Wednesday, March 2, 2016

২রা মার্চ পতাকা উত্তোলন সশস্ত্র যুদ্ধের নির্দেশনা by শহীদুল্লাহ ফরায়জী

২রা মার্চ ১৯৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লক্ষ লক্ষ ছাত্র-জনতার সমাবেশে ডাকসু ভিপি আ স ম আবদুর রব স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য এবং আবশ্যক করে তোলেন। পতাকা উত্তোলনের মধ্যদিয়ে সামরিক-রাজনৈতিক পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যোগ পায়।
পতাকা ব্যবহারের ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছরের। পতাকার উদ্ভব হয় মূলত যুদ্ধ ক্ষেত্রে পক্ষ-বিপক্ষকে চিহ্নিত করার প্রতীক হিসেবে। ১৮ শতকে দেশে দেশে যখন জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে তখন থেকে জাতি গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় পতাকার ব্যবহার শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা এর উদাহরণ যা ১৭৭৭ সালে জাতীয় প্রতীকে রূপলাভ করে।
২রা মার্চ ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্রের ইতিহাসে পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীনতার ঘোষণা বা স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধের নির্দেশনা প্রদানের আর কোন তথ্য নেই। ২রা মার্চ রাষ্ট্র, সশস্ত্র সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রামের বিরল ঘটনা।
আ স ম আবদুর রব ২রা মার্চ যে পতাকা উত্তোলন করেন তা ১৯৭০ সালে ৭ই জুন ‘নিউক্লিয়াস’-এর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ‘জয়বাংলা বাহিনী’র ফ্ল্যাগ হিসেবে নকশা তৈরি করে পরিকল্পনাকারীরা, যা পরে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে গৃহীত হবে এ পরিকল্পনায়। ২রা মার্চ ৭১ ‘নিউক্লিয়াসে’র সিদ্ধান্তেই পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকা উত্তোলনের সময় আ স ম আবদুর রব ঘোষণা দিয়েছিলেন ‘এই পতাকাই আজ থেকে স্বাধীন বাংলা দেশের পতাকা’। পতাকা উত্তোলনের সময় লক্ষ লক্ষ জনতা মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে জাতীয় পতাকাকে স্বাগত জানায়। ৩রা মার্চ ইশতেহার পাঠের জনসভায় এই পতাকাই উত্তোলন করা হয়, ইশতেহার পাঠ করেন শাজাহান সিরাজ মঞ্চে বঙ্গবন্ধু উপস্থিত ছিলেন। ইশতেহারে পকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়। এর পর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এ পতাকা উত্তোলিত হতে থাকে। ২৩শে মার্চ ‘জয় বাংলা বাহিনী’ সামরিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে পতাকা উত্তোলন করে ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ নেতাদের পক্ষে আ স ম আবদুর রব ধানমন্ডি ৩২ এ গিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে সেই পতাকা তুলে দেন এবং বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে উড়িয়ে ও গাড়িতে লাগিয়ে দেন। এ পতাকাই প্রবাসী সরকার অনুমোদন করে। এ পতাকা দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে শহীদদের পবিত্র দেহ জড়িয়ে চিরকালের জন্য চিরদিনের মতো চিরনিদ্রায় শায়িত করা হতো। পরে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু লালবৃত্তের মাঝে বাংলাদেশের সোনালি রঙের মানচিত্র উঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্তের সময় বঙ্গবন্ধু বিখ্যাত শিল্পী কামরুল হাসানের পরামর্শ নেন। আজ একটি ভুল ইতিহাসের প্রবণতা চলছে। কামরুল হাসানকে পতাকার নকশাকারক বলা হচ্ছে। এসব ভুল তথ্য কালের স্রোতে ধুয়ে-মুছে যাবে। যারা পতাকার সিদ্ধান্ত ও নকশা প্রণয়নকারী তাদের সঙ্গে কোন আলোচনা না করেই নির্বাহী আদেশে পতাকার পরিবর্তন ছিল বেদনাদায়ক। আমাদের পতাকায় রাজনৈতিক-সামাজিক মতাদর্শগত উপাদান বিদ্যমান।
‘পতাকা’ স্বাধীনতা উন্মুখ বাঙালি জাতির চৈতন্যের দলিল। পতাকা উত্তোলন মুক্তি-সংগ্রাম ইতিহাসের মহৎ কাজ। পতাকা উত্তোলন করে স্বাধীনতার বেদিতে নৈবেদ্য প্রদান করা হয়েছে। এটা ছিল দূরদর্শী লক্ষ্যের প্রতিফলন।
পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অবস্থান থাকা অবস্থায়, শক্তিশালী সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রশক্তির উপস্থিতিতে পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে নতুন রাষ্ট্রের নতুন পতাকা উত্তোলন শুধু সাহসিকতার বিষয় নয়- এটা স্পর্ধা, দেশ-জনগণের প্রতি সীমাহীন আনুগত্যের বিষয়। মৃত্যুকে অবজ্ঞা করে জাতির আত্মমর্যাদাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে পতাকা উত্তোলন করার নায়ক আ স ম আবদুর রব। বিশাল সূর্যের নিচে বাংলার জমিনের উপর লক্ষ মানুষের চোখ ও বিবেকের সামনে যে পতাকা উত্তোলন করা হয় তা কোন গোপনীয়তার শরিক নয়- যার সত্য উন্মোচিত করতে হবে। আ স ম আবদুর রব পতাকা উত্তোলন করেছেন তা শুধু ছবি বা সেলুলয়েড এ আবদ্ধ নয়, এটা ইতিহাসের দৃশ্যে খচিত, ৩০ লাখ শহীদের আত্মায় গ্রোথিত আর সূর্যের আলোয় সংরক্ষিত।
পতাকা উত্তোলনরত আ স ম আবদুর রব এ বাস্তব ছবি জীবন্ত ইতিহাস দেখার পরও যারা স্বীকার করতে চায় না বা নাম বলতে কুণ্ঠাবোধ করেন তারা যুক্তিহীনতার প্রতিনিধিত্ব করেন- মুক্তিযুদ্ধের নয়, তারা মিথ্যার উপর আস্থাবান, সত্যের উপর নয়।
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন পরশ্রীকাতরতা শব্দটি বাংলা ভাষা ছাড়া বিশ্বের কোন ভাষায় নেই। এ পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্তরাই পরশ্রীকাতরতার জন্য সত্য বলার নৈতিক শক্তি হারিয়েছে, এটা তাদের হীনম্মন্যতায় অর্জিত দুর্ভাগ্য।
২রা মার্চ, ৩রা মার্চ এবং ৭ই মার্চ এগুলো ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, ঐতিহাসিক ন্যায্যতা। একটি আরেকটির পরিপূরক, এগুলো অখণ্ড-খণ্ডিত করা যাবে না। ইতিহাসের ধারাবাহিকতা, ন্যায্যতা বিনষ্ট করা যায় না।
কয়েক হাজার বছর পূর্বের রোমান ইতিহাসের দৃশ্য, যুদ্ধ, সমুদ্র যুদ্ধ এবং ‘অভিযান মানচিত্র’ খোদাই করা আছে ঢালে বা পাথরে, যা কোনো শক্তি বিলুপ্ত করতে পারেনি। আর প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এই আধুনিক যুগে ৭১’ সালের ২রা মার্চের পতাকা উত্তোলন, উত্তোলনের দৃশ্য ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যাবে, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য!
যতদিন রাষ্ট্র থাকবে, পতাকা থাকবে, সত্য থাকবে ততদিন পতাকা উত্তোলনের স্পর্ধিত নায়ক আ স ম আবদুর রবের নাম উচ্চারিত হবে কখনও উচ্চস্বরে কখনও প্রাঞ্জল ভাষায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আ স ম আবদুর রবের নামে উজ্জীবিত হবে।
যারা ২রা মার্চ পতাকা উত্তোলনের সত্যকে মিথ্যা দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চায়, হীনম্মন্যতাকে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করতে চায়, তাদের উদ্দেশে বলবো ...........‘আসুন মিথ্যার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, মানুষ হিসেবে নিঃস্বার্থ ও পবিত্র হয়ে উঠি’।
শহীদুল্লাহ ফরায়জী
লেখক ও গীতিকবি

মইনের হাতেই প্রকৃত ক্ষমতা

এক-এগারো। ফের আলোচনার কেন্দ্রে। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘বিএনপি: সময়-অসময়’ শীর্ষক গ্রন্থে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে এক-এগারো ইস্যু নিয়েও আলোকপাত করেছেন। তিনি লিখেছেন, এক-এগারো ছিল নাটকীয়তায় ঠাসা। ওই দিনের ঘটনার অন্যরকম একটা বিবরণ পাওয়া যায় পুলিশের তৎকালীন আইজিপি (মহাপুলিশ পরিদর্শক) খোদা বকশ চৌধুরীর কাছ থেকে, যাঁকে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায় সরকার আইজিপি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল বিএনপি সরকারের রেখে যাওয়া পুলিশ প্রধানকে পরিবর্তন করে:
আওয়ামী লীগ নির্বাচন থেকে উইথড্র করার ঘোষণা দিল। রাষ্ট্রপতি  ও তত্ত্বাবধায় সরকারপ্রধান ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে একটা মিটিং ছিল। বেলা একটার দিকে অফিসে ফিরলাম। বেলা দুইটার পর ডিজিএফআইয়ের প্রধানের অস্থায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার বারীর ফোন, ইমপেসেন্ট কল, ‘আপনি কোথায়? তাড়াতাড়ি আসেন বঙ্গভবনে।’ গেলাম বঙ্গভবনে। খোঁজ করলাম মহামান্য কোথায়। রাষ্ট্রপতিকে সবাই এই সংক্ষিপ্ত নামেই সম্বোধন করত।
দেখলাম জেনারেল মইনের নেতৃত্বে সবাই দরবার হলের পর বঙ্গভবনের সবচেয়ে পেছনের করিডর দিয়ে বেরিয়ে আসছে- এয়ার চিফ ফখরুল, নেভির চিফ, ডিজিএফআইয়ের বারী এবং আরও কয়েকজন।
আমি জেনারেলের মুখোমুখি হয়ে সম্ভাষণ করলাম। তিনি বললেন, ‘আসেন।’ ফখরুল চোখের ইশারায় কী যেন বলতে চাইলেন। মইন বললেন, ‘আমরা হেডকোয়ার্টারে যাব। একটু তাড়াতাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।’ বঙ্গভবনে গাড়ি পার্কিংয়ে আসার পর দেখলাম এসএসএফ চিফ ফাতমী রুমী আসছেন। মইন এগিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বললেন।
ক্যান্টনমেন্ট সেনাসদরে গেলাম। একের পর এক জেনারেলরা আসছে। সন্ধ্যা হয়ে গেল। অল জেনারেল, সিভিলিয়ান মাত্র দুজন- আমি আর র‌্যাবের মিজানুর রহমান।
মইন সিচুয়েশন ব্যাখ্যা করলেন, ‘জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এখানে যদি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও শান্তিশৃঙ্খলা না থাকে, শান্তিরক্ষা মিশন থেকে আমাদের সব ফোর্স ফেরত পাঠাবে।’ আমাকে বললেন, ‘যদি আপনার পুলিশকে ফেরত পাঠায়, আপনি কী জবাব দিবেন? ক্যান ইউ একসেপ্ট ইট? আমি কি আমার সেনাদের বোঝাতে পারব? রেনাটা লক (জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী) দুপুরে আমার সঙ্গে দেখা করে এই চিঠি দিয়ে গেছে।’ মইনের হাতে একটা চিঠি দেখলাম। আমার কী করার ছিল। অলরেডি রেজিম চেইঞ্জ ইজ কমপ্লিট। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চিফ অ্যাডভাইজর হ্যাজ অ্যাগ্রিড টু রিজাইন। মইনের হাতেই প্রকৃত ক্ষমতা।
পরে জেনেছিলাম, চিঠির বিষয়টা ছিল ভুয়া। আমি তখন আফগানিস্তানে জাতিসংঘ মিশনে সিনিয়র পুলিশ অ্যাডভাইজর। ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি ছিলেন মনোজ বাসনিয়াত, নেপালি-আমেরিকান। এক-এগারোর সময় ঢাকায় ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেক্টর ছিলেন। জাতিসংঘের কথিত চিঠির প্রসঙ্গ আসতেই তিনি জানালেন, ইউএন হেডকোয়ার্টার থেকে কথিত চিঠি পাঠানোর বিষয়টি ঠিক নয়। ইউএন থেকে এরকম চিঠি এলে তা আমার নজরে আসতই। তবে বিষয়টা আমি শুনেছিলাম। ব্রিটিশ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আর ইউএস অ্যাম্বাসেডরদের সঙ্গে কথা বলে মনে হলো চিঠির বিষয়টা নিয়ে আলোচনা হোক, এটা তারা চায় না। বললেন, এই দুই মহিলা গণতন্ত্র এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথে বাধা। তাদের ভাবখানা অনেকটা এরকম, এদের সরিয়ে দিতে পারলেই মিল্ক অ্যান্ড হানি উইল ফ্লো।

সিরিয়ায় যৌনদাসী বাংলাদেশি নারী -রয়টার্সের রিপোর্ট

ভালো চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশের বহু নারীকে শুধু যে ভারতে পাচার করা হয়েছে তা-ই নয়। তাদেরকে প্রলোভন দেয়া হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে একই রকম কাজের। তারপর সেখান থেকে তাদেরকে পাচার করা হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায়। একবার সিরিয়ায় পৌঁছার পর তাদেরকে জোর করে গৃহকর্মে নিয়োজিত করা হয় অথবা দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা হয়। এভাবেই তাদেরকে বানানো হয় যৌনদাসী। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এতে বলা হয়, র‌্যাব-এর এক কর্মকর্তা বলেছেন, গত বছর তারা এমন ৪৫ জন নারীর মামলা পেয়েছেন। ওইসব নারীকে সিরিয়ায় বিপথে পরিচালিত করা হয়েছে, প্রহার করা হয়েছে, নির্যাতন করা হয়েছে না হয় তাদেরকে ধর্ষণ করা হয়েছে। র‌্যাব-৩ এর কমান্ডার খন্দকার গোলাম সারোয়ার সোমবার বলেছেন, শাহিনুর নামের এক নারীকে নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। তাকে সিরিয়ায় যারা আটকে রেখেছিল তাদের কবল থেকে তিনি পালান। এরপরই তিনি তার মাকে ফোন করেন। তার মা বিষয়টি র‌্যাবকে অবহিত করেন। গোলাম সারোয়ার আরও বলেন, শাহিনুরকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল লেবাবনে। কিন্তু তার পরিবর্তে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য ৫ জন নারীর সঙ্গে দুবাইয়ে। দুবাই থেকে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় সিরিয়ায়। সেখানে বিভিন্ন জনের কাছে তাদের বিক্রি করে দেয়া হয়। কখনো তারা গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। কখনো যৌনদাসী হিসেবে কাজ করেন। শাহিনুরের বয়স ৩৪ বছর। তিনি ভীষণ অসুস্থ। এমনকি তিনি নড়াচড়া করতে পারেন না। সিরিয়ায় অবস্থানকারী বাংলাদেশীরা তাকে নিয়ে আসেন ঢাকায়। এখন তাকে কিডনির অসুস্থতার চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের হিসাব মতে, বর্তমানে ৮০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করছেন। তার মধ্যে বেশির ভাগই রয়েছেন আরব দেশগুলোতে, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায়। নারীরা বিশেষত গৃহকর্ম নিয়ে এসব দেশে যান। তবে অনেক ক্ষেত্রেই তারা নির্যাতনের শিকার হন। তাদের থাকে না স্বাধীনতা। খন্দকার গোলাম সারোয়ার বলেন, যেহেতু ৫ বছর ধরে সিরিয়ায় যুদ্ধ চলছে তাই পাচারকারীদের গন্তব্য হয়ে উঠেছে দেশটি। তারা বাংলাদেশী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে ব্যবহার করে জর্ডান ও লেবাননে মানুষ আনা-নেয়া করে।  এসব দেশ থেকে পরে নারীদের নিয়ে যাওয়া হয় সিরিয়ায়। সেখানে তাদেরকে বিক্রি করে দেয়া হয়। এসব নারীর পালানোর সুযোগও থাকে না বললেই চলে। এ ঘটনায় বাংলাদেশে আটক করা হয়েছে ৮ জনকে। এর বেশির ভাগই রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক, স্টাফ। তারা সজ্ঞানে অথবা অসচেতনভাবে আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তবে এখনও সিরিয়া, লেবানন ও জর্ডানের পাচারকারীদের শনাক্ত করা যায়নি। তাদেরকে গ্রেপ্তারও করা যায়নি। গোলাম সারোয়ার বলেন, পাচারের শিকার যারা হচ্ছেন তারা গ্রামের দরিদ্র নারী। তাদেরকে মাসে ২০০ ডলার বেতন দেয়ার শর্তে প্রলুব্ধ করা হয়। এরপর গড়ে প্রতিজনের কাছ থেকে রিক্রুটিং ফি বাবদ আদায় করে ৩০ হাজার টাকা। এসন নারী গ্রামের। তারা শিক্ষিত নন। তারা নিরপরাধ। সিরিয়ায় কি ঘটছে সে সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। তারা মনে করেন, তাদেরকে লেবানন অথবা জর্ডানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে।

বিষক্রিয়া নয় হত্যা

ফুটফুটে নিষ্পাপ দুটি শিশু। ভাইবোন। নুসরাত আমান অরনি (১২) ও আলভী আমান (৬)। সোমবার বিকালে হঠাৎ না ফেরার দেশে চলে গেছে। প্রথমে খাদ্যের বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু বলে জানানো হয়েছিল। তবে তাদের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে পাওয়া গেছে ভিন্ন তথ্য। বিষক্রিয়া নয়, তাদের হত্যা করা হয়েছে। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসকরা জানান, উভয়ের শরীরে আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গেছে। শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হতে পারে তাদের। মর্মান্তিক এ ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে মাঠে নেমেছে একাধিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 
ঢামেকের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ মানবজমিনকে বলেন, প্রাথমিকভাবে শিশু দুটিকে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। দুই ভাইবোনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে। গলায়ও আঘাতের ছাপ পাওয়া গেছে। নখের আঁচড় রয়েছে তাদের শরীরে। দুটি শিশু জিহ্বা কামড়রত অবস্থায় ছিল। তাছাড়া, দুটি শিশুর চোখেও রক্ত জমাট বাঁধা অবস্থায় ছিল। ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়া গেলে চূড়ান্ত মতামত দেয়া যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয়রা জানায়, অরনি ও আলভীকে নিয়ে তাদের বাবা আমান উল্লাহ ও মা মাহফুজা মালেক জেসমিন রাজধানীর রামপুরার বনশ্রীর বি-ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৯ নং বাসার পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। এ দম্পতির আর কোনো সন্তান ছিল না। তাদের সঙ্গে আমানের প্রায় সত্তর বছর বয়সী মাও থাকেন। অরনি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণির ঙ শাখায় পড়তো। তার ক্রমিক নম্বর ছিল ৩৪। আর তার ছোট ভাই আলভী হলি ক্রিসেন্ট স্কুলে নার্সারিতে পড়তো। গত সোমবার বিকালে অরনি স্কুল থেকে বাসায় আসে। তখন তাদের বাসায় একজন মহিলা মেহমানও ছিল। বিকাল ৩টার দিকে বাসায় আসে অরনির গৃহশিক্ষক শিউলি আকতার।
তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমি গত ৮ই ফেব্রুয়ারি থেকে অরনিকে অঙ্ক, বিজ্ঞান ও সমাজ পড়াই। আজ (গতকাল মঙ্গলবার) বিকাল ৩টায় একই সময় বাসায় তাকে পড়াতে এসে দেখি বাড়ির সামনে জটলা। কারণ জানতে চাইলে স্থানীয়রা জানান পঞ্চম তলায় দুটি শিশু মারা গেছে। আমি মনে করেছি অন্য ফ্ল্যাটে হয়তো এমনটা ঘটেছে। উপরে উঠে অরনি ও আলভীর মৃত্যুর খবর জানতে পাই। বুঝতে পারছি না কীভাবে তা হলো?
আগের দিন সোমবারের বর্ণনা দিতে গিয়ে শিউলি আক্তার বলেন, আমি যথারীতি তিনটার দিকে বাসায় এসেছিলাম। তখন অরনির মা শুয়ে ছিলেন। অরনির লুকিয়ে রাখা টেলিভিশনের রিমোটটি ভাইকে দিয়ে তাকে পড়তে বসতে বলেন। গত রোববার তাদের বিবাহবার্ষিকী উদ্‌যাপন করার কারণে পড়া শেষ করতে না পারার জন্য অরনিকে না বকতেও বলে দেন। আসার পর বাসায় একজন মহিলা মেহমানকে নামাজ পড়তে দেখি। তাদের পড়িয়ে বিকাল সোয়া চারটার দিকে আমি চলে যাই। আমার পর বিকালে অরনিকে অন্য এক গৃহশিক্ষক ইংরেজি পড়াতেন।
আমানের বন্ধু মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আমান গার্মেন্টস সংক্রান্ত ব্যবসা করে। গত সোমবার রাতে জানতে পারি যে আমান ঘটনার সময় উত্তরায় ব্যবসার কাজে ব্যস্ত ছিল। সে বাসা থেকে ফোন পেয়ে তার দুই সন্তানের খারাপ খবর শুনতে পায়। জাহিদ নামে আমাদের অপর এক বন্ধু একই এলাকায় কয়েকটি ভবন দূরত্বে থাকে। তাকে সে বলে বাসা থেকে অরনি ও আলভীকে হাসপাতালে নিতে। এরপর জাহিদ তাদের হাসপাতালে নেয়। পরে রাতে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দু’শিশুর মারা যাওয়ার খবর জানতে পারি।
আমানের বাড়ি জামালপুর জেলার ইসলামপুর থানার উলিয়াবাহার এলাকার রায়েরপাড়ায়। তার পিতার নাম মৃত আবদুর রহিম সরকার। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে অরনি ও আলভীর লাশ নিয়ে তার ভাই আবুল হোসেন গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেন। তার আগেই সকালে আমান, তার স্ত্রী জেসমিন, আমানের বৃদ্ধা মা ও অপর এক আত্মীয় জামালপুরের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। দু’শিশুর চাচা আবুল হোসেন গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মানবজমিনকে বলেন, লাশবাহী গাড়িটি এখন মাঝপথে। জালালপুরে পৌঁছার পর জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে লাশ দাফন করা হবে।
বাসায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে অরনি-আলভীর স্মৃতি: গতকাল দুপুরে বাসায় গিয়ে দেখা যায় উৎসুক এলাকাবাসী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মীদের ভিড়। ফ্ল্যাটে আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। রয়েছেন বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক মো. আব্দুল কাদিরসহ ওই বাসার কয়েকজন লোক। বাসার খাট, টেবিল ও ওয়ারড্রপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অরনির আঁকা ছবি, বইপত্র, ব্যাগ ইত্যাদি। আলভীর খেলনা পুতুল, গাড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র। কিন্তু নেই কেবল এই দুই শিশু।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে আটক: এ ঘটনায় র‌্যাব পিন্টুসহ বাসার ২ দারোয়ান, অরনির গৃহশিক্ষক শিউলী আক্তার এবং অপর এক আত্মীয়কে ওই বাসা থেকে আটক করেছে। গ্রেপ্তার নয়, শুধু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের র‌্যাব-৩ এর কার্যালয়ে নেয়া হয়েছে বলে জানায় র‌্যাব।
র‌্যাব-৩ এর কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোস্তাক আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, গত সোমবার পর্যন্ত এই ঘটনাকে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু বলে জানা গিয়েছিল। মঙ্গলবার জানা গেল হত্যার শিকার হয়েছে দু’শিশু। ফলে এখন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ঘটনার অনুসন্ধান ও তদন্ত হচ্ছে। রহস্য উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা চলছে। এখন পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বাসায় বাইরের কারও অনুপ্রবেশ ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো কারণ রয়েছে কিনা তা মাথায় রেখে তদন্ত করা হচ্ছে।
এদিকে নুসরাত জাহান অরনি (১৪) ও আলভী আমানকে (৬) হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা। দু’টি লাশ ময়নাতদন্ত শেষে তারা এই তথ্য জানিয়েছেন। তবে ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়া গেলে চূড়ান্ত মতামত দেয়া যাবে বলে তারা উল্লেখ করেন। আর এ জন্য এক থেকে দেড় মাস অপেক্ষা করতে হবে। ভিসেরা রিপোর্টের জন্য নমুনা ইতিমধ্যেই মহাখালীর প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে ঢামেকের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ভিসেরা রিপোর্ট পাওয়া গেলে চূড়ান্ত মতামত দেয়া যাবে। এ বিষয়ে জানার জন্য ফোন করা হলে আমান ও জেসমিনের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবরা কেন এখনও বহাল তবিয়তে

প্রধানমন্ত্রীর প্রতি প্রশ্ন রেখে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, ওয়ান ইলেভেন ষড়যন্ত্র ছিল, এটা বিশ্বাস করলে কুশীলবদের কেন বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে না- কুশীলবদের গুটি কয়েক তো দেশেই আছেন। তারা কেন এখনও বহাল তবিয়তে? তারা কেন বাইরে আছেন, ভেতরে নেই? যারা দেশে আছেন তাদের ধরা হয় না কেন? খালেদা জিয়া বলেন, তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা হোক। আমি বলব- সরকারের যদি সততা থাকে, সত্যি যদি প্রধানমন্ত্রী এটা মিন করে থাকেন, তাদের ধরে দেখিয়ে দেবেন, প্রমাণ করে দেবেন। উনি এটা মিন করছেন, সত্যি বলছেন। খালেদা জিয়া বলেন, মাহফুজ আনামতো স্বীকার করেছেন। গতকাল রাতে বিগত আন্দোলনে চট্টগ্রাম জেলায় নিহত ও আহত বিএনপি নেতাকর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতিষ্ঠিত জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সাড়ে ১০টায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ অনুষ্ঠান হয়। খালেদা জিয়া বলেন, তখন ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলেন মেজর জেনারেল সৈয়দ ফাতেমী আহমেদ রুমি। তিনি এখন দেশেই আছেন। লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তো অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। কতবার এক্সটেনশন পেয়েছেন। কার মাধ্যমে পেয়েছেন? এই সরকারের মাধ্যমে। কেন তাকে ধরা হয় না? এখন তো দেশেই আছেন। হাসান মাশহুদ চৌধুরী যিনি এন্টি করাপশনে ছিলেন তিনিও দেশেই আছেন শুনেছি। সে দুর্নীতি দমন কমিশনে এসব মামলা করেছে। তাদের কেন ধরা হয় না? সরকারের যদি এতই সিনসিয়ারিটি থাকে, তাহলে তাদের ধরে দেখিয়ে দেবেন ওয়ান ইলেভেনের প্রতি তাদের সচেতনতা আছে। খালেদা জিয়া বলেন, ওয়ান ইলেভেনের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়ী। সেদিন তিনি ওই অবৈধ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, এ সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল। কিসের জন্য? ক্ষমতায় যেতে হবে, তাদের সঙ্গে আতাঁত করার জন্যে? এটার কোন দরকার ছিল না। তিনি ওই অবৈধ সরকারের হাত ধরে ক্ষমতায় এসেছেন। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে বলেন, উনি নিজে বলেছেন, মাইনাস টু ফর্মূলা। আমরা যদি একসঙ্গে থাকতাম, তাহলে ওয়ান ইলেভেন ওয়ালাদের কিচ্ছু করার সাহস ছিল না। সরকার এবং বিরোধী দল, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বড় দুইটি পার্টি বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ অন্যদের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক থাকলে কেউ অবৈধভাবে ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারবে না। অন্যায়ভাবে কাউকে কারাগারেও নিতে পারবে না। ওয়ান ইলেভেনের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সরকার ছিল অবৈধ সরকার। সেই সময়ের কথা প্রধানমন্ত্রী এখন উঠিয়েছেন। ওয়ান ইলেভেনের সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন আহমেদের শপথ গ্রহন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা গিয়েছিলেন। গণমাধ্যমের সবাই সব দেখেছেন। উনি সাংবাদিকদের বলেছেন, আমাদের আন্দোলনের ফসল। তার মানে উনি এটা করিয়েছেন। তার অর্থ তিনি গণতন্ত্রকে শেষ করে দিয়ে অবৈধভাবে অগণতান্ত্রিক সরকারের হাত ধরে ক্ষমতায় আসতে চান। উনি বাদ পড়তে পারেন না। কারণ যদি অন্যায় না করে থাকি তাহলে কিসের ভয়। শেখ হাসিনা তাদের সঙ্গে কাকুতি-মিনতি করে ১১ মাসে বেরিয়েছেন। সে সময় নিজের কারাবাসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, আর আমি বলেছিÑ আমি আপস করবো না। ওয়ান ইলেভেনের কুশীলবদের সঙ্গে রীতিমতো ফাইট করেছি। বলেছি- তোমাদের কথা মতো আমি চলবো না। আমার একটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি আছে। আমি জনগণের সঙ্গে বেঈমানি করে কিছু করতে পারবো না। দেশের মানুষের সঙ্গে বেঈমানি করতে পারবো না। সেজন্য আমি দেশ ছেড়ে কোথাও যাইনি। জেলখানায় ছিলাম। সেখানে আমি ১ বছর ৮ দিন ছিলাম। শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, উনি ১১ মাস পর বেরিয়ে বিদেশে চলে গেলেন, হাতে মেন্দি-টেন্দি লাগিয়ে। উনি যেসব কাজ করেছেন, এটা ঠিক করেননি। এরশাদের সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, এখন এরশাদ বলছে মাইনাস থ্রি। ও তো দালাল, সব সময় দালালিই করেছে। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, তখন তো তার অনেক অবৈধ টাকার কথা বলা হয়েছিল। কই সে টাকা। এখন অনেক কষ্ট করে লন্ডনে ছোট্ট একটি বাসায় থাকে তারেক রহমান। কেউ তার একটি অবৈধ টাকার প্রমান দিতে পারেনি। আসলে অবৈধ টাকা থাকলে তা কেউ হজম করতে পারে না। বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের সমালোচনা করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এখন তো দেশে কোন আন্দোলন নেই। তারপরও দেশ মোটেই ভালো নেই। প্রতিনিয়ত মানুষ ধরছে। আমাদের লোকজন জামিন পাচ্ছে, আবার জেল গেইট থেকে নতুন মামলা দিয়ে কারাগারে নিয়ে যাচ্ছে। এগুলো কি? বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য সবই করছে। তারা যতদিন বেঁচে থাকবেন ততদিন ক্ষমতায় থাকতে চান। আমি বলব এ সরকার ওয়ান ইলেভেনের লোকদের থেকেও খারাপ কাজ করছে। এরজন্য একদিন তাদেরকে জবাব দিতে হবে। আল্লাহ আছেন। তিনি সব কিছু দেখছেন। সব কিছুর মালিক তিনি। মানুষের চোখের পানি তিনি দেখছেন, তিনিই এসবের বিচার করবেন। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, এটা নামমাত্র নির্বাচন। নির্বাচন নির্বাচন খেলা। গণতন্ত্রকে তারা হাস্যস্পদ করে ফেলেছে। কারণ এই সরকার জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। তারা অবৈধভাবে সরকারে আছে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বক্তব্য উদ্ধৃতি করে খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান সরকার সংবিধানের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে। কিন্তু তারাই সংবিধান মানছে না। প্রধান বিচারপতি যেগুলো বলেছেন, অবসরের যাওয়ার পরে আর রায় লেখার সুযোগ থাকে না। তার মানে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার আগে যে রায়টা দিয়েছেন, ওইটি কার্যকর। অর্থাৎ  আরও দুইটি টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। আমাদের দাবিও সেখানে। খালেদা জিয়া বলেন, ২০১৪ সালে কোন নির্বাচন হয়নি। কাজেই আমাদের দাবি আরেকটা নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। তাদের যদি কোন ভয় না থাকে, তাহলে সকলকে সমান সুযোগ দিয়ে সব দলের অংশ গ্রহনের একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দিন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দেশপ্রেম নেই। সেই জন্য তারা লুটপাট, জমি দখল,  টেন্ডারবাজী এগুলো নিয়ে আছে। 
তরুণদের হাতে নেতৃত্ব দেব 
আন্দোলনে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, এখানে কথা উঠেছে, যারা আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহন করেছিল, তাদেরকে দলে ভালো ভালো জায়গা দিতে হবে। আমিও করতে চাই, কিন্তু আমাকে সহযোগিতা করতে হবে। সত্যিকারভাবে যারা কাজ করেছে, তাদের নামগুলো আমাকে দিতে হবে। ছাত্রদল ও যুবদলের ছেলেরা এখন ছোট নয়। এখন কিন্তু তাদের দলের দায়িত্ব নেয়ার সময় এসে গেছে। খালেদা জিয়া বলেন, আমি বলবÑ বয়স্ক নেতা যারা আছেন, তারা দলকে অনেক দিয়েছেন। তাদের বয়স হয়েছে, এখন তাদেরকে আমরা উপদেষ্টা পরিষদে নিয়ে তরুনদের সামনে আনব। যাতে তারা দেশ ও দলের জন্য কাজ করতে পারে- এটা আমার ইচ্ছা। আমি সবার সহযোগিতা চাই। অনুষ্ঠানের শুরুতে আন্দোলনে নিহত চট্টগ্রাম মহানগরের পাঁচলাইশের শোলকবহরের হুমায়ুন কবিরের স্ত্রী জেসমিন আক্তার এবং আন্দোলনে আহত পাহাড়তলীর সাগরিকার দক্ষিন কাট্টলীর আরাফাত, ইয়াছির, রাজিব, সরাইপাড়ার বদরুল আলম, চাঁন্দগাঁওয়ের নওশাদ আল জামসেদুর রহমান ও খুলশীর ঝাউতলার শাহ আলম মুনের হাতে আর্থিক অনুদানের চেক তুলে দেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আন্দোলনে আহত নেতা-কর্মীদের সহযোগিতায় দলের বিত্তবানদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারপারসন। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফারহাদ হালিম ডোনারের সভাপতিত্বে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেন বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম খান, সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আকবর খোন্দকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল মোজাদ্দেদী ও সাংবাদিক নেতা কাদের গনি চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

‘এই নাও তোমার চা’ by আব্দুল কাইয়ুম

মিষ্টি গলায় স্ত্রী বললেন, ‘এই নাও তোমার চা।’ সঙ্গে বিস্কুট। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ আসছিল। চা তৈরি হচ্ছে। স্ত্রী জানেন, দেরি হলে বাজখাঁই গলায় সাহেব চেঁচিয়ে উঠবেন, চা কোথায়? সেই সুযোগ তিনি দিতে চান না। চা দিয়েই তিনি আবার ছুটলেন রান্নাঘরে। সময় নেই। চুলায় ভাত। মাছও রাঁধতে হবে। টেবিলে নাশতা দিতে হবে। সাহেবের জন্য দুপুরের খাবার টিফিন বক্সে সাজিয়ে দিতে হবে। স্ত্রী নিজেও অফিসে যাবেন। আগের দিন দেরি হয়েছিল বলে বড় সাহেবের বকুনি খেতে হয়েছে। আজ অফিসে দেরি করার উপায় নেই...।
শেষ পর্যন্ত সবকিছুই হলো, শুধু স্ত্রী নিজেই নিজের তৈরি করা নাশতা খেতে পারলেন না। অফিসে দেরি করা চলবে না আজ। সংসারের অন্য সবাই খেয়েদেয়ে পরিপাটি হয়ে যার যার কাজে চলে যায়। স্ত্রীর তাতেই তৃপ্তি। ওই যে সকালে চা দেওয়ার সময় মিষ্টি হাসিটি ধরে রাখতে পেরেছেন এত চাপের মধ্যেও, সেখানেই তাঁর সার্থকতা!
আমাদের মধ্যবিত্ত ঘরের এটাই প্রতিদিনের চিত্র। সাহেব অফিস করবেন, তাঁর বড় চাকরি, বেতন বেশি। স্ত্রীর চাকরির তো কোনো দাম নেই, তা–ও করে করুক। কিন্তু সংসারের যাবতীয় কাজও তাঁকে করতে হবে হাসিমুখে। আর যাঁদের সংসারে স্ত্রী চাকরি করেন না, তাঁর জন্য তো কাজের শেষ নেই। রান্না, ঘর ঝাড়ু, ঘর মোছা, কাপড় ধোয়া, বাচ্চা মানুষ করা, স্কুলে নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ আর কাজ। কিন্তু তাঁদের এসব কাজের কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। দামও নেই। আর্থিক বা সামাজিক মূল্যায়ন নেই। সরকারি হিসাবের খাতায়ও তাঁদের অবদান শূন্য।
গত রোববার প্রথম আলো ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে এ বিষয়গুলো আলোচনা হয়। ‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’ প্রচারাভিযান ও বিজ্ঞাপনী সংস্থা মাত্রাও ছিল আমাদের সঙ্গে। অ্যাকশন এইডসহ কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রধান কর্মকর্তা, গবেষক, অর্থনীতিবিদ এবং আরও অনেকে আলোচনায় অংশ নেন। তাঁরা সবাই বললেন, এটা নারীর প্রতি বৈষম্য। গৃহস্থালিসহ অন্য সব কাজের স্বীকৃতি ও মর্যাদা দিতে হবে। সমাজে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
গেটস ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা মেলিন্ডা গেটস ও তাঁর স্বামী মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে বিশ্বব্যাপী নারীদের এই সমস্যাকে ‘টাইম পভার্টি’ বা ‘সময়-দারিদ্র্য’ বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ মজুরিবিহীন কাজের বাইরে অন্য কাজ করার সময়ের অভাবে তাঁরা পীড়িত। এ বছর তাঁরা এই সময়-দারিদ্র্য দূর করার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান। সংসার সামলানোর কাজ নিশ্চয়ই অপরিহার্য। কিন্তু এ কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না এবং মজুরিসমৃদ্ধ কাজের চেয়ে একে কম মর্যাদা দেওয়া হয়। আর এই কাজগুলো যেহেতু নারীদেরই বেশি করতে হয়, তাই তাঁদের পক্ষে অন্য কাজ করা সম্ভব হয় না। মেলিন্ডা গেটস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘নারীর মজুরিবিহীন শ্রম বিশ্বের সব সমাজে বৈষম্যের মূল এবং আমরা এ নিয়ে খুব বেশি কথা বলি না’ (সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ২৩ ফেব্রুয়ারি)।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশেও এই বৈষম্য আছে, সংসারে পুরুষের চেয়ে নারীদের মজুরিবিহীন শ্রম বেশি দিতে হয়, যদিও গরিব দেশগুলোর চেয়ে সেটা কম। জাপানে এই সময়-পার্থক্য বেশি ছিল। সম্প্রতি কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সংসারে সারাক্ষণ বাচ্চা দেখাশোনার কাজ থেকে নারীরা বেরিয়ে এসে অন্য কাজে যোগ দিতে পারেন।
বিশ্বব্যাপী নারীরা মজুরিবিহীন কাজে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড় চার ঘণ্টা কাজ করেন, যা পুরুষের মজুরিবিহীন কাজের সময়ের দ্বিগুণ। নরওয়েসহ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে এই পার্থক্য একটু কম। যেমন, নরওয়েতে নারীরা দিনে গড়ে সাড়ে তিন ঘণ্টা এবং পুরুষেরা তিন ঘণ্টা মজুরিবিহীন শ্রমের সাংসারিক কাজ করেন। ভারতে চিত্রটি ভিন্ন। নারীরা গড়ে ছয় ঘণ্টা এবং পুরুষেরা এক ঘণ্টারও কম সাংসারিক কাজ করেন।
বাংলাদেশে একজন নারী তাঁর সারা জীবনের প্রায় ১২ বছর রান্নাঘরে কাটান। অ্যাকশন এইড ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রজেক্টের আওতায় লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার তৃণমূল নারী ও পুরুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন কাজের সময়ের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে পরিচালিত এক গবেষণায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। এর চেয়ে হতাশাজনক অবস্থা আর কী হতে পারে! গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়িতে একজন নারী যেখানে সারা দিনে সেবামূলক কাজে পৌনে সাত ঘণ্টা ব্যয় করেন, সেখানে পুরুষ ব্যয় করেন সোয়া এক ঘণ্টারও কম।
একজন নারী প্রতিদিন ১২টিরও বেশি কাজ করেন, যা মজুরিবিহীন এবং জাতীয় আয়ের (জিডিপি) হিসাবে যোগ হয় না। আর পুরুষ করেন তিনটিরও কম। নারীর যে কাজ জাতীয় আয়ের হিসাবে (জিডিপি) যোগ হয় না—এমন কাজের আনুমানিক বার্ষিক মূল্য জিডিপির প্রায় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। কৃষিতে নারীর অবদান হিসাব করলে অবাক হতে হয়। ধান উৎপাদনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ২৩টি ধাপের মধ্যে ১৭টির সঙ্গে নারী সরাসরি যুক্ত। কিন্তু নারীর এই অবদানের স্বীকৃতি কোথাও নেই। কারণ এ কাজে কোনো নগদ আয় নেই বা এ কাজের জন্য কাউকে মজুরি দিতে হয় না। উপরন্তু নারী কাজ যতই করুন, যেহেতু ফসলের মালিক পুরুষ বা তাঁর স্বামী, তাই কাজের স্বীকৃতিও পুরোটা তাঁরই পকেটে চলে যায়। আর উঠতে-বসতে স্ত্রীকে কথা শুনতে হয়। বলা হয়, ‘সারা দিন করো কী?’
সাধারণত পেশাগত পরিচয়ে বলা হয়, স্বামী অমুক চাকরি করেন আর স্ত্রী গৃহিণী! স্ত্রীর পরিচয়ে অনেক সময় বলা হয়, উনি কোনো ‘কাজ’ করেন না! স্পষ্টতই এখানে ‘কাজ’ বলতে মজুরি-বেতন-ভাতা বাবদ নগদ আয় হয়—এমন কাজ বোঝানো হয়। আর নারীরা ঘরের যত কাজ করেন, সেসব কোনো কাজ বলে গণ্য হয় না, কারণ সেখানে কোনো নগদ আয় নেই।
একবার একটি চমৎকার কার্টুনচিত্র দেখেছিলাম। একজন নারী দশ-পনেরো হাতে কাজ করছেন। রান্না, সন্তান লালন-পালন, পরিবারের সদস্যদের সেবাযত্ন, ঘর পরিষ্কার করা, ...সব কাজ। আর ছবির ওপরে-নিচে লেখা, ‘আমার বউ কাজ করে না’! প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে কাজগুলো এতই অদৃশ্য। নারীর মজুরি ও স্বীকৃতিবিহীন কাজের এমন তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ খুব কমই দেখেছি। কার্টুনচিত্রটি একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমাদের সমাজে নারীর কাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কত বৈষম্যমূলক ও ত্রুটিপূর্ণ।
নারীর সব কাজের স্বীকৃতি দিয়ে সঠিক মূল্যায়ন না করলে সমাজে অর্ধেক মানুষ উৎপাদনশীল কাজের বাইরে থেকে যাবে। যেহেতু নারীকে একাধারে ঘর ও বাইরের সব কাজ করতে হয়, তাই তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। নিজের অবসর বলতে কিছু থাকে না। তিনি যদি চাকরি করেনও, তা হলেও তাঁর পক্ষে প্রশিক্ষণ নিয়ে পেশাগত উৎকর্ষ লাভ করা সম্ভব হয় না। ফলে চাকরিতে গেলেও নারী সব সময় কম বেতনের নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য হন। সমাজের অর্ধেক কর্মশক্তি এভাবে পূর্ণ অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়।
এর প্রতিকার কঠিন নয়। গৃহস্থালির কাজে পুরুষ সমান দায়িত্ব নিলে নারীর বোঝা অনেক কমে। তিনি পুরুষের সমান অবস্থানে থেকে চাকরি করতে পারেন। যেমন, স্বামী সপ্তাহে তিন-চার দিন সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া ও নিয়ে আসার দায়িত্ব নিতে পারেন। রান্নাঘরের কিছু কাজও ভাগাভাগি করে নেওয়া যায়। সরকারও নতুন কিছু আইন করতে পারে। চাকরিজীবীর জন্য বছরে ‘পরিবারের জন্য ছুটি’, ‘পিতৃত্ব ছুটি’র ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অনেক দেশে এ রকম আছে। একই সঙ্গে গৃহস্থালির কাজে আধুনিক প্রযুক্তি সহজলভ্য করা দরকার। ওয়াশিং মেশিন, রাইস কুকার, ঘর মোছার মেশিন প্রভৃতি সবার হাতের নাগালে আনা গেলে ঘরের কাজে সময় ভাগাভাগি সহজ হয়। কিন্তু এ জন্য আর্থসামাজিক উন্নয়ন দরকার। আবার বিপরীতক্রমে সমাজের অর্ধেক শক্তি নারীকে বাদ দিয়ে সমাজের উন্নয়নও সম্ভব নয়, এটাও মনে রাখতে হবে।
এক হিসাবে দেখা গেছে, গৃহস্থালির কাজে নারীর কাজের সময় দুই ঘণ্টা কমানো গেলে দেশের শ্রমশক্তিতে তাঁদের অংশগ্রহণ ১০ শতাংশ বাড়ে।
আসুন, আমাদের দেশে নারীর জন্য আপাতত ১০ শতাংশ কর্মক্ষেত্র বাড়ানোর লক্ষ্যে তাঁদের গৃহস্থালির কাজের সময় অন্তত দুই ঘণ্টা কমানোর উদ্যোগ নিই।
এ জন্য পুরুষকে এগিয়ে আসতে হবে। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

সত্যের মুখোমুখি হতে সবাই কি প্রস্তুত? by আলী রীয়াজ

জাতীয় সংসদে আবারও ২০০৭-০৮ সালের ক্ষমতাসীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যকলাপের তদন্তের দাবি উঠেছে। ক্ষমতাসীন জোটের নেতা ও মন্ত্রীরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার ঘটনাবলি তদন্তের জন্য কমিশন গঠনের দাবি করেছেন এবং সুস্পষ্টভাবেই ওই সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেছেন।
জোটের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা ও মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন তাঁর ভাষায় ‘এক-এগারোর সমস্ত ঘটনা বোঝার জন্য’ সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে দিয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করার দাবি তুলেছেন। রাশেদ খান মেনন তাঁর বক্তব্যে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে তাঁর নেতৃত্বাধীন ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত আগস্ট/২০০৭-এর ঘটনাবলি’-বিষয়ক সংসদীয় কমিটি তার প্রতিবেদনে ২০১২ সালেই এই সুপারিশ করেছিল। ফলে আজকেই শুধু এ নিয়ে আলোচনা উঠছে তা নয়। এখন নতুন করে এই আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে কারণ ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম বলেছেন যে ২০০৭-০৮ সালে সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহ করা খবর প্রকাশ করে তিনি ভুল করেছিলেন। গত প্রায় এক মাসে এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া থেকে এই রকমের ধারণা জন্মাতে পারে যে বিষয়টি কারও জানা ছিল না। ২০১২ সালে ওই কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে সংসদে খুব বেশি আলোচনা হয়নি, এখন যতটা উৎসাহ লক্ষণীয়, তখন ততটা উৎসাহ গণমাধ্যমেও দৃষ্ট হয়েছে বলে দাবি করা যাবে না।
সেই তুলনায় ২০০৯ সালের গোড়াতে সংসদে যখন এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, তখন বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। অনেকেই এর পরিণতি কী হয়, সেটা নিয়ে জল্পনাকল্পনা করেছিলেন, অনেকে এর একটা পরিণতি দেখতে চেয়েছিলেন। সে সময় এ নিয়ে বিএনপি নেতাদের আগ্রহ ছিল সংগত ও বোধগম্য কারণেই বেশি। সরকারি দলের যাঁরা ২০০৭-০৮ সরকারের আমলে বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছিলেন, অনেকেই তখন এ নিয়ে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। সেই আলোচনায় সেনা গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকার বিষয়ে যেসব আলোচনা হয়েছিল, তা সংবাদপত্রের পাতা খুললেই পাওয়া যাবে। এদের মধ্যে মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের বক্তব্য ছিল বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। ২০০৯ সালের ২৮ জানুয়ারি সংসদে আলোচনা করতে গিয়ে আব্দুল জলিল অভিযোগ করেছিলেন যে ডিজিএফআইয়ের লোকজন তাঁকে গ্রেপ্তার করে চোখ বেঁধে নিয়ে যান, পাঁচ দিন আটক রাখেন এবং তাঁকে নির্যাতন করেন। আব্দুল জলিল বলেন, ‘আমরা মানবাধিকারের জন্য লড়াই করেছি। কিন্তু আমাদের এমন একটা এজেন্সি আছে, যারা মানুষের প্রতি মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করতে জানে না। এই এজেন্সির নাম ডিজিএফআই।’ আব্দুল জলিল তাদের শাস্তি চেয়েছিলেন। সে সময় কোনো কোনো গণমাধ্যমে এই খবর বেরিয়েছিল যে আব্দুল জলিল ও মহীউদ্দীন খান আলমগীর আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার কথা বিবেচনা করছেন এবং তাঁদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ লড়বেন। তখন প্রকাশিত সেই সংবাদের সত্যতা কতটুকু সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু আলোচনার সমাপ্তি হয় অকস্মাৎ।
সেই সময়ে এই আলোচনায় যবনিকাপাত ঘটার পেছনে সে সময়কার ঘটনাপ্রবাহ কাজ করেছিল, না ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্ত কাজ করেছিল, সেটা আমরা জানি না। কিন্তু আমরা জানি যে এগুলো হচ্ছে সরকারি দলের সদস্যদের তোলা আলোচনা ও প্রশ্ন। ২০০৯ সাল থেকে তৎকালীন সংসদীয় বিরোধী দল বিএনপির সদস্যরা, বিশেষ করে তৎকালীন সংসদীয় বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া, এ নিয়ে সুযোগ পেলেই প্রশ্ন তুলেছেন। সেগুলো নেহাতই তাঁদের ক্ষোভের বিষয় বলেই বিবেচনা করা হয়েছে, তার বেশি নয়। অনেকেই একে দলীয় স্বার্থে তোলা প্রশ্ন বলেই চিহ্নিত করেছেন। ২০১১ সালের ১৫ মার্চ জাতীয় সংসদে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছিলেন, সংবাদপত্রের ওপরে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, ‘সংবাদপত্রে ফোন করে বলে দেওয়া হয় কোন নিউজ যাবে, কোনটা যাবে না। তাহলে এখনো কি ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীনের ভূতরা দেশ চালাচ্ছে?’ ২০১৬ সালে মাহ্ফুজ আনাম যে কথা বলার জন্য এখন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন, সেটা সংসদে খালেদা জিয়া ইঙ্গিত করেছিলেন ২০১১ সালে। যাঁরা ২০০৭-০৮ সালের ঘটনাপ্রবাহ জানেন, তাঁদের জন্য এ কোনো নতুন বিষয় ছিল না। তাঁরা একে উপেক্ষা করতে পেরেছেন, কিন্তু ২০১৬ সালে তাঁদের উৎসাহে কোনো ঘাটতি দেখা যায় না। শুধু তা-ই নয়, দীর্ঘদিন সংসদে অনুপস্থিত থাকার পর সংসদে ফিরেই খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ‘অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী’ বলে বর্ণনা করে ফখরুদ্দীন আহমদ এবং মইন উ আহমেদের বিচার দাবি করেছিলেন।
বিএনপির এসব বক্তব্যের কারণ আমরা বুঝতে পারি, ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির কারণে যে নির্বাচন বাতিল হয়েছিল, তা ছিল বিএনপির সাজানো নির্বাচন। সেই সময়ে রাষ্ট্রপতি যে বিএনপির হাতের পুতুল হিসেবে কাজ করছিলেন, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর। কিন্তু ২০১১ সালে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উত্তর স্মরণ করা দরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন ২৪ মার্চ অষ্টম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেছিলেন, ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীনদের বিচার চাইলে আদালতে মামলা করেন না কেন? আদালত এখন স্বাধীন। বিচার চাইলে মামলা করেন। আমাদের ঘাড়ে চাপাচ্ছেন কেন?
এসব বিষয় স্মরণ করিয়ে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করছি এই কারণে, সরকারি দলের নেতারা আবারও উচ্চ স্বরে এক-এগারোর কুশীলবদের বিচার চাইছেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এ নিয়ে গত সাত বছরে বিরোধী দলের দাবিকেই কেবল উপেক্ষা করা হয়নি, ওই কুশীলবদের কেউ কেউ এখনো নিজ নিজ ক্ষেত্রে বহাল আছেন (মশিউল আলম, ‘এক/এগারোর কুশীলবদের বিচার হয়নি কেন?’, প্রথম আলো, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও আমরা জানি না। এগুলোর পক্ষে যদি যুক্তিগ্রাহ্য কারণ থাকে, সেটি ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্ব নাগরিকদের জানানো। কিন্তু তা জানা নেই বলে এখন এই বিতর্কের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে।
এর বাইরে আরও কিছু প্রশ্ন তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। এক-এগারো বলে যেসব ঘটনার কথা বলা হয়, সেগুলো কোনো অরাজনৈতিক বিষয় ছিল না। একে অরাজনৈতিক বলে বিবেচনা করার চেষ্টা একধরনের রাজনৈতিক অসততা বলেই বিবেচনা করা উচিত। মনে রাখা দরকার যে কথিত এক-এগারো এক দিনে তৈরি হয়নি। তার প্রেক্ষাপট বিবেচনার বাইরে রেখে এক-এগারোকে আদৌ বিবেচনা করা কি সম্ভব? যাঁরা আজকে এক-এগারোর বিরুদ্ধে সরব, তাঁরা নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে পারেন, তাঁরা সেদিনও একইভাবে এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছিলেন কি না। বিএনপি নেতা ও কর্মীদের উত্তরটি আমাদের জানা আছে। ক্ষমতাসীন জোটের নেতারা আশা করি ভেবে দেখবেন। এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে ওই সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের সবই গ্রহণযোগ্য, আবার এ কথা বলার উদ্দেশ্য এ–ও নয় যে সবই অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু ২০০৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছিল কয়েক বছর ধরে; সেসব ঘটনা, অন্ততপক্ষে ২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহকে অস্বীকার করার সুযোগ কোথায়? যারা ঘটনাটিকে শুধু ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি শুরু হওয়া একটি বিষয় হিসেবে দেখতে চান তার মধ্যে রাজনৈতিক সুবিধা থাকতে পারে, এর বেশি কিছু নয়। সেই পরিস্থিতি তৈরির জন্য রাজনীতিবিদেরা, যার মধ্যে বর্তমান ক্ষমতাসীনেরাও আছেন, দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত আছেন কি?
২০০৭-০৮ সালের সরকারের সময়ে কেবল কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি, রাজনৈতিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে আটক করা সেই রাজনৈতিক পদক্ষেপের অংশ। দুই নেত্রীকেই বন্দিজীবন যাপন করতে হয়েছে। যথাযথ আইনি ব্যবস্থা অনুসরণ করার ক্ষেত্রে ব্যত্যয় হয়েছে, সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু আরও রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে, সেগুলো জানার অধিকারও নাগরিকদের আছে। ক্ষমতাসীন দল ও জোটের নেতারা যদি মনে করেন যে এসব প্রশাসনিক পদক্ষেপের তদন্ত হওয়া দরকার, তবে সুস্পষ্টভাবে এসব রাজনৈতিক বিষয়ের তদন্তের দাবিও তাঁদের তুলতে হবে। কোনো রকম রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সেনাসমর্থিত সরকারের ক্ষমতার অবসান হয়নি, সেটা আমাদের মনে রাখতে হবে। সরকারি দলের নেতারা ২০০৯ সালে এবং এখন আবার ২০০৭-০৮ সালের সরকারের অত্যাচারের বিচার চাইছেন—ন্যায়বিচারের স্বার্থে সেটা জরুরি, কিন্তু একই কারণে তা সবার জন্যই একইভাবে প্রযোজ্য হওয়া দরকার। সে ক্ষেত্রে দলীয়ভাবে বিবেচনার ইতিহাস ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে, সেই বিষয়ে সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্য শোনার আগ্রহ থাকল।
যেকোনো ধরনের তদন্তের কথা শুনলে আমার ব্যক্তিগতভাবে তিনটি প্রশ্ন মনে জাগে, তদন্ত স্বাধীনভাবে সম্পাদিত হবে কি না; তদন্ত সরকারের সমালোচক ও বিরোধীদের দমনের হাতিয়ারে পরিণত হবে কি না; আর শেষ পর্যন্ত এই তদন্তের প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখবে কি না। ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায়। আমি তার ব্যতিক্রম নই।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

সাদ্দামকে সরাতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন ব্লেয়ার

যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরাকের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করেছিলেন বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। এক্ষেত্রে তিনি ভয়াবহ মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন। মন্ত্রিপরিষদকে থোড়াই কেয়ার করেছেন। যুদ্ধে লিপ্ত সামরিক বাহিনীকে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামাদি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আত্মজীবনীমুলক বই ‘ব্রোকেন ভোজ’-এ এসব কথা লিখেছেন টম বোয়ার। এতে তুলে ধরা হয়েছে কিভাবে সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন টনি ব্লেয়ার। সেনাবাহিনীর প্রধানগণ, সরকারি বড় বড় কর্মকর্তা ও মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের সাক্ষাতকার ভিত্তিক এ বইয়ে বলা হয়েছে কিভাবে টনি ব্লেয়ার তার চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ, কেবিনেট সেক্রেটারি, ফরেন সেক্রেটারি, ডিফেন্স সেক্রেটারি ও মন্ত্রিপরিষদের বেশির ভাগ সদস্যকে কিভাবে অন্ধকারে রেখেছিলেন। ইরাক যুদ্ধে যথাযথ পরিকল্পনা নেয়ার অনুমতি তিনি দেননি। কারণ হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন, তিনি সৎভাবে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করছেন। সেনাবাহিনী সরঞ্জাম চেয়ে পায় নি। এর ফলে বৃটিশ সেনারা পর্যাপ্ত শরীর রক্ষাকারী সরঞ্জামের অভাবে মারা পড়েছে যুদ্ধ শুরু হলে। তখন চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ এডমিরাল স্যার মাইক বয়সে তখনকার প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে সতর্ক করেছিলেন। টনি ব্লেয়ারের কাছে ডিফেন্স সেক্রেটারি বা প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জিওফ হুন  বলেছিলেন, আমাদের মেশিন গান, শরীর রক্ষাকারী ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহের প্রয়োজন। জবাবে টনি ব্লেয়ার বলেছিলেন- না। আমি ইরাকে অস্ত্র পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি চেয়ে জাতিসংঘের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। উল্লেখ্য, টম বোয়ার একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। তিনি তার আত্মজীবনীতে তুলে ধরেছেন কিভাবে টনি ব্লেয়ার বৃটেনকে ইরাক যুদ্ধে টেনে নিয়ে যান। তার এ বই প্রকাশ হওয়ায় স্যার জন চিলকোট অনেকটা চাপেই পড়বেন। কারণ, তিনি ইরাক যুদ্ধ নিয়ে অনুসন্ধান করছেন। ৬ বছর অনুসন্ধানের পর তার সেই অনুসন্ধান রিপোর্ট প্রকাশ হতে যাচ্ছে শিগগিরই। টম বোয়ার তার বইয়ে লিখেছেন, নিজের সত্যিকার উদ্দেশ্য যাতে বাইরে প্রকাশ না পায় সে জন্য মন্ত্রিপরিষদ ও সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিজের পরিকল্পনা গোপন রাখতেন টনি ব্লেয়ার। গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বাইরে রাখতেন। যুদ্ধ পরবর্তী ইরাক নিয়ে যথাযথ পরিকল্পনার আহ্বান তিনি এড়িয়ে চলতেন। বলতেন, ওটা আমেরিকানরা দেখবে। তিনি যুদ্ধ চলাকালে এডমিরাল বয়সে থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরে বাধ্য হয়ে সে পরিকল্পনা বাদ দেন। সেনাবাহিনী থেকে বলা হতো, ইরাক যুদ্ধ ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরিণতি লাভ করতে পারে। এ সতর্কতাকে থোড়াই কেয়ার করতেন ব্লেয়ার।

অন্যায় মামলা থেকে অব্যাহতি দিন by সৈয়দ জিয়াউর রহ্‌মান

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে একটি প্রখ্যাত দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক আমার এক বন্ধুর একটি প্রশ্নের আমি সদুত্তর দিতে পারিনি। তাঁর প্রশ্ন ছিল—বাংলাদেশে যে কেউ যে কারও বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করতে পারে কি না। আমার এই সাংবাদিক বন্ধু বেশ কয়েকবার ভারত-বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং তিনি প্রায়ই ইন্টারনেটে ভারত-বাংলাদেশের খবরাখবর পড়ে থাকেন। তিনি ঢাকার ইংরেজি পত্রিকা ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে দায়ের করা বেশ কিছু রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা প্রসঙ্গে এই প্রশ্ন করেন। আমি আইন বিশেষজ্ঞ নই, তবে এখানকার কয়েকজন আইনবিশারদের কাছে শুনেছি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হয় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে; সাধারণ নাগরিকেরা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করতে পারে না। দ্বিতীয়ত, ১০ বছর আগের কোনো সরকারের নির্দেশ পালনের দায়ে পরবর্তীকালের কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো সাংবাদিককে অভিযুক্ত করতে পারে না।
আমেরিকায় প্রায় প্রতিদিনই প্রশাসনের বিরুদ্ধে, এমনকি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের খবরাখবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় এবং সেগুলোর কোনোটিতে কোনো ভুল তথ্য থাকলে প্রশাসনের কিংবা প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। পরে এই প্রতিবাদ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এর জন্য সম্পাদকের বিরুদ্ধে মানহানির কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয় না।
ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম ঢাকার একটি টেলিভিশনের এক আলোচনা অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, এক-এগারোর সময় দেশের অন্য সব পত্রপত্রিকার মতো তাঁর পত্রিকায়ও তিনি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া কিছু সংবাদ ছাপাতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই সংবাদ ছিল আওয়ামী লীগের নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ–সংক্রান্ত। মাহ্ফুজ আনাম ওই টেলিভিশন অনুষ্ঠানে দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, রাষ্ট্রীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া সেদিনকার সেই সংবাদ যাচাই না করে ছাপানোটা তাঁর ভুল হয়েছিল।
পরদিনই প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় মাহ্ফুজ আনামকে রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে কারাগারে পাঠানোর দাবি জানান। তারপরই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রসংগঠনের নেতারা উৎসাহিত হয়ে একের পর এক মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করে চলেছেন। এই সংখ্যা ৭৮–এ পৌঁছেছে বলে এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে। জাতীয় সংসদেও কয়েকজন সাংসদ দাবি জানিয়েছেন মাহ্ফুজ আনামকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর।
এক-এগারোর সময় ওই সংবাদ প্রকাশে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় সব সংবাদপত্র এবং টেলিভিশন। কেবল দৈনিক নিউ এজ পত্রিকায় এই সংবাদ প্রকাশিত হয়নি। ডেইলি স্টার ছাড়া আর যেসব পত্রপত্রিকায় এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ওই সংবাদ প্রকাশিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে কেউ কোনো মামলা করেনি। তা ছাড়া, তখনকার রাষ্ট্রীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার যেসব কর্মকর্তা সংবাদপত্রে ও টেলিভিশনে ওই সংবাদ প্রকাশে বাধ্য করেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও কোনো অভিযোগ নেই।
রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো সংবাদ যাচাই না করে ছাপার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে মাহ্ফুজ আনাম বিরল সাংবাদিক সততার পরিচয় দিয়েছেন। যাচাই না করে সংবাদ ছাপানো ভুল হয়েছিল বলে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তাতে তাঁর অনন্য পেশাগত মূল্যবোধের পরিচয় পাওয়া গেছে। এর জন্য মাহ্ফুজ আনাম জাতির কাছে প্রশংসিত হওয়ার দাবি রাখেন, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার নয়।
মাহ্ফুজ আমার অনুজ প্রতিম। তাঁর বড় ভাই ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস-এর সম্পাদক প্রয়াত মহ্বুব আনাম ছিলেন আমার সহপাঠী ও বন্ধু। সেই সুবাদে আমি মাহ্ফুজ আনামকে দীর্ঘকাল ধরে জানি। শুধু সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও মাহ্ফুজ অত্যন্ত সজ্জন এবং পরিশীলিত। মাহ্ফুজ আমাদের কনিষ্ঠ হলেও সততা ও সাহসিকতার ক্ষেত্রে তাঁর কাছে আমাদের মতো বর্ষীয়ান সাংবাদিকদেরও শেখার আছে। মাহ্ফুজের বাবা প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক ও পঞ্চাশ-ষাটের দশকের আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা প্রয়াত আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আত্মজীবনীতে একটি পারিবারিক মানবিক ঘটনার উল্লেখ করে লিখেছেন, তাঁর এই ছেলের কাছে তাঁদের অনেক কিছু শেখার আছে। মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে মানহানির আর রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় উৎসাহিত হয়েছেন যাঁরা, তাঁদের উচিত হবে মাহ্ফুজের সাংবাদিক সততার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে মামলা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে নিজেদের ভুল সংশোধন করা। তাঁদের উচিত হবে যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ ভুল ছিল বলে মাহ্ফুজ যে মন্তব্য করেছেন, তার জন্য তাঁকে দলের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানানো। মাহ্ফুজ আনামের এই স্বীকারোক্তির অর্থ হচ্ছে এসব সংবাদের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তিনি যদি তা স্বীকার না করতেন তবে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া ওই সব তথ্য সঠিক ছিল বলেই অনেকের ধারণা হতো।
তা ছাড়া, দেশের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অন্যায় ও নীতিবর্জিত মামলা-অভিযোগ দায়েরের ফলে গণতান্ত্রিক বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা থাকছে। বাংলাদেশে আশির দশকে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালে তখনকার আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার ২০-২৫টি সাক্ষাৎকার আমি প্রচার করেছি ভয়েস অব আমেরিকায়। ওই সব সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যমের ওপর এরশাদের দমননীতির বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন তাঁরা। জেনারেল এরশাদের ক্ষমতার শেষভাগে দেশব্যাপী তুমুল বিক্ষোভ-আন্দোলনের সময় বিবিসির ঢাকা সংবাদদাতা আতাউস সামাদ এবং আরও কয়েকজন সাংবাদিককে ‘মিথ্যা খবর’ পরিবেশনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিনই আমি এ নিয়ে আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার নিই। ভয়েস অব আমেরিকায় প্রচারিত ওই সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকেরা জাতির বিবেক, তাঁদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন দেশের মানুষ মেনে নিতে পারে না।’ আওয়ামী লীগপ্রধান আরও বলেছিলেন, ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যে স্বাধীন দেশ আমরা অর্জন করেছি, সেখানে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন কোনোমতেই সহ্য করা হবে না।’
তখনকার আওয়ামী লীগ নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সেই বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রত্যাশা করছি, তিনি সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিক মাহ্ফুজ আনামকে সত্বর এসব অন্যায় ও নৈতিকতাবিরোধী মামলা-অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থা নেবেন।
সৈয়দ জিয়াউর রহ্মান: লেখক, সাংবাদিক ও ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র এডিটর।

প্লট ফেরতে দায়মুক্ত রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান! by মোর্শেদ নোমান

প্লট ফেরত দিয়ে বিধি বহির্ভূতভাবে প্লট বরাদ্দ নেওয়া অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পেয়েছেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান মো. নুরুল হুদা। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগটি অনুসন্ধান শেষে নথিভুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সম্প্রতি দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকৌশলী মো. নুরুল হুদার বিরুদ্ধে বিধি বহির্ভূতভাবে প্লট বরাদ্দ নেওয়া অভিযোগ নথিভুক্তির (অব্যাহতি) মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
এর আগে জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে দুদকের দায়মুক্তি পেয়েছিলেন রাজউকের সাবেক এই চেয়ারম্যান।
রাজধানীতে নিজের প্লট থাকা সত্ত্বেও তথ্য গোপন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে একাধিক প্লট নেওয়ার অভিযোগে নুরুল হুদার বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। দুদকে আসা অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, রাজউকের চেয়ারম্যান থাকাকালে নুরুল হুদা রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ৯ নম্বর সেক্টরের ১০৩ নম্বর রোডে ১০ কাঠা আয়তনের একটি প্লট বরাদ্দ নেন। এ সময় স্ত্রী ওয়াহিদা হুদার নামে একই প্রকল্পের সেক্টর-৫, রোড-৩০৯, প্লট-৪৯ নম্বরে পাঁচ কাঠার আরেকটি প্লট বরাদ্দ নেন। সেখানে স্ত্রীকে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ‘মূল অধিবাসী’ ও ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ দেখানো হয়। এ ছাড়া নুরুল হুদা দম্পতির তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায়ও প্লট রয়েছে। এ অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি দমন সংস্থাটি অনুসন্ধান শুরু করার পর কৌশলের আশ্রয় নেন নুরুল হুদা। প্লট ফেরত দেওয়ার জন্য একাধিক আবেদন করেন নুরুল হুদার স্ত্রী। আবেদনপত্রে ওয়াহিদা হুদা বলেন, ‘রাজউকের প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসারে পূর্বাচল প্রকল্পের মূল অধিবাসী হিসেবে ঘর-বাড়িসহ জমিতে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁরা (স্বামী-স্ত্রী উভয়েই) প্লট বরাদ্দ পাওয়ার কথা। আমিও অনুরূপভাবে জমি ও বাড়ির বিনিময়ে মূল অধিবাসী হিসেবে প্লটের বরাদ্দ পেয়েছি। এ ক্ষেত্রে রাজউকের প্রচলিত বিধিবিধানের কোনো ব্যত্যয় হয়নি বলে আমি মনে করি। তারপরও বরাদ্দকৃত প্লটের ক্ষেত্রে রাজউকের প্রচলিত বিধিবিধানের কোনোরূপ ব্যত্যয় হয়ে থাকলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে আমাকে পুরো বিষয়টি অবহিত করলে আমি রাজউক বরাবর প্লটটি সমর্পণ করতে প্রস্তুত আছি।’
এরপর গত বছরের ২৫ নভেম্বর আরেক আবেদনপত্রে প্লটটি সমর্পণ করার সিদ্ধান্তের কথা জানান ওয়াহিদা হুদা। এরপর গত ৬ ডিসেম্বর তাঁর প্লট ফেরত দেওয়ার আবেদনটি গ্রহণ করে রাজউক কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে রাজউক কর্তৃপক্ষ পূর্বাচলে ওয়াহিদা হুদার প্লটটি বুঝে পেয়েছে বলে দুদককে জানানো হয়েছে।
মো. নুরুল হুদা ২০০৯ সালের ৩০ মার্চ অতিরিক্ত সচিবের পদমর্যাদায় দুই বছরের জন্য রাজউকের চেয়ারম্যান পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কয়েক দফা তাঁর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো শেষে ২০১৪ সালের ২০ এপ্রিল রাজউক চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর মেয়াদ শেষ হয়।

‘বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিদিন ব্যবহার হয় ৩০০০ কনডম’ প্রমাণ দেবেন বিধায়ক

প্রতিদিন জওয়াহারলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০০০ কনডম ব্যবহার করা হয়। এ বিষয়ে প্রমাণ দেবেন রাজস্থানের বিজেপি দলীয় বিধায়ক জ্ঞানদেব আহুজা। তার এ বক্তব্য প্রমাণ করতে তিনি শিগগিরই একটি সংবাদ সম্মেলন ডাকবেন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি আফজাল গুরুর ফাঁসি কার্যকরের বার্ষিকীতে র‌্যালি আয়োজন করে শিক্ষার্থীরা। এতে নেতৃত্বে ছিলেন কন্যা কুমার নামে এক ছাত্র নেতা। এ জন্য তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। এক পর্যায়ে তাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে যান কংগ্রেস ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী। এ জন্য রাহুল গান্ধী, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবন্দি কেজরিওয়াল সহ ৯ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন ভারতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। এতে ঘি ঢেলেছেন জ্ঞানদেব আহুজা। তিনি আলওয়ার জেলার রামগড় আসন থেকে নির্বাচিত বিধায়ক। গত ২২শে ফেব্রুয়ারি আলওয়ারে এক র‌্যালিতে নেতৃত্ব দেয়ার সময় তিনি বলেন, প্রতিদিন ওই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যবহার করা হয় ২০০০ বোতল মদ, ১০ হাজার সিগারেট, ৩০০০ কনডম। আরও বেশ কিছু জিনিসের বিষয়ে তিনি বক্তব্য রাখেন। তার এমন বক্তব্যের প্রতিবাদে বিধানসভার প্রথম দিনে গভর্নর যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন কংগ্রেস স্লোগান দেয়। তখন জ্ঞানদেব আহুজা বলেন, তার কাছে প্রমাণ আছে। তিনি বলেন, এ লড়াই অসুর ও দিব্যশক্তির। এ লড়াই চলবেই।