Thursday, April 9, 2015

আবেদন না করলেও রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করতে পারেন : খন্দকার মাহবুব

দণ্ডপ্রাপ্ত কেউ আবেদন না করলেও রাষ্ট্রপতি তার ক্ষমতাবলে দণ্ডিতের দণ্ড ক্ষমা, বিলম্বিত বা কমাতে পারেন বলে জানিয়েছেন বর্ষীয়ান আইনজীবী ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি বলেছেন, আমাদের সংবিধানেই এমন ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেয়া হয়েছে।
সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যে-কোনো দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করিবার এবং যে-কোন দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করিবার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকিবে।’
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ খন্দকার মাহবুব হোসেন আজ বৃহস্পতিবার নয়া দিগন্তকে বলেন, জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ক্ষমা চাওয়া নিয়ে বিভিন্ন ধরণের প্রশ্ন উত্থাপন করা হচ্ছে। আমাদের সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে এই ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তিনি যেকোনো দণ্ড ক্ষমা, বিলম্বিত ও কমাতে পারেন। এক্ষেত্রে আসামিকে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে হবে বা তাকে আবেদন করতেই হবে, তার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ক্ষমা না চাইলেও রাষ্ট্রপতি তাকে ক্ষমা করতে পারেন।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা কামারুজ্জামান আজই (বৃহস্পতিবার) প্রাণভিক্ষা না চাইলে দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করা হবে। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, কামারুজ্জামানের সাথে কিছু সময়ের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দেখা করবেন। তিনি প্রাণভিক্ষার জন্য আবেদন করলে তা প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হবে। আর তা করতে হবে আজকের মধ্যেই। অন্যথায় রায় দ্রুত কার্যকর করবে সরকার।
এর আগে আজ বেলা পৌনে ১২টার দিকে কারাগারে সাক্ষাৎ শেষে কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা সাংবাদিকদের বলেন, প্রাণভিক্ষার বিষয়ে তিনি ভাবনা-চিন্তা করবেন এবং পরে তার সিদ্ধান্ত কারা কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।

জরুরি ভিত্তিতে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড স্থগিতে ইইউ ও জাতিসংঘের আহ্বান

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার জরুরি ভিত্তিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিতের আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল জেনেভায় আয়োজিত এক প্রেস-ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই-কমিশনারের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি এ আহ্বান জানান। ওই ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র বলেন, আমরা বাংলাদেশ সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- স্থগিতের আহ্বান জানাচ্ছি। এতে বলা হয়, রিপোর্ট অনুযায়ী, সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কামারুজ্জামানের রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদনটি খারিজ করে দেয়ায় তার ফাঁসি আসন্ন। হাইকমিশনারের মুখপাত্র বলেন, বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদ- অনুসরণ না করা এবং অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যমান মৃত্যুদন্ডের যে বিধান রয়েছে, সেটারও বিরোধিতা করেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনার। ওই ব্রিফিংয়ে বলা হয়, আন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) যুদ্ধাপরাধ মামলাসমূহ পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগের পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারের মৃত্যুদন্ডের রায়সমূহ কার্যকর করা উচিত নয় বলে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় দীর্ঘদিন থেকেই সতর্ক করছে। তিনি বলেন, ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত আইসিটি বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি’র সদস্যদের বিরুদ্ধে ১৬টি রায় প্রদান করেছে, যার মধ্যে ১৪টিই মৃত্যুদন্ডের রায়।
ফাঁসি মুলতবি করার আহ্বান ইউরোপীয় ইউনিয়নের
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের শাস্তি  বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত করার প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব মামলা ও যেকোন অবস্থায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিরোধিতা করেছে। তারা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আবারও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি অত্যাসন্ন হওয়ার প্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুখপাত্র ওই বিবৃতি দিয়েছেন। এতে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে মৃত্যুদন্ড বাতিল করার আহ্বান জানিয়ে আসছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এতে বলা হয়, সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড কোন অপরাধের প্রতিকার নয় এবং এতে সুষ্ঠু বিচার করতে আদালতের যে ব্যর্থতা তা অপরিবর্তনীয় থেকে যায়। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব রকমের মৃত্যুদ- শিথিল করতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি বাতিলের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারকে মৃত্যুদন্ড মুলতবি করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

'যৌক্তিক সময়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন কামারুজ্জামান'

কামারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাত করেছেন তার পাঁচ আইনজীবী। সাক্ষাত শেষে আইনজীবী প্রতিনিধি দলের নেতা অ্যাডভোকেট শিশির মনির জানান, কামারুজ্জামান রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তিনি জানাবেন।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে কামারুজ্জামানের আইনজীবী এ্যাডভোকেট শিশির মো. মনিরের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আইনজীবী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পৌঁছান। ৪০ মিনিট সেখানে অবস্থান শেষে তারা কারাগার থেকে বের হন।
এসময় কারা ফটকে সাংবাদিকদের শিশির মনির জানান, কামারুজ্জামান সুস্থ আছেন, তার মনোবল অটুট রয়েছে। তিনি বিচলিত নন। কামারুজ্কামান দেশবাসীকে সালাম জানিয়েছেন এবং দোয়া চেযেছেন। তিনি আমাদের কাছে আইনের বিধিবিধানগুলো জানতে চেয়েছেন। আমরা আমাদের সাধ্যমত তাকে বিধি বিধানগুলো জানিয়েছি।
তিনি বলেন, কামারুজ্জামান রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা তা যৌক্তিক সময়ের মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ধীর স্থীর হয়ে জানাবেন।
শিশির মনির আরো জানান, আগামী ৭দিনের মধ্যে কামারুজ্জামান তার শেষ মতামত না জানানো পর্যন্ত রায় কার্যকরের কোন সুযোগ নেই। তিনি জানান, কামারুজ্জমান বলেছেন, তিনি আবারো আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাত শেষে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন।
এর আগে বুধবার কামারুজ্জামানকে রিভিউ আবেদনের রায় পড়ে শোনানোর পর তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কিনা কারাকর্তৃপক্ষের এমন প্রশ্নের জবাবে আইনজীবীদের সাথে কথ বলে তিনি তার সিদ্ধান্তের কথা জানাবেন বলে জানায়। এর আগে চার বিচারপতির স্বাক্ষরের পর রায়ের কপি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন না জানালে কারা কর্তৃপক্ষ তার ফাঁসি কার্যকর করার উদ্যোগ নেবে। আর প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করতে চাইলে তাকে সময় দেয়া হবে।
আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় হবে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। এদিকে আদালতের রায় কার্যকরের জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, রায় কার্যকরের জন্য সোমবার থেকেই ফাঁসির মঞ্চ পুরোপুরি প্রস্তুত। কারা প্রশাসন ইতিমধ্যে এক দফা মহড়া শেষ করেছে। ৮২ কেজি ওজনের ব্যক্তিকে ঝোলানো সম্ভব কিনা- তা প্রমাণের জন্য দুটি বালুর বস্তা দিয়ে সোমবার এক দফা পরীক্ষা করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মোট ১৬টি ফাঁসির রশি আছে, এর একটি নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। যে ছয়জন জল্লাদ এখন কারাগারে আছেন, তাদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। তাদের যে কোনো তিনজনকে নেয়া হবে। ফাঁসি কার্যকরের মাত্র এক ঘণ্টা আগে জল্লাদদের এসব তথ্য জানানো হবে।
প্রস্তুতির ব্যাপারে জানতে চাইলে জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী সাংবাদিকদের জানান, আদেশ পাওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব।

চরম দুর্ভোগে সহস্রাধিক পরিবার

ঝড়ে টিনের বেড়া ও চালা—সবই উড়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু
ঘরের খুঁটি। বাঁশ-টিনের ছাপরায় দিন কাটছে এই বৃদ্ধার। গত
মঙ্গলবার দুপুরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার
কুশলীবাসা গ্রাম থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
কুষ্টিয়া সদর, মিরপুর, দৌলতপুর ও কুমারখালী উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে গত রবি ও মঙ্গলবার রাতের ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে সহস্রাধিক বাড়িঘরের টিনের চাল দুমড়ে-মুচড়ে যায়। শিলের আঘাতে সদর উপজেলার সবচেয়ে বেশি বাড়ির টিনের চালা ফুটো হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। এ ছাড়া বোরো ধানসহ সহস্রাধিক হেক্টর জমির পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়। শত শত গাছ উপড়ে ও ভেঙে পড়ে।
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুজিব উল ফেরদৌস গতকাল বুধবার বিকেলে প্রথম আলোকে জানান, ঘটনার পর থেকে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করেছেন। জেলায় ৩৮ হাজার পরিবার বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই দিনে জেলা প্রশাসনের ভান্ডার থেকে ৯৫ টন চাল ও ছয় লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। জরুরিভাবে ৪০০ টন চাল, ৪০ লাখ টাকা ও দুই হাজার বান্ডিল টিন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ মুহূর্তে কয়েক হাজার বান্ডিল টিন খুবই প্রয়োজন বলে এই কর্মকর্তা জানান।
সদর উপজেলার বিত্তিপাড়া, উজানগ্রাম, মৃত্তিকাপাড়া, আলামপুর, আইলচারা গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এখনো অনেকের বাড়ির টিন ফুটো অবস্থায় রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অনেকে জানান, শিলাবৃষ্টিতে থাকার ঘরের টিন ফুটো হয়ে যাওয়ায় তাঁরা অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন। হাতে টাকাপয়সা নেই যে আবার নতুন টিন কিনে ঘরবাড়ি মেরামত করবেন।
ঝড়ের পর থেকে জেলার দৌলতপুর ও ভেড়ামারা উপজেলার ৫০ শতাংশ গ্রাহক দুই দিন বিদ্যুৎ-বিচ্ছিন্ন ছিলেন। গতকাল বিকেল পর্যন্ত এ দুই উপজেলায় ৭৫ শতাংশ গ্রাহক বিদ্যুৎ পেয়েছেন।
কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মুখলেচ গণি বলেন, ঝড়ে জেলায় শতাধিক বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়েছে। অনেক জায়গায় তার ছিঁড়ে গেছে। সেগুলো মেরামত করতে একটু সময় লাগছে।
কুষ্টিয়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কিংকর চন্দ্র দাস বলেন, রবি ও মঙ্গলবারের কালবৈশাখী ও অস্বাভাবিক শিলাবৃষ্টিতে জেলায় ১ হাজার ৮৫ হেক্টর জমির বোরো ধান, ১০৪ হেক্টরের মরিচ, ৪০৫ হেক্টরের পাট, ১৮৫ হেক্টরের তিল, ৬০ হেক্টরের পান, ২০৩ হেক্টরের বেগুন, ২ হাজার ২২৭ হেক্টরের ভুট্টা, ৪৭৭ হেক্টরের কলা ও ৬৪ হেক্টর জমির অন্য সবজিসহ প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
উজানগ্রামের কৃষক জাফর হোসাইন বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সবজি ও শসা আবাদ করেছিলেন। সব নষ্ট হয়ে গেছে। সরকার থেকে সহযোগিতা না করলে পথে বসতে হবে। কৃষক মহাম্মদ আলী ও ওহিদুল ইসলাম বলেন, মাঠের পর মাঠ বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে।
সোনাইডাঙ্গা গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, তাঁর ১৪ বিঘা কলার খেত শিল পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
কুষ্টিয়া-৪ (খোকসা-কুমারখালী) আসনের সাংসদ আবদুর রউফ বলেন, ঘটনার পরপরই তিনি নিজে সব এলাকা ঘুরে দেখেছেন। খুব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ঘরে টিন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঠিক তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফের সুপারিশ করা হবে। পাশাপাশি তাঁদের যথাসাধ্য সরকারি সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এডেনে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে

ইয়েমেনের বন্দরনগরী এডেনে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে বলে হুশিয়ারি দিয়েছে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা রেডক্রস। বন্দরনগরীর পথে পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে অসংখ্য মরদেহ। হাসপাতালগুলোতে উপচেপড়া ভিড়! এমতাবস্থায় দেশটিতে মানবিক বিপর্যয় চরম আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শতাধিক শিশুসহ গত কয়েকদিনে অন্তত ৫৬০ জন নিহত হয়েছে, ১৭ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে এবং আশ্রয়হীন হয়েছে আরও এক লাখ মানুষ।
জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এই পরিস্থিতিতে দেশটির বিপর্যস্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছানোও সম্ভব হচ্ছে না। রেডক্রসের দুটি বিমানের প্রয়োজনীয় সাহায্য নিয়ে সোমবার ইয়েমেনে পৌঁছানোর কথা থাকলেও দেশটির বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হচ্ছে না। ১৭ টন ওষুধ-পথ্য নিয়ে একটি কার্গো বিমান জর্ডানের রাজধানী আম্মানে জরুরি অবতরণের পর সেখানেই অবস্থান করছে। বুধবার বিমানটি ইয়েমেনে পৌঁছাতে পারে। আরও ৩৫ টন সহায়তা নিয়ে উড়ার অপেক্ষায় রয়েছে আরও একটি বিমান। এদিকে, ইয়েমেন সংকটের ফায়দা লুটছে আল কায়দা। বিশৃংখল সরকার ব্যবস্থায় সৃষ্ট চলমান অস্থিরতা, গোলযোগের মধ্যে দেশটির বিভিন্ন এলাকা দখল করে নিচ্ছে আল কায়দা। বুধবার টোকিওতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাস্টন কার্টার। আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে আলোচনার জন্য এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে বর্তমানে জাপানে অবস্থান করছেন কার্টার। তবে তিনি অঙ্গীকার করেছেন, ইয়েমেনে চলমান যুদ্ধ সত্ত্বেও চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখবে ওয়াশিংটন। কার্টার বলেন, ‘আমরা দেখেছি, ইয়েমেনে কিছু ক্ষেত্রে আল কায়দা সাফল্য পেয়েছে। তারা বিভিন্ন এলাকা দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে।’ জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেন নাকাতানির সঙ্গে ওই যৌথ সংবাদ সম্মেলনে কার্টার আরও বলেন, ইয়েমেনভিত্তিক আল কায়দা ইন দ্য এরাবিয়ান পেনিনসুলা যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের জন্য হুমকি। তাই যুক্তরাষ্ট্র আল কায়দার বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রাখবে।
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই একটি বৈধ সরকার সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করলে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান অনেক সহজ হয়।’ তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনে এখন সে ধরনের পরিস্থিতি নেই। তার অর্থ এই নয় যে, আমাদের সুরক্ষার জন্য পদক্ষেপ অব্যাহত রাখব না। আমরা ভিন্নভাবে তা অব্যাহত রাখব।’ কার্টার আশা প্রকাশ করেন, তবে শুধু এই কারণে নয়, ইয়েমেনের মানুষের দুর্দশা লাঘবে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। গত কয়েক মাস ধরে ইয়েমেনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলছে। জাতিসংঘের মতে, ইয়েমেনের বৈধ সরকারের প্রধান হলেন হাদি। আর তার ‘নির্বাচিত বৈধ সরকারকে রক্ষায়’ হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ২৬ মার্চ বিমান হামলা শুরু করেছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব দেশগুলোর জোটবাহিনী। ওদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোটকে ইয়েমেনে বিমান হামলায় সহায়তা করতে দ্রুত অস্ত্র দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মঙ্গলবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ সফরের সময় এ ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন। ব্লিনকেন জানিয়েছে, তারা সৌদি আরবকে সমর্থন করতেই দ্রুত অস্ত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি আরব জোটের বিমান হামলাকে সমর্থন করে আরও বলেছেন, তাদের এ পদক্ষেপ হুথি এবং তাদের মিত্রদের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা। সে বার্তাটি হচ্ছে, জোর করে ইয়েমেন দখল করা যাবে না। এদিকে, ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইতি টানতে একটি কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন বলে মত ইরান ও তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধানদের। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট ইরান ও তুরস্কের মধ্যে টানাপোড়েন সৃষ্টি করছে। মঙ্গলবার ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি আংকারায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর এসব কথা জানান।

গণমাধ্যমকে প্রেসটিটিউট বললেন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী

ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সাবেক সেনাপ্রধান ভিকে সিং মঙ্গলবার গণমাধ্যমকে ‘প্রেসটিটিউট’ বলে আখ্যায়িত করায় দেশজুড়ে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। দেশের বিরোধী দল তার মন্তব্যকে ‘কাণ্ডজ্ঞানহীন ও দুঃখজনক’ বলেছে। সুশীল সমাজ ও মিডিয়াও মন্ত্রীর ‘মুণ্ডুপাত’ করেছে। ইয়েমেনে থাকা ভারতীয়দের উদ্ধারের বিষয়ে মঙ্গলবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ের আগে টুইটার বার্তায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভিকে সিং লেখেন, ‘বন্ধুরা প্রেসটিটিউটসের থেকে আপনারা কী প্রত্যাশা করছেন।’
তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস তার ওই বক্তব্যকে ‘দুঃখজনক ও সংবেদনশীল’ বলে সমালোচনা করেছে। মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের মাধ্যমে সরকারের পুরো চিত্র মানুষের কাছে দৃশ্যমান হয়েছে বলেও দাবি তাদের। মিডিয়াতেও তার ওই মন্তব্য ঘিরে সমালোচনার ঝড় বইছে। সুশীল সমাজ ওই মন্তব্যের জন্য মন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে বলেছে। এর আগে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দিল্লিতে পাকিস্তানের হাইকমিশনে অংশ নেন ভিকে সিং। এরপর টুইটারে ওই অংশগ্রহণকে ‘বিরক্তকর ও কর্তব্যের অংশ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এ নিয়ে তখনও ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া, হিন্দুস্থান টাইমস, জি নিউজ।

বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাঙ্গাকারা

যোগ্য হাতেই উঠল সেরার স্বীকৃতি। ক্রিকেটের সবচেয়ে প্রাচীন ও বিখ্যাত প্রকাশনা উইজডেন ক্রিকেটার্স আলমানাকের ২০১৫ সালের সংস্করণে গত বছরের বিশ্বসেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত হয়েছেন লংকান গ্রেট কুমার সাঙ্গাকারা। ১৫২তম সংস্করণে প্রথমবারের মতো বর্ষসেরা মহিলা ক্রিকেটার নির্বাচিত করেছে উইজডেন। পুরস্কারটি জিতেছেন অস্ট্রেলিয়ার মেগ ল্যানিং। ১৮৬৪ সাল থেকে প্রতিবছর একটি করে সংস্করণ প্রকাশ করে আসছে ক্রিকেটের বাইবেল খ্যাত ইংলিশ ম্যাগাজিনটি। বীরেন্দর সেহওয়াগ ও সাঙ্গাকারাই শুধু একাধিকবার উইজডেনের বর্ষসেরার স্বীকৃতি পেয়েছেন। ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়েও সাঙ্গাকারার ব্যাটে যে মধ্যাহ্নের তেজ, তাতে ২০১৪ সালের সেরা ক্রিকেটার বেছে নিতে কোনো সমস্যা হয়নি উইজডেনের বিচারকদের। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে এক পঞ্জিকাবর্ষে সাঙ্গাকারার ব্যাট থেকে এসেছে রেকর্ড ২৮৬৮ রান। গত বছর ঢাকায় টি ২০ বিশ্বকাপ জিতে ক্রিকেটের ক্ষুদে সংস্করণকে বিদায় জানিয়েছেন ৩৭ বছর বয়সী এই বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান। ফাইনালে পেয়েছেন ম্যাচসেরার স্বীকৃতি। লর্ডসে প্রথমবারের মতো টেস্ট সেঞ্চুরি পেয়েছেন গত মৌসুমে। ইংল্যান্ডের মাটিতে শ্রীলংকার টেস্ট সিরিজ জয়ে বড় অবদান ছিল সাঙ্গাকারার।
২০১৫ বিশ্বকাপে তার টানা চার সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড প্রমাণ করে সাঙ্গাকারাকে বেছে নিয়ে ভুল করেনি উইজডেন। বিশ্বকাপ দিয়ে ওয়ানডে ছেড়েছেন। টেস্ট ক্যারিয়ারেরও ইতি টানবেন এ বছর। সাঙ্গাকারাকে কুর্নিশ জানিয়ে উইজডেন সম্পাদক লরেন্স বুথ লিখেছেন, ‘তাকে বেছে নেয়া খুব সহজ ছিল। বিশ্বকাপে তার টানা চার সেঞ্চুরি নিশ্চিত করেছে, সঠিক ব্যক্তিকেই আমরা বেছে নিয়েছি। চূড়ান্ত অবসরের পর আমরা সবাই তাকে মিস করব।’ সাঙ্গাকারার প্রশংসা করলেও ইংলিশ ক্রিকেটের দুর্গতির জন্য ইংল্যান্ড ও ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডকে ধুয়ে দিয়েছেন বুথ। কেভিন পিটারসেনকে যেভাবে দল থেকে বাদ দেয়া হয়েছে, সেটা মেনে নিতে পারেননি উইজডেন সম্পাদক। ঐতিহ্য অনুযায়ী ইংলিশ মৌসুমের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বছরের সেরা পাঁচজন ক্রিকেটার বেছে নেয়া হয়েছে। এই তালিকায় শ্রীলংকা অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস এবং ইংল্যান্ডের মঈন আলী ও গ্যারি ব্যালান্সের সঙ্গে আছেন দুই কাউন্টি তারকা অ্যাডাথ লিথ ও জিতান প্যাটেল। এএফপি/ওয়েবসাইট।

‘প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ঢাকা’ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর নিয়তি বরণ করতে জাহাঙ্গীরনগর ওরফে ঢাকার খুব বেশি সময় লাগবে না। মহেঞ্জোদারোর শেষ মেয়র, অর্থাৎ ধ্বংস হওয়ার অব্যবহিত আগে যিনি ওই নগরের প্রশাসক ছিলেন, যদি বিধাতার অনুমতি নিয়ে ওপার থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে নামেন এবং সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে গুলিস্তান নগর ভবনে যান, তাহলে তাঁর সময়ের মহেঞ্জোদারোর সঙ্গে ঢাকার একটা তুলনামূলক সমীক্ষা করতে পারবেন। তাঁর যদি প্রেস ব্রিফিং করার সুযোগ থাকে, তাহলে তিনি বলবেন:
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আপনারা আমার শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আপনাদের এই সাত-আট শ বছরের প্রাচীন নগর সম্পর্কে এই মুহূর্তে আমি বিশেষ কিছু বলতে পারব না। প্রথমত, আমি ক্লান্ত। বিমানভ্রমণে কোনো অসুবিধা হয়নি। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে বিপদে পড়ি। কনভেয়ার বেল্টের কাছে ট্রলি নিয়ে ঘণ্টা খানেক দাঁড়িয়ে থেকে আমার কোমর ধরে যায়। কিন্তু আমার লাগেজ আসে না। দু-চারজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করি। তাঁরা কোনো জবাব না দিয়ে একধরনের বিদঘুটে ভিরকুটি করেন। তার অর্থ অনেকটা এ রকম: মালমাত্তা ব্যাটা তোর, আমার কী করার আছে! যা হোক, শেষ পর্যন্ত কেউ একজন একটা সুটকেস এনে দিল। কিন্তু বড় যে বাক্সটায় দামি জিনিসপত্র ছিল, সেটা পাইনি। তারপর ট্যাক্সি ভাড়া করতে গিয়ে যা ঘটেছে তা না বলাই ভালো। বিমানবন্দর থেকে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ দিয়ে নূর হোসেন চত্বরে পৌঁছাতে আড়াই ঘণ্টার মতো লাগে। এই দীর্ঘ সময়ে আমি ঢাকা নগরের অনেক কিছুই দেখতে পারতাম, কিন্তু দেখার মধ্যে মাটিতে দেখেছি মানুষ পিল পিল করছে, আর পথের দুপাশে ডানে-বাঁয়ে যেদিকে দু চোখ যায় দেখেছি পোস্টার আর প্রকাণ্ড ডিজিটাল বিলবোর্ড। সেই বিলবোর্ডে কোনো ফুল-লতা-পাতার ছবি নয়, মানুষের ছবি। রাস্তায় মানুষ, বিলবোর্ডেও মানুষ। বলুন তো দেখি ব্যাপার কী?
এক সাংবাদিক বললেন: সিটি নির্বাচন হচ্ছে। প্রার্থীদের পোস্টার-বিলবোর্ড।
মহেঞ্জোদারোর মেয়র বললেন: তা বেশ। এত বিলবোর্ডের লেখা ও ছবি কে দেখবে? তবে দেখুন, আমাদের সময় এত সব নির্বাচন-টির্বাচন ছিল না। নাগরিকেরাই বসে যোগ্য একজনকে মনোনীত করতেন। যিনি মেয়র হতেন তাঁর কাছে তাঁর ঘর-সংসার, ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, নগরই ছিল সব। মানুষের নাগরিক সুবিধা-অসুবিধা, সুখ-দুঃখকে মেয়র নিজের বলে অনুভব করতেন। সে রকম মেয়র নাকি আপনাদের এই ঢাকায়ও অনেকে ছিলেন শুনেছি। অবশ্য সেটা অনেক আগের কথা। তখন আপনারা ইংরেজ সাহেবদের অধীন ছিলেন।
মহেঞ্জোদারোর নগরপিতা বলতে থাকেন: একটা কথা শুধু আমি আপনাদের বলতে চাই। অনেক উঁচু উঁচু দালানকোঠা বানিয়েছেন বটে, আমি একটা জিনিস দেখেছি, আমার নগর ধ্বংস হওয়ার আগে যেসব লক্ষণ লক্ষ করেছি, তার পনেরো আনা ঢাকায়ও দেখতে পাচ্ছি। আমার নিজের মেয়র-জীবনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এই পুরোনো নগরটিকে আপনারা গত ৪০ বছরে তিলে তিলে হত্যা করেছেন। কোনো স্বাধীন দেশের রাজধানী-নগর কী, সে সম্পর্কে আপনাদের কোনো ধারণা নেই। অথচ আপনাদের এই নগরের মেয়র ও প্রশাসকেরা দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই ইবনে বতুতা, মার্কো পলো ও হিউয়েন সাংয়ের চেয়ে বেশি সারা দুনিয়া ঘুরেছেন। ওসব রাজধানীতে গিয়ে দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে দেখেছেন, বড় বড় হোটেলে সস্ত্রীক থেকেছেন, রেস্তোরাঁয় গিয়ে সবচেয়ে দামি খাবারের অর্ডার দিয়েছেন, বিশেষ করে সুপার মার্কেটগুলোতে কেনাকাটাতেই বেশি সময় দিয়েছেন। ওসব দেশ থেকে কিছু শিখে আসেননি। ৪০ বছরের সব মেয়রেরই সয়সম্পত্তির দিক থেকে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে, আর অধঃপতনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে ঢাকা নগর। দেখুন, সততা ও দক্ষতার কোনো বিকল্প নেই। আপনাদের দেশে চাপাবাজি ও চালবাজি জিনিসটি খুব বেশি। আমাদের সময় আমরা কোনো গালভরা প্রতিশ্রুতিই দিতাম না। কাজ যা করার তা নীরবে করে যেতাম। করার মতো কাজেরও শেষ নেই। অনেক কাজ করতে কোনো বড় বরাদ্দের প্রয়োজন নেই। একটি নগরে রাস্তার দুপাশে কীভাবে কী ধরনের গাছ লাগাতে হয়, সেটা পর্যন্ত আপনারা জানেন না। একটি জনবহুল নগরে পার্কের কী প্রয়োজন, সেটাও জানেন না। আসার সময় গাড়ি থেকে কী একটা পার্ক বা উদ্যানের মতো দেখলাম, তার না আছে কোনো শ্রী, না আছে কোনো উপযোগিতা।
মহেঞ্জোদারোর নগরপিতা বলেন: আমি যে গাড়িতে আসি, তার চালক ছিলেন বয়স্ক মানুষ। তাঁর শ্বশুরের বাড়ি ছিল পুরান ঢাকায়। তাঁদের নাকি লোকে ঢাকাইয়া বলে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে তাঁর শ্বশুর এক নগরপিতার ড্রাইভার ছিলেন। এই নগরের অনেক কথা তিনি জানতেন। ট্রাফিক সিগন্যালে যখন গাড়ি পনেরো-কুড়ি মিনিট দাঁড়িয়ে থাকত, ড্রাইভার নানা বিষয়ে একা একাই বকবক করতেন। তিনি এই নগরের গত পনেরো বছরের হিস্ট্রি বললেন। তিনি বললেন, সর্বশেষ নির্বাচিত মেয়র নাকি ছিলেন বহু বছর। বহু বছর থাকার কারণ, সরকারি দলের প্রার্থী নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার আশঙ্কায় সরকার নির্বাচনই দেয়নি। তারপর এক সন্ধ্যায় তাঁকে কৌশলে ধঁা করে সরিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ছুরি দিয়ে করা হয় মহানগরকে জবাই বা দ্বিখণ্ডিত। সংবিধানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে: ‘প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ঢাকা’। কোন ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী? ‘ঢাকা উত্তর’ না ‘ঢাকা দক্ষিণ’?
রসিক ধরনের এক রিপোর্টার ছিলেন, তিনি বললেন, ঢাকা ভাগ করার সময় ‘ঢাকা’ বানানটাকেও ভাগ করলে ভালো ছিল।
মহেঞ্জোদারোর মেয়র বললেন, কী রকম?
রিপোর্টার: ঢাকার এক অংশের নাম ‘ঢা’ এবং অপর অংশের নাম ‘কা’। উত্তরের অংশ যদি ঢা হয় তো দক্ষিণের অংশ কা।
আইন-আদালত কভার করেন এমন একজন সাংবাদিক এক কোনায় বসা ছিলেন। তিনি বললেন: আশির দশকে এক সামরিক শাসক ঢাকার ইংরেজদের দেওয়া বানান Dacca পরিবর্তন করে করেন Dhaka. কাজটি তিনি ভালো করেছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু সংবিধান সংশোধন না করে রাজধানীর বানান পরিবর্তন করা সংবিধান লঙ্ঘন।
তাঁকে বাধা দিলেন আর একজন সাংবাদিক। তিনি বললেন: সংবিধান লঙ্ঘন করে যিনি ক্ষমতা দখল করেন, তাঁর কাছে সংবিধানের মূল্য কী? যে দেশে নির্বাচিত ব্যক্তিরাই সংবিধানের তোয়াক্কা করেন না।
কোর্ট রিপোর্টার বলেন, রাজধানী ঢাকাকে দুই নামে নামকরণ করা সংবিধান অবমাননা। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য নগরকে তো ওয়ার্ডে ভাগ করাই আছে। তাতে আছেন কাউন্সিলর। সিটিকে দুভাগ করে দুটি নামে চিহ্নিত করার যৌক্তিকতা কোথায়? লন্ডনকে প্রধানমন্ত্রী থ্যাচার একবার করেছিলেন। ছয় মাসের মধ্যে তিনি তাঁর ভুল শুধরে নেন। ঢাকাকে যখন যূপকাষ্ঠে শুইয়ে বলি দেওয়া হয়, তখন সরকারের ঘনিষ্ঠ কলাম লেখকেরাও তার বিরোধিতা করেছিলেন। করজোড়ে অনুরোধ করছিলেন ও কাজ থেকে বিরত থাকতে। কর্ণপাত করা হয়নি কারও কথায়।
মহেঞ্জোদারোর সাবেক মেয়র বলেন: পৃথিবীর বড় বড় দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা সফরে এলে তাঁদের নাগরিক সংবর্ধনা দেন রাজধানীর মেয়র। তাঁকে দেওয়া হয় কাসকেটে মহানগরের চাবি উপহার। এরপর যদি কোনো রাষ্ট্রপ্রধান ঢাকায় আসেন, নাগরিক সংবর্ধনা কোন মেয়র দেবেন, আর চাবিই বা কে দেবেন।
এক ছোকরা মতো সাংবাদিক উঠে দাঁড়িয়ে বলেন: বিদেশি অতিথিকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে দুই সিটি করপোরেশনের মাঝখানে নো ম্যানস ল্যান্ডে। দুই সিটির দুই দিক থেকে হাত বাড়িয়ে দুই মেয়র মহামান্য অতিথির দুই হাতে দুটি চাবি দেবেন।
আরেক সাংবাদিক বলেন: কে চাবি আগে দেবেন তা নিয়ে মারামারি হতে পারে তাঁদের সমর্থক বা ক্যাডারদের মধ্যে। কেউ খাবে থুতনিতে ঘুষি, কেউবা খোয়াবে এক পাটি দাঁত, কারও ভাঙবে পাঁজরের হাড়।
সাংবাদিকদের কথাবার্তা মহেঞ্জোদারোর মেয়র গালে হাত দিয়ে বসে শুনছিলেন। এর মধ্যে এক দৈনিকের একজন নারী রিপোর্টার বললেন: চাবি যদি লোহার তৈরি হয় কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু বিদেশি অতিথিদের নগরের সোনার চাবিই উপহার দেওয়া রীতি। সোনার হলে সর্বনাশ! কোনো মেয়রের চাবিতে খাদ থাকবে এগারো শতাংশ, কোনো মেয়রের চাবিতে সোনার খাদ থাকবে তেরো শতাংশ। সরকারি দলের মেয়রের চাবির খাদ যদি ১১ শতাংশ হয় কোনো কথা নেই, কিন্তু আরেক মেয়র যদি খোদানাখাস্তা বিরোধী দলের হন এবং তাঁরটির খাদ যদি হয় ১৩ শতাংশ, তাহলে একটি বছর তা নিয়ে বিতর্ক হবে এবং বিরোধী দলের মেয়র মামলায় জড়াবেন। তারপর জেলেও যেতে পারেন। সবশেষে বরখাস্তের আদেশ যাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে।
কোনো টিভি চ্যানেলের একটি সুদর্শন ছেলে, যাঁর মধ্যে নীতি-আদর্শ এখনো আছে, দাঁড়িয়ে নারী সাংবাদিককে থামিয়ে দেন: আপা, সোনার খাদ নিয়া আপনে আর কথা কইয়েন না। যে দেশের মানুষের মধ্যেই পনেরো আনা খাদ, সেখানে মেডেল আর চাবির খাদ মাপতে গেছেন!
সংবাদ সম্মেলনে কথাবার্তায় মহেঞ্জোদারোর মেয়র বিপন্ন বোধ করছিলেন। যেকোনো মহানগরের মেয়রের মর্যাদাই অসামান্য, তবে রাজধানী নগরের মেয়রের মর্যাদা বিরাট। কিন্তু যেসব দেশে একটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আছে, সেখানে কোনো মেয়র একজন কর্মকর্তা মাত্র। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী সচিবের সঙ্গেও মেয়রকে দাঁত বের করে হাত কচলে কথা বলতে হয়। তাঁরা নাখোশ হলে সব পণ্ড। সেই বাস্তবতায় মহানগরের মেয়র যদি দেশের সবচেয়ে যোগ্য ও সৎ মানুষটিও নির্বাচিত হন, তাঁর পক্ষে হতভাগ্য নগরবাসীর উপকার করা সম্ভব নয়।
কোনো দেশের রাজধানী নগর আর উপজেলা শহর এক জিনিস নয়। ঢাকা নগর আর দুপচাঁচিয়া পৌরসভা সমান নয়। স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকশ্রেণির কর্তারা নীহাররঞ্জন গুপ্তের দশ খণ্ড কিরীটী অমনিবাস পড়লেও পড়তে পারেন, কিন্তু ’৭২-এর সংবিধানের মতো চটি বইটি আগাগোড়া পাঠ করেছেন—এ কথা আমরা হলফ করে বলতে পারি না। রাষ্ট্র চালানোর জন্য ওটি একটি
ভালো নির্দেশিকা। সংবিধানের ৫(২) অনুচ্ছেদে ছয়টি শব্দ আছে: ‘রাজধানীর সীমানা আইনের দ্বারা নির্ধারিত হইবে।’
রাজধানী ঢাকার একটি স্থায়ী সীমানা নির্ধারিত হওয়া সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
এই বাস্তবতায় নির্বাচনই হোক আর যা-ই হোক, মহানগরের মানুষ যে অন্ধকারে ও চরম দুর্দশায় রয়েছে, সেখানেই থাকবে। ঢাকার ভবিষ্যৎ দিব্য চোখে দেখতে পেয়ে মহেঞ্জোদারোর মেয়র সংবাদ সম্মেলন থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে যান।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

তাঁদের সবার চেয়ে আমি ধনী

নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত মেয়র পদপ্রার্থী মাহী বি চৌধুরী
‘অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী দেখলাম। বড় ব্যবসায়ীর সন্তানদেরও দেখলাম। হলফনামায় সম্পদের হিসাব দেখে মনে হচ্ছে, তাঁদের সবার চেয়ে আমি ধনী। কারণ আমার জমি আছে, গাড়ি আছে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী মাহী বি চৌধুরী গতকাল বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে নিজের সম্পদের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। ঢাকা উত্তর সিটিতে ব্যবসায়ী নেতা আনিসুল হক এবং আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়ালও মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে আছেন।
মাহী বি চৌধুরী বলেন, ‘আনিসুল হক রুচিশীল ও সংস্কৃতিমনা মানুষ। তাবিথ আমাদেরই ছোট ভাই, বিত্তের মধ্যে বড় হওয়া একজন ভদ্র, শিক্ষিত ও মার্জিত ছেলে। আশা করি ঢাকা উত্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে।’ তিনি নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন না করার প্রতিশ্রুতি দেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি বিএনপির কেউ নই। ২০-দলীয় জোটেরও অংশ নই। বাস্তবতা হলো, আমার বাবা ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব। আমি নিজেও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী চেতনার মানুষ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করি। তবে শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনীতি আমার আদর্শ।’
এক প্রশ্নের জবাবে মাহী বলেন, ‘কোনো মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করিনি। আনুষ্ঠানিক আলোচনাও হয়নি। আমি এতটা রূঢ় হতে পারিনি। কারণ আবদুল আউয়াল মিন্টু বিএনপির প্রার্থী। এখনো তাঁর আপিল শেষ হয়নি।’
মাহী নিজেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংগঠন ব্লু ব্যান্ড কল তথা প্রজন্মের প্রার্থী বলে উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি প্রজন্মের কিছু ভাবনা এবং ঢাকার তিনটি মৌলিক সমস্যা তুলে ধরেন। এর মধ্যে আছে নিরাপত্তাহীন ঢাকা, স্থবির ঢাকা ও অন্ধকার ঢাকা। এর সমাধানে তিনি নিরাপদ ঢাকা, চলমান ঢাকা ও আলোকিত ঢাকা গড়ার অঙ্গীকার করেন।

রাজনীতির লঙ্কায় কেজরিওয়ালও রাবণ by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ওঁরা এখন সেই বহুকথিত বাক্যটি আওড়াতেই পারেন, লঙ্কায় যে যায়, সে-ই হয় রাবণ।
ওঁরা চারজনই আম আদমি পার্টি (এএপি) থেকে প্রায় বিতাড়িত। যোগেন্দ্র যাদব, প্রশান্ত ভূষণ, আনন্দ কুমার ও অজিত ঝা। ওঁরা সঙ্গে পেয়েছেন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল রামদসকে, যিনি ছিলেন এই সদ্যোজাত দলের অভ্যন্তরীণ লোকপাল। দলের আহ্বায়ক এবং একচ্ছত্র অধিপতি দিল্লীশ্বর অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই মুহূর্তে তাঁদের চোখের বালি। সাক্ষাৎ রাবণ। সেই রাবণই এখন তাঁর চলার পথের সব কাঁটা উপড়ে ফেলতে উৎসুক। কেননা, তিনি জানেন, পাঁচটা বছর তাঁর সামনে কোনো বাধা, কোনো বিপত্তি কেউই সৃষ্টি করতে পারবে না। কেজরিওয়াল তাই নির্দয়। তা ছাড়া সেই গল্পটাও নিশ্চয় তাঁর জানা, যার মূল কথা, বিড়ালকে প্রথম রাতেই মারতে হয়। এটুকু পড়ার মধ্য দিয়েই বোঝা যাচ্ছে, প্রবল সাড়া ও স্বপ্ন জাগিয়ে যে দলটি এই সেদিন ভূমিষ্ঠ হয়ে দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় দিল্লিতে ক্ষমতায় এসেছে, দিল্লি বিধানসভায় ৭০টির মধ্যে ৬৭টি আসন দখল করেছে, কংগ্রেসকে পুরোপুরি এবং বিজেপিকে প্রায় ঝাড়ে-বংশে উৎখাত করে দিয়েছে, সেই এএপিতে সবকিছু মোটেই ঠিকঠাক যাচ্ছে না। নীতিগত প্রশ্নে দল বিভাজিত। দলের বেশির ভাগ নেতা মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের পাশে দাঁড়ালেও যোগেন্দ্র যাদব ও প্রশান্ত ভূষণ যে প্রশ্নগুলো তুলে ধরেছেন, তা ক্রমেই গুরুতর আকার ধারণ করেছে। সংখ্যার তুলনায় কম হলেও তাঁদের পেছনে ক্রমেই জড়ো হচ্ছেন বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা, যাঁরা বিকল্প এক রাজনীতির স্বপ্ন ফেরি করে এএপিকে একজোট করেছিলেন। এই বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত দলকে ভেঙে দেবে, যার সব রকম ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কেজরিওয়াল কোনো সমঝোতার রাস্তায় হাঁটতে রাজি নন। মানুষের সমর্থনে বলীয়ান তিনি আগামী পাঁচ বছর নির্ভাবনায় রাজত্ব করতে চান। তাঁর স্থির নিদান, হয় আমায় বাছো, নয়তো ওঁদের। আমাকে বাছলে ওঁদের সরাতে হবে। পদে পদে বাধা নিয়ে আমি দল ও সরকার চালাতে পারব না। বিদ্রোহীরাও মাথা নোয়াতে নারাজ। তাঁদের কাছে বড় তাঁদের আদর্শ ও নীতি, যা জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁরা মহাপাতক হতে চান না। এই রেষারেষির নিট ফল এএপিতে অসন্তোষ ও সম্ভাব্য ভাঙন। যোগেন্দ্র-প্রশান্ত জুটি অতঃপর নতুন দল গড়বেন কি না, কিংবা সেই দলকে মানুষ কোল পেতে দেবে কি না, তা পরের কথা।
কেজরিওয়ালকে কেন রাবণের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে? কারণ, বিকল্প রাজনীতির কথা বলে তিন বছর আগে যে দলটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যোগেন্দ্র-প্রশান্তরা মনে করছেন, সেই আদর্শ থেকে কেজরিওয়াল বিচ্যুত হয়ে আর পাঁচটা দলের মতোই এএপি পরিচালনা করছেন। যে নৈতিকতার ধ্বজা তুলে তাঁরা ভোট চেয়েছেন, মানুষের সমর্থন পেয়েছেন, তা আদৌ পালিত হচ্ছে না। যেমন দল চালাতে অর্থের জোগানে রাশ টানা হয়নি। ভোটের খরচ চালাতে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ নেওয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র পালিত হচ্ছে না। সমালোচনা শুনতে প্রবল অনীহা। বিরুদ্ধ মত উঠলেই তা দমানো হচ্ছে এবং যাঁরা বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করছেন, তাঁদের কপালে দলবিরোধিতার তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। যোগেন্দ্র-প্রশান্তদের অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই এএপি তার যাবতীয় নিজস্বতা হারিয়ে আর পাঁচটা রাজনৈতিক দলের মতো হয়ে গেছে। কোনো পার্থক্য আর নেই। কেজরিওয়ালদের পাল্টা অভিযোগ, ক্ষমতালোভী যোগেন্দ্র-প্রশান্ত জুটি তাঁদের পেছন থেকে ছুরি মারতে চেয়েছেন। ওঁরা চাননি দল ক্ষমতায় আসুক। সে জন্য চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। নাশকতা করতে চেয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। অতএব দুষ্ট গরু হটিয়ে গোয়াল সাফ করা জরুরি।
প্রধানত দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন এএপির আঁতুড়ঘর। কংগ্রেস শাসনের শেষ দিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্না হাজারের আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ মদদ দিতে শুরু করলে সেই বিক্ষোভ সমাবেশ ক্রমেই উত্তাল হয়ে ওঠে। তিন বছর আগের সেই আন্দোলনের শরিক ছিলেন কেজরিওয়াল, যোগেন্দ্র, প্রশান্ত ও তাঁর বাবা শান্তি ভূষণও। প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আন্নার যতটা অনাগ্রহ ছিল, ততটাই আগ্রহী ছিলেন কেজরিওয়াল-যোগেন্দ্ররা। ফলে একটা সময় তাঁরা আন্নার আপত্তি সত্ত্বেও রাজনীতিতে এসে রাজনৈতিক দুরাচারগুলো দূর করার সংকল্প নেন। লক্ষণীয়, এএপিই সম্ভবত প্রথম ভারতীয় দল, যার কোনো আদর্শগত ভিত্তি ছিল না। বিভিন্ন ভাবনা, বিভিন্ন পেশা, বিভিন্ন মতের কিছু মানুষ জোটবদ্ধ হয়েছিলেন; দুর্নীতিমুক্ত, সুস্থ ও স্বচ্ছ রাজনীতি যার অনুঘটকের কাজ করেছিল। রাজনীতিতে একটি দলের শক্তিশালী হয়ে ওঠার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করে। শক্তিশালী ও জনমোহিনী নেতৃত্ব, আন্দোলন ও কর্মসূচি এবং ঠাসবুনট সংগঠন। নীতি ও বাস্তবতার সমঝোতার মধ্য দিয়ে সেই দলকে এগোতে হয়। শুধু আদর্শ বা শুধুই যুগের সঙ্গে চলনশীল হওয়া কোনো দলকে দীর্ঘমেয়াদি করে তুলতে পারে না। এই অভ্যন্তরীণ রসায়ন বড় দ্রুত, বড়ই আচম্বিতে নড়বড়ে হয়ে গেল এএপিতে। যোগেন্দ্র-প্রশান্ত জুটি শুধু আদর্শকে আঁকড়ে এগোতে চাইলেন সেই সময়ে, যখন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কেজরিওয়ালের মূল্যায়নের সময় আসেনি। কেজরিওয়ালের কাছে এটা সৌভাগ্যের। দলে নিজের আধিপত্য পুরোপুরি কায়েম করতে এই সন্ধিক্ষণকেই তিনি বেছে নিলেন, যখন তাঁর সামনে পরেরবারের ভোটের জন্য পড়ে রয়েছে অঢেল সময়।
রাজনীতিতে নেতা বনাম তাত্ত্বিক নেতৃত্বের সংঘাত নতুন নয়। কমিউনিস্ট পার্টি, কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি কিংবা সোশ্যালিস্ট দলগুলোতে নেতা বনাম তাত্ত্বিকদের সংঘাতের ভূরি ভূরি উদাহরণ ইতিহাসে রয়েছে। শেষ বিচারে দল তাঁর সঙ্গেই থাকে, সংসদীয় গণতন্ত্রে যাঁর ভোটে জেতানোর ক্ষমতা বেশি। বিজেপিতে নরেন্দ্র মোদি, তৃণমূল কংগ্রেসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সমাজবাদী পার্টিতে মুলায়ম সিং যাদব, বহুজন সমাজ পার্টিতে মায়াবতী, দুই দ্রাবিড় পার্টিতে জয়ললিতা বা করুণানিধি, প্রত্যেকেই আদর্শের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন ব্যক্তিগত ক্যারিশমায়। ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসেও তাই সোনিয়া-রাহুলদের কদর আর সবার চেয়ে এখনো বেশি; যেহেতু যতটুকু ভোট এখনো আসছে, তা তাঁদের জন্যই। আদর্শের সঙ্গে বাস্তবতার লড়াইয়ে তাত্ত্বিক নেতাদের ছেড়ে সব দলের অধিকাংশ সদস্য এ কারণেই বাস্তববাদী নেতাদের অনুগামী হয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বারবার ঘটে যায়। তাত্ত্বিক যোগেন্দ্র-প্রশান্তদের সরাতে বাস্তববাদী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে তাই খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। মেধা পাটেকর বা রামদাসেরা সরে গেছেন। তাঁদেরই মতো অরাজনৈতিক চরিত্ররাও হয়তো ক্রমেই হতাশ হয়ে দল ত্যাগ করবেন। তাতে এই মুহূর্তে দলে নিজের প্রাধান্য শতভাগ কায়েম করতে কেজরিওয়ালের অসুবিধা হবে না; বরং তিনি অনেক ভারমুক্ত হয়ে দল ও সরকার চালাতে পারবেন।
যোগেন্দ্র-প্রশান্তরা বারবার কেজরিওয়ালকে স্বৈরতন্ত্রী বলে অভিহিত করেছেন। একই অভিযোগ ছিল কিরণ বেদির। এই অভিযোগেই সাজিয়া ইলমি এএপি ছেড়েছিলেন। বিনোদ বিন্নিও। কিন্তু তাঁদের কেউই যোগেন্দ্র যাদবের মতো তাত্ত্বিক হিসেবে সর্বজনগ্রাহ্য ছিলেন না, প্রশান্ত ভূষণের মতো গণতন্ত্রী আইনজীবী ‘অ্যাকটিভিস্ট’ ছিলেন না, কিংবা শান্তি ভূষণের মতো নিঃস্বার্থ স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন না। এ কথা ভুললে চলবে না যে প্রবীণ শান্তি ভূষণ এএপির প্রতিষ্ঠা সদস্যই শুধু নন, দল গড়তে নিজের সঞ্চয় থেকে তিনি দুই কোটি টাকা দানও করেছিলেন। এঁরা সবাই যতটা আদর্শবাদী, ততটা বাস্তববাদী হতে পারেননি। এঁদের কাছে মস্তিষ্কের তুলনায় হৃদয় প্রাধান্য পায় বেশি। কিন্তু এঁরা ভুলে গেলেন, আজকের দুনিয়ায় আদর্শভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি ফলের প্রতীক্ষার চেয়ে চটজলদি সাফল্যেরই দাম বেশি। সেই সাফল্য যিনি এনে দিতে পারেন, কদর তাঁরই। যোগেন্দ্র বা প্রশান্ত কিংবা রামদসেরা সেখানে অপরিহার্য ও বিকল্প হয়ে উঠতে পারেন না। নরেন্দ্র মোদি তাই সংঘ পরিবারের আদর্শের চেয়ে বেশি কাম্য, মমতা-মুলায়ম-মায়াবতী-জয়ললিতাদের পালে তাই সব সময় হাওয়া বেশি থাকে।
ভবিষ্যতে কার ভাগ্যে কী লেখা আছে, তা ভবিষ্যৎই জানে। তবে এটা ঠিক, যোগেন্দ্র-প্রশান্ত-শান্তি ভূষণদের সীমানার বাইরে পাঠানোর মধ্য দিয়ে কেজরিওয়াল তাঁর পথ নিষ্কণ্টক করলেও এএপি কিন্তু তার বিবেককে হারাল। গণতন্ত্রে বিরুদ্ধ স্বর তত্ত্বগতভাবে গ্রাহ্য হলেও এমন কোনো গণতন্ত্রী নেতা বা নেত্রী এই মুহূর্তে এ দেশে নেই, যিনি সেই বহুত্ববাদে বিশ্বাসী। দলে নিজের অবস্থান প্রশ্নাতীত করে তুলে অরবিন্দ কেজরিওয়ালও নিজেকে সেই তালিকাভুক্ত করলেন। রাজনীতির লঙ্কায় তিনিও আর পাঁচজনের মতোই রাবণ হয়ে গেলেন।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

পাকিস্তানের নৈতিক বিপর্যয় ফাতিমা ভুট্টো

সাত ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট শাফকাত। ২০০৩ সালের দিকে কাজের খোঁজে কাশ্মীর থেকে করাচিতে পাড়ি দেয় সে। শেখার অক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে, বিদ্যালয়ের বৈতরণী পার করা হয়ে উঠেনি তার। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বিদ্যালয়ের ঝরে পড়াদের তালিকায় নাম উঠে যায় শাফকাতের। পড়া কিংবা লেখা কোনটাই পারতো না সে। করাচি আসার পর পিতা-মাতাকে আর কখনোই দেখেনি সে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে অবৈধভাবে তাকে আটক করে পুলিশ; ভয়াবহভাবে মারধরও করে। অথচ পাকিস্তানে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার যে বয়সসীমা, তার চেয়েও চার বছর ছোট ছিল সে। নির্জন কারাবাসই সঙ্গী হয়ে উঠে তার। তার যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়। সিগারেটের আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয় শরীর। তাকে যেসব পুলিশ সদস্য জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল, তারা তার তিন আঙুলের নখ উঠিয়ে ফেলে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, শাফকাতের বিষয়টি কোন ব্যতিক্রম ছিল না। এটাই ছিল নিয়ম। তাকে বলা হয়েছিল, ৭ বছর বয়সী এক বালককে হত্যার স্বীকারোক্তি দিতে। অথচ এ অপরাধ সে করেনি। তাকে বলা হয়েছিল, অন্যথায় সে কোন দিন কারাগার থেকে বের হতে পারবে না, তার প্রতি নির্যাতনও বন্ধ হবে না। এরপর এক সাত বছর বয়সী বালককে অপহরণ ও খুনের অভিযোগ আনা হয় শাফকাতের বিরুদ্ধে। বিচারে তার ফাঁসি হয়। শাফকাতের বড় ভাই মনজুর গত ডিসেম্বরে নির্যাতনের মুখে শাফকাতের স্বীকারোক্তির বিষয়ে বিবিসির সঙ্গে কথা বলেন। মনজুর বলেন, আমি যখন তাকে কারাগারে নির্যাতনের কথা জিজ্ঞেস করি, তখন সে থরথর করে কাঁপা শুরু করলো এবং একপর্যায়ে প্রস্রাব করে দিলো। নিজের মাথার ওপর উভয় হাত দিয়ে কান্না শুরু করে দেয় শাফকাত। সে বলতে থাকে, ‘আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করো না। আমি তোমাকে বলতে পারবো না তারা আমার সঙ্গে কি করেছে।’ তার বিরুদ্ধে একমাত্র প্রমাণ যেটি আদালত পেয়েছিলেন, তা হচ্ছে, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের মধ্যে ৯ দিন থাকার পর তার দেয়া স্বীকারোক্তিটি। কিশোর অপরাধী হিসেবেও শাফকাতের বিচার করা হয়নি। তার বিরুদ্ধে যখন অভিযোগ আনা হয়, তখন কোন আইনজীবীর সঙ্গেও যোগাযোগ হয়নি তার। তার মা ১০ বছরেও একবার তাকে দেখার সুযোগ পাননি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে শাফকাতকে একবার দেখতে কাশ্মীর থেকে করাচি যাওয়ার সামর্থ্যও নেই তার মায়ের। প্রায় ৭ বছর ধরে মুলতবি রাখার পর, পাকিস্তান সম্প্রতি আবারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শুরু করেছে। ১৬ই ডিসেম্বর পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে এক সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয় শতাধিক শিশু। ওই হামলার ঘটনাটি ছিল পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। এ সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়েই দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। চিন্তাভাবনা ছিল না, ছিল না কোন অন্তর অবলোকন। ছিল কেবল প্রতিশোধের স্পৃহা। রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর মুলতবি প্রত্যাহার করে নেয়, গঠন করে সামরিক আদালত। এসবের কোনটিই অপরাধ রোধক হিসেবে পরিচিত নয়। সামরিক আদালতের বিচারক ও কৌঁসুলিরা আসেন সেনাবাহিনী থেকে। এটি হলো পাকিস্তানের গভীরভাবে ভ্রান্ত ও নিষ্ফল বিচারিক পদ্ধতির নবতর বিতর্কিত সংযোজন। পাকিস্তানের কলহপ্রিয় সন্ত্রাসবাদ বিরোধ আদালতের মতো, সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত মামলাগুলোর বিচারের জন্যই সামরিক আদালতগুলোও গঠন করা হয়েছে। যদিও তাদের বিচারিক এখতিয়ার সময়ের ব্যবধানে কেবল বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। পাকিস্তানে বর্তমানে প্রায় ৮ হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর মৃত্যু পরোয়ানা ঝুলছে। এদের মধ্যে প্রায় ১০০০ অভিযুক্ত, যারা আপিল করতে করতে ক্লান্ত, তারা ফাঁসির কাষ্ঠের অপেক্ষায় আছেন। ৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ ইতিমধ্যেই কার্যকর হয়েছে। শাফকাতের ফাঁসি আগামী বৃহসপতিবার কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার ফাঁসির আদেশ স্থগিত করেছিল। এরপর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল কী করে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরকে ফাঁসির  মুখোমুখি করা হচ্ছে। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই স্থগিতাদেশের ২ মাসেরও বেশি সময় পর, পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদবিরোধী আদালত তার বিরুদ্ধে নতুন করে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে। ১৯৯৭ সালে বিধিবদ্ধ আইনের অধীনে ওই কঠোর আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সাংবিধানিক আইনের অধীনে নয়। ওই আদালতগুলোর নিয়ম হচ্ছে, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারলে, অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী বলেই সাব্যস্ত হবেন। আসামিদের এ আদালতে জামিন দেয়া হয় না। সাধারণত, মামলাগুলো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাই ওখানে হয় বেশি। শাফকাত হোসেন মৃত্যুপরোয়ানা মাথায় নিয়ে প্রায় ১১টি বছর পার করেছে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। তার বিরুদ্ধে যে অপরাধের অভিযোগ, সেটির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের কোন সমপর্কই নেই। সে কোন জঙ্গি নয়। করাচীতে সে স্বল্প সময় মুক্তভাবে ছিল, তখন সে একটি বাসায় তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করতো। সে কোন অবস্থাতেই জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলেনি। মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের ঘটনাটি পাকিস্তানের জন্য একটি নৈতিক বিপর্যয়। যারা মনে করেন, চোখের বদলে চোখ তুলে নেয়া উচিত, তাদের কাছে পাকিস্তানে ধর্ম অবমাননা, ধর্মত্যাগ ও ব্যভিচারের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের বিষয়টি কোন ছাপ ফেলবে না। অনুতাপহীন সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও অবিচারের এ যুগে, সহানুভূতির পক্ষে আমাদের কথা বলাটা দায়িত্বস্বরূপ। পাকিস্তান নিজেকে কিছুতেই ন্যায়পরায়ণ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করতে পারে না। এ রাষ্ট্র নিষিদ্ধঘোষিত আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের মতো সহিংস ও চরমপন্থি সামপ্রদায়িক দলের নেতাদের নিরাপত্তা প্রদান করে, অথচ নির্দোষ অপ্রাপ্তবয়স্ককে ফাঁসির আদেশ দেয়।
---
(ফাতিমা ভুট্টো পাকিস্তানি লেখিকা। তিনি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর নাতনি ও আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ভাইঝি। নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ প্রকাশিত হলো)

সরকার কি সাংবাদিকদের বিপক্ষে? সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগ নিরসনে পদক্ষেপ নিন

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা ক্রমেই বিপৎসংকুল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যাঁরা ঢাকার বাইরে জেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতা করেন, তাঁরা স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন বেশি। প্রথম আলোর বাউফল প্রতিনিধি মিজানুর রহমান যার সাম্প্রতিক উদাহরণ। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতি নিয়ে তিনি প্রতিবেদন করায় তুচ্ছ অজুহাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। একটি মামলায় জামিন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা ঠুকে দেওয়া হয়েছে।
আমরা মনে করি, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশে একের পর এক সাংবাদিককে নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনায় সম্পাদক পরিষদ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আমরা তাদের এই উদ্বেগের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করছি।
অতীতেও প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকার সাংবাদিকেরা পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছেন। এমনকি জাতীয় পত্রিকার সম্পাদকদের বিরুদ্ধেও ভিত্তিহীন মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এটি ব্যক্তিবিশেষ নয়, সাংবাদিকতার ওপরই বড় হুমকি।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুসারে, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে সাংবাদিক হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১১টি। এর বাইরে হত্যার হুমকি এসেছে নয়টি। সব মিলিয়ে কোনো না কোনো প্রকার সাংবাদিক হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ১০৬টি। ইতিমধ্যে কয়েকজন সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিক বিচারাধীন মামলায় আটকও রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) সরকারের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে। দেশে ও বিদেশের বিভিন্ন সংগঠনের এসব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সরকারের নীতিনির্ধারকদের টনক নাড়াবে কি?
যে সমাজে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা সাংবাদিকদের শত্রু মনে করেন, সেই সমাজে গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গভীরভাবে হুমকিগ্রস্ত।

চীন ও বৈশ্বিক সুশাসন by হাভিয়ের সোলানা

বিগত দুই দশকে দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে চীনের উত্থানকে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব চীনকে দুনিয়ার সুশাসনের কাঠামোয় যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি, অন্যান্য উদীয়মান দেশের কথা আর নাই-বা বললাম। এই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।
দেখা যাচ্ছে, চীন এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় নিজের অবস্থান পোক্ত করার জন্য এই মহাদেশগুলোর কয়েকটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। চীনের রিজার্ভ এখন ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। তারা এখন পণ্যের বিনিময়ে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। এর মাধ্যমে সে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বৃহত্তম অর্থদাতায় পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সে বিশ্বব্যাংককে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এসব দ্বিপক্ষীয় বন্দোবস্ত বাস্তবায়ন করে, তারা সব সময় সর্বোৎকৃষ্ট আন্তর্জাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করে না। সে কারণে পশ্চিম চীনকে বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়ার পথ ধরতে আহ্বান জানিয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা যায়। যাতে আরও বেশি পরিমাণে বৈশ্বিক পরিসরে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তো চীনকে ‘মুক্ত সওয়ারি’ আখ্যা দিয়েই দিয়েছেন। কারণ, বৈশ্বিক শক্তির কাছ থেকে যে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করা হয়, চীন সেটা পূরণ করতে পারেনি।
কিন্তু চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উদ্যোগের যদি কোনো লক্ষণ থেকে থাকে, তাহলে বলতে হয়, পরিবর্তন আসন্ন। গত বছরের জুলাইয়ে চীন ব্রিকসের পাঁচ সদস্য (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা) দেশকে সঙ্গে নিয়ে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গঠন করেছে, এর ১০০ বিলিয়ন ফান্ড গঠনেও তারা বড় ভূমিকা রেখেছে। একইভাবে, বেইজিংয়ের সর্বশেষ এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশনের বৈঠকে চীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) গঠনেও নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে। আবার সে একই সঙ্গে ৪০ বিলিয়ন ডলারের সিল্ক রোড ফান্ডও গঠন করেছে। লক্ষ্য হচ্ছে, এশিয়া-ইউরোপ সংযোগকারী সেই প্রাচীন স্থল ও জলপথের পুনর্নির্মাণ।
তথাকথিত ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ কৌশল বাস্তবায়ন করতে গিয়ে চীন ৬০টি দেশে বিনিয়োগ করবে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় এশিয়ার দেশগুলোও রয়েছে, যেখানে তার বিনিয়োগের পরিমাণ ইতিমধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সমুদ্রপথের মধ্যে ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ চীন সাগর ও ভূমধ্যসাগরও থাকবে। এগুলো একত্রে শুধু একটি সড়কই তৈরি করবে না, নেটওয়ার্ক নির্মাণ করবে; যার মাধ্যমে ইউরেশিয়ার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত পণ্য সরবরাহ সহজতর হবে।
এই উদ্যোগে ইউরোপের ভূমিকা গ্রিক বন্দর পিরাউসের সঙ্গে উঠে আসছে। এই বন্দরটি পরিচালনার আংশিক দায়িত্ব চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত নৌ-কোম্পানি কসকোর ওপর ন্যস্ত। বলকান ও হাঙ্গেরিতে চীনা অর্থায়নের মাধ্যমে এই বন্দর ইউরোপের বাকি অংশের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এর দ্বারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান সহযোগী হিসেবে চীনের পায়ের তলার মাটি আরও শক্ত হবে।
নতুন করে এই সিল্ক রোড নির্মাণের উদ্যোগের মধ্যে চীনের ইউরেশীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখা যায়। এটা শুধু গতিশীল পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক কেন্দ্রের সঙ্গে পশ্চিম ইউরোপের সংযোগই ঘটাবে না; কেন্দ্রীয় এশিয়াতেও চীনের প্রবেশদ্বার খুলে দেবে, যেখানে রাশিয়ার কর্তৃত্ব এ মুহূর্তে ক্ষয়িষ্ণু। আবার ভূমি নিয়ে চীনের পাশের বাড়ির প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, সিল্ক রোড সেটাও নিরসন করবে।
এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, চীনের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ানোর চেষ্টা একরকম সফল হয়েছে; আবার তা শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাজ্য সম্প্রতি এআইআইবির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। এর ফলে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ফ্রান্স, জার্মানি, কোরিয়া, রাশিয়া, তুরস্ক ও স্পেনের মতো দেশগুলোর আবেদনে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ভরে যাচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এসব বিষয় ভূরাজনৈতিক পরিসরে ধাক্কার শামিল। এ ধরনের ব্যাখ্যায় মৌলিক গলদ রয়েছে। সর্বোপরি, চীন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাশ কাটাতে চাইছে; তার কারণ হচ্ছে এরা চীনকে তার অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মর্যাদা দেয়নি।
যেমন, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ শতাংশ ভোট রয়েছে, যেখানে চীনের ভোট ৬ শতাংশেরও কম। আর জাপানিরাই সব সময় এই ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হয়। বিশ্বব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা, সেখানে মার্কিনরাই সব সময় সর্বেসর্বা। আর আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও সব সময় একজন ইউরোপীয়। জি-২০-এর সদস্যরা ২০১০ সালে আইএমএফে চীনের কোটা ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ দশমিক ১৯ শতাংশে উন্নীত করতে চাইলেও মার্কিন কংগ্রেস তা অনুমোদন করেনি। জি-২০–এর এই সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক পথে খুবই ছোট একটি পদক্ষেপ। যুক্তরাষ্ট্র বাগড়া দেওয়ায় সেই সংস্কার আর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
সত্য কথা হচ্ছে, চীনের নতুন উদ্যোগ কোনো সংশোধনবাদী প্রপঞ্চ নয়, এটা প্রতিক্রিয়ামূলক। নতুন শক্তি যদি বিরাজমান বৈশ্বিক কাঠামোতে স্থান না পায়, তাহলে তারা নিজেরাই কাঠামো তৈরি করে নেবে। তার মানে হচ্ছে, উন্নত দেশগুলোর হাতে এ ক্ষমতা রয়েছে যে তারা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আদর্শিক ও অর্থনৈতিক ব্লকে বিভক্ত নাও হতে দিতে পারে, যদি তারা চীন সম্পর্কে কৌশলগত অবিশ্বাস দূর করতে পারে।
এই বিবেচনায় এআইআইবিতে আরও বেশি ইউরোপীয় দেশের যুক্ত হওয়াটা ইতিবাচক লক্ষণ। কারণ, এতে একটা ব্যাপার নিশ্চিত হবে: নতুন ব্যাংক বিরাজমান কাঠামোকে পূর্ণতা দেবে, তার সঙ্গে বিরোধে জড়াবে না (বস্তুত, ইউরোপের প্রভাব আরও ব্যাপক হতে পারে যদি একক রাষ্ট্রের জায়গায় এআইআইবিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিত্ব থাকে, যেমন জি-২০ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় রয়েছে)।
বৈশ্বিক ব্যবস্থাপনায় চীনকে নিয়ে আসার জন্য পশ্চিমকে এখনো অনেক কিছু করতে হবে। শুধু তা-ই নয়, পশ্চিমকে চীনাদের নির্মিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজও করতে হবে, সেগুলোকে মেনে নিতে হবে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বহুপক্ষীয়তার সর্বোৎকৃষ্ট নজির স্থাপন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে, সে লক্ষ্যে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে পশ্চিমা নেতারা উদারতার পরিচয় দিতে পারেন। আর সেসব প্রতিষ্ঠান যাতে আন্তর্জাতিক শ্রম ও পরিবেশ মানদণ্ড মেনে চলে, সেটাও নিশ্চিত করা যেতে পারে।
এ প্রক্রিয়া শুরু করার এটাই আদর্শ সময়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যদি তাদের অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে এ বছর তাদের আকাঙ্ক্ষা এক বিন্দুতে মেলাতে পারে, তাহলে ২০১৬ সালে চীনে অনুষ্ঠেয় জি-২০ সম্মেলনকে তারা চূড়ান্তভাবে সফল করতে পারবে।
চীন যে বহুপক্ষীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে, সেটা দুনিয়ার জন্য সত্যিই ভালো খবর। ইউরোপ বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে চীনবিষয়ক কৌশলগত অবিশ্বাস কাটিয়ে উঠতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
হাভিয়ের সোলানা: ন্যাটোর সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল।

সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় সম্পাদক পরিষদের নিন্দা

জাতীয় দৈনিকের জেলা সংবাদদাতাদের ওপর পুলিশ, প্রভাবশালী রাজনীতিক ও স্থানীয় অপরাধীদের নির্যাতন-হয়রানির ক্রমবর্ধমান ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’। গতকাল এক বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদ এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, গত ৪ঠা এপ্রিল শনিবার ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে গোলাম সারওয়ারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্পাদক পরিষদের সভায় পুলিশ হেফাজতে প্রথম আলোর বাউফল প্রতিনিধি মিজানুর রহমানের ওপর নির্যাতনের সাম্প্রতিক ঘটনা বিশেষ করে আলোচিত হয়। মিজানুর রহমানের শারীরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে পটুয়াখালীর জেলা সিভিল সার্জনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন নিয়েও বিশদ আলোচনা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিজানুর রহমানের শরীরে জখম ও নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সভায় বলা হয়, মিজানুর রহমানকে সাজানো মামলায় পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং এ পর্যন্ত তার জামিনের আবেদন মঞ্জুর করা হয়নি। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘পুলিশকে মারধর ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়া’ সংক্রান্ত মামলার শুনানির তারিখ ১৫ই এপ্রিল। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা অপর চাঁদাবাজির মামলার শুনানি ২৮শে এপ্রিল। অর্থাৎ ২৮শে এপ্রিলের আগে তার জামিনে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সত্ত্বেও তাকে জেলহাজতে আটকে রাখা হয়েছে। সম্পাদক পরিষদ এই ঘটনার নিন্দা ও মিজানুর রহমানের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। জেলা প্রতিনিধিদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সম্পাদক পরিষদের সদস্য সংবাদপত্রগুলোর জেলা প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্পাদক পরিষদের সভায় প্রেস কাউন্সিলের একটি সাম্প্রতিক চিঠির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সম্পাদকদের উদ্দেশ্যে লেখা প্রেস কাউন্সিলের ওই চিঠিতে পেশাদার সাংবাদিকদের কাজের ওপর কিছু শর্ত আরোপের কথা জানানো হয়েছে। সভায় সর্বসম্মতভাবে এই অভিমত পুনর্ব্যক্ত করা হয় যে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সুরক্ষা ও সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সম্পাদক পরিষদ জোরালো ভূমিকা পালন করবে। সভায় দৈনিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, দি ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক এএইচএম মোয়াজ্জেম হোসেন, দৈনিক ইত্তেফাক-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক খন্দকার মনিরুজ্জামান, নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবির, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, নয়াদিগন্ত সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, দৈনিক ইনকিলাব সম্পাদক এমএম বাহাউদ্দিন করতোয়া সম্পাদক মো. মোজাম্মেল হক, বণিক বার্তা’র সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহ্‌মুদ ও ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক জাফর সোবহান।

‘ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া’ ইরানের পরমাণু চুক্তির অংশ নয়: ওবামা

‘ইসরাইলের টিকে থাকার অধিকারকে স্বীকৃতি দেবে তেহরান’- চুক্তিপত্রে লিখিতভাবে এমন শর্তের ভিত্তিতে ইরানের সঙ্গে যে কোন পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়া উচিত বলে মনে করে ইসরাইল। কিন্তু, গত রোববার ক্ষুব্ধ ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর এহেন দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি একে ‘ বিচারের মৌলিক ভুল’ বলেও মন্তব্য করেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। যুক্তরাষ্ট্রের একটি রেডিও নেটওয়ার্ক এনপিআর’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে ওবামা বলেন, ইসরাইলের এ দাবি চুক্তির বাইরের বিষয়। ইরান সরকার তাদের মনোভাব ও প্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে না ফেলা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করবে না, ইসরাইলের দাবিকে ওবামা এ ধরনের অযৌক্তিক প্রসঙ্গের সমজাতীয় বলে মন্তব্য করেন। ওবামা বলেন, এবং আমি মনে করি সেটা বিচারের মৌলিক ভুল। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ক্ষমতাধর ৬ রাষ্ট্রের প্রাথমিকভাবে সম্পাদিত চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী। তিনি এ চুক্তিকে ‘বাজে চুক্তি’ বলেও অভিহিত করেছিলেন।

পাকিস্তান সীমান্তের কাছে ৮ ইরানি সেনা নিহত

পাকিস্তানের সীমান্ত থেকে অবৈধভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানে অনুপ্রবেশ করা সুন্নি বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ে ইরানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ৮ সদস্য নিহত হয়েছেন। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর আলী আসগর মিরশেকারি জানিয়েছেন, পাকিস্তান থেকে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অবৈধভাবে ইরানে প্রবেশ করে এবং সেখানে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে পিছু হটে পাকিস্তানে পালিয়ে আসার আগে তারা ৮ ইরানি সেনাকে হত্যা করে। পাকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এ প্রদেশটিতে সুন্নি মুসলমান সম্প্রদায়ের একটি বৃহৎ অংশের বসবাস। মূলত, শিয়া-অধ্যুষিত ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর জঙ্গিদের হামলা নতুন নয়। তবে ২০১৩ সালের অক্টোবরে ইরানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ১৪ সদস্য নিহত হওয়ার পর এটাই সবচেয়ে মারাত্মক প্রাণহানির ঘটনা। ওই হামলার দায় স্বীকার করেছিল জঙ্গি সংগঠন জাইশ-উল আদল। একই জঙ্গি সংগঠন গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ৫ ইরানি সেনাকে জিম্মি হিসেবে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। গত এপ্রিলে এর মধ্যে ৪ সেনাকে জিম্মিদশা থেকে মুক্তি দেয় জঙ্গি সংগঠনটি। পঞ্চম সেনাকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

১৫০০ মিটার সাঁতার কেটে ‘শতবর্ষী তরুণী’র বিশ্বরেকর্ড

বয়সটা সত্যি কোন বাধা নয়। শরীর বুড়িয়ে গেলেও, মনটা যদি চিরতরুণ থাকে তবে হিমালয়সম বাধা অতিক্রমের সামর্থ্য না থাকুক, প্রাণ খুলে হাসতে তো পারবেন! অপরূপ প্রকৃতির মধ্য দিয়ে হেঁটে সৌন্দর্যটাকে নিজের মধ্যে ধারণ তো করতে পারবেন! জাপানের এক শতবর্ষী নারী সেটাই করে দেখিয়েছেন। নতুন করে শিখিয়েছেন চিরতরুণ বা চিরতরুণীর সংজ্ঞা। বিশ্বাস করুন বা নাই করুন, ফ্রিস্টাইল সাঁতারে জাপানের ১০০ বছর বয়সী ‘তরুণী’ মিয়েকো নাগাওকা সাঁতার কেটে ১,৫০০ মিটারের দূরত্ব পাড়ি দিয়েছেন। আর তা করতে তিনি সময় নিয়েছেন মাত্র ১ ঘণ্টা ১৬ মিনিট। বিশ্বরেকর্ড তিনি গড়ে ফেলেছেন। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অপেক্ষা। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ তার এ অসামান্য কৃতিত্বকে বিশ্বসেরার মর্যাদা দেবে অচিরেই, এমনটা আশা করা হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। শহুরে কয়জন তরুণ বা তরুণী এ কাজটি করার সামর্থ্য দেখাতে পারবেন, সেটাও বোধ হয় প্রশ্নবোধক ও বিস্ময়-চিহ্নের আড়ালে থেকে যাবে। হ্যাঁ, তিনি যা করেছেন, সেরকম দম রেখে সাঁতার কাটা আজকের দিনের শহুরে তরুণ-তরুণীদের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। গত শনিবার জাপানের পশ্চিমাঞ্চলীয় এহিম এলাকার একটি সুইমিং পুলে এ কৃতিত্ব গড়েন ‘শতবর্ষী তরুণী’ মিয়েকো। ১০০-১০৪ বছর বয়সী ক্যাটিগরিতে একমাত্র প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নেন তিনি। শুধু তাই নয়। মিয়েকো বলেছেন, যদি ১০৫ বছর পর্যন্ত বাঁচি, আমি সাঁতার কাটতে চাই। এখানেই শেষ নয়। লেখালেখির মতো অসামান্য ধৈর্য্যরে কাজও তিনি করে চলেছেন এ বয়সে। মিয়েকো নাগাওকার একটি বইও গত বছর প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, আমার বয়স ১০০ বছর এবং আমি বিশ্বের সেরা সক্রিয় সাঁতারু। আত্মবিশ্বাসেও বলীয়ান এ ‘শতবর্ষী তরুণী’। অলিম্পিকের যে ধরনের বড় সুইমিং পুল থাকে, ৯৯ বছর বয়সে সে ধরনের একটি সুইমিং পুলেও আয়োজিত ফ্রিস্টাইল সাঁতার প্রতিযোগিতায় ১,৫০০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন। ৮০ বছর বয়স থেকে সাঁতার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শুরু করেন তিনি। বিশ্বে নারীদের গড় আয়ুর দিক থেকে এগিয়ে জাপান। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাপানে নারীদের গড় আয়ু ছিল ৮৬ দশমিক ৬১ বছর। সে বছর জাপানের পুরুষদের গড় আয়ু ছিল ৮০ দশমিক ২১ বছর। বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তিও ছিলেন জাপানের মিসাও ওকাওয়া নামের এক নারী। সম্প্রতি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ১১৭ বছর। জাপানের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাপানে প্রায় ৫৯,০০০ শতবর্ষী মানুষ ছিলেন। যার অর্থ, জাপানের প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ৪৬ জনের বয়স ১০০ বছর বা তার বেশি।

খুলনায় সাবেক এমপির পুত্রবধূর রহস্যজনক আত্মহত্যা

খুলনায় সারা ফার্গুসা তন্বী (২১) নামের এক গৃহবধূ আত্মহত্যা করেছেন।  মঙ্গলবার রাতে নগরীর নুরনগর এলাকায় স্বামীর গৃহে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিলে এ ঘটনা ঘটে। তন্বী সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল গফ্‌ফার বিশ্বাসের ছেলে সোহেল বিশ্বাসের স্ত্রী। ঘটনার পর তন্বীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তন্বীর পরিবারের পক্ষ থেকে নির্যাতন করে মেয়েকে হত্যা করার অভিযোগ করা হয়েছে। তবে আবদুল গফ্‌ফার বিশ্বাস বলেন, সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুত্রবধূ আত্মহত্যা করেছে। তিনি পুত্রবধূর ওপর পারিবারিক নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ ধরনের কোন  ঘটনা ঘটেনি। খালিশপুর থানার এস আই কমল কান্তি পাল বলেন, বুধবার সকালে খবর পেয়ে নুরনগরে গফ্‌ফার বিশ্বাসের বাড়ির বারান্দায় খাটিয়ার ওপর তন্বীর লাশ পাওয়া যায়। পারিবারিক কলহের জের ধরে সে আত্মহত্যা করেছে বলে শোনা গেছে। ময়নাতদন্তের পর প্রাপ্ত প্রতিবেদনে প্রকৃত তথ্য জানা সম্ভব হবে। নিহত তন্বী খুলনা সোনাডাঙ্গা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি কামরুল আলম মিন্টুর কন্যা। আর সোহেল বিশ্বাস মহানগর জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি, খুলনা বিভাগীয় ট্রাক ও বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি ও সাবেক এমপি আব্দুল গফ্‌ফার বিশ্বাসের পুত্র।

সীমান্ত এলাকায় গুলিবর্ষণ না করতে বিজিবির অনুরোধ

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী গুলিবর্ষণ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিজিবি কক্সবাজার সেক্টরের কর্মকর্তারা। গতকাল দুপুরে সীমান্তের ঘুমধুম ফ্রেন্ডশীপ ব্রিজের কাছে বিজিবি-বিজিপি সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকে বিজিপির কর্মকর্তাদের কাছে সীমান্তে অহেতুক গুলিবর্ষণ বন্ধের দাবিও জানানো হয়। এ সময় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তারা সীমান্তে গুলিবর্ষণের কথা স্বীকার করে জানান, আতঙ্ক সৃষ্টি করতে নয়, সীমান্তে মিয়ানমারের ওপারে হাতি তাড়ানোর লক্ষে সীমান্তরক্ষীরা ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে থাকে। পতাকা বৈঠকে মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ বন্ধে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হয়। পতাকা বৈঠকে উল্লেখ করা হয়, সাম্প্রতিককালে ব্যাপক হারে মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। তাদেরকে আটক করে বিজিবি ফেরতও পাঠাচ্ছে। পতাকা বৈঠকে সীমান্তে একটি বর্ডার লিয়াজোঁ অফিস স্থাপনের বিষয়ে বিজিবি-বিজিপি ঐক্যমতে পৌঁছে। পতাকা বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে ১৪ সদস্য বিশিষ্ট দলের নেতৃত্ব দেন বিজিবি কক্সবাজার সেক্টরে কর্মান্ডার কর্নেল মুহাম্মদ খালেকুজ্জামান।  অপরদিকে মিয়ানমারের পক্ষে ৯ সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন বিজিপির মংডু সেক্টরের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল মিউ সুই। দুপুর ১২টা থেকে ২ ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকে মাদক ইয়াবা পাচারকারীদের তৎপরতা বন্ধের কার্যক্রম গ্রহণ করা, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং সীমান্তে বিরাজমান বিভিন্ন সমস্যা দূরীকরণে উভয় দেশের কর্মকর্তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং পারস্পরিক যোগাযোগ আরও বৃদ্ধির উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এতে বিজিবি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন কক্সবাজার সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার, উপ-মহাপরিচালক, মো. খালেকুজ্জামান, পিএসসি এবং মিয়ানমার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন নং-১ বর্ডার গার্ড পুলিশ কমান্ডিং অফিস, মংডু, মিয়ানমারের, সেকেন্ড কমান্ডিং অফিসার পুলিশ কর্নেল ‘মিউ সুই’ (গুড় ঝবি)। এ ছাড়াও বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলে কক্সবাজার, নাইক্ষ্যংছড়ি, রামু এবং টেকনাফ ব্যাটালিয়নের চারজন অধিনায়কগণসহ সর্বমোট ১৪ জন উপস্থিত ছিলেন। মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের মধ্যে ২ জন লেঃ কর্নেলসহ ৯ জন উপস্থিত ছিলেন।

শিগগিরই ১০,০০০ নার্স নিয়োগ by ইকবাল আহমদ সরকার

আমরা যা কিছু করছি সব জনগণের কল্যাণ ও সেবার জন্য করছি। আমাদের উদ্দেশ্য দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে পৌঁছে  দেয়া। এ লক্ষ্যেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। দেশের জনগণের প্রতিটি মৌলিক চাহিদা পূরণই হচ্ছে আমাদের প্রধান কাজ। সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। আর বিদেশে চিকিৎসা নয়, এদেশেই আমরা আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পেতে পারি সে লক্ষ্যে হাসপাতাল গড়ে তোলা হচ্ছে। আর আমি বিদেশে নয় আজ থেকে এই হাসপাতালে সব ধরনের চিকিৎসা নেব। গাজীপুরের কাশিমপুরের তেঁতুইবাড়ি এলাকায়  শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব  মেমোরিয়াল হাসপাতালের কেপিজে কলেজ চত্বরে নার্সিং কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সদস্য সচিব শেখ হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম  মোজাম্মেল হক, প্রকল্প পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক, সচিব সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, মালয়েশিয়া কেপিজে হেলথ  কেয়ার বার্হাডের প্রেসিডেন্ট তুয়ান হাজী আমির উদ্দিন আবদুল সাতার।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, নার্সিং পেশাকে আমি অত্যন্ত সম্মান করি। একজন রোগী ডাক্তারের চিকিৎসা নেন বটে, কিন্তু একজন নার্সের হাতের স্পর্শে,  সেবাযত্নই একজন রোগীকে সুস্থ করে তোলে। সুস্থ হওয়ার প্রেরণা  যোগায়। নার্সিং পেশাকে তাই আমি  শ্রেষ্ঠ পেশা হিসেবে বিবেচনা করি।  শিগগিরই আরো ১০ হাজার নার্স নিয়োগ দেয়া হবে। এ জন্য পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রথমবার ক্ষমতায় এসেও আমরা নার্স নিয়োগ দিয়েছি। অনেক নীতিমালা শিথিল করেও নিয়োগ দিয়েছি। এই পেশাকে আমরা অনেক গুরুত্ব দিয়েছি। নার্সিং  পেশাকে আমাদের দেশে নিচু হিসেবে দেখা হতো। চাকরির  ক্ষেত্রেও এ পেশা ছিল তৃতীয়  শ্রেণীভুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষিত   মেয়েরা এ পেশায় আসতো না। বিজ্ঞান বিষয় ছাড়া কেউ নার্সিংয়ে আসতে পারবে না বলে কারিকুলামে বাধ্যবাধকতা ছিল। আমরা এসব দূর করেছি। ক্ষমতায় এসে বলেছি, সরকারি-বেসরকারি খাতে নার্সিং ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আরো বলেন, আমাদের চেয়ে এ দেশের মানুষকে বেশি ভালোবেসেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। গ্রামবাংলার মানুষের জন্য কাজ করেছেন, জেল খেটেছেন। পাশে  থেকে সবসময় তার সঙ্গে কাজ করেছেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। আড়ালে  থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। মানবতার সেবায় তিনিও নিয়োজিত ছিলেন সবসময়। ভবিষ্যতে এই হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যার ও মেডিক্যাল কলেজে উন্নীত করার অঙ্গীকার করে তিনি আরো বলেন, এই এলাকায় প্রচুর শিল্প-কারখানা রয়েছে। সেখানে অনেক শ্রমিক কাজ করে। কিন্তু হঠাৎ  কোন দুর্ঘটনা ঘটলে চিকিৎসার তেমন সুযোগ নেই। এখানকার রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলেও চিকিৎসার ব্যবস্থা  নেই। তাই এই হাসপাতাল করা হয়েছে। হাসপাতালে চলাচলের সুবিধার্থে সামনে একটি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে। নার্সিংয়ের বেসিক  কোর্সে ২৪ ও পোস্ট বেসিক কোর্সে ৪০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আজ থেকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো নার্সিং কলেজটি।

ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণের স্থপতি: অর্থমন্ত্রী

ক্ষুদ্রঋণের সুবিধা সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে এর ওপর মুনাফা কমানো প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গতকাল পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) অডিটোরিয়ামে ‘প্রোমোটিং মাইক্রো ফাইন্যান্স ফর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট ইন আইওআরএ রিজন’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য দূরীকরণে ক্ষুদ্রঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ক্ষুদ্রঋণ গ্রাম ও শহরের নারীদের স্বাবলম্বী করতে দারুণ ভূমিকা রাখছে। এ সময় ড. মোহাম্মদ ইউনূসের প্রশংসা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ড. ইউনূস হলেন ক্ষুদ্রঋণের স্থপতি। এ কর্মশালায় আরও বক্তব্য রাখেন পিকেএসএফ’র চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কাজী খলিকুজ্জামান। ইন্ডিয়ান ওশেন রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পিকেএসএফ যৌথভাবে দুই দিনব্যাপী এ কর্মশালার আয়োজন করেছে। আইওআরএ’র ২০টি সদস্য দেশের মধ্যে ১২টি দেশ এ কর্মশালায় অংশ নিয়েছে।

রাজনীতিই সব? বাকি সব মিছে! by সজল চৌধুরী

লাগাতার অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচির কারণে দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলো যখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে, যখন অভিভাবক থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রী এমনকি শিক্ষামন্ত্রী স্বয়ং নিশ্চিত করতে পারেন না যে পরের পরীক্ষাটি কবে হবে, ঠিক সেই সময়েই আমাদের উপস্থিত হতে হয়েছিল জাপানের হোক্কাইডোতে অবস্থিত কেইসে মাধ্যমিক স্কুলের একটি আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক বনভূমি সংরক্ষণ ফোরামে। আমার মতো আরও অনেকেই ওই ফোরামে গিয়েছিলেন ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা বিষয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য এবং তাদের কমিউনিকেশন দক্ষতা বাড়ানোর জন্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করতে না করতেই কানে ভেসে এল বাদ্যযন্ত্রের সুরেলা আওয়াজ। কাছে গিয়ে দেখলাম, কতিপয় খুদে ছাত্রছাত্রী নিমগ্নচিত্তে বাজিয়ে চলেছে তাদের মিউজিক ক্লাসে। আর এই ক্লাসটি জাপানের প্রায় সব স্কুলেই নেওয়া হয়ে থাকে শুধু সাংস্কৃতিক চর্চাকে ছোটবেলা থেকেই সুসংগঠিত আর লালন করার জন্য। আমরা যে উপলক্ষে স্কুলটিতে গিয়েছিলাম, তার মূল লক্ষ্য ছিল সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের আসন্ন ফোরামের প্রস্তুতি পর্ব।
ভাবতে অবাক লাগল, আমাদের দেশের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা যখন লাগাতার হরতাল কিংবা সহিংসতা বন্ধের আশা করছে, পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে চরম অনিশ্চয়তায়, ঠিক তখন জাপানের এই ছাত্রছাত্রীরা প্রস্তুত হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ে গবেষণার লক্ষ্যে, এমনকি এই গবেষণাকে সফল করতে স্কুল কর্তৃপক্ষ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ছাত্রছাত্রীদের গ্রেট ব্রিটেন থেকে শুরু করে অনেক দেশে দীর্ঘ এক মাসের বেশি সময় ধরে ঘুরিয়েছে শুধু পর্যবেক্ষণ করার জন্য—সেখানকার বনভূমি, পশুপাখি—আর সবুজ রক্ষার নীতিমালার স্বরূপ বোঝার জন্য। এখনই তারা বুঝে যাচ্ছে গবেষণার প্রাথমিক ধারণা এবং প্রায়োগিক দিক সম্পর্কে। কষ্ট হচ্ছিল আমাদের দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে। এমনকি এ কথা বলতেও দ্বিধা নেই, বর্তমান বাংলাদেশে গবেষণা বলতে আসলে প্রকৃতপক্ষে কী বোঝায়, এ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা অনেক উঁচু শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নেই। এ ক্ষেত্রে খুদে শিক্ষার্থীদের কথা না হয় বাদই দিলাম, যার মূল কারণ শিক্ষার পরিবেশ-পলিসি। যদিও গণিত কিংবা বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আপাতদৃষ্টিতে এই অভাব অনেকখানি পূরণ করছে স্ব-উদ্যোগে, কিন্তু সরকার থেকে কি খুদে শিক্ষার্থীদের জন্য এমন কোনো পদক্ষেপ গুরুত্বসহকারে নেওয়া হয়েছে দেশের সব স্কুল-কলেজের জন্য প্রকৃতপক্ষে যেখান থেকে একজন শিক্ষার্থী ভবিষ্যৎ শিক্ষার জন্য দিকনির্দেশনা পাবে।
ওই ফোরামে যে বিষয়গুলো নিয়ে খুদে শিক্ষার্থীরা আলোকপাত করেছে, তা রীতিমতো প্রশংসার যোগ্য। তারা দেখিয়েছে কীভাবে জাপানের বর্তমান সবুজ বনভূমিকে আরও প্রাকৃতিক করা যায়, কিংবা অন্য দেশ থেকে কীভাবে কাঠ আমদানি কমিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল করা যায়, কিংবা সবুজ সহাবস্থান গড়ে তোলা যায়। যে বিষয়টি আমাদের সব থেকে বেশি দৃষ্টি কেড়েছে, সেটি হলো মূল পর্বের আলোচনা পর্ব। যেখানে একদিকে বসেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অন্যদিকে পরিবেশবিজ্ঞানী, আর তাঁদেরই মাঝখানে সগৌরবে কয়েকজন খুদে শিক্ষার্থী। সবাই শুধু তাদেরই কথা শুনছে, বড়রা কম কথা বলে তাদের কথা শুনতে বেশি আগ্রহী।
অথচ আমাদের দেশে এর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছোটদের অনুষ্ঠানে সেটা হোক শিক্ষামূলক কিংবা সাংস্কৃতিক; প্রধান আর বিশেষ অতিথিদের নিয়ে যে পরিমাণ ব্যতিব্যস্ততা পরিলক্ষিত হয়, সেখানে বড়দের দীর্ঘায়িত বক্তব্যের কারণে ছোটদের কথা শোনার প্রয়োজনীয়তা ঠিক যেন আমরা অনুভবই করতে পারি না। অথচ সেই আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রধান শিক্ষক, শিক্ষা বোর্ডের সভাপতি, বন বিভাগের সভাপতিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা যেন আজ শুধু এসেছেন শুনতেই, বলতে নয়।
এবার আসা যাক শিক্ষকদের দিকে। এখানকার একজন শিক্ষককে দেখলে বোঝার উপায় নেই তিনি যে একটি স্কুলের শিক্ষক; কারণ জাপানের সর্বস্তরের শিক্ষকদের বেতনকাঠামো থেকে শুরু করে সমাজের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তারা পেয়ে থাকেন। শুধু তা-ই নয়, সমাজে একজন শিক্ষকের মূল্য এখানে অনেক বেশি; যার দরুন একজন শিক্ষক এখানে সর্বদাই সচেষ্ট থাকেন শিক্ষার্থীদের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান প্রদানে। কারণ, শিক্ষার্থীদের শুধু বইলব্ধ জ্ঞান ধারণ করলে কিছুই হবে না। তাকে সব রহস্যের ভেতরে গিয়ে জ্ঞান আহরণ করতে হবে, আর তা সাধারণত পেয়ে থাকে একজন শিক্ষকের মাধ্যমে।
এমনকি প্রত্যেক শিক্ষার্থী যেন সুন্দর পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, সে জন্য জাপান সরকার কতজন শিক্ষার্থীর জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেমন হবে, সেটিরও রূপরেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে। যেমন, একটি স্কুলে ছাত্রছাত্রী যদি ৭২০ জনের মতো হয়ে থাকে, তাহলে স্কুলের শিক্ষা প্রদানের জন্য কমপক্ষে ৭ হাজার ২০০ বর্গমিটার জায়গা থাকতে হবে। এভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রে কী হবে, সেটিও নির্ধারণ করা আছে। তা ছাড়া, এখানে প্রাথমিক স্তর থেকেই নৈতিক শিক্ষা, প্রকৃতিগত শিক্ষা, সমাজ গঠনমূলক প্রায়োগিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার কারণে একজন শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই হয়ে ওঠে সামাজিক এবং সাংগঠনিক।
অথচ আমাদের দেশে রয়েছে তাদের থেকে সংখ্যায় শত গুণ বেশি ছাত্রছাত্রী। এত মেধাবী শিক্ষার্থী আমাদের দেশে থাকা সত্ত্বেও আমরা তাদের মুখে লেপে দিচ্ছি অন্ধকারের আবহ, ঠেলে দিচ্ছি অন্ধ কূপের মধ্যে দিনের পর দিন; এমনকি মৌলিক অধিকার শিক্ষাকেই পিষে মেরে ফেলছি কলুষিত রাজনৈতিক হানাহানিতে। শুধু তা-ই নয়, প্রাথমিক-মাধ্যমিকসহ সর্বস্তরের শিক্ষকদের এখানে জীবনযাপন করতে হয় দারিদ্র্যকে সঙ্গে নিয়ে। আর এই সত্যটাকে উপলব্ধি করার ক্ষমতাও আমাদের সমাজ দিন দিন হারিয়ে ফেলছে। অনিয়মই যেন এখানে সব নিয়ম। আর শুধু রাজনীতিই যেন সব—বাকি সব মিছে।
সজল চৌধুরী: বর্তমানে জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘হিউম্যান এনভায়রনমেন্টাল সিস্টেম’-এর ওপর গবেষণারত। সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
sajal_c@yahoo.com

নজির স্থাপন করেছে আইসিটি by শেখ হাফিজুর রহমান

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা ‘আইসিটি’ মানবতাবিরোধী অপরাধের যে বিচার পরিচালনা করছেন, গত ২৫ মার্চ সেটির পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। তাই এ নিয়ে নির্মোহ মূল্যায়ন ও অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ দরকার। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সদস্য (রুকন) আবুল কালাম আযাদ ওরফে ‘বাচ্চু’ রাজাকারকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। ওটি ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার প্রথম রায় এবং ওই রায়ে মুক্তিযোদ্ধা, নাগরিক সমাজসহ সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেন। ওই একই ট্রাইব্যুনাল পরের মাসে, অর্থাৎ ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। রায়ের পর কাদের মোল্লা ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে ট্রাইব্যুনাল থেকে বেরিয়ে আসেন। প্রতিবাদ ও বিক্ষোভে সোচ্চার হয়ে ওঠে দেশের মানুষ। অর্থাৎ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ব্যাপারে গরিষ্ঠসংখ্যক জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন রয়েছে।
গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আবুল কালাম আযাদকে দেওয়া হলো মৃত্যুদণ্ড, অথচ ওই একই অপরাধে (সুনিশ্চিতভাবে তাঁর চেয়েও ভয়াবহ অপরাধে) আবদুল কাদের মোল্লাকে ১৬ দিনের ব্যবধানে প্রদান করা হলো যাবজ্জীবন কারাদণ্ড! এ জাজমেন্টের ‘জুরিসপ্রুডেনশিয়াল’ (বা আইনবিজ্ঞান ও আইনের নীতিমালাসংক্রান্ত) আলোচনা ও বিশ্লেষণ সমৃদ্ধ হলেও রায়ের অংশটি ছিল দুর্বল ও অসংগতিপূর্ণ। বিশেষ করে আলুদীতে ৩০০ ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলেও কেন কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হলো, সে বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল কোনো যুক্তি (ও ব্যাখ্যা) প্রদান করেননি। ফলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ আপিলের শুনানির পর ট্রাইব্যুনালের রায় পরিবর্তন করে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে কাদের মোল্লাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আদালতের রায় কার্যকর করা হয় এবং এটি ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কোনো রায়ের প্রথম বাস্তবায়ন।
পাঁচ বছর ধরে চলা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১ ও ২ এ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ১৪ জনকে। (তাঁদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান ও সাবেক নেতা ১০ জন, বিএনপির নেতা দুজন, আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা একজন ও জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী একজন।) বয়সের কথা বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড এবং বিএনপির নেতা আবদুল আলীমকে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করেন।
গোলাম আযমের মামলার একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন হচ্ছে ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ অথবা জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের দায়িত্ব নীতিমালা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গোলাম আযমের শাস্তি নিশ্চিত করা। ১৯৪৬ সালে ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ নীতিমালা প্রতিষ্ঠা করে রিবেনট্রপ, ফ্রাঙ্ক, রোসেনবার্গ ও জুলিয়াস স্ট্রেইচারসহ নাজি যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডসহ অন্যান্য দণ্ডে দণ্ডিত করেন। টোকিও ট্রায়ালেও এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশে গোলাম আযমের মামলায় প্রসিকিউশন এ নীতিমালাটিকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন এবং ট্রাইব্যুনাল গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। কেননা, গোলাম আযম কোনো কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেননি, কিন্তু ইয়াহিয়া খান ও টিক্কা খানেরা বাঙালি নিধন, মুক্তিযোদ্ধা নির্মূল, নারী নির্যাতন ও লুটতরাজের যে ‘রোডম্যাপ’ প্রণয়ন করেছিলেন, তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে তৎপর ছিলেন তিনি। রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী তাঁর (এবং তাঁদের) নির্দেশেই গণহত্যা, নারী নির্যাতনসহ সারা বাংলাদেশে তাণ্ডব চালিয়েছে। ফলে জ্যেষ্ঠ ও নির্দেশ প্রদানকারী নেতা হিসেবে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় গোলাম আযম এড়াতে পারেন না। এ জন্য ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। কিন্তু এ রায়ের ব্যাপারেও অনেকেই ÿক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। কেননা, তাঁদের মতে, অপরাধের শাস্তির ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে অপরাধের নৃশংসতা ও ভয়াবহতা, বয়স নয়।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের আরেকটি বড় অর্জন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কর্তৃক আলবদর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দিনকে ১৮ জন বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা। কিন্তু এ রায়ের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এর বাস্তবায়ন। কেননা, লন্ডনে অবস্থানরত মাঈনুদ্দিন ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী আশরাফুজ্জামানকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় বাস্তবায়ন করার মধ্য দিয়েই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও পশ্চিমা কিছু দেশ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। আর সেটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে কোনো কোনো গোষ্ঠী। প্রাসঙ্গিকভাবেই কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে আইসিটিওয়াই বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফরমার যুগোস্লাভিয়া ও আইসিটিআর বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর রোয়ান্ডার তো মৃত্যুদণ্ড প্রদানের এখতিয়ার ছিল না। চরম এ দণ্ডটি নেই আইসিসি বা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের সংবিধিতেও। তাহলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কেন তা দিচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে মনে রাখতে হবে যে পৃথিবীর কোনো যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে তার ‘কনটেক্সট’, বিচারপ্রার্থীদের প্রত্যাশা ও সংশ্লিষ্ট দেশের বিচারিক ব্যবস্থা থেকে আলাদা করে দেখা যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অনুকূল নয়।
ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও শাস্তির বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে ১২ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন, টোকিও ট্রায়ালেও সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন অনুযায়ী এবং বাংলাদেশের দণ্ড আইন ও বিচারিক ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড এখনো প্রচলিত। প্রচলিত বিচারিক ব্যবস্থায় যেখানে একটি হত্যাকাণ্ডের জন্য নির্ধারিত শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড, সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গণহত্যার জন্য যদি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়, তাহলে তার চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে? আর কী করেই বা তা মেটাতে পারে বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচারের দাবি?
স্কাইপ কথোপকথন হ্যাকিং, ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার থেকে রায় চুরির মতো ঘটনা সত্ত্বেও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের যে বিচার হচ্ছে, তা স্বচ্ছ এবং খোলা। আইনের ‘যথাযথ প্রক্রিয়া’ (ডিউ প্রসেস) বলতে যা বোঝায়, সেটাকে মেনেই এটা হচ্ছে। কেননা, এ বিচারে কোনো লুকোছাপা নেই, প্রতিটি বিষয় জনগণের কাছে প্রকাশ্য, বিচারের খুঁটিনাটি প্রতিদিন দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ‘রিপোর্টেড’ হচ্ছে। এ বিচারে দোষী ব্যক্তিরা শুধু আপিল নয়, সর্বোচ্চ আদালতের রিভিউয়ের সুযোগ পর্যন্ত পাচ্ছেন।
দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক পরিচালিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারটি ইতিমধ্যে সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। কেননা, আন্তর্জাতিক কোনো সাহায্য ছাড়াই, ভিনদেশি আইনজীবী ও বিচারক বাদেই, দেশীয় তদন্তকারী, আইনজীবী ও বিচারকদের দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করে বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এত অল্প সময়ে এবং কম খরচে, অথচ আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া (ডিউ প্রসেস) ঠিক রেখে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার হচ্ছে বাংলাদেশে।
প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য যে ১৯৯৩-৯৪ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়া ও রোয়ান্ডার যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের যে বিচার শুরু হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি সমাপ্ত হয়নি। কম্বোডিয়ার গণহত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের জন্য কম্বোডিয়ার বিদ্যমান বিচারিক কাঠামোর মধ্যে ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি চেম্বারস ইন দ্য কোর্টস অব কম্বোডিয়া’ বা (ইসিসিসি) গঠনের জন্য জাতিসংঘের সঙ্গে দেনদরবারেই চলে যায় চার বছর। তারপর ইসিসিসি গঠন করে বিচার শুরুর আগেই গণহত্যার জন্য দায়ী খেমাররুজদের শীর্ষ নেতা পল পট, সন সেন, ইয়ান ইয়াতসহ অনেকে মৃত্যুবরণ করেন। আইসিসি বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারের প্রক্রিয়াও জটিল, ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এসব কারণে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা অনন্য।
শেখ হাফিজুর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক, মানবাধিকার ও অপরাধবিজ্ঞান গবেষক।

আমিরাতের যুবকরা: সব পেয়েও যাদের জীবন একঘেঁয়ে -বিবিসি

তেলসমৃদ্ধ সংয্ক্তু আরব আমিরাতের যুবকদের সম্পর্কে বলা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হন তারা।
মায়ের কোল থেকে কবর পর্যন্ত কোন কিছু নিয়েই তাদের ভাবতে হয় না। তারা সেরা স্কুলে লেখাপড়া করেন, সেরা স্বাস্থ্যসেবা পান, মোটা বেতনে চাকরি করেন।
আমিরাতের একজন তরুণী ব্যবসায়ী সুয়াদ আল-হোসানি, তার বয়েস ২৬ । তিনি বলেন, আমি কখনো কাজে ক্ষান্ত দিই না, পাঁচ বছরের ব্যবসায় আমি কখনো ছুটি নেই নি। দুবাই ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক মোহাম্মদ বাহারুন বলছেন, ইদানীং তরুণ আমিরাতিদের মধ্যে যারা চাকরি করতে আসছেন - তারা আগের চাইতে অনেক বেশি কর্মঠ এবং গতিশীল।
তিনি বলেন, এ যুগের আমিরাতি মেয়েরা তুলনামূলক ভাবে ছেলেদের চাইতে লেখাপড়ায় ভালো, এবং বেশি পরিশ্রমী।
কিন্তু আমিরাতের সমাজে এরা হলেন ব্যতিক্রম।
অনেক ধনী আমিরাতি তরুণই কাজ করতে চায় না। তারা শিকার, ক্যাম্পিং, মাছধরা, বাজপাখী ওড়ানো, বা মরুভুমিতে দামী গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো - এসব নিয়েই মেতে থাকে। তার পর আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, পশ্চিমা গানবাজনা, সিনেমা ।আরব আমিরাতে ভিন্নমতাবলম্বীদের নিপীড়নের যেসব খবর প্রায়ই বেরোয়, তাকে আদৌ গুরুত্ব দেন না এরা।
কিন্তু তার পরও সুখী নন এই তরুণরা। বিবিসির বিল ল জানাচ্ছেন, এদের অনেকেই মনে করেন, জীবন বড় একঘেঁয়ে - তাদের জীবনকে তারা অর্থপূর্ণ মনে করতে পারছেন না।
আরব আমিরাতের জনসংখ্যা ৯৩ লাখ। কিন্তু এর মাত্র ৬ ভাগের এক ভাগ হচ্ছেন আমিরাতি - অর্থাৎ এ দেশের আদি বাসিন্দা। বাকি সবাই মূলত নানা দেশ থেকে আসা অভিবাসী।
আমিরাতের নাগরিকরা একটি সাধারণ সেক্রেটারীর চাকরিতেও ভালো বেতন পান, যা প্রায় ১৫ হাজার দিরহাম বা চার হাজার ডলারের ওপরে। প্রায়ই তাদের বেতন বাড়ানো হয়। তাছাড়া আমিরাতিদের প্রায় কখনোই কাজ থেকে বরখাস্ত করা হয় না - তা সে সরকারী-বেসরকারি চাকরি যাই হোক না কেন।সাংবাদিক আব্বাস আল-লাওয়াতির আদি দেশ ওমানে। তিনি বলছেন, আমিরাতিরা এমন একটি সমাজে বাস করছে যেখানে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির পরিমাণ বিপুল, এবং এই সচ্ছলতা তারা প্রাপ্য অধিকার বলেই মনে করে।
কিন্তু তার পরও আমিরাতি যুবক-যুবতীদের মধ্যে বেকারত্ব অত্যন্ত বেশি - প্রায় ২৮ শতাংশ। লন্ডনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের হাসান হাকিমিয়ান বলছেন, আমিরাতে ১৫ থেকে ২৪ বছরের তরুণদের প্রতি ৫ জনের একজন বেকার। মেয়েদের মধ্যে এ হার অর্ধেকেরও বেশি।
গবেষকরা বলছেন সরকার এদেশের তরুণদের কাজ করতে উৎসাহিত করতে নানা কর্মসূচি নিচ্ছে, অভিবাসীদের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাচ্ছে। কিন্তু এতে কাজ হচ্ছে খুবই সামান্য।
আমিরাতি তরুণরা অনেকে মনে করে অভিবাসীদের ভিড়ে তারা হারিয়ে যাচ্ছে।

ব্যাগপাড়ার নারীরা by জাহিদ সুমন

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ছোট কুপট গ্রামটিকে এখন সবাই ব্যাগপাড়া বলেই চেনে। সাংসারিক কাজের ফাঁকে সবাই ব্যস্ত শপিং ব্যাগ তৈরিতে। রাতারাতি বদলে গেছে গ্রামটির চিত্র। দারিদ্র্যকে পিছনে ফেলে ব্যাগপাড়ার নারীরা এখন নতুন স্বপ্নে বিভোর।
যেভাবে শুরু: সুন্দরবন উপকূলীয় এ জনপদটির অধিকাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। তাদের জীবিকা নির্বাহের উৎস হচ্ছে- শ্রম বিক্রি করা, চিংড়িঘেরে মাছ ধরা, সুন্দরবনে কাঠ, গোলপাতা, মধু সংগ্রহ, মাছ ও কাঁকড়া ধরা। দিন এনে দিন খাওয়া এভাবেই তাদের সংসার চলে। তাদের সময় কাটে ঠিকই কিন্তু সংসার চালানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। ২০০৯ সালের ২৫শে মে সর্বনাশা জলোচ্ছ্বাস আইলায় মানুষের আশা-ভরসা সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায়। লবণাক্ততা এই এলাকায় প্রধান শত্রু। গ্রামের আবাদি জমিতে লবণ-পানি প্রবেশ করায় হারিয়ে গেছে কৃষি বৈচিত্র্য। সৃষ্টি হয় বেকারত্ব। বাড়ির পুরুষরা কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে শহরে। গ্রামের নারীরা যারা ঘর থেকে বাইরে বের হতো না তারা সন্তানদের মুখে আহার তুলে দিতে কাজের সন্ধানে ছুটতে থাকে। এ সময়ে দিশাহারা মানুষগুলোর ভাগ্য পরিবর্তনে সহযোগিতার হাত বাড়ায় বেসরকারি একটি উন্নয়ন সংস্থা। সুশীলন নামক এ সংস্থাটি তাদের জীবনযাত্রা বদলে ফেলতে সহযোগিতা করে। সিমেন্টের খালি ব্যাগ থেকে শপিং ব্যাগ তৈরি করার কৌশল শেখায় স্থানীয় এক যুবক আমিনুর। ছোট কুপট গ্রামের মালীপাড়ার আমিনুর রহমান এ অঞ্চলের জন্য আশীর্বাদ নিয়ে আসে। দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামটির নারীরা কোমর বেঁধে শপিং ব্যাগ তৈরির কাজে নেমে পড়েন।
ব্যাগপাড়ার ব্যস্ত নারীরা: শ্যামনগরের আটুলিয়া ইউনিয়নের ছোট কুপট গ্রাম বর্তমানে ব্যাগপাড়া নামে পরিচিত। গ্রামের নারীরা জানতে পারে সিমেন্টের ব্যাগের তৈরি শপিং ব্যাগের স্থানীয় বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে ভালই চাহিদা আছে। তারা সিদ্ধান্ত নিলো সংসারে কাজের ফাঁকে ঘরে বসে শপিং ব্যাগ তৈরি করবে। সিদ্ধান্ত নিলো তৈরি ব্যাগ স্বামীরা বাজারে গিয়ে দোকানে দোকানে বিক্রি করবে। তাদের আর ঘর থেকে বাইরে যেতে হবে না। সুশীলন ওই গ্রামের মানুষের বিকল্প জীবিকায়নের জন্য গ্রামের মানুষদের নিয়ে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। উৎপাদক দল তৈরি করে। বাজার বিশ্লেষণ করে বাজার সম্প্রসারণ কর্মপরিকল্পনা তৈরি এবং বাজার-যাচাই করে শপিং ব্যাগ তৈরি এবং বাজারজাতকরণমূলক কাজ সম্পর্কে নারীরা কিভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন।
শপিং ব্যাগে স্বপ্ন: ব্যাগপাড়ার একজন নারী সংসারের সকল কাজের পাশাপাশি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০টি শপিং ব্যাগ বানাতে পারেন। এই শপিং ব্যাগগুলো বানাতে তাদের খরচ হয় ৫০টি বস্তা যার মূল্য ২৫০ টাকা, ৫০ টাকার সুতা+মেশিন খরচসহ অন্যান্য ৫০ টাকা মোট ৩৫০ টাকা। আর বাজারে বিক্রি হয় ৬০০ টাকা। নিট লাভ ২৫০ টাকা। শ্যামনগরসহ আশপাশের বেশক’টি এলাকায় ব্যাগপাড়ার পুরুষরা নারীদের তৈরি ব্যাগ নিয়ে বিক্রি করছেন। যে বাজারে বেশি দাম পান সেখানেই ব্যাগ বিক্রি করেন। ব্যাগপাড়ার ৩৭ জন নারীর বদলে যাওয়া জীবন দেখতে ভিড় জমাচ্ছে শ্যামনগরের অজোপাড়াগাঁ ব্যাগপাড়ায়।
ব্যাগপাড়ার নারী প্রধান মাকসুদা খাতুন বলেন, লবণ-পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবনে সুখ ফিরিয়ে এনেছি। কখনও ভাবিনি আজকের মতো এমন দিন আসবে। অতীতকে আর স্মরণ করতে চাই না। ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। বদলে যাওয়া নারীদের স্বপ্ন বাস্তবায়নকারী সংগঠন সুশীলনের রি-কল প্রকল্পের প্রোগ্রাম ফ্যাসিলিটেটর রুখসানা পারভীন বলেন, ব্যাগপাড়ার নারীরা আজ দেশের মডেলে পরিণত হয়েছেন। এ গ্রামের নারীরা ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে দারিদ্র্যকে জয় করেছেন। সুশীলন তাদেরকে পরিচর্যা করেছে মাত্র।

সিটি নির্বাচনে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহারের আশঙ্কা by নুরুজ্জামান লাবু

আসন্ন সিটি নির্বাচনে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে গোয়েন্দা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীরা। এ কারণে বৈধ অস্ত্রধারীদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। এমনকি নির্বাচনের সাত দিন আগে সকল বৈধ অস্ত্র নিজ নিজ থানায় জমা দেয়ার নির্দেশও দেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় ৬ সহস্রাধিক বৈধ অস্ত্র ও সোয়া লক্ষাধিক গুলি বরাদ্দ দেয়া রয়েছে। এসব অস্ত্র-গুলি ব্যবহারে এগিয়ে রয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে বৈধ অস্ত্র দিয়ে সিটি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের হুমকি-ধমকি দেয়ার অভিযোগও উঠেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, বৈধ অস্ত্রধারীদের নজরদারি করা হচ্ছে। সিটি নির্বাচন নিয়ে কেউ যেন বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে নির্বাচন কমিশন অথবা ডিএমপি কমিশনারের পক্ষ থেকে সকল বৈধ অস্ত্রব্যবহারকারীদের অস্ত্র জমা দেয়ার নির্দেশনা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সিটি নির্বাচনে প্রার্থীদের পক্ষে বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার হতে পারে। ঘটতে পারে প্রাাণহানিসহ নানা দুর্ঘটনা। এ কারণে সিটি নির্বাচনের আগ মুহূর্তে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি বৈধ অস্ত্র জমা নেয়া হবে। তবে ক্ষমতাসীন দল সুবিধা নেয়ার উদ্দেশ্যে দশম জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারও বৈধ অস্ত্র জমা নাও নিতে পারে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সূত্র জানায়, বর্তমান সময়ে ব্যবসায়ী ও ভিআইপি ব্যক্তি ছাড়াও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য ছোটবড় রাজনৈতিক নেতাকর্মী বিশেষ কৌশলে অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন। এদের অনেকেই কোমরে অস্ত্র ঝুলিয়ে চলাফেরা করেন। এমনকি বৈধ অস্ত্র দিয়ে হুমকি-ধমকি দেয়ারও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে খোদ প্রধানমন্ত্রীর জনসভায় নেতাকর্মীদের অস্ত্র নিয়ে ঢোকার চেষ্টার ঘটনাও ঘটেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের চাইতে আওয়ামী লীগের ছয় বছরে দিগুণ অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। সাধারণত রাষ্ট্রদ্রোহী কিংবা আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়, এমন নাগরিকেরা নির্দিষ্ট পরিমাণ ট্যাক্স পরিশোধ করলে অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়। এর পরেও মন্ত্রী বা এমপিদের সুপারিশের ওপরও গুরুত্ব দেয়া হয়। এমন অনেকেই বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছেন, যাদের অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার কোনও যোগ্যতা নেই। এমনকি সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজরাও লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশ নিয়ে তারা অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছেন। একারণে এসব অস্ত্রের অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৈধ অনেক অস্ত্রের গুলির হিসাব থাকে। এছাড়া গুলি খরচ করা হলে সেই গুলির হিসাব দিতে হয়। কিন্তু অসাধু অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তারা বেশি দামে গুলি কেনে অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া লাইন্সেকৃত অস্ত্রের গুলির সঙ্গে মিলিয়ে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা বিশেষ উপায়ে অবৈধ গুলি সরবরাহ করে থাকে। অনেক বৈধ অস্ত্রধারীরা গোপনে এসব গুলিও ব্যবহার করে থাকে। এসব গুলি দিয়ে বৈধ অস্ত্র ভাড়া দেয়ার নজিরও রয়েছে। র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এমন অনেক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে যাদের হাতে লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ছিল। পরে সেসব অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করার সুপারিশও করা হয়েছে। র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান বলেন, অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আর বৈধ অস্ত্র যাতে কেউ অপব্যবহার করতে না পারে এজন্য গোয়েন্দা নজরদারি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন থেকে যেভাবে নির্দেশনা দেয়া হবে সেভাবেই কাজ করবে র‌্যাব।
ডিএমপি সূত্র জানায়, পুলিশের খাতায় ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা ৬ হাজার ১৯৫টি। এসব অস্ত্রের বিপরীতে গুলি বরাদ্দ রয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬৩১টি। এসবের মধ্যে ঢাকার ৮টি ক্রাইম জোনে লাইসেন্সধারী পিস্তলের সংখ্যা ১ হাজার ২৪৭টি, এর বিপরীতে গুলি বরাদ্দ রয়েছে ২৭ হাজার ২৫৬টি। রিভলভার রয়েছে ১ হাজার ২৭টি, রিভলভারের বিপরীতে গুলি বরাদ্দ রয়েছে ১৫ হাজার ৮৭৫টি। রাইফেল রয়েছে ৬৯৩টি, এর বিপরীতে গুলি বরাদ্দ রয়েছে ৪৩ হাজার ২৬৫টি। লাইসেন্সকৃত শটগানের সংখ্যা ৭৭৩টি, এর বিপরীতে গুলি বরাদ্দ রয়েছে ১৮ হাজার ৬৩১টি। একনলা বন্দুকের সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৮টি, এর বিপরীতে গুলি বরাদ্দ রয়েছে ১৬ হাজার ২৬০টি। দোনলা বন্দুকের সংখ্যা ১ হাজার ৬২টি, এর বিপরীতে বরাদ্দকৃত গুলির সংখ্যা ১৬ হাজার ৩৪৪টি। এছাড়া ৫টি এয়ারগান রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে শতাধিক কাউন্সিলর প্রার্থীর বৈধ অস্ত্র রয়েছে। তেজগাঁও এলাকার সরকার সমর্থিত একজন কাউন্সিলর প্রার্থী এবং তার অনুসারীদের একাধিক বৈধ অস্ত্র রয়েছে। বৈধ অস্ত্র অপব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমান আইন অনুযায়ী কোনোও অস্ত্রের লাইসেন্সধারী এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় গেলে সংশ্লিষ্ট থানায় রিপোর্ট করার বিধান রয়েছে। এই বিধান কেউ মানেন না। এছাড়া প্রতিটি থানায় মনিটরিং করতে থানার সেকেন্ড অফিসারের কাছে একটি রেজিস্টার খাতা থাকার কথা। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে দুবার ওই পুলিশ কর্মকর্তা তার এলাকার তালিকাভুক্ত লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদ পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শন শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অস্ত্রের লাইসেন্সে স্বাক্ষর করে থানায় জিডি করার পর পার্সোনাল ডায়েরিতে স্বাক্ষর করবেন। মনিটরিংয়ের কঠোর এ বিধান থাকলেও পুলিশ এবং অস্ত্রধারী কেউ মানেন না।