Thursday, January 3, 2019

ভারতীয় ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি পাকিস্তানি সেনাদের

নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপরে ভারতীয় একটি গোয়েন্দা ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করার দাবি করেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। দেশটির ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনসের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আসিফ গফুর ওই ড্রোনটির ছবি প্রকাশ করেছেন। বলা হয়েছে, মঙ্গলবার নিয়ন্ত্রণ রেখায় বাঘ সেক্টরে পাকিস্তান অংশের ভিতরে ওই ড্রোনটি গুলি করে ভূপাতিত করে পাকিস্তানি সেনারা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে নিজের একাউন্টে জেনারেল আসিফ গফুর লিখেছেন, একটি কোয়াডকপ্টার পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ রেখায় অনুমোদন দেয়া হবে না ইনশাল্লাহ। উল্লেখ্য, মনুষ্যবিহীন চার পা যুক্ত ড্রোনকে কোয়াডকপ্টার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এ বছর পাকিস্তানের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশের অভিযোগে এটাই প্রথম কোনো ভারতীয় মনুষ্যবিহীন ড্রোন ভূপাতিত করলো পাকিস্তানিরা। গত বছর এমন চারটি ভারতীয় ড্রোনকে ভূপাতিত করেছিল পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষীরা।
নববর্ষের প্রাক্কালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানকে আক্রমণ করে কড়া বক্তব্য রাখেন। তার কয়েক মিনিটের মধ্যে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের মহাপরিচালক ওই ড্রোনটি ভূপাতিত করার কথা প্রকাশ করেন। ওদিকে ভারতীয় সেনাদের অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের কারণে একজন নারী নিহত ও অনেকে আহত হওয়ার ঘটনায় মঙ্গলবার দিনের শুরুতে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ দিতে ভারতের একজন সিনিয়র কূটনীতিককে তলব করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ইস্যু করা এক হ্যান্ডআউটে বলা হয়েছে, ভারতের ভারপ্রাপ্ত উপ হাই কমিশনারকে তলব করেছিলেন মহাপরিচালক (এসএ অ্যান্ড সার্ক) ড. মোহাম্মদ ফয়সাল। এ সময় তিনি ভারতীয় সেনাদের অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিবাদ জানানো হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারতী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জনবহুল এলাকাগুলোকে অব্যাহতভাবে টার্গেট করে নিয়ন্ত্রণ রেখা ও ওয়ার্কি বাউন্ডারিতে অবস্থান করে। ২০১৮ সালে ভারতীয় সেনারা নিয়ন্ত্রণ রেখা ও ওয়ার্কিং বাউন্ডারিতে এমন ২৩৫০ বার অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘন করেছে। এতে নিরপরাধ ৩৬ জন মানুষের প্রাণহানী হয়েছে। আহত হয়েছেন ১৪২ জন। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ভারতের এই অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। ওই বছরে ভারতীয় সেনারা ১৮৭০ বার অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ভারতের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় নি।

মোদির কথায় হতাশ হিন্দুত্ববাদীরা

অযোধ্যার বিতর্কিত ভূমিতে রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কথায় হতাশ হয়েছেন হিন্দুত্ববাদীরা। সংঘ পরিবার থেকে তাবৎ হিন্দু সাধু-সন্তরার বার বার দাবি করেছেন, নির্বাচনের আগেই অযোধ্যায় রামমন্দির চাই। তার জন্য আইন বা অধ্যাদেশ আনুক মোদি সরকার। সম্প্রতি দিল্লিতে এক সমাবেশ করে সাধু-সন্তরা প্রধানমন্ত্রী মোদিকে একই ধরনের ‘আদেশ’ দিয়েছেন। কিন্তু মঙ্গলবার একটি সংবাদ সংস্থাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকার কোনো পদক্ষেপ নেবে না। অযোধ্যায় বিতর্কিত জমির মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। এই সপ্তাহেই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা। বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের দাবি, যেভাবেই হোক অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি হোক।
একই দাবি বিজেপির অতি কট্টরবাদীদেরও। অবিলম্বে মন্দিরের কাজ শুরু করতে অর্ডিন্যান্স জারিরও দাবি তুলেছে তারা। রামমন্দির তৈরি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। আগে শীর্ষ আদালত রায় দিক। তারপরই সরকারের যা কর্তব্য, তা করবে । নির্বাচনের আগে মোদি এ ব্যাপারে হাতিয়ার করেছেন দেশের সংবিধানকে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিষ্কার জানিয়েছিলাম, অযোধ্যা বিতর্কের সমাধান ভারতের সংবিধান মেনেই হবে। এই ইস্যুতে দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য বিরোধী কংগ্রেসকে দায়ী করেছেন মোদি। তিনি বলেছেন, আদালতে কংগ্রেসের আইনজীবীরা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে। এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত। মোদি এদিন আরো বলেছেন, বিচারব্যবস্থাকে তার মতো এগিয়ে যেতে দেয়ার পাশাপাশি দেশে শান্তি এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কংগ্রেসের আইনজীবীদের উচিত সুপ্রিম কোর্টে অযোধ্যা মামলার শুনানিতে বাধাদান না করা। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচনের আগে রামমন্দির নিয়ে কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছে না বিজেপি। অথচ চার বছর আগে রামমন্দিরের কথা বলেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল।

আটক সাংবাদিককে অবিলম্বে মুক্তির দাবি আরএসএফ ও সিপিজের

নির্বাচনে মিডিয়ার স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সাংবাদিকদের অধিকার বিষয়ক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার। এ জন্য তারা নিন্দা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, সাংবাদিকদের আরেকটি আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) খুলনায় গ্রেপ্তার করা সাংবাদিক হেদায়েত হোসেন মোল্লার অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছে। সংগঠন দুটি আলাদা আলাদা বিবৃতিতে এসব কথা বলেছে।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) লিখেছে, ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে মিডিয়ার স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হওয়ার জন্য নিন্দা প্রকাশ করছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স। বলা হয়েছে, এ সময়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে, জেলে পাঠানো হয়েছে এবং একটি টিভি নিউজ চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, নির্বাচন পরবর্তী সময়টা মিডিয়া স্বাধীনতার জন্য খুব বাজেভাবে শুরু হয়েছে। একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তাকে পাঠানো হয়েছে রিমান্ডে। পুলিশ বলছে, তিনি মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করেছেন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য।
এ ঘটনার শিকার সাংবাদিক হলেন হেদায়েত হোসেন মোল্লা। তিনি ঢাকা ট্রিবিউন নামের পত্রিকার খুলনা প্রতিনিধি হিসেবে সংবাদ সংগ্রহ করেন। একই সঙ্গে তিনি সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট বাংলা ট্রিবিউনেরও সাংবাদিক। তিনি ‘মিথ্যা তথ্য’ বলতে যা রিপোর্ট করেছিলেন তা হলো তার খুলনায় নিবন্ধিত ভোটারের চেয়ে ২২৪১৯ ভোট বেশি পড়েছিল।
এই অনিয়ম নিয়ে রিপোর্ট করেছিলেন দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার খুলনায় স্টাফ রিপোর্টার রাশিদুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ আনার পর তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। গত অক্টোবরে পাস হওয়া বহুল বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে তারা দু’জনেই এখন ১৪ বছরের জেল পেতে পারেন।
এশিয়া প্যাসিফিক ডেস্কে আরএসএফের প্রধান ডানিয়েল বাস্টার্ড বলেছেন, এই দু’জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে আমরা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। তাদের একমাত্র অপরাধ হলো নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন, যে কাজটি যেকোনো সাংবাদিকের করা উচিত একটি কার্যকর গণতন্ত্রে। এই নির্বাচনে মিডিয়ার স্বাধীনতা বার বার যেভাবে লঙ্ঘন করা হয়েছে তাতে নির্বাচনী ফলের বিশ্বাসযোগ্যতাকে খর্ব করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরএসএফ আরো বলেছে, নির্বাচনের দিনে বেশ কিছু সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ঢাকায় একটি ভোটকেন্দ্রের ছবি তুলতে গেলে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা হামলা চালায় ডেইলি স্টার পত্রিকার ফটো সাংবাদিক কাজী তাহসিন আগাজ অপূর্বর ওপর। ঢাকায় একই রকম হামলা হয় দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার রিপোর্টার কাফি কামালের ওপর। তাকে হাসপাতালে যেতে হয়েছে।
বিখ্যাত ফটোসাংবাদিক ড. শহিদুল আলম সম্প্রতি জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তিনি ও সাংবাদিক সুমন পাল কিছু ছবি তোলার চেষ্টা করলে হট্টগোলে আহত হয়েছেন শহিদুল আলম। সুমন পালকে বেশ কিছু ঘুষি মারা হয়েছে। দৈনিক মানবকণ্ঠের সাংবাদিক জুবায়ের রাকেশের ওপর হামলা চালায় প্রায় ২০ জন নেতাকর্মী। তারা তার ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। হামলা হয়েছে সিভয়েস ২৪ ডট কম সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইটের রিপোর্টার আল আমিনের ওপর। তিনি চট্টগ্রামে একটি ভোটকেন্দ্রে সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টাকালে তার ওপর হামলা চালায় প্রায় ১৫ জন নেতাকর্মী।
নির্বাচন কমিশন থেকে এক্রিডিটেশন পাওয়া সত্ত্বেও ডেইলি স্টারের কমপক্ষে সাতজন সাংবাদিককে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয় নি পুলিশ বা ক্ষমতাসীন জোটের প্রতিনিধিরা। ক্যাবল টিভি অপারেটররা অকস্মাৎ যমুনা টিভির সিগন্যাল অফ করে দেয় ২৮শে ডিসেম্বর। এর চারদিন আগে সশস্ত্র প্রায় ৩০ জন নেতাকর্মী এই টিভির সাংবাদিক ও এর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের ওপর একটি হোটেলে হামলা চালায়। আরএসএফের ২০১৮ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম।
ওদিকে, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট বিবৃতিতে বলেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে খুলনার সাংবাদিক হেদায়েত  হোসেন মোল্লাকে তিনদিনের রিমান্ডে দিয়েছে আদালত। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি ‘মিথ্যা তথ্য’ প্রকাশ করেছেন। এ মামলায় দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার সাংবাদিক রাশিদুল ইসলামকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে, তাকে গ্রেপ্তার করা হয় নি। এ বিষয়ে সিপিজের এশিয়া প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী স্টিভেন বাটলার বলেছেন, সরকারের উচিত তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা। মিডিয়ার স্বাধীনতাকে আক্রমণ করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত। এ ছাড়া নির্বাচনী খবর সংগ্রহে যাওয়া বেশ কিছু সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়েছে। তাদেরকে নির্বাচন কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয় নি।

শখ থেকেই সফল শাহনাজ by প্রতীক ওমর

বগুড়ার মেয়ে শাহনাজ ইসলাম শিল্পী। শহরজুড়ে এখন পরিচিতি ‘শিল্পী আপা’ নামে। শৈশব কেটেছে বগুড়া শহরে। বাবা ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ছিলেন। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করবেন সেটাই ছিল কথা। কিন্তু নবম শ্রেণিতে উঠতেই মা-বাবা বিয়ে ঠিক করলেন। পরিবারের সিদ্ধান্তই মাথা পেতে নিতে হলো। স্বামী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) প্রকৌশলী।
চাকরির সুবাদেই বিভিন্ন জেলায় বদলি। স্বামীর ঘরে গিয়েও দমলেন না শাহনাজ। ঘরেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে লাগলেন। চাকরিজীবী স্বামী সারাদিন বাইরে থাকতেন। সময় কাটাতে সেলাই আর রান্নার শখে ডুবে গেলেন। ঘরে বসেই পড়াশোনা, নতুন নতুন রান্না আর নিজের হাতে হরেক ডিজাইনের সালোয়ার-কামিজ সেলাই করতে লাগলেন। বাজার থেকে শাড়ি কিনে তাতে হাতের কাজ করতে লাগলেন। নিজের কাজ করা পোশাক পরার পর লোকজন প্রশংসা করতেন। সরকারি কোয়ার্টারে থাকতে গিয়ে অন্য নারীদের সঙ্গেও ভাব জমে যেত। এই নারীদের নিয়ে প্রায়ই রান্নার প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন। শখ নিয়ে সময় কাটানো থেকেই এখন সফল একজন উদ্যোক্তা শিল্পি। বগুড়া শহরের অভিজাত এলাকা জলেশ্বরীতলায় বুটিক শপ, ফ্যাশন হাউস ও চায়নিজ রেস্টুরেন্টের কর্ণধার। নাম দিয়েছেন ‘শখ’। দুই প্রতিষ্ঠানেরই এখন শহরে বেশ নাম-ডাক। একসঙ্গে সংসার ও ব্যবসা সামলেই শুধু সফল হননি শিল্পি, ব্যবসার আয়ে এক সন্তানকে পড়াশোনার জন্য বিদেশও পাঠিয়েছেন, অন্য দুই সন্তানকে পড়াচ্ছেন ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। একজন সফল নারী হিসেবে শহরজুড়ে এখন অনেক পরিচিতি তাঁর। শখ থেকে সফল নারী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প নিজেই শুরু করলেন শিল্পি । ‘পড়াশোনার শখ ছিল। দুই সন্তান কোলে নিয়েই ১৯৯২ সালে এইচএসসি পাস করেছি। হাতের কাজের শখ ছিল। ১৯৯৫ সালে ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে গেছি। তিনি বুটিক হাউসের উদ্যোক্তা ছিলেন। ওই বছর ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় বুটিকের স্টল দিয়েছেন তিনি। হাতের কাজের আগ্রহ দেখে আমার কাছে ২০টি শাড়ির অর্ডার দিলেন। রাতেই দোকান থেকে শাড়ি কিনে কয়েক দিন ধরে তাতে হাতের কাজ করলাম। ৮০০ টাকা করে আমার কাছ থেকে শাড়ি কিনে সেই আত্মীয় ওই শাড়ি মেলায় ২০০০ টাকায় বিক্রি করলেন। চোখ খুলে গেল আমার। মাথায় এল শখের এই কাজ করে তো আমি ঘরে বসেই বাড়তি লাভ করতে পারি। এরপর বগুড়ায় ফিরে মালতিনগরের বাসাতেই ১৫ হাজার টাকার পুঁজিতে বুটিক হাউস খুলে বসলাম। সাড়াও পেতে শুরু করলাম ভালো। পরিবার থেকেও উৎসাহ মিলল।’
শিল্পি বলেন, এক বছরের মাথায় জলেশ্বরীতলায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে ‘শখ’ বুটিক শপ খুলে বসেন তিনি। নিজেই ডিজাইন করেতে শুরু করেন। কারিগররা বাড়িতে কাজ করতেন। অল্প দিনেই শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল শখ-এর পরিচিতি। তখন বগুড়া শহরের নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। তিনি বলেন, ‘নিজেই ব্যবসাতে বসতাম। নিজেই কাঁচামাল কিনতাম। নিজেই ব্যাংক করতাম। নিজেই পাইকারি অর্ডার নিতাম। একজন নারী হয়ে দোকানে বসে ক্রেতা সামলানোর বিষয়টি তখন অনেকেই ভালো চোখে দেখেনি। কিন্তু স্বামী শফিকুল ইসলাম ব্যবসায় উৎসাহ দিতেন। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি। ব্লক, বাটিক ও নকশার কাজ করা সালোয়ার-কামিজ, থ্রিপিস, শাড়ি, বিছানার চাদর, কুশন কভার, শাল চাদরের ব্যাপক চাহিদা বাড়তে লাগল।’
তিনি জানান, ২০০১ সালে স্বামী মারা যাওয়ায় কিছুটা ভেঙে পড়েন। এখন তাঁর দোকানে ৮০ লাখ টাকার পুঁজি খাটছে। শখে সালোয়ার-কামিজ ১ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ২০০, শাড়ি ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৮০০, বেডকভার ১ হাজার ৮০০ থেকে ৫ হাজার, শাল চাদর ৫০০ থেকে ৫ হাজার, কুশন কভার ২০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শিল্পির সাফল্যের গল্প এখানেই শেষ নয়। বড় ছেলেকে পড়াশোনার জন্য কানাডা পাঠিয়েছেন। শিল্পি বলেন, “পড়াশোনার পাশাপাশি ওখানকার একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করে ছেলেটা। ওর পরামর্শেই এক বছর আগে ৫০ লাখ টাকা খরচ করে ‘শখ’ চায়নিজ রেস্টুরেন্ট দিয়েছি। দেশি পোশাক ও দেশি খাবারকে বিশ্বজুড়ে তুলে ধরাটাই এখন আমার বড় শখ।”

দেখুন তো তাদের চেনেন কিনা!

দেখুন তো ছবির এই পুরুষ ও নারীকে চিনতে পারেন কিনা! কেউ কেউ তাদেরকে চিনতে পারেন। অনেকেই হয়তো চিনবেন না। হ্যাঁ, ছবির পুরুষটি হলেন মিডিয়া মুঘল বলে পরিচিত রুপার্ট মারডক (৮৭)। আর নারীটি হলেন তার স্ত্রী জেরি হল (৬২)। তারা স্বামী-স্ত্রী। এই তো আগামী মার্চে তাদের তৃতীয় বিয়ে বার্ষিকী। তাতে হয়তো আনন্দে মেতে উঠবেন তারা। কিন্তু তার আগেই ইংরেজি নতুন বর্ষকে বরণ করতে এই দম্পতি ছুটে গিয়েছিলেন বারবাডোজে।
এটি তাদের প্রিয় অবকাশযাপন। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে তারা সেখানে প্রকৃতিকে অবলোকন করতে গিয়েছিলেন। তাদের বয়স হলেও মনকে এখনও মেরে ফেলেন নি। তাইতো সাঁতারের সংক্ষিপ্ত পোশাক পরে পানিতে নেমে পড়েছিলেন জেরি হল। তার সঙ্গে ছিলেন প্রিন্টের হাফপ্যান্ট পরা রুপার্ট মারডক। তারা গত মঙ্গলবার বারবাডোজের নীল পানিতে সাঁতার কেটেছেন। এক পর্যায়ে রুপার্ট মারডককে পানি থেকে তুলে আনতে সাহায্য করতে দেখা যায় জেরি হলকে। আবার কখনো শার্টহীন উদোম গায়ে স্বামী রুপার্ট সাঁতার কাটছেন তা বিস্ময়ভরা চোখে তাকিয়ে দেখছেন তিনি। এদিনটি সমুদ্র সৈকতে তারা উপস্থিত হলেও অতোটা প্রাইভেসি বজায় রাখেন নি। অনেকটা উন্মুক্ত অবস্থায়, অন্যদের সামনে তারা সমুদ্রের নিসর্গকে উপভোগ করেছেন। সাঁতার কাটতে কাঁটতে রুপার্ট মারডক যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন তখন সমুদ্র থেকে উঠে তারা তাদের স্যুটে ফিরে যান। সেভানে তাদেরকে দেখা যায় পানীয় পান করতে এবং বই পড়তে। এদিন জেরি হলের পছন্দের বই ছিল ক্রেসিদা কনোলি’র লেখা ‘আফটার দ্য পার্টি’ভ আর রুপার্ট মারডক পড়ছিলেন ‘ইউটোপিয়া ফর রিয়েলিস্টস: অ্যান্ড হাউ উই ক্যান তেট দেয়ার’। এর লেখক রাটগার ব্রেগম্যান।

যেভাবে গণতন্ত্র জিতেছে by আনোয়ার ইব্রাহিম

এটা সম্ভবত আমাদের সময়ের নির্দেশক হতে পারে যে, একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের অর্থ হলো ‘ডিজরাপশন অব দ্য ইয়ার’ বা বিঘ্নতার বিরুদ্ধে বিজয়। মে মাসে মালয়েশিয়ায় জাতীয় নির্বাচনে যে ফল আসে তাতে বিশ্বজুড়ে যে জনপ্রিয় জাতীয়তাবাদ, শরণার্থী, অভিবাসী ও অন্যান্য ইস্যুতে প্রবণতা, সেদিকেই আশা করা হয়েছিল।
মালয়েশিয়া একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এখানে সব গ্রুপের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সহযোগিতা এই পরিবর্তনকে সম্ভব করেছে। নির্বাচনী বাধাটা ছিল তীব্র, যেমনটা বিশ্ব প্রত্যাশা করেছে অথবা এ খাতের পণ্ডিতরা পূর্বাভাষ করেছেন। ফলে মালয়েশিয়ার ভোটাররা কি অর্জনের জন্য ভোট দিয়েছেন সে বিষয়ে আমাদের সতর্কতার সঙ্গে নোট নিতে হবে।
শুরুতেই, মালয়েশিয়ানরা ভোট দিয়েছেন বারিসান ন্যাশনাল (বিএন) জোটের শাসনের ইতি ঘটাতে। ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও) আধিপত্য করা এই জোট মালয়েশিয়ার ক্ষমতায় ছিল ১৯৫৭ সালে বৃটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই।
সাম্প্রদায়িক জাতিভিত্তিক রাজনীতির কারণে ইতি ঘটে বিএন-এর। উপরন্তু ভোটাররা ওই সরকার ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, যারা সরকারি পণ্য স্থানান্তরের মাধ্য হিসেবে, সুবিধা দিয়েছে ব্যক্তিবিশেষকে এবং গ্রুপকে।
বিগত সরকার ব্যবস্থায় ব্যবসায় ও সামাজিক উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে বিরাজমান ফ্যাক্টর ছিল সরকার। তারা যা দিয়েছিল তার বিনিময়ে প্রত্যাশা করেছিল ভোটারদের অবিচল সমর্থন। এক্ষেত্রে তাদের প্রার্থীদের অবস্থা ও পারদর্শিতাকে আমলে নেয়া হয় নি। দীর্ঘ কয়েক দশকে ইউএনএমও শাসনে নির্বাচনী বিরোধ বা সামন্ততন্ত্র ছিল মালয়েশিয়ার অঙ্গ। এতে ভোটারদেরকে তাদের রাজনৈতিক মাস্টারদের কাছে জিম্মি রাখা হয়েছিল।
ব্যাপক দুর্নীতি, যা মালয়েশিয়ার শাসন ব্যবস্থায় মহামারী আকার ধারণ করেছিল তার কারণে ২০১৮ সালের মে মাসে জনগণের মন পাল্টে দেয়। পরিসংখ্যানটা ভয়াবহ। ১ মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট বেরহাদ (১এমডিবি) তহবিল স্ক্যান্ডালে জনগণের বিলিয়নস রিঙ্গিত অদৃশ্য হয়ে যায়। সরকারের মন্ত্রণালয়গুলোতে খরচ করা হয়েছে নোংরাভাবে।
দুর্নীতির দাম্ভিকতা এতটাই উন্মুক্ত ছিল যে, তা যেকোনো উন্নয়ন কর্মকান্ডের চেয়ে বেশি কার্যকর ও ব্যাপক ছিল। যখন ধনীরা নিজেদেরকে আরো ধনী করছেন, তখন এটা খুব কম বিস্ময়ের বিষয় যে, যারা এর নিচে রয়েছেন, যাদের জীবনধারায় ক্রমাবনতি ঘটছে, তাদেরকে পথ অনুসরণ করতে হয়েছে। পুরো মালয়েশিয়ান সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এই ধারণাটি ভোটারদের আশ্বস্ত করেছে যে, শুধু কিছু র‌্যাডিকেল পরিবর্তন করা হবে।
নির্বাচনী বৃত্তের চেয়ে আরো অনেক গভীরে পরিবর্তনের শিকড় নিহিত। মালয়েশিয়ায় গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের মূল নিহিত রয়েছে ২০ বছরের সংস্কার বিষয়ক প্রচারণার মধ্যে। ১৯৯৮ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচনেই এটি একটি অংশ ছিল। ওই সময়ে আমাকে সরকার থেকে বরখাস্ত করা হলো এবং বানোয়াট অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হলো।
পারতি কেডিলান রাকায়েত (পিকেআর) যে সংস্কারমুলক এজেন্ড হাতে নিয়েছে আস্তে আস্তে তা-ই রাজনৈতিক পট পরিবর্তন করেছে। ২০১৩ সালের নির্বাচনে আমাদের বিরোধী জোট কিন্তু পপুলার ভোটে বিজয়ী হয়েছিল।
মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ ৯২ বছর বয়সে অবসর ভেঙে বেরিয়ে এলেন। এটা কোনো গোপন বিষয় নয় যে, মাহাথির ও আমাদের মধ্যে অতীতে এক ঝড়ো সম্পর্ক ছিল। তিনি যখন জেলে আমার সঙ্গে সাক্ষাত করতে এলেন এবং বিরোধী জোটে আমাদের যোগ দেয়া নিয়ে আলোচনা করলেন তখন এটা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, আমরা বড় ধরনের অর্জন করেছি।
পূর্বে যে দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিরোধী ছিল তারা একত্রিত হচ্ছে এর মধ্যে কোনো নেতিবাচক কিছু নেই। এক্ষেত্রে প্রয়োজন শুধু মন থেকে সব কালিমা মুছে ফেলা, ক্ষমা করে দেয়া এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে বড় পরিবর্তন, যাতে দেশের জন্য রাজনীতিকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায়। ২০ বছর পরে নির্বাচনে বিজয়ী হয় হাকাতান হারাপান জোট। নির্বাচনে পিকেআর একক বৃহৎ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। আমাদের নির্বাচন পূর্ববর্তী চুক্তি অনুযায়ী, মাহাথির মোহাম্মদ হওয়ার কথা আমাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী।
নতুন জোট সরকারের সামনে একটি সংস্কারমূলক এজেন্ডা আছে। তা বাস্তবায়নে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এতে মালয়েশিয়াকে একটি পরিপক্ব, সমতাভিত্তিক ও কার্যকর গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে স্বপ্ন সাজানো হয়েছে। আমাদের অনেক এজেন্ডার মধ্যে দুর্নীতি বন্ধ করা অন্যতম। অবাধ, সুষ্ঠু ও বাধাহীন নির্বাচন অনুষ্ঠান, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, সরকারি পণ্য ও সেবার সম বন্টন নিশ্চিত করতে একটি নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, অবাধ মিডিয়া, সক্রিয় নাগরিক-সামাজিক সংগঠনকে লালন করার কথা বলা হয়।
গণতান্ত্রিক আরো একটি উদ্যোগ হলো সাম্প্রদায়িকতা থেকে বেরিয়ে প্রকৃত মেধার কাছে সরে আসা, যেখানে মালয়েশিয়ার সব নাগরিক সুবিধা পাবেন। আভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক অবজ্ঞার ফলে উত্তরাধিকারে যে অবহেলার শিকার হয়েছে মালয় ও বুমিপুতেরা সম্প্রদায় তাদেরকে সহায়তার জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু ইউএনএমও-এর শাসনের অধীনে অনেক সময় ধরে ইতিবাচক বৈষম্য পরিণত হয়েছে এমন একটি ব্যবস্থায় যাকে দেখা হয় উদ্দোক্তা ও উচ্চাভিলাষীদের বোকা বানানো হিসেবে। প্রশান্তি ও দুর্নীতির জন্য ইতিবাচক কর্মকান্ড হয়ে ওঠে একটি অবলম্বন। তবে তা সহায়ক হাত নয়।
জাতিগত মূল পরিচয়ের দিকে না তাকিয়ে অভাবী মানুষকে এখন সহায়তা দিয়ে যাবে মালয়েশিয়া। গ্রামে বসবাস করা মালয়দের প্রয়োজনের বিষয়টি পছন্দ বা অপছন্দের বিষয় নয়। অভাবীদের যোগ্যতা সম্পন্ন করতে হবে। দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জাতি, বর্ণ, সম্প্রদায়গত ভিত্তি কোনো পার্থক্য হতে পারে না।
মালয়েশিয়ার শক্তি হলো এর বহুত্ববাদ। বহু সংস্কৃতির এই সমাজে আরো উন্মুক্ত ও প্রকৃত সম্পর্ক স্থাপনে আমাদেরকে আরো অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের ‘রিচনেস’ বা বিত্তশীলতা শেয়ার করার মধ্য দিয়ে এবং বিভিন্ন রকম প্রচলিত রীতি, ভাষা, সংস্কৃতি ও ধারণাকে আরো কার্যকর করার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে আরো অনেক কিছু অর্জন করেতে হবে। সংস্কার ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে মালয়েশিয়া হয়ে উঠবে অধিক গতিশীল, উৎপাদনশীল সমাজ এবং শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের দেশ। বিশ্বের জন্য এটাই প্রয়োজন।
এ পর্যন্ত যে পরিবর্তন হয়েছে তার প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট। ২০১৮ সালের শুরুতে আমি জেলে ছিলাম। আমাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে সরকার ছিল দৃঢ় অবস্থানে। তাই আমার জন্য ২০১৮ সালটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
জেলে থাকা অবস্থায় আমরা যে সমঝোতা করেছিলাম জোটের বিষয়ে সেই জোট নির্বাচনে নিরঙ্কুশ ও অপ্রত্যাশিত বিজয় পায়। এর অল্প কিছুদিনের মধ্যে আমি জেল থেকে মুক্তি পাই এবং আমাকে রাজকীয় ক্ষমা করা হয়। কয়েক মাসের মধ্যে আমি নির্বাচনে দাঁড়াই এবং একটি উপনির্বাচনের মাধ্যমে পার্লামেন্টে ফিরেছি। এখন আমি সংস্কারমুলক এজেন্ডা বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করছি। কয়েক দশকে বাস্তব পরিবর্তনের জন্য যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
যদি এটা ‘ডিজরাপশন’ হয় তাহলে আমি এর জন্য ২০১৯ ও তারপরের দিকেও তাকিয়ে থাকবো।
(আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে দেশটির পার্লামেন্টের একজন সদস্য। তিনি পারতি কেদিলান রাকায়াত দলের সভাপতি ও পাকাতান হারাপান কোয়ালিশনের নেতা। তার এ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে দ্য ডেইলি স্টারে। সেখান থেকে অনুবাদ)

নির্বাচন বাতিল ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি: ইসিতে ঐক্যফ্রন্টের স্মারকলিপি

একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বাতিল ও নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ফের জাতীয় নির্বাচন দিতে নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। আজ বৃহস্পতিবার ৩টার দিকে ফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবর স্মারকলিপি দেন তারা। 
এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, মঈন খান, গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক  মোস্তফা মোহসিন মন্টু, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব প্রমুখ।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলার সহায়তায় নির্বাচনের আগের রাত ৯টার মধ্যে সকল দোকানপাট বন্ধ করে সারাদেশে ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি করা হয়। এছাড়া ওই রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোটগ্রহন কর্মকর্তার সহায়তাায় আওয়ামী লীগকর্মী ও সন্ত্রসাবাহিনীর সহায়তায় ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট কেটে ব্যালেট বাক্সে ভর্তি করা হয়। ১৭টি পয়েন্টে অনিয়মের চিত্র ধরে হয় স্মারকলিপিতে। এছাড়া অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা, ভোট জালিয়াতি, সরকারি প্রশাসন তথা রাষ্ট্রযন্ত্রকে নজীরবিহীন ভাবে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার এবং নির্বাচন কমিশনের সর্বাতœক পক্ষপাতমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাপল বাতিল এবং অনতিবিলম্বে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানানো হয়। সিইসির হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
পরে সেখান থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সামনে স্মারকলিপির সারমর্ম তুলে ধরেন তিনি।
গুলশানে ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক:এর আগে সকালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের নিয়ে বৈঠক করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা।  বেলা সাড়ে  ১১টায়  বিএনপি চেয়ারপারসেনর গুলশান কার্যালয়ে এ বৈঠক শুরু হয়। শেষ হয় বেলা দেড় টায়। বৈঠকে প্রার্থীদর কাছ থেকে নির্বাচনে অনিয়মের বর্ণনা শুনেন তারা। অনেকেই লিখিত ভাবে তা জমা দিয়েছেন ফ্রন্টের নেতাদের কাছে। বৈঠক শেষে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান জানান, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি যাবেন নির্বাচন কমিশনে। ভোটে অনিয়মের চিত্রের প্রমাণ দিয়ে আসবেন। পরবর্তীতে করণীয় কি তা ফের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বিএনপি পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আজকের বৈঠকের বিষয় হাইকমান্ডকে জানানো হবে। সূত্র জানায় বৈঠকে নির্বাচনের বিভিন্ন এলাকায় অনিয়মের চিত্র তুলে ধরছেন প্রার্থীরা। এর পেক্ষিতে করণীয় কি হতে পারে সে বিষয়ে মতামতও দিয়েছেন তারা।  বৈঠকে উপস্থিত  প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকার ভোটের অনিয়মের একটি প্রতিবেদনও নিয়ে আসেন । গত ১লা জানুয়ারি  বিএনপির পক্ষ থেকে প্রার্থীদের একটি চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছিল ভোটে অনিয়ম-কারচুপির প্রমাণ, প্রতিটি কেন্দ্রের অস্বাভাবিক ভোটের হিসাব, গ্রেপ্তার এজেন্ট ও নেতা-কর্মীদের তালিকা, সহিংসতায় আহত ও নিহতদের তালিকাসহ ৮টি বিষয়ে তথ্যসহ একটি প্রতিবেদনও দিতে। ভোট কারচুপির ভিডিও থাকলে তাও প্রতিবেদনের সঙ্গে দিতে বলা হয়। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও গাজীপুর -৩ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ইকবাল সিদ্দিকী বলেন, নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আমার নির্বাচনী এলাকা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছি। সেখানে ভোটের অনিয়মের সব কিছু তুলে ধরেছি। গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, আমরা যেহেতু এই নির্বাচন প্রত্যাখান করেছি, ফলে কারও শপথ নেয়ার প্রশ্নই আসে না। বৈঠকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, জেএসডির আসম আব্দুর রব, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী,  বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন ।

স্বাধীনতা নতুন সংকটে -বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে মন্তব্য করেছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। তিনি বলেন, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আবার নতুন করে মহাসংকটে নিপতিত হলো। ক্ষমতাসীনদের সীমাহীন লোভ দেশ এবং দেশের মানুষকে আজকের অবস্থায় এনে ফেলেছে। গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নিজ বাসায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। কাদের সিদ্দিকী বলেন, ৩০শে ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা যে নির্লজ্জ ভোট ডাকাতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা এ জাতির ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে।
নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন এ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করেছিলো। ফলে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অন্যরাও খুবই নগণ্য ভোটে নির্বাচিত হয়, যা ছিল ন্যায় ও সত্যের বিচারে অবৈধ। কাদের সিদ্দিকী বলেন, এ বছর নানান টানাপড়েন থাকলেও দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
কিন্তু সরকার ও নির্বাচন কমিশন সংবিধান এবং ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতাকে পদদলিত করে নির্বাচনকে সমপূর্ণ প্রহসনে পরিণত করেছে। তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয়ে বিরোধী দলের দাবি-দাওয়া ও প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। তারপরও নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক এবং জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার স্বার্থে আমরা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি।
কিন্তু সমস্ত আইনকানুন ও সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমাদের নেতাকর্মীদের নামে গায়েবি মামলা ও পুলিশি হয়রানি করে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরিয়ে দিয়ে ফাঁকা মাঠে গোল  দেয়ার সব রকমের অপচেষ্টা করা হলেও নির্বাচনী মাঠে থাকার ব্যাপারে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। পদে পদে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, ভয়ভীতি, হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে আমাদের কর্মী- সমর্থকরা মাটি কামড়ে নির্বাচনী মাঠে থাকার চেষ্টা করেছে। বঙ্গবীর বলেন, বিভিন্ন স্থানে প্রচারণায় বাধা, হামলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় নির্বাচনী পোস্টার ছিঁড়ে ও পুড়িয়ে ফেলাসহ এহেন কোনো কাজ নেই যা সরকারি দল করে নি। জনগণ আশা করেছিল সেনাবাহিনী নামার পর পরিস্থিতির উন্নতি হবে, কিন্তু তার উল্টো হয়েছে। তিনি বলেন, ভোটের আগের রাতে সকল কেন্দ্রে সরকারদলীয় কর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মিলেমিশে প্রতি কেন্দ্রে অর্ধেক ভোট কোনো কোনো কেন্দ্রে তার চেয়েও বেশি নৌকা মার্কায় সিল মেরে বাক্স ভরে রাখে। যে কারণে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়ায় বেলা ১০টা-১১টার পর কোনো ভোটার ভোট দিতে পারেন নি, কারণ তাদের ভোট আগেই দেয়া হয়ে গেছে। অন্যদিকে সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে ধানের শীষের এজেন্টদের প্রবেশে বাধা দেয়া হয়।
এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারি দলের ক্যাডারের ভূমিকা পালন করে। সবকিছু মিলিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন ভোটের মৃত্যু ঘটায়, যা কোনো গণতান্ত্রিক দেশে সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। মানুষের ভোটাধিকার হরণের মাধ্যমে দেশের মানুষের যে ঘৃণা আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধু কন্যা অর্জন করলেন তা দেখে আমরা মর্মাহত এবং আতঙ্কিত। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বলেন, যখন স্বাভাবিক পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ হয়, তখনই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে, যা আমাদের কারোরই কাম্য নয়। দেশের ও মানুষের স্বার্থে এই নির্লজ্জ ভোট ডাকাতির নির্বাচন বাতিল করে অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি।

ঢাকা-ওয়াশিংটন আলোচনা হতে পারে: পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বৈঠক by মিজানুর রহমান



পার্টনারশিপ বা অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্কের যাবতীয় বিষয় নিয়ে শিগগিরই আলোচনায় বসছে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনে হবে সেই আলোচনা। এতে নেতৃত্ব দিতে যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণ পেয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক। তার বিপরীতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে নবনিযুক্ত আন্ডার সেক্রেটারি দেশটির প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেয়ার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া পরবর্তী এমন বৈঠকে উভয়ের আগ্রহ রয়েছে। গতকাল পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সেখানে তারা নীতিগতভাবে বৈঠকটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে আয়োজনের বিষয়ে একমত হয়েছেন। এখন উভয়পক্ষের ‘সুবিধাজনক সময়’ খোঁজা হবে।
সূত্রমতে, ওই বৈঠকে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশের কার্যকর অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হবে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অগ্রাধিকার ওই প্রকল্পের আওতায় সহযোগী বা সমর্থক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক সহযোগিতা’ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ওই স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশ আগেই সমর্থন দিয়েছে।
এখন এ থেকে বাংলাদেশ কীভাবে তার জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে অধিকতর লাভবান হতে পারে তা নিয়ে দ্বিপক্ষীয়ভাবে বিস্তৃত আলোচনার তাগিদ রয়েছে। সেগুনবাগিচার কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘রাজনৈতিক’ সম্পর্ক যেভাবেই দেখা হোক না কেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার। এটি আরও বিস্তৃত এবং গভীর করতে উভয়ে আগ্রহী। বাংলাদেশের নির্বাচন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র একটি ব্যালেন্স স্টেটমেন্ট দিয়েছে উল্লেখ করে দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা গতকাল মানবজমিনকে বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিজে ওই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। ভোটের দিনে সরজমিন পরিস্থিতি দেখতে তিনি সিলেটে গিয়েছিলেন। নির্বাচনের আগে এবং ভোটের দিনে যেসব অনিয়ম হয়েছে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। তারা অভিযোগগুলোর বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
তবে ওয়াশিংটন ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের সঙ্গে কাজ করা এবং গণতান্ত্রিক উন্নয়ন তথা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা দিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। কেবল সরকার নয়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সমর্থনে দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও ওয়াশিংটন যোগাযোগ রাখবে বলে জানিয়েছে। ঢাকার পেশাদার কূটনীতিকরা মনে করেন- যে কোনো সম্পর্কে ‘ভিন্নমত’ হতেই পারে। কিন্তু কূটনীতিতে জাতীয় স্বার্থ বরাবরই প্রাধান্য পায়। এটা মেনেই এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের সম্পর্ক এগিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দিনে দিনে আরও গভীর হবে বলেও আশা করছেন ঢাকার কর্মকর্তারা। উল্লেখ্য, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস উভয়ের আগ্রহেই গতকাল দিনের শুরুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. শহীদুল হক ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলারের মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক হয়। নভেম্বরে ঢাকায় আসা মার্কিন দূতের সঙ্গে সচিবের এটি ছিল দ্বিতীয় বৈঠক। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে এটিই তাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ-বৈঠক। সচিবের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর রাষ্ট্রদূত কোনো কথা বলেননি। তবে দায়িত্বশীল সূত্র বলছে সচিব-দূত বৈঠকে বাংলাদেশের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতি এবং অবস্থান নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব সন্ধ্যায় মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনসহ দুইদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তরিক পরিবেশে বৈঠকটি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনদিনের প্রচারণায় বাজিমাত মোকাব্বির খানের

নির্বাচনের মাত্র ছয়দিন আগে বৃটেন থেকে দেশে ফিরেন তিনি। প্রচারণায় সময় পেয়েছিলেন মাত্র তিনদিন। স্বল্প সময়ের প্রস্তুতি নিয়েই নির্বাচনে বাজিমাত করেন সিলেট-২ আসনের গণফোরাম প্রার্থী মোকাব্বির খান। তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করেন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী যে সাত প্রার্থী জয়ী হয়েছেন তাদের একজন মোকাব্বির। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর গণফোরামের প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন জমা দিয়ে বৃটেন চলে যান মোকাব্বির খান।
এ আসনে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ছিলেন নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা। কিন্তু আদালতে তার মনোনয়ন বাতিল হয়ে যাওয়ায় এ আসনে লড়তে নির্বাচনের মাত্র ছয়দিন আগে দেশে ফিরেন মোকাবিবর খান।
তিনি প্রচারণা চালাতে পেরেছেন মাত্র তিনদিন। উদীয়মান সূর্য্য প্রতীক নিয়ে এই আসনে মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির বর্তমান এমপি, কেন্দ্রীয় যুগ্ম  মহাসচিব ইয়াহ্‌ইয়া চৌধুরী এহিয়া এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহিবুর রহমানকে পরাজিত করে বিজয় ছিনিয়ে নেন গণফোরামের কেন্দ্রীয় এই নেতা। নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী মোকাব্বির খান ভোট পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৪২০ ভোট। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহিবুর রহমান পেয়েছেন ৩০ হাজার ৪শ’ ৪৯ ভোট। ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া ভোট পেয়েছেন ১৮ হাজার ৩২টি।
নিজের বিজয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে মোকাব্বির খান জানান, আমার নির্বাচনী এলাকার জনগণ এই নির্বাচনকে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলো। হাইকোর্ট কর্র্তৃক এই আসনের মহাজোট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের পর ৫/৬ দিন সময় থাকতে আমি নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় হই। যদিও এর আগে থেকেই আমি গণফোরামের প্রার্থিতা পেয়েছিলাম। তিনি বলেন, এত কম সময়ে এত বড় দুঃসাহস নিয়ে কেউ নির্বাচনের মাঠে নামার সাহস করতে পারবে না। কিন্তু আমি আমার এলাকার জনগণের উপর আস্থা রেখে অনেক দুঃসাহস দেখিয়ে নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় হয়েছিলাম। আমার এলাকার জনগণ আমার উপর আস্থা রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে আমাকে বিজয়ী করেছেন। এজন্য আমি তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।
ড. কামাল হোসেনের ঘনিষ্ঠজন ও আস্থাভাজন নেতা মোকাব্বির খান বলেন, আমি আমার নির্বাচনী এলাকার জনগণকে কথা দিয়েছিলাম যে, আমি কখনো দুর্নীতি করবো না, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবো না, সন্ত্রাসীকে প্রশ্রয়  দেবো না, ব্যক্তিগত সন্ত্রাসীবাহিনী গঠন করবো না। আমার কথার উপর আস্থা রেখেই জনগণ আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। আমি কখনো তাদের এই ভালোবাসার অমর্যাদা করবো না। মোকাব্বির খান বলেন, আমি আমার এলাকার জনসাধারণকে বলেছি আমার আহামরি টাকা-পয়সা নেই, আমি কারো অনুদান নেই না, কারো কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে নির্বাচন করিনি। এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াছ আলীর পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মোকাব্বির খান বলেন, তাহসিনা রুশদির লুনা আমাকে আন্তরিকভাবে সমর্থন জানিয়ে উনার ছেলে ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াছকে আমার নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত করেছেন। ইলিয়াছ আলীর ছোটভাই সিলেট জেলা বিএনপি’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আছকির আলী খুবই আন্তরিকভাবে আমার প্রচারণা ও নির্বাচনী জনসভায় উপস্থিত হয়ে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। আমি তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

ধর্ষণের ঘটনায় কেউ রেহাই পাবে না -ওবায়দুল কাদের

ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীতে গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত কেউ রেহাই পাবে না বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণসম্পাদক ওবায়দুল কাদের। গতকাল সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের বিদায়ী হাইকমিশনার হর্ষবর্ধণ শ্রিংলার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের এ কথা জানান। ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি এ ঘটনাটি সেদিনই জেনেছি। ওই নির্বাচনী এলাকা আমার নয়, কিন্তু আমার জেলায়। এ ধরনের ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয় এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত হোক- কেউ পার পাবে না। তিনি বলেন, আমি এ ব্যাপারে আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার মনোভাব জানি। অলরেডি পুলিশের আইজির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।
ডিআইজি সম্ভবত স্পটে গেছেন। সেনাবাহিনীর ওই অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসাররাও বিষয়টি সিরিয়াসলি দেখছেন। প্রশাসনও তৎপর। ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি বলতে পারি সরকার এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে আছে। এখানে অপরাধী যেই হোক, শাস্তি তাকে পেতেই হবে। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, নির্বাচনের দিবাগত রাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে রেখে এক নারীকে দল বেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই নারীর দাবি, ৩০শে ডিসেম্বর রোববার সকালে তিনি তার এলাকার ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে গেলে নৌকার কয়েকজন সমর্থক তাকে নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে বলেন। তিনি তখন ধানের শীষে ভোট দেয়ার কথা বললে তাদের সঙ্গে তর্কাতর্কি হয় এবং তাকে দেখে নেয়ার হুমকি দেন। পরে রাতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এদিকে নির্বাচন সংক্রান্ত নিউজের কারণে মঙ্গলবার বাংলা ট্রিবিউনের খুলনা প্রতিনিধি ও খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক প্রবাহের সিটি এডিটর হেদায়েত হোসেন মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাংবাদিক গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, বিষয়টি এখনও জানি না। খোঁজ নেব।
জনরায়কে মেনে নেয়া উচিত: জনরায়কে মেনে নেয়া উচিত বলে মন্তব্য করে ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্বাচনে বিজয়ী ঐক্যফ্রন্টের সাতজনও সংসদে বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারেন। ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত এমপিদের শপথ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, আমি সেটা আগেও বলেছি। একই কথা আমি বলব, বিষয়টি তাদের পুনর্বিবেচনা করা উচিত। যারা ইলেকটেড হয়েছেন তাদের জনগণ নির্বাচিত করেছেন। কাজেই জনগণের রায়কে তারা সম্মান করবেন- এটিই আমরা আশা করি। গতবার তারা নির্বাচন বয়কট করেছিলেন। এবার তারা অংশ নিয়ে যারা ইলেকটেড হয়েছেন তারা শপথ নেবেন না, তাহলে এটা কি জনরায়কে অসম্মান করা হয় না? আমি মনে করি তাদের জনরায়কে মেনে নেয়া উচিত। তিনি বলেন,সাতজনও একটা বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে পার্লামেন্টে। সংখ্যা কম হলে কণ্ঠস্বর দুর্বল নাও হতে পারে। নতুন মন্ত্রিসভায় কারা আসছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি আমার জন্য অ্যাম্ব্রাসিং, বিকজ এটা অ্যাবসিলিউটলি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এখতিয়ার, এ এরিয়াতে কারো অনুপ্রবেশের সুযোগ নেই। এটা একেবারেই তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তিনি প্রয়োজন মনে করলে কারো সঙ্গে আলাপ করতে পারেন। সেটাও তার ব্যাপার। এবার মন্ত্রিসভা বড় হবে নাকি, আগের মতোই হবে- এ বিষয়ে তিনি বলেন, সেটা আমি এ মুহূর্তে বলতে পারছি না। বাড়তেও পারে। প্রথমে একবারে বাড়বে সেটাও তো বলা যাচ্ছে না।
কেবিনেটে তো প্রথম কিছু হওয়ার পর, পরে সম্প্রসারিত হয়। এখন প্রথম কীভাবে করবেন তা প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার। এটাও কি রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের সরকার হবে- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, নট ইয়েট ডিসাইডেড। এসব বিষয়ে ফাইনালি কোনো সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। ১০ তারিখের মধ্যেই সব হয়ে যাবে- এটা আমি মোটামুটি জানি। বিরোধী দল কে হবে- এ বিষয়ে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, অপজিশন কে হবে, সেটা তো...। অপজিশন তো আছেই। গতবার তো অপজিশন ছিল তারাও তো আছেন। সেটা ঐকমত্যের সরকার ছিল। এবার ঐক্যফ্রন্ট আছে, তারা শপথ নেবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন, এটা চূড়ান্ত কি না সেটাও তো দেখার অপেক্ষা আছে। সাতজনের মধ্যে গণফোরাম আছে, তাদের আবার ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি না, সেটাও দেখার বিষয়। কাজেই ২-৩ দিনের মধ্যে সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে। পার্লামেন্টারি কমিটির মিটিং সম্ভবত কালকে (বৃহস্পতিবার) না-ও হতে পারে। পরেও হতে পারে। মেজরিটি পার্টি লিডার অব দ্য হাউজ হিসেবে শেখ হাসিনাকে যখন আমরা ইলেক্ট করব, তখন প্রেসিডেন্ট তাকে সরকার গঠনে শপথ নেয়ার জন্য আহ্বান করবেন। এটাই নিয়ম। বিপুল ভোটে বিজয়ী সরকারের চ্যালেঞ্জ কী হবে- জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন, চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নির্বাচনী ওয়াদা পূরণ করা। ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতিগুলো আমাদের লিডার শেখ হাসিনা জাতির সামনে ঘোষণা করেছেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই হলো চ্যালেঞ্জ।
বিশাল বিজয়ের সঙ্গে বিশাল দায়িত্বও জড়িয়ে আছে। ঐক্যফ্রন্ট আইনের আশ্রয় নেবে এবং আন্দোলনে যাবে- এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, লিগ্যাল ব্যাটল আমরা ফেইস করব। আর আন্দোলনের আওয়াজ তো শুনে আসছি ১০ বছর ধরে। দেখি এবার যদি কোনো আন্দোলন তারা বাস্তবে করতে যান তবে তা আমরা রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করব। নন-ভায়োলেন্ট মুভমেন্ট আমরা পলিটিক্যালি ফেস করব। ভায়োলেন্ট হলে সেটার জবাব দেয়ার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে। এ সময় ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা সাংবাদিকদের বলেন, আমি নতুন বছরের শুভেচ্ছা, একই সঙ্গে নির্বাচনে জয়লাভ করায় শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলাম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সেটাও জানিয়েছি।

খুলনায় গ্রেপ্তার সাংবাদিক রিমান্ডে: দুই সাংবাদিকের মামলা প্রত্যাহারের দাবি আসকের

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার বাংলা ট্রিবিউনের খুলনা প্রতিনিধি ও দৈনিক প্রবাহের সিটি এডিটর হেদায়েৎ হোসেন মোল্লাকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। বুধবার দুপুর ১২টার দিকে খুলনার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এর বিচারক নয়ন বিশ্বাস এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তারিক মাহমুদ তারা জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বটিয়াঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর  রহমান ৭ দিনের রিমান্ড দাবি করলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া মামলায় মঙ্গলবার বিকালে খুলনা মহানগরীর গল্লামারী এলাকা থেকে সাংবাদিক হেদায়েৎ হোসেন মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ৩০শে ডিসেম্বর রাতে খুলনার রিটার্নিং কর্মকর্তা তার কার্যালয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন। ওই ফলাফলে খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাট) আসনে মোট ভোটারের চেয়ে ২২ হাজারেরও বেশি ভোট গ্রহণ হয়েছে মর্মে বাংলা ট্রিবিউন ও দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় মঙ্গলবার সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ চৌধুরী বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বটিয়াঘাটা থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় সাংবাদিক হেদায়েৎ হোসেন মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এছাড়া মামলায় দৈনিক মানবজমিনের স্টাফ রিপোর্টার রাশিদুল ইসলামকেও আসামি করা হয়েছে।
এদিকে খুলনা প্রেস ক্লাবের সদস্য ও বিদায়ী কোষাধ্যক্ষ মো. হেদায়েৎ হোসেন মোল্লাকে গ্রেপ্তারের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ক্লাবের হুমায়ুন কবীর বালু মিলনায়তনে সাংবাদিকদের জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ক্লাবের সভাপতি এসএম হাবিবের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মো. সাহেব আলীর পরিচালনায় উপস্থিত সাংবাদিকরা সাংবাদিক গ্রেপ্তারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বক্তারা অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত সাংবাদিক মো. হেদায়েৎ হোসেন মোল্লাকে মুক্তি দেয়ার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।
সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন দৈনিক প্রবাহের সম্পাদক আশরাফ-উল-হক, দৈনিক পূর্বাঞ্চলের নির্বাহী সম্পাদক আহমদ আলী খান, ড. মো. জাকির হোসেন, দৈনিক প্রবর্তন সম্পাদক মোস্তফা সরোয়ার, অমিয় কান্তি পাল, গৌরাঙ্গ নন্দী, কাজী মোতাহার রহমান, মোজাম্মেল হক হাওলাদার, দৈনিক খুলনাঞ্চলের সম্পাদক মিজানুর রহমান মিলটন, মো. শাহ আলম, হাসান আহমেদ মোল্লা, মো. আনিসুজ্জামান, আনোয়ারুল ইসলাম কাজল, মামুন রেজা, কৌশিক দে বাপ্পি, মোস্তফা জামাল পপলু, মুনির উদ্দিন আহমেদ, মো. জাহিদুল ইসলাম, এনামুল হক, এএইচএম শামিমুজ্জামান, শামছুজ্জামান শাহীন, আবুল হাসান হিমালয়, অভিজিৎ পাল, বিমল সাহা, বাবুল আক্তার, শেখ লিয়াকত হোসেন, শেখ মাহমুদ হাসান সোহেল, আব্দুল মালেক, প্রবীর বিশ্বাস প্রমুখ।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিক গ্রেপ্তার, আসকের উদ্বেগ
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে খুলনার দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা এবং একজনকে গ্রেপ্তারে উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আসক এ উদ্বেগ জানিয়েছে। এতে বলা হয়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-১ আসনে ঘোষিত ফলে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ও মোট ভোটারের সংখ্যার পার্থক্য নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করায় দু’জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বটিয়াঘাটা উপজেলার নির্বাহী অফিসার। মামলার সূত্র ধরে ইতিমধ্যে একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
আসক জানায়, ডিজিটাল আইনের ধারাসমূহের ব্যাপকতা, ভুল বা ভ্রান্ত তথ্য প্রকাশের দায়ে সাংবাকিদের গ্রেপ্তার করা, ১৪টি অপরাধ জামিন অযোগ্য ঘোষণা প্রভৃতি কারণে শুরু থেকেই নানা পর্যায়ে সমালোচিত হয়ে আসছে। সাংবাদিকরা এই আইন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে তুলবে বলে বারংবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের শঙ্কা আরো বৃদ্ধি করবে। অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো ভুল তথ্য বা সংবাদ পরিবেশন করা হলে সেটির জন্য সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও তার প্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার নয়, বরং ভুল সংশোধনের কিংবা ব্যাখ্যা প্রদানের সুযোগ দেয়া যুক্তিযুক্ত। কেননা সাংবাদিকরা সাধারণত বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে তাদের সংবাদ উপস্থাপন করে থাকেন।
আসক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণমাধ্যমের প্রত্যাশিত ভূমিকা এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এ ঘটনার বৃহত্তর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে গ্রেপ্তারকৃত সাংবাদিককে দ্রুত মুক্তি দেয়ার এবং দুই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
এদিকে রাজশাহী প্রেস ক্লাব দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা মামলায় প্রতিবাদ জানিয়েছে।

ভোটে অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত চায় যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ার প্রতিক্রিয়া এসেছে। এ নিয়ে খোদ সরকারের মধ্যেই জল্পনা-কল্পনা ছিল। তাদের প্রতিক্রিয়া ‘পুরোপুরি নেতিবাচক’ হতে পারে মর্মে আগাম আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু কার্যত তা হয়নি। বরং ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর মঙ্গলবার রাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তাদের অবস্থান জানিয়েছে।
সেখানে তারা তাদের আকাঙ্ক্ষা, বাস্তবতা এবং পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়গুলো স্পষ্ট করেছে। ১০ বছরের মধ্যে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হওয়া এবং তাতে সরকার ও বিরোধী দল তথা মানুষের অংশগ্রহণের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে।
তবে প্রচার-প্রচারণা এবং ভোটের দিনের অনিয়ম বিশেষত বল প্রয়োগ, ভোটদানে বিরোধীদের বাধা প্রাপ্তি, বেশ কিছু স্থানে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় পশ্চিমারা প্রায় অভিন্ন সূরেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা অনিয়ম এবং সহিংসতার নির্ভরযোগ্য রিপোর্ট বা ঘটনাগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত করতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে।
নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ, ইসিকে সমস্যা সমাধানের আহ্বান: বাংলাদেশে নির্বাচনের দিনে ভোটারদের ভোটদানে বিরত রাখার অনিয়মের অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বলা হয়েছে, এতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর যে আস্থা তা কমিয়ে দিয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে সব পক্ষকে নিয়ে গঠনমূলকভাবে সমাধান করতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়। মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি মুখপাত্র রবার্ট পালাদিনো ‘বাংলাদেশ ইলেকশন’ শীর্ষক বিবৃতি দেন। এতে বলা হয়, ৩০শে ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কয়েক কোটি বাংলাদেশি ভোট দিয়েছেন এবং নির্বাচনে সব বড় বিরোধী দল অংশগ্রহণ করেছে। এজন্য তাদের প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে বলা হয়, ২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জনের পরে এটি একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।
ওই বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এবং এর গণতান্ত্রিক উন্নয়নে গভীরভাবে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানিকারী দেশ এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিপুল সংখ্যক মানুষের দেশ যুক্তরাষ্ট্র।
বিবৃতিতে রবার্ট পালাদিনো আরো বলেন, এর প্রেক্ষিতে আমরা নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ের হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন ও সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্টের বিষয়গুলো উদ্বেগের সঙ্গে নোট নিচ্ছি। ওইসব কারণে বিরোধীদলীয় বহু প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা মুক্তভাবে সভা, র‌্যালি ও নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারেন নি। নির্বাচনের দিনে কিছু মানুষকে ভোট দিতে দেয়া হয় নি। এটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি যে আস্থা আছে তাকে খর্ব করেছে। নির্বাচনের দিনের এ অনিয়মের বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সব দলকে আমরা সহিংসতা থেকে বিরত থাকার জন্য জোরালোভাবে উৎসাহিত করছি। নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ করছি অনিয়মের বিষয়ে সমাধান করতে সব পক্ষকে নিয়ে গঠনমূলকভাবে কাজ করতে। বাংলাদেশের উৎসাহব্যঞ্জক অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা একটির সঙ্গে অন্যটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। আমরা ক্ষমতাসীন সরকার ও বিরোধীদের সঙ্গে এই আন্তঃসম্পর্কযুক্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য অব্যাহতভাবে কাজ করতে চাই।
নির্বাচনের সব অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ সমাধানের আহ্বান বৃটেনের: নির্বাচনে সব রকম অনিয়মের কারণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বৃটেন। নির্বাচন পরিচালনা সংক্রান্ত সব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ সমাধানের জন্য জোরালো আহ্বান জানিয়েছে তারা। বৃটিশ সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয়বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনানুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার পর এ বিবৃতি দিয়েছেন। এতে তিনি বলেছেন, অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন যেকোনো কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য অত্যাবশ্যক। এ নির্বাচনে বিরোধীদের অংশগ্রহণের জন্য তিনি অভিনন্দন জানিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে তার বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন, গ্রেপ্তারসহ সব রকম বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে আমি অবহিত। এমন গ্রেপ্তারের কারণে বিরোধী দলগুলো নানাভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তাদের প্রচারণায় বিরত রাখা হয়েছে। নির্বাচনের দিনে নির্বাচন পরিচালনায় যেসব অনিয়ম হয়েছে, অনেক মানুষকে ভোট দিতে দেয়া হয়নি, এসব অনিয়মের বিষয়ে বৃটেন অবহিত।
মার্ক ফিল্ড তার বিবৃতিতে বলেন, নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে যেসব ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, অন্যায়ভাবে সহিংসতা করা হয়েছে তার জন্য আমি হতাশা প্রকাশ করছি। নির্বাচনের দিনে এত মানুষের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের প্রতি আমার সহমর্মিতা।
মার্ক ফিল্ড বলেন, সরকার ও সব বিরোধী দল নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য মিটিয়ে ফেলে একত্রে কাজ করা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশি জনগণের স্বার্থে তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে বের করতে হবে।
বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের ব্যাপকভিত্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব আছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বসবাস করেন বৃটেনে। অধিক স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য বাংলাদেশিদের প্রতি বৃটেনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান বৃটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

নির্বাচনে মানুষ স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে -প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের জনগণ যুদ্ধাপরাধী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। বাংলাদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধী এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির কোনো ঠাঁই নেই এবং দেশ কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনাতেই এগিয়ে যাবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সেই সম্মতিই লাভ করেছে আওয়ামী লীগ। এই নির্বাচনে বিপুল জয়লাভের মধ্য দিয়ে দায়িত্বটা আরো বেড়ে গেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করায় মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা গণভবনে শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানাতে এলে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, কবি-সাহিত্যিক, গায়ক-গায়িকা, চিকিৎসক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচন দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সকল শ্রেণির এবং শ্রেণি-পেশার জনগণ নৌকার বিজয়ের জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, যে কারণেই এই বিজয়। আওয়ামী লীগের এই বিপুল বিজয়ে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার জনগণ যেমন- কবি, শিল্পী থেকে সাহিত্যিক এমনকি সাধারণ জনগণের পর্যন্ত আগ্রহ ছিল, নৌকা যেন জয়লাভ করে।
তিনি বলেন, ‘আমি সমগ্র দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি এবং আমি আশা করি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সামনে এগিয়ে যাবে।’
দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে প্রধানমন্ত্রী দেশের সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘আমি সকলের সহযোগিতা চাই যাতে করে দেশের প্রগতি এবং উন্নয়ন অব্যাহত থাকে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে এবং সাংস্কৃতিকভাবে আরো এগিয়ে যাবো এবং বিশ্বে মাথা উঁঁচু করে চলবো। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ আমরা অবশ্যই বিনির্মাণে সক্ষম হব ইন্‌শাআল্লাহ।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের সেবা করাটা একটি বড় কাজ এবং আমি যতদিন বেঁচে থাকবো এটা অব্যাহত রাখবো।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনের পরে দেশ ও জনগণের প্রতি আমার দায়িত্বটা আরো বেড়ে গেছে।’ বাংলাদেশ স্কাউটস্‌ এবং গার্লস গাইড এসোসিয়েশনের কর্মকর্তাবৃন্দ, উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাবৃন্দ গতকালের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। শেখ হাসিনা বলেন, রোববারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় সকল সমপ্রদায় এবং শ্রেণি-পেশার জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। ‘সমাজের সর্বস্তরের জনগণ আওয়ামী লীগের বিজয়ের জন্য সর্বান্তকরণে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল এবং এজন্য আমি তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
নিরঙ্কুশ বিজয়ে শেখ হাসিনাকে পুতিনের অভিনন্দন: রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ে দলের সভাপতি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এক বার্তায় রোববারের জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, পুতিন প্রধানমন্ত্রীর সাফল্য এবং বাংলাদেশের অব্যাহত, শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি কামনা করেছেন।
রংপুর বিভাগ সমিতির অভিনন্দন: এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে ঢাকাস্থ রংপুর বিভাগ সমিতি। বুধবার সকালে সমিতির নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে গিয়ে তাকে ফুলেল অভিনন্দন জানান। রংপুর বিভাগ সমিতির সভাপতি সাবেক সিনিয়র সচিব মাহফুজুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব নূরুল ইসলামের নেতৃত্বে এ সময় সমিতির অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় নির্বাচন: দেশ-বিদেশে প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম ও সহিংসতার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে এ সকল বিষয়ে উত্থাপিত অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ইউরোপের ২৮ রাষ্ট্রের ওই জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ভোটের দিনে সহিংসতা এবং প্রচার-প্রচারণায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকা বিশেষত পুরো প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য বাধাদান ভোট এবং ভোটের পরিবেশকে দূষিত করেছে। নির্বাচনের দিন এবং তার আগে ঘটে যাওয়া সহিংস ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত চেয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
তাছাড়া, বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন নিয়ে উত্থাপিত সব অভিযোগের স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাজ্য। গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে এমন আহ্বান জানান দেশটির পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মার্ক ফিল্ড বলেন, নির্বাচন ঘিরে গ্রেপ্তার এবং বাধা প্রদানের বিশ্বাসযোগ্য ঘটনাগুলোর পাশাপাশি এসব ঘটনা যে বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারকে সীমিত করেছে অথবা প্রচারণা থেকে বিরত রেখেছে, সেসব বিষয়ে তিনি অবগত। নির্বাচনের দিন অনিয়মের কারণে ভোটারদের ভোট দিতে না পারার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই বিবৃতিতে মার্ক ফিল্ড নির্বাচনী প্রচারকালে ঘটে যাওয়া ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সংঘাতের ঘটনাগুলোর নিন্দা জানান।
ওদিকে, বাংলাদেশে নির্বাচনের দিনে ভোটারদের ভোটদানে বিরত রাখার অনিয়মের অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ভোটারদের বাধা প্রদানে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর যে আস্থা তা খর্ব হয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে সব পক্ষকে নিয়ে গঠনমুলকভাবে সমাধান করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এসব কথা বলা হয়েছে।
এদিকে বিএনপি অভিযোগ করেছে, ভোটে ‘কারচুপির’ পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরোধী মতের মানুষের ওপর ‘সন্ত্রাস’ চালাচ্ছে।
দলটির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হননি, বরং প্রত্যেক এলাকার ইউএনও, থানার ওসি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।”
ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “নির্বাচনের নামে নিষ্ঠুর রসিকতা করে এখন জনপদের পর জনপদে ধানের শীষের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর চলছে পৈশাচিক বর্বরতা। আক্রমণ করে ভেঙে ফেলা হচ্ছে নিরীহ মানুষের বাড়ি-ঘর-দোকানপাট-বাজার। অগ্নি সংযোগ করা হচ্ছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কৃষি খামার-সহায় সম্পদের ওপর বেপরোয়া হানা দেওয়া হচ্ছে অবিরামভাবে।”
এর আগে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন সদ্য সমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে স্বীকৃতি না দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি  আহ্বান জানিয়েছেন।
ড. কামাল হোসেন
মঙ্গলবার একটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ড. কামাল বলেন, 'আমি আশা করি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের জনগণের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এ ‘ভোট ডাকাতি’র নির্বাচনকে কোনোভাবেই স্বীকৃতি দেবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রহসনের এ নির্বাচনে জনগণের মতামতের কোনো প্রতিফলনই ঘটেনি। এটিকে সরকারের একটি ‘পাতানো নির্বাচন’ বলেও দাবি করেন প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ।'
অপরদিকে, ঐক্য ফ্রন্টের শরীক কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী আজ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভাবীকালে দেশের ইতিহাসে একটা কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে। সরকারের এ বিজয় অল্প কিছুদিনের মধ্যেই নিন্দার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
বুধবার মোহাম্মদপুরস্থ নিজ বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ভাড়া করা কিছু বিদেশি পর্যবেক্ষক সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে দাবি করলেও এটি ছিল অস্বাভাবিক কারচুপির নির্বাচন, ত্রুটিতে ভরা কলঙ্কিত নির্বাচন। এর মাধ্যমে  দেশে নির্বাচন পদ্ধতির অপমৃত্যু ঘটেছে।
এদিকে, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেছেন, গত ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণতন্ত্র ও সংবিধান পরাজিত হয়েছে স্বৈরতন্ত্র জয়ী হয়েছে। তাই এ নির্বাচন বাতিল করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট  আইনজীবী সমিতিরি সভাপতি।  
এর আগে, নির্বাচনে অংশ নেয়া ইসলামি দল খেলাফত মজলিস ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনকে জাতির কাছে অগ্রহণযোগ্য ভোট ডাকাতি ও প্রহসনের নির্বাচন উল্লেখ করে ওই নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করা এবং একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবিলম্বে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।
খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে গৃহীত এক প্রস্তাবে  বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যন্ত্রকে অবৈধভাবে ব্যবহার করে, জনগণের উপর পৈচাশিক নির্যাতন চালিয়ে ভোটাধিকার হরণ করে ফ্যাসিবাদী সরকারকে মসনদে টিকিয়ে রাখার জন্যে নির্বাচনের নামে যে মহাপ্রহসন মঞ্চস্থ করা হলো তা জাতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে খোদ নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতিই মানুষের আস্থা চিরতরে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে জালিয়াতি আর নীলনক্সার নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার কোনভাবেই জনগণের সরকার হতে পারে না। 
খেলাফত মসলিজ দাবি জানিয়েছে, দলীয় সরকারের পরিবর্তে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধিনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর এ দাবি আদায়ে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।