Showing posts with label আমদানি ও রপ্তানি. Show all posts
Showing posts with label আমদানি ও রপ্তানি. Show all posts

Wednesday, April 29, 2026

ভারতের মথ ডাল এ দেশে এসে মুগ ডাল হয়ে যাচ্ছে কেন by মাসুদ মিলাদ

বাজারে খুবই অপরিচিত ‘মথ’ ডাল নিয়ে এখন অনেকের কৌতূহল। এই ডালে ক্ষতিকর রং মিশিয়ে মুগ ডাল নামে বিক্রি হচ্ছিল। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বাজার থেকে নমুনা পরীক্ষা করে তার প্রমাণও পেয়েছে। এরপরই ক্রেতাদের সচেতন করতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে সংস্থাটি। সংস্থাটির সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয় প্রতিটি সরকারি ওয়েবসাইটে।

সরকারি সতর্কবার্তার আগে নাম না–জানা এই ডাল কোথায় থেকে আমদানি হয়, কীভাবে বাংলাদেশে এল, কারা আমদানি করে, কেনই–বা মুগ ডাল হিসেবে বিক্রি হয়, তা নিয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানা গেল নানা তথ্য।

শুরুতে জেনে নেওয়া যাক, এই ডাল কোথায় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যানে দেশে এই ডাল উৎপাদনের কোনো তথ্য নেই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, মথ ডাল খরা সহনশীল ডাল–জাতীয় ফসল। এটি ভারতের স্থানীয় ডাল। বিশ্বে মথ ডালের সিংহভাগ উৎপাদন হয় ভারতে।

ভারতের বাইরে দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে মথ ডাল উৎপাদন হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এটি পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। ভারতের মথ ডালের ৯৫ শতাংশের বেশি উৎপাদন হয় রাজস্থানে মরু এলাকায়। রাজস্থান সরকারের কৃষি পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্থানে গত ২০২৩–২৪ মৌসুমে ৪ লাখ ১৯ হাজার টন মথ ডাল উৎপাদিত হয়। রাজস্থানে এই ডাল বেশ জনপ্রিয়। এই ডাল দিয়ে পাঁপড় বানানো হয়।

বাংলাদেশে কখন আমদানি শুরু

বাংলাদেশে মথ ডাল আমদানি হচ্ছে শুধু ভারত থেকেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশে মথ ডাল আমদানি শুরু হয়েছে। এর আগে গত পাঁচ বছরে এনবিআরের তথ্যে মথ ডাল আমদানির কোনো রেকর্ড নেই।

এনবিআরের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজশাহীর বিসমিল্লাহ ফ্লাওয়ার মিল হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে মথ ডালের প্রথম চালান আমদানি করে। প্রথম চালানে ৬২ টন মথ ডাল আমদানি হয়। ২০২৪ সালে সব মিলিয়ে ৮ হাজার ৫১৬ টন মথ ডাল আমদানি হয়। তবে হঠাৎ এ বছর মথ ডালের আমদানি অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। যেমন চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে মথ ডাল আমদানি হয়েছে ২০ হাজার ৬৯১ টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০৮ শতাংশ বেশি।

বিসমিল্লাহ ফ্লাওয়ার মিলের হাত ধরে আমদানি শুরু হওয়া এ পণ্যটি এখন আমদানি করছে ৫৯টি প্রতিষ্ঠান। ভোমরা, হিলি ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে মূলত ভারত থেকে এই ডাল আমদানি হচ্ছে।

মথ ডাল কেন মুগ ডাল হিসেবে বিক্রি

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, মুগ ডাল কিছুটা গোলাকার। আর মথ ডাল কিছুটা লম্বা আকৃতির। এরপরও হলুদ রং মেশানো মথ ডাল ও মুগ ডাল পাশাপাশি রাখা হলে তা শনাক্ত করা কঠিন। ব্যবসায়ীরা জানান, মুগ ডালের চেয়ে মথ ডালের আমদানির মূল্য কম। এ কারণে বেশি দামের জন্য মথ ডালকে মুগ ডাল হিসেবে খুচরায় বিক্রি হয়।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানিতে কেজিপ্রতি দাম পড়েছে ১ ডলার ৯ সেন্ট বা ১৩৩ টাকা। অন্যদিকে মথ ডাল আমদানি হয়েছে কেজিপ্রতি ৮৫ সেন্ট বা ১০৪ টাকায়। অর্থাৎ মুগ ডালের চেয়ে মথ ডাল আমদানিতে কেজিতে ২৯ টাকা কম পড়ছে। খুচরা বাজারে মুগ ডাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। অন্যদিকে মুগ ডাল হিসেবে মথ ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। দামের পার্থক্যের কারণে তাই মথ ডালই বেশি বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে মথ ডালের আমদানিকারক নিউ মাতৃভান্ডারের কর্ণধার বাদল তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের রাজস্থানে উৎপাদন হওয়া এই ডাল দিল্লিতে বড় কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপরই আমদানি হয়। আগের কিছু চালানে রং মেশানো থাকলেও এখন যেসব মথ ডাল আমদানি হচ্ছে, সেগুলোয় কোনো রং নেই। মুগ ডালের চেয়ে দাম কম থাকায় মথ ডালের চাহিদা বেশি বলে জানান তিনি।

মুগ ডাল আমদানি কমছে, বাড়ছে মথ ডাল

পরিসংখ্যান ব্যুরো ও এনবিআরের হিসাবে দেখা যায়, দেশে বছরে গড়ে ৪৫ হাজার টন মুগ ডাল উৎপাদন হয় এবং বছরে গড়ে ৩০ হাজার টন মুগ ডাল আমদানি হয়। তবে মথ ডাল আমদানি শুরুর পর মুগ ডাল আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, বাজারে মুগ ডালের চাহিদা মেটাচ্ছে মূলত মথ ডাল। যেমন ২০২২–২৩ অর্থবছরে ২১ হাজার টন মুগ ডাল আমদানি হয়। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩–২৪–এ মুগ ডাল আমদানি কমতে শুরু করে। ওই বছরে মথ ডাল আমদানি শুরু হয়। তাতে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানি হয় প্রায় ১৮ হাজার টন। আর মথ ডাল আমদানি হয় ৯৯৬ টন।

গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানি আরও কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৯১৩ টনে। এ সময়ে ২১ হাজার ৪১৪ টন মথ ডাল আমদানি হয়। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আমদানির তালিকা থেকে কার্যত উধাও হয়ে গেছে মুগ ডাল। এ সময় পাঁচটি চালানে মুগ ডাল আমদানি হয়েছে ২১৩ টন। অন্যদিকে মথ ডাল আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ৭৯৯ টন।

রং মেশানো ডাল বিক্রি বন্ধে অভিযান

রং মিশিয়ে বাজারে ডাল বিক্রির অভিযোগে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে। গত ২৮ অক্টোবর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, মুগ ডাল নামে বিক্রি হওয়া ৩৩টি নমুনার ১৮টিতে টারটাজিন নামের একধরনের হলুদ রঙের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এরপরই অভিযান শুরু হয়। এখন প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও এ ধরনের অভিযান পরিচালনা হচ্ছে। যেমন গত বুধবার (৫ নভেম্বর) মথ ডালে রং মিশিয়ে মুগ ডাল বলে বিক্রির দায়ে টাঙ্গাইল শহরের ছয়আনী বাজারে দুই ব্যবসায়ীকে লাখ টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ডাল বা যেকোনো শস্যদানায় রং মেশানোর অনুমোদন নেই। টারটাজিন রং ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে আমদানির সময় মুগ ও মথ ডালে রং পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং রং মেশানো ডাল যাতে আমদানি না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

মথ ডাল
মথ ডাল। ছবি প্রথম আলো

Tuesday, February 10, 2026

গালফ ফুড ফেয়ারে ৫৫ লাখ ডলারের খাদ্যপণ্য রপ্তানি ক্রয়াদেশ পেল প্রাণ

প্রকাশ ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ঃ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খাদ্যপণ্যের মেলা গালফ ফুড ফেয়ারে ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভালো সাড়া পেয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ।

এবারের মেলায় প্রাণ প্রায় ৫৫ লাখ ডলার রপ্তানি ক্রয়াদেশ পেয়েছে। যা দেশীয় মুদ্রায় ৬৭ কোটি ১০ লাখ টাকার সমান। এসব ক্রয়াদেশ আমেরিকা, চীন, সৌদি আরব, ইরাক, সিরিয়া, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, সোমালিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে। বিস্কুট, নুডলস, বেভারেজ ও কনফেকশনারি পণ্যের ক্রয়াদেশ বেশি পেয়েছে প্রাণ।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী গালফ ফুড ফেয়ার-২০২৬ শেষ হচ্ছে আজ শুক্রবার। এ বছর মেলায় বিশ্বের ১৯৫টি দেশ থেকে আট হাজারের বেশি স্টলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য প্রদর্শন করে। প্রাণ গ্রুপ মেলায় প্রায় ৫০০ ধরনের খাদ্যপণ্য প্রদর্শন করে। প্রাণের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ শুক্রবার বিষয়টি জানানো হয়।

এ বিষয়ে প্রাণ গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক (রপ্তানি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, সেন্ট্রাল ও সাউথ আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়াতে আমরা কাজ করছি। এ লক্ষ্যেই আমরা গালফ ফুড ফেয়ারে প্রতিবছর অংশ নিচ্ছি। এই মেলায় পণ্য উৎপাদনকারী ও ডিস্ট্রিবিউটর প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন পণ্য ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা পায়। এ ছাড়া ভোক্তার আচরণে বিশ্বব্যাপী কী ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে সেটি বোঝা যায়।’

প্রাণের নির্বাহী পরিচালক গোলাম রসুল (রপ্তানি, ইউরোপ ও আমেরিকা) বলেন, এবারের মেলায় ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০০ আমদানিকারক প্রাণের স্টল পরিদর্শন করেছেন। আমাদের স্টলে রয়েছে জুস ও বেভারেজ, বিস্কুট ও বেকারি, স্ন্যাকস, নুডুলস, মসলা, কালিনারি ও ফোজেন ফুডস ক্যাটাগরির পণ্য প্রদর্শন করা হয়েছে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে প্রাণের পণ্য পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য। পাশাপাশি প্রাণকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি খাদ্যপণ্য প্রতিষ্ঠানের একটি হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি। গালফ ফুড ফেয়ার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বছর আমরা ভালো ক্রয়াদেশ পেয়েছি। আশা করছি, ক্রেতাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করে দেশের রপ্তানি আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারব।

গালফ ফুড ফেয়ারে প্রাণের স্টল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে
গালফ ফুড ফেয়ারে প্রাণের স্টল। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে। ছবি: প্রাণের সৌজন্যে

Friday, December 12, 2025

তুলা আমদানি: ভারতের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে বাংলাদেশ

ইন্ডিয়া টুডের রিপোর্টঃ তুলা আমদানিতে এখন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় উৎস হলো ব্রাজিল। এর মধ্য দিয়ে এ খাতে ভারতের কাছ থেকে সরে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ‘বাংলাদেশ মুভস অ্যাওয়ে ফ্রম ইন্ডিয়া, মেকস ব্রাজিল ইটস টপ কটন সোর্স’ শীর্ষক রিপোর্টে এ কথা বলেছে ইন্ডিয়া টুডে। এতে আরও বলা হয়, বিশ্বের অন্যতম টেক্সটাইল বাজারের ওপর ভারতের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশে কাঁচা তুলার বৃহত্তম উৎস হয়ে উঠেছে ব্রাজিল। চীনের পর বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানিকারক বাংলাদেশ। তবে ভারতকে টপকে ব্রাজিলের দিকে মনোনিবেশ করা হয়েছে বাংলাদেশে শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের কয়েক মাস পরে। সেখানে ২০২৪ সালে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের (ইউএসডিএ) এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ভারতকে টপকে বাংলাদেশে শীর্ষ সরবরাহকারী দেশ হয়ে উঠেছে ব্রাজিল। ওই রিপোর্টে বাংলাদেশে শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের বিষয়েও বলা হয়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে তুলা বা সুতা সরবরাহের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী এখনও ভারত। ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরে বাংলাদেশে মোট তুলা বা সুতা আমদানির শতকরা প্রায় ৮২ ভাগ এসেছে ভারত থেকে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মোট রপ্তানি আয়ের শতকরা কমপক্ষে ৮০ ভাগ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, এই রপ্তানি থেকে আসে দেশের বার্ষিক জাতীয় প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) শতকরা প্রায় ১০ ভাগ। তৈরি পোশাক খাতে নিয়োজিত আছেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। এর মধ্যে বেশির ভাগই নারী। ২০২৪-’২৫ মার্কেটিং বছরে (আগস্ট ২০২৪-জুলাই ২০২৫) রেকর্ড ৮.২৮ মিলিয়ন বেল তুলা বা সুতা আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ব্রাজিল সরবরাহ দিয়েছে ১.৯ মিলিয়ন বেল। এটা মার্কেটের শতকরা ২৫ ভাগ শেয়ারের সমান।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি মন্ত্রণালয় ডিসেম্বরে প্রকাশিত রিপোর্টে বলেছে, এ সময়ে ১.৪ মিলিয়ন বেল তুলা সরবরাহ দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে নেমে গেছে। ঠিক এক বছর আগে ভারত ১.৭৯ মিলিয়ন বেল রপ্তানি করে শীর্ষে ছিল। তখন রপ্তানিতে শতকরা ২৩ ভাগ ছিল ভারতের। বাংলাদেশে স্পিনিং শিল্পে কাঁচা তুলা দুই রকম সুতা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তা হলো সুতির সুতা এবং মিশ্র সুতা। ২০২৪-২৫ বিপণন বছরে বাংলাদেশের মোট তুলা আমদানি গত বছরের তুলনায় ৫.২ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউএসডিএ’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ সালে যেখানে ৭.৮ মিলিয়ন বেল তুলা আমদানি হয়েছিল, সেখানে এ বছরে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে কাঁচা তুলার সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে উঠে এসেছে ব্রাজিল। যুক্তরাষ্ট্র (৭ ভাগ শেয়ার), অস্ট্রেলিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকার কয়েকটি দেশও প্রধান সরবরাহকারী। 

mzamin

Tuesday, April 29, 2025

নানা বিপত্তির মাঝেও বাড়ছে পোশাক রপ্তানি

পোশাক শিল্পে শ্রমিক অসন্তোষে কারখানা বন্ধসহ নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা ও নানা বিপত্তির মাঝেও নতুন ও পুরাতন অর্থাৎ প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউরোপের বাজারেও পোশাক রপ্তানিতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়কালে ৯ মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০.৮৪ শতাংশ বেড়ে ৩০.২৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পেছনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা মূল অবদান রেখেছে। এ সময়ে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৪৯.৮২ শতাংশই হয়েছে ইইউতে। এ সময়ে ইইউ থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ১৫.০৭ বিলিয়ন ডলার, আগের গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১.৩১ শতাংশ বেশি। জুলাই-মার্চ সময়ে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক বাজার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে এর চেয়েও বেশি ১৭.২৩ শতাংশ। এ সময় দেশটিতে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানি ছিল ৫.৭৪ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাজ্য ও কানাডায় রপ্তানি হয়েছে যথাক্রমে ৩.৩৬ বিলিয়ন ও ৯৬৩.৮৫ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে কানাডায় রপ্তানিতে ১৫.৬৬ শতাংশ ও যুক্তরাজ্যে ৪.১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ও বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সূত্র জানায়, কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকে দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হয়। ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। এর মধ্যে গাজীপুর ও ঢাকার সাভারে শ্রমিক অসন্তোষের বেশ কয়েকদিন অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ থাকে; উৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান এ খাতের কর্মকাণ্ড।
জানা গেছে, শ্রমিক আন্দোলন, কারখানা বন্ধ, অর্ডার বাতিল হওয়া, কারখানার মালিক পলাতক, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপসহ নানা সংকটেও পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। এর কারণ পুরনো বাজারগুলো পোশাক রপ্তানি বাড়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। অপ্রচলিত বাজারেও পোশাক রপ্তানি দিন দিন বাড়ছে। রপ্তানি বাড়ায় খুশি এ খাতের রপ্তানিকারকরা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্যনীতি অর্থাৎ ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কার শেষ পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে চিন্তিত সবাই।
২৭ দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে এই বাজার থেকে। ২০২৪ সালের ৯ মাস (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত ২.০৬ শতাংশ নেতিবাচক (ঋণাত্মক) প্রবৃদ্ধি ছিল। বছরের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রপ্তানি বাড়ায় শেষ পর্যন্ত ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে শেষ হয়েছিল বছর। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান অফিসের (ইউরোস্ট্যাট) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই বছরের প্রথম দুই মাসে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকরা ৩৬৯ কোটি ৩৩ লাখ (৩.৬৯ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে এই বাজারে ২৬৯ কোটি ৫৮ লাখ (২.৬৯ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল।
প্রকাশিত ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসে ইইউ’র কোম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশ থেকে ১ হাজার ৬০৯ কোটি ৮২ লাখ (১৬.০৯ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে। এই আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭.৮১ শতাংশ বেশি। ইইউতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। চীন সবার শীর্ষে। তৃতীয় তুরস্ক।
এদিকে একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। মোট রপ্তানি আয়ের ২০ শতাংশের মতো আসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির এই দেশ থেকে। অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০২২ সালে এই বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৩৬ শতাংশ বেড়ে ৯৭৩ কোটি (৯.৭৩ বিলিয়ন) ডলারে উঠেছিল। পরে নেতিবাচক ধারা চলে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। তবে বছরের শেষ দিকে নামমাত্র প্রবৃদ্ধি দিয়ে শেষ হয়েছিল বছর। গত বছর বাংলাদেশ থেকে ৭৩৪ কোটি (৭.৩৪ বিলিয়ন) ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে, যা ছিল ২০২৩ সালের তুলনায় ০.৭৫ শতাংশ বেশি।
ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল বাংলাদেশে; যুক্তরাষ্ট্রের আমদানিকারকদের কাছ থেকে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ স্থগিতের নির্দেশনা আসতে শুরু করে। পাল্টা শুল্ক তিন মাস স্থগিতের পর অবশ্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি উল্লম্ফন দিয়ে শুরু হয়েছে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি এই দুই মাসে ১৫০ কোটি (১.৫০ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, যা গত বছরের এই সময়ের চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি।
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এরপরও রপ্তানি আয় বাড়ায় আমরা খুশি। ২০২৫ সালটা ভালোই শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে বিশ্বজুড়ে রীতিমতো বাণিজ্য যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়ে ঝড় তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এটার পরিণতি কী হবে, তা আমরা পরিষ্কার কিছুই বুঝতে পারছি না।
এদিকে অপ্রচলিত বাজারগুলোতেও পোশাক রপ্তানি বাড়ছে। অপ্রচলিত বাজারগুলোতেও ৬.৬৬ শতাংশ বেড়েছে। জুলাই-মার্চ এ ৯ মাস সময়কালে অপ্রচলিত বাজারে ৫.১২ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা মোট রপ্তানির ১৬.৯৩ শতাংশ। এর মধ্যে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত উল্লেখযোগ্য। জাপানে রপ্তানি হয়েছে ৯৬০.৪৫ মিলিয়ন ডলার, অস্ট্রেলিয়ায় ৬৫৩.৬৪ মিলিয়ন ডলার ও ভারতে ৫৩৫.১৫ মিলিয়ন ডলারের পোশাক। এ সময়কালে রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), নিউজিল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় রপ্তানি কমেছে।
ইভিটেক্স ড্রেস শাট লিমিটেড পরিচালক শাহ রাঈদ চৌধুরী বলেন, বড় ধরনের অস্থিরতার মধ্যদিয়ে যাচ্ছি আমরা। এর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানি বাড়া আমাদের স্বস্তি দিচ্ছে। এই বাজারগুলো আরও ভালোভাবে দখলের একটা সুযোগ এসেছে। এই সুযোগটাই এখন আমাদের সবাই মিলে কাজে লাগাতে হবে।

mzamin

Saturday, April 12, 2025

উদ্বেগ কাটেনি, সমাধানে জোর by এম এম মাসুদ

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার পর উদ্বিগ্ন ছিল সরকার ও রপ্তানিকারকরা। তবে পাল্টা শুল্ক বা রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ আরোপ তিন মাসের জন্য স্থগিতের ঘোষণায় স্বস্তি ফিরেছে। যেসব দেশ সমঝোতার চেষ্টা করেছে তাদের পুরস্কৃত করার ঘোষণার ঈঙ্গিত দিয়েছে ট্র্যাম্প প্রসাশন। পাশাপাশি ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের শেয়ারবাজার। অবশ্য বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য স্বস্তি ফিরলেও আতঙ্ক কাটেনি। কারণ এই তিন মাস ন্যূনতম ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বহাল থাকায় একধরনের অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে।

রপ্তানিকারক এবং বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কহার স্থায়ীভাবে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে তিন মাস সময়কে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগাতে হবে। এ ছাড়া বর্তমানের বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্ককে কীভাবে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা যায়, তার কৌশল নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। শুল্ক-অশুল্ক বাধার অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে এসব দূর করতে হবে।

এদিকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ ৯০ দিনের বিরতি চেয়ে গত সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে চিঠি দেন ড. ইউনূস। অন্যদিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ পণ্য আমদানিতে শুল্ক সুবিধা চেয়ে বাণিজ্য প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ারকে আলাদা চিঠি দিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। পরে ৯০ দিনের জন্য স্থগিতের অনুরোধে সাড়া দেয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এই বিরতি বাংলাদেশের প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট সময়। আপাতত তিন মাসের জন্য একটা স্বস্তি পাওয়া গেলেও ট্রাম্প প্রশাসন যাতে বাংলাদেশের ওপর আবার বাড়তি শুল্ক আরোপ না করে, সে জন্য সরকারকে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে। আবার চীন নতুন করে আরও বাড়তি শুল্কের মুখে পড়ায় আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে পারে।
পোশাক কারখানার মালিকরা জানান, আগামী ৯০ দিনের বিরতিতে তারা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে উদ্বেগ থেকেই গেছে। কারণ ট্রাম্প ঘোষিত শুল্ক ৯০ দিন পর কার্যকর হলে বাংলাদেশের ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক শিল্প সংকটে পড়বে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানিকারকদের ৫৩.৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক গুনতে হবে।

আশঙ্কা: চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বহাল থাকায় চীন ইউরোপে সস্তা কাপড়ে বাজার সয়লাব করে দিতে পারে। এটি বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের জন্য আরেকটি সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ যে ধরনের পণ্য বেশি রপ্তানি করে সেগুলোর গড় শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ। এর সঙ্গে ১০ শতাংশ যোগ হয়ে আপাতত শুল্কহার ২৫ শতাংশ হবে। দেশভিত্তিক ৩৭ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যে মোট শুল্কহার ৫২ শতাংশে দাঁড়াতো। এরমধ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ বাড়তি শুল্ক স্থগিত রাখার অনুরোধ জানায়। বাংলাদেশ সময় চেয়েছে তিন মাস।

তৎপর ঢাকা: চীন ছাড়া নতুন আরোপ করা পাল্টা শুল্ক ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই সময়ে দেশগুলোর পণ্যে পাল্টা শুল্ক ন্যূনতম ১০ শতাংশ কার্যকর হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র বাড়তি শুল্ক তিন মাস স্থগিত করায় পরবর্তী করণীয় নিয়ে তৎপর হয়েছে ঢাকা। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হবে। শুল্ক স্থগিত করায় আলোচনার সময় আরও পাচ্ছি। সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়েছে তাই নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাণিজ্যে ঘাটতি কমানোর নানা পদক্ষেপ নিতে পারবো।
শুল্ক স্থগিত করার অনুরোধ রাখায় ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মার্কিন প্রেসিডেন্টের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট মেনশন করে অধ্যাপক ইউনূস বলেছেন, ‘৯০ দিনের শুল্ক স্থগিত করতে আমরা যে অনুরোধ করেছিলাম, তাতে ইতিবাচক সাড়া দেয়ায় প্রেসিডেন্ট আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার বাণিজ্য এজেন্ডাকে সমর্থন জানাতে আমরা আপনার প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবো।’

চীন থেকে রপ্তানি সরবে: ওদিকে অন্যান্য দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আপাতত স্থগিত করলেও চীনের প্রায় সব পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে ১৪৫ শতাংশ করেন ডনাল্ড ট্রাম্প। আগের দিন চীনের পণ্যে শুল্ক ১২৫ শতাংশ করার কথা বললেও বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস জানায়, এটা প্রায় সব পণ্যে হবে ১৪৫ শতাংশ। দেশটির ওপর এই শুল্ক ইতিমধ্যে কার্যকরও হয়েছে।

বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিকারকরা মনে করেছেন, এই শুল্ক শেষ পর্যন্ত বহাল থাকলে চীন থেকে মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সরবে। এতে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার সুযোগ রয়েছে। চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ১২৫ শতাংশ শুল্ক বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চীনের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কেননা, চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো পণ্যের দাম আগের চেয়ে দ্বিগুণ। ফলে চীন থেকে রপ্তানি এখন আর লাভজনক হবে না। ভিয়েতনামে আগেই চীনা উদ্যোক্তারা বড় বিনিয়োগ করে ফেলেছেন। সেখানে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কম। ফলে চীনের  বিনিয়োগ টানার সুযোগ বাংলাদেশের সামনে।

তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র হিসাবে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এখন থেকে ২ ডলারের একটি কটন টি-শার্ট চীন থেকে আমদানি হলে মোট শুল্ক দিতে হবে ২.৮৩ ডলার। ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ থেকে একই টি-শার্ট রপ্তানি হলে শুল্ক দিতে হবে ০.৫৩ ডলার।

বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, উচ্চ শুল্কের কারণে চীনের ক্রয়াদেশ সরবে। কারখানাও স্থানান্তরিত হবে। চীনের হারানো ব্যবসা নিতে বাংলাদেশকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

পুরস্কৃত করবেন ট্রাম্প: বিশ্বের অনেক দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সমঝোতার চেষ্টা করেছে গত কয়েকদিনে। হোয়াইট হাউসের তরফে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যেসব দেশ প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করেনি তাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। হোয়াইট হাউস বাণিজ্যিক অংশীদারদের প্রতি একটি কঠোর বার্তা পাঠিয়ে বলেছে, প্রতিশোধ নিতে যাবেন না, তাহলে আপনাকেও পুরস্কৃত করা হবে।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পরিপালন করতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কার নির্ধারিত এ সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে। যাতে মার্কিন প্রশাসন বাড়তি ১০ শতাংশ শুল্ককে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনতে রাজি হয়। এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের সঙ্গে লেগে থাকতে হবে। আলাদা যোগাযোগ করতে হবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে। তিনিও মনে করেন, চীনা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আসারও অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি: গত জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। এ হার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ ১০ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারলেওটেক্সার তথ্য বলছে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি দুই মাসে প্রধান রপ্তানিকারক দেশ চীনের রপ্তানি বেড়েছে ৯ শতাংশেরও কম। ভিয়েতনামের বেড়েছে ১১ শতাংশ। ভারতের বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। পাকিস্তানের পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ২৩ শতাংশ হারে। তবে রপ্তানি আয়ের অঙ্কে চীন ও ভিয়েতনামের চেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। চীনের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৭৭ কোটি ডলার। ভিয়েতনামের ২৬৩ কোটি ডলারের মতো। বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১৫০ কোটি ডলার। ভারত ও পাকিস্তানের রপ্তানির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯৬ কোটি ডলার ও ৩৬ কোটি ডলার। গত কয়েক মাসের রপ্তানি প্রবণতা বলছে, চীন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে রপ্তানি পরিমাণের ব্যবধান কমছে। এই পরিসংখ্যান ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন রপ্তানিকারকরা।

উল্লেখ্য, গত ২রা এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে প্রায় ৬০টি দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশসহ বিভিন্ন হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এটি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ৯ই এপ্রিল। ডনাল্ড ট্রাম্প কার্যকরের দিনে তিন মাসের জন্য দেশভিত্তিক বাড়তি শুল্ক আরোপ স্থগিত করেন। তবে ২রা এপ্রিলের ঘোষণায় কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব পণ্যের ওপর সব দেশের জন্য ১০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়, যা ৫ই এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়ে গেছে।

mzamin

Friday, April 4, 2025

দুঃসংবাদ by এম এম মাসুদ ও সিদ্দিকুর রহমান

বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। এই ঘোষণা দেশের জন্য রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের দুঃসংবাদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা। তাদের মতে, এতে শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের জন্য এটি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। দেশ নতুন করে অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য উদ্বেগজনক। এতে মার্কিন ক্রেতাদের জন্য বাংলাদেশি পোশাকের দাম বাড়বে এবং দেশটির বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, ক্রেতারা বিকল্প দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন, ফলে রপ্তানি আদেশ হ্রাস পেতে পারে, যা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে। প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮৪০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমে গেলে বাংলাদেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং মার্কিন শিল্পকে সুরক্ষা দেয়ার লক্ষ্যে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে। এতদিন দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ করে শুল্ক ছিল।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি মারাত্মকভাবে আঘাত হানবে কারণ নতুন করের হার বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা সব আইটেমের জন্য ইমপ্লিকেবল হবে। নতুন করের হারে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে। ফলস্বরূপ, আমেরিকান ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং তারা ভোক্তাদের আইটেমগুলোর জন্য কম ব্যয় করবে। অন্যদিকে, নতুন শুল্কের হার মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে। ফলে বৈশ্বিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি কমিয়ে দেবে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই প্রভাব পড়বে আমেরিকার অর্থনীতিতে চাহিদা কমার কারণে। ফলে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কমার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপরে যেসব কারণে বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে, সেগুলো দূর করে এ শুল্ক কমিয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে পারলে নেতিবাচক প্রভাব থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। তিনি পরামর্শ দেন, বাংলাদেশকে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে আলোচনা করতে হবে যে, পরোক্ষ শুল্ক হিসাবের ভিত্তিগুলো যথাযথ কিনা। পাশাপাশি, সরকার ইতিমধ্যে যে সংস্কারগুলো করেছে, সেগুলো তুলে ধরা জরুরি। জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে এক্সপোর্ট সাবসিডি কমিয়েছে এবং সরকার সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপন করা উচিত সরকারের পাশাপাশি রপ্তানিকারকদেরও সম্মিলিতভাবে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এনিয়ে তিনি বলেন, এই বাড়তি শুল্ক সরবরাহকারীরা নয়, ক্রেতারা পরিশোধ করবে এই বিষয়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত দরকার। তিনি বলেন, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-কে একটি যৌথ নীতি নির্ধারণ করতে হবে, যাতে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতার কারণে নিজ উদ্যোগে পণ্যের দাম কমিয়ে এই বাড়তি শুল্কের চাপ নিজের ওপর না নেন। যদি কেউ এই কৌশল না মানে, তাহলে তার জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও রাখা উচিত।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি কমবেই- এই ধারণা দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের গার্মেন্ট রপ্তানি ইউএসের বাজারে বড় ধাক্কা খাওয়ার ঝুঁকি আছে। ইউএসের বাজারে রপ্তানি কমে যাবে, তা তো প্রেডিক্ট করতেই পারি। সেখানে অন্যান্য পণ্যও রপ্তানি করি, লেদার, ওষুধ ইত্যাদি, সেখানেও ধাক্কা খেতে পারি।

বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম বলেছেন, মার্কিন সরকার বাংলাদেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ কর আরোপ করেছে। এটা আমাদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। তিনি বলেন, ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ হলে এটা রপ্তানি খাতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে এবং সামগ্রিক রপ্তানি কমে যেতে পারে কারণ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পণ্যের সবচেয়ে একক বড় বাজার। এখন তাৎক্ষণিক সমাধান হলো আমাদের সরকার ধীরে ধীরে তাদের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ডিউটি কমিয়ে দিতে পারে। এটা করলে আমাদের ক্ষতি নেই কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের আমদানির চেয়ে রপ্তানি অনেক বেশি। তাই যতটুকু আমদানি হচ্ছে সেখানে সরকার যদি ডিউটি কমিয়েও দেয় এর প্রভাব খুব একটা হবে না। এটা একটা সমাধান হতে পারে, বলে মনে করেন হাতেম।

বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, যে ট্যারিফ বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা হয়েছে সেটা আমাদের ওপর হওয়ার কথা না। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের তৈরি পোশাক রপ্তানির এভারেজ ডিউটি ১৫.২ শতাংশ। আমেরিকাতে কিন্তু পণ্যের আইটেম অনুযায়ী ডিউটি কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফ্ল্যাট ১২.৫ শতাংশ। আমেরিকায় পলেস্টার পোশাকে একরকম, নিটে একরকম, উলে একরকম, ট্রাউজারে একরকম। একেকটায় একেক রকম ডিউটি। কিন্তু গড়ে সেখানে ১৫.২ শতাংশ। তিনি বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, যন্ত্রপাতি এবং পোশাক শিল্পের জন্য যেসব পণ্য আমদানি করি তার অধিকাংশ শুল্কমুক্ত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১ শতাংশ। ডিউটি বাড়ানোর প্রভাব তো পড়বেই। হয়তো টোটাল টার্নওভার কমে যাবে যুক্তরাষ্ট্রে। ধরা যাক, যুক্তরাষ্ট্র বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের তৈরি পোশাক আমদানি করে। সেখানে ১০ শতাংশ আমদানি হয়তো কমে যাবে। ফলে আমাদের ওপর এর প্রভাব অবশ্যই পড়বে কারণ আমাদের সবচেয়ে বড় বাজার হলো আমেরিকা।

শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, শুল্ক শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক কমানো সম্ভব হবে।

বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, এটি আমাদের জন্য একটি বড় হুমকি। ভারত ও চীনের তুলনায় বাংলাদেশের শুল্কহার বেশি হওয়ায় তারা এই নতুন কাঠামো থেকে সুবিধা পাবে। সরকারকে শুল্কনীতি পুনর্বিবেচনা এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন শুল্ক প্রত্যাহারে রাজি করানোর আহ্বান জানান। তা না হলে, আমাদের পোশাক খাত ভয়াবহ সংকটে পড়বে, সতর্ক করেন রকিবুল আলম চৌধুরী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের তথ্য অনুসারে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে, বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৮০০ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫.৯৩ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ৭.৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল, যা আগের বছরে ছিল ৭.২৮ বিলিয়ন ডলার। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে আমদানি ১.৫ শতাংশ কমে ২.২ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। এর ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৬.২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যে বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসছে, তা সহজেই অনুমেয়।

বাংলাদেশের ওপর প্রভাব: বাংলাদেশের পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এখন দেখতে হবে, বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের ওপর ঠিক কী হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বিষয়টি হলো ভিয়েতনাম, চীন ও কম্বোডিয়ার শুল্ক বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হবে, সে কারণে হয়তো আরএমজি শিল্প অতটা আক্রান্ত হবে না, এমন ধারণা কেউ কেউ করছেন।

দেখা যাচ্ছে, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কের ওপর শুল্ক আমাদের চেয়ে কম। এই ফাঁকে ভারত হয়তো লাভবান হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মূল্যবৃদ্ধির কারণে মার্কিন ভোক্তারা এমনিতেই কিনবে কম; এর জেরে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।? আরেকটি সুবিধা হলো, বাংলাদেশ মূলত মধ্যম ও কম দামের পণ্য রপ্তানি করে। এসব পণ্যের দাম যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ২০ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, চীন বা এমনকি ভারত এখন উচ্চ মূল্যের পোশাক রপ্তানি করছে। ফলে তারা যতটা আক্রান্ত হবে, বাংলাদেশ ততটা হবে না বলেই ধরে নেয়া যায়।     

তারপরও অনেকে বলছেন, বাংলাদেশের উচিত মার্কিন পণ্যের শুল্ক কমানো, সেটা হলে আমাদের পণ্যে মার্কিন শুল্ক কমে যাবে। বাংলাদেশের উচিত, মার্কিন পণ্যের ওপর প্রচলিত শুল্কের হার ৭৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা। এর ফলে বাংলাদেশি পণ্যে মার্কিন শুল্ক হবে ১৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের প্রধান ৫টি রপ্তানি পণ্য: বোনা পুরুষদের স্যুট: ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই পণ্যের রপ্তানি মূল্য ছিল ১.৯ বিলিয়ন ডলার। বোনা মহিলাদের স্যুট: একই বছরে এই পণ্যের রপ্তানি মূল্য ছিল ১.০৯ বিলিয়ন ডলার। বোনা পুরুষদের শার্ট: ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এই পণ্যের রপ্তানি মূল্য ছিল ৭০৫ মিলিয়ন ডলার। বোনা পোশাক: ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৩০% ছিল বোনা পোশাক, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। বোনা টেক্সটাইল পণ্য: বাংলাদেশের রপ্তানির একটি অংশ বিভিন্ন টেক্সটাইল পণ্য নিয়ে গঠিত, যা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। এই পণ্যগুলোর মধ্যে প্রধানত তৈরি পোশাক এবং টেক্সটাইল পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির শীর্ষে রয়েছে।

বুধবার হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশের পণ্য আমদানির ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ঘোষণার দিনকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিবস’ অভিহিত করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে ডনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্ক আরোপ তালিকা প্রকাশ করেন। যেখানে ভারতের পণ্যের ওপর ২৬ শতাংশ, পাকিস্তানের পণ্যের ওপর ২৯ শতাংশ চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ৩৪ শতাংশ, মিয়ানমারের পণ্যে ৪৪ শতাংশ, লাওসের পণ্যে ৪৮ শতাংশ এবং মাদাগাস্কারের পণ্যের ওপর ৪৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ, ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর ৪৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার পণ্যে ৪৪ শতাংশ, তাইওয়ানের পণ্যে ৩২ শতাংশ, জাপানের পণ্যে ২৪ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার পণ্যে ২৫ শতাংশ, থাইল্যান্ডের পণ্যে ৩৬ শতাংশ, সুইজারল্যান্ডের পণ্যে ৩১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার পণ্যে ৩২ শতাংশ, মালয়েশিয়ার পণ্যে ২৪ শতাংশ, কম্বোডিয়ার পণ্যে ৪৯ শতাংশ, যুক্তরাজ্যের পণ্যে ১০ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্যে ৩০ শতাংশ, ব্রাজিলের পণ্যে ১০ শতাংশ, সিঙ্গাপুরের পণ্যে ১০ শতাংশ, ইসরাইলের পণ্যে ১৭ শতাংশ, ফিলিপাইনের পণ্যে ১৭ শতাংশ, চিলির পণ্যে ১০ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ার পণ্যে ১০ শতাংশ, তুরস্কের পণ্যে ১০ শতাংশ, কলম্বিয়ার পণ্যে ১০ শতাংশ আরোপ করা হয়েছে।

mzamin

Thursday, January 9, 2025

সস্তায় গরুর মাংস রপ্তানি করতে চেয়েছিল ব্রাজিল, না আসার কারণ জানালেন রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশে অনেক সস্তায় গরুর মাংস রপ্তানির প্রস্তাব দিয়েছিল ব্রাজিল; কিন্তু সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রয়োজনীয় সনদ (সার্টিফিকেশন) না পাওয়ার কারণে ব্রাজিল আর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে গরুর মাংস রপ্তানি করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস।

আজ বুধবার রাজধানীর বারিধারায় অবস্থিত একটি রেস্তোরাঁয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত। আগামী ১৫ থেকে ১৮ জুন ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে অনুষ্ঠিতব্য ‘মেড ইন বাংলাদেশ এক্সপো ২০২৫’ উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (বিবিসিসিআই)।

বেশ কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে গরুর মাংস রপ্তানিতে আগ্রহ দেখিয়ে আসছিল ব্রাজিল। সর্বশেষ গত এপ্রিলে লাতিন আমেরিকার দেশটি প্রতি কেজি গরুর মাংস সাড়ে চার মার্কিন ডলারে (তখনকার বিনিময় হারে ৪৯৫ টাকা) বাংলাদেশে রপ্তানি করতে প্রস্তাব দিয়েছিল। ওই মাসে ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা দুই দিনের সফরে ঢাকায় এলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়েছিল কূটনীতিক সূত্রগুলো।

ব্রাজিল যখন বাংলাদেশে গরুর মাংস রপ্তানির প্রস্তাব দেয়, তখন ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংস কমবেশি ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। রাজধানীর বাজারে এখন গরুর মাংস প্রতি কেজি ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস জানান, ব্রাজিল বিশ্বের সব চেয়ে বড় গরু ও পোলট্রি মাংস উৎপাদনকারী দেশ। বিশ্বের অনেক মুসলিমপ্রধান দেশেই ব্রাজিল থেকে গরুর মাংস আমদানির অনুমতি রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই অনুমতি নেই। ওই অনুমতি পাওয়ার জন্যই ব্রাজিল চেষ্টা করছিল বলে রাষ্ট্রদূত জানান।

সনদ বা সার্টিফিকেশন পাওয়ার জন্য তিনি কীভাবে দৌড়ঝাঁপ করেছিলেন, এ সম্পর্কেও কথা বলেন পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস। তিনি জানান, তিনি প্রথমে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলেন এ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। সেখান থেকে তাঁকে বলা হয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যেতে। এরপর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যান ব্রাজিলের প্রতিনিধিরা।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘(তৎকালীন) মন্ত্রীর কাছে যাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বাংলায় লেখা কাগজপত্র দেখিয়ে নানা ধরনের নীতিমালার কথা জানান। তবে আমি এত নীতিমালা বুঝিনি। এককথায় যেটা বুঝেছি তা হলো, তাঁরা অনুমতি দেননি। তবে বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। আশা করছি শেষ পর্যন্ত অনুমতি পাওয়া যাবে।’

শুধু দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য নয়, ব্রাজিল বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ করতে চায় বলেও জানান পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস। কৃষি, ওষুধশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ নানা খাতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্রাজিল ও বাংলাদেশ পরস্পরের সঙ্গে কাজ করতে পারে বলে জানান তিনি।

ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত বলেন, কৃষি–বাণিজ্যে তাঁর দেশের অবস্থান অনেকটা পাওয়ার হাউস বা শক্তিকেন্দ্রের মতো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ব্রাজিল থেকে অভিজ্ঞতা নিতে পারে। তিনি জানান, ব্রাজিলের মানুষেরা বছরে মাথাপিছু ১০০ কেজি গরুর মাংস খায়। বাংলাদেশে এ হার অনেক কম। ব্রাজিলে একটি গরুর থেকে দিনে গড়ে ৪৫ কেজি দুধ পাওয়া যায়; বাংলাদেশে পাওয়া যায় সাত-আট কেজির মতো।

পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস বলেন, ‘সুতরাং শুধু মাংস রপ্তানি নয়, প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমেও বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করতে পারে ব্রাজিল। তবে এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে।’

রাষ্ট্রদূত বলেন, ব্রাজিলে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার কর্মসূচি রয়েছে। এ জন্য ব্রাজিল সরকার প্রচুর পরিমাণে ওষুধ কিনে থাকে। বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো এ সুযোগ নিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও সনদ বা সার্টিফিকেশনের জটিলতা রয়েছে।

বাংলাদেশি পণ্যের বড় প্রদর্শনী

সংবাদ সম্মেলনে ব্রাজিল বাংলাদেশ চেম্বারের সহসভাপতি মো. সাইফুল আলম জানান, চলতি বছরের ১৫ থেকে ১৮ জুন ব্রাজিলের সাও পাওলোতে প্রথমবারের মতো ‘মেড ইন বাংলাদেশ প্রদর্শনী ২০২৫’ অনুষ্ঠিত হবে। এই প্রদর্শনী দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশি আমদানিকারকদের পাশাপাশি রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশ ও তাদের ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

সাইফুল আলম আরও বলেন, ব্রাজিলের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিযোগিতামূলক নয়; বরং সহায়তামূলক। ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য, কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ব্রাজিলে রপ্তানি বছরে মাত্র ১০০ কোটি মার্কিন ডলার।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশ থেকে ১০০-১৫০ জন ব্যবসায়ী প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশি আমদানিকারকদের জন্য ব্রাজিলে ব্যবসায়িক সংযোগ গড়ে তোলার পাশাপাশি সয়াবিন, চিনি এবং শিল্পের যন্ত্রপাতির মতো উচ্চমানের পণ্য খোঁজার সুযোগ সৃষ্টি হবে এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিবিসিসিআই মহাসচিব মো. জয়নাল আবেদীন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ঢাকায় ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন ঢাকায় ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস। ছবি: সংগৃহীত

Tuesday, September 24, 2024

ইতিবাচক ধারায় রপ্তানি আয়

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার কমপ্লিট শাটডাউনে একপ্রকার অচল হয়ে পড়ে দেশ। ওই সময় জারি করা হয় সান্ধ্য আইন। বন্ধ করে দেয়া হয় ইন্টারনেট পরিষেবা। ব্যাহত হয় রপ্তানি কার্যক্রম, স্থবির হয়ে পড়ে পণ্য জাহাজীকরণ। এরপরেও ইতিবাচক ধারায় ছিল দেশের রপ্তানি আয়। বেড়েছে ২.৯১ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এটা উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ‘মেজর ইকোনমিক ইন্ডিকেটর: মান্থলি আপডেট’- শীর্ষক আগস্টের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, জুলাইয়ে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৩৮২ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের। ২০২৩ সালের একই মাসে পণ্য রপ্তানির অর্থমূল্য ছিল ৩৭১ কোটি ৫৬ লাখ বা ৩.৭১ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে ২.৯১ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে গত জুলাইয়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছর জুলাইয়ে রপ্তানি বিঘ্নিত হয়েছে স্বল্প সময়ের জন্য। পাশাপাশি গত বছরের তুলনায় আমদানিকৃত কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব পোশাক রপ্তানির চূড়ান্ত মূল্যে পড়ে থাকতে পারে। আবার ভ্যালু অ্যাডেড বা মূল্য সংযোজিত তৈরি পোশাক রপ্তানির ফলে পরিমাণে কম হলেও অর্থমূল্যের প্রবাহ বেশি হয়ে থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, গত বছর জুলাইয়ে ঈদের বন্ধ ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ বছরের জুলাইয়ে আগের বছরের একই মাসের চেয়ে উৎপাদন বেশি করা গেছে। বিরূপ পরিস্থিতির প্রভাবে সৃষ্ট সংকটে সার্বিক কার্যক্রম তিন-চারদিনের জন্য বিঘ্নিত হয়েছে। এ ব্যাঘাত বিবেচনায় নিয়ে আমরা গত বছরের জুলাইয়ের চেয়ে অন্তত ১০ শতাংশ বেশি উৎপাদন করতে পেরেছি। এছাড়া ভ্যালু অ্যাডেড পোশাকের উৎপাদনও আগের চেয়ে বেশি। এ ধরনের পণ্যের জন্য আমদানি করা কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও আছে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে। এ দু’টিই মূলত রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধির কারণ হয়ে থাকতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে পোশাক পণ্য। এ খাতের নিটওয়্যার পোশাক রপ্তানির অর্থমূল্য ছিল ১৭২ কোটি ৯১ লাখ ডলার। গত বছর জুলাইয়ে রপ্তানি হয়েছিল ১৬৯ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের পণ্য। এ হিসাবে চলতি বছরের জুলাইয়ে ৩ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের বা ২.০৫ শতাংশ বেশি নিটওয়্যার পোশাক রপ্তানি হয়েছে।
তৈরি পোশাক খাতের ওভেন পোশাকের রপ্তানির অর্থমূল্য চলতি বছরের জুলাইয়ে ছিল ১৪৪ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। গত বছরের একই মাসে রপ্তানি হয় ১৩৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের ওভেন পোশাক। এ হিসাবে ৫ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের বা ৩.৯৪ শতাংশ বেশি রপ্তানি হয়েছে।
বস্ত্র খাতের হোম টেক্সটাইল ছিল জুলাইয়ে রপ্তানি হওয়া তৃতীয় বৃহত্তম পণ্য। এ খাতের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪.২১ শতাংশ। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে হোম টেক্সটাইল রপ্তানির অর্থমূল্য ছিল ৫ কোটি ২৩ লাখ ডলার। চলতি বছরের একই মাসে রপ্তানি হয়েছে ৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলারের হোম টেক্সটাইল।
কৃষিপণ্য রপ্তানিতে চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১.২৩ শতাংশ। ওই মাসে পণ্যটি রপ্তানি হয়েছে ৮ কোটি ২ লাখ ডলারের। গত বছরের জুলাইয়ে রপ্তানি হয়েছিল ৭ কোটি ২১ লাখ ডলারের পণ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে রপ্তানিতে নেতিবাচক বা ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে এমন পণ্যের মধ্যে আছে পাট ও পাটজাত পণ্য, প্রকৌশল পণ্য ও রাসায়নিক পণ্য। তবে রপ্তানিকারকরা এ পরিসংখ্যানের যথার্থতা নিশ্চিতের বিষয়ে তাগিদ দিয়ে আসছেন বারবার। কারণ বাস্তবতার সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত তথ্য সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে মনে করেন তারা।

mzamin

Tuesday, December 10, 2019

গ্রিন টি’র বাজার বড় হচ্ছে by মাসুদ মিলাদ

*গত বছর সবুজ চায়ের ব্যবহার হয় ১ লাখ ৩৫ হাজার কেজি।
*বাংলাদেশে বছরে ৩ লাখ কেজির মতো সবুজ চা উৎপাদিত হয়।
*দিন দিন চাহিদা বাড়তে থাকায় নতুন কারখানা স্থাপন হয়েছে।

দুধ-চিনি মেশানো চায়ের স্বাদে অনেকেরই এখন অরুচি। মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে এই পানীয় পানের ক্ষেত্রেও। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের অনেকেই এখন সকালটা শুরু করতে চান দুধ-চিনিবিহীন চা দিয়ে। আরেকটু সচেতন মানুষ আরও এক ধাপ এগিয়ে বেছে নিচ্ছেন ‘গ্রিন টি’ বা সবুজ চা।
চা ব্যবসায়ীদের মতে, সময়ের হিসাবে কয়েক বছরের মধ্যে এই পরিবর্তন এসেছে চা পানে। ওজন নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর মতো নানা উপকারের কথা ভেবে এই চা পানে ঝুঁকছেন সচেতন মানুষেরা। সাধারণ চায়ের চেয়ে অধিকতর স্বাস্থ্যকর পানীয় হিসেবে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের চায়ের কাপে জায়গা করে নিয়েছে সবুজ চা।
বাংলাদেশ চা বোর্ড ও সবুজ চা বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর তথ্যে দেখা যায়, কয়েক বছর ধরে দেশে সবুজ চায়ের ব্যবহার বাড়ছে। বছরে এ বৃদ্ধির হার প্রায় ১৫ শতাংশ। অথচ সাধারণ চায়ের চাহিদা বৃদ্ধির হার কমবেশি ৫ শতাংশ।
চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সবুজ চা বিপণন ও উৎপাদনে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন কোম্পানি। পাঁচ বছর আগেও দেশে সবুজ চা বাজারজাত করত দুটি কোম্পানি। এখন নিজস্ব বাগানের উৎপাদন ও আমদানি করে সবুজ চা বাজারজাত করছে ছয়টি কোম্পানি। এই তালিকায় যুক্ত হচ্ছে আরও দুটি প্রতিষ্ঠান।
চা বোর্ড ও ব্যবসায়ীদের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৩ সালে দেশে প্রায় সাড়ে ৩১ হাজার কেজি সবুজ চা ব্যবহৃত হয়। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮ হাজার কেজিতে। গত দুই বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ১ লাখ ৩৫ হাজার কেজিতে উন্নীত হয়েছে।
ফিনলে দিয়ে শুরু
উদ্যোক্তারা জানান, বাংলাদেশে সবুজ চায়ের যাত্রা শুরুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফিনলে গ্রুপের নাম। স্কটল্যান্ডভিত্তিক এই চা কোম্পানি বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় আকারে সবুজ চা উৎপাদন শুরু করে ১৯৮৩ সালে। শুরুতে শতভাগ সবুজ চা রপ্তানি করত তারা। তবে কয়েক বছর ধরে দেশে চাহিদা বাড়তে থাকায় বাজারজাত শুরু করে এই কোম্পানি।
ফিনলের পর কাজী অ্যান্ড কাজী টি কোম্পানি ২০০৬ সালে যুক্ত হয় সবুজ চা উৎপাদনে। কাজী অ্যান্ড কাজী উৎপাদিত সবুজ চা শুরুতে সিংহভাগই রপ্তানি করত। তবে দেশে চাহিদা বাড়তে থাকায় মোড়কজাত করে বাজারজাত করছে তারা। জানতে চাইলে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ শোয়েব আহমেদ কোম্পানির সবুজ চায়ের বাজার নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী হননি।
পেডরোলো গ্রুপের হালদা ভ্যালি চা-বাগানে চার বছর আগে সবুজ চা উৎপাদন শুরু হয়। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে অবস্থিত এই বাগানে চীন থেকে এনে চারা লাগানো হয়। চা-পাতা সংগ্রহ থেকে উৎপাদনের প্রক্রিয়া তদারকিও করছেন চীনের চা বিশেষজ্ঞরা। সবচেয়ে দামি ও উন্নত মানের ‘ড্রাগনওয়েল গ্রিন টি’ দেশেও বাজারজাত শুরু করেছে এই গ্রুপ। পেডরোলো গ্রুপের চেয়ারম্যান নাদের খান প্রথম আলোকে বলেন, যুক্তরাজ্য, চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের বাজারে এই চা রপ্তানি হয়েছে। দেশীয় বাজারেও সবুজ চায়ের চাহিদা বাড়তে থাকায় ড্রাগনওয়েল এগুলো বাজারজাত করছে।
স্কয়ার গ্রুপ ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মৌলভীবাজারের বড়লেখা ইউনিয়নে বছরে ২৫ হাজার কেজি উৎপাদনক্ষমতার সবুজ চায়ের কারখানা চালু করেছে। শাহবাজপুর চা-বাগানের কুঁড়ি ও পাতা অর্গানিক সবুজ চা তৈরিতে ব্যবহার করছে তারা। তবে স্কয়ার গ্রুপ প্রাথমিকভাবে নিজেদের ৬০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নিজস্ব প্রয়োজনে পুরোটাই ব্যবহার করছে। তবে ভবিষ্যতে এর বাজারজাত করবে তারা।
নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণ
চাহিদা বাড়তে থাকায় সবুজ চা উৎপাদনে নতুন কারখানা স্থাপন করেছে চা বোর্ডের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। শ্রীমঙ্গলে ইনস্টিটিউট ক্যাম্পাসে নতুন এই কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। ইনস্টিটিউটের পরিচালক মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, বছরে ৪০ হাজার কেজি উৎপাদনক্ষমতার নতুন কারখানাটি এ মাসের শেষে চালু হতে পারে। ফিনলেও এ বছর জুন বা জুলাইয়ে কারখানা সম্প্রসারণ করবে।
আমদানি-রপ্তানির চিত্র
সবুজ চায়ের যে বাজার বাড়ছে, তা আমদানির চিত্রেও উঠে এসেছে। কাস্টম হাউস সূত্রে জানা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সবুজ চা আমদানি হয় ৩ হাজার ১৭০ কেজি। গত অর্থবছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫১০ কেজিতে। তবে সবুজ চা রপ্তানির সর্বশেষ তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সূত্রগুলো জানায়, রপ্তানির পরিমাণ এক লাখ কেজির বেশি।
বৈশ্বিক বাজার
আন্তর্জাতিক টি কমিটির তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে বিশ্বে মোট চা উৎপাদিত হয় ৫৫০ কোটি ৩০ লাখ কেজি। এর মধ্যে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ সবুজ চা। এর পরিমাণ ১৭৮ কোটি ৮০ লাখ কেজি। এর মধ্যে এক চীনেই উৎপাদিত হয় ১৫৫ কোটি কেজি। এ ছাড়া ভিয়েতনামে ৯ কোটি কেজি, জাপানে ৭ কোটি ৬৯ লাখ কেজি, ভারতে ১ কোটি ৮৬ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়। একই সময়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় ২ লাখ ৭০ হাজার কেজি। সবুজ চাসহ গত বছর বাংলাদেশে মোট চা উৎপাদিত হয় ৮ কোটি ২১ লাখ কেজি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৬ সালে বিশ্বে ৩৬ কোটি ১৭ লাখ কেজি সবুজ চা রপ্তানি হয়। এর মধ্যে চীন একাই রপ্তানি করে ২৭ কোটি কেজি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের রপ্তানি ৬ কোটি ৩৫ লাখ কেজি। আর ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানি ১ কোটি ২৮ লাখ কেজি।

Tuesday, November 12, 2019

বাংলাদেশের পাট পাতার চা এখন জার্মানিতে by ফারজানা লিয়াকত

ইন্টারট্রোপের বাজারজাতকৃত ‘জুট-টি’
কাক ভোরে ঘুম ভেঙে ঢুলো ঢুলো চোখে অফিসে ঢুকে, অলস দুপুরে বা বিকেলের আড্ডায় এক কাপ চা যেন প্রাণদায়িনী। চা-প্রেমিক শৌখিন মানুষদের জন্য চা প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর চেষ্টারও শেষ নেই। ফল, ফুল বা মরিচের স্বাদ—কী নেই ফ্লেভারের নামে! তবে এবার ফ্লেভার নয়, এসেছে পাট পাতার চা। গরম ভাতে পাট শাকের স্বাদের যেমন তুলনা নেই, এ পাতার গুনাগুণেরও শেষ নেই।
দেশীয় বাজারে পাট পাতার চা বহুল প্রচলিত না হলেও এই চা পৌঁছে গেছে ইউরোপের বাজারে। জার্মানি-ভিত্তিক একটি স্টার্টআপ ‘ইন্টারট্রোপ’ সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে ২ টন পাট পাতার চা নিয়েছে। জার্মানি প্রবাসী বাংলাদেশি উদ্যোক্তা মিজানুর রহমান দুজন জার্মানের সঙ্গে মিলে গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটি।
পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের সহযোগিতায় ও উদ্যোগে ‘ইন্টারট্রোপ’ জার্মানিতে চা নেওয়ার এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে মানিকগঞ্জের লেমুবাড়িতে সাড়ে সাত হেক্টর জমিতে ইতিমধ্যে চাষ করা হয়েছে অরগানিক পাট।
ভেষজ গুণে সমৃদ্ধ পাটের চায়ে আছে খনিজ এবং নানান পদের ভিটামিনের সমাহার। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ওমেগা-৩ সহ অনেক উপাদান, যা মানবদেহের জন্য ভীষণ উপকারী। ডায়বেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্‌রোগ ঠেকাতে উপকারী এই পানীয়।
কথা হচ্ছিল ইন্টারট্রোপের উদ্যোক্তাদের একজন মিজানুর রহমানের সঙ্গে। প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠান এবং পাটের চা রপ্তানির উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেন।
রংপুরের ছেলে মিজানুর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। জার্মানির হোহেনহেইম বিশ্ববিদ্যালয়ে যান স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিতে। ‘চাইলেই বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে মোটা মাইনের চাকরি করতে পারতাম। কিন্তু নিজের কিছু একটা করার ইচ্ছেটা ছিল প্রবল।’—হাসি মুখে বলেন মিজানুর। মিজানুরের কথায়, শুরুটা হয়েছিল এক সন্ধ্যায় আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান বোরনারের সঙ্গে আড্ডায়। তারপর দেখা মেলে জুলিয়ান কোফলারের। তিনজনে সিদ্ধান্ত নেন নিজেদের মতো করে কিছু করার। রাতারাতি বিল গেটস বনে যাবেন, এমন কোনো উচ্চাশা ছিল না তাদের। স্বপ্ন ছিল একটু আলাদা কিছু করার যাতে আর্থিক সচ্ছলতা ছাড়াও কল্যাণমূলক কিছুও থাকে। এশিয়া ও আফ্রিকার ট্রপিক্যাল দেশগুলোর নিজস্ব পণ্য ইউরোপের বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে শুরু হয় ‘ইন্টারট্রোপ’।
বাংলাদেশি হিসেবে পাটের কথাই প্রথমে মাথায় আসে মিজানুরের। পাঠের ব্যাগ ও অন্যান্য পাটজাত পণ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়। গল্পের ছলে বললেন, ‘২০১৫ সালে আমি আর জুলিয়ান একবার বাংলাদেশে আসি। সে সময় গাজীপুরে পাটজাত পণ্যের খোঁজে যাই আমরা। দুপুরের খাবারের মেন্যু ছিল অতি সাধারণ বাঙালি খাবার—ডাল, ভাত আর পাট শাক। পাট পাতা সবজি হিসেবে খাওয়া যায় দেখে বেশ অভিভূত হন জুলিয়ান।’
এরপর প্রস্তাব আসে জুলিয়ানে পক্ষ থেকে। তাঁর ভাষায়, জার্মানরা হয়তো সবজি হিসেবে পাট পাতা খাবে না; তবে অন্য কোনো উপায়ে খাওয়া গেলে মন্দ হবে না। ঠিক সেবারই ঢাকায় পাট উৎসবে দেখা হয় ইসমাইল হোসেন খানের সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে পাট পাতার চা নিয়ে আলোচনা হয়। তিনি তখন বাংলাদেশে পাট পাতার চা বাজারজাতকরণে কাজ করছেন। ব্যস! সেই থেকে শুরু। প্রসঙ্গত, ইসমাইল হোসেন খান বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের অধীনে পাট পাতার চা প্রকল্পের উপদেষ্টা। এর তিন মাস পর ইসমাইল খান ইন্টারট্রোপের অনুরোধে ১৬ কেজি নমুনা চা পাতা পাঠান জার্মানিতে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে যাত্রা শুরু করে ‘জুট-টি’।
জার্মানির বাজারে এ রকম একটি পণ্যের যাত্রা সহজ ছিল কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে মিজানুর বলেন, ‘একেবারে মসৃণ যে ছিল না, তা বলাই বাহুল্য। ইউরোপের বাজারে নতুন কোনো খাদ্যপণ্য চালু করতে খরচ হয় ২০ হাজার ইউরো। সৌভাগ্যবশত আমরা জানতে পারি ১৯৯৬ সালের আগে গ্রিসে পাট পাতার ব্যবহার হয়েছে। আর কী লাগে! আমরা ওই রেফারেন্স ব্যবহার করে জার্মান কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় করিয়ে নিলাম পাট পাতার চায়ের।’
ইন্টারট্রোপ প্রাথমিকভাবে পাট পাতার চা ওষুধের দোকানগুলোতে বিক্রি করার উদ্যোগ নিয়েছে। ভেষজ চায়ের বেশ কদর থাকায় জার্মানির বাজার নিয়ে বেশ আশাবাদী এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ইন্টারট্রোপের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক মিজানুর রহমান।
পাটের এই চায়ের ধরনেও রয়েছে অনেক বৈচিত্র্য। পাঁচটি আলাদা স্বাদে ‘জুট-টি’ বাজারজাত করেছে তারা। জার্মানির বিশাল বাজারে অন্তত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ জায়গা করে নেওয়ার প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে ইন্টারট্রোপ, জানালেন মিজানুর।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোলে এই প্রকল্পের অপার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে মিজানুর বলেন, শুধু সরকারিভাবে চা রপ্তানি নয়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে নানা ধরনের ছোট ও বড় প্রতিষ্ঠান। যেমন—উৎপাদন, প্যাকেজিং, পরিবহনসহ অনেক কিছু। আর এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে অরগানিক পাট উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য আরও সরকারি সহায়তা প্রয়োজন বলে মত তাঁর।
‘আত্মপ্রচারের ইচ্ছা কম। তাই গণমাধ্যমে কম এসেছি। আমি খুশি নিজের মতো কিছু করতে পেরে। আর ‘জুট-টি’-এর প্যাকেটে যখন ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা দেখি, ভীষণ গর্ববোধ করি।’—তৃপ্ত অথচ স্বপ্নমাখা চোখ নিয়ে আলাপ শেষ করলেন মিজানুর রহমান।
ইন্টারট্রোপের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক মিজানুর রহমান

Wednesday, October 30, 2019

কুঁড়ার তেলের বিদেশযাত্রা by ফখরুল ইসলাম

*১০ বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১২টি কারখানা গড়ে উঠেছে।
*বাজারে পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের তেল।
*দাম সয়াবিন তেলের চেয়ে কিছুটা বেশি।
*২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশ থেকে রপ্তানি হয় কুঁড়ার ২০ হাজার টন তেল।
*দেশে বছরে উৎপাদিত হয় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টন তেল।
*সাড়ে ছয় কেজি কুঁড়া থেকে এক লিটার তেল হয়।

দেশে তো জনপ্রিয় হচ্ছেই, ধানের কুঁড়ার তেল (রাইস ব্র্যান অয়েল) এখন বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশ থেকে কুঁড়ার ২০ হাজার টন তেল রপ্তানি হয়েছে। রপ্তানির প্রায় পুরোটাই হচ্ছে বগুড়া থেকে। বর্তমানে এই তেল প্রধানত রপ্তানি হচ্ছে ভারতে। তবে শ্রীলঙ্কা, জাপান, চীন—এসব দেশেও রপ্তানির প্রক্রিয়া চলছে।
স্বাধীনতার পর এবং আশির দশকেও দেশে প্রধান ভোজ্যতেল ছিল সরিষার তেল। তবে নব্বইয়ের দশক থেকেই অপরিশোধিত পাম তেল ও সয়াবিন তেলের আমদানি বাড়তে থাকে। দেশে গড়ে ওঠে বেশ কয়েকটি ভোজ্যতেল পরিশোধন কারখানাও। আর ভোজ্যতেল হিসেবে ঘরে ঘরে জায়গা করে নেয় পাম তেল ও সয়াবিন তেল। কেউ কেউ অবশ্য সূর্যমুখী বা জলপাই তেলও (অলিভ অয়েল) রান্নায় ব্যবহার করেন।
একসময় বিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে আসে অন্য ভোজ্যতেলের তুলনায় ধানের কুঁড়ার তেলে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক মাত্রা কম। ধানের তুষ ছাড়ানোর পর চালের গায়ে বাদামি যে অংশ থাকে, সেখান থেকে এই তেল নিষ্কাশন করা হয়।
গত ১০ বছরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধানের কুঁড়ার তেলের ১২টি কারখানা গড়ে ওঠে। পাবনার ঈশ্বরদীতে ২০১১ সালে রশিদ অয়েল মিলস লিমিটেড ‘হোয়াইট গোল্ড ব্র্যান্ড’ নামে ধানের কুঁড়ার তেল উৎপাদন শুরু করে। প্রায় একই সময়ে গড়ে ওঠে ময়মনসিংহে ‘স্পন্দন’ ব্র্যান্ডের আরেকটি কারখানা।
তবে উৎপাদনের মাঠে ভালোভাবে আছে এখন বগুড়ার মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ও তামিম অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। মজুমদার গ্রুপের তেলের ব্র্যান্ড ‘স্বর্ণা’। মজুমদার গ্রুপের কারখানায় প্রতিদিন তেল উৎপাদন হয় ৯০ থেকে ১০০ টন। এ ছাড়া রংপুরের গ্রিন অ্যান্ড পোলট্রি ফিড ইন্ডাস্ট্রিজও কিছু তেল উৎপাদন করে।
মজুমদার গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিত্ত মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা রপ্তানি করছি মূলত ভারতে। তবে বিশ্বব্যাপীই এই তেলের চাহিদা রয়েছে এবং বছর বছর চাহিদা বাড়ছে।’
কুঁড়ার তেল উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, দেশে বর্তমানে প্রতিদিন ২৫০–৩০০ টন এই তেল উৎপাদিত হয়। বছরে হয় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টন। সাড়ে ছয় কেজি কুঁড়া থেকে এক লিটার তেল হয়। ধান থেকে চাল তৈরি করলে ৭ থেকে ৮ শতাংশ কুঁড়া পাওয়া যায়।
তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিদিনের কুঁড়ার চাহিদা ১ হাজার ৫০ থেকে ১ হাজার ১০০ টন। দেশের চালকল থেকে বছরে ৩৭ লাখ টনের বেশি কুঁড়া উৎপাদিত হয়। বর্তমানে দেশে ব্যবহৃত ভোজ্যতেলের মধ্যে কুঁড়ার তেলের অবদান সোয়া দুই থেকে আড়াই শতাংশ। সয়াবিন ও পাম তেলের চাহিদা ১৪ লাখ টন।
তবে অন্যদের কাছ থেকে পরিশোধন করিয়ে নিয়েও এই তেল বাজারজাত করছে কয়েকটি বড় কোম্পানি। যেমন এসিআই। এসিআইয়ের রাইস ব্র্যান তেলের নাম ‘নিউট্রিলাইফ’। বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের ব্র্যান্ড ‘ফরচুন’। ‘নেচুরা’ নামের একটি ব্র্যান্ডও বাজারে রয়েছে।
এসিআই কনজ্যুমার প্রোডাক্টসের বিজনেস ডিরেক্টর অনুপ কুমার সাহা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এই পণ্যটির বিক্রির পরিমাণ যেহেতু বাড়ছে, অনুমান করা যায় যে সারা দেশে রাইস ব্র্যান তেল জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশ্বব্যাপীও এর জনপ্রিয়তা রয়েছে, তবে নানা কারণে রপ্তানি বাজার এখনো অত বড় হতে পারছে না।’
জনপ্রিয়তার কারণ জানতে চাইলে অনুপ কুমার বলেন, ডাক্তাররাই বলছেন এতে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অরাইজানল রয়েছে এবং এই তেল মানুষের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। অরাইজানল ইনসুলিন প্রতিরোধে সহায়তা করে। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ধারণা বোতলে তেলের রংটা একটু হালকা হলে ভালো হয়। কিন্তু তা করতে গেলে তেল থেকে উপকারিতা কম পাওয়া যেতে পারে।
কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা যায়, বোতলজাত এক লিটার কুঁড়ার তেলের দাম পাম ও সয়াবিন তেলের দামের চেয়ে একটু বেশি। প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম যেখানে ১০০ টাকার মতো, কুঁড়ার তেলের দাম সেখানে ১১৫ থেকে ১৩০ টাকা।
কুঁড়ার তেল উৎপাদনকারীরা বলছেন, এই তেল যেমন স্বাস্থ্যসম্মত, তেমনি সাশ্রয়ী। এক লিটার সয়াবিন তেলে যে খাবার রান্না করা যায়, তা পৌনে এক লিটার কুঁড়ার তেলেই করা সম্ভব। এদিকে বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থার (বিসিএসআইআর) এক গবেষণাও বলছে, ভোজ্যতেলে যেসব খাদ্যগুণ থাকা উচিত, জলপাই তেলের পর সবচেয়ে বেশি তা কুঁড়ার তেলে রয়েছে।
মজুমদার গ্রুপের চিত্ত মজুমদার বলেন, ‘বড় সমস্যা কুঁড়ার সরবরাহ। যে পরিমাণ চাহিদা রয়েছে, সেই পরিমাণ কুঁড়া সব সময় পাওয়া যায় না। কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এ কারণেই। তবে সম্ভাবনা বিশাল। পরিকল্পিতভাবে উৎপাদনের দিকে যেতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে দরকার নগদ সহায়তা। ভারতে আমরা রপ্তানি করি ঠিকই, কিন্তু ভারতই এ ব্যাপারে বাংলাদেশের বড় প্রতিযোগী।’

Thursday, October 10, 2019

রপ্তানির ৬০ ভাগই যায় ইউরোপে by টিপু সুলতান ও মজিবুল হক

দেশে যত রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার (গেঞ্জি, টি-শার্ট) শিল্পকারখানা রয়েছে, তার ৬০ ভাগই নারায়ণগঞ্জে। এখান থেকে বছরে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকার (৪০০ কোটি ডলার) রপ্তানি হয় বলে শিল্পমালিকেরা জানিয়েছেন।
দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতে নিটওয়্যার এবং ওভেনের (শার্ট-প্যান্ট) বাজার এখন প্রায় সমান সমান। সরকারি হিসাবে গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মোট নিটওয়্যার রপ্তানি হয় ১ হাজার ৫১৮ কোটি মার্কিন ডলার বা ১ লাখ ২১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার। একই বছর ওভেন রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ৫৪২ কোটি ডলার বা ১ লাখ ২৩ হাজার ৩৬০ কোটি টাকার।
রপ্তানি আয় তথা দেশের অর্থনীতিতে যাদের এমন ভূমিকা, তারা আছে নানামুখী সমস্যায়। নারায়ণগঞ্জে নিটওয়্যারের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র বিসিক শিল্পনগরী এলাকার রাস্তাঘাটের ভয়ংকর ভগ্নদশা। নর্দমাব্যবস্থা নেই বললেই চলে। পুরো এলাকা ময়লা-আবর্জনায় ভরা। যানবাহনের জট লেগে থাকে সারা দিন। বিদ্যুতের সমস্যা অনেকটা মিটলেও গ্যাসের চাপ কম। আছে পানিসংকট। নানা অজুহাতে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি তো রয়েছেই।
শতভাগ রপ্তানিমুখী এই শিল্পের যাত্রা শুরুই হয়েছিল নারায়ণগঞ্জ থেকে গত শতাব্দীর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। নব্বইয়ের দশকে এ শিল্প বিস্তার লাভ করে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) সূত্রে জানা গেছে, তাদের সদস্যভুক্ত রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পের সংখ্যা দেড় হাজার। এর ৬০ ভাগই নারায়ণগঞ্জে, বাকিগুলো গাজীপুর ও চট্টগ্রামে অবস্থিত। এর বাইরেও কিছু নিটওয়্যার কারখানা আছে, যারা বিজেএমইএর সদস্যভুক্ত।
বিকেএমইএর নেতারা জানান, শতভাগ রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার পণ্য তৈরিতে যেসব উপাদান ব্যবহৃত হয়, তার প্রায় ৮০ ভাগই দেশীয় সামগ্রী। বাকিটা আমদানি করা সামগ্রী। আর ওভেনে (শার্ট-প্যান্ট) ৬০-৭০ ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ওভেনের পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) সেভাবে গড়ে ওঠেনি।
নিটওয়্যার রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ। দেশের উৎপাদিত নিটওয়্যারের প্রায় ৬০ ভাগই যায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও চীনেও রপ্তানি হয়।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ব্যবসা ছিল রমরমা, তখন নারায়ণগঞ্জকে স্কটল্যান্ডের বস্ত্র ও পাটকলসমৃদ্ধ ড্যান্ডি শহরের সঙ্গে তুলনা করে ‘প্রাচ্যের ড্যান্ডি’ বলা হতো। পাটের সেই দিন নেই। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ এখন দেশের নিটওয়্যার তৈরির রাজধানীতে পরিণত হয়েছে।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি মো. ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, নারায়ণগঞ্জ নিটওয়্যারের সূতিকাগার। এর কারণ উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল। এখানকার শত বছরের পুরোনো হোসিয়ারি শিল্পের হাত ধরেই নিটওয়্যার শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। এখন এখানে প্রায় আট লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তিনি জানান, নিটওয়্যার শিল্পের পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে নিটিং ও ডায়িং কারখানা। প্রায় ৯০ ভাগ দেশীয় সুতা ব্যবহার করা হয় এখানে।
নারায়ণগঞ্জের নিটওয়্যারের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র বলা যায় পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীকে। মূলত হোসিয়ারিশিল্পের জন্য এটি করা হয়েছিল, কিন্তু তারা আসেনি। পরবর্তীকালে নিটওয়্যার শিল্পমালিকেরা এখানে কারখানা গড়ে তোলেন। বিসিক শিল্প মালিক সমবায় সমিতি সূত্রে জানা গেছে, এখানে নিটওয়্যার কারখানা আছে ৫০০, যা সারা দেশের মোট নিটওয়্যার শিল্পের এক-তৃতীয়াংশ। এর বাইরে ওভেন গার্মেন্টস, নিটিং, পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প আছে এখানে।
বিসিক শিল্প মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, এখান থেকে বছরে ৪০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। কাজ করেন প্রায় তিন লাখ শ্রমিক। অথচ এখানে সমস্যার অন্ত নেই। অবকাঠামোগত সমস্যা সবচেয়ে বড় সমস্যা। ময়লা ফেলার কোনো জায়গা নেই। রাস্তাগুলো ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নেই। যেসব কারখানায় পানির সংযোগ আছে, তারা পানি পায় না, কিন্তু বিল দিতে হয়।
সরেজমিন বিসিক শিল্প এলাকা ঘুরে এর প্রমাণও পাওয়া গেল। ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট। তাতেই চলছে পণ্যবাহী বড় বড় কাভার্ড ভ্যান বা ট্রাক। বেশির ভাগ রাস্তাই আবর্জনায় ভরা। নর্দমার পানি উপচে পড়ছে রাস্তায়। মানুষ পানি টপকে চলাফেরা করছে। যানজট তো আছেই। একজন বড় ব্যবসায়ী বলেন, যানজটের কারণে বিদেশি ক্রেতারা আসতে চান না। তাঁদের হেলিকপ্টারে করে আনতে হয়।
আর আছে চাঁদাবাজির অভিযোগ। তবে এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর হাতে ব্যবসায়ীরা জিম্মি। নানা অজুহাতে বড় বড় কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি করা হয়। তারপর ওই প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ স্থানীয় বড় এক মাস্তান শ্রমিক প্রতিনিধি হিসেবে আসেন মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করতে। বড় অঙ্কের টাকা না দিলে মীমাংসা হয় না। একই অবস্থা সিদ্ধিরগঞ্জের কারখানাগুলোতেও। সেখানে একই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অনুগত আরেক মাস্তান রাজত্ব করে। এসব নানা কারণে অনেক কারখানা এখান থেকে অন্যত্র চলে গেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে।
বিসিক শিল্পনগরী সিটি করপোরেশনের বাইরে। এটি এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদের অধীন। ব্যবসায়ীদের হোল্ডিং ট্যাক্স দিতে হয় ইউনিয়ন পরিষদকে। কিন্তু প্লটপ্রতি কর ধার্য না করে পরিষদপ্রতি বর্গফুট অনুযায়ী হোল্ডিং কর নেয়। কর পরিশোধ না করলে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন হয় না। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ কোনো সেবা দেয় না। এমনকি ময়লা সরানোর কাজটাও করে না তারা।
এটা স্বীকারও করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানকার উন্নয়নকাজ করার দায়িত্ব বিসিকের। তবে ময়লা সরানোর বিষয়ে আমি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতির সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু ময়লা ফেলার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। একটা বড় জায়গা পেলে ময়লা নেওয়ার কাজটা ইউনিয়ন পরিষদ করবে।’ তবে কবে নাগাদ বড় জায়গা পাওয়া যাবে, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
এসব সমস্যা নিয়ে কথা হয় বিসিকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তাঁদের দাবি, তাঁরা পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ পান না, তাই এসব সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না। পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীর এস্টেট কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের সমস্যা আমরাও বুঝি, আমরা ওপরে লেখালেখি করছি। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সমস্যার সমাধান করা যাবে।’ তিনি জানান, এ বছর তাঁরা ৬৮ লাখ টাকার মতো বরাদ্দ পেয়েছেন। এই টাকায় ৫৫০ ফুট ড্রেনের কাজ করা হয়েছে। ৩৮৬ ফুট রাস্তা মেরামতের কাজ চলছে।
তবে বিসিক শিল্প মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বিসিক কর্তৃপক্ষ বলে বাজেট নেই। কিন্তু এখানকার শিল্পকারখানাগুলো যে সার্ভিস চার্জ দেয়, সেটার একটা অংশ ব্যয় করলেও এই করুণ দশা থাকে না। এ নিয়ে সমিতির পক্ষ থেকে বহু চিঠি দিয়েছি। সংসদীয় কমিটিতে বক্তব্য দিয়েছি, শিল্পসচিবকে বলেছি। কোনো কাজ হয়নি।’ এ রকম একটি রপ্তানিমুখী শিল্পপল্লির সমস্যা সমাধানে সরকারের উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন মোহাম্মদ হাতেম।

Saturday, October 5, 2019

দুপুরের আগেই টিসিবি’র পিয়াজ শেষ

ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় দেশে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায় পিয়াজের দাম। এর প্রেক্ষিতে পণ্যটির দাম কমাতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে খোলা বাজারে পিয়াজ বিক্রি শুরু করে সরকার। কিন্তু দাম কম ও চাহিদা খুব বেশি থাকায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দুপুরের আগেই শেষ হয়ে যায় টিসিবির গাড়িতে থাকা পিয়াজ। গাড়িতে প্রতি কেজি পিয়াজের দাম রাখা হচ্ছে মাত্র ৪৫ টাকা। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই কেজি পিয়াজ কিনতে পারেন।
সরজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর ৩৫টি স্থানে টিসিবির মাধ্যমে পিয়াজ বিক্রি হলেও লাইনে দাঁড়িয়েও পিয়াজ পাননি না বলে অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা। এছাড়া সরবরাহ কম থাকা, সঠিক সময়ে পিয়াজের ট্রাক না আসাসহ বেশকিছু অভিযোগ করেন ক্রেতারা।
গতকাল রাজধানীর সচিবালয় গেটে গিয়ে দেখা যায়, বেলা না গড়াতেই ফুরিয়ে গেছে পিয়াজ।
অন্যান্য পণ্য থাকলেও পিয়াজ শেষ। এদিকে, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পিয়াজ না পেয়ে ফেরত যেতে হয়েছে অনেককেই।
এক ক্রেতা বলেন, সকাল ১০টার দিকে এসে দেখি টিসিবির গাড়ি এখনও আসেনি। তাই নিজের কাজ শেষ করে এসে দেখছি পিয়াজ শেষ। তারেক নামে এক ক্রেতা পিয়াজ কেনার পর পলিথিন খুলে দেখান তার মধ্যে বেশ কিছু পচা পিয়াজ। আর রয়েছে অতিরিক্ত আবর্জনা। আর পিয়াজের সাইজও তুলনামূলক অনেক ছোট। তিনি বলেন, দাম কম বলেই এই পিয়াজ কিনছি, তা না হলে কিনতাম না।
টিসিবি’র এক পিয়াজ বিক্রেতা বলেন, প্রতিদিন ৪০০ কেজি করে পিয়াজ পাই। আজ (গতকাল) পিয়াজের ক্রেতা একটু বেশি, তাই দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। টিসিবির প্রতিটি গাড়িতে ১ হাজার কেজি পিয়াজ দেয়ার কথা থাকলেও তারা ৪০০ কেজি করে প্রতি গাড়িতে পিয়াজ দিচ্ছে।
এ বিষয়ে টিসিবির মুখপাত্র মো. হুমাউন কবির বলেন, এতদিন প্রতি ট্রাকে ৪০০ কেজি পিয়াজ দেয়া হয়েছে। শনিবার থেকে ১ হাজার কেজি করে পিয়াজ দেয়া হবে। তখন পিয়াজ না পাওয়ার ভোগান্তি থাকবে না। তিনি বলেন, পিয়াজ নিয়ে আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। প্রতিদিনই মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পিয়াজ আসছে। ফলে ২/১ দিনের মধ্যে পিয়াজের দাম কমে যাবে বলে আশা করছি। বর্তমানে রাজধানীর ৩৫টি স্থানে পিয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে। প্রয়োজনে তা আরো বাড়ানো হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, কোরবানি ঈদের পর থেকেই পিয়াজের দাম বাড়তে শুরু করে। এরপর হঠাৎ করেই ভারত পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় এক লাফে দাম বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৩০ টাকায়। তবে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া পিয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। পুরান ঢাকার শ্যামবাজারের আড়তে গত দুই দিনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকা কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অবশ্য খুচরা বাজারে ততটা প্রভাব পড়েনি। শ্যামবাজারে প্রতি কেজি দেশি পিয়াজ ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, ভারতীয় পিয়াজ ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং মিয়ানমারের পিয়াজ ৫৮ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা। ঢাকার কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশি পিয়াজ কেজিপ্রতি ১০০ টাকা এবং ভারতীয় পিয়াজ ৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে, আগের চেয়ে দাম কেজিপ্রতি ১০ টাকার মতো কমেছে। অবশ্য কোথাও কোথাও সেরা মানের দেশি পিয়াজের দাম কেজিপ্রতি ১২০ টাকায় উঠেছিল, যা এখন ১১০ টাকায় নেমেছে।
ভারত রপ্তানি বন্ধের আগে শ্যামবাজারে প্রতি কেজি ভারতীয় পিয়াজ ৫৫-৫৬ এবং দেশি পিয়াজ ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি হতো। খুচরা বাজারে বাছাই করা দেশি পিয়াজ ৭৫-৮০ টাকা, সাধারণ দেশি পিয়াজ ৭০ টাকা এবং ভারতীয় পিয়াজ ৬০-৬৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করতেন বিক্রেতারা। ফলে দেখা যাচ্ছে, পাইকারিতে দাম আগের দরের কাছাকাছি চলে এসেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বুধবারের কেনা দেশি পিয়াজ ১১০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। তবে বৃহস্পতিবার কেনা প্রতি কেজি পিয়াজ ১০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। তারা বলছেন, দু’একদিনের মধ্যে দাম আরো কমবে। শান্তিনগরের পিয়াজ ব্যবসায়ী বলেন, ভারত পিয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ার ফলে হঠাৎ করে দাম বেড়েছে। তবে মিয়ানমারসহ অন্যান্য দেশ থেকে সরকার জরুরি ভিত্তিতে পিয়াজ আমদানি করায়, বিদ্যমান সংকট কমে আসছে। এ কারণে পিয়াজের দাম কমছে।
বুধবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে পিয়াজের দাম ৮০ টাকায় নামবে। এরই মধ্যে মিয়ানমার থেকে ৪৮৩ টন পিয়াজ আনা হয়েছে। আরো ৫০০ টন পিয়াজ দেশে পৌঁছানোর অপেক্ষায়। মন্ত্রী বলেন, প্রতিদিনই পিয়াজ কম বেশি আমদানি করা হচ্ছে। কেজি প্রতি পিয়াজের আমদানি মূল্য ৪৫ টাকা। পাইকারি মূল্য, যাতায়াত মূল্য, সব মিলিয়ে ৫০ কিংবা ৬০ টাকা কেজি হওয়া উচিৎ। পিয়াজের দাম বৃদ্ধির কারণ খুঁজতে ১০টি মনিটরিং টিম কাজ করছে। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং গুদামকে জরিমানা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রতিবছর দেশে পিয়াজের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে দেশে উৎপাদন হয়েছে ২৩.৭৬ লাখ টন। এছাড়া এই সময়ে আমদানি ১০ থেকে ১১ লাখ টন পিয়াজ আমদানি হয়েছে। ফলে, দেশে পর্যাপ্ত পিয়াজ মজুত থাকার পরেও দাম বেড়েই চলেছে।
যে ৩৫টি স্থানে পিয়াজ বিক্রি হচ্ছে: সচিবালয়ের গেট, জাতীয় প্রেস ক্লাব, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল, বাংলাদেশ ব্যাংক চত্বর, দৈনিক বাংলা মোড়, শাহজাহানপুর বাজার, ফকিরাপুল বাজার ও আইডিয়াল জোন, মতিঝিল বক চত্বর, ভিক্টোরিয়া পার্ক, কাপ্তান বাজার, শান্তিনগর বাজার, মালিবাগ বাজার, বাসাবো বাজার, রামপুরা বনশ্রী, খিলগাঁও তালতলা বাজার, রামপুরা বাজার। এছাড়া সায়েন্সল্যাব মোড়, নিউ মার্কেট/নীলক্ষেত মোড়, ঝিগাতলা মোড়, পলাশী মোড়, শ্যামলী/কল্যাণপুর, খামারবাড়ি ফার্মগেট, রজনীগন্ধা সুপার মার্কেট, কলমীলতা মোড়, কচুক্ষেত, আগারগাঁও তালতলা ও নির্বাচন কমিশন অফিস। অন্যদিকে, উত্তরার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স, আশকোনা হাজি ক্যাম্প, মহাখালী কাঁচাবাজার, মিরপুর-১ নম্বর মাজার রোড, মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বর, শেওড়াপাড়া বাজার, মোহাম্মদপুর টাউনহল কাঁচাবাজার, দিলকুশা, মাদারটেক নন্দীপাড়া কৃষি ব্যাংকের সামনে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে।
এদিকে, পিয়াজ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। এর জেরে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার পিয়াজের বাজারে আগুন লেগেছে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ও নেপালের। এই তিন দেশে কোথাও দ্বিগুণ, কোথাও বা তিনগুণ বেড়ে গেছে পিয়াজের দাম। কলম্বোতে এখন পিয়াজের দাম শ্রীলঙ্কার মুদ্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ (ভারতীয় মুদ্রায় ১২০ থেকে ১৩০ টাকা)। শ্রীলঙ্কা ইতিমধ্যেই চীন এবং মিশর থেকে আমদানির অর্ডার দিয়েছে। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর এক সবজির বাজারে গৃহিণী সীমা পোখারেল রয়টার্সকে বলেন, পিয়াজের এবারের মূল্যবৃদ্ধি রীতিমতো ভয়ংকর। গত মাসের তুলনায় এবার দামটা দ্বিগুণ।

Friday, October 4, 2019

২০ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসে ক্যাসিনো পণ্য

২০টি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ক্যাসিনো পণ্য আমদানি করে। এমনটাই জানতে পেরেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গত ৫ বছরে কখনো খেলনা, কখনো বার্থডে আইটেমসহ বিভিন্ন পণ্যের মিথ্যা ঘোষণার আড়ালে ক্যাসিনো পণ্য আমদানি করা হয়েছে বলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। সাম্পতিক সময়ের বিষয় নিয়ে কাস্টমস গোয়েন্দা থেকে এনবিআর চেয়ারম্যানকে ক্যাসিনো বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়া হয়। তাতে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- নিনাদ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ২০১৮ সালে ৩টি চালানে ক্যাসিনো কয়েন, মাহাজং মেশিন ও মেশিন টেবিল আমদানি করেছে। জাহিন ইন্টেরিয়র কম্পোনেন্ট নামে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮ সালে মাহাজং মেশিন, চৌধুরী ট্রেডার্স চলতি বছর ৪টি চালানে মাহাজং মেশিন, মাহাজং টেবিল ও টেবিল পার্টস আমদানি করেছে। আলিক রক ইন্টারন্যাশনাল চলতি বছর মাহাজং মেশিন পার্টস, বিবি ইন্টারন্যাশনাল ২০১৮ সালে মাহাজং মেশিন, এভারগ্রিন প্রোডাক্টস ফ্যাক্টরি (বিডি) লিমিটেড ২০১৬ সালে মাহাজং মেশিন ও মেশিন পার্টস, নিউ হোপ এগ্রোটিচ বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৮ সালে মাহাজং, মুন ট্রেডিং কোম্পানি চলতি বছর মাহাজং এবং বেস্ট টাইকন (বিডি) এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড চলতি বছর মাহাজং টেবিল গেম আমদানি করেছে।
এছাড়া সিক্স সি করপোরেশন ২০১৮ সালে ৪টি চালানে ক্যাসিনোর অন্যান্য সামগ্রীর পাশাপাশি মাহাজং মেশিন ও গেম এবং ডগজিন লংগারভিটি ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড ২০১৮ সালে ইলেকট্রনিক মাহাজং মেশিন আমদানি করেছে।
মাহাজং ছাড়াও ৯টি প্রতিষ্ঠান ক্যাসিনোর অন্য সামগ্রী আমদানি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এএম ইসলাম অ্যান্ড সন্স, পুষ্পিতা এন্টারপ্রাইজ, এ-থ্রি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, রেডিয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল, আলিফ এন্টারপ্রাইজ, সোলডার জিয়ার, চায়না হোটেল সাপ্লাই, জান্নাত ট্রেডিং ও এমআর ইন্টারন্যাশনাল। এই ২০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানই মাহাজং আমদানি করেছে বলে তথ্য পেয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা। এসব প্রতিষ্ঠানকে তলব করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের শুনানি নেয়া হয়েছে। আর কিছু প্রতিষ্ঠানের শুনানি চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে বেশ কিছু চালান যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। কী পরিমাণ আমদানি হয়েছে, তা বের করতে কাজ করছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিপ্ততর। প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ক্যাসিনোর সামগ্রী মাহাজং আটক করা হয়েছে।
এদিকে ক্যাসিনো পণ্যের আমদানি রোধে গেমস ও গেমস সামগ্রী পণ্য চালান খালাসের ক্ষেত্রে সব কাস্টম হাউসকে নির্দেশনা দিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা হয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা থেকে এনবিআর চেয়ারম্যানকে দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম থেকে ক্যাসিনো সামগ্রী আমদানির তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এইচএস কোড হেডিং ৯৫০৪-এর বিপরীতে বিভিন্ন গেমস ও গেমস ইকুইপমেন্ট আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪টি প্রতিষ্ঠান সরাসরি ক্যাসিনো সামগ্রী ঘোষণা দিয়ে আমদানি করেছে। এছাড়া গেমস ও বিভিন্ন ধরনের গেমস ইকুইপমেন্ট, যেমন মাহাজং গেম, কয়েন অপারেটেড মেশিন, স্পোর্টস টেবিল ও গেম মেশিন ঘোষণা সন্দেহে ২৯টি চালান শনাক্ত করা হয়েছে। এসব চালানের তথ্য কাস্টমস গোয়েন্দা নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করছে।
বলা হয়, এরই মধ্যে দুই আমদানিকারক ও এক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে পুষ্পিতা এন্টারপ্রাইজ নামক প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি ক্যাসিনো পণ্য ঘোষণা দিয়ে আমদানি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জিজ্ঞাসাবাদে ক্যাসিনো সামগ্রী কাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে এবং কারা ব্যবহার করছেন, সে বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে।
এ-থ্রি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ভারত থেকে বার্থডে আইটেমের সঙ্গে রোলেট গেম সেট ও পোকার সেট আমদানি করা হয়েছে। এসব পণ্য প্রতিষ্ঠানটি অনলাইনে বিক্রি করে দিয়েছে। তবে যাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে তাদের তলব করা হয়েছে।
এদিকে কাস্টমস গোয়েন্দা সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু মাহাজং আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের বেস্ট টাইকুন (বিডি) এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড নামক মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ক্যাসিনো আটক করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি মোবাইল সামগ্রী ঘোষণা দিয়ে মাহাজং আমদানি করেছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ব্যাটারি প্রস্তুতকারী কারখানা লংজারভিটি ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড ও মুন্সীগঞ্জের নিউ হোপ এগ্রোটেক বাংলাদেশ লিমিটেড নামে পোলট্রি ফিড ফ্যাক্টরি থেকে মাহাজং আটক করা হয়।
প্রতিবেদনে সুপারিশ করে বলা হয়, আমদানি নীতির নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় ক্যাসিনো সামগ্রী নেই। এছাড়া সংবিধানেও নেই। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করতে মত দেয়া হয়েছে। ক্যাসিনোর জন্য আলাদা এইচএস কোড না করা পর্যন্ত গেমস চালানগুলো শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করতে সব কাস্টম হাউসকে নির্দেশনা দেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।

Thursday, August 22, 2019

বাংলাদেশ এখন রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে দ্বিতীয় by রাজীব আহমেদ

বিশ্বে যে কয়েকটি দেশের রপ্তানি আয় খুব দ্রুত বাড়ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। গড় হিসাবে এক দশক ধরে দেশের রপ্তানি আয়ে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, ওপরে আছে কেবল ভিয়েতনাম। বিশ্ববাণিজ্যের এ চিত্র উঠে এসেছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। এটি গত সপ্তাহে প্রকাশ করা হয়। সব মিলিয়ে বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন ৪২ তম বড় রপ্তানিকারক দেশ, অন্যদিকে আমদানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৩০তম।

রপ্তানিতে বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রার অগ্রভাগে পোশাক খাত। একটু পেছনের দিকে তাকালে দেখা যায়, বৈশ্বিক পোশাকের বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। ২০০০ সালে পোশাক বাজারে এ দেশের হিস্যা ছিল আড়াই শতাংশের কিছু বেশি। এটা গেল বছর সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এতে পোশাক রপ্তানিতে একক দেশ হিসেবে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।

অবশ্য এত সুখবরের মধ্যে কপালে ভাঁজ ফেলার মতো খবরও আছে। বাংলাদেশের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে ভিয়েতনাম। ২০১৮ সালে বৈশ্বিক পোশাক বাজারে ভিয়েতনামের হিস্যা দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ একটু ওপরে আছে। কিন্তু ২০১৮ সালে বাংলাদেশের হিস্যা যেখানে কিছুটা কমেছে, সেখানে ভিয়েতনাম বেশ এগিয়েছে। ২০১৮ সালে ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির হার ছিল ১৩ শতাংশ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ছিল ১১ শতাংশ। দুই দেশেরই রপ্তানি আয় ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারের মতো।
  • ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ-২০১৯ শীর্ষক প্রতিবেদন।
  • বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতিবেদনটি গত সপ্তাহে প্রকাশ করা হয়।
  • বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন ৪২তম বড় রপ্তানিকারক দেশ।
  • রপ্তানিতে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার অগ্রভাগে পোশাক খাত।
বাংলাদেশের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির পেছনের কারণ জানতে চাইলে পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি ও শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান জায়ান্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফারুক হাসান তিনটি কারণ উল্লেখ করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘পোশাকের নতুন বাজার খোঁজা ও নতুন নতুন পোশাক পণ্য উৎপাদনে আমরা নিয়মিত প্রচেষ্টা চালিয়েছি, এখনো চলছে। আরেকটি দিক হলো যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত করতে অব্যাহত বিনিয়োগ।’ ফারুক হাসানের মতে, তৃতীয় কারণটি হলো পোশাক খাতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করতে কারখানার মালিকেরা সফল হয়েছেন।

চীনা হিস্যা ভিয়েতনামে
বৈশ্বিক পোশাক বাজারে চীনের হিস্যা কমছে। ২০১৭ সালের তুলনায় সাড়ে ৩ শতাংশ কমে ২০১৮ সালে চীনের হিস্যা দাঁড়িয়েছে ৩১ শতাংশের বেশি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও বাংলাদেশের হিস্যাও কিছুটা কমেছে। বেড়েছে ভিয়েতনামের। তাহলে চীনা ব্যবসা কি ভিয়েতনামেই বেশি যাচ্ছে?

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এখন পর্যন্ত চীনা ব্যবসা আমরা পাচ্ছি না। ভিয়েতনাম অনেক বেশি পাচ্ছে। এর কারণ শুল্ক সুবিধা ও সংস্কৃতি। বাংলাদেশের অবকাঠামো এখনো ভালো নয়।’ তিনি বলেন, কম্বোডিয়ার মতো দেশে প্রস্তুত জমি পাওয়া যায়। গ্যাস-বিদ্যুৎ সহজেই মেলে। বাংলাদেশের মতো তারা বলবে না যে এখন টাকা দাও, কয়েক বছর পরে জমি পাবে।

ভিয়েতনাম এত ভালো কীভাবে করছে, আরেকটি ব্যাখ্যা দেন ফারুক হাসান। তিনি বলেন, ভিয়েতনাম কৃত্রিম তন্তুর পোশাক বেশি রপ্তানি করে, যার দাম বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত দেশও নয়।

আর কেউ পারেনি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবশ্য রপ্তানি খাতের হিস্যা এখনো কম। ডব্লিউটিওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের জিডিপিতে পণ্য ও সেবা রপ্তানি খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশে। স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে অ্যাঙ্গোলা (৩৮.৬ %), কম্বোডিয়া (৭৪ %) ও মিয়ানমারের (২৪.৫ %) হার আরও বেশি।

এদিকে পোশাক খাত ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো খাত রপ্তানিতে তেমন এগোতে পারেনি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৫৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে পোশাক খাতের হিস্যা ৮৪ শতাংশ। এটি বছর বছর বাড়ছে। অন্যদিকে চামড়া, হোম টেক্সটাইল, পাট, চিংড়ি ইত্যাদি খাত একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে গেছে।

এগুলোকে একটি ‘হতাশাজনক চেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, মোদ্দা কথা হলো দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিদেশিরা পুঁজি, বাজার ও প্রযুক্তি নিয়ে আসবে। যেটা ভিয়েতনামে, ফিলিপাইনে হয়েছে। এ দেশে বিদেশি বিনিয়োগ যেটুকু আসছে, তার বেশির ভাগটাই জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ ইত্যাদি খাতে। উল্লেখ করে তিনি বলেন, পোশাক খাতেও বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। বিজিএমইএ তো সেটা চায় না।

পোশাক খাতে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহ না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, ‘পোশাক খাতের সংযোগ শিল্পে (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) বিদেশি বিনিয়োগ এলে আমরা খুব খুশি হব। সেটা আমাদের খুব দরকার। কারণ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পর পোশাক রপ্তানিতে দেশীয় কাপড় ব্যবহার না করলে বাণিজ্য সুবিধা মিলবে না।’ তিনি মনে করেন, পোশাক খাতে যেসব ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা সক্ষমতা অর্জন করেছেন, সেখানে বিদেশি বিনিয়োগের দরকার নেই।

Monday, August 19, 2019

ইউরেশিয়ার ৫ দেশ বাংলাদেশের রপ্তানির সম্ভাব্য বাজার by ফখরুল ইসলাম

রপ্তানি বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের চোখ এবার ইউরেশিয়ার দিকে। তারই অংশ হিসেবে ইউরেশীয় অর্থনৈতিক কমিশনের (ইইসি) সঙ্গে একটি সহযোগিতা চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে গত ৩১ মে ইইসির সদর দপ্তরে এ চুক্তি সই হয়। চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি এবং ইইসির মন্ত্রী পদমর্যাদার সদস্য তাতিয়ানা ভলোভিয়া।
পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশ রাশিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, আর্মেনিয়া ও কিরগিজস্তানের সমন্বয়ে গঠিত ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন (ইইইউ)। এই ইইইউ ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। অনেকটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আদলে গড়া এই ইইইউর সদস্যদেশগুলো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ।
তবে বর্তমানে তারা কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্টস স্টেটসের সদস্য। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১-৯৩ সময়ে যে ১১টি দেশ হয়, এগুলোকে একসঙ্গে বলা হয় কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্টস স্টেটস (সিআইএস)। ইইইউভুক্ত পাঁচটি দেশ একই সঙ্গে সিআইএসভুক্ত দেশও।
ইইইউর কার্যক্রম পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষই হচ্ছে ইইসি। ইইইউর আওতায় সদস্যদেশগুলোর মধ্যে কাস্টমস সীমান্ত নেই। ফলে বাধাহীনভাবে শুল্ক-কর পরিশোধ ছাড়াই এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য যাতায়াত করতে পারে। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইইইউর সব সদস্যদেশ একই শুল্ক হার এবং অভিন্ন বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করে থাকে।
জানা গেছে, ইইইউর আওতায় মোট ২ কোটি বর্গকিলোমিটার এলাকার এই পাঁচ দেশে ১৮ কোটি ২৭ লাখ মানুষ বসবাস করে। এ অঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু আয় ২৭ হাজার মার্কিন ডলার। বিশ্বের চাষযোগ্য জমির ১৪ শতাংশ এ এলাকার অন্তর্ভুক্ত। গম, তুলা ও ভুট্টা যেমন এ অঞ্চলে ব্যাপক উৎপাদিত হয়; ইউরিয়া সার, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল ও রাসায়নিক পণ্য এ অঞ্চলের আর্থিক ভিত্তির অন্যতম উৎস।
ইইইউভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ, ওষুধ, আলু ও সবজি রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে রাশিয়ায় তৈরি পোশাক, পাট, হিমায়িত চিংড়ি, আলু ইত্যাদি পণ্য রপ্তানি হলেও বাজার অনুযায়ী পরিমাণ খুব বেশি নয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়ার বাজারে বাংলাদেশ পণ্যের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা চেয়ে আসছে বহু বছর। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে কোনো দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি না থাকায় এবং রাশিয়া ইইইউর আওতায় গঠিত কাস্টমস ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় এককভাবে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা দিতে পারছে না। ইইসির সঙ্গে এবারের চুক্তি শুধু রাশিয়া নয়, ইইইউর সব সদস্যদেশেই বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে এবং বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক হিসেবে কাজ করবে। কারণ সহযোগিতা স্মারকের আওতায় শিগগিরই একটি কার্যদল গঠিত হবে, যার মূল কাজ হবে বাংলাদেশ ও ইইইউর সদস্যদেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চিহ্নিত ১৯টি খাতের উন্নয়নে কাজ করা।
গত বছরের অক্টোবরে রাশিয়া বলেছিল, ইইইউভুক্ত দেশগুলোতে শুল্কমুক্তভাবে পণ্য রপ্তানির জন্য বাংলাদেশের উচিত হবে ইইসিতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করা। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ সে আবেদন এখনো করেনি বলে জানা গেছে। যদিও এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশকে এখনো ইইইউভুক্ত দেশগুলো শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়। তবে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানিপণ্যে দেয় না। কমিশন অনুমোদন করলে তৈরি পোশাক, চামড়া, সিরামিক ইত্যাদি পণ্যের বড় বাজার হবে ইইইউভুক্ত দেশগুলো।
জানা গেছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হওয়ার বড় সুযোগ থাকলেও রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাংক যোগাযোগই নেই বাংলাদেশের। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আনতে সুষ্ঠু ব্যাংক লেনদেন জরুরি, যা বর্তমানে নেই। ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা রাশিয়াসহ সিআইএসভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করতে অনেকটা নিরুৎসাহিত বোধ করেন। ব্যাংক লেনদেন চালু হলে তৃতীয় দেশ অর্থাৎ তুরস্ক, পোল্যান্ডের মতো দেশের ওপর আর নির্ভর করতে হবে না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রাশিয়ায় রপ্তানি হয়েছে বাংলাদেশের ৮৮ কোটি ২০ লাখ ডলারের পণ্য, যা আগেরবারের চেয়ে ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। আর একই সময়ে রাশিয়া থেকে বাংলাদেশের আমদানি হয়েছে ৭৬ কোটি ২৯ লাখ ডলারের পণ্য, যা আগেরবারের চেয়ে দশমিক ৬ শতাংশ কম। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উজবেকিস্তানে রপ্তানি হয় প্রায় ৩ কোটি ডলার, ইউক্রেনে ২ কোটি ১৪ লাখ ডলার, আর্মেনিয়ায় ২৮ লাখ ৯২ হাজার ডলার ও বেলারুশে ২৭ লাখ ৪৮ হাজার ডলার মূল্যের পণ্য। এ ছাড়া মালদোভায় ২৩ লাখ ৫৬ হাজার, আজারবাইজানে ৭ লাখ ১৭ হাজার, তাজিকিস্তানে ৭ লাখ, কাজাখস্তানে ৬ লাখ, কিরগিজস্তানে ৩ লাখ এবং তুর্কমেনিস্তানে ২ লাখ ডলার দামের পণ্য রপ্তানি করা হয়।
এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সিআইএসভুক্ত দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে উচ্চ শুল্ক। শুল্কায়নের জটিলতাও আছে। তার চেয়েও বড় কথা দেশগুলোর সঙ্গে আধুনিক ব্যাংক যোগাযোগ নেই বাংলাদেশের। আবার বাণিজ্য করতে হয় তৃতীয় দেশের মাধ্যমে এবং মান্ধাতার আমলের টেলিগ্রাফিক লেনদেন (টিটি) পদ্ধতিতে।
এ ছাড়া ব্যাংক যোগাযোগের বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতি হয়েও আবার পিছিয়ে গেছে উভয় দেশ। প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছিল যে বাংলাদেশের সোনালী ব্যাংক ও রাশিয়ার স্পুতনিক ব্যাংক—উভয় দেশের ব্যাংক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে এবং উভয় দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মিলে ঠিক করবে ব্যাংক যোগাযোগ কীভাবে হবে। সে ব্যাপারেও কোনো অগ্রগতি নেই।
কমনওয়েলথ অব ইনডিপেনডেন্টস স্টেটসের বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি মো. হাবীব উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ-রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখন ১৫০ কোটি ডলারের মতো। অথচ কিছু পদক্ষেপ নিলে আগামী তিন বছরের মধ্যেই এ বাণিজ্য ১ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।’

Thursday, August 15, 2019

গারো পাহাড়ের সবজি যাচ্ছে বিদেশে by শাহরিয়ার মিল্টন

প্রথমবারের মতো শেরপুরের ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড়ের উৎপাদিত সবজি রফতানি হচ্ছে। গত জুন মাসে তিন দফায় সাড়ে চার মেট্রিক টন সবজি রফতানি হয়েছে। আড়তদার সুরুজ আলীর মাধ্যমে ঢাকার এ এস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড কুয়েতে এসব সবজি রফতানি করেছে। সবজির মধ্যে রয়েছে কাঁকরোল, করলা, ঝিঙ্গা ও চিচিংগা।
স্থানীয় বাজারে কাঁকরোল, করলা, ঝিঙ্গা ও চিচিংগা বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে। বিদেশে রফতানিকারক কোম্পানির প্রতিনিধির কাছে তা বিক্রি করা হয় ৩৬ থেকে ৩৮ টাকায়। এতে কৃষকরা আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন সবজি চাষে।
গোমড়া গ্রামের কৃষক জয়নাল বলেন, ‘দুই বছর ধরে কাঁকরোল চাষ করছি, লাভও বেশি পাচ্ছি। এ বছর চার কাঠা (২০ শতংশ) জমিতে কাঁকরোল চাষ করেছি। খরচ হয়েছে মাত্র ৫ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত কাঁকরোল বিক্রি করছি  ২০ হাজার টাকার, আরও ২০ হাজার টাকা বিক্রি করতে পারবো।’
কৃষক আহাম্মদ আলী বলেন, ‘আগে সবজি হাটে নিয়ে বিপাকে পড়তে হতো। বাজারে সবজির সরবরাহ বেশি হলে দাম কমে যেত। তখন অনেক সময় লোকসানে সবজি বিক্রি করতে হতো। এখন ঢাকায় বিক্রি করায় বেশি মূল্য পাচ্ছি। আবার শুনছি বিদেশেও যাচ্ছে আমাদের কাঁকরোল, হয়ত আরও  বেশি দাম পাবো।’
সবজির আড়তদার সুরুজ আলী বলেন, ‘আমাদের এলাকায় প্রচুর পরিমাণ সবজি চাষ হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয়ভাবে চাহিদা না থাকায় ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। আমি প্রথমে ঢাকার কাওরান বাজারে সবজি বিক্রি করতে যেতাম। সেখান থেকে ঢাকার এ এস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড কোম্পানির প্রতিনিধির মাধ্যমে জুন মাসে তিন দফায় সাড়ে চার মেট্রিক টন সবজি বিক্রি করেছি। এসব সবজিগুলোর বড় একটি অংশ কুয়েতে রফতানি করবে ওই প্রতিষ্ঠান। ওই কোম্পানি কুয়েত, দুবাই ও মালয়েশিয়াতে কৃষিপণ্য রফতানি করে থাকে। জুলাই মাসেও আরও পাঁচ থেকে ছয় মেট্রিক টন সবজি তাদের কাছে বিক্রি করার কথা রয়েছে। কিন্তু, বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।’
স্থানীয় কৃষকদের দাবি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মাধ্যমে সরাসরি বিদেশে রফতানিকারক কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হলে সবজির চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি দামও বাড়বে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সহেযোগিতা চেয়েছেন তারা।
ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কৃষকদের জমির মাটি পরীক্ষা থেকে শুরু করে ফসল তোলা পর্যন্ত সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া কৃষি বিভাগের নিবিড় তত্ত্বাবধানে হাত পরাগায়ণ, জৈব বালাইনাশক ও যুক্তিসঙ্গত বালাইনাশক ব্যবহারে বিষমুক্ত সবজির চাহিদা বাড়ছে।’
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার ঝিনাইগাতী উপজেলায় ৫৪০ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হয়েছে। স্থানীয় মানুষের চাহিদা পূরণ করে সিংহভাগ সবজি জামালপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেত। এখন তা বিদেশেও যাচ্ছে।
গারো পাহাড়ের সবজি

Tuesday, August 6, 2019

ভুট্টা রফতানিতে পোলট্রি শিল্পে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা by শামছুল ইসলাম

বাংলাদেশের ভুট্টা নেপালের বাজারে রফতানি হচ্ছে। পোলট্রি শিল্পে ভুট্টার চাহিদার তুলনায় দেশে অর্ধেক উৎপাদন হওয়ায় ওই রফতানি কার্যক্রম দেশীয় এই শিল্প অস্থিরতার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এমনিতে নিজেদের প্রয়োজনে ব্রাজিলসহ পৃথিবীর কয়েকটি দেশ থেকে ভুট্টা আমদানি করতে হচ্ছে। এরপরেও যদি দেশের ভুট্টা বিদেশে রফতানি করা হয় তাহলে আমদানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। ফলে ভুট্টা থেকে উৎপাদিত প্রধান পণ্য পোলট্রি ফিডের দাম বেড়ে যাবে। এতে দরিদ্র মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে পোলট্রি মুরগি ও ডিম।

জানতে চাইলে ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ইহতেশাম বি শাহজাহান নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশে পোলট্রি ও মাছের খাবার তৈরির প্রধান উপকরণ ভুট্টা। আর প্রাণিজ ওইসব খাদ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে সেটার প্রভাব পড়েছে ভুট্টার চাহিদা ও দামে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ফসলের ভালো দাম পাওয়ায় এখন কৃষকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ভুট্টাচাষ। কিন্তু বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ ভুট্টা উৎপাদন হচ্ছে তা আমাদের চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম। এগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এর পর যদি এটি রফতানি করা হয় তাহলে পোলট্রি মুরগি, ডিম, গরু, ছাগলে দাম বেড়ে যাবে। ফলে বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। দেশে আমিষের চাহিদা পূরণে এই সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে আমাদের জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে এটি রফতানি বন্ধ করা উচিত।

জানতে চাইলে নারিশ পোলট্রি অ্যান্ড হেচারির পরিচালক রফিকুল ইসলাম বাবু নয়া দিগন্তকে বলেন, কোনো পণ্য দেশের চাহিদা পূরণের পর সেটি রফতানি করা যেতে পারে। ভুট্টা উৎপাদন যতটুকু হচ্ছে তাতে আমাদের দেশের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। আমাদের নিজেদেরই আমদানি করতে হচ্ছে। এর পর যদি এটি রফতানি করা হয় তাহলে সেটা দেশের জন্য সাঙ্ঘাতিক হবে। এখন ১২০ টাকা মুরগি পাওয়া যায়। যেখানে অন্যান্য গোশতের দাম ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। এ ছাড়া দেশের পুষ্টির চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ হচ্ছে আমাদের পোলট্রি শিল্পের মাধ্যমে। এ জন্য দেশের স্বার্থে ভুট্টা রফতানি বন্ধ হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো: এছরাইল হোসেন বলেন, ভুট্টা অধিক লাভজনক ফসল হওয়ায় চাষিরা অলাভজনক অন্য আবাদ ছেড়ে দিন দিন ভুট্টার দিকে ঝুঁকছেন। দেশে সরাসরি ভুট্টা খাওয়ার খুব একটা প্রচলন না থাকলেও প্রাণিজ খাদ্য উপকরণ হিসেবে ভুট্টার চাহিদা ব্যাপক। এ কারণে এর দামও ভালো পাচ্ছেন কৃষক। যা ভুট্টার আবাদ বৃদ্ধির প্রথম কারণ। সরকারের নীতি সহায়তার পাশাপাশি বেশ কিছু উচ্চ ফলনশীল ভুট্টার জাতের কারণে ভুট্টার ফলন আগের থেকে অনেক বেড়েছে। এতে অন্য ফসলের তুলনায় একই জমিতে ভুট্টা চাষে বেশি লাভবান হচ্ছেন কৃষক।

রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ভুট্টা মানুষের অতি প্রয়োজনীয় খাদ্য তালিকায় এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি। দেশে উৎপাদিত বেশির ভাগ ভুট্টা পোলট্রি ও গোখাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ভুট্টা পুড়িয়ে খই ছাড়া এর ব্যবহার তেমন নেই। ভুট্টা থেকে তৈরি হতে পারে রুটি, খিচুড়ি, ফিরনিসহ নানা পুষ্টিকর খাবার।

এটি উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষক ভুট্টা চাষে আগ্রহী। তবে এটি ভাঙানোর আধুনিক ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল। সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিলে ভুট্টার উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক সময় দেশের হাতে গোনা কয়েকটি জেলায় ভুট্টার চাষ করা হতো। কিন্তু এখন প্রায় সব অঞ্চলেই কম-বেশি ভুট্টার চাষ করা হয়। গত ১০ বছর আগে যেখানে ভুট্টা উৎপাদনের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৫ লাখ ৫২ হাজার টন, বর্তমানে সেখানে উৎপাদন হচ্ছে ৩৮ লাখ ৯৩ হাজার টন। অর্থ্যাৎ, উৎপাদন বেড়েছে ২৩ লাখ ৪১ হাজার টন। পাশাপাশি অটুট রয়েছে ভুট্টার গুণগত মানও।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে দেশে মোট ভুট্টা উৎপাদন হয়েছিল ৭ লাখ ৩০ হাজার টন। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে অর্থাৎ ২০১০-২০১১ অর্থবছরে এর উৎপাদন দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৫২ হাজার টনে। এরপর ২০১১-২০১২ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৫৪ হাজার টন, ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে ২১ লাখ ৭৮ হাজার টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৫ লাখ ১৬ হাজার টন, ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ২৩ লাখ ৬১ হাজার টন, ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে ২৭ লাখ ৫৯ হাজার টন। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ভুট্টার উৎপাদন ৩০ লাখ টন ছাড়িয়ে যায়। আর ২০১৮ সালে এ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ লাখ ৯৩ হাজার টনে। অর্থাৎ গত ১০ বছরের ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ৬৪৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
নাটোরের ভুট্টাচাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, ধানের আবাদের চেয়ে ভুট্টার আবাদ অনেক লাভজনক হওয়ায় তার দেখাদেখি অনেকেই এ ফসল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বিঘাপ্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হলেও ৩৫ থেকে ৪০ মন পর্যন্ত ভুট্টা উৎপাদন সম্ভব। ভুট্টার শুকনো গাছ ও ভুট্টা মাড়াইয়ের পর তা জ্বালানি হিসেবে বাজারে বিক্রি করে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়।

Friday, July 19, 2019

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম রফতানি শূন্যের কোঠায়

বাংলাদেশসহ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু রফতানি প্রক্রিয়ায় জটিলতা, জেলা কৃষি বিভাগের গাফিলতি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই জেলার আমের রফতানি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে কৃষকদের অভিযোগ। ফলে গত কয়েক বছর ধরে এখানকার আম চাষি ও ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। আম রফতানির দৃশ্যমান ত্রুটিগুলো সমাধান করলে এই অঞ্চলের আমকেন্দ্রিক অর্থনীতি সচল হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আম চাষিদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ‘কনট্রাক্ট ফার্মিং’এ (আম চাষিদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের এক ধরনের চুক্তি) তারা আম উৎপাদন করেন। যে প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। কনট্রাক্ট ফার্মিংয়ের আইনি কোনও ভিত্তি নেই। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুবিধামতো চাষিদের সঙ্গে চুক্তি করেন। এখানে কৃষকদের কিছু করার থাকে না। কৃষি বিভাগও এ ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এছাড়া আম রফতানি সংশ্লিষ্ট কৃষি ও উদ্ভিদ সংঘ নিরোধ বিভাগের (কোয়ারেন্টাইন বিভাগ) উদাসীনতা ও খামখেয়ালিপনাও এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বিষয়গুলো তদারকিতে সরকারি কোনও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসছে না। ফলে অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে বিদেশে আমের বাজার সৃষ্টির প্রক্রিয়া।
চাষিরা আরও অভিযোগ করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে কোনও বছরই আম রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় না। এ মৌসুমে কী পরিমাণ আম রফতানি করা হবে তা আম চাষি, রফতানিকারক, স্থানীয় কৃষি বিভাগ, আম গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের কেউই জানেন না। ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’ পদ্ধতি রফতানির ক্ষেত্রে ভালো হলেও যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। প্রতিবছর আম সংগ্রহ করার পরপরই সংযোগ চাষির সঙ্গে চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও সেটি হয় না। কোনও কোনও সময় রফতানি শুরুর কয়েক মাস আগে তাড়াহুড়া করে সাদা কাগজে নামমাত্র চুক্তি সম্পাদন করা হয়। যেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটিও উল্লেখ থাকে না। কোন জাতের আম, কখন নেওয়া হবে, কত টাকা কেজি হিসেবে নেবেন এবং কত টন আম নেবেন সেই বিষয়ে কিছু উল্লেখ থাকে না। যদিও সাদা কাগজে চুক্তির কোনও বৈধতা বা আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে চাষিরা তাদের নিজেদের খেয়ালখুশিমতো আম উৎপাদন করে থাকেন। বিগত কয়েক বছর এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কোনও লাভ হয়নি।
চাষিরা জানান, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অথবা নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরে আমের কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। দেখা যায়, চাষি প্রথমে আমবাগান থেকে আম সংগ্রহ করেন এবং প্যাকিং করে রফতানির জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে আসেন। পরে সেখান থেকে রফতানিকারকরা আম বাছাই করে ক্রয় করে থাকেন এবং পুনরায় প্যাকিং করে নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরে যান। সেখানে পুনরায় খোলা হয় এবং কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষা সম্পন্ন করে নির্ধারিত কার্টনে প্যাকিং করা হয়। এতে দেখা যায়, পরিবহনের সময় ঘর্ষণজনিত কারণে আমের গায়ে দাগ পড়ে এবং ৫০-৬০ ভাগ আম বাদ পড়ে যায়। ফলে বিগত বছরগুলোতে এক হাজার কেজি আম চাষির কাছ থেকে ক্রয় করলে পাঁচ-ছয়শ’ কেজি কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষার সময় বাতিল হয়ে যায়। এ কারণে রফতানিকারকের চাহিদানুযায়ী এবং এয়ারস্পেস বুকিং মোতাবেক আম পাঠাতে পারেন না কৃষকরা। ফলে পরবর্তী সময়ে আম রফতানি বন্ধ হয়ে যায়। এ করণে বিদেশে আম রফতানির যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও নতুন বাজার তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে।
আমের কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষার বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমের কোয়ারেন্টাইনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো: যেমন—আমে কোনও রোগ বা পোকার আক্রমণ নেই, ব্যবহৃত কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নেই যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, ঢাকায় বসে পরীক্ষণ ত্রুটিপূর্ণ বা সম্ভব নয়। বিশেষ করে মাছি ও পোকা আমের খোসার নিচে হুল ফুটিয়ে ডিম প্রবেশ করিয়ে দেয় এবং পরে স্থানটি বন্ধ হয়ে যায়; যা আম পাকার পর কাটা ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যায় না। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের শ্যামপুরে বসে কাজটি সম্পন্ন করা হয়। ফলে রফতানি করা আমে নন-কমপ্লায়েন্স আসাটা স্বাভাবিক।’
জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথমবারের মতো ২০১৫ সালে শুরু হয় আম রফতানি প্রক্রিয়া। সেবার পরীক্ষামূলক বিদেশের বাজারে পাঠানো হয় দুই মেট্রিক টন। পরের বছর ২০১৬ সালে রফতানি করা হয় প্রায় ১০৪ মেট্রিক টন। ২০১৭ সালে তা আরও কমে যায়। ২০১৮ সালে তা দাঁড়ায় ৩৩ মেট্রিক টনে। আর এ মৌসুমে কী পরিমাণ আম রফতানি হবে, তা আম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কেউ জানেন না।
সরেজমিনে জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের একটি আমবাগানে কথা হয় কয়েকজন আম চাষির সঙ্গে। তাদের একজন শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালে পাঁচ মেট্রিক টন আম বিদেশে রফতানি করেছি। তবে পরের বছর থেকে কৃষি বিভাগের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম ও ব্যক্তি ইচ্ছার কারণে আম বিদেশে পাঠাতে পারিনি। উল্টো বাদ পড়েছি কন্ট্রাক্ট ফার্মিং থেকে।’ শহীদুলের মতো বিদেশে রফতানির লক্ষ্যে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের আওতায় বিশেষ পরিচর্যায় আম উৎপাদন শুরু করেন আহসান হাবিব, জেনারুল ইসলাম ও কাইয়ুম আলীর মতো প্রায় ৫০ জন চাষি। কিন্তু স্থানীয় কৃষি বিভাগের অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতায় তা ভেস্তে গেছে। এতে আর্থিকভাবে চরম ক্ষতির মুখে পড়েন এসব চাষি।
আম চাষি কাইয়ুম আলী অভিযোগ করেন, ‘আম রফতানিতে প্রয়োজন হয় স্থানীয় কৃষি বিভাগের সনদ বা প্রত্যয়নপত্র। এই সনদের কাছে জিম্মি রফতানিকারকরা। তারা কৃষি বিভাগের স্বার্থ রক্ষায় সিন্ডিকেট করে ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ে’ চাষিদের কাছ থেকে আম না কিনে, বাইরের খোলা বাজার থেকে নন-ব্যাগিং আম কিনে রফতানি করে। এতে সহায়তা করে কৃষি বিভাগ। অথচ এই আম রফতানিযোগ্য ছিল না। এতে আমরা যারা বিদেশে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন করেছিলাম, তারা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছি।
আরেক আম চাষি আহসান হাবিব বলেন, ‘কৃষি বিভাগের দুর্নীতি ও অদূরদর্শিতায় আম রফতানি না হলে, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সারাদেশের আম চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ অবস্থায় আমের নায্যমূল্য প্রাপ্তিতে আম রফতানিতে আমরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
চাষি রবিউল আওয়াল বলেন, ‘২০১৭ সালে বিদেশে রফতানির ২০ মেট্রিক টন আম উৎপাদন করি। কিন্তু মাত্র চার মেট্রিক টন বিদেশে রফতানি করতে পারি। ২০১৮ সালে একইভাবে ৩০ মেট্রিক টন আম উৎপাদন করে পাঠাই মাত্র দুই মেট্রিক টন। অথচ প্রতি মেট্রিক টন আম উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। বাকি আম স্থানীয় খোলা বাজারে বিক্রি করতে হয়েছে এবং বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মঞ্জুরুল হুদা জানান, আম রফতানিতে একাধিক পক্ষ থাকায় এবং তাদের নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষা করায় রফতানিটা সহজ হচ্ছে না। তাছাড়া আন্তর্জাতিক চাহিদা ও নিয়মকানুনের দিকে লক্ষ রেখে উৎপাদনকারী ও রফতানিকারকদের বোঝাপড়া ভালো না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত আম রফতানি হচ্ছে না। তবে কৃষি বিভাগের এ বিষয়ে প্রচেষ্টার কোনও ঘাটতি নেই। আমরা আশা করছি, রফতানি বাড়বে এবং এটা বাড়াতে হবে।’ কৃষি বিভাগের অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনও কিছু প্রথম চালু হলে, সেটা অতটা গোছানো থাকে না। এর কারণে অনিয়ম হয়ে থাকলেও থাকতে পারে। আমি এ সময় এখানে ছিলাম না। তবে অনিয়মটা ধরা পড়ার পর আমরা শক্ত অবস্থান নিয়েছি।’
আম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আম রফতানি প্রক্রিয়ায় কোনও আম বিশেষজ্ঞ বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা নেই; যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আম রফতানির পরিকল্পনা থেকে শুরু করে চাষি নির্বাচন, বাগান নির্বাচন, বাগান ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন পদ্ধতি, সংগ্রহ, প্যাকিংসহ সব ধাপে গবেষকদের সংশ্লিষ্টতা বা মতামত দরকার আছে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে এ প্রক্রিয়ায় গবেষকদের কোনও সংশ্লিষ্টতা দেখা যায়নি। বিষয়টিতে গুরুত্ব না দিলে আম রফতানির ক্ষেত্রে বিগত বছরের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তারা বলছেন,
আম রফতানি কোনও জটিল বিষয় নয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো একসঙ্গে পরিকল্পনা করে রফতানি করলে সহজেই এক-দুই ভাগ আম রফতানি করা সম্ভব; যার মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি বাগানে ঝুলছে আম