটি মনে করা হয় ফরাসি কবি পল ভার্লেন থেকে নেয়া। তার প্রথম কবিতার বই ‘বুক অব টুইলাইটস’ ‘ঊষসীর গ্রন্থ’ ১৯২৩-এ প্রকাশ পায়। তিনি প্রায়ই সবুজ কালি দিয়ে লিখতেন এবং মনে করতেন এ সবুজ বর্ণ তার ইচ্ছা ও স্বপ্নের একান্ত একটি ব্যক্তিগত প্রতীক।
নেরুদা প্রধানত চারটি ধারায় কবিতা সৃষ্টি করে গেছেন। প্রথমে প্রেম, দুঃখ ও হতাশাভিত্তিক যেখানে এ কবিতা গ্রন্থ, ‘দ্য ক্যাপটেন’স ভার্সেস (১৯৫২) ও ‘ওয়ান হান্ড্রেড লাভ পোয়েম্স’ (১৯৬৯) উল্লেখ্য। দ্বিতীয় ধারায় নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব ও নির্যাতনের আলেখ্য এবং ‘রেসিডেন্স অন আর্থ’ (১৯৩৫) সেই রকমে রচিত। তৃতীয় অধ্যায়ে মহাকাব্যিকতা, ‘জেনারেল স্টাডি’ (১৯৫০) তেমন ধারায় উপস্থাপিত। চতুর্থ ধারায় বাস্তব অভিজ্ঞতার নির্যাসে সাধারণ বিষয় দেখা যায় যেমন ‘এলিমেন্টারি ওডস’ (১৯৫৪)।
তাকে বলা হয় প্রেম ও রাজনীতির কবি। প্রথম প্রেম, হতাশা ও একা থাকা বা হওয়ার কবিতা থেকে সমাজ বাস্তবতা (১৯৪০), পরে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার অনুসারী এবং সারা জীবন তেমনি ছিলেন। প্রকৃতি থেকে নেয়া উপমা ও প্রতীক আগুন, পানি, বাতাস ও মাটি এ চারটি অনুষঙ্গ তার কবিতায় বারবার ব্যবহৃত।
মাটিকে প্রকৃতির প্রধান ভিত্তি ও উপাদান হিসেবে মনে করতেন। মানুষ এ সময়ে প্রকৃতি বা মাটি থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছে কিন্তু এটাও ঠিক, মানুষের জীবন প্রকৃতির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে যেতে পারে না একমাত্র মৃত্যু ছাড়া। কবির ‘মাচুপিচ্চু পর্বত’ নামে একটি বইয়ে একটিই দীর্ঘ বার অধ্যায়ের কবিতা যেটি ১৯৪৫-এ পরে ‘কান্টো জেনারেল’-এ বিশদভাবে বিধৃত হয়েছে।
আবেগ ও ইন্দ্রপরায়ণে মাটির নান্দনিকতার তিনি কবিতায় বলেছেন, ‘সোঁদা গন্ধক বর্ণ যেসব পাত্রের নিচে/প্রতœসম্ভারী স্বর্ণের মধ্যে/ধূমকেতু-ঢাকা তরবারির ন্যায়/আমার দুর্বল জর্জরিত হস্ত প্রবেশ করিয়ে দিই/মৃত্তিকার গভীরতম যোনিকূপে।’ শেষে উচ্চারিত ‘সমাপ্ত হয় এভাবে মানুষের বসন্ত ঋতু।’
বাতাস সমগ্র প্রকৃতিজুড়ে বিস্তৃত। বাতাস শূন্যতা ও নির্জনতায় জীবনের অর্থহীনতা বৃদ্ধি করে নৈরাশ্যের দিকে এগোয় ‘বাতাস থেকে বাতাসের দিকে’। কবিতা বারকারোলা-এ এই শূন্য অনুভূতি বর্ণিত হয়েছে ‘বাতাস ক্রন্দনরত বাঁশি হয়ে আমাকে ডাকবে’ আর পরিশেষে চূড়ান্ত স্থিরতা/ ‘কেউ আসবে/ দারুণভাবে প্রবাহিত হবে হয়তো।’
এই দ্বিধা নিয়েই জীবন। পানিও এরকম দ্বৈত দ্বন্দ্বে বিপুল ব্যাপ্ত। ‘সমুদ্র খুব একাকী’। পানি নিঃসঙ্গ-নির্জন। এর সঙ্গে মিলিত হতে পারে না, প্রেমিকার সঙ্গেও নয়। আগুন কবির কাছে ভালোবাসার ভরসা। ‘আকাশটাকে দগ্ধ করে তুলেছে আগুনের শিখা হলাহল’। এভাবেই সত্যকে পুড়িয়ে আগুন কবিতার রূপ নেয়। মাটি, বাতাস, পানি ও আগুন জীবনের প্রেম, স্বপ্ন, দুঃখ, হতাশা, আর্তি, কীর্তি, সম্মান, অপমান-এইসব মনোজাগতিক বোধানুভরের প্রতীক হিসেবে বাস্তবে কবিতায় বারবার ব্যবহার করেছেন অতি উজ্জ্বলতায় এবং সফলভাবে, তা পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়েছে।
১৯২৭ থেকে কূটনীতিক শিক্ষানবিস হিসেবে প্রথমে বার্মার রেঙ্গুন, শ্রীলংকার কলম্বো, ইন্দোনেশিয়া জাভার বাটাভিয়া এবং সিঙ্গাপুর এসব দেশ ও শহরে নিয়োজিত হন। পরে চিলিতে ফিরে আর্জেনটিনার বুয়েনস আয়ারস ও স্পেনের বার্সেলোনায় কূটনীতিক কর্মে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। পরে কনসাল হিসেবে মাদ্রিদে তার প্রিয় ব্যক্তিত্ব নোবেল জয়ী কবি গ্যাব্রিয়েলা মিস্ত্রালের স্থলাভিষিক্ত হন। সেখানে রাফায়েল আলবার্তি, ফেদারিকো গার্সিয়া লোরকা, পেরুর কবি সিজার ভাল্লেজো-এদের সান্নিধ্য লাভ করেন। এ সময়ে স্পেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং নেরুদা ধীরে ধীরে প্রথমবারের মতো রাজনীতিমনস্ক হয়ে উঠতে থাকেন। বিশেষ করে স্পেনের স্বৈরাচারী শাসক ফ্রাঙ্কোর সৈন্যদল লোরকাকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর তিনি সমাজতান্ত্রিক মতবাদের অনুসারী হয়ে পড়েন এবং পরবর্তী সারা জীবন এরকমই ছিলেন। ফ্রাঙ্কোর বিপরীতে রিপাবলিকানদের প্রকাশ্যে সমর্থন দেন ও এই বিষয়ে ১৯৩৩-এ ‘রেসিডেন্ট অন আর্থ’- পৃথিবীতে বসবাস ও ১৯৩৮-এ ‘স্পেন ইন দি হার্ট’ ‘হৃদয়ে স্পেন’ শীর্ষক সংকলন প্রকাশ করেন এবং এ কারণে কনসালের চাকরি হারান। ব্যক্তিগত জীবনে নেরুদা নারীদের কাছে খুব প্রিয়পাত্র হিসেবে সবসময় আকর্ষিত হতেন। জাভার থাকতে ওলন্দাজ এক মহিলা ব্যাংকার মারিকার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এ সময়ে কবিতায় বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং অনেক অতিবাস্তবতাযুক্ত কবিতা নিয়ে ‘রেসিডেনসিয়া এন লা ডিয়েরা বিষয়-বৈচিত্র্য, আঙ্গিক, প্রকরণসহ প্রকাশ পায়। প্রথম বিয়েটি বিচ্ছেদে রূপ নেয়। দ্বিতীয়বারে তারচেয়ে বিশ বছরের বড় আর্জেন্টিনাবাসী দেলিয়া দেল কারিলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। মাদ্রিদ থেকে মন্টেকার্লো, নেদারল্যান্ডস হয়ে দেলিয়ার সঙ্গে প্যারিসে এসে বসবাস শুরু করেন।
সে সময়ে রিপাবলিকানদের জয় হলে পাবলো বিশেষ কনসাল হিসেবে স্পেনের অভিবাসীদের ফরাসি ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করে চিলি পাঠানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। দ্বিতীয়বারের বিয়েও ভেঙে যায় এবং তৃতীয় ও শেষবারে তার বিয়ে হয় স্বদেশী গায়িকা মাতিলতা উরুতিয়ার সঙ্গে ১৯৬৬ সালে। ১৯৪০-৪৩ সালে কনসাল জেনারেল হন মেক্সিকোয়। ১৯৪০ সালে লিও ট্রটস্কি হত্যা চেষ্টায় পাবলো জড়িয়ে পড়েন। মেক্সিকোর রাষ্ট্রপতি কামাচো-এর অনুরোধে ট্রটস্কি হত্যার অন্যতম সন্দেহভুক্ত ও ষড়যন্ত্রকারী মেক্সিকোর চিত্রশিল্পী ডেভিড সিকুয়েইরস, তাকে চিলির ভিসা দিয়ে চিলিতে পাঠানোর ববস্থা করেন। এতে তিনি বেশ সমালোচিত হন। তখন নোবেলজয়ী মেক্সিকান কবি ওক্তাভিও পাজের সঙ্গে সম্পর্ক হয়। চিলিতে ফিরে ১৯৪৩-এ পেরু-ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন এবং মাচুপিচ্চু পর্বত’ শীর্ষ দীর্ঘ কবিতা লেখেন। এ ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালে ‘কান্টো জেনারেল ও কান্টো-১২’ এক মহাকাব্যিকতা ধরনের উল্লেখযোগ্য রচনা করেন। শেষে তিনি স্পেন-সৈন্য দ্বারা অগণিত পেরুবাসীর নিষ্ঠুর হত্যা বিষয় কবিতার মধ্য দিয়ে আবার তাদের জন্ম লাভের অনুরোধ করেছেন এবং কবির মাধ্যমে সেই মৃত জনগণকে কথা দিয়ে জানাতে ও প্রতিবাদে প্রতিরোধ করতে বলেছেন। এ কবিতাটিকে কবি ও শিক্ষাবিদ মার্টিন এসপাদা বলেছেন, ‘এটার মতো কোনো উঁচু স্তরের রাজনৈতিক কবিতা হতে পারে না’।
১৯৪৫ সালে পাবলো চিলির কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন ও সিনেটর নির্বাচিত হন। ১৯৪৬-এ পাবলো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গঞ্জালেস ভিদেলার সমর্থনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন, কিন্তু শ্রমিকদের ওপর তার অত্যাচার-অবিচারের জন্য তীব্র প্রতিবাদ জানান। কট্টর সমাজতন্ত্রবিরোধী ভিদেলা এ জন্য তাকে গ্রেফতার করার আদেশ জারি করেন ১৯৪৭-এ। পরে দুই বছর দেশের ভেতরই আত্মগোপনে ছিলেন এবং ১৯৪৯-এ দেশান্তরী হন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্বাসিত জীবন কাটান। দেশে ফেরেন ১৯৫২ সালে এবং তখন তিনি কবি হিসেবে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ও কীর্তির অধিকারী। প্রেম, রাজনীতি ও মানবতার কবি এ পরিচয়ে পৃথিবীর বহু ভাষায় তার কবিতা প্রকাশ পায়। ১৯৫০-এ আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার, ১৯৫৩-এ লেলিন শান্তি পুরস্কার ও স্টালিন শান্তি পুরস্কার এবং ১৯৭১-এ নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। এ সময়ে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি সালভাদর আলেন্দের এক ঘনিষ্ঠ জন ও উপদেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হন এবং তিনি তাকে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নির্বাচিত করেন।
বামপন্থী ছিলেন বলে নোবেল পুরস্কার অর্জনে নানা বাধা-বিপত্তি আসে। সেই জন্য নোবেল পাওয়ার বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘একজন কবি একই সময়ে যেমন এক সংহতির শক্তি তেমনি একটি স্বাতন্ত্র্যেরও। স্বৈরশাসক অগস্টো পিনোচেট ১৯৭৩-এ আলেন্দের রাজনৈতিক ক্ষমতা আমেরিকার সাহায্যে কেড়ে নেন এবং তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। পাবলোর সে সময়ে প্যারিসে মূত্রনালির কর্কট রোগ ধরা পড়ায় তিনি চিলিতে ফিরে আসেন এবং পিনোচেটের সৈন্যরা কিছুদিন পর তার বাড়ি তল্লাশি করতে আসে। তিনি তখন তার সেই বিখ্যাত উক্তি করেন- ‘চারদিক খুঁজে দেখ, শুধু একটি জিনিস, তোমাদের জন্য বিপদের, সেটা হচ্ছে কবিতা’। নোবেল পুরস্কারের পর সম্মানজনক গোল্ডেন রীথ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন স্ট্রুগা কবিতা সম্মেলনে। পাবলো ১৯৭৩-এর ২৩ সেপ্টেম্বরে মৃত্যুবরণ করেন এবং পিনোচেট নেরুদার শব নিয়ে শোক মিছিল করার অনুমোদন না দিলে জনতা তা না মেনে দলে দলে রাস্তায় নেমে পড়ে।
পাবলো এ লাভ পোয়েম্স বইটির জনপ্রিয়তা দেখে বলেছেন- ‘আমি সত্যি বুঝি না এসব কেমন করে হয়, কেন এই দুঃখ, যন্ত্রণা, প্রেম নিয়ে বইটা এত মানুষ, এত তরুণ-তরুণী পড়েই চলেছে। সত্যিই আমি বুঝি না। সত্যি কেউ বোঝে না।’
পাবলোর কবিতা নিয়ে চিলিসহ গ্রিস, আমেরিকা, অস্ট্রিয়া, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডার বিখ্যাত সব সুরকার গান রচনা করেছেন। তাকে নিয়ে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। এ সবের মধ্যে নেরুদার ‘পোস্টম্যান’ উল্লেখযোগ্য। পাবলোর তিনটি বসবাসগৃহ এখন জদুঘরে পরিণত হয়েছে। ওয়াশিংটন ডিসির অর্গানাইজেশন অব স্টেটস ভবনের দক্ষিণ পাশে তার একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে।
তার বাড়ি আইলা নেগ্রা স্মরণে ‘কবিতা’ শীর্ষক কবিতায় বলেছেন, ‘কিছু একটা শুরু হয়েছে আমার আত্মায়/জ্বর কিংবা বিস্মৃত ভাবা/আর আমি আমার মতো/ উদ্ধার করি/সেই আগুন/এবং এই প্রথম অস্পষ্ট পঙ্ক্তি লিখি,/কোন সারবস্তু ছাড়া, খাঁটি, খামাখা,/প্রকৃত বুদ্ধিমত্তায়। এমন কারোর যে জানে না কোনকিছুই,/ এবং সহসা আমি দেখি স্বর্গ উন্মুক্ত ও উদ্ভাসিত। আবার ‘পূর্ণ নারী টসটসে আপেল, গরম চাঁদ’ কবিতায় লিখেছেন ‘পূর্ণ নারী টসটসে আপেল, গরম চাঁদ,/সমুদ্র শ্যাওলা, বিচূর্ণ কর্দম আর আলোর ঘন বর্ণে/কোঁন অস্পষ্ট উজ্জ্বলতা খুলে দেয় তোমার/স্তম্ভদ্বয়ের মধ্যে?/ কোন প্রাচীন আঁধার স্পর্শ করে, একটি মানুষ তার বোধ দিয়ে?/ভালোবাসা জল ও নক্ষত্রের সঙ্গে ভ্রমণ,/ধোঁয়াশা বাতাস এবং হঠাৎ গোধূমচূর্ণের সঙ্গে/ভালোবাসা হল একটি সংঘর্ষ বজ -বিদ্যুৎ/আর দুটি শরীরের সঙ্গে যা পরাজিত হয় এক ফোঁটা মধুর মাধুরিতে। আরও তিনি কবিতায় বলেন যেই অমোঘ অনুভূতি ‘ভালোবাসা একটুখানি, ভুলে যাওয়া কত দীর্ঘ’।
কবিতাগুলো যেহেতু এখনও সাম্প্রতিক, ধর্মে ধ্র“পদী এবং মর্মে চিরকালীন, তাই ওরকম অতল জলের অবগাহিত চরিত্র নিয়ে চির ভাস্বর ও চির উজ্জ্বল হয়ে কবিতার জগতে চিরকাল বিরাজ করবে পৃথিবীর কবি। প্রেমের কবি পাবলো নেরুদা।

নদী সামনে এগোয়, পেছনে যায় না : মুর্তজা বশীর by মোহাম্মদ আসাদ

এবারের প্রদর্শনীর সবই কি নতুন কাজ দিয়ে?
-পুরনো-নতুন কাজ মিলিয়েই আছে। ১৮টি কাজই নতুন, যা আমি হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে এ বছর করেছি। জীবনের কঠিন সময় ফ্রেমে আসতে পারে। তবে আমি এখনও আনিনি।
আমি দেখেছি বয়স হয়ে গেলে সিনিয়ররা কিন্তু এক্সিভিশন করতে চান না। জয়নুল আবেদিন কোনো এক্সিবিশন করতে চাননি। সফিউদ্দিন সাহেব করেছেন মৃত্যুর আগে। সেটা হল খ্যাতি তার আছে, সেটা যেন ড্রপ না করে। ইয়াঙ্গার জেনারেশন অনেক মেধাবী। একটা ছেলের কাজ দেখে তো আমি বিস্মিত হয়েছি। সে হল বিশ্বজিৎ গোস্বামী। সে অফসেটে যে ড্রইং করেছে, নদীর ওপার থেকে। আমি ফেসবুকে দেখে হাসলাম। আমি খুব ভালো ড্রইং করতাম। তারপর আমি তার ওয়াটার কালার দেখলাম। তার কাজ অনেক ওপরে। ফেসবুকে অনেকেই পেইনটিংয়ের ছবি পাঠায়। আমার বিশ্বাস সেগুলোর বেশিরভাগই পিকচার হচ্ছে, পেইনটিং হচ্ছে না। ওয়ান ইজ দ্য, পেইনটিং ওয়ান ইজ দ্য পিকচার। সব সুন্দর কাজ পেইনটিং হয় না। হুবহু কিছু করা চিত্রশিল্পীর কি দরকার আছে? সেটা ফটোগ্রাফার করবে।
যা বলছিলাম, তখন প্রদর্শনী করতে লোকে ভয় পায়। কারণ ইয়াংরা তো খুব মেধাবী। তারা পৃথিবীতে কোথায় কি হচ্ছে দেখছে। হাজারও বই পড়ছে। আমাদের সময় বই পাওয়া যেত না। এদের কাছে টিকে থাকা একটা কঠিন কাজ। আমি এখনও ইতস্তত: করছি, আমার কাজগুলো ইয়াংরা কীভাবে গ্রহণ করবে। তবে আমার কাজগুলো যারা দেখেছে তারা বলেছে আপনার কাজ একজন বাঙালি শিল্পীর কাজ সেটা বোঝা যায়। দ্যাটস এনাফ।
আমি যেটা করতে চেয়েছি, আমার এই প্রদর্শনীতে দুইটি পেইনটিং আর একটি ড্রইং আছে। ওই ড্রইংটা হল একটা প্রোফাইল। সে ড্রইংয়ে কয়েকটা লাল আর সবুজ পুঁতির মালা। চোখ, নাক কিছুই নেই। খালি একটু আউট লাইন আর গলায় মালা। পেইনটিং দুটির মধ্যেও নাক-মুখ কিছুই নেই। আমি যা করতে চেয়েছি তা এখানে আছে। আমি বলতে চেয়েছি এটা একটা মেয়ে।
স্যার এবারের কাজগুলোতে কি নতুনত্ব কিছু পাব?
-এখানে যে ফিগারেটিভ কাজগুলো করেছি তার সঙ্গে পুরনো কাজের একটা ধারাবাহিকতা আছে। যার জন্য এ প্রদর্শনীর নাম দিয়েছি পর্যালোচনা। আগের ফিগারেটিভ থেকে নিয়ে নতুনভাবে করা। আমার ওয়াল সিরিজের কাজের সঙ্গে এপিটাফ সিরিজের কাজের মিল নেই। মিলটা হল মানসিকতা। এই যে দেখা। ওয়ালে যে ডিটেলিংটা করেছি, এপিটাফে সে ডিটেলিংটা আছে। ভিন্ন বিষয় কিন্তু শিল্পীর মেজাজ যেটা, সেটা একই আছে।
স্যার আপনার ফিরে আসা নিয়ে বলেন।
-একজন ৭০-৮০ বছরের মানুষও বাঁচতে চায়। ১০০ বছরের ওপরে হলেও বাঁচতে চায়। কারণ হল পৃথিবীটা সুন্দর। নিজের সন্তান, নাতি-নাতনি ছেড়ে একটা অনিশ্চয়তার জগৎ যে জগৎ থেকে ফিরবে না, সেখানে কেউ যেতে চায় না। আমার একমাত্র পুত্র, আমার কন্যা এদের কারও কথা মনে করে নয়। এই যে পৃথিবী এত সুন্দর, সুন্দর রমণী। আমি তো রমণীই আঁকি। যেহেতু মেয়েদের আঁকতে আমার খুব ভালো লাগে। এদের দেখার জন্য কিন্তু আমার কান্না পায় না। আমার কান্না পায় আমি যে মৃত্যুকে অতিক্রম করতে চেয়েছিলাম সেটা ভেবে। জীবিত অবস্থায় তুমি খ্যাতিমান হতে পার। তুমি যদি সেই রকম ওজনদার কিছু না রেখে যাও- মৃত্যুকে অতিক্রম করে যাওয়া, অমরত্ব পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। বললেই হল না, সেরকম কিছু তোমাকে রেখে যেতে হবে। যেমন ড. মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রেখে গেছেন, ওই রকম যদি কিছু রেখে যেতে পার।
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে দেখি আমার লেখালেখির কাজগুলো পরিকল্পনা হিসেবেই রয়ে গেছে। বাড়িতে এসে দেখি আমি তিনটি পাণ্ডুলিপি করেছিলাম। তার একটি হল ‘পবিত্র কোরআনের প্রতীক ও উপমা’। অন্য দুইটি হল ‘পবিত্র কোরআনে দোজখ-জান্নাত প্রসঙ্গ’ ও ‘বৈদিক সঙ্গীতায় উপমা ও প্রতীক’। এগুলো শেষ করা হয়নি।
আমি ধর্মে বিশ্বাস করি। কিন্তু আমি প্রাকটিসিং মুসলমান না। নামাজ রোজা এসব করি না। আমি জানি আল্লাহ আমাকে দিয়েছে। এই যে আমার এপিটাফ, এ পাথর আল্লাহ আমাকে দেখিয়েছে। এ প্রজাপ্রতির পাখায় আর্ট হয় এটা আল্লাহ আমাকে দেখিয়েছে। এর মধ্যে আমার কোনো ক্রেডিট নেই। যার জন্য আমি যখন প্রজাপতি আঁকি তখন ঢাকা কুরিয়ারে বেরিয়েছিল ‘আল্লাহ ইজ দ্য গ্রেটেস্ট আর্টিস্ট’। প্রজাপতির এই যে ভেরিয়েশন ফর্ম এটা তো আল্লাহর কাজ। আমি আল্লাহতে বিশ্বাস করি। এটা আমার বিশ্বাস।
আমার আরেকটি কাজ হল মন্দিরের টেরাকোটা নিয়ে। আমার গবেষণা হল বাংলায় যে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছে সেই বিদ্রোহের পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছে টেরাকোটা আর্ট। সেসব টেরাকোটায় আছে পালকি চড়ে যাচ্ছে, বাইজি নাচছে। আর তার ঘরে দেখে এক মেয়েরা এক খণ্ড কাপড় পরে থাকে। আমার গবেষণা হল মন্দির শুধুই একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয়। এটি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ সব কিছুই হয় মন্দিরকে কেন্দ্র করে। প্রতিটি কৃষকই মন্দিরে গিয়ে টেরাকোটায় দেখে বাইজি নাচছে। আর তার ঘরে ভিন্ন চিত্র।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ ছোট গল্পের সঙ্গে তুলনা করা যায়। সেখানে আছে একটা পানের খিলির মধ্যে লিফলেট। পানের সঙ্গে সে লিফলেট ডিস্টিবিউট হল। সেটার মতোই মন্দিরের টেরাকোটা দেখেছে। আর ঘরে উলঙ্গ, অভাব-অনটন, নীল চাষের জন্য অত্যাচার সে সব মানুষকে ক্ষুব্ধ করে। তারপর এ আউটব্রাস্ট হয়।
আপনার কাজ নিয়ে এখন কী ভাবছেন?
-জীবনটা তো সীমিত। আমি সব সময় বলতাম আমি ৯৩ বছর বাঁচতে চাই। আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগেই আমি এ কথা বলতাম। অনেকেই আমাকে বলত ৯৩ কেন? ৯২ অথবা ৯৪ কেন নয়? ৯৩ ডেডলাইন কেন? আমি বলতাম পিকাসোকে আমি জীবনে দেখতে পাইনি। পিকাসো মারা গেছেন ৯২ বছরে। আমি তার চেয়ে এক বছর বেশি বাঁচতে চাই। এখন ৯৩ বছর বাঁচব কিনা জানি না। ধর আমি কালকেও মরে যেতে পারি। আমি ধরে নিয়েছি সব ঠিক থাকলে আরও ৫ বছর বাঁচব। এই ৫ বছরে আমার সব কাজ সারতে হবে। আমার একটা ওয়ার্নিং হয়ে গেছে। এখন নতুন উপসর্গ আমার অক্সিজেন ড্রপ করছে। এই যে সীমিত জীবন আমার। আমার যেসব লেখালেখি, আমার যে ছবি আঁকা, আমার যে দুইটা নতুন ছবির কথা বলছি, চোখ-মুখ নেই, একটা মেয়ে মনে হলেও আরেকটা মনে হওয়ার কথা নয়। তবে যে কেউ দেখে বলবে এগুলো মেয়ের অবয়ব। হিউম্যান ফিগার একটি অবজেক্ট, বস্তু। বস্তুর সে জিনিসটা আমাকে প্রথম আকর্ষণ করে, সে জিনিস আমি রং করব আর বাকিটা ব্লাংক। সেভাবে আমি প্রস্তুতি নিচ্ছি। ডাক্তার আমাকে বড় কাজ করার পারমিট করছে না। ছোট ছোট ক্যানভাসে কাজ করছি। আর দুটি কারণে এ কাজ করব। এক হল নিজের তৃপ্তির জন্য। দুই হল জীবিকার জন্য। আমার কোনো পেনশন নেই। তারপর আমি কমার্শিয়াল কাজ করি না। আমি ফরমায়েশি কাজ করি না। আমাকে কালেকটররা বলে, আপনি এপিটাফ আমাদের দেন। আমি বলি নদী সামনে এগোয়, পেছনে যায় না। আমি এপিটাফ কেন আঁকব? পয়সার জন্য? সেটা কেন করব। পয়সার জন্য আঁকা নিজের বউ কারও কাছে তুলে দেয়া, তাই না? আমি সেটা করতে পারি না।
আপনার জীবন অলৌকিকভাবেই ফেরা, জ্ঞান ফেরার পর কি দেখলেন?
-আমার জ্ঞান ফেরার আগের তিন দিনের কথা কিছুই মনে নেই। তারপর মনে হল আমি একটা টানেলের ভেতরে। চারদিকে ভূমিকম্প, সবকিছু ভেঙেচুরে শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমি এখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছি। সিস্টার আমাকে বলছেন, কোথায় যাচ্ছেন, আপনার হাত-পা তো বাঁধা। সে সময় আমি যেদিকে তাকিয়েছি শুধুই রেড আর অরেঞ্জ কালার দেখেছি। ঘরের পর্দাটাও দেখেছি তেমন কটকটা রঙের। তারপর যখন একটু সুস্থ হলাম। তখন দেখতে পেলাম ফর্ম। হিউম্যান ফর্ম, সাদার মধ্যে সাদা। সাদার মধ্যে সাদা, সেটা আঁকার ইচ্ছা আছে।

রণবীর আমার জীবনের বিশাল একটি অংশ: ক্যাটরিনা

রণবীর কাপুর ও ক্যাটরিনা কাইফের প্রেম নিয়ে এখন পর্যন্ত বহুবার সরব হয়েছে মিডিয়া। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে নিজেদের প্রেম নিয়ে লুকোচুরি খেলে গেছে এ জুটি। অবশ্য ক্যাটরিনাকে নিজের জীবনের বিশেষ মানুষ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন রণবীর। ক্যাটের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে পারেন বলেও জানিয়েছিলেন জুনিয়র কাপুর। এবার রণবীরকে জীবনের বিশাল একটি অংশ বলে স্বীকৃতি দিলেন ক্যাটরিনা। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে তাঁদের বিয়ের কোনো রকম সম্ভাবনা নেই বলেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ৩১ বছর বয়সী এ তারকা অভিনেত্রী।

অনেক দিন থেকেই বলিউডে জোর গুঞ্জন, প্রেমিক রণবীর কাপুরকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন ক্যাটরিনা কাইফ। সম্প্রতি এই গুঞ্জনের সত্য-মিথ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে অবশেষে মুখ খোলেন ক্যাট। তিনি স্বীকার করে নেন, তাঁর জীবনে রণবীরের উপস্থিতি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য রণবীরের সঙ্গে প্রেমের কথা সরাসরি স্বীকার করেননি ক্যাট। কেবল জীবনে রণবীরের গুরুত্বপূর্ণ অস্তিত্বকে স্বীকার করেছেন তিনি।
রণবীর সম্পর্কে ক্যাটরিনা বলেন, ‘রণবীর আমার জীবনের বিশাল একটি অংশ। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে আমার বিয়ের কোনো রকম সম্ভাবনা নেই। বিয়ে নিয়ে এখন পর্যন্ত কিছু ভাবিনি আমি। ব্যক্তিগত জীবন কিংবা প্রেম নিয়ে আমি বরাবরই খুব কম কথা বলেছি। ক্যারিয়ারের শুরুর দিক থেকেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’ সম্প্রতি এক খবরে এমনটিই জানিয়েছে ওয়ান ইন্ডিয়া।
আপাতত বিয়ে নিয়ে ভাবার সময় না থাকলেও ক্যাটরিনা তাঁর পরবর্তী ছবির প্রচারণা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। হৃতিক রোশন ও ক্যাটরিনা কাইফ অভিনীত অ্যাকশন-থ্রিলার ঘরানার ‘ব্যাং ব্যাং’ ছবি মুক্তি পাচ্ছে ২ অক্টোবর। ‘বাঁচনা অ্যায় হাসিনো’ ছবির নির্মাতা সিদ্ধার্থ রাজ আনন্দ পরিচালিত ‘ব্যাং ব্যাং’ ছবিতে হৃতিক-ক্যাটরিনা ছাড়াও অভিনয় করেছেন জাভেদ জাফরি, জিমি শেরগিল, পবন মালহোত্রা প্রমুখ।

বাংলাদেশী শ্রমিকদের নিয়ে প্রতারণা

বিশাল নেটওয়ার্ক তাদের। বিদেশে কর্মী পাঠানোর নামে মানবপাচার করাই তাদের পেশা। এক্ষেত্রে প্রধান অস্ত্র মোটা বেতনের চাকরির প্রলোভন। নির্বিঘ্নে এ কাজ চালাতে খুলে বসেছে রিক্রুটিং এজেন্সি। চক্রে আছে দেশীয় সদস্যদের পাশাপাশি ভিনদেশীরাও। বিদেশী কোম্পানির চাকরির কাগজপত্র দেখিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর চোখে ধুলো দিয়ে ছাড়পত্রও ম্যানেজ করছে তারা। আর বিদেশের মাটিতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ছিনিয়ে নিচ্ছে সকল ধরনের বৈধ কাগজপত্র। এত সব অভিযোগের মধ্যেও কর্মী নিয়োগের নামে বাইরে লোক পাঠানো অব্যাহত রেখেছে তারা। চোখের সামনে সব কিছু ঘটলেও যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে তারা। আল-পূর্বাশা এন্টারপ্রাইজ (আরএল-৫০২) নামে একটি রিক্রুটিং এজেন্সি ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেসার্স গোলাম রাব্বী ইন্টারন্যাশনাল (আরএল-১০৭৮)-এর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ এনেছেন সুদান থেকে প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরে আসা ৩৭ কর্মী। অভিবাসী ঐক্য ফোরাম ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সমপ্রতি তারা দেশে ফেরত আসেন। অভিযোগে তারা ক্ষতিপূরণসহ ৪ দফা দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ওই রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক বরাবর দায়ের করা ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়, আল-পূর্বাশা এন্টারপ্রাইজ-এর ম্যানেজার বসির উদ্দিন সরোয়ার সুদানে মানবপাচার চক্রের মূল সমন্বয়কারী। তার সহযোগী হিসেবে রয়েছে টেক্সটাইলকর্মী বেলারুশে মানবপাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য হাসান সরোয়ার, সুদানি নাগরিক ইঞ্জিনিয়ার সিদ্দিক, হাসান ও মিরপুরের এসএম আজাদ। এর মধ্যে বেলারুশে মানবপাচার চক্রের সক্রিয় সদস্য হাসান সরোয়ার টেক্সটাইলকর্মী হওয়ার সুবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিলের কর্মীদের টার্গেট করে তাদেরকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে। সুদানি নাগরিক ইঞ্জিনিয়ার সিদ্দিক সামিটেক্স টেক্সাইল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির নামে মূল সমন্বয়কারী বসির সরোয়ারের সঙ্গে যোগসাজশ করে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয় বন্দোবস্ত করে দেয়। হাসান বশির সরোয়ারের পক্ষে সুদান অফিসের সমন্বয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত। এছাড়া এসএম আজাদ বিদেশী টেক্সটাইল মিলে মাসিক ৩০-৩৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিটি কর্মীর কাছ থেকে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা আদায় করেন। তাদের অভিযোগ সুদান নিয়ে যাওয়ার পর কোম্পানির প্রতিনিধিরা তাদের পাসপোর্টসহ সকল কাগজপত্র নিয়ে নেয়। তাদেরকে বিভিন্ন কোম্পানিতে ভাড়ায়ও কাজ করানো হতো। এর বিনিময়ে তাদের প্রতিমাসে বেতন দেয়া হতো ৮-৯ হাজার টাকা। ঠিকমতো খাবার দেয়া হতো না। খাবার ও চুক্তি অনুযায়ী বেতন বাড়ানোর কথা বললেই মারধর করা হতো। বাইরে যেতে দেয়া হতো না।

তারা আরও অভিযোগ করেন তাদের ৬ জন কর্মী জসিম উদ্দিন, এরশাদ, মিলন সরকার, সেকেন্দার আলী, সোহরাব ও কাইউম শেখকে লিবিয়ায় ভাল চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন চালায় বশির উদ্দিন সরোয়ার, হাসান এবং তাজুল ইসলাম নামে পাচারকারী চক্রের অপর সদস্য। ২৫শে জুন খাবার, বেতন বৃদ্ধি এবং বাসস্থানের কথা বলায় নিরাপত্তাকর্মী এবং পাচারকারীেেদর গুলিতে ২ জন আহত হন। মোবাইলের মাধ্যমে তাদেরকে হুমকি দেয়া হয় বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন তারা। তারা আরও উল্লেখ করেছেন এসব দুর্দশার মধ্যেই সুর মিলিটারি ক্লোথিং ফ্যাক্টরি নামে সুদানের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের চাহিদাপত্র এনে আরও ৯৫ জন কর্মী প্রক্রিয়া চালাচ্ছে বসির উদ্দিন সরোয়ার ও হাসান। কর্মীদের দেয়া অন্যান্য দাবিগুলো মধ্যে রয়েছে চুক্তি অনুযায়ী বকেয়া বেতন পরিশোধ করা, ফেরত আসা কর্মীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং জড়িত দালালদের বিচার করা। ৩৭ জন কর্মী স্বাক্ষরিত মো. এরশাদের দায়ের করা ওই অভিযোগপত্র দু’টির অনুলিপি মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশ সদর দপ্তর (মানবপাচার মনিটরিং সেল) বিএমইটি’র মহাপরিচালক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে দেয়া হয়েছে।

মহাকাশে লাখো মানুষের শহর!

পৃথিবীর কোণায় কোণায় এখন ছড়িয়ে পড়েছে মানুষ। পরবর্তী পদক্ষেপ কী? মানুষের পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে পৃথিবীর কক্ষপথে বসতি গড়ে তোলা। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নাসার কর্মকর্তা মহাকাশ বসতি বিশেষজ্ঞ আল গ্লোবাস মনে করেন, মানুষের পরবর্তী যৌক্তিক পদক্ষেপ হচ্ছে কক্ষপথে নিজেদের বসবাসের উপযোগী আবাসস্থল তৈরি করা।

বিশেষজ্ঞ গ্লোবাস দাবি করেন, ‘বড় ধরনের দুর্যোগ এড়াতে ২১০০ সালের মধ্যেই পৃথিবীর বাইরে কক্ষপথে বড় ধরনের ভাসমান আবাসস্থল গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’
তিনি বিশ্বাস করেন, শিগগিরই পৃথিবীর কক্ষপথে শহর গড়ে উঠবে। আর লন্ডন থেকে নিউইয়র্কে যেভাবে মানুষ বেড়াতে আসে, তেমনি পৃথিবী থেকে মহাকাশের এই শহরগুলোতে মানুষ বেড়াতে আসবে।
গ্লোবাসের মতে, ‘মানুষ যদি মহাকাশে বসতি তৈরি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, আমরা তা করতে পারি। আমাদের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা ও আর্থিক ক্ষমতা রয়েছে। তাই কক্ষপথে ভাসমান শহর তৈরি না করার কোনো কারণ নেই। আগামী কয়েক শতকে যদি পারমাণবিক যুদ্ধের মতো বড় ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে, তবে মহাকাশে ভাসমান শহর গড়ে না তোলাটাই হবে বিস্ময়কর।’

কেমন হবে মহাকাশের সেই বাড়ি?
মহাকাশে যদি বসতি স্থাপন করা সম্ভব হয়, তবে সেখানকার ঘরবাড়ি দেখতে কেমন হবে? গবেষকেরা বলছেন, একটি কেন্দ্রীয় সিলিন্ডারের চারপাশে ঘূর্ণমান বসতি তৈরি করা যাবে। এই ঘূর্ণমান অংশটি থেকেই কৃত্রিম মাধ্যাকর্ষণ তৈরি হবে এবং এখানকার অধিবাসীরা পৃথিবীর মতোই স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়াতে পারবে।
গ্লোবাস মনে করেন, এ ধরনের পরিবেশে শিশু সুগঠিত মাংসপেশি নিয়ে বেড়ে উঠবে। মহাকাশে দীর্ঘকাল থাকলেও পরে তারা পৃথিবীতে ভ্রমণে এলে এখানকার মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গেও মানিয়ে নিতে পারবে। তবে এই বসতির কেন্দ্রীয় কাঠামোর স্থানটিতে শূন্য মাধ্যাকর্ষণ থাকবে। এই বিশাল কাঠামোর বাইরের দিকে চাষাবাদ করা ও শক্তি উৎপাদনের ব্যবস্থা করা সম্ভব। গ্লোবাসের এই ‘মহাকাশ শহর’-এর ধারণা আকর্ষণীয় শোনালেও বর্তমানে তা নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব বলেই মেনে নিচ্ছেন তিনি। এই কাঠামো তৈরির খরচ বহন করা এখন সম্ভব নয়। কিন্তু আগামী শতকে এই ধারণা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এ ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা গেলে মহাকাশে একবারে এক লাখ থেকে কয়েক লাখের বসবাস করা সম্ভব হবে।’

বাধা কোথায়?
মহাকাশে বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধা রয়ে গেছে। মহাকাশে বসতি স্থাপনের আগে এই বাধাগুলো দূর করতে হবে। এর মধ্যে প্রথম বাধাটি হবে মহাকাশে পৌঁছাতে রকেটের খরচ কমাতে হবে। দ্বিতীয় বাধাটি হচ্ছে জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো সহজলভ্য করা। মহাকাশে তৈরি বসতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। অভ্যন্তরীণভাবে খাবার উৎপাদন ও সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে শক্তির চাহিদা মেটানোর মতো দরকারি বিষয়গুলো ওই শহরেই থাকতে হবে।
মহাকাশের তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষার জন্য ওই শহরে বিশেষ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মহাকাশের এই তেজস্ক্রিয়তা বড় সমস্যা তৈরি করবে না। (স্পেস ডটকম, ডেইলি মেইল)

ফেসবুকে এক পিতার কৈফিয়ত

‘আমার বারবার মনে হচ্ছিল, আমি আমার বাচ্চা দু’টোকে বাঁচাতে পারিনি। চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছি। সারাক্ষণ ভেবেছি, কোথায়-কোথায় ভুল করেছি। এখনও ভাবি, কোথায় ভুলটা হলো?’ এই লেখাটি একজন পিতার। তিনি চিরশ্রী জামান মুনমুন ও মুহাম্মদ বিন আলিমের পিতা আলিমুল হক টিপু। তার দুই সন্তানের প্রসঙ্গে গতকাল বিকালে তার ফেসবুক একাউন্টে তিনি একটি দীর্ঘ লেখা পোস্ট করেছেন। এতে প্রাক্তন স্ত্রী সাংবাদিক জয়শ্রী জামানের সঙ্গে ডিভোর্স প্রসঙ্গেও নানা কথা বলেছেন চীন প্রবাসী এ সাংবাদিক। তার দুই সন্তানের মৃত্যু আত্মহত্যা কিনা এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। এজন্য ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পর্যন্ত অপেক্ষায় আছেন বলে জানান। টিপু যখন দুই সন্তানের মৃত্যুর খবর পান পেইচিংয়ে তখন রাত ২টা। তিনি লিখেছেন, যখন আমি বাচ্চা দু’টোর মৃত্যুর খবর শুনি তখন তা বিশ্বাস হয়নি। সারারাত ছটফট করেছি। মনে মনে আশা করেছি একটি এসএমএস আসবে চিরশ্রীর কাছ থেকে। আব্বু, আম্মুকে ভয় দেখিয়েছি। কিন্তু কোন এসএমএস আসেনি। বেলা ১১টায় সহকর্মীরা যখন দল বেঁধে এলো, তখন বুঝলাম সব শেষ। পরবর্তী দু’টি দিন আমার কিভাবে কেটেছে আমি বলতে পারবো না। আমি এমনকি আমার বাবার ফোনও ধরিনি।
টিপু লিখেছেন, তার প্রথম সন্তান চিরশ্রী ইউরোপীয় মেয়েদের মতো সুন্দরী হতে চাইতো জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘চিরশ্রী বলতো আব্বু, বেহেশতে গেলে কি আমি ওদের মতো সুন্দর হতে পারবো? আমি বলতাম, তার চেয়ে কোটি গুণ বেশি সুন্দর হয়েই তুমি বেহেশতে যাবে।’ তিনি লিখেছেন, পিতা আলিমুল হক হিসেবে তিনি ওই লেখাটি লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘কোন শিশু যেন মনে না করে যে পিতা আলিমুল হক জঘন্য। এটা ভেবে যদি একটি শিশুর মনেও তার নিজের পিতার সম্পর্কে খারাপ ধারণা জন্মায়, তাহলে সেটা হবে আমার কাছে খুবই কষ্টের একটা বিষয়।’

আলিমুল হক টিপু নিয়মিত তার সন্তান চিরশ্রী  ও মুহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন জানিয়ে লিখেছেন, গত মে মাসে চিরশ্রীর এ লেভেলের ফাইনাল পরীক্ষার ফি বাবদ ৭৫ হাজার টাকা দিয়েছি। তাদের মৃত্যুর কিছু দিন আগেও মুহাম্মদের বই কেনার জন্য আবদুল্লাহ (টিপুর ভাইপো)’র মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা দিয়েছি। দুই সন্তানের খরচের জন্য প্রতি মাসেই তিনি টাকা পাঠাতেন বলে দাবি করেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও দুই সন্তানের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে লিখেছেন টিপু। তিনি লিখেছেন, আমার মেয়ে একটা এসএমএস পাঠিয়ে বলতো: কল মি নাও। এমন হয়নি যে আমি সঙ্গে সঙ্গে ফোন করিনি। তা রাত দু’টো তিনটে হলেও। বিভিন্ন পত্রিকায় আলিমুল হক টিপুকে কেন্দ্র করে লেখার সমালোচনা করে তিনি লিখেছেন, আমি মহামানুষ নই। কিন্তু এতটা খারাপও নই, যতটা পত্র-পত্রিকাগুলো গত কয়েকদিন ধরে লিখেছে।
টিপু দাবি করেন, ‘চিরশ্রী ও মুহাম্মদ তাদের মায়ের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করতো। সেই বিরক্তি শেষ পর্যন্ত ঘৃণায় রূপ নেয়।’ তিনি লিখেছেন, ‘আমি তাদের বলতাম, খারাপ স্ত্রী বা স্বামী হয়, কিন্তু খারাপ মা বা বাবা হয় না।’ তিনি এতে আরও উল্লেখ করেছেন চিরশ্রী তাকে বলেছিল আব্বু, আম্মু বিয়ে করলে আমরা তোমার কাছে চলে আসবো। টিপু তাকে বলেছিলেন, ‘মা, এ লেভেলটা শেষ করলেই চীনে তোর স্কলারশিপ হয়ে যাবে। একটু ধৈর্য ধর।’
জয়শ্রী জামানের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, পরকীয়া প্রেমের কারণেই জয়শ্রীর সঙ্গে আমার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে। তবে তা তার পরকীয়া নয়। বরং জয়শ্রীর পরকীয়ার কারণেই বিচ্ছেদ ঘটেছে দাবি করে তিনি লিখেছেন, স্বামী ও ফুটফুটে দু’টি সন্তান থাকতে ১৪ বছর বিবাহিত জীবনের পর যদি কোন স্ত্রী অন্য পুরুষকে প্রেমপত্র লেখে, তাহলে তার সঙ্গে কি বাস করা যায়? এরকম একটি চিঠি তার কাছে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। প্রধানমন্ত্রী সমীপে জয়শ্রী জামানের লেখা চিঠি প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, জয়শ্রী প্রধানমন্ত্রীকে আমার সম্পর্কে যে কথাগুলো লিখেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তিনি লিখেছেন, প্রেমের কারণে দিগন্ত টিভি থেকে তার চাকরি যায়নি। বরং বিয়ে করার কারণে দিগন্ত থেকে টিপু ও তার দ্বিতীয় স্ত্রী মাহবুবার চাকরি চলে যায়। পরে অবশ্য আলিমুল হক টিপুকে নিউজ কনসালটেন্ট এবং মাহবুবাকেও পুনঃনিয়োগ দেয়া হয়।
জয়শ্রীর সঙ্গে ডিভোর্স প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, জয়শ্রী জোর করে দুই সন্তানকে নিয়ে তার  বোন তিলোত্তমার বাসায় ওঠে। তাদের কন্যা চিরশ্রী সেদিন সারারাত কেঁদেছে। বলেছে, আমাকে আব্বুর কাছে দিয়ে আসো। পরের দিন সকালে জয়শ্রী বাধ্য হয়ে মেয়েকে দিয়ে যায়। এক মাস পর ছেলেটাকেও তার কাছে দিয়ে যায়। তারপর আটটি মাস ছেলেমেয়ে দু’টো টিপুর কাছে ছিল। ওই সময়ে জয়শ্রী তাকে এসএমএস করে আবার বিয়ে করার তাগিদ দিতো বলে তিনি জানান।

পরকীয়ায় আপস না করায় স্বামীকে ছাড়তে হয়েছিল by রুদ্র মিজান

জয়শ্রী বিয়ে করেছিলেন প্রেম করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে জয়শ্রীর কাছ থেকে দূরে সরে যান তার স্বামী আলিমুল হক টিপু ততদিনে সংসারে দুই সন্তান। জীবনে এমন বিপর্যয়ের পরও ভেঙে পড়েননি জয়শ্রী। দ্বিতীয় বিয়েও করেন নি। তার এই জীবন সংগ্রাম দেখে মুনমুন ও মুহাম্মদ বলতো, ‘মা, তুমি এভাবে জীবন কাটাচ্ছো কেন? তুমি বিয়ে করতো পারো। অন্তত একটা প্রেম তো করতে পারো।’ কিন্তু দুই সন্তানই ছিল তার পৃথিবী। এর বাইরে নিজেকে নিয়ে আলাদা কোন স্বপ্ন বুনতে চাননি তিনি। আর্থিক টানাপড়নে দিন কাটছিল।

আত্মহত্যার আগে একটি ইলেকট্রনিক গিটার চেয়েছিল মুহাম্মদ বিন আলিম। বলেছিল, ‘মা, আমি কি একটা গিটার পাবো না? আমি তো তেমন কিছু চাইনি তোমার কাছে।’ কিন্তু তার মা জয়শ্রী জামান তা কিনে দিতে পারেননি। চীন প্রবাসী পিতা আলিমুল হক টিপুর কাছেও একই আবদার করেছিলো মুহাম্মদ। কিন্তু টিপু এক কথায় জবাব দিয়েছেন ‘পারবো না।’ সেই থেকে বিমর্ষ ছিল মুহাম্মদ। খুব কম কথা বলতো। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এ খণ্ডকালীন চাকরি তার মা জয়শ্রীর। স্থায়ী হবে হবে করেও হয়নি। অভাব অনটনে জর্জরীত জয়শ্রীর কষ্ট দেখে মুহাম্মদ ও চিরশ্রী জামান মুনমুন হতাশায় ভুগছিল। গতকাল মানবজমিন-এর সঙ্গে আলাপকালে জয়শ্রী নিজেই জানান এ সব কথা। তিনি জানান, প্রায় এক বছর আগে মুহাম্মদকে একটি গিটার কিনে দিয়েছিলেন জয়শ্রী। এজন্য অনেক কষ্টে বই কম্পোজ করে টাকা সংস্থান করেন তিনি। কিন্তু প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিক গিটার দিতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘একটি গিটারের জন্য আমার বাবু চলে গেছে। আমার টাকা নেই বলে আমি আমার সন্তানদের হারিয়েছি। আমি এখন কাকে নিয়ে বাঁচবো, ওরা কেন এভাবে চলে গেল?’ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত জয়শ্রীর চিকিৎসা, ছেলে, মেয়ের লেখাপড়ার খরচ, বাসা ভাড়াসহ প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ টাকা  ব্যয় হতো। এ নিয়ে হিমশিম খেতেন জয়শ্রী। তার দুই সন্তান তা দৃঢ়ভাবে অনুভব করতো। মুনমুনের তেমন কোন চাহিদা ছিল না। এমনকি নিজের জন্য জামা কিনতে পর্যন্ত আগ্রহ ছিল না তার।
দুই সন্তানকে নিয়ে নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছিলেন জয়শ্রী জামান। স্বপ্ন বুনেছিলেন তার দুই সন্তানকে নিয়ে। তাদের লেখাপড়া করিয়েছেন উত্তরার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। অর্থ সংস্থানের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। পিতাহীন সংসারে দুই সন্তানের তিনিই ছিলেন মা ও বাবা। স্বপ্ন ছিল মেধাবী দুই সন্তান একদিন তার পাশে দাঁড়াবে। মায়ের সকল দুঃখ দূর করে দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। বরং জীবনের সবটুকু সুখ কেড়ে নিয়ে দুই সন্তানই পাড়ি দিয়েছে না ফেরার দেশে। রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের গরিবে নেওয়াজ এভিনিউ’র ১১ নম্বর বাড়ির পাঁচতলায় থাকতেন জয়শ্রী। সোমবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে সে বাড়িতে ঘটে এক মর্মান্তিক ঘটনা। বাসার দুই কক্ষের বারান্দার গ্রিলের সঙ্গে রশি বেঁধে আত্মহত্যা করে সাংবাদিক জয়শ্রীর দুই সন্তান মুনমুন ও মুহাম্মদ। ওই দিন বাদ জোহর আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে তাদের লাশ। এমন মর্মান্তিক ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন দৃঢ় মনোবলের অধিকারিণী জয়শ্রী। সেই থেকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। দিনের বেশির ভাগ সময়ই তাকে অচেতন করে রাখা হচ্ছে ওষুধের মাধ্যমে। নেয়া হয়েছে মোহাম্মদপুরে বোনের বাসায়।
সূত্র জানায়, জয়শ্রী জামানের বাড়ি রাজবাড়ী জেলা সদরের সজ্জনকান্দা। তার পিতা জেলা আওয়ামী লীগ নেতা একেএম নূরুজ্জামান। চার বোনের মধ্যে জয়শ্রী সবার ছোট। বর্তমানে তার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। জয়শ্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একই বিভাগের দুই বছরের সিনিয়র আলিমুল হক টিপুর সঙ্গে প্রেম ও পরে বিয়ে হয় তার। দাম্পত্য জীবনে দু’টি সন্তানের মা-বাবা হন এই দম্পতি। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যেই চলছিল তাদের জীবন। কিন্তু তা বেশিদিন সয়নি। বিয়ের ১৪ বছরের মধ্যেই বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে তাদের। ২০০৮ সালের ৬ই মার্চ জয়শ্রীকে ডিভোর্স দেন আলিমুল হক টিপু। এ সম্পর্কে জয়শ্রী জামান নিজেই একটি খোলা চিঠিতে লিখেছেন, ‘পরকীয়া প্রেমের ব্যাপারে আর আপস করতে না পারায় ছাড়তেই হলো তাকে। তার কাছ থেকে পাওয়া তালাকনামায় ২০০৮ সালের ৬ই মার্চ আমি স্বাক্ষর না দিলেও ১৪ই জুলাই ২০০৮ সালে দিগন্ত টেলিভিশনের সংবাদ পাঠিকা মাহবুবা মুস্তাফা মিলিকে সে বিয়ে করে।’ তখন থেকেই এক করুণ-কঠিন সংগ্রামে নামতে হয় জয়শ্রীকে। প্রথমে চাকরি নেন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। সেই সঙ্গে টিউশনি করাতেন তিনি। কিন্তু অভাব পিছু ছাড়ছিল না। খুঁজছিলেন অন্য কোন পেশা। খোলা চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘অভাব-অনটনের মধ্যেই আমার মেয়ে মুনমুন ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা দিয়ে চারটিতে স্টারসহ আটটিতে ‘এ’ পেয়েছে।’ কৃতিত্বের জন্য ডেইলি স্টারের সংবর্ধনা পেয়েছিল মেয়ে মুনমুন। ২০০৮ সালের পর দৈনিক ভোরের কাগজের মাধ্যমে জয়শ্রীর সাংবাদিকতা শুরু। ২০১২ সালে খণ্ডকালীন হিসেবে যোগ দেন বাসসে। গত বছরের ১৬ই জুন তার চাকরি চলে গেলে আবার অভাব-অনটনে পড়েন তিনি। চাকরি ফিরে পেতেই প্রধানমন্ত্রী সমীপে লেখেন খোলা চিঠি। জয়শ্রী নিজেই লিখেছেন চাকরি যাওয়ার আগে সাড়ে তিন মাস বেতন না পেয়ে চরম আর্থিক সমস্যায় পড়েন তিনি। বাধ্য হয়ে চাকরি ফিরে পেতে অনশনে বসেন। এ প্রসঙ্গে জয়শ্রী বলেন, ‘আমার বাচ্চাদের আত্মহত্যার পেছনে আমার চাকরি স্থায়ী না হওয়া একটি প্রধান কারণ। চাকরি স্থায়ী না হওয়ায় আমার বাচ্চারা অর্থকষ্টে ছিল।’
বাসসের উপ-প্রধান বার্তা সম্পাদক হালিম আজাদ জানান, জয়শ্রীর চাকরি যাওয়ার প্রায় আড়াই মাস পরে জয়শ্রী চাকরি ফিরে পান। এখনও তিনি জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক হিসেবে আছেন। অন্যদিকে তার স্বামী সাংবাদিক আলিমুল হক টিপু দ্বিতীয় বিয়ের পর দিগন্ত টিভি থেকে চাকরি হারান। তারপর নতুন চাকরি নিয়ে তিনি চলে যান চীনে। বর্তমানে তিনি বেইজিংয়ে রেডিও চায়নায় কর্মরত। দ্বিতীয় সংসারে আহমদ বিন আলিম নামে দুই বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। স্বজনরা জানান, আলিমুল ও জয়শ্রীর যখন ডিভোর্স হয় তখন মুহাম্মদের বয়স মাত্র সাত বছর এবং মুনমুনের ১১ বছর। শিশু বয়সে পিতার সান্নিধ্য বঞ্চিত হয় তারা। পিতা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। অন্যদিকে মায়ের আর্থিক টানাপড়েন। এ সবই তাদের ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল। মা-বাবার বিচ্ছেদ ও মায়ের আর্থিক দৈন্যের কারণেই ধীরে ধীরে হতাশাগ্রস্ত হয় মুনমুন ও মুহাম্মদ। এক পর্যায়ে মাদকাসক্ত হয়ে যায় তারা। ফেসবুকে আলিমুল হক টিপুর দ্বিতীয় পক্ষের সন্তানকে দেখে প্রায়ই মন খারাপ করতেন মুনমুন ও মুহাম্মদ। বিশেষ করে টিপুর ফেসবুক থেকে মুনমুন ও আলিমের ছবি মুছে ফেলায় মুনমুন ও আলিম খুব আঘাত পান বলে স্বজনরা জানান। জয়শ্রী জানান, মাস শেষে দুই সন্তানের কোচিং ও স্কুলের বেতন বাবদ দিতো হতো ২২ হাজার টাকা। ঘর ভাড়া দিতে হতো ২০ হাজার টাকা। তাছাড়া অন্যান্য ব্যয়তো ছিলোই। সন্তানদের জন্য মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পাঠাতেন টিপু। তবে সর্বশেষ তিনি ২৭ হাজার টাকা দিয়েছেন বলে জানান জয়শ্রী। কিন্তু সন্তানদের সঙ্গে ফোনে খুব কম কথা বলতেন টিপু।
সাধারণত সকাল ১১টায় বাসা থেকে বের হতেন জয়শ্রী। ফিরতেন রাত ১১টার পরে। স্কুলের নির্ধারিত সময়ের পর বাসায় একা থাকতো তার দুই সন্তান মুহাম্মদ ও মুনমুন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বেলমন্ট ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র মুহাম্মদ নিজেই গাঁজা ও ইয়াবা সংগ্রহ করতো। যদিও তাদের মা জয়শ্রী সন্তানদের মাদক নেয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন তারা ধুমপান করতো। ঘটনার দিন সোমবার বাইরে কোথাও যায়নি তারা। তবে দুপুরে একবার বাসার সামনের দোকানে গিয়ে মার্লবোরো সিগারেট কিনেছিল মুনমুন। ফাঁকা বাসায় সিগারেটের মধ্যে গাঁজা ভরে সেবন করতো তারা। মাদক ও পারিবারিক কারণেই দুই কিশোর-কিশোরী আত্মহত্যার পথে ধাবিত হয়েছে বলে নিহতদের স্বজন ও পুলিশের ধারণা। উত্তরা পশ্চিম থানার সাব ইন্সপেক্টর হারুন-অর-রশিদ জানান, গাঁজা, ইয়াবা, সিগারেটসহ নানা ধরনের মাদকে আসক্ত ছিল আলিম ও মুনমুন। তবে মাদকের বিষয়টি সত্য না বলে দাবি করেন জয়শ্রী। তিনি বলেন, আমর সন্তানরা ধুমপান করতো। কিন্তু মাদক সেবন করতো না। দুই সন্তানকে হারিয়ে জয়শ্রী এখন দুঃখভারাক্রান্ত। আত্মীয়-স্বজনসহ তার সহকর্মীদের মুখে একটি প্রশ্ন- স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স এবং দুই সন্তানের মৃত্যুর পর কি নিয়ে বাঁচবেন জয়শ্রী?

মওদুদ সামরিক শাসন নয়, এক–এগারোবিরোধী? by মিজানুর রহমান খান

মওদুদ আহমদের নতুন বই সব সামরিক শাসনবিরোধী, নাকি শুধু এক-এগারোর সামরিক শাসনবিরোধী, তা স্পষ্ট নয়। সদ্য প্রকাশিত তাঁর ১৩তম বইয়ের (বাংলাদেশ ইমারজেন্সি অ্যান্ড দি আফটারম্যাথ) পরতে পরতে দুঃখবোধ ও আক্ষেপ, জেনারেল মইন কেন খালেদা জিয়ার না হয়ে শেখ হাসিনার অনুগত হলেন। মওদুদ আহমদ যেকোনো অবস্থাতেই সেনা হস্তক্ষেপের বিরোধী, বেসামরিক শাসন যত বড় দুঃশাসনই হোক না কেন, তাতে কোনো অবস্থাতেই তিনি সামরিক বাহিনীর ভূমিকা মেনে নেবেন না—তাঁর বইয়ে এমন অঙ্গীকার নেই। তাঁর গুণমুগ্ধ পাঠক হিসেবে পরের বইয়ে এটা পাওয়ার আশা রাখি। কারণ, এরশাদের ‘জুনিয়র পার্টনার’ হওয়াকে ইদানীং তিনি দুর্ভাগ্যজনক মনে করেন, তাঁর বই পড়ে তা মনে হয় না। বরং তিনি সেনাশাসকের গুণকীর্তন করেছেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সমঝোতা পরিচ্ছেদটি পড়লে কারও মনে হতে পারে, তাঁর মূল আক্ষেপ হচ্ছে, ইশ্, এই সমঝোতাটা তাঁর নিজের নেত্রীর সঙ্গে কেন হলো না!

তিনি সামরিক বাহিনী এবং ‘কতিপয় বিপথগামীর’ মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করেছেন। এর মানে হলো, তাঁর চোখে যা গর্হিত ও বেআইনি, তা ‘বিপথগামীরা’ করেছে। আর ফটো আইডির মতো সাফল্যসমূহের মূল্যায়ন করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। ওঁর যুক্তি হলো, ‘এটা বলার কী আছে? তাদের বৈধতাই তো প্রশ্নবিদ্ধ।’ এটি যেন তাঁর একটি পরিষ্কার বুদ্ধিবৃত্তিক পলায়ন। খালেদা জিয়া এবং তাঁর বাহিনী, যার মধ্যে মওদুদ নিজেই একজন, এখন বলছেন, তিনি আইনমন্ত্রী থাকতে বিচারকের বয়সসীমা বৃদ্ধি কীভাবে ঘটল, তা তিনি লিখছেন। কিন্তু এক-এগারোর জরুরি অবস্থার আফটারমাথ বা পরিণাম যিনি লিখলেন, তাঁর হাত থেকেই আমরা পেতে চাইব জরুরি অবস্থার পূর্বাপর। কারণ, তাঁর বর্ণিত অনুমাননির্ভর ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বের’ সঙ্গে আমরা খালেদা জিয়া ও তাঁর সহযোগীদের সত্যিকারের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইব।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব শীর্ষক একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচ্ছেদে চারটি পৃষ্ঠা খরচ করে মওদুদ এক-এগারোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। মওদুদের সন্দেহ যা আমার কাছে প্রতিভাত হয়েছে, তা হলো, প্রায় ১০০ রাজনীতিকের চরিত্র হনন করে দেশটাকে আফগানিস্তান বানানোর একটা পরীক্ষা চলেছিল। ব্যর্থ রাষ্ট্র, তালেবানি রাষ্ট্র দেখতে তাঁর কথায় বন্ধু ‘যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত’ চেয়েছে। তবে তাঁর সরাসরি প্রশ্ন: ‘ভারত এটা দেখতে কী করে খুশি হতে পারে, যখন তার নিজেরই অনেক সমস্যা?’ এই যদি মওদুদের মূল্যায়ন হয়, তাহলে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপি বয়কট করল কেন? আফগানিস্তান বানানোর ষড়যন্ত্র ঠেকাতেই কি? মওদুদ জাতির অসামান্য উপকার করবেন, যদি তিনি এক-এগারোর পূর্বকালের খালেদা-ইয়াজউদ্দিন জুটির প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের পর্দা উন্মোচন করেন। তাহলে পরিষ্কার হবে যে, তাঁদের সংবিধান তছনছটা বিদেশি শক্তির ইন্ধনে ঘটেছিল কি না? বিচারপতি হাসান-বিতর্কের পরে সংবিধান ভাঙার খেলাটা ইয়াজউদ্দিনকে দিয়ে কে খেলিয়ে নিল? লেবাসটা বেসামরিক থাকলেই সাত খুন মাফ?
বাংলাদেশি রাজনীতিকেরা আর কতকাল নিজেদের ক্ষমতার লোভ, অযোগ্যতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও অদূরদর্শিতাকে ‘বিদেশি শক্তির’ অদৃশ্য কলকাঠির কলরব বলে আড়ালে রাখবেন? মওদুদ অ্যাংলো আমেরিকান টমাস পেইনের মতো জাতির বন্দী বিবেক হতে চাইলে আমরা তাঁকে স্বাগত জানাব। তাঁর ক্রোধ আছড়ে পড়েছে যে ‘বিদেশি শক্তির’ ওপর, তারা কি কেবল এক-এগারোতে জেনারেলদের দিয়ে খেলিয়েছে, বেসামরিক লেবাসধারীদের দ্বারা খেলাতে চায় না, নাকি পারে না? বিএনপি-জামায়াত আমাদের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পদ্ধতিগতভাবে কী করে ধ্বংস করেছে, তালেবানি রাষ্ট্র বানানোর এজেন্টদের কারা তখন দুধকলা দিয়ে পুষেছে, সেই বিবরণী তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদের কাছ থেকে বিস্তারিত আশা করি। আর তাহলেই আমরা সম্ভবত লড়াইয়ের উপযুক্ত কৌশল রপ্ত করতে পারব।
পাকিস্তানি মনোভঙ্গি মওদুদের বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়। এই তুলনাকে তিনি ইতিহাসের জায়গা থেকে দেখবেন, সভয়ে সেই ভরসা রাখি। বাঙালিকে চুপ রাখতে বিদেশি শক্তির এজেন্ট বলে গালি দেওয়া তারা অভ্যাসে পরিণত করেছিল। বর্তমান আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। এসব করতে তারা কারও পরামর্শের অপেক্ষায় থাকে? রাজনীতিবিদেরা ইতিহাসের কোন পর্বে জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন? বারংবার পেছন পথে গণতন্ত্রে উত্তরণের সৈনিক হওয়া কি তাঁর ব্যক্তিগত নিয়তি? মওদুদ সম্প্রতি জেল থেকে বেরিয়ে খালেদা জিয়াকে বলেছেন, কেবল অবৈধতা আর নতুন নির্বাচনী গান গাইলে চলবে না, শাসনের নতুন প্যাকেজ দিতে হবে। সেটা কোথায়? বরং এটাই সত্য যে তিনি এখন ‘বই লিখে বাড়ি রক্ষা’ তত্ত্বে জেরবার।
পাকিস্তান প্রসঙ্গে ফিরি। মওদুদ নিরঙ্কুশভাবে এই অভিমত দিয়েছেন, যা পড়ে জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর কথা মনে পড়ে। তিনি ১৯৫৬ সালেই বলেছিলেন, ‘বাঙালিরা যা কিছু করে, তা সব ভারতের হিন্দুরা শিখিয়ে-পড়িয়ে দেয়। এসবই পাকিস্তানের অখণ্ডতা নস্যাতের হুমকি।’ ৫৮ বছর পরেও মওদুদ ও মওদুদীর মূলসুর কাকতালীয় হলেও অভিন্ন। আমাদের রাজনীতিকেরা উত্তরাধিকার সূত্রে এই রোগে আক্রান্ত। মওদুদের নিরঙ্কুশ মূল্যায়ন: ‘বিদেশি শক্তি, যারা দেশটা রসাতলে নিতে চায়, তাদের হয়ে জেনারেল মইন মাঠে নেমেছিলেন।’ তিনি এক-এগারোর দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচারের যে দাবি তুলেছেন, তা যে-কেউ সমর্থন করতে পারেন। কিন্তু আওয়ামী লীগকে ফেলে দিতে আগামী নির্বাচনে জেতা বা ক্ষমতায় যাওয়ার প্রচারণা হিসেবে তাকে ব্যবহারের যেকোনো চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। বিদেশি শক্তির প্রতিভূ হিসেবে মইনকে শনাক্ত করতে গিয়ে মওদুদ স্ববিরোধিতা বা দ্ব্যর্থকতা থেকে মুক্ত নন। মওদুদ একবার লিখেছেন: বিদেশি শক্তি মইনকে শুরুতেই তাঁর ‘নিজস্ব খেলা’ খেলতে দেয়। কিন্তু তিনি ‘শিক্ষানবিশ’। ‘তাঁর নিজস্ব কোনো পরিকল্পনা ছিল না।’ আবার লিখেছেন, ‘তাঁর কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন।’ তাঁর আক্ষেপ কি এ কারণে যে, মইন কেন এরশাদ হতে পারলেন না?
কোনো সন্দেহ নেই, বিএনপির সঙ্গে এক-এগারোতে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়েছে। তবে এও ঠিক যে, বিএনপি-জামায়াতের সরকার ২০০৬ সালে বিদায় নিয়েছিল কেবল দ্বিতীয় মেয়াদে ফিরে আসতে। ইয়াজউদ্দিনকে ব্যবহার করে তারা ৫ জানুয়ারি ধরনের একটি একতরফা নির্বাচন করাতে পারলে বর্তে যেত। সংবিধান ভাঙার অপরাধে অধ্যাপক উদ্দিনের প্রতি অনুরাগ ও জেনারেল উদ্দিনের প্রতি মওদুদের বিরাগ স্পষ্ট। অনেকের মতে, মওদুদ ছিলেন সামরিক বাহিনীর জুনিয়র পার্টনার। এই ভাবমূর্তি ভাঙতে মওদুদ তাঁর বই নামের আগ্নেয়াস্ত্রকে ব্যবহার করবেন, সেটাই মনেপ্রাণে চাইব। সব অবস্থায় রাজনীতিবিদেরাই হাল ধরবেন, এই হোক ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের উভয়ের মন্ত্র। কিন্তু প্রতিষ্ঠান ভেঙে চলতে চাইলে তা স্লোগান হয়েই থাকবে। কেউ দণ্ডিত হলে তাঁকে প্রার্থী হতে দেওয়া যাবে না। ভোটের নিক্তিতে রাজনীতিকের দোষ-নির্দোষ শনাক্ত হয় না। এরশাদ ও তাঁর মতো দুর্নীতিগ্রস্তদের বিচার করতে পারলে তাঁদের তো নির্বাচনে দাঁড়ানোর প্রশ্ন আসে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের তথাকথিত দুর্নীতির মামলার সঙ্গে এরশাদের দুর্নীতির মামলার তুলনা সব থেকে আপত্তিকর। মওদুদ লিখেছেন, ‘পাকিস্তানিরা দুর্নীতি মামলায় জড়ানোর পরে মুজিব জাতির জনক হয়েছেন। আর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এরশাদকে জনগণ নির্বাচিত করে চলেছে।’ মুজিবের মতো এরশাদও একজন ত্যাগী নেতা, এমন ধারণা ছড়ালে কি করে রাজনীতিকদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ ঘটে?
মওদুদের চোখে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়ই নিষ্কলুষ। এক-এগারোর কুশীলবদের সব কাজকর্মে মওদুদের অনাস্থা ভয়ংকর। কিন্তু আস্থাবান তখন, যখন তিনি লিখেছেন, ‘পইপই করে তদন্ত করেও তারা দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে কোনো উল্লেখযোগ্য অভিযোগ আনতে পারেনি। অথচ জনগণের চোখে তাঁদের চরিত্র হননে আষাঢ়ে গল্প প্রচার করা হয়েছে।’ তাঁর দুঃখ, ‘কোনো সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করা হলো না।’ এটা ঠিক বুঝলাম না। তবে মওদুদের দুই নেত্রী-বন্দনায় শেখ হাসিনা সন্তুষ্ট হবেন কি? টাকাপয়সা তছরুপ না করে কোনো রাজনীতিক যদি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না করে তাকে ধ্বংস করেন, দলে গণতন্ত্রের চর্চার পথ রুদ্ধ করেন, তাকে কি আমরা দুর্নীতিগ্রস্ততা বলব না? মওদুদের বয়ানে হাসিনা দুর্নীতিমুক্ত, কিন্তু তাঁর কথায়, ‘সামরিক ক্রীড়নক মইনের ব্যর্থতায় হতাশ বিদেশি শক্তি হাসিনার নেতৃত্বাধীন একটি বশ্য ও অনুগত সরকারের অধিষ্ঠানকে অধিকতর পছন্দ করল।’
মওদুদ লিখেছেন, ‘ঘৃণার কারণে শেখ হাসিনা খালেদাকে ক্ষমতায় দেখতে চাননি। প্রয়োজনে মইনের নেতৃত্বাধীন সামরিক সরকার চেয়েছেন, ৮২-তে আওয়ামী লীগ তাই করেছিল।’ মওদুদ সাহেব আশা করি তাঁর দুর্নীতি ও বিরাজনৈতিকীকরণের সংজ্ঞাটা বদলাবেন। মইনের বিরাজনৈতিকীকরণ ছিল দুই বছরের, আর দুই দলের বিরাজনৈতিকীকরণের প্রক্রিয়া চলেছে দুই দশক ধরে। উপরন্তু গত পাঁচ বছরে যা চলেছে, তা বিরাজনৈতিকীকরণের চূড়ান্ত। তবে ভয় হয়, রাজনীতিকদের দুর্নীতির অভিযোগকে তিনি যেভাবে কেবল ভোটের দ্বারা বিচার করার ওপর ছেড়েছেন, তাতে দেশের আদালত থেকে রাজনীতিকদের বিচার-আচার তুলে দেওয়ার আবদার উঠতে পারে।
মওদুদের বইয়ের পাতায় পাতায় কান্না। ভয়ানক স্ববিরোধিতা। ‘ডাকাতদের বউদের কি কেউ মামলায় জড়ায়?’ এক-এগারোর অভিযুক্তদের স্ত্রীদের তালিকা বইয়ে ছাপিয়ে মওদুদ আলোচনা সভায় প্রশ্ন রেখেছেন। সচেতন নারীরা মওদুদের মনভোলানো কথায় ভুলবেন না। আয়ের সঙ্গে স্বামীদের অসংগতিপূর্ণ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন।
মওদুদ দুই বছর আগে লেখা আরেকটি বইয়ে তথ্য দিয়েছেন যে, তাঁরা যখন ১৪তম সংশোধনী আনেন, তখন বিচারক অপসারণে বাহাত্তরের অভিশংসনপ্রথায় যেতে বিএনপি গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তাভাবনা করেছিল। বিচার বিভাগ পৃথক্করণকালে এটা করা উপযুক্ত হবে বলে তারা তুলে রেখেছিল।
তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব আমাকে জানান, বিচারপতি খায়রুল হক পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় দেওয়ার পর বিএনপি বাহাত্তরে ফিরতে চেয়েছিল। সে ক্ষেত্রে দুই দলের মানসিকতায় কোনো তফাৎ নেই। ভবিষ্যতে ‘বিদেশি শক্তির’ ক্রীড়নক হওয়ার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে চাইলে রাজনীতিকদেরই যোগ্যতা ও মেধার ছাপ রাখতে হবে। প্রতিষ্ঠান গড়তে হবে। অন্যথায় কান্নাকাটি বৃথা। অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা পেতে চাইলে মওদুদকে সেনাশাসনের জন্য মইনের পাশাপাশি এরশাদদেরও বিচার চাইতে হবে। সব পরিস্থিতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ (ছদ্মেবশীসহ) অবৈধ। এ রকম নীতিগত বিরোধিতার শক্ত বাতাবরণ তৈরি করতে না পারলে রাষ্ট্রব্যবস্থার পাকিস্তানীকরণ ঠেকানো যাবে না।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

ইসলামিক স্টেট: নৃশংসতার প্রতিবাদ করুন by হাসান ফেরদৌস

পরপর তিনজন বিদেশি নাগরিক নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। তাঁদের দুজন সাংবাদিক, তৃতীয়জন একজন সাহায্য সংস্থার কর্মী। ভিডিও ক্যামেরার সামনে খঞ্জর উঁচিয়ে তাঁদের গলা কেটে ফেলা হয়েছে। খুন করা হয়েছে আল্লাহর নামে, ইসলামের নামে, ইসলামিক স্টেটের (আদ-দাওলা-ই-ইসলামিয়া) নামে। সারা পৃথিবীর সভ্য মানুষ সে খুনের নিন্দা করেছে, কেবল আমরাই চুপ। নীরবতা যদি সম্মতির লক্ষণ হয়, তাহলে সে কথার অর্থ কি এই যে এই নৃশংস হত্যা আমরা সমর্থন করি?

যাঁরা ভাবছেন, আইসিস (ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া) বা আইএস (ইসলামিক স্টেট) নিয়ে আমাদের মাথাব্যথার কোনো কারণ নেই, এটা যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা, তাঁদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করি। এখানে মুদ্রিত ছবিটি ভালোভাবে লক্ষ করুন। অথবা ইউটিউবে আইএস প্রচারিত ভিডিওটি আরেকবার দেখুন। এই নির্দয়তা ও বর্বরতা দিয়েই কি মুসলমান বাকি বিশ্বের কাছে পরিচিত হবে?
আফগানিস্তানে আল-কায়েদা ও তালেবানের উত্থান দেখে আমরা উদ্বিগ্ন হইনি, কিন্তু চোখ ফেলার আগেই সে বিপদ আমাদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছিল। আল-কায়েদা থেকেই আইএসের উদ্ভব, কিন্তু আল-কায়েদার তুলনায় সে অনেক বেশি শক্তিধর ও ভয়াবহ। সিরিয়া ও ইরাকের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল ইতিমধ্যে এই দলের নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং সেখানে তারা নয়া খেলাফতের পত্তন করেছে। এই দলের মূল শক্তি এসেছে সাদ্দাম হোসেনের সেনাবাহিনীর সাবেক সুন্নি সদস্যদের কাছ থেকে। সাদ্দামের পতনের পর যে শিয়া সরকার ইরাকে মার্কিন তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে তাদের স্থান হয়নি। এবার তারা এককাট্টা হয়েছে। ইরাক ও সিরিয়ার তেলের ওপর আংশিক নিয়ন্ত্রণ অর্জিত হওয়ায় এই দলের দৈনিক আয় প্রায় তিন মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বে এত ধনী জিহাদি গ্রুপ আর নেই, আগে কখনো ছিল না। আইএসের সাফল্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সুন্নি জিহাদি সমর্থকদের মধ্যে বিপুল উৎসাহের সঞ্চার করেছে, দলে দলে তারা সিরিয়া ও ইরাকে আসছে নয়া খেলাফত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নিতে।
মার্কিন ও ব্রিটিশ সূত্রগুলো জানিয়েছে, ৭৪টি দেশের অন্ততপক্ষে ১৫ হাজার বিদেশি জিহাদি আইএসে যোগ দিয়েছে। এরা যাচ্ছে, ভয় শুধু তা নিয়ে নয়। একসময় এরা যার যার দেশে ফিরে আসবে জিহাদি মন্ত্র নিয়ে এবং লঙ্কাকাণ্ড ঘটাবে। সন্ত্রাসী তৎপরতার জন্য পুরো এক বাহিনী মুজাহিদের প্রয়োজন নেই, এক বা দুজন হলেই চলে। আর ভয়টা সেখানে। স্বাভাবিকভাবে ভীত ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেন ইতিমধ্যে আইএসে যোগ দিয়েছে তার দেশের এমন কোনো নাগরিক যাতে নিজ দেশে না ফিরতে পারে, সে ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে। একই চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রেরও। এমনকি মুসলিমপ্রধান তুরস্ক ও তিউনিসিয়াও নিজ নাগরিকদের কীভাবে ঠেকানো যায়, সে ব্যাপারে সলাপরামর্শ শুরু করেছে।
মৌলবাদী উত্থানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আগে থেকেই ক্ষতাক্ত। আইএসের সাফল্য সেখানে মৌলবাদীদের মধ্যে নতুন উৎসাহের সঞ্চার করবে। ‘খলিফা’ আবুবকর বাগদাদি দুই মাস আগে মসুলে নিজের খেলাফত প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করতে গিয়ে বলেছিলেন, বিশ্বের যেখানে একসময় মুসলিম রাজত্ব ছিল, আইএস সেখানেই কায়েম হবে। তিনি সরাসরি ভারতের নাম উল্লেখ করেছিলেন, কারণ সেখানে দীর্ঘদিন মুসলমানদের রাজত্ব ছিল। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের নাম উল্লেখ না করলেও এই দুই মুসলিমপ্রধান দেশও যে তাঁর টার্গেট, তাতে সন্দেহ নেই।

সবচেয়ে বেশি ভয় পাকিস্তানকে নিয়ে। দীর্ঘদিন থেকে সেখানে মৌলবাদী শক্তিগুলো সক্রিয়। অনেক ক্ষেত্রে সামরিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ২০০ মৌলবাদী গ্রুপ সেখানে তৎপর। ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ফল দাঁড়িয়েছে এই যে এখন পাকিস্তানের ৬০ শতাংশ মানুষ শরিয়াভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে। তার চেয়েও ভয়ের কথা, সে দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নাগরিকের মধ্যে জিহাদি আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন রয়েছে। আইএসের প্যান-ইসলামিজমের মন্ত্র অনেক মুসলমানকেই উজ্জীবিত করবে, বাগদাদ-বসরার স্বপ্ন তাদের নেশা ধরাবে। পাকিস্তান পিস স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ আমির রানা সম্প্রতি করাচির ডন পত্রিকায় এক নিবন্ধে লিখেছেন, তালেবান দুর্বল হয়ে পড়েছে ও জিহাদি হুমকি সেখানে স্তিমিত বলে যারা মনে করে, আইএসের উত্থানে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। পাকিস্তানের ভেতরে তৎপর জিহাদি গ্রুপগুলোর আইএসের খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে শামিল হওয়া খুবই স্বাভাবিক। শুধু আদর্শগত বা আর্থিক সমর্থন নয়, আইএস-অনুপ্রাণিত ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব খোরাসান’ প্রতিষ্ঠায় তারা সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে পারে।
ইরাক-পরবর্তী আল-কায়েদাভিত্তিক যে মৌলবাদী আন্দোলন, তার একটি আপাত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তব্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে হটে এসেছে বটে, কিন্তু তার আগ্রাসী চরিত্রের মৌল কোনো পরিবর্তন হয়নি। সম্ভবত সে কারণে আল-কায়েদা বা আইএস-জাতীয় চক্রের প্রতি আমাদের সমালোচনা কার্যত অনুপস্থিত। কিন্তু আল-কায়েদাপ্রভাবিত আন্দোলন যেখানেই দানা বেঁধেছে, তার আসল শিকার হয়েছে সেসব দেশের নিরীহ মানুষ। ইরাক, সিরিয়া অথবা মালি ও নাইজেরিয়ার দিকে তাকান। তাকান নিকটবর্তী পাকিস্তানের দিকে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সেখানে মৌলবাদকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। আল-কায়েদা ও তার তালেবান সহযোগীরা সে রাষ্ট্রের ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। তার ফল হয়েছে এই যে অন্তর্ঘাতী সামরিক সংঘর্ষে সেখানে জনজীবন এখন বিপন্ন। প্রমাণ হিসেবে আমি ডন পত্রিকার একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের দিকে আপনাদের নজর টানব। রাফিয়া জাকারিয়া লিখেছেন, করাচির রাস্তায় এখন প্রতিদিন মানুষের লাশ। শিয়া-সুন্নি হানাহানিতে প্রতিদিন ‘করাচি এখন একটি মৃত মানুষের শহর। এখানে নিহত হয় দরিদ্র ও নিঃস্ব মানুষ, নিহত হয় রাজনৈতিক কর্মী। নিহত নাগরিকদের লাশ শহরের মর্গে পড়ে থাকে। যদি কেউ তাদের শনাক্ত করতে না আসে, তাহলে জনকল্যাণকর্মীরা কাফনের কাপড়ে জড়িয়ে তাদের কবর দেন। তাদের কথা কেউ মনেও রাখে না।’ শুধু করাচি নয়, রাজধানী ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতে এই বছরে যে সংখ্যায় মানুষ ধর্মীয় হানাহানিতে নিহত হয়েছে, তা আগের ১০ বছরের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
মৌলবাদের সহিংস চরিত্রের সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে, ফলে উদ্বিগ্ন আমাদেরও হওয়া উচিত। সামাজিক তথ্যমাধ্যমে ইতিমধ্যে ইসলামিক স্টেটের পক্ষে প্রচারণা শুরু হয়েছে। বাংলায় ই-মেইল চালাচালি শুরু হয়েছে। যাঁরা মনে করেন মৌলবাদী এই উত্থান আমাদের স্পর্শ করবে না, তাঁদের শুধু পাকিস্তানের উদাহরণটি মাথায় রাখতে বলি।
আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নতুন যে কোয়ালিশন গড়ার চেষ্টা হচ্ছে, এখন পর্যন্ত তার জন্য অর্থ, অস্ত্র ও লোকবল আসছে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে। মার্কিন কমেডিয়ান জন স্টুয়ার্ট ঠাট্টা করে বলেছেন, এই কোয়ালিশনের বর্তমান চেহারা বড় বেশি ‘খ্রিষ্টান’। কথাটা মিথ্যা নয়। আরব ও মুসলিম দেশগুলো মুখে মুখে তাদের সমর্থন জানিয়েছে বটে, কিন্তু বাস্তবে সে সমর্থন কত দূর কাজে আসবে, তা পরিষ্কার নয়। পশ্চিমের সমর্থনে যেকোনো অভিযানে অংশগ্রহণে তাদের স্বভাবতই দ্বিধা রয়েছে। কিন্তু আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই একা পশ্চিমের হাতে ছেড়ে দিলে তা কখনোই সফল হবে না। এই লড়াই শুধু সামরিক নয়, আদর্শগত। সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পশ্চিমের জিত হলেও আদর্শগত যুদ্ধে সে বিজয় অসম্ভব।
শুদ্ধ ইসলামি রাজত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আইএস আমাদের দেড় হাজার বছর আগে ফিরে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। সে আমন্ত্রণের জবাবে আধুনিক, বহুপক্ষীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে পাল্টা ন্যারেটিভ নির্মাণের দায়িত্ব আমাদের। এই কাজে বিলম্ব হলে তার খেসারত আমাদেরই ভোগ করতে হবে।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার মূল্য by জেফরি ডি স্যাকস

যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে স্কটল্যান্ডের গণভোট গতকাল বৃহস্পতিবার হয়ে গেছে। এ মুহূর্তে সারা দুনিয়ার নজর এর ফলাফলের দিকে। কিন্তু এ সময় শুধু স্কটল্যান্ডই নিজেদের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করতে চাইছে, ব্যাপারটা এমন নয়। দুনিয়ার নানা প্রান্তেই স্বাধীনতার আন্দোলন হচ্ছে, ১৯৮০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৯টি নতুন রাষ্ট্র জাতিসংঘে যোগ দিয়েছে। স্কটল্যান্ডের মানুষেরা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে আরও অনেকেই অনুপ্রাণিত হবে।

মূলত চারটি দাবির ওপর ভিত্তি করে স্কটিশরা এই স্বাধীনতার দাবি তুলেছে। প্রথমটি হচ্ছে সাংস্কৃতিক: স্কটিশ জনগণের স্বরূপ রক্ষা ও তা জোরদার করা। দ্বিতীয়টি আদর্শিক: স্কটল্যান্ডকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর আদলে সামাজিক গণতন্ত্রী রাষ্ট্রে পরিণত করা। তৃতীয়টি রাজনৈতিক: গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া। আর চতুর্থ কারণটি অর্থনৈতিক: নর্থ সির তেল ও গ্যাসের ওপর নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা।
যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক নেতারা ও ইউরোপীয় সরকারগুলো স্কটিশদের ‘না’ ভোট দিতে উৎসাহিত করেছেন। এই ‘না’ বাদীরা বলছেন, স্কটল্যান্ড স্বাধীন হলে উল্লিখিত দাবির খুব সামান্যই পূরণ হবে। কিন্তু স্বাধীনতা এলে দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষতিই হবে বেশি, কারণ এতে দেশটি থেকে শিল্পকারখানা সরে যেতে পারে, ফলে কর্মসংস্থানের অভাব হবে। তদুপরি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোয় স্বাধীন স্কটল্যান্ডের ঠাঁই না-ও হতে পারে।
এই বিতর্ক নিয়ে দুনিয়ার মনোভাব কী হতে পারে? এই স্বাধীনতা কি সাংস্কৃতিক পরিচয় ও স্বায়ত্তশাসনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হঠাৎ প্রাপ্ত সফলতা হিসেবে গণ্য হবে? অথবা এটাকে কি ইউরোপের অস্থিতিশীলতার আরেকটি উৎস হিসেবে দেখা হবে, যার কারণে ইউরোপ দুর্বল হয়ে পড়ছে? যার প্রভাব দুনিয়ার অন্যান্য স্থানেও অনুভূত হবে?
বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের কারণে ব্যাপক অস্থিতিশীলতা দেখা যেতে পারে। কসোভো, দক্ষিণ সুদান, কুর্দিস্তান ও ক্রিমিয়ায় যে সংকট চলছে, সে কথা একবার ভাবুন। তার পরও জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলন আরও শান্তিপূর্ণ ও নির্ঝঞ্ঝাটে পরিচালনা করা যায়। যেমন, ১৯৯৩ সালে চেকোস্লোভাকিয়া ভেঙে চেক রিপাবলিক ও স্লোভাকিয়া গঠন হলেও এর কোনো সুদূরপ্রসারী প্রভাব দেশ দুটিতে অনুভূত হয়নি—এটা ‘মখমল বিচ্ছেদ’ হিসেবে সুপরিচিত। উভয়ই এই বিচ্ছেদ মেনে নিয়েছিল, তারা জানত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের ভাগ্য জড়িয়ে আছে, ফলে তারা এর ওপর নজর দেয়।
স্কটল্যান্ড হয়তো শেষমেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। এরপর যুক্তরাজ্যের (বর্তমান বিতর্কে ‘আরইউকে’ হিসেবে আখ্যা পেয়েছে) অন্য তিন রাষ্ট্র ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের কাজ হবে স্কটল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনা করে দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে এই স্বাধীনতার শর্ত প্রণয়ন করে ফেলা: যুক্তরাজ্যের ঋণ পরিশোধ, সমুদ্রের তেল-গ্যাসসহ অন্যান্য সম্পদ ভাগাভাগি। উভয় পক্ষকেই তাদের দাবিতে ন্যায়সংগত ও বাস্তবানুগ হতে হবে।
একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত হবে সব আইন ও গণতান্ত্রিক নীতিমালা মেনে চলা সাপেক্ষে স্কটল্যান্ডের সদস্যপদ টিকিয়ে রাখা। একই ভাবে, ন্যাটোরও উচিত হবে দেশটির সদস্যপদ বাতিল না করা (যদিও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি মার্কিন ও ব্রিটিশ পরমাণু সাবমেরিন ঘাঁটি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা সমস্যাজনক হবে)।
স্কটল্যান্ড সাময়িকভাবে ব্রিটিশ পাউন্ড ব্যবহার করবে, স্কটল্যান্ড ও আরইউকে উভয়ই হয়তো এ বিষয়ে রাজি হতে পারে। কিন্তু শিগগিরই তারা হয়তো স্কটিশ পাউন্ড বা ইউরো চালু করবে। এসব আর্থিক আয়োজন যদি স্বচ্ছতা বা সহযোগিতার ভিত্তিতে হয়, তাহলে এসব নির্বিঘ্নে বা আর্থিক বিশৃঙ্খলা ছাড়াই ঘটতে পারে।
কিন্তু আরইউকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো যদি প্রতিশোধপরায়ণতার মনোভাব নিয়ে স্কটিশদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাহলে ব্যাপারটা খুব নোংরা হয়ে যাবে, এর জন্য মূল্যও দিতে হবে অনেক। যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো থেকে স্কটল্যান্ডকে দূরে রাখা হয়, তাহলে সেখানে এক আর্থিক ক্ষেত্রে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে, সে কারণে স্কটল্যান্ড ও আরইউকে উভয়েরই আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
শানে নজুল হচ্ছে, এই বিচ্ছেদ কোনো অনিবার্য ব্যাপার নয়, এটা ইচ্ছার ব্যাপার। আরইউকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো ‘হ্যাঁ’ ভোটের ব্যাপারে কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। আর সে ক্ষেত্রে সদ্য স্বাধীন স্কটল্যান্ড তার আপসরফার ক্ষেত্রে কতটা ন্যায়সংগত অবস্থান নেয়। তারা ঠান্ডা মাথায় কাজ করলে এই স্বাধীনতার জন্য তেমন কোনো মূল্য দিতে হবে না। যেসব অঞ্চলে ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো মুরব্বি নেই, সেখানে এরূপ পৃথক হওয়ার বিপদ অনেক বেশি। সে ক্ষেত্রে এককভাবে স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন হলে ও জাতীয় সরকার তা প্রত্যাখ্যান করলে, সে দেশ দুটোর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো সরাসরি যুদ্ধও শুরু হয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুগোস্লাভিয়া ও সম্প্রতি সুদানের ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই দেখা গেছে।
উল্লিখিত ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতার পর গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়, এসব সংকট একপ্রকার দীর্ঘস্থায়ীও হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যেসব রাষ্ট্র নতুন গঠিত হয়েছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো তাদের সবাইকে সদস্যপদ দেয়নি। ফলে এক গুরুতর ভূরাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়।
একবিংশ শতকে ভূরাজনীতি শুধু জাতিরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হতে পারে না। মূল ইস্যুগুলোর অধিকাংশই জাতির কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয়: বাণিজ্য, অর্থ, আইনের শাসন, নিরাপত্তা ও পরিবেশ। এটা আবার নির্ভর করে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি ও কার্যকারিতার ওপর। স্কটল্যান্ড স্বাধীন হলেও দেশটির উচিত হবে ইউরোপীয় ও বৈশ্বিক আইন ও কর্তব্যের আওতায় থাকা, তারা হয়তো সেটা করবেও।
ব্যক্তিগতভাবে আমি স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার সমর্থক, এটা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও গণতন্ত্র সংহত করবে। তবে এই সমর্থনের একটি পরিপ্রেক্ষিত আছে, আমার আশা, স্কটল্যান্ড ও আরইউকে উভয়ই একটি কার্যকর ও শক্তিশালী ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর অংশ হয়ে থাকবে।
স্কটল্যান্ড স্বাধীন হলে নিশ্চিতভাবেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল হবে, গণভোটের ফলাফল হয়তো আজকের মধ্যেই জানা যাবে। কিন্তু স্বাধীন হওয়ার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো যদি স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত না করে, তাহলে আক্ষরিক অর্থেই বিপর্যয় নেমে আসবে। না, শুধু স্কটল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্যই নয়, ইউরোপের গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার জন্যও তা বিপর্যয় বয়ে আনবে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জেফরি ডি স্যাকস: কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকসই উন্নয়নের অধ্যাপক।

ইসলামিক স্টেটকে কি নিশ্চিহ্ন করা সম্ভব? by আলী রীয়াজ

জঙ্গি সংগঠন আইএসের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যে কোয়ালিশন গড়ে উঠেছে, তার লক্ষ্য সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এই সংগঠনের বিলুপ্তি ঘটানো। প্যারিসে আনুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্য দিয়ে এই কোয়ালিশন গড়ে উঠেছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির সমন্বয়ে। গত কয়েক দশকে আমরা দেখেছি, কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে অভিযানের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো এই যে তারা একটি জায়গায় সমবেত থাকে না। যদিও আইএসকে একটি ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা নিয়ে কারও কারও আপত্তি থাকতে পারে যে এই সংগঠন একটি নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে এখনো সন্ত্রাসী তৎপরতা চালায়নি, কিন্তু তার আক্রমণের শিকার হয়েছে বিদেশি নাগরিকেরা এবং এই সংগঠনের হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে ইরাক ও সিরিয়ার বাইরের নাগরিকেরাও এবং তাদের লক্ষ্য যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তা অনস্বীকার্য। আইএসের অবস্থান চিহ্নিত নির্দিষ্ট এলাকায়৷ ফলে তার বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানো সম্ভব এবং এটি কোয়ালিশনের জন্য একটি অনুকূল অবস্থা। দ্বিতীয় অনুকূল বিষয় হলো এই যে এই কোয়ালিশনে রয়েছে ১০টি আঞ্চলিক মুসলিম দেশ। তাদের সমর্থন ও অংশগ্রহণের ফলে এই অভিযানকে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযান বলে চিহ্নিত করা যাবে না।

কিন্তু এসব সত্ত্বেও এই অভিযানের সাফল্য নিয়ে এবং তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত, সামরিক কৌশলের বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। এ যাবৎ পশ্চিমা শক্তিগুলো বলেছে যে তারা ইরাককে সাহায্য করবে এবং এ পর্যন্ত বিমান হামলার বাইরে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সেনা পাঠানোর ব্যাপারে তাদের অনীহা জানিয়েছে। ২০০১ সালে আফগানিস্তান অভিযান এবং ২০০৩ সালে ইরাক হামলার অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো দেশই আর প্রত্যক্ষভাবে কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে রাজি নয়। কিন্তু কেবল বিমান হামলার মাধ্যমে প্রায় ৩০ হাজার সদস্যের একটি বাহিনীকে পরাজিত করা এবং তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলো উদ্ধার করা সম্ভব বলে কোনো সামরিক বিশেষজ্ঞই মনে করেন না। তার জন্য যে স্থলশক্তি দরকার, সেটা যে ইরাকের নেই, তা সবাই বুঝতে পারেন। কেননা, এই ইরাকি সেনাবাহিনীই আইএসের আক্রমণের মুখে পশ্চাদপসরণ করেছে এবং তাদের ফেলে আসা অস্ত্রই জঙ্গিদের বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এসব জানা সত্ত্বেও এ বিষয় নিয়ে কেউই আলোচনায় খুব বেশি উৎসাহী নয়।
তবে মনে রাখা দরকার যে সামরিক কৌশলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই পরিস্থিতি তৈরির পেছনে যে কারণ, তার সমাধান খোঁজা। এই কোয়ালিশনে অনুপস্থিত দুই দেশের ভূমিকা আইএসের উত্থানের পেছনে কাজ করেছে, তা হলো ইরান ও সিরিয়া। যদিও তারা উভয়েই চায় যে আইএসের শক্তি ক্ষয় হোক এবং তাদের বিলোপ হোক, কিন্তু দুই দেশের ক্ষমতাসীনেরা চায় না তাতে এমন কোনো শক্তির হাত জোরদার হোক, যা তাদের জন্য হুমকি হতে পারে। যেমন ইরান চায় যে সুন্নি গোষ্ঠী হিসেবে আইএসের অবসান ঘটুক, এতে ইরাকে সুন্নিদের অবস্থানও দুর্বল হবে এবং শিয়ানিয়ন্ত্রিত সরকার জোরদার হবে। আইএস প্রশ্নে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের মিল থাকলেও সিরিয়া প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। যেহেতু আইএসের একটি অংশ সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে, সেহেতু আসাদ সরকার চায় যে এদের শক্তির অবসান হোক; কিন্তু তারা মোটেই এটা চায় না যে আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানে নেমে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় বিমান হামলা শুরু করুক বা এই সুযোগে দুর্বল হয়ে পড়া আসাদবিরোধীরা আবার শক্তি সঞ্চয় করুক।
আইএসের প্রতি সৌদি আরবের সক্রিয় সমর্থনের কথা অনেক দিন ধরেই জানা। সৌদি ক্ষমতাসীনেরা নিঃসন্দেহে উদ্বিগ্ন যে আইএস অতিরিক্ত সাফল্য লাভ করলে তা তাদের জন্যই হুমকি হয়ে উঠবে। কিন্তু আইএসের পরাজয় হলে এই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের মধ্যকার প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে সৌদি আরব দুর্বল হবে কি না, সেটাও তাদের বিবেচ্য। ফলে তারা এই অভিযানে কতটা ভূমিকা রাখতে চাইবে, সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আইএসের উত্থানের অন্যতম কারণ সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ। সেখানে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের দাবিতে আন্দোলনের গোড়াতে পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থনপুষ্টদের একাংশ যে এই নতুন সংগঠনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে, তা সরবে না বলা হলেও ওয়াশিংটন-লন্ডনের নীতিনির্ধারকেরা সেটা জানেন। এই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে বলেই জানা যায়। একাংশের ধারণা যে সিরিয়ার সংকটের গোড়াতেই আসাদবিরোধীদের সুস্পষ্টভাবে সমর্থন ও সাহায্য প্রদান করলে এই অবস্থার সূচনা হতো না। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন তা-ই মনে করেন বলে ফেব্রুয়ারি মাসে এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছিলেন। অন্যদিকে আরেক অংশের ধারণা, সে সময় কাউকে প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য না করাই সঠিক হয়েছে। কেননা, এর মধ্যেই আইএসের লোকেরা ছিল, তাদের সাহায্য করলে এখন যুক্তরাষ্ট্রই বিপদগ্রস্ত হতো। যেভাবেই দেখা হোক, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ অব্যাহত রেখে আইএসের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান সফল হবে কি না, তা নিঃসন্দেহে প্রশ্নসাপেক্ষ। আসাদ সরকার বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ নিয়ে একত্রে কাজ করতে রাজি। কিন্তু তার মানে হবে আসাদ সরকারকে মেনে নেওয়া। অন্যদিকে, যদি আসাদ সরকারকে না জানিয়ে আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশ বিমান হামলা চালায়, তা হবে আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ।
আইএসের মতো সংগঠনকে আদৌ নিশ্চিহ্ন করা যায় কি না, সে বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা সব সময়ই সন্দেহ প্রকাশ করে এসেছেন। আল-কায়েদার বিরুদ্ধে অভিযানের সময় বারবার বলা হয়েছে যে সংগঠন হিসেবে একে অস্তিত্বহীন করে ফেলার ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। যা করা যেতে পারে তা হলো তাকে নেতৃত্বহীন করে ফেলা, তার আবেদন অকার্যকর করা এবং আদর্শিকভাবে এ ধরনের আদর্শের বিরুদ্ধে প্রচারণা অব্যাহত রাখা। তা ছাড়া যেসব কারণে এ ধরনের সংগঠনের প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হওয়ার যে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ, সে বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া। এখন আবার যখন আইএসের ধ্বংসসাধনের ও নিশ্চিহ্ন করার কথা বলা হচ্ছে, এই আলোচনা আবারও ফিরে এসেছে।
আইএসের বিরুদ্ধে অভিযানের এসব সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে প্রশ্নের উত্তর এক দিনে পাওয়া যাবে না। কেননা, এমন ধারণা করার কারণ নেই যে এই অভিযান হবে স্বল্প সময়ের অভিযান। যে কারণে প্যারিসের ঘোষণাপত্রে কেবল সামরিক অভিযানের কথা বলা হয়নি; বলা হয়েছে আঞ্চলিক সীমান্তগুলো নিয়ন্ত্রণের কথা, আইএসের অর্থের সংস্থান বন্ধের ব্যবস্থা করা, বিদেশিদের এই যুদ্ধে যোগদান বন্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়া এবং এই আদর্শের মোকাবিলা করার কথা।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

কাশ্মীরের ধর্মনিরপেক্ষতা পুনরুদ্ধার by কুলদীপ নায়ার

যে পণ্ডিতেরা ফিরে এসেছেন, তাঁদের অনেকের মনই দুঃখ ভারাক্রান্ত। তাঁরা লক্ষ করেছেন, ধর্মনিরপেক্ষতার আবহ আসলে অতীতের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। যেখানে তাঁরা ও তাঁদের পূর্বপুরুষেরা সুখে-দুঃখে বাস করেছেন, সে জায়গাতেই তাঁরা এখন আগন্তুকে পরিণত হয়েছেন।
ধর্মীয় পক্ষপাত হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তুলে দিয়েছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগে এই পণ্ডিতেরা বাড়ি ছাড়েন। তাঁরা এখন ফিরে এলেও এলাকার পরিস্থিতিতে বন্ধুত্বের আবহ ফেরেনি। অধিকাংশ পণ্ডিতই জম্মু শহর ও তার আশপাশে থাকেন, কিন্তু তাঁরা থাকেন শরণার্থী শিবিরে, নিজেদের বাড়িতে নয়। জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর ফারুক আবদুল্লাহ বিষয়টি খতিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এতে কোনো কাজ হচ্ছে না।
পাঞ্জাবের হিন্দুদের মতো কাশ্মীরের পণ্ডিতদের ফেরার কোনো ঘর নেই। তাঁরা উভয়েই ফিরতে চান। কিন্তু যে জঙ্গিত্বের কারণে তাঁদের ঘর ছাড়তে হয়েছিল, সেটা এখনো বেশ শক্তিশালী।
বিজেপির বড় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ওমরকে অনুরোধ করেছেন, এই পণ্ডিতদের যেন ভূমি দেওয়া হয়। এ কথা বলে তিনি আসলে পুরো ব্যাপারটাকে রাজনৈতিক করে ফেলেছেন। রাজনাথ সিং এ কথা বলার কে? তিনি এই কাশ্মীরি পণ্ডিতদের স্বার্থ সংরক্ষণ করছেন না, আবার এই পণ্ডিতেরা কেউই বাইরের মানুষ নন। তাঁরা কাশ্মীরি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ভোগান্তির বিরুদ্ধে পণ্ডিতদের প্রতিবাদ বোধগম্য, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাঁদের স্বার্থ দেখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনীতি ফেঁদে বসবেন।
এটা হিন্দু-মুসলমান ইস্যু নয়, এটার গায়ে সে রং চড়ানোও ঠিক নয়। সব রাজনৈতিক দল মিলে এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত যাতে তাঁরা ফিরে আসতে পারেন। তাঁদের অধিকাংশেরই সম্পদ অক্ষত আছে, আর বাকিদের জমি যাঁরা জোরপূর্বক দখল করেছেন বা অন্যভাবে দখলভোগ করছেন, সেগুলো তাঁদের কাছ থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে।
হুরিয়ত নেতা সৈয়দ শাহ বলেছিলেন, এটা হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপার নয়। সে সময় পর্যন্ত গিলানির গায়ে মৌলবাদের হুল ফোটেনি। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়তো হয়নি, কিন্তু তাঁর নীরবতা সবার কাছেই দৃষ্টিকটু ঠেকেছে। গিলানির উচিত ছিল, তাঁর আগের অবস্থান পুনরায় ব্যক্ত করা: কাশ্মীরি পণ্ডিতেরা আমাদের সংস্কৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ, এটাকে সাধারণ হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নের সঙ্গে মেলানো উচিত হবে না। গিলানি আমাকে বলেছিলেন, কাশ্মীরের সামগ্রিক সংকটের সঙ্গেই পণ্ডিতদের এই সমস্যা সমাধান করা উচিত—এ মর্মে তিনি যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, সেটা আসলে ভুল ছিল।
যাঁরা মনে করেন কাশ্মীর আসলে দেশভাগের একটি অপূরিত কাজ, রাজনাথ সিংয়ের উল্লিখিত মন্তব্য সে বিতর্কের দ্বার উন্মোচিত করেছে, এটার আসলে কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল না। তাঁরা ধর্মের ভিত্তিতেই রাষ্ট্রভাগের পক্ষ নিয়েছেন। পাকিস্তানেও তাঁরা এ প্রত্যয়ে শাণ দিয়ে বলবেন, যে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়েছিল, সেটা কাশ্মীরের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হোক। ওমর যদি পণ্ডিতদের জমি দেওয়ার আহ্বানে সাড়া দেন, তাহলে আসলে সমস্যাটির গায়ে সাম্প্রদায়িক রংই চড়ানো হবে।
অনেক চরমপন্থী দাবি করেছে, কাশ্মীরি পণ্ডিতদের আলাদা জমি ও নিরাপত্তা দেওয়া হোক। বর্তমানে চার লাখ পণ্ডিতের মধ্যে ৩০ হাজার কাশ্মীরে অবস্থান করছেন। শেখ আবদুল্লাহ যত দিন কাশ্মীরের প্রভাবশালী ছিলেন, তত দিন সেখানে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। আবদুল্লাহ হয়তো বলবেন, কাশ্মীর ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে রাজ্যটির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিরোধিতা করেছেন তিনি। সাম্প্রদায়িকতার চেয়ে বহুত্ববাদের ওপর তিনি আস্থাশীল, সে কারণেই তিনি একটি ইসলামি রাষ্ট্রে যোগ দিতে চাননি।
এমনকি স্বাধীনতাসংগ্রামের সময়ও তিনি কংগ্রেসের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন, মুসলিম লিগের নয়৷ যদিও মুসলিম লিগ মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি করেছিল। নয়াদিল্লি যে শক্তিশালী কেন্দ্র সরকারের নীতি গ্রহণ করেছিল, সেটার বিরোধিতা করার কারণে তাঁকে মূল্য দিতে হয়েছে। কোডাইকানালে তাঁকে ১২ বছর বন্দী রাখার পরও তিনি নেহরুর পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। কারণ, নেহরু তাঁকে ভুল বুঝলেও পরে তিনি তাঁর ভুল বুঝতে পারেন। শেখ দাবি করেছিলেন, কেন্দ্রের হাতে শুধু তিনটি বিষয় থাকবে— পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ, দেশভাগের সময় যেটা প্রস্তাব করা হয়েছিল। এটি নিয়েই নেহরু তাঁকে ভুল বুঝেছিলেন।
শেখের একটি কথা খুব বিখ্যাত হয়েছিল, কাশ্মীরিরা ভারতীয় গম খেলে যদি ধরা হয় তারা ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে সরে এসেছে, তাহলে তারা সে গম খাবে না। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ছিল, কিন্তু ভারত বেশি দিন তার বহুত্ববাদী রূপ ধরে রাখতে পারবে কি না, সে নিয়ে তাঁর মনে শঙ্কা ছিল।
মুখ্যমন্ত্রী ওমর ফারুকের মনেও সে শঙ্কা আছে বলে জানা যায়। তাঁর ধারণা, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একজন মুসলিমবিদ্বেষী মানুষ। তবে কাশ্মীরের বন্যাকবলিত এলাকা হেলিকপ্টারে পরিদর্শন করার পর মোদি ও ওমর একই মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন, এটা বেশ ইতিবাচক ব্যাপার। মোদি এই বন্যাকে জাতীয় বিপর্যয় হিসেবে আখ্যা দিয়ে এক হাজার কোটি টাকার ত্রাণ বরাদ্দ করেছেন, এর মাধ্যমে তিনি সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ ছাপিয়ে গেলেন।
এতে হয়তো মোদির মুসলিমবিদ্বেষী ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও দূর হবে (কাশ্মীরের ৮০ শতাংশ মানুষই মুসলমান)। পাকিস্তানের বন্যাকবলিত মানুষদের সহায়তা করতে মোদি দেশটির সরকারের প্রতি তাঁর সদিচ্ছার কথা জানিয়েছেন, এটাও ইতিবাচক একটা ব্যাপার। এটা দুই দেশের মধ্যকার শীতল সম্পর্কে কিছুটা উষ্ণতার জোগান দেবে। পাকিস্তানও অনুরূপ ইঙ্গিত দিয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রীকেই জানতে হবে, দুঃখ-দুর্দশার কোনো জাতপাত নেই, রাজনীতি নেই।
কাশ্মীরি জনগণ প্রশিক্ষিত মানুষদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, এটা তাঁরা বোঝেন কি না জানি না। এই পণ্ডিতেরা ভারতের অন্যান্য অংশে গিয়ে চাকরি করছেন, তাঁরা অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ। রাজ্যটি তাঁদের এই মর্যাদার চাকরি দিতে চাইলেও তাঁরা সেখানে যেতে ইচ্ছুক নন। কাশ্মীর প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ তরুণদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সেটা পেলে কাশ্মীরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতো।
তার পরও শ্রীনগরের উচিত হবে এই পণ্ডিতদের ফেরত আনার চেষ্টা করা। এতে তাদের ধর্মনিরপেক্ষতার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার হবে, বছরের পর বছর ধরে তারা যেটা ভোগ করেছে। এ ক্ষেত্রে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হলে কাশ্মীর সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, যদিও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে কাশ্মীরের জনগণ ভালো বেতনে কর্মরত আছেন।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

আইএসের উত্থান ও শক্তির উৎস by আলী রীয়াজ

ইরাক ও সিরিয়ার একাংশজুড়ে প্রতিষ্ঠিত কথিত ইসলামিক স্টেট বা আইএসের দখল ও আধিপত্য এবং সংগঠনটির জঙ্গি কার্যক্রম মোকাবিলার উদ্দেশ্যে প্যারিসে ৩০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিদের সম্মেলনে যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, সেটা বৈঠকের আগেই নির্ধারিত ছিল। যে দেশগুলো মনে করেছে, এই গোষ্ঠীকে অবিলম্বে মোকাবিলা করা দরকার এবং তার জন্য সম্মিলিত সামরিক অভিযানের কোনো বিকল্প নেই, তারাই সেখানে তাদের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। যারা এই বৈঠকে আমন্ত্রিত হয়নি, সে রকম অনেক দেশও এই বিষয়ে অভিন্ন মত পোষণ করে যে আইসিসের ধ্বংসসাধন না করতে পারলে এই অঞ্চলে গত কয়েক বছরে যে সহিংস পরিস্থিতি চলছে, তাকে ম্লান করে দিয়ে আরও বেশি প্রাণঘাতী অবস্থার উদ্ভব ঘটবে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর বাইরের দেশগুলো, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর ধারণা, ইতিমধ্যেই দেরি হয়ে গেছে। এই শক্তি সম্ভবত তাদের দেশেও আঘাত হানবে। কিন্তু প্যারিসের এই বৈঠকে অর্জিত ঐকমত্য বাস্তবায়ন সম্ভব কি না, সম্ভব হলে কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং তার পরিণতি কী হবে, সেগুলোই এখন আলোচনার বিষয়।

প্যারিসের বৈঠকে এবং কয়েক দিন আগে দেওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাষণে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক এই কোয়ালিশনের লক্ষ্য হচ্ছে আইএসের ক্ষমতা হ্রাস ও ধ্বংসসাধন এবং সংগঠনের নিয়ন্ত্রণাধীন জায়গাগুলো পুনরায় ইরাকের নিয়ন্ত্রণে আনা। এই লক্ষ্য অর্জনের বাস্তব দিক এবং সমস্যাগুলো বিবেচনা করতে হলে আইএসের উত্থানের কারণ এবং তার বর্তমান শক্তির আকার ও উৎস বিষয়ে ধারণা থাকা দরকার।
এ বছরের রমজান মাসের প্রথম দিনে ‘খেলাফত’ বলে নিজেদের ঘোষণা করলেও এবং দিনটির সঙ্গে ১০০ বছর আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনার, যা শেষ খেলাফতের অবসানের প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রারম্ভ বলে বিবেচিত, যোগাযোগ থাকলেও আবু বকর আল বাগদাদির নেতৃত্বাধীন এই সংগঠনের কার্যক্রম যে ইসলাম ধর্মের কথিত স্বর্ণযুগের প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত নয়, সেটা ইতিহাস বিষয়ে সামান্য ধারণার অধিকারী এবং ইসলাম ধর্মের শিক্ষার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা সহজেই বুঝতে পারবেন। আইএসের উত্থানের পেছনে কাজ করেছে একাধিক রাজনৈতিক ও সামরিক কারণ। ইরাকে ২০০৩ সাল থেকে গঠিত সরকারের অনুসৃত নীতি, বিশেষ করে সুন্নি জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতাবঞ্চিত করা; সিরিয়ায় তিন বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ, বিশেষ করে সেখানে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতা সঞ্চয়; আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরান ও সৌদি আরবের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা; এবং সামগ্রিকভাবে এই পরিস্থিতি থেকে নিজস্ব লাভ অর্জনের চেষ্টায় পশ্চিমা দেশগুলোর অদূরদর্শী এবং অনেক ক্ষেত্রে স্ববিরোধী নীতি অনুসরণ। ২০১০ সালের শেষ নাগাদ শুরু হওয়া ‘আরব বসন্ত’ বলে পরিচিত অহিংস আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রায়ণের ব্যর্থতা—তা মিসরে ক্ষমতা থেকে মুসলিম ব্রাদারহুডকে বলপূর্বক অপসারণ কিংবা বাহরাইনে বিরোধীদের দমনে সরকারি সাফল্য কিংবা লিবিয়ায় ক্ষমতাবদলের পরও সবার অধিকার নিশ্চিত না হওয়া—যেভাবেই দেখি না কেন এবং যে ঘটনাগুলোকেই আমরা বিবেচনায় নিই না কেন, এ সবই রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে আধুনিক মারণাস্ত্রের সহজলভ্যতা, অনেক ক্ষেত্রে যা তুলে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরের এমন সব শক্তির হাতে, যাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্ববীক্ষা শুধু সংকীর্ণই নয়, তাদের আনুগত্যও পরিবর্তনশীল। আপাতদৃষ্টে বিস্ময়কর মনে হলেও এটাও সম্ভবত এই হিসাবের বাইরে রাখা সম্ভব নয় যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আল-কায়েদার নেতৃত্বের আকর্ষণ ক্ষমতার অভাব এবং সাংগঠনিকভাবে শক্তি হ্রাসও আইএসের উত্থানের পেছনে কাজ করেছে। যে কারণে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে গত কয়েক মাসে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে জঙ্গিবাদী আদর্শে উজ্জীবিত বলে দাবিদার তরুণ-তরুণীরা বিভিন্নভাবে আইএসে যোগ দিচ্ছেন এবং তার হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। এদের এক অংশ আসছে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলো থেকেও।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি যেমন আইএসের উত্থানকে সাহায্য করেছে, তেমনি ওই অঞ্চলের পরিস্থিতি সংগঠনটিকে সাহায্য করেছে এক বিশাল পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয়ে উঠতে; যে কারণে তাদের পক্ষে প্রায় ৩০ হাজার সদস্যের একটি বাহিনী গড়ে তোলা এবং বহাল রাখা সম্ভব হচ্ছে। আইএসকে গোড়াতে নির্ভর করতে হয়েছে বিদেশি অর্থের ওপরে; অভিযোগ রয়েছে যে সৌদি আরব ও কাতারের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে তারা অর্থ পেয়েছে। কিন্তু ইরাকের বিভিন্ন এলাকায় তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি তৈরির পর আইএসের জঙ্গিরা স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জোর করে চাঁদা আদায়ের মাধ্যমে তাদের অর্থের সংস্থান ঘটাতে থাকে, কিন্তু তার পরে তাঁরা অর্থ সংস্থানের জন্য জিম্মি আটকের পথ বেছে নেয়। এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যতটা খবর প্রকাশিত হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ঘটনা ঘটেছে বলেই অনুমান করা যায়, কেননা অনেক ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা গণমাধ্যম মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদের কর্মচারীদের মুক্ত করেছে। এই বছরের এপ্রিলে চারজন ফরাসি সাংবাদিককে এই গোষ্ঠীর হাত থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মুক্ত করা হয়; জার্মান পত্রিকা ফোকাস-এর ভাষ্য অনুযায়ী এই পরিমাণ ১৮ মিলিয়ন ডলার।
এ ধরনের ঘটনা কেবল আইএস ঘটাচ্ছে তা নয়, সিরিয়ার জঙ্গিগোষ্ঠী জাবহাত আল নুসরার কাছ থেকে ১৩ জন খ্রিষ্টান নানকে মুক্ত করা হয় চার মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে। মার্কিন সরকার এই বিষয়ে সব সময়ই ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছিল যে ইউরোপীয় সরকার এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মুক্তিপণ দেওয়ার ঘটনা জঙ্গিরা লোকজনকে জিম্মি করতে উৎসাহিত করছে। নিউইয়র্ক টাইমস একবার হিসাব দিয়েছিল যে ফরাসিরা ২০০৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫৫ মিলিয়ন ডলারের মতো মুক্তিপণ দিয়েছে। পাশাপাশি কাতারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সরকারের সঙ্গে জঙ্গিদের যোগাযোগের কারণে তারা এ ধরনের অর্থ আদান-প্রদানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। এই প্রক্রিয়ায় আইএসের হাতে কী পরিমাণ অর্থ জমেছে, তার কোনো হিসাব কারও কাছেই নেই; তবে তা কয়েক মিলিয়ন ডলার বলেই বিশ্লেষকদের অনুমান।
ইরাকের বিভিন্ন এলাকা আইএসের দখলে আসার পর তাদের অর্থের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে তেল। এক হিসাব অনুযায়ী এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরাকি এলাকাগুলোয় কমপক্ষে চারটি তেলক্ষেত্র আছে। সেখানে তেলকূপ আছে ৪০ থেকে ৭০টি। এখান থেকে প্রতিদিন যে তেল উত্তোলন ও পরিশোধন হয়, তার পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ব্যারেল। আর তা বাজারদর থেকে অনেক কম মূল্যে এমনকি ২০ থেকে ৬০ ডলারে বিক্রি করে তাদের দৈনিক আয় দাঁড়ায় ১ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কারা এই তেল কেনে? ইরাকের কোনো কোনো তেল কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ফড়িয়ারা এই তেল শেষ পর্যন্ত মসুল প্রদেশের মাধ্যমে তুরস্কে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। একইভাবে আনবার প্রদেশের মাধ্যমে তারা তেল নিয়ে যায় জর্ডানে, কুর্দিস্তানের পথে ইরানে, তা ছাড়া রয়েছে সিরিয়ার কালোবাজার, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যেখানে সাধারণ মানুষের পক্ষে বাছবিচার করা অসম্ভব—কার কাছ থেকে কী তেল তারা কিনছে।
আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং অনুকূল আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই সংগঠনের বিরুদ্ধেই প্যারিসের সম্মেলনে সমবেত দেশগুলো তাদের অভিযান পরিচালনার অঙ্গীকার করেছে। লক্ষণীয় যা তা হলো, তারা বলেনি যে তারা নিজেরা কথিত এই ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হতে যাচ্ছে; তাদের ঘোষণায় বলা হয়েছে যে তারা ইরাককে এই জঙ্গিগোষ্ঠী মোকাবিলায় সাহায্য করবে। কিন্তু এ ঘোষণার আগেই যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, এই গোষ্ঠীকে মোকাবিলায় ইরাক ও সিরিয়ার ভেতরে বিমান হামলা চালাবে। গত কয়েক মাসে তারা অন্তত ১৫০টি হামলা চালিয়েছে ইরাকে এবং প্যারিসের বৈঠকের পর বাগদাদের কাছে আইএসের লক্ষ্যবস্তুর ওপরে বোমা ফেলেছে।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

জাপানের বিনিয়োগ-সম্ভাবনা -আঞ্চলিক সহযোগিতা by আবদুল্লাহ্-আল-মামুন

জাপান ও বাংলাদেশের নতুন সম্পর্কের নাম দেওয়া হয়েছে জাপান-বাংলাদেশ কমপ্রিহেনসিভ ফ্রেন্ডশিপ। ভারত-জাপান নতুন সম্পর্কের নাম স্পেশাল স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড গ্লোবাল পার্টনারশিপ। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে জাপানের শুরু হয়েছে এ নিউ পার্টনারশিপ বিটুইন ম্যারিটাইম কানট্রিজ। মিয়ানমারের সঙ্গে গত বছর ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত হয়েছে জাপান-মিয়ানমার ইনভেস্টমেন্ট এগ্রিমেন্ট। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (JETRO) ২০১৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী পাকিস্তানে জাপানি কোম্পানিগুলোর লাভ বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয়। প্রথমে রয়েছে তাইওয়ানে অবস্থিত জাপানি কোম্পানিগুলো। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নেপাল দূতাবাসের আয়োজনে টোকিওতে অনুষ্ঠিত হয়েছে নেপালে জাপানের বিনিয়োগসংক্রান্ত সেমিনার। ভুটানের অর্থনীতি সমীক্ষায় সহযোগিতা করছে জাপান, যার ওপর ভিত্তি করে ভুটানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশলপত্র তৈরি হবে।
এসব থেকে সহজেই বোঝা যায়, জাপান এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক তৈরিতে খুবই আগ্রহী। এর কারণ দক্ষিণ এশিয়াসহ এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব, চীনের সঙ্গে সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বিরোধ, আবেনোমিক্স-এর ধারণায় অর্থনৈতিক মন্দা থেকে মুক্ত হতে দেশি অর্থনীতির সংস্কার ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সুবিধা অর্জন, চায়না প্লাস ওয়ান পলিসির অধীন বিনিয়োগের জন্য নতুন স্থানের সন্ধান, আন্তরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চীনে অবস্থিত জাপানি কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা, ভৌগোলিক ও সমুদ্র নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ার বিকাশমান অর্থনীতি। কারণ যা-ই হোক, অর্থনৈতিক সম্পর্কের যে হাত জাপান প্রসারিত করেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য অপরিসীম সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করেছে। তবে, এ অঞ্চলের মোট জাপানি বিনিয়োগের কত অংশ কোন দেশে যাবে, তা নির্ভর করবে অনেকগুলো বিষয়ের ওপর। জাপানি বিনিয়োগ পেতে কোন দেশের বাস্তবতা কী, এবার সেদিকে নজর দেওয়া যাক।
জাপানে চলছে আবেনোমিক্স আর ভারতে মোদিনোমিক্স। মোদি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি ‘লুক ইস্ট’ পলিসিকে পরিপূর্ণতা দিতে চান জাপানের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে। মোদি সম্প্রতি জাপান সফর করেন। নতুন পার্টনারশিপের আওতায় জাপান ভারতকে ৩৫ ট্রিলিয়ন ইয়েনের সরকারি সাহায্য ও বেসরকারি বিনিয়োগের নিশ্চয়তা প্রদান দিয়েছে। জাপানি বিনিয়োগের অনেকগুলো বিষয় ভারতকে আশাবাদী করে তুলেছে। আর ২৪ বছর পর কোনো জাপানি প্রধানমন্ত্রীর শ্রীলঙ্কা সফরের ঘটনা ঘটেছে ৭ সেপ্টেম্বর। সম্প্রতি জাপানি কোম্পানিগুলো শ্রীলঙ্কায় আইটি, ফাইন্যান্স অ্যান্ড লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগ শুরু করেছে। শ্রীলঙ্কা জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা সৃষ্টি করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের নিশ্চয়তা দিয়েছে। শ্রীলঙ্কায় সস্তা ও দক্ষ জনশক্তি ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এ আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে জাপানি বিনিয়োগের জন্য শ্রীলঙ্কাও হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান।
গত বছর মে মাসে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে মিয়ানমার সফর করেন, যা ছিল ৩১ বছর পর কোনো জাপানি সরকারপ্রধানের মিয়ানমার সফর। মিয়ানমার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উত্তরণের পাশাপাশি অন্তর্মুখিতা পরিহার করে চীনের বাইরে নতুন উন্নয়ন–সহযোগী হিসেবে জাপানকে পেতে চায়। জাপানও সদ্য উন্মুক্ত মিয়ানমারের সস্তা শ্রম ও বাজার দখল করতে চায়। ইয়াঙ্গুনের কাছে থিলাওয়াতে মিতসুবিশি, সুমিতোমো এবং মারুবিনির যৌথ উদ্যোগে ২৪০০ হেক্টর জমির ওপর তৈরি হচ্ছে বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা। ধারণা করা হচ্ছে, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে অনেক জাপানি কোম্পানি মিয়ানমারে চলে আসতে পারে।
সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় সাড়ে নয় হাজার জাপানি কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে পাকিস্তানে রয়েছে প্রায় ৮০টি কোম্পানি। JETRO-এর জরিপ অনুযায়ী, পাকিস্তানে অবস্থিত জাপানি কোম্পানিগুলো লাভের দিক থেকে সারা পৃথিবীর মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। তবে সন্ত্রাসবাদ, অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে জাপানের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় পাকিস্তান সম্ভবত অতটা গুরুত্ব পাবে না। ভৌগোলিক অবস্থান ও অবকাঠামোগত অসুবিধার কারণে নেপাল দীর্ঘদিন জাপানের বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করেও তেমন সফল হয়নি। তবে পর্যটনসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে এখন জাপানি কোম্পানিগুলো নেপালে বিনিয়োগের উৎসাহ দেখাচ্ছে। ভুটানও জাপানি বিনিয়োগের অংশীদার হতে চায়। এ জন্য তারা জাইকার সাহায্যে হ্যাপিনেস সার্ভে নামে অর্থনৈতিক সমীক্ষা পরিচালনা করছে। তবে অবকাঠামো, বাজারের আকার ও ভূরাজনৈতিক অবাস্তবতার কারণে ভুটানে আপাতত জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখা যায় না।
এ রকম আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে জাপানের বিনিয়োগ পেতে অন্তত তিনটি দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হবে: ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার। এমন মনে করার কারণ নেই যে জাপানের বিনিয়োগ এখন বাংলাদেশমুখী। ৩৫তম ওডিএ প্যাকের বাইরে জাপানের প্রতিশ্রুত ৬০০ বিলিয়ন ইয়েনের অর্থ পেতে অনেক ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে। মনে রাখতে হবে, জাপানি কোম্পানিগুলো যে দেশে বেশি সুবিধা পাবে, সে দেশে বিনিয়োগ করবে। জাপানের বিগ-বির মূল কথা হলো বাংলাদেশকে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থলে পরিণত করা। বিগ-বি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের উচিত সব বাধা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। ২০২১ সালে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার আমাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে জাপানকে প্রধান সহযোগী হিসেবে পাওয়া নিশ্চিত করা।
এর জন্য যে বিষয়গুলোর দিকে এখন থেকেই নজর দেওয়া উচিত তা হলো: নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া, এক ভবনে বিনিয়োগকারীদের জন্য সব সেবা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগকারীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ট্রেড ইউনিয়ন পরিচালনার জন্য যথাযথ আইন প্রণয়ন করা, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর যে গুমোট রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার সমাধানের পথ বের করা, আবের সফরের আগে ও ওই সময় যেসব আলোচনা ও পরিকল্পনা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দক্ষতার পরিচয় দেওয়া এবং ভারতের মতো জাপানি নাগরিকদের জন্য অন অ্যারাইভাল ভিসা দেওয়ার বিষয়টি চিন্তা করা। এসব করা না হলে বিগ-বি তো বটেই, পুরো জাপানি বিনিয়োগ সম্ভাবনাই অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। জাপানি বিনিয়োগ চলে যেতে পারে ভারত, শ্রীলঙ্কা কিংবা মিয়ানমারে।
আবদুল্লাহ্-আল-মামুন: সহকারী অধ্যাপক, জাপান স্টাডি সেন্টার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
munna.mamun@gmail.com

ইতিহাসের সত্য আদালত উপেক্ষা করেছেন -সাক্ষাৎকারে:মুনতাসীর মামুন by ফারুক ওয়াসিফ

যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনাল দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাঁর শাস্তি কমিয়ে আমৃতু্য কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন–এর সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হলো।

প্রথম আলো: এই রায়ের অভিঘাত কী হবে বলে মনে করেন আপনি?
মুনতাসীর মামুন: অনেকেরই অনুমান ছিল, এ রকম রায়ই হবে। এই রায় আমাদের শুধু হতাশই করেনি, ক্ষুব্ধও করেছে। এটি মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা। তিনটি অভিযোগ উঠছে—১. প্রসিকিউশন দুর্বল, ২. সরকারের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আঁতাত হয়েছে, ৩. বিচারকেরা দীর্ঘ প্রক্রিয়া নিচ্ছেন। এগুলো সবই অনুমান। দ্বিতীয়ত, এই রায় শোনার জন্য আদালতে কেউ যায়নি। আমার যেটা অনুমান তা হলো, আইনের ব্যাখ্যা যেভাবে ট্রাইব্যুনাল গ্রহণ করেছিলেন, সর্বোচ্চ আদালত সেভাবে করেননি। ১৯৭৫ সালের ঘটনা আওয়ামী লীগের ওপরে যে রকম অভিঘাত হেনেছিল, এই রায়ও একই রকম অভিঘাত হানবে।
প্রথম আলো: আপিল বিভাগের কথা বলছেন?
মুনতাসীর মামুন: হ্যাঁ। সরকার যদি আদালতকে প্রভাবিত করত, তাহলে সাঈদীর যাবজ্জীবন হতে পারত, যেখানে তাঁর মুক্তির সম্ভাবনা থাকত। সরকার বিচারকে প্রভাবিত করলে বিচারকেরা বিভক্ত হতেন না। অন্যদিকে, আমৃত্যু অন্তরীণ থাকা কিন্তু ফাঁসির থেকেও যন্ত্রণাদায়ক। আমরা সব সময় সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে এসেছি। আজকে বিচারকেরা হয়তো কৌশলগত চিন্তা করেছেন, প্রসিকিউশনের চিন্তা করেছেন। কিন্তু বিচারটা হচ্ছে ১৯৭১-এর অপরাধের। ১৯৭১ এমন এক বিষয়, এটাকে যদি উপেক্ষা করলে জটিলতার সৃষ্টি হবে।
প্রথম আলো: কিন্তু বিচারকেরা তো সাক্ষ্য–প্রমাণ এবং ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিবরণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবেন?
মুনতাসীর মামুন: তা যদি হয়, তাহলে আইনজীবীর দরকার পড়ে না। উচ্চ আদালতে তো সওয়াল জবাব হয় না। আইন তো একটাই থাকে। আমার কথা হচ্ছে, ১৯৭১-কে সাধারণ মামলার মতো বিচার করা যাবে না। তাহলে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছে কেন? বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সাক্ষ্য–প্রমাণের বিষয়টা তো সাধারণ মামলার মতো না।
প্রথম আলো: এই মামলাকে উচ্চ আদালতে নিয়ে যাওয়াই সমস্যা মনে করছেন?
মুনতাসীর মামুন: সুপ্রিম কোর্টে এটা দেওয়ার তো কোনো দরকার ছিল না। প্রধানমন্ত্রী এটা করেছেন অতি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য। আমি বারবার বলছি, একাত্তরকে আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে, নইলে জটিলতার সৃষ্টি হবে। আইনের দৃষ্টিতে দেখলে তো একাত্তর হয় না। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তো অনেকে বলেছেন যে আইন ভঙ্গ করা হচ্ছে। যেখানে ৩০ লাখ মানুষ মারা গেছে, সেখানে আপনি যদি জানেন কেউ অপরাধী, সেখানে আইনের দোহাই দিয়ে তাকে রেয়াত দেওয়া হবে? এটা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
প্রথম আলো : তাহলে দায়টা কার?
মুনতাসীর মামুন: অন্তিমে এটা তো বিচারকদের রায়।
প্রথম আলো: একদিকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ, অন্যদিকে প্রসিকিউশনের দুর্বলতা, দুইখানেই তো সরকারের ভূমিকা?
মুনতাসীর মামুন: এই কথাগুলো কিন্তু পূর্ণ রায় না দেখে বলা যাবে না। আমি আপাতত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি। আমি বলছি যে এ ধরনের বিচার কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে যায় না। বিচারকদেরও মনে রাখতে হবে, তাঁরা ১৯৭১-এর অপরাধের বিচার করছেন। একে নিছক আইনের কারিগরির মধ্যে ফেলে দেখলে হবে না। এ কারণেই বিদ্যমান সাক্ষ্য আইন এ মামলার বেলায় প্রযোজ্য নয়। কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি, বিচারকেরা ওই এভিডেন্স অ্যাক্টের মানসিকতা থেকে বেরোতে পারেননি। দুই নম্বর হচ্ছে, আমরা তো জানি, সাঈদীকে দেল্লা রাজাকার বলা হতো। এটা তো ইতিহাসের সত্য। এটাকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে, কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। ইতিহাসের সত্যকে কীভাবে আইন দিয়ে বিচার করা যাবে?
প্রথম আলো: তাহলে আপনি বলছেন, ইতিহাসের সত্য আদালতে প্রতিষ্ঠা পেল না।
মুনতাসীর মামুন: ইতিহাসের সত্য আদালত উপেক্ষা করেছেন। বিচারকেরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়তো কিছু করেননি, কিন্তু এগুলো সরকারের জন্য, সমাজ-রাষ্ট্র সবকিছুর জন্য খুব ক্ষতিকর হবে। এ কারণে বলছি, ১৯৭৫ সালে কিন্তু অনেকেই চিন্তা করেননি এর অভিঘাত কী হবে? ২০ বছর পর সেটা বোঝা গেল। এই রায় কিন্তু ১৯৭৫-এর মতো অভিঘাত সৃষ্টি করল।
প্রথম আলো: ২০টা অপরাধের মধ্যে আটটা অপরাধের বিচার হলো। বাকিগুলোর রায় কি অন্য রকম হতে পারে?
মুনতাসীর মামুন: প্রশ্ন অন্যভাবে জেগেছে। একই অপরাধে কাউকে এক শাস্তি, কাউকে অন্য ধরনের শাস্তি দিলে সেটা কীভাবে কার্যকর হবে? সে কারণেই বলছি, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এসব হলে তো জটিলতার সৃষ্টি করবে। আমরা কিন্তু ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে কিছু বলিনি। এখন সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সবকিছু অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে, দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে, সেখানে কী হবে আমরা বলতে পারি না। তাঁরা বলবেন এভিডেন্স অ্যাক্ট দেখতে হবে, ১৯৭১-কে বিশেষভাবে দেখতে হবে—এটা আমাদের ব্যাপার না। এই বাধ্যবাধকতা ট্রাইব্যুনালের আছে। এখানে মনে হয়, দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পরস্পর বিরোধিতা জন্মে যাচ্ছে। আপনি বলবেন, আইন অন্ধ, কিন্তু অন্ধও তো যষ্টি ছাড়া চলতে পারে না। হয়তো সরকার প্রসিকিউশন দুর্বল করে রেখেছে, তার কারণে এমনটা হয়েছে।
প্রথম আলো: কাদের মোল্লার দুটি রায়ের মাঝখানে বড় আন্দোলন ছিল। এখন মাঠে সে রকম কিছু না থাকাতেই কি...
মুনতাসীর মামুন: ভেবে দেখতে হবে এসব বলে আমরা সরকার, আদালত ও বিচারকে আর ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারি না। আমি সরকারের বা আওয়ামী লীগের লোক নই। তাই আমি বলতে পারি না, কারও সঙ্গে কারও কোনো আঁতাত হয়েছে কি না। যত প্রকার আইন থাকুক, ১৯৭১ সবকিছুর ওপরে। যত দিন এই বিবেচনাবোধ আমাদের মধ্যে কাজ না করবে, তত দিন জটিলতার সৃষ্টি হবে।
প্রথম আলো: আপনি ১৯৭৫ সালের মতো অভিঘাতের কথা বলছিলেন, সেটা কি ব্যাখ্যা করবেন?
মুনতাসীর মামুন: অভিঘাতটা হচ্ছে এই, প্রতিক্রিয়া আমাদের এখানে সব সময় জিতে যাচ্ছে। এই রায় তো প্রতিক্রিয়ারই অংশ। যুদ্ধাপরাধকে যেখানে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। যদি না-ই হয়, তাহলে সমন্বয়ের রাজনীতির কথা চলে আসে। তখন তো মুক্তিযুদ্ধই আর থাকে না। দুই নম্বরে, সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হলো রাজনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শিকভাবে। আদর্শটা হলো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ মানে একাত্তরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
প্রথম আলো: ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সরকারের পক্ষে কি কঠিন পথ নেওয়া সম্ভব?
মুনতাসীর মামুন: তার মানে বলতে চাইছেন আদালত কি সরকারের মুখ দেখে রায় দিচ্ছেন? এ ধরনের কথা আমার অবস্থান থেকে বলা সম্ভব নয়। আদালত আছেন, আমরা আদালতে গেছি এবং আদালতের রায় আমাদের মানতে হবে। আমি আমার দুঃখ প্রকাশ করছি, আমি আমার হতাশা প্রকাশ করছি এবং অপমানিত বোধ করেছি।
প্রথম আলো: যাঁদের বিচার হয়েছে, তাঁরা যে একাত্তরে অপরাধ করেছেন, সেটা কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হলো।
মুনতাসীর মামুন: তাঁদের অপরাধী হিসেবে দেখা হচ্ছে, কিন্তু যুদ্ধাপরাধ এবং নিছক অপরাধ কিন্তু ভিন্ন বিষয়। সাঈদী একজন অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে নয়। সেখানেই আমাদের ক্ষোভ। আমৃত্যু কারাদণ্ডও সর্বোচ্চ শাস্তি। সেখানেও মানুষের ভয়, বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে তো তারা বেরিয়ে আসবে। ট্রাইব্যুনাল সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছিলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় পেলে দুর্বলতাটা চিহ্নিত করা যাবে। যদি প্রসিকিউশনের দুর্বলতা পরিস্ফুট করেন বিচারকেরা, তাহলে আইনমন্ত্রীকে অবশ্যই প্রসিকিউশনের খোলনলচে পাল্টাতে হবে। না হলে তিনি রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।

এই রায়ে জামায়াত পুনর্বাসিত হবে -সাক্ষাৎকারে:ইমরান এইচ সরকার by ইফতেখার মাহমুদ

যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনাল দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তাঁর শাস্তি কমিয়ে আমৃতু্য কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ ব্যাপারে  গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার–এর সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হলো।

প্রথম আলো: আপিল বিভাগের রায়ের পর আপনি এবং গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা পুলিশি হামলার শিকার হলেন। ঘটনাটিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন।
ইমরান এইচ সরকার: মঙ্গলবার রাতেই আমরা শাহবাগে সমবেত হয়েছিলাম। জানিয়েছিলাম রায়ে সর্বোচ্চ সাজা না হলে আমরা কর্মসূচি অব্যাহত রাখব। সে অনুযায়ী গতকাল সকালে আপিল বিভাগের রায়ের প্রতিবাদে আদালত অভিমুখে মিছিল নিয়ে যাই। পরে সেখানে বাধাপ্রাপ্ত হলে শাহবাগে এসে সমাবেশ করার উদ্যোগ নিলে পুলিশ আমাদের ওপরে অতর্কিত হামলা করে। এর আগেও মঞ্চের ওপরে নানা হামলা দিয়ে একটি ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছিল। এবার পুলিশ বাহিনী সরাসরি আমাদের ওপরে গরম পানি, পিপার স্প্রে ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। রাবার বুলেট ছোড়ে। এতে আমিসহ গণজাগরণ মঞ্চের ১৫-২০ জন কর্মী আহত হয়েছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে নামা এই আন্দোলনের একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে এভাবে হামলা চালানো সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। এটি প্রতিবাদের ভাষাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। সরকার যা ইচ্ছা তাই করবে। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারবে না। প্রতিবাদ করলেই হামলা চালাবে। এমন পরিস্থিতিই তৈরি করা হয়েছে। আমরা আন্দোলন করছি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে। এই আন্দোলন তো দেশে সব মানুষের দাবি পূরণের জন্য।
প্রথম আলো: সাঈদীর রায়কে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
ইমরান এইচ সরকার: এটা পুরোপুরি আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর আঁতাতের রায়। সরকার বেশ আগে থেকেই আদালতের ওপরে প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছিল বলে আমাদের ধারণা। বিচারপতিদের ব্যাপারে সংসদে যে অভিশংসন আইন আনা হয়েছে, সেটাও তার অংশ। এর আগে আমরা যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে দেখেছি। কিন্তু উচ্চ আদালতে গিয়েই তা বদলে গেছে। বিচারকদের হাতে অবশ্য সেই ক্ষমতা আছে। কিন্তু তাঁরা কেন জন-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নেবেন সেটাই আমাদের প্রশ্ন।
প্রথম আলো: এই আপিল বিভাগ যখন কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় দিল, তখন তো আপনারা তা সমর্থন করেছিলেন। এখন কেন ভিন্নমত?
ইমরান এইচ সরকার: যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি আসলে ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ব্যাপার নয়। দেশবাসী তথা লাখ লাখ শহীদ পরিবার এই রায়কে কীভাবে মূল্যায়ন করছে, সেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার আইন ছিল শহীদ পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। গত বছর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালও সাঈদীকে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছিলেন।
আমরা আশা করেছিলাম, উচ্চ আদালত সেই ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখবেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে প্রচলিত আইনের দৃষ্টিতে দেখলে চলবে না। কিন্তু আমরা ন্যায়বিচার পাইনি বলেই হতাশ হয়েছি, রাজপথে নেমেছি। সাঈদীর হাতে নিহত এবং নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলো মনে করে, এই রায়ে তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশ্বের যেসব দেশে গণহত্যার দায়ে যুদ্ধাপরাধিদের বিচার হয়েছে সবখানেই অপরাধীরা সর্বোচ্চ শাস্তি পেয়েছে। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের ক্ষেত্রেও আমরা ফাঁসি দিতে দেখেছি। কিন্তু আমাদের দেশে একই অপরাধে কেন লঘু শাস্তি হলো?
প্রথম আলো: সাঈদীর রায় কেন এমন হলো বলে মনে করেন। প্রসিকিউশনে বা অন্য কোনো ব্যাপারে কোনো দুর্বলতা ছিল?
ইমরান এইচ সরকার: একটি পরিপ্রেক্ষিত তৈরির মধ্য দিয়েই সাঈদীর রায় দেওয়া হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা, ইসলামী ব্যাংকসহ জামায়াতের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু আমরা দেখলাম, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকেই সরকারের প্রভাবশালী মহল উল্টো সুরে কথা বলতে থাকে। আইনমন্ত্রী জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ না করার ব্যাপারে অভিমত জানানোর পর আমরা দেখলাম প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের অন্য মন্ত্রীরাও একই কথা বলছেন। পশ্চিমা প্রভাবশালী কূটনীতিকেরাও একই ধরনের কথা আগে থেকেই বলে আসছিলেন। ফলে এই দুইয়ের মধ্যে একটি যোগসূত্র আমরা দেখতে পেয়েছি।
প্রথম আলো: তার মানে আপনি বিদেশি চাপ এবং জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আঁতাতের কথা ইঙ্গিত করছেন?
ইমরান এইচ সরকার: অবশ্যই। একই সঙ্গে আমি বলব, এই রায় জামায়াতে ইসলামীকে বাংলাদেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেবে। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের কারণে দেশ থেকে জামায়াতে ইসলামী দল হিসেবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছিল। সরকারের আচরণ এবং আপিল বিভাগের এ রায়ের মধ্য দিয়ে জামায়াত আবার তার শক্তি ফিরে পাবে। জামায়াতে ইসলামীর আগামী দিনের রোডম্যাপ বাস্তবায়নে সরকার সহযোগিতা করছে বলেই অনেকেই মনে করেন।
গোলাম আযম এবং সাঈদী জামায়াতের ‘আইকন লিডার’। তাঁদের ফাঁসি দেওয়া হলো না। কাদের মোল্লা তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হওয়ায় তাঁর ফাঁসি হলো। এসব দেখে মনে হচ্ছে, রায়গুলোতে জামায়াতের ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটেছে।
প্রথম আলো: সরকার থেকে তো আপনাদের কর্মসূচিতে নিয়মিভাবেভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে। গণজাগরণ মঞ্চ দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একটি পক্ষ তো এখনো শাহবাগে অবস্থান করছে। আপনারা এখন কী করবেন?
ইমরান এইচ সরকার: গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে উঠেছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও স্বাধীনতার চেতনা সমুন্নত রাখার প্রত্যয়ে। গণজাগরণ মঞ্চ এই লক্ষ্যে যে ছয় দফা কর্মসূচি দিয়েছে তা থেকে সরে আসবে না। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। বাধা আসবে এটা জেনেই আমরা শহীদদের স্বপ্ন পূরণে মাঠে নেমেছি। সামনের দিনগুলোকে এই আন্দোলনে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে আমরা কাজ করে যাব।