Tuesday, February 4, 2025

গাজায় আরও বড় হামলার ফন্দি আটছে ইসরায়েল

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা—যেখানে নতুন মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে ধারণা।

রোববার (২ ফেব্রুয়ারি) ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে কী কী বিষয়ে আলোচনা হতে পারে তার ধারণা দেন।

তিনি বলেন, গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের শাসনের অবসান এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন প্রধান লক্ষ্য। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির বলয় সম্প্রসারিত করব এবং গাজার সংকট সমাধানের একটি কার্যকর পথ বের করব।

গাজায় ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা কমানোর গোপন পরিকল্পনা?

ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহু একটি নতুন মার্কিন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবেন, যার মূল লক্ষ্য গাজার জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমানো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কৌশল অনুযায়ী, গাজা থেকে ব্যাপকভাবে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে নেওয়া গেলে হামাস শাসনের অবসান ঘটানো সহজ হবে। এটি ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে।

তবে এই পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে দমনপীড়ন এবং জোরপূর্বক স্থানান্তরের কৌশল হিসেবে দেখছে।

গাজা দখলের পরিকল্পনায় কী রয়েছে?

নেতানিয়াহু জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে তার আলোচনায় মূলত ৩টি বিষয় প্রাধান্য পাবে— হামাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সেনাদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং ফিলিস্তিনিদের গাজা ছাড়তে বাধ্য করা।

নেতানিয়াহু বলেন, আমরা এমন একটি মধ্যপ্রাচ্য গড়তে চাই, যেখানে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে এবং সন্ত্রাসবাদ শিকড় গাড়তে পারবে না।

গাজায় হামলা জোরদার করবে ইসরায়েল?

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর বৈঠকের পর গাজায় সামরিক অভিযানের মাত্রা আরও তীব্র হতে পারে। সম্প্রতি গাজায় ইসরায়েলের বিমান হামলা ও স্থল অভিযান ব্যাপকহারে বেড়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শুধু গত এক মাসেই ৩,৫০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

নেতানিয়াহু বলেন, শক্তির মাধ্যমে আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করব। গাজার সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই আমাদের নৈতিক কর্তব্য।

আরব বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন পরিকল্পনা আরব বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে, সৌদি আরব ও কাতার যদি ফিলিস্তিনের পক্ষে কঠোর অবস্থান নেয়, তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে না।

তবে নেতানিয়াহু আশাবাদী, আরব দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এবং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নতুনভাবে গড়তে পারব।

প্রসঙ্গত, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের বৈঠক শুধু একটি কূটনৈতিক আলোচনা নয়, বরং এটি গাজার ভবিষ্যতের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। নেতানিয়াহুর ভাষায়, আমরা শান্তির বলয় সম্প্রসারিত করতে যাচ্ছি। গাজা আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসবেই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আলোচনার ফলে গাজায় দীর্ঘস্থায়ী দখলদারিত্ব এবং জনসংখ্যা পরিবর্তনের চেষ্টা হতে পারে, যা শুধু ফিলিস্তিন নয়, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বদলে দিতে পারে।

গাজা খালির বিরোধিতা করে পাঁচ আরব দেশের চিঠি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা খালি করার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন পাঁচ আরব পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ফিলিস্তিনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তারা এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে একটি যৌথ চিঠি পাঠিয়েছেন।

চিঠিটি সোমবার (০৩ ফেব্রুয়ারি) পাঠানো হয়। এতে সই করেছেন জর্ডান, মিসর, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। খবর রয়টার্স।

এ ছাড়া ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হুসেইন আল-শেখও চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। প্রথমে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস চিঠিটির খবর প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই কূটনীতিকেরা গত সপ্তাহান্তে মিসরের কায়রোতে এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। 

এদিকে ফিলিস্তিনিরা বহু বছর ধরে আশঙ্কা করে আসছেন যে, তাদের বাড়িঘর থেকে চিরতরে বিতাড়িত করা হতে পারে। ট্রাম্পের এই প্রস্তাবে সেই আশঙ্কার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সমালোচকেরা এই পরিকল্পনাকে জাতিগত নির্মূলের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। জর্ডান, মিসরসহ বেশ কয়েকটি আরব দেশ ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো যৌথ চিঠিতে আরব কূটনীতিকেরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, গাজা উপত্যকা পুনর্গঠনের দায়িত্ব গাজাবাসীর হাতেই থাকতে হবে। ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমিতেই বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, গাজা পুনর্গঠনের সময় ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্ব কেড়ে নেওয়া উচিত নয়। এই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন থাকা জরুরি হলেও, নেতৃত্ব ফিলিস্তিনিদের হাতেই থাকতে হবে। 

গাজা উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা ৬২ হাজার

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৬১ হাজার ৭০৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, নতুন পরিসংখ্যানে হাজারো নিখোঁজ ব্যক্তিকে মৃত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। খবর আল-জাজিরার।

গাজা উপত্যকার সরকারি তথ্য দপ্তরের প্রধান সালামা মারুফ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নিহতদের মধ্যে ৭৬ শতাংশের মরদেহ উদ্ধার করে চিকিৎসাকেন্দ্রে আনা হয়েছে। তবে এখনও অন্তত ১৪ হাজার ২২২ জন ধ্বংসস্তূপের নিচে বা এমন এলাকায় আটকে আছেন, যেখানে উদ্ধারকারীরা পৌঁছাতে পারেননি।

গাজার আল-শিফা হাসপাতাল থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে মারুফ বলেন, নিহতদের মধ্যে ১৭ হাজার ৮৮১ জন শিশু, যার মধ্যে ২১৪ জন নবজাতক রয়েছে।

মারুফ আরও জানান, ২০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেকে ২৫ বারেরও বেশি স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। সংঘর্ষে আহতের সংখ্যা ১ লাখ ১১ হাজার ৫৮৮ জন।

নতুন এই পরিসংখ্যান এমন সময়ে এসেছে যখন ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে। ১৫ মাস ধরে চলা ইসরায়েলের এই গণহত্যা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে।

বর্তমান যুদ্ধবিরতি অন্তত মার্চের শুরু পর্যন্ত বহাল থাকার কথা। এর ফলে উদ্ধারকর্মীরা গাজার বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন, যেখানে আগে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি।

ট্রাম্পের সমর্থন ও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয় জানান নেতানিয়াহু। পুরোনো ছবি।

নেতানিয়াহু কেন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেন by মোজাম্মেল হক তারা

বাইডেন যখন ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে এসে দাঁড়ালেন, তখন দুপুর পেরিয়ে গেছে। তিনি মুখ খোলার আগেই খবর চাউর হয়ে গেছে। যিনি ফাঁস করেছেন, তার নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাত-সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন, ‘ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত। নভেম্বরের নির্বাচনে আমাদের জেতার সুফল। সবে শুরু। হোয়াইট হাউসে পা রাখার প্রতীক্ষায়। আপনাদের জন্য আরও অনেক সুখবর অপেক্ষা করে আছে।’ কাজেই সাংবাদিকরা যদি বাইডেনের কাছে জানতে চান, এই চুক্তি সম্পাদনের কৃতিত্ব কার? তাদের দোষ দেওয়া যায় না। বাইডেন কিন্তু সে কথা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলেন, ‘মশকরা করছেন? ছয় মাস আগে গত বসন্তে আমি এই কাঠামোর ভিত্তিতে আলোচনার সূত্রপাত করেছি। তখনই স্বাক্ষর হতে পারত। কিন্তু দুপক্ষই ছুতানাতা ধরে গড়িমসি করল।’ কথা সত্য। কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত চুক্তির কাঠামোর উদ্ভাবক মিশর ও কাতার। বাইডেন প্রশাসন এর পৃষ্ঠপোষক। বাইডেন চেয়েছিলেন নির্বাচনের আগেই এটি স্বাক্ষরিত হোক। ডেমোক্র্যাটদের তাতে সুবিধা হবে। সমালোচকদের মুখ বন্ধ হবে। কিন্তু বাদ সাধলেন যুদ্ধ বন্ধে অনিচ্ছুক বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বিভিন্ন অজুহাত তুললেন, যাতে মধ্যস্থতাকারীরা হালে পানি না পায়। পুরো বিষয় ঝুলে গেল। মার্কিন রাজনীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ নেতানিয়াহু জানতেন, বাইডেন যতই হম্বিতম্বি করুন, নির্বাচন সামনে রেখে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস করবেন না, তাতে ইসরায়েল সমর্থক মার্কিন ইহুদিরা বিগড়ে যাবে। নির্বাচনে ট্রাম্পের জেতার সম্ভাবনা অধিক। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্পের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হোক এমন কিছু করাতেই ঝুঁকি বরং বেশি। উদারতার জন্য নয়, প্রতিহিংসাপরায়ণ হিসেবেই ট্রাম্পের খ্যাতি। আর সবকিছু ভুললেও কে কবে পা মাড়িয়েছিল, এটি ভোলার লোক নন তিনি। কাজেই চতুর নেতানিয়াহু নিজের মতো চলতে থাকলেন। তার এ মনোভাবের সাম্প্রতিকতম প্রকাশ হচ্ছে, চুক্তি সম্পাদনে সম্মতি জানিয়ে তিনি প্রথম ফোনটি করেছেন ট্রাম্পকে, যিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণের অপেক্ষায়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে অবশ্য ভুলে যাননি। সহযোগিতার জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কিন্তু সেটি এর পর।

নেতানিয়াহু যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হলেন কী কারণে? প্রথমত বাইডেন এবং ট্রাম্পের যৌথ চাপের কাছে তিনি অসহায়। প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়া একক সামর্থ্যে অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ইসরায়েলের পক্ষে অসম্ভব, বিশেষত ইরান যখন বৈরী। দ্বিতীয়ত এরই মধ্যে এক বছর কেটে গেছে, কিন্তু নেতানিয়াহু না পেরেছেন হামাসকে সাবাড় করতে, না পেরেছেন জিম্মি উদ্ধার করতে। ইসরায়েলের জনমত ছাড় দিয়ে হলেও জিম্মি উদ্ধারের পক্ষপাতী। তাতে কিছুদিনের জন্য যুদ্ধ স্থগিত থাকলে আপত্তি নেই। নেতানিয়াহুর বিরোধীরা প্রচার চালাচ্ছে, তিনি যুদ্ধ চালু রাখছেন নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে। যুদ্ধ বন্ধ করলে তার পতন অনিবার্য। একে তো হামাসের আক্রমণাত্মক অভিযানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিধানে ব্যর্থ হয়েছেন। উপরন্তু যুদ্ধের জন্য দুর্নীতির অভিযোগে তার বিচার প্রক্রিয়া থেমে আছে। কাজেই জিম্মি উদ্ধারে তিনি যে আন্তরিক, সেটি প্রমাণ করতে হলে বর্তমান প্রস্তাবে সায় না দিয়ে তার গত্যন্তর নেই।

বাইডেনের প্রতি সমালোচনা হচ্ছে, তিনি যুদ্ধ বন্ধের গীত গেয়েছেন সত্যি কিন্তু নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করতে অর্থবহ উদ্যোগ নিতে বরাবরই ইতস্তত করেছেন। অন্যদিকে যুদ্ধ চালু রাখতে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহে তিনি ক্ষণ বিলম্ব বা কার্পণ্য করেননি। তার এ পরস্পরবিরোধী নীতির দুর্বলতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন কুশলী পাকা ঘুঘু নেতানিয়াহু। টাকা ও অস্ত্র নেওয়ার সময় বাইডেনের সব শর্তে রাজি হয়েছেন কিন্তু সেসব হাতে পাওয়ার পর নিজের পথ ধরেছেন। কখনো ইসরায়েলের নিরাপত্তার অজুহাত খাড়া করেছেন, কখনো দোষ দিয়েছেন ইরান-হিজবুল্লাহ-হামাস-হুতি উৎপাতকে, নিজ মন্ত্রিসভার ভিন্ন মতাবলম্বীদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজে ট্রিগার চেপেছেন আড়াল থেকে।

ট্রাম্পের ব্যাপার ভিন্ন। যখন ক্ষমতায় ছিলেন জর্ডান উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে ইহুদি দখলদারদের অবৈধ বসতি স্থাপন, জাতিসংঘে গৃহীত প্রস্তাব লঙ্ঘন করে জেরুজালেমে রাজধানী স্থানান্তর এবং ইসরায়েলের দখলকৃত সিরীয় ভূখণ্ড গোলান হাইটসে স্থায়ী দখলদারিত্বের ঘোষণা, গাজায় স্থায়ী অবরোধ আরোপ ইত্যাদি নেতানিয়াহুর প্রতিটি দুষ্কর্মের ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসন সমর্থন জুগিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত তার ইহুদি জমি ব্যবসায়ী জামাতা জেরেড কুশনার ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মরক্কোকে রাজি করিয়েছেন। ধারণা ছিল সৌদি আরবকে ভেড়াতে পারলে কেল্লাফতে। এ চুক্তির নিচে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের দাবি চিরতরে চাপা পড়বে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কোণঠাসা এবং ইসরায়েলকে প্রধানতম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব ইসরায়েলকে সমর্পণ করে চীনের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারবে। কিন্তু হামাসের আকস্মিক হামলা এবং গাজা যুদ্ধে পুরোনো সব হিসাব-নিকাশ এখন গড়বড়। আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব বেড়েছে। চীনের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ইরানের সঙ্গে বৈরিতা কমেছে। এমতাবস্থায় ট্রাম্প টিমের কর্তব্য স্থির করার জন্য সময় দরকার। সর্বোপরি ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণ ও উদ্বোধনের প্রাক্কালে টিভি পর্দায় যুদ্ধের বীভৎসতা ও মৃত্যুর ভয়াবহ দৃশ্য নয়ন সুখকর নয়। ট্রাম্প ক্ষমতার সূচনাকালে মার্কিন জনগণের মধ্যে ফিল গুড (feel good) বা সুখ অনুভূতি সঞ্চালিত করতে চান। ফলে বাইডেনের ভাষায় ‘বিদায়ী ও আগত’ দুপক্ষ একই অভিন্ন স্বরে কথা বলেছেন। যুদ্ধবিরতি চুক্তি তারই সুফল।

সে তো গেল। চুক্তিতে কী আছে? চুক্তিটি তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত। চুক্তির প্রথম ধাপ ৪২ দিনব্যাপী। প্রথম দিন থেকেই সশস্ত্র হামলার অবসান হবে। হামাস ২০২৩-এর ৭ অক্টোবরের জিম্মিদের মধ্যে ৫ জন নারীসহ পঞ্চাশোর্ধ্ব ও অসুস্থ এমন ৩৩ জনকে মুক্তি দেবে। বিনিময়ে ইসরায়েলের কারারুদ্ধ বন্দিদের এক হাজারজন ছাড়া পাবেন। যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনেই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার জনবহুল এলাকাগুলো ত্যাগ করবে। যুদ্ধবিরতির সপ্তম দিন থেকে বাস্তুচ্যুত প্যালেস্টাইনিরা উত্তর গাজায় ঘরে ফেরার অনুমোদন পাবেন। প্রতিদিন খাদ্য, খাবার পানি ও ওষুধ বহনকারী ৬০০ ট্রাকের ঢোকার ক্ষেত্রে ইসরায়েল বাধা দেবে না।

চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে পর্যায়ক্রমে বাকি জিম্মিরা মুক্তি পাবেন। গাজা এবং মিশরেরর সীমান্তবর্তী আট মাইল দীর্ঘ ফিলাডেলফিয়া করিডোরের স্থানবিশেষ ছাড়া ইসরায়েল সেনাবাহিনী গাজা থেকে প্রত্যাহার শুরু করবে। ইসরায়েলের কাছ থেকে রাফা বর্ডার ক্রসিংয়ের নিয়ন্ত্রণভার মিশরের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর যুদ্ধের স্থায়ী নিষ্পত্তির আলাপ-আলোচনা শুরু হবে তৃতীয় ধাপে। এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কতটুকু? মনে রাখতে হবে, চুক্তির অভাবে নয়, প্যালেস্টাইন সমস্যা ঝুলে আছে চুক্তির বাস্তবায়নে সমস্যার কারণে। যার দায় পূর্ণতঃ ইসরায়েলের। ক্যাম্প ডেভিড একর্ড দিয়ে শুরু করা যাক, ১৯৭৯ সালে যা স্বাক্ষরিত হয়েছিল মিশরীয় প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিনের মধ্যে। চুক্তিতে ছিল পাঁচ বছরের মধ্যে ইসরায়েল মিশর এবং জর্ডানের সঙ্গে বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে পশ্চিম তীর ও গাজায় প্যালেস্টাইনের স্বশাসন এবং পূর্ব জেরুজালেম নিয়ে বিরোধের ফয়সালা করবে। এটি ভুলে যেতে ইসরায়েল বিলম্ব করেনি।

অতঃপর শুরু হলো অসলো শান্তি আলোচনা। ১৯৯৩ সালে ইসরায়েল পিএলওকে প্যালেস্টাইন জনগণের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নিল এবং ইয়াসিন আরাফাত ইসরায়েলের অস্তিত্বের বৈধতার স্বীকৃতি দিলেন। ১৯৯৫-এ স্বাক্ষরিত দলিলে শান্তি প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র গঠনসংক্রান্ত বিষয় বিশদ লিপিবদ্ধ হলো। বলা হলো, প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের চরিত্র ও মর্যাদা বিষয়ে (Statuas) চূড়ান্ত আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে জর্ডান উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে পিএলওর নেতৃত্বাধীন প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যবস্থাপনা ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। পশ্চিম তীরে বেআইনি ইহুদি বসতি অপসারণ আপাতত বিলম্বিত হবে, যতদিন না ইসরায়েলের সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের কাজ শেষ হচ্ছে। পশ্চিম তীরকে ভাগ করা হলো ABC—এই তিনটি ভাগে। সীমিত নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাসহ A ও B দায়িত্ব ভার ন্যস্ত হলো প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষের কাছে। C-এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অধিকারী ইসরায়েল, এলাকা পরিমাণে পশ্চিম তীরের ৬০ শতাংশ।

১৯৪৮ সালে ঔপনিবেশিক শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় উচ্ছেদকৃত স্থানীয় আরব জনগণের ভূমি দখল করে বহিরাগত বসতি স্থাপনকারীদের জন্য ইহুদি ইসরায়েল রাষ্ট্রের সৃষ্টি। আন্তর্জাতিক আইনে রিফিউজিদের নিজের ভিটা ও জমিতে ফেরা স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। কিন্তু প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে আরাফাত এ মৌলিক দাবির ব্যাপারে ছাড় দিলেন। গাজায় পুনর্বাসিত সংখ্যাগুরু রিফিউজিদের বংশধরদের মধ্যে এ ব্যাপারে ‘বিচ্ছিন্নতাবোধ’ স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। প্যালেস্টাইন বংশোদ্ভূত খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী এডোয়ার্ড সাইদ লিখেছেন, ‘এ চুক্তি হচ্ছে প্যালেস্টাইনিদের আত্মসমর্পণের দলিল, কুখ্যাত ভার্সাই সন্ধিপত্রের প্যালেস্টাইন সংস্করণ। আরাফাত আমাদের মার্শাল পেঁতা (প্রথম মহাযুদ্ধের বিখ্যাত যে ফরাসি বীর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎসি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন)।’

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক ফিস্ক লিখেছেন, ‘ভুয়া, মিথ্যাচার। আরাফাত এবং পিএলওকে ঠকানো ও নিরস্ত্র করার কৌশল। এর মধ্য দিয়ে তারা যে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের জন্য ২৫টি বছর লড়েছেন, তার সুফল বেহাত হয়ে গেল।’ অসলো চুক্তি স্বাক্ষরকালে পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতির সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার। এখন তা সংখ্যায় ৭ লাখ। অসলো চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার বাস্তবে কখনোই ঘটেনি।

ইতিহাসে অসংখ্য চুক্তির খোঁজ মিলবে, যা বাস্তবায়িত হয়নি। তার বেশ কিছুতে ইসরায়েলের রাষ্ট্রপ্রধান বা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির স্বাক্ষর ধরা আছে। জনৈক ভাষ্যকারের মত হচ্ছে, নেতানিয়াহু জিম্মিদের ফেরত পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। যেদিন তাদের মধ্যে জীবিত সর্বশেষ ব্যক্তি ইসরায়েলে পা রাখবেন, তার পরদিনই যুদ্ধ শুরু হবে। ট্রাম্প তাকে থামাবেন, সে ভরসা খুবই কম।

গাজার তরুণ লিখেছেন, ‘আমরা ছিলাম জীবন্মৃত, মৃত্যু ও ধ্বংসের আতঙ্ক আমাদের সর্বক্ষণ ঘিরে রেখেছিল। পরে কী হবে জানি না, আপাতত স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। সেইবা কম কীসের?’

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক, আমেরিকা প্রবাসী

গাজা উপত্যকায় নিহতদের মধ্যে ১৭ হাজার ৮৮১ শিশু, যার মধ্যে নবজাতক ২১৪ । ছবি : সংগৃহীত

অপরূপ থাইল্যান্ড ও পাশেই ‘মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ’ by মো. বায়েজিদ সরোয়ার

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের বিখ্যাত লুম্বিনী (লুম্ফিনি) পার্কে এলাম সকাল এগারটায়। সেটি ছিল ২০২৩ এর ২৯ জুন। বৃহৎ সব বৃক্ষে ছায়াময় পার্কে প্রজাপতির উড্ডীন বর্নময়তা। বর্ণাঢ্য উদ্যানে হাঁটছে সবুজ ময়ূরী, কৃত্রিম পরিখায় রঙিন মাছ। সু্ন্দর ফুল, বৃক্ষলতা, স্নিগ্ধ লেক মিলে অপরূপ এক পরিবেশে বেড়াতে থাকি। এই অদ্ভুত সময়ে পার্কে এসে অবশ্য একটা লাভ হলো-পার্কের প্রায় জনতাহীন এক ধরনের নির্জনতা। এমন পরিবেশে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, রোহিঙ্গা সমস্যা ও আরাকান আর্মির মতো বিষণ্ন বিষয় নিয়ে ভাবা এক অর্থে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক। তবুও ভাবনায় তা এলো।

এবার সপরিবারে থাইল্যান্ডে বেড়ানোর সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত ও অর্ধ একাডেমিক মিশনও অবশ্য ছিল। মিয়ানমার বিষয়ক ইস্যুগুলো মোকাবেলায় থাইল্যান্ড কি কি পলিসি ও কৌশল নিয়ে থাকে এবং তা বাস্তবায়ন করে থাকে-সে বিষয়টি বোঝা ও কিছু তথ্য সংগ্রহ করা। লুম্বিনী পার্ক ও অন্যান্য স্থানে এসে ভ্রমণের সঙ্গে সেই মিশনটাও বেশ কিছু মিলে গেল। কেন যেন অপরূপ থাইল্যান্ডে আমার ভ্রমণ জুড়ে ছিল নীরব মিয়ানমার ভাবনা।

থাইল্যান্ডের বার্মা বিষয়ক পলিসি, কৌশল ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে- এই ধারণাটা আমি প্রথম পেয়েছিলাম তৎকালীন লে. কর্ণেল মো. তোফায়েল আহমেদ (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) এর থেকে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই অসাধারণ মেধাবী ও প্রফেশনাল কর্মকর্তা ব্যাংককস্থ ‘রয়েল থাই আর্মি কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজে’ প্রথম বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তা হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন (১৯৯৯-২০০০)। সেই কোর্সে জেনারেল তোফায়েল অনন্য মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন।

ব্যাংককে বিরল এক সম্মেলন

এর প্রায় ১৭ মাস পরের ঘটনা। ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪। ততোদিনে মিয়ানমারের পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষত রাখাইনে দিক বদলকারী বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। আরাকান আর্মি রাখাইনের প্রায় ৯০% এলাকা দখলের দাবী করছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পুরো অঞ্চলই আরাকান আর্মির দখলে চলে গেছে। রাখাইনে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি এখন বাংলাদেশ। অন্যদিকে, কোন কোন স্থানে কয়েকটি সশস্ত্র রোহিঙ্গা সংগঠন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করছে। আবারও কি ইতিহাসের বিপক্ষে হাঁটলেন রোহিঙ্গা নেতৃবৃন্দ?

মিয়ানমারের চরম অশান্ত পরিস্থিতি এবং সীমান্ত প্রতিবেশী দেশগুলোর করনীয় ঠিক করতে মিয়ানমারের আশেপাশের দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক গত ১৯ ডিসেম্বর ব্যাংককে বসেছিল। এর উদ্যোক্তা ছিল থাই সরকার। মূলত মিয়ানমারের বর্তমান আইন শৃংখলা পরিস্থিতি, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে মিয়ানমারের প্রতিবেশী চীন, বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড এবং লাওসকে নিয়ে ওই সভায় আয়োজন করে থাইল্যান্ড। ২০ ডিসেম্বর আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ আবার মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। সেই অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ সভায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোঃ তৌহিদ হোসেন মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।

ধীরে বহে নাফ

ব্যাংকক সম্মেলনের বিশেষ স্টোরিটি ‘ফ্রনটিয়ার মিয়ানমার’ অফিসে পাঠিয়ে ল্যাপটপ অফ করলেন তরুন নিউজ-ক্রেজি আমেরিকান সাংবাদিক। চাও ফ্রায়া নদীর পাশেই হোটেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন নির্ঘুম মহানগরীর মধ্য রাতের নদীর দিকে...। ব্যাংককের প্রায় ১২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে কক্সবাজারের (টেকনাফ) অঞ্চলের নাফ নদীতে তখন অন্য পরিস্থিতি। গভীর রাতে ও পারের রাখাইনের (মংডু) অঞ্চল থেকে নৌকা যোগে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে হতভাগ্য শত শত রোহিঙ্গা। নাফ নদীর এপারে রোহিঙ্গা ঢল থামাতে দিন রাত ডিউটি করছে টেকনাফস্থ সীমান্ত রক্ষী বিজিবি ব্যাটালিয়ন ও কোস্ট গার্ডের সৈনিকরা। এই সীমান্ত রক্ষীদের চ্যালেঞ্চের কথা আমি কিছুটা বুঝতে পারি। প্রায় ১৭ বছর আগে আমিও এ অঞ্চলে সীমান্ত রক্ষী হিসেবে কর্মরত ছিলাম।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা সংকটের এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে। ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের (বর্ষা বিপ্লব) পর, আগষ্টে ক্ষমতা গ্রহণ করে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থণ নিয়ে বিশেষ প্রচেষ্টা নিয়েছে বর্তমান অন্তবর্তী সরকার। রাখাইনের নতুন পরিস্থিতি উদ্ভব হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘কৌশলগত হাই গ্রাউন্ড দখলই হতে পারে বাংলাদেশের মূল চাবিকাঠি।’

গত ২ মাসে বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ৬০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ (৪র্থ রোহিঙ্গা ঢল) করার ঘটনাটি মারাত্মক উদ্বেগ তৈরী করেছে। দক্ষিণ পূর্ব দিকে প্রতিবেশী পাল্টে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমাদের আগাম প্রস্তূতি ও সতর্কতা জরুরী। আশ্চর্য বিষয় হলো, এত বড় একটি ঘটনা কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে তেমন আলোচিত হচ্ছে না। ‘নিস্ক্রিয়তা’ ও ‘হতবিহ্বলতা’ নয়, ঢাকাকে এখন দ্রুত আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ (কন্সট্রাকটিভ এনগেজমেন্ট) স্থাপন করতে হবে। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অর্থনৈতিক অধিকারসহ পুনর্বাসনের বিষয়ে আরাকান আর্মির স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। রাখাইনে রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তৈরীতে অবদান রাখতে হবে। রাখাইনের দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য (মানবিক করিডোর) পাঠানো যেতে পারে। সংকটের সঙ্গে এখানে সম্ভাবনাও রয়েছে। তা ঢাকাকে সাহসীভাবে দ্রুত কাজে লাগাতে হবে। আমরা যেন এবার আরাকান ট্রেন মিস না করি।

উল ইয়ন-সাংবাদিকতা থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধ

আবার ফিরি ব্যাংককের লুম্বিনী পার্কে...। স্নায়ু-যুদ্ধের সময়কালে বিশেষত ১৯৫০-৬০ দশকে, থাইল্যান্ড ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ। অন্যদিকে, বার্মা সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই সময়কালে, সীমান্ত এলাকার বার্মিজ জাতিগত গেরিলা সংগঠন ও রেঙ্গুন সরকার-বিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করে ‍ও তাদের ‘বাফারে’ পরিনত করে থাই সরকার। লুম্বিনী পার্ক এই ধরণের ঘটনার নীরব স্বাক্ষী। এতে বার্মার বিষয়ে ঐ সময়ের থাই-নীতি বোঝার বিষয়টি সহজ হবে।

এক পর্যায়ে হাঁটতে হাঁটতে বিখ্যাত লুম্বিনী লেকের ধারে বসি। ১৯৬৮-১৯৭০ সালে এর কাছাকাছি একটি বাড়ি বার্মিজ প্রতিরোধের কেন্দ্রে পরিনত হয়েছিল। মনে হলো, পার্কের পূর্ব দিকের সেই বাড়িটি আমি দিব্যি দেখতে পাচ্ছি। এর পেছনে ছিল সিআইএ ও থাই গোয়েন্দা বাহিনী। বিখ্যাত বার্মিজ ইতিহাসবিদ ও লেখক থান্ট মিন্ট ইউ-এর লেখা ‘দি রিভার্স অব লস্ট ফুট ষ্টেপস- ‘এ পারসনাল হিস্ট্রি অব বার্মা’-বইতে এর কিছু বিবরণ রয়েছে। তরুন থান্ট মিন্ট ইউ কম্বোডিয়ার (আনটাক) শান্তি মিশনে (১৯৯২-১৯৯৩) নমপেনে আমার একধরণের দূরবর্তী-সহকর্মী ছিলেন। তিনি আনটাকের মানবাধিকার বিভাগে কাজ করতেন। তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থে (হিডেন হিস্টি অব বার্মা) থান্ট মিন্ট ইউ ‘রোহিঙ্গা গণহত্যার’ (২০১৭) কথা প্রায় নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন। দুঃখজনকভাবে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের মতো এই বার্মিজ লেখককেও পরে দেশ ছাড়তে হয়েছে।

বার্মায় সামরিক বাহিনী ক্ষমতা (১৯৬২) দখলের পর তৎকালীন বিখ্যাত বার্মিজ সাংবাদিক-সম্পাদক (দি নেশান) ‘এডওয়ার্ড উল ইয়ন’ থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেন। লুম্বিনী পার্কের পাশের একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন এই ‘ম্যাগসেসে’ অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত সাহসী সম্পাদক। এটি তখন জেনারেল নে উইন-সরকার বিরোধীদের অলিখিত ‘হেডকোয়ার্টারে’ পরিনত হয়। এই সময় আমাদের বিখ্যাত সাংবাদিক এস এম আলী (সৈয়দ মাহমুদ আলী) ‘ব্যাংকক পোষ্টের’ ম্যানেজিং এডিটর (১৯৬৬-১৯৭০) ছিলেন। প্রায় এই সময়ই ব্যাংককে এসেছিলেন আমাদের প্রথম নারী ভাস্কর ‘নভেরা আহমেদ’। নিজের কাল ও সময়ের চেয়ে প্রাগ্রসর এই বাঙালি নারী, তার বন্ধু (ফরাসী যুদ্ধ-ফটোগ্রাফার) পোলানস্কির সঙ্গে ভিয়েতনাম রণাঙ্গনে গিয়েছিলেন। নভেরা ১৯৫৮ সালে রেঙ্গুন যান। আইনজীবি-রাজনীতিক কামরুদ্দীন আহমদ তখন বার্মায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত। রেঙ্গুনে সেই সময় নভেরার একটি প্রদর্শনীও হয়েছিল। নভেরা আহমেদ রেঙ্গুনের কূটনৈতিক সার্কেলে অনেককে ইমপ্রেস করেছিলেন।

‘মিশন ব্যাংকক’ ও অতপর...

বিখ্যাত বার্মিজ রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক ‘উ নু’ ছিলেন বার্মার প্রথম (১৯৪৮) প্রধানমন্ত্রী। উ নু’কে ক্ষমতাচ্যুত করেই বার্মায় সামরিক শাসন এসেছিল। বার্মায় পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রদূত ছিলেন মোহাম্মদ আলী (বগুড়া)। এই বাঙালি রাজনীতিক পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এর পরই কামরুদ্দীন আহমদ বার্মার রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন (১৯৫৭-১৯৬১) । এই দুজন বাঙালি রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রী উ নু’র প্রায় ব্যক্তিগত বন্ধুতে পরিনত হয়েছিলেন। বিদায়ী সাক্ষাৎকারে (১৯৬১) উ নু’র রাষ্ট্রদূত কামরুদ্দীন আহমেদকে বলেছিলেন- ‘পাকিস্তানে কি বার্মায় সেনাবাহিনী কোনদ্নি ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না’। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী উ নু ১৯৬৯ সালে (ভারত-বৃটেন হয়ে) থাইল্যান্ড আসেন। সাংবাদিক উল ইয়ন এর বাড়িটি কেন্দ্র করে উ নু, প্রেসিডেন্ট নে উইন এর সরকার-বিরোধি কর্মকান্ড শুরু করেন। সম্পাদক উল ইয়ন হয়ে পড়েন উ নু’র প্রধান উপদেষ্টা ও উৎসাহদাতা।

১৯৬৪ সালে এস এম আলী, হংকং এ করাচীর ‘ডন’ পত্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশেষ প্রতিনিধি। রীতিমতো ‘ষ্টার’ সাংবাদিক। সেই সময় চীনা নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার বিদেশী সাংবাদিকদের জন্য ছিল বিরল সৌভাগ্য। মার্শাল চেন ই তখন চীনের জেষ্ঠ্য নেতাদের অন্যতম। চীনের বিপ্লবে মার্শাল চেন ই এর চরম সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা সর্বজনবিদিত। একবার এস এম আলী, মার্শাল চেন ই এর সাক্ষাৎকার মর্যাদাপূর্ণ পত্রিকা ‘ফার ইষ্ট্রার্ন ইকোনোমিক রিভিউ’ এ ছাপিয়ে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের কয়েকজন সাংবাদিক-গবেষকের চমৎকার একটি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। গত ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১ তারিখে বাংলাদেশের ৩ জন সাংবাদিক-গবেষক জুমে আরাকান আর্মির প্রধান মেজর জেনারেল তোয়াং ম্রা নায়িঙ (কাচিন স্টেটে অবস্থানকারী) এর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। এঁরা হলেন: শফিকুল আলম (বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব), আলতাফ পারভেজ ও আশফাক রনি। সাক্ষাৎকারটি ২ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে ‘দৈনিক প্রথম আলো’য় প্রকাশিত হয়।

উ নু-উল ইয়নদের উদ্দেশ্য ছিল থাইল্যান্ড একটি প্রতিরোধ ঘাঁটি তৈরী করা। যেখান থেকে মার্কিন ও পশ্চিমা দেশের সাহায্য নিয়ে বার্মার অভ্যন্তরে সরকার বিরোধি বিদ্রোহ সংঘটিত করা। ততোদিনে, বার্মার স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বার্মিজ প্রেসিডেন্ট নে উইন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। ব্যাংককে তখন একত্রিত হয়েছিলেন ১৯৫০-দশকের অনেক নেতৃস্থানীয় বার্মিজ রাজনৈতিক-সামরিক ব্যক্তিত্ব। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বার্মার প্রথম প্রেসিডেন্ট সাও শোয়ে থাইক (শান প্রধান) এর স্ত্রী বিখ্যাত ‘মহাদেবী অব ইয়ানঘি’। একসময়ের আলোচিত রাজনীতিবিদ ‘মহাদেবী’ (মহারানী) তখন ‘শান স্টেট আর্মি’র প্রধান’।

এয়ার রেইড ওভার রেঙ্গুন ও লিফলেট বিতরণ!

থাই গোয়েন্দা বাহিনী নির্বাসিত বার্মিজ গ্রুপগুলোকে সংগঠিত করেছিল। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় ধরণের সাহায্য আসেনি। উ নু সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা বিল ইয়াংকে ‘ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট’ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহ সহায়তা করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। তখন উ নু ‘পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেটিক পার্টি’ (পিডিপি) গঠন করেন এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেন। তবে প্রতিরোধ গোষ্ঠির মধ্যে মাত্র কয়েকশো বা সর্বোচ্চ কয়েক হাজারের বেশী সৈন্য ছিল না।

শুধুমাত্র একটি কানাডিও তেল কোম্পানী কয়েক মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। একটি বিমান রেঙ্গুন পর্যন্ত (এয়ার রেইড ওভার রেঙ্গুন) উড়ে গিয়েছিল। বোমার বদলে ফেলেছিল কয়েক হাজার লিফলেট! নবগঠিত গেরিলা বাহিনী মাত্র কয়েক মাইল ভেতরে যেতে পেরেছিল। থাই সীমান্ত থেকে নে উইন সরকারকে যুদ্ধ করে উৎখাতের করার জন্য তার ঘোষণা চরম ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছিল।

এ ডটার্স মেমোয়ার অব বার্মা

এই লুম্বিনী পার্কে এক সময় হাঁটতেন বার্মার প্রতিরোধ গোষ্ঠির নেতৃবৃন্দ। তারা আজ কোথায়? সাংবাদিক উল ইয়ন এর মেয়ে ‘ওয়েনডি উল ইয়ন’ পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লেখক হিসেবে পরিচিত পান। ওয়েনডি উল ইয়ন এর মেয়ে ‘জোসিলিন সিগ্রেড’ একজন হলিউড-অভিনেত্রী। উল ইয়ন ১৯৮০ সালে (আমেরিকার) মেরিল্যান্ডের সিলভার স্প্রিং এ মৃত্যু বরণ করেন। ওয়েনডি উল ইয়ন তার গ্রন্থে (এ ডটার্স মেমোয়ার অব বার্মা) পিতা উল ইয়নের বার্মার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম ও থাইল্যান্ডে বার্মার প্রতিরোধ গোষ্টির কার্যকলাপের কথা সবিস্তারে লিখেছেন। উ নু ও উল ইয়ন এর প্রতিরোধ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও তারাই অবশ্য প্রথম (১৯৬৯-৭০) বার্মার প্রায় সকল বিরোধি গোষ্ঠি/দলকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে এই কাজটি অবশ্য করেছিলেন অং সান সুচি।

লুম্বিনী পার্কে অন্য ধরণের কুমির!

এক সময় আমি অপরূপ লুম্বিনী লেকের পাশে এসে বসি। লুম্বিনী পার্কের অসাধারন সৌন্দর্য্যের মাঝেও একমাত্র অস্বস্তি ছিল লেকে ভেসে বেড়ানো বিশাল আকারের (ওয়াটার মনিটর লিজার্ড) ‘গিরগিটি’। প্রথমে আমি ওদের ‘কুমীর’ ভেবে ভুল করেছিলাম। হঠাৎ করে মিয়ানমারের অন্য ধরণের ‘কুমিরের’ কথা মনে এলো। কক্সবাজারের টেকনাফ অঞ্চলে বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) এ চাকুরী ও পরবর্তীতে রোহিঙ্গা-মিয়ানমার বিষয়ক গবেষণা-লেখালেখির কাজে বেশ কিছু রোহিঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। এই হতভাগ্য অত্যাচারিত একদল রোহিঙ্গা নিষ্ঠুর মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে ‘কুমিরের’ সঙ্গে তুলনা করেছিল।

১৯৮০ দশকে ব্যাংককে বাংলাদেশীদের মিলন মেলা

১৯৮০ দশকে ব্যাংকক একঝাঁক মেধাবী বাংলাদেশীর মিলন মেলায় পরিনত হয়। মেধাবী কূটনীতিক শাহ্ এএমএস কিবরিয়া জাতিসংঘের আঞ্চলিক কমিশন (এসকাপ) এর ‘নির্বাহী সচিব’ (১৯৮১-১৯৯২) হিসেবে ব্যাংককে কর্মরত ছিলেন। এটি ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদ (জাতিসংঘের উপমহাসচিব পদমর্যাদা সম্পন্ন)। এসকাপ সচিবালয়ে সেই সময়ে ড. রহমতুল্লাহ, এএসএইচকে সাদেক (পরে সচিব, মন্ত্রী), এনাম আহমেদ চৌধুরীসহ (সচিব) অনেক উচ্চ পদস্থ বাংলাদেশী কর্মরত ছিলেন। হেদায়েত আহমেদ ছিলেন ইউনেস্কোর আঞ্চলিক পরিচালক। ফাও এর আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন ওবায়েদুল্লাহ খান (কবি, সচিব, মন্ত্রী)।

ইউনেস্কোতে প্রচারের দায়িত্বে ছিলেন মাহফুজ আনাম (সম্পাদক, ডেইলী স্টার)। এই সময় ‘পূরবী সাংস্কৃতি চক্র’ নামে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। চিত্র শিল্পী আসমা কিবরিয়া (শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সহধর্মিনী) ছিলেন ‘পূরবী সাংস্কৃতি চক্র’ এর সভাপতি ও প্রধান চালিকা শক্তি। সাংবাদিক এস এম আলী তখন কুয়ালালামপুরস্থ ইউনেস্কোর প্রধান আঞ্চলিক প্রচার কর্মকর্তা (রিজিওনাল কমিউনিকেশন এডভাইজার)।

১৯৮০-১৯৯০ দশকে থাইল্যান্ডে ৩ জন খ্যাতিমান ও পেশাদার সেনাকর্মকর্তা/জেনারেল বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁরা হলেনঃ মেজর জেনারেল কাজী গোলাম দস্তগীর (১৯৭৮-১৯৮২), মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, বীর বিক্রম (১৯৮৯-১৯৯৩) ও মেজর জেনারেল আব্দুল মান্নাফ (১৯৯৩-১৯৯৫)।

ব্যাংকক এশিয়ার অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ফাও, ইউনেস্কো, ইউনিসেফ ইত্যাদি সংস্থাও তাদের আঞ্চলিক সদর দপ্তর ব্যাংককে স্থাপন করে। ব্যাংককের সকল বাঙালি পরিবার নিয়ে সেখানে তারা সক্রিয় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল তৈরী করেছিলেন।

ব্যাংককে কম্বোডিয়া শান্তি মিশনের অফিস

কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘ শান্তিমিশন ‘আনটাক’ (১৯৯২-১৯৯৩) চালু হলে, ব্যাংককে এর ‘চিফ লিয়াজোঁ অফিসার’ এর কার্যালয় স্থাপিত হয় ‘এসকাপ’ এর ১৫ তলা সচিবালয়ের বিল্ডিং এ (রাজডামনার্ন নক এভিনিউ, ব্যাংকক)। গুরুত্বপূর্ণ এই ‘চিফ লিয়াঁজো অফিসার’ পদে প্রথমে নিয়োজিত ছিলেন কর্ণেল ইকরামুল হক (পরে মেজর জেনারেল)। ১৯৯৩ এর মার্চে তার স্থালাভিষিক্ত হন কর্ণেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান (পরে মেজর জেনারেল)। উল্লেখ্য, মেজর জেনারেল মুনীরুজ্জামান বর্তমানে ‘বিআইপিএসএস’ নামক থিংক ট্যাংকের সভাপতি ও ‘গ্লোবাল মিলিটারি এডভাইসোরি কাউন্সিল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ এর চেয়ারম্যান। একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে তিনি দেশে বিদেশে অত্যান্ত পরিচিতি ব্যক্তিত্ব।

২০২১- পরবর্তী মিয়ানমার

মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী (তাতমাদো) বর্তমানে দুই ধরণের গৃহযুদ্ধে লড়ছে। একদিকে তাদের প্রতিপক্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলোর বিভিন্ন সশস্ত্র গেরিলা দল (ইএও)। এরা মূলত স্বায়ত্তশাসন চায়। অন্যদিকে তাতমাদোর বিরুদ্ধে লড়ছে গণতন্ত্রপন্থী মানুষেরা। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মূলত আং সান সূচীর ক্ষমতাচ্যুত ‘ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসী’ (এনএলডি) পার্টির সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ বা ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্মেন্ট’ (এনইউজি) গড়ে উঠেছে। এই সরকার ২০২১ এর এপ্রিলে ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) গঠন করেছে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরক্ষা যুদ্ধ’ শুরু করেছে। নব গঠিত পিডিএফকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বার্মার কয়েকটি জাতিগত গেরিলা গোষ্ঠি। আগে এমন ঘটনা ঘটেনি।

এনইউজি সরকার অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা না করলেও বর্তমানে (জুন, ২০২৩) থাইল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে কাজ করছে। মূলত এনএলডি পার্টির সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত হলেও এনইউজিতে জাতিগত সংখ্যালঘু বিদ্রোহী গোষ্ঠি এবং রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র দলগুলোর প্রতিনিধিত্বও রয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ‘অং কাও মো’ এনইউজি সরকারের মানবাধিকার বিষয়ক ‘উপমন্ত্রী’ (ডেপুটি মিনিস্টার) হিসেবে কাজ করছেন। জাতিগত গেরিলা গোষ্ঠিগুলো (বিশেষত রাখাইন চিন, কাচিন, কারেন ও শানে) মিয়ানমার বাহিনীর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য, সফলতা লাভ করেছে। থাইল্যান্ডে এনইউজির খুব ভালো সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। যতদূর জানা যায়, থাইল্যান্ডে আরাকান আর্মিরও ভালো নেটওয়ার্ক রয়েছে।

অর্থনীতি যখন রাজনীতি থেকে দূরে-থাইল্যান্ডের বাস্তবমুখী বার্মা-পলিসি

বার্মার সঙ্গে থাইল্যান্ডের এক ধরণের ‘জটিল’ সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এক সময়ের ‘শত্রুদেশ’ মিয়ানমার কিন্তু এখন থাইল্যান্ডের সীমান্ত বাণিজ্য, মাইগ্রেন্ট লেবার ও প্রাকৃতিক গ্যাসের চমৎকার উৎস দেশ। দুই দেশের সামরিক বাহিনী ও ব্যবসায়ীদের (অলিগার্ক) মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশেই এখন রয়েছে সামরিক সরকার বা সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার (জুন, ২০২৩)। মিয়ানমারে থাইল্যান্ডের বেশ লাভজনক বিনিয়োগ (তৃতীয় সর্বোচ্চ বিদেশী বিনিয়োগ) রয়েছে। বিশেষত জ্বালানী সেক্টরে থাই বিনিয়োগ সর্বোচ্চ। থাইল্যান্ডে এই ‘বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা’ অর্থাৎ মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে আঞ্চলিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় দেশটির চমৎকার কৌশল বলে বিবেচিত।

২০০১ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করলে থাইল্যান্ড ‘মৃদু সমালোচনা’ করে ও সামরিক সরকারের সঙ্গে পূর্বের সম্পর্ক (বিজনেস এজ ইউজুয়্যাল) বজায় রাখে। থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তি/দল মনে করে যে, সেনাবাহিনীই মিয়ানমারে একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা দেশটিতে স্থিতিশীলতা আনতে পারে। থাই সেনাবাহিনী ও ট্রাডিশনাল রাজনীতিকরা, মিয়ানমারের সরকার ছাড়া সেখানকার কোন বিদ্রোহি গোষ্ঠির সঙ্গে আলোচনায় যেতে চায়না। তবে এথনিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো রনাঙ্গণে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করলে এ ধারনা অবশ্য বদলে যেতে পারে।

তবে থাইল্যান্ড জান্তা সরকারের সঙ্গে খুব বেশি এনগেজমেন্ট বৃদ্ধি করেনি। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে ব্যাংকক মূলত এক ধরণের ‘সতর্ক’ অবস্থান বজায় রেখেছে, যেন তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান থাকতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক সমালোচনাও যেন না হয়।

থাইল্যান্ডে মানবিক কূটনীতি

মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ ও সরকারের নির্যাতনের কারণে বর্তমানে প্রায় লক্ষাধিক মিয়ানমার নাগরিক থাইল্যান্ডের ৯টি ক্যাম্পে ‘উদ্ধাস্তু’ হিসেবে দীর্ঘদিন (মূলত ১৯৮৪ সাল থেকে) ধরে বসবাস করছে। চিয়াং মাই ও তাক প্রদেশে এই ক্যাম্পগুলো অবস্থিত (থাইল্যান্ডের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে)। এই শরণার্থীদের সহযোগিতার জন্য থাই সরকার ‘মানবিক কূটনীতি’ অবলম্বন করেছেন। শরণার্থীদের জন্য খাদ্য বাসস্থান এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। বার্মার শান (তাই) সম্প্রদায়ের সঙ্গে থাইল্যান্ডের ‍মূল তাই/থাই জনগোষ্ঠির সম্প্রীতিমূলক সম্পর্ক রয়েছে। ভালো কাজের সুযোগ থাকায়, বর্তমানে প্রায় ১৮ লক্ষ বার্মিজ নাগরিক (শ্রমিক) থাইল্যান্ডে কাজ করছে। বাস্তববাদী থাইল্যান্ড সরকার, অর্থনীতির বিষয়টি ‘রাজনীতি-সামরিক’ বিষয়টি থেকে আলাদা করে দেখে।

মিয়ানমার বিষয়ে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র নীতি-ভিশনারী নেতৃত্বের প্রতিফলন

স্নায়ু-যুদ্ধের সময়কালে (বিশেষত ১৯৫০-৬০ দশক) থাই সরকার মিয়ানমারের কয়েকটি অ-কম্যুনিষ্ট গেরিলা দলকে সাহায্য করতো। এটি ছিল সেই সময়ের থাইল্যান্ডের ‘বাফার’ নীতির প্রতিফলন। মিয়ানমারের শান প্রদেশে মার্কিন মদদপুষ্ট অকম্যুনিস্ট গেরিলা দল (মূলত চীনের কুওমিনটাং বাহিনী) শান প্রদেশের কম্যুনিস্ট গেরিলাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো।

১৯৭০ এর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্নত হতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী প্রেম তিনসুলানন্দ ১৯৮০ এর প্রথম দিকে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র নীতির দীর্ঘ দিনের ‘বাফার পলিসির’ পরিবর্তন করেন। ১৯৮৮ সাল থেকে থাই সরকার মিয়ানমারের আভ্যন্তরিন বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি গ্রহণ করে। এর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। থাই প্রধানমন্ত্রী তাতিচাই চুনহাভেন এর সময়ে ‘টার্ন দি ব্যাটেল ফিল্ড টু মার্কেট প্লেস’ নীতি গ্রহণ করা হয়। এতে মিয়ানমারসহ ইন্দোচীনের দেশগুলোর সঙ্গে থাইল্যান্ডের বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও দুই দেশের অধিকাংশ জনগণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হওয়ায় সম্পর্কে উষ্ণতা রয়েছে। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ তাদের দূরদর্শিতা ও গতিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

তবে ১৮শ শতাব্দিতে, থাইল্যান্ড ও বার্মার মধ্যে কোন কোন সময় তীব্র উত্তেজনাকর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। বার্মিজ বাহিনী বেশ কয়েকবার থাইল্যান্ড আক্রমণ করেছে। ১৭৬৭ সালে বার্মিজ বাহিনী, থাইল্যান্ড আক্রমন করে রাজধানী আয়াথুয়া শহরকে বিধ্বস্ত করে। সেই সময় থেকে মিয়ানমারকে একটি ‘বৈরী’ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বর্তমানে থাই জনগণ পূর্বের শত্রুতাপূর্ণ অতীতকে তেমনভাবে আলোচনায় আনে না। বাস্তববাদী থাই জনগণ বর্তমানকে গুরুত্ব দেয়।

মিয়ানমারের সংকটে থাইল্যান্ডের অনন্য অবস্থান।

মিয়ানমারের ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের অবস্থান একেবারেই অনন্য। ব্যাংকক মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে অর্থনৈতিক ও কূটনীতিক ক্ষেত্রে সমর্থন করে থাকে। যা জান্তা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে, ব্যাংককের মিয়ানমারের বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠনের উপরেও প্রভাব আছে। তবে এই গেরিলা দলগুলোর সঙ্গে থাইল্যান্ড (চীনের মতো) গভীরভাবে জড়িত নয়।

থাইল্যান্ড হলো মিয়ানমারের বিপ্লবী গোষ্ঠির লাইফলাইন। এ ক্ষেত্রে লেখক হেট হ্লাং উইন লিখেছেন-Thailand is not aiding the Junta-it also serves as a life line of Mynmar's people and anti- junta resistant movement. ২০২১ এর পর অনেক মিয়ানমার নাগরিক থাইল্যান্ডে তাদের সম্পদ স্থানান্তর করেছেন। সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান এড়াতে হাজার হাজার তরুন থাইল্যান্ডে পালিয়েছে। অনেক মিয়ানমার রাজনীতিক, এক্টটিভিস্ট, বুদ্ধিজীবি থাইল্যান্ডে অবস্থান করে কর্মকান্ড চালান। অনেক থিংক ট্যাঙ্ক, মিডিয়া আউটলেট ও এনজিও থাইল্যান্ডে অবস্থিত।

মিয়ানমারের কয়েকটি জাতিগত গেরিলা সংগঠন তাদের অস্ত্র, খাদ্য, ওষুধ ও লজিস্টিক বিষয়ে থাইল্যান্ডের উপর নির্ভর করে থাকে। যা বহুল আলোচিত। বিভিন্ন বিদ্রোহী সংগঠনের মধ্যে ও বিদ্রোহী সংগঠন ও মিয়ানমারের সরকারের মধ্যে আলোচনার (মিটিং) নিরপেক্ষ স্থান হিসেবে থাইল্যান্ড ব্যবহৃত হয়। এসব কারণে মিয়ানমার সংকটে থাইল্যান্ডের অবস্থান অনন্য ও দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় (কি প্লেয়ার)। আশ্চর্যজনকভাবে এ বিষয়টি তেমন আলোচিত হয় না, যেমনটা চীনের বিষয়ে হয়।

থাইল্যান্ড মিয়ানমারের আভ্যন্তরিন রাজনৈতিক সমস্যাগুলোতে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে বরং একধরণের ‘নিরপেক্ষ অবস্থান’ নিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধাণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল এর কাছে-শান্তির ফুল (পপি) নিয়ে যত অশান্তি

গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল বা সোনালি ত্রিভূজ (বার্মা-লাওস-থাইল্যান্ড এর সীমান্তবর্তী) এলাকা হলো ড্রাগ ও অস্ত্র ব্যবসায়িদের স্বর্গ রাজ্য। এই সব অঞ্চলে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের ওয়ার লর্ড, জেনারেল, ড্রাগ-লর্ডদের অনেক চাঞ্চল্যকর কাহিনী প্রচলিত আছে। মিয়ানমারের শান রাজ্য (গোল্ডেন ট্রাঙ্গেলের অংশ) হলো যুদ্ধবাজ নেতা, চোরাচালনাকারী এবং মাদক ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। শান রাজ্যের পাহাড়ী ঢালে চাষ হয় পপি, যার আঞ্চলিক নাম পিস ফ্লাওয়ার বা শান্তির ফুল। এই শান্তির ফুল নিয়েই যতো অশান্তি। এই পপি ফুল থেকেই প্রস্তূত হয় হেরোইন। এছাড়াও শান রাজ্যে গড়ে উঠেছে শত শত ইয়াবা ও আইস কারখানা। শান রাজ্যের বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠনগুলো ব্যাপকভাবে মাদক ব্যবসায় জড়িত। বাংলাদেশে ইয়াবার সবচেয়ে বড় চালানও আসে এই শান রাজ্য থেকে। শান সীমান্ত সামাল দেওয়াই এখন থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় মাথা ব্যাথা।

সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা

মিয়ানমারের সঙ্গে থাইল্যান্ডের দীর্ঘ সীমান্তে (২৪ কি. মি.) শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে থাই সরকার। থাই সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর নাম- ‘বর্ডার পেট্রল পুলিশ’। সাধারণত অশান্ত সীমান্ত অঞ্চল, যেখানে ইনসারজেন্সী বা বিদ্রোহ চলে, সেখানে (বর্তমানে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে) ‘থাহান পারান (রেঞ্জার)’ নামে প্যারা মিলিটারি ফোর্স মোতায়েন করা হয়। এই বাহিনী সেনাবাহিনীর অধীনে কাজ করে থাকে। বর্তমানে সীমান্তে চোরাচালান ও মানবপাচার প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করছে থাই কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় ভ্রমন-লেখক মইনুস সুলতান ‘গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল’ এলাকা ভ্রমণের কথা তার গ্রন্থ ‘সুকথাই চিয়াংমাই থাইল্যান্ড ঘুরে বেড়ানো’ গ্রন্থে চমৎকারভাবে উল্লেখ করেছেন। থাইল্যান্ডের উত্তর সীমান্ত (বার্মা-লাওস) দেখভালের জন্য (চোরাচালান বিরোধী দায়িত্ব) দায়িত্বপ্রাপ্ত হলো, ফা মুয়াং টাস্কফোর্স। অন্যদিকে, নারসুয়ান টাস্কফোর্স এর দায়িত্ব দক্ষিণের বার্মা সীমান্ত। তবে দুটি টাস্কফোর্সই থাই সেনাবাহিনীর ‘৩য় আর্মি রিজিওনের’ অধীনে কাজ করে। সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীর গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বলা হয়, সীমান্ত বিষয়ে সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

আলোচিত ‘বার্মা অ্যাক্ট’ ও অতপর...

এবার থাইল্যান্ডে এসে পরিচিত ব্যক্তি-বন্ধুদের (একাডেমিয়া-মিডিয়া-উদ্যোক্তা) মিথষ্ক্রিয়ায় ‘বার্মা’ পরিস্থিতি জানার চেষ্টা ছিল। আগ্রহের একটা বিষয় ছিল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্মা অ্যাক্টের’ বাস্তব প্রতিফলন জানা। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ‘বার্মা অ্যাক্ট’ বিল পাশ হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের অভ্যন্তরীন বিষয়ে আরো সরাসরি যুক্ত হয়ে গেলো। এই বিলে আছে যে, মিয়ানমারের ভিতরে গণতন্ত্রের সংগ্রামে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেবে। বিল পাশের পর গণতন্ত্রপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠিগুলো বিশেষত ‘এনইউজি’ দারুন উজ্জীবিত হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের চার্চগুলো এই বিল পাশের জন্য লাগাতার তদবির করে যাচ্ছিল। এই সময়ে মিয়ানমারের ভিতর যে ৩টি অঞ্চলে গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা বেশী ছিল সেগুলো হলোঃ কাচিন, চিন ও কারেন অঞ্চল। এই অঞ্চলে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খৃষ্টান জনগোষ্ঠি রয়েছে। ভূ-রাজনীতির মূল আলো পড়বে হয়তো ঔই ৩ টি রাজ্যে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টা তাৎপর্যপূর্ণ। ‘বার্মা অ্যাক্টের’ পর বার্মার সশস্ত্র গোষ্ঠিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরো বাড়তি সহায়তা আশা করেছিল। তবে বার্মা অ্যাক্ট এর আওতায় এই দলগুলোকে ‘টেকনিক্যাল ও নন-লিথাল সহায়তা’ দেওয়ার কথা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারে সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম ও সিভিক একটিভিজমে কিছুটা সাহায্য করছে। মানবিক সহায়তায় তারা আছে। এছাড়াও মানবাধিকার, ক্রাইম ডকুমেন্টেশন ও রাজনৈতিক-সংলাপে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশসমূহ সক্রিয় রয়েছে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো যুদ্ধরত বিদ্রোহি গোষ্ঠিগুলোকে সিভিল সোসাইটি পরিচালনা, ক্রাইম ডকুমেন্টেশনে সহায়তা করছে। অন্যদিকে ভারতসহ এক নায়কতান্ত্রিক দেশগুলো (চীন, রাশিয়া) মিয়ানমার সরকারকে ‘যু্দ্ধ পরিচালনায়’ সাহায্য করছে। পশ্চিমা দেশসমূহ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন বিশেষত অস্ত্র সরঞ্জামাদি না পাওয়ায় এনইউজিসহ মিয়ানমারের বিদ্রোহি গোষ্ঠিগুলো কিছুটা হতাশ।

বার্মায় যতো মার্কিন ও ওয়েস্টার্ন কানেকশন!

মিয়ানমারের পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষত কারেন, কাচিন, চিন ও কারেনি ও শান অঞ্চলে (মূলত খ্রিস্টান অধ্যুষিত অঞ্চলে) রিলিফ সংস্থা ও খ্রিস্টান মিশনারী-যুক্ত এনজিওগুলো তৎপর। থাইল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে থাইল্যান্ড-বার্মা বর্ডার ‘কনসোটিয়াম’। এরা রিফিউজি ক্যাম্পে খাদ্য ও ঔষুধ সরবরাহ করে থাকে। রবার্ট ডি কাপলানের আলোচিত বই ‘মনসুন’ এ বর্ণিত হয়েছে কিভাবে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশের সাবেক কিছু সেনা সদস্য এই ধরণের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থেকে ইনটেলিজেন্সের (গোয়েন্দা) কাজও করে থাকেন। মিয়ানমারের দুর্গম যুদ্ধ কবলিত অঞ্চলে মানবতা সেবায় অনেক মিশনারী (বিশেষত পশ্চিমা দেশের) নিয়োজিত রয়েছেন। মানবিক সহায়তা দানকারী এই সব এনজিও/সংস্থা নিয়ে কিছু বিতর্ক অবশ্য আছে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি মিয়ানমার বিষয়ে ‘রনাঙ্গণ পর্যায়ে’ প্রকাশ্যে জড়িত হতে চায়-তাহলে তাকে থাইল্যান্ডের মাধ্যমেই করতে হবে। কিন্তু থাইল্যান্ড এভাবে নিজেকে জড়াতে চায় না। কারণ মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা সীমান্ত উপচে থাইল্যান্ডে এসে পড়বে। এছাড়াও থাইল্যান্ড মিয়ানমারের প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। তাই কোন বিদ্রোহী এথনিক গোষ্ঠিকে ব্যাপকভাবে অস্ত্র দিয়ে তারা মিয়ানমার জেনারেলদের ক্ষ্যাপাতে চায়না।

যতোদূর জানা যায়, থাইল্যান্ডের মাটি থেকে (সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করে) ন্যাশনাল ইউনিটি গভমেন্ট এবং কয়েকটি এথনিক গোষ্ঠি (সংখ্যায় অল্প) মিয়ানমারের অভ্যন্তরে কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি হলো- থাই সরকারকে চাপ দেওয়া, যেন থাইল্যান্ড এ বিষয়টি উপক্ষা করে।

ব্যাংককে এই মর্মে, একটা আলোচনা শুনেছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের কয়েকটি গেরিলা সংগঠনকে (থাই সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ) গোপনে অস্ত্র পাঠিয়ে থাকে। তবে তা, মোটেই বড় আকারের নয়। যাইহোক, এ বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমারের ‘নিউজরুম’ যখন থাইল্যান্ডে

যুদ্ধ হচ্ছে মিয়ানমারের বিস্তৃীর্ণ রনাঙ্গণে। অথচ মিয়ানমার যুদ্ধের ‘সংবাদের ঘাঁটি’ হলো থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ও চিয়াং মাই। ইরাওয়াদী (ইরাবতী), নারিনজারা, মিজ্জিমা ইত্যাদি সরকার বিরোধী পত্রিকা থাইল্যান্ড (চিয়াং মাই, ব্যাংকক) থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। চিয়াং মাই শহর থেকে একদল নির্বাসিত বার্মিজ সাংবাদিক ‘ইরাওয়ার্দী’ (ইরাবতি) পত্রিকা বের করেন। এখানেই থাকেন বিখ্যাত সুইডিস সাংবাদিক ‘বার্টিল লিন্টনার’, যিনি একজন সাংবাদিক ও কৌশলগত কনসালটেন্ট। এই দূধর্ষ ‘বার্মা বিশেষজ্ঞ’ উত্তর পূর্ব ভারত-বার্মা-থাইল্যান্ড অঞ্চলের উপর রির্পোটিং করে সাংবাদিকতা জগতে ‘লিজেন্ডে’ পরিনত হয়েছেন। তার অন্যতম বিখ্যাত বই হলো- ‘ল্যান্ড অব জেড-এ জার্নি ফ্রেম ইন্ডিয়া থ্রু নদার্ন বার্মা টু চায়না’। আশা করি, একদিন বাংলাদেশেও বার্টিল লিন্টার এর মতো সাংবাদিক আমরা দেখতে পাবো।

উল্লেখ্য, প্রায় ৪৭ বছর আগে ‘ব্যাংকক পোস্ট’ রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি স্মরণীয় নিউজ করেছিল। ১৯৭৮ সালে বার্মিজ বাহিনীর নির্যাতনের মুখে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজার এলাকায় অনুপ্রবেশ করেছিল। ঢাকায় প্রত্যাবাসন আলোচনার একপর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা বার্মার প্রতিনিধি দলকে বেশ কড়া কথা শুনিয়েছিলেন। এ বিষয়ে ‘ব্যাংকক পোস্ট’ একটি নিবন্ধন ছেপেছিল। ‘বাংলাদেশ ওয়ার্নস বার্মা’ ‘বাংলাদেশ বার্মাকে সতর্ক করলো’ (১৭ মে ১৯৭৮)। উল্লেখ্য, সেই সময়ে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবেলায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক কৌশল ও দৃঢ়তা দেশে ও বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। সাপ্তাহিক ‘দি ইকোনমিস্ট’ ১২ আগষ্ট ১৯৭৮ প্রকাশিত প্রতিবেদনে মন্তব্য করে ‘‘এক মাস আগে বার্মা ও বাংলাদেশ যে তাদের শরণার্থী সমস্যার একটি সুশৃঙ্খল ও তাৎক্ষণিক সমঝোতায় পৌঁছেছে, তা কি কোন অলৌকিক ঘটনা, নাকি মরীচিকা? ”

যখন ব্যাংককের গ্রান্ড প্যালেসে

আমরা এখন ব্যাংককের অপরূপ রাজপ্রাসাদ বা গ্রান্ড প্যালেসে। ৩০ জুনের দুপুর প্রায় বারোটার দিকে রাজকীয় চত্বরে পৌছেছি। রাজকীয় চত্বরটি যেমন বিপুল, তেমনি নানা প্রকারের ভবনসমূহের বর্নাঢ্যময় উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমরা ফনা তোলা নাগের প্রতীক বিশিষ্ট ‘চৌদেওয়ার’ পার হয়ে মূল আঙ্গিনায় ঢুকি। এখানে অবশ্য রাজা থাকেন না। আমাদের চোখের সামনে চেদি ও বৌদ্ধ স্তূপসমূহের গোলাকার উর্ধ্বমুখী স্পাইরাল স্থাপত্য ও তার পাশাপাশি বহুতল ছাদ বিশিষ্ট ভবনরাজি এক ধরনের গোলক ধাঁধার সৃষ্টি করে। এখানে এসে আমার নমপেনের অপরূপ রাজপ্রাসাদের কথা মনে পড়ে।

বিশাল রাজপ্রাসাদ কমপ্লেক্সে ঘুরতে ঘুরতে ‘চকরি মহাপ্রাসাৎ’ নামক বড় একটি অট্টালিকার সামনে এসে দাঁড়াই। প্রখর সূর্যালোকে প্রাসাদের স্বর্ণালী মন্ডপ আমাদের চোখে বর্নীল ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে। সিংহাসন রাখা দরবার হলের পাশ দিয়ে হেঁটে ছায়াচ্ছন্ন খোলা এক মন্ডপে বসে পড়ি। এখানে একটি স্টল থেকে চা কেনা হয়। এখানে দেখা হয় কয়েকজন বিদেশী পর্যটকের সঙ্গে। সবাইকে খুব ক্লান্ত মনে হয়। এক পর্যায়ে, পরিচয় হয় একজন মধ্যবয়সী বার্মিজ নাগরিকের সঙ্গে, যিনি কুয়ালালামপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। মনে করা যাক, অধ্যাপকের নাম-খিন মঙ।

বার্মিজরা (মঙ্গলয়েডদের মতো) সাধারনত নিজেদের দুঃখ কষ্ট বা মনের ভাব সহজে অন্যের কাছে প্রকাশ করেন না। অর্থাৎ বাঙালিদের বিপরিত! যাই হোক, কিছু পরে অবশ্য চশমা পরা এই অধ্যাপক দীর্ঘ প্রবাস জীবনের কথা বলেন। তাঁর দীর্ঘ নিঃশ্বাসে দৃশ্যমান হয় ছেড়ে আশা মাতৃভূমির জন্য বেদনা। খিন মঙ বলেন- ‘তার প্রিয় শহর রেঙ্গুন এর অর্থ- যুদ্ধের পরিসমাপ্তি। অথচ ১৯৪৮ থেকেই সেই অঞ্চলে এক ধরণের যুদ্ধ চলছে। বার্মিজ ভাষায় নে ইউন অর্থ ‘উজ্জল আলো’। কিন্তু লোকটা মিয়ানমারকে অন্ধকারে নিয়ে গেলেন।’ মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিয়ে বলেন- ‘‘এটা সত্যি তাতমাদোই মিয়ানমারকে ধরে রেখেছিল। আজ ওরাই দেশটাকে ধ্বংস করছে’’।

১৭৬৭ সালে, বার্মিজ বাহিনী তৎকালীন থাই রাজধানী ‘আয়ুধায়ায়’ (অযোধ্যা) আক্রমণ করেছিল। এতে নগরটি প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। থাই-বার্মা সম্পর্ক প্রসঙ্গে, বার্মিজ বাহিনীর আক্রমণ ও ধ্বংসের কথা এই অধ্যাপককে জিজ্ঞাসা করি। তিনি কৌতুক করে বলেন- ‘‘ঐ আক্রমণ না হলে তো এই ব্যাংকক শহর ও এই রাজপ্রাসাদ হয়তো হতো না’’ জানতে চাইলাম, এনইউজি সরকার, পশ্চিমা সাহায্য, বার্মা অ্যাক্ট নিয়ে...। চশমা টেনে অধ্যাপক কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন- ‘‘চীনের তুলনায় এগুলো হলো- পেপার টাইগার বুঝলেন? শোনেন বার্মার মানুষকে নিয়ে কেউ ভাবেনা। সবার দৃষ্টি বার্মার সম্পদের দিকে”। একপর্যায়ে খিন মঙ বলেন- ‘‘আগামী বছর কিছু পরিবর্তন হয়তো দেখবেন’’!

জমিদার বাড়ি থেকে পলিথিনের ঝুঁপড়িতে-একজন রোহিঙ্গা সেনা কর্মকর্তার ভাগ্য

বিকেলে এসেছিলাম ব্যাংককের চাও ফ্রায়া নদীর ধারে গড়ে ওঠা অপরূপ পর্যটন এলাকা ‘এশিয়াটিক দ্যা রিভার ফ্রন্টে’। হাজার পর্যটকের ভিড়ে একসময় ব্যাংককে থাকা একজন হতভাগ্য রোহিঙ্গা সেনা কর্মকর্তা-‘জেনারেল ওমর হাকিম’ এর কথা মনে পড়লো। রাখাইনের মংডুতে জন্মগ্রহণকারী ওমর হাকিম বার্মা সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেছিলেন। পরে কর্তপক্ষের হয়ে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। তবে সেনাবাহিনীতে একপর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তিনি পালিয়ে থাইল্যান্ড চলে যান। সেখান থেকে মালয়েশিয়া। ২০০০ সালে গোপনে দেশে (মংডু) ফিরেছিলেন। ২০১৭ সালে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে আসেন। কুতু পালং ক্যাম্পে এখন তিনি পলিথিনের ঝুপড়িতে থাকেন। মংডুর জমিদারের ছেলে এখন বিপন্ন শরণার্থী। জীবন কি বিচিত্র! (এই তথ্যটা কক্সবাজারের সাংবাদিক-লেখক মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের বই- ‘রক্তাক্ত আরাকান বিপন্ন রোয়াইঙ্গা’ থেকে নেওয়া। সাবেক এই রোহিঙ্গা সেনা কর্মকর্তার সঠিক র‌্যাংক বা পদ যাচাই করা যায়নি)।

পাতায়া সমুদ্র সৈকতে চিয়াং মাই ‘লিসেনিং পোস্টের’ গল্প

২৬ জুন, ২০২৩। পাতায়া শহরে এখন সকাল। হোটেল থেকে বীচ রোড পেরিয়েই সমুদ্র। গালফ অব থাইল্যান্ড এর নীল জল। সৈকতে আমরা হাঁটতে থাকি। উঁড়ছে একদল সাদা সী গাল। কিছু দূরে সমুদ্রে একটা প্লাটফর্ম থেকে প্যারা সেলিং শুরু করেছে একদল টুরিস্ট। বীচ রোডের ধারে বসার ব্যবস্থা। ওখানে পরিচয় হয় একজন বেশ বয়ষ্ক আমেরিকান-পর্যটকের সঙ্গে। কর্ণেল জনসন (আসল নাম নয়), একজন ভিয়েতনাম-ভ্যাটরান। আমার পরিচয় পেয়ে প্রাণ খুলে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, থাইল্যান্ড, বার্মা নিয়ে কথা বলেন...।

বিচে একদল বিদেশী নারী পুরুষ উৎসাহ নিয়ে আবর্জনা কুড়াচ্ছে। জনসন বলেন- ওরা ইউএস ওয়ার ভেটেরান্স (ভেটারান্স ওয়াইভস ক্লাব) এর একটি দল। ‘ট্রাশ পিক আপ ডিটেইল-চলছে।

বিশাল দেহের কর্ণেল বলেন- ‘‘শোন ১৯৬৯ সালে যখন (আরএন্ডআর এ) সায়গন থেকে পাতায়ায় প্রথম আসি... সামরিক বিমানে সায়গণ থেকে পাতায়ার নিকটবর্তী ইউ-থাপাও এয়ার বেজে। এখানে তখন ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটি কটেজ ছিল মাত্র...। বড় হোটেল একটি-নিপা লজ। আমি জংলি হাতিও দেখেছি...’’।

কর্ণেল একসময় পর্যটন ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। আমার সঙ্গে চিয়াং মাই এর গল্প বলেন। ‘‘চিয়াং মাই হলো যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ‘লিসেনিং পোস্ট’। একসময় এখান থেকে দক্ষিণ চীন, লাওস, কম্বোডিয়া থেকে সিগনাল ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ করা হতো। ওখানে আমেরিকান কনসুলেটটি এখন বড় আকারে তৈরী হচ্ছে। বার্মা ঘিরে নতুন কোল্ড ওয়্যার শুরু হচ্ছে। এবার চীন-রাশিয়া একদিকে, অন্যদিকে ইউএসএ। এর প্রভাব তোমাদের বাংলাদেশের উপরও কিন্তু পড়বে। থাই-বার্মা বিষয়াদি বুঝতে তোমাকে চিয়াং মাই অঞ্চলে কিছুদিন থাকতে হবে। তাহলে গুরুত্বপূর্ণ শান প্রদেশের রাজনৈতিক-সামরিক ডেভলেপমেন্ট বুঝতে পারবে। ’’ আর অবশ্যই যেতে হবে তাক প্রদেশের মায় সট শহরে-বার্মার গেটওয়ে। সীমান্ত বাণিজ্য, চোরাচালান, এনইউজি-কারেনদের কর্মকান্ড, কল ও স্ক্যাম সেন্টার...।

কর্ণেল জনসন সম্ভবত এ অঞ্চলে ইন্টেলিজেন্সও (গোয়েন্দা বিভাগে) কাজ করেছেন। এই অঞ্চল তার নখদর্পনে। বাংলাদেশের মিয়ানমার নীতি নিয়ে একটু খোঁচা মারলেন- ‘‘তোমরা কেন যেন এসার্টিভ না...’’। বার্মা অ্যাক্ট নিয়ে কিছু কথা হয়। আমার দিকে কিছুটা হেঁসে বললেন- ‘‘শোন, আমেরিকানরা হুট হাট করে কিছু করে না...। সব কিছুর একটা সময় আছে’’। বার্মা সম্পর্কে আমেরিকার অবস্থান কিছুটা বুঝতে পারলাম। কর্ণেল জনসন তাঁর চিয়াং মাই এর রিসোর্টের ছবি দেখালেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এবার চিয়াং মাই আর যাওয়া হলো না।

চিয়াং মাই প্রসঙ্গে সুইডিশ সাংবাদিক ‘বার্টিল লিনটার’ এর প্রসঙ্গ আসে। ‘‘বার্টিল লিনটার কিন্তু আমার ভালো বন্ধু। ও ওখানে বিয়ে টিয়ে করে একেবারে এই সমাজের সঙ্গে মিশে গেছে’’-বলেন কর্ণেল। এরপর আইফোনের স্ক্রিণে বার্মার উপর একটি লেখা পড়তে বলেন। ‘‘হোয়াট এ নিউ থাই গভারমেন্ট কুড মিন ফর মিয়ানমার’’-বার্টিল লিটনার (দি ইরাওয়ার্দী, ২৯ মে ২০২৩)।

মিয়ানমারের সংঘাত প্রশমন প্রচেষ্টা ও আসিয়ানের ভূমিকা

মিয়ানমার সংকটে থাইল্যান্ডের ‘সংঘাত প্রশমন প্রচেষ্টা’ ও আসিয়ানের ভূমিকা নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়। কর্ণেল জনসন বলেন- ‘‘মিয়ানমারের শান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য ২০২১ এর এপ্রিলে আসিয়ান দেশসমূহ ‘৫ দফা ঐক্যমত্য’ পরিকল্পনায় সম্মত হয়। বর্তমানে আসিয়ান (বিশেষত মালয়েশিয়ায়) সেই ৫-দফা শান্তি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে চায়। ওখানে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের মাঝে ‘হিউমেনিটারিয়ান করিডোর’ চালু করার কথা। তবে সমস্যা কিন্তু অন্যখানে...। ‘থাইল্যান্ডের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এটি চাইলেও হয়তো হবেনা। এর কারণ মিয়ানমার সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকায় থাই সেনাবাহিনীর কথাই শেষ কথা। ব্যাংককস্থ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়। তবে ভবিষ্যতে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার মিয়ানমারের বিষয়ে থাইল্যান্ডের বর্তমান পলিসি পরিবর্তন করতে চাইতে পারে। মিয়ানমারের যুদ্ধ বন্ধে সক্রিয় উদ্যোগও গ্রহণ করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে থাই সেনাবাহিনীকে আস্থায় না নিলে তাদের মধ্যে দ্বন্দ তৈরি হতে পারে’- বললেন কর্ণেল।

মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের ‘গলফ ডিপলোমেসি’

কর্ণেল জনসন এর সাথে কথা বলে, থাই-মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জেনারেল সম্পর্কে নতুন তথ্য পেলাম। ‘‘বার্মায় জেনারেলগণ ব্যক্তিগত সম্পর্ককে (ক্যাজুয়াল এন্ড পারসনাল) খুব গুরুত্ব দেয়। বার্মার অনেক প্রভাবশালী জেনারেলের সঙ্গে থাই জেনারেল ও রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে।’’ সামরিক কূটনীতির আলোকে দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের ভিজিট প্রায়ই হয়ে থাকে। এই সময়ে, চোখ ধাধানো সুন্দর গলফ ক্লাবগুলো দুই সেনাবাহিনীর প্রীতিময় সম্পর্কের প্রতীক হয়ে পড়ে। গলফের প্রাণবন্ত পার্টিগুলো দেখে তখন মনে হয়না-মিয়ানমার থাইল্যান্ডের প্রায় ২৪০০ কিঃ মিঃ ব্যাপী সীমান্তে ড্রাগ, অস্ত্র চোরাচালান, ইনসারজেন্সী, শরণার্থী সমস্যা, সীমান্ত সংঘর্ষ, অনুপ্রবেশ, ও প্রক্সি ওয়্যার আছে বা একসময় ছিল।

মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা ও ধনী ব্যবসায়ীদের মধ্যে গলফ খেলা বেশ জনপ্রিয়। একই ঘটনা থাইল্যান্ডেও। লেখক-বিশ্লেষক মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অবসরপ্রাপ্ত) মিয়ানমারের সিথওয়েতে কনসুলেট প্রধান হিসেবে (১৯৯৯-২০০২) চাকুরী করার বিরল অভিজ্ঞতার অধিকারী। ২০০০ সালে টেকনাফ সীমান্তের একটি ঘটনা কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তে বেশ উত্তেজনা দেখা দেয়। দুই দেশের বাহিনী তখন প্রায় মুখোমুখি অবস্থানে। সীমান্তে এমন বৈরীতার মধ্যেও বাংলাদেশের কনসাল (মেজর এমদাদ) ও মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় সেনাকমান্ডার জেনারেল অং টোয়ে সিথওয়ের (আকিয়াব) গলফ ক্লাবে একসঙ্গে গলফ খেলছিলেন। সেদিন অত্যন্ত স্মার্ট ও দক্ষ সেনা কর্মকর্তা মেজর এমদাদ গলফের বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে মিয়ানমারের জেনারেলকে সীমান্ত পরিস্থিতি সুন্দরভাবে বোঝাতে সক্ষম হন। গলফ-ডিপলোমেসি সেদিন সীমান্ত যুদ্ধকে থামিয়ে দিতে সহায়ক হয়েছিল।

অদ্ভুত বিষয় হলো, শুধুমাত্র মিয়ানমার আর্মি বা সশস্ত্র বাহিনী নয়; এমন কি কোন কোন গেরিলা আর্মির অফিসারগণও গলফ খেলে থাকে। কাচিন ইনডিপেন্ডেন্স আর্মির (কেআইএ) সদরদপ্তর ‘লাইজাতে’ তাদের নিজস্ব গলফ কোর্স রয়েছে। কেআইএর কর্ণেল মারান জ টাংয়ং বলেন- ‘‘গলফ খেললে অফিসারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে’’। উল্লেখ্য, আরাকান আর্মির জন্ম হয়েছিল কাচিনের এই লাইজাতে। দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব প্রাচ্যেও গলফ জনপ্রিয়। গলফ খেলার সময়, রিলাক্সড ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে অন্যপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়ে থাকে।

ঈদের নামাজে একজন মজলুম রোহিঙ্গার মোনাজাত

২৯ জুন ২০২৩, ঈদ উল আজহা। ঈদের নামাজ পড়তে এসেছি ব্যাংককের সেন্ট্রাল মসজিদে। অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা। এদেশে প্রায় ৫% নাগরিক ইসলাম ধর্মের অনুসারী। নামাজে এসে শাহনেওয়াজ আহমদ নামে একজন রোহিঙ্গা যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয়। আবেগে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরি। বহু বছর আগে কাঠের নৌকায় চড়ে বঙ্গোপসাগর, আন্দামান সাগর পেরিয়ে পরিবারের সঙ্গে ‘শিশু শাহনেওয়াজ’ মালয়েশিয়া এসেছিল। এখন ব্যাংককে একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকুরী করছে। কক্সবাজারে দেখা হত দরিদ্র, বিপন্ন রোহিঙ্গাদের বিপরীতে শিক্ষিত ও সুবেশিত এই যুবকটিকে দেখে খুব ভালো লাগলো।

শাহনেওয়াজ আহমদ থাইল্যান্ডের ‘রোহিঙ্গা এসোসিয়েশন’ ও ‘আরাকান প্রজেক্ট’ নিয়ে কথা বলে। ব্যাংককে রোহিঙ্গাদের ক্ষুদ্র একটি কমিউনিটি আছে। শাহনেওয়াজ আমাকে সেখানে দাওয়াত দিলেন। মোনাজাতের সময় লক্ষ্য করি যুবকটির চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির সাধারণ মানুষেরা তাদের উপর নেমে আসা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানেনা। চোখের জলই তাদের প্রতিবাদের ভাষা। মোনাজাতে আমিও অত্যাচারিত, বিপন্ন, দরিদ্র হতভাগ্য, মজলুম রোহিঙ্গাদের মঙ্গল ও মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি...। কেন তাদের প্রতি এতো অত্যাচার, অবিচার...? কেন তাদের এতো কষ্ট, এতো দুঃখ...? জনম দুখী রোহিঙ্গাদের দুঃখ কি শেষ হবে না?

অথৈ সমুদ্রে ভাসা ‘রোহিঙ্গা বোট ‍রিফিউজিদের’ করুন কাহিনী

শাহনেওয়াজের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর হতভাগ্য ‘রোহিঙ্গা বোট রিফিউজিদের’ কথা ভাবছিলাম! বছরের পর বছর ধরে রাখাইন থেকে (এমনকি বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকেও) হাজার হাজার রোহিঙ্গা ঝুঁকি নিয়ে অভিবাসনের আশায় সমুদ্র পথে কাঠের নৌকায় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছে। সাধারণত অক্টোবর থেকে এপ্রিলের মধ্যে রোহিঙ্গারা সমুদ্র পথে যাওয়ার চেষ্টা করে-তখন বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর শান্ত থাকে। টেকনাফ অঞ্চলে বিডিআর এ দায়িত্ব পালনকালে এসব ঘটনা জানার সুযোগ হয়েছিল। এই হতভাগ্যদের উল্লেখযোগ্য অংশই মৃত্যুবরণ করেছে বলে মনে করা হয়।

২০১২ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপর চরম নির্যাতন নেমে এলে এবং নিজ জন্মভূমিতে অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার সব আশা হারিয়ে-রোহিঙ্গারা ব্যাপকহারে (২০১২-২০১৫) সাগর পথে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল। এই সময় এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারীদের দল। একটি গবেষণায় প্রকাশ-২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত, প্রায় এক লাখ সত্তুর হাজার মানুষ মানাবপাচারকারীদের হাতে পড়ে পাচার হয়েছে। কিছু বাংলাদেশী নাগরিক ছাড়া পাচারকৃত এসব মানুষ সবাই রোহিঙ্গা। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সংঘবদ্ধ এইসব মানবপাচারকারী মানুষ পাচারের মাধ্যমে বছরে ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। যাত্রাপথে এইসব নারী, পুরুষ আর শিশুদের উপর চালানো হয় জঘন্য অত্যাচার ও নিপীড়ন। এই রোহিঙ্গাদের অনেকে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় থাকা তাদের আত্মীয়দের কাছে যাওয়ার জন্য নিজেরাই ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পথে বের হয়েছিল। আবার অনেকে মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে অবৈধভাবে সমুদ্র পথে সফর করতে বাধ্য হয়। অনেক সময় আটকে রাখা পাচারকৃত রোহিঙ্গাদের আত্মীয়স্বজন থেকে অর্থ আদায় করা হতো।

রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার ‘ট্রানজিট’ যখন থাইল্যান্ড

২০১৫ সালের মে মাসে আন্দামান সমুদ্রে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জীর্ণ নৌকায় চড়ে সমুদ্রে ভাসছিল। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এই অসহায় মানুষদের গ্রহণ করছিল না। এই বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা হলে-সারা বিশ্বে হৈ চৈ পড়েছিল। মানবপাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার সময় থাইল্যান্ডকে ‘ট্রানজিট’ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ২০১৫ সালের মে মাসে থাইল্যান্ডের দুর্গম পাহাড়ে ৩২ টি অগভীর কবরের সন্ধান পাওয়া যায়। এটি থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার সীমান্তে অবস্থিত একটি স্থান। যেখানে পাচারের পূর্বে রোহিঙ্গাদের অপেক্ষায় রাখা হতো ধারনা করা হয়। পরে মালয়েশিয়ার পুলিশ দেশটির সীমান্ত অঞ্চলে ১৩৯ টি কবরের সন্ধান পায়। উল্লেখ্য, মে মাসের প্রথম দিকে থাই কর্তৃপক্ষ মানবপাচারকারি চক্রগুলোর কর্মকান্ড কঠোরভাবে দমনের উদ্যোগ নেওয়ার পর আন্দামান সাগরে ভাসমান হাজার হাজার অভিবাসন প্রত্যাশির সংকটের চিহ্ন প্রকাশ পায়।

সমুদ্র পথে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে থাইল্যান্ড ‘পুশ ব্যাক টু সী’ (রিফাউলমেন্ট) নীতি অনুসরণ করে। উপকুল রক্ষী বাহিনী সাধারণত এইসব শরণার্থী বহনকারী নৌকাগুলো ফিরিয়ে দেয়। কখনো এইসব অভিবাসিদের নৌকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করে আবার সমুদ্রে ঠেলে দেওয়া হয়।

দুর্ধষ্য মানবপাচারকারী চক্র পালিয়ে আসা অসহায় রোহিঙ্গাদের থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় স্লেভ লেবার বা ‘দাস শ্রমিক’ হিসেবে ব্যবহার করে। বিশেষত থাইল্যান্ডের ‘চিংড়ি মাছের শিল্পে’ এই দাস শ্রমিকদের ব্যবহার করানো হয়। মাছের মতো রোহিঙ্গাদের বিক্রি করা হয়েছে হাত বদল হয়েছে। থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ‘রোহিঙ্গা দাস শ্রমিক’ গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিনত হয়েছিল। এ নিয়ে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা থাই সরকারের সমালোচনা করেছে। থাই কর্তৃপক্ষের একাংশ কিভাবে রোহিঙ্গাদের দুর্গম অঞ্চলে ‘ক্যাম্পে’ আটকে রেখে পরে মানবপাচারকারীদের কাছে বিক্রি করতো-এই মর্মে ‘রয়টার’ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ৫ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে প্রকাশ করেছিল (থাইল্যান্ড’স ক্লেনডেনস্টাইন রোহিঙ্গা পলিসি আনকাভারর্ড)

থাইল্যান্ডে মানবপাচারের এই জঘন্য কাজে পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যাপক যোগসাজস ছিল। পরবর্তীতে এ জন্য, থাই সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল ও কয়েকজন পুলিশ অফিসারের কঠোর শাস্তি হয়েছিল। তবে আশ্চর্য বিষয়, এতো বড় ঘটনায় খোদ মিয়ানমার সরকারের টিকিটাও স্পর্শ করা যায়নি। এই পৃথিবীতে রোহিঙ্গাদের দেখার কি কেউ নেই? সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবনতা এখনও চলছে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে থাইল্যান্ডে আলোচনা

লক্ষ্য করি, থাইল্যান্ডে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আলোচনা খুব কম। এর প্রধান কারণ হলো রাখাইনের সঙ্গে থাইল্যান্ডের কোন সীমান্ত নেই। মিয়ানমারের কায়িন (কারেন), কায়াহ (কারেন্নি), মন ও শান স্টেটের বিষয়গুলো থাইল্যান্ডে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়। রোহিঙ্গাদের ধর্মের (ইসলাম) বিষয়টিও হয়তো এ ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে।

তবে ২০১৫ সালের মে মাসে ‘রোহিঙ্গা নৌকা শরণার্থী সমস্যা’ এবং বিশেষত দক্ষিণ থাইল্যান্ডে রোহিঙ্গাদের নিয়ে থাই মানবপাচারকারীদের জঘন্য সংশ্লিষ্ঠতা বিশ্বজুড়ে হৈ চৈ ফেলে। তখন থাইল্যান্ডে রোহিঙ্গা শরণার্থী বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। থাই সমাজে রোহিঙ্গাদের প্রতি উল্লেখ করার মতো সমবেদনা নেই। আবার তীব্র অপছন্দও নেই। বর্তমানে বিভিন্নভাবে থাইল্যান্ডে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

মিয়ানমার বাহিনী (তাতমাদো) সামলানোর মূলমন্ত্র জানে থাই আর্মি

থাইল্যান্ড সশস্ত্রবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ থাই সেনাবাহিনী (রয়াল থাই আর্মি) একটি শক্তিশালী বাহিনী। এরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাহীন থাইল্যান্ডে অনেকবার অভ্যূত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে। জাতীয় রাজনীতিতে তাদের ব্যাপক প্রভাব আছে। থাই সেনাবাহিনী (স্পেশাল ওয়ারফেয়ার কমান্ড, টাস্কফোর্স-৯০) দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পিএসএফ/এসএসএফ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। কম্বোডিয়ার শান্তি মিশনে থাই সেনাবাহিনীর একটি ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে কাজ করতো। সেই অঞ্চলে দায়িত্বপালন কালে বন্ধু সূলভ থাই সেনাবাহিনী সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সেনানিবাস, বাসস্থান, যানবাহন, অবকাঠামো ইত্যাদি বিবেচনায় আপত দৃষ্টিতে থাই বাহিনী হয়তো ঝঁলমলে নয়। তবে তারা পেশাদার বাহিনী, আধুনিক অস্ত্র সরঞ্জামে সজ্জিত (আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড) এবং আভিযানিকভাবে খুব দ্ক্ষ।

দূধর্ষ তাতমাদোকে কিভাবে মোকাবেলা করে থাকে থাই আর্মি? থাই সেনাবাহিনী মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে (তাতমাদো) সামলানোর মূল মন্ত্রটা ভালোভাবে জানে- ‘‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী শুধু অস্ত্র বা শক্তির ভাষাই বোঝে...। তাতমাদোর এটাই একমাত্র ওষুধ। তাই আন্তরিকতা, বন্ধুত্ব দেখালেও প্রয়োজনে থাই সেনাবাহিনী অস্ত্রের ভাষায় বা শক্তির মাধ্যমে জবাব দেয়’’। পাতায়ায় কর্ণেল জনসন এমন একটা কথা বলেছিলেন।

ভূ-রাজনৈতিক জ্ঞান-বোঝাপড়া, বাস্তবতা-উপলদ্বি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত সংঘাত মোকাবেলা, ড্রাগ ও অস্ত্র চোরাচালান বিরোধী কর্মকান্ড, প্রক্সি যুদ্ধ পরিচালনা, সীমান্ত বাণিজ্য, ইত্যাদি পরিচালনা-ব্যবস্থাপনায়থাই সেনাকর্মকর্তা/জেনারেলদের গতিশীলতা, দক্ষতা, গভীর বোঝাপড়া ও দুর্দান্ত সামর্থ আছে। কর্ণেল জনসন বলেছিলেন- ‘‘দিস গাইস আর ব্লাডি কেপাবল। দে আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যা গেম’’।

থাই সেনাবাহিনীর ৫ টি সামরিক এলাকা (কমান্ড) রয়েছে। একেক সীমান্তে একেক ধরণের দায়িত্ব। চিয়াং মাইয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে (গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল) ‘ফুট আর্মি’ বা ‘বাইসাইকেল আর্মি’। সেখানে যুদ্ধ মূলত ড্রাগ ব্যবসায়িদের সঙ্গে। থাইল্যান্ডের দক্ষিণ অঞ্চলে বিশেষ করে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় একধরণের মৃদু (লো-ইনটেনসিটি) ইনসারজেন্সি বা বিদ্রোহ চলছে। উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডের দক্ষিণে ৩ টি প্রদেশ মালয়-মুসলিম অধ্যুষিত। বিদ্রোহীরা এই অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন চায়। সেখানে থাই সেনাবাহিনী নিয়োজিত রয়েছে। তবে বর্তমানে সেখানকার পরিস্থিতি শান্ত।

থাইল্যান্ডের ‘চিকেন নেক’ অঞ্চলে ভ্রমণ!

থাই সেনাবাহিনী থিউরি থেকে ভূমি পর্যায়ে ব্যবহারিক বিষয়ে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাদের আভিযানিক দক্ষতা অত্যন্ত প্রসংশনীয়। ব্যাংকক থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার রেললাইন ও সড়ক তৈরী হয়েছে অরণ্যময় টেনাসারিম পার্বত্য অঞ্চলের মধ্য দিয়ে। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের ম্যাপের দক্ষিণ দিকে তাকালে দেখা যায় যে, একটি সংকীর্ণ অঞ্চলে দু’টি দেশের সীমানা চলে গেছে। এটি মূলত মালয় পেনিনসূলার উত্তর অংশ। পশ্চিমে আন্দামান সাগর (মিয়ানমার), পূর্ব দিকে গালফ অফ সিয়াম (থাইল্যান্ড)। থাইল্যান্ডের এই এলাকার ‘খোলং ওয়ান’ (প্রাচুক খিরি খান রাজ্য) অঞ্চলটি হলো থাইল্যান্ডের ‘সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্ট’ বা ‘ন্যারোয়েস্ট পয়েন্ট’। এখানে থাইল্যান্ডের সীমানা বা এলাকা মাত্র ১১ কিমি বা ৬ মাইল বিস্তৃত। এর কাছেই সিংখোন পাস ও মিয়ানমারের ডান সিংকন বর্ডার পোস্ট অবস্থিত। এটাকে সাধারণভাবে থাইল্যান্ডের ‘চিকেন নেক’ বলা যায়। এই অঞ্চলটি থাইল্যান্ডের জন্য রণকৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর।

থাই সেনাবাহিনী আভিযানিক প্রস্তূতির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। রয়েল থাই আর্মি কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজ প্রতি বছর সামরিক-ছাত্রদের নিয়ে বিভিন্ন সামরিক এলাকা সফর করে এবং ঐ অঞ্চলের আভিযানিক পরিকল্পনা বা অপারেশনাল প্লান পর্যালোচনা করে। তৎকালীন মেজর তোফায়েল আহমেদ (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) থাইল্যান্ডে স্টাফ কলেজ করা কালিন সময়ে, তাদের ‘ফাইনাল এক্সারসাইজ’ পরিচালিত হয়েছিল এই চিকেন নেক ‘খোলং ওয়ান’ এলাকায়। এটি ছিল বিদেশী ছাত্রদের জন্য অত্যন্ত মজার একটি অভিজ্ঞতা।

১৯৯৩ সালের মার্চ। কম্বোডিয়ায় শান্তি মিশন থেকে আমি ব্যাংকক থেকে ট্রেনে মালয়েশিয়ার কুয়ালামপুরের দিকে যাচ্ছি...। প্রায় মধ্য রাত। ট্রেনটি থাই-বার্মা সীমান্ত এলাকা (চিকেন নেক) দিয়ে অরণ্যময় টেনাসারিম পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমার কম্পার্টমেন্টে ব্রিটেনের একজন সাহসী তরুন পর্যটক। ট্রেনটি ততক্ষণে মিয়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করে আরো দক্ষিণে মালয়েশিয়ার দিকে চলমান। তখন ব্রিটিশ তরুনটি আমাকে জানালো যে, ‘‘আগামী কয়েক ঘন্টা ধরে ট্রেনটি দক্ষিণ থাইল্যান্ডের একটি সংঘাতপ্রবন এলাকার মধ্য দিয়ে যাবে। স্থানীয় গেরিলারা ট্রেনে আক্রমণ করতে পারে, বোমাও ফেলতে পারে। সাবধান”। তার সতর্কতা পাত্তা না দিয়ে আমি রাত্রিকালীন দক্ষিণ থাইল্যান্ড দেখতে থাকি।

তখন আমি জানতাম না, আমি যে অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে ট্রেনে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলাম সেটি পরবর্তীতে রোহিঙ্গা পাচারকারীদের মূল রুটে পরিনত হবে। রাখাইন থেকে হাজার হাজার ‘রোহিঙ্গা নৌকা শরণার্থীদের’ নিয়ে দূধর্ষ মানবপাচারকারীরা থাইল্যান্ডের অরণ্যময় রেনং-ফাং না-বান ক্লোং টর-সাডাও-পাদাং বাসার এলাকার ক্যাম্পে আটকে রাখতো এবং পরে মালয়েশিয়া পাচার করতো। কি অদ্ভূত জীবন রোহিঙ্গাদের।

থাইল্যান্ডের কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কিছু সেনা, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল, কারেন প্রদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও মায় সটের কাছে ড্রাগ পাচার, ক্যাসিনো এনক্লেভ ও কল সেন্টার, স্ক্যাম সেন্টার এ জড়িত আছে বলে জানা যায়। গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ‘দৈনিক মানবজমিন’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে (মিয়ানমারে আটক ১৮ বাংলাদেশীর ফেরার আকুতি) জানা যায়, কারেণ অঞ্চলের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠির নিয়ন্ত্রণে থাকা স্ক্যাম সেন্টারে কিছু বাংলাদেশীও জিম্মি অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। ঐ স্ক্যাম সেন্টারগুলোর নিয়ন্ত্রক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেন্দ্রিক একটি আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্র।

থাইল্যান্ডে যত ভ্রমণ

কম্বোডিয়া শান্তিমিশনে (১৯৯২-৯৩) শান্তিরক্ষীদের কাছে থাইল্যান্ড (বিশেষত সীমান্তবর্তী এলাকা) অনেকটা ‘মিশন এরিয়ার’ মতোই ছিল। উল্লেখ্য, কম্বোডিয়ায় মিশনে যোগদানের জন্য ৩য় ইস্ট বেঙ্গল (বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন) ঢাকা থেকে ১৯৯২ সালের এপ্রিলে বিমানে থাইল্যান্ডের উথাপা বিমানবন্দর হয়ে পাতায়া আসে। এর পর পাতায়া থেকে সড়ক পথে বিশাল কনভয় যোগে এই কন্টিনজেন্ট অরন প্রথেট হয়ে কম্বোডিয়ায় পৌঁছেছিল। উল্লেখ্য, কম্বোডিয়া শান্তিমিশনে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন লেঃ কর্ণেল খোন্দকার কামালুজ্জামান (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)।

কম্বোডিয়ার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে (থাইল্যান্ডের পূর্বাঞ্চল) দায়িত্ব পালনকালে থাইল্যান্ডের ‘অরণ প্রথেট’ অঞ্চলে যাওয়া হয়েছিল। মূলত অরণ প্রথেট এলাকায় কম্বোডিয় শরণার্থীদের ক্যাম্প ছিল। কম্বোডিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় (১৯৭০-১৯৮০ দশকে) প্রায় ৩৭০০০০ কম্বোডিয় শরণার্থী থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছিল। ১৯৯২ এর মার্চে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শরণার্থীরা দেশে ফেরা শুরু করে। শান্তিরক্ষী হিসেবে এই প্রত্যাবাসন কর্মকান্ডের সঙ্গে আমি কিছুটা জড়িত ছিলাম।

পরে ব্যাংকক থেকে উত্তর পূর্বাঞ্চলের শহর নংখাই হয়ে লাওস ভ্রমন করেছি। ব্যাংকক থেকে ট্রেনে মালয়েশিয়া (হাট ইয়াই-পাদাং বাশার) যাওয়ার সময় মুসলমান-প্রধান দক্ষিণ থাইল্যান্ডের কিছুটা দেখা হয়েছিল।

এবার বার্মা সীমান্তে বিশেষত থাইল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চল (বার্মার পূর্বাঞ্চল) ভ্রমণের পরিকল্পনা ও তথ্য সংগ্রহ করি। ‘মিশন মায় সট’! মায় সট শহরটি মিয়ানমার-থাইল্যান্ডের প্রধান সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র ও বার্মা যাওয়ার গেটওয়ে। এর প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কাঞ্চনবুরি। এখানে গেলেই বিখ্যাত ‘ব্রীজ অন রিভার কাওয়াই’ দেখা যায়।

থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ভূমিকা

আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারক ও বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন যে, মিয়ানমারের সংকট সমাধানে থাইল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘতম সীমান্ত, দুই দেশের পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ ও আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ায় থাইল্যান্ড মিয়ানমারের ‘শান্তি বিনির্মাণে’ (পিস বিল্ডিং) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সামর্থ্য রয়েছে থাইল্যান্ডের। মিয়ানমারের সংঘাত-উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য থাইল্যান্ড একটি শক্তিশালী স্পেশাল টাস্কফোর্সও গঠন করেছে। এই টাস্কফোর্স যুদ্ধাক্রান্ত অঞ্চলের মানুষের সাহায্যে পাঠানোর বিবেচনা করছে। অনেক বিশেষজ্ঞ আশাবাদী যে, থাই সরকার মিয়ানমারের সকল অংশিজনের মধ্যে একজন মধ্যস্থতাকারী এর ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

থাইল্যান্ড আসিয়ান প্লাটফর্ম ব্যবহার করেও মিয়ানমারের অভ্যন্তরিন সংকট সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জান্তা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতা করার চেষ্টা করছে। এছাড়াও থাইল্যান্ড আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ‘আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর’ চেষ্টা করছে। যেমন- মিয়ানমারসহ আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা চুক্তি করেছে।

থাইল্যন্ড ভ্রমণে কি শিখলাম?

থাইল্যান্ড থেকে এবার কি কি শিখলাম? থাইল্যান্ড অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছে। থাইল্যান্ডের সাফল্যের অন্যতম প্রধান একটি কারণ হচ্ছে, সে দেশের নাগরিকরা তাদের রাজনৈতিক স্থিতিহীনতাকে সামাজিক অরাজকতায় রূপান্তরিত হতে দেয়নি (যেটা আমরা চমৎকারভাবে করেছি!)। তাদের সাফল্যের আরেকটি কারণ- শিল্পজাত দ্রব্যের উৎপাদনের বিকাশ আর তার রফতানিতে অভূতপূর্ব সাফল্য। ব্যবসা বান্ধব থাইল্যান্ড হলো বিদেশী বিনিয়োগের সুবর্ণভূমি।

রাষ্ট্রিয় কর্মকান্ড, পররাষ্ট্র নীতি এবং অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে থাইল্যান্ডের মানুষের বাস্তবধর্মিতা আছে। থাইল্যান্ডের শাসকগণ অত্যন্ত বিচক্ষণ। কয়েক শতাব্দী আগে বিদেশীদের আগমন হয়েছিল সেই দেশে। কিন্তু বিচক্ষণতার সঙ্গে (কিংস ডিপ্লোমেসি) থাই শাসকগণ তাদের সঙ্গে বাণিজ্য করেছে। কিন্তু বিদেশীদের মানদন্ডকে রাজদন্ডে পরিনত হতে দেয়নি। সব সময় স্বাধীন থেকেছে এই অঞ্চলের একমাত্র দেশ থাইল্যান্ড।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকেই থাইল্যান্ডের প্রতিবেশী সকল দেশ (লাওস, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া) দীর্ঘ যুদ্ধের আগুনে পুড়েছে। কিন্তু থাইল্যান্ডের নেতারা কূটনৈতিক পারদর্শিতা ও বিচক্ষনতা দিয়ে দেশকে যুদ্ধ থেকে রক্ষা করেছে। এম্বেসেডর শাহেদ আকতার দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে থাইল্যান্ডে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বলেন- ‘‘বলা হয়, থাইল্যান্ডে প্রত্যেক সমস্যার একটা স্থানীয় ‘থাই সলিউশান’ (সমাধান) আছে। থাইল্যান্ডের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী আনন্দ পানইয়াচুন বলেছিলেন- ‘‘আমাদের ম্যানেজমেন্টের ধরণ আলাদা’’। থাইল্যান্ড থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

থাইল্যান্ডের ‘মিয়ানমার পলিসি’ থেকে শিক্ষণীয়

থাইল্যান্ড ভ্রমণকালে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র-সামরিক-কৌশলগত বিষয়াদি বিশেষত ‘মিয়ানমার পলিসি বা নীতি’ থেকে টেকএওয়ে বা শিক্ষণীয় বিষয়গুলো আবার মনে পড়লো...। (ক) থাইল্যান্ডের নেতৃত্বের বিচক্ষণতা, (খ) কূটনীতিতে পারদর্শীতা ও বাস্তব সম্মত সাহসী পদক্ষেপ, (গ) সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় থাই সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, (ঘ) বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে নিজস্ব ‘থাই সলুশান’, (ঙ) সীমান্ত পরিস্থিতি ও ভূকৌশলগত বিষয়ে থাই সেনাবাহিনীর মতামতে গুরুত্ব, (চ) রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড ও অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে বাস্তব ধর্মিতা, (ছ) মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যাপক সীমান্ত-বাণিজ্যের সুবিধা নেয়া (ইনফরমাল ট্রেড), (জ) মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও এথনিক সশস্ত্র গোষ্ঠি সামলানোর মূল মন্ত্র-অস্ত্র/শক্তির ভাষায় কথা বলা, (ঝ) রাজনীতি-সামরিক-কৌশলগত বিষয় থেকে অর্থনীতিকে আলাদা রাখা..., (ঞ) অন্য দেশের বিষয়ে না জড়ানো।

রাখাইন ট্রেন মিস করা যাবেনা

জানুয়ারী ২০২৫। ১৮ মাস পরের কথা। বর্তমানে থাইল্যান্ডের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার (প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা, ফেউ থাই পার্টি) মিয়ানমার-বিষয়ক নীতির কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। সে দেশে যুদ্ধবন্ধে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায়, গত ১৯ ডিসেম্বর মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলো নিয়ে থাইল্যান্ডের উদ্যোগে ব্যাংককে পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় আসিয়ান দেশসমূহের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক। আসিয়ান নেতারাও মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও তার বিরোধী পক্ষকে দেশটির গৃহযুদ্ধে রক্তপাত বন্ধ করতে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে চাপ দিয়েছে (অক্টোবর ২০২৪) । রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকাকে দ্রুত সাহসী ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের কিন্তু রাখাইন ট্রেন মিস করা যাবে না।

এখন ঢাকার সক্রিয় হওয়ার সময়। আমাদের মনে রাখতে হবে, নেকড়ে অধ্যুষিত অরণ্যে পূর্বের মতো লুম্বিনী পার্ক বা শান্তি নিকেতন সূলভ ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ আধুনিক রাষ্ট্রে উপযোগী নয়।

ঈদের দিন সেন্ট্রাল মসজিদে দেখা রোহিঙ্গা যুবক শাহনেওয়াজ আহমদের কথা মনে পড়লো। বাংলাদেশের কাছে রোহিঙ্গাদের অনেক প্রত্যাশা। বলা যায়, এখন রাখাইন থেকে বাংলাদেশে ৪র্থ রোহিঙ্গা ঢল’ নামছে। এটা বন্ধ করতেই হবে। দক্ষিণ পূর্ব সীমান্ত নতুন প্রতিবেশীর (রাখাইন) জন্ম হতে চলেছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। কিন্তু অসাধারণ সুযোগও তৈরী হয়েছে।

আমি যখন থাইল্যান্ড বেড়াচ্ছিলাম, (জুন ২০২৩) তখন শান রাজ্যে তিনটি গেরিলা দল (আরাকান আর্মি, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স আর্মি ও তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি) একত্রে যুদ্ধ করা নিয়ে আলোচনা করছিল। এই তিনটি গেরিলা দল পরে ‘থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্স’ গড়ে তুলেছে। ‘আরাকান আর্মি’ রাখাইন অঞ্চলে নতুন ভাবে যুদ্ধ শুরু করেছে ও প্রায় ৯০ ভাগ অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। অন্য অঞ্চলেও বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলো ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে।

অপরূপ থাইল্যান্ড ভ্রমনকালে বিভিন্ন ব্যক্তির মিথস্ক্রিয়া ও আলাপচারিতায় পাওয়া মিয়ানমার বিষয়ক ইঙ্গিত ও সম্ভাবনাগুলোকে এখন মিলিয়ে দেখছি। কিছু ইঙ্গিত অবশ্য তখন পরিস্কারভাবে বুঝতে পারিনি। তবে ধারণা হয়েছে। কর্ণেল জনসন মিয়ানমারের ‘শান’ রাজ্যের কথা অনেকবার বলেছিলেন।‘‘ সামথিং ইজ কুকিং আপ দেয়ার?’’ এই সাবেক দূঁদে-গোয়েন্দা কর্ণেল কি ‘থ্রি ব্রাদারহুড এ্যালায়েন্স’ এর কথা বলেছিলেন? অধ্যাপক খিন মঙ বলেছিলেন- ‘‘২০২৪ সালে কিছু পরিবর্তন হয়তো দেখতে পাবেন’’।

রাখাইনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা কৌশলের যে পরীক্ষা

মিয়ানমারের রাখাইন স্টেটের পরিস্থিতি বর্তমানে একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের পতন বা পরিবর্তন খুব অল্প সময়ের মধ্যে কাবুল বা দামাস্কাস স্টাইলে হয়তো হবে না। তবে পতনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত সম্পর্ক এবং উপস্থিতি গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ যে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, তার কূটনৈতিক নীতি কীভাবে এই পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে এবং কীভাবে রাখাইন স্টেটের স্বাধীনতা বা কনফেডারেশনের প্রশ্নে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্র কৌশলকে সামঞ্জস্য করতে পারে, তা নিয়ে একটি সুষম বিশ্লেষণ ও আলোচনা দরকার।

রাখাইন স্টেটের পরিস্থিতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক নীতি এবং নিরাপত্তা কৌশলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। যা আগামীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম বড় পরীক্ষা হতে পারে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের পতনের ইঙ্গিত এবং রাখাইনে আঞ্চলিক শক্তির পালাবদল, বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য সুযোগও তৈরি করেছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি তার পররাষ্ট্র নীতি এবং নিরাপত্তা কৌশলকে দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করতে পারে, তবে শুধু রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনই সম্ভব হবে না, বরং রাখাইন রাজ্যের স্বাধীনতা বা কনফেডারেশনের প্রশ্নেও বাংলাদেশে অবস্থান পরিষ্কার হবে।

মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন রাজধানীতে অনেক ব্যস্ততা। মিয়ানমারের বিশাল একটা অংশ এথনিক সশস্ত্র গোষ্ঠি ও এনইউজি এর নিয়ন্ত্রণে আসায় থাইল্যান্ডও তাদের মিয়ানমার নীতির কিছুটা পরিবর্তন করেছে। আসিয়ানও এগিয়ে আসছে। ঢাকার এখন যথাযথ কূটনীতি ও কৌশলগত পদক্ষেপ প্রয়োগের সময়।

প্রায় ৬০০ শত বছর আগে মধ্যযুগে, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা (বেঙ্গল বা বঙ্গের অধিবাসীরা) আরাকান বা রাখাইনে একধরণের ‘হিতৈষী অভিভাবক সুলভ’ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যখন রাখাইন (বৌদ্ধ)-রোহিঙ্গা ও অন্যান্য মুসলমান জাতিগোষ্ঠি একত্রে ম্রাউক-উ (পাত্থুরিকিল্লা) ভিত্তিক এক প্রাণবন্ত ‘নগর সভ্যতা’ গোড়াপত্তন (১৪২৯ সাল) করেছিল। আশাকরি, এর প্রায় ৬০০ বছর পর, নতুন পরিবেশে ‘নুতন বাংলাদেশ’ এর সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকগণ এই অসাধারণ সুযোগ সুন্দরভাবে কাজে লাগাবে। এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও রক্ষিত হবে।

রাখাইনে একটি বাংলাদেশী সল্যুশনের (সমাধান) সন্ধানে

এই লেখায় থাইল্যান্ডের আলোচিত পলিসি ও কৌশলগুলো বাংলাদেশের মিয়ানমার বিষয়ক সমস্যা/চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি মডেল হতে পারে। মিয়ানমার বিষয়ে, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার পার্থক্য রয়েছে। তবুও থাইল্যান্ডের পলিসি ও কৌশলগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুকরণীয় হতে পারে। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা ইস্যু, সীমান্ত নিরাপত্তা, সীমান্ত বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের অনুসৃত পদক্ষেপগুলো অনুসরণযোগ্য। রাখাইনের বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ‘থাই সল্যুশনের’ মতো একটি ‘বাংলাদেশী সল্যুশান বা সমাধান’। আশা করি, ‘নতুন বাংলাদেশের’ ঢাকা এ ক্ষেত্রে সফল ভূমিকা রাখবে।

মো. বায়েজিদ সরোয়ার: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক

ছবি : সংগৃহীত

মিয়ানমার ভেঙে নতুন দেশ হচ্ছে? কিন্তু কীভাবে

মিয়ানমার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। বর্তমানে সেখানে গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার বিরাজ করছে। গত কয়েক বছর ধরে দেশটির বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠী সামরিক জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তবে এ গৃহযুদ্ধে শুধু দেশটির ভবিষ্যৎ নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককেও সংকটময় করে তুলেছে। এর মধ্যে মিয়ানমারের কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী নতুন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করছে। তবে, প্রশ্ন উঠছে—এটা কি সম্ভব? মিয়ানমারে নতুন একটি দেশ কীভাবে জন্ম হতে পারে? এ প্রক্রিয়ায় কার কী ভূমিকা রয়েছে?

বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর কার্যকলাপ

মিয়ানমারে বর্তমানে ৫০টিরও বেশি জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে, যারা দীর্ঘসময় ধরে সামরিক জান্তা সরকারের শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য লড়াই করতে। এর মধ্যে কিছু গোষ্ঠী নিজেদের দেশের শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হতে চাইছে। এমনই একটি গোষ্ঠী হলো আরাকান আর্মি। তারা রাখাইন রাজ্যের ব্যাপক অংশ দখল করেছে। আরাকান আর্মি তাদের নিজস্ব অঞ্চল তৈরির স্বপ্ন দেখছে। তারা মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও সামরিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

রাখাইনের কৌশলগত গুরুত্ব

রাখাইন রাজ্যটি মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস মজুত রয়েছে। এ ছাড়া রাখাইন রাজ্যটি চীনের জন্য কৌশলগতভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। মিয়ানমারের এই অঞ্চলে চীন বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায়। চীন রাখাইনে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বিনিয়োগ করেছে। এটি তাদের ভারত মহাসাগরে প্রবেশের পথ সহজ করবে। এ কারণে চীন রাখাইন রাজ্যকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে। তাই তাদের শাসনাধীন রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

আরাকান আর্মি এরই মধ্যেই মিয়ানমার ইউনিয়নের রাখাইন রাজ্যের ১৮টি শহরের মধ্যে ১৫টি দখল করে নিয়েছে। প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ৩০০ কিলোমিটার সীমান্তবর্তী এলাকাও এখন সেই বাহিনীর দখলে।

বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিভাজন

মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একতা নেই। যেহেতু তারা বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্যে বিভক্ত, তাদের আদর্শ ও লক্ষ্যও আলাদা। কিছু গোষ্ঠী যেমন আরাকান আর্মি, স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে কিছু গোষ্ঠী কেবল স্বায়ত্তশাসনের জন্য সংগ্রাম করছে। এই বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বিদ্রোহী আন্দোলনকে দুর্বল করে তুলছে।

তবে, চীনের ভূমিকা এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে সহায়তা করতে পারে। চীন মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। তারা বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। চীনের কূটনৈতিক তৎপরতা মিয়ানমারে নতুন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনাকে আরও জটিল করে তুলেছে, কারণ চীন শুধু শান্তির জন্য কাজ করছে না, বরং তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থও রয়েছে।

চীনের কূটনৈতিক ভূমিকা

মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে চীন খুবই সক্রিয়। চীনের লক্ষ্য মিয়ানমারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে নিজেদের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সুবিধা অর্জন করা। তারা মিয়ানমারে শক্তিশালী অর্থনৈতিক এবং সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে চায়। এই কূটনৈতিক তৎপরতা কখনো কখনো বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। তারা তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে মিয়ানমারের জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একাধিক বিরোধ থাকায় চীনের ভূমিকা এই বিরোধকে আরও তীব্র করতে পারে। কারণ চীন শুধু মিয়ানমারের ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

মিয়ানমার সরকারের চ্যালেঞ্জ

মিয়ানমারের জান্তা সরকার আরাকান আর্মির অস্তিত্বকে একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। যদিও চীন ও ভারত উভয়ই জান্তা সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবে তারা আরাকান আর্মির প্রতি যথেষ্ট আগ্রহও দেখিয়েছে। বিশেষ করে চীন রাখাইনে তার গ্যাস পাইপলাইন ও বন্দর নির্মাণ প্রকল্পে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছে, সেখানকার পরিস্থিতি খারাপ হলে তাতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে ভারতও রাখাইনের কালাদান মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে অঞ্চলটির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেছে।

নতুন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা

মিয়ানমারে কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী, বিশেষ করে আরাকান আর্মি, তাদের নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে। তবে এমন একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন অনেক জটিল বিষয়। আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতে এটি মিয়ানমারের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। অন্যদিকে, এই নতুন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন এক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে।

কীভাবে সম্ভব

নতুন একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া সহজ নয়। এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জাতিগত সংঘাত ও সামরিক শক্তির এক বিরাট পরীক্ষার মধ্যে পড়বে। প্রথমত, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যদি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করতে পারে, তবে তারা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করতে হলে তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে অনুমোদন পেতে হবে। যদি জাতিসংঘ এবং বিশ্বের পরাশক্তির দেশগুলো এই নতুন রাষ্ট্রকে সমর্থন করে, তবে এটি একটি বাস্তবতা পেতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হতে পারে।

বাংলাদেশের উদ্বেগ


বাংলাদেশের জন্য এ পরিস্থিতি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের কক্সবাজার সীমান্ত থেকে মাত্র কিছু কিলোমিটার দূরে আরাকান আর্মি একটি নতুন রাষ্ট্র গঠন করলে বাংলাদেশকে নতুন করে কূটনৈতিক ও সামরিক প্রস্তুতি নিতে হতে পারে। রোহিঙ্গা সংকট থেকে শুরু করে সীমান্ত সমস্যায় বাংলাদেশের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

চীনের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ

চীন মিয়ানমারের জাতিগত গোষ্ঠীগুলির মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর পেছনে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বাণিজ্যিক লাভের আগ্রহও রয়েছে। চীনের সহায়তায় মিয়ানমারে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও জান্তা সরকারের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে। কিন্তু এটি যদি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে মিয়ানমারের পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

পরিশেষে, মিয়ানমারে নতুন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা অনেকটাই রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক শর্তাবলির ওপর নির্ভর করছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে একতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ছাড়া এটি কঠিন চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

মিয়ানমার ভেঙে নতুন দেশ


যে গ্রামে ৫০০ বছর আগে বসতি গড়েছিল পর্তুগিজরা by মোহাম্মাদ মোরশেদ হোসেন

চারদিকে পাহাড়ঘেরা সবুজ মাঠ। সুনসান পরিবেশ। হরেক রকম ফুল ও পাতাবাহারগাছে পাখিদের কলকাকলি। মাঠের একপাশে পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ির ধাপ। সিঁড়ি বেয়ে উঠলে দেখা যায় কাচেঘেরা যিশুমাতা মরিয়মের প্রতিকৃতি। আশপাশে বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন আশ্রম ও ধ্যানঘর। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের দেয়াঙ পাহাড়ের নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত এই আশ্রমের নাম মরিয়ম আশ্রম। পর্তুগিজ বণিকদের হাতে পত্তন হওয়া প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো খ্রিষ্টান পল্লিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এই আশ্রম।

চট্টগ্রাম শহর থেকে দেয়াঙ পাহাড়ে যেতে পার হতে হবে শাহ আমানত সেতু। সেখান থেকে কোরীয় রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (কেইপিজেড) গেটে গিয়ে নামতে হবে। গেটে থেকে কেইপিজেড সড়ক ধরে এক কিলোমিটার গেলেই দেয়াঙ পাহাড়ের মরিয়ম আশ্রম।

আশ্রমের প্রবেশপথে মূল ফটকের পাশে ক্রুশসম্বলিত একটি পাথরের ফলকে বড় করে লেখা আছে—‘দিয়াঙে খ্রিস্টবাণী প্রচারের গোড়াপত্তন।’ সেখান থেকেই জানা গেল, ১৫১৮ সালে চট্টগ্রামে আসেন পর্তুগিজ বণিকেরা। ১৫৩৭ সালের দিকে তাঁরা দেয়াঙ পাহাড় এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। দক্ষিণ ভারতের কোচিন থেকে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের জন্য ১৫৯৮ সাল থেকে চট্টগ্রামে মিশনারি ও যাজকেরা আসতে থাকেন। যাঁদের মধ্যে প্রথম আসেন জেসুইট ধর্মসংঘের পুরোহিত ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্দেজ। ১৫৯৯ সালে দেয়াঙে চট্টগ্রামের প্রথম গির্জা নির্মাণ করেন তিনি। ১৬০০ সালে তিনি চট্টগ্রাম শহরের বান্ডেল রোড ও জামালখান এলাকায় আরও দুটি গির্জা নির্মাণ করেন।

মরিয়ম আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ব্রাদার ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্তের স্মৃতিস্তম্ভও দেখা গেল পাহাড়ের ওপর। আশ্রম ঘুরে দেখার সময় একটি প্রার্থনাঘর থেকে বেরিয়ে আসেন আশ্রমের সুবর্ণজয়ন্তীর প্রচার ও প্রকাশনা কমিটির সমন্বয়কারী ব্রাদার সিলভেস্টার মৃধা। তিনি বলেন, দেয়াঙের পাঁচ শ বছরের ইতিহাসকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। একটি হচ্ছে গোড়াপত্তনের, আরেকটি শেষের দিকের এক শ বছরের ইতিহাস। মরিয়ম আশ্রমের পাশে জোশেফ পাড়া ও মরিয়ম পাড়ায় প্রায় হাজারখানেক মানুষ বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছেন। ১৬২৯ থেকে ১৬৩১ সাল পর্যন্ত পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত আগস্টিনিয়ান যাজকেরা দেয়াঙে ছিলেন। এখনো ওই পর্তুগিজ বংশের ১২টি পরিবার এবং ডি রোজা বংশের ১১টি পরিবার দেয়াঙ পাহাড়ে আছে।

ব্রাদার সিলভেস্টার মৃধা আরও বলেন, ১৯৩২ সালের ১৭ অক্টোবর কানাডা থেকে চট্টগ্রামে আসেন ব্রাদার ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্ত। তিনি দেয়াঙে এসে এখানকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি নানান সেবামূলক কাজের উদ্যোগ নেন। তিনিই এই আশ্রম গড়ে তোলেন। আজকের মরিয়ম আশ্রম মা মারিয়ার পুণ্য তীর্থস্থান হিসেবে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের কাছে সমাদৃত। আগের ইতিহাস ভালো না হলেও বর্তমানে দেয়াঙ এলাকা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছে।

১৯৪৬ সালে ব্রাদার ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্ত গড়ে তোলেন মরিয়ম আশ্রম উচ্চবিদ্যালয়। এখানে এখন দেড় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। আশ্রমের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে ধ্যান-প্রার্থনার জায়গা, গির্জা, চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র, ছাত্রাবাস। এ ছাড়া তিনতলাবিশিষ্ট ধ্যানকেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে নির্জনে বসে ধ্যানসাধনা করা যাবে। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে আয়োজন হয় দুই দিনব্যাপী মা মরিয়মের তীর্থ উৎসব। তীর্থ দর্শনে আসেন সারা দেশের মানুষ।

১৯৭৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর দেয়াঙ পাহাড়কে তীর্থস্থান হিসেবে ঘোষণা দেন তৎকালীন বিশপ জোয়াকিম রোজারিও। ২০২৪ সালে মা-মারিয়ার উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত প্রকাশনা গ্রন্থ থেকে জানা গেছে, এই এলাকার খ্রিষ্টানদের ওপর আরাকানি সৈন্যদের অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্দেজ। ওই বছরই আরাকান রাজার নির্দেশে দেয়াঙে অবস্থানরত ৬০০ পর্তুগিজ শিশু, নারী ও পুরুষকে হত্যা করা হয়। ফাদার ফার্নান্দেজের সমাধির ওপরই বর্তমানে চট্টগ্রামের ক্যাথিড্রাল গির্জা দাঁড়িয়ে আছে।

মরিয়ম আশ্রম উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক দেবাশীষ দত্ত বলেন, আশ্রমে প্রতিদিন শত শত লোক আসেন। তাঁরা শুধু বেড়াতেই আসেন না, পাঠ নেন ইতিহাসেরও। ১৯৮১ সালের ১৯ জুন আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ফ্লেভিয়ান লাপ্লান্তের মৃত্যুর পর ২০০০ সাল থেকে আশ্রমের দায়িত্ব পালন করে আসছেন ব্রাদার লরেন্স ডায়েস। ৯৫ বছর বয়সী ডায়েসকে আশ্রমের চতুর্থ আশ্রম গুরু হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।

মা মরিয়মের প্রতিকৃতি। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের দেয়াঙ পাহাড়ের মরিয়ম আশ্রমে। সম্প্রতি তোলা
মা মরিয়মের প্রতিকৃতি। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের দেয়াঙ পাহাড়ের মরিয়ম আশ্রমে। সম্প্রতি তোলা। ছবি: প্রথম আলো

৭০০ বছর পর রূপকথার বৃটিশ কেল্লা বিক্রির পথে

মধ্যযুগীয় দুর্গ যার সঙ্গে সহজেই রূপকথার তুলনা করা যায়। ৭০০ বছর ধরে একই পরিবারের মালিকানায় থাকা রিপলে দুর্গ এবার বিক্রি হতে চলেছে। উত্তর ইয়র্কশায়ারের হ্যারোগেটের কাছে এই কেল্লা শুধু ইতিহাসে প্রসিদ্ধ তাই নয়, একে জড়িয়ে রয়েছে নানান রূপকথার মতো রঙিন কাহিনীর মালা। একটি কেল্লা ছাড়াও এর ভেতরে রয়েছে হোটেল, ক্রিকেট মাঠ, শ্যুটিং গ্রাউন্ড, কফি শপ, একটি বিশাল গুদামখানা এবং ৪৪৫ একরের বেশি এলাকা জুড়ে বাগান। বর্তমান মালিক ও মালকিন স্যার থমাস এবং লেডি ইঙ্গিলবি এই দুর্গের রক্ষণাবেক্ষণ আর চালাতে না পেরে আনুমানিক ২১ মিলিয়ন পাউন্ডে বেচে দিতে যাচ্ছেন। চতুর্দশ শতক থেকে ইঙ্গিলবি পরিবারের বাস এই কেল্লায়।

থমাস এই বাড়ির মালিকানা অর্জন করেন যখন তার বয়স ছিল ১৮। তারপর ৫০ বছর ধরে তিনি ও তার স্ত্রী এই কেল্লার সংরক্ষণ, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে এসেছেন। এখন তারা অবসর নিয়ে নিজের মতো করে জীবন কাটাতে চান বলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই কেল্লার ভেতরে একটি হেলিপ্যাডও আছে। মোট ৯টি খণ্ডে বিভক্ত এই সম্পত্তি। যা পৃথকভাবে এমনকি সবগুলো মিলিয়ে কেনা যাবে। যার মধ্যে রয়েছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান করার মতো বিশাল এলাকা। যেখানে বহু বিখ্যাত লোকের বিয়ের অনুষ্ঠানও হয়েছে অতীতে। ১৩০৮-০৯ সাল থেকে এই সম্পত্তি ইঙ্গিলবি পরিবারের হাতে আসে। এদের এক পূর্বপুরুষ স্যার থমাস সম্পত্তির উত্তরসূরি এডেলিন থোয়াঙ্গেকে বিয়ে করে যৌতুকরূপে এই সম্পত্তি পান।

দুর্গের রক্ষণাবেক্ষণের অর্ধ শতাব্দীর পর, স্যার থমাস এবং লেডি ইঙ্গিলবি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে এবার এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। স্যার থমাস বিবিসিকে বলেছেন, ‘এমন কিছু দিন আছে যা আমরা যা মিস করব, তার জন্য আমরা দুঃখিত।’

সূত্র : হিন্দুস্থান টাইমস

mzamin

সাবেক এক সেনাপ্রধানের চোখে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। নানা কারণেই আলোচিত। বিশেষ করে গত বছরের ৩১শে জুলাই তার ফেসবুক আইডি লাল করার কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। তখন চারদিকে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ধারাবাহিকভাবে ‘সামরিক বিদ্রোহ, সামরিক অভ্যুত্থান, গণঅভ্যুত্থান, গণবিপ্লব ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান’ শিরোনামে ফেসবুকে ১৭টি পোস্ট দিয়েছেন। যা নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। জানা-অজানা অনেক কাহিনী তিনি তুলে ধরেছেন, অনেকটা নির্মোহভাবে।

পাঠকদের আগ্রহের কথা ভেবে তার পোস্টগুলো হুবুহু তুলে ধরা হলো-

প্রথম অংশ

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানদের প্রায়ই সামরিক বিদ্রোহ, সামরিক অভ্যুত্থান , গণঅভ্যুত্থান এবং গণবিপ্লবের মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এর পেছনে দেশের বিশৃঙ্খল ও অপ্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র, দুর্বল অর্থনীতি, ব্যাপক দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থা বড় কারণ হিসেবে কাজ করে। কোনো সেনাপ্রধানই নিশ্চিত থাকতে পারেন না যে তাঁর মেয়াদকালে এ ধরনের অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না। বাইরে থেকে পরিস্থিতি  শান্ত বোঝা গেলেও, ছোট কোনো ঘটনা হঠাৎ করে দাবানলের সৃষ্টি করে সমগ্র দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারে।

যেমন, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ড, ১৯৯০ সালে ডা. মিলনের শহীদ হওয়া, কিংবা ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন—সবকিছুই দেখিয়েছে কীভাবে একটি মাত্র ঘটনা জাতির ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে। তাই পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে শান্ত দেখালেও, সম্ভাব্য অস্থির পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য একজন সেনাপ্রধানকে সবসময় সজাগ থাকতে হয় ।

সামরিক বিদ্রোহ, সামরিক অভ্যুত্থান, গণঅভ্যুত্থান এবং গণবিপ্লব—এগুলো একেক সময় একেক প্রকৃতির হয় আর প্রত্যেকটি সামাল দিতে বিশেষ দক্ষতা ও প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর অতীত ঘটনার বিশ্লেষণের মাধ্যমে একজন সেনাপ্রধান ভবিষ্যৎ সংকটগুলো অনুধাবন করতে পারেন এবং সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন। পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন সেনাপ্রধানকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে—কারণ তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল তারা জনস্বার্থে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। আবার কেউ কেউ জনগণের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যার কারণে সেনাবাহিনীকে ভাবমূর্তি সংকটে পড়তে হয়েছিল এবং তাঁরাও বড় ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছিলেন। ফলে সামগ্রিকভাবে সেনাপ্রধানদের সিদ্ধান্তগুলো স্থিতাবস্থা বজায় রাখার দিকেই ঝোঁকে। কারণ অতীতে যারা অসাংবিধানিক উপায়ে রাজনৈতিক জটিলতা সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদের পরিণাম হয়েছিল ভয়াবহ—মেজর জেনারেল শফিউল্লাহকে অকাল অবসরে পাঠানো হয়, ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফকে গুলি করে হত্যা করা হয়, জেনারেল জিয়াকে হত্যা করা হয়, জেনারেল এরশাদ কারাভোগ করেন, জেনারেল নাসিম গ্রেপ্তার হয়ে অকাল অবসর নেন, আর জেনারেল মঈনকে এখনো দেশছাড়া অবস্থায় থাকতে হচ্ছে।

দ্বিতীয় অংশ

‘সেনাবিদ্রোহ’ এমন এক পরিস্থিতি যা সেনাপ্রধানকে দিশেহারা করে পুরো কমান্ড কাঠামোতে অচলাবস্থা তৈরি করে। এর মূল কারণ হলো বিদ্রোহ সাধারণত অপ্রত্যাশিত জায়গায় হঠাৎই ঘটে, আর এর সঙ্গে মিলিত হয় সহিংসতা ও বিধ্বংসী শক্তি। আকস্মিকতা, নেতৃত্ব কাঠামোর ভেঙ্গে পড়া, আর আনুগত্য ও শৃঙ্খলার মনস্তাত্ত্বিক বাঁধন এক লহমায় গুঁড়িয়ে যাওয়ায় সেনাবাহিনীর মৌলিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়, যেখানে দ্রুতই অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা আর বিভ্রান্তি বাসা বাঁধে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ ঘটে প্রধানত অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে সুপ্ত শ্রেণিসংগ্রামের জেরে। পাকিস্তান আমলের ‘মালিক-ভৃত্য’ সম্পর্ক নতুন পরিস্থিতিতে অস্বস্তি বাড়ায়, বিশেষ করে স্বাধীনতার পরের প্রজন্মের সৈনিকরা যখন স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তাঁদের পরিচয় আর কর্তব্য নতুনভাবে নির্ধারণ করে। বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এই চাপা উত্তেজনাকে উস্কে দেয় এবং সৈনিকদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতার বীজ বুনে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে নেয়ার চেষ্টা করে। বহু বিদ্রোহ ঘটলেও, এর মধ্যে তিনটি বড় বিদ্রোহ দেশকে বিশেষভাবে কাঁপিয়ে দেয়।

তৃতীয় অংশ

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহে সৈনিকরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে আসা মাত্রই পুরো সেনাবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অফিসারদের নির্বিচারে হত্যা শুরু করে। ভাগ্যক্রমে এ পরিস্থিতি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। জেনারেল জিয়ার বিচক্ষণ নেতৃত্বে দ্রুত পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণে আসে। এদিকে, ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ৪ থেকে ৭ নভেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেয়া বিদ্রোহের কোনো আভাসই পাননি। এমন অমনোযোগের ফলে তিনি তাঁর সদ্য অর্জিত পদ হারান এবং বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন।

দ্বিতীয় বড় বিদ্রোহ ঘটে ১৯৭৭ সালে যখন ২২ ইস্ট বেঙ্গল ২৯/৩০ সেপ্টেম্বর রাতে বিদ্রোহ করে এবং ২ অক্টোবর বিমানবাহিনীতে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। জেনারেল জিয়া এ ঘটনায় হতভম্ব হয়ে গেলেও ক্ষমতায় টিকে যান, কারণ বিদ্রোহগুলো ছিল স্থানীয় পর্যায়ের যা সেনাবাহিনীর উন্নত সামরিক কাঠামো দিয়ে দমন করা সম্ভব হয়। ১৯৭৫ সালের বিদ্রোহীরা শাস্তি এড়াতে পারলেও, ১৯৭৭ সালের ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যাপক মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়। এটাই ভবিষ্যতে বিদ্রোহ করতে চাওয়া সৈনিকদের জন্য ছিল স্পষ্ট ও কঠোর সতর্কবার্তা।

তৃতীয় বড় বিদ্রোহ ঘটে ২০০৯ সালে, যখন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) এর সৈনিকরা তিন দিন ধরে চলা সহিংসতায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে। এ ঘটনার আগে বিদ্রোহের আশংকার আভাস থাকলেও, সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সেনাপ্রধান, বিডিআর মহাপরিচালক ও ডিজি ডিজিএফআই—সকলেই শুধু পরের দিনের প্রধানমন্ত্রীর সফর বাতিল করে স্বস্তিতে বসে থাকেন এবং বিদ্রোহের সম্ভাবনাকে নিছক গুজব মনে করে উড়িয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী হামলার কারণে রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। তবে অবশেষে বিদ্রোহ দমন করা হয় এবং বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

চতুর্থ অংশ

সেনাবাহিনীতে আরও দু'টি বিদ্রোহ হয়েছিল, যা অফিসার ও সৈনিকদের মধ্যে শ্রেণিগত দ্বন্দ্বের কারণে নয় বরং ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের ক্ষমতার দ্বন্দ থেকে সৃষ্টি হয়েছিল। এসব ঘটনায় অফিসার এবং সৈনিক উভয় পক্ষকেই সরাসরি কাজে লাগানো হয়েছিল, কিন্তু বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ও প্রণোদনা সৈনিকদের আগ্রহের সঙ্গে মেলেনি বলে তারা পুরোপুরি তাতে সমর্থন দেয়নি। মূলত, এগুলো ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিছু জেনারেলের নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই। সৈন্যরা দেখেছিল যে পরিস্থিতি কার পক্ষে যাচ্ছে, তারপর হয় চুপ থেকেছে কিংবা দেখেশুনে পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে ২৪ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের নেতৃত্বে সংগঠিত বিদ্রোহ। প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হওয়ার পর বিদ্রোহীরা প্রথমে উল্লসিত হয়ে উঠলেও, দ্রুতই বুঝতে পারে যে তাদের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়েছে। তখন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের উৎসাহে সরকার সৈনিকদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতে থাকে, যার ফলে বিদ্রোহীরা নৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং মনোবল হারিয়ে ফেলে। সরকারের তুলনায় কম শক্তি নিয়ে লড়াই করতে গিয়ে জেনারেল মনজুর দ্রুতই তাঁর অধস্তন অফিসার আর সৈনিকদের আস্থা হারিয়ে ফেলেন। তাঁরা এরশাদের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে শুভপুর ব্রিজ পার হয়ে সরকারের পক্ষ নেন এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেল এরশাদই জয়ী হন।

অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম দুর্বল পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে অপরিপক্কতা, অধস্তনদের দোদুল্যমান আনুগত্য এবং বিশ্বস্ত সহযোগীদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ব্যর্থ হন। তিনি বুঝতে পারেননি যে সেনাবাহিনীর ভেতরে কতখানি বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে, ফলে দ্বিধাবিভক্ত বাহিনীকে যখন তিনি ঢাকায় একত্রিত হওয়ার নির্দেশ দিলেন, তখনই তাঁর কমান্ড অচল হয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষরা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, এসএসসি ব্যাচ-১-এর পরিবর্তনশীল আনুগত্য এবং ৯ম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল ইমাম-উজ-জামানের অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নাসিমের ক্ষমতা দখলের চেষ্টাকে সফলভাবে নস্যাৎ করে দেয়।

পঞ্চম অংশ

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধানরা ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে চারটি উল্লেখযোগ্য সামরিক অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হয়েছেন বা নিজেরাই সেগুলো ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে প্রথমটি ঘটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, যখন কয়েকজন তরুণ মেজর রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক আহমদকে ক্ষমতাসীন করে।

সে সময়ের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কাজী মুহাম্মদ শফিউল্লাহ তার গোয়েন্দা সংস্থা সমূহের ব্যর্থতার কারণে সম্পূর্ণরূপে হতবাক হয়ে যান। ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটার ফলে তিনি কোনো পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেননি। কেবলমাত্র ট্যাঙ্কের ইঞ্জিন চালু করেই ওই তরুণ মেজররা ঢাকার রাস্তায় সাধারণ মানুষকে বিস্মিত করে দেয়। কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার বিপরীতে সেনাপ্রধান নতুন রাষ্ট্রপতির প্রতি আনুগত্য স্বীকার করেন। পরের দু’মাস “ইয়াং টার্কস” নামে পরিচিত ওই তরুণ অফিসারের দলই বঙ্গভবন থেকে দেশের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে, আর নতুন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া তখন সবকিছু শুধু নীরবে দেখছিলেন। কেন তিনি পুরো সেনাবাহিনী তার অধীনে থাকা সত্ত্বেও ওদের দমন করেননি তা আজও রহস্য হয়ে রয়েছে। আর এভাবেই এই অস্থির তরুণ অফিসারদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়ার পরিণতিতে আরেকটি অভ্যুত্থান ঘটে—যার নেতৃত্ব দেন সেনাবাহিনীর সিজিএস (চিফ অব জেনারেল স্টাফ), ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। জেনারেল জিয়ার নিষ্ক্রিয়তায় হতাশ হয়ে মোশাররফ ও তাঁর নিজের মতাদর্শী কিছু অফিসার ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমদকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেন, জেনারেল জিয়াকে বন্দি করেন, বঙ্গভবনের ওই তরুণ মেজরদের পালাতে বাধ্য করেন, নিজেকে সেনাপ্রধান ও মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেন এবং বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন করেন। তবে এই ক্ষমতা দখল বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। কারণ মোশাররফ বুঝতেই পারেননি যে অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তাহের (জাসদ) এর নেতৃত্বে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে নতুন করে বিদ্রোহের প্রস্তুতি চলছে। ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ তারিখে সেই বিদ্রোহ পূর্ণমাত্রায় বিস্ফোরিত হয়ে মোশাররফের নবগঠিত সরকারকে উৎখাত করে এবং জিয়াকে আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনে। সায়েম রাষ্ট্রপতি পদে থেকে যান।

ষষ্ঠ অংশ

১৯৮২ সালে তৃতীয় সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যখন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ নিজেই ক্ষমতা দখল করেন। আগের কয়েক সপ্তাহ জুড়ে তিনি সুপরিকল্পিতভাবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে বিনা বাধায় এবং কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই ক্ষমতা দখল করা যায়।

জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সুযোগ নিয়ে বেশিরভাগ অভিজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের চাকুরিচুত্য করেন, পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা (রিপ্যাট্রিয়েটেড) অফিসারদের ওপর নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন এবং ক্ষমতাসীন সরকারকে অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে দেশবাসীর নিকট চিত্রিত করেন। একই সঙ্গে, ‘দেশগঠনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা থাকা উচিত’—এই ধারণাটিকে প্রচার করে তিনি অনেককে নিজের পক্ষে টানেন। তিনি আরও অনেক পাকিস্তান হতে ফেরত আসা অনুগত জেনারেলকে ডিভিশন এবং গুরুত্বপূর্ণ সেনা-পদে বসান এবং ১৯৮১ সালে নির্বাচিত পেসিডেন্ট সাত্তারের প্রশাসনের কিছু সদস্যকেও পাশে টানেন । প্রেসিডেন্ট সাত্তারের নম্র স্বভাব ও জিয়া-উত্তর বিএনপির বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগ নিয়ে এরশাদ সহজেই বহুদিনের লালিত স্বপ্ন—সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন, যা অনেকেই ‘মসৃণ ক্ষমতা দখল’ বলে আখ্যা দেন ।

২০০৭ সালে শেষ অভ্যুত্থানটি ঘটে জেনারেল মইন-এর সময়। বেগম জিয়ার পদত্যাগের পর কে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন ও প্রশাসন চালাবেন--এই বাক বিতণ্ডায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয় যা থেকে ঢাকা শহরে সহিংসতা দ্রুত বেড়ে যায়। এই অস্থিরতা ও অচলাবস্থা কাজে লাগিয়ে জেনারেল মইন নিজের ক্ষমতা দখলের উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করতে থাকেন। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে সেনা মোতায়েন সত্ত্বেও পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে দেন। পশ্চিমা দূতাবাস এবং স্থানীয় জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয়কারীর সহায়তায় তিনি বিশ্বস্ত কিছু সহযোগীকে বেছে নিয়ে পরিকল্পনা মাফিক এগিয়ে যান। এর আগে বিএনপি নিজেদের অনুগত জেনারেলদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিল বটে, কিন্তু মইন বুঝেছিলেন—নতুন নেতৃত্ব এলে অনেকেই পক্ষ বদলায়।

তিনিও সফলভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিজের পক্ষে নিয়ে আসেন, যারা ‘রং বদলানো গিরগিটি’-এর মতো সুবিধামতো দলে ভিড়ে যায়। তাঁর মূল মিত্রদের মধ্যে ছিলেন ৯ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, ডিজিএফআইয়ের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারি। তাঁরা সকলে মিলে গোপনে মইনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। এএইচকিউ (আর্মি হেডকোয়ার্টার)-এর অপারেশন শাখাকে পাশ কাটিয়ে ৯ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের সৈন্যদের সাভার থেকে ঢাকায় আনা হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদকে রাষ্ট্রপতি ভবনে একটি জালচিঠি দেখিয়ে স্টেট অব ইমারজেন্সি ঘোষণা করতে বাধ্য করা হয়। চিঠিতে হুমকি দেয়া হয়েছিল যে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন হলে সব বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী দেশে ফেরত পাঠানো হবে। পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে মইন এক নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন যা শুধু সামনের পর্দার ভূমিকায় ছিল। পরে এই সরকার জনপ্রিয়তা হারালে এবং আন্তর্জাতিক মহল দ্রুত নির্বাচনের চাপ দিলে, নিজের রাজনৈতিক দল গঠনে ব্যর্থ মইন ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে নিরাপদ প্রস্থানের সুযোগ চান। আর এর বিনিময়েই শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আরোহণ তিনি নিশ্চিত করেন।

সপ্তম অংশ

বিপ্লব মোকাবিলা করা হয়তো একজন সেনাপ্রধানের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। অনেক সময় একটি রাষ্ট্র বা সমাজ তার গর্ভে বিপ্লবের ভ্রুণ ধারণ করলেও (যাকে বলা হয় “বিপ্লবে গর্ভবতী সমাজ”) তা প্রসব করতে বহু বছর লেগে যায়। যেমন, শেখ হাসিনার ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের কর্তৃত্ববাদী শাসন টিকে গিয়েছিল দীর্ঘদিন। আবার অন্য সময় বিপ্লব ঝড়ের গতিতে সংক্ষিপ্ত সময়ে ঘটে সবকিছু তছনছ করে ফেলে—যেমন বাংলাদেশে ঘটেছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে।

লেনিন বলেছিলেন, “জনগণের কোনো বিপ্লবই পুরোনো শাসন-ব্যবস্থার সমর্থক সশস্ত্র বাহিনীর একটা অংশের সহায়তা ছাড়া জয়ী হতে পারে না।” আর স্ট্যানিসল এন্ড্রিজিয়স্কি (Stanislaw Andrzejewski) তাঁর Military Organization and Society গ্রন্থে লিখেছিলেন, “সরকার সশস্ত্র বাহিনীর আনুগত্য ধরে রাখতে পারলে কোনো বিদ্রোহই সফল হবে না।” বাস্তবেও, যদি সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং সরকারকে সমর্থন করে, তবে কোনো বিপ্লব টেকার সম্ভাবনা কম। ফলে বিপ্লবীরা সেনাবাহিনীর অবস্থান বা নিরপেক্ষতা নিয়ে ভীষণ হিসাব-নিকাশ করে। সেনাবাহিনী সরকারকে আঁকড়ে থাকবে, না কি ছেড়ে দেবে—এই প্রশ্ন বিপ্লবীদের কাছে যেমন জটিল, তেমনি সেনাবাহিনীও ভোগে দ্বিধাদ্বন্দে—কারণ জনগণের আন্দোলন আদৌ কতটা সফল হবে, তা অনুমান করা সহজ নয়। বিপ্লবীরা সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব, শাসক দলের সাথে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক, প্রজন্মভেদ, আর বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ঐক্য পর্যবেক্ষণ করে। অন্যদিকে সেনাবাহিনীও দেখার চেষ্টা করে আন্দোলনের সঠিকতা, সরকারের অজনপ্রিয়তা, জনগণের অংশগ্রহণের মাত্রা, জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য, এবং আন্তর্জাতিক মহল হস্তক্ষেপ করবে কি না। এসব বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করেই উভয় পক্ষ ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে পদক্ষেপ নেয়।

অষ্টম অংশ

বিপ্লবে সেনাবাহিনীর অবস্থান কীভাবে পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়—তার তিনটি উদাহরণ দিচ্ছি। এর মধ্যে ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-১৭৯৯)-এর সময় সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, আবার নিজেও বড় রদবদলের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। শুরুর দিকে ফরাসি সেনাবাহিনী ছিল ঐতিহ্যবাহী, যেখানে অভিজাত অফিসাররা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত, আর সাধারণ শ্রেণির সৈনিকরা নিচের স্তরে থাকত। এই বৈষম্যের কারণে বাহিনীর ভেতরে দ্বন্দ্ব বাড়ে, বিশেষ করে স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব—এই বিপ্লবী ধারণাগুলো সমাজে ছড়িয়ে পড়ার পর। যখন বিপ্লব জোরদার হয়, সেনাবাহিনীর আনুগত্য নিয়ে পরীক্ষা শুরু হয়। অনেক অভিজাত অফিসার (সেনাবাহিনীর ৬০%) দেশত্যাগ করে নিপীড়নের ভয়ে পালাতে থাকে।

তখন বাহিনীর অফিসার পর্যায়ে শূন্যতা তৈরি হয়। এই সুযোগে ১৭৯৩ সালের ২৩ আগস্ট জাতীয় কনভেনশন লেভে আঁ ম্যাস (levée en masse) ঘোষণা করে, যেখানে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী অবিবাহিত পুরুষদের সৈন্য দলে যোগ দেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এভাবে নাগরিক-সৈন্যদের নিয়ে এক জাতীয়তাবাদী সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে, যেখানে অফিসার পদোন্নতিতে সমতা ও বিপ্লবী চেতনা নতুন উদ্যম জোগায়। এই নতুন কাঠামোর সেনাবাহিনী বিভিন্ন ইউরোপীয় জোটের বিরুদ্ধে ফ্রান্সকে রক্ষা করে এবং দেশের সীমানাও বাড়ায়। যদিও ১৭৯২ সাল থেকে সেনাবাহিনীর মূল যুদ্ধ ছিল বৈদেশিক শক্তির সাথে, তবুও অনেক সময় দেশের ভেতরের ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার এবং অভ্যুত্থান দমাতে এটিকে ব্যবহার করা হয় (যেমন ভেন্ডি বিদ্রোহ দমন)। সামরিক বাহিনী অচিরেই ফরাসি রাজনীতিতে এক শক্তিশালী অবস্থানে উঠে আসে, যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ক্ষমতায় আরোহণের মাধ্যমে। ১৭৯৯ সালে সামরিক শক্তির জোরেই তিনি নিজে এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী ফরাসি বিপ্লবের সময় কতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল—তা স্পষ্ট হয়ে যায়, বিপ্লবের সময় থেকে পরবর্তী কালেও।

নবম অংশ

রুশ-জাপানি যুদ্ধে (১৯০৪-১৯০৫) রাশিয়ান সাম্রাজ্যের বড় ধরনের পরাজয়ের পরপরই ১৯০৫ সালে প্রথম রুশ বিপ্লব শুরু হয়। কিন্তু এটি ব্যর্থ হয়ে যায় মূলত এই কারণে যে, সামরিক বাহিনী তখনও জার নিকোলাস দ্বিতীয়ের প্রতি অনুগত থাকে। রিজার্ভ বাহিনীতে কিছু বিদ্রোহের পাশাপাশি নৌবাহিনীতে সেভাস্তোপোল, ভ্লাদিভস্তক ও ক্রনস্টাড্টে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে—এর মধ্যে ব্যাটলশিপ পোটেমকিনের বিদ্রোহ ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। কঠোর শক্তি প্রয়োগ করে সরকার এগুলো দমন করে, যেখানে দুই হাজারের বেশি নাবিক মারা যায়। যদিও ব্যাপক অস্থিরতা চলছিল, সেনাবাহিনীর মূল অংশ রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়ে সরকারের পক্ষ অবলম্বন করে। ফলে সরকার ১৯০৫ সালের এ আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত দমন করতে সফল হয়।
এ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল ১৯০৫ সালের ২২ জানুয়ারির ‘ব্লাডি সানডে’। সেদিন সেন্ট পিটার্সবার্গে জারের শীতকালীন প্রাসাদের সামনে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় ইম্পেরিয়াল গার্ড, যাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয় । এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক ধর্মঘট শুরু হয়। কিন্তু এক পর্যায়ে সেমিওনভস্কি রেজিমেন্টকে সঙ্গে নিয়ে সরকার আর্টিলারি ব্যবহার করে বিদ্রোহী এলাকাগুলো ধ্বংস করে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ ওই বিক্ষোভ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যায়ের মস্কোর আন্দোলনও কঠোর হস্তে দমন করা হয়। এভাবে ১৯০৫ সালের বিপ্লব শেষ হয়ে যায়, আর প্রমাণিত হয়—যদি সেনাবাহিনী সরকারপক্ষ থাকে তাহলে বিদ্রোহের পক্ষের শক্তির জয়ী হওয়া কঠিন।

অন্যদিকে ১৯১৭ সালের দ্বিতীয় রুশ বিপ্লবে সেনাবাহিনী হয়ে ওঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও রূপান্তরমূলক শক্তি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির মুখে সৈনিকদের মনোবল তলানিতে গিয়ে ঠেকে। খাদ্য, অস্ত্র ও রসদের ব্যাপক সংকটের কারণে অধিকাংশ কৃষক-সৈনিক বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পেত্রোগ্রাদে গণবিক্ষোভ শুরু হলে, অনেক সৈনিক বেসামরিক মানুষের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়—বরং তারা বিক্ষোভে যোগ দেয়। এতে জার নিকোলাস দ্বিতীয় সিংহাসন ছাড়তে বাধ্য হন। অস্থায়ী সরকার ক্ষমতায় এলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সহ আরও কিছু সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু সেনাবাহিনীর আনুগত্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের জারি করা ‘অর্ডার নং ১’-এর ফলে সৈনিকদের কমিটিগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠে এবং এর কারণে সামরিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে যায়। ফ্রন্টলাইনে ধারাবাহিক পরাজয় আর অসন্তোষের জের ধরে বলশেভিকরা সংগঠিত হতে থাকে। ১৯১৭ সালের অক্টোবরে সেনাবাহিনীর বিশৃঙ্খলা কাজে লাগিয়ে তারা পেত্রোগ্রাদে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। অসন্তুষ্ট সেনা ইউনিটগুলো বলশেভিক রেড গার্ডের পক্ষে চলে আসে, ফলে খুব কম প্রতিরোধের মুখে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। এভাবে জারপন্থা ত্যাগ করে বলশেভিকদের সঙ্গে যাওয়া সেনাবাহিনীর অবস্থান বদলই রুশ বিপ্লবকে সাফল্যের পথে নিয়ে যায় এবং পরে রাশিয়ায় বলশেভিকদের শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করে। ঘটনাটি এটিই বোঝায় যে সেনাবাহিনীর সমর্থন বা অস্বীকৃতি বিপ্লবের চূড়ান্ত পরিণতি গঠনে সবসময় বড় ভূমিকা পালন করে।

দশম অংশ

স্বাধীনতার পর মাত্র ২৫ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ তিনটি গণবিপ্লব/গণঅভ্যুত্থান দেখেছে, যেখানে সেনাবাহিনী কখনো বিপ্লবীদের পাশে থেকেছে বা কখনো নিরপেক্ষ থেকেছে। প্রথমটি ঘটে ১৯৭১ সালে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের ওপর চরম নিপীড়ন চালায়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল উপেক্ষা করায় বাঙালিদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনা ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ছিল অনেক বাঙালি সেনাসদস্যও। লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম. আর. চৌধুরীর মতো কেউ কেউ আগেই পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিকল্পনা আঁকেন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক সমাধান চেয়ে দেরি করায় সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন পিছিয়ে যায়।

শেখ মুজিবের ডাকে বাঙালিরা কার্যত পূর্ব-পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিলে ২৫/২৬ মার্চ ১৯৭১-এর রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্মম গণহত্যা শুরু করে। তবু অনেক বাঙালি সেনা ইউনিট আগে থেকেই সতর্ক ছিল বা আক্রমণের মুখে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরে তারা ভারতের দিকে সরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) আর পুলিশও প্রচণ্ড আঘাতের মুখে ছত্রভঙ্গ হয়ে ভারতে চলে যায়। সেখান থেকে নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে এরা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। তারা এবং স্বেচ্ছাসেবকসহ নানা পেশার মানুষ একসঙ্গে ব্রিগেড ও সেক্টরভিত্তিক বাহিনী গঠন করে। টানা নয় মাসের গোরিলা যুদ্ধ আর শেষ সময়ে ভারতীয় বাহিনীর সরাসরি সাহায্যে দেশ স্বাধীন হয়। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে বহুজাতীয় বা বহু-জাতিগত রাষ্ট্রে সামরিক ঐক্যের চেয়ে জাতিগত পরিচয় অনেক সময় মানুষকে বেশি উদ্দীপ্ত করে, আর এটাই বিপ্লব বা স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।

একাদশ অংশ

দ্বিতীয় গণবিপ্লব বা ‘গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনকে ধরা হয়। এখানে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকার কারণে গণঅভ্যুত্থান সফল হয়। ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল এরশাদ জনসমর্থন ধরে রাখতে ব্যর্থ হন। তাঁর ব্যাপক দুর্নীতি, আতঙ্ক-সৃষ্টি, বিতর্কিত ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর ভারতপন্থী নীতির কারণে দেশে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। সেনাবাহিনীর অনেক জুনিয়র অফিসার এরশাদকে বোঝা বলে ভাবতে শুরু করে। যদিও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মাঝেমধ্যে তাঁকে সরানোর চেষ্টা করেছিল, এরশাদ এসব আন্দোলন দমন করতে সক্ষম হন। তবে ১৯৮৭ সালের শেষের দিকে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা যৌথভাবে আন্দোলনে নামলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বরেই সেনাবাহিনীর ভেতরে ফাটলের স্পষ্ট নমুনা ধরা পড়ে —সিজিএস মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবদুস সালাম (গজব আলী) এরশাদের সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারে সরাসরি আপত্তি জানান। অক্টোবরের পর বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে—হরতাল, অবরোধ ও ধর্মঘটে দেশ অচল হয়ে যায়। এরশাদ সামরিক শাসন জারি করার কথা ভাবলে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপ জানিয়ে দেয়, সেটি হলে সেনাপ্রধান জেনারেল নুরউদ্দিন খানকে প্রেসিডেন্ট বানাতে হবে। এর ফলে এরশাদ সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে পড়েন। এমনকি ৯ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল রফিকের মতো ব্যক্তিরাও প্রভাব হারিয়ে ফেলেন, কারণ সেনা সদর দপ্তর তাঁর পদক্ষেপগুলো আটকে দেয়। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে লাগাতার হরতাল, ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতি, রাজপথের সহিংসতা এবং সেনাবাহিনীর স্পষ্ট অনাগ্রহ—সবকিছু এরশাদকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। সেনাবাহিনীর এই “নিরপেক্ষ” ভূমিকার ফলেই বিদ্রোহ সফল হয়; দ্রুত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন ও পরবর্তী নির্বাচনের পথ তৈরি হয়।

দ্বাদশ অংশ

২০২৪ সালে তৃতীয় প্রধান ঘটনাটি ঘটে, যাকে ‘আধা-বিপ্লব’ বলা যেতে পারে। কারণ পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগেই ফ্যাসিবাদী সরকারের সংবিধান, রাষ্ট্রপতি ও সামরিক বাহিনী মিলে একে আটকে দেয়। বঙ্গভবনকে বড় ধরনের বিক্ষোভের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা হয়, কিন্তু গণভবন তুলনামূলকভাবে সহজেই বিক্ষোভকারীরা দখল করে। শুরুতে এই আন্দোলন ছিল পুরো পদ্ধতিগত কাঠামোকে ভাঙ্গার লক্ষ্যে, কিন্তু শিগগিরই সংবিধানগত কূটকৌশলে ও মারপ্যাচে জড়িয়ে পড়ায় তা আগের শাসনের মতোই পরিচিত ধারা অনুসরণ করতে বাধ্য হয়।

এটি শুরু হয় ২০২৪ সালের জুনে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে, যেখানে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ৩০% কোটা পুনর্বহাল করায় শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে নামে। আন্দোলন খুব দ্রুতই সরকারবিরোধী ও গণতন্ত্রপন্থী এক গণজাগরণে পরিণত হয়, বিশেষত শেখ হাসিনার মন্তব্য—‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিরা কোটা না পেলে কি সেটা রাজাকারের নাতি-নাতনিরা পাবে?’—এই বক্তব্য ক্ষোভকে বাড়িয়ে তোলে। সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের অন্য সহযোগী সংগঠনগুলোকে লেলিয়ে দিয়ে এ আন্দোলন দমনের চেষ্টা করে। কিন্তু যখন তারা নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়, পরিস্থিতি দ্রুতই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশও এ দমনে যোগ দিলে জনরোষ চরমে পৌঁছায়। সরকার দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে। বিজিবি, র‍্যাব এবং সেনাবাহিনী নামিয়ে চেষ্টা করা হয় বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতে। ইন্টারনেট আর মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে বাংলাদেশকে প্রায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগশূন্য করা হয়।

কিছু সময়ের জন্য সরকারের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনা চললেও তার খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট কোটা ৫৬% থেকে কমিয়ে ৭% করলে অন্দোলনে সাময়িক বিরতি আসে, কিন্তু ছয়জন আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার ও তাদের কাছ থেকে জোর করে ‘আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা’ আদায় করায় বিক্ষোভ আরো তীব্র হয়। ২৯ জুলাই আন্দোলন আবার জোরদার হয় এবং ১৫ বছর ধরে ‘অবৈধভাবে’ ক্ষমতা ধরে রাখা সরকার আগস্ট ৫-এ সম্পূর্ণভাবে উৎখাত হয়।

শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন, আর আওয়ামী লীগের অনেক বড় নেতা দেশ ছেড়ে চলে যান বা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে সামরিক বাহিনীর ছায়ায় আশ্রয় নেন।

ত্রয়োদশ অংশ


আজ পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে কয়েক সপ্তাহব্যাপী চলা এ আন্দোলনের সময় সেনাবাহিনীর সঠিক ভূমিকা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। সরকারিভাবে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি, সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরেও আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত আদালত (কোর্ট অব ইনকোয়ারি) হয়নি। ফাঁস হওয়া গোয়েন্দা তথ্যের টুকরো-টাকরা মিললেও, সেগুলো দিয়ে সেনাবাহিনীর আসল আচরণ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। এজন্য এ বিপ্লবটির ফরাসি এবং রুশ বিপ্লবগুলোর সাথে তুলনামূলক আলোচনা করা কষ্টকর। তবে ভবিষ্যতে আরো তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর হয়তো একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ সম্ভব হবে।
বর্তমানে অনেক তথ্য অজানা রয়ে গেছে। যেমন:
• পুরো ঘটনা কালে শেখ হাসিনা আর তিন বাহিনীর প্রধানদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কী আলোচনা হয়েছিল?
• বাহিনী সদর দপ্তর (সার্ভিস হেডকোয়ার্টার) এএফডি (আর্মড ফোর্সেস ডিভিশন) হতে কি নির্দেশনা পেয়েছিল?
• মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকীর ভূমিকা কী ছিল?
• কোন নির্দেশনা মৌখিক আর কোনটি লিখিতভাবে বাহিনীর বিভিন্ন ফরমেশন ও ইউনিটে পৌঁছেছিল?
• কখন কোথায় কী কনফারেন্স হয়েছে, বিদ্রোহের আগে ও চলাকালে?
• রুলস অব এনগেজমেন্ট বা লড়াইয়ের নিয়ম কী ছিল?
• কীভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল?
• ফিল্ডে নামা সেনাদের এএইচকিউ বা ফরমেশন সদর দপ্তর কী মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিল?
• কোন ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ বহনের নির্দেশনা ছিল?
• কখন গুলি চালাতে বলা হয়েছিল, আর কখন নিষেধ ছিল?
• নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ যখন পুলিশ, বিজিবি এবং র্যাবের হাতে আক্রান্ত হচ্ছিল, তাদের রক্ষা করতে কোনো নির্দেশনা ছিল কি না?
• জাতিসংঘের লোগো লাগানো সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার না করার কোনো নির্দেশ এসেছিল কি?
• হেলিকপ্টার ব্যবহারের ব্যাপারে কী নির্দেশনা ছিল?
• প্রতিদিন কোথায় কী কী ঘটনা ঘটেছে, ঠিক কীভাবে পরিস্থিতির মোড় ঘুরেছে?
• কোথায় কোথায় সেনাবাহিনী গুলি চালিয়েছে? গুলি চালানোর নিয়ম কী ছিল?
• স্নাইপার মোতায়েন করা হয়েছিল কি না?
• পুরো ঘটনাকালে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী কত রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল?
• নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশ, র্যাব আর বিজিবি গুলি চালাতে গেলে সেনা ইউনিটগুলোকে তাদের বাধা দেওয়ার নির্দেশ ছিল কি না?
• শেখ হাসিনা কিভাবে পালিয়ে গেলেন?
• আওয়ামী লীগের কর্মী, পুলিশ ইত্যাদি ক্যান্টনমেন্টে কিভাবে আশ্রয় নিল? তারা কি সেফ এক্সিট পেয়েছিল?
যেহেতু এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য কোনো যাচাই-বাছাই কমিটি গঠিত হয়নি, ফলে কী ঘটেছিল তার চূড়ান্ত বিবরণ এখনো অপুর্ণই থেকে গেছে।

চতুর্দশ অংশ

এরপরও, ফাঁস হওয়া তথ্যের টুকরো টুকরো ইঙ্গিত একত্র করে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কেমন ছিল—তার একটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছি। সব তথ্য যাচাই করা যায়নি। তবে এসব “পাজলের টুকরো” জোড়া দিয়ে একটা সামগ্রিক ছবি পাওয়া যায়—সেটি হলো, সেনাবাহিনীর অবস্থান খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত হলেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি উপাদান ছিল অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্যদের প্রভাব—যাকে এখন প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। ১৮ বা ১৯ জুলাই আমার জেনারেল ওয়াকারের সঙ্গে সেনাভবনে খাবার খেতে যাওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁর এমএ জানায়, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির কারণে হঠাৎ সৈন্য মোতায়েনের নির্দেশ আসায় সে ডিনার বাতিল করতে হয়েছে। বিজিবি, পুলিশ ও র্যাব বিদ্রোহ সামলাতে ব্যর্থ হওয়ায়, সরকার ১৯ জুলাই সেনাবাহিনীকে কারফিউ জারির নির্দেশ দেয়। অল্প সময়ের জন্য বিক্ষোভ কমে গেলেও, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ কারফিউ অগ্রাহ্য করে রাস্তায় নেমে আসে। আর সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে উৎসাহিত হয়ে আগেরবারের কোণঠাসা হওয়া র্যাব ও পুলিশ আবারও বিক্ষোভকারীদের ওপর নতুন করে সহিংসতা চালায়।

এরপর ভিডিওতে দেখা যায়, র‍্যাব ও পুলিশ তো বটেই, কিছু সেনা সদস্যও নাগরিকদের ওপর গুলি ছুড়ছে—যা মানুষের মনে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। সাধারণ মানুষ অনেক দিন ধরেই সেনাবাহিনীকে রক্ষক হিসেবে দেখে আসছিল, তারা এখন সেটিকে দমনমূলক ভূমিকায় দেখে হতবাক হয়ে পড়ে। বিশেষকরে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া হেলিকপ্টার থেকে একজন সৈনিকের গুলি চালানোর ছবি, আর জাতিসংঘের লোগো লাগানো গাড়ি ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের ঘটনা জাতিসংঘের তীব্র আপত্তির মুখে পড়ে। ফলে সাথে সাথেই এসব লোগো ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। নিরস্ত্র মানুষের ওপর এভাবে গুলি চালানো—যা অনেকটা “লাইভ-ফায়ার ড্রিল”-এর মতো—শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সামরিক বাহিনীর প্রবীণ সদস্যদেরও আহত করে। বিশেষ করে জিওসি ও ব্রিগেড কমান্ডারের নির্দেশে ৫ বীরএর সৈন্যদের যাত্রাবাড়ীতে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানোর ঘটনা অফিসার ও সৈন্যদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেখানে যেখানে গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সেখানেই এমন অসন্তোষ দেখা দেয়। আমি নিজেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা কয়েকজন জুনিয়র অফিসারের ফোন পাই—তাঁরা জিজ্ঞেস করছিলেন, কী করা উচিত। আমি পরামর্শ দিয়েছি—“কোনো অবস্থাতেই নিজ জনগণের ওপর গুলি চালাবে না।”

পঞ্চদশ অংশ

(চতুর্দশ অংশে বর্ণিত ৫ বীর কর্তৃক যাত্রাবারীতে জিওসি এবং ব্রিগেড কমান্ডারের নির্দেশে নিরস্ত্র জনগণের উপর গুলিবর্ষণের ঘটনাটি সঠিক নয়। ৫ বীর একটি গুলিও করেনি। এ অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত)
এদিকে শিক্ষার্থীরা কালো রংয়ের বদলে (১৯৭৫ সালে নিহত নেতাদের স্মরণে ক্ষমতাসীন দল কালো ব্যাজ/কালো রঙ ব্যবহার করত) নিজেদের ফেসবুক কভার ও প্রোফাইল ছবি লাল করে প্রতিবাদ জানায়। নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর এমন নির্মম দমন-পীড়ন বিশেষ করে আবু সাইদের নির্মম হত্যাকাণ্ড দেখে কয়েক রাত নির্ঘুম কাটানোর পর আমি তাঁদের অনুরোধ রাখতে মনস্থির করি। কিন্তু নিজে তেমন প্রযুক্তি-জ্ঞানী না হওয়ায়, আমার ছোট মেয়েকে (সে তখন আমেরিকায়) জিজ্ঞেস করে জানতে পারি কীভাবে ছবিটি পরিবর্তন করতে হয়। সে দ্রুতই লাল রঙের একটি গ্রাফিক পাঠায়, যেটি আমি আপলোড করি, তারিখ ছিল ৩১ জুলাইয়ের দিকে।

আমার ধারণা ছিল না এই পদক্ষেপের প্রভাব কতটা গভীর হবে। মাত্র ছয় ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য সেনাসদস্যের ফেসবুক প্রোফাইল ছবি লাল হয়ে যায়। শেখ হাসিনার নির্দেশে তাঁর সামরিক সচিব ফোন করে আমাকে অনুরোধ করে, আমি যেন আগের প্রোফাইলের ছবিতে ফিরি। আমি রাজি হইনি। এতে শেখ হাসিনা স্পষ্টতই বিরক্ত হন। এরপর আমার সরকারি চাকরিজীবী আত্মীয়স্বজনদের দিকে নানা ধরনের হুমকি আসতে থাকে। ডিজিএইচএস-এ (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) কর্মরত আমার এক ভাতিজিকে তাঁর এক সহকর্মী ব্যাগ থেকে কারবাইন দেখিয়ে বলে, “আর অফিসে এসো না।” একই সময়ে ডিজি ডিজিএফআই আর সিআইবি-এর ডিরেক্টর আমার সাথে দেখা করতে চায়, যাতে আমি একটি প্রেস কনফারেন্স করে বলি, লাল প্রোফাইল ছবি ছিল একটি “ভুল” পোস্ট। আমি রাজি হইনি। মোহাখালী ডিওএইচএস কাউন্সিল আমার বাসাবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করে।

২ বা ৩ আগস্ট নাগাদ সব ডিওএইচএস অঞ্চলেই অভিভাবক আর পরিবারগুলো রাস্তায় নামতে শুরু করে, প্রথমে মিরপুর ডিওএইচএস থেকে। মোড় ঘুরে যায় ৩ আগস্ট বেলা ১:৩০ ঘটিকায় যখন জেনারেল ওয়াকার সেনাপ্রাঙ্গণে জুনিয়র অফিসারদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। তাঁদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, কেননা নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালানোর নির্দেশে তাঁরা বিক্ষুব্ধ ছিলেন। তাঁদের অসন্তোষ অনুভব করে জেনারেল ওয়াকার বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে তাঁদের পক্ষে দাঁড়ান। তারপরে যদিও বিচ্ছিন্ন কিছু জায়গায় গুলির ঘটনা ঘটে, যেমন যাত্রাবাড়ীতে, অন্যত্র গুলির মাত্রা অনেকটাই কমে আসে।

ষষ্ঠদশ অংশ

একদিন মহাখালী ডিওএইচএস থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আয়ুব ফোন করে জানালেন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাফিজ আমার সাথে দেখা করতে চান। তিনি ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর কাদের মিলে আমার অফিসে আসেন। আমরা ঠিক করলাম, চলমান বিক্ষোভের পক্ষে একটি মিডিয়া ব্রিফিং করব, যা অনুষ্ঠিত হবে রাওয়ায় (RAOWA)। আমার এক বিশ্বস্ত সহযোগী মূল সংবাদমাধ্যমগুলোকে সেখানে আমন্ত্রণের ব্যবস্থা করল। আমরা বিভিন্ন বাসায় যাই, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন অফিসারদের বাড়িতে—যেমন সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নুরউদ্দিন খানের যিনি ১৯৯০ সালে এরশাদের স্বৈরতন্ত্র উৎখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ৪ আগস্টের এই ব্রিফিং ক্ষমতাসীন সরকারের ভিত নাড়িয়ে দেয়। তখনও তারা আশা করছিল, হয়তো দেশব্যাপী অচলাবস্থার মধ্যেও কোনোভাবে টিকে যাবে। শোনা যায়, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকী ও শেখ হেলাল ব্রিফিংয়ের বিষয়বস্তু শোনার পর রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে যান, হয়তো বুঝতে পারেন—তাঁদের সময় ফুরিয়ে এসেছে।

৪ আগস্ট থেকেই শেখ হাসিনা আমাকে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের সহিংসতার নানা ছবি পাঠাতে শুরু করেন এবং ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। আমি ফোনে সাড়া দেইনি। ৭ আগস্টের পর ছবি পাঠানো বন্ধ করেন তিনি। শুধু ২৭ অক্টোবর শেষবারের মতো একটি ভিডিও পাঠান। এর মধ্যে দেশ পুরোপুরি বিপ্লবীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ঢাকায় অবরোধ, যেটি মূলত ৬ আগস্ট হওয়ার কথা ছিল, সেটি এগিয়ে ৫ আগস্টে করা হয়। তবু শেখ হাসিনা শেষ মুহূর্তে আরেকটি মরিয়া চেষ্টা করেন। ৪ আগস্ট রাতে (প্রায় ২৩:০০টায়) গণভবনে সব নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানদের ডেকে তিনি নির্দেশ দেন, বিক্ষোভকারীদের শেষ দফা আক্রমণ যেমন করে হোক দমাতে হবে।

এজন্য একটি বিশদ পরিকল্পনা করা হয়। বিজিবি, র্যাব, ও পুলিশকে ঢাকার ১৩টি প্রবেশপথ আটকে দিতে বলা হয এবং সেনাবাহিনীকে শহরের প্রধান এলাকাগুলো দখলে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। সেনাপ্রধান বুদ্ধিমত্তার সাথে এমনভাবে সেনা মোতায়েন করেন, যাতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি কম থাকে—তিনি জানতেন যে বাহিনীর বেশিরভাগ সদস্যই গুলি চালাতে নারাজ।  ৫ আগস্ট অসংখ্য মানুষ ঢাকায় ঢুকতে শুরু করলে, বাইরের দিকে অবস্থান নেওয়া বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশ বাধা না দিয়ে তাদের পথ ছেড়ে দেয়। শহরের ভেতরে থাকা সেনা ইউনিটগুলোও জনতার সাথে মিশে গিয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ করে। গণভবন দখল হয়, আর শেখ হাসিনা তড়িঘড়ি করে দেশ ছাড়েন— কয়েক মুহূর্তের জন্য জনতাকে থামিয়ে রাখা হয়, যাতে তিনি হেলিকপ্টারে করে নিরাপদে বেরিয়ে যেতে পারেন। 

সপ্তদশ অংশ

শেষ দৃশ্যটা ঘটে সেনাসদরে যেখানে সেনাপ্রধান এবং নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানরা—মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর (বিএনপি) ও ডিজি ডিজিএফআই মেজর জেনারেল হামিদের মাধ্যমে—পাঁচটি রাজনৈতিক দল আর আইন শিক্ষক আসিফ নজরুলকে ডেকে পাঠান (এটি ছিল একটি বিতর্কিত পদক্ষেপ। যেখানে বিজিতদের বিজয়ীদের কাছে যাওয়ার কথা, সেখানে উল্টো বিজয়ীরা বিজিতদের কাছে রিপোর্ট করে)। শোনা যায়, সেখানে রাজনীতিবিদরা ও আসিফ নজরুল সেনাপ্রধানের রাষ্ট্রপতি ও সংবিধান বহাল রেখে, আগের তত্বাবধায়ক (caretaker)-এর আদলে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশ চালানোর পরামর্শ মেনে নেন।

পরে জনসম্মুখে সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার পদত্যাগ ঘোষণা করেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা দেন। এরপর বঙ্গভবনে, যেখানে ছাত্রনেতারাও উপস্থিত ছিলেন, ড. ইউনূসকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে ঠিক করা হয়। যে বিপ্লব জোরালোভাবে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত একটি ‘অকাল সিজার’ এর মতো জটিল কৌশলের মাধ্যমে অনেকটাই মিইয়ে যায়—কিছু ক্ষমতাবান লোক মূল নাটের গুরু হিসেবে থেকে যান।
যদি আদর্শভাবে ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের ন্যায় এই বিপ্লব সম্পূর্ণ সাফল্য পেতে চাইত, তাহলে হয়তো গণভবন ও বঙ্গভবন একযোগে দখল হতো, বিদ্যমান সংবিধান ছিঁড়ে ফেলা হতো, আর আগের শাসনের সহায়তায় যেসব ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা নিষ্ঠুরতা চালিয়েছেন, তাঁদের সবাই হয় দেশছাড়া হতেন বা বিচার মুখোমুখি হতেন। গড়ে উঠত একটি বিপ্লবী পরিষদ, যারা নতুন শাসনব্যবস্থা প্রণয়ন, মৌলিক সংস্কার এবং গণভোটের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করত। তারপর নির্বাচনী গণতন্ত্রে ফেরা যেত। কিন্তু অনভিজ্ঞ বিপ্লবী নেতৃত্ব পুরনো পদ্ধতিতে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করে পূর্ববর্তী ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়ে। নতুন কোনো ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ তারা তাই হারিয়ে ফেলে। এপরিস্থিতিতে ক্ষমতার শূন্যতা সৃষ্টি হয় যার ফাঁক দিয়ে অন্য বৃহৎ রাজনৈতিক দলটি আওয়ামী লীগের ফেলে যাওয়া শূন্য জুতোয় পা গলিয়ে দ্রুত আরেকটি স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে দ্রুত ধাবমান হয়।

mzamin