Showing posts with label দুর্ঘটনা. Show all posts
Showing posts with label দুর্ঘটনা. Show all posts

Wednesday, August 12, 2026

নারায়ণগঞ্জে এক বিস্ফোরণে না ফেরার দেশে একটি পরিবার

নারায়ণগঞ্জের বন্দরে গ্যাসের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে দগ্ধ একই পরিবারের তিন সদস্যই একে একে মারা গেছেন। স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের পর এবার মারা গেলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মাইদুল ইসলাম (২৮)। মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাইদুল ইসলাম মারা যান। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান।

এর আগে সোমবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মাইদুলের স্ত্রী বিউটি আক্তার (২৪)। আর গত শনিবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় তাদের একমাত্র সন্তান আট বছরের মারুফ। ফলে মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনায় পরিবারটির তিন সদস্যই প্রাণ হারালেন। এখন ওই পরিবারের আর কেউ জীবিত নেই। গত শুক্রবার ভোরে বন্দরের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কুড়িপাড়া চাপাতলী এলাকায় সালাহউদ্দিনের টিনশেডের ভাড়া বাড়িতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই বাড়ির একটি কক্ষে স্ত্রী বিউটি আক্তার ও আট বছরের ছেলে মারুফকে নিয়ে থাকতেন রাজমিস্ত্রি মাইদুল ইসলাম। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, কাজের সুবাদে প্রায় এক বছর ধরে ওই টিনশেডের ঘরে ভাড়া ছিলেন নাটোরের বাসিন্দা মাইদুলের পরিবার।

বিস্ফোরণের পর গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় মাইদুল, তার স্ত্রী বিউটি ও ছেলে মারুফকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের ঢাকার জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মধ্যেও একে একে নিভে গেল তিনটি প্রাণ।

ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা ছিল, গ্যাসের লাইনে লিকেজ থেকে ঘরের ভেতরে গ্যাস জমে এই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ঘরের জানালা বন্ধ থাকায় গ্যাস বের হওয়ার সুযোগ না পেয়ে ভেতরে জমে যায়। ভোরে মাইদুল ইসলাম সিগারেট ধরানোর সময় আগুনের সংস্পর্শে জমে থাকা গ্যাসে বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়। তবে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই শেষ করে দিলো একটি পুরো পরিবারকে। কর্মসূত্রে নারায়ণগঞ্জে এসে ভাড়া বাসায় বসবাস করা মাইদুল, তার স্ত্রী বিউটি ও একমাত্র সন্তান মারুফ- তিনজনই এখন শুধুই স্মৃতি।

নারায়ণগঞ্জে এক বিস্ফোরণে না ফেরার দেশে একটি পরিবার

Tuesday, February 10, 2026

ভৈরব নদে ঘাটে বাঁধা রশি ছিঁড়ে ডুবে গেছে কয়লাবাহী জাহাজ

যশোরের অভয়নগর উপজেলায় ভৈরব নদে কয়লাবোঝাই একটি কার্গো জাহাজ ডুবে গেছে। গতকাল সোমবার দিবাগত রাত একটার দিকে উপজেলার মশরহাটী এলাকায় ভৈরব নদে এমভি আরাফাতের নূর নামের ওই জাহাজ ডুবে যায়। জাহাজে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানি করা ৮৫০ মেট্রিক টন কয়লা ছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ওই কয়লা আমদানি করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সাহারা এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক রেদোয়ান কবির বলেন, কয়লাবোঝাই জাহাজটি নওয়াপাড়া মশরহাটী এলাকায় মীরবাড়ি ঘাটে নোঙর করা অবস্থায় ছিল। সেখানে ঘাটের সঙ্গে জাহাজ রশি দিয়ে বাঁধা ছিল। সোমবার রাতে সেই রশি ছিঁড়ে জাহাজের ভেতরে পানি ঢুকে যায়। এতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জাহাজে ৮৫০ মেট্রিক টন কয়লা ছিল। যার আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। জাহাজটি থেকে কয়লা উদ্ধারের কাজ চলছে। কয়লা ছড়িয়ে না পড়ায় নদের পানি দূষণ হবে না বলে তিনি দাবি করেন।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আমদানি করা ৮৫০ মেট্রিক টন কয়লা বড় জাহাজে করে মোংলা বন্দরের হাড়বাড়িয়ায় আনা হয়। সেখান থেকে ৩০ জানুয়ারি সকালে ছোট কার্গো জাহাজ এমভি আরাফাতের নূর কয়লা বোঝাই করে রওনা দেয়। ৩১ জানুয়ারি বিকেলে জাহাজটি অভয়নগর উপজেলার রাজঘাট এলাকায় ভৈরব নদের ঘাটে নোঙর করে। গতকাল সন্ধ্যায় জাহাজটি উপজেলার মশরহাটী এলাকায় আনা হয়। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে জাহাজ থেকে কয়লা আনলোড করার কথা ছিল। গতকাল সোমবার রাতে নদে ভাটা ছিল। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ভরা ভাটার সময় হঠাৎ রশি ছিঁড়ে জাহাজটি নদের মাঝখানে চলে যায়। এরপর জাহাজটি কাত হয়ে পানি উঠতে থাকে। এতে কার্গোর হ্যাচে ও ইঞ্জিনে পানি ঢুকতে শুরু করে। জাহাজটি দ্রুত নদের পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে। রাত একটার দিকে জাহাজটি নদের পানিতে ডুবে যায়। জাহাজে থাকা কয়লার দাম ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

ডুবে যাওয়া জাহাজটির মাস্টার রেজাউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, মশরহাটী এলাকায় ভৈরব নদের ঘাটে নোঙর করা জাহাজটিতে ৮৫০ মেট্রিক টন কয়লা ছিল। কয়লা নামানোর অপেক্ষায় ছিল জাহাজটি। গতকাল রাতে ভাটার সময় নদে পানি একেবারেই কমে যায়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে জাহাজটি রশি ছিঁড়ে নদের মাঝখানে গিয়ে কাত হয়ে যায়। এরপর নদে জোয়ার শুরু হয়। এ সময় জাহাজে দ্রুত পানি উঠতে শুরু করে। রাত একটার দিকে জোয়ারে জাহাজটি নদের পানিতে ডুবে যায়।

যশোরের অভয়নগর উপজেলার মশরহাটী এলাকায় ভৈরব নদে কয়লাবোঝাই কার্গো জাহাজ এমভি আরাফাতের নূর ডুবে গেছে
যশোরের অভয়নগর উপজেলার মশরহাটী এলাকায় ভৈরব নদে কয়লাবোঝাই কার্গো জাহাজ এমভি আরাফাতের নূর ডুবে গেছে। ছবি : প্রথম আলো

Sunday, February 1, 2026

ডিআর কঙ্গোতে খনি ধসে নিহত দুই শতাধিক মানুষ

পূর্ব গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআর কঙ্গো) উত্তর কিভু প্রদেশে একটি খনি ধসে দুই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।

উত্তর কিভুর গভর্নরের মুখপাত্র লুমুম্বা কাম্বেরে মুইসা সাংবাদিকদের জানান, বুধবার রুবায়া শহরের ওই খনিটি ভারী বৃষ্টির কারণে ধসে পড়ে। দুর্ঘটনার সময় হতাহতের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।

ধসে পড়া খনিটিতে কলটান খনিজ উত্তোলনের কাজ চলছিল। কলটান স্মার্টফোন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ তৈরিতে ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত মূল্যবান খনিজ। দুর্ঘটনার সময় নারী, শিশু এবং খনিতে কাজ করা শ্রমিকরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

খনিটির এক সাবেক তত্ত্বাবধায়ক বিবিসিকে জানান, খনিটি যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো না, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ছিল অত্যন্ত বেশি। উদ্ধারকাজেও চরম অসুবিধা দেখা দেয়। তিনি আরও বলেন, এলাকার মাটির গঠন অত্যন্ত ভঙ্গুর হওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

ধসে পড়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ জন জীবিত উদ্ধার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ থাকায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

mzamin

Monday, January 26, 2026

ফিলিপাইনে ৩৫৯ আরোহী নিয়ে ফেরিডুবি, ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার

ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বাসিলান প্রদেশে ৩৫০ জনের বেশি আরোহী নিয়ে একটি ফেরি ডুবে গেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানকার সরকারি কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

গতকাল রোববার দিবাগত মধ্যরাতে এমভি তৃষ্ণা ক্রেস্টিন ৩ নামের যাত্রীবাহী ফেরিটি ডুবে যায়। এ নৌযান বন্দরনগরী জাম্বোয়ানগা থেকে সুলুর দক্ষিণাঞ্চলের জোজো দ্বীপে যাচ্ছিল।

ডুবে যাওয়ার সময় ফেরিটিতে ৩৩২ জন যাত্রী ও ২৭ জন ক্রু ছিলেন। রোববার রাত ১টা ৫০ মিনিটে নৌযানটি থেকে বিপৎসংকেত পাওয়ার কথা জানায় ফিলিপাইনের কোস্টগার্ড। এর ঘণ্টা চারেক আগে সেটি জাম্বোয়ানগা ছেড়ে এসেছিল।

বাসিলান প্রদেশের বালুক-বালুক দ্বীপ থেকে প্রায় ১ নটিক্যাল মাইল (২ কিলোমিটার) দূরে থাকা অবস্থায় ফেরিটি ডুবে যায়। তখন আবহাওয়া বেশ ভালো ছিল বলেও জানা গেছে। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, উদ্ধার করা ব্যক্তিদের অনেককে ওই দ্বীপে নেওয়া হয়েছে।

ফিলিপাইনের সাউদার্ন মিন্দানাও ডিস্ট্রিক্টের কোস্টগার্ডের কমান্ডার রোমেল দুয়া বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, এ ঘটনায় অন্তত ৩১৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। ১৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। বাকি ২৮ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

রোমেল আরও জানান, উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য কোস্টগার্ডের একটি উড়োজাহাজ যুক্ত করা হচ্ছে। নৌবাহিনী আর বিমানবাহিনীও উদ্ধারকাজে তাদের সম্পদ নিয়োজিত করছে।

বাসিলান প্রদেশের গভর্নর মুজিভ হাতামান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও ফুটেজ পোস্ট করেছেন। মিন্দানাওয়ের ইসাবেলা বন্দরে ধারণ করা ভিডিওটিতে দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের কয়েকজনকে নৌকা থেকে নামাতে দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ স্ট্রেচারে ছিলেন।

গভর্নর স্থানীয় একটি রেডিওকে জানান, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগ সুস্থ আছেন। তবে বয়স্ক কয়েকজন মানুষকে জরুরি চিকিৎসা দিতে হয়েছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-26%2Fiukxxacq%2FPhilippines-ferry.webp?rect=0%2C0%2C864%2C576&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Saturday, January 17, 2026

‘ছেলেটা পরিবারসহ চলে গেল, কিছুই করতে পারিনি’ by আহমেদ উল্যা ইউসুফ

ছেলে, তাঁর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। ছেলে ও তাঁর স্ত্রী দুজনই চাকরিজীবী। ব্যস্ততার কারণে গ্রামের বাড়িতে খুব একটা যাওয়া হয় না। তাই গতকাল যখন গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় বসবাসরত বাবার সঙ্গে মুঠোফোনের ছেলের কথা হচ্ছিল, তখন তাঁকে স্ত্রী–সন্তান নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য বাড়িতে যেতে বলেছিলেন বাবা। কিন্তু ব্যস্ততার জন্য তাতে রাজি হননি ছেলে।

সেই ছেলে, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর খবর আজ শুক্রবার সকালে পেয়ে ঢাকায় ছুটে এসেছেন বাবা সত্তরোর্ধ্ব খোরশেদুল আলম। রাজধানীর উত্তরায় আবাসিক ভবনে আগুন লেগে যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের তিনজন একই পরিবারের। তাঁরা হলেন খোরশেদুল আলমের ছেলে ফজলে রাব্বি, তাঁর স্ত্রী আফরোজা আক্তার ও তাঁদের আড়াই বছরের ছেলে মো. রিশান।

ফজলে রাব্বি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে কাজ করতেন। আর আফরোজা কাজ করতেন স্কয়ার গ্রুপে। আজ শুক্রবার সকাল পৌনে আটটার দিকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর সড়কের যে বাড়িতে আগুন লাগে, সেই বাড়ির পঞ্চম তলায় থাকতেন ফজলে রাব্বি তাঁর স্ত্রী সন্তান নিয়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, প্রথমে আগুন লেগেছিল ভবনের দোতলায়। দ্রুত আগুন বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তৃতীয় তলাতেও আগুন জ্বলতে থাকে। এই দুই তলার বাসিন্দারা বেঁচে গেছেন। কিন্তু আগুনের ধোঁয়া ওপরের দিকে উঠে পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলার ছয়জন প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য না জানা গেলেও পুলিশের ধারণা, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে।

আগুনে ছেলে, পুত্রবধূ ও একমাত্র নাতির মৃত্যুর খবর শুনে ঢাকায় এসেছেন বলে জানান খোরশেদুল আলম। বিকেলে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর বড় মসজিদে তিনজনের জানাজা হয়। এরপর তাঁদের মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে ওঠানোর পর নিজে সেদিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন খোরশেদুল আলম।

কাঁদতে কাঁদতে খোরশেদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলেটা পরিবারসহ চলে গেল। আমি কিছুই করতে পারলাম না।’

খোরশেদুল আলম জানান, তাঁর একমাত্র ছেলে ফজলে রাব্বি। আর এক মেয়ে আছে, তাঁর বিয়ে হয়ে গেছে। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি গ্রামের বাড়িতে থাকেন।

ছেলে–নাতি দুজনই মারা যাওয়ায় খোরশেদুলের পরিবারে ‘আলো জ্বালানোর’ মতো আর কেউ রইল না। স্বজন হারানোর বেদনায় মুষড়ে পড়া প্রবীণ এই ব্যক্তি বলেন, গতকাল যখন ফজলে রাব্বির সঙ্গে কথা হয়, তখন বলেছিলেন এক সপ্তাহ কুমিল্লায় গিয়ে থেকে আসার জন্য। কিন্তু ব্যক্তিগত ব্যস্ততা থাকায় ছেলে যেতে রাজি হননি।

‘কুমিল্লায় গেলে হয়তো পরিবারসহ সন্তানের মৃত্যুর সংবাদটা শুনতে হতো না,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন তিনি।

এ সময় সেখানে উপস্থিত জিয়াদ নামে ফজলে রাব্বির এক আত্মীয় জানান, ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে ফজলে রাব্বির মা শোকে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যকে হারিয়ে পরিবারের অন্যদেরও একই অবস্থা।

ফজলে রাব্বির স্ত্রী আফরোজার পরিবারও উত্তরা এলাকায় থাকে। এ ঘটনার পর আফরোজার বাবা ও মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন এবং তাঁরা ঠিকমতো কথাও বলতে পারছেন না বলে আফরোজার বোন আফরিন জাহান জানিয়েছেন।

খোরশেদুল আলম জানান, নিহত ফজলে রাব্বি, তাঁর সন্তান ও স্ত্রীকে তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চিওড়ায় আগামীকাল দাফন করা হবে।

এই আগুনের ঘটনায় ভবনের ষষ্ঠ তলায় থাকা অপর একটি পরিবারের আরও তিনজন মারা গেছেন। তাঁরা হলেন মো. হারিস (৫২), তাঁর ছেলে মো. রাহাব (১৭) ও ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৭)।

রাজধানীর উত্তরায় ভবনে আগুনে মৃতদের স্বজনের আহাজারি। আজ শুক্রবার বিকেলে উত্তরা ১১ সেক্টরে 
রাজধানীর উত্তরায় ভবনে আগুনে মৃতদের স্বজনের আহাজারি। শুক্রবার বিকেলে উত্তরা ১১ সেক্টরে। ছবি: তানভীর আহাম্মেদ

Thursday, October 2, 2025

ইন্দোনেশিয়ায় স্কুলের ভবন ধস, ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ৯১ শিক্ষার্থী

ভবন ধসে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সাক্ষি হলো ইন্দোনেশিয়া। দেশটির একটি ইসলামিক স্কুলের ভবন ধসে পড়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছে ৯১ জন শিক্ষার্থী। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার দুইদিন পরও তাদের উদ্ধারে হিমশিম খাচ্ছে উদ্ধারকর্মীরা। স্কুলের উপস্থিতি নথি পর্যালোচনা করে নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

এতে বলা হয়, জাভা প্রদেশে অবস্থিত শতবর্ষ পুরোনো আল খোঁজিনি ইসলামিক বোর্ডিং স্কুলের একটি প্রার্থনা হল ভেঙে পড়লে ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ভবনটি যখন ধসে পড়ে তখন কিশোর বয়সী শত শত ছেলে শিক্ষার্থী সেখানে দুপুরের নামাজ পড়ছিল। জানা গেছে, ভবনটিতে অনুমোদনহীন সম্প্রসারণের কাজ চলছিল।

উদ্ধার কাজে যুক্ত হয়েছেন তিন শতাধিক উদ্ধারকর্মী। তারা মরিয়া হয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের উদ্ধারের কাজ করছেন। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে তিন শিক্ষার্থীর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকের মাথায় আঘাত পেয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা মঙ্গলবার রাতে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষের সংখ্যা ৩৮ থেকে সংশোধন করে ৯১ জন বলে জানিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, কমপক্ষে ছয়জন শিশু এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত আছে, তবে কংক্রিটের স্ল্যাব এবং ভবনের অন্যান্য ভারী ও নাজুক অংশের কারণে উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। ভারী সরঞ্জাম প্রস্তুত থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কারণ তাতে আরও ধস সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

উদ্ধারকর্মীরা সংকীর্ণ ফাঁক দিয়ে এখনো আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের কাছে অক্সিজেন, পানি এবং খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন যাতে তারা বেঁচে থাকতে পারে। আটকে পড়া শিক্ষার্থীরা বেশিরভাগই দ্বাদশ থেকে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। যাদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রার্থনা হলটি আগে দুই তলা ছিল, কিন্তু অনুমতি ছাড়াই আরও দুটি তলা যোগ করা হচ্ছিল। পুলিশের মতে, সম্ভবত পুরাতন ভবনের ভিত্তি আরও দুটি ফ্লোরের ভার বহন করতে পারেনি এবং কংক্রিট ঢালার সময় এটি ধসে পড়ে।

mzamin

Thursday, July 24, 2025

ভারতে উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে ককপিটের কণ্ঠস্বর

ভারতে এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে অনেকেই আশা করেছিলেন, এবার দুর্ঘটনাটি সম্পর্কে একটা মীমাংসা হবে। গত মাসে গুজরাটে হওয়া এ দুর্ঘটনায় ২৬০ জন নিহত হন।

কিন্তু ১৫ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনটি জল্পনাকল্পনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদনের সংযত ভাষা সত্ত্বেও এর একটি তথ্য তদন্তকারী, উড়োজাহাজ বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগাচ্ছে।

আকাশে ওঠার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ১২ বছরের পুরোনো বোয়িং–৭৮৭ উড়োজাহাজের জ্বালানি সরবরাহের দুটি সুইচই (ফুয়েল-কন্ট্রোল সুইচ) হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়।

ককপিটের ভয়েস রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, একজন বিমানচালক আরেকজনকে জিজ্ঞেস করছেন, তিনি ‘কেন এটা বন্ধ করেছেন’। উত্তরে দ্বিতীয়জন বলছেন, তিনি বন্ধ করেননি। তবে কোন বিমানচালক কোন কথাটা বলেছেন, রেকর্ডিং থেকে তা বোঝা যায়নি। মাটি ছেড়ে উড়ে যাওয়ার সময় সহবিমানচালক উড়োজাহাজটি চালাচ্ছিলেন। আর ক্যাপ্টেন তদারক করছিলেন।

জ্বালানি সুইচগুলো পরে আবার উড়ন্ত অবস্থায় যেমন থাকে, তেমন অবস্থানে নেওয়া হয়। এতে ইঞ্জিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবারও চালু হয়। বিধ্বস্ত হওয়ার সময় একটি ইঞ্জিন শক্তি ফিরে পেয়ে সচল হচ্ছিল। কিন্তু অন্যটি মাত্র চালু হয়েছিল, শক্তি ফিরে পায়নি। উড়োজাহাজটি এক মিনিটের কম সময় আকাশে ছিল। এরপর গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদ শহরের একটি আবাসিক এলাকায় ভেঙে পড়ে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বিভিন্ন অনুমাননির্ভর তত্ত্ব সামনে এসেছে। সম্পূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন পেতে এক বছর কিংবা আরও বেশি সময় লাগতে পরে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ‘গত মাসে এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার তদন্তে পাওয়া নতুন তথ্য ককপিটে থাকা জ্যেষ্ঠ পাইলটের দিকে নজর ঘুরিয়ে দিচ্ছে।’

ইতালির সংবাদপত্র করিয়েরে দেলা সেরা দাবি করেছে, তাদের সূত্র বলেছে ফার্স্ট অফিসার (সহবিমানচালক) বারবার ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি ইঞ্জিন বন্ধ করেছিলেন।

ওই ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন ছিলেন ৫৬ বছর বয়সী সুমিত সভারওয়াল। সহবিমানচালক ছিলেন ৩২ বছর বয়সী ক্লাইভ কুণ্ডার। উড়োজাহাজটি তিনি চালাচ্ছিলেন। তাঁদের দুজনের ১৯ হাজার ঘণ্টার বেশি উড়োজাহাজ চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল, যার প্রায় অর্ধেকটাই বোয়িং ৭৮৭-এ। ফ্লাইট চালানোর আগে দুজনই স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

এ ধরনের জল্পনাকল্পনা ফাঁসের ঢেউ তদন্তকারীদের বিচলিত করেছে। আর বিষয়টি ভারতীয় বিমানচালকদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

গত সপ্তাহে দুর্ঘটনার প্রধান তদন্ত সংস্থা ভারতের দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরোর (এএআইবি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘কিছু কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পছন্দসই এবং যাচাই না করা তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত টানার চেষ্টা করছে।’ বিজ্ঞপ্তিটি বলছে, তদন্ত চলমান থাকার সময় এ ধরনের কর্মকাণ্ড দায়িত্বজ্ঞানহীন।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের চেয়ারওম্যান জেনিফার হোমেনডি তদন্তে সহায়তা করছেন। তিনি এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লিখেছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো ‘অপরিণত ও অনুমাননির্ভর’। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনার তদন্তে অনেক সময় লাগে।

তড়িঘড়ি করে বিমানচালকদের দায়ী করার প্রচেষ্টাকে ‘হঠকারী’ ও ‘অত্যন্ত অসংবেদনশীল’ বলে এর নিন্দা জানিয়েছে ভারতের উড়োজাহাজ চালকদের সংগঠন ইন্ডিয়ান কমার্শিয়াল পাইলটস অ্যাসোসিয়েশন। চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

ভারতীয় বিমানচালকদের আরেকটি সংগঠন এয়ারলাইন পাইলটস অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার প্রধান স্যাম থমাস বিবিসিকে বলেন, ‘স্বচ্ছতাকে ডিঙিয়ে জয়ী হয়েছে অনুমান।’ তিনি ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের পাশাপাশি উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণের ইতিহাস ও নথিপত্র পর্যালোচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কানাডাভিত্তিক একজন উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা তদন্তকারী বলেছেন, প্রতিবেদনে কথোপকথনের যে অংশটি প্রকাশিত হয়েছে, তা কয়েকটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলে।

ওই তদন্তকারী বলেন, যদি ‘পাইলট বি’ ভুলবশত বা অজান্তেই সুইচগুলো চালু করে থাকেন, পরে তিনি তা অস্বীকার করতেই পারেন।

‘কিন্তু “পাইলট এ” যদি ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সুইচগুলো নাড়াচাড়া করে থাকেন, তাহলে তিনি হয়তো জেনেবুঝেই ওই প্রশ্ন করেছেন। কারণ, তিনি জানতেন ককপিট ভয়েস রেকর্ড তদন্ত করা হবে। এভাবে তিনি মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিতে এবং নিজের দায় এড়াতে চাইতে পারেন,’ বলেন কানাডার ওই তদন্তকারী।

ওই তদন্তকারী বলছেন, এএআইবি শেষ পর্যন্ত যদি শনাক্ত করতেও পারে কে কোন কথা বলেছেন, তবু নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না যে জ্বালানির সুইচ কে বন্ধ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো কখনোই এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানতে পারব না।’

ভারতের দুর্ঘটনার তদন্তকারীরা বিবিসিকে বলেছেন, জ্বালানি সুইচগুলো হাত দিয়ে বন্ধ করার যথেষ্ট পোক্ত প্রমাণ আছে বলে মনে হচ্ছে। তবু সব সম্ভাবনার জন্য ‘মন খোলা রাখা’ এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু কিছু বিমানচালকের মতে, উড়োজাহাজের ফুল অথরিটি ডিজিটাল ইঞ্জিন কন্ট্রোল (এফএডিইসি) ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এফএডিইসি ইঞ্জিনের অবস্থা ও কর্মক্ষমতা পর্যবেক্ষণে রাখে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনে ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের (সিভিআর) সম্পূর্ণ ট্রান্সক্রিপ্ট বা লিখিত বয়ান প্রকাশ করা হয়নি। শুধু উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার আগের কয়েক মুহূর্তের একটি কথোপকথন প্রকাশ করা হয়েছে।

বেছে বেছে এটুকু বয়ান প্রকাশ করায় প্রশ্ন উঠেছে যে তদন্তকারী দল কি কথোপকথনকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পেরেছে; কিন্তু সংবেদনশীলতার কারণে তা চেপে গেছে? নাকি তারা এখনো তা নিশ্চিত হতে পারেনি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে তাদের আরও সময় দরকার?

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডের (এনটিএসবি) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিটার গোয়েলজ বলেছেন, ভারতের তদন্ত সংস্থার উচিত বিমানচালকদের কণ্ঠস্বর শনাক্ত করে পুরো রেকর্ডিংয়ের লিখিত বয়ান প্রকাশ করা।

পিটার গোয়েলজ বলেন, উড়ালের সময় উড়োজাহাজে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারে (এফডিআর) ধরা পড়ত। পাশাপাশি এমন ত্রুটি ফ্লাইট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে সতর্কবার্তা দিত। সেগুলো বিমানের কর্মীরা নিশ্চিতভাবে খেয়াল করতেন এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন।

তদন্তকারীরা তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উড়োজাহাজ নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী শন প্রুচনিকি বলেন, ‘আমাদের সতর্ক হতে হবে। কারণ, সুইচগুলো বন্ধ করা হয়ে থাকলে সেটাকে বিমানচালকের ইচ্ছাকৃত ভুল, আত্মহত্যা বা অন্য যেকোনো কিছু বলে ধরে নেওয়াটা সহজ কাজ। কিন্তু আমাদের হাতে যে সীমিত তথ্য আছে, তার ভিত্তিতে এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।’

এদিকে বাজারে নানা বিকল্প তত্ত্ব ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি ভারতীয় সংবাদপত্র উড়োজাহাজের লেজে বৈদ্যুতিক আগুন লাগাকে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে।

কিন্তু প্রাথমিক প্রতিবেদন স্পষ্ট করেছে যে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ হয়েছিল; কারণ দুটি জ্বালানি সুইচই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফ্লাইট রেকর্ডার এই তথ্যকেই নিশ্চিত করেছে। একজন স্বাধীন তদন্তকারী আরও বলছেন যদি উড়োজাহাজের পেছনে আগুন ধরে থাকে, তাহলে সেটি দুর্ঘটনার পর ঘটেছে বলে মনে হয়। ছিটকে পড়া জ্বালানি বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাটারি থেকেও আগুন লাগতে পারে।

গত সপ্তাহে এএআইবির প্রধান জিভিজি যুগান্ধর জোর দিয়ে বলেন, প্রাথমিক প্রতিবেদনের লক্ষ্য হলো কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে তথ্য দেওয়া।

জিভিজি যুগান্ধর বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও সময় দিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এখনো তদন্ত চলছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার মূল কারণ এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ থাকবে। প্রযুক্তিগত বা জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নতুন কিছু পেলে সেটা সবাইকে জানানো হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

আহমেদাবাদের বি জে মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাসের ওপর আছড়ে পড়ে উড়োজাহাজটি। ভবনে আটকে যায় সেটির পেছনের অংশ। গুজরাট, ভারত
আহমেদাবাদের বি জে মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাসের ওপর আছড়ে পড়ে উড়োজাহাজটি। ভবনে আটকে যায় সেটির পেছনের অংশ। গুজরাট, ভারত। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Wednesday, July 23, 2025

বিমান দুর্ঘটনা: অপসাংবাদিকতা, অপতথ্য ও ফেসবুকে গুজবের গজব by রিজওয়ান-উল-আলম

গত সোমবার উত্তরায় একটি স্কুলভবনে একটি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ঘন কালো ধোঁয়া, মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা আর প্রিয়জন হারানো পরিবারের কান্না দেখে পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমন দুঃসময়ে মনে হয় যেন সব থেমে গেছে, অথচ কাজ না করলে বিপদ আরও বাড়ে। পুরো পরিস্থিতি বুঝে উঠতে সময় লাগছে, কিন্তু একটা কথা সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা গেল: এমন বিপদে কী বলতে হবে বা কী করতে হবে, তার জন্য আমাদের সংস্থাগুলো তৈরি ছিল না। আমরাও কি নাগরিক হিসেবে তৈরি ছিলাম?

ঘটনার পরের কয়েক ঘণ্টা বোঝা গেল, বাংলাদেশে বিপদ সামলানোর ব্যবস্থায় অনেক ঘাটতি আছে। আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে একটা এক্স পোস্ট (টুইট) দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে, অথচ বিপদ নিয়ে কথা বলার আমাদের পদ্ধতি এখনো অনেক পুরোনো। এই দুঃখজনক ঘটনাটা আমাদের জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশের এখনই দরকার ভালো পরিকল্পনা করে কথা বলা এবং বিপদ কমানোর ব্যবস্থা তৈরি করা। বিপদ হওয়ার পর তা নিয়ে ভাবলে হবে না, বরং এগুলো দেশ পরিচালনার এবং নাগরিকের দায়িত্বের মূল অংশ হতে হবে।

সময়মতো সুনির্দিষ্ট সরকারি তথ্যের আদান-প্রদানে না হওয়ায় ভুল তথ্য ছড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। যাচাই না করা ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশি ষড়যন্ত্র, পাইলটের আত্মহত্যা, এমনকি অদ্ভুত সব গুজবও মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, ভালো মানুষ আর সুযোগসন্ধানী—সবাই মিলে তা ছড়াচ্ছিল। যখন সত্যি খবর দ্রুত পাওয়ার সুযোগ থাকে না, তখন মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, মানুষ আতঙ্কিত হয়। যখন বিপদ আসে, তখন সবার আগে বিশ্বাস ভেঙে যায় না—তথ্য না থাকলেই বিশ্বাস মরে যায়।

একটা খুবই খারাপ বিষয় ছিল মৃতদের ছবি—যাদের মধ্যে কিছু শিশুও ছিল—ফেসবুক, টিকটক ও হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়া। কিছু ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার জায়গায় শোকাহত পরিবারের মুখের ওপর জুম করে ছবি তোলা হয়েছিল, যেন তাদের কষ্ট দেখানো একটা খেলা। এটা সাংবাদিকতা নয়। এটা কৌতূহলের আড়ালে নিষ্ঠুরতা।

ইউনিসেফের নিয়ম খুব স্পষ্ট: শিশুদের ছবি কোনো দুঃখজনক ঘটনার প্রতীক হিসেবে খুব সাবধানে, তাদের সম্মান বজায় রেখে এবং তাদের অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করতে হবে। তাদের পরিচয় গোপন রাখতে হবে, তাদের গল্প সাবধানে বলতে হবে। অথচ টিকটকারদের ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় এই সাধারণ নিয়মগুলো মানা হয়নি। পরিবারের মানসিক কষ্ট শুধু তোলা হয়নি; তা সারা দুনিয়ায় দেখানো হয়েছে, শেয়ার করা হয়েছে, মন্তব্য করা হয়েছে এবং টাকা আয়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।

আমাদের এটা নিয়ে কথা বলতে হবে, রাগ করে নয়, বরং দায়িত্ব নিয়ে। সম্পাদকদের তাঁদের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে খারাপ ছবি বা তথ্য সরিয়ে দিতে হবে, আর নাগরিকদের পোস্ট করার আগে ভাবতে হবে। একটা ছবি শেয়ার করা হয়তো সচেতনতা বাড়াচ্ছে মনে হতে পারে, কিন্তু যখন তা কারও সম্মান নষ্ট করে, তখন তা একধরনের শোষণ হয়ে যায়।

এখানে সমস্যাটা শুধু একটা প্রতিষ্ঠানের নয়। উত্তরার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, বিশেষ করে যখন সামরিক বিষয় জড়িত থাকে, তখন দ্রুত, স্বচ্ছ ও মানবিক যোগাযোগ জরুরি। চুপ থাকলে তদন্ত সুরক্ষিত থাকে না, বরং সন্দেহ বাড়ে। সংবাদমাধ্যমগুলো, যদিও কিছু সংবাদমাধ্যম সংযম দেখিয়েছিল, কিন্তু চাঞ্চল্যকর খবরের পেছনে ছুটেছিল। শোকাহত বাড়ি থেকে সরাসরি দেখানো, অনুমানভিত্তিক খবর এবং একে অপরের উল্টো খবর শুধু বিভ্রান্তি বাড়িয়েছিল।

বিপদে সাংবাদিকতার প্রথম কাজ হলো খবর যাচাই করা, ভাইরাল হওয়া নয়। অনেক সংস্থারই আগে থেকে তৈরি যোগাযোগ পরিকল্পনা ছিল না। কী প্রশ্ন আসতে পারে, কী উত্তর দিতে হবে—এমন মৌলিক কোনো প্রস্তুতি ছিল না। ২০২৫ সালে এটা মানা যায় না। নাগরিক ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা, যদিও তাঁদের উদ্দেশ্য ভালো ছিল, কিন্তু তাঁরা অনেক ভুল তথ্য ছড়িয়েছেন। খারাপ ছবি, ভুল খবর, ভুয়া উদ্ধারের খবর এবং মনগড়া হতাহতের তালিকা অবাধে ছড়িয়ে পড়েছে।

আগুন লাগলে কী করতে হয় বা ভূমিকম্প হলে কী করতে হয়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণের মতোই সংকটকালে কী করে যোগাযোগ করতে হয়, সে বিষয়ে মানুষের শিক্ষা দরকার। কখন কিছু শেয়ার করা উচিত নয়, তা জানা, কী শেয়ার করা উচিত, তার মতোই জরুরি।

পরিকল্পিত যোগাযোগ (স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন) মানে মিথ্যা বলা বা শুধু প্রচার করা নয়। এটি হলো একটি বিপদের আগে, চলাকালীন ও পরে তথ্য ব্যবস্থাপনার একটি চিন্তাভাবনা করে করা, স্বচ্ছ ও মানুষের জন্য তৈরি পদ্ধতি।

যদি বাংলাদেশের এমন একটি ব্যবস্থা থাকত, তাহলে আমরা দেখতাম যে ৬০ মিনিটের মধ্যে একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমকে বলছেন, যাচাই করা খবরসহ একটি লাইভ তথ্য বোর্ড থাকছে, বাংলা ও ইংরেজিতে নিয়মিত খবর দেওয়া হচ্ছে, সঠিক খবর ছড়ানোর জন্য সবার সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে এবং গুজব বন্ধ করার জন্য প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে।

ঝুঁকি কমানো শুধু একটি ফাইলে রাখা কাগজপত্রের মতো নয়। এর মানে হলো আবাসিক এলাকার খুব কাছে থাকা প্রশিক্ষণের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা, উড়োজাহাজের পথের নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা করা, শুধু উদ্ধারের জন্য নয়, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যও নকল মহড়া দেওয়া এবং বিমান দুর্ঘটনা সম্পর্কে কীভাবে দায়িত্বের সঙ্গে খবর প্রকাশ করতে হয়, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। এর মানে হলো বিপদ মোকাবিলার প্রস্তুতিতে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করা। উত্তরার মানুষ যদি বিমান দুর্ঘটনার সময় কী করতে হবে, সে বিষয়ে আগে থেকে প্রশিক্ষণ পেত, তাহলে হয়তো সেখানকার অনেক বিশৃঙ্খলা কমানো যেত।

১৮ কোটি ডিজিটাল নাগরিকের একটি সাধারণ নীতিবোধ থাকা উচিত। ডিজিটাল সহানুভূতির ওপর একটি দেশের নীতি অনেক আগেই দরকার ছিল। স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র—সব জায়গায় অনলাইনে দায়িত্বশীল আচরণ শেখাতে হবে। শেয়ার করার আগে ভাবুন।

নিজেকে জিজ্ঞেস করুন: এটা কি সত্যি? এটা কি সাহায্য করবে? এটা কি সম্মান বাড়াবে না ক্ষতি করবে? যদি আমার পরিবার কষ্টে থাকত, তাহলে কি আমি এটা শেয়ার করতাম? ভুল তথ্য মানুষকে মারে। মিথ্যা তথ্য কষ্ট দেয়। কিন্তু চুপ থাকলে দুটোই বাড়ে। ইন্টারনেট সবাইকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। এখন সময় এসেছে, আমরা যেন বিবেক দিয়ে তা ব্যবহার করতে শিখি।

এই লেখা কোনো অভিযোগ নয়, এটা একটা অনুরোধ। আমাদের সম্মিলিত কষ্টকে সংকল্পে পরিণত করার একটা অনুরোধ। উত্তরায় যা ঘটেছে, তা আমরা পাল্টাতে পারব না।

কিন্তু আমরা নিশ্চিত করতে পারি যে পরেরবার যখন কোনো বিপদ আসবে, তখন আমরা বিশৃঙ্খলা নয়, বরং স্পষ্টতা দিয়ে তার মোকাবিলা করব। আমরা সরকারকে বলছি দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য একটি জাতীয় কৌশলগত যোগাযোগ ইউনিট তৈরি করতে, কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষকে বিপৎকালে যোগাযোগ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে এবং শিশু-কিশোরদের ছবি প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তথ্য সুরক্ষা ও নৈতিক নিয়মকানুন মেনে চলতে।

আমরা সংবাদমাধ্যমকে অনুরোধ করছি অনলাইনে মানুষের কষ্টের কথা ভেবে তাদের নৈতিক নিয়মগুলো আবার দেখতে এবং যাচাই না করা খবর বা মানুষের কষ্টকে কাজে লাগানো থেকে বিরত থাকতে। আর আমরা নাগরিকদের বলছি, অনলাইনে সম্মান বজায় রাখতে, ভুয়া খবর রিপোর্ট করতে এবং মনে রাখতে যে প্রতিটি ছবির পেছনে একটি পরিবার আছে, যারা বাঁচার চেষ্টা করছে।

একটি জাতিকে কোনো দুঃখজনক ঘটনা দিয়ে চেনা যায় না। এর প্রতি আমাদের প্রতিক্রিয়াই আমাদের পরিচয় তুলে ধরে। কৌশলগত যোগাযোগ এবং বিপদ কমানো শুধু কিছু কাজের অংশ নয়, এগুলো আমাদের সবার দায়িত্ব। আমাদের আকাশ ভরে দেওয়ার জন্য যেন আরেকটা সাইরেনের অপেক্ষা করতে না হয়।

* রিজওয়ান-উল-আলম, সহযোগী অধ্যাপক, মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহত সন্তানের খোঁজে হাসপাতালে ছুটে আসেন অভিভাবকেরা। উত্তরা, ২১ জুলাই
স্কুলে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় হতাহত সন্তানের খোঁজে হাসপাতালে ছুটে আসেন অভিভাবকেরা। উত্তরা, ২১ জুলাই। ছবি: সাজিদ হোসেন

Tuesday, July 22, 2025

এই মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতাদের হাসপাতালে কাজ কী by রাফসান গালিব

রক্তাক্ত জুলাই যেন শেষ হচ্ছে না আমাদের। গত বছরের স্বৈরাচারী শাসকের গুলিতে নিহত শিশুদের চেহারা আমরা ভুলতে পারি না। সেই জুলাইয়ের স্মরণ চলাকালে আরেক জুলাইয়ে এসে আবারও আমাদের শিশুরা লাশ হলো। আগের জুলাইয়ে ঘাতকের গুলিতে আর এবার বিমানবাহিনীর এক প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায়।

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানটি আছড়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে যেভাবে আগুনে পুড়ে যাওয়া বাচ্চাদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, তা দেখে যেকোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের চিন্তা অবশ হয়ে যাওয়ারই কথা। আর যাঁরা সন্তানের মা-বাবা, তাঁদের মানসিক বিপর্যস্ততার কথা বললামই না।

এরপর তো একের পর এক পুড়ে যাওয়া শিশুর ছবি-ভিডিও, শিশুর খোঁজ পেতে মা-বাবাদের আহাজারি, হাসপাতালে আহত শিশু নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন—যেন পৃথিবীর কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, এমন বেদনাদায়ক দৃশ্য একের পর এক হাজির হতে থাকে আমাদের সামনে।

কেউ বাচ্চার খোঁজ পেতে শিশুর ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন, আবার কেউ হাসপাতাল থেকে শিশুর অভিভাবকের খোঁজ পেতে তার স্কুল আইডির ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছেন। আর রক্তের জন্য গোটা ঢাকাবাসী যেন পারলে ছুটে যায় উত্তরার সব হাসপাতাল থেকে শুরু করে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনে।

বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার অল্প মুহূর্তের মধ্যে মানুষের ঢল নামে যেন। উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত মানুষের চেয়েও উৎসুক মানুষের ভিড় বেশি। কে কত কাছ থেকে ছবি ও ভিডিও তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিতে পারবে, সেই প্রতিযোগিতাও যেন দেখা যায়। দেখা গেছে, অন্য যেকোনো ঘটনার চেয়ে আজকে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে হেলিকপ্টারে করে সেনাবাহিনীর টিমসহ অন্যান্য উদ্ধার সহায়তা দল ঘটনাস্থলে হাজির হতে সক্ষম হয়েছে। দ্রুত বিধ্বস্ত বিমান ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের আগুন নেভানোও সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু হতাহতদের উদ্ধার থেকে শুরু করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে চরম বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে উদ্ধারকারীদের। ঘটনাস্থল থেকেই বিষয়টি বারবার বলা হচ্ছিল। অতিরিক্ত মানুষের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সময় যত যায়, ততই যেন মানুষের ঢল বেড়েছে।

স্কুলের বাচ্চার খোঁজ নিতে যেকোনো মা-বাবা পাগলের মতো ছুটে যাবে, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু হাজার হাজার মানুষের ঢল কেন? সাধারণ মানুষের সাইকি বা মনস্তত্ত্ব আমরা বুঝি। কিন্তু যেসব রাজনীতিবিদ এ মুহূর্তে দলবলে হাসপাতালে ছুটে গেলেন, সেটিকে আমরা কী বলব?

গত শনিবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দিতে দিতে মঞ্চেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সেদিনই রাতে তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাজনৈতিক শিষ্টাচার বা কালচারের জায়গায় বিষয়টি বেশ প্রশংসিতও হয় রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজের মধ্যে। কিন্তু আজকে এই দুই অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতার ওপরেই মানুষ ক্ষুব্ধ হলো। কারণ, তাঁরা দুজনই নেতা-কর্মী নিয়ে সদলবলে হাসপাতালে ছুটে গেছেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট পর্যন্ত মানুষের ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এখানের ভিড় প্রধানত রক্ত দিতে ছুটে আসা মানুষের। এরপরও মানুষের ভিড়ের কারণে হাসপাতালে আসা–যাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে গেছে। অ্যাম্বুলেন্সের গতি কমে গেছে। এর মধ্যে আমরা দেখলাম রাজনৈতিক নেতারা দলবল নিয়ে হাসপাতালে ঢুকছেন। সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও হাসপাতালে ছুটে গিয়েছেন।

রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে অন্যান্য নেতা–কর্মী–সমর্থক, নিরাপত্তাকর্মী, মিডিয়াকর্মী মিলিয়ে রীতিমতো একটা হট্টগোল পরিস্থিতি তৈরি হলো হাসপাতাল এলাকায়।

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের সামনে ভিড় সামলাতে কাজ করছেন অনেক স্বেচ্ছাসেবী। তাঁদের একজনের বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই তরুণী খুব আক্ষেপ নিয়ে বলছেন, ‘আমরা বাইরে স্ট্রাগল করছি, যাতে রোগীরা ভেতরে ঢুকতে পারে। ওনারা রাজনীতি করেন মানলাম, এখন কি এটা করার টাইম ছিল? ওনারা সবাই দল বেঁধে এক শ জন মিলে যাচ্ছেন, রোগী ঢুকতে পারতেছে না, ওনাদের রাজনীতিটা কি আগে? ওনারা যদি রাজনীতিবিদ না হতো, ওনারা কি এভাবে ঢুকতে পারতেন?’

বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, উত্তরা আধুনিক হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ও যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। সেখানে তাঁদের ঘিরে এক প্রকার ধস্তাধস্তিও হয়েছে। কিছু স্বেচ্ছাসেবী তরুণ এই মুহুর্তে হাসপাতালের ভেতরে যেতে তাঁদের বাধা দিয়েছিলেন। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হচ্ছেও দেখা যায়। আরেক ভিডিওতে দেখলাম এপ্রোন পরা এক নারী চিকিৎসক তাঁদের হাতজোড় করে অনুরোধ করছেন, হাসপাতালে এসে ভীড় না করতে। এটি কি কোনো সভ্য দেশের দৃশ্য হতে পারে?

এ মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতাদের কারোরই হাসপাতালে যাওয়া কি খুব জরুরি ছিল? তাঁরা হাসপাতালে গেলে কি আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবেন? জাতির এত বড় ট্র্যাজিডিতে সংবেদনশীল আচরণ করলেন কি তাঁরা?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেইলি রোডে অগ্নিকাণ্ড, সিদ্দিক বাজারে বিস্ফোরণ, মগবাজার বিস্ফোরণের মতো একের পর এক বড় বড় দুর্ঘটনা সামাল দিয়েছেন জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা। এর আগে চুড়িহাট্টা, নিমতলী, রানা প্লাজার মতো আরও বড় বড় ট্র্যাজেডি সামাল দেওয়ার অভিজ্ঞতা তো আছেই।

হ্যাঁ, আমাদের অনেক সক্ষমতার অনেক ঘাটতি আছে, অনেক কিছু ব্যর্থতা আছে। কিন্তু একদম জরুরি মুহূর্তে রাজনৈতিক নেতাদের সদলবলে হাসপাতালে ছুটে যাওয়ার তো কোনো মানেই হয় না! আরও হাস্যকর বিষয় হলো, তাঁদের কেউ কেউ হাসপাতালের সামনে গিয়ে মানুষের দিকে হাত নাড়ছেন। এটি কি কোনো নির্বাচনী প্রচারণা?

একটি ছবিতে দেখা গেল, জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেলসহ কেন্দ্রীয় নেতারা একজন রোগীর শয্যার চারপাশে ঘিরে ধরে তাঁর খবরাখবর নিচ্ছেন। জামায়াতের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেই এ ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ এই সময়ে যেকোনো পোড়া রোগীর জন্য এটা হতে পারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, যখন কেউ পুড়ে যান, তখন তাঁর ত্বকের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যায়। তখন সেই জায়গায় সহজে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে এবং সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

চিকিৎসকেরা বলছেন, কোনো পোড়া রোগীর চারপাশে অনেক লোক জমে গেলে তাদের নিশ্বাস, জামাকাপড় বা স্পর্শের মাধ্যমে জীবাণু সংক্রমণ আরও দ্রুত ছড়াতে পারে। তাই রোগীর পাশে অপ্রয়োজনীয় ভিড় কারা যাবে না। রাজনৈতিক নেতাদের এই ভিড় করা যে একেবারেই অপ্রয়োজনীয়, তা নিঃসন্দেহে যে কেউ স্বীকার করবেন।

সংবাদকর্মীদেরও কোনো পোড়া রোগীর কাছে যাওয়ার সুযোগ নেই। অথচ সেটি আমরা করতে দেখলাম কোনো কোনো সংবাদকর্মীকে। সাক্ষাৎকারের নামে কোনো আহতের কাছ থেকে এই মুহুর্তে ‘অনুভূতি’ জানতে চাওয়াকে কোনোভাবেই সাংবাদিকতা বলা যায় না।

মাগুরার এক শিশু ধর্ষণ নিয়ে কয়েক মাস আগে দেশ প্রতিবাদে উত্তাল হলো। সেই শিশুকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় চিকিৎসার জন্য। তখনো আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা ওই শিশুকে দেখার জন্য তার কাছে গিয়ে ভিড় করেছেন। সেখানে গিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করেছেন। তখন বিষয়টি চরম সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।

আমাদের রাজনীতিবিদদের, রাজনৈতিক নেতাদের আসলে কবে হুঁশ হবে? বিপদের মুহূর্তে মানুষের কাছে ছুটে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতারা জনগণের প্রতি তাঁদের ‘দরদ’ প্রকাশ করতে চান, সেটির জন্য ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞানও যে তাঁরা অনেক সময় হারিয়ে ফেলেন, তা আজকের ঘটনায় আবারও প্রকাশ পেল।

* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
- ই-মেইল: rafsangalib1990@gmail.com
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

উত্তরায় প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের দেখতে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ছুটে যান জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
উত্তরায় প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের দেখতে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ছুটে যান জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত

Saturday, June 14, 2025

আহমেদাবাদ ট্র্যাজেডি: বিমান বিধ্বস্ত হওয়া নিয়ে উঠে আসছে যে সব প্রশ্ন, নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৪

গুজরাটের আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের মিনিট খানেকের মধ্যে কীভাবে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৮ বিমানটি  ভেঙে পড়লো তা নিয়ে বিস্মিত সকলে। ইতিমধ্যেই অনেক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিমানের পাইলটরা ছিলেন অভিজ্ঞ। ড্রিমলাইনারটির ক্যাপ্টেন সুমিত সাভারওয়াল এবং তার সহ-পাইলট ক্লাইভ কুন্ডার  সম্মিলিতভাবে ৯,০০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে উড়ান পরিচালনার অভিজ্ঞতা ছিল।  সাভারওয়াল  বাণিজ্যিক বিমান সংস্থার পাইলট হিসেবে ২২ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। ফলে তাদের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। ইতিমধ্যেই কীভাবে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে তা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরা তদন্তে সহায়তা করতে আসছেন। তদন্তকারীরা প্রথম বোয়িং ৭৮৭-এর সঙ্গে জড়িত মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণগুলো বোঝার জন্য রাডার, সিসিটিভি এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর) এবং ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর) সহ প্রমাণ সংগ্রহ করছেন। তারা সবদিক থেকে তদন্ত করছেন।

তবে  বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের মিনিট খানেকের মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ড্রিমলাইনার ৭৮৭-৮ বিমানটি কীভাবে ভেঙে পড়লো তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

অসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজিসিএ) মনে করছেন, পাখির ধাক্কায় হয়তো দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। অথচ এর আগে আরও উচ্চতা থেকে পাখির ধাক্কায় জখম বিমানকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা গেলেও এবার তা হয়নি।  বিমানের পাইলট এটিসিতে বিপদ বার্তা পাঠিয়েছিলেন। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কী উড্ডয়নের সময় কোনো সমস্যা দেখা দিয়েছিল। বিমান চালনায় দক্ষরা জানিয়েছেন, উড্ডয়নের পর পরই ল্যান্ডিং গিয়ার বন্ধ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এক্ষেত্রে তা খোলা ছিল কেন সেই প্রশ্ন
উঠেছে। তাছাড়া উড়ানে যে সময়ে গতিবেগ ১৯০-২০০ নট থাকার কথা সেখানে ১৭৪ নট ছিল কেন? তখন কি পাইলট  বিমানকে উপরের দিকে তুলছিলেন নাকি নিচে নামানোর চেষ্টা করছিলেন। এমন প্রশ্নও উঠেছে, বিমানটি কি প্রয়োজনের তুলনায় কম দৌড়ে আকাশে উঠেছিল।

দুই ইঞ্জিনের বোয়িংয়ের একটি ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আরেকটি ইঞ্জিনের মাধ্যমে বিমানটির উড়ে থাকার কথা। তাহলে কি এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটি যখন আকাশে উঠেছিল তখন দুটি ইঞ্জিনেই বিদ্যুৎ সংযোগ চলে গিয়েছিল? ২০০৯ সালে নিউ ইয়র্কের লা গার্ডিয়া বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই মার্কিন বিমানের দু’টি ইঞ্জিনই বিদ্যুৎ হারিয়ে ফেলে। সেই সময় বিমানটি আরও উচ্চতায় উঠেছিল এবং পানিতে অবতরণ করতে সক্ষম হয়েছিল এবং সমস্ত যাত্রী বেঁচে গিয়েছিল। এক্ষেত্রে অবশ্য বোয়িং বিমানটি মাত্র ৬২৫ ফুট উচ্চতায় ছিল।

কভেন্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিমান নিরাপত্তা বিভাগের ভিজিটিং প্রফেসর ফিলিপ বাউম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেন, ‘সম্ভবত মনে হচ্ছে’ সিস্টেম বা একাধিক সিস্টেমের ব্যর্থতার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
গরম আবহাওয়ায় প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি, যাত্রী এবং পণ্যসম্ভারের ভারী বোঝা নিয়ে উড়ে যাওয়া সবচেয়ে পাইলটের কাছে চ্যালেঞ্জ বলে  জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে,  উচ্চ প্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ পাইলটরা কি এমন অবস্থায় বিমানের নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে এবং পদক্ষেপ নিতে পারতেন?
এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, বিমানটিতে ১.২৫ লাখ লিটার জ্বালানি ছিল। পুড়েছিল সেই জ্বালানি। ফলে অত্যধিক তাপমাত্রার কারণেই যাত্রীদের বাঁচানো যায়নি।

আহমেদাবাদে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৪

গুজরাটের আহমেদাবাদে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৪ জনে। এর আগে বৃহস্পতিবার আহমেদাবাদ পুলিশ জানায়, কমপক্ষে ২৪০ জন নিহত হয়েছেন। যা পরর্বতীতে বেড়ে ২৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে। বিমানে থাকা ২৪২ যাত্রীর মধ্যে ২৪১ জনই নিহত হয়েছেন। আকস্মিকভাবে বেঁচে গেছেন একজন। বিমানটি চিকিৎসকদের একটি হোস্টলের উপর আছড়ে পড়ে। এতে সেখানে ৫০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ভারতীয় বংশোদ্ভূত ওই বৃটিশ নাগরিকের নাম রমেশ বিশ্বকুমার। তিনি বিমানের ১১-এ আসনে ছিলেন। রমেশ বলেছেন, এক মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে গেল। উড্ডয়নের ৩০ সেকেন্ডে পরই একটা বিকট শব্দ হয় এবং এর পরই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানান রমেশ।

এদিকে  গুজরাটের স্বাস্থ্য সচিব ধনঞ্জয় দিভেদি বলেছেন, নিহতদের শনাক্তের জন্য তাদের আত্মীয়দের  ডিএনএ নমুনা দিতে বলা হয়েছে। বিমানটি যে ভবনে আছড়ে পড়েছিল সেই ভবনের চারপাশে বিধ্বস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা যায়। লেজের অংশ ভবনের উপর আটকে থাকতে দেখা গেছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিমানটি একটি আবাসিক এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পরই বড় আগুনের কুণ্ডলি আকাশের দিকে উড়তে দেখা যায়। বিমানটিতে ২১৭ জন প্রাপ্ত বয়স্ক ছিলেন। এ ছাড়া ১১ জন শিশু ও দু’টি নবজাতক ছিল। ভারতীয় ছিলেন ১৬৯ জন। বৃটিশ নাগরিক ছিলেন ৫৩ জন। সাতজন পর্তুগিজ ও একজন কানাডার নাগরিকও ছিলেন। বিমানটি ছিল বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার। যা বিশ্বের অন্যতম আধুনিক বিমান। এর আগে বোয়িংয়ের এই মডেলের বিমান কখনো বিধ্বস্ত হয়নি। বৃহস্পতিবার লন্ডনের উদ্দেশ্য যাত্রা করা আহমেদাবাদ থেকে উড্ডয়নের কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়। এয়ার ইন্ডিয়া জানিয়েছে, বিমানটি লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল। এদিকে আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনাকে ভয়াবহ বলে অভিহিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, ভারত একটি বৃহৎ এবং শক্তিধর দেশ। আমি নিশ্চিত তারা এই পরিস্থিতি সামলে নেবে। যেকোনো প্রয়োজনে আমরা তাদের পাশে আছি। ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার মধ্যে এটি একটি। ট্রাম্প আরও বলেছেন, বেশির ভাগ যাত্রীই হয়তো মারা গেছেন।

স্ত্রীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করে লন্ডনে দুই শিশু সন্তানের কাছে ফেরা হলো না

আহমেদাবাদ বিমান দুর্ঘটনায় প্রিয়জনকে হারিয়েছেন এমন প্রতিটি পরিবারের এক-একটি কাহিনী সকলের চোখে পানি এনে দিচ্ছে। আমদাবাদের বিমান দুর্ঘটনায় লন্ডন প্রবাসী অর্জুন ভাই পাটোলিয়ার মৃত্যু হয়েছে। অর্জুনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর এখন লন্ডনে থাকা দুই শিশু সন্তান নিঃস্ব হয়ে গিয়েছে। লন্ডনে প্রয়াত স্ত্রী'র অস্থি বিসর্জন দিতে তিনি গুজরাটে এসেছিলেন। গুজরাটের আমরেলির বাসিন্দা অর্জুন ভাই পাটোলিয়া তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানের সঙ্গে লন্ডনে থাকতেন। তার স্ত্রী ভারতীবেন পাটোলিয়া গত ২৬ মে লন্ডনে প্রয়াত হন। স্ত্রী'র শেষ ইচ্ছা রাখতে চিতা-ভস্ম নিয়ে আমরেলি জেলার তার নিজ গ্রামের পুকুরে বিসর্জন দিতে এসেছিলেন অর্জুন। কিন্তু অর্জুনের আর লন্ডনে মেয়েদের কাছে ফেরা হল না। স্ত্রীর চিতাভস্ম বিসর্জন দেওয়ার পর অর্জুন এয়ার ইন্ডিয়ার অভিশপ্ত বিমানে চেপে  লন্ডনে ফিরছিলেন। ওড়ার কিছু সময়ের মধ্যেই বিমান দুর্ঘটনায় অর্জুন ভাই পাটোলিয়ারের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। অর্জুন ভাই পাটোলিয়ারের দুটি ছোট মেয়ে রয়েছে, যাদের মধ্যে একজনের বয়স ৮ বছর এবং অন্যজনের বয়স ৪ বছর। তারা অনাথ হয়ে পড়েছে।

mzamin

Friday, June 13, 2025

বিমানের ধ্বংসাবশেষ থেকে হেঁটে হেঁটে বের হন এক যাত্রী

ভারতের আহমেদাবাদে ভেঙ্গে পড়া এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানটির এক যাত্রী জীবিত রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। ফ্লাইটটিতে থাকা ২৩২ জন যাত্রী এবং ১০ জন ক্রু সদস্যের মধ্যে তিনিই একমাত্র বেঁচে ফিরেছেন। সংবাদমাধ্যম বিবিসির শেয়ার করা এক ভিডিওতে ওই ব্রিটিশ যাত্রীকে দুর্ঘটনাস্থল থেকে হেঁটে হেঁটে বের হতে দেখা যায়।

ভিডিওতে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপ ঘিরে স্থানীয় মানুষ এবং সাংবাদিকদের ভিড়। মানুষের শোরগোল এবং অ্যাম্বুলেন্সের শব্দে ভারি হয়ে উঠেছে দুর্ঘটনাস্থল। কিছুটা দূরে একাধিক অ্যাম্বুলেন্স দেখা যাচ্ছে। বেঁচে যাওয়া ওই যাত্রী আহত অবস্থায় খুড়িয়ে খুড়িয়ে অ্যাম্বুলেন্সের দিকে এগোচ্ছেন।

আহমেদাবাদ পুলিশ কমিশনার জি.এস. মালিক সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে জানান, ওই যাত্রী ১১এ নম্বর আসনে বসেছিলেন এবং তিনি এখন জীবিত ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

সরকারি যাত্রী তালিকা অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির নাম বিশ্বেশ কুমার রমেশ এবং তিনি ব্রিটিশ নাগরিক। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়, হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন রমেশ এবং নিজের বোর্ডিং পাসও দেখিয়েছেন, যেখানে তার নাম ও আসন নম্বর ১১এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

দুর্ঘটনার সময়কার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে রমেশ বলেন, ‘উড্ডয়নের ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই এক তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ হয়, আর সঙ্গে সঙ্গেই বিমানটি ভেঙে পড়ে। সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়।’

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তবে সরকারিভাবে মৃতের সংখ্যা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

বিমানটি যে বিজে মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের ওপর ভেঙে পড়ে, সেখানে থাকা ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থীকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। ভারতের চিকিৎসকদের সংগঠন ফাইমা জানিয়েছে, এখনো ৫ জন শিক্ষার্থী নিখোঁজ রয়েছেন এবং অন্তত দুইজনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।

এনডিটিভির খবরে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় ছাত্রাবাসে থাকা পাঁচজন মেডিকেল ছাত্র নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে চারজন স্নাতক এবং একজন স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী।

দুর্ঘটনাস্থল থেকে হেঁটে হেঁটে বের হতে দেখা যায় বিমানের যাত্রী বিশ্বেশ কুমার রমেশকে। ছবি: সংগৃহীত
দুর্ঘটনাস্থল থেকে হেঁটে হেঁটে বের হতে দেখা যায় বিমানের যাত্রী বিশ্বেশ কুমার রমেশকে। ছবি: সংগৃহীত


ভারতে উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে নিহত ২৪০ জনের বেশি

ভারতের গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদে ২৪২ জন আরোহী নিয়ে একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়েছে। উড়োজাহাজটি আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে আকাশে ওড়ার পরপরই একটি ভবনের ওপর আছড়ে পড়ে। ভারতের পুলিশ জানিয়েছে, ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় ২৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। একে এক দশকের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা বলা হচ্ছে।

বিধ্বস্ত হওয়া উড়োজাহাজটি ভারতীয় এয়ারলাইনস এয়ার ইন্ডিয়ার। বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বেলা ১টা ৩৯ মিনিটে আকাশে ওড়ে উড়োজাহাজটি। গন্তব্য ছিল যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের দক্ষিণে গ্যাটউইক বিমানবন্দর। এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উড়োজাহাজে ২৩০ জন যাত্রী, ১০ ক্রু ও দুজন পাইলট ছিলেন। যাত্রীদের মধ্যে ভারতের ১৬৯ জন, যুক্তরাজ্যের ৫৩ জন, পর্তুগালের ৭ জন ও কানাডার ১ জন নাগরিক ছিলেন।

উড়োজাহাজের আরোহীদের মধ্যে ২৪১ জন নিহত হয়েছেন বলে বৃহস্পতিবার রাতে এয়ার ইন্ডিয়ার এক এক্স পোস্টে বলা হয়েছে।

আহমেদাবাদ বিমানবন্দরের উড়োজাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বলেছে, উড়োজাহাজটি ২৩ নম্বর রানওয়ে থেকে আকাশে উড়েছিল। কয়েক সেকেন্ড পর উড়োজাহাজ থেকে জরুরি অবস্থার সংকেত পাঠানো হয়। এরপর সংকেত বন্ধ হয়ে যায়। তখন উড়োজাহাজটি ৬২৫ ফুট উচ্চতায় উঠেছিল বলে জানিয়েছে উড়োজাহাজ চলাচলের তথ্য প্রদানকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে, উড়োজাহাজটি ওড়ার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে একটি আবাসিক এলাকায় আছড়ে পড়ে। এ সময় আগুন ও ধোঁয়ার বড় কুণ্ডলী সৃষ্টি হয়। যে ভবনে গিয়ে উড়োজাহাজটি আছড়ে পড়ে, সেটি বি জে মেডিকেল কলেজের একটি হোস্টেল। উড়োজাহাজের পেছনের অংশ ভবনটির ওপরে আটকে যায়। আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে উড়োজাহাজের ধ্বংসাবশেষ।

গুজরাটের শীর্ষ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা বিধি চৌধুরী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ২৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁরা এখনো নিহতের সংখ্যা যাচাই–বাছাই করছেন। উড়োজাহাজের এক যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জানিয়েছেন, সব মরদেহ উদ্ধারের পর ডিএনএ পরীক্ষা শেষে এই দুর্ঘটনায় নিহতের মোট সংখ্যা জানানো হবে।

ওই উড়োজাহাজের যাত্রী ছিলেন গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানি। আহমেদাবেদর পুলিশ কমিশনার জি এস মালিক সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রীর নিহত হওয়ার খবর রয়টার্সকে নিশ্চিত করেন।

এক যাত্রী জীবিত উদ্ধার

বিধ্বস্ত হওয়া উড়োজাহাজের যাত্রী বিশ্বাস কুমার রমেশকে (৪০) জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি উড়োজাহাজের জরুরি বহির্গমনের পাশে ‘১১–এ’ নম্বর আসনে ছিলেন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রমেশ ভারতের সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, উড্ডয়নের ৩০ সেকেন্ড পর বিকট শব্দে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। চারপাশে মানুষের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। এ সময় কেউ একজন তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।

উড়োজাহাজের যাত্রীদের মধ্যে ২১৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক, ১১টি শিশু ও দুটি নবজাতক ছিল। তাঁদের স্বজনেরা আহমেদাবাদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভিড় করছেন। এমনই একজন পুনম প্যাটেল। বার্তা সংস্থা এএনআইকে তিনি বলেন, ‘আমার ভাবি লন্ডনে যাচ্ছিলেন। এক ঘণ্টার মধ্যে খবর পাই, উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়েছে।’

‘আমার ছেলে দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিয়েছে’

উড়োজাহাজটি যখন বিধ্বস্ত হয়, তখন বি জে মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে দুপুরে খাওয়ার সময়। হোস্টেলটি আহমেদাবাদের মেঘানি অঞ্চলে একটি আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। দুর্ঘটনার পর তোলা ছবিতে হোস্টেলের ক্যানটিনে টেবিলের ওপর খাবারের থালা ও গ্লাস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

দুর্ঘটনার পর ফেডারেশন অব অল ইন্ডিয়া মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (এফএআইএমএ) রয়টার্সকে জানিয়েছে, উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের পর ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের অন্তত দুজন নিবিড় পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছেন। এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ চিকিৎসকের স্বজন।

উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার সময় বি জে মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থী খাবার খেতে ওই হোস্টেলে গিয়েছিলেন। তাঁর মা রামিলা এএনআইকে বলেন, ‘আমার ছেলে নিরাপদে আছে। তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। (উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার সময় প্রাণে বাঁচতে) সে দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিয়েছিল। এতে সে কিছুটা আহত হয়েছে।’

দুর্ঘটনার কারণ কী

বিধ্বস্ত হওয়া উড়োজাহাজটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং। ৭৮৭–৮ মডেলের উড়োজাহাজটি ‘ড্রিমলাইনার’ নামেও পরিচিত। যাত্রী পরিবহনের জন্য সবচেয়ে আধুনিক উড়োজাহজাগুলোর মধ্যে এটি একটি। যুক্তরাজ্যের ক্রানফিল্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষক গ্রাহাম ব্রাইথওয়েট বলেন, বিধ্বস্ত হওয়া এই উড়োজাহাজ ১১ বছর আগে প্রথম আকাশে উড়েছিল। বিশ্বে ৭৮৭ উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম।

উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার পর বোয়িংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দরে ধস নেমেছে। আর উড়োজাহাজের ইঞ্জিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জিই অ্যারোস্পেস বলেছে, উড়োজাহাজটির ককপিটের তথ্য বিশ্লেষণ করতে তারা একটি দল ভারতে পাঠাবে। উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার কারণ খুঁজতে ভারতের সঙ্গে কাজ করবে যুক্তরাজ্যও।

বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের প্রধান পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন সুমিত সাবহারওয়াল ও সহকারী পাইলট ছিলেন ক্লাইভ কুন্ডার। ধারণা করা হচ্ছে, আকাশে ওড়ার পরপরই সেটিতে বড় যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ফলে দ্রুত নিচে নামতে গিয়ে সেটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ফ্লাইট সেফটি বিশেষজ্ঞ মার্কো চ্যান এনডিটিভিকে বলেন, উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার সময় আবহাওয়া স্থিতিশীল ও আকাশ পরিষ্কার ছিল।

উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার সময়ের ভিডিও বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞ অ্যান্টনি ব্রিকহাউস বলেন, ভিডিওতে দেখা গেছে, বিধ্বস্ত হওয়ার মুহূর্তে উড়োজাহাজের চাকা নিচে নামানো ছিল। অথচ এ সময় উড়োজাহাজ সাধারণত চাকা ওপরে তুলে নেয়। এটি দেখে মনে হবে, বিধ্বস্ত হওয়া উড়োজাহাজটি রানওয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।

তবে আসলে উড়োজাহাজটিতে কী ঘটেছিল, তা জানতে বিস্তারিত তদন্তের প্রয়োজন পড়বে। আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচল আইন অনুযায়ী, এ ঘটনার তদন্ত করবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। এতে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড। কারণ, উড়োজাহাজটির ইঞ্জিন যু্ক্তরাষ্ট্রে তৈরি। তদন্তে উড়োজাহাজটির ধ্বংসাবশেষ, রক্ষণাবেক্ষণের তথ্য, ব্ল্যাকবক্স ইত্যাদি খতিয়ে দেখা হবে।

হিন্দুস্তান টাইমস–এর খবরে বলা হয়, বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের একটি ব্ল্যাকবক্স ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। আরেক ব্ল্যাকবক্স উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে।

নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে এক কোটি করে রুপি দেবে টাটা

এয়ার ইন্ডিয়া টাটা গ্রুপের মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার পর গ্রুপটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের প্রতিটি পরিবারকে এক কোটি রুপি সহায়তা দেবে তারা। বৃহস্পতিরা সন্ধ্যায় টাটা গ্রুপের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরন এ ঘোষণা দেন বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমস ও বিবিসি।

টাটা গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় বহন করবে তারা। পাশাপাশি দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বি জে মেডিকেল কলেজের হোস্টেল পুনর্নির্মাণেও সহায়তা দেওয়া হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত বিবৃতিতে চন্দ্রশেখরন বলেন, ‘এই শোকের মুহূর্তে কোনো শব্দই যথেষ্ট নয়। আমরা নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।’

১৯৩২ সালে জেআরডি টাটার হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ভারতের প্রথম বেসরকারি বিমান সংস্থা ‘টাটা এয়ার সার্ভিসেস’। সেটিরই পরে নাম হয় এয়ার ইন্ডিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫৩ সালে ভারত সরকার এয়ারলাইনটি জাতীয়করণ করে। ২০২২ সালে এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ১৮ হাজার কোটি রুপিতে এয়ার ইন্ডিয়ার মালিকানা আবার টাটা গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।

‘এই ঘটনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না’

এয়ার ইন্ডিয়ার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক্সে এক পোস্টে মোদি লিখেছেন, ‘আহমেদাবাদের ট্র্যাজেডি আমাদের স্তব্ধ ও শোকাহত করেছে। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।’

উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যের রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলা। তাঁরা বলেছেন, এই ভয়াবহ মর্মান্তিক ঘটনার শিকার বিভিন্ন দেশের মানুষের পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের প্রতি বিশেষ প্রার্থনা ও গভীরতম সমবেদনা জানাচ্ছেন তাঁরা। এই ঘটনার পর যাঁরা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন তাঁরা।

বিধ্বস্ত হওয়া উড়োজাহাজের যাত্রী ও তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশ নাগরিকদের বহন করা লন্ডন অভিমুখী উড়োজাহাজ ভারতের আহমেদাবাদ শহরে বিধ্বস্ত হওয়ার পর যেসব দৃশ্য সামনে আসছে, সেগুলো ভয়াবহ। উড়োজাহাজের যাত্রী ও তাঁদের পরিবারের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করছি।’

উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় আরও শোক প্রকাশ করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, চেক প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী পিটার ফাইলা, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

বি জে মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাসের ওপর আছড়ে পড়ে উড়োজাহাজটি। ভবনে আটকে যায় সেটির পেছনের অংশ। গতকাল ভারতের গুজরাটের আহমেদাবাদে
বি জে মেডিকেল কলেজের একটি ছাত্রাবাসের ওপর আছড়ে পড়ে উড়োজাহাজটি। ভবনে আটকে যায় সেটির পেছনের অংশ। গতকাল ভারতের গুজরাটের আহমেদাবাদে। ছবি: রয়টার্স

আহমেদাবাদ বিমান ট্র্যাজেডি: মিনিটেই প্রাণ গেল ২৪১ জনের

ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো ভারত। বৃহস্পতিবার দেশটির গুজরাট রাজ্যের আহমেদাবাদে ঘটে গেল এক ট্র্যাজিক দৃশ্য। ভয়াবহ ওই বিমান দুর্ঘটনায় একজন ব্যতীত আরোহীর কেউই বেঁচে ফেরেনি। নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।  মোদির পাশাপাশি বিশ্বের অন্য নেতারাও শোক প্রকাশ করেছেন। কেন্দ্রীয় বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী রাম মোহন নাইডু জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। যিনি ওই বিমানের যাত্রী ছিলেন। তার আসনক্রম ১১-এ। তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক। তাকে বিশ্বাস নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে ২০৪টি মৃতদেহ উদ্ধার করেছে তারা। এ দুর্ঘটনায় বিমানে থাকা যাত্রীরাই কেবল প্রাণ হারাননি। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমানটি যেই ভবনে আছড়ে পড়েছে- সেটি ছিল মেডিকেল শিক্ষার্থীদের হোস্টেল। সেখানেও পাঁচ ইন্টার্ন চিকিৎসকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনাকবলিত ওই  হোস্টেলের অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থীকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে দুই জনকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে বিমানটিতে মোট ২৪২ জন আরোহী ছিলেন। যাদের মধ্যে ২৩২ জন সাধারণ যাত্রী ও ১০ জন ক্রু সদস্য। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, বিমানটি আহমেদাবাদের সরদার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বৃহস্পতিবার বেলা ১টা ৩৯ মিনিটে লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করে।  যেটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার সিরিজের একটি বিমান ছিল। যাত্রীদের মধ্যে ১৬৯ জন ভারতীয়, ৫৩ জন বৃটিশ, একজন কানাডীয় এবং সাতজন পর্তুগালের নাগরিক ছিলেন।

উড্ডয়নের কয়েক মিনিট পরই বিধ্বস্ত হয়েছে বিমানটি। দুর্ঘটনার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে পাইলট এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি)কে বিপদ সংকেত পাঠান। তবে ততক্ষণে বিমানের কন্ট্রোল আর তার হাতে ছিল না। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, পাইলটের কাছ থেকে বিপদ সংকেত পেয়ে এটিসি যোগাযোগের চেষ্টা করে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। তার পরই বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার খবর জানা যায়। বিমানটি রানওয়ে ২৩ থেকে ওড়ার এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এটিসি’র সঙ্গে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বিধ্বস্ত হওয়ার আগে বিমানটি মাটি থেকে ৬২৫ ফুট উচ্চতায় ছিল। সেটি দ্রুতগতিতে নিচের দিকে নেমে আসতে শুরু করে। তারপরই সেটি মেঘানিনগরের কাছে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের একটি ছাত্রাবাসে আছড়ে পড়ে। ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য বলছে, বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটি ভিটি-এএনবি। বিমানটি এদিনই দিল্লি থেকে অহমেদাবাদে আসে। তারপর সেটি লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। বিমানে থাকা যাত্রীদের ১১ জন শিশু বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া লন্ডনের উদ্দেশ্যে অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে আরোহী হয়েছিলেন গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানি। জোন ওয়ান থেকে বিমানে তার বোর্ডিংয়ের সময় ছিল দুপুর ১২টা ১০ মিনিট। তার আসন নাম্বার ছিল ২ডি। বিজয় রুপানির ঘনিষ্ঠ প্রশান্ত বালা আনন্দবাজারকে জানিয়েছেন, তিনি বিজয়কে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিয়ে এসেছেন। ওই বিমানে লন্ডনে যাওয়ার কথা ছিল তার। যাত্রীদের বিমান পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার বাসেও উঠেছিলেন বিজয়।

বলা হচ্ছে ভারতের ইতিহাসে এটিই বোয়িং বিমানের দুর্ঘটনা, যেখানে বিধ্বস্তের পর যাত্রীদের কেউই বেঁচে ফেরেননি। এ ঘটনায় শোক জানিয়েছেন বিশ্বনেতারা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই দুর্ঘটনাকে হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেছেন। এক্সের পোস্টে তিনি বলেছেন, আহমেদাবাদের এই দুর্ঘটনা আমাদের হতবাক ও দুঃখিত করেছে। এটি এমন এক হৃদয়বিদারক ঘটনা যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। এই দুঃখের মুহূর্তে, বিমান দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সকলের প্রতি আমি সমবেদনা প্রকাশ করছি। মোদি আরও লিখেছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার সঙ্গে যুক্ত মন্ত্রী এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করেছি। এক্সে এক পোস্টে বিমান আরোহীদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। এ ছাড়া দেশটি এ বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। বৃটেনের রাজা চার্লস বলেছেন, ওই দুর্ঘটনায় তিনি ও রানী ক্যামেলিয়া ‘নিদারুণভাবে হতবাক’। রাজ পরিবারের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্টে চার্লসের বার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, বিমানের যাত্রী, তাদের পরিবার ও বন্ধুদের জন্য প্রার্থনা ও সমবেদনা। জরুরি পরিষেবাগুলোর বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টার প্রতি সম্মান জানিয়েছেন রাজা চার্লস। এ ছাড়া এই হৃদয়বিদারক ও  বেদনাদায়ক সময়ে যারা সাহায্য এবং সমর্থন প্রদান করেছেন তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তিনি। নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বৃটিশ হাইকমিশন এক্সের এক পোস্টে সমবেদনা জানিয়ে বলেছে, এই দুর্ঘটনায় সমবেদনা জানিয়েছেন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি। এক্সে এক পোস্ট দিয়ে তিনি বলেছেন, আহমেদাবাদে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। যাত্রীদের প্রতি আমার সমবেদনা। আরও বলেছেন, ঘটনার কারণ উদ্‌ঘাটন ও জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছে বৃটেন। ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ওই সংবাদ ‘হৃদয়বিদারক’। এসময় বিমানের যাত্রী, তাদের পরিবার ও ভারতীয় জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। ভারতে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত থিয়েরি ম্যাথু বলেছেন, বিমান দুর্ঘটনার সংবাদে ফ্রান্স গভীরভাবে মর্মাহত। ফ্রান্সের পক্ষ থেকে বিমানে থাকা যাত্রী ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।

ভারতে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় প্রধান উপদেষ্টার শোক, সহায়তার প্রস্তাব
এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার বিধ্বস্তের ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লেখা এক শোক বার্তায় তিনি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের সহায়তারও প্রস্তাব দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং শোক বার্তাটি গণমাধ্যমে শেয়ার করে। নরেন্দ্র মোদিকে লেখা বার্তায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ২৪২ জন যাত্রী নিয়ে আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়া বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার মর্মান্তিক বিধ্বস্তের সংবাদে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় যেসব পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে আমরা তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। কঠিন এ সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও তাদের প্রিয়জনদের জন্য আমাদের প্রার্থনা ও সহানুভূতি রয়েছে। আমরা ভারতের সরকার ও জনগণের প্রতি সংহতি জানাচ্ছি এবং যেকোনো ধরনের পরিপূর্ণ সহায়তা করতে বাংলাদেশ প্রস্তুত আছে।

mzamin

বিশ্বের ইতিহাসে ভয়াবহ ১০ উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা

বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ভ্রমণ ও পণ্য পরিবহনের দ্রুততম মাধ্যম উড়োজাহাজ। সাধারণত নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে উড়োজাহাজ ভ্রমণ তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে করা হয়। তবে উড়োজাহাজও মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। কখনো দুর্ঘটনা ঘটলে যাত্রী ও ক্রুদের প্রাণহানিও হয় বেশি। বিশ্বের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ ১০টি দুর্ঘটনার তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো।

১. টেনেরিফ দুর্ঘটনা

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৭ সালের ২৭ মার্চ। স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের টেনেরিফ বিমানবন্দরে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। নির্দেশনা নিয়ে বিভ্রান্তি এবং রেডিও যোগাযোগে বিঘ্ন হওয়ায় এই দুর্ঘটনা হয়।

ওই দিন বেশ কুয়াশা ছিল। এ কারণে রানওয়েতে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন দুটি বোয়িং উড়োজাহাজের সংঘর্ষ হয়। এতে ৫৮৩ যাত্রীর প্রাণহানি ঘটে। তবে প্রাণে বেঁচে যান ৬১ জন।

২. জাপান

বিশ্বের ইতিহাসে আরেকটি ভয়াবহ উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ঘটে ১৯৮৫ সালের ১২ আগস্ট। জাপানের ইউয়েনো এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে গিরিখাতে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। এতে মারা যান ৫২০ জন। জীবিত ছিলেন মাত্র চারজন।

৩. দিল্লি

১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর ভারতের দিল্লির কাছে ঘটে আরেকটি উড়োহাজ দুর্ঘটনা। হরিয়ানা রাজ্যের চরকি দাদড়ি এলাকায় মাঝ–আকাশে ওই দুর্ঘটনা ঘটেছিল।

ওই দিন সৌদি এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজের সঙ্গে কাজাখস্তান এয়ারলাইনসের আরেকটি উড়োজাহাজের মধ্য আকাশে সংঘর্ষ হয়। এতে মারা যান ৩৪৯ জন। নির্দেশনা লঙ্ঘন করার কারণে এ ঘটনা ঘটে।

৪. প্যারিস

১৯৭৪ সালের ৩ মার্চ ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের বাইরের একটি এলাকায় আরেকটি উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে।

ওই দিন টার্কিশ ডিসি–১০ উড়োজাহাজের পেছনের কার্গো এলাকার দরজা ভেঙে পড়ে। এতে ৩৪৬ আরোহীর সবাই মারা যান। ওই দুর্ঘটনার পর উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাদের কার্গোর নকশায় পরিবর্তন আনে।

৫. এয়ার ইন্ডিয়া

১৯৮৫ সালের ২৩ জুনের ঘটনা। আটলান্টিক মহাসাগরের আয়ারল্যান্ড উপকূলে সম্ভাব্য শিখ জঙ্গিদের বোমায় উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। এতে মারা যান উড়োজাহাজের ৩২৯ আরোহীর সবাই। তাঁদের মধ্যে ২৬৮ জনই ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক।

৬. সৌদিয়া ফ্লাইট ১৬৩

১৯৮০ সালের ১৯ আগস্টের ঘটনা। পাকিস্তানের করাচি বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে জেদ্দায় যাচ্ছিল উড়োজাহাজটি। রিয়াদে উড্ডয়নের পরই উড়োজাহাজটিতে আগুন লেগে যায়। মারা যান ৩০১ আরোহীর সবাই।

ওই উড়োজাহাজ ছিল লকহিড এল–১০১১ ট্রাইস্টার মডেলের।

৭. ইরান এয়ার

১৯৮৮ সালের ৩ জুলাইয়ের ঘটনা। পারস্য উপসাগরের আকাশে ইরান এয়ারের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ গুলি করে ভূপাতিত করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে মারা যান ২৯০ আরোহীর সবাই। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, ভুল করে ওই গুলি করা হয়।

৮. ইরানের ইলিউশিন বিমান

২০০৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। ঘটনাস্থল ইরানের কেরমান এলাকা। খারাপ আবহাওয়ার কারণে বিধ্বস্ত হয় প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড সদস্যদের বহনকারী উড়োজাহাজটি। মৃত্যু হয় ২৭৫ আরোহীর।

৯. আমেরিকান এয়ারলাইনস

১৯৭৯ সালের ২৫ মের ঘটনা। ঘটনাস্থল শিকাগো। বাঁ পাখা থেকে একটি ইঞ্জিন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর বিধ্বস্ত হয় উড়োজাহাজটি। মারা যান ২৭৩ আরোহীর সবাই।

১০. কোরিয়ান এয়ারলাইনস

১৯৮৩ সালের ১ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ঘটনাস্থল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মনোরন দ্বীপ। সোভিয়েত বাহিনী গুলি করে ভূপাতিত করে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজটি। মারা যান ২৬৯ আরোহীর সবাই।

১৯৮৫ সালের ১২ আগস্টে জাপানের ইউয়েনো এলাকায় উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ঘটে
১৯৮৫ সালের ১২ আগস্টে জাপানের ইউয়েনো এলাকায় উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা ঘটে। ফাইল ছবি: রয়টার্স

অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া যাত্রীর বর্ণনা: বিকট শব্দের পর প্লেনটি ভেঙে পড়ে

ভারতের গুজরাট রাজ্যে বিমান দুর্ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরলেন বিধ্বস্ত বিমানের এক যাত্রী। তার নাম বিশ্বাস কুমার রমেশ। তিনি ভারত সফর শেষে লন্ডন ফিরছিলেন। সঙ্গে তার ভাইও ছিলেন।

ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস জানায়, কেন্দ্রীয় বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী রাম মোহন নাইডু জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। যিনি ওই বিমানের যাত্রী ছিলেন। তার আসন ক্রম ১১এ। তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক। ঘটনার পর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায় আহত ওই যাত্রী হাঁটছেন। তার পরনের সাদা ট্রাউজার ও গেঞ্জিতে ময়লা লাগানো। শরীরের বিভিন্ন স্থান রক্তাক্ত। আহত এই যাত্রীর চিকিৎসা চলছে হাসপাতালে। সেখানে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম তার সঙ্গে কথা বলেন। আহত ওই যাত্রী জানান, প্লেনটি উড্ডয়নের ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই নিচে নামতে শুরু করে। বিকট শব্দের পর এটি ভেঙে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এর আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি দাবি করেছিল, বিমান দুর্ঘটনায় এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনারের কোনো আরোহী বেঁচে নেই। বিমানটিতে মোট ২৪২ জন আরোহী ছিলেন। স্থানীয় পুলিশপ্রধান জিএস মালিকও জানিয়েছিলেন, উড়োজাহাজটিতে থাকা কোনো যাত্রীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই। বার্তা সংস্থা এপির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। জিএস মালিক জানান, আবাসিক এলাকায় উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ায় কিছু স্থানীয় বাসিন্দারও মৃত্যু হতে পারে। তবে সব আরোহীর মৃত্যুর ব্যাপারে এখনো বিস্তারিত বা আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি। বৃহস্পতিবার দুপুরে আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বিমানবন্দর থেকে বিমানটি যুক্তরাজ্যের লন্ডনের উদ্দেশ্যে উড্ডয়ন করে। এর কিছুক্ষণ পরই এটি আছড়ে পড়ে। বিমানটিতে ২৩২ জন সাধারণ যাত্রী এবং ১০ জন ক্রু ছিলেন। এর মধ্যে ১৬৯ জন ভারতীয়, ৫৩ জন বৃটিশ, ৭ জন পর্তুগিজ এবং একজন কানাডিয়ান ছিলেন।

mzamin

Tuesday, May 6, 2025

আমাজনে কুমিরে ভরা জলাভূমিতে ৩৬ ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন তাঁরা

আমাজন জঙ্গলের ভেতর কুমিরে ভরা এক জলাভূমি। এর মধ্যেই জরুরি অবতরণে বাধ্য হয় একটি ছোট উড়োজাহাজ। পাইলটসহ পাঁচ আরোহী প্রাণে বেঁচে গেলেও পড়ে যান আরেক বিপদে। চারপাশে কুমির ঘিরে রেখেছে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, সাহায্যের কোনো চিহ্ন নেই। সেই বিভীষিকাময় পরিবেশে তাঁরা কাটিয়েছেন ৩৬ ঘণ্টা। শেষমেশ তাঁরা জীবিত উদ্ধার হন।

সম্প্রতি বলিভিয়ার আমাজন অঞ্চলে ঘটেছে এমন ঘটনা। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বলিভিয়ার বেনি বিভাগের রাডার থেকে হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে যায় উড়োজাহাজটি। এর পরপরই এটির সন্ধানে অভিযান শুরু হয়। তবে হদিস মিলছিল না। পরদিন শুক্রবার বলিভিয়ার আমাজন অঞ্চলের স্থানীয় জেলেরা এর খোঁজ পান।

বেনি বিভাগের জরুরি অভিযান পরিচালনা কেন্দ্রের পরিচালক উইলসন আভিলা বলেছেন, তিন নারী, এক শিশু এবং ২৯ বছর বয়সী পাইলট উদ্ধার হয়েছেন। তাঁরা শারীরিকভাবে বেশ ভালো অবস্থায় আছেন।

স্থানীয় গণমাধ্যমকে পাইলট বলেন, উড়োজাহাজটি উত্তরাঞ্চলীয় বলিভিয়ার বাউরেস শহর থেকে ত্রিনিদাদ শহরের দিকে যাচ্ছিল। ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় উড়োজাহাজটিকে ইতানোমাস নদীর কাছে জরুরি অবতরণের প্রয়োজন হয়।

আন্দ্রেস ভেলার্দে নামের ওই পাইলট আরও বলেন, হঠাৎ করেই উড়োজাহাজটি উড়তে পারছিল না। তিনি একটি জলাভূমিতে উড়োজাহাজটি অবতরণ করাতে বাধ্য হন। পাইলটসহ পাঁচ আরোহী উড়োজাহাজটির ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন। কুমিরেরা চারপাশ ঘিরে ফেলেছিল। কোনো কোনো কুমির তিন মিটারেরও কম দূরত্বে চলে এসেছিল।

পাইলটের ধারণা, বিমানের ট্যাংক থেকে চুইয়ে পড়া পেট্রলের গন্ধই হয়তো ওই শিকারি প্রাণীদের দূরে রেখেছিল। তাঁরা পানিতে একটি অ্যানাকোন্ডা সাপও দেখতে পেয়েছিলেন। এমন আতঙ্কজনক পরিস্থিতির মধ্যেই তাঁরা উদ্ধার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

ভেলার্দে বলেন, ‘কুমিরদের জন্য আমরা পানি পান করতে পারিনি, কোথাও যেতেও পারিনি।’ যাত্রীদের একজনের সঙ্গে ময়দাজাতীয় খাবার কাসাভা ফ্লাওয়ার ছিল। তা দিয়েই তাঁরা ক্ষুধা মিটিয়েছেন।

জেলেরা উড়োজাহাজটির খোঁজ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে একটি হেলিকপ্টার পাঠায় কর্তৃপক্ষ। ওই পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

বেনি অঞ্চলের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক রুবেন টোরেস রয়টার্সকে বলেন, উড়োজাহাজটি নিখোঁজ হওয়ার পর নানা জল্পনা ও তত্ত্ব ছড়িয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সব সংস্থা একসঙ্গে কাজ করে জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে পেরেছে। এটাতেই তিনি খুশি।

উড়োজাহাজের ওপরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন পাঁচ আরোহী
উড়োজাহাজের ওপরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন পাঁচ আরোহী। ছবি: টারবাইনট্রাভেলার নামক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত

Saturday, March 29, 2025

শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল আট দেশ, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারে শুক্রবার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। এতে মিয়ানমারের পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে থাইল্যান্ডে। দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।

শুক্রবার রাত পৌনে একটার দিকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মিয়ানমারের জান্তা সরকারের হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে অন্তত ১৪৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৭৩২ জনের বেশি। থাইল্যান্ডে অন্তত নয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন বহু মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যমতে, শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এর কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারের মান্দালয় শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের ১২ মিনিট পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার একটি পরাঘাত (আফটার শক) হয়।

ভূমিকম্পের পর রাজধানী নেপিডো, মান্দালয়, সাইগাইংসহ ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করেছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। দেশটির সামরিক বাহিনী পরিচালিত সম্প্রচারমাধ্যম এমআরটিভি জানিয়েছে, নিহত ১৪৪ জনের মধ্যে নেপিডোয় ৯৬ জন, সাইগাইংয়ে ১৮ জন ও মান্দালয়ে ৩০ জন রয়েছেন। নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শক্তিশালী কম্পনে নেপিডো, সাইগাইং, মান্দালয়সহ পাঁচটি শহরে ভবন ধসে পড়েছে। এ ছাড়া একটি সেতু ও একটি রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ইরাবতী নদীর ওপর আভা সেতু ধসে পড়েছে। সেতুটি ভেঙে পানির মধ্যে হেলে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে ‘সব দেশ’কে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মিয়ানমারের এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় শোক প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের জনগণের পাশে দাঁড়াতে এরই মধ্যে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দল কার্যক্রম শুরু করেছে।

শহরজুড়ে ধ্বংসস্তূপ

ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিয়ানমারের মান্দালয় শহর। শহরটির এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেন, ‘সবকিছু কাঁপতে শুরু করলে আমরা সবাই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। আমার চোখের সামনে পাঁচতলা একটি ভবন ধসে পড়ে। আমাদের শহরের সবাই এখন রাস্তার ওপর রয়েছেন। ভয়ে কেউ ভবনের ভেতরে যাচ্ছেন না।’

ইন্টারনেটে প্রকাশিত ছবিতে মান্দালয় শহরজুড়ে ধ্বংসস্তূপ দেখা গেছে। শহরের বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত। মিয়ানমারের শেষ রাজার বাসভবন ‘মান্দালয় প্রাসাদের’ দেয়ালের একাংশও ভেঙে পড়েছে। ভূমিকম্পে মিয়ানমারের আরেক শহর তাউনগোয় একটি মসজিদের একাংশ ধসে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া শান প্রদেশের আউং বান শহরে একটি হোটেল ভবনের নিচে ২০ জন চাপা পড়েছেন। নিহত হয়েছেন দুজন।

রাজধানী নেপিডোতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই শহরেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের (৯৬) মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সেখানে অনেক ভবন ধসে পড়েছে। অনেক গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের কারণে অনেক জায়গায় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির মিয়ানমার অঞ্চলের পরিচালক মোহামেদ রিয়াস বলেন, মিয়ানমারে জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসাসহায়তা প্রয়োজন।

মিয়ানমারের শোচনীয় একসময়ে এই ভূমিকম্প হলো বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মিয়ানমারবিষয়ক গবেষক জো ফ্রিম্যান। তিনি বলেন, দেশটিতে চলমান সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সেখানে আগে থেকেই ত্রাণসহায়তার প্রয়োজন ছিল। এর মধ্যে ভূমিকম্পের কারণে সেই সংকট আরও তীব্র হলো।

মিয়ানমারে ২০২১ সালে নির্বাচিত অং সান সু চি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক জান্তা। এর পর থেকে দেশটিতে বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সংঘাত চলছে। বর্তমানে দেশটির বড় অংশ বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের ৩০ লাখের বেশি মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত। দেশটির এক–তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের ত্রাণসহায়তা প্রয়োজন।

থাইল্যান্ডে ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে ১১৭ জন আটকা

৭ থেকে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পকে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলা হয়। বিশ্বজুড়ে বছরে আনুমানিক ১৮টি এমন ভূমিকম্প হয়। এর চেয়ে তীব্র ৮ থেকে ৮ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পকে বলা হয় প্রলংকরী, এ ধরনের ভূমিকম্প বছরে আনুমানিক একটি হয়ে থাকে।

গতকালের ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি এত শক্তিশালী ছিল যে উৎপত্তিস্থল থেকে ১ হাজার ২০ কিলোমিটার দূরত্বের ব্যাংককে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে ব্যাংককে ৩৩ তলা একটি নির্মাণাধীন ভবন ধসে পড়েছে। ওই ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে অন্তত ১১৭ জন চাপা পড়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখানে অন্তত ৪০৯ জন উদ্ধারকাজে নেমেছেন।

ব্যাংককে হতাহতের বিষয়ে শহরের ডেপুটি গভর্নর তাভিদা কামোলভেজ বলেন, নির্মাণাধীন ওই ভবনের নিচে চাপা পড়ে এ পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। শহরের আরেক এলাকায় নিহত হয়েছেন একজন। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে জানিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপান্ত।

ব্যাংকক একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। ভূমিকম্পে গতকাল বিকেল পর্যন্ত শহরটিতে ১৬৯টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গতকাল ভূমিকম্পের সময় লোকজন ভয়ে রাস্তায় ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকেই ছিলেন পর্যটক। কম্পনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে একটি অভিজাত হোটেলের ছাদের সুইমিংপুল থেকে পানি উপচে নিচে পড়তে থাকে।

ভূমিকম্পের পর গতকাল থাইল্যান্ডের শেয়ারবাজারের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ৩১ মার্চ শেয়ারবাজারের লেনদেন আবার শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে ব্যাংকককে দুর্যোগ উপদ্রুত এলাকা ঘোষণা করেছে শহর কর্তৃপক্ষ।

ভূমিকম্পের সময় ব্যাংককে নিজ অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন শহরটির বাসিন্দা বুই থু। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ দেখতে পেলাম দেয়াল ফেটে যাচ্ছে। সুইমিংপুল থেকে পানি উপচে পড়ছে। চারদিক থেকে শুধু মানুষের চিৎকার ভেসে আসছিল। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।’

ভূম্পিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন এক মা ও তাঁর শিশুসন্তান।  গতকাল মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোয়
ভূম্পিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন এক মা ও তাঁর শিশুসন্তান। গতকাল মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোয়। ছবি: এএফপি

ভূমিকম্পে ব্যাংককে ভবন ধস: সাত শ কোটি টাকার ৩৩তলা ভবন মুহূর্তে ৩ তলার সমান ধ্বংসস্তূপ by পানিসা আমোচো

ব্যাংককের আকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। অস্তরাগের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। এই আবহে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি নির্মাণাধীন ৩৩ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন কয়েক শ উদ্ধারকর্মী।

আকাশের কমলা রঙের আভার নিচে এই দৃশ্যের অদূরে একটি সেতুতে দাঁড়িয়ে আছি আমি। সঙ্গে রয়েছেন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের একটি দল। একটি নির্মাণাধীন ৩৩ তলা ভবন মুহূর্তে তিনতলার সমান একটি কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হয়েছে, এটা আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

কিন্তু সামান্য দূরে চোখের সামনেই তো বাঁকানো তার ও ধাতুর উপাদান বের হয়ে আছে।

এরই মধ্যে আরও বেশি পেশাদার উদ্ধারকারী ও সামরিক বাহিনীর দল এসেছে। জ্বালানো হয়েছে ফ্লাডলাইট। কিন্তু জীবিত কোনো ব্যক্তিকে উদ্ধারের সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে।

মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলের মান্দালয়ে শুক্রবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। ১১ মিনিটের মাথায় সেখানে ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পের উৎপত্তি। উৎপত্তিস্থল অগভীর হওয়ায় কম্পনের তীব্রতা বেশি ছিল। প্রতিবেশী থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবর অনুযায়ী, ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারে ১৪৪ জন নিহত এবং ৭৩২ জন আহত হয়েছে বলে দেশটির জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং জানিয়েছেন। তিনি যে কোনো দেশ ও সংগঠনের সহায়তা চেয়েছেন। রাজধানী নেপিডোসহ মিয়ানমারের ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

মিয়ানমারের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে অনেক ভবন ধসে গেছে, রাস্তাঘাট চৌচির হয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ১ হাজার ২০ কিলোমিটার দূরের ব্যাংককে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে। ব্যাংককের ধসে পড়া এই ৩৩তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে অন্তত ১১৭ জন শ্রমিক চাপা পড়েছেন। এত ব্যাপক মাত্রার প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে থাইল্যান্ডবাসী পরিচিত নয়। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ভূমিকম্পের সময় আমি আমার বাসায় ছিলাম। এই রকম কোনো কিছু আমি আগে অনুভব করিনি।

ধসে পড়া ভবনটি জাতীয় নিরীক্ষা অফিসের। তিন বছর ধরে ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছিল। এতে ব্যয় হয়েছে দুই শ কোটি থাই বাথ বা সাড়ে চার কোটি পাউন্ডের বেশি অর্থ, বাংলাদেশি মুদ্রায় সাত শ কোটি টাকার বেশি।

ধসে পড়া ভবনের আশপাশের এলাকায় অনেকগুলো তাঁবু খাটানো হয়েছে। উজ্জ্বল হলুদ হ্যাট পরা উদ্ধারকর্মীরা হন্তদন্তভাবে ছোটাছুটি করছেন। আকাশচুম্বী ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাঁরা ১১৭ ব্যক্তিকে উদ্ধারের জোর চেষ্টা করছেন।

থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত তিন ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রায় এক ঘণ্টা আগে দুটি মরদেহ তাঁবুতে আনতে দেখেছি আমি।’

ধসে পড়া ভবনের পাশের সড়ক অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স এবং উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য গাড়িতে ভরা। সেতুতে আমাদের সঙ্গে কিছু উৎসুক মানুষও যুক্ত হয়েছেন। কী ঘটছে, তা তাঁরাও বুঝতে চেষ্টা করছেন।

একটি বড় ক্রেনসহ অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি আনা শুরু হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধান শুরু করার আগে ধ্বংসস্তূপের জঞ্জাল সরাতে হবে।

এই ভবন ধসে পড়ার এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে আমি ঘটনাস্থলে আসি। এসে দেখি, নির্মাণশ্রমিকেরা ধুলায় জবুথবু হয়ে আছেন। বেঁচে যাওয়ায় তাঁরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছেন।

বেঁচে যাওয়া একজন শ্রমিকের নাম অ্যাডিসর্ন কামফাসর্ন। ভূমিকম্পের সময় তিনি ছয়তলা থেকে নিচে জিনিসপত্র নামাচ্ছিলেন। হঠাৎ কম্পন অনুভব করে ১৮ বছর বয়সী এই শ্রমিক সিঁড়ির দিকে তাকান এবং একটি ক্রেন কাঁপতে দেখেন।

অ্যাডিসর্ন আমাকে বলেন, “আমি বুঝতে পারলাম খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আমি দৌড় দিলাম। এক মিনিটের মধ্যে ভবনটি ধসে পড়ল। মুহূর্তেই সব কিছু ঘটে গেছে। সবখানে ধোঁয়া, সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল। আশি নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমার কোনো মাস্ক ছিল না।”

মুঠোফোন হারিয়ে ফেলায় তিনি এখনো তাঁর পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। তিনি এর আগে জীবনে এমন ভয়াবহ কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি। তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি মারা যাচ্ছেন।

ওই নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করেন করেন এমন কয়েকজন শ্রমিক আমাকে বলেছেন, শ্রমিকদের মধ্যে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের নাগরিক রয়েছে।

ভূমিকম্পের সময়ে নুকুল খেমুথা (৩০) নামের এক শ্রমিক ওই ভবনের পঞ্চম তলায় কাজ করছিলেন। হঠাৎ ধাক্কা অনুভব করে তিনি তাকিয়ে দেখেন, পুরো ভবন ডুবে যাচ্ছে, অনেকগুলো গর্ত হয়ে যাচ্ছে।

নুকুল খেমুথা বলেন, কিছুক্ষণ আগে তাঁর এক সহকর্মী দশম তলায় বাথরুমে গিয়েছিলেন। তাঁরা তাঁর খবরের অপেক্ষায় আছেন। নুকুল খেমুথা আরও বলেন, ‘আমরা সবাই চিৎকার করে বলতে শুরু করি “দৌড়াও”। সবাইকে একে অপরের হাত ধরতে বলি এবং একসঙ্গে দৌড়াতে বলি।’

আমি যখন তাঁদের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখন তাঁরা ধূমপান করে নিজেদের শান্ত করতে চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। বেঁচে যাওয়াদের কেউ কোনো চিকিৎসা সহায়তা নেননি। কারণ, আটকা পড়া মানুষদের দিকেই তাঁদের পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ রয়েছে।

এদিকে ড্রিলিংয়ের শব্দ তীব্রতর হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীদের সামনে পড়ে আছে একটি দীর্ঘ রাত।

* পানিসা আমোচো থাইল্যান্ডে বিবিসি নিউজের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

ধসে পড়া নির্মাণাধীন ৩৩ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপের পাশে উদ্ধারকর্মীরা। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে, ২৮ মার্চ ২০২৫
ধসে পড়া নির্মাণাধীন ৩৩ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপের পাশে উদ্ধারকর্মীরা। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে, ২৮ মার্চ ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

Friday, January 31, 2025

ওয়াশিংটনের আকাশে বিমান-হেলিকপ্টার ভয়াবহ সংঘর্ষ

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির রোনাল্ড রিগ্যান জাতীয় বিমানবন্দরের কাছে মাঝ আকাশে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটি বিমানের সঙ্গে দেশটির একটি সামরিক হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে দ্বিখণ্ডিত ওই  বিমান এবং হেলিকপ্টারটি বিমানবন্দরের পাশের পোটোম্যাক নদীতে বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৩০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিবিসি’র মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে নিশ্চিত করেছে পুলিশ কর্মকর্তা। তারা জানিয়েছে, কোনো জীবিত মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছে, বিমানে ৬০ জন যাত্রী ছিলেন এবং দুইজন পাইলট ও দুইজন ক্রু সদস্য। এ ছাড়া সামরিক হেলিকপ্টারে ছিলেন তিনজন সেনা। দেশটির ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বুধবার বলেছে, হোয়াইট হাউস থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে পিএসএ এয়ারলাইন্স বোম্বারডিয়ার সিআরজে-৭০০ যাত্রীবাহী জেটের সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারের সংঘর্ষ হয়। ইতিমধ্যে এই ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রিগ্যান বিমানবন্দরের কোলঘেঁষা পোটোম্যাক নদীতে উদ্ধারকাজ পরিচালনায় একাধিক উদ্ধারকারী সংস্থা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এই দুর্ঘটনার পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আপাতত সকল উড্ডয়ন এবং অবতরণ বন্ধ রেখেছে।

বিবিসি’র লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষে বিমান দুই ভাগ হয়েছে। অন্যদিকে হেলিকপ্টারের উপরের অংশ নিচে পড়েছে। দুর্ঘটনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ঈশ্বর তাদের আত্মাকে শান্তি দিন। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘ভয়াবহ’ ওই বিমান দুর্ঘটনা সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়েছে। দুর্ঘটনার খবর পেয়েই জরুরিভিত্তিতে কাজ করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স এক্সে এক পোস্টে বলেছেন, তিনি দুর্ঘটনার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। দুর্ঘটনার কবলে পড়া যাত্রীদের জন্য প্রার্থনার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে দেশটির নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, পেন্টাগন সক্রিয়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, পুলিশ ও ফায়ার ডিপার্টমেন্টের কর্মীরা তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। সিএনএন বলছে, উদ্ধার অভিযান চালাতে মার্কিন কোস্ট গার্ড মোতায়েন করা হয়েছে।  

একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, সংঘর্ষের পর মোমবাতির ঝলকানির মতো কিছু একটা আকাশে দেখেছিলেন তিনি। বিবিসিকে সাক্ষাৎকার দেয়া ওই প্রত্যক্ষদর্শীর নাম অ্যারি শুলম্যান। জর্জ ওয়াশিংটন পার্কওয়ে ধরে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। রিগ্যান বিমানবন্দরের পাশ দিয়ে গেছে এই রাস্তা। গাড়ি চালিয়ে  সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় প্রায়ই বিমানের ওঠানামা দেখেন তিনি।

শুলম্যান বলেন, দেখে সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। বিমানটি  ঠিকমতো নেমে আসছিল, কোনো ত্রুটি ছিল না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই পেছনে ফিরে হতবাক হয়ে যান তিনি। শুলম্যান বলেন, আমি পেছনে ফিরে দেখি কিছুই আর ঠিকঠাক নেই। বিমানটি দেখে মনে হচ্ছিল সেটি ডানদিকে বেঁকে যাচ্ছে। সম্ভবত ৯০ ডিগ্রি। আমি বিমানের নিচের অংশ দেখতে পাচ্ছিলাম। বাইরে খুবই অন্ধকার ছিল। তাই  বিমানের নিচের অংশ ভালোমতো দেখতে পাওয়ার কথা না। তিনি আরও বলেন- বিমানটির নিচের অংশে উজ্জ্বল হলুদ আলো দেখা যাচ্ছিল। নিচ থেকে স্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে আসছিল।

বিমান দুর্ঘটনায় ষড়যন্ত্র দেখছেন ট্রাম্প

মাঝ আকাশে যাত্রীবাহী বিমানের সঙ্গে সেনা হেলিকপ্টারের ধাক্কা, ওয়াশিংটনে  ভয়ঙ্কর এই দুর্ঘটনা ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছে সর্বত্র। আর সেই আবহে মুখ খুললেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের অনতিদূরে, পোটোম্যাক নদীতে দু’টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েছে বিমানটি। উল্টো হয়ে নদীতে পড়েছে সেনার কপ্টারটিও। বিমানে ৬৪ জন এবং কপ্টারে চার যাত্রী ছিলেন এমন তথ্য এসেছে। সেই নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘একেবারে সঠিক পথে এগোচ্ছিল বিমানটি। বিমানবন্দরে নামার রাস্তা ধরেই এগোচ্ছিল। অনেকটা সময় ধরে সটান বিমানটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল হেলিকপ্টারটিই। রাতের আকাশ পরিষ্কার ছিল। জ্বলজ্বল করছিল বিমানের আলো। হেলিকপ্টারটি উপরে উঠে গেল না কেন, নীচেই বা নেমে গেল না কেন? বিমানটিকে দেখতে পাচ্ছে কি না জানতে চেয়ে কেন কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে হেলিকপ্টারটিকে নির্দেশ দেয়া হলো না’? সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথে এমন লিখেছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজ থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বে এমন ঘটনায় ষড়যন্ত্রের শঙ্কা মার্কিন প্রেসিডেন্টের। তার কথায়, ‘খুব খারাপ অবস্থা। দেখে মনে হচ্ছে এটা আটকানো যেত। ঠিক হয়নি’। সেনার কন্ট্রোল টাওয়ারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রাম্প।

৬৪ জন যাত্রী নিয়ে ওয়াশিংটনের রোনাল্ড রিগান বিমানবন্দরে অবতরণের সময়ে চপারে ধাক্কা খায় আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ৫৩৪২ বিমান। চপারের সঙ্গে বিমানটিও পোটোম্যাক নদীতে ভেঙে পড়েছে। উল্টো দিক থেকে সেনার চপারটি একই উচ্চতায় চলে এসেছিল বলেই এই দুর্ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে। আমেরিকার সেনাবাহিনীর তরফে জানানো হয়েছে, চপারে পাইলট-সহ তিন জন ছিলেন। তাদের প্রশিক্ষণ চলছিল। এ পর্যন্ত ১৯ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস নিউজকে নিশ্চিত করেছে পুলিশ কর্মকর্তা। বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই।
সূত্র : এনডিটিভি

mzamin


Monday, December 30, 2024

দক্ষিণ কোরিয়ায় বিমান ট্র্যাজেডি নিহত ১৭৯

দক্ষিণ কোরিয়া জুড়ে শোকের ছায়া। রোববার সকালটা বিষাদের এক খবরে মুষড়ে পড়ে দেশটি। ১৮১ আরোহী নিয়ে একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তাতে আগুনের বলয় তৈরি হয়ে তা বিস্ফোরিত হয়। এতে কমপক্ষে ১৭৯ জন নিহত হয়েছেন। বিমানের ধ্বংসস্তূপ থেকে দুই জনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তবে তাদের অবস্থা কেমন তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি। এ ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ায় ঘোষণা করা হয়েছে সাতদিনের শোক। ওদিকে এ খবর পেয়ে স্বজন হারানো পরিবারগুলোর সদস্য এবং তাদের বন্ধুরা ছুটে যান মুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখানে তারা অশ্রুসজল চোখে প্রিয়জনকে খুঁজে ফিরছিলেন। বিমানটির একজন যাত্রীর পরিবার বলেছে, তারা বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার আগে একজন যাত্রীর কাছ থেকে টেক্সট মেসেজ পেয়েছেন। তাতে বলা হয়েছে, ফ্লাইটের পাখায় একটি পাখির ধাক্কা লেগেছে। আরেকজন মেসেজ লিখেছেন, আমার শেষ কথা বলে দেয়া উচিত। স্থানীয় অনেক মানুষ বিমানটির জেট ইঞ্জিনে আগুনের বলয় দেখেছেন। শুনতে পেয়েছেন কয়েকদফা বিস্ফোরণের শব্দ। বিমানবন্দর থেকে প্রায় ৪.৫ কিলোমিটার দূরে ছিলেন এমন একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন- হঠাৎ দেখি বিমানটি ক্রমাগত নিচের দিকে নামছে। মনে করেছিলাম তা অবতরণ করছে। কিন্তু তারপরই দেখতে পাই আগুন জ্বলছে। এরপরই বিকট বিস্ফোরণ। বাতাসে ধোঁয়া উড়লো। ধারাবাহিকভাবে কতোগুলো বিস্ফোরণ হলো। এর ফলে যে প্রাণহানি হয়েছে তা বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ শোক প্রকাশ করছে নিহতদের জন্য। শোক জানিয়েছেন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি। শোক প্রকাশ করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও।

উল্লেখ্য, জেজু এয়ারের বোয়িং ৭৩৭-৮০০ বিমানটি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার মুয়ান যাচ্ছিল। স্থানীয় সময় রোববার সকাল ৯টার সামান্য পরেই তা অবতরণের চেষ্টা করে। কিন্তু অবতরণ নয়, তা একটি দেয়ালের ওপর বিধ্বস্ত হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমানটি রানওয়ে থেকে পিছলে যায়। তারপরই বিধ্বস্ত হয়। আগুন ধরে তা বিস্ফোরিত হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আকাশে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে দেয়। তবে ফ্লাইটের শুধু টেইলের বা পেছন দিকের একটি পোড়া অংশ পাওয়া গেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, ল্যান্ডিং গিয়ার পুরোপুরি প্রসারিত না হওয়া সত্ত্বেও বিমানটি ‘বেলি ল্যান্ডিং’ করার চেষ্টা করে। এখন তদন্তকারীরা যাচাই করে দেখছেন পাখির সঙ্গে ধাক্কা লেগে এ ঘটনা ঘটেছে, নাকি খারাপ আবহাওয়া এর কারণ। দুর্ঘটনার কমপক্ষে দুই ঘণ্টা পরেও ঘটনাস্থল থেকে কালো ধোঁয়া উড়ছিল। অন্যদিকে চলছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিমানের বিধ্বস্ত অংশ সংগ্রহের কাজ। ঘটনাস্থলে যাত্রীদের পোশাক, লাগেজ, পানির বোতল- সবই রক্তে ভেজা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। স্থানীয় মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, বিমানের দু’জন আরোহীকে উদ্ধার করা হয়েছে। ফ্লাইটে সবচেয়ে বেশি বয়সী ব্যক্তি ছিলেন ৭৮ বছর বয়সী একজন পুরুষ। আর সবচেয়ে কম বয়সী ছিল তিন বছর বয়সী একটি শিশু। বিমানটিতে দু’জন থাই যাত্রী ছিলেন বলে রিপোর্টে বলা হচ্ছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পায়েটংতার্ন শিনাওয়াত্রা এক্সে শোক জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, নিহত ও আহতদের পরিবারের প্রতি আমরা শোক প্রকাশ করছি। ওই বিমানে কোনো থাই যাত্রী আছেন কিনা তা যাচাই করতে জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের অবস্থা কী তাও তিনি জানতে চেয়েছেন।

ওদিকে খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছান দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট চোই সাং মোক। তিনি কর্মকর্তাদের জোরালো অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে যে, বিমান দুর্ঘটনার প্রতি সরকারি প্রতিক্রিয়া নিয়ে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি সভা আহ্বান করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিজে। উল্লেখ্য, জেজু এয়ার পরিচালিত ৭৩৭-৮০০ মডেলের ওই বিমানে ১৭৫ জন যাত্রী ও ৬ জন ক্রু ছিলেন। এ ঘটনায় বিবৃতি দিয়ে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে জেজু এয়ার। তাদের ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই দুর্ঘটনায় করণীয় সব কিছু করতে আমাদের শক্তি ব্যবহার করবে জেজু এয়ার। আতঙ্ক, ক্ষতির জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। বিমান সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কিম ই-বায়ে টেলিভিশনে বলেছেন, বিমানটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যায়নি। বিমানটির কোনো দুর্ঘটনায় পড়ার কোনো রেকর্ড নেই। আগে কোনো রকম ত্রুটির আলামত পাওয়া যায়নি এতে। তদন্তে সহযোগিতা করবে এই এয়ারলাইন। নিহতদের জন্য সমর্থন দেয়াকে শীর্ষ অগ্রাধিকার মনে করবে। ওদিকে মুয়ান বিমানবন্দরে সব রকম অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়া হয়।

মুয়ান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিবিসি’র সাংবাদিক জ্যাঁ ম্যাকেঞ্জি বলছেন, একটি কক্ষে হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নিহতদের দেহ শনাক্ত করতে কয়েকশ’ পরিবার সেখানে অপেক্ষা করছেন। নিহতদের শরীরের ক্ষত এত বেশি যে, তারা ছেলে না মেয়ে তা চেনার উপায় নেই। কেউ স্বামীকে হারিয়েছেন। কেউ হারিয়েছেন স্ত্রীকে। কেউবা ছেলেমেয়ে, কেউবা নাতিপুতিকে হারিয়েছেন। অনেক পরিবার একাধিক সদস্যকে হারিয়েছেন। তাদের বেশির ভাগই থাইল্যান্ডে বড়দিন উদ্‌যাপন করে ফিরছিলেন। মায়েং জি-সু (৭৮) বলেন, তার এক ভাতিজা ও ভাতিজার দুই সন্তান ছিল ফ্লাইটে। কিন্তু পুরো পরিবার শেষ হয়ে গেছে। তিনি হাউমাউ ও চিৎকার করে বলেন, বিশ্বাস করতে পারছি না একটি পুরো পরিবার অদৃশ্য হয়ে গেল। আমার হৃদয়ে খুব বেশি ব্যথা বোধ করছি।

mzamin