Tuesday, May 20, 2025

নেতানিয়াহুর নতুন ঘোষণার পর গাজা নিয়ে সব আশা কি শেষ?

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোমবার ঘোষণা দিয়েছেন, ইসরায়েল গাজার পুরো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেবে। তার এই ঘোষণার মধ্যেই গাজায় সামরিক অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরে ব্যাপক হামলার পূর্বাভাস দিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি।

নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, ‘আমাদের যুদ্ধ তীব্র হচ্ছে এবং আমরা অগ্রসর হচ্ছি। আমরা গাজা উপত্যকার প্রতিটি ইঞ্চি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেব। আমরা পিছু হটব না। সফল হতে হলে এমনভাবে এগোতে হবে যাতে আমাদের থামানো না যায়।’

এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইসরায়েল মূলত গাজা পুরোপুরি দখলের লক্ষ্যে তাদের কৌশলকে আরও স্পষ্ট করল। চলতি মে মাসের শুরুতেই ইসরায়েল গাজার পূর্ণ দখল এবং সেখানকার জনগণকে স্থানচ্যুত করার লক্ষ্যে একটি সম্প্রসারিত সামরিক পরিকল্পনা অনুমোদন করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেডরস আধানম গেব্রেয়েসুস পরিস্থিতিকে ভয়াবহ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, গাজায় ২০ লাখ মানুষ চরম খাদ্য সংকটে ভুগছে। সীমান্তেই টনকে টন খাদ্যসামগ্রী আটকে আছে, অথচ তা পৌঁছাতে মাত্র কয়েক মিনিট সময় লাগত।

ইসরায়েল সীমিত পরিসরে ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দিলেও তা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে যথেষ্ট নয়। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে মানবিক সংকট মোকাবিলায় অপর্যাপ্ত বলে বর্ণনা করেছে।

তবে ইসরায়েলি সরকারেই ত্রাণ বিতরণ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। চরম ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গিভির স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তিনি গাজায় কোনো ত্রাণ পাঠানোর পক্ষে নন। তার দাবি, আমাদের জিম্মিরা তো কোনো মানবিক সহায়তা পাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এমন মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করে বলেন, সীমিত ত্রাণ সহায়তা কেবল বেসামরিক জনগণের জন্য এবং এর মাধ্যমে আমাদের মিত্রদের কূটনৈতিক সমর্থন ধরে রাখা সম্ভব হবে।

এদিকে সোমবার সারাদিন ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৬০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। শুধু খান ইউনিস শহরে মারা যান ১১ জন। অন্যান্য এলাকায় আরও ১১ জন নিহত হন।

এএফপির মাঠ প্রতিবেদনে বলা হয়, খান ইউনিসের হাসপাতালগুলোতে গুলিবিদ্ধ ও রক্তাক্ত শিশুদের নিয়ে ছুটে আসছে অ্যাম্বুলেন্স ও ব্যক্তিগত গাড়ি। কেউ ট্র্যাকস্যুট পরে, কেউ খালি গায়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে বসে কাঁদছে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো গাজা নিয়ে কোনো আশা আর বেঁচে থাকবে না।

গাজা শহরের বাসিন্দা মোহাম্মদ সারহান বলেন, পুরো শহরটা যেন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। চারদিক থেকে গুলি, বোমা, যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারের শব্দ একসঙ্গে আঘাত করছে।

উত্তরের দেইর আল-বালাহ শহরে ভাই হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আয়মান বাদওয়ান। তিনি বলেন, আমরা শারীরিক, মানসিক সব দিক থেকেই ভীষণভাবে বিধ্বস্ত। আর কিছুই সহ্য করার মতো অবশিষ্ট নেই। এখনই আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ জরুরি।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলের পক্ষের প্রাণহানি হয় ১,২১৮ জনের, যাদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক নাগরিক। ওই হামলায় ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়, যাদের মধ্যে এখনো ৫৭ জন গাজায় অবস্থান করছেন বলে জানায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এদের মধ্যে ৩৪ জনকে মৃত বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, গাজা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ মার্চ থেকে ইসরায়েলের নতুন করে শুরু করা অভিযানে নিহত হয়েছেন অন্তত ৩,১৯৩ জন। পুরো যুদ্ধে এখন পর্যন্ত গাজায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩,৩৩৯ জন।

গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন ক্রমেই নতুন মাত্রা নিচ্ছে, যেখানে সামরিক অভিযান ও মানবিক সংকট একসঙ্গে চলছে। বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়লেও কোনো কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত নেই। নেতানিয়াহুর দখল ঘোষণার পর অনেকে বলছেন, গাজা নিয়ে হয়তো আর কোনো আশা আর বেঁচে থাকল না। 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত

ইসরায়েল এখনো বুঝতে পারছে না, তারা যুদ্ধে হেরে গেছে by ডেভিড হার্স্ট

সম্প্রতি ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরের মধ্যে আমরা যেন একটি টিভি গেম শো দেখলাম। এর নাম দেওয়া যেতে পারে ‘দ্য হোয়াইট হাউস অন উবার: হাউ টু প্রিপারচেজ আ ইউএস প্রেসিডেন্ট’। এই শোতে মনে হচ্ছিল, উপস্থাপক (ডোনাল্ড ট্রাম্প) যেন হঠাৎ ঠিক স্ক্রিপ্টে ফিরে গেছেন।

ট্রাম্প সৌদি আরবে গিয়ে বলছিলেন, উদার হস্তক্ষেপ (লিবারেল ইনটারভেনশনিজম) এক বিপর্যয় ছিল। তিনি ঠিকই বলছিলেন, আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া—সব জায়গায় দেখা গেছে, কোনো দেশকে জোর করে ভেঙে আবার নতুনভাবে তৈরি করা যায় না।

ট্রাম্প ইয়েমেনের ওপর মার্কিন বোমাবর্ষণ বন্ধ করলেন এবং সিরিয়ার ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণাও দিলেন। ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়েও তিনি ইঙ্গিত দিলেন।

এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের আধিপত্য কায়েমের দুটি প্রধান পথ বন্ধ হয়ে গেল। এর একটি হলো সিরিয়াকে বিভক্ত করা এবং অন্যটি হলো ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানো।

কিন্তু ট্রাম্পের এই অবস্থানে ইরান আশ্বস্ত হয়নি। কারণ, ইরান বহুবার এ রকম মার্কিন প্রতিশ্রুতিতে ধোঁকা খেয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্রবিষয়ক আলোচনার সময় তারা বুঝে গেছে, হোয়াইট হাউস যা বলে, বাস্তবে তা সব সময় হয় না।

ট্রাম্প ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তোলার কথা বলার পর মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারাও সেই ঘোষণা শুনে চমকে উঠেছিলেন।

কারণ, নিষেধাজ্ঞা ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট ও আইনত জটিল, যার অনেকগুলো কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সরানো সম্ভব নয়। পুরো নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে সময় ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা—দুটোই দরকার।

অন্যদিকে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরে উপসাগরীয় দেশগুলো তিন ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ খরচ করেছে। সৌদি আরব দিয়েছে ৬০০ বিলিয়ন ডলার। কাতার ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে।

ট্রাম্পকে একটি বোয়িং ৭৪৭ বিমান উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প পরিবারের কোম্পানির সঙ্গে জড়িত হয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বিতর্কিত চুক্তি।

এমনকি ট্রাম্পের ছেলে এরিকের জন্য দুবাইয়ে একটি টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনাও হয়েছে।

ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছিল, কে বেশি ট্রাম্পকে খুশি করতে পারে, তা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো একধরনের প্রতিযোগিতায় নেমেছিল।

আরব দেশগুলো যখন এই বিলাস প্রদর্শন করছিল, ঠিক সে সময়েই গাজায় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড চালায় ইসরায়েল।

১৯৪৮ সালের নাকবার (ফিলিস্তিনিদের জাতিগত উদ্বাস্তু হওয়ার দিন) বার্ষিকীতে ইসরায়েল যেন যত বেশি সম্ভব ফিলিস্তিনি হত্যা করতে চায়। ১৮ মার্চের আশপাশের কয়েক দিনে প্রায় ১০০ মানুষ নিহত হয়।

গাজার খান ইউনুস এলাকায় অবস্থিত ইউরোপিয়ান হাসপাতালে হামলার উদ্দেশ্য ছিল হামাস নেতা মুহাম্মদ সিনওয়ারকে (নিহত হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ছোট ভাই) হত্যা করা। অবশ্য মুহাম্মদ সিনওয়ার নিহত হয়েছেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

এ সময়েই এক বিস্ময়কর তথ্য সামনে আসে। সেটি হলো, হামাসের বিদেশি রাজনৈতিক নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল, যাতে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানো এবং আরও জিম্মি মুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু মুহাম্মদ সিনওয়ার তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ, এতে যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা ছিল না।

এখন মনে করা হচ্ছে, যদি সিনওয়ার মারা যান, তাহলে হামাসের মতো গোপন সংগঠনের জন্য নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলা সহজ নয়। এতে গঠনগতভাবে একধরনের স্থবিরতা আসবে। এটি ইসরায়েলের মূল উদ্দেশ্য।

কারণ, হামাসের নেতৃত্বের কাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া গেলে ইসরায়েলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হবে।

তবে বাস্তবতা হলো, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর লক্ষ্য যুদ্ধ থামানো নয়; বরং পুরো গাজাকে ধ্বংস করে ফেলা। ২১ লাখ মানুষের মধ্যে যারা বেঁচে আছে, তাদের অনাহারে ও বোমায় মরতে বাধ্য করা—এটাই যেন ইসরায়েলের কৌশল।

এই লক্ষ্য এতটাই স্পষ্ট যে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার নিরাপত্তা পরিষদে বলে ফেলেন, ‘আর কত প্রমাণ দরকার? এবার কি আপনি সত্যিই কিছু করবেন গণহত্যা ঠেকাতে?’

বিশ্বের অনেক দেশ মুখে সমালোচনা করলেও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, আমিরাতের প্রেসিডেন্ট বিন জায়েদ, কিংবা কাতারের আমির তামিম—কারও মুখ থেকে ইসরায়েলের সমালোচনা বের হয়নি।

এই নীরবতা ছিল এক ভয়াবহ বিশ্বাসঘাতকতা, বিশেষ করে যখন ফিলিস্তিনিরা তাদের জীবন দিয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যাচ্ছে।

আসলে গাজায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের ছায়া দেখা যাচ্ছে। ইসরায়েল দাবি করছে, তারা জিতে যাচ্ছে। বাস্তবে গাজায় তারা ভিয়েতনামের মতো এক ভয়াবহ যুদ্ধে আটকে পড়েছে।

আমেরিকা যেমন ভিয়েতনামে প্রতিটি যুদ্ধ জিতেছিল, কিন্তু পুরো যুদ্ধ হেরে গিয়েছিল, তেমনি ইসরায়েলও মাঠে জয় পেলেও রাজনৈতিকভাবে, নৈতিকভাবে ও কৌশলগতভাবে হেরে গেছে।

ভিয়েতনামে ৮ বছরে আমেরিকা ৫০ লাখ টন বোমা ফেলেছিল। গাজায় ইসরায়েল মাত্র এক বছরে এক লাখ টন বোমা ফেলেছে। হিসাব করলে দেখা যায়, ভিয়েতনামে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৫ টন বোমা পড়েছে, আর গাজায় পড়েছে ২৭৫ টন—১৮ গুণ বেশি।

তারপরও গাজাবাসী এলাকা ছাড়েনি। উত্তর গাজা খালি করতে না পেরে ইসরায়েল এখন দক্ষিণে রাফায় লোকদের পাঠাতে চায়। যাদের পাঠানো হবে, তারা আর কখনো ফিরতে পারবে না।

এটিই ইসরায়েলের ‘অপারেশন গিডিওনের রথ’-এর মূল উদ্দেশ্য।

নেতানিয়াহু বলছেন, হয়তো যুদ্ধবিরতি হবে, কিন্তু যুদ্ধ থামবে না। তবে তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা গুরুতর এবং পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন উগ্রপন্থী নাফতালি বেনেট।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিল দুটি শক্তি—ভিয়েতনামিদের দৃঢ়তা ও মার্কিন জনগণের বিবেক। আজ একই ঘটনা ঘটছে গাজায়। ফিলিস্তিনিরা তাদের ভূমি ছাড়ছে না। তারা মরছে, কিন্তু আত্মসমর্পণ করছে না।

আর পশ্চিমা বিশ্বে—বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও বামপন্থীদের মধ্যে—ইসরায়েলের বিরোধিতা প্রবল হচ্ছে। এখন আর কেউ ‘ইহুদিবিদ্বেষ’ বলে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে পারছে না।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ইসরায়েল প্রতিটি যুদ্ধে জিততে পারে। কিন্তু এই যুদ্ধের ক্ষেত্রে মানবতা, ন্যায়বিচার, বিবেক ও ইতিহাসের আদালতে তারা ইতিমধ্যেই হেরে গেছে।

দ্য মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া
ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত।
ডেভিড হার্স্ট মিডল ইস্ট আই-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক

গাজা সীমান্তে ইসরায়েলের সেনারা
গাজা সীমান্তে ইসরায়েলের সেনারা। ছবি: এএফপি

নুসরাত ফারিয়ার গ্রেপ্তার নিয়ে নানা প্রশ্ন

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলার সময় শিক্ষার্থী হত্যাচেষ্টার মামলায় গ্রেপ্তার চিত্রনায়িকা নুসরাত ফারিয়াকে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। গতকাল ঢাকা  মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্র্রেট আদালত শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামনে এসেছে নানা প্রশ্ন। তার গ্রেপ্তার নিয়ে সরকারের একজন উপদেষ্টা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। নুসরাত ফারিয়াকে ফ্যাসিস্টের সহযোগী বলে আদালতে উল্লেখ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে তার ঘনিষ্ঠরা দাবি করছেন তিনি জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থনসূচক ফেসবুক পোস্টও দিয়েছেন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে চিত্রনায়িকা নুসরাত ফারিয়া কানাডায় ছিলেন। আন্দোলনের পরে তিনি গত ৮ মাস দেশেই অবস্থান করছিলেন। কিন্তু রোববার থাইল্যান্ড যাওয়ার সময় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে আটক করে ভাটারা থানা পুলিশের কাছে তুলে দেয়া হয়। গ্রেপ্তার দেখানো হয় আন্দোলন চলাকালে এনামুল হক নামের এক শিক্ষার্থী হত্যাচেষ্টা মামলায়। নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তারের পর থেকে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে। বিদেশে থেকে তিনি কিভাবে এনামুল হত্যা চেষ্টা করেছেন, এ ছাড়া তাকে কখনো আন্দোলনবিরোধী কোনো মন্তব্য করতে দেখা যায়নি। তবুও তাকে জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অর্থের যোগানদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া তাকে শেখ হাসিনার সহযোগী ফ্যাসিস্ট হিসেবে মামলায় দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে জুয়ার বিজ্ঞাপনের মডেলিং  করার অভিযোগ আনা হয়েছে। ফারিয়াকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে নড়েচড়ে বসেছেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেছেন, ফারিয়াকে গ্রেপ্তার বিব্রতকর একটা ঘটনা হয়ে থাকলো। আমাদের প্রধান কাজ জুলাইয়ের প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করা। এ ছাড়া তার গ্রেপ্তার নিয়ে তার পক্ষে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, ৬২৬ জনকে নিরাপদে বের করে দিয়ে এখন নুসরাত ফারিয়াকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে বোঝাতে চাচ্ছেন আপনারা খুব বিচার করছেন? এগুলো বিচার নয়, এগুলো হাসিনা স্টাইলে মনোযোগ ডাইভারশন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও গতকাল সচিবালয়ে বলেছেন, তাকে ছেড়ে দিলে সবাই বলতো কেন ছেড়ে দিলেন।
নুসরাত ফারিয়া গ্রেপ্তারের পর সামনে উঠে এসেছে জুলাই আন্দোলনকে ঘিরে ঢালাও মামলা বাণিজ্যের বিষয়টি।

গ্রেপ্তারের পর রোববার পুরো রাত মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে ছিলেন নুসরাত ফারিয়া। সেখানে তাকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে সোমবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে তোলা হয়। এদিন সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয় মাইক্রোবাসে করে আদালতে নেয়া হয়। তাকে রাখা হয় সিএমএম আদালতের হাজতখানায়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বিল্লাল ভূঁইয়া ফারিয়াকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা তার জামিন চেয়ে আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে জামিনের বিরোধিতা করা হয়। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এ ছাড়াও মামলার পরবর্তী জামিন শুনানির জন্য আগামী ২২শে মে দিন ধার্য করেন আদালত।

সরজমিন দেখা যায়, নুসরাত ফারিয়াকে আদালতে হাজির করার খবরে প্রচুর জনসমাগম ছিল আদালতপাড়ায়। এদিন সকাল ১০টার একটু পরে তাকে আদালতে তোলা হয়। আদালতে নুসরাত ফারিয়াকে বিমর্ষ দেখা গেছে। তিনি আদালতে কোনো বক্তব্য দেন নি, তবে আইনজীবীর সঙ্গে ইশারায় কথা বলেছেন। সিএমএম কোর্টের প্রধান পিপি যখন একের পর এক যুক্তি তুলে ধরেছিলেন, তখনো নুসরাত ফারিয়া ছিলেন বিমর্ষ। তিনি কাঠগড়ায় দুই হাত রেখে পিপির বক্তব্য শুনছিলেন। এসময় তাকে কান্না করতেও দেখা গেছে।
ফারিয়াকে যে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে সে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত বছরের ১৯শে জুলাই এনামুল হক ভাটারা থানার সামনে পাকা রাস্তার উপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন। এ সময় মামলার ১০ নম্বর আসামি থেকে শুরু করে মামলার ২৮৩ নম্বর আসামি পর্যন্ত সকলে ছাত্র আন্দোলন দমনে তাদের অবৈধ অস্ত্র নিয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। এ ছাড়াও এ মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, ডিবি  হারুন অর রশীদ, বিপ্লব কুমার বিশ্বাস, অসীম কুমার উকিল, মো. ইমরান হোসেন, গোলাম রুহানী, অপু উকিল, গাজীপুরের সাবেক মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলমকে যথাক্রমে ১ থেকে ৯ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এসব আসামির হুকুমেই হামলা চালানো হয়েছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। ওই মামলায় নুসরাত ফারিয়াকে ২০৭ নম্বর আসামি করা হয়েছে। তার নামের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নুসরাত ফারিয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগের পক্ষে অর্থ যোগানদাতা এবং আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি পদ-প্রার্থী ছিলেন। মামলার বাদী এনামুল হক এজাহারে আরও বলেছেন, গত ১৯শে জুলাই সকাল ১১টায় ভাটারা থানার সামনে আন্দোলন করার সময়ে, হাসিনা গং (১ থেকে ৯ নম্বর আসামি) দের নির্দেশে নুসরাত ফারিয়াসহ আরও ২৭৩ আসামি এবং আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠন এবং ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ সকলে মিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মিলে দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এ সময় এনামুল হক গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়। এ ঘটনায় গত ৩রা মে ভুক্তভোগী এনামুল বাদী হয়ে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মামলা করেন। মামলাটি ৩রা মে এজাহার হিসেবে রেকর্ড হয়।

মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে ফারিয়ার আইনজীবী মোহাম্মদ ইফতেখার হাসান আদালতকে বলেন, আমার মক্কেল একজন সুপরিচিত অভিনেত্রী। অভিনয় তার পেশা। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নন। এ ছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় নুসরাত ফারিয়া বিদেশে অবস্থান করছিলেন। তিনি বিদেশে থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের পক্ষেও লেখালেখি করেছিলেন, সহমর্মিতাও প্রকাশ করেছিলেন। এমনকি নুসরাত ফারিয়া যে ওই সময় বিদেশে অবস্থান করছিলেন, এর স্বপক্ষে সব প্রমাণপত্র আমাদের কাছে রয়েছে। মোহাম্মদ ইফতেখার হাসান আরও বলেন, নুসরাত ফারিয়া আন্দোলনের সময় কানাডায় ছিলেন। পেশাগত কাজ শেষে গত বছরের ১৪ই আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন। এসময় তিনি ফারিয়ার পাসপোর্ট ও ভিসার কাগজপত্র আদালতের কাছে জমা দেন।

ওদিকে ফারিয়ার আইনজীবীর বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেন সিএমএম কোর্টের প্রধান পিপি ওমর ফারুক ফারুকী। তিনি আদালতকে বলেন, নুসরাত ফারিয়া অভিনেত্রী, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অন্যতম সহযোগী। পিপি বলেন, নুসরাত ফারিয়া কেবল ফ্যাসিস্টের সহযোগী নন, তিনি অনলাইনে জুয়ার প্রমোট করছেন। তিনি একটি জুয়ার অ্যাপসের শুভেচ্ছাদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি যুবসমাজকে বিভ্রান্ত করছেন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন চলাকালে যখন আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থী, ছাত্র-জনতা আন্দোলন করছিলেন, তখন একদল শিল্পী, অভিনেতা, অভিনেত্রী তাদের শরীরে গরম পানিও ঢেলে দিয়েছিলেন। তারা অনলাইনে গ্রুপ খুলেছিলেন। জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ওমর ফারুক ফারুকী আরও বলেন, নুসরাত ফারিয়া শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বায়োপিকে অভিনয় করেছিলেন। রুপালি পর্দায় তিনি শেখ হাসিনার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। অভিনয় করা কোনো দোষের কিছু নয়। কিন্তু তিনি পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন, প্রতিটা ঘরে শেখ হাসিনা রয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে তিনি ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে খুশি করতে চেয়েছিলেন। এ ছাড়াও তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হতে চেয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার সহযোগী হওয়ার কারণে নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে আদালতকে জানান তিনি। তিনি বলেন, আমরা আরও একজন অভিনেতাকে খুঁজছি। তিনি হলেন রুপালি পর্দার নায়ক ফেরদৌস। তিনি ভোট চুরি করে এমপিও হয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট শাসকেরা যেটা করেন, যেসব শিল্পী, যেসব অভিনেতার পরিচিতি আছে, তাদের ফ্যাসিস্টরা কাজে লাগান। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাও সেই একই কাজ করেছেন। নুসরাত ফারিয়া, ফেরদৌসদের মতো অভিনেতা, শিল্পীদের কাছে টেনেছিলেন। তারাও ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামল দীর্ঘায়িত করতে সহযোগিতা করেছেন।

নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে গতকাল দুপুরে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমি সাধারণত চেষ্টা করি আমার মন্ত্রণালয়ের কাজের বাইরে কথা না বলতে। কিন্তু আমার তো একটা পরিচয় আছে, আমি এই ইন্ডাস্ট্রিরই মানুষ ছিলাম এবং দুইদিন পর সেখানেই ফিরে যাবো। নুসরাত ফারিয়ার গ্রেপ্তার বিব্রতকর একটা ঘটনা হয়ে থাকলো আমাদের জন্য। আমাদের সরকারের কাজ জুলাইয়ের প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করা। ঢালাও মামলার ক্ষেত্রে আমাদের পরিষ্কার অবস্থান প্রাথমিক তদন্তে সংশ্লিষ্টতা না থাকলে কাউকে গ্রেপ্তার করা হবে না। এবং সেই নীতিই অনুসরণ করা হচ্ছিলো। ফারিয়ার বিরুদ্ধে এই মামলাতো অনেকদিন ধরেই ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে গ্রেপ্তারের কোনো উদ্যোগ নেয়ার বিষয় আমার নজরে আসেনি। কিন্তু এয়ারপোর্টে যাওয়ার পরেই এই ঘটনাটা ঘটে। আওয়ামী লীগের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিদেশ গমনকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের পর ওভার নার্ভাসনেস থেকেই হয়তোবা এইসব ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। ক’দিন আগে ব্যারিস্টার আন্দালিব পার্থের স্ত্রীর সঙ্গেও এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। এইসব ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য না। আমি বিশ্বাস করি ফারিয়া আইনি প্রতিকার পাবে। এবং এই ধরনের ঢালাও মামলাকে আমরা আরও সংবেদনশীলভাবে হ্যান্ডেল করতে পারবো এই আশা। আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের প্রধান কাজ জুলাইয়ের প্রকৃত অপরাধীদের বিচার করা।

নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার নিয়ে দলীয়ভাবে বিবৃতি দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এই গ্রেপ্তারকে লোক দেখানো বলে অভিহিত করেছে দলটি।
সোমবার রাতে এনসিপি’র যুগ্ম সদস্য সচিব (দপ্তর) সালেহ উদ্দিন সিফাত স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করা হয়। বিবৃতিতে এ ধরনের ঢালাওভাবে আসামি করা মামলায় গ্রেপ্তার ও জামিন না দিয়ে কারাগারে প্রেরণের ঘটনা গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াকে লঘু করে দেখানোর প্রবণতা সৃষ্টি করছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি মনে করে এ ধরনের ঘটনা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রহসনে পরিণত করছে। অথচ আমরা দেখেছি, জুলাই অভ্যুত্থানে হামলা ও গুলি করার ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ চলতি মাসেই কোনো রকম বাধা-বিপত্তি ছাড়াই দেশত্যাগ করেছেন। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সেনানিবাসে আশ্রিত ৬২৬ ব্যক্তির পরিচয় এখনো প্রকাশিত হয়নি।

এনসিপি জুলাই মাসের মধ্যেই জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায় উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা মনে করি, বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো ও প্রশাসনের মধ্যে থাকা একটি পক্ষ এই ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ‘জুলাই গণহত্যা’ এবং এর বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। অথচ এখন পর্যন্ত এই গণহত্যার বিচারে আমরা দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না।

ওদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এক ফেসবুক পোস্টে নুসরাতের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লিখেছেন, সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনিকে দেশ থেকে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়, শিরীন শারমিনকে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে বাসায় গিয়ে পাসপোর্ট করে দেয়া হয়। দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল জানুয়ারিতে হওয়ার কথা থাকলেও মে মাসে এসেও শুরু হয়নি। ইন্টেরিম, ৬২৬ জনের লিস্ট কোথায়?  ৬২৬ জনকে নিরাপদে বের করে দিয়ে এখন নুসরাত ফারিয়াকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে বোঝাতে চাচ্ছেন আপনারা খুব বিচার করছেন? এগুলো বিচার নয়, এগুলো হাসিনা স্টাইলে মনোযোগ ডাইভারশন।

ওদিকে অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়ার নামে মামলা ছিল বলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভা শেষে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তার নামে যদি কেস থাকে তাহলে আপনি কি করতেন? ছেড়ে দিলে আপনারাই তখন বলতেন স্যার আপনি ছেড়ে দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে। নির্দোষ প্রমাণ হলে ছেড়ে দেয়া হবে। নুসরাত ফারিয়ার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়ে সংস্কৃতি উপদেষ্টার বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এটা ওনার ব্যক্তিগত মতামত হতে পারে। যারা জুলাই গণহত্যায় প্রকৃত অপরাধী তারাই যাতে গ্রেপ্তার হয়, কেউ যেন ভোগান্তির শিকার না হয়, এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।

mzamin

যুবরাজ সালমানকেই কেন বেছে নিচ্ছেন ট্রাম্প by জোনাথন ফ্রিডল্যান্ড

একবার বিষয়টা ভেবে দেখুন তো—ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে আশার আলো হয়ে উঠছেন সেই লোক, যিনি গাজা খালি করে সেখানে সমুদ্রসৈকতের অবকাশকেন্দ্র করার স্বপ্ন দেখেছেন। এখন পর্যন্ত বর্তমান দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে পরিষ্কার এবং হয়তো একমাত্র পথটি দেখা যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকেই। ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়া ইসরায়েলের প্রতি তিনি ক্রমশই বিরক্ত হয়ে পড়ছেন।

ট্রাম্পের বদলে যদি যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট হতেন, তাহলে গত সপ্তাহে ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য সফরের ঘটনাপ্রবাহকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক, এমনকি যুগান্তকারী পরিবর্তন বলে মনে করা যেত। কিন্তু লোকটা যেহেতু ট্রাম্প, সে কারণেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না, এটা স্থায়ী নাকি আকস্মিক কোনো সিদ্ধান্ত। কেননা তার বেলায় কয়েক সপ্তাহ অথবা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।

ঘটনা যা দেখা গেছে, তার মধ্যে আমরা যদি আলোচনাকে সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে বলা যায়, গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সফর মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির একেবার স্পষ্ট এক পরিবর্তন। বিশেষ করে যে দেশটিকে দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রধান মিত্র হিসেবে দেখছে, সেই দেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির বড় পরিবর্তন। নিখাদ সত্যটা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলে যাননি।

এটা হয়তো ব্যাখ্যা করা এড়িয়ে যাওয়া যেত, কিন্তু সেটা যাচ্ছে না তার মূল কারণ, সফরে ট্রাম্প যা যা বলেছেন ও করেছেন। সৌদি আরবে গিয়ে তিনি কেবল যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানানি, তিনি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। যুবরাজকে তিনি বলেছেন, ‘আমি তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি।’ অথচ সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে একসময় কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেছিলেন। এবার ট্রাম্প গিয়ে যুবরাজকে জিজ্ঞাসা করেছেন, তিনি এমন শক্তিমত্তায় দেশটাকে বদলে দিচ্ছেন, সেখানে ঘুমানোর সময় কীভাবে পান।

দুই নেতা একটি চুক্তি করেছেন। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনবে। গত সপ্তাহের আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল এই নিশ্চয়তা যে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে ইসরায়েল সব সময় সামরিক দিক থেকে শ্রেষ্ঠ থাকবে। কিন্তু সেই গ্যারান্টি এখন অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ল। ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, এখন সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবচেয়ে শক্তিশালী অংশীদার’। এ মর্যাদা এত দিন একমাত্র ইসরায়েলের ছিল।

উপরন্তু কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই ট্রাম্প সৌদি আরবের প্রতি এই ভালোবাসা দেখালেন। এখানে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক ‘স্বাভাবিক’ করার কোনো শর্ত ছিল না।

এ ধরন তার সফরের সবখানেই দেখা গেছে। সিরিয়া গিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেন। সিরিয়ার নতুন নেতাকে ‘আকর্ষণীয়’ ও ‘লড়াকু’ বলে তিনি প্রশংসা করেছেন। অথচ ডিসেম্বর পর্যন্ত আহমেদ আল-শারা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তালিকায় শীর্ষ পলাতক দাগি সন্ত্রাসী। কেননা আল-কায়েদার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা ছিল। তাঁর মাথার দাম ছিল এক কোটি ডলার।

তাই পরিস্থিতির এমন মোড় নেওয়াটা বিস্ময়কর। এতে আবারও প্রমাণ হলো, ট্রাম্পের একজন দর–কষাকষিকারী হিসেবে বড় দুর্বলতা হলো বিনিময়ে কিছু না পেয়েই দিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। শারাকে এত কিছু তুলে দিলেও ইসরায়েল যে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইছিল, তা নিয়েও মুখ খোলেননি ট্রাম্প। এখানে আবারও প্রমাণ হলো, দর–কষাকষিকারী হিসেবে ট্রাম্পের বড় দুর্বলতা রয়েছে। তার প্রবণতা হলো, বিনিময়ে কিছু না পেয়েই অন্যকে দিয়ে দেওয়া। শারাকে এত কিছু দেওয়ার পরও ইসরায়েল যে নিরাপত্তা গ্যারান্টি চাইছিল, সে ব্যাপারে কিছুই বলেননি ট্রাম্প।

ট্রাম্প এখন এমন একটা চুক্তি করতে চাইছেন, যেটা তিনি নিজে চান। তাঁর একসময়কার প্রধান মিত্র কী ভাবল কি ভাবল না, তাতে তার কিছু যায়–আসে না। ট্রাম্প এখন ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে আলাদা একটা চুক্তি করতে চান, যাতে তারা লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজে হামলা করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু এই চুক্তিতে ইসরায়েলের ওপর হুতিরা যে বৃষ্টির মতো রকেট হামলা চলিয়ে যাচ্ছে, সেটি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তির ‘খুব কাছাকাছি’ পৌঁছে গেছেন। অথচ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, তেহরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই থামানো সম্ভব। ট্রাম্প তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। যদিও এরদোয়ান ইসরায়েলের প্রতি বৈরী এবং হামাসের ঘনিষ্ঠ মিত্র।

যতটা জোরে ও স্পষ্টভাবে সম্ভব, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে তিনি আর তাঁর এক নম্বর পছন্দের লোক নন। যুক্তরাষ্ট্র ও তাঁর নিজের স্বার্থে কোনটা সবচেয়ে ভালো হবে, তা নির্ধারণে ট্রাম্প পিছপা হবেন না।

* জোনাথন ফ্রিডল্যান্ড দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

সৌদি আরবে গিয়ে তিনি কেবল যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানানি, তিনি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন।
সৌদি আরবে গিয়ে তিনি কেবল যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানানি, তিনি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। ছবি : রয়টার্স

অভ্যুত্থান শহর থেকে কেন গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল না by নাহিদ হাসান

প্যারি কমিউন ব্যর্থ হয়েছিল। ১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত। স্থায়ী ছিল মোট ৭২ দিন। ছিল প্যারিসের শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ প্রথমবারের মতো একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার চেষ্টা। এটি ছিল শ্রমিকশ্রেণির প্রথম রাষ্ট্র। কারণ হিসেবে জার্মান দার্শনিক ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস লিখেছেন, বিপ্লবকে শহরের শ্রমিকদের মিত্র গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে বিস্তৃত করতে না পারা। ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা মাহফুজ আলমও তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, অভ্যুত্থান শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত হয়নি।

প্যারি কমিউন যেসব কারণে ব্যর্থ হয়েছিল, সেগুলো হচ্ছে:

১. কমিউন ছিল মূলত শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের নেতৃত্বাধীন, যাঁদের অনেকেই প্রশাসনিক ও সামরিক নেতৃত্বে অনভিজ্ঞ ছিলেন। বিপ্লবীদের একটি অংশ ছিল উদারপন্থী, আরেকটি ছিল রেডিক্যাল (যেমন ব্লাঙ্কিপন্থী ও প্রুধোঁপন্থী), ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

২. বিপ্লবীদের যতটা কঠোর হওয়ার দরকার ছিল, তাঁরা ততটা ছিলেন না। উল্টো ফ্রান্সের তৎকালীন থিয়ারের নেতৃত্বে ক্ষমতাচ্যুত সরকার ভেরসাইয়ে অবস্থান নিয়ে সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করে।

এই বাহিনী পরবর্তী সময় প্যারিস আক্রমণ করে এবং ‘রক্তাক্ত সপ্তাহ’–এ ৩০ হাজার কমিউনারকে হত্যা করে।

৩. গোটা ইউরোপ কমিউনারদের বিপক্ষে সশস্ত্রভাবেই দাঁড়ায়।

৪. শুরু থেকেই প্যারিসকে অবরুদ্ধ করে। শহরের শ্রমিকদের সঙ্গে গ্রামের কৃষকদের মৈত্রী গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। ভেরসাই বাহিনী ও প্রুশিয়ানদের দ্বারা ঘেরাওয়ের কারণে ফ্রান্সের কৃষকেরা পাশে দাঁড়াতে পারেননি।

এ ছাড়া কমিউন ছিল পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অভিজ্ঞতা। সমাজ তখনো পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না। দার্শনিক কার্ল মার্ক্সের ভাষায়, অপরিণত প্রলেতারীয় বিপ্লব। ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস ও কার্ল মাক্স প্যারি কমিউনের ব্যর্থতার মূলত দুটি কারণ লিখেছেন, একটি শহরের শ্রমিকদের সঙ্গে গ্রামের কৃষকদের মৈত্রী গড়ে তুলতে না পারা এবং বিপ্লবীদের আরও কঠোর হতে না পারা।

আবার লেনিনদের বলশেভিক পার্টি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সফল বিপ্লবের পর শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত করতে পেরেছিলেন। অথচ ১২টি দেশের সহযোগিতায় বড় কৃষকেরা বিপ্লবকে সশস্ত্রভাবে প্রতিরোধ করেছিলেন। তবু পেরেছিলেন। কেন?

কিন্তু চব্বিশের ছাত্র গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী সময় প্যারি কমিউন ও অক্টোবর বিপ্লবের মতো প্রচণ্ড একটি বিরোধী শর্তও নেই। সামরিক বাহিনী বিপক্ষে নেই, আন্তর্জাতিক সমর্থন কম নেই, শহরের সঙ্গে সঙ্গে মফস্‌সলে ও গ্রামেও অভ্যুত্থানের পক্ষে জাগরণ দেখা গেছে। কোথাও অবরোধ নেই, দমন নেই, বাইরের রাষ্ট্র আক্রমণও করছে না। সঙ্গে আছে রাষ্ট্রের সব জনগণের সমর্থন। এমনকি নারীরাও গণ–অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিলেন। তাহলে গণ–অভ্যুত্থান শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত হচ্ছে না কেন?

বিপ্লব বা অভ্যুত্থান রক্ষা পায়, নেতৃত্বদানকারীদের মিত্রশক্তির ওপর। মিত্র জোটে কর্মসূচির ভিত্তিতে, শত্রুও জোটে একই কারণে। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের প্রধান কর্মসূচি ছিল ফ্যাসিবাদের উচ্ছেদ। ফ্যাসিবাদ হলো হিংসা-বিদ্বেষমূলক, বৈচিত্র্যময় স্ব–ব্যক্তিস্বাধীনতাবিরোধী অসহিষ্ণু ভাবনাকে বৈধতা দানকারী এমন চেতনা। এই চেতনার পক্ষে সম্মতি আদায় করা হয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সন্ত্রাসের মিশেল ঘটিয়ে।

ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইগুলোতে কারা মিত্র? অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রমাণ হয়ে গেছে, তাঁরা হলেন শ্রমিক-কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী-চাকরিজীবী, নারী ও সংখ্যালঘু জাতি-ধর্মের নাগরিকেরা। গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছে যেসব ছাত্র, তারা তাঁদেরই সন্তান। তাই চাকরির অধিকার চাইতে গিয়ে ফ্যাসিবাদকেই অপসারণ করতে হয়।

মুসোলিনি ও হিটলার মনে করতেন, নারীর কাজ গৃহে। বড়জোর চিকিৎসক ও শিক্ষকতার পেশায়। নারীর মঙ্গল নারীর বদলে তাঁরাই নির্ধারণ করে দিতেন। তাঁদের তৈরি আদর্শ নারীর মডেলে নারীরা ফিরে যাবেন ঘরে; আর পুরুষ কাজ করবেন বাইরে। হিটলার মেয়েদের ঘরে ফেরাতে করলেন ‘বেকারত্ব প্রতিরোধ আইন’। যে মেয়েটি কাজ থেকে সরে এসে গৃহিণী হতে রাজি থাকতে, তাকে সুদহীন ঋণ দেওয়া হলো। প্রতিটি সন্তানের জন্য চার ভাগের এক ভাগ মকুব করা হলো। নারী-পুরুষের বিয়ের বয়স কমানো হলো। ইতালিতে মুসোলিনি চার্চের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিবাহবিচ্ছেদ নিষিদ্ধ করলেন।

১৮৮৬ সালে আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকেরা জীবন দিয়েছেন। সেই থেকে মে দিবস পালিত হয়। শ্রমিকেরা যদি বিনোদনের সময় না পান, তাহলে তো তাঁকে মানুষ হিসেবেই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। আট ঘণ্টা কর্মদিবস গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য। আশুলিয়া আর যাত্রাবাড়ীতে শ্রমিকদের গড়ে তুলতে হয় প্রতিরোধের স্তালিনগ্রাদ আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক মর্যাদা তাঁরা পাবেন না। পাওনা মজুরি চাইতে হয় রাস্তায়।

কৃষক-জেলেদের ৩০০ বছরের হাট ও ঘাটের জমিদারি উচ্ছেদে উদ্যোগ নেই। উপকূলের লবণচাষির কথা নেই। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণ কীভাবে হবে, সেটা নিয়ে আলাপ নেই, কৃষি সংস্কার কমিশন নেই। জেলা-উপজেলার সংস্কৃতিকর্মীদের মহড়ার ঘর নেই, উপস্থাপনের মঞ্চ নেই। শহরাঞ্চলে প্রতি ৫৫০ জনে একজন চিকিৎসক আর গ্রামাঞ্চলে প্রতি ৯ হাজার ৯০ জনে একজন ডাক্তার। এই চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে কথা কোথায়?

ঢাকার পাশের জেলাবাসীরা যে ভাড়ায় ট্রেনে রাজধানীতে আসতে পারেন, কুড়িগ্রাম কিংবা রাঙামাটির বাসিন্দারা একই ভাড়ায় তা পারেন? হাসিনা সরকার গত বছরের ৪ মে দূরত্বভিত্তিক রেয়াত বাতিল করে, সেই রেয়াত আর পুনর্বহাল হলো কই? ৩০০ বছরের ঔপনিবেশিক শহর ও গ্রামের বৈষম্য বিলোপের আলাপ ছাড়া গণ–অভ্যুত্থান শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত হবে কীভাবে?

মাওলানা ভাসানী তাঁর ‘মাও সে-তুঙ এর দেশে’ বইতে লিখেছেন, ‘মাও সে-তুঙ–এর দেশে আমাকে সব থেকে মুগ্ধ করেছে কী—এ প্রশ্ন অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছেন।...অনেক ভেবে দেখেছি, প্রশ্নটির জবাব আমি এককথায় দিতে পারি। —হাসি। হ্যাঁ, হাসিই আমায় সব থেকে বেশি মুগ্ধ করেছে। চীনের মানুষ আজ হাসতে পারে।...আমরা কি হাসির উৎসের সন্ধান পাবো না?’ —একটা জাতি হাসবে কীভাবে? অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসার জায়গাটা যখন নিশ্চিত, যখন তারা জানবে হঠাৎ অসুস্থ হলে রাষ্ট্র আছে, তখনই না হাসবে।

মুক্তিযুদ্ধে গ্রাম বাঁচিয়েছে বাংলাদেশকে। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ৫৪ বছরে একজন সরকারপ্রধানও কি রৌমারী, চিলমারী, ভূরুঙ্গামারীর যুদ্ধক্ষেত্রের গ্রামবাসীদের সঙ্গে দেখা করতে গেছেন? মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোতেও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ কলার ভেলায় যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে গেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করতে।

আধুনিক ব্যবস্থা ও স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শক্তিকে কেন কৃষক-জেলেদের মাঝে পাওয়া গেল না।

* নাহিদ হাসান: লেখক ও সংগঠক
nahidknowledge1@gmail.com

চব্বিশে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান নানা সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে
চব্বিশে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান নানা সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। ছবি : প্রথম আলো

কীভাবে ভারত–পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণরেখা বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক সীমান্ত হয়ে উঠল

ভারত ও পাকিস্তানকে বিভাজনকারী নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে বসবাস করার অর্থ যেন এক অনিশ্চিত জীবন কাটানো। সব সময়ই সংঘাতের আশঙ্কা তাঁদের ঘিরে থাকে। সেখানে শান্তি যেন এই আছে, এ নেই।

সম্প্রতি কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীর হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে তৈরি উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশ আবারও যুদ্ধের প্রান্তে এনে দাঁড়িয়েছিল। নিয়ন্ত্রণরেখার দুপাশেই গোলাবর্ষণ হয়েছে—ঘরবাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পাল্টাপাল্টি হামলায় ভারতের অংশে কমপক্ষে ১৬ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আর পাকিস্তান দাবি করেছে, সেখানে ৪০ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। তবে সরাসরি গোলাবর্ষণের কারণে প্রাণহানির সংখ্যা কত, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কানাডায় বসবাসরত পাকিস্তানি লেখক আনাম জাকারিয়া বিবিসিকে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণরেখায় বসবাসরত পরিবারগুলোকে ভারত ও পাকিস্তানের খেয়ালখুশি এবং দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনার শিকার হতে হচ্ছে।’

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর নিয়ে একটা বই লিখেছেন আনাম জাকারিয়া। তিনি বলেন, ‘প্রতিবার গুলি চলা শুরু হলে অনেকে বাংকারে ঢুকে পড়েন, গবাদিপশু ও জীবিকা নষ্ট হয়। ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের দৈনন্দিন জীবনে এই নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতার গভীর ছাপ পড়ে।’

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মোট ৩ হাজার ৩২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত আছে। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রণরেখার দৈর্ঘ্য ৭৪০ কিলোমিটার। এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। নিয়ন্ত্রণরেখার নাম শুরুতে ‘যুদ্ধবিরতি রেখা’ ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম যুদ্ধের পর ১৯৪৯ সালে এটি এ নামে পরিচিত হয়। ১৯৭২ সালে সিমলা চুক্তির আওতায় এটিকে ‘নিয়ন্ত্রণরেখা’ নামে পুনঃ নামকরণ হয়।

কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে চলে গেছে নিয়ন্ত্রণরেখা। ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই কাশ্মীরকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে থাকে। তবে দুই দেশই এর কিছু কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। নিয়ন্ত্রণরেখা বিশ্বের অন্যতম সামরিকীকৃত সীমান্ত। সেখানে সব সময়ই যেন সংঘাতের আশঙ্কা বিরাজ করে। যুদ্ধবিরতিগুলো ততক্ষণই স্থায়ী হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না পরবর্তী উসকানি আসে।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক হ্যাপিমন জ্যাকবের মতে, এই এলাকায় হালকা মাত্রার গোলাগুলি থেকে শুরু করে বড় পর্যায়ে ভূমি দখল বা সার্জিক্যাল স্ট্রাইক পর্যন্ত—বিভিন্নভাবে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হতে পারে। (ভূমি দখলের অর্থ হতে পারে পাহাড়ের চূড়া, সেনাচৌকি বা বাফার জোনের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো জোরপূর্বক দখল করে নেওয়া)।

বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, নিয়ন্ত্রণরেখা হলো ‘রক্তে আঁকা ও সংঘাতে গড়া’ একটি সীমান্তের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

আনাম জাকারিয়া বলেন, ‘এটি এমন একটি রেখা, যেটিকে ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মীরিদের মতামত বিবেচনায় না নিয়ে নিজেদের মতো করে টেনেছে। তারা এর সামরিকীকরণ করেছে, অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন করেছে।’

এ ধরনের যুদ্ধকালীন সীমানা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কিছু নয়।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক সুমন্ত্র বসু বলেন, এ ধরনের সীমান্তের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুপরিচিত হলো ১৯৪৯ সালের ‘গ্রিন লাইন’। এটি ইসরায়েল ও পশ্চিম তীরের মধ্যে সাধারণ সীমানা হিসেবে স্বীকৃত।

২০২১ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে নিয়ন্ত্রণরেখায় যে ক্ষীণ শান্তি বজায় ছিল, সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর তা মুহূর্তেই ভেঙে যায়।

কার্নেগি ইন্ডিয়ার বিশ্লেষক সূর্য ভালিয়াপ্পান কৃষ্ণ এ প্রসঙ্গে বিবিসিকে বলেন, নিয়ন্ত্রণরেখা ও আন্তর্জাতিক সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ের উত্তেজনার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, চার বছর সীমান্তে তুলনামূলক শান্তি বিরাজ করার পর এই ঘটনা ঘটল।

ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে সহিংসতার ঘটনা নতুন কিছু নয়। ২০০৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির আগে, ২০০১ সালে ৪ হাজার ১৩৪ বার এবং ২০০২ সালে ৫ হাজার ৭৬৭ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনার অভিযোগ তুলেছে ভারত।

প্রাথমিকভাবে ২০০৩ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হয়। ২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত খুব একটা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি। তবে ২০০৮ সালে আবার উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়। আর ২০১৩ সালের মধ্যে সে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে।

২০১৩ থেকে শুরু করে ২০২১ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণরেখা এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তে বড় ধরনের সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এরপর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন করে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তাৎক্ষণিক এবং ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা কমেছিল।

সূর্য ভালিয়াপ্পান কৃষ্ণ বলেন, ‘সীমান্তে তীব্র গোলাবর্ষণের সময় আমরা দেখেছি যে সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী হাজারো মানুষ মাসের পর মাস ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থেকেছে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও আন্তসীমান্ত গোলাগুলির কারণে সীমান্ত এলাকা থেকে ২৭ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীর হামলার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত করে নয়াদিল্লি। পাকিস্তান ১৯৭২ সালের সিমলা চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায়। এ সিমলা চুক্তিই নিয়ন্ত্রণরেখাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিল—যদিও এখন পর্যন্ত এ চুক্তি পুরোপুরি মেনে চলা হয়নি।

কৃষ্ণ বলেন, এ বিষয়টা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, সিমলা চুক্তি বর্তমান নিয়ন্ত্রণরেখার ভিত্তি, যা উভয় পক্ষই তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও একতরফাভাবে পরিবর্তন না করার বিষয়ে রাজি হয়েছিল।

জ্যাকবের মতে, কোনো এক ‘অদ্ভুত কারণে’ দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত নিয়ে আলোচনা ও বিতর্কগুলোতে নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়টি আসে না।

‘লাইন অন ফায়ার: সিজফায়ার ভায়োলেসেন্স অ্যান্ড ইন্ডিয়া-পাকিস্তান এসকেলেশন ডায়নামিকস’ শিরোনামে বই লিখেছেন হ্যাপিমন জ্যাকব। সেই বইয়ে তিনি লিখেছেন, ‘পরমাণু শক্তিধর দুই দেশ নিয়মিত ১০৫ মিমি মর্টার, ১৩০ ও ১৫৫ মিমি আর্টিলারি গান এবং ট্যাংকবিধ্বংসী গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্রের ব্যবহার করছে এবং এর ফলে বেসামরিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। আর এ বিষয়টি কীভাবে গবেষণামূলক বিশ্লেষণ ও নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ এড়িয়ে গেছে, তা বিস্ময়কর।’

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান বিষয় চিহ্নিত করেছেন হ্যাপিমন জ্যাকব: পাকিস্তান প্রায়ই ভারত–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জঙ্গি অনুপ্রবেশে সহায়তার জন্য ঢাল হিসেবে গুলিবর্ষণ করে। কাশ্মীর অঞ্চলটি তিন দশকের বেশি সময় ধরে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের সাক্ষী। অপর দিকে পাকিস্তানের অভিযোগ, ভারতই বরং কোনো উসকানি ছাড়াই বেসামরিক এলাকায় গুলি চালায়।

জ্যাকবের যুক্তি হচ্ছে, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক কৌশলের ফল নয় বরং তা স্থানীয় সামরিক বাস্তবতার প্রতিফলন।

প্রায়ই সীমান্ত এলাকার মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের মাধ্যমেই বৈরিতার সূচনা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে কখনো কখনো কেন্দ্রীয় অনুমোদন থাকলেও অধিকাংশ সময়ই অনুমোদন থাকে না। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পেছনে শুধু পাকিস্তান সেনাবাহিনীই দায়ী বলে যে অভিযোগটি তোলা হয়ে থাকে, তাকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, স্থানীয় সামরিক বাধ্যবাধকতা ও দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীগুলোকে দেওয়া একধরনের স্বায়ত্তশাসনের জটিল মিশ্রণ এ ক্ষেত্রে দায়ী।

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, প্রায় দুই দশক আগে ‘স্থগিত করা’ একটা ধারণাকে পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে। ধারণাটি হলো, নিয়ন্ত্রণরেখাকে একটি আনুষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তে পরিণত করা।

অনেকে আবার জোর দিয়ে বলেছেন, এই সম্ভাবনা কখনোই ‘বাস্তবসম্মত ছিল না’ এবং তা ‘এখনো সম্ভব নয়’।

এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক সুমন্ত্র বোস বিবিসিকে বলেন, এ ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে অবাস্তব ও অচল। কয়েক দশক ধরেই ভারতের মানচিত্রে জম্মু ও কাশ্মীরের পুরো অঞ্চলকেই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখানো হয়ে আসছে।’

সুমন্ত্র আরও বলেন, পাকিস্তানের জন্য নিয়ন্ত্রণরেখাকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ হবে কাশ্মীর ইস্যুকে ভারতের শর্ত অনুযায়ী মীমাংসা করা। সাত দশক ধরে বেসামরিক হোক কিংবা সামরিক—প্রতিটি পাকিস্তানি সরকার ও শাসকই এই প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।

২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘কাশ্মীর: রুটস অব কনফ্লিক্ট, পাথস টু পিস’ বইয়ে অধ্যাপক সুমন্ত্র বোস লিখেছেন, ‘কাশ্মীর সমঝোতার জন্য নিয়ন্ত্রণরেখাকে কাঁটাতার, বাংকার, পরিখা ও শত্রুভাবাপন্ন সেনাবাহিনীর লোহার পর্দার পরিবর্তে লিনেন কাপড়ের পর্দায় রূপান্তরিত করা প্রয়োজন। বাস্তব রাজনীতি বলছে, এই সীমান্ত চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে—হয়তো ভিন্ন নামে—তবু তাকে অতিক্রম করতে হবে, কিন্তু বিলোপ করে ফেলা যাবে না।’

২০০৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যবর্তী সময়টায় নিয়ন্ত্রণরেখাকে একধরনের ‘সফট বর্ডার’-এ রূপান্তরের প্রস্তাবটি কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তান শান্তি প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে।

বর্তমানে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে আবার উত্তেজনা দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি ওই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য ‘সহিংসতা এবং অনিশ্চয়তার চক্রকে’ ফিরিয়ে এনেছে।

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অবস্থিত একটি হোটেলের এক কর্মচারী সাম্প্রতিক সংঘর্ষের সময় বিবিসি উর্দুকে বলেছিলেন, ‘কখন কী হয়ে যাবে, কেউ জানে না। নিয়ন্ত্রণরেখার দিকে মুখ করে আজ রাতে কেউই ঘুমাতে চায় না।’

ওই কর্মীর কথাগুলো আরও একবার মনে করিয়ে দেয় যে জানালার ওপারে যখন যুদ্ধক্ষেত্র, তখন শান্তি আসলে কতটাই না ভঙ্গুর।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মোট ৩ হাজার ৩২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত আছে। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রণরেখার দৈর্ঘ্য ৭৪০ কিলোমিটার
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মোট ৩ হাজার ৩২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত আছে। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রণরেখার দৈর্ঘ্য ৭৪০ কিলোমিটার। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি