Sunday, September 20, 2026
অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্তকে নিয়ে ভুক্তভোগীর ক্ষোভ: ‘চোর তুহিন থেকে খুনি তুহিন’ by এম হাসান
তার অভিযোগ, রাজনৈতিক দলের এক প্রভাবশালী নেতার হাত থাকায় অতীতে একাধিক অভিযোগ সত্ত্বেও পুলিশ তুহিনের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
শনিবার ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে আসাদ উল্লাহ সোহাগ জানান, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি তুহিনের প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন। তাকে একই কৌশলে ডেকে নিয়ে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি হাতিয়ে নেয় তুহিন।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে আসাদ উল্লাহ সোহাগ তার পোস্টে লেখেন, সেদিন আমাকে কৌশলে ডেকে এনে আমার বাইকটি নিয়ে যায় তুহিন। এ ঘটনায় মামলা করতে যখন আমি কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় যাই, তখন পুলিশ মামলা না নিয়ে কেবল একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করেছিল।
তিনি পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে লেখেন, তুহিনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে থানা পুলিশ আমাদের জানিয়েছিল, তার মাথার ওপর একটি রাজনৈতিক দলের বড় নেতার হাত রয়েছে। তাই তাকে যেন কিছু না করা হয়—এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল। সেদিন আমি চুপ ছিলাম, কিন্তু আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি—দেশের পুলিশের শুধু পোশাকই পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্র বদলায়নি! অর্থ ছাড়া এই দেশে সহজ বিচারে সুবিচার পাওয়া যায় না।
মোটরসাইকেল খোয়ানোর চেয়ে সামাজিক অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়াকে দায়ী করে তিনি আরও লেখেন, আমার বাইকটি চুরির বিষয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু ছোট ছোট অপরাধের সঠিক বিচার না হলে অপরাধীরা পরবর্তী সময়ে কত বড় ও ভয়ানক অপরাধ ঘটানোর সাহস পায়, তা আজকের এই ঘটনা প্রমাণ করে। সেদিন যেসব নেতা ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তাকে আইন ও বিচার থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, আজকে তারা তাকে কীভাবে বাঁচাবেন?
উল্লেখ্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত তিনজনকে আটক করেছে। আটককৃতদের মধ্যে এই তুহিন অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

সোয়া হাতের জুতার গল্প, ২০০ বছরের কুঠিবাড়িতে যত রহস্য
স্থানীয়দের মুখে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় কুঠিবাড়ির ‘সোয়া হাতের জুতা’র গল্প। কথিত আছে, খাজনা বকেয়া রাখা কিংবা অপরাধের অভিযোগে প্রজাদের শাস্তি দিতে সোয়া হাত মাপের একজোড়া জুতা ব্যবহার করা হতো। ওই জুতা দিয়ে অপরাধী প্রজাদের পেটানো হতো বলে স্থানীয়দের দাবি। তবে এ বিষয়ে কোনো লিখিত দলিল পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আঠারো শতকের গোড়ার দিকে ইংরেজ জমিদার এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার এখানে কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। সাপলেজায় আসার পর স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তি ফরাজউল্লাহ তাকে জমি উপহার দেন বলে প্রচলিত আছে। পরে সেখানে ক্যাসপারের জমিদারি বিস্তৃত হয়।
একসময় পৌষ মাসের শেষদিকে এই কুঠিবাড়িতে আয়োজন করা হতো পুণ্যাহ উৎসব। খাজনা আদায়ের পাশাপাশি উৎসবে জাদু প্রদর্শনী, লোকগান, যাত্রাপালা ও নিমাই সন্ন্যাস পালার আয়োজন করা হতো। এসব দেখতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের সমাগম ঘটত।
কুঠিবাড়ির মূল ভবনটি ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত। চৌকোণাকৃতির ১৮টি খিলানের ওপর নির্মিত ভবনটি দোতলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর সঙ্গে ছিল আরও কয়েকটি স্থাপনা এবং বড় একটি পুকুর। স্থানীয়দের দাবি, ভবনের ওপরের তলায় ক্যাসপারের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী ও তৈজসপত্র সংরক্ষিত থাকত।
কুঠিবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘শিলারগঞ্জ’ নামটিও। স্থানীয়দের ভাষ্য, ব্রিটিশ আমলের জমিদার শিলার সাহেবের নাম থেকেই এলাকার নাম হয়েছিল শিলারগঞ্জ। তার ছেলে এডওয়ার্ড প্যারি ক্যাসপার এখানে কুঠিবাড়ি নির্মাণ করেন। পরে এলাকার নাম সাপলেজা হলেও ডাকঘরের নাম পরিবর্তন হয়নি। এখনো ‘শিলারগঞ্জ পোস্ট অফিস’ নামটি চালু রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কুঠিবাড়িতে নায়েব ও পাইক-পেয়াদাদের থাকার জন্য আলাদা ভবন ছিল। একটি দ্বিতল ভবনের নিচতলায় অফিসে বসে খাজনা আদায় ও বিচারকার্য পরিচালনা করা হতো। ক্যাসপারের একটি বড় বোটও ছিল বলে জানান তারা। শীত মৌসুমে তৎকালীন চন্দ্রদ্বীপ, বর্তমান বরিশাল, থেকে তিনি ওই বোটে করে কুঠিবাড়িতে আসতেন বলে প্রচলিত আছে।
শীতকালে থাকার উপযোগী রাখতে ভবনটি উষ্ণ রাখার বিশেষ ব্যবস্থাও ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। তাদের ভাষ্য, মূল ভবনের নিচের চার কোণে কয়লার আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা ছিল।
তবে কুঠিবাড়ির ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত লিখিত তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। ফলে ক্যাসপারের ব্যক্তিজীবন, তার জমিদারি পরিচালনা এবং কুঠিবাড়ি নির্মাণের নানা বিষয় এখনো অনেকটাই অজানা। স্থানীয়দের কাছে থাকা ক্যাসপারের ব্যবহৃত দুটি তরবারিসহ বেশ কিছু পুরোনো তৈজসপত্রও এখন আর দেখা যায় না।
বর্তমানে কুঠিবাড়ির তিনটি ভবনই সংস্কারের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পুকুরের শানবাঁধানো ঘাটও হারিয়েছে আগের জৌলুশ। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে ক্ষয়ের চিহ্ন। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে স্থাপনাটির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি মালিকানায় গেলেও ঐতিহাসিক এই স্থাপনা সংরক্ষণে এখনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অল্প কিছু বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল। তা দিয়ে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বরাদ্দ পাওয়া গেলে আরও ভালোভাবে সংস্কার করা হবে, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসতে পারেন।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কুঠিবাড়িটি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি মঠবাড়িয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে এর ইতিহাস অনুসন্ধান, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ ও যথাযথ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তা না হলে অযত্নে হারিয়ে যেতে পারে দুই শতকের পুরোনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা গল্প ও স্মৃতি।
![]() |
| ২০০ বছরের পুরোনো কুঠিবাড়ি। ছবি: কালবেলা |
Saturday, September 19, 2026
পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বর্তমান বাস্তবতা by মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.)
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি প্রধান সশস্ত্র বিদ্রোহের অবসান ঘটিয়ে অস্ত্রধারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি করে। চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি অথবা শক্তিশালী করা হয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন, কারণ এর মাধ্যমে সশস্ত্র সংঘাতের পরিবর্তে রাজনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও শান্তির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এখনো নিশ্চিত হয়নি। ভূমির মালিকানা, স্থানীয় পরিষদের ক্ষমতা ও নির্বাচন, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্র ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে বিরোধ রয়ে গেছে। অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন গড়ে উঠেছে। জনসংহতি সমিতির ভাঙনের পাশাপাশি ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট—ইউপিডিএফ এবং এর বিভিন্ন অংশ নিজেদের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র কাঠামো তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবানের কিছু এলাকায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টÑকেএনএফ এবং এর সশস্ত্র শাখার উত্থান নতুন নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংক ডাকাতি, অপহরণ, অস্ত্র লুট ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলায় কেএনএফের কথিত সংশ্লিষ্টতা দেখিয়েছে যে সীমিত ভৌগোলিক এলাকায় সক্রিয় একটি সংগঠনও জাতীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা-সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
চাঁদাবাজি, অপহরণ, গোষ্ঠীগত হত্যাকাণ্ড এবং অবৈধ কর আদায়ের কারণে ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, ঠিকাদার ও সাধারণ গ্রামবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন সংগঠন বিশেষ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করলেও তাদের সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সেই জনগোষ্ঠীর মানুষেরই স্বাধীন রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, জীবিকা ও নিরাপত্তাকে সংকুচিত করে। অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে মতামত দিতে বা গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মিয়ানমারের সংঘাত এ পরিস্থিতিতে আরো বিপজ্জনক মাত্রা যোগ করেছে। রাখাইন ও চীন রাজ্যে যুদ্ধ, আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান শক্তি, জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি এবং অবাধ অস্ত্রপ্রবাহ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তকে একটি অস্থিতিশীল রণসীমায় পরিণত করছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্গম বনাঞ্চল, পাহাড়ি পথ এবং বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারে বিস্তৃত জাতিগত এবং পারিবারিক যোগাযোগকে কাজে লাগাতে পারে। মাদক—বিশেষ করে ইয়াবা ও মেথামফেটামিনÑছোট অস্ত্র, চোরাই পণ্য এবং মানব পাচারের পথগুলোও অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি স্থানীয় ঘটনা খুব দ্রুত আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা-সংকটে রূপ নিতে পারে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতাকে বিদেশি শক্তি বা স্বার্থান্বেষী মহল কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ এলাকা, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য যোগাযোগ করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত। আন্তর্জাতিক অধিকার সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গোয়েন্দা সংস্থা, আন্তঃসীমান্ত জাতিগত নেটওয়ার্ক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী—সব পক্ষেরই এ অঞ্চলের ঘটনাবলির প্রতি আগ্রহ থাকতে পারে। এর কিছু মানবিক সহায়তা বা মানবাধিকারের বৈধ উদ্বেগ থেকে পরিচালিত হতে পারে; আবার কিছু তৎপরতার উদ্দেশ্য হতে পারে স্থানীয় সংগঠনকে প্রভাবিত করা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে কাজে লাগানো অথবা ঢাকাকে কূটনৈতিক চাপে রাখা। তবে সরকারকে প্রমাণিত বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অনুমাননির্ভর অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। বিদেশি অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণ কিংবা নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ গোয়েন্দা তথ্য, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। প্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। পাহাড়ি জনগণের প্রতিটি দাবি বা অভিযোগকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করলে নাগরিকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বাড়বে এবং প্রকৃত বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ আরো প্রসারিত হবে। আবার সব নিরাপত্তা-আশঙ্কাকে প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেওয়াও বিপজ্জনক। প্রয়োজন পেশাদার প্রতিগোয়েন্দা তৎপরতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং স্বচ্ছ তদন্ত।
অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ অমীমাংসিত থাকলেই বিদেশি পক্ষগুলো তা কাজে লাগানোর সুযোগ পায়। ভূমিবিরোধ, দুর্নীতি, দুর্বল স্থানীয় শাসন, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এবং সংস্কৃতি অবজ্ঞার ধারণা সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সদস্য সংগ্রহের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কিংবা নির্যাতনের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত না হলে সেসব ঘটনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই বিদেশি প্রভাব মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু গোপনীয়তা বা শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা প্রত্যেক নাগরিককে সমানভাবে সুরক্ষা দেয়। সশস্ত্র গোষ্ঠী যখন সড়ক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা আদায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখায়, তখন সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে আলোচনায় অংশ নিতে পারে না।
এ কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ও কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে সীমান্ত নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা, অস্ত্র ও মাদকের পথ বন্ধ এবং সশস্ত্র ঘাঁটি নির্মাণ প্রতিরোধ করতে হবে। অভিযান হতে হবে গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর, লক্ষ্যভিত্তিক ও আইনের সীমার মধ্যে। সামষ্টিক শাস্তি, নির্বিচার আটক কিংবা কোনো সম্প্রদায়কে হয়রানি করা অন্যায় এবং কৌশলগতভাবেও ক্ষতিকর। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের পাশাপাশি সেখানে নিয়োজিত সদস্যদের স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি, মানবাধিকার ও সংঘাত-সংবেদনশীলতা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সরকারকে একটি স্থায়ী জাতীয় সমন্বয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা, স্থানীয় পরিষদ এবং সব সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকবেন। এই কাঠামো সশস্ত্র সংগঠন, সীমান্তপথ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অর্থায়ন, ভূমিবিরোধ এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা সম্পর্কে সমন্বিত মূল্যায়ন করবে। সীমান্ত নজরদারিতে আধুনিক প্রযুক্তি, ড্রোন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও দ্রুত চলাচলের সক্ষমতা দরকার; তবে প্রযুক্তি কখনো মানব গোয়েন্দা তথ্য এবং জনগণের আস্থার বিকল্প হতে পারে না। শান্তিচুক্তির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করে সরকারকে প্রকাশ করতে হবেÑকোনগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনগুলো অসম্পূর্ণ এবং কোনগুলোতে আইনগত ব্যাখ্যা বা সংশোধন প্রয়োজন। এরপর একটি সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন-রোডম্যাপ প্রণয়ন করা উচিত। গ্রহণযোগ্য ভোটার তালিকার ভিত্তিতে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন প্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। ভূমি কমিশনকে পর্যাপ্ত জনবল, অর্থ, কার্যকর বিধিমালা, আধুনিক জরিপ, ডিজিটাল রেকর্ড এবং ভুয়া দাবি প্রতিরোধের ক্ষমতা দিতে হবে। ভূমিবিরোধের সমাধান জাতিগত উত্তেজনা বা শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়; আইন, দলিল, ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে।
সরকার, শান্তিচুক্তির স্বাক্ষরকারী পক্ষ, চুক্তিবহির্ভূত রাজনৈতিক সংগঠন, নারী, যুবক, প্রথাগত নেতা, বাঙালি অধিবাসী এবং তুলনামূলক ছোট পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নতুন সংলাপ শুরু করা প্রয়োজন। তবে সংলাপের অর্থ সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া নয়। যেসব সশস্ত্র সংগঠন সহিংসতা ত্যাগ, অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ এবং সংবিধান মেনে শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে অংশ নিতে রাজি হবে, তাদের জন্য যাচাইযোগ্য পুনর্বাসনের পথ রাখা যেতে পারে। যারা হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কিন্তু আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। উন্নয়নকে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু সড়ক ও পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করলেই শান্তি আসবে না, যদি স্থানীয়রা বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কায় থাকে কিংবা উন্নয়নের সুফল না পায়। বাংলা, ইংরেজি ও উপযুক্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা, দুর্গম এলাকায় আবাসিক বিদ্যালয়, বৃত্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, টেলিমেডিসিন, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। পাহাড় কাটা, বন উজাড় ও অপরিকল্পিত পর্যটন জীবিকা ধ্বংস এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার এবং মিয়ানমার সীমান্তের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি, যাতে কোনো সশস্ত্র সংগঠন প্রতিবেশী ভূখণ্ডকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। সহযোগিতার ক্ষেত্র হবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র পাচার এবং অপরাধীদের প্রত্যর্পণ। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের নীতিনির্ধারিত হবে ঢাকায় এবং ওই অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে।
সরকারকে দুটি বিপজ্জনক ধারণা পরিহার করতে হবে—একটি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা; অন্যটি হলো, নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো প্রয়োজন নেই এবং শুধু ছাড় দিয়েই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। টেকসই শান্তির জন্য রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও ন্যায়বিচার—উভয়ই দরকার। বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে সীমান্ত ও ভূখণ্ড রক্ষা, সশস্ত্র গোষ্ঠী নিরস্ত্রীকরণ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিহত করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ অভিযোগের সমাধান, সমান নাগরিক মর্যাদা, বাস্তবসম্মত অঙ্গীকার পূরণ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে কখনো আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বা সরকারের ওপর স্থায়ী চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না। পাহাড়ের মানুষ বাংলাদেশেরই নাগরিক; তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমৃদ্ধি দেশের সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে রাষ্ট্র সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে শক্তিশালী, আইন মানতে সংযত এবং মানুষের অভিযোগ সমাধানে আত্মবিশ্বাসীÑসেই রাষ্ট্রই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে শান্তি, যোগাযোগ ও সমৃদ্ধির সেতুতে রূপান্তর করতে পারবে।
hrmrokan@hotmail.com

Wednesday, September 16, 2026
যে প্রকল্পে বদলে গেল ওদের জীবন by রোকনুজ্জামান পিয়াস
জানা যায়, করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৫ লাখ কর্মী চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরত আসেন। এসব প্রত্যাগত কর্মী তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাব-অনটনে নিদারুণ কষ্টে দিনানিপাত করছিলেন। এ সময় তাদের কর্মক্ষম করে তোলার জন্য গ্রহণ করা হয় বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় রিইন্টিগ্রেশন কর্মসূচি। নানা প্রক্রিয়া শেষে ২০২৩ সালের জুলাইয়ে যাত্রা শুরু হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় রিইন্টিগ্রেশন প্রকল্পের। বস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডকে।
২০২৩ সালে ৩০শে জুলাই মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। মেয়াদ ধরা হয় ২০২৬ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত। প্রাথমিকভাবে ৪২৭ কেটি ৩০ লাখ ৩৫ হাজার টাকার এ প্রকল্পে ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে শেষমেশ বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫১৮ কোটি ৩০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে ২ কোটি ৩০ লাখ ৩৫০০০ টাকা সরকারের তহবিল থেকে এবং অবশিষ্ট ৫১৬ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংক সহজশর্তে ঋণ দেয়। প্রকল্পের মাধ্যমে উদ্যোক্তা, আত্মকর্মসংস্থান, পুনরায় বিদেশ গমন এবং চাকরি প্রাপ্তিতে প্রকল্প থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। সারা দেশে বিদেশফেরত কর্মীদের সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি ২৭টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এতে করে কর্মীরা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে হতে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তাসহ তাদের কাঙ্খিত সেবা সহজেই পায়। একটি রেফারেল সিস্টেমের মাধ্যমে এসব সেবা প্রদান করা হয়। এছাড়া নিবন্ধিত সেবাগ্রহীতা কর্মী ও তার পরিবারের সদস্যরা স্বনামধন্য হাসপাতাল থেকে স্বল্প খরচে চিকিৎসা পাচ্ছেন।
সূত্রমতে, ৩৫টি জেলায় স্থাপিত ‘প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার’-এর মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব সেন্টারের মাধ্যমে কাউন্সেলিং ও পরামর্শ নিয়ে প্রত্যাগত অসহায় অভিবাসী কর্মীরা নানাখাতে সম্পৃক্ত হয়ে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে গ্রোসারি শপ, কাপড়ের ব্যবসা, ড্রাইভিং, পোলট্রি, ডেইরি, ছাগল ও গরু পালন, বিফ ক্যাটারিং, ফলের বাগান, বাণিজ্যিক কৃষি ও মৎস্য চাষ ইত্যাদি। এছাড়া মেশন, টেইলারিং অ্যান্ড ড্রেস মেকিং, ইলেকট্রিশিয়ান, কন্সট্রাকশন, কার্পেন্টার, পেইন্টার, ওয়েলডিং, গোল্ড স্মিথ, রড বাইন্ডিং, মোবাইল সার্ভিসিং, টাইলস ফিটিং, ইন্ডাস্ট্র্রিয়াল, অটো মেকানিক, কাটিং মাস্টার, প্লাম্বার, সেলুন, ইলেকট্রিক, ফার্নিচার, কনফেকশনারি, স্যানিটারি, গার্মেন্টস পণ্য, ফর্মেসি, হার্ডওয়্যার, জুতা, অটো পার্টস, থাই গ্লাস, রাইস মিল, মিষ্টি, স্টেশনারি, হোটেল, চায়ের দোকান, ভেজিটবল, ফলসহ নানা ধরনের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। শুধু ব্যবসা নয়, প্রকল্পের মাধ্যমে বেসরকারি চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন ৫ হাজারেরও বেশিসংখ্যক কর্মী। প্রকল্প থেকে উপকারভোগীদের অনেকে ফ্রিল্যান্সিং, শিক্ষক, বাবুর্চি, ইমাম, মুয়াজ্জিন, শেফ, গ্রাম্য চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ারসহ নানা পেশা বা কাজে যুক্ত হয়েছেন। তথ্য বলছে, রেইজ প্রকল্পটিকে বিশ্বব্যাংক অন্যান্য দেশের জন্য রোল মডেল হিসেবে দেখছে। তাদের নিজস্ব সমীক্ষায় এটিকে সবচেয়ে ভালো প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি এ প্রকল্পকে বিশ্বব্যাংকের মর্যাদাপূর্ণ ‘বিশ্বব্যাংক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ এ ভূষিত করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক, ড. এটিএম মাহাবুব-উল করিম বলেন, আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ বেকার কর্মীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া অতিরিক্ত ৫৩০০০ ফেরত প্রবাসীকে উপকারভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি আরও ২০ হাজার জনকে দক্ষতা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। ৩৫টি প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার স্থাপন করে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সারা দেশে কর্মীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পেরেছি। ভবিষ্যত নিয়ে হতাশ হয়ে যাওয়া এসব কর্মীরা এখন স্বাবলম্বী হয়ে পরিবার নিয়ে ভালো আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র প্রকল্প হিসেবে ‘রেইজ প্রকল্প’ বিশ্বব্যাংকের এওয়ার্ড পেয়েছে। যা জাতি হিসেবে গর্বের। প্রকল্পটি অব্যাহত থাকলে আরও বিদেশফেরত কর্মীরা জীবিকা অর্জনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বেকারত্বের অভিশাপমুক্ত হবে লাখও কর্মী।

Friday, September 11, 2026
বিহারের বন্যা সামলাতে ফারাক্কা ব্যারেজের সব গেট খোলা, প্লাবিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ভারতের বিহার রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতেই ফারাক্কার সব গেট খুলে দেওয়া হয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, ফারাক্কা ব্যারেজের সব গেট খুলে দেওয়ার ফলে ভাটির দিকে অর্থাৎ বাংলাদেশের অভিমুখে প্রচুর পরিমাণে পানি ছাড়া হচ্ছে।
এর ফলে বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা নদীর পানি বিপৎসীমার ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিতে জেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত ৩ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে। এছাড়া ৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে এবং সাড়ে ৫৬ হেক্টরের বেশি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানায়, গত ৭ থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিনে পদ্মায় ৪৪ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। শুক্রবার সকাল ৯টায় পাঙ্খা গেজ স্টেশনে পদ্মার পানি রেকর্ড করা হয় ২১.৭৬ মিটার, যা বিপৎসীমার (২২.০৫ মিটার) মাত্র ২৯ সেন্টিমিটার নিচে।
একই দিনে মহানন্দা নদীর খালঘাট পয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয় ১৯.৪৩ মিটার (বিপৎসীমা ২০.৫৫ মিটার) এবং পুনর্ভবা নদীর রহনপুর পয়েন্টে ১৯.৪৬ মিটার (বিপৎসীমা ২১.৫৫ মিটার)। পাউবো জানিয়েছে, তিনটি নদীতেই পানি বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত রয়েছে।
নদীগুলোর পানি বাড়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ২টি ও শিবগঞ্জ উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের চরাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নে ১ হাজার ও আলাতুলি ইউনিয়নে ৫০০ পরিবার এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নে ১ হাজার, উজিরপুর ইউনিয়নে ২৫০ ও দুর্লভপুর ইউনিয়নে ২৫০টি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
পাঁকা ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম বলেন, চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। ঘরবাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। গবাদিপশু আর ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আমরা খুব বিপদের মধ্যে আছি।
পাঁকা এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন,ওই এলাকা থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দুরে ফারাক্কা ব্যারেজের অবস্থান। পর্যায়ক্রমে ১০৯টি গেট খুলে দেয়ায় বন্যার সৃষ্টি হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলায়।
পাকা ইনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক বলেন,ফারাক্কা ব্যারেজের সবগুলো গেট খুলে দেয়ায় চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে চরাঞ্চলের ইউনিয়নগুলো। যে হারে পানি বাড়ছে,অব্যাহত থাকলে ক্ষতিগ্রস্থ্য হবে হাজার হাজার মানুষ। মাঠেই ডুবে নষ্ট হবে কৃষকের মাঠের ধান।
তিনি আরও বলেন,তাঁর ইউনিয়নের ৬-৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে এবং অন্তত সাড়ে তিনশ পরিবারের বাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। আপাতত পানি বৃদ্ধি স্থগিত থাকলেও সামনে বন্যা বড় রূপ নিতে পারে বলে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
শিবগঞ্জ উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ ও নির্দেশনা পেলেই দুর্গতদের মাঝে সহায়তা কার্যক্রম শুরু করা হবে।
বন্যার কারণে সদর উপজেলার ২টি ও শিবগঞ্জ উপজেলার ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় সেগুলোতে সাময়িক পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রাজ্জাক।
অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতিকুল ইসলাম জানান, জেলার ৫টি উপজেলায় ৫৬.৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩১.৫ হেক্টর মাসকলাই, ১৪.২ হেক্টর শাকসবজি, ৪ হেক্টর রোপা আমন, ৩.৪ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলাসহ আউশ ধান ও হলুদ রয়েছে।

দাফন নাকি দাহ, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা–বাবার টানাটানিতে হিমঘরে লাশ
হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা শুভকে ইসলামি রীতিতে দাফন করতে চান মা, স্ত্রী ও ভাই। কিন্তু বাবা চান হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্য করতে। শুভর মৃত্যুর পরপরই মা ও স্ত্রী দাফন করতে চাইলে বাধা দেন বাবা। দাফন কিংবা দাহকাজ নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে স্ত্রীর পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার ইসলামি রীতিতে দাফনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী প্রথম আলোকে বলেন, দাফন নিয়ে মা ও বাবার মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে রাখা হয়েছে। মা ও ভাই উচ্চ আদালতে আবেদন করলে ইসলামি রীতিতে লাশ দাফনের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুভর মা পার্বতী রানী দাস ও বাবা হরি চন্দ্র দাসের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ২০০৩ সালে তিন সন্তানকে (দুই ছেলে ও এক মেয়ে) নিয়ে পার্বতী রানী হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর তাঁর নাম হয় আয়েশা বেগম। দুই ছেলের নামও পরিবর্তন করা হয়। শুভর নতুন নাম রাখা হয় মো. বিল্লাল এবং তাঁর ছোট ভাই সুজনের নাম হয় ইব্রাহিম। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) শুভ চন্দ্র দাস নাম পরিবর্তন করা হয়নি।
শুভর ভাই ইব্রাহিম প্রথম আলোকে বলেন, ধর্মান্তরের পর থেকেই তাঁরা মুসলিম পরিচয়ে জীবনযাপন করে আসছেন। ছোটবেলায় শুভ মাদ্রাসায় পড়েছেন। এখন বাবা হিন্দুধর্মের অনুসারী দাবি করে মরদেহ দাফনে বাধা দিচ্ছেন।
শুভ মুসলিম পরিচয়েই বড় হয়েছেন বলে দাবি পরিবারের। প্রায় আট বছর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মুসলিম তরুণী জ্যোতি আক্তারকে বিয়ে করেন। কাবিননামার মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে সুমাইয়া আক্তার নামে দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। তাঁরা নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার ভূঁইগড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।
শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামী জীবিত থাকতে বলে গেছেন, মারা গেলে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করতে। কিন্তু তাঁর শ্বশুর পুলিশ পাঠিয়ে মাসদাইর কবরস্থান থেকে মরদেহ নিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী মরে গিয়েও শান্তি পাইতাছে না। ওনারা তাকে কষ্ট দিতাছে। আমরা চাই, ইসলাম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাঁর মরদেহ দাফন করা হোক।’
তবে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাসের অবস্থান ভিন্ন। তাঁর দাবি, শুভ হিন্দু পরিবারে জন্মেছেন। তাই হিন্দু ধর্মীয় রীতিতেই তিনি ছেলের শেষকৃত্য করতে চান।
পরিবারের তথ্যমতে, শুভর জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর নাম পরিবর্তন করা হয়নি। তাঁর বাবা নিজে জাতীয় পরিচয়পত্রে সৎমায়ের নাম ব্যবহার করেছেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। মরদেহ নিয়ে বিরোধ শুরু হওয়ার পর প্রথমে শুভর মরদেহ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অ্যাম্বুলেন্সের ফ্রিজে রাখা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মফিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শুভর মায়ের আবেদনের পর মরদেহ দাফনের জন্য কবরস্থানে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুভর বাবা আইনজীবীর মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্যের জন্য মরদেহ চেয়ে আবেদন করেন। হস্তান্তরের আগপর্যন্ত মরদেহ ঢাকা মেডিকেলের হিমঘরে রাখার আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। তিনি বলেন, শুভর মা ও ভাই উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি ইকবাল কবির ও বিচারপতি সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ শুভকে ইসলাম ধর্মীয় রীতিতে দাফন করার আদেশ দেন।
রিটকারী আইনজীবী মো. জুয়েল আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে আদেশ হওয়ায় আদেশের কপি সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো সম্ভব হয়নি। রোববার কার্যদিবসের শুরুতেই আদেশের কপি পৌঁছানোর আশা করছেন।
শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তার বলেন, উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী তাঁরা শুভকে ইসলামি রীতিতে দাফন করবেন। রোববার আদেশের কপি পাওয়ার পর শহরের মাসদাইরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে শুভর হত্যাকাণ্ডের তদন্তও চলছে। ৫ সেপ্টেম্বর শুভর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে ৫টি গুলির খোসা ও ১০০টি ইয়াবা উদ্ধার করেছিল পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, ইয়াবার বিনিময়ে শুভর এক সহযোগীর মাধ্যমে তাঁকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়েছিল। সেখানে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল তাঁকে গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র কোপায়। পরে রিমান্ডে থাকা এক আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন জব্দ করা হয়।
![]() |
| নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লাল। ছবি: সংগৃহীত |
Tuesday, September 8, 2026
টানা এক সপ্তাহ পপকর্ন খেলে কী হয়, জানেন?
এ ছাড়া পপকর্নে পাবেন কিছুটা আমিষ। এতে আরও আছে ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, পটাশিয়াম, জিংক, কপারসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পপকর্ন থেকে আপনি পাবেন প্রচুর আঁশ।
তবে বিপত্তি বাধে পপকর্ন তৈরির সময় তাতে যোগ করা কিছু অস্বাস্থ্যকর উপাদানের কারণে। তাই আপনি একটানা এক সপ্তাহ পপকর্ন খেলে কী ঘটতে পারে, তা অনেকটাই নির্ভর করে আপনি কোন পপকর্ন খাচ্ছেন এবং কতটা খাচ্ছেন, তার ওপর।
পুষ্টি ও তুষ্টি
এক সপ্তাহ একটানা পপকর্ন খেলে এর আঁশের কারণে আপনার কোষ্টকাঠিন্যের ঝুঁকি কম থাকবে। আপনার অন্ত্রে বসবাসকারী উপকারী জীবাণুরাও পুষ্টি পাবে এই আঁশ থেকে। তাই আপনার পেটের পীড়ায় ভোগার ঝুঁকি কমবে।
পপকর্ন আঁশসমৃদ্ধ হওয়ায় তা খেলে আপনার পেট ভরা থাকবে বেশ কিছুটা সময়। এ ছাড়া পপকর্ন সুস্বাদু এবং মুচমুচে হওয়ায় এই স্ন্যাক খেলে তৃপ্তি পাবেন সহজে। তাই আপনার পক্ষে অন্যান্য উচ্চ ক্যালরিসম্পন্ন খাবার খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।
সব মিলিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হবে আপনার জন্য। এ ছাড়া পপকর্নের অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের উপকারও পাবেন।
তাই স্বাস্থ্যকর তেল, যেমন জলপাই তেল বা অ্যাভোক্যাডো তেল দিয়ে বানানো পপকর্ন, যাতে অন্য কোনো অস্বাস্থ্যকর উপাদান নেই, তা একটানা এক সপ্তাহ খেলে ক্ষতি নেই।
যদি থাকে অস্বাস্থ্যকর তেল
তবে যদি এমন পপকর্ন খান, যাতে অস্বাস্থ্যকর তেল ব্যবহার করা হয়েছে, তাহলে আপনি পড়বেন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। কক্ষ তাপমাত্রায় জমাট বেঁধে যায়, এমন তেল স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ এবং স্ট্রোকের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে এমন তেলের খাবার খেলে।
এমনটা অবশ্য নয় যে আপনি এক সপ্তাহ পপকর্ন খেলেই আপনি এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হবেন বা ঝুঁকি বাড়বে। তবে একটানা অস্বাস্থ্যকর তেল খাওয়া হলে দীর্ঘ মেয়াদে এ ধরনের রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আরও যা
* চিনি বা অতিরিক্ত লবণ দেওয়া টপিং দেওয়া থাকলে সেই পপকর্নের কারণেও আপনার দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
* কৃত্রিম রং বা রাসায়নিক মিশ্রিত পপকর্নেও বাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
* মাইক্রোওয়েভ ওভেনে সরাসরি প্যাকেট বসিয়ে যে পপকর্ন তৈরি করা হয়, তা ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ, এতে প্লাস্টিকের মতো অনমনীয় উপাদান থাকতে পারে। এসব উপাদান সহজে ভাঙে না এবং খাবারে মিশে ঢুকে যেতে পারে আমাদের দেহে।
* তবে স্বাস্থ্যকরভাবে তৈরি করা পপকর্নও অতিরিক্ত খেলে আপনি রোজকার প্রয়োজনীয় খাবারে রুচি বা আগ্রহ হারাতে পারেন। ফলে অন্যান্য বহু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
![]() |
| সুস্বাদু স্ন্যাক হিসেবে পপকর্ন দারুণ জনপ্রিয়। ছবি: পেক্সেলস |
Sunday, August 30, 2026
ব্যাগে ছয় দেশের পাসপোর্ট, বেনজীর এখন সেন্ট লুসিয়ায় by আল-আমিন
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের দুর্নীতিবাজ আইজিপি বেনজীর গত ২৭ জুলাই দুবাইয়ের আদালত থেকে জামিন পান এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই কারামুক্ত হন। এর আগে বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত নথি ও আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দুবাইয়ের আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত শর্তসাপেক্ষে তাকে জামিন দেয়। তার জামিনের জন্য ইউরোপের একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা দুবাইয়ে বিভিন্ন চ্যানেলে জোর লবিং করেন। দুবাইয়ের আদালত থেকে তার জামিন ও কারামুক্তির খবরে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হইচই পড়ে যায়। তাৎক্ষণিক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দুবাই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়; তবে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
সূত্র জানায়, জামিন পাওয়ার পরই দুবাই থেকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন বেনজীর। স্পেনসহ একাধিক দেশে যাওয়ার কথা চিন্তা করলেও বেশি সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপদ বিবেচনা করে শেষমেশ তিনি ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়াকেই বেছে নেন।
বেনজীর ও তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী সম্প্রতি বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া এক ডিআইজি আমার দেশকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর বেনজীর তৃতীয় দেশে যাওয়ার চেষ্টায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি সেন্ট লুসিয়ায় গেছেন বলে ওই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত শুরু হলে ২০২৪ সালের মে মাসে চুপিসারে দেশ ছাড়েন বেনজীর। বিদেশে যাওয়ার পর একাধিক দেশে তার অবস্থানের খবর পাওয়া যায়। পরে অনেকটা নাটকীয়ভাবে দুবাই পুলিশের হাতে বিতর্কিত সাবেক আইজিপি বেনজীরের গ্রেপ্তারের খবর বাংলাদেশ পুলিশের কাছে আসে ১২ জুন। দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত) পুলিশ ইমেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবি শাখাকে বিষয়টি জানিয়েছিল। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় সংসদে তার গ্রেপ্তারের তথ্য জানান। বাংলাদেশের সঙ্গে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও আরব আমিরাত থেকে বেনজীরকে ফেরত আনা সম্ভব হবে বলে সরকার আশা প্রকাশও করেছিল। তাকে দ্রুত ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়। কূটনীতিক চ্যানেলেও যোগাযোগ করে সরকার। দুবাই পুলিশ বেনজীরের নথিপত্র চেয়ে বাংলাদেশ পুলিশকে অনুরোধ করে। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৪৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট পাঠায় দুবাই পুলিশের কাছে।
বাংলাদেশ সরকার আশা করেছিল বেনজীরকে ফেরত দেবে দুবাই। কিন্তু তাকে ফেরত দেওয়া তো দূরের কথা, ২৭ জুলাই আরব আমিরাতের একটি আদালত তার জামিন মঞ্জুর করে এবং তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) শাহদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ অব্যাহত আছে। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সরবরাহ করা হয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সম্প্রতি বেনজীর দুবাই থেকে সেন্ট লুসিয়ায় গেছেন। আমরা বিষয়টির খোঁজ নিচ্ছি।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অপরাধবিজ্ঞানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সাবেক আইজিপি বেনজীরের জামিন এবং অন্য দেশে চলে যাওয়ার বিষয়টি শোনা যাচ্ছে। এতে অবশ্যই তাকে আইন ও বিচারের মুখোমুখি করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমরা আগেই বলেছি, দুবাই থেকে তাকে ফেরত আনার বিষয়ে শুরু থেকেই অনিশ্চয়তা ছিল। কারণ, দুবাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই। তিনি আরো জানান, ‘বেনজীর প্রভাবশালী। ভেতরের পরিস্থিতিতে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আইনগতভাবে তাকে ফেরানো খুব কঠিন। তাকে ফেরাতে সরকারের পক্ষ থেকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে শক্ত উদ্যোগ নিতে হবে।’
জানা গেছে, বেনজীরের ৬ দেশের পাসপোর্ট রয়েছে। আইজিপি থাকাকালে জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি তুরস্ক, স্পেন, অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সেন্ট লুসিয়ার পাসপোর্ট নেন। সরকারি চাকরিতে থেকেও বেসরকারি চাকরিজীবী দেখিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট তৈরির ঘটনায় বেনজীরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। ৬ দেশের পাসপোর্ট থাকলেও তিনি দুবাইয়ে বড় ব্যবসার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। দুবাইয়ে তার বাড়ি কেনাবেচা, রেস্টুরেন্ট ও গাড়ির ব্যবসা রয়েছে। সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর বন্ধু শহিদুল ইসলামের সঙ্গে তিনি যৌথভাবে ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।
পুনরায় জামিন বাতিল এবং গ্রেপ্তার আতঙ্কে বেনজীরের দুবাইয়ে ফেরার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণ করা হতে পারেÑএমন আতঙ্কে ছিলেন তিনি। যার কারণে জামিন পেয়েই তিনি দুবাই ত্যাগ করেন। তার বিদেশে আত্মগোপন বা লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বাংলাদেশের পুলিশ ধারণা করছে।
দুবাইয়ে পাঠানো নথি খতিয়ে দেখার পরামর্শ
বেনজীরের বায়োডাটা তৈরি, দুদকের মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগসহ ২৪৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্ট গত ২০ জুন দুবাই পুলিশের কাছে পাঠানো হয়। ওই নথিতে গলদ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন অপরাধবিজ্ঞানীরা।
ভারত, থাইল্যান্ড ও নেপালÑএই তিন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি রয়েছে। কিন্তু আরব আমিরাতের সঙ্গে নেই। বেনজীর দুবাইয়ে শুধু পলাতক আসামিই নন, তিনি ওই দেশে বিনিয়োগকারীও। মানিলন্ডারিং মামলায় বিভিন্ন দেশের অনেক আসামি দুবাইয়ে বসবাস করছেন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ওইসব আসামিকে ফেরতের ব্যাপারে একাধিকবার বিভিন্ন দেশ চিঠি দিলেও তাদের ফেরত দেওয়ার নজির খুবই কম। তবে খুনের মামলার আসামিদের বেলায় দুবাই পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে থাকে। বেনজীরের নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১০টি মামলার তদন্ত চলমান। তাকে কেন ফেরানো গেল না এবং পাঠানো নথিতে গলদ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন অপরাধবিজ্ঞানীরা।
আরো শক্ত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেনজীর দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সরকারের ভেতরে আত্মবিশ্বাস ছিল যে, তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে। দুবাই পুলিশ এবং কূটনৈতিক চ্যানেলেও যোগাযোগ শুরু করে সরকার। দুবাই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে এ নিয়ে স্কাইপিতে তিনবার কথা বলে। তারা প্রত্যেকবারই বেনজীরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল।
কিন্তু ২০ জুন ডকুমেন্ট পাঠানোর পর তাদের আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়। তাকে ফেরানো যাবে কি না, তা নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বেনজীরকে ফেরানো নিয়ে আরো শক্ত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। কূটনৈতিক চ্যানেলেও বড় উদ্যোগ নেওয়া দরকার ছিল। বেনজীর যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে পালিয়ে গেছেন, সেটিও বিস্তারিত আকারে তুলে ধরা দরকার ছিল। তাহলেই তাকে ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে আরো চিন্তা করত দুবাই সরকার।
সূত্র জানায়, বেনজীরকে ফেরানোর ক্ষেত্রে ইন্টারপোলে আরো একাধিক চিঠি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বেনজীর ২০১০ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ছিলেন র্যাবের মহাপরিচালক এবং ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ছিলেন। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান। অবসরের পর তিনি রংধনু গ্রুপের সঙ্গে ব্যবসায় সম্পৃক্ত হন। অবসরে যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৪ মে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ছত্রছায়ায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দুবাই পালিয়ে যান। মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বহু মামলায় অভিযুক্ত বেনজীরকে ধরতে গত বছরের ১১ এপ্রিল ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। ওই নোটিসের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করে দুবাই পুলিশ।
জানা গেছে, বেনজীরের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, শাপলা চত্বর গণহত্যা ও গুমের অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীরের নামও ছিল।
সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নতুন করে সরব হয়েছিলেন বেনজীর। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জুম মিটিং করে তিনি উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তার দুটি অডিও ভাইরাল হয়। ৮ ফেব্রুয়ারি তার ওই কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানায় পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন।
এর আগে ৬ ফেব্রুয়ারি ভাইরাল হওয়া এক অডিওতে বেনজীরকে বলতে শোনা গেছে, আওয়ামী লীগ যখন সংগঠিত হবে, তখন পুলিশের উপস্থিতি আপনাদের সামনে থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তার ওই অডিও প্রকাশের পর পুলিশের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বেনজীরকে ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের পলাতক ও দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তা’ বলে অভিহিত করে এবং তার এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।
বেনজীর যখন র্যাব ডিজির দায়িত্বে ছিলেন, তখন র্যাবে গুম, অপহরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেশি ঘটেছিল। সে সময় র্যাবের তথাকথিত মাদকবিরোধী অভিযানে ক্রসফায়ারে অসংখ্য নিহতের ঘটনায় দেশে-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। এছাড়াও ডিএমপির কমিশনার থাকাকালে বিরোধী দল দমন-নিপীড়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি। ২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ডিএমপি কমিশনার থাকাকালে তিনি বলেছিলেন, ‘শিবির দেখা মাত্রই গুলি’। তার এই বক্তব্যে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ক্র্যাকডাউনে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার নামে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ১৭ মামলা, দুদকের ৬টি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) ৩টি পরোয়ানা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

Monday, August 24, 2026
রংপুরে এক পরিবারের চারজনকে হত্যা: খুনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন, সন্দেহ
গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা লাশ চারটি হলো রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩)।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গতকাল ভোরে দুজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামের ওই দুই তরুণের বাড়ি গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির কাছে। এরপর গতকাল বেলা দেড়টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত তথ্য জানায়।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করেন।
হত্যার কারণ নিয়ে পুলিশের ভাষ্য
পুলিশ বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবন দিয়ে গণপতির নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। দেখতে পেয়ে গণপতি বাধা দিলে তাঁকে হত্যা করা হয়। গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে হত্যা করা হয় তাঁদেরও। এরপর ঘরে ঘুমিয়ে থাকা আয়ুশকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
গণপতির পরিবারের সঙ্গে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের আগে থেকেই পরিচয় ছিল উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় দুজন মিলে একে একে পরিবারটির চার সদস্যকেই হত্যা করেন।
মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে আরও জানান, হত্যার পরও ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা গোসল করেন, ফ্রিজ (রেফ্রিজারেটর) থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান এবং আবার ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তাঁরা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। আর যাওয়ার আগে আলমারি-ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেন।
গণপতি চক্রবর্তীর ঘরে ইয়াবা সেবন করার সরঞ্জাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি একটি সোনার চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, এসব আলামতের সূত্র ধরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ আরও জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি গয়নার দোকানে প্রায় আট বছর কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।
‘পুলিশ যা বলছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়’
তবে হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ যে কী করছে, কী হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ইয়াবাখোর দুজন নাকি এক এক করে চারজনকে মারছে।’
এ ঘটনায় গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। মামলার পর এর আগে আটক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।
গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘পুলিশ যা বলছে, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুইটা কম বয়সী ছেলে চারটা মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। আর ওই দুই ছেলের ফিজিক্যাল (শরীরের) যে অবস্থা, তাতে তারা চারজনকে মারার ক্ষমতা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যেই আছে।’
দুই তরুণ যে হত্যা করেছে, তা বিশ্বাস করতে চাইছে না তাঁদের পরিবারও। গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস বলেন, ‘আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে। তাই বলে কাউকে খুন করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাস বলেন, ‘ছেলেটা কিছু ছেলের পাল্লায় পড়ে নেশা করে। তবে মানুষ খুন করা তো সহজ নয়।’
জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আজ (গতকাল) ভোরে আটক করা হয়। পরে তাঁরা হত্যায় জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এ কারণে মামলায় তাঁদের দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’
একেক জায়গায় পড়ে ছিল লাশ
পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হয় তাঁর। এরপর শনিবার ফোন দিলে বোন, জামাতা ও বোনের মেয়ে—সবার নম্বর বন্ধ পান। কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বামীকে নিয়ে রাত পৌনে ৯টার দিকে ওই বাসায় যান। কারও সাড়া না পেয়ে পাশের একটি ভবনে উঠে জানালার কাচ ভেঙে ঘরের জিনিসপত্র অগোছাল দেখতে পান। এরপরই খবর দেন পুলিশকে। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে রাত ১১টার দিকে। দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ লাশ চারটি উদ্ধার করে বাড়িটি থেকে নিয়ে যায়।
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।
নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার থাকত। প্রথম ও তৃতীয় তলার কাজ চলছে। দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের পাশে আয়ুশের লাশ পাওয়া যায়। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামীর লাশ। তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ। গামছা প্যাঁচানো ছিল তাঁর গলায়।
হত্যার প্রতিবাদ, বিক্ষোভ
পরিবারসহ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে হত্যার ঘটনায় গতকাল দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে। মানববন্ধন থেকে হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। পরে শিক্ষার্থীরা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে।
হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে রংপুর মহানগর জামায়াত। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান। মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রেসক্লাবের সামনে এসে হয় সমাবেশ।
সমাবেশে মাহবুবুর রহমান বলেন, একটি পরিবারের চারজন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার এমন ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ঘটনায় নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদকের বিস্তার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাত্র দুজন মাদকসেবী কীভাবে একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করলেন, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।
‘কোথায় বাস করছি আমরা’
গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণপতি আগে রংপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০১০ সালে কামালকাছনার মাছুয়াপাড়ায় ৬ শতাংশ জমি কেনেন। তিন বছর আগে তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন সেখানে।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির পাশে লোকজনের ভিড়। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি তিনতলা ভবনেরও নির্মাণকাজ চলছে। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন হিমাংশু রায় নামের অবসরপ্রাপ্ত এক কলেজশিক্ষক। হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, কিছুই বুঝতে পারেননি।
বোন, জামাতা ও বোনের ছেলে–মেয়ের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না পূজা চক্রবর্তী। বাড়িতেও একজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেন নেই—সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাদের তো শত্রুও নেই। এটা কোন দেশ? কোথায় বাস করছি আমরা? বাড়িতেও নিরাপত্তা নেই!’
| রংপুরে হত্যার শিকার একই পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত |
Friday, August 21, 2026
মাওলানা সাঈদীর মৃত্যু: সেদিন হাসপাতালে যা হয়েছিল by মাসুদ সাঈদী
আব্বাকে ঠিক কোন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, তা জানার জন্য আমি এরপর হন্যে হয়ে কারাগারের পরিচিত কর্মকর্তাদের একের পর এক ফোন করতে থাকলাম। কিন্তু কোথাও আব্বাকে আনার খবর পেলাম না। আমি, আমাদের পরিবারের লোকজন এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা মিলে সম্ভাব্য তিনটি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকলাম। এগুলো হলো জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, মিরপুর ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন ও পিজি হাসপাতাল। কিন্তু কোথাও আব্বাকে নিয়ে আসার খবর পেলাম না। অবশেষে রাত ১০টারও কিছু সময় পর আমরা জানতে পারলাম আব্বাকে শাহবাগের পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ততক্ষণে খবর ছড়িয়ে পড়েছে আল্লামা সাঈদী অসুস্থ এবং তাকে পিজিতে নিয়ে আসা হচ্ছে। আব্বাকে নিয়ে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের ভিড় জমতে থাকে হাসপাতালের সামনে। রাত ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ ভেসে এলো পিজির মূল গেটের দিক থেকে। সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশাল বহর।
অ্যাম্বুলেন্স সোজা পিজি হাসপাতালের ডি ব্লকের ইমার্জেন্সির সামনে গিয়ে থামল। সবাই দৌড়ে সেখানে হাজির হওয়ার চেষ্টা করলাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটকে দিল আমাদের সবাইকে।
গাড়ির দরজা খুলল। দুজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের কাঁধে ভর করে আব্বা নামলেন। মেহেদি মাখানো লাল দাড়িতে আব্বার চেহারাটা খুব মায়াবি লাগছিল। দুজনের কাঁধে ভর করে নেমেই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কাউকে আগে সালাম দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে তিনি হাত নেড়ে সবার উদ্দেশে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম।’ মুহূর্তের মধ্যে একটা শোরগোল পড়ে গেল। গভীর রজনীতে হাসপাতাল কাঁপিয়ে জনতা সমস্বরে উত্তর দিল ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম’। আব্বার মুখে তখন সেই ভুবনকাড়া হাসি।
১৩ বছর কারাগারে থাকা অবস্থায় বহুবার আব্বাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। কোনোবার এমন হয়নি যে, আব্বাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে অথচ আমি উপস্থিত নেই। আব্বাকে হাসপাতালে আনলে বরাবর আমি যেটা করতাম তা হলোÑআব্বাকে বহনকারী গাড়ি হাসপাতালের গেটে পৌঁছালে আমি গাড়ির দরজার কাছে এগিয়ে যেতাম। আব্বার হাত ধরে তাকে গাড়ি থেকে নামাতাম। এরপর পাশাপাশি হেঁটে আব্বার শারীরিক অবস্থা জানতে জানতে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে যেতাম। কিন্তু এই শেষবার ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। আব্বাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই হাসপাতাল জুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি দেখে আমি ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। হাসপাতাল জুড়েই ছিল তাদের সরব উপস্থিতি। আর আব্বার গাড়ি যখন হাসপাতালে এসে পৌঁছাল, তখন পুরো গাড়িটাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘিরে ফেলল। তবু ওই অবস্থার মধ্যেই আমি আব্বার দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়েই আব্বার কাছ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। ওদের আচরণে আব্বা ভীষণ কষ্ট পেলেন। ধমকের সুরে প্রতিবাদ করলেন। আমাকে কাছে আসতে দিতে বললেন। কিন্তু কোনো কথাই তারা শুনল না। আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ভীষণ তাড়াহুড়া লক্ষ করলাম। ওদের রুক্ষ আচরণে আমি হতবাক হলাম। তবু ভাবলাম, যাক! হাসপাতালে যখন আব্বাকে এনেছে, আজকের রাতটা যাক। আগামীকাল ইনশাআল্লাহ আব্বার সঙ্গে দেখা করব, কথা বলব, আর আব্বার শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত জেনে নেব।
কিন্তু কে জানত, আব্বার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া বা আব্বার সঙ্গে দেখা করার ‘আগামীকাল’—আমার জীবনে আর কোনো দিনই আসবে না।
অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে হুইলচেয়ারে বসিয়ে দ্রুত আব্বাকে নিয়ে যাওয়া হলো ইমার্জেন্সিতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু লোক ছাড়া আর কাউকেই ঢুকতে দেওয়া হলো না। তারা ভেতরে ঢুকেই ডি-ব্লকের মূল গেট বন্ধ করে দিল। আমি পাগলের মতো পেছন পেছন ছুটছিলাম ইমার্জেন্সির দিকে, কিন্তু ঢুকতে পারলাম না। ইমার্জেন্সির চেকআপ প্রক্রিয়ায় সব মিলিয়ে সময় লেগেছে ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মতো। এর ফাঁকে আব্বার সঙ্গে কোনো ধরনের আলাপ কিংবা খোঁজখবর নেওয়ার কোনো সুযোগই তারা আমাকে দিল না!
ইমার্জেন্সি রুমে নেওয়ার কিছুক্ষণ পর সেখানে পিজি হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ এলেন। তার সঙ্গে এলেন পিজি হাসপাতালের ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এসএম মোস্তফা জামান। তারা কেউই আমাদের পরিচিত নন। তারা ইমার্জেন্সি রুমের বন্ধ দরজার ভেতরে কী আলোচনা করলেন আর কী সিদ্ধান্ত নিলেন, তা আমি বা আমরা জানতেই পারলাম না। তাদের তো উচিত ছিল এই আলোচনা করার সময় রোগীর সন্তান হিসেবে আমাকে বা আমাদের পরিবারের কাউকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনা করার, আমাদের বিস্তারিত জানিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কিন্তু তারা তা করেননি। শুধু তাই নয়, আব্বার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আমাদের কোনো কিছু না জানিয়েই ইমার্জেন্সি রুম থেকে তারা বেরিয়ে যান। বাইরে দেশের প্রায় সব ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাংবাদিকরা আব্বার শারীরিক অবস্থা জানার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। তারা রুম থেকে বের হতেই সাংবাদিকরা ওই দুজন চিকিৎসককে ঘিরে ধরলেন। ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলে চলে গেলেন আর ডা. এসএম মোস্তফা জামান সাংবাদিকদের ব্রিফ করা শুরু করলেন। তখন আমি জানতে পারলাম তারা চিকিৎসক এবং তাদের দুজনকে আব্বার চিকিৎসার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ডা. এসএম মোস্তফা জামান সাংবাদিকদের বললেন, “দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আমার অধীনে কার্ডিয়াক ইমার্জেন্সিতে ভর্তি রয়েছেন। কিছুক্ষণ আগে আমি খবর পেয়ে এখানে এসেছি। বর্তমানে তার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। প্রাথমিক ইসিজিতে ওনার হার্ট অ্যাটাক পাওয়া গেছে। এর আগেও ওনার হার্টে রিং পরানো হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছিল তার প্রাইমারি পিসিআই লাগবে। অর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে এনজিওগ্রাম করে রিং বসানোর প্রয়োজন হতে পারে। তবে ‘বুকের ব্যথা কমে যাওয়ায়’ আপাতত পিসিআই লাগবে না বলে মনে হচ্ছে(!)। তবে তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট মন্তব্য করা যাচ্ছে না। তাকে আমরা কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখছি।”
সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিং শেষ হলে ডা. এসএম মোস্তফা জামানের সামনে গিয়ে আমি দাঁড়ালাম। তাকে আমি আমার পরিচয় দিলাম। সোজাসাপ্টা জানতে চাইলাম, ‘আপনি বলছেন আমার আব্বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে আপনারা এখনো তার এনজিওগ্রাম করছেন না কেন? কেন সময় নষ্ট করছেন?’
ডা. এসএম মোস্তফা জামান জবাবে বললেন, ‘ঠিক এই মুহূর্তে আপনার আব্বার বুকে ব্যথা নেই, তাই এনজিওগ্রাম না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।’
তখন না বুঝলেও এখন বেশ বুঝতে পারছি—তাদের রিপোর্ট(!) অনুযায়ী আব্বার হার্ট অ্যাটাক হলেও ডাক্তাররা আব্বার প্রাইমারি পিসিআই (Primary Percutaneous Coronary Intervention)Ñঅর্থাৎ সঙ্গে সঙ্গে এনজিওগ্রাম কেন করল না? কেন তার মতো বিশ্ববিখ্যাত একজন মানুষের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করল না? কেন হাসপাতালে এত কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? কেন একটিবারের জন্যও আমাকে আব্বার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি? কেন আব্বার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আমাকে একটুও জানতে দেওয়া হয়নি?—তা এখন বেশ বুঝতে পারছি।
পিজির চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নিলেন প্রাথমিক চেকআপের পর আব্বাকে সিসিইউতে স্থানান্তর করবেন। আমরা রুমের সামনে অপেক্ষমাণ। হঠাৎ রুমের দরজা খুলে গেল। আব্বা হুইলচেয়ারে ঠিক দরজার দিকে মুখ করেই বসা ছিলেন। সামনেই আমরা কয়েকজন দাঁড়ানো। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে আব্বা আমাকে আর আমার ছোট ভাই নাসীমকে দেখে এক অমায়িক হাসি দিলেন। আমাদের দেখে আব্বা কতটা তৃপ্ত হলেন তা আমি তার মিষ্টি হাসি দেখেই অনুমান করতে পেরেছিলাম। আব্বা ভরসা পেলেন তার সন্তানরা তার কাছেই আছে, তার পাশেই আছে!
সিসিইউ রুমের দরজা মিলিয়ে গেল। আব্বা আমাদের চোখের অন্তরালে চলে গেলেন। আব্বা দুনিয়ার অন্তরালে যাওয়ার আগ মুহূর্তে এভাবেই আমাদের চোখেরও অন্তরালে চলে গেলেন। এই যে যাওয়া এটাই শেষ যাওয়া, এটাই শেষ দেখা। এরপর হাসপাতালের সামনে সিঁড়িতে, ফ্লোরে রাত-দিন এক পায়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমিÑ কখন আব্বাকে একনজর দেখার ডাক পাব। চিকিৎসাধীন বাবাকে মৃত্যুর আগে একটিবারের জন্যও তার সন্তানদের দেখার সুযোগ দেওয়া হয় নাÑপৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম দ্বিতীয় কোনো ঘটনা আছে কি না আমার জানা নেই।
১৪ আগস্ট ২০২৩, সোমবার। আগের দিন সারারাত নির্ঘুম কাটানোর পর ভোর হতেই আমি সিসিইউতে আবার ঢোকার চেষ্টা করলাম। দোতলায় সিসিইউর সামনে গিয়ে দেখি পঞ্চাশের অধিক পুলিশ সেখানে অবস্থান নিয়েছে। শুধু তাই নয়, সিসিইউর প্রবেশ মুখে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়েছে। আমি অবাক হয়ে গেলাম! এত কঠিন নিরাপত্তাবেষ্টনী কেন?—এমন আগে তো কখনো হয়নি! এখন কী এমন হলো যে এত কঠোর অবস্থানে পুলিশ!!
আব্বার খোঁজ নেওয়ার বা আব্বার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা বারবার করেও ব্যর্থ হলাম। কী করব? আমার কী করা উচিত?—ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। হঠাৎ মনে পড়ল ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদের কথা। গত রাতেই শুনেছিলাম তিনি পিজি হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান এবং আব্বা তার অধীনেই ভর্তি আছেন। দৌড়ে গেলাম মেশকাত সাহেবের রুমে। কিন্তু তাকে পেলাম না, তিনি তখনো অফিসে আসেননি। কী আর করা! হাসপাতালের ডি-ব্লকের নিচে একটি সিঁড়ি আছে। আমি সেই সিঁড়িতে গিয়ে বসে পড়লাম, ডা. মেশকাত যখনই রুমে ঢুকবেন আমি যেন তাকে মিস না করি। সম্ভবত বেলা ১১টার দিকে ডা. মেশকাত তার অফিসে এলেন। তিনি অফিসে ঢোকার কিছু পরেই আমি তার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখানে গিয়ে হতবাক হয়ে গেলাম আমি! তার রুমের সামনেও অনেক পুলিশ। আমি ভেবে পেলাম না এই সাজসাজ রব কীসের জন্য। রুমে ঢুকতে গিয়েই পুলিশি বাধার মুখে পড়লাম। কোথায় যাব, কার কাছে যাব? কেন যাব?— এমন হাজারো প্রশ্ন তাদের! আমি আমার পরিচয় দিলাম, কার কাছে যাব তাও জানালাম। তারা শুনে বলল, অপেক্ষা করুন, সাক্ষাতের অনুমতি আনতে হবেÑএই বলে একজন পুলিশ সদস্য রুমের ভেতরে চলে গেলেন। আমি একা বাইরে দাঁড়িয়ে ভাবছিলামÑএকজন অসুস্থ মানুষের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়ার জন্য ডাক্তারের অফিসে ঢুকতেও পুলিশের অনুমতি লাগবে? ডা. মেশকাত তো সরকারের মন্ত্রী না, এমপিও না, কোনো সচিব না কিংবা ভিআইপি প্রোটোকল পাওয়ার মতো কোনো ব্যক্তিও না! তাহলে? এই লোককে এত পাহারায় রাখার কারণ কী? কোথায় যেন একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। কিন্তু ভেবে পাচ্ছিলাম না রহস্যটা কী! অনেক সময় পর একজন রুম থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। আমি রুমে ঢুকে দেখি সেখানেও পুলিশে ভরা। ডা. মেশকাতের সঙ্গে দুজন লোককে বসা দেখলাম। আমাকে বসতে বলার পর একজন তার পরিচয় দিলেন যে তিনি পিজি হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান আর অন্যজন গতরাতে সাংবাদিকদের ব্রিফ করা সেই ডা. এসএম মোস্তফা জামান। আমি আব্বার শারীরিক অবস্থার কথা সরাসরি ডা. মেশকাত আহমেদের কাছে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, স্যার আগের থেকে সুস্থ আছেন। এবার আমি বললাম, ‘আমি আব্বার সঙ্গে দেখা করতে চাই এবং তা এখনই। আমি তার মুখ থেকেই শুনতে চাই তিনি কেমন আছেন এবং কেনই বা তাকে এখানে আনা হয়েছে।’ এ পর্যায়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান বললেন, ‘আমরা আপনাকে দেখা করার ব্যবস্থা করছি। আপনি বাইরে অপেক্ষা করুন।’
সরল বিশ্বাসে আমি বাইরে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঘণ্টা পেরিয়ে গেল কিন্তু না ডা. মেশকাত আহমেদ আমাকে কোনো খবর দিলেন, না ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান আমাকে কোনো খবর দিলেন! আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না এখন আমার কি করণীয়।
এরপর আমি আইনজীবীদের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুটি আবেদন করলাম। প্রথম আবেদনটি হলো— আম্মাসহ আমাদের পরিবারের অন্যসব সদস্যের আব্বার সঙ্গে হাসপাতালে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আবেদন। আর দ্বিতীয় আবেদনটি হলোÑবয়স ও অসুস্থতা বিবেচনায় আব্বার সার্বক্ষণিক দেখভাল ও সার্বিক সহযোগিতার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে আমি অথবা যেকোনো একজন অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে থাকার অনুমতি চেয়ে আবেদন।
বেলা গড়িয়ে ঘড়িতে দুপুর ১টার মতো বাজে। তখনো তাদের দুজনের কেউই আমাকে কোনো মেসেজ না দেওয়ায় আমি আবার ডা. মেশকাত আহমেদের রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি তিনি রুমে নেই। অফিস একেবারেই ফাঁকা। সেখান থেকে নেমে আমি সোজা চলে এলাম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমানের অফিসে। এখানে এসে রেজাউর রহমানের পাশে বসা দেখলাম ডা. এসএম মোস্তফা জামানকে। এখানে গিয়ে রেজাউর রহমানকে পেলাম ঠিকই কিন্তু তিনি তখন সরকারের বিভিন্ন সংস্থা আর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা নিয়ে ব্যস্ত। আমাকে সময় দেওয়ার মতো সময় তার কোথায়! তবু আল্লাহর সাহায্যে ধৈর্য নিয়ে দাঁতে দাঁত কামড়ে বসে আছি।
আব্বার কোনো খবর জানতে পারছি না, তাকে দেখতে পারছি নাÑএমনিতেই আমার মন খারাপ হয়ে আছে, তার মধ্যে দেখছি পরিচালক সাহেব তার রুমে থাকা লোকজনের সঙ্গে চা-নাশতা আর গল্পে সময় পার করছেন। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল আমার।
ভর দুপুরবেলা। বাইরে তখন প্রচণ্ড রোদ। পরিচালকের রুম থেকে বেরিয়ে আমি একা উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটছি। খুব অসহায় মনে হচ্ছিল নিজেকে। আব্বার সব মামলা সব জায়গায় (জজকোর্ট, সিএমএম কোর্ট, ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ) আমি একা বছরের পর বছর পরিচালনা করেছি। দৌড়িয়েছি, সিনিয়র-জুনিয়র ল’ইয়ারদের চেম্বারে গিয়েছি, করোনার সময়ও আমি নিয়মিত কাসিমপুর কারাগারে গিয়েছি, অসম্ভব পরিশ্রম করেছি কিন্তু আজকের মতো এতটা অসহায় আর দুর্বল কখনোই মনে হয়নি। অজানা আতঙ্ক পেয়ে বসেছিল আমাকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করার পর আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীক ফোন দিলাম। তিনি খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘তুমি কোনো চিন্তা করিও না। তোমার আবেদন এখন আমার হাতে। আমি সব ব্যবস্থা করছি । তার কথায় মনটা একটু হালকা হলো।’
আমি সিসিইউতে ওঠার সিঁড়িতে বসে রইলাম। উপরে ওঠার কোনো সুযোগ নেই, কারণ গোটা সিসিইউর এলাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একপ্রকার ঘিরে ফেলেছে। বিকাল ৫টার মতো বেজে গেল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমার আবেদন মঞ্জুরের কোনো খবর তখনো এলো না। এদিকে হঠাৎ করেই হাসপাতাল কম্পাউন্ডে প্রশাসনের বেশ কিছু গাড়ি ঢুকতে দেখলাম। অফিশিয়াল ড্রেসের ও সিভিল পোশাকের অনেক নতুন অফিসারকে দেখলাম। পাল্লা দিয়ে বেড়ে যাচ্ছিল ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাংবাদিকের সংখ্যা। সঙ্গে বাড়ছিল আল্লামা সাঈদীকে ভালোবাসার মানুষের সংখ্যাও। ঘড়ির কাঁটা যখন ৬টা ছুঁয়ে ফেলল এবং আব্বার সঙ্গে সাক্ষাতের তখনো কোনো সুযোগ আমরা পরিবারের সদস্যরা পেলাম না—তখন বুঝলাম আমাদের পরিকল্পিতভাবেই আব্বার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার সঙ্গে শুধু মিষ্টি কথার অভিনয় করেছেন আর আমি তার অভিনয়কে সহমর্মিতা ভেবেছিলাম!
মাগরিবের পরপরই আব্বার দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের খবর শুনি লোকমুখে। পাগলের মতো ছোটাছুটি করেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো খবর বের করতে পারলাম না। দায়িত্বরত প্রশাসনের লোকজনের কাছে গিয়ে বিষয়টির সত্যতা জানতে চাইলে তারা জানালেন, তিনি একেবারেই স্বাভাবিক আছেন। তারা দেখে এসেই নাকি আমাকে জানাচ্ছেন। কিন্তু তাদের চোখে চোখ রেখে আমি আশ্বস্ত হতে পারলাম না, তাদের চেহারায় বা অভিব্যক্তিতে তাদের কথার সত্যতা খুঁজে পেলাম না। এরই মধ্যে হাসপাতালের পরিবেশ ভারী হতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পরপরই সরকার এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গাড়ি হাসপাতাল চত্বরে আসতে শুরু করল। হাসপাতালের চারদিকে বিপুল পরিমাণে পুলিশ মোতায়েন করা হলো। হাসপাতালের ডাক্তার আর প্রশাসনের লোকদের ছুটোছুটি দেখতে পেলাম।
আব্বাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর থেকে নিয়ে আব্বার দুনিয়ার সফর শেষ করা পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিংবা কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আব্বার চিকিৎসার বিষয়ে আমার বা আমাদের সঙ্গে একটিবারের জন্যও কোনো আলোচনা করেননি, আব্বার পুরোনো রোগ কিংবা চিকিৎসা সম্পর্কেও আমাদের কাছে কিছু জানতে চাননি, তারা আব্বার কী চিকিৎসা করছেন, সে সম্পর্কেও আমাদের পরিষ্কার করে কিছু বলেননি, তারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আব্বার শারীরিক অবস্থার আপডেটও আমাদের জানাননি। সন্ধ্যার পর থেকে আব্বার শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছিলÑসেই খবরটিও আমাদের জানাননি। দ্বিতীয়বার আব্বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছেÑসেটিও তারা অফিশিয়ালি আমাদের কিছু জানাননি। শেষ পর্যন্ত আব্বাকে তারা লাইফ সাপোর্টে নিয়েছেনÑএ বিষয়েও আমাকে/আমাদের অবহিত করেননি। এমনকি লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে কোনো লিখিত বা মৌখিক অনুমতিও নেননি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আব্বার চিকিৎসা প্রক্রিয়াটাই ছিল রহস্যজনক, সন্দেহজনক।
হাজারো ভাবনা, অস্থিরতা আর ছুটোছুটির মধ্যেই এশার আজান হয়ে গেল। সব অস্থিরতা একদিকে রেখে মনের প্রশান্তি আর আব্বার দ্রুত সুস্থতা ও নেক হায়াত কামনায় মালিকের দরবারে সেজদা দেওয়ার জন্য ছোট ভাই নাসীম সাঈদীকে নিয়ে পিজি হাসপাতালের মসজিদের দিকে ছুটলাম। কাকতালীয় কি না জানি না, ইমাম সাহেব শাহাদতের আয়াত ধরলেন। তিনি সুরা আলে ইমরানের ১৬৭ নম্বর আয়াত থেকে তিলাওয়াত শুরু করলেন। যখন তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করছিলেন—যার অর্থ হলো আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছেন, তাদের কখনোই মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের কাছ থেকে তারা জীবিকাপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। মনের অজান্তেই চোখ বেয়ে অনর্গল পানি গড়াতে লাগল নামাজের ভেতরেই। মনে হচ্ছিল ভেতরটা ধুমড়ে-মুচড়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। নামাজের ভেতরেই চিৎকার দিতে ইচ্ছে করছিল। চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারছিলাম না, টপটপ করে দাড়ি ভিজে পাঞ্জাবিতে পড়ছিল। শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে চোখের পানিতে নামাজ শেষ করলাম। মোনাজাতরত অবস্থায়ই একজন পুলিশ অফিসার এসে আমাকে সালাম জানালেন। বললেন, রমনা জোনের এডিসি হারুন অর রশীদ ও শাহবাগ থানার ওসি নূর মোহাম্মাদ আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি কান্নাভেজা চোখ সামলে তাদের কাছে যাওয়ার পর তারা তাদের সঙ্গে আমাকে সিসিইউতে যেতে বললেন। আমি ধরেই নিলাম—স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আব্বার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি বুঝি পাওয়া গেল! দীর্ঘক্ষণের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে আব্বার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা। বহুল প্রতীক্ষিত ডাক আমাদের জন্য।
কিন্তু ডেকে নিয়ে তারা যে সংবাদটি জানালেন, সেটি বইবার মতো ক্ষমতা আমাদের ছিল না। পৃথিবী সমান ওজনদার এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ তারা দিলেন আমাদের। আমার পরম শ্রদ্ধেয় আব্বার ইন্তেকালের দুঃসংবাদ দিলেন তারা আমাদের। আব্বা এ দুনিয়াতে আর নেই। মাথা ঘুরতে লাগল। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। হাত-পা অকেজো হয়ে যেতে লাগল। এত ওজন, এই দুর্বিষহ সংবাদ বহন করার মতো শক্তি কি আমার আছে! চিৎকার করে বলে উঠলাম, কী বলছেন আপনারা এসব। ‘আব্বা আব্বা’ বলে চিৎকার দিলাম। প্রশাসনিক লোকদের শোরগোলে আমার সেই চিৎকার হারিয়ে গেল।
মুক্ত আব্বাকে দেখার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না আমার।
ভারতের পোষ্য দল আওয়ামী লীগ ও তাদের গোলাম শেখ হাসিনা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে কথিত যুদ্ধাপরাধের সাজানো বিচারের নামে বিচারিক হত্যা করতে চেয়েছিল, কিন্তু তা না পেরে চিকিৎসার নামে হত্যার (Medical Killing) পথ বেছে নিয়েছিল।
জালিম শেখ হাসিনা আর তার চিকিৎসক নামের খুনিরা যে একটি মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে আল্লামা সাঈদীকে চিকিৎসার নামে হত্যা করেছে, তা এখন বুঝতে পারি।
আমার দৃষ্টিতে ডা. চৌধুরী মেশকাত আহমেদ, ডা. এসএম মোস্তফা জামান ও মো. রেজাউর রহমান ক্লিনিক্যাল নেগ্লিডজেন্সের (Clinical Negligence) মতো ক্ষমাহীন অপরাধজনিত কারণে আমার বাবা আল্লামা সাঈদীকে হত্যার জন্য দায়ী।
কারো হার্ট অ্যাটাক হলে অ্যাটাকের ১২ ঘণ্টার মধ্যে এনজিওগ্রাম করে হার্টে রিং পরানো (Primary Percutaneous Coronary Intervention-PCI) হয় বা রোগীর বুকে ব্যথা থাকলে বা হার্টের গতি এলোমেলো (Arrhythmia) বা পেশেন্ট শকে গেলে সময়ের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত এনজিওগ্রাম করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বুকে ব্যথা না থাকলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে Early PCI-এর মাধ্যমে রোগীকে স্ট্যাবল করা হয়। কিন্তু আল্লামা সাঈদীর ব্যাপারে এর ব্যতিক্রম হলো কেন?
ডা. এসএম মোস্তফা জামান বলেছেন, তারা প্রথমেই আল্লামা সাঈদীকে PCI (Per Cutaneous Intervention) করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে রোগীর বুকে ব্যথা না থাকার কারণে তারা আর PCI না করে কনজারভেটিভ ট্রিটমেন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। PCI না করার এটি কোনো কারণ হতে পারে? কার্ডিওলজির আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নীতিমালায় কোথাও লেখা নেই যে, বুকে ব্যথা না থাকলে বা কমে গেলে PCI করার প্রয়োজন নেই। PCI না করার অন্য কারণগুলো আল্লামা সাঈদীর ক্ষেত্রে তো প্রযোজ্য ছিল না। তাহলে আপনারা কেন PCI করলেন না? এটা স্পষ্ট Medical Negligence, যা সুস্পষ্ট অপরাধ।
ডা. এসএম মোস্তফা জামান বলছেন, আল্লামা সাঈদীকে ৭:১০ মিনিটে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার অনুমতি পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হলো না কেন?
হাসপাতালে সার্বক্ষণিক মিডিয়ায় কথা বলেছেন মেডিকেল টিমের সদস্য ডা. এসএম মোস্তফা জামান। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটির সদস্য, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রলীগ নেতা এবং ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগিদের কথিত গণজাগরণ মঞ্চে আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির দাবিতে উগ্র স্লোগান দেওয়া ব্যক্তি। তার কাছে কি আল্লামা সাঈদী সুচিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ ছিল? যার ফাঁসির দাবিতে যে রাজপথে গলা ফাটিয়েছে, তিনি কি কখনো সুযোগ পেলে ওই লোকটিকে সুচিকিৎসা দিতে পারেন? তাহলে তাকে কেন আল্লামা সাঈদীর চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো?
এমতাবস্থায় সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, আল্লামা সাঈদীকে হত্যার রহস্য উদঘাটনে অনতিবিলম্বে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আল্লামা সাঈদীকে হত্যার জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
* লেখক : এমপি, আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তৃতীয় সন্তান
![]() |
| মৃত্যুর একদিন আগে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর সময় প্রাণবন্ত মাওলানা সাঈদী। |
টেকনাফে জেলেদের জালে ধরা পড়ল ১৬৬ কেজির বোল মাছ
ট্রলারের মালিক সাইফুল ইসলাম (৪৫) বলেন, প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার দুপুরে ছয় জেলে নৌকা নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে নামেন। বিকেলে জালে অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের সঙ্গে বিশাল বোল মাছটিও ধরা পড়ে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে মাছটি নৌকায় তুলতে জেলেদের বেগ পেতে হয়।
সাইফুল ইসলাম বলেন, এত বড় মাছ জীবনে কখনো দেখা হয়নি। বড় মাছ ধরতে পেরে জেলেরা খুশি। আড়তে মাছটি ওজন মেপে পাওয়া গেছে ১৬৬ কেজি। গত পাঁচ বছরে টেকনাফ সমুদ্র উপকূলে এত বড় বোল মাছ কোনো ট্রলারে ধরা পড়েনি। তবে মাঝেমধ্যে বড় বোল মাছ ধরা পড়েছে সেন্ট মার্টিনের ছেঁড়াদিয়ায়।
ট্রলারের জেলেরা জানান, বোল মাছটির বিক্রির জন্য ২ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল। ১২ জন মাছ ব্যবসায়ী বোল মাছটি কেনার আগ্রহ দেখান। শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বোল মাছটি কিনে নেন বাহারছড়ার মাছ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ করিম সওদাগর।
ক্রেতা করিম সওদাগর জানান, বোল মাছটি বিক্রির জন্য রাতেই ঢাকায় পাঠানো হবে। এ জন্য বরফ দিয়ে মাছটি সংরক্ষণের প্রস্তুতি চলছে। ঢাকায় এই মাছ দুই লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি করা হবে।
১৬৬ কেজি ওজনের বোল মাছ ধরা পড়ার সত্যতা প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন। বিরল প্রজাতির বড় এই বোল মাছ সব সময় জালে ধরা পড়ে না। সেন্ট মার্টিনের প্রবাল পাথরের স্তূপে এবং আশপাশে পাথর এলাকায় বোল মাছের বিচরণ বেশি থাকে। বোল মাছ ওজনে ৯-১০ মণও হয়ে থাকে। বোল মাছটি দেখতে স্থানীয় অনেকে আড়তে ভিড় জমিয়েছিলেন।
সেন্ট মার্টিন বোট মালিক সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ছেঁড়াদিয়ার চারপাশে পাথরস্তূপ ও প্রবাল আস্তরে বোল মাছের বিচরণ বেশি দেখা যায়। কিন্তু পাথরের জন্য সেখানে জাল ফেলা যায় না। দ্বীপের ২০-২৫টি নৌকা ছেঁড়াদিয়াতে নৌকা নিয়ে গিয়ে বড়শি ফেলে বোল মাছ ধরা হয়। ৩০ কেজি থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ মণ ওজনের বোল ধরা পড়ার রেকর্ড রয়েছে। মাছটির স্বাদে অতুলনীয়।
![]() |
| কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়ার জেলেদের জালে ধরা পড়েছে ১৬৬ কেজি ওজনের বোল মাছটি। ছবি: প্রথম আলো |
Thursday, August 20, 2026
বিরল রোগ: চোখের সামনে সন্তান অচল হয়ে পড়লেও কিছু করার থাকে না মা–বাবার by শিশির মোড়ল
পারে না শুধু দাঁড়াতে, হাঁটতে। সোজা হয়ে বসতে পারে না। বসলে মাথা ঢলে পড়ে। এই বয়সী শিশুর পেশিতে যে শক্তি থাকা দরকার, তা ওর নেই। শিশুটি বংশগত রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগটির নাম স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফি (এসএমএ)।
শাহিন আক্তার ও শাহাদাৎ হোসেন দম্পতির একমাত্র সন্তান এই শিশু। নাম অলিভিয়া সঞ্চারী নবনী, বয়স চার বছর দুই মাস। রাজধানীর মগবাজারে তাঁদের বাসা। সন্তানের এসএমএ আছে জানার মুহূর্ত থেকে এই দম্পতির কাছে দুনিয়ার সবকিছু যেন ধূসর হয়ে গেছে। তাঁদের মেয়ে বিরল রোগে ভুগছে। এমন রোগ কম দেখা যায়। এসএমএ একটি বিরল রোগ।
২৩ আগস্ট ওই দম্পতির বাসায় তাঁদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বাসা ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে কথা হয় শিশুটির সঙ্গে। শিশুর মা শাহিন আক্তার বলেন, ২০২১ সালের ২০ জুন নবনীর জন্ম। ঠিক সময়ে জন্ম হয়েছিল, জন্মের সময় ওজন ৩ কিলোগ্রামের বেশি ছিল। হাত–পা নড়াচড়াতেও সমস্যা ছিল না। জন্মের ২৫–২৬ দিন পর প্রথম চোখে পড়ল, মেয়ের পা দুটোর নড়াচড়া কমে গেছে। স্বামী–স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে শিশু স্নায়ুরোগবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মিজানুর রহমানের শরণাপন্ন হন। ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একটি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন, যে পরীক্ষার ব্যবস্থা দেশে ছিল না।
শিশুর বাবা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘তখন করোনা শেষ হয়নি, বিদেশ যাতায়াত কঠিন ছিল। আমরা অক্টোবরে (২০২১) ভারতের চেন্নাই গিয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালে মেয়েকে দেখাই। চেন্নাই থেকে রক্তের নমুনা পাঠানো হয় বেঙ্গালুরুতে। নভেম্বরে আমাদের জানানো হয় মেয়ের এসএমএ।’
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে এসএমএ মানুষের জিনের ত্রুটিজনিত রোগ। মা ও বাবা উভয়ই এসএমএর বাহক হলে তাঁদের সন্তানদের ২৫ শতাংশ ঝুঁকি থাকে এসএমএ রোগী হওয়ার। এসএমএ থাকলে পেশি নিয়ন্ত্রণের শক্তি ক্রমাগত কমতে থাকে, খাবার চিবানো ও গিলতে অসুবিধা হয়, মেরুদণ্ড বাকা ও কুঁজো হয়, শ্বাসকষ্ট থাকে। এসএমএর রোগীর দাঁড়াতে, হাঁটতে, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। সাধারণত ১০ হাজার শিশু জন্মে একটি শিশুর এসএমএ দেখা যায়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসএমএ–কে আমরা বিরল রোগ বলছি। তবে দেশে আরও অনেক ধরনের বিরল রোগ আছে।’
বিরল রোগ সংক্রামক বা অসংক্রমাক হতে পারে। তবে বিরল রোগ কেন্দ্রে কেন্দ্রে রেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো ধরনের কাজ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিরল রোগ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথকভাবে কোনো শাখা নেই। সামগ্রিকভাবে বিরল রোগ নিয়ে কোনো কাজ নেই। বিশেষ কোনো বিরল রোগ নিয়ে আলোচনা উঠলে তখন সেটার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।’
বিরল রোগ কী
জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে রোগের প্রাদুর্ভাব কম দেখা যায়, তা বিরল রোগ। এ বছর ফেব্রুয়ারির বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি দলিল বলছে, বিরল রোগ হচ্ছে একটি বিশেষ স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, যা প্রতি দুই হাজার মানুষের মধ্যে একজনে বা তার কমে দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় সাত হাজার বিরল রোগ আছে, ভুগছে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ। ৭০ শতাংশ বিরল রোগ শিশু বয়সে শুরু হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগ সাধারণত জটিল, একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এতে প্রভাবিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি সহ–অসুস্থতায় (কো–মরবিডিটি) ভোগে। রোগটি দ্রুত অবনতির দিকে যায়, প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টি করে ও অকালমৃত্যুর কারণ হয়।
বিরল রোগ নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। এদের নিয়ে কাজও কম। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে থাকতে দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দুই লাখ মানুষের মধ্যে একজনের যে রোগটি হয়, তা বিরল রোগ। দেশটিতে প্রায় ছয় হাজার বিরল রোগ আছে। এসব রোগে আড়াই কোটি মানুষ ভুগছে।
দেশে কত বিরল রোগ
এই প্রতিবেদক গত মার্চ থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তিনটি হাসপাতাল, বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও ৩০ জনের বেশি অভিভাববক ও রোগীর সঙ্গে কথা বলে দেশে বিরল রোগের পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেছেন। এই সময়ে এসএমএ, ডিএমডি, হিমোফিলিয়া, মোয়ামোয়া, সিফা সিনড্রোম, রেটস সিনড্রোম, প্রজেরিয়া, ট্রি ম্যান সিনড্রোম, এক্সপির মতো বিরল রোগের কথা জানা গেছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
এসএমএ জিনের ত্রুটিজনিত রোগ। এতে পেশির নিয়ন্ত্রণ শক্তি ক্রমাগত কমতে থাকে, খাবার চিবোতে ও গিলতে সমস্যা হয়, মেরুদণ্ড বাঁকা ও কুঁজো হয়, শ্বাসকষ্ট থাকে। রোগীর দাঁড়াতে, হাঁটতে ও সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। সাধারণত ১০ হাজার শিশু জন্ম নিলে তাদের মধ্যে একজনের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দেশে এই রোগী আছে ২০০ থেকে ৩০০।
জিনের ত্রুটিজনিত আরেকটি রোগ ডুচেনি মাসকুলার ডিস্ট্রোফি (ডিএমডি)। এটি ছেলেদের বেশি হয়। ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়। অনুমান করা হয়, দেশে ডিএমডি রোগী আছে দুই শর কাছাকাছি। ১০ হাজার জীবিত জন্মে একজনের এটি দেখা যায়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের চিকিৎসকেরা ‘রেটস সিনড্রোম’ নামের একটি বিরল রোগ নিয়ে গবেষণা করছেন। এটিও জিনের ত্রুটিজনিত স্নায়ুর রোগ। জন্মের দেড়-দুই বছর পর্যন্ত শিশু ভালোই থাকে। তারপর থেকে শিশুর খিঁচুনি হতে দেখা যায়। শিশুর মাথা বড় হয় না। শিশু ভুলে যেতে থাকে। কত মানুষ এতে আক্রান্ত, তা জানা যায় না।
দেশের গণমাধ্যমগুলো ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজনদারকে নিয়ে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। আবুল বাজনদারের হাত ও পায়ের আকৃতি ছিল গাছের শিকড়ের মতো। জিনের নির্দিষ্ট ত্রুটি থাকা মানুষ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগটি দেখা দেয়।
আবুল বাজনদার ১৯ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদককে বলেন, তিনি আবার অস্ত্রোপচারের জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছেন। এ পর্যন্ত তাঁর দুই হাত ও দুই পায়ে ৩০টি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে।
প্রায় একইভাবে গণমাধ্যমের দৃষ্টি পড়েছিল একজন ‘প্রজেরিয়া’ রোগীর ওপর। এতে শিশুর চেহারা প্রবীণের মতো হয়। জিনের রূপান্তরে এটা হয়। মানুষ অল্প সময়ে বুড়িয়ে যায়। হৃদ্রোগ ও রক্তনালির রোগের ঝুঁকি থাকে। এক কোটি মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি একজন দেখা যায়।
রক্তের একটি বিরল রোগ হিমোফিলিয়া। কেটে গেলে রক্তপাত বন্ধ হয় না। এই রোগ সাধারণত পুরুষের হয়, নারী এই রোগের বাহক। ১০ হাজার মানুষের মধ্যে এই রোগে একজনকে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।
২০১৬ সালের নভেম্বরে রাজধানীর উত্তরার একটি প্রায় অন্ধকার ঘরে ৮ ও ১২ বছর বয়সী দুই ভাইবোনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। এরা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। দুই ভাইবোন জিনের ত্রুটিজনিত জেরোডার্মা পিগমেনটোসামের (এক্সপি) রোগী। এক্সপির রোগী আলোতে থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যে চামড়া শুকিয়ে যায়। তাদের স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়, শ্রবণশক্তি কমে যায়। তাদের এখনো চিকিৎসা চলছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের গবেষকেরা জানিয়েছেন, দেশে অন্তত ২০০ জন ‘মোয়ামোয়া’ রোগী আছে। এটি মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ। এতে মস্তিষ্কের ধমনিতে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। রোগীর সাময়িকভাবে তীব্র মাথাব্যথা, শরীরের একাংশে অবশ ভাব, খিঁচুনি, কথায় অস্পষ্টতা, চোখে ঝাপসা দেখা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া—এই রোগের লক্ষণ।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটো মিয়া জানান, তিনি ময়মনসিংহের একটি পরিবারে ‘সিফা সিনড্রোম’ (কনজেনিটাল ইনসেনসিভিটি টু পেইন উইথ অ্যানহিড্রোসিস)–এর দুজন রোগী পেয়েছেন। ঘর্মগ্রন্থি (সোয়েট গ্লান্ড) না থাকার কারণে এদের ঘাম হয় না। এদের গরম লাগে বেশি, হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। এরা ব্যথা অনুভব করে না।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক (শিশু নিউরোলজি বিভাগ) জুবাইদা পারভীন বলেন, ‘দেশে স্নায়ুর বিরল রোগ আছে অন্তত ১৫টি। অন্য কতটি বিরল রোগের অস্তিত্ব আছে, তা জানা নেই। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, খোঁজা হয়নি।’
অবিরাম কষ্টের কাহিনি
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোহাম্মদ পারভেজের প্রথম সন্তান মুনতাসিরের জন্ম হয় ২০১৪ সালে। জন্মের পাঁচ বছর পর মুনতাসিরের অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, পা বেঁকে যায়, পায়ের পেশিতে ব্যথার কথা বলতে থাকে। ২০২২ সালে শনাক্ত হয় মুনতাসির ডিএমডির রোগী।
ডিএমডির রোগীর বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত–পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়, আঙুল বেঁকে যায়। আক্রান্ত শিশুর বয়স ১০–১২ হতেই নিজ থেকে আর চলাচল করতে পারে না। বাবা–মায়ের সামর্থ্য থাকলে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে পারে। মুনতাসিরের ক্ষেত্রে ঠিক এমনই হয়েছে।
১৫ এপ্রিল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে মুনতাসিরের বাবা মোহাম্মদ পারভেজের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘কিছুই করতে পারলাম না। আমার চোখের সামনে ছেলেটি ধীরে ধীরে অচল হয়ে গেল। বয়স মাত্র ১১ বছর। কিছুই করতে পারলাম না।’ চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এমন শিশুরা বেশি দিন বাঁচে না।
মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বিরল রোগে আক্রান্ত মানুষ, তাদের বাবা–মা–অভিভাবসহ অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁদের সবাই মোহাম্মদ পারভেজের মতো অসহায়। সন্তানের গল্প বলতে গিয়ে মায়ের চোখ ভেসে যায় জলে। কারও কষ্ট চিকিৎসা করাতে না পারার। কেউ জানেন চিকিৎসা করিয়েও সন্তানকে বাঁচাতে পারবেন না। ‘আমি মারা গেলে আমার সন্তানের কী হবে’, এমন চিন্তায় দিন যায় কোনো কোনো মায়ের।
২০ মার্চ কথা হয় খুলনার লবণচরার নূরজাহান রজনী ও মেহেদি হাসান আমিরের সঙ্গে। নূরজাহান রজনী কৃষি ব্যাংকে চাকরি করেন, মেহেদি হাসান আমির এলাকায় ছোটখাটো ঠিকাদারির কাজ করেন। তাঁদের তৃতীয় সন্তান আমিরা এসএমএর রোগী। আমিরা প্রায়ই তার বাবা–মা ও দুই বোনের উদ্দেশে বলে, ‘রাগ কোরো না। আমি বসতে পারি না, আমি হাঁটতে পারি না, রাগ কোরো না।’ নূরজাহান রজনী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এতটুকু মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে বুক ফেটে কান্না আসে।’
এমন সন্তান নিয়ে মা–বাবার জীবন আমূল বদলে যায়। রাজধানীর মগবাজারের শাহিন আক্তার ও শাহাদাৎ হোসেন দম্পতির ক্ষেত্রে তেমনই ঘটেছে। দুজন একসময় একটি বামপন্থী সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিয়মিত ওই দলের অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন, অংশ নিতেন। এখন সব বন্ধ। শাহাদাৎ হোসেন চাকরির প্রয়োজনে কর্মস্থলে যান। আপনার সময় কাটে কীভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মা শাহিন আক্তার বলেন, ‘আমার নিজের বলে আর কোনো সময় নেই। সারাটা সময় মেয়ের সঙ্গে। মেয়ে যখন ঘুমায়, তখনই কিছুটা ছুটি।’ ঘরের বাইরে যাওয়া নেই, আত্মীয় বাড়ি যাওয়া নেই। সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ। শাহিন আক্তারের দুনিয়া আটকে গেছে মেয়েতে।
এমন সন্তান দুটো থাকলে সমস্যা কি বেড়ে যায়? দুঃখ কি দ্বিগুণ হয়? ব্যবসায়ী ওমর ফারুকের দুটি ছেলেই বিরল রোগে আক্রান্ত। ২৩–২৪ আগস্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে আয়োজিত একটি ওয়ার্কশপের প্রথম দিনের একটি অধিবেশনে ওমর ফারুক বলেন, ‘আমাদের জীবন বদলে গেছে। আমাদের জীবন থেকে আনন্দ হারিয়ে গেছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাবক বলেন, এমন বাবা–মাও আছেন, যাঁদের তিনটি সন্তানই বিরল রোগে ভুগছে। ঘরজুড়ে একটি খাট, তার ওপর তিন সন্তানকে নিয়ে স্বামী–স্ত্রী রাত কাটাতেন। ইতিমধ্যে একটি সন্তান মারা গেছে। এখন ওই খাটেই বাবা–মা রাত কাটান বাকি দুই সন্তানকে নিয়ে।
সহজে রোগ শনাক্ত হয় না
পুরান ঢাকার সুজন সাহা ও রমা সাহার একমাত্র মেয়ে স্বস্তিকা সাহা। মেয়ের বয়স যখন ৯ মাস, বাবা–মা খেয়াল করলেন, মেয়ের বসতে ও দাঁড়াতে কষ্ট হয়। সুজন সাহা বলেন, ‘প্রথম মেয়েকে মিটফোর্ড হাসপাতালে দেখাই। পরে পিজি হাসপাতালে দেখাই। তারপর পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। মেয়ে দিন দিন দুর্বল হতে থাকে। আট মাস আগে ভারতের চেন্নাই গেলাম। পরীক্ষায় ধরা পড়ল মেয়ের এসএমএ। আগের তিনটি হাসপাতালের কোনো চিকিৎসকই রোগ ধরতে পারেননি।’ একাধিক শিশুর মা-বাবার কাছ থেকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শোনা গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন আফরিন আক্তার। তিনি এসএমএর রোগী। তিনি বলেন, প্রথমে একজন চিকিৎসক মায়োপ্যাথির চিকিৎসা দেন। পরে দেশে-বিদেশে পরীক্ষায় নিশ্চিত হন যে তার এসএমএ। আফরিন আক্তার বলেন, ‘তিন বছরের বেশি সময় আমি ভুল চিকিৎসার মধ্যে ছিলাম।’ তিনি এখন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।
প্রায় সব বিরল রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটো মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দিই, যেন রোগী স্বস্তি বোধ করে, রোগটি যেন আর না বাড়ে।’
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাওলী সরকার বলেন, ‘রোগনির্ণয় সঠিক না হলে ভুল চিকিৎসা হয়। এক রোগের লক্ষণ কিছু ক্ষেত্রে অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যায়, তখন ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো রোগের চিকিৎসাই হয়তো জানা নেই, তখন রোগটি যেন না বাড়ে, সে জন্য কিছু চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভালো রেফারেল পদ্ধতি না থাকার কারণে রোগীরা ভুল প্রতিষ্ঠান বা ভুল ব্যক্তির কাছে চলে যান, এতে সঠিক চিকিৎসা রোগীরা পান না।’
৯৫ শতাংশের চিকিৎসা নেই
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগের চিকিৎসা–সম্পর্কিত ওষুধসহ অন্যান্য পণ্যের দাম অনেক বেশি। অনেক দেশে এসব পণ্য ও ওষুধের প্রবেশাধিকার সীমিত। এটি বড় চ্যালেঞ্জ।
যেমন স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফির (এসএমএ) কথা বলা যায়। চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এ রোগের চিকিৎসার ওষুধ তিনটি। প্রথমত জিনথেরাপি। ইনজেকশনের মাধ্যমে জীবনে তা একবারই দিতে হয়। এর দাম প্রায় ২২ কোটি টাকা। আরেকটি ইনজেকশন আছে, প্রতি দুই মাস অন্তর রোগীর মেরুদণ্ডে দিতে হয়। একটি ইনজেকশনের দাম এক কোটি টাকা। আর আছে একটি সিরাপ। এর প্রতি বোতলের দাম ১০ লাখ টাকা। একজন রোগীর মাসে এক বোতল দরকার হয়।
জিনথেরাপি বাংলাদেশে দুটি শিশুকে দেওয়া হয়েছে। মেরুদণ্ডে দেওয়া ইনজেকশন কেউ পেয়েছে বলে জানা যায়নি। একটি বহুজাতিক কোম্পানি দেশের তিনটি শিশুকে বিনা মূল্যে সিরাপ দেওয়া শুরু করে। এখন শুধু মগবাজারের নবনী ওষুধটি বিনা মূল্যে পাচ্ছে।
বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে ওষুধ উদ্ভাবন করে তা সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছে বিক্রি করা ওষুধ কোম্পানির জন্য লাভজনক নয়। যে দু–একটি ওষুধ তৈরি হয়, তার দাম বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ওষুধ উদ্ভাবনে সমতাভিত্তিক বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রণোদনার অভাবের কারণে সারা বিশ্বের ৯৫ শতাংশ বিরল রোগের এখনো কার্যকর চিকিৎসা নেই।
রাষ্ট্র কী করছে
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিরল রোগ নিয়ে তাদের কোনো ধরনের কাজ নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর বলেন, ‘বিরল রোগ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথক শাখা নেই। সামগ্রিকভাবে বিরল রোগ নিয়ে কাজও নেই। বিশেষ কোনো বিরল রোগ নিয়ে আলোচনা উঠলে তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’
ব্যতিক্রমী ভূমিকা নিয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল, বিশেষ করে এই প্রতিষ্ঠানের শিশু নিউরো বিভাগ। এই বিভাগ বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রতি সপ্তাহে বিশেষ ক্লিনিক চালু করেছে। এ ছাড়া প্রতি মাসের মাঝামাঝি এক দিন বড় করে নিয়মিত সেমিনারের আয়োজন করে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে একটি বিরল রোগের (এসএমএ) চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসার সরঞ্জাম কেনার জন্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের অনুকূলে ৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫ কোটি টাকার ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি টাকা খরচ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
আত্মশক্তির সন্ধান
বিরল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তা বা পাশে দাঁড়ানোর জন্য কয়েকটি সংগঠন গড়ে উঠেছে। এসব সংগঠন তথ্য সংগ্রহ করে, দেশে–বিদেশে কোথায় রোগ পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, তা জানার ও জানানোর চেষ্টা করে।
এমনই একটি সংগঠন কিওর এসএমএ বাংলাদেশ। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক বলেন, ‘এসএমএ রোগী ও তাদের অভিভাবকদের নিয়ে এই সংগঠন তৈরি হয়েছে। রোগটির ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রোগনির্ণয়ে জেনেটিক পরীক্ষা দেশে চালু করার জন্য আমরা দৌড়ঝাঁপ করছি। ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা চেষ্টা করছি যেন কম দামে ওষুধ পাওয়া যায়।’
একইভাবে ডিএমডি রোগীদের জন্য গড়ে ওঠা সংগঠনের নাম ডিএমডি কেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। হিমোফিলিয়া রোগীদেরও আছে বাংলাদেশ হিমোফিলিয়া সোসাইটি। এই ধরনের সংগঠন বিদেশে আছে।
কী করা যায়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি সার্বিক ও রোগীকেন্দ্রিক পন্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যক্তির সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া, সামাজিকভাবে তাদের সম্পৃক্ত রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানে প্রবেশের বাধা দূর করা জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিরল রোগের জন্য পৃথক শাখা খোলার দাবি করেছেন কেউ, কেউ সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও কেউ কেউ বলেন।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক জুবাইদা পারভীন বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। রোগ শনাক্তে উপযুক্ত ল্যাবরেটরি স্থাপন করা জরুরি।’
[প্রথম আলো রোগী ও রোগীর অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে তাঁদের নাম এই প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে।]

Wednesday, August 19, 2026
কলকাতায় হোটেলে আগুন : স্ত্রী, সন্তান, শ্বশুরসহ কুষ্টিয়ার সাংবাদিকের মৃত্যু
মৃত দেবাশীষ দত্ত আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত আজকের আলো পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। ওই ঘটনায় তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন (২৭), ছেলে শর্ণশীষ দত্ত (৩) ও শ্বশুর আকরাম হোসেন (৬০) মারা গেছেন। চিকিৎসার জন্য ১৫ দিন আগে তাঁরা ভারতের কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে গিয়েছিলেন। আজ বুধবার তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল।
গতকাল মঙ্গলবার রাতে কলকাতায় নিউমার্কেটের কাছে মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ৯ ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এর মধ্যে কুষ্টিয়ার ওই চারজন ছিলেন।
সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত (৩৯) কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার দিলীপ দত্তের ছেলে। আজ সকালে দিলীপ দত্ত ছেলে, পুত্রবধূ ও তাঁদের সন্তানের মৃত্যুর খবর পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ছেলের (দেবাশীষ) লাশের ছবি দেখেছেন।
দিলীপ দত্ত আজ দুপুরে প্রথম আলোকে জানান, দেবাশীষের এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ে ফাহিমাকে (৮) রেখে ৩ আগস্ট তিনি স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে ভারতে যান। দুই দিন পর তাঁর শ্বশুরও কলকাতায় যান। প্রথমে তাঁরা কলকাতায় দুই দিন ছিলেন। এরপর স্ত্রী ও ছেলের চিকিৎসার জন্য বেঙ্গালুরুতে যান। গত সোমবার রাত এগারোটায় উড়োজাহাজে করে কলকাতায় আসেন তাঁরা। সেখানে হোটেলে উঠেছিলেন। আজ সকালে দিলীপ দত্ত জানতে পারেন যে অগ্নিকাণ্ডে তাঁরা সবাই মারা গেছেন।
দেবাশীষের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আজ সকাল থেকে তাঁর বাড়িতে বন্ধু, সাংবাদিক ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেন। ছেলেকে হারিয়ে মা স্বপ্না দত্ত পাগলপ্রায়। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘আমার দেবা (দেবাশীষ) একটু পরই বাড়িতে আসবে। এত দেরি করছে কেন? রাতে বলেছিল, ব্যাগ গোছাচ্ছে। সকালেই রওনা দেবে বাড়ির উদ্দেশে।’
![]() |
| কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে মৃত দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমীন ও ছেলে শর্ণশীষ দত্ত। ভারতে গিয়ে ৪ আগস্ট ফেসবুকে ছবিটি পোস্ট করেন দেবাশীষ দত্ত। ছবি : দেবাশীষ দত্তের ফেসবুক থেকে |
স্পেনের সেউতায় আটকা পড়েছেন ৮ হাজার অভিবাসী, আছে বাংলাদেশিও
স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার অভিবাসী আটকা পড়েছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। ইরাকি বার্তাসংস্থা শাফাক নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে।
মরক্কো থেকে ব্যাপক অভিবাসন প্রবাহের দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পরও তাদের আশ্রয় ও আইনি অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
সেউতা ও মেলিয়া উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। মরক্কোর মাধ্যমে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এগুলো ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
২৯ ও ৩০ জুলাইয়ের ব্যাপক প্রবেশের সময় ৭২ হাজারের বেশি মানুষ সাময়িকভাবে সেউতায় ঢুকে পড়েছিলেন। পরে তাদের বেশির ভাগই স্বেচ্ছায় মরক্কোতে ফিরে যান। স্পেন ও মরক্কোর তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় অন্তত ৯৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
রোববার ফ্রান্স২৪ জানিয়েছে, এখন যারা সেউতায় রয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে ইরাকি, সিরীয়, ইয়েমেনি, ফিলিস্তিনি, মিসরীয়, আলজেরীয়, তিউনিসীয়, মরক্কান, সুদানি, নাইজেরীয়, সেনেগালিজ, বাংলাদেশি ও ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন।
অনেক অভিবাসী সেউতার এল ত্রাম্পোলিন সৈকতে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করেছেন। খড়, কাপড় ও হাতের কাছে পাওয়া বিভিন্ন জিনিস দিয়ে বানানো এসব আশ্রয়ে রাত কাটাচ্ছেন তারা।
খাবার ও পানির সংকটের পাশাপাশি মানবেতর পরিবেশে দিন কাটছে তাদের। কেউ সমুদ্রের পানিতে কাপড় ধুচ্ছেন, কেউ কার্ডবোর্ডের ওপর ঘুমাচ্ছেন।
আটকে পড়াদের একজন ইরাকের মসুলের তরুণ আবদুলরহমান। কয়েক বছর মরক্কোয় থাকার পর তিনি সেউতায় পৌঁছান। এখন তার আশা, স্পেনে নিজের অবস্থান বৈধ করে সুইডেনে যেতে পারবেন, যেখানে তার এক আত্মীয় থাকেন।
সিরিয়ার এক নাগরিক মোহাম্মদও সেউতায় আটকে আছেন। তিনি জানান, মরক্কো থেকে একটি সিরীয় পরিবারের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রবেশ করেন। পরে কয়েকজন সিরীয়কে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হলেও তিনি থেকে যান। তার সন্তান এখনো মরক্কোতে রয়েছে।
ইয়েমেনের আবদুলমাজিদ মূল প্রবেশের এক দিন আগে প্রায় আট কিলোমিটার সাঁতরে সেউতায় পৌঁছান। এরপর থেকে খোলা আকাশের নিচে ঘুমাচ্ছেন তিনি। ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্পেন তার আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ করবে বলে আশা করছেন তিনি।
মিসরীয় দুই অভিবাসী তারেক ও রমাদান জানান, তারা লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কো হয়ে সেউতায় পৌঁছেছেন। লিবিয়ায় যাত্রাপথে সহিংসতা ও গোলাগুলির মুখেও পড়তে হয়েছে বলে জানান তারা।
সুদানের এক নাগরিক মুজাম্মিল জানান, ৩০ জুলাই সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর পর প্রথম তিন দিন তার কাছে খাবার ও পানি ছিল না। নাইজেরিয়ার কামারাও এখন ত্রাণ ও মানুষের দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।
তবে আটকে থাকা সবার আইনি পরিণতি এক হবে না। স্পেন প্রত্যেকের আশ্রয়ের আবেদন আলাদাভাবে যাচাই করবে।
দেশটির নিয়ম অনুযায়ী, কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে আশ্রয়ের আবেদন করলে সেটির সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া স্থগিত থাকে। তবে আবেদন করলেই আশ্রয় পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই।
এদিকে বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর কারণে সেউতার আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা আশ্রয় ও অভ্যর্থনা ব্যবস্থা আরও সংকটে পড়েছে। আশ্রয়ের আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিতে পুলিশের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়াতেও অনেকে সমস্যায় পড়ছেন।
স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গার্সিয়া জানিয়েছেন, গত ১৫ দিনে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ অভিবাসী চিকিৎসা নিয়েছেন। জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়ার চাপ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এখনো ২৮ জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
রোববার সেউতায় শত শত অভিবাসী বিক্ষোভ করেছেন। তারা আশ্রয়ের আবেদন করার সুযোগ এবং মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেউতায় আরও ৫০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করেছে স্পেন। এতে সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর মোট সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৬০০ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, নতুন করে বড় আকারের সীমান্ত পারাপার ঠেকাতে মরক্কোও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে।
সূত্র: শাফাক নিউজ
![]() |
| অনেক অভিবাসী সেউতার সৈকতে অস্থায়ী আশ্রয় তৈরি করেছেন। ছবি: সংগৃহীত |
Tuesday, August 18, 2026
চাপের মুখেও আবু সাঈদকে গুলির দৃশ্য কীভাবে টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছিল, উঠে এল সেই গল্প
আওয়ামী লীগ সরকারের প্রবল চাপ সত্ত্বেও সেই দৃশ্য কীভাবে এনটিভিতে প্রচার করা হয়েছিল, সেই গল্প উঠে এল সাংবাদিকদের নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে এনসিপি–সংশ্লিষ্ট ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ) আয়োজিত ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সেই গল্প বলেছেন এনটিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক ফকরুল আলম (কাঞ্চন)। ওই দৃশ্য ধারণ করা এনটিভির রংপুরের স্টাফ ক্যামেরাপারসন আসাদুজ্জামান আরমান এবং টেলিভিশনটির রংপুরের সিনিয়র স্টাফ করেসপনডেন্ট এ কে এম মঈনুল হকও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
আবু সাঈদকে পুলিশের গুলি করার সেই দৃশ্য এনটিভিতে প্রচারের গল্প বলতে গিয়ে ফকরুল আলম বলেন, ‘জুলাই বেদনার স্মৃতিতে ভরা। কারণ, যেদিন প্রথম আলোতে ৯৮ জনের মৃত্যুর খবর ছাপা হয়, সেদিন বিভিন্ন টেলিভিশন দুজনের মৃত্যুর খবর প্রচার করেছিল। আমাদের কাছে অনেক ফুটেজ থাকলেও দেখানো সম্ভব হয়নি। আবু সাঈদকে যেদিন শহীদ করা হয়, সেদিন রানডাউনে (বার্তা সম্পাদকের দায়িত্বে) তিনি ছিলেন।’
সে সময় আন্দোলনে সংঘাত-সংঘর্ষের খবর দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল উল্লেখ করে ফকরুল আলম বলেন, ‘১৬ জুলাই সংবাদ চলাকালে আমরা দুটি জায়গা থেকে লাইভ করি। প্রথমে বরিশালে সংঘর্ষের ঘটনার লাইভ প্রচারিত হয়। এরপর কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে রংপুরে লাইভে চলে গেলাম। আরমান (পাশে থাকা) সেদিন স্পটে ছিলেন। তিনি সেদিনের সুপার হিরো। মঈনুলও ছিলেন। ক্যামেরা নিয়ে দুঃসাহসী কাজটি করেছিলেন আরমান।’
শুধু এনটিভিই আবু সাঈদকে গুলি করার সেই দৃশ্য লাইভে প্রচার করেছিল উল্লেখ করে এনটিভির জ্যেষ্ঠ সংবাদ ব্যবস্থাপক ফকরুল আলম বলেন, ‘লাইভের পর আমরা নিউজরুমে হতভম্ব হয়ে পড়ি, হাত-পা কাঁপছিল। কারণ, আমি জানতাম এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। এরপর অনেক কিছু হলো—নানা রকম জিজ্ঞাসাবাদ, গোয়েন্দা, সরকারি কর্মকর্তা, মালিকপক্ষ ও জ্যেষ্ঠ সহকর্মীদের অনেক প্রশ্ন।’
সে যাত্রায় কীভাবে জেলে যাওয়া থেকে রেহাই পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে ফকরুল আলম বলেন, ‘সেদিন গোয়েন্দাদের বলেছিলাম—এ রকম একটি ঘটনা ঘটবে আমি তো জানি না, সংঘর্ষের ঘটনা দেখে লাইভে গিয়েছিলাম, আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে, পুলিশ তাঁকে গুলি করবে—তা আমরা জানতাম না। এ কথা বলে সেদিন রেহাই পেয়েছিলাম।’
জুলাইয়ের স্মৃতিচারণা, ক্ষোভ–হতাশা
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে জুলাই অভ্যুত্থানের সংবাদ সংগ্রহ করা বেশ কয়েকজন সাংবাদিক তাঁদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা–প্রাপ্তি নিয়ে অনুষ্ঠানে কথা বলেন। তাঁদের অধিকাংশ জুলাইয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণা করেন। কেউ কেউ অভ্যুত্থানের পর চাকরিচ্যুতির ঘটনা উল্লেখ করেন। কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় কেউ কেউ হতাশা প্রকাশ করেন।
ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাইয়ে যাঁরা যাত্রাবাড়ী-রামপুরার মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে ফুটেজ নিয়েছেন, মোবাইলকে যাঁরা অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন, গুলির পাশে দাঁড়িয়ে জুলাইকে লিপিদ্ধ করা সেই সাংবাদিকদের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের চেয়ে বড়। আর যাঁরা জুলাইয়ের বিপক্ষে ছিলেন, ইতিহাস তাঁদের অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে।
জুলাই-পরবর্তী সময়ে কৌশলে কিছু মানুষের সুবিধা পাওয়া আর কিছু মানুষ বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন অভ্যুত্থানে মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মুক্তাদির রশিদ। ঘৃণার সংস্কৃতি থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের অ্যাসাইমেন্ট এডিটর মাকসুদ উন নবী জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংবাদ প্রচারে বিভিন্ন সংস্থার বাধার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতি বিশ্বাস উঠে যাওয়ায় অনেক ছাত্র-জনতা সাংবাদিকদের মেরেছিল।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব অভ্যুত্থানের সময় দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশে সাংবাদিকতা করতেন। সে সময়ের অভিজ্ঞতা তুরে ধরে তিনি বলেন, নাহিদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র পাওয়ায় তাঁকে টার্গেট (নিশানা) করা হয়েছিল। ২৬ জুলাই তাঁর অফিসে তাঁকে তুলে আনতে গিয়েছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। অফিসে ঢুকে তাঁর ব্যবহৃত কম্পিউটার ভাঙচুর ও নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর করা হয়। মালিক–সম্পাদককে চাপ দেওয়া তাঁকে র্যাবের হাতে তুলে দিতে। তবে সম্পাদক দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে তাঁকে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
বর্তমানে কালের কণ্ঠে কর্মরত জাহিদুল ইসলাম অভ্যুত্থানের সময় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে কাজ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মিরপুর ও ধানমন্ডি এলাকায় আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহের শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্য ছিলেন সাংবাদিকেরা।
বর্তমানে দৈনিক আগামীর সময়ের স্টাফ রিপোর্টার আমজাদ হোসেন (হৃদয়) অভ্যুত্থানের সময় ছিলেন দেশ রূপান্তর পত্রিকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক। তিনি বলেন, আন্দোলনের কর্মসূচি প্রণয়ন, ৯ দফা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং গুজব ডিবাঙ্ক (উন্মোচন) করতে ভূমিকা রেখেছিলেন সাংবাদিকেরা।
অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মহিউদ্দিন মুজাহিদ (মাহি)। সে সময় ‘কঠিন সেন্সরশিপে’ আবদ্ধ থাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
এখন টেলিভিশন চ্যানেল থেকে চাকরিচ্যুত বেলায়েত হোসেন নিজের ভোগান্তির কথা উল্লেখ করেন। তিনি সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের কাছে প্রশ্ন রাখেন, দায়িত্বে থাকার সময় জুলাইয়ে ভূমিকা রাখা সাংবাদিকদের সঙ্গে বসার কোনো তাড়না তাঁর ছিল কি না।
স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানান দ্য ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাইমা ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাইয়ের পর অনেক সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে মালিকানা পরিবর্তন বা তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক অ্যালায়েন্সটা শিফট হয়েছে। এটা ভবিষ্যতে পীড়া দেবে।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে নিউ এজের নির্বাহী সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ মজুমদার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আসিফ শওকত (কল্লোল), ডেইলি স্টারের জিনা তাসরিন, টিআরটি ওয়ার্ল্ডের বাংলাদেশ প্রতিনিধি কামরুজ্জামান বাবলু, চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক জুমাতুল বিদা, বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান বার্তা সম্পাদক তৌহিদ হায়দার, এখন টিভির মাহমুদ রাকিব, যমুনা টিভির আহমেদ রেজা ও লামিয়া তিথি প্রমুখ বক্তব্য দেন।
![]() |
| ‘সাংবাদিকের চোখে জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অতিথিদের একাংশ। রাজধানীর গুলশানে হোটেল ওয়েস্টিনে। ১৭ আগস্ট ২০২৬ ছবি: এনসিপির সৌজন্যে |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1997)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







