Showing posts with label জলবায়ু. Show all posts
Showing posts with label জলবায়ু. Show all posts

Sunday, September 8, 2024

‘জলবায়ু সংক্রান্ত নীতি ও পরিকল্পনার সংস্কার প্রয়োজন’

বিগত সরকারের করা বেশ কয়েকটি জলবায়ু সংক্রান্ত জাতীয় নীতি ও পরিকল্পনা অগণতান্ত্রিকভাবে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বিদেশি পরামর্শকদের দিয়ে করা হয়েছে বলে দাবি করেছে নাগরিক সংগঠন ও উন্নয়ন সহযোগী সংগঠনের জোট ‘জলবায়ু ন্যায্যতা জোট-বাংলাদেশ’। তারা বলছে, এসব জলবায়ু নীতি ও পরিকল্পনায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও সংস্কার প্রয়োজন।

শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) নেতৃত্বাধীন ৩৯টি নাগরিক সংগঠন ও উন্নয়ন সহযোগী সংগঠনের জোট ‘জলবায়ু ন্যায্যতা জোট-বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে জোটের পক্ষ থেকে কয়েকটি জাতীয় নীতি ও পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে সিপিআরডি’র প্রধান নির্বাহী ও ‘জলবায়ু ন্যায্যতা জোট- বাংলাদেশ’- এর সমন্বয়কারী মো. শামছুদ্দোহা বলেন, ‘‘জলবায়ু অর্থায়নের জাতীয় তহবিল ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ)’ ও এর আইনি কাঠামো ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট অ্যাক্ট’-এ দলীয় সরকার, আমলাতন্ত্র ও পেশাজীবীদের আধিপত্য সর্বোতভাবে নিশ্চিত হয়েছে এবং এতে অবাধ দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করেছে। বিসিসিটিএফ পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্য বিশিষ্ট ট্রাস্টি বোর্ডের ১৪ জনই মন্ত্রী ও একজন সচিব। এছাড়া দুইজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি রয়েছেন সরকার দলীয় মন্ত্রী বা ফান্ড বোর্ডের আমন্ত্রণে বোর্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন, যারা প্রকারান্তরে দলীয় সরকারেরই অংশ।”
‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা’ বাতিলের দাবি জানিয়ে শামছুদ্দোহা বলেন, বিগত সরকারের এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) বিষয়ক মূখ্য সমন্বয়কারীর একক তত্ত্বাবধানে কোনো ধরনের অংশীজন আলোচনা ছাড়াই বিদেশি পরামর্শকদের দ্বারা এ পরিকল্পনাটি তৈরি করা হয়।
এটি দেশের অন্যান্য পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন এবং বিদেশি ঋণনির্ভর। এছাড়া জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার স্থানীয়করণের এবং অঞ্চলভিত্তিক জলবায়ু ঝুঁকিগ্রস্ততা নিরূপণের মাধ্যমে স্থানীয় অভিযোজন পরিকল্পনা প্রণয়নের দাবিও জানান তিনি।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ‘বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও এর জাতীয় নীতি-পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় এখনো গণতন্ত্র এবং স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের আধিক্য ও তীব্রতা পূর্বানুমিত হলেও আমাদের প্রস্তুতি এখনও কাগুজে পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন সুশীলনের উপ-নির্বাহী পরিচালক মো. নাসির উদ্দিন ফারুক, নাগরিক উদ্যোগের গবেষক ফারহান হোসেন জয়, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের উপ-ব্যবস্থাপক জনাব আহসানুল ওয়াহেদসহ জোটের বিভিন্ন প্রতিনিধিরা।

Friday, June 2, 2017

প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে রয়ে যেতে ট্রাম্পকে আহ্বান

বিশ্বনেতা থেকে শুরু করে প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী। অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অঙ্গীকার রক্ষা করার আহ্বান জানাচ্ছেন। বুধবার বিভিন্ন খবরে বলা হয়, যুগান্তকারী এই জলবায়ু চুক্তি থেকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেবেন। এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র সিরিয়া ও নিকারাগুয়া ব্যতিত বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। চুক্তি মোতাবেক বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখতে কাজ করবে দেশগুলো। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘ধোঁকাবাজি’ আখ্যা দেয়া ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারাভিযানকালে এই চুক্তি থেকে নিজ দেশকে প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেন। তবে মিত্র দেশগুলোর চাপের মুখে তিনি বুধবার বলেছেন, এ ব্যাপারে আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন তিনি। বিভিন্ন দেশের নেতারা ট্রাম্পকে আহ্বান জানাচ্ছেন চুক্তিতে রয়ে যেতে। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা। নিজের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় এই চুক্তি বাতিল করা ছাড়াও জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত তহবিলে মার্কিন অনুদান বন্ধেরও প্রতিশ্রুতি দেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে এই প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধে নিন্দা জানানো হয়।
ইউরোপে অনেক নেতাই চুক্তি থেকে আমেরিকার সরে যাওয়ার সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট অ্যান্টোনিও তাজানি বুধবার বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন কোনো রূপকথা নয়।’ তিনি বলেন, ‘মরূকরণ, পানির সংকট, রোগবালাই, বৈরী আবহাওয়ার কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে। নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। আমরা যদি দ্রুত সাহসিকতার সঙ্গে পাল্টা ব্যবস্থা না নিই, এর মানবিক ও অর্থনৈতিক দাম আরো চড়া হতে থাকবে।’ ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যঁ ক্লদ জাঙ্কারও এই চুক্তি ত্যাগের বিরুদ্ধে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন।
জার্মানিতে বুধবার তিনি বলেন, ‘আমেরিকা স্রেফ চাইলেই জলবায়ু সুরক্ষা চুক্তি ত্যাগ করতে পারবে না। ট্রাম্পের ধারণা পারবে, কারণ তিনি বিস্তারিত জানেন না।’ জাঙ্কার আরো বলেন, ‘ইউরোপের দায়িত্ব’ হলো যুক্তরাষ্ট্রকে বলা এই চুক্তি কিভাবে কাজ করে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি৭-এর সম্মেলনে, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আলোচনা ‘খুবই অসন্তোষজনক তো বটেই, খুব কঠিন ছিল।’ মার্কেল বলেন, ইউরোপিয়ান নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আমরা চাই যুক্তরাষ্ট্র নিজের অঙ্গীকারের প্রতি অটুট থাকুক।
চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়েছেন কূটনীতিক ও অন্যান্য নেতারাও। ইথিওপিয়ার কূটনীতিক জেবরু জাম্বার এন্দালিও যিনি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে জলবায়ু পরিবর্তন দরকষাকষিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন, তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এ চুক্তি ছেড়ে চলে যায় তবে তা হবে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। তার ভাষ্য, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে, তা বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হবে। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রতি।’ চীনা সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের কর্মকর্তা চাই কিমিন বলেন, এ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলে বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তার ভাষ্য, ‘প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও জাতিসংঘে আমাদের রাষ্ট্রদূত বারবার পরিষ্কার করে বলেছেন, প্যারিস চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেয়াটা হবে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।’ শি জিনপিং বুধবার চুক্তির প্রতি নিজের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বিশ্বখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষাবিদ নোয়াম চমস্কি অতীতে জলবায়ু সংক্রান্ত উদ্ভট দৃষ্টিভঙ্গি ধারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির কড়া সমালোচনা করেন। তিনি একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংগঠন’ হিসেবে আখ্যা দেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ওই দাবি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, মানবসভ্যতার ধ্বংস আনয়নের প্রতি দলটি রীতিমতো অঙ্গীকারাবদ্ধ।
কমপক্ষে ২২ জন রিপাবলিকান সিনেটর ও কয়েক ডজন প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য প্যারিস চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করার প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকারকারী ওকলাহোমার রিপাবলিকান নেতা জেমস ইনহোফের নেতৃত্বে সিনেটররা চুক্তি থেকে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের পক্ষে চিঠি লিখেছেন। তবে দলটির কেউ কেউ এখনো চুক্তির পক্ষে। যেমন, সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মিট রমনি উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, প্যারিস চুক্তির প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা শুধুমাত্র জলবায়ুর বিষয়ই নয়। বৈশ্বিক নেতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানও এখানে জড়িত।
অপরদিকে ডেমোক্রেট নেতারা মোটামুটি চুক্তির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ। সাবেক ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন সম্প্রতি বলেছেন, চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করাটা হবে সাংঘাতিক বোকামি আর একেবারেই ধারণাতীত। ডেমোক্রেট দলের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ সদস্যরাও উদ্বেগ জানিয়েছেন। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের ভবিষ্যতের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। প্যারিস চুক্তিতে থাকাই আমাদের শিশুদের ও বৈশ্বিক নেতৃত্ব রক্ষার সেরা উপায়। প্রতিনিধি পরিষদে প্রতিনিধি পরিষদের নেত্রী ন্যান্সি পেলোসি বলেন, নোংরা জ্বালানি এজেন্ডার প্রতি সমর্থন ও প্যারিস চুক্তি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত আমাদের পৃথিবীর প্রতি সাংঘাতিক এক হুমকি। নিউ ইয়র্কের মেয়র বিল দা ব্লাসিও ট্রাম্পের এ ধরনের সিদ্ধান্ত আগেই অগ্রাহ্য করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন।
অপরদিকে আমেরিকার প্রখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টেসলা ও স্পেসএক্স-এর প্রধান নির্বাহী এলেন মাস্ক হুমকি দিয়ে বলেছেন, প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে এলে ট্রাম্পের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে তিনি পদত্যাগ করবেন। এপ্রিলে অ্যাপল, গুগল ও শেল সহ ১৫টিরও বেশি প্রযুক্তি ও জ্বালানি কোম্পানি প্যারিস চুক্তির প্রতি সমর্থন দিতে প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানান। ইতালিতে প্রতিবাদে নেমেছেন অ্যাক্টিভিস্টরা। ট্রাম্পের কথিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বদলে তারা পৃথিবীকে আগে অগ্রাধিকার দিতে বলেছেন।

Friday, May 20, 2011

যখন তোমার পা-ই তোমার পাসপোর্ট by ফারুক ওয়াসিফ

সরকারের নড়াচড়ার আগেই মানুষ নড়াচড়া শুরু করেছে। বাংলাদেশের জলবায়ু-শরণার্থীদের পায়ে পায়ে শুরু হয়ে গেছে বিশ্বের বৃহৎ ও দীর্ঘতম এক অভিবাসন। উপকূলীয় দুর্গতরা নিজ নিজ বসতি ছেড়ে কেউ উঠেছে বাঁধের ওপর, কেউ এসে পড়েছে ঢাকার কড়াইল বস্তিতে, কেউ মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধে। খুলনা ও চট্টগ্রামেও তারা পৌঁছে যাচ্ছে। কেউ পাড়ি দিচ্ছে সীমান্ত। যারা পারছে তারা মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ নিচ্ছে। বিভিন্ন সমীক্ষা ও স্থানীয়জনপ্রতিনিধিসূত্রে জানা যাচ্ছে, সাতক্ষীরার গাবুরা ইউনিয়নের অর্ধেক মানুষই এলাকা ছেড়ে যে যেদিকে পারে চলে গেছে।
হাজার বছর ধরে আর্য-দ্রাবিড়, আরব-মুঘল-পাঠান ও ইংরেজকে আশ্রয় দিয়েছে বঙ্গ। আজ বঙ্গবাসীর অনেকেই মরিয়া হয়ে হাঁটা দিচ্ছে আর্যদের দেশে, আরবদের দেশে, ইউরোপীয়দের দেশের দিকে। নভোযান যেমন পৃথিবী ছাড়ার আগে কক্ষপথে কয়েক পাক ঘুরে দূরের গ্রহ-তারার দিকে ছুটে যায়, তারা তেমনি ঘোরা শুরু করেছে স্বদেশের পথে পথে। তাদের পায়ে পায়েই শুরু হয়ে গেছে পাল্টা এক বৈশ্বিক অভিবাসন। নতুন করে উঠছে পুরোনো সেই স্লোগান: তোমার পা-ই তোমার পাসপোর্ট, তোমার হাতই তোমার কর্মের অধিকার, তোমার অধিকারই তোমার ভিসা, তোমার সন্তানই নতুন মানবতা।
প্রাচীনকাল থেকে কয়েক শতক আগে পর্যন্ত বঙ্গীয় বদ্বীপ গ্রহণ করেছিল চারটি বড় অভিবাসনের স্রোত। বাংলা ছিল সভ্যতার ফ্রন্টিয়ার জোন বা সীমান্ত অঞ্চল—যার পরই সাগর ও অরণ্য। আরব বণিক ও ধর্মপ্রচারকেরা এসেছিল, এসেছিল ভাগ্যসন্ধানী তুর্কি সেনা ও সুফিরা, তারও আগে জয় করতে এসেছিল আর্যরা, সবার শেষে আসে ইংরেজ। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষও গঙ্গা পেরিয়ে এদিকে পা রাখে। গঙ্গা নদী পূর্বদিকে সরে আসার সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববঙ্গে বসতি স্থাপন এবং কৃষির বিস্তারও বেগবান হয়।
এই অভিবাসী স্রোতধারার বড় অংশই এখানকার মাটি ও মানুষের মধ্যে মিশে যায়। কম জনবসতিপূর্ণ কিন্তু উর্বর বাংলার আকর্ষণ কেইবা এড়াতে পেরেছিল? সেকালে ‘অভিবাসী’ বা ‘শরণার্থী’ নামক ধারণার জন্ম না হলেও এই ভূখণ্ডের শিথিল ও উদার সমাজকাঠামো বহিরাগতদের গ্রহণে বাধা দেয়নি। মুসাফির বা অতিথির বিশেষ অধিকার সেই সমাজে ছিল। এর সুবাদে সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিরাট এক মিশ্রণ-মঞ্চ হতে পেরেছিল বাংলা। আজ আমেরিকা নিজেকে যে অর্থে ‘মেল্টিং পট’ বলে থাকে, তার থেকেও অনেক মানবিক ও সমৃদ্ধ ছিল বাংলার বহুজন জাতির মিশ্রণ-প্রক্রিয়া।
আজ প্রতিদান চাইছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপে নিচের থেকে ওপরের দিকে, পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখে আরেকটা অভিবাসন-যাত্রা (এক্সোডাস) শুরু হয়ে গেছে। সিডর-আইলার দুর্গতরা, ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার শিকারেরা, নদীভাঙন ও খরায় বিপন্নরাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের বিচিত্র অভিঘাতে অজস্র পেশার অজস্র মানুষ তাদের বসতি ও পরিজন ছেড়ে বের হয়েছে পৃথিবীর পথে। ঢাকার মিরপুরের বস্তিতে, মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধে তারা আছে। খুলনা ও চট্টগ্রামের বস্তিতে নতুন আসা মানুষদের সারিতেও তারা দাঁড়িয়ে। তাদের বেশির ভাগই ছিল কৃষক-কারিগর বা জেলে, এখন তারা ছিন্নমূল মানুষ মাত্র।
বড় বড় নগরে তারা আসছে। সামান্য আশ্রয় নিয়ে নগর-দরিদ্রদের সঙ্গেও যখন তাদের সংঘাত ঘটবে, রাজনীতি ও রাষ্ট্র যখন তাদের বন্দোবস্ত দিতে ব্যর্থ হবে, তখন এটা পরিণত হবে জাতীয় সমস্যায়। আর আজকের দুনিয়ায় যাহাই জাতীয় তাহাই আন্তর্জাতিক। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যসহ ধনী দেশগুলোকে বাংলাদেশের দুর্গতদের জন্য সীমান্ত খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। স্পষ্ট কথায়, যারা প্রকৃতিকে চুষে-খেয়ে জলবায়ু বিপর্যয় নামিয়ে এনেছে, বিপন্নদের দায়িত্ব তাদের নিতে হবে। এটা তাদের ঔপনিবেশিক শোষণের দায়ও বটে। এই দায় অস্বীকার করা রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল, গণবিরোধী ও নীতির দিক থেকে অনৈতিক।
কেবল তো দিনের শুরু, দিনের শেষে প্রাকৃতিক সমস্যা সার্বিক রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সংকটের জন্ম দিতে বাধ্য। ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের এই জলবায়ু-শরণার্থীদের সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। বিশ্বের প্রতি ৪৫ জনের মধ্যে একজন এবং বাংলাদেশের প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন জলবায়ু বিপর্যয়ের শিকার হবে। সমুদ্রের উচ্চতা এক মিটার বাড়লেই দেশের ২০ শতাংশ এলাকা ডুবে যাবে। একদিকে হিমালয়ের বরফ গলা পানি, অন্যদিকে সমুদ্রের নোনা প্লাবণে আক্রান্ত হবে আরও বেশি এলাকা। অতি বন্যা, অতি বৃষ্টির পাশাপাশি চরম খরা ফিরে ফিরে আসবে। ধানের উৎপাদন কমে যাবে অর্ধেক। নতুন রোগ-মহামারির আক্রমণ ও জীবব্যবস্থার নৈরাজ্যের সামনে রক্ষাকবচ হারাব আমরা। খাদ্য-নিরাপত্তা, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে আরও বেশি মানুষ। এত মানুষের উপায় দেশের ভেতর থেকে করা সম্ভব না। যাওয়ার কোনো পথও থাকবে না। মুশকিল হলো, আন্তর্জাতিক আইনকানুন ও কনভেনশনগুলো রাজনৈতিক শরণার্থী ছাড়া অন্য কোনো শরণার্থীর দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। কাদের বলা হবে জলবায়ু-শরণার্থী, সে ব্যাপারেও সবাই একমত নয়। স্পষ্ট কথায় বাংলাদেশের এত মানুষের ভার কেউ নেবে না। কাজে কাজেই কোটি কোটি মানুষ নিজ সীমানার মধ্যেই বন্দী হয়ে পড়বে।
এমনিতেই দেশ জনসংখ্যার ভারে কুঁজো; সম্পদ, জমি ও সুযোগের চরম টানাটানি। রাষ্ট্র-প্রশাসন ও রাজনীতি গণবিরোধী, অদক্ষ, দুর্নীতিগ্রস্ত ও জনস্বার্থ-বর্জিত। যখন সব দিকেই আকাশ ভেঙে পড়বে আর সমুদ্র করবে তোলপাড়, তখন সীমিত সুযোগ নিয়ে কামড়াকামড়ি শুরু হবে। যাদের নেই তারা যাদের আছে তাদের ওপর হামলে পড়বে। এই চরমভাবাপন্ন পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে লতিয়ে লতিয়ে বাড়বে রাজনৈতিক হানাহানি, সন্ত্রাস ও দাঙ্গা। সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকেও তা উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। ভারতের আশঙ্কা, অন্তত কোটি সংখ্যক মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে সে দেশে যাত্রা করতে পারে। তাদের মোকাবিলার জন্য তারা আগাম কাঁটাতারের বেড়া এবং সন্ত্রাস দমনের সামর্থ্য সৃষ্টি করছে। এমনিতেই ভারতের বিপুল দারিদ্র্য সেখানে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে। এসব কারণে ভারত নিজের স্বার্থেই সব উপায়ে এই মানুষদের ঠেকিয়ে রাখবে। ভারতের সীমান্ত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও জোরদার করার সাম্প্রতিক তোড়জোড়কে এভাবেও পাঠ করা যায়।
সুতরাং আমাদের ল্যাঠা আমাদেরই সামলানোর কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যমান পরিবেশ ও মানুষবিনাশী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলানো ফরজ। সবচেয়ে বড় পরাশক্তি যে প্রাকৃতিক নিয়ম, তাকে মান্য করে নতুন করে শুরু করতে হবে সবকিছু। তার আগে দরকার হবে একটি নতুন আইন, যার সুবাদে বাংলাদেশের জলবায়ু-শরণার্থীরা আন্তর্জাতিক স্তরে তাদের অধিকার নিয়ে হাজির হতে পারবে। বাংলাদেশকে বিশেষ করে এই দুর্গতদের জীবন-জীবিকা-বাসস্থান ও নিরাপত্তার বিশেষাধিকার স্বীকার করতে হবে। তাদের বিশেষ স্ট্যাটাস দেওয়ার পরই আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে সেই স্ট্যাটাসের স্বীকৃতির জন্য কাজ করে যেতে হবে। এমনকি খসড়া হিসেবে প্রণীত অভিবাসন আইনেও জলবায়ু-দুর্গতদের জন্য বিশেষ সুযোগের ব্যবস্থা থাকতে হবে। যেসব দেশের উদ্বৃত্ত জমি ও সম্পদ আছে, তাতে এসব মানুষকে পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। জলবায়ুবিপন্ন পৃথিবীতে এটাই হবে ন্যূনতম মানবিক অধিকার, যা বাস্তবায়িত না হলে অন্যান্য অধিকারও বিশেষ কোনো অর্থ বহন করবে না। উদ্যোগী হলে এই কাজে অন্যান্য জলবায়ুবিপন্ন দেশের সমর্থনও আমরা পাব। আন্তর্জাতিক জনমতও সহানুভূতিশীল। সবার সম্মিলিত স্বার্থে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক আইন সংশোধন তাই জরুরি। এ ক্ষেত্রে ব্যথা যার, চিৎকারটা তাকেই করতে হবে।
সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন নিয়ে কাজ করছে। আধুনিক রাষ্ট্র ও অর্থব্যবস্থায় সবকিছুকেই ম্যানেজারিয়াল চোখে দেখা প্রায় বাতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমস্যাটা যখন বুনিয়াদি, তখন ব্যবস্থাপনার খুটখাট নিয়ে মেতে থাকা সমস্যাকে আড়াল করার শামিল। হাত দিতে হবে সমস্যার গোড়ায়। সে জন্য বিশ্বের বর্তমান রাজনীতি ও অর্থনৈতিক পদ্ধতি বদলাতে হবে, তেমনি জলবায়ু-দুর্যোগের সাপেক্ষে মানবাধিকারের আওতা ও ধারণা এবং আন্তর্জাতিক আইন-আদালতকেও নতুন করে সাজাতে হবে। জলবায়ুবিপন্নদের বৈধ জলবায়ু-শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়া এবং তাদের পুনর্বাসনের দাবিকে ন্যায্য অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা তাই জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
এই পৃথিবী আমাদের একমাত্র তরী, একে কেটে ভাগ করে চ্যালা কাঠ বানিয়ে রাখা অপরাধ। যাদের মাটি শুকনো, ডুবন্ত মানুষকে তাদের ডাঙায় উঠতে দিতেই হবে। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর গতিক দেখে মনে হয়, নিজেদের নাকের ডগার থেকে বেশি দূর তারা দেখতে পান না। তাঁরা বাঁচলেই মানুষ বাঁচবে না।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com

Tuesday, March 8, 2011

জবাবদিহির রাজনীতি, সুশাসনের অর্থনীতি by মামুন রশীদ



বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি ও রাজনীতিতে সহনশীলতার ব্যাপারে ড. আকবর আলি খানের অবস্থান পরিষ্কার। তাঁর সর্বশেষ বই ফ্রেন্ডলি ফায়ার, হাম্পটি ডাম্পটি ডিজঅর্ডার অ্যান্ড আদার এসেইজ যেন তাঁর হূদয়ের কথারই বহিঃপ্রকাশ। অর্থনীতি ও সুশাসন যেকোনো জাতিরই মেরুদণ্ড। আকবর আলি খানের গ্রন্থেও মূল আধেয় বা উপাদান হিসেবে আছে এই দুটি ইস্যু। লেখক দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা যেমন বলেছেন, তেমনি সুচিন্তিত অর্থনৈতিক নীতিমালার অভাবটাও তুলে ধরেছেন। দেশের অর্থনীতি ও সুশাসনকে ঘিরেই মূলত প্রবন্ধগুলো আবর্তিত, যেগুলো লেখক তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে বেশ প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন। তিনি ১৯৭০ সাল থেকে অর্থনীতি ও সুশাসনবিষয়ক চালচিত্রের তুলনামূলক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণও করেছেন।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির যখন জন্ম হয়, তখন এটি রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হলেও অর্থনৈতিক দিক থেকে ছিল একেবারেই বিধ্বস্তপ্রায়। তিন দশক পরে এসে অবশ্য পরিস্থিতির কমবেশি পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু এখন দেশটি অর্থনৈতিকভাবে অনেকটা বিকাশমান পর্যায়ে বা ধারায় থাকলেও রাজনৈতিক দিক থেকে অস্থিরতায় নিমজ্জিত। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও জনগণের মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ বেড়েছে। সমাজে বৈষম্য বাড়লেও দারিদ্র্য কমেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। লেখক পরামর্শ দিয়েছেন, ধনী ও গরিব উভয় শ্রেণীর স্বার্থে শহরগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সেবা-পণ্যের মান ও পরিমাণ বৃদ্ধি এবং পরিবহনব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এ ছাড়া ক্ষুধামুক্তির জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কার্যক্রম ও খাদ্য উৎপাদন জোরদার করা প্রয়োজন।
আমাদের দেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে যে সরকারি নীতিমালা ও সিদ্ধান্ত পাল্টায়, সেটি যেমন তুলে ধরেছেন তেমনি সরকারের নেওয়া ইতিবাচক সিদ্ধান্তগুলো নিয়েও আলোচনা করেছেন তিনি। বাংলাদেশ মানবিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সত্তরের দশকে যেখানে নিম্নপর্যায়ে অবস্থান করছিল, তা এখন মধ্যম স্তরে উন্নীত হয়েছে। এটি অবশ্যই সরকারি নীতিমালায় সঠিকতার সুবাদে সম্ভব হয়েছে। তা সত্ত্বেও, সরকার অনেক সময়ই অজ্ঞতার কারণে ফ্রেন্ডলি ফায়ার করে বা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়। এ ক্ষেত্রে ইনফরমেশন গ্যাপ বা তথ্যের দুর্বলতা সরকারযন্ত্রের ভুলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া সরকার কঠিন সমস্যা মোকাবিলা করার বিষয়টি পাশ কাটিয়ে সহজ ও জনপ্রিয় সমাধানের পথটাই বেছে নিতে পছন্দ করে। আকবর আলি খানের মতে এটি ‘বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবঞ্চনা বা প্রতারণা’বিশেষ। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিটা এমন যে অজ্ঞতার বিষয়টি প্রকাশ করলে নিজের ভাবমূর্তি যেন ধুলায় মিশে যাবে! সে জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নীতিমালা প্রণয়ন-প্রক্রিয়ায় ভুলত্রুটি রুখতে হলে তৃণমূল পর্যায়ের কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করতে হবে।
লেখক সরকার বা প্রশাসনযন্ত্রের দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘হাম্পটি ডাম্পটি ডিসঅর্ডার’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। নার্সারি শ্রেণীর বহুল জনপ্রিয় রাইম বা ছড়ায় যেমন বলা হয়েছে যে ‘হাম্পটি ডাম্পটি’ একবার ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না, তেমনি এই গ্রন্থে তিনি বলতে চেয়েছেন, যেকোনো সংস্থা বা সরকারব্যবস্থা একবার মুখ থুবড়ে পড়লে পরে আর ভালোভাবে কাজ করতে পারে না। সে জন্য গ্রন্থটির প্রণেতা বেসরকারীকরণ, আউটসোর্সিংয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করাসহ সরকারি সংস্থাগুলোতে কার্যকর সংস্কার সাধন এবং নতুন জনবলে প্রতিষ্ঠানগুলো সাজিয়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন।
গ্রন্থটিতে লেখক দেশে নৈতিকতানির্ভর ব্যাংকিং কার্যক্রমের ওপরও জোর দিয়েছেন। কারণ, নীতি-নৈতিকতাবর্জিত কার্যক্রম সার্বিকভাবে ব্যাংককে অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যায়। সে জন্য লেখক কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ তদারকি সংস্থাগুলো ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রমের ওপর তদারকি চালানোর পরামর্শ দেন। তিনি ব্যাংকের কর্মচারী থেকে শুরু করে সর্বস্তরের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের জন্য একটি যথাযথ আচরণবিধি প্রণয়ন এবং তা কঠোরভাবে পরিপালনের পরামর্শ দিয়েছেন। নীতি-নৈতিকতাবহির্ভূত কার্যক্রম রুখতে আইনি কাঠামো জোরদার করারও পরামর্শ দেন তিনি।
লেখক গ্রামাঞ্চলে অর্থায়ন বিষয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে দেখতে পান যে গ্রাম থেকে শহরের দিকে নিয়ে আসা হচ্ছে অর্থ। অথচ এর বিপরীতটাই হওয়ার কথা, অর্থাৎ শহর থেকে গ্রামে অর্থ স্থানান্তর হবে, এটাই স্বাভাবিক। এ ধরনের উল্টো পরিস্থিতির কারণে পল্লি অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক ও উদ্যোক্তারা নিদারুণভাবে ঋণসংকটে ভোগেন। গ্রামাঞ্চলে অর্থায়নের প্রবণতা কমে যাওয়ার কারণে সরকারকেই প্রধান ভিলেন মনে করেন লেখক। তিনি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন. ব্যাংক-বিমাসহ রাষ্ট্রায়ত্ত খাত ও আইনি কাঠামোয় সংস্কার সাধন এবং আর্থিকভাবে অলাভজনক বা সম্ভাবনাহীন ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি বাতিলের সুপারিশ করেন। সংস্কার-প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদে খরচ ও ঝক্কিটা দৃশ্যত একটু বেশি মনে হলেও এটি দীর্ঘ মেয়াদে দারুণ ফল বয়ে আনবে বলে তিনি মনে করেন।
এই গ্রন্থে লেখক যেসব বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো দেশের ভৌত অবকাঠামো জোরদারকরণ। নিয়মানুযায়ী মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সাড়ে ৭ শতাংশ পরিমাণ অর্থ ভৌত অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ করা উচিত। গত ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) জন্য ১৭০ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়, যা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক অনেক কম। সে কারণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতে (পিপিপি) বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে। তবে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতির হার কম। কারণ, বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকায় তাঁরা শহরকেন্দ্রিক বিনিয়োগের পথই বেছে নেন। তাঁরা বেশ ভেবেচিন্তে তবেই ঠিক করেন কোথায় কোন খাতে বিনিয়োগ করবেন। লেখক বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করতে কিছু নীতিগত পরামর্শ দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম পরামর্শ হলো, লালফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশের উন্নয়ন ঘটানো উচিত সরকারের। সংস্কারের মাধ্যমে উপযোগসেবা প্রদানকারী সরকারি সংস্থাগুলোর সেবার মান বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে হবে। পিপিপির অপেক্ষায় না থেকে সরকারের উচিত বিদ্যুৎ ও পানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো। দরিদ্রদের জন্য যে ভর্তুকি দেওয়া হয়, তা নিবিড়ভাবে তদারক করতে হবে। সরকারি নীতিমালা এমনভাবে গ্রহণ করতে হবে, যা অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়ায় এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে।
লেখক বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে ভোলেননি। কারণ দেশের বিচার বিভাগের সর্বস্তরে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আদালতের কাছে যেন নিষ্পাপ মানুষের জীবন-মৃত্যু তেমন কিছু নয়। এটি যেন ভুয়া বা জাল কাগজপত্র দাখিল আর অধিকতর অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকারও পরিচালিত হয় এলাকার তথাকথিত এলিট বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নেতৃত্বে। লেখক বিচারব্যবস্থায় কম্পিউটারায়ন এবং এই খাতের ওপর অব্যাহত তদারকি ও নজরদারি রাখার বিষয়ে জোর দিয়েছেন।
রাজনৈতিক অস্থিরতা যেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। গ্রন্থে লেখক রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে পাঁচটি উৎস চিহ্নিত করে দেখিয়েছেন। এগুলো হচ্ছে: সামাজিক পুঁজির অভাব, উত্তরাধিকারের রাজনীতি, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা, প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রিলেশনশিপ বা পৃষ্ঠপোষক-গ্রাহক সম্পর্ক এবং বড় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রধানদের মধ্যে ‘জিরো সাম গেইম’ বা কোনো রকম কথাও না বলা বা মুখ দেখাদেখিও না থাকা। তিনি বেসরকারি সংস্থাগুলো (এনজিও) আর সুশীল সমাজকে রাজনৈতিক শত্রুতা বা বৈরিতার ঊর্ধ্বে থাকা, এনজিওর মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে সামাজিক পুঁজি জোরদারকরণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর বংশানুক্রমিক বা উত্তরাধিকারের রাজনীতির নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসা, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) অধিকতর কার্যকর করে তোলা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের প্রতি সহনশীল ও উদারতা দেখানোর বিষয়ে জোরালো পরামর্শ দিয়েছেন।
আমাদের দেশের উন্নয়ন-প্রক্রিয়া সম্পর্কে নীতিনির্ধারক, পণ্ডিত-গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং যাঁরা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে জানতে আগ্রহী তাঁদের সবাই এই গ্রন্থ থেকে জ্ঞান আহরণের সুযোগ পাবেন বলে আমার বিশ্বাস।
মামুন রশীদ: ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক।

Tuesday, January 4, 2011

জলবায়ু সম্মেলনে আমরা কী পেলাম? by আহসান উদ্দিন আহমেদ ও শরমিন্দ নীলোর্মি

কানকুনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্তসরকারি আলোচনা ও দর-কষাকষি শেষ হয়েছে। সমস্যা সমাধানের অগ্রগতি হয়েছে নিঃসন্দেহে, তবে আরও এগোনোর সুযোগ ছিল, তা হয়নি। আলোচনার ধরনটাই এমন যে নিজেদের সুবিধামতো সব ফলাফল হয়ে যাবে, তা হওয়ার নয়। এককথায় মন্দের ভালো একটা অগ্রগতির স্মারক দিয়ে শেষ হয়েছে কানকুন বৈঠক।
ঘুমবিহীন দুই রাতের টানা দর-কষাকষির পর প্রায় মতৈক্যের একটা সনদ গৃহীত হয়েছে। এটি মূলত গেল বছরের কোপেনহেগেন সমঝোতার সুরে পুনরায় বেজেছে, তবে বেশি নির্গমনকারী দেশগুলোর দায় স্বীকারের চেষ্টা হিসেবে অর্থ ছাড়ের কথা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। বহু আকাঙ্ক্ষিত বিষয় ‘নির্গমন হ্রাসের’ ব্যাপারে যা বলা হয়েছে, তা চুলচেরা বিচারে বিশ্বের দুর্গত মানুষের বাঁচার জন্য যথেষ্ট উৎসাহ-উদ্দীপক নয়।
সম্মেলনের শুরুটা খারাপই ছিল। প্রথম সকালেই উদ্বোধনীতে জি ৭৭+নয়া চীনের পক্ষে আশাবাদ ব্যক্ত করা হলো যে, ‘কানকুনে এমন আলোচনা হবে, যাতে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে গিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও বাধ্যবাধকতার চুক্তিতে পৌঁছানো যায়।’ অর্থাৎ কানকুনে কেবল পথ রচনা করাই হবে মূল লক্ষ্য। শেষে যে বিষয়টির বাইরে কিছু হয়েছে তা নয়, মোটা দাগে তা-ই থেকেছে, তবে অর্থায়নে সামান্য অগ্রগতি হয়েছে বৈকি। যেহেতু বড় কোনো নির্গমন হ্রাসের চুক্তিপত্র করতে হয়নি, জলবায়ু সনদের আওতায় বেশি নির্গমনকারী দেশগুলো (যা সংযুক্তি-১ভুক্ত) তা-ই কিছুটা খুশিমনে বাড়ি ফিরেছে। বলা হয়েছে, ‘...তাপমাত্রা বৃদ্ধি যেন দুই ডিগ্রির বেশি না হয়’ এবং এর জন্য বেশি নির্গমনকারী দেশগুলো ১৯৯০ সালের তুলনায় তাদের নির্গমনের হার ২০২০ সালের মধ্যে ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমাবে। নির্গমন বেশি হ্রাসের ঘোষণা থাকলেও এ লক্ষ্যমাত্রা তেমন আহামরি নয়। নির্গমন বেশি হ্রাস করতে হলে ন্যূনতম ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ করতে হবে। কম হ্রাস করার সুযোগ থাকাতে সংযুক্তি-১ভুক্ত দেশগুলো খুশি হবেই, জানা কথা। অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী তাই বলেছেন, ‘...এটি এগিয়ে যাওয়ার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।’
তবে সবাই খুশি হয়নি। বলিভিয়া একেবারে বিরোধিতাই করেছে। যেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রির নিচে রাখার দাবি ছিল (বাংলাদেশের মন্ত্রী তাঁর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যে কী সুন্দর করেই না ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের দাবি পেশ করেছিলেন), সেখানে অর্জন ন্যূনতম দুই ডিগ্রি? এটা সার্বিকভাবে হতাশার বৈকি। পেদ্রো সলন সাধেই বলেননি, ‘(এই দলিল) বহু মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার দলিল।’ মানবতাবাদী এনজিওগুলো তেমনটাই মনে করছে।
এর বিপরীতে যা পাওয়া গেছে, তা যেন মন্দের ভালো। জলবায়ু তহবিলে (যে সবুজ অর্থায়নের কথা কোপেনহেগেনে বলা হয়েছে) এবার কিছু সুস্পষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। দ্রুত ছাড়ের তহবিলে ৩০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে। এ ছাড়া দূরবর্তী সময়ের সবুজ তহবিলের জন্য ২০২০ থেকেই ফি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন দেওয়ার মতৈক্য হয়েছে (এটা কিছুতেই সংযুক্তি-১-এর দেশগুলো দিতে চাইছিল না)। অর্থ দ্রুত ছাড়ের ব্যাপারে স্বল্পোন্নত দেশগুলো এবং দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর একটু তাড়া ছিল, তারই প্রতিফলন ঘটল এই অর্থায়নের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে।
জাপানের তীব্র বিরোধিতার মুখেও কিয়োটো প্রটোকল বোধকরি এ যাত্রা টিকেই গেল। হঠাৎ করেই ভারতের পক্ষে ভবিষ্যতে নির্গমন হ্রাসে বাধ্যবাধকতায় অংশ নেওয়ার ইঙ্গিতের পরই জাপান আশ্বস্ত হয়েছে, ইউরোপীয় গোষ্ঠী আহ্বান করেছে কিয়োটো চুক্তির নতুন রাউন্ডে অংশ নেওয়ার জন্য। এটা তীব্র ক্ষতির মুখোমুখি দেশগুলোর জন্য অন্তত ইতিবাচক হবে বলে ধারণা করা যায়।
অভিযোজনের একটি কমিটি নিয়ে বহু তর্ক-বিতর্ক হয়েছে সম্মেলনজুড়ে। অবশেষে একটি কমিটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে! অভিযোজনের বিষয়ে ক্ষয়ক্ষতি পূরণের কথাই মেনে নিয়েছে বিরোধকারী দেশগুলো (বলিভিয়া ছাড়া), সেখানে তেল উৎপাদানকারী দেশগুলোর (তথাকথিত) ‘ক্ষতিপূরণের’ জোরালো দাবিটা প্রায় অনুল্লেখ্য থেকেছে। ফলে অভিযোজনের বিষয়ে অর্থ ব্যবহারে তেমন কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে না বলে মনে হয়। অভিযোজনের সুবিধার্ধে আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মতৈক্য হয়েছে, এটা ছিল বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অন্যতম চাহিদা, যা পূরণ হবে বলে মনে হচ্ছে।
নির্গমন হ্রাসের ব্যাপারে সংযুক্তি-১ভুক্ত দেশগুলোর ওপর আলোচনা করার চাপটা নতুন দলিলে আর নেই, কিয়োটো চুক্তির পরের পর্বে বাধ্যবাধকতার চাপ রাখার সুযোগ আর পাওয়া যাবে না বলেই মনে হচ্ছে। উপরন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বহুল আলোচিত এমআরভির (পরিমাপযোগ্য, পরিবর্তনযোগ্য এবং সত্যায়নযোগ্য) বোঝা বেশ ভালোভাবেই চাপানো হয়েছে। অর্থায়ন পেলেও বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য এমআরভির বোঝা ভবিষ্যতেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটা হলে শর্ত পূরণ করে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে বাধ্য।
মোদ্দা কথা, কিছু মুদ্রার আগাম ঝনঝনানি শুনিয়ে সংযুক্তি-১ভুক্ত বেশি নির্গমনকারী দেশগুলো কিছুটা সুবিধা নিয়ে নিল বলে মনে হলো। এটা নিশ্চিত, দ্রুত অর্থায়নের কিছুটা তহবিল দ্রুতই এসে যাবে অভিযোজনের জন্য। তবে তাতে অভিযোজনের প্রয়োজন আরও বেড়ে যাবে বলে মনে হয়। কেননা ‘গভীর নির্গমন হ্রাসের’ বড় নিশ্চয়তা একেবারেই মেলেনি কানকুনে। প্রশ্ন তাই থেকেই গেল; নাকের বদলে নরুন পেলাম না তো?
এবার অর্থায়নের জন্য বিশেষ কমিটিতে কো-চেয়ার ছিলেন আমাদের পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী। কাজও করেছেন দিনরাত, প্রশংসনীয়ভাবে। তবে তিনি দৃষ্টি কেড়েছেন তাঁর বক্তৃতায়, যা বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। সেখানে বিশ্বব্যাপী নির্গমন হ্রাসের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছেন, দ্রুত নির্গমন হ্রাস না করলে একদিন অভিযোজনের আর দরকার পড়বে না। কেননা তা হবে বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ। এর পরও নির্গমনের ক্ষেত্রে আয়োজন কমই হয়েছে বলতে হবে। যেন বা ধনী দেশগুলো বিলিয়ন ডলারের ‘ক্ষতিপূরণের’ আশা দেখিয়ে নির্গমন কমানোর চাপটা কিছুটা হালকা করে নিল।
জলবায়ু পরিবর্তনের থাবায় বাংলাদেশের যে মানুষের জীবন যাচ্ছে, ওই ক্ষতির আবার পূরণ কী? প্রাপ্তির খাতাটা তাই লিখতে বসে মনে হচ্ছে, একটি গ্লাস আমরা বিশ্বনেতাদের কাছ থেকে পেলাম, যেটি অর্ধেক খালি। গ্লাসটা অর্ধেক ভরা হলে বরং বেশি খুশি হতাম।
লেখকদ্বয়: কানকুন সম্মেলনে বেসরকারিভাবে অংশগ্রহণকারী এবং যথাক্রমে সেন্টার ফর গ্লোবাল চেঞ্জ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত পরিবেশবিদ।

Tuesday, December 14, 2010

কানকুন জলবায়ু সম্মেলন

মেক্সিকোর কানকুনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে সাফল্য সামান্যই। কোপেনহেগেনের বহুল আলোচিত সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার পর এবারের সম্মেলন কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হলে এ ধরনের বহুপক্ষীয় আলোচনা ভবিষ্যতে আদৌ রাষ্ট্রগুলোর কাছে কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারত কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল। এ সম্মেলনের মাধ্যমে তা অনেকটাই কাটানো গেছে।
তবে জলবায়ু আলোচনার বেশ কিছু মুখ্য প্রশ্ন এবারও পাশ কাটিয়ে যাওয়া হলো। একটি ন্যায্য ও আইনগত বাধ্যবাধকতার চুক্তি করা যায়নি। অন্যদিকে কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ বাড়ানো নিয়েও কোনো সমঝোতা হয়নি। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে আগামী সম্মেলন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অথচ কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে ২০১২ সালে। এটির পরের পর্যায় শুরু করার ব্যাপারে সম্মত হতে কয়েক বছর লেগে যাবে। এই শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা থেকেই যাচ্ছে। এই সমঝোতায় ২০৫০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাও অনুপস্থিত। তা ছাড়া শিল্প খাতভিত্তিক কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। ফলে আরও এক বছর তারা অনিয়ন্ত্রিতভাবে দূষণ ঘটিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেল।
কানকুন সমঝোতায় শিল্পবিপ্লবপূর্ব সময়ের সাপেক্ষে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার ব্যাপারে অঙ্গীকার করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব এড়ানোর জন্য অপরিহার্য। তাই এ অঙ্গীকার ইতিবাচক। যদিও এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কোনো দেশ আইনগতভাবে বাধ্য নয়। গত কোপেনহেগেন সম্মেলনেও বহু অঙ্গীকারের কথা শোনা গেছে, কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি নেই বললেই চলে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব মোকাবিলায় গরিব দেশগুলোকে তহবিল প্রদানের ব্যাপারেও মতৈক্যে পৌঁছা গেছে। কোপেনহেগেন সম্মেলনেও ঝুঁকির মধ্যে থাকা দরিদ্র দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তহবিল প্রদানের মুলো ঝুলিয়ে একধরনের আশাবাদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এবারের সম্মেলনেও তার ছায়া অপসৃত হয়নি। আমাদের জলবায়ু কূটনীতিকে আরও সক্রিয় করা প্রয়োজন। মূলত শিল্পোন্নত ও সাম্প্রতিক কালে বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিতে বাংলাদেশ। তাই ক্ষতিপূরণের দাবি ন্যায্য। অভিযোজনও বিরূপতা কাঠানোর কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তন যে ভয়ানক বিপদ হাজির করে, তাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরই জোর দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য বাংলাদেশের দিক থেকে ন্যায্য তহবিল পাওয়ার চেষ্টা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নেওয়া।

Monday, November 22, 2010

বাংলাদেশে জীবিকা হারানো মানুষের ‘অগত্যা বাস্তুচ্যুতি’ by আহসান উদ্দিন আহমেদ ও শরমিন্দ নীলোর্মি

জলবায়ু পরিবর্তন একটি বাস্তবতা। যত সময় গড়াতে থাকবে, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত ততই অনুভূত হতে থাকবে এবং তা কেবল কিছু নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ না থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। এ কথা আজ সর্বজনবিদিত যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ ওপরের দিকেই অবস্থান করবে। আইপিসিসি বহু গবেষণার ফলাফল উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে দরিদ্র দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং সেখানকার দরিদ্র মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় প্রথম সারির দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। প্রশ্ন হলো, জলবায়ুতাড়িত বিপুলসংখ্যক দরিদ্রকে নিয়ে কীভাবে একটি অগ্রসর মধ্য-আয়ের দেশ হবে বাংলাদেশ?
বিগত তিন দশকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর অন্যতম হচ্ছে কৃষির আধুনিকায়ন এবং ফসলের উৎপাদন বাড়ানো। জলবায়ু পরিবর্তন কৃষক ও কৃষি-গবেষকদের যৌথ প্রচেষ্টার এসব অর্জন নষ্ট করার ক্ষমতা রাখে। অথচ জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের চাহিদা বাড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে তাই খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সমুদ্রের উপরিতলে স্ফীতি ঘটলে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হবে উপকূলীয় কৃষকদের। লবণাক্ত এলাকা দেশের ভেতরে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। লবণের প্রকোপে প্রচলিত কৃষি তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমের বহু এলাকায় প্রচলিত বোরো ধানের আবাদ করা যাবে না। উপকূলীয় এলাকার নদীতে লবণ অনুপ্রবেশ করায় নদীর পানি দিয়ে সেচ দেওয়া যাবে না, ফলে শুকনো মৌসুমের ফসল উৎপাদন লক্ষণীয় পর্যায়ে কমে যাবে।
তীব্র বন্যা ও সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় সড়ক যোগাযোগ ও স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে তুলবে। সমুদ্রের পানির উজানমুখী ধাক্কা আরও বেশি সক্রিয় থাকার কারণে ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে যাওয়া উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলো দ্রুত ক্ষয়ে যাবে, এমনকি কোনোটির অংশবিশেষ হঠাৎ ভেসে গিয়ে বাঁধের ভেতরের মানুষ ও স্থাপনার জন্য দুর্যোগ বয়ে আনবে। এখনো পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন ঘটেছে সামান্যই। অথচ তারই প্রভাবে সমুদ্রের পানির উজানমুখী ধাক্কা এতটাই বেড়েছে যে সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনা ও কক্সবাজারের দুর্বল বেড়িবাঁধগুলো অহরহ ভেঙে পড়ছে সমুদ্র থেকে আসা ঢেউয়ের তাণ্ডবে।
লবণাক্ততার কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে (পুরোনো শিল্পগুলো এখন ধুঁকছে)। এমনকি এ দেশের গৌরব সুন্দরবনও লবণাক্ততার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ থাবায় বিপর্যস্ত হবে। অপরাপর এলাকার চেয়ে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল, বিশেষত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল বেশি মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুকনো মৌসুমে বৃষ্টিহীনতা নদীর ক্ষীণ প্রবাহকে আরও কমিয়ে দেবে, এতে জোয়ারের উজানমুখী চাপে ক্রমশ আরও বেশি এলাকায় লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়বে।
উপকূলে বাঁধের বেষ্টনী থাকা সত্ত্বেও মানুষের জীবনযাত্রা নানাভাবে বিঘ্নিত হবে। বিগত কয়েক বছরে অনেক এলাকায় বাঁধের বেষ্টনী ভেঙে গেছে সঞ্চিত তাপের প্রভাবে অধিকতর শক্তিশালী উজানমুখী ঢেউয়ের ধাক্কায়। এতে শস্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক মাত্রায়। এ ছাড়া সমুদ্র স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে বেশি ফুঁসতে থাকায় ঘনঘন ৩ নম্বর বিপৎসংকেত দেখানোর ফলে সমুদ্রগামী মৎস্যজীবীরা নিয়মিত মাছ ধরতে পারেননি। এতে তাঁদের জীবিকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনাপ্রবাহ বারবার ঘটবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে, যা উপকূল এলাকার জনজীবনকে তীব্র ঝুঁকির মুখে ফেলে দেবে।
এ ছাড়া দুর্যোগের ঘনঘটা বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে পানিবাহিত ও অন্যান্য রোগ, যেমন—ডায়রিয়া, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বর্তমানের তুলনায় অনেক বেড়ে যাবে। এ ছাড়া চৈত্র, বৈশাখ ও ভাদ্র মাসের গরমে শিশু এবং বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা রয়েছে।
আমাদের দেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কয়েকটি ‘আপদ-বলয়ভুক্ত’ এলাকা আছে। আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, এসব আপদ-বলয় থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ দলে দলে বেরিয়ে আসছে এবং অজানা পথে পাড়ি দিচ্ছে। শহরমুখী মানুষের ঢল লক্ষণীয়। বিভিন্ন গবেষণা থেকে এটা আগেই জানা গেছে যে নগরে এবং উপকণ্ঠের অতিদরিদ্র মানুষের একটা বড় অংশ আপদ বা দুর্যোগ-পরবর্তী সীমাহীন কষ্টের প্রেক্ষাপটে সবকিছু খুইয়ে একসময় বাধ্য হয়ে ঘর ছেড়েছে।
যেখানে জীবনযাপন-প্রক্রিয়া ও ভঙ্গুর জীবিকা টিকিয়ে রাখা খুব কঠিন, সেখানে বিপন্নতা মাত্রাতিরিক্ত। সেখানে জীবনীশক্তি নিঃশেষ করে মানুষ কীভাবে থাকবে? যেখানে বায়ুমণ্ডলের আজেবাজে গ্যাসের থাবায় মানুষ তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, সেখানে সৃজনীশক্তি থাকলেও সে ভঙ্গুর জীবনীশক্তি নিয়ে বসবাস করতে পারে না। অগত্যা বাস্তুচ্যুতি ছাড়া তখন কীই-বা করার থাকে?
জলবায়ু পরিবর্তনের হিসাবে তাই বাস্তুচ্যুতি অনিবার্যভাবে দেখা দিয়েছে। ব্যাপক মাত্রায় জীবন ও জীবিকা নষ্ট হলে বাস্তুচ্যুতির সংকট ঘনীভূত হবে। অথচ এই মানুষগুলো, যারা ইতিমধ্যে বাস্তুচ্যুত হয়েছে বা হতে যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন ঘটানোয় তাদের দায়দায়িত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। এরা নিরীহ ও চলমান ঘটনার অশুভ বাস্তবতার অসহায় শিকার মাত্র।
এই অন্যায্য পরিস্থিতি থেকে বিপন্ন মানুষকে মুক্তি দিতে হলে প্রথমত দেশীয় পর্যায়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু এর কার্যকরণটি আন্তর্জাতিক, তার ন্যায্য সমাধান তাই আন্তর্জাতিক পরিসরে হওয়াটা বাঞ্ছনীয়।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক কাঠামো সনদ (১৯৯২ সালে স্বাক্ষরিত) মতে, এসব বাস্তুচ্যুত মানুষের অসহায় থাকার কথা নয়। এদের অভিযোজন করার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক মতৈক্য তৈরি হচ্ছে, এবারের তৃতীয় আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিয়ে এ বিষয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘসহ সবার বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু অভিযোজনের মাত্রাভেদ আছে। যখন বা যেখানে বিপন্নতা মাত্রাতিরিক্ত, সেখানে অভিযোজনের মানে হলো হয় আপদের সম্ভাব্য মাত্রা কমাতে হবে, নয়তো অন্যত্র সরে গিয়ে ঝুঁকির মাত্রা কমাতে হবে। বুদ্ধি খাটিয়ে সম্ভাব্য কম ঝুঁকির এলাকায় সরে যাওয়াই সেখানে ‘অভিযোজন’।
কিন্তু এ দেশে সম্ভাব্য কম ঝুঁকির এলাকায় সরে যাওয়াটা সহজ নয়। এত ঘনবসতির দেশ পৃথিবীজুড়ে আর নেই। কোথায় পাওয়া যাবে এমন জায়গা, যেখানে সহজে ভাগ্যহত মানুষের নির্বিঘ্নে জীবনযাপনের সুযোগ করে দেওয়া যাবে? গেলেও কতজনকে?
তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনতাড়িত বাস্তুহারা মানুষদের ভবিষৎ কী?
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্তর্জাতিক কাঠামো সনদ মতে, ‘সরে গিয়ে’ বিপন্নতা কমাতে হলে আন্তর্জাতিক অভিবাসন ছাড়া গতি নেই। কিন্তু এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা এখনো খুব কম। এখনো এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দর-কষাকষি ভালোভাবে শুরু হয়নি।
অভিবাসন বিষয়টি নতুন নয়। তবে এত দিন যা ছিল ‘সুযোগসন্ধানী অভিবাসন’ (যেমন, আমাদের শ্রমিকেরা গেছেন এবং নিরন্তর টাকা পাঠিয়ে দেশ গঠনে সবিশেষ ভূমিকা রাখছেন), তার চেয়ে এখনকার ‘অগত্যা বাস্তুচ্যুতি’-জনিত অভিবাসন হবে মৌলিকভাবে ভিন্ন। এখানে যেহেতু সম্ভাব্য অভিবাসীদের অধিকার ও ন্যায্যতা হরণ করেছে উন্নত অর্থনীতির দেশের ছেড়ে দেওয়া গ্যাস, ন্যায্যতার বিচারে তাদের জন্য ওই সব দেশে অভিবাসনের সুযোগ করে দিতে হবে। এটা দয়া নয়, অধিকার। আর জলবায়ুূ পরিবর্তনতাড়িত ‘অগত্যা বাস্তুচ্যুত’ কষ্টে থাকা মানুষের অধিকার নিয়ে আমাদের লড়াইটা চালাতেই হবে।
আমাদের মতে, বাংলাদেশ থেকে এ বিষয়ে কথা তোলা উচিত। আমাদের মতো বিপন্ন দেশ থেকে এবং এত বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা নিয়ে আমরা যদি এ বিষয়ে কথা না তুলি, তাহলে আমাদের হয়ে দর-কষাকষি করবে কে? দেরিতে হলেও এ বিষয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে ফেলেছেন। যদিও আন্তর্জাতিক দর-কষাকষিতে আমাদের মতো নাগরিক সমাজের দাবি উপেক্ষা করে কখনোই বাংলাদেশ বাস্তুচ্যুত মানুষের অভিবাসন নিয়ে কোনো দাবিনামা পেশ করেনি, দেশের প্রধানমন্ত্রী সম্প্র্রতি জাতিসংঘে তাঁর বক্তৃতায় বিষয়টি প্রথম উত্থাপন করেছেন। আশা করি, এ দেশের হয়ে, যাঁরা প্রতিনিধি হয়ে দর-কষাকষিতে অংশ নেন, তাঁরা এখন থেকে প্রধানমন্ত্রীর উত্থাপিত অতি যৌক্তিক দাবিটি বারবার তুলতে আর ভুলে যাবেন না।
দাবিনামা তুলতে পারলেই যে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো তা এমনি এমনি হাসিমুখে মেনে নেবে, তা নয়। তারা অনেক বিতর্ক তুলবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা, ভাষা জানার অযোগ্যতা, সাংস্কৃতিক বিভেদ—কত শত দুর্বলতা! সঠিকভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া নিয়েও আমাদের ধারণা, অনেক বিতর্ক উঠবে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে একটু সুবিধাজনক জায়গায় আছে। আমরা জলবায়ুূ পরিবর্তনতাড়িত ‘অগত্যা বাস্তুচ্যুত’ মানুষকে সহজেই খুঁজে দিতে পারি, ভোটার আইডি কার্ড ‘অগত্যা বাস্তুচ্যুত’ মানুষের খুঁজে দিতে সাহায্য করবে। এখন দাবিটি যথাস্থানে পেশ করা হোক, আলোচনাটা শুরু হোক, অন্যরা এতে অংশ নিতে শুরু করুক। অনেক দেশই আমাদের সঙ্গী হবে।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্রুত জনমত গঠন করা দরকার। সামনেই মেক্সিকোর কানকুনে উচ্চপর্যায়ে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষি সংঘটিত হবে, একটি নতুন চুক্তিও হয়তো স্বাক্ষরিত হবে। আমরা কি পারব এ বিষয়ে একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে? আপামর মানুষ কিন্তু আমাদের সম্মিলিত উদ্যোগের দিকে আশা করে তাকিয়ে আছে।
আহসান উদ্দিন আহমেদ: সমন্বয়কারী, সেন্টার ফর সাসটেইনেবল রুরাল লাইভলিহুডস, সিএসআরএল।
শরমিন্দ নীলোর্মি: সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য, সিএসআরএল)।

Friday, January 15, 2010

জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চল by মো. জামাত খান

আজ পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যাবে, পৃথিবীজুড়েই বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও হারিকেনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া হারাচ্ছে তার স্বকীয়তা। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ হারাচ্ছে তার ষড়্ঋতুর খেলা, একেবারেই হারিয়ে গেছে দুই ঋতু শরত্ ও হেমন্ত। নেই বর্ষার সময় বৃষ্টি, নেই শীতের সময় শীত (এ বছরের শীত বহুদিনের মধ্যে ব্যতিক্রম)। মনে হচ্ছে, একটি ঋতু গ্রীষ্মই যেন এখন প্রভাব বিস্তার করে আছে। এ দৃশ্য শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই বৃদ্ধি পাচ্ছে উষ্ণতা। আর এসব অবস্থার জন্য দায়ী জলবায়ু পরিবর্তন। বর্তমানে বায়ুমণ্ডল এবং জলবায়ু পরিবর্তিত হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে, যা এখন আর অনুমান বা গবেষণার বিষয় নয়। জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন, ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ করার জন্য মাটি খনন করে ছোট-বড় জলাশয় সৃষ্টি করতে। সম্প্রতি তিনি স্টকহোমে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এর প্রভাবে বাংলাদেশের দুই কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রধানমন্ত্রী দেশের কৃষি এবং কৃষকের দিকে দৃষ্টি দেওয়ার জন্য দলমত-নির্বিশেষে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ভূ-উপরিস্থ পানি দিয়ে সেচব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলেছেন।
পৃথিবীর খাদ্য পরিস্থিতির বিবেচনায় দেশের মানুষের জন্য খাদ্যনিরাপত্তা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য দেশের মধ্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য উত্পাদন বাড়াতে হবে। খাদ্য উত্পাদনের জন্য যেমন জমির সর্বোত্তম ব্যবহার প্রয়োজন, তেমনি ফসল উত্পাদনের জন্য যথাসময়ে বীজ, সেচ ও সার সরবরাহ আবশ্যক। গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে, এখনো বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে গভীর নলকূপের পানি দিয়ে সেচব্যবস্থা করা হয়। বরেন্দ্র অঞ্চলে ১২ হাজার গভীর নলকূপের সাহায্যে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এ অঞ্চলে পানির স্তর প্রতিবছর নিচে নেমে যাচ্ছে। বরেন্দ্রভূমি এখন ক্লান্ত, বিষণ্ন।
বরেন্দ্র অঞ্চলে দেশের অন্য অংশের চেয়ে বৃষ্টিপাত অনেক কম। বরেন্দ্র অঞ্চলের সমভূমির উচ্চতা ১২ মিটার হলেও বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু এলাকার উচ্চতা ৪৫ মিটার পর্যন্ত রয়েছে। তাই বরেন্দ্র অঞ্চল বন্যামুক্ত। বৃষ্টি কম এবং বন্যামুক্ত অঞ্চল হওয়ার কারণে গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ হচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সূত্রমতে, ১৯৯১ সালে উচ্চ বরেন্দ্র এলাকায় পানির স্তর ছিল ৪৮ ফুট নিচে, ২০০০ সালে তা ৬২ ফুটে নেমে যায়। মধ্য বরেন্দ্র এলাকায় ১৯৯১ সালে পানির স্তর ছিল ২৭ ফুট নিচে, ২০০০ সালে তা নামে ৪০ ফুটে। নিম্ন বরেন্দ্র এলাকায় ১৯৯১ সালে পানির স্তর ছিল ২০ ফুট নিচে, ২০০০ সালে তা নামে ২৯ ফুটে। এ পরিস্থিতি বর্তমান সময়ে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
রাজশাহীর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, গত বর্ষার ১ আষাঢ় থেকে ১২ শ্রাবণ পর্যন্ত রাজশাহীতে বৃষ্টি হয়েছে ২৭৩ দশমিক ৪ মিলিমিটার। এই বৃষ্টি হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে এলাকাভেদে। ২০০৮ সালের জুন মাসে রাজশাহীতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ২৪৪ দশমিক ৮ মিলিমিটার। ওই বছরের জুন মাসে বৃষ্টি হয়েছে ১৩২ দশমিক ৪ মিলিমিটার। এমনিতেই রাজশাহী অঞ্চলে দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় কম বৃষ্টি হয়ে থাকে। ওই বছরের জুন মাসে আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক বৃষ্টিপাত হওয়ায় এ অঞ্চলের পরিবেশে অস্বাভাবিকতা বিরাজ করছে। মে ও জুন মাসে বেশ কয়েকবার রাজশাহী অঞ্চলে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। অস্বাভাবিক এই আবহাওয়া পরিস্থিতি এ অঞ্চলের কৃষি, জনস্বাস্থ্য, বন ও মত্স্য সম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। একদিকে কৃষিতে ফসলের উত্পাদনপ্রক্রিয়ায় যেমন প্রভাব পড়েছে, তেমনি জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়েছে। দরিদ্র মানুষ ভাপসা গরম ও পানিবাহিত রোগে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। অনাবৃষ্টির ফলে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও উন্মুক্ত জলাশয়গুলো পানিশূন্য হয়ে পড়েছে।
এ জন্য বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর লাগাতারভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। ফলে জমি শুষ্ক হচ্ছে, হ্যান্ড টিউবওয়েলে এমনকি তারাপাম্পেও পানি ওঠে না। সেচকাজে ভূ-গর্ভস্থ পানির অধিক ব্যবহারের কারণে ভূমির ওপরের স্তর লৌহ ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা দূষিত হচ্ছে। ফলে জমির উর্বরতাশক্তি কমে যাচ্ছে। রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়ছে। কৃষকের ব্যয় বাড়ছে, আর সবচেয়ে ক্ষতি হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশের। গভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে বরেন্দ্র অঞ্চল ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পের বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ৭৪ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে পদ্মা ও মহানন্দা নদীর পানি ব্যবহার করে সেচসুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে সেচের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর অতিশয় নির্ভরতা কমবে এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির আধার পুনর্ভরণে সহায়ক হবে। পরিবেশের ভারসাম্য ফিরে আসবে।
এই প্রকল্পটি নিয়ে এখন বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিতে রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এ অঞ্চলের সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে জনসভা, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক করে আসছে। বরেন্দ্রের সর্বস্তরের মানুষ চায় পদ্মা ও মহানন্দা নদীর পানির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানিনির্ভর সেচব্যবস্থা গড়ে উঠুক। বর্তমানে দলমত-নির্বিশেষে মেয়র, সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, আদিবাসীসহ সর্বস্তরের মানুষ খরা মৌসুম আসার আগেই সেচ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে লাগাতার কর্মসূচি পালন করছে। উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকায় খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষার্থে গঙ্গা ব্যারাজ এবং উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প গ্রহণ অতীব জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলকে রক্ষার জন্য উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আশু পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
মো. জামাত খান: আহ্বায়ক, রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।

Sunday, January 10, 2010

খসরু চৌধুরী -আমরা কী করছি আর আসলে কী করা উচিত

কোপেনহেগেন সম্মেলন আপাত ব্যর্থ হলেও পৃথিবীর সম্যক জলবায়ু নিয়ে এই সম্মেলন সারা পৃথিবীতে একটা সাড়া ফেলেছে। দেশগুলো এটাও জানতে পেরেছে, পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় বাংলাদেশে আমরা কী করছি!
একটি দেশের জলবায়ু, বিশেষ করে উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম নিয়ামক শক্তি হচ্ছে সে দেশের বনভূমি। বর্তমান অবস্থায় বন বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী দেশের মোট আয়তনের ৯ দশমিক ৮ শতাংশ এলাকায় বনভূমি রয়েছে। বাস্তব অবস্থা অন্য রকম। বন বিভাগের দখলে সম্ভবত ৫ শতাংশ এলাকার বেশি নেই। আর বড় গাছের ছায়া রয়েছে, এমন এলাকা ৩ শতাংশের বেশি হবে না। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে একজন বাংলাদেশি হলেন পৃথিবীর সেই হতভাগ্য ব্যক্তিটি, যাঁর বনভাগ্যে পড়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে কম বন এলাকা।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপই যে বনভূমি কমে যাওয়ার মূল কারণ, এটা সবাই জানেন। কিন্তু বর্তমানে যে দ্রুততায় বনভূমি শেষ হয়ে যাচ্ছে, তাতে শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দোষারোপ করা যায় না। গত তিন মাসের পত্রপত্রিকা নাড়াচাড়া করলেই সবার চোখে পড়বে, এ বছর শুকনো মৌসুমের শুরু থেকেই আমাদের মিশ্র বৃষ্টিপাতের পাহাড়ি জঙ্গলগুলোর গাছপালা দেদার কাটা হচ্ছে। এ সময়টায় বৃষ্টি না হওয়ায় পাহাড় থেকে গাছ কাটা যেমন সহজ, তেমনি গাছ বহনের ট্রাক ও বনের কাঁচা রাস্তাগুলো ব্যবহার করা যায় স্বচ্ছন্দে। গাছ কাটা হচ্ছে মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের, চুনারুঘাটের রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যের, ফাঁসিয়াখালী অভয়ারণ্যের, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের, কক্সবাজারের মেদা কাচাপিয়া জাতীয় উদ্যানের, টেকনাফ গেম রিজার্ভের। সাজেক উপত্যকা, পাবলাখালীর দুর্গমতার জন্য সেখানে কী হচ্ছে, তার খবর খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে পাবলাখালীতে সীমান্ত-লাগোয়া কিছু এলাকা ছাড়া বন তেমন একটা নেই। পত্রপত্রিকার তদন্তে দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গাছ কাটার হোতারা হচ্ছেন স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী। এই রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা দলমতনির্বিশেষে কাজটি করে থাকেন।
আমরা যদি আমাদের তলানিতে ঠেকে যাওয়া বনসম্পদ রক্ষা করতে চাই, তাহলে আমাদের প্রয়োজন শক্তিশালী কার্যকর একটি বন বিভাগ। আমাদের বন এলাকা এবং বনের ওপর চাপের তুলনায় বন বিভাগের জনবল, অস্ত্রবল, পরিবহন নিদারুণভাবে কম। সরকারি অর্থ বরাদ্দও খুবই কম। মাঠপর্যায়ের কর্মচারীরা সমাজবিচ্ছিন্ন, জনবিচ্ছিন্নভাবে জীবন যাপন করেন। তাঁদের প্রস্তুত থাকতে হয় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা। স্নানাহার অনিশ্চিত, চিকিত্সা সুদূরপরাহত। তাঁদের পারিবারিক জীবন বলতে কিছু নেই। স্বাস্থ্যকর বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এসব কর্মচারীর ছেলেমেয়েদের শিক্ষারও কোনো ব্যবস্থা নেই। এলাকাগুলো জনবিরল হওয়ায় প্রতিটি এলাকায়ই রয়েছে সশস্ত্র ডাকাতের দল। সন্ত্রাসী দলগুলো তাদের প্রশিক্ষণ শিবির হিসেবে বনের এলাকাগুলো বেছে নেয়। শুধু সুন্দরবন এলাকার সমস্যার দিকে তাকালেই সারা দেশের অবস্থার একটি চিত্র পাওয়া যেতে পারে।
জল ও স্থল মিলিয়ে বাংলাদেশে সুন্দরবনের মোট এলাকা রয়েছে ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এ এলাকার দেখাশোনা করার জন্য বন বিভাগের জনবল রয়েছে মাত্র এক হাজার ১০০ জন। এ এলাকার বনজ সম্পদের ওপর প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষভাবে জড়িত দক্ষিণ বাংলার প্রায় তিন কোটি মানুষ। বন বিভাগের টহল ফাঁড়িগুলোতে কোনো যান্ত্রিক যানবাহন নেই। স্টেশন অফিসগুলোতে যেসব নৌযান আছে, সেগুলো অধিকাংশই নষ্ট। সুন্দরবনে নেওয়া নানা প্রকল্পের পরিত্যক্ত নৌযান এগুলো। খুবই দুর্বলভাবে নির্মিত এগুলো। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি তেলের জন্য সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই।
পুরো সুন্দরবন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে ৩০ থেকে ৪০টি ছোট-বড় ডাকাত দল। ডাকাত দলের ভয়ে বন বিভাগ দুর্গম এলাকার প্রায় ১০টি টহল ফাঁড়িতে অস্ত্র রাখা বন্ধ করে দিয়েছে। কোনো কোনো টহল ফাঁড়ি ডাকাত দল বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করে। অস্ত্রবল, লোকবল, যানবাহনবলে বলীয়ান এসব ডাকাত দলের বিরুদ্ধে ক্যাম্পগুলোর চার-পাঁচজন বনকর্মীর পক্ষে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব তো হয়ই না, উপরন্তু তাদের আশ্রয়দাতা হতে বাধ্য হতে হয়। ২০০৫ সালে সামান্য কিছু চায়নিজ রাইফেল দেওয়া ছাড়া বন বিভাগ বনকর্মীদের কোনো সাহায্যই করতে পারেনি। অথচ ডাকাত দল ব্যবহার করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকার সন্ত্রাসী দলগুলোর আধুনিক অস্ত্রপাতি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, সুন্দরবনের বনচারী ব্যবসায়ীরা বন বিভাগকে যে রাজস্ব দেন, ডাকাতদের দিতে হয় তার চেয়ে বেশি। সুন্দরবনের কর্মচারীরা খাদ্য হিসেবে শুধু গোনের সময় জেলেদের কাছ থেকে মাছ পান। তরিতরকারিও জেলেরাই আনেন। বাকি সময়টা শুধু আলু দিয়েই ভাত খেতে হয়। সকালে বন কর্মচারীরা টহলে বের হলে বন ফাঁঁড়িগুলো অরক্ষিত থাকে। জেলে-বাওয়ালি আশপাশে থাকলে বন অফিসের পাশে রাত কাটান। না থাকলে নিরালা, নিঝুম অন্ধকার। পানীয় জল বলতে তাঁরা পান বন অফিসের লাগোয়া একটি ছোট পুকুরের আধা-লোনা জল। জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ভেসে গেলে সেই জলও পানের উপযুক্ত থাকে না। ক্যাম্পগুলোর কক্ষগুলো জরাজীর্ণ। এগুলো সংস্কারের জন্য সরকারের কোনো বরাদ্দ নেই। তাঁদের চলাচলের জন্য রয়েছে খুবই ছোট নড়বড়ে একটি হাতে-বাওয়া ডিঙি। কাঠচোর, মাছচোর, হরিণচোরদের ধরতে পারলেও তাঁদের বিপদ। এই চোরদের কোর্টে চালান করার যানবাহনও তাঁদের নেই। কোর্টে চালান দিতে পারলেও আরেক বিপদ। তখন তাঁদের সাক্ষ্য দিতে যেতে হয় কোর্টে। তাঁদের যাতায়াত, খাই-খরচারও কোনো বরাদ্দ নেই। বেতন-ভাতাও সামান্য। অধিকাংশ কর্মচারী জলবাহিত রোগে ভোগেন। তাঁদের ট্রেনিংয়ের মানও নিচু। স্বভাবতই তাঁদের নৈতিকতার অবস্থাও শোচনীয়।
এ অবস্থায় নড়বড়ে একদল মানুষের কাছ থেকে আমরা কী করে আশা করব, তাঁরা লোভের বশবর্তী হবেন না। যে বিপুল প্রতিকূল প্রতিবন্ধকতা তাঁদের সামনে, সেখানে কী করে আশা করব যে তাঁরা উচ্চ নৈতিকতার আদর্শ স্থাপন করবেন।
বন বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের ব্যবস্থাপনার জন্য অন্তত তিন হাজার বনকর্মী দরকার। সেই সঙ্গে তাঁদের স্বাভাবিক আবাসন, যোগাযোগ, অস্ত্রায়ন উন্নত করা দরকার। সেই সঙ্গে দরকার উন্নত ট্রেনিং। সুন্দরবন-সংলগ্ন অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা—নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, বিডিআর, পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে বন বিভাগের সহজ সমন্বয় দরকার।
ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে যখন ঠগিদের মারাত্মক উত্পাত শুরু হয়েছিল, ব্রিটিশ সরকার তখন ঠগি দমনের জন্য সেনাবাহিনীর মেজর হেনরি স্লিম্যানকে একটি বাহিনী দিয়ে নিযুক্ত করেছিল। স্লিম্যান এই মারাত্মক বাহিনী দমন করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
ঢাকা শহরে বসে সুন্দরবনে ডাকাতের অত্যাচার বোঝা যায় না। বুঝতে হলে সুন্দরবনে যেতে হবে। তখন সহজেই অনুমেয় হবে, এখানেও স্লিম্যানের বাহিনীর মতো একটি বাহিনীর কিছুকাল কাজ করা দরকার।
দেশের শুকনো এলাকার বনাঞ্চলগুলোয় বন বিভাগের অবস্থা সুন্দরবনের চেয়ে উন্নত নয়। এ অবস্থায় বন রক্ষা করতে হলে একটি মাল্টি ডিসিপ্লিনারি কমিটির মাধ্যমে আমাদের বনগুলোর সম্যক অবস্থা জানতে হবে। কমিটির সুপারিশে বন বিভাগ পুনর্বিন্যাস করতে হবে। বন বিভাগের মেরুদণ্ড সোজা করার জন্য সরকারের আর্থিক বরাদ্দ অনেক বাড়াতে হবে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোনো ক্ষেত্রে বন উজাড় ধরা পড়ে গেলে দু-একজন কর্মকর্তা ও কতিপয় কর্মচারীর শাস্তি দেওয়া হয়েছে কালেভদ্রে। বর্তমানের অসুস্থ এই বন বিভাগ তার চেয়ে বেশি কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। এতে বন ব্যবস্থাপনার কোনো লাভ হয়নি।
সম্প্রতি খবরে প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রী বন উজাড়ের বিষয়ে অবগত হয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন। বন উজাড়ের অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির জন্য জাতীয় সংসদে বিল পেশ করার কথা ভাবছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ অবশ্যই ধন্যবাদার্হ। কিন্তু বন বিভাগকে শক্তিশালী করা না হলে তাদের কাছে কৈফিয়ত পাওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার আমাদের থাকে না। এ বিষয়টিরও সুরাহা হওয়া দরকার।
খসরু চৌধুরী: বন বিশেষজ্ঞ।

Thursday, December 24, 2009

কেমন হওয়া উচিত আমাদের জলবায়ু কূটনীতি -জলবায়ু সম্মেলন by মশিউল আলম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোপেনহেগেনের জলবায়ু সম্মেলন শেষে মন্তব্য করেছেন, সম্মেলনের পর সারা বিশ্বের দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যেসব বিজ্ঞানী-বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ থেকে ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁদের বরাত দিয়ে সংবাদ বেরিয়েছে, বাংলাদেশের জলবায়ু কূটনীতি সফল হয়েছে।
কোপেনহেগেনে ১২ দিন ধরে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলন চলাকালে ইন্টারনেটে এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করেছি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে, এমন দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারির দেশ বাংলাদেশ ওই সম্মেলনে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করে এবং অন্যরা তাকে কীভাবে গ্রহণ করে, এ রকম কৌতূহল ছিল। কারণ, এটা এমন এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন, যার মূল আলোচ্য বিষয়ে বাংলাদেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পক্ষ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সর্বাধিক ক্ষতির শিকার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটা নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারত এ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। এ সম্মেলন ছিল বাংলাদেশের জন্য এক নতুন মাত্রার বিরল সুযোগ।
সেখানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যেসব কথাবার্তা বেশি উচ্চারিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ছিল জলবায়ু উদ্বাস্তু, অভিযোজন তহবিল, ক্ষতিপূরণমূলক তহবিল ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসব কথা সাড়া জাগায়নি। আমাদের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে অবশ্য এ কথাগুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ফর ডিজাস্টার রিডাকশনের এক সমীক্ষায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম শীর্ষে উঠে এসেছে—এ কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বন্যার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ প্রথম, সুনামির ঝুঁকিতে তৃতীয়, ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকিতে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে।’ ...‘এই সম্মেলনে আমাদের ক্ষতিপূরণমূলক আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।’ অভিযোজনের পুরো অর্থ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই অর্থ অবশ্যই যথেষ্ট পরিমাণে ও সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’ অবশ্য কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর ওই ভাষণে আহ্বান ছিল। তবে ওই ভাষণ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনসহ অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যেসব বৈঠক ও আলাপ-আলোচনার খবর পাওয়া গেল, সেগুলোতে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের কণ্ঠ ছিল বেশি সোচ্চার, কার্বন নিঃসরণ কমানোর ব্যাপারে অপেক্ষাকৃত নিম্নকণ্ঠ।
কিন্তু ঝুঁকির শিকার ছোট ছোট কয়েকটি দেশের নেতারা কোপেনহেগেনে বেশ শোরগোল ফেলে দিয়েছেন। যেমন, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার গরিব দেশগুলোর জন্য ২০২০ সাল নাগাদ বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে—যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এ রকম এক প্রয়াসের কথা জানালে টুভালুর প্রধানমন্ত্রী আপিসাই ইয়েলেমিয়া বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে আমরা আমাদের অস্তিত্ব বিক্রি করতে আগ্রহী নই।’
সম্মেলনের শেষে বিশ্ববাসী মাত্র তিন পৃষ্ঠার যে কাগুজে দলিলটি পেল, সেটি সম্পর্কে প্রথম তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্তকারীদের একজন টুভালু নামের দেশটিরই প্রতিনিধি, ইয়ান ফ্রাই। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের অবস্থা টাইটানিক জাহাজের মতো, আমরা দ্রুত ডুবে যাচ্ছি, এখনই কিছু করা দরকার। কিন্তু এর মধ্যে একদল বলছে, আমরা ডুবে যাচ্ছি কি না, সেটা নিয়ে আরও আলোচনা করার আছে।’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, কোপেনহেগেনে জলবায়ু সম্মেলন চলাকালে টুভালু নামের দ্বীপরাষ্ট্রটি যে-মাত্রায় মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে, তা ওই দেশটির আকারের তুলনায় অনেক অনেক বেশি। আসলেই, এতটুকু যন্ত্র থেকে এত জোরে শব্দ হয়! এক রত্তি দেশ টুভালু, নয়টি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে পুরো রাষ্ট্রটির মোট ভূখণ্ডের আয়তন মাত্র ২৬ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা হাতে গোনা যাবে—মাত্র ১১ হাজার ৯৯২ জন। পৃথিবীর চতুর্থ ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র টুভালুর দ্বীপগুলো এত নিচু যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আর মাত্র ছয় থেকে আট ইঞ্চি বাড়লেই প্রশান্ত মহাসাগরে তলিয়ে যাবে গোটা দেশ।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী আপিসাই ইয়েলেমিয়া জলবায়ু সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। আমাদের আর কিছুই করার নেই। এমন কোনো পাহাড় আমাদের নেই, যেখানে উঠে আমরা বাঁচতে পারি। এ জন্যই আমরা এত চিত্কার করছি। এখানে আমরা এত হইচই করছি, কারণ আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার মৌলিক অধিকার আছে।’ তাঁরা চিত্কার করছেন ক্ষতিপূরণ বা অভিযোজনের অর্থ পাওয়ার জন্য নয়; কার্বন নিঃসরণ কমাতে ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলোকে আইনগত বাধ্যবাধকতাসহ চুক্তিবদ্ধ করার লক্ষ্যে। টুভালুর দাবি ছিল, তাপমাত্রা বৃদ্ধি শিল্পায়নপূর্ব সময় থেকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হবে, সে জন্য তারা কার্বন নিঃসরণ কমানোর নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ৩৫০ পিপিএম। টুভালুর নয়টি দ্বীপের মধ্যে চারটি হচ্ছে প্রবালদ্বীপ; সমুদ্রজলের অম্লতা বেড়ে যাওয়ার ফলে সেগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও হার ক্রমেই বাড়ছে। সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিপূরণ দাবি করেননি, দাবি জানিয়েছেন কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ।
জলবায়ু সম্মেলনের আরেক আলোচিত বক্তা ছিলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ। সাগরের নিচে মন্ত্রিসভার বৈঠক করে ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে আলোচিত ৪২ বছর বয়সী যুবক এই রাষ্ট্রপতি জলবায়ু সম্মেলনে সর্বাধিক কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান ২০২০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ ও ২০৫০ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নিতে। চীন, ভারত, ব্রাজিল—এসব দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান ২০২০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ কমাতে। আর সবার প্রতি আহ্বান জানান এমন এক চুক্তিতে পৌঁছাতে, যেখানে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে ‘পরিমাপযোগ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইযোগ্য’ (কোয়ান্টিফাইয়েবল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনালি ভেরিফাইয়েবল) পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে।
সহস্রাধিক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে গঠিত মালদ্বীপের ৮০ শতাংশ ভূখণ্ড সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র তিন ফুট উঁচু। যে হারে জলবায়ুর উষ্ণতা বাড়ছে, তা অব্যাহত থাকলে মালদ্বীপ নামের কোনো দেশ পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। সেই দেশের রাষ্ট্রপতি কোপেনহেগেনে জলবায়ু সম্মেলনে বললেন, ‘কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথ দেখাবে মালদ্বীপ। আমরা আগামী ২০২০ সালের মধ্যে কার্বন-নিউট্রাল দেশে পরিণত হব।’ ওই সময়ের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোহাম্মদ নাশিদ বলেন, ‘শিল্পোন্নত দেশগুলোর আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া আমরা এটা করতে পারব না। আমি শিল্পোন্নত দেশগুলোকে বলি, আপনাদের টাকা আছে, প্রযুক্তির সিংহভাগও আপনাদের আছে। আমাদের সবুজ হতে সহযোগিতা করুন। কিন্তু একই সঙ্গে আমি এ কথাও বলতে চাই, দয়া করে মনে রাখবেন, জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আলোচনার সঙ্গে টাকা-পয়সার কোনো, আদৌ কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে আমাদের নাতি-নাতনিদের। আমার দুটি মেয়ে আছে। আমি নাতি-নাতনির মুখ দেখতে চাই। কিন্তু আমরা যা করছি, তা যদি চালিয়ে যাই, তাহলে নাতি-নাতনির মুখ দেখতে পাব না। টু অ্যাসিউম দ্যাট ক্লাইমেট চেঞ্জ নেগোসিয়েশনস হ্যাভ এনিথিং টু ডু উইথ মানি, ইন মাই মাইন্ড, ইজ দ্য হাইট অব অ্যারোগেন্স।’ টেকপার্ট নামের এক ওয়েবসাইটের একজন সাংবাদিক প্রেসিডেন্ট নাশিদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ডুবে যাওয়ার আগে তিনি মালদ্বীপের সব মানুষকে অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভেবেছেন কি না। উত্তরে প্রেসিডেন্ট নাশিদ বলেন, ‘ভারত মহাসাগরের বুকে এই দ্বীপমালায় মানুষ বাস করছে ১০ হাজার বছর ধরে। আমাদের লিখিত ইতিহাসই আছে দুই হাজার বছরের। মালদ্বীপের মানুষ নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে চায় না। এমনকি এখানকার এক দ্বীপের মানুষ অন্য দ্বীপেও যেতে চায় না। উই ক্যান স্টে দিয়ার, ইফ দ্য ওয়ার্ল্ড স্টার্টস কেয়ারিং।’
আমাদের প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু সম্মেলনের ভাষণে ক্ষতিপূরণ ও অভিযোজনবাবদ তহবিলের দাবির পাশাপাশি এমন দাবিও তুলেছেন, আমাদের জলবায়ু উদ্বাস্তুদের বিশ্বজুড়ে অভিবাসনের সুযোগ দিতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, জলবায়ুর পরিবর্তন বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পেছনে বাংলাদেশের তেমন কোনো ভূমিকা নেই—মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যসহ সম্মেলনে দেওয়া সব তথ্য ও বক্তব্যই সন্দেহাতীতভাবে সঠিক ও যুক্তিসংগত। কিন্তু মূল আলোচ্য প্রসঙ্গ যেখানে কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং সে লক্ষ্যেই একটি আইনি বাধ্যবাধকতাপূর্ণ চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে সর্বাত্মক চাপ সৃষ্টি করা, সেখানে এই সব যুক্তিসংগত দাবি-দাওয়া পার্শ্ব-আলোচনার বিষয়। আমাদের এই অবস্থান সঠিক হলো, নাকি এর চেয়ে ভালো অবস্থান আমরা নিতে পারতাম, এ নিয়ে ভাবনার অবকাশ আছে। আমাদের জলবায়ু কূটনীতি কেমন হওয়া উচিত, আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে আমরা কী ভাষায়, সুরে ও ভঙ্গিতে আমাদের বক্তব্য হাজির করব, এ নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৫ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে বললেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের নির্দোষ শিকার বাংলাদেশকে সহায়তা করা তাদের (ধনী দেশগুলোর) নৈতিক দায়িত্ব। এখানে ভিক্ষার জন্য দেনদরবার করা মর্যাদাবান জাতি হিসেবে অপমানজনক।’ খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকলে এমন কথা বলতেন কি না সন্দেহ। এখন যখন বললেনই, কথাটা সংসদে গিয়ে বললে, এবং সেখানে এটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হলে ভালো হতো। কে জানে, হয়তো সংসদে তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়েই সরকারের নীতিনির্ধারক মহল বুঝতে পারত যে, কোপেনহেগেন সম্মেলনে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার এক বিরল সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের সামনে।
দুঃখের বিষয়, আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলাম না। তবে সামনে সময় আছে। আগামী বছর মেক্সিকোতে অনুষ্ঠেয় সম্মেলনের আগে জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে স্থির করতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হিসেবে আমরা ক্ষতিপূরণ-অভিযোজনসহ নানা ধরনের তহবিলের দাবিকে প্রাধান্য দেব, নাকি বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ কমানোর দাবিকেই প্রধান করে তুলব এবং মালদ্বীপের অনুসরণে নিজেরাও সে পদক্ষেপ নেওয়ার মধ্য দিয়ে এই বৈশ্বিক আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকায় যাওয়ার চেষ্টা করব। এ বিষয়ে আমরা একটি কৌশলগত পরিকল্পনা মিলিতভাবে তৈরি করতে পারি, যেখানে বলা হবে কী ধরনের আন্তর্জাতিক ফোরামে আমরা কার্বন নিঃসরণ কমানোর দাবিতে বৈশ্বিক আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা নিয়ে ভুক্তভোগী দেশগুলোর কাতারে নেতৃত্বের ভূমিকায় যাওয়ার চেষ্টা করব, আর কী ধরনের ফোরামে ক্ষতিপূরণ, অভিযোজন, সম্ভাব্য জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অভিবাসন ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলব, দাবি-দাওয়া তুলে ধরব।
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

Tuesday, December 22, 2009

ফের অচলাবস্থায় বিশ্ব জলবায়ু রাজনীতি -কোপেনহেগেনে ব্যর্থতা by মার্কাস বেকার

কোপেনহেগেন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ব্যর্থ হয়েছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকল না। উন্নয়নশীল দেশগুলোর আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেয়নি শিল্পোন্নত দেশগুলো। ভারত ও চীনের মতো নব্য শিল্পোন্নত দেশকে তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের দিকে দৃষ্টি না দিলেও চলবে।
শুরুর আগে সারা দুনিয়ার বিজ্ঞানী, পরিবেশবাদী ও রাজনীতিকেরা এক সুরে বলেছেন, এটা ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন। কিন্তু এখন সে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এ ধরনের সম্মেলন আর আদৌ হবে কি না, তা বলা কঠিন।
কোপেনহেগেনে এই সম্মেলনে একত্র হতে সারা দুনিয়ার সরকারগুলোর সময় লেগেছে প্রায় ১৭ বছর। এত দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ-আলোচনা, আপাত নিষ্পত্তিহীন দেনদরবার, মতাদর্শিক বিতর্ক, বিলম্ব আর নানা কৌশল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে গেছে এ সময়। ১৯৯২ সালে রিও ডি জেনিরোতে প্রথম জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনের পর আবার একত্র হতে ১৭ বছর লেগেছে। ১৯৯২ সালের পর ধীরে ধীরে যে আশা জাগছিল, সেখানে অনেক আশাভঙ্গের বেদনায় পুড়তে হলো।
সম্মেলন শেষ হওয়ার কিছু সময় আগে মনে হচ্ছিল, এ সম্মেলন ব্যর্থ হওয়া হয়তো ঠেকানো যাবে। চূড়ান্ত ঘোষণার শেষ দিককার খসড়াগুলোতে ২০৫০ সাল নাগাদ শিল্পায়নপূর্ব স্তরের থেকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ করার পাশাপাশি কীভাবে এ লক্ষ্য অর্জিত হবে, তার বিধানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০৫০ সাল নাগাদ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৮০ শতাংশ কমানো এবং ২০২০ সাল নাগাদ মধ্যমেয়াদি লক্ষ্যের সম্ভাবনার উল্লেখও এতে ছিল।
অবশেষে যে ছোট খসড়া চুক্তিতে ৩০টি শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্র সম্মত হয়, তাতে কেবল দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বিধান রাখা হয়। আগামী দশকগুলোর জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনার উল্লেখ তাতে আর থাকেনি। জলবায়ু বিপর্যয় রোধে বিজ্ঞানীরা যে হারে নিঃসরণ কমানোর কথা বলেছেন, সে বিষয়ে অঙ্গীকারে আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি রাখা হয়নি। কোপেনহেগেনে যে চরম ব্যর্থতা দেখা গেছে, তাতে হয়তো দুই ডিগ্রির সীমাও মেনে চলা হবে না।
৩০টি দেশের গ্রুপ আপসের এ পরিকল্পনা মূল হলে উপস্থাপন করলে ১৯২টি দেশের বাকি দেশগুলোর অনেকে প্রায় তত্ক্ষণাত্ তীব্র সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, তাদের পক্ষে এটাকে কোনো সমাধান হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন।
আমরা এখন বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতিতে অচলাবস্থার হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে। এর পরিণতিতে গরিবের মধ্যে যারা গরিব, তারাই প্রথম আক্রান্ত হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী ঝড় ও বন্যার মুখে তারা পড়বে। তাদের ফসল মরে যাবে। হিমবাহ গলে কোটি কোটি মানুষ তাদের পানির জোগান ও জীবিকা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
শিল্পোন্নত দেশগুলোও রেহাই পাবে না। কিন্তু তাদের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সম্পদের কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে।
কোপেনহেগেনের ব্যর্থতা বারাক ওবামারও ব্যর্থতা। তিনি এ সম্মেলনে একটি ছাড় দিয়েছেন: তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, গরিব দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তাকারীর ভেতর তাঁর দেশও থাকবে। গরিব দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি মোকাবিলায় আরও ভালোভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে এবং আরও প্রতিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সচেষ্ট হতে সহায়তার জন্য এই তহবিল। এই তহবিল ২০২০ সালে শুরু করে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হবে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বড়াই করে বলেছেন, এই পরিমাণটা ‘অনেক’। কিন্তু এ তহবিলের কতটুকু যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবে, সে বিষয়ে কোনো কথা তিনি বলেননি। এমনকি বিশ্বের নেতৃস্থানীয় দেশগুলো ‘কোপেনহেগেন অ্যাকর্ড’ নামে যে খসড়া সমঝোতা তৈরি করেছে, তাতেও এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র কতটা উদার তার বিস্তারিত বর্ণনাও মিলবে এই সমঝোতায়। দরিদ্র দেশগুলোকে তাত্ক্ষণিক সহায়তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ২০১০ ও ২০১২ সালের মধ্যে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার দিতে চায়। অন্যান্য অঞ্চল যে পরিমাণ সহায়তা দেবে, সে তুলনায় এ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কার্পণ্যের প্রমাণ মেলে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন গুণ। এমনকি জাপান দিচ্ছে ১১ বিলিয়ন ডলার। গরিব দেশের লোকজন হয়তো দ্বিধায় পড়তে পারে—তারা যুক্তরাষ্ট্রের এ সহায়তায় হাসবে না কাঁদবে।
১৭ বছর ধরে যে দেশগুলো জলবায়ু সুরক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্যতম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ৩০ দেশের গ্রুপের সঙ্গে আলোচিত আপস পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় এটা যথেষ্ট নয়।
নব্য শিল্পোন্নত দেশগুলোর, বিশেষত চীনের আচরণও এর চেয়ে ভালো ছিল না। মানবজাতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ চীনের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির জলবায়ু সুরক্ষাব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের অধীন করতে অস্বীকৃতি জানানোর মাধ্যমে চীন হয়তো এ সম্মেলন ব্যর্থ হতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে।
যারা জলবায়ু পরিবর্তনকে বিজ্ঞানী, বামপন্থী রাজনীতিক ও আতঙ্কে-ইন্ধনদাতা গণমাধ্যমের অবাস্তব ভাবনা বলে মনে করে, তাদের মতকে দৃঢ় করেছে কোপেনহেগেনের বিপর্যয়। মানবজাতি বহুপক্ষীয়, সামষ্টিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির কোনো সমাধান খুঁজে বের করতে অক্ষম—এমন মতকেও শক্তিশালী করেছে। এমন অবস্থান কোনোভাবেই শুধু বিশুদ্ধ নৈরাশ্যবাদ নয়। আসলে মানুষের স্বভাবগত কিছু বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে এগুলো তৈরি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই মানুষ নিজের ভূমিকা নেয়। উদাহরণস্বরূপ, অনেকের পক্ষে কল্পনা করাই কঠিন যে, মহামারির ফলে বিস্তৃত এলাকার পুরো জনগোষ্ঠী ধ্বংস হতে পারে—যদিও বহু জায়গায় বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুত্পাত বা উল্কাপাতের প্রভাব বিষয়েও একই কথা খাটে। এসবের ফলে পুরো অঞ্চল, এমনকি মহাদেশ পর্যন্ত মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন আরও বেশি ভয়াবহ। কারণ, এটি অনেকাংশে আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরের বিষয়।
কোনো যুদ্ধ বা মহামারি একই সঙ্গে অল্পসংখ্যক দেশের বাইরে প্রভাব ফেলেনি। পারমাণবিক যুদ্ধের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন সারা দুনিয়ার মানুষকে প্রভাবিত করে। দ্রুত একে মোকাবিলা করতে হবে। মানবজাতির বড় অংশের জীবনযাপনের বর্তমান ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসা প্রয়োজন। তা ছাড়া বিভিন্ন সমাজকে একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিপদ উপলব্ধি করার চেতনা না থাকার কারণে প্রায়ই মানুষ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর স্থান দেয় স্বল্পমেয়াদি সাফল্যকে। সাধারণ, দৈনন্দিন কাজকর্মে স্পষ্টভাবে এর দেখা মিলবে। তাদের হয়তো জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয়কর পরিণতি দেখার জন্য খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না।
স্পিগেল অনলাইন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
মার্কাস বেকার: জার্মান সাংবাদিক।

জলবায়ু সম্মেলন ও বাংলাদেশ -ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে স্বীকৃতি মিললেও ক্ষতিপূরণ নগণ্য

শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। কিন্তু কোপেনহেগেনের জলবায়ু সম্মেলন গোড়ায় যত আড়ম্বর ও উচ্চাশা সৃষ্টি করেছিল, শেষ দিনের ঘোষণায় সেই আশার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। পৃথিবীর জলবায়ু বাঁচাতে দরকার ছিল একটি কার্যকর চুক্তি, কিন্তু নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ সম্মেলনের শেষে পাওয়া গেল কেবল একটি মৌখিক ঘোষণা। কূটনৈতিক ভাষায় একে বলা হয় ‘নীতিগত সমঝোতা’। এতে শিল্পায়নপূর্ব সময়ের চেয়ে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার প্রয়োজন স্বীকৃত হলেও কী পদ্ধতিতে, কবে নাগাদ তা নিশ্চিত করা হবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধি রাখা হয়নি। বিজ্ঞানীদের হুঁশিয়ারি সবাই স্বীকার করে নিলেও সেই অনুযায়ী কাজ করার কোনো নিশ্চয়তা বিশ্বনেতারা দেখাতে পারেননি। হতাশা লুকানোর কোনো জায়গা তাই নেই। পৃথিবীকে রক্ষার চেষ্টায় ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো মানবজাতি।
কোপেনহেগেনে জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলন ঘিরে সৃষ্টি হওয়া উচ্চাশা পূরণ না হওয়ার প্রধান কারণ, একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে টানাটানি, অন্যদিকে শিল্পোন্নত দেশগুলোর সঙ্গে ভারত-ব্রাজিল-দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশের মতৈক্য না হওয়া। ধনী দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থে ছাড় না দেওয়ায় জলবায়ু সম্মেলন তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারল না। তবে সত্যিকার জলবায়ু-ঐক্য সৃষ্টির সূচনাবিন্দু হিসেবে কোপেনহেগেনকে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ বলা যাবে না। কেননা, শিল্পোন্নত দেশগুলো দুটি বিষয় প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিয়েছে—১. মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণে তাদের দায় এবং ২. বিপর্যয় মোকাবিলায় দরিদ্র ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। কার্বন নিঃসরণ বিষয়ে আলাদাভাবে বিভিন্ন দেশ যে অঙ্গীকার করেছে, আশা করা যায়, আগামী বছর মেক্সিকোয় অনুষ্ঠেয় কোপ-১৬-তে কোপেনহেগেনের অঙ্গীকার বাধ্যতামূলক আইনে পরিণত হবে। অভিযোজন তহবিলে আপাতত তিন বছরের জন্য প্রতিবছর ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি এসেছে, যা ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ভাগাভাগি হওয়ার কথা। কিন্তু ২০২০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণ কমানোয় (মিটিগেশন) যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল হবে, তা চলে যাবে মূলত অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণকারী দেশ তথা ভারত-চীন-ব্রাজিলের মতো দেশের কাছে। সুতরাং জলবায়ু-বিপন্নতার স্বীকৃতি ছাড়া বাংলাদেশের ঝুলিতে আপাতত কিছু জোটেনি।
এ সম্মেলনে বাংলাদেশের সাফল্য একটিই—বিশ্বে জলবায়ু-বিপর্যস্ত দেশগুলোর শীর্ষে থাকা দেশের স্বীকৃতি। এখানে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যে অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতিটি এল, তাতে বাংলাদেশের ২০ শতাংশ এলাকা ডুবে যাওয়া কিংবা প্রায় তিন কোটি মানুষের উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়ার ভয় মোটেই কাটেনি, বরং আরও বেড়েছে। যদিও বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বিপত্সীমার নিচে আসার কোনো নিশ্চয়তা এ সম্মেলন সৃষ্টি করতে পারেনি; তবে এ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে, সেটা কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় স্তরে সহযোগিতা ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের বন্দোবস্ত করতে হবে। ক্ষতিপূরণ আদায়ের শর্ত হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকে সব সরকারি উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন বাংলাদেশের জনগণের দুশ্চিন্তা দূর করতে পারেনি। কিন্তু এ দেশের নির্বাচিত সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে জলবায়ু-বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হবে। কোপেনহেগেন সম্মেলনের সমর্থন কাজে লাগিয়ে দেশে-বিদেশে তত্পরতা বজায় রাখার এটাই মোক্ষম সময়।

Friday, December 18, 2009

নারী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে -জলবায়ু পরিবর্তন by জোবাইদা নাসরীন

বিশ্ববাসীর চোখ এখন কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের দিকে। কয়েক শ বছর ধরে চলতে থাকা জলবায়ু পরিবর্তন জানান দিতে শুরু করেছে, এর ভয়াবহতা কতটা ব্যাপক হতে পারে। আতঙ্কিত এখন পুরো বিশ্ব, কেননা বিশ্বের জনসংখ্যা এবং প্রতিবেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে, ভবিষ্যতে এর তীব্রতা আরও বাড়বে। এতে দারিদ্র্য বাড়ছে, অবকাঠামো ভেঙে পড়ার দিকে। যুগ যুগ ধরে তৈরি হওয়া উন্নয়নপ্রচেষ্টার প্রতি এটি এক বড় ধরনের হুমকি। সবার ওপরই এর প্রভাব পড়ছে, ভবিষ্যতেও পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার আগেই একে সুস্থিত করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে এ সম্মেলনে, বিশ্বের জনগণ এমন আশায় বুক বাঁধছেন। বিশ্বজুড়েই এক বড়সড় আয়োজন চলছে।
কিন্তু সবার কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একই রকমভাবে অনুভূত হবে না। সবচেয়ে কম সম্পদ আছে যার, সে-ই ভুক্তভোগী হবে সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে নারীর ওপরই এই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে বেশি। নারীরা আবার দরিদ্রও বটে। সম্প্রতি জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গরিব দেশের দরিদ্র নারীদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি, যদিও এই পরিবর্তনে তাদের অবদান খুবই কম। দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড পপুলেশনের মতে, বিশ্বের ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন দরিদ্র নারী জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের তালিকায় সবচেয়ে সামনের সারিতে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে, তা নারীকে আঘাত করে সবচেয়ে বেশি। এ সময় নারীর সংসারের কাজ বেড়ে যায়, তাকে প্রতিকূল পরিবেশে খাদ্য প্রস্তুত, জ্বালানি ও পানি সংগ্রহের জন্য অনেক বেশি সময় দিতে হয়, শ্রম দিতে হয়। মেয়েশিশুদের ঘরের কাজে সহায়তার পরিমাণ বেড়ে যায়, তার স্কুল বন্ধ হয়ে যায়। গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এ সময় বাল্যবিবাহের প্রবণতাও বাড়ে। প্রাকৃতিক বিপর্যস্ততার সময় নারী একদিকে শিশুকে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করে, অন্যদিকে গৃহস্থালির জিনিসপত্র রক্ষার চেষ্টা করে। এ কাজগুলো তাদের জন্য খুব কষ্টের হয়। এ কারণেই অনেক নারী মারা যায়। ছোট শিশুরা এ সময় মায়ের কোল থেকে নামতে চায় না; সেই শিশুকে কোলে নিয়েই নারীকে চলতে হয়, ফলে নারী ও শিশু উভয়ে দুরবস্থার শিকার হয়। কোনো কোনো সময় মৃত্যুমুখে পতিত হয়। বাংলাদেশে কোন এলাকায় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটার (বিশেষ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বিধ্বস্ত এলাকায়) পর গর্ভবতী, দুগ্ধবতী ও বয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে এই জলবায়ু পরিবর্তন স্বাস্থ্য-হুমকি বাড়ায়। এ সময় সাধারণত পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা কমে যায় এবং গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর হার বেড়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও হবে। ফলে ফসল কম হবে। তখন নারীর অপুষ্টি দেখা দেবে সবচেয়ে বেশি। কারণটিও স্পষ্ট। বাংলাদেশের মতো পিতৃপ্রধান দেশে পরিবারে খাদ্যের অসম বণ্টন, খাদ্যের মতো মৌলিক অধিকারেও নারীর প্রবেশাধিকার কম হওয়ায় এবং সামাজিক মতাদর্শের কারণে নারীর জন্য ক্যালরির পরিমাণ কমে যাবে।
বাংলাদেশের চর ও উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকে নারীরা। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা সাধারণত কাজের খোঁজে শহরে বা অন্য জায়গায় যায়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এলে সেখানে থেকে যাওয়া নারীরাই তখন সন্তান আর বয়স্কদের দেখে রাখে। তীব্র সংকটের মুহূর্তেও তারা অসহায় হয়ে না পড়ে চেষ্টা করে প্রতিকূল পরিস্থিতি উতরে যেতে। নারীর এ লড়িয়ে ভূমিকার স্বীকৃতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যেও উঠে এসেছে। গত মাসে রোমে আয়োজিত খাদ্যনিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্বসম্মেলনে অংশ নিতে গিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রক্রিয়ায় তিনি নারীকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার জ্ঞান তাদের আছে; আর তাই জলবায়ু পরিকল্পনাবিষয়ক নীতি, পরিকল্পনা, কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মতো সকল ক্ষেত্রে নারীকে অবশ্যই জড়িত করতে হবে।’ (ইউএনবি, ১৯ নভেম্বর, ২০০৯) আমাদের সরকারপ্রধানের এমন উপলব্ধি নিঃসন্দেহে আশাসঞ্চারী। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নারীকে বাদ দেওয়া হয়; সমন্বিত দুর্যোগ মোকাবিলায় নারীর নিজস্ব জ্ঞান কাজে লাগানো হয় না। তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সব ক্ষেত্রে নারীকে জড়িত করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ও এর প্রভাবকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সব উদ্যোগে নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বজুড়েই প্রতিবেশকে বিপর্যস্ত করছে, মানুষকে স্থানান্তর করছে, উদ্বাস্তু করছে, সীমিত সম্পদের ওপর বেড়ে যাচ্ছে অকল্পনীয় প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বিপর্যস্ত এলাকায় বেড়ে যায় নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রা। ধর্ষণ, যৌন হয়রানিসহ নানা ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হয় নারীকে। বিপর্যয়-পরবর্তী অবস্থায় ঘরে ও শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে নারী-সহিংসতার শিকার হয়।
এর বাইরের চিত্রও আছে, বাংলাদেশের নারীরা এ অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিভিন্ন কৌশল নেয়। তারা বিপর্যয়ের প্রস্তুতি হিসেবে খাদ্য মজুদ রাখা, জ্বালানি, গৃহপালিত পশুদের খাবার সংগ্রহ করে রাখার চেষ্টা করে। তারা গৃহ পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়াসহ গৃহস্থালির পুনর্ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশ নেয়। ২০০৫ সালে বাংলাদেশ NAPA (National Adaptation Programme of Action) তৈরি করেছে এবং এখন এটি বাস্তবায়নের পথে আছে। এখানে লক্ষণীয় যে নারীকে সব সময় জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হিসেবেই দেখানো হয়েছে; কিন্তু এ ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনাকে সামনে আনা হয়নি।
জলবায়ু পরিবর্তনে নারীর নাজুকতা এত দিন খুব বেশি স্পষ্টভাবে দেখা বা এটিকে রাজনৈতিকভাবে সামনে আনা হয়নি। কারণ, তারা এই পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন করার কৌশল জানে এবং কীভাবে এর প্রভাব কম হবে, সেটিও জানে। সংগঠক হিসেবে, নেতা হিসেবে এবং সংসারের দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে নারী জলবায়ু পরিবর্তনের সময় কার্বন ডাই-অক্সাইডের ক্ষতি কমানোর ক্ষেত্রেও সাহায্য করছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের নীতিতে নারীর অভিজ্ঞতা, অভিযোজন কৌশল কিংবা প্রভাবের লিঙ্গীয় দিকটি অনুল্লিখিত রয়েছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনভিত্তিক কৌশলপত্র, অর্থায়ন এবং প্রকল্পে লিঙ্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি অতি জরুরি। এ মাসে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠেয় জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে বিষয়টি সামনে আসা প্রয়োজন।
এ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নারীর অভিজ্ঞতা ও লিঙ্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর প্রভাব দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে বিশাল ঝুঁকিতে থেকে যাবে বিশ্বের বড় অংশের দরিদ্র নারীরা।
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
zobaidanasreen@gmail.com

Wednesday, December 16, 2009

ন্যায্য, উচ্চাভিলাষী ও বাধ্যবাধকতার চুক্তি -জলবায়ু সম্মেলন by কুমি নাইডু

শৈশবে একদিন নিউজিল্যান্ডে আয়োজিত বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভের টেলিভিশন সম্প্রচার দেখছিলাম। তখনকার বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকাকে ক্রীড়াক্ষেত্রে বয়কটের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে আয়োজিত একটি রাগবি ম্যাচের ঠিক আগে এটি ঘটেছিল। আমার ছোট ভাই ও আমি বিভ্রান্তিতে পড়েছিলাম। আমার ভাইয়ের প্রশ্ন, এই সমাবেশে শ্বেতাঙ্গরা কী করছে? আমরা বুঝতে পারছিলাম না, ন্যায়বিচারের জন্য আমাদের এ লড়াইয়ে তাদের কী পাওয়ার থাকতে পারে। পরে আমি বুঝেছিলাম, তারা কী চেয়েছিল, তাদের কী দরকার ছিল। তাদের সেই প্রয়োজন, একটি ন্যায়সংগত দুনিয়ায় বাস করা।
১০ বছর পর বর্ণবাদের অবসান ঘটানো হয়। লাখ লাখ মানুষ নিষ্ক্রিয় থাকতে পারত, কোনো কিছু না-ই বা করতে পারত, কিন্তু তারা লড়াই করেছে।
একই ধরনের ঘটনা এখন ঘটছে জলবায়ু বিষয়ে। জলবায়ু ন্যায়বিচারের ডাকে সব জায়গা থেকে মানুষ একত্র হচ্ছে। এ ডাক কোপেনহেগেন জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে একটি ন্যায্য, উচ্চাভিলাষী ও আইনগত বাধ্যবাধকতার চুক্তিতে পৌঁছার ডাক।
দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা ছিল, রাষ্ট্রপ্রধানেরা কোপেনহেগেনে যাবেন কি না; জলবায়ু রক্ষায় চুক্তির বিষয়ে আলোচনার দায় তাঁরা নিজের কাঁধে নিতে চাইবেন কি না। এখন ১২০ জন রাষ্ট্রপ্রধান কোপেনহেগেনে যাচ্ছেন। এটি অনেকাংশে জনগণের ক্রমবর্ধনশীল জোটবদ্ধতার প্রতিক্রিয়া। সারা দুনিয়ার ধনী-গরিব, বৈশ্বিক উত্তর-দক্ষিণ অংশের জনগণ উপলব্ধি করছে, আমাদের সাধারণ ভাগ্য একে অন্যের সঙ্গে বাঁধা; আর সে ভাগ্য নির্ধারিত হবে এমন গুরুতর হুমকিতে আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাব তার ভিত্তিতে।
আমাদের রাষ্ট্রপ্রধানেরা জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিজ্ঞানকে বদলাতে পারেন না, এটি তাঁদের কাছে বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে; যদিও অনেকে তা বদলানোর চেষ্টা করে চলেছেন। এখন স্পষ্ট, তাঁদের যা বদলাতে হবে, তা হলো রাজনীতি।
সংবাদ বেরোচ্ছে, অনেক রাষ্ট্রপ্রধান পরিকল্পিত সময়ের আগে আসার এবং শেষ পর্যন্ত থাকার ইচ্ছা পোষণ করছেন। সবাই এ সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ চান, তাঁদের যাঁরা নির্বাচন করেছেন, সেসব ভোটারকে দেখাতে চান, তাঁরা জলবায়ু-বিশৃঙ্খলা বিষয়ে কতটা আন্তরিক। কিন্তু কোপেনহেগেন তো রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বাড়ানোর সুযোগ নেওয়ার জায়গা নয়।
এর সফলতা মোটা দাগে তিনটি মাপকাঠিতে পরিমাপ করা হবে: চুক্তিটি কি ন্যায্য হবে? ন্যায্য হতে হলে ধনী ও শিল্পোন্নত দেশগুলোকে তাদের কার্বন ঋণ ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব স্বীকার করতে হবে। অর্থাত্ ক্রমোষ্ণ পৃথিবীর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানো এবং এর অনিবার্য ক্ষতিকর প্রভাবের তীব্রতা কমাতে উন্নয়নশীল বিশ্বকে অর্থ সরবরাহ করতে হবে।
এটি কি উচ্চাভিলাষী হবে? এর মানে হলো, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০১৫ সালের পর আর বাড়তে দেওয়া যাবে না; শিল্পোন্নত দেশগুলোকে ২০২০ সাল নাগাদ ৪০ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে সম্মত হতে হবে এবং তাদের প্রচলিত ব্যবসার ধরন থেকে সরে যেতে হবে।
এটি কি বাধ্যবাধকতার হবে? আইনগত বাধ্যবাধকতার? জাতিসংঘের আলোচনার ইতিহাসে রাজনৈতিক চুক্তির ভূরি ভূরি দেখা মিলবে, যেগুলোর মূল্য দেনদরবারের জন্য ব্যয়িত কার্বন বা বিমান ভাড়ার অর্থমূল্যেরও সমান নয়।
দুনিয়াকে অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক করার জন্য ন্যায্য, উচ্চাভিলাষী ও বাধ্যবাধকতার চুক্তি এক অবিশ্বাস্য সুযোগ। এমন চুক্তি করা গেলে ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্ব-অর্থনীতিতে প্রায় ৩০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হতে পারে। পরিচ্ছন্ন, নির্ভরযোগ্য ও নবায়ন-উপযোগী জ্বালানি প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে ২০০ কোটি মানুষের জ্বালানি-দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হতে পারে।
নানা ধরনের বায়ুদূষণের অবসান ঘটিয়ে সবার স্বাস্থ্যসুবিধা বয়ে আনা যেতে পারে। পৃথিবীর অনেক অশান্ত স্থানে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় তা সহায়ক হতে পারে। সম্পদকেন্দ্রিক লড়াই ও জ্বালানি রাজনীতিকে বিশ্বের নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের বাইরে নিয়ে যেতেও সহায়ক হতে পারে।
ন্যায়বিচার ও শান্তি অত্যাবশ্যক। নিয়ন্ত্রণহীন জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অবিশ্বাস্য চাপ তৈরি করবে এবং পানীয় জল, খাদ্য উত্পাদন ও বাসযোগ্য ভূমির পরিমাণ অনেক কমে যাবে। সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আক্রান্ত হবে দরিদ্ররা। পৃথিবীর ৬৮০ কোটি মানুষের কেউই বাদ যাবে না।
বিজ্ঞান জানাচ্ছে, আমরা যদি এখনই সক্রিয় না হই, আজ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ছিন্নমূল হবে। আমাদের সন্তানেরা, তাদের সন্তানেরা জলবায়ুর ফল ভোগ করবে। বৈজ্ঞানিক মতামত জোরদার হচ্ছে, এর ফলে পৃথিবী কার্যত বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
কোপেনহেগেনে একটি ন্যায্য, উচ্চাভিলাষী ও বাধ্যবাধকতার চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। আলোচনায় সে চেষ্টাই করতে হবে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, তা হবে না; জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এ পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এমন কথা বলার সময় যে বিষয়টি তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন, তা হলো, যাঁরা এখন দায়িত্ব পালন করছেন, ক্ষমতার মালিক তাঁরা নন; যাঁরা তাঁদের সেখানে বসিয়েছেন তাঁরাই মালিক।
আমাদের নেতাদের বুঝতে হবে, বিশ্ববাসী তাঁদের ওপর চোখ রাখছে। আমরা বুঝি, প্রকৃতি দেনদরবার করে না। আমরা বুঝি, আমরা বিজ্ঞান বদলাতে পারি না। আমাদের দাবি, রাজনীতিবিদেরা রাজনীতি বদলান। তা না হলে তাঁদের অবশ্যই বুঝতে হবে, রাজনীতিবিদদের বদলানোর ক্ষমতা আমাদের আছে।
বিশ্বাসভিত্তিক সংঘ, ট্রেড ইউনিয়নবাদীরা, বেসরকারি সংস্থা, সামাজিক আন্দোলন, নারী সংগঠন, সম্প্রদায়ভিত্তিক সংঘ ও প্রগতিশীল বাণিজ্য সংঘ এমন সব দাবি তুলছে। আমাদের প্রত্যাশা, আমাদের নেতারা তাঁদের কথা শোনাবেন এবং সাহসের সঙ্গে সক্রিয়তা দেখাবেন।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব।
কুমি নাইডু: পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিসের নির্বাহী পরিচালক।

Monday, December 14, 2009

ধনীর বিলাসিতা ক্ষতি করবে আর দোষী হবে গরিব -জলবায়ু পরিবর্তন by ফরিদা আখতার

‘বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নির্গমন কমাতেই হবে’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে মতৈক্যের একটি জায়গা তৈরি হয়েছে। ধনী-গরিব সব দেশের পক্ষ থেকে একটি কথাই উঠছে। বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২০৫০ সালের মধ্যে গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে শতকরা ৮০ ভাগ কার্বন নির্গমন কমাতেই হবে। এ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যত আন্তর্জাতিক সভা হয়েছে, তার মধ্যে এই সিদ্ধান্তই বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু কে কমাবে? এবং কীভাবে কমাবে? সেই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। তবে এ কথাও আমরা সবাই জানি, কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের জন্য শিল্পোন্নত দেশের তথাকথিত উন্নয়ন বা অতি-উন্নয়ন এবং পৃথিবীর সব দেশেরই ধনীদের বিলাসী জীবনযাত্রার ধরন দায়ী। এই জীবনযাপনের সব মাধ্যম জ্বালানিনির্ভর, যার মধ্যে এই কার্বন নির্গমনের সব উপকরণ রয়ে গেছে।
ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে বর্তমানে জাতিসংঘের যে জলবায়ু সন্মেলন চলছে, তার কারণেও বাতাসে কার্বন নির্গমনের পরিমাণ বাড়বে, কারণ ১৯২টি দেশের কয়েক হাজার প্রতিনিধি উড়োজাহাজে করে যাবেন, অনেক গাড়ি চলবে, বাতি জ্বলবে আর খরচ হবে কাগজ, হাজার পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট বের হবে প্রতিদিন। এসব কূটতর্ক মনে হতে পারে, তবে এ ধরনের সম্মেলনের এই দিকটা না বললেই নয়। তাই বলে সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করলে ভালো কিছু হবে, তা বলছি না।
পৃথিবীর ধনী ও তথাকথিত শিল্পোন্নত দেশের ধনী মানুষের জীবনযাত্রা কী পরিমাণ ক্ষতিকর, তা এই জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনাতেই বোঝা যায়। আমরাও শিল্পোন্নত দেশের অনুকরণে শিক্ষিত হতে গিয়ে শিখেছি, লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’—এখন তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ‘লেখাপড়া করে যে, কার্বন নির্গমন করে সে।’ কৃষকের জ্ঞাননির্ভর ও প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর কৃষি বাদ দিয়ে জ্বালানিনির্ভর কৃষির প্রবর্তন করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও দাতা সংস্থার পরামর্শে। কৃষি মানে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, সেচযন্ত্র দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা, ধান কাটার জন্য যন্ত্রের ব্যবহার, ধান ভানার জন্য রাইস মিল—সবই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। ফলে ফ্যাক্টরি-ব্যবস্থায় খাদ্য উত্পাদনও হয়ে গেছে পরিবেশ ধ্বংসের কারণ। সভ্যতা আমাদের পরিবেশবান্ধব হতে শেখায়নি, শিখিয়েছে পরিবেশ ধ্বংস করতে। অনেকে বলবেন, আমরা প্রযুক্তির বিকাশ ও উন্নয়নের বিরোধিতা করছি। আসলে মানুষের কল্যাণ ও পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রযুক্তি খুব কদর পায়নি, পেয়েছে মুনাফা অর্জনকারী ও পরিবেশ ধ্বংসকারী প্রযুক্তি। কাজেই আমাদের সমালোচনা সেই প্রযুক্তির বিরুদ্ধেই।
ধনীদের জীবনযাত্রার গরমে উত্তর মেরুর নিষ্পাপ হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার আর টিকে থাকতে পারছে না। সেগুলো গলে যাচ্ছে। আগে শীতকালে গ্লেসিয়ার ছড়িয়ে পড়ত, গরমকালে ছোট হয়ে আসত। এই গ্লেসিয়ারের অবস্থা দেখে বিশ্বের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কি না, তা ধারণা করা যায়। ১৯৮০ সাল থেকে গ্লেসিয়ারের সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নজরে আসতে শুরু করে। এতে উন্নত বিশ্ব একটু চিন্তিত হয়ে উঠেছে। গ্লেসিয়ার না গলে যদি শুধু সমুদ্রের পানি বেড়ে যেত, তাহলে এত বেশি হইচই হতো কি না সন্দেহ আছে। কারণ, সেটা মূলত বাংলাদেশের মতো সমুদ্রপারের গরিব দেশের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত।
এদিকে আমাদের দেশের কাছাকাছি বরফ গলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে হিমালয়ের চূড়ায়। সেখানে বরফ সময়ের আগেই গলে যাচ্ছে। ফলে আমাদের নদীতে পানি অস্বাভাবিকভাবে এবং অসময়ে বাড়ছে। শীত, গরম ও বর্ষাকাল ঠিকমতো আর বোঝা যাচ্ছে না। এটা বড়ই যন্ত্রণার।
বাংলাদেশকে বিশ্বের পরিবেশসচেতন মানুষ এখন খুব চেনে। তারা বলে, ওহ্, বাংলাদেশ, তোমরা তো সমুদ্রের পানিতে ডুবে মরবে। বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে এবং এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে। কিন্তু অনেকে যেটা দেখছেন না তা হচ্ছে, সমুদ্র যেমন রাগে ফুঁসছে, তেমনি হিমালয়ের অভিমানও কম নয়। বাংলাদেশে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র মিশে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। জাতিসংঘের জলবায়ুসংক্রান্ত প্রতিবেদনে (Big melt threatens millions, says UN, People & the Planet. June 4, 2007) হিমালয়ের গ্লেসিয়ার গলে যাওয়ার ফলে এশিয়ার; বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার, নদীর উত্স ২০৩৫ সাল অর্থাত্ মাত্র ২০ থেকে ২১ বছরের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশসহ ভারত, তিব্বত, নেপাল, পাকিস্তান ও মিয়ানমারে আগামী কয়েক দশকে বন্যা ও খরার ঘটনা বেড়ে যাবে। এর অর্থ হচ্ছে, বঙ্গোপসাগরে পানির উচ্চতা এমনিতেই বাড়বে, তার ওপর যোগ হবে হিমালয়ের বরফগলা পানি। বাংলাদেশের মাথার ওপরে এবং পায়ের তলায় সব দিক থেকে আঘাত আসবে।
কোপেনহেগেনে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য একটি নতুন চুক্তি হওয়ার কথা। বর্তমানে যে চুক্তি চলছে, অর্থাত্ কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ ২০১২ সালে শেষ হয়ে যাবে। কাজেই বিশ্বে তাপমাত্রা কমিয়ে আনার জন্য নতুনভাবে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে চুক্তি হওয়ার কথা। আর তখনই গোল বাধছে। যাদের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে, তারা নিজেদের জীবনযাত্রা পরিবর্তনের খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হয় না; বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুব একটা সাড়া দিচ্ছে না। তাদের জীবাশ্মনির্ভর জীবনযাত্রা পরিবর্তন না করেই আলোচনার মোড় ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। তারা ভোগ কমানোর কথা যত না বলছে, তার চেয়ে বেশি আঙুল তুলে দেখানোর চেষ্টা করছে যে আসলে গরিব মানুষের সংখ্যাই দায়ী। সে কারণে তড়িঘড়ি করে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বিশ্ব জনসংখ্যা প্রতিবেদন, ২০০৯ প্রকাশ করে বসেছে। কোনো প্রকার গণনা ছাড়াই অঙ্ক কষে বিশ্বের জনসংখ্যা সাত বিলিয়ন হয়ে যাবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তারা আরও বলছে, আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য জনসংখ্যাও একটি বিষয় হিসেবে আসা উচিত। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার প্রভাব নিয়ে খুব বড় ধরনের যুক্তি তাদের পক্ষে নেই বলে তারা আভাসে-ইঙ্গিতে তা তুলছে। তারা ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ’ কথাটি উচ্চারণ না করে হালকাভাবে ‘পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি’ করা উচিত বলে পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে একটু চালাকি আছে। বলা বাহুল্য, এই সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কাজটি গরিবদের ওপরই ঘটবে, যেমন অতীতে ঘটেছে। ভোগই যদি কার্বন নির্গমনের প্রধান কারণ হয়, তাহলে গরিব দেশের গরিব মানুষ যা ভোগ করে, তা ধনীদের ভোগের ধারেকাছেও নেই। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ১৯৯৮ ওভারভিউ, ধনী-গরিবের ভোগের বিপুল ব্যবধান তুলে ধরেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মাত্র ২০ শতাংশ ধনী মানুষ ৮৬ শতাংশ ভোগ করে আর সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ গরিব মানুষ মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ ভোগ করে। এই ২০ শতাংশ ধনীরা ৪৫ শতাংশ মাছ-মাংস, ৫৮ শতাংশ জ্বালানি, ৮৪ শতাংশ কাগজ এবং ৮৭ শতাংশ গাড়ির ব্যবহার করে। এর বিপরীতে মাত্র ৫ শতাংশ মাছ-মাংস, ৪ শতাংশ জ্বালানি, ১ দশমিক ১ শতাংশ কাগজ এবং ১ শতাংশ গাড়ি ব্যবহার করে। তাহলে এই গরিব মানুষগুলোকে দুনিয়া থেকে একেবারে সরিয়ে দিলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ১ শতাংশও উন্নতি করা যাবে না। অথচ ধনীরা একটু দয়া করে তাদের ভোগের মাত্রা কমিয়ে দিলে অনেক পার্থক্য বোঝা যাবে, এই কথা একটি শিশুও হিসাব করে বুঝবে। কিন্তু তবুও কেন তৃতীয় বিশ্বের জনসংখ্যার দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে? এর কারণ, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই এখন ধনী দেশের জীবনযাত্রার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ধনী দেশের সরকার এ ব্যাপারে খুব একটা দায়িত্ব নিতে চায় না বলে ‘যত দোষ, নন্দ ঘোষ’কে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এবং এই নন্দ ঘোষ আর কেউ নয়, আমাদের গরিব মানুষ। দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর এর চেয়ে ভালো পদ্ধতি আর কী হতে পারে? বিশ্ব জনসংখ্যা রিপোর্ট, ২০০৯-এ আরও কারসাজি আছে। সেটা হচ্ছে, নারীদের সম্পৃক্ত করে প্রশ্নটি উত্থাপন করা হয়েছে। এ কথা সত্যি যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাচ্ছে, এতে গরিব দেশের গরিব মানুষ নিত্য বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে এবং নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, গত দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবছর ২১ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ৯৮ শতাংশ দুর্যোগই জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত। বিশ্বব্যাপী মানুষের ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা ১৯৯৮ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বেড়েছে। জনসংখ্যা প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে প্রকাশ করতে গিয়ে স্থানীয় ইউএনএফপিএ প্রতিনিধি বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারীদেরই খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কথাটি মিথ্যে নয়। তিনি সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশে দুটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সিডর ২০০৭ এবং আইলার ২০০৯-এর কথা উল্লেখ করেন এবং মানুষের ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দেন। কিন্তু এর সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা পরিবার পরিকল্পনার সম্পর্কটা কোথায়? পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির মাধ্যমে সন্তান জন্মদান কমানো কিংবা বন্ধ করা যাবে। অর্থাত্ সিডর বা আইলা হলে যে সন্তান জন্মায়নি, তার তো কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু যারা ইতিমধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে তাদের বাঁচানোর জন্য পরিবার পরিকল্পনা কতটা সহায়ক হবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে উন্নত না করে বিদেশ থেকে আমদানি করা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নারীর শরীরে ঢুকিয়ে দিলে তার স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হবে, সে দায়িত্ব কে নেবে? জন্মনিয়ন্ত্রণ করা না-করা নারীর নিজের বিবেচনায়ই হওয়া উচিত, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে জটিলতা বাড়ানোর কোনো দরকার নেই।
বাংলাদেশে ধনীদের একটি বড় অংশ ঢাকা শহরে বাস করে। তাঁদের ভোগের অবস্থা দেখলেই আমরা আন্দাজ করতে পারি, বিশ্বের ধনীদের কী অবস্থা। ঢাকা শহরে গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি যে যানজটের সৃষ্টি করছে, তার চেয়ে বেশি করছে বাতাসে কার্বন নির্গমন ও পরিবেশদূষণ। যানজটের সমস্যা ট্রাফিক সিগন্যালের নতুন নিয়মকানুন করে হয়তো ঠিক করা সম্ভব, কিন্তু একটি গাড়িতে মাত্র একজন কি-দুজন চড়বে বলে গাড়ির সংখ্যা বাড়ানোর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আনা না হলে কার্বন-জট ঠেকানো যাবে না। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সংসদে কিংবা উপজেলা পরিষদে যে জনপ্রতিনিধিরা যাচ্ছেন, তাঁদের জন্যও বিশেষ গাড়ি আমদানি করতে হচ্ছে। আমি অনেক আগে লিখেছিলাম (প্রথম আলোতেই), গাড়ির পরিবার পরিকল্পনা চাই, আজও বলছি, মানুষের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য যদি পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি করতে হয়, তাহলে গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চাই বিশেষ পরিকল্পনা। কার্বন নির্গমন ঠেকানোর জন্য এটাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। বাংলাদেশে আমরা এখনো জলবায়ু মোকাবিলায় নিজস্ব পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারি। এর আগে আমাদের প্রতি দোষারোপ করার চেষ্টা ঠেকাতে হবে। যারা দায়ী, সেই ধনী দেশকেই কার্বন নির্গমন কমানোর বেশির ভাগ দায়িত্ব নিতে হবে। সমস্যা যেখান থেকে শুরু, সমাধান সেখান থেকেই হতে হবে।
ফরিদা আখতার: নারী আন্দোলনের নেত্রী।

Saturday, December 12, 2009

বাংলাদেশের জলবায়ু-শরণার্থী -চারদিক by মনিরুল আলম

বাংলাদেশের আবহাওয়া শেষ! এতটুকু বলেই আমার ছোট বোনটা দ্রুত জানালা বন্ধ করতে যায়। সবাই মিলে বসেছি দুপুরের খাবার খেতে, ঠিক তখনই শুরু হলো বৃষ্টি। অদিনে বৃষ্টি, সারাক্ষণ ভাপসা গরম আর বন্যা-খরা তো আছেই—জলবায়ু পরিবর্তনের এসব বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। বেশ কয়েক দিন পর পর মৃদু ভূমিকম্প হচ্ছে। বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। ভারসাম্যহীন হয়ে উঠছে পরিবেশ। এ জন্য দায়ী উন্নত বিশ্বের শিল্পবর্জ্য, তাদের লোভ-লালসার জন্য সৃষ্ট কর্মকাণ্ড।
সাধারণ মানুষ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে না গিয়েও খুব সহজে বুঝতে পারছে, আবহাওয়ায় বড় ধরনের একটা পরিবর্তন হচ্ছে। সাম্প্রতিক সিডর, আইলা, বন্যা, নদীভাঙন, খরা, অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ধসের ঘটনা আগের বছরগুলোর চেয়ে অনেক গুণ বেড়েছে—এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
বড় ফুফু দেশের বাড়িতে থাকেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করে বন্যা-পরিস্থিতির কথা বলছিলেন বেশ কিছুদিন আগে। একমাত্র নাতনিকে নিয়ে ঘরে বসে আছেন। চারদিকে বন্যার পানি। সপ্তাহখানেক এই পানির মধ্যে কাটাতে হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, আগে এ রকম হয়নি। বন্যা হতো, তবে বাড়িতে পানি উঠত না। কয়েক বছর ধরে ঘরে পানি উঠছে। মাটি ফেলে ঘরভিটি উঁচু করার পরও পানি উঠছে। এখন কী করি, সামনের দিনগুলোতেই বা কেমনে বাঁচব আমরা—উদ্বিগ্ন আমার ফুফু!
জলবায়ুর এই পরিবর্তনে সাধারণ মানুষের করণীয়টা আসলে কী? ঢাকায় বসে যাঁরা এই জলবায়ু নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন, তাঁরাও কি বুঝতে পারছেন, আসলে করণীয়টা কী? বা আমরা কতটুকু করতে পারছি? প্রশ্ন অনেকভাবেই করা যায়, কিন্তু এর সমাধানটা কোথায় বা কোন সময়ে? কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ক্ষতির পাল্লা ভারী হতে শুরু করেছে।
ঘরহারা, ভিটেহারা মানুষ এখন দলে দলে শহরমুখী হতে শুরু করেছে। কিন্তু এটা কি কোনো সমাধানের পথ হতে পারে, নাকি ভালোভাবে বেঁচে থাকার কোনো উপায় এটা? বিশ্বদরবারে ইতিমধ্যে আমরা নিজ দেশে জলবায়ু-শরণার্থী হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেছি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষের অসহায়ত্বই ফুটে উঠেছে। ধনী দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর চলছে টানাপোড়েন। সমান তালে চলছে বিতর্ক, কে কতটুকু ছাড় দেবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আক্রান্ত দেশগুলোতে যে শরণার্থী তৈরি হবে, তা এই পৃথিবী আগে কখনো মোকাবিলা করেনি। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা এই জনপদের মানুষ নিজ প্রচেষ্টায় বেঁচে থাকার জন্য ৫৬ হাজার বর্গমাইলজুড়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। এদের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। এর দায় আমরা কীভাবে এড়াব?
আবারও সেই দারিদ্র্য, সেই অনাহারক্লিষ্ট ক্ষুধার্ত জনপদ! হেলিকপ্টার থেকে খাদ্য ছুড়ে ফেলা কিংবা রিলিফের জন্য লম্বা সারি।
এ কথা ভাবলে শিউরে ওঠে বুক। কোপেনহেগেনের দিকে তাকিয়ে আছে এখন সারা বিশ্ব। কিন্তু শোনা যাচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো এই সম্মেলন থেকে কিছুই পাবে না।
পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে কোথায় চলে যাবে? পাহাড়ের ওপর থেকে বরফ গলে গলে সমৃুদ্রকে কি পাগল করে দেবে? কার্বন নির্গমন কারা করে, কতটা করে, আর তাতে ক্ষতি হয় কার? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর কি কারও জানা নেই? এভাবে চলতে থাকলে কিছুদিন পরই লাখ লাখ মানুষ খাওয়ার পানি পাবে না আর। তখন শুধু বাঁচার তাগিদেই শুরু হবে অভিবাসন। মানুষের সেই বিপুল প্লাবন ঠেকাবে কে? উন্নয়নশীল বিশ্বের এ যুগের শিশুরা কি জানে, তাদের জন্য কী নির্মম ইতিহাস লেখা হচ্ছে?
ছবির বৃদ্ধটি যন্ত্রযানে একাকার মহানগরের এক উড়ালসেতুর ওপর নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছেন। সত্যি কি নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছেন? পথে বাড়তে থাকা শকটগুলো বলে দিচ্ছে, এখানে যে পরিমাণ কার্বন মনোক্সাইডের নির্গমন হচ্ছে, তার হাজার গুণ বেশি নির্গমন হচ্ছে উন্নত বিশ্বে। তারই খড়্গ এসে কেটে নেবে উন্নয়নশীল দেশের সব সুখ। বাংলাদেশ কি শুধু কেঁদেই যাবে? ঘুরে দাঁড়াবে না আরেকবার? ঘুরেফিরে সেই প্রশ্নই আমি নিজেকে করি...

প্রতিমন্ত্রীর বাসায় সৌরবিদ্যুৎ - উৎসাহজনক বার্তাটি কি সবার কাছে যাচ্ছে?

কোপেনহেগেনে যখন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন শুরু হলো, ঠিক তখন ঢাকায় বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী হাছান মাহমুদ তাঁর সরকারি বাসভবনে সৌরবিদ্যুৎ-ব্যবস্থা চালু করে তাত্পর্যপূর্ণ উদাহরণ স্থাপন করলেন। প্রতীকী হলেও এর মূল্য অনেক। দুই কিলোওয়াটের এই সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলে বাসার জরুরি কাজগুলো নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যাবে। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে এই বিদ্যুত্ ব্যবহার করলে দুই টন কার্বন নিঃসরণ কমবে। সারা দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধির ব্যবস্থা হলে নিঃসন্দেহে তা কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
তবে শর্ত দুটি। প্রথমত, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নামিয়ে আনতে না পারলে সুফল পাওয়া যাবে না। একটি দুই কিলোওয়াট প্যানেলের দাম প্রায় চার লাখ টাকা। এটা সাধারণের নাগালের বাইরে। তাও দূরবর্তী গ্রাম ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। তবে তা এখনো কেবল অবস্থাপন্ন গৃহস্থদের ঘরেই শোভা পায়। এটি সাধারণের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে দুটি লাভ। শুধু যে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে তা-ই নয়, তেল-গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উত্পাদন বৃদ্ধির চাপও কমিয়ে আনা যাবে।
আমাদের দেশে সৌরচুল্লি ব্যবহারেরও বিরাট সুযোগ রয়েছে। প্রায় তিন দশক আগেই আমাদের বিজ্ঞানাগারে সৌরচুল্লি উন্নয়নের গবেষণা চলেছে। একটি চকচকে ধাতব পদার্থের ডিশে প্রতিফলিত সূর্যের আলো কেন্দ্রীভূত করে অনায়াসে ভাত-তরকারি রান্না ও চা বানানো যেতে পারে। দামে সস্তা কিন্তু কাজে দামি এই চুল্লির ব্যাপক প্রচলনের যে সুযোগ রয়েছে, তার সদ্ব্যবহার করা উচিত।
প্রশ্ন হলো, প্রতিমন্ত্রী সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের যে উদাহরণ স্থাপন করলেন, তার অন্তর্নিহিত বার্তাটি কি সবাই ঠিকমতো বুঝে নিচ্ছেন? একই দিন প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, কক্সবাজারের চকরিয়ায় সংরক্ষিত বনের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতার ইটভাটা চলছে। এর মানে, বন উজাড় ও পরিবেশ ধ্বংস, কার্বন নিঃসরণ বাড়ানো। কাঠ না পুড়িয়ে গ্যাস বা কয়লা পুড়িয়েও ইটভাটা চালানো যায়। এতে ক্ষতি কিছুটা কম হবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। একদিকে প্রতিমন্ত্রী কার্বন নিঃসরণ কমাবেন, আরেক দিকে বন উজাড় করে ও কাঠ পুড়িয়ে অন্যরা কার্বন নিঃসরণ বাড়াবেন, এ দুটি তো একসঙ্গে চলতে পারে না। সরকারকে এদিকে নজর দিতে হবে।

Tuesday, December 8, 2009

জলবায়ু নিয়ে জুয়া -মিখাইল গর্বাচেভ ও আলেকজান্ডার লিখোতাল

ক্রমবর্ধমান সংশয় ও আলোচনায় অচলাবস্থার ফল হিসেবে শোনা যাচ্ছে কোপেনহেগেন সম্মেলনে সমন্বিত বৈশ্বিক জলবায়ু পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। হতাশাব্যঞ্জক? নিশ্চয়ই। তবে কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনকে সব সময় এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উত্তরণের মধ্যবর্তী পদক্ষেপ বলে গণ্য করা হয়েছে। এখান থেকে আমরা কত দূর যাব, সে প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
‘আগামীকাল’ শব্দটির ঘনিষ্ঠ যোগ আছে ‘ঝুলে পড়ার’ সঙ্গে। দেশগুলো মানতে বাধ্য এমন কোনো সমঝোতার অনুপস্থিতির অর্থ হতে পারে বিষয়টি ঝুলে যাওয়া। মহাপ্রলয়ের ভবিষ্যদ্বাণী শুনতে শুনতে ক্লান্ত মানুষ কোপেনহেগেনে জাদুকরী কিছু দেখতে মুখিয়ে আছে। যে ব্যর্থতার আশঙ্কা করা হচ্ছে তা যদি সত্যি হয়, তবে পরিণতিতে আমাদের রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থার ক্ষেত্রে বড় ধরনের, হয়তো অপরিবর্তনীয়, ক্ষতি হতে পারে। আর তাই সরকারগুলোও আমাদের প্রত্যাশাগুলো সতর্কতার সঙ্গে সামলানোর চেষ্টা করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার কতটা কাছাকাছি পৃথিবী পৌঁছেছে, সে বাস্তবতা মেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা আন্তরিকতার সঙ্গে এখনো আচরণ করছেন না। সরকারি পর্যায়ের আলাপ-আলোচনা বাস্তবতাবিবর্জিত। সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানের আলোচ্য প্রস্তাবনাগুলো গৃহীত হলে এই শতাব্দীতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আটটি ধনী দেশের গ্রুপ জি-৮ ও অন্যান্য দেশের নেতাদের সম্মত হওয়া তাপমাত্রার দ্বিগুণ।
আলোচনার টেবিলের বর্তমান প্যারামিটারগুলোর ওপর ভিত্তি করে কোনো মতৈক্য হলে তা রাশিয়ান রুলেটের মতো জুয়া খেলার চেয়েও ভয়ানক হবে। কোনো চুক্তি না হয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়টি ঝুলে যাওয়া এবং দুর্বল জলবায়ু চুক্তির মতো আত্মপ্রবঞ্চনা—উভয়ই এড়াতে প্রয়োজন কোপেনহেগেনে এক সাফল্যের দেখা পাওয়া, যা এখনো সম্ভব।
আমাদের বাজি দ্বৈত পদক্ষেপ প্রক্রিয়ার পক্ষে। রাষ্ট্রগুলোকে সার্বিক লক্ষ্যমাত্রা, একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, আগাম কর্মপন্থা ও তহবিল প্রদানের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিসংবলিত একটি কাঠামোর প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গীকার করা দরকার। আইনগতভাবে মানতে বাধ্য মতৈক্য চূড়ান্ত করতে হবে এ সম্মেলনের ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে আলোচনায় (COP15-bis), এবারের ঘোষণায় এই শর্ত থাকতে হবে। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশ প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে সক্ষম হবে এবং জাতিসংঘের আলোচনার উদ্যোক্তারা কপ ১৫ ঘোষণাকে যথাযথ, কাজের জন্য অনুকূল আইনি কাঠামোতে প্রতিফলিত করার সময় পাবে।
তদুপরি, আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ও পরিকল্পনাগুলোকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ২০১৫ সালে পর্যালোচনার জন্য একটি সম্মেলনের দরকার হতে পারে। তাই, যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন রাষ্ট্রপ্রধানদের কোপেনহেগেন সম্মেলনে যোগ দেওয়া বেশি জরুরি। কারণ নেতাদের জোরালো ও সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই দ্বৈত পদক্ষেপের সমাধান কার্যকর হবে না।
সামনে এগোতে হলে শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। জলবায়ু অবিচারের প্রতিকার অবশ্যই করতে হবে, যেহেতু উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সইতে হয় এবং এর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে প্রচুর ব্যয় করতে হয়। ধনী দেশগুলোকে প্রচুর অর্থ দিতে হবে। তাদের কাছে প্রয়োজনীয় সম্পদ নেই—এমন দাবি অন্তঃসারশূন্য শোনায়, তারা তো অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ট্রিলিয়ন ডলার ঢালতে পারে।
গরিব দেশগুলো নিজেদের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে ভেটো প্রদানের ক্ষমতা কার্যকরভাবে এখন জি-৭৭ ও চীনের দিকে সরে যাচ্ছে। ১০ বছর আগে পশ্চিমে কেউ কি ভেবেছে, তাদের ভবিষ্যত্ বা সন্তানের মঙ্গল নির্ভর করবে বেইজিং বা দিল্লি বা আদ্দিস আবাবায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর?
তাই শিল্পোন্নত দেশগুলোকে যত শিগগির সম্ভব আলোচনার টেবিলে একটি প্রকৃত অর্থসংস্থানের প্রস্তাব রাখতে হবে, যেন উন্নয়নশীল দেশগুলো ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানানো ও অঙ্গীকারের ঘোষণা দেওয়ার জন্য সময় পায়। বিশেষত, আগাম শুরুর তহবিলের বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তার জন্য অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠন করা জরুরি। পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরিতে তা সহায়তা করবে। অর্থপূর্ণ আলোচনা আবার চালু করার শর্ত তৈরিতেও তা ভূমিকা রাখবে।
চ্যালেঞ্জের মাত্রা বিষয়ে সঠিক তথ্য জানাতে হবে। সদিচ্ছা প্রকাশক ইঙ্গিত নয়, দরকার সুশৃঙ্খল ও রূপান্তরমূলক পরিবর্তন। জলবায়ু পরিবর্তনের সরকারি প্রতিক্রিয়া নতুন করে সাজাতে হবে হুমকির মাত্রা ও প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় নিয়ে। নতুন বৈশ্বিক সমঝোতা বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে, স্বার্থান্বেষী মহলের লঘু করে দেওয়া কোনো আপসভিত্তিক হলে চলবে না।
যুক্তিসংগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন যে স্তরে সুস্থিত করা উচিত সে স্তর অর্জনে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে ২০২০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন কমাতে হবে ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে তা প্রায় পুরো থামাতে হবে। এখন আলোচনার টেবিলে ২০২০ সালের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কমানোর যে কথা তোলা হচ্ছে, তা হলে চলবে না। প্রধান প্রধান উন্নয়নশীল দেশকেও জাতীয় পর্যায়ে যথাযথ উপশমমূলক কর্মসূচি অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। তবে ধনী দেশগুলোকেই আগে পদক্ষেপ নিতে হবে। গত ২০ বছরের নিষ্ক্রিয়তার ফলে তাদের কোনো অধিকার নেই অন্যকে নির্দেশ দেওয়ার।
নাগরিকদের সত্য অবহিত করা থেকে সরকার নিবৃত থাকা উচিত নয়। সবাইকে কিছু কোরবানি করতে হবে। কিন্তু আপনি কি চাইবেন আপনার ঘর পরিষ্কার, রুচিসম্মত ও নিরাপদ না হয়ে সস্তা, নোংরা ও বিপজ্জনক হোক? আপনি কি বলতে প্রস্তুত, ‘ঠিক আছে, উত্তরাধিকারসূত্রে এ ঘর আমি পেয়েছি, কিন্তু তা রক্ষণাবেক্ষণে আমি অবহেলা করেছি। আমার সন্তানেরা, তোমাদের মাথার ওপর তাই যেকোনো সময় ছাদ ভেঙে পড়তে পারে?’ এমন ধরনের উত্তরাধিকার আমরা কেউ নিশ্চয়ই রেখে যেতে চাইব না।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
মিখাইল গর্বাচেভ: সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট; গ্রিন ক্রস ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
আলেকজান্ডার লিখোতাল: গ্রিন ক্রস ইন্টারন্যাশনালের সভাপতি; ক্লাইমেট চেঞ্জ টাস্কফোর্সের (সিসিটিএফ) সদস্য।

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন -একটি সমন্বিত চুক্তিতে আসতে হবে

পৃথিবী নামে পরিচিত আমাদের এই প্রিয় গ্রহটি মানুষের বসবাসের যোগ্য হিসেবে টিকে থাকতে পারবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করছে কোপেনহেগেন জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ওপর। সম্মেলনের দুটি দিক। প্রথমত, বায়ুমণ্ডলে কার্বন নির্গমনের হার প্রত্যাশিত মাত্রায় কমিয়ে আনা, যেন জলবায়ুর উষ্ণায়ন রোধের একটা উপায় বের করা যায়। মানুষ যেন বেঁচে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু উষ্ণায়নের ফলে ইতিমধ্যেই যেসব দেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে এবং আগামী কয়েক দশকে যেসব দেশের মানুষ ও প্রকৃতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বে, তাদের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া। বিষয়টি বাংলাদেশ, মালদ্বীপসহ আরও বেশ কিছু দেশের জন্য জরুরি। কারণ, উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে এসব দেশের বিরাট অংশ ডুবে যাওয়ার হুমকি সৃষ্টি হয়েছে।
সম্মেলনে যদি সব দেশ মিলিতভাবে এই সিদ্ধান্তে আসতে পারে যে, তারা আগামী ২০২০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন বর্তমানের তুলনায় অন্তত ৪৫-৫০ শতাংশ কমিয়ে আনবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন প্রায় বন্ধ করবে, তাহলে ভবিষ্যত্ নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায়। কিন্তু সে রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা প্রায় নেই। এখন আলোচনা চলছে কীভাবে প্রথম ধাপে ১৫-২৫ শতাংশ ও দ্বিতীয় ধাপে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কার্বন নির্গমন কমিয়ে আনা যায়। যদি সেটাও হয়, কিছুটা সম্ভাবনা আছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্মেলনের শেষ দিনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববাসীকে আশান্বিত করে তুলেছেন। কারণ, এতে বোঝা যায় একটি অর্থবহ চুক্তিতে আসার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব আগের তুলনায় কিছুটা ইতিবাচক। মূলত তাদের মনোভাবের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ শিল্পোন্নত এবং সাম্প্রতিককালে চীন-ভারতসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো বেশি জ্বালানি তেল পুড়িয়ে বাতাসে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ছড়ায়। ফলে জলবায়ুর গড় উষ্ণতা বেড়ে যায়। মার্কিন মহাশূন্য সংস্থা নাসার এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৯৯৭ সালের পর ২০০৮ সালটি ছিল নবম উষ্ণতম এবং ২০০৯ সালটি হতে চলেছে ষষ্ঠ উষ্ণতম বছর। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা চার-পাঁচ ডিগ্রি বাড়লে প্রাণের অস্তিত্ব লোপ পেতে পারে। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে সেই ভয়ংকর পরিণতিই বরণ করতে হবে। তাই একদিকে জ্বালানি তেল ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি ও অন্যদিকে আরও বনায়ন, বন উজাড় বন্ধ প্রভৃতির মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন স্বেচ্ছাচারিতার শিকার বাংলাদেশ। উপকূলবর্তী প্রায় তিন কোটি মানুষ জলবায়ু-উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য মানুষ সংগ্রাম করছে। সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে। সাধ্যমতো নিজস্ব উদ্যোগে জলবায়ু-তহবিল গড়ে তুলছে। কিন্তু পাশাপাশি শিল্পোন্নত দেশগুলোর কাছেও আমাদের দাবি আছে। জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ আগামী চার বছরে এক হাজার কোটি ডলার সহায়তা চাইবে। প্রয়োজনের তুলনায় এটা কিছুই নয়। কিন্তু ন্যূনতম তহবিল নিয়েই আমাদের জীবনসংগ্রামে নামতে হবে।
মনে রাখা দরকার যে, যতটুকু তহবিলই পাওয়া যাক না কেন, তা জলবায়ু-বিপন্ন মানুষ ও এলাকার জন্য দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করার সক্ষমতাও আমাদের অর্জন করতে হবে। না হলে কোনো সহায়তাই কাজে আসবে না।

Wednesday, December 2, 2009

বাংলাদেশের মানুষের জন্য কী বার্তা বয়ে আনবে -জলবায়ু সম্মেলন by আসাদউল্লাহ খান

বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ধনী ও গরিব সব দেশই এক কঠিন সমস্যা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান অবস্থা এমন একপর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, বিশ্বের নীতিনির্ধারক মহল এ সর্বজনীন সমস্যা মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে আগামী ১০ বছরের আগেই দেশগুলো একে অপরের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংঘাত, এমনকি যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়বে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে আঘাতটা আসবে প্রকৃতি এবং পরিবেশ থেকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যথা সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চল নিমজ্জন এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে ফসলহানি ও ঘরবাড়ি নষ্ট হওয়ায় উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়তে থাকবে, যা সামাল দেওয়া দুর্ভোগকবলিত দেশগুলোর সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। আগামী ডিসেম্বর মাসে কোপেনহেগেনে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন সামনে রেখে কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের সভাপতি টিম ফ্লানারি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বিশ্ব নেতারা কার্বন নির্গমনের ব্যাপারে যদি একটা সঠিক এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন, তাহলে সমগ্র বিশ্বের জন্য তা বয়ে আনবে এক অশনিসংকেত।
বিগত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে প্রায় ১০০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কার্বন নির্গমনের যে হিসাব তিনি পেয়েছেন, তা একদিকে যেমন ভারসাম্যহীন, তেমনি অচিন্তনীয়। তাঁর কাছে বিশ্ব নেতাদের সবুজ সভ্যতা গড়ার আকুল আকুতি আসছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনজীবন ওলট-পালট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সাগরের উপকূলে অবস্থিত দেশগুলো। আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, হিমালয় অঞ্চলের বরফের চাঁইগুলো গলে যাওয়ার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার ৫০ কোটি মানুষ মারাত্মক পানিসংকটের মুখোমুখি হতে পারে। উত্তর চীনের বিরাট অংশ মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে। সাগরের উচ্চতা যেভাবে বাড়ছে তাতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মাইক্রোনেশিয়ার ক্ষুদ্র দ্বীপাঞ্চল বেষ্টিত দেশটি সাগরে তলিয়ে যেতে পারে। দুঃসংবাদ এসেছে মৌরিতাস থেকে। সেখানকার জেলেরা বলছে, উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে তারা গভীর সমুদ্রে টুনা মাছ ধরতে পারছে না। মারাত্মক শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে গত বছর পেরুর জাতীয় আয় ৪.৫ শতাংশ কমে গেছে। ২০০৮ সালে জাতিসংঘ আয়োজিত ৮০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের এক সম্মেলনে পেরুর প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশেলে এই ভঙ্গুর পৃথিবী নামের গ্রহের কথা উল্লেখ করে যথার্থই বলেছেন, ‘আমরা একে ধ্বংস করতে পারি, নয় তো পারি বাঁচাতে।’
বিশ্বের জন্য দুঃসংবাদ হলো, ২০০৭ সাল থেকে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের দিক থেকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েরই কার্বন নিঃসরণের মাত্রা এখন ২০ শতাংশ, বাকি বিশ্বের ৪৯ শতাংশ, রাশিয়া ৫.৭ শতাংশ, ভারত ৪.৫ শতাংশ, জাপান ৪.৩ শতাংশ, জার্মানি সর্বনিম্ন ২.৯ শতাংশ। দুঃসংবাদ আমেরিকার দিক থেকেও আসছে, যদিও প্রেসিডেন্ট ওবামা ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে সবুজ শতাব্দীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার এনার্জি কোম্পানিগুলো বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ১৫০টি কয়লাচালিত বিদ্যুত্ স্থাপনা তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে খবরে জানা গেছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বিদ্যুত্ স্থাপনাগুলোর কয়েকটাও যদি স্থাপিত হয়, তাহলে গ্রিন হাউস গ্যাসের নিঃসরণ আরও অনেক বেড়ে যাবে এবং তা শুধু আমেরিকার পরিবেশের জন্য যে হুমকি হবে তা নয়, এই বিশ্ব নামের গ্রহটি বসবাসের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়বে।
এ মাসে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিতব্য জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশ্ব নেতাদের সামনে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বলার অপেক্ষা রাখে না একটি পরিবেশবান্ধব পৃথিবী তথা সবুজ পৃথিবী অর্থাত্ দূষণমুক্ত শিল্প-কারখানা, বিদ্যুত্শক্তি, পরিবহনব্যবস্থা এবং বনাঞ্চল সংরক্ষণ করার উদ্যোগ আগেও গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আজকের দিনে দূষণে ভারাক্রান্ত বিশ্বে এই প্রচেষ্টা অপরিসীম গুরুত্ব বহন করছে। বিশ্ববাসী আশা করে, কোপেনহেগেনের এই সম্মেলন থেকে একটি আস্থার জগতে ফিরে আসার পথপরিক্রমা শুরু হবে।
আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, সীমিত সম্পদের এই পৃথিবীতে প্রায় ৬৫০ কোটি মানুষ বাস করছে। খাবারদাবার, শস্য, বনজ, প্রাণিজ, এমনকি খনিজ যেসব বস্তু মানুষ এই পৃথিবী থেকে ১২ মাসে আহরণ করছে, তা পূরণ হতে সময় লাগে ১৪.৪ মাস। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন কিংবা দুর্বিপাকে মুক্ত জীবনযাত্রা চালানোর অর্থ হলো, আসলটা এই ভেবে খেয়ে না ফেলে জীবনের পাথেয় থেকে পাওয়া আসলের মুনাফার ওপর ভিত্তি করে চলা।
এই টেকসই জীবনযাত্রা কিংবা উন্নয়নের পথের প্রথম সিঁড়ি হলো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। আমাদের দেশের কথাই ধরা যাক। আমাদের দেশ এক বছরে যতটা খাদ্যশস্য উত্পাদন করবে, তা খরচ করার পর হাতে যেন কিছুটা উদ্বৃত্ত থাকে অনিশ্চিত সমস্যা যথা সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, খরা, প্লাবন, ফসলহানি এবং অজানা দুর্বিপাক মোকাবিলা করার জন্য। এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ দেশেরই হাতে এমন নগদ উদ্বৃত্ত তো নেই, উপরন্তু নিরন্তর সংকট এবং মারাত্মক ঘাটতির মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও), ইউএনডিপি এবং ইউনিসেফের জরিপ প্রতিবেদন থেকে সম্প্রতি জানা গেছে, বর্তমান অবস্থায় পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অনাহারের মুখোমুখি হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিশ্বের ২০০ কোটি জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই। আরও উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, এই সংখ্যার মধ্যে ৮০ কোটি এবং আরও সূক্ষ্ম হিসাবে ৩০ কোটি শিশু জন্মগতভাবে অপুষ্টির শিকার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে সীমিত জমিতে কৃষি উত্পাদন বাড়াতে হবে এবং সেজন্য প্রয়োজন উন্মুক্ত সেচ, সার, এমনকি নিরাপদ জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসলের উত্পাদন বাড়ানো। সম্প্রতি উগান্ডার জাতীয় কৃষি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ওই দেশ গবেষণার মাধ্যমে পোকামাকড় এবং রোগসহিষ্ণু শস্যবীজ উদ্ভাবন করেছে। এই বীজে নাইট্রোজেনের ঘাটতি আছে এমন মাটিতেও চাষ করে ভালো ফসল পাওয়া গেছে। আমাদের দেশে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা সংস্থা লবণসহিষ্ণু এবং নিমজ্জনপ্রবণ এলাকায় চাষযোগ্য ধানের বীজ উদ্ভাবন করেছে। এগুলো এখন মাঠপর্যায়ে এনে পরীক্ষা করে চাষ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ আজ অনেকগুলো সমস্যা এবং সংকটের আবর্তে আটকে গিয়ে মুক্তির পথ খুঁজছে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সংকট উত্তরণের ব্যাপারে যতটা কথা বলছে, মাঠপর্যায়ে তার সিকি ভাগও কাজ হচ্ছে না। সিডর ও আইলার আঘাত সহ্য করে যে মানুষগুলো বেঁচে আছে, তাদের অবস্থা দেখে এ কথা নিঃসংকোচে বলা যায়।
জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ, অথচ এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কোনো দায় নেই। সাগরের উপকূলে প্রায় চার কোটি লোক বাস করছে প্রতিনিয়ত ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত সহ্য করে। একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে হিমালয় এবং মেরু অঞ্চলে বরফের চাঁই গলে যাওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সাগরের কাছাকাছি নিম্ন উচ্চতায় লোকালয়ের অবস্থান, বিশাল প্লাবনভূমি, সাইক্লোন, সিডর, আইলা এবং জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ হারিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ বাস্তুভিটা ত্যাগ করে নতুন আশ্রয় এবং জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। বেসরকারি এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের আঘাতে বরগুনা, পটুয়াখালী, কাউখালী, পিরোজপুর, সাউথখালী এবং বাগেরহাটের বলেশ্বর প্রভৃতি এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এ বছরের মে মাসে একই কারণে আইলার শিকার হয়েছে সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার সাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা, দাকোপ প্রভৃতি অঞ্চল। সুন্দরবনের অবস্থান এবং দিনের বেলায় আইলার তাণ্ডব ঘটায় প্রাণহানি কম হলেও, সাগর তীরবর্তী বেড়িবাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো লোনা পানিতে নিমজ্জিত। বেড়িবাঁধ নির্মিত না হওয়ায় আশ্রয়হীন মানুষ বাড়িঘর নির্মাণের জন্য শক্ত মাটি খুঁজে পাচ্ছে না। খাওয়ার পানির অভাব তাদের জীবনে বিভীষিকা সৃষ্টি করে চলেছে। বেড়িবাঁধের ওপরই আশ্রয়হীন মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
চরম দারিদ্র্য, ঘন জনবসতি, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, বেকারত্ব এবং কর্মসংস্থানের অভাবের সঙ্গে বারবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আঘাত দেশটির ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাগরের তীর ঘেঁষে অন্তত ১৪ ফুট উঁচু সাইক্লোন এবং জলোচ্ছ্বাসের আঘাত সহ্য করতে পারে এমন মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, এই অঞ্চলে লবণাক্ততা এবং নিমজ্জনসহিষ্ণু উঁচু ফলনশীল বীজ ধান সরবরাহ করতে হবে, যাতে দুর্যোগ ও দুর্বিপাক সহ্য করে ধানের গাছগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এবং মানুষের আশা ভঙ্গ না হয়। এককথায় বলতে গেলে হিমালয়ের বরফ গলা পানি এবং সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাত সহ্য করে এ দেশটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভাগ্য বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথার পুনরুক্তি করে বলতে হয়, বাংলাদেশের দিকে গতানুগতিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে হবে না, অন্যের দায় মুক্তির জন্য খেসারত অর্থ দিতে হবে।
আসাদউল্লাহ খান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক।
e-mail:aukhanbd@gmail.com