Sunday, November 15, 2009

হেমন্ত বাতাসে বইয়ের মেলা -চারদিক by খান মাহবুব

বর্ণমালার হাত ধরেই সভ্যতার যাত্রা। এ বর্ণমালা বইয়ের পাতায় স্থান নিয়ে সভ্যতাকে রক্ষাকবচের মতো আগলে রেখেছে। বাংলা বর্ণমালায় সজ্জিত বাংলা ভাষাকে বায়ান্নতে রক্ত দিয়ে রক্ষা করতে হয়েছে আমাদের। বায়ান্নর আন্দোলন আমাদের ভাষার ক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ এক অধ্যায়। ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পর থেকে এ অঞ্চলের প্রকাশনার যাত্রা অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আরও বেগবান হয়। এর ক্রমধারায় আশির দশকের মধ্যবর্তী সময়ে ঢাকার শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটে বইপাড়ার যাত্রা শুরু হয়।
শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের সৃজনশীল প্রকাশকেরা বরাবরই পরিমার্জিত ও পরিশীলিত রুচির পরিচয় দিয়ে আসছেন। তবে পুঁজির স্বল্পতা আমাদের যাত্রাপথকে বন্ধুর করেছে, অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করছে। এর ওপর গত দু-তিন বছরে আজিজ সুপার মার্কেটে তৈরি পোশাক ও কাপড়ের ব্যবসার ক্রমসম্প্রসারণের ফলে এখানকার প্রকাশনা ব্যবসা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বড় পুঁজির ধর্মই ছোট পুঁজিকে খেয়ে ফেলা। তাই কাপড় ব্যবসায়ীদের পুঁজির কাছে এখানকার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। ২০০৮ সালের সূচনা থেকে এ ধারা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এখানকার প্রকাশকেরা ব্যবসায়িক বিস্তৃতি, সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য প্রকাশনাশিল্পের এই দুষ্কালে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করে।
লেখক-পাঠকদের জন্য আরও ব্যাপকভাবে তারা বইমেলা আয়োজনের তাগিদ অনুভব করে। এ ধারায় গত বছর শাহবাগের ১৩টি প্রকাশনা সংস্থা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির সেমিনার হলে ৬ থেকে ১৫ নভেম্বর ১০ দিনের ‘হেমন্তের বইমেলা ১৪১৫’ শীর্ষক মেলার আয়োজন করে। ১০ দিনব্যাপী এই মেলার অভূতপূর্ব সাফল্য সবার মধ্যে দৃঢ়প্রত্যয় সৃষ্টি করে।
২০০৮ সালের মেলার সাফল্যের সামাগ্রিক কারণ গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের সহযোগিতা, গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততা, মেলার সেমিনার, লেখক-প্রকাশক মিলনমেলা ও মেলার শৃঙ্খলা। মেলায় বই বিক্রি ছিল আশাতীত। মেলার উদ্বোধন পর্বে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এ উদ্যোগকে উপমার যোগ্য বলে অভিহিত করেছেন।
গত বছরের মেলার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা কাঁধে নিয়ে এ বছর ৪ থেকে ১৯ নভেম্বর পাবলিক লাইব্রেরি উন্মুক্ত চত্বরে বর্ধিত কলেবরে ১৫টি প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে দ্বিতীয় ‘হেমন্তের বইমেলা ১৪১৬’। এই মেলায় অংশ নিচ্ছে প্রকাশনী সংস্থা পাঠক সমাবেশ, জাগৃতি, ঘাস ফুল নদী, সন্দেশ, জনান্তিক, পলল, ম্যাগনাম ওপাস, উত্স, মুক্তচিন্তা, জ্যোতিপ্রকাশ, শুদ্ধস্বর, ভাষাচিত্র, কথাপ্রকাশ, স্বরাজ, বাংলার মুখ, বনপাংশুল।
এ বছরের মেলা গত বছরের মেলার নির্ধারিত হলরুমের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে উন্মুক্ত চত্বরে। আজিজ সুপার মার্কেটকেন্দ্রিক প্রকাশকদের পারস্পরিক সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, বিশ্বাস, একযোগে কাজ করার মানসিকতা এ মেলাকে একদিন অমর একুশের বইমেলা ও ঢাকা আর্ন্তজাতিক বইমেলার পাশে নিয়ে দাঁড় করাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
আমরা পর্যায়ক্রমে হেমন্তের মতো প্রতিটি ঋতুতে একটি করে মেলা করার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা করতে পারি। প্রকাশনাকে একটি শিল্পের সম্মান দিতে এর সাংগঠনিক ভিত শক্ত হওয়া প্রয়োজন মনে করে মেলা-পরবর্তী সময়ে ‘কীভাবে একটি ভালো বই লেখা যাবে’ এবং ‘কীভাবে ভালো প্রকাশক হওয়া যাবে’—এই দুটো বিষয়ের ওপর কর্মশালা আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমান সময়ে বিশ্বায়নের হাওয়া পৃথিবীর দুই মেরু বরাবর চলমান। কেউ না চাইলেও বিশ্বায়নের সঙ্গে কমবেশি সম্পৃক্ত হতে হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির উত্কর্ষের এ যুগে আজ আর তৃতীয় বিশ্বকে উন্নত বিশ্বের পরিত্যক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হচ্ছে না। এখন মুদ্রণের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহূত হচ্ছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এবং সেবার ক্ষেত্রেই তৃতীয় ও উন্নত বিশ্ব একই মান নিশ্চিত করতে তত্পর। এ ধারায় কাগজের বইয়ের চাহিদা কিছুটা হয়তো হ্রাস পেতে পারে, তবে তা আশঙ্কাজনক নয় বলেই মনে হয়। তার পরও অনলাইন পাবলিশিংকে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। যদিও এখানো কাগজের বইয়ের প্রকাশনার উত্কর্ষসাধনে প্রকাশকদের গলদঘর্ম হতে হচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে অনলাইন পাবলিশিংয়ের ওপর কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা করছেন মেলার এই আয়োজকেরা।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের সরকারের সামর্থ্য কম। এ ছাড়া প্রকাশনা সত্যিকারের শিল্প হিসেবে গড়ে না উঠে ধীরগতির শিল্প হিসেবে বাংলাদেশে বিকাশ লাভ করেছে। কাজেই জিডিপির প্রবৃদ্ধির বিবেচনায় প্রতিযোগিতার দৌড়ে পেছনে থাকায় সরকার প্রকাশনাশিল্পকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে পারে না। আর যতটুকু বরাদ্দ থাকে, তা সুষ্ঠু নীতিমালা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় অনেকাংশে বেহাত হয়। কাজেই সামর্থ্যের কমতি থাকলেও প্রকাশকদের প্রকাশনাকে গণমুখী করার জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করা জরুরি। আমরা মনে করি, এ খাতের সমস্যা, সমস্যার উত্স ও সমাধানের পথ খুঁজতে প্রকাশকেরাই প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে পারেন। কারণ, এ ব্যবসা করতে গিয়ে এর সুখ-সুবিধার সঙ্গে নিত্যদিন বসবাসের ফলে এক ধরনের আত্তীকরণ ঘটেছে প্রকাশকদের।
তবে গুটি কয়েক মানুষের উদ্যোগকে বিস্তৃত করার জন্য ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। যদি সরকার ও সামর্থবান মহল এ মেলাকে পৃষ্ঠপোষকতা করে, তবে হেমন্তের বইমেলা অবশ্যই একটি জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে। শিশু যখন হাঁটতে চেষ্টা করে, তখনই পরিবারের সদস্যরা তাকে সাহায্য করে হাঁটতে শেখায়। এই মেলা যাত্রা শুরু করেছে—এখন প্রয়োজন তার চলার পথে সহায়ক হিসেবে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসা।
‘হেমন্তের বইমেলা’ চলবে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত। আপনারা আমন্ত্রিত।

পিতা-মাতার প্রতি কর্তব্য -ধর্ম by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলামে পারিবারিক জীবনে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্যের ব্যাপারে যেসব দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, এতে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে সন্তানের জীবনে দায়িত্ব পালনের দিক থেকে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো অধ্যায় নেই। পিতা-মাতার কারণেই সন্তান ইহজগতের মুখ দেখতে পেরেছে। সন্তান জন্মের পরই মা সর্বপ্রথম তাঁর প্রাণপ্রিয় শিশুকে মাতৃদুগ্ধপানে আগলে রাখেন। এই যে মমতাময়ী মা, তাঁর কারণেই পৃথিবীর আলো দেখার সৌভাগ্য হয়। যাঁর উষ্ণ ক্রোড়ে থেকে বাল্যাবস্থায় অসহায় শিশুটি নিরাপদে বেড়ে ওঠে। যখন মাতৃগর্ভে ভ্রূণের বিকাশ ঘটে, তখন থেকেই ওই ভ্রূণ অর্থাত্ ভবিষ্যত্ শিশুটি মায়ের রক্তস্রোত থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পুষ্টি পেয়ে থাকে। এটি মহান সৃষ্টিকর্তার এক অপরূপ মহিমা। তেমনই এ অপার দয়ার গুণেই সন্তানের যেকোনো বিপদ-আপদে তাঁদের প্রার্থনা ওষুধের মতোই কাজ করে। ছেলেমেয়েরা মানুষ হওয়াই বাবা-মায়ের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিদান। তাই জীবদ্দশায় মা-বাবার প্রতিটি সন্তানের যথাযথ দায়িত্ব পালন করে তাঁদের প্রতি সদা-সর্বদা কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। পিতা-মাতার প্রতি নেককার সন্তানের দোয়া কামনা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া কর, যেমনভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৪)
সন্তান প্রতিটি মা-বাবার কাছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তেমনি সন্তানের কাছে তার পিতা-মাতা আশীর্বাদস্বরূপ। শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সন্তান যতই বয়োবৃদ্ধ হোক না কেন, পিতা-মাতার কাছে তারা সর্বদা শিশুর মতো। আজন্ম সন্তান পিতা-মাতার কাছে স্নেহ, আদর আর দয়া-মায়াতেই লালিত-পালিত হয়। পিতা-মাতা কখনো সন্তানের অমঙ্গল কামনা করেন না, বরং শত দুঃখ-কষ্ট পেলেও সন্তানের জন্য শুভ কামনা করেন এবং দোয়া করে থাকেন। সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার ভালোবাসা যতই আত্মিক হোক না কেন, জনক-জননী হিসেবে পিতা-মাতার অধিকার ও তাঁদের প্রতি সন্তানের কর্তব্য পালনে যথেষ্ট দায়দায়িত্ব পালন করতে হয়। পরবর্তী জীবনে এ দায়িত্ব ও কর্তব্যের কারণেই সন্তানের ওপর পিতা-মাতার অধিকার আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তার সঙ্গে কাউকে শরিক করো না এবং তোমরা পিতা-মাতার সঙ্গে সত্ ও সদয় ব্যবহার করো।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬) রাসুলুল্লাহ (সা.) সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি মাতা-পিতার সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টিও মাতা-পিতার অসন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল।’ (মিশকাত)
বাবা-মা সন্তানকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা স্ব্বীকার করে জীবনসংগ্রাম-যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়েও বড় করেন, মানুষ করে গড়ে তোলেন, কিন্তু তাঁরা সন্তানের কাছ থেকে কোনো রকম প্রতিদান আশা করেন না। তবে সন্তানকে আদর্শবান করার জন্য একজন বাবা হিসেবে যে যেই ধর্মে বিশ্বাস করেন, সেই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া উচিত। প্রত্যেককে সত্কাজে উত্সাহিত করা, মন্দকাজের জন্য সবকিছু ভুলে শাসন করা এবং ভালো কাজের জন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে বাহবা দিতে হবে। কোনো ভদ্র পরিবারের সুসন্তান আদর্শচ্যুত হয় না। আদর্শ না থাকলে সন্তানকে সঠিক পথে রাখা যায় না। তাই বাবা-মায়ের উচিত, প্রতিটি সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে তার মধ্যে বিবেকবোধ জাগ্রত করে দেওয়া। জন্মগতভাবে সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার যে অধিকার রয়েছে তা অনেকের কাছ থেকে আদায় করা যায় না। কেবল সন্তানই পিতা-মাতার প্রতি তার কর্তব্য পালন করে তাদের অধিকারকে অক্ষুণ্ন রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে সন্তানের দায়িত্বই মূলত মুখ্য বিষয়। সন্তানের ধন-সম্পদের ওপর পিতা-মাতারই সর্বপ্রথম অধিকার রয়েছে। পিতা-মাতার জন্য সামর্থ্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সন্তানকে সম্পদ ব্যয় করতেই হবে। পিতা-মাতার জন্য খরচ না করে সম্পদ পুঞ্জীভূত করা কোনো অবস্থাতেই সঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সুসন্তানই পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসার দৃষ্টিতে একবার তাকাবে, তার প্রতিদানে আল্লাহ তাকে এক হজের সওয়াব দান করবেন। যদি কোনো ব্যক্তি নিজের হায়াত বৃদ্ধি এবং প্রশস্ত রুজি কামনা করে থাকে, তাহলে সে যেন নিজের পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো আচরণ এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে।’
যে ব্যক্তি আল্লাহর ওয়াস্তে পিতা-মাতার আনুগত্য করে, তার জন্য জান্নাতের দুটি দরজা খেলা থাকবে এবং যে ব্যক্তি তাঁদের অবাধ্য হবে, তার জন্য জাহান্নামের দুটি দরজা খোলা থাকবে। যদি পিতা-মাতার মধ্যে থেকে একজনই ছিল, তবে জান্নাত বা জাহান্নামের একটি দরজা খোলা থাকবে। এ কথা শুনে জনৈক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, জাহান্নামের এই শাস্তিবাণী কি তখনো প্রযোজ্য যখন পিতা-মাতা ব্যক্তির প্রতি জুলুম করে? রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তরে তিনবার বললেন, ‘যদি পিতা-মাতা সন্তানের ওপর জুলুমও করে, তবুও পিতা-মাতার অবাধ্যতার কারণে সন্তান জাহান্নামে যাবে। অর্থাত্ পিতা-মাতার কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার সন্তানের নেই। তাঁরা জুলুম করলেও সন্তান সেবা-যত্ন ও আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নিতে পারবে না।’ (মিশকাত) এক ব্যক্তি নবীজির কাছে এসে জিহাদ করার অনুমতি চাইলে তিনি বললেন, ‘তোমার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কি?’ লোকটি জবাব দিল: ‘হ্যাঁ, জীবিত আছেন।’ নবী করিম (সা.) বললেন, ‘তাহলে তাঁদের দুজনের জন্য জিহাদ কর (অর্থাত্ তাদের দুজনের খেদমত কর)।’
পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া বা তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম ও কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। পিতা-মাতাকে অভিশাপ দেওয়া এবং গালাগালি করা জঘন্যতম খারাপ কাজ। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, ‘আল্লাহ তাআলা সব গুনাহ মাফ করে দেন, কিন্তু যে ব্যক্তি পিতা-মাতার সঙ্গে নাফরমানি করে, তাঁদের মনে কষ্টদায়ক হয় এমন কাজ করে, তাকে পরকালের পূর্বে দুনিয়াতেই বিভিন্ন বিপদাপদে লিপ্ত করে দেওয়া হয়।’ (বায়হাকি) নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘আল্লাহ যে গুনাহের শাস্তি চান, তা কিয়ামতের দিন পর্যন্ত বিলম্বিত করে থাকেন। কিন্তু পিতা-মাতার নাফরমানির শাস্তি মৃত্যুর পূর্বে জীবিতাবস্থায় তড়িঘড়ি করে প্রদান করে থাকেন।’ (রাওয়াহুল হাকিম)
একবার এক ব্যক্তি রাসুলে করিম (সা.)-এর খেদমতে এসে আরজ করলেন, ‘হে রাসুলুল্লাহ (সা.)! আমার পিতা-মাতার ইন্তেকাল হয়েছে, তাঁদের জন্য আমার কী কী হক পালনীয়? নবী করিম (সা.) বলেন, ‘নামাজ আদায় করে গুনাহখাতা মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ফরিয়াদ করো এবং তাদের কোথাও কোনো ওয়াদা থাকলে তাও যথাযথ পালন করো।’ আরেকবার কোনো এক ব্যক্তি নবী করিমকে (সা.) প্রশ্ন করেছিলেন, ‘হে রাসুলুল্লাহ (সা.)! আমি কার সঙ্গে আদব রক্ষা করব ও সদ্ব্যবহার করব। তিনি তাত্ক্ষণিক বলে দিলেন, ‘তোমার পিতা-মাতার সঙ্গে।’ লোকটি আবার বলল, ‘তাঁরা তো ইন্তেকাল করেছেন।’ নবী করিম (সা.) জবাবে বললেন, ‘তাঁর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।’ কোনো মানবসন্তান যদি পিতা-মাতাকে অবজ্ঞা, অবহেলা ও ঘৃণার চোখে দেখে এবং তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে—এটা আদৌ ইসলামসম্মত নয়; যা ধর্ম ও সমাজের নীতিমালার ঘোরতর পরিপন্থী। সুতরাং পার্থিব জীবনে উন্নতি এবং পরকালে বেহেশত পেতে হলে অবশ্যই পিতা-মাতার প্রতি সেবা-যত্ন, মান-সম্মান ও আনুগত্য থাকতে হবে। সর্বোপরি স্মরণ ও বরণ করে নিতে হবে ইসলামে পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কর্তব্য অপরিসীম।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

রিয়েল এস্টেট এজেন্ট সমাচার -দুই দু’গুণে পাঁচ by আতাউর রহমান

আমাদের দেশে আমরা বলি ‘ডেভেলপার’ (‘ইউনিভার্সিটি’ ইত্যাকার আরও অনেক ইংরেজি শব্দের মতো এটাও বাংলা ভাষায় আত্তীকরণ করা হয়ে গেছে); বিলেতে ও মার্কিন মুলুকে ওরা বলে ‘রিয়েল এস্টেট এজেন্ট’। দুটোর মধ্যে অবশ্য খানিকটা গুণগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়—আমাদের দেশে এরা বাসস্থানপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে কইয়ের তেলেই কই ভাজে (তাও যদি সময়মতো প্রতিশ্রুতি পালন করত); আর ওসব দেশে ওরা নিজেদের অর্থায়নে বাসস্থান তৈরি করে অতঃপর বিক্রি করে, উপরন্তু মালিকের পক্ষ থেকে জমি-বাড়ি বিক্রি ও ভাড়া প্রদান ইত্যাদি যাবতীয় কার্যও সম্পাদন করে থাকে।
তো গল্প আছে: এক অনভিজ্ঞ রিয়েল এস্টেট সেলসম্যান কাস্টমারকে অন্ধকারে রেখে পানির নিচের একখণ্ড জমি বিক্রি করার পর তার বসের কাছে জানতে চাইল, কাস্টমার জমি দেখার পর রেগে গিয়ে যদি অ্যাডভান্সের টাকা ফেরত চায়, তাহলে সে তা ফেরত দেবে কি না। বস তখন রেগে গিয়ে বললেন, টাকা ফেরত? তুমি কী ধরনের সেলসম্যান হে? যাও এবং গিয়ে ওর কাছে একটা স্পিডবোট কিংবা নৌকা বিক্রি করে এসো।
আরও আছে: শহরের একটি অভিজাত এলাকায় বসবাসকারী এক ভদ্রলোক একই বাসায় দীর্ঘদিন বাস করায় ক্লান্ত হওয়ায় বাসাটি বিক্রি করে অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্দেশে একটি রিয়েল এস্টেট এজেন্সির শরণাপন্ন হলেন। পরের রোববারের পত্রিকার পাতায় এজেন্সি কর্তৃক প্রদত্ত তাঁর বাসার বিবরণসংবলিত বিজ্ঞাপন পাঠ করে তিনি তড়িঘড়ি এজেন্টকে টেলিফোন করলেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বাসাটি বিক্রি করব না। পত্রিকায় প্রদত্ত আপনাদের বিজ্ঞাপন পড়ে আমার প্রতীতি জন্মেছে যে আমি সারা জীবন এ রকম একটা বাসার স্বপ্নই দেখেছিলাম।
আমাদের দেশেও বাসস্থানসংক্রান্ত এ ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপন প্রায়ই পরিলক্ষিত হয়। এই যেমন ইদানীং পত্রিকার পাতায় ও রাস্তার মোড়ে মোড়ে একটি বিজ্ঞাপন শোভা পাচ্ছে: ‘চার লাখ টাকায় ফাইভ স্টার হোটেলের মালিকানা।’ ভাবখানা এই যে মাত্র চার লাখ টাকায় একটি পাঁচ তারা হোটেলের মালিক হওয়া যাবে। তাই বিজ্ঞাপনটি বিলেতি জোক বুকে বহু আগে পঠিত একটি চটি গল্পের স্মরণ পাইয়ে দেয়:
এক লোক গাড়ির শোরুমে গেছে ক্যাশ পয়সায় একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি কিনতে। তার কাছে ২০ পেনি শর্ট পড়ে গেল। পাশ দিয়ে একজন পরিচিত লোক যাচ্ছিল। সে দৌড়ে গিয়ে ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমাকে ২০ পেনি ধার দাও।’ লোকটি বলল, কেন? প্রত্যুত্তরে সে বলল, ‘আমি একটা মার্সিডিজ গাড়ি কিনব।’
‘তাহলে এই নাও ৪০ পেনি’, লোকটি পয়সাটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার জন্যও একটা কেনো।’
তা রিয়েল এস্টেট এজেন্ট তথা ডেভেলপারদের চরিত্র দুনিয়ার সর্বত্রই প্রায় সমান—মানুষকে পটিয়েপাটিয়ে রাজি করানোয় লোকগুলো সিদ্ধহস্ত। তবে এতদসত্ত্বেও পাশ্চাত্যে ওরা ন্যূনতম একটা সততার মাপকাঠি মেনে চলে। এই যেমন রিয়েল এস্টেট এজেন্ট কাস্টমারকে বোঝাচ্ছে, ‘এই বাড়িটার সুবিধা-অসুবিধা দুটোই আছে—অসুবিধা হচ্ছে, এটার দক্ষিণ দিক পানীয় তৈরির কারখানাসংলগ্ন আর উত্তর দিক চামড়া তৈরির কারখানাসংলগ্ন।’
‘তাহলে সুবিধাটা কী?’ কাস্টমার জিজ্ঞেস করল।
সুবিধাটা হচ্ছে, এজেন্ট জবাব দিল, ‘আপনি সব সময়ই বলতে পারবেন, বাতাসটা কোন দিক থেকে বইছে।’
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আরও অনেক কিছু অবলোকন করা যায়। কাস্টমারকে ভুলিয়েভালিয়ে একবার বড়শিতে গেঁথে ফেলতে পারলেই ব্যস, কেল্লা ফতে। জমি কিংবা ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময়সীমাসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির বরখেলাপিকে এারা কোনো অন্যায়ই মনে করে না। তা ছাড়া ফ্ল্যাটের দাম শনৈঃ শনৈঃ বাড়লে কোনো ছলছুতায় বুকিং বাতিল করে ডাবল পয়সা কামানোতেও কোনো অপরাধবোধ নেই। পাশের ফসলি জমির মালিক ওর জমি স্বেচ্ছায় বিক্রি করতে না চাইলে নিজের জমি ভরাটের নামে ওর জমি বালু দিয়ে ভরাট করে দাও অথবা চতুষ্পার্শ্বের জমি কিনে ফেলে ওকে বেকায়দায় ফেলে দাও; ব্যাটা ওর জমি বিক্রি না করে যাবে কোথায়? ইত্যাদি আরও কত কী! পাশ্চাত্যে আইনের শাসন প্রচলিত আছে বলে এসব কাজ করে সহজে পার পাওয়া যায় না; কিন্তু আমাদের দেশ বলেই সহজে পার পাওয়া যায়।
আতাউর রহমান: রম্য লেখক। ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক।

ডারউইন - চিরকুট by শাহাদুজ্জামান

মানুষের ভাবনাচিন্তার একেবারে গোড়া ধরে নাড়া দিয়েছেন যে কয়জন, ডারউইন তাঁদের মধ্যে একজন। তাঁর জন্মের ২০০ বছর পালিত হচ্ছে এ বছর। এ মাসে পালিত হচ্ছে তাঁর যুগান্তকারী বই ‘অরিজিন অব স্পেসিস’-এর দেড় শ বছর পূর্তি। কেঁচো, গিরগিটি, বাদুর, বানর, মানুষ—সব একই সূত্রে বাঁধা। কে আর তাঁর মতো ভেবেছিল এমন করে। মাত্র ২২ বছর বয়সে ‘বিগল’ নামের জাহাজে চড়ে বিশ্বভ্রমণে বেরিয়েছিলেন তিনি। বছর পাঁচ ধরে পৃথিবীর এ বন্দর থেকে ও বন্দরে ঘুরেছেন। যেখানে গেছেন, মানুষ ছাপিয়ে তাঁর চোখ পড়েছে সে এলাকার জন্তু, জানোয়ার, পোকামাকড়ের দিকে। কেন ভৌগোলিক এলাকার তারতম্যের সঙ্গে সঙ্গে জন্তু-জানোয়ারের আকার, প্রকৃতি বদলে যায় তার সূত্র খুঁজেছেন তিনি। প্রকৃতির সঙ্গে অভিযোজন-প্রক্রিয়ায় যোগ্যতমের টিকে থাকার মধ্য দিয়ে কী করে বিকশিত হয়েছে প্রাণিজগত্, তার তথ্য আর যুক্তি তুলে ধরেছেন তিনি। জানিয়েছেন, একই পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছে জগতের সকল প্রাণী। তাঁর ভাবনা প্রকৃতিবিজ্ঞানকে ছাপিয়ে প্রভাবিত করেছে সমাজবিজ্ঞানকেও, জনপ্রিয় হয়েছে সামাজিক বিবর্তনের ধারণাও। এই বিবর্তনের ভাবনার সূত্র ধরে সমাজবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, কোনো দৈববলে মানুষ কেউ রাজা বা কেউ দাস নয়, বরং একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দাস, সামন্ত, পুঁজিবাদী ইত্যাকার স্তরের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে সমাজ এবং মানুষ বন্দী হয়েছে এক এক শ্রেণীতে। জগত্-সংসারের নানা জট খুলতে সহায়ক হয়েছে ডারউইনের ভাবনা।
বলা বাহুল্য, তাঁর ভাবনার তীব্র বিরোধিতাও হয়েছে বরাবর। প্রধান আক্রমণটি এসেছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে। সব ধর্মেই মানব সৃষ্টির যে বিবরণ আছে, এ ভাবনা তার একেবারে বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ায়। মানুষকে বানরের বংশধর হিসেবে দেখানোটা রীতিমতো অপমানকর হিসেবেই বিবেচিত হয়। তাকে ঘিরে তৈরি হয় নানা ঠাট্টা-কৌতুক। এ বিরোধিতা এখনো অব্যাহত। কয়েক দিন আগে একটি ধর্মভিত্তিক টিভি চ্যানেলে একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখছিলাম, যেখানে প্রমাণ করার চেষ্টা চলছিল, আজকের পৃথিবীর যত অনাচার, ধ্বংস, অপকর্ম, তার পেছনে একজনমাত্র লোকই দায়ী, আর সে হচ্ছে চার্লস ডারউইন। তাঁরা দাবি করছেন, ডারউইন মানুষের চিন্তাকে বিভ্রান্ত করেছেন।
একটি মহল তাঁর বিরোধিতা করলেও, সাধারণভাবে সারা পৃথিবীতেই সম্মানের সঙ্গে পালিত হচ্ছে ডারউইনের জন্মদ্বিশতবার্ষিকী। ব্রিটিশ ছিলেন বলে ইংল্যান্ডে ডারউইনকে ঘিরে খানিকটা বাড়তি আয়োজন। ডারউইনকে ঘিরে ভিন্নমাত্রার দুটি আয়োজনে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছে। একদল চিত্রশিল্পী, ভাস্কর ও চলচ্চিত্রশিল্পী মিলে ডারউইনকে নিবেদন করে একটি প্রদর্শনী করেছেন নিউক্যাসল শহরের বাল্টিক হলে। একটি প্রজেক্টের অংশ হিসেবে পুরো দলটি মাসখানেক কাটিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার গালাপাগোস দ্বীপে, বিগল জাহাজে ভ্রমণের সময় যে দ্বীপের প্রাণীবৈচিত্র্য বিস্মিত করেছিল ডারউইনকে। সেই প্রাণীগুলোকেই যাঁর যাঁর শিল্পমাধ্যমে নতুন করে প্রকাশ করেছেন শিল্পীরা। ওই দ্বীপের প্রাণীদের নিয়ে বিমূর্ত এবং পরাবাস্তব ধরনের চমত্কার কিছু ছবি একেঁছেন চিত্রশিল্পীরা। এক চলচ্চিত্র নির্মাতা একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন গালাপাগোস দ্বীপের অতিকায় কাছিমগুলোকে নিয়ে, যার কথা বহুবার উল্লেখ করেছেন ডারউইন তাঁর লেখায়। তাঁর প্রমাণ্যচিত্রের মূল বিষয় ওই প্রকাণ্ড কাছিমগুলোর সঙ্গম। যে যৌনতার মাধ্যমে এই কাছিমগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের বংশবিস্তার করে চলেছে তার বিচিত্র প্রক্রিয়াটিকে মজাদার করে চিত্রায়িত করেছেন নির্মাতা। শত বছরের আয়ুসম্পন্ন এই কাছিমগুলোর কারও কারও সঙ্গে হয়তো ডারউইনের দেখা হয়েও থাকতে পারে। মনোযোগ আকর্ষণ করেছে একটি বিশেষ ভাস্কর্য। ভাস্কর দেয়ালে টানিয়ে দিয়েছেন বিশাল আকারের একটি কাচের ফ্রেম। কাছে গিয়ে দেখি স্বচ্ছ কাঁচের ওই ফ্রেমের ভেতর ঠাসা মাটি এবং তার ভেতর অসংখ্য জ্যান্ত কেঁচো। কেঁচোকে ডারউইন পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি কেঁচোর নাম দিয়েছিলেন ‘আদিম লাঙল’। মানুষ যখন লাঙল আবিষ্কার করেনি, হাজার বছর আগে কেঁচোই মাটিতে লাঙলের কাজ করেছে। অবিরাম নিচের মাটি ওপরে করে ভৃপৃষ্ঠের রাসায়নিক ভারসাম্য রক্ষা করেছে তারা। সেই অসংখ্য আদিম লাঙলকে স্বচ্ছ কাচের ফ্রেমে ঢুকিয়ে চারদিক অন্ধকার করে শিল্পী স্পট লাইট ফেলেছেন ফ্রেমের ওপর। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম স্পট লাইটের আলোয় অবিরাম মাটি খুঁড়ে চলেছে কেঁচোগুলো। মনে হচ্ছিল, কোনো একটি মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কতিপয় দর্শক এই প্রাচীন অথচ উপেক্ষিত প্রাণীটির পারফর্মেন্স দেখছি।
দ্বিতীয় যে অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত থেকেছি সেখানে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক জিলিয়ান বিয়ার ডারউইনের জীবন এবং ভাবনায় শিল্প-সাহিত্যের প্রভাববিষয়ক তাঁর গবেষণাটি উপস্থাপন করেন। ডারউইনের আত্মজীবনীতে দেখা যায়, তরুণ বয়সে সাহিত্য, চিত্রকলা এবং সংগীতের ব্যাপারে গভীর অনুরাগ ছিল ডারউইনের। বিগল জাহাজে ভ্রমণের সময় তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল মিল্টন, শেলি ও বায়রনের কবিতা। প্রকৃতির নানা জট খুলতে কবিতা তাঁকে সহায়তা করেছে লিখেছেন। ডারউইন পাডোভানিনোর ‘স্লিপিং ভেনাস’ চিত্রকর্মটির বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে। তাঁর বন্ধু চিত্রশিল্পী জন রাসকিনের আঁকা ময়ূরের পেখমের ছবি নিয়ে কৌতূহলোদ্দীপক মন্তব্য আছে ডারউইনের। ময়ূরের পেখমের বর্ণাঢ্যতা তাঁর বিবর্তনবাদ তত্ত্বের মূল কিছু প্রতিপাদ্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল বলে জানিয়েছেন ডারউইন। আবার পশুপাখির ডাক যেমন যৌনতার অনুষঙ্গ তেমনি তা সংগীতেরও আদি অনুপ্রেরণা, এ তিনের সম্পর্ক নিয়েও লেখা আছে ডারউইনের। ২০০ বছর পরেও নানাভাবে প্রাসঙ্গিক এই যুগান্তকারী চিন্তাবিদকে স্মরণ করা যাক নতুন করে।
নিউক্যাসল, যুক্তরাজ্য
>>>শাহাদুজ্জামান: কথাসহিত্যিক।

বার্লিন দেয়াল: পতনের ২০ বছর পর -খোলা চোখে by হাসান ফেরদৌস

৯ নভেম্বর ১৯৮৯ সালে বার্লিন দেয়ালের পতন ঘটে। সে দেয়ালের পতনের ভেতর দিয়ে সোভিয়েত কমুনিজম নামের কফিনের ওপর প্রথম বড় পেরেকটি ঠোকা হয়। দুই বছর পর, ডিসেম্বর ১৯৯১ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন নামের রাষ্ট্রের পতনের মধ্য দিয়ে তার শেষ পেরেকটিও ঠুকে দেওয়া হয়।
বার্লিন দেয়াল পতনের ২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে গত সপ্তাহে ইউরোপের মানুষ যখন সোভিয়েত লৌহ যবনিকার অবসান উদযাপন করছে, তখন ওয়াশিংটনে মার্কিন কংগ্রেসে বিতর্ক হচ্ছে এক নতুন স্বাস্থ্য বীমা আইন নিয়ে। এই আইন পাস হলে তাতে প্রথমবারের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সীমিত আকারে সাধারণ নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্য পরিচর্যার ব্যবস্থা চালু হবে। ক্যাপিটাল হিলের কংগ্রেস ভবনে এই নিয়ে যখন তুমুল তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে, ঠিক সেই সময় হাজার দশেক লোক বাইরে দাঁড়িয়ে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে: গেল, গেল, আমেরিকা কমিউনিস্টদের দখলে চলে গেল।
বার্লিন দেয়ালের ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ভেতর অনেকেই ধনতন্ত্রের বিজয় পতাকা দেখে হাততালি দিয়েছিলেন। এখন, সে ঘটনার ২০ বছর পর, সমাজতন্ত্রের চেতনার মৃত্যু হয়েছে, সে কথা বলতে অনেকেই দ্বিধান্বিত। বারাক ওবামার আমেরিকায় যা ঘটছে, তাকে সমাজতন্ত্রের পুনরুত্থান ভাবা অযৌক্তিক, কিন্তু গত এক বছরে পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে চলেছে, তাতে অনেকেই মাথা চুলকে ভাবছেন, এই গাড্ডা থেকে বেরোনোর পথ কী। সমাজতন্ত্রের সঙ্গে মিলমিশ করে একটা মিশ্র ব্যবস্থা সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে, এমন কথা কেউ কেউ মুখ ফুটে বলেও ফেলেছেন। অবশ্য সমাজতন্ত্র শব্দটি কেউ ভুলেও মুখে আনছেন না।
ইউরোপের দেশগুলো মোটামুটিভাবে মেনে নিয়েছে, বল্গাহীন ধনতন্ত্রের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে একসময় আমও যাবে, বস্তাও যাবে। এই লাগাম টেনে ধরার কাজটা সরকার তথা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আগ বাড়িয়ে করতে হবে। বিশ্বায়নের এই যুগে পৃথিবীর ছোট-বড় অধিকাংশ দেশই অর্থনৈতিকভাবে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, তাই টিকে থাকার জন্য সে কাজটা করতে হবে যৌথভাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও প্রধান অর্থনীতি আমেরিকা। নিজেদের স্বার্থে তাকেও সে কাজে হাত লাগাতে হবে বৈকি। কিন্তু আমেরিকায় সরকারের ভূমিকা প্রশ্নে বাম ও ডানের লড়াই কমার কোনো লক্ষণ নেই। সরকার সমস্যার সমাধান নয়, সেই সব সমস্যার কারণ, এ কথা আমেরিকার মানুষ কয়েক দশক ধরে শুনে আসছে সকাল-সন্ধ্যা। শুধু রোনাল্ড রিগ্যান নয়, উদারবাদী বলে পরিচিত বিল ক্লিনটনের সময়ও সেই একই কথা বলা হয়েছে। ‘বৃহত্ সরকারের কাল শেষ হয়েছে’ ক্লিনটন টেবিল ঠুকে ঘোষণা করেছিলেন। প্রথমে রিগ্যান, তারপর বিল ক্লিনটনের নেতৃত্বে বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি নজরদারি ক্রমেই কমিয়ে আনার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তার ফল যে কী ভয়াবহ হতে পারে, সে কথা আমেরিকার মানুষ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। গত এক বছরে ১৫০ ব্যাংকে লালবাতি জ্বলেছে। তার মধ্যে গণ্ডারসদৃশ বড় বড় ব্যাংক রয়েছে। জেনারেল মোটরস ও ফোর্ড কোম্পানির মতো ধনতন্ত্রের প্রতীক এখন সরকারের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে টিমটিমে বাতি জ্বালিয়ে টিকে আছে, সে দেওটিও যখন তখন নিভে যেতে পারে। শেয়ারবাজারে ধস নামায় মাঝারি আয়ের অসংখ্য মানুষ পথে বসেছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে মর্টগেজ বাজারের। লাখ লাখ মানুষ দেউলিয়া হয়ে নিজেদের বাড়িঘরের মালিকানা হারিয়েছে। এক ক্যালিফোর্নিয়াতেই পাঁচ লাখ লোক নিজেদের বসতবাড়ি খুইয়েছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে বেড়েছে বেকারত্ব। এ মুহূর্তে আমেরিকার প্রতি ১০ জনের একজন কর্মহীন। স্বাস্থ্যবীমা নেই এমন মানুষের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি।
ইউরোপের ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর অবস্থা যে এর চেয়ে খুব ভালো, তা নয়। সেখানে কোনো কোনো দেশে বেকারত্বের হার আরও বেশি। ইতালি, স্পেন ও গ্রিসে বেকার ও অভাবী মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। দাঙ্গা ঠেকাতে ফ্রান্সেও কয়েক দফা পুলিশ নামাতে হয়েছে। আইএমএফের কাছ থেকে জরুরি ঋণ না পেলে ফিনল্যান্ডের মতো দেশকে সরকারিভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করতে হতো।
পশ্চিমা ধনতান্ত্রিক সভ্যতার এমন এক জটিল সময়ে বার্লিন দেয়াল পতনের ২০ বছর উদ্যাপন করতে গিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার মানুষকে পেছন ফিরে তাকিয়ে বলতে হচ্ছে, এমন তো কথা ছিল না। মদ, মধু ও রুটির যে ঢালাও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার হলো কী?
কয়েক মাস ধরে বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলো এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিস্তর সময়, ঘাম ও বিদ্যুতের আলো ব্যয় করেছে। এ বছরের গোড়ার দিকে প্যারিসে বসেছিল বৃহত্ শক্তিগুলোর সম্মেলন, তার স্লোগান ছিল ‘নতুন বিশ্ব, নতুন পুঁজিবাদ।’ তার কয়েক মাস পরে লন্ডনে বসে তথাকথিত জি-২০ (গ্রুপ অব টোয়েন্টি, বা বৃহত্ ২০টি দেশের সম্মিলিত গ্রুপ) শীর্ষ বৈঠক। আর সবশেষে এই সেপ্টেম্বরে পিটসবার্গে হয়ে গেল আমেরিকার পৌরহিত্যে জি-২০ দলের আরেক শীর্ষ বৈঠক। সবখানে একই কথা: ধনতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে তাকে ঢেলে সাজাতে হবে। অর্থব্যবস্থা—বিশেষত ব্যাংক ও ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে, বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে সুষম বাণিজ্যিক সম্পর্ক নির্মাণ করতে হবে, দুই হাত খুলে খরচের ফলে যেভাবে ঋণের পাহাড় জমেছে, তাতে রাশ টেনে ধরতে হবে, গরিব দেশগুলোর ঋণ কমানোর পাশাপাশি তাদের অতিরিক্ত সাহায্যের কথাও ভাবতে হবে। মোদ্দা বক্তব্য হলো, খোলাবাজারের নামে পুরোনো কায়দায় বোম্বেটেপনা করলে চলবে না। টিকে থাকতে হলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমেরিকা বা চীন, যে যত বড় অর্থনীতিই হোক না কেন, সাধারণ নীতিমালার ভিত্তিতে না এগোলে নির্ঘাত মরণ। সে লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ভিত্তিতে যে ব্রেটন উডস-ভিত্তিক পুরোনো ব্যবস্থাপনা এখন পর্যন্ত চালু আছে, তা দিয়ে কাজ হবে না। ব্রেটন উডস সম্মেলন হয়েছিল ১৯৪৫ সালে। তখন চীন, ভারত বা ব্রাজিলের মতো দেশকে হিসাবের খাতায় আনা হতো না। এখন হিসাবের খাতায় তারাই প্রধান খদ্দের। ফলে তাদের নিয়ে এক সম্প্রসারিত আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থাপনা পরিষদ গড়ে তুলতে হবে।
সম্প্রতি ধনতন্ত্রের সংকট নিয়ে খোলাচোখে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকসে ‘ক্যাপিটালিজম বিয়ন্ড দ্য ক্রাইসিস’ নামের এক দীর্ঘ আলোচনায়। অধ্যাপক সেন মন্তব্য করেছেন, ধনতন্ত্রকে তার খোলনলচে বদলে ফেলার যে কথা বলা হচ্ছে, তা কিছুটা বাগাড়ম্বর-সর্বস্ব। যাঁরা অবাধ বাজারব্যবস্থার ভিত্তিতে বল্গাহীন ধনতন্ত্রের কথা বলেন, তাঁরা হয়তো লক্ষ করেননি নির্ভেজাল, অবাধ ধনতন্ত্র বলে কিছু নেই। ছোট-বড় সব ধরনের ধনতান্ত্রিক দেশেই সরকার তথা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বিস্তর খাত থাকে। নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ আইন ব্যবস্থাপনা থেকে যোগাযোগ, পরিবহন ও ডাকব্যবস্থার বড় অংশই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীনে। অধিকাংশ ধনতান্ত্রিক দেশেই, এমনকি আমেরিকায়ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্কুলপর্যায়ে শিক্ষা, জরুরি চিকিত্সা পরিচর্যা এবং কোনো না কোনো ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা জাল (যেমন, পেনশন) চালু রয়েছে। ধনতন্ত্র যে বর্তমানে সংকটের মধ্যে পড়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু অধ্যাপক সেন মনে করেন না সে সংকটের সমাধান হবে নতুন আরেক ধরনের ধনতন্ত্রের সূচনার মাধ্যমে, যা দরকার তা হলো ধনতন্ত্রের চলতি ‘মনোলিথিক’ ব্যবস্থার বদলে বাস্তবসম্মত একাধিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার সমর্থনে ও অংশগ্রহণে কর্মক্ষম ও নীতিসম্মত ব্যবস্থা গড়ে তোলা। অ্যাডাম স্মিথ থেকে কেইনস সে কথাই বলে গেছেন। যেমন, অ্যাডাম স্মিথ মনে করতেন, বাজার ও পুঁজি যার যার নিজের ক্ষেত্রে কল্যাণকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন। তিনি মুনাফার পক্ষে ছিলেন, কিন্তু মুনাফার বাইরেও কিছু কিছু মূল্যবোধ আছে, তিনি সেসবের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। বল্গাহীন মুনাফাখোরি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তিনি ‘সুচিন্তিত আর্থিক নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ’-এর কথা বলেছিলেন। সমাজে যারা দুর্বল ও দরিদ্র, তাদের রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকার কথাও তিনি উপেক্ষা করেননি। অন্য কথায়, পুঁজিবাদের যে অসুখ নিয়ে আমরা এখন চুল ছিঁড়ছি, তার লক্ষণ ও উত্তরণের পথ সোয়া দুই শ বছর আগেই সেই অ্যাডাম স্মিথই নির্দেশ করে গেছেন।
সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্রের তুলনায় ধনতন্ত্র অধিক সফল ও তুলনামূলকভাবে অধিক টেকসই হয়েছে, তা নিয়ে তর্ক নেই। সোভিয়েত-ব্যবস্থা যে শেষ পর্যন্ত টেসে গেল, তার একটা বড় কারণ পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে নিজেকে সে বদলে নিতে পারেনি। পেরেস্ক্রোইকা ও গ্লাসনস্ত দিয়ে গর্বাচেভ শেষ সময়ে একটা চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু সে পরিবর্তন ছিল পুরোটাই ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। তার কোনো অরগানিক বিকাশ ছিল না। অন্য দিকে ধনতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি নিজেকে সময়মতো পরিবর্তিত হতে দেওয়া, পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। ধনতন্ত্রের টিকে থাকার বড় কারণই হলো, অধ্যাপক সেনের ব্যাখ্যা ধার করে বলা যায়, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আইন ও নীতিমালার প্রয়োগ।
ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষেত্রে ও ব্যক্তিগত মালিকানা নির্ধারণের জন্য আইন ও নীতিমালা গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ধনতন্ত্র ঠিকমতো বিকশিত হতে পারেনি। ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন বদলেছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনকানুনও তৈরি হয়েছে। সোজা কথায়, এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম ও মূল্যবোধ ধনতন্ত্রকে পেছন থেকে উত্সাহ ও সমর্থন জুগিয়েছে। এ কাজে খবরদারির কাজটি করেছে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের পক্ষে সরকার। পুঁজিবাদ যত বিকশিত হয়েছে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর রাষ্ট্রীয় খবরদারির প্রয়োজনও সেই পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আমেরিকায় ঘটেছে এর উল্টোটা। পুঁজিবাদ যত জেঁকে বসেছে, এখানে আইনের খবরদারিও সেই পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে কী সর্বনাশ হয়েছে সে তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি।
সরকারের ভূমিকা প্রশ্নে ইউরোপে বিতর্ক মোটামুটি শেষ। গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের মোদ্দা আদর্শগুলো কাজে লাগিয়ে তাদের অনেকেই ধনতন্ত্রের একটি মানবিক চেহারা তৈরি করে নিয়েছে। ইউরোপের কোনো কোনো দেশে, বিশেষত স্ক্যান্ডেনেভিয়ায়—গণকল্যাণমুখী যে রাষ্ট্রব্যবস্থা মোটের ওপর তৈরি হয়েছে, চেতনায় ও আদর্শে তারা মার্ক্স ও এঙ্গেলসের সাম্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে খুব দূরে নয়। তারিক আলী তাঁর সাম্প্রতিক বই, দি আইডিয়া অব কম্যুনিজম-এ মন্তব্য করেছেন, কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে যে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, তার কেন্দ্রে একদিকে রয়েছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, অন্যদিকে সমাজের সামষ্টিক দায়দায়িত্ব। সোভিয়েত-ব্যবস্থার পতনের প্রধান কারণ এই দুই মূল নীতি থেকে সরে আসা। ধনতন্ত্র আজ সংকটের মুখে পড়েছে। তার কারণ প্রথম আদর্শের কথা মাথায় রাখলেও দ্বিতীয় আদর্শ সে ভুলতে বসেছে।
বার্লিন দেয়াল ধ্বংসের দুই দশক পরে যখন ধনতন্ত্রের বিজয়কেতন ওড়ানোর কথা, আমরা তখন ধনতন্ত্রের সম্ভাব্য মৃত্যু নিয়ে কথা বলছি। ইতিহাসের আলাদা কোনো দেবতা আছে কি না আমার জানা নেই। থেকে থাকলে তিনি নির্ঘাত এই মুহূর্তে হো হো করে হাসছেন।
৯ নভেম্বর ২০০৯, নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক। কলাম লেখক।

মেহেরপুরে ট্রান্সফরমার চুরি -নিরাপত্তার দায়িত্ব পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে

মেহেরপুরে ট্রান্সফরমার চুরি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছরই ১০৩টি ট্রান্সফরমার চুরি হয়েছে—এ সংখ্যা প্রমাণ করে, অবস্থা কতটা নিয়ন্ত্রণের বইরে চলে গেছে। গত তিন বছরের হিসাবে এ সংখ্যা সাড়ে পাঁচ শর বেশি। গ্রাহকদের ভোগান্তি এখন চরমে। ট্রান্সফরমার চুরির ফলে বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ থাকায় বেশ কিছু এলাকায় কৃষকদের সেচ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে চলতি মৌসুমে জেলার প্রায় ২৫ হাজার একর জমির ফসল উত্পাদন না হওয়ার আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ।
উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুত্ সঞ্চালন লাইন থেকে ট্রান্সফরমার চুরি শুধু দক্ষ লোকের পক্ষেই সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে পল্লী বিদ্যুতের দক্ষ লাইনম্যানরা জড়িত বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও গ্রাহকদের বিস্তর অভিযোগ। ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় গত দুই মাসে মেহেরপুর সদর থানায় ৩৫টি এবং গাংনী থানায় ১২৫টি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এ পর্যন্ত ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় কোনো অভিযোগ এজাহার হিসেবে নেয়নি। গত তিন বছরে ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় এ পর্যন্ত কোনো চোরকে সাজা দেওয়া যায়নি। ট্রান্সফরমার চোরদের শাস্তি দিতে না পারলে এ প্রবণতা কমবে কীভাবে?
চুরি যাওয়া ট্রান্সফরমারের কোনো দায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি কর্তৃপক্ষ বহন করে না। এর সম্পূর্ণ খরচ পরিশোধ করতে হয় ব্যক্তি গ্রাহক অথবা গ্রাহক সমিতিকে। এর সবচেয়ে ভুক্তভোগী হন সাধারণ কৃষকেরা। সেচসুবিধা বজায় রাখতে দ্রুত টাকা পরিশোধ করে বিদ্যুত্সংযোগ দ্রুত চালু করা ছাড়া তাঁদের কোনো উপায় থাকে না। একেকটি ট্রান্সফরমারের দাম ৩৬ থেকে ৫৬ হাজার টাকা। এত বিপুল পরিমাণ টাকা বারবার পরিশোধের ফলে কৃষকদের লোকসানের মুখে পড়তে হয়। এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, ব্যবসা করবে পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি আর ট্রান্সফরমার চুরি হলে ক্ষতিপূরণ দেবে গ্রাহক—এটা কেমন কথা? একজন গ্রাহক প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য দিয়েই তাদের কাছ থেকে বিদ্যুত্ কিনছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা তাদের দায়িত্ব। গ্রাহকদের ঘাড়ের ওপর সব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার এ প্রথা বদলানো প্রয়োজন। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকেই নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করতে হবে।

নতুন বেতনকাঠামো -মূল্যস্ফীতি যেন না বাড়ে

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা করা হলো। প্রায় পৌনে বারো লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রতিরক্ষা, স্বায়ত্তশাসিত ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে কর্মরত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের জন্য এটি একটি বড় সুখবর। তাঁরা বহু দিন এর প্রতীক্ষায় ছিলেন। ২০০৫ সালে সর্বশেষ বেতন বৃদ্ধির পর গত চার বছরে দ্রব্যমূল্যসহ জীবনযাত্রার সামগ্রিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে কিন্তু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা সে অনুপাতে বাড়েনি। তাই এই নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা একটি যুক্তিসংগত পদক্ষেপ। গত জুলাই থেকে মূল বেতন কার্যকর বলে গণ্য হবে, ফলে এ কয়েক মাসের বকেয়া মূল বেতন এ বছরই প্রদানের সিদ্ধান্ত বাড়তি আনন্দের বিষয়। ২০১০ সালের জুলাই থেকে অন্যান্য ভাতা কার্যকর হবে—এটাও তুলনামূলকভাবে সুখবর, কারণ এর আগেরবার নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী মূল বেতন ও অন্যান্য ভাতা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল তিন বছরে। সরকারকে ধন্যবাদ। সরকারি চাকরিজীবীদের অভিনন্দন।
এখন সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে জনগণের প্রত্যাশার বিষয়টিও ভাবা উচিত। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে জনগণ; বেতন-ভাতা বাড়ানো হলে বাড়তি অর্থের জোগানও দিতে হয় জনগণকেই। সুতরাং করদাতা জনগণ সরকারের কাছে আরও ভালো সেবা প্রত্যাশা করবে, এটাই স্বাভাবিক। সরকারি প্রশাসনযন্ত্রের কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে জনপ্রশাসনের সর্বনিম্ন কর্মচারী পর্যন্ত সবারই জনগণের কাছে এই দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করা উচিত নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণার সুবাদে। প্রত্যেকে নিজ নিজ পদ, ক্ষমতা, অবস্থান থেকে আরও ভালোভাবে দায়িত্ব পালনে উদ্যোগী হলে সে দায়বদ্ধতা পূরণ হয়, বেতন-ভাতা বৃদ্ধিরও ন্যায্যতা প্রতিপন্ন হয়।
এই সঙ্গে ভেবে দেখা যেতে পারে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা কয়েক বছরের ব্যবধানে ঘটা করে বাড়ানোর যে চল এ দেশে রয়েছে, তা কতটা যুক্তিসংগত। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তাঁদের বেতন-ভাতা বছরে বছরে সমন্বয় করা কি বেশি যুক্তিসংগত নয়? পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কাজটি সেভাবেই করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে মূল্যস্ফীতির হিসাব থাকে; যে বছর যে হারে মূল্যস্ফীতি ঘটে সে বছর ওই হারে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়। বার্ষিক ইনক্রিমেন্টকে মূল্যস্ফীতি সূচকের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি ঘটে ক্রমান্বয়ে, চার-পাঁচ বছর পর হঠাত্ করে নয়। সুতরাং দীর্ঘ সময় ধরে চাকরিজীবীদের মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রেখে চার বা পাঁচ বছর পর একবার বেতন-ভাতা বাড়ানো সঠিক পদ্ধতি নয়। এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশেষত লক্ষ করা যায়, যখন সাড়ম্বরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়, তখন বাজারে জিনিসপত্রের দাম হঠাত্ করে বেড়ে যায়। এবার মূল্যস্ফীতির তুলনায় বেতন-ভাতা বাড়ানো হয়েছে অনেক বেশি হারে। চার বছরে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে ৩১ শতাংশ, আর গ্রেডভেদে বেতন বেড়েছে ৫৬ থেকে ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, নতুন বেতন-কাঠামো মূল্যস্ফীতির ওপর খানিকটা চাপ ফেলতে পারে। অবশ্য সরকারের তরফ থেকে এ রকম আশঙ্কা নাকচ করা হয়েছে। যাই হোক, বেতন বৃদ্ধির ঘটনার সুযোগ নিয়ে অসত্ ব্যবসায়ীরা যাতে দ্রব্যমূল্য না বাড়াতে পারেন, সে জন্য সরকারকে দক্ষতার সঙ্গে বাজার তদারক করতে হবে।

বাবা তোমায় ভীষণ মনে পড়ে by শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য পাঁড়ে

(আমি সাত বছরের শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য পাঁড়ে। আমার বাবা ঘাতকের বোমায় নিহত বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে। আজ থেকে ঠিক চার বছর আগে, ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে জেএমবি নামের জঙ্গিদের বোমায় আমার বাবা ও তার সহকর্মী সোহেল আহমদ নৃশংসভাবে নিহত হন। তখন আমার বয়স মাত্র পৌনে তিন বছর। বাবার আদর তখন আমি একটু একটু বুঝতে শুরু করেছিলাম।)
বাবা, কী ভীষণ আদরই না করতে তুমি আমাকে। মাথায় তুলে নাচতে। বড় হয়ে আমি কী হব, কার মতো হব, তা নিয়ে মায়ের সঙ্গে বসে কত না স্বপ্ন বুনতে দুজনে। ঝালকাঠিতে আমাদের বাসায় প্রতিদিন যখন তোমাকে অফিসে নেওয়ার জন্য গাড়ি আসত, আমি বায়না ধরতাম, অফিসে যাব। তুমি বলতে, আমি যখন জেলা জজ হব, আমার নিজের দারুণ একটা গাড়ি থাকবে, তখন তোকে রোজ অফিসে নিয়ে যাব। মায়েরও খুউব ইচ্ছে ছিল, জজ বাংলোয় ঘর করার। বাবা, ওরা আমাকে-তোমাকে-মাকে কাউকে কোনো স্বপ্ন পূরণ করতে দিল না। আজ বেঁচে থাকলে তুমি হয়তো জেলা জজ হতে। এ কারণেই বাড়িতে কোনো গাড়ি এলে আজও আমি ছুটে যাই—হয়তো তুমি এলে!
বাবা, তোমার মৃত্যুর পর থেকে আমি বরিশালে দাদুবাড়ি থাকি। দাদু-দিদা তাঁদের সবটুকু ভালোবাসা উজাড় করে আমাকে ভরিয়ে রেখেছেন। আমাকে মানুষ করতে মা সারা দিন অমানুষিক পরিশ্রম করেন। সেই কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁর খাটুনি। এর পরও ক্লান্ত দেহে শ্রান্ত মনে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, আমাকে বুকে জড়িয়ে ভুলে থাকার চেষ্টা করেন তাঁর সব ব্যথা। কিন্তু বাবা, দুপুর বেলা সবাই যখন ঘুমোয়, মা অফিসে ব্যস্ত থাকেন, খটখটে রোদ্দুর পশ্চিমের জানালা দিয়ে আমার ঘরে ঢোকে আর বাইরে বড় বড় গাছের ওপর বসে কোনো কানাকুয়া অলস ডেকে ওঠে, তখন তোমাকে আমার ভীষণ মনে পড়ে বাবা। আমি একা একা বিছানা থেকে উঠে সামনের ঘরে তোমার ছবিটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকি, আর বাবা বাবা বলে তোমাকে ডাকি। তুমি কি কিছুই শুনতে পাও না বাবা? তুমি কি কিছুতেই ফিরবে না আর? আমাদের স্কুলে বন্ধুদের বাবারা যখন এসে টিফিনের সময় বা ছুটির সময় তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে যায়, তখন আমার খুউব ইচ্ছে করে, তুমি এসে একবার, মাত্র একবার আমাকে যদি নিয়ে যেতে, তাহলে মা কী খুশিই না হতেন বলো! পুজোর সময় সবাই বাবাকে নিয়ে কত আনন্দ করল। আমি আর মা ঘরে দরজা দিয়ে শুধু কাঁদলাম। আমার মা আর বিজয়া দশমীতে দুর্গা মায়ের কপালে সিঁদুর দিতে পারেন না। হঠাত্ রাতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখি, মা তোমার ছবি বুকে জড়িয়ে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করছেন। বাবা, আমার মায়ের চোখের জল কি কোনো দিন মুছবে না? আমাদের ঘরে তুমি, আমি, মা, দাদু-দিদা-মামা—সবাই মিলে একটা ছবি আছে। ওই ছবিটা আমার খুব প্রিয়। সেই আনন্দের ছবিটা থেকে ওরা কেন তোমাকে কেড়ে নিল বাবা, আমার কী দোষ ছিল?
মা বলেন, তুই বড় হয়ে ঠিক তোর বাবার মতো জজ হবি। আমি হব, বাবা। তোমার মতো। তোমার সেই কোট, জুতো—সবকিছু আমি গোপনে গোপনে পরে দেখি, আমাকে জজের মতো লাগে কি না। কিন্তু বাবা, আমার ভয়ও করে। যারা তোমাকে মেরেছিল, ওদের লোকজন এখনো বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে কাকু তোমার মামলা লড়েছিল, তাকেও ওরা মেরে ফেলেছে। ওরা সবকিছু দখল করে নিতে চায়। খুনিরা যদি সবকিছু দখল করে, ওদের যদি নির্মূল করা না যায়, তবে আমি বড় হব কোন দেশে বাবা! আমি মায়ের দুঃখ ঘোচাব কী করে বলো? আমার মা আর বাংলা মায়ের দুঃখ আজ একাকার মনে হয়। আমি ছোট বলে ভেব না, কিছু বুঝি না। আমি সব বুঝি বাবা। কে ভালো, কে মন্দ, আমি বুঝি বাবা। বুঝি বলেই আমি ঠিক করেছি, আমি তোমার মতো বিচারক হব। যত দিন আমি তোমার মতো হতে না পারছি, তত দিন যে আমার তোমার জন্য প্রতীক্ষার অবসান হবে না। যেদিন বিচারক হব, তোমার মতো পোশাক পরে, মায়ের হাত ধরে তোমার সমাধির পাশে গিয়ে তোমাকে ডাকব। সেদিন কি তুমি আসবে তোমার ছোট্ট শ্রেষ্ঠর মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতে?

পুঁজি ও বিনিয়োগ -না জেনে শেয়ার কিনতে নেই by আবু আহমেদ

আমাকে অনেকে শেয়ারবাজার নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, কোন শেয়ার কিনলে লাভ হবে। আবার অনেকে জিজ্ঞেস করেন, ওই শেয়ারটা ভালো কি না। তাঁদের জিজ্ঞাসা শুনে মনে হয়, তাঁরা নিজেরা কিছু জানেন না, জানলেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানেন না। তবে এ কথাও সত্য, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। বহু দিন ধরে শেয়ারবাজারে আছেন এমন লোকদের বিনিয়োগ নিয়ে আচরণ দেখলে আমাকে হতাশই হতে হয়। আবার অনেকে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ফাঁকফোকরগুলো ঠিকই বুঝে উঠতে সক্ষম হন। আমার এক সহকর্মী আছেন, যিনি পদার্থবিজ্ঞানে পড়েছেন, তিনি শেয়ার বেচাকেনার কিছু চার্ট তৈরি করে বললেন, এই অবস্থায় এই শেয়ারের মূল্য বাড়ার কথা। আমি তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, এটা মূল্য-ট্রেন্ড বোঝার জন্য অবশ্যই একটা ভালো পদ্ধতি, তবে এর সঙ্গে আরও অনেক উপাদানকে হিসাবে নিয়ে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমার আরেকজন পরিচিত বড় বিনিয়োগকারী আছেন, যিনি শুধু মার্কেট-ট্রেন্ডকে আমলে নিয়ে বেচাকেনার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর কথা হলো, বাজারের সঙ্গে থাকা ভালো। এর অন্য অর্থ হলো, জুয়াড়িরা যদি মার্কেট ট্রেন্ড ঠিক করে দেয়, তাহলে তিনি ওইটার পেছনে দৌড়াতেও প্রস্তুত। আমার পদার্থবিজ্ঞানের সহকর্মীর শেয়ারবাজারে আগমন বেশি দিনের নয়। তবে বাজারের গতি-প্রকৃতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণক্ষমতা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, তিনি বোঝার আগেই এমন কিছু শেয়ার কিনেছেন, যেগুলো থেকে ইতিমধ্যে পুঁজির এক-তৃতীয়াংশ হারিয়েছেন। তাঁর অন্য অসুবিধা হলো, শেয়ারবাজার বোঝার পর নতুন করে পুঁজি জোগানোর ক্ষমতা আর নেই। এভাবে অনেকেই আছেন যাঁরা বোঝার আগেই পুঁজির বৃহদাংশ হারিয়েছেন। তাঁরা কিন্তু শেয়ারবাজারের ওপর বেজায় রাগ। এ ব্যাপারটা বেশি ঘটছে কথিত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাঁরা শেয়ারের মূল্যের ব্যাপারে কোনো ভালো বই, ভালো ব্যাখ্যামূলক রিপোর্ট তো পড়েননি, বরং ভালো বোঝেন এমন লোকদের কাছ থেকেও এই নিয়ে কিছু শুনেননি।
তাঁরা বিনিয়োগকারী হয়েছেন বন্ধুর কথায় অথবা খবরের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখে। শেয়ারবাজার যখন তুঙ্গে থাকে, তখন ক্লাব-সোসাইটি, বিশেষ বিশেষ দোকান এই নিয়ে সরগরম থাকে। আর তখনই নতুনেরা এই বাজারে দলে দলে ভর্তি হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর ধারণা জন্মেছে যে শেয়ারকে ধরে রাখতে নেই, চার দিনের মাথায় অথবা আরও একটু সবুর করে ঝটপট বিক্রি করে দিলেই লাভ বেশি হয়। তাঁরা তাঁদের এই কাজের নাম দিয়েছেন ‘শেয়ার ব্যবসা’। আমি কক্সবাজারে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের একটা সমাবেশে বলেছিলাম, ‘আপনারা আপনাদের এই বিনিয়োগকে শেয়ার ব্যবসা বলছেন কেন, এটা তো একটা বিনিয়োগ।’
বিনিয়োগ একটা সম্মানিত কাজ, আর শেয়ার ব্যবসা তো একটা হালকা কাজ। কিন্তু তাতে যে আমি তাঁদের মন জয় করতে পেরেছি, তা নয়। তাঁরা এবং অন্যত্র অন্যরাও একটা ভাবনায় ভুগছেন যে চট-জলদি লাভকে ঘরে তুলতে না পারলে লাভ হারিয়ে যাবে। চার দিনের ট্রেডাররা এ জন্যই হন্যে হয়ে ছুটছেন কোন শেয়ারে লাভ করা যাবে তার সন্ধানে। আর তাঁদের জন্য ওই ট্রেন্ডটা সেট করে দিচ্ছে একঝাঁক জুয়াড়ি। জুয়াড়িরা যে দলবদ্ধভাবে চলে, তা নয়। তারাও বিভিন্ন দলে বিভক্ত থাকে, আবার বিচ্ছিন্নও থাকে। তাদের প্রথম কাজ হলো মূল্যকে উসকে দেওয়া, উসকাতে গিয়ে তারা গুজব, মিথ্যা তথ্য ইত্যাদি ছড়ায়। কখনো কখনো তাদের এই কাজের সঙ্গে কোম্পানির মালিকেরাও থাকেন। তাই অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর বদ্ধমূল ধারণা হলো, শেয়ারের মৌলভিত্তি তথা আয় ও সম্ভাবনা—এসব অর্থহীন, বরং কোন শেয়ারের মূল্য বাড়বে সেটা জানতে পারলেই কাজ হবে। এক হাউজিং কোম্পানির শেয়ারের মূল্য বেড়ে গেল মাত্র দুই মাসে ৩০০ শতাংশ। চারদিকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর এল, ওই কোম্পানির বিরাট ল্যান্ড ব্যাংক আছে এবং পুনর্মূল্যায়ন করলে নেট অ্যাসেট ভ্যালু অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করা হলো, নেট অ্যাসেট ভ্যালু বাড়লে কি শেয়ারের আয় এবং মুনাফা দেওয়ার ক্ষমতা বাড়বে? তখন আর কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর পাওয়া গেল না। যাঁরা শেয়ারবাজারে আছেন, তাঁরাই শুধু প্রশ্ন জিজ্ঞাস করেন না, বাইরের কিছু লোকও এই নিয়ে প্রশ্ন করেন। আমার বক্তৃতা শুনে দু-চারজন দাঁড়িয়ে বলেন, এটা তো জিরো-সাম গেইম, অর্থাত্ একজনের লাভ অন্যজনের ক্ষতি। যতই আমি বোঝাতে চেষ্টা করি না কেন যে এটা যোগফলের শূন্যের অঙ্ক নয়, এটাতেও সবাই একসঙ্গে জিততে পারে, তবুও আমি তাঁদের বিশ্বস্তভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি বলে মনে হয় না। অন্য কিছু লোকে প্রশ্ন করে, শেয়ারের মূল্য বাড়লে কোম্পানির কী লাভ হয়। এতে তো কোম্পানি নতুন করে পুঁজি পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রেও আমি বোঝাতে চেষ্টা করি যে এতে কোম্পানির লাভ হয়, কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে। শেয়ারের মূল্য বাড়লে কোম্পানির যে লাভ হয় না, এ ধারণাটা অনেক শিক্ষিত লোকের মধ্যেও আছে। একবার আমি রেভিনিউ রিফর্ম কমিশনের সদস্য হিসেবে কাজ করছিলাম। সেখানে আরও চারজন গণ্যমান্য এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিও কাজ করছিলেন। আমি যখন বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে আমাদের ছোট পুঁজিবাজারে কিছু ট্যাক্স-সুবিধা দেওয়ার পক্ষে জোরালো যুক্তি দিচ্ছিলাম, তখন একজন সদস্য বলে উঠলেন, ট্যাক্স কমিয়ে কেন পুঁজিবাজারকে উত্সাহ দিতে হবে? আর শেয়ারের মূল্য বাড়লে কোম্পানিগুলোরই বা কী লাভ হবে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, তিনি যদিও ট্যাক্স প্রশাসনে কাজ করেছেন, কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যের জগত্ সম্পর্কে তাঁর সম্যক ধারণা নেই। উত্সাহ দিয়ে পুঁজির প্রবাহ বৃদ্ধি করায় তিনি বিশ্বাসী নন। পরে অবশ্য আমার চাপাচাপিতে এবং চেয়ারম্যান মহোদয়ের সমর্থনে ফাইনাল রিপোর্টে শেয়ারবাজারে কিছু বাড়তি সুবিধা দেওয়ার পক্ষে বলা হয়েছিল। শেয়ারবাজার এগিয়েছে বটে, তবে বেশি এগিয়েছে আমাদের বিনিয়োগকারীরা, অন্তত সংখ্যায়। তাদের শেয়ার চাহিদা-ক্ষুধাকে মিটাতেই আমার মতো লোক বারবার সরকারি শেয়ারগুলো বেচার পক্ষে বলতে থাকে। অবশ্য এই বেচার পক্ষে অন্য যুক্তিও আছে। আমাদের সমাজে অনেক বুঝের লোক আছেন, আবার শিক্ষিত অবুঝ লোকও আছেন। সবার মন রক্ষা করে সরকার শেয়ার বেচার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, পারলেও বাস্তবায়ন করতে পারবে না। একটা স্বার্থ এক পক্ষকে বলবে ‘না’, অন্য বৃহত্ স্বার্থ সরকারকে বলবে, হ্যাঁ। তবে ‘হ্যাঁ’ এখনো জয়যুক্ত হয়নি। ছোট্ট কোটারি যারা ‘না’-এর পক্ষে, তারা আজও জয়ী হয়ে চলেছে। শেয়ার বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কাঁচা প্রশ্ন হলো, কোন শেয়ার ভালো। এটাও শিক্ষিত লোকদের প্রশ্ন। তবে সহজ উত্তর হলো, সব শেয়ারই ভালো, যদি বিনিয়োগকারী লাভ করতে পারে। একদিন আমার শিক্ষকতুল্য এক বিনিয়োগকারী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি না ওই শেয়ারকে ভালো বলেছিলে, এখন আবার ‘না’ বলছ কেন।’ আমি তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, ওটাই তো বলেছিলাম একটা মূল্যে, এখন মূল্য বেড়ে গেছে, তাই শেয়ার ভালো হলেও সেটা উপযুক্ত মনে করছি না। ওই ঘটনা থেকে আমি তাঁর সামনে পারতপক্ষে আর পড়তে চাই না। পড়লেও অন্য কথায় চলে যাই। যা হোক, শেয়ারবাজার নিয়ে জানা লোকেরাই বেশি জানার চেষ্টা করে। এটা এ জন্যই, একে তো তারা তাতে মজা পায়; অন্য কথা হলো, একেকজনের জ্ঞান একেক রকম। কেউ অনেক উঁচুস্তরের শেয়ার-সাহিত্য পড়ে, কেউ শুধু দেখা থেকে শিখে, কেউ আগেই ভেতরের খবর জানে। তাই বন্ধুরা ক্লাবে আড্ডা দেয়, ফোনে কথা বলে, কিন্তু বিষয় একটাই—নতুন করে কিছু জানা। আমি বিনিয়োগকারীদের সমাবেশে অনেক বক্তৃতা দিয়েছি। আমার বৈশিষ্ট্য হলো, কথা বলতে বলতে ব্ল্যাকবোর্ড বা সাদা বোর্ডে কিছু লেখা, অধিকাংশ সময় অতি সাধারণ সমীকরণ বা উপাদানগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক। আমার কাছে বোর্ডে লিখতে ভালো লাগে এ জন্য যে, আমি শ্রোতার বা দর্শকের প্রশ্নের উত্তর সহজ একটা অঙ্ক বা সমীকরণ লিখে তাত্ক্ষণিকভাবে দিতে পারি। এতে উপস্থিত বিনিয়োগকারীরা বেশি উপকৃত হয় বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু অনেক জানেন এমন বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ভাববিনিময় করতে আমার অধিক ভালো লাগে এই অর্থে যে আমি তাঁদের থেকে অনেক জানতে পারি। আমার অনেক ছাত্রও এখন বিনিয়োগ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান। তারা আমাকে দেখলে অনেক সম্মান করে এবং আমিও ভাবি সেই অনেক আগে দ্বিতীয়-তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নের সময় ওদেরকে ভ্যালুয়েশন, আয় হিসাব, পুঁজি আহরণ নিয়ে যেসব কথা বলেছি, আজ তারা ওই সব বিষয়কে আরও শাণিত করে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজে লাগাচ্ছে। শেয়ার এবং কোম্পানি, অর্থনীতি নিয়ে জানার কোনো বিকল্প নেই। জানার জন্য বাংলাদেশে অনেক উত্স নেই। সনাতনী উত্স থেকেই আমাদের যা জানার, জানতে হবে। একেবারেই না জেনে শেয়ারে বিনিয়োগ করতে নেই। বই-পুস্তক মোটামুটি একটা জ্ঞান দেয়। তবে ওই জ্ঞানের সঙ্গে চলতি জ্ঞানের সংযোগ ঘটাতে পারলে জানার ব্যাপারটা উঁচুতে পৌঁছে। অনেকে আমাকেও অনুরোধ করেছে তাদের জন্য কিছু লিখতে। তাদের ইচ্ছায় সাড়া দিতে গিয়ে আমি নিজেও ছোট্ট একটি বই লিখেছি, যা এখন বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজে পাওয়া যাচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে শিক্ষিত হয়ে ভালো আচরণ করবে—সেই লক্ষ্যে স্টক এক্সচেঞ্জ এবং রেগুলেটরও কিছু শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যকে অনেকে বিশ্লেষণ করে নিজের কাজে লাগাতে অপারগ হন। এটাও সহজ হয়ে যাবে যদি মৌলিক বিষয়গুলোকে একবার জানা যায়। বিভিন্ন হাউজ তাদের গবেষণা রিপোর্টও বের করছে। ওইগুলোও দেখা যেতে পারে। অনেক উদ্যোগী লোক এই বাজার নিয়ে সাপ্তাহিক-পাক্ষিক সাময়িকীও বের করেছেন। ওইগুলোও দেখা যেতে পারে। অডিট রিপোর্ট বা বার্ষিক প্রতিবেদনকে ছুড়ে ফেলে না দিয়ে একটু সময় নিয়ে চোখ বুলিয়ে নিন। উপকার পাবেন। অভিজ্ঞতা থেকে হোক, পড়ে হোক, এই দুইয়ের সম্মিলন ঘটিয়ে হোক, কিছু জেনে শেয়ারে বিনিয়োগ করুন, দেখবেন আপনি হারবেন না।
আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢা.বি.।

যানজট

রাজধানীবাসীর নানাবিধ সমস্যাগুলোর মধ্যে যানজট সমস্যা এখন চরমে পৌছেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সময়সূচি পরিবর্তন, নতুন নতুন ফ্লাইওভার-আন্ডার পাস নির্মান, ট্রাফিক বা ট্রাফিক আইনের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি তথা অত্যাধুনিক ট্রাফিক সিগনাল কোন কিছুই রাজধানীবাসির যানজট সমস্যার সমাধান করা যাবে বলে মনে হয় না। কেননা প্রতিনিয়ত মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে ঢাকার লোক সংখ্যা। তাই নতুন পদক্ষেপ সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলের বিষয়ে আশাবাদী গওয়া যায় না।
তাই এই সমস্যা নিরসনে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরন ঘটালে ঢাকামুখি মানুয়ের চাপ কমবে। চাকুরী, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিত্সার প্রয়োজনে ঢাকার উপর জনসংখ্যার যে চাপ পড়ে তা কমানো গেলে যানজট কমানো সম্ভব হবে।
মহিবুর রহমান, শিক্ষার্থী
সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা।

ইউরোপ -২০ বছরের হিসাব-নিকাশ-স্লাভো জিজেক

২০ বছর আগে ৯ নভেম্বর বার্লিন দেয়ালের পতন ঘটে। ঐতিহাসিক সেই দিনের ওপর জোর দিতে গিয়েবলা হয়: সেদিন যেন স্বপ্ন সত্যি হলো, তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ল কমিউনিস্ট শাসন, হঠাত্ দুনিয়ার গতিপথে এমন পরিবর্তন ঘটে গেল, যা মাত্র কয়েক মাস আগেও ছিল ধারণার বাইরে। পোল্যান্ডে বসে কেউ কি ভাবতে পেরেছিল, নির্বাচন হবে অবাধ আর তাতে জিতে প্রেসিডেন্ট হবেন লেস ওয়ালেসা?
অবশ্য নতুন গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী বাস্তবতায় মখমল বিপ্লবের মহিমা মলিন হতে সময় লাগেনি। প্রতিক্রিয়া হিসেবে জনগণ অনিবার্য হতাশাকে আশ্রয় করে পথ হাতড়ানোর চেষ্টা করে। ‘পুরোনো মহান’ কমিউনিস্ট সময়ের প্রতি স্মৃতিবিধুরতা; দক্ষিণপন্থী, জাতীয়তাবাদী জনপ্রিয়তামুখিতা; এবং নতুন কমিউনিস্টবিরোধী বিকারের মাধ্যমে পালাক্রমে এই হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে।
প্রথম দুটি প্রক্রিয়া সহজে অনুধাবনযোগ্য। কয়েক দশক আগেও যেসব ডানপন্থী ‘কমিউনিজমের থেকে মৃত্যু শ্রেয়’ বলে গলা ফাটাত, তাদেরই আজ অস্ফুট স্বরে মাঝেমধ্যে বলতে শোনা যায়, ‘হ্যামবার্গার খাওয়ার চেয়ে কমিউনিজম শ্রেয়।’ কিন্তু কমিউনিস্ট স্মৃতিবিধুরতাকে খুব গুরুত্বসহকারে নেওয়া উচিত হবে না: এ স্মৃতিবিধুরতায় সমাজতান্ত্রিক ধূসর বাস্তবতায় ফিরে যাওয়ার কোনো প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা নেই, এটি আসলে শোক পালন, অতীত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার একটি আচার। অন্যদিকে জনপ্রিয়তামুখী ডানপন্থীদের উত্থান কেবল পূর্ব ইউরোপেই ঘটেনি, বিশ্বায়নের আবর্তে আটকে পড়া সব দেশেই এর দেখা মেলে।
হাঙ্গেরি থেকে স্লোভেনিয়া পর্যন্ত কমিউনিজম-বিরোধিতার সাম্প্রতিক পুনরুত্থান বরং অনেক বেশি কৌতূহলোদ্দীপক। ২০০৬ সালের হেমন্তে হাঙ্গেরির ক্ষমতাসীন সোশ্যালিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা দেশটিতে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টির পেছনে আগের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের যোগসূত্রকে দায়ী করে। কমিউনিস্ট পার্টির উত্তরাধিকারী এই ক্ষমতাসীন দল, তাই এই সংকট, এমন কথা ওঠে। বিক্ষোভকারীরা সরকারের বৈধতাকেই প্রত্যাখ্যান করে, যদিও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমেই তারা ক্ষমতাসীন হয়েছিল। সোভিয়েত ফৌজ যেভাবে ১৯৫৬ সালের কমিউনিস্টবিরোধী বিদ্রোহ দমন করেছিল, তার সঙ্গে তুলনা করা হতে থাকে নাগরিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় পুলিশের ভূমিকার।
এই নব্য কমিউনিস্টবিরোধী আতঙ্ক এমনকি প্রতীকের পিছু নিতেও ছাড়েনি। ২০০৮ সালের জুন মাসে লিথুয়ানিয়া আইন করে কাস্তে-হাতুড়ির মতো কমিউনিস্ট প্রতীকের প্রদর্শনী এবং সোভিয়েত জাতীয় সংগীত বাজানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে পোলিশ সরকার টোটালিটেরিয়ান প্রপাগান্ডার ওপর নিষেধাজ্ঞার আওতা বাড়িয়ে তাতে কমিউনিস্ট বই, পোশাক-পরিচ্ছদ ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে আসার প্রস্তাব করে: তাহলে হয়তো চে গুয়েভারার ছবিসংবলিত কোনো টি-শার্ট পরার কারণেও কেউ গ্রেপ্তারের শিকার হতে পারত। স্লোভেনিয়ায় বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ডানপন্থীদের প্রধান সমালোচনা, তারা পুরোনো কমিউনিস্ট শাসনেরই জের।
কমিউনিস্টবিরোধিতার পুনরুজ্জীবনের এই শক্তির উত্স কী? যেসব দেশের তরুণেরা কমিউনিস্ট যুগ দেখেনি, তাদের আবার কমিউনিজমের ভয় ধরানো কেন? এসব প্রশ্নের একটি সরল উত্তর মিলবে নতুন কমিউনিস্টবিরোধিতার মধ্যেই, ‘পুঁজিবাদ সত্যিই যদি সমাজতন্ত্র থেকে এত ভালোই হবে, তবে কেন আমাদের এখনো এত করুণ জীবন যাপন করতে হয়?’
অনেকে মনে করে, এর কারণ আমরা সত্যিকারের পুঁজিবাদের মধ্যে বাস করছি না: সত্যিকারের গণতন্ত্রের দেখা আমরা এখনো পাইনি, শুধু গণতন্ত্রের মুখোশে আমাদের নিরন্তর ভাওতা দেওয়া হচ্ছে; পুরোনো অশুভ শক্তি এখনো ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ছে, সাবেক কমিউনিস্টদের এক অংশ নতুন মালিক ও ম্যানেজাররূপে আবির্ভূত হয়েছে। সত্যিকারে কিছুই বদলায়নি। তাই আবারও বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে হবে...অথচ পুঁজিবাদের এমন চিত্রকেই গতানুগতিক বামপন্থীরা সবচেয়ে বেশি গালি দেয়। এ সমাজের আনুষ্ঠানিক গণতন্ত্র শুধু সংখ্যালঘু সম্পদশালীদের শাসনকে আড়াল করে রাখে। অন্যভাবে বলা যায়, আজকের কমিউনিস্টবিরোধীরা বুঝতে পারে না, যে ব্যবস্থাকে তারা বিপথগামী ছদ্ম পুঁজিবাদী হিসেবে প্রকাশ্যে নিন্দা জানাচ্ছে, তা আসলে পুঁজিবাদী।
এ জন্যই এখন চীনে এত অস্থিরতা। সব সময় পুঁজিবাদকে মনে হয় গণতন্ত্রের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য গাঁটছড়া বাঁধা। পুঁজিবাদের বিস্ফোরণের পটভূমিতে অনেক বিশ্লেষক এখনো মনে করেন, চীনে রাজনৈতিক গণতন্ত্র অনিবার্যভাবে নিজের কর্তৃত্ব জাহির করবে।
কিন্তু এই কর্তৃত্ববাদী পুঁজিবাদ যদি উদারনৈতিক পুঁজিবাদের চেয়ে অধিকতর কার্যকর, অধিকতর লাভজনক বলে প্রমাণিত হয় তবে? গণতন্ত্র যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য ও স্বাভাবিক পরিণতি না হয়ে বরং প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে তাহলে কী হবে? এই পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট-উত্তর দেশগুলোতে পুঁজিবাদের প্রতি আশাভঙ্গকে পুঁজিবাদের স্বরূপ না চেনা জনগণের ‘অপরিণত’ প্রত্যাশার চিহ্ন হিসেবে খারিজ করে দেওয়া উচিত নয়।
পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের বিরাট অংশ পুঁজিবাদ চায়নি। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে জীবন যাপন করার স্বাধীনতা চেয়েছেন, নিজের ইচ্ছামতো একত্র হওয়ার ও কথা বলার স্বাধীনতা চেয়েছেন। যে জীবন সরলতা ও আন্তরিকতার, সেকেলে মতাদর্শিক অনুশাসন ও প্রচলিত নৈরাশ্যবাদী ভণ্ডামি থেকে মুক্ত, সে জীবন তারা চেয়েছেন। যেসব আদর্শকে সামনে রেখে বিক্ষোভকারীরা মাঠে নেমেছিল, সেগুলো অনেকাংশে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ থেকেই নেওয়া। জনগণের সেসব আকাঙ্ক্ষাকে বলা যেতে পারে ‘সমাজতন্ত্রের মানবিক রূপ।’
এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে ভিক্টর ক্রেভচেঙ্কোর কথা। এই সোভিয়েত প্রকৌশলী ১৯৪৪ সালে ওয়াশিংটনে এক বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের হয়ে সফরের সময় পক্ষত্যাগ করেন এবং কিছুদিনের ভেতর আই চুজ ফ্রিডম নামের একটি স্মৃতিকথা লেখেন। এ বইয়ে তিনি স্টালিনবাদের বিভীষিকা তুলে ধরেন। ১৯৩০-এর দশকের শুরুর দিকের উইক্রেনে দুর্ভিক্ষের সময়কার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন এ বইয়ে। ব্যবস্থার প্রতি তখন তাঁর অগাধ আস্থা ছিল। সেখানে যৌথ মালিকানা প্রতিষ্ঠার কাজে তিনি সহায়তা করেন।
১৯৪৯ সালের পর ক্রেভচেঙ্কোর ভাগ্যে কী ঘটেছিল, সে কথা বেশি লোকে জানে না। আমেরিকায় ম্যাককার্থির আমলে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে জঘন্য নিপীড়নমূলক এক অভিযানের বিরুদ্ধে আবেগঘন বক্তব্য দেওয়ার সাহস তিনি দেখিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করি, কমিউনিস্ট ও তাদের সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা কমিউনিস্টদের পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহার করতে পারি না, করা উচিতও নয়।’ আমেরিকাবাসীর জন্য তাঁর সতর্কবাণী: এভাবে স্টালিনবাদের বিরুদ্ধ যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত শত্রুপক্ষের সঙ্গে তাদের পার্থক্য ঘুচিয়ে দেবে।
পশ্চিমা দুনিয়ার বৈষম্য তাঁকে দিনে দিনে আচ্ছন্ন করে ফেলতে থাকে। তিনি আই চুজ ফ্রিডম-এর সিক্যুয়েল হিসেবে আই চুজ জাস্টিস নামের আরেকটি বই লেখেন। এই নামটা বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। তিনি একসময় যৌথ মালিকানার কম শোষণমূলক ধরনের খোঁজে নিজেকে আন্তরিকভাবে সম্পৃক্ত করেন। বলিভিয়ার গরিব কৃষকদের সংগঠিত করার চেষ্টায় তাঁর সব অর্থ ঢালেন। ব্যর্থ হয়ে মনোবল ভেঙে পড়ায় সামাজিক পরিসর থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। পরে ১৯৬৬ সালে নিউইয়র্কে নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন।
আজকের এ অবস্থানে আমরা কেমন করে এলাম? বিংশ শতকের কমিউনিজমের আশাভঙ্গ আর একবিংশ শতকের পুঁজিবাদের ঘোর কাটার পর আমরা শুধু নতুন ক্রেভচেঙ্কোদের আশা করতে পারি। তাঁদের শেষটা শুভ হোক, এতটুকুই আশা। ন্যায়বিচারের খোঁজে তাঁদের শুরু করতে হবে ছন্নছাড়া জায়গা থেকেই। তাঁদের মতাদর্শ নিজেদেরই উদ্ভাবন করতে হবে। বিপজ্জনক স্বপ্নবাজ বলে তাঁদের দোষানো হবে, কিন্তু আমরা যে ঘোরের মধ্যে বশীভূত, তা থেকে সবার আগে জেগে উঠবেন তাঁরাই।
নিউ ইয়র্কটাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব।
স্লাভো জিজেক: স্লাভোনিয় দার্শনিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

জলবায়ু সম্মেলন-ভারত ও চীন অভিন্ন কৌশল নিতে আগ্রহী by মুশফিকুর রহমান

অসময়ের বরফ পড়া বেইজিং থেকে চির বসন্তের কুনমিং পৌঁছে রোদ ঝলমল পরিবেশে চমত্কৃত হতে হলো। সিল্ক রুটের প্রবেশপথ কুনমিং থেকে ৮৮ কিলোমিটার দূরে পর্যটন আকর্ষণ ‘স্টোন ফরেস্ট’-এ যেতে পাহাড় ও সমতলের চীনের ইউনান প্রদেশের অনেকটুকু দেখার সুযোগ মেলে। সে দেখায় দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের প্রায় দুই হাজার ৫০০ বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সামান্য দেখা মিললেও নৈসর্গিক সৌন্দর্য ও দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি ও বৈচিত্র্যময় জীবিকার উন্নয়ন স্পষ্ট বোঝা যায়। কুনমিং থেকে ‘স্টোন ফরেস্টের’ ছোট্ট পথ যাত্রায় আমি অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে দুটো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র দেখেছি।
বেইজিংয়ের আলো ঝলমল আধুনিক জীবনের সমৃদ্ধির সঙ্গে প্রাদেশিক রাজধানী কুনমিংয়ের তুলনা অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু চীন তার অর্থনীতির অতি প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত—নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহের বিষয়ে আপসহীন। প্রকৃতি যেহেতু জ্বালানি কয়লার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার চীনকে দিয়েছে, স্বভাবতই তা কাজে লাগাতে কার্পণ্য করেনি সে দেশ। ইতিমধ্যেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কয়লা উত্পাদন ও ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে চীন পরিচিতি পেয়েছে। সেই সঙ্গে সবাইকে ছাড়িয়ে বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রধান ইন্ধন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের অন্যতম প্রধান হওয়ার খেতাবও চীনের গলায়। তবে তা নিয়ে চীনের ভাবনা তার নিজ দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ভাবনার চেয়ে অনেক কম গুরুত্বের।
বিশ্বের অন্যতম জনবহুল নগর বেইজিংয়ের ট্রাফিক শৃঙ্খলাসহ শহরের প্রায় সোয়া দুই কোটি মানুষের উপস্থিতিতে দূষণে দম আটকে আসার মতো পরিস্থিতি কখনোই মনে হয়নি। শহরের গাছপালার সবুজ আচ্ছাদনের পরিপাটি বরং চমত্কৃত করে আমাদের মতো সুস্থ পরিবেশের আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ ঢাকাবাসীকে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে চীন প্রায় দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র তৈরি করছে। বেইজিং, কুনমিং বা অন্যান্য বড় নগর ও উন্নয়নকেন্দ্রের আশপাশে গড়ে ওঠা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো ধোঁয়া কম ছড়াচ্ছে না। তবে এ জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে চীনকে দোষারোপ করার যে প্রকট প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়, চীন তাকে জাতীয় স্বার্থের বিবেচনায় অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে বিবেচনা করছে বলে মনে হয় না।
ইউরোপ, আমেরিকাসহ শিল্পোন্নত বিশ্ব বৈশিক উষ্ণায়নে নিজেদের ঘরের দূষণের দিকে যত তাকায়, তার চেয়ে বেশি নজর দেয় চীন ও ভারতের শিল্পায়ন ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ প্রবণতায়।
তবে পশ্চিমের সবাই বিষয়টি এক দৃষ্টে দেখে তাও ঠিক নয়। বরং চীন ও ভারতের মতো দ্রুত বিকাশমান বৃহত্ অর্থনীতির যে উন্নত হওয়ার সহজাত অধিকার রয়েছে, সেটি বোঝার মানুষও রয়েছে। কারণ তাঁরা জানেন যে বিশ্বে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে আবহাওয়ামণ্ডলে যত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরিত হয়েছে, তার সিংহভাগ দায় শিল্পোন্নত দেশসমূহের। মাথাপ্রতি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের হার বিবেচনায় এখনো চীনের গড়, শিল্পোন্নত ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশ ও যুক্তরাষ্ট্রের এক-ষষ্ঠাংশ। চীন তার বিদ্যুতের চাহিদার ৮০ শতাংশ কয়লা পুড়িয়ে পায়। চীন এখনো উত্পাদন ও অর্থনীতির উন্নয়নকে অব্যাহত রাখতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদনকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য হচ্ছে কেবল এ জন্য নয় যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে তার মাথাব্যথা নেই। বরং দূষণমুক্ত ও শূন্যদূষণের প্রযুক্তি তার পর্যাপ্ত নেই বা তার ব্যয়ভার বহন তার অর্থনীতির জন্য এখনো অপরিপক্ব। সে কারণে চীনকে এখনো তার প্রয়োজনীয় কয়লা উত্তোলনে প্রায় অর্ধকোটি খনি শ্রমিকের জীবন বাজি রাখা উত্পাদননির্ভর থাকতে হয় এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ জন খনি শ্রমিকের জীবনের মূল্যে সারা দেশ আলোকিত রাখার চ্যালেঞ্জ নিতে হয়।
এদিকে ডিসেম্বরের বহুল আলোচিত কোপেনহেগেন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনকে সামনে রেখে আমরা যখন বিশ্ব উষ্ণায়নে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়া দেশ হিসেবে ক্ষতিপূরণ, বিনিয়োগ ও অনুদানের জন্য দাবি তুলতে চেষ্টা করছি; ভারত ও চীন তখন সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়ে এগোতে চাইছে কোপেনহেগেন সম্মেলনে তাদের কৌশল নির্ধারণে। গত ২১ অক্টোবর ভারত ও চীন ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় কোপেনহেগেনের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে সহযোগিতার লক্ষ্যে সমঝোতার স্মারক স্বাক্ষর করেছে।
বিশ্বজুড়ে বেশ জোরেশোরে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে যে ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ ২০১২ সালে ফুরিয়ে গেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে কোপেনহেগেনে। বিশেষত, বিশ্বের উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা হ্রাস করার নতুন টার্গেট নির্ধারণ ও তা অর্জনের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নেওয়া; ইতিমধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে হুমকির মুখে পড়া দেশগুলোর সংকট মোকাবিলার পথ নির্ধারণ করা এ সম্মেলনের অন্যতম আলোচনার বিষয়। এ আলোচনার অংশ হিসেবেই শিল্পোন্নত দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস করতে সুনির্দিষ্ট টার্গেট নির্ধারণ ও চীন-ভারতের দূষণ হ্রাস করার মাত্রা নির্ধারণে সম্মত হওয়ার চেষ্টা করবে। সেই সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নমুখী দেশগুলো কীভাবে তাদের দূষণ হ্রাস ও উন্নয়ন অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে তাও আলোচনার বিষয় হবে। শিল্পোন্নত দেশগুলোকে মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে সুনির্দিষ্ট কী অর্থনৈতিক প্যাকেজ তারা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনে ব্যয় করতে প্রস্তুত।
বলাই বাহুল্য, আলোচনার উপাদানগুলো মোটেই সহজ নয়। বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলো তাদের অর্থনীতির উন্নয়নের সহজাত অধিকার দাবি ছাড়াও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দায় প্রধানত শিল্পোন্নত দেশগুলোর ওপর বর্তায় বলে দাবি করে।
পক্ষান্তরে, শিল্পোন্নত দেশগুলো তাদের দায় ঠেলে দিতে চায় চীন-ভারতসহ অধিকতর জনবহুল উদীয়মান অর্থনীতির দেশ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর দূষণপ্রবণতার দিকে। অনেক ক্ষেত্রে বরং কিয়োটো প্রটোকলের মতো অনেক নমনীয় টার্গেটের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসের চুক্তিকেও সরাসরি অবজ্ঞার প্রবণতা দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ শিল্পোন্নত অনেক দেশ।
এই পটভূমিতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও কোপেনহেগেন সম্মেলনকে সামনে রেখে ভারতের সঙ্গে চীনের যৌথ অবস্থান নেওয়ার সমঝোতা চুক্তি অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। এক অর্থে আমাদের অঞ্চলের জন্য যৌথ কৌশল নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো কোপেনহেগেন বিশ্ব সম্মেলনে যেতে পারলে তা শিল্পোন্নত বিশ্বের ওপর চাপ সৃষ্টি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর দাবি আদায়ে সহায়ক হতে পারে।
নিশ্চিতভাবে চীন, ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো সীমানাহীন বৈশ্বিক আবহাওয়ামণ্ডলীর সুস্থতা নিশ্চিত করার দায় থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে না। বরং কার্যকরভাবে দেশগুলো নিজ দেশের উন্নয়ন, জনগণের জীবনমান সমৃদ্ধ করার অগ্রাধিকারকে চ্যালেঞ্জ না করে, বৈশ্বিক পরিবেশ সুস্থতার চ্যালেঞ্জে শামিল হতে চায়। এ জন্য প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নশীল, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর একক সামর্থ্যের সীমায় তা নেই। তা ছাড়া ঐতিহাসিকভাবে শিল্পোন্নত দেশগুলোর দায়ভার বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও বিশ্ব পরিবেশ বিপন্ন করায় যেহেতু মুখ্য ভূমিকা রেখেছে, সে কারণে সামর্থ্যের নিরিখ ও নৈতিক দায় থেকেও শিল্পোন্নত বিশ্বকে তাই উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে নিজেদের সংযমী হওয়ার অনুকরণীয় উদাহরণ দিয়ে এবং অন্যদের সহায়তা করার বাস্তবানুগ অবস্থান নিশ্চিত করে।
মুশফিকুর রহমান: খনি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিষয়ক লেখক।

সঠিক ব্যবস্থাপনাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ -বৈদেশিক মুদ্রার বড় রিজার্ভ

এটা একটি ভালো খবর যে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রথমবারের মতো এক হাজার কোটি ডলার অতিক্রম করেছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি মাইলফলক। রিজার্ভের এই অবস্থা অর্থনীতির শক্তিমত্তার একটি সূচক হিসেবে পরিগণিত হতে পারে, বিশেষ করে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ইতিবাচক অবস্থা ধরে রাখার ক্ষেত্রে। এর মাধ্যমে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব যে, বাংলাদেশ বিদেশি দেনা পরিশোধের ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে। রিজার্ভের এ অবস্থা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতেও সহায়ক হবে। তারা এটিকে একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবেই দেখবে। আর তাই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রটিও আগের তুলনায় প্রশস্ত হবে।
তবে রিজার্ভের এই শক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার ও এর ব্যবস্থাপনা করা এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রবাসী-আয়ের উচ্চ প্রবাহ রিজার্ভ বাড়ানোয় ভূমিকা রেখেছে। আবার এই প্রবাসী-আয়ই দেশে মুদ্রা সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে বাজারে টাকা ছাড়তে হয়। সুতরাং, এই মুদ্রা সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমদানি ব্যয় কমে যাওয়াও রিজার্ভ বাড়ার অন্যতম কারণ। এখন দেশের অভ্যন্তরে চাহিদা কমে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় কমেছে। বিশেষ করে সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কোনোই গতি সঞ্চার করতে পারছে না। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগেও তেমন গতি নেই। ফলে ব্যাংকগুলোতেও অলস অর্থের পাহাড় জমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ যেন বেগবান হয়, সেদিকে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মানে বিদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্তি যেন নিরাপদ ও ভালো হয়, সেদিকে নজর দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন। গতানুগতিকভাবে শুধু আমেরিকার ট্রেজারি বন্ডই কেনা হবে, নাকি আরও কিছু উত্স খোঁজা হবে, সেটা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ রিজার্ভ থেকে কিছু অংশ বিনিয়োগ করার পদক্ষেপ নিয়েছে। এটি উদ্ভাবনীমূলক হলেও সতর্ক থাকা দরকার।
বস্তুত, বড় অঙ্কের রিজার্ভ বাংলাদেশের মতো ছোট দেশগুলোর জন্য মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিরাট স্বস্তিদায়ক। তবে এই স্বস্তি নিয়ে বসে থাকলেই চলবে না, এর থেকে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়ার পদক্ষেপ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকেই নিতে হবে। রিজার্ভ ধরে রেখে আরও বাড়ানোর চেষ্টা যেমন অব্যাহত রাখতে হবে, তেমনি অর্থনীতি যেন গতিশীল হয়ে ওঠে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।