Monday, July 14, 2014

ঢাকা নিয়ে সরকারের কোনো উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা নেই -সাক্ষাৎকারে : নজরুল ইসলাম by এ কে এম জাকারিয়া

প্রথম আলো > নানা মহল থেকে এত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, এর পরও ঢাকা শহরের পরিস্থিতি তো দিনে দিনে শোচনীয়ই হচ্ছে।
নজরুল ইসলাম > ঢাকার বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে। এই শহরটি নিয়ে যে ধরনের চিন্তাভাবনা প্রয়োজন, এর যে ভবিষ্যৎ ভাবনা প্রয়োজন, তার কিছুই চোখে পড়ছে না। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, ঢাকা নিয়ে দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায় থেকে যে সচেতনতা ও উৎকণ্ঠা থাকা উচিত, তা দেখছি না। ভাবটা এমন যে ঢাকা তো চলছে।
প্রথম আলো > সবকিছুর পরও ঢাকা তো চলছে, তা যেভাবেই হোক।
নজরুল ইসলাম > এ কথা ঠিক যে ঢাকা চলছে; নানা অনিয়ম, প্রতিবন্ধকতা ও পরিস্থিতির অবনতি সত্ত্বেও। ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ছে, এর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও হচ্ছে। কিন্তু ঢাকার ব্যাপারে সরকারের যে নির্বিকার ভাব, সেটাই সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ নিয়ে, এর ভালোমন্দ নিয়ে ভাবার লোকজন আছে, কিন্তু ঢাকা নিয়ে ভাবার কেউ নেই।
প্রথম আলো > যাঁরা দেশ চালান, ঢাকাকে দেখার দায়িত্ব তো তাঁদেরই।
নজরুল ইসলাম > দেশ পরিচালনা করেন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর কেবিনেট। এই যে ঢাকার পরিস্থিতি এত শোচনীয় হয়ে পড়ছে, এর পরও শুধু ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে কোনো কেবিনেট মিটিং হয়েছে কি? এ ধরনের একটি মিটিংয়ে নিশ্চয় পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না, কিন্তু সেখানে আলোচনা হলে কিছু প্রশ্ন উঠত, এর উত্তরও খোঁজার চেষ্টা হতো। একটি কেবিনেট মিটিং হলে আমরা অন্তত বুঝতাম যে সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।
প্রথম আলো > কিন্তু ঢাকাকে দেখার তো নানা কর্তৃপক্ষ রয়েছে।
নজরুল ইসলাম > ঢাকার ক্ষেত্রে এই শহরটি উন্নয়নের সবচেয়ে জরুরি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে একসময়ের ডিআইটি ও বর্তমানের রাজউক। এ ধরনের একটি বিশেষায়িত উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানকে যে ধরনের শক্তিশালী, মর্যাদাবান, দায়িত্বশীল ও দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা উচিত ছিল, তা করা হয়নি। উন্নয়ন নির্ভর করে যথাযথ পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের ওপর। রাজউকের সেভাবে গড়ে ওঠার বা সে ক্ষমতাও দেওয়া হয়নি। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির যে ব্যবস্থাপনা-কাঠামো বা নেতৃত্বের দরকার ছিল, তা গড়ে তোলা হয়নি। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই তা করা হয়নি। ফলে দুর্নীতি ও জমি বণ্টনই এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজউকের মূল কাজ। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাই প্রতিষ্ঠানটিকে সর্বনাশ করেছে। ভারতে দিল্লির জন্য দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কিন্তু আমাদের দেশের মতো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নেই।
প্রথম আলো > ঢাকাকে নিয়ে তো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা হয়েছে, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে না পারাই কি মূল সমস্যা নয়?
নজরুল ইসলাম > ঢাকা ঐতিহাসিক শহর। নানা পর্ব পার হয়েছে এই শহরটি। যথাযথ পরিকল্পনা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা হয়েছে। একাত্তরে ঢাকা যখন বাংলাদেশের রাজধানী হয়, তখন ঢাকার জনসংখ্যা ৮-১০ লাখের বেশি হবে না। পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ১৯৬০ সালে ডিআইটি ঢাকার উন্নয়নে ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উচিত ছিল নতুন দেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকা কেমন হবে, এর চরিত্র কী হবে, তার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা। কিন্তু তা হয়নি। বিশেষ করে, আশির দশকে ঢাকাকে কেন্দ্র করে যা হয়েছে তা এক অর্থে বিশৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন। ঢাকায় একের পর এক গার্মেন্টস তৈরি হয়েছে, লাখ লাখ শ্রমিক এই শহরে এসেছেন। বলা যায়, স্বাধীনতার পর বছর বিশেক ধরে ঢাকায় যে অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন হয়েছে, এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ঢাকা এখন বিশ্বের ১১তম জনবহুল শহরে পরিণত হেয়ছে।
প্রথম আলো > পরিস্থিতি সামাল দিতে ’৯৭ সালে তো ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান বা ডিএমডিপি নেওয়া হলো। তা ভূমিকা রাখতে পারছে না কেন?
নজরুল ইসলাম > দেখুন পরিকল্পনা করতে হয় সময়ের আগে। শত বছর পর কী হবে সেটা বিবেচনায় থাকতে হয়। তা না হলে অন্তত ৫০ বা কমপক্ষে ২০ বছর মাথায় রাখতে হয়। ’৯৭ সালে ডিএমডিপি হওয়ার পর ড্যাপ করতে আমাদের ১৫ বছর চলে গেছে। এ সময় স্বার্থান্বেষী মহল ও ভূমি ব্যবসায়ীরা অনেক কিছু দখল করে ফেলেছে। জলাশয় বা প্লাবন ভূমি দখল করে ভরাট করে ফেলেছে। এগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। ড্যাপ বা এ ধরনের কিছু আরও আগে করা উচিত ছিল। এমন কিছু হলে এখন যে সমস্যায় আমরা পড়ছি তা হতো না।
প্রথম আলো > ড্যাপ বাস্তবায়ন বর্তমানে আটকে গেছে, ভূমি ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্বেষী অনেক গোষ্ঠী এর বিরোধিতায় সোচ্চার। ড্যাপ সংশোধন বা নতুন পরিকল্পনার চিন্তাভাবনা চলছে। ড্যাপ থেকে সরে আসার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
নজরুল ইসলাম > ড্যাপ অনুমোদিত হতে হতে ভূমি ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন গোষ্ঠী উন্নয়নের নামে এমন অনেক জায়গা ভরাট করে ফেলেছে বা প্রকল্প করেছে যেগুলো ড্যাপের বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল বা জলাশয়ের মধ্যে পড়েছে। এগুলোর কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব কি না? ড্যাপের কারণে যে ভূমি ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন, তাঁরা এর বিরোধিতায় নেমেছেন। শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর এই গোষ্ঠী সরকারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। সমস্যা হচ্ছে, অপরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রণহীন উন্নয়নের কারণে প্রকৃতি একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা শোধরানো কঠিন।
প্রথম আলো > ড্যাপ অনুমোদিত হওয়ার আগে যেসব জায়গা ভরাট হয়েছে বা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, সেগুলো নিয়ে না হয় কিছু বাস্তব সমস্যা দেখা দিয়েছে; কিন্তু সরকার যে নতুন করে ড্যাপ লঙ্ঘন করে প্রকল্প অনুমোদন দিল। আমলা, পুলিশ ও সেনাসদস্যদের আবাসন প্রকল্প তিনটি কি ড্যাপের লঙ্ঘন নয়?
নজরুল ইসলাম > এটা অবশ্যই ড্যাপের লঙ্ঘন, কারণ এই প্রকল্প তিনটি ড্যাপের চিহ্নিত বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলের মধ্যে পড়েছে।
প্রথম আলো > ড্যাপ অনুমোদন করার পর সরকার কেন এ ধরনের প্রকল্পের অনুমোদন দিল?
নজরুল ইসলাম > রাজনৈতিক বিবেচনা ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষার জন্য এ কাজটি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ বা টেকনিক্যাল কমিটির সুপারিশের বাইরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে যখন এ ধরনের কাজ করা হয়, তখন এই উদ্দেশ্যটি পরিষ্কার। রাজনৈতিক প্রভাবে উন্নয়ন ও পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার একটি নজির হিসেবেই এই অনুমোদন বিবেচিত হবে। আর সরকার যদি নিজেই রাজনৈতিক স্বার্থে উন্নয়ন ও পরিকল্পনাবিরোধী অবস্থান নেয়, তবে পরিকল্পনা করে কী লাভ!
প্রথম আলো > এই প্রকল্প তিনটি বাতিল হওয়া উচিত বলে মনে করেন কি?
নজরুল ইসলাম > এটা স্পষ্ট যে প্রকল্প তিনটি ড্যাপের বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বর্তমান ড্যাপ কার্যকর থাকা পর্যন্ত এমন কিছু করা যাবে না, যা ড্যাপকে ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আমি মনে করি, ২০১৫ সালের মধ্যে দৃঢ়ভাবে বর্তমান ডিএমডিপি বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী মহাপরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এটা নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির জন্য ‘ঢাকা ওয়াচ’ ধরনের কিছু করা জরুরি। বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সংগঠন মিলে মাঠ উদ্ধার বা নদী-খাল দখল, দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে, এটা আরও সমন্বিতভাবে হওয়া উচিত। এ ধরনের কিছু সক্রিয় থাকলে কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক ও বেপরোয়া আচরণ ঠেকানো সম্ভব।
প্রথম আলো > দিনে দিনে ঢাকায় যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তার সমাধানের বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি। পরিস্থিতি সহনীয় করতে এই মুহূর্তে করণীয় কী?
নজরুল ইসলাম > আমি মনে করি, এই সময়ে ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা পরিবহন। পরিবহন সংকট, যানজট—এসব কারণে শহরের প্রতিটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি শিশুরাও। এ কারণে তাদের স্কুলে যাওয়া, পড়াশোনা, স্বাস্থ্য—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য যে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। কিন্তু আমরা দেখছি যে এ ক্ষেত্রেও প্ল্যানবহির্ভূতভাবে অনেক কাজ করা হচ্ছে। বাস র্যাপিড ট্রানজিটের ব্যাপারে সরকারের তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না অথচ এটা জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
প্রথম আলো > আপনি এর আগে এক সাক্ষাৎকারে ঢাকার দেখভালের জন্য একটি কর্তৃপক্ষ গঠনের কথা বলেছিলেন। এখনো কি তাই মনে করেন? সেই কর্তৃপক্ষের ধারণাটি নির্দিষ্ট করবেন কি?
নজরুল ইসলাম > সরকার যদি সত্যিই মনে করে যে ঢাকার জন্য তাদের কিছু করার রয়েছে, তবে অবশ্যই এই শহরটিকে দেখভালের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি উন্নয়ন ও সমন্বয় কর্তৃপক্ষ গঠন করা জরুরি। অতীতে ঢাকাসংক্রান্ত একটি সমন্বয় কমিটি ছিল, এখন সেটাও নেই। আমি মনে করি, পার্লামেন্টে আইন করে এ ধরনের একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করা যেতে পারে। ঢাকার উন্নয়ন ও সেবাসংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়সাধন যেহেতু এই কর্তৃপক্ষের অন্যতম কাজ হবে, তাই একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীকে এই কর্তৃপক্ষের প্রধান করতে হবে, যিনি রাজউক, রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, ঢাকা ওয়াসা বা সিটি করপোরেশনের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারবেন। আইন করে এ ধরনের একটি কর্তৃপক্ষ করা গেলে এর একটি নির্দিষ্ট কাঠামো থাকবে। তাদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি, টেকনিক্যাল ও গবেষণা সেল থাকতে পারে।
প্রথম আলো > আপনাকে ধন্যবাদ
নজরুল ইসলাম > ধন্যবাদ।

পরিচিতি: বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান (২০০৭-২০১১) অধ্যাপক নজরুল ইসলাম নগরবিশেষজ্ঞ হিসেবেও সমধিক পরিচিত। তিনি দীর্ঘ সময় (১৯৬৩-২০০৭) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। ঢাকা নিয়ে তাঁর গবেষণা ও লেখালেখির শুরু ১৯৬১ সাল থেকে। ঢাকার ওপর ইংরেজিতে তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি গ্রন্থ রয়েছে। নগর গবেষণাকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বর্তমানে তিনি এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ডেও তিনি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া

গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে দেশে দেশে ক্ষোভ

ইসরায়েলি বিমান হামলার শিকার হয় গাজার পুলিশপ্রধান
তাইসির আল-বাত্‌সের পরিবার। হামলায় নিহত সদস্যদের
দাফনের সময় ওই পরিবারের একটি শিশুর কান্না।
ফিলিস্তিনের গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নির্বিচারে বিমান ও স্থল হামলার প্রতিবাদে দেশে দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল রোববার অস্ট্রেলিয়া, ভারত, হংকং ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে এই হামলা বন্ধের দাবি জানান। খবর এএফপির। ইসরায়েল গতকাল ষষ্ঠ দিনের মতো গাজা ভূখণ্ডে বিমান ও স্থল হামলা চালায়। এই ছয় দিনে অন্তত ১৬৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।আহত হয়েছেন এক হাজারের বেশি।
হতাহতদের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি কট্টরপন্থী সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের টাউন হলের বাইরে ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদ জানাতে গতকাল অন্তত তিন হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। তাঁরা ‘ফিলিস্তিন মুক্ত করো’, ‘গাজা মুক্ত করো’ বলে শ্লোগান দেন। বিক্ষোভকারীরা ‘লজ্জা ইসরায়েল লজ্জা’ লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখান। অস্ট্রেলিয়ার গ্রিনস পার্টির সিনেটর লি রিয়ানন বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল গাজার বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা ইসরায়েলের জন্য লজ্জাজনক ঘটনা, আমরা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানাই।’ বিশ্বের সর্বোচ্চ মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় পাঁচ শতাধিক মানুষ গতকাল ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ করেন। রাজধানী জাকার্তায় অনুষ্ঠিত ওই বিক্ষোভ থেকে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে নানা স্লোগান দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনের পতাকা ও ইসরায়েলি হামলায় নিহত ফিলিস্তিনি শিশুদের ছবি নিয়ে বিক্ষোভে যোগ দেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আদিত্য নুগরোহো বলেন, ‘গাজাবাসী মুসলিম ভাইবোনদের প্রতি আমরা সংহতি প্রকাশ করছি। ইসরায়েলি দখলদারেরা তাঁদের ওপর যে নিপীড়ন চালাচ্ছে, সেই কষ্ট ও দুর্ভোগে আমরা সমব্যথী।’ হংকংয়ে বিক্ষোভে তিন শতাধিক মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভে অংশ নিয়ে ২১ বছর বয়সী কাশি আনজুম বলেন, ‘ফিলিস্তিনি ভাইবোনদের প্রতি সমর্থন জানাতে এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছি। ইসরায়েলের প্রতি আমাদের অনুরোধ, গাজার নির্দোষ জনগণকে হত্যা করা বন্ধ করো।’ ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানাতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ করেন শতাধিক মানুষ। এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বেশির ভাগই ছাত্র। নয়াদিল্লির ইসরায়েলি দূতাবাসের বাইরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তাঁরা। ‘আমরা গাজাবাসীর সঙ্গে আছি’, ‘ইহুদিদের গণহত্যাকে না বলুন’, প্রভৃতি লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। এর আগে গত শুক্রবার মালয়েশিয়া ও জাপানের টোকিওতে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ থেকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা হয়।

কেরির মধ্যস্থতায় ভোট পুনর্গণনায় রাজি দুই প্রার্থী

জন কেরি
আফগান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট পুনর্গণনায় রাজি হয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী। পুনর্গণনার সময় প্রতিটি ব্যালটের বৈধতাও খতিয়ে দেখা হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি গত শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা জানান। খবর বিবিসি ও এএফপির। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে জাতিসংঘের কার্যালয়ে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে কেরির পাশে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ ও আশরাফ গণি উপস্থিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধানের জন্য গত শুক্রবার কাবুল পৌঁছান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে কেরি বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভোট পুনর্গণনা শুরু হবে। ভোট পড়া ৮০ লাখ ব্যালটই খতিয়ে দেখা হবে। দুই প্রার্থীই ভোট পুনর্গণনায় রাজি হয়েছেন উল্লেখ করে কেরি বলেন, ‘দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর এই মনোভাব আফগান গণতন্ত্র ও দেশটিতে ক্ষমতা পরিবর্তনের বৈধ প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থনেরই ইঙ্গিত দেয়।’
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রথমে কাবুলে প্রদত্ত ভোট পুনর্গণনা করা হবে ও ব্যালটগুলো খতিয়ে দেখা হবে। এরপর অন্য প্রদেশগুলো থেকে ব্যালট এনে সেগুলো গণনা করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে দুই প্রার্থীই পুনর্গণনার ফলাফল মেনে নেওয়া ও ফল ঘোষণার পর জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কাজ শুরু করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। আশরাফ গণি ভোট পুনর্গণনার প্রক্রিয়াকে নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে সমন্বিত প্রচেষ্টা বলে মন্তব্য করেন। আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ বলেন, দুই পক্ষই একটা ‘কৌশলগত ও রাজনৈতিক মতৈক্যে পৌঁছেছি।’

স্বেচ্ছামৃত্যুর পক্ষে ডেসমন্ড টুটু

ডেসমন্ড টুটু
আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের স্বেচ্ছা–মৃত্যুর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। গতকাল রোববার তিনি বলেন, গুরুতর অসুস্থ কোনো ব্যক্তির বেঁচে থাকার আশা একেবারে ফুরিয়ে গেলে তাঁর স্বেচ্ছা মৃত্যুকে তিনি সমর্থন করেন। খবর এএফপির। ক্যান্টারবুরির সাবেক আর্চবিশপ জর্জ ক্যারে গত শনিবার জানান, যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বৈধতা দিতে যে বিল উত্থাপন করা হয়েছে, তাতে তিনি সমর্থন জানাবেন। যুক্তরাজ্যের সাপ্তাহিক দি অবজারভার-এ এক লেখায় ডেসমন্ড টুটু তাঁর এই অবস্থানের ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।
লেখায় ২৮ বছর বয়সী দক্ষিণ আফ্রিকান এক যুবকের স্বেচ্ছায়মৃত্যুর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিকিৎসকেরা ওই যুবককে সুস্থ করে তোলার কোনো আশা দিতে না পারায় তিনি স্বেচ্ছায়মৃত্যুকে বরণ করেন। শান্তিতে নোবেলজয়ী ডেসমন্ড টুটু লিখেছেন, তিনি তাঁর পরিবারকে বলেছেন, জীবনের শেষ মুহূর্তে তাঁকে যেন কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা না করা হয়। লেখায় বন্ধু ও দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাঁর (ম্যান্ডেলা) চিকিৎসার সমালোচনা করেন।

নাইজেরিয়ায় অপহৃত স্কুলছাত্রীদের পরিবারের পাশে মালালা

নাইজেরিয়ায় অপহৃত ২০০র বেশি স্কুলছাত্রীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছেন পাকিস্তানের নারীশিক্ষা আন্দোলনকর্মী ও স্কুলছাত্রী মালালা ইউসুফজাই। রোববার বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নাইজেরিয়ার ইসলামি জঙ্গি সংগঠন বোকো হারাম গত এপ্রিলে ওই স্কুলছাত্রীদের অপহরণ করে।
সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন বোকো হারামের অনেক সদস্য নাইজেরিয়ায় বন্দি আছে। বন্দি ওই সহযোদ্ধাদের মুক্তি দেয়া হলে বোকো হারাম অপহৃত স্কুলছাত্রীদেরও মুক্তি দেবে বলে জানিয়েছে। অপহৃত ওই স্কুলছাত্রীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে শনিবার নিজের জন্মদিনে নাইজেরিয়া যান মালালা। নাইজেরিয়ায় পৌঁছানোর পর তিনি জানান, সাহসী ওই মেয়েদের (অপহৃত) সম্মান জানাতেই বাবার সঙ্গে তিনি নাইজেরিয়া এসেছেন। ১৭ বছর বয়সী মালালা ইউসুফজাই মেয়েদের জন্য উন্নত শিক্ষার পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০১২ সালে মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে প্রচার চালানোর কারণে তার মাথায় গুলি করে পাকিস্তানি তালেবান জঙ্গিরা।

ম্যানইউতে যাবেন না রবেন

চাইলেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিতে পারেন আর্জেন রবেন। চাইছেন না। বলছেন, বায়ার্ন মিউনিখেই ভালো আছেন। জানিয়েছেন তা লুই ভ্যান গলকেও। গল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের নতুন কোচ। এই বিশ্বকাপের সেরা পারফরম্যান্সের তালিকার শীর্ষে নাম রবেনের। দুর্ধর্ষ খেলেছেন। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও জানবাজি রেখে খেললেন।
জিতলেন ৩-০ গোলে। তারও পরে জানালেন, গল তাকে চান ম্যানইউতে। যাবেন? রবেন বলেছেন, ‘না। এটাই আমি ভ্যান গলকে বলেছি। বায়ার্নে খুব ভালো আছি আমি। তিনি আমাকে বলেছেন, ম্যানইউতে আমার জন্য জায়গা খালি থাকবে সব সময়।’ নেদারল্যান্ডসের কোচ হিসেবে এটা ছিল ভ্যান গলের শেষ ম্যাচ। সেটি জয়ের পর রবেনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন, ‘আর্জেনও জানে, তার জন্য জায়গা আছে।’ ২০০৭ সালে চেলসি ছাড়ার পর রিয়াল মাদ্রিদ, এরপর বায়ার্নে অসাধারণ পারফরম্যান্স ডাচ উইঙ্গার রবেনের। ওয়েবসাইট।

রিচির স্বামীর গোপন প্রেমিকা

বিয়ের পর সুন্দরভাবেই সংসার জীবন কাটাচ্ছেন রিচি সোলায়মান। সাংসারিক কোনো ঝামেলা নেই তার। স্বামী অফিসে যাচ্ছেন। তাকে সবকিছু গুছিয়ে দিচ্ছেন। হঠাৎ একদিন অফিসে যাওয়ার পর একটি ডাইরিতে স্বামীর সাবেক প্রেমিকার গল্প দেখতে পান রিচি। এ নিয়ে অবশ্য কোনো রাগ বা অভিমান না করেই স্বামীর সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। এক সময় তার মনে প্রশ্ন জাগে। কেন সাবেক প্রেমিকাকে বিয়ে করেননি?
এভাবে ‘গোপন কিছু কথা থাকে’ নামে একটি নাটকে স্বামীর পুরনো প্রেমের ইতিবৃত্ত খোঁজেন রিচি। মাসুম শাহরীয়ারের রচনায় এটি পরিচালনা করেছেন ফয়সাল রাজীব। নাটকে অভিনয় প্রসঙ্গে রিচি বলেন, ‘গল্পটি বেশ সুন্দর। দর্শক অনেক রহস্য দেখতে পাবেন বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে।’ এতে তার স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্যামল মাওলা। আর সাবেক প্রেমিকার চরিত্রে দেখা যাবে তমালিকা কর্মকারকে। নাটকটি চ্যানেল নাইনের ঈদ অনুষ্ঠানমালায় প্রচার হবে বলে নির্মাতা জানিয়েছেন। এ নাটক ছাড়াও ঈদ উপলক্ষে বেশ কয়েকটি নাটকের কাজ নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন রিচি। পাশাপাশি রমজান মাস উপলক্ষে দশটি চ্যানেলে প্রচার চলতি একটি রান্নার অনুষ্ঠানের উপস্থাপনাও করছেন তিনি।

গাজায় ধ্বংসলীলা ও হত্যাকাণ্ডের হামলা কেন? by আলী রীয়াজ

গাজায় অব্যাহত ইসরায়েলি বিমান হামলায় সেখানে যে এক মানবিক বিপর্যয়ের সূচনা হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কয়েক দিন ধরে বিমান হামলার পর ইসরায়েলি প্রশাসন এখন স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে। গাজা আবার দখলের আগ্রহ ইসরায়েলের না থাকলেও নিদেনপক্ষে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও সেখানে সেনা পাঠিয়ে ধ্বংসলীলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানোর একধরনের উৎসাহ ইসরায়েলি প্রশাসনের মধ্যে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিমান হামলার বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীতে সমালোচনা ও ধিক্কার উঠেছে; কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন যে তিনি এতে কোনো চাপ অনুভব করছেন না। উপরন্তু তাঁদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব, অন্য যেকোনো সময়ের মতোই উগ্রভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

গাজায় যুদ্ধ নতুন কোনো ঘটনা নয়; এক অর্থে গাজা সব সময়ই যুদ্ধাবস্থার মধ্যে থাকে। গাজা হামাসের নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকে এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি হয়েছে কয়েক দফা। প্রতিবারই কোনো না কোনো আশু ঘটনাকে কেন্দ্র করে গাজায় ইসরায়েলিদের আক্রমণের সূচনা হয়। আর সেই আক্রমণের কারণ বা প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমরা দেখতে পাই হামাসের পক্ষ থেকে ইসরায়েলে রকেট নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।যেমন এ বছরের এপ্রিল মাসেও এ ধরনের রকেট নিক্ষেপ এবং ইসরায়েলি বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনার পেছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যে ঘটনাপ্রবাহই থাকুক না কেন, তার মাশুল গুনতে হয় সাধারণ মানুষকে। এ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে আমরা জাতিসংঘের আলোচনা, মহাসচিবের অনুরোধ এবং বিভিন্ন ধরনের হুঁশিয়ারি শুনতে পাই। এগুলো যে নেহাতই আনুষ্ঠানিকতা, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন হয় না।
এ দফায় যুদ্ধের ‘কারণ’ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে তিনজন ইসরায়েলি তরুণের অপহরণ এবং হত্যার ঘটনা। তাঁদের হামাস অপহরণ করেছিল বলে ইসরায়েলি অভিযোগ হামাস অস্বীকার করেছে। কিন্তু এটা অস্বীকারের উপায় নেই যে ওই তরুণেরা প্রাণ হারিয়েছেন। এ ঘটনার পর ইসরায়েলিরা গাজায় কয়েক শ হামাস কর্মীকে গ্রেপ্তার করে এ অভিযোগে যে নিহত তিনজন তরুণের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্তদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ধারণা, ইসরায়েলিরা এ ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সবাইকে শাস্তি দিচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ইসরায়েলি চরমপন্থীরা পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে একজন ফিলিস্তিনি তরুণকে অপহরণ করে পুড়িয়ে মেরেছে। নিহত তিন ইসরায়েলি তরুণের একজন মার্কিন নাগরিকও বটে; অন্যদিকে যে ফিলিস্তিনি তরুণকে হত্যা করা হয়েছে, তাঁর চাচাতো ভাইকে—সেও একজন মার্কিন নাগরিককে—ইসরায়েলি পুলিশ আটক করার সময় এবং আটক করার পরে নির্যাতন চালিয়েছে বলে প্রমাণসমেত অভিযোগ পাওয়া গেছে। এগুলো হলো এ দফার যুদ্ধাবস্থার আশু প্রেক্ষাপট। ইসরায়েলিরা অবশ্য দাবি করে যে ১১ জুন থেকে হামাস দফায় দফায় রকেট নিক্ষেপ করে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করায় বিমান হামলার সূচনা করেছে তারা।
কিন্তু যেকোনো যুদ্ধ, বিশেষত ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনিদের মধ্যকার প্রত্যক্ষ সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়া বা তার তীব্রতা বাড়ানোর পেছনে কেবল আশু কারণ কাজ করে না। গত এক দশকে যতবার আমরা যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতে শুনেছি, তার পেছনে সাধারণত আশু বিষয়ের চেয়ে অন্যান্য কারণ বেশি কাজ করেছে।
এ কারণগুলো দুই পক্ষের দিক থেকেই সৃষ্ট।ইসরায়েলের এ ধরনের সামরিক অভিযানের পেছনে রয়েছে নেতানিয়াহু সরকারের নিজস্ব দুর্বল অবস্থান। তাঁর সরকারের অংশীদার যে দক্ষিণপন্থী দল—নাফতালি বেনেতের নেতৃত্বাধীন ‘জিউয়িশ হোম’ (বাইয়েত ইয়ুহিদি)—তারা কয়েক মাস ধরেই ফিলিস্তিনি প্রশ্নে তাদের কঠোর অবস্থানের কারণে প্রধানমন্ত্রীর ওপরে চাপ দিয়ে আসছিল। এ বছরের মে মাসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির সফরের সময় তাঁর করা এক মন্তব্য নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন তীব্র হয়। জন কেরি মন্তব্য করেছিলেন যে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত না হলে ইসরায়েল এক বর্ণবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। জন কেরি পরে তাঁর এ বক্তব্য থেকে সামান্য সরে এলেও তাঁর বক্তব্য ইসরায়েলি রাজনীতিতে ঝড় তোলে। একইভাবে এ বছরের গোড়ায় ইসরায়েলি পার্লামেন্টে এ ভাষণ দেওয়ার সময় ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট মার্টিন সুলজ অভিযোগ করেন যে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের চেয়ে বেশি পানি ব্যবহার করছে। তিনি বলেন যে ‘ফিলিস্তিনি তরুণেরা আমাকে প্রশ্ন করেছে যে যেখানে ইসরায়েলিরা দিনে ৭০ লিটার পানি ব্যবহার করে, সেখানে ফিলিস্তিনিরা করে ১৭ লিটার।’ এ বক্তব্যের প্রতিবাদে বেনেতের দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করে। মি. বেনেত সরকারের অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রীও। এসব টানাপোড়েনের কারণে নেতানিয়াহুর সরকারকে সব সময়ই ফিলিস্তিন প্রশ্নে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। প্রায় এ ধরনের পরিস্থিতিতেই আমরা ২০১২ সালে গাজায় ইসরায়েলি হামলার ঘটনা ঘটতে দেখেছি। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যখনই সংকট দেখা দেয়, তখনই গাজায় অভিযান চালিয়ে ক্ষমতাসীনেরা তাদের শক্তি সংহত করার ও জনসমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করে থাকে।
সম্প্রতি নেতানিয়াহু এবং তাঁর দল নিজেরাও একধরনের চাপ অনুভব করছে। হামাস এবং ফাতাহ গোষ্ঠীর মধ্যে মতৈক্যের কারণে যে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠিত হয়েছে, তা নেতানিয়াহুর সরকারকে বিব্রত করেছে। এ সরকার গঠনের কারণে ফিলিস্তিনিদের শক্তি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়নি; কিন্তু ইসরায়েলের কোনো কোনো মহলের ধারণা যে ঐক্য তৈরি হয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর পরোক্ষ প্রচেষ্টায় এবং তাতে করে ফিলিস্তিনিদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে। গত প্রায় বছর খানেক ধরে ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকায় ইসরায়েলে এ রকম ধারণা আছে যে ফিলিস্তিনিদের এ ঐক্যের পেছনে আছে মার্কিন সমর্থন। নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েল সরকারের ধারণা যে এখন তারা এ যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসতে বাধ্য হবে। ইতিমধ্যেই তার লক্ষণ আমরা দেখতে পেয়েছি। কূটনৈতিকভাবে খানিকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নেতানিয়াহু সরকার সম্ভবত মনে করে এ যুদ্ধ থামাতে এগিয়ে আসার মধ্য দিয়ে বিরাজমান দূরত্বের অবসান ঘটবে।
হামাসের পক্ষ থেকেও এ যুদ্ধে কৌশলগতভাবে লাভবান হওয়ার আশা করার কারণ রয়েছে। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের ক্ষমতাচ্যুতি, তার বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই হামাস খানিকটা সংকটের মধ্যে আছে। মিসরের সঙ্গে গোপন যেসব সুড়ঙ্গ ছিল সিসি সরকার তার অনেকগুলোই বন্ধ করে দিয়েছে, যা হামাসের অস্ত্র সরবরাহকে বিঘ্নিত করেছে। শুধু তা-ই নয়, এসব পথে আসা বিভিন্ন সামগ্রীর ওপর কর আরোপ করে হামাস তাদের সংগঠন ও প্রশাসন চালাতে সক্ষম হচ্ছিল। হামাসের মধ্যে এ ধারণা রয়েছে যে এ ধরনের হামলার মুখে মিসর সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হবে এবং সুড়ঙ্গগুলো আবার চালু হবে। শুধু তা-ই নয়, তারা জানে যে শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের যুদ্ধবিরতি করতে হলে ইসরায়েলকে মিসরের মাধ্যমেই তা করতে হবে। মিসরের এ ভূমিকার কারণেই ইতিমধ্যে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন মিসরের প্রেসিডেন্টের
সঙ্গে কথা বলেছেন। এ পদক্ষেপ নিতে হলে সিসি সরকারকে হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। হামাসের জন্য সেটা ইতিবাচক হবে বলেই হামাস নেতৃত্বের ধারণা। হামাসের এ ধারণাও ভুল নয় যে এ ধরনের কোনো যুদ্ধবিরতি যদি হয়
তবে তারা ইসরায়েলের আগের প্রতিশ্রুত কিছু বিষয় অর্জন করতে পারবে এবং সম্ভবত আরও নতুন কিছু দাবিও তারা সংযুক্ত করতে পারবে।
এ যুদ্ধের ফলে মিসরের সঙ্গে হামাসের সম্পর্কের উন্নতি হবে, সেটা অবশ্য ইসরায়েলিরা মানতে রাজি নন। ইসরায়েল এ দফায় গাজা হামলার সময় এ আশাই করেছে যে যেহেতু মুসলিম ব্রাদারহুডের শক্তি ধ্বংস করতে চায় মিসর, সেহেতু তারা প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে সমর্থন পাবে। মিসরে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত জেরুজালেম পোস্ট-এর সংবাদদাতাকে সে কথা বলেছেনও। সিসি সরকার যে সে রকম চাইতে পারে, এটা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে না; কিন্তু মিসরের কোনো সরকারের পক্ষেই প্রত্যক্ষভাবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত মিসরের সরকার একটা যুদ্ধবিরতির চেষ্টায় উদ্যোগী হতে বাধ্য হবে।
গাজায় চলমান যুদ্ধ নতুন নয়। শিশু ও নারীসহ শতাধিক ফিলিস্তিনি নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা শুক্রবারের খবর; এ সংখ্যা যে আরও বাড়বে তা অনুমান করা যায়। অমানবিক হামলার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ; তাদের প্রাণের বিনিময়ে রাজনীতির দাবাখেলা চলছে। আগেও আমরা তা দেখেছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো এর শেষ কোথায়? প্রতি দুই বছরে একবার করে বড় আকারের যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠবে, শত শত মানুষের প্রাণ সংহার হবে, পৃথিবীজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠবে এবং শেষ পর্যন্ত একটা সাময়িক যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে তার আপাত অবসান ঘটবে। এ বৃত্তচক্র ভাঙার একটিমাত্র উপায়, সেটা সবাই জানেন; একটি বাস্তবোচিত টেকসই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। সেই সমাধানই কেবল ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার, ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। এর কোনো বিকল্প নেই। মধ্যপ্রাচ্যের সে দেশগুলো এ কথা বিশ্বাস করে, তারা যতক্ষণ না পর্যন্ত কার্যকর ভূমিকা নিচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এ লক্ষ্যে অগ্রগতি হবে না।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

মার্কিন বিভ্রমের খপ্পরে অস্ট্রেলিয়া by জোসেফ ই স্টিগলিৎজ

ভালো হোক বা মন্দ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি দুনিয়ার অন্যান্য জায়গায় অনুসরণের একটি চল আছে। তা সেটা প্রাসঙ্গিক হোক বা না হোক। অস্ট্রেলিয়ার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবটের সরকারও সম্প্রতি সে রকম একটি নজির স্থাপন করেছে।
পৃথিবীর নানা দেশের মতো রক্ষণশীল সরকারগুলো সরকারি ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে। কারণ হচ্ছে, আর্থিক ঘাটতি নাকি তাদের ভবিষ্যতের ওপর কালো ছায়া ফেলছে। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের ক্ষেত্রে এটার কোনো বাস্তবতা নেই, তবু এই অ্যাবট সরকার মার্কিন এই নীতি আমদানির জন্য মুখিয়ে আছে।
এখন কথা হচ্ছে, কেউ যদি হার্ভার্ডের অর্থনীতিবিদ কারমেন রেইনহার্ট এবং কেনেথ রগঅফের তত্ত্ব মেনেও নেন যে সরকারি ঋণ বেশি থাকলে প্রবৃদ্ধি কমে যায়, তাহলেও অস্ট্রেলিয়ার এই পথে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। তদুপরি, এই তত্ত্ব এখনো প্রমাণিত নয় এবং বাজারে এটা সমালোচিতও বটে। অস্ট্রেলিয়ার ঋণ/জিডিপির অনুপাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভগ্নাংশেরও কম। আর ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তা সর্বনিম্ন।
দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ একটি বড় চিন্তার বিষয়। এর মধ্যে জনগণের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগও রয়েছে: শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো। এ ধরনের বিনিয়োগে সর্বস্তরের জনগণের প্রতিভা বিকাশের পথ উন্মুক্ত হয়।
মার্কিন নীতির আদলে অ্যাবটের সরকারের প্রস্তাবিত ‘সংস্কার’-এ কিছু বৈপরীত্য রয়েছে। সর্বোপরি, মার্কিন নীতি সে দেশের অধিকাংশ জনগণের কোনো কাজে আসছে না। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য আয়ের মানুষের আয় ২৫ বছর আগের তুলনায় কমে গেছে। তার মানে এই নয় যে উৎপাদনশীলতা এক জায়গায় এসে থমকে গেছে, বরং এটা হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে মজুরি না বাড়া।
অস্ট্রেলীয় মডেল অনেক কার্যকর। বাস্তবে পণ্যনির্ভর অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়াই অন্যতম দেশ, যার প্রাকৃতিক সম্পদের কোনো ঘাটতি নেই। সে দেশের সমৃদ্ধির ভাগীদার অনেকেই। গত এক দশকে সে দেশের মধ্য আয়ের মানুষের বার্ষিক আয় বৃদ্ধির হার ৩ শতাংশেরও বেশি। ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় তা প্রায় দ্বিগুণ।
তবে অস্ট্রেলিয়ার যে পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, তাতে সেখানকার জনগণের আয়ের বৈষম্য আরও কম হওয়া উচিত। প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক জনগণ, আর এই সম্পদ থেকে যে ‘ভাড়া’ আসে তা সে দেশের অসমতা কমাতে ব্যবহার করা উচিত। আর প্রাকৃতিক সম্পদের ভাড়ার ওপর উচ্চ হারের কর বসানো সঞ্চয় ও কাজের ওপর কর বসানোর মতো নয় (কর ফাঁকির উদ্দেশ্যে লোহার আকরিক ও প্রাকৃতিক গ্যাস এক দেশ থেকে আরেক দেশে নেওয়া যায় না)। কিন্তু অসমতা পরিমাপক গিনি কো-এফিসিয়েন্ট-এর বিচারে অস্ট্রেলিয়ায় অসমতার অবস্থা নরওয়ের চেয়ে তিন গুণ খারাপ। নরওয়ে তার সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনেকাংশে গণতান্ত্রিক, দেশের বেশির ভাগ মানুষ সেখানকার সম্পদের সুবিধাভোগী।
অনেকেই বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কী ঘটছে অ্যাবটের সরকার সে বিষয়ে আসলেই অবগত কি না? তিনি কি জানেন, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০-এর দশকে নিয়মনীতি শিথিল ও উদারীকরণ শুরু হলে দেশটির প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করে? আর যেটুকু প্রবৃদ্ধি হয়, তার সুফল সমাজের উচ্চকোটির অল্প কিছু মানুষের ঘরেই পৌঁছায়। তিনি কি জানেন, এই ‘সংস্কার’ শুরু হওয়ার আগে ৫০ বছর যুক্তরাষ্ট্রে কোনো আর্থিক সংকট ছিল না। অথচ সারা দুনিয়ায়ই এটা এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই শিথিলকরণের ফলে সে দেশের আর্থিক খাত ফুলে–ফেঁপে ওঠে। বহু প্রতিভাবান তরুণ এই আর্থিক খাতের প্রতি আকৃষ্ট হন, অন্যথায় তাঁরা এর চেয়ে অনেক উৎপাদনশীল কাজে নিজেদের সৃজনশীলতা ও শক্তি নিয়োগ করতে পারতেন। আর্থিক খাতে তাঁরা নিত্যনতুন উদ্ভাবন ঘটিয়েছেন, এতে তাঁরা ব্যাপক টাকা বানাতে পেরেছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ও বৈশ্বিক অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সরকারি সেবার ব্যাপারে দুনিয়ার অনেক দেশই ঈর্ষাকাতর। এর স্বাস্থ্যসেবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো, খরচও সামান্য। সেখানে আয়নির্ভর শিক্ষাঋণ-সুবিধা রয়েছে।এতে ঋণগ্রহীতারা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের ঋণ পরিশোধ করতে পারে। আর তাদের আয় যদি খুবই কমে যায় (তারা সাধারণত নিম্ন বেতনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বেছে নেয়, যেমন শিক্ষা ও ধর্মীয় খাতে), তাহলে সরকার ক্ষেত্রবিশেষে ঋণ মওকুফও করে দেয়।
দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তফাত চোখধাঁধানো। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ছাত্রদের ঋণের পরিমাণ ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি, যেটা ক্রেডিট কার্ডের সম্মিলিত ঋণকেও ছাড়িয়ে গেছে। এটা যেমন ছাত্রদের জন্য, তেমনি মার্কিন অর্থনীতির জন্যও বোঝা হয়ে উঠছে। উচ্চশিক্ষায় মার্কিন মডেল ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তরুণদের ক্ষেত্রে সমসুযোগ সবচেয়ে কম। সে দেশের তরুণেরা তাদের বাবা-মায়ের আয় ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, অন্য যেকোনো উন্নত দেশের তুলনায়।
অ্যাবটের উচ্চশিক্ষা সম্পর্কিত ধারণা থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সফলতার কারণ সম্পর্কে তাঁর বোঝাপড়া নেই বললেই চলে। প্রতিযোগিতামূলক ফি বা মুনাফামুখিনতার কারণে হার্ভার্ড, ইয়েল বা স্ট্যানফোর্ডের প্রতিষ্ঠানগুলো মহান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়নি। সেখানকার এই মহান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনোটিই মুনাফামুখী নয়। সেগুলো সবই অলাভজনক, এগুলো চলে সরকারি অনুদানে বা বৃত্তিতে বা প্রাক্তন ছাত্রদের ও ফাউন্ডেশনগুলোর অর্থানুকূল্যে।
এখানে ভিন্ন ধরনের এক প্রতিযোগিতা আছে। তারা অন্তর্ভুক্তি ও বৈচিত্র্য অর্জনের প্রয়াস পায়। তারা গবেষণায় সরকারি বরাদ্দের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। যুক্তরাষ্ট্রের লাভজনক ও স্বল্প নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দুই ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জন করেছে: দরিদ্র পরিবার থেকে আসা তরুণদের শোষণ করা, কোনো মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত না করেই অতি উচ্চ ফি ধার্য করা, সরকারি অর্থপ্রাপ্তির জন্য নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করা এবং শোষণের সংস্কৃতি বজায় রাখা।
অস্ট্রেলিয়া যে সফলতা লাভ করেছে তার জন্য দেশটি গর্ব করতেই পারে। দুনিয়ার অন্যদেরও উচিত, তার কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভুল পাঠ ও আদর্শের কড়া মিশেল ঘটিয়ে সেখানকার নেতৃত্ব যদি এমন কোনো রোগের চিকিৎসা করতে নেমে যান, যার কোনো অস্তিত্বই নেই, তাহলে সেটা চরম লজ্জারই বিষয় হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

জোসেফ ই স্টিগলিৎজ: অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক।