Saturday, November 21, 2015

অ্যালার্জির চিকিৎসা by অধ্যাপক ডা: জি এম ফারুক

অ্যালার্জি। বাংলায় যার প্রতিশব্দ অপছন্দ। ক্লিমেনস ফন পির্কে (১৮৭৪-১৯২৯) নামে একজন অস্ট্রিয়ার শিশুচিকিৎসক ১৯০৬ সালে এই অ্যালার্জি শব্দটি প্রথম প্রয়োগ করেন। শব্দটি গ্রিক। গ্রিক ভাষায় ‘অ্যালো’ মানে ভিন্ন এবং ‘আরজন’ মানে ক্রিয়া। তাই অ্যালার্জির মানে দাঁড়ায় ভিন্নধরনের ক্রিয়া। অর্থাৎ এমন একটা ক্রিয়া, যা সাধারণ থেকে ভিন্ন। যেসব জিনিস থেকে এ ধরনের ভিন্ন প্রতিক্রিয়া হয় (ফুলের রেণু বা সাবানে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ) এগুলোকে বলা হয় অ্যালার্জিন। এ ধরনের অ্যালার্জিনের সংখ্যা অগণিত। এমন কথাও বলা যায়, পৃথিবীর যেকোনো জিনিস থেকেই অ্যালার্জি হওয়া সম্ভব। তবে খুব পরিচিত অ্যালার্জিন হলো বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য (পনির, গরুর দুধ, ময়দা, ডিম প্রভৃতি) ধুলো, ফুলের রেণু, কিছু ওষুধ ও রাসায়নিক পদার্থ। সংবেদনশীল (অ্যালার্জিক) মানুষের ওপর অ্যালার্জিনের প্রতিক্রিয়া তখনই হয়, যখন শরীরের সাথে বস্তুটির প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ঘটে। এ প্রত্যক্ষ যোগাযোগ চার প্রকারে হতে পারে- ১. নিঃশ্বাসের মাধ্যমে, যেমন- ফুলের রেণু; ২. কোনো কিছু খেলে, যেমন- গরুর দুধ; ৩. সুচ প্রয়োগ, যেমন- টিকা; ৪. স্পর্শের মাধ্যমে, যেমন- কসমেটিক বা কৃত্রিম রঙ।
এসব ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন- নিঃশ্বাসের সাথে অ্যালার্জিন গ্রহণ করলে শ্বাসকষ্ট হয়। অ্যালার্জিনটি খাবার হলে বমনেচ্ছা, বমি, পেট খারাপ বা পেটের অসুখ হয়। অ্যালার্জিনটি কসমেটিক কিংবা কৃত্রিম রঙ হলে চর্মের সংস্পর্শে তা ফুসকুড়ি, চুলকানি বা পানিভরা ফোসকা সৃষ্টি করবে।
অ্যালার্জির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যে পরীক্ষা করা হয় তার নাম প্রাউসনিৎস-কুস্টনার বিক্রিয়া। হাইনৎস কুস্টনার (১৮৯৭-১৯৩১) এর আবিষ্কারক। তিনি ছিলেন একজন জার্মান স্ত্রীরোগবিশারদ। তার প্রচণ্ড অ্যালার্জি ছিল রান্না করা মাছে। রান্না করা মাছ খেলেই তার গা চুলকাত। হাঁচি, কাশি ও বমি হতো। প্রায় ১২ ঘণ্টা পর এসব প্রতিক্রিয়া বন্ধ হতো।
কুস্টনারের এ প্রতিক্রিয়ার গবেষণায় এগিয়ে এলেন তৎকালীন জার্মান জীবাণুতত্ত্ববিদ কার্ল ভিলহেলম প্রাউসনিৎস (১৯৬১-১৯৩৩)। তিনি কুস্টনারের রক্ত থেকে কিছু সিরাম (রক্তের পানীয় অংশ) তার নিজের রক্তের সাথে মিশিয়ে দেন ইনজেকশনের মাধ্যমে। তারপর রান্না করা মাছের নির্যাসের ইনজেকশন দেন তার শরীরের একই জায়গায়, যেখানে রক্তের সিরামের ইনজেকশন দেয়া হয়েছিল। ইনজেকশনের পরপরই তিনি হতবাক হয়ে দেখলেন, কুস্টনারে দেহের প্রতিক্রিয়াগুলো তার শরীরেও স্পষ্ট প্রতীয়মান। প্রাউসনিৎসের এ পরীক্ষাটির দ্বারা তার রিয়াজিন তত্ত্ব প্রমাণিত হয়। অর্থাৎ তার মতে, সংবেদনশীল মানুষের রক্তে একধরনের বিশেষ পদার্থ আছে, যার নাম রিয়াজিন (রিএজেন্ট থেকে রিয়াজিন)। এই রিয়াজিন ও অ্যালার্জিনের বিক্রিয়ার ফলেই শরীরে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। স্বাভাবিক মানুষের রক্তে সাধারণত এই রিয়াজিন থাকে না। বর্তমানে এই রিয়াজিনকে বলা হয় ‘ইম্যুনোগ্লোবুলিন-ই অ্যান্টিবডিজ’। এখানে অ্যান্টিবডি হচ্ছে ওইসব রাসায়নিক পদার্থ, যা অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে শরীরে সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ যখনই কোনো বহিরাগত প্রোটিন দেহে প্রবেশ করে, তখনই আমাদের শরীর তাকে শত্রু বলে চিহ্নিত করে এবং এর বিরুদ্ধে রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করতে শুরু করে। যেসব পদার্থ প্রোটিনের বিরুদ্ধে রাসায়নিক তৈরি করতে শরীরকে বাধ্য করে, তাদের বলা হয় অ্যান্টিজেন (গ্রিক অ্যান্টিজেন অর্থ আমি সৃষ্টি করি)। বস্তুত সব অ্যালার্জিনই হলো অ্যান্টিজেন। এসব অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে শরীর যেসব রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে তাকে বলা হয় ‘অ্যান্টিবডি’। এই অ্যান্টিবডিও প্রোটিন অণু, যা রক্তের সাথে মিশে থাকে।
আমরা জানি, মানুষের ১০০ কিউবিক সেন্টিমিটার রক্তে প্রায় সাত গ্রাম প্রোটিন থাকে, যার মধ্যে প্রধানত তিন প্রকার প্রোটিন থাকে। মোট প্রোটিনের ৬০ শতাংশ হলো অ্যালবুমিন, ৩৫ শতাংশ গ্লোবিউলিন (কারণ তারা গোলাকৃতি) এবং বাকি ৫ শতাংশ হলো ফাইব্রিনোজেন, যার সাহায্যে রক্ত জমাট বাঁধে। আমাদের শরীরের সব অ্যান্টিবডি থাকে রক্তের গ্লোবিউলিন অংশে। আর অনাক্রম্য ইমিউন বিক্রিয়ায় (অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি বিক্রিয়া) সাহায্য করে বলে তাদের বলা হয় ইম্যুনোগ্লোবিউলিন। যেসব গ্লোবিউলিন এই অনাক্রম্য বিক্রিয়ায় জড়িত থাকে না তাদের বলা হয় নন-ইমিউন গ্লোবিউলিন। তাদের কাজ হলো বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ রক্তে বয়ে নিয়ে যাওয়া। গঠনপ্রণালীর ভিত্তিতে পাঁচটি বিভিন্ন শ্রেণীর প্রধান ইম্যুনোগ্লোবিউলিন শনাক্ত করা হয়েছে এবং নামে পরিবর্তে বিভিন্ন ইংরেজি অক্ষরের তাদের প্রকাশ করা হয়। এই পাঁচটি প্রধান ইম্যুনোগ্লোবিউলিন হলো ওমস, ওমঅ, ওমএ, ওমঊ, ওমউ এদের মধ্যে ওমঊ অ্যালার্জি বিক্রিয়ায় জড়িত (ওম মানে ইম্যুনোগ্লোবিউলিন)।
এখানে, মনে রাখা দরকার, রোগ সৃষ্টিকারী সব জীবাণুতেই প্রোটিন রয়েছে। দেহের অনাক্রম্য ব্যবস্থা ইমিউন সিস্টেম এসব বিপজ্জনক প্রোটিনকে সহজেই শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করতে আরম্ভ করে। সব অ্যান্টিবডিই যে সবরকম অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে লড়তে পারে তা কিন্তু নয়। বরং প্রত্যেক অ্যান্টিবডিই সুনির্দিষ্ট এবং কোনো একটি বিশিষ্ট অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধেই লড়তে পারে।
আমাদের শরীরে নিরীহ প্রোটিনের জন্য যে অ্যান্টিবডি সৃষ্টি হয় সেগুলো ইম্যুনোগ্লোবিউলিনের ওমব শ্রেণীর। তারা অবস্থান করে বিশেষ ধরনের এক কোষের ওপর, যার নাম মাস্ট সেল। এগুলো প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় চামড়ায়, শ্বাসনালী এবং খাদ্যনালীতে। এদের মধ্যে বহু রাসায়নিক পদার্থ থাকে যাদের প্রধান হলো ‘হিস্টামিন’। যখন কোনো নিরীহ প্রোটিন অথবা অ্যালার্জিন দেহে প্রবেশ করে, যেমন- ফুলের পরাগ, তখন তারা ওই মাস্ট সেলে পৌঁছে যায়, যার উপর ইতোমধ্যে ওই অ্যালার্জিনের প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি বসে আছে। তখন তাদের মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড যুদ্ধ, যার ফলে কোষটি ফেটে যায় এবং নিঃসরিত হয় হিস্টামিন। এ হিস্টামিন অল্প পরিমাণে দেহের পক্ষে উপকারী হলেও, এক সাথে অধিক পরিমাণ নিঃসারিত হলে হিস্টামিন বিপদের সৃষ্টি করে এবং অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। যেমন নিঃশ্বাসের সাথে অ্যালার্জিন শরীরে ঢুকলে যে অ্যালার্জি দেখা দেয় তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো হাঁপানি এবং হে ফিভার। হাঁপানি হলো শ্বাসকষ্ট, যা হতে পারে ফুলের রেণু, প্রাণীর লোম বা ধূলিকণা প্রভৃতি নিঃশ্বাসের সাথে ঢুকে গেলে। বাড়ির মধ্যেই রয়েছে এসব পরিচিত অ্যালার্জিন- যেমন ধূলিকণা, যা চোখে দেখা যায় না অথচ প্রচুর থাকে বিছানায়, কার্পেটে ও পর্দায়। যখনই পরিষ্কার করার জন্য পর্দা বা কম্বল ঝাড়া হয়। তখনই বাড়ির মধ্যে থাকা কোনো সংবেদনশীল মানুষের হাঁপানি শুরু হয়ে যায়।
আবার যেকোনো খাদ্যদ্রব্য থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে, যেমন, দুধ, ময়দা, ডিম, স্ট্রবেরি, চিংড়ি, কাঁকড়া, বাদাম, প্রভৃতি। এসব খাবার খেলে সংবেদনশীল মানুষের বমি, বমি ভাব এবং পেটের অসুখ ছাড়াও এর ফলে জিভ বা ঠোঁটও ফুলে যেতে পারে। আর অ্যালার্জিন যদি রক্তপ্রবাহের সাথে মিশে যায় তাহলে গায়ে ফুসকুড়ি বা চুলকানি, কিংবা একজিমা দেখা দিতে পারে। স্পর্শের দ্বারা অ্যালার্জিন শরীরে গেলে চামড়ায় চুলকানি, প্রদাহ বা আমবাত হতে পারে। এখানে মনে রাখা দরকার যে, অ্যালার্জি, অ্যাজমা, একজিমা, তারা তিন সহোদর হিসেবে পরিচিত।
অ্যালার্জির ভালো চিকিৎসা হচ্ছে অ্যালার্জিনকে এড়িয়ে চলা। অ্যালার্জিক খাবার না খাওয়া। কিন্তু বিশেষ অসুবিধা হলো তাদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। আমাদের চারপাশে বহুবিধ জিনিস আছে এবং তাদের যেকোনো একটার ফলেই অ্যালার্জির লক্ষণ দেখা দিতে পারে। চার দিকে অসংখ্য রকমের ফুল আছে। কোনো কোনো ফুলের পরাগ থেকে যেকোনো লোকের অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে। আবার খাবারে অ্যালার্জি। কিন্তু কোন খাবারে অ্যালার্জি? সব খাবারে সবার অ্যালার্জি থাকে না। কোনো খাবারে কারো অ্যালার্জি আছে কি না তা পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট খাদ্যের লঘু দ্রবণ জিভের তলায় কয়েক ফোঁটা দিয়ে দেখা হয় জিভ বা ঠোঁটের কোনো স্ফীত হলো কি না।
অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতির মতো হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাপদ্ধতিতেও অ্যালার্জির ভালো ভালো ওষুধ রয়েছে। যেমন ধুলোজনিত অ্যালার্জিতে আর্সেনিক অ্যালবাম, ব্রোমিয়াম, হিপার সালফ ভালো কাজ করে। ফুলের রেণুতে যাদের অ্যালার্জি তাদের জন্য অ্যালিয়াম সেপা, অ্যামোন কার্ব, ন্যাট্রাম সালফ ইত্যাদি ওষুধ। দুধে যাদের অ্যালার্জি তাদের জন্য রয়েছে ক্যালকেরিয়া কার্ব, চায়না, ন্যাট্রাম কার্ব ইত্যাদি। ডিমে যাদের অ্যালার্জি তাদের জন্য পালসেটিলা, চিনিনাম আর্স, ফেরাম মেট ইত্যাদি। গোশতে অ্যালার্জি থাকলে আর্সেনিক অ্যালবাম, কেলি কার্ব, চায়না ইত্যাদি। আপেলে যাদের অ্যালার্জি তাদের জন্য মার্ক কর, বেলেডোনা, আর্সেনিক ইত্যাদি। মাছে অ্যালার্জি থাকলে প্লাম্বাম, কার্বো অ্যালিমিলিস, পালসেটিলা ইত্যাদি। তেমনিভাবে অ্যালার্জিক অ্যাজমার জন্য ব্যবহৃত হয়, আর্সেনিক অ্যাল্ব, আর্সেনিক আয়োড, ন্যাট্রাম সালফ, নাক্স ভম ইত্যাদি। এসব শুধু উদাহরণ। যারা এসব ওষুধ ব্যবহার করবেন তাদেরকে রোগীর বিস্তারিত চিত্র অনুযায়ী ওষুধ বাছাই করতে হবে। মোট কথা অ্যালার্জিতে হোমিওপ্যাথি ওষুধের ফলপ্রদ ব্যবহার রয়েছে।
লেখক : নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ
রোড-১১, বাড়ি-৩৮, নিকুঞ্জ-২, খিলক্ষেত, ঢাকা। মোবাইল : ০১৭১২৮১৭১৪৪, ০১৫৫৬৬৩১৯৬৫।

ফাঁসির আসামির প্রাণভিক্ষা চাওয়ার প্রক্রিয়া কি

মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ আজ রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন। তবে রাষ্ট্রপতি তা নামঞ্জুর করেছেন। এর আগে ১৯৭১এর মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দুজনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছে। এর হলেন জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতা আবদুল কাদের মোল্লা এবং অপরজন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। এরা কেউই প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন নি। তাই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির কাছে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদই প্রথম প্রাণভিক্ষার আবেদন করলেন - যদিও মৃত্যুদন্ড কার্যকরের আগে শেষ সাক্ষাতের পরও তাদের পরিবারের লোকেরা দাবি করেছেন, এ খবর সঠিক নয়। কিন্তু ফাঁসির আসামির প্রাণভিক্ষার আবেদন ঠিক কিভাবে করতে হয়? এ নিয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদের সাথে কথা বলেন বিবিসি বাংলার মিজানুর রহমান খান। প্রশ্ন: প্রাণভিক্ষা চাওয়ার আবেদন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কিভাবে করেন? শফিক আহমেদ: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির কাছে কারা কর্তৃপক্ষ জানতে চাইবে যে তিনি প্রাণভিক্ষা চেয়ে কোনো আবেদন করতে চান কীনা। তারপর সেই আবেদন দেওয়া হবে কারাগারের প্রধান কর্মকর্তা অর্থাৎ জেলারের কাছে। জেলার সেই দরখাস্তটি পাঠিয়ে দেবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে। এবিষয়ে মতামত চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবেদনটি পাঠাবে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছে। যে অপরাধের জন্যে আসামির ফাঁসি হয়েছে সেসব অপরাধের ব্যাপারে আসামি কোনো ধরনের অনুকম্পা পেতে পারেন কীনা সেবিষয়ে মতামত দিয়ে আবেদনটি পাঠাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে। তারপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার নোটসহ ফাইলটি পাঠাবে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সে ফাইল যাবে রাষ্ট্রপতির কাছে। প্রশ্ন: কিন্তু প্রাণভিক্ষার আবেদনটা করা হয় রাষ্ট্রপতির বরাবরে.. শফিক আহমেদ: রাষ্ট্রপতির বরাবরে কিন্তু সাবমিট করতে হবে জেলারের কাছে। কারণ ওই আসামি জেলখানায়, জেলারের হেফাজতে রয়েছেন। প্রশ্ন: আসামির কাছ থেকে এই মৃত্যুদণ্ড কে সংগ্রহ করেন? এজন্যে কি তার কাছে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট পাঠাতে হয়? শফিক আহমেদ: ম্যাজিস্ট্রেট লাগবে না। জেলারই তার কাছে এটা চাইবেন। এজন্যে তিনি আসামীকে একটা সময় বেঁধে দেবেন। প্রশ্ন: আবেদন করার জন্যে কি নির্দিষ্ট কোনো ফর্ম আছে? শফিক আহমেদ: হ্যাঁ, ফর্মও আছে। আবার কেউ ইচ্ছে করলে তিনি নিজেও আলাদা কাগজে আবেদন করতে পারেন। যদি শিক্ষিত হন তাহলে কাগজ কলম চাইতে পারেন। সাধারণত যারা শিক্ষিত আসামি তারা নিজেরাই কাগজ কলম চেয়ে নিজেরাই আবেদন করে থাকেন। প্রশ্ন: এই আবেদন করার সময় কি আসামিকে অপরাধ স্বীকার করতেই হয়? শফিক আহমেদ: হ্যাঁ, তাকে অপরাধ স্বীকার করতে হবে। তাকে সুনির্দিষ্টভাবে বলতে হবে যে অভিযোগে আমি অভিযুক্ত হয়েছি সেগুলো প্রমাণিত হয়েছে এবং আমি এসব অপরাধ করেছি। সেজন্যে আমাকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং এখন আমি প্রাণভিক্ষা চাইছি। প্রশ্ন: একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামির যদি কিছু বলার থাকে, বিচার প্রক্রিয়াসহ যেকোনো বিষয়ে, সেসব বলার কোনো সুযোগ আছে? শফিক আহমেদ: না, কোনো সুযোগ নেই। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে কোনো প্রশ্ন তোলা বা কোনো রকমের মন্তব্য করার অধিকারও তার নেই। করলে এই আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। প্রশ্ন: আসামি আবেদন করছেন রাষ্ট্রপতির কাছে কিন্তু সেটা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হচ্ছে কেনো? শফিক আহমেদ: কারণ সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে যে রাষ্ট্রপতি নিজের ইচ্ছা অনুসারে দুটো কাজ করতে পারেন। ১. দেশে নির্বাচনের পর বিজয়ী দলের নেতাকে তিনি সরকার গঠন করতে আমন্ত্রণ জানাতে পারেন। ২. প্রধান বিচারপতি নিয়োগ। এছাড়া সমস্ত কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করতে হবে। প্রশ্ন: তাহলে কখন কার ফাঁসি কার্যকর করা হবে সেই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির নয়.. শফিক আহমেদ: না, সরকার প্রধানের অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে পরামর্শ দেবেন রাষ্ট্রপতিকে ঠিক সেভাবেই কাজ করতে হবে। তার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

একজন পর্যবেক্ষকের চোখে মিয়ানমার নির্বাচন by তাসকিন ফাহমিনা

ই​য়াঙ্গুনে এনএলডির নেতা–কর্মীদের উল্লাস
মিয়ানমারে ২০১০ সাল থেকে চলে আসা বেসামরিক সরকারের আড়ালে সামরিক সরকারের সরব উপস্থিতি, সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমাগত দমন-নিপীড়ন-নিধন, এমনকি এদের নাগরিক অধিকার ও ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া, সর্বোপরি জান্তা-সমর্থিত সরকারের অধীনে মিয়ানমারের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু হবে কি না—এই বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্টগুলো যখন পর্যবেক্ষণ করছিলাম, ঠিক তেমনি সময়ে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনসের (এনফ্রেল) কাছ থেকে ৮ নভেম্বরের মিয়ানমার নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আমন্ত্রণ আসে। এর আগে আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে নেপাল ও ফিলিপাইনের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থাকলেও এই নির্বাচন একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমার কাছে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৩১ অক্টোবর ইয়াঙ্গুনে এসে পৌঁছালাম। ঝকঝকে রাস্তাঘাট আর আলো-ঝলমলে ইয়াঙ্গুনে এরই মধ্যে এনফ্রেলের বিভিন্ন দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা এসে জমায়েত হয়েছেন। প্রথম দুই দিন চলল নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বিভিন্ন নিয়মকানুন ও দিকনির্দেশনা-বিষয়ক আলোচনা। এনফ্রেলের পাশাপাশি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও কার্টার সেন্টারের আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরাও ইতিমধ্যে মিয়ানমারে এসেছেন। আমার নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অঞ্চলটি ছিল তানিনতারি রিজিয়ন। কম্বোডিয়া থেকে আসা একজন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও ইয়াঙ্গুনের একজন দোভাষীসহ মিয়ানমারের দক্ষিণ-পূর্বে থাইল্যান্ডের বর্ডারের কাছে অবস্থিত তানিনতারির রাজধানী দাউইতে ৩ নভেম্বর ইয়াঙ্গুন থেকে প্লেনে করে পৌঁছে গেলাম এক ঘণ্টার মধ্যেই।
২.
বিভাগীয় ও জেলা নির্বাচন কমিশন, অং সান সু চির দল এনএলডি, জান্তা-সমর্থিত সরকারি দল ইউএসডিপি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কারেনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষ, মানবাধিকারকর্মী, নিরাপত্তা বাহিনীসহ দেশি ও অন্যান্য বিদেশি পর্যবেক্ষক-নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিলাম এই নির্বাচন নিয়ে। বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলের অভিযোগ ছিল ভুয়া ভোটার রেজিস্ট্রেশনসহ মৃত ব্যক্তিদের নাম ভোটার লিস্টে থাকা নিয়ে এবং ত্রুটিপূর্ণ অগ্রিম ভোট ব্যবস্থা নিয়ে। গত ২৯ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত মিয়ানমারে অগ্রিম ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই অগ্রিম ভোট আর্মি, সরকারি কর্মচারী, অসুস্থ ব্যক্তি, হাজতি কিংবা যাঁরা নির্বাচনের দিন নিজ এলাকায় যেতে পারবেন না, তাঁদের জন্য করা হলেও এতে অনেক কারচুপির অভিযোগ ছিল। আমরা অগ্রিম ভোট দেখতে ৬ নভেম্বর দাউই হাসপাতালে গেলাম। সেখানে একটি পুরুষ ওয়ার্ডে বিভিন্ন অসুস্থ ব্যক্তি, তাঁদের আত্মীয়স্বজন, পোলিং এজেন্ট ও পর্যবেক্ষকদের সামনে কোনো রকম গোপনীয়তা ছাড়াই তিনজন অসুস্থ ব্যক্তি ও তাঁদের তিনজন আত্মীয়ের ভোট দিতে দেখা যায়। সেখানে কোনো ব্যালট বাক্সও ছিল না, তাঁদের ভোট বিভিন্ন খামে ভরে নিয়ে যান নির্বাচন কমিশন থেকে আসা প্রতিনিধি। অগ্রিম ভোটিং কখন, কোথায় হচ্ছে এ সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি বিভাগীয় নির্বাচন কমিশন। ফলে বারবার আমরা ছুটে গিয়েছি বিভিন্ন জায়গায় খবর নিতে। তবে দাউই জেলখানায় আসামিদের অগ্রিম ভোটের ব্যবস্থা ছিল, যা আমরা পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছিলাম।
৩.
এরই মাঝে কথা হলো হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, তাঁদের বেশির ভাগেরই ভোটের অধিকার নেই। কারণ, তাঁদের ভারত-পাকিস্তান থেকে আসা সংকর জাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যদিও তাঁদের পূর্বপুরুষেরা কয়েক শ বছর আগে মিয়ানমারে এসেছিলেন।
মিয়ানমার নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। মোট প্রার্থীর মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ ছিলেন নারী। তানিনতারি রিজিয়নে ১৭৮ প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিলেন মোটে ১৪ জন। কেন নারী প্রার্থীর সংখ্যা এত কম? এই প্রশ্ন নারী অধিকারকর্মী নেইয় নেইয় অ্যায়েকে করা হলে তিনি বলেন, এখানে নারীদের পুরুষের অধীন মনে করা হয়। তাঁদের ঘর সামলানো, শিশু প্রতিপালন করা—এসব প্রধান কাজ বলে মনে করা হয়। বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত পুরুষেরাই নেন। নেইয় নেইয় অ্যায়ে বলেন, তানিনতারি রিজিয়নের অনেক নারী থাইল্যান্ডে পাচারের শিকার হন। ১৪–১৫ বছর বয়সেই অনেক মেয়েশিশুর বিয়ে হয়ে যায়। গ্রামাঞ্চলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিয়েতে রেজিস্ট্রেশন হয় না। ধর্ষণ ও পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন অনেক নারী। তিনি আরও জানান, নির্বাচনে কীভাবে ভোট দিতে হবে, তার প্রশিক্ষণ তাঁদের সংস্থা নারী ভোটারদের দিয়েছেন।
কথা হলো, মাঠে কর্মরত নারী কৃষকদের সঙ্গে। কি সু পিং জানান, তাঁদের কিছু জমি সরকারি দল ইউএসডিপির সঙ্গে সম্পর্কিত প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দখল করে নিয়েছেন। তিনি জানান, তিনি তাঁর অধিকার রক্ষা ও পরিবর্তনের লক্ষ্যে ভোট দিতে যাবেন।
৪.
৮ নভেম্বর নির্বাচনের দিন ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে বাতও ভোটকেন্দ্রে এসে পৌঁছালাম। সকাল ছয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ভোটের সময়। কিন্তু ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে শ খানেক নারী-পুরুষ কেন্দ্রের সামনে ভোট দেওয়ার জন্য লাইন করে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করে দেখলাম ভোট নেওয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে এবং ঠিক সকাল ছয়টা থেকে ভোটের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। নির্বাচনের দিন আমরা দাউই, লাংলং ও তাইএছাং—এই তিনটি টাউনশিপের ২৪টি ভোটকেন্দ্র ঘুরে ঘুরে দেখেছি। সবখানেই উপচে পড়া মানুষের ভিড়। চারদিকে একটা উৎসবের আমেজ। মুখে পান নিয়ে লুঙ্গি পরা ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবে সারিবদ্ধ হয়ে ভোট দেওয়ার জন্য তাতানো রোদ উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবে এরই মাঝে কেউ কেউ তাঁদের নাম ভোটার লিস্টে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কথা হচ্ছিল সংখ্যালঘু কারেন সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি বিমর্ষ ও নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর নাম ভোটার লিস্টে ছিল না!
৫.
কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনা পর্ব দেখে যখন হোটেলে ফিরলাম, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত ১০টা ছুঁই ছুঁই করছে। পরদিন সকালে নির্বাচন কমিশন অফিসে যাব বলে হোটেলের লবিতে এসে পৌঁছাতেই এক অপরিচিত নারী আমার কাছে ছুটে এসে বললেন, ‘আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আপনারা এসেছিলেন বলে নির্বাচন সুষ্ঠু হলো, ব্যাপক কারচুপি করতে পারল না! আমি আপনাদের জন্য অন্তর থেকে প্রার্থনা করি।’
যেতে যেতে মনে হচ্ছিল মানুষের ন্যায়সংগত সংগ্রামকে চাপা দিয়ে রাখা যায় না। মিয়ানমারের জনগণ ভোটের মাধ্যমেই এর জবাব দিয়েছে। মিয়ানমারের ত্রুটিপূর্ণ সংবিধান সংশোধন করে, ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন বাতিল করা হবে এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষাসহ অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সংগ্রামও ভবিষ্যতে স্বীকৃতি পাবে বলে বিশ্বাস করি। মিয়ানমারের জন্য রইল শুভকামনা।
তাসকিন ফাহমিনা: অধিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানবাধিকারকর্মী।

যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুন্যাল নিয়ে মার্কিন সমালোচনা বাড়ছে

প্রভাবশালী দুই বিরোধী নেতার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পর বাংলাদেশের যুদ্ধপরাধ ট্রাইবুন্যাল নিয়ে সমালোচনা আরো তীব্র করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পররাষ্ট্রনীতি দেখভাল করে থাকেন এমন কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতা ট্রাইবুন্যালকে ‘অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ’ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মাধ্যম বলে আখ্যা দিয়েছেন।
শুক্রবার মন্ত্রণালয় বলেছে, বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরন করার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা উচিত নয়। ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ১৫ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে দণ্ড দিয়েছে দুটি ট্রাইবুন্যাল। এদের বেশিরভাগই বিরোধী জামায়াতে ইসলামীর নেতা।
তবে, বিচারের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সংশয় বাড়ছে। বুধবার বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট বিএনপির সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের আলি আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখে। গণহত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগে তাদের দণ্ডিত করা হয় ২০১৩ সালে।
আগস্ট মাস পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার যুদ্ধাপরাধবিষয়ক রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা স্টিফেন র‌্যাপ বলেছেন, সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের অপরাধ সংঘটনের সময় তিনি বাংলাদেশে ছিলেন না- এ স্বাক্ষ্য দিতে স্বাক্ষীদের ডাকার অধিকার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এটা উদ্বেগজনক। ওই স্বাক্ষীদের মধ্যে সাবেক একজন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, ট্রাইবুন্যাল প্রসিকিউশনকে ৪১ জন স্বাক্ষী ডাকার সুযোগ দিয়েছে। পক্ষান্তরে সালাউদ্দিনের আইনজীবীদের ৪ জন স্বাক্ষী ডাকতে সীমিত করে দেয়া হয়। নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক ওই মানবাধিকার সংস্থা বলেছে, অধস্তনদের অপরাধ সংঘটনে উস্কে দেয়ার অভিযোগে মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তবে, কোন অধস্তন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা বা তাদের স্বাক্ষ্য নেয়া হয় নি। ট্রাইবুন্যালের কর্মপ্রক্রিয়া দেশের বিভক্ত রাজনীতি দিয়ে প্রভাবিত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগ দলের নেতা শেখ হাসিনা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ‘সহিংসতা, ভীতি আর সেলফ-সেন্সরশিপের এক পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সঙ্কুচিত হচ্ছে।
এপির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ এক মার্কিন কূটনীতিককে মঙ্গলবার লেখা এক চিঠিতে আইনপ্রণেতারা বাংলাদেশের নেতাদেরও সমালোচনা করেছেন যারা এ বছর কট্টরপন্থীদের হাতে ধর্মনিরপেক্ষ লেখক-ব্লগার সিরিজ হত্যার পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকে দায়ী করেন। হত্যার শিকার ভুক্তভোগিদের মধ্যে রয়েছেন আমেরিকান-বাংলাদেশী লেখক অভিজিত রায়। ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে ঢাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এক সময় বাংলাদেশে এমন কট্টরপন্থী সহিংসতা ছিল বিরল। প্রধানত মুসলিম দেশ হলেও দেশটিতে ধর্মনিরপেক্ষ বলিষ্ঠ এক সংস্কৃতি রয়েছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের পূর্ব অংশ। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ভিত্তিক আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। রক্তাক্ত অভিযানের মাধ্যমে এর কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখায় পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক নেতারা। এরপরই জেগে ওঠে পূর্ব পাকিস্তান। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জন্ম হয় বাংলাদেশের। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কৃতকর্ম ক্ষমা করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমন টানাপড়েনের ইতিহাস স্বত্বেও বাংলাদেশ কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম একটি দাতা রাষ্ট্র এবং রপ্তানি বাজার। তবে, হাসিনার শাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সুশীল সমাজ কর্মীদের প্রতি তার আচরণ নিয়ে সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেয়। বাংলাদেশে গার্মেন্ট কারখানায় ভয়াবহ দূর্ঘটনায় শ’ শ’ মানুষের মৃত্যুর পর শ্রম মান উন্নয়ন এবং কর্মস্থল নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশকে চাপ দিতে ২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে শুল্কমুক্ত বানিজ্য সুবিধা স্থগিত করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র।

পার্টিগার্ল থেকে আত্মঘাতী

হাসনা আইতবুলাচেন (২৬) কখনও ধর্মের ধারেকাছেও ছিল না। কোরআন পড়া তো দূরের কথা আরবি হরফ সম্বন্ধে তার ধারণাই ছিল না। সারাক্ষণ ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপ, অ্যালকোহল নিয়ে মজে থাকত। পরনে থাকত জিন্স প্যান্ট আর গায়ে শর্ট টি-শার্ট। মাথায় পরত বড় ‘কাউবয় হ্যাড’। যার কারণে তার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘কাউগার্ল’। সেই ‘কাউগার্ল’ই হয়ে গেল ইউরোপের প্রথম নারী আত্মঘাতী জিহাদি। হাসনার কয়েকজন বন্ধু ও তার চাচাতো ভাই ইউসুফের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি ডেইলি মেইলের শুক্রবারের এক প্রতিবেদনে এসব খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। প্যারিস হামলার মূলহোতা আহমেদ আবাউদকে ধরতে ফ্রান্সের সেইন্ট দেনিস এলাকায় হামলায় আত্মঘাতী বোমায় নিজেকে উড়িয়ে দেয় হাসনা। সেও প্যারিস হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে জানায় ফরাসি পুলিশ। হাসনা আইতবুলাচেন প্যারিস হামলার মূলহোতা হিসেবে পরিচিত আবদেল হামিদ আবাউদের চাচাতো বোন। তাকে তার প্রেমিকা বলেও ধারণা করা হচ্ছে। হাসনা আইত মরক্কো বংশোদ্ভূত বেলজিয়ান। ১৯৭৩ সালে তার বাবা-মা ফ্রান্সে আসেন। ১৯৮৯ সালে প্যারিসেই তার জন্ম। এরপর বাবা-মায়ের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। হাসনা মায়ের সঙ্গে প্যারিসেই থাকত।
তবে বাবার সঙ্গেও সম্পর্ক নিবিড় ছিল তার। বুধবার পুলিশি অভিযানের সময় সে তার ফ্ল্যাটের জানালা দিয়ে মাথা বের করে দিয়েছিল। ছুড়তে যাচ্ছিল বোমা। গায়ে বিস্ফোরকভরা সুইসাইড ভেস্ট পরে বোমা ডিটোনেট করতে গিয়েছিল। বিস্ফোরিত হওয়ার আগে তার চিৎকার শোনা গিয়েছিল, ‘প্লিজ হেল্প মি!’ এরপরই বিস্ফোরিত হয়ে তার মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা জানালা দিয়ে লম্বা সোনালি চুলের এক নারীকে দেখেছেন। হাসনার বন্ধুরা জানিয়েছেন, সে খুবই উদার প্রকৃতির মেয়ে ছিল। সব সময় কাউবয় হ্যাড পরত। কিন্তু অল্পদিন আগেই সে আচমকা দৃষ্টির আগোচরে চলে যায় এবং সর্বশেষ প্যারিসে ফরাসি পুলিশের অভিযানের সময় আÍঘাতী বোমায় নিজেকে উড়িয়ে দেয়। হাসনার ভাই ইউসুফ আইতবুলাচেন বলেন, ‘ধর্মের প্রতি তার কোনো আগ্রহই ছিল না। মাত্র এক মাস আগে থেকে সে তার মুখ ঢেকে রাখা শুরু করে। তিনি বলেন, ‘সব কিছু সমালোচনা করেই সে তার সময় কাটাত। বসবাসের জন্য তার একটা নিজস্ব ভুবন ছিল। নিজের ধর্মের প্রতি তার কোনো আগ্রহই ছিল না।
আমি তাকে কখনোই কোরআন খুলতে দেখিনি। সে সবসময়ই তার ফোনে ফেসবুক দেখতে অথবা হোয়াটসঅ্যাপে থাকত।’ ইউসুফ বলেন, আমি তাকে ওসব করতে নিষেধ করতাম। কিন্তু আমাদের কোনো আদেশ-নিষেধই শুনতো না। হাসনা পাঁচ বছর বয়স থেকেই গাড়ি ব্যবহার করত এবং প্রচুর ছেলে বন্ধুর সঙ্গে চলাফেরা করত। হাসনার প্রতিবেশী হাসানি তাকে ‘গেছো মেয়ে’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘পার্টিগার্লের বেশে থাকা হাসনা সব সময় জিন্স, রেইনার, শর্ট টি-শার্ট ও কালো হ্যাট পরত। কিন্তু এক মাস আগে থেকে সে নেকাব পরা শুরু করে।’ হাসানি আরও জানান, সে কাউকে ভয় করত না। নিজে ছোটখাটো একজন সৈন্যের মতো ছিল। সবসময় শপিং করতে পছন্দ করত। অন্য যারা হাসনাকে চিনতেন তারা জানান, সে খুবই বহির্মুখী ছিল। প্রচুর অ্যালকোহল পান করত এবং সবসময় কাউ হ্যাড পরত। কাউ হ্যাড পরার কারণে তার ডাক নাম হয়ে যায় ‘কাউগার্ল’। হাসনার প্রতিবেশী এক কৃষক বলেন, ‘আমরা তাকে খুব ভালো করেই চিনতাম। সে আমাদের কাছে কাউগার্ল নামেই পরিচিত ছিল। কারণ সবসময় এক বড় কাউ হ্যাড পরে থাকত সে। কিন্তু পরে জানা গেল অল্পদিন আগে সে গভীর মৌলবাদে ঢুকে পড়ে।’ দ্য টেলিগ্রাফ

বাংলাদেশ যেখানে ভালো আমেরিকা অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে by আনিসুল হক

বিশ্ব আইনশৃঙ্খলা সূচকে বাংলাদেশ বেশ ভালো অবস্থানে আছে। আমেরিকাভিত্তিক গবেষণা ও জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ গত সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ব আইনশৃঙ্খলা প্রতিবেদন–২০১৫ প্রকাশ করেছে। এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাদের আছে দুই হাজারেরও বেশি কর্মী। তারা বিভিন্ন বিষয়ে জরিপ করে পৃথিবীব্যাপী। ১৪১টা দেশে ১ লাখ ৪২ হাজার মানুষের মধ্যে তারা জরিপ চালিয়েছে নিজ এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে।
তাদের প্রকাশিত বিশ্ব আইনশৃঙ্খলা সূচক ২০১৪-তে বাংলাদেশের অবস্থান ভালোর দিকে, ১৪১টা দেশের মধ্যে প্রথম ৩০টির মধ্যেই আছে বাংলাদেশ। আর যৌথভাবে একই নম্বর পাওয়াদের একটা স্থানে ধরলে বাংলাদেশের অবস্থান ১২তম। সবচেয়ে ভালো সিঙ্গাপুর, তাদের প্রাপ্ত নম্বর ৮৯। এরপর উজবেকিস্তান, তারা পেয়েছে ৮৮, ৮৭ নম্বর পেয়ে যৌথভাবে তৃতীয় হংকং আর ইন্দোনেশিয়া। বাংলাদেশ পেয়েছে ৭৮, বাংলাদেশ ভালো করেছে অস্ট্রেলিয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে, জাপান কিংবা নিউজিল্যান্ডের অবস্থান বাংলাদেশের সমান। আমাদের আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের চেয়েও ভালো অবস্থানে আছে মিয়ানমার আর শ্রীলঙ্কা। ভারত কিংবা পাকিস্তানের অবস্থান আমাদের চেয়ে খারাপ। ভারত পেয়েছে ৬৭, পাকিস্তান ৬০; এদের অবস্থান লেবানন কিংবা ফিলিস্তিনের পরে।
এই জরিপ কিন্তু নাগরিকদের মনে নিরাপত্তার আশ্বাস কতটা, তার ওপর ভিত্তি করে করা। তিনটা প্রশ্ন করা হয়েছিল নাগরিকদের—আপনি যে এলাকায় থাকেন, সেখানকার পুলিশের ওপরে কি আপনার আস্থা আছে? আপনি রাতে চলাচল করাটা কি নিরাপদ মনে করেন? জরিপের সময় জানতে চাওয়া হয়েছিল, গত ১২ মাসে আপনার বা আপনার পরিবারের কারও কি টাকা বা সম্পদ চুরি গেছে?
এই সব প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের নাগরিকেরা অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের চেয়েও পুলিশের ওপর, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বেশি আস্থা রেখেছেন, এই তথ্যটা কিন্তু মূল্যবান। নিরাপত্তা আসলে নিরাপত্তার ধারণা। ৬ নভেম্বর প্রথম আলোয় এই কলামেই আমার লেখার শিরোনাম ছিল—‘এ দেশে এখন কে নিরাপদ?’ সেখানেও আমি বলেছিলাম, নিরাপত্তার ধারণাটা আসলে মনের ব্যাপার, চিত্তের স্বাধীনতাই আসল স্বাধীনতা। নইলে মানুষ নিজের বিছানাতেই বেশি মারা যায়, তবু নিজের বিছানাটাকেই মানুষ বেশি নিরাপদ বলে মনে করে। বাংলাদেশের মানুষ নিজেকে অন্য অনেক দেশের মানুষের চেয়ে বেশি নিরাপদ বলে মনে করেন, তাঁদের পুলিশের ওপর আস্থা আছে, তাঁরা রাতে চলতে ভয় পান না এবং ২০১৪ সালে জরিপটি হওয়ার আগের ১২ মাসে তাঁর পরিবারে কোনো চুরির ঘটনা ঘটেনি—এটা একটা খুবই ইতিবাচক তথ্য।
এখান থেকে আমাদের প্রেরণা নিতে হবে। যদিও এই জরিপ গত বছরের, এরই মধ্যে দেশে ঘটে গেছে অনেক খুনখারাবি এবং এ বছর জানুয়ারিও গেছে পেট্রলবোমার ভয়ে-আতঙ্কে, তবু মনে রাখলে ভালো করা হবে যে ২০১৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি গিয়েছিল আরও খারাপ। সেদিক থেকে গ্যালাপ প্রকাশিত এই সূচক থেকে আমরা প্রেরণা নিতে পারি।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রসদ কম। আধুনিক প্রযুক্তিতে তারা সুসজ্জিত নয়। তাদের অস্ত্র থাকলে গুলি থাকে না, যে অস্ত্র যাঁর কাছে আছে, সেই অস্ত্র চালনায় তাঁর দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। সম্প্রতি ডেইলি স্টার পত্রিকায় এ রকম একটা প্রতিবেদন পড়ে মনটা দমে গেল। পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থার মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সন্ত্রাসীরা যতটা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, তা শনাক্ত করা ও দমন করার মতো প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও বিশেষায়িত জ্ঞান আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই। তিনি মনে করেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য আমাদের বিশেষ প্রশিক্ষিত ইউনিট দরকার। মুখপাত্র নিজেই যখন এ কথা বলেন, তখন আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের উদ্বেগ না বেড়ে পারে না। কিংবা বাংলাদেশের একটা জেলা শহরে কারারক্ষীকে ক্ষুর দিয়ে আক্রমণ করার পর ঘোষণা এল, এরপর কারারক্ষী কারা এলাকার বাইরে গেলে ইউনিফর্ম পরে যাবেন না—এই ঘোষণা নিরস্ত্র সিভিলিয়ানদের মনে নিরাপত্তার কোন আশ্বাসটা জোগাবে? অর্থবল, লোকবল, রসদ, সাজসরঞ্জামের এতটা অপ্রতুলতা! আছে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। আছে দুর্নীতি। এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমাদের পুলিশ, আমাদের র্যাব, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে দক্ষতা, যোগ্যতার পরিচয় এর আগে দিয়েছে, তাতে তাদের ওপর আমাদের শ্রদ্ধা না এসে পারে না। এই সমাজে বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে পুলিশ চাইলে পারে না, এমন কিছু নেই। কখনো কখনো পুলিশ চায় না, কখনো কখনো পুলিশকে চাইতে দেওয়া হয় না। তা না হলে পুলিশ যেকোনো অপরাধ দমন করতে পারে, যেকোনো অপরাধীকে শনাক্ত করে ধরে ফেলতে পারে।
এই বিশ্বাসটাই মূল্যবান। গ্যালাপের জরিপে হয়তো এই মনোভাবটাই প্রকাশিত হয়েছে। আর পরিসংখ্যান দিয়ে দেখলেও বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্য অনেক দেশের তুলনায় ভালো। কিন্তু সমস্যা তো কেবল চুরি-ডাকাতির নয়। সমস্যা কেবল যৌতুক, নারী নির্যাতন, ঘুষ-দুর্নীতির নয়। এখন পৃথিবীজুড়েই নিরাপত্তার যে সমস্যা, তার কারণ বৈশ্বিক। যে কারণ সৃষ্টির জন্য বাংলাদেশ নিজেরা খুব কমই দায়ী, ঠিক জলবায়ুর পরিবর্তনের বিপদের মতোই, বিপদ আমরা সৃষ্টি করিনি, কিন্তু সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছি আমরাই।
আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবিলায় সবচেয়ে ভালোও করছে বাংলাদেশই। তেমনি বিশ্বব্যাপী উগ্রপন্থা, জঙ্গিবাদের যে বিপদ সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রেও সবচেয়ে ভালো করব আমরাই—গ্যালাপের জরিপ আমাদের সেই প্রেরণা জোগাচ্ছে।
এর মূলে আছে বাংলাদেশের মানুষের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের মানুষ বীর, কিন্তু নিষ্ঠুর নয়; বাংলাদেশের মানুষ মোটের ওপর আসলেই শান্তিকামী। বাংলাদেশের মানুষ কোনো দিনও পররাজ্যে হামলা করেনি, সাম্রাজ্য বিস্তার করতে যায়নি। নিজেরা ধান উৎপাদন করে, মসলিন উৎপাদন করে এই দেশের মানুষ সুখে ছিল। এই দেশের মানুষ ধার্মিক, ধর্মভীরু, কিন্তু ধর্মান্ধ কিংবা মতান্ধ নয়। এই দেশে ধর্ম প্রচারিত হয়েছে সুফি সাধক, আউলিয়া, দরবেশদের মাধ্যমে; তাঁরা প্রচার করেছেন সাম্যের বাণী, ভালোবাসার কথা। মোগলরা এই দেশে এসে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষা-সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসন চালাননি, মুসলমান শাসকেরা বাংলা সাহিত্যকে উৎসাহিত করেছেন, পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছেন। তাঁরা এখানে থিতু হয়েছেন, বিয়েশাদি করে স্থানীয় হয়ে গেছেন।
কিন্তু সারা পৃথিবীতে অন্যত্র যেমন, আমাদের দেশও বিশ্বায়িত সন্ত্রাসবাদের বিপদের আওতামুক্ত নয়। এ থেকে আমাদের দেশকে মুক্ত রাখতে আমাদের পারতেই হবে। সেটা করার জন্য দরকার হবে ৩৬০ ডিগ্রি পরিকল্পনা ও কর্মসূচি। এ জন্য দরকার হবে গণতন্ত্র, বাক্-স্বাধীনতা, মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। মানুষকে কথা বলতে না দিলে, বিরুদ্ধ মত,ÿ ক্ষোভ প্রকাশিত হতে না দিলে তা নিজেকে প্রকাশের জন্য বাঁকা পথ গ্রহণ করে। এ জন্য দরকার শিক্ষা, শিক্ষা মানে সুশিক্ষা। সেই শিক্ষা, যা মানুষের মনকে আলোকিত করে, তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করে। শুধু ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা এমবিএ, বিবিএ পড়লে হয় না। অন্যদিকে যাঁরা ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছেন, তাঁদের জন্য দরকার মূলধারার জীবিকা অবলম্বনের দক্ষতা। তাঁরা যেন চাকরিবাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন, মূলধারার জীবনযাপন করতে পারেন। তাঁদের যেন প্রান্তে ঠেলে দেওয়া না হয়। আসলে সমস্যার মূল যেন কেবল আইনশৃঙ্খলার মাটিতে খোঁজা নয়, এর মূল নিহিত আছে রাজনীতিতে এবং শুধু রাজনীতিতে নয়, সমাজে।
বাংলাদেশ মধ্য-আয়ের দেশ হয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষ ভালো করবেন, অনেকেই বৈষয়িক উন্নতি করবেন খুব বেশি। আমাদের আকাশরেখা বদলে যাচ্ছে গগনচুম্বী ভবন দিয়ে, আমাদের আকাশরেল হবে, পাতালরেল হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি গাড়ি চলবে আমাদের রাস্তা দিয়ে। আর অন্যদিকে বেশির ভাগ মানুষ কি পেছনে পড়ে রইবে? কিংবা একটা শ্রেণির মানুষ কি এই উন্নতির ইঁদুর দৌড়ের ট্র্যাকের বাইরে থাকবে? বাইরে থাকলে তারা কি সেটা মুখ বুজে সহ্য করবে? যেখানে বাইরের প্ররোচনা, অর্থায়ন, যোগাযোগ খুব একটা বাস্তব ঘটনা। আর বাংলাদেশ নিরুপদ্রবভাবে ভালোই করতে থাকবে, বাইরের শক্তিগুলোও কি তা হতে দিতে চাইবে?
কাজেই আজকে আমরা নিরাপত্তার যে ঝুঁকির মধ্যে আছি, তা সমাধানের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দক্ষ, যোগ্য করে তোলা, তাদের আধুনিক প্রযুক্তিতে বলীয়ান করা, তাদের প্রশিক্ষিত করা, আলাদা আইটি ইউনিট গড়ে তোলা, জনবল, অর্থবল, রসদ বাড়ানো—এসব তো একেবারে প্রাথমিক কাজ। পাশাপাশি দরকার রাজনৈতিক ও সামাজিক পদক্ষেপ। এবং দরকার জনগণকে যুক্ত রাখা। জনগণ চায় না বলেই এই দেশে চরমপন্থা কোনো দিনও সুবিধা করতে পারেনি। শ্রেণিশত্রু খতমের লাইন যারা নিয়েছিল, তারা নিজেরাই মারামারি করে নিঃশেষিত হয়ে গেছে। কারণ, জনগণ তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়নি। বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো করেই জানে, সন্ত্রাস করে পৃথিবীতে কেউ তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। নিজের মতবাদের শ্রেষ্ঠতা প্রমাণিত হয় ভালোবাসার বাণী, শান্তির বার্তা, উৎকর্ষের অঙ্গীকার প্রচার করার মাধ্যমে। ১৯ নভেম্বর আবুল মোমেন প্রথম আলোয় একটা চমৎকার লেখা লিখেছেন। ইসলাম সারা পৃথিবীতে তার নিশান উড়িয়েছিল তখনই, যখন মুসলমানরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শিল্পকলা, স্থাপত্যে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছিল। শারজা ইসলামিক ঐতিহ্য জাদুঘর পরিদর্শনকালে আমার বারবার এ কথাই মনে হচ্ছিল। অ্যালজেবরা কথাটা আরবি। আবার শূন্য বা জিরোর ধারণা পৃথিবীকে উপহার দিয়েছে ভারত। মুসলমানরা গ্রিসের জ্ঞান অনুবাদ করে আরবিতে, পরে পশ্চিম আবার সেটা অনুবাদ করে নেয় আরবি থেকে। শারজা জাদুঘরের দেয়ালে লেখা আছে—মুসলমানরা ভালো করেছিল, এর কারণ তারা অন্যদের জ্ঞানকেও গ্রহণ করেছিল মূল্যবান বলে।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকিত ভুবনের দিকে আমাদের মনের দরজা-জানালা সব খুলে রাখতে হবে। আর প্রচার করতে হবে ভালোবাসার কথা। কবির ভাষায়:
ও ভাই ভয়কে মোরা জয় করিব হেসে
গোলাগুলির গোলেতে নয় গভীর ভালোবেসে।
ভালোবাসায় ভুবন করে জয়,
সখ্যে তাহার অশ্রুজলে শত্রু মিত্র হয়,
সে যে সৃজন পরিচয়।
প্রত্যেকের অন্তরে ভালোবাসা জাগ্রত করতে হবে। পৃথিবীর মোড়লেরা সেটা চান না। তাঁদের দরকার হয় যুদ্ধ, উন্মত্ততা। পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষেরা শান্তির পক্ষে ধর্ম-বর্ণ-জাতিনির্বিশেষে এক জোট যদি হয়, সোচ্চার যদি হয়, তাহলেই কেবল তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে আমরা বাঁচতে পারব। আর আমাদের দেশটাকে শান্তির দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব আমাদের সবার, সর্বাধিক দায়িত্ব দেশ-পরিচালকদের, কিন্তু প্রতিটা নাগরিকেরই কিছু না–কিছু করণীয় আছে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

তোমরা যা পারো আমরা কুকুরেরা তা পারি না, তবু...

প্রথমটা বুঝতেই পারিনি। মাথাফাতা তালগোল-চক্কর। এক ঝলক তীব্র যন্ত্রণা। তার পর হঠাৎ সব হালকা হয়ে গেল। ঝটপট আমার প্রাণবায়ু আউট! খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি। শরীরের বাইরে বেরিয়ে আসার পর বুঝলাম, বেঁচে থাকা শরীরের ভার কী ভীষণ ভাবে সীমাবদ্ধ করে ফেলে প্রাণীকে। আমার মুক্ত প্রাণবায়ু তখন শূন্যে উড়ছে। উড়ে বেড়াচ্ছে। হাওয়া তখনও বারুদের বাষ্পে দম বন্ধ করা।! আমার তো আর দম নিতে হবে না! আমি দেখছিলাম শুধু।
সেও এক নারী! আমিও এক নারী। সে এক জন মানুষ। এই মুহূর্তে কুখ্যাততম সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের এক জন ছিল। আমি এক কুকুর! ফরাসি পুলিশে আমার কাজ ছিল গন্ধ শুঁকে শুঁকে বিস্ফোরক বের করা। সাঁ দেনি-র যে বাড়িটা ঘিরে ফেলেছিল পুলিশ-সেনা, হঠাৎ সেখান থেকে বেরিয়ে এল মেয়েটা! হাতে একে ফর্টিসেভেন। গুলি চালাতে চালাতে হঠাৎ কোমরে বাঁধা বিস্ফোরক উ়ড়িয়ে দিল। আমি দেখতে পাচ্ছিলাম দু’টো ছিন্নভিন্ন, টুকরো টুকরো লাশ! একটা মানুষ মেয়েটার। একটা আমার। আমরা দু’জনেই উড়ে গিয়েছি বিস্ফোরণে।
জীবনের (থুড়ি মরণের) আচমকা অভিজ্ঞতায় আমি তখন রীতিমতো চঞ্চল। এখান থেকে সেখান। সেখান থেকে এখান। এ দিক, ও দিক করতে করতে শুনলাম, আমাকে সবাই শহিদ বলছে! মানুষ শহিদ হয় জানতাম। কুকুরও তবে শহিদের মর্যাদা পায়! গর্বে ভরে উঠল প্রাণ। হঠাৎ দেখলাম সাংবাদিকদের জটলা। এক জন বলল— এই কুকুরটাকে নিয়ে একটা হিউম্যান স্টোরি করতে হবে! শুনেই রাগ হল। কিন্তু রাগ হলেই বা কী! আগে তাও ঘেউ ঘেউ করে হলেও প্রতিবাদ করার চেষ্টা করতে পারতাম। এখন তো তাও সম্ভব না। আগেও এটা শুনেছি! মানুষ যখনই কোনও জঘন্য কাজ করে, যেমন ধর্ষণ খুন ইত্যাদি ইত্যাদি, তখনই মানুষের কথায় তা পাশবিক আচরণ! আর যা কিছু ভাল, তা মানবিক! আচ্ছা, ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে এত চর্চা করা মানুষ ভেবে দেখেছ কি, এই উপমা প্রয়োগ কতটা বৈজ্ঞানিক!?!
পশু যা করে তা পাশবিক। বটেই তো! কিন্তু পশু কি মানুষের মতো এত ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিত সন্ত্রাস করতে পারে? এমন সন্ত্রাস কিন্তু শুধু মানুষই পারে! যা ‘পাশবিক’ বলো তোমরা, আসলে তা ‘মানবিক’!
এক দল মানুষ ঠিক করল, প্যারিস নগরীতে রক্তগঙ্গা বওয়াতে হবে। মারতে হবে! যত বেশি সম্ভব মানুষকে মারতে হবে! ভয় পাওয়াতে হবে! প্ল্যান হল! নিখুঁত প্ল্যান। হিমশীতল মাথায় তার ইমপ্লিমেন্টেশন। ১৩২ জন মানুষ দুনিয়া থেকে উধাও। কী অপরাধে? কেউ গান শুনতে গিয়েছিল। কেউ গিয়েছিল রেস্তোরাঁয় খেতে। কেউ বা ছিল পানশালায়। আচ্ছা মানুষ তোমরাই বল, পশু কি এমন ছক কষে গণহত্যা করতে পারে? করতে পেরেছে কখনও? তবু তোমাদের রোজকার ভাষায় এমন ঘটনা ‘পাশবিক’।
এমন ‘পাশবিক’ উদাহরণ তোমাদের ইতিহাসে অসংখ্য।
হিরোশিমা, নাগাসাকি (১৯৪৫)                             দু’লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু
টুইন টাওয়ার ধ্বংস (২০০১)                                প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড(১৯১৯)                   প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু
মুম্বই ট্রেন বিস্ফোরণ (২০০৬)                              ২০৯ জন মানুষের মৃত্যু
নাৎসি গণহত্যা (১৯৪১-১৯৪৫)                            ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু
কম্পবোডিয়ায় পল পট জমানা  (১৯৭৬-১৯৭৯)       ১৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যু
অশোকের কলিঙ্গ যুদ্ধ (২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)                 লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু

এ তালিকা চলতেই থাকবে! আমরা কুকুরের দল, বা বণ্যপ্রাণী বাঘ-সিংহ, কারও পক্ষে এই সব হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয়। সম্ভব নয় এত নিখুঁত হত্যার ছক কষা! তবু তোমরা এগুলোকে উদাহরণ দাও পাশবিক হত্যাকাণ্ড বলে। সত্যি অদ্ভুত।
অনেক মানুষ মরেছিল তোমাদের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে। ধর্মযুদ্ধের পক্ষে সারথি কৃষ্ণের জ্ঞান আজও ভগবদ্ গীতা বলে পূজিত এবং পাঠ্য। তারও অনেক বছর পর, আমার এক পূর্বপুরুষ যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছিল স্বর্গের পথে। আসলে তিনি ছিলেন স্বয়ং ধর্ম-ঠাকুর। আমি কিন্তু  সত্যিকারেরই একটা কুকুর ছিলাম। আমার ‘স্বর্গারোহন’-এও রীতি মতো ধর্ম-যোগ। এই ‘মানবিক’ কাজ সত্যিই কি কোনও পশু করতে পারবে?
সুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

প্রতিদিন আধাকাপ আঙুর খান

আঙুর পছন্দ নয়, এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। আঙুর একটি অসাধারণ সুপার ফুড হিসেবে পরিচিত। খুব সাধারণ দেখতে এই আঙুর ভিটামিন এ, বি৬, বি, ফোলেট, পটাশিয়াম, আয়রন, সেলেনিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি মিনারেলসে ভরপুর। আর এ কারণেই প্রতিদিন মাত্র আধাকাপ আঙুর দূর করার ক্ষমতা রাখে নানা শারীরিক সমস্যা। তাই সুস্থ থাকতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখুন আঙুর।
১) ক্যান্সার প্রতিরোধ করে
আঙুরের পাতলা খোসায় রেসভেরাট্রোল নামক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানের দেখা মেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই রেসভেরাট্রোল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেহে ক্যান্সারের কোষ গঠন করতে বাঁধা প্রদান করে থাকে।
২) হাড়ের সুস্থতায়
অ্যামেরিকান সোসাইটি অফ বোন অ্যান্ড মিনারেলস রিসার্চের মতে, আঙুর মাইক্রো নিউট্রিইয়েন্টস যেমন ক্যালসিয়াম, আয়রন এবং ম্যাঙ্গানিজে ভরপুর একটি ফল৷ যা হাড়ের গঠন এবং মজবুত হওয়ার জন্য অত্যন্ত জরুরি। ডাক্তাররা বলেন, প্রতিদিন আঙুর খেলে হাড়ের যেকোনো ধরণের সমস্যা এবং বয়সজনিত রোগ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব বিশেষ করে হাড় ক্ষয় এবং বাতের ব্যথা জাতীয় সমস্যা।
৩) হৃদপিণ্ড সুস্থ রাখতে
আঙুরের ফাইটোকেমিক্যাল হৃদপিণ্ডের পেশির ক্ষতি নিজ থেকেই পূরণে বিশেষভাবে সহায়তা করে থাকে। প্রতিদিন আঙুর খেলে হৃদপিণ্ডের সুস্থতা এবং দেহের কলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
৪) হজমে সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে
অর্গানিক এসিড, চিনি এবং সেলুসাস যা লেক্সাটিভের উপাদান কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বিশেষভাবে কার্যকরী যা আঙুরের মধ্যে বিদ্যমান। এছাড়াও আঙুরে প্রচুর পরিমাণে ইনস্যলুবেল ফাইবার রয়েছে যা পরিপাকনালী পরিষ্কার রাখে। ডাক্তাররা কোষ্ঠকাঠিন্যের রোগীদের নিয়মিত আঙুর খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
৫) দৈহিক দুর্বলতা প্রতিরোধে
রক্তস্বল্পতা বা রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা খুব সাধারণ একটি ব্যাপার। রক্ত স্বল্পতার কারণে দুর্বলতা, অল্পতেই হাপিয়ে উঠার প্রবণতা দেখা দেয়। এই সমস্যার সমাধান করে আঙুর। এতে থাকা আয়রন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় মিনারেল রক্তের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে। সুতরাং প্রতিদিন আঙুর খাওয়ার অভ্যাস করুন।
৬) কিডনির সমস্যা দূর করতে
আঙুরের ইউরিক এসিডের অ্যাসিডিটি কমিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। এটি পরিপাকতন্ত্র থেকে অ্যাসিডের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং কিডনির ওপর চাপ কমায়। এছাড়া আঙুর জল জাতীয় ফল হওয়ার কারণে কিডনি পরিস্কারের কাজে সাহায্য করে এবং কিডনির যেকোনও সমস্যা থেকে শরীরকে মুক্ত রাখে।
৭) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে
দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত থাকলে দেহে কোনো রোগ বাসা বাঁধতে পারে না। আঙুরে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফ্লেভানয়েড, মিনারেল, ভিটামিন সি, কে এবং এ। এইসবই মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করতে সহায়তা করে। তাই প্রতিদিন আঙুর খাবার অভ্যাস করা উচিত।