Wednesday, September 24, 2025

রংপুরের তারাগঞ্জ: আলুর দামে ধস, সরকারি দর ২২, কৃষক পান ৫ টাকা by রহিদুল মিয়া

হিমাগারে প্রতি কেজি আলুর দাম ১২ টাকা হলেও হিমাগারভাড়া বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে আসছে মাত্র ৫ টাকার কিছু বেশি।

আলুর দামে ধস নামায় ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন রংপুরের তারাগঞ্জে কৃষকেরা। হিমাগার পর্যায়ে উৎপাদন খরচ ২৯ থেকে ৩০ টাকা হলেও আলু বিক্রি করে কৃষকেরা হাতে পাচ্ছেন মাত্র ৫ টাকা। অথচ ২৭ আগস্ট হিমাগার পর্যায়ে আলুর কেজি ২২ টাকা বেঁধে দেয় সরকার। কিন্তু এ দামে হিমাগারে কেউ আলু কিনছেন না।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার মৌসুমে তারাগঞ্জে ৪ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। তিনটি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে ১৬ হাজার মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত হিমাগার থেকে আলু বের হয়েছে সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন। অথচ গত বছর এ সময় তিন ভাগের দুই ভাগ আলু বের করা হয়েছিল।

ইকরচালীর বড় আলুচাষি ইকবাল হোসেন বলেন, ‘হিমাগারে জায়গা না পেয়ে গোডাউনে, ঘরে আলু সংরক্ষণ করেছি। তা পচে যাওয়ায় ট্রাকে ট্রাকে সড়কের ধারে ফেলেছি। হিমাগারে যে আলু আছে, দাম না থাকলে ছেড়ে আসতে হবে।’

চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে আলু উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ২০ থেকে ২২ টাকা। বস্তা, গাড়িভাড়া, শ্রমিকের খরচ, হিমাগারে সংরক্ষণ খরচসহ এ খরচ দাঁড়াচ্ছে কেজিপ্রতি ২৯ থেকে ৩০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাজারে আলুর দাম প্রতি কেজি ১২ টাকা। হিমাগারে প্রতি কেজি আলুর দাম ১২ টাকা হলেও হিমাগারভাড়া বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে আসছে মাত্র ৫ টাকার কিছু বেশি। ফলে সরকারি ক্রয় দর ২২ টাকা আর বাস্তবে কৃষকের প্রাপ্তি ৫ টাকার মধ্যে বিশাল বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এতে হিমাগার পর্যায়ে কেজিতে কৃষকের ১৮ টাকা লোকসান থাকছে।

গত শুক্রবার তারাগঞ্জের তিনটি হিমাগার ঘুরে দেখা গেছে, প্রকারভেদে প্রতি কেজি আলু সাড়ে ১০ থেকে ১২ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। চাহিদা না থাকায় তেমন কর্মব্যস্ততা দেখা যায়নি। হিমাগারের শেডগুলো অধিকাংশ ফাঁকা। সিনহা হিমাগারে কথা হয় বামনদীঘি গ্রামের কৃষক সোনা মিয়ার সঙ্গে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তিন একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। জমিতে তাঁর উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ২০ টাকা পড়েছে। মৌসুমের শুরুতে ১৪ টাকা কেজি হওয়ায় লোকসানের ভয়ে আলু হিমাগারে রেখেছেন। সরকার ২২ টাকা দাম বেঁধে দিলেও, সেই দামে কেউ আলু নেন না।

তারাগঞ্জের প্রামাণিকপাড়ার কৃষক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়ছে ২০ টাকা, বস্তা, গাড়িভাড়া, হিমাগারভাড়াসহ ৩০ টাকা। অথচ বাজারে পাচ্ছি ১২ টাকা। হিমাগারের খরচ বাদ দিয়ে হাতে আসে ৫ টাকা। এভাবে লোকসান হলে কৃষকেরা আলু চাষ ছেড়ে তামাক চাষে ঝুঁকবেন।’

সিনহা হিমাগারের ব্যবস্থাপক দুলাল হোসেন বলেন, ‘হিমাগারের আলু সংরক্ষিত আছে১ লাখ ৫১ হাজার বস্তা। এই সময়ে গত বছর তিন ভাগের বেশি আলু বের হয়েছিল। এবার আজ পর্যন্ত মাত্র ২৮ হাজার বস্তা আলু বের হয়েছে। আলুর অবস্থা খুবই ভয়াবহ।’

তারাগঞ্জের এন এম হিমাগারের ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘১৫ ডিসেম্বরে মধ্যে হিমাগারের সব আলু বের হয়ে যায়। কিন্তু এবার যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হয় না আলু সব বের হবে। ২ লাখ ৬০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা থাকলেও এ পর্যন্ত আলু বের হয়েছে মাত্র ৪৫ হাজার বস্তা।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বলেন, সরকারিভাবে রংপুরে আলু কেনা হলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন। আগামী মৌসুমে আলুর চাষ কমবে। কৃষকেরা যাতে পরিকল্পিতভাবে আলু চাষ করেন, তা নিয়ে মাঠে কাজ করছেন, যাতে কৃষকেরা লোকসানে না পড়েন।

আলুর দাম না থাকায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। ক্রেতা না পাওয়ায় হিমাগারের বারান্দায় এভাবে ফেলে রাখা হয়েছে আলু। গতকাল তারাগঞ্জের এন এন হিমাগারে
আলুর দাম না থাকায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। ক্রেতা না পাওয়ায় হিমাগারের বারান্দায় এভাবে ফেলে রাখা হয়েছে আলু। গত ১৯ সেপ্টেম্বর তারাগঞ্জের এন এন হিমাগারে। ছবি: প্রথম আলো

আরও অনিয়ন্ত্রিত অস্ত্র চুক্তিতে চোখ নেতানিয়াহুর

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বেশিরভাগ বক্তব্যই দেন সচেতনভাবে। তাই তার সাম্প্রতিক ‘স্পার্টা ভাষণ’ ও তথাকথিত সাবমেরিন কেলেঙ্কারির তদন্তে নিযুক্ত গ্রুনিস কমিটির কাজের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে দেখা জরুরি। এ কেলেঙ্কারিতে প্রধানমন্ত্রী ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের সাবমেরিন ও অন্যান্য নৌযান কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ খবর দিয়ে অনলাইন হারেৎজ আরও লিখেছে, নেতানিয়াহু তার ‘স্পার্টা ভাষণে’ প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দূর করা, আইনি আপত্তিকে উপেক্ষা করা এবং দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেন। উদ্দেশ্য ইসরাইল নিরাপত্তার জন্য বিদেশি নির্ভরতা যাতে কমাতে পারে। তিনি সেইসব পদক্ষেপকেও যৌক্তিক প্রমাণ করতে চান, যেগুলো এখন গ্রুনিস কমিটির পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

গত সপ্তাহে খুব বেশি সংবাদ কাভারেজ ছাড়াই কমিটি ১৫ মাস আগে যেসব সতর্কবার্তা দিয়েছিল তার বিস্তারিত প্রকাশ করে। সেই সতর্কবার্তা পাঠানো হয় পাঁচজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে। এর মধ্যে ছিলেন নেতানিয়াহু ও ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এবং পরে মোসাদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ইয়োসি কোহেন। কমিটি বিস্তারিত জানায়, কীভাবে সাবমেরিন কেলেঙ্কারির একাধিক দিক সামনে এসেছিল- যেটি প্রথম প্রকাশ করেন সাংবাদিক রবিভ ড্রুকার ২০১৬ সালের শেষ দিকে। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এই বিষয়গুলো শিরোনামে আধিপত্য বিস্তার করতে পারত এবং হয়তো গণবিক্ষোভও ছড়িয়ে পড়ত। কমিটি নির্ধারণ করে নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভা ও নিরাপত্তা মন্ত্রিসভাকে বিভ্রান্ত করেন। ফলে তারা জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়। কমিটির মতে, নেতানিয়াহু ও কোহেন বৈঠকগুলো রেকর্ড না করার চেষ্টা করেন এবং নির্বাচিতভাবে মন্ত্রীদের আংশিক তথ্য দেন। নেতানিয়াহুকে পাঠানো সতর্কবার্তায় বলা হয় তিনি ‘জাতীয় নিরাপত্তাকে বিপদগ্রস্ত করেছেন এবং ইসরাইলের পররাষ্ট্র সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন।’ যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ের অন্যায্যতা এবং জিম্মিদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার প্রেক্ষাপটে এগুলো হয়তো তুচ্ছ মনে হতে পারে, কিন্তু আসলে তা নয়। কমিটি কয়েক বিলিয়ন ইউরোর অস্ত্র চুক্তিতে গুরুতর অনিয়ম ও গোপন উদ্দেশ্যের সন্দেহ প্রকাশ করে। যুদ্ধের শুরুতে সেনাবাহিনীর ব্যর্থতা বিবেচনায় সরকার অতিরিক্ত বহু বিলিয়ন শেকেল অনুমোদন করেছে, যার বেশিরভাগই অস্ত্র কেনার জন্য ব্যয় হবে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে প্রায় কোনো ধরনের তদারকি ছাড়াই, অচলাবস্থায় থাকা সরকার ও নেসেটের মাধ্যমে।

তাই নেতানিয়াহু যখন ‘প্রতিবন্ধকতা দূর করার’ কথা বলেন, অর্থনৈতিক ও ব্যবস্থাপনা ভাষার আড়ালে তার আসল পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়: নতুন অস্ত্র চুক্তির বিপুল সুযোগ তৈরি করা- যার ওপর কোনো কার্যকর তদারকি থাকবে না; বেসরকারি স্বার্থ অগ্রসরের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি হবে। গ্রুনিস কমিটি সতর্ক করেছে, কিন্তু এই সতর্কবার্তা হয়তো কোলাহলের ভিড়ে চাপা পড়ে যাবে।

এ সপ্তাহে সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তারা আরেকটি আর্থিক রায়ের সঙ্গে লড়ছিলেন- জানুয়ারি থেকে কেরিয়ার অফিসারদের পেনশন বৃদ্ধি বন্ধ করার সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত। প্রায় নয় বছর আগে রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষক যে মহা পেনশন ডাকাতি প্রকাশ করে, সেটিই এখন বন্ধ হলো। প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয় যে আইডিএফ চিফস অফ স্টাফ ও নিরাপত্তা সংস্থার সমকক্ষরা অবসরপ্রাপ্তদের গড়ে ১৪.৮ শতাংশ বেশি ভাতা দিয়েছিলেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে গোপন রাখা হয়েছিল। তৎকালীন চিফ গাদি আইজেনকট কিছুটা কমালেও প্রথাটি চলতেই থাকে। ছয় বছরের বিলম্ব শেষে আদালত রায় দেয় যে সরকার ও নেসেটের হাতে এটি সমাধানের জন্য তিন মাস সময় আছে।
ফলাফল হিসেবে শত শত অফিসার এই বছরের শেষের আগে অবসর নেয়ার ইচ্ছা জানিয়েছে। তারা আশঙ্কা করছে অবসর সুবিধা খর্ব হতে পারে এবং সরকার দ্রুত সমাধান দেবে না। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চাপের কারণে সেনাবাহিনীতে ব্যাপক হারে জনবল সংকট দেখা দিয়েছে।

তবু নতুন ‘স্পার্টা’র নেতাদের এতে উদ্বেগ নেই। তারা সমাজের ক্ষুদ্র অংশের উচ্চ প্রেরণার ওপর নির্ভর করছেন এবং ধর্মীয় দলগুলোর সেনা এড়ানোর সুযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছেন।
সাংবাদিক আসেনহাইমের সাম্প্রতিক ধারাবাহিক তুলে ধরেছে ইসরাইলের স্থলবাহিনীর দশকের অবনতির ধারাবাহিকতা, যা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ভয়াবহ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) গাই হাজুত তার বইয়ে (দ্য হাই-টেক আর্মি অ্যান্ড দ্য ক্যাভালরি আর্মি) পূর্বাভাস দিয়েছিলেন এই পতনের। ৭ অক্টোবর সীমান্তে নিয়োজিত তরুণ সেনাদের দুর্বলতার পেছনে মূল কারণ ছিল গোয়েন্দা বিভাগ ও শিন বেতের ভয়াবহ ব্যর্থতা। চিফ অফ স্টাফ এয়াল জামির স্বীকার করেছেন, এটাই গণহত্যার সুযোগ তৈরি করেছিল।

https://mzamin.com/uploads/news/main/180950_Abul-2-1.webp

জাতিসংঘ ফিলিস্তিন সম্মেলন: কেন যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্সকে আক্রমণ করছে, সৌদি আরবের বিষয়ে নীরব

মিডল ইস্ট আইঃ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ‘দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান’ (ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংকটের) কার্যকর করা বিষয়ে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের উদ্যোগে আয়োজিত জাতিসংঘ শীর্ষ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র খুশি নয়। ওয়াশিংটন এটি স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও শীর্ষ কর্মকর্তা এ নিয়ে কিছু লুকোননি। তাঁরা নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনের সমালোচনা করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্মেলনকে আগে ‘প্রতীকী’ ও ‘ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাতের ওপর কোনো প্রভাব নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি বলেছিলেন, এটি হামাসকে ‘সাহস জোগানোর’ একটি পদক্ষেপ।

ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি আরও খানিকটা এগিয়ে সম্মেলনকে ‘ঘৃণ্য’ আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন, সহ-আয়োজক ফ্রান্সকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য ‘ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা’ (ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সমুদ্রসৈকত এলাকা) ত্যাগ করতে হবে।

যেখানে ট্রাম্প প্রশাসন ফ্রান্সকে ব্যঙ্গ করাসহ সম্মেলনের সমালোচনায় জোরালো ও শক্ত ভাষা ব্যবহার করতে দ্বিধা করেনি; সেখানে সৌদি আরবের সহ-আয়োজক হওয়ার সিদ্ধান্তে উল্লেখযোগ্যভাবে নীরব থেকেছে তারা।

কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা মিডল ইস্ট আইকে বলেছেন, ফ্রান্সকে আক্রমণ করে সৌদি আরবকে ছাড় দেওয়ার এ দ্ব্যর্থহীন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি রিয়াদের ক্ষমতাকেই প্রতিফলিত করে। এর পেছনে রয়েছে সৌদি আরবের আর্থিক শক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সম্পর্ক সম্প্রসারণের ক্ষমতা।

কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক বাদের আল-সাইফ বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন নীরবে দেখিয়েছে যে, তারা ফিলিস্তিন বিষয়ে তাদের ঘনিষ্ঠ আরব মিত্রদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে চায় না।

‘ফ্রান্স কি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে’, প্রশ্ন তোলেন সাইফ। বলেন, ‘গালফভুক্ত দেশগুলোর প্রকৃত প্রভাব তাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি, আর এটি এমন প্রভাব, যা ট্রাম্প সহজে বোঝেন।’

গতকাল সোমবার জাতিসংঘের শীর্ষ সম্মেলনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর বক্তব্যে উপস্থিত নেতারা দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানান। ফ্রান্স সম্মেলনে একটি উচ্চপর্যায়ের অবস্থান নিয়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান উপস্থিত না হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান তাঁর পক্ষে বক্তব্য দেন।

গত মে মাসে ট্রাম্প সৌদি আরবে এক ঐতিহাসিক সফর করেন। সফরে তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন যে তাঁর প্রশাসন বৈদেশিক সংঘাতে কম হস্তক্ষেপ করবে। সফরের সময় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০ বিলিয়ন (৬০ হাজার কোটি) ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সফরে ট্রাম্পের দেওয়া ভাষণ ও সৌদি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির প্রভাব মিশ্র—কিছু ভালো ফল হয়েছে, কিছু হয়নি।

রিয়াদের চাপের কারণে ট্রাম্প ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা বন্ধ করেছেন। হুতিরা এখনো ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে। একইভাবে, ট্রাম্প সিরিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছেন।

কিন্তু মূল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাম্প তাঁর ভাষণ অনুযায়ী কাজ করেননি। তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের সময় তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ করেন, যদিও দ্রুতই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছেন। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি হত্যাকাণ্ডেও নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছেন; যা জাতিসংঘ, ইতিহাসবিদ ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা জাতিগত হত্যা বলে উল্লেখ করেছেন।

এদিকে সৌদি আরব–যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষের মধ্যে ১৪২ বিলিয়ন (১৪ হাজার ২০০ কোটি) ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হওয়ার পর থেকে কোনো বড় অস্ত্র বিক্রয়ের প্রকাশ্যে ঘোষণা আসেনি। সৌদি আরব এআই চিপের বড় ক্রেতা হতে চলেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত এ–সংক্রান্ত চুক্তির কোনো প্রকাশ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।

‘সৌদি আরবকে পাশে রাখা’

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা নিয়ে আলোচনার সময় ট্রাম্প বিশেষভাবে আক্রমণাত্মক বা কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ৭ অক্টোবর ২০২৩ ইসরায়েলে হামাসের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন। এটি ‘জাতিহত্যা, সম্ভবত’। ইসরায়েল গাজায় জাতিহত্যা চালাচ্ছে—সম্প্রতি জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্তে বিষয়টি (ইসরায়েলে হামাসের হামলা) এড়িয়ে গেছে।

কিন্তু সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘোষণা—ইসরায়েল গণহত্যা করছে। এ বিষয়ে ট্রাম্প নীরব।

‘যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নীতি এসেছে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে (ইউরোপ ও গালফের দেশগুলোর বিষয়ে)’, বলেন ওয়াশিংটনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ গ্রেগরি গস।

গ্রেগরি বলেন, ট্রাম্প প্রথমেই জার্মানি বা ফ্রান্সকে নেতিবাচকভাবে দেখেন। কিন্তু গালফের দেশগুলো তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করে ও ইউরোপের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

ট্রাম্পের আশা, জাতিসংঘে তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, কাতার ও সৌদি আরবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গাজার বিষয়ে আলোচনা করবেন তিনি; যদিও অনেক নেতাই এ সময় ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকবেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্রান্সের সমালোচনা করা ট্রাম্পের দূতদের জন্য সহজ, কারণ এতে ঝুঁকি কম। বিপরীতে, গুরুত্বপূর্ণ গালফ মিত্র সৌদি আরবের সমালোচনা করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন। কারণ, মিত্রদেশটির জনগণ গাজায় ইসরায়েলি বর্বরতা নিয়ে রেগে আছেন।

ফ্রান্স ন্যাটোর সদস্য হওয়ায় তারা চায়, যুক্তরাষ্ট্র জোটে সক্রিয় থাকুক এবং এজন্য দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট প্যারিস। কিন্তু সৌদি আরব ন্যাটোর অংশ নয়, তাই তাদের ওপর এমন চাপ নেই। ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আবার, সিরিয়া, লেবানন ও ইরানের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসন যুক্তরাষ্ট্র মেনে নেওয়ায় গালফের দেশগুলো উদ্বিগ্ন।

গত সপ্তাহে সৌদি আরব পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। এ ছাড়া চীনের সহায়তায় নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনও শুরু করেছে রিয়াদ।

গ্রেগরি গস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান–সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিকে আমলে নিয়েছে। সেই সঙ্গে সৌদি আরবকে পাশে রাখার চেষ্টা করছে তারা। কারণ, অনেকেরই ধারণা, পাকিস্তানের মাধ্যমে চীন ওই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। এ অবস্থায় ফ্রান্স যদি ন্যাটো ছেড়েও যায়, তাতে কারও মাথাব্যথা নেই।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-23%2Fxfp4d0bz%2FSaudi-Arabia%E2%80%9301.webp?rect=77%2C0%2C1182%2C788&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত আরব–ইসলামিক জরুরি সম্মেলনে অংশ নেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

ট্রাম্পের সঙ্গে মুসলিম নেতাদের বৈঠক: আলোচনায় গাজা সংকট ও ইসরাইলের প্রত্যাহার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কয়েকটি মুসলিম দেশের নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ছাড়াও অংশ নেন তুরস্ক, কাতার, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের প্রতিনিধিরা। আলোচনার কেন্দ্র ছিল গাজা যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি। এ খবর দিয়ে অনলাইন জিও নিউজ বলছে, ৫০ মিনিটের এই বৈঠকে মুসলিম নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকে ‘একটি বড় সম্মান’ বলে আখ্যায়িত করেন ট্রাম্প। তিনি তাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বলেন, আপনারা দারুণ কাজ করছেন, যা প্রশংসার যোগ্য। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান বৈঠককে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেন। ন্যাটো সদস্য তুরস্ক ইতিমধ্যেই গাজায় ইসরাইলের হামলাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছে। দেশটির সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ করেছে এবং যুদ্ধবিরতি ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

বৈঠকের পর নিউইয়র্কে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, একটি যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করা হবে এবং তিনি বৈঠকের ফলাফল নিয়ে খুশি। তবে বিস্তারিত কিছু জানাননি। অন্যান্য মুসলিম নেতারা গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। পরে ট্রাম্প বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন এবং সাংবাদিকদের জানান, গাজা যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে পারে। তিনি বলেন, আমরা এমন কিছু শেষ করতে যাচ্ছি, যা আমরা শুরু করিনি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের মতে, ট্রাম্প গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার ও যুদ্ধপরবর্তী শাসনব্যবস্থার পরিকল্পনা তুলে ধরেন, যেখানে হামাসের কোনো ভূমিকা থাকবে না। ওয়াশিংটন চাইছে আরব ও মুসলিম দেশগুলো সেনা পাঠিয়ে ইসরাইলের প্রত্যাহার নিশ্চিত করবে এবং পুনর্গঠন ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার জন্য অর্থায়ন করবে।

অ্যাক্সিওস জানায়, এই পরিকল্পনা ইসরাইল তৈরি করেনি। তবে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে এর বিস্তারিত জানানো হয়েছে। পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও ইসরাইল বারবার জানিয়েছে এটি তারা সহ্য করবে না। গাজায় ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্বব্যাপী নিন্দা চলছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৬৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি নেতানিয়াহুর সরকার গাজা নগরীতে স্থল অভিযানের সূচনা করেছে, যেখানে যুদ্ধবিরতির কোনো লক্ষণ নেই। তবুও ওয়াশিংটন ইসরাইলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবেই রয়ে গেছে।

সোমবার নিউইয়র্কে ফ্রান্স ও সৌদি আরবের উদ্যোগে আয়োজিত সম্মেলন বর্জন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। তবে ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সদস্যপদ পেতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো ক্ষমতা আছে এবং দেশটি নিয়মিতভাবে ইসরাইল-বিরোধী প্রস্তাব আটকে দেয়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদে বলেন, দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সবচেয়ে স্পষ্ট পথ হলো ইসরাইল ও একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, টেকসই এবং সংলগ্ন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। তিনি এই মুহূর্তকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

mzamin

ট্রাম্প উঠতেই জাতিসংঘের চলন্ত সিঁড়ি থেমে গেল, কে করল এ কাজ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে চলন্ত সিঁড়িতে পা রাখামাত্রই সেটি থেমে যায়। পরে জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প এ প্রসঙ্গ তুলে হাসিঠাট্টাও করেন।

কেন হঠাৎই চলন্ত সিঁড়িটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা খতিয়ে দেখতে গিয়ে জাতিসংঘ বলছে, তারা সম্ভবত এ রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে পেরেছে। তাদের ধারণা, ট্রাম্পের ভিডিওগ্রাফারের কারণেই এমনটি হয়েছে। তিনি সম্ভবত ভুল করে সেফটি ফাংশন সচল করে ফেলেছিলেন।

গতকাল ট্রাম্প জাতিসংঘে যে শুধু চলন্ত সিঁড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন, তা নয়; এদিন তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় টেলিপ্রম্পটারটিও (বক্তব্যের লিখিত রূপ ভেসে ওঠার স্ক্রিন) কাজ করছিল না। এমন অবস্থায় ট্রাম্প এসব বিভ্রাট নিয়ে ঠাট্টাচ্ছলে অভিযোগ করেন।

১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘জাতিসংঘ থেকে আমি দুটি জিনিস পেয়েছি—একটি খারাপ চলন্ত সিঁড়ি এবং একটি খারাপ টেলিপ্রম্পটার।’ ট্রাম্পের এ কথায় সেখানে উপস্থিত বিশ্বনেতাদের অনেকে হেসে ওঠেন।

তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এ ঘটনাকে অতটা হালকাভাবে নেননি। ঘটনার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডি চলন্ত সিঁড়িতে ওঠার সময় জাতিসংঘের কেউ যদি সচেতনভাবে এটি থামিয়ে দেয়, তবে তাকে সঙ্গে সঙ্গে বরখাস্ত এবং তার বিরুদ্ধে তদন্ত করা উচিত।’

জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেছেন, ওই চলন্ত সিঁড়ির কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরণব্যবস্থা পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, সিঁড়িটির ওপরের অংশের কম্ব স্টেপে যুক্ত থাকা নিরাপত্তাব্যবস্থা সচল হয়ে গিয়েছিল। আর এতেই সিঁড়িটি বন্ধ হয়ে যায়।

ডুজারিক বলেন, ট্রাম্পের ভিডিওগ্রাফার প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার আগমনের মুহূর্ত ভিডিও করতে উল্টোমুখী হয়ে চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দিকে যাচ্ছিলেন।

ডুজারিক এক বিবৃতিতে বলেন, ‘সম্ভবত ভিডিওগ্রাফার ভুল করে চলন্ত সিঁড়ির সেফটি ফাংশন সচল করে ফেলেছিলেন।

জাতিসংঘের মুখপাত্র আরও বলেন, সেফটি ফাংশনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন কোনো মানুষ বা বস্তু দুর্ঘটনাক্রমে চলন্ত সিঁড়ির যন্ত্রাংশে আটকা না পড়ে।

জাতিসংঘের এমন বক্তব্যের বিষয়ে হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

টেলিপ্রম্পটারের প্রসঙ্গে ট্রাম্প গতকাল সাধারণ পরিষদকে বলেন, ‘আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, যিনি এই টেলিপ্রম্পটার চালাচ্ছেন, তিনি বড় সমস্যার মধ্যে আছেন।’

তবে জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা বলেছেন, হোয়াইট হাউস তাদের নিজস্ব টেলিপ্রম্পটার ব্যবহার করেছিল।

ট্রাম্পের বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্ট আনালেনা বেয়ারবক বলেন, ‘জাতিসংঘের টেলিপ্রম্পটার ঠিকঠাক কাজ করছে।’

সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে জাতিসংঘের চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প
সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে জাতিসংঘের চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

না, লেনদেনে ট্রাম্প ভরসা করার মতো লোক নন by রিচার্ড কে শারউইন

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য কমিশনার মারোশ শেফচোভিচ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর মধ্যে হওয়া একটি বাণিজ্যচুক্তির কথা বলেছেন। এই চুক্তি অনুযায়ী, ইউরোপীয় রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক বসাবে। এর বদলে ইউরোপ আগামী তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭৫০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি কিনবে এবং আরও ৬০০ বিলিয়ন ডলার সেখানে বিনিয়োগ করবে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যদিও তার পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি। শেফচোভিচ এ চুক্তিকে বলছেন, ‘এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো চুক্তি ছিল।’ কিন্তু আসলেই কি এটা সবচেয়ে ভালো চুক্তি ছিল? ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর শুধু বিদেশি বাণিজ্য অংশীদারেরাই নন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, আইন প্রতিষ্ঠান, এমনকি সংবাদমাধ্যমও ভাবছে, ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করা মানে কি কেবল শক্তির খেলায় নামা, নাকি এর ফলে আমরা আইনকে অবহেলা করা এক নতুন স্বাভাবিক বাস্তবতায় ঢুকে পড়ছি?’

এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আইনের শাসন না থাকলে কোনো চুক্তিকেই আমরা ‘সর্বোত্তম’ বলতে পারি না। বাজার যেটা চায়, সেটা হলো স্থিতিশীলতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা, যা আসে আইনের শাসন থেকে। আইন না থাকলে সবকিছু হয়ে দাঁড়ায় জোরজবরদস্তি আর লোকদেখানো নাটক। একটা ভালো চুক্তির জন্য দরকার দুটি বিষয়—একটি হলো সত্যিকারের সদিচ্ছা; আরেকটি হলো এমন নিয়মকানুন, যা নির্ভরযোগ্যভাবে কার্যকর করা যায় এবং একতরফাভাবে পরিবর্তন করা যায় না।

এবার ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প আগের চেয়ে বেশি বেপরোয়া ও ‘স্বাধীন’ হয়েছেন। তাঁর ওপর আইনের নিয়ন্ত্রণ কার্যত উঠে গেছে। এর একটি উদাহরণ হলো দেশের সবচেয়ে বড় আইনজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তাঁর ‘চুক্তি’। এখন পর্যন্ত নয়টি বড় আইনপ্রতিষ্ঠান এমন চাপে পড়েছে যে তারা ট্রাম্পপন্থী কাজে ৯৪০ মিলিয়ন ডলারের বিনা পারিশ্রমিক আইনি সহায়তা দিতে রাজি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল—তাদের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল করা হবে, সরকারিভাবে চুক্তি থেকে বাদ দেওয়া হবে, এমনকি ফেডারেল কোর্টেও ঢুকতে দেওয়া হবে না। যদিও চারটি প্রতিষ্ঠান ট্রাম্পের এসব নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং আদালতে জয় পায়।

তাহলে প্রশ্ন আসে, দেশের সেরা আইনজীবীরা কেন এমন চাপের কাছে নতিস্বীকার করলেন? এর কারণ হলো আইনজীবীরা বুঝেছেন, এখন আর কেবল আইনের পক্ষে থাকলেই নিরাপদ থাকা যায় না। ট্রাম্প প্রশাসন পুরো আইন প্রয়োগব্যবস্থাকে নিজের ইচ্ছার অধীন নিয়ে এসেছে। প্রেসিডেন্ট চাইলে যেকোনো সময় যেকোনোভাবে তাঁদের শাস্তি দিতে পারেন। আইনের কোনো সুরক্ষা আর নেই। এখানেই মূল সমস্যা। যারা একচ্ছত্র ক্ষমতা চায়, তারা কোনো নিয়ম মানে না।

দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসেই ট্রাম্প ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তিনি ব্যবহার করেন ১৭৯৮ সালের এলিয়েন এনিমিস অ্যাক্ট। এই আইন কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন যুদ্ধ বা বিদেশি আগ্রাসনের মতো পরিস্থিতি ঘটে। কিন্তু ট্রাম্প এই আইন ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলার একটি মাদক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার করেন। এই যুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো দেশের নাগরিককে (যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন বা মাদক পাচারের উৎস) টার্গেট করা সম্ভব।

ট্রাম্পের আরেকটি নির্বাহী আদেশ যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার বাতিল করে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী বলছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এবং এখানকার আইনের আওতায় থাকা প্রত্যেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।’ এ পরিস্থিতিতে কেউ যদি ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ‘আপনি আসলে কোন ভিত্তিতে এই চুক্তিকে টেকসই বলে মনে করছেন?’

এই সংকটে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বড় বিশ্ববিদ্যালয়ও। ট্রাম্প প্রশাসন তাদের হুমকি দিয়েছে, বিলিয়ন ডলারের সরকারি অনুদান বন্ধ করে দেবে, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর-ছাড়ের সুবিধাও বাতিল করবে। এখন তারা ভাবছে, ট্রাম্পকে খুশি রাখতে কি চুক্তি করে ফেলবে, নাকি একজোট হয়ে বলবে, ‘আমরা এই অন্যায় শর্ত মেনে নেব না?’ যে চুক্তি যেকোনো সময় একতরফাভাবে বাতিল বা পরিবর্তন করা যায়, সেই চুক্তি আসলে ফাঁকা বুলি। এটি আত্মপ্রবঞ্চনা, স্বার্থের মুখোশ।

* রিচার্ড কে শারউইন, নিউইয়র্ক ল স্কুলের আইন বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেন। রয়টার্স

আলোর নিচে অন্ধকার: দুবাইয়ের গ্ল্যামার পাড়ায় যৌন ব্যবসা

দুবাইয়ের সবচেয়ে ঝলমলে এলাকাগুলোর আড়ালে চলে অন্য এক ব্যবসা। সেখানে আদিম নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে ধনীরা। তাদের মনোরঞ্জনের জন্য নারীদের ব্যবহার করে একটি চক্র। তারা বিভিন্ন নারীকে প্রলুব্ধ করে অথবা উঁচু পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সেখানে খদ্দেরের মন রক্ষা করে। এমনই এক যৌন কারবারি চক্রের মূল হোতাকে শনাক্ত করেছে বিবিসির অনুসন্ধান। তিনি চার্লস মুসেগওয়া। নিজেকে লন্ডনের সাবেক বাসচালক হিসেবে পরিচয় দেন। বিবিসির ছদ্মবেশধারী রিপোর্টারকে বলেন, তিনি এক রাতের জন্য কমপক্ষে ১০০০ ডলারের (৭৪০ পাউন্ড) বিনিময়ে নারী সরবরাহ করতে পারেন। তার দাবি, এসব নারী গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ‘প্রায় সবকিছুই’ করতে রাজি। বছরের পর বছর ধরে দুবাইয়ের বন্য সেক্স পার্টির গুজব শোনা যাচ্ছিল। টিকটকে এ বিষয়ের একটি হ্যাশট্যাগ ইতিমধ্যেই ৪৫ কোটি বারের বেশি দেখা হয়েছে। সেখানে নানা কৌতুক, প্যারোডি এবং অতিরঞ্জিত রিপোর্ট ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ করা হয়, অর্থলোভী কিছু প্রভাবশালী নারী নিজেদের জীবনযাত্রা চালাতে চরম মাত্রার যৌন অনুরোধ মেনে নেন।

কিন্তু বিবিসির ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের অনুসন্ধান বলছে, বাস্তবতা আরও ভয়ংকর। উগান্ডার তরুণীরা জানান, তারা ভেবেছিলেন দুবাই গিয়ে সুপারমার্কেট বা হোটেলে কাজ করবেন। কিন্তু মুসেগওয়ার নেটওয়ার্কে আটকা পড়ে বাধ্য হন যৌনকর্মে। মিয়া ছদ্মনামের এক যুবতী জানান, এক গ্রাহক নিয়মিতভাবে নারীদের উপর মলত্যাগ করার দাবি করতো। তিনি বলেন, মুসেগওয়ার চক্রে পড়ার পর তাকে ঋণের ফাঁদে ফেলা হয়। আগমনের পর জানানো হয় তিনি ২০০০ পাউন্ড ঋণী। দুই সপ্তাহের মধ্যে সেটি দ্বিগুণ হয়ে যায়- ভিসা, বিমান টিকিট, থাকা ও খাবারের নামে।

মোনিক কারুঙ্গি নামের এক তরুণী পশ্চিম উগান্ডা থেকে দুবাই যান। কিছুদিনের মধ্যেই মুসেগওয়ার কাছে ২৭০০০ ডলারের বেশি ঋণে জড়িয়ে পড়েন। তার পরিবার জানায়, তিনি কান্না ভেজা ভয়েস নোট পাঠাতেন। মোনিক ও কায়লা বিরুঙ্গি নামের আরও এক উগান্ডান তরুণীর রহস্যজনক মৃত্যু হয় দুবাইয়ের উঁচু ভবন থেকে পড়ে। যদিও পুলিশ এটিকে আত্মহত্যা বলেছে, পরিবারের দাবি সঠিক তদন্ত হয়নি। মোনিকের আত্মীয় মাইকেল জানান, তিনি যখন ঘটনাস্থলে যান, দেখেন অ্যাপার্টমেন্টে মাদক, যৌনকর্ম আর চার্লস মুসেগওয়া নিজেই নারীদের সঙ্গে বিছানায়। তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইলে মুসেগওয়া বলেন, আমি ২৫ বছর ধরে দুবাইয়ে আছি। দুবাই আমার। তুমি আমাকে রিপোর্ট করতে পারবে না।

আমি-ই দূতাবাস। মিয়া ও কিয়েরা উভয়েই নিরপেক্ষভাবে এই বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ট্রয় নামের একজন আগে মুসেগওয়ার নেটওয়ার্কে কাজ করতেন। তিনি জানান মুসেগওয়া নাইট ক্লাবগুলোর নিরাপত্তা কর্মীদের ঘুষ দিতেন, যাতে তার নারীরা সেখানে প্রবেশ করে গ্রাহক খুঁজতে পারে। মুসেগওয়া নিজেকে আড়ালে রাখতে অন্যদের নামে অ্যাপার্টমেন্ট ও গাড়ি ভাড়া নিতেন। ফলে কোনো কাগজপত্রে তার নাম থাকত না।

মোনিকের স্বপ্ন ও করুণ পরিণতি:
মোনিক একসময় নতুন চাকরি পেয়ে খুশি হন। ভাবেন, যৌন ব্যবসা থেকে মুক্তি পাবেন। কিন্তু ২০২২ সালের মে মাসে তিনি নতুন অ্যাপার্টমেন্ট থেকে পড়ে মারা যান। তার দেহ কখনো পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়নি। ধারণা করা হয়, দুবাইয়ের আল কুসাইস কবরস্থানের ‘দ্য আননোন’ অংশে অজ্ঞাত কবরেই শায়িত আছেন তিনি।

উগান্ডায় বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে কাজ করতে যাওয়া বিশাল শিল্পে পরিণত হয়েছে, যা বছরে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার কর রাজস্ব এনে দেয় দেশটিতে। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভয়ঙ্কর শোষণ। মানবাধিকারকর্মী মারিয়াম মুইজা জানান, তিনি উপসাগর অঞ্চল থেকে কমপক্ষে ৭০০ নারীকে উদ্ধার করেছেন। তার ভাষায়, মানুষকে বলা হয় সুপারমার্কেটে চাকরি দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে যৌনকর্মী হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়।

মুসেগওয়ার বক্তব্য:
সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চার্লস ‘অ্যাবি’ মুসেগওয়া। তার দাবি, আমি শুধু পার্টি আয়োজন করি। বড় খরচকারী লোকজন টেবিলে আসে, মেয়েরা স্বেচ্ছায় আসে। আমি কোনো অবৈধ ব্যবসা চালাই না। তিনি আরও দাবি করেন, মোনিক ও কায়লার মৃত্যু যথাযথভাবে পুলিশ তদন্ত করেছে এবং তিনি তাদের মৃত্যুর সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তবে বিবিসি আল বারশা পুলিশ স্টেশনে কেস ফাইল দেখতে চাইলে কোনো সাড়া মেলেনি।

mzamin

ভারত ও পাকিস্তান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন খেলা by আব্বাস নাসির

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের দৃশ্যত উন্নতি এবং ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অবনতি নিয়ে পাকিস্তানে ব্যাপক উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু উদ্দীপনার পাটাতন কি যথেষ্ট শক্তিশালী এবং সেটি কত দিন টিকবে? কিছু বিশ্লেষক এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের এই পরিবর্তনকে ‘জোটের পুনর্বিন্যাস’ এবং ‘দিক পরিবর্তন’ বলতে শুরু করেছেন। কিন্তু এই জোটের ‘পুনর্বিন্যাস’ অর্থ যদি হয় চীনের কাছ থেকে পাকিস্তানের সরে আসা, তাহলে আমার মনে হয়, এই বিশ্লেষকেরা সম্ভবত ঠিক বলছেন না।

এর কারণ হলো, চীন পাকিস্তানের জন্য নির্ভরযোগ্য অংশীদার ও মিত্র। পাকিস্তান অনেক জায়গায় অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ পাকিস্তান।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ক্রমে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকার দিল্লিতে ক্ষমতায় রয়েছে। তারা অব্যাহতভাবে তাদের সাম্প্রদায়িক সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব উসকে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ঠেকাতে হলে পারমাণবিক প্রতিরোধী ব্যবস্থার সঙ্গে সামরিক সরঞ্জামও প্রয়োজন।

এটা বলতেই হবে যে পাকিস্তানের জন্য কিছু সুযোগ এসেছে, যেটা জিরো সাম গেমের বা একজন জিতলে আরেকজন হারবে, এমন খেলার অংশ নয়। যুক্তরাষ্ট্র যেমন পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে তার সম্পর্ককে ‘হয় আমার পক্ষে, না হয় আমার বিরুদ্ধে’ এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেখে, চীন এ রকমভাবে দেখে না; বরং চীনের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও বাস্তববাদী। এর কারণ হলো চীন এখন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বাণিজ্যকে মূল মনোযোগের কেন্দ্রে রেখেছে।

পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো প্রায়ই চীনের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মানবাধিকার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে; কিন্তু চীন মাত্র ৪০ বছরের মধ্যে কীভাবে ৮০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনল, এ বিষয়টিতে তারা নীরব থাকে। আমরা এখন দেখছি যে গাজায় যে জাতিগত নির্মূল যজ্ঞ চলছে, তাতে প্রায় সমগ্র পশ্চিমা ‘গণতন্ত্র’ ইসরায়েলের দুষ্কর্মের দোসর হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।

এখনকার বাস্তবতায় দুটি বিষয় পাকিস্তানের পক্ষে গেছে। প্রথমত, ইসলামাবাদ সঠিকভাবে ট্রাম্পের আত্মমুগ্ধতাকে গুরুত্ব দিয়েছে। ট্রাম্পের নাম শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে। ২০২১ সালের আগস্টে কাবুল বিমানবন্দরের ‘অ্যাবি গেট’ বোমা হামলার একজন অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ করেছে। এতে ‘কঠোর নেতা’ হিসেবে ট্রাম্পের ভাবমূর্তি শক্তিশালী হয়েছে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন তড়িঘড়ি করে কাবুল ত্যাগ করছিল, তখন ওই হামলায় ১৩ জন মার্কিন সেনা এবং ২০০ আফগান নিহত হয়েছিলেন।

এরপর গত বছরের মে মাসে ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে একটি সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত যখন পাকিস্তানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষকে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানায়। মার্কিন সূত্র জানায়, ইসলামাবাদ দ্রুত ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানায় এবং আত্মমুগ্ধ নেতা ট্রাম্পকে একটি ‘জয়’ উপহার দেয়। ট্রাম্প নিজেকে শান্তির দূত হিসেবে উপস্থাপন করতে কখনো ক্লান্ত হন না। এ ঘটনায় তাঁর অহং ব্যাপকভাবে তৃপ্ত করেছিল।

অন্যদিকে মনে করা হয় যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এমন দুটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যা ট্রাম্পকে রাগিয়ে তোলে। প্রথমটি হলো, ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারে ছিলেন, তখন মোদি তাঁর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় ট্রাম্পের সঙ্গে একটি বৈঠক বাতিল করেছিলেন। এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে ট্রাম্পের যে বিশাল অহংবোধ তাতে নিশ্চিতভাবেই আঘাত করবে।

ভারতের জন্য আরেকটি অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটে মে মাসে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের সময়। সংঘাত যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায় তার জন্য মার্কিন নেতারা টেলিফোনে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশ হোয়াইট হাউসকে জানায়, তারা উত্তেজনা প্রশমন করবে; কিন্তু ভারত থামেনি।

বরং যুদ্ধে লজ্জাজনকভাবে যুদ্ধবিমান হারানোর (এরপর দুই দিন ভারত তাদের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমান ঘাঁটিতে নিরাপদে রাখে) প্রতিশোধ হিসেবে তারা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পাকিস্তানও পাল্টা জবাব দেয়। ১০ মে ভোররাতে পাকিস্তানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে জানান যে ভারত যে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে, সেটি উত্তেজনা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিপজ্জনক পদক্ষেপ। আর পাকিস্তান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই সংযম দেখিয়েছে।

ধারণা করা হয় যে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হওয়ার কারণ হলো ট্রাম্প মনে করেছেন ভারত মুখে এক কথা বললেও উল্টোটা করে আমেরিকাকে অবজ্ঞা করেছে। যদিও ভারত শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সাড়া দেয় এবং ট্রাম্প একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিতে সক্ষম হন; কিন্তু ততক্ষণে পারস্পরিক সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

এ ঘটনাক্রম যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক অবনতি ঘটিয়ে থাকতে পারে; কিন্তু এটা ভাবা শিশুতোষ হবে যে বিশ্বশক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এ রকম ছোটখাটো ইস্যুর (সেখানে কোনো নেতার আত্মঅহমিকার প্রশ্নটি যতই জড়িত থাকুক না কেন) ওপর নির্ভর করে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের প্রধান উত্তেজনার উৎস হলো ভারতের ব্রিকসের সদস্যপদ। এই জোটে রাশিয়া, চীন, ব্রাজিল, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ কয়েকটি ছোট দেশ মিলে একটি বাণিজ্যিক ব্লক গঠন করেছে। ব্রিকস একটি নতুন মুদ্রা চালুর চিন্তা করছে, যার মাধ্যমে মার্কিন ডলার ছাড়াই বাণিজ্য করা যাবে। যদি এমনটি বাস্তবে ঘটে, তাহলে ডলারের প্রাধান্য হ্রাস পাবে এবং বিশ্ব মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে একটি বিকল্প লেনদেনের পদ্ধতি পাবে। নতুন এই মুদ্রাকে অনেকে অবশ্যম্ভাবী বলে মনে করলেও যুক্তরাষ্ট্র এই বিষয়কে সহ্য করতে পারছে না।

চীনকে মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সামনে ঠেলে দিচ্ছে। ভারত এখন কোয়াডেরও সদস্য। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এই জোটের অন্য দুই সদস্য হলো অস্ট্রেলিয়া ও জাপান। এ কারণেই ব্রিকসে ভারতের সদস্যপদকে এশিয়ায় পশ্চিমা কৌশলগত কাঠামোর সঙ্গে অসাঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে; কিন্তু ভারতকে এখন এক পক্ষ বেছে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।

সুতরাং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতকে নিয়ে ট্রাম্পের উপহাস এবং নতুন শুল্ক, এ সবকিছুর পেছনে ভারতে পথে আনার প্রচেষ্টা রয়েছে। বাস্তবে সেটি যদি ঘটে, তাহলে পাকিস্তানের উচ্ছ্বাস স্বল্পায়ু হবে; আর যদি না করে তাহলে আমরা মুষ্টিযুদ্ধ খেলায় একেবারে প্রথম সারির দর্শক হয়ে থাকব।

* আব্বাস নাসির, দ্য ডন পত্রিকার সাবেক সম্পাদক
- দ্য ডন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে

 ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এমন দুটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যা ট্রাম্পকে রাগিয়ে তোলে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এমন দুটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যা ট্রাম্পকে রাগিয়ে তোলে। ছবি : রয়টার্স