Thursday, September 26, 2013

সংকট সমাধানে দেশপ্রেমের পরিচয় দিন by মোঃ মাহমুদুর রহমান

দেশী-বিদেশী সব মহল থেকে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংলাপের তাগিদ দেয়া হচ্ছে। এক পক্ষ সংলাপে বসতে সম্মত হলেও অপর পক্ষ সংলাপে বসতে রাজি নয়। মাঝে মাঝে কূটনৈতিক মহলের চাপে ক্ষমতাসীনরা সংলাপের বিষয়ে ইতিবাচক বক্তব্য দিলেও পরক্ষণেই বক্তব্য থেকে সরে যাচ্ছেন। বিরোধী দলকে সংলাপের জন্য আনুষ্ঠানিক পত্র দেয়ার ঘোষণা দিয়েও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এ ঘোষণা অনুযায়ী অজ্ঞাত কারণে কাজ করতে পারেননি। আসলে সদিচ্ছাবিহীন সংলাপ কোনো সমাধান নিয়ে আসতে পারে না, যার প্রমাণ ২০০৬ সালের আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের মধ্যে সিরিজ সংলাপ। প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য সংলাপ ছাড়া যেমন সমঝোতা অসম্ভব, তেমনি সদিচ্ছাবিহীন সংলাপে সংকটের সমাধানের আশাও অবাস্তব। আর এ মুহূর্তে একটি কার্যকর সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অন্য কেউ নয়। আজকের এই সংকটের সূচনা হয়েছে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার মাধ্যমে। ত্রয়োদশ সংশোধনীর দ্বারা অর্জিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা রহিত করা হয় পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। ফলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে অতীতের জাতীয় ঐকমত্য থেকে বর্তমান সরকার সরে যায়। এ প্রক্রিয়া শুরু হয় মহামান্য সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে। ২০১০ সালে এই কমিটি গঠন করা হলেও এতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কোনো সদস্য ছিলেন না। কমিটি আইনজ্ঞসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মতামত নিয়েছিল সংশোধনের সুপারিশ পেশের আগে। কোনো মহল থেকেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্তির সুপারিশ করা হয়নি। কমিটি তার সুপারিশ চূড়ান্ত করার শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সুপ্রিমকোর্টের রায়ের অজুহাত দেখিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির সুপারিশ করে। যদিও সুপ্রিমকোর্টের সংক্ষিপ্ত রায়ে পরবর্তী দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখা যেতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়েছিল। ওই বৈঠকের পর কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সুর পাল্টে যায়। যিনি আগে বার বার বলছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে থাকবে, তিনি নতুন করে বলতে শুরু করলেন, এ ব্যবস্থা রাখা যাবে না সুপ্রিমকোর্টের রায়ের কারণে। জনগণ যা বোঝার তাই বুঝলেন। এ দেশের রাজনীতিকরা তাদের দলীয় প্রধানের চিন্তার বাইরে চিন্তা করার সুযোগ পান না, কথার বিপরীতে কোনো কথা বলার মতো হিম্মত রাখেন না। যত বড় নেতাই হোন না কেন, দলীয় পদ-পদবি ও সরকারের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে হলে দলীয় নেত্রীর মর্জিমাফিক চলতে হয়। এটা বর্তমান সরকারপ্রধানের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনি বিগত জোট সরকারপ্রধানের ক্ষেত্রেও সত্য ছিল। এ অবস্থায় দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ নির্বাচনকালীন একটি দলনিরপেক্ষ সরকার চাইলেও দলের নেতৃস্থানীয় কেউ তা প্রধানমন্ত্রীর সামনে উপস্থাপন করবেন বলে মনে হয় না। আর দলের বাইরের কেউ বললে তা আমলে নেয়া হবে না। অথচ দেশবাসী প্রধানমন্ত্রীর দিকে চেয়ে আছে রাজনৈতিক সংকট সমাধানে দিকনির্দেশনার আশায়।
সংবিধান (সর্বশেষ সংশোধিত) অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান থাকবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। আর বিরোধী দলের মূল আপত্তির জায়গা এখানেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় সরকারপ্রধান রেখে কোনো সমঝোতার ফর্মুলাই মানবে না বিরোধী দল। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে কোনো ফর্মুলা দেয়া আওয়ামী লীগের কোনো নেতার পক্ষেই সম্ভব নয়, যদি প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো বক্তব্য প্রদান না করেন। উল্টো প্রধানমন্ত্রীকে খুশি রাখার জন্য কে কত সমঝোতাবিরোধী বক্তব্য প্রদান করতে পারেন, তার প্রতিযোগিতা চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি হচ্ছে, তার অধীনে যত নির্বাচন হয়েছে, সবই নিরপেক্ষ হয়েছে, যার জন্য বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। সুতরাং আগামী জাতীয় নির্বাচনও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। বাস্তবে হয়তো হতেও পারে। কিন্তু বিরোধী দল কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারছে না। দেশের সাধারণ মানুষও নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ সরকার চায়, যা বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী দোহাই দিচ্ছেন সংবিধানের। সংবিধানের বাইরে কোনো সমঝোতায় তিনি যাবেন না। সংবিধানের ভেতরে থেকেও অনেক সমাধান আছে যদি তিনি নিজেকে সরকারপ্রধানের পদ থেকে প্রত্যাহার করে নেন। দেশে শান্তি, শৃংখলা, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র বজায় রাখার স্বার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের একটি ঘোষণা দিলে আগামী নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, জনগণের প্রতি তার দায়বদ্ধতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
বিগত সংসদ নির্বাচনের সময় সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর ফলে এ ধরনের একটি সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল। ওই সংশোধনীতে বিচারপতিদের মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়েছিল। ফলে নবম সংসদ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ছিল বিচারপতি কে এম হাসানের। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল (বর্তমান শাসক দল) বিচারপতি কে এম হাসানের বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অজুহাতে তাকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মানতে অস্বীকার করে। তখন বিএনপি আজকের আওয়ামী লীগের মতো সংবিধানের দোহাই দিচ্ছিল। কারণ সংবিধান অনুযায়ী বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টা। অথচ আওয়ামী লীগ তখন কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলেছিল এর প্রতিবাদে। বিএনপিও সংবিধান রক্ষা করতে অনমনীয় ছিল। কিন্তু আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন বিচারপতি দেশ ও জনগণের কথা চিন্তা করে সেদিন জানিয়েছিলেন, সবাই না মানলে তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করবেন না। জাতি বিরাট সংকট থেকে মুক্তি পেয়েছিল। অন্য বিকল্পগুলো সমঝোতার মাধ্যমে গ্রহণ করে সংকট সমাধানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন শাসক দল বিএনপির একগুঁয়েমি ও অনমনীয়তার কারণে ধারাবাহিকভাবে সংবিধান সম্মত পরবর্তী বিকল্পগুলো গৃহীত না হওয়ায় সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করতে হয়। ফলে সংকট সমাধানের চেয়ে আরও জটিল আকার ধারণ করে এবং পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপিকে চরম মূল্য দিতে হয়। অথচ সুযোগ ছিল বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী অথবা বিচারপতি হামিদুল হককে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে সবার অংশগ্রহণে সুন্দর একটি নির্বাচন উপহার দেয়ার।
আসলে ক্ষমতার স্টিয়ারিং হুইল যার হাতে থাকে, তারাই অনমনীয়তা ও একগুঁয়েমির পরিচয় দেয়। যেমন দিয়েছিল ২০০৬ সালে বিএনপি, একইভাবে দিচ্ছে ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ। আর এই একগুঁয়েমির জন্য জনগণকে যেমন কষ্ট ভোগ করতে হয়, তেমনি ক্ষমতাসীনদেরও চরম মাশুল গুনতে হয়। সাংবাদিক, সুশীল সমাজ এবং চন্তাশীল দেশপ্রেমিক মানুষের দুশ্চিন্তা ও আহাজারি ক্ষমতার দম্ভে পদদলিত হয়। অবস্থা দেখে মনে হয়, কোনো বেপরোয়া চালক যাত্রীদের চিৎকার ও রাস্তায় চলমান মানুষের দুশ্চিন্তাকে গ্রাহ্য না করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ নামক গাড়িটি আজ একইভাবে চলছে।
সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর ফলে ২০০৬ সালে এই গাড়ির স্টিয়ারিং হুইল ধরার কথা ছিল বিচারপতি কেএম হাসানের। অর্ধেক যাত্রীর আপত্তির কারণে যাত্রী তথা জনগণের কথা চিন্তা করে আত্মসম্মানবোধ ও দেশপ্রেমের কারণে বিচারপতি কেএম হাসান নিজেকে দূরে সরিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের সুযোগ দিয়েছিলেন। আজ পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারপ্রধান থাকার সাংবিধানিক অধিকার পেয়েছেন। আজও দেশের বেশিরভাগ মানুষ তাকে এই পদে মানতে নারাজ। এখন জনগণের কথা চিন্তা করে তিনি নিজেকে সরিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের সুযোগ দিতে পারেন। আবার কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা না করে একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চতায় ফেলে দিতে পারেন। সবকিছুই নির্ভর করবে তার দেশপ্রেমের ওপর। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিচারপতি কেএম হাসানের দেশপ্রেমের কাছে হারবেন না। নিশ্চয়ই সময়মতো সংকট সমাধানে দেশপ্রেমের পরিচয় দেবেন।
মোঃ মাহমুদুর রহমান : ব্যাংকার

সহিংসতা থেকে বাঁচার একটিই পথ আছে by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে চলমান সংকট সরকারের মেয়াদের শেষদিকে এসে ক্রমান্বয়ে জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। সরকার চাইছে সংশোধিত সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে সংসদ বহাল রেখে, প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-এমপিদের স্বপদে রেখে নিজেদের মনোনীত নির্বাচন কমিশনের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে। অন্যদিকে বিরোধী দলসহ নাগরিক সম্প্রদায়ের অধিকাংশ চাইছেন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার। বিরোধী দল মনে করে, সরকার যেভাবে নির্বাচন করতে চাইছে তাতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে না। তাছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন করার মতো পরিবেশ পরিস্থিতি এখনও বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক অনাস্থার জায়গাটিতে যেহেতু কোনো উন্নতি হয়নি এবং নির্বাচন কমিশনকেও নব্বই পরবর্তী সরকারগুলো যেহেতু স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পারেনি, সে কারণে দলীয় সরকারকে বিশ্বাস করে তার অধীনে নির্বাচনে যেতে বিরোধীদলীয় অনীহাকে দেশবাসী অযৌক্তিক মনে করছেন না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দাতাগোষ্ঠীরা চাইছে সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। সাধারণ মানুষ সংঘাত ও সহিংসতা চান না। তারা চান উভয় দলের মধ্যে একটি আপসরফা হোক। কিন্তু সে আশা করতে করতে এবং সরকারি দলের পক্ষ থেকে কোনো সমঝোতা উদ্যোগ গ্রহণ না করায় তারা হতাশ হয়ে পড়ছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়ায় বিদেশের মাটিতে এ বিষয়ে কী আলাপ-আলোচনা হয়, অনেকে সেদিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
সরকারের ভুলে না যাওয়া ভালো যে, নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধান করাই উত্তম। এ ব্যাপারে বিদেশীরা সুবিধা করতে পারেন না। আর বিদেশীরা যদি আমাদের সমস্যার সমাধান করে দেন, তাহলে তা রাজনৈতিক নেতাদের জন্য লজ্জার বিষয়। ১৯৯৬ সালে একই রকম সমস্যা সমাধানে বিদেশীরা অনেক চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলেন। পরে এ দেশের রাজনৈতিক নেতারাই ওই সমস্যার সমাধান করেছিলেন। সমস্যা হল, সরকার আলোচ্য সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে, চলমান সংকটের মধ্যে আলোচনা-সমঝোতার পথে না গিয়ে, যেভাবেই হোক না কেন নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে দেশবাসীর নির্বাচনসংক্রান্ত দুশ্চিন্তা আরও গভীর করে তুলেছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে চলমান ১৮ দলীয় জোটের আন্দোলনের অংশ হিসেবে সম্প্রতি এ জোটের নেত্রী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনসভা করে দেশবাসীকে তাদের দাবির যৌক্তিকতার পক্ষে অধিকতর সম্পৃক্ত করার কাজে নেমেছেন। এসব জনসভায় বেগম জিয়া বলছেন, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে চাইলে তার জোট শুধু নির্বাচন প্রত্যাখ্যানই করবে না, তারা এমন নির্বাচন হতে দেবেন না। অন্যদিকে ১৭ সেপ্টেম্বর সিলেটের গোলাপগঞ্জে সরকারি দলের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী যেভাবেই হোক নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, বেগম জিয়া নির্বাচন বানচাল করতে পারবেন না। নির্বাচন নিয়ে দেশের দুই প্রধান নেত্রীর এ পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেখে দেশবাসী বুঝতে পারছেন যে, দশম সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সরকার যদি সাংবিধানিক কাঠামোর দোহাই দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনেই এ নির্বাচন করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে, আর বিরোধী দল যদি এ নির্বাচন বর্জন করে একে প্রতিহত করার লক্ষ্যে কর্মসূচি দেয়, তাহলে নিশ্চিত রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ভোটারবিহীন একটি যাচ্ছেতাই মার্কা নির্বাচন হয়ে স্বল্পায়ুর সরকার গঠিত হতে পারবে, নাকি তার আগেই অন্য কোনো রকম অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিবর্তন হবে, তা নিয়ে সুশীল সমাজ চিন্তিত। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে এলেও এখনই সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে যায়নি। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য বিরোধী দলের ওপর স্নায়ুচাপ বাড়িয়ে তাদের সমঝোতার দরকষাকষিতে কাবু করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কি-না তা আর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই স্পষ্ট হবে। দেশবাসী আনন্দিত হবে যদি সরকার দশম সংসদ নির্বাচনকে রক্তপাত ও সংঘর্ষের পথ থেকে বের করে সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে উৎসব ও আনন্দের পথে নিয়ে আসতে পারে।
এ উপমহাদেশে সাধারণ মানুষের কাছে যে কোনো নির্বাচন একটি সার্বজনীন উপভোগ্য রাজনৈতিক উৎসব। বিশেষ করে পাঁচ বছর পর পর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও ভোটাররা মিলে যে উৎসবের আমেজ গড়ে তোলে, তাকে উপভোগ্য বলা যায়। এ কারণে এ অঞ্চলে পাশ্চাত্যের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে নির্বাচনে ভোটের হার হয় অনেক বেশি। ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু ভেদে সবাই নির্বাচনের সময় সমান মর্যাদা পান বলে সাধারণ গ্রামীণ মানুষ ভোটের অধিকারকে বিশেষ মর্যাদা হিসেবে বিবেচনা করে নিজের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচনে সাগ্রহে ও সানন্দে অংশগ্রহণ করেন। এ কারণে গ্রামীণ স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণের হার খুব বেশি হয়। তবে নির্বাচনের পরিবেশ-পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক না থাকে, নির্বাচনে যদি সব দল অংশগ্রহণ না করে, নির্বাচনী প্রচারণা ও ভোটদানের নিরাপত্তা যদি সুনিশ্চিত না থাকে, তাহলে ওই নির্বাচনে ভোটারদের অংশগ্রহণ হ্রাস পায়। কারণ কোনো রকম হুমকি বা ঝুঁকির মধ্যে সাধারণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে চান না। কাজেই যখন আমরা আনন্দমুখর বা উৎসবমুখর নির্বাচনের কথা বলি, ওই নির্বাচন বলতে আমরা এমন নির্বাচনকে বোঝাই, যে নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করে, নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে এবং ভোটাররা নির্বিঘেœ ও স্বাধীনভাবে পূর্ণ নিরাপত্তাসহকারে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোট প্রদান করতে পারেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার নিজদলীয় তত্ত্বাবধানে একতরফা নির্বাচন করতে চাইলে সে রকম নির্বাচনে একদিকে যেমন আশংকাজনকভাবে ভোট কম পড়বে, তেমনি সহিংসতার ঝুঁকিও হবে মারাÍক। সরকার এমন নির্বাচন করতে চাইলেও শেষ পর্যন্ত তা করতে পারবে কি-না সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। কারণ, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার লক্ষ্যে নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হওয়ার পর প্রধান বিরোধী দলগুলো চুপ করে ঘরে বসে থাকবে না। তারা ওই নির্বাচন বন্ধ করার জন্য কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি দেবে। এ রকম আন্দোলন কর্মসূচি যাতে সাধারণ মানুষের কাছে অযৌক্তিক মনে না হয় সেজন্য এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরোধীদলীয় জোটের অর্ধশতাধিক টিম জনগণকে বিরোধীদলীয় আন্দোলনের যৌক্তিকতা অনুধাবনে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সরকার বিরোধীদলীয় আন্দোলন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করার কথা ভাবতে পারে। তবে সরকারের মেয়াদের শেষকালে এসে এসব আন্দোলন গণসমর্থন পেলে ওই আন্দোলন কর্মসূচি দমনে সরকার প্রশাসন ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কতটা সহায়তা পাবে তা নিয়ে ভাবার আছে।
সরকারের মনে রাখা ভালো, পে-স্কেলের ঘোষণা আর পদোন্নতি দিয়ে প্রশাসনকে কব্জায় রাখার যতই চেষ্টা করা হোক না কেন, এ দেশের প্রশাসকরা সরকারের মেয়াদের শেষদিকে এসে রাজনৈতিক অংক করে দায়িত্ব পালন করেন। পরে কোন দল ক্ষমতায় এসে সরকার গঠন করবে সেসব হিসাব বিবেচনায় নিয়েই তারা কাজ করেন। ১৯৯৬ সালে যেসব সরকারি কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সমর্থিত জনতার মঞ্চে যোগ দিয়েছিলেন, তারা রাজনৈতিক অংক করেই সে কাজে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। একইভাবে আজকের প্রশাসকরাও কোন দলের কতটা গণসমর্থন রয়েছে এবং কারা দশম সংসদ নির্বাচন হলে ওই নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে পারবে, সে অংকটি না করেই তারা সরকারের অন্যায় আদেশ বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের চাকরির ক্যারিয়ারকে ঝুঁকিযুক্ত করবেন বলে মনে হয় না। এরই মধ্যে সরকারি কর্মকর্তারা পাঁচটি হাই ভোল্টেজের সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী ফলাফল দেখে বুঝতে পেরেছেন যে, আসন্ন নির্বাচনী যুদ্ধে বেশিরভাগ মানুষ কোন দলকে সমর্থন দেবেন। কাজেই নিজেদের চাকরির ক্যারিয়ারের কথা বিবেচনা করেই তারা সামনের দিনগুলোতে সতর্কতার সঙ্গে কাজ করবেন। সেজন্য বলা যায়, আগামী দিনগুলোতে সরকার খুব সহজেই সরকারি কর্মকর্তাদের যা খুশি আদেশ দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারবে বলে মনে হয় না।
স্মর্তব্য, ১৯৯৬ সালে অনেকটা একই চরিত্রের রাজনৈতিক অচলাবস্থার সময় বিরোধী দল থেকে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও ১৯৯৬ সালের ১২ ফেব্র“য়ারি বিএনপি একটি যেনতেন ধরনের নির্বাচন করেছিল। ওই নির্বাচনে যে পরিমাণ সহিংসতা ও অনিয়ম হয়েছিল, সরকার আসন্ন দশম সংসদ নির্বাচন একতরফাভাবে করতে চাইলে সে নির্বাচনে সহিংসতা হবে তার চেয়ে অনেক বেশি। এর কারণ হল, উল্লিখিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন যারা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তারা জানতেন যে বিএনপি সরকার ওই নির্বাচনটি ক্ষমতায় থাকার জন্য করবে না। সংসদে সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় দলটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার মধ্য দিয়ে বিরোধীদলীয় দাবি মেনে নেয়ার জন্য ওই নির্বাচনটি করছে। এ কারণে আওয়ামী লীগসহ অন্য সব বিরোধী দল ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েও ওই নির্বাচন বানচাল করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেনি। আবার নির্বাচনের পর স্বল্পায়ুর সংসদে সরকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিরোধীদলীয় দাবি মেনে নেয়ার পর বিরোধী দলগুলো ওই সংশোধনীক প্রত্যাখ্যান না করে সপ্তম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু চলমান পরিস্থিতি ও সংকট অন্যরকম। এখন কিন্তু সরকার বিরোধীদলীয় দাবি মেনে নেয়ার জন্য একতরফা নির্বাচন করবে না। সরকার এ নির্বাচন করবে যে কোনোভাবে জয়লাভ করে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার জন্য। কাজেই এ নির্বাচনকে প্রতিহত করতে গিয়ে বিরোধী দলগুলো সর্বশক্তি নিয়োগে পিছপা হবে না। এর ফলে এ নির্বাচনে বোমাবাজি ও রক্তারক্তি এত বেশি হতে পারে যে, সরকার শেষ পর্যন্ত আদৌ নির্বাচন করতে পারবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ করা যায়। কারণ, অনুমিত সহিংসতা ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে সরকার আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের যে সহায়তা পাবে, তার মধ্যে পূর্ণ আন্তরিকতার অভাব থাকতে পারে।
এর পরও যদি সরকার গায়ের জোরে যে কোনো উপায়ে সহিংসতার মধ্যেও নির্বাচন করে ফেলতে চায়, তা হয়তো অনেক ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে করতে পারবে। তবে ওই রকম নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি হবে আশংকাজনকভাবে কম। কারণ, নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণা করার পর থেকে চলমান আন্দোলন ও সহিংসতার চিত্র দেখে নির্বাচনের দিন কী পরিমাণ সহিংসতা হতে পারে সে বিষয়টি অনুধাবন করার পর সাধারণ ভোটাররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যেতে চাইবেন না। এর ফলে ওই নির্বাচনটি যুগপৎ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমাজে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এমন নির্বাচনে বিজয়ী দল সরকার গঠন করলে ওই সরকারকে প্রথম দিন থেকেই বিরোধীদলীয় অসহযোগিতা ও আন্দোলন মোকাবেলা করতে হবে। ফলে আরেকটি শান্তিপূর্ণ সংসদ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঝুঁকির মুখে পড়বে। দেশবাসীর প্রশ্ন, এ নাজুক পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও একাডেমিকদের কাছে এর একটিই উত্তর আছে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে একটি শান্তিপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো হাসিমুখে জয়-পরাজয় মেনে নেয়ার সংস্কৃতি চর্চা করে এ দুরবস্থা থেকে জাতিকে বাঁচাত পারে।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

হরতালের বিকল্প ভাবতে হবে by ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ দেন। রায় ঘোষণার চার ঘণ্টার মধ্যেই এ রায়কে ন্যায়বিচারের পরিপন্থী দাবি করে ১৮ ও ১৯ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করে জামায়াতে ইসলামী। যদিও এ হরতালই জামায়াতের ডাকা প্রথম হরতাল নয়; যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে এর আগেও কয়েকবার হরতাল ডেকেছে তারা। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিসহ নানা ইস্যুতে বিরোধী দল দেশে অনেকবার হরতাল ডেকেছে। এই ইস্যুতে সামনে আরও এ ধরনের কর্মসূচি দেয়া হতে পারে। বস্তুত, হরতাল এদেশের সংস্কৃতিতে নতুন এক মাত্রা হিসেবে যোগ হয়েছে। যখন যারা বিরোধী দলে থাকে, তারা নানা ইস্যুতে হরতালের ডাক দেয়। অথচ বাস্তবতা হল, জনগণ হরতাল চায় না। একটি সংস্থার জরিপে দেখা দেছে, দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ লোকই হরতাল পছন্দ করে না। তা সত্ত্বেও জনগণকে বারবার হরতালের কবলে পড়তে হচ্ছে। হরতাল যেন এ দেশে ডাল-ভাতের মতো বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ভাষাগত দিক থেকে হরতাল একটি গুজরাটি শব্দ। গুজরাটে কোনো দাবিতে দোকানপাট বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে এ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এ দেশে হরতাল একটি ধ্বংসাÍক ও আতংকের শব্দে পরিণত হয়েছে। হরতালে জনগণের প্রাণহানিও ঘটছে। অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে। সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। সেশনজট বৃদ্ধি পেয়ে শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।
মূলত হরতাল বিভিন্ন সংগঠনের দাবি আদায়ের জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের একটি কৌশল এবং তা একটি গণতান্ত্রিক অধিকারও বটে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের ওপর হরতালের যে দীর্ঘস্থায়ী কুপ্রভাব পড়ছে, তা সহ্য করার মতো ক্ষমতা আমাদের আছে কি-না? নিশ্চয় নেই। শুধু তাই নয়, হরতালের কারণে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। হরতালের কারণে দেশের খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী সমাজসহ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই হরতালের ব্যাপারে সবাই উদ্বিগ্ন। অথচ হরতাল আহ্বানকারীরা দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিসহ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কথা ভাবেন না। ধারাবাহিকভাবে হরতাল চলে আসায় এখন অনেকের মনেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বাংলাদেশ কি হরতালের দেশে পরিণত হতে চলেছে?
এটা সব গণতান্ত্রিক দেশেই স্বীকৃত যে, রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে দেশকে অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ সবদিক থেকে এগিয়ে নেয়া। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর ফল হচ্ছে উল্টো। কারণ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন অজুহাতে কথায় কথায় হরতাল ডাকার মধ্য দিয়ে সহিংস ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। এতে করে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন সেক্টর যে পিছিয়ে যাচ্ছে0- তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। রমজান মাসকে নিরবচ্ছিন্ন শান্তির মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। এ মাসে মানুষের অর্থনৈতিক তৎপরতা বেড়ে যায় এবং ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোও সরব হয়ে ওঠে। কিন্তু রমজান মাসও এদেশে হরতালের কবল থেকে রেহাই পায় না।
হরতালের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। ফলে বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম, যা অনেক সময় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি হরতালের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে দেশের শিল্প খাত। হরতালে দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শেয়ারবাজারেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের আমদানি-রফতানি খাত। দেশের একটি প্রধান বণিক সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, সহিংস হরতালের কারণে বছরে জিডিপিতে ক্ষতির পরিমাণ ৭ শতাংশ। একদিনের হরতালেই ক্ষতি হয় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই ক্ষতি হয় দিনে ৩৬০ কোটি টাকার। এ হিসাবে বছরে যদি ৪০টি হরতাল হয়, তাহলে ক্ষতি হয় ৬৪ হাজার কোটি টাকার। সব মিলিয়ে হরতালের কারণে দেশের অর্থনীতিতে এখন চলছে মহাসংকট। একের পর এক হরতাল ডেকে দেশের অর্থনীতিকে পেছনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর ফল আÍবিনাশী হতে বাধ্য এবং এর খেসারত দিতে হবে পুরো জাতিকে।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশে বারবার হরতালের কারণে বাধাগ্রস্ত হয় মানুষের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড। হরতাল পঙ্গু করছে দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা, শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রকে। তাই হরতাল বন্ধে দেশের ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবী মহল, সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজসহ সব রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন দাবি আদায়ে হরতালের বিকল্প কোনো পন্থা খুঁজে বের করা। সবাই মিলে হরতালকে না বলার ব্যাপারেও সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি। এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ যত দ্রুত নেয়া হবে, ততই তা দেশ-জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে। এ ক্ষেত্রে সব রাজনৈতিক দলেরই ভেবে দেখা প্রয়োজন, যে দল হরতাল আহ্বান করে দেশে অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, তার কুপ্রভাব কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হলে ওই দলের ওপরই পড়ে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের এটাও বোঝা উচিত যে, জনগণ এখন আর বোকা নয় এবং জনগণকে বোকা ভাবার কারণও নেই। জনগণ যে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো যে কোনো সময় বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ তারা ইতিপূর্বে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনগুলোতে বেশ ভালোভাবেই দেখাতে সক্ষম হয়েছে। দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সব দলেরই উচিত হরতাল পরিহার করা। সময় এসেছে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার, পিছিয়ে দেয়ার নয়। হরতালের কারণে এ দেশ সবদিক থেকে পিছিয়ে যাক, এমনটি কারও কাম্য হতে পারে না। তাই সবারই উচিত হরতালের বিকল্প পন্থা খুঁজে বের করা।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ইউআইটিএস; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

দয়া করে আগ্রাসী ব্যাংকিং বন্ধ করুন by ড. আর এম দেবনাথ

যে আশংকা করা হচ্ছিল, তাই এখন ঘটছে- ঘটছে ব্যাংকিং খাতে। অনেক দিন থেকেই খবরের কাগজগুলো রিপোর্ট করছিল যে চট্টগ্রামের ব্যাংক ব্যবসা ভালো নয়। বড় বড় গ্রাহক ব্যাংকের টাকা পরিশোধে গাফিলতি করছে, ব্যর্থ হচ্ছে। তারা ‘ঋণ খেলাপি’তে পরিণত হতে পারে। এতে জড়িত কমপক্ষে এক ডজন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক। যেসব ব্যবসায়ী টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছেন, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ী। তারা আমদানিকারক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সারাদেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। খবরের কাগজগুলো অনেক সময় এদের ‘সিন্ডিকেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। চাল, ডাল, নুন, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, মরিচ, আদা, রসুন, ছোলা, সরিষার তেল, গম-আটা, মশলাপাতি ইত্যাদির ব্যবসায়ী তারা। বলা হয়, এরা অনেকেই চার্টার করে পণ্য আমদানি করে। স্বাধীনতার পর ২০-২৫ জন আমদানিকারক একসঙ্গে মিলে যত পরিমাণ পণ্য আমদানি করতে পারত, এখন একজনই তার চেয়ে বেশি আমদানি করার ক্ষমতা রাখে। পণ্য চলে আসে ‘আউটার অ্যাঙ্করেজে’। ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয় পরে। এমনই শক্তিশালী গ্র“পের ব্যবসায়ী চট্টগ্রামের আমাদানিকারকরা। একেকজনের নাম-সুনাম আকাশচুম্বী। ব্যাংকার বাহাদুররা তাদের কাছে গিয়ে বসে থাকে। তোয়াজ করে। ব্যাংকে ব্যাংকে মারামারি হয়। সহায়-সম্পত্তি তাদেরই। এটা চট্টগ্রামেই হোক, নোয়াখালী-কুমিল্লাতেই হোক, কিংবা ঢাকা মহানগরীতেই হোক অথবা হোক দেশের অন্যত্র। রমরমা ব্যবসা তাদের।
এতবড় ভূমিকা দিলাম কেন? দিলাম একটা প্রকাশিত খবরের তাৎপর্য বোঝার জন্য। খবরটি দেশের একটি দৈনিকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। রীতিমতো আতংকের খবর। ভয় পাওয়ার মতো খবর। এর থেকে শিক্ষা নেয়ার ব্যাপার আছে। কী সেই খবর?
খবরের শিরোনাম : ‘চট্টগ্রামের ২২ প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নিলামে : ১,১৮৯ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ অধিক লাভের আশায় জমি ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ’। এই শিরোনাম পড়ে কিছু বোঝা যায়, কিছু বোঝা যায় না। বোঝা যায়, নিলামে যখন উঠেছে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যেহেতু ব্যাংক ঋণ আদায়ের বিষয়, সেহেতু নিশ্চয়ই মামলা হয়েছে অর্থ ঋণ আদালতের অধীনে। যেহেতু মামলা হয়েছে, তাই ধরে নেয়া যায় ঋণগুলো ‘ব্যাড অ্যান্ড লস’ ক্যাটাগরিভুক্ত। ব্যাংকের খারাপ ঋণের প্রথম ধাপ স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট (এসএমএ)। তার পরের ধাপ সাব-স্ট্যান্ডার্ড অর্থাৎ ঋণের জ্বর হয়েছে। তার পরের ধাপ ডাউটফুল (সন্দেহজনক), অর্থাৎ ঋণ বিছানায় শুয়ে পড়েছে। কী হয় বলা যায় না। তার পরের ধাপ ‘ব্যাড অ্যান্ড লস’, অর্থাৎ ঋণ লাইফ সাপোর্টে আছে, তা উদ্ধারের আর আশা নেই। এ সর্বশেষ ধাপে গেলে ব্যাংক ঋণের বিপরীতে পুরোপুরি ‘প্রভিশন’ করে- এতে মুনাফা কমে। কারণ মুনাফা থেকেই ‘প্রভিশন’ করা হয়। অর্থাৎ ‘ব্যাড অ্যান্ড লস’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে চট্টগ্রামের ২২টি বিখ্যাত ও বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক কী করবে? টাকা উদ্ধারের সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ১২টি সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক মামলা করেছে। ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব জমি-দালান-কোঠা জামানত (বন্ধক) হিসেবে রেখেছিল, তা এখন নিলামে উঠেছে। তারপর কী হবে? নিলামে ‘দরদাতা’ পাওয়া যাবে কি? কঠিন প্রশ্ন, কঠিন উত্তর। ব্যাংকগুলোর যে অভিজ্ঞতা তাতে সন্দেহ করাই যায়। সন্দেহ করা হয়, দরদাতা বা সম্পত্তি ক্রেতা পাওয়া যাবে কি-না! সন্দেহ, কেউ সাহস করে বড় বড় ব্যবসায়ীর জমি কিনতে যাবে কি-না! কত জমি? রিপোর্ট মোতাবেক জমি ও সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় তিন হাজার ৮০০ শতক। এ সম্পত্তি বিক্রি করে ১ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা আদায় হওয়ার কথা।
দেখা যাক, এসব মামলা-নিলামের ফলাফল কী দাঁড়ায়! আমি কিন্তু আশাবাদী নই। যদি ক্রেতা পাওয়া যায়, তাহলে ব্যাংকের মালিকদের মহাভাগ্য। প্রশ্ন আরও আছে। যে সম্পত্তি নিলামে উঠেছে, তা আসলে/বাস্তবে আছে কি-না? দ্বিতীয় প্রশ্ন, জমির মূল্য ঠিক আছে কি-না? তৃতীয় প্রশ্ন, জমির মালিকানা (টাইটেল) ঠিক আছে কি-না? অনেক অনেক প্রশ্ন। এসব প্রশ্ন কেন করলাম? শুনেছি চট্টগ্রামে জমি ‘বন্ধক’ দেয়ার জন্য ব্যবস্থা আছে। এসব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাজই হচ্ছে জমির দুই নম্বরি ডকুমেন্ট তৈরি করা। মিউটেশন তৈরি করা। সেসব জমি ব্যাংকে ‘মর্টগেজ’ দেয়া। এটাই একশ্রেণীর দালালদের ব্যবসা। বাস্তবে সম্পত্তি আছে কি-না তাই প্রশ্ন করলাম। যদি সম্পত্তি থেকে থাকে, যদি টাইটেল ঠিক থেকে থাকে তাহলে প্রশ্ন, এত জমি কেনার এ মুহূর্তে ক্রেতা আছে কি-না? আমি সন্দেহ বাতিক লেখক, তাই এ প্রশ্নগুলো তুলে রাখলাম। আমি ভুল প্রমাণিত হলে ব্যাংকের কপাল ভালো হবে।
এখন দেখা যাক কারা এসব গ্রাহক? গ্রাহকদের মধ্যে আছে : নুরজাহান গ্র“প, মোস্তাফা গ্র“প, এমইবি গ্র“প, সিদ্দিক ট্রেডার্স। আরও আছে হারুন ট্রেডিং, রুমানা এন্টারপ্রাইজ, মনোয়ারা ট্রেডিং, আইমান এন্টারপ্রাইজ, মঈনুদ্দিন কর্পোরেশন, এসএস ইন্টারন্যাশনাল। এরা সবাই চট্টগ্রামের বড় বড় ব্যবসায়ী। আরও বড়, এদের চেয়ে বড় ব্যবসায়ী আছেন। খবরে প্রকাশ, তাদের অবস্থান ভালো নয়। তারা ঋণ পুনঃতফসিল, ওভারডিউ এবং নানা কায়দা করে ব্যাংকের টাকা আটকে রেখেছে। তাদের অবস্থাও ভালো নয়। আমাদের দুর্ভাগ্য, এরা সবাই ভোগ্যপণ্যের ব্যবসায়ী। এরাই সয়াবিন ইত্যাদি পণ্য বিক্রি করে, উচ্চমূল্যে বিক্রি করে বাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। মানুষের ভোগান্তি ঘটিয়ে যারা পয়সা কামাই করেছে তারা এখন বলছে, পণ্যে তারা লোকসান দিয়েছে। পণ্য বিক্রি হচ্ছে না। পণ্যের টাকা আদায় হচ্ছে না। তারা এখন ‘কেয়ারটেকার সরকারকেও’ দোষারোপ করছেন। তারা দোষারোপ করছেন ব্যাংকারদের। বলছেন, ব্যাংকাররা আগে বিপদে পড়লে আমদানিকারকের সাহায্যে এগিয়ে আসত। ঋণ পুনঃতফসিল করত, নতুনভাবে সুযোগ দিত- নতুন ঋণ দিয়ে যাতে ব্যবসায়ীরা লোকসান পুষিয়ে নিতে পারেন। তারা আরও বলছেন, তারা জমি কিনেছেন। তা এখন বিক্রি করতে পারছেন না। করতে পারলে ব্যাংকের টাকা ফেরত দিতে পারতেন। বলা যায়, শত যুক্তি তারা এখন দিচ্ছেন। কিন্তু এ কথার জবাব তারা দেবেন কি, যে মুনাফা তারা আগে করেছেন তা কী করেছেন? সেই টাকা কি সরকারকে দিয়ে দিয়েছেন? লাভ হলে নিজের, লোকসান হলে ব্যাংকের- এটা তো কাজের কথা নয়। এটা তো ঠিক, লাভ ও লোকসান উভয়ই ব্যবসায়ীর- নাকি তা নয়? হতে পারে কোনো কোনো ব্যবসায়ী লোকসান দিয়েছেন। সবাই একসঙ্গে লোকসান দিয়েছেন এবং দিয়েছেন সব পণ্যে- একথা বিশ্বাস করা খুবই কঠিন।
ব্যাংকাররা আগের তুলনায় কঠোরতর হয়েছে। হয়েছে নানা ‘স্ক্যামে’র কারণে। এসব ‘স্ক্যাম’ ব্যবসায়ীরাই করেছেন। ‘হলমার্ক’ যে কেলেংকারি করল, ‘বিসমিল্লাহ গ্র“প’ যে কেলেংকারি করল- কখনও কি ‘এফবিসিসিআই’ এর নিন্দা করেছে? তারা কি সেই টাকা উদ্ধারে কোনো ভূমিকা রেখেছে? না তা তারা করছে না। ‘আইবিপি’ ট্রাস্ট রিসিটের মাধ্যমে দেয়া ঋণের যে অপব্যবহার হচ্ছে, সে সম্পর্কে কি এফবিসিসিআই কিছু বলছে? না, তারা কিছুই বলে না। বলির পাঁঠা ব্যাংকাররা। ব্যাংকারদের মধ্যে অসৎ লোক আছে, চোর-চামার আছে। তাই বলে সবাই চোর নয়। অথচ সব ব্যাংকারকে, একটা পেশাকে যে দিনের পর দিন হেয় করা হচ্ছে, ব্যবসায়ীরা কি সে সম্বন্ধে কিছু বলছেন? না, তারা কিছু বলছেন না। দোষী ব্যাংকাররা। এখন ব্যাংকাররা যদি তাদের ভুল-ক্রটি শুধরানোর চেষ্টা করেন এবং সেটা করতে গিয়ে যদি তারা আগের মতো সাহায্য-সহযোগিতা ব্যবসায়ীদের না করতে পারেন, তাহলে তাতে দোষের কী? শত হোক ব্যাংকারদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুশাসন মানতে হবে। সর্বনিু ব্যাংকিং নৈতিকতা পালন করতে হবে। এতে দোষের কী?
তবে একটি কথা বলা দারকার। আজকের এ দশার জন্য, ব্যাংকিং ব্যবসার বর্তমান অবস্থার জন্য ‘আগ্রাসী ব্যাংকিং’ দায়ী। অযৌক্তিকভাবে ম্যানেজারদের মুনাফা, আমানত, ঋণ ইত্যাদি টার্গেট দেয়া হচ্ছে। যে শাখার আমানত ১০০ কোটি টাকা, তাকে বলা হচ্ছে আমানত আনতে হবে ২০০ কোটি টাকার। মুনাফা আছে এক কোটি টাকা। বলা হচ্ছে, মুনাফা করতে হবে দুই কোটি টাকা।
ব্যক্তিগতভাবে অফিসারদের আমানতের টার্গেট দেয়া হয় দ্বিগুণ-তিনগুণ। বাস্তবের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। ৪৭টি ব্যাংক ছিল। যোগ হয়েছে আরও ছয়টি। প্রতিযোগিতা আর প্রতিযোগিতা। ছোট অর্থনীতি, ব্যাংকের সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে ব্যবসা বাড়াতে হবে। এমডি সাহেবের বেতন ৪ লাখ, ৬ লাখ, ৮ লাখ টাকা মাসে। কর্মচারীর বেতন কম। অতি উৎসাহী এমডি সাহেবরা নিজের বেতন হালাল করার জন্য কর্মচারীদের জীবন বিপন্ন করে ছাড়ছে। লোকের চাকরি খাচ্ছে। পোষ্য লোকদের জায়গায় জায়গায় বসাচ্ছে। ব্যাংকের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ‘প্রতিযোগিতার’ কারণে কাস্টমার সিলেকশনে ভুল হচ্ছে। ব্যাংকাররা নিজেদের মুনাফার টার্গেট পূরণের জন্য ‘অনিয়ম’ করছে, খারাপ কাস্টমারকে ভালো করছে। মধ্য বয়সে চাকরি যখন যাবেই, তাই কিছু টাকা কামাই করে নাও। এটা করতে হলে ভালো কাস্টমার দিয়ে তা হবে না। যেনতেন ধরনের একজন কাস্টমার ধর, ঋণ দাও। ‘মর্টগেজ’ ঠিক আছে কি-না, পণ্যের গুণ ঠিক আছে কি-না, পণ্যের বাজার আছে কি-না- এসব দেখার প্রয়োজন নেই। লাভ দরকার। দু’দিন পর কী হবে, তা ভাবার দরকার নেই। চট্টগ্রামের ব্যাংকিং ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এ শিক্ষাই পাওয়া যায়।
ড. আর এম দেবনাথ : সাবেক অধ্যাপক, বিআইবিএম