Saturday, March 30, 2019

কুমিল্লা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন: প্রস্তুত প্রশাসন, ‘রাতে ভোট’ চান না কেউ

কাল রোববার সকাল থেকে কুমিল্লার সাতটি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট নেওয়া শুরু হবে। ভোটের দিনের পরিবেশ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও শঙ্কা বিরাজ করছে। তবে সুষ্ঠুভাবে ভোট নেওয়ার জন্য সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
বিএনপি এবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জন করছে। এ কারণে এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের মধ্যে হবে মূল লড়াই। দলীয় প্রার্থীদের বিপরীতে রয়েছেন একই দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা। তাঁরা বলছেন, সুষ্ঠু ভোট হলে তাঁরাই জয়ী হবেন। আর দলীয় প্রার্থীদের আশা, উন্নয়নের অগ্রযাত্রা বেগবান করতে মানুষ নৌকা প্রতীকেই ভোট দেবেন।
আগের রাতে ব্যালট বাক্স যাতে না ভরা হয়, সে নিরাপত্তা চান আওয়ামী লীগের দলীয় ও বিদ্রোহী উভয় প্রার্থীরাই। ভোটের দিন স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকবে—এমন আশাও তাঁদের।
তিতাসে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পারভেজ হোসেন সরকার বলেন, বহিরাগত সন্ত্রাসী, আগের রাতে ভোট কাটাকাটি ঠেকানো ও ভোটকেন্দ্রে ভোটারের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা (বুড়িচং, হোমনা, চান্দিনা ও মুরাদনগর উপজেলা) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টরা সকালে গিয়ে ব্যালট পেপার ও বাক্স যাচাই করতে পারবেন। রাতের বেলায় ভোট হলে নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হবে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, কাল বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, মুরাদনগর, চান্দিনা, তিতাস, হোমনা ও মেঘনা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোট নেওয়া হবে। এ সাতটি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ২৪ জন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২৯ জন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ২২ জনসহ ৭৫ জন প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। এতে ৪৮৭ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ৩ হাজার ২১৫ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও ৬ হাজার ৪৩০ জন পোলিং কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, অস্ত্রধারী আনসার, নির্বাহী ও বিচারিক হাকিম রয়েছেন।
সাতটি উপজেলায় ৪৮৭টি ভোটকেন্দ্রে ভোটার ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৪ জন। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ৭ লাখ ৩৪৪ জন ও নারী ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৩৮০ জন। ৪৮৭টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রার্থীরা।
বুড়িচং উপজেলা পরিষদে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী আবুল হাসেম খান বলেন, ‘ভারেল্লা উত্তর, ভারেল্লা দক্ষিণ, ময়নামতি ও মোকাম ইউনিয়নে প্রশাসনের নজরদারি বাড়াতে হবে। ব্যালট পেপার ও বাক্স ভোটের আগের রাত থেকেই হেফাজতে রাখতে হবে।’
ওই সাত উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ভোট নেওয়া হবে। এর মধ্যে মেঘনা উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ৫ জনসহ মোট প্রার্থী ১৫ জন, মুরাদনগরে চেয়ারম্যান পদে ৪ জনসহ ১৪ জন, বুড়িচংয়ে চেয়ারম্যান পদে ৩ জনসহ ১২ জন, তিতাসে চেয়ারম্যান পদে ২ জনসহ ১০ জন ও হোমনায় চেয়ারম্যান পদে ৬ জনসহ ১০ জন, ব্রাহ্মণপাড়ায় চেয়ারম্যান পদে ২ জনসহ ৮ জন ও চান্দিনায় চেয়ারম্যান পদে ২ জনসহ ৬ জন প্রার্থী রয়েছেন।
মেঘনায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী আবদুস সালাম ও মো. তাজুল ইসলাম বলেন, তাঁরা নির্বাচনে প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব চান না। প্রভাবমুক্ত নির্বাচন চান না। ভোটাররা যাঁকে ভোট দেবেন তিনি জয়ী হলে অসুবিধা নেই।
ব্রাহ্মণপাড়ার বিদ্রোহী প্রার্থী মুহাম্মদ আবু তাহের বলেন, নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে নিয়ে মিছিল–মিটিংয়ে থাকা মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী কলেজের তিন প্রভাষককে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা পদে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সরাতে হবে। সিল দিয়ে জাল ভোট মেরে একতরফা নির্বাচন ঠেকাতে হবে।
চান্দিনায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি ও তাঁদের সন্তানদের অযাচিত প্রভাব ভোটের দিন দেখতে চাই না।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও রিটার্নিং কর্মকর্তা (তিতাস, মেঘনা ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা) কাইজার মোহাম্মদ ফারাবী গতকাল বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘জনগণের তথা ভোটারদের সন্তুষ্টি ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা ভোটকেন্দ্রে সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। মানুষ শান্তিতে ভোট দিতে পারবেন। গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে প্রশাসনের বাড়তি নজরদারি রয়েছে।’

মানবপাচার চক্র: ভানুয়াতুতে ১০১ বাংলাদেশির দুর্বিষহ জীবন by দীন ইসলাম

প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতু গিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন ১০১ জন বাংলাদেশি। এদের মধ্যে ১৮ বছরের কম দুইজন রয়েছেন। বাংলাদেশিরা পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছেন না। পাশাপাশি পাচ্ছেন না ভালো চিকিৎসা সেবা। এজন্য জীবন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন তারা। দেশে কবে ফিরতে পারবেন এটাও জানেন না। মূলত ভালো বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ওই দেশটিতে কাজের আশায় নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। কাজ দূরে থাক, এখন ওই বাংলাদেশিদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে ভানুয়াতু সরকার।
বিষয়টি সম্পর্কে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ জেনেছে।
এ বিষয়ে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশটিতে আটক বাংলাদেশি হারুন অর রশীদ এর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, অস্ট্রেলিয়ায় চাকরি দেয়ার নামে দালালরা ১৫-২০ লাখ টাকা করে নেয়। এরপর ভারত, সিঙ্গাপুর ও ফিজি হয়ে দ্বীপরাষ্ট্রটিতে নিয়ে আটকে রেখে পালিয়ে গেছে দালালরা। গত দুই বছরে এরকম ১০১ জন অভিবাসী প্রত্যাশী অস্ট্রেলিয়ার নিকটবর্তী দ্বীপরাষ্ট্র ভানুয়াতুতে আটকা পড়েছেন। আপাতত তাদের পোর্ট ভিলার তিনটি বাড়িতে রাখা হয়েছে। ভানুয়াতু সরকার তাদের খাবারের ব্যবস্থা করছেন।
জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা আইওএমের হয়ে ভানুয়াতু হিউম্যান রাইটস কোয়ালিশন নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এই বাংলাদেশিদের সহায়তা দিচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি, ভানুয়াতু ও অস্ট্রেলিয়াতে ভালো চাকরি দেবার নামে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন ভানুয়াতুতে আটক আছেন তারা। হারুন অর রশিদ নামে আটকা পড়া একজন বাংলাদেশি মুঠোফোনে মানবজমিনকে বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা হবে এই আশ্বাসে আমি আত্মীয়স্বজন এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ভানুয়াতু আসি। এখন দেশে ফিরে যেতে হলে সেই ঋণ শোধ করার কোনো উপায় নেই। আমরা যদি এখানে থাকার সুযোগ পাই, কোনো কাজ আমরা পাব না। আবার দেশে ফিরে গেলে কী হবে, সেটাও ভাবতে পারছি না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভানুয়াতুতে শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া চার বাংলাদেশি মানবপাচারকারীকে আটক করেছে ভানুয়াতু কর্তৃপক্ষ? আটককৃতদের আদালতে হাজির করার প্রক্রিয়া চলছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ১০১ জনের তথ্য চেয়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)- এর মাধ্যমে ভানুয়াতু সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এখনও পর্যন্ত সরকার ১০১ জন সম্পর্কে কোনো তথ্য পায়নি। আইওএম সূত্রে জানা গেছে, আটকে থাকা বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দেশটির আদালতের নির্দেশের অপেক্ষায় আছে ভানুয়াতু সরকার। আদালতের সিদ্ধান্তের আগ পর্যন্ত ওই ১০১ বাংলাদেশিকে ভানুয়াতু সরকারের দেয়া খাবার আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা সঙ্গে নিয়ে সেখানেই দিন কাটাতে হবে। কারণ ওই মানবপাচার মামলায় তাদের সবাইকে সাক্ষী করা হয়েছে। সেখানে তাদের কাজের সুযোগও দেয়া হচ্ছে না। মানবপাচারের মামলা আগামী মাসে ভানুয়াতুর আদালতে উঠবে। আদালতের নির্দেশনা পেলেই বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করবেন তারা। পাচারকৃতদের সূত্রে জানা গেছে, তারা টাঙ্গাইল ও বরিশাল অঞ্চলের একটি পাচারচক্রের দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন? এ চক্রটি চাকরি দেবার নাম করে তাদের ভারত, সিঙ্গাপুর ও ফিজি হয়ে ভানুয়াতুতে নিয়ে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১০১ জন বাংলাদেশিকে পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে চার বাংলাদেশিকে ২০১৮ সালের নভেম্বরে গ্রেপ্তার করেছে ভানুয়াতু সরকার। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে দুই জন ভানুয়াতুতে মিস্টার প্রাইস নামে একটি গৃহস্থালী ও আসবাবপত্রের কোম্পানি চালাতেন। এদিকে, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে জানানো হয়, ভানুয়াতুতে তাদের কোনো প্রতিনিধি নেই? তবে গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার মাধ্যমে তারা আটকে থাকা এ বাংলাদেশিদের বিষয়ে জানতে পেরেছেন বলে দূতাবাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। অফিসিয়ালি কাজ শুরু হলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশের দূতাবাস।

ঢাকার রাস্তায় ছোট্ট সুপারম্যান -আনন্দবাজারের প্রতিবেদন

পরনে নীল পোশাক, গলায় বাঁধা লাল স্কার্ফ উড়ছে পিছনে। যেন সুপারম্যান হাজির ঢাকার রাস্তায়। বনানীর জতুগৃহ এফ আর টাওয়ারে লাগা আগুনের লেলিহান শিখার সঙ্গে দমকলের কর্মীরা যখন লড়ছেন, জলের পাইপের লিক বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বসে ছিলেন সুপারম্যান।
বৃহস্পতিবার দুপুরে লাগা আগুন ২৫টি প্রাণ নিয়ে নিয়ন্ত্রণে এসেছে সন্ধ্যা পেরোতেই। দমকল, পুলিশ তো ছিলই, ছিলেন সেনা, নৌ এবং বিমান বাহিনীর সদস্যরাও। কিন্তু সাধারণ মানুষও যে পিছিয়ে ছিলেন না, সেই ছবি রাতেই ভাইরাল হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। ছোট্ট একটি ছেলে এক দলা প্লাস্টিক নিয়ে লিক বন্ধ করতে বসে রয়েছে দমকলের জলের পাইপের ওপরে। সেই ছবিই কার্টুনে ফিরে আসে, ছোট্ট ছেলেটি যেন সুপারম্যান!তবে ঢাকার সুপারম্যান যে নেহাতই ছোট্ট, বয়স বড়জোর ১০ কি ১১! ফেসবুকে প্রথম তার পরিচয় জানান বনানীতে দায়িত্বে থাকা পুলিশের সার্জেন্ট সোহেল রানা— ‘আরে এ যে নাইম!’ জানিয়েছেন, ছেলেটি থাকে কড়াইল বস্তিতে। মাঝে মাঝে এসে আলাপ জমায় পুলিশ বক্সে।
তার বাবা অন্য কোথাও বিয়ে করে সংসার করছে। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে। মামি খেতে দিলে খেতে পায়, না হলে জোটে না। এর মধ্যেও বস্তির আনন্দ স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে, কারণ বড় হয়ে সে পুলিশ হতে চায়। সার্জেন্ট লিখেছেন, ‘আমরা তাকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিই। আমার সঙ্গে থাকতে ভালবাসে সে। তার দুঃখের কথা বলে। ছোট্ট ছেলে, কিন্তু বড় সুন্দর কথা বলে নাইম।’
গত কাল দুপুরে ৩২ নম্বরের এফ আর টাওয়ারে আগুন ছড়িয়ে পড়তে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। নাইমও বসে থাকেনি। লম্বা পাইপ এঁকে বেঁকে যে জল নিয়ে আসছে, দমকলের কর্মীরা তা ছড়িয়ে আগুন নেভাতে চেষ্টা করছেন। তেমনই একটা পাইপে একটা ফুটো দেখতে পেয়ে প্রথমে হাতে করে চেপে ধরে নাইম। তাতেও জল বেরিয়ে আসছে দেখে শুয়ে পড়ে সেটা বুকে চেপে ধরে। সেই সময়ে কিছু প্লাস্টিক এনে দেয় কেউ। তা দিয়েই অদম্য জেদে লিক বন্ধ করে বসেছিল ছোট্ট ছেলেটি। টানা কয়েক ঘণ্টা।শুক্রবার সকাল হতেই খোঁজ পড়ে নাইমের। পুলিশ গিয়ে নিয়ে আসে তাকে। মুখে লাজুক হাসি নিয়ে বলে, ‘‘আমি মানুষের সাহায্য করেছি। মানুষের উপকার করার চেষ্টা করেছি।’’ যেন— এ আর কী! সে দিন অনেক মানুষই কিন্তু ঘটনাস্থলে ভিড় জমিয়েছিলেন মোবাইলে ছবি আর নিজস্বী তুলতে। সে ভিড় সরাতে হিমশিম খেয়েছে দমকল আর পুলিশ। তার ছবি যে ভাইরাল হয়েছে, নাইম কি জানে? ঘাড় নেড়ে সে বলে, ‘‘হ, আমি শুনসি। আমারে অনেকে কইসে!’’ লাজুক কণ্ঠেই নাইম পাশে দাঁড়ানো সার্জেন্ট রানাকে দেখিয়ে জানিয়েছে, ‘‘আমি বড় হয়ে এই স্যরের মতো হইতে চাই। পুলিশ হইতে চাই। পুলিশ হইলে মানুষের সাহায্য করা যাইব!’’
সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

ছবিতে গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটের আগুন

রাজধানীর গুলশান-১ এর ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারে লাগা আগুন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। দুই ঘন্টার চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় নৌ বাহিনীর সদস্যরা। মার্কেটের কাঁচাবাজারের পূর্ব পাশের অংশে শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আগুন লাগে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এখন পর্যন্ত হতাহতের কোনো খবর পাওয়া না গেলেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কোটি টাকার সম্পত্তি।
সকাল পৌনে ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর শাকিল নেওয়াজ সাংবাদিকদের জানান, এর আগে যখন এই মার্কেটে আগুন লাগে (২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি) তখন আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমানেও যেখানে আগুন লেগেছে, তার আশপাশে আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। পানির স্বল্পতার কারণে ধীরে ধীরে কাজ করতে হচ্ছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শাকিল নেওয়াজ আরও জানান, ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করে।
এরই মধ্যে সেনাবাহিনীর এক প্লাটুনের মতো সদস্যকে কাজ করতে দেখা গেছে ঘটনাস্থলে।
অগ্নিকাণ্ডের কথা শুনে সঙ্গে সকালেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। এদিকে ব্যবসায়ীদের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে।
পিয়াস সরকারের ছবিতে গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটের আগুন...














বৃষ্টির শেষ কথা... by মরিয়ম চম্পা ও পিয়াস সরকার

গত ২৬শে মার্চ বিবাহবার্ষিকীর দিনে বৃষ্টি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিল লাইফ ইজ বিউটিফুল। মাত্র একদিন মাঝে। ২৮শে মার্চ বৃষ্টির জীবনে এলো কালো অধ্যায়। বনানীর এফ আর টাওয়ারের ভয়াবহ আগুন বৃষ্টির সুন্দর জীবনকে থামিয়ে দিয়েছে। প্রেমিক স্বামী নূরকে দিয়ে গেছে একরাশ যন্ত্রণা। এই নূর আর বৃষ্টি দীর্ঘ ১২ বছর প্রেম-ভালোবাসায় আবদ্ধ ছিল। তারপর ২০১৬ সালে প্রেমের পরিসমাপ্তি ঘটায় বিয়ে করে। পুরো নাম শেখ জারিন তাসনিম বৃষ্টি।
বয়স মাত্র ২৫ বছর। আর তার প্রেমিক স্বামী কাজী সাদ নূর।
নূর ঢাকা রিজেন্সি হোটেলে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ম্যানেজার। এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের সময় দুপুরে নূরকে ফোন দিয়ে বৃষ্টি বলেন, ‘টাওয়ারে আগুন লেগেছে, আমি ওপরে যাচ্ছি’। এটাই যে তার চিরতরে ওপরে এবং ওপারে চলে যাওয়া সেটা বুঝতে পারেনি নূর। স্ত্রীর চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। শুধু অঝোরে কাঁদছেন।
বৃষ্টি ও নূরের ছোটবেলার বন্ধু জাহিদ বলেন, বৃষ্টির পরিচয় বন্ধুর বউয়ের থেকে আগে হচ্ছে আমাদের ছোট বোন। এরপর হচ্ছে বন্ধুর বউ। আমরা তিনজন একই স্কুল-কলেজে পড়েছি। ২৬শে মার্চ বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে তাকে ফোন করে শুভেচ্ছা জানাই। এটাই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। ওদের দাম্পত্য কাপলটা আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের সবার মধ্যে একটি ঈর্ষণীয় ছিল। ওদের দেখে আমরা ঈর্ষা করতাম। টোটালি ইউনিক একটি কাপল ছিল তারা।
বৃষ্টি এতো পরিমাণে মিশুক ছিল যে একটুখানি কথা বলতো সে তার সঙ্গে দ্বিতীয়বার কথা বলতে এবং সম্পর্ক বজায় রাখতে বাধ্য। বৃষ্টি টাওয়ারের ১২ তলায় অবস্থিত ইউআর সার্ভিস বাংলাদেশ লিমিটেড-এ এইচআর এবং অ্যাডমিন অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিল। সে এতোটাই উৎসবপ্রিয় ছিল যে প্রত্যেকটি পালাপার্বণে তার বিশেষ প্ল্যান ও পরিকল্পনা থাকতো। সামনে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ইতিমধ্যে তার অনেক পরিকল্পনা ছিল। চাকরির পাশাপাশি বৃষ্টির একটি অনলাইন শপিং বিজনেস ছিল। সেখানে এক্সক্লুসিভ কিছু জিনিসপত্র যা সে নিজেই তৈরি করতো।
চাচাতো ভাই শেখ জিসান ইসলাম বলেন, দুই বোনের মধ্যে বৃষ্টি ছোট। বাবা শেখ মোজাহিদুল ইসলাম একজন ব্যবসায়ী। মা নীনা ইসলাম গৃহিণী। গ্রামের বাড়ি যশোর বেজপাড়া। ঢাকায় স্বামীর সঙ্গে খিলক্ষেত বটতলা ৮৪/১-এর বাসায় থাকতো। উত্তরা ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ এবং ইউআইইউ থেকে বিবিএ সম্পন্ন করে। জিসানের সঙ্গে সর্বশেষ ২৬ তারিখ কথা হয় বৃষ্টির। বিবাহবার্ষিকীতে বোনকে ফোন দিয়ে জিসান উইস করে বলে খাওয়াবি কবে। এটাই ছিল তার শেষ কথা।
তার স্বামী কাজী সাদ নুর। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে লাশ বুঝে নেন স্বজনরা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন চাচা শেখ জাহিদুল ইসলাম, দুলাভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন ও বোন শেখ শাহনেওয়াজ ফেরদৌস। সকাল ৭টায় লাশ বুঝে নেবার পর নিয়ে যাওয়া হয় যশোরে। গতকালই যশোরে তার জানাজা সম্পন্ন হয় বিকাল ৫টার দিকে। আর দাফন সম্পন্ন হয় পরপরই।
তার চাচা শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, খুব হাসি খুশি মেয়ে ছিল। ছিল অনেক ভালো। সবাইকে আপন করে রাখতো। কখনো তার মুখে দুঃখের ছাপ দেখিনি। তার চাচা আরো বলেন, বৃষ্টির শরীরে কোনো পোড়া ছিল না। মূলত অক্সিজেনের অভাবেই ঢলে পড়েছেন মৃত্যুর কোলে। আমাদের লাশ শনাক্ত করতে কোনো সমস্যা হয়নি।
বৃষ্টির পরিচিত সানজিদা আক্তার বলেন, খুব মজার মানুষ ছিল বৃষ্টি। তার সঙ্গে যখনই দেখা হতো- হাসি থাকতোই মুখে। আর খোঁজ খবর নিতেন নিয়মিত। রূপ সচেতন ছিলেন খুব। সব সময় পরিপাটি হয়ে থাকার চেষ্টা করতেন।
বৃষ্টির এই অকাল মৃত্যুতে পরিবারের ওপর নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বাবা যেন কাঁদতে ভুলে গেছেন। আর মায়ের কান্নায় ভারি হয়ে উঠছে চারপাশ। আদরের মেয়ে চলে গেলেন তাদের আগে এটা মেনে নেয়া অনেক কষ্টের। আর ভালোবাসার মানুষটিও হয়ে পড়েছেন নির্বিকার। তিনি বলেন, বৃষ্টির সঙ্গে শেষ কথা হয়, সে তখন বলছিল আগুন আর ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। আমি তাকে বলি, দৌড়ে উপরের দিকে চলে যাও। ১৮ তলায় অবস্থানকালে সে জানায়, ধোঁয়ার কারণে আর যেতে পারছে না। এ সময় পাশ থেকে তার সহকর্মীরা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল যে, তারা পাশেই আছে।’ এটাই বৃষ্টির সঙ্গে শেষ কথা। এরপর অসহায়ের মতো ছুটে বেরিয়েছেন বনানীর এফ আর টাওয়ারের সামনে। কুর্মিটোলা হাসপাতালে ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অবশেষে দেখা পান প্রিয়ার। অক্ষত শরীরে। তবে শুধু শ্বাসটাই ছিল না।

আগুনে পুড়ে গেছে ডিএনসিসি মার্কেটের ২১২ দোকান

গুলমানের ডিএনসিসি মার্কেটের আগুনে পুড়েছে ২১২টি দোকান। আর ১৩০ জন মালিকের কয়েক কোটি টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। গুলশান থানার পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম (অপারেশন) এ তথ্য জানিয়েছেন মানবজমিনকে।
এর আগে আজ ভোর ৫টা ৪৮ মিনিটের দিকে সৃষ্ট এ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় মার্কেটের বেশিরভাগ দোকান। আগুনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তারা সকাল ৮টা ২৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কি কারণে এ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত তা জানা যায় নি।
২০১৭ সালের ৩রা জানুয়ারি এই মার্কেট অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
তখন কেউ মারা যান নি। তবে তিন শতাধিক দোকান পুড়ে সে সময়। মার্কেটের একাংশ ধসে পড়ে। তাতে কয়েক শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়। 
উল্লেখ্য, এর মাত্র দু’দিন আগে বনানিতে এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ২৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় একশত মানুষ।
নিঃস্ব হয়ে গেলাম, মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব না
আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ দোকান মালিক লিটন জানান, প্রায় কোটি টাকার মালামাল ছিল তার। এই মার্কেটে তার ছিল ৮ টি দোকান। যেসব দোকান ছিল মুদি দোকান। ছিল বেবি ফুড, তেল, চাল, ডাল, মশলা ইত্যাদি। তিনি বলেন, তার প্রায় কোটি টাকার মালামাল ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, নিঃস্ব, ফকির হয়ে গেলাম। আর মাথা তুলে দাড়াতে পারব না। ব্যাংকে লোন আছে আমার।
মার্কেটে প্লাস্টিক সামগ্রী ও কাপড়ের দোকান ছিল আমেনা বেগমের। তিনি গতকাল আড়াই লাখ টাকার পণ্য এনেছেন। আর আজ সকালেই আগুনে সব পুড়ে ছাই।
আজ বিক্রি করতে গতকাল রাতে ৬০ হাজার টাকার মাছ এনেছেন সজিব মিয়া। এই টাকার মধ্যে ৪০ হাজার টাকাই ধারে। এই মাছের সঙ্গে জ্বলে গেছে সজিব মিয়ার স্বপ্নও। শুধু সজিব মিয়া, আমেনা বেগম, লিটন নন এরকম অন্তত দেড়শো ব্যবসায়ীর দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে গুলশান ডিএনসিসি মার্কেটে। যাদের সকলেই প্রায় সর্বশান্ত। দিকবিদিক ছুটছেন তারা, কি করবেন এখন?

‘বন্দুকধারীকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি’

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে ঘটা ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ভাগ্যের জোরে বেঁচে যান ফরিদ আহমেদ। কিন্তু এ হামলায় নিহত হন তার স্ত্রীসহ অর্ধশত মানুষ। শুক্রবার ২০,০০০ মানুষের এক সমাবেশে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, আমি ওই বন্দুকধারীকে ক্ষমা করে দিয়েছি। আল-জাজিরা জানিয়েছে, দুই সপ্তাহ আগে ঘটা ভয়ংকর সেই সন্ত্রাসী হামলার জাতীয় স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয় ক্রাইস্টচার্চে। সেখানেই বক্তব্য রাখেন ওই হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ও ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা ফরিদ আহমেদ।
ফরিদ আহমেদ বলেন, আমি আমার স্ত্রীর হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিয়েছি কারণ আমি আগ্নেয়গিরির মত জ্বলতে থাকা একটি হৃদয় নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। আমি আমার হৃদয়কে ভালবাসা ও দয়ায় পূর্ন রাখতে চাই যাতে আমি সহজেই হত্যাকারীকে ক্ষমা করে দিতে পারি। আমি চাই না আমার ক্ষতির জন্য পৃথিবীর আর একটি প্রাণও হারিয়ে যাক।
সমাবেশে তিনি সকলকে একসঙ্গে শান্তির জন্য কাজ করে যাওয়ার আহবান জানান। ফরিদ আহমেদ নিউজিল্যান্ডের সব নাগরিকদের একটি পরিবারের অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, আমি হয়ত ভিন্ন এক সংস্কৃতি থেকে এসেছি, আপনিও অন্য এক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী, হয়ত আমার বিশ্বাস এক, আপনার বিশ্বাস আমার থেকে আলাদা কিন্তু আমরা একসঙ্গে বৈচিত্রময় একটি বাগানের মত।
হামলার পর নিউজিল্যান্ডজুরে নিহতদের স্মরণে বেশ কয়েকটি স্বরণসভা আয়োজন করা হয়েছে। তবে এটি ছিল সবথেকে বড়। এতে অংশ নিয়েছেন দেশটির শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনও এ স্মরনসভায় যোগ দিয়েছেন। এতে সঙ্গীত পরিবেশন করেন বিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পীরা। এর মধ্যে রয়েছেন শিল্পী ইউসুফ ইসলাম যিনি পিস ট্রেন নামে তার বিখ্যাত গানটি গান। হাজার হাজার মানুষ নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
স্মরণসভায় প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আরডেন একটি মাওরি আদিবাসীদের পোষাক পরে আসেন। তিনি বিশ্ববাসীর প্রতি সবধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এক হওয়ার আহবান জানান। আরডেন বলেন, সকল সহিংসতার একটি সহজ সমাধান রয়েছে। এটি কোনো সীমানা নয়, জাতিগোষ্ঠী বা শক্তি নয়, এমনকি কোনো সরকারও নয়। এর সমাধান নিহিত আছে মানবতার মধ্যে। সমাবেশস্থলটি কড়া নিরাপত্তায় ঘিরে রাখা হয়েছে। ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলার পর থেকে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীগুলো সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।

একমাত্র সন্তান পুড়ে অঙ্গার, আংটি দেখে চিনলেন বাবা by খায়রুল ইসলাম

তখনো মিথির লাশ এসে পৌঁছেনি তাঁর গ্রামের বাড়ি বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার পৌর শহরের বশিপুর গ্রামে। শুক্রবার সকাল থেকে মিথিদের বাড়িতে চলছে স্বজনদের আহাজারি আর বুকফাটা আর্তনাদ। বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন মিথির মা। বাবা মাসুদুর রহমান মেয়ের লাশ নিতে গিয়েছিলেন ঢাকায়। বেলা ১১টায় মিথির লাশ বহনকারী গাড়িটি বশিপুর গ্রামে এলে সেখানে শুরু হয় মাতম।
রাজধানীর বনানীতে এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আইনজীবী মাসুদুর রহমানের একমাত্র সন্তান তানজিলা মৌলি মিথি (২৪) আগুনে পুড়ে মারা গেছেন। মিথি রাজধানীর মিরপুরে একটি বাসায় স্বামীকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন। আগামী ২ এপ্রিল সান্তাহারে এসে বাবা-মায়ের বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করার কথা ছিল মিথির। কিন্তু সেই ইচ্ছাটা আর পূরণ হলো তাঁর। এফআর টাওয়ারে লাগা ভয়াবহ আগুন মিথির দেহকে অঙ্গার করে দিয়েছে। সঙ্গে পুড়িয়েছে তাঁর স্বপ্ন।
মিথির চাচা সালাউদ্দিন সরদার বলেন, ‘ঢাকায় একটি ট্যুরিজম কোম্পানিতে চাকরি করতেন মিথি। এভাবে মিথির চলে যাওয়াটা কেউ মেনে নিতে পারছেন না।’
আগুনে আটকা পড়ার পর মিথি তাঁর বাবা ও স্বামীকে মোবাইলে বলেছিলেন, ‘আমাদের অফিসে আগুন লেগেছে, আমি আগুনে আটকা পড়ে আছি। আমাকে বাঁচাও, আমি বাঁচতে চাই।’ মেয়েকে বাঁচাতে বাবা মাসুদুর রহমান দিশেহারা হয়ে বগুড়ার সান্তাহার থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ঢাকায় আসার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে তিনি দেখেন মেয়ের আগুনে পোড়া নিথর দেহ। ভোটার আইডি কার্ড ও হাতের আংটি দেখে মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন বাবা। প্রথমে ঢাকার মিরপুরে মিথির প্রথম জানানা অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার বাদ জুমা বগুড়ার সান্তাহারে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
মিথির বিয়ে হয় মাত্র আট মাস আগে। স্বামী রায়হানুল ইসলাম রিমন চাকরি করেন ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসে। মিথি নিজেও চাকরি করতেন ট্যুরিস্ট অ্যান্ড হেরিটেজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে। এফআর টাওয়ারের দশম তলায় ছিল মিথির অফিস। তানজিলা মৌলি মিথি চাকরির পাশাপাশি ঢাকায় বেসরকারি এশিয়ান ইউনিভার্সিটির বিবিএ ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।

তৃণমূলের ৪২ কত দূর? by অমর সাহা

ভারতের ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনেরই প্রার্থী। যেখানেই ঘাসফুল, সেখানেই তিনি। তাঁর অবস্থান এই জোড়া ফুল আর ঘাসফুল জুড়ে।
এবার ২০১৯ সালে এসে মমতা একটু ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু ৪২ আসন ছাড়ছেন না। ৪২ আসনই তাঁর চাই বলে স্লোগান দিচ্ছেন। মমতা চান, এবার তৃণমূলকে এই ৪২ আসনেই জয়ী হতে হবে। মমতা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গ মানে মমতার ঘাসফুল বা জোড়া ফুল। তাঁর দলের ৪২ আসনের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নেই। আপসও নেই। মমতা নির্দেশও দিয়েছেন, তিনি কোনো অজুহাত শুনবেন না। তাঁর দলকে ৪২ আসনেই জিততে হবে।
লোকসভার নির্বাচন হচ্ছে ৫৪৩টি আসনে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে ৪২টি আসন। ২০১৪ সালে মমতা একাই ৩৪টি আসনে জিতেছিলেন। কংগ্রেস নিয়েছিল ৪টি আসন। আর বাম দল ও বিজেপির ভাগ্যে জুটেছিল ২টি করে আসন। এবার মমতা অতীতের সব কথা ভুলে একেবারে নতুনভাবে মাঠে নেমেছেন। দাবি তুলেছেন ৪২–এ ৪২ চাই। তিনি এ কথাও বলেছেন, এই রাজ্যে আর বিরোধী দল থাকতে পারবে না। শুধু তৃণমূল থাকবে। তৃণমূল জিতবে। তাই এবার ৪২ আসনই পাচ্ছেন তিনি।
পাশাপাশি মমতা আরও একটি স্লোগান তুলেছেন। সেটি হলো, ‘মোদি হটাও দেশ বাঁচাও’। মমতার লক্ষ্য, দিল্লির গদি থেকে মোদিকে হটিয়ে নতুন ধর্মনিরপেক্ষ প্রধানমন্ত্রী বসানো। কে হবেন সেই পদের দাবিদার? তা স্পষ্ট করেননি মমতা।
ভারতে তিনটি রাজনৈতিক জোট রয়েছে। এগুলো হলো বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএ, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট বা ইউপিএ এবং কংগ্রেস-বিজেপিবিরোধী ২৩ দলের আরেকটি জোট ইউনাইটেড ইন্ডিয়া। নেতা এখনো ঘোষিত না হলেও মমতা এই জোটের প্রধান হিসেবে রয়েছেন।
কংগ্রেস জোটে (ইউপিএ) রয়েছে ২৮টি রাজনৈতিক দল আর বিজেপি জোটে (এনডিএ) রয়েছে ২৯টি রাজনৈতিক দল। বিজেপি জোট জিতলে প্রধানমন্ত্রী হবেন নরেন্দ্র মোদি। কংগ্রেস জোট জিতলে রাহুল গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। মমতার তৃতীয় শক্তির জোট ইউনাইটেড ইন্ডিয়া জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নিয়ে জট এখনো কাটেনি। কোনো ঘোষণাও আসেনি। এই জোটের প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে ১ নম্বরে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর রয়েছেন তেলেগু দেশম পার্টির নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু, বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী, সমাজবাদী পার্টির মুলায়ম সিং যাদব প্রমুখ। এই জোটের আরও অনেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। বিজেপি বাদে ইউপিএ এবং ইউনাইটেড ইন্ডিয়া জোট সরকার গড়তে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
ভারতের কোনো জনমত সমীক্ষায় এখনো আশার কথা শোনা যায়নি। প্রতিটি জনমত সমীক্ষায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বা এনডিএ এবার আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়তে পারছে না। ভারতের লোকসভায় রয়েছে ৫৪৩টি আসন। সরকার গড়তে প্রয়োজন ২৭২টি আসন। সর্বশেষ জনমত সমীক্ষায়ও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, বিজেপি সরকার গড়ার জন্য ৮টি আসন থেকে দূরে থাকছে। পেতে পারে ২৬৪টি আসন। গত সপ্তাহে এবিপি নিউজ এবং সি-ভোরের ওই যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এনডিএ টেনেটুনে সরকার গড়তে সক্ষম হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কংগ্রেস বা মমতার জোটের পৃথকভাবে সরকার গড়ার সম্ভাবনা কম। ইউপিএ পেতে পারে ১৪১টি আসন আর মমতার ইউনাইটেড ইন্ডিয়া পেতে পারে ১৩৮টি আসন। তবে ইউপিএ এবং মমতার ইউনাইটেড ইন্ডিয়া জোট যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, সে ক্ষেত্রে তাদের সরকার গড়ার একটা সুযোগ এসে যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ৪২ আসনের মধ্যে তৃণমূল পেতে পারে ৩৪টি আসন। ৮টি যেতে পারে বিজেপির ঝুলিতে। কংগ্রেস এবং বাম দলের থলেতে কোনো আসন ঢুকতে না–ও পারে। তবে বাম দল ও কংগ্রেস এই হিসাব মানছে না। তারা বলছে, গতবারের থেকে এবার বেশি আসন পাবে।
এসব হিসাব–নিকাশের মধ্যে বিরোধীরা একটুও হাল ছাড়ছে না। তারা নিশ্চিত, এবার মোদি আর ফিরছেন না। সামনের দিনগুলোতে ভোটের চেহারা আরও বদলাবে। কমে যাবে মোদির ভোট। দেশে আসবে নতুন সরকার, নতুন প্রধানমন্ত্রী। আর এই লক্ষ্য নিয়ে রাজনৈতিক ময়দান চষে বেড়াচ্ছে বিজেপিবিরোধীরা।
মমতার লক্ষ্য, পশ্চিমবঙ্গের ৪২–এ ৪২ আসন। মমতা এই রাজ্যের ৪২ আসনে একাই প্রার্থী দিয়েছেন। মমতার ধারণা, নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের পরেই তৃণমূলের শক্তি থাকবে। কারণ, ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তর প্রদেশের ৮০ আসনে মায়াবতী, অখিলেশ যাদবরা আসন ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। মহারাষ্ট্র আসনসংখ্যার দিক থেকে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য। এখানে রয়েছে লোকসভার ৪৮টি আসন। এখানেও আসন রফা হয়েছে কংগ্রেসের সঙ্গে শারদ পাওয়ারের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপির। এরপরের অবস্থান মমতার তৃণমূলের। এই রাজ্যে ৪২টি আসন ভাগ করেননি তিনি। লড়ছেন একাই। চতুর্থ স্থানে আছে বিহার। আসনসংখ্যা ৪০। এখানেও আসন ভাগ হয়েছে বিজেপিবিরোধী দলের মধ্যে। পঞ্চম স্থানে রয়েছে তামিলনাড়ু। এখানে রয়েছে ৩৯টি আসন। এখানেও ডিএমকের সঙ্গে আসন রফা হয়েছে কংগ্রেসের। এরপরেই রয়েছে দেশের অন্যান্য রাজ্য। দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ বাদে অন্যান্য রাজ্যে বিরোধীদের আসন সমঝোতা হলেও সেখানে কংগ্রেস ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলের ৪২ আসন পাওয়ার মতো শক্তি নেই। কারণ, তারা এককভাবে মমতার মতো ৪২টি আসনে প্রার্থীই দিতে পারেনি। ফলে মমতার স্বপ্ন, নির্বাচনে আসনসংখ্যার দিক থেকে তারাই কংগ্রেসের পরে থাকবে। আর ইউনাইটেড ইন্ডিয়া জোটের শীর্ষে থাকবে মমতার তৃণমূল। আর তখন যদি দেখা যায় বিজেপির ভরাডুবি আর সম্মিলিত বিরোধীদের আসনসংখ্যা সরকার গড়ার মতো অবস্থানে রয়েছে, সে ক্ষেত্রে মমতাই হবেন রাহুল গান্ধীর পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার। এসব অঙ্ক কষেই এগোচ্ছেন মমতা। এই লক্ষ্যে কাউকে কোনো একটি আসন না দিয়ে বরং একাই ৪২ আসনে প্রার্থী দিয়ে জয়ের স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নও দেখা শুরু করেছেন মমতা।
রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরদার হচ্ছে মমতা কি সত্যিই ৪২ আসনেই জিততে পারবেন? বিরোধী দলগুলো কি একটি আসনও পাবে না? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মমতার ৪২ আসনে একতরফাভাবে জয়ের দাবি মানতে পারছেন না। তাঁরাও বলেছেন, এটা মমতার অলীক স্বপ্ন। মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস। এত দিন ধরে দেশের বিভিন্ন নামীদামি জনমত সংস্থার রিপোর্টে এ কথা এখনো তুলে ধরা হয়নি যে মমতা একাই ৪২ আসন পাচ্ছেন। জনমত সমীক্ষায় সর্বশেষ যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তাতেও বলা হয়েছে, খুব একটা বিপ্লব ঘটে না গেলে মমতার সেই ৩৪ আসনই জিততে হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি জনমত সংস্থা বলেছে, দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে উঠে আসবে বিজেপি। তারাও তৃণমূলের মতো ঘোষণা দিয়ে বসেছে, তারা এবার ২৩টি আসনে জিততে চলেছে। যদিও বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস এখনো ঘোষণা দেয়নি তারা কয়টি আসনে জিততে চলেছে। তাই রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্ন জোরদার হচ্ছে, মমতার ৪২ আসন জেতার পথ কত দূরে? সত্যিই কি মমতা ৪২ আসনে একাই জিততে চলেছেন, নাকি নির্বাচনের প্রচারে চমক দিচ্ছেন মমতা? নাকি মমতা যেভাবেই হোক সব আসনে জেতার ছক নিয়ে এগোচ্ছেন?

আবার আলোচনায় বেরলুসকোনির সেক্স পার্টি: বিষ প্রয়োগে মডেলের মৃত্যু!

আবার আলোচনায় ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বেরলুসকোনির রগরগে যৌনলীলা ‘বুঙ্গা বুঙ্গা’ পার্টি। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি মিলানের কাছে নিজের বিলাসবহুল বাসভবন ভিলা আরকোরে’তে বসিয়েছিলেন ওই পার্টি। সেখানে ভাড়া করেছিলেন পতিতাদের। তার মধ্যে প্রাপ্ত বয়স্ক নয় এমন বালিকাদের সঙ্গে তিনি অর্থের বিনিময়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন বলে অভিযোগ। এ নিয়ে মামলা চলমান। কিন্তু এমন সময়ে ওই বুঙ্গা বুঙ্গা পার্টির প্রত্যক্ষদর্শী, মামলার সাক্ষী, মডেল ইমানে ফাদিল (৩৪) মারা গেছেন।
কেউ মারা যাওয়া স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু মরক্কোয় জন্ম নেয়া ফাদিলকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
গত বছর মামলা থেকে রেহাই পেতে তাকে অর্থ দিয়েছিলেন বেরলুসকোনি- এমন অভিযোগ আছে। সামনেই ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টের এমপি নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বহুল বিতর্কিত বেরলুসকোনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। তবে কি পথের কাঁটা সরিয়ে দেয়ার কোনো চেষ্টা হয়েছে ইমানে ফাদিলের শরীরে বিষ প্রয়োগ করে! এসব নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়ায় বিস্তর লেখালেখি।
বৃটেনের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ লিখেছে, নিন্দিত রাজনীতিক সিলভিও বেরলুসকোনি আবার রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছেন। তিনি ইউরোপীয়ান পার্লামেন্টের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। কিন্তু ইমানে ফাদিলের মৃত্যু তার সেই বুঙ্গা বুঙ্গা পার্টিকে আবার সামনে এনে দিয়েছে। শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আবার মুখে মুখে ফিরছে তার সেই বুঙ্গা বুঙ্গা পার্টি।
ইমানে ফাদিলের বয়স ৩৪ বছর। তাকে মিলান’স হিউম্যানিটাস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করার পর ১লা মার্চ মারা গেছেন তিনি। অভিযোগ করা হচ্ছে, তার ওপর বিষাক্ত কিছু প্রয়োগ করা হয়েছে। তার বোন ফাতিমা বলেছেন, ফাদিলের পেট ফুলে গিয়েছিল। চোখ হলুদ হয়ে গিয়েছিল। চোখে কালো দাগ পড়েছিল। নাক দিয়ে মাঝে মাঝেই রক্ত আসছিল। এমন অভিযোগে ফাদিলের ময়নাতদন্ত হয়েছে মঙ্গলবার। মারা যাওয়ার আগে তিনি আইনজীবী ও মেডিকেল স্টাফদের বলে গিয়েছেন, তার শরীরে বিষাক্ত কিছু প্রয়োগ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার যে ময়নাতদন্ত হয়েছে তাতে দেখা গেছে তার শরীরে উচ্চ মাত্রায় বিষাক্ত পদার্থ আছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাডমিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল ও ক্রোম। এর মধ্যে ব্যাটারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ক্যাডমিয়াম। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণে অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
মিলানের ভিলা আরকোরে’তে ক্ষমতায় থাকার সময় সপ্তাহে তিনবার যুবতীদের নিয়ে যে উদ্দাম পার্টির আয়োজন করতেন সিলভিও বেরলুসকোনি, তাতে যারা উপস্থিত থাকতেন তার মধ্যে অন্যতম ইমানে ফাদিল। ওই রগরগে পার্টিতে আমন্ত্রণ জানানো হতো পতিতাদের। বাইরে থেকে এমন পার্টির নাম দেয়া হয়েছিল সেক্স পার্টি। তখন ওই ভিলার ভেতরে যুবতীদের নগ্ন হয়ে হাঁটা, নাচার দৃশ্য প্রকাশ হয়েছিল পত্রিকায়। খবরে ঠাসা ছিল পশ্চিমা মিডিয়া। ল্যাপ-ড্যান্সে যে যুবতী বিজয়ী হতেন তাকে সিলভিও বেরলুসকোনির সঙ্গে ঘুমানোর আমন্ত্রণ জানানো হতো।
এ নিয়ে যে মামলা হয়েছে তাতে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষ্য দেয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন ইমানে ফাদিল। এ ছাড়া তিনি একটি বই লিখছিলেন। তাতে ভিলা আরকোরের ভেতরে ওই পার্টিতে কি সব শয়তানি কর্মকাণ্ড পরিচালনা হতো তা তুলে ধরছিলেন। এ ছাড়া উৎকোচ গ্রহণের একটি মামলায় তার কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর কথা ছিল। অভিযোগ আছে যে, বেরলুসকোনি যাতে রাজনীতিতে ফিরতে পারেন, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন, সে জন্য এই মামলা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য, গত বছর সাক্ষী হিসেবে ফাদিলকে অর্থ দিয়েছিলেন বেরলুসকোনি, যাতে তিনি উল্টো সাক্ষ্য দেন আর মুক্তি পান বেরলুসকোনি। তবে তাতে সম্ভবত থামেন নি ইমানে ফাদিল। মুখ খোলার জন্য তাকে হয়তো বেরলুসকোনির চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দেয়া হয়ে থাকতে পারে। সিলভিও বেরলুসকোনির বয়স এখন ৮২ বছর। ইতালির একটি পত্রিকা দাবি করেছে, তার সঙ্গে মডেল ইমানে ফাদিলকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সিরিয়ার ব্যবসায়ী সায়েদ গানায়ামি। তিনি বারগামোতে স্টিল কারখানা পরিচালনা করেন। ওদিকে ইমানে ফাদিলের শরীরে বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগ করার কথা অস্বীকার করেছেন বেরলুসকোনি। এমন কি তাকে তিনি চেনেনই না বলে দাবি করেছেন।
তবে চারদিকে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে যে, তার যেসব সাঙ্গপাঙ্গ আছে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাদের কেউ একজন ইমানে ফাদিলের শরীরে বিষাক্ত পদার্থ প্রয়োগ করে থাকতে পারে। এ অবস্থায় ইমানে ফাদিল যে বইটি লিখছিলেন তার পাণ্ডুলিপি জব্দ করেছে মিলানের প্রসিকিউটররা। তারা হত্যার তদন্ত শুরু করেছে। ফাদিলের লেখা বইটির নাম- ‘আই মিট দ্য ডেভিল’। অর্থাৎ আমি শয়তানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি।
যদিও প্রাথমিক পরীক্ষায় তার শরীরে তেজস্ক্রিয়তা থাকার কথা অস্বীকার করা হয়েছে, তবু ইতালির শীর্ষ স্থানীয় প্যাথলজিস্ট ক্রিস্টিনা ক্যাটানিও ও তার টিম ইমানে ফাদিলের মৃতদেহ মঙ্গলবার পরীক্ষা করার সময় পরে নিয়েছিলেন ‘এন্টি-নিউক্লিয়ার স্যুট’ অর্থাৎ পারমাণবিকতা বিরোধী পোশাক। তাদের পরীক্ষার রিপোর্ট আগামী ৬ সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে। বেরলুসকোনি যেখান থেকে নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইছেন সেই আসনে নির্বাচনের সামান্য আগে প্রকাশিত হবে ওই রিপোর্ট। আইনজীবী পাওলো সেভেসিকে মারা যাওয়ার আগে ইমানে ফাদিল বলে গিয়েছে, তার শরীরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে প্রসিকিউটররা আশা করছেন, আসলে কি ঘটেছিল ইমানে ফাদিলের তা রিপোর্ট প্রকাশ হলেই জানা যাবে। তারপরই নির্ধারিত হবে বেরলুসকোনির ভাগ্য, যিনি নিজেকে ‘জেসাস ক্রাইস্ট অব পলিটিক্স’ বা রাজনীতির যিশু খ্রিস্ট বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
সিলভিও বেরলুসকোনি কেলেঙ্কারির ৯ বছর
২০১০ সালের অক্টোবর: বেরলুসকোনির বাসভবন থেকে চুরির অভিযোগ করা হয় ১৭ বছর বয়সী পতিতা কারিমা আল মাহরুজের বিরুদ্ধে। তিনি রুবি দ্য হার্ট স্টিলার হিসেবেও পরিচিত। বুঙ্গা বুঙ্গা পার্টিতে তিনিও উপস্থিত ছিলেন এবং তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক এই রুবির সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে বেরলুসকোনি যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে। এই অভিযোগ নিয়ে তখন তোলপাড় হয় ইতালির রাজনীতি। একপর্যায়ে রুবিকে চুরির দায় থেকে পুলিশ যেন মুক্ত করে দেয় এমন দাবি করেন সিলভিও বেরলুসকোনি।
২০১৩ সাল: অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালিকাদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগে অভিযুক্ত হন বেরলুসকোনি। এ অভিযোগে তাকে সাত বছরের জেল দেয়া হয়।
২০১৮ সাল: এ বছর বিচারকরা তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ উল্টে দেন। তারা বলেন, বেরলুসকোনি যা করেছেন তাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যায় না।
২০১৯ সালের জানুয়ারি: ২০১২ সালে বেরলুসকোনির বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়েছিলেন মডেল ইমানে ফাদিল। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। অভিযোগ করা হয়েছে, তার শরীরে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। অবশেষে ১লা মার্চ ফাদিল মারা যান। তার শরীরে পাওয়া যায় উচ্চ মাত্রার রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি। এ বছরেই মে মাসে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের নির্বাচনে দাঁড়াবেন বেরলুসকোনি।
অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালিকাদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে মামলায় বেরলুসকোনির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন আরেকজন মডেল। তিনি ফিলিপাইনের বংশোদ্ভূত মডেল আমব্রা বাত্তিলানা। তিনি বলেছেন, ইমানে ফাদিলের ভাগ্যে যা ঘটেছে তা অত্যন্ত উদ্ভট বিষয়। তিনি একটি বই লিখছিলেন। আর এমন সময় তাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। বিষয়টি ভাবলেই গা ছম ছম করে ওঠে।
২০১২ সালে বেরলুসকোনির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার পর নিজের জীবন নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাত্তিলানা। ফলে তিনি নিরাপত্তার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।

স্বামীর সঙ্গে চলে গেলেন অন্তঃসত্ত্বা রুমকি by শাহনেওয়াজ বাবলু

রুমকি রহমান। বয়স ৩০। গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বিন্যাকুড়িতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য আসেন ঢাকায়। পড়াশোনা শেষে চাকরি শুরু করেন বনানীর হেরিটেজ এয়ার কোম্পানিতে। সেখানেই পরিচয় হয় মাকসুদুর রহমান জেমির সঙ্গে। দু’জনই একই অফিসে চাকরি করতেন। পরিচয়  থেকে প্রেম।
পরে দুই পরিবারের সম্মতিতে ২০১৬ সালে বিয়ে করেন জেমি ও রুমকি। বিয়ের পরও হেরিটেজ এয়ার কোম্পানিতেই চাকরি করতেন এই দম্পতি। রুমকি ছিলেন ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। জীবনে যেমন প্রেম ছিল তাদের মরণেও তেমন। দু’জনই চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বনানীর এফ আর টাওয়ারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড রুমকি ও জেমির জীবন ইতিহাসকে থামিয়ে দেয়।
মাকসুদুর রহমান আগুন থেকে বাঁচতে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে নিহত হয়েছেন। আর স্ত্রী রুমকি পুড়ে মরেন আগুনে। আগুন লাগার পর ১০ তলা থেকে লাফ দেন মাকসুদ। সেখান থেকে গুলশান ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মাকসুদকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর রুমকিকে পাওয়া যায়নি। পরে বৃহস্পতিবার রাত নয়টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে তার লাশ শনাক্ত করেন রুমকির স্বামীর খালাতো ভাই ইমতিয়াজ। জেমিকে গতকাল ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় তার নিজ এলাকায় দাফন করা হয়। আর রুমকিকে দাফন করা হয় দিনাজপুরে তার পারিবারিক কবরস্থানে।
মাকসুদ তার ছোট বোন, মা এবং স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর গেণ্ডারিয়ার আলমগঞ্জ এলাকায় নিজ বাড়িতে থাকতেন। পরিবারের একমাত্র ছেলে মাকসুদুর। ছোটবেলায় বাবা মারা গেছেন। ছোট বোন রাজধানীর সেন্ট্রাল ওইমেন্স কলেজ থেকে চলতি বছর এইচএসসি পাস করেছে। সম্প্রতি পরিবার নিয়ে নতুন কেনা ফ্ল্যাটে ওঠার কথা ছিল তার।
জেমির খালাত ভাই ওয়াসেক ফাইয়াজ মানবজমিনকে বলেন, বনানীতে আগুন লাগার পর থেকেই আমরা ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। না পেয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজখবর নিই। ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে জেমি ভাইয়ার লাশ এবং ঢামেক থেকে রুমকি ভাবির লাশ শনাক্ত করি আমরা। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে তারা দু’জনই দুনিয়াতে নেই। তাদের বাসা আর আমাদের বাসা খুব কাছাকছি। ছোটবেলা থেকেই মাকসুদ ভাইয়ার সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ভাবিও খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
এদিকে নিহত রুমকির গ্রাম বিন্যাকুড়িতে চলছে শোকের মাতম। মা হারা পরিবারের একমাত্র কন্যাসন্তান ছিল রুমকি। বৃহস্পতিবার রাতেই তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে। সেখানে গতকাল বাদ জুমা তাকে দাফন করা হয়।
রুমকির বাবা আশরাফ আলী মানবজমিনকে বলেন, ‘মা মরা মেয়ে আমার। খুব শান্ত স্বভাবের ছিল। কিছুদিন আগেও আমি ঢাকায় গিয়ে তাকে দেখে এসেছি। তার বাসায় গেলে আমাকে আসতে দিতো না। বলতো, আরো কিছুদিন থেকে যাও না বাবা। আমার মেয়েটা সন্তান সম্ভবা ছিল। এক নিমিষেই সব শেষ হয়ে গেল আমার।’
নীলফামারী ও জলঢাকা প্রতিনিধি জানান, বনানী ট্যাজেডির শিকার রুমকির বাড়িতে এখন শুধুই কান্নার রোল। বৃদ্ধ বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনরা যেন মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। শোকে পাথর হয়ে গেছেন সবাই। বিয়ের মাত্র দু’বছরের মাথায় রুমকি ও তার স্বামীর এ করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের কেউ। গতকাল শুক্রবার ভোরে রুমকির লাশ গ্রামে এসে পৌঁছলে কান্নায় আকাশ বাতাস হয়ে ওঠে। চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি প্রতিবেশীরাও। বার বার মূর্চ্ছা যাচ্ছিলেন রুমকির বাবা-মা। জুমার নামাজ শেষে অনুষ্ঠিত রুমকির জানাজায় হাজারো মানুষের উপস্থিতি আর মুনাজাতে পরম করুণাময়ের কাছে রুমকির রুহের মাগফিরাত কামনায় করুণ আকুতি যেন সবাইকে অশ্রসজল করে। রুমকি জলঢাকা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সৈয়দ আলীর ছোট ভাই আশরাফ আলীর মেয়ে।

সড়ক দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যু: ঢাকা ছেড়ে গেল দুই বছরের আদিব by পিয়াস সরকার

মোটর মেকানিকের কাজ করে সংসার চালাতেন নাজমুল ইসলাম শান্ত। স্ত্রী রেশমা আর দুই বছরের ছেলে আদিবকে নিয়ে ছিল সুখের সংসার। থাকতেন মগবাজারে। একমাত্র ছেলেকে প্রকৌশলী করার স্বপ্ন ছিল তার। ২৫শে মার্চ বাইকে করে মিরপুর যাওয়ার পথে বাসচাপায় মারা যান শান্ত। সবেমাত্র বাবা ডাক শিখতে পারা আদিব এখনো বুঝে উঠতে পারেনি বাবা নামের আশ্রয়টি আর তার মাথার ওপর নেই। শান্তর লাশ দাফন করতে ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি গেছেন রেশমা। বাবা নেই তাই ছোট্ট আদিবের আর ঢাকা ফেরা হবে না।
দাদার বাড়িতে চাচাদের  আশ্রয়ে থাকবে সে।
এখন আদিব শুধু বাবাকে খুঁজে ফিরে। আর ডাকতে থাকে- বাবা। আয়। আয়। বাবার দেয়া প্রথম জুতা পায়ে হাঁটতো সে। চিরনিদ্রায় যাওয়ার মাত্র তিনদিন আগে কিনে দিয়েছিলেন এই লাল জুতা জোড়া। মগবাজারে আম বাগান এলাকায় পরিবার নিয়ে থাকতেন শান্ত। ২৫শে মার্চ সোমবার সকালে বের হয়েছিলেন নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে। গন্তব্য মিরপুর বিআরটিএ অফিস। উদ্দেশ্য মোটরসাইকেলের কাগজপত্র করানো। পথিমথ্যে মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় মডার্ন উড ফার্নিচারের দোকানের সামনে ধাক্কা দেয় তেঁতুলিয়া পরিবহনের একটি গাড়ি। তখন সময় আনুমানিক সোয়া ১০টা। গুরুতর আহত অবস্থায় পথচারীরা তাকে প্রথমে পাশের আল হেলাল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে নিয়ে যাওয়া হয় শেরে বাংলা জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত শান্তর বাড়ি মাদারীপুর জেলার কালীকাপুর, হোসনাবাদ গ্রামে। সেখানেই হয়েছে তার শেষ আশ্রয়। স্বামীর অকাল মৃত্যুতে অথৈ সাগরে পড়েছেন রেশমা বেগম। বয়স তার ২৪। বিয়ের ২ বছরের মাথায় কোল আলো করে আসে শিশু আদিব। নিজের অনাগত ভবিষ্যতের থেকে শিশুটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশি চিন্তিত তিনি। রেশমা বেগমের সঙ্গে কথা হয় মোবাইল ফোনে। কথা বলতে বলতে বেশ কয়েকবার থমকে যায় তার গলা। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে কান্নার শব্দ। তিনি বলেন, এই বাচ্চাটা বাবা ছাড়া কেমনে বাঁচবে। বাবা ছাড়া কোনোদিন ঘুমায়নি। এখন বাবার ছবি দেখলেই বলে ওঠে- বাবা। আয়। আয়। বাচ্চাটাকে কে বুঝাবে তার বাবা আর ফিরবে না। তিনি আরো বলেন, ছেলেকে ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চেয়েছিলো তার বাবা।
এখন তিনি তার শ্বশুর বাড়ি মাদারীপুরেই আছেন। মাদারীপুরেই থাকবেন নাকি চলে আসবেন ঢাকায়? এই প্রশ্নের উত্তরে প্রায় ২০ সেকেন্ড চুপ করে থাকেন তিনি। এরপর বলেন, ঢাকা গিয়ে আর কী করবো। ঢাকাতে আদিবের বাবা নাই। ঢাকাতে আমার কেউ নাই। এখানেই মানুষ করবো ছেলেটাকে। এই ছেলেটাই এখন আমার সব।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শান্তরা চার ভাই, এক বোন। কথা হয় নিহত শান্তর বড় ভাই জহিরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। বলেন, এই বাচ্চাটা নিয়ে কই যাবে রেশমা। ঢাকাতে আর ফিরবেই বা কেন? বাচ্চাটা আমাদের সঙ্গেই থাকবে। থাকবে তার মাকে নিয়ে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তেঁতুলিয়া পরিবহন কর্তৃপক্ষ থেকে এখনো কোনো যোগাযোগ করেনি কেউ। পাননি কোনো সহযোগিতা। ঘটনার পরই ঘাতক বাসচালকে আটক করেন পথচারীরা। মিরপুর মডেল থানার ওসি দাদন ফকির বলেন, চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

শোকের মাতম: বনানী ট্র্যাজেডিতে নিহত ২৫ by জিয়া চৌধুরী

‘একটু ভালো করে বাঁচবো বলে আর একটু বেশি রোজগার, ছাড়লাম ঘর আমি ছাড়লাম ভালোবাসা, আমার নীলচে পাহাড়।’ অঞ্জন দত্তের গানের মতো নিজের ঘর, ভালোবাসা ফেলে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসা ২৫ জন মানুষ আর কোনোদিন তাদের পরিবারে ফিরবেন না। বনানীর এফআর টাওয়ারের ভয়াবহ আগুন টেনে দিয়েছে তাদের জীবনের ইতিরেখা। নিজের ঘর, ভালোবাসার মায়া ফেলে তারা এখন বহু দূরের পথে।
বৃহস্পতিবার বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুনের ঘটনায় অন্তত ২৫ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস। নিহতদের একেক জনের জীবন ঘিরে ছিল হাজারো স্বপ্ন। অনেক ইচ্ছে-আহ্লাদ পূরণ হবার বাকি ছিল তাদের। কিন্তু মুহূর্তের আগুনে থমকে গেছে ২৫টি পরিবারও। হাসি-আনন্দের খোরাক হয়ে বেঁচে থাকার কথা যাদের, তারাই এখন অশ্রুর কারণ।
ছুটির দিনগুলোতে যাদের বাবা-মা কিংবা স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে আনন্দে সময় পার করার কথা তারা এখন আজীবনের ছুটিতে। অফিস, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কিংবা প্রতিদিনকার জীবনযাপন কোনো কিছুই এখন আর তাদের ছুঁতে পারবে না।
প্রিয়জনদের হারিয়ে শোক আর বেদনায় কাতর-স্তব্ধ পরিবারগুলো। শেষবারের জন্য পরিবারের সদস্যকে নিয়ে গেছেন নিজ নিজ এলাকায়, শেষ বিদায় দিতে। এদিকে, এফ আর টাওয়ারের আগুনের ঘটনায় নিহত মোট ২৫ জনের তালিকা দিয়েছে পুলিশ কন্ট্রোল রুম। নিহতরা হলেন- মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের রামপাশা গ্রামের সৈয়দা আমিনা ইয়াসমিন (৪৮), বরিশালের উত্তর করাপুর সরদারবাড়ীর মোহাম্মদ মনির হোসেন সরদার (৫২), ঢাকার গেন্ডারিয়ার মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান (৩২), নীলফামারী জলঢাকার রুমকি আক্তার (৩০), দিনাজপুরের বালুয়াডাঙ্গার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন (৪০), রংপুরের পীরগঞ্জের চাতরা গ্রামের মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান (৩৬), খুলনার তেরখাদার কোদলা গ্রামের মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, ঢাকার মিরপুরের রূপনগরের ফ্লোরিডা খানম পলি (৪৫), ঢাকার আতাউর রহমান (৬২), চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণের মোহাম্মদ রেজাউল করিম রাজু (৪০), নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের আহম্মদ জাফর (৫৯), নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের জেবুন্নেসা (৩০), ঢাকার মগবাজারের মোহাম্মদ সালাউদ্দিন মিঠু (২৫), টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের নাহিদুল ইসলাম তুষার (৩৫), বগুড়ার সান্তাহারের তানজিলা মৌলি (২৫), গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর মোহাম্মদ পারভেজ সাজ্জাদ (৪৬), শ্রীলঙ্কার নাগরিক নিরস ভিগমা রাজা (৩৫), কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মোহাম্মদ ইফতিয়ার হোসেন মিঠু (৩৭), যশোরের বেজপাড়া মেইন রোডের শেখ জারিন তাসনিম বৃষ্টি (২৫), নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি (৩০), শরীয়তপুরের শৈলপাড়ার আতিকুর রহমান (৪২), লালমনিরহাটের পাটগ্রামের আনজির সিদ্দিক আবির (২৭), ঢাকার ডেমরার আব্দুল্লাহ আল ফারুক (৬২), নওগাঁর মোহাম্মদ মঞ্জুর হাসান (৪৯) ও পাবনার আতাইকুলা থানার আমির হোসেন রাব্বি (২৯)। এদের সবার পরিবারজুড়ে এখন শোকের মাতম। প্রিয়জন হারানোর বেদনায় স্তব্ধ স্বজনরা। এর মধ্যে নিজ নিজ এলাকায় নিহতদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
আগুনে শেষ উচ্ছল জীবন
এই তো সপ্তাহ দুয়েক আগে গত ১২ই মার্চ জীবনের ২৬তম জন্মদিন পালন করলেন তানজিলা মৌলি। তখনো কি ভেবেছিলেন এটাই হবে তার জীবনের শেষ জন্মদিন উদযাপন! হয়তো ভাবেন নি। এমন প্রাণোচ্ছল, প্রাচুর্যে ভরা তরুণী প্রাণে কেই বা মৃত্যুর কথা চিন্তা করে। নিজের পরিবারকে নিয়ে আরো কতগুলো সময় আনন্দে-উচ্ছলতায় কাটানোর কথা ছিল তার। অথচ বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুনের ঘটনায় মাত্র ২৫ বছর বয়সেই থেমে গেছে এই তরুণ প্রাণ। বিতর্ক, উপস্থাপনা কিংবা যেকোনো আয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তানজিলা মৌলি পরিচিত ছিলেন তুখোড় হিসেবে, ছিলেন সবার প্রিয়জন।
এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেন তানজিলা মৌলি। এরপর এসিআই লিমিটেড থেকে ইন্টার্ন শেষে যোগ দেন হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস নামে একটি ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেল অপারেটর প্রতিষ্ঠানে। যার অফিস ছিল বনানীর এফ আর টাওয়ারের ১১তলায়। প্রায় দু’বছর আগে ২০১৭ সালের ৪ঠা আগস্ট নোয়াখালীর ছেলে মো. রায়হানুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয় বগুড়ার সান্তাহারের মেয়ে তানজিলা মৌলির। দুজনেই বেশ ঘুরতে পছন্দ করতেন। সবশেষ নেপাল ও কক্সবাজার ট্যুরের ছবি এখনো ফেসবুকের টাইমলাইনে ভাসছে। স্বামী রায়হানুল ইসলামকে নিয়ে আরো বহু দেশ ঘোরার ইচ্ছে ছিল তানজিলা মৌলির। অথচ বৃহস্পতিবারের আগুন কেড়ে নিয়েছে তার জীবন। স্বামীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে প্রিয়তমা স্ত্রীকে। সেদিন প্রচণ্ড ধোঁয়া ও উচ্চতাপে অক্সিজেনের অভাবে মারা যায় তানজিলা মৌলি।
এফ আর টাওয়ারে আটকা পড়ার পর বাবা মাসুদুর রহমান ও স্বামী রায়হানুল ইসলামের সঙ্গে সবশেষ কথা হয় তার। মুঠোফোনের কণ্ঠে ছিল বাঁচার আকুতি, কিন্তু ফোনের এপার থেকে যেন কিছুই করার ছিল না বাবা মাসুদুর রহমানের। বাবা আশ্বস্ত করেছিলেন, মা তোমার কিছু হবে না। দেখো সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। খবর পেয়ে বগুড়ার সান্তাহার থেকে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছাতে রাত প্রায় ৯টা বেজে যায়। ততক্ষণে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিথর দেহে পড়ে আছে তানজিলা মৌলির মরদেহ। বাবা মাসুদুর রহমান যে মেয়েকে কথা দিয়েছিলেন তার কিছুই হবে না। মেয়েকে দেয়া কথা তো রইলো না। মেয়ের নিথর দেহের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়া ছাড়া যেন আর কিছুই করার ছিল না বাবার।
প্রাণহীন এক নিথর দেহ নিয়ে বগুড়ার সান্তাহার ফিরেছেন বাবা, একেবারে শেষবারের মতো। তানজিলা মৌলিকে হারানোর বেদনা সান্তাহারবাসীকেও পোড়াচ্ছে। বশিপুর সরদার পাড়ার প্রতিটি বাড়িতে কন্যা হারানোর শোক। তার ছোটবেলার বন্ধু তুলিকা মানবজমিনকে বলেন, মৌলি আর কোনোদিন আসবে না তার প্রিয় সান্তাহারে। দেখা হবে না ওর বন্ধুদের সঙ্গে। কথা হবে না বাবা আর মার সঙ্গে। মিথির ঘরটি শূন্যই থাকবে, যেখানে শিশুকাল থেকে বেড়ে উঠেছে মিষ্টি এই মেয়েটি। কোনোভাবেই মানতে পারছি না এসব। তানজিলা মৌলিকে নিয়ে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সংগঠন বিওয়াইএলসি’র রাইয়ান বিন নূর জানান, মৌলি আপুর সঙ্গে পরিচয় ঠিক দুই বছর আগে।
জুনিয়র ১০ ক্যান্ডিডেটদের ইন্টারভিউ ছিল সেদিন। খুব অল্প সময়ে আপুর সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে যায়। উনি উনার সুন্দর হাসি দিয়ে সবাইকে খুব সহজেই কাছে টেনে নিতে পারতেন। প্রোগ্রামগুলোতে দেখা আর সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রায়ই কথা হতো। এই তো ক’মাস আগে হঠাৎ ভার্সিটি থেকে বের হয়ে দেখা! একদমই কাছাকাছি দুটো বিল্ডিং বলে প্রায়ই দেখা হতো, এই তো কিছুদিন আগেও হলো। সেদিন দুপুরে যখন আগুনের কথা জানতে পারি তখন মৌলি আপুকে ফোন করে পাওয়া যাচ্ছিল না। ফেসবুকে নক করতে গিয়ে দেখলাম ঘণ্টা দুয়েক আগেও তিনি অনলাইনে ছিলেন। অথচ এভাবে স্মিত হাসির মানুষটিকে হারাতে হবে ভাবতে চোখে জল চলে আসছে। তানজিলা মৌলির স্বামী রায়হানুল ইসলাম গত নভেম্বরে তার ফেসবুকে কাকতালীয়ভাবে লিখেছিলেন, নো ম্যাটার হাউ গুড ইউ আর, ইউ ক্যান অলয়েজ বি রিপ্লেসড। কয়েক মাস আগে নিছক ভাবনা যে সত্যি হয়ে যাবে তা কে ভেবেছিল! প্রাণখোলা হাসির মৌলিকে হয়তো আজীবন অনুভব করবেন তার স্বামী রায়হানুল ইসলাম।
শেষবারের মতো পাটগ্রামে আবীর
লালমনির হাটের পাটগ্রামের কলেজ রোড এলাকায় বেড়ে উঠেছেন আনজির সিদ্দিক আবীর। উচ্চ শিক্ষার টানে পরিবার ছেড়ে ঢাকায় আসেন মাধ্যমিকের পরপর। ঢাকা থেকে প্রায় চারশো কিলোমিটার দূরত্বের পাটগ্রাম তবুও ছিল তার বুকের ভেতর। ছুটি পেলেই বাবা-মার কাছে ফিরে যেতেন। বাবা আবু বকর সিদ্দিক, মা তাশরিফা খানম তামান্না আর বড় ভাই তানজীর সিদ্দিককে ঘিরে ছিল আবীরের জীবন। পরিবারের ছোট ছেলে হওয়ায় সেও ছিল সবার কাছে ভীষণ আদরের। গত ২৭শে মার্চ আনজির সিদ্দিক আবীর মধ্যরাতে ফেসবুকে স্ট্যাটাসে লিখেন ‘মা ছেলে শুয়ে শুয়ে নিউজ ফিড দেখি। আহা, কি আনন্দ! অথচ এমন আনন্দ আর কখনো আবীরের জীবনে ফিরবে না।
বনানীর আগুনের ঘটনা আবীরকে তার প্রিয় পরিবার থেকে বহু দূরে নিয়ে গেছে। যেখানে আর সে চাইলেও তার মায়ের সঙ্গে ফেসবুক টাইমলাইন স্ক্রল করতে পারবে না। জীবনের ওপারে এ আরেক জীবন। লালমনিরহাটের পাটগ্রামের স্থানীয় টিএন উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ২০১১ সালে আবীর ভর্তি হন সেন্ট যোসেফ কলেজে। পরে ঢাকার আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এআইইউবি) থেকে ব্যবসায় শিক্ষায় স্নাতকোত্তর শেষ করেন। আবীরের বড় ভাই তানজীর সিদ্দিক ছিল তার জীবনের ছায়ার মতো। পড়াশোনা শেষে ২০১৭ সালের ৪ঠা মার্চ যোগ দেন পুঁজিবাজারে লেনদেন বিষয়ক প্রতিষ্ঠান মিকা সিকিউরিটিজে। বড় ভাই তানজীর সিদ্দিকও কাজ করেন একই প্রতিষ্ঠানে।
মানবসম্পদ বিভাগে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগ দেয়ার কিছুদিনের মধ্যে কমপ্লায়েন্স অ্যাণ্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের নির্বাহীর দায়িত্ব পান। বনানীর এফ আর টাওয়ারের ১৪তলায় থাকা মিকা সিকিউরিটিজে গত বৃহস্পতিবারও যথারীতি অফিস করছিলেন আনজির সিদ্দিক আবীর। সেখানে কাজ করা শওকত নামে একজন কর্মী জানান আগুনের ঘটনার দিন তারা সবাই শেয়ারবাজারের লেনদেন মনিটরে ব্যস্ত ছিলেন। দুপুরের দিকে আগুন লাগে বলে তারা টের পান। মিকা সিকিউরিটিজের ৪৫ জন কর্মীর ৪৪ জনই প্রাণে বেঁচে গেলেও মারা যান আবীর। অবশ্য ভবনের সিঁড়ি পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন আবীর। সিঁড়িতে থাকা অবস্থায় কথা হয়েছিল শওকতের সঙ্গে। তবে বাকি কর্মীরা উপরে ছাদে ওঠে পাশের আহমেদ টাওয়ার দিয়ে নিরাপদে নেমে যেতে পারলেও বাথরুমে থাকায় বের হতে কিছুটা দেরি হয় আবীরের। পরে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন সিঁড়িতে গেলে সেখান থেকে আর বেরুতে পারেন নি বলে ধারণা তার সহকর্মীদের।

‘একাধিকবার বলেছি, ড্রাইভার সাহেব আস্তে চালান’ by অজয় কুন্ডু

মাদারীপুর সদর হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতেই কান্নার আওয়াজ। বৃহস্পতিবার বেলা একটা। প্রিয় মানুষকে খুঁজে না পেয়ে কেউ হাউমাউ করে কান্নাকাটি করছে, কেউবা স্বজনের মরদেহ দেখেই আহাজারি করছে। ক্রমেই বাড়ছিল আহত রোগীর সংখ্যা। রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরাও। হাসপাতালের শয্যা না থাকায় মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন অন্তত ১৫ জন নারী ও পুরুষ।
তাঁদের একজন মুজাম হাওলাদার (৪০)। তিনি কালকিনি উপজেলার আদিপাড়া এলাকার সেকাম হাওলাদারের ছেলে। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা থেকে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন। মাথায় গুরুতর আঘাত নিয়ে তিনি এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুর্ঘটনার পরিস্থিতি বলতে গিয়ে মুজাম বলছিলেন, ‘বাসটি শুরু থেকেই খুব দ্রুতগতিতে চলছিল। আমরা একাধিকবার বলেছি যে ড্রাইভার সাহেব আস্তে চালান। এ কথা বলায় আমাদের সঙ্গে হেলপার ও চালকের বাগ্‌বিতণ্ডাও হয়। কিন্তু কোনো কথাই চালক শোনেননি। এমনকি স্টিয়ারিং হাতে চালক একাধিকবার ফোনে কথাও বলেছেন। তাঁর বেপরোয়া গতি আর অসচেতনতার কারণেই আমরা আজ সঙ্গীদের হারালাম।’
বৃহস্পতিবার ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার চন্দ্রপাড়া এলাকায় অনুষ্ঠিত ওরস মাহফিল শেষ করে সুবিন-নবিন নামের একটি যাত্রীবাহী বাসে মাদারীপুর সদরের ভাঙ্গা ব্রিজ এলাকায় ফিরছিলেন মুসল্লিরা। সদর উপজেলার কলাবাড়ি এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা অপর একটি ট্রাককে জায়গা দিতে গিয়ে রাস্তার পাশে খাদে পড়ে যায় বাসটি। ঘটনাস্থলে ৮ জন নিহত হন। আহত হন অন্তত ৩০ জন। এ ছাড়া গুরুতর আহত অবস্থায় তিনজনকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আহত আরেক যাত্রী রুনি বেগম। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ বিকট শব্দ। তারপর গাড়ি উল্টে চলে গেল খাদে। কী থেকে যে কী হলো, কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। ভাবছি মরেই গেছি। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেছি। তবে খারাপ লাগছে এটা ভেবে যে বুধবার সকালে একসঙ্গে সবাই মিলে ওরস মাহফিলে গেলাম। আজ (বৃহস্পতিবার) ফেরার সময় হারাতে হলো স্বজনদের।’
তামান্না নামে এক স্কুলছাত্রী বলে, ‘আমি মা-বাবার সঙ্গে ছিলাম। ওয়াজ হচ্ছিল। হঠাৎ চালক অন্য গান ছাড়ায় যাত্রীরা চটে যায়। কিন্তু চালক কারও কথা না শুনে দ্রুতগতিতে বাস চালাচ্ছিল। এরপরই হঠাৎ সব অন্ধকার হয়ে গেল। পরে আমি কীভাবে হাসপাতালে এলাম, নিজেও জানি না।’
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আবদুল রাজ্জাক। তাঁর বাড়ি কালকিনি উপজেলায়। রাজ্জাক বলেন, ‘যাত্রীবাহী ওই বাসের পেছনে আমরা একটা মাইক্রোবাসে ছিলাম। বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। চোখের সামনে এমন দুর্ঘটনা সত্যি মর্মান্তিক।’ রাজ্জাক নিজেও উদ্ধারকাজে অংশ নেন।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার ওসি মো. মাহফুজার রহমান বলেন, ‘দুর্ঘটনার কবলে পড়া সুবিন-নবিন বাসটির নম্বর নাটোর ব-০০৬৪। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তবে আমাদের ধারণা, গাড়িটির কাগজপত্র ঠিক নেই। আমরা মালিকপক্ষকে গাড়িটির কাগজ দেখাতে বলেছি। কিন্তু তারা দেখায়নি। আমরা তাদের এক দিন সময় দিয়েছি।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বাসটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল। চালক কোনো সচেতনতা অবলম্বন করেনি। এ কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
নিহতদের লাশ মাদারীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। মাদারীপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসক অখিল সরকার বলেন, তাঁরা আহতদের সাধ্যমতো চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।

লাশের ব্যাগে বেজে উঠল ফোন by আবদুস সালাম

বিকেল ও সন্ধ্যার মাঝামাঝি একসময়ে গতকাল বনানীর এফআর টাওয়ারের আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। সারা দিন এই ভবনে তাণ্ডব চালিয়েছে লেলিহান আগুন। সারা দেশের মানুষের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই জানা গেছে এই আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে সাতজন। আর কত খারাপ খবর ওই পোড়া ভবনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কে জানে! সবার মতো আমরা ফটোসাংবাদিকেরাও খবরের অপেক্ষায় আছি। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও রোভার স্কাউটের সদস্যরা ভবনটির ভেতরে গেলেন। কী খবর নিয়ে তাঁরা ফেরেন, তার জন্য আমাদের অস্বস্তিকর অপেক্ষা। তাদের প্রতিটি গতিবিধির দিকে নজর রাখছি।
লক্ষ করলাম রোভার স্কাউটের কয়েকজন মরদেহ ভরার ব্যাগ নিয়ে ভবনের ভেতরে যাচ্ছেন। তার কিছুক্ষণ পরই এয়ার লিফটে করে কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ে নামানো হলো ব্যাগভর্তি একটি মরদেহ। তখন আমিও সড়কে। ভিড়ের কারণে ছবি তোলা গেল না। বুঝলাম উঁচু কোনো জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির ছাদে অবস্থান নিলাম। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে দেখলাম, নামানো হচ্ছে দ্বিতীয় মরদেহটি। ক্যামেরায় চোখ রেখে পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। মাত্র কয়েক মিনিটের অপেক্ষা, কিন্তু মনে হচ্ছিল কয়েক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। অবশেষে প্লাস্টিকের সাদা ব্যাগভর্তি মরদেহটি নিয়ে এয়ার লিফট নেমে এল। ছবি তুলছি। সড়কে প্রস্তুত থাকা ফায়ার সার্ভিসের লোকজন মরদেহটি গ্রহণ করছেন। ঠিক এমন সময় কার যেন মোবাইল বেজে উঠল! ফায়ার সার্ভিসের লোকজন নিজেদের মোবাইল বাজছে কি না, দেখলেন। না, তাঁদের কারও ফোন বাজছে না। এয়ার লিফটে থাকা ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী বুঝলেন ফোনের শব্দ কোথা থেকে আসছে। তিনি মরদেহের ব্যাগটির জিপার খুললেন।
মৃত ব্যক্তির প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বের করে আনলেন মোবাইল। হ্যাঁ, এই ফোনটিই বেজে উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের ওই কর্মী ফোনটি রিসিভ করলেন। দূর থেকে বুঝিনি ফোনের ওপারের মানুষটির সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীর কী কথা হয়েছে।

গণপূর্তমন্ত্রীর সঙ্গে একমত মির্জা ফখরুল, তবে...

বনানীতে এফ আর টাওয়ারে আগুন লেগে মৃত্যুর ঘটনাকে ‘হত্যাকান্ড’ বলে উল্লেখ করে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে তিনি এই আগুনের ঘটনার জন্য সরকারের অবহেলা এবং দায়িত্বপালনে ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন।
বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এফ আর টাওয়ারের সামনে আজ শুক্রবার বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ মন্তব্য করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম।
বিএনপি নেতা বলেন, আমরা তো দেখছি যে, পরপর কয়েকটি এই ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটল। যেটা এক কথায় বলা যেতে পারে সরকারের অবহেলা, কর্তৃপক্ষের অবহেলা। যারা দায়িত্বে থাকেন, তাদের অবহেলার কারণেই এসব ঘটেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ২০ তলা ভবন। বিল্ডিং কোড কোনোভাবে মানা হয়নি, বিল্ডিং তৈরিতে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হয়নি। অগ্নিনির্বাপণের জন্য কোনোরকমের ব্যবস্থা নেই। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে যে, ভবনের ভেতরে দিয়ে যে সিঁড়ি থাকার কথা সেই সিঁড়ি পর্যন্ত নেই। এ রকম বিল্ডিং কীভাবে নির্মাণের অনুমতি পায় আমরা সেটাই বুঝতে পারি না।
গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম সকালে এখানে এসে বলেছেন যে, এটা দুর্ঘটনা নয়, এটা হত্যাকাণ্ড। আপনি একে কী বলবেন, এ প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, এটাকে অবশ্যই হত্যাকাণ্ড বলতে হবে। তারা (সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ) তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। যেখানে মানুষের জীবনের প্রশ্ন, সেখানে প্রত্যেকের আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, একজন লোক লাফ দিয়ে পড়ল, আমরা দেখেছি যে উদ্ধারে যে নেট থাকে সে নেট ব্যবস্থা এখানে দেখিনি। পানি বিভিন্ন জায়গা থেকে জোগাড় করে আনতে হয়েছে। দেখুন বিল্ডিংগুলো ঘন ঘন। এসবের মাঝে গ্যাপ থাকার কথা, সেটাও নেই। এসব বিল্ডিং নির্মাণের জন্য যারা অনুমতি দেয়, যেমন রাজউকসহ অন্যান্য যারা আছে, তাদের অবহেলার কারণে এটা হয়েছে।
এই ঘটনার জন্য আপনি কাকে দায়ী করবেন, জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, এটা বলা মুশকিল হবে। সার্বিকভাবে সরকার পরিচালনা করছেন যারা, তাদের সার্বিক দায়িত্ব নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের এ বিষয়ে দায়-দায়িত্ব তো গ্রহণ করতেই হবে। তিনি বলেন, আমরা আগেই বলেছি দেশে একটি নৈরাজ্যের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কোনো জবাবদিহি নেই। সেই কারণে এই ধরনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের বিষয়ে ফখরুল ইসলাম বলেন, এটি হৃদয়বিদারক, মর্মান্তিক একটি অগ্নিকাণ্ড, যা আমাদের সকলকে অত্যন্ত মর্মাহত করেছে। এটা স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার মতো। এই যে মানুষগুলো চলে গেল, তাদের পরিবার-পরিজনদের বিষয়গুলো কী ভয়াবহ মর্মান্তিক। ওপরে সাফোকেশনে (শ্বাস বন্ধ হয়ে) তারা চলে গেলেন। এটা আমি মেনে নিতে পারি না, আমরা কেউ মেনে নিতে পারছি না এই ধরনের মৃত্যু।
সরকারের সমালোচনা করে ফখরুল আরও বলেন, আজকে দুর্ভাগ্যজনক যে, পরপর কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়ে গেল কিন্তু সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এটা আমার কাছে মনে হয়েছে সার্বিক যে নৈরাজ্য, সেই নৈরাজ্যের জন্য এসব সংঘটিত হচ্ছে। একই সঙ্গে জবাবদিহির যে ব্যবস্থা নেই, সেই কারণে দুর্ঘটনাগুলো সংঘটিত হচ্ছে।
ফায়ার ব্রিগেডকে শক্তিশালী করার কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, আমি মনে করি এই ক্ষেত্রে আমাদের ফায়ার ব্রিগেডকে আরও বেশি শক্তিশালী করা দরকার। তাদের আধুনিক যন্ত্রপাতি-সরঞ্জামাদি দরকার, যাতে মানুষজনকে রক্ষা করা যায়। আজকে উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, এই যে বেসিক কতগুলো উদ্যোগ, তার প্রতি নজর দেওয়া হচ্ছে না। আমরা আশা করব এরপরে হয়তো সরকার সজাগ হবে এবং তাদের যে বিভাগগুলো আছে তাদের অন্তত মানুষের জীবন রক্ষার স্বার্থে আন্তরিক হবে।