Showing posts with label পটুয়াখালী. Show all posts
Showing posts with label পটুয়াখালী. Show all posts

Monday, April 28, 2025

পটুয়াখালীতে শহীদ বাবার কবরের পাশে শা‌য়িত কলেজছাত্রী, কান্না থামছে না মায়ের

পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় জুলাই আন্দোলনের শহীদ বাবার কবরের পাশেই দাফন করা হয়েছে কলেজছাত্রী মেয়েকে। আজ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে নিজ গ্রামের বসতঘরের সামনের আঙিনায় তাকে দাফন করা হয়। এর আগে সন্ধ্যা সাতটার দিকে মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছান স্বজনেরা।

গতকাল শনিবার রাতে রাজধানীর শেখেরটেক এলাকার বাসা থেকে ওই কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গত ১৮ মার্চ তাকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে দুমকি থানায় মামলা রয়েছে। আজ রোববার রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর উদ্দেশে রওনা হন স্বজনেরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যা সাতটার দিকে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। একই অ্যাম্বুলেন্সে ছিলেন কলেজছাত্রীর মা। তিনি অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্নার একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ সময় স্বজনেরা তাঁকে ধরে বাড়িতে নিয়ে যান। নিজ ঘরে পৌঁছানোর একপর্যায়ে জ্ঞান ফিরলে তিনি আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। এমন অবস্থা থেকে কলেজছাত্রীর বৃদ্ধ দাদাও সেখানে কান্নাকাটি শুরু করেন।

পরে বাড়ির পাশে একটি স্কুলমাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ওই জানাজায় বিএনপির কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, এনসিপির মুখ্য সংগঠক সার্জিস আলমসহ নেতা–কর্মীরা অংশ নেন।

এর আগে কলেজছাত্রীর মা জানিয়েছিলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে গত বছরের ১৯ জুলাই ঢাকার মোহাম্মদপুরে তাঁর স্বামী গুলিবিদ্ধ হন। ১০ দিন পর ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। তাঁর শহীদ স্বামীকে দুমকি উপজেলার গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়।

ওই নারী আরও বলেন, গত ১৮ মার্চ সন্ধ্যায় বাবার কবর জিয়ারত করে নানাবাড়িতে ফেরার পথে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় তাঁর মেয়ে। ধর্ষণের সময় এজাহারভুক্ত আসামিরা তার অশালীন ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বলে। এরপর তাঁরা গত ২০ মার্চ থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে উপজেলার একটি ইউনিয়নের দুজনের নাম উল্লেখ করা হয়। সেই দুজন কিশোর। তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে যশোর শিশু সংশোধনাগারে পাঠানো হয়।

পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় কলেজছাত্রীর জানাজায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন। আজ রোববার রাতে
পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলায় কলেজছাত্রীর জানাজায় বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন। রোববার রাতে ছবি: প্রথম আলো

Friday, February 28, 2025

বোম্বাই মরিচ যেন ‘টাকার মেশিন’

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কুমির মারা গ্রামের মো. সোহেল হাওলাদার। ঢাকায় বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। ছুটিতে গ্রামে গেলে মো. জাকির হোসেন নামের এক কৃষকের পরামর্শে বোম্বাই মরিচের চাষ শুরু করেন তিনি।

ওই বছরই লাভের মুখ দেখেন সোহেল। সময়টা ছিল ২০১৮ সাল। পরে ২০২২ সালে ঢাকার চাকরি ছেড়ে গ্রামে স্থায়ী হন। নিজেকে যুক্ত করেন বাণিজ্যিকভাবে বোম্বাই মরিচ চাষে। ২০২২ সালে ৫০ হাজার টাকা খরচ করে ২ লাখ টাকা বিক্রি করেছিলেন তিনি। এখন পর্যন্ত তিনি লেগে আছেন বোম্বাই মরিচ উৎপাদন কাজে। তার দেখাদেখি ওই এলাকার অনেক যুবক চাকরির পেছনে না ছুটে বোম্বাই মরিচ চাষ শুরু করেছেন। ফলে শত পরিবার যুক্ত হয়ে পড়ছে বোম্বাই মরিচ উৎপাদন কাজে।

স্থানীয়ভাবে বোম্বাই মরিচ নামে পরিচিত থাকলেও দেশে নাগা মরিচ নামেই চেনে। এই বোম্বাই মরিচ চাষ করেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে এ গ্রামের শত পরিবার। কম টাকা ব্যয়ে অধিক লাভবান হওয়া যায় বলে বোম্বাই মরিচ চাষির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই এলাকার কৃষকরা টাকার মেশিন মনে করে বোম্বাই মরিচকে।

কৃষকরা জানান, পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কুমিরমারা গ্রামের প্রতিটি ঘরেই একজন করে বোম্বাই মরিচ চাষি রয়েছে। সাধারণত সারা দেশে কাঁচামরিচের চাষ হলেও কুমিরমারা গ্রামে প্রচুর আধুনিক পদ্ধতিতে বোম্বাই মরিচ চাষ করা হয়। বাঁশ কিংবা লোহার পাইপ দিয়ে কাঠামো তৈরি করে তার ওপর পলিথিন শিট দিয়ে ঢেকে দেন। এ শেটের নিচে চলে মরিচ আবাদ। এতে তাদের খুব বেশি খরচ না হলেও লাভ অনেক বেশি। বর্তমানে পাইকারি বাজারে তারা প্রতি পিস বোম্বাই মরিচ ৩-৪ টাকায় বিক্রি করছেন বলে জানান এখানকার কৃষকেরা।

জানা যায়, উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের কৃষকরা যে মরিচ উৎপাদন করেন, তা তাদের স্থানীয় পাখিমারা বাজারেই বিক্রি করে থাকেন। এখান থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা কিনে নিয়ে যান। নীলগঞ্জের এ বোম্বাই মরিচ ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক চাহিদাও আছে। কৃষকদের প্রতিদিনের বাজার করার টাকা বোম্বাই মরিচ বিক্রি করেই মিটিয়ে থাকেন। তারা আর্থসামাজিক পরিবর্তন করতে পেরেছেন বোম্বাই মরিচ চাষ করে। বাজারের ব্যাগে করে ১ ব্যাগ মরিচ বাজারে নিয়ে গেলে সারা সপ্তাহের প্রয়োজনীয় বাজার ক্রয় করে টাকা অতিরিক্তও থাকে। বেকার বসে না থেকে বোম্বাই মরিচ চাষ করার আহ্বান জানান এখানকার কৃষকরা।

বোম্বাই মরিচ চাষি মো. নূরে আলম হাওলাদার বলেন, এবার ১৫ শতাংশ জমিতে বোম্বাই মরিচ চাষ করছি। আমার খরচ হয়েছে ১ লাখ। এখন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ। আরও বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি। এটা লাভজনক। বর্ষা মৌসুমে একটা বোম্বাই মরিচ ৯ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারি।

মো. ইউনূস হাওলাদার বলেন, কম খরচে বেশি লাভবান হওয়া যায় বোম্বাই মরিচে। তবে বেশি লাভ পাই বর্ষাকালে। তখন দূর দূরান্ত থেকে পাইকাররা আমাদের কাছ থেকে মরিচ ক্রয় করে নিয়ে যায়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসাইন বলেন, আধুনিক কৃষির সঙ্গে নীলগঞ্জের কৃষকরা সরাসরি সম্পৃক্ত। তারা অসময়ে ফসল ফলিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। বিশেষ করে সেডের মাধ্যমে বোম্বাই মরিচ চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে উৎপাদন বেশি হয় এবং দামও বেশি পায় কৃষকরা। ২ শতক জমি থেকে ১ লাখ টাকা বিক্রি করতে পারে। আমরা সব সময় পাশে থেকে পরামর্শ দিয়ে থাকিব। 

বোম্বাই মরিচকে টাকার মেশিন মনে করে যে গ্রামের কৃষকরা। ছবি : কালবেলা
বোম্বাই মরিচকে টাকার মেশিন মনে করে যে গ্রামের কৃষকরা। ছবি : কালবেলা

Wednesday, December 11, 2024

বাবাকে নিয়ে হাজারো প্রশ্ন ছোট্ট শিশুটির by ফাহিমা আক্তার সুমি

কোথায় যাবো, এই অবুঝ শিশুদের কি বলে সান্ত্বনা দিবো, কি হবে আমার সন্তানদের ভবিষ্যৎ? কি দোষ ছিল ওদের বাবার? আমার ছোট্ট দুই সন্তান বাবাহারা হয়ে গেল। বড় মেয়েটি বাবাকে ছাড়া খেতে চায় না। রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে বাবার জন্য। সবসময় তাদের বাবাকে খুঁজতে থাকে। বাবাকে নিয়ে হাজার প্রশ্ন করে। বারো মাসের ছোট্ট মেয়েটি সবসময় বাবা বাবা করে। কি দোষ ছিল ওদের বাবার? এভাবে কথাগুলো বলছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ৩১ বছর বয়সী মেহেদী হাসানের স্ত্রী। তিনি গত ১৮ই জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। ছররা গুলিতে তার চোখ, মুখ, মাথাসহ পুরো শরীর ঝাঁজরা হয়ে যায়। পরে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মেহেদী পেশায় একজন গণমাধ্যমকর্মী ছিলেন।

মেহেদীর স্ত্রী ফারহানা ইসলাম পপি মানবজমিনকে বলেন, দুই সন্তানকে নিয়ে কেরানীগঞ্জের মান্দাইলে একটি ভাড়া বাসায় থাকতাম। সেই বাসা বর্তমানে ছেড়ে দিয়ে আমার বাবার কাছে থাকি। সন্তানদের নিয়ে অনেক চিন্তায় আছি। আমার বাবা অসুস্থ। ইচ্ছা ছিল বড় মেয়েকে জানুয়ারিতে স্কুলে ভর্তি করবো। আর ছোট মেয়ের বয়স ১২ মাস চলে। সন্তানদের নিয়ে মেহেদীর অনেক স্বপ্ন ছিল। মেয়েদের পড়াশোনা করাবে, তাদের খুব ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবে। এত কষ্ট দিয়ে মারার কি দরকার ছিল? সে কি দোষ করেছিলো। বুকে কেন পাড়া দিলো? একবারের জন্যও কি মায়া হয়নি, ভাবেনি তার ঘরে ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা আছে। তারা বাবাকে ছাড়া কীভাবে চলবে। বড় মেয়েটি ঠিক ওর মতো হয়েছে। বড় মেয়েটিকে একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করাবে। তাকে ভবিষ্যতে ডাক্তার বানানোর খুব ইচ্ছা ছিল ওর। বড় মেয়েটা ওর বাবাকে ছাড়া খেতে, ঘুমাতে চায় না। মাঝে মাঝে বাবার হাতে খেতে চায়, মাঝে একদিন না খেয়ে ছিল। বাবা কখন আসবে সেই প্রশ্ন সবসময় করতে থাকে।

তিনি বলেন, আমি কখনো কল্পনা করতে পারিনি যে এমন হবে। মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেও আমার সঙ্গে কথা হয়। ঘটনার দিন যখন প্রথমে তাকে কল করি তখন সে রিসিভ করেনি। পরে সে কল দিলে আমিও ব্যস্ততার কারণে রিসিভ করতে পারিনি। ওর সঙ্গে আমার ভালোবেসে বিয়ে ছিল। আমি অসুস্থ থাকায় আমাকে ছাদে যেতে নিষেধ করেছিল সেদিন ফোনে। ফোনে এটাও বলেছিল বাসায় সাবধানে থেকো মেয়েদের নিয়ে, আমি রাতে বাসায় এসে সব বলবো বাইরে কি হচ্ছে। চারিদিকে গুলির আওয়াজ শুনতে পাই মোবাইলে কথা বলার সময়। এমন গুলির আওয়াজ শুনে তাকে বাসায় বা অফিসে যেতে বললে সে আমাকে তখন ধমক দিয়ে বলে এটা আমার কাজ, আমার দায়িত্ব। আমাকে খাবারও খেয়ে নিতে বলেছিল। এগুলোই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা, তার আধাঘণ্টা পরেই জানতে পারি গুলির ঘটনা।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পপি বলেন, তার সঙ্গে আমার শেষ কথা হয় বিকাল ৪টার দিকে। গুলি লাগে সন্ধ্যার আগে। আমি যখন জানতে পারি ঘটনাটি তখন কোনো ভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। হানিফ ফ্লাইওভারের ঢালে গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সেখানে থাকা তার সহকর্মীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার দেবরকে খবরটি জানাই। সে তখনই গাজীপুর থেকে রওনা দেয়। আমিও ঢাকা মেডিকেলে ছুটে যাই। তাকে নিয়ে যাওয়ার পাঁচ মিনিট পর গিয়ে দেখি সে জরুরি বিভাগের আইসিইউ’তে। এই দৃশ্য মনে পড়লে এখনো ঘুমাতে পারি না। পরে তাকে ইসিজি রুমে নিয়ে যায় সেখানে থাকা চিকিৎসক জানায় সে স্পটেই মারা গেছে। ছররা গুলির সঙ্গে বুলেটও ছিল তার শরীরে। মুখে, চোখে, গলায়, ঘাড়ে, মাথাসহ পুরো শরীরে কোথাও বাকি ছিল না। মুখে কোনো দাঁত ছিল না। মেহেদীর বুকের ভেতরে জুতার ছাপ পাওয়া গেছে। অনেক কষ্ট দিয়ে তাকে মারা হয়েছে। মারা যাওয়ার পরে বুকের মধ্যে পাড়া দিয়ে হয়তো মৃত্যু নিশ্চিত করেছে আমার এমন মনে হচ্ছে। হঠাৎ এক-দুইটা গুলি লাগতে পারে কিন্তু এত বেশি গুলি ছিল ওর শরীরে। সেদিন রাতে তার মরদেহ মর্গে রাখা হয়। পরের দিন দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে তার মরদেহ হস্তান্তর করে। চারদিকে রাস্তার অবস্থা খুব ভয়াবহ ছিল। এই অবস্থার মধ্যে তার মরদেহ নিয়ে আমরা পটুয়াখালীর বাউফলে যাই, সেখানে তার নিজ বাড়িতে দাফন হয়।

তিনি আরও বলেন, আমি বেশি দূর পড়তে পারিনি। যখন এইচএসসি পরীক্ষার টেস্ট দিয়েছিলাম তখন বিয়ে হয়। আমার মেয়েদের জন্য আমার কিছু একটা করতে হবে। ওর বাবার মতো হয়তো যত্ন নিতে পারবো না কিন্তু মেয়েদের তো বড় করতে হবে। ওর বাবার দেখা স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। আমি এখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছি না, ভাবছি আমার মেয়েদের কি হবে? কোথায় যাবো আমি ওদের নিয়ে। আমার যোগ্যতা অনুযায়ী একটা চাকরির ব্যবস্থা যদি হয় মেয়েদের জন্য হলেও সেটি করতে চাই। আমি একটা অন্ধকার জীবনের মধ্যে আছি। বাবাকে নিয়ে সন্তানদের হাজার প্রশ্নের জবাব কীভাবে দিবো?

মেহেদীর মা মাহমুদা বেগম মানবজমিনকে বলেন, আমি আমার সন্তানকে ছাড়া ভালো নেই। আজ কতো মাস হলো সন্তানের মুখটা দেখতে পারি না। আমাকে মা বলে আর ডাকে না। আমার তিন ছেলের মধ্যে মেহেদী ছিল সবার বড়। সেই আমাদের সংসার চালিয়েছে। সবসময় আমাদের চিকিৎসা খরচ দিয়েছে। আমিও অসুস্থ আর বাবাও অসুস্থ। আমরা বাড়িতে থাকি পটুয়াখালীতে। ১৮ই জুলাই ঘটনার দিন দুপুরে মেহেদী আমাকে ডাক্তার দেখানোর জন্য টাকাও পাঠিয়েছিল। ওর কবরের কাছে গেলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না। মায়ের মন কি আর ঠিক থাকে। ওর বাবা সারাদিন মন খারাপ করে থাকে। সে স্ট্রোকের রোগী। হার্টের চারটি ব্লক ধরা পড়েছে। আমার ছোট ছেলেটার বয়স মাত্র বারো বছর, সে মাদ্রাসায় পড়ে পরীক্ষা দিচ্ছে। এখন কীভাবে চলবো। অসহায় হয়ে পড়েছি। আমার সন্তান কি দোষ করেছিল? কেন আমার সন্তানকে এভাবে মারলো? 

mzamin

Monday, November 18, 2024

দেড়শ’ কোটি টাকার মালিক মুহিবপত্নী by মো. শরিফুল হক শাহীন

পটুয়াখালী-৪ আসনের এমপি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মহিবুর রহমান মুহিবের স্ত্রী ফাতেমা আক্তার রেখার নামে ৩০টি দলিলে রয়েছে অন্তত ৩৭ একর জমি। সব জমিই পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা ও পায়রা বন্দরের আশপাশে। এসব জমির বর্তমান বাজারমূল্য দেড়শ’ কোটি টাকা হবে।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পান মুহিব। নির্বাচনে রাতের ভোটে এমপি নির্বাচিত হন। স্বামী এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরই টাকা আর জমির নেশায় পেয়ে বসে মুহিবপত্নীকে। দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ উপায়েই এ সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি।

২০১৯ সালের ২১শে নভেম্বর তাপস সাহা গং নামে এক হিন্দু পরিবারের কাছ থেকে কোটি টাকা দিয়ে ৮শ’ শতাংশ (৮ একর) জমি কেনেন রেখা। এই জমির অবস্থান ইটবাড়িয়া মৌজায়। দলিল নং-৪৫১২। ২০২৪ সালে ধুলাসার মৌজায় আলমগীর হোসেন হাওলাদারের কাছ থেকে নেন ৫ দশমিক ২৬ একর জমি। ২০২২ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ৬৬৭০নং দলিলে বৌলতলীতে রিয়াজুল ইসলাম মিলন তালুকদারের কাছ থেকে কেনেন ০.৬১ একর জমি। ২০১৭ সালের ৩১শে আগস্ট কাউয়ারচর মৌজায় আব্দুস সত্তার গংয়ের কাছ থেকে নেন দেড় একর, দলিল নং ৪১২০। একই সালের ৩১শে আগস্ট ১ দশমিক ৩৪ একর জমি কেনেন রেখা। যার দলিল নং ৪১১৯।

২০১৯ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর কাউয়ারচর মৌজায় ৩৯৬২নং দলিলে স্থানীয় দাদন মিয়ার ১ দশমিক ১২ একর জমি কেনেন মাত্র ২২ লাখ ৪৫ হাজার টাকায়। ২০১৮ সালের ১২ই এপ্রিল ধুলাসার মৌজায় মোশারেফ হাওলাদার গংয়ের কাছ থেকে নেন ১ দশমিক ২১ একর জমি। একই এলাকায় পরের বছরের ১৯শে জুন ২৫৪৬নং দলিলে দশমিক ৩৮ একর জমি কেনেন।
২০২৩ সালের ১১ই অক্টোবর ৫২১২নং দলিলে বৌলতলী মৌজায় ১ দশমিক ৩৯ একর ধানী জমি নেন স্থানীয় আবুল কাশেম গংয়ের কাছ থেকে। ২০১৯ সালের ২রা জানুয়ারি কাউয়ারচর মৌজায় আবদুল ছত্তার গংয়ের ০ দশমিক ৭৬ একর জমি লিখে নেন রেখা। যার দলিল নং-৪০১১। ২০২৩ সালের ২১শে সেপ্টেম্বর ধুলাসার মৌজায় নাজিম সিকদার গংয়ের দেড় একর জমি দলিল করে নেন মুহিবপত্নী ফাতেমা আক্তার। যার দলিল নং-৫০১৭। ২০১৯ সালের ২রা অক্টোবর কাউয়ারচরে জলিল গংয়ের ৩৯ শতাংশ জমি বাগিয়ে নেন রেখা।

২০১৮ সালের ২৩শে এপ্রিল ধুলাসার মৌজার সোনা মিয়া গং ও নুর সাঈদ গংয়ের কাছ থেকে ৪৮ লাখ টাকায় কেনেন একটি জমি। একই জায়গায় ৪০৮২নং দলিলে রয়েছে রেখার আরও ৩০ শতাংশ জমি। বৌলতলীতে ২০২২ সালের ২৬শে ডিসেম্বর স্থানীয় আজিজুর রহমানের ১০২ শতাংশ জমি মাত্র ৬ লাখ টাকায় দলিল করেন রেখা। দলিল নং-৬৬৭২।
একই সালে তিনি ফিরোজা বেগমের কাছ থেকেও সমপরিমাণ জমি দলিল করেন একই স্থানে। যার দলিল নং-৬৬৭১। ধুলাসারের আব্দুল মালেক গংয়ের ১৯০ শতাংশ, গঙ্গামতিতে ৩০ শতাংশ, ২০২০ সালে রফিকুল ইসলাম গংয়ের কাছ থেকে কেনেন ১৫৪ শতাংশ জমি। এ ছাড়া ২০১৮ সালে ০.৪৫ একর, ২০১৯ সালে ০.২০ একর, ২০১৭ সালে দেড় একর ও ০.৪২ একর জমি কেনেন রেখা।

ধুলাসার ইউনিয়নের সাবেক এক চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্কুল-কলেজের চাকরি বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য ও টিআর কাবিখার কাজ না করে পুরো টাকা লুটপাট করে নিয়েছেন তিনি। সেই অর্থেই কুয়াকাটা ও পায়রা বন্দরের মতো জায়গায় এত জমি কিনেছেন তিনি।
ফাতেমা আক্তার রেখা আলহাজ জালাল উদ্দিন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। কলেজের অফিস সহায়ক আলমগীর হোসেন বলেন, ফাতেমা আক্তার কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ছিলেন। ২০১৮ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হয়েছেন। তার বেতন সর্বসাকুল্যে ৩৮ হাজার টাকার মতো।

হিন্দু সমপ্রদায়ের কাছ থেকে দলিল করা কোটি টাকা মূল্যের আট একর জমির মালিকানা অস্বীকার করলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মো. মহিবুর রহমানের স্ত্রী ফাতেমা আক্তার। গত পহেলা অক্টোবর ঢাকার একটি নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এক হলফনামায় এ জমির মালিকানা তিনি অস্বীকার করেন। হলফনামায় দাবি করেছেন,‘রেজিস্ট্রিকৃত ওই সাফ কবলা দলিল আমি ও আমার নিকটজনের অজান্তে কে বা কারা সম্পন্ন করেছে যা আমি অবগত নই। আমি বিষয়টি অবগত হয়ে আমার প্রতিনিধির মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত জেনে দলিলের কপি সংগ্রহ করি। সে হলফনামায় আরও উল্লেখ করেছেন, আমি বা আমরা অবগত না থাকায় অত্র দলিলে আমি বা আমার নিকটজনের কোনোরূপ স্বত্ব বা মালিকানা থাকবে না। ভবিষ্যতেও দাবি করবো না। এ নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো অসুবিধা বা বিতর্ক, বিবাদ দেখা দিলে আমি বা আমার নিকটজন দায়-দায়িত্ব বহন করবো না। এমনকি দলিলটির মূল্য ও রেজিস্ট্রি খরচ সে পরিশোধ করেননি বলে উল্লেখ করেছেন। এই হলফনামাটি অতি সম্প্রতি কলাপাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দাখিল করা হয়েছে।

mzamin


Thursday, August 15, 2024

জিহাদের ছবি নিয়ে কেঁদেই চলেছেন মা

কোটা বিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত জিহাদ হোসেন (২৫)কে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার মা শাহিনুর বেগম। ছেলের ছবি বুকে চেপে কেঁদেই চলছেন তিনি। কান্না যেন থামছেই না তার। জিহাদের কথা বলতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বাবা নুরুল আমীম। ছোট ভাইকে হারিয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করছেন বড় ভাই জিন্নাত মোল্লা ও দুই বোন জান্নাতুল ও জয়নব। জিহাদ পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা সদরের মোল্লাপট্টি এলাকার নুরুল আমিন মোল্লা ও শাহিনুর বেগমের ছেলে।

দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে জিহাদ ছিলেন সবার ছোট। তাই পরিবারের সবার কাছে সে ছিল আদরের। ঢাকার যাত্রাবাড়ী কোনাপাড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থেকে সরকারি কবি নজরুল কলেজে ইতিহাস বিভাগে স্নাতকোত্তরে অধ্যায়নরত ছিলেন জিহাদ। তার মা শাহিনুর বেগম আদরের ছোট ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। সন্তানের ছবি শাড়ির আঁচলে মুছে বার বার বুকে জড়িয়ে অসহায়ের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বিলাপ করছেন।

সন্তানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল পরিবারের। তার এমন অকাল মৃত্যুতে মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে পরিবারটির। জিহাদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯শে জুলাই শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় দনিয়া কলেজ ও কাজলা ফুটওভার ব্রিজের মাঝামাঝি রাস্তায় বুকের ডান পাঁজরে গুলিবিদ্ধ হন জিহাদ। গুরুতর আহত অবস্থায় সহপাঠী ও বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে ওই এলাকার সালমান হাসপাতালে নিয়ে গেলে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জিহাদকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে ভর্তির কিছুক্ষণ পর বিকালে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ঢামেক হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পরের দিন শনিবার (২০শে জুলাই) রাত সাড়ে ৯টার লাশ বহনকারী এম্বুলেন্সযোগে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকায় আবৃত কফিনে জিহাদের মরদেহ দশমিনা উপজেলা সদরের মোল্লাপট্টি এলাকায় নিজ বাসভবনের সামনে এসে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

পরে ২১শে জুলাই রোববার ভোরে দশমিনা সদর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় চত্বরে জিহাদের জানাজার নামাজ শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জিহাদ দশমিনা সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি ও রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় স্যার সলিমুল্লাহ কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসি পাস করে সরকারি কবি নজরুল কলেজ থেকে ইতিহাসে স্নাতক সম্মান ডিগ্রি অর্জন করেন এবং একই কলেজে ওই বিষয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন।
জিহাদের বাবা নুরুল আমিন মোল্লা বলেন, আমার ছেলে মেধাবী ছিল। আমার ছেলেকে যারা খুন করেছে আমি তাদের বিচার দাবি করছি।

বড় বোন জান্নাতুল বলেন, দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের তথা দেশবাসীর অধিকার আদায় করতে গিয়ে আমার ছোট ভাই জীবন উৎসর্গ করেছে। বড় ভাই জিন্নাত হোসেন বলেন, আমার ভাই জিহাদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণ দিয়েছে। দেশে বিদ্যমান স্বৈরসরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, আন্দোলন করেছে। আগামীর বাংলাদেশ যেন সুন্দর হয়, দুর্নীতিমুক্ত হয়। যুগ যুগ ধরে আগামী প্রজন্ম যেন আমার ভাইয়ের এ অবদান মনে রাখে। শেখ হাসিনা সরকার স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছিল অন্য কোনো দল ভবিষ্যতে এ ধরনের  কোনো চেষ্টা যেন না করে। তাহলেই আমার ভাই ভালো থাকবে। আমার ভাইয়ের আত্মা শান্তি পাবে।

Saturday, October 19, 2019

বাউফলে মিন্টুর মাল্টা-কমলালেবু বাগান

উপকূলীয় অঞ্চল পটুয়াখালীর বাউফলে বিদেশি ফল মাল্টা-কমলালেবু চাষে ব্যাপক সফলতা লাভ করেছেন ধূলিয়া ইউনিয়নের মিজানুর রহমান (টিটু) নামে এক যুবক। তিনি পেশায় একজন জুয়েলারি ব্যবসায়ী হলেও শখের বশে ২০১৬ সালে প্রায় ৮ একর জমির ওপর মিজান গার্ডেন নামে একটি বাগান বাড়ি গড়ে তোলেন নিজ গ্রাম ধূলিয়ায়। সেখানে পার্সিমন, রাম্বুটান, ড্রাগন, প্যাশন, জাম্বুরা, পেঁপে, পেয়ারা, কমলার মতো নানা জাতের দেশি বিদেশি ফল গাছের পাশাপাশি বরিশালের স্বরূপকাঠীর একটি নার্সারি থেকে এনে শতাধিক মাল্টা-কমলালেবুর চারা রোপণ করেন। দীর্ঘ তিনবছর নিয়মিত পরিচর্যা ও দেখভাল করার পর এ বছর মিজান গার্ডেনে দেখা গিয়েছে মাল্টার বাম্পার ফলন। মিজানুর রহমান টিটু ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকার ব্যবসায়ী। মাঝে মাঝে বাড়িতে এসে বাগান দেখাশোনা করেন তিনি। সার্বক্ষণিক বাগান সৃজন ও পরিচর্যার দায়িত্বে রয়েছেন তুষার ইমরান। তিনি জানান, মাটিতে গোবর মিশিয়ে রোপণ করা হয় নাগপুরী, বারি-১, চায়না, এলাচি, বেড়াকাটা জাতের কমলা ও পাকিস্তানি, ইন্ডিয়ান বারি জাতের শতাধিক মাল্টা চারা।
রাসায়নিক সার ওষুধ ছাড়াই জৈবসার আর প্রাকৃতিক উপায়ে পরিচর্যা ও নিয়মিত পানি দেয়ায় ফল আসে গাছগুলোতে। গাছ গাছে এখন ছবির মতো ঝুলে আছে পাকা-আধাপাকা মাল্টা। প্রতিটি গাছে ঝুলে আছে অন্তত এক মণ মাল্টা। বিক্রির প্রয়োজন না থাকায় পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ প্রতিবেশী ও স্থানীয় দুস্থ লোকজনের মাঝে এসব মাল্টা বিলিয়ে দিতে পারবেন তারা। গাছে গাছে মাল্টা ঝুলে থাকার দৃশ্য দেখে স্থানীয়দের অনেকেই অভিভূত হচ্ছেন। চারা গাছ কিংবা মাল্টার কলম সংগ্রহ করতে চাচ্ছেন অনেকেই। দেখভালের দায়িত্বে থাকা অরেকজন শিক্ষক আরিফুর রহমান জানান- জলপাই, জাম্বুরা, থাই জাম্বুরা, কামরাঙা, বেড়াকাটা লেবু, বেড়াকাটা পেয়ারা, পার্সিমন, রাম্বুটান, খাটো জাতের থাই নারিকেলসহ নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফল গাছ রয়েছে তাদের ওই বাগান বাড়িতে। রয়েছে রেডলেডি জাতের পেঁপে, লাউসহ সবজির বাগানও। নানা জাতের  গোলাপ, রজনীগন্ধা, কামিনী, জবা, জিনিয়া, আলমন্ডা, প্যারাডাইস, মাধবীলতা, গোল্ডেন শাওয়ার, মেফ্লোয়ার, লিলি, সজনেসহ দেশি-বিদেশি শোভাবর্ধক ভেষজ গাছও রয়েছে বাগানে। বাগানে আরো আছে মহাছনক, পালমার, সূর্যডিম, মিসস্পেশাল, পুনাই, পুনাই লাল, ম্যাট্রাস, ম্যাট্রাস তোঁতা, হাঁড়িভাঙা, চিনের কিউজাইসহ নানা জাতের আম গাছ। দেশি-বিদেশি ফুল-ফলের সমারোহে মিজান গার্ডেন নামে ওই বাগান বাড়ি সেজেছে যেন স্বপ্নের মতো। এ ছাড়া বাড়িসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাল্টা ও কমলালেবুসহ নানা প্রজাতির দেশি-বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে। এরই মধ্যে শৌলা গ্রামের নুরজাহান গার্ডেন ও কর্পূরকাঠি গ্রামের স্বপ্নচূড়া থিম পার্কে সারি সারি গাছে ঝুলছে নাগপুরী, বারি কমলা-১, চায়না, এলাচি, বেড়াকাটাহ বিভিন্ন জাতের কমলালেবু ও মাল্টা। ক্রমাগত আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং রাসয়নিক সার ও বিষমুক্ত ফলের আশায় এখন অনেকেই ঘরের আঙিনায়, পরিত্যক্ত ভিটে-বাড়িসহ বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন ধরনের ফলদ গাছের চাষে ঝুঁকছেন। পৌর সদরের বাসাবাড়িতে কেউ কেউ আবার টবে ড্রাগন, মাল্টা, কমলাসহ বিভিন্ন ফল গাছ লাগিয়েছেন। গড়ে তুলছেন ছাদ বাগান। কালিশুরী ডিগ্রি কলেজের জীব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক তাসলিমা বেগম বলেন, ‘সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পঞ্চগড় জেলাসহ বিদেশের মাটিতেই কেবল ভালো কমলা কিংবা মাল্টা ফলে এমন ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। বীজ থেকে সরাসরি চারা তৈরি করা যায়। ভালো জাতের মাল্টা বা কমলালেবুর  চোখ কলম, পার্শ্বকলম ও ১০-১২ মাস বয়সের চারা বাডিং ও গ্রাফটিংয়ের জন্য আদিজোড় হিসেবে ব্যবহার করা ভালো। সোজা ও ভালো বৃদ্ধি সম্পন্ন তরতাজা চারা অথবা কলম বেছে নিয়ে রোপণ করা উচিত। দেশি প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় ফল গাছের পাশাপাশি মিজান গার্ডেনে মাল্টার মতো পুষ্টিমান সম্পন্ন পরিবেশ বান্ধব ফল গাছের পরিকল্পিত বনায়ন করা জরুরি।’ কৃষিবিদ আরাফাত হোসেন বলেন, ‘মাল্টা ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ও জনপ্রিয় ফল। এ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়ও এখন কমবেশি মাল্টা ও কমলার চাষ হচ্ছে। পুষ্টির চাহিদা পূরণে অন্য পেশার পাশাপাশি শিক্ষিত লোকজনের এ ধরনের ফল চাষে এগিয়ে আসা উচিত।’ বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান  বলেন, এ অঞ্চলের মাটি মাল্টা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। তার প্রমাণ ইতিপূর্বে যারা মাল্টা চাষ করেছেন তারা সফল হয়েছেন। এ বছরও আমরা ২০টি মাল্টার বাগান দিয়েছি। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে মাল্টা চাষিদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

Monday, September 23, 2019

জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব জৌলুশ হারাচ্ছে কুয়াকাটা by মোহাম্মদ ওমর ফারুক

কুয়াকাট বলতে ছিল ফায়েজ মিয়ার নারিকেল বাগান। যেখানে ছিল শত শত বিভিন্ন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির গাছ। বাগানে দিনের আলোতেও বন্য শিয়াল, বানর ও অন্যান্য পশুর ভয়ে হাঁটতে ভয় করতো মানুষ। ছিল পাখির অভয়াশ্রম। পাখির কলকাকলিতে মুগ্ধ হতো যে কেউ। কিন্তু আজ সেই বাগানটিই বিলীন হয়ে গেছে। হাতেগোনা কয়েকটি নারিকেল গাছ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ এ বাগানটি নারিকেলকুঞ্জ নামে পরিচিত ছিল।
কুয়াকাটার ইতিহাস-ঐতিহ্য ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। সাগরের ভাঙনে প্রাকৃতিক শোভা বাড়ানো জাতীয় উদ্যান এখন বিলীনের পথে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পূর্ব পশ্চিমে যেদিকেই দৃষ্টি যায়, সেদিকেই চোখে পড়ে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। এক সময়ের সবুজের সমারোহে ভরপুর কুয়াকাটা সৈকতের সৌন্দর্য দেখে পর্যটকরা হারিয়ে যেত প্রকৃতির মাঝে। গত দশ বছর আগেও এমন চিত্র দেখা গেছে কুয়াকাটা সৈকতে। সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখন শুধুই ছবি। পর্যটন নগরী কুয়াকাটার সৌন্দর্য-মতি নারিকেল বাগানের পর এবার বিলুপ্তির পথে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান। আগত পর্যটকদের বিনোদন কেন্দ্র জাতীয় উদ্যানের অন্যতম আকর্ষণ ঝাউবাগানের ৭০ শতাংশ বর্ষা মৌসুমে সুমদ্র গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আগামী জো’তে বাকি অংশটুকুও সমুদ্রে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছেন স্থানীয় জেলেরা। ঢেউয়ের ঝাপটায় ঝাউবাগানের শত শত গাছ উপড়ে পড়ে আছে সমুদ্র  সৈকতে। ফলে ভুতড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে ঝাউ বাগানের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এবং সমুদ্রে তলদেশে পলি জমায় পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে সাগরের বিশাল ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ছে। এ কারণে গত ১১ বছরে কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানসহ সংরক্ষিত বনের অর্ধেকেরও বেশি ১ হাজার ১০০ একর বনভূমি সাগরে বিলীন হয়ে গেছে। এখন আছে ১ হাজার ৩০ একর বন। উপকূলীয় বন বিভাগের পটুয়াখালী কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কুয়াকাটায় বনের আয়তন ২ হাজার ১৬৫ দশমিক ৮০ একর। ২০০৫ সালে সরকার একে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে। পর্যটকদের কাছ আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে ২০০৭-২০০৮ অর্থবছরে প্রাকৃতিক বনসংলগ্ন এ সৈকত ঘেঁষে ১০ হাজার হেক্টর ভূমির ওপর ঝাউ-বাগান গড়ে তোলা হয়। ২০১০ সাল থেকে এই বনে নতুন বাগান করা হয়। তবে ২০০৭ সালে সিডরের পর থেকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সামুদ্রিক ঢেউয়ের ঝাপটায় ভাঙনে মুখে পড়ে বনাঞ্চল। প্রতিবছর কমপক্ষে ১০০ একর বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। ফলে কুয়াকাটায় পর্যটকদের বিনোদন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য তৈরি বনবিভাগের পর্যটনকেন্দ্র প্রায় সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। রক্ষার কোনো উদ্যোগ না থাকায় জাতীয় উদ্যানটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসেছে। স্থানীয়দের মতে, কুয়াকাটা সৈকতের উন্নয়নে কাজ করছে পর্যটন করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও তদারকির অভাবে সব টাকাই ভেসে গেছে সাগরে। পটুয়াখালী উপকূলীয় বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, গত দশ পনেরো দিন আগে আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে চিঠি দিয়েছি। এ পর্যন্ত আমরা কোনো সাড়া পাইনি। যদি তারা কাজটা না করে তাহলে আমাদের দায়িত্ব দিলেও আমরা সেটা করে দিতে পারবো। পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি তাদের ফান্ড আমাদের দেয় তাহলে আমরা নিজেরাই কাজটা করে নিবো। আর নয় আমাদের মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করবো।
কুয়াকাট গিয়ে দেখা যায়, বর্তমান কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ৩-৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং কয়েকশ’ মিটার প্রস্থ সৈকত দৃশ্যমান। বর্তমান বর্ষায় মূল সৈকত দিনের আলোতে কয়েক ঘণ্টা জেগে ওঠে সাগরের ভাটায়। আর জোয়ার এলেই গোটা সৈকত তলিয়ে থাকে ৫-৭ ফুট সাগরের পানিতে। এদিকে অব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা না থাকায় দিন দিন পর্যটকদের আকর্ষণ হারাচ্ছে বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় স্থান সাগরকন্যা কুয়াকাটা। এ কারণে ভরা মৌসুমেও পর্যটক কম হওয়ায় হোটেল-মোটেলসহ পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় মন্দা নেমে এসেছে। তাছাড়া ২০১০ সালে কুয়াকাটাকে পৌরসভায় ঘোষণা করার পর পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য জমি বিক্রি ও ভবন নির্মাণ বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে থেমে গেছে ব্যক্তি উদ্যোগের নানা কার্যক্রমও। ফলে জমি কেনা-বেচার জটিলতার কারণেও আগ্রহ হারাচ্ছেন বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা। স্থানীয় বাসিন্দা শাহেদুল ইসলাম বলেন, কুয়াকাটা একটি অর্থনৈতিক জোন। অথচ সেই কুয়াকাটার সৈকতের উন্নয়নে নেয়া হচ্ছে না কোনো পদক্ষেপ। এ বছর সৈকত ভাঙার আতঙ্কে শুধু জিরো পয়েন্টে কিছু বালুভর্তি ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এসব বালুভর্তি ব্যাগও প্রায় বালুশূন্য হয়ে পড়েছে। এদিকে নানা সমস্যায় পড়ছে দেশি বিদেশি পর্যটকরা। থাকা, খাওয়া বা উন্নতমানের তেমন একটা হোটেল মোটেল না থাকায় পর্যটকরা পড়ছে ভোগান্তিতে। শুধু তাই নয়, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটে এখানে। অভিযোগ রয়েছে, এলাকার কিছু বখাটে লোকজন এসব অপকর্ম করে থাকে। বিশেষ করে পর্যটকরা যখন ভোরে এবং রাতে ঘুরতে আসে তখন তাদের নানানভাবে ফুসলিয়ে এবং জোর করে ছিনতাই করে থাকে। বরিশাল থেকে ঘুরতে আসা রাব্বি এজাজ নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বলেন, শুনেছি এখানে ছিনতাই হয়। তাই আমরা খুব সচেতন ছিলাম। তবে আমাদের সামনেও একটা ছিনতাই হয়েছিল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছিনতাইকারীরা ছোঁ মেরে নিয়ে চলে গেছে।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক তানভীর আহাম্মেদ সিদ্দিকী বলেন, কুয়াকাটা যতটা সৌন্দর্যপূর্ণ মনে করেছিলাম ততটা না। কুয়াকাট বিভিন্ন কারণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কুয়াকাটার স্থানীয় এলাকাবাসী দাবি করছে কুয়াকাটা বাঁচাতে সংশ্লিষ্টদের পদক্ষেপ প্রয়োজন। এ নিয়ে এলাকাবাসী অনেকবার রাস্তাও নেমেছে। কিন্তু কোনো ধরনের পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

Tuesday, September 3, 2019

যেন ফসলের মাঠ! by মো. সোহাগ হোসেন

কাদা-পানি, ছোট-বড় গর্ত। দেখে বোঝার উপায় নেই এটি একটি রাস্তা। মনে হয়, যেন ফসল চাষের জন্যে প্রস্তুত করে রাখা খন্ড খন্ড জমি।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ঝাটিবুনিয়া এলাকার একটি কাঁচা রাস্তার এই হাল। উপজেলার আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ ঝাটিবুনিয়া গ্রামের প্রধান রাস্তার সঙ্গে সংযুক্ত ঝাটিবুনিয়া জে আর বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র রাস্তা এটি।

বৃষ্টির সময় কাঁচা এই রাস্তাটিতে পানি জমে থাকায় ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ওইসব গর্তে পানি জমে রাস্তাটি চাষের জমিতে পরিণত হয়েছে। 

বেহাল এ রাস্তা দিয়ে ঝাটিবুনিয়া জে আর বালিকা বিদ্যালয়, মই ইসহাক মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও এন ডব্লিউ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোমলমতি ছাত্রছাত্রী এবং ইউনিয়নের দক্ষিণ ঝাটিবুনিয়া মহিষ কাট ও শ্রীনগরসহ ৫-৬ গ্রামের মানুষ চলাচল করেন।
এ রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে ছোট-ছোট যানবাহনও।

স্থানীয়দের চলাচলে কষ্টের প্রধান কারণ হলেও গ্রামীণ এ রাস্তাটি সংস্কারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনও উদ্যোগ নেই। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও রাস্তাটি সংস্কারে কোন ভূমিকা রাখছে না। গ্রামবাসীরা জানান, রাস্তাটি সংস্কারের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েছে তারা। কিন্তু কারও নজরে আসছে না রাস্তাটি। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।

জে আর বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী মোসা. লামিয়া জানায়, বৃষ্টির সময় রাস্তাটিতে খুবই কাদা হয়। এ সময় কাদা মাড়িয়ে স্কুলে যেতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। দক্ষিণ ঝাটিবুনিয়া গ্রামের   মো. বজলুর রহমান সিকদার জানান, এ গ্রামে জন্মে আমরা অপরাধ করেছি। আমাদের ইউনিয়নের প্রায় রাস্তাই পাকা কিন্তু আমরা পড়ে আছি আগের জামানায়। কাদাযুক্ত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমিও এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।

এ ব্যাপারে আমড়াগাছিয়া ইউপি চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ বলেন, রাস্তাটি সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে জানানো হবে। মির্জাগঞ্জ উপজেলা  চেয়ারম্যান খান মো. আবু বকর সিদ্দিকী জানান, রাস্তাটি দিয়ে চলাচলে ওই এলাকার লোকজনের খুবই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত রাস্তাটি পাকাকরণের ব্যবস্থা করে এলাকাবাসীর কষ্ট লাঘব করার দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে মির্জাগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. সুলতান  হোসেন বলেন, রাস্তাটি পাকা করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নিকট প্রতিবেদন পাঠানো হবে।

Monday, August 19, 2019

পর্যটকে মুখর কুয়াকাটা

বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও ঈদুল আজহার ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের বেলাভূমি সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা।
যেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য সৈকতে দাঁড়ালে চোখে পড়বে দিগন্তজোড়া আকাশ আর সমুদ্রের রাশি রাশি নীলজল আর সমুদ্রের নীলজলের তরঙ্গায়িত ঢেউ ভাঙা গর্জন আছড়ে পড়ছে বেলাভূমিতে। উড়ে যাচ্ছে সাদা গাংচিলের দল এদিক ওদিক- মাছ শিকারের জন্য লড়াকু জেলেরা ট্রলারে ও নৌকায় ছুটে যাচ্ছে গভীর সমুদ্রে তা উপভোগ করছে পর্যটকরা।
বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ও ঈদুল আজহার আনন্দ উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থী পরিবার-পরিজন নিয়ে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে এসেছেন। কলাপাড়া-কুয়াকাটা নদীতে বর্তমানে তিনটি ব্রিজ হওয়ায় সড়ক যোগাযোগ ভালো থাকায় এ বছর সর্বাধিক পর্যটকের আগমনে কুয়াকাটায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।
দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের উন্মাদনায় পুরো সৈকত এখন আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করছে। নানা বয়সি পর্যটকের আগমনে রাখাইন মার্কেট, ঝিনুকের দোকান, খাবারঘর, চটপটির দোকানসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়েছে। সোমবার বিকাল থেকে হোটেল-মোটেলগুলোতে পর্যটকরা উঠতে শুরু করেছে। সৈকতের কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টি।
এরই মাঝে সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দেখা, লাল কাঁকড়ার অবিরাম ছোটাছুটি, বালুকা বেলায় প্রিয়জনের সঙ্গে হাঁটাহাঁটি, আর সমুদ্রের মোহনীয় গর্জন শুনতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে কুয়াকাটায় ছুটে এসেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নানা বয়সের হাজারো মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সৈকত লাঘোয়া নারিকেল বাগান, ইকোপার্ক, ইলিশপার্ক, জাতীয় উদ্যান, শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার, সীমা বৌদ্ধবিহার, সুন্দরবনের পূর্বাঞ্চলখ্যাত ফাতরার বনাঞ্চল, ফকির হাট, গঙ্গামতি, কাউয়ার চর, আড়াই শতবর্ষী নৌকা, লেম্বুর চর, শুঁটকিপল্লী ও কুয়াকাটার জিরো পয়েন্টে শিশু-কিশোর যুবক-যুবতীসহ নানা বয়সি পর্যটকের পদচারণায় এখন মুখরিত হয়ে উঠেছে। সৈকতে বেড়াতে আসা নানা বয়সি পর্যটক স্মার্ট ফোনে সেলফি ও ভিডিও ক্লিপস সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এদিকে পর্যটক ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা দিতে বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা রক্ষীবাহিনীর ব্যাপক টহল অব্যাহত রয়েছে।
ঈদের ছুটিতে যশোর থেকে ভ্রমণে আসা ব্যবসায়ী আবুল কালাম ও নুবাইবা দম্পতি জানান, সৈকতের অপরূপ দৃশ্য দেখে অসাধারণ লেগেছে। দর্শণীয় স্পর্টে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুরে দেখেছি। শিক্ষার্থী রাইকা, নওসিন ও মিশু জানান, প্রথমবারের মতো কুয়াকাটায় এসেছি। খুব ভালো লেগেছে। সুযোগ পেলে প্রকৃতির টানে বার বার ছুটে আসব এখানে। অপর এক শিক্ষার্থী উম্মে কবির হাবিবা বলেন, সমুদ্রে উন্মাদনার সঙ্গে গোসল করার ছবি তুলে এফবিতে পোস্ট করেছি। যোগাযোগ, অপরুপ সৈকতের সৌন্দর্র্য এছাড়াও একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের লোভনীয় দৃশ্য অবলোকনের করা যায়। তাই সব বন্ধুকে এফবির মাধ্যমে আহ্বান করেছি বলে ওই শিক্ষার্থী জানিয়েছেন।
রুচিসম্মত খাবার পরিবেশনার নিশ্চয়তা নিয়ে খাবার হোটেল মালিকরা জানান, ঈদুল আজহার ছুটিতে পর্যটকদের ব্যাপক চাপ রয়েছে। আমরাও চেষ্টা করছি পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী খাবার পরিবেশনের।
কুয়াকাটা সমুদ্র রিসোর্ট হোটেল ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিরন জানান, ঈদের ছুটিতে পর্যটকের ঢল নেমেছে। ঈদের পরদিন থেকে কুয়াকাটায় আগাম বুকিং অনুযায়ী পর্যটক রয়েছে। চলতি মাসের ১৬ তারিখ পর্যস্ত এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি ধারণা করেছেন। ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের মো. খলিলুর রহমান জানান, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকের ব্যাপক চাপ রয়েছে। নিরাপত্তা দিতে ট্যুরিস্ট পুলিশসহ থানা পুলিশের দর্শনীয় স্থানে টহল রয়েছে।
এদিকে কলাপাড়া রাবনা বাঁধ নদীর মোহনায় দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রায় ঈদের দিন বিকাল থেকে দর্শনার্থীদের পদভারে গোটা বন্দর এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে। প্রতিদিন শত শত লোক পায়রা সমুদ্র বন্দরে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসেন। এটিও এখন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়ভাবে হয়ে উঠছে। রাবনা বাঁধ নদীর মোহনায় দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রায় ঈদের দিনে ঘুরতে আসা বাকেরগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ছাত্রী নাজরাতুন নাইম রুজি বলেন, দেশের তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রায় বন্দর কলাপাড়ায় হওয়ায় দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ হিসেবে আমরা গর্বিত। এখানে ঈদের ছুটিতে ঘুরতে এসে খুব ভালোই লেগেছে। ভবিষ্যতে এখানে পর্যটকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় স্থান হয়ে দাঁড়াবে।   
এ ব্যাপারে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি মো. মুনিবুর রহমান বলেন, কুয়াকাটায় আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

Thursday, June 20, 2019

পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সংঘর্ষ চীনা শ্রমিক নিহত

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বাঙালি শ্রমিকদের সঙ্গে  চীনা শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষে এক চীনা নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকালে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জাং ইয়াং ফাং (২৬) নামের ওই নাগরিকের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় ২ জন নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষে আহত হয়েছে অর্ধ শতাধিক। এদেরকে ঢাকা এবং বরিশাল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিকালে নির্মাণাধীন ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বাঙালি ও চীনা শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় সাবিন্দ্র দাস (৩২) নামের এক বাঙালি শ্রমিক নিহত হন। তিনি বয়লার থেকে পরে মারা যান। এ ছাড়া এ ঘটনায় আরো ৫ চীনা নাগরিককে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, পায়রা বন্দরে নির্মাণাধীন ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বয়লার থেকে নিচে পড়ে নিহত হন সাবিন্দ্র দাস নামের এক বাঙালি শ্রমিক। তিনি ধানখালী কাজল এন্টারপ্রাইজের নিযুক্ত শ্রমিক। তার বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলায়। এ সময় চীনা শ্রমিক ও কর্মকর্তারা তার লাশ গুম করার চেষ্টা করছে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে কয়েক হাজার বাঙালি শ্রমিক বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মঙ্গলবার বিকাল তিনটা থেকে তারা কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। সূত্র জানায় এ সময় আনুমানিক ৬ হাজার বাঙালি শ্রমিক ধর্মঘটে অংশ নেয়। তারা তিন হাজার চীনা শ্রমিককে অবরুদ্ধ করে ফেলে। এক পর্যায়ে উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। কলাপাড়া থেকে অতিরিক্ত পুলিশ এনেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। বিসিপিসিএল এর প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহমনি জিকো জানান ক্ষুব্ধ বাঙালি শ্রমিকরা ক্যান্টিন অফিস কক্ষ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ব্যাপক হামলা চালায়। চীনা শ্রমিকরা প্রতিরোধ করলে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে ৫০ জনের বেশি চীনা ও বাঙালি কর্মী আহত হন।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার রাম চন্দ্র দাস বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততার সঙ্গে পরিস্থিতি শান্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া চায়না-বাংলাদেশ বন্ধু রাষ্ট্র। তাই বিষয়টি আরো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. বাকির হোসেন জানান, বুধবার রাত ৩টা ৫০ মিনিটে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন জাং ইয়াং ফাং (২৬)। তার মাথায় আঘাত ছিল এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। এ ছাড়া আহত বাকি ৫ চীনা নাগরিককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হলে তাদের সেখান থেকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাকিদের বরিশালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাঙালি শ্রমিকও রয়েছে।
এদিকে জাং ইয়াং ফাং (২৬) নিহত হওয়ার ঘটনায় ভবিষ্যতে কোনো মামলা মোকদ্দমা করা হবে না দাবি করে বিনা ময়না তদন্তে তার লাশ গ্রহণের জন্য বরিশাল জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আবেদন করেছেন তাপ বিদ্যু কেন্দ্রের প্রজেক্ট ম্যানেজার লিউ সি।
এছাড়া বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত বাঙালি শ্রমিকদের চিকিৎসার খোঁজ খবর নেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার রাম চন্দ্র দাস, ডিআইজি শফিকুল ইসলাম, পটুয়াখালীর এডিসি হেমায়েত উদ্দিন।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। চলতি বছরেই কাজ শেষ হওয়ার কথা। নির্মাণকাজে চীনের ৩০০০ এবং ৭০০০ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন।

Wednesday, April 10, 2019

তরমুজ চাষে লাভবান কৃষক

মাঠের পর মাঠ তরমুজখেত। চারদিকে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে তরমুজ। তরমুজ তুলে জড়ো করছেন কৃষক। স্তূপ করে রাখছে বিক্রির জন্য। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মহাজনেরা তরমুজ কিনতে খেতে গিয়ে চাষিদের সঙ্গে দামদর করে কিনে নিচ্ছেন তরমুজ। এই তরমুজ ট্রাক-ট্রলি বোঝাই করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগে তরমুজচাষিরা খেত থেকে তরমুজ তুলে বিক্রি করার চেষ্টায় ব্যস্ত রয়েছেন।
এই চিত্র পটুয়াখালীর উপকূলীয় রাঙ্গাবালী উপজেলায় ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কাউখালী গ্রামের চিত্র। স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, গোটা রাঙ্গাবালীতে  প্রচুর তরমুজ চাষ হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি
চাষ হয় ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নে। কৃষকেরা বলছেন, রবি মৌসুমে তরমুজ চাষ লাভজনক হওয়ায় তাঁদের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে। প্রতিবছরই বাড়ছে  তরমুজের চাষ।
পটুয়াখালীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যালয় জানায়, ২০১৮ সালে জেলায় ১৩ হাজার ৭১৮ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছিল ৬ লাখ ৫৮ হাজার ৪৬৪ মেট্রিক টন। বিক্রি হয়েছিল ৬৫৮ কোটি টাকা। এ বছর আবাদ হয়েছে ২১ হাজার ৬৮৫ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ লাখ ৪০ দশমিক ৭৩৬ মেট্রিক টন, যার মূল্য দাঁড়াবে ১ হাজার ৪০ কোটি ৭৩৬ লাখ টাকা।
এদিকে রাঙ্গাবালী উপজেলার কাউখালীতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের সবচেয়ে বড় তরমুজচাষি মজিবর রহমান (৪৫) এ বছর নিজের ও অন্যের জমি মিলিয়ে মোট ৪৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। তিনি বলেন, মৌসুমের আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকার মহাজনেরা অগ্রিম দাদন দিতে এলাকায় চলে আসেন এবং ফলনের পর তরমুজ সংগ্রহ করতে এলাকায় অবস্থান করেন। ইতিমধ্যে মজিবর খেত থেকে তরমুজ তুলে মহাজনদের কাছে বিক্রি শুরু করেছেন।
গ্রামের কৃষক মো. প্রিন্স মীর (৪০) ৩০ হেক্টর, কাওসার মৃধা (৪৫) ১৫ হেক্টর, অসীম সাহা (৪০) ১০ হেক্টর, জীবন হাওলাদার (৫০) ৬ হেক্টর জমিতে  তরমুজ চাষ করেছেন। তাঁরা বলেন, এ বছর তরমুজের ফলন ভালো হয়েছে। গত বছরের চেয়ে এ বছর  আবাদ বেশি ও আকারে অনেক বড় হওয়ায় তরমুজচাষিরা খুব খুশি।
কৃষি কার্যালয়ের হিসাবমতে, রবি মৌসুমে বোরো আবাদ করলে এক হেক্টর জমিতে চাষাবাদ খরচ হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ধান উৎপাদন হবে ৭ মেট্রিক টন। ২৬ টাকা কেজি দরে মূল্য দাঁড়াবে ১ লাখ ৮২ হাজার টাকা। তরমুজ চাষে এক হেক্টর জমিতে খরচ হচ্ছে এক লাখ টাকার একটু বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে তরমুজ উৎপাদন হবে কমপক্ষে ৪৮ মেট্রিক টন। সর্বনিম্ন দর ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হবে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তরমুজে লাভবান বেশি হওয়ায় কৃষকেরা তরমুজ চাষের প্রতি ঝুঁকছেন।
কৃষকেরা বলেন, মৌসুম শুরু আগেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আড়তদারেরা এখানকার চাষিদের লাখ লাখ টাকা দাদন দিয়ে রেখেছেন। এখন আড়তদারেরা এলাকায় এসে চাষিদের কাছ থেকে তরমুজ সংগ্রহ করছেন। খেত থেকে তরমুজ কিনে ট্রলার কিংবা ট্রলি বোঝাই করে এনে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান বোঝাই করে তরমুজ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাচ্ছেন। খেতে বসেই ছোট-বড় প্রতিটি তরমুজ গড়ে ৮০ থেকে ২০০ টাকা দরে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ঢাকার কদমতলী এলাকার ব্যবসায়ী মো. মহিউদ্দিন জানান, এখান থেকে তরমুজ কিনে নিয়ে লঞ্চে ঢাকা পাঠাতে তিনি এখন গলাচিপায় অবস্থান করছেন। এর আগে তাঁর মতো অনেক ব্যবসায়ী এখানে তরমুজের জন্য দাদন দিয়ে রেখেছেন।
রাঙ্গাবালী উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. জুয়েল সিকদার বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি হওয়ায় চাষিদের সেচ খরচ কম হয়েছে। তবে নিচু জমিতে পানি জমে একটু ক্ষতি হলেও ফলন ভালো ও বড় আকারের তরমুজ ফলনে চাষিরা লাভবান হবেন বলে মনে করছেন।
পটুয়াখালীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হৃদয়েশ্বর দত্ত বলেন, মৌসুমের শুরুতেই নিম্নচাপের প্রভাবে বৃষ্টি হয়। তবে সব মিলিয়ে আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। এ অঞ্চলে দোআঁশ মাটিতে তরমুজের ফলন ভালো হয়।

Wednesday, January 30, 2019

পাখির কলকাকলি আর ঢেউয়ের গর্জনে মুখরিত সোনারচর by জোবায়ের হোসেন

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পর্যটন কেন্দ্রগুলো অন্যসব ঋতুর তুলনায় শীতে বেশি সজ্জিত থাকে। পর্যটকরাও ভ্রমণের জন্য বেছে নেয় এ সময়কে। এই শীতেও ডানা মেলেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে থাকা সোনারচরের প্রকৃতি। দ্বীপটিতে উড়ে আসা অতিথি পাখিদের কলকাকলি সমুদ্র সৈকতের অপরূপ শোভাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। অতিথি পাখির কলরব আর সাগরের ঢেউয়ের গর্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে সোনারচরের পরিবেশ। সাগরের আছড়ে পড়া ঢেউগুলোও কোনো চিত্রশিল্পীর রঙ তুলির পরশ মনে হয়। ফেনিল নোনা জলে ভেজা তটরেখায় চলে লাল কাঁকড়াদের ছোটাছুটি। সামান্য দূরেই ঝাউ বাগানের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ।
ঝাউ গাছের ঝরা পাতাগুলো শুকনো বালুর ওপর যেন কার্পেটের নরম বিছানায় পরিণত হয়ে আছে। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের যাবতীয় আয়োজন রয়েছে এ দ্বীপটিতে। নদী আর সাগরের জল আছড়ে পড়ছে এ দ্বীপের চারপাশে। সোনার চরের চিকচিক বালুতে যেন ভোরের কোমল সূর্য আলো ছড়ায়। অস্তগামী সন্ধ্যার লালিমা তেমনি মায়া ঢালে নিভৃতে। অপরূপ সোনারচর স্বর্ণালী স্বপ্নের মতোই বর্ণিল শোভায় ঘেরা। অন্তত একবার এসে ঘুরে দেখুন দেশের ভেতর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই দ্বীপটিকে।
আয়তন ও আকৃতি: ভূ-খণ্ড পরিমাপের হিসাবে সোনারচরের আয়তন ১০ হাজার একর। চরটি দেখতে অনেকটা বাদামের দানার আকৃতির মতো। সোনারচর ও এর পার্শ্ববর্তী চর আন্ডার মাঝখানে একসময় বড় নদী ছিল। চর পড়ে সে নদী এখন ছোট হয়ে গেছে। শুকনো সময়ে হেঁটেই পার হওয়া যায়। সোনারচর চ্যানেল সরু হয়ে গিয়ে বনের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়াও অগণিত চ্যানেল রয়েছে সোনারচরের আশপাশে। পর্যটকরা ঘুরতে পারেন নৌকা অথবা ট্রলার নিয়ে। চ্যানেলের দুই পাশ জুড়ে বহু পুরনো ম্যানগ্রোভ আর ঝাউ বন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি চরের কোল ঘেঁষে অবস্থান মৌসুমি জেলে ও জেলে শ্রমিকের। এই শীত মৌসুমে নানা স্থান থেকে ব্যবসার জন্য এই চরটিতে আশ্রয় নেয় অগণিত জেলে।
যাওয়ার পথ: প্রথমে পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে গলাচিপা উপজেলায় পৌঁছাতে হবে যেকোনো দর্শনার্থীকে। সেখান থেকে যেকোনো ভাড়া মোটরসাইকেল বা অন্য মাধ্যমে পৌঁছাতে হবে আগুনমুখা নদীর মোহনায়। আগুনমুখার তীরে পৌঁছালে বুড়াগৌরাঙ্গ ও দাঁড়ছিড়া নদী পাড়ি দিতেই দু’পাশ জুড়ে ঘন ম্যানগ্রোভ বনের দৃশ্য  যে কারো মনকে দ্বিগুণ প্রাণবন্ত করে তুলবে। ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে আগুনমুখার মোহনা থেকে ঘণ্টা দুয়েক এগুলেই চোখে পড়বে মায়াবী দ্বীপ ‘চর তাপসী’। তাপসীর দুই পাশ জুড়ে বিরল দৃশ্য অতিক্রম কালেই সোনারচরের হাতছানি। তাপসী থেকে ৩০ মিনিটের পথ দক্ষিণে এগুলেই সোনারচর। স্পিডবোটের ব্যবস্থা রয়েছে। বিত্তবানরা যেতে পারেন স্পিডবোট নিয়েও। এ ছাড়াও রয়েছে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোটে সোনারচর যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে স্পিডবোটযোগে সোনারচরে পৌঁছাতে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লাগবে। আবার কুয়াকাটা থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সোনারচরে যাওয়া যায়।
থাকার জায়গা: সোনারচরে রাত যাপনের জন্য নিরাপদ আরামদায়ক ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে, প্রশাসনের উদ্যোগে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ছোট্ট তিন কক্ষের একটি বাংলো। রয়েছে বন বিভাগের ক্যাম্প। এসব স্থানে রাতে থাকার সুযোগ রয়েছে। চাইলে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারে মাত্র আধাঘণ্টার মধ্যে চরমোন্তাজ ইউনিয়নে গিয়ে থাকার সুযোগ রয়েছে। সেখানে রয়েছে বন বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা স্যাপ বাংলাদেশ ও মহিলা উন্নয়ন সমিতির বাংলো।
সরজমিন সোনারচরের নিকটবর্তী একটি বাজারে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপচারিতা সম্ভব হয়। তাদের দাবি একটাই, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে এই চরের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে হবে। সোনারচরকে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণার দাবি জানিয়ে তারা বলেন, যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হলে এটি হবে
দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এখানে পর্যটকদের ভিড় জমবে। পাশাপাশি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারেন। পর্যটকরা সোনারচরের পাশেই জাহাজমারা, তুফানিয়া ও শিবচরসহ আরো কয়েকটি দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। জানতে চাইলে পটুয়াখালী-৪ (রাঙ্গাবালী-কলাপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মহিব্বুর রহমান মহিব বলেন, দক্ষিণাঞ্চলকে নিয়ে সরকারের মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। এখানকার পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সোনারচরকে পর্যটনশিল্পে যোগ করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অতি শিগগিরই আমরা সুসংবাদ দিতে পারব।

Sunday, March 25, 2018

এসিডে ঝলসে দিলো গৃহবধূকে

পাওনা টাকার জের ধরে শিরীন আক্তার (৩৫) নামে এক গৃহবধূর মুখমণ্ডল এসিড দিয়ে ঝলসে দেয়া হয়েছে। শনিবার সকালে পটুয়াখালী ডিসি স্কয়ার মঞ্চ প্রাঙ্গণে এ ঘটনা ঘটে। আহত শিরীন বর্তমানে পটুয়াখালী মহিলা সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বরগুনা জেলার গাবতলী গ্রামের বাসিন্দা আবু তালেব মিয়ার স্ত্রী এই শিরীন। শিরীন আক্তারের ছেলে রাহাত জানান, তার মা দীর্ঘ চার মাস ফরিদপুর আটরশি পীরের মাজারে কাজ করে আসছিলেন। কিছুদিন আগে রাহাতের বড় চাচা আবদুল লতিফ তার মাকে ফোনে বলে-আমি তোমার পাওনা টাকা দিয়ে দেবো। পটুয়াখালী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোমার দায়ের করা মামলাটি উঠিয়ে নেবে। শিরীন এতে রাজি হয়। এই বলে শিরীনকে মাজার শরীফ থেকে তার ভাসুর আবদুল লতিফ ও তার ছেলে ইমরান এবং দুঃসম্পর্কের চাচাতো ভাই নজরুল একই বাসে ফরিদপুর থেকে পটুয়াখালীতে শনিবার সকালে নিয়ে আসে। পরে তাকে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পূর্ব পাশে ডিসি স্কয়ার মাঠে নিয়ে এসিড জাতীয় দ্রব্য মুখে নিক্ষেপ করে পালিয়ে যায়। পরে এসিড নিক্ষেপকারীরা শিরীনের ছেলে রাহাতকে ফোন করে তার মায়ের অবস্থার কথা জানায় এবং সতর্ক হতে হুমকি দেয়। ঘটনার খবর পেয়ে রাহাত তার মাকে উদ্ধার করে পটুয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে।
হাসপাতালের মহিলা বিভাগের শিফট ইনচার্জ তানিয়া আক্তার জানান, রোগী বর্তমানে আশংকা মুক্ত, তবে তার দ্রুত উন্নত চিকিৎসা দরকার। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তির ছেলে ইমরানের সঙ্গে ০১৭৩০৪৭৫১২৯ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তারা মিথ্যা নাটক সাজিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আমরা এর কিছুই জানি না।
পটুয়াখালী সদর থানার ওসি তদন্ত আবুল বাশার জানান, খবর শুনে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Monday, March 19, 2018

পরিশ্রমই বদলে দিলো আত্মবিশ্বাসী লাইজুর ভাগ্য by জালাল উদ্দিন আহমেদ

পরিশ্রমই বদলে দিতে পারে মানুষের ভাগ্য, এমনটি বললেন কর্মযজ্ঞে বিশ্বাসী অর্ধশিক্ষিত হাস্যোজ্জ্বল সদালাপী তিন সন্তানের জননী লাইজু। পটুয়াখালী পৌর শহরের কাজীপাড়া নিবাসী লঞ্চঘাটের আলোচিত সিরাজ হোটেল মালিক মো. সিরাজ খানের পাঁচ সন্তানের দ্বিতীয় সন্তান লাইজু। সে বাবার অভাব-অনটনের মধ্যে কোনোরকম লেখাপড়া করে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও ইংরেজি বিষয় অকৃতকার্য হয়ে অর্থাভাবে আর এসএসসি পাস করা হয়নি। ২০ বছর বয়সের সময় বাবা ইটবাড়িয়া ইউনিয়নের মো. মালেক মৃধার বেকার ছেলে কবির মৃধার সঙ্গে বিয়ে দেন। লাইজু বাবার বাসায় স্বামীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। স্বামী বেকার কি করবে, বাবার টানা-পোড়নের সংসারে কতদিন বোঝা হয়ে থাকবে। এ ভাবনা-চিন্তার একপর্যায়ে ১০ বছর আগে স্থানীয় আশা নামক এনজিও থেকে ১০ হাজার টাকা লোন নিয়ে বাবার বাড়ির পিছনে ছোট জায়গায় লোনকৃত ১০ হাজার টাকা দিয়ে মুরগির বাচ্চা কিনে লালন পালন করা শুরু করেন লাইজু। কিছুদিন পর দুইশ’ মুরগি বিক্রি করে ২০ হাজার টাকা মুনাফার ১৩ হাজার টাকা দিয়ে একটি গাভী কিনে লালন-পালন করেন এবং বাকি টাকা দিয়ে মুরগির বাচ্চা কিনেন। পাশাপাশি তিতাস সিনেমা হলের পূর্বপাশে ছোট একটি চায়ের দোকান শুরু করেন স্বামী কবির মৃধাকে নিয়ে। দুইবছর পর ১৩ হাজার টাকায় কেনা গাভী গরুটি দুইটি বাচ্চাসহ ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন । এ বিক্রীত টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে সবুজবাগস্থ ভিপি দুলাল চেয়ারম্যানের কাছ থেকে একটি অস্ট্রেলিয়ান গাভী কেনেন। বর্তমানে তার ৬টি গাভী গরু ও দুইটি বাচ্চা রয়েছে যার মূল্য হবে ৬ লক্ষাধিক টাকা বলে লাইজু জানান। এছাড়াও লাইজু তার লভ্যাংশ টাকা দিয়ে ২টি ভেড়া কিনে লালন-পালন করেন। বর্তমানে ১টি বাচ্চাসহ ১০টি ভেড়া রয়েছে যার মূল্য হবে লক্ষাধিক টাকা। সেলাই মেশিন চালানোসহ মুরগি, গরু ও ভেড়া লালন-পালনের পাশাপাশি তিতাস সিনেমা হলের মোড়ে ঘরোয়া পরিবেশে কবির মৃধা নামে একটি ভাতের হোটেল ব্যবসা করেন। তিনি এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী। এ সব ব্যবসা পরিচালনা করে লাইজু তার তিন ছেলে-মেয়েকে পড়াশোনার খরচ চালিয়ে আসছেন। তার বড় ছেলে সাজিন করিম মৃধা কলেজে এইচএসসি প্রথমবর্ষে, দ্বিতীয় ছেলে সিয়াম পটুয়াখালী সরকারি জুবিলী স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে শাওন সবুজবাগস্থ দারুল কুরআন মাদ্‌রাসায় কেজিতে পড়াশুনা করে। তার এ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশব্যাপী পরিচালিত ‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ’- শীর্ষক বিশেষ কার্যক্রমের আওতায় ‘অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরিতে জেলা পর্যায়ে সর্বশ্রেষ্ঠ জয়িতার সম্মানে ভূষিত করেছে জেলা প্রশাসন। ২০১৭ সালের ৯ই ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া দিবস পালন উপলক্ষে জেলা প্রশাসকের দরবার হলে আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে কর্মে আত্মবিশ্বাসী লাইজুকে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরিতে জেলার সর্বশ্রেষ্ঠ জয়িতা’র সম্মানে ভূষিত করে ক্রেস্ট ও সম্মাননা পত্র প্রদান করেন জেলা প্রশাসক ড. মোঃ মাছুমুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা দিলারা খানমসহ সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ। জেলার সর্বশ্রেষ্ঠ জয়িতা সম্মানে ভূষিত লাইজু তার অনুভূতি প্রকাশে বলেন, আমি জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, আমি কষ্ট করে আমার ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছি, সরকার আমাকে যে সম্মান দিয়েছে, তাতে আমি অনেক গর্বিত ও অনেক খুশি। আমার স্বপ্ন ছেলে তিনটিকে মানুষ করে সরকারি চাকরিতে দেবো। আমি চেষ্টা করছি, আগামী পৌর নির্বাচনে ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডে সংরক্ষিত আসনে নির্বাচনে নির্বাচিত হয়ে গরিব-দুঃখী মানুষের সেবা করা।

Tuesday, February 6, 2018

স্বর্ণালী বালুর হাতছানি সোনারচরে

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার পূর্ব-দক্ষিণে বঙ্গপসাগরের কোল ঘেঁষে সোনার চর। বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপটির বুকে কোনো বসতি বা মানুষের সুরেলা কণ্ঠ কানে না বাজলেও পাখির কলরব আর সাগরের ঢেউয়ের গর্জনে মুখরিত হয়ে ওঠে পরিবেশ। সাগরে আছরে পরা ঢেউগুলোও কোনো চিত্র শিল্পীর রঙ তুলির পরশ মনে হয়। শেষ বিকেলে মৃদু বাতাসের ছন্দেও কিছুটা আনন্দ উপভোগ করে সবুজ গাছপালাও। নোনা জলে ভেজা স্বর্ণালী বালুতে চলে লাল কাঁকড়াদের ছুটাছুটি। খানিকটা দূরে ঝাউ বাগানের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা বাতাসের শো শো আওয়াজ। ঝাউ গাছের ঝরা পাতাগুলো শুকনো বালুর ওপর যেন কার্পেটের নরম বিছানায় পরিনত হয়। মাঝে মাঝে দ্বীপে উড়ে আসা পাখিদের কলকাকলি সমুদ্র সৈকতের অপরূপ রূপকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। এমনই অতুলনীয় হচ্ছে সোনারচরের সৌন্দর্য। স্থানীয়দের মতে এ চরটিকে সরকারিভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করলে পর্যটন শিল্পে যোগ হবে এক নতুন মাত্রা। স্বর্ণময় রূপ নিয়ে উপকূলবর্তী জেলা পটুয়াখালীর সর্বদক্ষিণে সমুদ্রের কোলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্য নিয়ে জেগে আছে এই চরটি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, নগর থেকে বহুদূরের এই চরের সৌন্দর্য এখনো অনেকের কাছেই অজানা। নদী আর সড়ক পথ পাড়ি দিয়ে সোনারচরে এসেই এর সৌন্দর্য্য উপলব্ধি করা যায়। অনেকেরই হয়তো বা ম্যানগ্রোভ আর ঝাউ বাগানের শো-শো শব্দ নির্জনে সৈকতের বালুতে গা এলিয়ে দিয়ে শোনা হয়নি । অবলোকন করা হয়নি উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের দৃশ্য। বন্ধুদের হাতে হাত রেখে নির্জন পরিবেশে ঝাউ বনের মধ্যে বয়ে যাওয়া দিঘল পথে যাওয়া হয়নি। নয়নে ধারন করতে পারেনি শিশির ভেজা বালুতে লাল কাঁকড়াদের আঁকা অনাবিল সুন্দরের আলপনা। কোনো শিল্পির রঙ তুলির ছোয়া প্রাকৃতিক সব বুনোরাই যেন সৈকতের সৌন্দর্য্যকে অনেকখানি বাড়িয়ে রেখেছে।
প্রকৃতির টানে
সোনারচরের আকর্ষণ যেকোনো মানুষকেই কাছে টানে। এখানে পা না ফেললে এটা বোঝার কোন উপায় নেই কোনো দর্শনার্থীর। এখানে রয়েছে প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত। সূর্যাস্ত আর সুর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে কোনো দর্শনার্থিকে স্থানন্তর হতে হয় না। একই স্থানে বসে পরিবারের সদস্যরা এ দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন। অপরুপ লীলার দৃশ্যে সমুদ্রে টেনে নেয়ার বিন্দুমাত্র ভয় জাগে না কারো মনে। সমুদ্রের স্রোতের কারণে পানির নিম্নমুখী টান লক্ষ্য করা যায়নি। ফলে পর্যটকরা এখানে থাকবেন নিরাপদে। সৈকতের গা ঘেঁসে জেগে থাকা ঝাউবন এখানকার সৌন্দর্য আরো অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। হরিণ, বুনো মহিষ, মেছোবাঘ, শুঁকর, উদসহ নানা প্রজাতির প্রাণী রয়েছে এখানে। কোনো দর্শনার্থির সকালে উঠতে ঘড়ির কাটা দেখতে হয় না। বনের পাখিরাই অপেক্ষমাণ সময়ের আওয়াজ তোলে সর্বদাই। কখন রাত বারোটা বাজলো, কিংবা কখন ভোর তা ঘড়ি দেখে কারো বোঝার প্রয়োজন হয় না এখানে। এই সময়গুলোতে পাখিরা একযোগে আওয়াজ তুলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। শীত মৌসুমে স্থানীয় পাখির দলে যোগ দেয় হাজারো অতিথি পাখি। সাইবেরিয়ান হাঁস, সরাইল, গাঙচিলসহ নানা জাতের পাখিরা আসে। প্রভাত আর গোধুলি ক্ষণই সোনারচরের অন্যতম আকর্ষণ। পূর্ব আকাশের দিগন্ত ছুঁয়ে উঁকি দেয় ভোরের নতুন সুর্য। শেষ বিকালে রক্তরঙ সূর্যটা রক্তিম আভা ছড়িয়ে সমুদ্রের কোলে নীড় খোঁজে। তখন সোনারচরের স্বর্ণময় রূপের নীল জলকে স্বর্ণালী করে তোলে। গোধুলির আচ্ছন্নতায় ম্লান হয় সোনারচরের আলো। নিজের রূপের আয়নায় ঘোমটা টেনে আরেকটি নতুন সকালের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়ে সমুদ্রের কোলে জেগে ওঠা স্বর্নালি বর্ণের সোনারচর।
আয়তন ও আকৃতি ঃ
ভূখন্ড পরিমাপের হিসাবে সোনারচরের আয়তন ৭ হাজার একর। সাম্প্রতিককালে চরের পূর্বদিকে নতুন চর পড়ায় এই আয়তন ১০ হাজার একরে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। চরটি দেখতে অনেকটা বাদামের দানার আকৃতির মত। সোনারচর ও এর পার্শ্ববর্তী চর আন্ডার মাঝখানে একসময় বড় নদী ছিল। কালের বিবর্তণে সে নদী এখন ছোট হয়ে গেছে। শুকনো সময়ে পায়ে হেঁটেই পার হওয়া যায়। সোনারচর চ্যানেল সরু হয়ে গিয়ে বনের সৌন্দর্য্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়াও অগনিত চ্যানেল রয়েছে সোনার চরের আশে পাশে। পর্যটকরা ঘুরতে পারেন নৌকা অথবা ট্রলার নিয়ে। চ্যানেলের দুই পাশ জুড়ে বহু পুরনো ম্যানগ্রোভ আর ঝাউ বন। যা বন বিভাগের রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ রেঞ্জের সোনারচর বিটের আওতাধীন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি চরের কোল ঘেঁষে অবস্থান মৌসুমি জেলে অথবা জেলে শ্রমিকের। শুকনো মৌসুমে নানা স্থান থেকে ব্যবসার জন্য এই চরটিতে আশ্রয় নেয় জেলেরা। একটু দূরেই রয়েছে তাদের সামর্থ্যানুযায়ী কয়েটি খাবার হোটেল। বৃত্তবানদের জন্য কোনো কোমল পানীয় না থাকলে সমুদ্রের বালু খনন করে তারা তোলে খাবার পানি। যার স্বাদ অসাধারণ।
যাওয়ার পথ ঃ
সরকারীভাবে কোনো পদক্ষেপ না থাকায় সোনারচরে সরাসরি সড়ক কিংবা নৌপথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা আজও হয়ে ওঠেনি। জেলা শহর পটুয়াখালী থেকে গলাচিপা উপজেলায় পৌঁছাতে হবে কোনো দর্শনার্থিকে। সেখান থেকে যে কোনো ভাড়াটে মটর সাইকেলের মাধ্যমে পৌঁছাতে হবে আগুনমুখা নদীর মোহনায়। কোনো তৃষ্ণার্থ ব্যক্তি আগুন মুখার তীরে পৌঁছালে বুড়াগৌরাঙ্গ ও দাঁড়ছিড়া নদী পাড়ি দিতেই দু’পাশ জুড়ে ঘন ম্যানগ্রোভ বনের দৃশ্য তার মনকে দ্বিগুণ প্রাণবন্ত করে তুলবে। ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে আগুনমুখার মোহনা থেকে ঘণ্টা দুয়েক এগুলেই চোখে পড়বে মায়াবী দ্বীপ ‘চর তাপসী’। তাপসীর দুই পাশ জুড়ে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য অতিক্রম কালেই সোনার চরের হাতছানি। তাপসী থেকে ৩০ মিনিটের পথ দক্ষিণে এগিয়ে গেলেই সোনারচর। বিত্তবানরা যেতে পারেন স্পিডবোট নিয়েও। এছাড়াও রয়েছে ছোট ছোট ইঞ্জিন চালিত ট্রলার। রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে সোনারচর যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আবার কুয়াকাটা থেকেও সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সোনারচরে যাওয়া যায়।
থাকার জায়গা ঃ
সোনারচরে রাত্রিযাপনের জন্য নিরাপদ আরামদায়ক ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। তবে প্রশাসনের উদ্যোগে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ছোট্ট তিন কক্ষের একটি বাংলো। রয়েছে বন বিভাগের ক্যাম্প। এসব স্থানে রাতে থাকার সুযোগ রয়েছে। চাইলে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখে ইঞ্জিন চালিত নৌকা বা ট্রলারে মাত্র আধাঘন্টার মধ্যে রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নে গিয়ে থাকার সুযোগ রয়েছে। সেখানে রয়েছে বন বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা স্যাপ-বাংলাদেশ, মহিলা উন্নয়ন সমিতির বাংলো ও সাথী মিয়ার রেস্ট হাউজ।
নামকরণ ঃ
সোনারচরে নেই কোনো স্বর্ণ, আছে স্বর্ণালি রঙের বালু আর মৃদু বাতাসের নিত্য। সকাল কিংবা শেষ বিকেলের রোদের আলো চরের বেলাভূমিতে পড়লে দূর থেকে পুরো দ্বীপটাকে সোনারি রঙের থালার মতো মনে হয়। বালুর ওপরে সূর্যের আলোয় চোখের দৃষ্টিতে সোনারঙ আভা ছড়িয়ে যায়। মনে হবে দ্বীপটিতে যেন কাঁচা সোনার প্রলেপ দেয়া হয়েছে। বিশেষত এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই দ্বীপটির নাম ‘সোনারচর’ রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এক সময়ে দ্বীপটিতে প্রচুর পরিমাণে সোনালী ধান জন্মাতো বলে এই নামকরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হয় । আবার অনেকে মৎস্য আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে চরটিকে সোনারচর বলে অখ্যায়িত করেন।
সম্ভাবনার হাতছানি ঃ
সরেজমিনে সোনারচরের নিকটবর্তী রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ বাজারে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপচারীতা হয়। তাদের দাবি একটাই, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে এই চরের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে হবে। সোনারচরকে পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণার দাবি জানিয়ে তারা বলেন, যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হলে এটি হবে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এখানে পর্যটকদের ভিড় জমবে। পাশাপাশি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারেন। পর্যটকরা সোনারচরের পাশেই জাহাজমারা, তুফানিয়া ও শিবচরসহ আরো কয়েকটি দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।

Tuesday, April 18, 2017

রাঙ্গাবালীর তরমুজ যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে

উপযোগী মাটি, সঠিক পরিচর্যা আর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর পটুয়াখালী জেলার কয়েকটি উপজেলায় তরমুজের ভালো ফলন হয়েছে। বিশেষ করে রাঙ্গাবালী উপজেলাতে তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তরমুজ চাষিরা ক্ষেত থেকে তরমুজ তুলে বাজারজাত করতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিদিন পটুয়াখালীর চরাঞ্চল রাঙ্গাবালীসহ একাধিক উপজেলা থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তরমুজ সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে এখনও ক্ষেত থেকে পুরোদমে তরমুজ সংগ্রহ শুরু করেননি কৃষকরা। রাঙ্গাবালী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি রবিশস্য মৌসুমে অন্যান্য রবিশস্যের পাশাপাশি রাঙ্গাবালী উপজেলায় এ বছর ১১২০০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন তরমুজ চাষীরা। এরমধ্য রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর, বড়বাইশদিয়া, ছোটবাইশদিয়া, চরমোন্তাজ, চালিতাবুনিয়া, কাছিয়বুনিয়া, কাউখালীসহ বেশ কয়েকটি স্থানে প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও তরমুজের আবাদ করা হয়েছে। তবে মার্চের প্রথম দিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে তরমুজ চাষীরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তা না হলে এ বছর তরমুজ ফলনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেত বলে দাবী করেন কৃষকরা। তবে বিপর্যয়ের ফলে চাষিরা এবছর দাম ভালো পাচ্ছেন বলে জানান আড়ৎ মালিকরা। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতিদিন ঢাকাগামী লঞ্চ, ট্রলার, এবং ট্রাক যোগে রাঙ্গাবালী উপজেলার বেশ কয়েকটি পয়েন্ট থেকে ঢাকা, রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, ঝিনাইদাহ, সিলেট, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তরমুজ সরবরাহ করা হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পাড় করে তরমুজ চাষীরা ক্ষেত থেকে তরমুজ তুলে বাজারজাত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এর সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে স্থানীয় আড়তদার এবং সৃজনশীল ব্যবসায়ীরা। রাঙ্গাবালী উপজেলার কাউখালী গ্রামের রাহেলা বেগম জানান, তিনি এ বছর ২ একর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। এতে তার ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ৪০ হাজার টাকা। তিনি তিন ধাপে এপর্যন্ত আড়াই লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন। গত বছরের তুলনায় এ বছর ফলন ভাল হয়েছে। তবে মার্চ মাসের বৃষ্টিপাতের কারণে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তা না হলে আরো ৫০ হাজার টাকার সমপরিমাণ তরমুজ তার ক্ষেত থেকে উৎপাদন করা সম্ভব হতো।
কিন্তু এবছর দাম ভাল পাচ্ছেন বলে জানা তিনি। রাঙ্গাবালী উপজেলা যুগীর হাওলা গ্রামের তরমুজ চাষী আবু হানিফ জানান, এবছর তিনি ৬০ হাজার টাকা ব্যায়ে ৪ একর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। এর মধ্যে বৃষ্টিতে ১ একর জমির তরমুজ বৃষ্টিতে বিনষ্ট হয়ে যায়। তিনি এ পর্যন্ত ৩ ধাপে সাড়ে তিন লাখ টাকার তরমুজ সরবরাহ করেছেন। সে ক্ষেত্রে তার এ বছর তরমুজ চাষ থেকে তিন লাখ টাকা লাভ হয়েছে। তবে তিনি জানান, কৃষি দফতর যদি তাদের নানা পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতেন তাহলে ফলন আরো ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। উপজেলার গাব্বুনিয়া গ্রামের দুদা মুন্সি জানান, তার ছোট ভাই ইমাম মুন্সি এবং তিনি মিলে ৯ একর জমিতে তরমুজের চাষ করেছন। এতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। তারা দুই ভাই এ পর্যন্ত স্থানীয় আড়তদারের কাছে ৪ ধাপে অন্তত ১২ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন। চালিতা বুনিয়ার নাসির সিকদার জানান, গত বছরের তুলনায় এবছর তার ক্ষেতে ফলন ভালো হয়েছে। এবছর আমি ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করে ৪ একর জমিতে তরমুজের আবাদ করে এ পর্যন্ত ২ ধাপে ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকারও বেশি তরমুজ বিক্রি করেছি। তাতে আমার সব পুশিয়ে অন্তত ৫ লাখ টাকা লাভ হয়েছে। বৃষ্টিতে ক্ষতি না হলে তিনি তার ক্ষেত থেকে ১০ লাখ টাকার তরমুজ উৎপাদন করতে পারতেন বলে জানান। পটুয়াখালী জেলা শহরের আরত মালিক মো: খায়রুল হাসান জানান ভিন্ন কথা। তিনি জানান, এ বছর তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু মার্চ মাসের দিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তরমুজ চাষিরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু গত বছরের তুলনায় এ বছর কৃষকরা দাম ভালো পাচ্ছেন।

Sunday, April 16, 2017

রাঙ্গাবালীতে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে অষ্টম শ্রেণীর এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। শুক্রবার গভীর রাতে উপজেলার সামুদফাৎ এলাকায় এ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ধর্ষণের শিকার ছাত্রী নিজে বাদী হয়ে শনিবার রাতে রাঙ্গাবালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছে। মামলার বিবরণে জানা গেছে, ঘটনার দিন সীলার বাড়ির পাশে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পিকনিকের আয়োজন করে স্থানীয় যুবকরা।
এসময় ওই শিক্ষার্থী ও তার এক বান্ধবীর সাথে পহেলা বৈশাখের ওই অনুষ্ঠান শেষে বাড়িতে রওনা হয়। এসময় সিরাজুল চৌকিদারের ছেলে সুমন (২২) ও আনোয়ার চৌকিদারের ছেলে দানেশ (২৮) ওই কিশোরীকে জোরপূর্বক একটি জঙ্গলে তুলে নিয়ে যায়। সেখানে হাত-পা বেঁধে তাকে ধর্ষণ করে সুমন। এক পর্যায়ে তার সাথে থাকা বান্ধবী চিৎকার করলে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তাকে রক্ষা করে। এসময় স্থানীয়দের উপস্থিতি টের পেয়ে সুমন ও তার সহযোগী পালিয়ে যায়। রাঙ্গাবালী থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শামসুল আরেফিন বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশি অভিযান অব্যাহত আছে।

Sunday, April 2, 2017

স্বামীর খোঁজে বাউফলে আমেরিকান তরুণী

প্রতারক স্বামীর খোঁজে পটুয়াখালীর বাউফলে এসে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আমেরিকা প্রবাসী সানজিদা চৌধুরী (২০) নামে এক শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণী। বৃহস্পতিবার সকালে ওই তরুণী ঢাকা থেকে বাউফলে আসেন। তিনি বর্তমানে উপজেলার দাসপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৬নং ওয়ার্ডের  সদস্য মো. হানিফ সরদারের বাড়িতে অবস্থান করছেন।
গতকাল বিকালে ওই ইউপি সদস্যের বাড়িতে গেলে আমেরিকান তরুণী সানজিদা বলেন, ‘জন্মসূত্রে তিনি আমেরিকার নাগরিক। তার বাবার নাম আবদুল মোতালেব চৌধুরী। তিনি (বাবা) আমেরিকার ফ্লোরিডার গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা। ঢাকার বারিধারায় নিউ ডিওএসএইচের চার নম্বর সড়কের ২৯৩ নম্বর বাড়িটি তাদের। এছাড়া চট্টগ্রামেও তাদের বাড়ি রয়েছে। ২০০৫ সালে তার মা মারা যান। তার বাবা সাত মাস আগে বাংলাদেশে এসে ভোলার ফরিদা বেগম নামে এক নারীকে বিয়ে করেন। এতে বাবার সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি হলে অভিমান করে ২০১৬ সালের ২৬শে অক্টোবর তিনি ঢাকায় আসেন। ঘটনাক্রমে নজরুল ইসলাম (৩০) নামে এক যুবকের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক হয়। পরে চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি তারা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুজনের মধ্যে ভালোই সম্পর্ক ছিল। ২৮শে মার্চ (গত মঙ্গলবার) সকালে স্বামী নজরুল ২০ লাখ টাকা, একটি মুঠোফোন (আইফোন), তার (সানজিদা) পাসপোর্ট ও এসএস কার্ড (নম্বর: ৫৬১৯২৯৯৮৬৪৫৩২১) নিয়ে পালিয়ে আসে। এরপর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পরে তিনি দেখতে পান বিয়ের কাবিননামায় নজরুলের পিতার নাম আলী হোসেন মাতব্বর। ঠিকানায় উল্লেখ করা হয়েছে দশমিনা উপজেলার আলীপুরা ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুরা গ্রামে তাদের (নজরুল) বাড়ি। তবে নজরুল তাকে জানিয়েছে তিনি বাউফল উপজেলার কালাইয়া গ্রামে থাকে। সে অনুযায়ী তিনি (সানজিদা) লঞ্চযোগে বৃহস্পতিবার বাউফলে এসে থানায় যান। বাউফল থানা পুলিশের পরামর্শ অনুযায়ী পরে তিনি পাশের দশমিনা থানায় স্বামীকে খুঁজতে যান। পুলিশের সহযোগিতায় ওই এলাকায় গেলে তাকে (নজরুল) খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সানজিদার বাবা মোতালেব চৌধুরী মেয়ের দুরবস্থার কথা জেনে গতকালই আমেরিকা থেকে ঢাকায় এসেছেন। এরপর তিনি বাউফলে রওনা হয়েছেন বলে জানা গেছে।
বাউফল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আযম খান ফারুকী বলেন, ‘তিনি যে ঠিকানার কথা বলেছেন তা দশমিনা উপজেলায়। এ কারণে তাকে দশমিনা থানায় পাঠানো হয়েছে।
দশমিনা থানার ওসি মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ওই ঠিকানা নজরুলের শ্বশুরবাড়ির। তার বাড়ি বাউফলের কালাইয়া গ্রামে। মূলত প্রতারণা করার জন্যই আমেরিকান ওই তরুণীকে নজরুল বিয়ে করেছে।’ তিনি আরো বলেন, ওই তরুণী যেহেতু শারীরিক প্রতিবন্ধী, অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে কষ্ট হয়, তাই তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে ইউপি সদস্য মো. হানিফ সরদারের জিম্মায় দেয়া হয়েছে।
সানজিদা বলেন, ‘স্বামীর প্রতারণায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও তিনি মেম্বারের বাড়িতে ভালোই আছেন। তার বাবার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বাংলাদেশে এসে তার মেয়েকে নিয়ে যাবেন।
ইউপি সদস্য হানিফ সরদার বলেন, সানজিদার বাবা এলে তাকে পুলিশের উপস্থিতিতে বাবার জিম্মায় দেয়া হবে।

Tuesday, March 14, 2017

গলাচিপায় যুবককে কুপিয়ে খুন

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় ইলিয়াস খাঁ (৩৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে খুন করেছে দুর্বৃত্তরা। এসময় কৃষি ব্যাংকের গার্ড দেলোয়ারকে (৩২) কুপিয়ে আহত করা হয়। সোমবার রাতে পানপট্টি ইউনিয়নে সেন্টার বাজার এলাকায় পানপট্টি কৃষি ব্যাংকের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশ জানায়, সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ইলিয়াসকে কুপিয়ে খুন করে দুর্বৃত্তরা।
এসময় কৃষি ব্যাংকের গার্ড দেলোয়ারকেও আহত করে তারা। পরে ইউনিয়ন পরিষদের পুকুর থেকে ইলিয়াসের লাশ উদ্ধার করা হয়। গলাচিপা থানার ওসি আ. রাজ্জাক মোল্লা জানান, ইলিয়াসের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।তবে হত্যার কারণ ও কারা এ ঘটনায় জড়িত তা জানা যায়নি।

Friday, October 30, 2015

ডাকাতি, অপহরণ আর মুক্তিপণে সর্বস্বান্ত জেলেরা by নেছারউদ্দিন আহমেদ টিপু

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে গত তিন মাসে শতাধিক মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতেরা ট্রলারগুলো থেকে জাল, জ্বালানি ও মাছ লুটের পাশাপাশি জেলেদেরও অপহরণ করে। আর অপহৃতদের উদ্ধারে মুক্তিপণ দিতেই সর্বস্বান্ত হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য বন্দরের মৎস্য ব্যবসায়ীদের এক হিসাব মতে, গত তিন মাসে কুয়াকাটা সংলগ্ন সাগরে অন্তত ১১০টি ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতেরা পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও পাথরঘাটা এবং বরগুনার এ উপকূলীয় এলাকার অন্তত ১০০ জেলেসহ ২০টি ট্রলার অপহরণ করেছে। এ ছাড়াও জাল, জ্বালানি তেল ও মাছসহ কোটি টাকার জিনিসপত্র লুট করেছে। মুক্তিপণ দিয়ে অপহৃত জেলেদের কেউ কেউ ফিরলেও এখন পর্যন্ত জিম্মি রয়েছেন অন্তত ২৫ জন।
আলীপুর মৎস্য বন্দরের আড়তদার ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি অক্টোবর মাসে তিন দফায় অন্তত ৫৫টি ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) গভীর রাতে মাছ ধরে ফেরার সময় ‘এফবি এলমা আক্তার’ নামে এ মৎস্য বন্দরের আবুল কোম্পানির ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। এতে জাল, জ্বালানি তেল ও মাছসহ অন্তত ১০ লাখ টাকার মালামাল লুট হয়েছে বলে দাবি করেছেন ট্রলারটির মালিক। ডাকাতেরা ওই ট্রলারে করেই রুহুল আমীন মাঝি (৪০), মো. শুক্কুর আলী (৪২) এবং মো. শানু মিয়া (৫০) নামে তিন জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া মো. আল আমীন (২৫), মো. নাঈম (২২) ও মো. বজলুর রহমান (৪৫) নামে অন্য দিন জেলেকে সাগরে নিক্ষেপ করেছে। এখন পর্যন্ত ট্রলার ও ওই জেলেদের হদিস পাওয়া যায়নি।
এর আগে ১৩ অক্টোবর বঙ্গোপসাগরে জেলেদের ট্রলারে ডাকাতেরা গুলি করে। এতে ফয়সাল (৩০), আহসান আলী (৩২), শাহ আলম (৪০) ও কাইয়ুম (২৯), আবদুল মান্নান মৃধা (৩০) ও আমির হোসেন (৩৩) নামে পাঁচ জেলে আহত হন। ওই দিন ডাকাতেরা আলীপুর মৎস্য বন্দরের মো. আনসার উদ্দিন মোল্লার ‘এফ বি মার্জিয়া’ ট্রলারে করে নয়া মিয়া, আল-আমিন ও আবুল কালাম নামে তিন জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
‘এফ বি মার্জিয়া’ ট্রলারের মালিক জানান, দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে নয়া মিয়া ফেরত এসেছেন। কিন্তু মুক্তিপণ না দেওয়ায় মুক্তি মেলেনি আল-আমিন ও আবুল কালামের।
তার​​ ও আগে ২৪ আগস্ট দুপুরে বঙ্গোপসাগরে অন্তত ৫০টি ট্রলারে গণডাকাতি হয়েছে। ওই সময় ডাকাতেরা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ‘এফবি তিমন’ ট্রলারের মাঝি লালচান (৩২) ও ‘এফবি মায়ের আশীর্বাদ’ ট্রলারের মাঝি মো. বশির হোসেনকে (৩৫) অপহরণ করে নিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত ওই দুই জেলে মুক্তি পাননি।
আলীপুর মৎস্য বন্দরের আড়তদার আবুল হোসেন কাজীর ভাষ্য, ‘সাগরে ডাকাতি করার সময় ডাকাতেরা নিজেদের দয়াল, মজনু, মাস্টার, আলীফ, বাচ্চু ও এনামুল বাহিনী নামে পরিচয় দেয়। এগুলো মূলত ছদ্ম নাম। এ ডাকাত চক্রের পেছনে খুলনা ও বাগেরহাটের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। এর মধ্যে খুলনার ফুলতলার দামোদর এলাকার বাচ্চু বেগ (গালা বাচ্চু) ওরফে ব্লাক বাচ্চুর নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। তিনি ভারতে অবস্থান করে তাঁর সহযোগী খুলনার ডুমুরিয়ার এনামুলের মাধ্যমে ট্রলারগুলোতে ডাকাতি করান। এ কাজে ডাকাতেরা উচ্চ কার্যক্ষমতা সম্পন্ন ইঞ্জিন ব্যবহার করে।’
মুক্তিপণ দিয়ে ফেরত আসা জেলেদের বরাত দিয়ে কুয়াকাটা-আলীপুর মৎস্য আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আনসার উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘আমরা শুনেছি ৩০ জেলের মুক্তিপণ বাবদ যে অর্থ পাওয়া যায়, তা খুলনা এলাকার প্রশাসন, নেতা ও সাংবাদিকদের জন্য ব্যয় হয়। এ জন্য ওদের ৫০ জনের মতো জেলেকে জিম্মি করতে হয়। বাকি ২০ জেলের মুক্তিপণের অর্থ জলদস্যু এবং তাদের নিয়ন্ত্রণকারীরা ভাগাভাগি করে নেয়।’
মহিপুর মৎস্য আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. ফজলু গাজি বলেন, ‘এ বছর দফায় দফায় ডাকাতির কবলে পড়ে জেলেরা ছাড়াও আমরা মৎস্য ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। প্রতি বছরই ডাকাতদের মুক্তিপণ দিতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা মৎস্যজীবীরা কিচ্ছু চাই না, সাগরে নিরাপদে মাছ ধরার নিশ্চয়তা চাই।’
একই সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিমাই চন্দ্র দাস বলেন, ‘সাগরে জল দস্যুতা রোধ হচ্ছে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে জেলেরা বেকার সময় কাটায়। আর আবহাওয়া ভালো হলে সাগরে মাছ ধরতে গেলে ডাকাতেরা অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর মুক্তিপণ দাবি করে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে জেলেরা যেমন এ পেশা ছেড়ে দেবে, তেমনি আমরাও ব্যবসা গুটাতে বাধ্য হব।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘সাগরে ডাকাতিগুলো সাধারণত খুলনা-বাগেরহাটের জলসীমানায় হয়ে থাকে। ডাকাতির শিকার হওয়া কলাপাড়া উপজেলার জেলেরা এসে জানালে আমরা সঙ্গে সঙ্গে আইনি পদক্ষেপ নিই। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ-কোস্টগার্ডকে অবহিত করি।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কোস্ট গার্ডের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের স্টাফ অফিসার (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ফজলুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলেরা সত্যিকারভাবে চিহ্নিত করে বলতে পারছে না কোন জায়গায় নিয়ে জেলেদের আটকে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে, যেসব জেলে মুক্তিপণ দিয়ে বের হয়ে আসে, তাঁরাও এসে আর মুখ খুলছেন না। তাঁরা যদি আমাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতেন, তাহলে আমরা সেভাবে ব্যবস্থা নিতে পারতাম।’
ফজলুল করিম আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কারা জেলে, কারা ডাকাত তা চিহ্নিত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। যদি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জেলেদের আইডি কার্ড দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের কাজ করতে সুবিধা হতো। আমরা মনে করি, সে ক্ষেত্রে সাগরবক্ষে ডাকাতিও বহুলাংশে কমে যেত। তা ছাড়া সুন্দরবন বিশাল জায়গা, সেখানে কাজ করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের জনবল বৃদ্ধি করলে, তাঁদের অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করা হলে জল দস্যুতা রোধে অন্য বাহিনীর সঙ্গে তাঁরাও ভূমিকা রাখতে পারতেন।’