Monday, November 8, 2010

সাহিত্যালোচনা- 'কবি ওলগা ফিওদোরোভনা বার্গলজ' অনুবাদঃ আন্দালিব রাশদী

১৯৭১ সালে সোভিয়েত মহাকাশবিজ্ঞানীরা একটি ছোট গ্রহ আবিষ্কার করেন এবং তার নাম দেন বার্গলজ, ত্রিশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি ওলগা ফিওদোরোভনা বার্গলজের নামে।

লেনিনগ্রাদের একটি মহাসড়ক তাঁর নামে, তাঁর জীবনোপাখ্যান নিয়ে রয়েছে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য নাটক অধিশব রহ গব, ইভান ফুলারের রচনা। সাহিত্যকর্মের জন্য প্রদেয় রাশিয়ার সর্বোচ্চ সম্মান ও পদক তিনি পেয়েছেন। মে মাসজুড়ে উদ্যাপিত হচ্ছে ওলগার জন্মশতবর্ষ জয়ন্তী। ১৯১০ সালের ১৬ মে তাঁর জন্ম সেন্ট পিটার্সবার্গের শহরতলিতে। তাঁর বাবা একজন চিকিৎসক। সহ-চিকিৎসকদের ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি করতে না চাওয়ায় তাঁর ওপর নেমে আসে দুঃসহ নির্যাতন।

অঞ্চলে বাঁধা চঞ্চল টাকা by ফারুক মঈনউদ্দীন

অর্থনীতিতে যে অলস অর্থ পড়ে থাকার কথাটি প্রায়ই শোনা যায়, সেটা মূলত ব্যাংক খাতের অবিনিয়োজিত তহবিলকেই বোঝানো হয়ে থাকে। বস্তুত, আজকাল কেউ আর ‘চঞ্চল টাকা অঞ্চলে’ বেঁধে রাখেন না। অঞ্চলে বাঁধা টাকা বলতে বোঝায় ঘরের সিন্দুকে নগদ টাকা রেখে দেওয়া। (অবশ্য ঘোষণা-অযোগ্য টাকা ব্যাংকে জমা রাখার সুযোগ না থাকলে অনেকেই ঘরের সিন্দুকে নগদ টাকা রেখে দিতে বাধ্য হন। চলতি দশকের প্রথম দিকে ভারতের পাঞ্জাব পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানের বাড়ি তল্লাশি করে গোয়েন্দা বিভাগ নগদ সাত কোটি রুপির সন্ধান পেয়েছিল, কঠোর ব্যাংক আইনের কারণে যা ব্যাংকে জমা দেওয়ার সুযোগ ছিল না)। অতএব বর্তমান বাস্তবতায় ঘরের সিন্দুকে রাখা টাকাকড়ি নয়, ব্যাংকের বিতরণযোগ্য ঋণের তুলনায় আমানতের অনুপাত বেশি থাকলে সেটাই অলস অর্থ বা তহবিল।
আমরা জানি, অর্থ বা টাকাকড়ির রয়েছে তিন ধরনের ভূমিকা: বিনিময়ের মাধ্যম, হিসাবের একক এবং মূল্যের ভান্ডার। টাকার উদ্ভব না হলে পণ্যসামগ্রীর বিনিময় সহজসাধ্য হতো না, হিসাবপত্র রাখা কঠিন হয়ে থাকত এবং কোনো জিনিসের সর্বজনস্বীকৃত মূল্য নির্ধারণ করাও সম্ভব হতো না। মূল্যের ভান্ডার হিসেবে স্বীকৃত অর্থের এই ভূমিকা অর্থনীতিবিদ কেইনসের অর্থভিত্তিক অর্থনৈতিক তত্ত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
মানুষের ভোগের চেয়ে আয় যখন বেশি হয়, তখনই অলস বা উদ্বৃত্ত অর্থের উদ্ভব ঘটে। এই উদ্বৃত্ত অর্থ বা তহবিলকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়। নগদ টাকা ঘরে রেখে দেওয়া যায়, নির্দিষ্ট সুদের হিসাবে অন্যকে ধার দেওয়া যায় অথবা মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করা যায়। মানুষ যদি নগদ টাকা অঞ্চলে বেঁধে রাখে, সেখান থেকে কোনো বাড়তি আয় হয় না। বিকল্প দুটি উপায় থাকা সত্ত্বেও মানুষ এককালে হয়তো নগদ টাকা ঘরের সিন্দুকে ফেলে রাখত, কেইনসও তেমন ধারণাই করেছিলেন। মানুষের এ প্রবণতা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ছিল যে, নগদ টাকা ঘরে রেখে দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ, অর্থাৎ বিনিয়োগ করা বা ধার দেওয়ার মধ্যে নিহিত ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। হাতে নগদ টাকাকড়ি থাকলে মানুষের মধ্যে যে নিরাপত্তাবোধ থাকে, টাকাকে অন্য কোনো সম্পদে রূপান্তরিত করে রাখলে সে নিরাপত্তাবোধ থাকে না। অথচ উদ্বৃত্ত অর্থ ধার দিলে তা থেকে সুদ আকারে বাড়তি আয়ের সুযোগ থাকে, মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করলে সুদের চেয়ে আরও বেশি আয় হতে পারে। তবু কেইনস মানুষের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে নগদ টাকা ধরে রাখার প্রবণতাকে উড়িয়ে দেননি। কারণ, নগদ টাকা ধরে রাখার বিকল্প যে দুটি পন্থা আছে, সেগুলো থেকে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা ও হাতছানি থাকলেও তার মধ্যে আছে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এবং লোকসানের ঝুঁকি। নগদ টাকা হাতের কাছে রাখার নিরাপত্তাবোধ সম্পর্কে মানুষের এই মনস্তত্ত্ব বিবেচনায় নেওয়ার কেইনসীয় ধারণার পেছনে সম্ভবত এ কারণ ছিল যে, তখনকার যুগে ব্যাংকব্যবস্থা ততটা সংহত ছিল না, সুদৃঢ় ছিল না ব্যাংকগুলোর ভিত্তি, সুলভ ছিল না ব্যাংক পরিষেবা এবং ছিল না বিচিত্র ও বিভিন্নমুখী ব্যাংকিং-সুবিধা।
অলস অর্থ ঘরে রেখে দেওয়ার এই মনস্তত্ত্বের পূর্বানুমান থেকেই কেইনস তাঁর সুদের হার-সম্পর্কিত মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে নগদ অর্থ ব্যবহারহীনভাবে ফেলে রাখলে সেটা দিয়ে কোনো প্রকৃত সম্পদ সৃষ্টি হয় না এবং অর্থনীতিতে রাখতে পারে না কোনো অবদান। সঞ্চিত অর্থের বিকল্প ব্যবহার, অর্থাৎ বিনিয়োগের ধারায় প্রবাহিত করা নিশ্চিত করা যায়, যদি বিকল্প বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা থেকে নিশ্চিত আয় সম্পর্কে পূর্ব-নিশ্চয়তা পরিমাপ করে দেওয়া যায়। এই পূর্ব-নিশ্চয়তার বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে কেইনসের সুদের হার তত্ত্বে। তাঁর মত ছিল, ঝুঁকি এড়ানোর জন্য নগদ টাকা ঘরে রেখে দেওয়ার মনুষ্য-প্রবৃত্তিকে পরিবর্তন করার জন্যই সুদ দেওয়া প্রয়োজন। অথচ ধ্রুপদি অর্থনীতিতে সুদকে দেখা হয়েছে সঞ্চয়ের পুরস্কার হিসেবে। বর্তমানে ভোগ না করে ভবিষ্যতে ভোগ করা হবে, এই ত্যাগের জন্যই সঞ্চয়কারীকে পুরস্কৃত করা উচিত—এটাই ছিল ধ্রুপদি অর্থনীতিবিদদের মতবাদ। অন্যদিকে কেইনস মনে করেন, চঞ্চল টাকাকে অঞ্চলে বেঁধে না রেখে বিনিয়োগের ধারায় প্রবাহিত করতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই সুদ দেওয়া প্রয়োজন। নগদ অর্থ ধরে রাখার এই মনুষ্য-প্রবৃত্তিকে কেইনস তুলে ধরেছেন তাঁর নগদপ্রিয়তা (লিকুইডিটি প্রেফারেন্স) তত্ত্বে, যার অর্থ নগদ টাকা ধরে রাখার চাহিদা। তাঁর মতে, মানুষের নগদপ্রিয়তার তিনটি উদ্দেশ্য থাকে: (১) লেনদেনের উদ্দেশ্য, অর্থাৎ স্বাভাবিক লেনদেন পরিচালনা করার জন্য মানুষের নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতা। যাদের হাতে টাকা থাকে, তারা যখন ইচ্ছা যেকোনো পণ্য কিনে নগদ টাকাকে পণ্যে রূপান্তরিত করতে পারে। মানুষের আয় যত বেশি হয়, লেনদেনের জন্য নগদ অর্থের চাহিদাও তত বেশি থাকে। (২) পূর্বসতর্কতার উদ্দেশ্য—আকস্মিক ব্যয় এবং জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য মানুষ নগদ অর্থ হাতের কাছে রাখতে চায়। (৩) ফাটকা বাজারির উদ্দেশ্য—সুদের হার কম হলে মানুষ ফাটকা বাজারে বিনিয়োগ করার জন্য নগদ টাকা হাতের কাছে রাখতে চায়, যাতে কোনো বিনিয়োগপত্রের (বন্ড) দাম কমলে সেটা তৎক্ষণাৎ কিনে ফেলা যায়। এখানে একটা বিষয় সহজেই বোঝা যায় যে, নগদপ্রিয়তা সুদের হারের বিপরীতানুপাতিকভাবে ওঠানামা করে, অর্থাৎ সুদের হার কম হলে নগদপ্রিয়তা বেশি থাকে আর সুদের হার বেশি হলে তার বিপরীত।
কেইনসের মতে, ফাটকা বাজারিতে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে যে তরল অর্থ হাতে মজুদ করে রাখা হয়, সেই নিষ্ক্রিয় টাকাকে সক্রিয় করে বিনিয়োগের ধারায় নিয়ে আসার জন্যই সুদ দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সুদকে সঞ্চয়ের পুরস্কার হিসেবে না দেখে অলস টাকাকে বিনিয়োগের ধারায় সম্পৃক্ত করার প্রণোদনা হিসেবে বিবেচনা করে কেইনস সুদের স্বরূপ সন্ধানে এক অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। ধ্রুপদি অর্থনীতিতে যখন মজুরি-খাজনা ইত্যাদির ধারণাকে সুদের সঙ্গে সমপর্যায়ে বিবেচনা করা হয়েছে, কেইনস তার বিপরীতে সুদকে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ তখনকার যুগে মানুষ যখন বিকল্প বিনিয়োগের পরিবর্তে নগদ টাকাকড়ি ঘরে রেখে দিত, সেই প্রবণতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সুদের হারকে একটা গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে উপস্থাপন করাই ছিল কেইনসের সুদের হার তত্ত্বের মূল ভিত্তি। আজকাল ব্যাংক পরিষেবা বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তার অভাবজনিত কারণেও মানুষ নগদ টাকা ঘরে ফেলে রাখে না। ফলে যেকোনোভাবেই হোক, মানুষের উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যাংক খাতের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বিনিয়োগের ধারায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু মানুষের জমাকৃত অলস অর্থ যখন ব্যাংকের সিন্দুকে কিংবা স্থিতিপত্রে উদ্বৃত্ত পড়ে থাকে, তখন আমরা সচেতন হওয়ার প্রয়াস পাই এবং দেশের অর্থনীতির নাড়ি ধরে বোঝার চেষ্টা করি এই উপসর্গের কারণ।
সুদের হার, তার উদ্ভব ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এই দীর্ঘ ভূমিকার কারণ আমাদের ব্যাংক খাতের তারল্য তথা অলস তহবিল। কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশের আমানত এবং ঋণ উভয়ের ওপরই সুদের তুলনামূলক উচ্চ হার নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হয়েছে এবং তার ফলে সুদের হারের কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতাও লক্ষ করা গেছে। এতে অবশ্যই লাভবান হয়েছে ব্যবসায়ী এবং শিল্পোদ্যোক্তা মহল এবং কিছুমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সামান্য কিছু সঞ্চয়স্পৃহা, পরিবর্তনের মোট ফলাফলে যার অবদান অনুল্লেখযোগ্য। কিন্তু সঞ্চয়ী মানুষের স্বাভাবিক এই আয়বঞ্চিতি অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রবাহিত হয়েছে, যার জন্য হয়তো আমাদের এবং সমগ্র অর্থনীতির পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়নি। প্রিয় পাঠক, নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এই খাতটি হচ্ছে আমাদের বিকাশমান শেয়ারবাজার। শেয়ারবাজারের আচমকা উচ্চকিত ভাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহল একই সঙ্গে উল্লসিত এবং চিন্তিত; কারণ সুদের হার কমে যাওয়ার কারণে বহু সঞ্চয়কারী তাঁদের সঞ্চয় নিয়ে ঢুকে পড়েছেন শেয়ারবাজারের মতো একটা অপরিচিত অনিশ্চিত রাজ্যে। এই নতুন প্রবণতার জন্য চাঙা হয়েছে শেয়ারবাজার, কিন্তু শঙ্কিত হয়েছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।
ব্যাংকের আমানতের ওপর সুদের হার কমে যাওয়ার কারণে গত বছর সাধারণ সঞ্চয়কারীরা সরকারি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকেছিলেন, কিন্তু বর্তমান বছরে সঞ্চয়পত্রের ওপর সুদের হার হ্রাস এবং সুদের ওপর আয়কর আরোপের পর সাধারণ মানুষের সঞ্চয়স্পৃহা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছে ৫৮০ কোটি টাকা। সুদের নিম্ন হারের কারণে সঞ্চয়ের অর্থ ভিন্ন খাত তথা শেয়ারবাজারে প্রবাহিত হওয়া অর্থনীতির সহজ ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মানুষের সঞ্চয় শেয়ারবাজারে খাটলেও সেটি থাকে ব্যাংকিং প্রবাহের মধ্যেই। ফলে দেশের ব্যাংক খাতে তারল্যের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না, যা ঋণের মূল্যকে করে তোলে আরও সুলভ। অন্যদিকে শেয়ারবাজার চলমান এবং সুদৃঢ় থাকলে অর্থনীতিতে শিল্পায়নের জন্য মূলধনের বিকল্প উৎস প্রসারিত হয়। কারণ, নতুন শিল্পোদ্যোগের জন্য ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পায়। একটা সুস্থ বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য স্থিতিশীল শেয়ারবাজার রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
কিন্তু আমাদের বিকাশমান মূলধন বাজারে শেয়ারের সরবরাহের তুলনায় বহু গুণ বেশি বিনিয়োগকারীর হঠাৎ লোভের হাতছানিকে যদি সঠিক পথে পরিচালিত করা না যায়, সেটা যেমন শেয়ারবাজারে ডেকে আনতে পারে বিপর্যয়, তেমনি নষ্ট করে দিতে পারে মানুষের আস্থা। বিনিয়োগকারীদের দায়িত্বশীল আচরণ, বাজার সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান এবং হঠাৎ লোভের হাতছানি থেকে বিরত থাকাই হবে বিকাশমান বাজারকে স্থিতিশীল রাখার প্রাথমিক পদক্ষেপ। বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বৃদ্ধি করার কার্যকর ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোকেও বিভিন্ন সচেতনতা ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে, যাতে যথাযথ প্রস্তুতিহীন বিনিয়োগকারীরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ করতে পারেন এবং তা করতে হবে আর বেশি কালক্ষেপণ না করে।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।
fmainuddin@hotmail.com

মধ্যবর্তী নির্বাচন, আমেরিকায়, বাংলাদেশে! by সোহরাব হাসান

‘ছাত্রলীগ’ না থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ডেমোক্রেটিক দল মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হয়েছে; বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রলীগকে সঙ্গে নিয়ে কীভাবে আগামী নির্বাচনে জয়ী হবেন?
এই প্রশ্নটি জোরালোভাবে উঠেছে আওয়ামী লীগের কট্টর ও নরম সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে, যারা আওয়ামী লীগের কাছ থেকে কিছু চায় না। মৌলবাদী জঙ্গিবাদীদের হাত থেকে রেহাই পেতে চায়, যারা বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ ছিল। আবার তত্ত্বাবধায়কের আড়ালে আধা উর্দি শাসনও পছন্দ করে না।
বাংলাদেশ ও আমেরিকার রাজনীতিতে অমিলই বেশি। বাংলাদেশ একটি গরিব দেশ, আমেরিকা ধনী দেশ। আমেরিকায় কখনো সামরিক শাসন আসেনি, বাংলাদেশে সেনা শাসন আসে যাওয়ার জন্য, যায় আসার জন্য। আবার কিছু কিছু বিষয়ে মিলও রয়েছে। দুই দেশেই দ্বিদলীয় ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। আমেরিকায় রিপাবলিকানরা অধিক কট্টর ও ডানপন্থী বলে পরিচিত। ডেমোক্র্যাটদের উদারপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দুই দশক ধরে বাংলাদেশও শাসন করে আসছে দুটি দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এখানেও আওয়ামী লীগকে অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী ও বিএনপিকে ডানপন্থী দল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে তাদের উভয়ের মধ্যে অগণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা এত প্রবল যে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে চিহ্নিত করতে কষ্ট হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বারাক ওবামা অর্থনৈতিক মন্দা থেকে মুক্তি এবং দিনবদলের কথা বলে আমেরিকানদের ভোট আদায় করেছিলেন। জর্জ ডব্লিউ বুশের যুদ্ধনীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা সে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। স্বভাবতই মার্কিন জনগণের প্রত্যাশা ছিল, ওবামা তাদের ভাগ্যোন্নয়নে কিছু করবেন, বেকারত্ব দূর হবে, অর্থনৈতিক মন্দা কেটে যাবে। কিন্তু প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রতিশ্রুতির পাহাড় গড়লেও তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সেখানকার মানুষ যতটা আশা নিয়ে ওবামাকে ভোট দিয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি হতাশা নিয়ে তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তরুণদের একটি বড় অংশ এখন রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকছে।
বাংলাদেশেও ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়। ওবামার সঙ্গে সুর মিলিয়ে শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের মানুষকে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। ২০২১ সাল নাগাদ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলেছিলেন। তরুণ প্রজন্ম তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। ওবামার মতো শেখ হাসিনারও শুরুটা ছিল চমৎকার। তিনি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন ধারা তৈরির ওয়াদা করেছিলেন। দুর্ভাগ্য, পুরোনো ধারাতেই রাজনীতি চলছে। সরকার কিংবা বিরোধী দল—কোথাও পরিবর্তনের সামান্য ইঙ্গিত নেই। একদিকে সরকারি দলের একগুঁয়েমি, অন্যদিকে বিরোধী দলের সংসদ বর্জন। কারও মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা নেই। একে অন্যকে ঘায়েল করতে ব্যস্ত। কেউ আদালতে, কেউ রাজপথে রাজনৈতিক বিরোধে মীমাংসা চায়। সংসদকে অকার্যকর করে রাখতে চায়।
শুরুতে লিখেছিলাম, ওবামার দলে ছাত্রলীগ নেই। অর্থাৎ, তাঁর ডেমোক্রেটিক দলে এমন কোনো কর্মী নেই—যাঁরা নানা অপকর্ম করে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে, যাঁরা দেশব্যাপী চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে লিপ্ত। স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারি ছাত্রসংগঠনটি সব সময় জনগণের স্বাধীনতা হরণের স্বাধীনতা ভোগ করে আসছে। স্বাধীনতার পর তারা মুজিববাদের নামে, পঁচাত্তরের পর ‘আমরা শক্তি আমরা বল, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’ স্লোগান দিয়ে সরকার-সমর্থক সংগঠনগুলো অপকর্ম চালিয়ে আসছে।
সেই ধরনের কোনো অপশক্তি সিনবাদের দৈত্যের মতো ওবামার কাঁধে চেপে না বসলেও তার দল প্রতিনিধি পরিষদে ৫৭টি ও সিনেটে আটটি আসন হারিয়েছে। আগে দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। এখন এক আসনের ব্যবধানে সিনেটে জয়ী হলেও প্রতিনিধি পরিষদে সুনামি হয়েছে তাদের।
নির্বাচনের পর বারাক ওবামা বাংলাদেশের নেতা-নেত্রীদের মতো একে নীলনকশার নির্বাচন বলে অভিহিত করেননি, ফলাফলের পেছনে বিদেশি ষড়যন্ত্রও আবিষ্কার করেননি। তিনি জনরায় মেনে নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে একযোগে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। একইভাবে বিজয়ী দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরাও মহাবিজয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বেফাঁস কিছু বলে ফেলেননি। ‘মুক্তাঙ্গনে’ জনসভা ডেকে সরকার পতনের আন্দোলনেরও ডাক দেননি। এটাই হলো গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, সুস্থ রাজনীতি। স্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য আমরা অনেক রক্ত দিয়েছি, তাজুল-নূর হোসেন-মিলনরা জীবন দিয়েছেন; কিন্তু জনগণের কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র এখনো আসেনি। আমাদের আর কত কাল এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে?
আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়ে গেছে। সেটি পূর্বনির্ধারিত। প্রতি দুই বছর পর পর প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচন হয়। বাংলাদেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি উঠেছে। সেটি অনির্ধারিত। প্রতিটি সরকারের আমলে বিরোধী দল মধ্যবর্তী নির্বাচন চায়, এমনকি জাতীয় নির্বাচনের পরপরই এ ধরনের দাবি ওঠে। দাবি ওঠানো হয়। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্প্রতি এক সমাবেশে সরকারকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘জনরোষ বাড়ার আগেই ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান।’ গণতান্ত্রিক সমাজে যে কেউ যেকোনো দাবি পেশ করতে পারেন। কিন্তু তারও নিয়মকানুন আছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের পতন ঘটাতে হলে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে হবে। ভোটাভুটিতে জয়ী হতে হবে। মুক্তাঙ্গনে সরকারের পদত্যাগ দাবি করলেই সরকার বদলাবে না। এ ছাড়া পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত একটি সরকারকে ২৩ মাসের মাথায় এভাবে সরিয়ে দেওয়া যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্য এটি বড় ধাক্কা। নির্বাচনী বিশ্লেষকেরা বলছেন, বেকারত্ব ও কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতির কারণে ভোটাররা ডেমোক্র্যাটদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
গত মঙ্গলবারের ভোট গ্রহণ শেষে দেখা গেছে, এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে রেকর্ডসংখ্যক আসন হারিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৪৭টি এখন রিপাবলিকানদের দখলে। পাশাপাশি কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে ২৩৯টিতে জয়ী হয়ে সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। এ ছাড়া যে ৩৭টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন হয়েছেন, সেখানেও ২৬টিতে জিতেছেন রিপাবলিকান প্রার্থীরা।
মূলত অর্থনৈতিক মন্দায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন জনগণ চাকরি হারিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে পড়ে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে নির্বাচনে। বেকারত্ব, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ, সরকারের বিপুল অঙ্কের দেনা ও স্বাস্থ্যসেবা খাত সংস্কারের মতো বড় বড় পরিকল্পনাও জনগণের মত পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। আর এতে ইন্ধন দিয়েছে টি-পার্টি আন্দোলন।
দলের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ওবামা প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান দলের নেতা জন বোয়েনারকে অভিনন্দন জানান। তিনি বোয়েনারকে বলেন, আগামী দিনে একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে তিনি আগ্রহী। বাংলাদেশে কোনো নির্বাচনে এরূপ ফল হলে বিরোধী দল রাজপথে অবস্থান নিত এবং সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরত না। সরকারও বিরোধী দলকে পুলিশ বাহিনী দিয়ে দমন করতে চাইত। নেতা-কর্মীদের জেলখানায় পাঠাত এবং সদম্ভে ঘোষণা করত, মেয়াদের এক দিন আগেও ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না। এখানেই আমেরিকা ও বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পার্থক্য।
এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হ্যানসেন হাসিম ক্লার্ক মিশিগান থেকে কংগ্রেসের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আমরা তাঁকে অভিনন্দন জানাই। আশা করি, তিনি অন্তত আওয়ামী লীগ বা বিএনপির মতো আচরণ করবেন না।
ওবামা ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁর নেওয়া কর্মসূচি জনগণের মধ্যে আশা জাগাতে পারেনি; বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে সক্ষম হয়নি—তার সবই স্বীকার করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের নেতা-নেত্রীরা কখনো ভুল স্বীকার করেন না। নিজের কৃতকর্মের দায় অন্যের ওপর চাপাতে পছন্দ করেন। একুশ শতকে বসবাস করেও তাঁরা চিন্তা-চেতনায় উনিশ শতকে পড়ে আছেন। সেই কথিত ‘ষড়যন্ত্র’ ও ‘দেশ বিক্রি’র তত্ত্বে আটকে আছেন নেতা-নেত্রীরা। এর থেকে মুক্তির উপায় কী?
রাজনীতি হবে গণমানুষের সমস্যা-সংকট নিয়ে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, যানজট সমস্যা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কীভাবে রোধ করা যায়, সেসব নিয়ে সংসদে আলোচনা হবে, সংসদের বাইরে আলোচনা হবে। অথচ দেশের রাজনীতি আটকে আছে একটি বাড়ি ও দুই পুত্রের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার মধ্যে। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, হাইকোর্ট যে রায়ই দিন না কেন, রাজপথেই বাড়ির বিষয়টি ফয়সালা হবে। আইনবিশারদের আইনি কথাই বটে। রাজপথে ফয়সালার অর্থ হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও-ঘেরাও-ভাঙচুর, লাঠিপেটা, জেলজুলুম—আরও কত কিছু। মনে হচ্ছে দেশে আর কোনো সমস্যা নেই। টিভি খুললে নেতাদের বুলন্দ আওয়াজ শুনি—বাড়ি রক্ষা কিংবা উচ্ছেদ করতে হবে। পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের রণহুংকারের বিবরণ পড়ি, তাতে লজ্জিত হই, ব্যথিত হই। যদিও তাঁরা নির্বিকার, একে অন্যকে ঘায়েল করেই চলেছেন।
গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের এক কর্মশালার আয়োজন করেছেন। সেই কর্মশালায় কী শিক্ষা দেওয়া হবে, তার ওপরে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তারা যদি সুস্থ রাজনীতি অনুশীলন করে; চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজির পথ পরিহার করে, তাহলে হয়তো আগামী নির্বাচনে জয়ের মৃদু সম্ভাবনা আছে। আর যদি সেসব পরিহার করতে না পারে, তাহলে তাদের পরিণামও বারাক ওবামার মধ্যবর্তী নির্বাচনের চেয়েও খারাপ হবে।
বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া সরকারের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। সেটি হলো ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি) নির্বাচন। অনেক আগেই ডিসিসির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সেখানে যিনি মেয়র আছেন তিনি বিএনপির লোক। সিটি করপোরেশনের কাজের চেয়ে দলীয় কাজেই বেশি ব্যস্ত থাকেন। তার পরও ডিসিসির নির্বাচন হচ্ছে না। সরকার কি তার জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সন্দিহান? না হলে ডিসিসির নির্বাচন দিতে বাধা কোথায়? আমরা আশা করব, সরকার বিরোধী দলের অন্তত এই চ্যালেঞ্জটি গ্রহণ করবে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন যাতে সুষ্ঠু ও অবাধ হয়, সেই ব্যবস্থা করবে। নির্বাচন কমিশনের কাজে অযথা নাক গলাবে না। আর সরকার যদি ডিসিসির নির্বাচন দিতে গড়িমসি করে, তাহলে বুঝব, তাদের পায়ের তলায় মাটি নেই। বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে থাকলে কেবল নিচেই নামতে হয়, ওপরে ওঠা যায় না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

সেন্সরশিপের প্রতি গভীর প্রেম by আশীষ নন্দী

প্রায় আড়াই শ বছর আগে স্যামুয়েল জনসন বলেছিলেন, ‘দুরাচারের শেষ আশ্রয় দেশপ্রেম।’ কথাটি একালে ভারতের ক্ষেত্রে নির্বিঘ্নে খাটে। কাশ্মীরবিষয়ক এক সভায় অরুন্ধতী যে বক্তব্য দিলেন, এর জন্য দেশদ্রোহের অভিযোগ তুলে তাঁর গ্রেপ্তার ও বিচারের যে হুমকি দেওয়া হলো, তা অন্য কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না। সেই সভায় সৈয়দ আলী গিলানিও বক্তব্য দিয়েছিলেন। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম না, তবে পরে অরুন্ধতী যে হূদয়কাড়া কৈফিয়ত দিয়েছেন, তা পড়েছি। এতে একদিকে যেমন গর্ব বোধ করেছি, অন্যদিকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়েছি। আমি মনোবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। পেশাগত নানা সীমাবদ্ধতা আছে। সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে এমন স্পষ্ট ভাষায় ও সাবলীলভাবে আমি বলতে পারতাম না। তিনি যা বলেছেন, তাতে একদিকে যেমন অধিকতর গণতান্ত্রিক ভারতের আকুতি আছে, অন্যদিকে আছে ভারতবাসীর অধিকতর মানবিক ভবিষ্যতের ভাবনা।
দুই বছর আগে আমি একই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলাম। তখন টাইমস অব ইন্ডিয়ায় এক কলাম লিখেছিলাম, যার বিষয়বস্তু ২০০২ সালে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সংঘবদ্ধ আক্রমণের দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক পরিণতি। লেখাটি ছিল গুজরাটের পরিবর্তনশীল মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির ওপর শাণিত আঘাত। সাম্প্রদায়িক ঘৃণা উসকে দেওয়ার জন্য আমার বিরুদ্ধে সমন জারি করা হলো। অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের জন্য আমাকে সুপ্রিম কোর্টে যেতে হলো। পুলিশের সমন বাতিল করাতে হলো। তবে সেই মামলা চলছে তো চলছেই; যদিও অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়ার সময় সুপ্রিম কোর্টই বলেছেন যে আমার নিবন্ধে আপত্তিকর কিছুই পাওয়া যায়নি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার আহমেদাবাদ সংস্করণ সম্পাদক অবশ্য ততটা ভাগ্যবান ছিলেন না। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ দাখিল করা হলো।
আমি খুব আশ্চর্য হব, যদি অরুন্ধতীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগকে এর যৌক্তিক পরিণতি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। গিলানির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে শতাধিক রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ঝুলছে। তাই আরেকটি মামলায় হয়তো বিশেষ ফারাক হবে না। তবে সরকার হয়তো শেষ অবলম্বন হিসেবে বহু পরীক্ষিত প্রথাগত পথই অনুসরণ করতে পারে এবং আয়কর আইনের মাধ্যমে অবাধ্য বিরোধীদের সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারে। জনগণ কখনো আয়কর কর্মীদের পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। তখন তো তাঁদের প্রতি ততটাই অবিশ্বাস তৈরি হবে, যতটা রয়েছে ক্রিমিনাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) প্রতি।
ইতিমধ্যে সারা বিশ্বের সামনে ভারতীয়রা নিজেদের হাস্যাস্পদ বানিয়েছে। এই কাণ্ডটি ঘটেছে অরুন্ধতী ও গিলানির সেই সভায় কিছু ব্যক্তির বিক্ষোভ প্রদর্শনের কারণে। সভায় উপস্থিত কয়েকজনের কাছ থেকে শুনেছি, গিলানি একবারও ‘বিচ্ছিন্নতা’ (secession) শব্দটি উচ্চারণ করেননি, এমনকি আজাদির একটি নরমভাবাপন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। তাঁর হাজির করা অ্যাজেন্ডা ছিল সব দিক থেকেই সংযত। এটা কি ভারত সরকারের কাছে কোনো বার্তা পৌঁছানোর পন্থা? এর কতটুকু ঠান্ডা মাথার জনসংযোগ আর কতটুকুই বা কাশ্মীরকে ঘিরে রাজনৈতিক সম্ভাবনার চতুর খেলা?
আমরা কখনোই তা জানব না। কারণ, আমাদের মাঝে যাঁরা আজ রাজনীতিক বলে পরিচিত আর যাঁরা জ্ঞানরোধী বাবু, তাঁরা গণযোগাযোগের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে অক্ষম। মুক্ত সমাজে বাকস্বাধীনতা আর মুক্ত গণমাধ্যমের কী ভূমিকা, তা জানার মতো যথেষ্ট শিক্ষিত তাঁরা নন। অধিকতর সহমর্মী ও মানবিক সমাজের দাবি জানানোও ইতিমধ্যে বিপজ্জনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, সেই দাবি তোলার অর্থ সমকালীন ভারত ও এর চালকদের গুরুতর সমালোচনা। এমন সমালোচনাকেই এখন জাতীয় স্বার্থবিরোধী এবং বিভক্তি সৃষ্টিকারী বলে অভিহিত করা হচ্ছে। অরুন্ধতীর ক্ষেত্রে অবশ্যই বিজেপি চলমান বিতর্কে গতির সঞ্চার করছে এবং সেন্সরশিপের জন্য যুক্তির বিস্তার করছে। কিন্তু এর সঙ্গে আমি যোগ করব, এই প্রতিযোগিতায় কংগ্রেসও হার মানতে চায় না। বিজেপির চেয়ে কংগ্রেস বেশি জাতীয়তাবাদী—তা দেখানোতেই কংগ্রেসের উৎসাহ বেশি।
গত দুই দশকে ভারতে এক নব্য মধ্যম শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে, যাদের হাতে অর্থ এসেছে কিন্তু মধ্যম শ্রেণীর মূল্যবোধ আসেনি। কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়ই তাদের মন জয়ের চেষ্টায় রত। এই নব্য মধ্যম শ্রেণী তাদের অন্তঃসারশূন্য জীবনকে সহিংস, উনিশ শতকের ইউরোপীয় ধাঁচের ‘জাতীয়তাবাদ’-এর মাধ্যমে অর্থপূর্ণ করতে চায়। অন্যের পাশাপাশি নিজেদেরও দেখাতে চায়, যে ব্যবস্থায় তারা উপনীত, সেখানে তাদেরও শরিকানা আছে। তাদের ভয়, জাতীয়তাবাদের এই নোংরা সংস্করণের বৈধতার প্রশ্নে সামান্যতম আঁচড় লাগলে তা তাদের নতুন লব্ধ সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ঝুঁকিতে ফেলবে। ‘ভারতমাতা’র মহিমা রক্ষার্থে তারা কাউকে ছাড় দেবে না—ভারতের সর্বশেষ বিরুদ্ধবাদী পর্যন্ত তারা এই লড়াইকে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা নিজেরাই তেমন কিছু করতে বাধ্য হয়। চোখের সামনে তারা দেখছে, তাদের ড্রয়িং রুমের ভেতর নিরাপদে ও আরামে উন্মোচিত হয়ে চলেছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, ঠিক যেমন করে টেলিভিশনের পর্দায় উন্মোচিত হয় মুম্বাইয়ের কোনো মারদাঙ্গা সিনেমা।
তাই এই দুর্দিন, এই অসহিষ্ণুতা। এটা শুধু অরুন্ধতী রায়ের বিরুদ্ধেই নয়, যারাই ভারতের মূল স্রোতের মন ও তার জাতীয়তাবাদের পরোয়া না করার স্পর্ধা দেখিয়ে তাদের আরামের ব্যাঘাত ঘটায় তাদের বিরুদ্ধেও। এমনকি অহিংস পথে লড়াই চালিয়ে যাওয়া গান্ধীবাদীরাও রেহাই পান না। দান্তেওয়াড়ায় হিমাংশু কুমারের আশ্রম কোনো মাওবাদী ধ্বংস করেনি, করেছে পুলিশ। আমি ভাবতাম, মুক্ত সমাজে লেখক-শিল্পীরা সেন্সরশিপের খড়্গের বাইরে থাকবেন। কিন্তু আমরা ভালোভাবেই জানি, তা নয়। তসলিমা নাসরিনকে থামাতে সিপিআই(এম) ও কংগ্রেস এক স্বরে বলল, তিনি ভারতীয় নন। যেন আপনি যদি ভারতে বসবাসকারী অভারতীয় হোন, তাহলে আপনার অধিকারগুলো ভারতের সংবিধান দ্বারা চালিত হবে না!
‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ লেখালেখি ও কর্মকাণ্ডের কথা বলে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের হয়রানির প্রবণতা শুরু হয়েছে অনেক আগে। ১৯৭০-এর দশকের মধ্যভাগ জাতীয় স্বার্থ বিষয়ে মতৈক্য ভেঙে পড়ার সময়। ইন্দিরা গান্ধী তখন জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং গুরুতর সেন্সরশিপ ও নজরদারির ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তিনি দাবি করেন, এসবই জাতীয় স্বার্থ, গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য। ১৯৭০-এর দশক এবং একবিংশ শতকের প্রথম দশকের মধ্যে পার্থক্য হলো, এখন কোটি কোটি মানুষ নানা ভাবে ভিন্নমত জানাচ্ছে এবং মূল স্রোতের জনমতের সঙ্গে তাদের মতের আমূল পার্থক্যকে স্পষ্ট করতে সরব হচ্ছে। পুরো উপজাতীয় আন্দোলন তার উদাহরণ।
কিছু কিছু সময় আছে, যখন জাতীয় মতৈক্য সম্ভব নয়, কাঙ্ক্ষিতও নয়। তখন সর্বোচ্চ সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনায় যাওয়া যায়। কাশ্মীরিদের ক্ষেত্রে এ কাজ হয়তো সহজ হবে না। ভারত সরকারের প্রতি তাদের আস্থা এখন শূন্যের কোঠায়। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাশ্মীরিরা ইতিমধ্যে ভারতের বাইরে চলে গেছে। অন্তত দুই প্রজন্মে এই মনোভাবের পরিবর্তন হবে না। এলোপাতাড়ি হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও নিত্যনতুন উপায়ে নৃশংসতা চালানোর ফলে তাদের সমাজও নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। মনে প্রচণ্ড চোট নিয়ে তাদের বসবাস করতে হচ্ছে। এ বক্তব্য যদি আপনার কাছে অত্যন্ত রূঢ় মনে হয়, তাহলে কাশ্মীর প্রসঙ্গে মনোরোগ চিকিৎসক শোভনা সোনপারের প্রতিবেদনটি খুঁটিয়ে পড়ে দেখতে পারেন।
আজকের ভারতীয় রাজনীতির সংস্কৃতিতে কী হচ্ছে যে তা এতটা নিষ্ঠুর, আত্মপ্রত্যয়ী ও উগ্র জাতীয়তাবাদীকে বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে? আমরা নিজেরা কি এতই নিষ্ঠুর হয়ে গেছি যে চারপাশের দুঃখ-দুর্দশার ব্যাপারে আমাদের অনুভূতি একেবারে ভোঁতা হয়ে গেছে? ভারতের ঐক্যের ধারণাটাই বা কী, যা ভারতবাসীকে বাধ্য করে পুলিশের নৃশংসতা ও নির্যাতনে সমর্থন দিতে? দেশের পুলিশ, আধা সামরিক ও সামরিক বাহিনীর সামর্থ্য সম্পর্কে গণতান্ত্রিক সরকারের স্পষ্ট ধারণা থাকা সত্ত্বেও তারা কেমন করে নির্যাতনবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর ঠেকিয়ে রাখতে পারে? স্বাধীনতার ৬০ বছর পরও আমরা কেমন করে এনকাউন্টারে মৃত্যুকে সমর্থন দিয়ে যেতে পারি? ভারতের দাম্ভিক মধ্যম শ্রেণীর বড় এক অংশকে যদি গণতন্ত্রের দাবির প্রতি পুরোপুরি সংবেদনশীল করা যেত, তাহলে কি এসব অনুশীলন এত দিন টিকতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে পারত?
প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রীতিকর নয়। আমরা ভালো করেই জানি, বুদ্ধিজীবী-সম্প্রদায়, গণমাধ্যম ও শিল্পী-সমাজ যদি তাদের কাজটি ঠিকমতো করত, তাহলে আজকের এই অবস্থা হতো না। মধ্যম শ্রেণীর পরিবর্তনশীল চরিত্র সহায়ক হয়নি।
ভারতবাসী তাদের গণতন্ত্র নিয়ে গর্বিত—গণতন্ত্রের ব্যাপারে এখনো মতৈক্য আছে। কিন্তু তারা যে গুরুতর স্ববিরোধের মধ্যে রয়েছে, সে ব্যাপারে সচেতন নয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নতুন মধ্যম শ্রেণী সৃষ্টি করেছে, যার বড় এক অংশ গণতান্ত্রিক রীতিনীতিতে যথেষ্ট অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি। গরিব এবং অপেক্ষাকৃত পাকাপোক্ত অবস্থানের মধ্যম শ্রেণী ভাবনাহীন, আত্মসমালোচনাহীন উগ্র জাতীয়তাবাদ ও বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণু রাজনীতিকে নিজের রাজনীতি মনে করে না। সাধারণ ভারতীয়রা অসামান্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যে বাস করতে অভ্যস্ত। রাজনৈতিক বৈচিত্র্য তাদের নিকট সমস্যা হিসেবে হাজির হয় না। পাকাপোক্ত আসন গেড়ে বসা মধ্যম শ্রেণীর ক্ষেত্রেও তা-ই।
উদাহরণ হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি প্রবন্ধের প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে। প্রবন্ধটিতে উনিশ শতকের মধ্যভাগে মধ্যম শ্রেণী আক্রমণে জর্জরিত হয়েছে। স্কুলে প্রবন্ধটি আমাদের পড়তে হয়েছিল। এক শতকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্যবইতে এ প্রবন্ধ আছে। আজকের দিনে এমন লেখা পাঠ্য করতে গেলে ভারতের অনেক জায়গাতেই রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হবে এবং সেন্সরশিপের দাবি উঠবে।
সম্প্রতি ভারতের তথ্য কমিশনের আয়োজনে এক বক্তৃতায় আমি বলেছিলাম, ভারতে সেন্সরশিপ ও নজরদারির ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল। এটি শুধু সরকারের পছন্দনীয় নয়, মধ্যম শ্রেণীর বড় অংশও তাদের অপছন্দের লেখক, শিল্পী, নাট্যকার, পণ্ডিত ও চিন্তকদের কণ্ঠ রোধ করতে চায়। বিশ্বায়িত মধ্যম শ্রেণী হয়ে ওঠার চেষ্টায় তারা নিজেদের পোশাক, খাদ্যাভ্যাস এবং ভাষাও বদলে ফেলতে রাজি, কিন্তু সেন্সরশিপের প্রতি ভালোবাসা নয়। ভাগ্য ভালো যে আমাদের মধ্যে এখনো এমন কিছু মানুষ আছেন (সম্পাদক, রাজনৈতিক কর্মী, এনজিও, আইনজীবী ও বিচারপতি), যাঁদের কাছে বাকস্বাধীনতা গণতন্ত্রের কোনো প্রান্তীয় বিবেচ্য কিংবা বুর্জোয়া গুণ নয়, বরং সভ্য সমাজ হিসেবে টিকে থাকার সূত্র।
ভারতের আউটলুক ম্যাগাজিন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
আশীষ নন্দী: ভারতীয় রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানের সমাজতাত্ত্বিক।

১৮ বছরের অপেক্ষা

আঠারো বছর পর সরকারের দরবারে দাবিনামা পেশ করেছে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ। এই সময়ে শিল্প খাতে ব্যাপক পরিবর্তন এলেও শ্রমিকদের অবস্থার তেমন বদল ঘটেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই অবনতি হয়েছে। এসব বিষয়েই এক মাস আগে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীর কাছে আলোচনার সময় চেয়েছিলেন স্কপের নেতারা, কিন্তু সাড়া মেলেনি। বাংলাদেশের বৃহত্তম ও সর্বদলীয় শ্রমিক জোট হিসেবে স্কপ যথাযথ গুরুত্ব পাওয়ার দাবিদার। সরকারের উচিত শ্রমিকনেতাদের কথা শোনা এবং বাস্তবভিত্তিক দাবিদাওয়া মেনে নেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া।
সব প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ নয়টি বিষয়ে আলোচনা করতে চায় স্কপ। পোশাকশিল্পে ইতিমধ্যে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্পজগতের অন্য ক্ষেত্রগুলোতেও একই প্রয়োজন দীর্ঘদিন ধরে অনুভূত হচ্ছে। কেননা, গত ১৮ বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক গুণ বেড়েছে এবং শিল্প-মানচিত্রেও অনেক ভাঙন-গঠন চলেছে। এসব বিষয় আমলে নিয়ে উৎপাদনী খাতের সমস্যা দূর করা জাতীয় স্বার্থেই দরকার।
স্কপ শ্রমিকদের জন্য সুস্থ ধারার ট্রেড ইউনিয়নের বিকাশ, ন্যূনতম পাঁচ হাজার টাকা মজুরি, বন্ধ পাটকলগুলো চালু এবং পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়ানো, চাকরির নিরাপত্তা, পেশাগত ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা এবং প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষায় নয় দফা দাবি উত্থাপন করেছে। পাশাপাশি তারা শ্রম আইনকেও যুগোপযোগী করতে চায়। এদিক থেকে দেখলে, সব কটি শ্রমিক সংগঠনের এই জাতীয়ভিত্তিক দাবিদাওয়া অবশ্যই আলোচনার যোগ্য। উল্লেখ্য, সর্বশেষ ১৯৯২ সালে স্কপ তৎকালীন সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেছিল। পরের প্রতিটি সরকারের সঙ্গে এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন শ্রমিকনেতারা।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বর্তমানে কয়েকটি প্রেশার গ্রুপ বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে। তাদের কথা সরকারকে শুনতেও হয়। অথচ জনগণের বড় একটি অংশ শ্রমজীবী। অর্থনীতিতেও তাঁদের অবদান কম নয়। এ ছাড়া স্বাধীনতাসংগ্রামসহ গত ৪০ বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামেও রয়েছে শ্রমিকদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধাও ছিল এই স্কপ। শ্রমমন্ত্রী তাদের সঙ্গে আলোচনা করে শিল্প খাতের সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়াসী হবেন বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

বাহাত্তরের নথিপত্র গায়েব

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রায় দেড় শ বছর আগে আক্ষেপ করেছিলেন, ‘বাঙালির ইতিহাস নাই।’ আজও সে কথা সত্য। আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের তথ্যপ্রমাণসমৃদ্ধ ইতিহাস এ পর্যন্ত রচিত হয়নি। যেসব দলিল, স্মারক ও উপাদান দিয়ে সেই ইতিহাস পূর্ণাঙ্গ হতে পারত, সেসবও খুইয়ে ফেলা হয়েছে। তারই প্রমাণ বাহাত্তর সালে সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত অজস্র নথিপত্র হারিয়ে ফেলার ঘটনা। প্রতীয়মান হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় স্মৃতিহীনতাতেই অভ্যস্ত আমরা, স্মৃতি রক্ষায় নয়।
রাষ্ট্রীয় নথিপত্রগুলো সংরক্ষণের অভাবে বিনষ্ট, বিস্মৃত ও বিপন্ন হওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সেই সব মূল্যবান নথিপত্র হারিয়ে যাওয়া জাতির অপূরণীয় ক্ষতি। এসব সংরক্ষণের দায়িত্ব যাদের—সংসদ সচিবালয়ে নেই, জাতীয় মহাফেজখানায় নেই, আইন মন্ত্রণালয়েও নেই। দেখা যাবে, এখন সবাই অভ্যাসমতো একে অন্যকে দোষারোপ করেই আত্মরক্ষার চেষ্টা করবে।
স্বাধীনতার পরপরই শুরু হয়ে গিয়েছিল সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়া। অনেক বৈঠক হয়, আসে অজস্র মতামত, নেওয়া হয় মৌলিক অনেক সিদ্ধান্ত। এতে জড়িত হন রাজনীতিবিদ, আইনবিশারদ, জনপ্রতিনিধি, লেখক-শিল্পীসহ বিভিন্ন ধরনের মানুষ। সেই মহান কর্মযজ্ঞের স্মৃতি ও প্রমাণ বহন করেছিল কাগজের অজস্র পৃষ্ঠা। এসব নথিপত্র ছাড়া পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় আইন ও সংবিধানের বিবর্তনের ধারাকেও উপলব্ধি করা। এ জন্যই বাহাত্তর সালের সেই সব মহামূল্যবান দলিল সংরক্ষণ খুবই জরুরি ছিল। কিন্তু সব সম্ভবের দেশে এগুলো কারও ঔদাসীন্যে নষ্ট হয়েছে অথবা কেউ কেউ তা সের দরে বিক্রি করে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অনেক দলিলপত্র নিখোঁজ রয়েছে। লাপাত্তা হয়ে গেছে যুদ্ধাপরাধ-সম্পর্কিত অনেক দলিলপত্র। এমনকি স্বাধীনতার মূল ঘোষণার হাতে লেখা কপিটিও নিরুদ্দেশ রয়েছে। অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে এবং এখনো হারাচ্ছে।
জাতীয়ভাবে দলিল সংরক্ষণের কোনো নীতি এ পর্যন্ত প্রণীত হয়নি। এমন আইন নেই, যার দ্বারা নথিপত্রে বিধৃত ইতিহাস সংরক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব। সংরক্ষণ ও ইতিহাসনিষ্ঠার বদলে আমরা বরং ভুলে যেতে, ভুলিয়ে দিতে এবং প্রমাণ নষ্ট করতেই পারদর্শী। এই মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।
জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিক হেগেল বলেছিলেন, প্রাচ্যের ইতিহাস নেই, তারা ইতিহাসের উপাদান মাত্র। এর জবাবেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাঙালির নিজস্ব জাতীয় ইতিহাস রচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রশ্ন উঠেছিল, ‘কে লিখিবে?’ তিনি উত্তর করেছিলেন, ‘তুমি লিখিবে আমি লিখিব সে লিখিবে।’ তাঁর এই লেখার প্রায় শতবর্ষ পরে জানা যাচ্ছে, ‘আমি, তুমি, সে’ মিলে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের উপাদানগুলো আমরা সংরক্ষণ করতে পারিনি। বরং ‘আমি, তুমি, সে’ মিলে আমরা সেই সুযোগ নষ্ট করছি। এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে?
এভাবে রাষ্ট্রের দালিলিক প্রমাণাদি খুইয়ে ফেলার মতো কাজ যারা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে হারানো সম্পদ খুঁজে বের করার চেষ্টাও অব্যাহত রাখতে হবে। এ ব্যাপারে অবিলম্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হোক। ইতিহাসের মৌলিক উপাদান ও তথ্যপ্রমাণ সংরক্ষণে যত্নশীল হওয়ার কোনো বিকল্প আছে কি?
জাতীয় মহাফেজখানাকে আধুনিক ও ইতিহাসবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে, বানাতে হবে আইন। নইলে বঙ্কিমের সেই আক্ষেপই আরও শতবর্ষজুড়ে প্রতিধ্বনিত হবে যে ‘বাঙালির ইতিহাস নাই।’

গান ডাউনলোড করায় জরিমানা

আইটিউনে ২৪টি গান ডাউনলোড করতে মাত্র ২৪ ডলার খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের এক নারীকে গুনতে হবে পুরো ১৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ গানপ্রতি ৬২ হাজার ৫০০ ডলার! চার সন্তানের জননী ওই নারীর নাম টমাস র‌্যাসেট।
২০০৬ সালে র‌্যাসেট অবৈধভাবে ২৪টি গান ডাউনলোড করেন। পরে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। আদালত থমাস র‌্যাসেটকে ১৫ লাখ ডলার জরিমানা করেন।

রাশিয়ার ১৩ জন ‘গুপ্তচর’কে গ্রেপ্তার করেছে জর্জিয়া

জর্জিয়া প্রতিবেশী রাশিয়ার একটি কথিত গোয়েন্দা চক্র ভেঙে দিয়েছে। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে চারজন রুশ নাগরিকসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৩ জনকে। এঁরা মস্কোর কাছে জর্জিয়ার সামরিক তথ্য সরবরাহ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে রাশিয়া।
জর্জিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সোতা ইউতিয়াশিভিল গতকাল শুক্রবার জানান, আটক গুপ্তচরদের মধ্যে চারজন রাশিয়ার নাগরিক। বাকিরা জর্জিয়ার সেনা-কর্মকর্তা।
মুখপাত্র বলেন, এঁদের গ্রেপ্তার জর্জিয়ার সামরিক গোয়েন্দাদের জন্য একটি বড় রকমের সাফল্য। পাশাপাশি রাশিয়ার সেনা গোয়েন্দাদের জন্য একটি বড় ধরনের আঘাত।
এদিকে, ১৩ জনকে আটকের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে রুশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, জর্জিয়ায় রুশ নাগরিক আটকের ঘটনায় তাঁরা উদ্বিগ্ন। তাঁরা বর্তমান পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন। তিনি ওই ঘটনাকে উসকানিমূলক তৎপরতা বলে উল্লেখ করেন।

মিয়ানমারে ভয় দেখিয়ে আগাম ভোট নেওয়ার অভিযোগ

মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনেছে প্রধান দুটি বিরোধী দল। ডেমোক্রেটিক পার্টি (মিয়ানমার) ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফোর্স (এনডিএফ) অভিযোগ করেছে, জান্তা সরকার-সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) নির্বাচনের আগেই ভোট সংগ্রহ করছে। আগামীকাল রোববার এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান থু ওয়াই বলেন, ভোটারদের এই ভীতি প্রদর্শন ও আগাম ভোট সংগ্রহের ব্যাপারে ইউনিয়ন ইলেকশন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে ইউএসডিপি প্রতারণা, ঘুষ ও ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আগাম ভোট সংগ্রহ করছে। এনডিএফও একই অভিযোগ করেছে। তবে তারা এ ব্যাপারে এখনো লিখিত অভিযোগ করেনি।
এনডিএফের প্রধান খিন মাউং সুয়ি বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর দাওয়িতে মোট ৪০ হাজার ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে অর্ধেক ভোট আগাম সংগ্রহের চেষ্টা করছেন সরকারি কর্মকর্তারা।
থু ওয়াই বলেন, সারা দেশ থেকে ভোট জালিয়াতি ও ভোটারদের ভয় দেখানোর খবর এসেছে। এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ইউএসডিপির প্রার্থীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে ভোটারদের ভয় দেখিয়ে বা রাস্তা মেরামতের কথা বলে প্রলুব্ধ করে আগাম ভোট দিতে বাধ্য করছেন।
থাইল্যান্ডভিত্তিক মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ অং নায়িং উ বলেছেন, দেশব্যাপী ‘ঘৃণিত’ হলেও নির্বাচনে ইউএসডিপি জয়লাভ করবে। তিনি বলেন, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ইউএসডিপির পরাজয় নিশ্চিত। জয় নিশ্চিত করতেই নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে দলটি।
১৯৯০ সালের পর এই প্রথম মিয়ানমারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচনে সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তা ছাড়া এই নির্বাচনে গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে (এনএলডি) নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এসব কারণে পশ্চিমা দেশগুলো একপেশে এই নির্বাচনের তীব্র সমালোচনা করে আসছে।

কিউবায় বিমান দুর্ঘটনায় ৬৮ আরোহীর সবাই নিহত

কিউবায় গত বৃহস্পতিবার একটি যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৬৮ জন আরোহীর সবাই নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ৬১ জন যাত্রী ও সাতজন ক্রু। এর মধ্যে ৪০ জন কিউবার ও অন্য ২৮ জন বিদেশি নাগরিক। রাজধানী হাভানা থেকে ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সান্তি স্পিরিতাস প্রদেশের পাহাড়ঘেরা গুয়াসিমাল গ্রামে এ দুর্ঘটনা ঘটে। গতকাল শুক্রবার সরকারের পক্ষ থেকে খবরের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।
কিউবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত সিভিল অ্যারোনটিকস ইনস্টিটিউটের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা অ্যারো ক্যারিবিয়ানের ফ্লাইট ৮৮৩-এর বিমানটি হাইতির রাজধানী পোর্ট অ প্রিন্স থেকে রওনা হয়। কিউবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর সান্তিয়াগো দি কিউবায় যাত্রাবিরতি শেষে সেখান থেকে এটি হাভানার পথে যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার আগে স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটা ৪২ মিনিটে বৈমানিক জরুরি বার্তা পাঠান। কিছুক্ষণের মধ্যে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কর্মকর্তারা বলেছেন, ২৮ জন বিদেশি যাত্রীর মধ্যে নয়জন আর্জেন্টিনা, সাতজন মেক্সিকো, তিনজন ডেনমার্ক, দুজন জার্মানি ও দুজন অস্ট্রিয়ার নাগরিক। এ ছাড়া ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, ভেনেজুয়েলা ও জাপানের একজন করে নাগরিক। যাত্রীরা প্রায় সবাই পর্যটনের উদ্দেশে হাভানা যাচ্ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কর্মকর্তারা বলেন, বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর বিস্ফোরিত হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর দূর থেকে তিনি পাহাড়ের ওপর আগুনের কুণ্ডলী দেখতে পান। বিমানটি গাছগাছালিতে ভরা একটি জংলা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে উদ্ধারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বুলডোজার ব্যবহার করতে হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসাবশেষ থেকে যাত্রী ও ক্রুদের লাশ উদ্ধার করেছেন।
কর্মকর্তারা বলেন, দুর্ঘটনার নেপথ্যে খারাপ আবহাওয়া না অন্য কিছু রয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। তবে গত বৃহস্পতিবার সান্তিয়াগো দি কিউবায় মৌসুমি ঝড় ও পার্শ্ববর্তী প্রদেশ গুয়ানতানামোয় হারিকেনের পূর্বাভাস দিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়। বৃহস্পতিবার ভোরে কিউবার পূর্বাঞ্চলে মাঝারি ধরনের ঝড় হয়। ওই দিন কিউবান এয়ারলাইনস নামের আরেকটি রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা সান্তিয়াগো দি কিউবা ও গুয়ানতানামোয় তাদের সব ফ্লাইট বাতিল করে। অনেকে মনে করছেন, বিরূপ আবহাওয়ার জন্য এ দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে।
কিউবায় গত ২১ বছরে এটাই সবচেয়ে বড় বিমান দুর্ঘটনা বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এর আগে সর্বশেষ ২০০২ সালের মার্চে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়। ওই ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়।

প্রভাবশালী আইনপ্রণেতাদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দলের প্রভাবশালী আইনপ্রণেতাদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মন্ত্রিসভার উচ্চপর্যায়ের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি আবার বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে জনগণ পরিষ্কার বার্তা পাঠিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ওবামা বলেন, ‘জনগণ চায়, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আমরা যেন অধিকতর মনোযোগী হই। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশের অগ্রযাত্রাকে আমাদের অধিকতর গুরুত্ব দিতে হবে। করের অর্থ অপচয় হচ্ছে কি না, এ নিয়ে জনগণ উদ্বিগ্ন। মোটকথা, ওয়াশিংটনের কর্মধারায় পরিবর্তন আনার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের।
গত মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অবসান ঘটেছে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শপথ গ্রহণ করবেন নবনির্বাচিত আইনপ্রণেতারা। ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে এখন সমঝোতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। হোয়াইট হাউস থেকে এর মধ্যে সমঝোতার কর্মপন্থা ঠিক করা হচ্ছে। দলগত অবস্থান থেকে জনগণের মৌলিক কিছু বিষয়ে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পূর্ব অবস্থানের পরিবর্তন ঘটবে। অতি উদারনৈতিক বলে পরিচিত বেশ কিছু জাতীয় পদক্ষেপকে পাশে রেখে মধ্যপন্থায় দেশ পরিচালনায় মনোযোগী হবেন প্রেসিডেন্ট ওবামা।
হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়েছে, উভয় দল থেকে আটজন করে প্রভাবশালী আইনপ্রণেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ১৮ নভেম্বর নীতিনির্ধারক এসব আইনপ্রণেতার সঙ্গে বৈঠক করবেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। বৈঠকে জনগণের কর্মসূচি নিয়ে অগ্রযাত্রার কার্যকর উপায় নির্ধারণে আলোচনা হবে। বৈঠকে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য স্পিকার জন বয়েনার, সিনেটে ডেমোক্র্যাট দলের নেতা হেরি রিড, বর্তমান স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি, প্রভাবশালী রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ম্যাককনেল, এরিক ক্যান্টর, সিনেটর জন কাইল, সিনেটর ডিক ডুরবিন ও কংগ্রেসম্যান স্ট্যানি হোয়ের উপস্থিত থাকবেন বলে জানানো হয়েছে।
জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেস শপথ গ্রহণের পর বর্তমান স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বিরোধী দলের নেতা হিসেবে মনোনীত হতে পারেন। ডেমোক্র্যাট দলের আইনপ্রণেতাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ন্যান্সি পেলোসি আগ্রহী থাকলেও দলে তাঁকে নিয়ে বিরোধিতা রয়েছে। সমঝোতা না হলে বা ন্যান্সি পেলোসি দায়িত্ব নিতে অনীহা জানালে কংগ্রেসম্যান স্ট্যানি হোয়ের বিরোধী দলের নেতা হতে পারেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি রবার্ট গিব বলেন, ১৮ নভেম্বরের সভার মধ্য দিয়ে এ ধরনের আরও বহু যৌথ সভার সূত্রপাত ঘটবে। প্রেসিডেন্ট ওবামা ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়া সফরের প্রাক্কালে বলেন, তাঁর এ সফরের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে।

বিবিসির চার হাজার সংবাদকর্মীর ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট

বিবিসির সংবাদকর্মীরা গতকাল শুক্রবার ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট শুরু করেছেন। প্রস্তাবিত পেনশন হ্রাস পরিকল্পনার প্রতিবাদে তাঁরা এ ধর্মঘট পালন করছেন। ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট (এনইউজে) এ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। এ সংগঠনের সদস্যসংখ্যা চার হাজার ১০০।
ধর্মঘটের কারণে বিবিসির রেডিও ফোরের গতকালের অনুষ্ঠান কার্যক্রমে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটে। তবে বিবিসি ওয়ানের ব্রেকফাস্ট নিউজ যথারীতি সংবাদ পরিবেশন কার্যক্রম চালিয়ে যায়।
বিবিসির পরিচালক মার্ক টমসন অবশ্য বলেছেন, ধর্মঘটের কোনো প্রভাব তাঁদের অনুষ্ঠান সম্প্রচার কার্যক্রমে পড়েনি। এমনকি এতে কোনো অনুষ্ঠান কাটছাঁটও করতে হচ্ছে না। তবে দাবি আদায় না হলে এনইউজে ১৫ ও ১৬ নভেম্বর পুনরায় ধর্মঘটে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। সাংবাদিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তখন বিবিসির সব রেডিও ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান হয় বন্ধ হয়ে যাবে, নয়তো অনুষ্ঠান সম্প্রচার কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
বিবিসি কর্তৃপক্ষ আগামী বছর এপ্রিল থেকে পেনশন বাজেট ১৫০ কোটি পাউন্ড কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘোষণার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন বিবিসির সংবাদকর্মীরা।

পুঁজিবাজারে চাঙা ব্যাংকিং খাত

শেয়ারবাজারে গত সপ্তাহে বিভিন্ন খাতের শেয়ার কেনাবেচায় মিশ্র অবস্থা বিরাজ করলেও যথেষ্ট চাঙা ছিল ব্যাংকিং খাত। সর্বশেষ পাঁচটি কর্মদিবসের মধ্যে চার দিনই ব্যাংকিং খাতের লেনদেনে চাঙা ভাব বিরাজ করেছে।
ডিএসই ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস রোববার ব্যাংকিং খাতের ৩০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫টির দর বেড়ে যায়। এ ছাড়া সোমবার ৩০টির মধ্যে ২০টির, মঙ্গলবার ৩০টির মধ্যে ২৭টির ও বৃহস্পতিবার ৩০টির মধ্যে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের দর বৃদ্ধি পায়। শুধু বুধবার ব্যাংকিং খাতের লেনদেন ভালো হয়নি। এদিন ৩০টির মধ্যে মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠানের দর বৃদ্ধি পেয়েছিল।
বৃহস্পতিবার দর বৃদ্ধির তালিকায় রয়েছে—ব্যাংক এশিয়া, ঢাকা ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, যমুনা ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক।
এ ছাড়া দর কমে যাওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে—এবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক।

এক সপ্তাহে সাধারণ সূচক বেড়েছে ৫০ পয়েন্ট

ঢাকার শেয়ারবাজারে গত এক সপ্তাহে মিশ্র অবস্থা দেখা গেছে। সপ্তাহে দুই দিন সাধারণ সূচকের ঊর্ধ্বগতি হলেও তিন দিন নিম্নগতি লক্ষ করা গেছে। আর্থিক লেনদেনও আগের সপ্তাহের চেয়ে কমেছে। তবে সাধারণ মূল্যসূচক কিছুটা বেড়েছে।
ডিএসই ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে সাধারণ মূল্যসূচক দশমিক ৬৩ শতাংশ বা প্রায় ৫০ পয়েন্ট বেড়ে যায়। সপ্তাহের শুরুতে সাধারণ মূল্যসূচক ছিল ৭৯৩৭ দশমিক শূন্য পাঁচ পয়েন্ট। যা এক সপ্তাহের লেনদেন শেষে দাঁড়ায় ৭৯৮৬ দশমিক ৯২ পয়েন্টে।
একই সময়ে আর্থিক লেনদেন গড়ে প্রতিদিন তিন দশমিক ৪৯ শতাংশ কমে দুই হাজার ৫২৮ কোটি টাকা করে হয়েছে।
সপ্তাহের শুরুতে ডিএসইর বাজার মূলধন ছিল তিন লাখ ৩৭ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা। যা সপ্তাহ শেষে দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ কমে তিন লাখ ৩৭ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
এ ছাড়া গেল সপ্তাহে বেশির ভাগ শেয়ারের দর বেড়েছে। এ সময় লেনদেন হওয়া মোট ২৪৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দর বেড়েছে ১৩৬টির, কমেছে ১০৮টির এবং অপরিবর্তিত ছিল মোট তিনটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম।
গত সপ্তাহে লেনদেনে শীর্ষে থাকা ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো—পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স সার্ভিসেস, বেক্সিমকো, তিতাস গ্যাস, এবি ব্যাংক, ডেসকো, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ও বেক্সটেক্স লিমিটেড।
সমাপনী মূল্যের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে দাম বৃদ্ধিতে শীর্ষে থাকা ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো—ফার্মা এইডস, স্টাইলক্রাফট, রূপালী ইনস্যুরেন্স, জেমিনি সি ফুড, মিথুন নিটিং, রহিম টেক্সটাইল, মুন্নু স্টাফলারস, এইমস প্রথম মিউচুয়াল ফান্ড, অগ্রণী ইনস্যুরেন্স ও ঢাকা ইনস্যুরেন্স।
সমাপনী মূল্যের ভিত্তিতে দাম কমে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো—কেয়া ডিটারজেন্ট, ফু ওয়াং সিরামিক, অগ্নি সিস্টেমস, আইপিডিসি, ন্যাশনাল টিউবস, মুন্নু সিরামিক, তিতাস গ্যাস, হক্কানি পালপ অ্যান্ড পেপার, প্রাইম টেক্সটাইল ও ফিডেলিটি অ্যাসেটস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ।