Showing posts with label কাজী সোহাগ. Show all posts
Showing posts with label কাজী সোহাগ. Show all posts

Tuesday, October 29, 2024

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ প্রকল্প বাতিল হচ্ছে by কাজী সোহাগ

বাতিল হচ্ছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ প্রকল্পের কাজ। বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ওই প্রকল্প নিয়ে কোনো ধরনের কাজ করতে চান না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। উল্টো রাশিয়ার সঙ্গে যে ধরনের চুক্তি হতে যাচ্ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে স্যাটেলাইট প্রকল্পের জন্য যে সফটলোনের প্রস্তাব বাংলাদেশ করেছে তার বিপরীতে উচ্চ ইন্টারেস্ট দাবি করেছে রাশিয়া। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আর্থিক অনিয়মের ঘটনা থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন স্যাটেলাইট সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার ওই প্রকল্পের কাজের মধ্যে বেশকিছু অসঙ্গতি পেয়েছে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) এক কর্মকর্তা বলেন, স্যাটেলাইট প্রকল্পের কাজ দীর্ঘমেয়াদি। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। তাই আগামী সরকারের জন্য হয়তো প্রকল্পটি রাখা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর সিদ্ধান্ত এখনও বাতিল হয়নি। এ প্রসঙ্গে বিএসসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ও ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বর্তমান সরকার বিষয়টি নিয়ে কি ভাবছে তা আমরা এখনো জানি না। এই সময় কাজ শুরু হবে কি না কিংবা পরবর্তীতে যারা আসবেন তারা শুরু করবেন কিনা বিষয়গুলো সেটা। তবে এটা বাতিল হবে না। আপাতত কার্যক্রম স্থগিত হয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ভাববার বিষয় রাশিয়ার সঙ্গে যাবো নাকি ফ্রান্সের সঙ্গে যাবো? এর মধ্যে আবার আর্থিক ইস্যুও রয়েছে। আমরা যদি সফ্‌ট লোন পাই তাহলে কার কাছ থেকে পাবো সেগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। আগের সরকারের আমলে বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে অনেকদূর এগিয়েছিল। কিন্তু রাশিয়া যে লোন অফার করেছিল সেটার ইন্টারেস্ট রেট অনেক হাই ছিল। ৫ ভাগেরও বেশি। কিন্তু সফ্‌ট লোন হয় সাধারণত এক থেকে দেড় পার্সেন্টের মধ্যে।

এক প্রশ্নে স্যাটেলাইটটি বঙ্গবন্ধুর নামে হবে কিনা সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে তিনি জানান। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণের জন্য রুশ ফেডারেশনের গ্লাভকসমসের সঙ্গে সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয় ২০২২ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি। মহাকাশ বিষয়ক রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্লাভকসমসের সঙ্গে স্যাটেলাইট তৈরি ও উৎক্ষেপণ বিষয়ে সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ?্য দিয়ে আর্থ অবজারভেটরি ক্যাটাগরির ওই স্যাটেলাইটটির নির্মাণের অভিযাত্রা শুরু হয়। ওইসময় ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এর উপস্থিতিতে ঢাকায় বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড এর প্রধান কার্যালয়ে সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তৎকালীন বিএসসিএল’র চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. শাহজাহান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ওই সময়ের সচিব মো. খলিলুর রহমান, বাংলাদেশে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেক্সান্ডার ভিকেনতেভিচ মান্তিতস্কি এবং অনলাইনে রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কামরুল আহসান ও গ্লাভকসমস-এর মহাপরিচালক দিমিত্রি লস্কুতব উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় টেলিযোগাযোগমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ রাশিয়া সরকারের সহযোগিতায় নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ১২ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ ফাইভ-জি যুগে প্রবেশ করেছে। আমরা তৃতীয় সাবমেরিন ক?্যাবল সংযোগ স্থাপনে ইতিমধ্যে কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে চুক্তিস্বাক্ষর করেছি যা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। আমাদের তৃতীয় অঙ্গীকার বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ নির্মাণ করা। এই সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে তার অভিযাত্রা আলোর মুখ দেখে। প্রসঙ্গত পর্যবেক্ষণমূলক স্যাটেলাইট ছিল বঙ্গবন্ধু-২। এর আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল  ৪ হাজার কোটি টাকা। রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ওই প্রকল্পের কাজ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিলম্ব হয়। এটি ২০২৩ সালে উৎক্ষেপণ করার কথা ছিল। সংশ্লিষ্টরা জানান, বঙ্গবন্ধু-২ স্যাটেলাইটের অভিযানের সময়কাল নির্ধারণ করা ছিল ১৮ বছরের মতো। এটি হতো একটি পৃথিবী অবজারভেটরি স্যাটেলাইট। এটি ভূ-পৃষ্ঠ থেকে উপরে ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থান করতো। ফলে দ্বিতীয় স্যাটেলাইটের জন্য অরবিটাল স্লট প্রয়োজন ছিল না।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ হয় ২০১৮ সালে। টিভি চ্যানেলগুলোর সেবা নিশ্চিত করাই এ স্যাটেলাইটের প্রধান কাজ। এর সাহায্যে চালু করা হয় ডিশ টিভি’র ডিরেক্ট টু হোম সার্ভিস-ডিটিএইচ। এছাড়াও যেসব জায়গায় অপটিক ক্যাবল বা সাবমেরিন ক্যাবল পৌঁছায় না সেসব জায়গায় এই স্যাটেলাইটের সাহায্যে দেয়া হচ্ছে ইন্টারনেট সংযোগ। এটি তৈরিতে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। যার মধ্যে এক হাজার ৩১৫ কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার আর বাকিটা বিদেশি অর্থায়ন।

Thursday, October 24, 2024

টেলিটক-হুয়াওয়ে প্রকল্প: ২০ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ by কাজী সোহাগ

বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের ফাইভ-জি প্রকল্পে ২০ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। টেলিটকের চার কর্মকর্তা কোম্পানির মগবাজার অফিসে বসে ওই ঘুষ গ্রহণ করেন। কর্মকর্তারা হলেন- প্রকল্পের তৎকালীন পিডি খায়রুল হাসান, ডিপিডি খালেদ হোসেন, জিএম মামুন ও আশরাফ। প্রকল্পের নাম-এক্সপানশন অফ টেলিটক’স নেটওয়ার্ক আপ টু রুরাল এরিয়াস অ্যান্ড নেটওয়ার্ক রিডিনেস ফর ফাইভ-জি সার্ভিস প্রজেক্ট। বর্তমানে প্রজেক্টটির কাজ অর্ধেকের মতো শেষ হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এদিকে ২০ কোটি টাকা লেনদেনের বিষয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বিষয়টি অস্বীকার করেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ প্রতিবেদককে অফিসে কিংবা আলাদাভাবে দেখা করার অনুরোধ জানান। অন্যদিকে হুয়াওয়ে ঘুষ লেনদেন বিষয়ে মানবজমিনের লিখিত প্রশ্নে বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছে। সেখানে এ ধরনের কোনো লেনেদেন হয়নি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মূলত টেলিটকের ফাইভ-জি প্রযুক্তিতে নিম্নমানের ডিভাইস ও ইকুইপমেন্ট সরবরাহ করতে টেলিটকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন এর সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ। মানবজমিনকে তিনি বলেন, টেলিটকের ফাইভ-জি প্রকল্পে হুয়াওয়ে যেসব ডিভাইস ও ইকুইপমেন্ট সরবরাহ করছে বর্তমানে পৃথিবীর কোনো দেশে এসব ব্যবহার হচ্ছে না। এসব অনাধুনিক হয়ে গেছে। আর টেলিটকের যেসব কর্মকর্তা হুয়াওয়ের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন তারা মূলত ওইসব নিম্নমানের ডিভাইস ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করছি। পাশাপাশি যে সকল কর্মকর্তা ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাই। ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে জানতে চাইলে পিডি খায়রুল হাসান বলেন, এসব স্পর্শকাতর বিষয়। এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। আপনি যদি আমাকে চিনে থাকেন তাহলে বুঝবেন আমি কেমন মানুষ। অন্য তিন কর্মকর্তার দু’জন প্রতিবেদককে আলাদাভাবে দেখা করার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেন। একই প্রসঙ্গে হুয়াওয়ের হেড অব মিডিয়া তানভীর আহমেদের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘুষ লেনদেনের প্রশ্নটি লিখিত আকারে দিতে বলেন। পরে ফাইভ-জি রেডিনেন্স প্রজেক্ট নিয়ে টেলিটকের মগবাজার অফিসে টেলিটক এর কয়েক কর্মকর্তার সঙ্গে হুয়াওয়ের অবৈধ লেনদেন হয়েছে-এমন অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে হুয়াওয়ের বক্তব্য কি? প্রশ্নটি লিখিত দিলে হুয়াওয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘নিজের বার্ষিক আয়ের ১৫ শতাংশেরও বেশি গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ করে হুয়াওয়ে। এ কারণেই টেলিযোগাযোগ খাতে এর সকল গ্রাহককে সবচেয়ে আধুনিক ও কার্যকরী পণ্য ও সমাধান দিতে পারে। আর সে কারণেই হুয়াওয়ে সকলের পছন্দের একটি ব্র?্যান্ড। অন্যদিকে ব্যবসায়িক পরিচ্ছন্নতা ও হুয়াওয়ের প্রতি সকলের আস্থার বিষয়টিকেও আমরা অনেক গুরুত্ব দেই। অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো আমাদেরও একটি অভ্যন্তরীণ অডিট টিম রয়েছে যারা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। বাংলাদেশে গত ২৬ বছরের পথচলায়  হুয়াওয়ে সবসময় স্থানীয় আইন ও নিয়ম মেনে এদেশের আইসিটি খাতের উন্নয়নে অবদান রেখেছে। তাই অনৈতিক লেনদেনের যে দাবি এখানে করা হচ্ছে সেটা ভিত্তিহীন।’ ফাইভ-জি নিয়ে টেলিটকের সঙ্গে কাজ করার সময় হুয়াওয়ের পক্ষ থেকে দেয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২০১২ সাল থেকে গবেষণার ও উন্নয়নের মাধ্যমে অত্যন্ত কার্যকরী হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার অ্যালগরিদম তৈরি করেছে, যা অপারেশনের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দ্রুতগতির ফাইভ-জি প্রযুক্তি প্রদানে সক্ষম। বাংলাদেশে ফাইভ-জি চালু করার ক্ষেত্রে হুয়াওয়ে টেলিটককে তার উচ্চমানের জঅঘ ইউনিট প্রদান করবে। এর মধ্যে অঅট (অ্যাকটিভ অ্যান্টেনা ইউনিট), যা ফাইভ-জি যুগে টেলিটক নেটওয়ার্কের কার্যকারিতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে। হুয়াওয়ের অঅট প্রযুক্তির একটি কার্যকারিতা হলো এটি বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যবহারের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি সাইটে বিদ্যুতের ব্যবহার কমাবে এবং দমকা হাওয়ার চাপেও নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করবে। যদিও হুয়াওয়ের এসব প্রযুক্তি নিয়ে এখন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এর আগে বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় বিটিসিএল’র ফাইভ-জি প্রকল্পের কাজ পাওয়ার অভিযোগ ওঠে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে। তড়িঘড়ি আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে ওই প্রকল্পের কাজে হুয়াওয়েকে নিয়োগের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রসঙ্গত ২০১৮ সালের ২৫শে জুলাই বাংলাদেশে ফাইভ-জি সেবা পরীক্ষায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল হুয়াওয়ে টেকনোলজিস (বাংলাদেশ) লিমিটেড। তখন ৮০০ মেগাহর্স স্পেকট্রাম ব্যবহার করে প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ চার জিবি পর্যন্ত ইন্টারনেটের গতি পাওয়া গিয়েছিল। পরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ডিজিটাল বাংলাদেশ মেলায় হুয়াওয়ে ফাইভ-জি প্রদর্শনীতে ১.৬ জিবিপিএস গতির সাক্ষী করে ঢাকাকে। ১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশের আইসিটি ও টেলিকম খাতে প্রযুক্তি সহজলভ্য করতে ভূমিকা রাখছে হুয়াওয়ে। কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি তরুণ-তরুণীদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশে ফাইভ-জি চালু করতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিকম অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশে লিমিটেড সহযোগী হিসেবে নির্বাচন করেছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আইসিটি অবকাঠামো ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে। অন্যদিকে টেলিটক একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধনকৃত টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর হিসেবে যাত্রা শুরু করে ২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর।
mzamin

Monday, October 21, 2024

অধ্যাদেশ দিয়ে চলবে সংসদ সচিবালয় by কাজী সোহাগ

সংসদ সচিবালয় আইনের পরিবর্তে এখন থেকে অধ্যাদেশ দিয়ে চলবে সংসদ সচিবালয়। ফলে আর্থিক ও প্রশাসনিক সব ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে সংসদ সচিবকে। আগের আইন অনুযায়ী সংসদ সচিবের দায়িত্ব ছিল প্রশাসনিক এবং নীতিগত বিষয়ে স্পিকারকে পরামর্শ দেয়া। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পদত্যাগের প্রেক্ষিতে আইনি জটিলতায় পড়ে ১২শ’ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংসদ সচিবালয়। ৫ই আগস্টের পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়িত্ব পাওয়া সংসদ সচিবকে সরিয়ে নতুন সচিব নিয়োগ দেয়া হয়। কিন্তু স্পিকারের পদ খালি থাকায় বিদ্যমান আইনে সচিব কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত মিটিং ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছেন না। অনেক কিছু সংস্কারের বিষয় থাকলেও আর্থিক ক্ষমতা না থাকায় উদ্যোগ নিতে পারছেন না। সংসদ সচিবালয় আইন-১৯৯৪ অনুযায়ী স্পিকার সব ক্ষমতার অধিকারি। কোনো কারণে স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংসদে ডেপুটি স্পিকারও নেই। তিনি বর্তমানে হত্যা মামলায় কারাগারে আটক আছেন। এ অবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করে সংসদ সচিবের ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে সংসদ সচিবের দায়িত্বে আছেন ড. মো. আনোয়ার উল্যাহ। গত ১৫ই সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা আদেশে, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে সংযুক্ত অতিরিক্ত সচিবকে সচিব হিসেবে পদোন্নতি প্রদান করে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে পদায়ন করা হয়। ১৭ই সেপ্টেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। তিনি ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (প্রশাসন) ক্যাডারে যোগদান করেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ও মাঠ প্রশাসনের উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিভিন্ন পদে তিনি কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ (বাজেট অনুবিভাগ), জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে তার কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সচিবের ক্ষমতা বাড়ানো প্রসঙ্গে সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের কাছে এ নিয়ে একটি অধ্যাদেশ-এর খসড়া পাঠানো হয়েছে। পরে এটা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ে পাঠানো হবে।  সম্ভবত এ সপ্তাহে জারি হবে। এটা হলে আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা সচিব পাবেন। বর্তমানে সংসদ সচিবালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কিছু কম্পিউটার থেকে শুরু করে সরঞ্জামাদি কিনতে হবে। সচিবের এখন যে ক্ষমতা রয়েছে সেই ক্ষমতা বলে তা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজনের তাগিদেই আসলে বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের কর্ম-বণ্টন আদেশ-২০১২ অনুযায়ী সচিবের ১৫টি ক্ষমতা রয়েছে। এর বেশির ভাগই রুটিন ওয়ার্ক ও স্পিকারকে পরামর্শ দেয়া। অধ্যাদেশ জারি হলে সচিবের ক্ষমতা এর থেকে বাড়বে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের ২৭ দিনের মাথায় জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করায় আইনি জটিলতার সৃষ্টি হয়। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ, পদোন্নতি, পদ সৃজন, বিলুপ্তিসহ বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন ও অর্থ ব্যয় সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদের জন্য চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪৭ কোটি ১৩ লাখ টাকার বাজেট অনুমোদন করে সংসদ সচিবালয় কমিশন। পাশাপাশি আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৮২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৪২০ কোটি ৯৭ টাকার বাজেট প্রক্ষেপণ অনুমোদন করা হয়। কিন্তু চলতি অর্থবছরের বাজেটের বেশিরভাগ টাকা এখন ব্যয় করতে পারছে না সংসদ সচিবালয়। অধ্যাদেশের বলে বাজেটের টাকা দিয়ে লুট হওয়া মালামাল কেনা ও সংসদ ভবনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

খসড়া অধ্যাদেশে যা বলা হয়েছে
সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, উপদেষ্টা পরিষদে পাঠানো প্রস্তাবিত খসড়ায় বলা হয়েছে- যেহেতু সংসদ ভেঙে গেছে। রাষ্ট্রপতির কাছে মনে হয়েছে, আশু ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান আছে। তাই সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদ সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ প্রণয়ন ও জারি করলেন। এতে জাতীয় সংসদ সচিবালয় আইন-১৯৯৪-এর (১৯৯৪ সালের ৮ নম্বর আইন) ধারা ২১-এর পর নতুন ধারা ২২ সংযোজিত হবে। ‘ক্রান্তিকালীন বিশেষ বিধান’ নামে নতুন ধারায় বলা হয়েছে: (১) এই আইনের অন্যান্য বিধানে যা কিছুই থাকুক না কেন, জাতীয় সংসদ ভঙ্গ থাকলে এবং ভঙ্গকালীন সময়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার সংবিধানের ৭৪(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগ করলে এবং রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করলে ও সংসদ সচিবালয় কমিশন বিদ্যমান বা বলবৎ না থাকলে, জাতীয় সংসদে স্পিকার নির্বাচন ও কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ সচিবালয় আইন এবং এর অধীন প্রণীত বিধিমালা ও নীতিমালাসমূহে সব ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা (সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ, নিয়োগ বিধি সংশোধন, পদোন্নতি, পদ সৃজন ও বিলুপ্তি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংখ্যা নির্ধারণ ও তাহাদের হ্রাস-বৃদ্ধি, সচিবালয়ের বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন ও বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়সহ অন্য সব বিষয়) সংসদ সচিবের ওপর ন্যস্ত হবে। এ ছাড়া (২) উপধারা (১)-এ উল্লিখিত (ক) পদ সৃজন ও বিলুপ্তি, (খ) কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা নির্ধারণ, (গ) কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধিকরণ, (ঘ) যুগ্ম সচিব ও তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতি এবং (ঙ) নিয়োগ বিধি সংশোধন সংসদ সচিবের সভাপতিত্বে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের সচিব, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং অর্থ বিভাগের সচিবের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পন্ন হবে। এদিকে আইনে অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- বাংলাদেশে অধ্যাদেশ হলো এমন আইন যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি দ্বারা কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুপারিশে জারি করা হয়, যা সংসদের আইনের মতোই ক্ষমতাসম্পন্ন এবং সংসদের অধিবেশন না থাকলেই কেবল অধাদেশ জারি করা যেতে পারে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদ ভেঙে গেলে অথবা সংসদ অধিবেশন না থাকলে কোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে এমন কোনো বিধান করা যাবে না যা বাংলাদেশ সংবিধানের অধীন সংসদের আইন দ্বারা আইন সঙ্গতভাবে করা যায় না কিংবা এর মাধ্যমে সংবিধানের কোনো বিধান পরিবর্তিত হয়। কোনো অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম বৈঠকে এটি উপস্থাপিত হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ কর্তৃক পাস হলে আইনে পরিণত হবে অন্যথায় অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বিলুপ্ত হবে।

Thursday, October 17, 2024

ফাইল গায়েব হয়ে যাচ্ছে সংসদ থেকে by কাজী সোহাগ

আর্থিক ও সংসদ সচিবালয়ের নেয়া পুরনো অনেক সিদ্ধান্তের ফাইল গায়েব করা হচ্ছে। এরইমধ্যে শতাধিক ফাইল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এসব ফাইলের বেশির ভাগই আর্থিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আরও ফাইল গায়েব করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে মানবজমিন-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে। ইতিমধ্যে যেসব ফাইল গায়েব হয়েছে তাতে শতাধিক কোটি টাকার হিসাব রয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী এসব ফাইল গায়েবের সঙ্গে সম্পৃক্ত। চতুর্থ শ্রেণির অনেক কর্মচারীকে টাকার বিনিময়ে ফাইল গায়েবের মিশনে নামানো হয়েছে। ৫ই আগস্টের পর অনেক কর্মকর্তা নিয়মিত অফিস করছেন না। তারা বাইরে থেকে টাকা দিয়ে কর্মচারীদের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ফাইল গায়েব করছেন। তবে এসবই হচ্ছে খুবই গোপনে। সংসদ সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তারা জানান, স্পিকারের দপ্তর, সংসদ সচিবের দপ্তর ও কমন শাখার অনেক ফাইলের হদিস নেই। আবার কমিটি শাখার অনেক ফাইল রাতারাতি গায়েব হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ফাইলে কমিটির নেয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত রয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রভাবিত হয়ে নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর ফাইল সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, ডাক ও টেলিযোগাযোগ সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটিসহ আরও অন্তত ১০টি স্থায়ী কমিটির ফাইল সংসদ সচিবালয় থেকে গায়েব হয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের হাতে যেন এসব ফাইল না যায় সে চেষ্টার অংশ হিসেবে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে এসব কিছুই হচ্ছে অর্থের বিনিময়ে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদে ৪৮টি সংসদীয় কমিটি ছিল। এসব কমিটির বেশির ভাগই কোনো মিটিং করেনি। অথচ মিটিংয়ের নামে অর্থ বরাদ্দ ও কমিটি সদস্যদের নামে মিটিংয়ে হাজিরার টাকা দেয়া হয়েছে। এ ধরনের বেশ কিছু ফাইল গায়েব করা হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। অথচ এসব ফাইল ৫ই আগস্টের পরেও দেখা গেছে বলে দাবি করেছেন তারা। সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, এরইমধ্যে সংসদ সচিবালয়ের অনেক কর্মকর্তার নামে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা হয়েছে। তাদের নামে আরও মামলার শঙ্কা রয়েছে। ১২ই অক্টোবর ভারতে পালানোর সময় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের যুগ্ম সচিব একেএমজি কিবরিয়া মজুমদারকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তের পুটিয়া এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। এ ধরনের শঙ্কা থেকে আরও কয়েক কর্মকর্তা আত্মগোপনে রয়েছেন। তারাও বিভিন্ন উপায়ে দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা করছেন বলে জানা গেছে। এ ধরনের বেশির ভাগ কর্মকর্তার বাসা ছিল সংসদ ভবনের ভেতরে। ওইসব বাসা এখন খালি। লুট হওয়ার পর তারা এসব বাসায় আর ফেরেননি। যারা নিজেদের অপরাধী মনে করেন না তারা তাদের বরাদ্দকৃত বাসা মেরামত ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে বাসায় উঠেছেন।

সংসদ সচিবালয়ের চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মচারী মানবজমিনকে জানান, প্রায় প্রতিদিনই সংসদ সচিবালয় থেকে ফাইল গায়েব হয়ে যাচ্ছে। ভেতরে পুরো বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। ৫ই আগস্টের দোহায় দিয়ে এসব ফাইল টাকার বিনিময়ে গায়েব করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। বলেন, আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা বাইরে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিচ্ছেন। পরে ভেতরে এসে নির্দিষ্ট ফাইলটি সরিয়ে রাখছেন। মূলত ওইসব ফাইল নিয়ম ও আইন মেনে তৈরি করা ছিল না। এসব ফাইলের বেশির ভাগই হচ্ছে আর্থিক সংশ্লিষ্ট। এসব নজরদারি করার মতো অবস্থা সংসদ সচিবালয়ের নেই। কারণ সচিবালয়ের ভেতরে চেইন অব কমান্ড বলে কিছু নেই। কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কেউ কেউ অফিস করছেন আবার কেউ কেউ অফিসে হাজিরা দিয়েই চলে যাচ্ছেন। এ সবের কারণ সম্পর্কে সংসদ সচিবালয়ের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, সংসদ সচিবালয়ের ভেতরে অফিস বা কাজ করার কোনো ধরনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। চেয়ার, টেবিল নেই। টেলিফোন, কম্পিউটার নেই। নেই ইন্টারনেট সংযোগ। বিদ্যুতের সমস্যার কারণে অনেক জায়গায় লাইটও নেই। বেশির ভাগ এসি লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আপাতত সংসদ সচিবালয়ের ভেতরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ছাড়া কারও প্রবেশের সুযোগ নেই। ভবনের মূল গেটে সেনা সদস্যর পাশাপাশি সংসদ সচিবালয়ের নিরাপত্তা বাহিনী সার্জেন্ট অ্যাট আর্মসের স্টাফরা রয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে সংসদ কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, ফাইল গায়েব করা হলে চিরস্থায়ী সমস্যার সৃষ্টি হবে। যারা এখন সংসদ সচিবালয়ের দায়িত্বে আছেন তাদের উচিত হবে অভ্যন্ত্ররীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় করা। এসব বিষয় জানতে ১৭ই সেপ্টেম্বর নিয়োগ পাওয়া সংসদ সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্যাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সংসদ ভবন বা জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্স ঢাকার শেরে বাংলা নগরে ২১৫ একর জায়গার ওপর অবস্থিত। ৯ তলা বিশিষ্ট ভবনটির মূল স্থপতি লুই আই কান। তিনি প্রখ্যাত মার্কিন স্থপতি। বাংলাদেশের সংসদ ভবন উপমহাদেশের অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন। এর স্থাপত্যশৈলী দ্বারা প্রকৃতির বিভিন্ন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় সংসদ ভবন চত্বর ও ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে হাজারো মানুষ। এ সময় তারা স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, হুইপদের কক্ষসহ ৯ তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষ তছনছ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ৫ই আগস্ট সংসদ ভবনের গেটে প্রথমে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রবেশে বাধা দিলেও লোকসমাগম বাড়লে আর তাদের আটকানো যায়নি। সংসদ ভবন চত্বরের দক্ষিণ প্লাজা, খেজুরবাগান মাঠ, টানেলে ঢুকে পড়ে অসংখ্য মানুষ। সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ওইদিন বিকাল থেকে রাতভর একদল মানুষ সংসদ ভবনের প্রায় সব কক্ষেই লুটপাট চালায়।

mzamin

Friday, October 11, 2024

টিকটক নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিচ্ছে বাংলাদেশ by কাজী সোহাগ

বাংলাদেশে একসময় জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ নিয়ে ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকটক বন্ধ করতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকার। টিকটকের অনেক কনটেন্ট নিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)তে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়ে। মূলত টিকটকের মাধ্যমে অশ্লীলতা ও দেশীয় কালচার নষ্ট হচ্ছে এমন অভিযোগ ওঠে।  বিভিন্ন সিনেমার জনপ্রিয় গানের একাংশ, ঠোঁট মিলিয়ে ভিডিওতে কোনো খারাপ উক্তি তৈরির এই অ্যাপ নিয়ে ইতিমধ্যে দেশে সমালোচনার ঝড় বইছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাপ টিকটকের ওপর নিষেধাজ্ঞার দাবি উঠেছে ভারতে। তবে এবার টিকটকের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এরইমধ্যে টিকটকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী। মানবজমিনকে তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে প্রাথমিক বৈঠক হয়েছে। সামনে হয়তো আরও বৈঠক হবে। টিকটককে বাংলাদেশে তাদের ডাটা সেন্টার বসানোর কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে তাদের সার্ভার রয়েছে ভারতে। এদিকে বিটিআরসি সূত্র জানিয়েছে, টিকটককে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ডাটা সেন্টারের পাশাপাশি এখানে একটি অফিস স্থাপনের কথাও বলা হয়েছে। অফিস থাকলে সেখানে টিকটকের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কাজ করবেন। তখন বাংলাদেশ নিয়ে টিকটকের আপত্তিকর ভিডিও বা নানা ধরনের কনটেন্ট বন্ধ করা সহজে সম্ভব হবে। টিকটক কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের এ ধরনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে। এর আগে অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে টিকটককে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ সরকার। ওই সময় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, শুধু টিকটক নয় দেশীয় সংস্কৃতির জন্য হুমকি রয়েছে এমন সব ধরনের সাইট আমরা বন্ধ করে দিতে চাই। তিনি বলেন, আমি ইন্টারনেটকে নিরাপদ করতে চাই। আমার দেশ ইউরোপ না আমেরিকা না আমার দেশে বাংলাদেশ। তাই এ দেশের মানুষ, সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না এমন কোনো কিছুকেই আমি রাখতে চাই না। এসব সাইট বন্ধ করলে আবার খোলা হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খোলা হলে বন্ধ করে দেবো। যতবার খোলা হবে ততবার বন্ধ করে দেবো। মনুষের জীবন ও মান ও দেশের জন্য ক্ষতিকর এসব সাইট বন্ধে কতোটুকু সফল হবো জানি না। তবে আমি আমার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে এই দায়িত্ব পালন করে যাবো। প্রযুক্তিবিদরা জানান, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট এরকম বেশকিছু অ্যাপের পর গত কয়েক বছর ধরে নতুন যে অ্যাপটি অনেকের আকর্ষণ কেড়েছে তা হলো চীনের অ্যাপ টিকটক। বাংলাদেশে টিকটক জুড়ে রয়েছে নানা ধরনের জনপ্রিয় গান, সিনেমার ডায়ালগ অথবা কোনো ভাইরাল হওয়া কোনো বক্তব্যের সঙ্গে ঠোঁট মিলিয়ে অভিনয়, নাচ দিয়ে মূলত হাস্যরসের ভিডিও। মোবাইল অপারেটরদের দেয়া তথ্যমতে, ভিডিও শেয়ারিংয়ের জনপ্রিয় প্ল্যাটফরম টিকটক ব্যবহার করেন ৫ কোটিরও বেশি বাংলাদেশি। বিশ্বব্যাপী অ্যাপ ডাউনলোড চার্টের শীর্ষের দিকে রয়েছে টিকটক। টিকটকের তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বব্যাপী আশি কোটি মানুষ এটি ব্যবহার করছে। ২০১৯ সালে জনপ্রিয় অ্যাপ ইন্সটাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটকে পেছনে ফেলে বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ ডাউনলোডকারী অ্যাপে পরিণত হয়েছে টিকটক। টিকটক ব্যবহারকারীরা জানান, এটা অনেকটা নেশার মতো হয়ে গেছে। কারণ টিকটক খুব সহজ। একটা টিকটক ভিডিও বানাতে সর্বোচ্চ সময় লাগছে এক মিনিট। ভিডিও আপলোড করার সঙ্গে সঙ্গে খুব সহজে মানুষকে রিচ করতে পারছেন এবং প্রতিক্রিয়া পেয়ে যাচ্ছেন। তারা বলেন, অনেক সহজে, অল্প পরিশ্রম করেই প্রতিক্রিয়া পাওয়া, মানুষের প্রশংসা পাওয়া সেটা একধরনের আত্মতৃপ্তির কাজ করে। এই আবেদনই বেশিরভাগ মানুষকে টিকটকের দিকে আগ্রহী করে তুলছে। ব্যবহারকারীদের অনেকে টিকটককে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, চারপাশে অনেক নেতিবাচক বিষয় ঘটছে এখন। সেগুলো মানুষের কানে আসে। সেসব বিষয়ে খবর পড়তে হয়। মানুষ খুব একঘেয়ে বোধ করছে এবং বিনোদনের উপায় খুঁজছে। টিকটক খুব সহজ একটা বিনোদন। টিকটকের ভিডিও দেখা যায় ফেসবুকে অথবা ইন্সটাগ্রামে। বাংলাদেশে মূলত হাসির ভিডিও তৈরির প্রবণতাই বেশি। অনেক জনপ্রিয় গান, সিনেমার ডায়ালগের ব্যবহারের অনুমোদন নিয়ে রেখেছে টিকটক। যা অন্য অ্যাপগুলোতে নেই। সেটাও এর জনপ্রিয়তার কারণ হতে পারে। ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন অনেকেই। টিকটকেও সেই সুযোগ রয়েছে। সেটা সম্ভব হতে হলে অবশ্য অনেক ফলোয়ার থাকতে হবে। ভিডিও’র মাধ্যমে কোনো পণ্যের বিক্রি বাড়াতে অনেক ব্র্যান্ড টিকটকে যাদের ফলোয়ার বেশি রয়েছে তাদের অর্থ দিয়ে থাকেন। অনেক সময় নতুন কোনো পণ্য বাজারে আনার আগে বিজ্ঞাপনদাতারা টিকটকে সেলিব্রিটিদের পণ্যের বিক্রি বাড়াতে কাজে লাগান। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যায় ফলোয়ার থাকলে টিকটকে লাইভ করতে পারেন ব্যবহারকারীরা। তারাই মূলত পণ্যের বাজারজাতকরণে বেশি গুরুত্ব পান। টিকটকে এমনকি লাইভ চলাকালীন নিলামের নমুনাও রয়েছে। বাংলাদেশে এভাবে সেলিব্রিটিরা কতো অর্থ উপার্জন করছেন সে সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই।
mzamin

Tuesday, October 8, 2024

ড. ইউনূসের লুকানো সেই বই প্রদর্শনে প্রতিযোগিতা by কাজী সোহাগ

মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে একটি বইয়ের অবস্থান নিয়ে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। বইটির লেখক বর্তমানে ক্ষমতাসীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২০২২ সালে সংসদ সচিবালয় নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের লেখা-এ ওয়ার্ল্ড অফ থ্রি জিরোস: দ্য নিউ ইকোনমিকস অফ জিরো প্রভার্টি, জিরো আনইমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড জিরো নেট কার্বন ইমিশনস বইটি কেনে। কিন্তু বইটি কেনার পর থেকে বিপাকে পড়েন সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরির কর্মকর্তারা। বইটি নিয়ে চলে লুকোচুরি। একবার বইটি সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরি কক্ষের শেলফে রাখা হয়। আবার কখনো কোনো কর্মকর্তার রুমে থাকা শেলফে স্থান পায় বইটি। কখনো শেলফে রাখা হলেও বইটি উল্টো করে রাখা হয়, যেন বইয়ের নাম দেখা না যায়। তবে ২০২২ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর থেকে বইটি আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি। ওইসময় সর্বশেষ লাইব্রেরির যে কর্মকর্তার শেলফে বইটি উল্টো করে রাখা ছিল সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।

এভাবে দুই মাসে বইটির অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে ১৫ থেকে ২০ বার। কিন্তু এবার ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে প্রধান উপদেষ্টার লেখা ওই বই নিয়ে। বইটি আবার ফিরে এসেছে সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরিতে। তবে বইটি রাখা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন সংসদ সচিবালয়ের কয়েক কর্মকর্তা। আগে চেষ্টা করা হয়েছে লুকিয়ে রাখার। এখন চেষ্টা হচ্ছে কীভাবে বইটি সামনে রাখা যায়। একবার ওই শেলফে রাখা হয় তো আবার অন্য শেলফে। কেউ বলছেন- এই শেলফে ভালোভাবে দেখা যায় তাই বইটি এখানে রাখা উচিত। আবার অন্যজন বলছেন, ওই শেলফে রাখা হলে আরও বেশি ভালো করে দেখা যাবে তাই বইটি ওখানেই রাখা ভালো হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংসদ লাইব্রেরির এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানান, নোবেলজয়ীর বই নিয়ে একসময় আমরা খুব বিপদে ছিলাম। তখনকার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ সংসদ সচিবের কাছে ওই বই কেনার তথ্য গোপন করা হয়। তারা জানলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে এমন শঙ্কা ছিল। তবে বইটি কেনার পর থেকে নানাভাবে লুকোচুরি করা হয়েছে। তখন আমরা বইটাকে আর বই হিসেবে দেখতে পারিনি দেখেছি একটি ভাইরাস হিসেবে। কিন্তু এখন গণেশ উল্টে গেছে। ৫ই আগস্ট দেশের পট পরিবর্তনের পর অনেক কিছুই পাল্টে গেছে সংসদ সচিবালয়ের। এখন নোবেলজয়ীর বই কোথায় রাখা হবে তা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ২০২২ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর ‘ড. ইউনূসের বই কিনে বিপাকে সংসদ’- শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে মানবজমিন। সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরির সঙ্গে যুক্ত ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, সংসদ লাইব্ররিতে ৮৫ হাজারের বেশি বই রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ হাজার বই ৫ই আগস্ট লুট হয়েছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই লাইব্রেরির বই উদ্ধার করা হচ্ছে। সংসদ সচিবালয়ের বিভিন্ন ফ্লোরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে লাইব্রেরির বই। কিছু লোকবল নিয়ে লাইব্রেরি সাজানো শুরু হয়েছে। কাজ অনেকটা গোছানো হয়েছে। তিনি বলেন, এই গোছাতে গিয়েই নোবেলজয়ীর লেখা বইটি পাওয়া গেছে। এখন বইটি সসম্মানে লাইব্রেরির শেলফে রাখা হয়েছে। আগে যেটা সম্ভব হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২২ সালের মে ও জুন মাসে দুই দফায় চার শতাধিক বই কেনে সংসদ সচিবালয়। পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটিডের মাধ্যমে বইগুলো কেনা হয়। এর মধ্যে ১৯শে জুন পাঞ্জেরীকে ৩৩টি বইয়ের চূড়ান্ত তালিকা দেয়া হয়। যার অর্ডার নং-১১.০০.০০০০.৬০৪.০৭.০৮৭.২, তারিখ: ১৯-০৬-২০২২। এতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের লেখা-এ ওয়ার্ড অফ থ্রি জিরোস: দ্য নিউ ইকোনমিকস অফ জিরো প্রভার্টি, জিরো আনইমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড জিরো নেট কার্বন ইমিশনস বইটি তালিকাভুক্ত ছিল। অর্ডার অনুযায়ী ২০২২ সালের ৫ই জুলাই বইটির দুই কপি সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরির জন্য সরবরাহ করা হয়। এরপরই ড. ইউনূসের লেখা বইটি নিয়ে শুরু হয় টানাহেঁচড়া। সংসদ সচিবালয়ের বই নিয়ে গঠিত যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যরা প্রথম বইটি নিয়ে আপত্তি তোলেন। তারা জানান, বইটিতে সরকারবিরোধী নানা ধরনের লেখা ও মন্তব্য রয়েছে। তাই এ বইটি কেনা ঠিক হয়নি। সংশ্লিষ্টরা কোনোভাবে এ বইয়ের বিষয়ে জানতে পারলে লাইব্রেরিতে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হতে পারে। যাচাই-বাছাই কমিটির এ ধরনের মন্তব্যর পর লাইব্রেরিতে কর্মরত কর্মকর্তারা বইটি নিয়ে কি করবে তা বুঝে উঠতে পারেননি । কারণ বইটির নাম চূড়ান্ত তালিকায় ছিল আবার তা কেনার পর দামও পরিশোধ করা হয়েছে। তাইতো প্রতিনিয়ত বইটির অবস্থান পরিবর্তন করা হয়। হাতেগোনা কয়েকজন এমপি সংসদ সচিবালয়ের লাইব্রেরি কক্ষে আনাগোনা করেন। প্রথমে বইটি লাইব্রেরির শেলফে রাখা হলেও পরে তা সরিয়ে ফেলা হয়। লাইব্রেরিতে আসা কোনো এমপি’র নজরে যেন বইটি না পড়ে সেজন্য এ উদ্যোগ নেয়া হয়। পরে রাখা হয় উপ-পরিচালক (গ্রন্থাগার) জেব উন নেছার অফিস কক্ষে। তবে সেখানে বইটি উল্টো করে রাখা হয় যেন কারও নজরে না পড়ে। পরে সেখান থেকেও সরিয়ে ফেলা হয়। ওইসময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংসদ লাইব্রেরির এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, বইটি কেনার পর থেকে আমাদের মধ্যে আতঙ্ক পেয়ে বসেছে। প্রায় প্রতিদিনই বইটি শেলফ থেকে শেলফে সরিয়ে রাখতে হচ্ছে। অতি উৎসাহী কয়েকজন বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করার চেষ্টা করছেন। তারা ভয় দেখিয়ে বলছেন- সংসদে প্রতিনিয়ত সংসদ নেতাসহ সরকারি দলের নেতারা নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন। সেখানে সংসদ লাইব্রেরির কর্মকর্তাদের তার লেখা বই কেনা ঠিক হয়নি। কারণ ওই বইয়ে রয়েছে সরকারবিরোধী নানা ধরনের কথাবার্তা ও মন্তব্য। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথমে সংসদ লাইব্রেরি থেকে বইয়ের একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। পরে তা অনুমোদন দেয় লাইব্রেরি কমিটি। ওই কমিটির প্রধান থাকেন পদাধিকার বলে ডেপুটি স্পিকার। কিন্তু তৎকালীন ডেপুটি স্পিকার এডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া অসুস্থ হয়ে আমেরিকায় চিকিৎসাধীন থাকায় লাইব্রেরি কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি। তাই লাইব্রেরি কর্মকর্তাদের তৈরি তালিকা অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত বইগুলো কেনা হয়। অন্যদিকে যাচাই-বাছাই কমিটি বইগুলো কেনার আগে কোনো আপত্তি জানায়নি। বই কেনার পরে তারা হঠাৎ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বইটি নিয়ে আপত্তি তোলে। এরপরই বইটি নিয়ে শুরু হয় লুকোচুরি। ২৮৮ পৃষ্ঠার বইটির প্রথম সংস্করণ বের হয় ২০১৭ সালে। রকমারিতে যার মূল্য দেয়া রয়েছে ১০৭৮ টাকা। বইটি প্রকাশ করে ভারতের বিখ্যাত প্রকাশনী সংস্থা হাচিতী ইন্ডিয়া।

mzamin

Thursday, September 19, 2024

কোমায় টেলিটক by কাজী সোহাগ

বিগত ১৫ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকে শুধু লুটপাটই করা হয়েছে হাজার কোটি টাকার উপরে। প্রতিষ্ঠানটিতে যারাই দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন তারাই অংশ নিয়েছেন লুটপাটে। যার কারণে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা থাকলেও কখনো উঠে দাঁড়াতে পারেনি টেলিটক। বরং দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আরও মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দেশের বেসরকারি মোবাইল অপারেটরদের গ্রাহক সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও উল্টো চিত্র টেলিটকে। এর প্রধান কারণ টেলিটকের গ্রাহক সেবার মান সর্বনিম্ন। ২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটক। সেই সময় থেকে যতটা না সেবা দিতে পেরেছে তার চেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে এই সরকারি অপারেটর। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের আঙ্গুল এই অপারেটরের দিকে। প্রতিষ্ঠানটির বেশির ভাগ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়েছে। সেসব মামলার কোনোটা আদালতে বিচারাধীন অথবা কোনোটা দুর্নীতি দমন কমিশনের অধীনে তদন্তাধীন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, টেলিটকের এমন কোনো প্রকল্প নেই যেখানে অনিয়ম আর দুর্নীতি হয়নি। বরং দুর্নীতি করার জন্যই টেলিটকে নানা ধরনের প্রকল্প নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে এই অপারেটরে হাজার কোটি টাকার বেশি লুটপাট হয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হলেও তা নিষ্পত্তি হয়নি। কয়েকদিন দুদক নড়েচড়ে বসে ঢাকঢোল পিটিয়ে থেমে যায়। এসব কারণে যারা টেলিটকে দায়িত্ব নিয়ে আসেন তারা দুর্নীতি করতে সাহস পান।

এদিকে টেলিটকের গ্রাহক সেবার মান নিয়ে রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলেই টেলিটকের অবস্থান স্পষ্ট হয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এর জুলাই মাসের গ্রাহক হিসেবে দেখা যায়, গ্রামীণফোনের গ্রাহক-৮৫ দশমিক ২৪ মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় সাড়ে আট কোটির বেশি, রবি আজিয়াটার গ্রাহক ৫৮ দশমিক ৯২ মিলিয়ন, বাংলালিংকের ৪৩ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের গ্রাহক মাত্র ৬ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, টেলিটক নানাভাবে সরকারের দিক থেকে সুবিধা পেলেও ডিজিটাল দুর্নীতিতে মজে আছে শুরু থেকেই। অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে, ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ১৭ বছরে টেলিটক এখন পর্যন্ত এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনেছে। আর গত কয়েক বছরেই টেলিটক লোকসান করেছে ৯৯৩ কোটি টাকা। কেনাকাটা থেকে শুরু করে নিয়োগ, পছন্দের কোম্পানিকে কাজ দেয়া, পুরনো পদ্ধতির এসব লুটপাট তো রয়েছেই। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে নির্দিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি আমদানি কমিশন ও বিটিএস স্থাপনে বাড়ি ভাড়ার অনিয়ম। কাগজে-কলমে কেনা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে নেই, স্ক্র্যাচ কার্ড এবং ক্যাশ কার্ডের হিসাবে এমন কোটি কোটি গরমিলের প্রমাণ মিলেছে।

নির্দিষ্ট কিছু সিমের মাধ্যমে বৈধ কায়দায় অবৈধ আয়ের সুযোগ করে দেয়ার বিষয়টি দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে রীতিমতো আলোড়ন তুলেছে। টেলিটকের হাজার হাজার সিম দিয়ে অবৈধ ভিওআইপি করা হচ্ছে। সিম বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের পরও অবৈধ ভিওআইপিতে হাজার হাজার টেলিটকের সিম ধরা পড়ছে। এসব সিম দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ লাখ ৩০ হাজার মিনিট হারে অবৈধ ভিওআইপি কল করা হতো। এর আগে অনেক অভিযানে অবৈধ ভিওআইপিতে উদ্ধার করা সিমের মধ্যে টেলিটকের সিমই বেশি পাওয়া যেতো। ২০১৮ সালের নভেম্বরে টেলিটকের ৭৭ হাজার ৫৯০টি সিম বন্ধ করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন। সিডিআর অ্যানালাইজার ও জিও-লোকেশন ডিটেকশন সিস্টেমের মাধ্যমে ওই সিমগুলো বন্ধ করে দেয় বিটিআরসি। টেলিটকে কর্মরত একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ এসব দুর্নীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় গ্রামীণফোন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে সরকার এবং বিটিআরসিসহ নানা পর্যায়ে এ অভিযোগও করে যে টেলিটকের অবৈধ কার্যক্রমের জন্য তাদের আয়ের সুযোগ নষ্ট হচ্ছে। বিল জেনারেট করে কোটি কোটি টাকা নিজেদের অ্যাকাউন্টে জমা দেয়ার মতো অভিনব ঘটনা বাংলাদেশে টেলিটকই প্রথম দেখিয়েছে। ২০১০ সালের ডিসেম্বর থেকে বেশ কিছুদিন পর্যন্ত টেলিটকের কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে কয়েক হাজার গ্রাহককে প্রতি মাসে তিনশ’ টাকা নিয়ে তাদের অবিরাম কথা বলার সুযোগ দেন।

 এতে টেলিটক কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন ছিল না। এর মাধ্যমে অন্তত ১৬ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ সম্পর্কিত অডিট প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কাগজপত্রে থাকলেও বাস্তবে টেলিটকের ভাণ্ডারে কোটি কোটি টাকার সিম কার্ড এবং স্ক্র্যাচ কার্ডের হদিস নেই। টেলিটকের লেজার এবং অন্যান্য হিসাবে মজুত দুই ধাপে ৩১ কোটি টাকার বিভিন্ন মূল্যমানের স্ক্র্যাচ কার্ড এবং ক্যাশ কার্ড ঘাটতি রয়েছে। একইভাবে ৪৩ হাজার ২৭১টি সিম কার্ডে মজুত ঘাটতির ফলে কোম্পানি ক্ষতির পরিমাণ আরও ৩ কোটি ৮৯ লাখ ৪৪ হাজার ৪৯ টাকা। অন্যদিকে থ্রিজি প্রকল্প নিয়ে টেলিটক সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে। চায়নার এক্সিম ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়া এবং নির্দিষ্ট দুটি কোম্পানির কাছ থেকে কেবল পণ্য কেনার ক্ষেত্রে বেশি অনিয়ম হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সে সময় কোনো স্থান নির্ধারণ না করেই যত্রতত্র নির্বিচারে সাইনবোর্ড-বিলবোর্ড দিয়ে বিপণন বিভাগের কর্মকর্তারা কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। বিজ্ঞাপন প্রদানের ক্ষেত্রে সীমাহীন পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রসঙ্গে টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নুরুল মাবুদ চৌধুরীকে একাধিকবার টেলিফোন করা হলে তিনি ধরেননি। এদিকে টেলিটকের সার্বিক করুন অবস্থা দেখে এর সংস্কারে ১০ দফা প্রস্তাব পেশ করে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশন।

 তারা জানায়, যাত্রা শুরুর পর থেকে টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড দেশের আপামর জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। তুলনামূলক কম কলরেট ও ডাটা রেট থাকার পরও বিটিআরসি’র মাসিক গ্রাহক সংখ্যার পরিসংখ্যান অনুসারে ৬৫ লাখ গ্রাহক রয়েছে যা অন্যান্য প্রাইভেট অপারেটরের তুলনায় খুবই কম। এত কম গ্রাহক নিয়ে টেলিটক ব্যাবসায়িকভাবে টেকসই অবস্থানে যেতে পারবে না। আমাদের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণে দেখতে পারি, টেলিটকের টাওয়ার সংখ্যা ৬০০০ এর মতো আর পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই সরকারি মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর রয়েছে যেখানে অন্য অপারেটরদের টাওয়ার সংখ্যা ১৫০০০ এরও বেশি। সীমিত ফোর-জি কাভারেজ, মাঠপর্যায়ে সেলস কার্যক্রমের উদাসীনতা, গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মাধ্যমে মার্কেটিং কার্যক্রম অনুপস্থিত, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো ও স্বচ্ছতার অভাব, বিগত রাজনৈতিক সরকারের টেলিটক নিয়ে নেতিবাচক মনোভাবের কারণে টেলিটকের দেশের মানুষের চাহিদা পূরণে সফল হতে পারেনি। আপামর মোবাইল গ্রাহকদের স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে, মোবাইল গ্রাহক এসোসিয়েশন মনে করে যে, বৈষম্যহীন স্বাধীন বাংলাদেশে টেলিটকের সেবার মান বাড়ানো ও গ্রাহকদের কম খরচে মোবাইল সেবা প্রদান করার জন্য টেলিটকের আমূল সংস্কার করা প্রয়োজন।

এর আগে বাংলাদেশ সরকার ৪টি লক্ষ্য নিয়ে টেলিটক প্রতিষ্ঠা করে। এসবের মধ্যে রয়েছে-দেশের জনগণকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদান করা, প্রাইভেট ও পাবলিক সেক্টরের মধ্যে সুস্থ বাজার প্রতিযোগিতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করা, মোবাইল টেলিফোন নেটওয়ার্কের সুবিধাবঞ্চিত দেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে যেমন হাওর অঞ্চল, দ্বীপাঞ্চল, পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণকে টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদান করা ও সরকারের রাজস্ব আহরণের নতুন উৎস সৃষ্টি করা। কিন্তু টেলিটক ওই চার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশের টেলিকম বিশেষজ্ঞরা। তবে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে টেলিটক জানিয়েছে, দ্রুত বর্ধনশীল মোবাইল টেলিযোগাযোগ চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে টেলিটক নিয়মিত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করে চলছে। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ইতিমধ্যে দেশের ৬৪টি জেলা, ৪০২টি উপজেলাসহ বেশির ভাগ হাইওয়ে টেলিটকের কাভারেজের আওতায় এসেছে। এ ছাড়া দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম হাওর, দ্বীপাঞ্চল, উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলে টেলিটকের নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং বিদ্যমান নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণের কাজ চলছে।  ২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বর কোম্পানি আইন-১৯৯৪ এর অধীনে দুই হাজার কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধন নিয়ে টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধিত হয় এবং উক্ত তারিখেই টেলিটক ‘কমেন্সমেন্ট অব বিজনেস’ সার্টিফিকেট অর্জন করে। ২০০৫ সালের ৩১শে মার্চ টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড এর ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়।

mzamin

Saturday, August 24, 2024

স্বাভাবিক হয়নি সংসদ সচিবালয় by কাজী সোহাগ

এখনো স্বাভাবিক হয়নি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়। এখানে প্রায় ১২শ’ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছে। ৫ই আগস্টের পর কেউই আসছেন না সংসদ সচিবালয়ে। নেই হাজিরার সিস্টেমও। ভেতরে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বসার চেয়ার, টেবিলও নেই। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে সংসদ ভবন। ভেতরের ফ্লোরগুলোতে অসংখ্য ফাইল আর কাগজে ভরা। বেশিরভাগ দরজা ও জানালা ভাঙা। সংসদে থাকা কয়েকশ’ কম্পিউটার ও ল্যাপটপের কোনো হদিশ নেই। ইন্টারনেট লাইন সম্পূর্ণ অকেজো।

এ অবস্থায় মেরামতেরও কোনো উদ্যোগ নেই। সংসদ সচিবালয়ের বেশ কয়েক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, সব ধরনের সিস্টেম একেবারে ভেঙে পড়েছে। তারা বলেন, সাংবিধানিকভাবে সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে। কিন্তু কিছু রুটিন ওয়ার্ক রয়েছে যা এখন করা সম্ভব হচ্ছে না। যারা কর্মকর্তা ও কর্মচারী আছেন তারা নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের জন্য কোনো ধরনের নির্দেশনা আসেনি। সরকারি চাকরি হওয়ায় তারা নিজ উদ্যোগে কোনোকিছু করতেও পারছেন না। সম্প্রতি সংসদ সচিবালয়ের সচিবকে সরকার বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। তাই এ অবস্থায় সংসদ সচিবালয় চালানোর মতো কোনো কর্মকর্তা উপস্থিত নেই। সবাই চেয়ে রয়েছেন সরকারের নির্দেশনার ওপর। যারা সংসদ এরিয়ায় বাসায় থাকতেন তাদের বেশিরভাগই বাসা ছেড়েছেন। কারণ সেখানে কোনো ধরনের আসবাবপত্র নেই। বেশিরভাগই বাসা ভাড়া করে আছেন অথবা নিকটাত্মীয়ের বাসায় অবস্থান করছেন। সংসদ ভবন বা জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্স ঢাকার শেরে বাংলা নগরে ২১৫ একর জায়গার ওপর অবস্থিত। ৯ তলা বিশিষ্ট ভবনটির মূল স্থপতি লুই কান। তিনি প্রখ্যাত মার্কিন স্থপতি। বাংলাদেশের সংসদ ভবন উপমহাদেশের অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন। এর স্থাপত্যশৈলী দ্বারা প্রকৃতির বিভিন্ন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় সংসদ ভবন চত্বর ও ভবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে হাজারো মানুষ। এ সময় তারা স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, হুইপদের কক্ষসহ ৯ তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষ তছনছ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ৫ই আগস্ট সংসদ ভবনের গেটে প্রথমে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রবেশে বাধা দিলেও লোকসমাগম বাড়লে আর তাদের আটকানো যায়নি। সংসদ ভবন চত্বরের দক্ষিণ প্লাজা, খেজুরবাগান মাঠ, টানেলে ঢুকে পড়ে অসংখ্য মানুষ। সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ওইদিন বিকাল থেকে রাতভর একদল লুটেরা সংসদ ভবনের প্রায় সব কক্ষেই লুটপাট চালায়। তারা অনেকেই আবার সকালে তালা ভাঙার জিনিসপত্রসহ চলে আসে এবং কক্ষের তালা ভেঙে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, টিভি, ফ্রিজসহ মূল্যবান কাগজপত্র লুটপাট করে এবং কক্ষের সব জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। এ সময় তারা সংসদ ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির লাইন বন্ধ করে দেয়। তিনি বলেন, বেলা ১১টার দিকে সংসদ ভবনে সেনাবাহিনী চলে আসে, সংসদ সচিবালয়ের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের সঙ্গে সংসদ ভবনের নিরাপত্তা বিধানে কাজ করে। তারা সচিবালয়ের কর্মচারী-কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কাউকে প্রবেশ করতে দেয়নি। তাদের সহয়োগিতায় এগিয়ে আসে একদল ছাত্র, যারা লুটের মালপত্র ফেরত দেয়ার অনুরোধ জানায় এবং কিছু জিনিসপত্র লুটেরাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে সংসদের একটি কক্ষে রেখে দেয়।


Thursday, August 22, 2024

এনটিএমসি যেভাবে নজরদারি করতো by কাজী সোহাগ

রাজনৈতিকভাবে কাউকে হেনস্তা করতে হলে আগে টার্গেট করা হতো ব্যক্তিকে। তারপর তার মোবাইল ফোনে আড়িপাতা হতো। ব্যক্তিগত বা স্পর্শকাতর আলোচনা প্রথমেই ফাঁস করা হতো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তারপর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হতো সেসব ফাঁস করা বিষয়গুলো ছড়িয়ে দিতে। দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদেশে থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকেও এ কাজে লাগানো হতো। আর এসব করা হতো ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মাধ্যমে। গত ১৫ বছরে হাজারেরও বেশি কল রেকর্ড ফাঁস হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধু রাজনৈতিক নয় সরকারের বিরুদ্ধে কেউ অবস্থান নিলে তার কল রেকর্ডও ফাঁস করা হয়েছে। এমন নজির রয়েছে ভূরি ভূরি। তাই নাগরিকের মোবাইলে আড়িপাতা, নজরদারিতে রাখা, ফেসবুক- মেসেঞ্জার, এক্স, টেলিগ্রাম, ভাইবার, ইমো ও স্কাইপিতে এমনকি ওয়েবসাইট ব্লক ও ই-মেইলে আড়িপাতার অভিযোগ ওঠা বিতর্কিত টেলি যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এনটিএমসি’র  বিলুপ্তির দাবি উঠেছে।

২০০৮ সালে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মোবাইল অপারেটরদের অর্থায়নে ডিজিএফআই ভবনে ন্যাশনাল মনিটরিং সেন্টার (এনএমসি) গঠিত হয়। পরে ২০১৩ সালের ৩১শে জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে এনএমসি পরিবর্তিত হয়ে ‘ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)’ নামে নবরূপে আত্মপ্রকাশ করে। সংস্থাটি ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে একটি স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কার্যক্রম শুরু করে। ২০২২ সাল থেকে এনটিএমসি’র মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান।

অভিযোগ রয়েছে- এনটিএমসি’র দায়িত্বে থাকাকালীন একের পর এক কল রেকর্ড ফাঁস করেন তিনি। রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ সরকারের জন্য হুমকি এমন সব ব্যক্তির স্পর্শকাতর কল রেকর্ড তার নির্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফরমে ছড়িয়ে দেয়া হতো। এসব কল রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে অনেক সুশীল সমাজের লোকজনকে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হতো। ৭টি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এনটিএমসি গঠন করা হলেও মূলত সরকার বিরোধীদের দমনে সংস্থাটি কাজ করেছে বলে দাবি করেছেন টেলিযোগাযোগ সংশ্লিষ্টরা। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকালীন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় সরকারের নির্দেশক্রমে ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থাসমূহকে আইনানুগ ইন্টারসেপশন সুবিধা প্রদান এবং নির্ধারিত কর্তৃপক্ষকে যোগাযোগ সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা প্রদান। ৭ উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে- সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক সকল প্রকার ইলেক্ট্রনিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য আইনানুগ ইন্টারসেপশন এর কাঠামো তৈরি করা, সরকার কর্তৃক অনুমোদিত সংস্থাসমূহকে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে প্রচলিত ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমগুলোতে মনিটরিং ও নজরদারি করার ব্যবস্থা করে দেয়া, যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করে সরকার কর্তৃক  নির্দেশিত সংস্থাসমূহকে সরবরাহ করা হয়, ল’ফুল ইন্টারসেপশন সিস্টেমের সচলতা ও কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২৪/৭ রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম চলায়মান রাখা, এনটিএমসি ও এনটিএমসি’র সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহের জনবলের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, যোগাযোগমাধ্যম ও তথ্য প্রযুক্তিগত বিষয়ে সার্বক্ষণিক গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রাখা এবং এনটিএমসি’র সকল প্রযুক্তি যুগোপযোগী করার মাধ্যমে চলমান ও ভবিষ্যৎ টেকনোলজির সঙ্গে বাংলাদেশের ইন্টারসেপশন সিস্টেমের সামঞ্জস্যতা বজায় রাখা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধন করে ল’ফুল ইন্টারসেপশন কার্যক্রম গতিশীল রাখা।

 বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের কাজের সঙ্গে খুব কমই সম্পৃক্ত ছিল। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, এই সংস্থার কার্যক্রম সংবিধান পরিপন্থি। সংবিধানের ৪৩ (খ) অনুচ্ছেদে চিঠিপত্র ও যোগাযোগের সকল মাধ্যমের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। অথচ এই সংস্থাটি গঠন করা হয় বিতর্কিত বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের পরামর্শে। মূলত নাগরিকের যোগাযোগে আড়িপাতা এবং নজরদারিতে রাখার জন্য সেইসঙ্গে ফোন কল, ফোনালাপ রেকর্ড, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন অ্যাপে আড়িপাতা ছাড়া অন্য কোনো কাজই করেনি এই সংস্থাটি। মোবাইল অপারেটরদেরও বাধ্য করতো বিভিন্ন ধরনের মেসেজ গ্রাহকদের মাঝে প্রদান করতে। ফোনালাপ রেকর্ড এমনকি ভিডিও কলিং রেকর্ড করে অনেক সম্ভ্রান্ত নাগরিককে হেনস্তা করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। তিনি বলেন, বিক্যাল মাউন্টেন ডাটা ইন্টার সেপ্টর এর মতো ভয়ানক যন্ত্র ব্যবহার করে আসছিল সংস্থাটি। এমনকি বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন বিতর্কিত ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এর কাছ থেকে পেগাসাস স্পাই ওয়ার কেনা হয়েছিল বলে দেশ ও বিদেশের স্বনামধন্য গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিকভাবেও বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছিল। আমরা এর প্রতিবাদ করেছিলাম এবং তদন্ত চেয়েছিলাম। যদিও ওই সময়ের সরকার এ বিষয়ে বক্তব্যে বলেছিলেন- এই ধরনের যন্ত্রপাতি ইসরাইলের কাছ থেকে কেনা হয়নি।

পেগাসাস স্পাইবার অ্যাপটি গ্রাহকের কাছে ম্যালওয়ারের মাধ্যমে পাঠানো হতো সংস্থার পক্ষ থেকে। অনেক গ্রাহক না বুঝেই ইন্সটল করলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের ব্যবহৃত ডিভাইসটি সংস্থার নিয়ন্ত্রণে চলে আসতো। এইভাবে নাগরিকদের সকল কার্যক্রমের তথ্য হাতিয়ে নিতো এই বিতর্কিত সংস্থাটি। মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং সংবিধান পরিপন্থি। সেইসঙ্গে মানবাধিকারের লঙ্ঘন। তাই দেশ জাতি এবং এবং সংবিধানকে সমুন্নত রেখে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা দেয়ার নিমিত্তে এ ধরনের সংস্থা বিলুপ্তি সময়ের দাবি এবং আবশ্যক। তাছাড়া এই সংস্থার অবৈধ যন্ত্রপাতি ক্রয়ের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। আমরা নাগরিকদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ও সুরক্ষার স্বার্থে এই সংস্থার বিলুপ্তি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি করছি। এদিকে এনটিএমসি’র ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে- বিশ্বব্যাপী অবাধ তথ্য প্রবাহের কারণে তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্রিক অপরাধ সংঘটনের মাত্রা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এতে আরও বলা হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশ বলে এনটিএমসি’র অধীনে ৪৪ জন জনবল (২৩ জন কর্মকর্তা ও ২১ জন অন্যান্য পদবি) এর পদ সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হতে জনবল সমন্বয় করা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইবনে ফজল সায়েখুজ্জামান।

 অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলা হয়, এনটিএমসি বিভিন্ন পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে ডিজিএফআই ভবনের সীমিত পরিসরে বিভিন্ন অবকাঠামোগত অসুবিধার সম্মুখীন হয়। যার ফলশ্রুতিতে জাতীয় নিরাপত্তায় এনটিএমসি’র ভূমিকার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা বিবেচনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ ইং তারিখে নিজস্ব বিশেষায়িত ভবন নির্মাণের নির্দেশ দেয়া হয়। এনটিএমসি’র অফিস বিল্ডিং এর জন্য তেজগাঁও বিমানবন্দরস্থ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ত্রাণভাণ্ডার সংলগ্ন ০.৯৪ একর জমি বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রযুক্তির আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ ও ইন্টারনেটের ব্যাপক বিস্তৃতির কারণে আইনপ্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ ইন্টারনেট ভিত্তিক অপরাধ কার্যক্রম তদন্তে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয় । উক্ত সমস্যা বিবেচনা করে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ক্রয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন পরিসরে এনটিএমসি’র সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করেন।

Saturday, August 3, 2024

শিগগিরই খুলে দেয়া হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে by কাজী সোহাগ

আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই খুলে দেয়া হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড  এক্সপ্রেসওয়ে। সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার সময় বনানী ও মহাখালীর গুরুত্বপূর্ণ দু’টি টোলপ্লাজা আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার পর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, আন্দোলনে দু’টি টোলঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই দু’টি টোলঘর বাদ দিয়ে ম্যানুয়ালি পদ্ধতি ব্যবহার করে চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সবমিলিয়ে আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু করা হবে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিক্ষোভ ও সংঘাতে গত ১৮ই জুলাই রাতে বনানী ও ১৯শে জুলাই বিকালে মহাখালী টোলঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। এতে আনুমানিক ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (এফডিইই) কোম্পানি লিমিটেড। গত ১৮ই জুলাই রাত পৌনে ৮টায় শত শত লোক বনানী টোলঘরে হামলা চালায়। তাদের মধ্যে একদল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) খুলে নিয়ে যায়। কেউ কম্পিউটার, ক্যামেরা নিয়ে যায়। আরেক দল আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুনে টোল বুথ, ছাউনি, সিস্টেম সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। আর ১৯শে জুলাই বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মহাখালী টোলঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। দু’টি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। তবে আগুনে পুড়ে যাওয়া বনানী টোলঘরের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ঠিক না করা পর্যন্ত অন্তত হাতে হাতে টোল নিয়ে (ম্যানুয়ালি) চালু করা যায় কিনা, সেটাও ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। প্রথমে কারফিউ পুরোপুরি না ওঠা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এক্সপ্রেসওয়ে চালু করার জন্য সরকারের কাছে নিরাপত্তা চায় প্রতিষ্ঠান।

এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধ থাকায় উত্তরা এয়ারপোর্ট থেকে এফডিসি সিগন্যাল এবং ফার্মগেট হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে প্রতিনিয়ত যাতায়াতকারীদের জন্য এখন হাতে ১ থেকে ২ ঘণ্টা বেশি সময় নিয়ে বের হতে হচ্ছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধ থাকায় উত্তরা-কুড়িল-বাড্ডা-রামপুরা-মৌচাক-পল্টন এবং উত্তরা-বনানী-মহাখালী-গুলশান-ফার্মগেট-আগারগাঁও সড়কে ব্যাপক যানজট তৈরি হচ্ছে। ফলে এসব সড়কের যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সামনে থেকে শুরু হয়ে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালীতে গিয়ে শেষ হবে এ উড়াল সড়ক। পুরো উড়াল সড়কের দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। হাতিরঝিল সংলগ্ন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ২০২৩ সালের ২রা সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত অংশে যান চলাচল উদ্বোধন করেন। পরদিন ৩রা সেপ্টেম্বর থেকেই এতে যান চলাচল শুরু হয়। এরপর চলতি বছরের ২০শে মার্চ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এফডিসি র‌্যাম্প খুলে দেয়া হয়। এটি একটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প যার প্রাক্কলিত ব্যয় ৮৯.৪০০ বিলিয়ন টাকা। এই প্রকল্পের ৭৩ ভাগ ব্যয় বহন করছে ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (এফডিইই) কোম্পানি এবং ২৭ ভাগ ব্যয় বহন করছে বাংলাদেশ সরকার।

Wednesday, October 23, 2019

উনি এখন আশুলিয়ার রাজা by কাজী সোহাগ

চলেন রাজকীয় স্টাইলে। গাড়ির সামনে পেছনে মোটরসাইকেলের বহর। বেতনভুক্ত ক্যাডার বাহিনী। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে নিজেকে আশুলিয়া এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন রাজা হিসেবে। তিনি যা চান তাই হয় এ এলাকায়। দখল, চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন বিপুল বিত্ত-বৈভব। তিনি সাভারের ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম। সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
তার আশীর্বাদ ছাড়া আশুলিয়ায় শিল্প-ব্যবসা চালানো দুরূহ।
তার কোপানলে পড়ে এখন অনেক ব্যবসায়ী এলাকা ছাড়া। আশুলিয়ায় বাড়ি থাকলেও তাদের কেউ কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকেন ঢাকায়। নিরাপত্তার স্বার্থে সবকিছু গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। ব্যবসা হারিয়ে আবার অনেকে হয়েছেন ঋণগ্রস্ত। এর বাইরেও রয়েছে মহাসড়কে চলাচলরত গণপরিবহনে চাঁদা আদায় থেকে শুরু করে জমি দখল, ডিশ ব্যবসা দখল, সরকারি খালের জমি দখল করে বিক্রি করে দেয়ার এন্তার অভিযোগ। চেয়ারম্যান হলেও একা কখনও চলাফেরা করেন না তিনি। বাড়ির বাইরে বের হলেই সঙ্গে থাকে ক্যাডার বাহিনী। সামনে পেছনে মোটরসাইকেল বহর। সরজমিন আশুলিয়ার ধামসোনা ইউনিয়ন ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। নামে ইউনিয়ন পরিষদ হলেও আশুলিয়ায় রয়েছে শহুরে পরিবেশ। ৩ লাখ ৮ হাজার জনসংখ্যার এ ইউনিয়নে রয়েছে ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড), পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, জাতীয় ক্যাডেট কোর প্রশিক্ষণ একাডেমি, বাংলাদেশ বিমান পোল্ট্রি ফার্ম, ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এ ছাড়া রয়েছে ২৬টি গ্রাম।
ক্যাডার পদে সিনিয়র-জুনিয়র: সরজমিন অনুসন্ধানে জানা যায় ৩০ জন সশস্ত্র ক্যাডার রয়েছে চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের। স্থানীয় কোনো যুবক এ দলে নেই। ক্যাডাররা সবাই বিভিন্ন জেলা থেকে আসা। প্রত্যেকেই বেতনভুক্ত। রয়েছে সিনিয়র-জুনিয়র পোস্ট। ৩৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন তাদের। পাশাপাশি কাজ হাসিলের পর থাকে বকশিশ। বেশি বিশ্বাসভাজন হলে বেতনের পাশাপাশি দেয়া হয় ছোটখাটো ব্যবসার সুযোগ। সেটাও আবার গার্মেন্ট কেন্দ্রিক। পোশাক শ্রমিকদের টিফিন সাপ্লাইয়ের ব্যবসা দেয়া হয় তাদের। আস্থা হারালে আবার কেড়েও নেয়া হয়। ক্যাডারদের কয়েকজন চেয়ারম্যানের সঙ্গ ছাড়তে চাইলেও ছাড়তে পারছেন না। নানা জালে আটকে রাখা হয়েছে তাদের। স্থানীয় না হওয়ায় প্রতিবাদের সুযোগও নেই। তাই বাধ্য হয়ে সাইফুল চেয়ারম্যানের হুকুম তামিল করতে হচ্ছে। সাইফুল চেয়ারম্যানের ক্যাডারের তালিকায় আছেন-মাহবুব, রিয়াজ, রিয়াদ মোল্লা, গাউছ, দাউদ, সুলতান, পান্নু, তমাল, ফরহাদ, সবুজ, ওয়াসিম গাজী, রতন, কামরুল, ফাহিম, মিলন, রোমেল, আজাদ, কালাম, ছোট মাহবুব, সেকেন্দার, নজরুল, সোহেল, সুমন, জাকির, আব্দুল আল কাদির, রানা, কুদ্দুস, নজরুল ও সাফি। এ ছাড়া বেতন ছাড়া চেয়ারম্যানের বিভিন্ন অবৈধ কাজ করে দেয়ার বিনিময়ে সুবিধা পাওয়ার মধ্যে রয়েছেন ওয়েলকাম মিন্টু, চান মিয়া, সজীব, সুমন, তুষার, আল-আমিন সরকার। এদের মধ্যে সবচেয়ে সিনিয়র ক্যাডার হিসেবে পরিচিত মাহবুব। তার বেতন ৩৫ হাজার টাকা। সাইফুল চেয়ারম্যানের হয়ে কাজ করার কথা স্বীকার করলেও বেতন নেয়ার কথা অস্বীকার করেন তিনি। মানবজমিনকে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান ভাই হচ্ছেন এই এলাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি। রাজনীতি করার কারণে তিনি মানুষের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও ভালোবাসা পান তিনি। কথা হয় আরেক ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ফরহাদের সঙ্গে। তিনি ধামসোনা ইউনিয়ন যুবলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট। বাড়ি খুলনায়। সাইফুল চেয়ারম্যানই তাকে এ পদটি দিয়েছেন। মানবজমিনকে ফরহাদ জানান, খুলনা থেকে আশুলিয়ায় আসি গার্মেন্টে কাজ করতে। পরে ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। কাজ ছেড়ে দিয়ে এখন তার সঙ্গেই আছি। বাইরে থেকে এসেছি তাই তাল মিলিয়ে চলতে হচ্ছে। এসব আপনি ভালো করেই জানেন। ক্যাডার হিসেবে কাজ কি প্রশ্নে তিনি জানান, চেয়ারম্যানের নানারকম কাজ করে দেয়া। তবে আমি চাঁদাবাজি, মারামারি এসব করি না। চেয়ারম্যানের অনুষ্ঠানে লোক দেয়ার দায়িত্ব থাকে আমার ওপর। যুবলীগের পদ পেতে ভাই আমাকে ব্যাপক সহায়তা করেছেন। এখন একটি ফাক্টরিতে টিফিন সাপ্লাই দেয়ার চেষ্টা করছি। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিমাসের প্রথম সপ্তাহে সন্ধ্যার দিকে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার লাবণী রেস্টুরেন্টে বসে চেয়ারম্যান ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের মাসিক বেতন দেন। এদের মধ্যে রিয়াজ, সবুজ, গাউছ, সুলতান, পান্নু, ফরহাদের বেতন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে থাকেন। এ ছাড়াও তার বাহিনীর মধ্যে সবুজ ও ফাহিম পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। এর আগে ইয়াবাসহ ঢাকা জেলা উত্তরের গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। আমিন মডেল টাউন এলাকায় বাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সাবেক এক সেনা কর্মকর্তা (সার্জেন্ট) আরিফ বিল্লাহ। চাঁদা না দেয়ার কারণে ওই সেনা সদস্যকে মোবাইল ফোনে বাড়ি থেকে ডেকে এনে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে সাইফুল চেয়ারম্যানের ক্যাডারদের বিরুদ্ধে। আশুলিয়ার শ্রীপুর এলাকায় গেদুরাজের ছেলে শাহিনের ডিশ ব্যবসা দখল করতে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পরিবহন শ্রমিক লীগের আশুলিয়া থানা শাখার সেক্রেটারি রাজা মোল্লার বাইপাইল এলাকায় তার কাউন্টার থেকে চাঁদা না দেয়ায় অস্ত্র নিয়ে তার ওপর হামলা চালিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। সরজমিন জানা যায়, নবীনগর-চন্দ্রা ও আব্দুল্লাপুর-বাইপাইল মহাসড়ক দিয়ে চলাচলরত যানবাহন থেকে চাঁদা আদায় করে চেয়ারম্যানের লোকজন। এর মধ্যে ওয়েলকাম ও মৌমিতা পরিবহনের প্রায় ১৫০টি বাস থেকে ৩০ টাকা, আশুলিয়া ক্লাসিকের প্রায় ১১০টি বাস থেকে ২৪০ টাকা ও প্রায় ৫০টি মিনিবাস থেকে ১২০ টাকা করে চাঁদা নেয়া হয়। ওয়েলকাম ও মৌমিতা পরিবহন থেকে চাঁদা আদায়ের দায়িত্বে রয়েছে ওয়েলকাম মিন্টু  ও তার সহযোগী চান মিয়া। এমনকি তাদের হাত থেকে বাদ যায়নি স্থানীয় সড়ক দিয়ে চলাচলরত অটোরিকশা। পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার আমিন মডেল টাউন স্কুলের সড়ক দিয়ে প্রায় ২৫টি অটোরিকশা চলাচল করে। প্রতিদিন এসব অটোরিকশা থেকে ৭০ টাকা করে আদায় করা হয়।
ইপিজেড ও গার্মেন্টে একচ্ছত্র আধিপত্য: ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় অবস্থিত ইপিজেড ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোতে সাইফুল চেয়ারম্যানের রয়েছে একচ্ছত্র আধিপত্য। ইপিজেডের ১০ থেকে ১৫টি ফ্যাক্টরির ঝুট ব্যবসা নিজের দখলে নিয়েছেন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরপরই। আগে যারা এসব ব্যবসা করতেন তাদের মারধর ও হুমকি-ধামকি দিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে। এসব ফ্যাক্টরির অন্যতম হচ্ছে হপলন, ওয়ের ফার্ম, এসবি উইকাস, ওয়াইকেকে, রিংসাইন। এসব থেকে সাইফুল চেয়ারম্যানের মাসে আয় ১ কোটি টাকার বেশি। ইপিজেডের বাইরে আরো ৩০ থেকে ৩৫টি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির ঝুট ব্যবসা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন সাইফুল চেয়ারম্যান। আগে ঝুট ব্যবসা করতেন এমন দুইজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানবজমিনকে বলেন, ব্যবসা দখল করে নিয়েছে সাইফুল চেয়ারম্যান। তাই আয়-রোজগার নেই বললেই চলে। ব্যবসা গেছে, তবে বেঁচে আছি- এটাই বড় কথা। তারা জানান, সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীর মাধ্যমে আমাদের ব্যবসা দখল করে নিয়েছেন চেয়ারম্যান। ঝুটের জন্য কোনো গাড়ি ও শ্রমিকদের ইপিজেডে ঢুকতে দিতো না তারা। শ্রমিকদের ভয় দেখিয়ে বলতো তারা যদি ইপিজেডের ভেতরে জীবিত প্রবেশ করে তাহলে লাশ হয়ে বাইরে বের হবে। আবার অনেক ব্যবসায়ীকে ক্যাডার দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে বলেও জানান তারা। পরে মান-সম্মানের ভয়ে তারা ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। সাইফুল চেয়ারম্যানের পক্ষে তার ব্যবসা দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন তার বড় ভাই রহিম। তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সাইফুলের আগে থেকে আমি এ এলাকায় ব্যবসা করি। তার ব্যবসা দেখাশোনার প্রশ্নই আসে না। এসব বিষয়ে আপনি সাইফুলের কাছে জিজ্ঞেস করেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সাইফুল চেয়ারম্যানের রয়েছে দামি একটি ল্যান্ড ক্রুজার, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকারসহ চারটি গাড়ি। এরমধ্যে অবৈধভাবে সরকারের ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে কেনা ল্যান্ড ক্রুজার গাড়িটি তিনি সচরাচর বের করেন না। সেটি বাড়ির ভেতরে গ্যারেজে রেখে দেন। ওই গাড়ির একটি ছবি রয়েছে মানবজমিনের হাতে। এ ছাড়া চেয়ারম্যান আশুলিয়ার বাইপাইলে ২৫ শতাংশ জমি দখল করে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করছেন ১৬ তলা বহুতল ভবন। ইতিমধ্যে ৪ তলার কাজ শেষ করেছেন। নয়ারহাটের কাছে বেলতলা এলাকায় ৮ বিঘা জমিসহ পেট্রোল পাম্প নামমাত্র মূল্যে কিনেছেন। আশুলিয়ার বাঁশবাড়ি মৌজায় ১৫ বিঘা জমির উপর নির্মাণ করেছেন বাগানবাড়ি। মানবজমিন-এর পক্ষ থেকে এলাকায় অনুসন্ধান চালানোর সময়ই বিভিন্ন শ্রেণির লোকদের দিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান সাইফুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তারা জানান, তিনি বাইরে রয়েছেন। পরে টেলিফোন করা হলে সাইফুল ইসলাম প্রথমে অভিযোগের বিষয় শোনেন। পরে তিনি বলেন, আমি গুরুতর অসুস্থ। কথা বলতে কষ্ট হয়। সামনা-সামনি আসেন কথা বলবো। টেলিফোনে এসব বিষয় নিয়ে কিছু বলতে চাই না।

Saturday, October 19, 2019

যুবলীগের নেতৃত্ব নিয়ে নানা আলোচনা by কাজী সোহাগ

ক্যালেন্ডারের পাতায় আর মাত্র ৩৪ দিন। আগামী ২৩শে নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে কাউন্সিল। ওইদিন থেকেই নতুন নেতৃত্ব হাল ধরবে যুবলীগের। কেমন হবে আগামীর যুবলীগ, কারা আসছেন নেতৃত্বে? শুদ্ধি অভিযানের মতো বড় ধাক্কার পর কেমন হবে যুবলীগের কমিটি এ নিয়ে এখন সরব আলোচনা। দীর্ঘ ৭ বছর পর কমিটি নিয়ে এ আলোচনায় থাকছে নানা দিক। ২০১২ সালে সর্বশেষ যুবলীগের জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ক্যাসিনো কেলেংকারি, অনিয়ম, দুর্নীতি আর টেন্ডারবাজির অভিযোগে যুবলীগের ভাবমূর্তি শূণ্যের কোটায় বলে মনে করছেন খোদ যুবলীগের নেতা-কর্মীরাই। তাদের মতে এখন সময় এসেছে নেতৃত্ব বদলের।
সংগঠন গোছানোর। আমূল পরিবর্তন ছাড়া যুবলীগের অতীত উজ্জল ভাবমূর্তি ফিরবে না বলে তাদের ধারণা। যুবলীগের চেয়ারম্যানসহ শীর্ষ কয়েক নেতার বিতর্কিত কর্মকান্ডে হতাশ ও আশাহত তৃণমুল যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। তাই শীর্ষ নেতৃত্বেই আমূল পরিবর্তন চান তারা। ক্লিন ইমেজ আর যুবকদের হাতেই যুবলীগকে ছেড়ে দেয়া হবে বলে তাদের বিশ্বাস।
এজন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দিকে চেয়ে আছেন তারা। নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন, যুবলীগের ভাবমূর্তি উদ্ধার করতে শেখ হাসিনাই যথেষ্ট। তিনি সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন বলে আমরা মনে করি। এদিকে রোববার বিকেলে কাউন্সিলের দিক-নির্দেশনা নিতে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে প্রেসিডিয়ামের সদস্যরা। বৈঠকে যাবেন না সংগঠনটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। কাউন্সিলের আগে বৈঠকটিকে বিশেষ গুরুত্বপুর্ন বলে মনে করছেন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। বৈঠক থেকে নেতৃত্ব নিয়ে একটা বার্তা পাবেন বলে তাদের ধারণা। ক্লিন ইমেজের পাশাপাশি মূল নেতৃত্ব যুবকদের হাতে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে ৪০ বছর বয়সীরা যুবলীগের নেতৃত্ব দিতে পারবেন এমন বিধান ছিল গঠনতন্ত্রে। কিন্তু ১৯৭৮ সালের দ্বিতীয় কংগ্রেসের পর এই বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়। ৬ষ্ঠ জাতীয় কংগ্রেসে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন ৬৪ বছর বয়সী ওমর ফারুক চৌধুরী, বর্তমানে তার বয়স ৭১। এছাড়াও সংগঠনটির সিনিয়র নেতাদের বেশীর ভাগেরই বয়স ৬০ পার হয়েছে। এই অবস্থান যুবনেতাদের বয়স কত হবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
এদিকে যুবলীগের পদ প্রত্যাশীরা এরইমধ্যে নীরবে তাদের তৎপরতা শুরু করেছেন। দিনের বেলায় আওয়ামী লীগের বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের অফিস থেকে তারা ছুটছেন ধানমন্ডির কার্যালয়ে। আর রাতে ছুটছেন নেতাদের বাসায় বাসায়। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে নিজেদের নামটা পৌঁছে দেয়া তাদের লক্ষ্য। আবার অনেকে চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে থাকার। আবার কোন কোন নেতা এরইমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছেন। পাঁচ তারকা হোটেলসহ রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত ক্লাবে শুভাকাঙ্খীদের নিয়ে পার্টি দিচ্ছেন। যুবলীগের কমিটি নিয়ে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে অনেকটা মিশ্র অভিপ্রায়ের কথা জানা গেছে। যুবলীগের সাবেক নেতাদের চাওয়া- তরুণ, যুববান্ধব ও সৎ নেতৃত্ব। আর বর্তমানরা চান, ছাত্র ও যুবরাজনীতির অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ কর্মিবান্ধব, গতিশীল ও সহজপ্রাপ্য কাউকে। দলের বেশিরভাগ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরাবরের চেয়ে এবার সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। তারা বলছেন, এবার সরাসরি নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই তিনি নিজেই বিভিন্ন মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। এবার সংগঠনে স্থান পাবেন পরিচ্ছন্ন ইমেজ, দক্ষ সংগঠক, ত্যাগী নেতারা। এ ছাড়া ছাত্রলীগের ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এরকম দেখে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যেই খোঁজ-খবর নেয়া শুরু করেছে। যুবলীগের চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক পদে অনেকেই আলোচনায় আছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য শেখ ফজলে নুর তাপস, শেখ মারুফ, বতর্মান কমিটির ১ নং সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরে আলম চৌধুরী লিটন ও শেখ ফজলে ফাহিম, যিনি এফবিসিসিআইয়ের বর্তমান প্রেসিডেন্ট। এছাড়াও আছেন শহীদ সেরনিয়াবাত, ফারুক হোসেন, মুজিবুর রহমান চৌধুরী, আতাউর রহমান, অ্যাডভোকেট বেলাল হোসেন, শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি।
এদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন, মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, মাহবুবুর রহমান হিরন, সুব্রত পাল, আবুল বাশার, ফারুক হাসান তুহিন, মাইনুল হোসেন খান নিখিল প্রমুখ। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের জন্য মুখিয়ে থাকেন সহস্রাধিক সাবেক ছাত্রনেতা। সাবেক ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে এবার আলোচনায় আছেন- ইসাহাক আলী খান পান্না, বাহাদুর বেপারি, লিয়াকত শিকদার, মাহমুদ হাসান রিপন, মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন। আওয়ামী লীগের এ সহযোগী সংগঠনের নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ বলেন, এখানে কেউ প্রার্থী হন না। অনেকে আলোচনায় থাকার চেষ্টা করেন বা নেতাদের কাছে নিজেকে তুলে ধরেন। আর প্রতিষ্ঠার পর থেকে যুবলীগের কংগ্রেসে কখনো ভোট হয়নি। স্বভাবত, কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নতুন নেতাদের নাম ঘোষণা করেন। দলীয় সূত্র বলছে, ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন নেতৃত্ব খুঁজছেন। অনেক নেতার প্রোফাইল তার হাতে।
তিনি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তথ্য অনুসন্ধান করছেন। এর মধ্য থেকে বাছাই করে স্বচ্ছ ইমেজের ও সাংগঠনিক দক্ষতা সম্পন্ন দুইজনকে এ বৃহৎ সংগঠনের দায়িত্ব দেয়া হবে। যুবলীগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ইতিপূর্বে প্রতিটি কংগ্রেসেই যুবলীগের ভেতর থেকেই সংগঠনের চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। তবে এবার ব্যতিক্রম হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। কারণ হিসেবে সংগঠনের নেতারা বলছেন, যুবলীগের চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বেশির ভাগই ষাটোর্ধ্ব। যুবলীগের মোট প্রেসিডিয়ামের পদ ২৭।
পদাধিকারবলে চেয়ারম্যান এবং সাধারণ সম্পাদক প্রেসিডিয়াম সদস্য হওয়ায় মোট ২৯ জন। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন। ২৮ জন প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে মাত্র পাঁচজনের বয়স ৬০ বছরের নিচে। বাকি ২৩ জনের বয়সই ষাটের বেশি। পাঁচজন যুগ্ম সম্পাদকের প্রত্যেকের বয়সই ৫৫ বছরের অধিক। নয় সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে শুধু একজনের বয়স ৫০-এর কম। বাকি আটজনের বয়সই পঞ্চাশোর্ধ্ব। সম্পাদকমন্ডলীর ৬০ জনের মধ্যে ৪৫ জনই পঞ্চাশোর্ধ্ব। সহসম্পাদক ২০ জনের মধ্যে ১৫ জনেরই বয়স ৫০-এর বেশি। সদস্য ২৬ জনের মধ্যে ১৫ জন ৫০ পার করেছেন। তবে এবার বয়সের এই বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তাই তৃনমূল যুবলীগের নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, অপেক্ষাকৃত যুবকদের হাতেই এবার দেয়া হবে নেতৃত্বের ভার।

Wednesday, October 16, 2019

দলবেঁধে বিদেশ ভ্রমণ: সংসদ সচিবালয়ে ফাইলের স্তূপ by কাজী সোহাগ

নানা ছুঁতোয় বিদেশ ভ্রমণে যান এমপিরা। এ নিয়ে নানা সমালোচনাও হয়েছে তাদের। তবে এবার দলবেঁধে বিদেশে গেছেন সংসদ সচিবালয়ের দায়িত্বে  থাকা শীর্ষ চার ব্যক্তি। তারা হলেন, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার এডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া, চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী ও সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান। তাদের সঙ্গে একজন হুইপও রয়েছেন। তিনি হলেন, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। দলে আরও রয়েছেন-বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি  তোফায়েল আহমেদ এমপি, শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি আমির হোসেন আমু এমপি, মো. হাবিবে মিল্লাত এমপি, ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল এমপি,আবদুস সালাম মূর্শেদী এমপি,পীর ফজলুর রহমান এমপি, সুবর্ণা মুস্তাফা এমপি ও শবনম জাহান এমপি। সার্বিয়ার বেলগ্রেডে ইন্টার পার্লামেন্টারী ইউনিয়ন (আইপিইউ) এর ১৪১তম এসেম্বলি এবং আইপিইউ এর সংশ্লিষ্ট মিটিংয়ে অংশ নিতে ১১ই অক্টোবর দেশ ছেড়েছেন তারা।
ফিরবেন ১৭ই অক্টোবর। তাদের এ সফরের মধ্যে রয়েছে ৫টি কর্মদিবস। সংসদ সচিবালয়ের শীর্ষ চার ব্যক্তির একসঙ্গে বিদেশ যাওয়া অনেকটা নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন, সংসদ সচিবালয়ের ঊর্দ্ধতন কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা বলেন, এর ফলে সংসদ সচিবালয়ের সব ধরনের আর্থিক আর প্রশাসনিক কাজে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এসব ব্যক্তিদের টেবিলে প্রতিদিন অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি ফাইল যায় স্বাক্ষরের জন্য। কিন্তু তারা সবাই বিদেশে থাকায় টেবিলে টেবিলে ফাইলের স্তুপ জমে গেছে। সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান,ফাইল মুভ না করলে কাজের গতি থাকে না। তাই এ ক’দিন অলস সময় কাটাতে হবে। কেউ কেউ আবার অফিসে হাজিরা দিয়েই ছুটছেন সচিবালয়ের বাইরে। আড্ডা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। অনেকে এই সুযোগে লম্বা ছুটিও কাটাচ্ছেন। সচিবালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সংসদের যে কোন ধরনের ফাইল বিভিন্ন টেবিল ঘুরে যায় সংসদ সচিবের কাছে। যেসব ফাইল তার নিষ্পত্তির ক্ষমতা রয়েছে সেগুলো তিনি নিষ্পত্তি করেন। যেগুলোর নিষ্পত্তি করতে পারেন না সেগুলো পাঠিয়ে দিতে হয় স্পিকারের কাছে। তাই সচিবের টেবিলে যেসব ফাইল যাচ্ছে সেগুলো পড়ে থাকছে। তার অনুপস্থিতিতে নিষ্পত্তিও হচ্ছে না আবার স্পিকারের টেবিলেও যাচ্ছে না। আবার প্রশাসনিক ও আর্থিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন ফাইলগুলো যায় সরাসরি স্পিকারের কাছে। ১৯৯৪ সালের সংসদ সচিবালয় আইন অনুযায়ি এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারি হচ্ছেন স্পিকার। বর্তমানে তার টেবিলে রয়েছে ফাইলের স্তুপ। এর পরিমাণ আরও বাড়বে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, নিয়ম অনুযায়ি স্পিকার অনুপস্থিত থাকলে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকে ডেপুটি স্পিকারের। তিনিও রয়েছেন বিদেশ সফরে। সাধারণত সংসদ অধিবেশনে মন্ত্রীদের উত্তর দেয়ার জন্য এমপিদের করা প্রশ্নের বিষয়টি দেখভাল করেন ডেপুটি স্পিকার। কিছুদিন পরই বসছে সংসদ অধিবেশন। প্রতিদিনই এমপিরা প্রশ্ন জমা দিচ্ছেন সংসদ সচিবালয়ের প্রশ্ন শাখায়। তারাও প্রশ্নের তালিকা তৈরি করছেন প্রতিদিন। কিন্তু সচিব ও ডেপুটি স্পিকার বিদেশে থাকায় ওই কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। কারণ প্রশ্ন শাখার তৈরি তালিকার ফাইল সচিবের স্বাক্ষর নিয়ে যায় ডেপুটি স্পিকারের কাছে। অন্যদিকে, এমপিদের আবাসন থেকে শুরু করে যাবতীয় বিষয় দেখভালের দায়িত্ব চীফ হুইপের। তিনি বিদেশ থাকায় এসব বিষয় স্থবির হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, নিউজিল্যান্ডে এসিসটেন্ট স্পিকার রয়েছেন। আবার ডেপুটি স্পিকারও রয়েছেন। স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতে এসিসটেন্ট স্পিকার দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু আমাদের দেশে এসিসটেন্ট স্পিকারের কোন পদ নেই। তাই তাদের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের সুযোগ কারও নেই। সংসদ সচিবালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান,সম্প্রতি সংসদ সচিবালয়ের ই-নথি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। তবে ই-নথির সঙ্গে ম্যানুয়াল ফাইলও রয়েছে। সচিব পর্যন্ত ওই পদ্ধতি কার্যকর। স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের কাছে ফাইল পাঠানো হয়। তবে এ পর্যন্ত ই-নথিতে ফাইল নিষ্পত্তির উদাহরণ নেই বললেই চলে। এসব প্রসঙ্গে সংসদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণকারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, বিদেশে অনুষ্ঠিত যে কোন কনফারেন্সে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল যেতেই পারেন। তবে সংসদ সচিবালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যহত করে, বিকল্প কোন ব্যবস্থা না করে একসঙ্গে বিদেশ যাওয়া কতটা নৈতিক তা বিবেচনা করা উচিত। তিনি বলেন, এমনিতেই এই সংসদের কার্যক্রম নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। সে প্রেক্ষিতে এ ধরনের বিদেশ সফর ওই প্রশ্নকে আরও গভীর করে। পাশাপাশি ভূল বার্তা দেয়। এটা কোন ইতিবাচক দৃষ্টান্ত নয়।

Monday, October 7, 2019

আমি পালাবো না: মানবজমিনকে ওমর ফারুক by কাজী সোহাগ

ক্যাসিনোকাণ্ডের ঝড় বইছে যুবলীগে। ঢাকা মহানগর যুবলীগের কয়েকজন নেতার নিয়ন্ত্রণে ক্যাসিনোপাড়া গড়ে ওঠার চিত্র প্রকাশের পর থেকে চাপে ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। ক্যাসিনো সম্রাজ্যের আয় যেতো তাদের পকেটেও। গ্রেপ্তার নেতাদের মুখে প্রকাশ পেয়েছে এমন তথ্য। এরপর থেকে নজরদারিতে শীর্ষ নেতারাও। যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ তার দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন, দেশ ছেড়ে পালাবেন না।
অপরাধ করলে প্রচলিত বিচারের মুখোমুখি হয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান।

তিনি বলেন যদি অপরাধ করে থাকি তাহলে আইনশৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী আমাকে গ্রেপ্তার করবে। আমার কাজ হবে বিচারিক আদালতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা। ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, একেক সময় একেক খবর পাচ্ছি। আর বুকটা ভেঙ্গে ছয় টুকরো হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন মানুষের অনুকম্পা পাওয়ার চেয়ে ঈর্ষা পাওয়ায় শ্রেয় মনে হচ্ছে। এখন যে অবস্থা তাতে নিজেকে এখন ঘৃণিত ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছে। অনেকের কাছে আমি এখন ঘৃণার পাত্র। এখন আসলে সবকিছুর উত্তর দেয়া বা তর্কের সময় নয়। এখন আমি হাজারো কথা বললেও তা মিথ্যায় পরিণত হবে। এদিকে গতকাল যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে কর্তৃপক্ষ। এজন্য  বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনে সর্বোচ্চ সর্তকতা জারি করা হয়েছে। বেনাপোল ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহাসিন খান পাঠান জানান, ঢাকা পুলিশের এসবি ( স্পেশাল ব্রাঞ্চ) থেকে তাদের কাছে মৌখিক নির্দেশনা এসেছে। যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও নেপালের নাগরিক যাতে কোনোভাবেই দেশ ত্যাগ করতে না পারেন তার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ক্যাসিনো কাণ্ডে যুবলীগের বেশ কয়েকজন নেতার নাম আসার পর থেকে আলোচনায় যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী।

গতকাল টেলিফোনে মানবজমিনকে সাক্ষাৎকার দেন ওমর ফারুক চৌধুরী। তিনি বলেন, যদি অপরাধীও হই তারপরও দেশ ছেড়ে আমাকে কেন পালাতে হবে? রাজনীতি করি। রাজনীতি করতে গেলে ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। এখন যে অভিযান চলছে তা আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত, দলের সিদ্ধান্ত। যদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাই তাহলে তো আমাকে শাস্তি দেয়া বিচারকের জন্য সহজ হয়ে যাবে। অপরাধ হচ্ছে প্রমাণের বিষয়। বিচারিক আদালতে নিরপরাধের জন্য লড়তে হবে। আপনি কি গ্রেপ্তার আতংকে আছেন-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি আতংকের নয়। বিষয়টি প্রক্রিয়ার। অপরাধ করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী আমাকে গ্রেপ্তার করতেই পারে। বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতি করার কারণে দলের সাংগঠনিক কাজগুলো দেখভালের দায়িত্ব ছিলো আমার। দলীয় কর্মসূচি কে কিভাবে করছে, ভালোবেসে করছে কিনা সেগুলো দেখেছি। এর বাইরে কে টাকার পেছনে ছুটলো কিংবা অন্য কোন দিকে গেলো তা দেখার সুযোগ আমার ছিলো না। দলের মধ্যে অনেক ধরনের মতাবলম্বী নেতা-কর্মী থাকেন।

তাদের সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়ে। এখন অনেক কিছুই জানতে পারছি। মিডিয়ার মাধ্যমেও অনেক কিছু বেরিয়ে আসছে। আগে অজানা অনেক বিষয় ছিলো। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কার প্রসঙ্গে ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, সম্রাটের গ্রেপ্তারের বিষয়টি দল বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। সে অপরাধের সঙ্গে জড়িত এমন অভিযোগ থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক করেছে। এখন তার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী দেখছে। আর আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত আছে-যদি কেউ অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয় তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে দল থেকে বহিস্কার করা হবে। শুধু সম্রাট নয় আরও যদি কেউ একইভাবে আটক হন তাহলে তাকেও গ্রেপ্তার করা হবে। শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে কি না প্রশ্নে তিনি বলেন, না উনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। তার পক্ষ থেকে কোন নির্দেশনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই যে কেউ আটক হলে তাকে বহিষ্কার করতে হবে এটা তারই সিদ্ধান্ত। আমাদেরও সিদ্ধান্ত। চলমান অভিযানে যুবলীগে কি ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জানতে চাইলে ওমর ফারুক চৌধুরী বলেন, অভিযানটা হচ্ছে দলের সিদ্ধান্তে। তাই এটা এখনই বলা যাবে না। সময়ই সবকিছু জানিয়ে দেবে।

Thursday, October 3, 2019

ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান: আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের চোখে by কাজী সোহাগ

কলুষমুক্ত বিশুদ্ধ আওয়ামী লীগ দেখতে চান দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা। দুর্নীতি, অপকর্ম আর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সঙ্গে জড়িতরা দলে আর যেনো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে তেমনটিই প্রত্যাশা তাদের। তাই চলমান অভিযানে খুশি দলের তৃণমুলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। তবে অভিযানের প্রক্রিয়া নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ রয়েছে শীর্ষ কয়েক নেতার। তাদের যুক্তি, এভাবে ঢাকঢোল পিটিয়ে দলের নেতাদের গ্রেপ্তার না করে বিষয়টি নীরবেও করা সম্ভব হতো। দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা জানান, দলের নাম ভাঙিয়ে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করা, আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয়ে ক্ষমতার দাপট দেখানো ও বলয় তৈরি করে রাজনীতি করা কথিত নেতাদের লাগাম টেনে ধরতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের সর্বস্তরে শুদ্ধি অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি দলকে পরিশুদ্ধ করে জনগণের কাছে আওয়ামী লীগকে জনপ্রিয় সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। চলমান শুদ্ধি অভিযান প্রসঙ্গে তৃনমুলের কর্মীরা মানবজমিনকে জানিয়েছেন, অনেক আগে থেকেই দুর্নীতিবাজদের লাগাম টেনে ধরার দরকার ছিলো।
চাঁদার বখরা নিয়ে দলের মধ্যে মারামারি, খুনোখুনির অনেক ঘটনা ঘটেছে। যে অভিযান শুরু হয়েছে তা শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সুবাতাস বইবে।
তারা বলেন, দলীয় সভাপতির এ উদ্যোগ সবার জন্য কড়া সতর্কবার্তা। বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়ে দলের নেতাকর্মীরা তাদের আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা, কর্মপদ্ধতি এগিয়ে নিয়ে যাবে। এতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি মাইলফলক হিসেবে থাকবে। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, গত ১১ বছর সরকার দেশের উন্নয়নে যেভাবে অবদান রেখেছে, সেভাবে দল ও সরকারের ইমেজ বাড়েনি। সরকারের সেক্টর-ভিত্তিক ঈর্ষণীয় উন্নয়ন হলেও তা ম্লান হয়েছে কতিপয় দুর্নীতিবাজ আর সন্ত্রাসীর অপকর্মে। আর এসবের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে কোনও না কোনোভাবে সম্পৃক্ত। তাই তাদের কর্মের বদনামটা শেষ পর্যন্ত দল বা সরকারের ওপরই এসে পড়ছে। এসব বিষয় বিবেচনা করে সরকার এবার মাদক নির্মূল ও দুর্নীতি-সন্ত্রাস দমনের ওপর জোর দিয়েছে। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে দুষিত রক্ত বের করতে হবে। আমাদের পার্টির ক্লিন ইমেজ গড়ে তুলতে হবে। ক্লিন ইমেজ করতে হলে আমাদের আগাছা,পরগাছা মুক্ত আওয়ামী লীগ গড়ে তুলতে হবে, সেটাই বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার স্বপ্নের আওয়ামী লীগ। দুঃসময়ের কর্মীরা যে আওয়ামী লীগে কোনঠাসা, সেই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নয়। সেখানে দলের আদর্শ নেই। ওবায়দুল কাদের বলেন, যারা বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার করে অপকর্ম, দুর্নীতি, লুটপাট, ভূমি দখল করবে-তারা আওয়ামী লীগের লোক হতে পারে না। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গড়ার জন্য শেখ হাসিনা মদ ও জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছেন। উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, আজকে কিছু অনুপ্রবেশকারী দলে প্রবেশ করে আমাদের সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছে।
আওয়ামী লীগ বিশাল রাজনৈতিক দল, কত দল এদেশে এসছিলো  কিন্তু আজকে খুঁজে পাওয়া যায় না, আমাদের সকলকে সচেতন থাকতে হবে। ক্যাসিনো জুয়া এগুলো আমাদের সংবিধান পরিপন্থী, সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে আছে মদ ও জুয়া নিষিদ্ধ, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ, এগুলো জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু একটা সুন্দর দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন পূরণ করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছেন। আমরা বিশ্বাস করি তিনি তার লক্ষ্যে পৌঁছাবেন। সাংগঠনিক কাজে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে আসা পাবনার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মাসুদ আলম বলেন, দলের ভেতরে যে অসংগতি দেখা দিয়েছিলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। জনগনের কান্না তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তার নির্দেশে পরিচালিত এই অভিযানের কারনে এখন আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারি আমরা আওয়ামী লীগ করি, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের কর্মী আমরা। একই এলাকার আরেক আওয়ামী লীগ কর্মী মিজান আরমান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারে আছে এটাই ছিলো এতদিন আমাদের গর্বের বিষয়। এখন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। সেটা হলো দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় না আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ জনগণের আওয়ামী লীগ। দুর্নীতিবাজ আর অপকর্মকারীরা কিছুদিনের জন্য হয়তো দলে রাজা হয়ে থাকেন, দীর্ঘদিনের জন্য না। ধানমন্ডি থানা আওয়ামী লীগ নেতা জেরিন সুলতানা বলেন, দলকে ভালোভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে ভালো ও ক্লিন ইমেজের নেতাদের বেছে নিতে হবে। তাদের দায়িত্ব দিতে হবে। আর দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

Thursday, September 19, 2019

কী হবে যুবলীগের ট্রাইব্যুনালে? by কাজী সোহাগ

সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিয়ে আত্মবিচারে নেমেছে আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন যুবলীগ। গঠন করেছে ট্রাইব্যুনাল। এ নিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দেয়া হয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি  দিয়েছেন। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিষয়টি নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ক্ষোভের কথা জেনে সংগঠনের অভিযোগবিদ্ধ নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এ উদ্যোগ নিয়েছে যুবলীগ। যুবলীগ ট্রাইব্যুনালের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। এদিকে যুবলীগ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ বেশ কয়েক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা নাম প্রকাশ করে এ নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি। কয়েক নেতা জানান, সাধারণত ট্রাইব্যুনালে তথ্য-প্রমাণ দাখিল করতে হয়। এক্ষেত্রে চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসীর তথ্য-প্রমাণ কি হবে। কাগজে-কলমে তো আর চাঁদাবাজি হয় না। সংগঠনটির পক্ষ থেকে পত্রিকায় দেয়া বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সব অভিযোগ তদন্ত করবে যুবলীগ ট্রাইব্যুনাল। সাম্প্রতিক সময়ে যুবলীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত অভিযোগ উঠেছে সেগুলোর ব্যাপারে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ নিজস্ব ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তদন্ত করবে। এতে আরও বলা হয়েছে, যুবলীগের কোন নেতা বা কোন শাখার বিরুদ্ধে যদি কারও অভিযোগ থাকে তাহলে তা আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠাতে পারেন। তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে যুবলীগের কোন নেতা বা শাখার(যে পর্যায়েরই হোক না কেন) বিরুদ্ধে নুন্যতম অভিযোগের যদি সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে তাৎক্ষনিকভাবে ওই ব্যক্তি ও কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে যুবলীগ।

যদি অভিযোগ ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে তাহলে সংশ্লিষ্ট থানায় তাৎক্ষনিকভাবে অভিযোগটি পাঠাবে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্তা গ্রহণের জন্য ওই থানাকে অনুরোধ করবে। এসব বিষয়ে যুবলীগের সবার সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এদিকে একই বিষয় নিয়ে যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী এক বিবৃতিতে বলেন, সমপ্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেসব তথ্য ও বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে চায় যুবলীগ। সংগঠনের ভেতর কেউ যেন নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধ না করে সেজন্য শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি নিয়ে চলে এ সংগঠন। এজন্য আওয়ামী যুবলীগের নিজস্ব ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এ ট্রাইব্যুনালে যুবলীগের কোনো নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে তা তদন্ত ও অনুসন্ধান করা হয়। দোষী নেতা-কর্মী তিনি যেই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। যুবলীগ ট্রাইব্যুনাল প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন,যুবলীগ তো নিজেরাই উদ্যোগ নিয়েছে, তারা এ ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। তারা নিজেরাই শুনানির ব্যবস্থা করেছে। ভালো কথা, শুভ উদ্যোগ। যুবলীগ নিজেদের সংকট, অনিয়মের অভিযোগ সমাধান করবে। এটা আমরা পর্যবেক্ষণ করব। জঙ্গি দমনের মত চাঁদাবাজদের মোকাবেলা করা হবে প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ওবায়দুল কাদের বলেন,এ ব্যপারে প্রধানমন্ত্রী তথ্য পাচ্ছেন। দলের লোকের বাইরেও প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব সেল আছে। যত বড় নেতাই হোক, যত প্রভাবশালী ব্যক্তিই হোক, কোনো অবস্থাতেই এ ধরনের ব্যক্তিদের ছাড় দেয়া হবে না। এ ব্যপারে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন তাতে জিরো টলারেন্সের বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। এ ব্যপারে জোর তদন্ত চলছে। সবই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে তেমন নয়। কিছু কিছু প্রশাসনিক এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বলা হয়েছে, যারাই অপকর্ম করবে- দলের লোক হোক, আর বাইরের লোক হোক, যত প্রভাবশলী হোক সবার সঙ্গে আইনের ভাষায় কথা বলবে।

এদিকে যুবলীগ নিয়ে দলীয় প্রধানের সমালোচনার পর রোববার থেকে যুবলীগের নেতাকর্মীদের সংগঠনটির বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের কার্যালয়ের আশপাশে উপস্থিতি কমে গেছে। গত শনিবার ১৪ই সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় ছাত্রলীগের পাশাপাশি যুবলীগের কতিপয় নেতার কর্মকাণ্ডের কড়া সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা মহানগর যুবলীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতাকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরা শোভন-রাব্বানীর (ছাত্রলীগ থেকে অপসারিত দুই শীর্ষ নেতা) চেয়েও খারাপ। সভায় যুবলীগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এরা তো জন্মদিন (শেখ হাসিনার) পালনের নামে চাঁদাবাজি করতে পারে, এমনভাবে আমার জন্মদিন পালনের দরকার নেই। যুবলীগের কিছু নেতার বিরুদ্ধে উচ্ছৃঙ্খল আচরণের অভিযোগ আমার কাছে আছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ ও বেপরোয়া চলাচল বরদাশত করা হবে না। এরপর যুবলীগ নিয়ে তার কাছে আসা নানা অভিযোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুবলীগের ঢাকা মহানগরের একজন নেতা যা ইচ্ছে করে বেড়াচ্ছে, চাঁদাবাজি করছে। আরেকজন এখন দিনের বেলায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলেন। সদলবলে অস্ত্র নিয়ে ঘোরেন। এসব বন্ধ করতে হবে। যারা অস্ত্রবাজি করেন, যারা ক্যাডার পোষেন, তারা সাবধান হয়ে যান,এসব বন্ধ করুন। তা না হলে, যেভাবে জঙ্গি দমন করা হয়েছে, একইভাবে তাদেরকেও দমন করা হবে। এরপরই যুবলীগের চেয়ারম্যান সংগঠনের নেতাকর্মীদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সোচ্চার হন। তিনি নেতাকর্মীদের যেকোনো ধরণের অপরাধ থেকে দূরে থাকতে হুশিয়ার করেন।

Wednesday, September 4, 2019

রোহিঙ্গাদের মোবাইল নেটওয়ার্ক, দায় নিচ্ছে না কেউ by কাজী সোহাগ

রোহিঙ্গাদের হাতে মোবাইল সিম ইস্যুতে দায় নিতে চান না কেউই। বরং একে অপরকে দোষারোপ করছেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বলছে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। নিয়ম বহির্ভূত কিছু হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ও এর দায় নিতে চায় না। তারা সংশ্লিষ্টদের সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন। মোবাইল অপারেটররা বলছে, নিয়ম মেনেই তারা মোবাইল ফোনের সিম বিক্রি করেছেন। এখানে আইনের কোন ব্যত্যয় হয়নি।
এ প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ইস্যুতে মন্ত্রনালয়, বিটিআরসি ও অপারেটরদের কেউই দায় এড়াতে পারেন না।সবারই এখানে দায় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে-মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আশ্রয় ক্যাম্পে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করছেন রোহিঙ্গারা। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গার হাতে রয়েছে মোবাইল ফোন। সিমের পাশাপাশি তারা ব্যবহার করছেন ইন্টারনেট সেবাও। এর মাধ্যমে গ্রুপ চ্যাটিং করে নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান করছেন নিয়মিত। এক ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে এক জায়গায় লাখ লাখ রোহিঙ্গার সমবেত হওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। আর এসব সম্ভব হচ্ছে মোবাইল ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে। নিয়ম অনুযায়ি কোন রোহিঙ্গা বাংলাদেশের সিম ব্যবহার করতে পারে না। কারণ সিম কিনতে গেলে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি লাগে। তার ওপর রয়েছে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি। বিষয়টি আমলে নিয়ে সোমবার রোহিঙ্গাদের মোবাইল সেবা বন্ধের জন্য অপারেটরদের নির্দেশনা দেয় বিটিআরসি। সেখানে বলা হয়,‘আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কোনো ধরনের সিম বিক্রি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে সিম ব্যবহার বন্ধ তথা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মোবাইল সুবিধা প্রদান না করা সংক্রান্ত সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করে বিটিআরসিকে অবহিতকরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হল।’ বিটিআরসি কর্মকর্তারা জানান, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের কাছ থেকে ‘জরুরি ব্যবস্থা’ নেয়ার নির্দেশনা পেয়ে তারা অপারেটরদের চিঠি পাঠান। বিটিআরসির এই নির্দেশনা প্রসঙ্গে রবি আজিয়াটা লিমিটেডের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয় তথ্যভান্ডারে (এনআইডি) সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে বায়োমেট্রিক যাচাইকরণের মাধ্যমে একজন ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরই একটি মোবাইল সিম বিক্রয় করা হয়। অর্থাৎ মোবাইল সিম কিনতে হলে একজন ব্যক্তির বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি যে, সিম সংক্রান্ত যে কোনো সমস্যার সমাধান শুধুমাত্র বৈধ নাগরিকদের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) ও এনআইডি ডাটাবেজে নিবন্ধন নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। একই প্রসঙ্গে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটর্স অব বাংলাদেশ (এমটব) মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম ফরহাদ (অব.) বলেন, মোবাইল অপারেটররা সবসময়ই বিটিআরসির নির্দেশনা মেনে চলে। এ ব্যপারে তারা নিজেদের আয়ত্তের মধ্যে সম্ভব যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। এখানে আরো বলা দরকার যে এন আই ডি ডাটাবেসের সঙ্গে বায়োমেট্রিক নিশ্চিতকরণের পরেই কেবল মোবাইল সিম সক্রিয় করা যায়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, রোহিঙ্গাদের হাতে সিম ইস্যুতে সবাই যেভাবে দায়িত্ব এড়াতে চাচ্ছেন তা অত্যন্ত হাস্যকর। রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় দুটি মোবাইল টাওয়ার বসানো হয়েছে। এটা বসাতে মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির অনুমোদন লাগে। আর যদি অনুমোদন না নিয়ে টাওয়ার বসানো হয় তাহলে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০১ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অপারেটরকে ৩০০ কোটি টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। বিটিআরসি এ ধরণের কোন জরিমানা সংশ্লিষ্ট অপারেটরকে করেনি। তিনি বলেন, ২ বছর আগে ওই এলাকায় মোবাইল সিমের ব্যবহারকারী কতজন ছিলো আর এখন কতজন সে হিসেবটা বের করলেই খুব সহজেই বোঝা যাবে। পাহাড়ি এলাকায় সাধারণত এক কিলোমিটারের মধ্যে ৫০টির বেশি পরিবার থাকে না। সে হিসেবে তাদের হাতে কয়টা সিম থাকতে পারে আর এখন কতটা আছে? মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ইস্যুতে আসলে দায়টা সবার। এ প্রসঙ্গে বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) মো.জাকির হোসেন খাঁন মানবজমিনকে বলেন, রোহিঙ্গাদের হাতে সিম ইস্যুতে এরইমধ্যে অপারেটরদের চিঠি দেয়া হয়েছে। তাদের ৭ দিন সময় বেঁধে দেয়া আছে। আমরা দেখি তাদের জবাব কি আসে। আর ক্যাম্প এলাকায় মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। যদি নিয়ম বহির্ভূতভাবে স্থাপন করা হয় তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় দিনের বেলা মোবাইল সংযোগ পুরোদমে চালু থাকলেও রাতে শুধু টু-জি নেটওয়ার্ক চালু থাকবে। এর মাধ্যমে শুধু কথা বলা (ভয়েস কল) যাবে। প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত ১৩ ঘণ্টা থ্রি-জি, ফোর-জি চালু থাকবে না। গতকাল মঙ্গলবার এ নিয়ে একটি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গা এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কের বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে। তিনি জানান, নতুন নিয়ম থাকলেও বর্ডার এলাকার মোবাইল টাওয়ারে টিএ (টাইমিং অ্যাডভান্স) ভ্যালু বজার রাখারও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, স্থানীয় মানুষদের কাছ থেকে একেকটা সিম ৫০০ থেকে ১০০০ হাজার টাকার বিনিময়ে কিনছেন রোহিঙ্গারা। বিশেষ করে কর্পোরেট সিম সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন রোহিঙ্গারা। এই সিম একজনের নামে অনেকগুলো দেয়ার সুযোগ রয়েছে। এটাই কাজে লাগাচ্ছেন অসাধুরা। বাড়তি টাকার বিনিময়ে ওইসব সিম তুলে দিচ্ছেন রোহিঙ্গাদের হাতে। তারা জানান, এখন রোহিঙ্গাদের শক্তিশালি নেটওয়ার্ক রয়েছে। মুহুর্তের মধ্যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সমবেত হতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে তারা যে ভয়ংকর হয়ে উঠবে না এ নিশ্চয়তা কে দেবে? এটা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন একটি ইস্যু। সরকার বা বিটিআরসি যদি এখনই কোন ব্যবস্থা না নেয় তাহলে পরিস্থিতি হয়তো নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যেতে পারে। রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাদের নির্যাতন থেকে জীবন বাঁচাতে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেন বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। নতুন-পুরনো মিলিয়ে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থান করছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয়ের পাশাপাশি সার্বিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। দেশি-বিদেশি এনজিওর পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার তাদের খাদ্য, অস্থায়ী বাসস্থান, চিকিৎসা, বস্ত্র, লেখাপড়া, বিনোদনসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে।

Sunday, September 1, 2019

পাহাড় জুড়ে আতঙ্ক by কাজী সোহাগ

দেশের তিন পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান ফের অশান্ত হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলার পর পাহাড়জুড়ে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক। বিশেষ করে সাধারণ পাহাড়িরা রয়েছেন বিপাকে। এমনিতেই সারা বছর তারা উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। এর মধ্যে যোগ হয়েছে সশস্ত্র হামলা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি যে কোনো সময় তাদের ওপরও হামলা হতে পারে এ  আশংকা করছেন তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ অধিবাসীরা। এদিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় সম্প্রতি পাহাড়ে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নজরদারি ও তৎপরতা বাড়িয়েছে। পাহাড়ে একচ্ছত্র আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও ভূমি দখলের লক্ষ্যে অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে পাহাড়কে অশান্ত করে তুলেছে আঞ্চলিক চারটি সংগঠন।
ওই চার সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসিত), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা বা মূল) ও জেএসএস (সংস্কার)। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে আসছে তারাই আধিপত্য বিস্তার ও নিজের শক্ত অবস্থান জানান দিতে অস্ত্রের হুঙ্কার দিচ্ছে। তারা প্রতিনিয়তই ঘটাচ্ছে নৃশংস নানা ঘটনা। আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে এই আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করছে নানা ধরনের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র। ২৬ শে আগষ্ট সকাল ১০টার দিকে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার বরাদম এলাকায় সেনাবাহিনীর একটি দল অভিযান চালাতে গেলে ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর গুলি চালায়। এ সময় দুপক্ষের ‘গোলাগুলিতে’ এক পর্যায়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফের (প্রসিত) দলের তিন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। নিহতরা হলো বজেন্দ্র চাকমা (৪৫), তরুণ চাকমা (২৫) ও নবীন জ্যোতি চাকমা (৩২)। তারা দীঘিনালার কৃপাপুর এলাকার বাসিন্দা। ওইদিন অভিযানস্থল থেকে সন্ত্রাসীদের ব্যবহৃত একটি আমেরিকান এম-৪ অটোমেটিক কারবাইন (৪ রাউন্ড গুলিসহ) ও দুটি পিস্তল (৮ রাউন্ড গুলিসহ) উদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, আমেরিকান এই ভারী অস্ত্র মূলত সমরাস্ত্র হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। অথচ এমন বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ব্যবহার করছে পার্বত্য অঞ্চলের এই সংগঠনগুলো। এ অঞ্চলে কাজ করা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করেন, পার্বত্য অঞ্চলের চার সংগঠনের হাতে অন্তত সাড়ে ৪ হাজার অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। যার বেশিরভাগই বিদেশি এবং কেউ না কেউ সরবরাহ করছে। চলতি মাসেই মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে প্রায় তিন দফায় সেনা টহলের ওপর গুলি চালায় পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা। ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীদের গুলিতে ইতোমধ্যেই একজন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। অবশ্য অভিযান চালাতে গিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে ১৬ আগস্ট সুমন চাকমা নামে এক ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। এসব কারণে চরম আতঙ্ক, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সময় পার করছে পাহাড়ের শান্তিপ্রিয় নিরীহ বাঙালি ও সাধারণ উপজাতিরা। গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, ১৯৯৮ সাল থেকে ইউপিডিএফ (প্রসিত) ও জেএসএসের (সন্তু লারমা) মধ্যে আধিপত্য ও চাঁদাবাজি নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে এলেও ২০১৫ সালের শেষদিকে এসে নিজেদের মধ্যে ‘সহাবস্থানের’ অলিখিত একটি চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তি অনুসারে পার্বত্য অঞ্চলের নির্বাচন, এলাকার আধিপত্য, চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারাসহ কিছু ক্ষেত্রে তারা দুটি দলই এক সঙ্গে কাজ করছে। বর্তমানে খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফের (প্রসিত) তৎপরতা সবচেয়ে বেশি দেখছে নিরাপত্তা বাহিনী। অন্যদিকে রাঙামাটিতে বেশি তৎপর জেএসএস (মূল)। এই দুটি দলই আবার পাঁচ-ছয় মাস ধরে বান্দরবান এলাকায় প্রভাব সৃষ্টির জন্য তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কেননা এখানে মূলধারার রাজনীতি তথা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা বেশ মজবুত। এ কারণে সেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যেও কাজ করছে ওই আঞ্চলিক পাহাড়ি সংগঠনগুলো। তারা জানান,পাহাড়ে অবস্থানরত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কাছে বর্তমানে এসএমজি, এলএমজি, এম-১ কারবাইন, গ্রেনেড, এম-১৬ রাইফেল, এম-৪, একে-৪৭ ও একে-২২ রাইফেলের মতো অস্ত্রসহ অন্তত ৪ হাজারের মতো অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। বিভিন্ন সময় অস্ত্রসহ আটক ইউপিডিএফ বা জেএসএসের সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে গোয়েন্দারা আরও জানতে পেরেছেন, পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর ওই চারটি সশস্ত্র আঞ্চলিক সংগঠনের চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, শান্তিচুক্তি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলায় অশান্তি-অস্থিরতা কাজ করছে। তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে নিরাপত্তাহীনতায়। গত বছরের ৩ মে আধিপত্যের কোন্দলে ‘ব্রাশফায়ার’ করে জেএসএস (সংস্কার) সমর্থিত নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করে ইউপিডিফের (মূল) সন্ত্রাসীরা। পর দিন ৪ মে শক্তিমানের শেষকৃত্যে যোগ দিতে যাওয়ার সময় ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) সভাপতি তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাসহ পাঁচজনকে ‘ব্রাশফায়ার’ করে হত্যা করে ইউপিডিএফের (মূল) সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। চলতি বছরও আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছে। পাহাড়ে এমন গোলাগুলি, সংঘর্ষ, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণের ঘটনা এখন অহরহ ঘটছে। ১৯৯৭ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির সঙ্গে (জেএসএস) শান্তিচুক্তির পরই প্রকাশ্যে বিরোধিতা করে ইউপিডিএফ। শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ঘোষণা দিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে ইউপিডিএফ সদস্যরা। মূলত তারপরই পাহাড়ে আবারও রক্তের খেলা শুরু হয়। এরপর ২০০৭ সালে জেএসএস থেকে বেরিয়ে রূপায়ণ দেওয়ান ও সুধাসিন্ধু খিসাদের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা), যা সংস্কার নামেও পরিচিত। এতদিন ইউপিডিএফ ও জেএসএস (সংস্কার) দুই সংগঠন অনেকটা এক হয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে মূল ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নামে পাহাড়ের চতুর্থ আঞ্চলিক দল বা সংগঠন গঠিত হলে এই চার সংগঠনের ক্ষমতার বিস্তার, চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের লড়াইয়ে আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের কাছে থাকা অস্ত্রের ৩ ভাগের একভাগেরও কম জমা দেয়। তাও আবার জরাজীর্ণ, নষ্ট বা পরিত্যক্ত অস্ত্রগুলো। পক্ষান্তরে অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলো তারা তাদের কাছে রেখে দেয়। পাশাপাশি নতুন নতুন অত্যাধুনিক অস্ত্রে তারা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ সম্প্রতি এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, বর্তমানে ওই স্থানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন। ভবিষ্যতেও এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

Saturday, June 29, 2019

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে জাতীয় সংসদের বিশেষ আয়োজন by কাজী সোহাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম-শতবার্ষিকী পালনের কর্মসূচিতে চমক থাকবে সংসদ সচিবালয়ের। সেখানে বঙ্গবন্ধুর স্মরণে তৈরি করা হবে বঙ্গবন্ধু মঞ্চ। বছরব্যাপী ওই মঞ্চে থাকবে নানা আয়োজন। ডাকা হবে সংসদের বিশেষ অধিবেশন। সেখানে উপস্থিত থাকবেন বিদেশি আমন্ত্রিত অতিথিরা। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন  চৌধুরীর পক্ষ থেকে বিশ্বের সব দেশের পার্লামেন্টের স্পিকারের কাছে পাঠানো হবে বিশেষ উপহার প্যাকেট। প্যাকেটে থাকবে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর ইংরেজী ভার্সন, প্রকাশনা, ব্রুসিয়ার, মেমোরিয়াল কয়েন। এছাড়া দেশী-বিদেশী অতিথিদের অংশগ্রহণে থাকবে সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম। সংশ্লিষ্টরা জানান, বছরব্যপী অনুষ্ঠান ঘিরে আরও চমকপ্রদ কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে। এ নিয়ে শতাধিক খসড়া প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। দুই মাসের মধ্যে তা চূড়ান্ত করা হবে। সম্প্রতি মুজিব বর্ষ উদযাপনের জন্য সব মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। বৈঠকে তিনটি সাব-কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এর মধ্যে প্রকাশনা বিষয়ক দুটি উপ-কমিটি কাজ শুরু করেছে। আরেকটি আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি বিদেশী অতিথিদের নির্বাচন ও তাদের আমন্ত্রণ, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করবে। প্রায় সব এমপিকে সম্পৃক্ত করা হবে মুজিব বর্ষ পালনের কর্মসূচিতে। তাদের সঙ্গে থাকবেন সংসদ সচিবালয়ের ১২শ কর্মকর্তা ও কর্মচারি। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে ২০২০ সালকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসেবে উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, যেহেতু মুজিব বর্ষ পালনে প্রধানমন্ত্রী জাতীয়ভাবে কমিটি গঠন করেছেন এবং সরকারের পক্ষ থেকেও ব্যপকভাবে আয়োজন করা হবে তাই আমরাও পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে আয়োজন করবো। তিনি বলেন, মুজিব বর্ষ পালন উপলক্ষ্যে প্রায় শতাধিক প্রস্তাব এসেছে। এখনও চূড়ান্ত করিনি। বিবেচনা ও যাচাই বাছাই করে শিগগির কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হবে।
স্পিকার বলেন, পুরো বছরব্যপী অনুষ্টানসূচি সাজানো হবে। বেশকিছু সেমিনার, ওয়ার্কশপ থাকবে বঙ্গবন্ধুর ওপরে। সেখানে হয়তো বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টারিয়ান, স্পিকারসহ কাদের আনা যায় সেটা চূড়ান্ত করা হবে। তিনি বলেন, অনেক প্রস্তাবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বঙ্গবন্ধু মঞ্চ করার প্রস্তাব। বছরব্যপী ওই মঞ্চ রাখা হবে। সেখানে বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান চলবে। সেখানে ফটোগ্রাফ এক্সিবিউশন হতে পারে, সংসদ কেন্দ্রিক উনার যেসব বক্তব্য তা অডিও করা যায় কিনা তা ভেবে দেখা হচ্ছে। এছাড়া অনেক ইন্টারেস্টিং প্রস্তাবও এসেছে। তবে বঙ্গবন্ধু মঞ্চটা এক বছরের জন্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্পিকার বলেন, বঙ্গবন্ধুর ওপরে কোন বিশেষ অধিবেশন ডাকা যায় কিনা সেটাও ভাবা হচ্ছে। সেটা হলে কিভাবে তা সাজানো হবে, কারা বক্তব্য রাখবেন, বাইরের কোন অতিথি আসবেন কিনা তা ভাবা হচ্ছে। সংসদের এসব প্রোগ্রামের সঙ্গে জাতীয় কমিটির অনুষ্ঠানের সঙ্গে যেন কোন বিরোধ তৈরি না করে সে বিষয়টিও আমাদের দেখতে হবে। সমন্বয় করতে হবে। একা একা অনুষ্ঠানমালা সাজানো ঠিক হবে না। ব্যপক আয়োজনের মাধ্যমে মুজিব বর্ষ পালনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, জাতির পিতার জন্ম-শতবার্ষিকী অনেক বড় বিষয়। তার চাইতে আমি যেটা মনে করি আমরা যে সুযোগটা পাচ্ছি এই সময়টা যে আমরা সেলিব্রেট করতে পারছি সেটাও কিন্তু একটি ঐতিহাসিক ব্যপার। আমরা প্রত্যেকে একটি ইতিহাসের অংশ হবো। তিনি বলেন,আমরা তো আর কেউ চিরকাল থাকবো না। আগামীতে আরও অনেক প্রজন্ম আসবে।
কিন্তু এটা আমাদের জন্য একটি মাইলস্টোন হিসেবে থাকবে। এ সুযোগ পাওয়াটা অনেক বিরল বিষয় বলে মনে করি। স্পিকার বলেন, সংসদের পক্ষ থেকে আমরা জাতির কাছে বা ভবিষ্যত প্রজন্মর কাছে একটি বার্তা দিতে চাই যে, যার জন্য আমাদের এই দেশ, যার জন্য আমাদের এই সংসদ, যার জন্য আমরা আজকে সারাবিশ্বে মাথাউঁচু করে স্বাধীন জাতি হিসেবে দাঁড়াতে পারি, যাকে ঘিরে সরাবিশ্বে আমাদের আত্মপরিচয়, বাঙালি হিসেবে আত্মপরিচয় এজন্য তার জীবনকে, জন্মকে আমরা সেলিব্রেট করবো। একজন মহান নেতা কিন্তু সচরাচর একটি জাতির জীবনে আসে না। বঙ্গবন্ধু ছিলেন খুবই ক্ষণজন্মা একজন মানুষ। নেতা। তিনি বলেন, আরও অনেক ধরণের প্রস্তাব আছে। এক্ষেত্রে সমন্বয়টা খুব জরুরি। কারণ জাতীয় কমিটি যে কাজ করবে আমরা তার ডুব্লিকেট করতে চাই না। আমরা আমাদের স্বাতন্ত্রিকতা রেখে সংসদ কেন্দ্রিক কিভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন করা যায় সেটা দেখবো। বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ও কিন্তু কাজ করবে। যেমন-যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয় তারা তাদের মতো করে অনুষ্ঠান করবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সারাদেশে কিভাবে পালন করবে তারা ঠিক করবে। তবে প্রত্যেকের একটি বিষয়বস্তু আছে। পার্লামেন্টেরও একটা বড় বিষয়বস্তু আছে। যেমন-গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, দেশকে এগিয়ে নেয়া, উন্নয়ন সবকিছু। স্পিকার বলেন, গণপরিষদ, সংবিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে জাতির পিতার কাজগুলো সেগুলো আমরা ফোকাস করবো।
একটি দেশসৃষ্টি ও সংবিধান প্রণনের জন্য যা কিছু তিনি করেছেন তা তুলে ধরা হবে। সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে কিন্তু পুরো রাষ্ট্রের কাঠামো, কিভাবে দেশ চলবে সবকিছু সেখানে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। সেটাও কিন্তু জাতির পিতা ১০ই জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরদিনই ১১ জানুয়ারি সংবিধানের প্রণয়নের কাজটি হাতে নিয়েছিলেন। তারপর কিভাবে গণপরিষদে সংবিধান পাস হলো এসব দিক থেকে বঙ্গবন্ধুকে দেখবো। পাশাপাশি সংসদে উনি কি কি বক্তব্য রেখেছেন তা দেখা হবে। বঙ্গবন্ধুর তো অনেক বক্তব্য রয়েছে। তবে পার্লামে›কে›িন্দ্রক যে বক্তব্যগুলো আছে সেসব বিষয় হাইলাইট করা হবে। স্পিকার বলেন,আরেকটি পরিকল্পনা রয়েছে আমার। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন সংসদকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর বিষয়টি জানাতে চাই। সেটার বিষয়ে আমার নিজস্ব একটি চিন্তা রয়েছে। তাহলো-বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীর ইংরেজির কপি, তার সঙ্গে আরও কিছু প্রকাশনা বা মেমোরিয়াল কয়েন, ব্রুসিয়ার একসঙ্গে একটি প্যাকেজ করে সারাবিশ্বের সব স্পিকারের কাছে পাঠাতে পারি। এমপিদের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে স্পিকার বলেন, সব এমপিরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে এসব অনুষ্ঠানগুলোতে অংশ নেবে।
আরও অনেক সাব-কমিটি গঠন করা হবে। দায়িত্বগুলো বন্টন করে দেয়া হবে বাস্তবায়নের জন্য। কারও একার পক্ষে তো এত অনুষ্ঠান করা সম্ভব হবে না। এমপিদের সঙ্গে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদেরও আমরা সংযুক্ত করবো। উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে ফেব্রুয়ারিতে দুটি কমিটি গঠন করে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সভাপতি করে ১০২ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটি’ ও জাতীয় অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামকে সভাপতি করে ৬১ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। জাতীয় কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে,আগামী বছরের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী যথাযথভাবে পালনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতি, পরিকল্পনা ও কর্মসূচি অনুমোদন করবে এই কমিটি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।