Sunday, October 6, 2013

বিজেপি ক্ষমতায় এলে ভারতের জন্য বিপদ

বিমান বসু
বিমান বসু। পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআইএম) কেন্দ্রীয় নেতা। জন্ম ১৯৪০ সালের ১ জুলাই, কলকাতায়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনাও করেছেন কলকাতায়। ১৯৫৮ সালে আইনশাস্ত্র পড়ার সময়ই বিমান বসু কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক সদস্যপদ লাভ করেন। এর আগে সর্বভারতীয় ছাত্র ফেডারেশনের পশ্চিমবঙ্গ শাখার সহসভাপতি ছিলেন। ১৯৭১ সালে কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) রাজ্য কমিটির সদস্য এবং ২০০৬ সালে সম্পাদক হন। ২০০৫ সাল থেকে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৭১ সালে সহায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন এই বামপন্থী নেতা। গত ২৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় তাঁর এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান ও অমর সাহা

প্রথম আলো  পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ৩৪ বছর বামফ্রন্ট শাসন করার পর ২০১১ সালে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। গত আড়াই বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বিমান বসু  সত্যি কথা বলতে, আমাদের রাজ্যের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। বামফ্রন্ট সরকার যেসব ক্ষেত্রে সফল হয়েছিল, পরবর্তী সরকার সেগুলো নস্যাৎ করে দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে আমি ভূমি সংস্কার ও অপারেশন বর্গার কথা বলতে পারি। বামফ্রন্টের এ কর্মসূচি সারা ভারতবর্ষে একটি আদর্শ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এর মাধ্যমে বর্গাচাষিদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বর্গাচাষি মারা গেলে তার সন্তানেরা সেই জমির ওপর অধিকার ভোগ করত। জমির মালিক জমি বিক্রি করতে চাইলে বর্গাচাষির সঙ্গে কথা বলতে হবে; নতুন মালিক যেন তার অধিকার খর্ব করতে না পারে।
দ্বিতীয় হচ্ছে, ছোট চাষিদের সহায়তায় বিনা মূল্যে অল্প পরিমাণ বীজ, সার ও কীটনাশক সরবরাহ করা হতো। এই যে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট কৃষিব্যবস্থায় বিরাট পরিবর্তন আনল, পরবর্তী সরকারের উচিত ছিল সেটিকে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু তারা সেটি না করে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
প্রথম আলো  গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে বামফ্রন্টের প্রধান অবদান কী ছিল?
বিমান বসু  বর্গাচাষিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পঞ্চায়েতব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ফসল তোলা নিয়ে গ্রামে গ্রামে সংঘাত-সংঘর্ষ হতো। আমরা সেটা বন্ধ করেছি। গ্রামবাংলায় সুস্থিতি ও সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছি। আমরা যে পঞ্চায়েতব্যবস্থা চালু করেছিলাম, এখন তার ওপরও আমলাতন্ত্রের খবরদারি শুরু হয়েছে। আমাদের সময়ে তৃণমূল পর্যায়ে যেসব সিদ্ধান্ত হতো, এখন তা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম আলো  বিধানসভার পর পঞ্চায়েত নির্বাচনেও বামফ্রন্টের খারাপ করার কারণ কী?
বিমান বসু  ৩৪ বছর পর বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট হেরে গেল। জয়ী হলো কংগ্রেস-তৃণমূল জোট। এর প্রভাব জনগণের মধ্যে ভিন্ন মাত্রায় পড়েছে। ২০১১ সালের নির্বাচনের আগে কয়েকটি জেলায় মাওবাদী চরমপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস সন্ত্রাসের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ২০০৯ ও ২০১০ সালেও কয়েকটি জেলায় মাওবাদীদের সঙ্গে নিয়ে তারা আমাদের অনেক নেতা-কর্মীকে হত্যা করেছে। সে সময়ে পরিকল্পিতভাবেই তৃণমূলের কর্মীদের মাওবাদী দলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর শাসক দল তাদের নীতি পরিবর্তন করে এবং যাদের মাওবাদী দলে পাঠানো হয়েছিল, তাদের আবার তৃণমূলে ফিরিয়ে আনে। এ অবস্থায়ই পঞ্চায়েত নির্বাচন হলো, যাতে তৃণমূলের সন্ত্রাস-মাস্তানি সত্ত্বেও আমরা ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছি।
আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে তৃণমূল নেত্রী সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য জনগণকে অসম্ভব ও অবাস্তব সব প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন। জনগণ কিছুটা সময়ের জন্য হলেও তাতে বিভ্রান্ত হচ্ছে, এসব বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না খতিয়ে দেখছেন না। যেমন সরকার গ্রামীণ পুলিশে চাকরি দিয়েছে। কোনো ব্লক থেকে এক-দুজন করে লোক নিলেও বলা হচ্ছে ২০ জন নেওয়া হবে, ছোট ব্লকে ১৫ জন। কিন্তু যখন দেখা যাবে সরকার এই প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারছে না, তখন তৃণমূলের প্রতি জনগণের মোহভঙ্গ হবে।
প্রথম আলো  নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে বামফ্রন্টের গৃহীত কর্মসূচি কি ভুল ছিল বলে মনে করেন?
বিমান বসু  প্রকল্প নেওয়া ভুল না হলেও তাড়াহুড়ো করা ঠিক হয়নি। মানুষকে বুঝিয়েই সবকিছু করা উচিত ছিল। এখানে বলা প্রয়োজন, নন্দীগ্রামে কিছুই করা হয়নি, এমনকি জরিপও হয়নি। সবই তৎকালীন বিরোধী দলের প্রচারণা ছিল। আর সিঙ্গুরে তাড়াহুড়ো না করে যেসব মানুষ স্বেচ্ছায় জমি দিয়েছিল, তাদেরটা নিয়েই কাজ শুরু করা যেত। সেই জমির পরিমাণ ৬০৪ একর, যা সরকার বুঝে নিয়েছিল। আর যারা জমি দিতে চায়নি, তাদের জমি অধিগ্রহণ না করে বিকল্প ব্যবস্থা করা যেত। সেটা করা হয়নি বলেই সমস্যা তৈরি হলো।
প্রথম আলো  বামফ্রন্টের জনসমর্থন পুনরুদ্ধারে আপনারা কী কী পরিকল্পনা নিয়েছেন?
বিমান বসু  বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে যেভাবে বামপন্থীদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে, তাতে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর গত আড়াই বছরে বামফ্রন্টের ১৩১ জন নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ৫৩ জন ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসীর সংখ্যা ৯ এবং তফসিলি সম্প্রদায়ের ৪৮ জন। হাজার হাজার কর্মীর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে; গ্রেপ্তার করা হয়েছিল সাড়ে তিন হাজার নেতা-কর্মী; পলাতক জীবন বেছে নিয়েছেন আরও হাজার তিনেক। এ অবস্থায় আমরা কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করছি, অনেককে আইনি সহায়তা দিচ্ছি। একই সঙ্গে সরকারের কথা ও কাজের অমিলের বিষয়টি জনগণের সামনে তুলে ধরছি।
প্রথম আলো  সারা ভারতের রাজনীতিতে এখন বামপন্থীদের অবস্থান কী?
বিমান বসু  সত্য কথা বলতে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও কেরালার বাইরে সারা ভারতে বামফ্রন্টের জনভিত্তি তেমন নেই। তামিলনাড়ু, অন্ধ্র, বিহার ও হিমাচলের কিছু এলাকায় ভালো অবস্থান আছে; তবে সারা রাজ্যে নয়।
প্রথম আলো  আগামী নির্বাচনে মৌলবাদী ও হিন্দুত্ববাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে বামপন্থীদের কোনো বোঝাপড়া হবে কি?
বিমান বসু  নির্বাচনী বোঝাপড়া নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি। অবস্থা বুঝেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামী নভেম্বরে পাঁচটি রাজ্যে যে বিধানসভা নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেই নির্বাচনের ফলাফলেই বোঝা যাবে, আসলে বিজেপি কতটা জায়গা দখল করতে পারল। বিজেপির বিরাট মতলব আছে। অতীতে যা হওয়ার হয়েছে, এখন আর মানুষ বিজেপিকে বিশ্বাস করে না। যারা সরাসরি রাজনীতি করে না, বামফ্রন্ট, কংগ্রেস বা আঞ্চলিক কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়—ভারতের এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শেই বিশ্বাসী। আমার মনে হয় না তারা বিজেপির রাজনীতি গ্রহণ করবে। তবে অনেক সময় ভুল করেও মানুষ বিষ খায়। সে রকম কিছু হলে সেটি ভারতের জন্য বিপদ হবে।
প্রথম আলো  ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে আসি। বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও দুটি বকেয়া সমস্যা রয়ে গেছে—তিস্তার পানিবণ্টন ও সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন। আপনার মন্তব্য কী?
বিমান বসু  এটি দুর্ভাগ্যজনক। বাংলাদেশের পানি সমস্যা ও সীমান্ত সমস্যার সমাধান আগেই হওয়া উচিত ছিল। আমি মনে করি, উভয় দেশের স্বার্থেই সেটা করতে হবে। বাংলাদেশ ভারতের বন্ধুরাষ্ট্র। অতএব এই বন্ধুত্ব রক্ষার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা ভারত সরকারকে করতে হবে। আমরা সব সময়ই এ দুটি সমস্যা সমাধান করার কথা বলে আসছি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এখন যাঁরা ক্ষমতায় আছেন, তাঁরা তো গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মানেন না। তাঁরা যদি সর্বদলীয় বৈঠক ডাকতেন, সবাইকে নিয়ে বসতেন, তাহলে আমরা আমাদের কথা বলতে পারতাম। পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে চুক্তির বিরোধিতা করছে, কিসের ভিত্তিতে? বামফ্রন্ট তো দুই কোটি ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। তারা পেয়েছে দুই কোটি ৩০ লাখ ভোটারের সমর্থন, সে ক্ষেত্রে তাদের কেন্দ্রকে বলা উচিত ছিল, আমরা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মতামত নিই; তারপর সিদ্ধান্ত দেব। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শেষ মুহূর্তে ঢাকা সফল বাতিল করলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেলেন না। তিনি তো সব দলের নেতাদের নিয়ে বসে, পানি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত জানাতে পারতেন; তা করলেন না।
জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকতে ঠিক এর বিপরীত ভূমিকাই নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দুই দেশের স্বার্থেই গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি হওয়া উচিত। কেন্দ্রও তাঁর যুক্তি মেনে নিয়ে চুক্তি করেছিল।
প্রথম আলো  যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচির প্রতিবাদে আপনারা ইউপিএ সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, সেই সিদ্ধান্ত কি সঠিক বলে মনে করেন?
বিমান বসু  যেকোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করার আগে দেশের মানুষের স্বার্থকে প্রথমে দেখতে হবে। আমরা বলেছিলাম, এই কর্মসূচিতে দুর্ঘটনা ঘটলে মার্কিন কোম্পানিকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ভোপাল ট্র্যাজেডিতে ইউনিয়ন কারবাইডের কাছ থেকে আমরা ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারিনি। সেখানে বহু মানুষ জীবন দিয়েছে ও পঙ্গু হয়ে গেছে। এখন হাইকোর্টের রায়ে সেই কথা বলা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল।
প্রথম আলো  সারা বিশ্বে বামপন্থার ভবিষ্যৎ কী?
বিমান বসু  বামপন্থীরা যেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সেই বৈষম্য যেহেতু রয়ে গেছে, সেহেতু বামপন্থার ভবিষ্যৎ নেই, এ কথা বলা যাবে না। বামপন্থার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো। সেখানে তারা পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমর্থনের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। নিজেদের জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করছে। তারা আমেরিকার খবরদারি মেনে নেয়নি। বিশ্বব্যবস্থায় ল্যাটিন আমেরিকার এই ধারা আমাদের জন্য নতুন দিশা দেখাচ্ছে। আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো গিরগিটির মতো বারবার রং বদলালেও তাদের মূল যে বৈশিষ্ট্য শোষণ ও জবরদস্তি, তা থেকে সরে আসছে না। তারা সিরিয়ায় হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল, চীন ও রাশিয়ার জন্য পারেনি। এমনকি আমেরিকার ৭০ শতাংশ মানুষ এ যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। আমেরিকার আসল উদ্দেশ্য ইরানকে কব্জা করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা।
প্রথম আলো  বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আপনার বার্তা কী?
বিমান বসু  বাংলাদেশের অর্থনীতিও ভারতের মতো কৃষিভিত্তিক। যদিও সাম্প্রতিক কালে সেখানে শিল্পকারখানাও গড়ে উঠেছে। কৃষির সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোকে সংহত করা, ঐক্যবদ্ধ করা এবং তাদের ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমেই দেশকে এগিয়ে নেওয়া যাবে। এর পাশাপাশি শিল্পশ্রমিকদের স্বার্থও দেখতে হবে। অবিভক্ত ভারতে বাংলার যে অংশে বাম ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার প্রায় সবটাই বর্তমান বাংলাদেশে। চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, হাজং বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহনকারী বাংলাদেশের মানুষ কারও কাছে নতি স্বীকার করবে না বলেই আমার বিশ্বাস।
প্রথম আলো  আপনারা কি অতীতের ভুল সংশোধন করে পার্টিকে সামনে এগিয়ে নিতে চান?
বিমান বসু  আমাদের কাজে ভুলত্রুটি ছিল স্বীকার করি। নিরন্তর আলোচনা এবং কাজের মাধ্যমেই অতীতের ভুলগুলো সংশোধন করে সামনে এগোতে হবে। দমন-পীড়ন ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পার্টিতে আসছে—এটি আশার কথা।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
বিমান বসু  ধন্যবাদ।

কেন মেধাবীরা আসছেন না?

৫ অক্টোবর সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালিত হলো। ইউনেসকো ১৯৯৪ সালে ৫ অক্টোবরকে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সহযোগিতায় ইউনেসকো বিশ্বের শিক্ষকদের অধিকারবিষয়ক একটি আন্তরাষ্ট্রীয় সম্মেলনের আয়োজন করে। শিক্ষকদের অবদানের স্বীকৃতি ও তাঁদের অধিকারসম্পর্কিত যাবতীয় বিষয় নিয়ে ১৪৬টি অনুচ্ছেদসংবলিত একটি সুপারিশনামা এ সম্মেলনে পেশ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ইউনেসকো শিক্ষকদের দায়িত্ব ও অধিকারের গুরুত্ব উপলব্ধি করে ১৯৯৪ সালে ৫ অক্টোবরকে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনেসকো প্রতিবছর সহযোগী সংগঠন আইএলও, ইউএনডিপি, ইউনিসেফ ও এডুকেশন ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে দিবসটি পালন করে থাকে। এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য হলো—আ কল ফর টিচারস! অর্থাৎ, শিক্ষকদের জন্য আহ্বান! বর্তমানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা শিক্ষকসমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মানসম্মত শিক্ষাই মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় এবং উন্নত জীবনযাপনের প্রতিজ্ঞাকে বাস্তবায়ন করে। তাই তো দুর্নীতিমুক্ত, মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষ জনসম্পদ গড়তে প্রয়োজন দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। কারণ, একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, নির্ভরযোগ্য ও স্বপ্রণোদিত শিক্ষকের দ্বারাই কেবল মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায় এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের মজবুত ভিত্তি স্থাপন করা সম্ভব।
কিন্তু একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য শিক্ষক তৈরি করতে যেসব সুযোগ-সুবিধা থাকা আবশ্যক, সেগুলোর অধিকাংশই আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অনুপস্থিত। যে শিক্ষকদের ওপর জাতি গঠন ও দক্ষ জনসম্পদ তৈরির মহান দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে, সেই শিক্ষকেরা যদি উপেক্ষিত ও অবমূল্যায়িত থাকেন, তাহলে তাঁদের পক্ষে যথাযথভাবে অর্পিত দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু তবু একজন শিক্ষক সারা জীবনই তাঁর মেধা, দক্ষতা, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তাঁর জ্ঞানের ভান্ডার উজাড় করে দিয়ে দেশকে মেধাসমৃদ্ধ করার কাজে ব্রত থাকেন। বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো শিক্ষানীতি, ২০১০-এর আলোকে প্রথমবারের মতো প্রণীত শিক্ষা আইন। এ আইনের একটি খসড়াও তৈরি হয়েছে। তবে সেখানে শিক্ষকদের মৌলিক অধিকার বিষয়ে অস্পষ্টতা থেকে গেছে। এই শিক্ষা আইন নিয়ে শিক্ষাবিদদের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। অনেকের মনে এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই আইনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থাকে বৃত্তবন্দী করে ফেলা হচ্ছে না তো! এ ছাড়া এই আইনের দ্বারা সরকারি-বেসরকারি, ক্যাডার ও নন-ক্যাডার শিক্ষকদের একই মাপকাঠিতে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ সংক্ষিপ্ত বিচারের আওতায় এনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দ্বারা বিচার করা হবে। উল্লেখ্য, ক্যাডার সার্ভিসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মকর্তারা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকেন।
তাই শিক্ষা আইনে প্রস্তাবিত বিচার-প্রক্রিয়া শিক্ষকসমাজ তথা শিক্ষাব্যবস্থায় কতটুকু ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। শিক্ষকেরা শুধু দক্ষ জনশক্তি গড়ার কারিগরই নন, তাঁরা সব পেশার মূল উৎসও বটে। মানসম্মত শিক্ষার পথপ্রদর্শকও শিক্ষকেরা। তাই শিক্ষক ও শিক্ষাসম্পর্কিত আইন এমন হওয়া উচিত, যাতে শিক্ষকদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে এবং শিক্ষার মানও বজায় থাকে। শিক্ষকেরা তাঁদের পেশাদারি জ্ঞান ও দক্ষতা দিয়ে জাতিকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে সারা জীবন নিরলসভাবে ত্যাগ স্বীকার করেন। এ ত্যাগের বিনিময়ে শিক্ষকেরা যেন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি পান, সেটাই হবে শিক্ষক দিবসের প্রধান চাওয়া। শিক্ষকদের মৌলিক প্রয়োজনীয়তাকে কোনো সময়ই যে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না, তার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায় একজন এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক যখন বর্তমান সময়েও মাত্র ৫০০ টাকা বাড়িভাড়া ভাতা পান, তা থেকে। তাই শুধু শিক্ষা আইন প্রণয়ন করেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; এমন শিক্ষা আইন প্রণীত হওয়া উচিত, যা দ্বারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে যাঁরা এ মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করবেন,
তাঁদেরও দক্ষ, বিচক্ষণ ও নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে। তবে মানসম্মত ও টেকসই শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক গড়ে তোলার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই ১৯৬৬ সালের ইউনেসকো-আইএলওর সুপারিশনামার ভিত্তিতে এমন একটি শিক্ষা আইন প্রণয়ন করা দরকার, যেটির গ্রহণযোগ্যতা সবার কাছে থাকবে। এত সব সত্ত্বেও আশার বিষয় হলো, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে এসেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে দুর্নীতি ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা, বিনা মূল্যে বই বিতরণ ও নকল প্রতিরোধের প্রচেষ্টা শিক্ষা খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এ প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়, শিক্ষা নিজেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়ক উপাদান হতে পারে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিক্ষকদের সামাজিক দায়িত্ব ও গুরুত্বকে শিক্ষানীতি ও দুর্নীতিবিরোধী নীতিমালার অগ্রভাগে রাখারও সুপারিশ করা হয়। (সূত্র: প্রথম আলো)। পরিশেষে বলতে হয়, দুর্নীতিমুক্ত, মানসম্মত ও টেকসই শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের সম্মিলন ঘটাতে হবে। কারণ, দক্ষ ও বিচক্ষণ শিক্ষক না হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মানোন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। তবে যে পেশায় সর্বদা বৈষম্য তাড়া করে বেড়ায়, সে পেশার প্রতি স্বাভাবিকভাবে মেধাবীরা বিমুখ থাকবে। তাই শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আগ্রহ জাগাতে হলে শিক্ষায় আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে।
পুলক চাকমা: সহকারী পরিচালক, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট।
pulakchakma21@gmail.com

রিপাবলিকানদের ভয়ংকর খেলা

আমেরিকায় বিরোধী দল সরকার অচল করে দিয়েছে। না, রাস্তায় নেমে জ্বালাও-পোড়াও করে নয়, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে মারামারি করেও নয়; তারা এটা করেছে পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ উপায়ে। ওবামা সরকার ২০১৪ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পেশ করেছে, বিরোধী রিপাবলিকান দল সেটা অনুমোদন করেনি। ফলে ১ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে যে অর্থবছর, সেদিন থেকে ওবামার জনপ্রশাসনের প্রায় আট লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ হয়ে গেছে; লে-অফ হয়ে গেছে তাঁদের চাকরি। চিকিৎসাসহ অনেকগুলো সামাজিক সেবাব্যবস্থায় সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এটাকে বলা হচ্ছে ‘গভর্নমেন্ট শাট ডাউন’। আসলে এটা সম্পূর্ণ অচলাবস্থা নয়, আংশিক। তাই কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে এটাকে ‘পার্শিয়াল শাট ডাউন’ও লেখা হচ্ছে। সহজ ভাষায় বলা চলে, মার্কিন জনপ্রশাসনে একটা বড় ধরনের অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এমন ঘটনা খুব ঘন ঘন ঘটে না; শেষবার এমনটি ঘটেছিল ১৭ বছর আগে, ১৯৯৬ অর্থবছরে, যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ওবামার মতোই একজন ডেমোক্র্যাট, বিল ক্লিনটন। তখনো প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পরিবেশ কর্মসূচির বিরোধিতা করে বিরোধী রিপাবলিকান দল বার্ষিক বাজেট আটকে দিয়েছিল। সেবার বাজেট নিয়ে অচলাবস্থা চলেছিল ২৮ দিন। এখনকার অচলাবস্থাও একই রকমের।
তবে অনেকে আশা করছেন, এবার হয়তো ২৮ দিনের আগেই একটা সমঝোতা হবে, অচলাবস্থা কেটে যাবে। আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন, এবারের সংকট বরং আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। কারণ, প্রেসিডেন্ট ওবামার সামনে আর কোনো নির্বাচন নেই, তিনি তাঁর অবস্থান থেকে নড়বেন না। মজার বিষয় হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ওবামার সামনে যদি আরও একবার নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকত, তাহলে সে নির্বাচনে তিনি নির্ঘাত বিজয়ী হতেন। কারণ, রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে বিরোধিতার কারণে সৃষ্ট এ অচলাবস্থায় তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়ার কথা। যদিও এ মুহূর্তে এ সম্পর্কে কোনো জনমত জরিপের খবর পাওয়া যায়নি, কিন্তু এটা খুব সহজেই বোঝা যায়। কারণ ‘পেশেন্ট প্রটেকশন অ্যাক্ট’ ও ‘অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট’ নামে দুটি আইনের মাধ্যমে তিনি আমেরিকান জনস্বাস্থ্যব্যবস্থাকে গরিববান্ধব করার উদ্যোগ নিয়েছেন, যেটাকে বলা হচ্ছে ‘ওবামাকেয়ার’, তা প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের প্রথম মেয়াদের স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার উদ্যোগের চেয়েও বেশি জনপ্রিয়। ১৯৯৬ সালে রিপাবলিকানদের বাজেট-বিরোধিতার কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থায় ক্লিনটনের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ওই বছর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়ে, অথচ ১৯৯২ সালে প্রথমবার তিনি পেয়েছিলেন ৪৩ শতাংশ ভোট।
কিন্তু এ মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট ওবামার জনপ্রিয়তা বাড়া-কমা অন্তত তাঁর জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। আমেরিকান জনগণের জন্যও এটা গৌণ বিষয়। ওবামার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ তাঁর মৌলিক আদর্শের একটা অংশ। এই আদর্শিক লড়াইয়ে তিনি হারতে রাজি নন। তিনি বঞ্চিত-লাঞ্ছিতের নেতা, গরিবের প্রেসিডেন্ট। আমেরিকার ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবা গরিবদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের অধিকাংশের স্বাস্থ্যবিমা করার সামর্থ্য নেই। ওবামা এ অবস্থা বদলে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু কাজটা যে সহজ নয়, বিরোধী রিপাবলিকান পার্টি তাঁকে তা হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিচ্ছে। আমেরিকান পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকান দলের হাতে, সেই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ওবামাকেয়ার আটকে গেলে ডেমোক্র্যাটরা প্রথমে ভেবেছিলেন, এ বাধা ক্ষণস্থায়ী। প্রেসিডেন্ট ওবামা তো আশা করছিলেন, শুক্রবারের মধ্যেই একটা সমঝোতা হয়ে যাবে। কিন্তু তা যখন হলো না, তখন বড়ই জটিল অবস্থার সৃষ্টি হলো। ইতিমধ্যে মার্কিন অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে; নিচের দিকে নামতে শুরু করেছে শেয়ারবাজারের সূচক। জনগণের করের টাকা সরকার কীভাবে খরচ করবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। গণতান্ত্রিক বা প্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থার এ মৌলিক বৈশিষ্ট্যের অনুশীলন আমেরিকায় বেশ ভালোভাবেই চলছে। বিরোধী দল সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন করছে না বলে সরকার টাকা খরচ করতে পারছে না—বাংলাদেশে এমন কথা আমরা ভাবতেও পারি না। কিন্তু আমেরিকায় এটাই স্বাভাবিক অনুশীলন।
অবশ্য এ অনুশীলন এবার কতটা গঠনমূলকভাবে ঘটছে, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ওবামাকেয়ার ঠেকিয়ে দেওয়ার জন্য রিপাবলিকান দলের নেতাদের বিরুদ্ধে আমেরিকার সংবাদমাধ্যমে প্রচুর সমালোচনা দেখতে পাচ্ছি। পয়লা অক্টোবর সরকারের অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আগেই নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাবেক নির্বাহী সম্পাদক বিল কেলার পত্রিকাটিতে লিখেছেন, ওবামাকেয়ার বানচাল করতে দক্ষিণপন্থীরা যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছে, তাতে মধ্যপন্থী, শান্তশিষ্ট লোকজন বিরক্তির বা হয়রানির (এক্সাসপারেশন) শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের এ বিরোধকে কেলার ‘ক্রুসেড’ হিসেবে বর্ণনা করে লিখেছেন, রিপাবলিকানদের এ তৎপরতাকে পণ্ডিতেরা বর্ণনা করছেন পাগলামিপূর্ণ, বুদ্ধিবিবেচনাহীন, ঔদ্ধত্যপূর্ণ, অসৎ, সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, উদ্ভট এবং রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী বলে। এ রকম সমালোচনা শুধু যে উদারপন্থী-মধ্যপন্থীরাই করছেন, তা নয়। বিল কেলার আরও লিখেছেন, দক্ষিণপন্থীদের পক্ষে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার জন্য ব্লগ লেখেন জেনিফার রুবিন নামে যে রাজনৈতিক ব্লগার, তিনি পর্যন্ত রিপাবলিকানদের ওবামাকেয়ার-বিরোধিতার সমালোচনা করে লিখেছেন, ‘তাঁদের কোনো ধারণাই নেই তাঁরা আসলে কী করছেন।’ সিএনবিসি টেলিভিশনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ওবামাও ‘এক্সাসপারেশন’ শব্দটি ব্যবহার করে বলেছেন, তিনি শান্ত থাকার চেষ্টা করছেন, কিন্তু তা পারছেন না। বিল কেলার আরও মন্তব্য করেছেন, রিপাবলিকানদের দক্ষিণপন্থা ষাটের দশকের মতো রূপ নিয়েছে। তিনি তাঁদের ওবামাকেয়ারের বিরোধিতাকে বলেছেন ‘রিপাবলিকানদের ভিয়েতনাম’। আর কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন-এর ওয়াশিংটন প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার নেইল ম্যাকডোনাল্ড লিখেছেন, রিপাবলিকানদের এ তৎপরতার পেছনে রয়েছে একটা ‘পারভার্স ম্যাথ’ বা বিকৃত হিসাব-নিকাশ।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ওবামা সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নাম প্রকাশ না করে লিখেছে, তিনি বলেছেন, ওবামাকেয়ার নিয়ে রিপাবলিকানরা যে বিরুদ্ধতার লড়াই শুরু করেছেন, তাতে তাঁরা শেষ পর্যন্ত সুবিধা করতে পারবেন না। ‘জয় আমাদেরই হবে। জনপ্রশাসনের এ অচলাবস্থা কাটতে কত সময় লাগবে, সেটা কোনো ব্যাপার না, শেষ পর্যন্ত আমরাই জিতব। আর শেষ ফলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’ এ কথায় খেপে গিয়ে কংগ্রেসের রিপাবলিকান স্পিকার বলেছেন, ‘এটা কোনো খেলা নয়’ যে এখানে জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন থাকবে। স্পিকারের এ মন্তব্য ধরে নিউইয়র্ক টাইমস-এ ৪ অক্টোবর খুব কড়া একটা নিবন্ধ লিখেছেন রাজনৈতিক ভাষ্যকার চার্লস ব্লো। তিনি স্পিকারের সমালোচনা করে লিখেছেন, স্পিকারের বক্তব্য ভুল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা একটা খেলাই বটে এবং রিপাবলিকানদের এ খেলায় মেতে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছেন স্পিকার নিজেই, যা থেকে বের হওয়ার এখন আর কোনো সহজ পথ নেই। নিশ্চিতভাবেই এটা একটা খেলা, রিপাবলিকানরা এ ভয়ংকর ও মর্মান্তিক খেলায় মেতেছেন জনগণের পার্লামেন্টে বসে।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

এমপিওভুক্তি নিয়ে কেন এত গড়িমসি? by শরীফুজ্জামান আগা খান

অবশেষে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (নিু মাধ্যমিক-মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) এমপিওকরণে অচলাবস্থা সম্ভবত কাটছে। এমপিওভুক্তির বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক রুটিন ওয়ার্ক হওয়ার কথা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দুষ্ট রাজনীতির প্রভাবে বিগত এক দশকে এক্ষেত্রে অহেতুক জটিলতা দেখা দিয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর মন্ত্রী-এমপিদের তালিকার ভিত্তিতে ২০১০ সালে কেবল একবারই ১ হাজার ৬২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে। এর পর ২০১১ সালে এমপিও দেয়ার নাম করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিদের কাছ থেকে তিনটি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নেয়। ওই নামের তালিকা এখনও ঝুলে আছে। আমাদের দেশে ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনানির্ভর। সরকারি, এমপিওভুক্ত, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নির্বিশেষে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একই সিলেবাস, কারিকুলাম, একাডেমিক ইয়ার এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করে। অথচ এ তিন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে সরকারি সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে পার্থক্য বিস্তর। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি সুবিধাভোগী, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনেকাংশে সুবিধাভোগী, অন্যদিকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একেবারেই সুবিধাবঞ্চিত। আবার এমপিওভুক্ত নয় বিধায় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিল্ডিং, কম্পিউটার, লাইব্রেরি কিংবা অনুদানের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। ব্যানবেইসের হিসাব অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ২৬ হাজার ৪৭টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত এবং এর বাইরে নানা মানমাত্রায় ১৩ ক্যাটাগরিতে ৮ হাজার ৫৫টি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে এমপিওভুক্তির যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৫ হাজার ৭৩৩টি।
নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে ২০০৫ সাল থেকে আন্দোলন করে আসছেন। সর্বশেষ এ বছর জানুয়ারিতে পক্ষকালব্যাপী আন্দোলনের সময় পুলিশের বিষাক্ত রাসায়নিকের পিপার স্প্রে, টিয়ার শেল, জলকামানের পানি, লাঠিচার্জ এরকম নির্যাতনে বহু শিক্ষক-কর্মচারী আহত হন। পিপার স্প্রের বিষক্রিয়ায় শিক্ষক সেকেন্দার আলী পরে মারা যান। পুলিশ শিক্ষকদের ঢাকা শহরে এমাথা ওমাথা তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। দীর্ঘ ওই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সংগঠনের নেতাদের বৈঠক হলে তিনি তিন মাসের ভেতর এমপিওভুক্তির আশ্বাস দেন। তার ওই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলনের কর্মসূচি স্থগিত করেন। পরে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষক প্রতিনিধিদের কয়েক দফা আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাতে তাদের হতাশ হতে হয়।
সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। অগত্যা শিক্ষক-কর্মচারীরা ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে আবার কর্মসূচি দিতে বাধ্য হন। ঘোষিত কর্মসূচির ভেতর রয়েছে- ১ অক্টোবর থেকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা। ৫ অক্টোবর শিক্ষক দিবসে জেলায় জেলায় সমাবেশ। ৭ অক্টোবর থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষক-কর্মচারীদের লাগাতার অবস্থান ধর্মঘট। শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন করে আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্যরাও জাতীয় সংসদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন। অবশ্য সংসদ সদস্যরা আগে থেকেই এমপিওভুক্তির বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য শিক্ষা এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে তাগিদ দিয়ে আসছেন। নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও চায়। সেই সঙ্গে স্বীকৃতির সময় থেকে চাকরির বয়সকাল গণনা এবং এমপিওর ক্ষেত্রে সব ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধের দাবি জানায়। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা বিনা বেতনে ১০-১২ বছর সময়কাল এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। কাজেই এক্ষেত্রে আর কালবিলম্ব করা সমীচীন নয়। অচিরেই এমপিওভুক্ত না হলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে যা একটি বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হবে।
বিনা বেতনে চাকরি করা শিক্ষক-কর্মচারীদের গড় বয়স ৪০ পেরিয়ে গেছে। ১০-১৫ বছরের ভেতর অনেকেই অবসরে যাবেন। চাকরির মেয়াদের সঙ্গে অবসরকালীন অর্থের সম্পর্ক রয়েছে। কাজেই বিগত চাকরির সময়কার বেতন না পাক, সার্ভিস বুকে ওই সময়ের হিসাবটা যেন থাকে। নইলে একবারে খালি হাতে অবসরে যেতে হবে। তেমনটি ঘটলে মধ্য বয়সের মতো অর্থ সংকটে বৃদ্ধ বয়সও কষ্টকর হয়ে উঠবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির সঙ্গে অনিয়ম এবং দুর্নীতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির নৈতিক দাবিদার। সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতির আলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হবে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। অন্যথায় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে কিছু সংখ্যক প্রতিষ্ঠান বাছাই করতে গেলে গতবারের মতো এবারও ইঁদুর দৌড় প্রতিযোগিতার উদ্ভব হবে। এমপিদের ডিও লেটারে দলীয় কোটারি চিন্তায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা বড় ধরনের সমস্যা। এরকম পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়গুলো ঘিরে দালালচক্রের সক্রিয় হতে দেখা যায়। ঘুষের অংকের রেট নিলামে ওঠে। ২০১০ সালে এমপিও ছাড়ার প্রাক্কালে এবং ২০১১ সালে এমপিও ছাড়ার সম্ভাবনার কথা শোনা গেলে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ৪-৫ লাখ টাকা পাত্রে/অপাত্রে ঘুষ দিয়ে এখন ধরা খেয়ে বসে আছে। কোনো প্রতিষ্ঠানে ঢোকার প্রাক্কালে একজন শিক্ষক বা কর্মচারীকে ১-২ লাখ টাকা ডোনেশন দিতে হয়েছে। এর পর ঘর, স্বীকৃতি এরকম খরচেও অংশ নিতে হয়েছে। আগের এমপিওভুক্তির জন্য জোগান দেয়া ঘুষের টাকাও হয়তো ভেস্তে গেছে। স্বীকৃতিপ্রাপ্তির আগে প্রাথমিক অনুমতিকাল মেয়াদে তিন বছর এবং পরে আরও ৮-১০ বছরকাল বিনা বেতনে অতিবাহিত করছেন। এভাবে অর্থ ও সময় হারিয়ে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীর নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বিদ্যমান ব্যবস্থা শিক্ষাব্যবস্থা কুলষিত করার অন্যতম ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে অর্থ সংকটকে বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে সরকার দেখিয়ে থাকে। এখন বাজেটে এ খাতে অর্থ বরাদ্দ না দিলে অর্থ সংকট তো হবেই। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রীতি হল- কোনো দেশের জিডিপির শতকরা ৬ ভাগ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ থাকবে। সেখানে আমাদের দেশে এ বরাদ্দ মাত্র ২.৬ ভাগ। দক্ষিণ এশিয়ার ভেতর যা সর্বনিু। বিগত কয়েক বছরে মোট বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ আনুপাতিক হিসেবে ক্রমাগত নিুমুখী। ব্যানবেইস সূত্রেপ্রাপ্ত বিভিন্ন স্তরের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর পাঠদানে খসড়া হিসাব অনুযায়ী ৮২ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োজিত আছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট স্বল্পতার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা শিক্ষক সংগঠনের পক্ষ থেকে বাজেট বরাদ্দ কম হলে কম বেতন নেয়ার প্রস্তাব করি। এমনও প্রস্তাব দিই, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আওতায় এনে ২ কি ৩ অর্থবছরে ধাপে ধাপে বেতন ১০০ ভাগে উন্নীত করা হোক। অনেক সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রীও এ প্রস্তাবে আমাদের সঙ্গে একমত। আরেকটি বিকল্প হতে পারে, একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করা। যেমন- ২০১০ সাল পর্যন্ত স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একযোগে এমপিওভুক্ত করা যেতে পারে। বর্তমানে কোনো স্তরেই এমপিওভুক্ত নয় এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেশি সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনার দাবি রাখে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী একটি প্রতিশ্র“তি ছিল- প্রতি পরিবারে অন্তত একজন সদস্যের চাকরির ব্যবস্থা করা। স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা নিজ যোগ্যতাবলে এক ধরনের কর্মসৃজন করে নিয়েছেন। এখন সরকারের কর্তব্য হবে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করে সত্যিকার চাকরি কার্যকর করা। রাজনৈতিক বিবেচনায় স্বল্প সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির একটা গুঞ্জন চলছে। এমনটি করা হলে আসন্ন সংসদ নির্বাচনে সরকারি দলের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে এমপিওপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের প্রতি কতটা কৃতজ্ঞ থাকবে এটা বলা মুশকিল। তবে বড় সংখ্যক এমপিওবঞ্চিতরা সরকারের প্রতি যে বিক্ষুব্ধ হবেন, সে কথা না বললেও চলে।
শরীফুজ্জামান আগা খান : তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট

বিদেশীদের উদ্যোগের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন by ইকতেদার আহমেদ

যে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাচন পদ্ধতি সে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোয় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট প্রাপ্তির মাধ্যমে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। সরকারের নির্ধারিত মেয়াদান্তে কী পদ্ধতিতে কোন সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তা অধিকাংশ রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই একটি মীমাংসিত বিষয়। এটি সংবিধান ও আইন দ্বারা নির্ধারিত। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ী দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল এবং ১৯৭৩ সালে সংবিধানের বিধিবিধানের আলোকে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান পূর্ববর্তী যে সংসদ কার্যকর ছিল, সে সংসদটির সদস্যরা পাকিস্তানের সামরিক বিধিমালা লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে নির্বাচিত হওয়ায় এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের গণপরিষদের সদস্য হিসেবে অভিহিত করায় সংবিধান প্রণয়ন-পরবর্তী ওই পরিষদ অবলুপ্ত করা হয়।
১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী ১৯৭৫ সালের প্রথম ভাগে ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা হতে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা হয়। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে ১৯৭২-এর সংবিধানে যে বিধান ছিল তা অক্ষুণœ রাখা হয়। উল্লেখ্য, ’৭২-এর সংবিধানে মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান ছিল। ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম সংসদের কোনোটিই মেয়াদ পূর্ণ করতে না পারায় মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়া পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা দেখা দেয়নি। ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং এ চারটি নির্বাচনের শেষোক্ত তিনটি রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার অধীন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী সংবিধানবহির্ভূত ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ৬ষ্ঠ সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচন-পরবর্তী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিল প্রণয়নপূর্বক এক মাসেরও কম ব্যাপ্তিকালে ওই সংসদ অবলুপ্ত হলে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। তবে ৯ম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানের বিধানাবলী অনুযায়ী গঠিত হয়নি।
৫ম জাতীয় সংসদ গঠিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ অবলুপ্ত হওয়া অবধি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আন্দোলন করতে থাকে। সে সময় এ তিনটি দলের জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকলেও সম্মিলিতভাবে তা সংবিধানে সংশোধনী আনয়নপূর্বক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। ওই তিনটি দলের আন্দোলন তীব্রতর হয়ে হরতাল, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতির মাধ্যমে জনজীবন বিপর্যস্ত এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ক্ষুণœ হতে থাকলে এ দেশে কর্মরত প্রভাবশালী রাষ্ট্রের বিদেশী কূটনীতিক এবং কমনওয়েলথের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাও সমঝোতার উদ্যোগ নেয়। কমনওয়েলথের উদ্যোগে সমঝোতা বৈঠকে একজন সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল উভয় দলের (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেও ফলপ্রসূ সমাধান দিতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীকালে দেখা গেল ৬ষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী দেশের ভবিষ্যৎ ও স্থিতিশীলতার কথা চিন্তা করে নিজ উদ্যোগে ওই সংসদে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব না থাকা সত্ত্বেও তাদের দাবি বাস্তবায়নপূর্বক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান সংবিধানে সন্নিবেশন করে মেয়াদ অবসান বা মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রণয়ন করেন।
৫ম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা বহাল ছিল। কিন্তু সংবিধানের বিধিবিধানের আলোকে তখন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হলে জাতীয় পার্টির প্রধান এইচএম এরশাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল থাকায় আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ও বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া সমঝোতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি সরকারব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করেন। এর আগে এরশাদের পদত্যাগ-পরবর্তী কী পদ্ধতিতে সরকার গঠিত হবে, সেটি বড় দুটি দলের নেত্রীদ্বয়ের সমঝোতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়েছিল। আমাদের জাতীয় জীবনে বড় দুটি দলের নেত্রীদ্বয়ের জাতির সন্ধিক্ষণে সমঝোতায় উপনীত হওয়া জাতির জন্য কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক।
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৭ম, ৮ম ও ৯ম সংসদ নির্বাচন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ৫ম সংসদ নির্বাচন তুলনামূলক বিচারে নিরপেক্ষ হলেও দুঃখজনকভাবে বিজিত দলের কাছে সে নিরপেক্ষতা গ্রহণযোগ্য হয়নি। উপরোক্ত ৪টি সংসদ নির্বাচনে বড় দুটি রাজনৈতিক দল দু’বার বিজয়ী ও দু’বার বিজিত হয়।
জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলনে একতরফাভাবে প্রবর্তিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা জনআকাক্সক্ষার বিপরীতে একতরফাভাবে বাতিল হয়। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যে এখনও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে এবং এ নিয়ে গণভোটের আয়োজন করা হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অবস্থান যে এর পক্ষে হবে- এ বিষয়ে দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোনো সংশয় নেই। দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন সাধারণ নির্বাচন অবলোকনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসীর মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত শুধু আমাদের দেশের ক্ষেত্রে নয়, অনেক সময় উন্নত দেশের ক্ষেত্রেও সম্ভব হয় না। উদাহরণস্বরূপ, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলীয় প্রার্থী আল গোরের কাছে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী জর্জ ডব্লিউ বুশ পপুলার ভোটে পরাজিত হলেও দেখা গেল বুশের ভাই ফ্লোরিডার গভর্নর হওয়ার সুবাদে সেই অঙ্গরাজ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে প্রদত্ত ভোট অবৈধভাবে হেরফের করে ইলেকটোরাল কলেজের ২৫টি ভোট রিপাবলিকানদের অনুকূলে নিয়ে আসতে সমর্থ হন। এ কারসাজির ফলে ইলেকটোরাল কলেজের ৫ ভোটের স্বল্প ব্যবধানে আল গোর পরাজিত হন। তার ইলেকটোরাল কলেজের ভোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬৬ এবং বুশের ২৭১। ফ্লোরিডার ইলেকটোরাল কলেজের ২৫টি ভোট আল গোরের অনুকূলে গেলে তার ভোটের সংখ্যা হতো ২৯১। অপরদিকে বুশের ইলেকটোরাল কলেজের ভোটের সংখ্যা হতো ২৪৬। সে সময় ফেডারেল বিচারকদের বেশিরভাগ রিপাবলিকানদের আনুকূল্যে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হয়েও আল গোর সুবিচার পেতে ব্যর্থ হন।
আমাদের সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী, মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ বহাল রেখে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। সংবিধানে এ ব্যবস্থাটি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে একতরফাভাবে প্রবর্তিত হয় এবং ওই সংশোধনীর মাধ্যমে একতরফাভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অবসান ঘটানো হয়। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করে আসছে। এমনকি তারা স্পিকার ও রাষ্ট্রপতি দলীয় ব্যক্তি বিধায় উভয়ের যে কারও নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণে অপারগ। নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একটি সমঝোতায় উপনীত না হলে সংঘাত ও বিপর্যয়ের আভাস পাওয়া যায়। সংঘাত ও বিপর্যয় হলে জনশৃংখলা ও দেশের স্থিতিশীলতা ব্যাহত হবে- এ উপলব্ধি থেকে দেশের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যক্তিবর্গ এবং সুশীল সমাজ অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। এ ধরনের উদ্বিগ্নতা ঢাকায় কর্মরত উন্নয়নশীল দেশের কূটনীতিক ও জাতিসংঘ মহাসচিবের মধ্যেও দেখা গেছে।
এ উদ্বিগ্নতার অংশ হিসেবে সম্প্রতি জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ফোনালাপ করে উভয়কে দেশের ভবিষ্যৎ ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে সমঝোতায় উপনীত হওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। অনুরোধ-পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সংসদে যোগ দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিএনপি প্রস্তাব দিলে স্বাগত জানাব।’ অপরদিকে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘সংলাপ কিংবা আলোচনায় রাজি, তবে আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচন নয়।’ প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার প্রতিক্রিয়া থেকে অনুধাবন করা যায়, আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসে সমঝোতায় উপনীত হওয়ার পথ এখনও অনেক দূরে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের ফোনালাপের আগে জাতিসংঘের একজন দূত এসে দুটি বৃহৎ দলের মধ্যে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারব্যবস্থা নিয়ে সমঝোতার উদ্যোগ নিলেও তা ব্যর্থ হয়। জাতিসংঘ থেকে অপর একটি প্রতিনিধি দল উভয় দলের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ নিয়ে আগামীতে আবার ঢাকায় আসবেন, জাতিসংঘের সদর দফতর থেকে এমনটিই ব্যক্ত করা হয়েছে। ইত্যাবসরে উভয় দলের সমঝোতা বিষয়ে প্রভাবশালী দেশ বিশেষত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের উদ্যোগ লক্ষণীয়। তাছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উভয় নেত্রীর বরাবরে প্রদত্ত চিঠি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের দূতিয়ালীর সাফল্য বিষয়ে আগের অভিজ্ঞতার আলোকে দেশবাসী সন্দিহান। আর জাতিসংঘ সদর দফতরে সাধারণ অধিবেশনের সময় উভয় নেত্রীর আলোচনায় বসার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তাও সফলতা পায়নি। আমাদের নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে বিদেশীদের যে কোনো ধরনের মধ্যস্থতা আমাদের আত্মমর্যাদার জন্য হানিকর। এ ধরনের মধ্যস্থতা এর আগে কখনও সফলতা পায়নি। বর্তমানেও যে সফলতা পাবে, সে নিশ্চয়তা নেই। তাই নিজ ও দলের স্বার্থ পরিহার করে ১৯৯৬ সালে যেমন বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া একতরফাভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করে সংঘাতের পথ পরিহার করে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা বিষয়ে মীমাংসায় উপনীত হয়েছিলেন, ঠিক তেমনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরও উচিত হবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একতরফাভাবে নির্বাচনকালীন এমন একটি অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা তুলে ধরা, যা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এবং দলের ওপর বিএনপিপ্রধানের মতো আওয়ামী লীগপ্রধানের একক নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত থাকায় বর্তমান বাস্তবতায় সংবিধান সংশোধন করে হলেও গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা দিয়ে তিনি সংকট নিরসন করতে পারেন। আর আমাদের সংকটে বিদেশীরা যে উদ্বিগ্ন তাতে আমরা আশান্বিত। তবে অতীতে যেমন তাদের উদ্যোগ বিফল হয়েছে, বর্তমানেও তা বিফল হবে- এমন আশংকায় আমাদের সে আশা হয় তিরোহিত। এ বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী স্ব-উপলব্ধি থেকে জাতীয় স্বার্থে গ্রহণযোগ্য সমঝোতার পথ প্রশস্ত করলে তা হবে তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচায়ক ।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ ও কলামিস্ট

নগরবাসী শোন তবে- অচিরেই তোমরা বধির হবে by মোকাম্মেল হোসেন

নিজেকে হাঁসের বাচ্চা মনে হচ্ছে। হাঁসের বাচ্চা যেভাবে খাবারের উদ্দেশে দৌড় দেয়, আমিও টেম্পোতে ওঠার জন্য সেভাবে দৌড় দিচ্ছি। তবে এতে বিশেষ কোনো লাভ হচ্ছে না। একটা টেম্পোতে সর্বোচ্চ ১৪ জনের বসার ব্যবস্থা আছে। বিপরীত দিক থেকে কোনো খালি টেম্পো এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অন্তত ৩৪ জন সেটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সময় যত গড়াচ্ছে, ঘরমুখো মানুষের ভিড় তত বাড়ছে। সবার মধ্যেই একটা যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। তারা সবাই একবার যুদ্ধ করতে করতে অফিসে এসেছে। এখন আবার যুদ্ধ করতে করতে বাড়ি ফেরার জন্য রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে।
দৌড়াদৌড়ির এক পর্যায়ে দম নেয়ার জন্য ফুটপাতের একটা দোকানের সামনে গিয়ে বসলাম। বসে বসে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছি, হঠাৎ দেখি মাথায় হেলমেট নিয়ে এক লোক টেম্পো যুদ্ধে শামিল হয়েছে। লোকটার জন্য খুব মায়া হল। আহা রে, বেচারা! মোটরবাইকটা খারাপ না হলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই সে বাসায় পৌঁছে যেত! একেই বলে ভাগ্য। অনেকেই যুদ্ধে জড়াতে চায় না। তারপরও ভাগ্য তাদের যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।
একটা টেম্পোতে ওঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর মি. হেলমেট ঘুরে দাঁড়াতেই আমি তাকে চিনতে পারলাম। এ হচ্ছে শ্রীপুরের জয়নাল। আনন্দমোহন কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় জয়নাল আমার সহপাঠী ছিল। সেসময় গাছগাছড়া দিয়ে তৈরি শ্রীপুরের ন্যাংটা বড়ির খুব নামডাক। কলেজে জয়নালের নাম হয়ে গেল ন্যাংটা জয়নাল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীতের কুয়াশা অস্তিত্ব হারালেও গাছের শাখায়, পাতায় পাতায় তার স্মৃতিটুকু থেকে যায়। জীবনের ট্রেনে যাত্রী হওয়ার পর যাদের বন্ধু বলে চিনেছি, সুহৃদ বলে জেনেছি- একেকজন একেক স্টেশনে নেমে গেলেও হৃদয়ে তাদের স্মৃতি অমলিন। জয়নালকে দেখে আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। দৌড়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াতেই সে ভাবলেশহীন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের আয়নায় স্মৃতির বরফ ভাঙার দৃশ্য দেখতে দেখতে বললাম-
: চিনতে পারছ?
জয়নাল আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। বলল-
: পারছি, পারছি! চিনতে না পারার কোনো কারণ নাই!
জয়নালকে নিয়ে আবার ফুটপাতের সেই দোকানের সামনে গিয়ে বসলাম। চা-পানের ফাঁকে দুজন দুজনের বর্তমান অবস্থান ও ঠিকানা অদল-বদল করলাম। ওঠা দরকার। তারপরও উঠতে ইচ্ছা করছে না। মেঘের পাঁজর থেকে নেমে আসা শীতল বাতাস মরুযাত্রীর শরীরে যেরকম ভালো লাগার পরশ বুলিয়ে দেয়, সেরকম একটা অনুভূতি হচ্ছে। কথাবার্তার এক ফাঁকে জয়নালকে বললাম-
: মোটরসাইকেল যে গ্যারেজে দিছ, হেলমেটটাও সেইখানে রাইখ্যা আসলেই পারতা! খামাখা মাথায় লইয়া ঘুরতেছ কী জন্য?
জয়নাল আমার কথা শুনে হো-হো করে হেসে উঠে বলল-
: মোটরসাইকেল থাকলে তো গ্যারেজে রাখব!
-তাইলে হেলমেট মাথায় দিছো কী জন্য!
: তার আগে তুমি বল- রাস্তায় যে ট্রাফিক পুলিশ থাকে, তারা কি মোটরসাইকেল চালানোর জন্য মাথায় হেলমেট দেয়?
-না!
: কিসের জন্য দেয়?
-শব্দ দূষণের হাত থেইক্যা রক্ষা পাওয়ার জন্য।
: আমিও সেই একই কারণে মাথায় হেলমেট পইরা চলাফেরা করি।
একজন মানুষ মাথায় হেলমেট পরছে অথচ মোটরসাইকেলে না চড়ে বাসে-টেম্পোতে চড়ছে, ফুটপাতে হাঁটছে- বিষয়টি আমার কাছে শুধু অভিনবই নয়, আশ্চর্যজনকও বটে! জয়নালকে বললাম-
: এই যে তুমি হেলমেট মাথায় দিয়ে চলাফেরা কর- লোকজন হাসাহাসি করে না!
-লোকের কথায় কী আসে যায়! সমস্যাটা আমার, তাই এর সমাধানটাও আমি আমার মতো কইরাই বাইছ্যা লইছি।
: শব্দ দূষণের হাত থেইক্যা বাঁচার জন্য তোমার মতো অন্যরাও যদি এভাবে সমাধানের পথ বাইছ্যা লয়, তাইলে ঢাকা শহর তো হেলমেটধারীদের শহরে পরিণত হবে!
-হইলে অবাক হওয়ার কিছু নাই। এই শহর হইল জংলিদের শহর। জংলিরা ফুটপাতের ওপর ওয়েল্ডিংয়ের দোকান খুইল্যা বসছে, যেখানে গাড়ির হর্ন বাজানোর কোনো প্রয়োজন নাই, সেখানে কমপক্ষে দশবার উচ্চশব্দের হর্ণ বাজাইতেছে...
হর্ন বাজানোর কথা শুনে একটা ঘটনা মনে পড়ল। আম্মাকে নিয়ে ডায়াবেটিস হাসপাতালে যাচ্ছি। শাহবাগ মোড়ে ফুটপাতের ওপর দিয়ে এক জোড়া মোটরসাইকেল বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে যাওয়ার সময় এক ভদ্রলোক আরোহীদের উদ্দেশে একটা গালি উচ্চারণ করলেন। আরোহীরা সংখ্যায় ছিল ছয়জন। বয়সে সবাই তরুণ। গালি শুনে তারা মোটরসাইকেল থেকে নেমে এসে ভদ্রলোককে ঘিরে ফেলল। অবস্থা দেখে ভদ্রলোক ভয়ে কাঠ হয়ে গেলেন। বিপদ বুঝতে পেরে আমি ভদ্রলোকের হাত ধরলাম। তারপর যুবকদের উদ্দেশে বললাম-
: আপনেরা হেলমেট পইরা মোটরসাইকেল চালান, তাই বুঝতে পারেন না এর হর্ন কতটা মারাত্মক। উনি হার্টের রোগী। আপনাদের বাজানো হর্ন শুইন্যা উনি এইখানে মারাও যাইতে পারতেন। তখন এর দায়-দায়িত্ব কে নিত? ফুটপাতের ওপর মোটরসাইকেল চালানোর ব্যাপারে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আছে। আর এইরকম হাইড্রোলিক হর্ন বাজানোও নিষিদ্ধ। আপনেরা একসঙ্গে দুইটা আইন ভঙ্গ করার পরও কিছু হইতেছে না- কারণ দেশটা বাংলাদেশ। এই মোটরসাইকেল যে দেশে তৈরি হইছে, আমদানিকারকের মাধ্যমে একবার খোঁজ লইয়া দেখেন তো- সেখানে এই ধরনের হর্ন কেউ ভুলেও বাজায় কিনা!
আমার কথা শুনে যুবকরা কিছুক্ষণ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে চলে যাওয়ার পর ভদ্রলোক আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন-
: ভাই, বাঁচাইলেন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি বললাম-
: বাঁচানোর মালিক আল্লাহ। আপনে শুধু একটা কথা মনে রাখবেন। বলা হয়- নারী জাতির হৃদয় হইল সমুদ্রের মতো গভীর। এই দেশে বাস করতে হইলে আপনের-আমার মতো মানুষের হৃদয়ও নারী জাতির হৃদয়ের মতো গভীর সমুদ্রে রূপান্তরিত করণ লাগব, যাতে সেই গভীরতা ভেদ কইরা কোনো কথা প্রকাশ না পায়...
আমাকে চুপ থাকতে দেখে জয়নাল বলল-
: তুমি আমার এই বেশভূষা দেইখ্যা খুব আবাক হইছ, তাই না?
- হুঁ, তা হইছি।
: শোন, আমি দেশের একজন সেরা নাক-কান ও গলা বিশেষজ্ঞের পেশেন্ট ছিলাম। তিনি দীর্ঘদিন আমার কান লইয়া ঘষামাজা করলেন--নানা প্রকার ওষুধ খাইতে দিলেন। শেষে বললেন- অতিরিক্ত শব্দ হয় এমন জায়গায় না যাওয়ার জন্য। সেরকম পরিবেশ কি এই শহরে আছে? রাস্তাঘাটে হাজার ধরনের শব্দ। বাড়িতে যাওয়ার পরও শব্দের হাত থেইক্যা নিস্তার নাই। লোডশেডিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাই পাওয়ারের জেনারেটর ডাইনে গর্জন দিয়া উঠে, বামে গর্জন দিয়া উঠে...
জয়নালের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরদিন রাস্তায় বের হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আমার কানব্যথা শুরু হয়ে গেল। তবে প্রতিবিধান হিসেবে জয়নালের মতো আমি মাথায় হেলমেট পরলাম না- দুই কানে তুলা গুজে রাস্তায় চলাচল করতে লাগলাম। একদিন বাইরে থেকে বাসায় ফেরার পর কান থেকে তুলা বের করতে দেখে লবণ বেগম অবাক হয়ে বলল-
: তুমি কানে তুলা দিছ কী জন্য!
- শব্দ দূষণ থেইক্যা বাঁচার জন্য।
: কি! আমি শব্দ দূষণ করি?
- আরে! কী যন্ত্রণা! তুমি শব্দ দূষণ করবা কিভাবে? তুমি বাস-ট্রাক, না পলিটিশিয়ান?
জয়নালের উদাহরণ দিয়ে সবকিছু বুঝিয়ে বলার পরও লবণ বেগমের সংশয় কাটছে না দেখে তাকে কম্পিউটারের সামনে টেনে নিয়ে বললাম-
: তোমারে একটা ওয়েবসাইট বাইর কইরা দিতেছি। পইড়া দেখ- শব্দ দূষণ সম্পর্কে সেখানে কী লেখছে!
ওয়েবসাইটে ঢাকা শহরের শব্দ দূষণ সম্পর্কে যেসব তথ্য পাওয়া গেল তা এক কথায় ভয়াবহ। সেখানে বলা হয়েছে, ৬০ ডেসিবল মাত্রার শব্দ একজন মানুষকে সাময়িকভাবে বধির করে দিতে পারে। আর শব্দের মাত্রা যদি ১০০ ডেসিবল হয় তবে তার প্রভাবে মানুষ সম্পূর্ণরূপে বধির হয়ে যাবে। ঢাকা শহরে চলাচলকারী ট্রাক ও বাস থেকে সৃষ্টি হওয়া শব্দের মাত্রা ৯২ থেকে ৯৪ ডেসিবল। মোটরবাইক থেকে সৃষ্ট শব্দের মাত্রা ৮৭ থেকে ৯২ ডেসিবল। এর বাইরে অন্যান্য যানবাহন থেকে সৃষ্ট শব্দের মাত্রা ৯৫ ডেসিবল। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে- দেশের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ শ্রবণজনিত সমস্যায় ভুগছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৩০ লাখের অবস্থা মারাত্মক।
ওয়েবে লসএঞ্জেলেসের শব্দবিজ্ঞানী ডা. ভার্ন ও নুভসেনের অভিমত দেখতে পেলাম। তারা বলেছেন-
: ফিসফিস করে কথা বলার মধ্যে যে মাধুর্য ছিল তা আমরা হারাতে বসেছি।
জীবনের যাত্রা শুরু হয় শব্দের মধ্য দিয়ে। মানুষ শব্দের মাধ্যমেই রাগ-অনুরাগ, আদর-আবদার, উপদেশ-নির্দেশ ইত্যাদির প্রকাশ ঘটায়। টিনের চালে বৃষ্টির আওয়াজ, সমুদ্রের গর্জন আর পাখির কিচির-মিচির শব্দ ছাড়াও যে নারী কোনো পুরুষের মুখ থেকে অথবা যে পুরুষ কোনো নারীর মুখ থেকে চির পুরাতন অথচ চির নতুন- ভালোবাসি এ কথাটা শুনতে পায় না, তার মতো হতভাগ্য বা হতভাগিনী এই পৃথিবীতে আর কে আছে!
শব্দহীনতা কখনোই কাম্য নয়। শব্দহীন জীবন মানে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাওয়া। অথচ এ শব্দই আজ দানবের রূপ ধরে আমাদের গ্রাস করতে চাচ্ছে। আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাব, আর অন্য একজন গাড়িতে হাইড্রোলিক হর্ন বাজিয়ে আমার শ্রবণশক্তি নষ্ট করে দেবে অথচ এ জন্য তার কোনো শাস্তি হবে না- এটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না।
জয়নালকে একদিন ফোন করলাম-
: দোস্ত, আইজ বনানী যাব। সুযোগ পাইলে তোমার অফিসে একবার ঢুঁ মারতে পারি।
- আমি তো বাড়িতে।
: বাড়িতে তুমি কী কর?
- চাষাবাদ করি।
: চাকরি?
- চাকরি ছাইড়া দিছি।
এর কিছু দিন পর সকালে জামালপুর কমিউটার ট্রেনে চড়ে ঢাকায় আসছিলাম। শ্রীপুর স্টেশনে এসে ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেল। কী করি- কী করি, শেষে জয়নালকে ফোন করলাম-
: জয়নাল, তোমাদের শ্রীপুরে আইসা তো ট্রেনের ইঞ্জিন বইট মারল।
- তুমি এখন কোন জায়গায়?
: স্টেশনে।
- একটু অপেক্ষা কর। আমি আসতেছি...
ভেবেছিলাম জয়নালের সঙ্গে দেখা করে ওখান থেকে বাসে ঢাকায় ফিরব। জয়নাল সে কথা দ্বিতীয়বার উচ্চারণ না করার হুমকি দিয়ে বলল-
: যাওয়ার নাম মুখে আনবা না!
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর বিশ্রাম নিতে নিতে জয়নালকে জিজ্ঞেস করলাম-
: হঠাৎ চাকরি ছাড়লা কী জন্য?
- সে এক বিরাট ইতিহাস।
: কী রকম!
- বিরোধী দলের হরতাল চলাকালে একদিন অফিসে যাইতেছি, পুলিশ আটকাইল। বলল-
: আপনি হেলমেট পরছেন কেন?
হেলমেট পরার কারণ বললাম। কেউ আমার কথা বিশ্বাস করল না। একজন চিৎকার করে বলল-
: মাথায় হেলমেট দিয়া পুলিশের গাড়িতে যারা আগুন দেয় ও পুলিশের ওপর আক্রমণ করে- তুই তাদের দলের সদস্য। তোর নিস্তার নাই।
থানা হাজতে থাকা অবস্থায়ই এলাকার এমপি সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তিনি আমার সম্পর্কে জানতেন। তাই বিষয়টি বেশিদূর গড়ায়নি। আমি আর হেলমেট পরব না- এই মুচলেকা দেওয়ার পর ছাড়া পাইলাম। এরপর আমি ভাইব্যা দেখলাম- চাকরির জন্য জীবন না, জীবনের জন্যই চাকরি। যে চাকরি আমার জীবনকে অনিরাপদ করে তোলে- সে চাকরি কেন আমি করব? তাই থানা থেইক্যা বাইর হইয়া সোজা উত্তরের পথ ধরছি।
দেখলাম- জয়নাল কৃষিকাজ আর হাঁস-মুরগি ও মাছের খামার নিয়ে ভালোই আছে। ফেরার সময় জয়নাল আমার হাতে একটা কাগজ দিয়ে বলল-
: শব্দ দূষণ সম্পর্কে একটা গান লিখছি আমি। আজকাইল তো বিভিন্ন রোগব্যাধি ও সমস্যা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার জন্য রেডিও-টেলিভিশনে গানবাজনা প্রচার করা হয়। এই গানটা প্রচার করা যায় কিনা- দেইখ্য তো...
আমি কাগজটার ওপর চোখ রাখলাম। মোট ১২ লাইনের একটি গান। এর মধ্যে দুটি লাইন হচ্ছে এরকম-
নগরবাসী শোন তবে- অচিরেই তোমরা বধির হবে।
বধির হবে, বধির হবে, বধির হবে॥
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

আগামী নির্বাচন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি by বদরুদ্দীন উমর

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচন নিজের সরকারের অধীনে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে যেভাবে অনড় অবস্থানে আছেন তাতে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, তিনি আসলে নির্বাচনই চান না। তার দিক থেকে নির্বাচন না চাওয়ার কারণ খুব স্পষ্ট। নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের পক্ষে জয়ের কোনো সম্ভাবনা তো নেই-ই, উপরন্তু ভরাডুবি ছাড়া অন্য কোনো কিছুই হওয়ার নয়। একথা বিস্ময়কর মনে হতে পারে, তবু বলা দরকার যে, আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনার নিজের পক্ষেও পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। বিগত নির্বাচনে তিনি বাগেরহাট ও তাদের এলাকা গোপালগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। রামপালে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করে সুন্দরবন ধ্বংসের যে কর্মসূচি তারা নিয়েছেন, তাতে বাগেরহাটে এবার নির্বাচন করলে তার জামানতও বাজেয়াপ্ত হতে পারে।
গোপালগঞ্জের লোকদের জন্য তিনি অনেক করেছেন। প্রশাসন, পুলিশ থেকে নিয়ে সর্বত্র তিনি গোপালগঞ্জের লোক এমনভাবে বসিয়েছেন, যার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক ক্ষোভ আছে। কিন্তু তা হলেও গোপালগঞ্জে নির্বাচন প্রার্থী হয়ে তার বিশেষ সুবিধা হবে না। কারণ ওপরতলায় এভাবে লোক ঢুকিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করলেও গোপালগঞ্জের সাধারণ মানুষের জন্য তিনি কিছুই করেননি। এজন্য সেখানকার জনগণের মধ্যে তার বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে তার প্রতিফলন নির্বাচনে ঘটার কথা। নির্বাচনে দাঁড়ালেই যে শেখ হাসিনা কোনো ম্যাজিক দেখিয়ে নিশ্চিতভাবে নিজে নির্বাচিত হবেন এমন কোনো ব্যাপার নেই। ১৯৯১ সালে ঢাকা শহরে দুটি আসনে দাঁড়িয়ে দুটিতেই তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। তাছাড়া অন্য একটি বিষয়ও বিগত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দেখা গেছে। ব্যক্তিগতভাবে কোনো কোনো আওয়ামী লীগ প্রার্থী তুলনায় ভালো হলেও শেখ হাসিনা এবং তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ক্ষোভের কারণেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছিলেন। কাজেই ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনা নির্বাচনে কোনো ম্যাজিক দেখিয়ে জয়লাভ করবেন, এ চিন্তা সম্পূর্ণ অবাস্তব।
যাই হোক, এক্ষেত্রে মূল বিষয়টি হল নির্বাচনে জয়ের পরিবর্তে ভরাডুবির ষোলো আনা সম্ভাবনা দেখে শেখ হাসিনা নির্বাচন হতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে গায়ের জোর দেখিয়ে বলেই চলেছেন যে, তার সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। অন্য কোনোভাবে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, মধ্যবর্তী সরকার ইত্যাদি নিরপেক্ষ কোনো সরকারের অধীনেই নির্বাচন দেয়া যাবে না। এজন্য তারা সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছেন। তাদের ধারণা, সংবিধানের সংশোধনী পাস করলেই যা ইচ্ছা তাই করা যায়।
বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তা যে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হওয়া সম্ভব নয়, এ বিষয়ে সাধারণভাবে জনগণের মধ্যে একটা ঐকমত্য আছে। বিরোধী দলগুলো তো বটেই, এমনকি আওয়ামী লীগ জোট সরকারের শরিকদের মধ্যে প্রায় সবারই মত হল, বর্তমান সরকারের পরিবর্তে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই নির্বাচন করা দরকার। বাস্তবত দেখা যাচ্ছে যে, আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যসব উল্লেখযোগ্য দল ও জনগণের বিপুল অংশ এটাই চান। কিন্তু শেখ হাসিনা এই পরিস্থিতিতে যেভাবে নিজের দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়ে বসে আছেন, তার সঙ্গে বাস্তবতার যে কোনো সম্পর্ক নেই এটা তারাও জানেন। সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে গেলে দেশজুড়ে তার বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ হবে, বিরোধী দলগুলো যেভাবে নির্বাচন বয়কট করবে, তাতে সমগ্র নির্বাচন ব্যবস্থাই ভণ্ডুল হবে। কাজেই সে রকম কোনো নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতির এমন ক্ষমতা নেই যাতে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে তার ওপর নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দিতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে দেশে এক রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। তখন এই শূন্যতা পূরণের একমাত্র উপায় দাঁড়াবে ২০০৭-০৮ সালে ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীন সরকারের মতো একটি সরকার কর্তৃক ক্ষমতাসীন হওয়া। এই সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক সম্ভাবনার দিকেই শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধের ধারক-বাহক’ এবং ‘স্বাধীনতার পতাকাবাহী’ হিসেবে নিজের পবিত্র কর্তব্য সমাধা করার চেষ্টায় আছেন। ভুলে যাওয়ার কোনো উপায় নেই যে, পরবর্তী সময়ে ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীন সরকারের অনেক সমালোচনা করলেও সেই সরকারের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পক্ষে সাফাই গেয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, তারা হল তাদের আন্দোলনের ফসল এবং ক্ষমতায় গেলেই সেই সরকারের প্রত্যেকটি কাজকে তারা সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের ব্যবস্থা করবেন!
কাজেই গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী হিসেবে বেনামি কোনো সামরিক সরকারের প্রতি শেখ হাসিনার কোনো বিতৃষ্ণা আছে এটা মনে করার কারণ নেই। কাজেই নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার মতো করে একটি নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তে একটি বেনামি সামরিক সরকারের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পথ পরিষ্কার করতে শেখ হাসিনার কোনো দ্বিধা নেই। কাজেই নির্বাচনের পরিবর্তে এ ধরনের একটি সরকার শেখ হাসিনার সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হলে তাতে কারও বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
এখানে অবশ্য বলা দরকার যে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কূটকৌশলের কারণে ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীনের মতো একটি সরকার শূন্যতা পূরণের জন্য ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেও তার স্থায়িত্ব বেশি হওয়ার কথা নয়। যে নির্বাচন হতে না দেয়ার জন্য শেখ হাসিনা তাদের ক্ষমতাসীন হওয়ার ব্যবস্থা করবেন, সে নির্বাচন তাদের অল্পদিনের মধ্যেই দিতে হবে। আগেকার বেনামি সামরিক সরকার নির্বাচন দিতে দু’বছর সময় নিয়েছিল। কিন্তু এবার নির্বাচন দিতে হবে অল্পদিনের মধ্যেই, কারণ ২০০৭ সাল ও ২০১৪ সালের পরিস্থিতি এক নয়। কাজেই আগামী জানুয়ারি মাসে যদি একটি বেনামি সামরিক সরকার ক্ষমতাসীন হয়, তাহলে তাকে তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবেই কাজ করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশে আগামী দিনগুলোতে কী ঘটতে যাচ্ছে এ বিষয়ে গণক-ঠাকুরের মতো কিছু বলার উপায় নেই। কিন্তু পরিস্থিতি যেভাবে অগ্রসর হচ্ছে এবং শেখ হাসিনা সমগ্র রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশৃংখলা সৃষ্টির যে কৌশল অবলম্বন করেছেন, তার থেকে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের জন্য যে ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত তার কথাই এখানে বলা হয়েছে। তবে এটা মনে রাখা দরকার যে, বাংলাদেশ হল দেশী ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের এক উর্বর ক্ষেত্র। কাজেই নানা ষড়যন্ত্রের অলিগলি বেয়ে শেষ পর্যন্ত বর্তমান পরিস্থিতির আশু পরিণতি কী দাঁড়াবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা কারও পক্ষে সম্ভব নয়।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

শান্তিতে নোবেল পেতে পারে মালালা

পাকিস্তানের নারী শিক্ষা আন্দোলনকর্মী মালালা ইউসুফজাই এ বছর শান্তিতে নোবেল পেতে পারে বলে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। মালালার সঙ্গে নোবেল জয়ে এ বছরের দৌড়ে কঙ্গোর চিকিৎসক ডেনিস মুখওয়েগে এবং রাশিয়া ও বেলারুসের দু’জন মানবাধিকার সংগঠকও আছেন আলোচনায়। প্রথা অনুযায়ী সোমবার চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মাধ্যমে শুরু হবে ৬টি শাখায় পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা। স্টকহোমে সোমবার গ্রিনিচমান সময় সাড়ে ৯টায় চিকিৎসায় নোবেল জয়ী বা নোবেল জয়ীদের নাম ঘোষণা করবেন জুরি বোর্ড। তবে প্রতি বছরের মতো এবারও শান্তি ও সাহিত্যে নোবেল কে পাচ্ছেন তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে। এবার শান্তিতে নোবেলের জন্য রেকর্ড সংখ্যক ২৫৯ জন মনোনয়ন পেয়েছেন।
১১ অক্টোবর সব জল্পনা-কল্পনার অবসান হবে নরওয়ের নোবেল কমিটির ঘোষণায়। শান্তি পুরস্কারবিষয়ক নোবেল কমিটির তালিকা থেকে নিজে একটি ছোট তালিকা প্রস্তুত করেন অসলোর পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের প্রধান ক্রিস্টিয়ান বের্গ হার্পভিকেন। ২০০৯ সাল থেকে তিনি এমনটি করে আসছেন। তার এবারের ছোট তালিকার শীর্ষ রয়েছে মালালা ইউসুফজাই। হার্পভিকেন বলেছেন, সে (মালালা) শুধু মেয়েদের এবং শিশুদের শিক্ষা ও নিরাপত্তার অধিকারের প্রতীক হয়ে উঠেনি, চরমপন্থা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হয়েও উঠেছেন। উল্লেখ্য মাত্র ১৬ বছরের মেয়েকে শান্তিতে নোবেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার দেয়াটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে বলেও দ্বিমত রয়েছে।