Monday, December 15, 2025

গাজার আহত শিশুদের ক্ষণিকের শান্তি দিচ্ছে ‘ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটি’

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের দুই বছরের বেশি সময়ের নির্বিচার হামলায় নিহতের পাশাপাশি হাজার হাজার শিশু বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয়েছে। বারবার বাস্তুচ্যুতি, ক্ষুধার্ত, স্বজন হারানো কিংবা পরিবার-স্কুল-পাড়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শিশু সংখ্যাও অজস্র। গত অক্টোবর থেকে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে ধ্বংসযজ্ঞ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে এসেছে। আগের দৈনন্দিন ভয়াবহতা না থাকলেও সেই ভয়াবহতার চাপ ও ছায়া সব জায়গায় রয়ে গেছে। উপত্যকাটির অন্য বাসিন্দাদের মতো শিশুদের এসব তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

গাজায় শারীরিক ও মানসিক অভিঘাতে ভোগা শিশুদের ক্ষণিকের জন্য হলেও শান্তি দিতে ছোট পরিসরে ভার্চ্যুয়াল রিয়ালিটি (ভিআর) সেবা চালু হয়েছে। গাজা মেডটেক নামের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এই সেবা দেওয়া হচ্ছে। তারা ভুক্তভোগী শিশুদের ভিআর হেডসেট পরিয়ে ভিন্ন জগতে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। এই জগতে তারা যুদ্ধের ভয়াবহ, ক্ষয়ক্ষতি এবং ধ্বংসের স্মৃতি কিছু সময়ের জন্য ভুলে থাকতে পারে। অল্প সময়ের জন্য আনন্দে মেতে উঠতে পারে।

মধ্য গাজার আজ-জাওয়াইদা এলাকার একটি তাঁবুতে শিশুরা ভিআর সেশনে অংশ নিতে পারছে। এতে অংশ নেওয়া শিশু সালাহ আবু রুকবা বলেন, ‘আমার মাথায় আঘাত লেগেছে। খুব ব্যথা করে। আমি তা ভুলে থাকার চেষ্টা করছি।’

ভিআর সেশনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আবু রুকবা বলে, ‘আমি যখন মাথায় হেডসেট পরি, আঘাতের ব্যথা ভুলে যাই। ধ্বংস, যুদ্ধ, এমনকি ড্রোনের শব্দের কথাও আমি ভুলে যাই। তখন আমার আরাম লাগে।’

গাজা মেডটেকের যোগাযোগ কর্মকর্তা লামা আবু দালাল বলেন, ‘আবু রুকবা এবং অন্য শিশুদের শরীর ও মনে যুদ্ধের স্মৃতি মিশে গেছে। ভিআর হেডসেট তাদের জীবনকে বদলে দেওয়া ক্ষতগুলো ভুলতে সাহায্য করে। কয়েক মুহূর্তের জন্য তারা আবার শিশু হয়ে উঠতে পারে।’ প্রকল্পটি কবে থেকে শুরু হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ফিলিস্তিনি উদ্ভাবক মোসাব আলী গাজা মেডটেকের উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। নিজের আহত ছেলেকে সান্ত্বনা দিতে তিনি সর্বপ্রথম ভিআর হেডসেট ব্যবহার করা শুরু করেন। মোসাব আলী যুদ্ধের একপর্যায়ে ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন।

বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, ভিআর সেবা মানসিক রোগ, বিশেষ করে পোস্ট-ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) চিকিৎসায় ভালো ফল দিতে পারে। কিন্তু গাজায় এই সেবা চালানো কঠিন। কারণ, ইসরায়েলের অবরোধের কারণে সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি গাজায় প্রবেশ করতে পারছে না।

জাতিসংঘের অনুমান, গাজার ৯০ শতাংশের বেশি শিশু নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার অভাবে চরম মানসিক চাপে রয়েছে। তাদের সুস্থ হতে দীর্ঘমেয়াদি সেবা প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (ডব্লিউএইচও) জাতিসংঘের আরও কয়েকটি সংস্থা গাজায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং মানসিক সহায়তা পৌঁছানোর পথে সব ধরনের বাধা তুলে নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে।

সালাহ আবু রুকবা ইসরায়েলের হামলায় মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন। ভিআর সেশনে অংশ নিলে সে যন্ত্রণা কিছুটা ভুলে থাকতে পারে
সালাহ আবু রুকবা ইসরায়েলের হামলায় মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন। ভিআর সেশনে অংশ নিলে সে যন্ত্রণা কিছুটা ভুলে থাকতে পারে। ছবি: আল–জাজিরার ভিডিও থেকে নেওয়া

বাশারমুক্ত সিরিয়ায় বিদেশি শক্তির পাশাখেলা by আলতাফ পারভেজ

কীভাবে একটা কর্তৃত্ববাদী সরকার সমৃদ্ধ কোনো দেশের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং সেই ঝুঁকিকে ব্যবহার করে আবার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তি কীভাবে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করে নেয়, আজকের সিরিয়া তার এক পাঠকক্ষ। বাশারমুক্ত সিরিয়ায় বিদেশি শক্তির পাশাখেলা নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ

সিরিয়ায় আসাদ বংশকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু ২০১১ সালে এবং সফল হয় ২০২৪–এর ডিসেম্বরে। চলতি ডিসেম্বরে বাশার আল–আসাদহীন সিরিয়ার এক বছর হলো। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, বাথ পার্টিবিরোধী ‘বিপ্লবী’রা ক্ষমতায় এসে এক বছরে মানুষের জন্য কী করলেন, দেশটির কী অবস্থা?

বাশার এখন মস্কোতে

আসাদকে পালানোতে বাধ্য করে মুখ্যত হায়াত তাহরির আল-শামস (এইচটিএস)। এই নামের বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘সিরিয়ার মুক্তির জন্য গঠিত সংস্থা’। এটা ছিল হঠাৎ সৃষ্ট ধর্মীয়-রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সশস্ত্র জোট। চূড়ান্ত যুদ্ধকালে তুরস্কের সহায়তাপুষ্ট সিরিয়ান ন্যাশনাল আর্মিও (এসএনএ) এইচটিএসের পাশে ছিল। এসএনএ গড়ে ওঠে বাশারের বাহিনী ছেড়ে আসা কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার নেতৃত্বে। গৃহযুদ্ধের শুরুতে দেশটির বিভিন্ন দিকে অনেকগুলো সংগঠন বাশারবিরোধী যুদ্ধে নামে। ক্রমে তারা টেলিগ্রাম চ্যানেলকে ব্যবহার করে যত যূথবদ্ধ হয়েছে, তত প্রতিপক্ষকে কাবু করায় সফল হয়েছে।

সিরিয়ায় আসাদ বংশ ক্ষমতায় ছিল প্রায় ৫০ বছর। পরিবারের সর্বশেষ শাসক ক্ষমতাচ্যুত বাশার আল-আসাদ এখন মস্কোতে। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি সেখানে পালান। বাশারের ক্ষমতাচ্যুতির ভেতর দিয়ে বিগত শতাব্দীর শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিকাশমান বাথ পার্টির শেষ দুর্গের পতন হয়।

বাশারের পর

বাশার আল-আসাদ ডিসেম্বরে পালিয়ে গেলেও আহমেদ আল-শারা দেশটির প্রেসিডেন্ট হন দু-তিন মাস পর। বাশারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শুরুতে তিনি ছিলেন আল-কায়েদার সিরিয়া শাখা আল-নুসরা ফ্রন্টের নেতা। এইচটিএস ওই আল-নুসরার পরিবর্তিত এক ধরনের নাম।
শারার সরকার এ মুহূর্তে অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। আরও চার বছর এই সংবিধানের অধীনে দেশ চলবে। এত দিনকার বাশারবিরোধী সশস্ত্র গ্রুপগুলো নতুন সরকারের প্রতিরক্ষা বাহিনী হিসেবে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।

মানবাধিকার দলন উল্টো চেহারা নিয়েছে

বাশার বংশ দামেস্ক থেকে চলে গেছে—এটা প্রচারিত হওয়ামাত্র সিরিয়াজুড়ে ব্যাপক লুটপাট হয় বেশ কয়েক দিন। লুটের প্রধান শিকার হয় বাশারের সহযোগী, রাষ্ট্রীয় নানান প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষভাবে সংখ্যালঘু আলাউইত ও দ্রুজ পরিবাগুলো। কোথাও কোথাও কবরস্থানগুলোও ভাঙচুর হয়। এ রকম একটা স্থান হলো বাশার আল-আসাদের বাবা হাফেজ আল-আসাদের কবর। হাফেজ আসাদ ও সাদ্দাম হোসেন ছিলেন আরব জাতীয়তাবাদী বাথ পার্টির দুই বড় চরিত্র। আট দশক আগে সিরিয়াতেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ওই রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল।

বাশার পরিবারের পলায়নমাত্র দেশটির অনেক মানবাধিকারকর্মী ওই আমলের অন্যায়-অবিচারের ডকুমেন্টেশন শুরু করেন, যাতে বিচারের দাবি তোলা যায়। তাঁদের সমস্যা হলো, আসাদদের পরে অন্যায়-অবিচারের ভিন্ন আরেক সুনামি বইছে সিরিয়াজুড়ে এবং এর শিকার মুখ্যত অ-সুন্নি জনগোষ্ঠী। আলাউইত ও দ্রুজদের বাইরে খ্রিষ্টানরাও নিয়মিত আক্রান্ত ও অপহৃত হচ্ছে। কেউ কেউ মারা পড়ছে। বড় অংশ পালাচ্ছে। তবে আল-শারার মন্ত্রিপরিষদে দ্রুজ, খ্রিষ্টান, কুর্দি ও আলাউইত সম্প্রদায়ের একজন করে সদস্য রাখা হয়েছে। মন্ত্রিসভার এই অন্তর্ভুক্তিমূলক চেহারা দেশ-বিদেশে প্রশংসিতও হয়েছে।

নতুন সরকারের এক বছর পূর্তিকালে সবচেয়ে বড় চমক হলো, এইচটিএস বলছে, আইএস (ইসলামিক স্টেট) গেরিলাদের নির্মূলে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করবে সিরিয়া। শারা রীতিমতো ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে এই অঙ্গীকার করে এসেছেন গত নভেম্বরে। একদিকে সাবেক আইএস সহযোগীরা ক্ষমতায়, আবার তারাই অন্য আইএসদের ধরপাকড়ে সহযোগিতা করতে চায়—এ রকম সবই একধরনের ধাঁধার মতো।

যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে নতুন সিরিয়ার কাছে আরেক নীরব চাওয়া, দামেস্ক যেন ক্রমে ইসরায়েলের বন্ধু হয়ে ওঠে। একে ইতিহাসের এক করুণ অধ্যায়ই বলতে হবে; কারণ, বহুকাল ধরে সিরিয়া প্যালেস্টাইন গেরিলাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের বড় কূটনৈতিক বন্ধু। এখন শারার কল্যাণে পুরোনো সিরিয়ার পুরোনো ইসরায়েল নীতি অনেকটা বদলে যাবে বলে মনে হচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক পাশাখেলা

সিরিয়ায় আসাদের পতনের পর সবচেয়ে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে। ১৩ বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর যুক্তরাষ্ট্র দারুণ উৎসাহের সঙ্গে ‘নতুন সিরিয়া’র সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়েছে। অথচ আজকের সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক-সামরিক উত্থান সেই সংগঠনের সহযোগী হিসেবে, যারা যুক্তরাষ্ট্রে বিমান হামলার দায়ে অভিযুক্ত।

আল-শারা ও আল-নুসরা ফ্রন্ট ২০২৪ সালেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কালোতালিকাভুক্ত থাকলেও এখন ওয়াশিংটনের শাসকেরা সিরিয়ার নতুন সরকারের বড় মিত্র। পূর্বের ‘সন্ত্রাসী’ মোহাম্মদ আল-জোলানিকেই এখন মার্কিন মিডিয়া ‘আল-শারা’ নামে ‘মডারেট লিডার’ বলছে! ট্রাম্প দেশটির ওপর থেকে এত দিনকার অর্থনৈতিক অবরোধও তুলে নিয়েছেন। এসব দেখে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র শারার মাধ্যমে সিরিয়ার ‘বিপ্লব’ ছিনতাই করেছে।

সময়টা এখন তুরস্কের

বাশার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার কৃতিত্বের বড় অংশ বিদেশিদেরও প্রাপ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক এ বিষয়ে বড় দাবিদার। শেষ মুহূর্তের ঘটনাবলির প্রধান কৃতিত্ব যুক্তরাষ্ট্রের বদলে তুরস্কের প্রাপ্য। ইসরায়েলের মতো তুরস্কও চায় বাশার–উত্তর সিরিয়ার একাংশ তার প্রভাবে থাকুক। প্রায় ৯০০ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে সে চেষ্টাই করছে তারা, যে সীমান্তের দুই দিকে আছে কুর্দিরা। সিরিয়ায় আঙ্কারার প্রভাব বাড়ামাত্র কুর্দিরা এরদোয়ান সরকারের সঙ্গে আপস চুক্তির মাধ্যমে সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধে রাজি হয়েছে।

নতুন সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দিদের জন্য কোণঠাসা এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিরিয়াতেও কুর্দিদের সংগঠন এসডিএফ নতুন সরকারের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করেছে। এ চুক্তির একটা অংশ হলো দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কুর্দিদের যে স্বঘোষিত স্বায়ত্তশাসিত এলাকা রয়েছে, তাকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে আনার বিষয়।

এটা একটা স্পর্শকাতর অধ্যায়, যার বাস্তবায়ন কীভাবে হয়, সেটা দেখার অপেক্ষায় আরও কিছুদিন থাকতে হবে। তুরস্ক তার দেশের কুর্দি তো বটেই, সিরিয়ার কুর্দিদেরও কোনো ধরনের স্বশাসনের বিপক্ষে। কুর্দিদের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাগত ভবিষ্যতরর প্রশ্নে তুরস্কের বিপরীত অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। শারার পক্ষে এই দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে না।

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর পরপরই ২০-৩০ লাখ মানুষ তুরস্কের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে। এ ঘটনা এবং কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি মোকাবিলার অজুহাতে তুরস্ক সিরিয়ার ভেতরে বেশ বড় একটা এলাকায় নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে রেখেছে। নতুন সরকারের আমলে সিরিয়ায় সফরকারী প্রথম বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন। বাস্তব কারণেই আহমেদ আল-শারাকেও প্রথম বিদেশ সফরে তুরস্কে যেতে হয়।
এর মধ্যেই ২০১২ সাল থেকে বন্ধ তুরস্ক দূতাবাস খুলেছে দামেস্কে। সিরিয়ার বাজারব্যবস্থায় তুরস্কের কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে যুক্ত হবে বলে সবার ধারণা। আঙ্কারা শরণার্থীদেরও ফেরত পাঠাতে ইচ্ছুক। সিরিয়ায় এর প্রভাব থাকলে মিসর ও ইসরায়েলকে বাদ দিয়েই সন্নিহিত সাগরের খনিজ উত্তোলনের চেষ্টা চালাবে তারা। তবে তুরস্কের এ রকম সব পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েলের চাওয়ার ওপর।

ইসরায়েলের নির্বিঘ্ন উপস্থিতি

বাশারের সঙ্গে ইসরায়েলের বিবাদের মূলে ছিল সিরিয়ায় ইরানের উপস্থিতি। যেহেতু তেহরান হামাস ও হিজবুল্লাহকে অস্ত্র জোগাত, সে কারণে ইসরায়েল সিরিয়ার মাটিতে ইরানিদের দেখতে অনিচ্ছুক ছিল। গৃহযুদ্ধে ইরান ও হিজবুল্লাহর সমর্থনে আসাদের বিজয় হতো ইসরায়েলের জন্য সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক বিপদ। এতে ইরান-ইরাক-সিরিয়া-লেবাননজুড়ে লম্বা এক সামরিক রুটে ইরানের সহজ চলাচল কায়েম হয়ে যেত।

সেই হিসাব থেকে ইসরায়েল শারাদের বিপ্লবী অভিযানের এক দূরবর্তী সহযোগী ছিল। গৃহযুদ্ধের মধ্যে তারা বারবার বাশারের সহযোগী ইরানের সামরিক স্থাপনা ও সরবরাহ লাইনে হামলা করে আগুয়ান গেরিলাদের জন্য বন্ধুসুলভ ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-তুরস্ক মিলে বাশারকে সরাতে ইতিহাসের ওই সময় বাছাই করেছে এ কারণেও যে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া এত বেশি যুক্ত হয়ে পড়েছিল, বাশারের সমর্থনে বাড়তি জনবল ও অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।

সিরিয়ায় সশস্ত্র সুন্নি শক্তিকে ক্ষমতায় বসিয়ে সেখান থেকে শিয়া ইরানকে দূরে রাখাকে ইসরায়েল আপাতত বেশ সুবিধাজনক মনে করলেও নিজেদের তারা পুরো বিপদ–মুক্ত ভাবে না। সে জন্য গত এক বছর ইসরায়েলের বিমানগুলো সিরিয়াজুড়ে উন্নত অস্ত্রপাতির গুদামগুলো বেছে বেছে ধ্বংস করেছে। পাশাপাশি তুরস্কের মতো সীমান্ত–সংলগ্ন সিরিয়ার একাংশজুড়ে বিশাল এক ‘নিরাপদ অঞ্চল’ গড়ে তুলেছে। বাস্তবে এখন তুরস্ক ও ইসরায়েল সীমান্তে সিরিয়ার ভেতর ওই দুই দেশের দুটি বাফার জোন রয়েছে।
ইসরায়েল যেটা চাইছে, তা হলো সিরিয়া জাতিগত সংঘাতে কমবেশি ব্যর্থ রাষ্ট্র হয়ে থাকুক আর তুরস্ক সিরিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকুক।

ইরান ও রাশিয়া এখন কী করবে

বাশারের পলায়নে মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ইরান। সিরিয়ায় ইরানের বিপুল সামরিক বিনিয়োগ ছিল। গৃহযুদ্ধে যুক্ত হয়ে তারা বহু সামরিক প্রতিভাও হারিয়েছে।
ইরানের আহ্বানে ও প্রভাবে বাশারকে রক্ষায় লেবাননের অনেক হিজবুল্লাহ সৈনিকও এসেছিলেন। এ রকম সবাইকে সিরিয়া ছাড়তে হয়েছে দ্রুত। বাশারের পলায়নে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের রাজনৈতিক-সামরিক প্রভাব কমে গেছে অনেকখানি। আশপাশে সব মৌসুমে ভরসা করার মতো বন্ধু নেই আর তাদের। সিরিয়ায় প্রভাব হারিয়ে হিজবুল্লাহকে সহায়তার সরবরাহ লাইনও বিপর্যস্ত। হামাসও অনেকখানি ধ্বংসপ্রাপ্ত। ফলে ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ছদ্মযুদ্ধে তেহরান এখন প্রায় কোণঠাসা।

সিরিয়ার মাটিতে ক্রমে ইসরায়েলের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য আমূল পাল্টে যাওয়ার পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের জন্যও মোটাদাগের এক বিপর্যয়। ধর্মীয়ভাবে বেশ র‌্যাডিক্যালদের শাসনকালেই এই পালাবদল ঘটছে।
ইরানের জন্য দূরবর্তী একটা আশার আলো হলো সিরিয়ায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এবং ফিলিস্তিনিদের পক্ষে নীরব জনমত আছে। এই দুই বিষয়ে ইরানের অবস্থানের প্রতি সিরিয়ার মানুষের সহানুভূতি আছে, যদিও বাশারের প্রতি ইরানি নীতি এই মানুষেরা সমর্থন করত না।

নতুন সিরিয়ায় ইরানের পাশাপাশি রাশিয়ার ভূমিকাও বেশ নগণ্য হয়ে গেছে। তবে সেটা ইরানের মতো বিপর্যয়কর নয়। রাশিয়া পুরোনো সিরিয়ার প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী ছিল। শারা সিরিয়ায় রুশদের উপস্থিতি পুরো সরাতে বলছেন না। হয়তো সেটা ইসরায়েলের দিক থেকে ভবিষ্যৎ বিপদের শঙ্কায়। ইতিমধ্যে মস্কো সফর করেছেন তিনি এবং এর পর থেকে সিরিয়ায় রুশদের পুরোনো তিনটি সেনা স্থাপনায় বেশ স্বাভাবিক পরিবেশ দেখা যাচ্ছে।

পুনর্গঠনের অপেক্ষায় অর্থনীতি

দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর স্বাভাবিকভাবে সিরিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা চলছে। প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে অবকাঠামোর অর্ধেকই ধ্বংসপ্রাপ্ত। এগুলোর পুনর্নির্মাণ এবং ত্রাণের জন্য বিশেষজ্ঞদের হিসাবে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার দরকার। তুরস্ক ও উপসাগরীয় দেশগুলো এ বিষয়ে সহায়তা করতে ইচ্ছুক। অনেক বিনিয়োগ ঢুকছেও দেশটিতে। তবে এসবের সুফল পেতে সামাজিক পূর্বশর্ত হিসেবে শান্তি দরকার। সমস্যা হলো, শারার সরকারের পক্ষে সেসব উগ্র গ্রুপকে সংখ্যালঘুবিরোধী সহিংসতা থেকে টেনে ধরা কঠিন, যারা বাশারবিরোধী যুদ্ধে মিত্র ছিল।

যুদ্ধকালে দক্ষিণের কুইনেত্রা ও দাররা প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় ইসরায়েল ১০-১৫টি সশস্ত্র গ্রুপকে লালন-পালন করত। দামেস্কের কেন্দ্রীয় সরকার এদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছে কি না, সেটা এখনো অনিশ্চিত।

আরেক সমস্যা ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ। বাশার পালালেও গত ১২ মাসে ইসরায়েল বহুবার দেশটিতে হামলা চালিয়েছে। সিরিয়ার ভেতর বহু জায়গায় তাদের চেকপোস্ট। সন্দেহ হলে নানাজনকে ধরেও নিয়ে যাচ্ছে তারা। নতুন সরকার এসব বিষয়ে দায়সারা বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছে।

সিরিয়া যা শেখাল

কীভাবে একটা কর্তৃত্ববাদী সরকার সমৃদ্ধ কোনো দেশের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং সেই ঝুঁকিকে ব্যবহার করে আবার আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তি কীভাবে নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধার করে নেয়, আজকের সিরিয়া তার এক পাঠকক্ষ।

শারার সরকার যতই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করুক, এটা রূঢ় বাস্তবতা যে দেশটির ভাগ্য নির্ধারক এখন তুরস্ক, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। ভূরাজনৈতিক ওই পাশাখেলায় শারা ও তাঁর সহযোগীরা ধর্মীয় আবরণে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে কেবল। কিন্তু বিশ্বের মানুষের কৌতূহল একটাই, দেশটিতে কথিত বিপ্লবের পর শান্তি আসবে কি না?

বিলাদ আল–শাম মধ্যপ্রাচ্যের এমন এক জায়গা, যেখানে শান্তি না আসা পর্যন্ত পুরো অঞ্চলে শান্তি আসবে না। শাম অঞ্চলে ফ্যাসাদ সৃষ্টির ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণীর কথাও মনে করিয়ে দেয় বর্তমান বাস্তবতা।

* আলতাফ পারভেজ, ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

(বাঁ থেকে ডানে) সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে, ১৪ মে ২০২৫
(বাঁ থেকে ডানে) সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে, ১৪ মে ২০২৫ ছবি: হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে

রাতারাতি নায়ক আহমেদ

রাতারাতি ‘নায়ক’ উপাধি পেয়েছেন আহমেদ আল আহমেদ। তিনি যে সাহসিকতায় অস্ত্রধারীকে জাপটে ধরে গুলি করা থামিয়েছেন তাতে তাকে বীর বললে কমই বলা হয়। রোববার অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বন্ডাই বিচে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে হামলাকারী পিতাপুত্র হত্যা করে কমপক্ষে ১৫ জনকে। এ সময় অসীম সাহস নিয়ে পিছন থেকে গিয়ে হামলাকারীকে জাপটে ধরেন আহমেদ। তিনি সঙ্গে সঙ্গে হামলাকারীর বন্দুক নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। এতে রক্ষা পায় অনেক মানুষ। এ জন্য অস্ট্রেলিয়াজুড়ে প্রশংসায় ভাসছেন আহমেদ। এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, সিডনির বন্ডাই বিচে গুলিবর্ষণের সময় তার দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সাহসিকতা বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, নিরস্ত্র ওই ব্যক্তি গুলি চলার মধ্যেই এক বন্দুকধারীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাকে কাবু করে ফেলেন। মাত্র ১৫ সেকেন্ডের সেই ভিডিওতে দেখা যায়, পার্ক করা গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা লোকটি হঠাৎ পেছন দিক থেকে বন্দুকধারীর দিকে দৌড়ে যান। তিনি বন্দুকধারীর গলা চেপে ধরেন, তার হাত থেকে রাইফেল কেড়ে নেন এবং তাকে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর তিনি অস্ত্রটি উল্টো করে বন্দুকধারীর দিকেই তাক করে ধরেন। ওই সাহসী ব্যক্তির নাম আহমেদ আল আহমেদ। বয়স ৪৩ বছর। পেশায় তিনি একজন ফল বিক্রেতা। হামলার সময় তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হন। দুটি গুলি তার শরীরে লাগে।
একটি টুইট পোস্টে বলা হয়েছে, এখানে দেখা যাচ্ছে এক সাহসী মানুষ একাই বন্দুকধারীকে ধরাশায়ী করছেন। অবিশ্বাস্য দৃশ্য। সেভেন নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মুস্তাফা নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি আহমেদের চাচাতো ভাই। তিনি বলেন, তিনি (আহমেদ) হাসপাতালে আছেন। ভেতরে ঠিক কী অবস্থা, আমরা পুরোপুরি জানি না। তবে আমরা আশা করছি তিনি ভালো থাকবেন। তিনি শতভাগ একজন নায়ক।

আহমেদের ওই রাতেই অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি কেবল ওই এলাকায় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি বুঝে তিনি নিজ উদ্যোগেই হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেন। অনলাইনে তার সাহসিকতার জন্য ব্যাপক প্রশংসা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ নিজেও তাকে ‘নায়ক’ বলে অভিহিত করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এই হামলায় কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হন। পরে ঘটনাস্থলেই এক বন্দুকধারীর মৃত্যু হওয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬। আহত অবস্থায় ২৯ জনকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা পিতা ও পুত্র। পিতার বয়স ৫০ বছর। তার নাম সাজিদ আকরাম। তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। ছেলে ২৪ বছর বয়সী নাভিদ আকরাম। গুরুত্বর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি।

নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ জানিয়েছে, হানুক্কার প্রথম দিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শত শত মানুষ জড়ো হন। এই হামলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে একজন ইসরাইলি নাগরিকও রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, হামলার পরপরই জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। তিনি বলেন, হানুক্কা বাই দ্য সি অনুষ্ঠানে বন্ডাই বিচে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। এটি ইহুদি অস্ট্রেলীয়দের ওপর লক্ষ্য করে চালানো আক্রমণ। আনন্দ ও ধর্মীয় উদযাপনের দিনে এটি ছিল চরম অশুভ কাজ- ইহুদিবিদ্বেষ, সন্ত্রাসবাদ, যা আমাদের জাতির হৃদয়ে আঘাত করেছে। তিনি আরও বলেন, ইহুদি অস্ট্রেলীয়দের ওপর হামলা মানে প্রতিটি অস্ট্রেলীয়র ওপর হামলা। আমাদের দেশে ঘৃণা, সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের কোনো জায়গা নেই। আমরা একে নির্মূল করব।

mzamin

পশ্চিম তীরে ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ

অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের কাজ অন্তত ২০১৭ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘ মহাসচিবের এক প্রতিবেদন থেকে এমনটা জানতে পেরেছে এএফপি। মূলত ২০১৭ সাল থেকে জাতিসংঘ এ ধরনের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে আসছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে প্রায় ৪৭ হাজার ৩৯০টি আবাসন ইউনিটের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া ও এর অনুমোদন দেওয়া বা টেন্ডার প্রকাশ করা হয়েছে। এ সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় অনেক বেশি। গত বছর এ ধরনের আবাসন ইউনিটের সংখ্যা ছিল ২৬ হাজার ১৭০টির মতো।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ সম্প্রসারণের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটি নিয়মিত উত্তেজনা উসকে দিচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে এবং একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ও সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা হুমকির মুখে ফেলছে।’

২০১৭ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পশ্চিম তীরে প্রতিবছর গড়ে ১২ হাজার ৮১৫টি ইসরায়েলি আবাসন ইউনিট যুক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন গুতেরেস। তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, আগের বছরগুলোর তুলনায় বসতির সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে।

১৯৬৭ সালে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল ও পরে অঞ্চলটিকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। জেরুজালেমকে বাদ দিলে পশ্চিম তীরে বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর বসবাস। সেই সঙ্গে সেখানে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনিও রয়েছেন।

গুতেরেস বলেন, এ ধরনের তৎপরতা অবৈধ ইসরায়েলি দখলদারিকে আরও দৃঢ়, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিনি জনগণের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেদের নেওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ন করছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়। এর জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় তাণ্ডব শুরু করে ইসরায়েল। তখন থেকে পশ্চিম তীরেও সহিংসতা ছড়িয়েছে দেশটি।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে এএফপির করা হিসাব অনুযায়ী, ওই সংঘাত শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা বা বসতি স্থাপনকারীদের হাতে অন্তত ১ হাজার ২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সশস্ত্র যোদ্ধারা যেমন আছেন, তেমন বেসামরিক মানুষেরাও আছেন।

একই সময় পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের হামলা বা ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে অন্তত ৪৪ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের সরকারি হিসাব অনুসারে এমন তথ্য জানা গেছে।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের একটি বসতি এলাকা
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের একটি বসতি এলাকা। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

হামলাকারীর বন্দুক কেড়ে নিয়ে বাঁচালেন বহু মানুষের প্রাণ

অস্ট্রেলিয়ার জনপ্রিয় বন্ডি বিচে বন্দুক হামলার ঘটনায় এ পর্যন্ত ১২ জনের নিহতের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সময় রোববার আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে দুই বন্দুকধারী এলোপাতাড়ি গুলি চালালে এতে আরও ২৯ জন আহত হন। ভয়াবহ এই হামলার সময় এক পথচারী হামলাকারীর কাছ থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছেন বহু মানুষের জীবন। তার এই বীরত্বপূর্ণ কাজের ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। এর মাধ্যমে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

এতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা ১৫ সেকেন্ডের  ভিডিওতে দেখা যায়, গোলাগুলি শুরুর পর নিরস্ত্র এক পথচারী একটি পার্ক করা গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। এরপর তিনি পেছন দিক থেকে বন্দুকধারীর দিকে দৌড়ে যান। তার গলা চেপে ধরে বন্দুকটি ছিনিয়ে নেন। বন্দুকধারী মাটিতে পড়ে গেলে ওই সাহসী ব্যক্তি তার দিকেই বন্দুক তাক করে রাখেন।

তার এই সাহসিকতায় অনেকগুলো প্রাণ বেঁচে গেছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এই পথচারীর নাম-পরিচয় সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বন্ডি বিচে হতাহতের ঘটনা মর্মান্তিক ও গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমরা এনএসডব্লিউ (নিউ সাউথ ওয়েলস) পুলিশের সঙ্গে কাজ করছি এবং আরও তথ্য নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপডেট দেব। (নাগরিকদের) জীবন রক্ষার জন্য পুলিশ ও জরুরি সেবাকর্মীরা ঘটনাস্থলে কাজ করে যাচ্ছেন।

mzamin

মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পদক্ষেপ কি কৌশলগত ভুল by খালিল আল-আনানি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ১লা ডিসেম্বর সোমবার একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। এ আদেশে তিনি তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা টিমকে মুসলিম ব্রাদারহুডের কিছু শাখাকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন (এফটিও) হিসেবে চিহ্নিত করার সম্ভাবনা যাচাই করতে বলেছেন। এটা তাঁর প্রশাসনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত, যা একটি বেপরোয়া নীতিগত ভুলের প্রতিনিধিত্ব করে। এটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের মূল স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে, মধ্যপ্রাচ্য আরও অস্থিতিশীল হবে এবং যেসব শক্তিকে ওয়াশিংটন মোকাবিলা করার দাবি করে, তাদেরই ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

এ আদেশে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি এবং জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডের সঙ্গে পরামর্শ করে ৩০ দিনের মধ্যে একটি রিপোর্ট দেবেন। এ রিপোর্টে মিসর, জর্ডান ও লেবাননে মুসলিম ব্রাদারহুডের শাখাগুলোকে এফটিও হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা উচিত কি না, সেটি উল্লেখ থাকবে।

এটি প্রথমবারের মতো হলো, তা নয়। গত দশকে বহুবার চেষ্টা হয়েছে; ট্রাম্পের প্রথম আমলে কংগ্রেসের কিছু সদস্য, বিশেষ করে সিনেটর টেড ক্রুজ এমন চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ, মার্কিন সরকারের ভেতরে বাস্তববাদী পেশাদারেরা ছিলেন, যাঁরা মৌলিক সত্যটি বুঝতেন: মুসলিম ব্রাদারহুড একটি আন্দোলন হিসেবে এ ধরনের চিহ্নিতকরণের আইনি মানদণ্ড পূরণ করে না; বরং তা করা হবে ভয়াবহ নীতিগত ভুল।

মার্কিন আইনে কোনো সংগঠনকে এফটিও হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে হলে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়: সংগঠনটি অবশ্যই বিদেশি হতে হবে; সেটিকে বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে হবে অথবা তা করার সক্ষমতা ও অভিপ্রায় থাকতে হবে এবং এসব কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্র বা এর জনগণের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে হবে।

মুসলিম ব্রাদারহুডের ক্ষেত্রে এই তিনটির মধ্যে দুটি শর্ত অনুপস্থিত। মিসর, জর্ডান বা লেবাননে ব্রাদারহুডের কোনো শাখাই বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সহিংসতার সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যভাবে যুক্ত নয়। তারা রাজনৈতিক, সামরিক বা অর্থনৈতিক—কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা বা নাগরিকদের জন্য প্রকৃত হুমকি তৈরি করে না। পরিহাস হলো, আরব স্বৈরশাসকদের সমর্থকেরা প্রায়ই ব্রাদারহুডকে ওয়াশিংটনের দালাল বা এজেন্ট হিসেবে অভিযুক্ত করেন।

সংস্কারবাদী আন্দোলন

মিসরে ব্রাদারহুড এক শতাব্দী পুরোনো একটি সংস্কারবাদী আন্দোলন, যা গামাল আবদেল নাসেরের সময়ের দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতার পর ১৯৭০-এর দশকের শুরু থেকে অহিংস অংশগ্রহণের পথে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। দশকের পর দশক তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং দরিদ্র জনগণের জন্য সামাজিক সেবা প্রদান করেছে। বিশেষভাবে ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে তারা ছিল জঙ্গি জিহাদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ, যা হাজারো মিসরীয়কে আল-কায়েদা ও অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রেখেছিল।

২০১১ সালের বিপ্লবের পর ব্রাদারহুড সংসদীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং মুহাম্মদ মুরসি মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু ২০১৩ সালের জুলাইয়ে আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁকে অপসারণ করা হয়। এরপর ঘটে রাবা হত্যাকাণ্ড, যা আধুনিক মিসরীয় ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। ফলে এক যুগব্যাপী নজিরবিহীন দমন-পীড়নের সূচনা হয়।

গণহত্যা, কারাবন্দী ও নির্বাসনের মধ্যেও ব্রাদারহুড নেতৃত্ব অহিংস অবস্থানেই অবিচল থাকে, যা সংগঠনের বহু তরুণ সদস্যের হতাশার কারণ ছিল। এখন ব্রাদারহুড সাংগঠনিকভাবে বিভক্ত, রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত এবং মিসরের ভেতরে তাদের কার্যক্রম প্রায় নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুধু অযৌক্তিকই নয়, বরং অর্থহীন। আইনি ভিত্তি দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ হলেও মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার পেছনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য একেবারেই স্পষ্ট।

প্রথমত, এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্পকে ঘিরে থাকা চরম ডানপন্থী উগ্রপন্থীদের জন্য একটি জয়। যেমন সেবাস্তিয়ান গোরকা, ট্রাম্পের সিনিয়র কাউন্টারটেররিজম পরিচালক, যাঁকে নিয়ে ইউরোপের নব্য নাৎসিগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বহু প্রতিবেদন রয়েছে এবং লরা লুমার, যিনি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ইসলামবিরোধী প্রচারণার জন্য পরিচিত এক কট্টর ডানপন্থী কর্মী। দুজনই দীর্ঘদিন ধরে ব্রাদারহুডকে বৈশ্বিক ইসলামপন্থী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছেন এবং এটিকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তির জন্য জোরদার লবিং করেছেন।

দ্বিতীয়ত, আরবের স্বৈরশাসকেরা বহু বছর ধরে ব্রাদারহুডকে অপরাধী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য ওয়াশিংটনে লবিং করছেন। কারণ, এটি এখনো তাঁদের সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। মিসর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—যারা আরব বসন্তবিরোধী প্রতিবিপ্লবের স্থপতি—ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে দেখছে এ অঞ্চলের সংগঠিত রাজনৈতিক বিরোধিতার শেষ চিহ্নটুকুও নিশ্চিহ্ন করার সুযোগ হিসেবে। সময়টিও সন্দেহজনক—সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের হোয়াইট হাউস সফরের কয়েক দিনের মধ্যেই এই ঘোষণা এল।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ইসলামকে ইসরায়েল তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে; আরব সমাজে এর ব্যাপক জনসমর্থন এবং অধিকৃত ভূখণ্ডে ইসরায়েলি নীতির প্রতি এর প্রত্যাখানের কারণে। মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করলে ইসরায়েলের অন্যতম প্রভাবশালী আদর্শিক প্রতিপক্ষ দুর্বল হবে, যা ইসরায়েলি স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসরায়েলপন্থী থিঙ্কট্যাংকের বেশ কিছু প্রতিবেদন ট্রাম্প প্রশাসনকে ব্রাদারহুডের নির্দিষ্ট শাখাগুলোকে এফটিও তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম দাতব্য ও অধিকার–সংক্রান্ত সংগঠনগুলোর সঙ্গে ব্রাদারহুডকে যুক্ত করার প্রচেষ্টা বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল–সমর্থিত লবিং সংস্থাগুলো, বিশেষত যেসব সংগঠন গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে সক্রিয়। এদের কয়েকটি সংগঠন ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্যের সরকারগুলোকে ‘চরমপন্থা মোকাবিলার’ নামে ইসলামি নাগরিক সংগঠনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার সুপারিশ করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট তাঁর রাজ্যে মুসলিম ব্রাদারহুড ও কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসকে সন্ত্রাসী সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। জাতীয়ভাবে ভবিষ্যতে কী হতে পারে, এটা তার একটি অশুভ ইঙ্গিত।

দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি

মুসলিম ব্রাদারহুডকে এফটিও হিসেবে চিহ্নিত করার বিষযটি মার্কিন নিরাপত্তা স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে ভয়াবহ ও ব্যাপক পরিণতি বয়ে আনবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক ইসলামি আন্দোলনের মুখোমুখি দাঁড় করাবে, যা আরব ও মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে গভীরভাবে প্রোথিত। ব্রাদারহুড কেবল একটি ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সংগঠন নয়; এটি একটি ধারণা, যার লাখ লাখ সমর্থক গোটা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের নানা স্থানে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ প্রকৃত সন্ত্রাসী সংগঠন, যেমন আল–কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটকে মোকাবিলার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করবে। ঐতিহাসিকভাবে সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে এমন মধ্যপন্থী ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দুর্বল করে যুক্তরাষ্ট্র অনিচ্ছাকৃতভাবে আরও উগ্র বিকল্পগুলোর প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়ে দেবে। এভাবে এই সিদ্ধান্ত নিজেই তার পূর্বাভাস সত্যে পরিণত করবে।

এটি হতাশাগ্রস্ত কিছু তরুণকে আরও চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করবে। ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করার বিষয়টিকে উগ্রপন্থীরা ব্যবহার করবে এই বার্তা দিতে যে শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ড অর্থহীন; বিশেষ করে যখন এই তরুণেরা দেখতে পায়, ওয়াশিংটন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারাকে আলিঙ্গন করছে, যিনি একসময় হায়াত তাহরির আল-শামের নেতা ছিলেন এবং যাঁর মাথার দাম একসময় ১০ মিলিয়ন ডলার ছিল। কিন্তু তাঁকে এখন হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানানো হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ কার্যকলাপকে অপরাধী বানানো হলে উগ্র গোষ্ঠীই লাভবান হয়।

এফটিও ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যকার অবিশ্বাস আরও গভীর করবে। বিশেষত যখন তাদের নাগরিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে মিথ্যা অজুহাতে লক্ষ্যবস্তু করা শুরু হবে। ফলে বিচ্ছিন্নতা বাড়বে এবং রাজনৈতিক বিভাজন তীব্রতর হবে। বিশেষ করে মিশিগান ও পেনসিলভানিয়ার মতো ‘সুইং’ অঙ্গরাজ্যগুলোতে।

শেষত, এই পদক্ষেপের ফলে কাতার ও তুরস্কের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়তে পারে, যে দুটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন মিত্র এবং যারা নির্বাসিত ব্রাদারহুড নেতাদের আশ্রয় দিয়ে থাকে। সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, কয়েক দশকের মধ্যে ব্রাদারহুড এখন সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে: রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, সাংগঠনিকভাবে দুর্বল এবং অঞ্চলজুড়ে দমন-পীড়নের কারণে সামাজিকভাবে সংকুচিত। এমন এক আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা কেবল বিশ্লেষণগত দিক থেকে অসংগত নয়, কৌশলগত দিক থেকেও আত্মঘাতী।

এই ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প উগ্রপন্থীদের দুর্বল করবেন না; বরং আরও শক্তিশালী করবেন। তিনি আমেরিকানদের আরও নিরাপদ করবেন না; বরং যুক্তরাষ্ট্রকে আরও অনিরাপদ করে তুলবেন। আর তিনি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনবেন না; বরং এর ভাঙন আরও ত্বরান্বিত করবেন। সংক্ষেপে, এটি ওয়াশিংটনের নেওয়া সবচেয়ে ভ্রান্ত ও কৌশলগতভাবে ব্যয়বহুল পদক্ষেপগুলোর একটি, যা বছরের পর বছর ধরে মার্কিন স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

* খালিল আল-আনানি, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি দুটি বইয়ের লেখক—ইনসাইড দ্য মুসলিম ব্রাদারহুড: রিলিজিয়ন, আইডেন্টিটি অ্যান্ড পলিটিকস এবং ইসলামিজম অ্যান্ড রেভল্যুশন অ্যাক্রস দ্য মিডল ইস্ট।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ

মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিক্ষোভ।
মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিক্ষোভ। ফাইল ছবি: এএফপি

সুদানে নিহত শান্তিরক্ষী: প্রিয়জনের মৃত্যুর খবরে শোকস্তব্ধ স্বজনেরা

প্রায় দেড় যুগ আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন মো. মমিনুল ইসলাম (৩৮)। অন্যদিকে সাত বছর আগে যোগ দেন সৈনিক শান্ত মন্ডল (২৬)। কুড়িগ্রামের এই দুজন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের জন্য গত মাসে সুদানে যান। যাওয়ার সময় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে দ্রুত ফিরে আসার কথা দিয়েছিলেন শান্ত। মমিনুল মাকে চিন্তা না করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু গতকাল সন্ত্রাসীদের হামলায় দুজনই শহীদ হয়েছেন। প্রিয়জনের মৃত্যুর খবরে দুজনের বাড়িতেই এখন মাতম চলছে।

সৈনিক শান্ত মন্ডল কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছাট মাধাই গ্রামের মন্ডলপাড়ার বাসিন্দা। তিনি সাবেক সেনাসদস্য নুর ইসলাম মন্ডল ও সাহেরা বেগমের ছোট ছেলে। তাঁর বড় ভাই সোহাগ মন্ডলও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। অন্যদিকে সৈনিক মমিনুল ইসলামের বাড়ি উলিপুর উপজেলার উত্তর পান্ডুল গ্রামে। মমিনুলের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে ও ছোট মেয়ের বয়স পাঁচ বছর।

গতকাল শনিবার সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেসে স্থানীয় সময় আনুমানিক বেলা ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত ড্রোন হামলা চালায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী। ওই হামলায় দায়িত্বরত কুড়িগ্রামের শান্ত ও মমিনুলসহ নাটোর, রাজবাড়ী, কিশোরগঞ্জ ও গাইবান্ধার মোট ছয়জন শান্তিরক্ষী শহীদ হন। আহত হন আরও আটজন।

রোববার বিকেলে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছাট মাধাই গ্রামের মন্ডলপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শান্ত মন্ডলের মৃত্যুর খবরে স্বজনেরা আহাজারি করছেন। স্বামীর মৃত্যুর খবরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন শান্তর পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী দিলরুবা খন্দকার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘শান্ত আমাকে কথা দিয়েছিল দ্রুত ফিরে আসবে। সে কথা ভাঙতে পারে না। আমার শান্তকে এনে দাও।’ বলতে বলতে মূর্ছা যান তিনি।

রাজারহাট ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বিপ্লব আলী পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে শান্তদের বাড়িতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘সুদানে হামলায় শান্ত নিহত হয়েছে। এই সংবাদ রংপুর সেনাক্যাম্প থেকে আমাকে আজ দুপুরে জানায়। এরপর আমি এই বাসায় এসেছি।’

শান্তর বড় ভাই সোহাগ মন্ডল বলেন, ‘শনিবার বিকেলেও ওর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়েছে। সবকিছু ঠিকই ছিল। রাতে ড্রোন হামলার খবর শুনে সুদানে থাকা এলাকার অন্য সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হই, আমার ভাই আর নেই।’

অন্যদিকে উলিপুরের উত্তর পান্ডুল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহত মমিনুলের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড়। আঙিনায় মাটিতে শুয়ে বিলাপ করছিলেন মমিনুলের বোন কমেলা বেগম। শোবার ঘরে বাক্‌রুদ্ধ স্ত্রী মুন্নী বেগম। পাশেই দুই মেয়ে।

ম‌মিনুলের স্ত্রী মু‌ন্নি বেগম ব‌লেন, ‘দুইটা মাসুম বাচ্চা আমার এতিম হ‌য়ে গে‌ল। এখন এই সন্তান দুটাক নি‌য়ে কী কর‌ব? সন্তা‌ন‌দের কে দেখ‌বে? মেয়েরা বাবা‌কে ছাড়া‌ কীভাবে চলবে?’

ম‌মিনুলের মা মনোয়ারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘অক্টোবর মাসে ২০ দিনের ছুটিতে বাড়িত আসি সগার কাছত দোয়া নিয়ে ঢাকাত গেইল। নভেম্বর মাসে যাওয়ার সময় আমায় জড়ায় ধরে কয়, “মা কান্না কোরো না। মুই খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসিম।” শনিবার সকালে বাপ মোর ভিডিও কল দিয়ে এলাকার সগারে সাথে কথা কইছে। সকা‌লে মোর বাপ নাশতা খায়া গে‌ছে। কিন্তু মোর বাপটাক বোম ফে‌লে দি‌য়ে মারি ফেলাইছে। মোর বাপটা কা‌রও ক্ষ‌তি করে নাই, তা-ও কে‌ন ওরা মোর বাপক মারি ফেলাইল?’

ভিনদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুই সৈনিক নিহতের ঘটনায় একদিকে যেমন মাতম চলছে, অন্যদিকে এলাকাবাসী গর্ববোধ করছেন। উলিপুরের উত্তর পান্ডুল গ্রামের বাসিন্দা হবিবর রহমান (৬৫) বলেন, ‘ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করে পড়ালেখা করেছে। বিশ্বশান্তির জন্য জীবন দিয়েছে। তার এই শহীদি মৃত্যুতে আমরা গর্বিত।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-14%2Fl6z09yaz%2FWhatsApp-Image-2025-12-14-at-7.26.22-PM.jpeg?rect=115%2C0%2C1080%2C720&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নিহত মমিনুল ইসলামের বোন কমেলা বেগম ভাই হারানোর শোকে আহাজারি করছেন। রোববার বিকেলে উলিপুর উপজেলার উত্তর পান্ডুল গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো

ইসরায়েলের অংশগ্রহণের প্রতিবাদে ইউরোভিশনের ট্রফি ফেরত দিচ্ছেন সুইস সংগীতশিল্পী নেমো

আন্তর্জাতিক গানের প্রতিযোগিতা ইউরোভিশনে ইসরায়েলের অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সুইজারল্যান্ডের সংগীতশিল্পী নেমো নিজের পুরস্কার ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল অনবরত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরও দেশটিকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার নেমো পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন।

নেমো তাঁর গাওয়া ‘দ্য কোড’ গানটির জন্য ২০২৪ সালে ইউরোভিশন পুরস্কার জিতেছেন। তাঁর মতে, ইউরোভিশন প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলের অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রতিযোগিতার আদর্শিক জায়গার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আর সে আদর্শিক জায়গাটি হলো সব মানুষের অন্তর্ভুক্তি ও সবার মর্যাদা বজায় রাখা।

ইউরোভিশনের আয়োজক সংস্থা ইউরোপিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিয়ন (ইবিইউ)–এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী পদক্ষেপের সর্বশেষ সংযোজন এটি। গত সপ্তাহে ইবিইউ ইসরায়েলকে আগামী বছর অস্ট্রিয়ায় অনুষ্ঠেয় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার পর পাঁচটি দেশ প্রতিযোগিতা থেকে সরে গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে নেমো বলেন, ‘ইউরোভিশন বলে যে তারা ঐক্য, অন্তর্ভুক্তি ও সব মানুষের মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ায়। এই মূল্যবোধগুলোর কারণেই এ প্রতিযোগিতাটি আমার কাছে এত অর্থবহ। কিন্তু যখন কিনা জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে (অধিকৃত ফিলিস্তিন অঞ্চল, পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েল বিষয়ক তদন্ত) গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তখন বোঝা যায়, ওই আদর্শগুলোর সঙ্গে ইবিইউর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো স্পষ্টত সাংঘর্ষিক।’

ইসরায়েল বারবার গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। ইসরায়েলের দাবি, তারা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে সীমান্ত পেরিয়ে হামাসের নেতৃত্বে হামলার পর নিজেদের আত্মরক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে। ওই হামলার কারণেই এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছে।

গত বুধবার আইসল্যান্ডের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম আরইউভির খবরে বলা হয়েছে, দেশটি ২০২৬ সালে অনুষ্ঠেয় ইউরোভিশন গানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। গাজায় অব্যাহত ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি। এর আগে স্পেন, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়াও একই ধরনের ঘোষণা দেয়।

সুইস সংগীতশিল্পী নেমো
সুইস সংগীতশিল্পী নেমো। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

ওসমান হাদিকে গুলি: আমাকে শোরুমে নিয়ে যান, সব সত্য বেরিয়ে আসবে -আদালতে মোটরসাইকেলের মালিক

শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিক মো. আব্দুল হান্নান আদালতে দাবি করেছেন, তিনি ওই মোটরসাইকেল বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য র‌্যাব ও পুলিশকে তাঁকে শোরুমে (বিক্রয়কেন্দ্র) নিয়ে যেতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তারা তা করেনি।

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি ঢাকা–৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। গত শুক্রবার মতিঝিল এলাকায় গণসংযোগ করে ফেরার পথে বেলা ২টা ২৪ মিনিটে পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে চলন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা অবস্থায় তাঁকে গুলি করা হয়। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওসমান হাদির অবস্থা এখনো সংকটজনক।

ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনায় সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যে মোটরসাইকেলে গিয়ে তাঁকে গুলি করেছিল সন্ত্রাসীরা, সেই মোটরসাইকেলের মালিক মো. আবদুল হান্নানকে গতকাল রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে আটক করে র‌্যাব।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে হান্নানকে আজ রোববার আদালতে হাজির করে পুলিশ। রাজধানীর পল্টন থানার উপপরিদর্শক সামিম হাসান জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁর ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলমের আদালতে এই আবেদনের শুনানি হয়।

রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী আদালতে বলেন, ওসমান হাদিকে হত্যাচেষ্টায় যে হোন্ডা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছে। হোন্ডার একটি নেমপ্লেট ছিল। হোন্ডার মালিকানার তথ্য যাচাই করে তদন্ত কর্মকর্তা ও পুলিশ বাহিনী মালিক হিসেবে আবদুল হান্নানের নাম পেয়েছে। হত্যাচেষ্টার রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য যারা গুলি করেছে, তাদের সঙ্গে হোন্ডার মালিকের সম্পর্ক কী, সেটা যাচাই করা প্রয়োজন। সে জন্য এই আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া প্রয়োজন।

ওমর ফারুক ফারুকী আরও বলেন, ‘সারা জাতি আজ উদ্বিগ্ন। সামনে নির্বাচন। এমপি প্রার্থী ও রাজনৈতিক নেতারা হুমকির সম্মুখীন। সারা জাতি আজ এ হত্যাচেষ্টার রহস্য উদ্‌ঘাটনের দিকে তাকিয়ে আছে। এ রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে হবে, আগামীর দেশের জন্য, জাতির জন্য, নির্বাচনের জন্য।’

পরে আসামি আব্দুল হান্নান আদালতের অনুমতি নিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমাকে গ্রেপ্তারের পর র‍্যাবকে বলেছিলাম, শোরুমে নিয়ে চলেন তাহলে সব সত্যি বেরিয়ে আসবে। কিন্তু তারা নিয়ে যায়নি। থানায় এসে পুলিশকেও বলেছিলাম শোরুমে নিয়ে যেতে। বলেছিলাম তদন্ত করেন, সব বেরিয়ে যাবে।’

হান্নান বলেন, ‘আমি এ হোন্ডা মিরপুর মাজার রোড থেকে কিনেছিলাম। তবে হাতে সমস্যা হওয়ায় পরিবার থেকে বাইক চালাতে নিষেধ করেছিল। এ জন্য বাসায় বাইকটি পড়ে ছিল। পড়ে থাকলে বাইকটি নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে একটি শোরুমে বিক্রি করি এবং আমি নাম চেঞ্জ করে দিবো বলেছিলাম। তারা দুই মাস আগে কল দিয়েছিল, কিন্তু অসুস্থ থাকায় মালিকানা পরিবর্তন করার জন্য যেতে পারিনি।’

আদালতে হান্নানের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিল না। শুনানি শেষে আদালত তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আবদুল হান্নানকে আদালতে হাজির করে পুলিশ
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আবদুল হান্নানকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। ছবি: প্রথম আলো

রায়েদ সাদকে হত্যা যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন: হামাস

গাজা নগরীতে ইসরায়েলের হামলায় দলের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার রায়েদ সাদ নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এর আগে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে গতকাল শনিবার হামাসের এই নেতাকে হত্যার দাবি করেছিল।

শনিবারের ওই হামলায় ৫ জন নিহত এবং অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

হামাস এ হামলার বিষয়ে বিবৃতি দিলেও প্রথমে রায়েদ সাদ নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তখন হামাস বলেছিল, গাজা নগরের বাইরে একটি বেসামরিক গাড়িতে হামলা হয়েছে। এই হামলা অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

পরে আজ রোববার এক ভিডিও বার্তায় হামাসের গাজাপ্রধান খলিল আল-হাইয়া বলেন, গাজায় ইসরায়েলের হামলায় নিহত পাঁচজনের মধ্যে রায়েদ সাদও রয়েছেন।

খলিল আল-হাইয়া বলেন, ‘ইসরায়েল বারবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে যাচ্ছে, যার সর্বশেষ সংযোজন হামাস কমান্ডারকে (রায়েদ সাদ) হত্যা। গতকালই এ ঘটনা ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে আমরা সব মধ্যস্থতাকারী এবং বিশেষ করে চুক্তির প্রধান নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে মার্কিন প্রশাসন ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আহ্বান জানাই, তাঁরা যেন ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্মান করতে ও তা মেনে চলতে বাধ্য করেন।’

এর আগে টেলিগ্রামে এক পোস্টে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বলেছিল, ওই কমান্ডার (রায়েদ সাদ) হামাসের সক্ষমতা পুনর্গঠনে কাজ করছিলেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে ইসরায়েলে হামাসের হামলা পরিকল্পনাকারীদের একজন ছিলেন তিনি।

রায়েদ সাদ হত্যাকাণ্ড অক্টোবরে গাজায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর হামাসের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতাকে হত্যার প্রথম ঘটনা।

একজন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, রায়েদ সাদকে লক্ষ্য করেই এ হামলা চালানো হয়েছিল। তিনি রায়েদ সাদকে হামাসের অস্ত্র তৈরি শাখার প্রধান বলে দাবি করেন।

হামাস সূত্র রায়েদ সাদকে হামাসের সশস্ত্র শাখা কাসাম ব্রিগেডের সেকেন্ড ইন কমান্ড তথা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মকর্তা বলে জানিয়েছে। এই সূত্রগুলো বলেছে, সাদ আগে হামাসের গাজা সিটি ব্যাটালিয়নের প্রধান ছিলেন। হামাসের সবচেয়ে বড় ও অস্ত্রসজ্জিত ব্যাটালিয়নের একটি এটি।

অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় ইসরায়েলের হামলা থামেনি। অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরায়েলের প্রায় ৮০০ বার গাজায় হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ৩৮৬ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।

গাজা নগরীতে এই গাড়িতে হামলা চালিয়ে হামাস নেতা রায়েদ সাদকে হত্যা করে ইসরায়েল
গাজা নগরীতে এই গাড়িতে হামলা চালিয়ে হামাস নেতা রায়েদ সাদকে হত্যা করে ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় কেন বন্ধ রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে গাজা যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ থেকে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইসরায়েলের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিনিময় অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে জানা আছে এমন ছয়জন কর্মকর্তা এমন তথ্য জানিয়েছেন।

ওই কর্মকর্তারা বলেন, ২০২৪ সালের দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্র গাজার ওপর একটি মার্কিন ড্রোনের ‘লাইভ ভিডিও’ ইসরায়েলের সঙ্গে বিনিময় করা বন্ধ করে দিয়েছিল। গাজায় জিম্মিদের খোঁজ এবং হামাস যোদ্ধার অবস্থান শনাক্ত করতে ইসরায়েল সরকার ওই ভিডিও ব্যবহার করত।

কর্মকর্তাদের পাঁচজন বলেছেন, মার্কিন গোয়েন্দারা অন্তত কয়েক দিন এই ‘লাইভ ভিডিও’ ইসরায়েলকে দেননি।

দুটি সূত্র বলেছে, ইসরায়েল গাজায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য কতটা ব্যবহার করতে পারবে, সে বিষয়েও সীমা আরোপ করে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

ঠিক কোন সময়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তাঁরা নির্দিষ্ট করে বলতে রাজি হননি।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কার্যক্রম নিয়ে কথা বলা ওই ছয় সূত্রের কেউ তাঁদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।

সূত্রগুলো জানায়, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে সাধারণ মানুষ নিহত হওয়ার সংখ্যা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে যখন উদ্বেগ বেড়েই চলছিল, তখন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত ফিলিস্তিনি বন্দীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছে বলেও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সন্দেহ ছিল।

তিনটি সূত্র আরও বলেছে, ইসরায়েল মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করার সময় যুদ্ধ আইন মেনে চলার বিষয়ে যথেষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি, এ নিয়েও কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল।

মার্কিন আইন অনুযায়ী, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে কোনো বিদেশি দেশের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করার আগে এ আশ্বাস পাওয়া আবশ্যক।

দুটি সূত্র বলেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ছিল সাময়িক ও কৌশলগত। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভেতর থেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। গাজা যুদ্ধে বাইডেন প্রশাসন ইসরায়েলকে গোয়েন্দা তথ্য ও অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে অব্যাহত সমর্থন দিয়ে যাওয়ার নীতিতে অটল থেকেছে।

এ বিষয়ে জানেন এমন এক কর্মকর্তা বলেন, গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের হাতে যথাসময়ে কিছু তথ্য বিনিময় করা বা না করা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকে। হোয়াইট হাউসের অনুমতি ছাড়াই তাঁরা এ বিষয়ে নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

ঠিক কবে গোয়েন্দারা তথ্য বিনিময় না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অথবা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এ বিষয়ে অবগত ছিলেন কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এ বিষয়ে জানতে জো বাইডেনের একজন মুখপাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের আইন মেনে গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেওয়ার পর আবার তথ্য বিনিময় শুরু হয়।

ড্রোন দিয়ে তোলা ছবিতে গাজা সিটির ধ্বংসচিত্র। ছবিটি ২৭ অক্টোবর, ২০২৫ তোলা
ড্রোন দিয়ে তোলা ছবিতে গাজা সিটির ধ্বংসচিত্র। ছবিটি ২৭ অক্টোবর, ২০২৫ তোলা। ছবি: রয়টার্স