Tuesday, January 14, 2025

দাম্পত্য কলহের জের, জুলাই হত্যা মামলায় প্রযোজক সারোয়ারের নাম

স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহের জেরে জুলাই–আগস্টের একটি হত্যার মামলায় স্বামীকে আসামি করার অভিযোগে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ওই হত্যা মামলায় নিহতের পরিবারের কেউ বাদি না হয়ে গৃহশিক্ষক বাদি হওয়ায় রহস্য আরও ঘনীভূত। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না থাকলে কাউকে হয়রানি করা হবে না। ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে ইফাত হাসান খন্দকার (১৬) নামে শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনার টেলিভিশন ও ওটিটি প্লাটফর্মের প্রযোজক সারোয়ার জাহান বাপ্পীকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার সময় বাপ্পী বসুন্ধরার বাসায় থাকার প্রমাণ পেয়ে বিপাকে পড়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এর আগে ওই ব্যক্তির নামে তার স্ত্রী রুকাইয়া তাহসিনা বিভিন্ন অভিযোগে পাঁচটি মামলা করেছেন। বাপ্পীও তার স্ত্রীর নামে দুটি মামলা করেছেন। ভুক্তভোগী বাপ্পীর দাবি, স্ত্রী তাহসিনার পূর্বের তিন বিয়ের বিষয় জানাজানি হলে ধামাচাপা দিতে তার নামে পাঁচটি মামলা করেন। সবশেষ সারওয়ার বিবাহবিচ্ছেদের পরিকল্পনা করার মধ্যে যাত্রাবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়। বাপ্পীর অভিযোগ হয়রানি করতে স্ত্রীই তার মামলা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এটা করিয়েছেন। এর আগে স্ত্রীর বিরুদ্ধে সারওয়ারের করা একটি মামলা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তে বেরিয়ে আসে তাহসিনার প্রতারণা ও তিন বিয়ের ঘটনাটি। যদিও তার স্ত্রী তাহসিনা এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। একইসঙ্গে তাহসিনা দাবি করেছেন, স্বামীর পরকীয়া সম্পর্কের কারণে তাদের সংসারে ফাটল ধরেছে। গত ২০ জুলাই ইফাত হাসান আন্দোলন দমনকারীদের গুলিতে নিহত হন। এ ঘটনায় আদালতে দায়ের করা হত্যা মামলায় ১১৮জন নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ নম্বর আসামি করা হয়েছে বাপ্পীকে। মামলায় তাকে ঢাকার ১৮নং ওয়ার্ডের যুবলীগ নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মামলার বাদী ইফাতের গৃহশিক্ষক কাউছার আলম বলেন, ঘটনাস্থলে অনেকেই ছাত্র–জনতার উপর হামলা চালায়। আমার পক্ষে সবাইকে চেনা সম্ভব হয়নি।  ঘটনাস্থলে উপস্থিত এলাকাবাসীর সহায়তায় আসামির তালিকা করেছি। এখানে অনেককে আমি চিনি না এবং চেনা সম্ভবও না। দুর্ভাগ্যজনক কারোর নাম চলে আসলে তদন্তে তিনি অব্যহতি পেয়ে যাবেন। এখানে দোষের কিছু দেখছি না। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. শাহিনুজ্জামান বলেন, তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না। তবে যদি কাউকে হয়রানি করতে আসামি করা হয়, যাচাইবাছাই শেষে তার নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া হবে। বাপ্পী অভিযোগ করে বলেন, স্ত্রী তাহসিনার আরও স্বামী রয়েছে। একজন প্রবাসে, আরেক দেশে বাসায় যাতায়াত করেন। এমনকি সন্তানদের বাবার নাম পরিবর্তন করে অপর এক ব্যক্তিকে স্বামী হিসেবে দেখিয়ে সন্তানের পাসপোর্ট করেন। তখন তাহসিনা সন্তানের চিকিৎসার কথা বললে আদালত মানবিক কারণে মামলা খারিজ করে দেন। পরে আরেকটি মামলার তদন্ত করে পিবিআই তাহসিনার তিন বিয়ের সত্যতা পায় এবং আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। ওই মামলাটি এখনও বিচারাধীন রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তাহসিনা বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা সবগুলো অভিযোগ ভিত্তিহীন। সাইফুল ইসলাম নামে একজনের সঙ্গে আগে বিয়ে হয়েছিল। তার সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পর সারওয়ারকে বিয়ে করি। তারও আগে বিয়ে হয়েছিল। সব জেনেই আমরা বিয়ে করি। সন্তানের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাপ্পী রাজি হয়নি। এ রাগে অন্য একজনের নাম ব্যবহার করে সন্তানের পাসপোর্ট করি। পিবিআই তদন্তে তিন বিয়ের প্রমাণ পায়। এ বিষয়ে তাহসিনা বলেন, ‘সারওয়ার মোটা অঙ্কের টাকার ওই তদন্ত রিপোর্ট নিজের মতো করে বানাতে সহায়তা করেছে। ওই প্রতিবেদনের কিছুই সত্য না। আদালতে এটি প্রমাণিত হবে।
mzamin

টিউলিপকে দুর্নীতিবিরোধী দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান -বিবিসির প্রতিবেদন

বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত বৃটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে অর্থমন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি দমন বিষয়ক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে দেশটির দুর্নীতিবিরোধী জোট অক্সফাম এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতো দাতব্য সংস্থাগুলো। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

এতে বলা হয়, অর্থমন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে টিউলিপের দায়িত্ব হচ্ছে বৃটেনের আর্থিক দুর্নীতি মোকাবেলা করা। তবে তার পরিবারের সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন পাউন্ড আত্মসাতের অভিযোগের ফলে তাকে সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। লন্ডনে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তির কাছ থেকেও বিনামূল্যে দুটি ফ্ল্যাট উপহার পেয়েছেন টিউলিপ। যে তথ্য গোপন করায় পদত্যাগের ক্রমবর্ধমান চাপে পড়েছেন তিনি।

সপ্তাহান্তে কনজারভেটিভ নেতা কেমি ব্যাডেনোচও প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের কাছে টিউলিপকে বরখাস্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে তার ফ্ল্যাট কাণ্ডের কথা প্রকাশ হওয়ার পর টিউলিপ নিজে স্টারমারের মান উপদেষ্টাকে তার বিরুদ্ধে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি তিনি কোনো ভুল করেননি।

বিবিসি বলছে, এত কিছুর পরও টিউলিপের ওপর আস্থা রাখছেন প্রধানমন্ত্রী স্টারমার। সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি মুখপাত্র বলেছেন, স্যার কিয়ের স্টারমার টিউলিপের ওপর ‘পূর্ণ আস্থা’ রেখেছেন। তবে বৃটেনের দুর্নীতিবিরোধী জোট অক্সফাম এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো টিউলিপকে তার দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশেও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তদন্তের মুখে রয়েছেন টিউলিপ। তার খালা, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতির সঙ্গে টিউলিপেরও নাম রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই তদন্তটি হাসিনার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ববি হাজ্জাজের করা একাধিক মামলার সঙ্গে যুক্ত।

বিবিসির হাতে পৌঁছানো আদালতের নথিতে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার অভিযোগে টিউলিপের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ববি হাজ্জাজ। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, টিউলিপের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকার জন্য চুক্তিভুক্ত ওই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যায়ের পরিমাণ অতিরিক্ত হারে বেড়েছে। দাবি করা হচ্ছে- ওই চুক্তির ফলে ব্যয় বেড়ে ১ বিলিয়ন পাউন্ড হয়েছে। নথি অনুসারে, চুক্তির ৩০ শতাংশ অর্থ একটি বিদেশী কোম্পানি এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে টিউলিপ এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

দুর্নীতিবিরোধী দাতব্য সংস্থাগুলোর জোট বলছে, বিশ্বে বৃটেনের সুনাম ধরে রাখতে সরকারকে বিশ্বাসযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। টিউলিপের বর্তমান অবস্থা সেরকম সিদ্ধান্তের মধ্যে পড়ে। যদিও তিনি ওমন কাজ করেছেন কিনা তা স্পষ্ট নয়, তবে এর সঙ্গে বৃটেনের স্বার্থ জড়িত রয়েছে। বিবৃতিতে তারা আরও বলেছে, বৃটেনের অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক দুর্নীতি মোকাবেলার দায়িত্বে আছেন টিউলিপ। তবে একজন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে তদন্ত জোরালো করা যেতে পারে। ওই দাতব্য সংস্থাগুলো বলছে, মন্ত্রী (টিউলিপ) আইন লঙ্ঘন করেছে কিনা তা নিয়ে মান উপদেষ্টার তদন্তের ফলাফল যাই হোক না কেন, এ নিয়ে দ্বন্দ্ব দীর্ঘস্থায়ী হবে।

১০ নং ডাউনিং স্ট্রিটের মুখপাত্র এর আগে টিউলিপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছেন, মান উপদেষ্টার কাছে তদন্তের আহ্বান জানিয়ে সঠিক কাজ করেছেন টিউলিপ। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের মান উপদেষ্টা স্যার লরি ম্যাগনাসের কাছে প্রকাশ্যে তদন্তের আহ্বান জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন টিউলিপ। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে আমি আর্থিক দুর্নীতি এবং বাংলাদেশের সাবেক সরকারের সঙ্গে আমার পরিবারের যোগসূত্রের জন্য মিডিয়ার বিষয়বস্তু হয়েছি, যার বেশিরভাগই ভুল। আমি স্পষ্ট যে আমি কোনো ভুল করিনি। তবে সন্দেহ এড়ানোর জন্য আমি চাই আপনি স্বাধীনভাবে এ বিষয়ে তদন্ত করুন।’

ওদিকে প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের কাছে তদন্তের স্বার্থে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী জোট। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দাবি জানিয়েছে তারা। জোট মনে করে যে, বাংলাদেশের নতুন অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন করা, সেখানে গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত করা এবং আত্মসাত হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধারে তাদের সাহায্য করা বৃটেনের নিজের দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কাছে দুর্নীতিবিরোধী জোটের অনুরোধ হচ্ছেঃ
১. সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সদস্য ও সহযোগীদের ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং সম্পদ জব্দ করার জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া।
২. বৃটেনের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যেন সম্পদ হিমায়িত করতে এবং পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করতে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দ্রুত কাজ শুরু করে তা নিশ্চিত করা।
৩. ক্ষমতাচ্যুত শাসনের সদস্য এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্পদের সন্দেহজনক গতিবিধির জন্য তাদের রেড অ্যালার্টে রাখার বিষয়টিও নিশ্চিত করা।

mzamin

টিউলিপের প্রচারপত্র, সোনার প্রলেপযুক্ত কলমের মোড়কসহ গণভবনে যা দেখা গেল -দ্য টাইমসের প্রতিবেদন

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি আবাস ছিল গণভবন। রাজধানী ঢাকার এই বাড়িতে কড়া পাহারায় বসবাস করতেন তিনি। ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের সময় গত ৫ আগস্ট হাজারো মানুষ গণভবনে ঢুকে পড়েন। ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। গণভবনে চলে ব্যাপক লুটপাট।

সেই থেকে গণভবন কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। যদিও এখন আর সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশের সুযোগ নেই। ভবনটি এখন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে। পাহারা দিচ্ছেন আনসার সদস্যরা। গত শনিবার অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমতি নিয়ে গণভবনে প্রবেশ করে ঘুরে দেখার সুযোগ পান দ্য সানডে টাইমসের প্রতিবেদক।

যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন দল লেবার পার্টির মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের প্রচারপত্র, লেবার পার্টির পোস্টার, নামী ব্র্যান্ডের শপিং ব্যাগ, দামি কলমের মোড়ক, বিদেশি বিশিষ্টজনদের উপহার দেওয়া পোশাক-গয়না, তৈজসপত্রসহ আরও নানা জিনিস পড়ে আছে এখানে-সেখানে।

সংবাদমাধ্যমটি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে শেখ হাসিনার সরকারি এই আবাসে কয়েক ডজন কক্ষ আছে এবং রয়েছে বিশাল বাগান ও পুকুর। এই পুকুরে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী মাছ ধরতেন। তাঁর বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি আর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় কয়েক শ মানুষকে হত্যার ঘটনায় ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে।

গণভবনে গত বছরের ৫ আগস্ট ব্যাপক লুটপাট হয়। নগদ অর্থ, আসবাব, ফ্রিজ থেকে শুরু করে শাড়ি, গয়না, দামি খাবার—সবকিছু লুটপাট করা হয়। যদিও পরবর্তী সময়ে অনেকে লুটের জিনিস ফেরত দিয়ে গেছেন। তবে এখনো অনেক কিছু ধ্বংসস্তূপ আর ধুলার মধ্যে পড়ে আছে।

ধুলায় ঢেকে থাকা একটি রাজনৈতিক প্রচারপত্র পড়ে থাকতে দেখা গেল। এটা যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনীতিবিষয়ক মিনিস্টার (ইকোনমিক সেক্রেটারি) টিউলিপের। দেশটির আর্থিক খাতে দুর্নীতি বন্ধের দায়িত্বে আছেন তিনি। টিউলিপ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার মেয়ে। টিউলিপের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার আমলের দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

পাশেই একটি মোড়ক পড়ে ছিল। সেটা সোনার প্রলেপ দেওয়া মন্টব্ল্যাঁ কলমের। একেকটির দাম দেড় হাজার ডলার। সঙ্গে পড়ে ছিল হীরার মান যাচাইয়ের সনদ। যুক্তরাজ্যের এক বিশিষ্ট আইনজীবীর একটি আইনি পরামর্শের কপি সেখানে দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমে হাসিনার আমল নিয়ে করা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রকাশ আটকে দিতে আইনি পরামর্শ ছিল তাতে। বিদেশি ব্যাংকে হিসাব খোলার আবেদনপত্র পড়ে ছিল পাশেই।

শেখ হাসিনার বাবা ও বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক কূটনৈতিক তারবার্তার কপিও ধুলায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

টিউলিপের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও কিছু জিনিস এখনো পরিত্যক্ত গণভবনে পড়ে আছে। এর মধ্যে একটি ‘ধন্যবাদ নোট’ দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হওয়ার পর নিজ এলাকা হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্নের লেবার পার্টির স্থানীয় সদস্যদের উদ্দেশে সেটা লেখা।

আরেকটি ছিল টিউলিপের ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন। জীবনমানের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে চরম সংকটে পড়া মানুষের কল্যাণে টিউলিপ যা যা করেছিলেন, সেসব সম্পর্কে পাঠকদের পড়ার আহ্বান রয়েছে তাতে।

যদিও টিউলিপ বরাবরই দাবি করে এসেছেন, খালার (শেখ হাসিনা) সঙ্গে তাঁর কখনোই রাজনৈতিক বিষয়ে কথাবার্তা হতো না। ২০১৭ সালে তিনি বলেছিলেন, খালার সঙ্গে ‘কখনোই’ রাজনীতি নিয়ে কথা বলেননি তিনি।

একই বছর এক সাংবাদিকের পক্ষ থেকে টিউলিপের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করা এক আইনজীবীর ‘গুমের’ ঘটনায় শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে কি না। তখন টিউলিপ সন্তানসম্ভবা ওই সাংবাদিককে হুমকি দিয়েছিলেন। ওই সাংবাদিক পুলিশে অভিযোগ জানিয়েছিলেন।

এর পর থেকে টিউলিপের বিরুদ্ধে অভিযোগ সামনে আসে, তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাজ্যে এমন তিনটি সম্পত্তিতে বসবাস করেছেন, যেগুলো শেখ হাসিনার শাসনামলের কর্মকর্তা ও সহযোগীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সংবাদমাধ্যম সানডে টাইমসের অনুসন্ধানে জানানো হয়েছে, এর একটি কেনা হয়েছিল অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে। কর ফাঁকির আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত ওই কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের দুই ব্যবসায়ীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আলোচিত পানামা পেপারসে ওই কোম্পানির নাম এসেছে।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, টিউলিপের ব্যবহার করা সম্পত্তি নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিককে বরখাস্ত করতে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেইডনক।

যদিও টিউলিপ বরাবর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এ পরিস্থিতিতে টিউলিপের ওপর ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির সরকারের পূর্ণ আস্থা আছে, এটা বলতে গতকাল রোববার যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞানমন্ত্রী পিটার কাইলি অস্বীকৃতি জানান।

যাহোক, শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার পর গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের কাজ চলছে বলে জানান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা ও স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি জানান, ফ্যাসিবাদের বিপদ সম্পর্কে দেশ-বিদেশের মানুষকে সতর্ক করতে এটাকে জাদুঘর করা হচ্ছে।

দেয়ালজুড়ে গ্রাফিতি

গণভবনের মূল প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকতে চোখে পড়েছে একটি গ্রাফিতি। সাদা দেয়ালে লাল কালিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে একটি বার্তা লেখা রয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের ভারতপ্রীতি বিতর্কিত একটি বিষয়।

বিশাল সিঁড়ি পেরিয়ে প্রথম তলায় শেখ হাসিনার শয়নকক্ষ। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেখানটায়। কিছু জিনিস এখনো অক্ষত আছে। তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ৫০ বছর পূর্তির স্মারক ডাকটিকিট। সেটায় তাঁর প্রতিকৃতি অঙ্কিত আছে। এ ছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার দিনের বিস্তারিত সময়সীমা ও ফোনকলের ট্রান্সক্রিপ্ট দেখা গেল।

প্রবেশপথের পাশেই পড়ে রয়েছে একটি ডেন্টাল চেয়ার, একটি ম্যাসাজ চেয়ার আরেকটি ট্রেডমিল।

হীরার মান যাচাইয়ের নথি

এক কোনায় ধুলা–ময়লার মধ্যে কিছু কাগজ পড়ে ছিল। এর মধ্যে একটি জেমোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট অব আমেরিকার বিবৃতি। হীরার মান যাচাইয়ের জন্য বিশ্বে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য কর্তৃপক্ষ এটা।

শেখ হাসিনার শয়নকক্ষে এক জোড়া মার্কস অ্যান্ড স্পেনসার ব্র্যান্ডের দামি মোজার প্যাকেট পড়ে থাকতেও দেখা যায়।

পাশেই শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত রান্নাঘর। সেখানে বারবিকিউ স্বাদের হুলা হুপসের (আলু ও ভুট্টা দিয়ে বানানো খাবার। এটি যুক্তরাজ্যের বেশ জনপ্রিয়) প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখা গেল। বাংলাদেশে এটা দুষ্প্রাপ্য।

ভবনটির বাইরের দিকে বেশ কিছু চেয়ার ও টেবিল সাজানো অবস্থায় রয়েছে।

জাতিসংঘের বিজনেস কার্ড

একটি করিডোর পেরিয়ে এগিয়ে গেলেই টিউলিপের ভাই রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের কক্ষ। তিনি ‘ববি’ নামে পরিচিত। সেখানে মেঝেতে তাঁর বেশ কিছু জাতিসংঘের বিজনেস কার্ড পড়ে ছিল। তাতে ‘শাসনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে তাঁর পরিচয় লেখা আছে। পড়ে ছিল ববির মুঠোফোনের বিলের নথিও। সিমটি গ্রামীণফোনের।

বিদেশি বিশিষ্টজনদের দেওয়া উপহারের তালিকা অক্ষত থাকতে দেখা গেল। এর মধ্যে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর দেওয়া একটি স্কার্ফের কথা আছে। মাখোঁ ২০২১ সালে বাংলাদেশ সফরের সময় শেখ হাসিনাকে এটা উপহার দিয়েছিলেন। আরও আছে ফ্রান্সের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জিয়ান কাসটেক্সের দেওয়া সোনার একটি স্মারকের কথা।

উপহারের নথিতে যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অলোক শর্মার দেওয়া চায়ের কাপের কথা লেখা আছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে ব্রিটিশ জনগণের পক্ষে তিনি এই উপহার দিয়েছিলেন। এ ছাড়া চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং-ই-এর দেওয়া টি সেটের কথাও রয়েছে সেখানে।

পত্রিকার পাতা, ছবি

একই কক্ষে ধুলায় ঢাকার একটি সংবাদপত্র চোখে পড়ল। সেটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত ইংরেজি ভাষার ‘আওয়ার টাইম’ পত্রিকার ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের একটি সংখ্যা। শেখ হাসিনার প্রেস সেক্রেটারি এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।

পত্রিকার ওই পাতায় শেখ হাসিনাকে নিয়ে একটি সংবাদ ছিল। লাল হরফে শিরোনাম ‘বিশ্বের ক্ষমতাশালী নারীদের তালিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’।

কক্ষের বাইরে বাগানে লম্বা ঘাসের আড়ালে শেখ মুজিব ও শিশু হাসিনার একটি পুরোনো সাদাকালো আলোকচিত্র পড়ে থাকতেও দেখা গেল।

টিউলিপ সিদ্দিক। ছবি : সংগৃহীত
দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় পদত্যাগের প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ইকোনমিক সেক্রেটারি ও সিটি মিনিস্টার এবং শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক। তবে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান তিনি। সোমবার (১৩ জানুয়ারি) লন্ডনের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজে সোমবার (১৩ জানুয়ারি) ২৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন সাংবাদিক টিউলিপকে প্রশ্ন করছেন, তিনি পদত্যাগ করবেন কিনা? তবে এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বারবার ‘গুড মর্নিং’ বা শুভ সকাল বলে কাটিয়ে গেছেন তিনি। দুবার প্রশ্ন করা হলে দুবারই তিনি একই কথা বলেন। পরে গাড়িতে উঠে, বেরিয়ে যান ব্রিটেনের এই মন্ত্রী। কালবেলা

লস অ্যাঞ্জেলেসে দাবানলের কারণ কী: এখনো জ্বলছে ঘর–বাড়ি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নামানো হতে পারে সেনাবাহিনী

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি শেরিফ রবার্ট লুনা বলেছেন, গোয়েন্দারা (দাবানলের) সম্ভাব্য সব কারণ খতিয়ে দেখছেন। সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসের যে কয়েকটি অঞ্চল দাবানলে জ্বলছে, সেগুলোর মধ্যে প্যালিসেইডস ও ইটন অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রে দাবানলের সাধারণ কারণ হিসেবে বজ্রপাতকে দায়ী করা হয়। কিন্তু এবার এ দুই অঞ্চলে বজ্রপাতের কারণে দাবানল হয়নি।

কেউ আগুন দিয়েছে বা গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগ থেকে দাবানলের সূত্রপাত হয়েছে; এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে এমন কোনো ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি। বজ্রপাতের পর এ দুটি উৎসকেই দাবানলের সবচেয়ে বড় দুই কারণ হিসেবে ধরা হয়।

ক্যালিফোর্নিয়া ২০২২-২৩ সালে বেশ আর্দ্র ছিল। ফলে ওই সময়ে সেখানে বিপুল গাছপালা জন্মেছে। কিন্তু পরের বছরের খরার কারণে সেই আর্দ্রতা শুকিয়ে গিয়েছিল। এতে সেখানে প্রচুর পরিমাণে ছোটখাটো দাবানলের সৃষ্টি হয়েছিল।

গত বছরের অক্টোবর থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসের বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্রগুলোতে কেবল দশমিক ৪ সেন্টিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এই নজিরবিহীন শুষ্ক সময় এবং সান্তা অ্যানা হিসেবে পরিচিত সমুদ্রের শক্তিশালী ঝোড়ো হাওয়া একসঙ্গে মিলে দাবানল সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল।

বিবিসির আবহাওয়া পূর্বাভাস–বিশেষজ্ঞ সারাহ কিথ-লুকাস বলেন, অন্তত আগামী সপ্তাহে (দাবানলকবলিত) অঞ্চলে বৃষ্টির কোনো পূর্বাভাস নেই।

স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকেল থেকে শনিবার পর্যন্ত দাবানলকবলিত অঞ্চলে বাতাসের গতি কিছুটা কমেছে; কিন্তু পূর্বাভাস–বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ঝোড়ো হাওয়া রোববার থেকে সোমবারের মধ্যে ফের বাড়তে পারে।

এখনো জ্বলছে ঘর–বাড়ি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নামানো হতে পারে সেনাবাহিনী

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে ব্যস্ত সময় পার করছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। একে তো টানা সাত দিন ধরে দাবানলে জ্বলছে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের এই শহর, তারপর দিন দুয়েকের বিরতির পর আবার বাড়তে শুরু করেছে বাতাসের গতি। বাতাসের গতি তীব্র হওয়ার আগেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে ফায়ার সার্ভিস।

৭ জানুয়ারি সূত্রপাতের পর লস অ্যাঞ্জেলেসে ছয়টি দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল। এখনো তিনটি দাবানল সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে শহরের পশ্চিম অংশে ‘প্যালিসেইডস’ ও পূর্বে ‘এটন’ দাবানলের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি। এই দুই দাবানল সামান্যই নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির নিরিখে লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানল মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে চলেছে।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণটা আসলেই হতবাক করে দেওয়ার মতো। দাবানলে লস অ্যাঞ্জেলেসের এলাকার পর এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ধনকুবের কি সাধারণ মানুষ—সবার বাড়ি মিশে গেছে মাটির সঙ্গে। আগুন পুড়েছে অন্তত ১২ হাজার ৩০০ বাড়ি। আর আগুনে এখন পর্যন্ত ১৩৫ থেকে ১৫০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়াবিষয়ক ওয়েবসাইট অ্যাকুওয়েদার।

আগুনে সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের দুর্দশাও চরমে পৌঁছেছে। বাড়িঘর হারানোর শোকের মধ্যেই প্রাণ বাঁচাতে এক লাখ মানুষকে উপদ্রুত এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল হলে একই নির্দেশ দেওয়া হতে পারে আরও ৮৭ হাজার জনকে। আর ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪ জনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছেন।

আগুন নেভাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। আকাশ থেকে ফেলা হচ্ছে পানি ও রাসায়নিক। নানা সরঞ্জাম হাতে মাঠে নেমেছেন ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা। এখন পর্যন্ত ২৩ হাজার ৭১৩ একর জায়গা গ্রাস করা সবচেয়ে ভয়াবহ প্যালিসেইডস দাবানল মাত্র ১৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আর ১৪ হাজার ১১৭ একর এলাকায় জ্বলতে থাকা এটন দাবানল নিয়ন্ত্রণে এসেছে ২৭ শতাংশ।

ফায়ার সার্ভিস যেটুকু সফলতা পেয়েছে, তার একটি বড় কারণ ঝড়ো বাতাস সান্তা আনার গতি কমা। তবে সপ্তাহান্তে বাতাসের গতি কমার পর আবার বাড়াতে শুরু করেছে। ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রোববার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত স্থানীয় মরুভূমি থেকে সৃষ্টি হওয়া এই বাতাস লস অ্যাঞ্জেলেসের ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১১২ কিলোমিটার গতিতে বয়ে যেতে পারে।

লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির ফায়ার সার্ভিসের প্রধান অ্যান্থনি ম্যারন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এ বাতাসে আর্দ্রতা খুবই কম। তাই লস অ্যাঞ্জেলেসজুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি থাকবে। যেসব এলাকা থেকে লোকজনকে সরে যেতে বলা হয়েছে, আগামী বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ সতর্কতা তুলে নেওয়ার আগপর্যন্ত ওই এলাকাগুলো খুলে দেওয়া হবে না।

এদিকে আগুন নেভানোর কাজে এরই মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার আশপাশের সাত অঙ্গরাজ্য থেকে ছুটে এসেছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। প্রতিবেশী দেশ কানাডা ও মেক্সিকোও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এজেন্সির প্রশাসক ড্যানি ক্রিসওয়েল বলেছেন, আগুন নেভানোর কাজে সহায়তার জন্য সেনাসদস্যদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

লস অ্যাঞ্জেলেসের প্যালিসেইডস অঞ্চলের দাবানলের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটি হেলিকপ্টার। ১১ জানুয়ারি ২০২৫
লস অ্যাঞ্জেলেসের প্যালিসেইডস অঞ্চলের দাবানলের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটি হেলিকপ্টার। ১১ জানুয়ারি ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

হামলা অব্যাহত, গাজায় ভয়াবহ দুর্ভোগে মানুষ

সোমবার ভোর থেকে গাজায় ভয়াবহ হামলায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৬ ফিলিস্তিনি। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো আশ্রয় নিয়েছিলেন গাজা সিটির সালাহ আল দিন স্কুলে। সেখানে ইসরাইলি বাহিনী হামলা চালিয়ে হত্যা করেছে কমপক্ষে ৫ জনকে। গাজার উত্তরাঞ্চলে বিশাল এলাকা অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরাইল। সেখানে হামলা শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ৫ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বা নিখোঁজ আছে। কাতারের রাজধানী দোহায় অব্যাহত আছে সমঝোতা প্রক্রিয়া। এরই মধ্যে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনে ইসরাইল গণহত্যা চালিয়ে হত্যা করেছে কমপক্ষে ৪৬,৫৮৪ জনকে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে এক লাখ ৯ হাজার ৭৩১ জন। ওই একই দিনের আগে হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। তাতে কমপক্ষে ১১৩৯ জন ইসরাইলি নিহত হয়। কমপক্ষে ২০০ মানুষকে জিম্মি করে হামাস। এর বদলা নিতে ইসরাইল নৃশংসভাবে গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের বসতি, হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুল সহ সব স্থানে। যারা বেঁচে আছেন, এই শীত মৌসুমে তাদের অবস্থা করুণ। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের (এনআরসি) কমিউনিকেশন বিষয়ক উপদেষ্টা শাইনা লো বলেছেন, গাজার উত্তরাঞ্চলে পরিস্থিতি অকল্পনীয়।  সেখানে মানুষের খাদ্য ও পানের পানি নেই বললেই চলে। ত্রাণ পৌঁছানো হচ্ছে না সেখানে। উত্তর গাজার ক্রসিং পয়েন্ট ইসরাইলিরা অবরুদ্ধ করে ৬ই অক্টোবর। তখন থেকে ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত জাতিসংঘ গাজার উত্তরাঞ্চলে প্রবেশের জন্য ১৬৫ বার চেষ্টা করেছে। জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে শাইনা লো বলেন, এর মধ্যে ১৪৯ বারই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। বাকি ১৬ বার ইসরাইলিরা তাদের সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। গাজাবাসীর মানবিক পরিস্থিতি ভয়াবহ। তার ওপর হামলা হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে নয়। এর মধ্যে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যাওয়া নিরাপদ কিনা সে বিষয়েও নিশ্চিত নন গাজাবাসী। বহু মানুষ চলাচলে অক্ষম। অথবা এতই প্রবীণ যে, তারা চলাচল করতে পারেন না। ফলে অনেক মানুষ বাড়িতেই অবস্থান করছেন। তারা ঘর ছাড়তে নারাজ। কারণ, তারা বিশ্বাস করেন নিজের ঘরে থাকার অধিকার তাদের আছে। আন্তর্জাতিক আইনেই তাদের এই অধিকার আছে। তাদেরকে সরে যেতে বলা হলেও তারা সুরক্ষিত বলে মনে করেন। গাজা সিটি থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টাকালে অনেক পুরুষ এবং বালককে আটক করা হয়েছে। তারা কোথায় আছেন তার চেয়ে তাদের ভবিষ্যৎ কী তা নিয়ে বেশি আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেক সময়ই বিতরণ করার মতো ত্রাণ থাকে না এনআরসি’র হাতে। শাইনা লো বলেন, গাজার মানুষ যে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন তার কোনো প্রতিকার আমাদের কাছে নেই। তার ভাষায়, আমাদের এমন একজন স্টাফ মেম্বার আছেন, যিনি নভেম্বরে তার পরিবারের কমপক্ষে ১২০ জন সদস্যকে হারিয়েছেন। তারপরও তিনি বাইরে এসে তার দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কাজ করছেন শিশুদের নিয়ে। ওদিকে কাতারে যুদ্ধবিরতি নিয়ে যে আলোচনা চলছে তার সমালোচনা করেছেন ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। তিনি ইসরাইলের কট্টর জাতীয়তাবাদী ধর্মীয় দলগুলোর অন্যতম একটি দলের প্রধান। বলেছেন, গাজায় যুদ্ধ বন্ধ এবং জিম্মিদের মুক্তির যে আলোচনা চলছে, তাতে চুক্তি হলে সেটা হবে একটি ‘আত্মসমর্পণের’ চুক্তি। এমন চুক্তি হলে তা হবে ইসরাইল রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বিপর্যয়।
mzamin

টিউলিপ সিদ্দিকের নৈতিকতা ও প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান by শহীদুল্লাহ ফরায়জী

টিউলিপ সিদ্দিকের প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান এবং অর্থ ও নৈতিক কেলেঙ্কারি এখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আলোচনার উপাদান। যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী মা শেখ রেহানা সিদ্দিক এবং তার খালা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার- হত্যা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার-সহ বিভিন্ন গুরুতর বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বৃটিশ-মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের সম্পদের তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যা ও গুম নিয়ে সাংবাদিকের পক্ষ থেকে যখন টিউলিপ সিদ্দিকের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছিল তখন তিনি অসহিষ্ণুভাবে বলেছিলেন- ‘আমি বৃটেনে জন্মগ্রহণ করেছি এবং বৃটেনের সাংসদ।’ আরও বলেছিলেন- এটা যেন সবাই খেয়াল রাখেন। অর্থাৎ তিনি যেহেতু বৃটেনের বংশোদ্ভূত নাগরিক এবং বৃটেনের রাজনীতি ও সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেহেতু বাংলাদেশ-প্রশ্নে জ্ঞাত নন এবং এ বিষয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানানোর কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু টিউলিপ সিদ্দিকের এই অবস্থান অনুসৃত নৈতিকতার বিপরীত। এতে প্রমাণিত হয় একদিকে তার মুক্তচিন্তার সক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে অন্যদিকে নৈতিকতার স্বপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করা, কৌশলগত সুবিধা গ্রহণের কারণ। তার মা এবং খালা বাংলাদেশের রাজনীতি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন, কীভাবে আর্থিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে ব্যক্তিগত সুবিধাকে অনুমোদনযোগ্য করে তুলেছিলেন, তা না জানার কোনো কারণ নেই। টিউলিপ সিদ্দিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ নৈতিক বিশ্বাসের দু’টি উৎসকে অস্বীকার করে নিজেকে ক্রমাগত নিরাপদ রাখতে চেয়েছেন। এর একটি হচ্ছে- রাজনৈতিক বিশ্বাস অন্যটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস। বৃটিশ নাগরিক হিসেবে টিউলিপ সিদ্দিক নাগরিক এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার অস্তিত্বকে মূল্যহীন করেছেন। ফলে তিনি বুঝতে পারেননি, কোন ক্রিয়ার প্রশংসা করা হয় আর কোন ক্রিয়ার নিন্দা করা হয়।

টিউলিপ সজ্ঞানে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বগতোক্তি করেছেন- তিনি বৃটিশ নাগরিক, নৈতিকভাবে বৃটেনের প্রতি তার আনুগত্য রয়েছে এবং বৃটিশ রাজ্যের আজ্ঞাবাহী। বর্তমানে তিনি বৃটিশ সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া-  (ক্রেমলিনের অভ্যন্তরে) পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিষয়ক চুক্তিটি স্বাক্ষর করার সময় বৃটিশ নাগরিক এবং লেবার পার্টির একজন কাউন্সিলর টিউলিপ সিদ্দিক স্বশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেন কি? পারলে সেটা রাষ্ট্রীয় কোন প্রটোকলের আওতায় পড়ে? গণমাধ্যমে প্রকাশ- টিউলিপ মোট ১০ বিলিয়ন ডলারের সেই চুক্তিটির ‘দালালি’ করতে সহায়তা করেছিলেন। টিউলিপ সিদ্দিক জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নন কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক। অথচ তিনি বাংলাদেশের প্রতি শর্তহীন অনুজ্ঞাও প্রকাশ করেননি বরং বৃটেনের নিরঙ্কুশ নাগরিকত্ব নিশ্চিত করেছেন।
কী-নীতির ভিত্তিতে ১০ বিলিয়ন ডলারের পারমাণবিক চুক্তির অনুষ্ঠানে টিউলিপ সিদ্দিকের অবস্থান অনিবার্য হয়ে পড়েছিল! কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত এই উপস্থিতির দৃষ্টান্তের কারণে প্রশ্ন উঠা- দশ বিলিয়ন ডলারের দালালি করতেই তিনি খালা শেখ হাসিনার সফর সঙ্গী হয়েছিলেন, এটা যৌক্তিক। কোনোরকম প্রলোভন ছাড়া নিছক ভ্রমণের জন্য তিনি রাশিয়ায় যাননি, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তি ও নৈতিকতা- দু’টোকে দূরে সরিয়েই অনৈতিক কাজে জড়িত হয়েছেন এবং উৎসাহিত করেছেন।

টিউলিপ সিদ্দিক তার খালার গত ১৫ বছরের শাসনে গণহত্যা-সহ রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের প্রশ্নে টু-শব্দটি উচ্চারণ করার প্রয়োজন বোধ করেননি বরং অব্যাহতভাবে সমর্থন দিয়ে গেছেন। খালার ক্ষমতার প্রভাবে ক্রিকেট খেলার মাঠে বাংলাদেশ-গ্যালারিতে বসে বিনা টিকিটে খেলা দেখেন। এতে তার মাধ্যমে ন্যায্যতা এবং অন্তর্দৃষ্টির সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সুবিধা ভোগের নানারকম ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ না করে নৈতিক মূল্যকে তিনি বিলীন করেছেন। আইনবোধ এবং যুক্তিবোধ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে আইনসম্মত কাজে লিপ্ত হওয়াই নৈতিকতার মূল শর্ত, যা টিউলিপের মাঝে অনুপস্থিত। এ ছাড়াও যৌথ প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিনামূল্যে ফ্ল্যাট নিয়েছেন তিনি এবং তার ছোট বোন। এসব কোনোটাই নৈতিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং বিশুদ্ধ কর্তব্যবোধও নয়। বিভিন্ন ধরনের উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ বা সম্পদ লাভের উদ্ভূত প্রেরণা গ্রহণ কোনোক্রমেই বৈধ নয়। উল্লেখ্য, হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক হত্যা করে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। দুর্নীতির অভিযোগে পরিবারের সকলেই এখন অভিযুক্ত।

টিউলিপ সিদ্দিক তার বক্তব্যে বোঝাতে চেয়েছেন- বৃটিশ রাজ্য তার সর্বাগ্রে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাজে সম্পৃক্ত হওয়ায় তার বাসনা কী- তা ক্রমাগত উন্মোচিত হচ্ছে। অতএব নীতি ও নৈতিকতায় টিউলিপ যে-বলিষ্ঠতা অর্জনে সক্ষম হননি তা স্পষ্ট। নীতিদর্শনে কান্ট বলেছেন- ‘কর্তব্য যখন একমাত্র কর্তব্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তখন বহিঃনিয়ন্ত্রণের অবকাশ থাকে না এবং তখনই প্রকৃতপক্ষে পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রকাশ পাওয়া যায়। মানুষ যখন স্বার্থ, লাভ-লোকসান বা প্রীতিবোধ দ্বারা কর্তব্য কাজে উদ্বুদ্ধ হয় তখন তার ইচ্ছার ভিত্তি প্রকৃতপক্ষে বহির্শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সে কাজ বা ভিত্তি কখনো প্রকৃত অর্থে মঙ্গলময় বলে গণ্য হতে পারে না।’

বৃটিশ রাজনীতিতে দুর্নীতি ও নৈতিক কেলেঙ্কারি: বৃটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিক সম্পর্কিত সামপ্রতিক অভিযোগগুলো জনগণের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে এবং বৃটেনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। লেবার পার্টির ট্রেজারির অর্থনৈতিক সচিব এবং সিটি মিনিস্টার হিসেবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত টিউলিপ, দুর্নীতি ও অনৈতিক আচরণের অভিযোগে জড়িয়ে পড়েছেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; গত ৪০ বছরে বেশ কয়েকজন বৃটিশ এমপি দুর্নীতি ও নৈতিকতা লঙ্ঘনের কারণে পদত্যাগ করেছেন বা বরখাস্ত হয়েছেন। একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো কনজারভেটিভ এমপি নিল হ্যামিল্টনের ক্ষেত্রে, যিনি হ্যারডস ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মালিক মোহাম্মদ আল-ফায়েদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে অভিযুক্ত। দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর হ্যামিল্টন ১৯৯৭ সালে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।

আরেকটি উদাহরণ হলো লেবার এমপি ইলিয়ট মোরলের ক্ষেত্রে, যিনি ২০০৯ সালে মিথ্যা খরচের দাবি করার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। দুর্নীতির দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর মোরলে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং পরে ১৬ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। টিউলিপ সিদ্দিকের কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে, এটা স্পষ্ট যে- তিনি একজন এমপি হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন, আস্থা বিনষ্ট করেছেন এবং তার পদত্যাগ করা উচিত বা বরখাস্ত হওয়া উচিত। টিউলিপের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে উপহার হিসেবে একটি ফ্ল্যাট পাওয়া সম্পর্কে মিথ্যা বলা, উপহার ঘোষণা করতে ব্যর্থ হওয়া এবং বাংলাদেশে অর্থ আত্মসাতের জন্য তদন্তের মুখোমুখি হওয়া। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে টিউলিপের ভূমিকায় এই অভিযোগগুলো বিশেষভাবে গুরুতর।

লন্ডনের ফ্ল্যাটের মালিকানা বিষয়ক সত্যিকারের তথ্য প্রকাশে তিনি তার বৃটিশ আর্থিক, স্বার্থ, সম্পদ এবং দায়বদ্ধতা নিবন্ধনের অঙ্গীকারনামার শপথ ভঙ্গ করেছেন। টিউলিপের কর্মকাণ্ড বিশ্বাস ভঙ্গ এবং জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করে। লন্ডনের ফ্ল্যাটের প্রকৃত প্রকৃতি বা তথ্য প্রকাশ করতে তার ব্যর্থতা এবং যথাযথ ঘোষণা ছাড়া উপহার গ্রহণ- গুরুতর নৈতিক লঙ্ঘন। উপরন্তু, বাংলাদেশে অর্থ আত্মসাতের তদন্ত টিউলিপের সততা এবং পদের যোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। উপসংহারে, টিউলিপ সিদ্দিকের কেলেঙ্কারি- বৃটিশ রাজনীতিতে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তার একটি স্পষ্ট স্মারক। নিল হ্যামিল্টন এবং ইলিয়ট মোরলের উদাহরণ প্রমাণ করে যে, দুর্নীতি এবং নৈতিক লঙ্ঘন সহ্য করা হয় না। টিউলিপের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো এবং বিশ্বাসভঙ্গ স্পষ্ট করে যে, তার দ্রুত পদত্যাগ করা উচিত নয়তো তিনি বরখাস্ত বা আদালতে দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন। বৃটিশ জনগণ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আরও উচ্চতর নৈতিকতা আশা করে।

ইতিমধ্যে বৃটিশ সিটি মিনিস্টার টিউলিপ সিদ্দিককে বরখাস্তের আহ্বান জানিয়েছেন কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান। কিন্তু টিউলিপ সিদ্দিক এখনো স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে নিরপেক্ষ তদন্তে সহযোগিতা করার যে-রীতি এবং প্রথা বা নৈতিক বাধ্যবাধকতার পথ, তা তিনি অনুসরণ করেননি। তিনি কোন অধিকার বলে বাংলাদেশের সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে হাজির থেকেছেন সে ব্যাখ্যা আজও দেননি। এসব কর্মকাণ্ড- খালা শেখ হাসিনা এবং ভাগ্নি টিউলিপ সিদ্দিককে কোনোক্রমেই নৈতিক অনুমোদন দেয় না। বিবেকের নির্দেশে না চলায় এই বিষয়কে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমশই জটিলতর হচ্ছে। অনেকেরই দাতা হাতেম তাইয়ের মতো দাতব্য হয়ে ওঠার আড়ালে মানিলন্ডারিং-এর তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে সর্বনাশা দুর্নীতির যে-অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, আইনগত এবং নৈতিকভাবে অনুমোদন অযোগ্য কর্মকাণ্ড যেভাবে বিস্তার লাভ করেছিল, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের যে ভয়াবহ চিত্র প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে- তার দুর্বিষহ পরিণতির জন্য আমাদেরকে আরও অপেক্ষা করতে হবে।? অবশ্য শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা এবং তার পরিবার যে নৈতিক বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ নন বা ছিলেন না- এটি নিয়ে সন্দেহের আর কোনো অবকাশ নেই। এই পরিবার সহজেই সকল ধরনের অন্যায়-অবিচার এবং দুর্নীতিকে গ্রহণ করে নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছে। তাদের মর্যাদা সারা বিশ্বে যেভাবে ধূলিসাৎ হয়েছে, তা আর কোনোদিন পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

কান্ট বলেছিলেন-‘মানুষ যদি ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ থেকে নিজেকে ছিন্ন করার ক্ষমতা রাখে এবং যুক্তির রাজ্যে প্রবেশ করার শর্তহীন শক্তির অধিকারী হয়, তাহলেই বাধ্যবাধকতা ও নৈতিক দায়িত্বশীলতা উভয়ই রক্ষা করা সম্ভব।’

টিউলিপ সিদ্দিকের রাজনৈতিক সূর্য মধ্য গগনে তীব্র উজ্জ্বলতায় আলো ছড়াবে, না কি চিরকালের জন্য অস্তমিত হবে, তা দেখার জন্য আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com

mzamin

সাংবাদিকতা আমার নেশা, পেশা by মতিউর রহমান চৌধুরী

সাংবাদিকতা আমার নেশা, পেশা। মিথ্যার কাছে কখনো নিজেকে বিক্রি করে দেইনি। গোটা পরিবার প্রবাসী। প্রচণ্ড চাপ ছিল পরিবার থেকে প্রবাসী হওয়ার। কিন্তু মায়ের ইচ্ছায় ৫২ বছর আগে সাংবাদিকতার নেশাকে পেশা হিসেবেই বেছে নিয়েছিলাম। আপসের চোরাগলিতে হাঁটার অনেক সুযোগ এবং অফার এসেছিল। বিনীতভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেছি।  দীর্ঘসময় ধরে আমাকে এর জন্য মূল্য দিতে হয়েছে। ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ সকালে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়ার সময় পাক বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়ে যাই। বেঁচে আছি- এটা এক বিস্ময়কর ঘটনা। যুদ্ধ শেষে শেখ ফজলুল হক মণির নির্দেশে সাংবাদিকতায় এসে প্রথমেই ধাক্কা খেলাম । ১৯৭৪ সন,  আমি তখন বাংলার বাণীর রিপোর্টার। ১৭ই মার্চ জাসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এম মনসুর আলীর বাড়ি ঘেরাও করলো। সে রিপোর্ট লেখার কারণে ১৮ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর কেউই আমাকে চাকরি দিতে চাচ্ছিলেন না।

যাইহোক, কিছুদিন পর পূর্বদেশের তৎকালীন সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী আমাকে চাকরি দেন। সেটাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। চারটি পত্রিকা রেখে সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাকে গেজেটেড সরকারি চাকরিরও অফার করা হয়। কিন্তু সে চাকরিতে আমি যোগ দেইনি। সুইডেন চলে যাব এমনটাই স্থির হয়েছিল। এর মধ্যে পরিবর্তন আসে দেশে। ১৫ই আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের নতুন যাত্রা শুরু হয়। ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ ঘটে দৈনিক দেশবাংলার। সেখানে যোগ দেই। কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব দেয়া হয়। অল্পদিনের মধ্যেই দৈনিক সংবাদে চাকরি হয়ে যায়। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় জিয়াউর রহমান। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় মন্ত্রীরা ঘুষ খাবেন না, তথ্য পাচার করবেন না। কোরআন শরীফ ছুঁয়ে তারা শপথ নেন। এই খবরটা আমার কাছে এসেছিল বিভিন্ন সূত্র থেকে।  ইত্তেফাকের সহকর্মী আলমগীর হোসেনের সহায়তায় খবরটির চূড়ান্ত সত্যতা যাচাই করার পর লিখে দেই।  ব্যানার হেডিং হয়ে যায়। পরদিন হুলস্থূল। জিয়াউর রহমানের প্রেস উপদেষ্টা দাউদ খান মজলিস ডেকে পাঠান বঙ্গভবনে। খবরের সূত্র জানতে চান। এটা বলি কী করে! একমাত্র সম্পাদক ছাড়া আর কারও কাছে সূত্র বলার সুযোগ নেই। এটাই সাংবাদিকতার শপথ। উত্তেজিত দাউদ খান মজলিস ফোন করলেন সংবাদের সম্পাদক আহমেদুল কবিরের কাছে। বললেন, তোমার রিপোর্টার তো আমার সর্বনাশ করে দিয়েছে। ফিরে এলাম প্রেস ক্লাবে। এরপর সচিবালয়ে ঢুকতেই নিরাপত্তারক্ষী বাধা দিলেন। বললেন, আপনার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল হয়ে গেছে। দুপুরের পর অফিসে যেতেই বলা হলো, কবির সাহেব রেগেমেগে অস্থির, দেখা করতে বলেছেন। সম্পাদক আহমেদুল কবির তখন কথা বলছিলেন বার্তা বিভাগের দায়িত্বরত প্রয়াত বজলুর রহমানের সঙ্গে। তিনিই আমার রিপোর্টটি খুব যত্ন সহকারে ছেপেছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল আমি আর যাই করি ভুল রিপোর্ট দেবো না। কবির সাহেব সূত্র জানতে চাইলেন না। বললেন, ওরা তো খবরের সত্যতা অস্বীকার করছে না। তারা শুধু জানতে চাচ্ছে কে খবরটা লিক করেছে। বজলু ভাই তখন আমাকে সমর্থন করলেন। বললেন, ওর দোষ কোথায়। ও তো ঠিকই লিখেছে। কোরআন শরীফ ছুঁয়ে যদি কেউ শপথ ভঙ্গ করে তাহলে এই সমস্যা আমাদের নয়। বিষয়টির নিষ্পত্তি এখানেই হলো না। তিন দফা এসবি অফিসে যেতে হয়েছিল। সংবাদে থাকাকালে বাংলাদেশ চীন থেকে অস্ত্র কিনছে এই রিপোর্ট প্রকাশের পর সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ কয়েকঘণ্টার জন্য আটক রাখে আমাকে। বাতিল হয় অ্যাক্রিডিটেশন। জেনারেল আমসা আমিন ছিলেন দায়িত্বে। বারবার একই প্রশ্ন। কে দিয়েছে আপনাকে এই খবর। বলা চলে, এই সব  রিপোর্টই আমার জন্য ইত্তেফাকের দরজা খুলে দেয়।

ইত্তেফাকের তখন স্বর্ণযুগ। এক দুপুরে ডাক পেলাম সেখান থেকে। ইত্তেফাক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দেখা করতে বলেছেন। এক সাক্ষাতেই চাকরি হয়ে গেল। কূটনৈতিক রিপোর্টারের দায়িত্ব পেয়ে গেলাম। সে দিনগুলো ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। বহুবার ডিজিএফআই আর এসবি অফিসে যেতে হয়েছে। পৃথিবীর বড় বড় ইভেন্ট কাভার করার সুযোগ হয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে প্রথম বাংলাদেশি সাংবাদিক হিসেবে অংশ নেয়ার বিরল সুযোগও আসে। এমনকি বিশ্বকাপ ক্রিকেটেও প্রথম বাংলাদেশি সাংবাদিক ছিলাম। আর এসবের জন্য আজও কৃতজ্ঞতা জানাই সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কাছে। বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে ইত্তেফাককে আরও সমৃদ্ধ করেন। পরে যোগ দেন রাজনীতিতে।  মন্ত্রীও হন। সে নিয়ে অবশ্য তখনই লিখিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, একজন সম্পাদক যেখানে মন্ত্রী, এমপি বানান তার কেন মন্ত্রী হতে হবে! যাইহোক, এটা অন্য বিতর্ক। ইত্তেফাকে থাকাকালে নিয়মিতভাবে কলাম লিখতাম সাপ্তাহিক খবরের কাগজে। তখন উপসাগরীয় যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ কাভার করার জন্য সৌদি আরব যাওয়ার  প্রস্তুতিপর্বে দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। তখন এরশাদের জমানা। লেখাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। আমার গাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নিয়ে গিয়ে ব্রিজের ওপর থেকে ফেলে দেয়া হয়। মামলা গড়ায় আদালতে।

তৃতীয়মাত্রা-খ্যাত সাংবাদিক জিল্লুর রহমানের বিরামহীন তাগিদের প্রেক্ষিতে লেখাটা জমা দিয়ে প্লেনে চড়েছিলাম। তারপর তো অনেক কিছু ঘটে যায় দেশে। সাপ্তাহিক খবরের কাগজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। হুলিয়া জারি করা হয় আমার বিরুদ্ধে। আবারো বাতিল করা হয় আমার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। প্রধান বিচারপতি তখন সাহাবুদ্দীন আহমদ। তার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ থেকেই ঐতিহাসিক রায় আসে। সাপ্তাহিক খবরের কাগজের প্রকাশনা ফের চালু হয়। আজ সংবাদমাধ্যম যেটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছে মূলত বিচারপতি সাহাবুদ্দীনেরই অবদান।  অথচ, তার কথা আমরা কেউই স্মরণ করি না। এখানে বলে রাখা ভালো, দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য লেখার কারণে আমাকে ১৭ ঘণ্টা আটক রাখা হয়েছিল। ইত্তেফাক ছাড়লাম। যোগ দিলাম আজকের কাগজে। অল্পদিন পরেই ছাড়তে হলো মালিকপক্ষের সঙ্গে বিরোধের কারণে। পরের ইতিহাস নিজের পায়ে দাঁড়ানো। পারিবারিক সঞ্চয় আর স্ত্রীর বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া অর্থ খুইয়ে বাংলাবাজার পত্রিকা ছেড়ে দিতে হলো। বাংলাবাজারে থাকা অবস্থায় জেলে যেতে হলো। রয়টার্সের সাবেক ব্যুরো প্রধান সিরাজুল ইসলাম কাদিরের একটি রিপোর্ট প্রকাশের কারণেই খালেদা জিয়ার প্রশাসন আমাকে অফিস থেকে গ্রেপ্তার করে। নতুন যাত্রা শুরু হলো মানবজমিন-এ। যত ঝামেলা এখানেই। একটি ক্যাসেট কেলেঙ্কারির রিপোর্ট প্রকাশের জন্য মামলা হলো আদালতে। তখন সাহাবুদ্দীন আহমদ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। শেখ হাসিনা তখন প্রধানমন্ত্রী। আদালত অবমাননার মামলায় প্রমাণ চেয়ে নির্দেশনা এলো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। এক্ষেত্রে মানবজমিনই ব্যতিক্রম। হাজির করলাম ক্যাসেট। যেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ বিচারপতি লতিফুর রহমান কথা বলছিলেন টেলিফোনে একটি নির্দিষ্ট মামলা নিয়ে। প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ আমার পথে দাঁড়ালেন। যেটা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা ছিল। বিচারপতি পদত্যাগ করলেন। মামলায় আমার এক মাস জেল হলো। সম্পাদক মাহবুবা চৌধুরীর একদিন। আর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছয় মাস। মামলাটি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। মাঝখানে বিরতি। আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় শেখ হাসিনা। মানবজমিন-এ তার বিরক্তি ছিল প্রচণ্ড। বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিলেন। দেশ ছাড়তে বাধ্য হলাম। টানা আট মাস বিদেশে থাকতে হলো। দীর্ঘ সময় অ্যাক্রিডিটেশন পেলাম না। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ। ভয়েস অফ আমেরিকা থেকে সরানোর জন্য লবিং করলো হাসিনার প্রশাসন। ২৮ বছর পর ছাড়তে হলো ভয়েস অফ আমেরিকা। কূটনৈতিক পার্টিগুলোতেও এজেন্সির লোকেরা নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতো। হাসিনার পতনের তিনদিন আগে ২রা আগস্ট আবার দেশ ছাড়তে হলো আমাকে।

এগুলো সংক্ষিপ্ত বয়ান। তবে,  এখানে দু’টি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর আত্মগোপন এবং গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি খবর। দীর্ঘ ১১ বছর আত্মগোপনে ছিলেন হারিছ চৌধুরী। করোনায় তার মৃত্যু হয়। দাফন করা হয় সাভারে। কিন্তু খবরটি মামুলি কোনো খবর নয়। ১১ বছর ধরে ঢাকার পান্থপথে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান নামে গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু মানবজমিন-এর অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ব্যক্তিই হারিছ চৌধুরী। ২০২২ সনের ৬ই মার্চ আমার এই অনুসন্ধানী রিপোর্টটি প্রকাশের পর চারদিকে হইচই পড়ে যায়। সকল সংবাদমাধ্যম খবরটি লুফে নেয়। জানতে চাওয়া হয় ইন্টারপোল থেকেও। কিন্তু গোয়েন্দারা বরাবরের মতোই অস্বীকার করেন। বলেন, খবরের কোনো সত্যতা নেই, মানবজমিনকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত মানবজমিন দুঃখ প্রকাশ করেনি। বিষয়টি গড়ায় আদালতে। হারিছ চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার সামিরা তানজীন চৌধুরীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় মাহমুদুর রহমান নয়, হারিছ চৌধুরী মারা গেছেন।

পরের খবরটি রীতিমতো চাঞ্চল্যকর। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তখন বলা হয় তিনি পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। সেই আলোচিত পদত্যাগপত্রের অনুসন্ধান করতে গিয়েই পাওয়া গেল অবিশ্বাস্য এক খবর। পদত্যাগপত্র নেই কোথাও। এর কারণ কী? তিনি কি পদত্যাগ করেননি? প্রেসিডেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল দেশ ছাড়ার সময় শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দিয়ে যাননি। খবরটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয় সরকারি মহলে। রাজনৈতিক নেতারাও উষ্মা প্রকাশ করেন। সপ্তাহখানেক ধরে  মিডিয়াজুড়েই ছিল এই খবরটি। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও খবরটি ঘিরে নানা বিশ্লেষণমূলক রিপোর্ট প্রচার হতে থাকে। প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতে চাপ দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি থেমে যায় নানা রাজনৈতিক ইকুয়েশনে।

(হবিগঞ্জ প্রেসক্লাব-এর ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে  প্রকাশিত ‘অন্তরালের মুখ’ স্মরণিকা থেকে)

mzamin

লস অ্যানজেলেসে দাবানল বিপজ্জনক অবস্থায়, নিহত বেড়ে ২৪

লস অ্যানজেলেসের ভয়াবহ আগুন নিয়ন্ত্রণে গুরুতর দশার মুখোমুখি অগ্নিনির্বাপকরা। ক্রুদের কাছ থেকে পাওয়া রিপোর্টে বলা হচ্ছে, সেখানে আগুনের হুমকি এখনও অতি উচ্চ। কারণ এ সপ্তাহে সেখানে ভয়াবহ বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। এরই মধ্যে এই দাবানলে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ২৪। বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে নিহতের সংখ্যা প্রচুর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গাভিন নিউসম বলেছেন একথা। এ খবর দিযেছে অনলাইন সিএনএন। এতে বলা হয়েছে, লস অ্যানজেলেস কাউন্টি থেকে কমপক্ষে এক লাখ অধিবাসী উদ্ধার নির্দেশের অধীনে রয়েছেন। প্রায় ৮৭ হাজার মানুষকে উদ্ধার সতর্কতার অধীনে রাখা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ইতিহাসে দ্বিতীয় ও চতুর্থ সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অগ্নিকাণ্ড হতে পারে ইটন এবং প্যালিসাডস ফায়ার।  এরই মধ্যে আগুনে পুরোপুরি পড়ে গেছে প্যালিসাডস, ইটন ও হার্স্ট মিলে ৬০ বর্গমাইল এলাকা, যা প্যারিসের চেয়ে বড় এলাকা। গভর্নর নিউসম বলেন, এটা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়। আরও অনেক মানুষ মারা যেতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে পারে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার দাবানল। তিনি আরও বলেছেন, আমি মনে করি আগুনের ভয়াবহতার মতোই হবে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি। তিনি যখন এনবিসি’কে এসব তথ্য দেন, তখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু সোমবার সকালে সে সংখ্যা পৌঁছে যায় ২৪। ক্যালিফোর্নিয়ার অগ্নিনির্বাপণকারীরা বলেছেন, আগুন নিভে যাওয়ার পরও উদ্ধার করা এলাকাগুলো বিপজ্জনক হবে। রাজ্যের ফরেস্ট ও ফায়ার প্রোটেকশন বিভাগ থেকে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের কাছাকাছি যাদের বাড়ি তাদেরকে উদ্ধার অভিযানের মধ্যে রাখতে হবে। তাদেরকে আগুন থেকে দূরে সরে থাকতে হবে। এমনকি রাস্তায় রাস্তায়ও আগুন দেখা দিয়েছে। গ্যাস লাইনগুলো রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। কর্তৃপক্ষ বলতে পারছে না গ্যাসলাইন ফেটে গিয়ে সেখান থেকে গ্যাস বের হচ্ছে কিনা। রাস্তায়, মাঠেঘাটে সবখানে পড়ে আছে ছাই আর পেট্রোলিয়াম পণ্যের বিষাক্ত বর্জ্য। ফলে লোকালয়ে এখনই ফেরা উচিত নয় পরিবারগুলোর। এমন সতর্কতা দিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়া ফায়ার ব্যাটালিয়নের প্রধান ডেভিড আকুনা। ওদিকে যারা অগ্নিকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধারে কাজ করছেন তাদের সহায়তা দিতে বিনামূল্যে খাবার প্রস্তাব করছে কয়েক ডজন রেস্তরাঁ। একই সঙ্গে তারা বাস্তুচ্যুত মানুষদের জন্যও খাবার দিচ্ছে।
mzamin

ভুতুরে এলাকা

গাজার উত্তরাঞ্চল অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরাইল। ইতিমধ্যে ইসরাইলি হামলায় সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার মানুষ। নিখোঁছ আছেন অনেকে। হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাঝেও হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি বাহিনী । গুম, খুন ও লাগাতার হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ওই এলাকা। ফলে অঞ্চলটিকে ভুতুড়ে বলে আখ্যায়িত করছেন অনেকে। এ তথ্য দিয়েছে অনলাইন আল-জাজিরা। ওই অঞ্চলের একটি মেডিকেল সোর্স আল-জাজিরা’কে জানায়, অক্টোবরের শুরুতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে ইসরাইলি বাহিনী। এতে প্রাণ হারান আরও ৯ হাজার ৫০০ ফিলিস্তিনি। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস ইসরাইলের অতর্কিত হামলাকে জাতিগত নির্মূল, উৎখাত ও ধ্বংসের ভয়ংকর রূপ হিসেবে আখ্যায়িত করে। দেইর আল-বালা থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি হিন্দ খওদারি বলেন, গাজা এখন ধ্বংসস্তূপ এর ভুতুড়ে এলাকা। তিনি আরও বলেন, পদ্ধতিগতভাবে গাজাবাসীর ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র এমনকি হাসপাতালেও রেহাই পাচ্ছেন না তারা। উত্তারাঞ্চলের সবচেয়ে সুনামধন্য হাসপাতাল কামাল আদওয়ান।  ডিসেম্বরের শেষে সেখানে আক্রমণ চালায় ইসরাইলি বাহিনী । ধ্বংস করে দেয়া হয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। আটক করা হয় হাসপাতালের পরিচালক হুসাম আবু সাফিয়াকে। অবিচল হামলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফিলিস্তিনের অন্য অঞ্চলগুলোও। রোববার উত্তরাঞ্চলের নুসেইরাত শরনার্থী শিবিরের আবাসিক ভবনে জোরপূর্বক উচ্ছেদের আদেশ দেয় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। বলা হয়, যদি সেখানে অবস্থানরতরা ওই এলাকা না ছাড়েন তবে তাদের  প্রাণহানির ঝুঁকি আছে। ইতিমধ্যে কাতার, যুক্তরাষ্ট্র ও মিশরের মধ্যস্থতায় হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি চুক্তির লক্ষ্যে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে ইসরাইল। হোয়াইট হাউসের তরফ থেকে জানানো হয়, যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির বিষয়ে কথা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যে। কথোপকথনের সময় এ বিষয়ে দ্রুত অগ্রগতির তাগিদ দেন জো বাইডেন। ক্ষমতা ছাড়ার আগে এ সমস্যার সুরাহা করতে চাইছেন বাইডেন।  এখানে বাধ সেধেছেন ইসরাইলের নেতারা। তারা জোর দিয়ে বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হলেও যুদ্ধ থামবে না। এছাড়া তারা ওই অঞ্চলে সামরিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন। 
mzamin

বিলাসবহুল ৮ গাড়ি ও ৫ প্রতিষ্ঠানে জয়ের সম্পৃক্ততা পেয়েছে এফবিআই

ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ৮টি বিলাসবহুল গাড়ি এবং ৫টি কোম্পানির মালিকানা থাকার তথ্য পেয়েছে মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআই। ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই)-এর তদন্ত রিপোর্ট বলছে, ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনা ও তার ছেলে জয় যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেনে ৩০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা) পাচার করেছেন। আর্থিক লেনদেনে উল্লেখযোগ্য অনিয়ম রয়েছে জয়ের। এফবিআইয়ের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৪ সালের ২২ শে ডিসেম্বর হাসিনা ও জয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনে ৩০০ মিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগের তদন্ত শুরু করে। ২০২৩ সালের ২৩ শে এপ্রিল মার্কিন বিচার বিভাগের অপরাধ বিভাগের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে এফবিআই প্রতিবেদনটি জমা দেয়। এফবিআই’র প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি পেয়েছে দুদক। এ নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ। রিপোর্টে জয়ের মালিকানাধীন ৮ বিলাসবহুল গাড়ির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। যার মধ্যে রয়েছে ম্যাকলারেন ৭২০এস (মূল্য ২ লাখ ৫০ হাজার ৫৭৮ ডলার), মার্সিডিজ বেঞ্জ এএমজি জিটি (মূল্য ১ লাখ ৯ হাজার ৮০৬ ডলার), মার্সিডিজ বেঞ্জ এস-ক্লাস (মূল্য ৫১ হাজার ৮ ডলার), এসএল শ্রেণির মার্সিডিজ বেঞ্জ (৭৩ হাজার ৫৭০ ডলার), লেক্সাস জিএক্স ৪৬০ (মূল্য ৩০ হাজার ১৮২ ডলার), রেঞ্জ রোভার (৩৭ হাজার ৫৮৬ ডলার), জিপ গ্র্যান্ড চেরোকি (৭ হাজার ৪৯১ ডলার) এবং গ্র্যান্ড চেরোকি (৪ হাজার ৪৭৭ ডলার)। এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা হংকং ও কেম্যান আইল্যান্ডে সজীবের ব্যাংক হিসাব খুঁজে পেয়েছে। স্থানীয় একটি মানি এক্সচেঞ্জ কোম্পানির মাধ্যমে ওয়াশিংটন ডিসি, নিউইয়র্ক ও লন্ডনে সন্দেহজনক অর্থ স্থানান্তরের বিষয়টি জানা যায়। জয়ের সন্দেহজনক কার্যকলাপ খতিয়ে দেখতে এফবিআই বৃটিশ গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই অনুসন্ধানগুলো সম্ভাব্য অবৈধ ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পেশাল এজেন্ট লা প্রিভোটের সঙ্গে মার্কিন বিচার বিভাগের সিনিয়র ট্রায়াল অ্যাটর্নি লিন্ডা স্যামুয়েলসের যোগাযোগ হয়। তিনি বাংলাদেশ থেকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার চুরি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাচার সংক্রান্ত একটি মামলায় ওয়াশিংটন ফিল্ডের সহায়তা চেয়েছিলেন। হাসিনা ও সজীব সজীব যুক্তরাষ্ট্র ও কেম্যান আইল্যান্ডে অর্থ পাচার করেছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচার বিভাগের সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ বা মানি লন্ডারিং বিভাগ এসব তহবিল খুঁজে বের করতে, সংযত করতে, জব্দ করতে ওয়াশিংটন ফিল্ডের সহায়তা চেয়েছিল। আমাদের তদন্তে ওয়াজেদ কনসাল্টিং ইনকর্পোরেটেড নামে সন্দেহজনক কার্যকলাপও পাওয়া গেছে। ওয়াজেদ কনসালট্যান্ট বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে অসংখ্য ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল এবং বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট প্রকল্পের যুক্ত ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব আর্থিক লেনদেনের বৈধতা নির্ধারণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই ও তদন্তের দাবি রাখে। এফবিআই আরও বলেছে, তারা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য যাচাই এবং যে কোনো সম্ভাব্য অবৈধ কার্যক্রম মোকাবেলায় সহযোগিতা করার জন্য দুদকের সাথে যোগাযোগ করেছে। তদন্তে ম্যাসাচুসেটস ও ভার্জিনিয়ায় সজীব সজীবের স্ত্রী ক্রিস্টিন ও. ওয়াজেদের সঙ্গে সন্দেহজনক ব্যাংক কার্যক্রমের তথ্যও পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এফবিআই আরও জানিয়েছে, তাদের গোপন তথ্যদাতা জয়ের দুই সহযোগীর নামও জানিয়েছেন- যুক্তরাষ্ট্র মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক নিজাম চৌধুরী। গোয়েন্দা সংস্থাটি ওয়াজেদ কনসাল্টিং, ইকম সিস্টেমস, এমভিয়ন ও ইন্টেলিজেন্ট ট্রেড সিস্টেমস লিমিটেডসহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে সজীবের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছে। ৩৬ জুলাই খ্যাত ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ও পরিবারের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। কমিশনের উপ-পরিচালক মো. সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত দল অনুসন্ধান শুরু করে এবং ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থাকে চিঠি দিয়েছে। অনুসন্ধান দলের এক সদস্য নিউ এজকে সোমবার বলেন, তারা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, পাসপোর্ট অফিস, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। অর্থ পাচারের বিষয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সূত্র থেকে ইতোমধ্যে তথ্য পাওয়া গেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, পাসপোর্ট অফিস ও নির্বাচন কমিশন তাদের কিছু তথ্য দিলেও বাকি অফিসগুলো এখনো চিঠির জবাব দেয়নি। তবে সজীব তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দাবি করেছেন, তার ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। তিনি বলেন, আমরা কখনো কোনো সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না বা থেকে অর্থ উপার্জন করিনি। তিনি বলেন, অবশ্যই এই দুই দেশে আমাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। আমাদের কোনো অফশোর অ্যাকাউন্ট নেই। যে পরিমাণ অর্থ দাবি করা হচ্ছে, তা আমরা কেউ কখনো দেখিনি। এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা, সজীব সজীব, শেখ রেহানা এবং শেখ রেহানার মেয়ে ও ব্রিটিশ মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে ৮০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে কমিশন। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ ৯টি প্রকল্পে ৮০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। 
mzamin