Wednesday, December 30, 2020

গল্প- শুভ নববর্ষ by আন্দালিব রাশদী

১ জানুয়ারি ২০১৫

শুভ নববর্ষ।

২০১৫ আপনার জন্য বয়ে আনুক অনাবিল সুখ ও সমৃদ্ধি। অনাবিল-টনাবিল – এ-ধরনের গেয়ো শব্দ আমার মেজাজ খারাপ করে দেয়।

বছরের প্রথম দিন আমি মেজাজ ঠান্ডা রাখতে চাই – একেবারে কুল। আগের নববর্ষে যেসব রেজোল্যুশন নিয়েছিলাম বছরের শেষ দিন তা রিভিউ করেছি।

আমার টপমোস্ট রেজোল্যুশন ছিল সাড়ে পাঁচ কেজি ওজন কমানো। বাসার ওয়েইং স্কেলটাতে আমার ভরপেট ওজন আর খালি পেট ওজন একই দেখায় বলে আমি নিউমার্কেট ফুটওভারব্রিজের ওপর ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্রের স্বচ্ছ পস্ন্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে কাঁটাটা কোথায় গিয়ে স্থির হয় তা বের করেছি। এটা আমার বছরের শেষদিনের কাজ। আমার ওজন সাড়ে পাঁচ কেজি কমেনি। আরো সোয়া দুই কেজি বেড়েছে। সুতরাং এ-বছর অর্থমন্ত্রীর রিভাইজড বাজেটের মতো রিভাইজড রেজোল্যুশন নিতে হলো – এ-বছর লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে ওজন কমাতে হবে পৌনে আট কেজি – তার মানে ৭ হাজার ৭৫০ গ্রাম। ৩৬৫ দিনে বছর – তার মানে প্রতিদিন সোয়া একুশ গ্রাম ওজন কমাতে হবে।

একটি মাত্র রেজোল্যুশন শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পেরেছি। সিদ্ধান্ত ছিল : বানিয়ে বানিয়ে লেখা কোনো বইপত্র পড়ব না। ২০১৪-তে আমি কারো লেখা কোনো গল্প-উপন্যাস পড়িনি। এটা ২০১৫-তেও অব্যাহত রাখতে হবে।

রাত বারোটা এক মিনিট থেকে সকাল সাড়ে নটার মধ্যে আমি তেরোটি শুভেচ্ছা এসএমএস পেয়েছি।

আগে হ্যাপি নিউ ইয়ার লেখা কার্ড পেতাম। সেগুলো জমিয়ে রাখতাম। আমার ব্যক্তিগত আর্কাইভে আমাকে পাঠানো বিভিন্ন ধরনের অন্তত আড়াইশো কার্ড রয়েছে।

এসএমএস অনেক সস্তা। বিশ টাকার প্যাকেজ নিলে একশ একটা এসএমএস করা যায়।

আমি এসএমএস পাই, দু-এক সপ্তাহ পরপর ডিলিট করি। গোয়েন্দারা চাইলে কিছু কিছু এসএমএস রিট্রিভ করতে পারেন। এটা জমিয়ে রাখার নয়, ডিলিট করার যুগ। সম্পর্ক ধরে রেখে বোঝা বাড়াতে নেই, কান্নাকাটি অর্থহীন, ডিলিট করে ফেললেই হলো।

আমি যে-তেরোটি এসএমএস পেয়েছি তার পাঁচটি বাংলায় টাইপ করা। পাঁচটিই বেশ ইন্টারেস্টিং।

১. পাত্র ও পাত্রীর বন্দোবস্ত করতে পারি। আমরা অগ্রিম কোনো ফি চার্জ করি না। পরীক্ষা প্রার্থনীয়। পাখিভাই মেট্রোমনিয়ালস।

২. শুভ নববর্ষ। আপনাকে স্বীকার করতেই হবে নারীর সৌন্দর্য তার স্তন। আমরা নারীর ফিগারের সঙ্গে সংগতি রেখে স্তনের সমন্বয় করে থাকি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন হারবাল মেডিসিন প্রয়োগ করে স্তনের বৃদ্ধি ও হ্রাসের জন্য সত্বর যোগাযোগ করুন : ব্রেস্টএইড, পেট্রোনাস পস্নাজা, রোড-১৬-এ (পুরাতন ২৭)।

দ্র : ব্রেস্টএইডের সব ওষুধ ও সেবা ৫০% হ্রাসকৃত মূল্যে পাবেন পুরো জানুয়ারি মাস।

৩. রঞ্জুর বাবা,

২০১৫ সালে আপনার ওপর আল্লাহর গজব নাজেল হোক। আপনি ধ্বংস হয়ে যান। – ফাতিমা।

৪. শুভ নববর্ষ। সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। – তুষার।

৫. তিতির ইনশাল্লাহ এ-বছর তোর বিয়ে হবেই। দোয়া করি। – ছোটখালা।

আশ্চর্য, ছোটখালাও বাংলা টাইপ শিখে গেছে। আর আমাকে লিখতে হয় ইংরেজি হরফে।

আমি শুধু একটিই পাঠিয়েছি। ইংরেজি হরফের বাংলায় : নতুন বছরের শুভকামনা। ভালো থাকবেন।

সম্বোধন করিনি, ইতিতে নামও লিখিনি। আমার নম্বর তার সেভ করা। আমি পাঠিয়েছি ২০১৫-এর প্রথম মিনিটে – রাত বারোটা এক মিনিটে। ১২ ঘণ্টায়ও কোনো জবাব আসেনি।

আমার কী লেখা উচিত ছিল : আপনার তিতির?

১৮ ঘণ্টায়ও যখন জবাব এলো না, নিজেকে মনে হলো বেহায়া। এই মেসেজটা আমার পাঠানোর কী দরকার ছিল?

তৃতীয় বার্তাটি রঞ্জুর বাবাকে দেওয়া, কোনোভাবেই আমাকে নয়। প্রথমত, কারো বাবা হওয়ার শারীরিক সামর্থ্য আমার নেই। ফাতিমা আমার অপরিচিত নাম নয়; কিন্তু এই ফাতিমা সম্ভবত রঞ্জুর মা, তিনি মোটেও পরিচিত নন।

নবীজির কন্যা ফাতিমা মুসলিম জাহানের অশেষ শ্রদ্ধার পাত্রী। পাকিস্তানের আইয়ুব আমলে বাঙালিরা প্রেসিডেন্ট পদে সমর্থন করেছিলেন জিন্নাহর ভগ্নি ফাতিমা জিন্নাহকে, ফাতিমা ভুট্টো পিতামহ জুলফিকার আলীর ফাঁসি নিয়ে বই লিখেছেন, ফাতিমা লোপেজ নামে একজন ফ্যাশন ডিজাইনার এবং ফাতিমা রবিনসন নামে একজন নৃত্যশিল্পী রয়েছেন, তারা কেউই আমার সরাসরি পরিচিত নন, পরোক্ষভাবে জেনেছি। প্রত্যক্ষ পরিচিত একজনই, আমার ক্লাসমেট ফাতিমা আওরঙ্গজেব। গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন, কিন্তু মৃত্যু তাকে গ্রহণ করেনি। কৌতূহল থেকেই বছরের প্রথম দিনই অভিযোগের বার্তা পাঠানো নারী ফাতিমাকে কলব্যাক করলাম।

প্রথম রিংয়ে ফোন ধরে আমার হ্যালো শোনার আগেই তিনি বললেন, বেহায়া কোথাকার! ফোন করতে তোমার লজ্জা হলো না?

আমার নারীকণ্ঠ শুনে তিনি থতমত খেয়ে পরক্ষণেই বললেন, তুই তা হলে সেই বেশ্যা, যে রঞ্জুর বাবাকে কব্জা করে রেখেছিস। এ-বছরই আল্লাহর গজব তোর ওপরও নাজেল হবে।

বছরের প্রথম দিন আমাকে ‘বেশ্যা’ গাল শুনতে হলো এবং সঙ্গে আল্লাহর গজবের অভিশাপ।

আমি বিনয়ের সঙ্গেই বললাম, ফাতিমা ম্যাডাম এটা রং নম্বর। তিনি বললেন, ওই গাধাটাকে দে কিছু কথা শোনাই।

কৌশল পালটে এবার আমি ধমক লাগাই এবং তুই সম্বোধন করে বলি, তোর সব কথা আমি রেকর্ড করেছি, এগুলো পুলিশকে দেবো।

তখন তিনি বললেন, আপনি কে? কে বলছেন!

আমি তো এটাই বলতে চাচ্ছিলাম, যে আপনি মেসেজটা রং নম্বরে পাঠিয়েছেন।

কিন্তু তিনি তো আমাকে এই নম্বরই দিয়েছেন। আগে যে-নম্বরে কথা বলতাম সেটা এখন আর ব্যবহার করে না।

তিনি সতর্ক ছিলেন নববর্ষের অভিশাপটা যাতে তার কাছে না পৌঁছে। কিন্তু তিনি কি আপনার হাজব্যান্ড? মানে রঞ্জু আপনার ছেলে।

সরি আপা, মাথা ঠিক ছিল না, কী বলতে কী বলেছি ক্ষমা করে দেবেন। দেখুন ফাতিমা আমার নাম নয়, তিনি আমার হাজব্যান্ডও নন এবং রঞ্জু নামে আমার কোনো ছেলেও নেই। যে-মেয়েটি এই বাংলা এসএমএস লিখে দিয়েছে তার নাম ফাতিমা, ক্লাস নাইন থেকে টেনে উঠেছে, আমি ফাতিমাদের বাসায় ভাড়া থাকি। ভুলে সে নিজের নাম লিখে ফেলেছে। কিন্তু আপনি কে বলছেন?

আমার নাম তিতির।

তিতির মানে, ওই যে মুরগির মতো? তিতিরের মাংসের স্বাদ কেমন? আমি কখনো খাইনি। এক কেজির দাম কত পড়ে?

দেখুন তিতিরের মাংসের স্বাদ কেমন, কেজি কত আমার কোনো ধারণা নেই। কিন্তু আপনি রঞ্জুর বাবাকে এত বড় একটা ভয়ংকর অভিশাপ দিলেন কেন?

আপনি আমার মেসেজটা ডিলিট করে ফেলুন। আমার হাজব্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছিল না। এই সময় লোকটা ঢুকে পড়ে, মানে আমার সঙ্গে একটা সম্পর্ক করে ফেলে, আমাকে বিয়েও করতে চায়। কিন্তু সমস্যা ছিল তার ছেলে রঞ্জু। রঞ্জুর বয়স এগারো বছর। মা নেই। লোকটা বলল, লাখদশেক টাকা হলে রঞ্জুকে কানাডায় একেবারে স্থায়ীভাবে রেখে আসবে। রঞ্জুর ছোট ফুপুর কোনো ছেলে নেই। পাঁচটা মেয়ে, তিনি তাকে অ্যাডপ্ট করবেন। কিন্তু তার আর্থিক অবস্থা খারাপ, সেজন্য তাকেও লাখপাঁচেক টাকা দেওয়ার কথা। আমি আমার হাজব্যান্ডের টাকা মেরে, আমার সব অর্নামেন্ট বেচে তাকে দশ লাখ টাকা দিয়েছি। দুমাস আগে কানাডা যাওয়ার সময় আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে শেষ ফোন করেছে। বলেছে, একুশ দিন পর এসে আমার সঙ্গে বিয়ের কাজটা সেরে নেবে। তার কোনো সাড়া না পাওয়ায় কদিন ধরে খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ পত্রিকায় দেখলাম তার ছবি – একটি কোম্পানির বিপুল অংকের টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়েছে। তার এলাকার থানায় খোঁজ নিয়ে জানলাম ছমাস ধরে পলাতক, স্ত্রী ও শাশুড়িকে হত্যা করে পালিয়েছে। তার রঞ্জু নামের কোনো সন্তান নেই।

এবার আমি জিজ্ঞেস করি, লোকটার নাম কি রইসুল ইসলাম খান?

আপনি চেনেন? আপা আপনি কি তাকে চেনেন? কোথায় আছে বলতে পারবেন?

আমি বললাম, রঞ্জুর তো লিউকেমিয়া, বস্নাড ক্যান্সার। মাসদুয়েক আগে আমরা নিজেরা চাঁদা তুলে রঞ্জুর চিকিৎসার জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকা দিলাম। রইসুলের তো ছেলে নিয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়ার কথা। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে অ্যাপয়েন্টমেন্টের কাগজও দেখিয়েছে। রইসুল অনেকদিন আগে আমাদের ম্যানুফ্যাকচারিং ইউনিটে কোয়ালিটি কন্ট্রোল ম্যানেজার ছিল। হঠাৎ মাসতিনেকের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায় তার চাকরি চলে যায়। সবাই তাকে পছন্দ করত। তার চাকরি ফিরিয়ে দিতে সবাই বলেছে, ইউনিয়নও চাপ দিয়েছে; কিন্তু সিইও সাহেব রাজি হননি। রইসুল রঞ্জুর চিকিৎসা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলেছে, সামনাসামনি এবং ফোনে। আমার নম্বর তার ফোনে সেভ করা ছিল। রইসুল তাহলে আমার নম্বরটাই আপনাকে দিয়েছে।

এবার তিনি বললেন, আপা আপনার সঙ্গে দেখা করব!

আমি প্রথমে বললাম, কী দরকার?

তারপর ঝামেলা এড়াতে মিথ্যাটাই বললাম, আমি আগামী দুমাস দেশের বাইরে থাকব।

আমি তার ফোন আর ধরিনি। নম্বরটি বস্নক করে দিই।

ব্রেস্টএইড আমার নম্বরটি কোথায় পেল?

স্তন ক্যান্সার-সচেতনতা সপ্তাহের একটি অনুষ্ঠানে আমি লাম্প ডিটেক্টর নিয়ে একটি বক্তৃতা দিই, সঙ্গে ছিল ডিজিটাল প্রেজেন্টেশন। আমাদের কোম্পানির ফার্মাসিউটিক্যাল ইকুইপমেন্টস আমদানির লিস্টে সিনোরা ব্রেস্ট লাম্ব ডিটেক্টরও আছে। আমি বলি, কোনো পুরুষ ডাক্তারকে স্তন দেখানোর বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়িয়ে এমনকি অন্য কোনো নারীকেও না বলে আপনি নিজেই এই ছোট যন্ত্রটি দিয়ে আপনার স্তনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন। কোনো শক্ত বা নরম মাংসপি- ভেতরে বেড়ে উঠতে থাকলে মেশিনই আপনাকে বলে দেবে, সতর্ক করে দেবে।

সেই অনুষ্ঠানে এক ডজন স্পন্সরের মধ্যে ব্রেস্টএইডও ছিল। কাজেই আয়োজকদের কাজ থেকে আমার নম্বর পেতেই পারে। তাদের নববর্ষের শুভেচ্ছাটির সঙ্গে স্তন ক্যান্সার সারানোর কোনো সম্পর্ক নেই, স্তনের সৌন্দর্য বৃদ্ধির আহবান আছে। এই আহবানে আমার সাড়া দেওয়ার কোনো কারণ নেই। নায়িকা সালমা হায়েক, গায়িকা জেনেট জ্যাকসন, স্পাইস গার্লস ব্যান্ডের ভিক্টোরিয়া বেকহাম, বেওয়াচের পামেলা অ্যান্ডারসন সিলিকন ইমপস্ন্যান্ট করে স্তনের আকার বাড়িয়ে নিয়েছে – বড় স্তন আকর্ষণ করে না বিকর্ষণ করে ছেলেরাই ভালো বলতে পারবে। আমি বলব, পামেলা অ্যান্ডারসনকে কেবল বড় স্তনের কারণে আমার একটুও ভালো লাগে না।

পাখিভাই ম্যাট্রোমনিয়ালস আমাকে শুভেচ্ছা পাঠাতেই পারে। মৃত্যুর আগে আমার মা নিজের হাতে আমার ছবি ও বায়োডাটা দিয়ে এসেছেন – তারা যেন তিতিরের জন্য একটি উপযুক্ত পাত্র খুঁজে দেয়। বিজ্ঞাপন বার্তায় যা-ই লেখা থাকুক, আনুষঙ্গিক খরচ হিসেবে তিন হাজার সাতশো টাকাও দিতে হয়েছে। পুলিশের খাতায় নাম ওঠা দুশ্চিন্তার কারণ হতেই পারে, ঘটকের খাতায় নাম উঠলে এতটুকু আশ্বস্ত থাকা যায়, জীবনের কিছুটা দায় তো তিনিই নিয়ে নিলেন। আমার বেলায় ঘটক সাহেব এখনো উপযুক্ত পাত্র উপস্থাপন করতে পারেননি। তিনি আমাকেই বলেছেন, ইনশাল্লাহ আগামী ষাট দিবসের মধ্যেই আমাদের ভগ্নি তিতিরের একটি ফয়সালা হয়ে যাবে। বড় বিয়েতে ঘটকই দাওয়াত পায় না। ভগ্নি, ভুলবেন না কিন্তু।

পাঁচ নম্বর এসএমএসটি আমার ছোটখালার। তিনি মনে করছেন কোনো একটা অশুভ প্রভাবে আমার জন্য ভালো কোনো প্রস্তাব আসছে না, আমার বিয়ে হচ্ছে না। আজমির শরিফ থেকে ইচ্ছাপূরণ সুতো এনে আমার বাহুতে বেঁধে দিয়ে বলেছেন, লক্ষ্মীসোনা, দোহাই আল্লাহর হাত থেকে এটা খুলিস না, গোসলের সময়ও না। এই পূর্ণিমাতে বেঁধে দিলাম অমাবস্যাতে খুলে দেব। খাজা বাবার দোয়ায় ইনশাল্লাহ তোর বিয়েটা হয়ে যাবে।

তিনি ধরে নিয়েছেন, পির-পয়গম্বরের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া আমার বিয়ে হবে না। শ্বশুরবাড়ির ওমরাহ-ফেরত এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের জেরিক্যান থেকে ছোটখালা এক গ্লাস জমজমের পানিও রেখে দিয়েছেন। এই পানির সঙ্গে সেদ্ধ করা ফিলটার করা স্বচ্ছ পানি মিশিয়ে পাঁচশো এমএল বোতলে ভরে আমার জন্য নিয়ে এসেছেন। তার উপস্থিতিতে বিসমিল্লাহ বলে আমাকে প্রায় চারশো পঞ্চাশ এমএল পানি খেয়ে নিতে হলো। অবশিষ্ট পানির সঙ্গে আরো মিশিয়ে আবার পাঁচশো এমএল, এভাবে মোট তিনদিন খাবার হুকুম দিলেন। দুটো ঘটনাই ২০১৪ সালের। তেমন উলেস্নখযোগ্য কোনো প্রস্তাব এলো না।

ছোটখালার মনে তখন ভিন্ন প্রশ্ন – কেউ তাবিজ করেনি তো? আমি হাসি।

ছোটখালা বলেন, হাসিস না। কুফরি কালাম করে মানুষের ক্ষতি করা যায়। তোর বিয়ে ঠেকানোর জন্য কেউ হয়তো তোদের বাড়ির সীমানার ভেতরেই কোথাও তাবিজ পুঁতে রেখেছে।

তিনি আবার মেয়েদের বয়স প্রসঙ্গে ফিরে আসেন। ছেলেদের বয়স যত বাড়ে বাড়ুক সমস্যা নেই। কিন্তু একটা বয়সের পর মেয়েদের লাবণ্য কমতে থাকে। বিয়ের কাজটা সারতে হয় তার আগে। বাচ্চাকাচ্চাও নিয়ে হয় তরতাজা যৌবনে। ভাটির কোনোটাই জুতমতো হয় না – বিয়েও না, সন্তানও না।

তা হলে আমার লাবণ্য কমতে শুরু করেছে?

ছোটখালা বললেন, আমি তা বলিনি, কিন্তু এটা তো সত্য বিশ্বসুন্দরীদের অনেকে এর মধ্যে বুড়ি হয়ে গেছেন। সুস্মিতা সেন, ঐশ্বরিয়া রাই এমনকি এ-বছর যে-মেয়েটা মিস ইউনিভার্স হলো কী যে তার নাম – সবাই বেঁচে থাকলে থুত্থুড়ে বুড়ি হবে। এটাই সত্যি। চার নম্বর এসএমএসটিতে একটি প্রাচীন, বহুল ব্যবহৃত, জরাজীর্ণ দার্শনিকী বাক্য : সময় ও স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। কথাটা তুষার আমাকে নতুন করে মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছে। তার মানে আমি সাড়া না দিলে সে আমার জন্য বসে থাকবে না, কিংবা আমি বসে থাকলে সময়ের বার্ধক্যলেপন থেমে থাকবে না। একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে যাব! আমার চেহারাটা এমন হাড়গিলার মতো হলো কেমন করে? আমি তো এমন ছিলাম না।

তুষার নিশ্চয়ই মনে করেছে এতদিন পর তার বার্তা পেয়ে আমি গদগদ হয়ে তখনই কল করে বসব। একদম ভুল ধারণা। তুষার যতই সেলিব্রেটি হয়ে উঠছে, তার সম্পর্কে আমার আগ্রহ ততই কমেছে। ততই দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তাকে নিয়ে গসিপ কলাম যা ইচ্ছা তা-ই লিখুক, কখনো আমাকে যেন না জড়ায়। তুষার এখন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, চ্যানেল ঘুরিয়ে যেখানেই যাই সেখানেই তুষার। স্টুপিড, আমার যেন কাজ নেই।

----দুই----

আমি বছরের প্রথম দিনের খবরের কাগজ হাতে তুলে নিই। প্রথম পৃষ্ঠায় বাঁদিকে এক কলাম ইঞ্চিতে রজনীগন্ধার কটি ডাঁট, এরই নিচে পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, সব পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীকে ২০১৫ সালের প্রাণঢালা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

আমাদের বাড়িতে চার-পাঁচটি পত্রিকা আসে। একটি কেবল গাঁটের পয়সায় কেনা, বাকিগুলো সৌজন্যে আসা। আমার বাবা মোটামুটি একজন গুরুত্বপূর্ণ লোক।

আমাদের বাড়িতে আমিই, আর কেউ কখনো পত্রিকার ভাঁজ ভাঙে না, বাবা কখনো নয়। আমার যেদিন ইচ্ছা হয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি, বিশেষ করে ক্ল্যাসিফায়েড বিজ্ঞাপনের পাতা। বছরের প্রথম দিন বলে খুব মনোযোগ দিয়ে যা পড়েছি তার কিছুটা তুলে ধরছি :

শ্রীলংকার প্রিমিয়ার লিগে খেলতে গিয়ে বাংলাদেশের কৃতী ক্রিকেটার আশরাফুল ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। জেরার মুখে তিনি স্বীকার করেছেন, ২০১২-এর ২৬ আগস্ট রুহুনু রয়ালস ভার্সাস ওয়েমবা ইউনাইটেডের খেলায় তিনি ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অপরাধ করেছেন। পাঁচ বছরের জন্য তাকে ক্রিকেট থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ছোটখাটো গড়নের আশরাফুল আমার প্রিয় ব্যাটসম্যান ছিলেন। এখন কী আর করা – যদি প্র্যাকটিস ছেড়ে দেন, ফিরে আসার আর সম্ভাবনা থাকবে না।

রওশন এরশাদ বলেছেন, নির্বাচনের সময় এলে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা দল ছেড়ে চলে যান। সেটাই তো করার কথা। যেখানে তাদের প্রাপ্তিযোগ বেশি হবে, ভবিষ্যৎ বেশি ঝলমলে মনে হবে, তারা তো সেখানেই যাবেন। এটা দোষের কিছু নয়। তিনি বলেছেন, এ-কারণেই তিনি পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। আপনি ঠিক কাজটিই করেছেন, পার্টি চেয়ারম্যানের নির্দেশ পালিত হবে না তো কারটা পালিত হবে। তাছাড়া তিনি তো আপনার স্বামীও। স্বামীর নির্দেশ পালনে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। আমার স্বামী নেই, থাকলে আমিও তার কথা শুনতাম। স্বামী নেই মানে এই নয় যে, আমি অল্পবয়সে বিধবা কিংবা স্বামী-পরিত্যক্ত কোনো নারী। কিংবা বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে যোগসাজশ করে স্বামীকে দুনিয়া থেকে একেবারে সরিয়ে দিয়েছি, এমনও নয়। আমার বিয়েই হয়নি। মা বলত, উপযুক্ত ছেলে আসছে না। চেষ্টা অব্যাহত আছে। পাখিভাই ম্যাট্রোমনিয়ালস ছাড়াও অনানুষ্ঠানিকভাবে আমার মায়ের পরিচিতজনরা আমার বিয়ের জন্য সক্রিয়।

বলেছিই তো, স্বামী থাকলে আমি তার কথা শুনতাম। কিন্তু আমার মেজফুপু তার স্বামীর কথা শুনতেন না, শুনতেন আপনার স্বামীর কথা। এ-নিয়ে তাদের সংসারে যথেষ্ট অশাস্তি হয়েছে। ফুপু এই অশাস্তিটাই উপভোগ করতেন। ফুপা ভোট দিতেন নৌকায় আর ফুপু লাঙলে।

ফুপা এরশাদ সাহেবকে নিয়ে এটা-ওটা বলতেন। কিন্তু ফুপু যেদিন বললেন, তুমি কত বড় সাধু আমার তা জানা আছে – এর পর থেকে ফুপা আপনার স্বামীর সঙ্গে নারীনাম জড়িয়ে বিদ্রূপ করা বন্ধ করলেন। পরে নৌকা ও লাঙলের সমন্বয় ঘটে যাওয়ায় তাদের ঘরে শাস্তির সুবাতাস বইতে থাকে।

ফুপু সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফুপুর চেয়ে বারো বছরের কমবয়সী এবং যথেষ্ট আকর্ষণীয় একজন নারী কনুইয়ের গুঁতোয় তাকে থমকে দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যান। ফুপু নমিনেশনের দৌড়ে অনেক পিছিয়ে পড়েন।

ফুপা তার স্ত্রীর এই পিছিয়ে-পড়াটা খুব উপভোগ করেন এবং বলেন, তোমার আরো পনেরো বছর আগে জন্মগ্রহণ করা উচিত ছিল।

আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি লোকজন কেন আপনার স্বামীকে  স্বৈরাচার বলে। তিনি যদি আমাদের এলাকা থেকে নির্বাচন করেন, আমি তাকে ভোট দেবো। তবে আমার মেজফুপু শওকত আরা জুলহাস উদ্দিনের মন এতটাই ভেঙে গেছে যে, তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন, এমনকি আর কখনো ভোট দেবেন না – এ-ঘোষণাও দিয়েছেন।

আমি ফুপুকে ফোন করি।

ফুপু, শুভ নববর্ষ।

আরে রাখ তোর শুভ নববর্ষ। নববর্ষের গুষ্টি মারি।

সরি ফুপু, তোমার সম্ভবত মেজাজ খারাপ। এ-সময় আমার ফোন করা ঠিক হয়নি।

তাহলে কখন করতি, রাতের বেলায়? তাহলে তো তৃতীয় মহাযুদ্ধের গোলাগুলির শব্দ শুনতি। গত দুদিনের মধ্যে এখনই বরং মেজাজটা ভালো। সারা সকালে মাত্র এক কাপ কড়া কফি খেয়েছি। তোর কী খবর? ঘটক কাউকে এখনো পায়নি?

চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বলেছেন ইনশাল্লাহ ২০১৫ সালে পেয়ে যাবেন।

শোন তিতির আমি তোকে বলি। এখনই ভালো আছিস। তোর মা ভেবেছিল, তোকে কারো গলায় ঝুলিয়ে দেবে, যেমন করে সে নিজে আমার ভাইটার গলায় ঝুলে পড়েছিল। খোকাবাবু একটা মাটির মানুষ, সেজন্য নূপুরকে মেনে নিয়েছে। তোর বেলায় হবে ঠিক তার উলটো, পাত্র এসে তোর গলায় ঝুলে পড়বে। বাপের ভোগাস্তির প্রায়শ্চিত্ত তোকেই করতে হবে। তুই দেখতে সুন্দর, পড়াশোনায় ভালো, বিদেশি ডিগ্রি পেয়েছিস, ভালো চাকরি আছে। তোর বিয়ে করার কী দরকার? সুখ আর স্বাধীনতা সহ্য হয় না, তাই না? আমার যদি তোর মতো পড়াশোনা থাকত, বিদেশি একটা এমবিএ থাকত, একটা ভালো চাকরি থাকত, আমি সৈয়দ জুলহাস উদ্দিনকে বিয়ে করি?

ফুপু আস্তে বলো, ফুপা শুনলে আমার ক্ষতি হবে। তুমি খুব ভালো করে জানো আমার পাঁচজন ফুপার মধ্যে আমি জুলহাস ফুপাকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি। বিদেশে গেলে একমাত্র তিনিই বইয়ের দোকানে ঢুকে আমাকে ফোন করে বলেন, বইয়ের নাম বলো কী বই কিনব। অথচ আমি জানি তিনি নিজে একটা বইও পড়েন না। একবার আমার ফোনে চার্জ ছিল না। আমার সঙ্গে কথা বলতে পারেননি তবু অনুমান করে আমার জন্য দুটো বই কিনে এনেছেন : ওরিয়ানা ফ্যালাসির ইন্টারভিউ উইথ হিস্টি আর ওয়াল্টার স্কেটের দ্য কনসাইজ ডিকশনারি অব ইংলিশ ইটিমোলজি, হার্টের বাইপাস সার্জারি করাতে সিঙ্গাপুর গিয়ে ফেরার সময় আনলেন লি কুয়ান ইডর ফ্রম দ্য থার্ড ওয়ার্ল্ড টু ফার্স্ট।

ফুপু বললেন, থাম থাম, দুটো বই দিয়ে তোর মাথা কিনে নিয়েছে। তার নিজের মাথায় কী ছিল কে জানে? লিলিয়ানকে কী এনে দিত জানিস কিনা বল?

আমি জিজ্ঞেস করি, লিলিয়ান কে?

লিলিয়ান রড্রিগস। জুলহাস উদ্দিনের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। তার জন্য আনতো ব্রা আর প্যান্টি আর আমার জন্য এনেছিল সৌদি বোরকা। জুলহাস কোম্পানির তিনজন বোর্ড মেম্বার আর লিলিয়ানকে নিয়ে হ্যাপি নিউ ইয়ার করতে কক্সবাজার গেছে। বছরের শেষে সূর্যাস্ত দেখবে। হুইস্কি খেয়ে রাত বারোটা এক মিনিটে নতুন বছরকে বরণ করবে। অথচ আমাকে বলেছে প্রোডাক্ট প্রমোশন ম্যানেজারদের কনফারেন্স। আমি জিজ্ঞেস করি, লিলিয়ানও যাচ্ছে? কী বলেছে শুনবি, ওর সেক্রেটারিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স ছাড়া তো চলবেই না? অন্য কেউ হলে বলত ‘তার’, লিলিয়ানের বেলায় ‘ওর’।

ফুপু তোমার সঙ্গে শিগগির দেখা করব, ভালো থেকো।

ক্যান্ লিলিয়ানের কথা আর শুনবি না? আজই চলে আয় সন্ধেবেলায়, পুতুল আর পুপুল বার-বি-কিউ করবে।

ফুপুর যমজ দুই মেয়ে পুতুল আর পুপুল। আইডেন্টিক্যাল টুইন। সন্ধ্যায় বাসা থেকে বেরোব না, জানিয়ে দিই।

ফুপু ধ্যাৎ বলে লাইনটা কেটে দিলেন।

ভালো করেছেন। আমাকে পেপারটা তো পড়তে হবে।

নিচের দিকে দু-কলাম জুড়ে : স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই দাম্পত্য নির্যাতনের শিকার।

পাঁচ থেকে পঁচিশ বছর দাম্পত্যজীবন কেটেছে এমন পাঁচশো ষাট দম্পতির ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাহাত্তর শতাংশ নারী এবং নয় শতাংশ পুরুষ দাম্পত্য নির্যাতনের শিকার। বাকি উনিশ শতাংশ নারী ও পুরুষ বলেছেন, সংসার এমনই। স্বামী বা স্ত্রীর বিরুদ্ধে তাদের কোনো অভিযোগ নেই। এই উনিশ শতাংশের কয়েকজন স্বামী ও স্ত্রীর সাড়া লক্ষণীয় :

আমার বাবা আমার মায়ের ওপর যে নির্যাতন চালাতেন সে-তুলনায় আমার স্বামী তো ফেরেশতা।

আমার শাশুড়ি প্ররোচনা না দিলে আমার স্বামী কখনো নির্যাতন করেন না, এটা তো আর তার দোষ নয়।

আমার মায়ের ক্যাটক্যাট শুনতে শুনতে আমার বাবা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, আমি তো এখনো আছি।

সমীক্ষকরা ধরে নিয়েছেন, দাম্পত্যজীবনের প্রথম পাঁচ বছরে স্বামী ও স্ত্রীর প্রকৃত চেহারার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে না, আর পঁচিশ বছর সংসার করে ফেলতে পারলে যা-ই ঘটুক, সবটাই গা-সহা হয়ে যায়।

এই সমীক্ষা প্রতিবেদনটি কমসংখ্যক নমুনার ওপর ভিত্তি করে করা। আমার চারপাশে যত দম্পতি দেখতে পাচ্ছি মেজফুপাসহ অধিকাংশ স্বামীই নির্যাতিত বলে আমার ধারণা। এমনকি আমাদের গৃহকর্মী (আমরা এখন আর কাজের বুয়া বলি না) গোলাপের মাও বলেছে, একটা ফিউজ বাল্ব গোলাপের বাবার ওপর ছুড়ে মেরেছিল, গালের কাছে বেশ খানিকটা কেটে রক্ত বেরিয়েছে। শেষ পৃষ্ঠার একটি সংবাদ : তিন বোতল ফেনসিডিলসহ পুলিশের কনস্টেবল মামুন চৌধুরী গ্রেফতার। রাত একটার দিকে সিভিল ড্রেসে কুড়িগ্রামের মিতালী সিনেমা হলের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ওত পেতে থাকা মাদক প্রতিরোধ বাহিনী সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে তাকে আটক করে। তার ব্যাগ তল্লাশির পর তিন বোতল ফেনসিডিল পায়। তাকে থানায় সোপর্দ করা হয়।

মাত্র তিন বোতল ফেনসিডিল!

কাশি সারাতেই তো দুই বোতল লেগে যায়। বছরের শুরুতে এমন লঘুপাপে একজন পুলিশ গ্রেফতার – বছরটা পুলিশের জন্য না জানি কেমন যায়।

আরো একটি খবর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে :

একটি গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে সিফাত নামের এক যুবক সঙ্গোপনে ঢুকে বর ও তার সঙ্গীদের ওপর গুঁড়ো দাহ্যপদার্থ ছড়িয়ে তাদের ওপর জ্বলন্ত দেশলাইয়ের কাঠি ছুড়ে মারে। দাউদাউ আগুন জ্বলে ওঠে। সিফাতকে ধাওয়া করে ধরে ফেলা সম্ভব হয়। জনতা তাকে গণধোলাই দেয়। বর সেলিমউল্লাহসহ তিনজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ছয় মাস আগে একই পাত্রীর সঙ্গে সিফাতেরও গায়ে হলুদ হয়। কিন্তু গায়ে হলুদের পর পাত্রী বিগড়ে যায় এবং সিফাতকে প্রত্যাখ্যান করে। প্রতিশোধ নিতেই এ-কা- করেছে বলে সে জানায়, কিন্তু যেহেতু মেয়েটিকে সে ভালোবাসে সেজন্য তাকে অক্ষত রেখেছে। দুজন পাত্র এই মেয়েটিকে বিয়ে করতে চাচ্ছে, কিন্তু আমার বেলায়?

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০১৪ সালে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৬.৩১, বাড়ি ভাড়া ৯.৭৫; বাড়ি ভাড়া সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বস্তি এলাকায় ১৬.০৭ আর ফ্ল্যাটের ভাড়া বেড়েছে ১২.৮২ শতাংশ। দাম কমেছে ভোজ্যতেল, লবণ, ডাল, সুগন্ধি চাল, মসলা, চা, ডিম ও আটার। এসব প্রতিবেদন পড়ে আমার কী লাভ? নিজের অবস্থা বুঝতে পারা? হতে পারে। অক্টোবরে আমার বেতন শতভাগের কাছাকাছি বেড়েছে। কাজেই আমার যথেষ্ট উদ্বৃত্ত থাকবে।

----তিন----

সম্পাদকের নববর্ষের শুভেচ্ছার ঠিক নিচে প্রথম পৃষ্ঠায় যে-সংবাদটি দেখে আঁতকে উঠব বলে কেউ কেউ মনে করে থাকবে তা মোটেও আঁতকে ওঠার মতো কিছু নয়। বেশ পুরু হরফে ছাপা : ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সচিবের ছড়াছড়ি। যে-কজনের ছবি ছাপা হয়েছে মোস্তফা আল আমিনও তাদের মধ্যে আছেন।

আমি অবাক হইনি তার কারণ আমি তো মোস্তফা আল আমিনকে সেই কবে থেকে চিনি, মনেও নেই। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়ার সময়ও তিনি হুংকার দিতেন, আমি আফটার অল বীর মুক্তিযোদ্ধা। জয়নব, তার বোকা স্ত্রী বলল, একটা ভীরু মুক্তিযোদ্ধা দেখাও তো? কোন ফ্রন্টে তুমি লড়াই করেছিলে বলো তো শুনি? আমি সব খবর জানি। তুমি একাত্তরে নারায়ণগঞ্জে বেশ্যাখানায় গিয়েছ, বাহাত্তরে নূরজাহান রোডের বাড়িতে বিহারি মেয়ে রেপ করেছ, তিয়াত্তরে তুমি প্রকৃতই শহিদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে বাস্ত্তচ্যুত করে সে-বাড়ি দখল করেছ।

মোস্তফা আল আমিন বললেন, ইম্পসিবল! একাত্তরে আমার বয়স তো বারোও হয়নি, তেরো বছরের ছেলের পক্ষে বিহারি মেয়ে রেপ করা সম্ভব? আর চোদ্দো বছর বয়সে কী করেছি বললে?

বলেছি তুমি একটা ভ-। তুমি একটা ভুয়া, তোমার সবই ভুয়া।

দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, আর একবার যদি কথাটা শুনি, তাহলে…।

এ পর্যন্ত বলে তিনি দম নিলেন। তারপর সাঁড়াশির মতো নিজের দুই বলিষ্ঠ হাতে স্ত্রীর গলা টিপে ধরলেন, জোরে, আরো জোরে।

সম্ভবত দম বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে মোস্তফা আল আমিনের মাথায় তার মেয়ের সদ্য কেনা গিটারের প্রচ- আঘাত লাগলে তিনি ছিটকে পড়েন, মাথা থেকে অঝোরে রক্তের ধারা নেমে আসে। গলা থেকে হাতের ফাঁস সরে যাওয়ার পর চোখ খুলে রক্ত দেখে তিনি চেঁচিয়ে ওঠেন, আমি কিছু করিনি।

মোস্তফা আল আমিন, সরকারের স্থায়ী সচিব এবং রণাঙ্গনের বীর দাবিদার সুদর্শন মানুষটি আতঙ্কিত চোখে এদিক-ওদিক তাকান – কোনো সাংবাদিক আসেনি তো?

গিটারের আঘাতটা কি ঠিকমতো লাগেনি? লাগলে মেয়েটি খুনের মামলায় জড়িয়ে যেত। মেয়েটি সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে আর ফিরে যায়নি। মার মৃত্যুর সময় বাংলাদেশেই ছিল না।

এটা জানা কথা, তিনি বলেছেন, আরে ধ্যাৎ, পত্রিকায় ছবি ছাপা হলেই হলো? সংখ্যায় তো আমরাই বেশি। আসল আর কজন চাকরি পেয়েছে? ভোট হলেও আমাদের কেউ হারাতে পারবে না। গণতন্ত্র বলে একটা কথা আছে না।

মেয়ে জানে, বাবা-মায়ের বিষয় নিয়ে ছেলেমেয়েদের মাথা ঘামাতে নেই। সেও ঘামাবে না।

তাছাড়া ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার মেয়ের বিয়ে বাবার ভুয়া হওয়ার কারণে ভেঙে গেছে – এমন নজির নেই। ভুয়া হলেই বরং কামাই বেশি। আর্থিক নিরাপত্তা গ্যারান্টেড। সুযোগও বেশি।

ছোটখালা ফোন করলেন, বললেন, দুলাভাইয়ের এবার খুব নামডাক হয়েছে, সব কাগজে ছবি। তিতির, তোর বিয়ে এবার কেউই ঠেকাতে পারবে না।

একুশ ঘণ্টা পর তুষারের আর একটা বাংলা এসএমএস : তিতির,  তোমার বাবা তো খুব ইন্টারেস্টিং মানুষ! হ্যাপি নিউ ইয়ার।

গিটার কত কাজে লাগে। আর একটা কিনব।

Friday, December 25, 2020

পাকিস্তানের জেল থেকে পালানোর চেষ্টা করে যেভাবে ধরা খেল ৩ ভারতীয় পাইলট

পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একটি ভারতীয় বিমান ধ্বংস আর তার পাইলট অভিনন্দন ভর্থমানের আটক হওয়া এবং সবশেষে শুক্রবার রাতে পাকিস্তান থেকে তার দেশে ফেরা - এই নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।
কিন্তু ৪৭ বছর আগে অনেকটা একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল আরো এক ভারতীয় পাইলটের। তিনি স্কোয়াড্রন লিডার ধীরেন্দ্র জাফা।
১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়ে ভারতের পশ্চিম সীমান্তে তার বিমানটি গুলি করে নামায় পাকিস্তানি বাহিনী।
তার পরের কয়েক মাস তিনি এবং তার আরো কয়েকজন সতীর্থ পাকিস্তানের জেলে কাটিয়েছেন, কয়েকজন জেল থেকে পালিয়ে গেছেন, তারপর ধরাও পরেছেন আবার শেষমেশ সেই ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফিরে এসেছেন, যে সীমান্ত চেকপোস্ট দিয়ে শুক্রবার রাতে ভারতে ফিরেছেন অভিনন্দন ভর্থমান।
পেছনে ফিরে দেখা...
'রেড ওয়ান, ইউ আর অন ফায়ার'... স্কোয়াড্রন লিডার ধীরেন্দ্র জাফার হেডফোনে কাছাকাছি থাকা আরেকটি যুদ্ধবিমান থেকে ভেসে এসেছিল সঙ্গী পাইলট ফর্ডীর চিৎকার।
আরেক পাইলট মোহনও চেঁচাচ্ছেন তখন, "বেল আউট রেড ওয়ান, বেল আউট।"
"জেফ স্যার, ইউ আর অন ফায়ার, গেট আউট.. ফর গড সেক, বেল আউট," সঙ্গী পাইলট জগ্গু সাকলানীও সতর্ক করছেন স্কোয়াড্রন লিডার জাফাকে।
জাফা ততক্ষণে তার সুখয় যুদ্ধবিমানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন। আগুন পৌঁছে গেছে ককপিটে। 'ইজেক্ট' হাতলে টান দিলেন জাফা আর মুহূর্তেই হাওয়ায় উড়ে গেলেন তিনি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্যারাসুট খুলে গেল, নিচের দিকে নামতে শুরু করলেন ওই পাইলট।
তার প্যারাসুট মাটি ছুঁতেই কানে এলো নারা-এ-তকবির আর আল্লাহু আকবর ধ্বনি। গ্রাম থেকে কয়েক শ' লোক ঘিরে ফেলেছে ওই পাইলটকে। তারা কেউ হাতের দস্তানা খুলে নিচ্ছে, কেউ পকেট থেকে ২০০ পাকিস্তানি টাকা নিয়ে নিয়েছেন, একজন গলার মাফলারও খুলে নিল। কেউ একজন বুট ধরে টানছিল, সেই সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য সেখানে পৌঁছে যান।
ভিড় থেকে কোনোমতে তাকে বাঁচানোর পর একজন লম্বা-চওড়া পাকিস্তানি অফিসার জানতে চেয়েছিলেন, তোমার কাছে কোনো অস্ত্র আছে? তিনি বলেছিলেন রিভলভার ছিল, কিন্তু মনে হয় ভিড়ের মধ্যে কেউ সেটা ছিনিয়ে নিয়েছে।
পশতু ভাষায় ওই অফিসার দুজন সৈন্যকে নির্দেশ দিয়েছিলেন জাফাকে তুলে শিবিরে নিয়ে গিয়ে চা খাওয়াতে।
হাতে চোট লেগেছিল ধীরেন্দ্র জাফার। চায়ের কাপটাও ধরতে পারছিলেন না ভালমতো। একজন পাকিস্তানি সেনা চামচে করে তাকে চা খাইয়ে দিয়েছিলেন।
হাসপাতালে জাফার কোমরে প্লাস্টার করার পরে তাকে যুদ্ধবন্দীদের শিবিরে পাঠানো হয়েছিল।
সেখানে রোজ জেরা চলত তার। যখন টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হতো, তখন বালিশের ঢাকনা পরিয়ে দেয়া হতো তার মাথায়, যাতে চার দিকে কী আছে সেটা দেখতে না পান তিনি।
একদিন ওই ভবনটিরই অন্য একটি ঘরের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে।
রক্ষীরা যখন তাকে একটা সেলের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, বাইরে থেকেই লোকজনের কথাবার্তার আওয়াজ আসছিল। কিন্তু যেই সেলের ভেতরে তাকে ঢোকানো হলো, সঙ্গে সঙ্গে গোটা ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
হঠাৎই কেউ একজন বলে উঠেছিল, 'আরে, জেফ স্যার...'! কথাটা বলেই ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট দিলীপ পারুলকর জড়িয়ে ধরেছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার ধীরেন্দ্র জাফাকে। সেখানে আরও দশজন যুদ্ধবন্দী ভারতীয় পাইলট ছিলেন।
অনেকদিন পরে নিজের দেশের, নিজের বাহিনীর সঙ্গীদের দেখা পেয়ে চোখে পানি চলে এসেছিল ধীরেন্দ্র জাফার।
ঠিক তখনই যুদ্ধবন্দীদের ওই শিবিরের ইনচার্জ স্কোয়াড্রন লিডার উসমান হানিফ মুখে এক টুকরো হাসি নিয়ে ওই ঘরে ঢুকেছিলেন।
পেছনে আর্দালির হাতে একটা কেক আর সকলের জন্য চা ছিল। ভারতীয় বাহিনীর কয়েকজন যুদ্ধবন্দী খ্রিস্টান ছিলেন, আর তখন ছিল ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭১।
তাই ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানাতেই পাকিস্তানি বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার হানিফ কেক আর চা আনিয়েছিলেন তাদের জন্যে।
হাসি মস্করায় কেটে গিয়েছিল সন্ধ্যেটা।
পালানোর ছক
কিন্তু যখন সবাইকে নিজের নিজের সেলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, তার আগে ওই যুদ্ধবন্দীদের দলে সবচেয়ে সিনিয়র ভারতীয় অফিসার উইং কমান্ডার বনি কোয়েলহো ঘোষণা করেন যুদ্ধে নিহত সহযোদ্ধাদের স্মরণে দু'মিনিট নীরবতা পালন করা হবে, আর তার পরে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে।
যুদ্ধের আগেই দিলীপ পারুলকর তার সিনিয়র অফিসারদের বলেছিলেন যে যুদ্ধবন্দী করা হলে তিনি চেষ্টা করবেন পাকিস্তানের জেল থেকে পালাতে। অফিসাররা বলেছিলেন, "ওসব বোকামি করো না।" কিন্তু সেটাই করেছিলেন পারুলকর।
আরো দুই যুদ্ধবন্দী পাইলট - ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মালভিন্দর সিং গারেওয়াল আর হরিশ সিংজীর সঙ্গে মিলে পারুলকর পাকিস্তানি জেল থেকে পালানোর ছক কেটে ফেলেন।
দেয়ালে একটা গর্ত করে সেলের বাইরে যাওয়ার কথা ঠিক করেন। সেখান থেকে একটা ৬ ফুটের দেয়াল টপকাতে পারলেই রাস্তায় পৌঁছে যাওয়া যাবে।
যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে কেউ ইলেকট্রিক মিস্ত্রীর স্ক্রুডাইভার চুরি করলেন, আরেকজন যোগাড় করলেন কোকা কোলার বোতলের ছিপিতে ফুটো করার একটা ধারালো লোহার টুকরো।
রাত দশটার পরে দিলীপ পারুলকর আর গারেওয়াল দেয়ালের প্লাস্টার খুঁচিয়ে তুলে ফেলার শুরু করলেন। ওই ঘরে চারজন যুদ্ধবন্দী থাকতেন। একটা সমস্যা ছিল ওই প্লাস্টার কীভাবে লুকিয়ে রাখা হবে।
কিছু দিন আগে যুদ্ধবন্দীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ছোট ছোট বাক্সতে ভরে নিয়ে এসেছিল রেডক্রস। ওই বাক্সের মধ্যেই তারা ভর্তি করে রাখতে থাকল খসানো প্লাস্টার।
দুজন নজর রাখত গার্ডরা আসছে কিনা সেদিকে আর দুজন প্লাস্টার খসাতো। ট্রানজিস্টার রেডিওর আওয়াজ বাড়িয়ে দেয়া হতো, যাতে দেয়াল খোঁড়ার শব্দ কেউ না পায়।
এক পাকিস্তানি গার্ড সেলাইয়ের কাজ জানে, এটা শোনার পর তাকে দিয়ে একটা পাঠান সুট বানালেন পারুলকর।
আরেক যুদ্ধবন্দী কামাথ ব্যাটারি দিয়ে একটা সুচকে চুম্বকে পরিণত করে কাজ চালানোর মতো একটা কম্পাস বানিয়ে দিলেন। পোশাক আর কম্পাসটা বাইরে যাওয়ার পরে খুব কাজে লাগবে।
যেদিন পালানো হবে
১৪ অগাস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। সবাই মিলে ঠিক করে যে ওই দিন গার্ডরা ছুটির মুডে থাকবে। সেদিনই পালানো হবে।
১২ অগাস্ট রাতে ব্যাপক বৃষ্টি শুরু হলো, বাজও পড়ছিল। সেই রাতেই প্লাস্টারের শেষ অংশটা সরিয়ে ফেলা হলো। দুদিন পরে ওই গর্ত দিয়েই এক এক করে তিনজন বেরিয়ে গেলেন।
দেয়ালের ওপারে লোকজন চলাফেরার আওয়াজ আসছিল। সিনেমার নাইট শো শেষ হয়েছিল তখন।
ঝড় বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বাইরে যে গার্ড ছিল সে দৌড়ে চলে যায় একটু আড়ালে, আর ঠিক সেই সময়েই লাফিয়ে পাচিল টপকিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন তিন ভারতীয় যুদ্ধবন্দী পাইলট।
মানুষের ভিড়ে মিশে গিয়ে দ্রুত পা চালাতে শুরু করেন তিনজন। কিছুক্ষণ পরে তারা যখন বাস-স্ট্যান্ডে পৌঁছান, একজন কন্ডাক্টর চেঁচাচ্ছিল, 'পেশোয়ার, পেশোয়ার' বলে। তিনজনেই লাফিয়ে বাসে উঠে বসেন।
ভোর ছ'টা নাগাদ তারা পেশোয়ার পৌঁছান। বাস-স্ট্যান্ড থেকে একটা টাঙা ভাড়া করে জমরুদ রোডে যান তারা। তারপরে হাঁটতে শুরু করেন। আরও একটা বাসের ছাঁদে উঠে পরেন তিনজন।
জামরুদে পৌঁছানোর আগে রাস্তার ধারে একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়ে, যাতে লেখা ছিল 'আপনি উপজাতীয় এলাকায় প্রবেশ করছেন।" আগুন্তকদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে "আপনারা সড়ক ছেড়ে অন্যদিকে যাবেন না আর নারীদের ছবি তুলবেন না।'
আরেকটা বাসে চেপে তারা লোন্ডী কোটাল পৌঁছান। সেখান থেকে আফগানিস্তান সীমান্ত মাত্র পাঁচ কিলোমিটার।
একটা চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে গারেওয়াল লন্ডীখানা কীভাবে যেতে হবে, সেটা জেনে নিচ্ছিলেন।
আর দিলীপ পারুলকর লক্ষ্য করলেন স্থানীয় মানুষদের সকলের মাথাতেই একটা না একটা কিছু ঢাকা দেয়া আছে। হরিশসিংজীর মাথায় টাক ছিল। তাই পারুলকর দুটি পেশাওয়ারি টুপি কিনলেন।
কিন্তু গারেওয়ালের মাথায় সেই টুপিটা ঠিক মতো লাগছিল না, তাই পারুলকর আবারও সেই দোকানে ফিরে গিয়েছিলেন।
কী পরিচয় দেবেন নিজেদের
একটা ট্যাক্সিওয়ালা চিৎকার করে লোক ডাকছিল, 'কারা লোন্ডিখানা যাবে চলে এসো।'
তিন ভারতীয় পাইলট যখন ওই ট্যাক্সিটার দিকে এগোতে যাবেন, ঠিক সেই সময়ে পিছন থেকে একজন কেউ ডাকল ওদের।
এক বয়স্ক ব্যক্তি জানতে চাইছিলেন, 'আপনারা লোন্ডিখানা যাবেন? কোথা থেকে এসেছেন?'
তারা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন যে তারা নিজেদেরকে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর সদস্য হিসেবে পরিচয় দেবেন, বলবেন তারা পুরনো বন্ধু। লাহোরের হোটেলে দেখা হয়ে যাওয়ার পরে একটু ঘুরতে বেরিয়েছেন।
সেই গল্পটাই শোনালেন তখন। কিন্তু এবার বেশ কড়া গলায় ওই প্রৌঢ় বললেন, "লোন্ডিখানা বলে কোনো জায়গা তো এখানে নেই আর। ইংরেজরা চলে যাওয়ার পরেই ওই জায়গাটা শেষ হয়ে গেছে!"
তার বোধ হয় সন্দেহ হয়েছিল এরা তিনজনই বাঙালি। আফগানিস্তান হয়ে বাংলাদেশ চলে যেতে চাইছে।
গারেওয়াল হেসে জবাব দিয়েছিলেন, "আমাদের দেখে কী বাঙালি মনে হচ্ছে আপনার? জীবনে কখনো বাঙালি দেখেছেন?"
তবে ওই ব্যক্তি এদের কথায় সন্তুষ্ট না হয়ে এলাকার তহসিলদারকে ডেকে আনলেন। সেও এদের কথায় বিশ্বাস করতে পারল না।
হঠাৎই পারুলকর বলেন যে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর প্রধানের এডিসি স্কোয়াড্রন লিডার উসমানের সঙ্গে কথা বলতে চান তিনি।
এই উসমান হলেন সেই রাওয়ালপিন্ডির যুদ্ধবন্দীদের শিবিরের ইনচার্জ।
ফোন করা হলো। পারুলকর বললেন, "আপনি তো খবর পেয়েই গেছেন। আমরা লোন্ডিকোটালে আছি। এখানকার তহসিলদার আটকিয়ে রেখেছে। আপনি লোক পাঠাতে পারবেন?"
উসমান মুহূর্তে বুঝে গেলেন তার শিবির থেকে পালানো যুদ্ধবন্দীরাই ফোন করেছে।
তিনি তহসিলদারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। তাকে বললেন, "এদের একটু খাতির-টাতির করুন। আমাদেরই লোক। আপনাদের কাছেই রাখুন। লোক যাচ্ছে।"
বন্দী শিবিরে হৈ চৈ
ওদিকে রাওয়ালপিন্ডির বন্দীশিবিরে ততক্ষণে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেছে। রক্ষীরা ভয়ে কাঁপছে। তাদের গাফিলতিতেই যে তিনজন পালিয়েছে!
ধীরেন্দ্র জাফা বলছিলেন, "কয়েকজন গার্ড আলোচনা করছিল নিজেদের মধ্যে যে জাফাই বোধহয় এটার মাথা। একেও ওই গর্তে ঢুকিয়ে পেছন থেকে গুলি করে দিই। মনে হবে তিনজন পালাতে পেরেছে আরেকজনকে গুলি করে দিয়েছি আমরা।"
এই আলোচনা যখন চলছে, তখনই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ফোন আসে গার্ড রুমে। একজন গার্ড ফোনে কথা বলতে গিয়ে বলে ফেলেন যে তিনজন পালিয়েছে।
পারুলকর বুঝতে পারেন তিনি বেঁচে গেলেন সেই যাত্রায়।
এরপরে যুদ্ধবন্দীদের আরো কড়া নিরাপত্তায় মোড়া লায়লপুর জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিমানবাহিনী ছাড়াও ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধবন্দীরাও ছিলেন।
হঠাৎই একদিন জেলে হাজির হলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টো। তিনি বললেন, সব যুদ্ধবন্দীদের ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান।
১৯৭২ সালের পয়লা ডিসেম্বর সব ভারতীয় যুদ্ধবন্দীকে ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফেরত পাঠানো হলো।
সেই সময়ে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী গিয়ানী জৈল সিং, যিনি পরে ভারতের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, তিনি স্বয়ং যুদ্ধবন্দীদের স্বাগত জানাতে সীমান্তে হাজির হয়েছিলেন।
হাজার হাজার মানুষ সেদিন ফুল ছিটিয়ে জড়িয়ে ধরে স্বাগত জানিয়েছিলেন ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের।
পরের দিন দিল্লির রামলীলা ময়দানে গণ-সম্বর্ধনা দেওয়া হয় পাকিস্তান ফেরত সব যুদ্ধবন্দীকে।
বন্দী থাকার এক বছরে যে বেতন পেয়েছিলেন গারেওয়াল, তার থেকে ২৪০০ টাকা দিয়ে একটা ফিয়াট গাড়ি কিনেছিলেন তিনি।
দিলীপ পারুলকর বিমানবাহিনীর প্রধানকে উপহার দিয়েছিলেন পেনের মতো দেখতে সেই কম্পাসটা। আর ভারতে ফেরত আসার পাঁচ মাস পরে তার বিয়ে ঠিক হয়।
পাকিস্তানি জেলে সঙ্গী যুদ্ধবন্দী স্কোয়াড্রন লিডার এ বি কামাথ তাকে টেলিগ্রাম করেছিলেন বিয়ের দিন। লিখেছিলেন, "এই মিষ্টি বন্দিত্ব থেকে তোমার মুক্তি হবে না।"
সূত্র : বিবিসি
ভারতের একটি সুখোই বিমান, ইনসেটে পালিয়ে আসা ভারতীয় পাাইলটদের ছবি - সংগৃহীত

Wednesday, December 16, 2020

ভারত নয়, চীন পদ্মাসেতু বানিয়েছে, এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি by তারিক চয়ন

বাংলাদেশের পঞ্চাশতম স্বাধীনতা বার্ষিকী শুরু হওয়ার স্মরণে এক সম্মেলনে শেখ হাসিনা, মোদীর সঙ্গে যোগ দেবেন। এর এক সপ্তাহ আগেই চীনা কোম্পানির প্রকৌশলীরা তাদের বাংলাদেশী সহযোগীদের সঙ্গে মিলে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যানটি স্থাপন করেছে।

ভারতের অনলাইন পত্রিকা দ্য প্রিন্ট এ লেখা এক নিবন্ধে দিল্লিভিত্তিক সাংবাদিক জ্যোতি মালহোত্রা একথা লেখেন। সোমবার প্রকাশিত ইংরেজিতে লেখা জ্যোতি মালহোত্রার নিবন্ধটি হুবহু অনুবাদ করা হলোঃ

বাংলাদেশের জন্য এটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ এক দিন। গণমাধ্যম বর্ণনা করেছে ঐতিহাসিক সেই অনুষ্ঠানটি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইংরেজি সংবাদপত্র ডেইলি স্টার এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম, যিনি নিজেই একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং  প্রায়ই হাসিনা সরকারের সমালোচনা করেন, তিনি সংক্ষেপে বলেছেন, "বঙ্গবন্ধুর 'রাজনৈতিক ইচ্ছা' বাংলাদেশের জন্মের ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছিল। একইভাবে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ইচ্ছাই পদ্মা সেতুটি বাস্তবে রূপ নেবার দাবিদার।"

পদ্মাসেতুর নির্মাণ নির্ধারণ করে যে, চীন কিভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় তার পথ করে নিয়েছ। এই অঞ্চলে ভারতের অত্যধিক প্রভাব প্রতিস্থাপন করতে। এটা স্পষ্ট করতে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো জায়গা আর কি হতে পারে যেখানে ভারত বেশ কয়েক বছরের শৈশব পার করার পর অবশেষে একটি পরিণত সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

কারণ স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করা প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক বিষয়ে ভারত অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ছিল।

২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পদ্মাসেতু তৈরিতে সহায়তার জন্য এক বিলিয়ন ডলারের 'লাইন অফ ক্রেডিট' ঘোষণা করেছিলেন। যা বাংলাদেশের নিজস্ব ৩ বিলিয়ন ডলারের সঙ্গে যুক্ত হতো। যেটি আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা থেকে বাংলাদেশ ঋণ হিসেবে নিতো।

কিন্তু বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানের জাইকার অন্য হিসেব ছিল। ২০১৩ সালে তারা দুর্নীতির অভিযোগ আনে। তাদের “অহঙ্কার” এবং “নির্দয় আচরণ” দেখে বেজায় ক্ষিপ্ত হয়ে হাসিনা ঋণের আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। মাহফুজ আনামের মতে, "আমাদের আত্মসম্মানে লাগা গভীর ক্ষতে" হাসিনাকে বলতে বাধ্য করে, "আমাদের ভিক্ষাবৃত্তির মানসিকতা দূরে রাখতে হবে।" এটি যদিও "আত্মনির্ভরশীল" ছিল না। হাসিনা সত্যিই টাকাওয়ালা বন্ধুদের খুঁজছিলেন।

২০১৫ সালের জুনে যখন নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় গিয়েছিলেন, তখনো ভারতের পাঠ চুকায়নি। দিল্লি ২০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান এবং পদ্মাসেতু প্রকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়তে আরও ২ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রস্তাব দেয়। সেটা যথেষ্ট ছিল না। ইতোমধ্যেই টেন্ডার জিতে নেয়া চায়না রেলওয়ে ব্রিজ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে।

২০১৬ সালের অক্টোবরে শি জিনপিং ঢাকায় যান,  যা ছিল ৩০ বছরের মধ্যে কোন চীনা প্রেসিডেন্টের প্রথম বাংলাদেশ ভ্রমণ। তিনি ২৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ঋণ সহায়তায় স্বাক্ষর করেন। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ৪২টি স্প্যানের প্রথমটি ৩৭ এবং ৩৮ তম পিলারের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছিল।

ব্যাপারটা এমন নয় যে, একটি সেতু সম্পর্ক তৈরি বা নষ্ট করে দিতে পারে। অন্যান্য সংযোগ প্রকল্প ছাড়াও (চিলাহাটি-হলদিবাড়ী) একটি পুরনো অচল রেললাইন পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব দিয়ে মোদী সরকার এখন এ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। শিলিগুড়ি থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত ২০১৮ সালে প্রতিশ্রুত একটি পেট্রোলিয়াম পাইপলাইনের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যন্ত শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের পঞ্চাশতম স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের অংশ হিসাবে মোদি ঢাকা সফর করলে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে যা তাৎপর্যপূর্ণ তা হলো ঢাকার মন-মানসিকতার পরিবর্তন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ায় চূড়ান্ত বাস্তববাদী হিসেবে দেখিয়েছেন। খোলামেলাভাবে চীনাদের সঙ্গে 'মজা' করছেন। যদিও ১৯৭১'র যুদ্ধে চীন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল; প্রকৃতপক্ষে, চীন এমনকি ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য বাংলাদেশের আবেদনে ভেটো দিয়েছিল।

সুতরাং, একদিকে হাসিনা মোদির সঙ্গে ১৭ই ডিসেম্বর ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেবেন এবং অন্যদিকে তিনি শি জিনপিং এর বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্যও প্রস্তুত।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, তিনি দিল্লিতে একটি বার্তা পাঠাতে চান যে 'বাংলাদেশীরা উইপোকা সমতুল্য, ওদের বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া উচিত' ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের এমন মন্তব্য তিনি ভুলে যাবেন না।

তদুপরি, জাতীয় নাগরিক নিবন্ধক (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (সিএএ)  মুসলমান "বাংলাদেশিদের" ভারতীয় নাগরিক হওয়া থেকে বিরত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয় - যা ঢাকার জন্য লাগাতার উদ্বেগের বিষয়। যদিও ভারতীয় কর্মকর্তারা বারবার বলছেন যে, এনআরসি এবং সিএএ দুটোই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

তদুপরি, ভারতের বিপরীতে চীনের অর্থনীতি করোনা ভাইরাস মহামারি দ্বারা খুব খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বলে মনে হয় না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক তথ্যমতে, বাংলাদেশ তার মাথাপিছু জিডিপি আয়ের ক্ষেত্রে ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। যদিও পাঁচ বছর আগে ভারত ২৫ শতাংশ বেশি ছিল। যে কারণে বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান বলেছেন, "অভিযুক্ত উইপোকার কারখানাটি এখন জ্বলজ্বল করছে।"

তবুও সব শেষ হয়ে যায়নি। বাংলাদেশ চীনকে সম্প্রতি ধমকের সুরে চলে যেতে অথবা চীনা করোনা ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের জন্য অর্থ প্রদান করতে বলেছে। এটি ঘটেছে এমন এক সময়ে যখন তিন কোটি ডোজ ভ্যাক্সিন কেনার জন্য ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে ঢাকার একটি চুক্তি স্বাক্ষর হচ্ছিল।

গল্পটি থেকে শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, মোদি সরকার নিজ দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) আদর্শিক এজেন্ডাকে জাতীয় স্বার্থের উপর স্থান দেয়ার অনুমতি দিতে পারে না। ভারতের বৈদেশিক নীতি, বিশেষত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর সংবেদনশীল প্রতিবেশী অঞ্চলে, দলীয় বিবেচনার বাইরে রাখা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মোদিকে জোর দিয়ে বলতে হবে, ভারতে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক বাংলাদেশ ভারতের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যতিক্রমী উদাহরণ।


ছোটাচু এবং সোনালি বিকেল by কামাল হোসাইন

হ্যাঁ, আমরা সবাই ‘বাংলা’ নামের দেশটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। মায়ের প্রতি যেমন আমাদের সীমাহীন নির্ভেজাল ভালোবাসা, তেমনই ভালোবাসা এ দেশের মাটির প্রতিও। আরও ভালোবাসা মানুষ। বাতাস। আকাশ। পাহাড়। ঘাস। ফুল। পাখি। প্রজাপতি। নদী। আর আদিগন্ত সবুজের প্রতিও...
>>সেদিন বিকেল। সিফাত ওর পড়ার ঘরে পড়ছিল। ঠিক ওই সময় ছোটাচুর ডাক- সিফু, বাবু তুমি কোথায়?
ছোটাচু সিফাতকে ছোট্ট করে একটু মোডিফাই করে ‘সিফু’ বলে ডাকে।
ছোটাচু খুব ছোট্ট করে ডাকলেও সিফাত তা শুনতে পায়। যেন হৃদয়তন্ত্রীতে তা বেজে ওঠে বেহালার সুরে। যেখানেই থাকুক, শুনতে যেন পাবেই, এমন ব্যাপার।
আজও তার ব্যত্যয় ঘটল না।
সে-ও উত্তর করল- ছোটাচু, এই তো আমি, পড়ছি। আসব?
বাড়ির সবার কাছেই সে অত্যন্ত প্রিয়। সবাই ওকে আদর-স্নেহ-ভালোবাসায় ভরিয়ে রাখে।
তবে ছোটাচু যেন একটু বেশিই ভালোবাসে ওকে।
ওকে না দেখে যেন থাকতে পারে না ছোটাচু। সিফাতও তেমনি ছোটাচুর দারুণ ভক্ত। ছোটাচু বলতে ও অজ্ঞান।
ছোটাচুর সাইকেলটাও সিফাতের আরও একটু আকর্ষণের অন্যতম কারণ। সিফাত যখন সাইকেলে বসতে শিখেছে, সেই ছোটবেলা থেকেই ছোটাচুর সাইকেলে উঠে ঘুরঘুর করে বেড়ানোর অভ্যাস তৈরি হয়েছে তার। যদি ছোটাচু সাইকেল নিয়ে একটু বের হয়েছে, আর ওর চোখে তা পড়েছে, তাহলে ওকে একটু সাইকেলে না চড়িয়ে চলে যাবে, এমন সাধ্যি ছোটাচুর নেই। তাড়াহুড়োর কারণে যদিবা চলে যায়, তাহলে ওর কান্না দেখে কে? বাড়ি মাথায় করবে কেঁদেকেটে।
সাইকেলে চড়তে ও খুব পছন্দ করে। সাইকেল চলবে, আর ও দুলে দুলে আধো বোলে নানারকম ছড়া কাটবে।
সুতরাং প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে তাকে সাইকেলে চড়িয়ে, মামা বিস্কুট, চিপস কিনে দিয়ে তবেই রক্ষে।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সে ছোটাচুর শিয়রের পাশে হাজির হবে। তারপর ছোটাচুর চুল টেনে ঘুম ভাঙাবে। কখনও সখনো সে ছোটাচুর বুকের মধ্যে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকে। তারপর একসময় উঠে শুরু হয় ছোটাচুর প্রতিদিনকার চাকরি।
ছোটাচুও সিফাতের এ রকম নানা পদের বায়না, দুষ্টুমিপনায় নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে ভালোবাসে খুব।
এতে সামান্য কোনো বিরক্তির কারণও ঘটে না কখনও।
আবার সিফাতের অন্য তিন চাচু এলে ওর আনন্দের পালা আরও বেড়ে দ্বিগুণ থেকে ত্রিগুণ হয়ে যায়। এই তিন চাচু হলো সবুজ চাচু, নাইম চাচু আর সোহাগ চাচু। ওদেরও বেজায় ন্যাওটা সিফাত।
ওদের তিনজন তিন ধরনের গল্প করে সিফাতের সঙ্গে।
একজন রূপকথার গল্প শোনায় তো অন্যজন ভূত-প্রেতের। অপরজন তো কল্পবিজ্ঞানের গল্পে সিফাতকে মাতিয়ে রাখে।
তাই ওরা তিনজন যখন এসে হাজির হয়, তখন সিফাতকে আর পায় কে?
সিফাতের ছোটাচু কাজের মানুষ। নানারকম কাজের সঙ্গে সে জড়িত। এই যেমন গ্রামের মানুষের বই পড়ার জন্য পাঠাগার গড়া। কোথাও কোনো সাঁকো ভেঙে পড়েছে, তা ‘পিচ্চিবাহিনী’ নিয়ে মেরামত করা। কোনো গরিব মানুষ অসুখে পড়েছে, তার চিকিৎসার জন্য পয়সা কালেকশন করা। কেউ টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না, তার বইপত্র-খাতাকলম কেনার ব্যবস্থা করা। সে যাতে স্কুলে বিনাবেতনে পড়তে পারে, তার জন্য দরখাস্ত লেখাসহ নানাবিধ কাজের সঙ্গে সে সরাসরি জড়িত।
সিফাতের উত্তরে ছোটাচু বলেÑ আয় খোকা।
সিফাত ছোটাচুর উত্তরেরও অপেক্ষা করে না। ছুটতে ছুটতে সে চলে আসে ছোটাচুর ঘরে।
এসেই ছোটাচুর কোলে ধপাস করে বসে পড়ে সে।
হাঁপাতে-হাঁপাতে বলেÑ বল চাচু, কী জন্য ডেকেছ?
পড়াশোনার কী হাল, বাবা?
ভালো চাচু। তবে কী জান চাচু? অঙ্ক নাÑ ও জিনিসটা একদম মাথায় ঢোকে না আমার। কী যে করি!
কী আর করবি। মাথায় ঢোকে না বললেই তো চলবে না। মাথায় ঢোকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
তা তো বুঝলাম, কিন্তু...
কোনো কিন্তু নয়, অসম্ভব বলে কোনো কথা নেই। বেশি বেশি চর্চা করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
তাহলে কিন্তু আমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দিতে হবে।
আচ্ছা সে হবে।
আচ্ছা এবার বল, কী জন্য ডেকেছ আমায়?
ছোটাচু বলল, এখন তো বিকেল, সন্ধ্যা হই হই করছে। চল একটু সবুজ মাঠের সবুজের বিশাল সমারোহ দেখে আসি।
সিফাত ছোটাচুর কথায় এককথায় রাজি। ছোটাচুর কেবল বলা দরকার, কোথাও যেতে হবে। ব্যস, এটুকুই যথেষ্ট। কোথায় তা ওর বিবেচ্য নয়, ছোটাচু বলেছে মানে যেতে হবে। বিনাবাক্যে সে রাজি।
বিকেলের কমলা রোদ তখন মাঠে ভেসে যাচ্ছে। হেমন্তের শেষ বিকেলের এই সোনারোদ যেন ওদের গায়ে আদর বুলিয়ে দিচ্ছে। মাঠভরা পাকা ধান তাদের সরব উপস্থিতি যেন ঝনঝন শব্দে জানান দিয়ে যাচ্ছে মাঝে মধ্যে।
ছোটাচু বলল- আজ তোকে আমাদের দেশের গল্প শোনাব।
ছোটাচু শুরু করে ঠিক গল্পের মতো করেই-
সুনীল আকাশ। পেঁজা তুলোর পাহাড়ে ঘেরা। কুয়াশাচ্ছন্ন। আস্তে-আস্তে ফিকে হয়। টুপটুপ শিশির ঝরে পাতায়-ঘাসে। মৃদু হাওয়ায় দোল খায় লাউডগা। জারুল গাছের পাতার ফাঁকে দোয়েলের শিস। পুকুর-ডোবায় আকাশের তারার মতো শাপলা ফোটে। হাসে কুটিকুটি। ঢেউ লেগে আহ্লাদে ফেটে পড়ে। পুব আকাশে চিকচিক উঁকি দেয় সূর্যিমামা। শুরু হয়ে যায় নতুন একটা দিনের।
আদিগন্ত বিস্তৃত আকাশের গায়ে সোনারোদ ঝিকমিক। নদীর ঢেউ খেলে কুলকুল। পাল উড়িয়ে চলে নৌকার সারি। মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালির মিহি সুর। এক মায়াবী জগৎ। ভালো লাগার দুর্বার হাতছানি।
এমন যে দৃশ্য, তাতে মন ব্যাকুল করে। আকুল হয়।
ছোটাচুর এমন চমৎকার শব্দমালার উচ্চারণে সিফাত যেন কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো হয়ে যায়। কথাগুলো শুনতে ওর ভীষণ ভালো লাগে।
মনে হয় যেন ছোটাচুর বলা কথাগুলো হৃদয়ের কোন গহিন ভেতর থেকে উঠে আসছে।
ছোটাচু মাঝে মধ্যে একটু ঢোঁক গিলে আবার শুরু করে।
শুরু করার আগে সিফাতের দিকে তাকায়। দেখেÑ তার শ্রোতাটি ঠিকমতো শুনছে কিনা।
ছোটাচু একটু থামে। তারপর আবার বলতে থাকেÑ
এই যে চমৎকার স্বপ্নসুন্দর পরিবেশ, সে আমাদের দেশের। প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের চিরচেনা ছবি। এমন মনকাড়া ছবি বিশ্বের আর কোথাও মেলে না। তাই তো আমরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে উঠি একটা মিষ্টি গানÑ ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি...।’
হ্যাঁ, আমরা সবাই ‘বাংলা’ নামের দেশটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। মায়ের প্রতি যেমন আমাদের সীমাহীন নির্ভেজাল ভালোবাসা, তেমনই ভালোবাসা এ দেশের মাটির প্রতিও। আরও ভালোবাসা মানুষ। বাতাস। আকাশ। পাহাড়। ঘাস। ফুল। পাখি। প্রজাপতি। নদী। আর আদিগন্ত সবুজের প্রতিও।
কিন্তু এ সোনার দেশটি একদিন আমাদের ছিল না। পাকিস্তান নামের দেশের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আর আমাদের এ অংশের নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান।’
আমরা বাঙালি। আমাদের মিষ্টি একটা ভাষা আছে। নাম বাংলা। আর পাকিস্তানিরা ভিনভাষী। তাদের সবকিছুতেই আমাদের সঙ্গে অমিল। চলায়। বলায়। ভাষায়। বলতে পারিস সবকিছুতেই।
মুখের ভাষাটাও তারা কেড়ে নিতে চাইল। এ দেশের মানুষ সমস্বরে ‘না’ বলল।
এ ‘না’কে প্রতিষ্ঠা করতে কারা ভূমিকা রেখেছিল জানিস? এ দেশের অসংখ্য ছাত্র। শিক্ষক। যুবক। জেলে। চাষা। কুলি। মজুর। তাঁতি। মাঝি। আর তোদের চেয়ে একটু বয়সে বড় দামাল কিশোরটিও।
এত লোকের ‘না’ বলা কণ্ঠ তারা আবার থামিয়ে দিতে চাইল। আর এর জন্য আবার এক নয়, দুই নয় দীর্ঘ ৯ মাস লড়াই চলল তাদের সঙ্গে আমাদের।
১৯৭১ সালে সংঘটিত ওই লড়াইয়ের নাম ছিল ‘মুক্তিযুদ্ধ’। গোটা বাঙালি জাতিই সেদিন ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে মুক্ত হতে চেয়েছিল। তাই অমন নাম। ওরা ওইসব মুক্তিকামী মানুষকে রুখে দিতে নানারকম অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু প্রমাণ হয়েছিলÑ দেশপ্রেমের কাছে সবকিছু নস্যি।
লড়াই করার অর্থ হলোÑ আমরা আর তাদের সঙ্গে থাকতে চাই না। স্বাধীনতা চাই। চলার স্বাধীনতা। বলার স্বাধীনতা। দেখার স্বাধীনতা। ভাবার স্বাধীনতা। ভাষার স্বাধীনতাÑ কেবলই স্বাধীনতা। যে স্বাধীনতা বিশ্বে আমাদের আলাদা করে চেনাবে। আমাদের একটা নিজস্ব মানচিত্র হবে। পতাকা হবে। এ দাবিই ছিল মূল। আমরা বললামÑ ‘আমাদের দাবি মানতে হবে।’
ওরা ‘না’ বলল।
‘না’ বললেই হলো? এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার নেশায় মেতে উঠল। জীবনবাজি রেখে যুদ্ধে গেল। বীরের মতো লড়াই করে রক্ত দিল।
ছোটাচু থামে। তার কথাগুলো কেমন স্বপ্নের মতো মনে হয়। ছোটাচুও যেন সেই স্বপ্নের জগতের এক ‘অন্য মানুষ’ হয়ে গেছে।
সিফাত এগুলো একটু একটু তার বইতে পড়েছে। কিন্তু এমনভাবে তার মাথায় আজ অবধি ঢোকেনি। এজন্যই তো সে ছোটাচুর কাছে অঙ্ক শিখতে চায়। তাহলে এখন থেকে আর পরীক্ষায় তাকে অঙ্কে কম নম্বর পেতে হবে না।
সিফাত ছোটাচুর কথা শুনতে উদগ্রীব। থামল মানেই যেন সব শেষ হয়ে গেল। তাই সে ছোটাচুকে তাড়া দেয়, ছোটাচু তারপর?
ছোটাচু অতিরিক্ত কোনো কথা না বলে আবার শুরু করে-
তারপর কত রক্ত! তারপর ওরা হারল। আমাদের চরম মনোবলের কাছে ওরা পরাজিত হলো।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা নতুন একটা পতাকা পেলাম। আর পেলাম নতুন একটা দেশের ঠিকানা। পেলাম স্বাধীন মানচিত্র। গর্বে আমাদের বুকটা টান টান হলো। তার মানে ওই দিন আমরা পাকিস্তানি দস্যু বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে বিজয় অর্জন করলাম।
আমাদের নতুন দেশটির নাম হলো ‘বাংলাদেশ’। বিশ্বে স্বাধীন দেশ হিসেবে আমরা নতুন করে পরিচিতি পেলাম।
স্বাধীন দেশের লাল-সবুজ পতাকা সেদিন থেকে সগৌরবে পতপত করে আকাশে ওড়ে। ঘোষণা করে তার শ্রেষ্ঠত্বের কথা।
আমাদের এ গর্বের ইতিহাস আর প্রিয় এ দেশটির কথা আমরা কখনও ভুলব না। যাদের রক্ত আর প্রাণের বিনিময়ে এই দেশ, এই মাটি, তাদের মনে রাখব চিরদিন। দেশকে ভালোবেসে প্রতিদিন অন্তত একবার আমরা সবাই বলবÑ ‘প্রিয় বাংলাদেশ, আমি তোমায় ভালোবাসি। যতদিন শরীরে প্রাণ আছে ততদিন ভালোবাসব।’
পূর্ণ গল্পটি শেষ করে নড়েচড়ে বসল ছোটাচু।
ছোটাচু এভাবেই অনেক জ্ঞানের কথা, জানার কথা দারুণ সব গল্পের মাধ্যমে শিখিয়ে দেয়।
যখন গল্পটি শেষ হলো তখন সূর্য প্রায় ডুবুডুবু।
এখন ঘরে ফেরার পালা। একটু বাদে একটু একটু শিশির পড়তে শুরু করবে। এ সময় বাইরে থাকলে ঠান্ডা লাগতে পারে। তাই আর মাঠে বেশিক্ষণ থাকা হলো না। চাচা-ভাইপোতে আবার আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করে বাড়ির দিকে।
তবে সিফাতের কাছে আজকের এ বিকেলটা অন্যরকম হয়ে ওর স্মৃতিতে গেঁথে থাকবে। স্মৃতিময় এ দিনটির কথা কি সে কখনও ভুলতে পারবে?

Friday, November 20, 2020

বাংলাদেশের গর্ব পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার

পাহাড়পুর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে বাংলাদেশের একটি গর্ব। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা সোমপুর বিহার বর্তমানে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার। পালবংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপালদেব অষ্টম শতকের শেষের দিকে বা নবম শতকে এই বিহার তৈরি করেছিলেন। ১৮৭৯ সালে স্যার কানিংহাম এই বিশাল কীর্তি আবিষ্কার করেন।
পাহাড়পুরকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার বলা যেতে পারে। পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী পুন্ড্রনগর এবং অপর শহর কোটিবর্ষ’র মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত ছিল সোমপুর মহাবিহার। এর ধ্বংসাবশেষ বর্তমান বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজশাহীর অন্তর্গত নওগাঁ জেলার বদলগাছি উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত। স্থানীয়রা এটিকে ‘গোপাল চিতার পাহাড়’ আখ্যায়িত করতো। সেই থেকে এর নাম হয়েছে পাহাড়পুর, যদিও এর প্রকৃত নাম সোমপুর বিহার।

বৌদ্ধ বিহারটির ভূমি-পরিকল্পনা চতুষ্কোনাকার। এর চারদিক চওড়া সীমানা দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। সীমানা দেয়াল বরাবর অভ্যন্তর ভাগে সারিবদ্ধ ছোট ছোট কক্ষ ছিল। উত্তর দিকের বাহুতে ৪৫টি এবং অন্য তিন দিকের বাহুতে রয়েছে ৪৪টি করে কক্ষ। সবশেষ যুগে ৯২টি কক্ষে মেঝের ওপর বিভিন্ন আকারের বেদী নির্মাণ করা হয়। কক্ষগুলোর প্রতিটিতে দরজা আছে। এগুলো ভেতরের দিকে প্রশস্ত, কিন্তু বাইরের দিকে সরু হয়ে গেছে।

বিহারের উত্তর বাহুর মাঝ বরাবর রয়েছে প্রধান ফটক। প্রধান ফটক ও বিহারের উত্তর-পূর্ব কোণের মাঝামাঝি আরেকটি ছোট প্রবেশপথ ছিল। উত্তর বাহুর প্রবেশপথের সামনে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত একটি পুকুর ছিল। প্রথম নির্মাণ যুগের পরবর্তী আমলে এই পুকুর খনন করা হয়। পরে এটি ভরাট করে দেওয়া হয়।

কেন বসবাস জীবন্ত আগ্নেয়গিরির ঠিক নিচেই?

কেপ ভার্দের আগ্নেয়গিরি -স্যাটেলাইট ছবি
আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমে আটলান্টিকের বুকে একটি দ্বীপপুঞ্জের নাম কেপ ভার্দে। অসংখ্য সক্রিয় আগ্নেয়গিরিতে ঘেরা এই দেশের দ্বীপগুলো, আর তা থেকে অগ্ন্যুৎপাতও হয়ে থাকে নিয়মিত।
সম্প্রতি কেপ ভার্দেতে একটি আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা নি:সরণের পর তা নিচের গ্রামগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।
লাভার স্রোত ঢুকে পড়েছে বহু লোকের বসার ঘরে পর্যন্ত, কিন্তু তারপরও তারা সেই বাড়িঘর ছেড়ে যেতে চাইছেন না।
সাবেক ব্রিটিশ প্যারাঅলিম্পিয়ান অ্যাথলিট এড অ্যাডেপশিয়ান দেখা করতে গিয়েছিলেন কেপ ভার্দের এমনই একজন বাসিন্দার সঙ্গে।
আসলে আমি বা আপনি কি একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরির পাদদেশে থাকতে রাজি হব? উত্তরটা নিশ্চয়ই হবে না।
অথচ কেপ ভার্দের অনেক লোকজন কিন্তু ঠিক সেটাই করছেন - আর তাদেরই একজনের বাড়িতে গিয়ে একেবারে তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলেন সাবেক প্যারা-অ্যাথলিট এড অ্যাডেপশিয়ান।
রামিরোর বাড়ির ভেতর তার সঙ্গে প্যারা-অ্যাথলিট অ্যাডেপশিয়ান (বাঁয়ে)
রামিরোর বাড়িতে ঢুকেই তিনি দেখেন, ড্রয়িং রুমের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়েছে জমাট লাভাস্রোত।
বিস্ময় চাপতে না-পেরে তিনি বলে ওঠেন, "এটা কী করে সম্ভব? এ তো অবিশ্বাস্য! দেওয়ালে পর্যন্ত ফাটল ধরে গেছে লাভার চাপে।"
ওই বাড়ির মালিক, ব্যবসায়ী রামিরো কিন্তু বলছিলেন, "যখন অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয় আমরা একেবারেই ভাবিনি যে সেটা এত ভয়ঙ্কর হবে।"
"তবুও আমাদের সৌভাগ্য বলতে হবে ও আমি ও আমার ছেলে মিলে বাড়িতে যা সব দামী জিনিসপত্র ছিল তার প্রায় সবই বের করে নিতে পেরেছিলাম।" 
আগ্নেয়গিরির পাদদেশে কেপ ভার্দে দ্বীপপুঞ্জ
জমাট লাভা থেকে একটা পাথরের টুকরো হাতে তুলে নিয়ে অ্যাডেপশিয়ান বলতে থাকেন, "বিশ্বাস করা যায় এটা একটা আগ্নেয় শিলা?"
"ভাবুন তো, নিজের ড্রয়িং রুমে বসে আপনি টিভিতে ইস্টএন্ডার দেখছেন আর রিল্যাক্স করছেন - এমন সময় হঠাৎ গরম লাভার স্রোত হুড়মুড় করে আপনার ঘরের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ল!"
"আমি তো ভেবেই স্তম্ভিত হয়ে যাচ্ছি - বিশ্বাসই করতে পারছি না এমন কিছু কখনও ঘটতে পারে।"
কেপ ভার্দের ফোগো আইল্যান্ডে 'পিকো দো ফোগো' আসলে একটি খুবই সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, আর এই সাঙ্ঘাতিক কান্ডটি সেই ঘটিয়েছে।
সেটির অগ্ন্যুৎপাতে আচমকা ভেসে গেছে নিচের দুটি গ্রাম - কিন্তু তার পরও রামিরো ও তার বন্ধুরা কিছুতেই সেই গ্রাম থেকে সরতে রাজি নন।
আগ্নেয়গিরির পাদদেশে এই সেই ফোগো আইল্যান্ড
ওই গ্রামের লাভাবিধ্বস্ত রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে অ্যাডেপশিয়ান তাকে জিজ্ঞেস না-করে পারেন না, "মাথার ওপর এত বিশাল একটা আগ্নেয়গিরি থেকে যে কোনও সময় উদ্গীরণের ভয় - সেই আতঙ্ক মাথায় নিয়ে এই গ্রামে কীভাবে পড়ে থাকতে পারেন?"
রামিরো নির্বিকারভাবে জবাব দেন, "আমি আসলে জীবনে দু-দুবার সাঙ্ঘাতিক অগ্ন্যুৎপাত দেখেছি - দেখেছি কীভাবে গরম ফুটন্ত লাভার স্রোত সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।"
"কিন্তু বিশ্বাস করুন কখনও দেখিনি সেই অগ্ন্যুৎপাতে কাউকে মারা যেতে - আর সেটাই আমাকে এখনও এই গ্রামে রয়ে যাওয়ার ভরসা জুগিয়েছে, আত্মবিশ্বাস দিচ্ছে।"
কেপ ভার্দের আগ্নেয়গিরি - স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবি

Tuesday, November 17, 2020

যৌন আনন্দের জন্য গাঁজা ব্যবহার করেন যে লোকেরা

যৌন আনন্দ বাড়ানোর জন্য গাঁজাকে ব্যবহার
কিছুদিন আগেই 'বিনোদনমূলক নেশার সামগ্রী' হিসেবে গাঁজা বৈধ করা হয়েছে কানাডায়, আরো অনেক দেশেই ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা বিতর্ক চলছে। এর মধ্যেই এক ধরণের গাঁজাসেবী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে - যারা গাঁজা ব্যবহার করছেন যৌন আনন্দ বাড়ানোর জন্য।
এই ধরণের লোকদের বলা হচ্ছে 'ক্যানাসেক্সুয়াল' - শব্দটা তৈরি হয়েছে গাঁজার ইংরেজি নাম ক্যানাবিসের প্রথম অংশটা নিয়ে।
এর বিচিত্র সব পদ্ধতি অবলম্বন করছেন - যার মধ্যে আছে শয়নকক্ষে গাঁজা মেশানো মোমবাতি জ্বালানো, বা মেয়েদের গোপন অঙ্গে গাঁজার তেল ছিটিয়ে দেয়া।
বিবিসির সাংবাদিক আয়মান আল-জুজি লিখছেন, শুনতে অদ্ভূত শোনালেও অনলাইনে এধরণের নানা রকম পণ্য বিক্রি ক্রমশই বাড়ছে - যার মধ্যে আছে গাঁজা থেকে তৈরি তেল, স্প্রে, মোমবাতি, এমনকি গাঁজা গাছের ফুল।
সত্যিকথা বলতে কি, যৌন সুখের জন্য গাঁজার ব্যবহার বহু প্রাচীন। ভারতবর্ষে ঐতিহ্যাশ্রয়ী হিন্দুদের অনেকে বিশ্বাস করেন গাঁজা থেকে তৈরি পানীয় - যাকে বলা হয় 'ভাঙ লাচ্ছি' - তা পান করলে যৌন ইচ্ছা বৃদ্ধি পায়।
প্রাচীন মিশরে মহিলারা তাদের যৌনাঙ্গে প্রয়োগ করতেন গাঁজা মেশানো মধু - যার উদ্দেশ্য ছিল তাদের ভাষায় 'জরায়ুকে ঠান্ডা করা।'
তার মানে কি 'ক্যানাসেক্সুয়াল' মোটেও নতুন ব্যাপার নয়?
ক্যানাসেক্সুয়াল কথাটা প্রথম ব্যবহার করেন ক্যালিফোর্নিয়ার এ্যাশলি ম্যান্টা। তিনি ২০১৩ সালে গাঁজা নামের 'যাদুকরী ক্ষমতাসম্পন্ন' গাছের ওপর ভিত্তি করে নানা ধরণের সেক্স থেরাপি সেবা চালু করেছিলেন। তখনও গাঁজা যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ছিল।
অনলাইনে ক্যানাসেক্সুয়ালদের জন্য বিক্রি হচ্ছে নানা রকম পণ্য
কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্রেরও বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গাঁজার ব্যবহার বৈধ করা হয়েছে । নিষেধাজ্ঞা প্রথম তোলা হয় উরুগুয়েতে, আর যুক্তরাজ্যে চিকিৎসার ক্ষেত্রে গাঁজার ব্যবহার বৈধ করার ব্যাপারটা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।
ব্রিটেনের লুটন শহরের বাসিন্দা এ্যাডাম এবং ডোনিয়া (ছদ্ম নাম)। তারা গত তিন বছর ধরেই ক্যানাসেক্সুয়াল - অর্থাৎ যারা গাঁজা-জাত সামগ্রীকে যৌন আনন্দ বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করছেন।
ডোনিয়া বলেন, "আমার শরীরের গঠন নিখুঁত নয়। কিন্তু গাঁজা ব্যবহার করলে আমার এসব চিন্তা মাথা থেকে চলে যায়, দেহ-মন রিল্যাক্সড হয়। আমি একটা উত্তাপ অনুভব করি, যৌনমিলনে অধিকতর আনন্দ অনুভব করি।"
ইন্টারনেটে পাওয়া নির্দেশিকা দেখে তিনি নিজেই গাঁজা-মেশানো অলিভ অয়েল তৈরি করে নিয়েছেন।
আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠান বলছে, এসবের চাহিদা এত বাড়ছে যে তারা সরবরাহ করে কুলাতে পারছে না।
কিন্তু গাঁজার এধরণের ব্যবহার সম্পর্কে কোন জরিপ হয় নি, এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও প্রমাণিত নয়।
বরং কিছু জরিপে দেখা গেছে উল্টোটা। একটি জরিপে দেখা গেছে, পুরুষরা গাঁজা ব্যবহার করলে তাদের যৌনমিলনের সক্ষমতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। আরেকটি জরিপ বলেছে, যারা প্রতিদিন গাঁজা খান তাদের যৌন সমস্যায় ভোগার সম্ভাবনা দ্বিগুণ বেড়ে যায়।
ব্রিটিশ যৌনস্বাস্থ্য এবং এইচআইভি সমিতির একজন কনসালট্যান্ট ড. মার্ক লটন বলছেন, যৌনমিলনের সময় এ্যালকোহল বা অন্য কোন ধরণের মাদকদ্রব্য ব্যবহার করার ক্ষেত্রে লোকের সতর্ক হওয়া উচিত।
অবশ্য এ্যাশলি ম্যান্টা মন করেন, এটা ঠিক যে এ ব্যাপারে আরো গবেষণা দরকার, এবং এসব পদ্ধতি হয়তো সবার জন্য নয়।
কিন্তু তিনি বলেন, তার নিজের যৌনজীবনে গাঁজা ব্যবহার করে তিনি ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছেন।
গাঁজার এধরণের ব্যবহারের পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলে নি

Sunday, November 15, 2020

গল্প- বুদাপেস্টকে আঘাত করে by নো ভায়োলেট বুলাওয়ায়ো

অনুবাদ : অদিতি ফাল্গুনী। [ভূমিকা ও লেখক পরিচিতি: 'নো ভায়োলেট বুলাওয়ায়ো' লেখকের ছদ্মনাম। তার প্রকৃত নাম এলিজাবেথ জান্ডিল টেশেলে। তিনি ১৯৮১ সালের ১২ অক্টোবর জিম্বাবুয়ের শলোতসো শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ‘ভায়োলেট’ লেখকের মায়ের নাম আর জিম্বাবুয়ের লোকভাষায় ‘নো’ অর্থ ‘সঙ্গে’। লেখক তার ছদ্মনাম গ্রহণ করার সময় মা ভায়োলেটের নাম নিয়ে এটাও জানিয়ে দেন যে, তিনি প্রয়াত ভায়োলেটের সঙ্গে আছেন। আর ‘বুলাওয়ে’ জিম্বাবুয়ের সেই শহর যেখানে তিনি বড় হয়ে ওঠেন।

বুলাওয়ে তার অল্প বয়সেই পরিবারের অনেক নিকটজনের এইডস রোগে মৃত্যু হতে দেখেছেন। স্বল্প বয়সেই অনেক মৃত্যুতে প্রচুর স্বজন হারানো ও ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের অভিশাপে পীড়িত জিম্বাবুয়েতে বড় হওয়া এই লেখক তাই তার আখ্যান রচনা করেন একদমই অলঙ্কারবর্জিত, ছিপছিপে ও নির্মেদ এক ভাষায়। অথচ, তারই পরতে পরতে এক ধরনের কালো রহস্যময়তা ও খুব নির্মেদ ভাষাতেই কোনো কোনো শব্দ ব্যবহারে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করে পাঠককে দেন অতীন্দ্রিয়তার আস্বাদ।

যেমন ‘হিটিং বুদাপেস্ট’ গল্পটির কথাই ধরা যাক—গল্পে বুলাওয়ে শহরের কয়েকটি ছেলে ও মেয়েশিশু অভিজাতপাড়া ‘বুদাপেস্ট’-এ যাচ্ছে খাবার চুরি করতে। শিশুদের কারো নাম ‘বেজন্মা (বাস্টার্ড),’ কারো নাম ‘খোদা জানে (গড নোজ)’ আবার কারো নাম ‘প্রিয়া (ডার্লিং)’। বেজন্মার ছোট বোনের নাম আবার ‘ভগ্নাংশ (ফ্র্যাকশন)’। আছে আমাদের দেশেও, সমাজের দরিদ্র শ্রেণিতেই ‘মরা’, ‘পচা’ এমন নানা নাম শিশুদের রাখা হয়। আছে খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত নাম ‘স্টিনো’ আবার নিখাদ আফ্রিকীয় নাম ‘চিপো’ বা ‘সবহো।’ এই ছ’টি ছেলে ও মেয়ে শিশু ‘স্বর্গ’ (প্যারাডাইস) নামক তাদের বস্তিতে মায়েদের চোখের সামনে থেকে বেরিয়েই দূরে শহরের বিত্তশালী বা অভিজাত এলাকায় যাচ্ছে খাবার খুঁজতে। যেহেতু  মায়েরা চুল আঁচড়ানোয় আর কথা বলায় ব্যস্ত থাকে তাই তারা বাচ্চাদের খেয়াল করে না । বাচ্চাদের খেয়াল করে না জাকারান্দা গাছের নিচে দাঁড়ানো বস্তির বয়সী পুরুষেরাও। তাদের চোখ তাস খেলাতেই আটকে থাকে। আর সেই ফাঁকে বস্তির বাচ্চারা ছুটছে অভিজাত এলাকা ‘বুদাপেস্ট’-এ খাবার চুরির আশায়। আমাদের ‘গুলশান-বনানী-উত্তরা-বারিধারা’র মতই জিম্বাবুয়ের বুলাওয়ে শহরের অভিজাত এলাকা ‘বুদাপেস্ট’। বুদাপেস্ট কেমন? বস্তির মতোতো নয় একেবারেই। দুগ্ধ ফেননিভ সব বিশাল বাড়ি, কংক্রিটের দেয়াল আর কাঁচের জানালা, বাড়িগুলোর সামনে অনেক ফল বা ফুলের গাছ। তবে বুদাপেস্টে ঢুকলে মনে হয় যেন এক বিরাণ বা শূন্য এলাকা। এখানকার মানুষেরা সব যেন পাসপোর্ট হাতে বিদেশ চলে গেছে। হ্যাঁ, আফ্রিকার বিত্তশালীরা তো আমাদের বিত্তশালীদের মতোই আরো নিরাপদে থাকতে উন্নত পশ্চিমে পাড়ি জমায়। বাচ্চাগুলো বিত্তশালীদের বাড়ির পেয়ারা চুরি করে খায়। পেয়ারা খেয়েই পেট ভরে যায় ওদের। এই বাচ্চাদের কারোর ‘সুজন কাকা (আঙ্কল পোলাইট)’ বিদেশে গিয়ে শুরুতে এটা-সেটা পাঠালেও এখন আর চিঠিও লেখে না। কারো বয়স্কা কোনো আত্মীয়া আমেরিকায় কাজ করে। চিপো নামের দশ বছরের মেয়েটি তার পিতামহের হাতেই গর্ভবতী হয়েছে বলে আগের মতো সেরা দৌড়বিদ আর নেই এই শিশুদের ভেতর। তবু, সে-ও বের হয়েছে পেয়ারা চুরির অভিযানে। পেট ভরে পেয়ারা খাবার পর বস্তির পাশের কবরখানার পেছনে এক ঝোপের আড়ালে শিশুগুলো দ্যাখে এক নারীর লাশ। শিশুগুলোর দলপতি ‘বেজন্মা’ নামের ছেলেটি মৃতার হাতের ঘড়ি চুরি করে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে একটি বা দেড়টি রুটি পাওয়া যেতে পারে বলে জানায়।...সব বলে দিলাম নাকি? অনুনকরণীয় ক্রোধ ও রহস্যে লেখা এই গল্পটি ২০১১ সালে ‘আফ্রিকার ম্যানবুকার প্রাইজ’ হিসেবে পরিচিত ‘কেইন প্রাইজ ফর আফ্রিকান রাইটিং’ পুরস্কার অর্জন করে।

জিম্বাবুয়েতে জন্ম নেওয়া ও বড় হওয়া এই লেখক নজুবে হাইস্কুলে পড়াশোনা করার পর মিজিলকাজি হাইস্কুলে এ লেভেল পড়তে যান। মিজিলকাজি সড়কের নাম এই অনূদিত গল্পে আছে। মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে কলেজের পড়া শেষ করে তিনি কালামাজু ভ্যালি কম্যুনিটি কলেজে ভর্তি হন এবং ইংরেজিতে ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন যথাক্রমে টেক্সাসের এ এ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটি কমার্স ও সাউদার্ন মিডল-ইস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে। ২০১০ সালে তিনি কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে ‘মাস্টার অফ ফাইন আর্টস’ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সেখানে তাকে ট্রুম্যান কাপোটে ফেলোশিপ দেয়া হয়। ‘হিটিং বুদাপেস্ট’ গল্পটিই তার ‘উই নিড নিউ নেমস’ উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছেদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। উপন্যাসটি ২০১৩ সালের ম্যান বুকার পুরস্কারের জন্য শর্ট-লিস্টেড হয়েছিল। এছাড়াও তিনি এতিসালাত প্রাইজ ফর লিটারেচার ও হেমিংওয়ে ফাউন্ডেশন/পেন এওয়ার্ড পেয়েছেন)। জিম্বাবুয়ের এই লেখক স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টেগনের ফেলো (২০১২-১৪)। ২০১২ সালে ‘দ্য ন্যাশনাল বুক ফাউন্ডেশন’ তাকে ৩৫ জন সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তির তালিকাভুক্ত করে।]

আমরা বুদাপেস্ট যাবার পথে চলেছি: ‘বেজন্মা’ এবং ‘চিপো’ আর ‘খোদা জানে’ ও ‘সবহো’ আর ‘স্টিনা’ এবং ‘আমি।’ আমরা তো রাস্তায় হেঁটে চলেছি যদিও এমনকি মিজিলিকাজি সড়ক পার হবারও অনুমতি নেই আমাদের, যদিও কিনা বেজন্মার দায়িত্ব হলো ওর ছোট বোন ভগ্নাংশকে দেখে রাখা, আরযদিও মা আমাকে বাইরে বের হতে দেখলে খুন করবে; তবু আমরা চলেছি। বুদাপেস্টে চুরি করার জন্য প্রচুর পেয়ারা আছে আর ঠিক এক্ষণি পেয়ারার জন্য আমি মারা যাবো, অথবা পেয়ারার জন্য দরকারী এমন যে কোনো কিছুর জন্য। পেটের ভেতরটা এমন করছে যেন কেউ বেলচা দিয়ে খুঁড়ে নাড়ি-ভুড়ি সব বার করে এনেছে।

‘স্বর্গ’ থেকে বের হয়ে আসা খুব কঠিন নয় যেহেতু আমাদের মায়েরা এখন তাদের চুল ঠিক করা আরকথা বলায় ব্যস্ত। আমরা তাদের পাশ দিয়ে আসার সময় তারা আমাদের একবার দেখে নিয়ে আবার দূরে তাকায়। জাকারান্দা গাছের নিচে দাঁড়ানো পুরুষেরা অবশ্য আমাদের দিকে তাকায় না এবং তাদের চোখ কখনোই তাস খেলা থেকে অন্য দিকে সরে না। শুধুমাত্র বস্তির একদম গেঁড়ি বাচ্চাগুলো আমাদের দিকে তাকায় এবং আমাদের পিছু পিছু ওরা আসতেও চায়, কিন্তু বেজন্মা শুধু সামনের উলঙ্গ বাচ্চাটির মাথায় তার মুঠি দিয়ে একটি ঘা বসায় আর তারপর বাচ্চারা সবাই পিঠ ফিরিয়ে দৌঁড় দেয়।

এই ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করতে করতে আমরা ছুটে চলেছি; বেজন্মা সবার সামনে যেহেতু সে আজখেলায় জিতেছে আর ও মনে করছে ওর হাতেই সব ক্ষমতা, আর তারপর আমি আর খোদা জানে, স্টিনা এবং সবার শেষে আসে চিপো যে আগে ‘স্বর্গ’-এ দৌড়ে সবার সেরা হতো তবে ওর দাদাজান ওকে গর্ভবতী করার পর থেকে আর পারে না।

মিজিলিকাজি সড়ক পার হবার পর আমরা আর একটি ঝোপের ভেতর দিয়ে হড়কাতে হড়কাতে চলি, বিশাল স্টেডিয়ামের পাশে আশা সড়কের কাছ থেকে জোরে ছুটি যেখানে কিনা আবছা আলোয় সব বেঞ্চি পাতা যদিও আমরা সেসব বেঞ্চিতে কখনো বসবো না। চিপোর বিশ্রামের জন্য আমাদের একবার থামতে হবে।

‘তোমার বাচ্চাটা কখন হবে?’ বেজন্মা জিজ্ঞাসা করে। চিপোর জন্য আমাদের থামতে হলে বেজন্মা একদম পছন্দ করে না। আমরা যেন ওর সাথে একদমইনা খেলি, সে চেষ্টাও সে করেছে।

‘হবে একদিন।’

‘কবে? কাল? বৃহস্পতিবার? আগামী সপ্তায়?’

‘আহা দেখতে পাচ্ছিস না ওর পেট এখনো ছোট? বাচ্চাটাকে আগে তো বাড়তে হবে।’

‘বাচ্চা তো পাকস্থলীর বাইরেই বাড়ে। সেজন্যই তারা জন্ম নেয়। সেজন্যই তাদের জন্ম হয়।’

‘ঠিক আছে, এখনো সময় হয়নি। সেজন্যই এখনো ওর পেট বড় হয়নি।’     

‘এটা কী ছেলে না মেয়ে হবে?’

‘ছেলে। প্রথম বাচ্চা ত’ ছেলেই হয়।’

‘কিন্তু তুমি তো মেয়ে। তুমি তো তোমার মা’র প্রথম বাচ্চা।’

‘আমি বলেছি আর কি ধরো তেমনটা হতে পারে।’

‘উফ্ মুখটা বন্ধ করো, এ যেন তোমার নিজের পেট নয়।’

‘আমার মনে হয় এটি একটি মেয়ে। আমার পেটের ভেতর কোনো লাথি তো পাই না।’

‘ছেলেরা পেটের ভেতর লাথি মারে, ঘুষি মারে আর মাথা দিয়ে গুঁতোয়।’

‘তুমি কি ছেলে চাও?’

‘না। মানে হ্যাঁ। কি জানি হতে পারে।জানি না আসলে।’

‘বাচ্চা ঠিক কোথা থেকে আসে শুনি?’

‘যেভাবে এটা পেটের ভেতর ঢোকে।’

‘ঠিক কিভাবে এটা পেটের ভেতরে ঢোকে?’

‘প্রথমত, খোদাকে সেখানে বাচ্চা রাখতে হয়।’

‘না, কোনো খোদা না। একটি পুরুষকেই সেখানে বাচ্চা রাখতে হয়। আমার খালাতো ভাই মুসা আমাকে বলেছে। তোমার দাদাজানই কি তোমার পেটে বাচ্চা রাখেননি, চিপো?’

চিপো এবার মাথা নেড়ে মেনে নেয়।

‘তারপর একটি পুরুষ যদি সেখানে বাচ্চা জন্মই দেয়, সে কেনো সেটি বের করে নেয় না?’

‘কারণ মেয়েরাই বাচ্চার জন্ম দেয়, মোটা মাথা কোথাকার। এজন্যই ওদের বুক থাকে যাতে বাচ্চারা দুধ খেতে পারে।’

‘কিন্তু চিপোর বুক এখনো ছোট। পাথরের মতো।’

‘বাচ্চা এলেই বড় হয়ে যাবে। তাই না চিপো?’

‘আমি চাই না আমার বুক বড় হোক। আমি বাচ্চা চাই না। আমি অন্য কিছু চাই না, শুধু পেয়ারা খেতে চাই,’ চিপো বলে এবং আবার ছোটা শুরু করে।আমরা ওর পিছ পিছ দৌড়াই।দৌড়াতে দৌড়াতে বুদাপেস্ট শহরের মাঝামাঝি এসে আমরা থামি। বুদাপেস্ট যেন একটি আলাদা দেশ।এমন একটি দেশ যেখানে এমন মানুষেরা থাকে যারা ঠিক আমাদের মতো না।

তবে এই দেশটি আরদশটা সাধারণ দেশের মতোও নয়—দেখে মনে হয় যেন কোনো একদিন এই দেশের সবাই ঘুম থেকে উঠে তাদের ফটক, দরজা, জানালা সব বন্ধ করে, পাসপোর্ট হাতে নিয়ে আরো ভালো কোনো দেশে চলে গেছে। এমনকি বাতাসও কেমন ফাঁকা; কিছু পুড়ছে না, রান্না করা খাবারের কোনো গন্ধ নেই বা কোনো কিছু পচছেও না, শুধু সাদা বাতাস যেখানে আরকিচ্ছুটি নেই।

বুদাপেস্ট বড়, নুড়ি বিছানো যত উঠোন আর দীর্ঘ যত বেড়া এবং কংক্রিটের নানা দেয়াল আর ফুল ও সবুজ গাছে ভরা, গাছগুলো ফলে ভরা যারা কিনা ঠিক আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছে যেহেতু এখানে আশপাশের কেউই বোধ করি জানে না যে ফল কি কাজে লাগে।এই ফলগুলোই আমাদের সাহস দেয়, নয়ত আমরা এখানে আসার সাহসই করতাম না। মনে হচ্ছে এই না বুঝি এখানকার রাস্তাগুলো থুতু মেরে আমাদের আবার বস্তিতেই ফিরে যেতে বলে।

আমরা চিপোর চাচার গাছ থেকে ফল চুরি করতাম, তবে সেই চুরি যেন ঠিক চুরি ছিলনা। চিপোর চাচার গাছের সব ফল চুরি করার পর আমরা অন্য অপরিচিত মানুষদের গাছের ফল চুরি করা শুরু করলাম।এত সব বাড়ির গাছ থেকে আমরা ফল চুরি করেছি যে আমি সব গুণতেও পারবো না। আমাদের ভেতর খোদা জানে এই সিদ্ধান্ত নিল যে আমরা নির্দিষ্ট যে কোনো একটি রাস্তা বেছে নেবো এবং সেই সড়কের প্রতিটি বাড়ি দেখা শেষ করে তবেই আমরা অন্য পথে যাবো। যেন আমরা গুলিয়ে না ফেলি যে কোথায় ছিলাম এবং কোথায় যাবো। এটা একটা কৌশল আরখোদা জানে বলে এভাবেই কেবল আমরা আরো ভালোভাবে চুরি করতে পারবো।

আজআমরা আরএকটি নতুন সড়কধরেছি এবং তাই সতর্কতার সাথে চারপাশ খুঁটিয়ে দেখছি। আমরা অতিক্রম করলাম এসএডিস সড়ক, যেখানে কিনা সপ্তাহ দুই আগে আমরা প্রতিটা পেয়ারা গাছ থেকে ফল চুরি করেছি। আমরা দেখতে পাই যে সাদা পর্দা সরে যায় এবং মাখনের মতো যে বাড়িটায় একটি ডানাঅলা, তবে প্রশ্রাব করতে থাকা, বালকের মূর্তি আছে, সেই বাড়ির জানালা থেকে একটি মুখ দেখা যায়। আমরা দাঁড়াই এবং তাকিয়ে থাকি, অপেক্ষা করি এই মুখটি কি করবে যখন কিনা জানালাটি খুলে যায় এবং আমাদের দিকে একটি ক্ষীণ কণ্ঠের চেঁচানি শোনার জন্য প্রতীক্ষা করি। আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। এজন্য নয় যে জানালার পাশের মুখটি আমাদের থামতে বলেছে। কারণ আমাদের কেউই এখনো দৌড় শুরু করিনি। কারণ গলার স্বরটি অত বিপজ্জনক শোনায় না। জানালা থেকে সঙ্গীত গলিয়ে সড়কে চুঁইয়ে পড়ছে; এটা কাইতো নাচের গান নয়, কোনো নাচের হলঘর নয়, আমাদের জানা-শোনার পরিধির ভেতর কিছু নয়।

এক দীর্ঘকায়া, ক্ষীণাঙ্গী নারী দরজা খোলেন এবং ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি কিছু খাচ্ছেন এবং আমাদের দিকে যেন ঢেউ তুলে এগিয়ে আসেন। ইতোমধ্যে মহিলার ভয়ানক রুগ্ন স্বাস্থ্য দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমরা এমনকি দৌড়ও দেব না। আমরা মহিলার জন্য অপেক্ষা করি, যাতে আমরা দেখতে পাই যে তিনি কেনো আমাদের দিকে বা আদৌ আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসছেন কিনা; ‘স্বর্গ’-এ কেউ আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসে না। শুধুমাত্র হাড়ের মা ছাড়া যিনি কিনা সবার দিকেই তাকিয়ে হাসেন। মহিলা ফটকের পাশে থামেন; এটা তালা দেয়া এবং তিনি তার সাথে এটা খোলার চাবি আনেননি।

‘জিজ, আমি এত গরম সইতে পারছি না। পায়ের নিচে মাটি কি শক্ত, তোমরা বাবা কিভাবে যে সব সও?’ অ-বিপজ্জনক কণ্ঠস্বরে মহিলা বলেন।তার হাতের খাবারটিতে একটি কামড় দিয়ে তিনি হাসেন। একটি সুন্দর, গোলাপী রঙের ক্যামেরা তার গলা থেকে ঝুলছে। দীর্ঘ স্কার্টের নিচ থেকে বের হয়ে আসা ভদ্রমহিলার পা জোড়ার দিকে আমরা তাকাই। শিশুর পায়ের মতো পরিষ্কার ও সুন্দর এক জোড়া পা। তিনি তার পায়ের আঙুলগুলো নাড়াচ্ছেন। আমি মনে করতে পারি না যে আমার পা কখনো অমন সুন্দর দেখিয়েছিল কিনা। হতে পারে যখন আমি জন্মেছিলাম, তখন আমার পা জোড়াও অমন সুন্দর ছিল।

তারপর আমি মহিলার লাল আর কিছু একটা চিবুতে থাকা মুখের দিকে তাকালাম। তার গলার পাশের শিরা আর যেমনভাবে তিনি তার বড় ঠোঁটগুলো চাটছিলেন, তাতেই বুঝতে পেরেছিলাম যে তিনি যা খাচ্ছেন তা’ সত্যিই মজাদার।

আমি তার হাতের দিকে তাকালাম, দেখতে চাইলাম তিনি ঠিক কি খাচ্ছেন। এটা সমতল তবে বাইরের দিকটা শক্ত। উপরের দিকটা আবার মাখনের মতো নরম এবং এর উপর মুদ্রার মতো কিছু একটা, গাঢ় গোলাপী যেন পুড়ে যাওয়া কোনো ক্ষতস্থান। আমি দেখলাম খাবারটির উপরে লাল, সবুজ ও হলুদের কিছু ছিটা আর সবার শেষে আছে সেই ফুস্কুড়ির মতো বাদামী রঙা কি একটা যেন।

‘ওটা কি?’ চিপো মহিলার হাতে ধরা জিনিষটির দিকে এক হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে আর এক হাতে তার পেট ঘষতে থাকে। পেটে বাচ্চা আসার পর থেকে চিপো কথা বলার সময় পেটে হাত ঘষে খেলতে ভালোবাসে। ওর পেটটি ঠিক যেন একটি ফুটবলের মতো, খুব বড় না। আমরা সবাই মহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি এবং শুনতে চেষ্টা করি যে তিনি কি বলেন আমাদের।

‘ওহ, এটা? এটা তো একটা ক্যামেরা,’ মহিলাটি বলেন যা আমরা জানি।

স্কার্টের উপর হাত মুছে ভদ্রমহিলা ক্যামেরায় মৃদু চাপড় মারেন। তারপর তার হাতের খাবারের বাকি অংশটুকু দরজার পাশের ময়লা রাখা ঝুড়িটার দিকে ছুঁড়ে মারেন,কিন্তু খাবারটা ঝুড়িতে পড়েনি। তিনি হাসেন।তবে আমি বুঝতে পারি না যে এতে মজার কি আছে। ভদ্রমহিলা আমাদের দিকে তাকান। হতে পারে যে তিনি চান যে আমরাও হাসি যেহেতু তিনি হাসছেন, তবে আমরা তার হাত থেকে মাটিতে পড়ে যাবার আগে উড়তে থাকা মৃত পাখির মতো খাবারটির দিকে তাকিয়ে থাকি। আমরা এর আগে কাউকে এভাবে খাবার ছুঁড়তে দেখিনি। আমি চিপোর দিকে তাকাই।

‘তোমার বয়স কত?’ মহিলা চিপোকে জিজ্ঞাসা করেন। ওর পেটের দিকে এমনভাবে তাকান যেন তিনি এর আগে কোনো গর্ভবতী মেয়েকে দেখেনি। কিন্তু চিপো শুনছেও না, সে মাটির উপরে পড়ে থাকা বস্তাটির দিকে তাকাতেই ব্যস্ত।

‘ওর বয়স দশ,’ খোদা জানে চিপোর হয়ে উত্তর করে, ‘আমাদের নয় বছর, ‘যমজ বোনের মতো একই বয়স আমাদের,’ খোদা জানে আমাকে দেখিয়ে বলে, ‘আর বেজন্মার বয়স এগারো, সবহোর আট এবং স্টিনার বয়স আমি ঠিক জানি না।’

‘ওহ,’ মহিলাটি বলেন, হাতের ক্যামেরাটি নাড়া-চাড়া করতে করতেই।

‘আর তোমার কত বয়স?’ খোদা জানে মহিলাকে জিজ্ঞাসা করে। ‘আর কোথা থেকে এসেছ তুমি?” আমি ভাবছিলাম খোদা জানে কত কথাই না বলে।

‘আমি?আমার বয়স হচ্ছে ৩৩, আমি লন্ডন থেকে এসেছি। এই প্রথম আমি আমার বাবার দেশ ঘুরতে এসেছি।’

‘আমি একবার লন্ডন থেকে আনা কিছু মিষ্টি খেয়েছিলাম। সুজন কাকা যখন প্রথম সেখানে যান তখন মিষ্টিগুলো পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে অনেক দিন আগের কথা।এখন উনি একটা চিঠিও পাঠান না,’ খোদা জানে বলে। তার পাকানো মুখ এখন চিবুনো বন্ধ করে। আমি যেন মহিলার সাথে সমান তালেই ঢোক গিলি।

‘তোমাকে তো পনেরোর বাচ্চার মতো দেখায়,’ খোদা জানে বলে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে বকবকানি খোদা জানেকে মহিলা না একটা চড় মারে! উত্তরে ভদ্রমহিলা বরং শুধু হাসেন। যে হাসিতে মনে হয় যে তাকে গর্ব বোধ করার মতো কিছু বলা হয়েছে।

‘ধন্যবাদ,’ মহিলা বলেন।আমি তার দিকে তাকিয়ে ভাবি যে এতে ধন্যবাদ দেবার কি আছে? অন্যদের দিকেও তাকাই। আমি জানি ওরাও আমার মতো মহিলাকে একটু বিচিত্রই ভাবছে। মহিলা তার মাথার চুলে হাতবোলান যা কিনা জটা ধরা ও ময়লা দেখতে; আমি যদি বুদাপেস্টে থাকতাম তবে আমি প্রতিদিন আমার পুরো শরীর ধুতাম এবং সুন্দর করে আমার চুল আঁচড়াতাম। গোটা পৃথিবীকে দেখাতাম যে আমি সত্যিকারের জায়গায় থাকা এক সত্যিকার মানুষ।

‘বাচ্চারা—তোমরা কিছু মনে করবে না তো যদি আমি তোমাদের একটা ছবি তুলি?’

আমরা একথার উত্তর করি না। কারণ প্রাপ্তবয়ষ্করা কোনো কিছুর জন্য আমাদের কাছে অনুমতি চাইবে এমন অভিজ্ঞতা আমাদের নেই।

আমরা দেখলাম মহিলা মাত্র কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন, আমরা দেখলাম তার তেজি চুলের গোছা, হাঁটার সময় মাটি ঝাড়-দিয়ে চলা তার লম্বা স্কার্ট, সুন্দর চীনে পা, বড় বড় গয়না, বড় বড় চোখ আর তার মসৃণ বাদামী ত্বক যেখানে কিনা একটি ক্ষত চিহ্নও নেই যাতে কিনা বোঝা যেত যে সে একজন জীবন্ত ব্যক্তি।তার নাকে একটি নথ ছিল অবশ্য। গায়ের টি-শার্টে লেখা ‘সেভ দার্ফুর।’

‘বাচ্চারা—এদিকে এসো—বলো—চীজ, চীজ, চীইইইইইইইইইইজ,’ মহিলা উদ্দীপনা যোগান আর সবাই বলতে থাকে, ‘চীইইইজ।’ আমি অবশ্য ঠিক বলি না কারণ আমি মনে করার চেষ্টা করি যে ‘চীজ’ অর্থ ঠিক কি এবং আমার মনে পড়ে না।  গতকাল হাড়ের মা আমাকে বলেছে ডুডু পাখির গল্প।সেই পাখি যে কিনা একটি নতুন গান শিখেছিল এবং গেয়েছিল একটি নতুন গান যার শব্দগুলোর অর্থ সে পুরো জানে না এবং পাখিটাকে পরে ধরা হয়, মেরে ফেলা হয় আর রাতের খাবারের জন্য রান্না করা হয়। কারণ গানটিতে পাখিটি আসলে তাকে মেরে না ফেলা এবং রান্না না করার জন্য অনুরোধ করছিল। মহিলা আবার আমার দিকে আঙুল বাড়ান, মাথা নাড়ান এবং আমাকে আবার ‘চীইইইইইইইইইইজ’ বলতে বলেন এবং আমি তাই করি যেহেতু তিনি অনেক দিনের পরিচিতার মতো আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন।

আমি প্রথম আস্তে বলা শুরু করি, বলি, ‘চীজ’ এবং ‘চীজ,’ এবং তারপর বলতেই থাকি ‘চীইইইইইইইইইইজ’ এবং সবাই বলছে ‘চীইইইইইইইইইইজ’ এবং আমরা সবাই গান গাইছি আর ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক ক্লিক করছে তো করছেই। এরপরই স্টিনা, যে কখনো কোনো কথা বলে না, সহসা হাঁটা শুরু করে। মহিলা এবার ছবি তোলা বন্ধ করেন এবং কথা বলেন, ‘তুমি ঠিক আছ?’ কিন্তু স্টিনা থামে না। এরপর চিপো স্টিনার পিছু পিছু হাঁটতে থাকে। ওর পেট ঘষতে ঘষতেই। তারপর আমাদের সবাই তার পিছু পিছু হাঁটে। ছবি তোলারত মহিলাকে রেখে আমরা সামনে এগোই বেজন্মা এসএডিসি সড়কের এক কোণে থামে এবং মহিলার দিকে গালি দেয়া শুরু করে। এবং তখন আমার সেই খাবারের টুকরোটির কথা মনে পড়ে যায় যা আমরা খেতে চাই কিনা এমনটা জিজ্ঞাসা না করেই মহিলা ছুঁড়ে ফেলেছিলেন এবং তখন আমিও স্টিনার সাথে মিলে চেঁচানো শুরু করি, এবং সবাই এই চেঁচানোয় যোগ দেয়। আমরা চেঁচাই এবং চেঁচাই এবং চেঁচাই; মহিলা যা খেয়েছিলেন আমরা সেটা খেতে চাই, আমরা বুদাপেস্টে আওয়াজ তুলতে চাই, আমরা চাই আমাদের পেটে যেন আর খিদে না থাকে। মহিলা আমাদের চেঁচানোয় বিভ্রান্ত হয়ে তাড়াহুড়ো করে ঘরে ঢুকে গেলেন এবং আমরা তার দিকে চেঁচাতেই থাকলাম।

আমরা কর্কশভাবে চেঁচাতেই থাকি। আমাদের গলা চুলকাতে থাকে। মহিলা যখন তার বাড়ির দরজা আটকে অদৃশ্য হয়ে যান, আমরা চেঁচানো থামাই এবং পেয়ারা খুঁজতে যাই।

বেজন্মা বলে যে আমরা যখন বড় হব তখন আমরা পেয়ারা চুরি থামাবো এবং বড়লোকদের বাড়ির ভেতরে আরো বড় জিনিষ চুরিতে হাত দেব। তবে তেমন সময় আসতে আসতে আমার হয়ত এখানে আর আসা হবে না; আমি তখন আমেরিকায় ফস্টালিনা আন্টির কাছে থাকব, আরো ভালো নানা কাজ করব।কিন্তু এখনকার কাজ হল পেয়ারা চুরি করা। আমরা আইএমএফ সড়কে যাবার কথা ঠিক করি। সেখানে একটি সাদা রঙের বাড়ি।এত বড় যে পাহাড়ের মতো লাগে দেখতে। সামনে একটি বিশাল সুইমিং পুল, তার চারপাশে অনেকগুলো ফাঁকা চেয়ার পাতা। এই সুন্দর বাসাটির ভালো দিক হল বাড়ির উঠোনের অনেক পেছনে পাহাড় এবং আমাদের হাতের কাছে পেয়ারা গাছ। যেন বা পেয়ারাগুলো জানত যে আমরা আসছি আর সেটা শুনে ওরা দৌড়ে আমাদের কাছে ছুটে এসেছে।

কংক্রিটের দেয়ালের উপর উঠতে আসলে খুব বেশি সময় লাগে না। সময় লাগে না গাছের উপর উঠে, প্লাস্টিক ব্যাগে পেয়ারা ভরতে। এই পেয়ারাগুলো বড়, মানুষের হাতের মুঠির সমান এবং নিয়মিত পেয়ারার মতো হলুদ হয়ে পাকে না; বাইরে থেকে তাদের সবুজ দেখায় ও ভেতরে গোলাপী ও তুলতুলে। এই পেয়ারাগুলো খেতে এতই ভালো যে আমি বলে বোঝাতে পারবো না।

*****

‘স্বর্গ’-এ ফিরে আমরা আর দৌড়াই না। আমরা খুব ভালোভাবে হাঁটি যেন বুদাপেস্ট এখন আমাদের নতুন দেশ, পেয়ারা খেয়ে এবং সারা পথে পেয়ারার খোসা ছড়িয়ে সেখানে আমরা পথ নোংরা করে রাখব। এইউ সড়কের পাশে এসে চিপোর বমির জন্য আমাদের থামতে হয়। আজতার বমি দেখাচ্ছে প্রস্রাবের মতো, তবে গাঢ়তর। আমরা সেই বমি না ঢেকেই সেখানে রেখে আসি।

‘একদিন আমি এখানে থাকবো, এমন একটা বাসায়,’ একটি শক্ত পেয়ারা চিবুতে চিবুতে সবহো বলে। সে বাম দিকে তাকায় এবং একটি বড় নীল বাড়ির দিকে আঙুল তুলে দেখায় যেখানে আছে প্রচুর সিঁড়ি এবং বাড়িটার চারপাশে অনেক ফুল। সবহোর গলা শুনে মনে হয় সে জানে যে সে কি নিয়ে কথা বলছে।

‘তুমি এটা কিভাবে করবে?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।

সবহো রাস্তায় পেয়ারার খোসা ছাড়ায় আর ওর বড় দুই চোখ মেলে বলে, ‘আমি এটা জানি।’

‘সে স্বপ্নে সেই বাসায় থাকবে,’ বেজন্মা সূর্যের দিকে তাকিয়ে বলে এবং সবহোর কল্পনার সেই ভবিষ্যত বাড়ির দিকে একটি পেয়ারা ছুঁড়ে মারে। পেয়ারাটা ফেটে গিয়ে বাড়িটার দেয়াল গোলাপী হয়ে যায়। আমি একটি মিষ্টি পেয়ারায় কামড় দিই। তবে এই গোলাপী পেয়ারার বীজ আবার শক্ত যা চিবুতে আমার ভালো লাগে না এবং অনেক সময়ও নেয়। কাজেই আমি ধীর-স্থিরভাবে পেয়ারা চিবুতে থাকি এবং মাঝে মাঝে আস্ত পেয়ারাই গিলে ফেলি যদিও জানি এর পর কি হবে।

‘তুমি এমনটা করলে কেনো?’ সবহো তার কল্পনার আগামী দিনেবাড়িটার এই মূহূর্তে ময়লা হয়ে যাওয়া কংক্রিটের দেয়ালের দিকে তাকায়। তারপরই তাকায় বেজন্মার দিকে।

বেজন্মা হাসে, আর একটা পেয়ারা ছুঁড়ে মারে। কংক্রিটের দেয়ালে ধাক্কা না খেলেও বাড়ির দরজায় পেয়ারাটা লাগে। দরজাটি কোনো শব্দ করে না যেমনটা সাধারণত: কোনো দরজায় কিছু একটা ঠোক্কর লাগলে হয়।

‘কারণ আমি পারি।কেননা আমি যা করতে চাই, তাকরতে পারি। এছাড়া এটা আরএমন কী?’

‘কারণ তুমি আমাকে বলতে শুনেছিলে যে আমি বাড়িটা পছন্দ করি, কাজেই এই বাড়িটার কোনো ক্ষতি তোমার করা উচিত নয়। অন্যকোনো বাড়িতে পেয়ারা ছোঁড়ো না যেটার বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই?’

‘ভালো কথা, তাই বলে এটা তোমার বাড়ি না, তাই না?’ বেজন্মা একটি কালো রঙের ট্রাক স্যুট পরেছেযা ও কখনো গা থেকে খোলে না, এছাড়াও ওর গায়ে একটি কমলা রঙের টি-শার্ট যেখানে লেখা ‘কর্নেল’। বেজন্মা তার কর্নেল টি-শার্টটি গা থেকে খুলে মাথার উপর বেঁধে ফেলে এবং আমি জানি না কিসে তাকে কদর্য বা সুন্দর দেখায়, তাকে সত্যিই নারী বা পুরুষের মতো দেখায়। বেজন্মা ঘুরে দাঁড়িয়ে পেছন দিকে ফিরে হাঁটতে থাকে যাতে সে সবহোর দিকে মুখ করে হাঁটতে পারে।সে সবসময়ই যার সাথে ঝগড়া করবে তার দিকে তাকিয়ে হাঁটতে পছন্দ করে। সে স্টিনা ছাড়া আমাদের সবাইকেই পিটিয়েছে।

‘এছাড়াও বুদাপেস্ট কোনো বাথরুম নয় যে এখানে যে কেউই ঢুকে হাঁটতে পারবে। তুমি এখানে কোনোদিনই বাস করতে পারবে না।’

‘আমি বুদাপেস্টের কোনো পুরুষকে বিয়ে করবো। সে আমাকে স্বর্গ থেকে নিয়ে যাবে, আমাকে সরিয়ে নিয়ে যাবে এইসব খুপড়ি ঘর এবং স্বর্গপথ ও ফামবেকি নামের সব বস্তি আর এই সব কিছু থেকে,’ সবহো বলে।

‘হা হা। তোমার মনে হয় কোনো পুরুষ তোমার মতো একফোকলা দেঁতো মেয়েকে বিয়ে করবে? এমনকি আমিই তো তোমাকে বিয়ে করব না,’ খোদা জানে বলে। গলার স্বর চড়িয়ে। সে আর চিপো এবং স্টিনা আমাদের সামনে থেকে হাঁটে বা হেঁটে যায়। আমি খোদা জানের শার্টের দিকে তাকাই, পিঠের দিকে ছেঁড়া আর তার আলকাতরার মতো কালো পাছা সূতির সাদা, ময়লা প্যান্টের ভেতর থেকে এক জোড়া অবাক চোখের মতো যেন তাকিয়ে আছে।

‘আমি তোমার সাথে কথা বলছি না মাথা মোটা!’ সবহো খোদা জানের দিকে তাকিয়ে চেঁচায়, ‘এছাড়া, আমার দাঁত তো আবার হবে। মা বলেছে তখন আমি দেখতে আরো সুন্দর হবো।’

খোদা জানে এবার তার হাত ছুঁড়ে এবং ‘যাহোক’ ভঙ্গিতে হাত নাচায়। কারণ এবিষয়ে তার কিছুই বলার নেই।

সবাই জানে যে সবহো দেখতে সুন্দর, সুন্দর আমাদের সবার চেয়ে, ‘স্বর্গের সব শিশুর থেকেই সবহো সুন্দর।মাঝে মাঝে আমরা ওর সাথে খেলতে রাজি হই না যতক্ষণ না ও এসব কথা বলা বন্ধ করে যা আমরা সবাই জানি।

‘যাক, আমি এসব নিয়ে ভাবি না। আমি এদেশ থেকে দ্রুতই বের হয়ে যাব। আমি অনেক টাকা বানাবো এবং দেশে ফিরে আসব আর বুদাপেস্ট অথবা লস এ্যাঞ্জেলসে বা এমনকি প্যারিসেও একটি বাড়ি কিনবো,’ বেজন্মা বলে।

‘আমরা যখন স্কুলে যেতাম, তখন আমাদের শিক্ষক মিস্টার গোনো বলতেন যে টাকা আয়ের জন্য শিক্ষা দরকার, এটাই তিনি বলতেন, আমার নিজের শিক্ষক।’ চিপে তার পেটে হাত বুলাতে বুলাতে এমনভাবে বলে যেন মিস্টার গোনো তার নিজের বাবা।যেন বা মিস্টার গোনো বিশেষ কেউ, যেন বা মিস্টার গোনোই তার পেটের ভেতর রয়েছে।

‘কিন্তু এখন তুমি কিভাবে টাকা বানাবে যখন আমরা আর স্কুলে যাচ্ছি না?’ চিপো বলে।

‘টাকা বানাতে স্কুলে যাওয়া লাগে না।কোন বাইবেলে পড়েছ যে টাকা বানাতে স্কুলে যেতে হয়?’ বেজন্মা চিপোর দিকে তাকিয়ে চেঁচায় আর নিজের মুখটা চিপোর মুখের এত কাছে আনে যেন ওর নাকটা ছিঁড়েই ফেলবে।

চিপো ওর পেটের উপর হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বাকি পেয়ারাটা শান্তভাবে চিবোয়। সে আমাদের থেকে দ্রুতগতিতে হাঁটে।

‘আমি আমার আন্টি ফস্টালিনার সাথে থাকতে যাচ্ছি; খুব বেশি দিন নয়, তোমরা দেখতে পাবে,’ আমি বলি, গলা চড়িয়ে বলি যেন ওরা সবাই শুনতে পায়। আমি আর একটা নতুন পেয়ারা চিবুনো শুরু করেছি; এটা এত মিষ্টি যে আমি তিন কামড়েই শেষ করে ফেলি। এমনকি পেয়ারার বীচিগুলো চিবুনোরও আর চেষ্টা করি না।

‘আমেরিকা বহু দূরে,’ বেজন্মা বলে, সে বিরক্ত বোধ করছে। ‘আমি এত দূরে কোথাও যেতে চাই না যেখানে বিমানে করে যেতে হয়।যদি সেখানে গিয়ে তুমি আটকে যাও আর ফিরে আসতে না পারো? আমি গেলে ঐ দক্ষিণ আফ্রিকা আর বোতসোয়ানা পর্যন্ত যেতে চাই, এভাবে, যখন অবস্থা খারাপ হবে, আমি কারো সাথে কথা না বলেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে যাবো; যেখানেই যাও না কেনো, সেখান থেকে চাইলে সহজে ফিরে আসার রাস্তা যেন তোমার থাকে।’

আমি বেজন্মার দিকে আবার তাকাই এবং বুঝে উঠতে পারি না তাকে কি বলব। আমার মাড়ির পাশের একটি দাঁত ও মাড়ির ভেতরে আঠার মতো আটকে আছে একটি পেয়ারার বীজ। বীজটা ছাড়াতে শেষমেশ আমি আমার একটি আঙুল ব্যবহার করি। এটা কানের খইলের মতো লাগে।

‘আমেরিকা সত্যি অনেক দূর,’ চিপো বলে, বেজন্মার সাথে সে একমত।

চিপো এবার হাঁটা থামায়, তার হাত তার পেটের নিচে, যাতে আমরা তাকে ধরতে পারি। ‘কি হবে যদি তোমার প্লেনে কিছু হয়? যখন তুমি প্লেনের ভেতরে আছো, তখন সন্ত্রাসীদের সাথে তুমি কি করবে?’

আমার মনে হয় যে, সমতল মুখ, ফুটবলাকৃতি পেটের চিপো এসব কথা বলছে নিছকই বেজন্মাকে সুখী করতে যেহেতু কুচ্ছিত মুখের বেজন্মা একটু আগেই ওর দিকে চেঁচিয়েছে। আমি ওর দিকে কথাভরা চোখে তাকালেও আমার মুখ পেয়ারা চিবিয়েই চলে।

‘আমার কিছু যায় আসে না, আমি যাচ্ছি,’ আমি বলি এবং খোদা জানে আর স্টিনাকে ধরতে ছুট দেই। কারণ আমি জানি এসব কথার শেষ কোথায় যদি চিপো আর বেজন্মা আমার উপর চড়াও হয়।

‘ঠিক আছে, যাও, আমেরিকা যাও এবং নার্সিং হোমে গিয়ে কাজ করো আর রোগীদের পাছা ধুইয়ে দাও। তুমি মনে করো আমরা এসব গল্প জানি না?’ বেজন্মা আমার পিছন পিছন চেঁচায় তবে আমি হাঁটতেই থাকি।

আমি ভাবি ডান দিকে ফিরে বেজন্মাকে একটা মার লাগাই। আমার আমেরিকা সম্পর্কে ওভাবে বলার জন্য।আমি ওকে চড় মারবো, ওর বড় কপালে গুঁতো দিবো, তারপর আমার হাতের মুঠি ওর মুখের ভেতর জোরে ঢোকাবো এবং ওর দাঁত ওর থুতুর সাথে ফেলতে বাধ্য করবো।আমি ওর পেটে এমনভাবে মারবো যে ও যতটা পেয়ারা খেয়েছে তার সবটুকুই বমি করে ফেলে দেবে এবং তারপর ওকে মাটিতে ফেলে দেবো। ওর পিঠে আমার হাঁটু দিয়ে খোঁচা দেবো, ওর হাত জোড়া ওর পেছন দিকে শক্ত করে বাঁধবো এবং তারপর ওর মাথা টেনে তুলবো যতক্ষণ না ও প্রাণ ভিক্ষা চায়। তবে আমি এসব কিছুই করি না আর চুপ করে হাঁটতে থাকি। আমি জানি ও হিংসা করছে।কারণ ওর আসলে আমেরিকায় কেউ নেই। কারণ আন্ট ফস্টালিনা ওর আন্ট নয়। কারণ সে বেজন্মা আরআমি প্রিয়া।

*****

যে সময় নাগাদ আমরা ‘স্বর্গ’-এ ফিরে আসি, ততক্ষণে আমাদের পেয়ারাগুলো খাওয়া শেষ এবং পেট এতটাই ভরা যে পারলে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটি। রাতে আমরা শুধু পানি খাবো এবং হাড়ের মা আমাদের একটি গল্প বলবেন যা আমরা শুনবো এবং তারপর ঘুমোতে যাবে। আজ রাতে ঝোপের আড়ালে আর হাগু করবো না। করতে হলে খুব বেশি রাত হবার আগেই করতে হবে। নয়তো হাগু করতে যাবার সময় তোমার পাশে কে থাকবে? ঝোপের পাশে যেতে হলে তো ঐ কবরখানাটা পার হতে হয় আর সেখানে তোমার সাথে একটা ভূতের দেখা হয়ে যেতে পারে।

হাগু করার সময় আমরা সবাই ঝোপের আড়ালে ঠিক একটি জায়গা খুঁজে নিই, আর আমি, আমি একটি পাথরের পেছনে উবু হয়ে বসি।পেয়ারা খাওয়ার সবচেয়ে খারাপ দিক এইটিই। তুমি যখন খুব বেশি পেয়ারা খাও, তখন এর বীজগুলোর চাপে হাগু বন্ধ হয়ে আসে। তবু জোর করে হাগু হওয়াতে গেলে এত ব্যথা হয় যেন তুমি আস্ত একটা দেশ জন্ম দেবার কষ্ট করছো। মিনিটের পর মিনিটের পর মিনিট পার হয় অথচ কেউ একবার চেঁচিয়ে বলবে না, ‘আমার হয়ে গেছে, তোমরা তাড়াতাড়ি করো।’

আমরা সবাই ওভাবেই উবু হয়ে বসে আছি, ভিন্ন ভিন্ন নানা জায়গায়, আর আমি আমার উরুতে একটা টান লাগায় হাতের মুঠি দিয়ে টান লাগার জায়গায় পেটাচ্ছি যেন ব্যথাটা কমে যায়। আর তখনি কে যেন চেঁচালো। চেঁচানোটা ঠিক সেই সময়ের না যখন তুমি নিজের তলপেটে নিজেই খুব চাপ দিচ্ছ হাগু হবার জন্য আর একটি পেয়ারার বীজ তোমার হাগু বের হবার রাস্তা দিয়ে বের হবে; বরং এটা বলছে, ‘এসো এবং দেখো,’ কাজেই আমি তলপেটে হাগু হবার জন্য ধাক্কা দেয়া বন্ধ করি, প্যান্টটা টেনে তুলে পাথরের আড়াল থেকে উঠে দাঁড়াই।

উঠে দাঁড়িয়ে দেখি, খোদা জানে উবু হয়ে বসা অবস্থাতেই ভয়ানক চেঁচাচ্চে। সামনের ঘন গাছপালার দিকে আঙুল তুলে দেখায় এবং আমরা দেখি লম্বা কিছু একটা গাছ থেকে ঝুলছে।

‘কি ওটা?’ কেউ একজন, আমি জানিনা কে, ফিসফিস করে।

কেউ উত্তর করে না। তবে আমরা ইতোমধ্যেই দেখে ফেলেছি যে এটা কে? সবুজ একটি দড়ি থেকে এক মহিলা ঝুলছে। সন্ধ্যা নেমে আসার আগে ঠিক এই সময়টায় সূর্য যেন গাছের পাতার ফাঁক থেকে সঙ্কুচিত হয়ে দেখা দিচ্ছে আর সবকিছুই একটি অদ্ভুত বর্ণ ধারণ করছে, যা কিনা নারীটির গায়ের চামড়ায় এমন এক আভা ছড়াচ্ছে যে মনে হচ্ছে তার ভেতরে টকটকে লাল কয়লা জ্বলছে।

মহিলার রোগা হাত দু’টো দু’পাশে নিস্তেজ হয়ে ঝুলছে, আর তার হাত ও পা দু’টো মাটিতে ঠেকেছে, যেন বা কেউ তাকে সেখানে টেনে নিয়েছে, বাতাসে একটি সরল রেখা ঝুলছে।

এই মহিলার চোখ জোড়া তার দেহের সবচেয়ে ভীতিকর অংশ। এত বেশি সাদা দেখতে যে বলার নয়, আর মুখটি হাঁ করে বের করা। মহিলা একটি হলুদ পোশাক পরে এবং তার জুতোর ডগায় ঘাস যেন চাটছে।

‘চল্ দৌড়াই.’ স্টিনা বলে। সেই দেশি খেলার পর থেকে এই প্রথম স্টিনা কোনো কথা বললো। স্টিনা যখন কোনো কথা বলে, তখন বুঝে নিতে হবে যে সত্যিই গুরুতর কিছু ঘটেছে এবং আমি দৌড় দেবার জন্য প্রস্তুত হই।

‘ভীতুর দল, দেখতে পাচ্ছ না যে মহিলা নিজেই নিজের গলায় দড়ি দিয়েছে আর এখন সে মৃত?” বেজন্মা একটি পাথর তুলে ছুঁড়ে মারে; এটা মহিলার উরুতে আঘাত করে। আমার মনে হলো কিছু একটা ঘটবে তবে কিছুই ঘটে না।মহিলা নড়েন-চড়েন না।

‘দ্যাখো, আমি তো তোমাকে বলেছিলাম যে উনি মারা গেছেন।’ বেজন্মা বলে, সে এখন সেই গলায় কথা বলছে যে গলায় কথা বলে সে মনে করিয়ে দিতে চায় যে আমাদের ভেতর কে দলনেতা।

‘এভাবে মরা মানুষের গায়ে পাথর ছুঁড়লে খোদা তোমাকে শাস্তি দেবে,’ খোদা জানে বলে।

বেজন্মা তবু আর একটি পাথর ছোঁড়ে। এটা মৃত মহিলার পায়ে ‘খু’ জাতীয় একটা শব্দ করে আঘাত করে। তবু মহিলার কোন নড়ন-চড়ন নেই।আমার প্রচণ্ড ভয় লাগছে; মনে হচ্ছে যেন মহিলা আমার দিকে তার সাদা, কোটর থেকে বেরিয়ে আসা চোখ জোড়া দিয়ে দেখছেন। তিনি যেন আমার দিকে তাকিয়ে আছেন আর অপেক্ষা করছেন যেন আমি কিছু একটা করব! তবে আমি জানি না আমি কি করব।

‘খোদা এখানে থাকেন না, নির্বোধ কোথাকার,’ বেজন্মা বলে। সে আর একটি পাথর ছোঁড়ে যা মহিলার হলুদ পোশাকে গড়িয়ে পড়ে এবং আমি খুশি হই যে পাথরটি গড়িয়ে পড়ে যায়।

‘আমি এখন বাসায় যাব আরমা’কে সব বলবো,’ সবহো বলে, তার গলার স্বর কেমন যেন কান্না কান্না। স্টিনা চলে যাবার জন্য হাঁটা শুরু করে, তবে তার পেছন পেছন সবহো এবং খোদা জানেও হাঁটতে থাকে। বেজন্মা কিছুক্ষণের জন্য পিছিয়ে থাকলেও একটু পরেই আমার কাঁধের উপর থেকে তাকিয়ে দেখি সে ঠিক আমার পেছনে। আমি জানতাম যে সে ঐ ঝোপের আড়ালে একটি মৃতদেহের সাথে সারাজীবন থাকতে পারবে না যদিও সে হাব-ভাব করে যেন আমাদের ‘স্বর্গ’ নামক বস্তির সে রাষ্ট্রপতি। আমরা আবার একসাথে হাঁটা শুরু করি, কিন্তু তখন বেজন্মা ঠিক আমাদের সামনে যেন লাফ দিয়ে এলো।

‘একমিনিট, তোমরা কে কে রুটি খেতে চাও?’ বেজন্মা বলে, মাথার উপর তার ‘কর্নেল’ লেখা টি-শার্টটা সে শক্ত করে বাঁধে। বেজন্মার বুকের উপর ক্ষতটির দিকে চোখ গেল আমার, ওর বাঁ দিকের বুকের নিচেই।পেয়ারার ভেতর গোলাপী রঙের মতোই ওর এই ক্ষত।

‘রুটি কোথায় পাবো?’ আমি জিজ্ঞাসা করি।

‘শোনো, তুমি লক্ষ্য করোনি যে মহিলার জুতাজোড়া একদম প্রায় নতুন? জুতোজোড়া হাতাতে পারলে, বাজারে বিক্রি করে আমরা একটা রুটি বা এমনকি দেড়টা রুটিও কিনতে পারি। কি বলো?’

আমরা সবাই ঘুরে দাঁড়াই এবং বেজন্মার পিছু পিছু আবার ঝোপের ওখানে যাই যেখানে সেই লাশটা ঝুলছে।আমরা তখন ছুটছি, তারপর আবার দৌড়াচ্ছি, তারপর আবার দৌড়াচ্ছি আর হাসছি, আর হাসছি, আর হাসছি।

পাথর খায়, মল ত্যাগ করে বালি

প্রাণী জগতে বৈচিত্রের শেষ নেই। প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করছেন আর চমকে যাচ্ছেন। এবারো ঘটলো তেমনটি। নতুন প্রজাতির এক ঝিনুক আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা যেটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। এই এই ঝিনুক খায় পাথর। আবার যখন মল ত্যাগ করে তখন বের হয় বালি। অর্থাৎ পাথর খেলে বালি বানিয়ে ফেলে এই প্রাণী। এই ঝিনুক এক প্রজাতির ‘শিপ ওয়ার্ম’। একে সমুদ্রের উইপোকা বলেও অভিহিত করেন অনেকে।
দেখতে ঝিনুকের মতো না হলেও এটি আসলে এক প্রকার ঝিনুক; কিন্তু দেহের আকার বড়ো হওয়ায় খোলসের মধ্যে নয়, বাইরেই থাকে সাদা জেলির মতো দেহাংশ। শিপওয়ার্মের আকার মূলত ১ থেকে ৫ ফুট হয়। লিথোরেডো অ্যাবাটানিকার আকার প্রায় ৪ ফুট। রয়েছে কয়েক ডজন দাঁতও।
ফিলিপাইনের আবাতান নদীতে ২০০৬ সালে প্রথম এ ঝিনুকটিকে দেখতে পান ফ্রান্সের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচরাল হিস্ট্রির সদস্যরা। ঝিনুকটি আদতে ‘শিপ ওয়ার্ম’ গোত্রের। সেই সময় তারা এ শিপ ওয়ার্মটিকে ‘টেরেদিনিদি’ গোত্রের বলে মনে করেছিলেন।
এই গোত্রের কীট বা ঝিনুকগুলো মূলত নোনা জলে বাস করে। এর নামকরণও হয়েছে তাদের খাদ্যাভাসের উপর ভিত্তি করেই। শিপ ওয়ার্ম নাম থেকেই বোঝা যায়, এরা মূলত জাহাজে বা বন্দরের কাঠের পাটাতনে খোলসের মধ্যে থাকে এবং কাঠ খেয়েই জীবনযাপন করে।
সম্প্রতি ফিলিপাইনের জীব বৈচিত্র অভিযানে এ শিপ ওয়ার্মটিকে পাথরের ভিতরে দেখতে পান গবেষকরা। চমকের শুরু তখন থেকেই। শিপ ওয়ার্ম হলে তা পাথরের মধ্যে কী করছে? এরপর নানা পরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, যেটিকে তারা শিপ ওয়ার্ম ভাবছিলেন, সেটি আসলে এক নতুন প্রজাতির ঝিনুক। চমকের পরের ধাপে তারা দেখেন, এ ঝিনুকটি পাথর খাচ্ছে এবং মল হিসাবে বালি বের করছে! গবেষকরা এর নাম দিয়েছেন লিথোরেডো অ্যাবাটানিকা।
ফিলিপাইনের আবাতান নদীর পাড়ে তিন থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যেই দেখা মিলছে এ শিপ ওয়ার্মের। এটির নামে ওয়ার্ম থাকলেও এটিকে এক প্রকার ঝিনুক বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
দেখতে ঝিনুকের মতো না হলেও এটি আসলে এক প্রকার ঝিনুক - ছবি : সংগৃহীত