Thursday, August 6, 2026

উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের

যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ইরানে হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানো হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত পাঁচটি সূত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।

বৃহস্পতিবার (০৬ আগস্ট) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দেওয়ার পর উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই বার্তা দেওয়া হয়।

দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা, উপসাগরীয় অঞ্চলের দুটি সূত্র এবং এক জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিকের দাবি, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাশাপাশি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।

সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, আরাগচি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকে ট্রাম্পের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নতুন হামলা থেকে বিরত রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, ইরানে হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থ এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের দাবি, আরাগচির বার্তা ছিল ইরান পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত, তবে কূটনৈতিক সমাধানই বৃহত্তর সংঘাত ও আঞ্চলিক ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানোর সর্বোত্তম উপায়।

উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সূত্র জানায়, ইরানের বার্তা ছিল স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের সতর্কতার মাধ্যমে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, কারণ এসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং তাদের অর্থনীতি জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল।

সূত্রগুলোর দাবি, এরপর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত, আলোচনায় ফেরা, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানান।

আরেকটি উপসাগরীয় সূত্র জানায়, ইরানের এই সতর্কবার্তা মূলত সব উপসাগরীয় দেশের জন্য হলেও তা প্রধানত সৌদি আরব ও কাতারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কাতার, ওমান ও সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রকে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে, নতুন করে মার্কিন হামলা হলে পুরো অঞ্চল অগ্নিগোলকে পরিণত হতে পারে।

গত ২ আগস্ট ট্রাম্প জানান, দ্রুত একটি সমঝোতার সুযোগ তৈরি হওয়ায় তিনি ইরানে পরিকল্পিত হামলা স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছেন।

এক ইরানি কর্মকর্তার দাবি, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে জ্বালানি স্থাপনা, তেল শোধনাগার, বিদ্যুৎ ও পানির অবকাঠামো, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং তেলক্ষেত্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শত্রুপক্ষ ইরানের অবকাঠামোকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার চেয়ে বড় ক্ষতি করা হবে।

২০১৯ সালে সৌদি আরবের আরামকো তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও উল্লেখ করেন ওই কর্মকর্তা। তার দাবি, ওই হামলা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোর ঝুঁকি স্পষ্ট করে দিয়েছিল।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়ে ইরান ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের বোঝাতে চাইছে যে, নতুন সংঘাতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।

এক জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিকের মতে, সমঝোতার পথে বড় বাধাগুলোর একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো চুক্তি চায় না, যাতে ইরান নিজেদের বিজয়ী দাবি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু চায়, যা তারা যুদ্ধজয়ের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে।

সূত্র : রয়টার্স 

একটি মহড়া চলাকালীন ইরানের খোরদাদ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত
একটি মহড়া চলাকালীন ইরানের খোরদাদ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। ছবি : সংগৃহীত

জেরুজালেমের পবিত্র স্থান রক্ষায় মুসলিম দেশগুলোর যৌথ পদক্ষেপ

অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেম এবং সেখানে অবস্থিত ইসলামি ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলোতে ইসরাইলের কর্মকাণ্ড নথিবদ্ধ ও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আরব ও মুসলিম দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।

বুধবার জর্ডানে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক শেষে গৃহীত যৌথ ঘোষণায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

এতে বলা হয়, ইসরাইলের কর্মকাণ্ড এবং উপাসনাকারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ঘটনাগুলো প্রচারের জন্য একটি গণমাধ্যমভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বৈশ্বিক জনমতের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে।

বৈঠকে জেরুজালেমবিষয়ক আরব মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটির সদস্যরা, আরব লীগের মহাসচিব আহমেদ আবুল গেইত এবং তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা জেরুজালেম ও সেখানকার পবিত্র স্থানগুলোতে ইসরাইলের পদক্ষেপ বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান।

যৌথ ঘোষণায় জেরুজালেমের আরব, ইসলামি ও খ্রিষ্টান পরিচয় এবং শহরটির আইনগত ও জনসংখ্যাগত চরিত্র পরিবর্তনের লক্ষ্যে ইসরাইলের নীতির নিন্দা জানানো হয়। এসব পদক্ষেপকে অবৈধ বলেও উল্লেখ করা হয়।

ঘোষণায় বলা হয়, জেরুজালেম এখন ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে। শহরটির ইসলামি ও খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলো আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হুমকির মধ্যে রয়েছে। এতে অভিযোগ করা হয়, ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেমে অবৈধ দখল আরো শক্তিশালী করছে। পাশাপাশি নতুন বসতি নির্মাণ, ভূমি দখল, সম্পত্তি জব্দ, ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং জেরুজালেমকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ধর্মীয় পবিত্র স্থানগুলোতে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডেরও নিন্দা জানান।

তারা অভিযোগ করেন, এসব স্থানের ঐতিহাসিক ও আইনগত অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে এবং সময় ও স্থানভিত্তিক বিভাজন চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

যৌথ ঘোষণায় আরো বলা হয়, আল-আকসা মসজিদ লক্ষ্য করে ইসরাইলের ধারাবাহিক ও নজিরবিহীন পদক্ষেপ চলছে। এর মাধ্যমে মসজিদটির ইসলামি পরিচয় এবং ঐতিহাসিক ও আইনগত অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘোষণায় জোর দিয়ে বলা হয়, পুরো আল-আকসা প্রাঙ্গণই মুসলমানদের একান্ত ইবাদতের স্থান।

নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও কর্মকর্তাদের ক্রমবর্ধমান প্রবেশ, মুসল্লিদের ওপর বিধিনিষেধ, জেরুজালেম ওয়াক্‌ফ ও আল-আকসা মসজিদবিষয়ক বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ এবং পবিত্র স্থানটির নিচে ও আশপাশে চলমান খননকাজের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা হবে।

একই সঙ্গে জেরুজালেমের খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোর বিরুদ্ধেও ইসরাইলের পদক্ষেপের নিন্দা জানানো হয়। এর মধ্যে চার্চ অব দ্য হলি সেপালকারে প্রবেশে বাধা, গির্জার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, গির্জার প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তির ওপর বিধিনিষেধ এবং ধর্মযাজক, উপাসনাকারী ও ধর্মীয় প্রতীকের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে।

ঘোষণায় বলা হয়, উগ্রপন্থিদের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন খ্রিষ্টান ধর্মযাজকেরা। একই সঙ্গে ইসরাইলের প্রণীত আইনের মাধ্যমে গির্জার অর্থ ও জমি দখলের চেষ্টাও চলছে।

এ ছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের সময় ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) ও আরব লীগের যৌথ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের আহ্বান জানানো হয়েছে। সেখানে জেরুজালেম এবং এর পবিত্র স্থানগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে।

জেরুজালেমের পবিত্র স্থান রক্ষায় মুসলিম দেশগুলোর যৌথ পদক্ষেপ
ছবি: সংগৃহীত

হাসিনাকে ভারত এই সুযোগ কেন দিল, প্রশ্ন বিএনপির

বিবিসি বাংলাঃ বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের অনেকে।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিল—এটি আমাদের প্রশ্ন।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। সেই প্রসঙ্গে টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন; তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলা সুযোগ দেওয়া হলো।’

‘বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর এই সুযোগ দিলে’—এই প্রশ্নও রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

পাঁচই আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। সরকারি দল বিএনপির নেতৃত্বের মাঝেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে দলটির নেতাদের অনেকে বলছেন।

বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাইবেন কি না, নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সেই প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন তিনি।

ওই সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একপক্ষকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে; একপক্ষ দায়মুক্তি পেলে অন্যপক্ষেরও সে অধিকার আছে।

দুই বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাদের কোনো অনুশোচনা না থাকায় বাংলাদেশে বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছে।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি বা ক্ষমা চায়নি। এমনকি তাদের কোনো অনুশোচনা নেই।’

‘বরং তারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে থেকে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। জনগণ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ,’ মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

দুই বছর আগে শেখ হাসিনার শাসনের পতন হলে সে সময় গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান এনে ওই অধ্যাদেশ যুক্ত করা হয়েছিল।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী প্রস্তাব সংসদে পাস করে। ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থেকে যায়।

নয়া দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাদের দলের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।


সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির ব্যাপারে বিচার হবে। সংশ্লিষ্ট আইনে সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা তো (আওয়ামী লীগ) আদালতে যায়নি। আদালত থেকেই যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেভাবেই সরকার কাজ করবে।’

একইসাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, ‘জনগণও বিচার করবে। জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। তাদের দীর্ঘ শাসনে বিরোধী দল ও মতের মানষকে দমন-পীড়ণ চালিয়েছে; গুম, খুন করেছে। ফলে তাদের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই এবং তাদের ব্যাপারে জনগণও বিচার করবে।’

এদিকে, ভারতের নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হতে পারেন, এমন খবর যখন আলোচনায় আসে, তখনই বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

গত সোমবার ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা দিল্লিতে শেখ হাসিনা যাতে রাজনৈতিক কার্যক্রম না চালায়, সেজন্য ভারত সরকারের সহযোগিতা চান।

একই দিনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ভারত সরকারকে এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন, দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এছাড়া এরপর মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশনা তুলে ধরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য বিবরণীতে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচার না করতে অনুরোধ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছিলেন।

যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবাদ সম্মেলনটি বেসরকারিভাবে আয়োজন করা হচ্ছে। এরসাথে ভারত সরকারের সম্পর্ক নেই। এবং সেখানে যে বক্তব্য আসবে, তা ভারত সরকার সমর্থন করে না।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরও নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে এবং তাতে শেখ হাসিনা সরাসরি বক্তব্য ও প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।

বিএনপি সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে বক্তব্যই দেওয়া হোক না কেন, তাদের সমর্থন ছাড়া নয়া দিল্লিতে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন করা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন।

আর সেকারণে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্য থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে।

হাসিনাকে ভারত এই সুযোগ কেন দিল, প্রশ্ন বিএনপির
সালাহউদ্দিন আহমদ

নেতানিয়াহুর আপত্তি, ঝুঁকিতে ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় হামলা বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত ‘শান্তি পরিকল্পনা’ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গাজার শাসকগোষ্ঠী ও সশস্ত্র প্রতিরোধী সংগঠন হামাসকে নিরস্ত্র করা নিয়ে প্রস্তাবিত শর্তে রাজি নন বলে জানিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, হামাস পুরো নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না।

যদিও গত সপ্তাহেই ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তাঁর শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি ‘বড় মাইলফলক’ অর্জিত হয়েছে। এই পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলও নাকি ‘খুবই সন্তুষ্ট’। গত অক্টোবরে নীতিগতভাবে সম্মত ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে। আর ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা সরাবে ইসরায়েল।

সেই পরিকল্পনার ঘোষণার আসার পরই দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে জটিলতা দেখা দেয়। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান, হামাস অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করবে না। হামাস বলেছে, ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার ও হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্র ছাড়বে না তারা।

তবে নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে ইসরায়েলের এমন অবস্থান জানানোর পর গতকাল বুধবার রাত পর্যন্ত এ নিয়ে হামাসের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও নতুন কিছু বলেননি।

গাজা থেকে সেনা সরাবে না ইসরায়েল

প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার প্রথমবার প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, কথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর শর্তে ইসরায়েল রাজি হয়নি। হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজায় বর্তমান অবস্থান থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে না। তবে চুক্তির শর্ত চূড়ান্ত করতে আলোচনা চলবে।

ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার অন্তর্বর্তী প্রশাসন তদারকির জন্য বোর্ড অব পিস গঠন করা হয়েছে। এর আগে সোমবার ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন বোর্ড অব পিসের প্রধান দূত নিকোলাই স্লাদেনভ। বৈঠকের পরদিন ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা নিয়ে এ কথা বললেন নেতানিয়াহু।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বা তাঁর দল মনে করছে, তারা হামাসকে নিরস্ত্র এবং গাজার বেসামরিকীকরণ করতে পারবে। আমরা বিষয়টি পর্যালোচনা করছি। একটি খসড়া পাঠিয়েছিল। আমরা তাতে সম্মতি দিইনি। সেটি আমাদের খসড়া ছিল না। আমরা মন্তব্য জানিয়ে তা ফেরত পাঠিয়েছি।’

প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর গাজায় ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত একটি সীমারেখায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। এটি হলে গাজার ৪৭ শতাংশ এলাকা ফিলিস্তিনিদের ও ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকত। কিন্তু ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের বদলে ইসরায়েল উল্টো গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়েছে। এখন তারা গাজার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে।

ইসরায়েল যে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে চায় না নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সদস্যরাও সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ রোববার বলেছেন, হামাসকে নিরস্ত্র ও তাদের সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত গাজায় অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনারা তাঁদের বর্তমান অবস্থান থেকে সরে যাবেন না।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিকল্পনাটি ট্রাম্পের হওয়ায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু। তিনিও গাজা থেকে সেনা সরাতে চান না। আর প্রস্তাবিত এ চুক্তি প্রত্যাখ্যানে কট্টর ডানপন্থী জোটসঙ্গীদের চাপে আছেন নেতানিয়াহু। কারণ, অক্টোবরে ইসরায়েলে যে নির্বাচন হবে, সেই নির্বাচনে ডানপন্থীরা তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

গাজা সিটিতে আল-মুত্তাকিন মসজিদে ইসরায়েলি হামলার পর ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন কয়েকজন  ফিলিস্তিনি নাগরিক। ২৮ জুলাই ২০২৬
গাজা সিটিতে আল-মুত্তাকিন মসজিদে ইসরায়েলি হামলার পর ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন কয়েকজন ফিলিস্তিনি নাগরিক। ২৮ জুলাই ২০২৬ ছবি: এএফপি

চীনা ক্ষেপণাস্ত্র ইরানকে যেভাবে যুদ্ধে টিকিয়ে রেখেছে by জান্নুস টি এইচ সিয়াহান

চীনের তৈরি শত শত কাঁধে বহনযোগ্য বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র (ম্যানপ্যাডস) নীরবে ইরানে পৌঁছে যাওয়া ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার উচ্চঝুঁকির সংঘাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবিরাম বিমান হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো যখন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন বেইজিং জাঁকজমকপূর্ণ কূটনৈতিক সম্মেলন বা ভারী যুদ্ধট্যাংক নয়, বরং বহনযোগ্য স্বল্পপাল্লার প্রাণঘাতী বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে হস্তক্ষেপ করেছে। স্বল্প উচ্চতায় উড়ন্ত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে সক্ষম এই গোপন প্রতিরক্ষাসহায়তা পারস্য উপসাগরে পশ্চিমা আকাশ-আধিপত্যের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন যে দ্রুত আকাশ-নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযান কল্পনা করেছিল, তা এখন পরিণত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ও অসম যুদ্ধের এক ক্লান্তিকর লড়াইয়ে।

এই অস্ত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা নীরবে সম্পন্ন করেছে হংকংয়ে নিবন্ধিত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ঝংছিং বাওশাং ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট, যা বেইজিংভিত্তিক মূল প্রতিষ্ঠান ঝংছিং বাওশাং গ্রুপের পক্ষে কাজ করেছে। পশ্চিম চীনের শিনজিয়াংয়ের উরুমকি থেকে পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করে একটি সমন্বিত আকাশপথ এবং মধ্য এশিয়া হয়ে অতিরিক্ত রেলপথের মাধ্যমে এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানে পৌঁছানো হয়। এরপর সেগুলো সরাসরি ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ইউনিটগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই বেইজিংয়ের সরকারি অবস্থান ছিল ‘সম্ভাব্য অস্বীকার’-এর কৌশল বজায় রাখা। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র হস্তান্তরের খবরকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দেয় এবং আঞ্চলিক শান্তি ও সংঘাত নিরসনের প্রতি চীনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। তবে এই কূটনৈতিক অবস্থানের আড়ালে রয়েছে সুপরিকল্পিত কৌশলগত পদক্ষেপ। নিম্ন উচ্চতায় উড়ন্ত লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে সক্ষম প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে বেইজিং একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানো এড়াতে চাইছে। অন্যদিকে নিশ্চিত করছে যে তেহরান যেন ভয়াবহ সামরিক বিপর্যয় বা জোরপূর্বক সরকার পরিবর্তনের মুখে না পড়ে।

ইরানের সামরিক নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত সংকটপূর্ণ এক সময়ে আবার এই অস্ত্রসজ্জা ঘটেছে। দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র ও ‘সাপ্রেশন অব এনিমি এয়ার ডিফেন্সেস’ (এসইএড) কৌশল ব্যবহার করে কয়েক মাসের ধারাবাহিক হামলায় ইরানের কেন্দ্রীভূত রাডার নেটওয়ার্ক এবং দূরপাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা (যার মধ্যে রাশিয়ার সরবরাহ করা এস-৩০০ এবং দেশীয় বাভার-৩৭৩ রয়েছে) গুরুতরভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে শত শত চলমান, কাঁধে বহনযোগ্য প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের আকস্মিক আগমন রাডার নেটওয়ার্কবিহীন দুর্বল এলাকাগুলোতে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দিচ্ছে। এর ফলে ইরানি বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক, সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোর চারপাশে বিকেন্দ্রীভূত ও টেকসই নিম্ন-উচ্চতার প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে তুলতে পারছে।

কৌশলগত সুরক্ষাকবচ

কিউডব্লিউ-১২ এবং এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আগের প্রজন্মের কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় বিশাল অগ্রগতি, যা আধুনিক পশ্চিমা সামরিক বিমানগুলোর জন্য সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান সিএএসআইসি এবং সিএএসির তৈরি এই চতুর্থ প্রজন্মের ম্যানপ্যাডসগুলো বিশেষভাবে প্রচলিত ইনফ্রারেড প্রতিরোধব্যবস্থা (আইআরসিএম) অতিক্রম করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

আগের প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র সহজেই ম্যাগনেশিয়ামভিত্তিক ফ্লেয়ার দ্বারা বিভ্রান্ত হতো। কিন্তু কিউডব্লিউ-১২-এ রয়েছে মধ্য-ইনফ্রারেড দ্বৈত-ব্যান্ড ডিজিটাল ফিল্টারিং সিকার। আর এফএন-১৬-এ রয়েছে দ্বৈত-বর্ণের ইনফ্রারেড ও অতিবেগুনি রোসেট-স্ক্যান কোয়াসি-ইমেজিং সিকার। এই উন্নত নির্দেশনাব্যবস্থা একই সঙ্গে লক্ষ্যবস্তুর গতি, চলাচলের ধরন এবং বর্ণালিগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে ক্ষেপণাস্ত্র ফ্লেয়ারের প্রলোভন উপেক্ষা করে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর মূল কাঠামোর দিকে আঘাত হানতে সক্ষম হয়।

এ ছাড়া কিউডব্লিউ-১২ এবং এফএন-১৬ উভয় ক্ষেপণাস্ত্রেই লেজার ও রেডিওভিত্তিক প্রক্সিমিটি ফিউজ এবং সরাসরি আঘাতের ডেটোনেটর সংযুক্ত রয়েছে। এর ফলে ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুর কয়েক মিটারের মধ্যে পৌঁছেই বিস্ফোরিত হতে পারে। ছোট আকারের নজরদারি ড্রোন, লয়টারিং মিউনিশন বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কম তাপ উৎপাদনকারী লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও এটি কার্যকর, যেগুলোকে পুরোনো প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র সহজে আঘাত করতে পারত না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্যবস্থাগুলো সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় (প্যাসিভ) পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। কাঁধ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র কোনো রাডার-তরঙ্গ নির্গত করে না। ফলে আকাশে থাকা সিগন্যাল গোয়েন্দা প্ল্যাটফর্ম বা রাডার–অনুসারী অ্যান্টিরেডিয়েশন ক্ষেপণাস্ত্র এগুলো শনাক্ত করতে পারে না। ছোট ছোট মোবাইল পদাতিক দল শহরের ভবনের আড়াল কিংবা দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান নিয়ে কেবল চোখে দেখা বা অপটিক্যাল সাইটের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে। ফলে আক্রমণকারী বিমানের জন্য এমন এক অদৃশ্য কিন্তু প্রাণঘাতী হুমকির পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগে কোনো ইলেকট্রনিক সতর্কবার্তা পাওয়া যায় না।

বেইজিং যে দূরপাল্লার এইচকিউ-৯বির মতো ভারী বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা না দিয়ে কেবল স্বল্পপাল্লার বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা তাদের কৌশলগত সীমারেখা সম্পর্কে সুস্পষ্ট সচেতনতারই প্রতিফলন। ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ভারী ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা স্থানান্তরের জন্য বিশাল নৌ বা বিমান পরিবহন প্রয়োজন হতো, যা গোপন রাখা প্রায় অসম্ভব। এতে চীনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর তাৎক্ষণিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কিংবা সরাসরি নৌ অবরোধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারত। এ ছাড়া এ ধরনের ভারী ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও রাডার নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় অপরিহার্য।

অন্যদিকে ম্যানপ্যাডস পরিচালনার জন্য খুব অল্প প্রশিক্ষণই যথেষ্ট। এর লজিস্টিক চাহিদাও অত্যন্ত সীমিত। ফলে বেইজিং সহজেই দাবি করতে পারে যে তাদের সরবরাহ করা অস্ত্রগুলো সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক; এগুলোর উদ্দেশ্য কেবল স্বল্পপাল্লায় আত্মরক্ষা নিশ্চিত করা, কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক শক্তি প্রদর্শন নয়।

বেইজিংয়ের শীতল ভূ-অর্থনৈতিক হিসাব

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তেহরানকে চীনের সামরিক সহায়তা কোনো আদর্শিক ঐক্যের কারণে নয়; বরং কঠোর ভূ-অর্থনৈতিক প্রয়োজন থেকেই পরিচালিত। ইরান চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এবং চীনের শিল্পাঞ্চলগুলোর জন্য পেট্রোডলারের বাইরে অপরিশোধিত তেলের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। ইরানি রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ সামরিক পতন ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হবে, যা চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্য এশিয়াজুড়ে স্থলভিত্তিক বাণিজ্য করিডরকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সচল রেখে বেইজিং নিশ্চিত করতে চায় যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা সম্পদ এবং আর্থিক সামর্থ্যের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যেই ব্যয় হবে। ফলে ওয়াশিংটনের কৌশলগত মনোযোগ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে পুরোপুরি কেন্দ্রীভূত হতে পারবে না।

একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রটি চীনের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের এক অমূল্য পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে কিউডব্লিউ-১২ এবং এফএন-১৬ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের মাধ্যমে চীনের প্রতিরক্ষাশিল্প জানতে পারছে, তাদের ইনফ্রারেড ইমেজিং ও অতিবেগুনি সিকার প্রযুক্তি পশ্চিমা বিশ্বের অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার–ব্যবস্থা এবং ‘ডিরেক্টেড ইনফ্রারেড কাউন্টারমেজার্স’-এর বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর। এই বাস্তব যুদ্ধের তথ্য ও উপাত্ত চীনের সামরিক আধুনিকায়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের প্রস্তুতিতেও সহায়তা করবে।

ইরানের জন্য চীনের এই ‘ম্যানপ্যাডস’ সংগ্রহ বিমান প্রতিরক্ষা মতবাদের একটি মৌলিক পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে, যা ‘মোজাইক এয়ার ডিফেন্স’ স্থাপত্য নামে পরিচিত। পশ্চিমা নির্ভুল হামলায় কেন্দ্রীভূত কমান্ড সেন্টার ও স্থির রাডার দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায়—এই শিক্ষা থেকে তেহরান তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছে।

ইরানে চীনের ম্যানপ্যাডস সরবরাহ নীরবে এই সংঘাতের গতিপথ বদলে দিয়েছে। ফলে আকাশে পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারলেও তেহরান দীর্ঘ সময় ধরে পশ্চিমা বিমানশক্তির ওপর একটি বড় ধরনের সামরিক ও আর্থিক চাপ বজায় রাখতে সক্ষম হতে পারে।

* ড. জান্নুস টি এইচ সিয়াহান, ইন্দোনেশীয় রাজনৈতিক ভাষ্যকার
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত এবং সংক্ষেপিত।

চীনা ক্ষেপণাস্ত্র ইরানকে যেভাবে যুদ্ধে টিকিয়ে রেখেছে

কার্টার থেকে রিগ্যান, ক্লিনটন থেকে ট্রাম্প—কীভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ধাঁধায় ফেলেছেন ইরানের নেতারা

নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ প্রতিবেদনঃ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে ইরান ‘অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারণা’ করছে বলে গত সোমবার অভিযোগ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী তেহরানের নেতাদের আচরণ বুঝতে না পারারই একটি নতুন লক্ষণ।

ট্রাম্প নিজেকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতা চেনার এবং তা কাজে লাগানোর একজন দক্ষ কারিগর মনে করেন। তবে ইরানের নেতারা তাঁকে পুরোপুরি ধাঁধায় ফেলে দিয়েছেন।

গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তাঁরা শুধু আমার ক্ষোভই বাড়াচ্ছেন। তাঁরা শুধুই আমাকে রাগাচ্ছেন।’

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সামনে হয়তো আরও বড় হতাশা অপেক্ষা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি নতুন চুক্তি খুব কাছাকাছি। কিন্তু সেখানে শুল্ক আদায়ের বিষয়ে নিজেদের দাবিতে অনড় ইরান।

ট্রাম্প অবশ্য আগেই এ শুল্কের দাবিকে অগ্রহণযোগ্য বলে নাকচ করে দিয়েছেন। ইরানের সঙ্গে একটি সুবিধাজনক চুক্তি করতে না পারার খেসারত ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত ভোটারদের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ওই নৌপথ নিয়ে চলমান দ্বন্দ্ব বিশ্ববাজারে তেলের দামকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এর মাশুল দিতে হচ্ছে মার্কিন ভোক্তা ও বিশ্ব অর্থনীতিকে।

ইরানকে বুঝতে গিয়ে ট্রাম্পই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নন যিনি এমন সংকটে পড়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইরানের ধোঁয়াশাপূর্ণ শাসনকাঠামো এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের মানসিকতা বোঝার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই ব্যর্থ হয়েছেন, কেউ কেউ বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কাও খেয়েছেন।

এ ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে তাঁর করা পরমাণু চুক্তিটি ছিল ২০ মাসের দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল। রিপাবলিকান ও কিছু ডেমোক্র্যাট সদস্য অবশ্য সমালোচনা করেছিলেন যে ইরান ‘উদারতার ভান’ করে ওবামাকে একটি ত্রুটিপূর্ণ চুক্তিতে প্রলুব্ধ করেছে। তবে সব সমালোচনা সত্ত্বেও ওবামা এ চুক্তিকে তাঁর একটি বড় অর্জন বলে মনে করতেন।

সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ও মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের কর্মকর্তা কেনেথ পোলাক মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্পই হয়তো ইরানের নেতৃত্বকে সবচেয়ে কম বুঝতে পেরেছেন।

কয়েক দশক ধরে ইরানকে নিয়ে গবেষণা করা এ বিশ্লেষক বলেন, ‘অনেক দিক থেকেই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের হতাশার এক চরম প্রতীক হলেন ট্রাম্প। তিনি একদিকে ইরানের সঙ্গে চুক্তি করার জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যাকুল ছিলেন, আরেকদিকে দেশটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শক্তিও প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু দেখলেন, কোনো পথেই তাঁর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রায়ই এমনভাবে কথা বলেন, যেন ব্যাপক শক্তি প্রয়োগ করলেই খুব দ্রুত একটি চুক্তি করা সম্ভব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে হামলা চালানোর মাধ্যমে তেহরান–ওয়াশিংটন যুদ্ধ শুরু হয়। ওই হামলায় দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে থাকা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর পরপরই ইরানের জনগণকে তাঁদের সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান ট্রাম্প।

ট্রাম্প সে সময় আরও বলেন, তিনিই ইরানের পরবর্তী নেতা ‘বেছে দেবেন’। পরে মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন। তবে ট্রাম্পের আশা অনুযায়ী ইরানে কোনো গণ-অভ্যুত্থান ঘটেনি। উল্টো দেশটির কট্টরপন্থী সরকার নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।

গত মার্চ মাসে আলী খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মোজতবা খামেনি তাঁর বাবার চেয়েও অনেক বেশি কট্টর এবং পারমাণবিক বোমা অর্জনের বিষয়ে আগ্রহ আরও বেশি। নতুন খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেওয়া ‘অগ্রহণযোগ্য’ হবে বলে ট্রাম্প জনসমক্ষে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরান তা পাত্তাই দেয়নি। এমনকি সশরীর বৈঠকের জন্য ট্রাম্পের দেওয়া একটি প্রকাশ্য প্রস্তাবের কোনো জবাবই দেননি নতুন এ সর্বোচ্চ নেতা।

এ পরিস্থিতি সত্ত্বেও ট্রাম্প ইরানে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশা ছাড়েননি। গত এপ্রিলের শেষের দিকে তিনি বলেন, ‘ইরান যদি একটি চুক্তি করে, তবে তারা নিজেদের খুব ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে।’ তাঁর মতে, চুক্তি করলে ইরান ‘একটি বৈধ দেশে পরিণত হতে পারে, মৃত্যু আর আতঙ্কের কোনো দেশ হিসেবে নয়।’

অবশ্য ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন যে তাঁরা হরমুজ প্রণালি এবং নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিষয়গুলো নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। তবে ট্রাম্পের মূল দাবিগুলোর একটি বড় অংশ তাঁরা শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছেন।

‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চেয়ে ইরানিরাই ভালো বোঝেন’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তীব্র বিদ্বেষের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেশটির কোনো নেতাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে বড় কোনো সমঝোতা বা সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আগ্রহী নন। মাসের পর মাস ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের লেনদেন চললেও, দেশটির শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি এখনো কোনো স্পষ্ট ধারণা পাননি বলেই মনে হয়।

চলমান সংঘাতের পুরোটা সময় ট্রাম্প ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা ও তাঁর প্রতিনিধিদের মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান প্রতিনিয়ত বদলেছেন। তিনি কখনো তাঁদের ‘পাগল’, কখনো ‘যৌক্তিক’, কখনো ‘উন্মাদ স্বভাবের’, ‘অত্যন্ত বুদ্ধিমান’ কিংবা ‘একেবারেই উন্মাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ইরানের সঙ্গে একটি বড় চুক্তি করার আশা নিয়ে ট্রাম্পের পূর্বসূরি কয়েকজন প্রেসিডেন্টও ঠিক একই ধরনের হতাশাজনক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক পরিচালক সুজান ম্যালোনি বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের আদর্শিক প্রতিশ্রুতি এবং তাদের গভীরভাবে গেঁথে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামোকে ক্রমাগত অবমূল্যায়ন করে এসেছেন।’

নীতিনির্ধারকদের এ ব্যর্থতার একটি বড় কারণ, মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ নেতাদের সরাসরি যোগাযোগের অভাব। কোনো মার্কিন কর্মকর্তা কখনোই ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, সদ্যপ্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কিংবা তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনির সঙ্গে সশরীর সাক্ষাৎ করার সুযোগ পাননি।

সুজান ম্যালোনির মতে, চলমান যুদ্ধ ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্বের ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে দেশটিতে এই মুহূর্তে বিকল্প কোনো শক্তিশালী ক্ষমতা কেন্দ্র গড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ।

ইরানের আধা-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একজন প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট থাকলেও, সবকিছুই মূলত সর্বোচ্চ নেতার পূর্ণ ধর্মীয় কর্তৃত্বের অধীন পরিচালিত হয়। অতীতে এ ব্যবস্থার ভেতরেই কখনো কখনো এমন কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার উত্থান ঘটেছে, যাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে ছিলেন। বিভিন্ন সময় ওয়াশিংটন তাঁদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলেও, শেষ পর্যন্ত তা শুধু অনুশোচনা আর ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

দুই মার্কিন রাজনৈতিক দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) প্রেসিডেন্টদের অধীনেই মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতিতে দীর্ঘকাল কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রবীণ কূটনীতিক ডেনিস রস পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে আমাদের চেয়ে ইরানিরাই হয়তো অনেক ভালো বোঝেন।’

‘তিক্ত হতাশা’

১৯৮০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তেহরানের মার্কিন দূতাবাস থেকে আগের বছর জিম্মি হওয়া ৫২ জন মার্কিনকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একটি গোপন আলোচনার অনুমোদন দেন। কার্টারের ডায়েরির পাতা থেকে জানা যায়, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতোই তিনিও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশল এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যকার কোন্দলের মতো খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত গভীরভাবে ভাবতেন।

১৯৮০ সালের শুরুর দিকে কার্টার ভেবেছিলেন যে তিনি জিম্মিদের মুক্ত করার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পেরেছেন। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ইরানের অবরুদ্ধ শত কোটি ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেওয়া ও দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ওয়াশিংটন কোনো হস্তক্ষেপ করবে না—এমন কিছু প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কার্টারের ভাষায় এটা ছিল এক ‘তীব্র হতাশা’।

কেননা, ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি সেই প্রস্তাব এক ঝটকায় নাকচ করে দেন। খোমেনির এ আকস্মিক সিদ্ধান্ত মার্কিন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাঁর নিজের অধীনস্থদেরও পুরোপুরি অন্ধকারে ফেলে দিয়েছিল। পরে কার্টার জিম্মিদের উদ্ধারে একটি সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলেও তা ব্যর্থ হয়। অবশেষে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর কার্টারের প্রেসিডেন্ট পদের শেষ দিনে এসে এক চুক্তির মাধ্যমে ওই মার্কিনরা মুক্তি পান।

গোপন অস্ত্রচুক্তি

এ ঘটনার ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৯৮৫ সালে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান তাঁর সহযোগীদের একজন ইরানি অস্ত্র ব্যবসায়ীর পাঠানো একটি বার্তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন।

বার্তায় দাবি করা হয়েছিল যে খোমেনি মারা যাওয়ার পর ইরানের কিছু মধ্যপন্থী কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হতে পারেন। রিগ্যান এটিকে পরবর্তী সময়ে একটি ‘কৌশলগত সুযোগের সন্ধান’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। লেবাননে জিম্মি থাকা মার্কিনদের মুক্তির বিনিময়ে ইরানের কাছে গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেন। তবে এ পুরো প্রক্রিয়াটি পরে ইতিহাসে কুখ্যাত ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিতি পায়। কারণ, মার্কিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ওই অস্ত্র বিক্রির টাকা গোপনে নিকারাগুয়ার একটি কমিউনিস্ট-বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘কন্ট্রাস’-এর তহবিলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ গোপন লেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর রিগ্যানের প্রেসিডেন্সি এক বড় কেলেঙ্কারির মুখে পড়ে। ঘটনার জেরে কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তা দোষী সাব্যস্ত হন এবং রিগ্যানের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত মরীচিকা বলেই প্রমাণিত হয়। তেহরানে কোনো মধ্যপন্থী নেতার দেখা পাওয়া যায়নি। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) পরে জানতে পারে যে পুরো প্রক্রিয়ার ‘হোতা’ সেই ইরানি অস্ত্র ব্যবসায়ী আসলে একজন ‘প্রতারক’ ছিলেন।

এদিকে এ ঘটনার প্রধান বিষয়গুলো নিজের অজানা ছিল দাবি করে প্রেসিডেন্ট রিগ্যান পরবর্তী সময় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে ক্ষমা চান। তবে ইরানি মধ্যপন্থীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির মূল লক্ষ্যটির পক্ষে তিনি নিজের অবস্থান বজায় রেখেছিলেন।

প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে ১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরও একটি বাস্তব সুযোগ আসে। সে বছর ইরানে সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং এমনকি দূতাবাসে মার্কিন জিম্মি সংকটের ঐতিহাসিক ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। এটি ছিল একটি প্রকৃত ও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

জবাবে ক্লিনটনও ইরানের পেস্তা ও কার্পেট আমদানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেন। একই সঙ্গে ইরানের পুরোনো কিছু ক্ষোভ ও অভিযোগের যৌক্তিকতা স্বীকার করে সমঝোতামূলক বক্তব্য দেন। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেডেলিন অলব্রাইট তো ১৯৫৩ সালে ইরানে এক সামরিক অভ্যুত্থানে সিআইএর সমর্থন দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমাও চান। এ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল, যিনি দেশটির পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত তেলশিল্পকে জাতীয়করণ করেছিলেন।

তবে ইরানের শক্তিশালী কট্টরপন্থী নেতারা প্রেসিডেন্ট খাতামির এ উদারপন্থী দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা করেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হলে তাঁদের পশ্চিমা–বিরোধী আদর্শের মূল ভিত্তিই হুমকির মুখে পড়ত।

অলব্রাইটের সেই বক্তব্যের কয়েক দিন পর, ইরানের নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বে আসা) মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সব সম্ভাবনা এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেন।

আন্তর্জাতিক শান্তিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ওয়াশিংটনের কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ করিম সাদজাদপুরের মতে, প্রেসিডেন্ট খাতামি পরে ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছিলেন যে খামেনি বিশ্বাস করতেন—ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ছাপিয়ে গেছে ইরান

ইরানের সঙ্গে বড় কোনো কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছেন শুধু সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১৫ বছরের জন্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়। এর বিনিময়ে শিথিল করা হয় দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।

ওবামা প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা আশা করেছিলেন, আরেক মধ্যপন্থী ইরানি নেতা হাসান রুহানির সঙ্গে করা ওই চুক্তি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রথম ধাপ হবে। কিন্তু সেটি আর হয়নি। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি চুক্তির অনুমোদন দিলেও সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার কোনো আগ্রহ দেখাননি।

ওবামার সমালোচকেরা তখন বলেছিলেন, আয়াতুল্লাহ খামেনির এ আচরণই প্রমাণ করে যে রুহানির ওপর ভরসা করা আর অতীতে খাতামির ওপর ভরসা করা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

যুক্তরাষ্ট্রকে যে বিশ্বাস করা যায় না—ইরানের এমন দীর্ঘদিনের সন্দেহ খুব দ্রুতই সত্য বলে প্রমাণিত হয়। ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (তাঁর প্রথম মেয়াদে) হুট করেই সেই পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেন এবং চুক্তির আগের চেয়েও আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তেহরানের ওপর চাপিয়ে দেন। জবাবে তেহরানও তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরদার করে।

এমন পরিস্থিতি দুই দেশকে গত বছর এক সহিংস সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়। ওই সংঘাতের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন।

সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রস বলেন, তখন থেকেই ইরান প্রতিনিয়ত ওয়াশিংটনকে কূটনীতিতে টেক্কা দিয়ে যাচ্ছে এবং যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের স্পষ্ট অধৈর্য মনোভাব ইরানের কৌশলকে আরও সহজ করে তুলেছে।

রস পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমাদের তাড়াহুড়াকে তারা একধরনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমরা সব সময় সবকিছু দ্রুত শেষ করতে চাই। আর তারা এ নীতিতে কাজ করে যে—সময় আমাদের চেয়ে তাদের স্বার্থকেই বেশি রক্ষা করবে।’

* অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্‌

সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি ই-৩ সেন্ট্রি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় মার্কিন বিমানবাহিনীর একটি ই-৩ সেন্ট্রি উড়োজাহাজ ধ্বংস হয়। ফাইল ছবি: রয়টার্স

পলাতক স্বৈরশাসকদের পরিণতি কী হয় by আলী রীয়াজ

অনিবার্য কিন্তু অভাবনীয় একটি ঘটনা ঘটেছিল আজ থেকে দুই বছর আগে, ৫ আগস্ট ২০২৪—স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার পতন এবং পলায়ন। প্রায় ১৬ বছর ধরে নিপীড়ন–নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশের মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছিল এর আগের ৩৫ দিনের আন্দোলনে।

জনগণ যখন স্বৈরাচারী শাসকের অত্যাচারের ভয়কে জয় করে, তখন ওই শাসকের পতন হয়ে ওঠে অনিবার্য; ৫ আগস্টের আগেই বাংলাদেশ সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। ফলে ৫ আগস্ট ছিল তারই শেষ পর্ব। হাসিনার পলায়নও একার্থে অবশ্যম্ভাবীই ছিল। দেশে দেশে স্বৈরশাসকেরা জনগণের ক্ষোভের মুখে পালিয়েই যান। শেখ হাসিনা দম্ভোক্তি করতেন, ‘শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ কখনো পালায় না, পালিয়ে যায়নি কখনো।’

হাসিনার পলায়নের দুই বছর হয়েছে। ইতিমধ্যে পলাতক অবস্থায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এই সময়ে তিনি ভারতে আশ্রিত অবস্থায় আছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিত হন, বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলেন। কিন্ত তাঁর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কী? অতীতে বিভিন্ন দেশে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক শাসকদের কী হয়েছে, সম্ভবত তা আমাদের ধারণা দিতে পারবে, শেখ হাসিনার জন্য ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করতে পারে।

লোকচক্ষুর আড়ালে জীবনাবসান

যেসব স্বৈরশাসক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশত্যাগে সক্ষম হন না বা তাঁর সমর্থকদের নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন, তাঁরা নির্মম হত্যাকাণ্ডের সম্মুখীন হন। লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির ইতিহাস ২০১১ সালের; রোমানিয়ার নিকোলাই চচেস্কু ১৯৮৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পলায়নের সময় সস্ত্রীক বিক্ষোভকারীদের হাতে ধরা পড়েন এবং তাঁদের হত্যা করা হয়।

যাঁরা পালিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে পেরেছিলেন, তাঁদের কারও কারও পরিণতি হয় নীরবে-লোকচক্ষুর আড়ালে জীবনাবসান। ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের পর, পলাতক রেজা শাহ পাহলভি অসুস্থ অবস্থায় কায়রোতে মৃত্যুর আগপর্যন্ত মাত্র দেড় বছরে ছয়টি দেশে আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরেছেন। ফিলিপাইনে ২০ বছর দেশ শাসনের পর ১৯৮৬ সালে ফার্দিনান্দ মার্কোস ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে আশ্রয় নেন, সেখানে তিনি ১৯৮৯ সালে মারা যান।

আফ্রিকার দেশ চাদের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেন হাবরের ১৯৯০ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে যান সেনেগালে; সেখানেই ২০২১ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিউনিসিয়ার শাসক জেইন বেন আলী ২০১১ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর সৌদি আরবে আশ্রয় নেন, ২০১৯ সালে তিনি মারা যান। এসব শাসক তাঁদের শাসনকালে নিজ দেশ ও সারা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলেও তাঁদের মৃত্যুসংবাদ মোটেই গুরুত্ব পায়নি, তাঁদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন বা খবরও অনেকের অজ্ঞাতেই ঘটেছে।

নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন

পলাতক শাসকদের এক বড়সংখ্যকই অন্য দেশে আশ্রয়লাভের পর রাজনৈতিক জীবন থেকে কার্যত অবসর গ্রহণ করেন এবং সবার অজ্ঞাতে নিষ্ক্রিয় জীবন যাপন করেন। সিরিয়ার বাশার আল–আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে রাশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, কিন্তু তার পর থেকে তাঁর অবস্থান বিষয়ে কিছুই জানা যায়নি, তাঁর কাছ থেকে কোনো ধরনের বক্তব্যও শোনা যায়নি।

আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান আশরাফ গনির ক্ষেত্রেও তা–ই। তালেবান কাবুল দখল করলে ২০২১ সালের আগস্টে তিনি পালিয়ে আশ্রয় নেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ইউক্রেনে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে; প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় পলায়ন করেন। এত দিন বলা হচ্ছিল যে তিনি রোস্টভ শহরে বাস করছেন।

কিন্তু এ বছরের জুলাই মাসে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে তিনি ছদ্মনাম ধারণ করে সোচি শহরে বাস করছেন। ধারণা করা হয় যে আশ্রয়দাতা দেশগুলো কূটনৈতিক বিবেচনায় পলাতকদের এই শর্তেই আশ্রয় দিয়ে থাকে।

পরাজিত, পর্যুদস্ত এবং কার্যত তাঁর সমর্থকদের থেকে বিচ্ছিন্ন এসব সাবেক শাসক নিজেরাও আর রাজনীতিতে ফিরতে আগ্রহী হন কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। তা ছাড়া ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত ব্যাপক সম্পদ দিয়ে বিলাসবহুল জীবন যাপন করতেই তাঁরা সম্ভবত স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

প্রত্যর্পণ

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পলাতক এসব শাসককে নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে বিচারের সম্মুখীন করার চেষ্টা হলেও এর সাফল্য বেশি নয়। ১৯৯১ সালে গৃহযুদ্ধের পটভূমিতে ইথিওপিয়ার শাসক মেঙ্গেতসু হাইলে মারিয়াম জিম্বাবুয়ে পালিয়ে গেলে তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করা হয়।

ইথিওপিয়া সরকার তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও জিম্বাবুয়ের সরকার তাতে রাজি হয়নি। জিম্বাবুয়ের শাসক রবার্ট মুগাবের পতনের পর এ রকম ইঙ্গিত ছিল যে হাইলে মারিয়ামকে প্রত্যর্পণ করা হবে। কিন্তু তা ঘটেনি।

পেরুর শাসক ফুজিমোরি ২০০০ সালে পালিয়ে জাপানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পেরু সরকারের প্রত্যর্পণের অনুরোধ জাপান প্রত্যাখ্যান করে এ যুক্তিতে যে তিনি একই সঙ্গে জাপানের নাগরিক। তবে ফুজিমোরি ২০০৫ সালে স্বেচ্ছায় চিলিতে আসেন, পেরু সরকারের জারি করা একটি আন্তর্জাতিক ওয়ারেন্টের ভিত্তিতে তাঁকে সেখানে আটক করা হয়। ২০০৭ সালে চিলি তাঁকে পেরুর কাছে প্রত্যর্পণ করে।

কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট কুরমানবেক বাকিয়েভ ২০১০ সালে বেলারুশে পালিয়ে যান। কিরগিজ সরকার তখন থেকে বাকিয়েভের প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে, বেলারুশ তাতে কর্ণপাত করছে না; বেলারুশে বাকিয়েভ সরকারি আতিথ্যেই আছেন।

বিচার

পলাতক ব্যক্তিদের নিজ দেশে তাঁদের অনুপস্থিতিতে বিচারের ঘটনা স্বাভাবিক বলেই বিবেচিত। ইথিওপিয়ার হাইলে মারিয়ামের বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে বিচার শুরু হয় ১৯৯৪ সালে। ২০০৬ সালে এই মামলার শেষে তাঁকে আদালত যাবজ্জীবন দণ্ড প্রদান করেন। ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতে করা আপিলের রায়ে তাঁর যাবজ্জীবন দণ্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

তিউনিসিয়ার আদালত ২০১২ সালে একাধিক মামলায় সাবেক শাসক বেন আলী ও তাঁর স্ত্রীকে বিচার করে যাবজ্জীবন, ৩৫ বছর এবং ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন। কিরগিজস্তানের পলাতক রাষ্ট্রপ্রধান কুরমানবেক বাকিয়েভকে ২০১০ সালের অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট ব্লেইস কম্পাওরে ২৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৪ সালে এক গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে আইভরিকোস্টে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ২০২২ সালে দেশের আদালত তাঁকে তাঁর পূর্বসূরিকে হত্যার মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ব্লেইস কম্পাওরে ইতিমধ্যে আইভরিকোস্টের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।

অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বিশ্বের কয়েকজন স্বৈরশাসক। ইরানের রেজা শাহ পাহলভি, সিরিয়ার বাশার আল আসাদ, রোমানিয়ার নিকোলাই চচেস্কু, তিউনিসিয়ার শাসক জেইন বেন আলী এবং বাংলাদেশের শেখ হাসিনা।
অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বিশ্বের কয়েকজন স্বৈরশাসক। ইরানের রেজা শাহ পাহলভি, সিরিয়ার বাশার আল আসাদ, রোমানিয়ার নিকোলাই চচেস্কু, তিউনিসিয়ার শাসক জেইন বেন আলী এবং বাংলাদেশের শেখ হাসিনা। কোলাজ: প্রথম আলো

মিশিগানে আবদুল আল-সাইয়েদের জয়ের পরও ইসরায়েলপন্থী আইপ্যাক আলোচনায়, কিন্তু কেন

আল–জাজিরাঃ যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটের প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক নির্বাচনে (দলীয় প্রাইমারি) জয়ী হয়েছেন প্রগতিশীল জনস্বাস্থ্যকর্মী আবদুল আল-সাইয়েদ। তাঁর এ জয়কে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (আইপ্যাক) জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো নির্বাচনী প্রচারে ছয় কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেও সফল হতে পারেনি। তাদের সমর্থিত প্রার্থী কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে মিশিগানের এ আসনে প্রথম মুসলিম হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন আবদুল আল-সাইয়েদ।

ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার ১২ ঘণ্টার বেশি সময় পর গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্র–ভিত্তিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও অন্যান্য প্রধান গণমাধ্যম আল-সাইয়েদের জয়ের খবর নিশ্চিত করে।

গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের ফল আইপ্যাকের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের দলীয় প্রাথমিক বাছাইয়ে আল-সাইয়েদকে হারাতে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা নেয় সংগঠনটি। ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শুধু আইপ্যাকই স্টিভেন্সের প্রচারে তিন কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।

আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে আল-সাইয়েদ রিপাবলিকান দলের সাবেক কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সের মুখোমুখি হবেন। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের মধ্যে মিশিগানের এ আসনটি অন্যতম। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা এ আসনের ফলই নির্ধারণ করে দিতে পারে।

মিসরীয় বংশোদ্ভূত আবদুল আল-সাইয়েদ নভেম্বরে জয়ী হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম মুসলিম সিনেটর।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেওয়া দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য মিশিগানের এই ফল মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির নীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

আল-সাইয়েদ গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনকে ‘জাতিগত নিধন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, যেসব যুদ্ধে অর্থ ব্যয় করলে মূলত ইসরায়েলই লাভবান হয়, সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত।

কোনো প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন না দেওয়া নিরপেক্ষ সংগঠন আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক মায়া বেরি প্রাথমিক বাছাইয়ে আল-সাইয়েদের জয়কে বড় ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন।

মায়া বেরি বলেন, নির্বাচনী প্রচারে কোনো নীতিগত আলোচনা ছাড়া শুধু আবদুল নামের একজন আরব–আমেরিকান মুসলিমকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। ভোটাররা এ ধরনের নেতিবাচক প্রচারে প্রভাবিত হননি।

আল-জাজিরাকে মায়া বেরি বলেন, ‘মিশিগানের মানুষ যে এ ধরনের নোংরা রাজনীতি মেনে নেবে না, সেটা দেশের সবাই জানতে পারবে—এতে আমি খুবই আনন্দিত।’

প্রচারের সময় স্টিভেন্স ও তাঁর সমর্থকেরা আল-সাইয়েদকে নারীবিদ্বেষী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। আরব–আমেরিকান অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে আরব পুরুষদের নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

স্টিভেন্স ইসরায়েলের একজন দৃঢ় সমর্থক। ২০২২ সালেও আইপ্যাকের সমর্থনে তিনি প্রগতিশীল ইহুদি আইনপ্রণেতা অ্যান্ডি লেভিনকে পরাজিত করেছিলেন।

মঙ্গলবারের এ ফলাফল ডেমোক্রেটিক পার্টির ইসরায়েলপন্থী অংশের জন্য সাম্প্রতিক আরেকটি নির্বাচনী ধাক্কা। কারণ, দলটির তৃণমূল সমর্থক এবং সামগ্রিকভাবে মার্কিন জনমতের একটি বড় অংশ এখন ইসরায়েল সম্পর্কে আগের তুলনায় বেশি সমালোচনামুখর।

জনমত জরিপে আল-সাইয়েদের জয়ের আভাস থাকলেও স্টিভেন্স প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেন। বিশেষ করে মিশিগানের সবচেয়ে বড় শহর ডেট্রয়েটে তিনি শক্ত অবস্থান গড়ে তোলেন। রাত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তিনি আল-সাইয়েদের ব্যবধানও কমিয়ে আনেন। ফলে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পর কয়েক ঘণ্টা জয়-পরাজয় নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল।

গতকাল বুধবার সকালে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে আল-সাইয়েদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘মিশিগান...আমরা জিতেছি। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হতে পেরে আমি গর্বিত। এবার নভেম্বরে জয়ের পথে এগিয়ে চলুন।’

এপি আল–সাইয়েদের জয় নিশ্চিত করার পরপরই হ্যালি স্টিভেন্স তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং সাধারণ নির্বাচনে সমর্থনের ঘোষণা দেন।

এক বিবৃতিতে স্টিভেন্স বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন জেতায় আবদুল আল-সাইয়েদকে অভিনন্দন। তিনি একজন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা, রোডস স্কলার এবং নিবেদিতপ্রাণ মিশিগানবাসী। মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে সাধারণ নির্বাচনে আমি তাঁকে সমর্থন করছি।’

প্রাইমারি থেকে কয়েক সপ্তাহ আগে সরে দাঁড়ানো অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা ম্যালরি ম্যাকমরোও আল-সাইয়েদকে সমর্থন জানান।

এ ছাড়া প্রাইমারিতে স্টিভেন্সকে সমর্থন দেওয়া মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার এবং সিনেটর গ্যারি পিটার্সও বুধবার সাধারণ নির্বাচনে আল-সাইয়েদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন।

ঐক্যের আহ্বান

এখন আল-সাইয়েদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ করা। জয় নিশ্চিত হওয়ার আগেই সমর্থকদের উদ্দেশে আল-সাইয়েদ বলেন, ‘এখন থেকে আমাদের ভাঙা সম্পর্কগুলো জোড়া লাগাতে হবে।’

আল-সাইয়েদ আরও বলেন, ‘আমি সবার কাছে একটি অনুরোধ করব, জয়ের পর যেন উদারতা দেখাই। “আমি তো আগেই বলেছিলাম”—এমন মনোভাব নয়। আমাদের এমন একটি আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যা আরও বড়, আরও শক্তিশালী এবং আরও প্রভাবশালী হবে। এমন একটি আন্দোলন, যা এই অঙ্গরাজ্যের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছাবে এবং আমাদের মনে করিয়ে দেবে, আমরা আসলে কী হতে পারি।’

আল-সাইয়েদ বলেন, সাধারণ নির্বাচনে মাইক রজার্স ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ধরনের রাজনৈতিক আক্রমণ চালাবেন, তার তুলনায় প্রাইমারির এই লড়াই অনেক ছোট। তিনি বলেন, ‘মাইক, আমি জানি আপনি শুনছেন, আমরা আসছি।’

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আল-সাইয়েদের জয়কে রিপাবলিকানদের জন্য ‘সুসংবাদ’ বলে মন্তব্য করেছেন।

মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে সিনেটর পদে টেলিভিশন বিতর্কে ডেমোক্রেটিক দলের প্রাথমিক বাছাইয়ের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল আল-সাইয়েদ ও হ্যালি স্টিভেন্স
মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে সিনেটর পদে টেলিভিশন বিতর্কে ডেমোক্রেটিক দলের প্রাথমিক বাছাইয়ের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল আল-সাইয়েদহ্যালি স্টিভেন্স। ছবি: রয়টার্স

বিয়ে করে সংসার করব—এমন মানুষ এখনো পাইনি

প্রকাশ ২৯ জুলাই ২০২৫ঃ নাচ দিয়ে শুরু হলেও তমা মির্জা এখন পুরোপুরি চলচ্চিত্রের মানুষ। সমালোচকদের প্রশংসার পাশাপাশি পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। গত কয়েক বছরে যে কয়টি ছবিতে অভিনয় করেছেন, প্রতিটির চরিত্রই ছিল ভিন্ন। সর্বশেষ ‘দাগি’ সিনেমায় তাঁর অভিনয়ও আলোচিত হয়েছে। এরপর একাধিক নতুন সিনেমা ও ওয়েব সিরিজে অভিনয়ের গুঞ্জন শোনা গেলেও কোনোটিরই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। কী করছেন তমা মির্জা, খবর নিলেন মনজুর কাদের

পবিত্র ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া শিহাব শাহীনের ছবি ‘দাগি’তে দর্শকনন্দিত হয়েছে তমা মির্জার অভিনয়। তার আগে চরকিতে মুক্তি পাওয়া ওয়েব ফিল্ম ‘আমলনামা’তেও প্রশংসা কুড়ান এই অভিনেত্রী। সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রবোদ্ধারাও বলছেন, অভিনয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন তমা।

তবে এরপর আর তাঁর নতুন কোনো কাজের ঘোষণা আসেনি। এই অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করলে তমা বললেন, ‘আসলে এখনই কিছু বলতে চাই না। একাধিক ছবির বিষয়ে কথা হয়েছে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও পরিচালকদের সঙ্গে একাধিকবার আলাপ হয়েছে। কোন ছবির কাজ আগে শুরু করব, এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে এটুকু বলতে পারি, যা হবে, হয়তো দারুণ কিছুই হবে।’

তমার ভাষায়, ‘দাগি’ ও ‘আমলনামা’ তাঁর ক্যারিয়ারে বিশেষ মাত্রা যুক্ত করেছে, ‘দুটি ছবির গল্প ও চরিত্র একেবারে আলাদা। একজন অভিনেত্রী হিসেবে এ ধরনের ভিন্নতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দর্শকও চান অভিনয়শিল্পীকে বিভিন্ন রূপে দেখতে। এতে করে তাঁদের আগ্রহ তৈরি হয়, পরবর্তী কাজের জন্য অপেক্ষা করেন।’

নিজের অভিনয়কে কেমনভাবে দেখেন, জানতে চাইলে তমা বলেন, ‘পর্দায় নিজেকে দেখে ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে, আমি পরিশ্রম করেছি। বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয়ের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটা কিছুটা হলেও ফুটে উঠেছে। আমাদের চলচ্চিত্রজগৎ ছোট, কাজের পরিসর সীমিত। ঈদকেন্দ্রিক বড় বাজেটের ছবিগুলো ব্যবসাসফল হলেও বাকিগুলোর বাণিজ্যিক সাফল্য কম। এ পরিস্থিতিতে পরপর দুটি কাজ প্রশংসিত হলে তা যে কতটা ইতিবাচক, তা বলে বোঝানো যাবে না।’ একটু থেমে তমা আরও বলেন, ‘আমার যেন দুটো ডানা আছে, কিন্তু ডানা মেলে উড়তে পারছি না। তখন আকাশটাই ছোট মনে হয়। শিল্পীর নিয়মিত কাজ থাকা উচিত। বছরে যদি তিন থেকে চারটি মানসম্মত কাজ করা যায়, তাহলে নিজেকে আরও গড়েপিটে তোলা যায়, দর্শকের ভালোবাসাও মেলে।’

অবসর কই

চার বছর আগে প্রবাসী এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে সংসারজীবনের ইতি টানেন তমা মির্জা। ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’তে নিজেকে ভেঙে নতুন করে তৈরি করেন তমা। এরপর ‘৭ নাম্বার ফ্লোর’ দিয়ে আবারও জ্বলে ওঠেন। সময় যত যাচ্ছে, ততই যেন তাঁর অভিনয়ে নতুন আলো ফুটছে। অনেকের মতে, ‘ফ্রাইডে’, ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’, ‘সুড়ঙ্গ’, আমলনামা’ ও ‘দাগি’—এই কয়েকটি কাজেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন, পেয়েছেন দর্শকের ভালোবাসা। ওপার বাংলার পরিচালক অঞ্জন দত্তর পরিচালনায় ‘দুই বন্ধু’ নামে একটি সিরিজেও কাজ করেছেন।

তবে এ মুহূর্তে কোনো শুটিং নেই, নতুন গল্প শোনা, সিনেমা দেখা আর নিজেকে সময় দেওয়ার মধ্যেই কেটে যাচ্ছে দিন। ‘সিনেমা দেখতে খুব ভালোবাসি। সব ধরনের সিনেমাই দেখি—নতুন, পুরোনো, দেশি, বিদেশি। সম্প্রতি “সাইয়ারা” দেখলাম। ছবির নায়িকার অভিনয় দেখে সত্যি মুগ্ধ হয়েছি। ছোট ছোট এক্সপ্রেশন, চোখেমুখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিয়েছেন। ভাবছিলাম, আমি যদি এ ধরনের চরিত্রে কাজ করি, এমন এক্সপ্রেশন দিতে পারব কি না! এই ভাবনাগুলো মাথায় ঘোরে,’ বললেন তমা।

যখন অভিনয়ের বাইরে থাকেন, নিজেকে সময় দেন তমা। পরিবারকে সময় দেন। গান শোনেন, বই পড়েন, রান্না করেন। তাঁর কাছে রান্নাও একটি শিল্প। বলেন, ‘রান্না করতে ভালোবাসি। গরুর মাংস, মুরগি, হাঁস, খাসি—সব মাংসের কারি আমার হাতে ভালো হয়, সবাই মজা করে খায়। রান্না করে খাওয়াতে ভালো লাগে। নতুন নতুন রেসিপি ট্রাই করি। এটা আমার জন্য আনন্দের কাজ।’

তবে রান্নার চেয়েও বেশি ভালোবাসেন একা থাকা। ‘এক কাপ চা হাতে নিয়ে ঘরের ভেতরে হেঁটে বেড়াই। ভাবি, জীবনে কী ভুল করেছি, কেন করেছি। কীভাবে শোধরানো যেত। এখনো কি কিছু ভুল করছি? ভবিষ্যতে ভুল যাতে না হয়, তার পরিকল্পনা করি। এই একাকিত্বই আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।’

পর্দার বাইরে রাফী-তমা

তমা মির্জার সাম্প্রতিক আলোচিত বেশির ভাগ কাজের পরিচালক রায়হান রাফী। তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথাও শোনা গেছে। কেউ কেউ বলেছিলেন, তাঁরা প্রেম করছেন, এমনকি বিয়েও করে ফেলবেন। তবে এ বিষয়ে তমার অবস্থান স্পষ্ট, ‘“সুড়ঙ্গ”র পর রায়হান রাফীর সঙ্গে বড় পর্দায় আমার আর কোনো কাজ হয়নি।ওটিটিতে একটি কাজ হয়েছে, তবে বর্তমানে আমাদের একসঙ্গে কাজের সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। অবশ্যই রাফী একজন ভালো পরিচালক। আমাদের কাজগুলো দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে, প্রশংসিত হয়েছে, এমনকি ব্যবসায়িক সাফল্যও পেয়েছে। এসব কারণেই হয়তো বলা হয়েছে, রাফী-তমা অফ স্ক্রিনেও একটি সফল জুটি। আগের কোনো বিষয় নিয়ে এখন কথা বলতে চাই না। কারণ, তা একান্তই ব্যক্তিগত। তবে এটা ঠিক, তারকাদের ব্যক্তিগত বিষয় খুব একটা ব্যক্তিগত থাকে না। তাই বলছি, আমাদের অফ স্ক্রিনে একসঙ্গে দেখার সম্ভাবনা একেবারেই নেই, আর অন স্ক্রিন সম্ভাবনাও আপাতত নেই।’

কথার সূত্র ধরে তমা আরও বললেন, ‘প্রেম, বন্ধুত্ব, বিয়ে—যেটাই বলা হোক বা না হোক, একসঙ্গে আড্ডা, দেখা বা কথাবার্তা—এসবকে আমি ছন্দপতন মনে করি না। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলায়। আমি আমার মতো করে আছি, আমরা আমাদের মতো করে এগোচ্ছি—এটাই সবচেয়ে ভালো। একই জায়গায় কাজ করি বলে দেখা হতেই পারে, কথাও হতে পারে, আড্ডাও হতে পারে।’

সংসারভাবনা

বিয়ে নিয়ে এখন তেমন করে ভাবছেন না তমা। আপাতত অভিনয়ই তাঁর প্রথম ও প্রধান ভাবনা। ‘সংসার করতে হলে আগে মনস্থির করতে হয়। কাউকে বিয়ে করে সংসার করব—এমন মানুষ এখনো পাইনি। জীবনের পথে চলতে গিয়ে অনেকেই বন্ধু হয়ে আসে, কেউ থেকে যায়, কেউ আবার চলেও যায়। আবার এটাও বলা যাবে না যে আমার জীবনে প্রেম একবারই এসেছিল। একজনকেই ভালোবেসেছি, আর কাউকে পারিনি—এটাও নিছক মিথ্যা হবে। প্রেম বারবার আসতে পারে। কেউ কেউ হয়তো ভালোবেসে সারা জীবন একজনের সঙ্গেই কাটিয়ে দেন। তবে এই সময়ে এসে এমন কাউকে পাওয়া সত্যিই কঠিন। জীবনের যেসব সময়ে প্রেম এসেছে, ভালোবাসা এসেছে, তখন হয়তো ভেবেছি, বিয়ে করব, সংসার করব, নিজেকে স্থির করব। কিন্তু এখন যেহেতু জীবনে এমন কেউ নেই, তাই তেমন কিছু ভাবছি না। তবে হঠাৎ বৃষ্টির মতো যদি কেউ আসে, যদি মনে হয় তাঁর সঙ্গে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব, তখনই বিয়ে করব,’ বললেন তমা।

তমা মির্জা
তমা মির্জা। ছবি: অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই’

অনলাইন একিক্টভিস্ট সাদিকুর রহমান খান বলেছেন,বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই।

বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘তারেক রহমানের ডাকে সরকার পড়লে হাসিনা সরকার পড়ার কথা ছিল ২৮ অক্টোবর। তারেক রহমানের ডাকে ১০ লাখ লোক ঢাকা আসলো। পুলিশ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথে ১০ মিনিটে ১০ লাখ পালাইয়া গেল। নেতা নাকি কর্মীরা আগে পালাইসিল, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আরও বড় প্রশ্ন, ১০ লাখ লোক কেমনে ১০ মিনিটে পালাইয়া যায়? এরা এসেছিল ক্ষমতার জন্য।

একজন মানুষও তারেক রহমানের ডাকে মরতে রাজি হয় নাই। একজনও না। নেতাও না। কর্মীও না। জুলাই আগস্টে মির্জা ফখরুলকে বারবার বলতে হইছে এই আন্দোলন আমাদের আন্দোলন না। আমরা এর সাথে জড়িত না। কারণ জুলাই বিএনপির আন্দোলন হইলে কোটি কোটি মানুষ এই আন্দোলনে আসতই না।

১৭ বছরে এক দফা কি কম দিসে?

একটা মানুষ পাত্তা দিসে?

দেয় নাই।

মানুষ যাইয়া শুনলো নাহিদ ইসলাম নামের অপরিচিত, অরাজনৈতিক একটা ছেলের কথা। ৩ আগস্ট নাহিদ ইসলামের এক দফাতেই সরকারের নৈতিক পতন হয়ে যায়। হাসিনা পরিবারের সবাই পালাতে শুরু করে ৩ তারিখ থেকেই। আর ৪ আগস্ট আসিফ মাহমুদ ঢাকা দখলের ডাক দেন। ৫ আগস্ট মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে ঢাকার রাজপথ দখলে নেয়। শহীদ হয় দুইশরও বেশি মানুষ। বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনদিন পালাইতে হয় নাই। কারণ হাসিনা জানত, পুলিশের বাঁশি শুনলেই এরা পালাবে। ১৭ বছর তো তাই পালাইসে।

জুলাইয়ে কারা রাজপথে ছিল, সেটা ডকুমেন্টারিতে দেখানোর কিছু নাই। মানুষ দেখেছে জুলাইয়ে কে লন্ডনে ছিল, কে শিলং এ ছিল আর কে ঢাকায় ছিল। এই জেনারেশনের সাথে তামাশা করে লাভ নাই। জুলাইয়ের নেতা কারা, জুলাইয়ের ইমাম কে, বাংলাদেশের একেবারে প্রত্যন্ত এলাকায় যাইয়া ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করেন, যান, ১০ সেকেন্ডে এই দেশের বাচ্চারা সাক্ষ্য দেবে নাহিদ, আসিফ, হাসনাত আর আখতারদের নাম।

জুলাইয়ের ইতিহাসে এই প্রজন্মের অন্তরে লেখা আছে। দুই পয়সার ডকুমেন্টারি দিয়ে সেই লেখা মুছতে পারবেন না। আপনাদের কর্মীরা হইলো ১০ মিনিটে সব রাইখা পালাইয়া যাওয়া বিড়ালের দল,

আর নাহিদের ডাকে যারা আসছিল, তাদের ব্যাপারে হাসিনার শুনতে হয়েছিল, একটা গুলি করি। একটা মরে, ঐ একটাই যায় স্যার। বাকিডি যায় না।

গুলি করে যেই জেনারেশনের সাথে হাসিনা পারে নাই, মিথ্যা ইতিহাস আর মিথ্যা ডকুমেন্টারি দিয়ে সেই জেনারেশনকে মুছে ফেলতে চাওয়ার দু:সাহস কেমনে হয় আপনাদের?’

‘বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই’

১১ বছর পর ‘মন বোঝে না’ মুক্তিতে তমার মন খারাপ

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ঃ সিনেমা মুক্তিতে নায়িকা তমা মির্জার যেখানে উচ্ছ্বাস থাকার কথা, সেখানে তিনি উল্টো বিরক্তি প্রকাশ করলেন। জানালেন মন খারাপের কথা, একই সঙ্গে বিরক্তও। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলেন চূড়ান্ত অপেশাদার আচরণের। ২০১৩ সালে শুটিং শুরু হওয়া ‘মন বোঝে না’ ছবির শুটিং পরের বছরে শেষ হয়। এরপর মুক্তি নিয়ে কোনো খবর ছিল না প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের। হঠাৎ করে সপ্তাহখানেক আগে জানা যায়, ছবিটি মুক্তি পাচ্ছে। গত শুক্রবার দেশের কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে ছবিটি মুক্তি পেয়েছে। তবে মুক্তির আগে–পরে ছবিটির প্রচারণায় নেই চিত্রনায়িকা তমা মির্জা ও চিত্রনায়ক আরিফিন শুভ। তাঁরা দুজনেই এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভিনয়শিল্পী।

‘মন বোঝে না’ ছবিটি দেশের কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। জানা গেছে, ২০১৩ সালে ছবিটির শুটিং হয় বাংলাদেশের মধ্যে ঢাকা, কুমিল্লা, গাজীপুর এবং শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন লোকেশনে। ২০১৪ সালে আরিফিন শুভ ও তমা মির্জা অভিনীত ছবিটির পুরো শুটিং শেষ হয়। অভিনয়শিল্পীরা তাঁদের পক্ষ থেকে সব কাজ শেষ করে দেন। ছবিটিও মুক্তির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তারপরও প্রযোজক মুক্তি দেননি।

আজ মঙ্গলবার বিকেলে কথা হয় তমা মির্জার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একজন প্রযোজক যখন কোনো ছবি বানান, তাঁর সেই ছবি মুক্তি দেওয়ার শতভাগ অধিকার রয়েছে। কিন্তু এখানে কথা হচ্ছে, আমি ছবি বানালাম, এরপর বছরের পর বছর মুক্তি না দিয়ে ফেলে রাখলাম, তা কী করে হয়। মুক্তির আগে আমরা যাঁরা প্রধান চরিত্রের অভিনয়শিল্পী, তাঁদের সঙ্গেও কোনো ধরনের আলাপ–আলোচনা নেই! মতামত জানার কোনো প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। এটা চূড়ান্তমাত্রার অপেশাদার আচরণ।’

‘মন বোঝে না’ ছবিটির পরিচালক আয়েশা সিদ্দিকা। ছবিটি প্রসঙ্গে তমা বললেন, ‘১১ বছর আগে আমরা শুটিং শেষ করেছি। ওই সময় অনুযায়ী ছবিটি সময়োপযোগী ছিল। অনেক টাকা বিনিয়োগ করে শুটিং করা হয়েছিল। আমরাও সেভাবে কাজ করেছি। এরপর দীর্ঘ সময়ে শুভ ভাই ও আমি—আমরা অনেকটাই বদলে গেছি। আমাদের অভিনয়, চিন্তাভাবনা ও আউটলুক—সবকিছুতে একটা পরিবর্তনও এসেছে। এই সময়ে এসে দর্শকেরা আমাদের সমসাময়িক কাজের সঙ্গে তুলনা করলে এটা ছবির জন্য ক্ষতি। ছবির ক্ষতি মানে তো প্রযোজকও ক্ষতিগ্রস্ত। আমার কেন জানি মনে হয়, একটা ছবির শুটিং শেষ হওয়ার তিন বছরের মধ্যে তা মুক্তির ব্যবস্থা করা উচিত। না হলে সেই ছবির মেরিট নষ্ট হয়। এতে শিল্পীরও সুনাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মানলাম, একজন প্রযোজক অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন; কিন্তু এত আগের একটি সিনেমা মুক্তি দেওয়াতে দর্শকেরা যেমন হতাশ, আমরাও তেমনি হতাশ।’

নাচ দিয়ে শুরু হলেও তমা মির্জা এখন পুরোপুরি চলচ্চিত্রের মানুষ। সমালোচকদের প্রশংসার পাশাপাশি পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। গত কয়েক বছরে যে কটি ছবিতে অভিনয় করেছেন, প্রতিটির চরিত্রই ছিল ভিন্ন। সর্বশেষ ‘দাগি’ সিনেমায় তাঁর অভিনয়ও আলোচিত হয়েছে। এর আগে চরকিতে মুক্তি পাওয়া ওয়েব ফিল্ম ‘আমলনামা’তেও প্রশংসা কুড়ান এই অভিনেত্রী। সাধারণ দর্শকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রবোদ্ধারাও বলছেন, অভিনয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন তমা। এরপর আর তাঁর নতুন কোনো কাজের ঘোষণা আসেনি। এই অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করলে তমা বললেন, ‘আসলে এখনই কিছু বলতে চাই না। একাধিক ছবির বিষয়ে কথা হয়েছে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ও পরিচালকদের সঙ্গে একাধিকবার আলাপ হয়েছে। কোন ছবির কাজ আগে শুরু করব, এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে এটুকু বলতে পারি, যা হবে, হয়তো দারুণ কিছুই হবে।’

তমার ভাষায়, ‘দাগি’ ও ‘আমলনামা’ তাঁর ক্যারিয়ারে বিশেষ মাত্রা যুক্ত করেছে, ‘দুটি ছবির গল্প ও চরিত্র একেবারে আলাদা। একজন অভিনেত্রী হিসেবে এ ধরনের ভিন্নতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দর্শকও চান অভিনয়শিল্পীকে বিভিন্ন রূপে দেখতে। এতে তাঁদের আগ্রহ তৈরি হয়, পরবর্তী কাজের জন্য অপেক্ষা করেন।’

‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’তে নিজেকে ভেঙে নতুন করে তৈরি করেন তমা। এরপর ‘৭ নাম্বার ফ্লোর’ দিয়ে আবারও জ্বলে ওঠেন। সময় যত যাচ্ছে, ততই যেন তাঁর অভিনয়ে নতুন আলো ফুটছে। অনেকের মতে, ‘ফ্রাইডে’, ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’, ‘সুড়ঙ্গ’, আমলনামা’ ও ‘দাগি’—এই কয়েকটি কাজেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন, পেয়েছেন দর্শকের ভালোবাসা। ওপার বাংলার পরিচালক অঞ্জন দত্তর পরিচালনায় ‘দুই বন্ধু’ নামে একটি সিরিজেও কাজ করেছেন। এ মুহূর্তে কোনো শুটিং নেই, নতুন গল্প শোনা, সিনেমা দেখা আর নিজেকে সময় দেওয়ার মধ্যেই কেটে যাচ্ছে দিন। ‘সিনেমা দেখতে খুব ভালোবাসি। সব ধরনের সিনেমাই দেখি—নতুন–পুরোনো, দেশি–বিদেশি,’ বললেন তমা।

তমা মির্জা
তমা মির্জা। ছবি : তমার ফেসবুক থেকে