Saturday, August 29, 2026
বিদেশি শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ সীমিত করতে বিধিনিষেধ আরোপ ট্রাম্প প্রশাসনের
২৪ আগস্ট জারি করা এক স্মারকে মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার অধীন শিক্ষার্থী ও বিনিময় দর্শনার্থী কর্মসূচি বলেছে, পাঠ্যক্রমভিত্তিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের অনুমোদন নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এমন কিছু ঘটনা তারা লক্ষ্য করেছে, যা বিদ্যমান বিধিমালা লঙ্ঘন করতে পারে।
স্মারকে বলা হয়েছে, পাঠ্যক্রমভিত্তিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কেবল তখনই অনুমোদনযোগ্য, যখন সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ কোনো প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়। সংশ্লিষ্ট বিধিমালা না মানলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করার অনুমোদন হারাতে পারে।
এর পরই ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেস এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিদেশি শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট কিছু কাজের অনুমতির আবেদন প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের এক মুখপাত্র বলেছেন, সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পর্যালোচনা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের সময় তারা পাঠ্যক্রমভিত্তিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের কিছু অনুমোদন স্থগিত রেখেছেন।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কার্যালয় জানিয়েছে, ২৪ আগস্টের স্মারকটি আগের নির্দেশনার তুলনায় আরও নির্দিষ্ট, সরাসরি এবং প্রকৃতিগতভাবে বেশি বিধিনিষেধমূলক।
মার্কিন সরকার এর আগে আগস্টের মাঝামাঝিও এ বিষয়ে একটি স্মারক জারি করেছিল।
বার্কলের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী কার্যালয় বলেছে, নির্দিষ্ট কিছু কাজের অনুমতির আবেদন নিকট ভবিষ্যতে প্রক্রিয়াকরণ করা সম্ভব হবে না বলে তারা মনে করছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে ডিগ্রি অর্জনের বাধ্যতামূলক শর্তের অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের আবেদন স্বাভাবিকভাবে প্রক্রিয়া করা হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একইভাবে পিএইচডি গবেষণাপত্র ও স্নাতকোত্তর থিসিস গবেষণাসংক্রান্ত ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের আবেদনও আবার প্রক্রিয়া করার কথা জানিয়েছে তারা।
নতুন কেন্দ্রীয় বিধিনিষেধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন প্রক্রিয়া তৈরির জন্য আইন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে বার্কলে।
তবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ বলেছে, এসব বিধিমালায় নতুন করে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ও নিয়োগদাতাদের সতর্ক করে দিয়ে তারা বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে এই সুবিধাজনক ব্যবস্থার অপব্যবহার আর সহ্য করা হবে না।
ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত ও অর্থায়ন বন্ধের হুমকি দিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের গাজা অভিযানবিরোধী ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ, বৈচিত্র্যভিত্তিক কর্মসূচি, জলবায়ু কার্যক্রম এবং তৃতীয় লিঙ্গসংক্রান্ত নীতি।
এসব পদক্ষেপ নিয়ে অধিকারকর্মীরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষাগত স্বাধীনতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বৈচিত্র্যবিরোধী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাবিদ্যা ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়েও অভিযোগ তুলেছে।
বৃহস্পতিবার বিচার বিভাগ অভিযোগ করে, প্রতিষ্ঠানটির ভর্তি প্রক্রিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ অভিযোগ তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিচার বিভাগের এই সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করে বলেছে, অভিযোগগুলো সঠিক নয়। তাদের দাবি, ভর্তি নীতিমালা আইন মেনেই পরিচালিত হয়েছে এবং এতে কোনো বৈষম্য করা হয়নি।
বিচার বিভাগ এর আগে আরও কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও একই ধরনের পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছে। এসব বিষয়ে সমঝোতার জন্য আলোচনা করার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছে তারা। আলোচনা ব্যর্থ হলে আদালতে মামলা করা হবে বলেও সতর্ক করেছে বিচার বিভাগ।
এছাড়া ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর ভিসাও বাতিল করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এসব বিক্ষোভকে প্রশাসন ইহুদিবিদ্বেষী এবং উগ্রপন্থিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে অভিহিত করেছে।
তবে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে থাকা ইহুদি সংগঠনসহ বিভিন্ন অধিকারকর্মী বলছেন, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলের বিরোধিতা করা ইহুদিবিদ্বেষ নয়। তাদের মতে, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে উগ্রপন্থার সমর্থন হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই।
সূত্র : রয়টার্স
![]() |
| যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : রয়টার্স |
Tuesday, August 25, 2026
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে আবারো উত্তাল ভারত
মঙ্গলবার বিপুলসংখ্যক বিহার পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিপিএসসি) চাকরিপ্রার্থীসহ অন্যান্য শিক্ষার্থী পাটনার গান্ধী ময়দান থেকে পূর্বঘোষিত মিছিল শুরু করেন। পরে তারা ডাক বাংলো মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাক্কাধাক্কি হয় এবং একপর্যায়ে তারা ব্যারিকেড ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
পুলিশ জলকামান ছুড়লে আন্দোলনকারীদের অনেকে ভিজে স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হলে কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অনেকের হাতেই ছিল জাতীয় পতাকা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পাটনার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ডাক বাংলো মোড়ে অতিরিক্ত বাহিনীর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) ও র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়।
যেসব দাবিতে আন্দোলন
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা কয়েক সপ্তাহ ধরে পাটনার গার্দানিবাগ এলাকায় অবস্থান ও বিক্ষোভ করছেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা এক ধাপে নেওয়া, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বিহার স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (বিএসএসসি) নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজন এবং হিন্দি মাধ্যমের প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া ৭০তম বিপিএসসি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে পরীক্ষাটি বাতিলের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
পুলিশের আইনশৃঙ্খলা বিভাগের সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার কামাখ্যা নারায়ণ সিং বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং আলোচনার ফল ইতিবাচক। তার দাবি, শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। এরপরও যারা মিছিল নিয়ে এগিয়ে আসবেন, তাদের থামানো হবে এবং সামনে যেতে দেওয়া হবে না।
সরকারের সঙ্গে সংলাপের দাবি
বিক্ষোভস্থলে কংগ্রেস নেতা সুশীল কুমার বলেন, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় এক ধাপের ব্যবস্থা এবং নেগেটিভ মার্কিং বাতিলসহ বিপিএসসি, বিএসএসসি ও সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা কয়েক দিন ধরে অনশন করলেও সরকার তাদের সঙ্গে কার্যকর সংলাপে বসেনি। মুখ্যমন্ত্রীকে আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধিদলকে আলোচনায় আমন্ত্রণ জানানোর আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে চলমান বিপিএসসি পরীক্ষাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছেন বিহারের বিরোধীদলীয় নেতা তেজস্বী যাদব। তিনি আন্দোলনকারীদের দাবি উপেক্ষা না করে তাদের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
তেজস্বী যাদবের দল রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) আন্দোলনকে সমর্থন করেছে। এছাড়া রেভল্যুশনারি ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন, এসএসএআই ও ছাত্র যুব সংগ্রাম মোর্চাসহ ১৪টি ছাত্র ও যুব সংগঠনও বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানাতে ‘বিদ্যার্থী সহযোগ শিবির’
বিক্ষোভের মধ্যে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ হিসেবে মাসিক ‘বিদ্যার্থী সহযোগ শিবির’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে বিহার সরকার। মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, প্রতি মাসের চতুর্থ মঙ্গলবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব শিবির আয়োজন করা হবে। সেখানে শিক্ষার্থীরা সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে সরাসরি নিজেদের অভিযোগ ও সমস্যার কথা জানাতে পারবেন।
এ ছাড়া অনলাইনে অভিযোগ নিবন্ধন এবং তার অগ্রগতি অনুসরণের সুবিধাও থাকবে। এ জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল ও ১১০০ হেল্পলাইন চালুর কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মন্তব্য ঘিরেও ক্ষোভ
এর আগে বিপিএসসি পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে পরীক্ষার নিয়ন্ত্রক রাজেশ কুমার বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘হাতি চলে বাজার, কুকুর ভোকে হাজার’—এই মন্তব্যকে আন্দোলনকারীদের প্রতি অবমাননাকর হিসেবে দেখছেন বিরোধীরা।
তেজস্বী যাদব ওই কর্মকর্তাকে অবিলম্বে অপসারণ এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, পরীক্ষায় বারবার অনিয়ম ও বাতিলের ঘটনা ঘটলেও দায় নির্ধারণ বা জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
শিক্ষার্থীদের দাবি ও সরকারের অবস্থান নিয়ে অচলাবস্থা কাটাতে দ্রুত সংলাপ না হলে পাটনায় আন্দোলন আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি

Saturday, July 18, 2026
বুয়েট আমার কাছে এক না পাওয়া প্রিয়তমার মতো
স্বপ্নেও কখনো ভাবিনি ডাক্তার হব। ছোটবেলায় প্রথমে পদার্থবিজ্ঞানী, পরে প্রকৌশলী হতে চেয়েছি। আমার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ছিল বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়)। বুয়েট আমার কাছে এক না পাওয়া প্রিয়তমার মতো! প্রতিদিন যখন সামনে দিয়ে যাই, মাঝেমধ্যেই হার্টবিট মিস হয়। জীবনে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্ন শুনতে হয়েছে, তা হলো, ‘আমি কেন ডাক্তার হলাম?’ উত্তর একটাই—মা-বাবা চেয়েছেন তাই। আমি মূলত প্রকৌশলের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। পরে একই সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল, বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে যাই।
মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর মনে হতো এত বিদঘুটে পড়াশোনা কীভাবে মনে রাখব। এত পড়া আমাকে দিয়ে হবে না। পাসটা করে নিই, এরপরই একটা ব্যবস্থা নিতে হবে। ভেবেছিলাম, বিসিএস দিয়ে ক্যাডার চেঞ্জ করে ফেলব। পরে বিসিএস জটের কারণে এফসিপিএস পরীক্ষা দিই। পার্ট ওয়ান পাসও করে ফেলি। পরে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার হিসেবে সুপারিশ পাই। শেষমেশ যেটা বুঝলাম, ডাক্তারি থেকে আমার মুক্তি নেই! সৃষ্টিকর্তা আমাকে ডাক্তার হিসেবেই দেখতে চান। শুধু তা–ই নয়, মেডিকেলের জন্য আমি হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছি, যাঁদের মধ্যে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এখন বিভিন্ন মেডিকেলে পড়াশোনা করছে এবং অনেকে ডাক্তার হয়ে গেছে।
তোমরা যারা জিপিএ–৫ পেয়েছ, জেনে রেখো, এটাই তোমাদের সাফল্যের শেষ নয়, বরং একটি নতুন শুরু। আমি পাঁচটি পয়েন্ট বলব, যেগুলো শুধু ভর্তি পরীক্ষার ফলই নয়, তোমাদের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
প্রথমত, লক্ষ্য পরিষ্কার করো। যদি তোমার লক্ষ্য পরিষ্কার না হয়, তাহলে পথ কখনো পরিষ্কার হবে না। ঠিক করো তুমি কোন জীবন চাও। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত পড়ো। অল্প পড়লেও প্রতিদিন পড়ো। ধারাবাহিকতা সেই শক্তি, যা প্রতিভাকেও হার মানায়। তৃতীয়ত, সঠিক রিসোর্স বেছে নাও। বই-প্রশ্নব্যাংক-গাইড—সবকিছু বিচক্ষণতার সঙ্গে নির্বাচন করো। ভুল রিসোর্স সঠিক মেধাকেও থামিয়ে দিতে পারে। চতুর্থত, মানসিক শক্তি ধরে রাখো। চাপ আসবে, ভয় আসবে। কিন্তু মনে রাখবে, জেতার আগে হার মানা যাবে না। তোমার বিশ্বাসই তোমার শক্তি। পঞ্চমত, সময়ের মূল্য বুঝো। তোমরা এখন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়ে আছ। এক ঘণ্টা নষ্ট মানে এক ধাপ পিছিয়ে পড়া।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তোমার স্বাস্থ্য। পরীক্ষা শুরু হয়ে গেলেই দেখবে আজ ঢাকা, কাল খুলনা, পরের দিন চট্টগ্রামে পরীক্ষা হচ্ছে। শরীর ও মনের জোর না থাকলে এত পরীক্ষা দিয়ে ভালো করা সত্যিই কঠিন। বর্তমানে ভাইরাল জ্বর ও ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেক বেড়েছে। সব সময় মাস্ক ব্যবহার করবে, মশা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবে, পুষ্টিকর খাবার খাবে, পর্যাপ্ত পানি পান করবে।
যেকোনো যুদ্ধ জেতার সবচেয়ে ভালো কৌশল হচ্ছে প্রতিপক্ষকে জানা। এ ক্ষেত্রে তোমার প্রতিপক্ষ কিন্তু তোমার বন্ধুরা নয়, প্রতিপক্ষ হচ্ছে সেই ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নগুলো। একটা ভালো প্রশ্ন ব্যাংক নিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। তাহলে সবচেয়ে কম সময়ে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়েরই সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিতে পারবে। পড়াশোনা তো সবাই করবে, কিন্তু তোমাকে একটু কৌশলী হতে হবে। ভর্তি পরীক্ষার সময় যখনই আমার খারাপ লাগত, একটা ডায়েরি হাতে নিতাম। ভর্তি পরীক্ষা শেষ হওয়ামাত্রই কী করব, কোথায় ঘুরতে যাব—এগুলো লিখতাম। মনকে এভাবে সান্ত্বনা দিতাম—আর মাত্র কয়েকটা দিন। এরপরই ‘আগুনের দিন শেষ হবে একদিন, ঝরনার সাথে গান হবে একদিন।’
ধরো, তুমি মেডিকেলে পড়বে, এ জন্য কি শুধু মেডিকেলের ফরম তুললেই হবে? মোটেই না। তুমি বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম তুলবে, যেগুলোর সঙ্গে মেডিকেলের প্রশ্ন পদ্ধতির মিল আছে। এতে অনেকগুলো অপশন তৈরি হবে এবং মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার দিন দেখবে নিজেকে অনেকটাই নির্ভার লাগছে। আমি নিজে ১৬টা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম তুলেছিলাম।
প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তিনটি বিকল্প মাথায় রাখতে পারো:
১. মেডিকেল ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়;
২. ইঞ্জিনিয়ারিং ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়;
৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক ইউনিট।
এতে তোমার চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যাবে। এত কিছুর পরও যদি চান্স না-ই পাই, তাহলে কি হেরে যাব? আমার পরিচিত অসংখ্য মানুষ আছেন, যাঁরা পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পাওয়ার পরও দেশে-বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় পড়াশোনা করেছেন, প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তোমাকে শুধু খুঁজে নিতে হবে, তোমার মেধা কোথায় লুকিয়ে আছে।
আমরা যারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছি, তাদের জীবনপথ অনেকটা নির্ধারণ হয়ে গেছে। আমাদের এই জীবনে হয়তো চাইলেও অনেক বেশি কিছু করে ফেলার সুযোগ এখন আর নেই। কিন্তু তোমরা জানো না, তোমাদের সামনে কত সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। হয়তো একদিন তোমাদের সঙ্গে দেখা করার জন্যই আমার কয়েক দিন আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখতে হবে। তোমাকে শুধু পরিশ্রম করে সেই জায়গাটায় একবার পৌঁছাতে হবে, সেই বিশ্বাসটা মনে ধরে রাখো মনে।
এ কঠিন সময়ে বাবা-মায়ের সমর্থন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি তোমার কাছে তোমার মা-বাবার সমর্থন থাকে, তাহলে তুমি এই পৃথিবীতে সবচেয়ে ভাগ্যবান মানুষগুলোর একজন। অভিভাবক, যাঁরা আমার কথা শুনছেন, তাঁরা অবশ্যই সফলতা ও ব্যর্থতায় আপনার ছেলেমেয়ের পাশে থাকবেন। আপনার একটি ইতিবাচক কথাও আপনার ছেলেমেয়েকে বিশ্বসেরা বানাতে পারে।
ধরো, পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেলে। এরপর যে বন্ধুটি সুযোগ পায়নি, তার পাশে থাকার দায়িত্ব কিন্তু তোমার। সে হয়তো সংকোচে তোমার কাছে আসবে না, তোমাকেই এগিয়ে যেতে হবে সেই বন্ধুর কাছে। তোমার একটি কথাও তার মনে যেন আঘাত না দেয়, এটা তোমাকে খেয়াল রাখতে হবে। দেখবে কদিন পরই কে কত ভালো প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পেল, এ নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যাবে। তুমি সব সময় নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করবে, তবে অহংকার নিয়ে নয়। নিজের প্রতিষ্ঠানকে সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবে, সেটা তুমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে, যে বিষয়েই পড়ো না কেন।
তোমার আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রমের মাধ্যমেই তুমি জয় করে ফেলতে পারো যেকোনো বাধা। তোমাদের সবার জন্য অন্তরের অন্তস্তল থেকে দোয়া ও শুভকামনা।
![]() |
| ডা. অন্তর সাহা। ছবি: প্রথম আলো |
Tuesday, June 16, 2026
মাদাগাস্কারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাসের জীর্ণ দশাই কি বিক্ষোভ উসকে দিয়েছিল
শিক্ষার্থী উলরিক সাম্বিজাফি এএফপির সংবাদকর্মীদের ছাত্রাবাসের অবস্থা দেখানোর জন্য ডাকেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের থাকার জায়গাগুলো দেখে যান।’ গত ২৫ সেপ্টেম্বর মাদাগাস্কারে শুরু হওয়া যে বিক্ষোভ ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তাতে অংশ নেন এই শিক্ষার্থীও।
সাম্বিজাফির থাকার কক্ষের পেছনের দরজায় গিয়ে দেখা গেল, মাত্র দুই মিটার (৬ দশমিক ৫ ফুট) দূরের একটি খোলা নর্দমা দিয়ে আবর্জনা ভেসে যাচ্ছে।
২৪ বছর বয়সী সাম্বিজাফি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। এএফপিকে তিনি তাঁর পায়ের গোড়ালি ও হাঁটুর মাঝ বরাবর দেখিয়ে বলেন, ‘বর্ষায় নর্দমার পানি এই পর্যন্ত উঠে আসে। এগুলোই প্রমাণ করে যে আমাদের বিদ্রোহ ন্যায্য।’
সাম্বিজাফির বাড়ি মাদাগাস্কারের পূর্বাঞ্চলে। তিনি দেশটির সেসব শিক্ষিত তরুণের একজন; যাঁরা দেশটিতে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন দেশে হওয়া ‘জেন–জি’ আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় এ বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গতকাল মঙ্গলবার মাদাগাস্কারের পার্লামেন্টে ভোটাভুটি হয়েছে। এতে প্রেসিডেন্ট আন্দ্রি রাজোয়েলিনা অভিশংসিত হয়েছেন। এরপর সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিট রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
রাজধানী আন্তানানারিভোর আঙ্কাতসো এলাকায় অবস্থিত এ ভবনটি ২০২৩ সালে চালু হয়েছে। তবে এখনই সেখানে ফাটল দেখা দেওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, এটির নির্মাণে বড় ত্রুটি রয়েছে।
‘তাঁরা তরুণদের কথা ভাবেননি’
সাম্বিজাফি বলেন, ‘মাদাগাস্কারের তরুণদের কথা কেউ ভাবেন না। কারণ, এই দেশের নেতাদের সন্তানেরা আন্তানানারিভো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন না। তাঁরা বর্দো, এমআইটি, হার্ভার্ড ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েন।’
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ মাদাগাস্কারে বিদ্যুৎ ও পানির সংকটকে কেন্দ্র করে এ বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল। পরে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।
গত সপ্তাহে রাজোয়েলিনা তাঁর দেশের তরুণ, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ও তাঁদের আবাসন পরিস্থিতির দিকে গভীরভাবে নজর দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
সম্প্রতি নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেজর জেনারেল রুফিন ফরচুনাত দিম্বিসোয়া জাফিসাম্বোর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করবেন, যা সব শিক্ষার্থীর চাহিদা পূরণ করবে।
এ নিয়ে সাম্বিজাফি তাচ্ছিল্যের হাসি হাসেন। তিনি বলেন, মাদাগাস্কারে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, ‘নিজের থালার খাবার শেষ হওয়ার খবর নেই, পাত্রে কী রাখা আছে তার খোঁজ’।
ছাত্রাবাসের এ ভবন ও কক্ষগুলোই যে আঙ্কাতসো এলাকায় শিক্ষার্থীদের থাকার সবচেয়ে খারাপ জায়গা, তা নয়। পাশের হলুদ চারতলা ভবনেরও একই দশা। ৪০০ জনকে রাখার উপযোগী করে এটি বানানো হয়েছে। তবে সেখানে অনেক বেশি শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকেন। প্রায় ১০ বছর আগে ভবনটিতে শিক্ষার্থীরা থাকতে শুরু করেন। পুরোনো বাসিন্দাদের কেউই মনে করতে পারেন না যে কমিউনিটি কিচেনের প্লাগ বা নল কখনো কাজ করত কি না।
৩০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইয়ানদোহারিলালা রাকোতন্দ্রিনা নিচতলার একটি কক্ষে রাখা দুটি দুই চাকার যান দেখিয়ে বলেন, এটি স্কুটারের জন্য গ্যারেজ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
তৃতীয় তলার বাথরুম ও লন্ড্রিতে দেখা গেল ট্যাপ থেকে অল্প অল্প করে পানি পড়ছে। পানির চাপ নেই সেখানে।
দেয়ালে একটি কাগজ সাঁটানো। কোন শিক্ষার্থী কোন দিন এগুলো পরিষ্কার করবেন, তার রুটিন দেওয়া। তবে কিছু শৌচাগারের অবস্থা এতটাই খারাপ যে তার স্বাভাবিক রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। পানির সংকটের কারণে এগুলো আরও দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
রাকোতন্দ্রিনা বলেন, ‘আমরা আক্ষরিক অর্থে আবর্জনার মধ্যে বসবাস করছি।’ তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন আশপাশ থেকে প্রস্রাবের তীব্র দুর্গন্ধ আসছিল।
মেঝেতে বিছানা
ইজেকিয়েল লেডি নামের ওই ছাত্রাবাসে রাজধানীর বাইরে থেকে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ নেই। চারজনের জন্য তৈরি কক্ষে ছয়জনকে থাকতে হচ্ছে।
১৮ বর্গমিটার (১৯৪ বর্গফুট) মাপের ছোট কক্ষে ছাত্রদের কয়েকজনকে মিলে এক বিছানায় বা মেঝেতে তোশক বিছিয়ে ঘুমাতে দেখা যায়।
এক শিক্ষার্থীকে দেখা গেল ভাঙা আয়নার সামনে চুল কাটার সেবা দিচ্ছেন। চুল কাটার জন্য প্রতিজনের কাছ থেকে দুই হাজার আরিয়ারি (দশমিক ৪০ ইউরোর কম) নিচ্ছেন তিনি, যা শহরে চুল কাটার খরচের অর্ধেক।
লেডি নামে এক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী বলেন, ‘মাদাগাস্কারের তরুণেরা সব পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে পারদর্শী। সম্ভবত এ জন্যই নেতারা মনে করেন, তাঁদের সাহায্য করার প্রয়োজন নেই।’
![]() |
| আঙ্কাতসো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসের দৃশ্য। ছবি: এএফপি |
Sunday, May 10, 2026
‘বুলিংয়ের শিকার’ হয়ে মাস্টার্স না করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়েন তরুণী, কী ঘটেছিল by নাজনীন আখতার
কথাগুলো বলেছিলেন এক তরুণী (২৬)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ার সময় তিনি কিছু সহপাঠীর মাধ্যমে বুলিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি।
তরুণী বলেন, তাঁর অভিজ্ঞতা এতটাই ভীতিকর ছিল যে অনার্সের পর তিনি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করেননি। এর পরিবর্তে চাকরিতে যোগ দেন। প্রায় এক বছর চাকরি করেন। মাস্টার্স করার জন্য গত মাসে তিনি বিদেশে চলে যান।
দেশে থাকাকালে ভুক্তভোগী তরুণী এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি ‘বুলিংয়ের শিকার’ হওয়ার বিবরণ দিয়েছিলেন। বিদেশে যাওয়ার পর সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর সঙ্গে আবার কথা হয়।
ওই তরুণী বলেন, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, এ নিয়ে লোকজনকে যতটা প্রতিবাদী হতে দেখা যায়, বুলিং-গসিপের মতো মানসিক হয়রানি-পীড়নের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠীদের বুলিং-গসিপের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে জানান ওই তরুণী। তিনি বলেন, মনোবিদের কাছে গিয়ে ছয় থেকে সাতটি কাউন্সেলিং সেশন নিতে হয়েছে তাঁর। তবে তাঁর এই মানসিক হয়রানির বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্ব পায়নি।
তরুণী বলেন, ‘এটা (বুলিং) সেখানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। অথচ বুলিদের (হেনস্তাকারী) কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে পারলাম না।’
‘ওদের সঙ্গে আর পড়ব না’
ভুক্তভোগী তরুণী রাজধানীর একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি-এইচএসসি পাস করেন। তাঁর মা–বাবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ২০১৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হন।
তরুণী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি সবার সঙ্গে মেশার চেষ্টা করতেন। তবে কারও সঙ্গেই খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা হয়নি। এর মধ্যে একটি গ্রুপ হয়ে ওঠে ‘এলিট’ (প্রভাবশালী)। এই গ্রুপে মূলত ছেলেরাই ছিলেন। তাঁরা পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। পারিবারিকভাবে সচ্ছল। তাঁরা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তান। তাঁদের সঙ্গে তাঁর মেশা কম হতো।
২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোট কয়েকটি গ্রুপ তৈরি হয় বলে জানান তরুণী। তিনি বলেন, তখন কারও কোনো কাজ ছিল না। ফেসবুকে কাউকে না কাউকে নিশানা করে বুলিং করা হতো। কোভিডের পর সরাসরি ক্লাস শুরু হয়। তখনো এসব বুলিং থামেনি। কারও মধ্যে ‘বসিং’ (হুকুমবাজি) প্রবণতা বেশি ছিল। কাকে পশ্চিমা পোশাকে মানায় না, কার পোশাক পরার ধরন ভালো না, কে কোন সহপাঠীদের সঙ্গে প্রেম শুরু করেছে—এসব নিয়ে ক্লাসে গসিপ (পরচর্চা) চলত। সেই সঙ্গে চলত ব্যাকবাইটিং (কারও অনুপস্থিতিতে নিন্দা করা)।
তরুণীর ভাষ্য, তিনি খেয়াল করলেন, যা তিনি বলেননি, তা নিয়ে তাঁকে দোষারোপ করা হচ্ছে। বুলিং করা হচ্ছে। যে গ্রুপটা এলিট ছিল, সেই গ্রুপের ছেলেরা ছিল বুলি টাইপের। তিনজন ছেলে বেশি বুলি ছিলেন। তাঁরা গসিপও করতেন বেশি। তাঁরা নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করতেন খুব। বডি শেমিং, স্লাট শেমিং করতেন। একজন ছেলে কথা বলার সময় বাজে দৃষ্টিতে তাকাতেন। একবার একজন শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করে ‘বেখেয়ালের’ অজুহাত দিতে ‘সরি’ বলেছিলেন।
বছর দুয়েক পর এই ‘এলিট’ গ্রুপের তুলনামূলক ‘নিরীহ’ একটি ছেলের সঙ্গে ভালো লাগার সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে জানান তরুণী। সম্পর্কটিকে তিনি বর্ণনা করেন ‘সিচুয়েশনশিপ’ হিসেবে। তিনি বলেন, সম্পর্কটিকে দীর্ঘ বা স্থায়ী করার ক্ষেত্রে তাঁরা কেউ কারও প্রতি প্রতিশ্রুতবদ্ধ ছিলেন না। শুরুতে তাঁরা বলেছিলেন, সম্পর্ক ভেঙে গেলে তাঁরা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। সম্পর্কের এক বছরের মধ্যে ছেলেটি সাবেক প্রেমিকার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তখন তিনি (তরুণী) সম্পর্কটি ভেঙে দেন।
তরুণীর ভাষ্য, এরপর দেখলেন, তিনি ক্লাসে গেলে অনেকে ফিসফিস করেন। তিনি বুঝতে পারতেন, তাঁকে নিয়েই কিছু বলা হচ্ছে। যাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেছে, সেই ছেলে, তাঁর বন্ধুসহ কিছু সহপাঠী মিলে তাঁকে নানান ধরনের মন্তব্য করে কোণঠাসা করে ফেলেন। সে সময় তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন। ক্লাসে যেতে ইচ্ছা করত না। পড়াশোনা করতে পারতেন না। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ভুগতে শুরু করেন।
তরুণী বলেন, ‘আমি কতটা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলাম, বোঝাতে পারব না। মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে দুটি ক্লাস করে আর যাইনি। মা–বাবা অবাক হয়েছিলেন। তাঁদের বলেছি, আমি “বুলিড” হয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওদের সঙ্গে আর পড়ব না।’
শিক্ষক যা বললেন
তরুণীর অভিযোগ নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগটির শিক্ষক ও তৎকালীন স্টুডেন্ট কাউন্সেলরের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের ডেকে তিনি কথা বলেছিলেন। অন্য সহপাঠীদের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। তাঁদের কথা ছিল, ‘ব্রেকআপ’ হওয়ার কারণে মেয়েটি বিষণ্ন ছিল।
ওই শিক্ষক বলেন, ‘মেয়েটি যে ধরনের অভিযোগ করেছিল, তা প্রমাণ করা কঠিন। ফলে মেয়েটিকে আমি মানসিকভাবে শক্ত হওয়ার জন্য বুঝিয়েছিলাম। মেয়েটি অন্তর্মুখী। সে তার কষ্টের কথা সেভাবে শেয়ার করতে পারত না।’
বুলিংয়ের মতো হেনস্তার বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সুযোগ নেই—এমন প্রশ্নে ওই শিক্ষক বলেন, ব্যবস্থা আছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হতে হবে। শুরুতে তিনি মেয়েটিকে লিখিতভাবে অভিযোগ দিতে বলেছিলেন। পরে মেয়েটি বিভাগের প্রধানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স পরীক্ষা হয়ে গেছে।
তরুণী বলেন, অনার্স ও ইন্টার্নশিপ শেষে তিনি প্রথম মৌখিক অভিযোগ করেন। পরে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স পরীক্ষার পর লিখিত অভিযোগ দেন। তিনি পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এর মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং দুজনের বিরুদ্ধে মানসিক ও মৌখিক হয়রানির অভিযোগ দেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, একটা কমিটি হয়েছে। মাস্টার্সের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে এখনো ব্যবস্থা নিতে পারে।
মৌখিক অভিযোগ যখন করেছিলেন, তখন সেটাকে আমলে নেওয়া হয়নি বলে দাবি তরুণীর। তিনি বলেন, ফলে হেনস্তাকারীরা নিজেদের আরও ক্ষমতায়িত বোধ করেছেন। তাঁদের কোনো অনুতাপ হয়নি। তাঁরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে ‘ব্রেকআপ’ বিষয়টিকে সামনে আনেন। এখানে ‘ব্রেকআপ’ কোনো বিষয় ছিল না।
সহপাঠীদের আচরণে হীনম্মন্যতায় ভোগে ৫ শতাংশ
বেসরকারি সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন ২০২২ সালের অক্টোবরে ‘করোনা-পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একাডেমিক চাপের প্রভাব এবং তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা’ শীর্ষক জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, সহপাঠীদের দ্বারা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণে হীনম্মন্যতায় ভোগেন প্রায় ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।
জরিপে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসার মোট ১ হাজার ৬৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৫৬ শতাংশ।
একই সংগঠন ২০২২ সালের মার্চে ‘তরুণীদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব’ শিরোনামে আরেকটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, তরুণীরা তাঁদের দেহের আকৃতি, গঠন ও অবয়ব নিয়ে কথাবার্তায় হেয়প্রতিপন্ন বোধ করেন। বন্ধুবান্ধবের কাছে ‘বডি শেমিং’-এর শিকার হয়েছেন ২২ শতাংশ তরুণী। এই জরিপে এক হাজারের বেশি তরুণী অংশ নিয়েছিলেন।
২০২১ সালে পোল্যান্ডের ম্যানেজমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘কনসিকোয়েন্সেস অব বুলিং অন ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইন বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর বুলিংয়ের পরিণতি) শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে আসে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বুলিং হয়। বুলিং প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানা, অভিযোগ করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়া, অন্যদের সচেতন করা, পরিবারকে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষকসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ভুক্তভোগীকে সহায়তা দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গবেষণা প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়।
‘বুলিংয়ের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিটের পরিচালক কামাল চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সেল রয়েছে। যৌন পীড়নের ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সেভাবে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। বুলিংয়ের মতো ঘটনায় ভুক্তভোগীর মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, ক্লাসে যেতে ভয় পাওয়া, মানসিকভাবে দুর্বল বোধ করা, হীনম্মন্যতা, এমনকি অপরাধবোধে ভোগার মতো প্রবণতা দেখা যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে নিজের ক্ষতি করা বা আত্মহত্যায় ঝুঁকতে দেখা যায়। এ কারণে কেউ বুলিংয়ের অভিযোগ করলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে ভুক্তভোগীকে কাউন্সেলিংয়ের মতো মানসিক সহায়তা দেওয়া উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হলে ও ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) তিনতলায় বিনা মূল্যে মানসিক সহায়তা দেওয়া হয় বলে জানান অধ্যাপক কামাল চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রচার কম থাকায় অনেক শিক্ষার্থী এসব সেবা সম্পর্কে জানেন না। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে অবস্থিত নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিটে ফি দিয়ে সেবা নেওয়া যায়।
![]() |
| প্রতীকী ছবি |
Monday, January 12, 2026
ডাকসু–জকসু: শিবিরের জয়, ওল্ড স্কুল পলিটিকসের মৃত্যুঘণ্টা ও জেন–জি মনস্তত্ত্ব by হেলাল মহিউদ্দীন
ফেসবুকে প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছি। প্রতিটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পর এ রকম ফলাফল কেন হয়েছে, জানতে চেয়ে তাঁদের কয়েকজনের কাছে নির্মোহ মতামত দেওয়ার অনুরোধ রেখেছি। উত্তরদাতাদের নির্বাচনের আগে তাঁদের প্রোফাইল ও পোস্টগুলো ভালোমতো পর্যালোচনা করেছি। যাঁদের চিহ্নিত করতে পেরেছি ছাত্রশিবির, ছাত্রদল বা বাম সংগঠনগুলোর কর্মী-সমর্থক হিসেবে, তাঁদের নির্বাচিতদের তালিকায় রাখিনি। আপাতনীরব, আপাতনিরপেক্ষ, ফেসবুকে তেমন সক্রিয় নন, খুব বেশি পোস্ট দেন না, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পোস্টগুলোতে প্রতিক্রিয়া দেন, তাঁদের বেছে নিয়েছি।
আমার ইমেইল দিয়ে জানিয়েছি, ইচ্ছা করলে তাঁরা তাঁদের মতামত জানাতে পারেন। বেশির ভাগই মতামত দিয়েছেন। সবশেষ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) নির্বাচন বিষয়েও কয়েকটি মতামত পেয়ে গেছি।
বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষক ও ছাত্রছাত্রীরা এ বিষয়ে চমৎকার গবেষণা শুরু করতে পারেন। চমকপ্রদ ফলাফল পাবেন, সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বুঝতেই গবেষণা দরকার।
আমার অনুরোধে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীরা সাড়া দিয়েছেন বেশি। তাঁদের বিষয়বস্তুর গভীরে গিয়ে পর্যালোচনার শক্তিও ছাত্রদের চেয়ে শক্তিশালী মনে হয়েছে। যা–ই হোক, উত্তরদাতাদের ভাষ্যগুলোর সংযোগ-সমন্বয় ও পুনঃপর্যালোচনা করার পর নিশ্চিত হলাম, ছাত্রশিবিরের জয়জয়কারকে শুধু সাময়িক বিস্ময়-ঘোরজাগানো ঝাঁকুনি ভাবলে বাংলাদেশের সামাজিক রাজনীতির নতুন গতিপথ ও বাঁক-সন্ধিগুলো চেনা যাবে না।
২.
বাংলাদেশে গ্রাম-সমাজ ও মফস্সলের নিম্নমধ্যবিত্তদের সন্তানেরা দ্রুত শহুরে মধ্যবিত্তের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন। আমরা যাঁদের জেন-জি বলি, এঁরা তাঁরাই। বাংলাদেশের আগামী রাজনীতির গতিপথও তাঁরাই নির্ধারণ করবেন। কারণ, তাঁদের ভুবনদৃষ্টি তাঁদের আগের দুটি প্রজন্ম (মিলেনিয়াল ও জেনারেশন এক্স) থেকে আলাদা। আলাদা হওয়ার পরও জেন-জিদের সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ, জানাশোনা ও বোঝার মিথস্ক্রিয়া এই দুই প্রজন্মের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি। জেন-জিদের স্বতন্ত্র ও স্বাধীন মানস গড়ে উঠেছে এই দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাব-ভাবনার ঠিক-বেঠিক, ভুলভ্রান্তি দেখেশুনেও পর্যালোচনা করে।
জেন-আলফারা এখনো বয়সে ছোট। মাত্র বারো-তেরো বছরে বা কৈশোরে পড়েছে জেন-আলফাদের প্রথম সারিটি। জেন-জিদের অন্য রকম শক্তির বড় উৎস জেন-আলফাদের সঙ্গেও জেন-জিদের সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতাই থাকবে সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ জেন-জিরাই একমাত্র প্রজন্ম, যারা চারটি জেনারেশনের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় সক্রিয়। জেন-আলফাদের ওপরও তাদের প্রভাব হবে অপরিসীম।
এ আলাপকে আপাতদৃষ্টে খাপছাড়া বা ‘ধান ভানতে শিবের গীত’ মনে হলেও পাঠক শেষ পর্যন্ত পাঠ করলে বুঝবেন, কীভাবে বিষয়গুলো অঙ্গাঙ্গি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে।
৩.
উত্তরদাতাদের একজনের মতামত ছিল দীর্ঘ। মতামত না বলে একটি চোখ খুলে দিতে পারা কেস স্টাডি বলাই ভালো। সেটিই সংক্ষেপে গুছিয়ে লিখছি।
লিখেছেন, ‘আমি ভেবেছিলাম যাকে পছন্দ হবে, তাকেই ভোট দেব। কিন্তু মা বললেন—যেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিই। মাকে ভালোবাসি, তাঁর কথা ফেলার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। তেমন সচ্ছল নই। বাবা মফস্সলে একটি ওষুধের দোকান চালান। একসময় জাসদ করতেন, পরে খানিকটা আওয়ামী লীগপন্থী। মা প্রাইমারি স্কুলে পড়ান। কখনোই শুনিনি জামায়াত-শিবির পছন্দ করতেন। বড় ভাই আমার চেয়ে বয়সে দশ বছরের বড়। ছাত্রদল করতেন সক্রিয়ভাবে। দুজনকেই জিজ্ঞেস করলাম—মা বলছেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিতে। তোমাদের কী মত? দুজনই বললেন—তোমার যেটা ভালো মনে হয়, সেটাই করো।
‘বাবা ও বড় ভাই স্বভাবে বেশ কর্তৃত্বপরায়ণ হওয়ার পরও আমার বিবেচনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন দেখে নিজেকে সম্মানিত লাগছিল। কিন্তু মার অনুরোধের কারণ জানার কৌতূহলটি গেল না। তাই তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম—তুমি আবার কবে জামায়াত-শিবির হলে?
‘মা জানালেন—কখনো হননি, এখনো না। কিন্তু ওনার স্কুলেরই আরেক সহকর্মী নারীর পরিবার জামায়াতের রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট। শেখ হাসিনার শাসনকালের কোনো এক সময় তাঁর পুরো পরিবার ও স্বজন যেভাবে নির্যাতিত-নিগৃহীত হয়েছে, ভাষায় প্রকাশের অতীত। সবচেয়ে কষ্টকর ঘটনা, ভদ্রমহিলার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছেলেটিকে তার চার বন্ধুসহ ছাত্রলীগের পান্ডারা তুলে নিয়ে যায় এবং এমনই নির্যাতন চালায়, ছেলেটি এখনো ট্রমাগ্রস্ত। ছেলেটি ক্লাস টেনেও সেরা তিনজন ছাত্রের একজন ছিল। কিন্তু আর পরীক্ষাই দিতে পারেনি। সে এবং তার চার বন্ধুর চারজনই একসময় মার প্রাইমারি স্কুলেরই ছাত্র ছিল। মার ভাষায়, পাঁচজনই ছিল ভালো ছাত্র, ভদ্র, শান্তশিষ্ট ও অমায়িক। ছাত্রশিবিরও করত না। কিন্তু মাত্র একজনের পারিবারিক জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার অপরাধে পাঁচটি ছেলের জীবন, ভবিষ্যৎ, পাঁচটি পরিবার তছনছ হয়ে গেল।
‘মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম—তোমার কলিগ ভদ্রমহিলাই কি তোমাকে অনুরোধ করেছেন আমাকে বলতে যেন ছাত্রশিবিরকে ভোট দিই? মা জানালেন—না! ভদ্রমহিলাকে স্কুলে দেখামাত্রই তাঁর নিজ থেকে মনে হতো আমাকে বলবেন। কিন্তু বলতে ভুলে যান। সেদিন আর ভোলেননি। মার তীব্র অপরাধবোধ—ভদ্রমহিলার জন্য নামাজে বসে দোয়া করা ছাড়া কিছুই করতে পারেননি। আমাকে অনুরোধ জানানোকে তিনি সামান্য হলেও সামাজিক দায়িত্ব পালন করা হবে ভেবে নিয়েছেন।
‘আগে জানতাম ভোট দিতে পারলে বাবা-মা কোন দলকে ভোট দিতেন। এবার সংসদ নির্বাচন নিয়ে বলছেন—কোনো দলকে নয়, ব্যক্তিকে—সত্যিকারের যোগ্যজনকেই ভোট দেবেন। আমিও সেভাবেই ভোট দিয়েছি।’
৪.
কোথাকার পানি কোথায় গড়ায়? কোথাকার ভোট কোথায় এসে কীভাবে কোন প্রার্থীর বাক্সে জমা হয়! ঘটনাটি আবারও দেখায়, বাংলাদেশের সমাজ এখনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, সহকর্মী, নিকটজনের পারস্পরিক বিজড়নের একটি মানবিক সত্তা, একটি নেটওয়ার্ক। কান টানলে মাথা আসার মতো। ছাত্রীটি জেন-জি। তাঁর বড় ভাই মিলেনিয়াল বা জেন-ওয়াই। মা–বাবা জেন-এক্স। তিন প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। তাঁর মানস গঠনও তাই অনেক পরিণত।
নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। প্রথম সংসদীয় সরকারটি জনগণের প্রত্যাশা পুরোপুরি মেটাতে না পারলেও ভালো-মন্দ, ভুলত্রুটি মিলিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে খুব একটা হতাশ করেনি। সম্ভাবনা বাড়ছিল।
ছিয়ানব্বই হতেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধঃপতনের শুরু। তারপর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড খারাপ থেকে খারাপতর এবং চব্বিশে এসে চূড়ান্ত খারাপতম হয়েছিল। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ চলে গেল দুর্নীতির বরপুত্র, পুঁজিপতি, বেনিয়া, লুটেরা, টাকা পাচারকারী ঋণখেলাপিদের হাতে।
মফস্সল থেকে উঠে আসা নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যবিত্ত রাজনৈতিক শ্রেণি হয়ে ওঠা দূরে থাক, বড় অংশই ছিটকে দূরে সরে গেল। যারা রাজনীতিতে নামল, তারা সরাসরি উচ্চবিত্তের খাতায় নাম লেখাল। পদ্ধতি অবশ্যই লুটপাট, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি। প্রমাণ প্রধানমন্ত্রীর নিজ মুখে স্বীকারোক্তি তাঁর পিয়নের চার শ কোটি টাকার মালিকানা। রূপপুর প্রকল্পের এক বালিশের মূল্য পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা হওয়া। হাদির হত্যাকারী ফয়সালের মতো ওয়ার্ড পর্যায়ের সন্ত্রাসীর ঘরে পৌনে তিন শ কোটি টাকার ব্যাংক চেক মেলা। সম্রাটদের ঘরে সিন্দুকে, ফ্রিজে হাজার কোটি টাকা মেলা। ব্যাংক থেকে ত্রিশ হাজার কোটি টাকা লোপাট। গুন্ডাতন্ত্রের ছোবল থেকে বুয়েটের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও নিস্তার না মেলা। আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড।
জেন-এক্স (ছাত্রীটির পিতার প্রজন্ম) তিনটি পর্বের প্রত্যক্ষদর্শী হলেও কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। জেন-এক্স অনুকরণীয়-অনুসরণীয় হওয়ার মতো কিছু করতে পারেনি। ফলে তাদের নৈতিক শক্তিও সামান্যই। তাই জেন-জিদের চোখে তারা ব্যর্থ। পুরোনো রাজনীতিতে তাদের বলিদান জেন-জিদের তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রয়োজন সম্পর্কে ভাবনা গড়ে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, শক্তি দিয়ে সবকিছু পদানত রাখার চেষ্টা বুমেরাং হয়েছে। অন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া মতামতেও একই সুর পেলাম। প্রায় সবাই জানালেন, আত্মীয়স্বজন পরিমণ্ডলে একই রকম ঘটনা দেখেছেন, শুনেছেন, জেনেছেন।
৫.
ছাত্রশিবিরের জয় মানে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির জয় ভেবে নেওয়ার কোনো কারণ দেখি না। বরং বিষয়টির বড়সড় বার্তা—‘ওল্ড স্কুল পলিটিকস’ বাংলাদেশে আর কাজ করবে না। মতামতদাতাদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, তাঁদের ভোটদানের পেছনে বিবেচনায় ছিল কোন প্রার্থী কতটা গোছানো, সুশৃঙ্খল এবং নির্ভরযোগ্য; কারা কতটা বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি করতে পেরেছেন। কোন দল কোন রাজনৈতিক আদর্শবাদ প্রতিষ্ঠা করবে বা না করবে, তাদের বিবেচনায় ছিল না। কারা ধর্মাশ্রয়ী কারা নয়, কারা জাতীয়তাবাদী কারা সমাজতন্ত্রী, বিষয়গুলো তাঁদের মধ্যে কোনো আবেদন তৈরি করেনি। কোন ব্যানারে ভোট করছেন, তা-ও নয়। তাঁদের যাপিত জীবনের সমস্যা সমাধানে কোন প্রার্থীকে সত্যিকার আন্তরিক, সৎ, নির্ভরযোগ্য মনে হচ্ছে, সেটিই দেখেছেন বেশি।
আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক আলাপ পেয়েছি। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে ছাত্রসংগঠনের মূল পিতৃপ্রতিম রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে, তারা যেন ছাত্রপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়। ‘ঘরপোড়া গরুদের সিঁদুরে মেঘ দেখে আগুন ভাবা’র মতো। আওয়ামী শাসনামলে ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য তাঁরা দেখেছেন। ভয়—এখানেও ক্ষমতা, সরকারেও ক্ষমতা; এত বেশি ক্ষমতার আঁচে তারাও যদি ছাত্রলীগের মতোই দানবীয় ক্ষমতায় ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। সেটি হতে না দেওয়াও শুদ্ধির একটি পথ।
একটা সময় ছিল যখন ভাবা হতো, রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্র সংসদে এলে বরাদ্দ পেতে, সরকারি আনুকূল্য পেতে, উন্নয়ন ও ছাত্রকল্যাণের কাজগুলো করতে ঝক্কিঝামেলা কমবে। এ ভাবনা কখনোই সঠিক প্রমাণিত হয়নি। জেন-জিরা সেটি জেনেছে। জানার আলোকে নতুন পথ ধরতেও শিখেছে। ‘নিউ স্কুল পলিটিকস’ অনেকটা এ রকম শুদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরিণত হয়ে উঠবে সম্ভবত।
৬.
জেন-জিদের চোখে বর্তমান সময়টি একটি ‘কারেকশন ফেজ’। আর ‘ভুল করা যাবে না’ প্রতিজ্ঞার সময়। তাই সক্রিয় রাজনীতির বাইরের আপাত-অরাজনৈতিক জেন-জিরাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুদ্ধি আনতে অবদান রাখছে। শুদ্ধি পর্বটি চলছে পাঁচটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে। যাতে শেষমেশ একটা সময়ে গিয়ে মোটামুটি পরিশুদ্ধ একটি রাজনীতির পথ তৈরি হয়।
দেখা যাক প্রক্রিয়া পাঁচটি কী কী:
এক. নিরীক্ষণ (স্ক্রুটিনি) ও পরীক্ষণ (এক্সপেরিমেন্ট) : ‘গতানুগতিক পথে হেঁটে বাপ-দাদারা অনেক তো দেখেছে। এবার একটু ভিন্নভাবেই না হয় হেঁটে দেখি—কী হয় দেখা যাক’ ভাবনা। জেন-জিদের মধ্যে এই মনোভাব প্রবল। আমরা জেন-এক্সরা ভাবতাম—ওকে ভোট দেব? সে তো জিতবে না। মাঝে ভোটটিই নষ্ট হবে। জেন-জিরা ‘ভোট নষ্ট’ ধরনের সেকেলে তত্ত্বটির ধার ধারে না। কালোকে কালো, সাদাকে সাদাই দেখে!
দুই. মূল্যায়ন (ইভালুয়েশন): ‘দেখলাম তো কে কতটা কী করেছে না করেছে; আমাদের হিসাব-নিকাশ যথেষ্টই করা হয়ে গেছে’—এই ভাবনা। এরা অতীতের ক্ষমতাসীনদের ভালো-মন্দের মূল্যায়ন দলান্ধ জেন-এক্সদের চেয়ে অনেক বেশি নির্মোহভাবে করতে পারে।
তিন. পর্যবেক্ষণ (অবজারভেশন) ও পরিবীক্ষণ (মনিটরিং): ‘সবকিছুতেই চোখ রাখছি, কোনো কিছুই নজর এড়াচ্ছে না’, ‘সবকিছু মনে রাখা হবে’ ভাবনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দখল থাকার সুবাদে প্রজন্মটির এক বড় অংশ নিত্যদিনের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণে রাখে এবং বিশ্লেষণ করে নিজ নিজ অবস্থান তৈরি করে। দল-মত-পথ অন্ধভাবে মেনে নেয় না।
চার. বর্জন (রিজেকশন) : চিরাচরিত উত্তরাধিকারের রাজনীতি বর্জন বড় উদাহরণ। পুরোনো রাজনীতির একটি ধারাবাহিকতা ছিল বাবা যে দল করে, পুরো পরিবার সে দলই করে। তিনজন মতামত দানকারী জানিয়েছেন, তাঁদের বংশপরম্পরা আওয়ামী লীগ রাজনীতির। তবু তারা পরিবারকে অসন্তুষ্ট করেই লীগের রাজনীতিকে সজ্ঞানে বর্জন করেছে।
পাঁচ. শুদ্ধীকরণ (কারেকশন) : ‘রাজনীতিবিদেরা ভুল করলে ছাড় দেওয়া হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, লিখে-এঁকে, ট্রল করে যতভাবে সম্ভব তাদের শুদ্ধির পথে ঠেলে দিতে হবে’ মনোভাব। মতামত দানকারীদের প্রায় সবাই জানিয়েছেন, তাঁদের ভোটদানের বিবেচনা ছিল—তাকেই ভোট দেব, যে চুরিদারি করবে না, টাকা মেরে খাবে না, লাইসেন্স-পারমিট নেবে না, নেতার পেছনে ছুটবে না, নেতার নামে স্লোগান দেবে না, কাউকে মিছিলে যেতে বাধ্য করবে না, গেস্টরুম আর সিট বরাদ্দের রাজনীতি করবে না, গুন্ডামি-মাস্তানি-দাদাগিরি ও ক্ষমতার দাপট দেখাবে না।
রাজনীতিতে বড় ব্যবসায়ী ও কালোটাকার মালিকদের সংসদীয় আসনের সিট কেনাবেচা, টাকাপয়সায় দৌরাত্ম্য, রাজনীতির মাঠ দখল আবারও শুরু হয়েছে। জেন-জিদের ভোটিং বিহেভিয়ার এ বার্তাও দিচ্ছে—এই আয়োজনগুলো কিছুদিনের জন্য সাময়িক সাফল্য দিলেও জেন-জিরা তাদেরও বেশি দিন টিকতে দেবে না। কারণ, আগামী কয়েকটি বছর বাংলাদেশের রাজনীতি বিচিত্র ধরনের শুদ্ধি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। এই নতুন প্রক্রিয়া আমাদের চিরাচরিত রাজনীতির পূর্বানুমান ও হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করেই এগোবে।
* হেলাল মহিউদ্দীন, যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সমাজবিজ্ঞান অধ্যাপনায় নিয়োজিত
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| ৭ জানুয়ারি, বুধবার দিবাগত রাত ১টায় জকসু নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নির্বাচিত ভিপি, জিএস ও এজিএস। তাঁরা তিনজনই ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘অদম্য জবিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের। ছবি: প্রথম আলো |
Friday, November 21, 2025
রাজধানীতে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির দুই ভবনের মাঝ থেকে শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার
বাড্ডা পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) সোহেল রানা প্রথম আলোকে বলেন, আজ বিকেলে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ড. ফরাশ উদ্দিন ভবন ও মূল ভবনের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানে থেকে মুশফিকুজ্জামানের লাশ উদ্ধার করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এসআই সোহেল রানা বলেন, ঘটনাটি আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা বা না অন্য কিছু, তদন্ত শেষে ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
খবর পেয়ে সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে ছুটে আসেন মুশফিকুজ্জামানের বাবা বি এম মুখলেছুজ্জামান ও চাচা মনিরুজ্জামান মনির। মুখলেছুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, তিন চার দিন আগে পড়াশোনা নিয়ে কয়েক সহপাঠীর সঙ্গে মুশফিকুজ্জামানের হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল। বিষয়টি তার মায়ের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন। ছেলে বলেছিল, তারা তাকে ছাদে নিয়ে যেতে চাইতো। এরই মধ্যে আজ এমন ঘটনা ঘটল।
মনিরুজ্জামান মনির প্রথম আলোকে বলেন, মুশফিক তাঁর মা-বাবার সঙ্গে খিলগাঁওয়ে ব্লকে থাকতেন। প্রতিদিনের মতো আজ সকালে মুশফিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। তাঁর মৃত্যুর খবর পেয়ে তিনি মর্গে এসেছেন। মুশফিক এক ভাই, এক বোনের মধ্যে বড়।
তবে সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আজ বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজে মুশফিকুজ্জামানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ তলার ছাদে উঠতে দেখা গেছে। সেখানে অন্য কেউ ছিলেন না। ধারণা করা হচ্ছে, মুশফিকুজ্জামান ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা গেছেন।
![]() |
| মরদেহ উদ্ধার। প্রতীকী ছবি |
Saturday, November 15, 2025
পয়লা অগ্রহায়ণে ‘আদি নববর্ষ’ উদ্যাপন করবে ডাকসু
চারুকলায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্য ও ডাকসুর যৌথ উদ্যোগে ‘আদি নববর্ষ’ উদ্যাপন করা হবে। অনুষ্ঠানটি চারটি পর্বে সেদিন রাত ১০টা পর্যন্ত চলবে। প্রথম পর্বে হবে রংতুলিতে নবান্ন। দেশবরেণ্য চিত্রশিল্পী এবং চারুকলার প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে জুলাই ও নবান্ন থিমে ছবি আঁকা হবে। মোট ১৫ জন শিল্পী এই পর্বে ছবি আঁকবেন। পর্বটি শুরু হবে সকাল ১০টায়। দ্বিতীয় পর্বে হবে আদি নববর্ষ আনন্দযাত্রা। উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব এটি। চারুকলার সহযোগিতায় আনন্দযাত্রার জন্য তিনটি মোটিফ তৈরি করা হচ্ছে। একটি মোটিফ জুলাই নিয়ে। একটি মোটিফ জেলেজীবন নিয়ে এবং অন্যটি কৃষিজীবন নিয়ে। এ ছাড়া গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের উপস্থাপনা থাকবে এতে। তৃতীয় ও চতুর্থ পর্বে থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের শুভেচ্ছা বিনিময়। বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্যের সদস্য বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণে এই পর্বে থাকবে আবৃত্তি, নাচ, গান ও জাদু পরিবেশনা। আমন্ত্রিত অতিথিদের শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে থাকবে দেশবরেণ্য শিল্পীদের পরিবেশনায় সংগীত ও পালাগান।
এ উদ্যাপনের কারণ তুলে ধরে মুসাদ্দিক বলেন, দেশজ সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো নববর্ষ উদ্যাপন, যা বর্তমানে পয়লা বৈশাখ হলেও এককালে ছিল পয়লা অগ্রহায়ণ। বাংলা সনের পঞ্জিকায় যে ১২টি মাস আছে, তার মধ্যে ১১টিই নক্ষত্রের নামে। এ ক্ষেত্রে ‘বৈশাখ’ বিশাখা নক্ষত্রের নামে, ‘জ্যৈষ্ঠ’ জ্যাষ্ঠা নক্ষত্রের নামে, ‘আষাঢ়’ আষাঢ়ার নামে এবং এভাবে শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র যথাক্রমে শ্রবণা, পূর্বভাদ্রপদা, অশ্বিনী, কৃত্তিকা, পৌষী, মঘা, ফাল্গুনী ও চিত্রার নামে। যে মাসটি নক্ষত্রের নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, সেটি হচ্ছে অগ্রহায়ণ; আর এই নামের সঙ্গে মিশে আছে বাংলার কিছু ইতিহাস, কিছু স্মৃতি এবং কিছু বিস্মৃত হয়ে যাওয়া তথ্য।
মুসাদ্দিক ইবনে আলী মোহাম্মদ বলেন, প্রায় প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে নববর্ষের উৎসব উদ্যাপিত হতো। নববর্ষের আদি অনুষ্ঠান হিসেবে ‘আমানি’ উৎসব বা ‘নবান্ন’ উৎসবের কথা বলেছেন ঐতিহাসিকেরা, যা পয়লা অগ্রহায়ণে অনুষ্ঠিত হতো। এটি ছিল মূলত কৃষকের উৎসব। সম্রাট আকবরের সময় থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ‘বৈশাখ’ মাসকে বাংলা বছরের প্রথম মাস হিসেবে প্রচলন করা হয়। কিন্তু বৈশাখকে বছর শুরুর মাস আর পয়লা বৈশাখকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে বাংলার মানুষ উদ্যাপন করেনি বলে দাবি করেন তিনি।
ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সূচনা হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। পরে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে পয়লা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের ব্যবস্থা করেন। কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারেও এভাবে ধীরে ধীরে পয়লা বৈশাখ সম্পর্কে কিছু উৎসাহ-উদ্দীপনার খবরাদি পাওয়া যায়। ১৯৬৭ সালে এই বংলায় প্রথম পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাকিস্তানি শাসকেরা এই অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করায় পাকিস্তানবিরোধী মানসিকতার বাঙালির কাছে পয়লা বৈশাখ ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
মুসাদ্দিক বলেন, ‘বর্তমান প্রজন্ম আজ ভুলতে বসেছে, এককালে পয়লা অগ্রহায়ণই ছিল এ অঞ্চলের মানুষের নববর্ষ। প্রজন্মকে সেই ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা নবান্ন উৎসবকে আদি নববর্ষ উৎসব নামে উদ্যাপন করার উদ্যোগ নিয়েছি।’
সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি যুবায়ের, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মিনহাজ ও বিপ্লবী সাংস্কৃতিক ঐক্যের সভাপতি মৃন্ময় মিজান উপস্থিত ছিলেন।
![]() |
| সংবাদ সম্মেলনে ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক ইবনে আলী মোহাম্মদ। আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। ছবি: সংগৃহীত |
Thursday, October 2, 2025
সেকালের শামসুল হক, একালের ‘জ্বালাময়ী’ জালাল—তাঁদের ‘পরিণতি’ কেন এমন হয় by গওহার নঈম ওয়ারা
প্রভোস্ট প্রমুখ গিয়ে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর আবাসিক সিট বাতিল করে উত্তেজিত ছাত্রদের দাবির মুখে তাঁকে পুলিশের হাওলা করে দিয়েছেন। হত্যাচেষ্টার জন্য অভিযুক্ত করে মামলাও করেছে হল কর্তৃপক্ষ। আজকাল কোনো খবরেই আর গা ভাসাই না।
যে হলের ঘটনা, সে হলে ১৯৭৪ সালে পাশের হল থেকে ধরে এনে সাতজনকে গুলি করে মারা হয়েছিল। সেই ঘটনায় কত দিন পরে কারা মামলা করেছিলেন। খুনিদের চিনতেন সবাই, পরের দিন সব পত্রিকায় একই বয়ান ছাপা হয়েছিল। যখন সব বয়ান, সব স্ক্রিপ্ট মিলে যায়, তখন মনে হয় কলকাঠি অন্য কেউ নাড়ছেন নিরাপদ কোনো জায়গায় বসে। টিভির ছবিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির চেহারা বোঝা যাচ্ছিল না।
ফেসবুকে দেখে মনে হলো কোথায় যেন দেখেছি। নাম ও চেহারার মিল জালাল আহমেদ সাকিনের—পেকুয়া, কক্সবাজার। আজ থেকে ১০–১১ বছর আগে ৯ আগস্ট ২০১৪ সালে বায়তুল মোকাররমের উত্তর ফটক থেকে পুলিশ তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল (গুম বলা চলে)। যত দূর মনে পড়ে, প্রায় দুই মাস তাঁর কোনো হদিস ছিল না। এ প্রসঙ্গে তখনকার ডিবির ভাষ্য ছিল, ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তাই আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগায় গ্রেপ্তারের প্রায় দুই মাস পরে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হলো।’ (প্রথম আলো, ১৪ অক্টোবর ২০১৪)।
তখন জালাল আহমেদ সাকিনের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ ছিল—জালাল ‘নির্বাচিত সরকারকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে ২৪ পাতার একটি খসড়া বই লিখে সহিংস আন্দোলনের মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ করেছেন। আসলে কর্তৃত্ববাদী একটি সরকারকে সরাতে কী কী কৌশল অবলম্বন করা যায়; কোন তরিকায় বিরোধী সমমনাদের ঐক্য গড়ে তোলা আর অটুট রাখা যায়, এসব নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা তিনি লিখে ফেলেছিলেন কাগজে।
বলা যায়, দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর থিসিস ছিল সেটি। সেটি নিয়েই তিনি ছুটে যেতেন পরিবর্তনপ্রত্যাশীদের কাছে।’ আগস্টের ৯ তারিখে আটকের পর তাঁকে কথিত রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় আটক দেখানো হয় ৪ অক্টোবর। পল্টন থানায় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাটি করেন তৎকালীন ডিবির উপপরিদর্শক মিজানুর রহমান। আরও দিন চারেক পর ১৩ অক্টোবর মহানগর হাকিম রেজাউল করিমের আদালতে ১০ দিনের রিমান্ড চায় ডিবি।
আদালত ১৯ অক্টোবর রিমান্ড শুনানির পর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তারপর সবাই তাঁর কথা ভুলে যান একসময়। জামিন হতে হতে এক বছর কেটে যায় কারাগারে। যে ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জালাল জড়িত ছিল, তারাও হাত গুটিয়ে নেয়। এ যেন আরেক শামসুল হক ট্র্যাজেডি।
যে তরুণ শামসুল হকের সাহসের ওপর ভর করে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন মুসলিম লীগকে চ্যালেঞ্জ করে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। দল করার আগেই উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থী টাঙ্গাইলের করটিয়ার প্রতাপশালী জমিদার খুররম খান পন্নীকে বিপুল ভোটে হারিয়ে সারা পাকিস্তানে সাড়া ফেলে দেন। নির্বাচনের পর ৮ মে ১৯৪৯ সালে ঢাকাবাসীর পক্ষে ‘পূর্ববঙ্গ মুসলিম লীগ কর্মী শিবির’ আইন পরিষদের সদস্য জননেতা শামসুল হককে ভিক্টোরিয়া পার্কে গণসংবর্ধনা দেয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বলছিলেন, ‘ছেলেতুল্য এই শামসুল হকই বাংলার ভাবি প্রধানমন্ত্রী হবে এই ভবিষ্যদ্বাণী করছি।’
১৯৪৭-৫২ সালে অনেকেই শামসুল হককে পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ চিফ মিনিস্টার বলে কল্পনা করতেন। সেই শামসুল হককে পার্টির নেতারা মানসিক রোগী হিসেবে জেলে রেখে চলে আসেন। জালালও কি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন?
এই প্রশ্নের কিছুটা উত্তর মেলে তাঁর এক শুভানুধ্যায়ীর লেখায় ‘পরিবার ও পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্নতা, বৈদ্যুতিক শক-সহ নানা প্রক্রিয়ায় নিপীড়ন জালালকে মানসিকভাবে পর্যদস্ত করে ফেলে। আটক থাকাকালে নানা থেরাপি, আন্দোলনে মাথায় আঘাত, বিপন্ন জীবন—সব মিলিয়ে জালালের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা জেল–জুলুমের বাইরে খোলা বাতাসে থাকা আর দশজনের মতো থাকার কথা নয়।
জানা যায় মেধাবী ছেলে জালালও সেটি বুঝত, কিছু থেরাপিও নিয়েছেন। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে পূর্ণ চিকিৎসা করাতে পারেননি। সাংবাদিকতার সামান্য একটি চাকরিতে তার পড়ালেখার খরচ মেটানো কঠিন ছিল। বন্ধুরা তাঁকে বলেছিলেন সরকারের সহায়তায় চিকিৎসা নিতে। জালাল রাজি হননি। নিজের চিকিৎসা নিতে সরকারি পয়সা নিতে নিজের কাছে নিজেকে ছোটো লাগে—এই ছিল তাঁর জবাব।
তবে আহত জালাল দমে যাননি। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু কিছু কিছু আঘাত মানুষের মন ও মস্তিষ্ককে এমনভাবে ক্ষতবিক্ষত করে যে তার আর উপশম হয় না। যেমন হয়নি কিংবদন্তি ছাত্র জননেতা শামসুল হকের।
জালালের আরেক বন্ধু বলছিলেন, ‘জ্বালাময়ী জালালের আগুন জ্বালানো ঝলক আমরা দেখেছি ২০১৮ সালের আন্দোলনে। ২০১৮ সালে নুর-ফারুক-রাশেদ গ্রেপ্তার, পুরো আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন জালাল। জানুয়ারি মাসে রিট হওয়ার পর টিএসসিতে প্রথম ৩০-৩৫ জনের ছোট্ট মিটিংয়ে যে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে, সেই স্ফুলিঙ্গ থেকেই জেগে ওঠেন জালাল। কথিত মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ থেকে জানে মেরে ফেলার হুমকি দিলে আমরা আড়ালে চলে গেলেও জালাল আরও সামনে আসেন। জানুয়ারি মাসে যখন অল্প কজন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, টিএসসি ও শাহবাগ ঘুরে ঘুরে সমর্থক সংগ্রহের কাজ চালাচ্ছিলেন, সেই সময় থেকেই জালাল সক্রিয়ভাবে আন্দোলন সংঘটিত করতে থাকেন। অন্যদের আড়ালে থেকে কাজ করার পরামর্শ দিলেও তিনি সামনেই থেকে যান বুক ফুলিয়ে বুলেটের সামনে। জালাল বলেছিলেন, “রক্ত না দিলে পরিবর্তন আসে না। আমি রক্ত দেব।”’
জালাল রক্ত দিয়েছেন ঠিকই। ২০১৩ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০১৮ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০২৪ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০১৮ সালে নুর, ফারুক ও রাশেদ গ্রেপ্তার, পুরো আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন জালাল। তাঁদের কারামুক্ত করতে দৌড়েছিলেন জালাল।
বিনিময়ে কী পান জালাল? বারবার আহত হয়ে, জেলে গিয়ে, নিপীড়ত হয়ে নস্যাৎ হয় পড়াশোনা, রুদ্ধ হয় মসৃণ ক্যারিয়ার। এমনকি স্নাতক শেষ হতে হতে পেরিয়ে যায় জীবনের এক দীর্ঘ দশক।
জালাল মানসিকভাবেও অনেকটা একা হয়ে যান এরই মধ্যে। গণ–অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠাঁই হয় তাঁর। আশা ছিল, তাঁর দল জালালের আপসহীনতা ও সাহসের মূল্যায়ন করবে। কিন্তু হায়! ওর বন্ধু বা সমবয়সীরা কেউ তো হলে নেই। আর যারা মাস্টার্সে পড়েন, তাঁরাও তাঁর পাঁচ-ছয় বছরের জুনিয়র। বয়সের পার্থক্য মানসিকতার পার্থক্যকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। একদিকে যেহেতু জালাল দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে এত অবদান রেখেছেন, আর তিনি এত সিনিয়র, তাই জুনিয়রদের থেকে একটু সম্মান ও শ্রদ্ধা আশা করতেন।
অন্যদিকে গণ–অভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশের তরুণদের মনে কাউকে না গোনায় ধরার যে উত্তরাধুনিক ঢেউ বয়ে গেছে, তার সঙ্গে জালালের প্রত্যাশার সংঘর্ষ ঘটে। তার ওপর আছে ক্যাম্পাসে নানামাত্রিক রাজনৈতিক চাল-প্রতিচাল। কাকে ডাউন করে কে উঠবেন, এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা পেয়েছে যেন।
তাৎক্ষণিকভাবে সিট বাতিল করে পুলিশের হাতে খুনের আসামি হিসেবে জালালকে তুলে দেওয়ার আগে হল কর্তৃপক্ষকে এগুলো বিবেচনা করা উচিত ছিল। তাঁরা বলতে পারেন, বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের নিবৃত্ত করার আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তাঁরাও প্রাণের ভয়ে ছিলেন, তাই জালালকেই বলি দিতে হয়েছে।
সেদিন রাতে জালালের পক্ষে দু–একজন দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের ক্ষীণস্বর হল কর্তৃপক্ষের কান পর্যন্ত যায়নি। তাঁরা বলেছিলেন ‘মব’ না করে জালালকে উদ্ধার করে সবকিছু শুনে ঠান্ডা মাথায় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
যে হলের এই ঘটনা, তার পাশের হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ও ডাকসু নির্বাচনের প্রার্থী আবদুল ওয়াহেদ জানান, ‘ঘটনার পর আবদ্ধ রুমে জালালের আত্মহত্যার আশঙ্কা করছিলাম। তাই বলি যে এ রকম ঘটনা ঘটলে রুমের সামনে অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের দায় নিতে হবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও পুলিশের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা কথা দেন, তাঁর গায়ে হাত তোলা হবে না। কিন্তু রুম থেকে বের হওয়ার পর তাঁকে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনেই প্রচণ্ড মারধরে রক্তাক্ত করে ফেলা হয়। সে সময় তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করি যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ঠিক হচ্ছে না। জালাল দোষী হলেও আইন অনুযায়ী তাঁর শাস্তি হোক; কিন্তু হামলা ও মারধর সমাধান নয়। তখন একদল শিক্ষার্থী আমার মুঠোফোন কেড়ে নেন এবং জালালের ওপর হামলার ভিডিও ফেসবুক থেকে ডিলিট করতে বাধ্য করেন। এ সময় তাঁরা আমার গায়েও হাত তোলেন। এ ছাড়া আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া মুঠোফোনটি থানা থেকে এক ঘণ্টা পরে উদ্ধার করেছি।’
এ লেখা প্রকাশের আগেই হয়তো জালালের জামিন হবে কিংবা হবে না। তবে তাঁকে নিয়ে এখন কেউ ভাবছে না। যেমন আওয়ামী লীগ ভাবেনি তাদের পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্তম্ভ শামসুল হকের কথা। পাগলা গারদে পাঠিয়ে পার্টি থেকে বহিষ্কার করে দায় সেরেছিলেন সবাই। তাঁর শূন্য চেয়ারটা সারা জীবনের জন্য দখলের প্রত্যাশায় থাকা ব্যক্তিরা কেন তাঁকে নিয়ে ভাববেন?
তবে নতুন বাংলাদেশে শামসুল হকদের নিয়ে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে আন্দোলনের অন্যতম রূপকার কেন এভাবে হারিয়ে যাবেন। জেল আর রিমান্ডের অত্যাচারে জেরবার হওয়া নেতা– কর্মীদের সঠিক চিকিৎসা আর মানসিক পুনর্বাসনের অঙ্গীকার করতে হবে।
* গওহার নঈম ওয়ারা, লেখক ও গবেষক
- wahragawher@gmail.com
![]() |
| ‘জালাল রক্ত দিয়েছেন ঠিকই। ২০১৩ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০১৮ সালে রক্ত দিয়েছেন। ২০২৪ সালে রক্ত দিয়েছেন।’ ছবি: সংগৃহীত |
Monday, September 22, 2025
‘সেবার রাজনীতি’ যেভাবে ‘খয়রাতি মন’ তৈরি করে by আলতাফ পারভেজ
সব বিতর্ক একসঙ্গে আলোচনায় না এনে আলাদাভাবে বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে পারি আমরা। যেমন ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দান-অনুদানের কদর ও নির্বাচনে তার প্রভাব নিয়ে কথা হচ্ছে। আপাতত এ বিষয় এবং এর রাজনৈতিক–অর্থনীতি নিয়ে ভাবতে পারি আমরা।
ডাকসু, জাকসু ও রাকসু হলো শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন। পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দর–কষাকষি করে শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাস জীবন স্বস্তিকর করাই এসব ইউনিয়নের প্রকৃত লক্ষ্য। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছাত্রদের দাবিদাওয়া আদায় করে দেওয়াই ছাত্র সংসদের কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থায় সংসদের বিধান সে জন্যই রাখা হয়েছে। এটা অনেকটা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ‘সিবিএ’র মতো।
কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে একাধিক শ্রমিকসংগঠন থাকতে পারে; কিন্তু শ্রমিকেরা তাদের মধ্য থেকে কালেকটিভ বার্গেনিং এজেন্ট বা সিবিএ হিসেবে বেছে নেয় কয়েকজন কর্মীকে। ডাকসু, জাকসু ও রাকসুতেও শিক্ষার্থীদের তা–ই করার কথা।
ডাকসু, জাকসু ও রাকসুর কাজ হলো ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে কর্তৃপক্ষের কাছে ধরনা দেওয়া। এখন প্রশ্ন হলো ইউনিয়ন নেতৃত্ব যদি সরকার, রাষ্ট্র বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দাবিদাওয়া আদায়ের বদলে নিজেরাই ভিন্ন কোনো উৎস থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে শিক্ষার্থীদের জন্য সেবা ও সুবিধা বাড়াতে চেষ্টা করে, তাহলে সমস্যা কী? এর কি বিশেষ কোনো রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচনী অধ্যায়ের পূর্বাপর অনুসন্ধান করে অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলছেন, বিদ্যাপীঠগুলোতে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি বাছাইয়ের নির্বাচনে দান-অনুদানে যুক্ত সংগঠন ও প্রার্থীরা ভোটে এগিয়ে ছিলেন। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দর–কষাকষির চেয়ে নিজেরাই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীবান্ধব কিছু পদক্ষেপ নিয়ে সেবাধর্মী সংগঠনগুলো বাড়তি ভোট পেয়েছে। ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প থেকে শুরু করে হলে পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র বসানো পর্যন্ত অনেক কাজ করছে কোনো কোনো সংগঠন। তাদের বক্তব্য, শিক্ষার্থীরা এসব কাজ পছন্দ করছেন। তাঁরা এরকম দান-অনুদানে যুক্তদের ভোটে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে মনে হয়েছে।
এ রকম যুক্তি ও অনুমান যেহেতু অনেকের কাছে বেশ বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে, সেই কারণে এই সিদ্ধান্তে আসাও সহজ হয় যে অতীতে শিক্ষার্থীরা যেসব বিষয় দেখে নেতৃত্ব পছন্দ করতেন, এখনকার পছন্দের মানদণ্ড তার চেয়ে ভিন্ন।
এর ফল হিসেবে পরের অধ্যায় অনুমান করা কঠিন নয়। জাতীয়ভাবেও হয়তো অনেক সংগঠন এখন দান-খয়রাতধর্মী সেবামূলক কাজের দিকে বেশি ঝুঁকবে। সে ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন তো উঠতে পারে, ক্যাম্পাসে হোক বা অন্যত্র হোক, এসব সেবাধর্মী কাজের খরচ কারা জোগান দেবে বা দিচ্ছে?
শিক্ষার্থীদের পক্ষে ওয়াশিং মেশিন কিনে হলগুলোর তলায় বসানো সম্ভব নয়। হঠাৎ হঠাৎ গরু কিনে জিয়াফত আয়োজনও সহজ নয়। তাহলে নিশ্চয়ই বাইরের কোনো উৎস থেকে তারা এই অর্থ পাচ্ছে বা নিচ্ছে।
শত শত শিক্ষার্থীকে ইফতার করানো বা উপঢৌকন দেওয়াও বাইরের আর্থিক–সহায়তা ছাড়া সম্ভব নয়। তার মানে এ ধরনের সেবাধর্মী তৎপরতা শুধুই ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক বিশুদ্ধ কোনো বিষয় নয়। এর ক্যাম্পাস–বহির্ভূত একটি অন্তর্জাল অবশ্যই আছে; কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের এত অন্তর্জাল খোঁজার ‘টাইম নেই’। সুবিধাটা নগদ নগদ তাঁরা পছন্দ করছেন।
যেমন এখন ঢাকা শহরে গণপরিবহনের স্বল্পতা একটি বিশাল সমস্যা। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও খোদ রাজধানীতে সে রকম কোনো স্বস্তিকর ব্যবস্থা কোনো সরকার করতে পারেনি বা করেনি। এসব নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ-দুঃখ আছে। এখন কোনো রাজনৈতিক দল বা তার ছায়ায় পুষ্ট কোনো ‘সামাজিক সংগঠক’ যদি ঢাকায় বিনা মূল্যে ১০০ বাস নামায়, তাতে সাধারণ মানুষ খুব খুশি হবেন।
এ রকম খরচ ও সেবার একটি রাজনৈতিক-অর্থনীতি থাকতে পারে। নিদেনপক্ষে এর মাধ্যমে সমাজে মতাদর্শিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা তো থাকবেই; কিন্তু বিপন্ন মানুষ, নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকদের অত কিছু খেয়াল করলে চলে না। যে দল বা সংগঠন এ রকম সেবা দেবে, তারা ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থান বা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে না বিপক্ষে, সেটি ভাবার চেয়ে মানুষ দ্রুততার সঙ্গে ওই সেবা নেবেন এবং সেবাদানকারীও তাঁদের পছন্দনীয় হয়ে উঠবে।
এ রকম আরও সেবাদানকারী তখন এগিয়ে আসতে পারে এ রকম কাজে। কারণ ‘পছন্দ’ রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবে অনেক লোভনীয় জিনিস; কিন্তু তাতে গণপরিবহন–ব্যবস্থার দাবি খুব একটা এগোবে না। একাধিক দল একই সেবা দিতে নামলে ওই দাবি বরং হারিয়ে যাবে।
কিন্তু এ রকম মডেল রাষ্ট্রের খুব পছন্দ; অন্যান্য ‘কর্তৃপক্ষের’ও পছন্দ। সমাজে দারিদ্র্য কমানো, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা, বৈষম্য হ্রাস করা, শিক্ষার অধিকার কিংবা স্বাস্থ্যসুবিধা বাড়ানোর দায় রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে এসব বিষয়ে ভূমিকা রাখার লক্ষ্যেই। আর সরকার গঠিত হয় রাষ্ট্রের সেসব দায় বাস্তবায়নের জন্য।
কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র বা বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র সেসব দায়িত্ব মেটাতে পারছে না। তাতে জন–অসন্তোষ আছে। এ ধরনের রাষ্ট্রে নাগরিকেরা বিদ্যমান ব্যবস্থার পরিবর্তন চাইতে পারেন। সে অবস্থায় রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ‘বিকল্প’ হিসেবে সেবাধর্মী কাজ, দান, অনুদান ও খয়রাত রাষ্ট্রের জন্য একটি ভালো ডিফেন্সলাইন। এতে রাষ্ট্রের গায়ে ক্ষোভের আঁচড় কম লাগে। প্রশাসন তার ব্যর্থতা আড়াল করতে পারে।
যেমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে খাবারের মান ও পরিমাণ বাড়ানো দেশের সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এটা রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন এমন হতে পারে ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে শক্তিশালী কোনো সংগঠন তাদের মূল দল বা দেশ-বিদেশের সহযোগী বন্ধুদের মাধ্যমে বিপুল অর্থ এনে নিজেরাই হলে হলে বাড়তি খাবার সরবরাহ করল। এটা শিক্ষার্থীরা খুব পছন্দ করবে। আবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং রাষ্ট্রও খুব পছন্দ করবে।
কেবল ক্যাম্পাসে নয়, কয়েক বছর ধরে গ্রামাঞ্চলেও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মধে৵ কিছু রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠন এভাবে ‘দরিদ্রবান্ধব সেবাধর্মী কাজ’ করছে। জাতীয় নির্বাচন হলে তারও চমকপ্রদ কিছু ফল দেখব আমরা। এ রকম সবকিছুর প্রাপ্তি হিসেবে সেবাধর্মী দান-অনুদানের একটি প্রতিযোগিতাও হয়তো দেখব আমরা চারদিকে। এতে জনসমাজে পদ্ধতিগত বঞ্চনার রাষ্ট্রীয় সমাধানের দাবি ক্রমে অবলুপ্ত হতে বাধ্য। এ রকম সমাধানচিন্তার প্রস্তাবকারীদেরও স্বভাবত সামনে দুর্দিন।
এ রকম আর্থসামাজিক অবস্থা রাষ্ট্রের জন্য একটি সুযোগের মতো। ক্ষমতার রাজনীতিতে উচ্চ আকাঙ্ক্ষী ধনাঢ্য সমাজের জন্যও অনুরূপ। জনসমাজ সেবা পেয়ে খুশি থাকলে শিক্ষা খাত বা স্বাস্থ্য খাতে ব্যায় না বাড়িয়ে বাড়তি টাকা রাষ্ট্র সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র শক্তিশালী করায় বিনিয়োগ করতে পারে। এতে ‘রাষ্ট্র’ ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এবং সমাজের পুরোনো অধিকারবাদী, পরিবর্তনবাদী রাজনীতিকেও কোনঠাসা করতে পারে।
সেবাধর্মী রাজনীতিতে রাষ্ট্রের লাভ তাই দ্বিবিধ। ফলে আন্তরিকভাবেই এ রকম ‘কাজ’ রাষ্ট্রের সব ‘কর্তৃপক্ষের’ সমর্থন, সহায়তা ও সহযোগিতা পায় ও পাবে। সব দেশে সেটিই হয়। কারণ, একদিকে এতে সব ‘কর্তৃপক্ষের’ সুরক্ষা বাড়ে। অন্যদিকে এতে তাদের শক্তিও বাড়ে। কুলীন সমাজ এ রকম রাষ্ট্রকে দিয়ে খুব সহজে কর্তৃত্ববাদী একটি শাসনও কায়েম করতে পারে।
কুলীন সমাজ ও করপোরেটদের জন্য দান-অনুদান কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক সুবিধা রাষ্ট্রের মতোই ব্যাপক ও সম্পূরক। সে বিষয়েও দু–চার কথা বলা দরকার।
সেবাধর্মী রাজনীতির একটি অনিবার্য পার্শ্বফল হলো সামাজিক বৈষম্য আড়াল হওয়া। সমাজে সম্পদের যে অসম বণ্টন এবং পুঁজির শোষণ রয়েছে, দানের রাজনীতি তাকে ন্যায্যতা ও স্বাভাবিক চেহারা দেয়। দারিদ্র্য ও যাবতীয় সামাজিক দুর্দশা যে একটি কাঠামোগত সমস্যা, সেটি আড়াল করে তথাকথিত এই ‘সেবা’।
‘সেবার রাজনীতি’ জনসমাজকে এই বার্তাই দেয়—‘ধনাঢ্যরা কীভাবে আয় করছেন, রাষ্ট্র সম্পদের সুষম বণ্টনে ব্যর্থ কি না, সেসব দেখার দরকার নেই তোমার। বৃহত্তর সমাজের কথা বাদ দাও। ধনাঢ্যরা তোমাকে যা দিচ্ছেন, তাতে তোমার ভালোই চলে যাবে। তুমি এতে সন্তুষ্ট থাকো। শোকর করো এবং দাতাদের তোমার অভিভাবক হতে দাও।’
এভাবে সেবার পথে, অধিকারবাদী প্রতিদ্বন্দ্বীকে বিনা যুদ্ধে ধরাশায়ী করে কুলীন সমাজ রাষ্ট্র ও রাজনীতির অভিভাবকত্ব পায়। তবে এ রকম ‘সেবাবাদ’ দুইভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষতি করে। রাষ্ট্রকে জনস্বার্থে সম্পদ বণ্টন ও ব্যবস্থাপনায় আরও ন্যায্য ও দক্ষ হতে বাধাগ্রস্ত করে এটা। জনগণের তরফ থেকে এ লক্ষ্যে চাপ কমতে থাকায় রাষ্ট্র ক্রমে একটি ক্ষুদ্র সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর নিজস্ব হাতিয়ারে পরিণত হয়। গুটিকয়েকের হাতে সম্পদের পুঞ্জীভবনকে তখন সমস্যা মনে করা হয় না। এতে রাষ্ট্রের ভেতর সমান্তরাল অর্থনৈতিক বিকাশ সীমিত থেকে যায়।
দ্বিতীয়ত সমাজ ও রাষ্ট্রকে অধিকতর সুষম ও ন্যায়ানুগ করার ক্ষেত্রে জনসমাজের রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও আইনি অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত করে দান-অনুদান মডেল। সুবিধাবঞ্চিত সমাজ যেহেতু বাস্তব কারণে সেবা-দান-অনুদান অগ্রাহ্য করতে পারে না; বরং এটা পাওয়ার জন্য ন্যায্য ভিন্নমতও চেপে যায়, সে কারণে এই মডেল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশও রুদ্ধ করে।
এটা জনসমাজে সৃষ্টিশীল উদ্যমের বদলে ‘খয়রাতি মন’ তৈরি করে চলে, বিশেষ করে সুবিধাগ্রহীতাদের মধ্যে। এ অবস্থায় মানুষ ভাবতে শুরু করে—তার বা তাদের অবস্থার পরিবর্তন বাইরের কোনো শক্তির দয়াদাক্ষিণ্যনির্ভর। নিজেরা বা তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যমান অবস্থার বদলে সক্ষম নয়। তাদের সে রকম লক্ষ্যে সংঘবদ্ধ হওয়ারও দরকার নেই। এ রকম মনোভাব সহজে সুবিধাপ্রাপ্ত ও ক্ষমতাবানদের পুরোনো কর্তৃত্ব ও শক্তিকে উৎপাদন-পুনরুৎপাদন হতে সহায়তা করে চলে।
‘সেবা-মডেল’ সমাজের ক্ষমতা-সম্পর্ক অপরিবর্তনশীল করে রাখতে চায় এবং সেবার আদলে নতুন ধরনের একটি উপনিবেশ-সংস্কৃতি জারি করে ও তাকে প্রতিমুহূর্তে প্রয়োজনীয় মনে করায়। ‘সুবিধাবঞ্চিত ব্যক্তিরা’ এতে চিরকাল নির্ভরশীল ও অপরের মুখাপেক্ষী থেকে যায় এবং তাঁদের দেশের ‘প্রতিষ্ঠানগুলো’র প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়নও আর হয় না। এতে সমৃদ্ধ সমাজ নির্মাণের বদলে ‘সুবিধা’ পাওয়ার সর্বব্যাপক আকুতি দেখা দেয়। এসব বিবেচনায় সমাজে ‘সেবা’ বিশেষ ধরনের একটি রাজনৈতিক বিনিয়োগ এবং নিশ্চিতভাবে কৌশলগত ও হেজিমনিক বিনিয়োগও বটে।
* আলতাফ পারভেজ, গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Sunday, September 21, 2025
সরকার বদলায় কিন্তু শিক্ষার অবহেলা বদলায় না by মোস্তাফিজুর রহমান
প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হার ৯৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, মাধ্যমিকেও ভর্তি বেড়েছে। সংখ্যার হিসাবে নিঃসন্দেহে ভালো শোনায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ভর্তি ও পরীক্ষার সাফল্য কি শিক্ষার্থীদের দক্ষ করছে? বাস্তব উত্তর হচ্ছে ‘না’। তারা ডিগ্রি হাতে পাচ্ছে, কিন্তু শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার মতো সক্ষমতা গড়ে উঠছে না। প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা, উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা কিংবা বিদেশি ভাষার দক্ষতা, যা আধুনিক চাকরির বাজারে জরুরি—এসব দক্ষতা শিক্ষার্থীরা পাচ্ছে না।
কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকার শিক্ষাকে কখনোই প্রকৃত অর্থে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেনি, বরং শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থে। আর শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে গিয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ বা গবেষণায় বিনিয়োগ না করে ভরসা করা হয়েছে প্রাইভেট টিউশন, কোচিং আর গাইড বইয়ের ওপর।
শিক্ষা বাজেটই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল জাতীয় বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ (জিডিপির ২.৪৯ শতাংশ)। কিন্তু ক্রমান্বয়ে তা কমতে কমতে নেমে এসেছে বাজেটের ১২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে। আমরা আশা করেছিলাম বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে হয়তো ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হবে। বাস্তবে তা হলো না, হতাশা রয়ে গেল।
করোনা মহামারির অভিঘাত এখনো কাটেনি। গণসাক্ষরতা অভিযান-এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আগস্ট ২০২৩ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ৪২৭ দিনের মধ্যে ২৭৯ দিন স্কুল বন্ধ ছিল। অর্থাৎ মাত্র ১৪৮ দিন ক্লাস হয়েছে। এত দীর্ঘ শিক্ষাবিরতি শিশুদের শেখার ক্ষতি করেছে ভয়াবহভাবে। এ ঘাটতি পূরণে কোনো বিশেষ উদ্যোগ না থাকায় নতুন প্রজন্ম ‘হারানো প্রজন্মে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।
শিক্ষায় বৈষম্য বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমস্যা। শহর ও গ্রামের মধ্যে, ধনী ও গরিবের মধ্যে, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার মধ্যে এই বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। প্রাথমিক স্তরে অনেক ধরনের—সরকারি স্কুল, মাদ্রাসা, এনজিও স্কুল, কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম ইত্যাদি। ফলে শিক্ষার্থীদের মান, সুযোগ ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতিতে বিশাল ফারাক তৈরি হচ্ছে। এই বৈষম্যকে আরও গভীর করেছে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় কেবল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই অংশ নিতে পারবে। অথচ দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী এনজিও ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে। এ সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে বৈষম্য তৈরি করছে।
এই পটভূমিতে সরকার পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি–৫) হাতে নিয়েছে এবং ২০২৭ সাল থেকে নতুন পাঠ্যক্রম শ্রেণিকক্ষে চালুর পরিকল্পনা করছে। এটি বড় সুযোগ হলেও আশঙ্কা রয়ে গেছে। কারণ, এর পূর্ববর্তী কর্মসূচি (পিইডিপি–৪) জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০২৩–এর জন্য ডিজাইন করা হলেও পরে জুন ২০২৫ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু এখনো এর ১৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি, যা আমাদের সক্ষমতার ঘাটতিকে নির্দেশ করে। আর এবারও যদি সেই ধারাবাহিকতা থাকে, তবে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসবে না।
পিইডিপি–৫ সফল করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে একীভূত করতে হবে। পাঠ্যক্রমকে কর্মসংস্থানমুখী করতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকেই প্রযুক্তিশিক্ষা, জীবনদক্ষতা, কারিগরি জ্ঞান ও উদ্যোক্তা হওয়ার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা বাড়ানো। এগুলো ছাড়া মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
সরকার একা এই সংস্কার করতে পারবে না। নাগরিক সমাজ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করতে হবে। এনজিওগুলো বহু বছর ধরে শিশুশিক্ষা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীকে ফিরিয়ে আনা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর সহায়তা ও কমিউনিটি স্কুলে কাজ করছে। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো দরকার। কমিউনিটির অংশগ্রহণও অপরিহার্য। শিক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও। স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটি, অভিভাবক-শিক্ষক সমিতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া শিক্ষায় কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে শিক্ষা নিয়ে অনেক বড় বড় কথা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো তরুণেরা ডিগ্রি পেলেও চাকরি পাচ্ছেন না, দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না। সরকার বদলায়, কিন্তু শিক্ষার প্রতি অবহেলা বদলায় না।
এখন সময় এসেছে সত্যিকারের পরিবর্তনের। যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা যায়; যদি সরকার, এনজিও, শিক্ষক সংগঠন ও কমিউনিটি একসঙ্গে কাজ করে এবং বৈষম্য দূরীকরণকে মূল লক্ষ্য বানায়, তবে শিক্ষার ভবিষ্যৎ বদলানো সম্ভব। শিক্ষা শুধু ডিগ্রি নয়, এটি কর্মসংস্থান ও জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি। সেই চাবিকেই শক্ত হাতে ধরতে হবে, না হলে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন কেবল কথার ফুলঝুরিই হয়ে থাকবে।
* মোস্তাফিজুর রহমান, লেখক ও গবেষক
- smostafiz_r@yahoo.com
Sunday, September 14, 2025
জাকসু নির্বাচন: ‘ইনক্লুসিভ’ বিশ্ববিদ্যালয় চান ভিপি, জিএস কাজ করবেন ঐক্যবদ্ধভাবে
শনিবার জাকসু নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোকে এ কথাগুলো বলেছেন নবনির্বাচিত ভিপি ও জিএস।
দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন উল্লেখ করে ভিপি আবদুর রশিদ বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর আন্দোলনের পর জাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা সে অধিকার ফিরে পেয়েছি। জাকসুর নেতা বা ভিপি হওয়া আমাদের কখনোই ইচ্ছা ছিল না। আমাদের ইচ্ছা ছিল শিক্ষার্থীরা যে অধিকার থেকে দীর্ঘ ৩৩ বছর বঞ্চিত ছিল, সে অধিকার ফিরিয়ে আনা।’
নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে বেশি প্রার্থী জয়লাভ করেছেন উল্লেখ করে নবনির্বাচিত ভিপি বলেন, ‘কিন্তু আমাদের প্রথম কাজ হবে সকল দল, মত সাথে নিয়ে একটি ইনক্লুসিভ জাহাঙ্গীরনগর গড়ে তোলা। আমরা যে ইশতেহার দিয়েছিলাম, সেটি এমন কোনো অলৌকিক ইশতেহার নয়, যেটি বাস্তবায়ন করতে পারব না। শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়াই আমাদের ইশতেহার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন যেসব অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল, সেগুলো আদায় করা হবে।’
দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চর্চা বন্ধ করতে চান উল্লেখ করে আবদুর রশিদ জিতু বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সকল প্রকার দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চর্চা, সেটি বন্ধ করব ইনশা আল্লাহ। কারণ, আমরা দেখেছি দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চর্চা কীভাবে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক লাইফ নষ্ট করে। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে যেভাবে কাজ করা দরকার, আমরা সেভাবে কাজ করে যাব।’
এদিকে জাকসুর নবনির্বাচিত জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেছেন, ‘নবনির্বাচিত ভিপি আমাদের প্যানেলের বাইরে থেকে নির্বাচিত হলেও আমরা সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব। আমাদের প্রথম কাজ হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই আন্দোলনে ছাত্রলীগ যে হামলা চালিয়েছিল, ওই হামলায় যেসব শিক্ষক জড়িত ছিলেন তাঁদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন সমস্যা রয়েছে, সেটি সমাধান করা।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর, নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে চান উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের দপ্তর ও প্রকাশনা সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করে গড়ে তোলার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন, আমরা সবকিছু বাস্তবায়নের চেষ্টা করে যাব।’
নবনির্বাচিত এই জিএস বলেন, ‘নির্বাচনে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী ভোট প্রদান করেছেন। সকল প্রার্থী এবং শিক্ষার্থী এই নির্বাচন মেনে নিয়েছেন এবং সুষ্ঠুভাবে ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট শিক্ষার্থীদের কাছে যে অঙ্গীকার করেছে এবং শিক্ষার্থীরা যে বিশ্বাস নিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছেন, আমরা সে অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে দায়বদ্ধ।’
শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে তাঁরা নিরলসভাবে কাজ করে যাবেন উল্লেখ করে শিবিরের এই নেতা বলেন, ‘নারী স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।’
| জাকসু নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর নবনির্বাচিত ভিপি আবদুর রশিদ (জিতু) ও জিএস মো. মাজহারুল ইসলাম। ছবি: প্রথম আলো |
জাকসু নির্বাচনে ২৫ পদের ২০টিতেই জিতল ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল
৩৩ বছর পর ১১ সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়। এরপর গতকাল শুক্র ও আজ শনিবার দিনভর গণনার পর বিকেলে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
ভিপি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেলের জিতু
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ফলাফল অনুযায়ী, ভিপি পদে ৩ হাজার ৩৩৪টি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেল ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের’ প্রার্থী আবদুর রশিদ (জিতু)। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক। আন্দোলনের আগে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের আরিফ উল্লাহ পেয়েছেন ২ হাজার ৩৯২ ভোট।
এ ছাড়া ভিপি পদে বাগছাস–সমর্থিত প্যানেলের আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল পেয়েছেন ১ হাজার ২১১ ভোট। ভোটের দিন বিকেল চারটার দিকে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল–সমর্থিত প্যানেলের শেখ সাদী হাসান পেয়েছেন ৬৪৮ ভোট।
জিএস-এজিএসসহ ২০ পদে শিবির জয়ী
জিএস পদে ৩ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের মো. মাজহারুল ইসলাম। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের আবু তৌহিদ মো. সিয়াম পেয়েছেন ১ হাজার ২৩৮ ভোট। স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের মো. শাকিল আলী পেয়েছেন ৯৫৯ ভোট। নির্বাচন বর্জন করা ছাত্রদলের তানজিলা হোসাইল বৈশাখী পেয়েছেন ৯৪১ ভোট।
এজিএস (পুরুষ) পদে বিজয়ী হয়েছেন ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের ফেরদৌস আল হাসান। তিনি ২ হাজার ৩৫৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের জিয়া উদ্দিন পেয়েছেন ২ হাজার ১৪ ভোট। স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের তৌহিদুল ইসলাম ভূঁঞা পেয়েছেন ৭১৫ ভোট। ছাত্রদলের মো. সাজ্জাদ উল ইসলাম পেয়েছেন ৭০১ ভোট। এজিএস (নারী) পদে ৩ হাজার ৪০২ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের মালিহা নামলাহ পেয়েছেন ১ হাজার ৮৩৬ ভোট। ছাত্রদলের আঞ্জুমান আরা ইকরা পেয়েছেন ৭৬৪ ভোট।
শীর্ষ তিন পদের বাইরে ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে আবু উবায়দা উসামা (২ হাজার ৪২৮ ভোট), পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সম্পাদক পদে সাফায়েত মীর (২ হাজার ৮১১ ভোট), সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে জাহিদুল ইসলাম (১ হাজার ৯০৭ ভোট), সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মোহাম্মদ রায়হান উদ্দিন (১ হাজার ৯৮৬ ভোট), নাট্য সম্পাদক পদে রুহুল ইসলাম (১ হাজার ৯২৯ ভোট), সহক্রীড়া সম্পাদক পদে মো. মাহাদী হাসান (২ হাজার ১০৫ ভোট), সহক্রীড়া (নারী) সম্পাদক পদে ফারহানা আক্তার (১ হাজার ৯৭৬ ভোট) জয়ী হয়েছেন।
এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে মো. রাশেদুল ইসলাম (২ হাজার ৪৩৬ ভোট), সহসমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (পুরুষ) পদে তৌহিদ হাসান (২ হাজার ৪৪২ ভোট), সহসমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (নারী) পদে নিগার সুলতানা (২ হাজার ৯৬৬ ভোট), স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক পদে হুসনী মোবারক (২ হাজার ৬৫৩ ভোট), পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে তানভীর রহমান (২ হাজার ৫৫৯ ভোট), কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে নুসরাত জাহান ইমা (৩ হাজার ১৪ ভোট), ফাবলিহা জাহান নাজিয়া (২ হাজার ৪৭৫ ভোট), নাবিলা বিনতে হারুন (২ হাজার ৭৫০ ভোট) এবং কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে হাফেজ তারিকুল ইসলাম (১ হাজার ৭৪৬ ভোট), মো. আবু তালহা (১ হাজার ৮৫৪ ভোট) জয়ী হয়েছেন।
বিজয়ী অন্য যাঁরা
ছাত্রশিবিরের প্যানেলের বাইরে সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক পদে বাগছাস–সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের প্রার্থী আহসান লাবিব (১ হাজার ৬৯০ ভোট), ক্রীড়া সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মাহামুদুল হাসান (৫ হাজার ৭৭৮ ভোট), সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মুহিবুল্লাহ শেখ (২ হাজার ১৮ ভোট) এবং কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) মোহাম্মদ আলী চিশতী (২ হাজার ৪১৪ ভোট) পেয়ে জয় পেয়েছেন।
জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। শিক্ষার্থীদের রায়ের প্রতি সবাইকে সম্মান দেখাতে হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে কাজ করবেন, সেই প্রত্যাশা থাকবে। নির্বাচন করার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার কিছুটা ঘাটতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁরা নির্বাচনটি সম্পন্ন করতে পেরেছেন। এটি তাঁদের জন্য গৌরবের ব্যাপার।
ফল ঘোষণার আগমুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের এক সদস্যের পদত্যাগ
নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগমুহূর্তে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য রেজওয়ানা করিম পদত্যাগ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগমুহূর্মুতে তিনি তাঁর বিভাগের একজন স্টাফকে দিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। আমি বিস্মিত হয়েছি, গতকাল পর্যন্ত তিনি আমাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। রাতের মধ্যে কি এমন হলো যে তিনি পদত্যাগ করলেন! এটি আমাদের সবাইকে বিস্মিত করেছে।’
অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম আরও বলেন, রেজওয়ানা করিম কয়েকদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর তিনি কাজ করেছেন, মিটিং করেছেন। তাঁর কোনো বিষয় আপত্তি থাকলে সেগুলো জানাতে পারতেন। কিন্তু নির্বাচনের পর ফল ঘোষণার আগমুহূর্তে পদত্যাগ করা বিস্ময়কর।

Saturday, September 13, 2025
৩৩ বছর কাটল, কথা রাখছেন না জাকসুর কেউ by অনিন্দ্য সাইমুম
জাকসু ও হল সংসদে ভোটও হচ্ছে ৩৩ বছর পর। জাকসুতে ১৯৯২ সালের পরের নির্বাচন বাতিল হয়েছিল একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায়। তখনকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকটি গ্রুপ ছিল। ১৯৯৩ সালের ২৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের জন্য নির্ধারিত শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন চলছিল। ওই নির্বাচন বানচালের জন্য শিক্ষকদের একটি গ্রুপ জাকসুর প্রতিনিধি ও ছাত্রদের দিয়ে শিক্ষকদের ওপর হামলা চালায়। ওই হামলায় কয়েকজন শিক্ষক আহত হন। পরে সভাপতি (উপাচার্য) জাকসু ভেঙে দেন।
এরপর ৩৩ বছর কেটে গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার জাকসুতে ভোট গ্রহণ হয়। ওই দিন রাত সোয়া ১০টা থেকে চলছে গণনা। সেই সঙ্গে চলছে ফলাফলের জন্য অনন্ত অপেক্ষা।
কে কী কথা দিয়েছিলেন
অব্যবস্থাপনা, অভিযোগ আর বর্জনে জাকসুর এবারের নির্বাচন নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তবে আলোচনা আরও প্রকট হয় ভোট গণনায় দীর্ঘসূত্রতায়। বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ হলেও শুক্রবার পেরিয়ে আজ শনিবার দুপুর পর্যন্ত কয়েক হাজার ভোট গুনে শেষ করতে পারেনি জাকসুর নির্বাচন কমিশন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১০টা থেকে টানা ভোট গণনা চলছে।
গণনা শুরুর পর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোট গণনা করতে আজ সারা রাত লেগে যাবে। আশা করছি, কাল (শুক্রবার) দুপুরের মধ্যে ফলাফল ঘোষণা করা সম্ভব হবে।’
পরদিন শুক্রবার সকাল আটটা নাগাদ একটি দুঃসংবাদ জানা যায়। ভোট গণনার কাজে অংশ নিতে এসে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতা। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। তিনি প্রীতিলতা হলে পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। এ খবরে গণনা কক্ষে কান্নায় ভেঙে পড়েন জান্নাতুলের সহকর্মীরা।
শোকের মধে৵ও চলতে থাকে ভোট গণনা। সকাল ১০টার পরে জাকসু নির্বাচনের নির্বাচনী কর্মকর্তা রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা জানান, হল শিক্ষার্থী সংসদের ভোট গণনা শেষে কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের ভোট গণনা শুরু হবে।
এ কে এম রাশিদুল আলম জানান, রাতে (শুক্রবার) গণনা শেষ হতে পারে। রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে সম্পূর্ণ গণনা শেষ করে বেসরকারিভাবে ফল প্রকাশ করতে পারবেন তাঁরা।
দুপুরে নামাজ ও মধ্যাহ্নভোজের জন্য দেওয়া এক ঘণ্টার বিরতিতে রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘আমাদের সব কটি হল সংসদের মধ্যে কেবল তিনটি হল ছাড়া বাকি হলগুলোর গণনা শেষ হয়েছে বা চলছে।’
ভোট গণনায় এত দেরি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনেকের মধে৵ ক্ষোভ দেখা যায়। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ৪৮ ব্যাচের শিক্ষার্থী উম্মে হাবীবা শুক্রবার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল সন্ধ্যা থেকে নির্বাচনের ফলের জন্য অপেক্ষা করছি। কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না কখন ভোট গণনা শেষ হবে। এভাবে অপেক্ষার কারণে জাকসু নির্বাচনের আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো কলাভবনের সামনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জাকসু নির্বাচনে নওয়াব ফয়জুন্নেসা হল কেন্দ্রের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক সুলতানা আক্তার বলেন, ‘হল সংসদে একটিমাত্র ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট হচ্ছে; কিন্তু জাকসুতে তিনটি করে, অর্থাৎ যদি আট হাজার ভোট কাস্ট (প্রদত্ত ভোট) হয়ে থাকে, তবে ২৪ হাজার কাউন্ট (গণনা) করতে হবে ম্যানুয়াল (হাতে গোনা) পদ্ধতিতে। তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব, তিন দিনেও তো এটা সম্ভব হবে না। এই পদ্ধতির আমরা পরিবর্তন চাই।’
বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে ‘নির্বাচনের ফল প্রকাশ না করে বানচাল করার ষড়যন্ত্র চলছে’ বলে অভিযোগ করে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল।
অবশেষে শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের ভোট গণনা শুরু হয়েছে বলে জানান জাকসু নির্বাচন কমিশনার রেজোয়ানা করিম স্নিগ্ধা।
ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘রাতের মধ্যেই ভোট গণনা শেষ করে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। তবে সেটির নির্দিষ্ট সময় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। রাতের শেষভাগেও (ফল ঘোষণা) করা হতে পারে।’
জাকসু নির্বাচনের ফল স্থগিত করা হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা হবে বলে ঘোষণা দেন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী আবদুর রশিদ জিতু।
অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে শুক্রবার রাত পৌনে নয়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের নিচে এক সংবাদ সম্মেলনে জাকসু নির্বাচন কমিশন থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার।
শুক্রবার পেরিয়ে শনিবার
আজ শনিবার, তৃতীয় দিনের মতো ভোট গণনা চলছে। গণনা কখন শেষ হবে তা নিয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা যায়নি। নির্বাচন কমিশন একেকবার একেক সময়সীমার কথা বলে আসছেন।
জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য অধ্যাপক লুৎফুল এলাহী আজ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বলেন, মোট ১৫টি হলের ভোট গণনা শেষ। আশা করছি, বাকি হলগুলোর ভোট গণনা বেলা ১টার মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।
বেলা সাড়ে ১১টার কিছু আগে অধ্যাপক লুৎফুল এলাহী জানান, ১৭ হলে ভোট গণনা শেষ হয়েছে। বাকি আর চারটির।
সর্বশেষ দুপুর পৌনে ১২টার দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আশা করছি, সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে জাকসু নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হবে।’
ভোট গণনা শেষ হওয়ার সময় আর ফলাফল নিয়ে কর্তৃপক্ষের বারবার এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও রাখতে না পারা দেখে মনে পড়ে যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই কবিতা ‘কেউ কথা রাখেনি’। সুনীল বলেছিলেন ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি’। ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত জাকসু নির্বাচনে ভোট গণনা আর ফলাফল নিয়ে প্রতিশ্রুতি শুনে মনে হয় কথা রাখছে না জাকসুর নির্বাচন কমিশনও।
ভোটার ১১ হাজার ৭৪৩ জন
জাকসুতে মোট ভোটার ১১ হাজার ৭৪৩ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ৫ হাজার ৭২৮ এবং ছাত্র ৬ হাজার ১৫ জন। কেন্দ্রীয় সংসদে মোট ২৫টি পদে লড়ছেন ১৭৭ জন প্রার্থী। একই সঙ্গে ২১টি হল সংসদের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে।
সহসভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী ৯ জন। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে ৮ জন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (নারী) পদে ৬ জন এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (পুরুষ) পদে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
একেকটি হলে পদসংখ্যা ১৫। ২১টি হল সংসদে মোট পদ ৩১৫টি। এতে ৪৭৭ জন প্রার্থী হয়েছেন। ছাত্রীদের ১০টি আবাসিক হলে ১৫০টি পদের মধ্যে ৫৯টিতে কোনো প্রার্থী নেই। একজন করে প্রার্থী রয়েছে ৬৭টি পদে। সে হিসেবে মাত্র ২৪টি পদে ভোট হয়েছে।
জাকসুতে মোট সাতটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর মধ্যে চারটি পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ও তিনটি আংশিক প্যানেল রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্যানেলগুলো হলো ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল, ছাত্রশিবির-সমর্থিত সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট, প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের সম্প্রীতির ঐক্য ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ-সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম।
আংশিক প্যানেল দিয়েছে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলন, স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ এবং ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফ্রন্টের সংশপ্তক পর্ষদ। এ ছাড়া অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন।
পাঁচ প্যানেলের ভোট বর্জন
ভোট গ্রহণ শুরু হয় বৃহস্পতিবার সকাল নয়টায়। সকালের দিকে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরাও ভোট দিতে ক্যাম্পাসে আসেন। জাকসু ভোটের জন্য গঠিত নির্বাচন কমিশন বৃহস্পতিবার রাতে জানায়, ভোট পড়তে পারে ৬৮ শতাংশের আশপাশে।
এর আগে নির্বাচনে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে ভোট গ্রহণের সময় শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচন বর্জন করে ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেল। এরপর প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের সম্প্রীতির ঐক্য, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফ্রন্টের সংশপ্তক পর্ষদ, স্বতন্ত্র অঙ্গীকার পরিষদ এবং ছাত্রফ্রন্টের একাংশের একটি প্যানেল নির্বাচন বর্জন করে। কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও নির্বাচন বর্জন করেছেন।
ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার কিছু সময় আগে নির্বাচনী দায়িত্ব থেকে সরে আসেন বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত তিন শিক্ষকও।
ইতিহাস যা বলে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ৫৪ বছর আগে, ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে জাকসু প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বছরই জাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪—পরপর তিন বছর জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরে আর ধারাবাহিকতা থাকেনি।
১৯৮০, ১৯৮১, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে জাকসু নির্বাচন হয়। ১৯৯২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে ছাত্রদল একচেটিয়াভাবে জয়লাভ করেছিল। তারা জাকসু ও হল সংসদের ১০৭টি পদের মধ্যে ১০৫টি পেয়েছিল। সব মিলিয়ে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে নির্বাচন হয়েছে ৯ বার। তারপর টানা ৩৩ বছরের অপেক্ষা।
![]() |
| জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ নির্বাচনে ভোট গণনা চলছে। আজ শনিবার সকালে, সিনেট হলে। ছবি: প্রথম আলো |
ডাকসু ও জাকসু: তাহলে চব্বিশ থেকে আমরা কী শিক্ষা নিলাম by সোহরাব হাসান
ঘণ্টাখানেক পরই খবর পেলাম, জাহাঙ্গীরনগরে ছাত্রদল ও বাম সমর্থকসহ পাঁচটি প্যানেল ভোট বর্জনের আওয়াজ দিয়ে লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে যে তাঁরা ফলাফল ঘোষণার আগেই নিজেদের নৈতিক পরাজয় স্বীকার করে নিলেন, এই বোধও সম্ভবত নেতাদের নেই।
ভোট গ্রহণের পর আরেক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলি, যিনি চব্বিশের গণ–আন্দোলনে জাহাঙ্গীরনগরে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর বক্তৃতা শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশবাসীকেও উদ্দীপ্ত করেছে। তিনি জাকসুর নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম–অব্যবস্থাপনার জন্য প্রশাসনকেই দুষলেন। যাঁরা এই নির্বাচনের দায়িত্ব নিয়েছেন, তাঁদের সেই দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা ও দক্ষতা আছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি স্টার মার্ক পেয়ে থাকে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাস নম্বরও পায়নি। বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় ভোট গ্রহণ শেষ হলেও গণনার কাজ এই সম্পাদকীয় লেখা পর্যন্ত শেষ হয়নি।
বেদনাদায়ক ঘটনা হলো জাহাঙ্গীরনগরে ভোট গণনাকালে শুক্রবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস মৌমিতা অসুস্থ হয়ে মারা যান। তিনি পোলিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন। এর আগে ডাকসু নির্বাচনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ভেতর অসুস্থ হয়ে মারা যান এস টিভির সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম শিবলী।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিও চলছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন শুধু একটি সাধারণ নির্বাচনই নয়, এটি একটি “ফাউন্ডেশনাল ইলেকশন”, যার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে আগামীর বাংলাদেশের পথরেখা। তাই নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাদের অবশ্যই মৌলিক সংস্কারগুলো চূড়ান্ত করে ফেলতে হবে।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব এবং এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এটাও পুরোনো কথা। এরই মধ্যে উপদেষ্টা পরিষদে রদবদলের গুঞ্জনও আছে। প্রধান উপদেষ্টা যদি মনে করেন, নির্বাচনের অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে উপদেষ্টা পরিষদের যোগ–বিয়োগ করা দরকার, সেটা এখনই করতে হবে।
ডাকসু নির্বাচনের ফল অনেককেই চমকে দিয়েছে। এখানে জাতীয় রাজনীতির চেয়েও বেশি ভূমিকা রেখেছে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও নমনীয়তা, সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিপদে আপদে যাঁকে কাছে পেয়েছেন তাঁকে ভোট দিয়েছেন। ডাকসুতে বড় বিজয় পেয়েছে ছাত্রশিবির। শিবিরের বিশাল জয়ের বিষয়ে এনসিপির এক নেতার মূল্যায়ন হচ্ছে, ‘প্রথাগত ধর্মীয় রাজনীতির বাইরে এসে লিবারেল ধারায় মধ্যমপন্থী জায়গা থেকে প্রচার ও প্যানেল সাজিয়েছিল শিবির। ডানপন্থী বা ধর্মভিত্তিক বক্তব্য না টেনে মধ্যপন্থী জায়গা থেকে তারা প্রচার চালিয়েছে, এ বিষয়টিও তাদের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।’
অন্য ছাত্রসংগঠনগুলো যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে ডাকসু ও জাকসুতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেই প্যানেলকে বেছে নিয়েছে, তাকে সম্মান জানাতে হবে। তাদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। কী কারণে তারা পরাজিত হলো সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। ইতিমধ্যে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সঙ্গে শিবিবের আঁতাত আবিষ্কার করেছেন। তাঁদের এই আবিষ্কারের পেছনে তথ্যপ্রমাণ থাকলে সেটা দেশবাসীকে জানানো হোক। কিন্তু এটিও প্রশ্ন, তারা গত এক বছরে কী করেছে?
নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের প্রথম ধাপ। আমাদের রাজনীতিকেরা গত ৫৪ বছরে এই ধাপটিই পার হতে পারেননি। তাঁরা ক্ষমতায় গিয়ে এমন কাজ করে দেখাতে পারেননি, যাতে মানুষ মনে করে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব। রাজনীতিকেরাই আন্দোলন সংগ্রাম করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করলেন। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে ২০০৭ সালের নির্বাচনটিই করতে পারল না। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে গিয়ে তাদের আন্দোলনের ফসল তত্ত্বাবাধায়ক ব্যবস্থাটিই বাতিল করে দিল। তার পরিণামও তারা ভোগ করছে।
এখন আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। বিএনপি মাঠে আছে। মাঠে আছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও অন্যান্য দলও। কিন্তু এসব দল গত কয়েক মাস ধারাবাহিক আলোচনা করেও নির্বাচন তথা ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর বিষয়ে মতৈক্যে আসতে পারেনি। এই ব্যর্থতার দায় ‘পতিত স্বৈরাচারের’ ওপর চাপিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করা যাবে, গণতন্ত্র এক পাও এগোবে না।
আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিকেরা, ছাত্রনেতারা কেউ অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেন না। তাঁদের অনেকে বিতাড়িত আওয়ামী লীগকে নিয়ে প্রতিদিনই কথা বলেন। তাদের ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু নিজেরা কীভাবে একটি নির্বাচন করবেন, সে বিষয়ে ঐকমত্যে আসতে পারছেন না।
ছাত্রদল, বাম ছাত্রসংগঠন ও বাগছাসের নেতারা জাতীয় রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। এখনো বলছেন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে তাঁরা খুব কম কথাই বলেছেন। নানা সূত্রে জানতে পেরেছি, এই কাজটি ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীরা করেছেন। ছাত্রদল তো সুষ্ঠু পরিবেশ নেই বলে নির্বাচনই ঠেকিয়ে দিতে চেয়েছিল। পরে সব ছাত্রসংগঠনের দাবির মুখে তারা ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে রাজি হয়। অন্যদিকে বাম ও চব্বিশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতৃত্ব বহু ভাগে ভাগ হয়ে গেল, যার সুফলটা এককভাবে শিবির–সমর্থিত প্যানেল পেয়েছে।
ছাত্রদলের নেতারা মনে করতেন, জাতীয় নির্বাচন হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। একসময় বামপন্থী রাজনীতিকেরাও এই কাজটি করতেন। তাঁরা বলতেন, আগে সমাজ বদলাও। এরপর মানুষের ভাগ্যও বদলে যাবে। কিন্তু তাঁরা এ কথা কখনো ভাবেননি যে মানুষ না বদলালে সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা কিছুই বদলায় না।
চব্বিশে গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেই ছাত্রনেতৃত্ব একটি দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সরকারকে হটিয়ে দিতে পেরেছে, তারা কেন সুন্দরভাবে একটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে পারবে না। ডাকসু নির্বাচনটি মোটামুটি উতরে গেলেও জাকসুতে এসে প্রলয়কাণ্ড ঘটল, যার দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এড়াতে পারবে না। দুর্ভাগ্য, চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর যাঁরা নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেছেন, তাঁরাও পুরোনো পথে হাঁটছেন।
মাঠে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো যদি নির্বাচনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারে, যদি ছাত্রনেতৃত্ব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয় কিংবা নির্বাচন হওয়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের রায় না মেনে নেয়, তাহলে সামনে আরও অনেক বিপদ অপেক্ষা করে আছে।
* সোহরাব হাসান, সাংবাদিক ও কবি
- মতামত লেখকের নিজস্ব
| জাকসু নির্বাচনে ভোট দিতে শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হল কেন্দ্রে। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ |
Friday, July 18, 2025
প্রবন্ধ- শিক্ষার বিউপনিবেশায়ন by ন্গুগি ওয়া থিয়োং’ও এবং অনুবাদ: নূরুল কবীর
‘গ্যালিক লিগ’ খোদ আয়ারল্যান্ডে গ্যালিক বা আইরিশ ভাষার পুনরুজ্জীবনের জন্য নানা তত্পরতায় নিবেদিত একটি আইরিশ সংগঠন। আইরিশ জনগণের নিজস্ব ভাষা গ্যালিক, ইতিপূর্বে আধিপত্যশীল ইংরেজি ভাষার অধীন হয়ে পড়েছিল। পুরোদস্তুর সরকারি সমর্থনসহ নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও মর্যাদা ও প্রভাবের দিক থেকে আইরিশ ভাষা এখনো ইংরেজির অধস্তন পর্যায়ে বিদ্যমান রয়েছে। আয়ারল্যান্ডের যত মানুষ আইরিশ ভাষায় কথা বলে, তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করে। কতিপয় সুবিখ্যাত আইরিশ সাহিত্যিক, যেমন ডব্লিউ বি ইয়েটস ও জেমস জয়েস, ইংরেজি ভাষায় লিখেছেন এবং তাঁদের সমূহ সৃষ্টি ইংরেজি সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভার হিসেবেই সর্বত্র অধীত হয়ে থাকে। ব্রিটেনসহ পৃথিবীর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো ‘ইংরেজি বিভাগের’ কথা ভাবা যায় না, যেখানে কোর্স হিসেবে আইরিশ বংশোদ্ভূত এই লেখকদের সাহিত্যকর্ম অন্তর্ভুক্ত নয়। যেসব লেখক ইংরেজি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে ব্যাপক অবদান রেখেছেন, এই দুজন তাঁদের অন্যতম।
গ্যালিক ও ইংরেজি ভাষার মধ্যে বিদ্যমান অসম ক্ষমতার সম্পর্কটি, যা এখন ইংরেজির অনুকূলে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, চিরদিনই এমন ছিল না। ত্রয়োদশ ও ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে, যখন ইংরেজরা আয়ারল্যান্ডে, বিশেষত তার মুনস্টের রাজ্যে বসতি স্থাপন করে, তখন ধ্রুপদি জ্ঞানচর্চার প্রশ্নে ইংরেজির চেয়ে আইরিশ ভাষা বেশি সমৃদ্ধ ছিল। স্বভাবতই আয়ারল্যান্ডে আদি বসতি স্থাপনকারী ইংরেজরা তখন তুলনামূলকভাবে বেশি প্রাণশক্তিসম্পন্ন আইরিশ ভাষার প্রতি আকৃষ্ট হয়। আইরিশ ভাষার প্রতি সেই ইংরেজদের আকর্ষণ ছিল নিতান্তই বাস্তবানুগ: ইংরেজ আবাদিরা যাঁদের ভেতর বসতি স্থাপন করেছিল, তাঁদের অধিকাংশের ভাষাই ছিল আইরিশ।
এ অবস্থায় ১৩৬৬ সালে লন্ডনভিত্তিক ইংরেজ সরকার আইরিশ বা গ্যালিক ভাষার দ্রোহাত্মক গ্রাস থেকে ইংরেজিকে রক্ষা করার জন্য তত্পর হয়ে ওঠে; আয়ারল্যান্ডের কিলকেনি নগরের জন্য জারি করে ‘কিলকেনি বিধিমালা’—যার বিভিন্ন ফরমানের অধীন একদিকে বসতি স্থাপনকারী ইংরেজ–অধ্যুষিত সেই অঞ্চলে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার জোরদার করা হয়; অন্যদিকে আইরিশ ভাষার ব্যবহারকে রীতিমতো একটি ফৌজদারি অপরাধমূলক দুষ্কৃতি হিসেবে স্থির করা হয়। কিলকেনিতে বসবাসকারী কোনো ইংরেজ বা আইরিশ ব্যক্তি একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য আইরিশ ভাষা ব্যবহার করলে অভিন্ন বিধিমালার অধীন তাঁদের জমি বাজেয়াপ্ত হয়ে যাওয়ার হুমকিও জারি রাখা হয়। ওদিকে ব্রিটিশ সরকারের এসব নীতিমালার তরফে সাহিত্যিক ও দার্শনিক ন্যায্যতা জোগানোর কাজে এগিয়ে আসেন মুনস্টের রাজ্যে বসতি গাড়া ‘দ্য ফেয়ারি কুইন’-খ্যাত ইংরেজ কবি এডমান্ড স্পেন্সার। স্পেন্সার তাঁর ১৫৯৬ সালে প্রকাশিত আ ভিউ অব দ্য প্রেজেন্ট স্টেইট অব আয়ারল্যান্ড পুস্তকে ‘যুক্তি’ প্রদর্শন করেন, ‘ভাষা ও নামকরণ পদ্ধতি হচ্ছে আইরিশ জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক স্মৃতি বিলোপ-সাধনের সর্বোত্তম উপায়।’ তিনি লেখেন, ‘বিজেতা কর্তৃক বিজিতের ভাষাকে অবজ্ঞা করা এবং বিজিতের ওপর বিজেতার ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়াই জগতের স্বাভাবিক নিয়ম।’
খোদ আয়ারল্যান্ডে আইরিশ ভাষার প্রান্তিকতাপ্রাপ্তির ঘটনাটি অবশ্য মোটেও কোনো ধরনের স্বাভাবিক বিবর্তন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ঘটেনি, তা বরং (ইংরেজদের) সচেতন রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও শিক্ষাসংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবায়নের ভেতর দিয়ে সংঘটিত হয়েছে।
আয়ারল্যান্ড ছিল ইংল্যান্ডের প্রথম বসতি স্থাপনকারী উপনিবেশ। পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড কর্তৃক বিভিন্ন দেশের উপনিবেশায়নের ক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ড একধরনের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আয়ারল্যান্ডসহ তার অন্য উপনিবেশগুলোয় ইংরেজরা যেসব ব্যবস্থা প্রবর্তন ও চর্চা করেছে, পৃথিবীর অপরাপর ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোও—তা হোক স্পেন, ফরাসি বা পর্তুগিজ—তাদের আপন আপন উপনিবেশগুলোয় অভিন্ন ব্যবস্থা ও চর্চা জারি রেখেছিল। জাপান কর্তৃক ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কোরিয়া জবরদখলে রাখার সময়েও তা–ই ঘটেছে। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশায়নের ক্ষেত্রেও অভিন্ন ব্যবস্থা জারি ছিল, যেমন নরওয়ের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সে দেশের সামি জনগোষ্ঠীর ভাষার অবদমন। স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের অপরাপর দেশগুলোতেও, সামান্য রকমফের সাপেক্ষে, একই ঘটনা ঘটেছে। বিজিত জনগণের ভাষার অবদমন আর বিজেতার ভাষার উচ্চতর মর্যাদা দান ও তার আধিপত্যের বিষয়টি আবার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত—যা কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির বিজয় ও জবরদখল প্রক্রিয়াকে নিষ্কণ্টক রেখে জারি থাকে।
ভাষিক অবদমন প্রকল্পটি মোটেই কোনো নন্দনতাত্ত্বিক আনন্দের জন্য গৃহীত হয়নি। স্পেন্সার খুব ভালো করেই বুঝতেন যে আইরিশ ভাষা ও নামকরণ পদ্ধতির উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াটি আখেরে আইরিশ জনগণের আত্মপরিচয় ভুলিয়ে দেবে, তাঁদের প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করবে এবং তার ফলে আইরিশদের ওপর বিজয়ী আধিপত্য কায়েম করা ইংরেজদের জন্য সহজতর করে তুলবে। একটা গোটা জনগোষ্ঠীকে সামরিকভাবে পরাজিত করে তার ওপর আধিপত্য জারি রাখার ব্যয় ও কার্যকারিতার তুলনায় ভাষাগত বিজয়ের মাধ্যমে সেই জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য কায়েম রাখা অনেক কম ব্যয়বহুল এবং অনেক বেশি কার্যকর। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিজয়ীকে শুধু বিজিত জনগোষ্ঠীর এলিট সমাজের মন ও মননকে অধিকার করার জন্য বিনিয়োগ করতে হয়, আর তারপর ওই এলিট গোষ্ঠী নিজেই অবশিষ্ট জনতার ভেতর অধীনতার বোধ ছড়িয়ে দেবে—বিজিত জনগোষ্ঠীর এলিট সম্প্রদায়টি বিজয়ী ঔপনিবেশিক শক্তির ভাষিক সেনাবাহিনীতে পরিণত হবে।
আধুনিক ব্রিটেনের সমৃদ্ধি ও শক্তিমত্তার পেছনে ভারত উপনিবেশের মুখ্য ভূমিকা থাকার কারণে ভারত এমনকি আয়ারল্যান্ডের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছিল, যার ফলাফল পরবর্তীকালে এশিয়া ও আফ্রিকার অপরাপর উপনিবেশগুলোয় রপ্তানি করা হয়। ১৮৩৪ থেকে ১৮৩৮ সাল পর্যন্ত ‘সুপ্রিম কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া’র সদস্য হিসেবে টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলে উপনিবেশিত ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও দণ্ডবিধি প্রণয়নের মতো দুটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ প্রকল্প সম্পন্ন করেছিলেন। ম্যাকলে তাঁর ইতিহাসখ্যাত ‘মিনিটস অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন’–এ, ১৮৩৫ সালে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ভারতে প্রচলিত সংস্কৃত ও ফারসি ভাষাকে ইংরেজি দিয়ে প্রতিস্থাপন করার জন্য ওকালতি করেছিলেন। সে ক্ষেত্রে তার ঘোষিত লক্ষ৵ ছিল ভারতবর্ষে এমন একটি ‘শ্রেণি’ গঠন করা, যার সদস্যরা ‘আমাদের এবং আমাদের দ্বারা শাসিত লক্ষ লক্ষ প্রজার ভেতর ভাষাগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে—যারা রক্তমাংস আর গাত্রবর্ণে ভারতীয় হলেও রুচিবোধ, মতামত, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে হবে ইংরেজ’।
এ ঘটনার ঠিক ৮৭ বছর পর উপনিবেশিত কেনিয়ার ব্রিটিশ গভর্নর স্যার ফিলিপ মিশেলের মুখে ম্যাকলের কথা পুনরাবৃত্ত হয়। ‘কেনিয়া ল্যান্ড’ ও তার মুক্তিকামী ‘ফ্রিডম আর্মি’র—ব্রিটিশদের ভাষায় মাউ মাউ—বিরুদ্ধে পরিচালিত ব্রিটিশ সরকারের সামরিক অভিযানকে সহযোগিতা করার জন্য মিশেল আফ্রিকার শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি প্রবর্তনের ফজিলত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিশেল বলেছিলেন, এই নতুন ভাষাশিক্ষা ‘এমন একটি সভ্য রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সাহায্য করবে, যেখানে জন্মগত আদি পরিচয়নির্বিশেষে প্রত্যেকেই ব্রিটিশ মান ও মূল্যবোধের অধিকারী হবে, যেখানে প্রত্যেকেরই স্বার্থ নিহিত থাকবে—থাকবে অংশীদারত্ব’।
ক্যাপ্টেন রিচার্ড হেনরি প্র্যাট যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া রাজ্যের কারলিসল অঞ্চলে তাঁর কুখ্যাত কারলিসল ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করে, ১৮৭৯ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী শিশুদের জন্য তার নিজস্ব শিক্ষাপদ্ধতি চালু করেন। নিজের প্রতিষ্ঠিত বোর্ডিং স্কুলের পেছনে সক্রিয় শিক্ষা-দর্শন নিয়ে ১৮৯২ সালে রিচার্ড বলেন, ‘শিক্ষার্থীর বুকের ভেতরের আদি ইন্ডিয়ানটিকে হত্যা করো, আর মানুষটাকে রক্ষা করো।’ রিচার্ডের শিক্ষা কর্মসূচি এক অভিন্ন ঔপনিবেশিক বিন্যাসকেই অনুসরণ করেছে: কিছু মানুষকে তাঁদের মাতৃভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করো, ঔপনিবেশিক প্রভুদের ভাষায় দীক্ষিত করে নতুনভাবে তাদের গড়ে তোলো, তারপর শাসিত জনগোষ্ঠীর ভেতর ছেড়ে দাও।
ওয়ালটার রোডনি তাঁর হাউ ইউরোপ আন্ডারডেভেলপড আফ্রিকা গ্রন্থে ফ্রান্সের বিভিন্ন উপনিবেশ ও তার বাইরে ফরাসি ভাষা প্রচারের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, ১৮৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের চূড়ান্ত লক্ষ৵ সম্পর্কে, সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য পিয়ের ফঁস্যাঁকে উদ্ধৃত করে বলেন, ‘ফরাসি সাম্রাজ্যের কেন্দ্রের সঙ্গে তার উপনিবেশগুলোকে একটা শক্ত মনস্তাত্ত্বিক বন্ধনে আবদ্ধ করা প্রয়োজন ছিল। কারণ, যেদিন উপনিবেশগুলো তাদের প্রগতিশীল মুক্তির ভেতর দিয়ে একটি সম্ভাব্য ফেডারেশনে সংঘবদ্ধ হবে, সেদিনও তারা যেন ভাষা, চিন্তা ও চেতনার দিক থেকে ফরাসিই থেকে যায়।’
স্পষ্টতই এসব কর্মকাণ্ডের একটি পরিষ্কার লক্ষ৵ ছিল: উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর এলিট সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের মন ও মননের উপনিবেশায়নই ছিল সেই সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষানীতির লক্ষ৵। বলার অপেক্ষা রাখে না, বাস্তবে সেই লক্ষ৵ পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হয়েছে। উপনিবেশ–উত্তর পরিবেশে আয়ারল্যান্ডের মতো স্বাধীনতা অর্জনের পরও প্রতিটি দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ স্বদেশি ভাষার তুলনায় ঔপনিবেশিক ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করতে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করে। আফ্রিকার ক্ষেত্রে মহাদেশটির এমনকি পরিচয়জ্ঞাপক বয়ানগুলোও নানা ইউরোপীয় ভঙ্গি ও ভাষায়—প্রধানত ইংরেজি, ফরাসি ও পর্তুগিজ—বর্ণিত হয়। এমনকি উপনিবেশ–উত্তর যেসব দেশের এলিট সম্প্রদায় জাতীয়তাবাদী মনোভাবাপন্ন এবং নিজেদের স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর, তাঁরাও নিজেদের রাগ কিংবা আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য ঔপনিবেশিক ভাষাকেই বেছে নেন। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ভাষাশিক্ষার জন্য বরাদ্দ অর্থের ৯০ শতাংশই নানা ঔপনিবেশিক ভাষা শিক্ষায় ব্যয় করা হয়, যদিও এসব দেশের জনগণের ৯০ শতাংশই আফ্রিকার বিভিন্ন ভাষা ব্যবহার করেন। আফ্রিকার কোনো কোনো সরকার, এমনকি আফ্রিকার ভাষাগুলোকে প্রগতি ও উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচনা করেন। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক ভাষাগুলোকেই তাঁরা বৈশ্বিক আধুনিকতার যুগে প্রবেশের সিংহদ্বার বলে বিশ্বাস করেন।
কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এ কথা নিশ্চয় অদ্ভুত শোনাবে যে ফরাসি সাহিত্য কেবল জাপানি ভাষাতেই রচনা করা যেতে পারে, কিংবা ইংরেজি সাহিত্য জুলু ভাষায়—এমনি অদ্ভুত যেকোনো ফরাসি লেখকের সঙ্গে দেখা হলে আপনি তাঁর দিকে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘পৃথিবীতে এত ভাষা থাকতে আপনি ফরাসি ভাষায় কেন লিখছেন?’ কিংবা একজন ইংরেজ লেখককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি জুলু ভাষায় লিখছেন না কেন?’ ইতিহাসের পরিহাস এই আফ্রিকার কিংবা অপর যেকোনো উপনিবেশ–উত্তর দেশের লেখকদের ক্ষেত্রে, এখনো, এহেন অযৌক্তিক, অদ্ভুত আর অবাস্তব প্রত্যাশা জারি রয়েছে।
এমন অদ্ভুত ও অবাস্তব পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো কী করে? ব্যাপারটা তো মোটেও এমন নয় যে ঔপনিবেশিক ভাষাগুলো অন্যান্য ভাষার অধিক কোনো ভাষা। যেকোনো পরিস্থিতিতে একাধিক ভাষাজ্ঞান যেকোনো ব্যক্তিকেই বিশেষভাবে ক্ষমতায়িত করে থাকে। কিন্তু উপনিবেশের ক্ষেত্রে কিংবা অনুরূপ অন্য কোনো পরিস্থিতিতে, যেখানে একটি আধিপত্যশীল ও আধিপত্যের শিকার দুটি শ্রেণি বিদ্যমান ছিল, ব্যাপারটা মোটেই এমন ইতিবাচক কিছু ছিল না। অর্থাৎ বিষয়টি কোনো উপনিবেশিত সমাজে বিদ্যমান কোনো ভাষার সঙ্গে মোটেই আরেকটি নতুন ভাষা যোগ করার মতো নিরীহ ব্যাপারমাত্র ছিল না। কেননা কোনো বিজিত সমাজে একটি নতুন ভাষা প্রবর্তন করাই বিজয়ী ঔপনিবেশিক শক্তির জন্য যথেষ্ট ছিল না, বরং নিজের ভাষাটিকে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর ভাষার কবরের ওপর চাষ করেই কেবল তাকে ক্ষান্ত হতে হতো। আফ্রিকার ভাষাগুলোর মৃত্যুই সে অঞ্চলে ইউরোপীয় ভাষাগুলোকে জীবন দিয়েছে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ভাষাগুলো প্রাণবন্ত হয়ে ওঠার জন্য উপনিবেশগুলোর নিজস্ব ভাষাগুলোকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। আফ্রিকার ভাষাগুলোর বিস্মৃতিই ইউরোপীয় ভাষাগুলোর জাগৃতি নিশ্চিত করেছে।
ভাষার এই দুটি অবস্থা—বিস্মৃতি ও জাগৃতি—মোটেই সংশ্লিষ্ট ভাষাগুলোর অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে জড়িত নয়, বরং উপনিবেশিত অঞ্চলে ঔপনিবেশিক শক্তির ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সমাজের ভেতর সচেতনভাবে একটি মনোভঙ্গি তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত।
------২------
আফ্রিকার শিশুরা তাদের স্কুলে নিজেদের মধ্যে মাতৃভাষায় কথা বলে ধরা পড়ে গেলে কী ধরনের দৈহিক শাস্তির শিকার হতো, তা আমি আমার ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড গ্রন্থে আলোচনা করেছি। এ রকম ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শিশুটিকে তার ‘নির্বুদ্ধিতার’ পরিচয়জ্ঞাপক একটি প্ল্যাকার্ড গলায় ঝুলিয়ে রাখতে বাধ্য করা হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘অপরাধী’ শিশুটিকে নোংরা আবর্জনা গিলতেও বাধ্য করা হতো। এভাবে আফ্রিকার ভাষাচর্চাকে একটি অপরাধমূলক, বেদনাদায়ক, এমনকি নোংরামির সঙ্গে তুল্য তত্পরতা হিসেবে হাজির করা হতো। এ ধরনের কর্মকাল শুধু আফ্রিকা মহাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
ডোভার স্যামুয়েলস নামের একজন মাওরি রাজনীতিক ওয়েটাঙ্গি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ৵ দিতে গিয়ে, ২০১৫ সালে, নিউজিল্যান্ডের এক স্কুলে মাওরি ভাষায় কথা বলে ধরা পড়ে যাওয়ার পর যা ঘটত, তার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীটিকে টেনেহিঁচড়ে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত সবার সামনে নিয়ে আসা হতো...এবং তাকে শরীর বাঁকিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে দাঁড়াতে বলা হতো। তারপর, (শিক্ষক মহাশয়) তার পেছনে দাঁড়িয়ে জুতাসুদ্ধ পায়ে আধা ডজন লাথি মারত। ... এ রকম অবস্থায় আমার ঊরুর পেছন দিকটায় শুধু কালশিটেই পড়ে যেত না, অনেক সময় সেখান থেকে রক্তও বেরিয়ে আসত।’
ওদিকে নরওয়ের সামি জনগোষ্ঠী ১৮৭০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত সময়টি—যে সময়কে সামিরা একটি ‘নৃশংস শতাব্দী’ হিসেবে মনে রেখেছে—এক অভিন্ন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছে। নরওয়ের শাসকশ্রেণি সামি জনগোষ্ঠীকে স্বতঃস্ফূর্ত নরওয়েজিয়ান ভাষাভাষীতে পরিণত করার জন্য অভিন্ন ঔপনিবেশিক নির্মমতার চর্চা করেছে।
আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের জনগণের ভেতর, তাঁদের আপন আপন ভাষার বিপরীতে ইংরেজির চর্চা বিস্তারের জন্য ইংরেজরাও বরাবর এই অভিন্ন সহিংসতা চর্চার পথ অবলম্বন করেছে। ওয়েলসের স্কুল প্রাঙ্গণে যে শিক্ষার্থীরা ওয়েলশ ভাষায় কথা বলত, তাদের গলায় ‘ওয়েলশ নয়’ লেখা প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো।
ভাষা, সংস্কৃতি ও চিন্তার ভেতর এই ‘মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন’ সৃষ্টিতে বা অন্য কথায়, মননের উপনিবেশায়নে সহিংসতাই নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। কারোর মনে হতে পারে যে ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতালাভের পর উদ্ভূত নতুন রাষ্ট্রগুলো, নিদেনপক্ষে, পুরোনো জমানার অসম ক্ষমতা–সম্পর্কগুলোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে। কিন্তু উপনিবেশিত মনন এ রকম প্রত্যাশিত পদক্ষেপের প্রতিবন্ধক হিসেবে হাজির থাকে। কেননা বাস্তব জগৎকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে নিজেকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতাটি উপনিবেশিত জনগণের ভেতর ইতিপূর্বেই আত্তীকৃত হয়ে যায়।
এটা হচ্ছে কন্ডিশনিং বা বশীকরণের একটি চিরায়ত উদাহরণ, যা হামেশাই আচরণগত মনোবিজ্ঞানের নির্দেশিকায় পাওয়া যায়। বশীকরণ হলো পুরস্কার প্রদান ও শাস্তি বিধানের একটি পদ্ধতি—অবাঞ্ছিত আচরণের জন্য শাস্তি ও বাঞ্ছিত আচরণের জন্য পুরস্কার। শিশুপালনে কিংবা পশুকে বশীভূত করার জন্য প্রায়ই নানা মাত্রায় এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। বাঞ্ছিত আচরণের সঙ্গে ‘পুরস্কার’ প্রত্যয়টি জড়িত থাকার কারণে ‘আনন্দ’ যেমন, অবাঞ্ছিত আচরণের সঙ্গে ‘শাস্তি’র প্রসঙ্গ জড়িত থাকায় ‘বেদনা’ও তেমনি এই প্রক্রিয়ার এক অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে জারি থাকে। বশীকরণ প্রক্রিয়ার অধীনে স্বভাবতই সংশ্লিষ্ট শিশু কিংবা অন্য কোনো প্রাণী বেদনাদীর্ণ পরিসরে প্রবেশ না করার জন্য নিষিদ্ধ আচরণ চর্চা এড়িয়ে চলে এবং আনন্দময় পরিসরের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য সিদ্ধ আচরণ চর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়। শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে দখলদার ঔপনিবেশিক শক্তির ভাষা ভালোভাবে আত্মস্থ করার জন্য কোনো শিক্ষার্থী মহিমান্বিত হয়, কিন্তু অপর নিন্দিত শিক্ষার্থীটি তার মাতৃভাষার এমনকি একটি শব্দ উচ্চারণ করতেই বিপদাপন্ন হয়ে পড়ে। স্পষ্টতই মাতৃভাষাচর্চার পরিসরটি শিক্ষার্থীর জন্য তখন বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে, ফলে সে তা এড়িয়ে চলে। অন্যদিকে দখলদার ভাষার পরিসরটি তার জন্য আনন্দদায়ক হিসেবে প্রতিভাত হয়, ফলে ওই ভাষাচর্চাই তার অন্বিষ্ট হয়ে ওঠে।
এই বশীকরণ প্রক্রিয়ার পরিণতি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভেতর একধরনের ‘পাভলভীয় চেতনা’র বিকাশ ঘটে। ফলে ‘পুরস্কার’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়ামাত্রই আনন্দের আতিশয্যে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, আর ‘শাস্তি’ শব্দের সঙ্গে সঙ্গে বেদনাবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। এভাবে বশীকৃত কোনো জনগোষ্ঠীর প্রথম প্রজন্মের এই আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের ভেতর কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছাড়াই একটি স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে সঞ্চারিত হতে পারে—তারা হয়তো বুঝতেই পারবে না, কেন স্বদেশি ভাষা ও সংস্কৃতি তার জন্য আতঙ্কজনক, আর কেনই–বা বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতি তার জন্য আনন্দদায়ক হিসেবে প্রতিভাত হয়। ভাষার ক্ষেত্রে উপনিবেশ–উত্তর সমাজের এলিট সম্প্রদায় ও শিক্ষাবিদেরা ধরেই নেয় যে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক ভাষাগুলো অন্তর্গতভাবেই বৈশ্বিক চরিত্রমণ্ডিত, আর বুদ্ধিবৃত্তি ও সর্বজনীনতা ধারণ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উপযোগী। এ রকম প্রচলিত অনুমান থেকেই বোঝা যায়, কেন আফ্রিকার ভাষাগুলোর দুষ্কৃতায়ন এখনো অব্যাহত রয়েছে। আফ্রিকার শিক্ষাবিদেরা তাঁদের এই আত্মঘাতী কর্মকাল সম্পর্কে নিজেরাই এখনো সচেতন নন। আফ্রিকারই কোনো সরকারের নির্দেশে আফ্রিকারই কেউ আফ্রিকান ভাষাভাষী কোনো আফ্রিকানকে এখনো শাস্তি দিয়ে চলেছে।
ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থা সৃষ্ট প্রাথমিক আতঙ্ক এভাবে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়। পূর্ববর্তী প্রজন্ম থেকে এই আতঙ্ক পরবর্তী প্রজন্ম উত্তরাধিকার হিসেবে লাভ করে। এভাবে অস্বাভাবিকতাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তারপর শিক্ষার বাঞ্ছিত লক্ষ৵ হিসেবে এই স্বাভাবিক অস্বাভাবিকতার জাতীয়করণ ঘটে।
মননের উপনিবেশায়ন শিক্ষার জাতিগত ক্ষমতায়নপ্রয়াসী অর্থবহ সৃষ্টিশীলতা বিকাশের পথ রোধ করে দেয়। কোনো উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর ওই জনগোষ্ঠীর ওপর ঔপনিবেশিক শক্তির নিয়ন্ত্রণপ্রক্রিয়া নিহিত থাকে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা মানুষের জ্ঞানেন্দ্রিক প্রক্রিয়াকে, এমনকি জ্ঞানকেও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে দিতে পারে।
এবার আলোচনার এই পর্যায়ে, আমাদের শিক্ষা ও জ্ঞানের মধ্যকার পার্থক্য নিরূপণ করা প্রয়োজন। আমাদের ইতিমধ্যেই ‘জ্ঞাত’ কিছুর সঙ্গে, নানা মানবীয় তত্পরতার পারস্পরিক প্রভাব ও প্রদীপ্তির দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে নতুন কিছু নিরন্তর যুক্ত করে চলার ব্যাপারটিই হলো জ্ঞান। আমাদের স্বাভাবিক জ্ঞানেন্দ্রিক প্রক্রিয়া ‘জ্ঞাত’ পরিসর থেকে যাত্রা শুরু করে ‘অজ্ঞাত’ পরিসরের দিকে অগ্রসর হয়।
প্রতিটি নতুন পদক্ষেপই কিছু ‘অজানা’কে আমাদের জানিয়ে দেয়, অর্থাৎ আমাদের ইতিমধ্যে ‘জ্ঞাত’র সঙ্গে নতুন কিছু যোগ করে। এভাবেই দ্বান্দ্বিকভাবে যুক্ত পরম্পরার এক নিরন্তর অভিযাত্রায় নতুনভাবে ‘জ্ঞাত’ কিছু আমাদের ইতিপূর্বে ‘পরিজ্ঞাত’ বিষয়কে সমৃদ্ধ করে চলে। প্রত্যেকের স্থানিক অবস্থান থেকেই জগৎ সম্পর্কে তার জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়া শুরু হয়।
অন্যদিকে শিক্ষা হলো কোনো বিদ্যমান সমাজে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য, সে সমাজে কর্মক্ষম থাকার জন্য মানুষকে প্রস্তুত করার একটি পদ্ধতি। শিক্ষার সঙ্গে ‘জ্ঞান’ বিতরণের ব্যাপারটি জড়িত থাকতে পারে, কিন্তু তা হলো শিক্ষকের বিশ্ব-দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সীমাবদ্ধ জ্ঞান। একটি সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা রূপায়ণের ক্ষেত্রে, আধিপত্য ও অধীনতার, কিংবা প্রভু ও ভৃত্যের সম্পর্কে আবদ্ধ উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াটি সতর্কভাবে পরীক্ষা করাটা গুরুত্বপূর্ণ। ঔপনিবেশিক শিক্ষা কখনোই সুষম কিংবা অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না—নেতিবাচকতা থেকে পাথেয় সংগ্রহ করাই ছিল তার বৈশিষ্ট্য।
ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া, বরাবরই, স্বাভাবিক জ্ঞানেন্দ্রিক প্রক্রিয়াকে নাকচ করে অগ্রসর হয়েছে। উপনিবেশিত দেশগুলোতে বরাবর ইউরোপই—ইউরোপীয় নাম, তার ভূগোল, তার ইতিহাস ও তার জ্ঞান—ঔপনিবেশিক শিক্ষার যাত্রাবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। শিক্ষার উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াটি বরাবরই উপনিবেশিত পরিসরে বিরাজমান জ্ঞানকে নাকচ করার মাধ্যমে শুরু হয়েছে। আবার ভাষার ক্ষেত্রে, জ্ঞানের উত্স হিসেবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও শৈল্পিক অনুসন্ধানের বাহন হিসেবে শুরুতেই স্থানীয় ভাষাগুলোর উপযোগিতাকে অস্বীকার করে উপনিবেশয়ান প্রক্রিয়া অগ্রসর হয়েছে। এভাবে আপন ভিত্তিভূমি থেকে মূলোত্পাটনের কারণে আপন পরিমণ্ডলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, আমাদের বিভিন্ন সামর্থ্য, এমনকি আমাদের নানা অর্জন সম্পর্কেও একধরনের স্থায়ী অনিশ্চয়তাবোধ সৃষ্টি করেছে।
এ অবস্থায় যেকোনো সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য বিউপনিবেশায়ন একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার বিকল্প নেই। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা, যা চার শ বছর ধরে পৃথিবীকে বর্তমানের রূপ দিয়েছে, তা পুরোনো ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশিত—উভয় প্রকার সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়াটি যা কিছু নাকচ করে অগ্রসর হয়েছিল, সেই সবকিছুকে নাকচ করেই কেবল বিউপনিবেশায়ন সংঘটিত হতে পারে। আমাদের স্থানিক বিন্দুতেই, অর্থাৎ আমরা যেখানে আছি, ঠিক সেখানেই আমাদের জ্ঞানের অভিজ্ঞতা শুরু হয়। আমাদের সব ভাষাই জ্ঞানের উত্স হিসেবে কার্যকর। আমরা সবাই নক্ষত্র ভালোবাসি, কিন্তু তাদের দেখার জন্য শারীরিক বা রূপকভাবে আমাদের ইউরোপে অভিপ্রয়াণের প্রয়োজন নেই।
পৃথিবীতে কিংবা যেকোনো দেশে অনেক ভাষা ও সংস্কৃতির, এমনকি অনেক ধর্মের, উপস্থিতি একটি সমস্যাজনক ব্যাপার—এই প্রচলিত অভিজ্ঞানকে আমাদের প্রত্যাখ্যান করতে হবে। মূল সমস্যা আসলে এগুলোর ভেতর বিদ্যমান ‘মর্যাদার স্তরানুক্রমতান্ত্রিক সম্পর্কের’ মধ্যে নিহিত। আমার ভাষা তোমার ভাষার চেয়ে উচ্চতর মর্যাদাসম্পন্ন, আমার সংস্কৃতি তোমার সংস্কৃতির চেয়ে উন্নততর, আমার ভাষা বৈশ্বিক গুণসম্পন্ন আর তোমার ভাষা নিতান্তই আঞ্চলিক, আর আমার ভাষা জানতে হলে তোমার ভাষা পরিত্যাগ করতে হবে—এমন সব ধারণাই সমস্যাজনক। আমার ঈশ্বর তোমার ঈশ্বরের চেয়ে বেশি ঐশ্বরিক—এই ধারণা নিজেই খুব অনৈশ্বরিক। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে অন্যের ভাষার চেয়ে নিজের ভাষার সহজাত উত্কৃষ্টতায় বিশ্বাস করতে প্রণোদিত করে—যা আবার, জ্ঞান ও ক্ষমতার মানদণ্ড, অন্যের তুলনায় নিজের উচ্চতর মর্যাদা দাবি করতে ইন্ধন জোগায়। এই প্রপঞ্চকেই আমি বলি—ভাষিক সামন্ততন্ত্র।
এই ভাষিক সামন্ততন্ত্র থেকে মুক্ত হলে সব ভাষা, ছোট কিংবা বড়, গোটা মানবসমাজের কল্যাণে অবদান রাখতে পারে। সব ভাষাই ইতিহাস, সৌন্দর্য ও সম্ভাবনার অমূল্য ভান্ডার—এই সত্যনিষ্ঠ প্রত্যয়ের ভিত্তিতেই যাবতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা উচিত। ভাষাগুলোর ভেতর পারস্পরিক আদান-প্রদানমূলক আন্তসম্পর্ক জারি থাকলে প্রত্যেকেরই প্রত্যেককে কিছু দেওয়ার থাকে। এমনকি কোনো একটি ভাষা যদি অন্য ভাষাভাষী মানুষের ভেতর যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও আবির্ভূত হয়, সে ক্ষেত্রেও তা ওই নির্দিষ্ট ভাষাটির জাতীয়তা বা বৈশ্বিকতার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যের গুণেই সংঘটিত হয়েছে—এমন কোনো অনুমিত ধারণার ভিত্তিতে গ্রাহ্য হওয়া উচিত নয়, বরং তা প্রয়োজন ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে ঘটেছে বলেই বিবেচনা করা সংগত। সর্বোপরি ওই নির্দিষ্ট ভাষাটির বিকাশের জন্য অপরাপর ভাষাকে কবরস্থ করা উচিত নয়।
সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য একটি নতুন রণধ্বনি প্রয়োজন—মর্যাদার স্তরানুক্রমতন্ত্র নয়, আন্তসম্পর্ক নির্মাণ। আমাদের বোঝা প্রয়োজন যে ছোট-বড় সব ভাষারই একটি সাধারণ ভাষা আছে—অনুবাদ।
শিক্ষার তরফে কখনোই মানুষের ভাষিক ও সাংস্কৃতিক স্ববিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত নয়। আমি জগতের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই, কিন্তু তার জন্য আমার নিজের ভিত্তিভূমিকে নাকচ করতে হবে না। আমার স্থানিক অবস্থান থেকেই আমি জগতের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই। আমি মনে করি, শিক্ষার লক্ষ৵ হলো সেই জ্ঞান, যা মানুষকে তার আপন অবস্থানে রেখেই ক্ষমতায়ন করে—যা জগতের সঙ্গে আমাদের প্রকৃত যোগাযোগকে উন্মোচিত করে। আপন ভিত্তিভূমিতে অবস্থান করেই আমরা গোটা জগতের অন্বেষণ করি—সেই জগৎ থেকে এমন কিছু খুঁজে আনি, যা আমাদের ভিত্তিভূমিকে সমৃদ্ধ করে। জ্ঞানের বিন্যাস ও বিন্যস্ত জ্ঞানকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুষম শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর সঞ্চারিত করার জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবায়নই এখন পৃথিবীর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আমাদের যে ধারণাগুলো প্রত্যাখ্যান করতে হবে, তা হলো:
ঐশ্বর্য তো ঐশ্বর্যই নয়, যদি না তা পূতিগন্ধময় আবর্জনা থেকে স্ফুরিত হয়।
প্রাসাদ তো প্রাসাদই নয়, যদি না তা কারাগারের ওপর নির্মিত হয়।
কোটি টাকা অর্থহীন, যদি না লাখো গরিবের পকেট কেটে তা পুঞ্জীভূত হয়।
আমার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যদের তো বিলীন হতে হবে।
শিক্ষাকে এমন জ্ঞান সঞ্চারিত করতে হবে, যা আমাদের আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রাসাদের স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য জোগায়—আমাদের একে অন্যের সত্তাকে বিকশিত করতে উদ্বুদ্ধ করে।
(শেষ)
![]() |
| গ্রাফিকস: প্রথম আলো |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1996)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...









