Sunday, January 11, 2026

ইরানে ট্রাম্পের ‘মাদুরো মডেল’ যে বিপদ ডেকে আনতে পারে by সানাম ভাকিল

ভেনেজুয়েলায় মাদুরো-পর্বকে ইরানের ভবিষ্যৎ হিসেবে কল্পনা করা ভুল হিসাব হতে পারে। টাইম সাময়িকীর সানাম ভাকিল দেখিয়েছেন, বাইরের চাপ সব সময় শাসনব্যবস্থা ভাঙে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা ভিন্নরূপে টিকিয়ে রাখে। ইরানের ক্ষেত্রে এমন কৌশল দমন-পীড়ন বাড়াতে ও আন্দোলনকে দুর্বল করতে পারে। কোনো দেশে জনগণের সামনে স্পষ্ট রাজনৈতিক বিকল্প না থাকলে বিদেশি হস্তক্ষেপ পরিবর্তন নয়; বরং অনিশ্চয়তাই ডেকে আনে।

যখন খবর এল যে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে; তখন ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের আরেক শত্রু (ইরান) সম্পর্কে একটি পরিচিত ধারণা দ্রুত দানা বাঁধতে শুরু করে। অনেকেই যুক্তি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কারাকাসে একজন ক্ষমতাসীন কর্তৃত্ববাদী নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা কার্যকর করতে পারে, তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিরও একই পরিণতি হতে পারে।

কিন্তু এ ধারণা গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ, এমনকি বিপজ্জনকও; বিশেষ করে সেই সব ইরানির জন্য, যাঁরা ‘অর্থবহ’ রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশা করেন।

ভেনেজুয়েলা নিয়ন্ত্রণ ও সেখানকার কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটানো নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার বাগাড়ম্বর করা সত্ত্বেও বাস্তব পরিস্থিতি অনেক বেশি কঠিন। মাদুরোকে মার্কিন বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে এবং বিচারের মুখোমুখি করতে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে মাদুরোর দীর্ঘদিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর শাসনের প্রতি অনুগত দেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট ও সামরিক বাহিনীর বড় অংশের সমর্থন নিয়ে মাদুরোর অনুগত দেলসির এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় টিকে থাকা প্রমাণ করে, রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েনি এবং শাসকগোষ্ঠী এখনো তাদের কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে। এমনকি নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর মতো বিরোধী দলের নেতাদেরও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। ট্রাম্প যা চান, সেই প্রকৃত রাজনৈতিক রূপান্তরের সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করে এটি।

ভেনেজুয়েলায় বর্তমানে যা গড়ে উঠেছে, তা এমন এক ব্যবস্থা, যা নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, চাপ সহ্য করে ফেলেছে এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সাজিয়েছে। তবে এটি ভেতরের ক্ষমতার ভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখেছে। এই ফলাফল ট্রাম্পের কৌশল বা দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে। সেটি হলো, তাঁর লক্ষ্য—কোনো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন বা গণতন্ত্রে উত্তরণ নয়; বরং এমন একটি নমনীয় ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য শাসনকাঠামো তৈরি, যা মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে কাজ করবে।

ট্রাম্পের পদক্ষেপের সম্ভাব্য ফলাফল বিবেচনায় নিলে ইরান-ভেনেজুয়েলার পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা মনে করেন যে ট্রাম্প ইসলামী প্রজাতন্ত্রটিকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করবেন; তাঁরা তাঁর অতীত রেকর্ড বুঝতে ভুল করছেন। মাদুরো পর্ব এটিই ইঙ্গিত দেয়, ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার প্রকৃতপক্ষে ‘মুক্তি’ নয়, বরং ‘সুবিধা আদায়’ এবং শাসনব্যবস্থার ‘পতন’ নয়, বরং ‘বাধ্য বা অনুগত’ করা। ইরানের জনগণের জন্য এটি একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ। কারণ, একটি দুর্বল কিন্তু টিকে থাকা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র প্রায়ই আরও বেশি সহিংস ও কম জবাবদিহিমূলক হয়ে ওঠে।

‘মাদুরো-পর্বের’ পুনরাবৃত্তি ইরানেও সম্ভব, এ বিশ্বাস একটি বিভ্রান্তিকর তুলনার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। ভেনেজুয়েলা ও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো, কৌশলগত পরিবেশ ও টিকে থাকার পদ্ধতিতে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। সামরিক পদক্ষেপ ইরানের নেতৃত্বকে ভেঙে দেবে, অথচ বড় ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে না—এ ধারণা বিশেষভাবে বিপজ্জনক। বিশেষ করে তা এমন এক সময়, যখন ইরানের বহু শহর ও জনপদে ধারাবাহিক বিক্ষোভ চলছে এবং দেশটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

একই সঙ্গে মাদুরো-পর্ব ইরানের ক্ষমতাসীন অভিজাত মহলেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনৈতিক ক্লান্তি, ক্রমহ্রাসমান বৈধতা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা এ শাসকগোষ্ঠীর কাছে ভেনেজুয়েলা টিকে থাকার একটি উদাহরণ। বার্তাটি স্পষ্ট—চরম চাপেও কোনো শাসন টিকে থাকতে পারে; যদি তারা অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখে, কঠোরভাবে ভিন্নমত দমন করে ও বাইরের শক্তিগুলোর কাছে সামান্য নমনীয়তা দেখিয়ে চাপ কিছুটা কমাতে পারে। এ শিক্ষা যদি তেহরান গ্রহণ করে; তবে একদিকে তারা ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কৌশলগত সমঝোতার পথ খুঁজবে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে আরও কঠোর দমননীতি গ্রহণ করতে পারে।

ইরানি সমাজের জন্য এ পথচলা অত্যন্ত অস্বস্তি-উদ্বেগের। জনগণের বড় একটি অংশ এখন আর শুধু সংস্কারের দাবি করছে না। তারা ক্ষমতাসীনদেরই প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করছে। কিন্তু স্পষ্ট কোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিকল্প ছাড়া বাইরের চাপ তাদের ক্ষমতাশালী করবে না; বরং আরও সীমাবদ্ধ করবে। এ কারণে বর্তমান মুহূর্ত ইরানিদের জন্য জরুরি হিসাব-নিকাশের সময়; যদিও তা কঠিন।

বিক্ষোভকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বর্তমান প্রজাতন্ত্রের শাসন তাঁরা আর মানতে রাজি নন। কিন্তু এই শাসনের পতনের পর কোনো ধরনের রাষ্ট্র, সরকার বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে; সে বিষয়ে তাঁরা এখনো কোনো ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত ধারণা দিতে পারেননি। রাজনৈতিক কাঠামো, শাসনপ্রণালি ও সামাজিক সমঝোতা নিয়ে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে আন্দোলন সহজেই দেশের ভেতরের ক্ষমতাবান গোষ্ঠী বা বিদেশি শক্তির হাতে ব্যবহার হয়ে যেতে পারে। অথচ এসব শক্তির কেউ প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের ব্যাপারে আগ্রহী নয়।

ইতিহাসে দেখা যায়, কখনো কখনো বাইরের চাপ কোনো ব্যবস্থার পতনের সঙ্গে মিলে গেছে, যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে। তবে অধিকাংশ সময়ই এ চাপ স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে উচ্ছেদ না করে নতুনভাবে গড়ে তোলে। যখন কোনো একটি সরকার খুব চাপে পড়ে; তখন সে সমস্যার সমাধান না করে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করে। এ জন্য দমন-পীড়ন বাড়ায়, জনগণ থেকে দূরে সরে যায় এবং কখনো কখনো দেশের বাইরে বিপজ্জনক কাজেও জড়িয়ে পড়ে। ‘ভেনেজুয়েলার ছক’ ইরানের ওপর প্রয়োগের চেষ্টা বড় ধরনের ভুল হিসাবের ঝুঁকি তৈরি করবে এবং তা এমন এক সময়ে আঞ্চলিক ভারসাম্যকে আরও নড়বড়ে করে তুলবে, যখন ইসরায়েলের সঙ্গে উত্তেজনা আবার বিপজ্জনক মাত্রার দিকে এগোচ্ছে।

‘মাদুরো–পর্বের’ মূল শিক্ষা হওয়া উচিত সতর্ক থাকা। নির্ভরযোগ্য কোনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া শুধু বাহ্যিক চাপ স্বাধীনতা এনে দেয় না। পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগকে ‘পরিবর্তন’ বলে ভুল করার অর্থ—ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে হয়তো ক্ষতবিক্ষত করা, কিন্তু টিকিয়ে রাখা। আর ইরানিদের ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে মুক্তির আশা করার অর্থ হলো—নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন কাজকে আরও পিছিয়ে দেওয়া। কারণ, তাঁরা শুধু বর্তমান অবস্থা থেকেই বাঁচতে চান, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট কিছু ভাবেন না।

[নিবন্ধটি টাইম সাময়িকীর অনলাইন সংস্করণে ৮ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে। লেখক সানাম ভাকিল চাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্‌]

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প  
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি ও রয়টার্স

ট্রাম্পের এক লাখ ডলারের ট্যালেন্ট ট্যাক্স বনাম চীনের ফ্রি আমন্ত্রণ by ওয়াই টনি ইয়াং

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে নতুন এইচ-১বি ভিসা আবেদনকারীদের প্রতিবছর এক লাখ ডলার দিতে হবে। এটি শুধু অভিবাসন নীতির ভুল নয়; এটি একটি গুরুতর কৌশলগত ভুল। কারণ, এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিভা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াকে ত্বরান্বিত করবে।

অন্যদিকে চীনের অবস্থানকে আগের চেয়ে শক্তিশালী করবে। দীর্ঘদিন ধরে এইচ-১বি ভিসার সবচেয়ে বড় উপকার যাঁরা ভোগ করে আসছেন, তাঁরা হলেন এশীয় পেশাজীবীরা, বিশেষ করে ভারতীয়রা। ফলে এই নতুন নিয়ম সরাসরি তাঁদের ওপর আঘাত হেনেছে।

এক লাখ ডলারের এই ফি বিশ্বে নজিরবিহীন। কানাডা বা যুক্তরাজ্যের ভিসা খরচের তুলনায় এটি ২৫ থেকে ৩০ গুণ বেশি। এই বিশাল ব্যয় শুধু বড় করপোরেশনগুলো বহন করতে পারবে। মাঝারি ও ছোট কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিভাধরদের নিয়োগ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। এতে প্রতিভাধর দক্ষ কর্মী নিয়োগের ক্ষমতা প্রযুক্তি জায়ান্টদের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রের সেই উদ্যোক্তা পরিবেশ, যা কিনা একসময় এশীয় প্রকৌশলী ও উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করেছিল।

ট্রাম্পের ঘোষণার পরই দেখা গেছে এর ধাক্কাটা কতটা বড়। বড় বড় কোম্পানি দ্রুত তাদের বিদেশে থাকা কর্মীদের জানিয়ে দিয়েছে, ‘অবিলম্বে আমেরিকায় ফিরে আসো।’ এতে প্রমাণ মিলেছে, সিলিকন ভ্যালি থেকে ওয়াল স্ট্রিট পর্যন্ত এশীয় পেশাজীবীদের নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা প্রায় পাঁচ লাখ এইচ-১বি ভিসাধারীর জন্যও বার্তাটি স্পষ্ট: একবার বের হয়ে গেলে আর সহজে ফেরার সুযোগ নেই।

এ পরিস্থিতিতে চীন একেবারে উল্টো পথে হাঁটছে। তারা আগামী ১ অক্টোবর চালু করছে কে-ভিসা প্রোগ্রাম। এটি তরুণ বিদেশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পেশাজীবীদের লক্ষ্য করে বানানো হয়েছে। সহজ প্রবেশাধিকার, নমনীয় কর্মব্যবস্থা আর কয়েক লাখ ডলারের সরকারি সহায়তার মতো সুবিধা এতে থাকছে। এর পাশাপাশি আরও বড় কর্মসূচিতে চীন দিচ্ছে কয়েক লাখ ডলারের সাইনিং বোনাস, বাসাভাড়ায় ভর্তুকি, জীবনসঙ্গীর চাকরির নিশ্চয়তা এবং স্থায়ী বসবাসের সুযোগ। অর্থাৎ যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বাধা তৈরি করছে, চীন সেখানে সব বাধা সরিয়ে সুযোগ করে দিচ্ছে।

সময় নির্বাচনও চীনের কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ। যুক্তরাষ্ট্র যখন এক লাখ ডলারের ফি চালু করছে, তখনই চীন চালু করছে কে-ভিসা। এতে এশীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পেশাজীবীরা যুক্তরাষ্ট্রের বদলে চীনকে বিকল্প হিসেবে দেখছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, এতে মার্কিন শ্রমিকদের মজুরি রক্ষা হবে। কিন্তু গবেষণা বারবার দেখিয়েছে, উচ্চ দক্ষ অভিবাসীরা মার্কিনদের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহযোগী। তাঁরা উৎপাদনশীলতা বাড়ান, নতুন উদ্ভাবন আনেন এবং আরও চাকরি তৈরি করেন।

২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষ অভিবাসীদের নিয়োগ আসলে তরুণ মার্কিন শ্রমিকদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায়। এই নীতির আসল পরিণতি আরও ভয়াবহ। এক লাখ ডলারের ফি দিয়ে মার্কিনদের চাকরি বাড়ানোর বদলে কোম্পানিগুলো তাদের কার্যক্রম সরিয়ে নেবে সেই দেশগুলোয়, যেখানে দক্ষ কর্মী সহজলভ্য। আর এটাই চীন চাইছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র হারাবে প্রতিভা ও চাকরি দুটোই, আর প্রতিদ্বন্দ্বীরা পাবে দুটোই।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্টার্টআপ ও নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো। গুগল বা মাইক্রোসফট এই খরচ মেনে নিতে পারবে, কিন্তু পাঁচজন কর্মী নিয়ে কাজ করা একটি এআই স্টার্টআপের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এতে উদ্ভাবনের জায়গা কেবল বড় কোম্পানির দখলে যাবে, আর নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরিবেশ হয়ে উঠবে শ্বাসরুদ্ধকর। যে এশীয় উদ্যোক্তারা আগে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা শুরু করতে চাইতেন, তাঁরা এখন অন্য দেশে তাকাবেন। চীনের সহজ কে-ভিসার প্রক্রিয়া আর বিশাল বাজার তাঁদের কাছে আরও আকর্ষণীয় মনে হবে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে প্রজন্মজুড়ে। এশীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি স্নাতকেরা, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকেই ক্যারিয়ার গড়ার সেরা জায়গা মনে করতেন, তাঁরা এখন হিসাব পাল্টাচ্ছেন। চীনের পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বাধা মিলে বৈশ্বিক প্রতিভা প্রবাহের দিকটাই বদলে দিচ্ছে।

চীনের গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় ২০০০ সালে ছিল মাত্র ৪০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২০ বিলিয়নে (যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭১০ বিলিয়নের সমান)। এর সঙ্গে ভিসার সুবিধা ও প্রতিভা নিয়োগ কর্মসূচি যোগ হয়ে চীন এখন সেই জায়গায় দাঁড়িয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিরুৎসাহিত করা পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করার সবচেয়ে বড় সুযোগ তার হাতেই চলে আসছে।

ট্রাম্পের নতুন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এমন ভুল করছে, যা চীনকে আলাদা করে কিছু করতে হচ্ছে না। অর্থাৎ চীনকে প্রতিভাবান মানুষ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেড়ে নেওয়ার জন্য কোনো কঠিন পদক্ষেপ নিতে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এক লাখ ডলারের মতো বিশাল ফি চাপিয়ে এশীয় মেধাবী পেশাজীবীদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে কী হচ্ছে? যেসব এশীয় বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী বা উদ্যোক্তা আগে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করতে বা ব্যবসা শুরু করতে চাইতেন, তাঁরা এখন নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। অন্যদিকে চীন বলছে, ‘আমরা তোমাদের স্বাগত জানাই, আসো এখানে সুযোগ নাও।’

এভাবে যুক্তরাষ্ট্র নিজের প্রতিযোগিতামূলক শক্তি হারাচ্ছে। আর যেসব মেধাবী মানুষকে কেন্দ্র করে এই নীতি করা হয়েছিল, তাঁরাই শেষ পর্যন্ত চীন বা অন্য দেশে গিয়ে চীনের শক্তি আরও বাড়িয়ে তুলবেন। মানে দাঁড়াল—যুক্তরাষ্ট্র নিজের হাতে নিজের ক্ষতি করছে, আর চীন বিনা খরচে সেই লাভটা পেয়ে যাচ্ছে।

* ওয়াই টনি ইয়াং, ওয়াশিংটন ডিসির জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
- এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সি চিন পিং
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সি চিন পিং। ফাইল ছবি

জামালপুরে দৃষ্টিনন্দন ‘মসজিদে নূর’ দেখতে মানুষের ভিড়

চারদিকে ফসলের মাঠ। এর আশপাশে মিতালি গড়েছে গাছগাছালি। এমন মনোরম আবহের মাঝখানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘মসজিদে নূর’ জামে মসজিদ। তিন দরজাবিশিষ্ট দুই তলা মসজিদটি মার্বেল পাথরের অবকাঠামোর তৈরি। ছাদের চারপাশে পিলারের ওপর সাতটি গম্বুজসহ চারটি বড় মিনার। জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা শহরের প্রবেশপথে চোখে পড়বে মসজিদটি।

তুরস্কের আদলে কারুকার্যমণ্ডিত এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। জামালপুর-বকশীগঞ্জ সড়ক–সংলগ্ন বকশীগঞ্জ শহরের দড়িপাড়া এলাকায় আধুনিক স্থাপত্যে গড়ে তোলা হয়েছে এই মসজিদ। মসজিদের স্থাপত্যশৈলী দেখতে সেখানে প্রতিদিনই ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী।

প্রকৃতির সঙ্গে মিশে একাকার ও নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী মসজিদে নূর জামে মসজিদ দেখতে প্রতিদিন ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী। সম্প্রতি জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা শহরের দড়িপাড়া এলাকায়
প্রকৃতির সঙ্গে মিশে একাকার ও নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী মসজিদে নূর জামে মসজিদ দেখতে প্রতিদিন ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী। সম্প্রতি জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা শহরের দড়িপাড়া এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

সম্প্রতি মসজিদে নূর–সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা শহরগামী প্রধান সড়কের ডান পাশে আরেকটি পাকা সড়ক চলে গেছে। সেটি ধরে ৫০০ মিটার এগোলেই চোখে পড়ে নয়নাভিরাম মসজিদটি। এর চারপাশে সবুজ সমারোহ। আঙিনায় সারিবদ্ধ ঝাউগাছসহ মসজিদের চারপাশে আছে হরেক ফুলের বাগান। ডান পাশে একটি দৃষ্টিনন্দন অজুখানা আছে। এর ঠিক সামনেই বিশাল একটি মাঠ। সেখানে নিয়মিত খেলাধুলা করে স্থানীয় কিশোর, তরুণ ও যুবকেরা।

মসজিদের ভেতরে ঢুকতেই নজর কাড়ে কারুকাজ। মেঝেতে ব্যবহৃত হয়েছে মার্বেল পাথর। সম্পূর্ণ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দ্বিতল মসজিদের সিলিংয়ে ঝুলছে দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি। এ ছাড়া মসজিদের মূল চত্বরের পবিত্রতা রক্ষার্থে চারপাশে নির্মিত হয়েছে দেয়াল।

নির্মাতা ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১১ মে জুমার নামাজের মাধ্যমে মসজিদটি মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পাঁচ একর জায়গাজুড়ে এটি নির্মিত হয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাহবুবুল হক নামের এক ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেন।

তুরস্কের আদলে কারুকার্যমণ্ডিত এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন
তুরস্কের আদলে কারুকার্যমণ্ডিত এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। ছবি: প্রথম আলো

জামালপুর শহরের জিগাতলা এলাকা থেকে মসজিদটি দেখতে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ কালাম নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘অনেকের কাছেই এ মসজিদের সৌন্দর্যের কথা শুনেছি। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগল মসজিদের মিনারগুলো।’

মসজিদের প্রাঙ্গণে কথা হয় বকশীগঞ্জ উপজেলা শহরের রমজান আলীর সঙ্গে। তিনি তাঁর সন্তানদের নিয়ে এটি দেখতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এত বড় জায়গা নিয়ে সুন্দর মসজিদটি জামালপুরের আর কোথাও নাই। মূলত এর স্থাপত্যশৈলী দেখতেই প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ ভিড় করেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহে এর মতো সুন্দর মসজিদ আর নেই।’

মসজিদের ইমাম মো.বেলাল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, মসজিদের ভেতরে, নিচে ও দোতলায় প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন। ফুলের বাগানে ঘেরা এই মসজিদের পাশে বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা ও মাদ্রাসা আছে। এখন মুসল্লিদের মুখে মুখে মসজিদটির নাম ছড়িয়ে পড়েছে।

আঙিনায় সারিবদ্ধ ঝাউগাছসহ মসজিদের চারপাশে আছে হরেক ফুলের বাগান। ডান পাশে একটি দৃষ্টিনন্দন অজুখানা আছে। এর ঠিক সামনেই বিশাল একটি মাঠ
আঙিনায় সারিবদ্ধ ঝাউগাছসহ মসজিদের চারপাশে আছে হরেক ফুলের বাগান। ডান পাশে একটি দৃষ্টিনন্দন অজুখানা আছে। এর ঠিক সামনেই বিশাল একটি মাঠ। ছবি: প্রথম আলো

সরকারবিরোধী আন্দোলন রাজতন্ত্রে ফেরার জন্য নয়

ইরানের ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভির সমর্থকদের দাবি, তাঁর আহ্বানে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন। এতে করে তাঁর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁরা বলছেন, চলমান বিক্ষোভ একধরনের গণভোট (রেফারেন্ডাম) হয়ে গেছে, যাতে রেজা পাহলভি জয়ী হয়েছেন।

কিন্তু আসলে কি তাই? ইরানে বিকল্প নেতৃত্ব কেমন হতে পারে, সেই বিতর্কের এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। বিক্ষোভকারীরা ধর্মীয় নেতাদের ৪৭ বছরের শাসনের অবসান চাইলেও রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনকে এখনো অনেকে সন্দেহের চোখে দেখেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত রেজা পাহলভিকে সমর্থন দেননি।

বিদেশ থেকে সম্প্রচারিত রাজতন্ত্রপন্থী ফারসি ভাষার স্যাটেলাইট চ্যানেলসহ বিভিন্ন মাধ্যম রেজা পাহলভির প্রত্যাবর্তনের দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছে। বিক্ষোভে শাহর প্রতি সমর্থনকে তারা বেশি বেশি প্রচার করছে।

রেজা পাহলভির প্রতি ট্রাম্পের আচরণ ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি লাতিন আমেরিকার দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর মাচাদোকে তাড়াহুড়ো করে সমর্থন দেননি ট্রাম্প। তেমনি রেজা পাহলভিকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়েও ট্রাম্প একইভাবে সতর্ক। মনে হচ্ছে ইরানের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জড়িয়ে পড়া নিয়ে ওয়াশিংটন কিছুটা শঙ্কিত।

বিক্ষোভকারীরা প্রধানত দুর্নীতি ও নিপীড়ন বন্ধ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানাচ্ছেন। এই মুহূর্তে তাঁদের মধ্যে বিকল্প নেতৃত্ব এতটা স্পষ্ট নয় এবং এখন পর্যন্ত তাঁদের একক কোনো রাজনৈতিক দাবিদাওয়াও নেই।

এই রাজনৈতিক শূন্যতা রেজা পাহলভির জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। কারণ, তাঁর নামটি পরিচিত এবং দশকের পর দশক ধরে রাজতন্ত্রের প্রতিনিধি হিসেবে একটা সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন।

অন্যদিকে ইরানের ভেতরে যাঁরা দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দিতে পারতেন, তাঁরা বছরের পর বছর ধরে কারাগারে বন্দী। এসব নেতৃত্বের মধ্যে নার্গিস মোহাম্মদি ও মোস্তফা তাজজাদেহ অন্যতম।

এক ইরানি নাগরিক মনে করেন, ইরান এ মুহূর্তে কোনো একক রাজনৈতিক ঘোষণাপত্রের (ম্যানিফেস্টো) অবস্থায় নেই। অতীতের মতো গত শুক্রবারও নিজ সমর্থকদের রাস্তায় বিক্ষোভ জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন রেজা পাহলভি। আগামী মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচে ট্রাম্পের মালিকানাধীন রিসোর্ট মার-আ-লাগোতে একটি অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

তবে রেজা পাহলভির প্রতিনিধিরা বলেছেন, তাঁর সঙ্গে ট্রাম্পের সাক্ষাতের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ‘জেরুজালেম প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ নামের বার্ষিক এ অনুষ্ঠানের সঙ্গে ট্রাম্পের প্রতিনিধিত্বকারী দলের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

ট্রাম্প কী চাইছেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্প হয়তো ইরানের বর্তমান সরকারের কোনো অংশের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছেন। ওমানের কর্মকর্তারা সপ্তাহান্তে তেহরান সফরে যাবেন বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় সাধারণত ওমান ভূমিকা রাখে।

ইরানের বর্তমান প্রশাসনের মধ্যে এরই মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লেও তা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সিদ্ধান্তকে তেমন একটি প্রভাবিত করতে পারছে না। তিনি এখনো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখার পক্ষে। তাঁর কাছে এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক।

ট্রাম্প কেন রেজা পাহলভিকে পূর্ণমাত্রায় সমর্থন দিতে রাজি নন, সেটার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর একটি হলো ট্রাম্প তাঁকে সমর্থন দিলে ইরানে তাঁর প্রত্যাবর্তনের আহ্বান নিয়ে ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে।

পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গার্ডিয়ান–এর কাছে ইরানের এক নাগরিক বলেন, ‘আজকের স্লোগানে যা শোনা যাচ্ছে, তা রাজতন্ত্রের ফেরার আহ্বান নয়। বরং এটি প্রাণঘাতী বাস্তবতা থেকে বাঁচার উপায়। যে সমাজে সমস্যা সমাধানের কোনো পথ খোলা নেই, তাতে পেছনে (রাজতন্ত্র) ফিরে যাওয়ার কথা ওঠে কোনো আগ্রহ থেকে নয়, বরং বাধ্য হয়েই তাঁরা এমনটি করেন। এই পশ্চাদমুখী যাত্রা কোনো বিকল্প নয়। এটি ক্লান্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার হতবিহ্বল প্রতিক্রিয়া, যা আর কোনো নির্দেশনা মেনে চলার অবস্থায় থাকে না।’

বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। ৬ জানুয়ারি ২০২৬, তেহরান গ্র্যান্ড বাজার
বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছুড়ছে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী। ৬ জানুয়ারি ২০২৬, তেহরান গ্র্যান্ড বাজার। ছবি: এএফপি

'মুসলমান তোষণের' তকমা মুছতেই কি একের পর এক মন্দির উদ্বোধন মমতা ব্যানার্জীর? by অমিতাভ ভট্টশালী

এপ্রিল মাসে পশ্চিমবঙ্গের সৈকত শহর দীঘায় জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধন, গত সপ্তাহে কলকাতা সংলগ্ন নিউটাউনে দুর্গা অঙ্গন পরিসরের শিলান্যাসের পরে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে মমতা ব্যানার্জী উত্তরাঞ্চলীয় শিলিগুড়ি শহরে একটি মহাকাল মন্দির পরিসরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।

এছাড়াও সম্প্রতি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র বেশ কয়েকটি তীর্থস্থানের পরিকাঠামো উন্নয়নও করেছে তার সরকার।

এর মধ্যে সর্বশেষ প্রকল্পটির উদ্বোধন করেছেন তিনি সোমবার, পাঁচই জানুয়ারি। বঙ্গোপসাগরের তীরে গঙ্গাসাগরের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সড়ক যোগাযোগের জন্য ১৭০০ কোটি ভারতীয় টাকার মূল্যের একটি সেতু প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন তিনি।

বিজেপি যে তার দিকে মুসলমান তোষণের রাজনীতি করেন বলে আঙ্গুল তুলত, সেই তকমা কাটানোই কি এই হিন্দু ধর্মীয় পরিসরগুলি গড়ছে তার সরকার? সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই সব উদ্যোগ কি কয়েকমাসের মধ্যে হতে চলা রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে আরও কিছু হিন্দু ভোট তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা?

তার দল বলছে অযোধ্যায় যখন রাম মন্দির গড়া এবং তার উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীই মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন, তখন তো এসব প্রশ্ন ওঠে না!

বিশ্লেষকরা অবশ্য মনে করছেন যে আরও কিছু হিন্দু ভোট টানার উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী যে 'নরম হিন্দুত্বের পথ' নিয়েছেন, সেই প্রচেষ্টা দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল বা ছত্তিশগড়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল, এমনকি কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীরাও করেছিলেন, তবে সকলেই ব্যর্থ হয়েছেন। 'হিন্দু ধর্মীয় ভাবাবেগ' কীভাবে ভোটে রূপান্তরিত করা যায়, সে ব্যাপারে বিজেপি বহুগুণ বেশি পারদর্শী।

উদাহরণস্বরূপ, বিশ্লেষকরা দেখাচ্ছেন যে, নাগরিকত্ব, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার বা সর্বশেষ মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে ছেড়ে দেওয়ার মতো ইস্যুগুলিকে লাগাতার বিজেপি তুলে ধরছে – যাতে 'হিন্দু ভাবাবেগ' ব্যবহার করা যায় ভোটযন্ত্রে।

মন্দির গড়তে কী কী প্রকল্প মমতা ব্যানার্জীর?

গত বছর এপ্রিল মাসে সৈকত শহর দীঘায় এক নতুন জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। এরপরে গত সোমবার কলকাতা লাগোয়া নিউটাউনে দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাস করেন তিনি।

প্রায় ১৭ একর জমির ওপরে দুর্গা অঙ্গনটি গড়ে উঠবে। সেখানে মন্দিরের পাশাপাশি গড়া হবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনও।

ইউনেস্কো আগেই কলকাতার দুর্গাপুজোকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এখন সরকার চাইছে দুর্গা অঙ্গনকে কেন্দ্র করে যাতে আরও পর্যটক আকৃষ্ট করা যায়। ইতোমধ্যেই কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে দ্বিতীয় সব থেকে পছন্দের গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

ওই শিলান্যাস অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মিজ. ব্যানার্জী বলেছিলেন, "অনেকে আমাকে তোষণের রাজনীতির জন্য দোষারোপ করেন। কিন্তু আমি সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ। প্রতিটা ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করি আমি। এমন একটাও ধর্মীয় উৎসব দেখাতে পারবেন না যেখানে আমি যাই না। গুরদোয়ারায় গেলে কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে নিই। রোজায় যখন যাই তখন কেন আপত্তি ওঠে? প্রতিটা ধর্মের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। সেগুলোর কোনও একটিকে আমি অশ্রদ্ধা কেন করব?"

দুর্গা অঙ্গনের শিলান্যাসের আগেই মিজ. ব্যানার্জী ঘোষণা করেছিলেন যে উত্তরাঞ্চলীয় শহর শিলিগুড়িতে একটা মহাকাল মন্দির গড়া হবে। হিন্দুদের উপাস্য মহাকাল শিবেরই আরেকটি নাম। শিলিগুড়ি থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরের শৈল শহর দার্জিলিংয়ে একটি প্রাচীন ও বিখ্যাত মহাকাল মন্দির আছে।

গত বছর নভেম্বর মাসে রাজ্য মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে শিলিগুড়ির মাটিগাড়া এলাকায় মহাকাল মন্দির এবং সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক পরিসর গড়া হবে। মন্দিরের জন্য ২৫ একর জমি এবং সাংস্কৃতিক পরিসরের জন্য আরও তিন একর জমি চিহ্নিত করা হয়েছে।

মমতা ব্যানার্জীর ১৬ই জানুয়ারি ওই প্রকল্পটির শিলান্যাস করার কথা আছে।

দীঘা, নিউটাউন এবং শিলিগুড়ি – তিনটি মন্দিরের ক্ষেত্রেই লাগোয়া সাংস্কৃতিক পরিসর গড়া হচ্ছে এবং পুরো পরিসর পরিচালনার জন্য ট্রাস্ট গড়া হচ্ছে।

কী যুক্তি দিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস?

একের পর এক মন্দির গড়ার পিছনে কোনও রাজনীতি আছে, এটা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে না তৃণমূল কংগ্রেস। তবে একান্ত আলোচনায় তারা বলে থাকেন যে বিজেপি যেভাবে হিন্দু ভোট একজোট করতে মেরূকরণের রাজনীতি করে থাকে, তারই পাল্টা মমতা ব্যানার্জীর এই মন্দির গড়ার পরিকল্পনা।

আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির অন্যতম মুখপাত্র অধ্যাপক মনোজিৎ মন্ডল বলছিলেন, "কোনও মন্দিরই কিন্তু সরাসরি সরকার গড়ছে না। স্বশাসিত সংস্থাগুলি বানাচ্ছে এবং ট্রেজারি থেকেও কোনও অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে না বলেই আমি জানি।

"এইসব মন্দিরগুলি তো বিপুল সংখ্যক পর্যটক আকৃষ্ট করছে। দীঘার মন্দিরটি উদ্বোধনের পরে কয় মাসের মধ্যেই এক কোটিরও বেশি মানুষ সেখানে গেছেন। পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন যদি হয়, সেটা কি খারাপ?" প্রশ্ন মি. মণ্ডলের।

তিনি আরও বলছিলেন যে অযোধ্যায় রামমন্দির যখন একটি অ-সরকারি ট্রাস্ট বানায় কিন্তু তার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় আকর্ষণ হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী – তখন তো কোনও প্রশ্ন ওঠে না!

তার কথায়, "অযোধ্যায় যখন প্রধানমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় রামমন্দির গড়া হয়, তার উদ্বোধনের দিন হিন্দু সাধু সন্ন্যাসীদের বদলে তিনিই হয়ে ওঠেন কেন্দ্রীয় আকর্ষণ বিন্দু – তখন তো কেউ প্রশ্ন তোলে না! তাহলে পশ্চিমবঙ্গে কেন মন্দির আর তার সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গন গড়া হলে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে?"

'বড়ো দেরি করে ফেলেছেন'

বছরের শেষে কলকাতায় তিন দিনের সফরে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি মূলত নির্বাচন নিয়েই বিজেপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলোচনা সারেন। তারই মধ্যে একটি সংবাদ সম্মেলনে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল মমতা ব্যানার্জীর একের পর এক মন্দির গড়ার পরিকল্পনা নিয়ে।

"অমিত শাহ ওই সংবাদ সম্মেলনে যেটা বলেছেন, আমিও সেই একই কথা বলব। একজন গর্বিত হিন্দু হিসাবে আমি মন্দির গড়াকে খারাপ কেন বলব? কিন্তু মমতা ব্যানার্জী বড়ো দেরি করে ফেলেছেন," বলছিলেন বিজেপি নেতা অধ্যাপক বিমল শঙ্কর নন্দ।

তার কথায়, "এতদিন মমতা ব্যানার্জী সংখ্যালঘু তোষণ করে এসেছেন। এখন তার মনে ভয় ঢুকেছে যে হিন্দুদের ভোট তিনি পাবেন না এবারের নির্বাচনে। তাই তাদের মন জিততে মন্দির বানাচ্ছেন। চেষ্টা করছেন যদি হিন্দুদের মন ঘোরানো যায়। কিন্তু অমিত শাহের মতোই আমিও বলব তিনি বড়ো দেরি করে ফেলেছেন।"

'নরম হিন্দুত্ব'-র পথ কি আরও হিন্দু ভোট টানতে পারবে?

বিশ্লেষকরা বলছেন, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের ফারাক মাত্রই চার থেকে পাঁচ শতাংশ। তবে এলাকা বিশেষে ভোটের এই ফারাকটা যদিও কম বেশি আছে। বিজেপি এই ফারাকটা মেটাতে পারলেই তারা তৃণমূল কংগ্রেসকে টপকিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে এক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের একটা 'প্লাস পয়েন্ট' হলো তাদের অতি শক্তপোক্ত সংগঠন এবং পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের গড়ে তোলা কর্মী-দলের কাঠামো।

এখানে একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে বিজেপি কিন্তু প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোটারদের সমর্থন কখনই পায় না। তাই আদতে তাদের প্রাপ্ত ভোটের হিসাব কষতে হয় বাকি ৭০ শতাংশের মধ্যে থেকে।

আবার তৃণমূল কংগ্রেসেরও আশঙ্কা আছে যে তাদের দিকে যে হিন্দু ভোটাররা আছেন, সেখান থেকে কিছুটা বিজেপি টেনে নিতে যাতে না পারে।

"বিজেপি এখন তাই হিন্দু ভোটের আরও মেরূকরণ করতে চাইছে। তারা বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার, নাগরিকত্ব এবং একেবারে সম্প্রতি মুস্তাফিজুর রহমানের মতো বিষয়গুলিকে তুলে আনছে নির্বাচনের আগে। এতে তারা মনে করছে যে হিন্দু ভোটারদের একটা অংশ তাদের দিকে ঘুরে যেতে পারে," বলছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক ও দ্য ওয়াল সংবাদ পোর্টালের এক্সিকিউটিভ এডিটর অমল সরকার।

তার কথায়, "ধর্মীয় মেরূকরণের হিসাব গত কয়েকটি নির্বাচন থেকেই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে, কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেটাই কেন্দ্রস্থলে চলে আসবে বলে মনে হচ্ছে। আবার আসাম আর কেরালাতেও মোটামুটি একই সময়ে নির্বাচন আছে। মুসলমান-বিরোধী হাওয়া তুলতে পারলে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই আসাম এবং কেরালাতেও তারা নিজেদের পালে হাওয়া লাগাতে পারবে বলে বিজেপি সম্ভবত হিসাব কষছে। এটারই পাল্টা চাল হিসাবে মমতা ব্যানার্জীর এই একের পর এক মন্দির নির্মাণের ঘোষণাকে দেখতে হবে।"

যদিও বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং সরাসরি নগদ দেওয়া হয়, এরকম নানা প্রকল্প মমতা ব্যানার্জীর সরকার অনেকদিন আগে থেকেই নিয়েছেন। কাকে তারা ভোট দেবেন, সেই ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের কাছে এ ধরনের প্রকল্পগুলি চিরকালই একটা নির্ণায়ক হয়ে থেকেছে – সেই বামফ্রন্ট আমল থেকেই।

আর নারীদের মধ্যে মমতা ব্যানার্জীর জনপ্রিয়তা আছেই।

এসব সত্ত্বেও কেন আরও হিন্দু ভোট টানতে মমতা ব্যানার্জীকে মন্দির গড়তে হচ্ছে – এই প্রশ্নের জবাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য বলছিলেন, "সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতি করেন বলে মমতা ব্যানার্জীর বিরোধীরা যে অভিযোগ করেন, সেটা তো এই মন্দির গড়ার ঘোষণাগুলির মাধ্যমে ব্যালান্স করার একটা চেষ্টা তার আছেই। তবে সেই প্রচেষ্টা কিন্তু এখন নয়, ২০২১ এর ভোটের আগে থেকেই তিনি শুরু করেছিলেন। তবে যে ভোটাররা হিন্দু সংখ্যাগুরুবাদে বিশ্বাস করেন, তাদের কিন্তু এইসব দেখিয়ে মমতা ব্যানার্জী নিজের দিকে টানতে পারবেন না।

"এই অংশটা হচ্ছে বিজেপির ডেডিকেটেড ভোট ব্যাংক। কিন্তু তার বাইরে যে ফ্লোটিং হিন্দু ভোট আছে, তাদের একটা অংশকে যদি মন্দির প্রকল্পগুলি দেখিয়ে টানতে পারে, তৃণমূল কংগ্রেস সেই চেষ্টা করছে," বলছিলেন মি. ভট্টাচার্য।

তিনি এই আশঙ্কাও প্রকাশ করছিলেন যে এর আগে যে অ-বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতাসীন দলগুলি বিজেপির মোকাবিলা করে হিন্দু ভোট টানার জন্য এই 'নরম হিন্দুত্বের লাইন' নিয়েছেন, কেউই কিন্তু সফল হননি।

তার কথায়, "যেমন দিল্লির অরবিন্দ কেজরিওয়াল চেষ্টা করেছেন বড়ো বড়ো হনুমান মন্দির বানিয়ে – তিনি পরাজিত। ছত্তিশগড়ের কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেল রামচন্দ্রের বনবাসে যাওয়ার পথ গড়েছিলেন, তিনিও হেরেছেন। মধ্যপ্রদেশের কংগ্রেস চেষ্টা করেছে – তারাও আজ পরাজিত। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী হঠাৎ শিব-ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। আসলে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে বিজেপি অন্যদের থেকে শত যোজন এগিয়ে আছে। এটা তাদের পরিচিত মাঠ।"

অমল সরকারের কথায়, "হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে একটা সময় মোকাবিলা করার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হত। কিন্তু এখন একটা ট্রেন্ড চলছে যে হিন্দুত্ব দিয়েই তাদের মোকাবিলা করার চেষ্টা হচ্ছে। এটা ভারতের রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ধরে শুরু হয়েছে।"

কলকাতা লাগোয়া নিউ টাউনে দুর্গা অঙ্গনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী
কলকাতা লাগোয়া নিউ টাউনে দুর্গা অঙ্গনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী

গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড আমাদের প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ড আমরা না নিলে রাশিয়া ও চীন তা দখল নিতে পারে, আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ওই ভূখণ্ড “নিজের মালিকানায়” নেওয়া প্রয়োজন।’

গত শুক্রবার এক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘দেশগুলোর মালিকানা থাকতে হয়। আর মালিকানা থাকলে আপনি তার সুরক্ষা দেবেন, ইজারা থাকলে নয়। গ্রিনল্যান্ডকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সহজ উপায়ে হোক অথবা কঠিন উপায়ে, আমরা এটা করব।’ গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি চুক্তির মাধ্যমে, মানে সহজ পথে বিষয়টিকে সমাধান করতে চাই। এতে কাজ না হলে কঠিন পথেই করব।’ ট্রাম্পের দাবি, খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ এ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য জরুরি। কারণ, আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের সামরিক তৎপরতা বাড়ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমরা রাশিয়া বা চীনকে গ্রিনল্যান্ড দখল করতে দেব না। আমরা পদক্ষেপ না নিলে তারা ঠিকই সেটিকে দখল করে নেবে। তাই গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আমাদের কিছু করতে হবে। হয় তা সুন্দরভাবে, না হয় আরও কঠিন কোনো উপায়ে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া ও চীন আর্কটিক অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা বাড়ালেও এখন পর্যন্ত বিশাল এই বরফাচ্ছাদিত দ্বীপের ওপর কোনো মালিকানা দাবি করেনি। এদিকে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে ট্রাম্পের এই হুমকিতে ডেনমার্কসহ ইউরোপীয় মিত্ররা বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

গ্রিনল্যান্ডে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। হোয়াইট হাউস সম্প্রতি বলেছে, প্রশাসন ন্যাটোভুক্ত সহযোগী দেশ ডেনমার্কের আধা স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে অঞ্চলটিকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনাও তারা নাকচ করছে না। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষ বলে দিয়েছে যে ভূখণ্ডটি বিক্রি হবে না। ডেনমার্ক বলেছে, সামরিক অভিযান চালানো হলে তা ট্রান্স আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটোর শেষ হয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেবে।

সবচেয়ে কম জনবহুল অঞ্চল হলেও গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান উত্তর আমেরিকা ও উত্তর মেরু অঞ্চলের মধ্যে হওয়ায় এটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা পাওয়ার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। তা ছাড়া ওই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজ পর্যবেক্ষণের জন্যও স্থানটি বেশ উপযোগী।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারবারই বলে আসছেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়াই তিনি দাবি করেছেন, অঞ্চলটি ঘিরে রুশ ও চীনা জাহাজ অবস্থান করছে। গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত পিটুফিক ঘাঁটিতে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ জনের বেশি সেনাসদস্য স্থায়ীভাবে মোতায়েন আছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র এ ঘাঁটি পরিচালনা করে আসছে। ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগুলোর আওতায় গ্রিনল্যান্ডে নিজেদের ইচ্ছেমতো সংখ্যায় সেনা মোতায়েনের ক্ষমতা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

তবে ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইজারাভিত্তিক চুক্তি যথেষ্ট নয়। দেশগুলোর মালিকানা থাকতে হবে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, দেশগুলো ৯ বছরের চুক্তি এমনকি ১০০ বছরের চুক্তির ভিত্তিতে চলতে পারে না।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চীনের মানুষকে ভালোবাসি। আমি রাশিয়ার মানুষকে ভালোবাসি। কিন্তু আমি চাই না, তাঁরা গ্রিনল্যান্ডে আমাদের প্রতিবেশী হোন। সেটা হবে না। ব্যাপারটা ন্যাটোকেও বুঝতে হবে।’

গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিবাদ

গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলো গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার যুক্তরাষ্ট্র বা ডেনমার্কের নেই।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সে দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে আনার পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নজরে গ্রিনল্যান্ড। তিনি দ্বীপটির দখল চান বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন। তার প্রতিবাদে গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক দলগুলো জোরালোভাবে বলেছে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে একমাত্র গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদেরই। যুক্তরাষ্ট্র বা ডেনমার্ক তা ঠিক করবে না। গ্রিনল্যান্ডের পার্লামেন্টে সব রাজনৈতিক দল যৌথ বিবৃতি দিয়ে এমনই জানিয়েছে।

গ্রিনল্যান্ডকে আমরা রক্ষা করব: ডেনমার্ক

এনডিটিভি জানায়, ডেনমার্কের পার্লামেন্ট সদস্য এবং প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান রাসমুস জারলোভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডে আক্রমণ করে, তবে ডেনমার্কের নিজেকে রক্ষা করতেই হবে। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, মার্কিন সেনারা গ্রিনল্যান্ডে আক্রমণ করলে ডেনমার্কের সেনাবাহিনীও তাঁদের আটকাতে পারবে না। তবু এমন কোনো হামলা গ্রহণযোগ্য নয় বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

এনডিটিভির সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জারলোভ বলেন, ‘আমরা এটাও স্পষ্ট করতে চাই, আমাদের ওপর সামরিক হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। এতে ন্যাটোভুক্ত দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার মতো একটি বোকামিপূর্ণ এবং বিধ্বংসী পরিস্থিতি তৈরি হবে, যা সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক এবং খুবই, খুবই বোকামি এবং অপ্রয়োজনীয়।’

জারলোভ মনে করেন, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডে হামলার হুমকি দেওয়া বা শত্রুতার কোনো কারণ নেই। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশাধিকারের সুযোগ আগে থেকেই আছে। দুই দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যার মধ্যে তাদের খনি খননের জন্য প্রবেশাধিকার দেওয়া আছে। এর ব্যাখ্যায় ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘এর আসলেই কোনো প্রয়োজন নেই এবং আশা করি, আমরা আবার সঠিক পথে ফিরে আসতে পারব এবং এ নিয়ে উত্তেজনা বাড়বে না।’

ট্রাম্প এর আগে ২০১৯ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন তাঁকে উত্তরে বলা হয়েছিল, এটি বিক্রির জন্য নয়। ২০২৪ সালে নির্বাচনে জিতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাম্প আবার একই প্রস্তাব দেন। এবারও তাঁকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: এএফপি

আরব বসন্তে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রনায়করা এখন কোথায়?

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ ২৬ বছর বয়সী তিউনিসিয়ার তরুণ মোহাম্মদ বৌয়াজ্জির মৃত্যুর ১৫ বছর গত হয়েছে। যিনি পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে রাস্তায় নিজের শরীরে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। তার এই প্রতিবাদের ঢেউ মুহূর্তের মধ্যে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থানের অভাব, দুর্নীতি এবং দশকের পর দশক ধরে চলা রাজনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে লাখ লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে পরিবর্তনের আকঙ্খা ছিল প্রবল। টানা ২৮ দিনের বিক্ষোভে তিউনিসিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জয়নাল আবিদিন বিন আলির পতন হয়। যিনি টানা ২৩ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তিউনিসিয়ার জনগণের এই বিক্ষোভের সফলতা গোটা আরব বিশ্বকেই নাড়িয়ে দেয়। একে একে মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং সিরিয়াতেও ওই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষমতালোভী আরব রাষ্ট্রনায়কদের পতন ঘটানো সাধারণ মানুষের এই বিপ্লব বিশ্ব রাজনীতিতে আরব বসন্ত নামে পরিচিত। যার মাধ্যমে পাঁচ দেশের অতি প্রভাবশালী প্রেসিডেন্টের পতন হয়। এসব নেতাদের সঙ্গে কি ঘটেছিল তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।

তিউনিসিয়ার জয়নাল আবিদিন বিন আলি  
তার জন্ম ১৯৩৬ সালে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নির্বাসনে থেকেই ২০১৯ সালে তার মৃত্যু হয়। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেন আলি প্রেসিডেন্ট হাবিব বুরগিবাকে শারীরিকভাবে অযোগ্য ঘোষণা করে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে কঠোর শাসন কায়েম করেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও দুর্নীতি, বৈষম্য ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতির পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। টানা এক মাসের আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি বেন আলি সৌদি আরবে পালিয়ে যান। পরে তিউনিসিয়ার আদালত তাকে অনুপস্থিতিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ২০১৯ সালে সৌদি আরবে নির্বাসনে তার মৃত্যু হয়।

মিশর: হোসনি মুবারক
১৯৮১ সালে আনোয়ার সাদাত হত্যার পর ক্ষমতায় আসেন মুবারক। জরুরি আইন ও সামরিক প্রভাবের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন দেশ শাসন করেন। ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি গণবিক্ষোভ শুরু হয় এবং ১৮ দিনের মাথায় ১১ ফেব্রুয়ারি মুবারক পদত্যাগে বাধ্য হন। বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হলেও পরে তা বাতিল হয়। দুর্নীতির মামলায় কিছুদিন আটক থাকার পর ২০১৭ সালে মুক্তি পান। ২০২০ সালে কায়রোতে তার মৃত্যু হয়।

ইয়েমেন: আলি আবদুল্লাহ সালেহ
ইয়েমেনের রাজনীতিতে দক্ষ কৌশলী হিসেবে পরিচিত সালেহ ৩৩ বছর দেশ শাসন করেন। ২০১১ সালের আন্দোলনের পর ২০১২ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর তিনি সাবেক শত্রু হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে জোট বেঁধে ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলে সহায়তা করেন। কিন্তু ২০১৭ সালে সেই জোট ভেঙে গেলে হুথি বাহিনীর হাতে তিনি নিহত হন।

লিবিয়া: মুয়াম্মার গাদ্দাফি
১৯৬৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতায় আসা গাদ্দাফি চার দশকের বেশি সময় লিবিয়া শাসন করেন। তেল সম্পদের ওপর ভর করে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। ২০১১ সালে বেনগাজিতে আন্দোলন শুরু হলে তা গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। ন্যাটোর বিমান হামলা ও বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রায় তার শাসনের অবসান ঘটে। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর সির্তে শহরে বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়ে তিনি নিহত হন।

সিরিয়া: বাশার আল-আসাদ
২০০০ সালে বাবার মৃত্যুর পর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাশার আল-আসাদ ক্ষমতায় আসেন। ২০১১ সালে দারা শহরে শিক্ষার্থীদের গ্রাফিতি লেখাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু হয়, যা পরে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। প্রায় ১৪ বছর ধরে চলা যুদ্ধে লাখো মানুষ নিহত ও অর্ধেকের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। রাশিয়া, ইরান, তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তি এতে জড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর হায়াত তাহরির আল-শামের নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের দ্রুত অভিযানে দামেস্কের পতন ঘটে। বাশার আল-আসাদ পরিবারসহ মস্কোতে পালিয়ে যান এবং সেখানে আশ্রয় নেন।
আরব বসন্ত বহু স্বৈরশাসকের পতন ঘটালেও অঞ্চলজুড়ে স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। কারও পরিণতি হয়েছে মৃত্যু, কারও নির্বাসন, আবার কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ- আরব বসন্তের উত্তরাধিকার আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে চলেছে।

mzamin

ইরান পরিস্থিতি: কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত খামেনির, ট্রাম্প বলছেন পরিস্থিতি বিপজ্জনক

ইরানে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থায় অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট বিক্ষোভ চলছেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ জনে। দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ রয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ গতকাল শনিবার বিক্ষোভ দমনে আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।

ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) গতকাল সতর্ক করে বলেছে, দেশের নিরাপত্তা রক্ষাই তাদের জন্য ‘শেষ কথা’। বিদ্যমান পরিস্থিতি আর কোনোভাবেই চলতে পারে না। আর সেনাবাহিনী বলেছে, সরকারি সম্পদ সুরক্ষায় তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যাপক এ বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার যখন তৎপরতা বাড়িয়েছে, তখন আইআরজিসি ও সেনাবাহিনীর তরফে এ বক্তব্য এল।

এর আগে গত শুক্রবার ইরানের নেতাদের আবার সতর্ক করে দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গতকাল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে আছে।

ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম জানায়, রাজধানী তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে একটি পৌর ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার জন্য ‘দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করা হচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে বিক্ষোভে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্য দেখানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিরাজ, কোম ও হামেদান শহরে বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর এসব সদস্য নিহত হয়েছেন।

মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক দুরবস্থার প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ লাভ করে। গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিক্ষোভ দ্রুত দেশটির বড় অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমান শাসনের অবসান দাবি করছেন। অবশ্য ইরানি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এসব ‘দাঙ্গা’ উসকে দিচ্ছে।

এদিকে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত শেষ শাহর (মোহাম্মদ রেজা পাহলভি) ছেলে রেজা পাহলভি বিদেশ থেকে বিক্ষোভে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছেন।

হাসপাতালে অনেক আহত বিক্ষোভকারী

ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একজন চিকিৎসক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, শুক্রবার থেকে আহত অনেক বিক্ষোভকারীকে হাসপাতালে আনা হচ্ছে। কারও মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। কারও হাত-পা ভাঙা। আবার কারও শরীরে গভীর ক্ষত রয়েছে। একটি হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ অন্তত ২০ জনকে আনা হয়েছিল। পরে তাঁদের মধ্যে পাঁচজন মারা যান।

বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির জনসংযোগ দপ্তর জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গাচসারানে ‘সশস্ত্র দাঙ্গাবাজদের’ সঙ্গে সংঘর্ষে বসিজ বাহিনীর তিন সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন পাঁচজন। পশ্চিমাঞ্চলীয় হামেদানে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। উত্তর-পূর্বের মাশহাদের আহমদাবাদ এলাকায় নিহত হয়েছেন এক ব্রিগেডিয়ার জেনারেলের ছেলে। গত দুই রাতে খুজেস্তানের শুশতার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর দুই সদস্য নিহত হয়েছেন।

ইরানের মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত তারা ৬৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫০ জন বিক্ষোভকারী, ১৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

বিপ্লবী গার্ড ও সেনাবাহিনীর বিবৃতি

ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ (ব্ল্যাকআউট) রেখেছে। এ কারণে অনেক তথ্যই বহির্বিশ্বে পৌঁছাচ্ছে না।

দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের একজন বাসিন্দা টেলিফোনে রয়টার্সকে জানান, তাঁদের এলাকায় আইআরজিসির সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। তাঁরা গুলি চালাচ্ছেন। নিরাপত্তার কারণে ওই ব্যক্তি তাঁর পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, গত দুই রাতে ‘সন্ত্রাসীরা’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। আগুন দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনায়।

আইআরজিসির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অর্জন রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের জন্য ‘শেষ কথা’ (রেড লাইন)। বর্তমান পরিস্থিতির ধারাবাহিকতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেনাবাহিনী জানায়, তারা ‘জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো ও সরকারি সম্পদের সুরক্ষা’ দেবে।

আইআরজিসির বাইরে পৃথক কাঠামোয় পরিচালিত হয় সেনাবাহিনী। এই বাহিনীও দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীন।

‘শহরের কেন্দ্রস্থল’ দখলের প্রস্তুতির আহ্বান পাহলভির

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া সর্বশেষ বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রেজা পাহলভি বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এখন আর শুধু রাস্তায় নামা নয়, শহরগুলোর কেন্দ্রস্থল দখল ও ধরে রাখার প্রস্তুতি নিতে হবে।’ তিনি অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত, বিশেষ করে পরিবহন, তেল, গ্যাস ও জ্বালানি খাতের শ্রমিক ও কর্মচারীদের দেশব্যাপী ধর্মঘটে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আপাতত পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী নন। এতে ইঙ্গিত স্পষ্ট যে সংকট কোন দিকে যায়, তা দেখেই তিনি বিরোধী নেতৃত্বের বিষয়ে অবস্থান নেবেন।

এর আগে গত সপ্তাহে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিক্ষোভকারীদের সহায়তায় এগিয়ে আসতে পারে। শুক্রবার তিনি আরও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘তোমরা যদি গুলি চালাও, আমরাও গুলি চালাব।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমি শুধু চাই, ইরানের বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ থাকুক। পরিস্থিতি এখন খুবই বিপজ্জনক।’

রাজপথে কিছু বিক্ষোভকারী অবশ্য পাহলভির পক্ষে স্লোগান দিয়েছেন। ‘শাহ দীর্ঘজীবী হোক’—এমন স্লোগানও শোনা গেছে। তবে অধিকাংশ স্লোগানে বর্তমান সরকারের শাসনের অবসান এবং অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের দাবি তোলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা ইরানের অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় দেশটির অর্থনীতি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ’

চলমান বিক্ষোভ অন্তত তিন বছরের মধ্যে ইরানের শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট ও গত বছরের যুদ্ধের পর সরকার আগের তুলনায় বেশি নাজুক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

শুক্রবার ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির নেতারা এক যৌথ বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীদের হত্যার নিন্দা জানান। তাঁরা ইরানকে সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

ইরানের কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, অর্থনৈতিক দাবিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ বৈধ। তাদের নিরাপত্তা বাহিনী কেবল ‘সহিংস দাঙ্গাবাজদের’ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।

শুক্রবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অভিযোগ করে বলেন, বিক্ষোভকারীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হয়ে কাজ করছেন। দাঙ্গাবাজেরা সরকারি সম্পদে হামলা চালাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বিদেশিদের ‘ভাড়াটে’ হিসেবে কাজ করা কাউকে সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন।

নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাওয়ের হিসাবে, ইরানে গত দুই সপ্তাহে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার রাতে বিক্ষোভের এ দৃশ্যটি উত্তর তেহরানের
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শুক্রবার রাতে বিক্ষোভের এ দৃশ্যটি উত্তর তেহরানের। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে

জেলা প্রশাসনে কমিটি নিয়ন্ত্রণ এবং পদে যখন ডিসির স্ত্রী by নাহিদ হাসান

জেলা বা উপজেলা প্রশাসনে যেভাবে বিভিন্ন কমিটি হতো, সেভাবেই হতে দেখা যাচ্ছে এখনো। গণ–অভ্যুত্থানের পর আগের মতোই চলছে জনপ্রশাসন, এখানে কোনো সংস্কার নেই। সম্প্রতি গাইবান্ধায় জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা নিয়ে স্থানীয়ভাবে সমালোচনা তৈরি হয়। সেখানে পদাধিকারবলে আহ্বায়ক হয়েছেন ডিসির স্ত্রী। ডিসির স্ত্রী কীভাবে ‘পদবি’ হতে পারে, তা জানি না। আইনি কাঠামো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আগে প্রভু বানাত। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে এ পরিস্থিতি কতটুকু বদলাল?

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের গঠনতন্ত্রের ধারা অনুযায়ী, জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী হবেন জেলা প্রশাসক কর্তৃক মনোনীত জেলার একজন নারী ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে জেলা প্রশাসকদের অনেকেই তাঁদের স্ত্রীকে এই সংস্থার পদে বসিয়েছেন। এখনো এর ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে। এতে যেমন জেলা নারী ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা মূল্যায়ন হওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, ক্রীড়া ক্ষেত্রে তাঁরা ভূমিকা রাখতে পারছেন না, অন্যদিকে জেলা প্রশাসকদের ক্ষমতাচর্চার নমুনাও প্রকাশ পাচ্ছে।

অতীতে ডিসিরা প্রশাসন ক্যাডারের জন্য পৃথক ব্যাংক, স্পেশাল ফোর্স, দিবস উদ্‌যাপনে কোটি টাকা বরাদ্দ, জ্বালানি তেল ব্যবহারের সীমা তুলে দেওয়া এবং ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন বিচারিক ক্ষমতাও। শেখ হাসিনার আমলে সর্বশেষ ডিসি সম্মেলনে তাঁরা চেয়েছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের রাজনীতি বন্ধ করতে। প্রস্তাবের ফর্দে ছিল ২৪৪টি দাবি।­

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কমিটিতে চেয়ারম্যান হন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। উপদেষ্টা হিসেবে থাকেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। শরীয়তপুরের ডিসি শিক্ষা কমিটিতে চেয়ারম্যানদের বদলে ইউএনওকে চেয়ারম্যান করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অথচ বাংলাদেশ ইউনেসকো ও আইএলওর সদস্য। সদস্যদেশের শিক্ষকেরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার সুযোগ পান।

সংবিধান বলছে, নির্বাচিতদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানের ওপর ‘স্থানীয় শাসনের’ ভার থাকবে। উপজেলা পরিষদ বাতিলবিষয়ক কুদরত-ই-ইলাহি পনির মামলার ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়েছিল, জেলাসহ প্রতিটি প্রশাসনিক একাংশ সব পরিস্থিতিতে শুধু নির্বাচিতরাই চালাবেন। প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান পরোক্ষ ভোটে জেলা পরিষদ সৃষ্টির সময় আশঙ্কা করেছিলেন, আমলাতন্ত্র মাঠের নির্বাচিতদের গিলে খাবে।

অথচ দেখেছি, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানদের সরিয়ে ইউএনওদের শিক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান বানাতে চায়। অন্যদিকে আপিল বিভাগের রায় অনুসারে ইউএনও এবং ডিসির এসিআর লেখার কথা উপজেলা ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের। কারণ, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ বলছে, প্রতিটি জেলার ‘স্থানীয় শাসনে’ তিনটি বিষয় থাকবে—(ক) প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কার্য, (খ) জনশৃঙ্খলা রক্ষা, (গ) জনসাধারণের কার্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। মানে ডিসিদের যেসব প্রস্তাব প্রতিবছর তুলে ধরা হয়, তার ৯০ শতাংশ তোলারই এখতিয়ার তাঁদের নেই।

১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান ও ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময়ও তারা বিচার বিভাগকে আলাদা করার বিরোধী ছিল। ২০০৭ সালে মাসদার হোসেন মামলার যে রায় এসেছিল, তা ডিসিরা মানতে পারছিলেন না। অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ, সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় করে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ তারা নিল।

দুই.

২০২০ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি। কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন মধ্যরাতে তুলে নিয়ে আসেন সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে। তাঁর অপরাধ সরকারি নিউ টাউন পুকুরকে ডিসির নামে করার বিষয়টি সংবাদে তুলে ধরা। সেই সাংবাদিক নির্যাতনকারী ডিসির বিদায়ের দিনও কুড়িগ্রামে চাকরিপ্রার্থীরা মানববন্ধন করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর পদে ৭৩ জনের নিয়োগ নিয়েও কথা উঠেছিল। এমনকি বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার নিয়োগগুলোতেও তা-ই ঘটেছে। এ কাজে তাঁকে যেমন সাহায্য করেছেন নাজিম উদ্দীনের মতো তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট, তেমনি স্থানীয় দালাল চক্রও।

কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অতিথি শিক্ষক ছিলেন বিখ্যাত ভাওয়াইয়া শিল্পী শফি। আট বছর আগে একজন শিল্পীর কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এক ডিসি তাঁকে চাকরিটা দেন। তিনি শিল্পী হওয়ায় ডিসির বাদ্যযন্ত্র ক্রয় কমিটিতে তিনি ছিলেনও। কেনা হয় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকার হারমোনিয়াম-তবলা। এগুলো নিম্নমানের হওয়ায় তিনি ফেসবুকে প্রতিবাদ জানান। এতে চাকরিচ্যুত হন। ডিসির অনুগত অধ্যক্ষ তাঁকে চাকরিচ্যুত করেন।

কুড়িগ্রাম জেলায় বহুতল মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি দরকার। রেল কর্তৃপক্ষের নিষেধ অমান্য করেই পুরোনো স্টেশন উচ্ছেদপূর্বক বরাদ্দ দেন ওই ডিসি। এতে গণকমিটির নেতৃত্বে ফুঁসে ওঠে স্থানীয় জনগণ। পরে রেলমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তিনি পিছিয়ে আসেন। শেষে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের ঘটনায় ডিসি সুলতানার পর্ব সমাপ্ত হয়। কেন?

কারণ, মাঠ প্রশাসনে একেকজন জেলা প্রশাসক (ডিসি) তিন শতাধিক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে থাকেন। গত ডিসেম্বরে ডিসিদের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটিগুলোর হালনাগাদ তথ্য পাঠানোর নির্দেশনার চিঠি থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।

ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর জীবনযাপন সাধারণের মতোই। সচিব পদটাও আর দশটি পদের মতোই। কিন্তু সেই সচিবই ভারতে এসে হতেন বড়লাট। হতেন অসীম ক্ষমতার মালিক। যাকে খুশি প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী বানাতেন। চার্চিল বলেছিলেন, ভারতীয়রা এক পশুসদৃশ জাতি। ভারতীয়দের পশু জেনেই তাঁরা যাবতীয় কানুন বানাতেন। সেই কানুনই মূলত আমরা সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদে যুক্ত করেছি। ব্যাখ্যা অংশে ‘প্রচলিত আইন’-এর নামে মেনে নিয়েছি। ফলে ডিসিদের কাছে জনগণ হচ্ছে প্রজা। তো ‘প্রজাদের’ কল্যাণে কমিটির প্রধান তো জেলা প্রশাসক বা তাঁর পত্নীরাই থাকবেন! হাজার প্রাণের বিনিময়ে একটি অভ্যুত্থানেও তার হেরফের করতে পারে না।

* নাহিদ হাসান, লেখক ও সংগঠক
- nahidknowledge1@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

জেলা প্রশাসনে কমিটি নিয়ন্ত্রণ এবং পদে যখন ডিসির স্ত্রী

গ্রিনল্যান্ড আমরা রক্ষা করব’- যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ধ্বংসাত্মক’ ন্যাটো যুদ্ধের সতর্কবার্তা ডেনমার্কের

গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক হামলা চালায়, তবে ডেনমার্ককে আত্মরক্ষা করতে হবে। এমন মন্তব্য করেছেন ডেনমার্কের সংসদ সদস্য ও পার্লামেন্টের প্রতিরক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান রাসমুস জারলোভ। তিনি স্বীকার করেন, ডেনমার্কের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রকে থামাতে সক্ষম না হলেও এমন কোনো হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এনডিটিভিকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে জারলোভ বলেন, আমরা স্পষ্ট করে জানাতে চাই আমাদের ওপর সামরিক হামলা চালানো গ্রহণযোগ্য নয়। এতে ন্যাটোর দুই সদস্য দেশের মধ্যে একেবারেই অযৌক্তিক ও বিপর্যয়কর যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হবে, যা সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক, অত্যন্ত বোকামিপূর্ণ এবং অপ্রয়োজনীয়।

জারলোভ বলেন, গ্রিনল্যান্ডে হামলা চালানোর মতো কোনো হুমকি, শত্রুতা বা যুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেই। কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশাধিকার ভোগ করে এবং দুই দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। এর আওতায় খনিজ অনুসন্ধানসহ নানা কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের সুযোগ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, এর একেবারেই কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা আশা করি বিষয়টি আবার সঠিক পথে ফিরবে এবং পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হবে না।

গ্রিনল্যান্ড বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না
ডনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম প্রেসিডেন্সির সময়ে ২০১৯ সালে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু তখনই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল, এই দ্বীপ বিক্রির জন্য নয়। ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের পর ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প আবারও গ্রিনল্যান্ড কেনার সেই পুরোনো প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা ফের প্রত্যাখ্যান করা হয়। এ প্রসঙ্গে জারলোভ বলেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির বিষয়টি দামের প্রশ্ন নয়। তার ভাষায়, আমরা ৫৭ হাজার ড্যানিশ নাগরিককে বিক্রি করে আমেরিকান বানাতে পারি না। গ্রিনল্যান্ডের জনগণ এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।

‘মার্কিন সামরিক হামলা হলে ন্যাটোর অবসান’
এদিকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য যুক্তরাষ্ট্র যদি সামরিক হামলা চালায়, তাহলে ৭৬ বছরের পুরোনো পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে। এ বিষয়ে জারলোভ বলেন, নিশ্চিতভাবেই সামরিক হামলা হলে সেটাই হবে ন্যাটোর শেষ। কারণ তখন ডেনমার্ককে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫  কার্যকর করতে হবে। এই ধারাটি সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার দেয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশ বাধ্য হবে ডেনমার্ককে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই রক্ষা করতে। অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র এতে ভেটো দেবে, আর সেখানেই ন্যাটোর মৃত্যু ঘটবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের জন্য তারা ‘বিভিন্ন বিকল্প’ বিবেচনা করছে। ব্রিফিংয়ে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বলেন, সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করা হয়নি। লিভিট জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার এবং আর্কটিক অঞ্চলে প্রতিপক্ষদের ঠেকাতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, তিনি আগামী সপ্তাহে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা করছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুবিও স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কিনতে চান, সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে চান না।
ডেনমার্ক সরকারও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এই বৈঠককে স্বাগত জানিয়েছে এবং একে ‘প্রয়োজনীয় সংলাপ’ বলে অভিহিত করেছে।

mzamin