Showing posts with label চট্টগ্রাম. Show all posts
Showing posts with label চট্টগ্রাম. Show all posts

Monday, July 27, 2026

একসময় দর্শক আবিষ্কার করেন, দেলুপি আসলে বাংলাদেশ by আহমেদ মুনির

প্রকাশ ২৪ নভেম্বর ২০২৫ঃ ঘটনার শুরু খুলনার পাইকগাছা উপজেলার একটি ইউনিয়নে।নাম দেলুপি। যাত্রাপালার মহড়া চলছিল গ্রামের একটি বাড়িতে। মথুরার মহারাজা উগ্রসেনের রাজ্যে মহা দুর্বিপাক। তার ছেলে যুবরাজ কংসের অত্যাচারে দেশবাসী বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে যাত্রাপালার এক অভিনেতার মুঠোফোন বেজে ওঠে। খবর আসে প্রধানমন্ত্রী ‘সাবিনা’ পালিয়ে গেছেন।

মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের ‘দেলুপি’ সিনেমার গল্প ঠিক এখান থেকে শুরু। একটা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। আর তার প্রায় কাছাকাছি সময়ে দেখা দেওয়া আকস্মিক বন্যায় দেলুপির মানুষ হতভম্ব। শুরু হয় নতুন করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আর প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক, এই দুই দুর্যোগ যেভাবে দেলুপির মানুষজন মোকাবিলা করে, সে গল্প নিয়েই এই চলচ্চিত্র।

সিনেমা দেখতে দেখতে একসময় দর্শক আবিষ্কার করেন, দেলুপি আসলে বাংলাদেশ। যে ঘটনাপ্রবাহ দেলুপির কৃষক, জেলে, যাত্রাপালা দলের সদস্য, রাজনীতিবিদ, তরুণদের ছুঁয়ে এগিয়ে চলে, তা পুরো দেশেরই কাহিনি।

দেবেশ রায় তাঁর ‘উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে’ বইয়ে অভিযোগ করেছিলেন, এ দেশের লেখকেরা পাশ্চাত্য গদ্যরীতিতে ভর করে, তাঁদের মননে উপন্যাসের কাঠামো নির্মাণ করেছেন। বাংলার পুঁথি, পালা বা গীতিকার ধারা থেকে সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদি সে ধারায় বাংলা উপন্যাস এগিয়ে যেত তবে নিশ্চয় ভিন্ন কিছু পেতাম আমরা।

চলচ্চিত্র মাধ্যমের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা খাটে। এ দেশের শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রে আমরা তেমন স্বতন্ত্র দেশীয় ভাষা খুঁজে পাই না। সেটা যে থাকতে হবে, তা–ও নয়। কিন্তু ‘দেলুপি’ যেন সেই চেষ্টা করেছে। সেদিক দিয়ে ‘দেলুপি’ বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য একটা ঘটনাও হয়ে থাকল।

যাত্রাপালার নাটকীয়তাকে ধরে নতুন নির্মাণের পথে এগিয়েছে এই চলচ্চিত্র। একই সঙ্গে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ধারাবাহিকতা থেকেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেনি। লম্বা বেড়িবাঁধ ধরে যাত্রাপালার অভিনেতাদের হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় ইংমার বার্গম্যানের ‘সেভেন্থ সিল’–এর দৃশ্যকে। অথবা ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ও যেন উঠে আসে মিহিরকে বলা পলাশের সংলাপে।

পলাশ যেন বিজন ভট্টাচার্যের কণ্ঠেই মিহিরকে বলতে থাকে, ‘তুই চলে যা।’ দুঃখকে মেনে নেওয়া বাঙালির নিয়তি, ট্র্যাজেডিকে বরণ করে নেওয়াই তার পরমার্থ—এই সংলাপে সেই মনোভাবকে যেন ঠাট্টা করা হলো। কিন্তু তরুণ মিহির এই অমোঘ সত্যকে বদলে দিল।

‘দেলুপি’তে কোনো ভিলেন নেই। কোনো বিদ্বেষ নেই। আছে বিশ্বাস, আছে প্রেম। নতুন কিছু হবে, সেই স্বপ্নের বীজ। যারা বাংলাদেশের বড় পরিবর্তনের দিকে তাকিয়ে আবার আশাহত হয়েছেন, ‘দেলুপি’ তাদের শুশ্রূষা দেবে। এই চলচ্চিত্র আশাবাদের চলচ্চিত্র। সেই আশাবাদ কোনো রাজনৈতিক প্রত্যয় থেকে আসেনি। এসেছে এ দেশের মানুষের প্রতি বিশ্বাস থেকে।

চট্টগ্রামে আমি যখন প্রেক্ষাগৃহে বসে সিনেমাটি দেখছিলাম, তখন দর্শকদের ক্ষণে ক্ষণে হেসে উঠতে, হাততালি দিতে শুনেছি। বিশেষ করে যখন একদিকে কংসের বধ হচ্ছে আর অন্যদিকে একটি যুগলের প্রেম পরিণতি পাচ্ছে। অশুভের পতন আর প্রেমের জয়, এর বাইরে মানুষ আর কী চাইতে পারে। এক দর্শক তো বলে ফেললেন, ‘দেলুপি’ না দেখাটা রীতিমতো অন্যায়।

‘দেলুপি’র দৃশ্য। নির্মাতার সৌজন্যে
‘দেলুপি’র দৃশ্য। নির্মাতার সৌজন্যে

Thursday, April 9, 2026

পাহাড়, সমুদ্র, চা–বাগান—একসঙ্গে দেখা যায় যে উপজেলায় by মোহাম্মাদ মোরশেদ হোসেন

পাহাড়ের কোলঘেঁষা ঝাউবন। একটু দূরে চোখ রাখলে দেখা যায় নীল সমুদ্রের ঢেউ। এর সঙ্গে রয়েছে চা–পাতায় ভরপুর সবুজ উপত্যকা। পাহাড়, সমুদ্র আর চা–বাগানের এ রূপের দেখা মিলে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায়।

উপজেলাটির অবস্থান চট্টগ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে। শঙ্খ নদের তৈলারদ্বীপ সেতু পার হয়ে এতে প্রবেশ করতে হয়। প্রতিদিনই দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই এখানে ছুটে আসেন। এ উপজেলার পরেই পর্যটনের রাজধানী–খ্যাত কক্সবাজারের অবস্থান।

চা–বাগান

চট্টগ্রাম থেকে তৈলারদ্বীপ সেতু পার হয়ে এক কিলোমিটার ভেতরে যেতেই দেখা মিলবে উপজেলার চাঁনপুর বাজারের। এ বাজার থেকে হাতের বাঁয়ে রামপুর ডিসি সড়ক দিয়ে পুকুরিয়া চৌমুহনী গেলেই বেলগাঁও চা–বাগান। দক্ষিণ চট্টগ্রামের এটিই একমাত্র চা–বাগান। সপ্তাহজুড়েই এ বাগান দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

চা–বাগানটির মূল ফটকের কাছে যানবাহন রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এরপরই ভেতরে ঢুকতে পারেন দর্শনার্থীরা। বিস্তীর্ণ বাগানে চা–পাতা তোলা, চা–পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণ, চা–শ্রমিকের জীবনধারা, বাংলো—সবকিছুই ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।

১০ অক্টোবর চা–বাগানটিতে গিয়ে দেখা যায়, নিরিবিলি পরিবেশের এ বাগান দেখতে দূরদূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে এসেছেন। তাঁদের কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ চা–পাতা পরখ করে দেখছেন। জানতে চাইলে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে ঘুরতে আসা সাইদুল ইসলাম প্রথম আলোকে  বলেন, ‘আমাদের এলাকায় চা–বাগান রয়েছে। এরপরও বিচিত্র অভিজ্ঞতা নিতে পাঁচ বন্ধু ঘুরতে এসেছি। এখান থেকে সমুদ্রসৈকতেও যাবে। একসঙ্গে বহু কিছু দেখা হবে, এ আশায় বাঁশখালীতে ঘুরতে আসা।’

বেলগাঁও চা–বাগানের ব্যবস্থাপক আবুল বাশার বলেন, ১৯৮৫ সালে ৬৪০ একর জমির ওপর চা–বাগানটি গড়ে তোলা হয়েছিল। এখন এটির আয়তন ৮৩৩ একর। এ বছর বাগানটি থেকে চার লাখ কেজি চা–পাতা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিদিনই বাগানে দর্শনার্থীরা আসেন।

সৈকতে মুগ্ধ পর্যটক

বাঁশখালীর সমুদ্রসৈকত বালিয়াড়ি, বেড়িবাঁধ আর ঝাউবন দিয়ে সাজানো। এটিই কক্সবাজারের পর দেশের বৃহত্তম সৈকত। উপজেলার খানখানাবাদ থেকে বাহারচরা, ছনুয়া, গণ্ডামারা ও সরল ইউনিয়নের ৩৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ সৈকত বিস্তৃত।
আয়তনে বিশাল এ সৈকতকে পৃথক তিনটি নামে ডাকেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর একটি কদমরসুল সৈকত। উপজেলার গুনাগরী খাসমহল থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে গেলে এর দেখা মেলে। এটি উপজেলার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন সৈকত হিসেবে পরিচিত। ঝাউবন কিংবা বালিয়াড়িতে বসে সূর্যাস্ত ও লাল কাঁকড়ার লুকোচুরি দেখা এ সৈকতের মূল আকর্ষণ।

বন বিভাগ জানায়, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর সৈকতটিতে ঝাউগাছ লাগানো হয়। এর পর থেকে এখানে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। পরে সেখানে অবকাশযাপনের জন্য একটি রিসোর্ট, কংক্রিটের ছাতা ও বৈঠকখানা নির্মাণ করে পর্যটন করপোরেশন। বর্তমানে রিসোর্টটি বন্ধ থাকলেও কংক্রিটের ছাতা ও বৈঠকখানায় বসে থাকা যায়।

কদমরসুল সৈকত থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দক্ষিণে খানখানাবাদ সমুদ্রসৈকতের অবস্থান। এখানে চোখে পড়বে বেড়িবাঁধে সারি সারি দোলনা ও কংক্রিটের সিসি ব্লক। নিচের দিকে তাকালে এসব ব্লকে বসে আড্ডা দিতে মন চাইবে অনেকের। এসব ব্লক ধরে দক্ষিণ দিকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ ঝাউবন দেখা যায়। ২০০৬ সালে এসব গাছ লাগিয়েছিল বন বিভাগ।

দর্শনার্থীদের জন্য আকর্ষণীয় তৃতীয় সৈকতটির নাম বাহারছড়া। বাঁশখালীর প্রধান সড়কের কালীপুর ইউনিয়নের সালেহার বাপের পুল থেকে পশ্চিম দিকে বশিরুল্লাহ মিয়াজির বাজার হয়ে এ সৈকতে যেতে হয়। বেড়িবাঁধের সিসি ব্লক আর স্থানীয় কিছু ছোট দোকানের কারণে এ জায়গা পর্যটকদের জন্য আকর্ষণের। বেড়িবাঁধে সূর্যাস্ত দেখার আয়োজন হিসেবে চেয়ার, টেবিল ও বড় ছাতা বসিয়ে রেখেছেন স্থানীয় দোকানিরা। এ ছাড়া মাঝারি ও ছোট সাইজের ঝাউগাছ দেখতেও সৈকতে অনেকে আসেন।

সৈকতের উত্তর পাশে এক কিলোমিটারজুড়ে বেড়িবাঁধে বসানো হয়েছে সিসি ব্লক। ওই ব্লকে বসে সমুদ্র দেখার পাশাপাশি সূর্যাস্ত উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা। ওই এক কিলোমিটারজুড়ে সৈকতে দোকানিরা চেয়ার–টেবিল আর বড় ছাতা বসিয়েছেন। সেখানে খাওয়ার পাশাপাশি সময় আড্ডায় মেতে ওঠেন বিভিন্ন বয়সী লোকজন। বাহারছড়া সৈকতের দক্ষিণ দিকের আধা কিলোমিটার সৈকতে লাগানো হয়েছে ঝাউগাছ।

রয়েছে পাহাড়-ইকোপার্ক

উপজেলার প্রধান সড়কের পূর্ব দিকজুড়েই বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চল। পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালীপুর, বৈলছড়ি, জলদি, শীলকূপ, চাম্বল ও পুইছড়ি—এই আট ইউনিয়নের পূর্বাঞ্চলই পাহাড়ঘেরা। এর মধ্যে কালীপুর ইউনিয়নেই রয়েছে উপজেলার সর্বোচ্চ পাহাড়। সেই পাহাড়চূড়া থেকে শঙ্খ নদ আর গণ্ডামারা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দৃশ্য দেখা যায়।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে চাম্বল ইউনিয়নের ‘মিনি কাশ্মীর’। বাঁশখালীর প্রধান সড়ক থেকে তিন থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার ভেতরে চাম্বলের পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি এলাকা আম্বাঘোনা, ছিবাজিল্লা ঝিরি, গৌরাণিতা ঝিরি ও বন্বিতার ঝিরি—এ চার অঞ্চল ‘বাঁশখালীর মিনি কাশ্মীর’ নামে পরিচিত। চট্টগ্রাম শহর থেকে উত্তর চাম্বল হয়ে সিকদার দোকান পর্যন্ত রিকশায় এসে প্রায় ২০ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছানো যায় সেখানে।

এ ছাড়া উপজেলায় পাহাড়ের সৌন্দর্যের আরেক আকর্ষণ ‘বাঁশখালী ইকোপার্ক।’ শীলকূপ ইউনিয়নে ২০০৩ সালে পার্কটি করা হয়। প্রায় এক হাজার হেক্টর উঁচু-নিচু পাহাড়, লেকের স্বচ্ছ পানি আর ঘন বনাঞ্চলের এ পার্কেও আসছেন অনেকে। এতে প্রায় ৩১০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। বাঁশখালীর প্রধান সড়কের মনসুরিয়া বাজার থেকেই পার্কে যাওয়া যায়।

বাঁশখালীর বাসিন্দা ও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আলমগীর মোহাম্মদ বলেন, ভৌগোলিকভাবে বাঁশখালী বিচিত্র এলাকা। পর্যটন করপোরেশনের যথাযথ মনোযোগ পেলে বাঁশখালী হয়ে উঠবে পর্যটনশিল্পে এক নতুন সম্ভাবনার সংযোজন।

চা বাগান ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছেন কয়েকজন দর্শনার্থী। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বেলগাঁও চা বাগানে
চা বাগান ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছেন কয়েকজন দর্শনার্থী। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বেলগাঁও চা বাগানে। ছবি: প্রথম আলো

Sunday, April 5, 2026

চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফলের চাষ, এখন হোসেনের বাগানে কাজ করেন ৫ জন by নেয়ামতউল্যাহ

একসময় ধান ছাড়া কিছুই চাষ হতো না। অথচ সেই ধানি জমিতেই ফলছে মিষ্টি কুল, আম ও কমলা। ভোলার লালমোহন উপজেলার এক কৃষকের সাহসী সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে এলাকার কৃষিচিত্র। করোনাকালে শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসে মো. হোসেন বিশ্বাস (৪৫) প্রমাণ করেছেন—সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে ধানি জমিতেও ফলানো যায় স্বাবলম্বিতার গল্প।

ভোলার লালমোহন উপজেলার পূর্ব চরউমেদ গ্রামের হোসেন বিশ্বাস ১৮০ শতাংশ জমিতে গড়ে তুলেছেন একটি মিশ্র ফলের বাগান। এখানে ফল কিনতে এখন আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ আসছেন।

মো. হোসেন বিশ্বাসের বাবা জালাল আহমেদ বিশ্বাস (৭১) বলেন, করোনার লকডাউনের সময় তাঁর ছেলে বেকার হয়ে ঢাকা থেকে গ্রামে ফিরে আসেন। ফল চাষের জন্য জমি চাইলে তিনি প্রথমে রাজি হননি। তাঁর যুক্তি ছিল, ১৮০ শতাংশ জমিতে যেখানে ৬০–৭০ মণ ধান হয়, সেখানে ফল চাষ করে লাভ কী। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘ফল তো পাখি ছাড়া কেউ খায় না।’ কিন্তু ছেলের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজি হন। এখন বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ বিমুখ করে না, প্রথম বছরেই লাভ হলো। এখন তো আর কথা নেই।’

সরেজমিনে দেখা যায়, ভোলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে ডাওরী–বাহাদুর চৌমহনী–রায়চাঁদ বাজার সড়কের পূর্ব পাশে ধানি জমিতে মাটি ফেলে কাঁটা মান্দারের ডাল পুঁতে সুপারির চারা লাগানো হয়েছে। মান্দার পাতা পচে সারে পরিণত হয়—এটি ভোলার শত বছরের পুরোনো চাষপদ্ধতি। এই সুপারিবাগানের পাশেই নিয়ম ভেঙে গড়ে উঠেছে মো. হোসেনের মিশ্র ফলের বাগান।

যাঁরা একসময় হোসেন বিশ্বাসকে ‘পাগল’ বলতেন, তাঁরাই এখন ফলের বাগান করার কথা ভাবছেন। লালমোহন ও আশপাশের এলাকা থেকে আসা ক্রেতাদের বাগান থেকে বরই কিনতে দেখা যায়। তাঁদের ভাষ্য, সুপারিবাগানের তুলনায় অন্যান্য ফলের বাগানে আয় অনেক বেশি।

হোসেন ৬০ শতাংশ জমিতে অস্ট্রেলিয়ান জাতের বলসুন্দরী কুল, ৪০ শতাংশে চায়না টকমিষ্টি কুল, ২০ শতাংশে থাই আপেল, ভারত সুন্দরী ও কাশ্মীরি আপেল কুলের চাষ করেছেন। এসব চারা তিনি সংগ্রহ করেছেন রাজশাহীর এক বন্ধুর খামার থেকে। এ ছাড়া বাগানে আছে ১৩০টি হলুদ মাল্টা, ৬০টি দার্জিলিং কমলা ও ১৪০টি বিভিন্ন জাতের আমগাছ।

ভোলায় আগে থেকেই বাউকুল, নারকেলি কুল, টক বোল, মিষ্টি বোল ও খুদে আপেল কুলের চাষ হলেও ২০২২ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে বলসুন্দরী, চায়না টকমিষ্টি ও কাশ্মীরি আপেল কুলের আবাদ শুরু হয়। এসব জাতের ফলন ও দাম দুটিই ভালো। মো. হোসেন এ বছর বাড়ি থেকেই কুল বিক্রি শুরু করেছেন ২০০ টাকা কেজি দরে, বর্তমানে বলসুন্দরী বিক্রি হচ্ছে ১৩০ টাকা কেজি।

মো. হোসেন বিশ্বাস বলেন, তিনি দীর্ঘদিন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সদরুল আমিনের অধীনে কাজ করেছেন। সেখান থেকে ফল চাষের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে মেট্রোরেলে চাকরি করলেও করোনায় বেকার হয়ে পড়েন। তিনি বলেন,‘আল্লাহ প্রথম বছরেই মুখ তুলে তাকিয়েছেন। গত বছর ২২ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছি। এ বছর শুধু কুল থেকেই ১৮ লাখ টাকার বিক্রি আশা করছি।’

হোসেনের বাগানে পাঁচজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। তাঁদের প্রতিদিন ৮০০ টাকা মজুরি ও চারবার নাশতা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাঁদের এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাঁরা নিজেরাও ভবিষ্যতে বাগান করতে পারেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে ফলের আবাদ হয়। এর মধ্যে নারকেল, সুপারি, কাঁঠাল ও তরমুজের আবাদ প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর। তবে অন্যান্য ফলের ক্ষেত্রে জেলার প্রায় ২১ লাখ মানুষের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফলে সারা বছর বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়।

লালমোহন উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, বেলে দোআঁশ মাটি ও আবহাওয়া বলসুন্দরী, টকমিষ্টি ও কাশ্মীরি আপেল কুলের জন্য খুবই উপযোগী। এমনকি লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও কুল ভালো হয়। তাই বেকার যুবকেরা সহজেই এই চাষে স্বাবলম্বী হতে পারেন। মো. হোসেনের বাগান দেখে ইতিমধ্যে ওই গ্রামের বেকার যুবকেরা প্রায় ১২ একর জমিতে ফলের আবাদ শুরু করেছেন।

ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ) কৃষিবিদ এ আর এম সাইফুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত বলসুন্দরী ও কাশ্মীরি আপেল কুল উচ্চফলনশীল। ভোলার উর্বর জমিতে এসব জাতের ফলন আরও বেশি হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বাজারে ফলের সরবরাহ বেড়েছে। ভোলায় ফল চাষের সম্ভাবনা ও চাহিদা—দুটিই আছে। কৃষি বিভাগ ফলের আবাদ বাড়াতে নানা প্রকল্প নিয়ে কৃষকদের পাশে আছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-28%2Ffg8hqd0j%2FBhola-1.jpg?rect=480%2C0%2C3204%2C2136&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
হোসেন ৬০ শতাংশ জমিতে অস্ট্রেলিয়ান জাতের বলসুন্দরী কুল, ৪০ শতাংশে চায়না টকমিষ্টি কুল, ২০ শতাংশে থাই আপেলের চাষ করেছেন। ছবি: প্রথম আলো

Tuesday, March 31, 2026

শহরের কাছেই পাহাড়–ঝরনা ও সাগর–হ্রদ, ঘুরে আসুন এক দিনে by কৃষ্ণ চন্দ্র দাস

পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঝরনার পানি। পাশেই আঁকাবাঁকা হ্রদ। একটু দূরে সমুদ্রসৈকত ঘেঁষে ছোটাছুটি করছে নৌকা। এমন সব দৃশ্যের দেখা মেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। পাহাড়–ঝরনা ও সাগর–হ্রদ সবকিছুই রয়েছে এই উপজেলায়। ফলে সীতাকুণ্ডে ভ্রমণে এসে খুব অল্প সময়েই মুগ্ধ হন পর্যটকেরা।

সীতাকুণ্ডে বেড়ানোর উপযুক্ত সময় বর্ষা থেকে শীত মৌসুম। বর্ষায় পানিতে টইটম্বুর থাকে ঝরনা। তবে এ সময় ভ্রমণ কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই শীত মৌসুমকেই নিরাপদ ভ্রমণ ও ট্রেকিংয়ের উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেন পর্যটকেরা। শীতল আবহাওয়ার কারণে এ সময় পাহাড়, জঙ্গল ও বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে ক্লান্তি লাগে না। সহজেই পাহাড়ে বেয়ে ওপরে ওঠা যায়।

সীতাকুণ্ডের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মহাসড়কের পূর্ব পাশে সারি সারি পাহাড়। আর সেখানেই রয়েছে ঝরনা ও হ্রদ। পাহাড়গুলোয় হনুমান–বানরসহ বন্য প্রাণীর ছোটাছুটি, ঝিঁঝি পোকার ডাক ও পাখির কলতান উপভোগ করা যায়। আর পশ্চিম দিকে সমুদ্রসৈকত। সেখানে বসে উপভোগ করা যায় লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি, সাগরের গর্জন ও মাছ ধরার নৌকাসহ মনোরম নানা দৃশ্য।

সীতাকুণ্ড উপজেলাটি চট্টগ্রাম নগরের পাশেই। ফলে চট্টগ্রাম নগর থেকে মাত্র এক দিনেই সীতাকুণ্ডের পাহাড়–ঝরনা ও সাগর–হ্রদের দৃশ্য উপভোগের সুযোগ রয়েছে। তবে সময় থাকলে দুই থেকে তিন দিনের ভ্রমণের পরিকল্পনাও নিতে পারেন। একটু আগেভাগে কোথায়, কীভাবে যাবেন—এসব ঠিক করে রাখলে ভ্রমণ যেমন আনন্দদায়ক হবে, তেমনি খরচও কম হবে।

সীতাকুণ্ডে ভ্রমণের ক্ষেত্রে পাহাড় ট্রেকিং ও ঝরনা–হ্রদ সকালে ঘুরে দেখাই ভালো। তাহলে বিকেলে সমুদ্রসৈকতে ঘুরে বেড়ানো যায়। সাগরপাড়ে বসে দেখা যায় সূর্যাস্তের দৃশ্য।

সীতাকুণ্ডে মোট আটটি ঝরনা রয়েছে। ঝরনাগুলো হলো সহস্রধারা–১, রূপসী ঝরনা, সুপ্তধারা, সহস্রধারা–২, মধুখাইয়া, বাড়বকুণ্ডের অগ্নিকুণ্ড, বাঁশবাড়িয়া বিলাসী ঝরনা ও কুমারীকুণ্ড। এর মধ্যে সহজেই সহস্রধারা–২ ঝরনাটিতে যেতে পারেন পর্যটকেরা। কিন্তু অন্য সাতটি ঝরনায় যেতে হলে পর্যটকদের পাহাড় ডিঙিয়ে যেতে হয়। পাহাড় ডিঙিয়ে ঝরনার কাছে যাওয়ার রোমাঞ্চকর যাত্রা পর্যটকেরা বেশ উপভোগ করেন। সীতাকুণ্ডে ঘুরে বেড়ানোর মতো তিনটি সমুদ্রসৈকত রয়েছে। এর মধ্যে আকিলপুর ও বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকত বালুময়। এর বাইরে গুলিয়াখালী সৈকতটি ম্যানগ্রোভ বনযুক্ত।

কম পরিশ্রমে ঝরনা, হ্রদ ও সমুদ্রসৈকত দেখতে এক দিনের ভ্রমণের পরিকল্পনায় রাখতে পারেন সহস্রধারা ঝরনা–২ ও লবণাক্ষ হ্রদ ও গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত। তবে কিছুটা পরিশ্রম করলে এর সঙ্গে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের সুপ্তধারা ঝরনা ও সহস্রধারা ঝরনা–১ ঘুরে আসা যায়। সীতাকুণ্ডে পর্যটকদের জন্য কিছুটা কষ্টকর যাত্রা হয় চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মন্দির, রূপসী ঝরনা ও বিলাসী ঝরনায় যাওয়ার ক্ষেত্রে। তবে সুবিধা হলো সীতাকুণ্ডের সব পর্যটন স্পটই মাত্র ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে।

সীতাকুণ্ডে যাওয়া ও থাকা

ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে যেকোনো বাসযোগে সীতাকুণ্ড পৌর সদরের বাসস্ট্যান্ডে নামতে হবে। চট্টগ্রাম নগর থেকে যেতে খুব একটা সময় লাগে না। তাই দূরের পর্যটকেরা চট্টগ্রাম নগরে রাতযাপন করে সীতাকুণ্ডে ঘুরে বেড়াতে পারেন। তবে সীতাকুণ্ডেও বিভিন্ন মানের ১৯টি হোটেল রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ১০টি হোমস্টে। ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যেই কক্ষ ভাড়া পাওয়া যায়।

ভ্রমণ পরিকল্পনা–১

ঝামেলা এড়িয়ে কম পরিশ্রমে এক দিনের পরিকল্পনায় রাখতে পারেন সহস্রধারা ঝরনা–২, লবণাক্ষ হ্রদ ও গুলিয়াখালী সৈকতে ঘুরে বেড়ানো। লবণাক্ষ হ্রদ ও সহস্রধারা ঝরনা–২ যেতে সীতাকুণ্ড পৌর সদর থেকে মিনিবাস কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ছোট দারোগাহাট নামতে হবে। এরপর হেঁটে কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় সূর্য মন্দির যেতে হবে। তারপর টিকিট কেটে লবণাক্ষ হ্রদে বেড়াতে পারেন। নৌকায় ভ্রমণ করতে করতে একসময় পৌঁছে যাবেন সহস্রধারা ঝরনা–২–এ। সেখানে ঝরনার পানিতে নিজেকে ভিজিয়ে নিতে পারেন। তবে হ্রদের পানিতে না নামায় উত্তম। কারণ, হ্রদটি অত্যন্ত গভীর এবং পানিও ঠান্ডা। এই ঝরনা দেখার যাত্রা সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে করাই ভালো। এরও আগে যেতে পারেন। যেতে সময় লাগতে পারে আধা ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা। তবে যেভাবেই যান না কেন, ফিরতে হবে বেলা দেড়টার মধ্যে।

সীতাকুণ্ডে যদি হোটেল ভাড়া নেন, তবে এর আশপাশে দুপুরের খাবার সেরে হালকা বিশ্রাম নিলে ক্লান্তি কম হয়। বিশ্রাম শেষে পৌর সদরের নামার বাজার সড়কের মাথায় গিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গুলিয়াখালী সৈকতের উদ্দেশে রওনা দিতে হবে। বেলা সাড়ে তিনটার মধ্যে গুলিয়াখালী বেড়িবাঁধে পৌঁছাতে পারলে সুবিধা হয়। এরপর হেঁটে কিংবা নৌকায় মূল সৈকতে যাওয়া যায়। সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে কাটিয়ে ভ্রমণ শেষ করতে পারেন।

ভ্রমণ পরিকল্পনা–২

পাহাড় ট্রেকিং, দুটি ঝরনা ও সমুদ্রসৈকত দেখতে এ পরিকল্পনাটি করতে পারেন। এটিতে রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন, সুপ্তধারা ঝরনা ও বাঁশবাড়িয়া সৈকতে ঘুরে বেড়ানো। এটিও শুরু করার উত্তম সময় সকাল ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে।
সীতাকুণ্ড পৌর সদরের মন্দির সড়কের মাথা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যেতে হবে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্কের ফটক। এরপর টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলেই পাহাড় ট্রেকিং শুরু। কিছুদূর গেলে দেখা মিলবে সুপ্তধারা ঝরনার। এরপর সেখান থেকে পাহাড় বেয়ে আরও এক হাজার ফুট ওপরে উঠলে দেখা মিলবে সহস্রধারা ঝরনা–১। সেখান থেকে বেলা আড়াইটার মধ্যে ফিরতে হবে। এরপর হালকা বিশ্রাম শেষে রওনা দিতে হবে বাঁশবাড়িয়া সৈকতের উদ্দেশে। ইকোপার্কের গেট থেকে কিংবা সীতাকুণ্ড বাসস্ট্যান্ড থেকে ৮ ও ১৭ নম্বর মিনিবাসে বাঁশবাড়িয়া বাজারে নামতে হবে। এরপর মহাসড়ক পার হয়ে সৈকত সড়কের মাথা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাওয়া যায় সমুদ্রসৈকতে। বিকল্প হিসেবে পৌর সদরের কলেজ রোডের মাথা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে বাঁশবাড়িয়া সৈকতে যাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া দরদাম করে নিতে হবে।

ভ্রমণ পরিকল্পনা–৩

ভূমি থেকে ১ হাজার ২০০ ফুট ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় থাকা চন্দ্রনাথ মন্দির ও সমুদ্রসৈকত ভ্রমণে এ পরিকল্পনাটি নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ভ্রমণ সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যে শুরু করতে পারলে ভালো হয়। পাহাড় বেয়ে ওঠানামায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে।

শুরুতেই পৌর সদরের মন্দির সড়কের মাথা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে ৩ নম্বর সেতু পর্যন্ত যেতে হবে। পথে অসংখ্য মঠ ও মন্দির দেখা যাবে। এরপর হেঁটে পাহাড়ে ওঠার পালা। পাহাড়টির একেবারে চূড়ায় রয়েছে চন্দ্রনাথ মন্দির। দ্বিতীয় বৃহত্তম চূড়ায় বিরূপাক্ষ মন্দির। চূড়ায় ওঠার সময় পথে পথে বানরের দেখা মিলতে পারে। শোনা যাবে পাখিদের কিচিরমিচির। বিরূপাক্ষ মন্দিরের কাছাকাছি গেলে মেঘের ছোঁয়াও পাওয়া যেতে পারে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পর ক্লান্ত–পরিশ্রান্ত শরীরে চারদিকে সবুজ পাহাড় দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যাবে। এরপর ফিরে এসে আকিলপুর সৈকতে বেড়াতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পৌর সদর থেকে ৮ ও ১৭ নম্বর মিনিবাসে ছোট কুমিরা বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে অটোরিকশায় সমুদ্রসৈকতে যাওয়া যায়।

ভ্রমণ পরিকল্পনা–৪

সূর্যাস্ত দেখা ও নৌকায় ভ্রমণের জন্য যেতে পারেন ভাটিয়ারী লেক ও সানসেট পয়েন্ট। এ দুটি পর্যটনকেন্দ্র সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত। চট্টগ্রাম নগর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে ভাটিয়ারী বাজার। সীতাকুণ্ড থেকে এর দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় শুরুতেই আপনি যেতে পারেন ভাটিয়ারী হ্রদে। এই যাত্রা দুপুরে শুরু করলেও পারবেন। সেখানে কিছুক্ষণ নৌকায় ভ্রমণ করে সেনাবাহিনী পরিচালিত সানসেট রেস্তোরাঁয় সময় কাটানো যায়। রেস্তোরাঁটি পাহাড়ের টিলায়। সেখান থেকেও সুন্দর সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়। একই দিনে আপনি চাইলে সকালে কিংবা বিকেলে কুমিরা জেটি ঘুরে আসতে পারেন। ৭০০ মিটারের জেটিতে দাঁড়িয়ে সাগরের দৃশ্য দেখে মনোরম বিকেল কাটানো যায়। এ ছাড়া সেখান থেকে দেখা যায় জাহাজভাঙার কাজ। উপকূলের কিছু কারখানায় পুরোনো জাহাজ কাটা হয়।

ভ্রমণ পরিকল্পনা–৫

সীতাকুণ্ড ভ্রমণে অগ্নিকুণ্ড মন্দির, অগ্নিকুণ্ড ঝরনা ও সৈকত ভ্রমণও রাখতে পারেন পরিকল্পনায়। এর জন্য ভ্রমণ শুরু করতে হবে সকালে। সীতাকুণ্ড সদর কিংবা চট্টগ্রাম নগর থেকে বাসযোগে বাড়বকুণ্ড বাজারে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা ব্যাটারিচালিত রিকশায় যাওয়া যাবে অগ্নিকুণ্ড মন্দিরের একেবারে কাছে। এরপর ছোট্ট একটি পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠলে অগ্নিকুণ্ড মন্দির। সেখানে দেখা যাবে পানির ওপরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। মন্দিরের কাছেই অগ্নিকুণ্ড ঝরনা। তবে শীতকালে এই ঝরনায় পানি থাকে না। অগ্নিকুণ্ড মন্দির থেকে ফিরে এসে বিকেলে যেকোনো একটি সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণের মতো পর্যাপ্ত সময় থাকে।

পাশেই মিরসরাই

সীতাকুণ্ডের মতো ঝরনা–হ্রদ রয়েছে পাশের উপজেলা মিরসরাইয়েও। সেখানে মুহুরী প্রজেক্ট, মহামায়া হ্রদ, খৈয়াছাড়া ঝরনা, রূপসী ঝরনা, ডোমখালী সমুদ্রসৈকত, মেলখুম ট্রেইলসহ বেশ কিছু পর্যটন স্পট রয়েছে। সীতাকুণ্ডের সঙ্গে চাইলে পাশের উপজেলা মিরসরাইয়ের এসব পর্যটনকেন্দ্রও ভ্রমণের পরিকল্পনায় রাখা যায়।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা ঝরনা। সম্প্রতি তোলা
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা ঝরনা। সম্প্রতি তোলা। ছবি: প্রথম আলো

Monday, March 30, 2026

চিকিৎসায় লাখো রোগীর ভরসা মা ও শিশু হাসপাতাল by ফাহিম আল সামাদ

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে একজন রোগী মাত্র ১০০ টাকা খরচ করে চিকিৎসক দেখাতে পারেন। সেখানে চিকিৎসকেরা সরাসরি তাঁদের সেবা দেন। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়, তবে এর জন্য বাড়তি টাকা লাগে না।

সন্তানের হঠাৎ জ্বরে আঁতকে ওঠেন মো. ইয়াসিন আরাফাত। তড়িঘড়ি করে বাসার কাছে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ছুটে আসেন তিনি। চিকিৎসকদের জানান, ছেলে দুই দিন ধরে জ্বরে ভুগছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসক তাঁকে আশ্বস্ত করেন, তাঁর সন্তান ঠিক আছে। সাধারণ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছে। বাসায় পরিচর্যা হলেও সুস্থ হয়ে যাবে।

সম্প্রতি নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে কথা হয় ইয়াসিনের সঙ্গে। বাবার কাঁধে মাথা দিয়ে আছে তিন বছরের শিশু রায়হান। ইয়াসিন জানান, পরিবার নিয়ে আগ্রাবাদ রঙ্গিপাড়া এলাকায় থাকেন তিনি। পেশায় ব্যবসায়ী। সন্তানের হঠাৎ জ্বরে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার আতঙ্কে ভুগছিলেন। এখন নিশ্চিন্ত হয়েছেন।

ইয়াসিনের সঙ্গে কথা বলার সময় হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বহির্বিভাগে আরও ৩০ থেকে ৪০ জন অপেক্ষা করছিলেন। জ্বর, সর্দি-কাশি, ব্যথা—এসব সমস্যায় তাঁদের সবার শিশু আক্রান্ত। নগরের আগ্রাবাদ, চৌমুহনী, হালিশহর ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের জন্য কাছের হাসপাতাল এটি, যেখানে দ্রুত ও সহজে সেবা পান বলে জানিয়েছেন রোগীরা।

হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে মিলে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার রোগী হাসপাতাল থেকে সেবা নিচ্ছেন। এর মধ্যে বহির্বিভাগ থেকে সেবা নিচ্ছেন ১ হাজার ২০০ জনের বেশি। গত বছর মোট ৪ লাখ ৭১ হাজার রোগী হাসপাতালটির বহির্বিভাগ থেকে সেবা নিয়েছেন। সব মিলিয়ে রোগী ছিল ৭ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে একজন রোগী মাত্র ১০০ টাকা খরচ করে চিকিৎসক দেখাতে পারেন। সেখানে চিকিৎসকেরা সরাসরি তাঁদের সেবা দেন। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়, তবে এর জন্য বাড়তি টাকা লাগে না। তবে সরাসরি অধ্যাপককে দেখাতে চাইলে ৫০০ টাকা, সহযোগী অধ্যাপককে ৪০০ টাকা ও সহকারী অধ্যাপককে দেখাতে চাইলে ৩৫০ টাকা ফি দিতে হয় একজন রোগীকে।

হাসপাতালের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ডা. মো. নুরুল হক বলেন, কোনো রোগী যদি অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক কিংবা সহকারী অধ্যাপককে ফি দিয়ে দেখান, তাহলে এক সপ্তাহের মধ্যে আবার তিনি দেখাতে পারবেন। এর জন্য বাড়তি কোনো টাকা লাগবে না।

মূলত প্রায় ১০ হাজার আজীবন সদস্য, ৪০০ দাতা সদস্য ও সরকারি-বেসরকারি অনুদানে চলে বৃহৎ এই হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য আজীবন সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। ভবিষ্যতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নতুন আরেকটি রেডিওথেরাপি মেশিন কেনার পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া এমআরআই ও মেমোগ্রাফি মেশিনও কেনার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

নগরের আগ্রাবাদ এলাকায় ১৯৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চারতলা ভবনে যাত্রা শুরু হয়। সে শুরুর তিন বছরে রোগীর সংখ্যা ছিল সব মিলিয়ে ৩৫ হাজারের মতো। সে সময় প্রায়ই আগ্রাবাদ এলাকায় জোয়ারের পানির কারণে হাসপাতালের নিচতলায় গোড়ালিসমান পানি উঠত। এরপর চার দশক পেরিয়েছে। প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৪ সালে ১৩ তলার নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণ শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

২০২৩ সালে চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতাল নামে উদ্বোধন করা হয় সেই ভবন। বর্তমানে হাসপাতালের সব বিভাগ এ ভবনেই। পাশাপাশি ১৫০ শয্যার ক্যানসার ইনস্টিটিউটের ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে ২০২১ সালে। ১৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই ইনস্টিটিউট ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর উদ্বোধন করা হয়। এখন পর্যন্ত ৮০০-এর মতো রোগী এখান থেকে রেডিওথেরাপি সেবা নিয়েছেন। প্রতিদিন এ সেবা নিচ্ছেন ৬০-৬৫ জন।

৪০০ চিকিৎসকসহ প্রায় ২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন এখানে। হাসপাতালটিতে সাধারণ সব রোগের চিকিৎসাসহ ৩৪ শয্যার সিসিইউ, ৩০ শয্যার অত্যাধুনিক আইসিইউ, কার্ডিয়াক ইউনিট, নিওনেটলজি, শিশু আইসিইউ, নিউরোসার্জারি, মা-শিশুর জন্য বিশেষ ইউনিট, কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার ও শিশুবিকাশ কেন্দ্র রয়েছে। ক্যাথল্যাবে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চিকিৎসার পাশাপাশি স্বাস্থ্য শিক্ষাতেও নানা উদ্যোগ তারা নিয়েছে। ২০০৫-০৬ সালে ৫০ আসনের চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে প্রতি ব্যাচে ১১৫ জন শিক্ষার্থী এমবিবিএস সম্পন্ন করছেন। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নার্সিং ইনস্টিটিউটে ডিপ্লোমা কোর্সে ৫০ জন এবং ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নার্সিং কলেজের বিএসসি অনার্স (নার্সিং) কোর্সে ৫০ জন ভর্তি করা হয় বছরে।

হাসপাতালের নির্বাহী কমিটির সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি, যাতে রোগীদের সব ধরনের সুবিধা দিতে পারি। মা ও শিশু হাসপাতালের অধীন জেনারেল হাসপাতাল, ক্যানসার ইনস্টিটিউট, নার্সিং ইনস্টিটিউটসহ বেশ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা আছে আরও কিছু যন্ত্রপাতি কেনার। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।’

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন একজন চিকিৎসক। সম্প্রতি তোলা
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন একজন চিকিৎসক। সম্প্রতি তোলা। ছবি: সৌরভ দাশ

Friday, March 6, 2026

চট্টগ্রামের নামী বেকারি-রেস্তোরাঁয় কী খাচ্ছে মানুষ by ফাহিম আল সামাদ

প্রকাশ ০৬ মার্চ ২০২৬ঃ বেকারির সামনে ফুটপাতের ওপর টেবিলে সাজিয়ে রাখা নানা পদের ইফতারি। মুখরোচক সব খাবার কিনতে ব্যস্ত ক্রেতারা। তবে বেকারির ভেতরের যেতেই দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বেকারির রান্নাঘরের দেয়ালজুড়ে কয়েক শ তেলাপোকার বিচরণ। এর পাশেই তৈরি করা হচ্ছিল মুখরোচক এসব ইফতারি। স্যাঁতসেঁতে রান্নাঘরে খাদ্য তৈরিতে নেই স্বাস্থ্যবিধির বালাই।

গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড় এলাকায় হারুন বেকারিতে গিয়ে এমন চিত্র দেখতে পান জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করে সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়। জানতে চাইলে অধিদপ্তরের উপপরিচালক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছোট একটা বেকারি; দেখলে মনে হয় তেলাপোকার ফ্যাক্টরি। আমরা রান্নাঘরে ঢুকেই রীতিমতো অবাক হয়েছি। দেয়ালজুড়ে তেলাপোকার বিচরণ। রান্নাঘরে সেগুলো ঘোরাঘুরি করছিল।’

শুধু হারুন বেকারি নয়, গত ১০ দিনে চট্টগ্রাম নগরের অন্তত ৫টি খাদ্য তৈরি বেকারি ও রেস্তোরাঁয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পেয়েছেন নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তারা। এর মধ্যে বারকোড সুইটস, মেরিডিয়ান রেস্তোরাঁর মতো নামী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তেলাপোকা বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও জীবাণু বহন করে, যা খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ডায়রিয়া, আমাশয়, ফুড পয়জনিংসহ নানা রোগের কারণ হতে পারে।

যেখানে যা দেখলেন কর্মকর্তারা

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি নগরের চকবাজার এলাকায় নামী রেস্তোরাঁ কাচ্চি ডাইনে পরিদর্শনে যান জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসন। প্রতিষ্ঠানটির রান্নাঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে তেলাপোকা ও ইঁদুরের বিচরণ। ১ মার্চ মুরাদপুর এলাকায় বারকোড সুইটস অ্যান্ড কনফেকশনারির রান্নাঘরে গিয়েও তাঁরা তেলাপোকা-ছারপোকার বিচরণ ও বিড়ালের উপস্থিতি দেখতে পান।

গত বুধবার কালুরঘাট এলাকার বিএসপি ফুড প্রোডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেড ও গতকাল বৃহস্পতিবার গরীবুল্লাহ শাহ হাউজিং এলাকায় হোম রেসিপি ফুড বেকারি গিয়েও তেলাপোকা পাওয়া গেছে রান্নাঘরে। চারটি প্রতিষ্ঠানের রান্নাঘরই স্যাঁতসেঁতে ও অপরিচ্ছন্ন বলে জানিয়েছেন নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তারা। তাঁরা জানান, এসব প্রতিষ্ঠানকে আগে মোটা অঙ্কের জরিমানা ও সতর্ক করলেও আবার একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায় বলে কর্মকর্তার জানিয়েছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান জরিমানা দেওয়ার পর সাময়িকভাবে কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

রাসায়নিকের অবাধ ব্যবহার

নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা ও ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নয়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ব্যবহার করা হচ্ছে অবাধে। খাদ্যপণ্যে ব্যবহারযোগ্য নয়—এমন রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে ইফতারের খাদ্যপণ্য তৈরিতে। জিলাপি তৈরিতে দেদার ব্যবহার করা হচ্ছে হাইড্রোজ বা সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড।

গতকাল বৃহস্পতিবার নগরের চকবাজার এলাকায় সাতকানিয়া ভাতঘর নামের প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। এ সময় সেখানে জিলাপি তৈরিতে হাইড্রোজের ব্যবহার করতে দেখা যায়। দীর্ঘ সময় বা অতিরিক্ত মাত্রায় এর সংস্পর্শে এলে কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অনেক সময় মেধাশক্তি দুর্বলও করে দেয়।

কর্মকর্তারা বলছেন, হাইড্রোজ যে ড্রামে আনা হয়, এর ওপরেই লেখা আছে, এটি ব্যবহারের সময় খাওয়া বা পান করা যাবে না। কারণ, এটি বাতাসের ক্ষতিকর কণা ছড়ায়। এটি ব্যবহার করা হয় পোশাক খাতে। আর সেটি ব্যবহার হচ্ছে খাবার তৈরিতে। গোপালজল, কেওড়াজলও খাবারে ব্যবহার নিষিদ্ধ, তবু ব্যবহার করা হচ্ছে।

এসব প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়ার মতো শাস্তি প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জরিমানা করে এসব প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়ার কারণে তারা একই ভুল আবার করে। যেহেতু সিলগালা করে দেওয়ার বিধান আছে, তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে কঠিন শাস্তি দিলে বাকিরা সতর্ক থাকবে।

নগরের জিইসি মোড়ের হারুন বেকারিতে কয়েক শ তেলাপোকার বিচরণ। গতকাল তোলা
নগরের জিইসি মোড়ের হারুন বেকারিতে কয়েক শ তেলাপোকার বিচরণ। গতকাল তোলাছবি: সংগৃহীত

Wednesday, February 25, 2026

আপেল–কমলার দাম বেশি, চাপে ক্রেতা by সুজয় চৌধুরী

প্রকাশ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ইফতারের টেবিলে ফল যেন অনিবার্য। সারা দিন রোজা রাখার পর এক টুকরা আপেল, কয়েক কোয়া কমলা বা একমুঠো আঙুর; অনেকের কাছে তা শুধু খাবার নয়, স্বস্তির অংশ। কিন্তু পবিত্র রমজানের শুরুতেই চট্টগ্রামের বাজারে এসব পরিচিত ফল হাতে নিতে গিয়েই হোঁচট খাচ্ছেন ক্রেতারা। পাইকারি থেকে খুচরা—সব পর্যায়েই দাম বেড়েছে।

নগরের স্টেশন রোডের ফলমন্ডির পাইকারি বাজারে গতকাল শুক্রবার দেখা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার আপেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৭০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে ছিল ২৪০ টাকা। চীনের কমলা ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২৮০ টাকা। আঙুরের দাম আরও বেশি। চীনের লাল আঙুর ৪২০ টাকা, কালো ৫৫০ টাকা ও সাদা ২৫০ টাকা কেজি। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি জাতেই ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মিসরের মাল্টা ২৬০ টাকা ও চীনের মাল্টা ২২৪ টাকা কেজি।

পাইকারি ফল বিক্রেতা মোহাম্মদ হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, রোজার শুরুতে দাম কিছুটা বাড়তি থাকে। গত কয়েক বছরও একই চিত্র দেখা গেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে সম্প্রতি কর্মবিরতি চলেছে। এতে পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। বিদেশি ফলের অনেক জাহাজ আটকে ছিল। এখন প্রতিদিন খালাস হচ্ছে। শিগগিরই দাম কমে যাবে।

পাইকারি দামের সঙ্গে খুচরা বাজারের ব্যবধান ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। নগরের ২ নম্বর গেট, প্রবর্তক মোড়, হামজারবাগ, কর্নেলহাট ও স্টেশন রোড ঘুরে দেখা গেছে, কমলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৩৬০ টাকা, আপেল ৩৮০ টাকা, কালো আঙুর ৬৫০ টাকা, লাল আঙুর ৫০০ টাকা ও মাল্টা ৩৩০ থেকে ৩৮০ টাকায়।

হামজারবাগে ফল কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘রোজায় বাচ্চারা ফল চায়। কিন্তু এক কেজি ভালো আঙুর কিনতে গেলেই ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাগে। সব ফল একসঙ্গে কেনা যায় না। তাই কম কিনছি।’

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারেই দাম বেশি। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, দোকানের ভাড়া, শ্রমিকের মজুরি ও পচনশীল পণ্যের ঝুঁকি যুক্ত হয়। কর্নেলহাটের ফল ব্যবসায়ী আবদুল হান্নান বলেন, ‘ফল বেশি দিন রাখা যায় না। নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কিছুটা বেশি রাখতে হয়। পাইকারির সঙ্গে ১০০ টাকা ব্যবধান মানেই, পুরোটা লাভ নয়। লাভ সীমিত।’

অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীদের দাবি, সরবরাহে বড় কোনো ঘাটতি নেই। চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী হোসেন বলেন, রোজায় চাহিদা বাড়ে বলেই দাম কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়। তবে প্রতিদিন ফলের চালান আসছে। কয়েক দিনের মধ্যে দাম কিছুটা সমন্বয় হতে পারে।

আমদানি ব্যয় বাড়তি

দেশে ৩৮ ধরনের ফল আমদানি হয়। এর প্রায় ৯৫ শতাংশই আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙুর ও আনার। বাকি অংশে রয়েছে নাশপাতি, কিউই, অ্যাভোকাডো, রাম্বুটানসহ নানা ফল।

বিদেশি ফলের দাম বাড়তে শুরু করে ২০২২ সালের জুন–জুলাই থেকে। ডলার–সংকটের সময় আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ক–কর বাড়ানো হয়। একই সময়ে ডলারের বিনিময় হারও বেড়ে যায়। আমদানিকারকদের ব্যয় বাড়ায় প্রভাব পড়ে বাজারে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারদর, ডলারের বিনিময় হার ও শুল্ক–কর কাঠামো—এই তিন বিষয় আমদানি করা ফলের দামে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ফল অনেক দিন ধরেই বিলাস পণ্য। শুল্ক–কর প্রায় ১২৩ শতাংশ। অর্থাৎ এখন এক কেজি আপেলে প্রায় ১২০ টাকা শুল্ক–কর দিতে হয়। এটি কমানো গেলে বাজারদরও কমতে পারে।

তদারকির দাবি

খুচরা বাজারে পাইকারির তুলনায় ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি দামে ফল বিক্রির বিষয়টি স্বাভাবিক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, মৌসুমি চাহিদাকে কেন্দ্র করে অযৌক্তিক মুনাফার প্রবণতা তৈরি হয়। বাজার স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর তদারকি দরকার। এবারও ফলের দাম বেড়ে গেছে। ফলে পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান বেশি হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিক্রির জন্য ফলের পসরা সাজিয়েছেন এক বিক্রেতা। গতকাল বেলা দুইটায় চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি বাজারে
বিক্রির জন্য ফলের পসরা সাজিয়েছেন এক বিক্রেতা। গতকাল বেলা দুইটায় চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়ি বাজারে। ছবি: প্রথম আলো

Thursday, February 19, 2026

‘আপনার ছেলে আর নেই, ইন্না লিল্লাহ পড়েন’ by আব্দুর রাজ্জাক

১৮ বছর বয়সী ফাহাদের চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। তবে উন্নত জীবনের আশায় দালালের মাধ্যমে বাবা তাঁকে পাঠিয়ে দেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। দালালের মাধমে ইথিওপিয়া থেকে ১৫ দিন দুর্গম জঙ্গলে পথচলার পর দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান ফাহাদ। তবে আফ্রিকায় পৌঁছেই মৃত্যু হয় তাঁর।

হাসিখুশি ফাহাদ সব সময় বিদেশে যেতে চাইতেন। তাঁর দুই মামা দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসা করে ভালো আয় করেন। নিজেদের অবস্থা বদলেছেন। তাই তিনিও চাইতেন তেমন কিছু করবেন। ছেলের ইচ্ছা পূরণ করতে ৯ লাখ টাকা খরচ করে দালালের মাধ্যমে ফাহাদকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠান তাঁর বাবা নুর মোহাম্মদ। তবে আফ্রিকায় পৌঁছেই মৃত্যু হয় ফাহাদের।

৩০ জানুয়ারি ঢাকা থেকে বিমানে দক্ষিণ আফ্রিকার পথে রওনা হন মো. ফাহাদ (১৮)। প্রথমে ইথিওপিয়া, সেখান থেকে আরেকটি বিমানে জিম্বাবুয়ে হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার কথা ছিল তাঁর, কিন্তু তা আর হয়নি। দালালেরা ইথিওপিয়া থেকে জঙ্গলের পথ ধরে জিম্বাবুয়ে নিয়ে যায় তাঁকে। সেখান থেকে সড়ক পথে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান ১৫ ফেব্রুয়ারি রোববার। রোববার সকালে ছেলে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছেছেন—এমন খবর পান ফাহাদের বাবা নুর মোহাম্মদ (৪৫)। কিন্তু সেই রাতেই আরেকটি টেলিফোনে ছেলের মৃত্যুর খবর আসে।

ফাহাদের কথা বলতে বলতে প্রতিমুহূর্তে কান্নায় গলা বুজে আসছিল নুর মোহাম্মদের। তিনি বলেন, ‘আমি ছেলেকে কখনো কোনো অভাব দেখাইনি। বলতাম, বাবা তুই পড়ালেখা কর। কিন্তু সে দক্ষিণ আফ্রিকা যেতে চাইত। এরপর ব্যবস্থা করে দিই। এখন আমার ফাহাদ আর নেই।’

নুর মোহাম্মদ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার জোয়ারা ইউনিয়নের উত্তর জোয়ারা গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে ফাহাদ ছিলেন মেজ। সম্প্রতি স্থানীয় কাঞ্চনাবাদ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন তিনি। চলতি বছর তাঁর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও আর পড়তে ইচ্ছুক ছিলেন না তিনি।

একটি বেসরকারি বিমা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নুর মোহাম্মদ বলেন, ফাহাদের দুই মামা আগে থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকেন। তাঁদের সেখানে ব্যবসা আছে। ফাহাদের বড় মামা প্রায় ১০ বছর আগে এবং ছোট মামা ৮ মাস আগে একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় গেছেন। ছেলের পীড়াপীড়িতে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি। সেই টাকা দিয়ে দালালের মাধ্যমে ফাহাদকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

নুর মোহাম্মদ বলেন, ঢাকা থেকে ৩০ জানুয়ারি আফ্রিকার উদ্দেশে বিমানে ওঠেন ফাহাদ। ১৫ ফেব্রুয়ারি রাতে হঠাৎ একটা ফোন আসে। ফোনে অপরিচিত একজন তাঁকে বলেন, ‘আপনার ছেলে ফাহাদ আর নেই, ইন্না লিল্লাহ পড়েন, সে মারা গেছে।’

পরিবারের ধারণা, দীর্ঘ পথযাত্রা, অনাহার, অসুস্থতা ও চিকিৎসার অভাবেই ফাহাদের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা ফাহাদকে ২০০ ডলার দিয়েছিলেন। ব্যাগেও পর্যাপ্ত শুকনা খাবার দিয়েছিলেন। তবে জঙ্গলে তাঁর থেকে সবকিছু ছিনতাই হয়েছে। এ কারণে ফাহাদকে কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে।

নুর মোহাম্মদ জানান, দালালেরা ঢাকা থেকে প্রথমে ইথিওপিয়া ও জিম্বাবুয়ে পর্যন্ত বিমানে নেওয়ার কথা বলেছিল। পরে সীমান্ত পার করে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ফাহাদকে ইথিওপিয়া থেকে একাধিক দেশ ঘুরিয়ে সড়কপথে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেওয়া হয়। এ কারণে অনেক সময় তাঁকে জঙ্গলে হাঁটতেও হয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলে এ যাত্রা।

১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ফাহাদের ছোট মামা মোহাম্মদ ফয়সাল দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে নুর মোহাম্মদকে ফোন করেন। তিনি জানান, ফাহাদ দক্ষিণ আফ্রিকার মুসিনা শহরে পৌঁছেছেন। সেখানের একটি কক্ষে তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন। শুনে স্বস্তি পেয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। ওই দিন রাতেই ফাহাদের মৃত্যুর খবর আসে ফোনে। ফাহাদের সঙ্গে থাকা পাসপোর্ট ও কাগজে দেওয়া ঠিকানা দেখে একজন নুর মোহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই খবর দেন।

ফাহাদের বাবা নুর মোহাম্মদ জানান, দালাল চক্রকে প্রথমে দুই লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি। পরে যাত্রা শুরুর করার সময় ব্যাংকের হিসাব নম্বরের মাধ্যমে আরও সাত লাখ টাকা দেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছানোর পর আরও দেড় লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। ফাহাদের মৃত্যুর খবরে দালালেরা টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

শোকে কাতর নুর মোহাম্মদের কান্নারও শক্তি নেই। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে অন্তত শেষবারের মতো দেখতে চাই। কীভাবে ওকে ছাড়া থাকব? এত হাসিখুশি ছেলেটার জীবন শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-18%2Ffm4052ve%2FWhatsApp-Image-2026-02-18-at-8.00.29-PM.jpeg?rect=0%2C0%2C1013%2C675&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে বিমানে ওঠার আগে ঢাকায় বিমানবন্দরে মো. ফাহাদ। ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া

যে কারণে সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় জামায়াত বারবার জেতে by গাজী ফিরোজ

চট্টগ্রাম–১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অবস্থা সব সময় শক্ত ছিল। এই আসনে নির্বাচনের এক বছর আগেই জামায়াতে ইসলামী নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করে। তিন তিনবার জামায়াতের প্রার্থী এখানে জয়লাভ করেন। অপর দিকে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করে নির্বাচনের এক মাস আগে। থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিএনপির কোনো কমিটি নেই। সাংগঠনিকভাবে জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থীর বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী ছিল নতুন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও দুই দলের নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা, নতুন প্রার্থী ও প্রচারণার জন্য শুধু এক মাস সময় পাওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। তবে মাত্র ৪৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান বিএনপির প্রার্থী। নেতা–কর্মীরা বলছেন, বিএনপি আগে থেকে প্রার্থী নির্ধারণ করলে, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটিগুলো সক্রিয় থাকলে এই ব্যবধান কাটিয়ে উঠতে পারত।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী ১ লাখ ৭২ হাজার ৬১ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিন ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫ ভোট পেয়েছেন।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের যুগপৎ আন্দোলনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সে কারণে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে সাতকানিয়া–লোহাগাড়া আসনটি জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরীকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে বিষয়টি আলোচনায় ছিল।

জোটের আলোচনা থাকলেও জামায়াতে ইসলামী এই আসনে শাহজাহান চৌধুরীকে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে। তিনি এলাকায় নিয়মিত প্রচারণা শুরু করেন। এর আগে এই আসনে নির্বাচন করায় এলাকার প্রার্থী হিসেবেও পরিচিত তিনি। তাঁকে নতুন করে পরিচিত হতে হয়নি। শাহজাহান চৌধুরী ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী অলি আহমদের কাছে পরাজিত হন। ২০০১ সালে তাঁর দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও চট্টগ্রাম–১৪ আসনে উভয় দল পৃথকভাবে নির্বাচন করে এবং তাতে শাহজাহান চৌধুরী বিজয়ী হন। ২০০৮ সালে এই আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আ ন ম শামসুল ইসলাম নির্বাচিত হন।

১৯৯১ সালের পর থেকে তিনবার জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচিত হওয়ার কারণে এই আসনে দলটির সাংগঠনিক অবস্থা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে ভালো। বিএনপি থেকে অলি আহমদ নির্বাচন করলেও তিনি ২০০৬ সালে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) নামের নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। নেতৃত্ব হারা হয়ে যায় সাতকানিয়া–লোহাগাড়া বিএনপি। বিএনপির কিছু নেতা–কর্মী অলির সঙ্গে যুক্ত হন। আর কিছু জামায়াতে ভিড়ে যান। বাকি যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।

২০০৮ সালের নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় বিএনপি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। আসনে নিজেদের কোনো প্রার্থী না থাকায় নেতা–কর্মীরা ছিলেন দোদুল্যমান। আসনটি কখনো জামায়াত, আবার কখনো এলডিপিকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে, সেই শঙ্কায় থাকতেন নেতা–কর্মীরা।

অপর দিকে আওয়ামী লীগের বাধার মুখে প্রকাশ্যে ও গোপনে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে গেছে জামায়াতে ইসলামী। এমনকি ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধের মামলায় জামায়াতের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসি দেওয়ার ঘটনায় সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় ব্যাপক সহিংসতা হয়। কিন্তু আন্দোলন–সংগ্রামে সেখানে বিএনপির কোনো ভূমিকা ছিল না।

এদিকে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদের গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়া–লোহাগাড়া আসনে। তাঁরাও শাহজাহানের জন্য প্রচারণায় নেমেছিলেন। পক্ষান্তরে বিএনপির প্রার্থী কে হবেন, তা–ও স্পষ্ট ছিল না। উল্টো আসনটি বিএনপি তার জোটের শরিকদের ছেড়ে দিতে পারে, এমন আলোচনাও ছিল।

তবে এলাকাবাসী পাশে ছিলেন বলে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, এমনটাই মনে করেন জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে সাতকানিয়া–লোহাগাড়াবাসীর সুখে–দুঃখে আছি আমি। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ১৭ বছরও জুলুম–নির্যাতনের শিকার লোকজনের পাশে ছিলাম। ৫ আগস্টের পর থেকে সশরীর তাদের পাশে ছিলাম। তাই লোকজন আমাকে বেছে নিয়েছেন। ভবিষ্যতেও আমি তাদের জন্য নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে করে যাব।’

জামায়াতে ইসলামীর আসন হিসেবে পরিচিত সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় ১ লাখ ২৭ হাজার ২৫ ভোট পেয়ে বিএনপি কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে। জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাতকানিয়া–লোহাগাড়ায় বিএনপির কমিটি নেই। আমাদের প্রার্থী নির্ধারণও হয়েছিল এক মাস আগে। এটি জোটকে দেওয়া হতে পারে, এমন ধারণা ছিল সবার। এরপরও জামায়াতের শক্তিশালী প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ১ লাখ ২৭ হাজার ভোট পাওয়া কম নয়।’

হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, ‘সাতকানিয়া–লোহাগাড়া বিএনপিকে শক্তিশালী করতে সাংগঠনিকভাবে যা যা করা দরকার, আমরা সব করব। এবারের নির্বাচন থেকে আমরা ঘাটতিগুলো কাটিয়ে উঠব।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-15%2Fa12qqfj8%2FWhatsApp-Image-2026-02-15-at-16.34.13.jpeg?rect=0%2C0%2C621%2C414&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
শাহজাহান চৌধুরী। ছবি: সংগৃহীত

Monday, February 16, 2026

এক গ্রাম থেকেই সংসদ সদস্য হলেন তিনজন by গাজী ফিরোজ

গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও সাঈদ আল নোমান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের তিনটি আসন থেকে পৃথকভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তাঁরা। এই তিনজনই চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার একটি গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামটির নাম গহিরা। এক গ্রাম থেকে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এলাকার লোকজনের মধ্যে খুশির আমেজ বিরাজ করছে।

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসন থেকে নির্বাচিত হন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। সাঈদ আল নোমান নির্বাচিত হয়েছেন নগরের চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং, খুলশী, পাহাড়তলী) আসন থেকে। তিনজনই বিএনপির মনোনয়নে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।

গিয়াস উদ্দিন কাদের ও হুম্মাম সম্পর্কে চাচা-ভাতিজা। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বড় ভাই সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফাঁসি কার্যকর হয় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর।

গিয়াস উদ্দিন কাদের ও হুম্মাম গহিরা গ্রামের বক্স আলী চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দা। তাঁদের বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার উত্তরে সাঈদ আল নোমানের বাড়ি। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে।

বক্স আলী চৌধুরী বাড়ির বাসিন্দাদের একজন নুর উদ্দিন চৌধুরী। তিনি গহিরা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি। জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের মধ্যে গহিরা একমাত্র গ্রাম যেখান থেকে এবারের নির্বাচনে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে এলাকার লোকজনের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা নিজ সংসদীয় এলাকা ছাড়াও নিজেদের গ্রামের উন্নয়নে অবদান রাখবেন, বাসিন্দাদের সেটিই প্রত্যাশা।’

বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর আবদুল্লাহ আল হারুন, বিএনপি নেতা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান গহিরা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান পার্লামেন্টের স্পিকার ও পাকিস্তানের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীর বাড়িও এই গ্রামে। তিনি গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী চৌধুরী মহিবুল হাসান, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চু এবং রাউজান আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বাড়িও এই গহিরা গ্রামে।

রাউজান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার পাশাপাশি নির্বাচিত আরও দুজন সংসদ সদস্যের বাড়িও এই এলাকায়। তাঁরাও এলাকার উন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। গ্রামের জন্য এটি খুবই সুসংবাদ।’

প্রয়াত সালাউদ্দিন কাদের ও আবদুল্লাহ আল নোমানের কবর গহিরা গ্রামে। এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে তাঁদের ছেলে হুম্মাম কাদের ও সাঈদ আল নোমানের। তাঁরা দুজনই নিজ সংসদীয় আসনের পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

গহিরা গ্রাম থেকে এবারের নির্বাচনে তিনজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে এলাকার জন্য গর্বের বিষয় বলে মন্তব্য করেন গহিরা ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রায়হান মাহমুদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামের শিক্ষা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর পাশাপাশি বাকি দুজনও অবদান রাখতে পারেন। এতে এলাকার লোকজন উপকৃত হবেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-14%2Fbvs984wu%2FUntitled-6-1f.png?rect=0%2C0%2C918%2C612&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী ও সাঈদ আল নোমান। ফাইল ছবি

Sunday, February 15, 2026

হালদায় জোয়ারে ভাসছিল মৃত ডলফিন, গত ১১ মাসে মরল ৫টি

প্রকাশ ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র হালদা নদীতে জোয়ারের পানিতে ভাসছিল একটি মৃত ডলফিন। নৌ পুলিশ সেটি উদ্ধার করে নদী পাড়ে এনে রেখেছে। ডলফিনটির সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করবে মৎস্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার হালদা রিভার রিসার্স সেন্টার।

আজ মঙ্গলবার বেলা দুইটার দিকে হাটহাজারী উপজেলার উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের রামদাস মুন্সিরহাট এলাকায় নদীতে জোয়ারের সময় ভাসমান অবস্থায় ডলফিনটি উদ্ধার করা হয়।

গত ১১ মাসের ব্যবধানে এ নিয়ে পাঁচটি মৃত ডলফিন হালদা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্স সেন্টার।

হালদা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক মুহাম্মদ রমজান আলী প্রথম আলোকে বলেন, উদ্ধার হওয়া ডলফিনটি কয়েক দিন আগে মারা গেছে। এটির শরীরে পচন ধরেছে। শরীরের চামড়া ফুলে উঠেছে। তবে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পর এটির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানা যাবে।

উদ্ধারকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডলফিনটির ওজন ২৫ থেকে ২৮ কেজি। দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে চার ফুট। এর আগে সর্বশেষ গত বছরের ১৬ ডিসেম্বরে নদীর হাটহজারীর বাড়িঘাণা অংশে আরেকটি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে গত ১১ মাসে মোট পাঁচটি মৃত ডলফিন উদ্ধার হয় নদী থেকে। এ ছাড়া গত সাড়ে ছয় বছরে হালদা থেকে ৫০টি মৃত ডলফিন উদ্ধার হলো। দু-একটি ছাড়া প্রায় সব ডলফিনেরই শরীরে আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত করেছিল উদ্ধারকারী দল। একাধিক ডলফিনকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ।

হালদা নদী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকাভুক্ত (অতি বিপন্ন প্রজাতি) হালদার ডলফিন। বিশ্বের বিভিন্ন নদীতে এই প্রজাতির ডলফিন আছে মাত্র ১ হাজার ১০০টি। এর মধ্যে শুধু হালদাতেই ছিল ১৭০টি। গত সাড়ে ছয় বছরে হালদায় ৫০টি ডলফিন মারা গেছে।

হাটহাজারী উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘নৌ পুলিশ এটি উদ্ধার করে। পরে আমরা গিয়ে সুরতহাল করি। পরে ময়নাতদন্ত করে এটির মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা হবে।’

হালদা নদী থেকে উদ্ধার করা মৃত ডলফিন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের রামদাস মুন্সিরহাট নদীর পাড়ে
হালদা নদী থেকে উদ্ধার করা মৃত ডলফিন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের রামদাস মুন্সিরহাট নদীর পাড়ে। ছবি: নৌ পুলিশের সৌজন্যে

Friday, February 13, 2026

হাত দিয়ে টান দিতেই উঠে যাচ্ছে সড়কের কার্পেটিং, ভিডিও ভাইরাল by কাইছার হামিদ

প্রকাশ ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ একটি সড়কের কার্পেটিং হাত দিয়ে টেনে টেনে তুলে নিচ্ছেন তিনজন ব্যক্তি। অন্য একজন মুঠোফোনে সেই দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করছেন। ভিডিওতে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ তুলে সড়কটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায় এক বাসিন্দাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে ভিডিওটি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভিডিওটি গত বৃহস্পতিবারর চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার নাওঘাটা গ্রামে ধারণ করা। যে সড়ক থেকে কার্পেটিং তোলা হচ্ছিল, তা স্থানীয়ভাবে পদুয়া-নাওঘাটা সড়ক নামে পরিচিত। এটি দিয়ে উপজেলার নাওঘাটা,আঁধারমানিক, ধলিবিলা ও বাগমুয়া গ্রামের ১৫ হাজার মানুষ নিয়মিত চলাচল করেন। কার্পেটিং তোলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা নাওঘাটা গ্রামেরই বাসিন্দা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত মঙ্গলবার সড়কটির সংস্কারকাজ শেষ করেন ঠিকাদার। তবে দুই দিন যেতেই এর কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, দায়সারাভাবে ঠিকাদার সড়কের সংস্কার কাজটি শেষ করেছেন। এ কারণে আগামী বর্ষায় এতে খানাখন্দ তৈরি হবে। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে দুর্ভোগে পড়বেন ওই সড়ক দিয়ে চলাচল করা পথচারীরা।

লোহাগাড়া উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সড়কটির এক হাজার ৫০ মিটার অংশ উন্নয়নের জন্য ৯৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। এরপর দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে সড়কটির কার্যাদেশ পায় স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স দিপু কান্তি পাল’। ২০২৪ সালের জুনে বিটুমিন ও পাথরের কার্পেটিং দিয়ে সড়কটির কাজ সম্পন্ন করা হয়। তবে গত বছর সড়কটির একাধিক স্থানে কার্পেটিং উঠে যায়।

হাত লাগাতেই উঠে আসছে পিচঢালাইয়ের কার্পেটিং। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার নাওঘাটা গ্রামে
হাত লাগাতেই উঠে আসছে পিচঢালাইয়ের কার্পেটিং। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার নাওঘাটা গ্রামে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

উপজেলা প্রশাসন জানায়, সড়কটির মোট বরাদ্দ থেকে প্রায় ৯ লাখ টাকা জামানত হিসেবে রাখা হয়েছিল। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী সড়কের কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার এক বছর পর ঠিকাদারকে ওই টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার কথা। তবে এর মধ্যে সড়কে কোথাও সংস্কার প্রয়োজন হলে তা ঠিকাদারকে করে দিতে হবে এমন শর্ত দেওয়া হয়েছিল। এ কারণে ঠিকাদার জামানতের ৯ লাখ টাকা ফেরত পেতে যেনতেনভাবে সড়কটির সংস্কার করেছেন।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কটির ডেলিয়াপাড়া এলাকায় অন্তত ২০ ফুট কার্পেটিং হাত দিয়ে তুলে ফেলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁরা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে একটি ট্রাক ওই স্থানে ব্রেক করতেই কার্পেটিং উঠে যায়। এ কারণে তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়ে কার্পেটিং তুলে ফেলছেন।

পদুয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালে সড়কটি প্রথমবার উন্নয়নকাজের সময়ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। সেই উন্নয়ন এক বছরও স্থায়ী হয়নি। পুনরায় সংস্কারকাজেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সড়কটি শর্ত মেনে সংস্কার করা হোক।

প্রকল্পটির ঠিকাদার দিপু কান্তি পাল ছয় মাস আগে মারা গেছেন। এলজিইডি কার্যালয় এবং সড়ক সংস্কারে নিয়োজিত শ্রমিকেরা জানান, দিপু কান্তি পালের সহযোগী জাকারিয়া বাবুল নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে সড়কটি সংস্কার করেছেন। তবে জাকারিয়া বাবুলের কাছে সড়কের কার্পেটিং উঠে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করেন।

জানতে চাইলে লোহাগাড়া এলজিইডি কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী মইনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঠিকাদার আমাদের না জানিয়ে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজটি করেছেন। কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করে আমাদের বুঝিয়ে না দিলে জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া হবে না।’

বিক্ষুব্ধ দুজন বাসিন্দা সড়কের কার্পেটিং তুলে নিচ্ছেন। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার নাওঘাটা গ্রামে
বিক্ষুব্ধ দুজন বাসিন্দা সড়কের কার্পেটিং তুলে নিচ্ছেন। চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার নাওঘাটা গ্রামে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

Sunday, February 8, 2026

বিএনপির প্রার্থী বললেন, দয়া করে ১২ তারিখ পর্যন্ত চাঁদাবাজি করবেন না

চট্টগ্রাম–১৩ (আনোয়ারা ও কর্ণফুলী) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চাঁদাবাজি বন্ধ রাখার জন্য প্রকাশ্যে চাঁদাবাজদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। গতকাল শুক্রবার রাতে আনোয়ারা উপজেলার চাতরী এলাকায় একটি নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের সময় এ অনুরোধ জানান তিনি। তাঁর এই বক্তব্যের ৫৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, এমন কেউ একজন ভিডিওটি ধারণ করেছেন।

গতকাল রাত ১০টার পর নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনের ওই অনুষ্ঠানে স্থানীয় বিএনপির নেতা–কর্মী, ভোটার ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। ভিডিওতে সরওয়ার জামাল নিজামকে বলতে শোনা যায়, এই চাতরী হলো আনোয়ারার প্রাণকেন্দ্র। আনোয়ারার হেডকোয়ার্টার হলো এটি এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক এলাকা। এখানকার ব্যবসা–বাণিজ্য ও মানুষের আয়ের ওপর পুরো এলাকার অর্থনৈতিক গতিশীলতা নির্ভরশীল।

সরওয়ার জামাল নিজাম আরও বলেন, ‘এখানে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি চলছে। আমি অনুরোধ জানাব, আপনারা যাঁরা চাঁদাবাজি করছেন, দুই হাত জোড় করে বলছি, ১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা চাঁদাবাজি করবেন না।’ বিএনপির গায়ে কালিমা লেপনের চেষ্টা হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম–১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুল হাসান, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মোহাম্মদ এমরান, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এস এম শাহজাহান, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মু. রেজাউল মোস্তফা, খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ ইমরান ও জাতীয় পার্টির আবদুর রব চৌধুরী।

চট্টগ্রামের আনোয়ারার চাতরীতে নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম ১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম
চট্টগ্রামের আনোয়ারার চাতরীতে নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম ১৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার জামাল নিজাম। ছবি: ভিাডিও থেকে নেওয়া।

Friday, February 6, 2026

উড়িরচরে মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে বিদেশি জাহাজ, ৩৩ বছর পর তোলা হচ্ছে by নুরুল আনোয়ার

প্রকাশ ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ঃ ফসলের মাঠে এক্সক্যাভেটর দিয়ে চলছে খনন। উৎসুক মানুষের ভিড় চারপাশে। ভিড় ঠেলে দেখা গেল, এরই মধ্যে খোঁড়া হয়েছে প্রায় ১৭ ফুট গভীর একটি গর্ত। এরপরও থেমে নেই গর্ত খোঁড়ার কাজ।

গত সোমবার এই চিত্র দেখা গেল সন্দ্বীপের বিচ্ছিন্ন ইউনিয়ন উড়িরচরের উত্তর-পশ্চিমে চর ন্যাংটা এলাকায়। খননের উদ্দেশ্য, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা একটি জাহাজ উদ্ধার। ৪ জানুয়ারি থেকে একাধিক এক্সক্যাভেটর দিয়ে চলছে খনন।

উড়িরচরের বাংলাবাজার থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের কোস্টগার্ড কন্টিনজেন্টের পাশেই চলছে জাহাজ উদ্ধারের এই কাজ। ধানি জমি পার হয়ে সেখানে যেতেই চোখে পড়ে মাটি বোঝাই করে চলাচল করছে কয়েকটি ট্রাক। দুটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে প্রায় ৫০ ফুট চওড়া এবং ২০০ ফুট দীর্ঘ জায়গাজুড়ে গর্ত খোঁড়া হচ্ছে। ১৭ ফুট গভীর পর্যন্ত খোঁড়া হলেও জাহাজের মূল কাঠামোর দেখা এখনো মেলেনি।

নিলামের নথি ঘেঁটে জানা গেছে, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজটির নাম এমভি টনি বেস্ট। লাইবেরিয়াভিত্তিক বেস্ট শিপিং করপোরেশনের মালিকানাধীন জাহাজটি ১৯৯৩ সালে এই এলাকার কাদায় আটকে পড়ে। পরে মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং একাধিকবার মালিকানা পরিবর্তনের পর জাহাজটি মাটির নিচ থেকে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাসিন্দারা জানান, জাহাজটি যখন আটকে পড়ে, তখন চারপাশে কেবল জলরাশি ছিল, আশপাশে ছিল না কোনো স্থায়ী বসতি। পরের তিন দশকে সেখানে চর জেগে ওঠে, যাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বসতিও। শুরু হয় চরের জমি চাষাবাদ। একই সঙ্গে মাটির নিচে চাপা পড়তে শুরু করে জাহাজটি। একপর্যায়ে এটি পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়।

এলাকাবাসী জানান, প্রায় ১০ বছর আগে চরটিতে চাষাবাদ শুরু হয়। মাটির নিচে চাপা পড়ায় জাহাজটির কথা এলাকার মানুষ প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। হঠাৎ আবার খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হওয়ায় জাহাজটি নিয়ে বাসিন্দাদের মধ্যে কৌতূহলের শেষ নেই।

জাহাজটির প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন পাওয়া গেল এলাকায়। তাঁর নাম মুকবুল হোসেন (৭৫)। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে উড়িরচরে মহিষবাথানের মালিক তিনি। তাই এলাকায় পরিচিত ‘মুকবুল বাতানি’ নামে। জানতে চাইলে মুকবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাহাজ আটকি যাইবের ঘটনা মনে আছে। কিন্তু কত দিন আগে, তা ঠিক করি বলতে পারব না। সে সময় লক্ষ্মী অলারা (চর লক্ষ্মীর বাসিন্দারা) জাহাজের দামি জিনিস খুলে লই গেছে। তারপর দিনে দিনে জাহাজটা মাটিচাপা পইড়তে থাকে।’

কতটা বড় এই জাহাজ

জাহাজটির নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেল, পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূলবর্তী দেশ লাইবেরিয়ার পতাকাধারী এই জাহাজ পানিতে ভেসেছে প্রায় ২২ বছর। ১৯৭১ সালে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে এটি বাংলাদেশের নোয়াখালী উপকূলের কাছে আটকে পড়ে সমুদ্রযাত্রার সমাপ্তি টানে।

জাহাজটির বর্তমানে মালিকানায় রয়েছে মেসার্স রায়হান ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৪৭০ ফুট আর প্রস্থ ৬৮ ফুটের মতো। এখন স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রির জন্য জাহাজটি তুলে আনার কাজ চলছে।

নিলাম, হাতবদল

চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে জাহাজটি আটকে পড়ার পর শুরুতে উদ্ধারের চেষ্টা চালায় মালিকানায় থাকা প্রতিষ্ঠান বেস্ট শিপিং করপোরেশন। তবে ব্যর্থ হয়ে জাহাজটি নিলামে (অকশন) দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের আদালতের শরণাপন্ন হয় প্রতিষ্ঠানটি। কাদায় আটকে পড়া জাহাজকে কেন্দ্র করে শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বেস্ট শিপিং করপোরেশন, জাহাজের স্থানীয় প্রতিনিধি, কর্মকর্তা ও ক্রু—সব পক্ষের স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে মামলায়।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের দেওয়ানি বিভাগের অ্যাডমিরালটি স্যুট (সমুদ্র বাণিজ্য-সংক্রান্ত মামলা) নম্বর ১৯/১৯৯৩ অনুযায়ী জাহাজটি নিলামে তোলা হয়। ১৯৯৫ সালের ১৫ মার্চ চট্টগ্রামের মুসলিম ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান ৫৪ লাখ টাকায় জাহাজটি নিলামে কিনে নেয়।

প্রতিষ্ঠানটি জাহাজের উপরিভাগের সামান্য কিছু অংশ কেটে নিলেও পুরো জাহাজ আর উদ্ধার করতে পারেনি। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে কাজ থেমে যায়। পরে ৩০ লাখ টাকায় তারা জাহাজের স্বত্ব বিক্রি করে দেয় অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে। এরপর একের পর এক বদল হয় মালিকানা। তবে কেউ মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজের বাকি অংশ আর উদ্ধার করতে পারেনি। এবারের চেষ্টার আগে সর্বশেষ ২০১০ সালে ঢাকার ইউছুফ আলী নামের এক ব্যক্তি জাহাজটি কিনে মাটির নিচ থেকে উদ্ধারের চেষ্টা চালান। তবে সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

আবার উদ্ধার চেষ্টা

জাহাজটির বর্তমান মালিক মেসার্স রায়হান ট্রেডার্সের কর্ণধার মো. জামাল উদ্দিন জানান, বেশ বড় জাহাজটি যেখানে চাপা পড়ে আছে এর ওপরের প্রায় ১০ একর জমি তিনি কিনে নিয়েছেন। এখন মাটি খুঁড়ে জাহাজটি উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে উদ্ধারের চেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যন্ত্রপাতির সংকট।

জামাল উদ্দিন বলেন, ‘বিরামহীন কাজ চলছে। তবে ভারী যন্ত্রপাতি ছাড়া বেশি গভীরে যাওয়া সম্ভব নয়। এখন সেই যন্ত্রপাতির খোঁজ করছি। জানি না শেষ পর্যন্ত কী হবে।’

জাহাজটি উদ্ধারের জন্য নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধারে নামার আগে তাঁরা সেখানে বোরিং (মাটির গভীরে পাইপ প্রবেশ করিয়ে) করে জাহাজটির অবস্থান নিশ্চিত হয়েছেন। বোরিং কাজে যুক্ত নুরুল হুদা বলেন, ‘সর্বনিম্ন ৩২ ফুট আর সর্বোচ্চ ৫০ ফুট গভীরে জাহাজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। মোটামুটি ৪০ ফুট গভীরে পৌঁছালে জাহাজটি দৃশ্যমান হবে।’

খোঁড়াখুঁড়ির জন্য রায়হান ট্রেডার্স জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের লিখিত অনুমতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, মাটির এতটা গভীর থেকে জাহাজটি কেটে তুলে আনার কাজ হয়তো সহজ হবে না। এরপরও চেষ্টা চলছে।

জাহাজ তোলার খবর পেয়ে প্রতিদিনই ভিড় করছে মানুষ। কৌতূহলী মানুষের মুখে লেগে আছে জাহাজটি নিয়ে নানা আলাপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এটি নিয়ে আলোচনায় মেতেছেন এলাকার বাসিন্দারা। তাঁদের কেউ জাহাজ তোলার খবরে বাহবা দিচ্ছেন, কেউ লিখেছেন, ‘জাহাজ তোলার নামে মাটির ব্যবসা চলছে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-28%2Foya1n2rr%2FWhatsApp-Image-2026-01-28-at-14.45.38.jpeg?rect=0%2C0%2C1280%2C853&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা জাহাজ উদ্ধারে চলছে খননকাজ। গত সোমবার চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের উড়িরচরে। ছবি: প্রথম আলো

Monday, January 12, 2026

‘কুকি-চিন’ নিয়ে আসলে কী ঘটছে by আলতাফ পারভেজ

প্রকাশ ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ঃ কুকি-চিন মানুষদের নিয়ে মিজোরামের রাজধানী আইজল খুব উত্তাল যাচ্ছে গত কয় দিন। মিছিল-মিটিং হচ্ছে। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারকে স্থানীয় মিজোরা বাংলাদেশের কুকি-চিনদের উদারভাবে আশ্রয় দিতে বলছে। মিয়ানমারের পালিয়ে আসা চিনদের জন্যও তারা একই নীতি চায়। এ দাবির পেছনে রয়েছে বিস্তর ঘটনা—আর সামনে আছে সম্ভাব্য আরও কিছু অধ্যায়। প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের সেসব বিষয়ে কতটা অবহিত ও সতর্ক?

মিজোরামে যখন কুকি-চিন প্রসঙ্গ

মিজোরা যাদের কুকি-চিন বলছে, বাংলাদেশে তারা হলো বম, লুসাই, পাংখোয়া ইত্যাদি। সংখ্যায় খুব কম এসব জাতিগোষ্ঠী। বান্দরবান সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি, বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল অঞ্চলে এদের বেশি বসবাস, যা মিয়ানমারভুক্ত চিন প্রদেশ এবং ভারতভুক্ত মিজোরাম-সংলগ্ন। বান্দরবানের কাছাকাছি মিজোরামের জিলার নাম লঙ্গৎলাই। আর চিনের অংশ পালেতওয়া টাউনশিপের মাটুপি। কাছেই আরাকানের মংডু।

চার ধরনের প্রশাসনিক পরিচয় নিয়েও এ অঞ্চলে রয়েছে বহু জাতিসত্তার মানুষ। বহুকাল ধরে এ রকম জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে নৃতাত্ত্বিক বন্ধন ঘিরে নানান ভাঙা-গড়া-সংঘাত-সংঘর্ষ ছিল এবং আছে। তার মধ্যে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মিশেলও যুক্ত হয় প্রতিনিয়ত। সে রকমই এক চলতি অধ্যায়ে আইজলে এক সপ্তাহ ধরে মিজোরা বাংলাদেশের কুকি-চিনদের ব্যাপারে সমব্যথী হয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করছে। ঢাকায় সে খবর হয়তো সামান্যই এসে পৌঁছাল।

‘জো’দের পারস্পরিক বন্ধনকে বিবেচনায় রাখা দরকার

‘মি-জো’ কথার মানে ‘পাহাড়ের মানুষ’। এটা বেশ বিস্তৃত ধারণা। এতে অনেক জাতিসত্তা অন্তর্ভুক্ত। এসব জাতিসত্তা নিজেদের বলে ‘জো’। আইজলের মিজোদের বক্তব্য হলো কুকি-চিনরাও জো। সুতরাং তারা বিপদে পড়ে যদি মিজোরামে ঢুকে থাকে, তাহলে এদের তাড়ানো যাবে না। মিজোরামের এখনকার সরকার এ রকম মনোভাব সমর্থন করে। তবে সীমান্তরক্ষীরা কেন্দ্রীয় সরকার-নিয়ন্ত্রিত। ফলে সীমান্তে অন্য দেশের জোরা বাধা পাওয়ায় আইজল ক্ষুব্ধ। এর আগে অবশ্য মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে চিন থেকে প্রচুর জো মিজোরামে ঢুকে আছে।

যেহেতু চিন, বান্দরবান, মিজোরাম মিলে জোদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী বেশি, সে কারণে আইজলের রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষদের মধ্যে একটা ধর্মতাত্ত্বিক শক্ত বন্ধনও কাজ করছে। বম, পাংখোয়া, লুসাইরা ‘ব্রিটিশ খ্রিষ্টান’ হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১০০ বছর হলো প্রকৃতি পূজারি থেকে তাঁদের ধর্মান্তরের। কিন্তু ‘বম’ শব্দের অর্থ যে বন্ধন—তার সামাজিক চেহারা একই রকম আছে। আশপাশের দেশের অ-বমদের সেটা মনে না রাখলে ভুল করা হবে।

জটিল হচ্ছে জাতিগত সমীকরণ

ভারতবর্ষ এবং মিয়ানমারের দখল, কাটাছেঁড়া, ‘মুক্তি’—সবই ঘটেছে ব্রিটিশদের হাতে। শত শত বছরের পুরোনো নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতা এসব কাটাছেঁড়ায় মুশকিলে পড়েছে। অনেক সময় প্রশাসনিক মুশকিলে ভৌগোলিক এসব ত্রিমোহনার মানুষকে সীমান্ত পেরোতেও হয় আইন-আদালতের কথা ভুলে।

এ রকম বিবিধ প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে মিজোরামে পাঁচ দশক আগে থিতু হওয়া প্রচুর চাকমাও আছেন। বৌদ্ধ চাকমাদের সঙ্গে ওদিকে আবার খ্রিষ্টান মিজোদের সম্পর্ক মধুর নয়। সেই অমধুর সম্পর্কের জের দেখা গেল আইজলে সাম্প্রতিক কুকি-চিনকেন্দ্রিক সমাবেশগুলোয়। ইয়াং মিজো অ্যাসোসিয়েশনের (ওয়াইএমএ) কর্মীরা বলছেন, অতীতে চাকমাদের বিষয়ে প্রশাসন যতটা উদার ছিল, কুকি-চিন বা জোদের বিষয়ে একই রকম হতে সমস্যা কোথায়? বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলে একটা জো জাতীয়তাবাদ কাজ করছে।

এর প্রবল সমর্থন আছে আবার চিন প্রদেশের চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (সিএনএফ) দিক থেকে। সেখানে পালেটোয়া শহরটির ওপর অধিকার নিয়ে চিনদের সঙ্গে রাখাইনদের ব্যাপক বিরোধ যাচ্ছে। ওই রাখাইনদের সংগঠন আরাকান আর্মির নাম চলে এসেছে আবার সাম্প্রতিক কুকি-চিন সমস্যায়। এ কারণে জটিল এক জাতিগত সমীকরণে ঢুকছে এ পুরো অঞ্চল নতুন করে। তাতে ২০২২ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর জো বনাম রাখাইন ইতিহাসে নিশ্চিতভাবে নতুন কিছু যোগ করল।

পাহাড়ে প্রজ্ঞার ঘাটতি যেন না হয়

জোদের একাংশ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে কেন ‘কুকি-চিন’ নাম পেল, তার কলোনিয়াল ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ঢাকা, নয়াদিল্লি কিংবা মিয়ানমারের নেপিডোতে এসব নিয়ে এখন খুব আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। তবে বাংলাদেশে হঠাৎ কুকি-চিনদের একটা সংগঠনের নাম শোনা যাচ্ছিল পত্রপত্রিকায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযানের খবরও শোনা যাচ্ছে।

কুকি-চিনরা কীভাবে ছোট জাতিসত্তা থেকে এ রকম বড় সংগঠনের জাতীয় ‘গল্প’ হয়ে উঠল, সেটার পেছনে ছুটলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা অনেক কিছু পাবেন। সেসব অনুসন্ধান হলে কেএনএফ (কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট) এর আকার-আকৃতি নিয়ে চালু গল্পের ফুলেফেঁপে থাকা মেদ কমতে পারে। কিন্তু সংখ্যায় যা–ই হোক, কেএনএফ দূরদূরান্তে থাকা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সহানুভূতি ও উৎসাহ পেয়ে থাকলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

কেএনএফ সদস্যরা মিয়ানমারের চিন রাজ্যের ভিক্টোরিয়ায় বিদ্রোহী গোষ্ঠী চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের সদর দপ্তরে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলে শোনা যায়। এরপর এই কুকি-চিন তরুণেরা আরও প্রশিক্ষণের জন্য মিয়ানমারের কাচিন পর্যন্ত গেছে—এমন কথাও চালু রয়েছে। এগুলো সবই যাচাই অযোগ্য দাবি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে চিন ও ‘কুকি’রা নৃবিজ্ঞানে একই অধ্যায়ে আছে। এশিয়ার এ অঞ্চলে এরা সবাই মিলে মোটেই ছোট কোনো জাতিশক্তি নয়। এটা খেয়াল না করলে সমস্যা বাড়তে পারে।

ইতিমধ্যে যা ঘটেছে, বম-পাংখোয়া-লুসাই পাড়াগুলো আর আগের মতো নেই। এ বছর ‘ফাথার বুহ তেম’ (নবান্ন) উৎসবও হলো না। উল্টো গ্রাম বা খোয়াগুলো এখন অনেক মাচাং বাসিন্দাদের অপেক্ষা করছে।

লক্ষণ হিসেবে এসব অশুভ। আইজলে কে কী বলছে—শোনা দরকার। বম, লুসাইসহ এ রকম সবার মধ্যে আস্থা ফেরাতে হবে। সংলাপ দরকার। পারস্পরিক দরদে হয়তো ঘাটতি পড়েছে।

পার্বত্য এলাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং সংখ্যালঘু অনেকে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের কাছে অনেক কিছু আশা করে থাকবে। কিন্তু ২৫ বছর পরও তাদের প্রান্তিকতা ঘোচেনি বলে দীর্ঘশ্বাস ছিল। সেই শ্বাস-প্রশ্বাসকে চাকমা থেকে বাঙালি অনেকের প্রয়োজনীয় মনোযোগ পেয়েছিল কি না, সে সন্দেহ উঠছে এখন।

ইতিমধ্যে হয়তো কিছু দেরিই হলো। অনেক বেশি দেরি হলো কি না, কে জানে! তবে সশস্ত্রতায় সমৃদ্ধি মেলে কি? বরং ‘পার্টি’র সংখ্যা বাড়তে থাকলে শান্তিতে টান পড়তে বাধ্য। ঠিক একই কারণে ঘরের কথা আইজল যায়। জাতিতে জাতিতে দূরত্ব বাড়ে। পাহাড় নিয়ে কোনো তরফ থেকেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ঘাটতি না হওয়া কাম্য। বিশেষ করে গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্মা-অ্যাক্ট’ পাস হওয়ার পর যখন মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

* আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2023-01%2Fa442f99a-872f-4391-85c0-68851efb8e7e%2Fbandarban.gif?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পাহাড় নিয়ে কোনো তরফ থেকেই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ঘাটতি না হওয়া কাম্য। বিশেষ করে গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্মা-অ্যাক্ট’ পাস হওয়ার পর যখন মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংগৃহীত

Tuesday, November 25, 2025

কুতুবদিয়াবাসী কবে অবহেলা ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে রক্ষা পাবে by আবদুল্লাহ নাজিম আল মামুন

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার দেশের ১০টি অনুন্নত উপজেলাকে উন্নত করতে একটা বাজেট রেখেছে। সেই বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা। কিন্তু কক্সবাজার জেলার অনুন্নত সাগরদ্বীপ কুতুবদিয়া উপজেলাকে সেখানে বাদ দেওয়া হয়েছে।

‎কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত কুতুবদিয়া উপজেলাকে বলা হয় বাতিঘরের দ্বীপ। এখানে বসবাস করে দেড় লক্ষাধিক মানুষ। এই দ্বীপের বর্তমান আয়তন ১৮ মাইলের কম। একসময় এর আয়তন ছিল ১০০ বর্গমাইলের বেশি। বর্ষায় বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে নদীভাঙনের কারণে দ্বীপটি এখন অস্তিত্বসংকটের মুখে পতিত হয়েছে। হয়নি কোনো উন্নয়ন।

৩৪ বছরেও কোনো টেকসই বেড়িবাঁধ পায়নি দ্বীপটি। যুগের পর যুগ জিও ব্যাগ দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকানো হয়েছে। কিন্তু এই জিও ব্যাগ সমুদ্রের বিশাল ঢেউ আর জোয়ারের ফলে ভেঙে গিয়ে কুতুবদিয়া দ্বীপ প্লাবিত হয়। যাতায়াতের মাধ্যমে কোনো নিরাপত্তা নেই। নেই ফেরি কিংবা যাত্রীবাহী লঞ্চ। মেডিকেলে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল।

‎অন্যদিকে পাশেই রয়েছে মাতারবাড়ী ও মহেশখালী। মাতারবাড়ীতে রয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর ও কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। মহেশখালীর সঙ্গে কক্সবাজারে যাতায়াতের জন্য রয়েছে ফেরি। কিন্তু বিপুল খনিজ সম্পদের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়াকে সব সময় অবহেলার চোখে দেখেছেন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো।

‎কুতুবদিয়ায় রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস, যা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। রয়েছে গন্ধক ও চুনাপাথর, যা কুতুবদিয়ার ভূপৃষ্ঠের একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় কালোবালির মতো খনিজ সম্পদ পাওয়া যায়। দ্বীপটি তেল, গ্যাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস হিসেবে পরিচিত, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ছাড়া কুতুবদিয়া উপজেলা পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় একটি দ্বীপ। দ্বীপের পশ্চিমে ‘মায়া দ্বীপ’ নামের আরও একটি চর জেগে উঠছে। এই চরটিকে পর্যটনের জন্য পরিকল্পনা করা যেতে পারে। আর এখানে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বাতিঘর ও বাংলাদেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র। রয়েছে বিশাল এলাকাজুড়ে সমুদ্রসৈকত, যা উত্তর-দক্ষিণে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রায়।

‎যদি সরকার ও দেশি-বিদেশি ভ্রমণ-সংস্থাগুলো এগিয়ে আসে, তাহলে বাংলাদেশ পর্যটনশিল্পের জন্য দ্বীপটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

‎আর এখানকার মানুষের প্রধান পেশা সাগর থেকে মাছ আহরণ ও লবণ উৎপাদন করা। এখানকার লবণচাষিরা প্রতিবছর ৫৯০ একর জমিতে ২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টনের অধিক লবণ উৎপাদন করে থাকেন, যা দেশে লবণশিল্পের জন্য বিশাল অবদান।

এত কিছু থাকার পরও কুতুবদিয়া নিয়ে কোনো মহাপরিকল্পনা নেই। দ্বীপবাসীরা পায়নি কোনো টেকসই বেড়িবাঁধ। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে নানা ভোগান্তিতে বসবাস করতে হচ্ছে কুতুবদিয়াবাসীকে।

কোনো ইমার্জেন্সি রোগীকে মেডিকেলে নিয়ে গেলে সেখানেও উন্নত চিকিৎসা পাওয়া যায় না। মেডিকেলের কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম মেডিকেলে ইমার্জেন্সি রোগীকে রেফার করে দেন। এরপর রোগীকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার সময় আরেক সিন্ডিকেটের মুখে পড়তে হয়। কুতুবদিয়া-মগনামা চ্যানেলে কোনো ফেরি না থাকায় ডেনিসবোটের মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়ে নেন। এভাবেই নানা ভোগান্তি ও সিন্ডিকেটের মধ্য দিয়ে কুতুবদিয়াবাসীকে পারাপার হতে হয় নিত্যদিন।

অন্তর্বর্তী সরকারকে এই দ্বীপ নিয়ে মহাপরিকল্পনা করতে হবে। এই দ্বীপের দেড় লক্ষাধিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। কুতুবদিয়া-মগনামা চ্যানেলে ফেরি চালুর মধ্য দিয়ে যাতায়াতব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

‎এ ছাড়া উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কুতুবদিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অক্সিজেন, অ্যাম্বুলেন্সসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম দিতে হবে। রাস্তাঘাট সংস্কার করতে হবে। তবেই কুতুবদিয়াবাসী অবহেলা ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে রক্ষা পাবে।

* আবদুল্লাহ নাজিম আল মামুন
‎- কুতুবদিয়া দ্বীপ, কক্সবাজার

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-04-29%2Fbq3k7t3z%2FUntitled-1.jpg?rect=0%2C0%2C1592%2C1061&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার আলী আকবরডেইল ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে শত কোটি টাকা খরচ করে ২০২৪ সালে নির্মাণ হয়েছিল ছয় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। এখন বাঁধের নড়বড়ে অবস্থা। ছবি: প্রথম আলো

Sunday, September 28, 2025

জাহাজভাঙা শ্রমিক: স্যাঁতসেঁতে ছোট ঘরে বাস, মজুরি দিনমজুরের অর্ধেকও নয় by কৃষ্ণ চন্দ্র দাস

৬৪ বর্গফুটের একটি ছোট কক্ষ। স্যাঁতসেঁতে মেঝের এক কোনায় থালাবাসন, গ্যাস সিলিন্ডার, চুলাসহ রান্নার সরঞ্জাম রাখা। বাকি অংশে ঘুমানোর জন্য কাঁথা-বালিশ। কক্ষের ওপরের দিকে বাঁধা দড়িতে ঝুলে আছে কিছু পোশাক। কক্ষটিতে সুমন মোল্লাসহ চারজন জাহাজভাঙা শ্রমিক গাদাগাদি করে থাকেন। রাত হলেই মেঝেতে কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে পড়েন।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বক্তারপাড়া এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে এমআই শ্রমিক কলোনির চিত্র এটি। কলোনিটিতে ১০৪টি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে তিন থেকে পাঁচজন শ্রমিক থাকেন। সব মিলিয়ে ২০ থেকে ২২টি কক্ষে থাকেন ১১০ জনের মতো শ্রমিক। বাকি কক্ষগুলো এখন ফাঁকা।

এই কলোনি থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে দেখা মেলে জামাল কলোনির। সেখানকার অবস্থা আরও খারাপ। কলোনির কক্ষগুলো একই রকম হলেও লম্বা আকৃতির ঘর মুখোমুখি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে হাঁটাচলা করতেই অসুবিধা হয়। রয়েছে খাবার ও গোসলের পানির সমস্যা।

শুধু এমআই ও জামাল কলোনি নয়, সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানার শ্রমিকদের প্রায় সব কলোনির অবস্থাই এমন।
সারি সারি ঘরগুলোতে থাকেন জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকেরা। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে
সারি সারি ঘরগুলোতে থাকেন জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকেরা। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। প্রথম আলো
খুপরিতে অস্বাস্থ্যকর জীবন

উপজেলায় মোট কতটি শ্রমিক কলোনি রয়েছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিরা, সোনাইছড়ি, ভাটিয়ারী ও সলিমপুর ইউনিয়নে অন্তত ৬০টি শ্রমিক কলোনি রয়েছে। এসবের মধ্যে বড় তিনটি শ্রমিক কলোনি ঘুরে দেখা গেছে, কোনোটিই বসবাসের উপযোগী নয়। এ তিনটি কলোনির অন্তত ২৫ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। প্রত্যেকের তথ্য অনেকটা একই রকম। কলোনিগুলোর প্রতিটি কক্ষের ভাড়া দুই হাজার থেকে চার হাজার টাকা হলেও নেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ।

এমআই কলোনির সুমন মোল্লা সীতাকুণ্ডের একটি গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ফিটারম্যান হিসেবে কাজ করেন। ওই কারখানার সবচেয়ে পুরোনো ফিটারম্যান তিনি। ২০ বছর ধরে জাহাজভাঙা কারখানায় কাজ করছেন। কাজ শুরু করেছিলেন শ্রমিক হিসেবে। এরপর ফিটারম্যানের সহকারীর কাজ করেন। ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও তিনি এখনো ঘণ্টাপ্রতি ৫৫ টাকা বেতন পান। সে হিসাবে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করে পান ৪৪০ টাকা। এটাই ওই কারখানার শ্রমিকদের সর্বোচ্চ বেতন। জাহাজভাঙা কারখানায় শ্রমিকদের বেতন হয় ঘণ্টা হিসাবে। এই বেতন দেশের বড় শহরগুলোতে কর্মরত দিনমজুরদের দৈনিক আয়ের প্রায় অর্ধেক। সরকার ঘোষিত দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা।

ওই কলোনির পাশে থাকা পুকুরঘাটে বসে কথা হয় সুমন মোল্লার সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে কথা বলা শুরু করতেই আরও অন্তত ১৫ জন শ্রমিক ঘাটে আসেন। শুরুতে কারখানার মালিকের ভয়ে কর্মক্ষেত্র ও আবাসন সম্পর্কে কিছু বলতে চাইছিলেন না তাঁরা। তবে একপর্যায়ে তাঁরা কথা বলতে শুরু করেন। ৪৭ বছর বয়সী সুমন মোল্লার বাড়ি নওগাঁ জেলায়। তাঁর দুই মেয়ে, স্ত্রী ও মা-বাবা থাকেন গ্রামের বাড়িতে। তিনি অন্য তিনজন শ্রমিকের সঙ্গে কক্ষ ভাগাভাগি করে থাকেন।

সেখানে অপর শ্রমিক আবুল কালাম বলেন, তিনি কাটারম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। আট ঘণ্টায় বেতন ২৮০ টাকা। তিনি বলেন, দৈনিক ২৮০ টাকা বেতন নিয়ে ২ হাজার টাকার ঘর ভাড়া নিলে খাব কী? বাড়িতে থাকা পরিবারের চারজনের ভরণপোষণ করব কীভাবে?
সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড
সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড। প্রথম আলো
কত মজুরি পান শ্রমিকেরা

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাহাজভাঙা শিল্পে কাটার (জাহাজ ও সমতল), ফিটার, লোডিং মিলে মোট সাত ধরনের শ্রমিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ফিটারশ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি মজুরি পান। দক্ষ একজন ফিটারশ্রমিক দৈনিক আয় করেন ৪৪০ টাকা। কাটার বা ওয়্যারশ্রমিকদের আয় দিনে ২৪০-৩৫০ টাকা।

জাহাজভাঙা শিল্পের অধিকাংশ শ্রমিকের নিয়োগপত্র, শ্রম আইন অনুযায়ী সবেতন ছুটি বা উৎসব বোনাস নেই বলে জানান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) পরিচালিত জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্যকেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির। তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, দুর্ঘটনা ও পেশাগত রোগ থাকলেও নেই চিকিৎসাসুবিধা। ২০১৮ সালে ঘোষিত নিম্নতম মজুরিও বাস্তবায়িত হয়নি। নেই ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর মনিরা পারভীন বলেন, এ শিল্পের শ্রমিকেরা অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত থাকেন বলে তাঁদের দায় নেন না জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকেরা। জাহাজে রয়েছে ক্যানসার সৃষ্টি করার মতো বিষাক্ত উপাদান অ্যাসবাস্টাস, পিসিবি ও টিবিটি। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী শ্রমিকদের ছোট্ট একটা ঘরে বেশ গাদাগাদি করে থাকতে হয়। সেই ঘরে নেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। শীত, বর্ষা—সব ঋতুতেই তাঁরা মাটিতে বিছানা করে থাকেন।

তবে গ্রিন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করছে বলে জানান কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক (সেফটি) মো. টিপু সুলতান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাঁদের জানামতে, খুব কমসংখ্যক কারখানায় দু-একটা পদে ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করছে না বলে তাঁরা জেনেছেন। ওই সব জাহাজভাঙা কারখানাকে তাঁরা নোটিশ দিয়েছেন। মজুরি বাস্তবায়নের জন্য আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

তবে শ্রমিকেরা যে মজুরি পাচ্ছেন, তা বেশি বলে দাবি করেন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শুধু জাহাজভাঙা কারখানা বলে মনগড়া বেতনকাঠামো আমাদের ওপর চাপিয়ে দিলে ঠিক হবে না। শিল্প বিবেচনায় বেতনকাঠামো ঠিক করতে হবে। গার্মেন্টসের মতো জায়গায় ১২ হাজার টাকা বেতন। জাহাজভাঙা শিল্পে তা ১৮ হাজার কিংবা তারও বেশি।’
https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-09%2F9cdkfc82%2FCtg-1.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
একটি কক্ষে রান্না ও ঘুমানোর ব্যবস্থা। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এম আই কলোনিতে। ছবি প্রথম আলো

Tuesday, May 27, 2025

নারীর নেশাতেই পতন: যেভাবে দিনমজুর থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী

আলী আকবর। একসময় ছিল স্বল্প শিক্ষিত একজন বেকার তরুণ। বসবাস করতো নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন চালিতাতলী পূর্ব মসজিদ এলাকায়। তার বাবা মঞ্জু মিয়া ছিলেন খেটে খাওয়া মানুষ। সেও দৈনিকভিত্তিক মজুর ছিলেন। তবে সেই কাজে তার মন বসেনি। কিশোর গ্যাংয়ে যোগ দিয়ে শুরু করে ছোটখাটো অপরাধ। পরে তার সাহস ও দুর্ধর্ষতা দেখে তাকে দলে ভেড়ায় বিদেশ পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী আলোচিত এইট মার্ডার মামলার প্রধান আসামি সাজ্জাদ আলী খান। এরপর থেকে তারই নির্দেশে বায়েজিদ, অক্সিজেন, হাটহাজারী, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, কর্ণফুলি নদীসহ নগরীর নানা স্থানে চাঁদাবাজি শুরু করে আকবর। হাতে তুলে নেয় দেশি-বিদেশি অস্ত্র। অপরাধ জগতে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে আকবর ঝুঁকে পড়ে নারী ও মদের নেশায়। একসময় ঢাকার এক মেয়েকে বিয়ে করে আলী আকবর হয়ে যান ঢাকাইয়া আকবর। আর সেই নামেই স্বস্তিবোধ করতো সে।

নাম শুনতে যেমন ভয়ঙ্কর, কাজ ছিল আরও ভয়ঙ্কর। হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, গুলি ছোড়া, অস্ত্রের ঝনঝনানি, আগুন দিয়ে বাড়ি-দোকান জ্বালিয়ে দেয়া তার কাছে ছিল মামুলি ব্যাপার। প্রায় ১ যুগ আগে সাজ্জাদ আলী খানের হাত ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডে পা রাখলেও ধীর ধীরে এই জগতে আলোচিত হয়ে ওঠে ঢাকাইয়া আকবর। সিএমপিও তাকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। তবে শেষমেশ নারীতেই পতন হলো এই সন্ত্রাসীর। রোববার চমেক হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে শুক্রবার রাত আটটার দিকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করা হয়। তার শরীরে অন্তত ১০-১২টি গুলি লাগে। এসময় গুলিবিদ্ধ হন ৮ বছরের শিশু রাতুলসহ আরও এক দর্শনার্থী। তবে অনেকে মনে করছেন, ঢাকাইয়া আকবরের মৃত্যু আন্ডারওয়ার্ল্ডে আরও অশান্তি সৃষ্টি করবে নতুন করে।

সূত্র মতে, ফেসবুকে বেশ সক্রিয় আকবর। তার আইডিও ভেরিফাইড। প্রায় সময় সে নানারকম ভিডিওর পাশাপাশি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্নাকে কটূক্তি করে ভিডিও পোস্ট করতো। নগরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই ডন সরোয়ার বাবলা ও বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী খানের সঙ্গে চাঁদাবাজি ও ব্যবসাকে ঘিরে দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ঝামেলা চলছিল। সেই বিরোধে জড়িয়ে ছিল তাদের শিষ্যরা। ঢাকাইয়া আকবর একসময় সাজ্জাদ আলী খানের শিষ্য থাকলেও ৩ বছর আগে থেকে তার দল ছাড়ে। পরে যোগ দেয় তারই প্রতিপক্ষ সরোয়ার বাবলার সঙ্গে। গত ১৫ই মার্চ ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হলে এই দু’গ্রপের উত্তেজনা আরও বাড়ে। ২৯শে মার্চ নগরের বাকলিয়ায় ব্যাপক গোলাগুলিতে ডাবল মার্ডার হয়। এরপরই ঘটে ঢাকাইয়া আকবরের ঘটনা। সরোয়ার বাবলার গ্রুপের লোকজন বলছে, এসব ঘটাচ্ছে ছোট সাজ্জাদের বাহিনী। একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে তারা হত্যা করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ‘সন্ত্রাসী’ আকবরের পরনারীর প্রতি দুর্বলতা ছিল আগে থেকেই। তাই তাকে ‘হত্যাচেষ্টা মিশনে’ পাতা হয়েছিল তরুণীর ফাঁদ। যার সঙ্গে মাত্র পাঁচদিনের পরিচয়ে ‘ডেটিংয়ে’ গিয়েছিলেন আকবর। এদিকে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র বলছে, এই হামলার নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন বড় সাজ্জাদ। ২০২৩ সালের দিকে কারাবন্দি অবস্থায় আকবরকে জামিন না করানোয় সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয় গুরু ও শিষ্যের। সেই থেকেই আকবরের ওপর ক্ষোভ থাকলেও সামপ্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে তা আরও বেড়ে যায়। পতেঙ্গা সৈকতে গোলাগুলির নেপথ্যে ছিল সেই দ্বন্দ্ব। প্রত্যক্ষদর্শী এক ব্যবসায়ী বলেন, আকবরের সঙ্গে থাকা চারজন ছেলেসহ তারা ৬-৭ জন সৈকতের ২৮ নম্বর দোকানে বসেছিলেন। মোটরসাইকেলে করে ৪ জন যুবক ঘটনাস্থলে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। এরপর আকবরের সঙ্গে থাকা ৪ জন সেখান থেকে দৌড়ে পালায়। আর যে তরুণী ছিলেন তিনি গুলিবর্ষণকারীদের সঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।  আকবরকে গুলির পরপরই স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হন। তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। এরপর তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার আগে আকবর কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, এই হামলার পেছনে রায়হান, খোরশেদ, ইমন ও বোরহান দায়ী। তারাই তাকে গুলি করেছে। ওই তরুণীর সঙ্গেও তার প্রথম দেখা।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই চারজন ছাড়াও সেগুন এবং মোহাম্মদ নামে আরও দু’জন ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন। বাকি চারজনসহ এই ছয়জন চট্টগ্রামের আলোচিত এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী। গুলিবিদ্ধ আকবরের বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজির অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময় এসব মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। ঢাকাইয়া আকবর ২০২৩ সালে গুরু সাজ্জাদ আলী খানের ভাইয়ের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। পরে না পেয়ে সাজ্জাদ আলী খানের বাড়ি গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। তার সঙ্গে থাকতে ঢাকাইয়া আকবর চট্টগ্রামের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘নিয়মিত চাঁদাবাজি’ করতেন। সাজ্জাদের ‘ সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ হিসেবে কাজ করতেন ঢাকাইয়া আকবর। ২০১৭ সালে আকবরকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। সে সময় ছয় রাউন্ড কার্তুজসহ একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয় তার কাছ থেকে। এরপর দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন আকবর। দু’বছর কারাভোগের পর ২০২২ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর জামিনে ছাড়া পান তিনি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুর সদর থেকে দু’টি অস্ত্রসহ তাকে আবারো  গ্রেপ্তার করে বায়েজিদ থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভবন মালিককে ফোন করে চাঁদা দাবির অভিযোগ ছিল সে সময়।

আকবরের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৩ সালে গ্রেপ্তারের পর জেলে থাকা অবস্থায় আকবর ভেবেছিলেন ‘গুরু’ সাজ্জাদ আলী খান তার জামিনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু ‘গুরুর’ সেই ‘আশীর্বাদের হাত’ পায়নি সে। তার পরিবারই অনেক কষ্টে জোগাড় করেছে মামলা পরিচালনার ব্যয়। তখন থেকেই গুরুর ওপর ক্ষোভ জন্মে তার। জামিনে বেরিয়ে আকবর গুরুকে টেক্কা দিতে নিজেই গড়ে তোলেন বাহিনী। এরপর থেকেই বড় সাজ্জাদের চাঁদাবাজিসহ নানা কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সে। পুলিশকে সাজ্জাদের বিভিন্ন তথ্য দিয়েও সাহায্য করতো সে। তাই আকবরের প্রতি সমপ্রতি বেশ ক্ষুব্ধ হয় বড় সাজ্জাদ। আকবরের ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, কারাবন্দি ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্না শারমিনকে নিয়ে প্রায়ই ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও পোস্ট করতো সে। এ ছাড়া পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান এবং বিএনপি’র এক শীর্ষ নেতাকে হুমকি দিয়েও ভিডিও পোস্ট করতে দেখা গেছে। সমপ্রতি গ্রেপ্তার হওয়া শীর্ষ এই সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুলিশকে তথ্য দিয়েছেন আকবর- এমন গুঞ্জন আছে। হাসপাতালে আকবরের স্বজনদেরও দাবি, এই ঘটনায় কারাগারে বন্দি ‘সন্ত্রাসী’ ছোট সাজ্জাদের অনুসারীরা জড়িত।

mzamin

Monday, May 26, 2025

সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর খুন

চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে বান্ধবী নিয়ে বেড়াতে গিয়ে দুর্বৃত্তের গুলিতে চিকিৎসাধীন সন্ত্রাসী আলী আকবর প্রকাশ ঢাকাইয়া আকবর (৩২) মারা গেছে। গতকাল সকাল ৮টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকার পশ্চিম পয়েন্টের ২৮ নম্বর দোকানের সামনে আড্ডারত অবস্থায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবরকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। গত ৫ই আগস্টের পর চট্টগ্রামের আলোচনায় আসা সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের অনুসারীরা এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের কয়েকটি সূত্র। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন দর্শনার্থী জান্নাতুল বাকী (৩০) এবং শিশু মহিম ইসলাম রাতুল (৮)। সে নগরের দক্ষিণ পতেঙ্গার ফুলছড়িপাড়ার শওকত হোসেনের ছেলে। আর জান্নাতুল বাকী ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে কর্মরত বলে জানিয়েছে পুলিশ।

সূত্র বলছে, সম্প্রতি ঢাকা থেকে আটক হওয়া সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের লোকজন এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। আর ঘটনার কলকাঠি নেড়েছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। যিনি ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের ‘গুরু’। গুলিবিদ্ধ ঢাকাইয়া আকবরও একসময় বড় সাজ্জাদের শিষ্য ছিল। কিন্তু বছরখানেক আগে কারাবন্দি অবস্থায় আকবরকে জামিন না করানোয় সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়। সেই থেকেই আকবরের ওপর ক্ষোভ থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে তা আরও বেড়ে যায়। পতেঙ্গা সৈকতে গোলাগুলির নেপথ্যে ছিল সেই দ্বন্দ্ব। ঘটনার শুরু থেকেই আকবরের সঙ্গে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবকের বর্ণনা অনুযায়ী, নুসরাত জাহান নামে ওই তরুণীর সঙ্গে আকবরের ফেসবুকে পরিচয় হয় মাত্র পাঁচদিন আগে। কথাবার্তার একপর্যায়ে দেখা করার প্রস্তাব দেয় আকবর। ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার পতেঙ্গা সৈকতে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। সে অনুযায়ী নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন মোড় এলাকায় এক ছোট ভাইকে দিয়ে প্রাইভেটকার পাঠায় আকবর। কিন্তু সেদিন ওই তরুণী আসেনি। পরদিন বিকালে তরুণীকে নিয়ে বেড়াতে যেতে আবারো একইস্থানে গাড়ি পাঠানো হয়। শুক্রবার বিকাল ৩টার পর অক্সিজেন মোড় জামান হোটেলের বিপরীতের প্রাইম ব্যাংকের সামনে দাঁড়ায় প্রাইভেটকারটি। কিছুক্ষণ পর নুসরাত জাহান নামে ওই তরুণী ঘটনাস্থলে যান বোরকা ও মাস্ক পরে। গাড়িতে ওঠার আগে তরুণী জানান, তার এক বান্ধবী ও বয়ফ্রেন্ডও সঙ্গে যাবে। পাঁচ মিনিটের মাথায় ওই তরুণী মুঠোফোনে ওই দু’জনকে সরাসরি পতেঙ্গা সৈকতে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে প্রাইভেটকারে চড়ে। তরুণীকে নিয়ে এরপর যাওয়া হয় একই থানাধীন চালতাতলী পূর্ব মসজিদ এলাকায় আকবরের বাড়ির সামনে। সেখান থেকেই আকবর গাড়িতে চড়ে। গাড়ি গিয়ে থামে জিইসি মোড় এলাকায়। একটি কাপড়ের শো-রুম থেকে কয়েকটি শার্ট কেনে আকবর।

এরপর গাড়িটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সরাসরি পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের দিকে রওয়ানা হয়। গাড়িতে থাকা অবস্থায় আকবর পতেঙ্গা এলাকার কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করে। বিকাল আনুমানিক পাঁচটায় গাড়ি পতেঙ্গায় পৌঁছায়। আকবর তার বন্ধুদের ফোন করলে তারা আসতে দেরি হবে বলে জানায়। তখন ওই তরুণীসহ কর্ণফুলী টানেল হয়ে আনোয়ারা পারকির সমুদ্র সৈকতে যায়। সেখানে প্রায় আধাঘণ্টা তরুণীর সঙ্গে সময় কাটায় আকবর। একপর্যায়ে অচেনা কয়েকজন ছেলে আকবরকে সালাম দিয়ে জানায়, ফেসবুকে আকবরের ভিডিও তারা দেখে। আকবর তাদের চিনতে না পেরে সন্দেহবশত তড়িঘড়ি করে আবারো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ফেরে। পতেঙ্গা সৈকতে ফেরার পর আকবরের পূর্বপরিচিত পতেঙ্গা এলাকার বন্ধুরা কল দেয় এবং সৈকতে তাদের দেখা হয়। যাদের মধ্যে তিনজন আকবরের সমবয়সী ছিল, বাকি একজন বড় ভাই। এরপর প্রাইভেটকার পার্কিং করে তারা সবাই মিলে সৈকতের ২৮ নম্বর দোকানে গিয়ে বসে। কিছুক্ষণ তারা গল্প করে দোকানিকে ডেকে নাশতা অর্ডার করে। এরই মধ্যে দোকানি পিয়াজু নিয়ে আসেন। আকবর এক প্লেট পিয়াজুসহ ওই তরুণীকে নিয়ে একটু দূরে আরেকটি টেবিলে গিয়ে বসে। প্রায় ১০ মিনিট পর হঠাৎ চার যুবক এসে আকবরকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। চারদিক ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ আকবর প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রের দিকে দৌড়াতে থাকে এবং একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আকবরের সঙ্গে থাকা সবাই এ সময় ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালায়।
আকবরকে গুলির পরপরই স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হন। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার আগে আকবর কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, এই হামলার পেছনে রায়হান, খোরশেদ, ইমন ও বোরহান দায়ী। তারাই আকবরকে গুলি করেছে। ওই তরুণীর সঙ্গেও তার প্রথম দেখা। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই চারজন ছাড়াও সেগুন এবং মোহাম্মদ নামে আরও ২ জন ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল। বাকি চারজনসহ এই ছয়জন চট্টগ্রামের আলোচিত এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী।

mzamin

Thursday, May 1, 2025

স্কুল থেকে ফেরার পথে রাহাতকে পিটিয়ে নদীতে ফেলে হত্যা

চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁওয়ে রাহাত ইসলাম (১২) নামে সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া এক বন্ধুকে মারধরের পর আহত অবস্থায় নদীতে ফেলে  হত্যা করেছে তার চার বন্ধু। পুলিশ ওই চার বন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে। বুধবার সকাল ৭টার দিকে নগরের হামিদচরের নদী থেকে নিহতের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত রাহাত নগরের চান্দগাঁওয়ের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব ফরিদের পাড়ার মো. লিয়াকত আলীর ছেলে এবং সানোয়ারা বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পাশাপাশি সে ব্রাদার্স ইউনিয়ন জুনিয়র ক্রিকেট দলের সদস্যও।

২৯শে এপ্রিল স্কুল ছুটিতে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে হারিয়ে যায় রাহাত। এ সময় চার বন্ধু মিলে শত্রুতার জেরে পূর্বের একটি ঘটনা নিয়ে তাকে মারধর করে নদীতে ফেলে দেয়। সকালে স্থানীয়রা লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।

রাহাতের মা রোজি আক্তার বলেন, ছেলের ছয় বছর বয়স থেকে ক্রিকেট অনুশীলনের জন্য আউটার স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতাম। অনুশীলন শেষ হওয়ার পর আবার তাকে নিয়ে বাসায় ফিরতাম। আমার কষ্ট হতো, ছেলে তা বুঝতে পারত। এ জন্য প্রায়ই বলত, মা আমি যখন বড় ক্রিকেটার হব, তখন বিদেশে খেলতে গেলে তোমাকেও নিয়ে যাব সঙ্গে। এসব কথা বলতে না বলতেই অঝোরে কাঁদতে থাকেন রোজি আক্তার। তখন তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন কোচ মাসুমউদ্দৌলা। পরে তিনি বলেন, ‘রাহাত অলরাউন্ডার ছিল। বোলিং, ব্যাটিং সবই করতো। ভালো কিপারও ছিল। গত বছর ক্লাবের অনূর্ধ্ব-১১-১২ গ্রুপের অধিনায়ক করা হয় তাকে। সীমিত ওভারের বেশ কয়েকটি খেলায় পাশাপাশি দুটি ৫০ রান ছিল তার। একবার ৪৯ রানে অপরাজিত ছিল সে। একজন সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারকে হারিয়ে ফেললাম আমরা।’

মা-বাবার তৃতীয় সন্তান রাহাত। তার বড় দুই ভাই রয়েছে। তবে তারা অসুস্থ। রাহাতের চাচা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমার ভাইয়ের যে ছেলেটা মেধাবী ছিল, খেলাধুলায় সেরা ছিল, সেই ছেলেটাই নেই।
সহপাঠীদের সঙ্গে রাহাতের কোনো ঝগড়া হয়েছে কি না, এ তথ্য নিশ্চিত করতে পারেননি সানোয়ারা ইসলাম বালক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল মনসুর চৌধুরী বলেন, স্কুলে রাহাতের সঙ্গে বন্ধুদের ঝগড়ার বিষয়ে কোনো তথ্য আমাদের কাছে ছিল না। আমাদের কাছে কোনো অভিযোগও করা হয়নি। আমি শ্রেণিশিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছি, তিনিও কিছুই জানেন না। রাহাতের মা আমাদের বলেছেন, ১০-১২ দিন আগে রাহাত একদিন বাসায় ফিরে তাঁকে বলেছে, কয়েকটা ছেলের সঙ্গে তার গণ্ডগোল হয়েছে। তার মা এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে ঝগড়া না করার জন্য বলেছিলেন।’ ঘটনার পর সানোয়ারা ইসলাম বালক উচ্চবিদ্যালয়ের তিন শিক্ষককে নিয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে বলে প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন।

রাহাতের বাবার একটি গ্রিলের ওয়ার্কশপ রয়েছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুই মাস আগে স্কুলে বসা নিয়ে সহপাঠীদের সঙ্গে তার ছেলের কথা-কাটাকাটি হয়। সেটি মীমাংসাও হয়ে যায়। কিন্তু এই ঘটনার জেরে তার ছেলেকে বুধবার টিফিন ছুটির পর নদীর তীরে নিয়ে যায় সহপাঠীরা। তারাই মেরে নদীতে ফেলে দেয় বলে তিনি দাবি করেন।
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার সকালে রাহাত স্কুলে গিয়েছিল। কিন্তু ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়ে আর বাসায় ফেরেনি। চান্দগাঁও থানার ওসি আফতাব উদ্দিন বলেন, চার বন্ধু মিলে এক বন্ধুকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় চারজনকে থানা হেফাজতে নিয়ে আসা হয়েছে। তদন্তের পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

mzamin