Showing posts with label সুশাসনের জন্য নাগরিক. Show all posts
Showing posts with label সুশাসনের জন্য নাগরিক. Show all posts

Sunday, November 30, 2025

রাজনীতিটা এখন ব্যবসায়িক জায়গায় পরিণত হয়েছে: বদিউল আলম মজুমদার

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, রাজনীতিটা এখন ব্যবসায়িক জায়গায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতির সঙ্গে অর্থবিত্তের মালিক হওয়া এখন প্রায় নিশ্চিত। ভবিষ্যতেও যদি রাজনীতিকদের ক্ষমতায় গিয়ে সম্পদ আহরণের ধারা চলতে থাকে, তাহলে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ সহজ হবে না। জনপ্রতিনিধিরা যদি জনগণের সেবা করতে গিয়ে নিজেদের সেবা করেন, তাহলে মানুষকে হয়তো আরেকবার জেগে উঠতে হবে।

আজ রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথা বলেন বদিউল আলম মজুমদার। ‘ভয়েস নেটওয়ার্ক’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

সেমিনারে বদিউল আলম মজুমদার ২০০৮ সালে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত মেয়রদের সম্পদের হিসাব তুলে ধরেন। তিনি জানান, নির্বাচনের পর পাঁচ বছরে খুলনা সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে সাড়ে ১৪ হাজার শতাংশের বেশি। বরিশাল সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে ৫ হাজার ৯১৭ শতাংশ। রাজশাহী সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে ২ হাজার ৩০৮ শতাংশ। আর সিলেট সিটি মেয়রের সম্পদ বাড়ে ৬০৮ শতাংশ।

বাংলাদেশের নির্বাচনী অঙ্গনকে অপরিচ্ছন্ন বলে উল্লেখ করেন বদিউল আলম মজুমদার। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টাকা দিয়ে কেনা যায়, এমন একটা গণতন্ত্র এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

সরকারের উপদেষ্টারা যদি নির্বাচনে অংশ নেন, তাহলে আরপিও (নির্বাচনসংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) অনুযায়ী তা নিয়মের ব্যত্যয় হবে কি না, সে বিষয়ে সেমিনারে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।

দেশের রাজনীতিবিদদের চাহিদা অসীম উল্লেখ করে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরা বা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের মতো কাজ যতই করা হোক, মানসিকভাবে যদি আমরা আমাদেরকে অন্তর থেকে ধৌত করতে না পারি, তাহলে অন্য কোনো বিষয় দিয়ে কোনো কিছু হবে না।’

বিএনপির এই নেতা মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ যদি জাতি হিসেবে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করতে না পারে, তাহলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি বলেন, তাত্ত্বিকভাবে দেখলে নির্বাচনকে খুব সহজ মনে হবে। কিন্তু বাস্তবে এটা অত্যন্ত জটিল সমীকরণ।

জেসমিন টুলি মনে করেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রের ব্যবহার বাড়বে। তাই সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আগেই সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে।

আগামী নির্বাচনে যাতে ফ্যাসিস্টরা কোনোভাবে অংশ নিতে না পারে, তা খেয়াল রাখতে হবে বলে মন্তব্য করেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য অধ্যাপক দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকিয়ে আছি নির্বাচন কমিশনের দিকে, তারা যাতে সুষ্ঠুভাবে এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।’

নির্বাচন ঘিরে গণমাধ্যমে যাতে সঠিক সংবাদ প্রচারিত হয়, সেই আহ্বান জানান উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য। নির্বাচনের সময় সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলে সংঘর্ষের ঘটনা কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

নির্বাচন কমিশন গঠনের পর থেকে কমিশনের কার্যক্রম এখনো জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি বলেন, বিশেষ করে সম্প্রতি যে নির্বাচন কর্মকর্তা অথবা ডিসি-এসপির যে নিয়োগগুলো হয়েছে, এগুলো কিছুটা প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। কোনো একটি দলের দিকে তাঁরা হেলে পড়ছেন কি না, এই প্রশ্নটিও আসছে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এখনো নিরপেক্ষতার প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে যেকোনো সময় সরকারের এই অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি মনে করেন, আগামী নির্বাচনে যদি কোনো জবরদখলের ঘটনা ঘটে, তা দেশের জন্য কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।

বিগত সময়ে দেশের মানুষের ভোটাধিকার আইসিইউতে চলে গিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। তিনি বলেন, ‘এটা থেকে বের হওয়াটা এখন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

বিভিন্ন হেভিওয়েট প্রার্থীর পিএসকে থানার ওসিরা ‘স্যার’ ডাকেন বলে অভিযোগ করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। তিনি বলেন, মাঠ প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও জনপ্রশাসন মূলত এখনো পেশিশক্তি যেদিকে, সেদিকে হেলে থাকে। একটা চাঁদাবাজির মামলা নেওয়ার আগে পুলিশ বারবার খোঁজ নেয়, তাঁর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না। তাঁদের এই হচ্ছে অভিজ্ঞতা।

অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে আহ্বান জানিয়ে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, আগামী নির্বাচনে যেন আওয়ামী লীগের কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীও অংশ নিতে না পারেন। ফ্যাসিবাদ ও তার দোসররা যাতে অংশ নিতে না পারে। ডামি নির্বাচনে যারা অংশ নিয়েছে, তারাও যাতে অংশ নিতে না পারে। এ নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সাহাবুল হক। সভাপতিত্বে করেন ভয়েস নেটওয়ার্কের চেয়ারপারসন মো. জসীম উদ্দিন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।

আয়োজকেরা জানান, ভয়েস নেটওয়ার্ক নামের এই প্ল্যাটফর্মে ২১টি নিবন্ধিত পর্যবেক্ষক সংস্থা যুক্ত আছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সংলাপ, গবেষণা, বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা কাজ করবে।

সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ারেছুল করিম, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি প্রমুখ।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-30%2Fwgobduw2%2FBadiul-Alam.jpeg?rect=242%2C0%2C1038%2C692&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার। আজ রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে। ছবি: প্রথম আলো

Friday, March 21, 2025

সংস্কার না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরও ফ্যাসিবাদ ফিরতে পারে: আলী রীয়াজ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম# সংস্কার শুধু সরকারের ইচ্ছার বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক দল এবং নাগরিকদের বহুল আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। তাই সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ও নাগরিক সনদ প্রণয়ন করতে হলে নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ।

বৃহস্পতিবার (২০ মার্চ) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর উদ্যোগে ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক, সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ মোহাম্মদ সাহান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান প্রমুখ। লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন সুজন-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।

ড. আলী রিয়াজ বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নটি ওঠার কারণ হলো, বিগত ১৫ বছরে বাংলাদেশে ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ভঙ্গুর করে ফেলা হয়েছে। স্বাধীনতার পর বিগত ৫৪ বছরে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আমরা দেখেছি, বিগত ১৫ বছরে বিচার বিভাগকে কীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হলে, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে পুনগর্ঠিত করা না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হলেও ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে। তাই বাংলাদেশে ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থান ঠেকাতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শেখ হাসিনা দেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ব্যবস্থায় পৌঁছাতে তার ১৫ বছর লেগেছে। তিনি নির্বাচন ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে দিয়েছিলেন। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে কারণে শেখ হাসিনার পলায়নের পর আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করছে, যাতে একটি ‘নাগরিক সনদ’ তৈরি করা যায়।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের তিনটি ম্যান্ডেট। একটি হলো, স্বৈরাচারী ব্যবস্থা যাতে আবার ফিরে আসতে না পারে সেজন্য কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করা; দ্বিতীয়ত মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা; তৃতীয়ত একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজন করা। এগুলো একইসঙ্গে হতে পারে, কোনোটি অপরের সঙ্গে সংঘর্ষিক নয়।

বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, বিচার বিভাগ নিয়ে অতীতে বিভিন্ন প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন তার প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেছে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ তুলে ধরেছে। আমি মনে করি, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু এখন সময় এসেছে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের।

ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকার অর্থেই ধর্মনিরপেক্ষ। এখানে সুফিবাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হয়েছে। কিন্তু তারপর সংস্কার কমিশনের জরিপে ৮৫ শতাংশ মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতার বিপক্ষে মতামত দিয়েছে। এর অন্যতম কারণ হলো জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়ে শুরু হওয়া ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিচিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।

তিনি বলেন, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনেক সমস্যা থাকলেও রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালিত হতে হবে। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার ও দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই যৌক্তিক কতগুলো সংস্কার করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, অতীতে সংস্কার একটি গালিতে পরিণত হলেও সংস্কার এখন বহুল আকাঙ্ক্ষিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আমি মনে করি, সংস্কারের পূর্বে আমাদের রাষ্ট্র ভাবনা কেমন হবে, তা পরিষ্কার করা উচিত। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, বাংলাদেশে কখনই রাষ্ট্র ভাবনা ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে সুচিন্তিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রবর্তনের অল্প কিছু কাল পরেই এতে নানান সমস্যা পরিলক্ষিত হয়েছে। ফলে সংবিধানে অনেকগুলো সংশোধনী আনতে হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ সংশোধনী আনা হয়েছে ব্যক্তি স্বার্থে।

বিগত ১৬ বছরের অভিজ্ঞতার ফলে সংস্কার একটি অনিবার্য বাস্তবতা এবং এক্ষেত্রে একটি স্ট্যান্ড তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মূল প্রবন্ধ পাঠকালে দিলীপ কুমার সরকার ৫টি সংস্কার কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসমূহ সংক্ষেপে তুলে ধরে বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের বিশ্বাস জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোসহ সকল অংশীজনের সঙ্গে বসে স্বল্প সময়ের মধ্যেই সংস্কারের ব্যাপারে ঐকমত্যে আসতে পারবে এবং সেই ঐকমত্যের সূত্র ধরেই আমরা সংস্কার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করব। এক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কর্তৃক রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর একটি তালিকা তৈরি করা; ঐকমত্যের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার ও রাজনৈতিক সরকারের উদ্যোগে যে সকল সংস্কার প্রস্তাব কার্যকর করা হবে তা বিভাজিত করা; জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি জাতীয় সনদ প্রস্তুত করা; একটি জাতীয় সংলাপ আয়োজন করে জাতীয় সনদে সকল রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য অংশীজনের স্বাক্ষর গ্রহণের মধ্য দিয়ে সংস্কারের বিষয়ে তাদের অঙ্গীকারাবদ্ধ করা; অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য নির্ধারিত সংস্কারগুলো সম্পন্ন করে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিবেশ সৃষ্টি করা; একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ তথা সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা; বিজয়ী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা এবং নবগঠিত সরকারের নেতৃত্বে জাতীয় সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাগুলো বাস্তবায়নের করা এবং পরবর্তীতেও তা চলমান রাখার প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় সনদে এই মর্মে উল্লেখ থাকবে, ‘যে রাজনৈতিক দল বা জোটই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করুক না কেন, সেই দল বা জোট জাতীয় সনদে বর্ণিত সংস্কার প্রক্রিয়া আবশ্যিকভাবে সম্পন্ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং যে সকল দল বা জোট বিরোধী দলের আসনে বসবে, তারা আবশ্যিকভাবে তা সমর্থন করবে। জাতীয় সনদ স্বাক্ষরের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকল রাজনৈতিক দলসহ সকলের জন্য অবশ্য পালনীয় একটি আচরণবিধি প্রণীত হবে। সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নসহ আচরণবিধি সংশ্লিষ্ট সকলে যথাযথভাবে মেনে চলছেন কি না, তা দেখার জন্য রাজনৈতিক দলসহ সকল অংশীজনের সমন্বয়ে একটি লিয়াজোঁ কমিটি গঠিত হবে। পাশাপাশি জাতীয় সনদের বিষয়গুলোকে সংবিধানে সন্নিবেশনের জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি বিল আনা যেতে পারে। এক্ষেত্রে একটি বিকল্প ধারণা হতে পারে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে উচ্চ আদালতের পরামর্শ (গাইডেন্স) সাপেক্ষে একটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে জাতীয় সনদে বর্ণিত বিষয়সমূহকে সংবিধানের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।’ >>বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম

সংস্কার না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরও ফ্যাসিবাদ ফিরতে পারে: আলী রীয়াজ
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর উদ্যোগে ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক

Thursday, October 31, 2024

ভোটে কী পরিবর্তন আসছে?

নির্বাচনের যাত্রা শুরু হচ্ছে দেশে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি চূড়ান্ত হয়েছে। এই কমিটির মাধ্যমে গঠিত হবে নির্বাচন কমিশন। যে কমিশনের সামনে দেশের মানুষের ১৬ বছরের  ভোট দিতে না পারার আক্ষেপ ঘোচানোর দায়িত্ব পড়বে। বিদ্যমান আইনে নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি হচ্ছে। এই কমিটি যে সুপারিশ দেবে তার ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট কমিশন গঠন করে দেবেন। নতুন নির্বাচন কমিশন কেমন নির্বাচন আয়োজন করবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি কেমন হবে,  দেশের সব দল নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পাবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। সূত্রের দাবি কমিশন গঠন হলে এ সংক্রান্ত সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে তাদের কার্যপরিধি ঠিক করবে। এছাড়া সব দলকে নির্বাচনে আনাসহ আরও কিছু বিষয় নির্ভর করবে সরকারের সিদ্ধান্তের উপর।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, আমাদের প্রত্যাশা নির্বাচন কমিশন গঠিত হোক সৎ, সাহসী ও যোগ্য মানুষ দ্বারা। যারা সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে তাদের দায়িত্বটা সুচারুভাবে পালন করবেন। যার মাধ্যমে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা কার্যকর হয়। একই সঙ্গে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের দেয়া সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা যথাযথ ভূমিকা রাখবে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ করতে সার্চ কমিটির প্রধান হচ্ছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। বুধবার মন্ত্রী পরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যদিও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কমিটির প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
এর আগে গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য কমিশনার নিয়োগের সুপারিশ করতে সার্চ কমিটির প্রধান হিসেবে আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীকে মনোনীত করেন প্রধান বিচারপতি। এছাড়া সদস্য হিসেবে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি একেএম আসাদুজ্জামানকে মনোনীত করা হয়েছে। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ সুপ্রিম কোর্টের এই দুই বিচারপতির নাম সুপারিশ করে তা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনানুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের শূন্য পদে নিয়োগ দেয়ার যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের নাম সুপারিশ করার উদ্দেশ্যে ৬ (ছয়) জন সদস্যের সমন্বয়ে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করবেন প্রেসিডেন্ট। সদস্যের মধ্যে থাকবেন- প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক, যিনি অনুসন্ধান কমিটির সভাপতিও হবেন। এছাড়া, প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারক, বাংলাদেশের মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং প্রেসিডেন্ট কর্তৃক মনোনীত ২ (দুই) জন বিশিষ্ট নাগরিক, যাদের একজন হবেন নারী। এই দুই সদস্যের মধ্যে পিএসসি’র সাবেক একজন নারী চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষকের নাম তালিকায় আছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে নানা বিতর্কের মধ্য দিয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনটি ছিল অনেকটা বিনা ভোটের। কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বিরোধী দলবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে উঠেছিল, তা এই কমিশন ধ্বংস করে দেয়। নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ না থাকলেও বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করে রকিবউদ্দীন কমিশন। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট ও তাদের শরিক দলের প্রার্থীরা ভোটের আগেই ৩০০ আসনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এতে ভোটের আগেই সরকার গঠনের আসন পেয়ে যায় আওয়ামী লীগ। এছাড়া এতে পাঁচ কোটির বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারায়। এদিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই ২৩৪টি আসন পায়। আর জাতীয় পার্টি ৩৪টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ৬টি, জাসদ (ইনু) ৫টি, তরীকত ফেডারেশন ২টি, জাতীয় পার্টি (জেপি) ২টি, বিএনএফ ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৬টি আসনে জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনে (১৪৭টি আসনে) ভোট প্রদানের হার দেখানো হয় ৪০ দশমিক ০৪ ভাগ। নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়। এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে সংসদে বিরোধী দল বানানো হয়। একই সঙ্গে দলটি থেকে মন্ত্রীও করা হয় এবং এরশাদকে বানানো হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত। জাতীয় পার্টি আসলে সরকারের অংশ নাকি বিরোধী দল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে এই কমিশনের দায় সবচেয়ে বেশি।

২০১৪ সালের মতো ২০১৮ সালেও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ-সংশয় ছিল। নির্বাচনের আগে বিএনপি’র সঙ্গে আরও কিছু দল যুক্ত হয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ আরও কিছু দল ও জোটের সঙ্গে সংলাপ করেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এমন প্রেক্ষাপটে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই ২৫৮টি আসন পায়। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি ২২টি এবং মহাজোটভুক্ত অন্য দলগুলো ৮টি আসনে জয়ী হয়। আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত বিএনপি পায় মাত্র ৬টি আসন। এ ছাড়া গণফোরাম ২টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৩টি আসনে জয়ী হন। এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয় ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় মোট ভোটের ৭৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বিএনপি পায় মাত্র ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ ভোট। একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ এবং ১ হাজার ৪১৮টি কেন্দ্রে ৯৬ শতাংশের ওপর ভোট পড়ে। অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৫টি আসনের ৫৮৬টি কেন্দ্রে যতগুলো বৈধ ভোট পড়ে তার সবগুলোই পেয়েছে নৌকা মার্কার প্রার্থীরা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল রাতের ভোট। বিএনপি এবং তাদের জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অনেক প্রার্থী ভোটের আগের রাতেই ভোটকেন্দ্র নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ ছিল, রাতেই কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের প্রার্থীর সমর্থকরা ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভরেন। আগের রাতে সিল মারার সত্যতা গণমাধ্যমেও উঠে আসে। পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তায় বিতর্কিত এই নির্বাচন হয়।

২০২২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি সিইসি হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক আমলা কাজী হাবিবুল আউয়াল। নিয়োগ পাওয়ার পরই তিনি জানান, তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বিএনপি’র মতো বড় রাজনৈতিক দলসহ অন্যান্য দলকে নির্বাচনে আনা। যদিও শেষ পর্যন্ত বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোকে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আনতে ব্যর্থ হন তিনি। দায়িত্ব গ্রহণের পরই বিভিন্ন সিটি ও উপ-নির্বাচনের আয়োজন করে। সেই নির্বাচনগুলোও নানাভাবে বিতর্কিত হয়। এসব নির্বাচনে ভোটের হারও ছিল অনেক কম। পরবর্তীতে আরওপিও সংশোধন করে নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করে আউয়াল কমিশন। নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ করার আইন কঠিন করা হয়। শুরু থেকেই সিইসি রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়ার কথা বললেও শেষ পর্যন্ত ডিসিদের রিটার্নিং কর্মকর্তা করা হয়। যোগ্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধন না দিয়ে ভুঁইফোঁড় কয়েকটি দলকে নিবন্ধন দেয় ইসি। এ ছাড়া রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ নানা ইস্যুতে সিইসি ও অন্যান্য কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যয় ধরা হয়। এমন বাস্তবতায় ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি একতরফাভাবে এই নির্বাচন আয়োজন করে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন। বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল নির্বাচন বয়কট করায় নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক দেখাতে বিভিন্ন আসনে বিরোধী প্রার্থী হিসেবে ডামি প্রার্থী (নকল) দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এজন্য ডামি ও একতরফা নির্বাচন হিসেবে খেতাব পায় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন।  

mzamin

Sunday, September 15, 2024

আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য হবে না

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের অনেকেই পালিয়ে গেছেন। নেতৃত্ব দেয়ার মতো কাউকে এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন হলে তা অগ্রহণযোগ্য হবে  না। আমি-ডামি, একতরফা ও মধ্যরাতের নির্বাচন করে নির্বাচনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেছে আওয়ামী লীগ। গতকাল ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি’র আয়োজনে ‘গণতন্ত্র সুরক্ষায় রাষ্ট্র মেরামত এবং জাতীয় নির্বাচন’ শীর্ষক ছায়া সংসদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।

সুজন সম্পাদক বলেন, বর্তমান সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল রুটিন সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পনেরো-ষোলো বছরের জঞ্জাল দূর করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। তারপরেও জাতীয় নির্বাচন বিলম্বিত হলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কমতে পারে। গত তিনটি নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন, পুলিশ, প্রশাসন, রিটার্নিং অফিসার, পোলিং অফিসারসহ নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সবাই অপরাধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। কমিশন নির্বাচনব্যবস্থাকে বিভিন্ন অজুহাতে দলীয়করণ করে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করেছে। আদালতের নির্দেশ অমান্য করেছে। অতি-উৎসাহী হয়ে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছে। তাই নির্বাচনী অপরাধে অভিযুক্ত সবাইকে বিচারের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা উচিত। এ সময় তিনি গত  ডামি নির্বাচনে অভিযুক্ত সবার বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের জন্য সমতল ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারেনি। সে সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সরকারের রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি কথিত দলকে নিবন্ধন দিয়েছে।

সভাপতির বক্তব্যে ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, এদেশের মানুষ ভুলে যায়নি কীভাবে দিনের ভোট রাতে হয়েছিল। মৃত মানুষ ভোট দিয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিরাও ভোট দিয়েছে। কোথাও কোথাও শতভাগ ভোট পড়েছে। শিশুরাও ভোট দিয়েছে। আমি আর ডামি প্রার্থীর নির্বাচন হয়েছিল। ৮ থেকে ১০ শতাংশ ভোট পড়লেও ভোটের সংখ্যা বাড়িয়ে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ দেখানো হয়েছিল। ছায়া সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতার্কিকদের পরাজিত করে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিতার্কিকরা বিজয়ী হন।
mzamin

Saturday, September 14, 2024

তাদের অবিচল লড়াই by মো. আল আমিন

সুজন, টিআইবি, সিপিডি, সিজিএস, মায়ের ডাকসহ নানা সংগঠন গণতন্ত্র, সুশাসন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। কেউ কেউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিল উচ্চকণ্ঠ। এসব করতে গিয়ে তারা হয়েছেন নির্যাতিত। তারপরও হাল ছাড়েননি। চালিয়ে গেছেন লড়াই। বিশেষ করে গত ১৬ বছর তাদের লড়াই ছিল জনতার পক্ষে। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে কথা বলে গেছেন-

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন): দেশের সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সুজন। আওয়ামী স্বৈরশাসনামলে হুমকি, হামলা এবং চাপের  মুখেও নাগরিক ইস্যুতে সরব ভূমিকা রেখেছে সংগঠনটি। শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের নানাচিত্র প্রতিনিয়ত তুলে ধরেছে নাগরিকের সামনে। এতে নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হয়েছে সংগঠনটির। সুজনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হলেন উন্নয়নকর্মী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, নির্বাচন, উন্নয়ন ও সুশাসন নিয়ে তিনি দেশের সুশীল সমাজের অন্যতম সরব কণ্ঠ। নাগরিক ইস্যুতে কথা বলার কারণে তিনি শেখ হাসিনা সরকারের বিরাগভাজন হয়েছেন। গোয়েন্দা সংস্থা থেকে হুমকি দেয়া, এনজিও ব্যুরো থেকে হয়রানি করা, তার প্রতিষ্ঠিত সংস্থা সুজন বন্ধ করে দেয়া, সংস্থার অনুদান বন্ধ করে দেয়া এবং ওয়েবসাইট হ্যাক করা, স্বজনদের হয়রানিসহ অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু এসব উপেক্ষা করেই সমাজের প্রয়োজনে কাজ করে গেছেন তিনি। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক মাস পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বদিউল আলম মজুমদার।

ওদিকে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। শেখ হাসিনা সরকারের দুর্নীতি ও দুঃশাসন নিয়ে তথ্য প্রকাশ করার ফলে সরকারের রোষানলে পড়তে হয় সংস্থাটির। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত টিআইবি’র প্রতিবেদনকে একপেশে, সরকারবিরোধী, অযৌক্তিক ও গোঁজামিলে ভরা বলে দাবি করে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা বলেন, বিএনপি’র ভাষায় কথা বলে টিআইবি। বিএনপি’র ওকালতি করতেই এই রিপোর্ট। এ ছাড়া টিআইবি’র অন্য প্রতিবেদন নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছে সরকার। তবে সরকারের চাপের মধ্যেও নিরপেক্ষ তথ্য প্রকাশ করে গেছে সংস্থাটি। সর্বশেষ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সংস্থাটি। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন ও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের হামলায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে টিআইবি। সেইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সকল দাবি মেনে নেয়ারও আহ্বান জানায় তারা। এদিকে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ডিবিতে আটক ছয় সমন্বয়কসহ অন্যদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়ার দাবিতে বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও মানববন্ধনে অংশ নেন তিনি। তাকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিটির প্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
: ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি গবেষণা ও পলিসি ডায়ালগের মাধ্যমে দেশের নীতিনির্ধারণের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। বিগত ১৬ বছর শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে নিরপেক্ষ চরিত্র ধরে রেখেছে বেসরকারি এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের নেয়া ভুল পদক্ষেপগুলো নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সমালোচনা থেমে ছিল না। এতে সরকারের রোষানলে পড়তে হয় তাদের। আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ সিপিডি’র প্রতিবেদনকে নির্জলা মিথ্যাচার বলে আখ্যা দেন। সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকও সিপিডি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, একটি রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আনতে জরিপ করে সিপিডি। এ ছাড়া খোদ শেখ হাসিনা সিপিডি’র নাম না করে তাদের প্রতিক্রিয়াকে ‘ভালো না লাগা’ পার্টি বলে আখ্যা দেন। বেসরকারি এই গবেষণা সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো হলেন- বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র জানতে গত ২৮শে আগস্ট একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যকে এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমানও। এ ছাড়া সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, জ্যেষ্ঠ গবেষক ও অর্থনীতিবিদ তৌফিকুল ইসলাম এবং গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। অর্থনীতি নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ে সবসময় সমালোচনা করে এসেছে সংস্থাটির এই গবেষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ২০১৪ সালে গঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। তবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন কোটা সংস্কার ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এই নেটওয়ার্কটি সবার দৃষ্টি কাড়ে। চব্বিশের জুলাইতে দ্বিতীয় কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই প্ল্যাটফরমটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৪ই জুলাই একটি সংবাদ সম্মেলনে বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে হাসিনার অবমাননাকর মন্তব্যের পরে আন্দোলনটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পরের দিন, ছাত্রলীগের ও পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মমভাবে হামলা চালায়, ফলে সারা দেশে ছয়জন শিক্ষার্থী নিহত হন। এর প্রতিক্রিয়ায়, ছাত্রলীগের সদস্যদের ছাত্রাবাস থেকে বহিষ্কার করা হয়, যার জেরে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে দেয়। ১৬ই জুলাই রাতের মধ্যে, ছাত্রাবাসগুলো জোরপূর্বক খালি করা হয়েছিল। ১৭ই জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক ঢাবিতে শিক্ষকদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে। হত্যাকাণ্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের নিন্দা জানিয়ে শত শত অধ্যাপক এতে যোগ দেন। এই প্রতিবাদ ছাত্র আন্দোলনকে আরও জোরদার ও নিপীড়ন মোকাবিলায় সহায়তা করে। বৈঠকের পর সংগঠনটির অধ্যাপকরা স্থানীয় থানা থেকে আটক ছাত্রদের উদ্ধার করেন এবং চিকিৎসা চলাকালীন শীর্ষ ছাত্র নেতাদের দ্বিতীয়বার আটক করার পরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে ২৭শে জুলাই গোয়েন্দা অফিসে যান। ৩১শে জুলাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সংগঠনের সদস্যরা একটি সমাবেশে ছাত্রদের গ্রেপ্তার করার জন্য সাদা পোশাকের পুলিশদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়, যার জেরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। ২রা আগস্ট দ্রোহযাত্রায় (বিদ্রোহীদের  কুচকাওয়াজ) অংশ নেন ইউটিএন’র  সদস্যরা। যেখানে সিনিয়র সদস্য আনু মুহাম্মদ কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দেন এবং হাসিনাকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি বিভিন্ন নাগরিক ইস্যুতে সরব ছিল।

মায়ের ডাক হলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের শাসনামলে সরকারি সংস্থা কর্তৃক বলপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের প্ল্যাটফরম। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনার দাবিতে গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে প্ল্যাটফরমটি। মায়ের ডাকের অন্যতম সমন্বয়ক হলেন সানজিদা ইসলাম তুলি। যিনি প্ল্যাটফরমটির প্রতিষ্ঠাতা। তার ভাই বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ২০১৩ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস): বাংলাদেশভিত্তিক একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, যা সুশাসন, দুর্নীতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের বিষয়ে গবেষণা ও মিডিয়া স্টাডি পরিচালনা করে। দ্রুত পরিবর্তনশীল জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংগঠনটি ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সংলাপের আয়োজন করে আলোচনায় আসে সিজিএস। বিশ্বের ৭০টি দেশের গবেষক, শিক্ষক, লেখক, সমরবিদ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন পেশার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়। চ্যানেল আই-এর টক শো তৃতীয় মাত্রার জনপ্রিয় সঞ্চালক জিল্লুর রহমান এই সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে সিজিএসের উদ্যোগে বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের নিয়ে মিট দ্য অ্যাম্বাসেডর অনুষ্ঠান করেন জিল্লুর রহমান। ওই অনুষ্ঠানে আসা জাপানি রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য নিয়ে বেশ আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত বলেন, আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির কথা আমিও শুনেছি। এতে অনেকটা বেকায়দায় পড়ে যায় আওয়ামী লীগ সরকার। এরপরই নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয় জিল্লুর রহমান ও সিজিএসের কর্মকর্তাদের। তথ্য সংগ্রহের নামে জিল্লুর রহমানের পৈতৃক বাড়িতে যায় পুলিশ। এ ছাড়া জিল্লুর রহমানসহ সিজিএস সাবেক ও বর্তমান তিন কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সেখানে তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় বিদেশ থেকে অর্থসহায়তা আসে কিনা, টাকা কীভাবে খরচ হয়। অন্যদিকে জিল্লুর রহমানের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ। এ সময় সিজিএসের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়। তারপরও সুশাসন, দুর্নীতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের বিষয়ে সিজিএসের গবেষণা থেমে থাকেনি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক): মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা প্রদানকারী একটি বেসরকারি সংগঠন। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি মানবাধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে কর্মকৌশল দিয়ে আসছে। এই কর্মকৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি, সালিশ ও মামলার মাধ্যমে আইনি সহায়তা প্রদান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও মানবাধিকার গবেষণা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলার সাহায্যে আইন ও নীতি সংস্কারের প্রয়াস এবং গণমাধ্যম ও নিজস্ব প্রকাশনার মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য প্রদান। বিগত ১৬ বছর আওয়ামী শাসনামলে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, বিচারের অপেক্ষায় কারাবাস, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন, বস্তি উচ্ছেদ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া বিগত সরকারের নেয়া প্রহসনমূলক আইনগুলোর সমালোচনা করেছে তারা। এতে এনজিও ব্যুরো থেকে হয়রানির শিকারও হতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। বন্ধ করে দেয়া হয় বিদেশি অনুদানের অর্থছাড়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের চেয়ারপারসন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট জেড আই খান পান্না।

ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ (এফবিএস): বাংলাদেশ অধ্যয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাডেমিক, বিশ্লেষক এবং গবেষকদের প্ল্যাটফরম। এই ফোরাম ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংক্রান্ত সমসাময়িক বিষয়ের ওপর গবেষণা, মতামত এবং নীতি-নির্ধারণমূলক আলোচনার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকে। এফবিএস গঠিত হয় ২০২২ সালে। এরপর থেকেই সুশাসন, অর্থনীতি, দুর্নীতি, মানবাধিকার, নির্বাচন ও সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিনিয়ত ওয়েবিনারের আয়োজন করে আসছে প্ল্যাটফরমটি। ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজের ওয়েবিনারের আলোচক হিসেবে নিয়মিত মুখ হলেন-আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজ, সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ, সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহিদ খান, বিশিষ্ট সাংবাদিক মনির হায়দার, টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব, উন্নয়ন ও অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক এবং জার্মান ফেডারেল শিক্ষা ও গবেষণা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প গবেষক জিয়া হাসান, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের রিসার্চ ফেলো মির্জা এম হাসান। এ ছাড়া দেশ-বিদেশের একাডেমিক, বিশ্লেষক এবং গবেষকরা অংশ নেন প্ল্যাটফরমটির ওয়েবিনারে।   
অধিকার বাংলাদেশভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা। আদিলুর রহমান খান এবং সুশীল সমাজের অন্যান্য সদস্যরা ১৯৯৪ সালের ১০ই অক্টোবর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে হওয়া গুম-খুনের সঠিক তথ্য প্রকাশ করে হয়রানির শিকার হয় প্রতিষ্ঠানটির মানবাধিকার কর্মীরা। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ আন্দোলন শুরুর পর তার প্রতিক্রিয়ায় ২০১৩ সালের ৫ই মে হেফাজত সারা দেশ থেকে সংগঠনের কর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষার্থীদের ঢাকায় জড়ো করে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নিয়েছিল। সরকারের বার বার আহ্বানেও তারা ওই স্থান না ছাড়ায় রাতে সমন্বিতভাবে অভিযান চালিয়ে তাদের সরিয়ে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই অভিযানে ৬১ জন নিহত হন বলে পরে অধিকার তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করে। যদিও পুলিশের দাবি, রাতের অভিযানে কেউ মারা যাননি। অধিকারের প্রতিবেদনে প্রকাশিত সংখ্যাটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হলে গ্রেপ্তার করা হয় অধিকারের সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে। সংগঠনটির পরিচালক নাসির উদ্দিন এলান আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। তদন্ত শেষে ওই বছরের ৪ঠা সেপ্টেম্বর ঢাকার আদালতে আদিলুর ও এলানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। ২০১৪ সালে তাদের বিচার শুরু হয়। ৯ বছর পর ২০২৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় এই দুইজনকে দুই বছর কারাদণ্ড দেয়। এদিকে মানবাধিকার ইস্যুতে কাজ করার জন্য ২০২২ সালে অধিকারের নিবন্ধন বাতিল করে দেয় সরকার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা): বাংলাদেশের অন্যতম একটি বেসরকারি আইনজীবী সংগঠন, যা পরিবেশ সংরক্ষণে আইনি সহায়তার প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে বেলার প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সংস্থাটির হয়ে তিনি পরিবেশের ক্ষতিসাধনকারী নানা চক্র আর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছেন। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সহিংসতায় প্রাণহানির পাশাপাশি মিথ্যা মামলা ও নির্বিচারে গ্রেপ্তারের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেন তিনি। অংশ নেন বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও মানববন্ধনে। বর্তমানে তিনি মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন।

Wednesday, August 21, 2024

কার দায় কতো? by মো. আল-আমিন

দেশের ইতিহাসে একতরফা নির্বাচনের যেসব নজির রয়েছে তার মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল অন্যতম। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই বিতর্কিত নির্বাচনের আয়োজন করে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে হওয়া ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন। ওই সংসদের মেয়াদ পূর্তির পর ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন। এ নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ নিলেও ভোটের আগের রাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় নির্ধারিতসংখ্যক ভোট কেটে নেয়ায় ওই নির্বাচন আখ্যা পায় রাতের ভোট হিসেবে। রাতে ভোটে গঠিত সংসদ ও নির্বিঘ্নে ৫ বছর পার করে। ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন। এই নির্বাচন বয়কট করে বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। ক্ষমতায় থেকে নিজেদের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীর বাইরে দলের নেতাদেরই ডামি প্রার্থী করে প্রায় সব আসনে। নিজের দলের নেতাদের মাঝেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় নির্বাচনে।

এ কারণে এই নির্বাচন পরিচিত হয় ডামি নির্বাচন হিসেবে। বলা হয়ে থাকে দশম সংসদ নির্বাচন এক তরফা ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আয়োজন করে রকিব কমিশন আওয়ামী লীগকে বিনা ভোটে দেশ চালানোর লাইসেন্স দেয়। এরপর থেকেই দলটি বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ওই নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় পরের দুই নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন একতরফা ও একপেশে হয়ে পড়ে। একে একে ভেঙে পড়ে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা। নির্বাচন বিমুখ হয়ে পড়েন ভোটাররা। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মত স্বাধীন কমিশন হয়েও সরকারি দলের আজ্ঞাবহ এবং তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা করে পর পর তিনটি নির্বাচন কমিশন দেশকে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে নিপতিত করে। দেশকে এই অবস্থায় নেয়ার পেছনে তিনটি কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই দায়ী। নির্বাচন কমিশন সঠিক ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাস ভিন্ন হতে পারতো। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর এখন যেসব ঘটনার বিচারের দাবি উঠছে তিনটি নির্বাচন কমিশনে থাকা সবার দায় নিরুপণ করে বিচারও জরুরি।

বিনা ভোটের নির্বাচন
কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অধীনে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বিরোধী দলবিহীন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে উঠেছিল, তা এই কমিশন ধ্বংস করে দেয়। নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ না থাকলেও বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করে রকিবউদ্দীন কমিশন। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট ও তাদের শরিক দলের প্রার্থীরা ভোটের আগেই ৩০০ আসনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এতে ভোটের আগেই সরকার গঠনের আসন পেয়ে যায় আওয়ামী লীগ। এছাড়া এতে পাঁচ কোটির বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারায়। এদিকে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই ২৩৪টি আসন পায়। আর জাতীয় পার্টি ৩৪টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ৬টি, জাসদ (ইনু) ৫টি, তরীকত ফেডারেশন ২টি, জাতীয় পার্টি (জেপি) ২টি, বিএনএফ ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১৬টি আসনে জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনে (১৪৭টি আসনে) ভোট প্রদানের হার দেখানো হয় ৪০ দশমিক ০৪ ভাগ। নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তৃতীয় দফা সরকার গঠিত হয়। এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে সংসদে বিরোধী দল বানানো হয়। একই সঙ্গে দলটি থেকে মন্ত্রীও করা হয় এবং এরশাদকে বানানো হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত। জাতীয় পার্টি আসলে সরকারের অংশ নাকি বিরোধী দল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে এই কমিশনের দায় সবচেয়ে বেশি।

রাতের ভোট
২০১৪ সালের মতো ২০১৮ সালেও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সন্দেহ-সংশয় ছিল। নির্বাচনের আগে বিএনপি’র সঙ্গে আরও কিছু দল যুক্ত হয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নামে একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ আরও কিছু দল ও জোটের সঙ্গে সংলাপ করেন এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। এমন প্রেক্ষাপটে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে কেএম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একাই ২৫৮টি আসন পায়। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি ২২টি এবং মহাজোটভুক্ত অন্য দলগুলো ৮টি আসনে জয়ী হয়। আর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টভুক্ত বিএনপি পায় মাত্র ৬টি আসন। এছাড়া গণফোরাম ২টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৩টি আসনে জয়ী হন। এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয় ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ পায় মোট ভোটের ৭৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। বিএনপি পায় মাত্র ১২ দশমিক ০৭ শতাংশ ভোট। একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ এবং ১ হাজার ৪১৮টি কেন্দ্রে ৯৬ শতাংশের ওপর ভোট পড়ে। অন্যদিকে বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ৭৫টি আসনের ৫৮৬টি কেন্দ্রে যতগুলো বৈধ ভোট পড়ে তার সবগুলোই পেয়েছে নৌকা মার্কার প্রার্থীরা। এসব কেন্দ্রে ধানের শীষ কিংবা অন্য প্রার্থী কোনো ভোটই পাননি।

এ নির্বাচনে ভোটের পরিস্থিতি ও ফলাফল যে স্বাভাবিক ছিল না, তা হুদা কমিশনের সদস্য মাহবুব তালুকদার তার নির্বাচননামা বইয়ে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন, জনগণের কাছে একাদশ সংসদ নির্বাচন রাতের নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এই নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবেও গ্রহণযোগ্যতা হারায়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল রাতের ভোট। বিএনপি এবং তাদের জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অনেক প্রার্থী ভোটের আগের রাতেই ভোটকেন্দ্র নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে ধরেন। তাদের অভিযোগ ছিল, রাতেই কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের প্রার্থীর সমর্থকেরা ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভরেন। আগের রাতে সিল মারার সত্যতা গণমাধ্যমেও উঠে আসে।

ডামি নির্বাচন
২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে একটি ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনও ছিল বিতর্কিত। এমন বাস্তবতায় ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি একতরফাভাবে এই নির্বাচন আয়োজন করে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।  সাড়ে ৭ মাস আগে আয়োজিত এই নির্বাচনও বয়কট করে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক দেখাতে বিভিন্ন আসনে বিরোধী প্রার্থী হিসেবে ডামি প্রার্থী (নকল) দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

এই নির্বাচনের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেন বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন পর্যাবেক্ষক সংস্থা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) তাদের প্রতিবেদনে বলে, বিরোধীদের অনুপস্থিতির প্রেক্ষাপটে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে আগের তুলনায় সহিংসতা কম হলেও মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। অন্যদিকে এ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে মন্তব্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আরেকটি বিতর্কিত বিষয় ছিল ভোটের অস্বাভাবিক হার। নির্বাচনের দিন সকাল থেকে প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি কম থাকলেও ৪১ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দেয় নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের দিন ৩ দফা ভোটের শতকরা হার ঘোষণা করে ইসি। সেই হিসাব অনুযায়ী দুপুর ১২টা ১০ মিনিট পর্যন্ত গড়ে সাড়ে ১৮ শতাংশ ভোট পড়ে। এরপর বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ ভোট পড়ার কথা জানানো হয়। অর্থাৎ প্রায় ৩ ঘণ্টায় ভোট বাড়ে ৮ শতাংশ। সে হিসাবে ঘণ্টায় ভোট প্রদানের হার ২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সকাল ৮টায় শুরু হওয়া ভোটে দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে এসে কমিশন জানায়, ভোট পড়েছে ১৮ শতাংশ। সে হিসাবে ঘণ্টায় ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ ভোট পড়ে। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে দেখা গেছে, সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট প্রদানের হার সবচেয়ে বেশি থাকে। তারপর এই হার কমতে থাকে। বিশেষ করে বিকাল ৩টার পর হাতেগোনা ভোটার ভোট দিতে আসেন। নির্বাচন কমিশনের দেয়া হিসাবেও দেখা গেছে দুপুর ১২টার পর থেকে ৩টা পর্যন্ত ঘণ্টায় ভোট প্রদানের হার ছিল ২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। কিন্তু শুধু শেষ এক ঘণ্টায় ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। অর্থাৎ ১ কোটি ৭৬ লাখ ৫৯ হাজার ৮৮৮ জন ভোটার ভোট শেষ হওয়ার পূর্বের এক ঘণ্টায় তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনোই দেখা যায়নি। বিরোধী দলগুলোর দাবি, এ নির্বাচনে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পড়তে পারে। মানুষ ভোট দিতে যায়নি।

কার কতো দায়?
দেশের চলমান সংকটের জন্য গত তিনটি নির্বাচন কমিশনকেই দায় দিচ্ছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এই তিন কমিশনের কারণেই এতো মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। সংকটে পড়তে হয়েছে। তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা উচিত।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন যদি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন না করতেন, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন হতো। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের (আওয়ামী লীগের) মধ্যে ধারণা তৈরি হলো যে, তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে এবং পারবে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন রাতের ভোট আয়োজন করে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন বিতর্কিত একতরফা নির্বাচনের আয়োজন করেন। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য এই তিন কমিশনই দায়ী। তারা বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজনে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন চাইলে যেকোনো নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনটা যদি না হতো তাহলে আজকের ঘটনা ঘটতো না। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করার দায়ে এই তিন কমিশনেরই বিচার হওয়া উচিত।

সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান এ বিষয়ে বলেন, শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব না। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের সদিচ্ছা প্রয়োজন। নির্বাচনকালীন সরকার চাইলেই কেবল সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। নির্বাচন কমিশন যতগুলো ভালো নির্বাচন করেছে, সেগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের ব্যর্থতা আছে। আমরা বলতে পারি তারা পদত্যাগ করলো না কেন? তবে সেটাও চিন্তা করতে হবে যে, তখন পদত্যাগ করার মতো পরিস্থিতি থাকে কিনা। আমি পদত্যাগ করার পর যদি আয়নাঘরে যেতে হয়, নিপীড়নের স্বীকার হতে হয়। এগুলোও বিবেচনা করতে হবে।

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, সংকটের জন্য কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের দায় সবচেয়ে বেশি। তারা যদি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত করতেন, তাহলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।

Tuesday, August 13, 2024

গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সুদূরপ্রসারী সংস্কার জরুরি: ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজের ওয়েবিনারে বক্তারা

গণ-অভ্যুত্থানের  বাস্তবায়নে সুদূরপ্রসারী সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। গতকাল ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ আয়োজিত ‘গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ: এখন কী করতে হবে’ শীর্ষক বিশেষ ওয়েবিনারে তারা এ কথা বলেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশে একটি অসহনীয় অবস্থা তৈরি হয়েছিল। তার ফল এই গণ-অভ্যুত্থান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসেছে ক্রান্তিকালীন সরকার হিসেবে-এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেয়ার জন্য। তিনি আন্দোলন থেকে দুটি বার্তা পেয়েছেন। প্রথমত, যারা অন্যায় করেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তদন্তের মাধ্যমে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, ওই অবস্থার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য সুদূরপ্রসারী সংস্কার করতে হবে। সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে। এগুলো সময়সাপেক্ষ ও জরুরি। তিনি বলেন, এই সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন।

কিছু সংস্কার পরবর্তী সময়ে করতে হবে, যারা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসবেন, তারা সেটি করবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে যেতে হবে, যাতে একটি জাতীয় সনদ তৈরি করা যায়। সুজন সম্পাদক বলেন, ছাত্ররাজনীতি বন্ধ নয়, লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ছাত্রদের নেতৃত্বে যে গণবিস্ফোরণ হয়েছে, যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা নস্যাৎ করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। এদিকে সতর্ক থাকতে হবে। আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতি ঘোলাটে করার অনেক চেষ্টা হবে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার চেতনা থেকে দেশ যোজন যোজন দূরে। ১৯৯১ সালে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, এবার যেন ব্যর্থতা না আসে, সেজন্য ছাত্রসমাজ ও নাগরিক সমাজকে দায়িত্ব নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, জন-আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকার গঠিত হয়েছে। দুটি আকাঙ্খা-একটি হলো এই সরকার দ্রুত একটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। অন্যটি হলো বড় রকমের পরিবর্তন আনতে হবে। সামগ্রিক কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। যারা সরকারে আছেন, তারা বলুক এই দুটি স্বপ্নের মধ্যে তারা কী করতে চান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে এই সরকারের মামলা করা জরুরি মন্তব্য করে আলী রীয়াজ বলেন, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যাওয়া যেতে পারে। যারা হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন-আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, এই সংবিধান রেখে জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব নয়। এই সংবিধানেই স্বৈরতন্ত্রের বীজ বপন করা আছে। এই সংবিধান রেখে চিরস্থায়ীভাবে স্বৈরতন্ত্রের বিলোপ হবে না। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে জন-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে হবে। ১৫ বছরে জঞ্জাল তৈরি হয়েছে। কাঠামো ভেঙে পড়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, পুনর্গঠন করতে তাড়াহুড়া কেন, দেশ বদলাতে চান না?


ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহুমুখী ঘটনা ঘটেছে। দায়ীদের জবাবদিহি করতে হবে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে জাতিসংঘের সহায়তা নেয়া দরকার। তিনি বলেন, বাক্স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সব কালো আইন বাতিল করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নির্ধারণ করে সংস্কার পরিকল্পনা করতে হবে। জনপ্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ, সংসদ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য কমিশন, মানবাধিকার কমিশনসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতির ঘটনাগুলো নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের মধ্যে জবাবদিহি সম্পন্ন করতে হবে। শিক্ষা ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনের দাবি রাজনৈতিক দিক থেকে যৌক্তিক তবে ডকট্রিন অব নেসেসিটি থেকে এখনই তা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে ভাবতে হবে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের রিসার্চ ফেলো মির্জা এম হাসান বলেন, এখন যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলোর দাবি করা হচ্ছে, সেগুলোর ভিত্তি ২০০৭-০৮ সালে করা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে অনেক কিছু ধুয়েমুছে ফেলা হয়। এখন এমন কিছু করতে হবে, যাতে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্ক নতুন করে দাঁড়াতে পারে। গণতন্ত্র নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ম তামিম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ আসতে পারে রাজনৈতিক দল থেকে। রাজনৈতিক কর্তৃত্বের জন্য যেসব ব্যবস্থা আছে, সেগুলো তারা সহজে পরিবর্তন করতে চান না। ১৯৯১ ও ২০০৭-০৮ সালেও এ ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল; কিন্তু পরিবর্তন আসেনি। এর অন্যতম প্রধান কারণ বিচারহীনতা। অপরাধীদের বিচার করা যায়নি।
সাংবাদিক মনির হায়দারের সঞ্চালনায় ওয়েবিনারে ‘গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ, এখন কী করতে হবে’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। প্রবন্ধে তিনি রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, পরিসংখ্যান জালিয়াতি থামানো, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিস্থিতি, ডিজিটাল অর্থনীতির নিরাপত্তা, মেধাভিত্তিক নিয়োগ বিষয়ে তার চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন।